content
stringlengths
0
129k
সত্যেন্দ্রনাথ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বস বাবা! তুমি বলছি-কিছু মনে কোরো না!
আমরা বসলাম
কর্নেল বললেন, আপনার অসুখ শুনে দুঃখিত কুমারবাহাদুর!
আমাকে আর কুমারবাহাদুর বলবেন না প্লিজ! বউমা! কর্নেলসায়েব কিন্তু কফির ভক্ত
ছন্দা কফি অলরেডি খাইয়েছে
আর কফি খাব না
আপনার এই অসুখ কবে হল?
গত মাসে হঠাৎ বাথরুমে পড়ে গেলাম
তারপর ডান হাত থেকে ডান পা অব্দি নিঃসাড়
সম্ভবত প্যারালেসিস
কিন্তু আপনি তো জানেন, জীবনে আমি ওষুধ খাইনি
আমি আমার পূজ্য দেবতা শ্রীবিষ্ণু আর নিজের ইচ্ছাশক্তিতে বিশ্বাসী
এ অসুখ শিগগির সেরে যাবে
এই তো আজই মনে হচ্ছে, অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছি
ছন্দা বললেন, আপনারা কথা বলুন
দরকার হলে আমাকে ডাকবেন
ছন্দা বেরিয়ে যাওয়ার পর কর্নেল আস্তে বললেন, আপনার গৃহদেবতার মন্দিরে আজ ভোরে একটা মিসহ্যাপ হয়েছে
সত্যেন্দ্রনাথ নির্বিকার মুখে বললেন, পাপের শাস্তি! নরহরি এ বাড়িতে ঢোকার পর থেকে একটার পর একটা-থাক্ ওসব কথা
আপনার খবর বলুন!
আমার খবর নতুন কিছু নেই
যথাপূর্বং
সেই পাখিপ্রজাতি অর্কিড ক্যাকটাস এবং মাঝে মাঝে রহস্যের গন্ধ পেলেই ছুটে বেড়ানো
সত্যেন্দ্রনাথ ভুরু কুঁচকে তাকালেন
নরহরি ব্যাটাচ্ছেলের মৃত্যুরহস্যের গন্ধ পেয়েই যদি এখানে এসে থাকেন, তাহলে আপনাকে অনুরোধ করব, এটা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না
তাছাড়া এতে সত্যি বলতে কী কোনও রহস্যই নেই
পুলিস নরহরির খুনীকে ঠিকই ধরে ফেলবে
কর্নেল একটু হেসে বললেন, কাল বিকেলে নরহরিবাবু আমার কাছে গিয়েছিলেন
আপনার কাছে? নরহরি গিয়েছিল?
আপনার গৃহদেবতার আসল মূর্তি নাকি চুরি গেছে
আমাকে তা উদ্ধার করে দিতে হবে
সত্যেন্দ্রনাথ প্রায় গর্জন করলেন, চোর! চোর! নিজেই চুরি করে বেচে দিয়ে সাধু সাজার জন্য আপনার কাছে গিয়েছিল!
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, উনি বলছিলেন, মন্দিরের তালা খোলার কৌশল শুধু উনি এবং আপনি জানেন
আর কেউ জানে না
এখন উনি আর বেঁচে নেই
তাই বিষ্ণুমূর্তি সত্যি চুরি গেছে কি না দেখা দরকার
সত্যেন্দ্রনাথ ডাকলেন, বউমা!
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ছন্দা ঘরে ঢুকলেন
খাটের কাছে এসে বললেন, বলুন বাবা!
আজ তুমি ভোরে মন্দিরে প্রণাম করতে যাওনি?
ছন্দা মুখ নিচু করে বললেন, প্রণাম করেছি
তবে মন্দিরের দরজা বন্ধ ছিল
ভটচাঙ্কাকু উপুড় হয়ে পড়েছিলেন
মাথার পেছনে রক্ত
আপনাকে তো সব বললাম একটু আগে
তা হলে মন্দিরের দরজা খোলা ছিল না?
তুমি বাহাদুরকে ডাকো! আমাকে মন্দিরের দরজায় বসিয়ে রেখে আসবে
সে আমাকে রেখে ফিরে এলে তুমি হলঘরের দরজায় পাহারা দেবে
কেউ তালা খোলার কৌশল যেন না বুঝতে পারে
হ্যাঁ বাবা!
যাও! বাহাদুরকে ডেকে আনো! বলে সত্যেন্দ্রনাথ কর্নেলের দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলেন
সরি কর্নেলসায়েব! আপনার বাইনোকুলার দিয়ে তালা খোলার কৌশল দেখার সুযোগ কিন্তু আপনাকে দিচ্ছি না
আপনারা দুজনে হলঘরে বসে থাকবেন
ছন্দা তখনই বেরিয়ে গেলেন
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ঠিক আছে
আমি হলঘরেই বসে থাকব
আমি শুধু জানতে চাই সত্যিই আসল মূর্তি আছে, নাকি নেই
আপনি কি বলতে চাইছেন চোর আসল মূর্তি হাতিয়ে নকল মূর্তি রেখেছে?
নরহরিবাবু সেই কথাই বলছিলেন
সত্যেন্দ্রনাথ আবার গর্জন করলেন, চোর! চোর! নরহরিই চুরি করেছে, তারপর টাকার বখরা নিয়ে স্যাঙাতদের সঙ্গে ঝামেলা বেঁধেছে
তখন তারা ওকে খুন করেছে
ওঃ! আমাদের পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠা করা গৃহদেবতা
তিনি মুখ ঘুরিয়ে অশ্রু সম্বরণ করলেন
একটু পরে বাহাদুর এসে ওঁকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুলে ফেলল
অবাক হয়ে গেলাম! বাহাদুরের গায়ে দেখছি অসম্ভব জোর
আমরা তাকে অনুসরণ করলাম
হলঘরে নেমে সত্যেন্দ্রনাথ বললেন, বউমা! বাহাদুর ফিরে আসার পাঁচ মিনিট পরে আবার যেন আমাকে আনতে যায়
ওই পাঁচ মিনিটই যথেষ্ট
ছন্দা করিডরের দরজার তালা খুলে দিলেন
বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথকে নিয়ে ঢুকে গেল
আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম
ভাবলাম, ছন্দাকে বলি, নরহরি ভট্টাচার্য কর্নেলকে মিথ্যা করে বলেছিলেন, উনি নাকি পঁয়ত্রিশ বছর এই মন্দিরের সেবাইত
কেন উনি মিথ্যা বলেছিলেন?
কিন্তু কর্নেল দেয়ালে টাঙানো বিষ্ণুমূর্তির ছবি দেখছেন এবং ছন্দা তার কাছে
গিয়ে চুপিচুপি কী যেন বলছেন
তাই কথাটা বলার সুযোগ পেলাম না
বাহাদুর ফিরে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে
বাহাদুর! এবার তোমার কুমারসাহেবকে নিয়ে এস
সত্যেন্দ্রনাথ বাহাদুরের কোলে চেপে এসে বাঁকা হেসে বললেন, নরহরি শুধু চোর নয়, মিথ্যুক
মূর্তি চুরি যায়নি
আসল মূর্তিই আছে
কর্নেলসায়েব! এবার আসুন! গল্প করা যাক
এই বাজে ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কোনও লাভ নেই
বরং এই মজাটা উপভোগ্য-এক বাহাদুর আর এক বাহাদুরকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে
বীরেশ্বর এবং ঝুলির বেড়াল
কুমারবাহাদুরের কাছে বিদায় নিয়ে কর্নেল যখন বেরুলেন, তখন প্রায় সওয়া বারোটা বাজে
ছন্দা আমাদের সঙ্গে হলঘরের দরজা অব্দি এলেন
বললেন, শ্বশুরমশাই বলছেন আসল মূর্তিই আছে
অথচ ভটচাকাকু বলেছিলেন, বিষ্ণুমূর্তি বদলে গেছে
কিছু বুঝতে পারছি না
কর্নেল বললেন, তুমি তো বিয়ের পর থেকে গৃহদেবতাকে প্রণাম করতে যাও! তুমি কি মূর্তির কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করোনি?
ছন্দা একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, অত কিছু লক্ষ্য করিনি
আমি মন্দিরের বারান্দা থেকে প্রণাম করে চলে আসি
কারণ মন্দিরের তালা খোলা এবং বন্ধ করার সময় কারও ওখানে থাকা বারণ
কিছুদিন আগে ভটচাকাকু বিষ্ণুমূর্তির রঙ বদল এবং বুকের কাছে রেখা ফুটে ওঠার কথা বলেছিলেন
তাই ব্যাপারটা দেখার চেষ্টা করেছিলাম
মন্দিরের ভেতর ইলেকট্রিক আলো জ্বালানোর নিয়ম নেই
ভোরে এবং সন্ধ্যায় দুবার পুজোর সময় প্রদীপ জ্বালানো হয়
পরশু আর কাল ভোরে প্রণামের পর বুকের কাছে একটা সূক্ষ্ম রেখা চোখে পড়েছিল
রঙটাও একটু তামাটে দেখাচ্ছিল