id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
1133
জীবনানন্দ দাশ
বুনো হাঁস
প্রকৃতিমূলক
পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে- জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহবানে বুনো হাঁস পাখা মেলে- শাঁই শাঁই শব্দ শুনি তার; এক-দুই-তিন- চার-অজস্র-অপার- রাত্রির কিনার দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া এঞ্জিনের মতো শব্দে; ছুটিতেছে-ছুটিতেছে তারা। তারপর পড়ে থাকে, নক্ষত্রের বিশাল আকাশ, হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ-দু-একটা কল্পনার হাঁস; মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা স্যানালের মুখ; উড়ুক উড়ুক তারা পউষের জ্যোৎস্নায় নীরবে উড়ুক কল্পনার হাঁস সব — পৃথিবীর সব ধ্বনি সব রঙ মুছে গেল পর উড়ুক উড়ুক তারা হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোৎস্নার ভিতর ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/946
5884
সুফিয়া কামাল
মিটাতে জঠর ক্ষুধা
মানবতাবাদী
অন্তর তৃষা মিটাতে এনেছে মমতার মধু-সুধা? রিক্তের প্রাণ ভরিবে কি আজ পুণ্যের আশ্বাসে? অবহেলিতেরে ডেকে নেবে ঘরে, তাদের দীর্ঘশ্বাসে। ব্যথিত মনের সম বেদনায় দূর করি দিয়ে প্রাণ জুড়াবে, শুনাবে ভরসায় ভরা আগামী দিনের গান? হে কাফেলা! তুমি চল পাঁওদল কাঁধেতে মিলায়ে কাঁধ, পথে পথে আজ চলিছে যাহারা তাহাদের সংবাদ লও, শোনো ঘরে কার আজও আছে অনাহার, তবুও ভিক্ষা মাগিতে এ পথে বাহির হবে না আর। কত সে মাতার সন্তান আজও রহিয়াছে কারাগারে- শোন ফরিয়াদ, মাথা কুটে বারে বারে পাষাণ প্রাচীর ভাঙ্গিতে পারেনি যারা ঈদের খুশী কি ঘরে আনিয়াছে তারা? তাদের অশ্রু মুছাতে তোমরা যাত্রীরা কর পণ, আজকে দিনের শপথ রহুক বেদনায় ভরা মন। উৎসব তোলো সার্থক করে তাহাদের আঁখিজল মুছায়ে, আবার আগামী দিনেতে মেলি আনন্দ দল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/304
3928
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সময় চলেই যায়
হাস্যরসাত্মক
“সময় চ’লেই যায়’ নিত্য এ নালিশে উদ্‌বেগে ছিল ভুপু মাথা রেখে বালিশে। কব্‌জির ঘড়িটার উপরেই সন্দ, একদম করে দিল দম তার বন্ধ– সময় নড়ে না আর, হাতে বাঁধা খালি সে, ভুপুরাম অবিরাম- বিশ্রাম-শালী সে। ঝাঁ-ঝাঁ করে রোদ্‌দুর, তবু ভোর পাঁচটায় ঘড়ি করে ইঙ্গিত ডালাটার কাঁচটায়– রাত বুঝি ঝক্‌ঝকে কুঁড়েমির পালিশে। বিছানায় প’ড়ে তাই দেয় হাততালি সে।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/somoy-chole-jay/
2259
মহাদেব সাহা
লিরিকগুচ্ছ - ২৩
প্রেমমূলক
কী অর্থ ধারণ করো তুমি কোন অর্থবহ, আমি তো বুঝেছি মাত্র তুমি অর্থ অনন্ত বিরহ!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1396
4899
শামসুর রাহমান
নির্জন তরণী
চিন্তামূলক
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চিরচেনা নদীটির তীরে এসে দেখি জনহীন ঘাট, হা কপাল, একটিও নৌকা নেই। বুকের ভেতর হু হু হাওয়া বয়ে যেতে থাকে, ব্যগ্র দৃষ্টি ঢেউদের ব্যাকুলতা করে পাঠ।আমি তো ভেবেছিলাম, রঙিলা নায়ের মাঝি হাত নেড়ে গলা ছেড়ে ডেকে নেবে আমাকে নৌকায় তার, আমি হাসি মুখে যাব সেই দিকে আর বসব বাদামি পাঠাতনে।নদীতীরে নৈঃসঙ্গের হাত ধরে চলে পায়চারি কিছুক্ষণ, অকস্মাৎ আমার আপনকার মাথার ভেতর মসৃণ প্রবেশ করি-সে এক বেগানা আশ্চর্য জগৎ বটে, নানাবিধ পাখি ওড়ে রঙধনুময় ঠিকানায়।বেলা ক্লান্ত হয়ে এলে পর দিগন্তের আবছায়া ভেদ ক’রে ভেসে ওঠে এক তরী, কে জানে কীসের টানে ঠিক নদীতীর অভিমুখে খুব দ্রুত চলে আসে, মাঝি নেই, কেউ নেই, তবু তরী আমন্ত্রণময়!কী এক অপূর্ব ঘোরে উঠে পড়ি তাড়াতাড়ি রঙিলা নায়ের যাত্রী রূপে। অচমকা কারা যেন বেঁধে ফেলে আমার দু’হাতে, হো-হো হেসে ওঠে অন্তরালে, অসহায় আমি’ মন-মাঝি তোর বৈঠা নে রে’ ব’লে সাড়া তুলি নায়ে, গতি পায় নির্জন তরণী।  (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nirjon-toroni/
3391
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাষাণী মা
স্বদেশমূলক
হে ধরণী , জীবের জননী , শুনেছি যে মা তোমায় বলে , তবে কেন তোর কোলে সবে কেঁদে আসে , কেঁদে যায় চলে । তবে কেন তোর কোলে এসে সন্তানের মেটে না পিয়াসা । কেন চায় , কেন কাঁদে সবে , কেন কেঁদে পায় না ভালোবাসা । কেন হেথা পাষাণ - পরান , কেন সবে নীরস নিষ্ঠুর , কেঁদে কেঁদে দুয়ারে যে আসে কেন তারে করে দেয় দূর । কাঁদিয়া যে ফিরে চলে যায় তার তরে কাঁদিস নে কেহ , এই কি মা , জননীর প্রাণ , এই কি মা , জননীর স্নেহ !    (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pashani-ma/
2963
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খাটুলি
ছড়া
একলা হোথায় বসে আছে, কেই বা জানে ওকে-- আপন-ভোলা সহজ তৃপ্তি রয়েছে ওর চোখে। খাটুলিটা বাইরে এনে আঙিনাটার কোণে টানছে তামাক বসে আপন-মনে। মাথার উপর বটের ছায়া, পিছন দিকে নদী বইছে নিরবধি। আয়োজনের বালাই নেইকো ঘরে, আমের কাঠের নড়্‌নড়ে এক তক্তপোষের 'পরে মাঝখানেতে আছে কেবল পাতা বিধবা তার মেয়ের হাতের সেলাই করা কাঁথা। নাতনি গেছে, রাখে তারি পোষা ময়নাটাকে, ছেলের গাঁথা ঘরের দেয়াল, চিহ্ন আছে তারি রঙিন মাটি দিয়ে আঁকা সিপাই সারি সারি। সেই ছেলেটাই তালুকদারের সর্দারি পদ পেয়ে জেলখানাতে মরছে পচে দাঙ্গা করতে যেয়ে। দুঃখ অনেক পেয়েছে ও, হয়তো ডুবছে দেনায়, হয়তো ক্ষতি হয়ে গেছে তিসির বেচাকেনায়। বাইরে দারিদ্র্যের কাটা-ছেঁড়ার আঁচড় লাগে ঢের, তবুও তার ভিতর-মনে দাগ পড়ে না বেশি, প্রাণটা যেমন কঠিন তেমনি কঠিন মাংসপেশী। হয়তো গোরু বেচতে হবে মেয়ের বিয়ের দায়ে, মাসে দুবার ম্যালেরিয়া কাঁপন লাগায় গায়ে, ডাগর ছেলে চাকরি করতে গঙ্গাপারের-দেশে হয়তো হঠাৎ মারা গেছে ঐ বছরের শেষে-- শুকনো করুণ চক্ষু দুটো তুলে উপর-পানে কার খেলা এই দুঃখসুখের, কী ভাবলে সেই জানে। বিচ্ছেদ নেই খাটুনিতে, শোকের পায় না ফাঁক, ভাবতে পারে স্পষ্ট ক'রে নেইকো এমন বাক্‌। জমিদারের কাছারিতে নালিশ করতে এসে কী বলবে যে কেমন ক'রে পায় না ভেবে শেষে।খাটুলিতে এসে বসে যখনি পায় ছুটি, ভাব্‌নাগুলো ধোঁয়ায় মেলায়, ধোঁয়ায় ওঠে ফুটি। ওর যে আছে খোলা আকাশ, ওর যে মাথার কাছে শিষ দিয়ে যায় বুলবুলিরা আলোছায়ার নাচে, নদীর ধারে মেঠো পথে টাট্টু চলে ছুটে, চক্ষু ভোলায় খেতের ফসল রঙের হরির-লুটে-- জন্মমরণ ব্যেপে আছে এরা প্রাণের ধন অতি সহজ ব'লেই তাহা জানে না ওর মন।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khatule/
60
আবিদ আনোয়ার
আমি কার খালু
চিন্তামূলক
ধীরে ধীরে হাট ভাঙছে, অন্ধকার টেনে ধরছে দিগন্তের ফিকে লালসালু-- ডেকেছি বিস্তর তবু কেউ এসে বলে নাই আমি কার খালু!উল্লোল বাজারি শব্দে ডুবে গেছে হার্দ্য এই ডাক, বিপণি বিতান থেকে মাছের মহাল, মায় অন্ধগলি ঘুরেছি বেবাক; কানফাটা শোরগোলেও কেউ কিছু ভোলে নাই কার কী ভূমিকা: লাভ বুঝে দর হাঁকে বিক্রেতারা, ক্রেতা কেনে দেখে দেখে ফর্দে কী কী লিখা। দুরস্ত সাহেব-সুবো, মলিন ভিখিরি থেকে উলঙ্গ টোকাই এ-হাটে সবাই ব্যস্ত--আমি শুধু দিগ্ভ্রান্ত কিছু মনে নাই কী করতে এসেছি আর হারিয়েছি কাকে নাকি নিজেকেই খুঁজি! ছিলো কি আমার কোনো ঠিকানা ও নিজস্ব ঠিকুজি?জানিও না এই হাটে কে আছেন এমন দয়ালু আমাকে যাবার আগে ঠিকঠাক বলে দেবে আমি কার খালু!
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/ami-kar-khalu/
3260
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দ্বার খোলা ছিল মনে
চিন্তামূলক
দ্বার খোলা ছিল মনে, অসর্তকে সেথা অকস্মাৎ লেগেছিল কী লাগিয়া কোথা হতে দুঃখের আঘাত; সে লজ্জায় খুলে গেল মর্মতলে প্রচ্ছন্ন যে বল জীবনের নিহিত সম্বল। ঊর্ধ্ব হতে জয়ধ্বনি অন্তরে দিগন্তপথে নামিল তখনি, আনন্দের বিচ্ছুরিত আলো মুহূর্তে আঁধার-মেঘ দীর্ণ করি হৃদয়ে ছড়ালো। ক্ষুদ্র কোটরের অসম্মান লুপ্ত হল, নিখিলের আসনে দেখিনু নিজ স্থান, আনন্দে আনন্দময় চিত্ত মোর করি নিল জয়, উৎসবের পথ চিনে নিল মুক্তিক্ষেত্রে সগৌরবে আপন জগৎ। দুঃখ-হানা গ্লানি যত আছে, ছায়া সে, মিলালো তার কাছে।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dar-khola-chilo-mone/
2207
মহাদেব সাহা
ফ্লাড
মানবতাবাদী
সীতা, তুমি এখন কলকাতায় বসে বসে আমাদের বন্যার খবর পড়ছো প্রতিদিন খবরের কগজের পাতায় দেখছো সেইসব প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতায় দেখছো সেইসব বন্যাদুর্গত মানুষের দুঃস্থ ফটোগ্রাফ বন্যায় যাদের ঘরদোর ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতি যাদের সাথে করছে ভীষণ শত্রুতা জলদস্যুদের মতো বন্যা এসে যাদের ঘরে অকস্মাৎ হানা দিচ্ছে লুটে নিচ্ছে ঘরের আসবাব, ভাঙা বেঞ্চ, পৈতৃক পিঁড়ি, পুরনো আমলের খাতাপত্র, বন্যায় ভেসে যাচ্ছে বড়ো বড়ো কাঠের গুঁড়ি, চালাঘর, ভেড়ে পড়ছে ভীষণ জলের তোড়ে কড়িবর্গা, ভেসে যাচ্ছে শিশুর খেলনা হাতি, বুড়োদের সারাদিন বসে থাকার হাতলভাঙা মলিন চেয়ার। বন্যায় ধসে পড়ছে গ্রামের পোস্টাপিস, স্কুলঘর, মানুষের সাজানো সংসার এই ভয়ঙ্কর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে বাংলার ভবিষ্যৎ নিঃস্ব বাংলা আজ কোথায় দাঁড়াবে তার কিছুই জানে না, এমন সময় হয়তো একদল সমাজকর্মী এসে তাদের লাল সালুতে লেখা কোনো এক ত্রাণশিবিরে নিয়ে যাবে দুর্গত বাংলা আজ আশ্রয়শিবিরে করবে সারারাত অজ্ঞাতবাস; গতকাল আমরা যখন পল্টন থেকে ফিরছিলাম কয়েকজন তরুণ আমাদের দিকে এগেয়ে এসে তাদের চাঁদা তোলার কাপড়খানা মেলে ধরেছিলো আমার সঙ্গী ওদের হতে দিয়েছিলো একটি আধুলি আমার পকেটে কোনো পয়সা ছিলো না আমি তইি ওদের দলে মিশে গিয়েছিলাম। সীতা, সেবার তুমি ছিলে পূর্ববাংলার এক মফস্বল শহরে সে-বছর ভীষণ বন্যার খবর দিয়ে তার পাঠিয়েছিলো ইদ্রিস বন্যায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অসংখ্য পরিবার তোমার বোধহয় মনে আছে সীতা, দুর্গাদা তখণ সদ্য জেল থেকে বেরিয়েছে আমরা শহরে কতো বড়ো ভিক্ষা মিছিল বের করেছিলাম তোমার হতে ছিলো সেই লাল ব্যানারেরা একটা অংশ সে-মিছিল ছিলো এই বন্যার বিসতৃতির চেয়ে অনেক বড়ো বন্যা সেদিন আমাদের সীমানা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সীতা, আজো তো তোমাদের বিহারে বন্যা তুমি কি সেদিনের মতোই আজো মিছিলে নেমেছো কলকাতার রাস্তায় তাই ঢাকাতেও বেরিয়েছে এতো বড়ো মিছিল; সীতা, এই ভয়ঙ্কর বন্যায় আমাদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, উল্টে গেরেছ টেলিগ্রাফের তারসুদ্ধ খুঁটি রেললাইন, মালভর্তি ওয়াগন পড়ে আছে স্টেশনে তবু আমার মনে হয় এই বন্যা বড়িয়ে দিয়েছে আমাদের সীমানা স্তলভাগের চেয়ে জলের দূরত্ব বোধ হয় অনেক কম জলের ওপর দিয়ে মানুষের কন্ঠ অনেক দূর যায় কিংবা দুর্যোগে দুর্বিপাকে মানুষে মানুষে কোনো ব্যবধান থাকে না খুলে পড়ে টুকরো টুকরো মানুষের অন্তর্গত অসংখ্য লেবাস তাই আমি যখন ঢাকার রাজপথে বন্যাত্রাণ মিছিলের পাশাপাশি তুমি তখন কলকাতার রাস্তায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1473
1939
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
অধঃপতন সঙ্গীত
ব্যঙ্গাত্মক
১ বাগানে যাবি রে ভাই?      চল সবে মিলে যাই, যথা হর্ম্ম্য সুশোভন,  সরোবরতীরে। যথা ফুটে পাঁতি পাঁতি,      গোলাব মল্লিকা জাতি, বিগ্নোনিয়া লতা দোলে মৃদুল সমীরে || নারিকেল বৃক্ষরাজি,         চাঁদের কিরণে সাজি, নাচিছে দোলায় মাথা ঠমকে ঠমকে। চন্দ্রকরলেখা তাহে, বিজলি চমকে || ২ চল যথা কুঞ্জবনে,         নাচিবে নাগরী গণে, রাঙ্গা সাজ পেসোয়াজ, পরশিবে অঙ্গে। তম্বুরা তবলা চাটি,       আবেশে কাঁপিবে মাটি, সারঙ্গ তরঙ্গ তুলি, সুর দিবে সঙ্গে || খিনি খিনি খিনি খিনি, ঝিনিক ঝিনিক ঝিনি তাধ্রিম্ তাধ্রিম্ তেরে গাও না বাজনা! চমকে চাহনি চারু, ঝলকে গহনা || ৩ ঘরে আছে পদ্মমুখী          কভু না করিল সুখী, শুধু ভাল বাসা নিয়ে, কি হবে সংসারে। নাহি জানে নৃত্যগীত,         ইয়ার্‌কিতে নাহি চিত, একা বসি ভাল বাসা ভাল লাগে কারে? গৃহকর্ম্মে রাখে মন,            হিত ভাবে অনুক্ষণ, সে বিনা দুঃখের দিনে অন্য গতি নাই! এ হেন সুখের দিনে, তারে নাহি চাই || ৪ আছে ধন গৃহপূর্ণ,                যৌবন যাইবে তূর্ণ, যদি না ভুঞ্জিনু সুখ, কি কাজ জীবনে? ঠুসে মদ্য লও সাতে,            যেন না ফুরায় রাতে, সুখের নিশান গাঢ় প্রমোদভবনে। খাদ্য লও বাছা বাছা,           দাড়ি দেখে লও চাচা, চপ্ সুপ কারি কোর্ম্মা, করিবে বিচিত্র। বাঙ্গালির দেহ রত্ন,                ইহাতে করিও যত্ন, সহস্র পাদুকা স্পর্শে, হয়েছে পবিত্র। পেটে খায়, পিঠে সয়, আমার চরিত্র || ৫ বন্দে মাতা সুরধুনি,             কাগজে মহিমা শুনি, বোতলবাহিনি পুণ্যে একশ নন্দিনি! করি ঢক ঢক নাদ,               পূরাও ভকতসাধ, লোহিত বরণি বামা,    তারেতে বন্দিনি! প্রণমামি মহানীরে,               ছিপির কিরীটি শিরে, উঠ শিরে ধীরে ধীরে যকৃৎজননি! তোমার কৃপার জন্য,            যেই পড়ে সেই ধন্য শয্যায় পতিত রাখ, পতিতপাবনি! বাক্‌স বাহনে চল, ডজন ডজনি || ৬ কি ছার সংসারে আছি,          বিষয় অরণ্যে মাছি, মিছা করি ভন্‌ভন্ চাকরি কাঁটালে। মারে জুতা সই সুখে,             লম্বা কথা বলি মুখে, উচ্চ করি ঘুষ তুলি দেখিলে কাঙ্গালে || শিখিয়াছি লেখা পড়া,          ঠাণ্ডা দেখে হই কড়া, কথা কই চড়া চড়া, ভিখারি ফকিরে। দেখ ভাই রোখ কত, বাঙ্গালি শরীরে! ৭ পূর পাত্র মদ্য ঢালি,                  দাও সবে করতালি, কেন তুমি দাও গালি, কি দোষ আমার? দেশের মঙ্গল চাও?                 কিসে তার ত্রুটি পাও? লেক্‌চারে কাগজে বলি, কর দেশোদ্ধার || ইংরেজের নিন্দা করি,            আইনের দোষ ধরি, সম্বাদ পত্রিকা পড়ি, লিখি কভু তায়। আর কি করিব বল স্বদেশের দায়? ৮ করেছি ডিউটির কাজ,       বাজা ভাই পাখোয়াজ, কামিনি, গোলাপি  সাজ, ভাসি আজ রঙ্গে। গেলাস পূরে দে মদে, দে দে দে আরো আরো দে, দে দে এরে দে ওরে দে, ছড়ি দে সারঙ্গে। কোথায় ফুলের মালা,আইস্ দে না? ভাল জ্বালা, “বংশী বাজায় চিকণ কালা?” সুর দাও সঙ্গে। ইন্দ্র স্বর্গে খায় সুধা,           স্বর্গ ছাড়া কি বসুধা? কত স্বর্গ বাঙ্গালায় মদের তরঙ্গে। টলমল বসুন্ধরা ভবানী ভ্রূভঙ্গে || ৯ যে ভাবে দেহের হিত,        না বুঝি তাহার চিত, আত্মহিত ছেড়ে কেবা, পরহিতে চলে? না জানি দেশ বা কার?    দেশে কার উপকার? আমার কি লাভ বল,  দেশ ভাল হলে? আপনার হিত করি,          এত শক্তি নাহি ধরি, দেশহিত করিব কি, একা ক্ষুদ্র প্রাণী। ঢাল মদ! তামাক দে! লাও ব্রাণ্ডি পানি || ১০ মনুষ্যত্ব? কাকে বলে?         স্পিচ দিই টোনহলে, লোকে আসে দলে দলে, শুনে পায় প্রীত। নাটক নবেল কত,             লিখিয়াছে শত শত, এ কি নয় মনুষ্যত্ব? নয় দেশহিত? ইংরেজি বাঙ্গালা ফেঁদে,  পলিটিক্‌‌স লিখি কেঁদে, পদ্য লিখি নানা ছাঁদে,  বেচি সস্তা দরে। অশিষ্টে অথবা শিষ্টে,            গালি দিই অষ্টে পৃষ্ঠে, তবু বল দেশহিত কিছু নাহি করে? নিপাত যাউক দেশ! দেখি বসে ঘরে || ১১ হাঁ! চামেলি ফুলিচম্পা!         মধুর অধর কম্পা! হাম্বীর কেদার ছায়ানট সুমধুর‌! হুক্কা না দুরস্ত বোলে?  শের মে ফুল না ডোলে! পিয়ালা ভর দে মুঝে! রঙ্ ভরপুর! সুপ্ চপ কটলেট,               আন বাবা প্লেট প্লেট, কুক্ বেটা ফাষ্টরেট,  যত পার খাও! মাথামুণ্ড পেটে দিয়ে,           পড় বাপু জমি নিয়ে, জনমি বাঙ্গালিকুলে, সুখ কর্যেও যাও। পতিতপাবনি সুরে, পতিতে তরাও || ১২ যাব ভাই অধঃপাতে,        কে যাইবি আয় সাতে, কি কাজ বাঙ্গালি নাম,  রেখে ভূমণ্ডলে? লেখাপড়া ভস্ম ছাই,         কে কবে শিখিছে ভাই লইয়া বাঙ্গালি দেহ, এই বঙ্গস্থলে? হংসপুচ্ছ লয়ে করে,         কেরাণির কাজ করে, মুন্সেফ চাপরাশি আর ডিপুটী পিয়াদা। অথবা স্বাধীন হয়ে,           ওকালতি পাশ লয়ে, খোশামুদি জুয়াচুরি, শিখিছে জিয়াদা! সার কথা বলি ভাই,         বাঙ্গালিতে কাজ নাই, কি কাজ সাধিব মোরা, এ সংসারে থাকি, মনোবৃত্তি আছে যাহা,          ইন্দ্রিয় সাগরে তাহা বিসর্জ্জন করিয়াছি, কিবা আছে বাকি? কেহ দেহভার বয়ে, যমে দাও ফাঁকি? ১৩ ধর তবে গ্লাস আঁটি,            জ্বলন্ত বিষের বাটি শুন তবলার চাঁটি, বাজে খন্ খন্। নাচে বিবি নানা ছন্দ,           সুন্দর খামিরা গন্ধ, গম্ভীর জীমূতমন্দ্র হুঁকার গর্জ্জন || সেজে এসো সবে ভাই,          চল অধঃপাতে যাই, অধম বাঙ্গালি হতে, হবে কোন কাজ? ধরিতে মনুষ্যদেহ, নাহি করে লাজ? ১৪ মর্কটের অবতার,                   রূপগুণ সব তার বাঙ্গালির অধিকার, বাঙ্গালি ভূষণ! হা ধরণি, কোন্ পাপে,            কোন্ বিধাতার শাপে হেন পুত্রগণ গর্ব্ভে, করিলে ধারণ? বঙ্গদেশ ডুবাবারে,              মেঘে কিম্বা পারাবারে, ছিল না কি জলরাশি? কে শোষিল নীরে? আপনা ধ্বংসিতে রাগে         কতই শকতি লাগে? নাহি কি শকতি তত বাঙ্গালি শরীরে? কেন আর জ্বলে আলো বঙ্গের মন্দিরে? ১৫ মরিবে না? এসো তবে,        উন্নতি সাধিয়া সবে, লভি নাম পৃথিবীতে, পিতৃ সমতুল! ছাড়ি দেহ খেলা ধূলা,         ভাঙ বাদ্যভাণ্ডগুলা মারি খেদাইয়া দাও, নর্ত্তকীর কুল। মারিয়া লাঠির বাড়ি,         বোতল ভাঙ্গহ পাড়ি, বাগান ভাঙ্গিয়া ফেল পুকুরের তলে। সুখ নামে দিয়ে ছাই,         দুঃখ সার কর ভাই, কভু না মুছিবে কেহ, নয়নের জলে, যত দিন বাঙ্গালিকে লোকে ছি ছি বলে ||
https://banglarkobita.com/poem/famous/937
5891
সুবোধ সরকার
কী বললেন, বিশ্বায়ন_
মানবতাবাদী
আমি আমেরিকায় গিয়ে শুনে এলাম লোকে ওখানেও বলছে: দিনকাল যা পড়েছে তুমি তোমার খাবারের কাছে ঠিক সময়ে পৌঁছতে না পারলে অন্য একজন পৌঁছে যাবে। আরে, এ তো আমাদের দেশে গরিব লোকেরা করত। এখন বছরে তিনবার ধান হয় বলে একজন ভিখিরি, একজন পাগলের খাবার কেড়ে নেওয়ার আগে দুবার ভাবে। তবে গতকাল শুনলাম মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করতেন অংশুমান রায় কী ভাল, তার অফিস তাকে সপরিবারে মরিশাস পাঠাল বেড়াতে। দশদিন বাদে ফিরে এসে দেখল তার চেয়ারে বসে আছে তার থেকে একটু ফর্সা তার থেকে একটু লম্বা তার চেয়ে একটু ঘন চুল অন্য এক অংশুমান রায়।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4183.html
5994
হুমায়ুন আজাদ
সেই কবে থেকে
প্রেমমূলক
সেই কবে থেকে জ্বলছি জ্ব’লে জ্ব’লে নিভে গেছি ব’লে তুমি দেখতে পাও নি ।সেই কবে থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতিস্তম্ভের মতো ভেঙে পড়েছি ব’লে তুমি লক্ষ্য করো নি ।সেই কবে থেকে ডাকছি ডাকতে ডাকতে স্বরতন্ত্রি ছিঁড়ে বোবা হয়ে গেছি ব’লে তুমি শুনতে পাও নি ‘।সেই কবে থেকে ফুটে আছি ফুটে ফুটে শাখা থেকে ঝ’রে গেছি ব’লে তুমি কখনো তোলো নি ।সেই কবে থেকে তাকিয়ে রয়েছি তাকিয়ে তাকিয়ে অন্ধ হয়ে গেছি ব’লে একবারো তোমাকে দেখি নি ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%9c/
3472
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফসল কাটা হলে সারা মাঠ হয়ে যায় ফাঁক
রূপক
ফসল কাটা হলে সারা মাঠ হয়ে যায় ফাঁক; অনাদরের শস্য গজায়, তুচ্ছ দামের শাক। আঁচল ভরে তুলতে আসে গরিব-ঘরের মেয়ে, খুশি হয়ে বাড়িতে যায়, যা জোটে তাই পেয়ে। আজকে আমার চাষ চলে না, নাই লাঙলের বালাই; পোড়ো মাঠের কুঁড়েমিতে মন্থর দিন চালাই। জমিতে রস কিছু আছে, শক্ত যায় নি আঁটি; ফলায় না সে ফল তবুও সবুজ রাখে মাটি। শ্রাবণ আমার গেছে চলে, নাই বাদলের ধারা; অঘ্রান সে সোনার ধানের দিন করেছে সারা। চৈত্র আমার রোদে পোড়া, শুকনো যখন নদী, বুনো ফলের ঝোপের তলায় ছায়া বিছায় যদি, জানব আমার শেষের মাসে ভাগ্য দেয় নি ফাঁকি, শ্যামল ধরার সঙ্গে আমার বাঁধন রইল বাকি।  (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/fosol-kata-hole-sara-math-hoye-jai-fak/
2814
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এক পরিণাম
নীতিমূলক
শেফালি কহিল, আমি ঝরিলাম, তারা! তারা কহে, আমারো তো হল কাজ সারা— ভরিলাম রজনীর বিদায়ের ডালি আকাশের তারা আর বনের শেফালি।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ek-porinam/
5248
শামসুর রাহমান
শ্লোগান
চিন্তামূলক
হৃদয়ে আমার সাগর দোলার ছন্দ চাই অশুভের সাথে আপোসবিহীন দ্বন্দ্ব চাই। এখনো জীবনে মোহন মহান স্বপ্ন চাই দয়িতাকে ভালোবাসার মতোন লগ্ন চাই। কবিতায় আমি তারার মতোন শব্দ চাই, শান্তি এবং কল্যাণময় অব্দ চাই। মল্লিকা আর শেফালির সাথে চুক্তি চাই, সর্বপ্রকার কারাগার থেকে মুক্তি চাই। মুক্তি চাই, মুক্তি চাই।   (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shlogan/
3498
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (অষ্টম সর্গ)
কাহিনীকাব্য
বিসর্জনআজিও পড়িছে ওই সেই সে নির্ঝর! হিমাদ্রির বুকে বুকে শৃঙ্গে শৃঙ্গে ছুটে সুখে, সরসীর বুকে পড়ে ঝর ঝর ঝর।আজিও সে শৈলবালা বিস্তারিয়া ঊর্ম্মিমালা, চলিছে কত কি কহি আপনার মনে! তুষারশীতল বায় পুষ্প চুমি চুমি যায়, খেলা করে মনোসুখে তটিনীর সনে।কুটীর তটিনীতীরে লতারে ধরিয়া শিরে মুখছায়া দেখিতেছে সলিলদর্পণে! হরিণেরা তরুছায়ে খেলিতেছে গায়ে গায়ে, চমকি হেরিছে দিক পাদপকম্পনে।বনের পাদপপত্র আজিও মানবনেত্র হিংসার অনলময় করে নি লোকন! কুসুম লইয়া লতা প্রণত করিয়া মাথা মানবেরে উপহার দেয় নি কখন!বনের হরিণগণে মানবের শরাসনে ছুটে ছুটে ভ্রমে নাই তরাসে তরাসে! কানন ঘুমায় সুখে নীরব শান্তির বুকে, কলঙ্কিত নাহি হোয়ে মানবনিশ্বাসে।কমলা বসিয়া আছে উদাসিনী বেশে শৈলতটিনীর তীরে এলোথেলো কেশে অধরে সঁপিয়া কর, অশ্রু বিন্দু ঝর ঝর ঝরিছে কপোলদেশে— মুছিছে আঁচলে। সম্বোধিয়া তটিনীরে ধীরে ধীরে বলে, ‘তটিনী বহিয়া যাও আপনার মনে! কিন্তু সেই ছেলেবেলা যেমন করিতে খেলা তেমনি করিয়ে খেলো নির্ঝরের সনে!তখন যেমন স্বরে কল কল গান করে মৃদু বেগে তীরে আসি পড়িতে লো ঝাঁপি বালিকা ক্রীড়ার ছলে পাথর ফেলিয়া জলে মারিতাম— জলরাশি উঠিত লো কাঁপিতেমনি খেলিয়ে চল্‌ তুই লো তটিনীজল! তেমনি বিতরি সুখ নয়নে আমার। নির্ঝর তেমনি কোরে ঝাঁপিয়া সরসী-পরে পড়্‌ লো উগরি শুভ্র ফেনরাশিভার!মুছিতে লো অশ্রুবারি এয়েছি হেথায়। তাই বলি পাপিয়ারে! গান কর্ সুধাধারে নিবাইয়া হৃদয়ের অনলশিখায়!ছেলেবেলাকার মত বায়ু তুই অবিরত লতার কুসুমরাশি কর্ লো কম্পিত! নদী চল্‌ দুলে দুলে! পুষ্প দে হৃদয় খুলে! নির্ঝর সরসীবক্ষ কর্ বিচলিত!সেদিন আসিবে আর হৃদিমাঝে যাতনার রেখা নাই, প্রমোদেই পূরিত অন্তর! ছুটাছুটি করি বনে বেড়াইব ফুল্লমনে, প্রভাতে অরুণোদয়ে উঠিব শিখর!মালা গাঁথি ফুলে ফুলে জড়াইব এলোচুলে, জড়ায়ে ধরিব গিয়ে হরিণের গল! বড় বড় দুটি আঁখি মোর মুখপানে রাখি এক দৃষ্টে চেয়ে রবে হরিণ বিহ্বল!সেদিন গিয়েছে হা রে— বেড়াই নদীর ধারে ছায়াকুঞ্জে শুনি গিয়ে শুকদের গান! না থাক্‌, হেথায় বসি, কি হবে কাননে পশি— শুক আর গাবে নাকো খুলিয়ে পরাণ! সেও যে গো ধরিয়াছে বিষাদের তান!জুড়ায়ে হৃদয়ব্যথা দুলিবে না পুষ্পলতা, তেমন জীবন্ত ভাবে বহিবে না বায়! প্রাণহীন যেন সবি— যেন রে নীরব ছবি— প্রাণ হারাইয়া যেন নদী বহে যায়!তবুও যাহাতে হোক্‌ নিবাতে হইবে শোক, তবুও মুছিতে হবে নয়নের জল! তবুও ত আপনারে ভুলিতে হইবে হা রে! তবুও নিবাতে হবে হৃদয়-অনল!যাই তবে বনে বনে ভ্রমিগে আপনমনে, যাই তবে গাছে গাছে ঢালি দিই জল! শুকপাখীদের গান শুনিয়া জুড়াই প্রাণ, সরসী হইতে তবে তুলিগে কমল!হৃদয় নাচে না ত গো তেমন উল্লাসে! ভ্রমিত ভ্রমিই বনে ম্রিয়মাণ শূন্যমনে, দেখি ত দেখিই বোসে সলিল-উচ্ছ্বাসে! তেমন জীবন্ত ভাব নাই ত অন্তরে— দেখিয়া লতার কোলে ফুটন্ত কুসুম দোলে, কুঁড়ি লুকাইয়া আছে পাতার ভিতবে—নির্ঝরের ঝরঝরে হৃদয়ে তেমন কোরে উল্লাসে শোণিতরাশি উঠে না নাচিয়া! কি জানি কি করিতেছি, কি জানি কি ভাবিতেছি, কি জানি কেমনধারা শূন্যপ্রায় হিয়া!তবুও যাহাতে হোক্‌ নিবাতে হইবে শোক, তবুও মুছিতে হবে নয়নের জল। তবুও ত আপনারে ভুলিতে হইবে হা রে, তবুও নিবাতে হবে হৃদয়-অনল!কাননে পশিগে তবে শুক যেথা সুধারবে গান করে জাগাইয়া নীরব কানন। উঁচু করি করি মাথা হরিণেরা বৃক্ষপাতা সুধীরে নিঃশঙ্কমনে করিছে চর্ব্বণ!’সুন্দরী এতেক বলি পশিল কাননস্থলী, পাদপ রৌদ্রের তাপ করিছে বারণ। বৃক্ষছায়ে তলে তলে ধীরে ধীরে নদী চলে সলিলে বৃক্ষের মূল করি প্রক্ষালন।হরিণ নিঃশঙ্কমনে শুয়ে ছিল ছায়াবনে, পদশব্দ পেয়ে তারা চমকিয়া উঠে। বিস্তারি নয়নদ্বয় মুখপানে চাহি রয়, সহসা সভয় প্রাণে বনান্তরে ছুটে।ছুটিছে হরিণচয়, কমলা অবাক্‌ রয়— নেত্র হতে ধীরে ধীরে ঝরে অশ্রুজল। ওই যায়— ওই যায় হরিণ হরিণী হায়— যায় যায় ছুটে ছুটে মিলি দলে দল।কমলা বিষাদভরে কহিল সমুচ্চস্বরে— প্রতিধ্বনি বন হোতে ছুটে বনান্তরে— ‘যাস্‌ নে— যাস্‌ নে তোরা, আয় ফিরে আয়! কমলা— কমলা সেই ডাকিতেছে তোরে!সেই যে কমলা সেই থাকিত কুটীরে, সেই যে কমলা সেই বেড়াইত বনে! সেই যে কমলা পাতা ছিঁড়ি ধীরে ধীরে হরষে তুলিয়া দিত তোদের আননে!কোথা যাস্‌— কোথা যাস্‌— আয় ফিরে আয়! ডাকিছে তোদের আজি সেই সে কমলা! কারে ভয় করি তোরা যাস্‌ রে কোথায়? আয় হেথা দীর্ঘশৃঙ্গ! আয় লো চপলা!এলি নে— এলি নে তোরা এখনো এলি নে— কমলা ডাকিছে যে রে,তবুও এলি নে! ভুলিয়া গেছিস্‌ তোরা আজি কমলারে? ভুলিয়া গেছিস্‌ তোরা আজি বালিকারে?খুলিয়া ফেলিনু এই কবরীবন্ধন, এখনও ফিরিবি না হরিণের দল? এই দেখ্‌— এই দেখ্‌ ফেলিয়া বসন পরিনু সে পুরাতন গাছের বাকল! যাক্‌ তবে, যাক্‌ চলে— যে যায় যেখানে— শুক পাখী উড়ে যাক্‌ সুদূর বিমানে! আয়— আয়— আয় তুই আয় রে মরণ!বিনাশশক্তিতে তোর নিভা এ যন্ত্রণা! পৃথিবীর সাথে সব ছিঁড়িব বন্ধন! বহিতে অনল হৃদে আর ত পারি না! নীরদ স্বরগে আছে, আছেন জনক স্নেহময়ী মাতা মোর কোল রাখি পাতি— সেথায় মিলিব গিয়া, সেথায় যাইব— ভোর করি জীবনের বিষাদের রাতি! নীরদে আমাতে চড়ি প্রদোষতারায় অস্তগামী তপনেরে করিব বীক্ষণ, মন্দাকিনী তীরে বসি দেখিব ধরায় এত কাল যার কোলে কাটিল জীবন। শুকতারা প্রকাশিবে উষার কপোলে তখন রাখিয়া মাথা নীরদের কোলে— অশ্রুজলসিক্ত হয়ে কব সেই কথা পৃথিবী ছাড়িয়া এনু পেয়ে কোন্‌ ব্যথা!নীরদের আঁখি হোতে ববে অশ্রুজল! মুছিব হরষে আমি তুলিয়া আঁচল! আয়— আয়— আয় তুই, আয় রে মরণ! পৃথিবীর সাথে সব ছিঁড়িব বন্ধন!’এত বলি ধীরে ধীরে উঠিল শিখর! দেখে বালা নেত্র তুলে— চারি দিক গেছে খুলে উপত্যকা, বনভূমি, বিপিন, ভূধর!তটিনীর শুভ্র রেখা— নেত্রপথে দিল দেখা— বৃক্ষছায়া দুলাইয়া বহে বহে যায়!ছোট ছোট গাছপালা— সঙ্কীর্ণ নির্ঝরমালা— সবি যেন দেখা যায় রেখা-রেখা-প্রায়।গেছে খুলে দিগ্বিদিক— নাহি পাওয়া যায় ঠিক কোথা কুঞ্জ— কোথা বন— কোথায় কুটীর! শ্যামল মেঘের মত— হেথা হোথা কত শত দেখায় ঝোপের প্রায় কানন গভীর!তুষাররাশির মাঝে দাঁড়ায়ে সুন্দরী! মাথায় জলদ ঠেকে, চরণে চাহিয়া দেখে গাছপালা ঝোপে-ঝাপে ভূধর আবরি!ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রেখা-রেখা হেথা হোথা যায় দেখাকে কোথা পড়িয়া আছে কে দেখে কোথায়! বন, গিরি, লতা, পাতা আঁধারে মিশায়!অসংখ্য শিখরমালা ব্যাপি চারি ধার— মধ্যের শিখর-পরে (মাথায় আকাশ ধরে) কমলা দাঁড়ায়ে আছে, চৌদিকে তুষার!চৌদিকে শিখরমালা— মাঝেতে কমলা বালা একেলা দাঁড়ায়ে মেলি নয়নযুগল! এলোথেলো কেশপাশ, এলোথেলো বেশবাস, তুষারে লুটায়ে পড়ে বসন-আঁচল!যেন কোন্‌ সুরবালা দেখিতে মর্ত্ত্যের লীলা স্বর্গ হোতে নামি আসি হিমাদ্রিশিখরেচড়িয়া নীরদ-রথে— সমুচ্চ শিখর হোতে দেখিলেন পৃথ্বীতল বিস্মিত অন্তরে!তুষাররাশির মাঝে দাঁড়ায়ে সুন্দরী! হিমময় বায়ু ছুটে, অন্তরে অন্তরে ফুটে হৃদয়ে রুধিরোচ্ছ্বাস স্তব্ধপ্রায় করি! শীতল তুষারদল কোমল চরণতল দিয়াছে অসাড় করে পাষাণের মত! কমলা দাঁড়ায়ে আছে যেন জ্ঞানহত! কোথা স্বর্গ— কোথা মর্ত্ত্য— আকাশ পাতাল! কমলা কি দেখিতেছে! কমলা কি ভাবিতেছে! কমলার হৃদয়েতে ঘোর গোলমাল!চন্দ্র সূর্য্য নাই কিছু— শূন্যময় আগু পিছু! নাই রে কিছুই যেন ভূধর কানন! নাইক শরীর দেহ, জগতে নাইক কেহ— একেলা রয়েছে যেন কমলার মন! কে আছে— কে আছে— আজি কর গো বারণ!বালিকা ত্যজিতে প্রাণ করেছে মনন! বারণ কর গো তুমি গিরি হিমালয়! শুনেছ কি বনদেবী— করুণা-আলয়— বালিকা তোমার কোলে করিত ক্রন্দন, সে নাকি মরিতে আজ করেছে মনন?বনের কুসুমকলি তপনতাপনে জ্বলি শুকায়ে মরিবে নাকি করেছে মনন! শীতল শিশিরধারে জীয়াও জীয়াও তারে বিশুষ্ক হৃদয়মাঝে বিতরি জীবন!উদিল প্রদোষতারা সাঁঝের আঁচলে— এখনি মুদিবে আঁখি? বারণ করিবে না কি? এখনি নীরদকোলে মিশাবে কি বোলে?অনন্ত তুষারমাঝে দাঁড়ায়ে সুন্দরী! মোহস্বপ্ন গেছে ছুটে— হেরিল চমকি উঠে চৌদিকে তুষাররাশি শিখর আবরি!উচ্চ হোতে উচ্চ গিরি জলদে মস্তক ঘিরি দেবতার সিংহাসন করিছে লোকন! বনবালা থাকি থাকি সহসা মুদিল আঁখি কাঁপিয়া উঠিল দেহ! কাঁপি উঠে মন!অনন্ত আকাশমাঝে একেলা কমলা! অনন্ত তুষারমাঝে একেলা কমলা! সমুচ্চ শিখর-পরে একেলা কমলা! আকাশে শিখর উঠে চরণে পৃথিবী লুটে— একেলা শিখর-পরে বালিকা কমলা! ওই— ওই— ধর্‌— ধর্‌— পড়িল বালিকা! ধবলতুষারচ্যুতা পড়িল বিহ্বল!— খসিল পাদপ হোতে কুসুমকলিকা! খসিল আকাশ হোতে তারকা উজ্জ্বল!প্রশান্ত তটিনী চলে কাঁদিয়া কাঁদিয়া! ধরিল বুকের পরে কমলাবালায়! উচ্ছ্বাসে সফেন জল উঠিল নাচিয়া! কমলার দেহ ওই ভেসে ভেসে যায়! কমলার দেহ বহে সলিল-উচ্ছ্বাস! কমলার জীবনের হোলো অবসান! ফুরাইল কমলার দুখের নিঃশ্বাস, জুড়াইল কমলার তাপিত পরাণ! কল্পনা! বিষাদে দুখে গাইনু সে গান! কমলার জীবনের হোলো অবসান! দীপালোক নিভাইল প্রচণ্ড পবন! কমলার— প্রতিমার হল বিসর্জ্জন! আকাশে শিখর উঠে চরণে পৃথিবী লুটে— একেলা শিখর-পরে বালিকা কমলা! ওই— ওই— ধর্ ‌— ধর্ ‌— পড়িল বালিকা! ধবলতুষারচ্যুতা পড়িল বিহ্বল!— খসিল পাদপ হোতে কুসুমকলিকা! খসিল আকাশ হোতে তারকা উজ্জ্বল!প্রশান্ত তটিনী চলে কাঁদিয়া কাঁদিয়া! ধরিল বুকের পরে কমলাবালায়! উচ্ছ্বাসে সফেন জল উঠিল নাচিয়া! কমলার দেহ ওই ভেসে ভেসে যায়! কমলার দেহ বহে সলিল-উচ্ছ্বাস! কমলার জীবনের হোলো অবসান! ফুরাইল কমলার দুখের নিঃশ্বাস, জুড়াইল কমলার তাপিত পরাণ! কল্পনা! বিষাদে দুখে গাইনু সে গান! কমলার জীবনের হোলো অবসান! দীপালোক নিভাইল প্রচণ্ড পবন! কমলার— প্রতিমার হল বিসর্জ্জন!   (বন-ফুল কাব্যোপন্যাস)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bon-ful-oshtom-sorgo/
1079
জীবনানন্দ দাশ
নির্জন স্বাক্ষর – (ধুসর পাণ্ডুলিপি, ১৯৩৬)
প্রেমমূলক
তুমি তো জানো না কিছু – না জানিলে, আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে; যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে – পথের পাতার মতো তুমিও তখন আমার বুকের ‘পরে শুয়ে রবে? অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন সেদিন তোমার!
https://banglapoems.wordpress.com/2012/10/02/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%b0-%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a3/
4580
শামসুর রাহমান
কারো দণ্ডে
প্রেমমূলক
কারো দণ্ডে দেশান্তরী হইনি, তবুও মনে হয় সর্বক্ষণ নির্বাসনে আছি। কোথাও দেখি না কোনো চেনা মুখ; যাদের কাছের লোক বলে জানতাম এতকাল, তারাও কেমন অচেনার আবরণে উপস্থিত হয় পথে। এখন ব্যাপক অগ্নিঝড় পাড়ায় পাড়ায়, কী সহজে দিনের আলোয় দিব্যি খুন হয় আদম-সন্তান আর রক্ষক ভক্ষক হয়ে যায় মসনদে খুব জেঁকে বসবার মোহে।এরকম ডামাডোলে, উৎপীড়নে, ধোঁয়ায়, লাঠির, বন্দুকের কর্কশ চিৎকারে ত্রস্ত দিনরাত এই কসাইখানাকে আজ কী করে স্বদেশ বলে ভাবি? প্রিয়তমা, এখন তুমিও নেই এ শহরে, সব স্থানে অমাবস্যা ছেয়ে আছে, এই দিশেহারা কবি নির্বাসিত জনের বেদনা বয়ে একা, জীবন্মৃত।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/karo-donde/
5567
সুকুমার রায়
আড়ি
হাস্যরসাত্মক
কিসে কিসে ভাব নেই? ভক্ষক ও ভক্ষ্যে- বাঘে ছাগে মিল হলে আর নেই রক্ষে। শেয়ালের সাড়া পেলে কুকুরেরা তৈরি, সাপে আর নেউলে ত চিরকাল বৈরী! আদা আর কাঁচকলা মেলে কোনোদিন্ সে? কোকিলের ডাক শুনে কাক জ্বলে হিংসেয়। তেলে দেওয়া বেগুনের ঝগড়াটা দেখিনি? ছ্যাঁক্ ছ্যাঁক্ রাগ যেন খেতে আসে এখনি। তার চেয়ে বেশি আড়ি আমি পারি কহিতে- তোমাদের কারো কারো, কেতাবের সহিতে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/514
4317
শামসুর রাহমান
অভিশপ্ত নগরের ঠোঁট
মানবতাবাদী
অভিশপ্ত নগরের ঠোঁট, শিরদাঁড়া, বুক ছুঁয়ে হাওয়া বয়, কোট নড়ে। তপ্ত দু’টি চায়ের পেয়ালা গেইশা নারীর মতো, কাকাতুয়া-ঝুটি কাঁপে, কালো টেবিলে চামচ কথা বলে পিরিচের সঙ্গে, দূরে গণিকার আলো-নেভা আস্তানায় বিষণ্ন নাবিক অতিশয় ব্যবহৃত স্তনে হাত রেখে ঘন ঘন নাক ডাকে, কুকুরের ক্রন্দন, পাড়ায় চৌদিদারি হাঁকডাক ঝিমধরা নৈঃশব্দ্যকে ভীষণ অসুস্থ ক’রে তোলে।শব্দের গলিত শবে ব’সে টলমল আকণ্ঠ করছে পান স্মৃতির কারণ-জল কোনো পোড়-খাওয়া কাপালিক কবি। রাত্রি তাকে কোন্‌ ফাঁকে বানায় আধার লেহনের? ফুল্‌কি ওড়ে দিগ্ধিদিক।দশদিকে ঢাকঢোল, খোল কর্তাল, ট্রাম্পেট, বাঁশি; সমর্থিত রূপসীর মাথায় কাঁটার তাজ কিছু রঙ বাজ পরিয়ে দিয়েছে, মাথা হেঁট। বিজ্ঞাপিত সৌন্দর্যে গ্রহণ লাগে বুঝি, পরমায়ু-পুঁজি কমে। টনক নড়ে না, তার অঙ্কুশে কাতর জনকের ফসফুস-চেরা রক্তের ঝলক পিকদানে ঘন ঘন, ভগ্নীর আগুনে ঝাঁপ বিদেশ বিভুঁইয়ে; লগ্নহীন দিন যায়।হঠাৎ পুঁতির মালা দুলে ওঠে কিশোরীর,পুঁথিপাঠ, কবে ঘাসফুলে বুলিয়ে আঙুল আর আঁচলে লুকিয়ে কিছু কুল ঘরে ফেরে। ইদানীং রূপের খাঁচায় হাঁসফাঁস, চন্দ্রকর অগ্নিকণা; কে তাকে বাঁচায় ডামাডোলে?টেকে না অস্থির মন ঘরে সারা দিনমান, সাঁঝ আজকাল প্রায়শই শ্মশানের পুড়ন্ত শবের উৎকট গন্ধের মতো, রাত্রির করুণ অপচয়। কোনো কোনো রাতে লোকপ্রসিদ্ধ বোবায় ধরে তাকে, মধ্যরাতে শিশু জননীর বুকে লগ্ন হ’তে ভয় পায়। সত্তায় কাঁপুনি, ব’সে থাকে সারারাত; জেগে উঠে বিবাগী শয্যায় শুনি কার কণ্ঠস্বর? জানালার কাছে নারকেল গাছে হাওয়া ঢ’লে পড়ে সখীর ধরনে। একটি রোরুদ্যমান মুখ যেন কুয়াশার ফ্রেমে আঁটা। কোথায় হলুদ বাটা? কুকারে চাপানো লাল মাংস? মাঝে মাঝে উৎসবের আগে বিউটি পার্লারে রূপচর্চা, কখনো বা মুখ্য কাজে ধৈর্যচ্যুত, পাশা খেলে, পরাজিত দ্বন্দের সহিত বারবার তামাশার বিপন্ন শিকার হ’য়ে আত্মহননের আবৃত্তিতে মাতে। তার সাথে উতস্তত পুরুষের খচরামি; যামিনী না যেতে চোরাবালি ডাকে তাকে, বুঝি বা সৌন্দর্য ডোবে পরিত্রানহীন।প্রচণ্ড কর্কশ কবি ছুঁড়ে দ্যায় জোরদার লতা প্রাণপণে, ব্যর্থতা সাপের মতো জড়ায় কেবলি মহাক্রোশে তাকে, চেয়ে থাকে অসহায়; ফোঁসে ক্রুর বালি; তবু হ্যাজাক নেভে না। ঝাঁক ঝাঁক পাখি ডানা ঝাপ্টায়, চ্যাঁচায় মাঠ জুড়ে উড়ে, আবার উঠুক ভেসে মাথা, হিলহিলে সাপ দিক ঝাঁপ, গল্পগাথা সৃজনবিদিত হোক; ক্লান্তকণ্ঠ, নাছোড় সাগ্নিক কবি পাক নব্য বাকের বিভূতি।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ovishopto-nogorer-thot/
4975
শামসুর রাহমান
ফের উঠে সোজাই দাঁড়াই
প্রেমমূলক
আমি কি তোমাকে মেয়ে ভালোবেসে অবশেষে অপবাদ বয়েই বেড়াবো? পড়ে আছি এক কোণে, বয়সের ভারে আজ তা’ বলে কি হেলাই প্রাপ্য?আজও পূর্ণিমা-চাঁদ জেগে থাকে আসমানে, জাগে না কি হৃদয় তোমার? হয়তো তুষার কিছু জমেছে সেখানে, নইলে কেন দেখা দাও না আর?আমার এ কাতরতা দেখে দূরে আকাশের তারাও কাঁপতে থাকে খুব! তুমি এতটুকু আর বিচলিত নও তো কিছুতে।তা’হলে আমি কি আজ সবকিছু থেকে দূরে সরে কোনও ভাগাড়ে থাকবো? তবু কেন জানি আমি মাথা নেড়ে আচমকা ফের উঠে সোজাই দাঁড়াই।  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/fer-uthe-sojai-darai/
5154
শামসুর রাহমান
যদি বদলে দেয়া যেতো
চিন্তামূলক
১ যদি বদলে দেয়া যেতো নিছক এই ছকবাঁধা জীবন। প্রাতঃকৃত্য, খবরের কাগজ শুঁকে শুঁকে কিছুসময় কাটানো, রুটি-তরকারি, ধোঁয়া-ওগরানো চা, স্বল্পকালীন দরকারি গার্হস্থ্য কথাবার্তা, অফিসে দৌড়ানো, কাজ-অকাজ, আড্ডা, নোংরা টয়লেটে আরশোলা পায়ে-মাড়ানো, মলমূত্রত্যাগ, কায়ক্লেশে ঘরে ফেরা, নৈশ আহার, বেঁচে-থাকা না-থাকার ভাবনা, এই পৃথিবীতে কে কাহার, নিদ্রা, যেন উন্মাদের লাগাতার কাগজ ছেঁড়া, মৈথুন, নিদ্রা, ভোরে সদ্যচরের মতো জাগরণ-দুঃসহ এই পুনরাবৃত্তি। মরিয়া জুয়াড়িবৎ সর্বস্ব পণ রেখে এক দানে জীবনকে পাল্টে ফেলার সাধ ময়ূরের পেখম। এমন কি পারে না হতে আর নই গৃহী, নির্দিষ্ট কোথাও বারবার আওয়া নেই, নেই ফিরে আসা? উপেক্ষিত নিসর্গের সঙ্গে আলাপ, শ্যামলিম উপত্যকায় শুয়ে-শুয়ে শ্লথগতি মেঘের শোভা নিরীক্ষণ, অনূঢ়া, স্বাস্থ্যবতী, কামার্তা গয়লানীর সঙ্গে শয়ন সুস্নিগ্ধ ঝোপের আড়ালে কিছুক্ষণ, ঘাগরা ওল্টানো, শ্বাসরোধকারী চুম্বন, ক্ষমাহীন আলিঙ্গন, মিলন, পুনর্মিলন; অনন্তর পাহাড়-বেয়ে-ওঠা, অশ্লীল, আক্রমণপরায়ণ মানবপিণ্ড থেকে দূরে ভ্রমণ, পাহাড়ি প্রাণীর বিধানবিরোধী সহযাত্রী; নির্ধারিত বৃত্তিহীন ফলমূল ভক্ষণে ক্ষুধার নিবৃত্তি,-এসব কিছুই কি সম্ভাব্যতার পরপারে? জীবনকে আত্মদ্রোহে স্থাপন করতে প্রবল ইচ্ছুক আমি প্রথাছুট, বৈচিত্র্যময় চলমানতায়। ২ জগৎ-সংসারে কে আছে এমন যার শ্রুতি বিমোহিত নয় ঘন সবুজ পত্রালি থেকে কিচ্ছুরিত সূর্যরশ্মির মতো কোকিলের সুর, ঝর্ণাজল আর নুড়ির মোহন সংঘর্ষে উৎপন্ন মৃদু কলম্বর আর জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত্রির হৃদয় থেকে উৎসারিত বংশীধ্বনিতে? এমন কারও সন্ধান কি পাব যে আবদুল করিম খাঁর যমুনা তীরের স্বর্গীয়, চিরব্যাকুল ছলাৎছল, রবিশঙ্করের সেতারের নির্ঝর, য়ুহিদি মেনহুইনের বেহালা-নিঃসৃত সুরধারায় অবগাহনে অনিচ্ছুক? বন্দনীয় এইসব সুর থেকেও, হে মেয়ে অনেক মধুর তোমার প্রেমার্দ্রে কণ্ঠস্বর, যা আমার ভেতরের চাপা আগুনকে উসকিয়ে কখনও দীপান্বিত শবে বরাত, কখনও বা আবীর-ছাড়ানো বসন্তোৎসব। ৩ সারা দিনমান ইট ভাঙার শব্দ, ঘাম-ঝরানো খাটুনি। আমার মুহূর্তগুলো ভারী হাতুড়ির অবিরাম পিটুনিতে বিচূর্ণিত। হে মধ্যরাত্রির শান-বাঁধানো ফুটপাথ, হে নিঃসঙ্গতার কালো সাঁড়াশি, মাঝ মেঘনার লাফিয়ে-ওঠা ডাগর, রূপসী মাছ, নিষ্পাপ চুম্বনের স্মৃতি, অবসরের আঙুলে ঘূর্ণ্যমান আংটি, পুরানো, শূন্য বাড়ির অভ্যন্তরীণ প্রতিধ্বনি, দিগন্তের শব্দহীন, ধূসর চিৎকার, দু’জনের কল্পিত পলায়ন, সংসারবিহীন সংসার, খরার পরে বৃষ্টির তুমুল কত্থক, নেশাতুর নানা প্রহরের সাইকেডেলিক চিত্রমালা, আঙুলের ডগার কাঠিন্য, কুকুর কুকুরীর বেআব্রু প্রণয়, হে গা-গুলোনো, নিঃশ্বাস অপহরণকারী গার্হস্থ্য, হে অন্তর্গত লতাগুল্মঢাকা সন্ন্যাস-তোমাদের কাছ থেকে বহুকাল কর্জ নিয়েছি বিরল সম্পদ। ধারদেনা চুকিয়ে দেয়ার সাধ অনেক দিনের, অথচ নিষ্ফল শ্রম আর খঞ্জ প্রেরণায় সতত আমি অধমর্ণ। ৪ তুমি কি জান যখন দুষ্ট বালক আগুন ধরিয়ে দেয় নীড়ে, ছিন্নপালক, শাবকহারা পাখির তখনকার অভিব্যক্তি? হতে কি পার নৌকো ডোবার মুহূর্তে যাত্রীর অনুভূতির অংশীদার? জিভ বার করে দেয়া দেয়ালের আর্তনাদের সঙ্গে তুমি পরিচিত, একথা ধরে নিয়ে বলি, উদ্যানের ফুল, ঝুঁকে-থাকা আকাশ, আমার সংশয়াকুল মনে বইয়ে দেয় না সুবাতাস। অপরাহ্নের ক্রোড়ে সমর্পিত ঘাসঘেরা করোটির ওপর প্রজাপতি আর ফড়িং-এর ওড়াউড়ি, প্রায়শ নির্ঘুম রাতে, হে প্রধান সুন্দরী, তোমার বাসার দিকে ফেরানো আমার মুখ, সম্মোহিত, তন্নিষ্ঠ, তুমি কি জান? ৫ কী হতো আমার, যদি তুমি না থাকতে? আয়ত তোমার চোখ, সেই জন্যেই সপ্তর্ষিমণ্ডল, পর্যটক মেঘ, উদ্ভিন্ন গোলাপ। সোনালি তোমার বাহু, সেই জন্যেই এই আলিঙ্গন, শূন্যতার খুনসুটি, হাওয়ার মাতলামি। স্ফুরিত তোমার ঠোঁট, সেই জন্যেই তৃষাতুর কথা, অন্ধকারকে দীপান্বিতা-করা হাসি, মদির আগুন ধরানো চুম্বন, বুজে আসা আমার চক্ষুদ্বয়। নিখুঁত তোমার গলা, সেই জন্যে কাঁধ-বেয়ে-নেমে আসা চুলের জড়িয়ে ধরা, আমার নিঃসঙ্গতা আর অনুপস্থিতিকে চুমুক-খাওয়া কণ্ঠস্বর, পথ-হাঁটার ওপর ছড়িয়ে পড়া গান। কী হতো আমার, যদি তুমি না থাকতে চিররৌদ্র, চিররাত্রিময় এই শহরে? কী করব আমি, যদি অনিবার্য হয়ে ওঠে দিগন্তে মিলিয়ে-যাওয়া পক্ষধ্বনির মতো বিচ্ছেদ? সত্যি-সত্যি কুরে-কুরে-খাওয়া বিরহ কি ডিম পাড়বে আমার অস্তিত্বের অতল গহ্বরে? চাবিফোকর দিয়ে বিশ্বদর্শন সম্ভবপর কিনা, এ নিয়ে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করা গ্যাছে মাঝে মাঝে নানা কাজের ফাঁকে। কাটা মুণ্ডু ভাসমান, বড় রকমের বিস্ফোরণে আসমান ভেঙে পড়বার উপক্রম। কোথায় লুকিয়ে বাঁচবে, সে-পথ খুঁজতে খুঁজতে সবাই বেসামাল। আমার চোখে শুধু চাবিফোকর আর তোমার বিপন্ন মুখ। একটি প্রশ্ন ঐন্দ্রজালিকের মতো আমার নাক বরাবর ছুঁড়ে মারছে মুঠো মুঠো ঝিলিক-দেয়া তারা-কি হতো আমার, যদি তুমি না থাকতে? টোপর-পরা বিদ্রূপ ব্যালকনিতে বসে পা দোলায় ঘন ঘন; ধপাস শব্দে চমকিত দেখি নিজেকে মেঝেতে, চোখ দুটো উল্টে যাচ্ছে, জানলাভেদী সেবিকা জ্যোৎস্না চোখের পাতায় আঙ্গুল বুলোয়! আমার সঙ্গে কেউ কি ধুলোয় খেলতে আসবে আবার ঘোর অনিচ্ছাসত্ত্বেও কামড়ে-ধরা কোনও খেলা? ৬ আর কড়া নেড়ে-নেড়ে ক্লান্তির ভারে-নুয়ে-পড়া নয়। এবার দড়াম ঢুকে পড়বো দস্যুতার শিখায় প্রজ্বলিত। মনঃপূত নয় এই আচরণ, কিন্তু কি করা? নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের পরে হতচকিত আদমের মতো পাতাময় ত্রিডাল নেব না ভিক্ষা; জ্যোতির্ময় উন্মাদনা আমাকে উদোম করেছে। চার দেয়াল ডালকুত্তা, ধুলোমাখা নিভন্ত বাল্বগুলো ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে থাকে, সোফা অতিকায় হাড়গিলা, ভয়-ধরানো। হাওয়া ভূতুড়ে, শক্ত লতার মতো জাপটে ধরে, মটমটিয়ে ওঠে হাড়গোড়, মাংস-মজ্জা খসে খসে পড়তে চায়। রামধনু পোশাক ছুঁড়ে দাও, ফিরে যাই। আমার হৃদয় আঁচড়াচ্ছে বাজপাখি, সী মোরগের সৌজন্যে এখানে আসা না- আসা। আমাদের দু’জনের মেঘমেদুর সম্পর্ক এখন ঘাতকের মারণাস্ত্রের ছায়া। ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে বুনো জানোয়ারের জ্বলন্ত টিকাবৎ চোখের দিকে।৭ সুকৌশলে ছাঁটা অনেকখানি, সৈনিকের কদম-ছাঁট চুল যেন। হাওয়ায় পালকের কুচি, নীলিমার দিকে লোলুপ দৃষ্টি দেয়া মুনাসিব; ওড়া বারণ। স্পষ্ট কোনও কারণ ওরা বলবে না সহজবোধ্য ভাষায়। ধারণা, হয়ত অমূলক নয়, অনেক ওপরে, আকাশের জাজিমে আয়েশে গড়ানো অশোভন অভাজনের পক্ষে। সেখানে সুনীল কক্ষের ফরাসে মখমলী তাকিয়ায় ঠেস্‌ দিয়ে যারা ফরাসি টানে ফুড়ুক ফুড়ুক, দ্যাখে বাইজীর নাচ ঢুলুঢুলু লালচে চোখে লকলকে লালচে, তারা শুধু বশংবদ তোতা পাখি পুষে তৃপ্তির ফোয়ারায় গা ভেজায়। সেখানে ঈগল পায় না আমন্ত্রণলিপি। ওকে তপ্ত কড়াইতে ভেজে ভেজে অভ্যক্ষ কাবাব বানানো ছুঁড়ে দেবে নোংরা বুদ্বদময় নর্দমায়। কী আশ্চর্য, সবাই দেখতে পায়, ভস্মরাশি থেকে উত্থিত বিহঙ্গের অবাধ, বর্ণাঢ্য ওড়া মেঘের স্তরে স্তরে। অগ্নিগোলক নির্বাপিত ওর ডানার ঝাপ্‌টায়, চূড়ান্ত নীলিমাকে সে ছোঁবেই। ওড়ো, হাওয়া কেটে-কেটে, সূর্যের সোনালি চুলের ভেতর দিয়ে তার অনিঃশেষ ওড়া।   (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jodi-bodle-deya-jeto/
2631
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অসম্ভব ভালো
নীতিমূলক
যথাসাধ্য-ভালো বলে, ওগো আরো-ভালো, কোন্‌ স্বর্গপুরী তুমি ক’রে থাকো আলো। আরো-ভালো কেঁদে কহে, আমি থাকি হায়, অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্ষায়।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/osomvob-valo/
4853
শামসুর রাহমান
দেখছি এখন এই
চিন্তামূলক
দেখছি এখন এই খানিক দূরেই পথে এক বেজায় জখমি লোক প’ড়ে আছে আর একটি কুকুর তার পাশে ঘোরাঘুরি ক’রে শুঁকছে আহত প্রাণীটিকে। জখমি পথিক প্রাণহীন।এমন সময় আসে যখন শহরে আর গ্রামে সামান্য কথায় কোনও মানুষ অপর মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় যেন গাছের সামান্য পাতা- এভাবেই কত-যে প্রাণের হয় অবসান খবর রাখে কি কেউ? হয়তো রাখলে নিয়মিত অনেক বিশাল খাতা দিয়ে ঢের ঘর ভ’রে যেত।কে তুমি এখন এই আমার আঁধার-হয়ে আসা কালে এলে জেনে নিতে আমার গোপন কথাগুলো খুঁচিয়ে জেনে নিতে? যাও তুমি চ’লে যাও। যেটুকু শান্তির মৃদু হাওয়া বয়ে যায় অন্তরে নীরবে তাকে বইতে দেয়ার পথে ছুড়ে দিয়ো না পাথর এই শান্তির চরণে।এখন আমরা যাব দূরে, বেশ দূরে- যেখানে মানব-শক্রদের শয়তানি, নানাবিধ হয়রানি শেষ করে সারাক্ষণ মঙ্গলের পথে হেঁটে যাবে, যদি কোনও পথ কেউ আগুন জ্বালিয়ে দেয়, ভেঙে ফ্যালে ঘরবাড়ি তা হ’লে তাদের অপরাধ শাস্তির বেতের বাড়ি সুদীর্ঘ জেলের ভাত খেতে-খেতে কাটাবে সময়!   (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dekhchi-ekhon-ei/
4246
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
যেভাবে
চিন্তামূলক
পথের উপর একটি গাছের মধ্যে আপন অন্য গাছের গভীর কাছে-থাকার দৃশ্য দেখতে-দেখতে দেখতে-দেখতে আমার মনে পড়লো, আমি আগাগোড়াই ভীষণ একা। . গাছ দুটি কি সবার দেখা? গাছটি কি নয় সবার দেখা? . এমন কথা ভাবতে-ভাবতে, আলতো কথা ভাবতে-ভাবতে পুকুরে মুখ গেলাম ধুতে আর একটি মুখ আমায় ছুঁতে — আসতে-আসতে ভাসতে গেলো যেভাবে যায়, সক্কলে যায়, যেমনভাবে যাবার কথা একলা রেখে।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%b8%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d/#respond
3485
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বউ কথা কও
রূপক
'বউ কথা কও' 'বউ কথা কও' যতই গায় সে পাখি নিজের কথাই কুঞ্জবনের সব কথা দেয় ঢাকি।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bou-kotha-kou/
941
জীবনানন্দ দাশ
আশা অনুমিতি
চিন্তামূলক
সূর্যের আকাশের মত মানুষেরা অনুভাবনায় স্থির এক আশ্বাস রয়ে গেছে পৃথিবীতে, রয়ে গেছে আমাদের হৃদয়ে যে এই ইতিহাস পৃথিবীর রক্তাক্ত নদীর কেবলি আয়ত উৎসারণ অন্ধকারে নিজেরে প্রচুর ক’রে তবু স্তিমিত হয়ে পড়ে; মতুন নির্মল জলকণিকারা আসে নক্ষত্রের সূর্যের নীলিমার মানব হৃদয়ের আশ্চর্য রেবার হিল্লীলের মত। সময় যা আচ্ছন্ন করেছিল তাকে সময় সংক্রান্তির পারে মৃত্যু বা নিশ্চিহ্ন করেছিল তাকে উজ্জ্বল বস্তুপুঞ্জে জাগিয়ে তুল্বার জন্যে দেখ সচেতন হয়ে জেগে উঠে মানবঃ চারিদিকে উন্মুক্ত সূর্যের অন্তরালে সূর্যের আলোর নক্ষত্রেরা রাত্রির নগরীর জ্ঞানের অন্তহীন পরিচ্ছন্ন পবিত্রের ভিতর।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/aasha-anumiti/
1081
জীবনানন্দ দাশ
নীলিমা
প্রকৃতিমূলক
রৌদ্র ঝিল্‌মিল, উষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল, অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে! -উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী, উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি, আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা, -মরীচিকা-ঢাকা! অগণন যাত্রিকের প্রাণ খুঁজে মরে অনিবার,- পায় নাকো পথের সন্ধান; চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল- হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল তোমার ও- মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী। জনতার কোলাহলে একা ব’সে ভাবি কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী! স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা! চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধ ধরণীর রুধির-লিপিকা জ্বলে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা! বসুধার অশ্রু-পাংশু আতপ্ত সৈকত, ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল, নিষ্করুণ এই রাজপথ, লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার, এই ধূলি-ধূম্রগর্ভ বিস্তৃত আঁধার ডুবে যায় নীলিমায়-স্বপ্নায়ত মুগ্ধ আঁখিপাতে, -শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে , শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে; ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক, তোমার চকিত স্পর্শে, হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!
https://banglarkobita.com/poem/famous/890
188
কাজী নজরুল ইসলাম
অকূল তুফানে নাইয়া কর পার
ভক্তিমূলক
অকূল তুফানে নাইয়া কর পার পাপ দরিয়াতে ডুবে মরি কান্ডারি নাই কড়ি নাই তরী প্রভু পারে তরিবার।। থির নহে চিত পাপ-ভীত সদা টলমল পুণ্যহীন শূন্য মরু সম হৃদি-তল নাহি ফুল নাহি ফল পার কর হে পার কর ডাকি কাঁদি অবিরল নাহি সঙ্গী নাহি বন্ধু নাহি পথেরি সম্বল। সাহারায় নাহি জল শাওন বরিষা সম তব করুণার ধারা ঝরিয়া পড়ুক পরানে আমার।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/akul-tuphaney-naiya-koro-par/
3806
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যৌবনের প্রান্তসীমায়
চিন্তামূলক
যৌবনের প্রান্তসীমায় জড়িত হয়ে আছে অরুণিমার ম্লান অবশেষ;-- যাক কেটে এর আবেশটুকু; সুস্পষ্টের মধ্যে জেগে উঠুক আমার ঘোর-ভাঙা চোখ স্মৃতিবিস্মৃতির নানা বর্ণে রঞ্জিত দুঃখসুখের বাষ্পঘনিমা স'রে যাক সন্ধ্যামেঘের মতো আপনাকে উপেক্ষা ক'রে। ঝরে-পড়া ফুলের ঘনগন্ধে আবিষ্ট আমার প্রাণ, চারদিকে তার স্বপ্ন মৌমাছি গুন গুন করে বেড়ায়, কোন্‌ অলক্ষ্যের সৌরভে। এই ছায়ার বেড়ায় বদ্ধ দিনগুলো থেকে বেরিয়ে আসুক মন শুভ্র আলোকের প্রাঞ্জলতায়। অনিমেষ দৃষ্টি ভেসে যাক কথাহীন ব্যথাহীন চিন্তাহীন সৃষ্টির মহাসাগরে। যাব লক্ষ্যহীন পথে, সহজে দেখব সব দেখা, শুনব সব সুর, চলন্ত দিনরাত্রির কলরোলের মাঝখান দিয়ে। আপনাকে মিলিয়ে নেব শস্যশেষ প্রান্তরের সুদূরবিস্তীর্ণ বৈরাগ্যে। ধ্যানকে নিবিষ্ট করব ঐ নিস্তব্ধ শালগাছের মধ্যে যেখানে নিমেষের অন্তরালে সহস্রবৎসরের প্রাণ নীরবে রয়েছে সমাহিত। কাক ডাকছে তেঁতুলের ডালে, চিল মিলিয়ে গেল রৌদ্রপাণ্ডুর সুদূর নীলিমায়। বিলের জলে বাঁধ বেঁধে ডিঙি নিয়ে মাছ ধরছে জেলে। বিলের পরপারে পুরাতন গ্রামের আভাস, ফিকে রঙের নীলাম্বরের প্রান্তে বেগনি রঙের আঁচলা। গাঙচিল উড়ে বেড়াচ্ছে মাছধরা জালের উপরকার আকাশে। মাছরাঙা স্তব্ধ বসে আছে বাঁশের খোঁটায়, তার স্থির ছায়া নিস্তরঙ্গ জলে। ভিজে বাতাসে শ্যাওলার ঘন স্নিগ্ধগন্ধ। চারদিক থেকে অস্তিত্বের এই ধারা নানা শাখায় বইছে দিনেরাত্রে। অতি পুরাতন প্রাণের বহুদিনের নানা পণ্য নিয়ে এই সহজ প্রবাহ,-- মানব-ইতিহাসের নূতন নূতন ভাঙনগড়নের উপর দিয়ে এর নিত্য যাওয়া আসা। চঞ্চল বসন্তের অবসানে আজ আমি অলস মনে আকণ্ঠ ডুব দেব এই ধারার গভীরে; এর কলধ্বনি বাজবে আমার বুকের কাছে আমার রক্তের মৃদুতালের ছন্দে। এর আলো ছায়ার উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে চলে যাক আমার চেতনা চিন্তাহীন তর্কহীন শাস্ত্রহীন মৃত্যু-মহাসাগরসংগমে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/juybanar-pantsemay/
5401
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
চরকার গান
স্বদেশমূলক
ভোমরায় গান গায় চরকায়, শোন ভাই! খেই নাও, পাঁজা দাও, আমরাও গান গাই। ঘর-বার করবার দরকার নেই আর, মন দাও চরকায় আপনার আপনার! চরকার ঘর্ঘর পড়শীর ঘর-ঘর। ঘর-ঘর ক্ষীর-সর, -আপনায় নির্ভর! পড়শীর কন্ঠে জাগল সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া। ঝর কায় ঝুর ঝুর ফুর ফুর বইছে! চরকার বুলবুল কোন বোল কইছে? কোন ধন দরকার চরকার আজ গো? ঝিউড়ির খেই আর বউড়ির পাঁজ গো! চরকার ঘর্ঘর পল্লীর ঘর-ঘর। ঘর-ঘর ঘির দীপ, -আপনায় নির্ভর! পল্লীর উল্লাস জাগল সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া! আর নয় আইটাই ঢিস-ঢিস দিন-ভর, শোন বিশকর্মার বিস্ময়-মন্তর! চরকার চর্যায় সন্তোষ মনটায়, রোজগার রোজদিন ঘন্টায় ঘন্টায়! চরকার ঘর্ঘর বস্তির ঘর-ঘর। ঘর-ঘর মঙ্গল, -আপনায় নির্ভর! বন্দর-পত্তন হঞ্জে সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া! চরকায় সম্পদ, চরকায় অন্ন, বাংলার চরকায় ঝলকায় স্বর্ণ! বাংলার মসলিন বোগদাদ রোম চীন কাঞ্চন-তৌলেই কিনতেন একদিন। চরকার ঘর্ঘর শ্রেষ্ঠীর ঘর-ঘর। ঘর-ঘর সম্পদ, -আপনায় নির্ভর! সুপ্তের রাজ্যে দৈবের সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া! চরকাই লজ্জার সজ্জার বস্ত্র। চরকাই দৈনের সংসার-অস্ত্র। চরকাই সন্তান চরকাই সম্মান। চরকায় দুঃখীর দুঃখের শেষ ত্রাণ। চরকার ঘর্ঘর বঙ্গের ঘর-ঘর। ঘর-ঘর সমভ্রম, -আপনায় নির্ভর! প্রত্যাশ ছাড়বার জাগল সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া! ফুরসুৎ সার্থক করবার ভেলকি! উসখুস হাত! বিশকর্মার খেল কি! তন্দ্রার হুদ্দোয় একলার দোকলা! চরকাই একজাই পায়সার টোকলা। চরকার ঘর্ঘর হিন্দের ঘর-ঘর। ঘর-ঘর হিকমৎ, -আপনায় নির্ভর! লাখ লাখ চিত্তে জাগল সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া! নিঃস্বের মূলধন রিক্তের সঞ্চয়, বঙ্গের স্বস্তিক চরকার গাও জয়! চরকায় দৌলত! চরকায় ইজ্জৎ! চরকায় উজ্জ্বল লক্ষীর ইজ্জৎ! চরকার ঘর্ঘর গৌড়ের ঘর-ঘর। ঘর-ঘর গৌরব, -আপনায় নির্ভর! গঙ্গায় মেঘনায় তিস্তায় সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া! চন্দ্রের চরকায় জ্যোৎস্নার সৃষ্টি! সূর্যের কাটনায় কাঞ্চন বৃষ্টি! ইন্দ্রের চরকায় মেঘ জল থান থান। হিন্দের চরকায় ইজ্জৎ সম্মান! চরকার দৌলত! ইজ্জৎ ঘর-ঘর। ঘর-ঘর হিম্মৎ, -আপনায় নির্ভর! গুজরাট-পাঞ্জাব-বাংলায় সাড়া, দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/chorkar-gaan/
2086
মহাদেব সাহা
উদ্ভিদ মানুষ
চিন্তামূলক
মানুষের যা হবার তাই হয়, মানুষ হয় না কোনো উদ্ভিন্ন মানুষ- সম্পূর্ণ আলোকপ্রাপ্ত, অন্তরে বাইরে দ্যুতিময়। সবুজ বৃক্ষের মতো যথার্থ হৃদয়বান হয় না মানুষ হয় না সে উন্মুক্ত উদার; মানুষের যা হবার তাই হয় তার বেশি হয় না সে আলোকিত প্রবুদ্ধ মানুষ, হয় না আয়ত্ত তার সব বিদ্যা, সামান্যই হয় শেখা মানবপ্রেমের পাঠ- বরং হিংসা আর সহিংসতা চর্চায়ই যায় তার অর্ধেক জীবন আরো বিশ কিছুকাল যায় ধনুর্বিদ্যা শিখে; এরপর যেটুকু সময় বাকি থাকে কাটে অনুশোচনায়, মনস্তাপে মানুসের যা হবার তাই হয় তার বেশি হয় না যে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ মানুষ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1401
2250
মহাদেব সাহা
লিরিকগুচ্ছ - ০১
প্রেমমূলক
আমি নিরিবিলি একলা বকুল তাতে কার ক্ষতি সামান্য ফুল যদি ঝরে যাই! ভালোবেসে তবু এই উপহার ঝরা বকুলের ঝরা সংসার যেন রেখে যাই!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1387
3769
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যতবার আলো জ্বালাতে চাই
ভক্তিমূলক
যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিবে যায় বারে বারে। আমার জীবনে তোমার আসন গভীর অন্ধকারে। যে লতাটি আছে শুকায়েছে মূল কুঁড়ি ধরে শুধু, নাহি ফোটে ফুল, আমার জীবনে তব সেবা তাই বেদনার উপহারে। পূজাগৌরব পুণ্যবিভব কিছু নাহি, নাহি লেশ, এ তব পূজারি পরিয়া এসেছে লজ্জার দীন বেশ। উৎসবে তার আসে নাই কেহ, বাজে নাই বাঁশি, সাজে নাই গেহ– কাঁদিয়া তোমায় এনেছে ডাকিয়া ভাঙা মন্দির-দ্বারে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/505.html
5938
সৈয়দ শামসুল হক
পরানের গহীন ভিতর-১১
সনেট
কি আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর? ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে? উত্তর সিথানে গাছ, সেই গাছে পাখির কোটর আছে নাকি? পাখিরা কি মানুষের গলা নিয়া ডাকে? যখন তোমার দ্যাখা জানা নাই পাবো কি পাবো না, যখন গাছের তলে এই দেহ দিবে কালঘুম, যথন ফুরায়া যাবে জীবনের নীল শাড়ি-বোনা তখন কি তারা সব কয়া দিবে আগাম-নিগুম? আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক, আমার বিছানে নাই সোহাগের তাতের চাদর, আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বড় ফোক, আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানী আতর। তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা, আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা।
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/poraner-gohin-bhitor-11/
2024
ভাস্কর চক্রবর্তী
স্মৃতি
প্রেমমূলক
পঁচিশ বছর আগেকার মুখ যেন জাপানী অক্ষর বাজুবন্ধ মৃদু বেজে ওঠে গান গান গান শুধু গান ছোট এক ঘরে শুয়ে আজ মনে পড়ে প্রেমিক ছিলাম
http://kobita.banglakosh.com/archives/4230.html
3878
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ খেয়া
রূপক
দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা-পরা ওই ছায়া ভুলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ। ও পারেতে সোনার কূলে আঁধারমূলে কোন্ মায়া গেয়ে গেল কাজ-ভাঙানো গান। নামিয়ে মুখ চুকিয়ে সুখ যাবার মুখে যায় যারা ফেরার পথে ফিরেও নাহি চায়, তাদের পানে ভাঁটার টানে যাব রে আজ ঘরছাড়া--- সন্ধ্যা আসে দিন যে চলে যায়। ওরে আয় আমায় নিয়ে যাবি কে রে দিনশেষের শেষ খেয়ায়।সাঁজের বেলা ভাঁটার স্রোতে ও পার হতে একটানা একটি-দুটি যায় যে তরী ভেসে। কেমন করে চিনব ওরে ওদের মাঝে কোন্‌খানা আমার ঘাটে ছিল আমার দেশে। অস্তাচলে তীরের তলে ঘন গাছের কোল ঘেঁষে ছায়ায় যেন ছায়ার মতো যায়, ডাকলে আমি ক্ষণেক থামি হেথায় পাড়ি ধরবে সে এমন নেয়ে আছে রে কোন্ নায়। ওরে আয় আমায় নিয়ে যাবি কে রে দিনশেষের শেষ খেয়ায়।ঘরেই যারা যাবার তারা কখন গেছে ঘরপানে, পারে যারা যাবার গেছে পারে; ঘরেও নহে, পারেও নহে, যে জন আছে মাঝখানে সন্ধ্যাবেলা কে ডেকে নেয় তারে। ফুলের বার নাইকো আর, ফসল যার ফলল না--- চোখের জল ফেলতে হাসি পায়--- দিনের আলো যার ফুরালো, সাঁজের আলো জ্বলল না, সেই বসেছে ঘাটের কিনারায়। ওরে আয় আমায় নিয়ে যাবি কে রে বেলাশেষের শেষ খেয়ায়।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shesh-kheya/
1493
নির্মলেন্দু গুণ
পতিগৃহে
প্রেমমূলক
পাঁজরে প্রবিষ্ট প্রেম জেগে ওঠে পরাজিত মুখে, পতিগৃহে যেরকম পুরোনো প্রেমিক স্বামী ও সংসারে মুখোমুখি । প্রত্যাখ্যানে কষ্ট পাই,–ভাবি, মিথ্যে হোক সত্যে নাই পাওয়া । বুকের কার্নিশে এসে মাঝে-মধ্যে বসো প্রিয়তমা, এখানে আনন্দ পাবে, পাবে খোলা হাওয়া ।সেই কবে তোমাকে বুনেছি শুক্রে, শুভ্র বীজে, যখন নদীর পাড় ঢাকা ছিল গভীর সবুজে । সময় খেয়েছে মূলে, বীজের অঙ্কুরে অমাক্রোধ, দাবাগ্নিতে পুড়ে গেছে ভালোবাসা জনিত প্রবোধ ।অহল্যাও পেয়েছিল প্রাণ জীবকোষে, পাথর-প্রপাতে একদিন । তোমার অতনু জুড়ে কোনোদিন হবে নাকি সেরকম প্রাণের সঞ্চার ? কোনদিন জাগিবে না আর? পুরোনো প্রেমিক আমি কতো পুরাতনে যাবো? ক্ষমা করো ভালোবাসা, প্রিয় অপরাধ ।যদি কভু মধ্যরাতে পরবাসে ঘুম ভেঙে যায়, যদি আচ্ছন্ন স্বপ্নের ঘোরে উচ্চারণ করো এই মুখ, যদি ডাকো যৌবনের প্রিয় নাম ধরে–; রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যাবো পতিগৃহে পুরোনো প্রেমিক । মুখোমুখি দাঁড়াবো তোমার, যদি ক্ষমা পাই ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%97%e0%a7%83%e0%a6%b9%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%a8/
4650
শামসুর রাহমান
খুঁজি ক্ষুব্ধ অনুরাগে
সনেট
স্বদেশে এসেছি ফিরে অবসন্ন আট দিন পর আপন শহরে আজ। যতটা আনন্দ পাবো বলে সম্যক ধারণা ছিল, বিমান বন্দর থেকে দলে বলে স্মিত বেরিয়ে এসেই মন লাশকাটা ঘর! এ কেমন শহর দেখছি অপরাহ্নে? যেন ঝড় মুড়িয়ে ফেলেছে একে, রেখে গ্যাছে ধ্বংস চিহ্নগুলি ইতস্তত। নিসর্গ বিষাদগ্রস্ত; শ্যামা, বুলবুলি কারো কণ্ঠে গান নেই, ফুটপাথ বিমর্ষ, ধূসর।ফের গৃহপ্রবেশের পরেও খুশির কোনো ঢেউ হৃদয়ে করে না খেলা। সব কিছু ছায়াচ্ছন্ন লাগে, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মাংস, সব্জির ঘ্রাণ আকর্ষণহীন আর বই, কবিতার খাতা, কেউ টানে না তেমন, কাকে যেন খুঁজি ক্ষুব্ধ অনুরাগে চৌদিকে; কুয়াশা ঘন হয়, অশ্রুপাত করে প্রাণ।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khuji-khubdho-onurage/
4695
শামসুর রাহমান
ঘুরে দাঁড়াও
মানবতাবাদী
আর নয়, অন্য কিছু নয়, এবার দাঁড়াও ঘুরে, জুতে নাও ধনুকে অব্যর্থতীর। দেখছো না ধেয়ে আসছে চৌদিক থেকে হন্তারক দল? রক্তপায়ী বাদুড়ের ঝাঁক ঝুলে আছে ভরসন্ধেবেলা, চোখ পুড়ে যায়, মিত্র ভেবে শক্রকেই ধরেছো জড়িয়ে বার বার, মৈত্রীর সহজপাঠী ভুলে বসে আছো। পদতল থেকে দ্রুত মাটি স’রে যাবার আগেই পূর্ণ বেগে ছোটাও দূরন্ত অশ্ব, হানো শত বাণ।যুদ্ধে ক্লান্তি আছে, ব্যেপে-আসা বিষাদ, শূন্যতা, বুকফাটা ক্রন্দনের রোল শুনে হাত থেকে খ’সে পড়বে ধনুক হয়তো, এবং ফেরাতে পারো মুখ রক্তঝরা গোধূলি-আকাশ থেকে। যারা মৃত বহু আগে, তারা যদি আজ তোমার হাতেই মৃত্যু পায়, তাহ’লে কোরো না খেদ, শুধু ঘুরে দাঁড়াও এবার।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ghure-darao/
227
কাজী নজরুল ইসলাম
আমার কোন কুলে আজ
রূপক
আমার কোন কুলে আজ ভিড়লো তরী এ কোন সোনার গাঁয়? আমার ভাটির তরী আবার কেন উজান যেতে চায়?দুখেরে কান্ডারী করি আমি ভাসিয়েছিলাম ভাঙ্গা তরী তুমি ডাক দিলে কি স্বপন পরী নয়ন ইশারায় গো?নিভিয়ে দিয়ে ঘরের বাতি ডেকেছিলে ঝড়ের রাতি কে এলে মোর সুরের সাথি গানের কিনারায়?সোনার দেশের সোনার মেয়ে ওগো হবে কি মোর তরীর নেয়ে এবার ভাঙ্গা তরী চল বেয়ে রাঙা অলকায়।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/amar-kon-kul/
1014
জীবনানন্দ দাশ
ঘাস
প্রকৃতিমূলক
কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয় পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা; কাঁচা বাতাবির মতো সবুজ ঘাস- তেমনি সুঘ্রাণ – হরিনেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে ! আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো গেলাসে গেলাসে পান করি, এই ঘাসের শরীর ছানি- চোখে ঘসি, ঘাসের পাখনায় আমার পালক, ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার শরীরের সুস্বাদু অন্ধকার থেকে নেমে ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/944
2584
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অদৃষ্টের হাতে লেখা
প্রেমমূলক
অদৃষ্টের হাতে লেখা সূক্ষ্ম এক রেখা, সেই পথ বয়ে সবে হয় অগ্রসর। কত শত ভাগ্যহীন ঘুরে মরে সারাদিন প্রেম পাইবার আগে মৃত্যু দেয় দেখা, এত দূরে আছে তার প্রাণের দোসর! কখন বা তার চেয়ে ভাগ্য নিরদয়, প্রণয়ী মিলিল যদি–অতি অসময়! “হৃদয়টি?’ “দিয়াছি তা!’ কান্দিয়া সে কহে, “হাতখানি প্রিয়তম?’ “নহে, নহে, নহে!’   Matthew Arnold (অনুবাদ কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/odrishter-hate-lekha/
1930
প্রেমেন্দ্র মিত্র
পাখিদের মন
মানবতাবাদী
নির্জন প্রান্তরে ঘুরে হঠাত্ কখন, হয়তো পেতেও পারি পাখিদের মন। আর শুধু মাটি নয় শ্স্য নয়, নয় শুধু ভার, আর-এক বিদ্রোহী ধিক্কার– পৃথিবী-পরাস্ত-করা উজ্জল উত্ ক্ষেপ। আজো এরা মাঠে-ঘাটে মাটি খুঁটে খায়, মেনে নেয় সব কিছু দায় ; তবু এক সুনীল শপথ তাদের বুকের রক্ত তপ্ত করে রাখে। জীবনের বাঁকে বাঁকে, যত গ্লানি যত কোলাহল ব্যাধের গুলির মতো বুকে বিঁধে রয়, সে-উত্তাপে গ’লে গিয়ে হ’য়ে যায় ক্ষয়। শুধু দুটি তীব্র তীক্ষ্ণ দুঃসাহসী ডানা, আকাশের মানে না সিমানা। কোনোদিন এ-হৃদয় হয় যদি একান্ত নির্জন, হয়তো পেতেও পারি পাখিদের মন –আর এক সূর্য-সচেতন।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3998.html
4260
শঙ্খ ঘোষ
তুমি
মানবতাবাদী
তুমি বললে মানবতা আমি বললে পাপ বন্ধ করে দিয়েছে দেশ সমস্ত তার ঝাঁপ তুমি বললে হিটলারিও জনপ্রেমে ভরা আমি বললে গজদন্ত তুমি বললে ছড়া ।তুমি বললে বাঁচার দাবি আমি বললে ছুতো হামলে কেন এল সবাই দিব্বি খেত শুত । হোক না জীবন শুকনো খরা বন্ধ্যা বা নিষ্ফলা । আমি বললে সেপাই দিয়ে উপড়ে নেবে গলা ।তুমি বললে দণ্ডকে নয় আপন ভূমিই চাই আমি বললে ভণ্ড, কেবল লোক খ্যাপাবার চাঁই । চোখের সামনে ধুঁকলে মানুষ উড়িয়ে দেবে টিয়া তুমি বললে বিপ্লব, আর আমি প্রতিক্রিয়া ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b8%e0%a7%87-%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b/
5701
সুকুমার রায়
হরিষে বিষাদ
ছড়া
দেখছে খোকা পঞ্জিকাতে এই বছরে কখন কবে ছুটির কত খবর লেখে, কিসের ছুটি কঁদিন হবে। ঈদ্ মহরম দোল্ দেওয়ালি বড়দিন আর বর্ষাশেষে- ভাবছে যত, ফুল্লমুখে ফুর্তিভরে ফেলছে হেসে এমন কালে নীল আকাশে হঠাৎ -খ্যাপা মেঘের মত, উথলে ছোটে কান্নাধারা ডুবিয়ে তাহার হর্য যত। 'কি হল তোর?' সবাই বলে, 'কলমটা কি বিঁধল হাতে? জিবে কি তোর দাঁত বসালি? কামড়াল কি ছারপোকাতে?' প্রশ্ন শুনে কান্না চড়ে অশ্র“ ঝরে দ্বিগুন বেগে, 'পঞ্জিকাটি আছড়ে ফেলে বললে কেঁদে আগুন রেগে; ঈদ্ পড়েছে জষ্ঠি মাসে গ্রীষ্মে যখন থাকেই ছুটি, বর্ষাশেষে আর দোল্ ত দেখি রোব্‌বারেতেই পড়ল দুটি। দিনগুলোকে করলে মাটি মিথ্যে পাজি পঞ্জিকাতে- মুখ ধোব না ভাত খাব না ঘুম যাব না আজকে রাতে।'
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/horishe-bishad/
1405
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
ওখানে কি কেউ আছে
প্রেমমূলক
লাল সালোয়ার ঝুলছে রুপালী গ্রিলে ওখানে কি কেউ আছে ! ওই জানালায় এত মেঘ আর রোদের হল্লা কেন ওখানে কি কেউ আছে ! সামান্য এক বাড়ির এতটা কিসের অহংকার ওখানে কি কেউ আছে ! চিরকিশোরের অবাক দু’চোখে থমকে দাঁড়ায় কেন ওখানে কি কেউ আছে !
https://banglarkobita.com/poem/famous/1034
2180
মহাদেব সাহা
তোমার বাড়ি
স্বদেশমূলক
এই বাড়িটি একলা বাড়ি কাঁপছে এখন চোখের জলে ভালোবাসার এই বাড়িতে তুমিও নেই, তারাও নেই! এই বাড়িটি সন্ধ্যা-সকাল তাকিয়ে আছে নগ্ন দুচোখ একলা বাড়ি ধূসর বাড়ি তোমার স্মৃতি জড়িয়ে বুকে অনাগত ভবিষ্যতের দিকেই কেবল তাকিয়ে থাকে, কেউ জানে না এই বাড়িটি ঘুমায় কখন, কখন জাগে স্তব্ধ লেকের কান্নাভেজা এই বাড়িটি রক্তমাখা! এই বাড়িতে সময় এসে হঠাৎ কেমন থমকে আছে এই বাড়িটি বাংলাদেশের প্রাণের ভিতর মর্মরিত, এই বাড়িতে শহীদমিনার, এই বাড়িতে ফেব্রুয়ারি এই বাড়িটি স্বাধীনতা, এই বাড়িটি বাংলাদেশ এই বাড়িটি ধলেশ্বরী, এই বাড়িটি পদ্মাতীর এই বাড়িটি শেখ মুজিবের, এই বাড়িটি বাঙালীর!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1351
698
জয় গোস্বামী
পোকা উঠেছে
মানবতাবাদী
পোকা উঠেছে। গাছের কাণ্ডের গায়ে পোকা। ধানবীজ হাতে ঢেলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেখছে ধুতি ও ফতুয়াপরা চাষি হাবলা গোবলা ছেলে দৌড়ে নেমে আসছে ঢালু পিচরাস্তা থেকে ওরে পড়ে যাবি, ওরে পড়ে যাবি, ডাকতে ডাকতে আমি বল্মীকের স্তূপ ভেঙে সমাজ সংসারে ছুটে আসি
https://banglarkobita.com/poem/famous/1749
1125
জীবনানন্দ দাশ
বাতাসে ধানের শব্দ শুনিয়াছি
সনেট
বাতাসে ধানের শব্দ শুনিয়াছি — ঝরিতেছে ধীরে ধীরে অপরাহ্নে ভরে; সোনালি রোদের রঙ দেখিয়াছি — দেহের প্রথম কোন প্রেমের মতন রূপ তার — এলোচুল ছড়ায়ে রেখেছ ঢেকে গূঢ় রূপ — আনারস বন; ঘাস আমি দেখিয়াছি; দেখেছি সজনে ফুল চুপে চুপে পড়িতেছে ঝরে মৃদু ঘাসে; শান্তি পায়; দেখেছি হলুদ পাখি বহুক্ষণ থাকে চুপ করে, নির্জন আমের ডালে দুলে যায় — দুলে যায় — বাতাসের সাথে বহুক্ষণ, শুধু কথা, গান নয় — নীরবতা রচিতেছে আমাদের সবার জীবন বুঝিয়াছি; শুপুরীর সারিগুলো দিনরাত হাওয়ায় যে উঠিতেছে নড়ে,দিনরাত কথা নয়, ক্ষীরের মতন ফুল বুকে ধরে, তাদের উৎসব ফুরায় না; মাছরাঙাটির সাথী মরে গেছে — দুপুরের নিঃসঙ্গ বাতাসে তবু ওই পাখিটির নীল লাল কমলা রঙের ডানা স্ফুট হয়ে ভাসে আম নিম জামরুলে; প্রসন্ন প্রাণের স্রোত — অশ্রু নাই — প্রশ্ন নাই কিছু, ঝিলমিল ডানা নিয়ে উড়ে যায় আকাশের থেকে দূর আকাশের পিছু, চেয়ে দেখি ঘুম নাই — অশ্রু নাই — প্রশ্ন নাই বটফলগন্ধ মাখা ঘাসে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/batashe-dhaner-shobdo-shuniasi/
3283
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নব বৎসরে করিলাম পণ
স্বদেশমূলক
নব বৎসরে করিলাম পণ– লব স্বদেশের দীক্ষা, তব আশ্রমে তোমার চরণে হে ভারত, লব শিক্ষা। পরের ভূষণ পরের বসন তেয়াগিব আজ পরের অশন; যদি হই দীন, না হইব হীন, ছাড়িব পরের ভিক্ষা। নব বৎসরে করিলাম পণ– লব স্বদেশের দীক্ষা।না থাকে প্রাসাদ, আছে তো কুটির কল্যাণে সুপবিত্র। না থাকে নগর, আছে তব বন ফলে ফুলে সুবিচিত্র। তোমা হতে যত দূরে গেছি সরে তোমারে দেখেছি তত ছোটো করে; কাছে দেখি আজ হে হৃদয়রাজ, তুমি পুরাতন মিত্র। হে তাপস, তব পর্ণকুটির কল্যাণে সুপবিত্র।পরের বাক্যে তব পর হয়ে দিয়েছি পেয়েছি লজ্জা। তোমারে ভুলিতে ফিরায়েছি মুখ, পরেছি পরের সজ্জা। কিছু নাহি গণি কিছু নাহি কহি জপিছ মন্ত্র অন্তরে রহি– তব সনাতন ধ্যানের আসন মোদের অস্থিমজ্জা। পরের বুলিতে তোমারে ভুলিতে দিয়েছি পেয়েছি লজ্জা।সে-সকল লাজ তেয়াগিব আজ, লইব তোমার দীক্ষা। তব পদতলে বসিয়া বিরলে শিখিব তোমার শিক্ষা। তোমার ধর্ম, তোমার কর্ম, তব মন্ত্রের গভীর মর্ম লইব তুলিয়া সকল ভুলিয়া ছাড়িয়া পরের ভিক্ষা। তব গৌরবে গরব মানিব, লইব তোমার দীক্ষা।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nobo-botsore-korilam-pon/
4047
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হৃদয়ের ভাষা
সনেট
হৃদয় , কেন গো মোরে ছলিছ সতত , আপনার ভাষা তুমি শিখাও আমায় । প্রত্যহ আকুল কন্ঠে গাহিতেছি কত , ভগ্ন বাঁশরিতে শ্বাস করে হায় হায় ! সন্ধ্যাকালে নেমে যায় নীরব তপন সুনীল আকাশ হতে সুনীল সাগরে । আমার মনের কথা , প্রাণের স্বপন ভাসিয়া উঠিছে যেন আকাশের ‘পরে । ধ্বনিছে সন্ধ্যার মাঝে কার শান্ত বাণী , ও কি রে আমারি গান ? ভাবিতেছি তাই । প্রাণের যে কথাগুলি আমি নাহি জানি সে – কথা কেমন করে জেনেছে সবাই । মোর হৃদয়ের গান সকলেই গায় , গাহিতে পারি নে তাহা আমি শুধু হায় ।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hridoyer-vasha/
4155
রেদোয়ান মাসুদ
ভালোবেসেই যাবো
প্রেমমূলক
তুমি ভুলতে বললেই ভুলে যাবো এ কি করে ভাবো? ভুল যদি করেই থাকি ভালোবেসে সে ভুলে ভাসিনা একটু চোখের জলে। ভাসতে ভাসতে যদি কখনও পৌছে যাই তোমার বাড়ির ঘাটে; তখন কি তুমি ফিরিয়ে দিবে? না’কি ভালোবেসে আবার গ্রহন করে নিবে তোমার বুকে? জানি তুমি ভুলে যেতেই বলবে। কারন তুমি ভুল করেছো ভালোবেসে, আর সেই ভুলই করে যাবে অবশেষে! আমি ভুল করিনি ভালোবেসে। তাই ভালোবেসেই যাবো কাছে থেকে, দূরে থেকে অবশেষে মৃত্যুর শয্যা থেকে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2135.html
1779
পূর্ণেন্দু পত্রী
উৎকৃষ্ট মানুষ
প্রেমমূলক
উৎকৃষ্ট মানুষ তুমি চেয়েছিলে এই যে এঁকেছি। এই তার রক্ত-নাড়ি, এই খুলি এই তার হাড় এই দেখ ফুসফুসের চতুদিকে পেরেক, আলপিন সরু কাঁটাতার। এইখানে আত্মা ছিল গোল সূর্য, ভারমিলিয়ন ভাঙা ফুলদানি ছিল এরই মধ্যে ছিল পিকদানি পিকদানির মধ্যে ছিল পৃথিবীর কফ, থুতু, শ্লেষ্মা, শ্লেষ অপমান, হত্যা ও মরণ। উৎকৃষ্ট মানুষ তুমি খুঁজেছিলে এই যে এঁকেছি! ক্ষতচিহ্নগুলি গুণে নাও।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1295
2635
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অস্তাচলের পরপারে
চিন্তামূলক
সন্ধ্যাসূর্যের প্রতিআমার এ গান তুমি যাও সাথে করে নূতন সাগরতীরে দিবসের পানে । সায়াহ্নের কূল হতে যদি ঘুমঘোরে এ গান উষার কূলে পশে কারো কানে! সারা রাত্রি নিশীথের সাগর বাহিয়া স্বপনের পরপারে যদি ভেসে যায় , প্রভাত – পাখিরা যবি উঠিবে গাহিয়া আমার এ গান তারা যদি খুঁজে পায় । গোধূলির তীরে বসে কেঁদেছে যে জন , ফেলেছে আকাশে চেয়ে অশ্রুজল কত , তার অশ্রু পড়িবে কি হইয়া নূতন নবপ্রভাতের মাঝে শিশিরের মতো । সায়াহ্নের কুঁড়িগুলি আপনা টুটিয়া প্রভাতে কি ফুল হয়ে উঠে না ফুটিয়া !  (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ostacholer-porpare/
3092
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জানি আমার পায়ের শব্দ রাত্রে দিনে শুনতে তুমি পাও
প্রেমমূলক
জানি আমার পায়ের শব্দ রাত্রে দিনে শুনতে তুমি পাও, খুশি হয়ে পথের পানে চাও। খুশি তোমার ফুটে ওঠে শরৎ-আকাশে অরুণ-আভাসে। খুশি তোমার ফাগুনবনে আকুল হয়ে পড়ে ফুলের ঝড়ে ঝড়ে। আমি যতই চলি তোমার কাছে পথটি চিনে চিনে তোমার সাগর অধিক করে নাচে দিনের পরে দিনে। জীবন হতে জীবনে মোর পদ্মটি যে ঘোমটা খুলে খুলে ফোটে তোমার মানস-সরোবরে-- সূর্যতারা ভিড় ক'রে তাই ঘুরে ঘুরে বেড়ায় কূলে কূলে কৌতূহলের ভরে। তোমার জগৎ আলোর মঞ্জরী পূর্ণ করে তোমার অঞ্জলি। তোমার লাজুক স্বর্গ আমার গোপন আকাশে একটি করে পাপড়ি খোলে প্রেমের বিকাশে। পদ্মা, ২৭ মাঘ, ১৩২১
https://banglarkobita.com/poem/famous/1945
5161
শামসুর রাহমান
যাত্রা থামাবো না
চিন্তামূলক
এগিয়ে যেতেই চাই। স্থবির আমার চতুর্দিকে গজিয়ে উঠুক নিত্য দীর্ঘকায় ঘাস আর আমি পোকামাকড়ের স্পর্শেও অনড় থাকি, আমাকে করে না দখল এমন সাধ কস্মিনকালেও। আমি দূর তারাময় আকাশে সাঁতার কেটে চাঞ্চল্যের স্বাদ পেতে চাই।অথচ আমাকে আজকাল বারবার ভীষণ ঝিমুনি ঘিরে ধরে; হাঁটতে দাঁড়ালে যেন কেউ চেপে চেয়ারে বসিয়ে দেয় অথবা শয্যায় হাত-পা ছড়িয়ে দিব্যি নিদ্রা নেশায় ডুবিয়ে কোন্‌ সে অবাস্তব মজলিশে নিয়ে যায়, বলা দায়। কাটলে আজব নেশা, ক্লান্তির ছায়ায় মিশে যাই।মধ্যরাতে বাঁশের বাঁশির সুর না জানি কোত্থেকে ভেসে আসে, মনকেমনের আলোড়ন আমাকে চঞ্চল ক’রে তোলে; শয্যা ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। হঠাৎ যুবতী চাঁদের বাহু প্রণয়ের আভা ছড়িয়ে আমার সত্তায় কী গান গেয়ে চলে গেল যোজন শূন্যতায়!এগিয়ে চলার সাধ মিটে গেছে কি আমার? কখনও তা’ নয়। আজও জীবনের এই ধূসর গোধূলি বেলাতেও কাঁটাময় পথে হেঁটে ক্লান্তির কুয়াশা মেখে সত্তায় এগোতেই চাই! পথে আমাকে ফেলুক গিলে, দাঁতাল কাঁটারা সব ছিঁড়ে খুঁড়ে নিক আমার শরীর, যাত্রা তবু থামাবো না।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jatra-thamabo-na/
1657
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ভিতর-বাড়িতে রাত্রি
চিন্তামূলক
রাত্রি হলে একা-একা পৃথিবীর ভিতর-বাড়িতে যেতে হয়। সারাদিন দলবদ্ধ, এখানে-ওখানে ঘুরি-ফিরি, বাজারে বাণিজ্যে যাই; মাঝে-মাঝে রোমাঞ্চিত হবার তাগিদে সামান্য ঝুঁকিতে বসি তাসের আড্ডায়; কেউ বা তিন-আনা যেতে; কেউ হারে। রাত করলে সবাই উঠে যায়। মাথায় কান-ঢাকা, টুপি, পায়ে, মোজা, বারোটা-রাত্তিরে জানি না কোথায় যায় দুরি তিরি রাজা ও রমণী। আমি যাব ভিতর-বাড়িতে। ভিতর-বাড়ির রাস্তা এখনও রহস্যময় যেন। এত যে বয়স হল, তবুও অচেনা লাগে। কোথায় কবাট-জানালা, উঠোন, মন্দির, কুয়োতলা, কুলুঙ্গি, ঘোরানো সিঁড়ি, বারান্দা, জলের কুঁজো। কোথায় ময়নাটা ঠায় রাত্রি জাগে। বুঝবার উপায় নেই কিছুই, অন্তত আমি কিছুই বুঝি না। বাড়িটা ঘুমের মধ্যে হানাবাড়ি। তবু দুয়ার ঠেললেই কেউ ভীষণ চেঁচিয়ে উঠবে, এখন আশঙ্কা হয়। দুয়ার ঠেলি না, আমি সারা রাত্রি দেখি খরস্রোত অন্ধকার বয়ে যায় ভিতর-বাড়িতে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1668
1038
জীবনানন্দ দাশ
ঝরা ফসলের গান
চিন্তামূলক
আঁধারে শিশির ঝরে ঘুমোনো মাঠের পানে চেয়ে চেয়ে চোখ দুটো ঘুমে ভরে আজিকে বাতাসে ভাসিয়া আসিছে হলুদ পাতার ঘ্রাণ কাশের গুচ্ছ ঝ’রে পড়ে হায় খ’সে প’ড়ে যায় ধান বিদায় জানাই-গেয়ে যাই আমি ঝরা ফসলের গান,- নিভায়ে ফেলিও দেয়ালি আমার খেয়ালের খেলাঘরে!ওগো পাখি, ওগো নদী, এতোকাল ধরে দেখেছ আমারে- মোরে চিনে থাকো যদি, আমারে হারায়ে তোমাদের বুকে ব্যথা যদি জাগে ভাই,- যেন আমি এক দুখ-জাগানিয়া, -বেদনা জাগাতে চাই! পাই নাই কিছু, ঝরা ফসলের বিদায়ের গান তাই গেয়ে যাই আমি,- মরণেরে ঘিরে এ মোর সপ্তপদী।।ঝরা ফসলের ভাষা কে শুনিবে হায়!- হিমের হাওয়ায় বিজন গাঁয়ের চাষা হয়তো তাহার সুরটুকু বুকে গেঁথে ফিরে যায় ঘরে হয়তো সাঁঝের সোনার বরণ গোপন মেঘের তরে সুরটুকু তার রেখে যায় সব,-বুকখানা তবু ভরে ঘুমের নেশায়,-চোখে চুমো খায় স্বপনের ভালোবাসা!ওগো নদী, ওগো পাখি, আমি চলে গেলে আমারে আবার ফিরিয়া ডাকিবে নাকি! আমারে হারায়ে তোমাদের বুকে ব্যথা যদি জাগে ভাই,- জেনো আমি এক দুখ-জাগানিয়া, -বেদনা জাগাতে চাই; পাই নাই কিছু, ঝরা ফসলের বিদায়ের গান তাই, গেয়ে যাই আমি, – গাহিতে গাহিতে ঘুমে বুজে আসে আঁখি
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/jhora-fosholer-gan/
5049
শামসুর রাহমান
বেহালাবাদকের জন্যে পঙ্‌ক্তিমালা
প্রেমমূলক
আমার ভিতর রাশি রাশি নিউজপ্রিন্টের রোল ঢুকে গেছে সরাসরি, দ্যাখো আজ কেমন কাগুজে গন্ধ রয়েছে ছড়িয়ে সত্তাময়; হিজিবিজি লক্ষ লক্ষ অক্ষর বেজায় চেঁচামেচি করে, প্রায় অশ্লীলতা বলা যায়, আর কি অস্থির ওরা সর্বক্ষণ, ওরা ভীষণ কলহপরায়ণ। উন্মাতাল, বেহালাবাদক তুমি সুরে সুরে আমার ভিতর থেকে অই তাল তাল খসখসে নিউজপ্রিন্টের মণ্ড তুলে এনে ক্লিন্ন ডাষ্টবিনে ছুঁড়ে দাও। ওসব ফক্কড় হিবিজিবি অক্ষর সুনীল শূন্যতায়, নক্ষত্রের পরপারে।দূষিত রক্তের মতো কালিতে নিমগ্ন আমি সকল সময় যেন অপদেবতা একাকী। আমাকে যায় না চেনা আগেকার মতো, অতি দ্রুত কেমন নির্মুখ আমি হয়ে যাচ্ছি এ খর বেলায়। বেহালাবাদক তুমি কালির সমুদ্র থেকে আমাকে নিমেষে তুলে আনো ধ্বনির মোহন ঝড় তুলে দীপ্রছড় টেনে টেনে।নিজের রক্তাক্ত বেশভূষা দেখে, ক্ষত দেখে দেখে ঘুরঘুট্রি অন্ধকারে শ্বাপদের গুহায় আমার কাটে সারাবেলা, তার নখরে রয়েছে বাঁধা পরমায়ু আমার এবং নক্ষত্র দেখিনা কতকাল জলাশয়ে দেখিনি আপন মুখ, যে রূপালি শহরে যাবার কথা ছিল, পড়েনি সেখানে পদচ্ছাপ। বেহালাবাদক তুমি বানিয়ে সূরের স্বপ্নময় পথরেখা আমাকে সেখানে পৌঁছে দাও, পৌঁছে দাও। আমি এক ঊর্ণাজালে আটকা পড়ে গেছি, কষ্ট পাচ্ছি, কষ্ট পাচ্ছি অনেক শতক ধরে, বুঝিরা পাঁজর খসে যাবে বদরাগী হাওয়ার আঁচড়ে। বেহালাবাদক তুমি আমাকে কর্কশ ঊর্ণাজাল থেকে দ্রুত মুক্তি দাও, মুক্তি দাও সঙ্গীতের উধাও গৌরবে কিংবা ঊর্ণাজাল হয়ে যাক ফুলশয্যা অথবা তোমার বাদ্য।বেহালাবাদক তুমি এতদিন পরেও কি পাওনি আমার কোনো চিঠি? হায়, আমিতো চিঠিতে ডাকটিকিটে লাগাতে ভুলে যাই, বারংবার ভুল হয়ে যায়।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/behalabadoker-jonye-pongktimala/
2257
মহাদেব সাহা
লিরিকগুচ্ছ - ১৭
প্রেমমূলক
অভাব দিয়ে প্রিয়, তোমার মুছিয়ে দিলাম মুখ, ফোটেনি ফুল, ঝরেনি জল ভেঙেছে যতো বুক! তোমার চেয়ে সে-কথা ভালো কে আর জানে প্রিয়, না-থাকাগুলি দিয়েই তোমায় করেছি স্মরণীয়!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1394
3857
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শিমূল রাঙা রঙে
চিন্তামূলক
শিমূল রাঙা রঙে চোখেরে দিল ভ’রে। নাকটা হেসে বলে, “হায় রে যাই ম’রে।’ নাকের মতে, গুণ কেবলি আছে ঘ্রাণে, রূপ যে রঙ খোঁজে নাকটা তা কি জানে।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shimul-ranga-ronge/
6000
হুমায়ূন আহমেদ
গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না
প্রকৃতিমূলক
প্রতি পূর্নিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই গৃহত্যাগী হবার মত জ্যোৎস্না কি উঠেছে ? বালিকা ভুলানো জ্যোৎস্না নয়। যে জ্যোৎস্নায় বালিকারা ছাদের রেলিং ধরে ছুটাছুটি করতে করতে বলবে- ও মাগো, কি সুন্দর চাঁদ ! নবদম্পতির জ্যোৎস্নাও নয়। যে জ্যোৎস্না দেখে স্বামী গাঢ় স্বরে স্ত্রীকে বলবেন- দেখ দেখ নীতু চাঁদটা তোমার মুখের মতই সুন্দর ! কাজলা দিদির স্যাঁতস্যাতে জ্যোৎস্না নয়। যে জ্যোৎস্না বাসি স্মৃতিপূর্ন ডাস্টবিন উল্টে দেয় আকাশে। কবির জ্যোৎস্না নয়। যে জ্যোৎস্না দেখে কবি বলবেন- কি আশ্চর্য রূপার থালার মত চাঁদ ! আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নার জন্য বসে আছি। যে জ্যোৎস্না দেখামাত্র গৃহের সমস্ত দরজা খুলে যাবে- ঘরের ভেতরে ঢুকে পরবে বিস্তৃত প্রান্তর। প্রান্তরে হাঁটব, হাঁটব আর হাঁটব- পূর্নিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে। চারদিক থেকে বিবিধ কন্ঠ ডাকবে- আয় আয় আয়।
http://kobita.banglakosh.com/archives/1130.html
314
কাজী নজরুল ইসলাম
চৈতী
প্রেমমূলক
হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর, আজ্‌কে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার! আজ্‌কে তোমার জন্মদিন- স্মরণ-বেলায় নিদ্রাহীন হাত্‌ড়ে ফিরি হারিয়ে-যাওয়ার অকূল অন্ধকার! এই -সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে-পাওয়া হার!শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল, কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল? আঁধার দীঘির রাঙলে মুখ, নিটোল ঢেউ-এর ভাঙলে বুক,- কোন্‌ পূজারী নিল ছিঁড়ে? ছিন্ন তোমার দল ঢেকেছে আজ কোন্‌ দেবতার কোন্‌ সে পাষাণ-তল?অস্ত-খেয়ার হারামাণিক-বোঝাই-করা না’ আস্‌ছে নিতুই ফিরিয়ে দেওয়ার উদয়-পারের গাঁ ঘাটে আমি রই ব’সে আমার মাণিক কই গো সে? পারাবারের ঢেউ-দোলানী হান্‌ছে বুকে ঘা! আমি খুঁজি ভিড়ের মাঝে চেনা কমল-পা!বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুম্‌রে ওঠে মন, পেয়েছিলাম এম্‌নি হাওয়ায় তোমার পরশন। তেম্‌নি আবার মহুয়া-মউ মৌমাছিদের কৃষ্ণ-বউ পান ক’রে ওই ঢুল্‌ছে নেশায়, দুল্‌ছে মহুল বন, ফুল-সৌখিন্‌ দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!প’ড়ছে মনে টগর চাঁপা বেল চামেলি যুঁই, মধুপ দেখে যাদের শাখা আপ্‌নি যেত নুই। হাস্‌তে তুমি দুলিয়ে ডাল, গোলাপ হ’য়ে ফুটতো গাল থর্‌কমলী আঁউরে যেত তপ্ত ও-গাল ছুঁই! বকুল শাখা-ব্যকুল হ’ত টলমলাত ভুঁই!চৈতী রাতের গাইত’ গজল বুলবুলিয়ার রব, দুপুর বেলায় চবুতরায় কাঁদত কবুতর! ভুঁই- তারকা সুন্দরী সজনে ফুলের দল ঝরি’ থোপা থোপা লা ছড়াত দোলন-খোঁপার’ পর। ঝাজাল হাওয়ায় বাজত উদাস মাছরাঙার স্বর!পিয়ালবনায় পলাশ ফুলের গেলাস-ভরা মউ! খেত বঁধুর জড়িয়ে গলা সাঁওতালিয়া বউ! লুকিয়ে তুমি দেখতে তাই, বলতে, ‘আমি অমনি চাই! খোঁপায় দিতাম চাঁপা গুঁজে, ঠোঁটে দিতাম মউ! হিজল শাখায় ডাকত পাখি “ বউ গো কথা কউ”ডাকত ডাহুক জল- পায়রা নাচত ভরা বিল, জোড়া ভুর” ওড়া যেন আসমানে গাঙচিল হঠাৎ জলে রাখত্‌ে পা, কাজলা দীঘির শিউরে গা- কাঁটা দিয়ে উঠত মৃণাল ফুটত কমল-ঝিল! ডাগর চোখে লাগত তোমার সাগর দীঘির নীল!উদাস দুপুর কখন গেছে এখন বিকেল যায়, ঘুম জড়ানো ঘুমতী নদীর ঘুমুর পরা পায়! শঙ্খ বাজে মন্দিরে, সন্ধ্যা আসে বন ঘিরে, ঝাউ-এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়! মাঠের বাঁশী বন্‌-উদাসী ভীম্‌পলাশী গায়অবাউল আজি বাউল হ’ল আমরা তফাতে! আম-মুকুলের গুঁজি-কাঠি দাও কি খোঁপাতে? ডাবের শীতল জল দিয়ে মুখ মাজ’কি আর প্রিয়ে? প্রজাপতির ডাক-ঝরা সোনার টোপাতে ভাঙা ভুর” দাও কি জোড়া রাতুল শোভাতে?বউল ঝ’রে ফ’লেছ আজ থোলো থোলো আম, রসের পীড়ায় টস্‌টসে বুক ঝুরছে গোপাবজাম! কামরাঙারা রাঙল ফের পীড়ন পেতে ঐ মুখের, স্মরণ ক’রে চিবুক তোমার, বুকের তোমার ঠাম- জামর”লে রস ফেটে পড়ে, হায়, কে দেবে দাম!ক’রেছিলাম চাউনি চয়ন নয়ন হ’তে তোর, ভেবেছিলুম গাঁথ্‌ব মালা পাইনে খুঁজে ডোর! সেই চাহনি নীল-কমল ভ’রল আমার মানস-জল, কমল-কাঁটার ঘা লেগেছে মর্মমূলে মোর! বক্ষে আমার দুলে আঁখির সাতনরী-হার লোর!তরী আমার কোন্‌ কিনারায় পাইনে খুঁজে কুল, স্মরণ-পারের গন্ধ পাঠায় কমলা নেবুর ফুল! পাহাড়তলীর শালবনায় বিষের মত নীল ঘনায়! সাঁঝ প’রেছে ঐ দ্বিতীয়ার-চাঁদ-ইহুদী-দুল! হায় গো, আমার ভিন্‌ গাঁয়ে আজ পথ হ’য়েছে ভুল!কোথায় তুমি কোথায় আমি চৈতে দেখা সেই, কেঁদে ফিরে যায় যে চৈত-তোমার দেখা নেই! কন্ঠে কাঁদে একটি স্বর- কোথায় তুমি বাঁধলে ঘর? তেমনি ক’রে জাগছে কি রাত আমার আশাতেই? কুড়িয়ে পাওয়া বেলায় খুঁজি হারিয়ে যাওয়া খেই!পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’, এই তরীতে হয়ত তোমার প’ড়বে রাঙা পা! আবার তোমার সুখ-ছোঁওয়ায় আকুল দোলা লাগবে না’য়, এক তরীতে যাব মোরা আর-না-হারা গাঁ পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’।।হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর, আজ্‌কে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার! আজ্‌কে তোমার জন্মদিন- স্মরণ-বেলায় নিদ্রাহীন হাত্‌ড়ে ফিরি হারিয়ে-যাওয়ার অকূল অন্ধকার! এই -সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে-পাওয়া হার!শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল, কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল? আঁধার দীঘির রাঙলে মুখ, নিটোল ঢেউ-এর ভাঙলে বুক,- কোন্‌ পূজারী নিল ছিঁড়ে? ছিন্ন তোমার দল ঢেকেছে আজ কোন্‌ দেবতার কোন্‌ সে পাষাণ-তল?অস্ত-খেয়ার হারামাণিক-বোঝাই-করা না’ আস্‌ছে নিতুই ফিরিয়ে দেওয়ার উদয়-পারের গাঁ ঘাটে আমি রই ব’সে আমার মাণিক কই গো সে? পারাবারের ঢেউ-দোলানী হান্‌ছে বুকে ঘা! আমি খুঁজি ভিড়ের মাঝে চেনা কমল-পা!বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুম্‌রে ওঠে মন, পেয়েছিলাম এম্‌নি হাওয়ায় তোমার পরশন। তেম্‌নি আবার মহুয়া-মউ মৌমাছিদের কৃষ্ণ-বউ পান ক’রে ওই ঢুল্‌ছে নেশায়, দুল্‌ছে মহুল বন, ফুল-সৌখিন্‌ দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!প’ড়ছে মনে টগর চাঁপা বেল চামেলি যুঁই, মধুপ দেখে যাদের শাখা আপ্‌নি যেত নুই। হাস্‌তে তুমি দুলিয়ে ডাল, গোলাপ হ’য়ে ফুটতো গাল থর্‌কমলী আঁউরে যেত তপ্ত ও-গাল ছুঁই! বকুল শাখা-ব্যকুল হ’ত টলমলাত ভুঁই!চৈতী রাতের গাইত’ গজল বুলবুলিয়ার রব, দুপুর বেলায় চবুতরায় কাঁদত কবুতর! ভুঁই- তারকা সুন্দরী সজনে ফুলের দল ঝরি’ থোপা থোপা লা ছড়াত দোলন-খোঁপার’ পর। ঝাজাল হাওয়ায় বাজত উদাস মাছরাঙার স্বর!পিয়ালবনায় পলাশ ফুলের গেলাস-ভরা মউ! খেত বঁধুর জড়িয়ে গলা সাঁওতালিয়া বউ! লুকিয়ে তুমি দেখতে তাই, বলতে, ‘আমি অমনি চাই! খোঁপায় দিতাম চাঁপা গুঁজে, ঠোঁটে দিতাম মউ! হিজল শাখায় ডাকত পাখি “ বউ গো কথা কউ”ডাকত ডাহুক জল- পায়রা নাচত ভরা বিল, জোড়া ভুর” ওড়া যেন আসমানে গাঙচিল হঠাৎ জলে রাখত্‌ে পা, কাজলা দীঘির শিউরে গা- কাঁটা দিয়ে উঠত মৃণাল ফুটত কমল-ঝিল! ডাগর চোখে লাগত তোমার সাগর দীঘির নীল!উদাস দুপুর কখন গেছে এখন বিকেল যায়, ঘুম জড়ানো ঘুমতী নদীর ঘুমুর পরা পায়! শঙ্খ বাজে মন্দিরে, সন্ধ্যা আসে বন ঘিরে, ঝাউ-এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়! মাঠের বাঁশী বন্‌-উদাসী ভীম্‌পলাশী গায়অবাউল আজি বাউল হ’ল আমরা তফাতে! আম-মুকুলের গুঁজি-কাঠি দাও কি খোঁপাতে? ডাবের শীতল জল দিয়ে মুখ মাজ’কি আর প্রিয়ে? প্রজাপতির ডাক-ঝরা সোনার টোপাতে ভাঙা ভুর” দাও কি জোড়া রাতুল শোভাতে?বউল ঝ’রে ফ’লেছ আজ থোলো থোলো আম, রসের পীড়ায় টস্‌টসে বুক ঝুরছে গোপাবজাম! কামরাঙারা রাঙল ফের পীড়ন পেতে ঐ মুখের, স্মরণ ক’রে চিবুক তোমার, বুকের তোমার ঠাম- জামর”লে রস ফেটে পড়ে, হায়, কে দেবে দাম!ক’রেছিলাম চাউনি চয়ন নয়ন হ’তে তোর, ভেবেছিলুম গাঁথ্‌ব মালা পাইনে খুঁজে ডোর! সেই চাহনি নীল-কমল ভ’রল আমার মানস-জল, কমল-কাঁটার ঘা লেগেছে মর্মমূলে মোর! বক্ষে আমার দুলে আঁখির সাতনরী-হার লোর!তরী আমার কোন্‌ কিনারায় পাইনে খুঁজে কুল, স্মরণ-পারের গন্ধ পাঠায় কমলা নেবুর ফুল! পাহাড়তলীর শালবনায় বিষের মত নীল ঘনায়! সাঁঝ প’রেছে ঐ দ্বিতীয়ার-চাঁদ-ইহুদী-দুল! হায় গো, আমার ভিন্‌ গাঁয়ে আজ পথ হ’য়েছে ভুল!কোথায় তুমি কোথায় আমি চৈতে দেখা সেই, কেঁদে ফিরে যায় যে চৈত-তোমার দেখা নেই! কন্ঠে কাঁদে একটি স্বর- কোথায় তুমি বাঁধলে ঘর? তেমনি ক’রে জাগছে কি রাত আমার আশাতেই? কুড়িয়ে পাওয়া বেলায় খুঁজি হারিয়ে যাওয়া খেই!পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’, এই তরীতে হয়ত তোমার প’ড়বে রাঙা পা! আবার তোমার সুখ-ছোঁওয়ায় আকুল দোলা লাগবে না’য়, এক তরীতে যাব মোরা আর-না-হারা গাঁ পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’।।হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর, আজ্‌কে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার! আজ্‌কে তোমার জন্মদিন- স্মরণ-বেলায় নিদ্রাহীন হাত্‌ড়ে ফিরি হারিয়ে-যাওয়ার অকূল অন্ধকার! এই -সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে-পাওয়া হার!শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল, কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল? আঁধার দীঘির রাঙলে মুখ, নিটোল ঢেউ-এর ভাঙলে বুক,- কোন্‌ পূজারী নিল ছিঁড়ে? ছিন্ন তোমার দল ঢেকেছে আজ কোন্‌ দেবতার কোন্‌ সে পাষাণ-তল?অস্ত-খেয়ার হারামাণিক-বোঝাই-করা না’ আস্‌ছে নিতুই ফিরিয়ে দেওয়ার উদয়-পারের গাঁ ঘাটে আমি রই ব’সে আমার মাণিক কই গো সে? পারাবারের ঢেউ-দোলানী হান্‌ছে বুকে ঘা! আমি খুঁজি ভিড়ের মাঝে চেনা কমল-পা!বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুম্‌রে ওঠে মন, পেয়েছিলাম এম্‌নি হাওয়ায় তোমার পরশন। তেম্‌নি আবার মহুয়া-মউ মৌমাছিদের কৃষ্ণ-বউ পান ক’রে ওই ঢুল্‌ছে নেশায়, দুল্‌ছে মহুল বন, ফুল-সৌখিন্‌ দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!প’ড়ছে মনে টগর চাঁপা বেল চামেলি যুঁই, মধুপ দেখে যাদের শাখা আপ্‌নি যেত নুই। হাস্‌তে তুমি দুলিয়ে ডাল, গোলাপ হ’য়ে ফুটতো গাল থর্‌কমলী আঁউরে যেত তপ্ত ও-গাল ছুঁই! বকুল শাখা-ব্যকুল হ’ত টলমলাত ভুঁই!চৈতী রাতের গাইত’ গজল বুলবুলিয়ার রব, দুপুর বেলায় চবুতরায় কাঁদত কবুতর! ভুঁই- তারকা সুন্দরী সজনে ফুলের দল ঝরি’ থোপা থোপা লা ছড়াত দোলন-খোঁপার’ পর। ঝাজাল হাওয়ায় বাজত উদাস মাছরাঙার স্বর!পিয়ালবনায় পলাশ ফুলের গেলাস-ভরা মউ! খেত বঁধুর জড়িয়ে গলা সাঁওতালিয়া বউ! লুকিয়ে তুমি দেখতে তাই, বলতে, ‘আমি অমনি চাই! খোঁপায় দিতাম চাঁপা গুঁজে, ঠোঁটে দিতাম মউ! হিজল শাখায় ডাকত পাখি “ বউ গো কথা কউ”ডাকত ডাহুক জল- পায়রা নাচত ভরা বিল, জোড়া ভুর” ওড়া যেন আসমানে গাঙচিল হঠাৎ জলে রাখত্‌ে পা, কাজলা দীঘির শিউরে গা- কাঁটা দিয়ে উঠত মৃণাল ফুটত কমল-ঝিল! ডাগর চোখে লাগত তোমার সাগর দীঘির নীল!উদাস দুপুর কখন গেছে এখন বিকেল যায়, ঘুম জড়ানো ঘুমতী নদীর ঘুমুর পরা পায়! শঙ্খ বাজে মন্দিরে, সন্ধ্যা আসে বন ঘিরে, ঝাউ-এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়! মাঠের বাঁশী বন্‌-উদাসী ভীম্‌পলাশী গায়অবাউল আজি বাউল হ’ল আমরা তফাতে! আম-মুকুলের গুঁজি-কাঠি দাও কি খোঁপাতে? ডাবের শীতল জল দিয়ে মুখ মাজ’কি আর প্রিয়ে? প্রজাপতির ডাক-ঝরা সোনার টোপাতে ভাঙা ভুর” দাও কি জোড়া রাতুল শোভাতে?বউল ঝ’রে ফ’লেছ আজ থোলো থোলো আম, রসের পীড়ায় টস্‌টসে বুক ঝুরছে গোপাবজাম! কামরাঙারা রাঙল ফের পীড়ন পেতে ঐ মুখের, স্মরণ ক’রে চিবুক তোমার, বুকের তোমার ঠাম- জামর”লে রস ফেটে পড়ে, হায়, কে দেবে দাম!ক’রেছিলাম চাউনি চয়ন নয়ন হ’তে তোর, ভেবেছিলুম গাঁথ্‌ব মালা পাইনে খুঁজে ডোর! সেই চাহনি নীল-কমল ভ’রল আমার মানস-জল, কমল-কাঁটার ঘা লেগেছে মর্মমূলে মোর! বক্ষে আমার দুলে আঁখির সাতনরী-হার লোর!তরী আমার কোন্‌ কিনারায় পাইনে খুঁজে কুল, স্মরণ-পারের গন্ধ পাঠায় কমলা নেবুর ফুল! পাহাড়তলীর শালবনায় বিষের মত নীল ঘনায়! সাঁঝ প’রেছে ঐ দ্বিতীয়ার-চাঁদ-ইহুদী-দুল! হায় গো, আমার ভিন্‌ গাঁয়ে আজ পথ হ’য়েছে ভুল!কোথায় তুমি কোথায় আমি চৈতে দেখা সেই, কেঁদে ফিরে যায় যে চৈত-তোমার দেখা নেই! কন্ঠে কাঁদে একটি স্বর- কোথায় তুমি বাঁধলে ঘর? তেমনি ক’রে জাগছে কি রাত আমার আশাতেই? কুড়িয়ে পাওয়া বেলায় খুঁজি হারিয়ে যাওয়া খেই!পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’, এই তরীতে হয়ত তোমার প’ড়বে রাঙা পা! আবার তোমার সুখ-ছোঁওয়ায় আকুল দোলা লাগবে না’য়, এক তরীতে যাব মোরা আর-না-হারা গাঁ পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’।।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9a%e0%a7%88%e0%a6%a4%e0%a7%80-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%a8%e0%a6%9c%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2/
2650
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশে যুগল তারা
চিন্তামূলক
আকাশে যুগল তারা চলে সাথে সাথে অনন্তের মন্দিরেতে আলোক মেলাতে।(স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akashe-jugol-atar/
2282
মহাদেব সাহা
স্মৃতি
চিন্তামূলক
স্মৃতি ছাড়া কোনো নোটবুক নাই টুকে রাখি কোথা ইট বা খোয়াই ভাঙা বাড়িটার ধূলি-জঞ্জাল বুক ভরে যারা ছিলো এতোকাল; কোথা লিখে রাখি এতো প্রিয় নাম যার পাশাপাশি একদা ছিলা! কিছু ভালোবাসা কিছু অবহেলা কোনটা প্রকৃত কোনটা বা খেলা বুনো ঝাউবীথি উদাসীন শাল চিরচেনা নদী মায়াবী রাখাল কাকে বলি তুমি কাকে নামে ডাকি অনেক ঠিকানা কাকে মনে রাখি। এতা পশুপাখি লোক লোকালয় পরিচিত ঘরে এতো পরিচয় তুচ্ছ তাকেও কতো দামে জানি ছেঁড়া কাগজেরও অভিমানখানি কতোদিন কতো ফুল আর মেঘ তারও পথ চেয়ে কী যে উদ্বেগ এই ধূলি কাঠ পাথরের ঘ্রাণ চিরদিন এই মানুষের গান লিখে রাখি কোথা এতো প্রিয়নাম যার পাশে আমি একদা ছিলাম! স্মৃতি ছাড়া আর নোটবুক নাই কিছু মনে পড়ে, কিছু ভুলে যাই! সে আসে আমার কাছে ঘুরে ঘুরে যেন এক স্রোতস্বিনী নদীর সুবাস, ভালোবাসা সে যেন হৃদয়ে শুধু ঘুরে ঘুরে কথা কয়, চোখের ভিতর হতে সুগভীর চোখের ভিতরে, সে আসে প্রতিদিন জানালায় ভোরের রোদের মতো বাহুলগ্ন আমার প্রেমিকা; সে আসে প্রত্যহ এই আলোকিত উজ্জ্বল শহরে, ইতিহাস আরো সব কিংবদন্তী কথা কয় আমার স্মৃতিতে, সে আসে দূর থেকে মনে হয় শ্যামল ছায়ায় ভরা যেন এক হরিণীর চোখ, অথবা রোদের সুরভিমাখা হেমন্তের শিশির সকাল সে আসে আমার কাছে নুয়ে পড়ে আমলকী বন; সে আসে আমার কাছে ভরে ওঠে বছরের শূন্য খামার নদীতে সহসা ওড়ে মাছরঙ নায়ের বাদাম ক্ষেতের দরাজ দেহ সিক্ত করে মেঘের মৈথুন, সে আসে আমার কাছে ফুটে ওঠে নিসর্গের নিবিড় কদম সে আসে আমার কাছে ঘুরে ঘুরে নদীর স্রোতের মতো জলে-ভাসা ভেলা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/375
3788
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যুগে যুগে জলে রৌদ্রে বায়ুতে
রূপক
যুগে যুগে জলে রৌদ্রে বায়ুতে গিরি হয়ে যায় ঢিবি। মরণে মরণে নুতন আয়ুতে তৃণ রহে চিরজীবী।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/juge-juge-jole-roudre-baiute/
4332
শামসুর রাহমান
আইসক্রিম
চিন্তামূলক
হঠাৎ পৃথিবীটাকে কেমন আলাদা মনে হয় বালকের। ভেণ্ডারের কাছ থেকে তৃষ্ণার্ত দুপুরে কিনেছে আইসক্রিম ছোট মাটির কলস ভেঙে জমানো পয়সা বের করে। পৌরপথে হেঁটে-হেঁটে বালক আইসক্রিম করছে লেহন; রূপকথা থেকে এক রাজা এসেছেন এ শহরে, মনে হলো তার; কিন্তু কী বিস্ময়, সে ব্যতীত কেউ তাকে ঠিক লক্ষ করছে না, তাঁর পোশাকের বাহার ভীষণ ব্যর্থ সাধারণ পোশাকের ভিড়ে। রাজার নিকটে যাবে কি যাবে না ভেবে বালক আইসক্রিম হাতে ফুটপাতে উঠে পড়ে, চলে আসে আবার গলির মোড়ে, একা। রাজার আয়ত চোখ মনে পড়ে তার; রৌদ্র-লাগা গোলাপি আইসক্রিম ক্রমশ গলতে থাকে তার মুখের ভেতর, জিভ কেমন বিবশ হয়ে আসে।  (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/aiscrim/
2548
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
মজার দেশ
ছড়া
এক যে আছে মজার দেশ, সব রকমে ভালো, রাত্তিরেতে বেজায় রোদ, দিনে চাঁদের আলো ! আকাশ সেথা সবুজবরণ গাছের পাতা নীল; ডাঙ্গায় চরে রুই কাতলা জলের মাঝে চিল ! সেই দেশেতে বেড়াল পালায়, নেংটি-ইঁদুর দেখে; ছেলেরা খায় 'ক্যাস্টর-অয়েল' -রসগোল্লা রেখে ! মণ্ডা-মিঠাই তেতো সেথা, ওষুধ লাগে ভালো; অন্ধকারটা সাদা দেখায়, সাদা জিনিস কালো ! ছেলেরা সব খেলা ফেলে বই নে বসে পড়ে; মুখে লাগাম দিয়ে ঘোড়া লোকের পিঠে চড়ে ! ঘুড়ির হাতে বাঁশের লাটাই, উড়তে থাকে ছেলে; বড়শি দিয়ে মানুষ গাঁথে, মাছেরা ছিপ্ ফেলে ! জিলিপি সে তেড়ে এসে, কামড় দিতে চায়; কচুরি আর রসগোল্লা ছেলে ধরে খায় ! পায়ে ছাতি দিয়ে লোকে হাতে হেঁটে চলে ! ডাঙ্গায় ভাসে নৌকা-জাহাজ, গাড়ি ছোটে জলে ! মজার দেশের মজার কথা বলবো কত আর; চোখ খুললে যায় না দেখা মুদলে পরিষ্কার !
https://banglarkobita.com/poem/famous/433
1417
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
দূরের মানুষ
প্রেমমূলক
দূরের মানুষ দুরেই থাকা ভালো সাইবেরিয়ান হাঁসের মতো দূরে কাছে এলে দূরত্বটাই বাড়ে দূরে গেলে বিরহের উত্তাপে নির্বাপিত তৃষ্ণা আবার জাগে । দূরের মানুষ দূরেই থাকা ভালো কখনো যদি প্রশ্ন জাগে মনে দূরের মানুষ কাছে কেন এলে ? ভালোবাসা খুদ-কুঁড়ো জল চেয়ে কাটলো অনেক বছর অনেক মাস কালো গোলাপ আর পারি না যে দশ বছরের তৃষ্ণা বুকের মাঝে এবার তোমায় দিলাম বনবাস ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1046
1037
জীবনানন্দ দাশ
জুহু
চিন্তামূলক
সান্টাক্রুজ থেকে নেমে অপরাহ্নে জহুর সমুদ্রপারে গিয়ে কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিলো সূর্যের নিকটে থেমে সোমেন পালিত; বাংলার থেকে এত দূরে এসে- সমাজ, দর্শন, তত্ত্ব, বিজ্ঞান হারিয়ে, প্রেমকেও যৌবনের কামাখ্যার দিকে ফেলে পশ্চিমের সমুদ্রের তীরে ভেবেছিলো বালির উপর দিয়ে সাগরের লঘুচোখ কাঁকড়ার মতন শরীরে ধবল বাতাস খাবে সারাদিন; যেইখানে দিন গিয়ে বৎসরে গড়ায়- বছর আয়ুর দিকে- নিকেল-ঘড়ির থেকে সূর্যের ঘড়ির কিনারায় মিশে যায়- সেখানে শরীর তার নকটার্ন-রক্তিম রৌদ্রের আড়ালে অরেঞ্জস্কোয়াস খাবে হয়তো বা, বোম্বায়ের ‘টাইমস্‌’টাকে বাতাসের বেলুনে উড়িয়ে, বর্তুল মাথায় সূর্য বালি ফেনা অবসর অরুণিমা ঢেলে, হাতির হাওয়ায় লুপ্ত কুয়েতের মতো দেবে নিমেষে ফুরিয়ে চিন্তার বুদ্‌বুদদের। পিঠের ওপার থেকে তবু এক আশ্চর্য সংগত দেখা দিলো; ঢেউ নয়, বালি নয়, ঊনপঞ্চাশ নায়ু, সূর্য নয় কিছু- সেই রলরোলে তিন চার ধনু দূরে-দূরে এয়ারোড্রামের কলরব লক্ষ্য পেলো অচিরেই- কৌতুহলে হৃষ্ট সব সুর দাঁড়ালো তাহাকে ঘিরে বৃষ মেষ বৃশ্চিকের মতন প্রচুর; সকলেরই ঝিঁক চোখে- কাঁধের উপরে মাথা-পিছু কোথাও দ্বিরুক্তি নেই মাথাত ব্যথার কথা ভেবে। নিজের মনের ভুলে কখন সে কলমকে খড়গের চেয়ে ব্যাপ্ত মনে ক’রে নিয়ে লিখেছে ভূমিকা, বই সকলকে সম্বোধন ক’রে! কখন সে বাজেট-মিটিং, নারী, পার্টি- পলিটিক্স, মাংস, মার্মালেড ছেড়ে অবতার বরাহকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিলো; টোমাটোর মতো লাল গাল নিয়ে শিশুদের ভিড় কুকুরের উৎসাহ, ঘোড়ার সওয়ার, পার্শী, মেম, খোজা, বেদুইন সমুদ্রের তীর, জুহু, সূর্য, ফেনা, বালি- সান্টাক্রুজে সবচেয়ে পররতিময় আত্মক্রীড়া সে ছাড়া তবে কে আর? যেন তার দুই গালে নিরুপম দাড়ির ভিতরে দু’টো বৈবাহিক পেঁচা ত্রিভুবন আবিষ্কার ক’রে তুব ঘরে ব’সে আছে; মুন্সী, সাভাকর, নরীম্যান তিন দৃষ্টিকোণ থেকে নেমে এসে দেখে গেল, মহিলারা মর্মরের মতো স্বচ্ছ কৌতুহলভরে, অব্যয় শিল্পীরা সবঃ মেঘ না চাইতে এই জল ভালোবাসে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/juhu/
2160
মহাদেব সাহা
তিনি এক স্বপ্নচারী লোক
মানবতাবাদী
আমার বাবার এখন দ্রুত পাল্টাচ্ছে চোখ তাকে ততো ব্যথিত লাগে না তিনি অনায়াসে ঘাসের ভিতর আরো পতঙ্গের উৎসাহ দেখেন, মানুষের নব জাগরণ, অতিশয় ব্যগ্র তিনি পৃথিবীর ভালো দেখতে চান, তাকে আর ব্যথিত লাগে না। সহজে এখন তিনি পাপীকেও তীর্থধূলির মতো বুকে তুলে নেন। একদিন যেমন তিনি শস্যের সম্ভাব্য ক্ষতি নিশ্চিত জেনেও তবু বলেছেন, বর্ষণ থামার বেশি বাকি নাই, এবারের শস্য রক্ষা হবে উথালপাতাল সেই ভাঙনের স্রোতে আমাদের দক্ষিণের দুটি ঘর ভাসমান দেখে তবু তিনি কীভাবে যে বলেছেন আমাদের বাড়ি আর বিশেষ ভাঙবে না, ভাঙনপবণ এই নদীকেও কোনোদিন এতোটা বিশ্বাস কেউ করে যেন তিনি এইভাবে বিশ্বাসের বলে ঠেকাবেন যতো সর্বনাশ। এখনো তেমনি তার অথই বিশ্বাস সুখী হবে দুর্গত-দুঃখিত এই দেশ, দুর্দিনের দাহ লেশ মুছেযাবে এই অনশন, অন্নাভাব, অগ্নিমূল্যে বেঁচে থেকে তিনি অকাতরে এখনো বলেন, আর চাল দুর্মূল্য হবে না, দেখো এইবার ঠিকই পাওয়া যাবে অপর্যাপ্ত শিশুখাদ্য দেশে লোকে তার কথা শুনে হাসে। আমি ভাবি স্বপ্ন আর কোথাও নেই শুধু তার এই দুটি চোখে না হলে সবুজ তণ্ডুলে এতো কাঁকরের বিষ কেন তার চোখেই পড়ে না! বাবার চোখের দিকে আমি ভয়ে তাকাতে পারি না। কী করে যে তার প্রায় অবলুপ্ত এই দুটি চোখে এতো ভরসা রাখেন এখন তো তার এই চোখ দ্রুত পাল্টাচ্ছে প্রত্যহ এখন হয়তো সবুজকে তিনি আর তেমন সবুজ দেখেন না চশমার পয়েন্ট তার দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে তা হলে কী হবে আমি জানি তবু এই গভীর কুয়াশাচ্ছন্ন চোখে তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ বড়ো বেশি উজ্জ্বল দেখেন। আমার বাবার মতো বিশ্বাসী লোক আমি কখনো দেখিনি তার এখন বয়স বেড়েছে বেশ বোঝা যায় আর ততো তাকে মনে হচ্ছে তিনি এই পৃথিবীর প্রকৃত প্রেমিক শুধু ভালো দেখতে চান জেনে যেতে চান বুঝি ব্যথিত বৃক্ষের অব্যাহতি মানুষের কুশলকল্লোল না হলে কী নিয়ে যাবেন তিনি অতো দূরে নিতান্ত একাকী শেষবেলা, তাও বুঝি! আমি জানি আজীবন আমার বাবার এই সামান্য বিশ্বাস ছাড়া তেমন আর কিছুই ছিলো না শুধু এইটুকু নিয়ে তিনি দুঃসময়ে আমাদের আদিগন্ত দিয়েছেন দোলা নিজে তিনি পুড়েছেন ব্যর্থতার রোদে বিপর্যয়ে এই একাকী মানুষ, তবু চিরদিন তিনি বড়ো স্বপ্নচারী লোক সেই স্বপ্ন আজো তার চোখে, তাকে ততো ব্যথিত লাগে না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1504
2985
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গাছ দেয় ফল
নীতিমূলক
গাছ দেয় ফল ঋণ ব'লে তাহা নহে। নিজের সে দান নিজেরি জীবনে বহে। পথিক আসিয়া লয় যদি ফলভার প্রাপ্যের বেশি সে সৌভাগ্য তার।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gach-dey-fol/
3138
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তব চিত্তগগনের
ভক্তিমূলক
তব চিত্তগগনের দূর দিক্‌সীমা বেদনার রাঙা মেঘে পেয়েছে মহিমা।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tobo-chittogogoner/
5036
শামসুর রাহমান
বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়
স্বদেশমূলক
সারারাত নূর হোসেনের চোখে এক ফোঁটা ঘুমও শিশিরের মতো জমেনি, বরং তার শিরায় শিরায় জ্বলেছে আতশবাজি সারারাত, কী এক ভীষণ বিস্ফোরণ সারারাত জাগিয়ে রেখেছে ওকে, ওর বুকে ঘন ঘন হরিণের লাফ, কখনো অত্যন্ত ক্ষীপ্র জাগুয়ার তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে জ্বলজ্বলে চোখে খর তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে, এতটুকু ঘুমাতে দেয়নি। কাল রাত ঢাকা ছিল প্রেতের নগরী, সবাই ফিরেছে ঘরে সাত তাড়াতাড়ি। চতুর্দিকে নিস্তব্ধতা ওঁৎ পেতে থাকে, ছায়ার ভেতরে ছায়া, আতঙ্ক একটি কৃষ্ণাঙ্গ চাদরে মুড়ে দিয়েছে শহরটিকে আপাদমস্তক। মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক নৈঃশব্দ্যকে আরো বেশি তীব্র করে তোলে প্রহরে প্রহরে, নূর হোসেনের চোখে খোলা পথ ওর মোহন নগ্নতা দিয়ে আমন্ত্রণ জানায় দুর্বার। অন্ধকার ঘরে চোখ দুটি অগ্নিঘেরা জানালা, কব্জিতে তার দপদপ করে ভবিষ্যৎ। এমন সকাল তার জীবনে আসেনি কোনোদিন, মনে হয় ওর; জানালার কাছে পাখি এ-রকম সুর দেয়নি ঝরিয়ে এর আগে, ডালিমের গাছে পাতাগুলি আগে এমন সতেজ কখনো হয়নি মনে। জীবনানন্দের কবিতার মায়াবী আঙুল তার মনে বিলি কেটে দেয়। অপরূপ সূর্যোদয়, কেমন আলাদা, সবার অলক্ষে নূর হোসেনের প্রশস্ত ললাটে আঁকা হয়ে যায়, যেন সে নির্ভীক যোদ্ধা, যাচ্ছে রণাঙ্গনে। উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠে রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য শ্লোগান, বীরের মুদ্রায় হাঁটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ শহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা নূর হোসেনের বুক নয়, যেন বাংলাদেশের হৃদয় ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।
https://banglapoems.wordpress.com/2014/11/10/%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%95-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b9%e0%a7%83%e0%a6%a6%e0%a7%9f-%e0%a6%b6/
1755
পূর্ণেন্দু পত্রী
আগুনের ভেতর দিয়ে বাস-রুট
চিন্তামূলক
গনগনে আগুনের ভিতর দিয়ে আমাদের বাস-রুট। পিকাসোর ছবির মতো ক্ষতবিক্ষত ভাঙচুরে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে গেছি আমরা। ফাটাচায়ের পেয়ালা থেকে লাফিয়ে উঠে যে-সব নীরব শোক আত্মঘাতী হওয়ার জন্যে ছুটে যায় ঘুরন্ত চাকার দিকে তাদের পিঠে হাত রেখে আমরা বলি এসো। আশবাঁটিতে মাছ-কাটার মতো ফিনকি দেওয়া যাদের আর্তনাদে সূর্যোদয়ের আকাশ ভাঙা আশির মতো ঝাঁঝরা, তাদের হাতে গন্তব্যের টিকিট দিয়ে বলি এসো। বিকট অন্ধকার আর নক্ষত্র লন্ঠনে মাঝখানে কোনো বসার জায়গা না পেয়ে যেন বন্যার্ত এইভাবে গায়ে গা এঁটে যায় আমাদের। বাতাস যেন ডালপালাময় কোনো ফলন্ত গাছ এইভাবেই বাতাসকে বিশ্বস্ত ভঙ্গিতে জড়িয়ে থাকে আমাদের হাত-পা নিশ্বাস বিশ্বাস আর গনগণে আগুনের ভিতর দিয়ে আমাদের বাস-রুট। খালি চোখে রাহুতে খাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়েছিল যারা খরার খেতে আলোর বীজ-বপনের ব্যগ্রতায়, তাদের রক্তাক্ত শহীদবেদী ছুয়ে ছুয়েই স্টপেজ। যে-কোনো মহৎ ভাবনার শরীর যখনই হয়ে ওঠে আঠারো বছরের কুমারীর মতো স্বাস্থ্যময় গোপন সুড়ঙ্গ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলাৎকার সেই সব ফুপিয়ে কান্নার গা ঘেঁষেই স্টপেজ। উলঙ্গ ষাঁড়েরা ছড়ি ঘুরিয়ে চলেছে তিনমাথা চারমাথার মোড়ে মোড়ে। খুনখারাপির দাঁত থকথকে পানের পিক ছিটিয়ে চলেছে বাঁকে বাঁকে আর গনগনে আগুনের ভিতর দিয়ে আমাদের বাস-রুট। আকাশের ছেঁড়া-কাঁথায় চিকেন-পকসের কাতরতা নিয়ে শুয়ে আছে মেঘ। গত দশ বছর বজ্রের গলায় আল্‌সার। বিস্তীর্ণ ভূখন্ডে শ্যামল চাষাবাদের জন্যে প্রস্তুত বৃষ্টিরা হারিয়ে ফেলেছে তাদের নৈশ অভিযানের মানচিত্র। জল নেই অথচ থকথকে কাদা আর গর্ত গহ্বর নিম্নগামী আদিম খাদ। গন্তব্য ক্রমাগতই রয়ে যায় দূরত্বে অথবা ভূল রুটে বাজতে থাকে বিপন্ন হর্ন। গনগনে আগুনের ভিতর দিয়েই আমাদের বাস-রুট।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1167
4307
শামসুর রাহমান
অন্য কিছু
চিন্তামূলক
আমার তিনটি শার্ট চাই আপাতত, এক জোড়া ট্রাউজার, দুটি গেঞ্জি আর তিন জোড়া জুতো। আন্ডারওয়ার অবশ্যই, রবিন পাখির মতো কয়েকটি রুমালও জরুরি। চাই কিছু গ্রন্থাবলি; চাই, চাই- বীমার কিস্তির টাকা, চাই মাগ্যিভাতা, রেস্ত রোজ। শুধু কি এসবই চাই? অন্য কিছু নয়?খবর কাগজ ওড়ে হাওয়ায়, যেন ওরা পরীর পোশাক মিহি ঝলমলে, কিঞ্চিৎ রহস্যময় বটে, বহুরূপী মেঘের নানান স্তরে ভাসমান দেখি। সেলুনে মুণ্ডিত হতে দেখি রোজ কিছু মাথা, রকমারি ছাঁট কী বাহারি চুলে দেখি মঞ্চে বিদূষক নায়কের কানে কী যেন কী বলতে গিয়ে হেসে লুটোপুটি, দুটি শালিখের দিকে একজন বুড়োসুড়ো লোক ছুঁড়ে দেন বাসি রুটি, গলির ধুলোয় বালক বানায় দূর্গ, জুয়াড়ী পয়সা গোঁজে ট্যাঁকে। শুধু কি এসবই দেখি? অন্য কিছু নয়?কখনো গলির মোড়ে অস্পষ্ট সংলাপ শুনি দু’টি মানুষের, কখনোবা কর্কশ বচসা, চৌরাস্তায় পুলিশের বাঁশি বাজে, মধ্যরাতে ক্ষিপ্র কুকুরের পদশব্দ; ফেরি-অলা ডেকে যায় মধ্যবিত্ত কিশোরীকে আর মহিলাকে সচকিত ক’রে; প্রায়শই গৃহিনীর অসুস্থ বিলাপ শুনি, রেডিওতে শস্তা গান বাজে একটানা, অকস্মাৎ মেঘের গর্জন শুনি চৈত্রের আকাশে। শুধু কি এসবই শুনি? অন্য কিছু নয়?  (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/onyo-kichu/
4067
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হোক ভারতের জয়
স্বদেশমূলক
এসো এসো ভ্রাতৃগণ! সরল অন্তরে সরল প্রীতির ভরে সবে মিলি পরস্পরে আলিঙ্গন করি আজ বহুদিন পরে । এসেছে জাতীয় মেলা ভারতভূষণ , ভারত সমাজে তবে হৃদয় খুলিয়া সবে এসো এসো এসো করি প্রিয়সম্ভাষণ । দূর করো আত্মভেদ বিপদ-অঙ্কুর , দূর করো মলিনতা বিলাসিতা অলসতা , হীনতা ক্ষীণতা দোষ করো সবে দূর । ভীরুতা বঙ্গীয়জন-কলঙ্ক-প্রধান — সে-কলঙ্ক দূর করো , সাহসিক তেজ ধরো , স্বকার্যকুশল হও হয়ে একতান । হল না কিছুই করা যা করিতে এলে — এই দেখো হিন্দুমেলা , তবে কেন কর হেলা ? কী হবে কী হবে আর তুচ্ছ খেলা খেলে ? সাগরের স্রোতসম যাইছে সময় । তুচ্ছ কাজে কেন রও , স্বদেশহিতৈষী হও — স্বদেশের জনগণে দাও রে অভয় । নাহি আর জননীর পূর্বসুতগণ — হরিশ্চন্দ্র যুধিষ্ঠির ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ বীর , অনন্তজলধিতলে হয়েছে মগন । নাহি সেই রাম আদি সম্রাট প্রাচীন , বিক্রম-আদিত্যরাজ , কালিদাস কবিরাজ , পরাশর পারাশর পণ্ডিত প্রবীণ । সকলেই জল বায়ু তেজ মৃত্তিকায় মিশাইয়া নিজদেহ অনন্ত ব্রহ্মের গেহ পশেছে কীর্তিরে শুধু রাখিয়ে ধরায় । আদরে সে প্রিয় সখী আচ্ছাদি গগনে সে লোকবিশ্রুত নাম সে বিশ্ববিজয়ী ধাম নির্ঘোষে ঘুষিছে সদা অখিল ভুবনে । যবনের রাজ্যকালে কীর্তির আধার চিতোর-নগর নাম অতুলবীরত্বধাম , কেমন ছিল রে মনে ভাবো একবার । এইরূপ কত শত নগর প্রাচীন সুকীর্তি-তপন-করে ভারত উজ্জ্বল ক ' রে অনন্ত কালের গর্ভে হয়েছে বিলীন । নাহি সেই ভারতের একতা-বিভব , পাষাণ বাঁধিয়া গলে সকলের পদতলে লুটাইছে আর্যগণ হইয়া নীরব । গেল , হায় , সব সুখ অভাগী মাতার — ছিল যত মনোআশা নিল কাল সর্বনাশা , প্রসন্ন বদন হল বিষণ্ন তাঁহার । কী আর হইবে মাতা খুলিয়া বদন । দীপ্তভানু অস্ত গেল , এবে কালরাত্রি এল , বসনে আবরি মুখ কাঁদো সর্বক্ষণ । বিশাল অপার সিন্ধু , গভীর নিস্বনে যেখানে যেখানে যাও কাঁদিতে কাঁদিতে গাও — ডুবিল ভারতরবি অনন্ত জীবনে । সুবিখ্যাত গৌড় যেই বঙ্গের রতন — তার কীর্তিপ্রতিভায় খ্যাতাপন্ন এ ধরায় হয়েছিল একদিন বঙ্গবাসিগণ । গেল সে বঙ্গের জ্যোতিঃ কিছুকাল পরে — কোনো চিহ্ন নাহি তার , পরিয়া হীনতাহার , ডুবিয়াছে এবে বঙ্গ কলঙ্কসাগরে । হিন্দুজনভ্রাতৃগণ! করি হে বিনয় — একতা উৎসাহ ধরো , জাতীয় উন্নতি করো , ঘুষুক ভুবনে সবে ভারতের জয় । জগদীশ! তুমি , নাথ , নিত্য-নিরাময় করো কৃপা বিতরণ , অধিবাসিজনগণ , করুক উন্নতি — হোক্‌ ভারতের জয়!
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hak-barater-jay/
3902
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সখি লো সখি লো নিকরুণ মাধব
ভক্তিমূলক
সখি লো, সখি লো, নিকরুণ মাধব মথুরাপুর যব যায় করল বিষম পণ মানিনী রাধা রোয়বে না সো, না দিবে বাধা, কঠিন‐হিয়া সই হাসয়ি হাসয়ি শ্যামক করব বিদায়। মৃদু মৃদু গমনে আওল মাধা,        বয়ন‐পান তছু চাহল রাধা, চাহয়ি রহল স চাহয়ি রহল— দণ্ড দণ্ড, সখি, চাহয়ি রহল— মন্দ মন্দ, সখি— নয়নে বহল বিন্দু বিন্দু জলধার। মৃদু মৃদু হাসে বৈঠল পাশে,       কহল শ্যাম কত মৃদু মধু ভাষে। টুটয়ি গইল পণ, টুটইল মান,       গদগদ আকুল ব্যাকুল প্রাণ, ফুকরয়ি উছসয়ি কাঁদিল রাধা— গদগদ ভাষ নিকাশল আধা— শ্যামক চরণে বাহু পসারি কহল, শ্যাম রে, শ্যাম হমারি, রহ তুঁহু, রহ তুঁহু, বঁধু গো রহ তুঁহু,       অনুখন সাথ সাথ রে রহ পঁহু— তুঁহু বিনে মাধব, বল্লভ, বান্ধব,        আছয় কোন হমার! পড়ল ভূমি‐’পর শ্যামচরণ ধরি,        রাখল মুখ তছু শ্যামচরণ‐’পরি, উছসি উছসি কত কাঁদয়ি কাঁদয়ি        রজনি করল প্রভাত। মাধব বৈসল, মৃদু মধু হাসল কত অশোয়াস‐বচন মিঠ ভাষল,       ধরইল বালিক হাত। সখি লো, সখি লো, বোল ত সখি লো,       যত দুখ পাওল রাধা, নিঠুর শ্যাম কিয়ে আপন মনমে        পাওল তছু কছু আধা। হাসয়ি হাসয়ি নিকটে আসয়ি        বহুত স প্রবোধ দেল, হাসয়ি হাসয়ি পলটয়ি চাহয়ি        দূর দূর চলি গেল। অব সো মথুরাপুরক পন্থমে        ইঁহ যব রোয়ত রাধা। মরমে কি লাগল তিলভর বেদন,       চরণে কি তিলভর বাধা। বরখি আঁখিজল ভানু কহে,       অতি       দুখের জীবন ভাই। হাসিবার তর সঙ্গ মিলে বহু        কাঁদিবার কো নাই।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sake-lu-sake-lu-nekarun-madab/
3707
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাঝারির সতর্কতা
নীতিমূলক
উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/majharir-sotorkota/
2521
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
শব্দে নৈশব্দে
চিন্তামূলক
দুপুর মাথায় করে আমাকে হাঁটিয়ে নিয়ে পথ আচানক থেমে যায় অশ্বত্থের নিচে - আর ঘুঘুদের বিরহ কাসিদা তখনি কি জানি কেন ছিঁড়ে দেয় তক্ষকের কঠিন ধমক- বুঝি বা জানিয়ে দিতে, তাদের আহার নিদ্রা সহবাস খিদা এসবের একচ্ছত্র অধিকার আছে এই অশ্বত্থ বাড়িতে সেখানে আমিতো এক অনাহুত আগন্তুক ছাড়া কিছু নই তবুও অশ্বত্থ কোনো কার্পণ্য করে না ছায়া দিতে ঘুম দিতে- স্বপ্নের ভিতরে ঢুকে আমার মাথার চুলে যত্নের কাঁকই চালাতে নিপুণমন্ত্রে - গৌতম বুদ্ধের কথা শোনাতে শোনাতে-যে সব শব্দকে আমি মৃত জেনে সেই কবে লাশকাটা ঘরে নিজেই এসেছি ফেলে - সেই সব মৃতদেহগুলো হাতে হাতে জড়াজড়ি করে এসে নির্বাণের শ্লোক হয় মাথার ভিতরেঘুম ভেঙে জেগে উঠে মনে হয় এইসব শব্দেরা অমর সম্মোহিত স্বরে বলি - আমি হবো এ অমর শব্দের রক্ষক চিন্তার আঙুল দিয়ে মগজে এসব কথা সাজাবার পর হঠাৎ চিৎকারে সব ছিন্নভিন্ন করে দেয় অদৃশ্য তক্ষকতারপর পথ এসে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে-যেতে-যেতে নিজেই হারিয়ে যায় - তার আগে দিয়ে যায় নির্জনতা আর এককের গানে বাঁধা একতারা - আর আমি বুকে কান পেতে শুনি কোন অন্তহীন শূন্যতার বুক ফাঁটা নিঃশব্দ চিৎকার
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/shobde-noishobde/
874
জসীম উদ্‌দীন
মা ও খোকন
গীতিগাথা
মা বলিছে, খোকন আমার! যাদু আমার মানিক আমার! উদয়তারা খোকন আমার! ঝিলিক মিলিক সাগর-ফেনার! ফিনকি হাসি ক্ষণিকজ্বলা বিজলী-মালার খোকন আমার! খোকন আমার দুলকি হাসি, ফুলকি হাসি জোছনা ধারার। তোমায় আমি দোলার উপর দুলিয়ে দিয়ে যাই যে দুলে, - যাই যে দুলে, সকল ভুলে, রাঙা মেঘের পালটি তুলে, দেই তোমারে দোলায় দুলে। খোকন তখন লাফিয়ে উঠে সাইকেলেতে যায় যে ছুটে, বল খেলিয়ে খেলার মাঠে সবার তারিফ লয় যে লুটে। মা বলিছে, খোকন আমার! মানিক আমার! এতটুকুন দস্যি আমার! লক্ষ্মী আমার! হলদে রঙের পক্ষী আমার! তোমায় আমি পোষ মানাব বুকের খাঁচায় ভরে তোমায় আমি মিষ্টি দেব, তোমায় আমি লজেন্স দেব, তোমায় আমি দুধ খাওয়াব সোনার ঝিনুক ভরে! খোকন তখন লাফিয়ে উঠে, রান্না ঘরে যায় যে ছুটে, কলাই ভাজা চিবোয় সে যে পূর্ন দুটি মুঠো। মা বলিছে, খোকন আমার! যাদু আমার! মানিক আমার! ঈদের চাঁদের হাসি আমার! কেমন করে রাখি তোরে বুকের মাঝে ধরে? এতটুকুন আদর আমার! দূর্বা শিষের শিশির আমার! মেঘের বুকের বিজলী আমার! সকল সময় পরাণ যে মোর হারাই হারাই করে; এত করে আদর করি ভরসা না পাই তোরে আমার বুকের মাঝে ধরে। পাল-পাড়াতে কলেরাতে, মরছে লোকে দিনে রাতে, বোস পাড়াতে বসন্ত আজ দিচ্ছে বড়ই হানা, আমরা মাথার দিব্যি লাগে ঘরটি ছেড়ে- যাসনে কোথাও ভুলি মায়ের মানা। খোকন তখন লাফিয়ে উঠে, ওষুধ লয়ে যায় যে ছুটে, পাল-পাড়াতে দিনে রাতে রোগীর সেবা করে; মরণ-মুখো রোগী তখন অবাক হয়ে চেয়ে দেখে ফেরেস্তা কে বসে আছে তার শিয়রের পরে। মুখের পানে চাইলে, তাহার রোগের জ্বালা। যায় যে দূরে সরে। মা বলিছে, খোকন আমার! সোনা আমার! হীরে-মতির টুকরো আমার! টিয়ে পাখির বাচ্চা আমার! তোরে লয়ে মন যে আমার এমন ওমন কেমন যেন করে। পুতুল খেলার পুতুল আমার! বকুল ফুলের মালা আমার! তোরে আদর করে আমার পরাণ নাহি ভরে। ও পাড়াতে ওই যে ওধার, ঘরে আগুন লাগছে কাহার, আজকে ঘরের হোসনেরে বার, আমার মাথায় হাত দিয়ে আজ বল ত শপথ করে। খোকন তখন লাফিয়ে উঠে, ক্ষিপ্ত হয়ে যায় যে ছুটে, জ্বলন্ত সেই আগুন পানে সবার সাথে জুটে। দাউ দাউ দাউ আগুন ছোটে, কুন্ডলী যে পাকিয়ে ওঠে; ওই যে কুঁড়ে, ঘরের তলে, শিশু মুখের কাঁদন ঝলে, চীৎকারিয়ে উঠছে মাতা আঁকড়িয়ে তায় ধরে। জ্বলছে আগুন মাথার পরে কে তাহাদের রক্ষা করে। মুহূর্তে যে সকল কাঁদন যাবে নীরব হয়ে; সেই লেলিহা আগুন পরে খোকা মোদের লাফিয়ে পড়ে, একটু পরে বাইরে আসে তাদের বুকে করে। মা যে তখন খোকারে তার বুকের মাঝে ধরে, বলে আমার সোনা মানিক! লক্ষ্মী মানিক! ঘুমো দেখি আমার বুকের ঘরে। খোকা বলে, মাগো আমার সোনা মানিক। সকল শ্রানি- জুড়াব আজ তোমার কোলের পরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/579
4477
শামসুর রাহমান
একটি টিনের বাঁশি
সনেট
যখন ছিলাম সাত বছরের খেয়ালি বালক, মধ্যদিনে বিছানাকে রত্নদ্বীপ ভেবে সযতনে খুঁজতাম গুপ্তধন। শিকারের খোঁজে ঘুরে বনে দিতাম মাথায় গুঁজে সাতরঙা পাখির পালক রেড ইণ্ডিয়ানদের মতো আর উটের চালক সেজেছি তো সাহারায়। সে-সব দুপুরে ক্ষণে ক্ষণে চিরচেনা বাঁশি-অলা বাজাতো টিনের বাঁশি, মনে জ্বালাতো আতশবাজি, গলিময় সুরের আলোক।আজ এই জীবনের মধ্যদিনে ভাবি যদি সেই বাঁশি-অলা ফিরে আসে, এ-গলির মোড়ে ঘুরে ঘুরে বাজায় টিনের বাঁশি, তা হলে আনাড়ি তার সুরে পাবো কি আনন্দ আর? ডেকে এনে নিজের পাশেই আবার বসাবো তাকে? অসম্ভব, সে পৃথিবী পড়ে হয়ে গেছে ছাই আর সে-বালক অনেক আগেই!   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-tiner-bashi/
4536
শামসুর রাহমান
কতিপয় উচ্চারণ
প্রেমমূলক
হর পরহেজগার মুসলমানের কণ্ঠে প্রায় প্রতিক্ষণ উচ্চারিত হয় আল্লা-রসুলের নাম, ভক্তিরসে নিমজ্জিত হিন্দু হরে কৃষ্ণ হরে রাম, দুর্গা দুর্গা জপেন সর্বদা, নিবেদিত ভক্তপ্রাণ খৃস্টান গির্জায় কিংবা ঘরে যীশু আর মাতা মেরী উচ্চারণে, স্তবে অনলস। কৃচ্ছ্রনিষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষু বুদ্ধের উদ্দেশে ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ মন্ত্র আওড়ান পবিত্রতা ধ্যানে এনে।অথচ এই যে আমি রুগ্ন, অসহায়, ধিক্কার অথবা চরম দণ্ডের প্রতি উদাসীন সকল সময় সুফী ঘরানার নৃত্যপর বৃত্ত ছুঁয়ে অন্তর্গত স্তব্ধতায় লীন কিবা স্বপ্নে কিবা জাগরণে আমার স্পন্দিত ওষ্ঠে ফোটাই তারার মতো অবিরত দয়িতা তোমার প্রিয় নাম।   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kotipoy-uccharon/
1507
নির্মলেন্দু গুণ
মানুষ
চিন্তামূলক
আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম, হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়, মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় । আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি, গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না, অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না । কী করে তাও বেঁচে থাকছি, ছবি আঁকছি, সকালবেলা, দুপুরবেলা অবাক করে সারাটা দিন বেঁচেই আছি আমার মতে । অবাক লাগে । আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে জুতো থাকতো, বাড়ি থাকতো, ঘর থাকতো, রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে নারী থাকতো, পেটের পটে আমার কালো শিশু আঁকতো । আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে আকাশ দেখে হাসবো কেন ? মানুষগুলো অন্যরকম, হাত থাকবে, নাক থাকবে, তোমার মতো চোখ থাকবে, নিকেলমাখা কী সুন্দর চোখ থাকবে ভালোবাসার কথা দিলেই কথা রাখবে । মানুষ হলে উরুর মধ্যে দাগ থাকতো , বাবা থাকতো, বোন থাকতো, ভালোবাসার লোক থাকতো, হঠাৎ করে মরে যাবার ভয় থাকতো । আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখা আর হতো না, তোমাকে ছাড়া সারাটা রাত বেঁচে থাকাটা আর হতো না । মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ; অথচ আমি সাপ দেখলে এগিয়ে যাই, অবহেলায় মানুষ ভেবে জাপটে ধরি ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/195
3978
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেই পুরাতন কালে ইতিহাস যবে
চিন্তামূলক
সেই পুরাতন কালে ইতিহাস যবে সংবাদে ছিল না মুখরিত নিস্তব্ধ খ্যাতির যুগে-- আজিকার এইমতো প্রাণযাত্রাকল্লোলিত প্রাতে যাঁরা যাত্রা করেছেন মরণশঙ্কিল পথে আত্মার অমৃত-অন্ন করিবারে দান দূরবাসী অনাত্মীয় জনে, দলে দলে যাঁরা উত্তীর্ণ হন নি লক্ষ্য, তৃষানিদারুণ মরুবালুতলে অস্থি গিয়েছেন রেখে, সমুদ্র যাঁদের চিহ্ন দিয়েছে মুছিয়া, অনারদ্ধ কর্মপথে অকৃতার্থ হন নাই তাঁরা-- মিশিয়া আছেন সেই দেহাতীত মহাপ্রাণ-মাঝে শক্তি জোগাইছে যাহা অগোচরে চিরমানবেরে-- তাঁহাদের করুণার স্পর্শ লভিতেছি আজি এই প্রভাত-আলোকে, তাঁহাদের করি নমস্কার।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shi-puratan-kala-etehas-jaba/
1924
পূর্ণেন্দু পত্রী
হে স্বচ্ছন্দ তরুলতা
প্রকৃতিমূলক
হে স্বচ্ছন্দ তরুলতা, তোমরা রয়েছ বলে আছি। চামচিকের নাচানাচি গাঢ়তর করেছে আঁধার কোলাব্যাঙ জেনে গেছে তার হাতে মেঘ, অন্নজল মাকড়সারও বড় সাধ মাঝ গাঙে মাছ ধরবে জালে, ইদুর সুড়ঙ্গ কেটে চলে যাবে চাঁদের পাহাড়ে। হে স্বচ্ছন্দ তরুলতা, তোমরা রয়েছ বলে আছি। শিকড়ে জড়ানো মাটি, হাঁটাহাঁটি ব্যস্ত শত মুলে শাখায় সংসার, পুষ্প-পল্লবের উঠোন দালান মৃত্যু আছে সেখানেও, খরা আছে, বহু ভাঙচোর ঝড় কিছু কাড়ে, কিছু বৃষ্টিজল ভাসায়-পচায় রোদ্দুর চিবোয় কিছু, ঝরে যায়, তবু ঢের থাকে শিশিরে স্নানের যোগ্য। পৃথিবীর তামাটে প্রান্তরে তোমারই একমাত্র শামিয়ানা, সুস্থ, সভা, সুদৃশ্য ভাষণ। গরুর গাড়ির ধুলো বাতাসের যতটা গভীরে যেতে পারে, শিশু যায় জননীর যত অভ্যন্তরে তোমরা গিয়েছ এই পৃথিবীর ততটা নিকটে। সূর্য থেকে কতটুকু অগ্নিকণা নিতে হয় জানো মেঘ থেকে কতটুকু জ্যোৎস্না ও কাজল মলিনতা থেকে মুক্তো, আবর্জনা থেকে খাদ্যপ্রাণ। দিগন্তের কোন দিকে প্রকৃত আপন গৃহকোণ, কে আত্মীয়, শ্মশানের বিশ্বস্ত সুহৃদও কারা জানো। হে স্বচ্ছন্দ তরুলতা, তোমরা রয়েছ বলে আছি। জেনেছি বাঁচার অর্থ, অবিচ্ছিন্ন ফোটা, জেগে থাকা প্রত্যহ উৎপন্ন হওয়া, প্রতিদিন নবদুর্বাদল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1266
449
কাজী নজরুল ইসলাম
মরমি
প্রেমমূলক
কোন মরমির মরম ব্যথা আমার বুকে বেদনা হানে, জানি গো, সেও জানেই জানে। আমি কাঁদি তাইতে যে তার ডাগর চোখে অশ্রু আনে, বুঝেছি তা প্রাণের টানে।     বাইরে বাঁধি মনকে যত ততই বাড়ে মর্ম-ক্ষত, মোর সে ক্ষত ব্যথার মতো বাজে গিয়ে তারও প্রাণে কে কয়ে যায় হিয়ার কানে।উদাস বায়ু ধানের খেতে ঘনায় যখন সাঁঝের মায়া, দুই জনারই নয়ন-পাতায় অমনি নামে কাজল-ছায়া!     দুইটি হিয়াই কেমন কেমন বদ্ধ ভ্রমর পদ্মে যেমন, হায়, অসহায় মূকের বেদন বাজল শুধু সাঁঝের গানে, পুবের বায়ুর হুতাশ তানে। (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/mormi/
3675
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভোরের আলো-আঁধারে
চিন্তামূলক
ভোরের আলো-আঁধারে থেকে থেকে উঠছে কোকিলের ডাক যেন ক্ষণে ক্ষণে শব্দের আতশবাজি। ছেঁড়া মেঘ ছড়িয়েছে আকাশে একটু একটু সোনার লিখন নিয়ে। হাটের দিন, মাঠের মাঝখানকার পথে চলেছে গোরুর গাড়ি। কলসীতে নতুন আখের গুড়, চালের বস্তা, গ্রামের মেয়ে কাঁখের ঝুড়িতে নিয়েছে কচুশাক, কাঁচা আম, শজনের ডাঁটা। ছটা বাজল ইস্কুলের ঘড়িতে। ঐ ঘণ্টার শব্দ আর সকাল বেলাকার কাঁচা রোদ্দুরের রঙ মিলে গেছে আমার মনে। আমার ছোটো বাগানের পাঁচিলের গায়ে বসেছি চৌকি টেনে করবীগাছের তলায়। পুবদিক থেকে রোদ্দুরের ছটা বাঁকা ছায়া হানছে ঘাসের 'পরে। বাতাসে অস্থির দোলা লেগেছে পাশাপাশি দুটি নারকেলের শাখায়। মনে হচ্ছে যমজ শিশুর কলরবের মতো। কচি দাড়িম ধরেছে গাছে চিকন সবুজের আড়ালে। চৈত্রমাস ঠেকল এসে শেষ হপ্তায়। আকাশে ভাসা বসন্তের নৌকোয় পাল পড়েছে ঢিলে হয়ে। দূর্বাঘাস উপবাসে শীর্ণ; কাঁকর-ঢালা পথের ধারে বিলিতি মৌসুমি চারায় ফুলগুলি রঙ হারিয়ে সংকুচিত। হাওয়া দিয়েছে পশ্চিম দিক থেকে,-- বিদেশী হাওয়া চৈত্রমাসের আঙিনাতে। গায়ে দিতে হল আবরণ অনিচ্ছায়। বাঁধানো জলকুণ্ডে জল উঠছে শিরশিরিয়ে, টলমল করছে নালগাছের পাতা, লাল মাছ কটা চঞ্চল হয়ে উঠল। নেবুঘাস ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে খেলা-পাহাড়ের গায়ে। তার মধ্যে থেকে দেখা যায় গেরুয়া পাথরের চতুর্মুখ মূর্তি। সে আছে প্রবহমান কালের দূর তীরে উদাসীন; ঋতুর স্পর্শ লাগে না তার গায়ে। শিল্পের ভাষা তার, গাছপালার বাণীর সঙ্গে কোনো মিল নেই। ধরণীর অন্তঃপুর থেকে যে শুশ্রূষা দিনে রাতে সঞ্চারিত হচ্ছে সমস্ত গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায়, ঐ মূর্তি সেই বৃহৎ আত্মীয়তার বাইরে। মানুষ আপন গূঢ় বাক্য অনেক কাল আগে যক্ষের মৃত ধনের মতো ওর মধ্যে রেখেছে নিরুদ্ধ ক'রে, প্রকৃতির বাণীর সঙ্গে তার ব্যবহার বন্ধ। সাতটা বাজল ঘড়িতে। ছড়িয়ে-পড়া মেঘগুলি গেছে মিলিয়ে। সূর্য উঠল প্রাচীরের উপরে, ছোটো হয়ে গেল গাছের যত ছায়া। খিড়কির দরজা দিয়ে মেয়েটি ঢুকল বাগানে। পিঠে দুলছে ঝালরওআলা বেণী, হাতে কঞ্চির ছড়ি; চরাতে এনেছে একজোড়া রাজহাঁস, আর তার ছোটো ছোটো ছানাগুলিকে। হাঁস দুটো দাম্পত্য দায়িত্বের মর্যাদায় গম্ভীর, সকলের চেয়ে গুরুতর ঐ মেয়েটির দায়িত্ব জীবপ্রাণের দাবি স্পন্দমান ছোট ঐ মাতৃমনের স্নেহরসে। আজকের এই সকালটুকুকে ইচ্ছে করেছি রেখে দিতে। ও এসেছে অনায়াসে, অনায়াসেই যাবে চলে। যিনি দিলেন পাঠিয়ে তিনি আগেই এর মূল্য দিয়েছেন শোধ ক'রে আপন আনন্দ-ভাণ্ডার থেকে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/buray-alo-adara/
5995
হুমায়ুন কবির
মেঘনায় ঢল
প্রকৃতিমূলক
শোন্ মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করে মাঠে চল, এল মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল। নদীর কিনার ঘন ঘাসে ভরা মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা করিস না দেরি–আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল।এখনো যে মেয়ে আসে নাই ফিরে–দুপুর যে বয়ে যায়। ভরা জোয়ারের মেঘনার জল কূলে কূলে উছলায়। নদীর কিনার জলে একাকার, যেদিকে তাকাই অথই পাথার, দেখতো গোহালে গরুগুলি রেখে গিয়েছে কি ও পাড়ায় ? এখনো ফিরিয়া আসে নাই সে কি ? দুপুর যে বয়ে যায়।ভরবেলা গেলো, ভাটা পড়ে আসে, আঁধার জমিছে আসি, এখনো তবুও এলো না ফিরিয়া আমিনা সর্বনাশী। দেখ্ দেখ্ দূরে মাঝ-দরিয়ায় কাল চুল যেন ঐ দেখা যায়– কাহার শাড়ির আঁচল-আভাস সহসা উঠিছে ভাসি ? আমিনারে মোর নিল কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী ?আরও পড়ুন…  দুঃখের ৫০ টি  উক্তি
http://kobita.banglakosh.com/archives/4361.html
6031
হেলাল হাফিজ
ঘরোয়া রাজনীতি
প্রেমমূলক
ব্যর্থ হয়ে থাকে যদি প্রণয়ের এতো আয়োজন, আগামী মিছিলে এসো স্লোগানে স্লোগানে হবে কথোপকথন। আকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো, ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি লাল শাড়িটা তোমার পড়ে এসো। ১৬.২.৮৪
https://banglarkobita.com/poem/famous/104
4196
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
আপন মনে
চিন্তামূলক
আমার ভিতর ঘর করেছে লক্ষ জনায়– এবং আমায় পর করেছে লক্ষ জনে এখন আমার একটি ইচ্ছে, তার বেশি নয় স্বস্তিতে আজ থাকতে দে না আপন মনে।লক্ষ জনে আমার ভিতর ঘর করেছে, লক্ষ জনে পর করেছে। আমার একটি ইচ্ছা, স্বগতোক্তির মতো–আপন মনে থাকার। যারা থাকতে দিচ্ছে না, তাদের কাছে আমার এই সামান্য নিবেদন বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/apon-mone/
3258
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেশান্তরী
ছড়া
প্রাণ-ধারণের বোঝাখানা বাঁধা পিঠের 'পরে, আকাল পড়ল, দিন চলে না, চলল দেশান্তরে। দূর শহরে একটা কিছু যাবেই যাবে জুটে, এই আশাতেই লগ্ন দেখে ভোরবেলাতে উঠে দুর্গা ব'লে বুক বেঁধে সে চলল ভাগ্যজয়ে, মা ডাকে না পিছুর ডাকে অমঙ্গলের ভয়ে। স্ত্রী দাঁড়িয়ে দুয়ার ধরে দুচোখ শুধু মোছে, আজ সকালে জীবনটা তার কিছুতেই না রোচে। ছেলে গেছে জাম কুড়োতে দিঘির পাড়ে উঠি, মা তারে আজ ভুলে আছে তাই পেয়েছে ছুটি। স্ত্রী বলেছে বারে বারে, যে ক'রে হোক খেটে সংসারটা চালাবে সে, দিন যাবে তার কেটে। ঘর ছাইতে খড়ের আঁঠির জোগান দেবে সে যে, গোবর দিয়ে নিকিয়ে দেবে দেয়াল পাঁচিল মেঝে। মাঠের থেকে খড়কে কাঠি আনবে বেছে বেছে, ঝাঁটা বেঁধে কুমোরটুলির হাটে আসবে বেচে। ঢেঁকিতে ধান ভেনে দেবে বামুনদিদির ঘরে, খুদকুঁড়ো যা জুটবে তাতেই চলবে দুর্বছরে। দূর দেশেতে বসে বসে মিথ্যা অকারণে কোনোমতেই ভাব্‌না যেন না রয় স্বামীর মনে। সময় হল, ঐ তো এল খেয়াঘাটের মাঝি, দিন না যেতে রহিমগঞ্জে যেতেই হবে আজি। সেইখানেতে চৌকিদারি করে ওদের জ্ঞাতি, মহেশখুড়োর মেঝো জামাই, নিতাই দাসের নাতি। নতুন নতুন গাঁ পেরিয়ে অজানা এই পথে পৌঁছবে পাঁচদিনের পরে শহর কোনোমতে। সেইখানে কোন্‌ হালসিবাগান, ওদের গ্রামের কালো, শর্ষেতেলের দোকান সেথায় চালাচ্ছে খুব ভালো। গেলে সেথায় কালুর খবর সবাই বলে দেবে-- তারপরে সব সহজ হবে, কী হবে আর ভেবে। স্ত্রী বললে, "কালুদাকে খবরটা এই দিয়ো, ওদের গাঁয়ের বাদল পালের জাঠতুত ভাই প্রিয় বিয়ে করতে আসবে আমার ভাইঝি মল্লিকাকে উনত্রিশে বৈশাখে।"
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dasantare/
362
কাজী নজরুল ইসলাম
নাকিব
মানবতাবাদী
নব-জীবনের নব-উত্থান-আজান ফুকারি এসো নকিব। জাগাও জড়! জাগাও জীব! জাগে দুর্বল, জাগে ক্ষুধা-ক্ষীণ, জাগিছে কৃষাণ ধুলায়-মলিন, জাগে গৃহহীন, জাগে পরাধীন জাগে মজলুম বদ-নসিব! মিনারে মিনারে বাজে আহ্বান – ‘আজ জীবনের নব উত্থান!’ শঙ্কাহরণ জাগিছে জোয়ান জাগে বলহীন জাগিছে ক্লীব, নব জীবনের নব উত্থান – আজান ফুকারি এসো নকিব! হুগলি, ১৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৩২ (জিঞ্জির কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/nakib/
2184
মহাদেব সাহা
দক্ষিণ সমুদ্রে যাবো
প্রকৃতিমূলক
দক্ষিন সমুদ্রে যাবো একা যাবো, সমুদ্র সান্নিধ্যে যাবো একা যাবো, একাকীই যাবো সেখানে সমুদ্র গড়ে মাটির ত্রিপল খুলে ছাউনি বিছাবো জলেরই বিছানা হবে, কাঁথা হবে, পাড়সুদ্ধ হবে হাতের মুদ্রায় ওই সবুজ বর্ষাতি তাও হবে আঙুলেই বাড়ির নকশা হবে, চৌচাল মেলানো ওই দেয়াল কার্ণিশ হবে সমুদ্র্লানের আগে হাতের মুষ্টি খুলে ঝরোকা বানাবো। দক্ষিণ সমুদ্রে যাবো কি কি আমি জাদু জানি সমস্ত দেখাবো সাগরবালিকা আসবে, উড়ন্ত মাছেরা আসবে জলের মূর্তিও আসবে, ওরা আসবে, সেখানে রঙিন জলে সকলের শরীর ধোয়াবো ওই জলে গা ধুয়ে রমণী পুরুষ হবে, পুরুষ রমণী আহা সে কেমন হবে? বেশ হবে! ভালোই তো হবে। আমি কি কি জাদু জানি ওসব দেখাবো, আঙুলে আরশি করে চাঁদের চেয়েও ভালো চন্দ্রিমা দেখাবো নারীর চেয়েও নারী প্রতিমা দেখাবো দক্ষিণ সমুদ্রে যাবো, সমুদ্রেই যাবো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1454
1135
জীবনানন্দ দাশ
বেদিয়া
প্রেমমূলক
চুলিচালা সব ফেলেছে সে ভেঙে, পিঞ্জরহারা পাখি! পিছুডাকে কভু আসে না ফিরিয়া, কে তারে আনিবে ডাকি? উদাস উধাও হাওয়ার মতন চকিতে যায় সে উড়ে, গলাটি তাহার সেধেছে অবাধ নদী-ঝর্ণার সুরে; নয় সে বান্দা রংমহলের, মোতিমহলের বাঁদী, ঝোড়ো হাওয়া সে যে, গৃহপ্রাঙ্গণে কে তারে রাখিবে বাঁধি! কোন্ সুদূরের বেনামী পথের নিশানা নেছে সে চিনে, ব্যর্থ ব্যথিত প্রান্তর তার চরণচিহ্ন বিনে! যুগযুগান্ত কত কান্তার তার পানে আছে চেয়ে, কবে সে আসিবে ঊষর ধূসর বালুকা-পথটি বেয়ে তারই প্রতীক্ষা মেগে ব'সে আছে ব্যাকুল বিজন মরু! দিকে দিকে কত নদী-নির্ঝর কত গিরিচূড়া-তরু ঐ বাঞ্ছিত বন্ধুর তরে আসন রেখেছে পেতে কালো মৃত্তিকা ঝরা কুসুমের বন্দনা-মালা গেঁথে ছড়ায়ে পড়িছে দিগ্‌দিগন্তে ক্ষ্যাপা পথিকের লাগি! বাবলা বনের মৃদুল গন্ধে বন্ধুর দেখা মাগি লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ উষার শ্বাস! ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস নিবিড় কাননে তটিনীর কূলে ডেকে যায় ফিরে ফিরে বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী আসিল কি রে! তারই লাগি ভায় ইন্দ্রধনুক নিবিড় মেঘের কূলে, তারই লাগি আসে জোনাকি নামিয়া গিরিকন্দরমূলে। ঝিনুক-নুড়ির অঞ্জলি ল'য়ে কলরব ক'রে ছুটে নাচিয়া আসিছে অগাধ সিন্ধু তারই দুটি করপুটে। তারই লাগি কোথা বালুপথে দেখা দেয় হীরকের কোণা, তাহারই লাগিয়া উজানী নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে সোনা! চকিতে পরশপাথর কুড়ায়ে বালকের মতো হেসে ছুড়ে ফেলে দেয় উদাসী বেদিয়া কোন্ সে নিরুদ্দেশে! যত্ন করিয়া পালক কুড়ায়, কানে গোঁজে বনফুল, চাহে না রতন-মণিমঞ্জুষা হীরে-মাণিকের দুল, -তার চেয়ে ভালো অমল উষার কনক-রোদের সীঁথি, তার চেয়ে ভালো আলো-ঝল্মল্ শীতল শিশিরবীথি, তার চেয়ে ভালো সুদূর গিরির গোধূলি-রঙিন জটা, তার চেয়ে ভালো বেদিয়া বালার ক্ষিপ্র হাসির ছটা! কী ভাষা বলে সে, কী বাণী জানায়, কিসের বারতা বহে! মনে হয় যেন তারই তরে তবু দুটি কান পেতে রহে আকাশ-বাতাস-আলোক-আঁধার মৌন স্বপ্নভরে, মনে হয় যেন নিখিল বিশ্ব কোল পেতে তার তরে!
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/bediya/
4883
শামসুর রাহমান
নিজেকে বুঝে নিতে চাই
চিন্তামূলক
প্রতিদিন নিজেকে খণ্ডিত ক’রে বুঝে নিতে চাই এতকাল এত পথ হেঁটে, এত ধুলোবালি গায়ে ঠাঁই দিয়ে আখেরে কী পেয়ে চৌদিকে ছড়াব ফুলঝুরি? কেউ-কেউ তাকায় আমার দিকে যেন সে দেখছে কোনও-এক আজব অদ্ভুত কিমাকার জীব যাকে ধরে নিতে হবে ঠিক চিড়িয়াখানায়! হাসব কি কাঁদব না ভেবে আসমানে চোখ রেখে পথ হাঁটি।মধ্যরাতে কে যে ডাকে ঘুমন্ত আমাকে পারি না বুঝতে কিছুতেই। দোর খুলে তাকাই আঁধারে যতদূর পারি কালিমাকে ভেদ ক’রে আর বাড়াই দু’হাত ছুঁতে আগন্তু কটিকে। এই যে তোমরা আজ সারাদিন দাঁড়িয়ে রয়েছ রোদে পড়ে বৃষ্টির ধারায় ভিজে, কী লাভ হয়েছে তাতে? দয়াপরবশ কেউ কি এসেছে একমুঠো খাদ্য কিংবা পানীয়ের বাটি নিয়ে? না, এখন এই আজকের দুনিয়ায় আসে না সহজে কেউ ক্ষুধার্তের হাহাকার দূর করে দিতে।না, আমার উক্তিতে নিখাদ সত্য নেই। আজও এই ইট-চুন-পাথরের যুগেও কোনও-না-কোনও স্থানে ফুল ফোটে, অপরূপ জল বয়ে যায়। মানুষ পশুর রূপ সর্বক্ষণ করে না ধারণ কিছুতেই।  (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nijeke-bujhe-nite-chai/
3200
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দামিনীর আঁখি কিবা
প্রেমমূলক
দামিনীর আঁখি কিবা ধরে জ্বল’ জ্বল’ বিভা কার তরে জ্বলিতেছে কেবা তাহা জানিবে? চারি দিকে খর ধার বাণ ছুটিতেছে তার কার-‘পরে লক্ষ্য তার কেবা অনুমানিবে? তার চেয়ে নলিনীর আঁখিপানে চাহিতে কত ভালো লাগে তাহা কে পারিবে কহিতে? সদা তার আঁখি দুটি নিচু পাতে আছে ফুটি, সে আঁখি দেখে নি কেহ উঁচু পানে তুলিতে! যদি বা সে ভুলে কভু চায় কারো আননে, সহসা লাগিয়া জ্যোতি সে-জন বিস্ময়ে অতি চমকিয়া উঠে যেন স্বরগের কিরণে! ও আমার নলিনী লো, লাজমাখা নলিনী, অনেকেরি আঁখি-‘পরে সৌন্দর্য বিরাজ করে, তোর আঁখি-‘পরে প্রেম নলিনী লো নলিনী! দামিনীর দেহে রয় বসন কনকময় সে বসন অপসরী সৃজিয়াছে যতনে, যে গঠন যেই স্থান প্রকৃতি করেছে দান সে-সকল ফেলিয়াছে ঢাকিয়া সে বসনে। নলিনী বসন পানে দেখ দেখি চাহিয়া তার চেয়ে কত ভালো কে পারিবে কহিয়া? শিথিল অঞ্চল তার ওই দেখো চারি ধার স্বাধীন বায়ুর মতো উড়িতেছে বিমানে, যেথা যে গঠন আছে পূর্ণ ভাবে বিকাশিছে যেখানে যা উঁচু নিচু প্রকৃতির বিধানে! ও আমার নলিনী লো, সুকোমলা নলিনী মধুর রূপের ভাস তাই প্রকৃতির বাস, সেই বাস তোর দেহে নলিনী লো নলিনী! দামিনীর মুখ-আগে সদা রসিকতা জাগে, চারি ধারে জ্বলিতেছে খরধার বাণ সে, কিন্তু কে বলিতে পারে শুধু সে কি ধাঁধিবারে, নহে তা কি খর ধারে বিঁধিবারি মানসে? কিন্তু নলিনীর মনে মাথা রাখি সঙ্গোপনে ঘুমায়ে রয়েছে কিবা প্রণয়ের দেবতা। সুকোমল সে শয্যার অতি যা কঠিন ধার দলিত গোলাপ তাও আর কিছু নহে তা! ও আমার নলিনী লো, বিনয়িনী নলিনী রসিকতা তীব্র অতি নাই তার এত জ্যোতি তোমার নয়নে যত নলিনী লো নলিনী।Thomas Moore (অনুবাদ কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/daminir-akhi-kiba/
4830
শামসুর রাহমান
দাবানল
মানবতাবাদী
জাহান্নাম নাকি? নিষ্ঠুরতা বশম্বদ ভয়ানক উৎপীড়কের, লন্ডভন্ড চতুর্দিক, পশুপাখি ফুড়িং, মৌমাছি পোড়ে দাবানলে, অসুরের নখ মাটি আঁচড়াচ্ছে জোরে, এখন উদ্ধারকল্পে ডাকি কাকে? দাউ দাউ বনভূমি। ডান দিকে সাপ ছোটে, বাম দিকে সন্ত্রস্ত নেউল, নেকড়েরা অকস্মাৎ মেষপাল, বৃক্ষগুলি জ্বলন্ত পাথরে মাথা কোটে। পালাতে চাই না, শাপশান্ত স্থগিত থাক আজ, আমাকে চাটছে তপ্ত লকলকে জিভ, যাচ্ছে পুড়ে সমস্ত শরীর, চর্ম ফাটে, চর্বি গলে, এ কেমন কারুকাজ? শিরদাঁড়া খাড়া, হাসি মুখে অগ্নিশুদ্ধ হবো ভোরে, শামুক আত্মা-জুড়ানো পানি ভস্মময় ওষ্ঠ জুড়ে; আমাকে শুইয়ে দাও কবিতার নালাম্বরী ক্রোড়ে।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dabanol/