content
stringlengths
0
129k
হাজারিলাল মোট উনচল্লিশ লাখ টাকা দিতে চেয়েছে
সত্যেন্দ্রনাথ নড়ে বসলেন
কে বলল আপনাকে? বউমা?
ছন্দা জানে না
তা হলে কে বলল?
আমার সোর্স বলা বারণ
দুঃখিত কুমারবাহাদুর! কর্নেল তার কাঁধের কিটব্যাগটা খুলে দুই ঊরুর ওপর রাখলেন
ফের বললেন, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, যে-বিষ্ণুমূর্তির জন্য হাজারিলাল আপনাকে তিরিশ লাখ টাকা দিতে চেয়েছে, তা সত্যিই মন্দিরে আছে তো?
সত্যেন্দ্রনাথের চোখ জ্বলে উঠল
কেন থাকবে না? কাল আপনারা যখন ছিলেন, তখন আমি দেখে এসেছি
তারপর সন্ধ্যায় আবার বাহাদুরের সাহায্যে মন্দিরে গিয়ে নিজেই পুজো করেছি
আজ ভোরেও-
কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, সেটা আসল না নকল মূর্তি, তা লক্ষ্য করেছেন কি?
কালকের মতো আবার আপনি আসল-নকলের প্রশ্ন তুলছেন
কাল আপনাকে বলেছি, আসল মূর্তিই আছে
আপনার এই হেঁয়ালির উদ্দেশ্য কী
কুমারবাহাদুর!.কাল আপনি মন্দিরে ঢুকে প্রদীপ জ্বেলেছিলেন কি?
না জ্বাললেও আমাদের গৃহদেবতাকে আমি চিনি
দুচোখে পদ্মরাগ মণি বসানো আছে
বাইরের আলোতেও তা ঝকমক করে ওঠে
তাছাড়া কাল সন্ধ্যায় এবং আজ ভোরে প্রদীপ জ্বেলেছিলাম
হাজারিলাল বয়সে তরুণ হলেও দুর্ধর্ষ
ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা সাংঘাতিক দুবৃত্ত
পুলিসও ওকে সমীহ করে চলে
তাই বলছি, মূর্তি যদি নকল হয়, আপনার বিপদ ঘটতে পারে
আমার মেজাজ নষ্ট করে দিচ্ছেন কর্নেলসায়েব! আপনি আমার পুরনো বন্ধু
অন্য কেউ হলে জোরে শ্বাস ছেড়ে সত্যেন্দ্রনাথ ফের বললেন, আমার ব্যাপারে প্লিজ আপনি নাক গলাবেন না
কর্নেল হাসলেন
এ কথা ঠিক যে, নরহরিবাবুকে বিষ্ণুমূর্তি চুরি করানোর জন্যই আপনার ছেলের বন্ধু বীরেশ্বর সেন আপনার গৃহদেবতার সেবাইতপদে সুপারিশ করেছিলেন
কিন্তু ধর্মভয়ে হোক বা আপনার ভয়েই হোক, উনি তা পারছিলেন না
আপনি যখন তা টের পেলেন, তখন সতর্ক হলেন
এবার বলুন, কীভাবে আপনি টের পেয়েছিলেন?
সত্যেন্দ্রনাথ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে কর্নেলের কথা শুনছিলেন
শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, আপনি সব জানেন তা হলে?
কিছু তথ্য থেকেই এটা আমার অনুমান মাত্র
সত্যেন্দ্রনাথ একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, গতমাসে একদিন বিকেলে দোতলার বারান্দায় বসে আছি
হঠাৎ থামের পাশ দিয়ে দেখি, নীচের গেটে দুর্গাদাস নরহরির হাতে কী একটা গুঁজে দিয়ে চলে গেল
সেটা কোমরে ধুতির ভাঁজে খুঁজে নরহরি চলে এল
আমি ওকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না
সন্ধ্যায় ও মন্দিরে পুজো করতে ঢুকল
তখন আমি ওর থাকার ঘর সার্চ করলাম
বীরেশ্বরের এয়ারমেলে পাঠানো একটা চিঠি দেয়ালের একটা তাকে পঞ্জিকার তলায় রেখে দিয়েছে
চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে মাথায় আগুন ধরে গেল
কিন্তু ওকে আমি পারিবারিক প্রথা অনুসারে তালা খোলার সিস্টেম সরল বিশ্বাসে শিখিয়ে দিয়েছিলাম
ওকে পুলিসের হাতে তুলে দিই বা তাড়িয়ে দিই, একই কথা
পুলিসের হাত থেকে একদিন ছাড়া পাবেই
তখন কী হবে?
তালার নাম্বারিং সিস্টেম চেঞ্জ করা যায় না?
তবে আমি চেঞ্জ করতে জানি বলে রটিয়েছি
কেন তা বুঝতেই পারছেন!
বাই দি বাই-জয়রাম শর্মা কি সত্যি নিখোঁজ হয়েছিলেন?
সত্যেন্দ্রনাথ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, আপনি সবই জানেন দেখছি! •
জানার দরকার ছিল
কার স্বার্থে?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, নিজের স্বার্থে
আমার হবির কথা আপনার অজানা নয়
প্লিজ কর্নেল সায়েব! আর এতে নাক গলাবেন না
কিন্তু আপনি টাকার লোভে হাজারিলালকে নকল বিষ্ণুমূর্তিসহ মন্দির বেচে দেবেন না
আপনার মঙ্গলের জন্য বলছি
মোহনপুরে গিয়েও হাজারিলালের হাত থেকে আপনি বাঁচবেন না
দুর্গাপ্রসাদ মোহনপুরের লোক
কিন্তু সে থাকে এখানে
আপনি ভেবেছেন, মোহনপুরে দুর্গাপ্রসাদের ঘাঁটি আছে
কিন্তু যতই ঘাঁটি থাক, অন্তত আপনার নাতনি টিনির কথা চিন্তা করুন
হাজারিলাল সব পারে
সত্যেন্দ্রনাথ গলার ভেতর বললেন, কিন্তু হাজারিলালের মূল উদ্দেশ্য দেবতাসহ মন্দির কেনা
ওর প্রচণ্ড ধর্মবাতিক আছে
এদিকে দুর্গাপ্রসাদের কাছে আমার দু লক্ষ টাকার বেশি দেন
দুর্গাপ্রসাদ বাড়ি কিনতে চাইলে তাকে বেচে দিন
একই প্রব্লেম
হাজারিলাল রেগে যাবে
আমার হয়েছে উভয়সঙ্কট
দুর্গাপ্রসাদ যেমন দুবৃত্ত, হাজারিলালও তা-ই
তাহলে কোনও থার্ড পার্টিকে বেচে দিয়ে কলকাতাতেই কোথাও ফ্ল্যাট কিনে চলে যান
বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন
তারপর পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ ঘুরলেন
শুনলাম কাল আপনি এক আছাড়ে একটা বেড়াল মেরেছেন
বেড়ালের নাকি নটা প্রাণ! এক আছাড়ে বেড়াল মারা কম কথা নয়
সত্যেন্দ্রনাথ বালকের মতো গর্জন করলেন, কী বলতে চান আপনি?
কর্নেল আস্তে বললেন, বলতে চাই, পূর্বপুরুষের জমিদারি রক্ত আপনার শরীরে আছে
কথাটা বলেই কর্নেল দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন
আমিও ওঁকে অনুসরণে দেরি করলাম না
মনে হচ্ছিল, পিঠে জমিদারি শ্বাসপ্রশ্বাসের গরম ঝাঁপটা এসে লাগছে
ই এম বাইপাসের মোড়ে কর্নেল কালকের মতোই নেমে গেলেন
আমার মনে অনেক প্রশ্ন থেকে গেল
কিন্তু তখন কিছু করার ছিল না
সেদিন সন্ধ্যার পর সত্যসেবক পত্রিকার অফিস থেকে কর্নেলকে ফোন করলাম
ষষ্ঠীচরণ সাড়া দিয়ে বলল, বাবামশাই বেইরেছেন
বলে গেছেন, কখন ফিরবেন কিছু ঠিক নেই
কর্নেলের সাড়া পেলাম টেলিফোনে পরদিন সকালে
মর্নিং ডার্লিং! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে
বললাম, মর্নি ওল্ড বস! মোটেও হয়নি
চিচিং ফাঁকের ব্যাপারটা
ওঃ কর্নেল!
এখানেই তোমার বেকেরফাস্টোর নেমন্তন্ন
টেলিফোন রেখে ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছুতে পৌনে নটা বেজে গেল
বৃদ্ধ রহস্যভেদী ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন
বললেন, আজ কেউ আসছে না
কাজেই নটায় ব্রেকফাস্ট করা যাবে