id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
5827
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
প্রেমহীন
|
প্রেমমূলক
|
শেষ ভালোবাসা দিয়েছি তোমার পূর্বের মহিলাকে
এখন হৃদয় শূন্য, যেমন রাত্রি রাজপথ
ঝকমক করে কঠিন সড়ক, আলোয় সাজানো, প্রত্যেক বাঁকে বাঁকে
প্রতীক্ষা আছে আঁধারে লুকানো তবু জানি চিরদিন
এ-পথ্ থাকবে এমনি সাজানো, কেউ আসবে না, জনহীন, প্রেমহীন
শেষ ভালোবাসা দিয়েছি তোমার পূর্বের মহিলাকে!
রূপ দেখে ভুলি কী রূপের বান, তোমার রূপের তুলনা
কে দেবে? এমন মূঢ় নেই কেউ, চক্ষু ফেরায়, চক্ষু ফেরাও
চোখে চোখে যদি বিদ্যুৎ জ্বলে কে বাঁচাবে তবে? এ হেন সাহস
নেই যে বলবো; যাও ফিরে যাও
প্রেমহীন আমি যাও ফিরে যাও
বটের ভীষণ শিকড়ের মতো শরীরের রস
নিতে লোভ হয়, শরীরে অমন সুষমা খুলো না
চক্ষু ফেরাও, চক্ষু ফেরাও!
টেবিলের পাশে হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়ালে তোমার
বুক দেখা যায়, বুকের মধ্যে বাসনার মতো
রৌদ্যের আভা, বুক জুড়ে শুধু ফুলসম্ভার,-
কপালের নিচে আমার দু’চোখে রক্তের ক্ষত
রক্ত ছেটানো ফুল নিয়ে তুমি কোন্ দেবতার
পূজায় বসবে? চক্ষু ফেরাও, চক্ষু ফেরাও, শত্রু তোমার
সামনে দাঁড়িয়ে, ভূরু জল্লাদ, চক্ষু ফেরাও!
তোমার ও রূপ মূর্ছিত করে আমার বাসনা, তবু প্রেমহীন
মায়ায় তোমায় কাননের মতো সাজাবার সাধ, তবু প্রেমহীন
চোখে ও শরীরে এঁকে দিতে চাই নদী মেঘ বন, তবু প্রেমহীন
এক জীবনের ভালোবাসা আমি হারিয়ে ফেলেছি খুব অবেলায়
এখন হৃদয় শূন্য, যেমন রাত্রির রাজপথ।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1897
|
5178
|
শামসুর রাহমান
|
রঙ
|
চিন্তামূলক
|
এই পৃথিবীতে দেখতে দেখতে
অনেক কিছুরই রঙ বদলায়,
এই চিরচেনা আকাশের রঙ-
তা-ও চদলায় অবেলায়।
কখনো কখনো মেঘ হয়ে যায়
গ্রাম্য মেলার ঢ্যাঙা এক সঙ,
কখনো সে মেঘ এক লহমায়
সুরসুন্দরী, কখনো ঝিনুক,
বুদ্ধ রাজার বিষণ্ন মুখ।
কোনো কোনো ফুল রঙ পাল্টায়,
কোনো কোনো প্রাণী পারে আগাগোড়া
বদলাতে রঙ। শুধু ডোরাকাটা
বাঘ পারেনাতো পাল্টাতে, হায়,
তার বিখ্যাত জ্বলজ্বলে ডোরা।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/rong/
|
3676
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভোরের পাখি ডাকে কোথায়
|
রূপক
|
ভোরের পাখি ডাকে কোথায়
ভোরের পাখি ডাকে।
ভোর না হতে ভোরের খবর
কেমন করে রাখে।
এখনো যে আঁধার নিশি
জড়িয়ে আছে সকল দিশি
কালীবরন পুচ্ছ ডোরের
হাজার লক্ষ পাকে।
ঘুমিয়ে-পড়া বনের কোণে
পাখি কোথায় ডাকে।ওগো তুমি ভোরের পাখি,
ভোরের ছোটো পাখি,
কোন্ অরুণের আভাস পেয়ে
মেল’ তোমার আঁখি।
কোমল তোমার পাখার ‘পরে
সোনার রেখা স্তরে স্তরে,
বাঁধা আছে ডানায় তোমার
উষার রাঙা রাখি।
ওগো তুমি ভোরের পাখি,
ভোরের ছোটো পাখি।রয়েছে বট, শতেক জটা
ঝুলছে মাটি ব্যেপে,
পাতার উপর পাতার ঘটা
উঠছে ফুলে ফেঁপে।
তাহারি কোন্ কোণের শাখে
নিদ্রাহারা ঝিঁঝির ডাকে
বাঁকিয়ে গ্রীবা ঘুমিয়েছিলে
পাখাতে মুখ ঝেঁপে,
যেখানে বট দাঁড়িয়ে একা
জটায় মাটি ব্যেপে।ওগো ভোরের সরল পাখি,
কহো আমায় কহো–
ছায়ায় ঢাকা দ্বিগুণ রাতে
ঘুমিয়ে যখন রহ,
হঠাৎ তোমার কুলায়-‘পরে
কেমন ক’রে প্রবেশ করে
আকাশ হতে আঁধার-পথে
আলোর বার্তাবহ।
ওগো ভোরের সরল পাখি
কহো আমায় কহো!কোমল তোমার বুকের তলে
রক্ত নেচে উঠে,
উড়বে ব’লে পুলক জাগে
তোমার পক্ষপুটে।
চক্ষু মেলি পুবের পানে
নিদ্রা-ভাঙা নবীন গানে
অকুণ্ঠিত কণ্ঠ তোমার
উৎস-সমান ছুটে।
কোমল তোমার বুকের তলে
রক্ত নেচে উঠে।এত আঁধার-মাঝে তোমার
এতই অসংশয়!
বিশ্বজনে কেহই তোরে
করে না প্রত্যয়।
তুমি ডাক,”দাঁড়াও পথে,
সূর্য আসেন স্বর্ণরথে–
রাত্রি নয়, রাত্রি নয়,
রাত্রি নয় নয়।’
এত আঁধার-মাঝে তোমার
এতই অসংশয়!আনন্দেতে জাগো আজি
আনন্দেতে জাগো।
ভোরের পাখি ডাকে যে ওই
তন্দ্রা এখন না গো।
প্রথম আলো পড়ুক মাথায়,
নিদ্রা-ভাঙা আঁখির পাতায়,
জ্যোতির্ময়ী উদয়-দেবীর
আশীর্বচন মাগো।
ভোরের পাখি গাহিছে ওই,
আনন্দেতে জাগো। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vorer-pakhi-dake-kothai/
|
831
|
জসীম উদ্দীন
|
নক্সী কাঁথার মাঠ - চার
|
কাহিনীকাব্য
|
(চার)চৈত্র গেল ভীষণ খরায়, বোশেখ রোদে ফাটে,
এক ফোঁটা জল মেঘ চোঁয়ায়ে নামল না গাঁর বাটে |
ডোলের বেছন ডোলে চাষীর, বয় না গরু হালে,
লাঙল জোয়াল ধূলায় লুটায় মরচা ধরে ফালে |
কাঠ-ফাটা রোদ মাঠ বাটা বাট আগুন লয়ে খেলে,
বাউকুড়াণী উড়ছে তারি ঘূর্ণী ধূলী মেলে |
মাঠখানি আজ শূণ্য খাঁ খাঁ, পথ যেতে দম আঁটে,
জন্-মানবের নাইক সাড়া কোথাও মাঠের বাটে :
শুকনো চেলা কাঠের মত শুকনো মাঠের ঢেলা,
আগুন পেলেই জ্বলবে সেথায় জাহান্নামের খেলা |
দরগা তলা দুগ্ধে ভাসে, সিন্নি আসে ভারে :
নৈলা গানের ঝঙ্কারে গাঁও কানছে বারে বারে |
তবুও গাঁয়ে নামল না জল, গগনখানা ফাঁকা ;
নিঠুর নীলের বক্ষে আগুন করছে যেনে খাঁ খাঁ |উচ্চে ডাকে বাজপক্ষি 'আজরাইলে'র ডাক,
'খর দরজাল' আসছে বুঝি শিঙায় দিয়ে হাঁক!
এমন সময় ওই গাঁ হতে বদনা-বিয়ের গানে,
গুটি কয়েক আসলো মেয়ে এই না গাঁয়ের পানে |
আগে পিছে পাঁচটি মেয়ে---পাঁচটি রঙে ফুল,
মাঝের মেয়ে সোনার বরণ, নাই কোথা তার তুল |
মাথায় তাহার কুলোর উপর বদনা-ভরা জল,
তেল হলুদে কানায় কানায় করছে ছলাৎ ছল |
মেয়ের দলে বেড়িয়ে তারে চিকন সুরের গানে,
গাঁয়ের পথে যায় যে বলে বদনা-বিয়ের মানে |
ছেলের দলে পড়ল সাড়া, বউরা মিঠে হাসে,
বদনা বিয়ের গান শুনিতে সবাই ছুটে আসে |
পাঁচটি মেয়ের মাঝের মেয়ে লাজে যে যায় মরি,
বদনা হাতে ছলাৎ ছলাৎ জল যেতে চায় পড়ি |
এ-বাড়ি যায় ও-বাড়ি যায়, গানে মুখর গাঁ,
ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে যেন-রাম-শালিকের ছা |কালো মেঘা নামো নামো, ফুল তোলা মেঘ নামো,
ধূলট মেঘা, তুলট মেঘা, তোমরা সবে ঘামো!
কানা মেঘা, টলমল বারো মেঘার ভাই,
আরও ফুটিক ডলক দিলে চিনার ভাত খাই!কাজল মেঘা নামো নামো চোখের কাজল দিয়া,
তোমার ভালে টিপ আঁকিব মোদের হলে বিয়া!
আড়িয়া মেঘা, হাড়িয়া মেঘা, কুড়িয়া মেঘার নাতি,
নাকের নোলক বেচিয়া দিব তোমার মাথার ছাতি |
কৌটা ভরা সিঁদুর দিব, সিঁদুর মেঘের গায়,
আজকে যেন দেয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায়!দেয়ারে তুমি অধরে অধরে নামো |
দেয়ারে তুমি নিষালে নিষালে নামো |
ঘরের লাঙল ঘরে রইল, হাইলা চাষা রইদি মইল ;
দেয়ারে তুমি অরিশাল বদনে ঢলিয়া পড় |
ঘরের গরু ঘরে রইল, ডোলের বেছন ডোলে রইল ;
দেয়ারে তুমি অধরে অধরে নামো |বারো মেঘের নামে নামে এমনি ডাকি ডাকি,
বাড়ি বাড়ি চলল তারা মাঙন হাঁকি হাঁকি
কেউবা দিল এক পোয়া চাল, কেউবা ছটাকখানি,
কেউ দিল নুন, কেউ দিল ডাল, কেউ বা দিল আনি |
এমনি ভাবে সবার ঘরে মাঙন করি সারা,
রূপাই মিয়ার রুশাই-ঘরের সামনে এল তারা |
রূপাই ছিল ঘর বাঁধিতে, পিছন ফিরে চায়,
পাঁটি মেয়ের রূপ বুঝি ওই একটি মেয়ের গায়!
পাঁচটি মেয়ে, গান যে গায়, গানের মতই লাগে,
একটি মেয়ের সুর ত নয় ও বাঁশী বাজায় আগে |
ওই মেয়েটির গঠন-গাঠন চলন-চালন ভালো,
পাঁচটি মেয়ের রূপ হয়েছে ওরই রূপে আলো |রূপাইর মা দিলেন এনে সেরেক খানেক ধান,
রূপাই বলে, 'এই দিলে মা থাকবে না আর মান |'
ঘর হতে সে এনে দিল সেরেক পাঁচেক চাল,
সেরেক খানেক দিল মেপে সোনা মুগের ডাল |
মাঙন সেরে মেয়ের দল চলল এখন বাড়ি,
মাঝের মেয়ের মাথার ঝোলা লাগছে যেন ভারি |
বোঝার ভারে চলতে নারে, পিছন ফিরে চায় ;
রূপার দুচোখ বিঁধিল গিয়ে সোনার চোখে হায়!
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-4/
|
120
|
আল মাহমুদ
|
কবিতা এমন
|
চিন্তামূলক
|
কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি–রাবেয়া রাবেয়া–
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!
কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।
কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3754.html
|
4753
|
শামসুর রাহমান
|
ডাহুক
|
রূপক
|
ডাহুক তার গলার ভেতর রাত্রিকে খানিক খেলিয়ে, খানিক
বাজাতে বাজাতে নিজের ভেতর স্থির হয়। ডাহুক গহনতায়
ডুব দিতে থাকে ক্রমাগত; ডাহুকের পালকগুলো রাত্রি
হয়ে ওঠে। রাত্রিময়তা রাত্রিকে স্পর্শ করে ডাহুককণ্ঠে।
ডাহুক আমাকে দেয় রাত্রি, যেমন সাকী ভরে তোলে সুরাপায়ীর পাত্র।
রাত্রি এমন এক প্রহরে প্রবেশ করে, যখন রাত্রি, ডাহুক আর এই আমার
মধ্যে কোনও ভেদচিহ্ন থাকে না। ডাহুক ফোঁটা ফোঁটা আঙুরের রস হয়ে
ঝরে, হয়ে যায় বিন্দু বিন্দু সুর।ডাহুকের সুর আমাকে বহুদূর নিয়ে যায় ভিন্ন এক দৃশ্যের ভিতরে।
কে সেখানে দাঁড়িয়ে? তিন মাথা-অলা ভয়ঙ্কর এক প্রাণী দাঁড়ানো
আমার সামনে। গায়ক পাখিদের চিরশক্র এই প্রাণীর চারপাশে
ছড়ানো অনেক রক্তাক্ত পালক, বহু পাখির ছিন্ন মুণ্ডু, অর্ধভুক্ত যকৃৎ,
প্লীহা। আর কী অবাক কাণ্ড, সেই ভয়ঙ্কর প্রাণীর আমিষাশী
দন্ত-নখরের নাছোড় হিংস্রতাকে ফাঁকি দিয়ে এক দ্যুতিময়
পাখির কী তন্ময় উড়াল, সপ্ত সিন্ধু দিগন্তে অন্তহীন
প্রকৃতি-মাতানো কী গান! (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dahuk/
|
5793
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
দেখা হবে
|
ভক্তিমূলক
|
ভ্রূ-পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে-
সগন্ধের সঙ্গে পাবো, দ্বিপ্রহরে বিজন ছায়ায়
আহা, কি শীতল স্পর্শ হৃদয়-ললাটে, আহা, চন্দন চন্দন
দৃষ্টিতে কি শান্তি দিলে, চন্দন, চন্দন
আমি বসে থাকবো দীর্ঘ নিরালায়
প্রথম যৌবনে আমি অনেক ঘুরেছি অন্ধ, শিমূলে জরুলে
লক্ষ লক্ষ মহাদ্রুম, শিরা-উপশিরা নিয়ে জীবনের কত বিজ্ঞাপন
তবুও জীবন জ্বলে, সমস্ত অরণ্য-দেশ জ্বলে ওঠে অশোক আাগুনে
আমি চলে যাই দূরে, হরিণের ক্রস্ত পায়ে, বনে বনান্তরে,অন্বেষণ।
ভ্রু-পল্লবে ডাক দিলে ….এতকাল ডাকো নি আমায়
কাঙালের মতো আমি এত একা, তোমায় কি মায়া হয়নি
শোনো নি আমার দীর্ঘশ্বাস?
হৃদয় উন্মুক্ত ছিল, তবুও হৃদয় ভরা এমন প্রবাস!
আমার দুঃখের দিনে বৃষ্টি এলো, তাই আমি আগুন জ্বেলেছি,
সে কি ভুল!
শুনিনি তোমার ডাক, তাই মেঘমন্দ্র স্বরে গর্জন করেছি, সে কি ভুল?
আমার অনেক ভুল, অরন্যের একাকীত্ব অসি’রতা ভ্রাম্যমান ভুল!
এক মুহুর্তেই
সর্ব অঙ্গে শিহরণ, ক্ষণিক ললাট ছুঁয়ে উপহার দাও সেই
অলৌকিক ক্ষণ
তুমি কি অমূল-তরু, স্নিগ্ধজ্যোতি, চন্দন, চন্দন,
দৃষ্টিতে কি শান্তি দিলে চন্দন, চন্দন
আমার কুঠার দূরে ফেলে দেব, চলো যাই গভীর গভীরতম বনে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1890
|
5745
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
একটি কথা
|
রূপক
|
একটি কথা বাকি রইলো, থেকেই যাবে
মন ভোলালো ছদ্মবেশী মায়া
আর একটু দূর গেলেই ছিল স্বর্গ নদী
দূরের মধ্যে দূরত্ব বোধ কে সরাবে।
ফিরে আসার আগেই পেল খুব পিপাসা
বালির নীচে বালিই ছিল, আর কিছু না
রৌদ্র যেন হিংসা, খায় সমস্তটা ছায়া
রাত্রি যেমন কাঁটা, জানে শব্দভেদী ভাষা
বালির নীচে বালিই ছিল, আর কিছু না
একটি কথা বাকি রইলো, থেকেই যাবে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1795
|
5999
|
হুমায়ূন আহমেদ
|
কাচপোকা
|
রূপক
|
একটা ঝকঝকে রঙিন কাচপোকা
হাঁটতে হাঁটতে এক ঝলক রোদের মধ্যে পড়ে গেল।
ঝিকমিকিয়ে উঠল তার নকশাকাটা লাল নীল সবুজ শরীর।
বিরক্ত হয়ে বলল,রোদ কেন?
আমি চাই অন্ধকার ।চির অন্ধকার
আমার ষোলটা পায়ে একটা ভারি শরীর বয়ে নিয়ে যাচ্ছি-
অন্ধকার দেখব বলে।
আমি চাই অন্ধকার ।চির অন্ধকার
একটা সময়ে এসে রোদ নিভে গেল
বাদুড়ে ডানায় ভর করে নামল আঁধার।
কি গাঢ়,পিচ্ছিল থকথকে অন্ধকার !
কাচপোকার ষোলটা ক্লান্ত পা বার বার
সেই পিচ্ছিল আঠালো অন্ধকারে ডেবে যাচ্ছিল।
তার খুব কষ্ট হচ্ছিল হাঁটতে
তবু সে হাঁটছে-
তাকে যেতে হবে আরও গভীর অন্ধকারে।
যে অন্ধকার-আলোর জন্মদাত্রী।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1119.html
|
636
|
জয় গোস্বামী
|
একটি শেষমুহূর্তের নারীসিন্ধুতট
|
রূপক
|
একটি শেষমুহূর্তের নারীসিন্ধুতট
অন্যটিতে আরম্ভের ডানা ছড়ানো ঈগল
ছোঁ মেরে ওঠে আবার, তার নখে সরীসৃপ
পায়ের গোছে শিকল
একটি শুভ আরম্ভের মাঙ্গলিক ঘট
ঘটের নীচে সাপের চোখ, মণি
বুড়ো আঙুল কেটে দেওয়ার পরেও বাকি থাকে
কলম, তর্জনী
মাটির কান, মাটির নীচে রক্ত চলাচল–
ভূর্গভের হৃদয় নড়ে–ওষ্ঠ? নড়ে তা-ও!
দুঃখ তার কণ্ঠা ক্ষুর দিয়ে
ফাঁক করেছে–খাও
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1724
|
4466
|
শামসুর রাহমান
|
একজন লোক
|
রূপক
|
লোকটার নেই কোন নামডাক।
তবু তার কথা অষ্টপ্রহর
ভেবে লোকজন অবাক বেবাক।লোকটার নেই কোনোখানে ঠাঁই।
জীবন লগ্ন পথের ধুলায়,
হাতে ঘোরে তার অলীক লাটাই।লোকটা কারুর সাতে-পাঁচে নেই।
গাঁয়ের মোড়ল, মিলের মালিক-
তবু ঘুম নেই কারুর চোখেই;
লোকটার কাঁধে অচিন শালিক।
বলে দশজনে এবং আমিও
রোদ্দুর খায় লোকটা চিবিয়ে,
জ্যোৎস্নাও তার সাধের পানীয়।
হাজার প্রদীপ জ্বালায় আবার
মনের খেয়ালে দেয় তা নিবিয়ে।মেঘের কামিজ শরীরে চাপিয়ে
হাঁটে, এসে বসে ভদ্রপাড়ায়।
পাথুরে গুহায় পড়ে না হাঁপিয়ে
সে-ও সাড়া দেয় কড়ার নাড়ায়।
তবু দশজনে জানায় নালিশ
লোকটা ঘুমায় সারাদিনমান,
কাছে টেনে নিয়ে চাঁদের বালিশ। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekjon-lekhok/
|
4365
|
শামসুর রাহমান
|
আমার অসুখ
|
প্রেমমূলক
|
হ্যালো হ্যালো জাভেদ, তুমি
শুনতে পাচ্ছ?
এখানে কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
অনেক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি, শুধু হ্যালো হ্যালো
বলাই সার, ওপার থেকে
কোনো সাড়াশব্দ নেই। টেলিফোনের ভেতর
একটা ভূতুড়ে আওয়াজ ছাড়া
অন্য কোনো ধ্বনি আমার কানে
বাজছে না আজ।অথচ একজন মানুষের কণ্ঠস্বর
শোনার জন্যে আমি কী রকম তৃষ্ণার্তা হয়ে উঠেছি
তুমি তা বুঝতে পারবে না জাভেদ।
ক’দিন ধরে আমি এই আমার একলা ঘরে
বিছানাবন্দি হয়ে আছি। আমার টিপয়ে এখন
সূর্যাস্তের রঙের মতো
ত্র্যান্টিবায়টিক ক্যাপসুল, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স,
থার্মেমিটার আর একটা পিরিচে
কয়েকটা বিস্কুট। বুঝতেই পারছ জাভেদ
এই ঘর থেকে বের হবার সামর্থ্য আমার নেই।আজ কদিন ধরে আমি কোথাও
যেতে পারছি না। মাঝে মাঝে দেয়ালের টিকটিকির শব্দ
পাখিটাখির গান কিংবা কোনো উঠাইগিরা
কুকুরের ডাক শুনতে পাই। কিন্তু জাভেদ
এখন আমি সবচেয়ে বেশি শুনতে চাই
একজন মানুষের প্রকৃত কণ্ঠস্বর।
আমি সেই থেকে একটানা হ্যালো হ্যালো করে
ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, কিন্তু তুমি
এখনো নিরুত্তর। কতদিন আমি তোমার ভরাট গলার
ওঠানামা শুনি না।
হাসপাতালের বেড়ে নয়, আমি আমার
নিজের ঘরেই বিছানায় নিঃসঙ্গ শুয়ে আছি।
আমার শিয়রে অনিদ্রোয় হ্রদে ভেসে বেড়ানো
কোনো নার্স নেই গলায় মালার মতো স্টোথিসকোপ দুলিয়ে
ডাক্তার আমার পালসবিট গুনছে না।
শরীরে নিদ্রার রজনীগন্ধা ফোটে না, জাভেদ। কারো
কণ্ঠস্বর, হোক সেই স্বর চেনা কি অচেনা, মধুর
অথবা কর্কশ, শুনতে পেলেই
আমি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠব।জাভেদ, অসুখ তো একলা পথে ভ্রমণেই মতো। এখন
আমি ভ্রমণ করছি এক বিশাল
মরুভূমিতে, যেখানে মরীচিকা আছে
মরূদ্যান নেই, সাপে ওগরানো বিষ আছে, নেই
এক ফোঁটা দ্রাক্ষারস। আমি এই মরুভূমির
বালিয়াড়িতে মুখ থুবড়ে পড়ছি
বারংবার, রাশি রাশি বালুকণায় ভরে গিয়েছে
আমার মুখ, আমার কণ্ঠনালী। এখন আমি
প্রাণপণে চাই প্রত্যাবর্তন।
আমি চেয়ে আছি অস্পষ্ট দিগন্তের দিকে,
যেমন তীর্থযাত্রী আপন নিবাসে
ফিরে আসার তাগিদে তাকায় তার ফেরার পথে।
জাভেদ, বারবার দিনদুপুরে
রাতবিরেতে বেজে ওঠে আমার টেলিফোন। আর
রিসিভার তুললেই অনেক্ষণ ধরে
একটা যান্ত্রিক ভূতুড়ে আওয়াজ হতে থাকে,
কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই না। (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-osukh/
|
4143
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
নীল পাঞ্জাবীওয়ালা বাবুটা
|
প্রেমমূলক
|
একটা ছেলে যখন একটা মেয়েকে নক দেয়, প্রথম দুই একদিন মেয়েটি কিছু না বললেও কয়েকদিন যেতেই মেয়েটি ছেলেটির সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করে দেবে, অপমান করবে, রাগ দেখাবে অথবা ছেলেটির কোনো কথার আর কোনো উত্তর দেবে না। একটা ভদ্র ছেলে কোনোভাবেই এই অপমান সহ্য করতে পারবে না। সে রাগে ঐ মেয়েকে আর জীবনেও নক দেবে না। কিন্তু একটা বাউলা ছেলে বলবে, ‘মেয়েরা প্রথম প্রথম এমনই করে, কয়েকদিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে’। সে নিয়মিত নক করেই যাবে। প্রতিদিন নানান রকমের অভিনয় করে কথা বলবে। নানানভাবে ভালোবাসার কথা বলবে। আর সেই অভিনয়গুলো মেয়েটির কাছে দারুণ লাগবে। মনে মনে বলবে, ‘এমন একটি ছেলেই তো চেয়েছিলাম জীবনে। টাকা-পয়সা, যোগ্যতা দিয়ে কি হবে যদি আমাকেই ভালো না বাসে। এরকম ভালোবাসাইতো আমি চেয়েছিলাম। বন্ধু বান্ধবদের কাছে গর্ব করে বলবে, ‘জানিস সে অনেক কেয়ারিং, আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। সারাক্ষণ ফোন দেয়। ঐদিন একটা নীল পাঞ্জাবী পড়ে এসেছিল। কত যে ভালো লেগেছিল। আমিও একটি লাল শাড়ি পড়েছিলাম সেদিন। আমার কাছে মনে হয়েছিল আমরা দুজন যেন স্বামী স্ত্রী। জানিস আমার জন্য কি সুন্দর একটি গিফট এনেছিল। আমিতো দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক যেন আমার পছন্দের জিনিসটা আমাকে এনে দিয়েছে। হ্যাঁ ওই আমার জীবনের সব, ওই আমার হৃদয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কলরব। অন্য কেউ কি আমার মন কি চায় তা বুঝতে পারে’।আরও জানিস ঐদিন আমি শয়তানি করে বলেছিলাম, ‘করিমের বিরিয়ানি’ আমার খুব প্রিয়। কি অবাক কান্ড, বিকেল বেলা হঠাৎ দেখি ও ফোন দিয়েছে। বলল, ‘একটু নিচে আসো’। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন’? সে বলল, ‘আসোনা একটু, আসলেই বুঝতে পারবে’। মোবাইলটা টেবিলে রেখে আব্বু-আম্মুর রুমে গেলাম দেখি আব্বু বাসায় আছে কিনা। দেখলাম আম্মু একা আর আব্বু বাইরে গিয়েছে। আম্মুকে বললাম, ‘আম্মু খুব খুধা লাগছে একটু নিচে যাই কিছু খেয়ে আসি’। আম্মু বলল, ‘ঠিক আছে যা, তাড়াতাড়ি আসিস। তোর আব্বু বাসায় এসে তোকে না দেখলে খুব রাগ করবে’। আমি আম্মুকে বলল, ‘ঠিক আছে আম্মু আমি এখনই চলে আসবো’।ওয়াশরুমে গিয়ে কোনোরকম ড্রেস পাল্টিয়ে অনিকাকে নিয়ে নিচে গেলাম। দূরে থেকেই দেখি নীল পাঞ্জাবী পড়া রহিমের হাতে একটি ব্যাগ। আরও একটু সামনে গিয়ে আমিতো রীতিমতো অবাক। দেখি প্যাকেটের গায়ে লেখা ‘করিমের বিরিয়ানি’। আনন্দে মনটি যেন একবারে ভরে উঠল, হৃদয়ের মাঝে জমে থাকা সকল ভালোবাসা সন্ধ্যা প্রদীপের মতো জ্বলে উঠল। হ্যাঁ এমন একটা বরই তো চেয়েছিলাম আমি। এ যেন আমার স্বপ্নের পুরুষ, নীল পাঞ্জাবীওয়ালা। এর মধ্যেই হঠাৎ আমার মনে হচ্ছিল, আমি পাতায়া সুমুদ্র সৈকতে আছি রহিমের সাথে। রহিম সাগরের জল ছিটিয়ে দিচ্ছে আমার গায়ে আর আমিতো আনন্দে আত্মহারা। যেন স্বর্গে আছি। মনের ঘোর না কাটতেই হঠাৎ রহিম বলল, ‘এ কি তুমি ঐদিকে তাকিয়ে কি ভাবছ’? আমি রহিমের দিকে তাকিয়ে চোখটি একটু বাঁকা করে বললাম, ‘দাও দাও প্যাকেট দাও’। বাহ! ব্যাগের মধ্যে দু’টি বিরিয়ানি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘দুটি কেন’? রহিম অনিকার দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘কেন? অনিকার জন্য একটা’। অনিকা যেন খুশিতে নাই। অনিকা নিচের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছে, ‘আল্লাহ আমার জন্যও যেন এমন একটা বর রাখে’। হঠাৎ লক্ষ করলাম অনিকা নিচের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে অনিকা কি ভাবছিস মনে মনে? বিরিয়ানির প্যাকেটা নে’। আমি এবার রহিমের দিকে তাকিয়ে আবার বললাম দুইটা কেন’? রহিম একটু বিরক্তিসুরে বলল’ ‘বললাম তো আনিকার জন্য একটা’। আমি একটু করুনসুরে বললাম, ‘তোমারটা’? কথাটি শুনে রহিমের মুখটি কেমন যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। কিন্তু কিছু বুঝতে না দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি একটু আগেই বাসা থেকে খেয়ে এসেছি’। ও বুঝতে দিতে না চাইলেও ওর চেহারা দেখেই আমি বুঝতে পারলাম ওর পকেটে হয়তো টাকা কম ছিল। টাকা নেই পকেটে তারপরেও একটি নয় দুটি বিরিয়ানি এনেছে। খুব মায়া হলো রহিমের জন্য। ভালোবাসায় হৃদয়টি ভরে গেল। মন চেয়েছিল বিরিয়ানির প্যাকেটটি খুলে নিজের হাত দিয়ে ওকে একটু খাইয়ে দেই। কিন্তু বাসার নিচে দাঁড়িয়ে খাওয়াতে গেলে কেউ দেখে ফেললে সমস্যা হবে। আম্মুতো ওর কথা জানে না তাই ওকে বাসায়ও আসতে বলতে পারলাম না। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। কপালে কুয়াশার মতো কয়েকফোটা ঘাম জমে গেল। বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে সেই ঘাম মুছতে মুছতে তাকিয়ে রইলাম রহিমের মুখের দিকে। রহিমও তাকিয়ে রইল আমার দিকে। দুজনের মায়াভরা চারটি চোখের মিলন কোনোভাবেই যেন বিচ্ছেদের সুর শুনতে চাচ্ছে না। কিন্তু চারদিকের পরিবেশ হাত নেড়ে বলছে, যে যার মতো বাসায় চলে যাও। জীবনে মনে হয় কোনোদিন এত অসহায় লাগে নি। যেকোনো মুহুর্তে বাবা চলে আসতে পারে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও রহিমকে বিদায় দিয়ে বাসায় ঢুকতে হলো। ফেরার সময় বারবার পিছনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আমার বাবুটিও যেন যেতে চাচ্ছে না। তার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আসলে রহিমকে বাবু বলে ডাকার অন্য একটি কারণ আছে তা পরে বলবো। বাসায় ঢুকে বারান্দায় গিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকালাম দেখলাম রহিম এমনভাবে হাটছে যেন ১০৫ ডিগ্রী জ্বরে আক্রান্ত কোনো যুবক হেঁটে যাচ্ছে। রহিমের চেহারা এখন আর তেমন বুঝা যাচ্ছে না। হেঁটে হেঁটে যেন ভোরবেলার কুয়াশার মতো রাস্তার সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝেই আমাদের বাসার দিকে তাকায়। এসময় আমি আমার ডান হাতে একটু চুমু দিয়ে হাতটি রহিমের দিকে ছুড়ে দিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম হাতের উপর কয়েকফোটা জল। এরমধ্যেই আম্মু রুমে এসে বলল, ‘তোর চোখে জল কেন’? আমিতো থতমত খেয়ে গেলাম। সাথে সাথে ওড়না দিয়ে চোখের জল মুছে একটি হাচি দিয়ে বললাম, ‘হাচি আসছিল আম্মু’। কিন্তু আমার বুবুটার জন্য বুকের মধ্যে কেমন যেন চিনচিন করছিল। পদ্মা মেঘনার ঢেউ যেন আছরে পরে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল আমার হৃদয়ের সকল অবয়ব।প্রায় পাঁচ ছয় মাস পরে প্রিয়তি তার সেই বান্ধবী সাগরীকাকে বলল, ‘দোস্ত একটা কথা’। সাগরীকা বলল, ‘কি কথা বল’। প্রিয়তির মুখে মেঘের ভার, কপালে বিন্দু বিন্দু জল। সাগরীকা প্রিয়তির মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর মনে মনে বলল, ‘যেই প্রিয়তির সাথে দেখা হলে রহিমের কথা বলতে বলতে হাসিতে মেতে উঠত, আর আজ কি অসহায় তার চোখ, কি অসহায় তার মুখ’। সাগরীকা প্রিয়তিকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি রে তোর মন খারাপ কেন? তোর চেহারার এমন অবস্থা কেন’? এসময় প্রিয়তি সাগরীকাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সাগরীকাও আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। এরপর সাগরীকা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের ওড়না দিয়ে প্রিয়তির চোখ মুখ মুছে দিয়ে বলল, ‘কি হয়েছে বল’। প্রিয়তি ভাঙ্গা কন্ঠে করুন সুরে বলল, ‘কিছু হয়নিরে সাগরীকা তবে অনেক কিছুই হয়ে গেছে, আজ আর তোর সহায়তা ছাড়া আমার মুক্তি নেই’। সাগরীকা বলল, ‘তোর সেই বাবুটা কই’? এই কথাটি প্রিয়তির বুকের মধ্যে যেন তিরের মতো বিদ্ধ হলো। প্রিয়তির ঠোঁট কাঁপছে। কিছু বলতে চায় কিন্তু আবার ফিরিয়ে নেয়। এরপর অনেক কষ্টে মুখ খুলল প্রিয়তি, ‘তুই বুজি আজ আমাকে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছিস’। সাগরীকা বলল, ‘এই কথা কেন বলছিস? এতদিন তো আমাদের একটু সময়ও দিতি না। ক্লাশ শেষ না হতেই বাবুকে নিয়ে বের হয়ে যেতি। আগেতো বাসায় গিয়েও অনেক ফোন দিতি। বলতে পারবি তিন চার মাসের মধ্যে ভুলেও একবার আমাকে ফোন দিয়েছিস’? সাগরীকার কথায় প্রিয়তির বুকটি যেন ঝাজড়া হয়ে রক্ত বের হয়ে যাচ্ছে। সাথে প্রিয়তির পেটের মধ্যে জন্ম নেওয়া তিন চার মাসের ভ্রুনটিও যেন বের হয়ে যেতে চাচ্ছে। প্রিয়তি মনে মনে বলছে, ‘বের হয়ে যাক পেটের মধ্যে থেকে, তাহলে সকল আপদ মুক্ত হতো’। প্রিয়তির চোখে আবার ঝর্নার মতো জল দেখে সাগরীকা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলল, ‘সরি দোস্ত আসলে আমি বুঝতে পারিনি তোর মনে এত কষ্ট। আমাকে ক্ষমা করে দিস। কি হয়েছে তোর, আমাকে সব খুলে বল’।প্রিয়তি কাপাকাপা কন্ঠে বলল, ‘আমাকে একজন গাইনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি? আমার খুব লজ্জা করছেরে সাগরীকা, তুই আর আমাকে লজ্জা দিছ না’। এই বলে প্রিয়তি তার সামান্য উঁচু হওয়া পেটটিতে হাত দিয়ে দেখালো। সাগরীকার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। শুধু মনে মনে বলল, ‘আহারে প্রিয়তির সেই আদরের বাবুটিও আজ বাবুর বাবা হতে চলছে’। এরপর সাগরীকা প্রিয়তিকে বলল, ‘তোর সেই বাবুটিকেও ডাক একসাথে যাই ডাক্তারের কাছে’। প্রিয়তি একটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, ‘তুই আর বাবু বাবু ডেকে আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিছ না। বাবু এখন আর বাবু নেই। আমাকে একটি বাবু দিয়ে সে চলে গিয়েছে। সে এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। তাকে এখন বাবু ডাকলে অপমান করা হবে। এখন অন্য কেউ তাকে বাবু ডাকে না, বর বলে ডাকে। আর সে এত তাড়াতাড়ি বর না হলেও বাবু বাবু ডাকার মতো নারীর এখন কি তার অভাব আছে’? সাগরিকা বলল, ‘আর তুই’? প্রিয়তি বাম হাত দিয়ে চোখের জল মুছছে আর ডান হাত সেই উচু পেটে রেখে বলল, ‘আমি এখন আর আমার বুকের সন্তানকে নষ্ট করবো না। আমি এই বুকের সন্তানকে নিয়েই স্বপ্ন দেখবো। ওকেই আমি বাবু বাবু ডেকে জীবনটা পাড় করে দেবো। এটাই আমার সান্ত্বনা’। সাগরীকা প্রিয়তির কথা যতই শুনছে ততই অবাক হয়ে হচ্ছে। কিছুক্ষন নীরব থেকে বলল, ‘তোর আসল বাবুরই খবর নেই আর এই নতুন বাবুকে বুকে নিয়ে কি কলঙ্কের ভার আরো ভারী করতে চাস? সাগরীকার কথায় প্রিয়তির লাল চোখ আরো লাল হতে লাগল। রক্তাক্ত চোখেই সাগরীকার দিকে তাকিয়ে প্রিয়তি বলল, ‘এটা আমার ভালোবাসার ফসল, ভালোবাসার ক্ষেত্রে কলঙ্ক বলতে কিছু নেই। আর কলঙ্ক যদি হয়েই থাকে হোক তাতে কি আমি এই কলঙ্ক মাথায় নিয়েই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। আমি যে জীবনে কাউকে ভালোবেসছিলাম, কারো কাছে ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিলাম তার একটু স্মৃতি বা চিহ্ন হলেও থাক আমার বুকে। স্মৃতির মাঝেতো একটু ক্ষত থাকবেই। সাগরীকা প্রিয়তিকে অনেক বোঝালো তারপর প্রিয়তি রাজী হলো অনাগত সন্তানটি এবরশন করার জন্য। এর কয়েকমাস পর নিউজ পেপারে একটি হেডলাইন হলো, “রাস্তার উপর ব্যাগে মোড়ানো জীবন্ত শিশু”। খবরটি মুহূর্তের মধ্যেই ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেল। সেই নীল পাঞ্জাবীওয়ালা বাবুটিও খবরটি তার নিজ আইডিতে শেয়ার করে লিখলো, ‘কিয়ামত খুবই সামনে চলে আসছে’। তার এই স্ট্যাটাস দেখে প্রিয়তীর বান্ধবী সাগরীকা হাহা রিএ্যাক্ট দিলো। কিন্তু নীল পাঞ্জাবীওয়ালা বাবুটি কিছুই বুঝতে পারলো না। আর প্রিয়তি তো তার সেই প্রিয় বাবুটির ব্লক লিস্টেই আছে। সাগরীকা প্রিয়তিকে নীল পাঞ্জাবীওয়ালার স্ট্যাটাস স্কীনসট দিয়ে দেখালো। প্রিয়তি স্কীনসট দেখে চোখে একফোটা জলও আনলো না। শুধু তাকিয়ে রইল স্কীনসটের উপরে গোলাকার ছোট্ট একটি ছবির (প্রোফাইল পিকচার) উপর। এই সেই নীল পাঞ্জাবীপড়া ছবি যা দেখে সে বাবুটিকে নিজের বর হিসেবেই ভেবে নিয়েছিল। এসময় প্রিয়তিও তার প্রোফাইলে লাল শাড়ি পড়া ছবিটি দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5872.html
|
992
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কুড়ি বছর পরে–জীবনান্দ দাশ
|
প্রেমমূলক
|
আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
আবার বছর কুড়ি পরে-
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে-
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে-তখন হলুদ নদী
|
https://banglapoems.wordpress.com/2012/10/02/%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%9b%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6-%e0%a6%a6%e0%a6%be/
|
877
|
জসীম উদ্দীন
|
মুসাফির
|
চিন্তামূলক
|
চলে মুসাফির গাহি,
এ জীবনে তার ব্যথা আছে শুধু, ব্যথার দোসর নাহি।
নয়ন ভরিয়া আছে আঁখিজল, কেহ নাই মুছাবার,
হৃদয় ভরিয়া কথার কাকলি, কেহ নাই শুনিবার।
চলে মুসাফির নির্জন পথে, দুপুরের উঁচু বেলা,
মাথার উপরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া করিছে আগুন-খেলা।
দুধারে উধাও বৈশাখ-মাঠ রৌদ্রেরে বুকে চাপি,
ফাটলে ফাটলে চৌচির হয়ে করিতেছে দাপাদাপি।
নাচে উলঙ্গ দমকা বাতাস ধুলার বসন ছিঁড়ে,
ফুঁদিয়ে ফুঁদিয়ে আগুন জ্বালায় মাঠের ঢেলারে ঘিরে।
দুর পানে চাহি হাঁকে মুসাফির, আয়, আয়, আয়, আয়,
কস্পন জাগে খর দুপুরের আগুনের হলকায়।
তারি তালে তালে দুলে দুলে উঠে দুধারের স্তব্ধতা,
হেলে নীলাকাশ দিগনে- বেড়ি বাঁকা বনরেখা-লতা।
চলে মুসাফির দুর দুরাশার জনহীন পথ পাড়ি,
বুকে করাঘাত হানিয়া সে যেন কি ব্যথা দেখাবে ফাড়ি।
নামে দিগনে- দুপুরের বেলা, আসে এলোকেশী রাতি,
গলায় তাহার শত তারকার মুন্ডমালার বাতি।
মেঘের খাঁড়ায় রবিরে বনিয়া নাচে সে ভয়ঙ্করী,
দুর পশ্চিমে নিহত দিনের ছিন্নমুন্ড ধরি।
রুধির লেখায় দিগন্ত বায় লোল সে রসনা মেলি,
হাসে দিগনে- মত্ত ডাকিনী করিয়া রক্ত-কেলি।
চলেছে পথিক-চলেছে সে তার ভয়ঙ্করের পথে,
বেদনা তাহার সাথে সাথে চলে সুরের ইন্দ্ররথে।
ঘরে ঘরে জ্বলে সন্ধ্যার দীপ, মন্দিরে বাজে শাঁখ,
গাঁয়ের ভগ্ন মসজিদে বসি ডাকে দুটো দাঁড়কাক।
কবরে বসিয়া মাথা কুটে কাঁদে কার বিরহিনী মাতা,
চলেছে পথিক আপনার মনে বকিয়া বকিয়া যা-তা।
চলেছে পথিক-চলেছে পথিক-কতদুর-কতদুর,
আর কতদুর গেলে পরে সে যে পাবে দেখা বন্ধুর।
কেউ কি তাহার আশাপথ চাহি গণেছে বয়ষ মাস,
ধুঁয়ার ছলায় কাঁদিয়া কি কেউ ভিজায়েছে বেশবাস?
কিউ কি তাহারে দেখায়েছে দীপ কানো গেঁয়ো ঘর হতে,
মাথার কেশেতে পাঠায়েছে লেখা গংকিণী নদী সোঁতে?
চলেছে পথিক চলেছে সে তার ললাটের লেখা পড়ি,
সীমালেখাহীন পথ-মায়াবীর অঞ্চলখানি ধরি।
ঘরে ঘরে ওঠে মৃদু কোলাহল, বঁধুরা বধুর গলে,
বাহুর লতায় বাহুরে বাঁধিয়া প্রণয়-দোলায় দোলে।
বাঁশী বাজে দুরে সুখ-রজনীর মদিরা-সুবাস ঢালি,
দীঘির মুকুরে হেরে মুখ রাত চাঁদের প্রদীপ জ্বালি।
নতুন বধুর বক্ষে জড়ায়ে কচি শিশু বাহু তুলি,
হাসিয়া হাসিয়া ছড়াইছে যেন মণি-মানিকের ধুলি।
চলেছে পথিক-রহিয়া রহিয়া করিছে আর্তনাদ-
ও যেন ধরার সকল সুখের জীবন- প্রতিবাদ।
রে পথিক ! বল, কারে তুই চাস, যে তোরে এমন করে,
কাঁদাইল হায়, কেমন করিয়া রহিল সে আজ ঘরে?
কোন ছায়া-পথ নীহারিকা পারে, দেখেছিলি তুই কারে,
কোন সে কথার মানিক পাইয়া বিকাইলি আপনারে ।
কার গেহ ছায়ে শুনেছিলি তুই চুড়ির রিণিকি-ঝিনি,
কে তোর ঘাটেতে এসেছিল ঘট বুড়াইতে একাকিনী ।
চলে মুসাফির আপনার রাহে কোন দিকে নাহি চায়,
দুর বনপথে থাকিয়া থাকিয়া রাত-জাগা পাখি গায়।
গগনের পথে চাঁদেরে বেড়িয়া ডাকে পিউ, পিউ কাঁহা,
সে মৌন চাঁদ আজো হাসিতেছে, বলিল না, উহু আহা।
বউ কথা কও-বউ কথা কও-কতকাল -কতকাল,
রে উদাস, বল আর কতকাল পাতিবি সুরের জাল।
সে নিঠুর আজো কহিল না কথা, রহস্য-যবনিকা
খুলিয়া আজিও পরাল না কারো ললাটে প্রণয় টীকা।
চলেছে পথিক চলেছে সে তার দুর দুরাশার পারে,
কোনো পথবাঁকে পিছু ডাকে আজ ফিরাল না কেউ তারে।
চলেছে পথিক চলেছে সে যেন মৃত্যুর মত ধীরে,
যেন জীবন- হাহাকার আজি কাঁদিছে তাহার ঘিরে।
চারিদিক হতে গ্রাসিয়াছে তারে নিদারুণ আন্ধার,
স্তব্ধতা যেন জমাট বেঁধেছে ক্রন্দন শুনি তার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/756
|
4870
|
শামসুর রাহমান
|
নগ্ন স্তব্ধতা
|
মানবতাবাদী
|
যে-কোনো দিনেরই মতো তিমিরের নাড়ী-ছেঁড়া আলো
ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে। একটি তরুণী
লাল নীল ঘুড়ি
ছেড়ে দেয় বায়ু স্তরে; বিকেলে চায়ের কাপে প্রফুল্ল চুমুক,
ঘোরানো সিঁড়িতে গাঢ়-মিহি স্বরে কথোপকথন,
ছাদের ওপারে ছিল জ্বলজ্বলে ডাগর বেলুন,
চাঁদ বলি তাকে। কবি তাঁর
শব্দের ঝর্ণাকে ব্যালে শিক্ষকের ধরনে নিপুণ
পরিচালনায়
মোহন গন্তব্যে পৌঁছে দেন। এখানে আগুন নিয়ে
দ্যুতি, বলে তাঁকে গাছপালা,
নীড়ে-ফেরা পাখি, অস্তরাগময় শহরে কলোনি।অকস্মাৎ চতুদিকে দৃষ্টি-অন্ধ করা কী বিপুল
উদ্ভাসন; মাটিতে আগুন,
লতাগুল্ম, গাছে-গাছে গোলাপের, চামেলীর পরাগে আগুন,
পাথরে-পাথরে লকলকে
জিভের মতন জ্বলে আগ্রাসী আগুন,
পশুপাখি, মানুষের ভেতরে আগুন, অন্তরীক্ষে,
জলের ওপরে আর ভেতরে আগুন জ্বলে; যেন এ-শহর
পরেছে চকিতে উরু, জানু, বুক, মাথা
জুড়ে আগুনের শাড়ি। মর্ত্যভূমি বজ্ররশ্মিজালে
বন্দি হয়ে চোখের পলকে রূপান্তরে কী উত্তপ্ত ভস্মাধার।সাইরেন বড় মূক, ঘোষণা করার মতো কোনো
কণ্ঠস্বর নেই
এখন কোথাও। সংখ্যাহীন ঝলসানো গোরু-ঘোড়া
মাঠে কি গোয়ালে, আস্তাবলে পড়ে আছে
ইতস্তত ভীষণ নিষ্প্রাণ, প্রভুভক্ত কুকুরের ক্ষয়ে-যাওয়া
নিঃস্পন্দ শরীর সমর্পিত
নগ্ন বারান্দায় নৈবেদ্যের মতো। নিস্তব্ধ বসন্ত, পাখিদের
অজস্র কংকাল নগ্ন গাছে-গাছে। এমনকি পাথরের নিচে যতো
প্রাণী টিকে থাকে প্রতিহিংসার মতো,
তারাও এখন চিহ্নহীন।মাটি আর দেবে না কিছুই। কোনোখানে এক ফোঁটা
জল নেই ভয়ানক দূষণ ব্যতীত। ফলমূল
কোথাও নির্দোষ নেই আর। খাদ্য আছে শস্যাগারে,
অথচ ভক্ষণযোগ্য নয় এককণা।তেজস্ক্রিয় ভস্মের ঘোমটা-টানা পৃথিবীর ঠোঁটে,
রোদ চুমো খায় পুনরায়। কিন্তু এই রোদ নিয়ে
উৎসব করার মতো কোনো প্রাণী নেই।
দশ দিকে। মহাজন অথবা ঘাতক, গৃহী কিংবা
ঘরছাড়া চিরপলাতক, জুয়াড়ী অথবা নববিলাসের
টানে সাতঘাট জল-খাওয়া বাবু, দূরন্ত সাহেব,
অথবা পটের বিবি, বেশ্যার দালাল,
তুখোড় দোকানদার অথবা খদ্দের,
ট্রাফিক পুলিশ কিংবা ধাবমান যান,
মুর্দা কিংবা মুর্দাফরাস কারুরই
নামগন্ধ নেই।
যোজন যোজনব্যাপী ধুধু চরাচরে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে
থরে থরে সাজানো কৌটায়,
নানান রঙের জামা কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে আর
কার্পেটে পাপোষে মৃত্যু বুঁদ হয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে
ঠোঁট চাটে টুপ ভুজঙ্গ মৃত্যু, যেন
নিজেকেই আকণ্ঠ করবে পান। চতুর্দিকে ক্রুর দাবদাহ,
বস্তুত পৃথিবী পঞ্চতপা।হঠাৎ ভূতল থেকে কেউ
উঠে আসে হামাগুড়ি দিয়ে কায়ক্লেশে আদিম শিশুর মতো,
পারে না তাকাতে ঝলসিত পৃথিবীর দিকে, চোখ
তুলতেই দ্যাখে একজন এক টুকরো আনন্দের মতো ফল
বাড়িয়ে দিয়েছে তার প্রতি রমণীয় ভঙ্গিমায়।
নারী আর পুরুষের তীব্র থরো থরো
আলিঙ্গনে আদিগন্ত নগ্ন স্তব্ধতায়
আনন্দ-বেদনা জাত কবিতার মতো হেসে ওঠে ভালোবাসা। (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nogno-stobdhota/
|
5316
|
শামসুর রাহমান
|
স্বপ্নচারিতায়
|
প্রেমমূলক
|
খুব ফিকে গাঁদা রঙের বিকেল। চোখ চোলা,
মন ডুবুরীর আঁটো পোশাক পরেছে
নিরিবিলি; আমাকে কি মানায় এখন জেগে
স্বপ্ন দেখা? দেখি অকস্মাৎ ঘরে এসে, হে নবীনা,
তুমি একগুচ্ছ ফুল তুলে দিতে হাতে
ঋজু স্মিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ ছিলে বসে
দূরে টুকরো টাকরা কথা, আমার গতায়ু
যৌবনের শুশ্রুষায় নিজেকে নিয়োগ
করেছিলে বুঝি, নয়তো কী ক’রে আবার
আমার ভেতর যুবা বয়সের দিনগুলি
আড়মোড়া ভাঙে? কখন যে বাড়াই তোমার দিকে হাত,
শুধু রিক্ত পাঁচটি আঙুল স্পর্শ করে শূন্যতাকে।তুমি চ’লে যাবার পরেও বসে থাকো
সম্মুখ চেয়ারে
আমার মুখস্থ-করা সেই ভঙ্গিমায়। হেঁটে যাই
তোমার ভেতর দিয়ে স্বপ্নচারিতায়
কোনো এক বেনামি নগরে। কেউ দেখে না, শোনে না
কিছু, শুধু নিজে জানি, তুমিহীনতায়
তুমি থাকো পবিত্র সৌরভ হয়ে এবং তোমার করতলে
লোর্কার কমলালেবু, ঠোঁটে নেরুদার প্রজাপতি।আমার পাঁজর ফুঁড়ে রক্তের ফোয়ারা টেবিলের
গোলাপকে আরো বেশি লাল ক’রে তোলে আর দেয়ালের সাদা
থেকে পেরেকের ক্ষতচিহ্নসহ
নিঃশব্দে ওঠেন জেগে যীশু,
তর্জনী উচিয়ে
আমাকে দেখিয়ে দেন ক্রূশকাঠ, উচ্চারিত হয়
‘বও, বয়ে যাও তুমি বিরামবিহীন। গলগোথা
গন্ধে ভরে যায় ঘর, লাল জোব্বা, হায়,
প’ড়ে আছে পুরোনো মেঝেতে, বুড়ো সুড়ো
কারো খুব কুষ্ণিত ললাটরেখা, কে এক নারীর
দু’গালে গড়িয়ে পড়ে কী করুণ পানি; কারা যেন
জুয়ো খেলে চ’লে গেছে, দিব্যকান্তি গাঁথা ক্রূশকাঠে।কখনো তোমাকে শুনি, শোনাই তোমাকে
কখনো-বা, তোমার মধুর কণ্ঠস্বরে মুছে যায়
আমার অতীত আর তোমার নীরব ফুলগুলি
কী বাঙ্ময় ঝুঁকে থাকে আমার উদ্দেশে। তোমারও কি
এমন ধরন? কিছুকাল
পরে কথাচ্ছলে প্রশ্ন করি, ‘সেদিন বিকেলবেলা
এসেছিলে নাকি? স্মিত ঠোঁটে
বললে তুমি, ‘কই, না তো। কে খবর দিলো মিছেমিছি?’
বেজে ওঠে যেন স্যাল্ডেলিয়ার কোথাও
এবং তোমাকে ঘিরে থাকে গীতবিতানের বিভিন্ন মুর্চ্ছনা। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/swopnocharitai/
|
5223
|
শামসুর রাহমান
|
শিবির
|
সনেট
|
প্রতিদিন ভিড় ঠেলে পথ চলি, দেখি সবখানে
দলাদলি, মরমুখো সব দল, খুন খারাবির
জন্যে তৈরী সর্বক্ষণ অনেকেই, শান্তির দাবির
যেন মূল্য নেই কোনো। মোহময় শ্লোগানে শ্লোগানে
মুখর চৌদিক, অতিকায় জন্তু বিধ্বস্ত উদ্যানে
ভীষণ চঞ্চল, অন্ধ ওরা আর জন্মেই বধির-
তাহলে কোন্ দলে ভিড়ে ঢেকে নেবো মাথা শিরস্ত্রাণে?আমার শিবির নেই কোনো, আমি অত্যস্ত একাকী
পড়ে আছি এক কোণে নিরস্ত্র এবং বর্মহীন
কী জানি কিসের প্রতীক্ষায় দৃষ্টি জ্বেলে রাত্রিদিন।
মাঝে মধ্যে বিরানায় ডাকে একলা ভয়ার্ত পাখি,
আমি কবিতার রক্তোৎপল বুকে মুখ ঢেকে থাকি
কী অমোঘ ঘৃণা আর উপেক্ষার প্রতি উদাসীন। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shibir/
|
5
|
অতুলপ্রসাদ সেন
|
বাংলা ভাষা
|
স্বদেশমূলক
|
মোদের গরব, মোদের আশা,
আ-মরি বাংলা ভাষা!
তোমার কোলে,
তোমার বোলে,
কতই শান্তি ভালোবাসা!কি যাদু বাংলা গানে!
গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,
গেয়ে গান নাচে বাউল,
গান গেয়ে ধান কাটে চাষা!বিদ্যাপতি, চণ্ডী, গোবিন্,
হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন-
ঐ ফুলেরই মধুর রসে,
বাঁধলো সুখে মধুর বাসা!বাজিয়ে রবি তোমার বীণে,
আনলো মালা জগৎ জিনে!
তোমার চরণ-তীর্থে আজি,
জগৎ করে যাওয়া-আসা!ঐ ভাষাতেই নিতাই গোরা,
আনল দেশে ভক্তি-ধারা,
আছে কৈ এমন ভাষা,
এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা?ঐ ভাষাতেই প্রথম বোলে,
ডাকনু মায়ে ‘মা, মা’ বলে;
ঐ ভাষাতেই বলবো হরি,
সাঙ্গ হলে কাঁদা হাসা!মোদের গরব, মোদের আশা,
আ-মরি বাংলা ভাষা!
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4245.html
|
3052
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চেয়ে থাকা
|
ভক্তিমূলক
|
মনেতে সাধ যে দিকে চাই
কেবলি চেয়ে রব।
দেখিব শুধু, দেখিব শুধু,
কথাটি নাহি কব।
পরানে শুধু জাগিবে প্রেম,
নয়নে লাগে ঘোর,
জগতে যেন ডুবিয়া রব
হইয়া রব ভোর।
তটিনী যায়, বহিয়া যায়,
কে জানে কোথা যায়;
তীরেতে বসে রহিব চেয়ে,
সারাটি দিন যায়।
সুদূর জলে ডুবিছে রবি
সোনার লেখা লিখি,
সাঁঝের আলো জলেতে শুয়ে
করিছে ঝিকিমিকি।
সুধীর স্রোতে তরণীগুলি
যেতেছে সারি সারি,
বহিয়া যায়, ভাসিয়া যায়
কত-না নরনারী।
না জানি তারা কোথায় থাকে
যেতেছে কোন্ দেশে,
সুদূর তীরে কোথায় গিয়ে
থামিবে অবশেষে।
কত কী আশা গড়িছে বসে
তাদের মনখানি,
কত কী সুখ কত কী দুখ
কিছুই নাহি জানি।দেখিব পাখি আকাশে ওড়ে,
সুদূরে উড়ে যায়,
মিশায়ে যায় কিরণমাঝে,
আঁধাররেখাপ্রায়!
তাহারি সাথে সারাটি দিন
উড়িবে মোর প্রাণ,
নীরবে বসে তাহারি সাথে
গাহিব তারি গান।
তাহারি মতো মেঘের মাঝে
বাঁধিতে চাহি বাসা,
তাহারি মতো চাঁদের কোলে
গড়িতে চাহি আশা!
তাহারি মতো আকাশে উঠে,
ধরার পানে চেয়ে
ধরায় যারে এসেছি ফেলে
ডাকিব গান গেয়ে।
তাহারি মতো, তাহারি সাথে
উষার দ্বারে গিয়ে,
ঘুমের ঘোর ভাঙায়ে দিব
উষারে জাগাইয়ে।পথের ধারে বসিয়া রব
বিজন তরুছায়,
সমুখ দিয়ে পথিক যত
কত-না আসে যায়
ধুলায় বসে আপন-মনে
ছেলেরা খেলা করে,
মুখেতে হাসি সখারা মিলে
যেতেছে ফিরে ঘরে।পথের ধারে ঘরের দ্বারে
বালিকা এক মেয়ে,
ছোটো ভায়েরে পাড়ায় ঘুম
কত কী গান গেয়ে।
তাহার পানে চাহিয়া থাকি
দিবস যায় চলে,
স্নেহেতে ভরা করুণ আঁখি—
হৃদয় যায় গলে।
এতটুকু সে পরানটিতে
এতটা সুধারাশি ।
কাছেতে তাই দাঁড়ায়ে তারে
দেখিতে ভালোবাসি।কোথা বা শিশু কাঁদিছে পথে
মায়েরে ডাকি ডাকি,
আকুল হয়ে পথিকমুখে
চাহিছে থাকি থাকি।
কাতর স্বর শুনিতে পেয়ে
জননী ছুটে আসে,
মায়ের বুক জড়ায়ে শিশু
কাঁদিতে গিয়ে হাসে।
অবাক হয়ে তাহাই দেখি
নিমেষ ভুলে গিয়ে,
দুইটি ফোঁটা বাহিরে জল
দুইটি আঁখি দিয়ে।যায় রে সাধ জগৎ-পানে
কেবলি চেয়ে রই
অবাক হয়ে, আপনা ভুলে,
কথাটি নাহি কই।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/cheye-thaka/
|
3125
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ডাকাতের সাড়া পেয়ে
|
হাস্যরসাত্মক
|
ডাকাতের সাড়া পেয়ে
তাড়াতাড়ি ইজেরে
চোক ঢেকে মুখ ঢেকে
ঢাকা দিল নিজেরে।
পেটে ছুরি লাগালো কি,
প্রাণ তার ভাগালো কি,
দেখতে পেল না কালু
হল তার কী যে রে! (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dakater-sara-peye/
|
2661
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আজ গড়ি খেলাঘর
|
চিন্তামূলক
|
আজ গড়ি খেলাঘর,
কাল তারে ভুলি—
ধূলিতে যে লীলা তারে
মুছে দেয় ধূলি।(স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aj-gori-khelaghor/
|
2492
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
ধূমপান নিষেধ - অথচ
|
নীতিমূলক
|
এখন তোমার জন্যে ধূমপান নিষেধ - তা বেশ----
বহুকাল উপভোগ করেছো তো ধোঁয়ার আবেশ
কিছু কিছু স্বাধীনতা হয়তো বা ভালো লুপ্ত হলে
স্বেচ্ছায় পারোনি যেটা, আজ হৃদ-রোগের কবলে
পড়ে সেটা থামিয়েছো। হৃদয়ের গেছে কি বাসনা ?
নিজেকে সম্রাট ভেবে যে দু'ঠোটে পুড়িয়েছো সোনা
সেই ঠোঁট সে হৃদয় কখনো কি বলে না তোমাকে
শুধু মাত্র বেঁচে থাকা - এই লোভে প্রিয় বাসনাকে
হত্যা করা স্বার্থপর প্রাণী তুমি - হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড়
করে আরো বড় এক মৃত্যুকেই ভেবে নিয়ে জোড়
একা হয়ে, অধমের ক্লিষ্ট ক্লিব মুঢ় অপমানে
বেঁচে থাকাকেই ভাবো জীবনের সর্বৎকৃষ্ট মানে
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/dhumpan-nishedh-othocho/
|
5174
|
শামসুর রাহমান
|
যেসব কবিতা আমি
|
সনেট
|
যেসব কবিতা আমি কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলি,
মেলার মাটির পাখি হয়ে ওরা শূন্যে ঝুলে থাকে,
শ্রাবণ ধারায় গলে যায়, পুনরায় যেন ডাকে
মাটির ভেতর থেকে বীজ-স্বরে। বকুল, চামেলি
কিংবা মল্লিকার মাংসে পুর্নজন্ম নিতে চায়, গূঢ় চেলি
হ’য়ে সূর্যাস্তের দিকে উড়ে যাবে ভেবে শূন্যতাকে
তুষ্ট করবার ব্যর্থতায় অন্ধকারে মুখ ঢাকে।
টেবিলে সাগর দস্যু আর জলকন্যাদের কেলি।আহত কবিতাবলী ছিন্ন ভিন্ন আঙুলের মতো
তাহলে বিদায় বলে অন্তর্হিত প্রেতের বাসায়।
রক্তাক্ত পালক ওড়ে ইতস্তত উত্তরে দক্ষিণে,
পুবেও পশ্চিমে ঝরে বালির সারস অবিরত।
একটি ক্ষুর্ধাত কুকুরকে ঘোর বৃষ্টিময় দিনে
ছেঁড়া স্বপ্ন ছুঁড়ে দিই কবিতার জন্মের আশায়। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jesob-kobita-ami/
|
3855
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শান্তি
|
প্রেমমূলক
|
থাক্ থাক্ চুপ কর্ তোরা , ও আমার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে ।
আবার যদি জেগে ওঠে বাছা কান্না দেখে কান্না পাবে যে ।
কত হাসি হেসে গেছে ও , মুছে গেছে কত অশ্রুধার ,
হেসে কেঁদে আজ ঘুমাল , ওরে তোরা কাঁদাস নে আর ।কত রাত গিয়েছিল হায় , বসেছিল বসন্তের বায় ,
পুবের জানালাখানি দিয়ে চন্দ্রালোক পড়েছিল গায় ;
কত রাত গিয়েছিল হায় , দূর হতে বেজেছিল বাঁশি ,
সুরগুলি কেঁদে ফিরেছিল বিছানার কাছে কাছে আসি ।
কত রাত গিয়েছিল হায় , কোলেতে শুকানো ফুলমালা
নত মুখে উলটি পালটি চেয়ে চেয়ে কেঁদেছিল বালা ।
কত দিন ভোরে শুকতারা উঠেছিল ওর আঁখি -‘ পরে ,
সমুখের কুসুম – কাননে ফুল ফুটেছিল থরে থরে ।
একটি ছেলেরে কোলে নিয়ে বলেছিল সোহাগের ভাষা ,
কারেও বা ভালোবেসেছিল , পেয়েছিল কারো ভালোবাসা !
হেসে হেসে গলাগলি করে খেলেছিল যাহাদের নিয়ে
আজো তারা ওই খেলা করে , ওর খেলা গিয়েছে ফুরিয়ে ।
সেই রবি উঠেছে সকালে ফুটেছে সুমুখে সেই ফুল ,
ও কখন খেলাতে খেলাতে মাঝখানে ঘুমিয়ে আকুল ।
শ্রান্ত দেহ , নিস্পন্দ নয়ন , ভুলে গেছে হৃদয় – বেদনা ।
চুপ করে চেয়ে দেখো ওরে , থামো থামো , হেসো না কেঁদো না । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shanti/
|
4934
|
শামসুর রাহমান
|
পূর্বপুরুষের রক্ত
|
সনেট
|
আমার শিরায় পূর্বপুরুষের রক্ত কী উচ্ছল
নাচে আগোচরে। অগ্নিকুন্ড, বর্শা অসি ক্ষুরধার,
স্বেদসিক্ত ঘোড়া, চিত্রায়িত রাঙা কাচ, সিংহদ্বার
ঝলসানো হরিণ এবং মল্লযুদ্ধ রক্তোৎপল
মাঝে মধ্যে আনে ঘোর স্তরে স্তরে অবচেতনের।
আমিও ছিলাম সেই দূর শতকের সুবিশাল
দূর্গের প্রাকার আর আমার গন্ডারচর্ম ঢাল
ঝলসে উঠেছে রণক্ষেত্রে, ডঙ্কা শক্রূ হননেরনেশা ধরিয়েছে রক্তে। আবার এ কোন সুপ্রাচীন
ভেসে ওঠে জলজ্ব্যান্ত? নিভৃত প্রকোষ্ঠে বসে শীতে
নিমগ্ন কিসের ধ্যানে সে মানব এমন একাকী?
চঞ্চল পালক তার হাতে, কোনো মায়াবী সংগীতে
যেন সে গভীর আন্দোলিত, তার দিকে চেয়ে থাকি
নিষ্পলক; সে-তো আমি, গানে-পাওয়া, আর্ত উদাসীন। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/purbopurusher-rokto/
|
4778
|
শামসুর রাহমান
|
তিনটি ঘোড়া
|
রূপক
|
তিনটি শাদা ঘোড়া বাতাসে দেয় লাফ,
বন্য কেশরের জ্বলছে বিদ্যুৎ।
চোখের কোণে কাঁপে তীব্র নরলোক,
তিনটি শাদা ঘোড়া বাতাসে দেয় লাফ।আকাশে মেঘদল সঙ্গ চায় বুঝি,
মাটির নির্ভর উঠছে দুলে শুধু।
বাতাসে ঝলমল মুক্ত তলোয়ার,
তিনটি তলোয়ার আঁধারে ঝলসায়।স্বপ্নহীনতায় স্বকাল হলো ধু-ধু,
স্বস্তি নেই খাটো মাঠের মুক্তিতে।
খুরের ঘায়ে ওড়ে অভ্র চৌদিকে,
তিনটি শাদা ঘোড়া স্বপ্ন তিনজন।শূন্যে মেঘদল যাচ্ছে ডেকে দূরে,
মেঘের নীলিমায় দেয় না ধরা তারা;
লক্ষ গোলাপের পাপড়ি ওঠে ভেসে,
অন্ধকারে যেন মুখের রেখাগুলো।তিনটি ঘোড়া বুঝি সাহস হৃদয়ের,
ত্রিকাল কেশরের শিখায় জাগ্রত।
শূন্য পিঠে ভাসে মুকুট উজ্জ্বল,
তিনটি শাদা ঘোড়া বাতাসে দেয় লাফ। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tinti-ghora/
|
1716
|
পাবলো নেরুদা
|
আমার কাছ থেকে দূরে থেকো না
|
প্রেমমূলক
|
আমার কাছ থেকে দূরে থেকো না, দয়া করো
একটা দিন অনেক অনেক দীর্ঘ সময়,
অনেক দূরে ঘুমে থাকা ট্রেনের আশায়
নীরব ইস্টিশানের জন্যে, আমার জন্যে।
একদন্ড আমায় ছেড়ে যেয়ো না, কারণ-
ভয়ের শীতল স্রোত ঘিরে ফেলে আমায়,
অথবা ঘর খোঁজা ধোঁয়া এসে চেপে বসে
বুকের উপরে, গলা টিপে ধরে আমার।
হারিওনা তুমি ছায়া হয়ে সমুদ্র তীরে;
তোমার চোখের পাতায় হারিওনা দূরে।
এক মুহূর্ত আমার ছেড়ে থেকোনা প্রিয়,
এক মুহুর্তে তুমি খুব দূরে চলে যাবে
আমি উদ্ভ্রান্ত ভেবে যাব, তুমি আসবে?
নাকি আমি আমৃত্যু রয়ে যাব একা?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3942.html
|
1149
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মনোসরণি
|
চিন্তামূলক
|
মনে হয় সমাবৃত হয়ে আছি কোন্ এক অন্ধকার ঘরে–
দেয়ালের কর্নিশে মক্ষিকারা স্থিরভাবে জানে :
এইসব মানুষেরা নিশ্চয়তা হারায়েছে নক্ষত্রের দোষে;
পাঁচফুট জমিনের শিষ্টতায় মাথা পেতে রেখেছে আপোষে।হয়তো চেঙ্গিস আজও বাহিরে ঘুরিতে আছে করুণ রক্তের অভিযানে।
বহু উপদেশ দিয়ে চলে গেলে কনফুশিয়াস–
লবেজান হাওয়া এসে গাঁথুনির ইঁট সব ক’রে ফেলে ফাঁস।বাতাসে ধর্মের কল ন’ড়ে ওঠে–ন’ড়ে চলে ধীরে।
সূর্যসাগরতীরে মানুষের তীক্ষ্ন ইতিহাসে
কত কৃষ্ণ জননীর মৃত্যু হ’ল রক্তে–উপেক্ষায়;
বুকের সন্তান তবু নবীন সংকল্পে আজো আসে।
সূর্যের সোনালি রশ্মি, বোলতার স্ফটিক পাখনা,
মরুভূর দেশে যেই তৃণগুচ্ছ বালির ভিতরে
আমাদের তামাশার প্রগল্ভতা হেঁট শিরে মেনে নিয়ে চুপে
তবু দুই দন্ড এই মৃত্তিকার আড়ম্বর অনুভব করে,
যে সারস-দম্পতির চোখে তীক্ষ্ন ইস্পাতের মতো নদী এসে
ক্ষণস্থায়ী প্রতিবিম্বে–হয়তো বা
ফেলেছিলো সৃষ্টির আগাগোড়া শপথ হারিয়ে,
যে বাতাস সারাদিন খেলা করে অরণ্যের রঙে,
যে বনানী সুর পায়–আর যারা মানবিক ভিত্তি–গ’ড়ে–ভেঙ্গে গেলো বারবার–
হয়তো বা প্রতিভার প্রকম্পনে–ভুল ক’রে–বধ ক’রে–প্রেমে–
সূর্যের স্ফটিক আলো স্তিমিত হ’বার আগে সৃষ্টির পারে
সেইসব বীজ আলো জন্ম পায় মৃত্তিকা অঙ্গারে।
পৃথিবীকে ধাত্রীবিদ্যা শিখায়েছে যারা বহুদিন
সেই সব আদি অ্যামিবারা আজ পরিহাসে হয়েছে বিলীন।
সূর্যসাগরতীরে তবুও জননী ব’লে সন্ততিরা চিনে নেবে কারে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/monosharonii/
|
3262
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দ্বিতীয় সর্গ
|
কাহিনীকাব্য
|
"এত কাল হে প্রকৃতি করিনু তোমার সেবা,
তবু কেন এ হৃদয় পূরিল না দেবি?
এখনো বুকের মাঝে রয়েছে দারুণ শূন্য,
সে শূন্য কি এ জনমে পূরিবে না আর?
মনের মন্দির মাঝে প্রতিমা নাহিক যেন,
শুধু এ আঁধার গৃহ রয়েছে পড়িয়া--
কত দিন বল দেবি রহিবে এমন শূন্য,
তা হোলে ভাঙিয়ে যাবে এ মনোমন্দির!
কিছু দিন পরে আর দেখিব সেখানে চেয়ে
পূর্ব্ব হৃদয়ের আছে ভগ্ন-অবশেষ,
সে ভগ্ন-অবশেষে-- সুখের সমাধি 'পরে
বসিয়া দারুণ দুখে কাঁদিতে কি হবে?
মনের অন্তর-তলে কি যে কি করিছে হুহু,
কি যেন আপন ধন নাইকো সেখানে,
সে শূন্য পূরাবে দেবি ঘুরিছে পৃথিবীময়
মরুভূমে তৃষাতুর মৃগের মতন।
কত মরীচিকা দেবী করেছে ছলনা মোরে,
কত ঘুরিয়াছি তার পশ্চাতে পশ্চাতে,
অবশেষে শ্রান্ত হয়ে তোমারে শুধাই দেবি
এ শূন্য পূরিবে না কি কিছুতে আমার?
উঠিছে তপন শশী, অস্ত যাইতেছে পুনঃ,
বসন্ত শরত শীত চক্রে ফিরিতেছে;
প্রতি পদক্ষেপে আমি বাল্যকাল হোতে দেবি
ক্রমে ক্রমে কত দূর যেতেছি চলিয়া--
বাল্যকাল গেছে চলে, এসেছে যৌবন এবে,
যৌবন যাইবে চলি আসিবে বার্দ্ধক্য--
তবু এ মনের শূন্য কিছুতে কি পূরিবে না?
মন কি করিবে হুহু চিরকাল তরে?
শুনিয়াছিলাম কোন্ উদাসী যোগীর কাছে--
"মানুষের মন চায় মানুষেরি মন;
গম্ভীর সে নিশীথিনী, সুন্দর সে উষাকাল,
বিষণ্ণ সে সায়াহ্নের ম্লান মুখচ্ছবি,
বিস্তৃত সে অম্বুনিধি, সমুচ্চ সে গিরিবর,
আঁধার সে পর্ব্বতের গহ্বর বিশাল,
তটিনীর কলধ্বনি, নির্ঝরের ঝর ঝর,
আরণ্য বিহঙ্গদের স্বাধীন সঙ্গীত,
পারে না পূরিতে তারা বিশাল মনুষ্য-হৃদি--
মানুষের মন চায় মানুষেরি মন।'
শুনিয়া, প্রকৃতিদেবি, ভ্রমিণু পৃথিবীময়;
কত লোক দিয়েছিল হৃদি-উপহার--
আমার মর্ম্মের গান যবে গাহিতাম দেবি
কত লোক কেঁদেছিল শুনিয়া সে গীত।
তেমন মনের মত মন পেলাম না দেবি,
আমার প্রাণের কথা বুঝিল না কেহ,
তাইতে নিরাশ হোয়ে আবার এসেছি ফিরে,
বুঝি গো এ শূন্য মন পূরিল না আর।"
এইরূপে কেঁদে কেঁদে কাননে কাননে কবি
একাকী আপন-মনে করিত ভ্রমণ।
সে শোক-সঙ্গীত শুনি কাঁদিত কাননবালা,
নিশীথিনী হাহা করি ফেলিত নিশ্বাস,
বনের হরিণগুলি আকুল নয়নে আহা
কবির মুখের পানে রহিত চাহিয়া।
"হাহা দেবি একি হোলো, কেন পূরিল না প্রাণ"
প্রতিধ্বনি হোতো তার কাননে কাননে।
শীর্ণ নির্ঝরিণী যেথা ঝরিতেছে মৃদু মৃদু,
উঠিতেছে কুলু কুলু জলের কল্লোল,
সেখানে গাছের তলে একাকী বিষণ্ণ কবি
নীরবে নয়ন মুদি থাকিত শুইয়া--
তৃষিত হরিণশিশু সলিল করিয়া পান
দেখি তার মুখপানে চলিয়া যাইত।
শীতরাত্রে পর্ব্বতের তুষারশয্যার 'পরে
বসিয়া রহিত স্তব্ধ প্রতিমার মত,
মাথার উপরে তার পড়িত তুষারকণা,
তীব্রতম শীতবায়ু যাইত বহিয়া।
দিনে দিনে ভাবনায় শীর্ণ হোয়ে গেল দেহ,
প্রফুল্ল হৃদয় হোলো বিষাদে মলিন,
রাক্ষসী স্বপ্নের তরে ঘুমালেও শান্তি নাই,
পৃথিবী দেখিত কবি শ্মশানের মত
এক দিন অপরাহ্নে বিজন পথের প্রান্তে
কবি বৃক্ষতলে এক রহিছে শুইয়া,
পথ-শ্রমে শ্রান্ত দেহ, চিন্তায় আকুল হৃদি,
বহিতেছে বিষাদের আকুল নিশ্বাস।
হেন কালে ধীরি ধীরি শিয়রের কাছে আসি
দাঁড়াইল এক জন বনের বালিকা,
চাহিয়া মুখের পানে কহিল করুণ স্বরে,
"কে তুমি গো পথশ্রান্ত বিষণ্ণ পথিক?
অধরে বিষাদ যেন পেতেছে আসন তার
নয়ন কহিছে যেন শোকের কাহিনী।
তরুণ হৃদয় কেন অমন বিষাদময়?
কি দুখে উদাস হোয়ে করিছ ভ্রমণ?"
গভীর নিশ্বাস ফেলি গম্ভীরে কহিল কবি,
"প্রাণের শূন্যতা কেন ঘুচিল না বালা?"
একে একে কত কথা কহিল বালিকা কাছে,
যত কথা রুদ্ধ ছিল হৃদয়ে কবির--
আগ্নেয় গিরির বুকে জ্বলন্ত অগ্নির মত
যত কথা ছিল কবি কহিলা গম্ভীরে।
"নদ নদী গিরি গুহা কত দেখিলাম, তবু
প্রাণের শূন্যতা কেন ঘুচিল না দেবি।"
বালার কপোল বাহি নীরবে অশ্রুর বিন্দু
স্বর্গের শিশির-সম পড়িল ঝরিয়া,
সেই এক অশ্রুবিন্দু অমৃতধারার মত
কবির হৃদয় গিয়া প্রবেশিল যেন;
দেখি সে করুণবারি নিরশ্রু কবির চোখে
কত দিন পরে হোল অশ্রুর উদয়।
শ্রান্ত হৃদয়ের তরে যে আশ্রয় খুঁজে খুঁজে
পাগল ভ্রমিতেছিল হেথায় হোথায়--
আজ যেন এইটুকু আশ্রয় পাইল হৃদি,
আজ যেন একটুকু জুড়ালো যন্ত্রণা।
যে হৃদয় নিরাশায় মরুভূমি হোয়েছিল
সেথা হোতে হল আজ অশ্রু উৎসারিত।
শ্রান্ত সে কবির মাথা রাখিয়া কোলের 'পরে,
সরলা মুছায়ে দিল অশ্রুবারিধারা।
কবি সে ভাবিল মনে, তুমি কোথাকার দেবী
কি অমৃত ঢালিলে গো প্রাণের ভিতর!
ললনা তখন ধীরে চাহিয়া কবির মুখে
কহিল মমতাময় করুণ কথায়,--
"হোথায় বিজন বনে দেখেছ কুটীর ওই,
চল পান্থ ওইখানে যাই দুজনায়।
বন হোতে ফল মূল আপনি তুলিয়া দিব,
নির্ঝর হইতে তুলি আনিব সলিল,
যতনে পর্ণের শয্যা দিব আমি বিছাইয়া,
সুখনিদ্রা-কোলে সেথা লভিবে বিরাম,
আমার বীণাটি লয়ে গান শুনাইব কত,
কত কি কথায় দিন যাইবে কাটিয়া।
হরিণশাবক এক আছে ও গাছের তলে,
সে যে আসি কত খেলা খেলিবে পথিক।
দূরে সরসীর ধারে আছে এক চারু কুঞ্জ,
তোমারে লইয়া পান্থ দেখাব সে বন।
কত পাখী ডালে ডালে সারাদিন গাইতেছে,
কত যে হরিণ সেথা করিতেছে খেলা।
আবার দেখাব সেই অরণ্যের নির্ঝরিণী,
আবার নদীর ধারে লয়ে যাব আমি,
পাখী এক আছে মোর সে যে কত গায় গান--
নাম ধোরে ডাকে মোরে "নলিনী' "নলিনী'।
যা আছে আমার কিছু সব আমি দেখাইব,
সব আমি শুনাইব যত জানি গান--
আসিবে কি পান্থ ওই বনের কুটীরমাঝে?"
এতেক শুনিয়া কবি চলিল কুটীরে।
কি সুখে থাকিত কবি, বিজন কুটীরে সেই
দিনগুলি কেটে যেত মুহূর্তের মত--
কি শান্ত সে বনভূমি, নাই লোক নাই জন,
শুধু সে কুটীরখানি আছে এক ধারে।
আঁধার তরুর ছায়ে-- নীরব শান্তির কোলে
দিবস যেন রে সেথা রহিত ঘুমায়ে।
পাখীর অস্ফুট গান, নির্ঝরের ঝরঝর
স্তব্ধতারে আরো যেন দিত মিষ্ট করি।
আগে এক দিন কবি মুগ্ধ প্রকৃতির রূপে
অরণ্যে অরণ্যে একা করিত ভ্রমণ,
এখন দুজনে মিলি ভ্রমিয়া বেড়ায় সেথা,
দুই জন প্রকৃতির বালক বালিকা।
সুদূর কাননতলে কবিরে লইয়া যেত
নলিনী, সে যেন এক বনেরি দেবতা।
শ্রান্ত হোলে পথশ্রমে ঘুমাত কবির কোলে,
খেলিত বনের বায়ু কুন্তল লইয়া,
ঘুমন্ত মুখের পানে চাহিয়া রহিত কবি--
মুখে যেন লিখা আছে আরণ্য কবিতা।
"একি দেবি কলপনা, এত সুখ প্রণয়ে যে
আগে তাহা জানিতাম না ত!
কি এক অমৃতধারা ঢেলেছ প্রাণের 'পরে
হে প্রণয় কহিব কেমনে?
অন্য এক হৃদয়েরে হৃদয় করা গো দান,
সে কি এক স্বর্গীয় আমোদ।
এক গান গায় যদি দুইটি হৃদয়ে মিলি,
দেখে যদি একই স্বপন,
এক চিন্তা এক আশা এক ইচ্ছা দুজনার,
এক ভাবে দুজনে পাগল,
হৃদয়ে হৃদয়ে হয় সে কি গো সুখের মিল--
এ জনমে ভাঙ্গিবে না তাহা।
আমাদের দুজনের হৃদয়ে হৃদয়ে দেবি
তেমনি মিশিয়া যায় যদি--
এক সাথে এক স্বপ্ন দেখি যদি দুই জনে
তা হইলে কি হয় সুন্দর!
নরকে বা স্বর্গে থাকি, অরণ্যে বা কারাগারে
হৃদয়ে হৃদয়ে বাঁধা হোয়ে--
কিছু ভয় করি নাকো--বিহ্বল প্রণয়ঘোরে
থাকি সদা মরমে মজিয়া।
তাই হোক্--হোক্ দেবি আমাদের দুই জনে
সেই প্রেম এক কোরে দিক্।
মজি স্বপনের ঘোরে হৃদয়ের খেলা খেলি
যেন যায় জীবন কাটিয়া।"
নিশীথে একেলা হোলে এইরূপ কত গান
বিরলে গাইত কবি বসিয়া বসিয়া।
সুখ বা দুখের কথা বুকের ভিতরে যাহা
দিন রাত্রি করিতেছে আলোড়িত-প্রায়,
প্রকাশ না হোলে তাহা,মরমের গুরুভারে
জীবন হইয়া পড়ে দারুণ ব্যথিত।
কবি তার মরমের প্রণয় উচ্ছ্বাস-কথা
কি করি যে প্রকাশিবে পেত না ভাবিয়া।
পৃথিবীতে হেন ভাষা নাইক, মনের কথা
পারে যাহা পূর্ণভাবে করিতে প্রকাশ।
ভাব যত গাঢ় হয়, প্রকাশ করিতে গিয়া
কথা তত না পায় খুঁজিয়া খুঁজিয়া।
বিষাদ যতই হয় দারুণ অন্তরভেদী,
অশ্রুজল তত যায় শুকায়ে যেমন!
মরমের ভার-সম হৃদয়ের কথাগুলি
কত দিন পারে বল চাপিয়া রাখিতে?
একদিন ধীরে ধীরে বালিকার কাছে গিয়া
অশান্ত বালক-মত কহিল কত কি!
অসংলগ্ন কথাগুলি, মরমের ভাব আরো
গোলমাল করি দিল প্রকাশ না করি।
কেবল অশ্রুর জলে, কেবল মুখের ভাবে
পড়িল বালিকা তার মনের কি কথা!
এই কথাগুলি যেন পড়িল বালিকা ধীরে--
"কত ভাল বাসি বালা কহিব কেমনে!
তুমিও সদয় হোয়ে আমার সে প্রণয়ের
প্রতিদান দিও বালা এই ভিক্ষা চাই।"
গড়ায়ে পড়িল ধীরে বালিকার অশ্রুজল,
কবির অশ্রুর সাথে মিশিল কেমন--
স্কন্ধে তার রাখি মাথা কহিল কম্পিত স্বরে,
"আমিও তোমারে কবি বাসি না কি ভাল?"
কথা না স্ফুরিল আর, শুধু অশ্রুজলরাশি
আরক্ত কপোল তার করিল প্লাবিত।
এইরূপ মাঝে মাঝে অশ্রুজলে অশ্রুজলে
নীরবে গাইত তারা প্রণয়ের গীত।
অরণ্যে দুজনে মিলি আছিল এমন সুখে
জগতে তারাই যেন আছিল দুজন--
যেন তারা সুকোমল ফুলের সুরভি শুধু,
যেন তারা অপ্সরার সুখের সঙ্গীত।
আলুলিত চুলগুলি সাজাইয়া বনফুলে
ছুটিয়া আসিত বালা কবির কাছেতে,
একথা ওকথা লয়ে কি যে কি কহিত বালা
কবি ছাড়া আর কেহ বুঝিতে নারিত।
কভু বা মুখের পানে সে যে কি রহিত চেয়ে,
ঘুমায়ে পড়িত যেন হৃদয় কবির।
কভু বা কি কথা লয়ে সে যে কি হাসিত হাসি,
তেমন সরল হাসি দেখ নি কেহই।
আঁধার অমার রাত্রে একাকী পর্ব্বতশিরে
সেও গো কবির সাথে রহিত দাঁড়ায়ে,
উনমত্ত ঝড় বৃষ্টি বিদ্যুৎ আশনি আর
পর্ব্বতের বুকে যবে বেড়াত মাতিয়া,
তাহারো হৃদয় যেন নদীর তরঙ্গ-সাথ
করিত গো মাতামাতি হেরি সে বিপ্লব--
করিত সে ছুটাছুটি, কিছুতে সে ডরিত না,
এমন দুরন্ত মেয়ে দেখি নি ত আর!
কবি যা কহিত কথা শুনিত কেমন ধীরে,
কেমন মুখের পানে রহিত চাহিয়া।
বনদেবতার মত এমন সে এলোথেলো,
কখনো দুরন্ত অতি ঝটিকা যেমন,
কখনো এমন শান্ত প্রভাতের বায়ু যথা
নীরবে শুনে গো যবে পাখীর সঙ্গীত।
কিন্তু, কলপনা, যদি কবির হৃদয় দেখ
দেখিবে এখনো তাহা পূর্ণ হয় নাই।
এখনো কহিছে কবি, "আরো দাও ভালবাসা,
আরো ঢালো' ভালবাসা হৃদয়ে আমার।"
প্রেমের অমৃতধারা এত যে করেছে পান,
তবু মিটিল না কেন প্রণয়পিপাসা?
প্রেমের জোছনাধারা যত ছিল ঢালি বালা
কবির সমুদ্র-হৃদি পারে নি পূরিতে।
স্বাধীন বিহঙ্গ-সম, কবিদের তরে দেবি
পৃথিবীর কারাগার যোগ্য নহে কভু।
অমন সমুদ্র-সম আছে যাহাদের মন
তাহাদের তরে দেবি নহে এ পৃথিবী।
তাদের উদার মন আকাশে উড়িতে যায়,
পিঞ্জরে ঠেকিয়া পক্ষ নিম্নে পড়ে পুনঃ,
নিরাশায় অবশেষে ভেঙ্গে চুরে যায় মন,
জগৎ পূরায় তার আকুল বিলাপে।
কবির সমুদ্র-বুক পূরাতে পারিবে কিসে
প্রেম দিয়া ক্ষুদ্র ওই বনের বালিকা।
কাতর ক্রন্দনে আহা আজিও কাঁদিল কবি,
"এখনও পূরিল না প্রাণের শূন্যতা।"
বালিকার কাছে গিয়া কাতরে কহিল কবি,
"আরো দাও ভালবাসা হৃদয়ে ঢালিয়া।
আমি যত ভালবাসি তত দাও ভালবাসা,
নহিলে গো পূরাবে না এ প্রাণের শূন্যতা।"
শুনিয়া কবির কথা কাতরে কহিল বালা,
"যা ছিল আমার কবি দিয়েছি সকলি--
এ হৃদয়, এ পরাণ, সকলি তোমার কবি,
সকলি তোমার প্রেমে দেছি বিসর্জ্জন।
তোমার ইচ্ছার সাথে ইচ্ছা মিশায়েছি মোর,
তোমার সুখের সাথে মিশায়েছি সুখ।"
সে কথা শুনিয়া কবি কহিল কাতর স্বরে,
"প্রাণের শূন্যতা তবু ঘুচিল না কেন?
ওই হৃদয়ের সাথে মিশাতে চাই এ হৃদি,
দেহের আড়াল তবে রহিল গো কেন?
সারাদিন সাধ যায় সুধাই মনের কথা,
এত কথা তব কেন পাই না খুঁজিয়া?
সারাদিন সাধ যায় দেখি ও মুখের পানে,
দেখেও মিটে না কেন আঁখির পিপাসা?
সাধ যায় এ জীবন প্রাণ ভোরে ভাল বাসি,
বেসেও প্রাণের শূন্য ঘুচিল না কেন?
আমি যত ভালবাসি তত দাও ভালবাসা,
নহিলে গো পূরিবে না প্রাণের শূন্যতা।
একি দেবি! একি তৃষ্ণা জ্বলিছে হৃদয়ে মোর,
ধরার অমৃত যত করিয়াছি পান,
প্রকৃতির কাছে যত তরল স্বর্গীয় গীতি,
সকলি হৃদয়ে মোর দিয়াছি ঢালিয়া--
শুধু দেবি পৃথিবীর হলাহল আছে যত
তাহাই করি নি পান মিটাতে পিপাসা!
শুধু দেবি ঐশ্বর্য্যের কনকশৃঙ্খল দিয়া
বাঁধি নাই আমার এ স্বাধীন হৃদয়!
শুধু দেবি মিটাইতে মনের বীরত্ব-গর্ব্ব
লক্ষ মানবের রক্তে ধুই নি চরণ!
শুধু দেবি এ জীবনে নিশাচর বিলাসেরে
সুখ-স্বাস্থ্য অর্ঘ্য দিয়া করি নাই সেবা!
তবু কেন হৃদয়ের তৃষা মিটিল না মোর,
তবু কেন ঘুচিল না প্রাণের শূন্যতা?
শুনেছি বিলাসসুরা বিহ্বল করিয়া হৃদি
ডুবাইয়া রাখে সদা বিস্মৃতির ঘুমে!
কিন্তু দেবি-- কিন্তু দেবি-- এত যে পেয়েছি কষ্ট,
বিস্মৃতি চাই নে তবু বিস্মৃতি চাই নে!--
সে কি ভয়ানক দশা, কল্পনাও শিহরে গো--
স্বর্গীয় এ হৃদয়ের জীবনে মরণ!
আমার এ মন দেবি হোক্ মরুভূমি-সম
তৃণলতা-জল-শূন্য জ্বলন্ত প্রান্তর,
তবুও তবুও আমি সহিব তা প্রাণপণে,
বহিব তা যত দিন রহিব বাঁচিয়া,
মিটাতে মনের তৃষা ত্রিভুবন পর্য্যটিব,
হত্যা করিব না তবু হৃদয় আমার।
প্রেম ভক্তি স্নেহ আদি মনের দেবতা যত
যতনে রেখেছি আমি মনের মন্দিরে,
তাঁদের করিতে পূজা ক্ষমতা নাইকো ব'লে
বিসর্জ্জন করিবারে পারিব না আমি।
কিন্তু ওগো কলপনা আমার মনের কথা
বুঝিতে কে পারিবেক বল দেখি দেবি?
আমার ব্যথার মর্ম্ম কারে বুঝাইবে বল--
বুঝাইতে না পারিলে বুক যায় ফেটে।
যদি কেহ বলে দেবি "তোমার কিসে দুখ,
হৃদয়ের বিনিময়ে পেয়েছ হৃদয়,
তবে কাল্পনিক দুখে এত কেন ম্রিয়মাণ?'
তবে কি বলিয়া আমি দিব গো উত্তর?
উপায় থাকিতে তবু যে সহে বিষাদজ্বালা
পৃথিবী তাহারি কষ্টে হয় গো ব্যথিত--
আমার এ বিষাদের উপায় নাইক কিছু,
কারণ কি তাও দেবি পাই না খুঁজিয়া।
পৃথিবী আমার কষ্ট বুঝুক্ বা না বুঝুক্,
নলিনীরে কি বলিয়া বুঝাইব দেবি?
তাহারে সামান্য কথা গোপন করিলে পরে
হৃদয়ে কি কষ্ট হয় হৃদয় তা জানে।
এত তারে ভালবাসি, তবু কেন মনে হয়
ভালবাসা হইল না আশ মিটাইয়া!
আঁধার সমুদ্রতলে কি যেন বেড়াই খুঁজে,
কি যেন পাইতেছি না চাহিতেছি যাহা।
বুকের যেখানে তারে রাখিতে চাই গো আমি
সেখানে পাই নে যেন রাখিতে তাহারে--
তাইতে অন্তর বুক এখনো পূরিতেছে না,
তাইতে এখনো শূন্য রয়েছে হৃদয়।"
কবির প্রণয়সিন্ধু ক্ষুদ্র বালিকার মন
রেখেছিল মগ্ন করি অগাধ সলিলে--
উপরে যে ঝড় ঝঞ্ঝা কত কি বহিয়া যেত
নিম্নে তার কোলাহল পেত না শুনিতে,
প্রণয়ের অবিচিত্র নিয়তনূতন তবু
তরঙ্গের কলধ্বনি শুনিত কেবল,
সেই একতান ধ্বনি শুনিয়া শুনিয়া তার
হৃদয় পড়িয়াছিল ঘুমায়ে কেমন!
বনের বালিকা আহা সে ঘুমে বিহ্বল হোয়ে
কবির হৃদয়ে রাখি অবশ মস্তক
স্বর্গের স্বপন শুধু দেখিত দিবস রাত,
হৃদয়ের হৃদয়ের অনন্ত মিলন।
বালিকার সে হৃদয়ে সে প্রণয়মগ্ন হৃদে,
অবশিষ্ট আছিল না এক তিল স্থান--
আর কিছু জানিত না, আর কিছু ভাবিত না,
শুধু সে বালিকা ভাল বাসিত কবিরে।
শুধু সে কবির গান কত যে লাগিত ভাল,
শুনে শুনে শুনা তার ফুরাত না আর।
শুধু সে কবির নেত্র কি এক স্বর্গীয় জ্যোতি
বিকীরিত, তাই হেরি হইত বিহ্বল!
শুধু সে কবির কোলে ঘুমাতে বাসিত ভাল,
কবি তার চুল লয়ে করিত কি খেলা।
শুধু সে কবিরে বালা শুনতে বাসিত ভাল
কত কি--কত কি কথা অর্থ নাই যার,
কিন্তু সে কথায় কবি কত যে পাইত অর্থ
গভীর সে অর্থ নাই কত কবিতার--
সেই অর্থহীন কথা, হৃদয়ের ভাব যত
প্রকাশ করিতে পারে না এমন কিছু না।
একদিন বালিকারে কবি সে কহিল গিয়া--
"নলিনি! চলিনু আমি ভ্রমিতে পৃথিবী!
আর একবার বালা কাশ্মীরের বনে বনে
যাই গো শুনিতে আমি পাখীর কবিতা!
রুসিয়ার হিমক্ষেত্রে আফ্রিকার মরুভূমে
আর একবার আমি করি গে ভ্রমণ!
এইখানে থাক তুমি, ফিরিয়া আসিয়া পুনঃ
ওই মধুমুখখানি করিব চুম্বন।"
এতেক কহিয়া কবি নীরবে চলিয়া গেল
গোপনে মুছিয়া ফেলি নয়নের জল।
বালিকা নয়ন তুলি নীরবে রহিল চাহি,
কি দেখিছে সেই জানে অনিমিষ চখে।
সন্ধ্যা হোয়ে এল ক্রমে তবুও রহিল চাহি,
তবুও ত পড়িল না নয়নে নিমেষ।
অনিমিষ নেত্র ক্রমে করিয়া প্লাবিত
একবিন্দু দুইবিন্দু ঝরিল সলিল।
বাহুতে লুকায়ে মুখ কাতর বালিকা
মর্ম্মভেদী অশ্রুজলে করিল রোদন।
হা-হা কবি কি করিলে,ফিরে দেখ, ফিরে এস,
দিও না বালার হৃদে অমন আঘাত--
নীরবে বালার আহা কি বজ্র বেজেছে বুকে,
গিয়াছে কোমল মন ভাঙ্গিয়া চুরিয়া!
হা কবি অমন কোরে অনর্থক তার মনে
কি আঘাত করিলে যে বুঝিলে না তাহা?
এত কাল সুখস্বপ্ন ডুবায়ে রাখিয়া মন,
এত দিন পরে তাহা দিবে কি ভাঙ্গিয়া?
কবি ত চলিয়া যায়-- সন্ধ্যা হোয়ে এল ক্রমে,
আঁধারে কাননভূমি হইল গম্ভীর--
একটি নড়ে না পাতা, একটু বহে না বায়ু,
স্তব্ধ বন কি যেন কি ভাবিছে নীরবে!
তখন বনান্ত হোতে সুধীরে শুনিল কবি
উঠিছে নীরব শূন্যে বিষণ্ণ সঙ্গীত--
তাই শুনি বন যেন রয়েছে নীরবে অতি,
জোনাকি নয়ন শুধু মেলিছে মুদিছে।
একবার কবি শুধু চাহিল কুটীরপানে,
কাতরে বিদায় মাগি বনদেবী-কাছে
নয়নের জল মুছি-- যে দিকে নয়ন চলে
সে দিকে পথিক কবি যাইল চলিয়া। সঙ্গীত কেন ভালবাসিলে আমায়?
কিছুই নাইক গুণ, কিছুই জানি না আমি,
কি আছে? কি দিয়ে তব তুষিব হৃদয়!
যা আমার ছিল সাধ্য সকলি করেছি আমি
কিছুই করি নি দোষ চরণে তোমার,
শুধু ভাল বাসিয়াছি, শুধু এ পরান মন
উপহার সঁপিয়াছি তোমার চরণে।
তাতেও তোমার মন তুষিতে নারিনু যদি
তবে কি করিব বল, কি আছে আমার?
গেলে যদি, গেলে চলি, যাও যেথা ভাল লাগে--
একবার মনে কোরো দীন অধীনীরে।
ভ্রমিতে ধরার মাঝে যত ভালবাসা পাবে,
তাতে যদি ভাল থাক তাই হোক্ তবে--
তবু একবার যদি মনে কর নলিনীরে
যে দুখিনী, যে তোমারে এত ভালবাসে!
কি করিলে মন তব পারিতাম জুড়াইতে
যদি জানিতাম কবি করিতাম তাহা!
আমি অতি অভাগিনী জানি না বলিয়া যেন
বিরক্ত হোয়ো না কবি এই ভিক্ষা দাও!
না জানিয়া না শুনিয়া যদি দোষ করে থাকি,
ক্ষুদ্র আমি, ক্ষমা তবে করিয়ো আমারে--
তুমি ভাল থেকো কবি,ক্ষুদ্র এক কাঁটা যেন
ফুটে না তোমার পায়ে ভ্রমিতে পৃথিবী।
জননি, কোথায় তুমি রেখে গেলে দুহিতারে?
কত দিন একা একা কাটালাম হেথা,
একেলা তুলিয়া ফুল কত মালা গাঁথিতাম,
একেলা কাননময় করিতাম খেলা!
তোমার বীণাটি ল'য়ে, উঠিয়া পর্ব্বতশিরে
একেলা আপন মনে গাইতাম গান--
হরিণশিশুটি মোর বসিত পায়ের তলে,
পাখীটি কাঁধের 'পরে শুনিত নীরবে।
এইরূপ কত দিন কাটালেম বনে বনে,
কত দিন পরে তবে এলে তুমি কবি!
তখন তোমারে কবি কি যে ভালবাসিলাম
এত ভাল কাহারেও বাসি নাই কভু।
দূর স্বরগের এক জ্যোতির্ম্ময় দেব-সম
কত বার মনে মনে করেছি প্রণাম।
দূর থেকে আঁখি ভরি দেখিতাম মুখখানি,
দূর থেকে শুনিতাম মধুময় গান।
যে দিন আপনি আসি কহিলে আমার কাছে
ক্ষুদ্র এই বালিকারে ভালবাস তুমি,
সে দিন কি হর্ষে কবি কি আনন্দে কি উচ্ছ্বাসে
ক্ষুদ্র এ হৃদয় মোর ফেটে গেল যেন।
আমি কোথাকার কেবা! আমি ক্ষুদ্র হোতে ক্ষুদ্র,
স্বর্গের দেবতা তুমি ভালবাস মোরে?
এত সৌভাগ্য, কবি, কখনো করি নি আশা--
কখনো মুহূর্ত্ত-তরে জানি নি স্বপনে।
যেথায় যাও-না কবি, যেথায় থাক-না তুমি,
আমরণ তোমারেই করিব অর্চ্চনা।
মনে রাখ নাই রাখ, তুমি যেন সুখে থাক
দেবতা! এ দুখিনীর শুন গো প্রার্থনা।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/diteya-ago/
|
575
|
কায়কোবাদ
|
বঙ্গভূমি ও বঙ্গভাষা
|
স্বদেশমূলক
|
‘বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা আমার জন্মভূমি।
গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে ব’য়ে,
যাহার চরণ চুমি।
ব্রহ্মপুত্র গেয়ে বেড়ায়,
যাহার পূণ্য-গাথা!
সেই-সে আমার জন্মভূমি,
সেই-সে আমার মাতা!
আমার মায়ের সবুজ আঁচল
মাঠে খেলায় দুল!
আমার মায়ের ফুল-বাগানে,
ফুটছে কতই ফুল!
শত শত কবি যাহার
গেয়ে গেছে গাথা!
সেই-সে আমার জন্মভূমি,
সেই-সে আমার মাতা!
আমার মায়ের গোলা ছিল,
ধন ধান্যে ভরা!
ছিল না তার অভাব কিছু,
সুখে ছিলাম মোরা!
বাংলা মায়ের স্নিগ্ধ কোলে,
ঘুমিয়ে রব আমি!
বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা জন্মভূমি!’
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3840.html
|
3770
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যথাকর্তব্য
|
নীতিমূলক
|
ছাতা বলে, ধিক্ ধিক্ মাথা মহাশয়,
এ অন্যায় অবিচার আমারে না সয়।
তুমি যাবে হাটে বাটে দিব্য অকাতরে,
রৌদ্র বৃষ্টি যতকিছু সব আমা-’পরে।
তুমি যদি ছাতা হতে কী করিতে দাদা?
মাথা কয়, বুঝিতাম মাথার মর্যাদা,
বুঝিতাম তার গুণে পরিপূর্ণ ধরা,
মোর একমাত্র গুণ তারে রক্ষা করা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jothakortobyo/
|
3737
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মুহুর্ত মিলায়ে যায়
|
রূপক
|
মুহুর্ত মিলায়ে যায়
তবু ইচ্ছা করে—
আপন স্বাক্ষর রবে
যুগে যুগান্তরে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/muhurto-milae-jai/
|
4147
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
বেঁচে থাকার আকুতি
|
প্রেমমূলক
|
বেঁচে থেকেও মরে গেছি
মরবার নেই কোন ভয়,
হেরে গিয়েও বেঁচে আছি
হারবার আর কিছু নেই।
যা হারাবার তাই হারিয়েছি
দুঃখগুলো রয়েছে পাশে,
ভালোবাসা হৃদয়ে ছিল
হৃদয়েই যতনে আছে।
চোখ দুটো তাকিয়ে ছিল
এখনও তাকিয়েই আছে,
ঘুমের ঘরে স্বপ্নগুলো
শুধু দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে।
মেঘের আড়ালে চাঁদটি
এখনও লুকোচুরি খেলে,
বৃষ্টিগুলো হঠাৎ করে
চোখ ভাসিয়ে মারে।
বাগানের ফুলগুলো সব
এখনও বাতাসে দোলে,
ভোমরা আসেনা বলে
মধুগুলো শুকিয়ে মরে।
তীর্থের কাক চেয়ে থাকে
শুন্য কলসির দিকে,
জল ছাড়া নদী যেমন
শুকিয়ে শুকিয়ে মরে।
ঝাকে ঝাকে পাখি আসে
সন্ধায় ফিরে নীড়ে,
দুঃখগুলো এভাবেই আসে
যায় নাকো আর ফিরে।
পথের ধারে পথিক যেমন
হাটে আকাবাকা পথ ধরে,
আমি হাটতেছি সেভাবে
কোন এক অচেনা গন্তব্যে।
যদি দেখা হয় কোনদিন
জীবনের কোন এক বাকে,
বলবো কথা সেদিন আমি
তোমার শনে কানে কানে।
তোমার মুখের হাসিতে আমি
হারিয়ে যাব অতি গোপনে,
হৃদয়ের সাথে হৃদয় মিলাবো
ভাসাবো অশ্রুর প্লাবনে।
মরে গিয়েও বেঁচে থাকবো
তোমার হৃদয়ের গভীরে,
যতন করে রেখো তুমি
জনমের পর জনম ধরে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2127.html
|
854
|
জসীম উদ্দীন
|
পুতুল
|
স্বদেশমূলক
|
পুতুল, তুমি পুতুল ওগো ! কাদের খেলা-ঘরের ছোট খুকু,
কাদের ঘরের ময়না পাখি ! সোহাগ-করা কাদের আদরটুকু।
কার আঁচলের মানিক তুমি। কার চোখেতে কাজললতা হয়ে,
এসেছ এই সোনার দেশে রামধনুকের রঙের হাসি লয়ে।
ভোর বেলাকার শিশির তুমি, কে রেখেছে শিউলী ফুলের পরে,
খোকা-ভোরের হাসিখানি কে রেকেছে পদ্মপাতায় ধরে।
পুতুল! তুমি মাটির পুতুল! নানাজনের স্নেহের অত্যাচার,
হাসিমুখে সইতে পার আপন পরের তাই ধার না ধার।
তাই ত তুমি পুতুল লয়ে সারাটা দিন খেলাও খেলাঘরে,
তুমি পুতুল, তাই ত পুতুল খেলার সাথী তোমার স্নেহের বরে।
পুতুল! আমার সোনার পুতুল! আমি পুতুল হব তোমার বরে,
তুমি হবে আমার পুতুল সারাটা দিন কাটবে আদর করে।
তোমায় আমি চাঁদ বলিব, জোছনা দিয়ে মুছিয়ে দিও মুখ,
তোমায় আমি বলব মানিক, মালা হয়ে জুড়িয়ে দিও বুক।
তুমি আমার উদয়-তারা, হাতে পায়ে জ্বলবে সোনার ফুল,
তুমি আমার রূপের সাগর রূপকথা যার খুঁজে না পায় কূল।
আমি তোমার কি হব ভাই? পুতুল! আমার রাঙা পুতুল-খুকু,
ঘুমপাড়ানী মাসী-পিসীর ঘুমের দেশের ঘুমানীটুকু।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/205
|
1983
|
বিষ্ণু দে
|
আলেখ্য
|
চিন্তামূলক
|
আঁটসাঁট বেঁধে আচল জড়ালো কোমরে,
মুগ্ধ চোখের এক নিমেষের দেরিতে
লঘু লাবণ্যে লাফ দিয়ে হল পার |
কালো পাহাড়ের গায় চমকাল রেখা,
শাড়ির শাদায় কস্তাপাড়ের সিঁদুরে
কষ্টিতে ঋজু কোমল শরীরে তরল স্রোতের ছন্দ |
এই লাবণ্যে এই নিশ্চিত ছন্দে
আমরা সবাই কেনইবা পার হব না
সামনের এই পাহাড়ের খাড়া খন্দ ?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4117.html
|
2775
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ইয়ারিং ছিল তার দু কানেই
|
হাস্যরসাত্মক
|
ইয়ারিং ছিল তার দু কানেই।
গেল যবে স্যাকরার দোকানেই
মনে প’ল, গয়না তো চাওয়া যায়,
আরেকটা কান কোথা পাওয়া যায়–
সে কথাটা নোটবুকে টোকা নেই!
মাসি বলে, “তোর মত বোকা নেই।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/iyaring-chilo-tar-du-kanei/
|
4930
|
শামসুর রাহমান
|
পুরাণের পাখি
|
মানবতাবাদী
|
না রাজু, তোমাকে আমরা ঘুমোতে দেব না।
এই যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি তোমার শিয়রে
প্রতারিত, লুষ্ঠিত মানুষের মতো,
আমাদের মধ্যে কেউ এমন নেই যে তোমাকে
ঘুমোতে দেবে।
জেগে থাকতেই ভালবাসতে তুমি
এই নিদ্রাচ্ছন্ন দেশে; অন্ধকারে দু’টি চোখ সর্বক্ষণ
জ্বলত পবিত্র দীপশিখার মতো,
সেই চোখে আজ রাজ্যের ঘুম।
না রাজু, তোমার এই ভঙ্গি আমাদের প্রিয় নয়,
এই মুহূর্তে তোমার সত্তা থেকে
ঝেড়ে ফেলো নিদ্রার ঊর্ণাজাল।
তোমার এই পাথুরে ঘুম আমাদের
ভয়ানক পীড়িত করছে;
রাজু, তুমি মেধার রশ্মি-ঝরানো চোখ মেলে তাকাও
তোমার জাগরণ আমাদের প্রাণের স্পন্দনের মতোই
প্রয়োজন।দিনদুপুরে মানুষ শিকারীরা খুব করেছে তোমাকে।
টপকে-পড়া, ছিটকে-পড়া
তোমার রক্তের কণ্ঠস্বরে ছিল
পৈশাচিকতা হরণকারী গান। ঘাতক-নিয়ন্ত্রিত দেশে
হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলে তুমি,
মধ্যযুগের প্রেতনৃত্য স্তব্ধ করার শুভ শ্লোকউচ্চারিত হয়েছিল তোমার কণ্ঠে,
তোমার হাতে ছিল নরপশুদের রুখে দাঁড়াবার
মানবতা-চিহ্নিত প্রগতির পতাকা
তাই ওরা, বর্বরতা আর অন্ধকারের প্রতিনিধিরা,
তোমাকে, আমাদের বিপন্ন বাগানের
সবচেয়ে সুন্দর সুরভিত ফুলগুলির একজনকে,
হনন করেছে, আমাদের ভবিষ্যতের বুকে
সেঁটে দিয়েছে চক্ষুবিহীন কোটরের মতো একটি দগদগে
গর্ত।
শোনো, এখন যাবতীয় গাছপালা, নদীনালা,
ফসলের ক্ষেত, ভাসমান মেঘমালা, পাখি আর মাছ-
সবাই চিৎকারে চিৎকারে চিড় ধরাচ্ছে চরাচরে, ‘চাই
প্রতিশোধ।‘
নক্ষত্রের অক্ষর শব্দ দু’টি লিখে দিয়েছে আকাশে
আকাশে।যে-তোমাকে কবরে নামিয়েছি বিষণ্নতায়, সে নও তুমি।
প্রকৃত তুমি ঐ মাথা উঁচু ক’রে আজও নতুন সভ্যতার
আকর্ষণে
হেঁটে যাচ্ছ পুঁতিগন্ধময় গুহা-কাঁপানো মিছিলে,
তোমার অঙ্গীকার-খচিত হাত নীলিমাকে স্পর্শ করে
নিঃশঙ্ক মুদ্রায়,
ওরা তোমাকে যতই পুড়িয়ে ভস্ম করুক হিংসার আগুনে,
তুমি বার বার আগুন থেকে বেরিয়ে আসবে পুরাণের
পাখি। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/puraner-pakhi/
|
5212
|
শামসুর রাহমান
|
শহরে নেমেছে সন্ধ্যা
|
সনেট
|
শহরে নেমেছে সন্ধ্যা, যেন নীরব ধর্মযাজিকা
প্রার্থনায় নতজানু। ফুটপাতে বেকার যুবক,
বিশীর্ণ কেরানী ঘোরে, লাস্যময়ী দৃষ্টির কুহক
হেনে হেঁটে যায়, কেউ কেউ দোকানকে মরীচিকা
ভেবে চিত্রবৎ স্থাণু কারো কারো চোখে স্বপ্নশিখা।
ক্লান্ত পাখিঅলা পঙ্গু পথিকের সঙ্গে মারাত্মক
বচসায় মাতে আর স্বপ্ননাদিষ্ট পুলিশও নিছক
অভ্যাসে বাজায় বাঁশি, কম্পমান কৃষ্ণ যবনিকা।আমাকেও সন্ধ্যা তার কেশ-তমসায় ঘন ঢেকে
কেমন বিষণ্ন ঘণ্টা বার বার বাজায় আমার
অস্তিত্বের অণুপরমাণুময় ক্রূদ্ধ বনভূমি
লুকানো সৈনিক নিয়ে ধেয়ে আসে চতুর্দিক থেকে,
ক্লান্তিতে দুচোখ বুজে আসে, জীর্ণ আমার সত্তার
মরুতে জীবনতৃষ্ণা কী প্রবল জাগিয়েছো তুমি। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shohore-nemeche-sondhya/
|
1167
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মৃত্যুর আগে
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষসন্ধ্যায়,
দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল
কুয়াশার ; কবেকার পাড়াগাঁর মেয়েদের মতো যেন হায়
তারা সব; আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল
জোনাকিতে ভ’রে গেছে; যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপ দাঁড়ায়েছে চাঁদ – কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;
আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত- রাত্রিটিরে ভালো ,
খড়ের চালের’পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার ;
পুরানো পেঁচার ঘ্রাণ ;- অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো !
বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ ,- মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার
গভীর আহ্লাদে ভরা; অশত্থের ডালে – ডালে ডাকিয়াছে বক ;
আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এইসব নিভৃত কুহক;
আমরা দেখেছি যারা বুনোহাঁস শিকারীর গুলির আঘাত
এড়ায়ে উড়িয়া যায় দিগন্তের নম্র নীল জ্যোৎস্নার ভিতরে,
আমরা রেখেছি যারা ভালোবেসে ধানের গুচ্ছের’পরে হাত,
সন্ধ্যার কাকের মতো আকাঙ্ক্ষায় আমরা ফিরেছি যারা ঘরে;
শিশুর মুখের গন্ধ, ঘাস, রোদ , মাছরাঙা , নক্ষত্র , আকাশ
আমরা পেয়েছি যারা ঘুরে-ফিরে ইহাদের চিহ্ন বারো-মাস;
দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ,
হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা,
ইঁদুর শীতের রাতে রেশমের মতো রোমে মাখিয়াছে খুদ ,
চালের ধূসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হয়ে ঝরেছে দু’বেলা
নির্জন মাছের চোখে;- পুকুরের পাড়ে হাঁস সন্ধ্যার আঁধারে
পেয়েছে ঘুমের ঘ্রাণ – মেয়েলি হাতের স্পর্শ লয়ে গেছে তারে;
মিনারের মতো মেঘ সোনালি চিলেরে তার জানালায় ডাকে,
বেতের লতার নিচে চড়ুয়ের ডিম যেন শক্ত হয়ে আছে,
নরম জলের গন্ধ দিয়ে বার-বার তরীটিরে মাখে ,
খড়ের চালের ছায়া গাড় রাতে জ্যোৎস্নার উঠানে পড়িয়াছে ;
বাতাসে ঝিঁঝিঁর গন্ধ- বৈশাখের প্রান্তরের সবুজ বাতাসে;
নীলাভ নোনার বুকে ঘন রস গাড় আকাঙ্ক্ষায় নেমে আসে ;
আমরা দেখেছি যারা নিবিড় বটের নিচে লাল লাল ফল
প’ড়ে আছে; নির্জন মাঠের ভিড় মুখ দেখে নদীর ভিতরে ;
যত নীল আকাশেরা রয়ে গেছে খুঁজে ফেরে আরো নীল আকাশের তল;
পথে পথে দেখিয়াছি মৃদু চোখ ছায়া ফেলে পৃথিবীর’পরে ;
আমরা দেখেছি যারা শুপুরির সারি বেয়ে সন্ধ্যা আসে রোজ ,
প্রতিদিন ভোর আসে ধানের গুচ্ছের মতো সবুজ সহজ;
আমরা বুঝেছি যারা বহু দিন মাস ঋতু শেষ হলে পর
পৃথিবীর সেই কন্যা কাছে এসে অন্ধকারে নদীদের কথা
ক’য়ে গেছে ;- আমরা বুঝেছি যারা পথ ঘাট মাঠের ভিতর
আরো এক আলো আছে :দেহে তার বিকেলবেলার ধূসরতা ;
চোখের –দেখার হাত ছেড়ে দিয়ে সেই আলো হয়ে আছে স্থির :
পৃথিবীর কঙ্কাবতী ভেসে গিয়ে সেইখানে পায় ম্লান ধূপের শরীর ;
আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর ? জানি না কি আহা,
সব রঙ কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ ;- একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিল – সোনা ছিল যাহা
নিরুত্তর শান্তি পায়;- যেন কোন মায়াবীর প্রয়োজনে লাগে ।
কি বুঝিতে চাই আর ? ... রৌদ্র নিভে গেলে পাখি – পাখালির ডাক
শুনিনি কি ? প্রান্তরের কুয়াশায় দেখিনি কি উড়ে গেছে কাক !
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/887
|
972
|
জীবনানন্দ দাশ
|
এখানে আকাশ নীল
|
সনেট
|
এখানে আকাশ নীল- নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল
ফুটে থাকে হিম শাদা- রং তার আশ্বিনের আলোর মতন;
আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ
রৌদ্রের দুপুর ভ’রে;- বারবার রোদ তার সুচিক্বণ চুল
কাঁঠাল জামের বুকে নিঙড়ায়ে;- দহে বিলে চঞ্চল আঙুল
বুলায়ে বুলায়ে ফেরে এইখানে জাম লিচু কাঁঠালের বন,
ধনপতি, শ্রীমন্তের, বেহুলার, লহনার ছুঁয়েছে চরণ;
মেঠো পথে মিশে আছে কাক আর কোকিলের শরীরের ধূল,কবেকার কোকিলের জানো কি তা? যখন মুকুন্দরাম, হায়,
লিখিতেছিলেন ব’সে দু’পহরে সাধের সে চন্ডিকামঙ্গল,
কোকিলের ডাক শুনে লেখা তাঁর বাধা পায়- থেমে থেমে যায়;-
অথবা বেহুলা একা যখন চলেছে ভেঙে গাঙুড়ের জল
সন্ধ্যার অন্ধকারে, ধানক্ষেতে, আমবনে, অস্পষ্ট শাখায়
কোকিলের ডাক শুনে চোখে তার ফুটেছিল কুয়াশা কেবল।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ekhaney-akash-nil/
|
2702
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা
গেঁথেছি শেফালিমালা।
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে
সাজিয়ে এনেছি ডালা।
এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার
শুভ্র মেঘের রথে,
এসো নির্মল নীল পথে,
এসো ধৌত শ্যামল
আলো-ঝলমল
বনগিরিপর্বতে।
এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদল
শীতল-শিশির-ঢালা।ঝরা মালতীর ফুলে
আসন বিছানো নিভৃত কুঞ্জে
ভরা গঙ্গার কূলে
ফিরিছে মরাল ডানা পাতিবারে
তোমার চরণমূলে।
গুঞ্জরতান তুলিয়ো তোমার
সোনার বীণার তারে
মৃদু মধু ঝংকারে,
হাসিঢালা সুর গলিয়া পড়িবে
ক্ষণিক অশ্রুধারে।
রহিয়া রহিয়া যে পরশমণি
ঝলকে অলককোণে,
পলকের তরে সকরুণ করে
বুলায়ো বুলায়ো মনে–
সোনা হয়ে যাবে সকল ভাবনা,
আঁধার হইবে আলা।শান্তিনিকেতন, ৩ ভাদ্র, ১৩১৫
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amra-bedhechi-kasher-guccho/
|
4496
|
শামসুর রাহমান
|
একদা তোমার আমি
|
প্রেমমূলক
|
একদা, তোমাকে আমি অহংকারী বলে জানতাম। মনে পড়ে,
কোনো এক পঁচিশে বৈশাখে
তুমি আর আমি পাশাপাশি ছিলাম কী মুগ্ধ বসে।
চিনতে পারনি তুমি পাশে-বসে-থাকা জবুথবু
তরুণকে যার
কবিতা তখন এ শহরে যত্রতত্র
বাচ্চা রাজহাঁসের মতন
পাখা ঝাপটাত, সেই পদাবলি পাঠক গোষ্ঠীকে দিয়েছিল
ভীষণ ভড়কে আর উদাসীন পণ্ডিতবর্গের
টেরিকাটা দামি মাথা চুলকোতে বাধ্য করেছিল।
তুমি একবারও তার দিকে, এমনকি তাচ্ছিল্যভরেও, ফিরে
তাকাওনি; দৃষ্টি ছিল মঞ্চে, কখনোবা কিছু দর্শকের প্রতি।
প্রকৃত রানীর মতো ছিলে তুমি সে আসরে
অমন সুদুর একাকিনী। কী মদির তাপ গোলাপি নেশার মতো
তোমার নিজস্ব পারফিউমের মতো
আমার সত্তায় হল সঞ্চারিত; সকালের আকাশের মতো
কী সহজ আভিজাত্য ছিল তোমার অস্তিত্বে ব্যাপ্ত
এবং আমার ঠোঁট দুটি অদৃশ্য পাখির মতো
গান গাইছিল স্মিত তোমার শরীরে সারাক্ষণ।
সে রাতে তরুণ কবি অর্জিত মোহন কাম তার
অন্য কারো নিবেদিত শরীরে উৎসর্গ করেছিল,
অথচ তুমিই ছিলে, শুধু তুমি তার
অস্তিত্বে অণুপরমাণুময়।
তোমাকে দেখেছি আমি দূর থেকে ঊনসত্তরের
পদধ্বনিময় দিনে, করেছি আবৃত্তি
তোমার উজ্জ্বল মুখ, চকচকে চোখ, কালো চুলের গৌরব,
মধ্যরাতে বৈমাত্রের পরিবেশে কবিতা লেখার ফাঁকে ফাঁকে।
একাত্তরে গুলিবিদ্ধ ঈগলের মতো রক্তাপ্লুত
বিধ্বস্ত শহরে থেকে সবুজ গ্রামের অভ্যন্তরে
পলাতক হয়েছি যখন,
তখনও তোমার কথা হৃদয়কে বলেছি নিভৃতে
দীর্ঘশ্বাসসহ-যে উতল দীর্ঘশ্বাসে মিশ্র স্মৃতি,পঁচিশে বৈশাখ, চৈত্রপাতা, বৃষ্টিপাত, ধু-ধু মাঠ,
প্রেতায়িত ঘোড়াদের লাফ,
ধ্বংসস্তূপ সেতারের ব্যাকুল বেহাগ, দেয়ালের
কী বিমূর্ত দাগ, ছত্রভংগ মিছিলের প্রজ্বলিত আর্তনাদ-
মাছরাঙা পাখি, মাছ, শাপলা শালুক দেখার সময়।
এখন কেমন আছ তুমি? এখন তো
আঁধার চিৎকার করে অগ্নিদগ্ধ ঘোড়ার মতন।
যখন আলিজিরিয়া যুদ্ধক্ষুব্ধ ছিল, জামিলাকে
নেকড়ের পাল ছিঁড়ে-খুঁড়ে মেতেছিল খুব পৈশাচী উল্লাসে,
ফিলিস্তিনি লায়লাকে ঝাঁক ঝাঁক ডালকুত্তা তুমুল তাড়িয়ে
বেড়িয়েছে রাত্রিদিন, তখন কোথায় ছিলে তুমি?
তখন কেমন ছিলে তুমি?
যখন চেগুয়েভারা ছিলেন কাদায় পড়ে বলিভিয়ার জঙ্গলে তাঁর
নিঃসাড় তর্জনী রেখে মুক্তি ও সাম্যের দিকে, দীপ্র
সূর্যোদয়ের উদ্দেশে
তখন কোথায় ছিলে তুমি?
তখন কেমন ছিলে তুমি?ও দৃষ্টির সরিয়ে নাও আমার অস্তিত্ব থেকে, আমি
পুড়ে যাচ্ছি, হে মহিলা, মদির অনলে।
এ দাহ অসহ্য তবু তোমার কাছেই যেতে চাই বারংবার,
তোমার নিঝুম ঘাটে তুলে নিতে চাই
আঁজলা আঁজলা জল অকূল তৃষ্ণায়।
কখনো ভাবিনি আগে এতকাল পরে দেখা হবে পুনরায়,
কখনো ভাবিনি আগে কোনো দিন বসব তোমার
মুখোমুখি, আমাদের সংলাপে মুখর হবে অনেক প্রহর,
কাফকা ডস্টয়ভস্কি এসে বসবেন অপরাহ্নে চায়ের সময়,
চায়ের পেয়ালা তুমি সুন্দর ভঙ্গিতে তুলে দেবে
আমার ব্যাকুল হাতে, অন্ধকার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
আমাকে ফেরত দেবে ভুলে ফেলে-আসা।
পকেট চিরুনি।
তোমার গ্রীবার ডালে প্রত্যহ রজনীগন্ধা ফোটে,
দেখি আমি দেখি।
চারদিকে নিদ্রামগ্ন ফেরেশতার মতো জ্যোৎস্না, তুমি
জ্যোৎস্নার অধিক স্নিগ্ধতায় স্বপ্ন হয়ে আছ, দেখি
আমি দেখি।জ্যোৎস্নার নেকাব ছিঁড়ে মাঝে-মাঝে কাক উড়ে যায়।
কত কথা বলো তুমি, অথচ যে-কথা
শোনার আশায় আমি থাকি প্রতীক্ষায় প্রতিদিন,
কাটাই নির্ঘুম রাত্রি, সে-কথা সর্বদা ভার্জিনিয়া উলফের
দূর বাতিঘরের আড়ালে, স্যামুয়েল
বেকেটের নরকের অন্তরালে চাপা পড়ে যায়।
কয়েদির খুপরির ঘুলঘুলি পেরুনো আলোর মতো
কার্পণ্য তোমার,
এবং আমিও যে গোপন উচ্চারণ চাই আমার আপনকার ঠোঁটে
তা-ও নিমেষেই
প্রস্তর যুগের স্তব্ধতার মতো অনুচ্চার থেকে যায়, জানি
অন্তর্গত বাসনার বসন্ত আমার
পুষ্পিত হবে না কোনো দিন।
জ্যোৎস্নার নেকাব ছিঁড়ে মাঝে মাঝে কাক উড়ে যায়। (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekoda-tomar-ami/
|
3848
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শক্তের ক্ষমা
|
নীতিমূলক
|
নারদ কহিল আসি, হে ধরণী দেবী,
তব নিন্দা করে নর তব অন্ন সেবি।
বলে মাটি, বলে ধূলি, বলে জড় স্থুল,
তোমারে মলিন বলে অকৃতজ্ঞকুল।
বন্ধ করো অন্নজল, মুখ হোক চুন,
ধুলামাটি কী জিনিস বাছারা বুঝুন।
ধরণী কহিলা হাসি, বালাই, বালাই!
ওরা কি আমার তুল্য, শোধ লব তাই?
ওদের নিন্দায় মোর লাগিবে না দাগ,
ওরা যে মরিবে যদি আমি করি রাগ। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shokter-khoma/
|
2369
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মেঘ ও চাতক
|
নীতিমূলক
|
উড়িল আকাশে মেঘ গরজি ভৈরবে;—
ভানু পলাইল ত্রাসে;
তা দেখি তড়িৎ হাসে;
বহিল নিশ্বাস ঝড়ে;
ভাঙ্গে তবু মড়-মড়ে;
গিরি-শিরে চূড়া নড়ে,
যেন ভূ-কম্পনে;
অধীরা সভয়ে ধরা সাধিলা বাসবে।
আইল চাতক-দল,
মাগি কোলাহলে জল—
“তৃষায় আকুল মোরা, ওহে ঘনপতি!
এ জ্বালা জুড়াও, প্রভু, করি এ মিনতি।”
বড় মানুষের ঘরে ব্রতে, কি পরবে,
ভিখারী-মণ্ডল যথা অাসে ঘোর রবে;—
কেহ আসে, কেহ যায়;
কেহ ফিরে পুনরায়
আবার বিদায় চায়;
ত্রস্ত লোভে সবে;—
সেরূপে চাতক-দল,
উড়ি করে কোলাহল;—
“তৃষায় আকুল মোরা, ওহে ঘনপতি!
এ জ্বালা জুড়াও জলে, করি এ মিনতি।”
রোষে উত্তরিলা ঘনবর;—
“অপরে নির্ভর যার, অতি সে পামর!
বায়ু-রূপ দ্রুত রথে চড়ি,
সাগরের নীল পায়ে পড়ি,
আনিয়াছি বারি;—
ধরার এ ধার ধারি।
এই বারি পান করি,
মেদিনী সুন্দরী
বৃক্ষ-লতা-শস্যচয়ে
স্তন-দুগ্ধ বিতরয়ে
শিশু যথা বল পায়,
সে রসে তাহারা খায়,
অপরূপ রূপ-সুধা বাড়ে নিরন্তর;
তাহারা বাঁচায়, দেখ, পশু-পক্ষী-নর।
নিজে তিনি হীন-গতি;
জল গিয়া আনিবারে নাহিক শকতি;
তেঁই তাঁর হেতু বারি-ধারা।—
তোমরা কাহারা?
তোমাদের দিলে জল,
কভু কি ফলিবে ফল?
পাখা দিয়াছেন বিধি;
যাও, যথা জলনিধি;
যাও, যথা জলাশয়;—
নদ-নদী-তড়াগাদি, জল যথা রয়।
কি গ্রীষ্ম, কি শীত কালে,
জল যেখানে পালে,
সেখানে চলিয়া যাও, দিনু এ যুকতি।”
চাতকের কোলাহল অতি।
ক্রোধে তড়িতেরে ঘন কহিলা,—
“অগ্নি-বাণে তাড়াও এ দলে।”—
তড়িৎ প্রভুর আজ্ঞা মানিলা।
পলায় চাতক, পাখা জ্বলে।
যা চাহ, লভ সদা নিজ-পরিশ্রমে;
এই উপদেশ কবি দিলা এই ক্রমে।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/megh-o-catok/
|
4116
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
আমার ভাবনা
|
প্রেমমূলক
|
আমার ভাবনার মাঝে তোমার ছায়া
প্রতি ছায়া হয়ে থাকে।
আমার চোখের মাঝে তোমার ছবি
অবিরাম ভেসে উঠে।
আমার কানের মাঝে তোমার সূর
এখনও বেঝে উঠে।
আমার হাতের সাথে তোমার স্পর্শ
এখনও শিহরন জাগে।
আমার আকাশ তোমার জন্য এখনও
মেঘে ঢাকা থাকে।
আমার চলার পথ তোমার আশায়
এখনও থেমে থাকে।
আমার হৃদয়ে তোমার জন্য এখনও
ঝর্ণা বয়ে আছে।
আমার দেহের রক্ত মাংস তোমার জন্য
এখনও জমে আছে।
আমার মুখখানি তোমার জন্য এখনও
মলিন হয়ে আছে।
আমার সাগরের জল তোমার জন্য
বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
আমার চারিদিক তোমার জন্য এখনও
অন্ধকারে ঘিরে রেখেছে।
আমার প্রতিটা সকাল তোমার আশায়
বুক বেঁধে থাকে।
আমার প্রতিটা দিন তোমার জন্য
অন্ধকার হয়ে থাকে।
আমার প্রতিটা সন্ধ্যা পাখির মত
নীড়ের আশায় থাকে।
আমার প্রতিটা রাত তোমার জন্য
এখনও নির্ঘুম কাটে।
আমার সকল স্বপ্ন তোমাকে নিয়েই
এখনও বুনে আছে।
আমার বুকের শূন্য জমি তোমার জন্য
এখনও পড়ে আছে।
আমার মনের সমস্ত চিন্তা তোমাকে নিয়েই
এখনও ঘিরে আছে।
আমার হৃদয়ের সকল কথা তোমার জন্য
এখনও জমে আছে।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2080.html
|
4781
|
শামসুর রাহমান
|
তিনটি হাঁস এবং পিতামহ
|
রূপক
|
রাস্তার লোকটা সেই তিনটি নিস্তব্ধ হাঁস রেখে
চলে গেলো, প্রায় কিছু না বলেই লম্বাটে পা ফেলে
অন্তর্হিত; যেন বোবা, ক্ষমাপ্রার্থী হয়তোবা। দেখি
স্কুটার-দলিত শাদা-লাল হাঁসগুলো বারান্দার
কংক্রীটে নিঃসাড় চঞ্চু রেখে নির্বিকার পড়ে আছে
মূক বেহালার মতো।তাদের শরীর ছুঁয়ে বুঝি
বহু যুগ বয়ে গেছে প্রবল হাওয়ার। কে বলবে
ওরা তিনজন মৃদু ঘুরতো বাগানে, খেতো খুঁটে
খুদকুঁড়ো, তুলতো গুগলি কিছু পুকুরে ফুলের মতো ভেসে
কোনে দিন? এখন তো তারা শুধু তিনটি স্তব্ধতা
বারান্দায়, আমাদের স্নেহের ওপারে। ছায়াচ্ছন্নবারান্দায় দৃষ্টি মেলে জেদী পিতামহ
তাঁর অন্ধকার ঘরে একা
সমুদ্রের ঢেউয়ের ফেনার মতো চূল নেড়ে নেড়ে
-যেন সেই ঝড়ের রাতের রাজা, উন্মত্ত লীয়ার-
চতুর্দিক আর্তনাদে দীর্ণ করে বললেনঃ “ওরে
ফিরিয়ে আনলি কেন শীতল কংক্রীটে?
এখ্খুনি নিয়ে যা তোরা, আমার স্বপ্নের শবগুলি
ফিরিয়ে আনলি কেন? নিয়ে যা, নিয়ে যা!” (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tinti-hash-o-pitamoho/
|
4132
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
তুমি আসবে বলে
|
প্রেমমূলক
|
তুমি আসবে বলে
প্রজাপতিরা ছিল ডানা মেলে
জোনাকিরা ছিল আলো নিয়ে
গোলাপ ফুল আগে থেকেই ফুটেছিল
তোমাকে বরন করবে বলে।
কিন্ত তুমি আগে থেকেই নাকি জানতে
গোলাপে কাটা আছে
আর সেই ভয়ে তুমি আর
আসলেনা এই হৃদয়ে।
তুমি কি জান না
গোলাপের গন্ধ নিতে পরীরা আসে
আকাশ থেকে, ভোমরা আসে
গুন গুন গানের সূরে
মৌমাছিরাও আসে মধু নিতে?
কিন্তু আজকের গোলাপটি ছিল
শুধু তোমার জন্য।
কাটা না হয় একটু হাতে বিধত
হয়তোবা একটু রক্ত ও ঝরত।
আর যে রক্ত দিয়ে লিখতে পারতে
একটা ভালবাসার মহাকাব্য!
যার জন্য তুমি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে
আমার এই তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে।
বুকভরা ভালবাসা নিয়ে
বসেছিলাম তোমার শনে
শুধু তুমি আসবে বলে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2194.html
|
2951
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ক্ষণমিলন
|
সনেট
|
পরম আত্মীয় বলে যারে মনে মানি
তারে আমি কতদিন কতটুকু জানি!
অসীম কালের মাঝে তিলেক মিলনে
পরশে জীবন তার আমার জীবনে।
যতটুকু লেশমাত্র চিনি দুজনায়,
তাহার অনন্তগুণ চিনি নাকো হায়।
দুজনের এক জন এক দিন যবে
বারেক ফিরাবে মুখ, এ নিখিল ভবে
আর কভু ফিরিবে না মুখোমুখি পথে,
কে কার পাইবে সাড়া অনন্ত জগতে!
এ ক্ষণমিলনে তবে, ওগো মনোহর,
তোমারে হেরিনু কেন এমন সুন্দর!
মুহূর্ত-আলোক কেন, হে অন্তরতম,
তোমারে চিনিনু চিরপরিচিত মম? (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khonmilon/
|
5626
|
সুকুমার রায়
|
দাদা গো দাদা
|
ছড়া
|
দাদা গো দাদা, সত্যি তোমার সুরগুলো খুব খেলে!
এম্নি মিঠে- ঠিক যেন কেউ গুড় দিয়েছে ঢেলে!
দাদা গো দাদা, এমন খাসা কণ্ঠ কোথায় পেলে?-
এই খেলে যা! গান শোনাতে আমার কাছেই এলে?
দাদা গো দাদা, পায়ে পড়ি তোর, ভয় পেয়ে যায় ছেলে-
গাইবে যদি ঐখেনে গাও, ঐ দিকে মুখ মেলে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/dada-go-dada/
|
525
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সান্তনা
|
স্বদেশমূলক
|
চিত্ত- কুঁড়ি- হাস্না- হানা মৃত্যু- সাঁঝে ফুটলো গো!
জীবন- বেড়ায় আড়াল ছাপি' বুকের সুবাস টুটলো গো!
এই ত কারার প্রাকার টুটে'
বন্দী এল বাইরে ছুটে,
তাই ত নিখিল আকুল- হৃদয় শ্মশান- মাঝে জুটল গো!
ভবন- ভাঙ্গা আলোর শিখায় ভূবন রেঙ্গে উঠলো গো।স্ব-রাজ দলের চিত্ত- কমল লুটল বিশ্বরাজের পায়,
দলের চিত্ত উঠলো সুটে শতদলের শ্বেত আভায়।
রূপে কুমার আজকে দোলে
অপরূপের শীশ- মহলে,
মৃত্যু- বাসুদেবের কোলে কারার কেশব ঐ গো যায়,
অনাগত বৃন্দাবনে মা যশদা শাঁখ বাজায়।আজকে রাতে যে ঘুমুলো, কালকে প্রাতে জাগবে সে।
এই বিদায়ের অস্ত আঁধার উদয়-ঊষার রাংবে রে!
শোকের নিশির শিশির ঝরে
ফলবে ফসল ঘরে ঘরে,
আবার শীতের রিক্ত শাখায় লাগবে ফুলেল রাগ এসে।
যে মা সাঁঝে ঘুম পাড়াল, চুম দিয়ে ঘুম ভাংবে সে।না ঝ'রলে তাঁর প্রান- সাগরে মৃত্যু- রাতের হিম- কণা
জীবন- শুক্তি ব্যররথ হ'ত, মুক্তি- মুক্তা ফ'লত না।
নিখিল আঁখির ঝিনুক মাঝে
অশ্রু- মাণিক ঝলত না যে!
রোদের উনুন না নিবিলে চাঁদের সুধা গ'লত না।
গগন- লোকে আকাশ বধুর সন্ধ্যা- প্রদীপ জ্ব'লত না।মরা বাঁশে বাজবে বাঁশি কাটুক না আজ কুঠার তায়,
এই বেনুতেই ব্রজের বাঁশি হয়ত বাজবে এই হেথায়।
হয়ত এবার মিলন- রাসে
বংশীধারী আসবে পাশে,
চিত্ত- চিতার ছাই মেখে শিব সৃষ্টি- বিষান ঐ বাজায়!
জন্ম নেবে মেহেদী ঈসা ধরার বিপুল এই ব্যথায়।কর্মে যদি বিরাম না রয়,শান্তি তবে আসত না!
ফ'লবে ফসল- নইলে নিখিল নয়ন- নীরে ভাসত না!
নেই ক' দেহের খোসার মায়া,
বীজ আনে তাই তরুর ছায়া,
আবার যদি না জন্মাত, মৃত্যুতে সে হাসত না।
আসবে আবার- নৈলে ধরায় এমন ভালো বাসত না!
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/santona/
|
2456
|
মোহাম্মদ কামাল
|
বাঙালি রক্তের মত লাল-2 -
|
স্বদেশমূলক
|
রক্তের আলকাতরা অন্ধকারে বধ্যরাত্রিদালি’র চোয়ানো ঘড়ির মত মহাকালে জমাটধ্বংস চমকে উজ্জ্বলন্ত পলকের লোমহর্ষ লাল! গলনাঙ্কে হিমালয় এত ফিনকি ধারা কখনো দ্যাখেনিকখনো দ্যাখেনি এত জল বঙ্গোপসাগরকখনো মাখেনি কোন মুক্তিযুদ্ধ এত সংশপ্তকের হৃৎপিণ্ডের লাভালক্ষপ্রাণের ঘনীভূত একছোপ চোয়ানো রক্তের মতমহাকালের প্রকাশ্য দিবালোকে জমাটবাংলাদেশের মানচিত্রঅনন্তে একছোপ চোয়ানো রক্তের মত মহাকালে জমাট অগ্নিচেতনার লালনিজস্ব তাজা ক্ষতের মত লালস্বাধীনতা বাঙালি রক্তের মত লাল
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/11/02/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf-%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a4-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b2-2-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%be/
|
5017
|
শামসুর রাহমান
|
বারবার ফিরে আসে
|
স্বদেশমূলক
|
বার বার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট
ময়দানে ফিরে আসে, ব্যাপক নিসর্গে ফিরে আসে,
ফিরে আসে থমথমে শহরের প্রকাণ্ড চোয়ালে।
হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে, ঘোরে হাতে হাতে,
মিছিলে পতাকা হয় বারবার রক্তাপ্লুত শার্ট।
বিষম দামাল দিনগুলি ফিরে আসে বারবার,
বারবার কল্লোলিত আমাদের শহর ও গ্রাম।
‘আবার আসবো ফিরে’ ব’লে সজীব কিশোর
শার্টের আস্তিন দ্রুত গোটাতে গোটাতে
শ্লোগানের নিভাঁজ উল্লাসে
বারবার মিশে যায় নতুন মিছিলে, ফেরে না যে আর।
একটি মায়ের চোখ থেকে
করুণ প্লাবন মুছে যেতে না যেতেই
আরেক মায়ের চোখ শ্রাবণের অঝোরে আকাশ হ’য়ে যায়।
একটি বধূর
সংসার উজাড়-করা হাহাকার থামতে না থামতেই, হায়,
আরেক বধূর বুক খাঁ-খাঁ গোরস্থান হ’য়ে যায়,
একটি পিতার হাত থেকে কবরের কাঁচা মাটি
ঝ’রে পড়তে না পড়তেই
আরেক পিতার বুক-শূন্য-করা গুলিবিদ্ধ সন্তানের লাশ
নেমে যায় নীরন্ধ্র কবরে।বারবার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট,
ময়দানে ফিরে আসে, ব্যাপক নিসর্গে ফিরে আসে,
ফিরে আসে থমথমে শহরের প্রকাণ্ড চোয়ালে।
উনিশ শো উনসত্তরের
তরুণ চীৎকৃত রৌদ্রে যে-ছেলেটা খেলতো রাস্তায়,
বানাতো ধুলোর দুর্গ, খেতো লুটোপুটি নর্দমার ধারে
বিস্ময়ে দেখতো চেয়ে ট্রাক, জীপ,
রাইফেল, টিউনিক, বেয়োনেট, বুট, হেলমেট,
এখন সে টলমল পদভরে শরীক মিছিলে।
লাজনম্র যে মেয়েটি থাকতো আড়ালে সর্বক্ষণ,
যে ছিল অসূর্যস্পশ্যা, এখন সে ঝলসায় মিছিলে মিছিলে।
তাদের পায়ের নিচে করে জ্বলজ্বল নীল নকশা নব্য সভ্যতার।বারবার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট,
ময়দানে ফিরে আসে, ব্যাপক নিসর্গে ফিরে আসে,
ফিরে আসে থমথমে শহরের প্রকাণ্ড চোয়ালে।
হতাশাকে লাথি মেরে, ভয়কে বেদম লাঠি পেটা ক’রে
সবখানের শ্লোগানের ফুলকি ছড়াই।
বারবার আমাদের হাত হয় উদ্দাম নিশান,
বারবার ঝড়ক্ষুব্ধ পদ্মা হই আমরা সবাই।আমাকেই হত্যা করে ওরা, বায়ান্নোর রৌদ্রময় পথে,
আমাকেই হত্যা করে ওরা
উনসত্তরের বিদ্রোহী প্রহরে,
একাত্তরে পুনরায় হত্যা করে ওরা আমাকেই
আমাকেই হত্যা করে ওরা
পথের কিনারে
এভন্যুর মোড়ে
মিছিলে, সভায়-
আমাকেই হত্যা করে, ওরা হত্যা করে বারবার।
তবে কি আমার
বাংলাদেশ শুধু এক সুবিশাল শহীদ মিনার হ’য়ে যাবে ?
|
https://banglapoems.wordpress.com/2016/02/15/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%b0/
|
1842
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
নিসর্গ
|
চিন্তামূলক
|
ছিঃ ছিঃ।
ছেঁড়া-খোঁড়া এক ফালি সবুজ রুমালের জন্যে আমাদের হা-পিত্যেশ,
আর তুই মাছরাঙা রঙের সাত-সাতটা পাহাড়
আর মিছিলের মতো লম্বা আঠারো মাইল শাল-মহুয়ার বন
আর গায়ে হলুদের কনের মতো একটা গোটা নদী আঁকড়িয়ে?
আবার নীল মেঘের খোঁপায় কি গুজেছিস ওটা?
সূর্যাসে-র লাল পালক?
চলতে-ফিরতে পায়ে বাজছে রুপোর মল
ভিতরে একশো গন্ডা পাখির স্বর।
আদরখাকী, বেশ আছিস তুই রাজবাড়ি বিছিয়ে।
তোর কাছে এলে সোনালী কুকুরের মতো লাফিয়ে ওঠে জন্মজন্মান্তর
মনে পড়ে যায় পুরনো শতাব্দীর সেই সব খেলাধুলো
যখন আমরাই ছিলাম দিগদিগন্তের রাজাধিরাজ
হাজার হাজার বর্গমাইল জুড়ে আমাদের মুক্তাঞ্চল
আমরাই পদ্মপাতায় ওলোট-পালট হাওয়া
মেঘের ভিতরে আমাদের কাশবন, বাঁশবন, নাগরদোলা
জলের ভিতরে অফুরন্ত মৃগয়া
সন্ধের চাঁদকে আমরাই জাগিয়ে দিয়ে বলতাম, যা, বেড়িয়ে আয়।
এখন আমরা কলের গানের মতো এটেঁ গেছি কাঠের চৌকো বাক্সে
আমাদের ঘর আছে কিন্তু জানলা নেই
জানলা আছে কিন্তু নিসর্গ নেই।
শক্তিশালী করাতে প্রত্যহ আমাদের কাট-ছাঁট
কত্তার মার্জিমাফিক কখনো দৈত্য দানবের মতো লম্বা
কখনো ভিখিরির দুপয়সার মতো চ্যাপ্টা।
গরবিনী, হঠাৎ ছুটি-ছাটায় চলে এলে
তোর মায়াকাননের অন্তর্বাস খুলে দিবি তো ঘুমের আগে?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1215
|
538
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সুরা আদ-দুহা
|
ভক্তিমূলক
|
শপথ প্রথম দিবস- বেলার শপথ রাতের তিমির- ঘন,
করেন নি প্রভু বর্জন তোমা', করেন নি দুশমনী কখনো।
পরকাল সে যে উত্তমতর, হইকাল আর দুনিয়া হ'তে,
অচিরাত তব প্রভু দানিবেন (সম্পদ) খুশী হইবে যাতে।
পিতৃহীন সে তোমারে তিনি কি করেন নি পরে শরন দান?
ভ্রান্ত পথে তোমারে পাইয়া তিনিই না তোমা পথ দেখান?
তিনি কি পাননি অভাবী তোমারে আভাব সব করেন মোচন?
করিয়ো না তাই পিতৃহীনের উপরে কখনো উতপীড়ন।
যে জন প্রার্থী--- তাহারে দেখিও করো না তিরস্কার কভু,
বক্ত করহ নিয়ামত যাহা দিলেন তোমারে তব প্রভু।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sura-ad-duha/
|
2807
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
এই দেহটির ভেলা নিয়ে দিয়েছি সাঁতার গো
|
চিন্তামূলক
|
এই দেহটির ভেলা নিয়ে দিয়েছি সাঁতার গো,
এই দু-দিনের নদী হব পার গো।
তার পরে যেই ফুরিয়ে যাবে বেলা,
ভাসিয়ে দেব ভেলা,
তার পরে তার খবর কী যে ধারি নে তার ধার গো,
তার পরে সে কেমন আলো, কেমন অন্ধকার গো।
আমি যে অজানার যাত্রী সেই আমার আনন্দ।
সেই তো বাধায় সেই তো মেটায় দ্বন্দ্ব।
জানা আমায় যেমনি আপন ফাঁদে শক্ত করে বাঁধে
অজানা সে সামনে এসে হঠাৎ লাগায় ধন্দ,
এক-নিমেষে যায় গো ফেঁসে অমনি সকল বন্ধ।
অজানা মোর হালের মাঝি, অজানাই তো মুক্তি
তার সনে মোর চিরকালের চুক্তি।
ভয় দেখিয়ে ভাঙায় আমার ভয়
প্রেমিক সে নির্দয়।
মানে না সে বুদ্ধিসুদ্ধি বৃদ্ধজনার যুক্তি,
মুক্তারে সে মুক্ত করে ভেঙে তাহার শুক্তি।
ভাবিস বসে যেদিন গেছে সেদিন কি আর ফিরবে।
সেই কূলে কি এই তরী আর ভিড়বে।
ফিরবে না রে, ফিরবে না আর, ফিরবে না,
সেই কূলে আর ভিড়বে না।
সামনেকে তুই ভয় করেছিস, পিছন তোরে ঘিরবে
এমনি কি তুই ভাগ্যহারা? ছিঁড়বে বাঁধন ছিঁড়বে।
ঘন্টা যে ওই বাজল কবি, হোক রে সভাভঙ্গ,
জোয়ার-জলে উঠেছে তরঙ্গ।
এখনো সে দেখায় নি তার মুখ,
তাই তো দোলে বুক।
কোন্ রূপে যে সেই অজানার কোথায় পাব সঙ্গ,
কোন্ সাগরের কোন্ কূলে গো কোন্ নবীনের রঙ্গ।
পদ্মাতীরে, ২৬ মাঘ, ১৩২১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1942
|
5597
|
সুকুমার রায়
|
খুচরো ছড়া
|
ছড়া
|
শুনেছ কি ব'লে গেলোশুনেছ কি ব'লে গেলো সীতানাথ বন্দ্যো?
আকাশের গায়ে নাকি টকটক গন্ধ?
টকটক থাকে নাকো হ'লে পরে বৃষ্টি--
তখন দেখেছি চেটে একেবারে মিষ্টি।বল্ব কি ভাইবলব কি ভাই হুগলি গেলুম
বলছি তোমায় চুপি-চুপি--
দেখতে পেলাম তিনটে শুয়োর
মাথায় তাদের নেইকো টুপি।।কহ ভাই কহ রেকহ ভাই কহ রে, অ্যাঁকা চোরা শহরে,
বদ্যিরা কেন কেউ আলুভাতে খায় না?
লেখা আছে কাগজে আলু খেলে মগজে,
ঘিলু যায় ভেস্তিয়ে বুদ্ধি গজায় না।ঢপ্ ঢপ্ ঢাক ঢোলঢপ্ ঢপ্ ঢাক ঢোল ভপ্ ভপ্ বাশিঁ
ঝন্ ঝন্ করতাল্ ঠন্ ঠন্ কাসিঁ।
ধুমধাম বাপ্ বাপ্ ভয়ে ভ্যাবাচ্যাকা
বাবুদের ছেলেটার দাঁত গেছে দেখা।
আকাশের গায়েআকাশের গায়ে কিবা রামধনু খেলে,
দেখে চেয়ে কত লোক সব কাজ ফেলে;
তাই দেখে খুঁৎ ধরা বুড়ো কয় চটে,
দেখছ কি, এই রং পাকা নয় মোটে।।শোন শোন গল্প শোনশোন শোন গল্প শোন,'এক যে ছিলো গুরু',
এই আমার গল্প হলো শুরু।
যদু আর বংশীধর যমযজ ভাই তারা,
এই আমার গল্প হলো সারা।মাসি গো মাসিমাসি গো মাসি, পাচ্ছে হাসি
নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্--
হাতীর মাথায় ব্যাঙের ছাতা
কাগের বাসায় বগের ডিম।।ডাক্তার ফস্টারডাক্তার ফস্টার
ইস্কুল মাস্টার
বেত তার চটপট
ছাত্রেরা ছটফট--
ভয়ে সব পস্তায়,
বাড়ি ছেড়ে রাস্তায়,
গ্রাম ছেড়ে শহরে,
গয়া কাশী লাহোরে।
ফিরে আসে সন্ধ্যায়
পড়ে শোনে মন দেয়।।বাসরে বাস! সাবাস বীরবাসরে বাস! সাবাস বীর!
ধনুকখানি ধরে,
পায়রা দেখে মারলে তীর--
কাগটা গেল মরে!বলছি ওরে, ছাগল ছানাবলছি ওরে, ছাগল ছানা, উড়িস নে রে উড়িস নে।
জানিস তোদের উড়তে মানা-- হাতপাগুলো ছুড়িস নে।।
তিন বুড়ো পণ্ডিততিন বুড়ো পণ্ডিত টাকচুড়ো নগরে
চড়ে এক গামলায় পাড়িড় দেয় সাগরে।
গামলাতে ছেদা ছিলো, আগে কেউ দেখেনি,
গানখানি তাই মোর থেমে গেল এখনি।।
রঙ হলো চিড়েতনরঙ হল চিড়েতন, সব গেল গুলিয়ে,
গাধা যায় মামাবাড়ি, টাকে হাত বুলিয়ে
বেড়াল মরে বিষম খেয়ে চাঁদের ধরল মাথা,
হঠাৎ দেখি ঘরবাড়ি সব ময়দা দিয়ে গাথা ।।নাচননাচ্ছি মোরা মনের সাধে গাচ্ছি তেড়ে গান
হুলো মেনি যে যার গলায় কালোয়াতীর তান।
নাচ্ছি দেখে চাঁদা মামা হাসছে ভরে গাল
চোখটি ঠেরে ঠাট্টা করে, দেখনা বুড়ার চাল।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/khuchro-chhora/
|
4342
|
শামসুর রাহমান
|
আজকাল বহু রাত
|
প্রেমমূলক
|
একজন ধার্মিক যেমন পবিত্র ধর্মগ্রন্থে অকুণ্ঠ বিশ্বাসী,
তেমনি আমিও বিশ্বাস অর্পণ করেছি
আমার প্রতি তোমার গভীর ভালোবাসায়।
এক মোহন, মজবুত সুতোয় গ্রথিত আমরা দু’জন;
আমরা যে-ঘর বানিয়েছি শূন্যের মাঝার
তার একটি ইটকেও খসাবার সাধ্যি নেই কোনো
জলোঠোসের কিংবা ভূমিকম্পের। আমরা পরস্পর
লগ্ন থাকব, যতদিন বেঁচে আছি।
এটাতো খুবই সত্যি আমাদের দু’জনের দেহ আলাদা,
কিন্তু অভিন্ন আমাদের হৃদয়, আমাদের কল্ব।আজকাল বহু রাত আমি জেগে কাটাই
সুফীর তরিকায়
আর এই নিশি-জাগরণই আমাকে জপিয়েছে,
গভীর নিশীথের নির্ঘুম প্রহরই আমাকে
তোমার নিবিড়তম সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে পারে।
নিদ্রার বালুচরে তোমার পদছাপ হারায় সহজে।
তাই আমি জেগে থাকব
প্রায়শ সারা রাত আর অবিরত
তোমার অস্তিত্ব আমার শিরায় শিরায় ফুটবে
অলৌকিক বুদ্বুদের মতো। (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ajkal-bohu-rat/
|
3176
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমার বীণায় কত তার আছে
|
প্রেমমূলক
|
তোমার বীণায় কত তার আছে
কত-না সুরে,
আমি তার সাথে আমার তারটি
দিব গো জুড়ে।
তার পর হতে প্রভাতে সাঁঝে
তব বিচিত্র রাগিণীমাঝে
আমারো হৃদয় রণিয়া রণিয়া
বাজিবে তবে।
তোমার সুরেতে আমার পরান
জড়ায়ে রবে।তোমার তারায় মোর আশাদীপ
রাখিব জ্বালি।
তোমার কুসুমে আমার বাসনা
দিব গো ঢালি।
তার পর হতে নিশীথে প্রাতে
তব বিচিত্র শোভার সাথে
আমারো হৃদয় জ্বলিবে ফুটিবে,
দুলিবে সুখে–
মোর পরানের ছায়াটি পড়িবে
তোমার মুখে। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomar-binai-koto-tar-ache/
|
785
|
জসীম উদ্দীন
|
ও মোহন বাঁশী
|
ভক্তিমূলক
|
ও মোহন বাঁশী!
বাজাও বাজাওরে কানাই!
ধীরে অতি ধীরে;
আমি জল আনিতে যমুনাতে,
ও বাঁশী শুনব ফিরে ফিরেরে কানাই!
ধীরে অতি ধীরে।
কলসী ভরার ছলে,
তোমার ছায়া দেখব জলেরে কানাই!
আমি হারায়ে পায়ের নূপুর,
ও ঘরে নাহি যাব ফিরেরে কানাই।
ধীরে অতি ধীরে।
তোমার বাঁশীর স্বরে
যদি কলসীর জল নড়েরে,
তারে ঘুম পাড়াবরে,
কাঁকণ বাজাইয়া করেরে কানাই!
আমি কেমনে মানাব আমার
নয়নের নীরের কানাই!
ধীরে অতি ধীরে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/799
|
4058
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হে ভুবন
|
ভক্তিমূলক
|
হে ভুবন
আমি যতক্ষণ
তোমারে না বেসেছিনু ভালো
ততক্ষণ তব আলো
খুঁজে খুঁজে পায় নাই তার সব ধন।
ততক্ষণ
নিখিল গগন
হাতে নিয়ে দীপ তার শূন্যে শূন্যে ছিল পথ চেয়ে।
মোর প্রেম এল গান গেয়ে;
কী যে হল কানাকানি
দিল সে তোমার গলে আপন গলার মালাখানি।
মুগ্ধচক্ষে হেসে
তোমারে সে
গোপনে দিয়েছে কিছু যা তোমার গোপন হৃদয়ে
তারার মালার মাঝে চিরদিন রবে গাঁথা হয়ে।
সুরুল, ২৮ পৌষ, ১৩২১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1929
|
1410
|
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
|
চৈত্রের সংলাপ
|
প্রেমমূলক
|
ক.
তুমি আমার চৈত নিদানের
বড় কষ্টের চাল
ফুটছো ম্রিয়মাণ আলোতে
বুকে অনন্ত কাল ।
খ.
তোমার কথা ভেবে ভেবে
আমার কাটে দিন
তুমি তখন অন্য কারোর
শুধতে আছো ঋণ ।
গ.
ট্রেন ছুটছে হু- হু হাওয়ায়
আমার চোখে জল
তোমার কাছে রেখে এলাম
সুখের করতল ।
ঘ.
পোষ্টাপিসের পিয়ন বললো
নেই চিঠি নেই নেই
হঠাৎ মেঘে ঢাকলো আকাশ
রোদের অজান্তেই ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1038
|
2538
|
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
|
দ্বিপ্রহরে
|
প্রকৃতিমূলক
|
বইয়ের পাতায় মন বসেনা, খোলা পাতা খোলাই পড়ে’ থাকে,
চোখের পাতায় ঘুম আসেনা—- দেহের ক্লান্তি বুঝাই বলো কা’কে ?
কাজের মাঝে হাত লাগাব, কোথাও কোন’ উত্সাহ নাই তার,
চেয়ে আছি চেয়েই আছি, চাওয়ার তবু নাইক কিছু আর !বেলা বাড়ে, রোদ চড়ে’ যায়, প্রখর রবি দহে আকাশ তল,
ঝাঁঝাঁ করে ভিতর-বাহির, চোখের পথে শুকায় চোখের জল ;
মোহাচ্ছন্ন মৌন জগৎ, কোথাও যেন জীবনচেষ্টা নাহি,
ক্লিষ্ট আকাশ নির্ণিমেষে দিনের দাহ দেখছে শুধু চাহি’ !ঘরে ঘরে আগল আঁটা, আমার ঘরেই মুক্ত শুধু দ্বার,
সেই যে খুলে’ চলে’ গেছে তেম্ নি আছে, কে দেয় উঠে’ আর !
পথের ধারে নিমের গাছে একটি কেবল তিক্ত মধুর শ্বাস
ক্ষণে ক্ষণে জানায় শুধু গোপন বুকের উদাসী উচ্ছ্বাস !হাহা করে তপ্ত হাওয়া শষ্যহারা বসন্ত-শেষ মাঠে,
চোতের ফসল বিকিয়ে গেছে কবে কোথায় অজানা কোন্ হাটে !
উদার মলয় নিঃস্ব আজি, সাম্ নে শুধু ধূসর বালুচর
পঞ্চতপা দিক্-বিধবার বসন খানি লুট্ ছে নিরন্তর !কোন্ পথে সে গেছে চলি’ মরু-বেলায় চিহ্নটি নাই তার,
লুপ্ত সকল শ্যামলিমা লয়ে তাহার মুগ্ধ উপাচার ;
জাগ্ ছে শুধু প্রখর দাহ তৃষ্ণাভরা বিশুষ্ক জিহ্বায়
দিনান্ত সে আস্ বে কখন ? দম্ কা বাতাস ধমক্ দিয়ে যায় !
|
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/post20160512101251/
|
155
|
আহসান হাবীব
|
ইচ্ছা
|
ছড়া
|
মনারে মনা কোথায় যাস?
বিলের ধারে কাটব ঘাস।
ঘাস কি হবে?
বেচব কাল,
চিকন সুতোর কিনব জাল।
জাল কি হবে?
নদীর বাঁকে
মাছ ধরব ঝাঁকে ঝাঁকে।
মাছ কি হবে?
বেচব হাটে,
কিনব শাড়ি পাটে পাটে।
বোনকে দেব পাটের শাড়ি,
মাকে দেব রঙ্গিন হাঁড়ি।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3804.html
|
3010
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গীতোচ্ছ্বাস
|
সনেট
|
নীরব বাঁশরিখানি বেজেছে আবার ।
প্রিয়ার বারতা বুঝি এসেছে আমার
বসন্তকানন-মাঝে বসন্তসমীরে ।
তাই বুঝি মনে পড়ে ভোলা গান যত ।
তাই বুঝি ফুলবনে জাহ্নবীর তীরে
পুরাতন হাসিগুলি ফুটে শত শত ।
তাই বুঝি হৃদয়ের বিস্মৃত বাসনা
জাগিছে নবীন হয়ে পল্লবের মতো ।
জগৎ-কমলবনে কমল-আসনা
কত দিন পরে বুঝি তাই এল ফিরে ।
সে এল না -- এল তার মধুর মিলন,
বসন্তের গান হয়ে এল তার স্বর!
দৃষ্টি তার ফিরে এল, কোথা সে নয়ন!
চুম্বন এসেছে তার, কোথা সে অধর!
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/geetochchhash/
|
1687
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
শিয়রে মৃত্যুর হাত
|
চিন্তামূলক
|
শিয়রে মৃত্যুর হাত। সারা ঘরে বিবর্ণ আলোর
স্তব্ধ ভয়। অবসাদ। চেতনার নির্বোধ দেয়ালে
স্তিমিত চিন্তার ছায়া নিভে আসে। রুগ্ণ হাওয়া ঢালে
ন্যাসপাতির বাসী গন্ধ। দরজার আড়ালে কালো-টুপি
যে আছে দাঁড়িয়ে, তার নিষ্পলক চোখ, রাত্রি ভর
হলে সে হারাবে।
সিঁড়ি-অন্ধকারে মাথা ঠুকে ঠুকে
কে যেন উপরে এল অনভিজ্ঞ হাতে চুপিচুপি
ভিজিট চুকিয়ে দিয়ে ম্রিয়মাণ ডাক্তারবাবুকে।
শিয়রে মৃত্যুর হাত। স্তব্ধীভূত সমস্ত কথার
মন্থর আবেগে জমে অস্বস্তির হাওয়া। সারা ঘরে
অপেক্ষা নিঃশ্বব্দ জটলা। যেন রাত্রির জঠরে
মানুষের সব ইচ্ছা-অনিচ্ছা ভাসিয়ে শূন্য সাদা
থমথমে ভয়ের বন্যা ফুলে ওঠে। ওদিকে দরজার
আড়ালে আবছায়া-মূর্তি সারাক্ষণ যে আছে দাঁড়িয়ে,
নিষ্পলক চোখ তার। নিরুচ্চার মায়ামন্ত্রে বাঁধা
ক্লান্তির করুণ জ্যোৎস্না নেমেছে শয্যার পাশ দিয়ে।
শিয়রে মৃত্যুর হাত। জরাজীর্ণ ফুসফুসে কখন
নিশ্বাস টানার দীর্ঘ যন্ত্রণার ক্লান্তি ধীরে-ধীরে
স্তব্ধ হয়ে গেছে কেউ জানে না তা। ভোরের শিরশিরে
হাওয়ায় জানলার পর্দা কেঁপে উঠে তারপর আবার
শান্ত হয়ে এল। ছায়া অন্ধকার। মাঠ-নদী-বন
পেয়েছে নিদ্রার শান্তি। এদিকে রাত্রির অবসানে
সে-ও নেই। শান্তি! শান্তি! সে চলে গিয়েছে। সঙ্গে তার
কে গেছে জানে না কেউ, শুধু এই অন্ধকার জানে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1628
|
2902
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কালের প্রবল আবর্তে প্রতিহত
|
ভক্তিমূলক
|
কালের প্রবল আবর্তে প্রতিহত
ফেনপুঞ্জের মতো,
আলোকে আঁধারে রঞ্জিত এই মায়া,
অদেহ ধরিল কায়া।
সত্তা আমার,জানি না, সে কোথা হতে
হল উত্থিত নিত্যধাবিত স্রোতে।
সহসা অভাবনীয়
অদৃশ্য এক আরম্ভ-মাঝে কেন্দ্র রচিল স্বীয়।
বিশ্বসত্তা মাঝখানে দিল উঁকি,
এ কৌতুকের পশ্চাতে আছে জানি না কে কৌতুকী।
ক্ষণিকারে নিয়ে অসীমের এই খেলা,
নববিকাশের সাথে গেঁথে দেয় শেষ-বিনাশের হেলা,
আলোকে কালের মৃদঙ্গ উঠে বেজে,
গোপনে ক্ষণিকা দেখা দিতে আসে মুখ-ঢাকা বধূ সেজে,
গলায় পরিয়া হার
বুদ্বুদ্ মণিকার।
সৃষ্টির মাঝে আসন করে সে লাভ,
অনন্ত তারে অন্তসীমায় জানায় অবির্ভাব।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kalar-probal-abata/
|
6009
|
হেলাল হাফিজ
|
অচল প্রেমের পদ্য - ১১
|
প্রেমমূলক
|
যুক্তি যখন আবেগের কাছে অকাতরে পর্যুদস্ত হতে থাকে,
কবি কিংবা যে কোনো আধুনিক মানুষের কাছে
সেইটা বোধ করি সবচেয়ে বেশি সংকোচ আর সঙ্কটের সময়।
হয় তো এখন আমি তেমনি এক নিয়ন্ত্রনহীন
নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি,
নইলে এতদিন তোমাকে একটি চিঠিও লিখতে
না পারার কষ্ট কি আমারই কম!
মনে হয় মরণের পাখা গজিয়েছে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/212
|
4722
|
শামসুর রাহমান
|
জমিনের বুক চিরে
|
সনেট
|
জমিনের বুক চিরে লাঙলের পৌরুষে কৃষক
শস্য তোলে কায়ক্লেশে; রকমারি রঙিন আনাজে
ঋদ্ধ করে গৃহকোণ। মাঠ ছেড়ে চ’লে আসে সাঁঝে;
কোনো কোনো জ্যোৎস্নারাতে কী ব্যাকুল করে সে পরখ,
শোঁকে ফসলের ডগা। কিছুতেই ভাবে না নরক
নিজের কুটিরটিকে, বিবির পাশেই শোয়, মাঝে
উদোম বাচ্চার ঘুম, সারাদিন হাড়ভাঙা কাজে
কাটে, রাতে স্বপ্ন দ্যাখে পঙ্গপাল নামে বেধড়ক।কবিও কর্মিষ্ঠ চাষী, রোজ চষে হরফের ক্ষেত
নুয়ে-নুয়ে, কখনো কখনো খুব আতশি খরায়
জলসেচে মগ্ন হয়, বোনে কিছু বীজ অলৌকিক।
মাটি ফুঁড়ে চারা জাগে, তখলিফে আগাছা নিড়ায়
কতদিন, ঘ্রাণ নেয় স্তবকের উপমাসমেত;
কখনো কখনো পোকা শায়েরকে সাজা দেয় ঠিক। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jominer-buk-chire/
|
3864
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শীতের হাওয়া
|
প্রেমমূলক
|
শীতের হাওয়া হঠাৎ ছুটে এল
গানের বেলা শেষ না হতে হতে?
মনের কথা ছড়িয়ে এলোমেলো
ভাসিয়ে দিল শুকনো পাতার স্রোতে।
মনের কথা যত
উজান তরীর মতো;
পালে যখন হাওয়ার বলে
মরণ-পারে নিয়ে চলে,
চোখের জলের স্রোত যে তাদের টানে
পিছু ঘাটের পানে —
যেথায় তুমি, প্রিয়ে,
একলা বসে আপন-মনে
আঁচল মাথায় দিয়ে।
ঘোরে তারা শুকনো পাতার পাকে
কাঁপন-ভরা হিমের বায়ুভরে।
ঝরা ফুলের পাপড়ি তাদের ঢাকে —
লুটায় কেন মরা ঘাসের ‘পরে।
হল কি দিন সারা।
বিদায় নেবে তারা?
এবার বুঝি কুয়াশাতে
লুকিয়ে তারা পোউষ-রাতে
ধুলার ডাকে সাড়া দিতে চলে —
যেথায় ভূমিতলে
একলা তুমি, প্রিয়ে,
বসে আছ আপন-মনে
আঁচল মাথায় দিয়ে?
মন যে বলে, নয় কখনোই নয় —
ফুরায়নি তো, ফুরাবার এই ভান।
মন যে বলে — শুনি আকাশময়
যাবার মুখে ফিরে আসার গান।
শীর্ণ শীতের লতা
আমার মনের কথা
হিমের রাতে লুকিয়ে রাখে
নগ্ন শাখার ফাঁকে ফাঁকে,
ফাল্গুনেতে ফিরিয়ে দেবে ফুলে
তোমার চরণমূলে —
যেথায় তুমি, প্রিয়ে,
একলা বসে আপন মনে
আঁচল মাথায় দিয়ে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5754.html
|
2734
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমি চেয়ে আছি তোমাদের সবাপানে
|
ভক্তিমূলক
|
আমি চেয়ে আছি তোমাদের সবাপানে।
স্থান দাও মোরে সকলের মাঝখানে।
নীচে সব নীচে এ ধূলির ধরণীতে
যেথা আসনের মূল্য না হয় দিতে,
যেথা রেখা দিয়ে ভাগ করা নেই কিছু
যেথা ভেদ নাই মানে আর অপমানে,
স্থান দাও সেথা সকলের মাঝখানে।যেথা বাহিরের আবরণ নাহি রয়,
যেথা আপনার উলঙ্গ পরিচয়।
আমার বলিয়া কিছু নাই একেবারে,
এ সত্য যেথা নাহি ঢাকে আপনারে,
সেথায় দাঁড়ায়ে নিলাজ দৈন্য মম
ভরিয়া লইব তাঁহার পরম দানে।
স্থান দাও মোরে সকলের মাঝখানে।১৫ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ami-cheye-achi-tomader-sobapane/
|
1896
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
সব দিয়েছেন
|
ভক্তিমূলক
|
দেবার সময় সব দিয়েছেন তিনি।
সাগর জলে নোনা এবং
চায়ের জলে চিনি।
রূপ দিয়েছেন
ধূপ দিয়েছেন
মনকে অন্ধকূপ দিয়েছেন
চাঁদের আলোয় বিষ দিয়েছেন রাতে
তাঁরই কাচের বাসন ভাঙে সামান্য সংঘাতে।
দেবার সময় যা দিয়েছেন
নেবার সময় সবই নেবেন তুলে।
থাকবে কিছু রক্তফোঁটা
ঘনান্ধকার রাত্রে ফোটা
ব্যথাকাতর দু-একটি আঙ্গুলে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1262
|
5443
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
এই নবান্নে
|
মানবতাবাদী
|
এই হেমন্তে কাটা হবে ধান,
আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান-
পৌষপার্বণে প্রাণ-কোলাহলে ভরবে গ্রামের নীরব শ্মশান।
তবুও এ হাতে কাস্তে তুলতে কান্না ঘনায়ঃ
হালকা হাওয়ায় বিগত স্মৃতিকে ভুলে থাকা দায়;
গত হেমন্তে মরে গেছে ভাই, ছেড়ে গেছে বোন,
পথে-প্রান্তরে খামারে মরেছে যত পরিজন;
নিজের হাতের জমি ধান-বোনা,
বৃথাই ধুলোতে ছড়িয়েছে সোনা,
কারোরই ঘরেতে ধান তোলবার আসেনি শুভক্ষণ-
তোমার আমার ক্ষেত ফসলের অতি ঘনিষ্ঠ জন।
এবার নতুন জোরালো বাতাসে
জয়যাত্রার ধ্বনি ভেসে আসে,
পিছে মৃত্যুর ক্ষতির নির্বাচন-
এই হেমন্তে ফসলেরা বলেঃ কোথায় আপন জন?
তারা কি কেবল লুকোনো থাকবে,
অক্ষমতার গ্লানিকে ঢাকবে,
প্রাণের বদলে যারা প্রতিবাদ করছে উচ্চারণ
এই নবান্নে প্রতারিতদের হবে না নিমন্ত্রণ?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/280
|
570
|
কায়কোবাদ
|
আযান
|
ভক্তিমূলক
|
কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।
কি মধুর আযানের ধ্বনি!
আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে,
কি যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধমনে
কি নিশীথে, কি দিবসে মসজিদের পানে।
হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে,
কি যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে-
কত সুধা আছে সেই মধুর আযানে।
নদী ও পাখির গানে তারই প্রতিধ্বনি।
ভ্রমরের গুণ-গানে সেই সুর আসে কানে
কি এক আবেশে মুগ্ধ নিখিল ধরণী।
ভূধরে, সাগরে জলে নির্ঝরণী কলকলে,
আমি যেন শুনি সেই আযানের ধ্বনি।
আহা যবে সেই সুর সুমধুর স্বরে,
ভাসে দূরে সায়াহ্নের নিথর অম্বরে,
প্রাণ করে আনচান, কি মধুর সে আযান,
তারি প্রতিধ্বনি শুনি আত্মার ভিতরে।
নীরব নিঝুম ধরা, বিশ্বে যেন সবই মরা,
এতটুকু শব্দ যবে নাহি কোন স্থানে,
মুয়াযযিন উচ্চৈঃস্বরে দাঁড়ায়ে মিনার ‘পরে
কি সুধা ছড়িয়ে দেয় উষার আযানে!
জাগাইতে মোহমুদ্ধ মানব সন্তানে।
আহা কি মধুর ওই আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3832.html
|
1817
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
ছেঁড়া-খোঁড়া
|
প্রকৃতিমূলক
|
লোকালয় ছিঁড়ে-খুঁড়ে, ক্ষয় ক্ষতি দুহাতে ছড়িয়ে।
গেরিলা বাতাস গেছে নৈঋত কোণের দিকে বেঁকে।
এখন কোথাও শব্দ নেই।
এখন কোথাও সুখ নেই।
রেডিও, টিভিতে শুধু
সংবাদের নানাবিধ ধানভানা আছে।
অনেকদিনের পর আকাশে ফুটেছে দুটি তারা।
বহুদিন আগেকার তিনফোটা শিশিরের জল
হাতের তালুতে নিয়ে কচুপাতা জঙ্গলের একধারে সুখী হয়ে আছে।
অনেকদিনের পরে আকাশের ঘাঁটি থেকে মিলিটারি মেঘ
ব্যারাকে ফিরেছে বলে কার্ফু উঠে গেছে,
কার্ফু উঠে গেছে বলে ঘাস-ফড়িংয়ের ঝাঁক বেরিয়ে পড়েছে
বেড়ালের নখে-চেরা ওলোট-পালোট দৃশ্যে জাফরানের খোঁজে।
অনেকদিনের পরে জেগেছে রেলের ভাঙা বাঁধ,
আকাশের তাকিয়ায় চাঁদ
যদিও সর্বাঙ্গে তার নষ্ট-ভ্রস্ট মানুষের মতো অপরাধ।
দুর্যোগ থেমেছে দেখে, এক হাঁটু সর্বনাশ ঠেলে
শহরে-জঙ্গলে আমি এসেছি আমার সব ছেঁড়া-খোঁড়া
পালক কুড়োতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1277
|
2066
|
মহাদেব সাহা
|
আমার সোনার বাংলা
|
স্বদেশমূলক
|
আমি যে দেশকে দেখি সে কি এই স্বপ্নভূমি থেকে জেগে ওঠা
বহুদূরব্যাপী কল্লোলিত, সে কি রূপসনাতন
সে কি আমার সোনার বাংলা, কোনো রূপকথা নয়!
তার চক্ষুদ্বয় তবে এমন কোটরাগত কেন, মুখ জুড়ে সূর্যাস্তের
কালোছায়া,
কেন তার সবুজ গাছের দিকে সহসা তাকালে দেখি
ধূসর পিঙ্গল বর্ণ, নেমেছে তুষার আর মাছে সারি সারি
কুয়াশার তাঁবু
লোকশ্রুত এই কি সোনার বাংলা শোনা যায় শুধু শোকগাথা!
কেউ কেউ দেশের বদলে তাই মানচিত্র দেখায় কেবল
বলে, এখানে গোলাপ চাষ হয়, এখানে অধিক খাদ্য ফলে
গান শোনে টেপরেকর্ডার বাংলার চিরন্তন মুগ্ধ ভাটিয়ালি
আর বারোমাস পাখির কূজন
তারও কিছু সামান্য নমুনা এই পেটে
যেন মেপে মেপে দেশের মডেল একখানি
অপরূপ কাসকেটে তুলে রাখা আছে!
মৃদু টেপে এখানে পাখিরও গান শোনা যায়, ম্যাপের রেখায় মূত্য
স্নিগ্ধ নদী, শেস্যক্ষেত, সবুজলালিত ঘন পার্ক
সুচারু ফোয়ারা থেকে ঝরে জল পান করে পাথরের
পীতাভ হরিণ
চেয়ে আছে স্বপ্নময় বাংলাদেশ ট্যুরিস্টের মনোরম ম্যাপের পাতায়।
আমি যে দেশকে দেখি সে যে এই স্বপ্নভূমি থেকে উঠে আসা
আপাদমস্তক ভিন্নভিন্ন
সে যে আজো জয়নুলের দূর্ভিক্ষের ছিন্নভিন্ন
সে যে আজো জয়নুলের দুর্ভিক্ষের কাক
আজো বায়ান্নর বিক্ষুব্ধ মিছিল
আজো আলুথালু, আজো দুঃখী,
আজো ক্ষুন্ন পদাবলী!
তার কনকচাঁপার সব ঝাড় কেটে আজ সেখানেই বারুদ
শুকানো হয় রোদে
আর চন্দ্রমল্লিকার বনে আততায়ীদের কী জমাট আড্ডা বসে গেছে,
নিষ্পত্র নিথর লেকালয় দুঃখ-অধ্যুষিত
সেই পিকাসোর বেয়াড়া ষাঁড়টি যেন তছনছ করে এই নিকানো
উঠোন ঘরবাড়ি
লোকশ্রুত এই কি সোনার বাংলা, এই কি সোনার বাংলা!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1346
|
128
|
আল মাহমুদ
|
ত্যাগে দুঃখে
|
চিন্তামূলক
|
আজকাল চোখে আর অন্য কোনো স্বপ্নই জাগেনা।
কবিতার কথা বুঝি, কবিতার জন্য বহুদূর একাকী গিয়েছি
পদচারণার স্মৃতি সারাদিন দুঃখবোধ ঐকান্তিক সখ্যতা ভেঙেছে
ত্যাগে দুঃখে ভরে আছে সামান্য পড়ার ঘর
সন্তানসহ দুঃখী সঙ্গিনীর মুখ।
অবোধ বাল্যেও নাকি একটা ছোট কাপও ভাঙিনি–
আমার আম্মা প্রায়ই আমার বোনের কাছে শৈশব শোনান।
সুন্দর ফ্লাওয়ার ভাসে জ্যান্ত পাখির ডানা কবিতার ছন্দ ইত্যাদি
কেন জানি বহু চেষ্টা সত্বেও আমি
কিছুতেই ভাঙতে পারি না।
ক্রিশেনথিমাম নাকি ইতস্তত ছড়িয়ে লাগালে
অবশেষে উদ্যান বড় সুন্দর দেখায়। কই, আমি তো এখনও
আমার উদ্ভিদগুলো সাজিয়ে লাগাই।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3756.html
|
3395
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পিলসুজের উপর পিতলের প্রদীপ
|
গীতিগাথা
|
পিলসুজের উপর পিতলের প্রদীপ,
খড়কে দিয়ে উসকে দিচ্ছে থেকে থেকে।
হাতির দাঁতের মতো কোমল সাদা
পঙ্খের কাজ-করা মেজে;
তার উপরে খান-দুয়েক মাদুর পাতা।
ছোটো ছেলেরা জড়ো হয়েছি ঘরের কোণে
মিটমিটে আলোয়।
বুড়ো মোহন সর্দার
কলপ-লাগানো চুল বাবরি-করা,
মিশকালো রঙ
চোখ দুটো যেন বেরিয়ে আসছে,
শিথিল হয়েছে মাংস,
হাতের পায়ের হাড়গুলো দীর্ঘ,
কণ্ঠস্বর সরু-মোটায় ভাঙা।
রোমাঞ্চ লাগবার মতো তার পূর্ব-ইতিহাস।
বসেছে আমাদের মাঝখানে,
বলছে রোঘো ডাকাতের কথা।
আমরা সবাই গল্প আঁকড়ে বসে আছি।
দক্ষিণের হাওয়া-লাগা ঝাউডালের মতো
দুলছে মনের ভিতরটা।
খোলা জানলার সামনে দেখা যায় গলি,
একটা হলদে গ্যাসের আলোর খুঁটি
দাঁড়িয়ে আছে একচোখো ভূতের মতো।
পথের বাঁ ধারটাতে জমেছে ছায়া।
গলির মোড়ে সদর রাস্তায়
বেলফুলের মালা হেঁকে গেল মালী।
পাশের বাড়ি থেকে
কুকুর ডেকে উঠল অকারণে।
নটার ঘণ্টা বাজল দেউড়িতে।
অবাক হয়ে শুনছি রোঘোর চরিতকথা।
তত্ত্বরত্নের ছেলের পৈতে,
রোঘো বলে পাঠাল চরের মুখে,
"নমো নমো করে সারলে চলবে না ঠাকুর,
ভেবো না খরচের কথা।"
মোড়লের কাছে পত্র দেয়
পাঁচ হাজার টাকা দাবি ক'রে ব্রাহ্মণের জন্যে।
রাজার খাজনা-বাকির দায়ে
বিধবার বাড়ি যায় বিকিয়ে,
হঠাৎ দেওয়ানজির ঘরে হানা দিয়ে
দেনা শোধ ক'রে দেয় রঘু।
বলে--"অনেক গরিবকে দিয়েছ ফাঁকি,
কিছু হালকা হোক তার বোঝা।"
একদিন তখন মাঝরাত্তির,
ফিরছে রোঘো লুঠের মাল নিয়ে,
নদীতে তার ছিপের নৌকো
অন্ধকারে বটের ছায়ায়।
পথের মধ্যে শোনে--
পাড়ায় বিয়েবাড়িতে কান্নার ধ্বনি,
বর ফিরে চলেছে বচসা করে;
কনের বাপ পা আঁকড়ে ধরেছে বরকর্তার।
এমন সময় পথের ধারে
ঘন বাঁশ বনের ভিতর থেকে
হাঁক উঠল, রে রে রে রে রে রে।
আকাশের তারাগুলো
যেন উঠল থরথরিয়ে।
সবাই জানে রোঘো ডাকাতের
পাঁজর-ফাটানো ডাক।
বরসুদ্ধ পালকি পড়ল পথের মধ্যে;
বেহারা পালাবে কোথায় পায় না ভেবে।
ছুটে বেরিয়ে এল মেয়ের মা
অন্ধকারের মধ্যে উঠল তার কান্না--
"দোহাই বাবা, আমার মেয়ের জাত বাঁচাও।"
রোঘো দাঁড়াল যমদূতের মতো--
পালকি থেকে টেনে বের করলে বরকে,
বরকর্তার গালে মারল একটা প্রচণ্ড চড়,
পড়ল সে মাথা ঘুরে।
ঘরের প্রাঙ্গণে আবার শাঁখ উঠল বেজে,
জাগল হুলুধ্বনি;
দলবল নিয়ে রোঘো দাঁড়াল সভায়,
শিবের বিয়ের রাতে ভূতপ্রেতের দল যেন।
উলঙ্গপ্রায় দেহ সবার, তেলমাখা সর্বাঙ্গে,
মুখে ভুসোর কালি।
বিয়ে হল সারা।
তিন প্রহর রাতে
যাবার সময় কনেকে বললে ডাকাত
"তুমি আমার মা,
দুঃখ যদি পাও কখনো
স্মরণ ক'রো রঘুকে।"
তারপরে এসেছে যুগান্তর।
বিদ্যুতের প্রখর আলোতে
ছেলেরা আজ খবরের কাগজে
পড়ে ডাকাতির খবর।
রূপকথা-শোনা নিভৃত সন্ধ্যেবেলাগুলো
সংসার থেকে গেল চলে,
আমাদের স্মৃতি
আর নিবে-যাওয়া তেলের প্রদীপের সঙ্গে সঙ্গে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pelsujar-upar-petalar-prodep/
|
3328
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নিষ্ফল উপহার
|
গীতিগাথা
|
নিম্নে আবর্তিয়া ছুটে যমুনার জল--
দুই তীরে গিরিতট, উচ্চ শিলাতল।
সংকীর্ণ গুহার পথে মূর্ছি জলধার
উন্মত্ত প্রলাপে ওঠে গর্জি অনিবার।এলায়ে জটিল বক্র নির্ঝরের বেণী
নীলাভ দিগন্তে ধায় নীল গিরিশ্রেণী।
স্থির তাহা, নিশিদিন তবু যেন চলে--
চলা যেন বাঁধা আছে অচল শিকলে।মাঝে মাঝে শাল তাল রয়েছে দাঁড়ায়ে,
মেঘেরে ডাকিছে গিরি ইঙ্গিত বাড়ায়ে।
তৃণহীন সুকঠিন শতদীর্ণ ধরা,
রৌদ্রবন বনফুলে কাঁটাগাছ ভরা।দিবসের তাপ ভূমি দিতেছে ফিরায়ে--
দাঁড়ায়ে রয়েছে গিরি আপনার ছায়ে
পথশূন্য, জনশূন্য, সাড়া-শব্দ-হীন।
ডুবে রবি, যেমন সে ডুবে প্রতিদিন।রঘুনাথ হেথা আসি যবে উত্তরিলা
শিখগুরু পড়িছেন ভগবৎ লীলা।
রঘু কহিলেন নমি চরণে তাঁহার,
"দীন আনিয়াছে, প্রভু, হীন উপহার।'বাহু বাড়াইয়া গুরু শুধায়ে কুশল
আশিসিলা মাথায় পরশি করতল।
কনকে মাণিক্যে গাঁথা বলয়-দুখানি
গুরুপদে দিলা রঘু জুড়ি দুই পাণি।ভূমিতল হইতে বালা লইলেন তুলে,
দেখিতে লাগিলা প্রভু ঘুরায়ে অঙ্গুলে।
হীরকের সূচীমুখ শতবার ঘুরি
হানিতে লাগিল শত আলোকের ছুরি।ঈষৎ হাসিয়া গুরু পাশে দিলা রাখি,
আবার সে পুঁথি-'পরে নিবেশিলা আঁখি।
সহসা একটি বালা শিলাতল হতে
গড়ায়ে পড়িয়া গেল যমুনার স্রোতে।"আহা আহা" চীৎকার করি রঘুনাথ
ঝাঁপায়ে পড়িল জলে বাড়ায়ে দু হাত।
আগ্রহে সমস্ত তার প্রাণমনকায়
একখানি বাহু হয়ে ধরিবারে যায়।বারেকের তরে গুরু না তুলিলা মুখ,
নিভৃত অন্তরে তাঁর জাগে পাঠসুখ।
কালো জল কটাক্ষিয়া চলে ঘুরি ঘুরি,
যেন সে ছলনাভরা সুগভীর চুরি।দিবালোক চলে গেল দিবসের পিছু
যমুনা উতলা করি না মিলিল কিছু।
সিক্তবস্ত্রে রিক্তহাতে শ্রান্তনতশিরে
রঘুনাথ গুরু-কাছে আসিলেন ফিরে।"এখনো উঠাতে পারি' করজোড়ে যাচে,
"যদি দেখাইয়া দাও কোন্খানে আছে।'
দ্বিতীয় কঙ্কণখানি ছুঁড়ি দিয়া জলে
গুরু কহিলেন, "আছে ওই নদীতলে।'
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nisful-uphar/
|
6048
|
হেলাল হাফিজ
|
প্রত্যাবর্তন
|
প্রেমমূলক
|
প্রত্যাবর্তনের পথে
কিছু কিছু ‘কস্ট্লি’ অতীত থেকে যায়।
কেউ ফেরে, কেউ কেউ কখনো ফেরে না।
কেউ ফিরে এসে কিছু পায়,
মৌলিক প্রেমিক আর কবি হলে অধিক হারায়।
তবু ফেরে, কেউ তো ফেরেই,
আর জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়,
ভালোবাসা যাকে খায় এইভাবে সবটুকু খায়।
প্রত্যাবর্তনের প্তহে
পিতার প্রস্থান থেকে,
থাকে প্রণয়ের প্রাথমিক স্কুল,
মাতার মলিন স্মৃতি ফোটায় ধ্রুপদী হুল,
যুদ্ধোত্তর মানুষের মূল্যবোধ পালটায় তুমুল,
নেতা ভুল,
বাগানে নষ্ট ফুল,
অকথিত কথার বকুল
বছর পাঁচেক বেশ এ্যানাটমিক ক্লাশ করে বুকে।
প্রত্যাবর্তনের পথে
ভেতরে ক্ষরণ থাকে লাল-নীল প্রতিনিয়তই,
তাহকে প্রেসক্লাব–কার্ডরুম, রঙিন জামার শোক,
থাকে সুখী স্টেডিয়াম,
উদ্গ্রীব হয়ে থাকে অভিজাত বিপনী বিতান,
বাথরুম, নগরীর নিয়ন্ত্রিত আঁধারের বার,
থাকে অসুস্থ সচ্ছলতা, দীর্ঘ রজনী
থাকে কোমল কিশোর,
প্রত্যাবর্তনের পথে দুঃসময়ে এইভাবে
মূলত বিদ্রোহ করে বেহালার সুর।
তারপর ফেরে, তবু ফেরে, কেউ তো ফেরেই,
আর জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়,
ভালোবাসা যাকে খায় এইভাবে সবটুকু খায়।
১২.৫.৮০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/120
|
2976
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গণিতে রেলেটিভিটি প্রমাণের ভাবনায়
|
হাস্যরসাত্মক
|
গণিতে রেলেটিভিটি প্রমাণের ভাবনায়
দিনরাত একা ব’সে কাটালো সে পাবনায়–
নাম তার চুনিলাল, ডাক নাম ঝোড়্কে।
১ গুলো সবই ১ সাদা আর কালো কি,
গণিতের গণনায় এ মতটা ভালো কি।
অবশেষে সাম্যের সামলাবে তোড় কে।একের বহর কভু বেশি কভু কম হবে,
এক রীতি হিসাবের তবুও কি সম্ভবে।
৭ যদি বাঁশ হয়, ৩ হয় খড়কে,
তবু শুধু ১০ দিয়ে জুড়বে সে জোড় কে।যোগ যদি করা যায় হিড়িম্বা কুন্তীতে,
সে কি ২ হতে পারে গণিতের গুন্তিতে।
যতই না কষে নাও মোচা আর থোড়কে
তার গুণফল নিয়ে আঁক যাবে ভড়কে। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gonite-reletivity-promaner-vabnai/
|
981
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কবি
|
চিন্তামূলক
|
ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন
আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপন!
নিরালায় সুর সাধি,- বাঁধি মোর মানসীর বেণী,
মানুষ দেখেনি মোরে কোনোদিন,- আমারে চেনেনি!
কোনো ভিড় কোনোদিন দাঁড়ায়নি মোর চারিপাশে,-
শুধায়নি কেহ কভু-‘আসে কি রে,- সে কি আসে-আসে!’
আসেনি সে ভরাহাটে-খয়াঘাটে-পৃথিবীর পসরায় মাঝে,
পাটনী দেখেনি তারে কোনোদিন,মাঝি তারে ডাকেনিকো সাঁঝে!
পারাপার করেনি সে মণিরত্ন-বেসাতির সিন্ধুর সীমানা,-
চেনা চেনা মুখ সবি,-সে যে সুদূর-অজানা!
করবীকুঁড়ির পানে চোখ তার সারাদিন চেয়ে আছে চুপে,
রূপ-সাগরের মাঝে কোন্ দূর গোধূলির সে যে আছে ডুবে!
সে যেন ঘাসের বুকে, ঝিলমিল শিশিরের জলে;
খুঁজে তারে পাওয়া যাবে এলোমেলো বেদিয়ার দলে,
বাবলার ফুলে ফুলে ওড়ে তার প্রজাপতি-পাখা,
ননীর আঙুলে তার কেঁপে ওঠে কচি নোনাশাখা!
হেমন্তের হিম মাঠে, আকাশের আবছায়া ফুঁড়ে
বকবধূটির মতো কুয়াশায় শাদা ডানা যায় তার উড়ে!
হয়তো শুনেছ তারে,-তার সুর,- দুপুর- আকাশে
ঝরাপাতা-ভরা মরা দরিয়ার পাশে
বেজেছে ঘুঘুর মুখে,- জল-ডাহুকীর বুকে পউষনিশায়
হলুদ পাতার ভিড়ে শিরশিরে পূবালি হাওয়ায়!
হয়তো দেখেছ তারে ভুতুড়ে দীপের চোখে মাঝরাতে দেয়ালের’পরে
নিভে- যাওয়া প্রদীপের ধূসর ধোঁয়ায় তার সুর যেন ঝরে!
শুক্লা একাদশী রাতে বিধবার বিছানায় যেই জ্যোৎস্না ভাসে
তারি বুকে চুপে চুপে কবি আসে,- সুর তার আসে।
উস্খুস্ এলোচুলে ভ’রে আছে কিশোরীর নগ্ন মুখখানি,-
তারি পাশে সুর ভাসে,- অলখিতে উড়ে যায় কবির উড়ানি!
বালুঘড়িটির বুকে ঝিরিঝিরি ঝিরিঝিরি গান যবে বাজে
রাতবিরেতের মাঠে হাঁটে সে যে আলসে,- অকাজে!
ঘুম-কুমারীর মুখে চুমো খায় যখন আকাশ
যখন ঘুমায়ে থাকে টুনটুনি,- মধুমাছি,-ঘাস,
হাওয়ার কাতর শ্বাস থেমে যায় আমলকী ঝাড়ে,
বাঁকা চাঁদ ডুবে যায় বাদলের মেঘের আঁধারে,
তেঁতুলের শাখে-শাখে বাদুড়ের কালো ডানা ভাসে,
মনের হরিণী তার ঘুরে মরে হাহাকারে বনের বাতাসে!
জোনাকির মতো সে যে দূরে দূরে যায় উড়ে উড়ে-
আপনার মুখ দেখে ফেরে সে যে নদীর মুকুরে !
জ্ব’লে ওঠে আলোয়ার মতো তার লাল আঁখিখানি।
আঁধারে ভাসায় খেয়া সে কোন্ পাষাণী!
জানে না তো কী যে চায়,- কবে হায় কী গেছে হারায়ে।
চোখ বুজে খোঁজে একা,-হাতড়ায় আঙুল বাড়ায়ে
কারে আহা।-কাঁদে হা হা পুরের বাতাস,
শ্মশানশবের বুকে জাগে এক পিপাসার শ্বাস!
তারি লাগি মুখ তোলে কোন মৃতা,-হিম চিতা জ্বেলে দেয় শিখা,
তার মাঝে যায় দহি বিরহীর ছায়া-পুত্তলিকা!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/905
|
2301
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
কবি
|
সনেট
|
কে কবি-- কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,
শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,
সেই কি সে যম-দমী? তার শিরোপরি
শোভে কি অক্ষয় শোভা যশের রতন?
সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী
যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন,
অস্তগামি-ভানু-প্রভা-সদৃশ বিতরি
ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ-কিরণ।
আনন্দ, আক্ষেপ ক্রোধ, যার আজ্ঞা মানে
অরণ্যে কুসুম ফোটে যার ইচ্ছা-বলে;
নন্দন-কানন হতে যে সুজন আনে
পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে;
মরুভূমে-- তুষ্ট হয়ে যাহার ধেয়ানে
বহে জলবতী নদী মৃদু কলকলে!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/kobi/
|
191
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
অনাদি কাল হতে অনন্ত লোক
|
ভক্তিমূলক
|
অনাদি কাল হতে অনন্ত লোক
গাহে তোমারই জয়।
আকাশ-বাতাস রবি-গ্রহ তারা চাঁদ,
হে প্রেমময়।।
সমুদ্র-কল্লোল নির্ঝর-কলতান-
হে বিরাট, তোমারই উদার জয়গান;
ধ্যান গম্ভীর কত শত হিমালয়
গাহে তোমারই জয়।।
তব নামের বাজায় বীণা বনের পল্লব
জনহীন প্রান্তর স্তব করে, নীরব।
সকল জাতির কোটি উপাসনালয়
গাহে তোমারই জয়।।
আলোকের উল্লাসে, আঁধারের তন্দ্রায়
তব জয়গান বাজে অপরূপ মহিমায়,
কোটি যুগ-যুগান্ত সৃষ্টি প্রলয়
গাহে তোমারই জয়।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/onadikal/
|
1140
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ভেবে ভেবে ব্যথা পাব
|
সনেট
|
ভেবে ভেবে ব্যথা পাব: মনে হবে, পৃথিবীর পথে যদি থাকিতাম বেঁচে
দেখিতাম সেই লক্ষ্মীপেঁচাটির মুখ যারে কোনোদিন ভালো করে দেখি নাই আমি –
এমনি লাজুক পাখি, — ধূসর ডানা কি তার কুয়াশার ঢেউয়ে ওঠে নেচে;
যখন সাতটি তারা ফুটে ওঠে অন্ধকারে গাবের নিবিড় বুকে আসে সে কি নামি?শিউলির বাবলার আঁধার গলির ফাঁকে জোনাকির কুহকের আলো
করে না কি? ঝিঁঝিঁর সবুজ মাংসে ছোটো — ছোঁটো ছেলেমেয়ে বউদের প্রাণ
ভুলে যায়; অন্ধকার খুঁজে তারে আকন্দবনের ভিড়ে কোথায় হারালো
মাকাল লতার তলে শিশিরের নীল জলে কেউ তার জানে না সন্ধ্যান।আর সেই সোনালি চিলের ডানা — ডানা তার আজো কি মাঠের কুয়াশায়
ভেসে আসে; — সেই ন্যাড়া অশ্বত্থের পানে আজও চ’লে যায় সন্ধ্যা
সোনার মত হলে?
ধানের নরম শিষে মেঠো ইঁদুরের চোখ নক্ষত্রের দিকে আজো চায়?
আশ্চর্য বিষ্ময়ে আমি চেয়ে রবো কিছু কাল অন্ধাকার বিছানার কোলে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/vebe-vebe-betha-pabo/
|
5089
|
শামসুর রাহমান
|
মরুর বালি
|
প্রেমমূলক
|
কেউ কি এসে কবির এমন ক্ষয়া জীবন-গোধূলিতে
গান গেয়ে আজ পুঁতবে খুঁটি কবির প্রাণের খোলা ভিতে।
কৃষ্ণপক্ষে আজকে যাদের জীবন কাটে স্মৃতি নিয়ে,
কে-বা চাইবে সুখী হ’তে স্মৃতির জালটি ছিঁড়ে দিয়ে?ক’দিন ধ’রে মুষড়ে আছি একলা নিজের ছোট ঘরে,
ভুগছি আমি, কাঁপছি এবং পুড়ছি বেজায় কালো জ্বরে!
কেউ কি আমায় বলতে পারো শান্তি কোথায় পাবো কিছু?
কোথায় যেতে হবে না আর ক’রে আমার মাথা নিচু?যেদিন থেকে ভাবি না আর তোমার মুখের হাসি, কথা
মনের গুহায় গুমরে মরে অনেক কথা, রাঙা ব্যথা।
হয় না বলা সেসব কথা কারো কাছেই ডেকে ডুকে,
তোমার কথা স্মৃতির পাতায় নিয়েছিলাম সুখে টুকে।পরে যেদি আমায় হেসে প্রশ্ন করো, ‘গ্যাছো ভুলে?’
নীরব থেকে দৃষ্টি দেবো হরিণ-চোখে, কালো চুলে।
জানি আমি অনেক কথাই বলার জন্যে বলি শুধু,
হৃদয় জুড়ে অনেক সময় মরুর বালি করে ধুধু।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/morur-bali/
|
700
|
জয় গোস্বামী
|
প্রত্যেকটা মাধুর্যের দিন
|
প্রেমমূলক
|
রাত্রে অসম্ভব ভয় করে
মনে পড়ে তোমাকে প্রবলপ্রবল
প্রবলগত আট বছরের প্রত্যেকটা মাধুর্যের দিন
ফিরে এসে মন ছিঁড়ে খায়কী করে সমস্তটুকু মুছে ফেলব বলো?তোমার প্রেমিক,তিনি আমাকে কি সাহায্য করবেন
তোমারই মতন?ওষুধের স্ট্রিপ শেষ,চোখ খুলে বসে থাকি একা বিছানায়----রাত্রি কেটে যায়
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/protyekta-madhurjer-din/
|
5794
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়
|
চিন্তামূলক
|
শব্দ মোহ বন্ধনে কবে প্রথম ধরা পড়েছিলুম আজ মনে নেই
কোনো এক নদীর তীরে দাঁড়িয়ে জলস্রোতের পাশে
অকস্মাৎ দেখা যেন ঠিক আর এক স্রোত
সমস্ত ধ্বনির পাশাপাশি অন্য এক ধ্বনি
জীবন যাপনের পাশাপাশি এক অদেখা জীবন যাপন…
এক একদিন মনে হয়, প্রত্যেক পথেরই বুকের মধ্যে রয়েছে
দিক-হারাবার ব্যাকুলতা
চেনা বাড়ির রাস্তা দুঃখে কাতরায় নিরুদ্দেশের জন্য
প্রত্যেক স্বপ্নের ভিতরে আর একটি স্বপ্ন, তার ভিতরে, তারভিতরে, তার ভিতরে…নৌকোর গলুইতে পা ঝুলিয়ে বসার মতন প্রিয়
বালাকাল ছেড়ে একদিন এসেছি কৈশোরে
বাবার হাত শক্ত করে চেয়ে ধরে নিজের চোখের চেয়েও
অনেক বড় চোখ মেলে
পা দিয়েছিলাম এই শহরের বাঁধানো রাস্তায়
ছোট ছোট স্টিমারের মতো ট্রাম, মুখ-না-চেনা এত মানুষ
আর এত সাইনবোর্ড, এত হরফ, দেয়ালের এত পোশাক, ভোরের
কুয়াশার মধ্যেও যেন সব কিছুর জ্যোতি ঠিকরে আসে
আমার চোখে
ঘোড়াগাড়ির জানলা দিয়ে দেখা মুহুর্মুহু ব্যাকুল উন্মোচন
কেউ জানে না আমি এসেছি, তবু চতুর্দিকে এত সমারোহ
মায়ের গা ঘেঁষে বসা উষ্ণ আসনটি থেকে যেন আমি ছিটকে
পড়ে যাবো বাইরে, বাবা হাত বাড়িয়ে দিলেন
বাঁক ঘোরবার মুখেই হঠাৎ কে চেঁচিয়ে উঠলো, গুলাবি রেউড়ি, গুলাবি রেউড়ি
কেউ বললো, পাথরে নাম লেখাবেন, কেউ বললো, জয় হোক
তার সঙ্গে মিশে গেল হ্রেষা ও লৌহ শব্দ
সদ্য কাটা রক্তাক্ত মাংসের মতন টাটকা স্মৃতির সেই বয়েস…তারপর
একদিন আমি নিজেই ছাড়িয়ে নিয়েছিলাম বাবার হাত
বাবা আমাকে ধরতে এসেছেন,
আমি আড়ালে লুকিয়েছি
বাবা আমাকে রাস্তা চেনাতে গেলে
আমি ইচ্ছে করে গেছি ভুল রাস্তায়
তাঁর উৎকণ্ঠার সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছে আমার ভয় ভাঙা
তাঁর বাৎসল্যকে ঠকিয়েছে আমার সব অজানা অঙ্কুর
তিনি বারবার আমায় কঠিন শাস্তি দিলে আমি তাঁকে
শাস্তি দিয়েছি কঠিনতর
আমি অনেক দূরে সরে গেছি…প্রথম প্রথম এই শহর আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল তার
শিহরন জাগানো গোপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
ছেলেভোলানো দৃশ্যের মতন আমি দেখেছিলাম রঙিন ময়দান
গঙ্গার ধারের বিখ্যাত সূর্যাস্তে দারুণ জমকালো সব
সারবন্দী জাহাজ
ইডেন বাগানে প্যাগোডার চূড়ায় ক্যালেণ্ডারে ছবির মতন রোদ
পরেশনাথ মন্দিরের দিঘিতে নিরামিষ মাছেদের খেলা
বাসের জানলায় কাঠের হাত, দোকানের কাচে সাজানো
কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের বই
প্রভাত ফেরীর সরল গান, দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে বাঁদরদের সঙ্গে পিকনিক
দুমাসে একবার মামাবাড়িতে বেড়াতে যাবার উৎসব…
ক্রমশ আমি নিজেই খুঁজে বার করি গোপন সব
ছোট ছোট নরক
কলাবাগান, গোয়াবাগান, পঞ্চাননতলা, রাজাবাজার
চিৎপুরের সুড়ঙ্গ, চীনে পাড়ার গোলোকধাম, সোনাগাছি, ওয়াটগঞ্জ, মেটেবুরুজ
একটু বেশি রাতে দেখা অজস্র ফুটপাথের সংসার
হাওড়া ব্রীজের ওপর দাঁড়ানো বলিষ্ঠ উলঙ্গ পাগলের
প্রাণখোলা বুককাঁপানো হাসি
চীনাবাদাম-ভাঙা গড়ের মাঠের গল্পের শেষে হঠাৎ কোনো
হিজড়ের অনুনয় করা কর্কশ কণ্ঠস্বর
আমায় তাড়া করে ফেরে বহুদিন
দশকর্ম ভাণ্ডারের পাশেগাড়িবারান্দার নীচে তিনটে কুকুর ছানার সঙ্গে
লাফালাফি করে একটি শিশু
কুকুরগুলোর চেয়ে শিশুটিই আগে দৌড়ে যায় ঝড়ের মতন লরির তলায়
সে তো যাবেই, যাবার জন্যই সে এসেছিল, আশ্চর্য কিছু না
কিন্তু পরের বছর তার মা অবিকল সেই শিশুটিকেই আবার
স্তন্য দেয় সেখানে
এইসব দেখে, শুনে, দৌড়িয়ে, জিরিয়ে।
আমার কণ্ঠস্বর ভাঙে, হাফ প্যান্টের নীচে বেরিয়ে থাকে
এক জোড়া বিসদৃশ ঠ্যাঙ
গান্ধী হত্যার বিকট টেলিগ্রাম যখন কাঁপিয়ে দেয় পাড়া
তখন আমি বাটখারা নিয়ে পাশের বস্তির ছেলেদের সঙ্গে
ছিপি খেলছিলাম…ভেবেছিলাম আসবো, দেখবো, বেড়াবো, ফিরে যাবো, আবার আসবো
ভেবেছিলাম দূরত্বের অপরিচয় ঘুচবে না কখনো
ভেবেছিলাম এই বিশাল মহান, গম্ভীর সুদূর শহর
গা ছমছমে অচেনা হয়েই থাকবে
জেলেরা যেমন সমুদ্রকে, শেরপারা যেমন পাহাড়কে, তেমন ভারে
এই শহরকে আমি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিতে চাইনি
এক সময় দুপুর ছিল দিকহীন চিলের ছায়ার সঙ্গে ছুটে যাওয়া
শৈশব মেশানো আলপথ, পুকুরের ধারে ঝুঁকে থাকা খেজুর গাছ
এক সময় ভোর ছিল শিউলির গন্ধ মাখা, চোখে স্থলপদ্মের স্নেহ
এক সময় বিকেল ছিল গাব গাছে লাল পিপড়ের কামড়
অথবা মন্দিরের দূরাগত টুংটাং
অথবা পাটক্ষেতে কচি অসভ্যতা
এক সময় সকাল ছিল নদীর ধারে স্কুল-নৌকোর প্রতীক্ষায়
বসে থাকা
অথবা জারুল বাগানে হঠাৎ ভয় দেখানো গোসাপের হাঁ
এক সময় সন্ধ্যা ছিল বাঁশ ঝাড়ে শাকচুন্নীদের
নাকিসুর শুনে আপ্রাণ দৌড়
অথবা বঞ্চিত রাজপুত্রদের কাহিনী
জামরুল গাছের নীচে
চিকন বৃষ্টিতে ভেজা
এক সময় রাত্রি ছিল প্রগাঢ় অকৃত্রিম নিস্তব্ধতা
মৃত্যুর কাছাকাছি ঘুম, অথবা প্রশান্ত মহাসমুদ্রে
আস্তে আস্তে ড়ুবে যাওয়া এক জাহাজ
গন্ধলেবুর বাগানে শিশিরপাতেরও কোনো শব্দ নেই
কোনো শব্দ নেই দিঘির জলে একা একা চাঁদের
অবিশ্রান্ত লুটোপুটির
চরাচর জুড়ে এক শান্ত ছবি, গ্রাম বাংলায়
মেয়েলি আমেজ মাখা সুখ
তার মধ্যে একদিন সব নৈঃশব্দ খান খান করে ভেঙে
সমস্ত সুখের নিলাম করা সুরে
জেগে উঠতো নিশির ডাক :
সস্তা না মূল? সস্তা না মূল…কৈশোর ভেঙেছে তার একমাত্র গোপন কার্নিস
কৈশোরই ভেঙেছে
ভেঙে গেছে যত ঢেউ ছিল দূর আকাশগঙ্গায়
শত টুকরো হয়ে গেছে সোনালী পীরিচ
সে ভেঙেছে, সে নিজে ভেঙেছে
পাথরকুচির আঠা দুই চোখে লেগেছিল তার
রক্ত ঝরে পড়েছিল হাতে
তবুও সমস্ত সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে এসে
পা সেঁকে নিয়েছে গাঢ় আগুনের আঁচে
কৈশোর ভেঙেছে সব ফেরার নিয়ম
যেরকম জলস্তম্ভ ভাঙে
কৈশোর ভেঙেছে তার নীল মখমলে ঢাকা অতিপ্রিয় পুতুলের দেশ
সে ভেঙেছে অনুপম তাঁত
চতুর্দিকে ছিন্নভিন্ন প্রতিষ্ঠান, চুন, সুরকি, ধুলো
মৃত পাখিদের কলকণ্ঠস্বর উড়ে গেছে হাওয়ার ঝাপটে
যেখানে বরফ ছিল সেখানেই জলছে মশাল
যেখানে কুহক ছিল সেখানে কান্নার শুকনো দাগ
এখনো স্নেহের পাশে লেগে আছে ক্ষীণ অভিমান
আয়নায় যাকে দেখা, তাকেই সে ভেঙেছিল বেশি
কৈশোর ভেঙেছে সব, কৈশোরই ভেঙেছে
যখন সবাই তাকে সমস্বরে বলে উঠেছিল, মা নিষাদ
সেইক্ষণে সে ভেঙেছে, তার নিজ হাতে গড়া ঈশ্বরের মুখ
আমরা যারা এই শহরে হুড়মুড় করে বেড়ে উঠেছি
আমরা যারা ইট চাপা হলুদ ঘাসের মতন একদিন ইট ঠেলে
মাথা তুলেছি আকাশের দিকে
আমরা যারা চৌকোকে করেছি গোল আর গোলকে করেছি জলের মতন
সমতল
আমরা যারা রোদ্দুর মিশিয়েছি জ্যোৎস্নায় আর
নদীর কাছে বসে থেকেছি গাঢ় তমসায়
আমরা যারা চালের বদলে খেয়েছি কাঁকর, চিনির বদলে কাচ
আর তেলের বদলে শিয়ালকাঁটা
আমরা যারা রাস্তার মাঝখানে পড়ে থাকা
মৃতদেহগুলিকে দেখেছি
আস্তে আস্তে উঠে বসতে
আমরা যারা লাঠি, টিয়ার গ্যাস ও গুলির মাঝখান দিয়ে
ছুটে গেছি এঁকেবেঁকে
আমরা যারা হৃদয়ে ও জঠরে জ্বালিয়েছি আগুন
সেই আমরাই এক একদিন ইতিহাস বিস্মৃত সন্ধ্যায়
আচমকা হুল্লোড়ে বলে উঠেছি, আঃ,
বেঁচে থাকা কি সুন্দর!
আমরা ধুসরকে বলেছি রক্তিম হতে, হেমন্তের আকাশে
এনেছি বিদ্যুৎ
আমরা ঠনঠননের রাস্তায় হাঁটুসমান জল ভেঙে ভেঙে
পৌঁছে গেছি স্বর্গের দরজায়
আমরা নাচের তাণ্ডব তুলে ভাঙিয়ে ডেকে তুলেছি মধ্যরাত্রিকে
আমরা নিঃসঙ্গ কুষ্ঠরোগীকে, পথভ্রান্ত জন্মান্ধকে, হাড়কাটার
বাতিল বেশ্যাকে বলেছি, বেঁচে থাকো
বেঁচে থাকো
হে ধর্মঘটী, হে অনশনী, হে চণ্ডাল, হে কবরখানার ফুলচোর
বেঁচে থাকো
হে সন্তানহীনা ধাইমা, তুমিও বেঁচে থাকো, হে ব্যর্থ কবি, তুমিও
বাঁচো, বাঁচো, হে আতুর, হে বিরহী, হে আগুনে পোড়া সর্বস্বান্ত, বাঁচো
বাঁচো জেলখানায় তোমরা সবাই বাঁচো হাসপাতালে তোমরা
বাঁচো, বাঁচো, বেঁচে থাকো, উড়তে থাক নিশান, জ্বলুক বাতিস্তম্ভ
হাড় পাঁজরায় লেপটে থাক শেষ মুহূর্ত ভূমিকম্প
অথবা বজ্রপাতের মতন আমরা তুলেছি বেঁচে থাকার তুমুল হুঙ্কার
ধ্বংসের নেশায়, ধ্বংসকে ভালোবেসে আমরা চেয়েছি জন্মজয়ের প্রবল।
উখান।যারা অপমান দিয়ে চকিতে মিলিয়ে গেছে পথের বাঁকে, তারা।
হয়তো ভুলে গেছে, আমি ভুলিনি
স্মৃতির মধ্যে ঢুকেছিল বীজ, একদিন তা মহীরুহ হয়েছে
সমস্ত গভীরতার চেয়ে গভীর পাতালতম প্রদেশে তার শিকড়
সমস্ত উচ্চতার চেয়ে উঁচুতে অভ্রংলিহ তার শিখর
তার হিরণ্য ডালপালায় বসেছে এক পাখি যার হীরে কুচি চোখ
বহুদিনের অতীত ভেদ করে সে বলেছে, প্রতীক্ষায় আছি
আমার সারা শরীরে ঝাঁকুনি লাগে, কার জন্য প্রতীক্ষা?
কিসের জন্য প্রতীক্ষা?
আমি বিহ্বল হয়ে আকাশের দিকে তাকাই, আকাশকে মনে হয়
বারুদখানা
আমি বৃষ্টির মধ্যে সরু হয়ে হেঁটে যাই, বৃষ্টিকে মনে হয়
তেজস্ক্রিয়
আমি জানলার গরাদের বাইরে দাঁড়িয়ে আমার প্রাণ-প্রতিমাকে
প্রশ্ন করি, জানো, কার জন্য প্রতীক্ষা?
কিসের প্রতীক্ষা?
এ তো প্রতিশোধ নয়, প্রতিশোধের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক মনোরাজ্য
যার কামারশালায় বিচ্ছুরিত শব্দের ফুলকি সর্বক্ষণ
ঘিরে রাখে আমার
একলা সময়
আসলে আমার একাকিত্ব নেই, আমার নির্জনতা নেই, মুক্তি নেই
এক একদিন এই শহর স্তব্ধ হয়ে যায়
এক একদিন এই চোখে দেখা জগতে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়
সমস্ত জনপ্রাণী
সেই মাতৃগর্ভের মতন নিবাত নিষ্কম্প অস্তিত্বের মধ্যেও
জেগে থাকে আদিম শব্দ
সমস্ত জাগরণের পাশে সেই এক মহা জাগরণ
সমস্ত ধ্বনির চেয়ে সেই এক আলাদা ধ্বনি
তখন সমস্ত অন্ধকারের পাশে এসে দাঁড়ায়।
এক অন্য অন্ধকার
স্পষ্ট চেনা যায় এক একবার, আবার চেনা যায় না
গভীর অতলের মধ্যে ড়ুবে যেতে যেতে হঠাৎ আঁকড়ে ধরি
ভাসমান তৃণ
এই নিমজ্জন ও ভেসে ওঠা, বারবার, যেন শরীরের মধ্যেই
শরীরকে খোঁজাখুঁজি
যেমন নারীর ভিতরে নারীকে, তার ভিতরে এক অন্য নারী, যেমন
স্তন ও কোমরের খাঁজে অন্য এক
রূপের চোখ ফাটানো বিভা,
তার ভিতরে অন্য এক, তার
ভিতরে, তার ভিতরে,
যেমন স্বপ্নের মধ্যে
স্বপ্ন…এমনকি যেখানে সুন্দর অতি প্রথাসিদ্ধ, অরণ্যে বা পাহাড় চূড়ায়
যেখানে মেঘ ও রৌদ্রের খেলায় মেতে থাকে মেঘ ও রৌদ্রের প্রভুরা
সেখানে সমস্ত আলোর পাশে উড়তে থাকে আরও একটি আলোর পর্দা
সমস্ত বৃক্ষের মাথা ছাড়িয়ে উঠে আসে আর একটি বৃক্ষ, তার
হিরণ্য ডালপালা নিয়ে
সেখানে বসে থাকে একটি পাখি, যার হীরে কুচি চোখ
অচেনাতম কণ্ঠস্বরে সে বলে ওঠে, মনে আছে? প্রতীক্ষায় আছি!
তখনই শৃঙ্খলের মতন ঝনঝনিয়ে ওঠে নাদব্রহ্ম, তখনই
ছ’ নম্বরের দিকে ব্যাকুলভাবে চায় পাঁচটি ইন্দ্রিয়
কার প্রতীক্ষা? কিসের জন্য প্রতীক্ষা? উত্তর পাই না
যদিও জানি, এই নীলিমার পরপারে নেই আর অন্য নীলিমা
মৃত্যুর ওপারে জীবন!ছায়ার ভিতর থেকে বের হয়ে আসে ছায়া, সমান দূরত্ব রেখে
যমজের মতো ছুটে যায়
অথবা হ্রদের পাশে খুব শান্তভাবে বসে থাকা, যেন দু’রকম জলের কিনারে
দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়,দেখা হলো, দেখা হলো
রোদ্দুরের মধ্যে ওড়ে কার্পাস তুলোর বীজ,
এত মায়া, এত বেশি মায়া
সব কিছু এক জীবনের নর্ম সহচর, দেখা হলো, আরক্ত সন্ধ্যায়
দেখা হলো
দেখা হলো নারী ও নৈরাজ্য, কয়েক ফোঁটা ছন্নছাড়া কান্না বিন্দু
পড়ে রইলো ঘাসে
এদিকে ওদিকে জাগে আকস্মিক হাতছানি, যে-কোনো নদীর বাঁকে
চোখের ইশারা
দেখা হলো, পাথরের বুকে ঘুম, নদীর দর্পণে লুপ্ত সভ্যতার সঙ্গে
দেখা হলো
জননী-চুম্বক ছেড়ে আরও দূরে দেখা হলো নিভৃত শিল্পের বড়
মর্মভেদী টান
দেখা হলো, দেখা হলো, দেখা…
|
https://www.bangla-kobita.com/sunilgangopadhyay/dekha-holo-bhalobasa-bedonai/
|
607
|
জয় গোস্বামী
|
c.c.d
|
চিন্তামূলক
|
ভরন্ত C.C.D থেকে বেরিয়ে এল প্রেমিক-প্রেমিকা...
দেখামাত্র শ্বাস আটকে আসে!
এখন নিশ্চয় সে-ও কোনও C.C.D-তে বসে
তার নব্যপুরুষকে নিয়ে
মোবাইলে ছবি তুলছে--- যেমন আমার ছবি তুলত একদিনদেখতে দেখতে আমার চোখের সামনে ভিড় করা C.C.D
একটা হানাবাড়ি।সব আলো নিভে গেছে,আবছা অন্ধকার
চারপাশে কেউ নেই----এমনকী ওয়েটারও নয়এক কাপ চা হাতে নিয়ে বসে আছি প্রেতরূপী আমি
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/ccd/
|
4277
|
শঙ্খ ঘোষ
|
হাতেমতাই
|
চিন্তামূলক
|
হাতের কাছে ছিল হাতেমতাই
চূড়োয় বসিয়েছি তাকে
দুহাত জোড় করে বলেছি ‘প্রভু
দিয়েছি খত দেখো নাকে।
এবার যদি চাও গলাও দেব
দেখি না বরাতে যা থাকে -
আমার বাঁচামরা তোমারই হাতে
স্মরণে রেখো বান্দাকে!’
ডুমুরপাতা আজও কোমরে ঝোলে
লজ্জা বাকি আছে কিছু
এটাই লজ্জার। এখনও মজ্জার
ভিতরে এত আগুপিছু!
এবার সব খুলে চরণমূলে
ঝাঁপাব ডাঁই করা পাঁকে
এবং মিলে যাব যেমন সহজেই
চৈত্র মেশে বৈশাখে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1134
|
302
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
চরকার গান
|
স্বদেশমূলক
|
ঘোর –
ঘোর রে ঘোর ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর
ওই স্বরাজ-রথের আগমনি শুনি চাকার শব্দে তোর॥
১
তোর ঘোরার শব্দে ভাই
সদাই শুনতে যেন পাই
ওই খুলল স্বরাজ-সিংহদুয়ার, আর বিলম্ব নাই।
ঘুরে আসল ভারত-ভাগ্য-রবি, কাটল দুখের রাত্রি ঘোর॥
২
ঘর ঘর তুই ঘোর রে জোরে
ঘর্ঘরঘর ঘূর্ণিতে তোর
ঘুচুক ঘুমের ঘোর
তুই ঘোর ঘোর ঘোর।
তোর ঘুর-চাকাতে বল-দর্পীর তোপ কামানের টুটুক জোর॥
৩
তুই ভারত-বিধির দান,
এই কাঙাল দেশের প্রাণ,
আবার ঘরের লক্ষ্মী আসবে ঘরে শুনে তোর ওই গান।
আর লুটতে নারবে সিন্ধু-ডাকাত বৎসরে পঁয়ষট্টি ক্রোড়॥
৪
হিন্দু-মুসলিম দুই সোদর,
তাদের মিলন-সূত্র-ডোর রে
রচলি চক্রে তোর,
তুই ঘোর ঘোর ঘোর।
আবার তোর মহিমায় বুঝল দু-ভাই মধুর কেমন মায়ের ক্রোড়॥
৫
ভারত বস্ত্রহীন যখন
কেঁদে ডাকল – নারায়ণ!
তুমি লজ্জা-হারী করলে এসে লজ্জা নিবারণ,
তাই দেশ-দ্রৌপদীর বস্ত্র হরতে পারল না দুঃশাসন-চোর॥
৬ এই সুদর্শন-চক্রে তোর
অত্যাচারীর টুটল জোর রে ছুটল সব গুমোর
তুই ঘোর ঘোর ঘোর।
তুই জোর জুলুমের দশম গ্রহ, বিষ্ণু-চক্র ভীম কঠোর॥
৭
হয়ে অন্নবস্ত্রহীন
আর ধর্মে কর্মে ক্ষীণ
দেশ ডুবছিল ঘোর পাপের ভারে যখন দিনকে দিন,
তখন আনলে অন্ন পুণ্য-সুধা, খুললে স্বর্গ মুক্তি-দোর॥
৮
শাসতে জুলুম নাশতে জোর
খদ্দর-বাস বর্ম তোর রে অস্ত্র সত্যডোর,
তুই ঘোর ঘোর ঘোর।
মোরা ঘুমিয়ে ছিলাম, জেগে দেখি চলছে চরকা, রাত্রি ভোর॥
৯
তুই সাত রাজারই ধন,
দেশ- মা-র পরশ-রতন,
তোর স্পর্শে মেলে স্বর্গ অর্থ কাম মোক্ষ ধন।
তুই মায়ের আশিস, মাথার মানিক, চোখ ছেপে বয় অশ্রু-লোর॥ (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/chorkar-gan/
|
3421
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রচ্ছন্ন পশু
|
মানবতাবাদী
|
সংগ্রামমদিরাপানে আপনা-বিস্মৃত
দিকে দিকে হত্যা যারা প্রসারিত করে
মরণলোকের তারা যন্ত্রমাত্র শুধু,
তারা তো দয়ার পাত্র মনুষ্যত্বহারা!
সজ্ঞানে নিষ্ঠুর যারা উন্মত্ত হিংসায়
মানবের মর্মতন্তু ছিন্ন ছিন্ন করে
তারাও মানুষ বলে গণ্য হয়ে আছে!
কোনো নাম নাহি জানি বহন যা করে
ঘৃণা ও আতঙ্কে মেশা প্রবল ধিক্কার--
হায় রে নির্লজ্জ ভাষা! হায় রে মানুষ!
ইতিহাসবিধাতারে ডেকে ডেকে বলি--
প্রচ্ছন্ন পশুর শান্তি আর কত দূরে
নির্বাপিত চিতাগ্নিতে স্তব্ধ ভগ্নস্তূপে!
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/paschanna-pushu/
|
5841
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ভালোবাসি, ভালোবাসি
|
প্রেমমূলক
|
ধরো কাল তোমার পরীক্ষা,
রাত জেগে পড়ার
টেবিলে বসে আছ,
ঘুম আসছে না তোমার
হঠাত করে ভয়ার্ত কন্ঠে উঠে আমি বললাম-
ভালবাসো?
তুমি কি রাগ করবে?
নাকি উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি…..ধরো ক্লান্ত তুমি,
অফিস থেকে সবে ফিরেছ,
ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পীড়িত,
খাওয়ার টেবিলে কিছুই তৈরি নেই,
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে
ঘর্মাক্ত আমি তোমার
হাত ধরে যদি বলি- ভালবাসো?
তুমি কি বিরক্ত হবে?
নাকি আমার হাতে আরেকটু চাপ দিয়ে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি…..ধরো দুজনে শুয়ে আছি পাশাপাশি,
সবেমাত্র ঘুমিয়েছ তুমি
দুঃস্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠলাম
শতব্যস্ত হয়ে তোমাকে ডাক দিয়ে যদি বলি-ভালবাসো?
তুমি কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে?
নাকি হেসে উঠে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি…..ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে,
মাথার উপর তপ্ত রোদ,
বাহন পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময়
হঠাত দাঁড়িয়ে পথ
রোধ করে যদি বলি-ভালবাসো?
তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে?
নাকি রাস্তার সবার
দিকে তাকিয়ে
কাঁধে হাত দিয়ে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি…..ধরো শেভ করছ তুমি,
গাল কেটে রক্ত পড়ছে,
এমন সময় তোমার এক ফোঁটা রক্ত হাতে নিয়ে যদি বলি- ভালবাসো?
তুমি কি বকা দেবে?
নাকি জড়িয়ে তোমার গালের রক্ত আমার
গালে লাগিয়ে দিয়ে খুশিয়াল গলায় বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি…..ধরো খুব অসুস্থ তুমি,
জ্বরে কপাল পুড়েযায়,
মুখে নেই রুচি,
নেই কথা বলার অনুভুতি,
এমন সময় মাথায় পানি দিতে দিতে তোমার মুখের
দিকে তাকিয়ে যদি বলি-ভালবাসো?
তুমি কি চুপ করে থাকবে?
নাকি তোমার গরম শ্বাস আমার শ্বাসে বইয়ে দিয়ে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি..ধরো যুদ্ধের দামামা বাজছে ঘরে ঘরে,
প্রচন্ড যুদ্ধে তুমিও অংশীদার,
শত্রুবাহিনী ঘিরে ফেলেছে ঘর
এমন সময় পাশে বসে পাগলিনী আমি তোমায়
জিজ্ঞেস করলাম-
ভালবাসো?
ক্রুদ্ধস্বরে তুমি কি বলবে যাও….
নাকি চিন্তিত আমায় আশ্বাস দেবে, বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি…….ধরো দূরে কোথাও যাচ্ছ
তুমি,
দেরি হয়ে যাচ্ছে,বেরুতে যাবে,
হঠাত বাধা দিয়ে বললাম-ভালবাসো?
কটাক্ষ করবে?
নাকি সুটকেস ফেলে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসিধরো প্রচন্ড ঝড়,উড়ে গেছে ঘরবাড়ি,
আশ্রয় নেই
বিধাতার দান এই পৃথিবীতে,
বাস করছি দুজনে চিন্তিত তুমি
এমন সময় তোমার
বুকে মাথা রেখে যদি বলি ভালবাসো?
তুমি কি সরিয়ে দেবে?
নাকি আমার মাথায় হাত রেখে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি..ধরো সব ছেড়ে চলে গেছ কত দুরে,
আড়াই হাত মাটির নিচে শুয়ে আছ
হতভম্ব আমি যদি চিতকার করে বলি-
ভালবাসো?
চুপ করে থাকবে?
নাকি সেখান থেকেই
আমাকে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি…..যেখানেই যাও,যেভাবেই থাক,
না থাকলেও দূর
থেকে ধ্বনি তুলো,
ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি..দূর থেকে শুনব তোমার কন্ঠস্বর,
বুঝব তুমি আছ, তুমি আছ
ভালোবাসি,ভালোবাসি……..!আরও পড়ুন… কেউ কথা রাখেনি
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2584.html
|
1061
|
জীবনানন্দ দাশ
|
দুটি তুরঙ্গম
|
চিন্তামূলক
|
আকাশে সমস্ত দিন আলো;
পাতায় পালকে রোদ ঝিকমিক করে;
জলগুলো চ'লে গেছে চেনা পথ ধ'রে
অবিরল আরো দূর জলের ভিতরে।যদিও গভীরভাবে সময়ের সাগর উজ্জ্বল-
কি এক নিঃশব্দ নিবিড় আবেগে তাকে কালো
দু'টি তুরঙ্গম যেন অনন্তের দিকে টেনে নেয়;
নিরন্তর এ রকম অগ্রসর হ'য়ে যাওয়া ভালো।সারাদিন এঁকেবেঁকে নদীটির ঢেউ
মিশে যায় শাদা কালো রঙের সাগরে;
সারাদিন মেঘ পাখি উঁচু উঁচু গাছ
যেন প্রায় সূর্য স্পর্শ করে।মৌমাছি রৌদ্র নারী শরীর ও মন
মুহূর্ত ও মহাকাল দু'জনের কাছে
বারবার ব্রহ্মাণ্ডের অপরূপ অগ্নি পরিধির
ভিতরে নিবিড় অগ্নিশিল্প হয়ে আছে।সব শেষ হয়ে গেলে তারপর থাকে
একদিন যা জেনেছি তার চেয়ে ভালো
সমস্ত দিনের সূর্য- আর সেই সূর্যের বিদায়,
আঁধারের রঙে মাখা নক্ষত্রের আলো।নগর বন্দর দিক জনতার পথে
ক্ষতি রক্ত ভালোবাসা ব্যথা জ্ঞান-লাভ
ভালো,- তবু- সেই সব স্থিরতর ক'রে নিতে হয়;
প্রকৃতি মানুষ আর সময়ের নিজের স্বভাবজেনে নিতে হয় নদী প্রান্তরের ঘাসে;
এ ছাড়া আর কি সত্য ইতিহাস জানে?
কিছু গ্রন্থ রীতি চিন্তা- দু'একটী নক্ষত্র নারীর
দিকে চেয়ে বোঝা যায় জীবন ও মৃত্যুর মানে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/duti-turongom/
|
2566
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
1-আরোগ্য
|
চিন্তামূলক
|
এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি–অন্তরে নিয়েছি আমি তুলিএই মহামন্ত্রখানি,চরিতার্থ জীবনের বাণী।দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা-কিছু উপহারমধুরসে ক্ষয় নাই তার।তাই এই মন্ত্রবাণী মৃত্যুর শেষের প্রান্তে বাজে–সব ক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে।শেষ স্পর্শ নিয়ে যাব যবে ধরণীরব’লে যাব তোমার ধূলিরতিলক পরেছি ভালে,দেখেছি নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে।সত্যের আনন্দরূপ এ ধূলিতে নিয়েছে মুরতি,এই জেনে এ ধুলায় রাখিনু প্রণতি।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/1-%e0%a6%86%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%af/
|
6059
|
হেলাল হাফিজ
|
যুগল জীবনী
|
চিন্তামূলক
|
আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না।
বলে,–’কি নাগর
এতো সহজেই যদি চলে যাবে
তবে কেন ঘর বেঁধেছিলে উদ্ধাস্তু ঘর,
কেন করেছিলে চারু বেদনার এতো আয়োজন।
শৈশব কৈশোর থেকে যৌবনের কতো প্রয়োজন
উপেক্ষার ‘ডাস্টবিনে’ ফেলে
মনে আছে সে-ই কবে
চাদরের মতো করে নির্দ্বিধায় আমাকে জড়ালে,
আমি বাল্য-বিবাহিতা বালিকার মতো
অস্পষ্ট দু’চোখ তুলে নির্নিমেষে তাকিয়েছিলাম
অপরিপক্ক তবু সন্মতি সূচক মাথা নাড়িয়েছিলাম
অতোশতো না বুঝেই বিশ্বাসের দুই হাত বাড়িয়েছিলাম,
ছেলেখেলাচ্ছলে
সেই থেকে অনাদরে, এলোমেলো
তোমার কষ্টের সাথে শর্তহীন সখ্য হয়েছিলো,
তোমার হয়েছে কাজ, আজ প্রয়োজন আমার ফুরালো’?
আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না।
দুরারোগ্য ক্যান্সারের মতো
কবিতা আমার কোষে নিরাপদ আশ্রম গড়েছে
সংগোপনে বলেছে,–’হে কবি
দেখো চারদিকে মানুষের মারাত্মক দুঃসময়
এমন দুর্দিনে আমি পরিপুষ্ট প্রেমিক আর প্রতিবাদী তোমাকেই চাই’।
কষ্টে-সৃষ্টে আছি
কবিতা সুখেই আছে,–থাক,
এতো দিন-রাত যদি গিয়ে থাকে
যাক তবে জীবনের আরো কিছু যাক।
২৬.১০.৮১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/130
|
1070
|
জীবনানন্দ দাশ
|
নাবিক
|
চিন্তামূলক
|
কবে তব হৃদয়ের নদী
বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি!
সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে
দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে
বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন!
-পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন!
কারাগার-মর্মরের তলে
নিরাশ্রয় বন্দিদের খেদ-কোলাহলে
ভ’রে যায় বসুধার আহত আকাশ!
অবনত শিরে মোরা ফিরিতেছি ঘৃণ্য বিধিবিধানের দাস!
-সহস্রের অঙ্গুলিতর্জন
নিত্য সহিতেছি মোরা,-বারিধির বিপ্লব-গর্জন
বরিয়া লয়েছ তুমি,- তারে তুমি বাসিয়াছ ভালো;
তোমার পঞ্জরতলে টগ্বগ্ করে খুন-দুরন্ত, ঝাঁঝালো!-
তাই তুমি পদাঘাতে ভেঙে গেলে অচেতন বসুধার দ্বার,
অবগুণ্ঠিতার
হিমকৃষ্ণ অঙ্গুলির কঙ্কাল-পরশ
পরিহরি গেলে তুমি,-মৃত্তিকার মদ্যহীন রস
তুহিন নির্বিষ নিঃস্ব পানপাত্রখানা
চকিতে চূর্ণিয়া গেলে,-সীমাহারা আকাশের নীল শামিয়ানা
বাড়ব-আরক্ত স্ফীত বারিধির তট,
তরঙ্গের তুঙ্গ গিরি, দুর্গম সঙ্কট
তোমারে ডাকিয়া নিল মায়াবীর রাঙা মুখ তুলি!
নিমেষে ফেলিয়া গেলে ধরণীর শূন্য ভিক্ষাঝুলি!
প্রিয়ার পাণ্ডুর আঁখি অশ্রু-কুহেলিকা-মাখা গেলে তুমি ভুলি!
ভুলে গেলে ভীরু হৃদয়ের ভিক্ষা, আতুরের লজ্জা অবসাদ,-
অগাধের সাধ
তোমারে সাজায়ে দেছে ঘরছাড়া ক্ষ্যাপা সিন্দবাদ!
মণিময় তোরণের তীরে
মৃত্তিকায় প্রমোদ-মন্দিরে
নৃত্য-গীত-হাসি-অশ্রু-উৎসবের ফাঁদে
হে দুরন্ত দুর্নিবার,-প্রাণ তব কাঁদে!
ছেড়ে গেলে মর্মন্তুদ মর্মর বেষ্টন,
সমুদ্রের যৌবন-গর্জন
তোমারে ক্ষ্যাপায়ে দেছে, ওহে বীর- শের!
টাইফুন্-ডঙ্কার হর্ষে ভুলে গেছ অতীত-আখের
হে জলধি পাখি!
পক্ষে তব নাচিতেছে লক্ষ্যহারা দামিনী-বৈশাখী!
ললাটে জ্বলিছে তব উদয়াস্ত আকাশের রত্নচূড় ময়ূখের টিপ,
কোন্ দূর দারুচিনি লবঙ্গের সুবাসিত দ্বীপ
করিতেছে বিভ্রান্ত তোমারে!
বিচিত্র বিহঙ্গ কোন্ মণিময় তোরণের দ্বারে
সহর্ষ নয়ন মেলি হেরিয়াছ কবে!
কোথা দূরে মায়াবনে পরীদল মেতেছে উৎসবে,-
স্তম্ভিত নয়নে
নীল বাতায়নে
তাকায়েছ তুমি!
অতিদূর আকাশের সন্ধ্যারাগ-প্রতিবিম্বে প্রস্ফুটিত সমুদ্রের
আচম্বিত ইন্দ্রজাল চুমি
সাজিয়াছ বিচিত্র মায়াবী!
সৃজনের জাদুঘর-রহস্যের চাবি
আনিয়াছ কবে উন্মোচিয়া
হে জল-বেদিয়া!
অলক্ষ্য বন্দর পানে ছুটিতেছ তুমি নিশিদিন
সিন্ধু- বেদুঈন!
নাহি গৃহ- নাহি পান্থশালা-
লক্ষ লক্ষ ঊর্মি-নাগবালা
তোমারে নিতেছে ডেকে রহস্য-পাতালে-
বারুণী যেথায় তার মণিদীপ জ্বালে!
প্রবাল-পালঙ্ক-পাশে মীননারী ঢুলায় চামর!
সেই দুরাশার মোহে ভুলে গেছ পিছু-ডাকা স্বর,
ভুলেছ নোঙর!
কোন্ দূর কুহকের কূল
লক্ষ্য করি ছুটিতেছে নাবিকের হৃদয়-মাস্তুল
কে বা তাহা জানে!
অচিন আকাশ তারে কোন্ কথা কয় কানে কানে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/896
|
2525
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
সাদা অন্ধকার
|
চিন্তামূলক
|
কতিপয় হাস্যকর লোক বসে বসে
কথার পিঠের সাথে কথা জুড়ে জুড়ে
উদ্ভট মজার খেলা দেখাবার নির্লজ্জ সাহসে
মূল্যবান কাগজের শুভ্রতাকে খুঁড়ে
কবরের মত শুধু গহ্বর বানিয়ে চলেছেকতিপয় হাস্যকর লোক বসে বসে
সারি সারি ম্যাচের খোলসে
বারুদবিহীন কাঠি ঠুকে ঠুকে - আগুন জ্বলেছে
আগুন জ্বলেছে বলে কর্কশ চিৎকার
করে যাচ্ছে অযথাই - আরকতিপয় হাস্যকর লোক বসে বসে
বাজিকর সুলভ কৌশলে
ভীষণ বুড়িয়ে যাওয়া সভ্যতার করতল ঘষে
রেখাগুলো ইচ্ছেমত পাল্টে দেবে বলে
তৎপর রয়েছে -- এই নিরেট সময়ে
দেয়ালের ক্যালেন্ডার লাল-কালো অথবা রঙিন
মুদ্রিত তারিখগুলো মুছে ফেলে ভয়ে
সাদা হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/shada-ondhokar/
|
2206
|
মহাদেব সাহা
|
ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস
|
মানবতাবাদী
|
কতোদিন কোথাও ফোটে না ফুল, দেখি শুধু
অস্ত্রের উল্লাস
দেখি মার্চপাস্ট, লেফট রাইট, কুচকাওয়াজ ;
স্বর্ণচাঁপার বদলে দেখি মাথা উঁচু করে আছে হেলমেট
ফুলের কুঁড়ির কোনো চিহ্ন নেই, গাছের আড়ালে থেকে
উঁকি দেয় চকচকে নল,
যেখানে ফুটতো ঠিক জুঁই, বেলি, রঙিন গোলাপ
এখন সেখানে দেখি শোভা পাচ্ছে বারুদ ও বুলেট ;
প্রকৃতই ফুলের দুর্ভিক্ষে আজ বিরান এদেশ
কোথাও সামান্য কোনো সবুজ অঞ্চল নেই, খাদ্য নেই,
শুধু কংক্রিট, পাথর আর ভয়ল আগুন
এখানে কারফিউ-ঘেরা রাতে নিষিদ্ধ পূর্ণিমা ;
আজ গানের বদলে মুহুর্মুহু মেশিনগানের শব্দ-
সারাক্ষণ বিউগল, সাইরেন আর বিকট হুইসিল
বুঝি কোথাও ফুলের কোনো অস্তিত্বই নেই।
ফুলের শরীর ভেদ করে জিরাফের মতো আজ
অস্ত্রই বাগয়েছে গ্রীবা
পাতার প্রতীক তাই ভুলে গেছি দেখে দেখে অস্ত্রের মডেল!
খেলনার দোকানগুলিতে একটিও গিটার, পুতুল কিংবা
ফুল পাখি নেই
শিশুদের জন্য শো-কেসে সাজানো শুধু অস্ত্রের সঞ্চার
বাইরেবাতাস শ্বাসদুদ্ধকর, রাজপথে সারি সারি বুট,
সব কিছু চেয়ে আছে অস্ত্রেরই বিশাল ডালপালা ;
কোথাও ফোটে না ফূল, কোথাও শুনি না আর
হৃদয়ের ভাষা,
কেবল তাকিয়ে দেখি মার্চপাস্ট, কুচকাওয়াজ, লেফট রাইট
এই রক্তাক্ত মাটিতে আর ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1361
|
1244
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সূর্য নিভে গেলে
|
প্রেমমূলক
|
সূর্য, মাছরাঙা, আমি
উত্তীর্ণ হয়েছে পাখী মদী সূর্যের অন্ধ আবেগের
দু’মুহূর্তে আনন্দের পরীক্ষার বুঝি।
নিভে গেছে;- আমি কেন তবু সূর্য খুঁজি।
তুমি
জানি না কোথায় তুমি- সূর্য নিভে গেছে;
তোমার মননে আজ স্থির
সন্ধ্যার কুমোর পোকা- বাঁশের ছ্যাঁদায় ঘূণ-
শাদা বেতফলের শিশির।
আছে
‘নেই- নেই-’ মনে হয়েছিল কবে- চারিদিকে উঁচু- উঁচু গাছে,
বাতাস? না সময় বলছে; ‘আছে, আছে।’
অনেক অনেক দিনের পর আজ
অঘ্রাণ রাত
অন্ধকারে সময়পরিক্রমা
করতে গিয়ে আবছা স্মৃতির বইয়ের
পাতার থেকে জমা-
খরচ সবি মুছে ফেলে দিয়ে
দানের আয়োজনে নেমে এল,
চেয়ে দেখি নারী কেমন নিখুঁতভাবে কৃতী;
ডানা নড়ে শিশির শব্দ করে
বাহিরে ঐ অঘ্রাণ রাত থেকে;
এসব ঋতু আমার হৃদয়ে
কি এক নিমেষনিহত সমাহিতি
নিয়ে আসে; ভিতরে আরো প্রবেশ ক’রে প্রাণ
একটি বৃক্ষে সময় মরুভূমি
লীন দেখেছে, গভীর পাখি বৃক্ষ তুমি।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shurjo-nivey-geley/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.