content stringlengths 0 129k |
|---|
কর্নেল চাপা গলায় বললেন, শাট আপ! |
অবিশ্যি ওঁর মুখে কৌতুক ঝলমল করছিল |
প্যান্ট-শার্ট থেকে ঝোপের আবর্জনা পরিষ্কার করে টুপি খুললেন কর্নেল |
টুপি থেকে একটা পোকা তুলে ঝোপে ফেলে দিলেন |
তারপর বললেন, জয়ন্ত! বীরেশ্বরবাবুর কথা আমরা ছন্দার কাছেই জেনেছি |
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল, ভটচাযমশাইয়ের অন্তিম মুহূর্তের কথাটা |
এই সময় টিনি ফুলগাছের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল |
মেয়েটির বয়স সাত-আট বছরের বেশি নয় |
সে কর্নেলের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকার পর বলল, তোমার মুখে সাদা দাড়ি কেন? |
কর্নেল সহাস্যে বললেন, তুমি স্কিপিং করতে করতে ছড়া বলো কেন? |
দাদু শিখিয়ে দিয়েছেন |
বলো না তোমার মুখে সাদা দাড়ি কেন? |
ছড়াটা আবার বলো |
তা হলে বলব |
টিনি আওড়াল- |
নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো |
তবেই তোমার পোয়াবারো |
কর্নেল ওর চিবুকে তর্জনী ছুঁইয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, আমার দাড়ি সাদা কেন, তা যদি তোমাকে বলে দিই, তাহলে তোমার দাদুর দাড়িও সাদা হয়ে যাবে |
দাদুর দাড়িই নেই |
দাদুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো না |
তোমার দাদু উঠেছেন? |
বাহাদুর এসে দাদুকে ওঠাল |
এই সময় দোতলার একটা জানালা থেকে ছন্দা ডাকলেন, টিনি! এখনও কী করছ? ওঁদের ডাকতে পাঠালাম না তোমাকে? সঙ্গে করে নিয়ে এস |
নীচের দরজা খুলে দিয়েছি |
সিঁড়ি দিয়ে উঠো না যেন |
টিনি বলল, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে দাদু রাগ করে |
তোমরা এদিকে এস |
এবার আমরা সেই করিডর দিয়ে হলঘরে ঢুকলাম |
হঠাৎ আমার মনে হল ছন্দা ওই বিপজ্জনক সিঁড়ি দিয়ে তখন আমাদের যেন নামতে বাধ্য করলেন |
টিনি হলঘরে গিয়েই দৌড়ে ওপরে চলে গেল |
কর্নেলের কাছে চুপিচুপি প্রশ্নটা তুললাম |
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, তুমি ছন্দা সম্পর্কে ক্রমশ বেশি সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ছ জয়ন্ত! |
আপনার মতো লম্বাচওড়া ওয়েটি মানুষের ভারে সিঁড়িটা ভেঙে পড়ার চান্স ছিল কিন্তু! |
এবার কর্নেলের মুখে হাসি ফুটল |
সেটা অবিশ্যি ঠিক |
অত উঁচু থেকে পড়লে আপনার কী অবস্থা হত বুঝতে পারছেন? |
হাড়গোড় ভাঙা দ হয়ে যেতাম |
কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না |
বললেন, যাই হোক, ছড়াটার একটা মানে যেন বোঝা যাচ্ছে |
দোতলা থেকে নীচে নেমে এসে বাঁয়ে ঘুরলেই ঠাকুরবাড়ির দরজা |
আর ডাইনে ঘুরলে-হ্যাঁ, ওই ছবিটা |
গৃহ-দেবতা বিষ্ণুমূর্তির ছবি |
দেখতে পাচ্ছ? |
আমরা হলঘরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম |
দেখলাম, দেয়ালে চওড়া ফ্রেমে বাঁধানো একটা বিষ্ণুমূর্তির ফোটো টাঙানো আছে |
এই সময় হলঘরের সিঁড়িতে বেঁটে গোলগোল আর শক্তসমর্থ গড়নের প্রৌঢ় একটা লোককে দেখতে পেলাম |
তার পরনে খাকি হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি |
সে থমকে দাঁড়িয়ে সেলাম দিয়ে বলল, কর্নিলসাব! আপ? |
কর্নেল সহাস্যে বললেন, চিনতে পেরেছ জঙ্গবাহাদুর? |
জি হাঁ কর্নিলসাব! আপ এত্তা বরষ বাদ এখানে আসলেন! |
প্রায় পনের বছর পরে |
তা তুমি কেমন আছো বলো? |
ভালো নেহি আছে কর্নিল সাব! আর এখানে আমার নোকরি নেহি আছে |
এসেই সে-খবর পেয়েছি |
জঙ্গবাহাদুর একটু হেসে চাপা গলায় বলল, ঠাকুরমশাই মার্ডার হইয়ে গেল |
পুলিস আসল |
আমাকে বহুরানি খবর ভেজেছিল |
লেকিন আমি আসিনি |
ঠাকুরমোশাই আচ্ছা আদমি ছিল না |
উহি তো আমাকে নোকরি থেকে বরখাস্ত করিয়েছিল |
এই ঠাকুরমোশাই কতদিন ও বাড়িতে ছিলেন? |
তিন বরষ হবে |
আগের ঠাকুরমোশাই আচ্ছা আদমি ছিল |
জদ্বাহাদুর ঘুরে ওপরটা দেখে নিয়ে বলল, বহুরানি খবর ভেজলেন দুসরাবার |
কুমারসাবভি বললেন, ভুল হইয়ে গেছে |
তুম্ ফির কাম করো |
তুমি এ বাড়ির পুরনো লোক |
তুমি কাজে বহাল হলে কুমারবাহাদুর আর বউরানির সুবিধা হবে |
জঙ্গবাহাদুর মুখে দুঃখের ছাপ ফুটিয়ে বলল, কুমারসাবের এত্তা বেমারি হইয়েছে, আমি জানতাম না কর্নিলসাব! |
ওপর থেকে ছন্দা ডাকলেন, বাহাদুর! গল্প পরে হবে |
ওঁদের আসতে বলো |
জঙ্গবাহাদুর আবার সেলাম ঠুকে নীচে কোথাও গেল |
আমরা দোতলায় গিয়ে দেখি, ছন্দা দাঁড়িয়ে আছেন |
বললেন, শ্বশুরমশাইকে আপনার আসার কথা বলেছি |
ভেবেছিলাম ভটচাকাকুর দুঃসংবাদটা আপনার মুখ দিয়েই ওঁকে জানাব |
কিন্তু জঙ্গবাহাদুর জানিয়ে ফেলল |
কর্নেল বললেন, ওঁর রিঅ্যাকশন কী? |
শুনে গুম হয়ে গেলেন |
কোনও কথা বললেন না |
আপনারা আসুন |
ছন্দা আমাদের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন |
ঘরটা সেকেলে আসবাবে সাজানো |
কয়েকটা আলমারি বইয়ে ভর্তি |
সব জানালা বন্ধ |
শুধু একটা জানালা খোলা আছে |
জানালাটার পাশে একটা প্রকাণ্ড খাট |
সেই খাটে কর্নেলের মতোই লম্বাচওড়া একজন বৃদ্ধ কয়েকটা বালিশে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছেন |
ঘরের ভেতর শুধু ওই উত্তরের জানালা দিয়েই যেটুকু আলো আসছে |
খাটের পাশে দুটো চেয়ার আর একটা গোল টেবিল সাজানো আছে |
কর্নেল এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়ালেন |
হ্যালো কুমারবাহাদুর! |
সত্যেন্দ্রনাথের ডান হাতটা একটু উঠেই পড়ে গেল |
বাঁ হাত বাড়িয়ে কর্নেলের হাত চেপে ধরলেন |
তারপর ধরা গলায় বললেন, আমার বড় দুঃসময়ে আপনাকে পেয়ে মনে ভরসা এল |
আপনাকে কতদিন দেখিনি! |
প্রায় পনের বছর |
বসুন কর্নেলসায়েব! |
আলাপ করিয়ে দিই |
আমার তরুণ বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী |
দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.