id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
4482
শামসুর রাহমান
একটি পুরনো ফটোগ্রাফ দেখে
প্রেমমূলক
যখন পুনেরো বছরের তটে তোমার শরীর তরঙ্গিত নিরিবিলি সেই তোমাকেই দেখলাম- রয়েছ দাঁড়িয়ে একা নাগরিক নিসর্গের মাঝে নিস্তব্ধ রমনা পার্কে শীতের দুপুরে। রোদ, হাওয়া নীরবে খাচ্ছিল চুমো তোমাকে নিবিড়। নীল শাড়ি, তোমার প্রথম শাড়ি, আসন্ন প্রখর যৌবনের সঙ্কেতে কেমন মদালসা। তুমি যেন সদ্য স্নান সেরে স্নিগ্ধতার সরোবরে মৃদু নিচ্ছিলে বিশ্রাম।নিষ্প্রভ রঙিন ফটোগ্রাফে প্রস্ফুটিত তরুণীর প্রেমের অনলে পুড়ি প্রথম দৃষ্টিতে। রূপ তার চিরদিন থাকবে অম্লান, সময়ের স্পর্শহীন। অধর,স্তনাগ্র, চোখ, গ্রীবা, ঊরু, নিতম্ব দেখছে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন অবিরাম; সে স্বপ্নের অভ্র-গুঁড়ো এখন আমার কবিতায় অলৌকিক স্পন্দমান।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-purono-fotograph-dekhe/
4446
শামসুর রাহমান
এ পথে আমার পর্যটন
প্রকৃতিমূলক
এ পথে আমার পর্যটন তেমন নতুন নয়, তবু কেন হঠাৎ একটি মোড়ে এসে দাঁড়ালে কেমন যেন অচেনা, অদেখা মনে হয়; আনন্দে ময়ূর হয় চেতনা আমার।এই গাছ ছিল না কোথাও, এই ঝিল কোনোদিন পড়েনি সতৃষ্ণ চোখে, এর জলে ডুবাই নি হাত আগে কিংবা তীরবর্তী ঘাসে শুয়ে কায়ক্লেশে ধীরে মুছে নিতে করিনি প্রয়াস।এ পথে বিশ্রাম নিলে বেশিক্ষণ, কখন যে চোখ নিভাঁজ, প্রগাঢ় ঘুমে বুজে আসে, ঝরে শুক্‌নো পাতা সমস্ত শরীরে, আহরিত জ্বলজ্বল আশরফি মাটির ঢেলা হয়ে যায় অবলীলাক্রমে।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/e-pothe-amar-porjoton/
19
অমিতাভ দাশগুপ্ত
নারীমেধ
মানবতাবাদী
এক‘মেয়েমানুষের মাংস এমনিতেই খেতে খুব স্বাদু, আর যদি দিশি মদে ভিজিয়ে ভিজিয়ে হায় হায় ভাবাই যায় না….. তাছাড়া এখন খুব পড়েছে মরশুম, ছয় মাসে ছ-ডজন নারীকে কিডন্যাপ করে চাকুমচুকুম ঢাউস ঢেঁকুর তুলে ‘ক্যায়সা খুশি কি রাত’…..গেয়ে নেচে চলে গেল ঘোর দেশপ্রেম, দ্যাখো, কি এলেম !!’দুই‘তুই কি আমার বোন ? তুমি আমার মা ? মুখে নখের আঁচড় কেন—-উদলা কেন গা ? গিয়েছিলাম বনে, বনে ছিল কালকেউটে কামড়াল নির্জনে। পুতের মত ভায়ের মত পাঁচটি সোনার ছা আশ মিটিয়ে মাস খেয়েছে উদলা করে গা ।’তিন—- মা কোথায় যাস ? —- পার্কে। — সাথে যাবে তোর আর কে ? — শ্যামের বিধবা বোন। দরজা ভেজিয়ে পথে নামে মেয়ে, ডুকরে ওঠে মা — শোন…….. শিস দিয়ে দিয়ে ছিনাল বাতাস বহে যায় শন শন।।’চার‘গাঁ থেকে এসেছে চাষার ঝিয়ারি ফুটপাতে পাল পাল, জানে না কোথায় কার পাশে শুলে হাত ভরে মেলে চাল।’পাঁচ‘মেয়েকে বসিয়ে ফাঁকা মাঠে বাপ দূরে দাঁতে ঘাস কাটে। দরের ব্যাপারে টনটনে কোলাকুলি সেয়ানে সেয়ানে। দিন রাত বছরে বছরে তবে না উনুনে হাড়ি চড়ে !’ছয়‘তখন ধূ- ধূ রাত। ছিটে বেড়ার ঘরের পাশে সাপের শিসের শব্দ। বোনের ঘরে গিয়েছিলাম। বোনের ঘর ফাঁকা। দিদির ঘরে গিয়েছিলাম। দিদির ঘর ফাঁকা। বাপের ঘরে ঢুকেই দেখি, প্যারালিটিক দুহাতে তাঁর আঁজলা -ভরা টাকা !’সাত . ‘তুমি তো নও যাজ্ঞসেনী, বাঁধবে, বেণী বাঁধবে। অশ্রু মুছে বাপের ভায়ের পোয়ের অন্ন রাঁধবে। কে খায়, তোমায় কে খায়, রাক্ষসদের মরণ আছে যজ্ঞিডালের মাথায়। রাবণবধের তলোয়ারের দু-কষ বেয়ে মর্চে অনেক প্রায়শ্চিত্তের পর ঝরছে—-একটু ঝরছে !’এক‘মেয়েমানুষের মাংস এমনিতেই খেতে খুব স্বাদু, আর যদি দিশি মদে ভিজিয়ে ভিজিয়ে হায় হায় ভাবাই যায় না….. তাছাড়া এখন খুব পড়েছে মরশুম, ছয় মাসে ছ-ডজন নারীকে কিডন্যাপ করে চাকুমচুকুম ঢাউস ঢেঁকুর তুলে ‘ক্যায়সা খুশি কি রাত’…..গেয়ে নেচে চলে গেল ঘোর দেশপ্রেম, দ্যাখো, কি এলেম !!’দুই‘তুই কি আমার বোন ? তুমি আমার মা ? মুখে নখের আঁচড় কেন—-উদলা কেন গা ? গিয়েছিলাম বনে, বনে ছিল কালকেউটে কামড়াল নির্জনে। পুতের মত ভায়ের মত পাঁচটি সোনার ছা আশ মিটিয়ে মাস খেয়েছে উদলা করে গা ।’তিন—- মা কোথায় যাস ? —- পার্কে। — সাথে যাবে তোর আর কে ? — শ্যামের বিধবা বোন। দরজা ভেজিয়ে পথে নামে মেয়ে, ডুকরে ওঠে মা — শোন…….. শিস দিয়ে দিয়ে ছিনাল বাতাস বহে যায় শন শন।।’চার‘গাঁ থেকে এসেছে চাষার ঝিয়ারি ফুটপাতে পাল পাল, জানে না কোথায় কার পাশে শুলে হাত ভরে মেলে চাল।’পাঁচ‘মেয়েকে বসিয়ে ফাঁকা মাঠে বাপ দূরে দাঁতে ঘাস কাটে। দরের ব্যাপারে টনটনে কোলাকুলি সেয়ানে সেয়ানে। দিন রাত বছরে বছরে তবে না উনুনে হাড়ি চড়ে !’ছয়‘তখন ধূ- ধূ রাত। ছিটে বেড়ার ঘরের পাশে সাপের শিসের শব্দ। বোনের ঘরে গিয়েছিলাম। বোনের ঘর ফাঁকা। দিদির ঘরে গিয়েছিলাম। দিদির ঘর ফাঁকা। বাপের ঘরে ঢুকেই দেখি, প্যারালিটিক দুহাতে তাঁর আঁজলা -ভরা টাকা !’সাত . ‘তুমি তো নও যাজ্ঞসেনী, বাঁধবে, বেণী বাঁধবে। অশ্রু মুছে বাপের ভায়ের পোয়ের অন্ন রাঁধবে। কে খায়, তোমায় কে খায়, রাক্ষসদের মরণ আছে যজ্ঞিডালের মাথায়। রাবণবধের তলোয়ারের দু-কষ বেয়ে মর্চে অনেক প্রায়শ্চিত্তের পর ঝরছে—-একটু ঝরছে !’
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a7-%e0%a6%85%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ad-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a7%8d/
1
অতুলপ্রসাদ সেন
ওগো নিঠুর দরদী
ভক্তিমূলক
ওগো নিঠুর দরদী, ও কি খেলছ অনুক্ষণ। তোমার কাঁটায় ভরা বন, তোমার প্রেমে ভরা মন, মিছে খাও কাঁটার ব্যথা, সহিতে না পার তা আমার আঁখিজল, ওগো আমার আঁখিজল তোমায় করেগো চঞ্চল তাই নাই বুঝি বিফল আমার অশ্রু বরিশন। ওগো নিঠুর দরদী। ডাকিলে কও না কথা, কি নিঠুর নিরবতা। আবার ফিরে চাও, তুমি আবার ফিরে চাও, বল ওগো শুনে যাও তোমার সাথে আছে আমার অনেক কথন। এ কি খেলছ অনুক্ষণ, ওগো নিঠুর দরদী।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4251.html
2175
মহাদেব সাহা
তোমার দুইটি হাতে পৃথিবীর মৌলিক কবিতা
প্রেমমূলক
তোমার দুহাত মেলে দেখিনি কখনো এখানে যে ফুটে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গোলাপ, তোমার দুহাত মেলে দেখিনি কখনো এখানে যে লেখা আছে হৃদয়ের গঢ় পঙক্তিগুলি। ফুল ভালোবাসি বলে অহঙ্কাল করেছি বৃথাই শিল্প ভালোবাসি বলে অনর্থক বড়োই করেছি, মূর্খ আমি বুঝি নাই তোমার দুখানি হাত কতো বেশি মানবিক ফুল- বুঝি নাই কতো বেশি অনুভূতিময় এই দুটি হাতের আঙুল। তোমার দুখানি হাত খুলে আমি কেন যে দেখিনি, কেন যে করিনি পাঠ এই শুদ্ধ প্রেমের কবিত। গোলাপ দেখেছি বলে এতোকাল আমি ভুল করেছি কেবল তোমার দুইটি হাত মেলে ধরে লজ্জায় এবার ঞাকি মুখ। তোমার দুইটি হতে ফুটে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গোলাপ, তোমার দুইটি হতে পৃথিবীর একমাত্র মৌলিক কবিতা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1372
1357
তসলিমা নাসরিন
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত
প্রেমমূলক
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু এখনো কেমন যেন হৃদয় টাটায়- প্রতারক পুরুষেরা এখনো আঙুল ছুঁলে পাথর শরীর বয়ে ঝরনার জল ঝরে। এখনো কেমন যেন কল কল শব্দ শুনি নির্জন বৈশাখে, মাঘ-চৈত্রে- ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু বিশ্বাসের রোদে পুড়ে নিজেকে অঙ্গার করি। প্রতারক পুরুষেরা একবার ডাকলেই ভুলে যাই পেছনের সজল ভৈরবী ভুলে যাই মেঘলা আকাশ, না-ফুরানো দীর্ঘ রাত। একবার ডাকলেই সব ভুলে পা বাড়াই নতুন ভুলের দিকে একবার ভালোবাসলেই সব ভুলে কেঁদে উঠি অমল বালিকা। ভুল প্রেমে তিরিশ বছর গেল সহস্র বছর যাবে আরো, তবু বোধ হবে না নির্বোধ বালিকার।
https://banglarkobita.com/poem/famous/411
4512
শামসুর রাহমান
এভাবে কতক্ষণ বসে থাকব
প্রেমমূলক
এভাবে কতক্ষণ বসে থাকব চোখ দুটোকে প্রতীক্ষা-কাতর করে? তুমি কি চাও আমার শরীর হয়ে উঠুক বল্মীকময়? আমার নিজস্ব ধ্যানে কেবল তোমাকেই ধ্রুবতারা মেনে ঠায় বসে থাকব মাসের পর মাস উপবাসে শীর্ণ? নিদ্রাহীনতায় রুক্ষ, জীর্ণ? যদি জানতে পারতাম তোমার প্রকৃত ইচ্ছা, আমি নিজেকে প্রস্তুত করে নিতাম সেই অনুসারে। এখন আমি সারাক্ষণ গোলকধাঁধায় ঘুরে মরছি; তোমার মন জুগিয়ে চলার পথ খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই। কখনও প্রজাপতি এসে আমাকে জিগ্যেশ করে আমি কেন এমন দিশেহারা? কখনও দোয়েল আমার কাঁধে এসে বসে, উদ্বিগ্ন সুরে জানতে চায় আমার মনের খবর আর কখনও জানলার পাশের গাছের ডালটি গ্রীবা বাড়িয়ে আমাকে সবুজ সমবেদনা জানায়। কী বলে ওদের উদ্বেগের ছায়া মুছে দেব, ভেবে পাই না। ওদের কাছ থেকে কিছু শব্দ সংগ্রহ করে নিজের নিঃসঙ্গতাকে তোমার পৌনঃপুনিক বিরূপতার কাঁটাগুলোকে সহনীয় করে তোলার জন্যে কয়েকটি পঙ্‌ক্তি রচনায় উদ্যোগী হই আষাঢ়ের এই গোধূলি বেলায়। বাল্মীকি হওয়া আমার সাধ্যাতীত। আমার হাতে তাঁর বীণা নেই। আমি একতারা বাজিয়ে বাজিয়ে সময় কাটাই। এই সুরে মুগ্ধ হবে গৌড়জন, এই অসম্ভব দাবি কি আমাকে সাজে? আমার এই একতারার সুর যদি তোমার শরীরে শস্য ক্ষেতের ঘ্রাণ বুনে দিতে পারে, যদি তোমার বিরূপতার অমাবস্যায় আনতে পারে জ্যোৎস্নার ঝলক, ঠোঁটের রুক্ষতায় ফোটাতে পারে গোলাপ, তবেই এই শূন্য ঘরে আমার বাউল-নাচ। একবার তুমি তোমার অভিমানের ধূলিঝড় থামিয়ে এই আমাকে একটিবার এসে দেখে যাও। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/evabe-kotokkhom-bose-thakbo/
3251
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেওয়া-নেওয়া -সানাই
প্রকৃতিমূলক
বাদল দিনের প্রথম কদমফুলআমায় করেছ দান,আমি তো দিয়েছি ভরা শ্রাবণেরমেঘমল্লারগান।সজল ছায়ার অন্ধকারেঢাকিয়া তারেএনেছি সুরের শ্যামল খেতেরপ্রথম সোনার ধান।আজ এনে দিলে যাহাহয়তো দিবে না কাল,রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।স্মৃতিবন্যার উছল প্লাবনেআমার এ গান শ্রাবণে শ্রাবণেফিরিয়া ফিরিয়া বাহিবে তরণীভরি তব সম্মান।
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%93%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%93%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%87/
2827
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একাল ও সেকাল
প্রকৃতিমূলক
বর্ষা এলায়েছে তার মেঘময় বেণী। গাঢ় ছায়া সারাদিন, মধ্যাহ্ন তপনহীন, দেখায় শ্যামলতর শ্যাম বনশ্রেণী। আজিকে এমন দিনে শুধু পড়ে মনে সেই দিবা-অভিসার পাগলিনী রাধিকার, না জানি সে কবেকার দূর বৃন্দাবনে। সেদিনও এমনি বায়ু রহিয়া রহিয়া। এমনি অশ্রান্ত বৃষ্টি, তড়িৎচকিত দৃষ্টি, এমনি কাতর হায় রমণীর হিয়া। বিরহিণী মর্মে-মরা মেঘমন্দ্র স্বরে। নয়নে নিমেষ নাহি, গগনে রহিত চাহি, আঁকিত প্রাণের আশা জলদের স্তরে। চাহিত পথিকবধূ শূন্য পথপানে। মল্লার গাহিত কারা, ঝরিত বরষাধারা, নিতান্ত বাজিত গিয়া কাতর পরানে। যক্ষনারী বীণা কোলে ভূমিতে বিলীন; বক্ষে পড়ে রুক্ষ কেশ, অযত্নশিথিল বেশ, সেদিনও এমনিতর অন্ধকার দিন। সেই কদম্বের মূল, যমুনার তীর, সেই সে শিখীর নৃত্য এখনো হরিছে চিত্ত– ফেলিছে বিরহ-ছায়া শ্রাবণতিমির। আজও আছে বৃন্দাবন মানবের মনে। শরতের পূর্ণিমায় শ্রাবণের বরিষায় উঠে বিরহের গাথা বনে উপবনে। এখনো সে বাঁশি বাজে যমুনার তীরে। এখনো প্রেমের খেলা সারা নিশি, সারা বেলা, এখনো কাঁদিছে রাধা হৃদয়কুটিরে।
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%93-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2/
3228
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুঃসময়-কল্পনা
চিন্তামূলক
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে, সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া, যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে, যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া, মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে, দিক্‌-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা– তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা। এ নহে মুখর বনমর্মরগুঞ্জিত, এ যে অজাগরগরজে সাগর ফুলিছে। এ নহে কুঞ্জ কুন্দকুসুমরঞ্জিত, ফেনহিল্লোল কলকল্লোলে দুলিছে। কোথা রে সে তীর ফুলপল্লবপুঞ্জিত, কোথা রে সে নীড়, কোথা আশ্রয়শাখা! তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা। এখনো সমুখে রয়েছে সুচির শর্বরী, ঘুমায় অরুণ সুদূর অস্ত-অচলে! বিশ্বজগৎ নিশ্বাসবায়ু সম্বরি স্তব্ধ আসনে প্রহর গনিছে বিরলে। সবে দেখা দিল অকূল তিমির সন্তরি দূর দিগন্তে ক্ষীণ শশাঙ্ক বাঁকা। ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা। ঊর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি মেলি অঙ্গুলি ইঙ্গিত করি তোমা-পানে আছে চাহিয়া। নিম্নে গভীর অধীর মরণ উচ্ছলি শত তরঙ্গ তোমা-পানে উঠে ধাইয়া। বহুদূর তীরে কারা ডাকে বাঁধি অঞ্জলি “এসো এসো’ সুরে করুণ মিনতি-মাখা। ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা। ওরে ভয় নাই, নাই স্নেহমোহবন্ধন, ওরে আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা। ওরে ভাষা নাই, নাই বৃথা বসে ক্রন্দন, ওরে গৃহ নাই, নাই ফুলশেজরচনা। আছে শুধু পাখা, আছে মহানভ-অঙ্গন উষা-দিশা-হারা নিবিড়-তিমির-আঁকা– ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%83%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%95%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a6%be/
397
কাজী নজরুল ইসলাম
প্রিয়ার রূপ
প্রেমমূলক
অধর নিসপিস নধর কিসমিস রাতুল তুলতুল কপোল; ঝরল ফুল-কুল, করল গুল ভুল বাতুল বুলবুল চপল। নাসায় তিলফুল হাসায় বিলকুল, নয়ান ছলছল উদাস, দৃষ্টি চোর-চোর মিষ্টি ঘোর-ঘোর, বয়ান ঢলঢল হুতাশ। অলক দুলদুল পলক ঢুল ঢুল, নোলক চুম খায় মুখেই, সিঁদুর মুখটুক হিঙুল টুকটুক, দোলক ঘুম যায় বুকেই। ললাট ঝলমল মলাট মলমল টিপটি টলটল সিঁথির, ভুরুর কায় ক্ষীণ শুরুর নাই চিন, দীপটি জ্বলজ্বল দিঠির। চিবুক টোল খায়, কী সুখ-দোল তায় হাসির ফাঁস দেয় – সাবাস। মুখটি গোলগাল, চুপটি বোলচাল বাঁশির শ্বাস দেয় আভাস। আনার লাল লাল দানার তার গাল, তিলের দাগ তায় ভোমর; কপোল-কোল ছায় চপল টোল, তায় নীলের রাগ ভায় চুমোর॥(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/priyar-rup/
4554
শামসুর রাহমান
কবির কণ্ঠস্বর
মানবতাবাদী
সীসার মতো আকাশ বিনত, গাছগুলি স্থাপত্য, তরতাজা রৌদ্রর রঙে অকস্মাৎ ধরেছে জং; ক’দিন ইঁদুরগুলোর জোটে নি এক কণা খাদ্য, বাঁধানো কবরগুলোয় মস্ত ফাটল।পেঁচা মূক, স্থবির; শ্মশান পেরিয়ে সৌন্দর্য ব্যান্ডেজ বাঁধা পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিরুদ্দেশ যাত্রায় লীন। একজন কবির বুক বুলেটে ঝাঁঝরা করে উল্লাসে মত্ত ওরা। ঘাসবঞ্চিত মাটি সন্তানহারা জননীর মতো দমকে দমকে ডুকরে ওঠে আর কবির কণ্ঠস্বর অমর্ত্য উৎসব স্পন্দমান লোকালয়ের অন্তরে।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobir-konthoswar/
4601
শামসুর রাহমান
কী ভাবছো তুমি_
প্রেমমূলক
কী ভাবছো? কী ভাবছো তুমি অন্তরালে? কাল রাত নির্ঘুম কেটেছে বুঝি? নানা স্তর থেকে অকস্মাৎ অসংখ্য বিলুপ্ত প্রাণী, সংহারপ্রবণ, সংহারপ্রবণ, অতি কোলাহলময় এবং অকুতোভয়, উঠে এসেছিল দিতে হানা তোমার এ জরাগ্রস্ত ঘরে? মেলেছিল রুক্ষ ডানা ভয়ঙ্কর কোনো পাখি ঢেকে দিতে অস্তিত্ব তোমার? নাকি ভুলে-যাওয়া সব পাখি, অস্পষ্ট ফুলের ঝাড় মনের ভিতরে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে দেখছো কর্কশ বালুচরে পড়ে আছো, যেখানে রঙের খেলা নেই, ফুলঘ্রাণ নেই একরত্তি, কতকাল কোনো গান বাজেনি তোমার প্রাণে। কেবলি ক্ষয়ের টানে একা উদাস চলেছো ভেসে, চতুর্দিকে কম্পমান বনরেখা।যে-জন বাজায় বেলা দু’হাতে একেলা, তুমি তার কাছ থেকে বহু দূরে চলে গ্যাছো, যার অন্ধকার ফুলের স্তবক হয়, জ্যোৎস্নায় সাঁতার কেটে, ডুব দিয়ে মল্লিকার বনে যে-জন আড়ালে দ্যাখে খুব মগ্ন হয়ে একটি অস্পষ্ট পরী, দ্যাখে সেই পরী মগের ভিতরে তার আঙুল ডুবিয়ে রত্ন, ঘড়ি, এবং পিঙ্গল চোখ তুলে আনে, তার পরগণা থেকে নির্বাসিত তুমি। তোমার মগজে ধূলিকণা ওড়ে অবিরত ইদানীং। এ ভীষণ বনবাস কখন কাটবে বলো? করে পাবে করোটি সুবাস?স্বপ্নের জটিল লতা-গুল্মময় হৃদয়ের তন্তুগুলি দ্রুত খাচ্ছে উঁই অগোচরে, বেলা যায়। পরিপার্শ্ব বিদেশ-বিভূঁই মনে হয়; কোথায় কী আছে বাসগৃহে, ফুটপাতে, দূরবর্তী গাছে, যেওনা-পল্লীর কাছে, ভুলে থাকো? কী ভাবছো? কী ভাবছো তুমি? ভাবছো কি মানুষের আলুথালু সত্তা দুঃস্বপ্নের জন্মভূমি? ভাবছো কি কৃষ্ণচূড়া প্রায় ডাকঘর অতিশয় শূন্য, মুছে যায় স্বপ্নাক্ষর কালো ফুঁয়ে বারংবার, ঝরণা তলে কেন কুড়োয় না ফুল সুধা, বুলেটের ঝড়ে আর্তস্বরে ডেকে যান দীর্ণ পাবলো নেরুদা?   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ki-vabcho-tumi/
1813
পূর্ণেন্দু পত্রী
গায়ত্রী মন্ত্রের আলো
চিন্তামূলক
কবিতা লেখার রাত ভিজে গেছে অঘ্রাণের উদাসীনতায়। সব ক্ষীপ্র অত্যুৎসাহে উদ্যোগে ও কর্মকান্ডে আজ লেগে আছে শিশিরের সাদা ফোঁটা জল বসন্তের গুচ্ছ বীজ। সাদা বালি, লাল বালি বারুদ গুড়োর গুঢ় বালি চরাচর থেকে উড়ে আমাদের জানালার গায়। বিস্ফোরণে পুড়ে পুড়ে বাতাসের নীল কন্ঠনালী তবু ন্যায়-নীতি মেনে কি জানাতে চায় শুনে রাখা ভাল। পায়ে রক্তদাগ, সূর্যে রাহুর দাঁতের কালো ছায়া। সন্ত্রাসের মেঘ চিরে প্রসবব্যাথার চোখে নক্ষত্রেরা তাকিয়ে রয়েছে কবিতার দিকে, গায়ত্রী মন্ত্রের আলো চেয়ে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1191
3693
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মন্ত্রেসে যে পূত রাখীররাঙা সুতো
প্রেমমূলক
মন্ত্রেসে যে পূত রাখীররাঙা সুতো বাঁধন দিয়েছিনু হাতে, আজ কিআছে সেটি সাথে। বিদায়বেলা এল মেঘের মতো ব্যেপে, গ্রন্থি বেঁধে দিতে দু হাত গেল কেঁপে, সেদিন থেকে থেকে চক্ষুদুটি ছেপে ভরে যে এল জলধারা। আজকে বসে আছি পথের এক পাশে, আমের ঘন বোলে বিভোল মধুমাসে তুচ্ছ কথাটুকু কেবল মনে আসে ভ্রমর যেন পথহারা– সেই-যে বাম হাতে একটি সরু রাখী– আধেক রাঙা, সোনা আধা, আজো কি আছে সেটি বাঁধা।পথ যে কতখানি কিছুই নাহি জানি, মাঠের গেছে কোন্‌ শেষে চৈত্র-ফসলের দেশে। যখন গেলে চলে তোমার গ্রীবামূলে দীর্ঘ বেণী তব এলিয়ে ছিল খুলে, মাল্যখানি গাঁথা সাঁজের কোন্‌ ফুলে লুটিয়ে পড়েছিল পায়ে। একটুখানি তুমি দাঁড়িয়ে যদি যেতে! নতুন ফুলে দেখো কানন ওঠে মেতে, দিতেম ত্বরা করে নবীন মালা গেঁথে কনকচাঁপা-বনছায়ে। মাঠের পথে যেতে তোমার মালাখানি প’ল কি বেণী হতে খসে আজকে ভাবি তাই বসে।নূপুর ছিল ঘরে গিয়েছ পায়ে প’রে– নিয়েছ হেথা হতে তাই, অঙ্গে আর কিছু নাই। আকুল কলতানে শতেক রসনায় চরণ ঘেরি তব কাঁদিছে করুণায়, তাহারা হেথাকার বিরহবেদনায় মুখর করে তব পথ। জানি না কী এত যে তোমার ছিল ত্বরা, কিছুতে হল না যে মাথার ভূষা পরা, দিতেম খুঁজে এনে সিঁথিটি মনোহরা– রহিল মনে মনোরথ। হেলায়-বাঁধা সেই নূপুর-দুটি পায়ে আছে কি পথে গেছে খুলে সে কথা ভাবি তরুমূলে।অনেক গীতগান করেছি অবসান অনেক সকালে ও সাঁজে অনেক অবসরে কাজে। তাহারি শেষ গান আধেক লয়ে কানে দীর্ঘ পথ দিয়ে গেছ সুদূর-পানে, আধেক-জানা সুরে আধেক-ভোলা তানে গেয়েছ গুন্‌ গুন্‌ স্বরে। কেন না গেলে শুনি একটি গান আরো– সে গান শুধু তব, সে নহে আর কারো– তুমিও গেলে চলে সময় হল তারো, ফুটল তব পূজাতরে। মাঠের কোন্‌খানে হারালো শেষ সুর যে গান নিয়ে গেল শেষে, ভাবি যে তাই অনিমেষে।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/montrese-je-put-rakhirranga-suto/
4394
শামসুর রাহমান
আমি আর করবো কত শোক
রূপক
আমি আর করবো কত শোক? অপরাহ্নে পাথরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে খুব উঁচু বুনো ঘাস সরাতে সরাতে মাঝে মধ্যে থমকে দাঁড়াই। ভূগর্ভস্থ কোনো স্তব্ধ সভ্যতার মতো নিস্তব্ধতা চর্তুদিকে। এদিক ওদিক, সবদিকে খানিক তাকিয়ে, পাথরের মধ্যে দিয়ে খুব উঁচু বুনো ঘাস সরাতে সরাতে দু’পায়ে বাজিয়ে নুড়ি এগোই একাকী।ছায়াচ্ছন্ন পথ, সাঁকো, উঠোন, ইঁদারা পুরোনো কালো পাম-সু, বিবর্ণ, বিবাহমণ্ডপ, নৈশ ভোজ, ঝলমলে গোরস্থান, নানান বয়সী কত মুখ ভেসে ওঠে বারংবার। খুব উঁচু বুনো ঘাস সরাতে সরাতে দু’পায়ে বাজিয়ে নুড়ি এগোই একাকী।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ami-ar-korbo-koto-shok/
817
জসীম উদ্‌দীন
নকশী কাঁথার মাঠ – ০৪
কাহিনীকাব্য
চার কানা দেয়ারে, তুই না আমার ভাই, আরও ফুটিক ডলক দে, চিনার ভাত খাই — মেঘরাজার গান চৈত্র গেল ভীষণ খরায়, বোশেখ রোদে ফাটে, এক ফোঁটা জল মেঘ চোঁয়ায়ে নামল না গাঁর বাটে | ডোলের বেছন ডোলে চাষীর, বয় না গরু হালে, লাঙল জোয়াল ধূলায় লুটায় মরচা ধরে ফালে | কাঠ-ফাটা রোদ মাঠ বাটা বাট আগুন লয়ে খেলে, বাউকুড়াণী উড়ছে তারি ঘূর্ণী ধূলী মেলে | মাঠখানি আজ শূণ্য খাঁ খাঁ, পথ যেতে দম আঁটে, জন্-মানবের নাইক সাড়া কোথাও মাঠের বাটে : শুকনো চেলা কাঠের মত শুকনো মাঠের ঢেলা, আগুন পেলেই জ্বলবে সেথায় জাহান্নামের খেলা | দরগা তলা দুগ্ধে ভাসে, সিন্নি আসে ভারে : নৈলা গানের ঝঙ্কারে গাঁও কানছে বারে বারে | তবুও গাঁয়ে নামল না জল, গগনখানা ফাঁকা ; নিঠুর নীলের বক্ষে আগুন করছে যেনে খাঁ খাঁ | উচ্চে ডাকে বাজপক্ষি “আজরাইলে”র ডাক, “খর দরজাল” আসছে বুঝি শিঙায় দিয়ে হাঁক! এমন সময় ওই গাঁ হতে বদনা-বিয়ের গানে, গুটি কয়েক আসলো মেয়ে এই না গাঁয়ের পানে | আগে পিছে পাঁচটি মেয়ে—পাঁচটি রঙে ফুল, মাঝের মেয়ে সোনার বরণ, নাই কোথা তার তুল | মাথায় তাহার কুলোর উপর বদনা-ভরা জল, তেল হলুদে কানায় কানায় করছে ছলাৎ ছল | মেয়ের দলে বেড়িয়ে তারে চিকন সুরের গানে, গাঁয়ের পথে যায় যে বলে বদনা-বিয়ের মানে | ছেলের দলে পড়ল সাড়া, বউরা মিঠে হাসে, বদনা বিয়ের গান শুনিতে সবাই ছুটে আসে | পাঁচটি মেয়ের মাঝের মেয়ে লাজে যে যায় মরি, বদনা হাতে ছলাৎ ছলাৎ জল যেতে চায় পড়ি | এ-বাড়ি যায় ও-বাড়ি যায়, গানে মুখর গাঁ, ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে যেন-রাম-শালিকের ছা | কালো মেঘা নামো নামো, ফুল তোলা মেঘ নামো, ধূলট মেঘা, তুলট মেঘা, তোমরা সবে ঘামো! কানা মেঘা, টলমল বারো মেঘার ভাই, আরও ফুটিক ডলক দিলে চিনার ভাত খাই! কাজল মেঘা নামো নামো চোখের কাজল দিয়া, তোমার ভালে টিপ আঁকিব মোদের হলে বিয়া! আড়িয়া মেঘা, হাড়িয়া মেঘা, কুড়িয়া মেঘার নাতি, নাকের নোলক বেচিয়া দিব তোমার মাথার ছাতি | কৌটা ভরা সিঁদুর দিব, সিঁদুর মেঘের গায়, আজকে যেন দেয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায়! দেয়ারে তুমি অধরে অধরে নামো | দেয়ারে তুমি নিষালে নিষালে নামো | ঘরের লাঙল ঘরে রইল, হাইলা চাষা রইদি মইল ; দেয়ারে তুমি অরিশাল বদনে ঢলিয়া পড় | ঘরের গরু ঘরে রইল, ডোলের বেছন ডোলে রইল ; দেয়ারে তুমি অধরে অধরে নামো | বারো মেঘের নামে নামে এমনি ডাকি ডাকি, বাড়ি বাড়ি চলল তারা মাঙন হাঁকি হাঁকি কেউবা দিল এক পোয়া চাল, কেউবা ছটাকখানি, কেউ দিল নুন, কেউ দিল ডাল, কেউ বা দিল আনি | এমনি ভাবে সবার ঘরে মাঙন করি সারা, রূপাই মিয়ার রুশাই-ঘরের সামনে এল তারা | রূপাই ছিল ঘর বাঁধিতে, পিছন ফিরে চায়, পাঁটি মেয়ের রূপ বুঝি ওই একটি মেয়ের গায়! পাঁচটি মেয়ে, গান যে গায়, গানের মতই লাগে, একটি মেয়ের সুর ত নয় ও বাঁশী বাজায় আগে | ওই মেয়েটির গঠন-গাঠন চলন-চালন ভালো, পাঁচটি মেয়ের রূপ হয়েছে ওরই রূপে আলো | রূপাইর মা দিলেন এনে সেরেক খানেক ধান, রূপাই বলে, “এই দিলে মা থাকবে না আর মান |” ঘর হতে সে এনে দিল সেরেক পাঁচেক চাল, সেরেক খানেক দিল মেপে সোনা মুগের ডাল | মাঙন সেরে মেয়ের দল চলল এখন বাড়ি, মাঝের মেয়ের মাথার ঝোলা লাগছে যেন ভারি | বোঝার ভারে চলতে নারে, পিছন ফিরে চায় ; রূপার দুচোখ বিঁধিল গিয়ে সোনার চোখে হায়! ***** ডলক = বৃষ্টি বেছন = বীজ বাউকুড়াণী = ঘূর্ণি বায়ু জাহান্নাম = নরক নৈলা গান = বৃষ্টি নামাবার জন্য চাষীরা এই গান গেয়ে থাকে খর-দরজাল = প্রলয়ের দিনে ইনি বেহেস্ত ও দোযখ মাথায় করে আসবেন | (খাড়া দর্জাল) রুশাই-ঘরের = রান্না ঘরের
https://banglarkobita.com/poem/famous/807
1573
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
খুকুর জন্য
প্রকৃতিমূলক
যার যেখানে জায়গা, যেন সেইখানে সে থাকে। যা মনে রাখবার, যেন রাখে নিতান্ত সেইটুকু। খুকু, ঘরে একটা জানলা চাই, বাইরে একটা মাঠ। উঠোনে একটিইমাত্র কাঠ- গোলাপের চারা আস্তেসুস্থে বড় হোক, কিচ্ছু নেই তাড়া। একদিন সকালে নিশ্চয় দেখব যে, তার ডালে ফুল ধরেছে। খুকু, তার-কিছু তো চাইনি, আমি চেয়েছি এইটুকু।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1580
4195
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
আনন্দ ভৈরবী
প্রকৃতিমূলক
আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি এমন ছিলনা আষাঢ় শেষের বেলা উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল আনন্দ ভৈরবী।আজ সেই গোঠে আসেনা রাখাল ছেলে কাঁদেনা মোহনবাঁশিতে বটের মূল এখনো বরষা কোদালে মেঘের ফাঁকে বিদ্যুৎ-রেখা মেলে।সে কি জানিতনা এমনি দুঃসময় লাফ মেরে ধরে মোরগের লাল ঝুঁটি সে কি জানিতনা হৃদয়ের অপচয় কৃপণের বামমুঠি।সে কি জানিতনা যত বড় রাজধানী তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর সে কি জানিতনা আমি তারে যত জানি আনখ সমুদ্দুর।আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি এমন ছিলনা আষাঢ় শেষের বেলা উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল আনন্দ ভৈরবী।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/ananda-bhairabi/
1801
পূর্ণেন্দু পত্রী
কী করে ভালোবাসবো
প্রেমমূলক
কী করে ভালোবাসবো বল কী করে ভালোবাসবো বল সখী, মরুভূমির মতন যদি প্রাণের দাহে অহরহই জ্বলি, হৃদয়ে যদি গভীর ক্ষত বালুচরের মতন গ্রাস করে, কী করে ভালোবাসবো বল কী করে ভালোবাসবো বল সখী। দগ্ধ যদি বুকের টানে আমার সব হাসিরা ঝরে যায়, আমার সব সকাল আর রাত্রি যদি কাঁদনে ছলোছলো, আমার সব সূর্যমুখী পাপড়ি ছিড়ে ধুলোয় যদি মেশে, কী করে ভালোবাসবো বল কী করে ভালোবাসবো বল সখী। আমার সুখ সাধের ঘরে পিদিম যদি না জ্বলে কোনোদিন, আমার দূর মাঠের শেষে দুগোছা ধান না যদি পায় রোদ আমার আম-মউল-স্বাদ হাওয়ায় যদি বারুদ-বিষ ছড়ায়, কী করে ভালোবাসবো বলকী করে ভালোবাসবো বল সখী। প্রতিটি অনাহারের রাতে সাপের ফনা দারালো তলোয়ার, প্রতিটি রোগশোকের দিনে বেদনা যেন শিকারী কোনো রাহু প্রতিটি মরা মনের ডালে শুকনো সব কুন্দকলি কাঁদে, মুক্তমাখা পাপিয়ারও সুখের গান শিকলে গাঁট বাঁধা। কী করে ভালোবাসবো আজ কী করে ভালোবাসাবো বল সখী, আঁধার -ঘোর আমার ঘরে যদি না কেউ বীরের মতো এসে জ্বালিয়ে যায় আগুনে এই পাষাণপুরী মনের মণি-মানিক, কী করে ভালোবাসবো তবে কী করে ভালোবাসবো বল সখী।
https://banglarkobita.com/poem/famous/327
2281
মহাদেব সাহা
স্বাধীন প্যালেস্টাইন তোমার জন্য এই কবিতা
মানবতাবাদী
আমার এই কবিতা, গোলাপ ও স্বর্ণচাঁপার প্রতি যার বিশেষ দুর্বলতা ছিলো যার তন্ময়তা ছিলো পাখি, ফুল ও প্রজাপতির দিকে সে এখন প্যালেস্টাইনী গেরিলাদের কানে স্বাধীনতার গান গাইছে; ইসরাইলী হামলায় ক্ষতবিক্ষত লেবাননের পল্লীতে সে এখন ব্যস্ত উদ্ধারকর্মী, হাতে শুশ্রূষার ব্যাগ নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাহুতে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে আমার এই কবিতা; ধ্বংসস্তপের মধ্যে কুড়িয়ে পাওয়া একটি ভাঙা গিটারে সে আবার বাজিয়ে দিচ্ছে প্রত্যাশার গান, আমার এই উদাসীন ও লাজুক কবিতাটিই এখন নক্ষত্র ও চন্দ্রমল্লিকার বদলে আহরণ করছে বুলেট- যে-হাতে গোলাপ কুড়াতো সেই হাতেই সে এখন প্যালেস্টাইন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিচ্ছে মেশিনগান, বুকে বাংলাদেশের নয় কোটি মাুনষের উষ্ণ ভালোবাসা নিয়ে আমার এই কবিতাটি এখন সারারাত জেগে আছে অবরুদ্ধ গেরিলাদের পাশে। আমার এই কবিতাটি এখন আহত একজন প্যালেস্টাইনী যোদ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র নার্স, যুদ্ধে মৃত লেবাননের সেই স্বজনহারা যুবতীটার জন্য আমার কবিতাটিই এখন ব্যথিত এপিটাফ; প্যালেস্টাইনের সেইসব শহীদ যাদের জন্য কোনো শোকের গান গাওয়া হয়নি আমার কবিতাটিই তাদের জন্য আজ সারাদিন শোকের গান গাইবে, শ্রাবণের বর্ষণের মতো আমার এই কবিতাটিই এখন তাদের কবরে ঝরে-পড়া নীরব শোকাশ্রু। স্বাধীন প্যালেস্টাইন তোমাকে কেউ স্বীকৃতি দেবে কি না দেবে সে-কথা আমার জানা নেই- কিন্তু আমার এই কবিতাটির নিবিড় উষ্ণতার মধ্যে প্যালেস্টাইন তোমার স্বাধীনতার চিরকালীন স্বীকৃতি লেখা রইলো; আমি জানি জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতির সনদপত্রের চাইতেও এই ভালোবাসার স্বীকৃতি অনেক বেশি মূল্যবান! তাই তোমাদের জন্য বাড়িয়ে দিচ্ছি বাংলাদেশের সবুজ মাঠের বিশাল হাতছানি, ভাটিয়ালি গানের ব্যঞ্জনা আর পৃথিবীর একই আকাশের অভিন্নতার সাথে আমার এই কবিতার রক্তিম অভিনন্দন।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1364
3828
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাহুর প্রেম
প্রেমমূলক
শুনেছি আমারে ভালোই লাগে না, নাই বা লাগিল তোর । কঠিন বাঁধনে চরণ বেড়িয়া চিরকাল তোরে রব আঁকড়িয়া লোহার শিকল-ডোর । তুই তো আমার বন্দী অভাগী, বাঁধিয়াছি কারাগারে, প্রাণের বাঁধন দিয়েছি প্রাণেতে, দেখি কে খুলিতে পারে । জগৎ-মাঝারে যেথায় বেড়াবি, যেথায় বসিবি, যেথায় দাঁড়াবি, বসন্তে শীতে দিবসে নিশীথে সাথে সাথে তোর থাকিবে বাজিতে এ পাষাণপ্রাণ চিরশৃঙ্খল চরণ জড়ায়ে ধ'রে-- একবার তোরে দেখেছি যখন কেমনে এড়াবি মোরে? চাও নাহি চাও, ডাকো নাই ডাকো, কাছেতে আমার থাকো নাই থাকো, যাব সাথে সাথে, রব পায় পায়, রব গায় গায় মিশি-- এ বিষাদ ঘোর, এ আঁধার মুখ, এ অশ্রুজল, এই ভাঙা বুক, ভাঙা বাদ্যের মতন বাজিবে সাথে সাথে দিবানিশি।।নিত্যকালের সঙ্গী আমি যে, আমি যে রে তোর ছায়া-- কিবা সে রোদনে কিবা সে হাসিতে দেখিতে পাইবি কখনো পাশেতে কভু সম্মুখে কভু পশ্চাতে আমার আঁধার কায়া । গভীর নিশীথে একাকী যখন বসিয়া মলিনপ্রাণে চমকি উঠিয়া দেখিবি তরাসে আমিও রয়েছি বসে তোর পাশে চেয়ে তোর মুখপানে । যে দিকেই তুই ফিরাবি বয়ান সেই দিকে আমি ফিরাব নয়ান, যে দিকে চাহিবি আকাশে আমার আঁধার মুরতি আঁকা-- সকলি পড়িবে আমার আড়ালে, জগৎ পড়িবে ঢাকা । দুঃস্বপনের মতো চিরকাল তোমারে রহিব ঘিরে, দিবসরজনী এ মুখ দেখিব তোমার নয়ননীরে চিরভিক্ষার মতন দাঁড়ায়ে রব সম্মুখে তোর । 'দাও দাও' বলে কেবলি ডাকিব, ফেলিব নয়নলোর । কেবলি সাধিব, কেবলি কাঁদিব, কেবলি ফেলিব শ্বাস, কানের কাছেতে প্রাণের কাছেতে করিব রে হাহুতাশ । মোর এক নাম কেবলি বসিয়া জপিব কানেতে তব, কাঁটার মতন দিবসরজনী পায়েতে বিঁধিয়ে রব । গত জনমের অভিশাপ-সম রব আমি কাছে কাছে, ভাবী জনমের অদৃষ্ট-হেন বেড়াইব পাছে পাছে।।যেন রে অকূল সাগর মাঝারে ডুবেছে জগৎ-তরী, তারি মাঝে শুধু মোরা দুটি প্রাণী-- রয়েছি জড়ায়ে তোর বাহুখানি, যুঝিস ছাড়াতে, ছাড়িব না তবু মহাসমুদ্র-'পরি । পলে পলে তোর দেহ হয় ক্ষীণ, পলে পলে তোর বাহু বলহীন-- দোহে অনন্তে ডুবি নিশিদিন, তবু আছি তোরে ধরি।।রোগের মতন বাঁধিব তোমারে দারুণ আলিঙ্গনে-- মোর যাতনায় হইবি অধীর, আমারি অনলে দহিবে শরীর, অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর কিছু রহিবে না মনে।।ঘুমাবি যখন স্বপন দেখিবি, কেবল দেখিবি মোরে-- এই অনিমেষ তৃষাতুর আঁখি চাহিয়া দেখিছে তোরে । নিশীতে বসিয়া থেকে থেকে তুই শুনিবি আঁধারঘোরে কোথা হতে এক ঘোর উন্মাদ ডাকে তোর নাম ধ'রে । নিরজন পথে চলিতে চলিতে সহসা সভয় গণি সাঁঝের আঁধারে শুনিতে পাইবি আমার হাসির ধ্বনি।।          হেরো অমোঘন মরুময়ী নিশা-- আমার পরান হারায়েছে দিশা, অনন্ত ক্ষুদা অনন্ত তৃষা করিতেছে হাহাকার । আজিকে যখন পেয়েছি রে তোরে এ চিরযামিনী ছাড়িব কী করে, এ ঘোর পিপাসা যুগযুগান্তে মিটিবে কি কভু আর! বুকের ভিতরে ছুরির মতন, মনের মাঝারে বিষের মতন, রোগের মতন, শোকের মতন রব আমি অনিবার।।জীবনের পিছে মরণ দাঁড়ায়ে, আশার পিছনে ভয়-- ডাকিনীর মতো রজনী ভ্রমিছে চিরদিন ধরে দিবসের পিছে সমস্ত ধরাময় । যেথায় আলোক সেইখানে ছায়া এই তো নিয়ম ভবে-- ও রূপের কাছে চিরদিন তাই এ ক্ষুদা জাগিয়া রবে।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rahur-prem/
4794
শামসুর রাহমান
তৃতীয় পক্ষ
মানবতাবাদী
রক্তচক্ষু রাম বলে রহিমকে, ‘এই দ্যাখ আমার রামদা, তোকে বলি দেবো’ রহিম পাকিয়ে চোখ বলে রামকে, ‘বেদ্বীন, এই তলোয়ার দিকে তোকে টুক্‌রো টুক্‌রো করে কুত্তাকে খাওয়াবো’। অনন্তর রামদা এবং তলোয়ারে কী ভীষণ ঠোকাঠুকি।একজন প্রশান্ত মানুষ, অস্ত্রহীন, ছুটে এসে দাঁড়লেন দু’জনের মাঝখানে, কণ্ঠে তার অনাবিল মৈত্রীর দোহাই। দু’দিকেই দুই অস্ত্র দ্বিধাহীন হানে তাকে। নির্মল, নির্বাক আসমান দ্যাখে রক্তধারা বয়ে যায় চৌরাস্তায়।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tritiyo-pokkho/
3997
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্পর্শমণি
গাথাকাব্য
নদীতীরে বৃন্দাবনে সনাতন একমনে জপিছেন নাম, হেনকালে দীনবেশে ব্রাহ্মণ চরণে এসে করিল প্রণাম। শুধালেন সনাতন, 'কোথা হতে আগমন, কী নাম ঠাকুর?' বিপ্র কহে, 'কিবা কব, পেয়েছি দর্শন তব ভ্রমি বহুদূর। জীবন আমার নাম, মানকরে মোর ধাম, জিলা বর্ধমানে-- এতবড়ো ভাগ্যহত দীনহীন মোর মতো নাই কোনোখানে। জমিজমা আছে কিছু, করে আছি মাথা নিচু, অল্পস্বল্প পাই। ক্রিয়াকর্ম-যজ্ঞযাগে বহু খ্যাতি ছিল আগে, আজ কিছু নাই। আপন উন্নতি লাগি শিব-কাছে বর মাগি করি আরাধনা। একদিন নিশিভোরে স্বপ্নে দেব কন মোরে-- পুরিবে প্রার্থনা! যাও যমুনার তীর, সনাতন গোস্বামীর ধরো দুটি পায়! তাঁরে পিতা বলি মেনো, তাঁরি হাতে আছে জেনো ধনের উপায়।'শুনি কথা সনাতন ভাবিয়া আকুল হন-- 'কী আছে আমার! যাহা ছিল সে সকলি ফেলিয়া এসেছি চলি-- ভিক্ষামাত্র সার।' সহসা বিস্মৃতি ছুটে, সাধু ফুকারিয়া উঠে, 'ঠিক বটে ঠিক। একদিন নদীতটে কুড়ায়ে পেয়েছি বটে পরশমানিক। যদি কভু লাগে দানে সেই ভেবে ওইখানে পুঁতেছি বালুতে-- নিয়ে যাও হে ঠাকুর, দুঃখ তব হবে দূর ছুঁতে নাহি ছুঁতে।'বিপ্র তাড়াতাড়ি আসি খুঁড়িয়া বালুকারাশি পাইল সে মণি, লোহার মাদুলি দুটি সোনা হয়ে উঠে ফুটি, ছুঁইল যেমনি। ব্রাহ্মণ বালুর 'পরে বিস্ময়ে বসিয়া পড়ে-- ভাবে নিজে নিজে। যমুনা কল্লোলগানে চিন্তিতের কানে কানে কহে কত কী যে! নদীপারে রক্তছবি দিনান্তের ক্লান্ত রবি গেল অস্তাচলে-- তখন ব্রাহ্মণ উঠে সাধুর চরণে লুটে কহে অশ্রুজলে, 'যে ধনে হইয়া ধনী মণিরে মান না মণি তাহারি খানিক মাগি আমি নতশিরে।' এত বলি নদীনীরে ফেলিল মানিক।২৯ আশ্বিন, ১৩০৬
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sporshomoni/
4583
শামসুর রাহমান
কালঘুম
রূপক
কথা ছিল না। আমরা যারা বুকের ভেতর ফুল, ধুলো আর আলকাতরার গন্ধমাখা হাওয়া টেনে নিই, সিগারেট ধরাই, সিনেমায় ভিড় বাড়াই, আপিশ করি আড্ডা দিই, বিছানায় যাই স্ত্রীর সঙ্গে, তাদের অনেকের বেঁচে থাকার কথা ছিল না। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলাম রাতে। রাস্তায় কুসংস্কারের মতো অন্ধকার। বাড়িটার সামনে এসে চমকে উঠি। খুব অচেনা মনে হয়। এর দেয়াল, দরজা, ছাদের কার্নিশ কিছুই যেন আগে দেখিনি। অথচ এই বাড়িতেই আমার নিত্যদিনের আসা-যাওয়া; রৌদ্র আর জ্যোৎস্নাপায়ী এ-বাড়ি আমার মুখস্থ। আর মুগ্ধাবেশে চেয়ে থাকি কখনো কড়িকাঠের দিকে, কখনো বা পুরানো জানালার নির্জনতায়। সারাদিন এক অস্বস্তি ছিল রোদে, হাওয়ায়। যেন রোদ আর হাওয়া থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হবে। চলে যেতে হবে জাহাজড়ুবির অসহায় যাত্রীর মতো। এই অস্বস্তি প্লেগের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা শহরে। একটা চাপা উত্তেজনা পথচারীদের দখল করে রেখেছে। ওরা অপেক্ষমাণ কিছু একটার জন্যে, যেমন নিদ্রামগ্ন চোখ স্বপ্নাচ্ছন্নতায় মেতে থাকে প্রত্যুষের প্রতীক্ষায়। ব্যাকা-ট্যারা গলির মোড়ে, পথের ধারে অফিসের কামরায়, করিডোরে ফিস্‌ফিসিয়ে কথা বলছে কয়েকজন। সেই মুহূর্তে কোনো ভাবোল্লাস তাদের মধ্যে তরঙ্গিত হচ্ছিলো কিনা জানি না। সারাদিনের পর স্টেডিয়ামের বইয়ের দোকানে সন্ধ্যা কাটিয়ে ক্লান্ত পায়ে বাড়ি ফিরি। সচরাচর এত তাড়াতাড়ি বাড়িমুখো হই না। উৎকণ্ঠা নিয়ে রাতে খাবার খেলাম, এলোমেলো কিছু ভাবলাম, তারপর যথারীতি গেলাম বিছানায়। বালিশে মাথা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মরহুম পিতার কথা মনে পড়লো। তাঁর উপস্থিতি টের পাই ঘরে। তাঁর পরনে সেই শাদা পাঞ্জাবি আর পা-জামা, মাথায় কালো মখমলী টুপি, হাতে লাঠি। লাঠির মুণ্ডে লতাপাতার নক্‌শা। হঠাৎ আমার ঘরে কেন তাঁর এই উপস্থিতি? তিনি কি আমাকে সতর্ক করে দিতে এসেছেন, যাতে কোনো খানা-খন্দে আমি মুখ থুবড়ে না পাড়ি? কিন্তু তিনি কোনো সতর্কবাণী উচ্চারণ করেননি। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন পারলৌকিক উদাসীনতায়। ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনে বর্ষীয়ান পয়গম্বরের মতো মনে হচ্ছিল তাঁকে, বিশেষত তাঁর টিকালো নাক আর সফেদ দাড়ির জন্য। এই দৃশ্যে এক ধরনের মহিমা ছিল। আমার পিতার কাছে অনেক কিছু শিখেছি আমি। কিন্তু সেই মুহূর্তে কেবল মনে পড়ছিল, তাঁর শেখানো একটা প্রবাদ-‘খোঁড়ার পা খালেই পড়ে। কেন মনে পড়ছিল, বলতে পারবো না। আমার পিতার গানের গলা ছিল না। বরং তিনি ছিলেন প্রকৃতই সুরছুট। তাঁর কণ্ঠে গাম্ভীর্য ছিল, ছিল না মাধুর্য। গান তিনি গাইতেন না। তবে কখনো কখনো বিছানায় শুয়ে-শুয়ে গুন গুন করতেন। শুধু একটি গানের বেসুরো গুঞ্জরণ শুনেছি তাঁর কণ্ঠে বারংবার ‘দিন ফুরালো, সমঝে চলো’-এই ক’টি শব্দ ছাড়া সে গানের কোনো কথা আমার মনে পড়ে না। আমার লেখার টেবিলের কাছে রাখা শূন্য চেয়ারটিতে তিনি বসে আছেন। নিঃসাড়, নিশ্চুপ। আমি উঠে বসতে চাই। তাঁকে তাজিম দেখানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু পারি না। আমাকে কেউ যেন গেঁথে দিয়েছে বিছানায়। আমি ছটফট করছি শয্যাত্যাগের জন্যে, পিতার সঙ্গে কথা বলার জন্যে। শয্যাবন্দি আমি বাক্‌ শক্তিরহিত। জনক তাঁর পুত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন ভাবলেশহীন। ঘরের ভেতর কয়েকটি শজারু আর উড়ুক্কু মাছ। তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ওদের প্রতি, যেন তিনি ওদের নিয়ে এসেছেন সঙ্গে লাঠির সংকেতে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টের পাইনি। শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন। গাছের গুঁড়ির মতো ঘুমোতে থাকি। ঘর কেঁপে ওঠে বারবার, ঘুমের ভেতরে টের পাই। তখন ক’টা বাজে জানতে পারিনি। ঘড়ি দেখার মতো উৎসাহ ছিল না এত ক্লান্ত ছিলাম সে-রাতে। গাঢ় ঘুমে চোখ বুঝে আসছিল। ভয়ংকর শব্দসমূহ সেই ঘুমে সামান্য চিড় ধড়িয়ে ছিল মাত্র তার বেশি কিছু নয়। মাতাল যেমন সাময়িক মতিচ্ছন্নতায় বোধের বাইরে পড়ে থাকে, তেমনি আমি ছিলাম সে-রাতে। আমার সীমাহীন অবসাদ, নিষ্ক্রিয়তা আর পাথুরে ঘুম আমার শয্যাসঙ্গিনীর মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল। মাঝে মাঝে ভয়ানক শব্দ শুনে চমকে-ওঠা ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকা ছিল না আমাদের। ঘুমন্ত আমরা টের পাইনি কি ভয়াবহ এক সকাল অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। একটি সকাল কী ভীষণ বদলে দিলো সন্ত্রস্ত আমাকে আর ভিন-দেশী জেনারেলদের বুটজুতোয় থেঁৎলে-যাওয়া, বুলেটের ঝড়ে ক্ষত-বিক্ষত আমার আপন শহরকে।(অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kalghum/
3359
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পর ও আত্মীয়
নীতিমূলক
ছাই বলে, শিখা মোর ভাই আপনার, ধোঁওয়া বলে, আমি তো যমজ ভাই তার। জোনাকি কহিল, মোর কুটুম্বিতা নাই, তোমাদের চেয়ে আমি বেশি তার ভাই।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/por-o-atmiyo/
5228
শামসুর রাহমান
শুচি হয়
মানবতাবাদী
কখনো দূর থেকে কখনো খুব কাছে থেকে আমাকে আমার কবিতা সঙ্গ দ্যায়। অপরূপ গোসলের পানি শীতল ধারায় ধুঁইয়ে দ্যায় দেহমনের ক্লেদ নীল পদ্ম হয়ে ফুটি। আমার এই জন্মান্তরকে কেমন করে নিরাপদে রোদ বৃষ্টি অথবা আগুনের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাব?আজ মধ্যরাতে, চাঁদ যখন নির্বাসনে তারামণ্ডলী গা ঢাকা দিয়েছে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের মতো, যখন স্বৈরাচারীরা ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি করে কিংবা নাক ডেকে ঘুমায়, তখন আমি মনস্থির করে ফেলেছি আমার কবিতা বিষয়ে। এতকাল যে ধারণার সঙ্গে লদকা লদকি করেছি অষ্টপ্রহর, তাকে অন্ধকার স্রোতে বন্যা উপদ্রুত এলাকার, লাশের মতো ভাসিয়ে দিতে এতটুকু দ্বিধা করিনি।আমার কবিতায় থাকবে না সেই ভঙ্গি, যা ভড়কে দেখে পাঠককে, যার ধাক্কায় পা হড়কে পড়বে কবিযশঃ প্রার্থীরা কিংবা যার মর্মোদ্ধার করার প্রাণান্তকর, চেষ্টা হোঁৎকা সমালোচকগণ শেষটায় মাথা চুলকোতে চুলকোতে ঘা করে ফেলবেন এবং এমন এক জগাখিচুড়ি, ফিসফিসে থিসিস দাঁড় করাবেন, যারা মাথামুণ্ড তারা নিজেরাও বুঝতে পারবেন না। আমার কবিতার ভাষা কস্মিনকালেও বিজ্ঞাপনের ন্যাকা বুলির মতো হবে না, এমন শব্দাবলী তাতে থাকবে না যাতে বারবার তাক থেকে নামাতে হয় স্ফীতোদর অভিধান। আমার কবিতার ভাষায় বেজে উঠবে দিনানুদৈনিক জীবনযাপনের ছন্দ। আমার কবিতা অশালীন। চলচ্চিত্রের নায়িকার কোমর আর নিতম্বের দুলুনি অথবা লম্বা ঘোমটার নিচে খ্যামটা নাচ কিংবা কালো বোরখা ঢাকা জবুথবু ঢঙের বিরোধী, আমার কবিতা সবে কামরুল হাসানের সেই তন্বীর মতো যে ঢেঁকিতে ধান কোটে, গভীর ইঁদারা থেকে শক্ত হাতে রশি টেনে বালতি ভরা পানি তোলে গ্রীষ্মের দুপুরে হাড়-কাঁপানো শীতের সকালে।আমার কবিতা, আমি ঘোষণা করছি, কখনো স্বৈরাচারী শাসক, নষ্ট মন্ত্রী, ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদ, কালোবাজারি আর চোরাচালানিদের সঙ্গে ফুলের তোড়া সাজানো এক টেবিলে ডিনার খেতে প্রবল অনাগ্রহী, বরং গরিব গেরস্তের ঘরে ভাগ করে খাবে চিড়ে গুড়। জেনে রাখুন আমার কবিতা পুলিশের লাঠি আর বন্দুকের উদ্যত নল দেখে দেবে না চম্পট। আমার কবিতা নয় গালে ঘাড়ে পাউডার-বুলানো বিদূষক কিংবা বিশুদ্ধ গোলাপি আমেজে মশগুল বুলবুলের সুরমুগ্ধ ফুলবাবু, আমার কবিতা জয়নুল আবেদিনের গুণ টানা মাঝি। যার বেঁকে যাওয়া পিঠে ছড়িয়ে পড়ে ঘামমুক্তো আর সূর্যাস্তের রঙ।আমার কবিতা গণঅভ্যুত্থানের চূড়ায় নূহের দীপ্তিমান জলযান, আমার কবিতা বলিভিয়ার জঙ্গলে চেগুয়েভেরার বয়ে যাওয়া রক্তের চিহ্ন গায়ে নিয়ে হেঁটে যায় মাথা উঁচিয়ে যারা ডুগডুগি বাজিয়ে যখন ইচ্ছে গণতন্ত্রকে বাঁদর-নাচ নাচায় তাদের পাকা ধানে মই দ্যায় আবার কবিতা ফুঃ বলে উড়িয়ে দ্যায় দুর্দশার মুষলপর্ব। আমার কবিতা নাজিম হিকমতের মতো জেলের নীরন্ধ্র কুঠরীতে বসে মুক্তির অক্ষরে লেখে আত্মজীবনী।আমার কবিতা বেঈমান অন্ধকারের বুকে ঈগলের মতো নখর আর চঞ্চু বসিয়ে ঠুকরে ঠুকরে বের করে আনে ফিনকি-দেয়া আলো এবং সেই আলোর ঝরনাধারায় শুচি, হয় শুচি হয়, শুচি হয়।   (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shuchi-hoy/
3945
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাধ
প্রকৃতিমূলক
অরুণময়ী তরুণী উষা জাগায়ে দিল গান। পুরব মেঘে কনকমুখী বারেক শুধু মারিল উঁকি, অমনি যেন জগৎ ছেয়ে বিকশি উঠে প্রাণ। কাহার হাসি বহিয়া এনে করিলি সুধা দান। ফুলেরা সব চাহিয়া আছে আকাশপানে মগন-মনা, মুখেতে মৃদু বিমল হাসি নয়নে দুটি শিশির-কণা। আকাশ-পারে কে যেন ব'সে, তাহারে যেন দেখিতে পায়, বাতাসে দুলে বাহুটি তুলে মায়ের কোলে ঝাঁপিতে যায়। কী যেন দেখে, কী যেন শোনে-- কে যেন ডাকে, কে যেন গায়-- ফুলের সুখ, ফুলের হাসি দেখিবি তোরা আয় রে আয়। আ মরি মরি অমনি যদি ফুলের মতো চাহিতে পারি। বিমল প্রাণে বিমল সুখে বিমল প্রাতে বিমল মুখে ফুলের মতো অমনি যদি বিমল হাসি হাসিতে পারি। দুলিছে, মরি, হরষ-স্রোতে, অসীম স্নেহে আকাশ হতে কে যেন তারে খেতেছে চুমো, কোলেতে তারি পড়িছে লুটে। কে যেন তারি নামটি ধ’রে ডাকিছে তারে সোহাগ ক'রে শুনিতে পেয়ে ঘুমের ঘোরে মুখটি ফুটে হাসিটি ফোটে, শিশুর প্রাণে সুখের মতো সুবাসটুকু জাগিয়া ওঠে। আকাশ পানে চাহিয়া থাকে, না জানি তাহে কী সুখ পায়। বলিতে যেন শেখে নি কিছু, কী যেন তবু বলিতে চায়। আঁধার কোণে থাকিস তোরা, জানিস কি রে কত সে সুখ, আকাশপানে চাহিলে পরে আকাশপানে তুলিলে মুখ। সুদূর দূর, সুনীল নীল, সুদূরে পাখি উড়িয়া যায়। সুনীল দূরে ফুটিছে তারা, সুদূর হতে আসিছে বায়। প্রভাতকরে করি রে স্নান ঘুমাই ফুলবাসে, পাখির গান লাগে রে যেন দেহের চারি পাশে। বাতাস যেন প্রাণের সখা, প্রবাসে ছিল, নতুন দেখা, ছুটিয়া আসে বুকের কাছে বারতা শুধাইতে। চাহিয়া আছে আমার মুখে, কিরণময় আমারি সুখে আকাশ যেন আমারি তরে রয়েছে বুক পেতে। মনেতে করি আমারি যেন আকাশ-ভরা প্রাণ, আমারি প্রাণ হাসিতে ছেয়ে জাগিছে উষা তরুণ মেয়ে, করুণ আঁখি করিছে প্রাণে অরুণসুধা দান। আমারি বুকে প্রভাতবেলা ফুলেরা মিলি করিছে খেলা, হেলিছে কত, দুলিছে কত, পুলকে ভরা মন, আমারি তোরা বালিকা মেয়ে আমারি স্নেহধন। আমারি মুখে চাহিয়া তোর আঁখিটি ফুটিফুটি। আমারি বুকে আলয় পেয়ে হাসিয়া কুটিকুটি। কেন রে বাছা, কেন রে হেন আকুল কিলিবিলি, কী কথা যেন জানাতে চাস সবাই মিলি মিলি। হেথায় আমি রহিব বসে আজি সকালবেলা নীরব হয়ে দেখিব চেয়ে ভাইবোনের খেলা। বুকের কাছে পড়িবি ঢলে চাহিবি ফিরে ফিরে, পরশি দেহে কোমলদল স্নেহেতে চোখে আসিবে জল, শিশিরসম তোদের ‘পরে ঝরিবে ধীরে ধীরে।হৃদয় মোর আকাশ-মাঝে তারার মতো উঠিতে চায়, আপন সুখে ফুলের মতো আকাশপানে ফুটিতে চায়। নিবিড় রাতে আকাশে উঠে চারি দিকে সে চাহিতে চায়, তারার মাঝে হারায়ে গিয়ে আপন মনে গাহিতে চায়। মেঘের মতো হারায় দিশা আকাশ-মাঝে ভাসিতে চায়-- কোথায় যাবে কিনারা নাই, দিবসনিশি চলেছে তাই বাতাস এসে লাগিছে গায়ে, জোছনা এসে পড়িছে পায়ে, উড়িয়া কাছে গাহিছে পাখি, মুদিয়া যেন এসেছে আঁখি, আকাশ-মাঝে মাথাটি থুয়ে আরামে যেন ভাসিয়া যায়, হৃদয় মোর মেঘের মতো আকাশ-মাঝে ভাসিতে চায়। ধরার পানে মেলিয়া আঁখি উষার মতো হাসিতে চায়। জগৎ-মাঝে ফেলিতে পা চরণ যেন উঠিছে না, শরমে যেন হাসিছে মৃদু হাস, হাসিটি যেন নামিল ভুঁয়ে, জাগায়ে দিল ফুলেরে ছুঁয়ে, মালতীবধূ হাসিয়া তারে করিল পরিহাস। মেঘেতে হাসি জড়ায়ে যায়, বাতাসে হাসি গড়ায়ে যায়, উষার হাসি--ফুলের হাসি-- কানন-মাঝে ছড়ায়ে যায়। হৃদয় মোর আকাশে উঠে উষার মতো হাসিতে চায়।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shadh/
5432
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আজব লড়াই
মানবতাবাদী
ফেব্রুয়ারী মাসে ভাই, কলকাতা শহরে ঘটল ঘটনা এক, লম্বা সে বহরে! লড়াই লড়াই খেলা শুরু হল আমাদের, কেউ রইল না ঘরে রামাদের শ্যামাদের; রাস্তার কোণে কোণে জড়ো হল সকলে, তফাৎ রইল নাকো আসলে ও নকলে, শুধু শুনি ‘ধর’ ‘ধর’ ‘মার’ ‘মার’ শব্দ যেন খাঁটি যুদ্ধ এ মিলিটারী জব্দ। বড়রা কাঁদুনে গ্যাসে কাঁদে, চোখ ছল ছল হাসে ছিঁচকাঁদুনেরা বলে, ‘সব ঢাল জল’। ঐ বুঝি ওরা সব সঙ্গীন উঁচোলো, ভয় নেই, যত হোক বেয়নেট ছুঁচোলো, ইট-পাটকেল দেখি রাখে এরা তৈরি, এইবার যাবে কোথা বাছাধন বৈরী! ভাবো বুঝি ছোট ছেলে, একেবারে বাচ্চা! এদের হাতেই পাবে শিক্ষাটা আচ্ছা; ঢিল খাও, তাড়া খাও, পেট ভরে কলা খাও, গালাগালি খাও আর খাও কানমলা খাও। জালে ঢাকা গাড়ি চড়ে বীরত্ব কি যে এর বুঝবে কে, হরদম সামলায় নিজেদের। বার্মা-পালানো সব বীর এরা বঙ্গে যুদ্ধ করছে ছোট ছেলেদের সঙ্গে; ঢিলের ভয়েতে ওরা চালায় মেশিনগান, “বিশ্ববিজয়ী” তাই রাখে জান, বাঁচে মান। খালি হাত ছেলেদের তেড়ে গিয়ে করে খুন; সাবাস! সাবাস! ওরা খেয়েছে রাজার নুন। ডাংগুলি খেলা নয়, গুলির সঙ্গে খেলা, রক্ত-রাঙানো পথে দু’পাশে ছেলের মেলা; দুর্দম খেলা চলে, নিষেধে কে কান দেয়? ও-বাড়ি ও ও-পাড়ার কালো, ছোটু প্রাণ দেয়। স্বচে দেখলাম বস্তির আলী জান, ‘আংরেজ চলা যাও’ বলে ভাই দিল প্রাণ। এমন বিরাট খেলা শেষ হল চটপট বড়দের বোকামিতে আজো প্রাণ ছটফট; এইবারে আমি ভাই হেরে গেছি খেলাতে, ফিরে গেছি দাদাদের বকুনির ঠেলাতে; পরের বারেতে ভাই শুনব না কারো মানা, দেবই, দেবই আমি নিজের জীবনখানা ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1911
4380
শামসুর রাহমান
আমার নির্মাণ
মানবতাবাদী
আমার নির্মাণ আজ আমাকেই বড়ো ব্যঙ্গ করে। যা-কিছু গড়েছি এতদিন বেলা অবেলায় প্রায় প্রত্যহ নির্মম শ্রমে, সেসবই কি তবে, হায়, খড়ের কুটোর মতো পরিণামহীন জলে-ঝড়ে? আমিতো দিয়েছি ডুব বারংবার, পাতালের ঘরে দানবের মুখোমুখি নিয়ত থেকেছি বসে আর পর্বতচূড়ায় অনাহারে কাটিয়েছি দিন হাড় কালি ক’রে; জঙ্গলের জটাজালে আছি হেলাভরেএখনো প্রত্যাশাময়। রক্ত দিয়ে লিখি রাত্রিদিন শূন্যের দেয়ালে কত পংক্তিমালা, সবই কি অসার? এই যে স্বপ্নের মতো অনুপম ঘরগেরস্থালি, অথবা নিঝুম বনস্থলী, হ্রদ, চকচকে মীন জেগে ওঠে শূন্যতায় অকস্মাৎ-এ-ও কি নচ্ছার কারুর জঠরে যাবে? আমার নির্মাণ ধুলো-বালি?   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-nirman/
4238
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
মুহূর্তে শতাব্দী
চিন্তামূলক
ওই বাড়ি, শিরীষের পাতায় আহত… এ-সত্য মৃত্যুর হিম ছোঁয়া দিয়ে তাকে ব’লে যাবে, আজই নয়, কিন্তু কাল তোর মসৃণ চূড়াটি ভাঙবো, পলেস্তরা খশাবো পীযূষে ভাঙবো, ভেঙে টুকরো করবো ইট কাঠ পাথর প্রতিমা শব্দের…শিরীষ তাই ছুঁয়ে গেলো মহিমা দুপুরে চুল-নাড়া খুশকি যেন, বালক বোকার পচা রাগ নিতান্ত সামান্য তার ঝরে-পড়া ধেয়ানি শহরে মসজিদের পাশাপাশি, কাঁচা ফল রোদের উপর ভয়ংকর ম্লান পাতা, তবু কত চোখ উন্নাসিক দ্যাখে ব্যস্ত চঞ্চল রঙিন চুড়ো-করা উড়ো মেয়ে পাগল একটি শুধু স্পৃষ্ট হয় হেমন্তবিদ্যুতে বলে, থাকো, চেয়ে থাকো, মৃত্যু এসে দাঁড়াবে এখানে পুলিশের মতো স্পষ্ট, হেমন্তের পাতায় আহত থাকো, তুমি চেয়ে থাকো–মুহূর্তে শতাব্দী সৃষ্টি হবে।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/muhurte-shotabdi/
4343
শামসুর রাহমান
আজীবন আমি
প্রেমমূলক
আমার হৃদয়ে ছিল লোকোত্তর সফল বাগান তর্কাতীত ঐশ্বর্যে ভাস্বর। কোনো দিন সময়ের সিংহবর্ণ মরুভূমি তাকে পারেনি ডোবাতে তরঙ্গিত বালির কবরে, অথবা উটের দীর্ঘ কোনো বেঢপ পায়ের নিচে হয়নি দলিত বাগানের কোমল পরাগ।বরং সেখানে বহু চৈত্রসন্ধ্যা তার সুরভিত প্রশান্ত চিকুর দিয়েছে এলিয়ে বারবার, আর কত চকিত রাত্রির নীলিমায় আকাশের বাঁকা সিঁড়ি বেয়ে এসেছে তো রক্তকরবীর ডালে শব্দহীন চাঁদ সে-চাঁদ দু’জনে মিলে দেখেছি অনেক সপ্রেম প্রহরে; কতবার সে চাঁদের স্মৃতি-ছবি এঁকেছি নিভৃত মনে শিল্পীর প্রজ্ঞায়।তুমিও দেখেছ রাত্রির মুকুরে ভাসে অগণন তারার বিস্ময়; হৃদয়ের হ্রদে নীল তারা জলের শয্যায় শুয়ে দেখে কত স্বপ্ন অলৌকিক। আমরা দু’জন সেই স্বপ্নের মেদুর অংশ হয়ে নিয়েছি প্রাণের উন্মীলনে জীবনের দান-আর এ বাগান আজও মুঞ্জরিত, আজও।এখানে বাগানে আমার প্রভাত হয়, রাত্রি নামে, উৎসারিত কথাহৃদয়ের সোনালি রুপালি মাছ হয়ে ভাসে আর বসন্তের আরক্ত প্রস্তাবে প্রজ্বলিত, উন্মোচিত তুমি। বাগানে আবার ঐ বর্ষার সঙ্গীত সমস্ত সত্তায় আনে অপরূপ শ্যামল আবেগ। জ্যোৎস্নার লাবণ্যে আর রৌদ্রের স্বতন্ত্র মহিমায় তুমি তন্বী গাছের বিন্যাসে আছ এই বাগানে আমার গানে গানে জীবনের দানে উল্লসিত। এবং তোমার প্রাণ প্রতিটি ফুলের উন্মোচনে শিহরিত আর উত্তপ্ত তামার মতো বাস্তবের পরিধি পেরিয়ে অভীপ্সা তোমার প্রসারিত, মনে হয়, সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কোনো জীবনের দিকে যে-জীবন পৃথিবীর প্রথম দিনের মতোই বিস্মিত চোখ রাখে আগন্তুক ভবিষ্যের চোখে অথবা প্রেমের মতো উজ্জ্বল সাহসে ভাঙা-চোরা পথে, আবর্তে আবর্তে খোঁজে চির-অচেনাকে, এমনকি হাত রাখে নিশ্চিন্তে অকল্যাণের হাতে।যখন জীবনে সেই বাগানের সঞ্চারী সুরভি ধ্রুপদী গানের মতো, সন্ধ্যার ধূপের মতো অর্পিত আবেগে করে স্তব ঈপ্সিতের, সেই ক্ষণে তোমাকেই খুঁজি বাগানের মধুর উপমা তোমার অস্তিত্বে সুরভিত আজীবন আমি।   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ajibon-ami/
555
কাজী নজরুল ইসলাম
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে
ভক্তিমূলক
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি তুমি কেন হায় আসিলে হেথায় সুখের স্বরগ হইতে নামি।চারিপাশে মোর উড়িছে কেবল শুকনো পাতা মলিন ফুলদল বৃথাই কেন হায় তব আঁখিজল ছিটাও অবিরল দিবসযামী।এলে অবেলায় পথিক বেভুল বিঁধিছে কাঁটা নাহি যবে ফুল কি দিয়া বরণ করি ও চরণ নিভিছে জীবন, জীবনস্বামী।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/harano-hiar-nikunjo-pothey/
1160
জীবনানন্দ দাশ
মানুষের ব্যথা আমি পেয়ে গেছি
সনেট
মানুষের ব্যথা আমি পেয়ে গেছি পৃথিবীর পথে এসে — হাসির আস্বাদ পেয়ে গেছি; দেখেছি আকাশে দূরে কড়ির মতন শাদা মেঘের পাহাড়ে সূর্যের রাঙা ঘোড়া; পক্ষিরাজের মতো কমলা রঙের পাখা ঝাড়ে রাতের কুয়াশা ছিঁড়ে; দেখেছি শরের বনে শাদা রাজহাঁসদের সাধ উঠেছে আনন্দে জেগে — নদীর স্রোতের দিকে বাতাসের মতন অবাধ চলে গেছে কলরবে; — দেখেছি সবুজ ঘাস — যত দূর চোখ যেতে পারে; ঘাসের প্রকাশ আমি দেখিয়াছি অবিরল, — পৃথিবীর ক্লান্ত বেদনারে ঢেকে আছে; — দেখিয়াছি বাসমতী, কাশবন আকাঙ্খার রক্ত, অপরাধমুছায়ে দিতেছে যেন বার বার কোন এক রহস্যের কুয়াশার থেকে যেখানে জন্মে না কেউ, যেখানে মরে না কেউ, সেই কুহকের থেকে এসে রাঙা রোদ, শালিধান, ঘাস, কাশ, মরালেরা বার বার রাখিতেছে ঢেকে আমাদের রুক্ষ প্রশ্ন, ক্লান্ত ক্ষুধা, স্ফুট মৃত্যু — আমাদের বিস্মিত নীরব রেখে দেয় — পৃথিবীর পথে আমি কেটেছি আচঁড় ঢের, অশ্রু গেছি রেখে তবু ঐ মরালীরা কাশ ধান রোদ ঘাস এসে এসে মুছে দেয় সব।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/manusher-betha-aami-paye-gesi/
1214
জীবনানন্দ দাশ
সপ্তক
প্রেমমূলক
এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে;- জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা। অনেক হয়েছে শোয়া;- তারপর একদিন চ’লে গেছে কোন দূর মেঘে। অন্ধকার শেষ হ’লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগেঃ সরোজিনী চ’লে গেল অতদূর? সিঁড়ি ছাড়া- পাখিদের মতো পাখা বিনা? হয়তো বা মৃত্তিকার জ্যামিতিক ঢেউ আজ? জ্যামিতির ভূত বলেঃ আমি তো জানি না। জাফরান- আলোকের বিশুষ্কতা সন্ধ্যার আকাশে আছে লেগেঃ লুপ্ত বেড়ালের মতো; শূন্য চাতুরির মূঢ় হাসি নিয়ে জেগে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shoptok/
4095
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
কথা
মানবতাবাদী
কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত, রাখালেরা পুনর্বার বাশিঁতে আঙুল রেখে রাখালিয়া বাজাবে বিশদ। কথা ছিলো বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বসবে না, চিত্রল তরুণ হরিনেরা সহসাই হয়ে উঠবে না রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট।কথা ছিলো, শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের নাম। নদীর চুলের রেখা ধ’রে হেঁটে হেঁটে যাবে এক মগ্ন ভগীরথ, কথা ছিলো, কথা ছিলো আঙুর ছোঁবো না কোনোদিন।অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল, রাখালের হাত দুটি বড় বেশি শীর্ণ আর ক্ষীণ, বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে উঠে নাই-কথা ছিলো, চিল-ডাকা নদীর কিনারে একদিন ফিরে যাবো। একদিন বট বিরিক্ষির ছায়ার নিচে জড়ো হবে সহজিয়া বাউলেরা, তাদের মায়াবী আঙুলের টোকা ঢেউ তুলবে একতারায়- একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধ’রে বোলবে: উদ্ধার পেয়েছি।কথা ছিলো, ভাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরন্য, জমিন, আমাদের পাহাড় ও সমুদ্রের আদিগন্ত উপকূল- আজন্ম এ জলাভূমি খুঁজে পাবে প্রকৃত সীমানা তার।কথা ছিলো, আর্য বা মোঘল নয়, এ জমিন অনার্যের হবে। অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের ধারাবাহিকতা কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ। মাতৃভূমি-খন্ডিত দেহের ’পরে তার থাবা বসিয়েছে আর্য বণিকের হাত।আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা, প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানারঙ পতাকা ওড়ায়। কথা ছিলো, ‘আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন’, আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ। অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে। জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি, আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%9b%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a7%8b-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%9f-%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b9/
1326
তসলিমা নাসরিন
ছিল, নেই
শোকমূলক
মানুষটি শ্বাস নিত, এখন নিচ্ছে না। মানুষটি কথা বলত, এখন বলছে না। মানুষটি হাসত, এখন হাসছে না। মানুষটি কাঁদত, এখন কাঁদছে না। মানুষটি জাগত, এখন জাগছে না। মানুষটি স্নান করত, এখন করছে না। মানুষটি খেত, এখন খাচ্ছে না। মানুষটি হাঁটত, এখন হাঁটছে না। মানুষটি দৌড়োত, এখন দৌড়োচ্ছে না। মানুষটি বসত, এখন বসছে না। মানুষটি ভালবাসত, এখন বাসছে না। মানুষটি রাগ করত, এখন করছে না। মানুষটি শ্বাস ফেলত, এখন ফেলছে না। মানুষটি ছিল, মানুষটি নেই। দিন পেরোতে থাকে, মানুষটি ফিরে আসে না। রাত পেরোতে থাকে, মানুষটি ফিরে আসে না। মানুষটি আর মানুষের মধ্যে ফিরে আসে না। মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যেতে থাকে যে মানুষটি নেই, মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যেতে থাকে যে মানুষটি ছিল। মানুষটি কখনও আর মানুষের মধ্যে ফিরে আসবে না। মানুষটি কখনও আর আকাশ দেখবে না, উদাস হবে না। মানুষটি কখনও আর কবিতা পড়বে না, গান গাইবে না। মানুষটি কখনও আর ফুলের ঘ্রাণ শুঁকবে না। মানুষটি কখনও আর স্বপ্ন দেখবে না। মানুষটি নেই। মানুষটি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, মানুষটি ছাই হয়ে গেছে, মানুষটি জল হয়ে গেছে। কেউ বলে মানুষটি আকাশের নক্ষত্র হয়ে গেছে। যে যাই বলুক, মানুষটি নেই। কোথাও নেই। কোনও অরণ্যে নেই, কোনও সমুদ্রে নেই। কোনও মরুভূমিতে নেই, লোকালয়ে নেই, দূরে বহুদূরে একলা একটি দ্বীপ, মানুষটি ওতেও নেই। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও আর যাকে পাওয়া যাক, মানুষটিকে পাওয়া যাবে না। মানুষটি নেই। মানুষটি ছিল, ছিল যখন, মানুষটিকে মানুষেরা দুঃখ দিত অনেক। মানুষটি ছিল, ছিল যখন, মানুষটির দিকে মানুষেরা ছুঁড়ে দিত ঘৃণা। মানুষটি ছিল, ছিল যখন, মানুষটিকে ভালবাসার কথা কোনও মানুষ ভাবেনি। মানুষটি যে মানুষদের লালন করেছিল, তারা আছে, কেবল মানুষটি নেই। বৃক্ষগুলোও আছে, যা সে রোপন করেছিল, কেবল মানুষটি নেই। যে বাড়িতে তার জন্ম হয়েছিল, সে বাড়িটি আছে। যে বাড়িতে তার শৈশব কেটেছিল, সে বাড়িটি আছে। যে বাড়িতে তার কৈশোর কেটেছিল, সে বাড়িটি আছে। যে বাড়িতে তার যৌবন কেটেছিল, সে বাড়িটি আছে। যে মাঠে সে খেলা খেলেছিল, সে মাঠটি আছে। যে পুকুরে সে স্নান করেছিল, সে পুকুরটি আছে। যে গলিতে সে হেঁটেছিল, সে গলিটি আছে। যে রাস্তায় সে হেঁটেছিল , সে রাস্তাটি আছে। যে গাছের ফল সে পেরে খেয়েছিল, সে গাছটি আছে। যে বিছানায় সে ঘুমোতো, সে বিছানাটি আছে। যে বালিশে সে মাথা রাখত, বালিশটি আছে। যে কাঁথাটি সে গায়ে দিত, সে কাঁথাটি আছে। যে গেলাসে সে জল পান করত, সে গেলাসটি আছে। যে চটিজোড়া সে পরত, সে চটিড়োড়াও আছে। যে পোশাক সে পরত, সে পোশাকও আছে। যে সুগন্ধী সে গায়ে মাখত, সে সুগন্ধীও আছে। কেবল সে নেই। যে আকাশে সে তাকাত, সে আকাশটি আছে কেবল সে নেই। যে বাড়ি ঘর যে মাঠ যে গাছ যে ঘাস যে ঘাসফুলের দিকে সে তাকাত, সব আছে কেবল সে নেই। মানুষটি ছিল, মানুষটি নেই।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1968
3362
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরম সুন্দর আলোকের স্নানপুণ্য প্রাতে
ভক্তিমূলক
পরম সুন্দর আলোকের স্নানপুণ্য প্রাতে। অসীম অরূপ রূপে রূপে স্পর্শমণি রসমূর্তি করিছে রচনা, প্রতিদিন চিরনূতনের অভিষেক চিরপুরাতন বেদীতলে। মিলিয়া শ্যামলে নীলিমায় ধরণীর উত্তরীয় বুনে চলে ছায়াতে আলোতে। আকাশের হৃৎস্পন্দন পল্লবে পল্লবে দেয় দোলা। প্রভাতের কন্ঠ হতে মণিহার করে ঝিলিমিলি বন হতে বনে। পাখিদের অকারণ গান সাধুবাদ দিতে থাকে জীবনলক্ষ্মীরে। সবকিছু সাথে মিশে মানুষের প্রীতির পরশ অমৃতের অর্থ দেয় তারে, মধুময় করে দেয় ধরণীর ধূলি, সর্বত্র বিছায়ে দেয় চিরমানবের সিংহাসন।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/porom-sundor-aloker-snanpunnyo-prate/
3425
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রতিনিধি
গীতিগাথা
অ্যাক্‌ওয়ার্থ্‌ সাহেব কয়েকটি মারাঠি গাথার যে ইংরাজি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছেন তাহারই ভূমিকা হইতে বর্ণিত ঘটনা গৃহীত। শিবাজির গেরুয়া পতাকা "ভগোয়া ঝেণ্ডা' নামে খ্যাত।বসিয়া প্রভাতকালে সেতারার দুর্গভালে শিবাজি হেরিলা এক দিন-- রামদাস গুরু তাঁর ভিক্ষা মাগি দ্বার দ্বার ফিরিছেন যেন অন্নহীন। ভাবিলা, এ কী এ কাণ্ড! গুরুজির ভিক্ষাভাণ্ড-- ঘরে যাঁর নাই দৈন্যলেশ! সব যাঁর হস্তগত, রাজ্যেশ্বর পদানত, তাঁরো নাই বাসনার শেষ! এ কেবল দিনে রাত্রে জল ঢেলে ফুটা পাত্রে বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবারে। কহিলা, "দেখিতে হবে কতখানি দিলে তবে ভিক্ষাঝুলি ভরে একেবারে।' তখনি লেখনী আনি কী লিখি দিলা কী জানি, বালাজিরে কহিলা ডাকায়ে, "গুরু যবে ভিক্ষা-আশে আসিবেন দুর্গ-পাশে এই লিপি দিয়ো তাঁর পায়ে।'গুরু চলেছেন গেয়ে, সম্মুখে চলেছে ধেয়ে কত পান্থ কত অশ্বরথ!-- "হে ভবেশ, হে শংকর, সবারে দিয়েছ ঘর, আমারে দিয়েছ শুধু পথ। অন্নপূর্ণা মা আমার লয়েছে বিশ্বের ভার, সুখে আছে সর্ব চরাচর-- মোরে তুমি, হে ভিখারি, মার কাছ হতে কাড়ি করেছ আপন অনুচর।'সমাপন করি গান সারিয়া মধ্যাহ্নস্নান দুর্গদ্বারে আসিয়া যখন-- বালাজি নমিয়া তাঁরে দাঁড়াইল এক ধারে পদমূলে রাখিয়া লিখন। গুরু কৌতূহলভরে তুলিয়া লইলা করে, পড়িয়া দেখিলা পত্রখানি-- বন্দি তাঁর পাদপদ্ম শিবাজি সঁপিছে অদ্য তাঁরে নিজরাজ্য-রাজধানী।পরদিনে রামদাস গেলেন রাজার পাশ, কহিলেন, "পুত্র, কহো শুনি, রাজ্য যদি মোরে দেবে কী কাজে লাগিবে এবে-- কোন্‌ গুণ আছে তব গুণী?' "তোমারি দাসত্বে প্রাণ আনন্দে করিব দান' শিবাজি কহিলা নমি তাঁরে। গুরু কহে, "এই ঝুলি লহ তবে স্কন্ধে তুলি, চলো আজি ভিক্ষা করিবারে।'শিবাজি গুরুর সাথে ভিক্ষাপাত্র লয়ে হাতে ফিরিলে পুরদ্বারে-দ্বারে। নৃপে হেরি ছেলেমেয়ে ভয়ে ঘরে যায় ধেয়ে, ডেকে আনে পিতারে মাতারে। অতুল ঐশ্বর্যে রত, তাঁর ভিখারির ব্রত! এ যে দেখি জলে ভাসে শিলা! ভিক্ষা দেয় লজ্জাভরে, হস্ত কাঁপে থরেথরে, ভাবে ইহা মহতের লীলা। দুর্গে দ্বিপ্রহর বাজে, ক্ষান্ত দিয়া কর্মকাজে বিশ্রাম করিছে পুরবাসী। একতারে দিয়ে তান রামদাস গাহে গান আনন্দে নয়নজলে ভাসি, "ওহে ত্রিভুবনপতি, বুঝি না তোমার মতি, কিছুই অভাব তব নাহি-- হৃদয়ে হৃদয়ে তবু ভিক্ষা মাগি ফির, প্রভু, সবার সর্বস্বধন চাহি।'অবশেষে দিবসান্তে নগরের এক প্রান্তে নদীকূলে সন্ধ্যাস্নান সারি-- ভিক্ষা-অন্ন রাঁধি সুখে গুরু কিছু দিলা মুখে, প্রসাদ পাইল শিষ্য তাঁরি। রাজা তবে কহে হাসি, "নৃপতির গর্ব নাশি করিয়াছ পথের ভিক্ষুক-- প্রস্তুত রয়েছে দাস, আরো কিবা অভিলাষ-- গুরু-কাছে লব গুরু দুখ।'গুরু কহে, "তবে শোন্‌,করিলি কঠিন পণ, অনুরূপ নিতে হবে ভার-- এই আমি দিনু কয়ে মোর নামে মোর হয়ে রাজ্য তুমি লহ পুনর্বার। তোমারে করিল বিধি ভিক্ষুকের প্রতিনিধি, রাজ্যেশ্বর দীন উদাসীন। পালিবে যে রাজধর্ম জেনো তাহা মোর কর্ম, রাজ্য লয়ে রবে রাজ্যহীন।'"বৎস, তবে এই লহো মোর আশীর্বাদসহ আমার গেরুয়া গাত্রবাস-- বৈরাগীর উত্তরীয় পতাকা করিয়া নিয়ো' কহিলেন গুরু রামদাস। নৃপশিষ্য নতশিরে বসি রহে নদীতীরে, চিন্তারাশি ঘনায়ে ললাটে। থামিল রাখালবেণু, গোঠে ফিরে গেল ধেনু, পরপারে সূর্য গেল পাটে।পূরবীতে ধরি তান একমনে রচি গান গাহিতে লাগিলা রামদাস, "আমারে রাজার সাজে বসায়ে সংসারমাঝে কে তুমি আড়ালে কর বাস! হে রাজা, রেখেছি আনি তোমারি পাদুকাখানি, আমি থাকি পাদপীঠতলে-- সন্ধ্যা হয়ে এল ওই, আর কত বসে রই! তব রাজ্যে তুমি এসো চলে।'
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/protenede/
701
জয় গোস্বামী
প্রাক্তন
প্রেমমূলক
ঠিক সময়ে অফিসে যায়? ঠিক মতো খায় সকালবেলা? টিফিনবাক্স সঙ্গে নেয় কি? না ক্যান্টিনেই টিফিন করে? জামা কাপড় কে কেচে দেয়? চা করে কে আগের মতো? দুগগার মা ক’টায় আসে? আমায় ভোরে উঠতে হত সেই শার্টটা পরে এখন? ক্যাটকেটে সেই নীল রঙ টা? নিজের তো সব ওই পছন্দ আমি অলিভ দিয়েছিলাম কোন রাস্তায় বাড়ি ফেরে? দোকানঘরের বাঁ পাশ দিয়ে শিবমন্দির, জানলা থেকে দেখতে পেতাম রিক্সা থামল অফিস থেকে বাড়িই আসে? নাকি সোজা আড্ডাতে যায়? তাসের বন্ধু, ছাইপাঁশেরও বন্ধুরা সব আসে এখন? টেবিলঢাকা মেঝের ওপর সমস্ত ঘর ছাই ছড়ানো গেলাস গড়ায় বোতল গড়ায় টলতে টলতে শুতে যাচ্ছে কিন্তু বোতল ভেঙ্গে আবার পায়ে ঢুকলে রক্তারক্তি তখন তো আর হুঁশ থাকে না রাতবিরেতে কে আর দেখবে। কেন, ওই যে সেই মেয়েটা। যার সঙ্গে ঘুরত তখন। কোন মেয়েটা? সেই মেয়েটা? সে তো কবেই সরে এসেছে! বেশ হয়েছে, উচিত শাস্তি অত কান্ড সামলাবে কে! মেয়েটা যে গণ্ডগোলের প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম কে তাহলে সঙ্গে আছে? দাদা বৌদি? মা ভাইবোন! তিন কূলে তো কেউ ছিল না এক্কেবারে একলা এখন। কে তাহলে ভাত বেড়ে দেয়? কে ডেকে দেয় সকাল সকাল? রাত্তিরে কে দরজা খোলে? ঝক্কি পোহায় হাজার রকম? কার বিছানায় ঘুমোয় তবে কার গায়ে হাত তোলে এখন কার গায়ে হাত তোলে এখন?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রঠিক সময়ে অফিসে যায়? ঠিক মতো খায় সকালবেলা? টিফিনবাক্স সঙ্গে নেয় কি? না ক্যান্টিনেই টিফিন করে? জামা কাপড় কে কেচে দেয়? চা করে কে আগের মতো? দুগগার মা ক’টায় আসে? আমায় ভোরে উঠতে হত সেই শার্টটা পরে এখন? ক্যাটকেটে সেই নীল রঙ টা? নিজের তো সব ওই পছন্দ আমি অলিভ দিয়েছিলাম কোন রাস্তায় বাড়ি ফেরে? দোকানঘরের বাঁ পাশ দিয়ে শিবমন্দির, জানলা থেকে দেখতে পেতাম রিক্সা থামল অফিস থেকে বাড়িই আসে? নাকি সোজা আড্ডাতে যায়? তাসের বন্ধু, ছাইপাঁশেরও বন্ধুরা সব আসে এখন? টেবিলঢাকা মেঝের ওপর সমস্ত ঘর ছাই ছড়ানো গেলাস গড়ায় বোতল গড়ায় টলতে টলতে শুতে যাচ্ছে কিন্তু বোতল ভেঙ্গে আবার পায়ে ঢুকলে রক্তারক্তি তখন তো আর হুঁশ থাকে না রাতবিরেতে কে আর দেখবে। কেন, ওই যে সেই মেয়েটা। যার সঙ্গে ঘুরত তখন। কোন মেয়েটা? সেই মেয়েটা? সে তো কবেই সরে এসেছে! বেশ হয়েছে, উচিত শাস্তি অত কান্ড সামলাবে কে! মেয়েটা যে গণ্ডগোলের প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম কে তাহলে সঙ্গে আছে? দাদা বৌদি? মা ভাইবোন! তিন কূলে তো কেউ ছিল না এক্কেবারে একলা এখন। কে তাহলে ভাত বেড়ে দেয়? কে ডেকে দেয় সকাল সকাল? রাত্তিরে কে দরজা খোলে? ঝক্কি পোহায় হাজার রকম? কার বিছানায় ঘুমোয় তবে কার গায়ে হাত তোলে এখন কার গায়ে হাত তোলে এখন?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রঠিক সময়ে অফিসে যায়? ঠিক মতো খায় সকালবেলা? টিফিনবাক্স সঙ্গে নেয় কি? না ক্যান্টিনেই টিফিন করে? জামা কাপড় কে কেচে দেয়? চা করে কে আগের মতো? দুগগার মা ক’টায় আসে? আমায় ভোরে উঠতে হত সেই শার্টটা পরে এখন? ক্যাটকেটে সেই নীল রঙ টা? নিজের তো সব ওই পছন্দ আমি অলিভ দিয়েছিলাম কোন রাস্তায় বাড়ি ফেরে? দোকানঘরের বাঁ পাশ দিয়ে শিবমন্দির, জানলা থেকে দেখতে পেতাম রিক্সা থামল অফিস থেকে বাড়িই আসে? নাকি সোজা আড্ডাতে যায়? তাসের বন্ধু, ছাইপাঁশেরও বন্ধুরা সব আসে এখন? টেবিলঢাকা মেঝের ওপর সমস্ত ঘর ছাই ছড়ানো গেলাস গড়ায় বোতল গড়ায় টলতে টলতে শুতে যাচ্ছে কিন্তু বোতল ভেঙ্গে আবার পায়ে ঢুকলে রক্তারক্তি তখন তো আর হুঁশ থাকে না রাতবিরেতে কে আর দেখবে। কেন, ওই যে সেই মেয়েটা। যার সঙ্গে ঘুরত তখন। কোন মেয়েটা? সেই মেয়েটা? সে তো কবেই সরে এসেছে! বেশ হয়েছে, উচিত শাস্তি অত কান্ড সামলাবে কে! মেয়েটা যে গণ্ডগোলের প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম কে তাহলে সঙ্গে আছে? দাদা বৌদি? মা ভাইবোন! তিন কূলে তো কেউ ছিল না এক্কেবারে একলা এখন। কে তাহলে ভাত বেড়ে দেয়? কে ডেকে দেয় সকাল সকাল? রাত্তিরে কে দরজা খোলে? ঝক্কি পোহায় হাজার রকম? কার বিছানায় ঘুমোয় তবে কার গায়ে হাত তোলে এখন কার গায়ে হাত তোলে এখন?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রঠিক সময়ে অফিসে যায়? ঠিক মতো খায় সকালবেলা? টিফিনবাক্স সঙ্গে নেয় কি? না ক্যান্টিনেই টিফিন করে? জামা কাপড় কে কেচে দেয়? চা করে কে আগের মতো? দুগগার মা ক’টায় আসে? আমায় ভোরে উঠতে হত সেই শার্টটা পরে এখন? ক্যাটকেটে সেই নীল রঙ টা? নিজের তো সব ওই পছন্দ আমি অলিভ দিয়েছিলাম কোন রাস্তায় বাড়ি ফেরে? দোকানঘরের বাঁ পাশ দিয়ে শিবমন্দির, জানলা থেকে দেখতে পেতাম রিক্সা থামল অফিস থেকে বাড়িই আসে? নাকি সোজা আড্ডাতে যায়? তাসের বন্ধু, ছাইপাঁশেরও বন্ধুরা সব আসে এখন? টেবিলঢাকা মেঝের ওপর সমস্ত ঘর ছাই ছড়ানো গেলাস গড়ায় বোতল গড়ায় টলতে টলতে শুতে যাচ্ছে কিন্তু বোতল ভেঙ্গে আবার পায়ে ঢুকলে রক্তারক্তি তখন তো আর হুঁশ থাকে না রাতবিরেতে কে আর দেখবে। কেন, ওই যে সেই মেয়েটা। যার সঙ্গে ঘুরত তখন। কোন মেয়েটা? সেই মেয়েটা? সে তো কবেই সরে এসেছে! বেশ হয়েছে, উচিত শাস্তি অত কান্ড সামলাবে কে! মেয়েটা যে গণ্ডগোলের প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম কে তাহলে সঙ্গে আছে? দাদা বৌদি? মা ভাইবোন! তিন কূলে তো কেউ ছিল না এক্কেবারে একলা এখন। কে তাহলে ভাত বেড়ে দেয়? কে ডেকে দেয় সকাল সকাল? রাত্তিরে কে দরজা খোলে? ঝক্কি পোহায় হাজার রকম? কার বিছানায় ঘুমোয় তবে কার গায়ে হাত তোলে এখন কার গায়ে হাত তোলে এখন?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
2701
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমরা চাষ করি আনন্দে
প্রকৃতিমূলক
আমরা   চাষ করি আনন্দে। মাঠে মাঠে বেলা কাটে সকাল হতে সন্ধে॥ রৌদ্র ওঠে, বৃষ্টি পড়ে,   বাঁশের বনে পাতা নড়ে, বাতাস ওঠে ভরে ভরে চষা মাটির গন্ধে॥ সবুজ প্রাণের গানের লেখা   রেখায় রেখায় দেয় রে দেখা, মাতে রে কোন্‌ তরুণ কবি নৃত্যদোদুল ছন্দে। ধানের শিষে পুলক ছোটে-- সকল ধরা হেসে ওঠে অঘ্রানেরই সোনার রোদে, পূর্ণিমারই চন্দ্রে॥(রচনাকাল: 1911)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amra-chash-kori-anande/
4418
শামসুর রাহমান
ইতিহাস, তোমাকে
চিন্তামূলক
করাতের অসংখ্য দাঁতের মতো মুহূর্তগুলো আমাকে কামড়ে ধরেছিল, আর সেই মরণ-কামড়ে আমি ঝাঁঝরা শরীরটাকে দু’ একবার নেড়েচেড়ে পৃথিবীর বন্ধ দরজা নখ দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে নিঃসাড় হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু আমার দুঃখ-চর্চিত ললাটে অন্য সম্মানের আভাস ছিল বলেই বেঁচে রইলাম। তৃষ্ণার দুপুরে কোনো আহত সাপের মতো এক সীমাহীন ক্রোধে, মূর্খ যন্ত্রণায় নিজেকে টেনেহেঁচড়ে বেঁচে রইলাম সর্বনাশের পাশ কাটিয়ে সমস্ত দুর্দশার মুখের ওপর আমার প্রবল থাবা মেলে দিয়ে।জীবনকে খণ্ড খণ্ড চিত্রে দেখেছি-কখনো সুন্দর কখনো কুৎসিত। যুবককে দেখেছি দুপুর সন্ধ্যা আর রাত্রিকে রেণুর মতো উড়িয়ে দিতে হাওয়ায় আর বৃদ্ধকে দেখেছি তার খাটো মোমবাতিটাকে হিংসুক বাতাসের বিরোধিতা থেকে রক্ষা করার জন্য কী ব্যস্তবাগীশ।কখনো অশেষ হঠকারিতায় জীবনকে একটা আংটির মতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে চেয়েছি,-কখনো সময়ের জরায়ু ছিঁড়ে নিতে চেয়েছি কয়েকটি টসটসে নিটোল কালো আঙুর, যাদের আমি ঠোঁটে নিয়ে থেঁতলে দিতে, পিষে ফেলতে ভালবাসি, ভালবাসি যাদের মাংসল কণাগুলো ছুড়ে ফেলে দিতে ইতিহাসের হলুদ জঞ্জালে। পেঁজা তুলোর মতো তুষারে অশ্বেতরের পায়ের ছাপ, সোনালি গমের মাঠ আগুনের লকলকে জিভ কিংবা ধোঁয়াটে সন্ধ্যার প্রান্তরে খণ্ডিত সৈনিক একেই বলবে কি ইতিহাসের বিশ্বস্ত বিবৃতি?একটি আলোকিত দেহকে বিনাশ করবে বলে যারা ক্রুশকাঠে পেরেক ঠুকেছিল, তাদের উৎসব, ব্যভিচার কিংবা যারা বালিতে, অন্ধকার গুহার দেয়ালে মাছের চিত্র এঁকে ক্রুশবিদ্ধ অস্তিত্বের মহাপ্রয়াণে চোখ মুছেছিল, তাদের ঘরকন্না, প্রেমের ব্যাপ্ত বলয়, তা-ও কি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয় প্রতারক ইতিহাসের?ইতিহাস সরোদের মতো বেড়ে উঠলে আমি সুখী, দামামার মতো গর্জে উঠলে দুঃখ আমাকে বিবর্ণ করে। জীবন যখন বর্বরের মুঠোয় কপোতের নরম বুকের মতো কেঁপে ওঠে, গহন পাতালের প্রাগৈতিহাসিক শীতল জল নিভিয়ে দিতে চায় হৃদয়ের আগুন, আমার সমস্ত সম্ভ্রম আর উল্লাস অর্পণ করি আগামীর অঞ্জলিতে ‘কেননা ভবিষ্যৎ এক জলদমন্দ্র সুর ইতিহাসের ধ্রুপদী আলাপে।   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/itihas-tomake/
1848
পূর্ণেন্দু পত্রী
পান খাওয়ার গল্প
প্রেমমূলক
সবুজ পাতায় প্রথম মাখালে চুন আট-পহরের ঘাঁটা বিছানায় ধপ ধপে সাদা চাদর তারপর সেই সাদা চাদরে জাঁতিকাটা ফালা ফালা সুপরি বহু যুগের ক্ষুধায় কাঁদতে কাঁদতে যে মরেছে তার কঙ্কাল, আরেকবার বাঁচার ইচ্ছেয় যার হাড়ের ফুটোগুলো এখনো বাঁশীর মতো ব্যাকুল অর্থাৎ আমি, খানিক পরেই আমার পাশে এনে বসাল তোমাকে কেয়া-খয়েরের কুঁচি গা ফেটে বেরোচ্ছে ঋতুবতী রমণীর নরম গন্ধ এমন গন্ধ যে ঘুমোতে দেয় না নিশ্বাসকে এমন নরম যাতে ভাসিয়ে দেওয়া যায় সর্বঙ্গ। তিনদিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে কে যেন মুড়ে দিল আমাদের আর, হরিণের হলুদ মাংসে যেমন ব্যাধের তীর, তেমনি একটি কঠিন লবঙ্গ ভেদ করে চলে গেল তোমার মধ্যে আমাকে আমার ভিতরে তোমাকে। আমি বললাম, সুখী এই বনগন্ধকেই তো শরীর ছিঁড়ে খুঁজেছি সারাটা গ্রীস্ম। তুমি বললে, সুখী তোমার চৌচির ডালপালাকে দেব বলেই তো সাজিয়েছি আমার বসন্ত। আমাদের সামনে তখন অনন্তকাল। আমাদের জিভের লালায়, দাঁতের কামড়ে, হাতের থাবায় পৃথিবীর যত বন, তার গন্ধের ফেনা যত পাখি, তার পশমের রোদ যত নদী, তার নুড়ি পাখরের গান। অমরতার ময়ুর নাচ দেখাবে বলে যখন একটু একটু করে পেখম মেলছিল রক্তে ঠিক তখুনি, দুটি আকীর্ণ শরীরের গোপন ভাস্কর্যকে ভেঙে-চুরে, কেউ একজন চিবিয়ে খেতে লাগল আমাদের খিলিশুদ্ধ। আমরা রক্তপাতের মতো গড়িয়ে পড়ছি তার ঠোঁটের কশ বেয়ে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1257
4565
শামসুর রাহমান
কাঁটার মুকুট
চিন্তামূলক
অসুস্থ, অসুখী একজন বহুকাল বিষাদের বুকে বুক চেপে স্তব্ধতার কানে কানে ফিস্‌ফিসে স্বরে কথা বলে। বাচাল সে নয় কোনোকালে; আঁধারকে জব্দ করবার সাধ অন্তরীণ আর দুর্ভাবনার মক্ষিকা তাড়াতে নারাজ। মাঝে-মাঝে মুঠো থেকে ছেড়ে দ্যায় একটি কি দু’টি পাখি আর রঙধনু মেখে নেয় বয়েসী শরীরে। মাথার ভেতর তার ধোঁয়াটে আকাশ, পাগলাটে চাঁদ, বুকে সপ্তর্ষিমণ্ডল চেতনায় পূর্বপুরুষের স্বপ্ন, কলরব, অপরাধ, আহ্লাদ, বিমর্ষ নৈঃশব্দ্যের গাঢ় শৈলী।সে জানে গোখরো তাকে ছোবল দেবেই, তবু ওরা বিষধর সর্পকেই গলায় জড়িয়ে নিতে বলে; মাথা তার শোণিতের ছোপে রঙিন স্থাপত্য যেন, তবু কাঁটার মুকুট পরানোর খেলা।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/katar-mukut/
3948
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সান্ত্বনা
প্রেমমূলক
কোথা হতে দুই চক্ষে ভরে নিয়ে এলে জল     হে প্রিয় আমার। হে ব্যথিত, হে অশান্ত, বলো আজি গাব গান কোন্‌ সান্ত্বনার। হেথায় প্রান্তরপারে নগরীর এক ধারে সায়াহ্নের অন্ধকারে জ্বালি দীপখানি শূন্য গৃহে অন্যমনে একাকিনী বাতায়নে বসে আছি পুষ্পাসনে বাসরের রানী-- কোথা বক্ষে বিঁধি কাঁটা ফিরিলে আপন নীড়ে হে আমার পাখি। ওরে ক্লিষ্ট, ওরে ক্লান্ত, কোথা তোর বাজে ব্যথা, কোথা তোরে রাখি।চারি দিকে তমস্বিনী রজনী দিয়েছে টানি মায়ামন্ত্র-ঘের-- দুয়ার রেখেছি রুধি, চেয়ে দেখো কিছু হেথা নাহি বাহিরের। এ যে দুজনের দেশ, নিখিলের সব শেষ, মিলনের রসাবেশ অনন্ত ভবন-- শুধু এই এক ঘরে দুখানি হৃদয় ধরে, দুজনে সৃজন করে নূতন ভুবন। একটি প্রদীপ শুধু এ আঁধারে যতটুকু আলো করে রাখে সেই আমাদের বিশ্ব, তাহার বাহিরে আর চিনি না কাহাকে।একখানি বীণা আছে, কভু বাজে মোর বুকে কভু তব কোরে। একটি রেখেছি মালা, তোমারে পরায়ে দিলে তুমি দিবে মোরে। এক শয্যা রাজধানী, আধেক আঁচলখানি বক্ষ হতে লয়ে টানি পাতিব শয়ন। একটি চুম্বন গড়ি দোঁহে লব ভাগ করি-- এ রাজত্বে, মরি মরি, এত আয়োজন। একটি গোলাপফুল রেখেছি বক্ষের মাঝে, তব ঘ্রাণশেষে আমারে ফিরায়ে দিলে অধরে পরশি তাহা পরি লব কেশে।আজ করেছিনু মনে তোমারে করিব রাজা এই রাজ্যপাটে, এ অমর বরমাল্য আপনি যতনে তব জড়াব ললাটে। মঙ্গলপ্রদীপ ধ'রে লইব বরণ করে, পুষ্পসিংহাসন-'পরে বসাব তোমায়-- তাই গাঁথিয়াছি হার, আনিয়াছি ফুলভার, দিয়েছি নূতন তার কনকবীণায়। আকাশে নক্ষত্রসভা নীরবে বসিয়া আছে শান্ত কৌতূহলে-- আজি কি এ মালাখানি সিক্ত হবে, হে রাজন্‌, নয়নের জলে।রুদ্ধকণ্ঠ, গীতহারা, কহিয়ো না কোনো কথা, কিছু শুধাব না-- নীরবে লইব প্রাণে তোমার হৃদয় হতে নীরব বেদনা। প্রদীপ নিবায়ে দিব, বক্ষে মাথা তুলি নিব, স্নিগ্ধ করে পরশিব সজল কপোল-- বেণীমুক্ত কেশজাল স্পর্শিবে তাপিত ভাল, কোমল বক্ষের তাল মৃদুমন্দ দোল। নিশ্বাসবীজনে মোর কাঁপিবে কুন্তল তব, মুদিবে নয়ন-- অর্ধরাতে শান্তবায়ে নিদ্রিত ললাটে দিব একটি চুম্বন।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20150129114058/
1456
নাজিম হিকমত
জেলখানার চিঠি
প্রেমমূলক
১প্রিয়তমা আমার তেমার শেষ চিঠিতে তুমি লিখেছ ; মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে দিশেহারা আমার হৃদয়।তুমি লিখেছ ; যদি ওরা তেমাকে ফাঁসী দেয় তেমাকে যদি হারাই আমি বাঁচব না।তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী, বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ূ বড় জোর এক বছর।মৃত্যু…… দড়ির এক প্রান্তে দোদুল্যমান শবদেহ আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু। কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো জল্লাদের লোমশ হাত যদি আমার গলায় ফাসীর দড়ি পরায় নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়।অন্তিম ঊষার অস্ফুট আলোয় আমি দেখব আমার বন্ধুদের,তোমাকে দেখব আমার সঙ্গে কবরে যাবে শুধু আমার এক অসমাপ্ত গানের বেদনা।২ বধু আমার তুমি আমার কোমলপ্রাণ মৌমাছি চোখ তোমার মধুর চেয়েও মিষ্টি। কেন তোমাকে আমি লিখতে গেলাম ওরা আমাকে ফাঁসী দিতে চায় বিচার সবে মাত্র শুরু হয়েছে আর মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয় ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে ।ও নিয়ে ভেবনা ওসব বহু দূরের ভাবনা হাতে যদি টাকা থাকে আমার জন্যে কিনে পাঠিও গরম একটা পাজামা পায়ে আমার বাত ধরেছে। ভুলে যেও না স্বামী যার জেলখানায় তার মনে যেন সব সময় ফুর্তি থাকেবাতাস আসে, বাতাস যায় চেরির একই ডাল একই ঝড়ে দুবার দোলে না।গাছে গাছে পাখির কাকলি পাখাগুলো উড়তে চায়। জানলা বন্ধ: টান মেরে খুলতে হবে।আমি তোমাকে চাই ;তোমার মত রমনীয় হোক জীবন আমার বন্ধু,আমার প্রিয়তমার মত……..।আমি জানি,দুঃখের ডালি আজও উজাড় হয়নি কিন্তু একদিন হবে।৩ নতজানু হয়ে আমি চেয়ে আছি মাটির দিকে উজ্জল নীল ফুলের মঞ্জরিত শাখার দিকে আমি তাকিয়ে তুমি যেন মৃন্ময়ী বসন্ত,আমার প্রিয়তমা আমি তোমর দিকে তাকিয়ে।মাটিতে পিঠ রেখে আমি দেখি আকাশকে তুমি যেন মধুমাস,তুমি আকাশ আমি তোমাকে দেখছি প্রিয়তমা।রাত্রির অন্ধকারে,গ্রামদেশে শুকনো পাতায় আমি জ্বালিয়েছিলাম আগুন আমি স্পর্শ করছি সেই আগুন নক্ষত্রের নিচে জ্বালা অগ্নিকুন্ডের মত তুমি আমার প্রিয়তমা, তোমাকে স্পর্শ করছি।আমি আছি মানুষের মাঝখানে,ভালবাসি আমি মানুষকে ভালবাসি আন্দোলন, ভালবাসি চিন্তা করতে, আমার সংগ্রামকে আমি ভালবাসি আমার সংগ্রামের অন্তস্থলে মানুষের আসনে তুমি আসীন প্রিয়তমা আমার আমি তোমাকে ভালবাসি। ৪ রাত এখন ন’টা ঘন্টা বেজে গেছে গুমটিতে সেলের দরোজা তালা বন্ধ হবে এক্ষুনি। এবার জেলখানায় একটু বেশি দিন কাঁটল আট্টা বছর।বেঁচে থাকায় অনেক আশা,প্রিয়তমা তোমাকে ভালবাসার মতই একাগ্র বেঁচে থাকা। কী মধুর কী আশায় রঙ্গীন তোমার স্মৃতি….। কিন্তু আর আমি আশায় তুষ্ট নই, আমি আর শুনতে চাই না গান। আমার নিজের গান এবার আমি গাইব।আমাদের ছেলেটা বিছানায় শয্যাগত বাপ তার জেলখানায় তোমার ভারাক্রান্ত মাথাটা ক্লান্ত হাতের ওপর এলানো আমরা আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে। দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে আমাদের ছেলেটা নিরাময় হয়ে উঠবে তার বাপ খালাস পাবে জেল থেকে তোমার সোনালী চোখে উপচে পড়বে হাসি আমার আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে ! ৫ যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর তা আজও আমরা দেখিনি। সব থেকে সুন্দর শিশু আজও বেড়ে ওঠে নি আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো আজও আমরা পাইনি। মধুরতম যে-কথা আমি বলতে চাই। সে কথা আজও আমি বলি নি। ৬ কাল রাতে তোমাকে আমি স্বপ্ন দেখলাম মাথা উঁচু করে ধুসর চোখে তুমি আছো আমার দিকে তাকিয়ে তোমার আদ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।কৃষ্ণপক্ষ রাত্রে কোথাও আনন্দ সংবাদের মত ঘড়ির টিক্ টিক্ আওয়াজ বাতাসে গুন্ গুন্ করছে মহাকাল আমার ক্যানারীর লাল খাঁচায় গানের একটি কলি, লাঙ্গল-চষা ভূঁইতে মাটির বুক ফুঁড়ে উদগত অঙ্কুরের দুরন্ত কলরব আর এক মহিমান্বিত জনতার বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত ন্যায্য অধিকার তোমার আদ্র ওষ্ঠাধর কম্পু কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।আশাভঙ্গে অভিশাপ নিয়ে জেগে উঠলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বইতে মুখ রেখে। অতগুলো কণ্ঠস্বরের মধ্যে তোমার স্বরও কি আমি শুনতে পাই নি ?অনুবাদ : সুভাষ মুখোপাধ্যায়
http://kobita.banglakosh.com/archives/4201.html
5514
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ভবিষ্যতে
স্বদেশমূলক
স্বাধীন হবে ভারতবর্ষ থাকবে না বন্ধন, আমারা সবাই স্বরাজ-যজ্ঞে হব রে ইন্ধন! বুকের রক্ত দিব ঢালি স্বাধীনতারে, রক্ত পণে মুক্তি দের ভারত-মাতারে৷ মূর্খ যারা অজ্ঞ যারা যে জন বঞ্চিত তাদের তরে মুক্তি-সুধা করব সঞ্চিত৷ চাষী মজুর দীন দরিদ্র সবাই মোদের ভাই, একস্বরে বলব মোরা স্বাধীনতা চাই॥ থাকবে নাকো মতভেদ আর মিথ্যা সম্প্রদায় ছিন্ন হবে ভেদের গ্রন্থি কঠিন প্রতিজ্ঞায়৷ আমরা সবাই ভারতবাসী শ্রেষ্ঠ পৃথিবীর আমরা হব মুক্তিদাতা আমরা হব বীর॥‘ভবিষ্যতে’ ও ‘সুচিকিৎসা’ — এই ছড়াদুটি ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের লেখা ‘সুকান্ত-প্রসঙ্গ’, ‘শারদীয়া বসুমতী’, ১৩৫৪-থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি। এগুলি ১৯৪০-এর আগের লেখা বলে অনুমিত।
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/vobishyote/
3015
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ্রহণে ও দানে
নীতিমূলক
কৃতাঞ্জলি কর কহে, আমার বিনয়, হে নিন্দুক, কেবল নেবার বেলা নয়। নিই যবে নিই বটে অঞ্জলি জুড়িয়া, দিই যবে সেও দিই অঞ্জলি পুরিয়া।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/grohone-o-dane/
2926
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কে তোমারে দিল প্রাণ
ভক্তিমূলক
কে তোমারে দিল প্রাণ রে পাষাণ। কে তোমারে জোগাইছে এ অমৃতরস বরষ বরষ। তাই দেবলোকপানে নিত্য তুমি রাখিয়াছ ধরি ধরণীর আনন্দমঞ্জরী; তাই তো তোমারে ঘিরি বহে বারোমাস অবসন্ন বসন্তের বিদায়ের বিষণ্ন নিশ্বাস; মিলনরজনীপ্রান্তে ক্লান্ত চোখে ম্লান দীপালোকে ফুরায়ে গিয়াছে যত অশ্রু-গলা গান তোমার অন্তরে তারা আজিও জাগিছে অফুরান, হে পাষাণ, অমর পাষাণ। বিদীর্ণ হৃদয় হতে বাহিরে আনিল বহি সে রাজবিরহী বিরহের রত্নখানি; দিল আনি বিশ্বলোক-হাতে সবার সাক্ষাতে। নাই সেথা সম্রাটের প্রহরী সৈনিক, ঘিরিয়া ধরেছে তারে দশ দিক। আকাশ তাহার 'পরে যত্নভরে রেখে দেয় নীরব চুম্বন চিরন্তন; প্রথম মিলনপ্রভা রক্তশোভা দেয় তারে প্রভাত-অরুণ, বিরহের ম্লানহাসে পাণ্ডুভাসে জ্যোৎস্না তারে করিছে করুণ। সম্রাটমহিষী, তোমার প্রেমের স্মৃতি সৌন্দর্যে হয়েছে মহীয়সী। সে-স্মৃতি তোমারে ছেড়ে গেছে বেড়ে সর্বলোকে জীবনের অক্ষয় আলোকে। অঙ্গ ধরি সে অনঙ্গস্মৃতি বিশ্বের প্রীতির মাঝে মিলাইছে সম্রাটের প্রীতি। রাজ-অন্তঃপুর হতে আনিল বাহিরে গৌরবমুকুট তব, পরাইল সকলের শিরে যেথা  যার রয়েছে প্রেয়সী রাজার প্রাসাদ হতে দীনের কুটিরে-- তোমার প্রেমের স্মৃতি সবারে করিল মহীয়সী। সম্রাটের মন, সম্রাটের ধনজন এই রাজকীর্তি হতে করিয়াছে বিদায়গ্রহণ। আজ সর্বমানবের অনন্ত বেদনা এ পষাণ-সুন্দরীরে আলিঙ্গনে ঘিরে রাত্রিদিন করিছে সাধানা। এলাহাবাদ, ৫ পৌষ, ১৩২১ - প্রভাতে
https://banglarkobita.com/poem/famous/1921
867
জসীম উদ্‌দীন
বাস্তু ত্যাগী
স্বদেশমূলক
দেউলে দেউলে কাঁদিছে দেবতা পূজারীরে খোঁজ করি, মন্দিরে আজ বাজেনাকো শাঁখ সন্ধ্যা-সকাল ভরি। তুলসীতলা সে জঙ্গলে ভরা, সোনার প্রদীপ লয়ে, রচে না প্রণাম গাঁয়ের রুপসী মঙ্গল কথা কয়ে। হাজরাতলায় শেয়ালের বাসা, শেওড়া গাছের গোড়ে, সিঁদুর মাখান, সেই স্থান আজি বুনো শুয়োরেরা কোড়ে। আঙিনার ফুর কুড়াইয়া কেউ যতনে গাঁথে না মালা, ভোরের শিশিরে কাঁদিছে পুজার দুর্বাশীষের থালা। দোল-মঞ্চ যে ফাটিলে ফাটিছে, ঝুলনের দোলাখানি, ইঁদুরে কেটেছে, নাটমঞ্চের উড়েছে চালের ছানি। কাক-চোখ জল পদ্মদীঘিতে কবে কোন রাঙা মেয়ে, আলতা ছোপান চরণ দুখানি মেলেছিল ঘাটে যেয়ে। সেই রাঙা রঙ ভোলে নাই দীঘি, হিজলের ফুল বুকে, মাখাইয়া সেই রঙিন পায়েরে রাখিয়াছে জলে টুকে। আজি ঢেউহীন অপলক চোখে করিতেছে তাহা ধ্যান, ঘন-বন-তলে বিহগ কন্ঠে জাগে তার স্তব গান। এই দীঘি-জলে সাঁতার খেলিতে ফিরে এসো গাঁর মেয়ে, কলমি-লতা যে ফুটাইবে ফুল তোমারে নিকটে পেয়ে। ঘুঘুরা কাঁদিছে উহু উহু করি, ডাহুকেরা ডাক ছাড়ি, গুমরায় বন সবুজ শাড়ীরে দীঘল নিশাসে ফাড়ি। ফিরে এসো যারা গাঁও ছেড়ে গেছো, তরুলতিকার বাঁধে, তোমাদের কত অতীত-দিনের মায়া ও মমতা কাঁদে। সুপারির বন শুন্যে ছিঁড়িছে দীঘল মাথার কেশ, নারকেল তরু উর্ধ্বে খুঁজিছে তোমাদের উদ্দেশ। বুনো পাখিগুলি এডালে ওডালে, কইরে কইরে কাঁদে, দীঘল রজনী খন্ডিত হয় পোষা কুকুরের নামে। কার মায়া পেয়ে ছাড়িলে , এদেশ, শস্যের থালা ভরি, অন্নপূর্ণা আজো যে জাগিছে তোমাদের কথা স্মরি। আঁকাবাঁকা রাকা শত নদীপথে ডিঙি তরীর পাখি, তোমাদের পিতা-পিতামহদের আদরিয়া বুকে রাখি ; কত নমহীন অথই সাগরে যুঝিয়া ঝড়ের সনে, লক্ষীর ঝাঁপি লুটিয়া এনেছে তোমাদের গেহ-কোণে। আজি কি তোমরা শুনিতে পাও না সে নদীর কলগীতি, দেখিতে পাও না ঢেউএর আখরে লিখিত মনের প্রীতি ? হিন্দু-মুসলমানের এ দেশ, এ দেশের গাঁয়ে কবি, কত কাহিনীর সোনার সুত্রে গেঁথেছে সে রাঙা ছবি। এদেশ কাহারো হবে না একার, যতখানি ভালোবাসা, যতখানি ত্যাগ যে দেবে, হেথায় পাবে ততখানি বাসা। বেহুলার শোকে কাঁদিয়াছি মোরা, গংকিনী নদীসোঁতে, কত কাহিনীর ভেলায় ভাসিয়া গেছি দেশে দেশ হতে। এমাম হোসেন, সকিনার শোকে ভেসেছে হলুদপাটা, রাধিকার পার নুপুরে মুখর আমাদের পার-ঘাটা। অতীতে হয়ত কিছু ব্যথা দেছি পেয়ে বা কিছুটা ব্যথা, আজকের দিনে ভুলে যাও ভাই, সে সব অতীত কথা। এখন আমরা স্বাধীন হয়েছি, নুতন দৃষ্টি দিয়ে, নুতন রাষ্ট্র গুড়িব আমরা তোমাদের সাথে নিয়ে। ভাঙ্গা ইস্কুল আবার গড়িব, ফিরে এসো মাস্টার। হুঙ্কারে ভাই তাড়াইয়া দিব কালি অজ্ঞানতার। বনের ছায়ায় গাছের তলায় শীতল স্নেহের নীড়ে, খুঁজিয়া পাইব হারাইয়া যাওয়া আদরের ভাইটিরে ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/790
5183
শামসুর রাহমান
রাজকাহিনী
ব্যঙ্গাত্মক
ধন্য রাজা ধন্য, দেশজোড়া তার সৈন্য! পথে-ঘাটে-ভেড়ার পাল। চাষীর গরু, মাঝির হাল, ঘটি-বাটি, গামছা, হাঁড়ি, সাত-মহলা আছে বাড়ি, আছে হাতি, আছে ঘোড়া। কেবল পোড়া মুখে পোরার দুমুঠো নেই অন্ন, ধন্য রাজা ধন্য। ঢ্যাম কুড় কুড় বাজনা বাজে, পথে-ঘাটে সান্ত্রী সাজে। শোনো সবাই হুকুমনামা, ধরতে হবে রাজার ধামা। বাঁ দিকে ভাই চলতে মানা, সাজতে হবে বোবা-কানা। মস্ত রাজা হেলে দুলে যখন-তথন চড়ান শূলে মুখটি খোলার জন্য। ধন্য রাজা ধন্য।
https://banglarkobita.com/poem/famous/592
1645
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বাঘ
প্রকৃতিমূলক
প্রকৃতিমূলক আঁচড়িয়ে কামড়িয়ে ফেঁড়ে কাণ্ডটাকে ফুলন্ত গাছের তখনও দাউ-দাউ জ্বলে রাগ। চিত্রিত বিরাট বাঘ। ফিরে যায় ঘাসের জঙ্গলে। থেকে-থেকে শরীরে চমকায় জ্বালা। দূরের কাছের ছবিগুলি স্থির পাংশু! ত্রিজগৎ নিশ্বাস হারায় চলন্ত হলুদ-কালো চিত্রখানি দেখে। বাঘ যায়। বনের আতঙ্ক হেঁটে যায়। বাঘ যায়। অন্ধকার বনের নিয়তি। চিত্রিত আগুনখানি যেন ধীরে-ধীরে হেঁটে যায়। প্রকাণ্ড শরীরে চমকায় হলুদ জ্বালা। বড় জ্বালা। শোণিতে শিরায় যেন ঝড়-বিদ্যুতের গতি সংবৃত রাখার জ্বালা বুঝে নিতে-নিতে বাঘ যায়। বনের আতঙ্ক হেঁটে যায়। আমরা নিশ্চিন্ত বসে বাঘ দেখি ডিস্‌নির ছবিতে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1664
2141
মহাদেব সাহা
চাই পাখির স্বদেশ
প্রকৃতিমূলক
আকাশের বান্ধাব পাখিরা, মেঘলোকে রহস্যের সতত সন্ধানপ্রার্থী; কখনো বেড়াও উড়ে সকৌতুকে সমুদ্রের নীল জলরাশির ওপর; তোমাদের বিশাল ডানার ছায়া পড়ে হ্রদে আমার হৃদয়ে, উড়বার সাধ নেই, তবু তোমাকে আমার বড়ো ভালো লাগে পাখি, আমি চিরদিন একটি স্বপ্নের পাখি পুষে রাখি বুকের ভিতর। খুব ছোটবেলা থেকে আমি পাখিদের প্রতি বড়ো মনোযোগী, যদিও কখনো আমি ডানায় করিনি ভর, পাখিদেরই ডেকেছি মাটির কাছাকাছি, আকাশকে সবুজ উঠোনে; পাখিদের প্রতি এই পক্ষপাত থেকে আমি কখনো নিইনি হাতে শিকারীর তীর, কখনো শিখিনি তীর ছোঁড়া, কোথাও দেখলে তীর, গুলি, কেমন আঁতকে ওঠে বুক, এই বুঝি বিদ্ধ হলো প্রকৃতির শুদ্ধ সন্তানেরা; আকাশে তোমার ওড়া দেখে আমি স্বচ্ছেন্দে বেড়াই ভেসে স্বপ্নপুরীতে দূর দেশে যেখানে প্রত্যহ মায়াবী পাখিরা দিব্য সরোবরে মনোরম জলক্রীড়া করে; এই পাখির পৃথিবী কেন কিরাতের তীরে ভরে গেলো, আমি পাখিদের নিরাপদ অবাধ আকাশ চাই, চাই পাখিদের স্বাধীন স্বদেশ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1417
4087
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
অভিমানের খেয়া
প্রেমমূলক
এতোদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই, পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত পারিজাতহীন কঠিন পাথরে। প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে, নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা__ এই খেলা আর কতোকাল আর কতোটা জীবন! কিছুটাতো চাই__হোক ভুল, হোক মিথ্যে প্রবোধ, আভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক জোস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই, কিছুটাতো চাই, কিছুটাতো চাই। আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন__আর কতোদিন? ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতোটা বিলাবে? কতো আর এই রক্ত-তিলকে তপ্ত প্রনাম! জীবনের কাছে জন্ম কি তবে প্রতারনাময়? এতো ক্ষয়, এতো ভুল জ’মে ওঠে বুকের বুননে, এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে কতোটা ক্ষরন কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়। তুমি জানো না__আমি তো জানি, কতোটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে এতো গান, এতো হাসি নিয়ে বুকে নিশ্চুপ হয়ে থাকি বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে বলি এইতো জীবন, এইতো মাধুরী, এইতো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু সুনীল রাত! তুমি জানো নাই__আমি তো জানি। মাটি খুঁড়ে কারা শস্য তুলেছে, মাংশের ঘরে আগুন পুষেছে, যারা কোনোদিন আকাশ চায়নি নীলিমা চেয়েছে শুধু, করতলে তারা ধ’রে আছে আজ বিশ্বাসী হাতিয়ার। পরাজয় এসে কন্ঠ ছুঁয়েছে লেলিহান শিখা, চিতার চাবুক মর্মে হেনেছো মোহন ঘাতক। তবুতো পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মুখর হৃদয়, পুষ্পের প্রতি প্রসারিত এই তীব্র শোভন বাহু। বৈশাখি মেঘ ঢেকেছে আকাশ, পালকের পাখি নীড়ে ফিরে যায় ভাষাহীন এই নির্বাক চোখ আর কতোদিন? নীল অভিমান পুড়ে একা আর কতোটা জীবন? কতোটা জীবন!! ৩১.০৫.৭৬; কাঁঠালবাগান, ঢাকা
https://banglarkobita.com/poem/famous/315
5431
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আগ্নেয়গিরি
মানবতাবাদী
কখনো হঠাৎ মনে হয়ঃ আমি এক আগ্নেয় পাহাড়। শান্তির ছায়া-নিবিড় গুহায় নিদ্রিত সিংহের মতো চোখে আমার বহু দিনের তন্দ্রা। এক বিস্ফোরণ থেকে আর এক বিস্ফোরণের মাঝখানে আমাকে তোমরা বিদ্রূপে বিদ্ধ করেছ বারংবার আমি পাথরঃ আমি তা সহ্য করেছি। মুখে আমার মৃদু হাসি, বুকে আমার পুঞ্জীভূত ফুটন্ত লাভা। সিংহের মতো আধ-বোজা চোখে আমি কেবলি দেখছিঃ মিথ্যার ভিতে কল্পনার মশলায় গড়া তোমাদের শহর, আমাকে ঘিরে রচিত উৎসবের নির্বোধ অমরাবতী, বিদ্রূপের হাসি আর বিদ্বেষের আতস-বাজি– তোমাদের নগরে মদমত্ত পূর্ণিমা। দেখ, দেখঃ ছায়াঘন, অরণ্য-নিবিড় আমাকে দেখ; দেখ আমার নিরুদ্বিগ্ন বন্যতা। তোমাদের শহর আমাকে বিদ্রূপ করুক, কুঠারে কুঠারে আমার ধৈর্যকে করুক আহত, কিছুতেই বিশ্বাস ক’রো না– আমি ভিসুভিয়স-ফুজিয়ামার সহোদর। তোমাদের কাছে অজ্ঞাত থাক ভেতরে ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠা আমার অগ্ন্যুদ্‌গার, অরণ্যে ঢাকা অন্তর্নিহিত উত্তাপের জ্বালা। তোমার আকাশে ফ্যাকাশে প্রেত আলো, বুনো পাহাড়ে মৃদু-ধোঁয়ার অবগুণ্ঠন: ও কিছু নয়, হয়তো নতুন এক মেঘদূত। উৎসব কর, উৎসব কর– ভুলে যাও পেছনে আছে এক আগ্নেয় পাহাড়, ভিসুভিয়স-ফুজিয়ামার জাগ্রত বংশধর। আর, আমার দিন-পি কায় আসন্ন হোক বিস্ফোরণের চরম, পবিত্র তিথি।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1910
1491
নির্মলেন্দু গুণ
নাম দিয়েছি ভালবাসা
প্রেমমূলক
আমরা মিশিনি ভালবেসে সব মানুষ যেভাবে মেশে, আমরা গিয়েছি প্রাজ্ঞ আঁধারে না-জানার টানে ভেসে।ভাসতে ভাসতে আমরা ভিড়িনি যেখানে নদীর তীর, বুনোবাসনার উদবেল স্রোতে আশ্লেষে অস্থির।আমরা দুজনে রচনা করেছি একে অপরের ক্ষতি, প্রবাসী প্রেমের পাথরে গড়েছি অন্ধ অমরাবতী।আমরা মিশিনি বিহবলতায় শুক্রে-শোনিতে-স্বেদে, আমাদের প্রেম পূর্ণ হয়েছে বেদনায়,বিচ্ছেদে।
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/name-deeaci-bhalobasha/
3154
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি আমার আপন
ভক্তিমূলক
তুমি আমার আপন, তুমি আছ আমার কাছে, এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও। তোমার মাঝে মোর জীবনের সব আনন্দ আছে, এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও।আমায়             দাও সুধাময় সুর, আমার             বাণী করো সুমধুর; আমার             প্রিয়তম তুমি, এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও।এই          নিখিল আকাশ ধরা এই যে      তোমায় দিয়ে ভরা, আমার      হৃদয় হতে এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও।দুখি      জেনেই কাছে আস, ছোটো   বলেই ভালোবাস, আমার   ছোটো মুখে এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও।মাঘ, ১৩১৬ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumi-amar-apon/
730
জয় গোস্বামী
মেঘবালিকার
প্রেমমূলক
আমি যখন ছোট ছিলাম খেলতে যেতাম মেঘের দলে একদিন এক মেঘবালিকা প্রশ্ন করলো কৌতুহলে“এই ছেলেটা, .                         নাম কি রে তোর?” আমি বললাম, .                          “ফুসমন্তর !”মেঘবালিকা রেগেই আগুন, “মিথ্যে কথা । নাম কি অমন হয় কখনো ?” .                      আমি বললাম, “নিশ্চয়ই হয় । আগে আমার গল্প শোনো ।”সে বলল, “শুনবো না যা- সেই তো রাণী, সেই তো রাজা সেই তো একই ঢাল তলোয়ার সেই তো একই রাজার কুমার পক্ষিরাজে শুনবো না আর । .                               ওসব বাজে ।”আমি বললাম, “তোমার জন্য নতুন ক’রে লিখব তবে ।”সে বলল, “সত্যি লিখবি ? বেশ তাহলে মস্ত করে লিখতে হবে। মনে থাকবে ? লিখেই কিন্তু আমায় দিবি ।” আমি বললাম, “তোমার জন্য লিখতে পারি এক পৃথিবী ।”লিখতে লিখতে লেখা যখন সবে মাত্র দু-চার পাতা হঠাৎ তখন ভুত চাপল আমার মাথায়-খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম ছোটবেলার মেঘের মাঠে গিয়েই দেখি, চেনা মুখ তো একটিও নেই এ-তল্লাটেএকজনকে মনে হল ওরই মধ্যে অন্যরকম এগিয়ে গিয়ে বলি তাকেই ! “তুমি কি সেই ? মেঘবালিকা তুমি কি সেই ?”সে বলেছে, “মনে তো নেই আমার ওসব মনে তো নেই ।” আমি বললাম, “তুমি আমায় লেখার কথা বলেছিলে-” সে বলল, “সঙ্গে আছে ? ভাসিয়ে দাও গাঁয়ের ঝিলে ! আর হ্যাঁ, শোন-এখন আমি মেঘ নই আর, সবাই এখন বৃষ্টি বলে ডাকে আমায় ।” বলেই হঠাৎ এক পশলায়- চুল থেকে নখ- আমায় পুরো ভিজিয়ে দিয়ে- .                        অন্য অন্য বৃষ্টি বাদল সঙ্গে নিয়ে মিলিয়ে গেল খরস্রোতায় মিলিয়ে গেল দূরে কোথায় দূরে দূরে…।“বৃষ্টি বলে ডাকে আমায় বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়-” আপন মনে বলতে বলতে আমিই কেবল বসে রইলাম ভিজে একশা কাপড়জামায় গাছের তলায় .                         বসে রইলাম বৃষ্টি নাকি মেঘের জন্যএমন সময় অন্য একটি বৃষ্টি আমায় চিনতে পেরে বলল, “তাতে মন খারাপের কি হয়েছে ! যাও ফিরে যাও-লেখ আবার । এখন পুরো বর্ষা চলছে তাই আমরা সবাই এখন নানান দেশে ভীষণ ব্যস্ত তুমিও যাও, মন দাও গে তোমার কাজে- বর্ষা থেকে ফিরে আমরা নিজেই যাব তোমার কাছে ।”এক পৃথিবী লিখবো আমি এক পৃথিবী লিখবো বলে ঘর ছেড়ে সেই বেড়িয়ে গেলাম ঘর ছেড়ে সেই ঘর বাঁধলাম গহন বনে সঙ্গী শুধু কাগজ কলমএকাই থাকব । একাই দুটো ফুটিয়ে খাব— .                    দু এক মুঠো ধুলো বালি-যখন যারা আসবে মনে .                   তাদের লিখব লিখেই যাব !এক পৃথিবীর একশোরকম স্বপ্ন দেখার সাধ্য থাকবে যে-রূপকথার— সে রূপকথা আমার একার ।ঘাড় গুঁজে দিন .                       লিখতে লিখতে ঘাড় গুঁজে রাত .                      লিখতে লিখতে মুছেছে দিন—মুছেছে রাত যখন আমার লেখবার হাত অসাড় হল, .                    মনে পড়ল সাল কি তারিখ, বছর কি মাস সেসব হিসেব .                       আর ধরিনি লেখার দিকে তাকিয়ে দেখি এক পৃথিবী লিখব বলে একটা খাতাও .                       শেষ করিনি ।সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল খাতার উপর আজীবনের লেখার উপর বৃষ্টি এল এই অরণ্যে বাইরে তখন গাছের নিচে নাচছে ময়ূর আনন্দিত এ-গাছ ও-গাছ উড়ছে পাখি বলছে পাখি, “এই অরণ্যে কবির জন্যে আমরা থাকি ।” বলছে ওরা, “কবির জন্য আমরা কোথাও আমরা কোথাও আমরা কোথাও হার মানিনি—”কবি তখন কুটির থেকে তাকিয়ে আছে অনেক দূরে বনের পরে, মাঠের পরে নদীর পরে সেই যেখানে সারাজীবন বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে, সেই যেখানে কেউ যায়নি কেউ যায় না কোনদিনই— আজ সে কবি দেখতে পাচ্ছে সেই দেশে সেই ঝরনাতলায় এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায় সোনায় মোড়া মেঘহরিণী— কিশোর বেলার সেই হরিণী ।কবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুনআমি যখন ছোট ছিলাম খেলতে যেতাম মেঘের দলে একদিন এক মেঘবালিকা প্রশ্ন করলো কৌতুহলে“এই ছেলেটা, .                         নাম কি রে তোর?” আমি বললাম, .                          “ফুসমন্তর !”মেঘবালিকা রেগেই আগুন, “মিথ্যে কথা । নাম কি অমন হয় কখনো ?” .                      আমি বললাম, “নিশ্চয়ই হয় । আগে আমার গল্প শোনো ।”সে বলল, “শুনবো না যা- সেই তো রাণী, সেই তো রাজা সেই তো একই ঢাল তলোয়ার সেই তো একই রাজার কুমার পক্ষিরাজে শুনবো না আর । .                               ওসব বাজে ।”আমি বললাম, “তোমার জন্য নতুন ক’রে লিখব তবে ।”সে বলল, “সত্যি লিখবি ? বেশ তাহলে মস্ত করে লিখতে হবে। মনে থাকবে ? লিখেই কিন্তু আমায় দিবি ।” আমি বললাম, “তোমার জন্য লিখতে পারি এক পৃথিবী ।”লিখতে লিখতে লেখা যখন সবে মাত্র দু-চার পাতা হঠাৎ তখন ভুত চাপল আমার মাথায়-খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম ছোটবেলার মেঘের মাঠে গিয়েই দেখি, চেনা মুখ তো একটিও নেই এ-তল্লাটেএকজনকে মনে হল ওরই মধ্যে অন্যরকম এগিয়ে গিয়ে বলি তাকেই ! “তুমি কি সেই ? মেঘবালিকা তুমি কি সেই ?”সে বলেছে, “মনে তো নেই আমার ওসব মনে তো নেই ।” আমি বললাম, “তুমি আমায় লেখার কথা বলেছিলে-” সে বলল, “সঙ্গে আছে ? ভাসিয়ে দাও গাঁয়ের ঝিলে ! আর হ্যাঁ, শোন-এখন আমি মেঘ নই আর, সবাই এখন বৃষ্টি বলে ডাকে আমায় ।” বলেই হঠাৎ এক পশলায়- চুল থেকে নখ- আমায় পুরো ভিজিয়ে দিয়ে- .                        অন্য অন্য বৃষ্টি বাদল সঙ্গে নিয়ে মিলিয়ে গেল খরস্রোতায় মিলিয়ে গেল দূরে কোথায় দূরে দূরে…।“বৃষ্টি বলে ডাকে আমায় বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়-” আপন মনে বলতে বলতে আমিই কেবল বসে রইলাম ভিজে একশা কাপড়জামায় গাছের তলায় .                         বসে রইলাম বৃষ্টি নাকি মেঘের জন্যএমন সময় অন্য একটি বৃষ্টি আমায় চিনতে পেরে বলল, “তাতে মন খারাপের কি হয়েছে ! যাও ফিরে যাও-লেখ আবার । এখন পুরো বর্ষা চলছে তাই আমরা সবাই এখন নানান দেশে ভীষণ ব্যস্ত তুমিও যাও, মন দাও গে তোমার কাজে- বর্ষা থেকে ফিরে আমরা নিজেই যাব তোমার কাছে ।”এক পৃথিবী লিখবো আমি এক পৃথিবী লিখবো বলে ঘর ছেড়ে সেই বেড়িয়ে গেলাম ঘর ছেড়ে সেই ঘর বাঁধলাম গহন বনে সঙ্গী শুধু কাগজ কলমএকাই থাকব । একাই দুটো ফুটিয়ে খাব— .                    দু এক মুঠো ধুলো বালি-যখন যারা আসবে মনে .                   তাদের লিখব লিখেই যাব !এক পৃথিবীর একশোরকম স্বপ্ন দেখার সাধ্য থাকবে যে-রূপকথার— সে রূপকথা আমার একার ।ঘাড় গুঁজে দিন .                       লিখতে লিখতে ঘাড় গুঁজে রাত .                      লিখতে লিখতে মুছেছে দিন—মুছেছে রাত যখন আমার লেখবার হাত অসাড় হল, .                    মনে পড়ল সাল কি তারিখ, বছর কি মাস সেসব হিসেব .                       আর ধরিনি লেখার দিকে তাকিয়ে দেখি এক পৃথিবী লিখব বলে একটা খাতাও .                       শেষ করিনি ।সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল খাতার উপর আজীবনের লেখার উপর বৃষ্টি এল এই অরণ্যে বাইরে তখন গাছের নিচে নাচছে ময়ূর আনন্দিত এ-গাছ ও-গাছ উড়ছে পাখি বলছে পাখি, “এই অরণ্যে কবির জন্যে আমরা থাকি ।” বলছে ওরা, “কবির জন্য আমরা কোথাও আমরা কোথাও আমরা কোথাও হার মানিনি—”কবি তখন কুটির থেকে তাকিয়ে আছে অনেক দূরে বনের পরে, মাঠের পরে নদীর পরে সেই যেখানে সারাজীবন বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে, সেই যেখানে কেউ যায়নি কেউ যায় না কোনদিনই— আজ সে কবি দেখতে পাচ্ছে সেই দেশে সেই ঝরনাতলায় এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায় সোনায় মোড়া মেঘহরিণী— কিশোর বেলার সেই হরিণী ।কবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%98%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%b0%e0%a7%82%e0%a6%aa%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-joy-goswami/#respond
3930
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমাপন
চিন্তামূলক
আজ আমি কথা কহিব না। আর আমি গান গাহিব না। হেরো আজি ভোরবেলা এসেছে রে মেলা লোক, ঘিরে আছে চারি দিকে চেয়ে আছে অনিমিখে, হেরে মোর হাসিমুখ ভুলে গেছে দুখশোক। আজ আমি গান গাহিব না।সকাতরে গান গেয়ে পথপানে চেয়ে চেয়ে এদের ডেকেছি দিবানিশি। ভেবেছিনু মিছে আশা, বোঝে না আমার ভাষা, বিলাপ মিলায় দিশি দিশি। কাছে এরা আসিত না, কোলে বসে হাসিত না, ধরিতে চকিতে হত লীন। মরমে বাজিত ব্যথা--সাধিলে না কহে কথা-- সাধিতে শিখি নি এতদিন। দিত দেখা মাঝে মাঝে, দূরে যেন বাঁশি বাজে, আভাস শুনিনু যেন হায়। মেঘে কভু পড়ে রেখা, ফুলে কভু দেয় দেখা, প্রাণে কভু বহে চলে যায়।        আজ তারা এসেছে রে কাছে এর চেয়ে শোভা কিবা আছে। কেহ নাহি করে ডর, কেহ নাহি ভাবে পর, সবাই আমাকে ভালোবাসে আগ্রহে ঘিরিছে চারি পাশে।        এসেছিস তোরা যত জনা, তোদের কাহিনী আজি শোনা। যার যত কথা আছে খুলে বল্‌ মোর কাছে, আজ আমি কথা কহিব না ।আয় তুই কাছে আয়, তোরে মোর প্রাণ চায়, তোর কাছে শুধু বসে রই। দেখি শুধু, কথা নাহি কই। ললিত পরশে তোর পরানে লাগিছে ঘোর, চোখে তোর বাজে বেণুবীণা-- তুই মোরে গান শুনাবি না? জেগেছে নূতন প্রাণ, বেজেছে নূতন গান, ওই দেখ পোহায়েছে রাতি। আমারে বুকেতে নে রে, কাছে আয়--আমি যে রে নিখিলের খেলাবার সাথী। চারি দিকে সৌরভ, চারি দিকে গীতরব, চারি দিকে সুখ আর হাসি, চারি দিকে শিশুগুলি মুখে আধো আধো বুলি, চারি দিকে স্নেহপ্রেমরাশি! আমারে ঘিরেছে কারা, সুখেতে করেছে সারা, জগতে হয়েছে হারা প্রাণের বাসনা। আর আমি কথা কহিব না-- আর আমি গান গাহিব না।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shomapon/
4848
শামসুর রাহমান
দূরে থাকে ঘর
চিন্তামূলক
লোকটা একলা হাঁটে ফুটপাতে, পার্কে বসে কিছুক্ষণ গাছ গাছালির মাঝে, শোনে ‘এ জগতে কার কে’ ব’লে একজন বৃদ্ধ, হয়তো ছিটগ্রস্ত, গেলেন বেরিয়ে, যেন কোন ব্যর্থ, নিঃস্ব অভিনেতা। লোকটা এড়িয়ে কৌতূহলী দৃষ্টি বেঞ্চি ছেড়ে উঠে যায়,এবং তাকায় আশপাশে, আত্মসুখে বুঁদ, দ্যাখে বসন্ত জাগ্রত তরুণীর যৌবনের মতো। লোকটা কখনো ঘাসে কখনো আকাশে চোখ রাখে, কখনোবা নীল মসজিদের গম্বজের অনেক ওপরে উড়ে যায়, মেঘে ভাসে; ইচ্ছে হলে ফের পাতালে প্রবেশ ক’রে, জলপুরী দেখে কাটার প্রহর; জলকিন্নরীর কথা বলে, গাঢ় চুমো এঁকে ওদের অধর কেমন রাঙিয়ে দেয়, কখনো বা বিরান উদ্যানে জাগায় ফুলের গুচ্ছ শুকনো গাছে ফের গানে গানে।বড় বেশি জনহীন পথে লোকটা একাকী হাঁটে শিস্‌ দিতে দিতে, ভাবে পা রাখবে সোনালি চৌকাঠে ঝেড়ে ফেলে ধুলোবালি শান্ত বেলাশেষে। অকস্মাৎ কী-যে হয়, দূরে থাকে ঘর, নিমেষে সে মেশে অক্ষরের ভিড়ে, হয়ে যায় অলৌকিক কণ্ঠস্বর।   (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dure-thake-ghor/
2621
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
ভক্তিমূলক
অমন   আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে চলবে না। এবার   হৃদয় মাঝে লুকিয়ে বোসো, কেউ    জানবে না, কেউ বলবে না। বিশ্বে তোমার লুকোচুরি, দেশ বিদেশে কতই ঘুরি - এবার   বলো আমার মনের কোণে দেবে ধরা, ছলবে না। আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে চলবে না।       জানি আমার কঠিন হৃদয় চরণ রাখার যোগ্য সে নয় - সখা,    তোমার হাওয়া লাগলে হিয়ায় তবু কি প্রাণ গলবে না।       না হয় আমার নাই সাধনা, ঝরলে তোমার কৃপার কণা তখন    নিমেষে কি ফুটবে না ফুল চকিতে ফল ফলবে না। আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে চলবে না।বোলপুর, ১১ ভাদ্র ১৩১৬ কাব্যগ্রন্থঃ গীতাঞ্জলি রচনা সংখ্যাঃ ২৩
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aral-diye-lukiye-gele/
1937
ফররুখ আহমদ
বৃষ্টির ছড়া
প্রকৃতিমূলক
বৃষ্টি এল কাশ বনে জাগল সাড়া ঘাস বনে, বকের সারি কোথা রে লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে। নদীতে নাই খেয়া যে, ডাকল দূরে দেয়া যে, কোন সে বনের আড়ালে ফুটল আবার কেয়া যে।গাঁয়ের নামটি হাটখোলা, বিষটি বাদল দেয় দোলা, রাখাল ছেলে মেঘ দেখে, যায় দাঁড়িয়ে পথ-ভোলা। মেঘের আঁধার মন টানে, যায় সে ছুটে কোন খানে, আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে আমন ধানের দেশ পানে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4009.html
3214
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিনের প্রান্তে এসেছি
চিন্তামূলক
দিনের প্রান্তে এসেছি গোধূলির ঘাটে। পথে পথে পাত্র ভরেছি অনেক কিছু দিয়ে। ভেবেছিলেম চিরপথের পাথেয় সেগুলি; দাম দিয়েছি কঠিন দুঃখে। অনেক করেছি সংগ্রহ মানুষের কথার হাটে, কিছু করেছি সঞ্চয় প্রেমের সদাব্রতে। শেষে ভুলেছি সার্থকতার কথা, অকারণে কুড়িয়ে বেড়ানোই হয়েছে অন্ধ অভ্যাসে বাঁধা; ফুটো ঝুলিটার শূন্য ভরাবার জন্যে বিশ্রাম ছিল না। আজ সামনে যখন দেখি ফুরিয়ে এল পথ, পাথেয়ের অর্থ আর রইল না কিছুই। যে প্রদীপ জ্বলেছিল মিলন-শয্যার পাশে সেই প্রদীপ এনেছিলেম হাতে ক'রে। তার শিখা নিবল আজ, সেটা ভাসিয়ে দিতে হবে স্রোতে। সামনের আকাশে জ্বলবে একলা সন্ধ্যার তারা। যে বাঁশি বাজিয়েছি ভোরের আলোয় নিশীথের অন্ধকারে, তার শেষ সুরটি বেজে থামবে রাতের শেষ প্রহরে। তার পরে? যে জীবনে আলো নিবল সুর থামল, সে যে এই আজকের সমস্ত কিছুর মতোই ভরা সত্য ছিল, সে-কথা একেবারেই ভুলবে জানি, ভোলাই ভালো। তবু তার আগে কোনো একদিনের জন্য কেউ একজন সেই শূন্যটার কাছে একটা ফুল রেখো বসন্তের যে ফুল একদিন বেসেছি ভালো আমার এতদিনকার যাওয়া-আসার পথে শুকনো পাতা ঝরেছে, সেখানে মিলেছে আলোক ছায়া, বৃষ্টিধারায় আমকাঁঠালের ডালে ডালে জেগেছে শব্দের শিহরণ, সেখানে দৈবে কারো সঙ্গে দেখা হয়েছিল জল-ভরা ঘট নিয়ে যে চলে গিয়েছিল চকিত পদে। এই সামান্য ছবিটুকু আর সব কিছু থেকে বেছে নিয়ে কেউ একজন আপন ধ্যানের পটে এঁকো কোনো একটি গোধূলির ধূসরমুহূর্তে। আর বেশি কিছু নয়। আমি আলোর প্রেমিক; প্রাণরঙ্গভূমিতে ছিলুম বাঁশি-বাজিয়ে। পিছনে ফেলে যাব না একটা নীরব ছায়া দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে। যে পথিক অস্তসূর্যের ম্লায়মান আলোর পথ নিয়েছে সে তো ধুলোর হাতে উজাড় করে দিলে সমস্ত আপনার দাবি; সেই ধুলোর উদাসীন বেদীটার সামনে রেখে যেয়ো না তোমার নৈবেদ্য; ফিরে নিয়ে যাও অন্নের থালি, যেখানে তাকিয়ে আছে ক্ষুধা, যেখানে অতিথি বসে আছে দ্বারে, যেখানে প্রহরে প্রহরে বাজছে ঘন্টা জীবনপ্রবাহের সঙ্গে কালপ্রবাহের মিলের মাত্রা রেখে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/denar-sas-pantta/
1111
জীবনানন্দ দাশ
প্রার্থনা
ভক্তিমূলক
আমাদের প্রভু বীক্ষণ দাওঃ মরি নাকি মোরা মহাপৃথিবীর তরে? পিরামিড যারা গড়েছিলো একদিন- আর যারা ভাঙে- গড়ে;- মশাল যাহারা জ্বালায় যেমন জেঙ্গিস যদি হালে দাঁড়ায় মদির ছায়ার মতন- যত অগণন মগজের কাঁচা মালে; যে-সব ভ্রমণ শুরু হ’লো শুধু মার্কোপোলোর কালে, আকাশের দিকে তাকায়ে মোরাও বুঝেছি যে-সব জ্যোতি দেশলাইকাঠি নয় শুধু আর- কালপুরুষের গতি; ডিনামাইট দিয়ে পর্বত কাটা না-হ’লে কী করে চলে,- আমাদের প্রভু বিরতি দিয়ো না; লাখো-লাখো যুগ রতিবিহারের ঘরে মনোবীজ দাওঃ পিরামিড গড়ে- পিরামিড ভাঙে গড়ে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/prarthona/
5423
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অদ্বৈধ
মানবতাবাদী
নরম ঘুমের ঘোর ভাঙল? দেখ চেয়ে অরাজক রাজ্য; ধ্বংস সমুখে কাঁপে নিত্য এখনো বিপদ অগ্রাহ্য? পৃথিবী, এ পুরাতন পৃথিবী দেখ আজ অবশেষে নিঃস্ব স্বপ্ন-অলস যত ছায়ারা একে একে সকলি অদৃশ্য। রুক্ষ মরুর দুঃস্বপ্ন হৃদয় আজকে শ্বাসরুদ্ধ, একলা গহন পথে চলতে জীবন সহসা বিক্ষুব্ধ। জীবন ললিত নয় আজকে ঘুচেছে সকল নিরাপত্তা, বিফল স্রোতের পিছুটানকে শরণ করেছে ভীরু সত্তা। তবু আজ রক্তের নিদ্রা, তবু ভীরু স্বপ্নের সখ্য; সহসা চমক লাগে চিত্তে দুর্জয় হল প্রতিপক্ষ! নিরুপায় ছিঁড়ে গেল দ্বৈদ নির্জনে মুখ তোলে অঙ্কুর, বুঝে নিল উদ্যোগী আত্মা জীবন আজকে ক্ষণভঙ্গুর। দলিত হৃদয় দেখে স্বপ্ন নতুন, নতুনতর বিশ্ব, তাই আজ স্বপ্নের ছায়ারা একে একে সকলি অদৃশ্য।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1110
5421
সিকান্দার আবু জাফর
সংগ্রাম চলবেই
মানবতাবাদী
জনতার সংগ্রাম চলবেই,আমাদের সংগ্রাম চলবেই।হতমানে অপমানে নয়, সুখ সম্মানে বাঁচবার অধিকার কাড়তে দাস্যের নির্মোক ছাড়তে অগণিত মানুষের প্রাণপণ যুদ্ধ চলবেই চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই।প্রতারণা প্রলোভন প্রলেপে হ’ক না আঁধার নিশ্ছিদ্র আমরা তো সময়ের সারথী নিশিদিন কাটাবো বিনিদ্র।দিয়েছি তো শান্তি আরও দেবো স্বস্তি দিয়েছি তো সম্ভ্রম আরও দেবো অস্থি প্রয়োজন হ’লে দেবো একনদী রক্ত। হ’ক না পথের বাধা প্রস্তর শক্ত, অবিরাম যাত্রার চির সংঘর্ষে একদিন সে-পাহাড় টলবেই। চলবেই চলবেই আমাদের সংগ্রাম চলবেইমৃত্যুর ভর্ৎসনা আমরা তো অহরহ শুনছি আঁধার গোরের ক্ষেতে তবু তো’ ভোরের বীজ বুনছি। আমাদের বিক্ষত চিত্তে জীবনে জীবনে অস্তিত্বে কালনাগ-ফণা উৎক্ষিপ্ত বারবার হলাহল মাখছি, তবু তো ক্লান্তিহীন যত্নে প্রাণে পিপাসাটুকু স্বপ্নে প্রতিটি দণ্ডে মেলে রাখছি। আমাদের কি বা আছে কি হবে যে অপচয়, যার সর্বস্বের পণ কিসে তার পরাজয় ? বন্ধুর পথে পথে দিনান্ত যাত্রী ভূতের বাঘের ভয় সে তো আমাদের নয়।হতে পারি পথশ্রমে আরও বিধ্বস্ত ধিকৃত নয় তবু চিত্ত আমরা তো সুস্থির লক্ষ্যের যাত্রী চলবার আবেগেই তৃপ্ত। আমাদের পথরেখা দুস্তর দুর্গম সাথে তবু অগণিত সঙ্গী বেদনার কোটি কোটি অংশী আমাদের চোখে চোখে লেলিহান অগ্নি সকল বিরোধ-বিধ্বংসী। এই কালো রাত্রির সুকঠিন অর্গল কোনোদিন আমরা যে ভাঙবোই মুক্ত প্রাণের সাড়া জানবোই, আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে নূতন সূর্যশিখা জ্বলবেই। চলবেই চলবেই আমাদের সংগ্রাম চলবেই।
https://banglapoems.wordpress.com/2013/02/21/%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%9a%e0%a6%b2%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b0/
2395
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
সনেট
সুরপুরে সশরীরে, শূর-কুল-পতি অর্জ্জুন, স্বকাজ যথা সাধি পুণ্য-বলে ফিরিলা কানন-বাসে ;---তুমি হে তেমতি, যাও সুখে ফিরি এবে ভারত-মণ্ডলে, মনোদ্যানে আশা-লতা তব ফলবতী !— ধন্য ভাগ্য, হে সুভগ, তব ভব-তলে ! শুভ ক্ষণে গর্ভে তোমা ধরিলা সে সতী, তিতিবেন যিনি, বৎস, নয়নের জলে ( স্নেহাসার!) যবে রঙ্গে বায়ু-রূপ ধরি জনরব, দূর বঙ্গে বহিবে সত্বরে এ তোমার কীৰ্ত্তি-বাৰ্ত্তা!—যাও দ্রুতে, তরি, নীলমণি-ময় পথ অপথ সাগরে! অদৃশ্যে রক্ষার্থে সঙ্গে যাবেন সুন্দরী বঙ্গ-লক্ষ্মী! যাও, কবি আশীৰ্ব্বাদ করে!–
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/satyendranath-tagore/
1186
জীবনানন্দ দাশ
রাত্রি ও ভোর
প্রেমমূলক
শীতের রাতের এই সীমাহীন নিষ্পন্দন গহ্বরে জীবন কি বেঁচে আছে তবে? ডানা-ভাঙ্গা নক্ষত্রের মতন উৎসবে আঁধারের ভিতরে কি করেকেবলি স্ফুলিঙ্গ অন্ধ সংক্রান্তির মতো? বহুদিন ক্ষমাহীন সময়ের ভিতরে সে অনেক জ্বলেছে আছে, তবু তুমি নেই, তাই তো দাহন ভেঙ্গে গেছে মৃত নক্ষত্রের গন্ধ ক্রমেই হতেছে পরিণতঅন্ধকার সনাতনে_ সৃষ্টির প্রথম উৎসারিত পটভূমি তারি অন্তিমের কথা? অন্তহীন মোজেইকে আলোকের গোলকধাঁধায় কেউ প্রিয়া_ কেউ তার অনিবার্ণ হতে চায়; ঝ'রে যায়_ দূর মৃগতৃষ্ণিকার মতো দীপ্ত তুমি।এখন ভোরের বেলা মনে হয় তুমি শাদা যূথিকার মতো তেমনি পবিত্র স্বাদ তোমার শরীর শিখা ঘিরে কোথাও বিষয় খুঁজে তোমাকে দেখেছি রৌদ্রে লুকানো শিশিরে সৃষ্টির প্রথম ভোর থেকে অবশেষে আজ এই পরিণতশেষ ভোর, শোষ রোদ, শেষ ফুল, অন্তিম শিশির মীনকেতনের দিন জন্মান্তরে কেটে গেছে, -আজ প্রতিসারী আরেক প্রয়াণে উৎস; -একটি মেঘের মতো চ'লে এসে ভারি নীলিমায় ভেসে যেতে-যেতে_ থেমে_ শুনেছি, বলেছো তুমি, স্থিরমেঘশান্তি প্রকৃতির- মানুষ তা হারিয়ে ফেলেছে চারিদিকে সময়ের সকল বিশাল মরুভূমি বলয়িত নগরীর সমাজের সভ্যতার কলঙ্কসুন্দর মৃগতৃষ্ণায় লয় পেয়ে গেলে স্থির তুমি_ স্থিরতর তুমি#জীবনান্দদাশের অগ্রন্থিত কবিতাসমগ্র
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ratri-o-bhore/
2008
বুদ্ধদেব বসু
প্রত্যহের ভার
সনেট
যে-বাণীবিহঙ্গে আমি আনন্দে করেছি অভ্যর্থনা ছন্দের সুন্দর নীড়ে বার-বার, কখনো ব্যর্থ না হোক তার বেগচ্যুত, পক্ষমুক্ত বায়ুর কম্পন জীবনের জটীল গ্রন্থিল বৃক্ষে ; যে-ছন্দোবন্ধন দিয়েছি ভাষারে, তার অন্তত আভাস যেন থাকে বত্সরের আবর্তনে, অদৃষ্টের ক্রূর বাঁকে-বাঁকে, কুটিল ক্রান্তিতে ; যদি ক্লান্তিআসে, যদি শান্তি যায়, যদি হৃত্পিণ্ড শুধু হতাশার ডম্বরু বাজায়, রক্ত শোনে মৃত্যুর মৃদঙ্গ শুধু;— তবুও মনের চরম চুড়ায় থাক সে-অমর্ত্য অতিথি-ক্ষণের চিহ্ন, যে-মূহূর্তে বাণীর আত্মারে জেনেছি আপন সত্তা ব’লে, স্তব্ ধ মেনেছি কালেরে, মূঢ় প্রবচন মরত্বে ; খন মন অনিচ্ছার অবশ্য বাঁচার ভুলেছে ভিষণ ভার, ভুলে গেছে প্রত্যহের ভার |
http://kobita.banglakosh.com/archives/4131.html
194
কাজী নজরুল ইসলাম
অনেক ছিল বলার
প্রেমমূলক
অনেক ছিল বলার, যদি সেদিন ভালোবাসতে পথ ছিল গো চলার, যদি দুদিন আগে আসতে আজকে মহাসাগর স্রোতে চলেছি দূর পারের পথে ঝরা পাতা হারায় যথা, সেই আঁধারে ভাসতে যাই সেই আঁধারে ভাসতে।গহন রাতি ডাকে আমায়, এসে তুমি আজকে কাঁদিয়ে গেলে হায় গো আমার বিদায় বেলার সাঁঝকে আসতে যদি হে অতিথি, ছিল যখন শুক্লা তিথি ফুটতো চাঁপা, সেদিন যদি চৈতালী চাঁদ হাসতে।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/onek-chlo-bolar/
1516
নির্মলেন্দু গুণ
শুধু
প্রেমমূলক
কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন। তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও কতবার যে আমি সে কথা বলিনি সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন। তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে জেগে উঠবার জন্য দরোজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবেঃ ‘এই ওঠো, আমি, আ…মি…।‘ আর অমি এ-কী শুনলাম এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন। আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য, আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য, আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য। তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে, আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a7%e0%a7%81-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af-nirmalendu-gun/
579
কালীপ্রসন্ন ঘোষ
পারিব না
নীতিমূলক
‘পারিব না’ একথাটি বলিও না আর, কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার; পাঁচজনে পারে যাহা, তুমিও পারিবে তাহা, পার কি না পার কর যতন আবার একবার না পারিলে দেখ শতবার।পারিবে না বলে মুখ করিও না ভার, ও কথাটি মুখে যেন না শুনি তোমার। অলস অবোধ যারা কিছুই পারে না তারা, তোমায় তো দেখি নাক তাদের আকার তবে কেন ‘পারিব না’ বল বার বার ?জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার, হাঁটিতে শিখে না কেহ না খেয়ে আছাড়, সাঁতার শিখিতে হলে আগে তবে নাম জলে, আছাড়ে করিয়া হেলা ‘হাঁট’ আর বার; পারিব বলিয়া সুখে হও আগুসার।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4333.html
2124
মহাদেব সাহা
কী যেন বলতে চায় বন্দী স্বদেশ
স্বদেশমূলক
আজ যেখানেই কান পাতি শুনি সজকলে চাপা কণ্ঠস্বর, খুব ধীরে কানের নিকটে মুখ এনে কী যেন বলতে চায় এই ফাল্গুনের বিষণ্ন গোলাপ, বসন্তের প্রথম কোকিল মনে হয় কী যেন বলতে চায় প্রতিটি নিঃশব্দ মুখ; কী যেন বলতে চায় মেঘমুক্ত ভোরের আকাশ গতরাতের কাহিনী লাইটপোস্ট, আইল্যাণ্ডের নীরব দোয়েল আর রমনার সবুজ চত্বর আমাকে দেখেই যেন ঠোঁট নাড়ে, আমাকে দেখেই যেন জ্বলে ওঠে রাতজাগা ইউক্যালিপ্‌টাসের সারি সামান্য দূরেই আরো একগুচ্ছ ম্লান স্বর্ণচাঁপা; তাদের যে-কারো দিকে তাকালেই মনে হয় কী যেন বলতে চায় তারা। মানুষের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় ভীষণ জরুরী কোনো কথা যেন তাদের বলার আছে, তাই কারো চোখের দিকে চোখ পড়তেই সভয়ে সরিয়ে নিই চোখ কারো মুখের দিকে ভালো করে তাকানোর সাহস পাইনে- যদি রমনার সবুজ মাঠ, স্বচ্ছ লেক আর এই নিঃসঙ্গ ফুটপাত আমাকে বলতে থাকে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তারা যা দেখেছে চোখ মেলে, প্রত্যহ অভিজ্ঞতা তারা যা দেখেছে চোখ মেলে, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তারা যা দেখেছে চোখ মেলে, প্রত্যহ যেসব ঘটনার সাক্ষী তারা- কোথায় রাখবো এতো চাপা উত্তপ্ত নিঃশ্বাস! তাই তো এমন মাথা হেট করে চলে যাই লজ্জার মুখোশ পরে কোনোদিকে তাকাইনে বড়ো; আমি তো শুনিনি তাই কী যেন বলতে চায় ক্ষুধার্ত যুবতী তার অনাহারী কোলের শিশুটি, রুগ্ন বৃদ্ধা, শোকার্ত তরুণ! গতরাতে বীভৎস রক্তপাত দেখে আহত গোলাপ নিজের দেহের রঙ নিয়ে যেন নিজেই লজ্জিত, সেদিন দুপুরবেলা নিষ্ঠুরতা দেখে একদল গ্রামের শালিক হয়ে আছে সেই থেকে মর্মাহত, গভীর হতাশ। সবাই আমার কাছে কী যেন বলতে চায় এই গোলাপ, শালিক আর ব্যথিত মানুষ, কী যেন বলতে চায় ঝরাপাতা, মায়ের করুণ অশ্রু, বন্দী স্বদেশ!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1357
1430
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
মেঘের বান্ধবী
প্রেমমূলক
প্রিয় বান্ধবী আমার কত যুগ পার হয়ে মুখোমুখি বসেছে ওখানে পানসির দাঁড়ের শব্দ ছপছপ ছপছপ বিধ্বস্ত প্রতিমা তাকে ফেলে এখন কোথায় যাবো কার কাছে, কে আছে নৈবেদ্য সাজায়ে তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও আমি এই ব্যাংকের ব্যস্ততার ভিড়ে আড়ালে আড়ালে সাদা পঙ্খিরাজ ওড়াবো ধবল মেঘের দেশে মেঘেদের বেশে জ্যৈষ্ঠ না আষাঢ় মাসে গাঙে নয়া পানি বৃন্দাবন দুবে যায় নেশা আজ দু’চোখে প্রবল বাঁকা দু’নয়নে নেশা আকাশ চৌচির বৃষ্টি নামে বাজ পড়ে বিদীর্ণ ভুবন হৃদয় গাঙের ঢেউয়ে বৈঠা বাই আমরা দু’জন ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1014
772
জসীম উদ্‌দীন
আরে ও রঙিলা নায়ের মাঝি
প্রেমমূলক
তুমি এই ঘাটে লাগায়ারে নাও লিগুম কথা কইয়া যাও শুনি। তোমার ভাইটাল সুরের সাথে সাথে কান্দে গাঙের পানি, ও তার ঢেউ লাগিয়া যায় ভাসিয়া কাঙ্খের কলসখানি। পূবালী বাতাসে তোমার নায়ের বাদাম ওড়ে, আমার শাড়ীর অঞ্চল ধৈরয না ধরে। তোমার নি পরাণরে মাঝি হারিয়াছে কেউ; কলসী ভাসায়া জলে গণেছ নি ঢেউ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/795
3659
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতী
মানবতাবাদী
শুধাই অয়ি গো ভারতী তোমায় তোমার ও বীণা নীরব কেন? কবির বিজন মরমে লুকায়ে নীরবে কেন গো কাঁদিছ হেন? অযতনে, আহা, সাধের বীণাটি ঘুমায়ে রয়েছে কোলের কাছে, অযতনে, আহা, এলোথেলো চুল এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে আছে। কেন গো আজিকে এ-ভাব তোমার কমলবাসিনী ভারতী রানী-- মলিন মলিন বসন ভূষণ মলিন বদনে নাহিকো বাণী। তবে কি জননি অমৃতভাষিণি তোমার ও বীণা নীরব হবে? ভারতের এই গগন ভরিয়া ও বীণা আর না বাজিবে তবে? দেখো তবে মাতা দেখো গো চাহিয়া তোমার ভারত শ্মশান-পারা, ঘুমায়ে দেখিছে সুখের স্বপন নরনারী সব চেতনহারা। যাহা-কিছু ছিল সকলি গিয়াছে, সে-দিনের আর কিছুই নাই, বিশাল ভারত গভীর নীরব, গভীর আঁধার যে-দিকে চাই। তোমারো কি বীণা ভারতি জননী, তোমারো কি বীণা নীরব হবে? ভারতের এই গগন ভরিয়া ও-বীণা আর না বাজিবে তবে? না না গো, ভারতী, নিবেদি চরণে কোলে তুলে লও মোহিনী বীণা। বিলাপের ধ্বনি উঠাও জননি, দেখিব ভারত জাগিবে কি না। অযুত অযুত ভারতনিবাসী কাঁদিয়া উঠিবে দারুণ শোকে, সে রোদনধ্বনি পৃথিবী ভরিয়া উঠিবে, জননি, দেবতালোকে। তা যদি না হয় তা হলে, ভারতি, তুলিয়া লও বিজয়ভেরী, বাজাও জলদগভীর গরজে অসীম আকাশ ধ্বনিত করি। গাও গো হুতাশ-পূরিত গান, জ্বলিয়া উঠুক অযুত প্রাণ, উথলি উঠুক ভারত-জলধি-- কাঁপিয়া উঠুক অচলা ধরা। দেখিব তখন প্রতিভাহীনা এ ভারতভূমি জাগিবে কি না, ঢাকিয়া বয়ান আছে যে শয়ান শরমে হইয়া মরমে-মরা! এই ভারতের আসনে বসিয়া তুমিই ভারতী গেয়েছ গান, ছেয়েছে ধরার আঁধার গগন তোমারি বীণার মোহন তান। আজও তুমি, মাতা, বীণাটি লইয়া মরম বিঁধিয়া গাও গো গান-- হীনবল সেও হইবে সবল, মৃতদেহ সেও পাইবে প্রাণ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/baroti/
2396
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সমাধি-লিপি
স্বদেশমূলক
দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে ( জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম ) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন! যশোরে সাগরদাঁড়ী কবতক্ষ-তীরে জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী!
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/post20160702063156/
6012
হেলাল হাফিজ
অনির্ণীত নারী
চিন্তামূলক
নারী কি নদীর মতো নারী কি পুতুল, নারী কি নীড়ের নাম টবে ভুল ফুল। নারী কি বৃক্ষ কোনো না কোমল শিলা, নারী কি চৈত্রের চিতা নিমীলিত নীলা। ১৫.৬.৮০
https://banglarkobita.com/poem/famous/84
1847
পূর্ণেন্দু পত্রী
পাখি বলে যায়
রূপক
ওপারে আমার ডিঙি পড়ে আছে, এপারে জল। অনর্গল পাতা ঝরে পড়ে। বৃদ্ধ বটের দীর্ঘশ্বাস মেটে আকাশ কালো থাবা নাড়ে, যেন গোগ্রাসে গিলবে সব অর্বাচীন পাখি বলে যায় আজ দুর্যোগ ক্ষমতাসীন। ওপারে আমার ভিঙি পড়ে আছে, এপারে চর ধুলি কাতর পথের দুধারে দুঃখিত বন, ঝাপসা চোখ। ভীষণ শোক যে-ভাবে কাঁদায়, সেইভাবে নামে নির্বিকার মেঘলা দিন। পাখি বলে যায় আজ দুর্যোগ ক্ষমতাসীন। ওপারে আমার ডিঙ্গি পড়ে আছে, এপারে ঘাট খোলা কপাট ঘরে ডেকে আনে সেই হাওয়া যার হৃদয় নেই। চারিদিকেই মনে হয় যেন মরণপন্ন কারো অসুখ চেতনাহীন। পাখি বলে যায় আজ দুর্যোগ ক্ষমতাসীন।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1256
132
আল মাহমুদ
পাখির মতো
প্রকৃতিমূলক
আম্মা বলেন, পড়রে সোনা আব্বা বলেন, মন দে; পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠালচাঁপার গন্ধে। আমার কেবল ইচ্ছে জাগে নদীর কাছে থাকতে, বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে পাখির মতো ডাকতে।সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে কর্ণফুলীর কূলটায়, দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি ফেরেস্তারা উল্টায়। তখন কেবল ভাবতে থাকি কেমন করে উড়বো, কেমন করে শহর ছেড়ে সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো ! তোমরা যখন শিখছো পড়া মানুষ হওয়ার জন্য, আমি না হয় পাখিই হবো, পাখির মতো বন্য।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3709.html
179
উৎপল কুমার বসু
ময়ূর
প্রকৃতিমূলক
ময়ূর, বুঝি-বা কোনো সূর্যাস্তে জন্মেছ । এবং মেঘের তলে উল্লাসে নতুন ডানাটিকে মেলে ধরে যখন প্রথম খেলা শুরু হবে—- সেই স্থির পরকালে আমি প্রথম তোমার দেখা পেয়েছি, ময়ূর ।সমুদ্রসৈকত ধরে এত দূর, এত গাঢ় স্তব্ধতার কাছে এসে তোমার প্রবল দৌড় দেখা গেল, যেন আরো শব্দহীনতার প্রতি — অন্ধকার ঝাউবনে— অস্তিত্ব-জটিল আমাদের আর্তরবে ডেকেছ সহসাঅথচ বনের শেষে নির্বসন যৌবনের চোখে বিদ্যুত্চমক বলে মনে হল তোমার প্রতিভা মনে হল নবীন নবীনতমা সৃষ্টির ক্ষমতাও বুঝি এইভাবে ক্রমাগত অন্তরহীনতার বুকে মিশে যায় ।ফিরে দাও সাগরে আবার । ফিরে দাও উন্মাদ তুফানে অস্তিত্বকে ফিরে দাও । বিপুল পৃথিবীময় পাথরের বুকে আমি তার ভেঙে পড়া দেখেছি গর্জনে । দেখেছি আছাড় ডুবন্ত জাহাজ থেকে ভেঙে নেয় পাটাতন, জয়ের মাস্তুল ।তবুও ঝড়ের শেষে, তবুও দিনের শেষে, অন্ধকার বনে, বৃষ্টির মেঘের তলে শোনা গেল আর্ত কেকারব— বুঝি নির্জনতা পেয়ে পুনর্বার মেলেছ বিশাল, নক্ষত্রে সাজানো ডানা । পেয়েছ নির্দেশ ?ময়ূর, বুঝি-বা কোনো সূর্যাস্তে জন্মেছ । এবং মেঘের তলে উল্লাসে নতুন ডানাটিকে মেলে ধরে যখন প্রথম খেলা শুরু হবে—- সেই স্থির পরকালে আমি প্রথম তোমার দেখা পেয়েছি, ময়ূর ।সমুদ্রসৈকত ধরে এত দূর, এত গাঢ় স্তব্ধতার কাছে এসে তোমার প্রবল দৌড় দেখা গেল, যেন আরো শব্দহীনতার প্রতি — অন্ধকার ঝাউবনে— অস্তিত্ব-জটিল আমাদের আর্তরবে ডেকেছ সহসাঅথচ বনের শেষে নির্বসন যৌবনের চোখে বিদ্যুত্চমক বলে মনে হল তোমার প্রতিভা মনে হল নবীন নবীনতমা সৃষ্টির ক্ষমতাও বুঝি এইভাবে ক্রমাগত অন্তরহীনতার বুকে মিশে যায় ।ফিরে দাও সাগরে আবার । ফিরে দাও উন্মাদ তুফানে অস্তিত্বকে ফিরে দাও । বিপুল পৃথিবীময় পাথরের বুকে আমি তার ভেঙে পড়া দেখেছি গর্জনে । দেখেছি আছাড় ডুবন্ত জাহাজ থেকে ভেঙে নেয় পাটাতন, জয়ের মাস্তুল ।তবুও ঝড়ের শেষে, তবুও দিনের শেষে, অন্ধকার বনে, বৃষ্টির মেঘের তলে শোনা গেল আর্ত কেকারব— বুঝি নির্জনতা পেয়ে পুনর্বার মেলেছ বিশাল, নক্ষত্রে সাজানো ডানা । পেয়েছ নির্দেশ ?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a7%9f%e0%a7%82%e0%a6%b0-%e0%a6%89%e0%a7%8e%e0%a6%aa%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%81/
5416
সলিল চৌধুরী
ফাঁদ
প্রেমমূলক
আমার ইচ্ছেগুলো প্রজাপতি হয়ে ঘাসে ঘাসে বনে বনে ওড়ে আর ফেরে আমার মনের মতো ছোট এক ছেলে জাল নিয়ে পিছু পিছু ঘোরে আর ফেরে ইচ্ছে ধরার সাধ জাল দিয়ে বেঁধে তাই তার দিন গেল কেঁদে আর কেঁদে। আমার আর একটা ইচ্ছা ‘তুমি’ তার নাম তারও হাতে জাল ছিল পরে জানলাম আমার মনের মতো ছোট শিশুটিকে জাল দিয়ে বেঁধে ফেলে এখে দিলে বুকে মনকে ধরার সাধ জাল দিয়ে বেঁধে তাই তার দিন গেল কেঁদে আর কেঁদে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4179.html
3894
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্যামল ঘন বকুলবন
প্রকৃতিমূলক
শ্যামল ঘন বকুলবন- ছায়ে ছায়ে যেন কী সুর বাজে মধুর পায়ে পায়ে। (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shamol-ghono-bokulbon/
3647
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভক্তের প্রতি
সনেট
সরল সরস স্নিগ্ধ তরুণ হৃদয়, কী গুণে তোমারে আমি করিয়াছি জয় তাই ভাবি মনে। উৎফুল্ল উত্তান চোখে চেয়ে আছ মুখপানে প্রীতির আলোকে আমারে উজ্জ্বল করি। তারুণ্য তোমার আপন লাবণ্যখানি লয়ে উপহার পরায় আমার কণ্ঠে, সাজায় আমারে আপন মনের মতো দেবতা-আকারে ভক্তির উন্নত লোকে প্রতিষ্ঠিত করি। সেথায় একাকী আমি সসংকোচে মরি। সেথা নিত্য ধূপে দীপে পূজা-উপচারে অচল আসন-’পরে কে রাখে আমারে? গেয়ে গেয়ে ফিরি পথে আমি শুধু কবি— নহি আমি ধ্রুবতারা, নহি আমি রবি।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vokter-proti/
2581
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অত চুপি চুপি কেন কথা কও
চিন্তামূলক
অত চুপি চুপি কেন কথা কও ওগো মরণ, হে মোর মরণ। অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও, ওগো একি প্রণয়েরি ধরন। যবে সন্ধ্যাবেলায় ফুলদল পড়ে ক্লান্ত বৃন্তে নমিয়া, যবে ফিরে আসে গোঠে গাভীদল সারা দিনমান মাঠে ভ্রমিয়া, তুমি পাশে আসি বস অচপল ওগো অতি মৃদুগতি-চরণ। আমি বুঝি না যে কী যে কথা কও ওগো মরণ, হে মোর মরণ।হায় এমনি করে কি, ওগো চোর, ওগো মরণ, হে মোর মরণ, চোখে বিছাইয়া দিবে ঘুমঘোর করি হৃদিতলে অবতরণ। তুমি এমনি কি ধীরে দিবে দোল মোর অবশ বক্ষশোণিতে। কানে বাজাবে ঘুমের কলরোল তব কিঙ্কিণি-রণরণিতে? শেষে পসারিয়া তব হিম-কোল মোরে স্বপনে করিবে হরণ? আমি বুঝি না যে কেন আস-যাও ওগো মরণ, হে মোর মরণ।কহ মিলনের এ কি রীতি এই ওগো মরণ, হে মোর মরণ। তার সমারোহভার কিছু নেই– নেই কোনো মঙ্গলাচরণ? তব পিঙ্গলছবি মহাজট সে কি চূড়া করি বাঁধা হবে না। তব বিজয়োদ্ধত ধ্বজপট সে কি আগে-পিছে কেহ ববে না। তব মশাল-আলোকে নদীতট আঁখি মেলিবে না রাঙাবরন? ত্রাসে কেঁপে উঠিবে না ধরাতল ওগো মরণ,হে মোর মরণ?যবে বিবাহে চলিলা বিলোচন ওগো মরণ, হে মোর মরণ, তাঁর কতমতো ছিল আয়োজন, ছিল কতশত উপকরণ। তাঁর লটপট করে বাঘছাল তাঁর বৃষ রহি রহি গরজে, তাঁর বেষ্টন করি জটাজাল যত ভুজঙ্গদল তরজে। তাঁর ববম্‌ববম্‌ বাজে গাল, দোলে গলায় কপালাভরণ, তাঁর বিষাণে ফুকারি উঠে তান ওগো মরণ, হে মোর মরণ।শুনি শ্মশানবাসীর কলকল ওগো মরণ, হে মোর মরণ, সুখে গৌরীর আঁখি ছলছল, তাঁর কাঁপিছে নিচোলাবরণ। তাঁর বাম আঁখি ফুরে থরথর, তাঁর হিয়া দুরুদুরু দুলিছে, তাঁর পুলকিত তনু জরজর, তাঁর মন আপনারে ভুলিছে। তাঁর মাতা কাঁদে শিরে হানি কর খেপা বরেরে করিতে বরণ, তাঁর পিতা মনে মানে পরমাদ ওগো মরণ, হে মোর মরণ।তুমি চুরি করি কেন এস চোর ওগো মরণ, হে মোর মরণ। শুধু নীরবে কখন নিশি-ভোর, শুধু অশ্রু-নিঝর-ঝরন। তুমি উৎসব করো সারারাত তব বিজয়শঙ্খ বাজায়ে। মোরে কেড়ে লও তুমি ধরি হাত নব রক্তবসনে সাজায়ে। তুমি কারে করিয়ো না দৃক্‌পাত, আমি নিজে লব তব শরণ যদি গৌরবে মোরে লয়ে যাও ওগো মরণ, হে মোর মরণ।যদি কাজে থাকি আমি গৃহমাঝ ওগো মরণ, হে মোর মরণ, তুমি ভেঙে দিয়ো মোর সব কাজ, কোরো সব লাজ অপহরণ। যদি স্বপনে মিটায়ে সব সাধ আমি শুয়ে থাকি সুখশয়নে, যদি হৃদয়ে জড়ায়ে অবসাদ থাকি আধজাগরূক নয়নে, তবে শঙ্খে তোমার তুলো নাদ করি প্রলয়শ্বাস ভরণ– আমি ছুটিয়া আসিব ওগো নাথ, ওগো মরণ, হে মোর মরণ।আমি যাব যেথা তব তরী রয় ওগো মরণ, হে মোর মরণ, যেথা অকূল হইতে বায়ু বয় করি আঁধারের অনুসরণ। যদি দেখি ঘনঘোর মেঘোদয় দূর ঈশানের কোণে আকাশে, যদি বিদ্যুৎফণী জ্বালাময় তার উদ্যত ফণা বিকাশে, আমি ফিরিব না করি মিছা ভয়– আমি করিব নীরবে তরণ সেই মহাবরষার রাঙা জল ওগো মরণ, হে মোর মরণ।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/oto-chupi-chupi-keno-kotha-kow/
5544
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সুচিকিৎসা
হাস্যরসাত্মক
বদ্যিনাথের সর্দি হল কলকাতাতে গিয়ে, আচ্ছা ক’রে জোলাপ নিল নস্যি নাকে দিয়ে। ডাক্তার এসে, বল্ল কেশে, “বড়ই কঠিন ব্যামো, এ সব কি সুচিকিৎসা ? —আরে আরে রামঃ। আমার হাতে পড়লে পড়ে ‘এক্‌সরে’ করে দেখি, রোগটা কেমন, কঠিন কিনা–আসল কিংবা মেকি। থার্মোমিটার মুখে রেখে সাবধানেতে থাকুক, আইস–ব্যাগটা মাথায় দিয়ে একটা দিন তো রাখুক। ‘ইনজেক্‌শন’ নিতে হবে ‘অক্সিজেন’টা পরে তারপরেতে দেখব এ রোগ থাকে কেমন ক’রে।” পল্লীগ্রামের বদ্যিনাথ অবাক হল ভারী, সর্দি হলেই এমনতর? ধন্য ডাক্তারী!!‘ভবিষ্যতে’ ও ‘সুচিকিৎসা’ — এই ছড়াদুটি ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের লেখা ‘সুকান্ত-প্রসঙ্গ’, ‘শারদীয়া বসুমতী’, ১৩৫৪-থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি। এগুলি ১৯৪০-এর আগের লেখা বলে অনুমিত।
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/suchikitsa/
4669
শামসুর রাহমান
গদ্য সনেট_ ৪
প্রেমমূলক
অনেকদিন যাবত চিলেকোঠা বিষয়ে একটি ধারণা লালন করছি। দূরের আকাশে মেঘেদের কোলে কোথাও যদি আমার নিজস্ব একটা চিলেকোঠা থাকতো তা হলে কী ভালোই না হতো। সেখানে কিছু চমৎকার সময় কাটানোর জন্যে যখন তখন চলে যেতে পারবো; কোনো সিঁড়ির প্রয়োজন হবে না, ব্যবহার করতে হবে না বায়ুযান। আমার সেই চিলেকোঠায় নিষিদ্ধ হবে খবরের কাগজ, থাকবে শুধু বই আর ক্যাসেট প্লেয়ার।চিলেকোঠায় হাত নেড়ে গালিবের ধরনে ডেকে আনবো কবিতাকে, কোনো কোনোদিন তুমি আসবে হাওয়ায় আঁচল উড়িয়ে, বসে গল্প করবে আমার সঙ্গে, ইচ্ছে হলে গান গাইবে কিংবা কিছু না বলে আমার বুকে মাথা রেখে দেখবে কালপুরুষ আর আমি তোমার চুল নিয়ে খেলা করবো। কখনো নীল পাখির গানের সুরে ভেসে আমরা কবিতার শীশমহলে পৌঁছে যাবো।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/godyo-sonet-4/
2653
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশের চাঁদ
চিন্তামূলক
হাতে তুলে দাও আকাশের চাঁদ — এই হল তার বুলি। দিবস রজনী যেতেছে বহিয়া, কাঁদে সে দু হাত তুলি। হাসিছে আকাশ, বহিছে বাতাস, পাখিরা গাহিছে সুখে। সকালে রাখাল চলিয়াছে মাঠে, বিকালে ঘরের মুখে। বালক বালিকা ভাই বোনে মিলে খেলিছে আঙিনা-কোণে, কোলের শিশুরে হেরিয়া জননী হাসিছে আপন মনে। কেহ হাটে যায় কেহ বাটে যায় চলেছে যে যার কাজে — কত জনরব কত কলরব উঠিছে আকাশমাঝে। পথিকেরা এসে তাহারে শুধায় , 'কে তুমি কাঁদিছ বসি । ' সে কেবল বলে নয়নের জলে, 'হাতে পাই নাই শশী।' সকালে বিকালে ঝরি পড়ে কোলে অযাচিত ফুলদল, দখিন সমীর বুলায় ললাটে দক্ষিণ করতল। প্রভাতের আলো আশিস-পরশ করিছে তাহার দেহে, রজনী তাহারে বুকের আঁচলে ঢাকিছে নীরব স্নেহে। কাছে আসি শিশু মাগিছে আদর কণ্ঠ জড়ায়ে ধরি, পাশে আসি যুবা চাহিছে তাহারে লইতে বন্ধু করি। এই পথে গৃহে কত আনাগোনা, কত ভালোবাসাবাসি, সংসারসুখ কাছে কাছে তার কত আসে যায় ভাসি, মুখ ফিরাইয়া সে রহে বসিয়া, কহে সে নয়নজলে, 'তোমাদের আমি চাহি না কারেও, শশী চাই করতলে।' শশী যেথা ছিল সেথাই রহিল, সেও ব'সে এক ঠাঁই। অবশেষে যবে জীবনের দিন আর বেশি বাকি নাই, এমন সময়ে সহসা কী ভাবি চাহিল সে মুখ ফিরে দেখিল ধরণী শ্যামল মধুর সুনীল সিন্ধুতীরে। সোনার ক্ষেত্রে কৃষাণ বসিয়া কাটিতেছে পাকা ধান, ছোটো ছোটো তরী পাল তুলে যায়, মাঝি বসে গায় গান। দূরে মন্দিরে বাজিছে কাঁসর, বধূরা চলেছে ঘাটে, মেঠো পথ দিয়ে গৃহস্থ জন আসিছে গ্রামের হাটে। নিশ্বাস ফেলি রহে আঁখি মেলি, কহে ম্রিয়মাণ মন, 'শশী নাহি চাই যদি ফিরে পাই আর বার এ জীবন।' দেখিল চাহিয়া জীবনপূর্ণ সুন্দর লোকালয় প্রতি দিবসের হরষে বিষাদে চির-কল্লোলময়। স্নেহসুধা লয়ে গৃহের লক্ষ্মী ফিরিছে গৃহের মাঝে, প্রতি দিবসেরে করিছে মধুর প্রতি দিবসের কাজে। সকাল বিকাল দুটি ভাই আসে ঘরের ছেলের মতো, রজনী সবারে কোলেতে লইছে নয়ন করিয়া নত। ছোটো ছোটো ফুল, ছোটো ছোটো হাসি, ছোটো কথা, ছোটো সুখ, প্রতি নিমেষের ভালোবাসাগুলি, ছোটো ছোটো হাসিমুখ আপনা-আপনি উঠিছে ফুটিয়া মানবজীবন ঘিরি, বিজন শিখরে বসিয়া সে তাই দেখিতেছে ফিরি ফিরি। দেখে বহুদূরে ছায়াপুরী-সম অতীত জীবন-রেখা, অস্তরবির সোনার কিরণে নূতন বরনে লেখা। যাহাদের পানে নয়ন তুলিয়া চাহে নি কখনো ফিরে, নবীন আভায় দেখা দেয় তারা স্মৃতিসাগরের তীরে। হতাশ হৃদয়ে কাঁদিয়া কাঁদিয়া পুরবীরাগিণী বাজে, দু-বাহু বাড়ায়ে ফিরে যেতে চায় ওই জীবনের মাঝে। দিনের আলোক মিলায়ে আসিল তবু পিছে চেয়ে রহে— যাহা পেয়েছিল তাই পেতে চায় তার বেশি কিছু নহে। সোনার জীবন রহিল পড়িয়া কোথা সে চলিল ভেসে। শশীর লাগিয়া কাঁদিতে গেল কি রবিশশীহীন দেশে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akasher-chad/
3797
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যেতে নাহি দিব
চিন্তামূলক
দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর; হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর। জনশূন্য পল্লিপথে ধূলি উড়ে যায় মধ্যাহ্ন-বাতাসে; স্নিগ্ধ অশত্থের ছায় ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিণী জীর্ণ বস্ত্র পাতি ঘুমায়ে পড়েছে; যেন রৌদ্রময়ী রাতি ঝাঁ ঝাঁ করে চারি দিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম– শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম। গিয়েছে আশ্বিন– পূজার ছুটির শেষে ফিরে যেতে হবে আজি বহুদূরদেশে সেই কর্মস্থানে। ভৃত্যগণ ব্যস্ত হয়ে বাঁধিছে জিনিসপত্র দড়াদড়ি লয়ে, হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি এ-ঘরে ও-ঘরে। ঘরের গৃহিণী, চক্ষু ছলছল করে, ব্যথিছে বক্ষের কাছে পাষাণের ভার, তবুও সময় তার নাহি কাঁদিবার একদণ্ড তরে; বিদায়ের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে ফিরে; যথেষ্ট না হয় মনে যত বাড়ে বোঝা। আমি বলি, “এ কী কাণ্ড! এত ঘট এত পট হাঁড়ি সরা ভাণ্ড বোতল বিছানা বাক্স রাজ্যের বোঝাই কী করিব লয়ে কিছু এর রেখে যাই কিছু লই সাথে।’ সে কথায় কর্ণপাত নাহি করে কোনো জন। “কী জানি দৈবাৎ এটা ওটা আবশ্যক যদি হয় শেষে তখন কোথায় পাবে বিভুঁই বিদেশে? সোনামুগ সরু চাল সুপারি ও পান; ও হাঁড়িতে ঢাকা আছে দুই-চারিখান গুড়ের পাটালি; কিছু ঝুনা নারিকেল; দুই ভাণ্ড ভালো রাই-সরিষার তেল; আমসত্ত্ব আমচুর; সের দুই দুধ– এই-সব শিশি কৌটা ওষুধবিষুধ। মিষ্টান্ন রহিল কিছু হাঁড়ির ভিতরে, মাথা খাও, ভুলিয়ো না, খেয়ো মনে করে।’ বুঝিনু যুক্তির কথা বৃথা বাক্যব্যয়। বোঝাই হইল উঁচু পর্বতের ন্যায়। তাকানু ঘড়ির পানে, তার পরে ফিরে চাহিনু প্রিয়ার মুখে; কহিলাম ধীরে, “তবে আসি’। অমনি ফিরায়ে মুখখানি নতশিরে চক্ষু-‘পরে বস্ত্রাঞ্চল টানি অমঙ্গল অশ্রুজল করিল গোপন। বাহিরে দ্বারের কাছে বসি অন্যমন কন্যা মোর চারি বছরের। এতক্ষণ অন্য দিনে হয়ে যেত স্নান সমাপন, দুটি অন্ন মুখে না তুলিতে আঁখিপাতা মুদিয়া আসিত ঘুমে; আজি তার মাতা দেখে নাই তারে; এত বেলা হয়ে যায় নাই স্নানাহার। এতক্ষণ ছায়াপ্রায় ফিরিতেছিল সে মোর কাছে কাছে ঘেঁষে, চাহিয়া দেখিতেছিল মৌন নির্নিমেষে বিদায়ের আয়োজন। শ্রান্তদেহে এবে বাহিরের দ্বারপ্রান্তে কী জানি কী ভেবে চুপিচাপি বসে ছিল। কহিনু যখন “মা গো, আসি’ সে কহিল বিষণ্ণ-নয়ন ম্লান মুখে, “যেতে আমি দিব না তোমায়।’ যেখানে আছিল বসে রহিল সেথায়, ধরিল না বাহু মোর, রুধিল না দ্বার, শুধু নিজ হৃদয়ের স্নেহ-অধিকার প্রচারিল–“যেতে আমি দিব না তোমায়’। তবুও সময় হল শেষ, তবু হায় যেতে দিতে হল। ওরে মোর মূঢ় মেয়ে, কে রে তুই, কোথা হতে কী শকতি পেয়ে কহিলি এমন কথা, এত স্পর্ধাভরে– “যেতে আমি দিব না তোমায়’? চরাচরে কাহারে রাখিবি ধরে দুটি ছোটো হাতে গরবিনী, সংগ্রাম করিবি কার সাথে বসি গৃহদ্বারপ্রান্তে শ্রান্ত ক্ষুদ্র দেহ শুধু লয়ে ওইটুকু বুকভরা স্নেহ। ব্যথিত হৃদয় হতে বহু ভয়ে লাজে মর্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে এ জগতে, শুধু বলে রাখা “যেতে দিতে ইচ্ছা নাহি’। হেন কথা কে পারে বলিতে “যেতে নাহি দিব’! শুনি তোর শিশুমুখে স্নেহের প্রবল গর্ববাণী, সকৌতুকে হাসিয়া সংসার টেনে নিয়ে গেল মোরে, তুই শুধু পরাভূত চোখে জল ভ’রে দুয়ারে রহিলি বসে ছবির মতন, আমি দেখে চলে এনু মুছিয়া নয়ন। চলিতে চলিতে পথে হেরি দুই ধারে শরতের শস্যক্ষেত্র নত শস্যভারে রৌদ্র পোহাইছে। তরুশ্রেণী উদাসীন রাজপথপাশে, চেয়ে আছে সারাদিন আপন ছায়ার পানে। বহে খরবেগ শরতের ভরা গঙ্গা। শুভ্র খণ্ডমেঘ মাতৃদুগ্ধ পরিতৃপ্ত সুখনিদ্রারত সদ্যোজাত সুকুমার গোবৎসের মতো নীলাম্বরে শুয়ে। দীপ্ত রৌদ্রে অনাবৃত যুগ-যুগান্তরক্লান্ত দিগন্তবিস্তৃত ধরণীর পানে চেয়ে ফেলিনু নিশ্বাস। কী গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ, সমস্ত পৃথিবী। চলিতেছি যতদূর শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর “যেতে আমি দিব না তোমায়’। ধরণীর প্রান্ত হতে নীলাভ্রের সর্বপ্রান্ততীর ধ্বনিতেছে চিরকাল অনাদ্যন্ত রবে, “যেতে নাহি দিব। যেতে নাহি দিব।’ সবে কহে “যেতে নাহি দিব’। তৃণ ক্ষুদ্র অতি তারেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী কহিছেন প্রাণপণে “যেতে নাহি দিব’। আয়ুক্ষীণ দীপমুখে শিখা নিব-নিব, আঁধারের গ্রাস হতে কে টানিছে তারে কহিতেছে শত বার “যেতে দিব না রে’। এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে গভীর ক্রন্দন–“যেতে নাহি দিব’। হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়। চলিতেছে এমনি অনাদি কাল হতে। প্রলয়সমুদ্রবাহী সৃজনের স্রোতে প্রসারিত-ব্যগ্র-বাহু জ্বলন্ত-আঁখিতে “দিব না দিব না যেতে’ ডাকিতে ডাকিতে হু হু করে তীব্রবেগে চলে যায় সবে পূর্ণ করি বিশ্বতট আর্ত কলরবে। সম্মুখ-ঊর্মিরে ডাকে পশ্চাতের ঢেউ “দিব না দিব না যেতে’– নাহি শুনে কেউ নাহি কোনো সাড়া। চারি দিক হতে আজি অবিশ্রাম কর্ণে মোর উঠিতেছে বাজি সেই বিশ্ব-মর্মভেদী করুণ ক্রন্দন মোর কন্যাকণ্ঠস্বরে; শিশুর মতন বিশ্বের অবোধ বাণী। চিরকাল ধরে যাহা পায় তাই সে হারায়, তবু তো রে শিথিল হল না মুষ্টি, তবু অবিরত সেই চারি বৎসরের কন্যাটির মতো অক্ষুণ্ন প্রেমের গর্বে কহিছে সে ডাকি “যেতে নাহি দিব’। ম্লান মুখ, অশ্রু-আঁখি, দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে টুটিছে গরব, তবু প্রেম কিছুতে না মানে পরাভব, তবু বিদ্রোহের ভাবে রুদ্ধ কণ্ঠে কয় “যেতে নাহি দিব’। যত বার পরাজয় তত বার কহে, “আমি ভালোবাসি যারে সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে। আমার আকাঙক্ষা-সম এমন আকুল, এমন সকল-বাড়া, এমন অকূল, এমন প্রবল বিশ্বে কিছু আছে আর!’ এত বলি দর্পভরে করে সে প্রচার “যেতে নাহি দিব’। তখনি দেখিতে পায়, শুষ্ক তুচ্ছ ধূলি-সম উড়ে চলে যায় একটি নিশ্বাসে তার আদরের ধন; অশ্রুজলে ভেসে যায় দুইটি নয়ন, ছিন্নমূল তরু-সম পড়ে পৃথ্বীতলে হতগর্ব নতশির। তবু প্রেম বলে, “সত্যভঙ্গ হবে না বিধির। আমি তাঁর পেয়েছি স্বাক্ষর-দেওয়া মহা অঙ্গীকার চির-অধিকার-লিপি।’– তাই স্ফীত বুকে সর্বশক্তি মরণের মুখের সম্মুখে দাঁড়াইয়া সুকুমার ক্ষীণ তনুলতা বলে, “মৃত্যু তুমি নাই।– হেন গর্বকথা! মৃত্যু হাসে বসি। মরণপীড়িত সেই চিরজীবী প্রেম আচ্ছন্ন করেছে এই অনন্ত সংসার, বিষণ্ণ নয়ন-‘পরে অশ্রুবাষ্প-সম, ব্যাকুল আশঙ্কাভরে চির-কম্পমান। আশাহীন শ্রান্ত আশা টানিয়া রেখেছে এক বিষাদ-কুয়াশা বিশ্বময়। আজি যেন পড়িছে নয়নে– দুখানি অবোধ বাহু বিফল বাঁধনে জড়ায়ে পড়িয়া আছে নিখিলেরে ঘিরে, স্তব্ধ সকাতর। চঞ্চল স্রোতের নীরে পড়ে আছে একখানি অচঞ্চল ছায়া– অশ্রুবৃষ্টিভরা কোন্‌ মেঘের সে মায়া। তাই আজি শুনিতেছি তরুরক মর্মরে এত ব্যাকুলতা; অলস ঔদাস্যভরে মধ্যাহ্নের তপ্ত বায়ু মিছে খেলা করে শুষ্ক পত্র লয়ে; বেলা ধীরে যায় চলে ছায়া দীর্ঘতর করি অশত্থের তলে। মেঠো সুরে কাঁদে যেন অনন্তের বাঁশি বিশ্বের প্রান্তর-মাঝে; শুনিয়া উদাসী বসুন্ধরা বসিয়া আছেন এলোচুলে দূরব্যাপী শস্যক্ষেত্রে জাহ্নবীর কূলে একখানি রৌদ্রপীত হিরণ্য-অঞ্চল বক্ষে টানি দিয়া; স্থির নয়নযুগল দূর নীলাম্বরে মগ্ন; মুখে নাহি বাণী। দেখিলাম তাঁর সেই ম্লান মুখখানি সেই দ্বারপ্রান্তে লীন, স্তব্ধ মর্মাহত মোর চারি বৎসরের কন্যাটির মতো।
http://kobita.banglakosh.com/archives/435.html
2074
মহাদেব সাহা
আমি ছিন্নভিন্ন
মানবতাবাদী
আমি ছিন্নভিন্ন-বিগত বছরের এটাই সর্বাপেক্ষা প্রধান সংবাদ বিশ্বের সমস্ত প্রচার মাধ্যম থেকে একযোগে প্রচারযোগ্য এই একটাই বিশ্বসংবাদ, আমি ছিন্নভিন্ন যদিও একান্ত ব্যক্তিগত এই শোকবার্তা কারো মনে জাগাবে না সামান্য করুণা তবু মনে হয় এই শতাব্দীর এটাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদ-শিরোনাম : আমি ছিন্নভিন্ন ; এই কবিতার মদ্যে আমি এই একান্ত জরুরী খবরটাই শুধু উদ্ধৃত করেছি শিম্ভের সমস্ত সংবাদ উৎস হতে এই একটাই বার্তা শুধু প্রচারিত হচ্ছে একটি শতাব্দী ধরে- মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখো, তার বুকের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করো সে বলবে, আমি ছিন্নভিন্ন গোলাপের দিকে তাকাও সে বলবে, আমি ছিন্নভিন্ন বন কিংবা উদ্ভিদের কছে যাও সেও এই একই কথাই বলবে, অনন্ত নীলিমার দিক চোখ ফেরাও তার কন্ঠে শুনতে পাবে এই একই ভয়াবহ বার্তা ; আমি ছিনইভন্ন পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে ফিরে তাকাও সেও ক্রমাগত আর্তনাদ করে উঠবে, আমি ছিন্নভিন্ন সৌন্দর্যকে জিজ্ঞেস করো সেও এই একই উত্তর দেবে, মানুষের শুদ্ধতাকে প্রশ্ন করো সেও নিঃসঙ্কোচে বলবে, আমি ছিন্নভিন্ন প্রকৃতি ও শস্যক্ষেত্রের কাছে যাও অন্য কিচুই শুনতে পাবে না, এমন যে শান্ত জলধারা তার কাছেও যাও আহত কন্ঠে বলবে সেও দলিত-মথিত, ছিন্নভিন্ন গোলাপের কৌমার্য, ফুলের শুদ্ধতা আর হৃদয়ের বিশুদ্ধ আবেগ তারাও এই একই কথা বলবে ; দেশ ছিন্নভিন্ন, মানুষ ছিন্নভিন্ন,মানুষের সত্তা ছিন্নভিন্ন যতোই লুকোতে চাই তবুও প্রকৃত সত্য হচ্ছে আমি ছিন্নভিন্ন,কাঁটায় কাঁটায় বিদ্ধ ও বিক্ষত ট্রাজিডির করুণ নয়ক যেন চোখের সম্মুখে দেখে একে একে নিভিছে দেউটি, অগ্নিদগ্ধ স্বর্ণলঙ্কাপুরী মুহূর্তে বিরান এই সমগ্র জীবন, হয়তো সম্মুখ যুদ্ধে হইনি আক্রান্ক ভূমিকম্প কিংবা ঘূর্ণিঝড় তছনছ করেনি উদ্যান, তবুও তাকিয়ে দেখি আমি যেন ধ্বংসস্তপ এর ব্যক্তিগত শোকবর্তা যদিও কারোই মনে বিশেষ চাঞ্চল্য কিছু জাগাবে না ঠিক তবুও যেমন একটি গোলাপ বলে, একটি উদ্ভিদ বলে, এই দেশ বলে, মানুষের সত্তার শুদ্ধতা বলে আমিও তেমনি বলি সব চেয়ে সত্য আর মর্মান্তিক একটি সংবাদ ; আমি ছিন্নভিন্ন- আমার সমস্ত সত্তা ছিন্নভিন্ন, ছিন্নভিন্ন আমার শরীর ছিন্নভিন্ন, তবুও দাঁড়িয়ে আছি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1366
659
জয় গোস্বামী
ঘরে রাধাবিনোদ আকাশ
রূপক
ঘরে রাধাবিনোদ আকাশ ঝুলনের চাঁদটি মেঝেতে বিছানার পাশের লণ্ঠন তার শুধু চক্ষু দপ্‌দপ্‌ অমাবস্যা পূর্ণিমা সড়ক ফালাফালা ক’রে সারারাত সে খুঁজে বেড়াচ্ছে একফালি কবিতা লেখার যোগ্য শব!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1734
1897
পূর্ণেন্দু পত্রী
সরোদ বাজাতে জানলে
চিন্তামূলক
আমার এমন কিছু দুঃখ আছে যার নাম তিলক কামোদ এমন কিছু স্মৃতি যা সিন্ধুভৈরবী জয়জয়ন্তীর মতো বহু ক্ষত রয়ে গেছে ভিতর দেয়ালে কিছু কিচু অভিমান ইমনকল্যাণ। সরোদ বাজাতে জানলে বড় ভালো হতো। পুরুষ কিভাবে কাঁদে সেই শুধু জানে। কার্পেটে সাজানো প্রিয় অন্তঃপুরে ঢুকে গেছে জল। মুহুর্মুহু নৌকাডুবি, ভেসে যায় বিরুদ্ধ নোঙর। পৃথিবীর যাবতীয় প্রেমিকের সপ্তডিঙা ডুবেছে যেখানে সেখানে নারীর মতো পদ্ম ফুটে থাকে। জল হাসে, জল তার চুড়িপরা হাতে, নর্তকীর মতো নেচে ঘুরে ঘুরে ঘাগরার ছোবলে সব কিছু কেড়ে নেয়, কেড়ে নিয়ে ফের ভরে দেয় বাসি হয়ে যাওয়া বুকে পদ্মগন্ধ, প্রকাশ্য উদ্যন। এই অপরূপ ধ্বংস, মরচে-পড়া ঘরে দোরে চাঁপা এই চুনকাম দরবারী কানাড়া এরই নাম? সরোদ কাজাতে জানলে বড় ভালো হতো। পুরুষ কীভাবে বাঁচে সেই শুধু জানে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1315
4457
শামসুর রাহমান
এইসব ফুল
সনেট
ঘুম থেকে জেগে দেখি টেবিলে সাজানো কিছু ফুল, যে-ফুল দেখেছি স্বপ্নে অচিন উপত্যকার গাছে। জানি, সে নীরবে রেখে গ্যাছে ফুল হৃদয়ের কাছে অগোচরে, ফুলগুচ্ছ ঘিরে গীত হয় বুলবুল ক্ষণে ক্ষণে কে জানে কী সুখে! পৃথিবীতে কোনো ভুল কোথাও হয়নি যেন আজ; হতাশ মুমূর্ষ বাঁচে, এমনকী ধূমায়িত আমারও সত্তায় আলো নাচে অমেয় সৌরভে; এই জানলায় ওড়ে কার চুল?মহান আলিগিয়েরি দান্তের উদ্দেশে কোনো নারী দূর ফ্লোরেন্সের বাগিচায় একা, করি অনুমান, চয়ন করেছে ফুল একদা সপ্রেম; হয়তো-বা কবির অমর কাব্যে সে-পুষ্পের অপরূপ শোভা নিভৃতে পেয়েছে ঠাঁই। যে-ফুলে আমার এই বাড়ি হেসে ওঠে, তার কিছু ঘ্রাণ পাবে কি আমার গান?   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ei-sob-ful/
2607
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপযশ
ছড়া
বাছা রে, তোর চক্ষে কেন জল। কে তোরে যে কী বলেছে আমায় খুলে বল্‌। লিখতে গিয়ে হাতে মুখে মেখেছ সব কালি, নোংরা ব ' লে তাই দিয়েছে গালি? ছি ছি, উচিত এ কি। পূর্ণশশী মাখে মসী— নোংরা বলুক দেখি। বাছা রে, তোর সবাই ধরে দোষ। আমি দেখি সকল-তাতে এদের অসন্তোষ। খেলতে গিয়ে কাপড়খানা ছিঁড়ে খুঁড়ে এলে তাই কি বলে লক্ষ্মীছাড়া ছেলে। ছি ছি, কেমন ধারা। ছেঁড়া মেঘে প্রভাত হাসে, সে কি লক্ষ্মীছাড়া। কান দিয়ো না তোমায় কে কী বলে। তোমার নামে অপবাদ যে ক্রমেই বেড়ে চলে। মিষ্টি তুমি ভালোবাস তাই কি ঘরে পরে লোভী বলে তোমার নিন্দে করে! ছি ছি, হবে কী। তোমায় যারা ভালোবাসে তারা তবে কী। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/opojosh/
2222
মহাদেব সাহা
ভূদৃশ্যের বর্ণনা
চিন্তামূলক
ভূদৃশ্য এমন হয় চতুর্দিকে অদম্য পাহাড়, বাবলার ঝোপ পাশে মানুষের খেয়ালি বসতি, কাদামাটি ধুলোর বিস্তার কেউ করে গান, কেউ অশ্রু ফেলে, নিমজ্জিত ঘর আর বাড়ি, ভূদৃশ্য এমন হয় মাঝে নদী মাথায় আকাশ, উঁকি দেয় ছেঁড়া চাঁদ, গাঢ় পাতা, হাস্যহীন কলরোলহীন তবু পাড়া- মানুষ ফেলেছে তাঁবু বহুদূর বনের পশ্চাতে কিন্তু চিতাবাঘ আর প্রফুল্ল হরিণ জল খায় ঘোরে ফেরে বাৎসল্যে দ্বিধায় হঠাৎ আক্রান্ত কেউ মৃত্যু এসে নিয়ে যায় তাকে, এই খেলাধুলা ভূদৃশ্য এমন হয় চারদিকে উড়ন্ত পাহাড় পাশে সামাজিক নদী মানুষের ব্যবহার মেঘ ধরে মেঘ বন্দী করে তার ক্ষেতে ও টিলায়!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1528
5742
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
এই দৃশ্য
প্রেমমূলক
হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো নীল ডুরে শাড়ী, স্বপ্নে পিঠের ওপরে চুল খোলা বাতাসে অসংখ্য প্রজাপতি কিংবা সবই অভ্রফুল? হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো চোখ দুটি বিখ্যাত সুদূর, পায়ের আঙুলে লাল আভা। ডান হতে, তর্জনিতে সামান্য কালির দাগ একটু আগেই লিখছিলে বাতাসে সুগন্ধ, কোথা যেন শুরু হলো সন্ধ্যারতি অন্যদেশ থেকে আসে রাত্রি, আজ কিছু দেরি হবে হাঁটুর ওপরে থু শিল্পের শিরায় আসে উত্তেজনা, শিল্পের দু’চোখে পোড়ে বাজি মোহময় মিথ্যেগুলি চঞ্চল দৃষ্টির মতো, জোনাকির মতো উড়ে যায় কোনোদিন দুঃখ ছিল, সেই কথা মনেও পড়ে না হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো সময় থামে না জানি, একদিন তুমি আমি সময়ে জড়াবো সময় থামে না, একদিন মৃত্যু এসে নিয়ে যাবে দিগন্ত পেরিয়ে- নতুন মানুষ এসে গড়ে দেবে নতুন সমাজ নতুন বাতাস এসে মুছে দেবে পুরোনো নি:শ্বাস, তবু আজ হাঁটুর ওপরে থুতনি,তুমি বসে আছো এই বসে থাকা, এই পেঠের ওপরে খোলা চুল, আঙুলে কালির দাগ এই দৃশ্য চিরকাল, এর সঙ্গে অমরতা সখ্য করে নেবে হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো....
https://banglarkobita.com/poem/famous/447
2380
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
যশের মন্দির
সনেট
সুবর্ণ-দেউল আমি দেখিনু স্বপনে অতি-তুঙ্গ শৃঙ্গ শিরে! সে শৃঙ্গের তলে, বড় অপ্রশস্ত সিঁড়ি গড়া মায়া-বলে, বহুবিধ রোধে রুদ্ধ উর্দ্ধগামী জনে! তবুও উঠিতে তথা-- সে দুর্গম স্থলে-- করিছে কঠোর চেষ্টা কষ্ট সহি মনে বহু প্রাণী। বহু প্রাণী কাঁদিছে বিকেলে, না পারি লভিতে যত্নে সে রত্ন-ভবনে। ব্যথিল হৃদয় মোর দেখি তা সবারে।-- শিয়রে দাঁড়ায়ে পরে কহিলা ভারতী, মৃদু হাসি; ``ওরে বাছা, না দিলে শকতি আমি, ও দেউলে কার সাধ্য উঠিবারে? যশের মন্দির ওই; ওথা যার গতি, অশক্ত আপনি যম ছুঁইতে রে তারে!''
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/jasher-mandir/
1448
নবারুণ ভট্টাচার্য
কবির
মানবতাবাদী
(বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রদ্ধাপদেষু)গাঢ় আঁধার দুমড়ে ভেঙে কোথায় চলেছিস আগুন খেতে যাচ্ছি আমি, তোদের বাবার কী এই দেশেতে কবির জন্ম দগ্ধ অভিশাপ মাকড়কূলে সিংহ হেন, ভস্মে ঢালার ঘি।যাবজ্জীবন হেলায় থাকি, প্রসাদ করে তুচ্ছ জিভের ওপর গনগনে আঁচ কয়লা রেখে দি মূষিক কবি, শৃগাল কবি ওড়ায় ন্যাড়া পুচ্ছ আগুন ক্ষেতের শস্য দেহ ভস্মে সঁপে দি।প্রতিষ্ঠানের প্রসাদ বিষ্ঠা হেলায় ঠেলে ফেলে কবি থাকেন কাঠের চিতায় এমন আঁকি পট অবহেলায় অবোধ এবং খেলায় এলেবেলে কবির চিতায় পাপতরাসী গাথে তাহার মঠ।ঘেন্না করি অবজ্ঞাতে বুটের পেরেক, চামড়া আগুন হতে গেছেন তিনি, স্বর্ণপ্রভ কাঠ ঘেন্না করি রাতবিরেতে আছেন যেমন—আমরা দুস্থ ইতর ভাষাবিহীন নগ্ন এ তল্লাটগণ্ডি ভেঙে আগুন মেঙে কোথায় চলেছিস যেথায় খুশি যাচ্ছি আমি, তোদের বাবার কী এই দেশেতে কবির জন্ম দগ্ধ অভিশাপ বেশ্যাকূলে সীতার সামিল, ভস্মে ঢালার ঘি।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%94%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3-%e0%a6%ad%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f/
343
কাজী নজরুল ইসলাম
তোমারি আঁখির মত
প্রেমমূলক
তোমারি আঁখির মত আকাশের দুটি তারা চেয়ে থাকে মোর পানে নিশীথে তন্দ্রাহারা। সে কি তুমি? সে কি তুমি?ক্ষীণ আঁখিদীপ জ্বালি বাতায়নে জাগি একা অসীম অন্ধকারে খুঁজি তব পথরেখা সহসা দখিনবায়ে চাঁপাবনে জাগে সাড়া। সে কি তুমি? সে কি তুমি?তব স্মৃতি যদি ভুলি ক্ষণতরে আনকাজে কে যেন কাঁদিয়া ওঠে আমার বুকের মাঝে।বৈশাখী ঝড়ে রাতে চমকিয়া উঠি জেগে বুঝি অশান্ত মম আসিলে ঝড়ের বেগে ঝড় চলে যায় কেঁদে, ঢালিয়া শ্রাবণধারা। সে কি তুমি? সে কি তুমি?
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/tomar-akhir-moto/
4375
শামসুর রাহমান
আমার চেয়ে অধিক
প্রেমমূলক
যখন তোমাকে দেখি ফুলদানি সাজাতে গোলাপ অথবা রজনীগন্ধা, ক্যামেলিয়া দিয়ে এবং সোনালী থালা ভ’রে তোলো বেলফুল আর স্বর্ণচাঁপা এনে, তখন তোমাকে কী-যে ভালো লাগে আমার, সুপ্রিয়া। এমনকী যখন ছ্যা ঢালো পেয়ালায় কিংবা কারো সমুখে এগিয়ে দাও খাবারের প্লেট- তাতেও শিল্পের সুষমার স্পর্শ থাকে।জানি তুমি অবসরে কখনো সখনো সূঁচ আর সুতোয় কাপড়ে খুব মগ্নতায় ফোটাও কত যে রঙ বেরঙের ফুল। রূপদক্ষ আঙুলের মৃদু ছোঁয়ায় শিল্পের জন্ম হয়। কখনো-বা সহজেই রিফু হয় শাল, শার্ট, শাড়ি, আরো কত কিছু। যখন তোমার কোনো কথা কিংবা আচরণে বড় বেশি ছিঁড়ে যায় আমার হৃদয়, তাকে রিফু করবার মতো সূঁচ-সুতো অথবা দক্ষতা জগৎ-সংসারে নেই, এ-সত্য আমার চেয়ে অধিক কে জানে!   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-cheye-odhik/