content
stringlengths
0
129k
নজরুলও আদালতে লিখিত রাজবন্দীর জবানবন্দী দিয়ে এবং প্রায় চল্লিশ দিন একটানা অনশন করে ইংরেজ সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং এর সমর্থনে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে গ্রন্থ উৎসর্গ করে শ্রদ্ধা জানান
তিনি আধুনিক ভারতবর্ষীয় সঙ্গীতে 'বুলবুল' নামে খ্যাত
মানুষ তাঁর নামের সঙ্গে এক-এক সময় এক-একটি তকমা জুড়ে দিয়ে তাঁকে খণ্ডিতরূপে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করে, তাঁর সঠিক মূল্যায়ন থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে, সম্ভবত সমালোচকদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে এমনটি ঘটেছে
অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ সমালোচনার শিকার হন তিনি, এ অবস্থার বর্ণনায় নজরুল নিজেই বলেন―
'হিন্দুরা ভাবে, ফার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা'ত-নেড়ে
মৌ-লোভী যত মৌলভী আর মোল-লারা কন হাত নেড়ে―
দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম―কাফের কাজী ও
যদিও শহীদ হইতে রাজীও
কাজেই যারা হিন্দুধর্মকে আচার সর্বস্ব করে এবং যারা ইসলামধর্মকে করে ফতোয়া সর্বস্ব তাদের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান, দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন―
'আদি শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র-আচার
মূল সর্বনার্শের এরে ভাঙিব এবার
শুধু কী নজরুল এ-ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিলেন? না, সু-সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতাবা আলীও ছিলেন; তিনি বলেন, 'সমাজে ব্যক্তির সুষ্ঠু জীবন যাপনের সুবিধার্থেই ধর্মের প্রয়োজন
অন্যথায় ফতোয়ার সমষ্টি মাত্র যে কেতাব দরদহীন নীতি সর্বস্ব সেটা কুমড়ো কাটা করলে মানবকুলের কোন ক্ষতি হবে না―এ নিশ্চিত
' নজরুল আরো বিশ্বাস করেন, 'ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধর্ম
' তিনি বিশ্বাস করেন মানুষ আত্মবুদ্ধিতে যা ভাল বুঝে, যা ভাল বলে অনুসরণ করে, তাকে তা করার সুযোগ দেওয়া উচিত; যেকোনো প্রকার সংস্কার দিয়ে, প্রাধিকারের শাসন দিয়ে, বাহ্যশক্তির চাপ সৃষ্টি করে মানুষের স্বাভাবিক বোধ ও বুদ্ধিকে খর্ব করা অন্যায়
এ-উপলব্ধির সঙ্গে তিনি যখন দেখেন ধর্মের ধ্বজাধারীদের সৃষ্ট বাঁধা-নিষেধের ডোরে বাঁধা সমাজে মানুষের বিকাশের পথ অনেকাংশে রুদ্ধ তখন তিনি গর্জে উঠেন―
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
নজরুল একসময় মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, ধর্ম-ব্যবসায়ীদের লীলাখেলা তখনই তিনি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান; দেখেন ভজনালয়ে দলাদলি, স্বার্থের হানাহানি
এ দেখে তিনি বলে উঠেন―
তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি
কোথা চেঙ্গিস, গজনীমাসুদ, কোথায় কালা-পাহাড়?
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা দেওয়া দ্বার
মানবতা শিক্ষাদানের জন্য তিনি গেয়ে উঠেন―
মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব'সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ'ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্য মুনি,
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহাবেদনার ডাক শুনি
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
এইখানে বসি গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই
মানব হৃদয়ের অমন জয়গান শুনে মোল্লাদল আঙুল কানে দেয়
ধণ্না দিতে শুরু করে কবি গোলাম মোস্তফা সাহেবের দ্বারে
তিনি কবিতা লিখেন নজরুলকে কশাঘাত করে
লাঞ্ছিত নিস্পেষিতদের কী করুণ আর্তনাদ তাঁর সৃষ্টিকর্মে ধরা পড়ে! হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ, জাতিভেদ প্রথা, ধর্মের নামে মারামারি-হানাহানি তিনি আদৌ বরদাস্ত করেননি; বরং এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কিভাবে মিলন ঘটানো যায় তাই ছিল তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন
চণ্ডীদাস গেয়েছিলেন, 'শুনহ মানুষ ভাই,/ সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই
' এ যুগের চণ্ডীদাস রূপে নজরুল কণ্ঠেও তা প্রতিধ্বনিত হয়―
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান
'ব্যাটা বলে কী?' গোস্সায় মোল্লারা কামড়ে ধরেন নিজেদের গোশ্ত
বোঝার ভুলে রাগ বাড়ে―'আল্লাহকে আরশচ্যুত করে বসায়েছে মানুষকে
শিরক নির্ঘাত
কাফের নিশ্চয়
' আমাদের নজরুলও কম যান না―
কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আফিম-নেশা,
ধ্বংস করেছি ধর্ম যাজকী পেশা
ভাঙ্গি মন্দির, ভাঙ্গি মসজিদ
ভাঙ্গিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত―
এক মানবের একই রক্ত মেশা
কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা
অবশেষে বাকহীন নজরুলকে টুপি পরিয়ে তাঁর লিখিত গজল সংকলন প্রকাশ করে তাঁকে একজন মৌলবাদী রূপে চালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রগতিবাদী চিন্তাধারার প্রভাবের আশঙ্কায় বেচাইন একদল ধর্মব্যবসায়ী
কবি ও সাহিত্যিকের মুখ্য কর্তব্য মানুষকে তার মনুষ্যত্ব বিকাশে উদ্বুদ্ধ করা
তজ্জন্য বিচারশক্তি, কল্পনাশক্তি এবং ধারণাশক্তি অপরিহার্য; কিন্তু মৌলবাদীর আছে শুধু ধারণ শক্তি, অপর তিনটির অভাব আবশ্যিক শর্ত
উক্ত মনুষ্যত্ব বোধ জাগ্রত হলে সমাজের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয় মানুষ
মৌলবাদ সৃষ্ট সমাজের রূপ তুলে ধরেন নজরুল―
জনগণে যারা জোঁক-সম শোষে তারে মহাজন কয়,
সন্তান-সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়
মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ
মাটির মালিক তাহারাই হন
নিশ্চয়ই মানুষের ভ্রাতৃত্ব এক
কাজেই প্রকৃতি সর্বাবস্থায় সাম্য ও মৈত্রীর রূপায়ণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে
অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বলেন, 'যাতে সর্বাবস্থায় সমান অংশে দুনিয়ার সম্পদ মানুষ ভোগ করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই মানব সমাজকে সংঘ চেতনার পথে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে
' একথাই অনেক আগে নজরুল বলেন―
তোমার দেওয়া এ বিপুল পৃথ্বী সকলে করিব ভোগ,
এই পৃথিবীর নাড়ী সঙ্গে আছে সৃজন-দিনের যোগ
অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ আরো উল্লেখ করেছেন, '[...] জমি নগদ লগ্নি বা ভাগে দেওয়া না-যায়েজ এবং জমিদারী প্রথা কোন অবস্থায়ই জায়েয নয়
' ক'জন মুসলিম আলেম এমন কথা প্রকাশ করতে সাহস করেন? তারাই তো উপরতলার মানুষের ছত্র ছায়াতলে মেলা বসান, কিন্তু আমাদের নজরুল না-যায়েজ শোষকগোষ্ঠীর জাঁতাকলে নিষ্পেষিত মানুষের জয়গান সুকণ্ঠে প্রকাশ করেন―
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়তো উহার বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি
অথবা হয়তো কিছুই নহে, সে মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়
বাস্তবিকই নজরুল ছিলেন সত্যিকারের মানব-দরদী একজন মহাকবি
আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে এত বিশাল আকারের কবি ক'জনই-বা আবির্ভূত হয়েছেন? এক শ্রেণীর মুসলিম আলেমদের চালচলনে, স্বার্থসিদ্ধির কলাকৌশল অবলোকনে মনে হয় নজরুলের মনে এ-ধরনের একটি ধারণা জন্মে ছিল হয়তো-বা; মানুষের অজ্ঞানতাপ্রসূত ভীতি, এবং এই ভীতিজাত কুসংস্কারই ধর্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে
এর কারণ এও হতে পারে যে, স্রষ্টাকে সাধারণত শক্তিশালী শাস্তিদাতা রূপে চিত্রিত করা হয় সাধারণ্যে, তাই নজরুল হেঁকে উঠেন―
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়
পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল―মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ কেতাব―গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো
সংসারে দুঃখদারিদ্র্যে জর্জরিত মানবকুলের প্রতি অবিচার, অত্যাচার লক্ষ্য করে কবিচিত্ত অস্থির―
গাহি গান, গাঁথি মালা, কণ্ঠ করে জ্বালা,
দংশিল সর্বাঙ্গে মোর নাগ-নাগবালা
যেখানে মানবতার অবমাননা সেখানে নজরুলের 'উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার
' নজরুল তাঁর কবিতায় ব্যতিক্রমী এমন সব বিষয় ও শব্দ ব্যবহার করেন, যা আগে কখনও ব্যবহূত হয়নি
কবিতায় তিনি সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক যন্ত্রণাকে ধারণ করায় অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন
তবে মানব-সভ্যতার কয়েকটি মৌলিক সমস্যাও ছিল তাঁর কবিতার উপজীব্য
নজরুল তাঁর কাব্য-সৃষ্টি-কর্মে হিন্দু-মুসলিম মিশ্র ঐতিহ্যের পরিচর্যা করেন
কবিতা ও গানে তিনি এ মিশ্র ঐতিহ্যচেতনাবশত প্রচলিত বাংলা ছন্দোরীতি ছাড়াও অনেক সংস্কৃত ও আরবি ছন্দ ব্যবহার করেন
নজরুলের ইতিহাস-চেতনায় ছিল সমকালীন এবং দূর ও নিকট অতীতের ইতিহাস, সমভাবে স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নজরুলের কবিতা ও গান আমাদের প্রেরণা যুগিয়েছে পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে―
নব ধ্যান ধারণায় জাগো
নব প্রাণ নব প্রেরণায় জাগো
সকল কালের উচ্চে তোল গো শির,