id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
611
|
জয় গোস্বামী
|
অন্ধ চলেছেন
|
মানবতাবাদী
|
অন্ধ চলেছেন। খঞ্জ, চলেছেন। লাঠি
পুরনো বন্ধুর মতো চলেছে তাঁদের সঙ্গে।
হাত কাটা। ন্যাড়া মাথা। ঘেয়ো।
অষ্টাবক্র। ব্যান্ডেজ জড়ানো
চাকাঅলা কাঠের বাক্সের মধ্যে বসা--
সকলকে নিয়ে এই ধীরগতি মিছিলও চলেছে
অতিকায় মেঘের চাঙড় ফেটে ফেটে
গনগনে অস্তরশ্মি বেরোচ্ছে তখন
ঢাল বেয়ে ঢাল বেয়ে সকলেই ওই
চুল্লির ভিতরে নেমে যেতে
ব্যান্ডেজ, কাপড়, কাঠ, চাকা, ক্ষয়গ্রস্ত হাড়, আর
খণ্ড খণ্ড না-মেটা বাসনা
কতরকমের সব রঙিন পালক হয়ে ছিটকে ছিটকে উঠেছে আকাশে
আমলকীতলার মাঠে, এখনো একেকদিন, সেইসব রঙ ভেসে আসে
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1712
|
571
|
কায়কোবাদ
|
কে তুমি
|
প্রেমমূলক
|
( ১ )
কে তুমি? — কে তুমি?
ওগো প্রাণময়ী,
কে তুমি রমণী-মণি!
তুমি কি আমার, হৃদি-পুষ্প-হার
প্রেমের অমিয় খনি!
কে তুমি রমণী-মণি?( ২ )
কে তুমি?—
তুমি কি চম্পক-কলি?
গোলাপ মতি
তুমি কি মল্লিকা যুথী ফুল্ল কুমুদিনী?
সৌন্দর্যের সুধাসিন্ধু,
শরতের পূর্ণ ইন্দু
আঁধার জীবন মাঝে পূর্ণিমা রজনী!
কে তুমি রমণী-মণি?( ৩ )
কে তুমি? —
তুমি কি সন্ধ্যার তারা, সুধাংশু সুধা-ধারা
পারিজাত পুষ্পকলি
বিশ্ব বিমোহিনী
অথবা শিশির স্নাতা, অর্ধস্ফুট, অনাঘ্রাতা
প্রণয়-পীযূষ ভরা,সোনার নলিনী!
কে তুমি রমণী-মণি?( ৪ )
কে তুমি?—
তুমি কি বসন্ত-বালা, অথবা প্রেমের ডালা,
প্রাণের নিভৃত কুঞ্জে
সুধা-নির্ঝরিনী!
অথবা প্রেমাশ্রু-ধারা, শোকে দুঃখে আত্মহারা
প্রেমের অতীত স্মৃতি,
বিধবা রমণী!
কে তুমি রমণী-মণি?( ৫ )
কে তুমি?—
তুমি কি আমার সেই
হৃদয়-মোহিনী?
সেই যদি,—কেন দূরে? এস, এই হৃদি-পুরে
এস’ প্রিয়ে প্রাণময়ী,
এস’ সুহাসিনী!
এস’ যাই সেই দেশে,—ফুল ফুটে চাঁদ হাসে
দয়েলা কোয়েলা গায়
প্রাণের রাগিণী!
জরা নাই—মৃত্যু নাই, প্রণয়ে কলঙ্ক নাই
চল যাই সেই দেশে
এস’ সোহাগিনী!
কে তুমি রমণী-মণি?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3836.html
|
3858
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শিশু ভোলানাথ
|
চিন্তামূলক
|
ওরে মোর শিশু ভোলানাথ ,
তুলি দুই হাত
যেখানে করিস পদপাত
বিষম তাণ্ডবে তোর লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সব ;
আপন বিভব
আপনি করিস নষ্ট হেলাভরে ;
প্রলয়ের ঘূর্ণচক্র -' পরে
চূর্ণ খেলেনার ধূলি উড়ে দিকে দিকে ;
আপন সৃষ্টিকে
ধ্বংস হতে ধ্বংসমাঝে মুক্তি দিস অনর্গল ,
খেলারে করিস রক্ষা ছিন্ন করি খেলেনা - শৃঙ্খল ।
অকিঞ্চন , তোর কাছে কিছুরই তো কোনো মূল্য নাই ,
রচিস যা তোর ইচ্ছা তাই
যাহা খুশি তাই দিয়ে ,
তার পর ভুলে যাস যাহা ইচ্ছা তাই নিয়ে ।
আবরণ তোরে নাহি পারে সম্বরিতে দিগম্বর ,
স্রস্ত ছিন্ন পড়ে ধূলি -' পর ।
লজ্জাহীন সজ্জাহীন বিত্তহীন আপনা - বিস্মৃত ,
অন্তরে ঐশ্বর্য তোর , অন্তরে অমৃত ।
দারিদ্র্য করে না দীন , ধূলি তোরে করে না অশুচি ,
নৃত্যের বিক্ষোভে তোর সব গ্লানি নিত্য যায় ঘুচি ।
ওরে শিশু ভোলানাথ , মোরে ভক্ত ব'লে
নে রে তোর তাণ্ডবের দলে ;
দে রে চিত্তে মোর
সকল - ভোলার ওই ঘোর ,
খেলেনা - ভাঙার খেলা দে আমারে বলি ।
আপন সৃষ্টির বন্ধ আপনি ছিঁড়িয়া যদি চলি
তবে তোর মত্ত নর্তনের চালে
আমার সকল গান ছন্দে ছন্দে মিলে যাবে তালে । (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shishu-volanath/
|
1318
|
তসলিমা নাসরিন
|
কাঁপন ১৮
|
প্রেমমূলক
|
শরীর কি শুধু রাত্তিরেই চায় বজ্রপাত! চায় ছিঁড়ে ফুঁড়ে আসা ঝড় তুফান!
সারাদিন দেখি ফুঁসে ওঠে জল, সারাদিন দেখি অলিতে গলিতে বান!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1988
|
344
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
তোমারে পড়িছে মনে
|
প্রেমমূলক
|
তোমারে পড়িছে মনে
আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে,
যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে
কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে-
তোমারে পড়িছে মনে।
হয়তো তেমনি আজি দূর বাতায়নে
ঝিলিমিলি-তলে
ম্লান লুলিত অঞ্ছলে
চাহিয়া বসিয়া আছ একা,
বারে বারে মুছে যায় আঁখি-জল-লেখা।
বারে বারে নিভে যায় শিয়রেরে বাতি,
তুমি জাগ, জাগে সাথে বরষার রাতি। সিক্ত-পক্ষ পাখী
তোমার চাঁপার ডালে বসিয়া একাকী
হয়ত তেমনি করি, ডাকিছ সাথীরে,
তুমি চাহি' আছ শুধু দূর শৈল-শিরে ।।
তোমার আঁখির ঘন নীলাঞ্জন ছায়া
গগনে গগনে আজ ধরিয়াছে কায়া । ...আজি হেথা রচি' নব নীপ-মালা--
স্মরণ পারের প্রিয়া, একান্তে নিরালা
অকারণে !-জানি আমি জানি
তোমারে পাব না আমি। এই গান এই মালাখানি
রহিবে তাদেরি কন্ঠে- যাহাদেরে কভু
চাহি নাই, কুসুমে কাঁটার মত জড়ায়ে রহিল যারা তবু।
বহে আজি দিশাহারা শ্রাবণের অশান্ত পবন,
তারি মত ছুটে ফেরে দিকে দিকে উচাটন মন,
খুঁজে যায় মোর গীত-সুর
কোথা কোন্ বাতায়নে বসি' তুমি বিরহ-বিধুর।
তোমার গগনে নেভে বারে বারে বিজলীর দীপ,
আমার অঙ্গনে হেথা বিকশিয়া ঝরে যায় নীপ।
তোমার গগনে ঝরে ধারা অবিরল,
আমার নয়নে হেথা জল নাই, বুকে ব্যথা করে টলমল।আমার বেদনা আজি রূপ ধরি' শত গীত-সুরে
নিখিল বিরহী-কন্ঠে--বিরহিণী--তব তরে ঝুরে!
এ-পারে ও-পারে মোরা, নাই নাই কূল!
তুমি দাও আঁখি-জল, আমি দেই ফুল!
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/tomayporechemone/
|
588
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
মায়ের প্রতি
|
স্বদেশমূলক
|
তোমার বন্দিনী মূর্তি ফুটিল যখন,
দীপ্ত দিবালোকে,
সহস্র ভায়ের প্রাণ উঠিল শিহরি,
ঘৃণা, লজ্জা, শোকে |
পবিত্র বন্দনমন্ত্রে কম্পিত বাংলা
দূর আর্য ভূমি!
মুক্তকণ্ঠে যুক্তকরে ডাকিছে তোমায়,
হে লজ্জাবারিণী— |
সাধনার ধন তুমি ভারতবাসীর,—
সহস্র পীড়নে,
উপবাসে, অনশনে ভোলে নাই তোমা |
দুর্বল সন্তানে
দিব্য মন্ত্রে দিব্য স্নেহে দাও স্থান আজি
মন্দিরে তোমার ;
যায় যাক্ থাক্ প্রাণ, সে মন্ত্র শুনিয়া
জাগিব আবার— |
হিমাচল হবে দূর কুমারিকা পার
কাননে, প্রান্তরে,
নগরে-নগরে ক্ষুদ্র প্রল্লীতে-পল্লীতে,
প্রাসাদে কুটিরে,
কোটি কোটি মৃত প্রাণ, হোমাগ্নির প্রায়
উঠুক জ্বলিয়া,
মা তোর তাপসী-মূর্তি পূজিবে সন্তান
হিয়া রক্ত দিয়া |
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3864.html
|
4726
|
শামসুর রাহমান
|
জরুরি অন্তত
|
মানবতাবাদী
|
ব্যাপক সংকটে পথ কোথায়?
শক্রঘেরা ব্যুহে মিত্র খুঁজি।
ব্যর্থ সন্ধানে আমারও হায়
ফুরায় ক্রমাগত আয়ুর পুঁজি।
অগ্রজের কৃতকর্ম যত
প্রেতের মতো নাচে অবচেতনে।
অচিন সত্তায় প্রাচীন ক্ষত,
ঊর্ণনাভ ঘোরে বিবশ মনে।যায় যে যৌবন অস্তাচলে,
জীবন হিমায়িত শুকনো ডাল;
অথচ সেখানেও হঠাৎ জ্বলে
বিরল উৎসবে শিমুল-লাল।নিষেধ চারদিকে তুলছে ফণা,
শুকনো ডাল থেকে উধাও পাখি।
বিলাপে জমে আসে রক্তকণা,
হৃদয়ে হাহাকার, একাকী থাকি।বজ্রপাতে পোড়া গাছের কাছে
সবুজ পাতা চাওয়া নিরর্থক।
সেখানে অঙ্গার, ভস্ম আছে
এবং স্বপ্নের দগ্ধ ত্বক।স্বপ্ন আনে প্রাণে ক্ষণিক দ্যুতি,
লগ্ন তাই আজো প্রতীক্ষায়।
ভোগায় দিনরাত যে-বিচ্যুতি,
তাকেই শোধরাই তিরিক্ষায়।
কিন্তু থেকে যায় ক্রটির ছাপ
এখনো নন্দিত জল্পনায়।
কেবলি বেড়ে যায় মনস্তাপ,
তোমাকে খুঁজে ফিরি কল্পনায়।বিস্ফোরণ আমি শুনবো বলে
সবার মতো আজ পেতেছি কান
শ্মশানে কিংশুক ফোটাতে হলে
জরুরি অন্তত আত্মদান। (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/joruri-ontoto/
|
637
|
জয় গোস্বামী
|
এসেছিলে,
|
প্রেমমূলক
|
যেভাবে বৃষ্টির জল তোড়ে বয়ে যায়
ঢালুদিকে
সেইভাবে, আমার জীবন
আজ অধোগামী।সালোয়ার একটু উঁচু ক’রে
তুমি সেই জল ভেঙে ভেঙে রাস্তা পার হয়ে গেলে—
এত যত্নে, সাবধানে, যেন বা জলের গায়ে
আঘাত না লাগে!পড়ন্ত জীবন শুধু মনে রাখবে অপরূপ চলে যাওয়াটিকে।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রযেভাবে বৃষ্টির জল তোড়ে বয়ে যায়
ঢালুদিকে
সেইভাবে, আমার জীবন
আজ অধোগামী।সালোয়ার একটু উঁচু ক’রে
তুমি সেই জল ভেঙে ভেঙে রাস্তা পার হয়ে গেলে—
এত যত্নে, সাবধানে, যেন বা জলের গায়ে
আঘাত না লাগে!পড়ন্ত জীবন শুধু মনে রাখবে অপরূপ চলে যাওয়াটিকে।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রযেভাবে বৃষ্টির জল তোড়ে বয়ে যায়
ঢালুদিকে
সেইভাবে, আমার জীবন
আজ অধোগামী।সালোয়ার একটু উঁচু ক’রে
তুমি সেই জল ভেঙে ভেঙে রাস্তা পার হয়ে গেলে—
এত যত্নে, সাবধানে, যেন বা জলের গায়ে
আঘাত না লাগে!পড়ন্ত জীবন শুধু মনে রাখবে অপরূপ চলে যাওয়াটিকে।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রযেভাবে বৃষ্টির জল তোড়ে বয়ে যায়
ঢালুদিকে
সেইভাবে, আমার জীবন
আজ অধোগামী।সালোয়ার একটু উঁচু ক’রে
তুমি সেই জল ভেঙে ভেঙে রাস্তা পার হয়ে গেলে—
এত যত্নে, সাবধানে, যেন বা জলের গায়ে
আঘাত না লাগে!পড়ন্ত জীবন শুধু মনে রাখবে অপরূপ চলে যাওয়াটিকে।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%9b%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%a4%e0%a6%ac%e0%a7%81-%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a7%8b-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8/
|
435
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বোধন
|
স্বদেশমূলক
|
১দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,
দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥
কেঁদো না, দমো না, বেদনা-দীর্ণ এ প্রাণে আবার আসিবে শক্তি,
দুলিবে শুষ্ক শীর্ষে তোমারও সবুজ প্রাণের অভিব্যক্তি।
জীবন-ফাগুন যদি মালঞ্চ-ময়ূর তখতে আবার বিরাজে,
শোভিবেই ভাই, ওই তো সেদিন, শোভিবে এ শিরও পুষ্প-তাজে॥২হোয়ো না নিরাশ, অজানা যখন ভবিষ্যতের সব রহস্য,
যবনিকা-আড়ে প্রহেলিকা-মধু, – বীজেই সুপ্ত স্বর্ণ শস্য!
অত্যাচার আর উৎপীড়নে সে আজিকে আমার পর্যুদস্ত,
ভয় নাই ভাই! ওই যে খোদার মঙ্গলময় বিপুল হস্ত!
দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,
দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥৩দুদিনের তরে গ্রহ-ফেরে ভাই সব আশা যদি না হয় পূর্ণ,
নিকট সেদিন, রবে না এদিন, হবে জালিমের গর্ব চূর্ণ!
পুণ্য-পিয়াসী যাবে যারা ভাই মক্কার পূত তীর্থ লভ্যে;
কণ্টক-ভয়ে ফিরবে বা তারা বরং পথেই জীবন সঁপবে।
দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,
দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥৪অস্তিত্বের ভিত্তি মোদের বিনাশেও যদি ধ্বংস-বন্যা,
সত্য মোদের কাণ্ডারি ভাই, তুফানে আমরা পরোয়া করি না।
যদিও এ পথ ভীতি-সংকুল, লক্ষ্যস্থলও কোথায় দূরে,
বুকে বাঁধো বল, ধ্রুব-অলক্ষ্য আসিবে নামিয়া অভয় তূরে।
দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,
দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥৫অত্যাচার আর উৎপীড়নে সে আজিকে আমরা পর্যুদস্ত,
ভয় নাই ভাই! রয়েছে খোদার মঙ্গলময় বিপুল হস্ত!
কী ভয় বন্দি, নিঃস্ব যদিও, অমার আঁধারে পরিত্যক্ত,
যদি রয় তব সত্য-সাধনা স্বাধীন জীবন হবেই ব্যক্ত!
দুঃখ কী ভাই হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,
দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥ (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bodhon/
|
1904
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
সেই পদ্মপাতাখানি
|
চিন্তামূলক
|
সেই পদ্মপাতাখানি ছুঁয়ে আছি তবু।
যতই ফুঁ দাও ঝড়ে নেভাতে পারবে না
মোমের আগুন।
এত ভূল কর কেন যোগে ও বিয়োগে?
ত্রিশূলের কতটুকু ক্ষমতা ক্ষতির?
নির্বাসনদণ্ড দিয়ে মুকুট কেড়েছ,
তবু দেখ পৃথিবীর পাসপোর্ট আত্মীয় করেছে।
আমার পতাকা উড়ছে
পাখিদের স্বাধীনতা ছুঁয়ে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1200
|
3216
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দিবসরজনী তন্দ্রাবিহীন
|
ভক্তিমূলক
|
দিবসরজনী তন্দ্রাবিহীন
মহাকাল আছে জাগি—
যাহা নাই কোনোখানে,
যারে কেহ নাহি জানে,
সে অপরিচিত কল্পনাতীত
কোন আগামীর লাগি। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dibosrojoni-tondrabihin/
|
98
|
আবিদ আনোয়ার
|
১৪০০ সাল
|
রূপক
|
আজ ভোরে সূর্য নয়
দিগন্ত রাঙালো নিজে রবীন্দ্র ঠাকুর:
শ্মশ্রুময় দেবকান্তি, অমিতাভ চিবুকের নূর
ছড়ালো রৌদ্রের মতো
যেন এই অপ্রাকৃত আকাশের নীল
লক্ষকোটি জাগর জোনাকি নিয়ে
করে ঝিলমিল!
প্রশ্নচিহ্ন হয়ে জ্বলে চেতনার গভীর ভেতরে--
“কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহল ভরে?”দিগন্তে তাকিয়ে দেখি
ফ্যালফ্যাল চেয়ে আছে মহান কাঙাল--
কেঁপে ওঠে ইতস্তত ভ্রষ্ট মহাকাল।গীতাঞ্জলি হাতে নিই ঝেড়েমুছে ধুলা:
হঠাৎ পালাতে গিয়ে লজ্জা পেলো
গুটিকয় কালের আরশুলা।
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/1400-shal/
|
3248
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দূর হতে কী শুনিস মৃত্যুর গর্জন, ওরে দীন
|
মানবতাবাদী
|
দূর হতে কী শুনিস মৃত্যুর গর্জন, ওরে দীন,
ওরে উদাসীন--
ওই ক্রন্দনের কলরোল,
লক্ষ বক্ষ হতে মুক্ত রক্তের কল্লোল।
বহ্নিবন্যা-তরঙ্গের বেগ,
বিষশ্বাস-ঝটিকার মেঘ,
ভূতল গগন
মূর্ছিত বিহ্বল-করা মরণে মরণে আলিঙ্গন;
ওরি মাঝে পথ চিরে চিরে
নূতন সমুদ্রতীরে
তরী নিয়ে দিতে হবে পাড়ি,
ডাকিছে কাণ্ডারী
এসেছে আদেশ--
বন্দরে বন্ধনকাল এবারের মতো হল শেষ,
পুরানো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা
আর চলিবে না।
বঞ্চনা বাড়িয়া ওঠে, ফুরায় সত্যের যত পুঁজি,
কাণ্ডারী ডাকিছে তাই বুঝি--
"তুফানের মাঝখানে
নূতন সমুদ্রতীরপানে
দিতে হবে পাড়ি।"
তাড়াতাড়ি
তাই ঘর ছাড়ি
চারি দিক হতে ওই দাঁড়-হাতে ছুটে আসে দাঁড়ী।
"নূতন উষার স্বর্ণদ্বার
খুলিতে বিলম্ব কত আর।"
এ কথা শুধায় সবে
ভীত আর্তরবে
ঘুম হতে অকস্মাৎ জেগে।
ঝড়ের পুঞ্জিত মেঘে
কালোয় ঢেকেছে আলো--জানে না তো কেউ
রাত্রি আছে কি না আছে; দিগন্তে ফেনায়ে উঠে ঢেউ--
তারি মাঝে ফুকারে কাণ্ডারী--
"নূতন সমুদ্রতীরে তরী নিয়ে দিতে হবে পাড়ি।"
বাহিরিয়া এল কা'রা। মা কাঁদিছে পিছে,
প্রেয়সী দাঁড়ায়ে দ্বারে নয়ন মুদিছে।
ঝড়ের গর্জনমাঝে
বিচ্ছেদের হাহাকার বাজে;
ঘরে ঘরে শূন্য হল আরামের শয্যাতল;
"যাত্রা করো, যাত্রীদল"
উঠেছে আদেশ,
"বন্দরের কাল হল শেষ।"
মৃত্য ভেদ করি
দুলিয়া চলেছে তরী।
কোথায় পৌঁছিবে ঘাটে, কবে হবে পার,
সময় তো নাই শুধাবার।
এই শুধু জানিয়াছে সার
তরঙ্গের সাথে লড়ি
বাহিয়া চলিতে হবে তরী।
টানিয়া রাখিতে হবে পাল,
আঁকড়ি ধরিতে হবে হাল;
বাঁচি আর মরি
বাহিয়া চলিতে হবে তরী।
এসেছে আদেশ--
বন্দরের কাল হল শেষ।
অজানা সমুদ্রতীর, অজানা সে-দেশ--
সেথাকার লাগি
উঠিয়াছে জাগি
ঝটিকার কণ্ঠে কণ্ঠে শূন্যে শূন্যে প্রচণ্ড আহ্বান।
মরণের গান
উঠেছে ধ্বনিয়া পথে নবজীবনের অভিসারে
ঘোর অন্ধকারে।
যত দুঃখ পৃথিবীর, যত পাপ, যত অমঙ্গল,
যত অশ্রুজল,
যত হিংসা হলাহল,
সমস্ত উঠিছে তরঙ্গিয়া,
কূল উল্লঙ্ঘিয়া,
ঊর্ধ্ব আকাশেরে ব্যঙ্গ করি।
তবু বেয়ে তরী
সব ঠেলে হতে হবে পার,
কানে নিয়ে নিখিলের হাহাকার,
শিরে লয়ে উন্মত্ত দুর্দিন,
চিত্তে নিয়ে আশা অন্তহীন,
হে নির্ভীক, দুঃখ অভিহত।
ওরে ভাই, কার নিন্দা কর তুমি। মাথা করো নত।
এ আমার এ তোমার পাপ।
বিধাতার বক্ষে এই তাপ
বহু যুগ হতে জমি বায়ুকোণে আজিকে ঘনায়--
ভীরুর ভীরুতাপুঞ্জ, প্রবলের উদ্ধত অন্যায়,
লোভীর নিষ্ঠুর লোভ,
বঞ্চিতের নিত্য চিত্তক্ষোভ,
জাতি-অভিমান,
মানবের অধিষ্ঠাত্রী দেবতার বহু অসম্মান,
বিধাতার বক্ষ আজি বিদীরিয়া
ঝটিকার দীর্ঘশ্বাসে জলে স্থলে বেড়ায় ফিরিয়া।
ভাঙিয়া পড়ুক ঝড়, জাগুক তুফান,
নিঃশেষ হইয়া যাক নিখিলের যত বজ্রবাণ।
রাখো নিন্দাবাণী, রাখো আপন সাধুত্ব আভিমান,
শুধু একমনে হও পার
এ প্রলয়-পারাবার
নূতন সৃষ্টির উপকূলে
নূতন বিজয়ধ্বজা তুলে।
দুঃখেরে দেখেছি নিত্য, পাপেরে দেখেছি নানা ছলে;
অশান্তির ঘূর্ণি দেখি জীবনের স্রোতে পলে পলে;
মৃত্যু করে লুকোচুরি
সমস্ত পৃথিবী জুড়ি।
ভেসে যায় তারা সরে যায়
জীবনেরে করে যায়
ক্ষণিক বিদ্রূপ।
আজ দেখো তাহাদের অভ্রভেদী বিরাট স্বরূপ।
তার পরে দাঁড়াও সম্মুখে,
বলো অকম্পিত বুকে--
"তোরে নাহি করি ভয়,
এ সংসারে প্রতিদিন তোরে করিয়াছি জয়।
তোর চেয়ে আমি সত্য, এ বিশ্বাসে প্রাণ দিব, দেখ্।
শান্তি সত্য, শিব সত্য, সত্য সেই চিরন্তন এক।"
মৃত্যুর অন্তরে পশি অমৃত না পাই যদি খুঁজে,
সত্য যদি নাহি মেলে দুঃখ সাথে যুঝে,
পাপ যদি নাহি মরে যায়
আপনার প্রকাশ-লজ্জায়,
অহংকার ভেঙে নাহি পড়ে আপনার অসহ্য সজ্জায়,
তবে ঘরছাড়া সবে
অন্তরের কী আশ্বাস-রবে
মরিতে ছুটিছে শত শত
প্রভাত-আলোর পানে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের মতো।
বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা
এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা।
স্বর্গ কি হবে না কেনা।
বিশ্বের ভাণ্ডারী শুধিবে না
এত ঋণ?
রাত্রির তপস্যা সে কি আনিবে না দিন।
নিদারুণ দুঃখরাতে
মৃত্যুঘাতে
মানুষ চূর্ণিল যবে নিজ মর্তসীমা
তখন দিবে না দেখা দেবতার অমর মহিমা?
কলিকাতা, ২৩ কার্তিক, ১৩২২
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1949
|
4961
|
শামসুর রাহমান
|
প্রবাসী
|
রূপক
|
তুইও যাচ্ছিস চ’লে ক্রমশ যাচ্ছিস চ’লে কেমন জগতে।
তোর জগতের কোনো সুস্পষ্ট ভূগোল কোনোমতে
ত্রঁকে দিতে পারলেও হয়তো বা হতো বোঝাপড়া বড়ো জোর
নিজের মনের সঙ্গে। কাফকা অনধিগম্য তোর,
ভূতলবাসীর আর্ত অস্তিত্বের উপাখ্যান ওরে
তোর তো জানার কথা নয়, তবু কেন কোন সে বিপাকে, ঘোরে
ক্রমশ যাচ্ছিস চ’লে অমন জগতে? কোন মন্ত্র
করেছে দখল তোকে, কার ষড়যন্ত্র
করছে বিচ্ছিন্ন তোকে মার্বেল, পাখির বাসা আর
জনক জননী থেকে? কেবলি আড়ালে ডাকে’ কোন অন্ধকার?ফুটফুটে শার্ট আর হাফপ্যান্ট প’রে, আড়াআড়ি
ঝুলিয়ে সুনীল ব্যাগ, মায়ের আদর খেয়ে খুব তাড়াতাড়ি
যখন যেতিস রোজ মর্নিং ইশকুলে, কী-যে ভালো
লাগতো তখন। সারাক্ষণ তোর পথ চেয়ে আলো
থাকুক কল্যাণ হয়ে, বলতাম মনে মনে। হায়,
চুকেছে ক্লাশের পাট আজ, বইপত্র ধুলিম্লান, অসহায়
রঙিন মার্বেলগুলো কোথায় যে আছে প’ড়ে। কখনো হাসিস
অকস্মাৎ অকারণ কাঁদিস কখনো- এ কেমন খেলা তোর?
পাখি শিস
দিলেও সম্প্রতি তুই হোসনে খুশিতে তরঙ্গিত। ঘরের যে কোনো কোণ
বেছে নিয়ে থাকিস নিঃসঙ্গ ব’সে; ক্রীড়াপরায়ণ ভাই বোন
ডেকেও পায় না কাছে তোকে-এই অলক্ষুণে দৃশ্য
দেখে দেখে বড়ো কন্টকিত আমি, ভয়ানক নিঃস্ব।এখন নিঃসঙ্গ আমি, পরিপার্শ্ব কর্কশ বিমুখ, উপরন্তু
অত্যন্ত বিরল বন্ধু। বুঝি তাই হৃদয়ের তন্তু
কেমন বেসুরো বাজে। হে বালক, হে পুত্র আমার, তুইও শেষে
নিলি ঠাঁই গোধূলি জগতে? এ কেমন ভিন দেশে
অকালে জমালি পাড়ি? রাত্রিদিন আমাদের সঙ্গে বসবাস
ক’রেও প্রবাসী সারাক্ষণ। নীলাকাশে শুকনো ঘাস
কিংবা শুধু ঝাঁক ঝাঁক পোকা ও মাকড়
দেখিস কি চতুষ্পার্শ্বে? না কি ভয়ংকর হিচককী কাকে ঘর
বারবার অতিশয় ভ’রে যেতে দেখে অবিরত
দু’হাতে ফেলিস ঢেকে মুখ মন্ত্রচালিতের মতো। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/probasi/
|
5600
|
সুকুমার রায়
|
খোকার ভাবনা
|
ছড়া
|
মোমের পুতুল লোমের পুতুল আগ্লে ধ'রে হাতে
তবুও কেন হাব্লা ছেলের মন ওঠে না তাতে?
একলা জেগে একমনেতে চুপ্টি ক'রে ব'সে,
আন্মনা সে কিসের তরে আঙুলখানি চোষে?
নাইকো হাসি নাইকো খেলা নাইকো মুখে কথা,
আজ সকালে হাব্লাবাবুর মন গিয়েছে কোথা?
ভাব্ছে বুঝি দুধের বোতল আস্ছে নাকো কেন?
কিংবা ভাবে মায়ের কিসে হচ্ছে দেরী হেন।
ভাব্ছে এবার দুধ খাবে না কেবল খাবে মুড়ি,
দাদার সাথে কোমন বেঁধে করবে হুড়োহুড়ি,
ফেল্বে ছুঁড়ে চামচটাকে পাশের বাড়ির চালে,
না হয় তেড়ে কামড়ে দেবে দুষ্টু ছেলের গালে।
কিংবা ভাবে একটা কিছু ঠুক্তে যদি পেতো—
পুতুলটাকে করত ঠুকে এক্কেবারে থেঁতো।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/khokar-vabna/
|
5778
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
জাগরণ হেমবর্ণ
|
রূপক
|
জাগরণ হেমবর্ণ, তুমি ওকে সন্ধ্যায় জাগাও
আরও কাছে যাও
ও কেন হিংসার মতো শুয়ে আছে যাখন পৃথিবী খুব
শৈশবের মতো প্রিয় হলো
জল কনা- মেশা হওয়া এখন এ আশ্বিনের প্রথম সোপানে
বারবার হাতছানি দিয়ে ডেকে যায়
আরও কাছে যাও
জাগরণে হেমবর্ণ, তুমি ওকে সন্ধ্যায় জাগাও।
মধু-বিহ্বলেরা কাল রাত্রিকে খেলার মাঠ করেছিল
ঘাসের শিশিরে তার খণ্ডচিহ্ন
ট্রেনের শব্দের মতো দিন এলে সব মুছে যায়
নিথর আলো মধ্যে
চমশা-পরা গয়লানী হাই তোলে দুধের গুমটিতে
নিথর আলোর মধ্যে
কাক শালিকের চক্ষু শান
রোদ্দুরের বেলা বাড়ে, এত স্বচ্ছ
নিজেকে দেখে না
আর খেলা নেই
ও কেন স্বপ্নের মধ্যে রয়ে যায়
শরীরে বৃষ্টির মতো মোহ
আরও কাছে যাও
জাগরণ হেমবর্ণ, তুমি ওকে সন্ধ্যায় জাগাও।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1788
|
2070
|
মহাদেব সাহা
|
আমি কি বলতে পেরেছিলাম
|
ভক্তিমূলক
|
আমার টেবিলের সামনে দেয়ালে শেখ মুজিবের
একটি ছবি টাঙানো আছে
কোন তেলরঙ কিংবা বিখ্যাত স্কেচ জাতীয় কিছু নয়
এই সাধারণ ছবিখানা ১৭ মার্চ- এ বছর শেখ মুজিবের
জন্ম দিনে একজন মুজিব প্রেমিক আমাকে উপহার দিয়েছিলো
কিন্তু কে জানতো এই ছবিখানা হঠাৎ দেয়াল ব্যপে
একগুচ্ছ পত্র পুষ্পের মতো আমাদের ঘরময়
প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে রাত্রিবেলা
আমি তখন টেবিলের সামনে বসেছিলাম আমার স্ত্রী ও সন্তান
পাশেই নিদ্রামগ্ন
সহসা দেখি আমার ছোট্ট ঘরখানির দীর্ঘ দেয়াল জুড়ে
দাঁড়িয়ে আছেন শেখ মুজিব;
গায়ে বাংলাদেশের মাটির ছোপ লাগানো পাঞ্জাবি
হাতে সেই অভ্যস্ত পুরনো পাই
চোষে বাংলার জন্য সজল ব্যাকুলতা
এমনকি আকাশকেও আমি কখনো এমন গভীর ও জলভারানত
দেখিনি।
তার পায়ের কাছে বয়ে যাচ্ছে বিশাল বঙ্গোপসাগর
আর তার আলুথালু চুলগুলির দিকে তাকিয়ে
আমার মনে হচ্ছিলো
এই তো বাংলার ঝোড়ো হাওয়ায় কাঁপা দামাল নিসর্গ
চিরকাল তার চুলগুলির মতোই অনিশ্চিত ও কম্পিত
এই বাংলার ভবিষ্যৎ!
তিনি তখনো নীরবে তাকিয়ে আছেন, চোখ দুটি স্থির অবিচল
জানি না কী বলতে চান তিনি,
হঠাৎ সারা দেয়াল ও ঘর একবার কেঁপে উঠতেই দেখি
আমাদের সঙ্কীর্ণ ঘরের ছাদ ভেদ করে তার একখানি হাত
আকাশে দিকে উঠে যাচ্ছে-
যেমন তাকে একবার দেখেছিলাম ৬৯-এর গণআন্দোলনে
তিনি তখন সদ্য ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসেছেন
কিংবা ৭০-এর পল্পনে আর একবার ৭১-এর ৭ই মার্চের
বিশাল জনসভায়;
দেখলাম তিনি ক্রমে উষ্ণ, অধীর ও উত্তেজিত হয়ে উঠছেন
একসময় তার ঠোঁট দুটি ঈষৎ কেঁপে উঠলো
বুঝলাম এক্ষুনি হয়তো গর্জন করে উঠবে বাংলার আকাশ,
আমি ভয়ে লজ্জায় ও সঙ্কোচে নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম।
আমার মনে হেলা আমি যেন
মুখে হাত দিয়ে অবনত হয়ে আছি
বাংলাদেশের চিরন্তন প্রকুতির কাছে,
একটি টলোমলো শাপলা ও দিঘির কাছে,
শ্রাবণের ভরা নদী কিংবা অফুরন্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতের কাছে
কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো অভিযোগ নিঃসরিত হলো না;
তবু আমি সেই নীরবতার ভাষা বুঝতে চেষ্টা করলাম
তখন কী তিনি বলতে চেয়েছিলেন, কী ছিলো তার ব্যাকুল প্রশ্ন
ব্যথিত দুটি চোখে কী জানার আগ্রহ তখন ফুটে উঠেছিলো!
সে তো আর কিছুই নয় এই বাংলাদেশের ব্যগ্র কুশলজিজ্ঞাসা
কেমন আছে আট কোটি বাঙালী আর এই বাংলা বাংলাদেশ!
কী বলবো আমি মাথা নিচু করে ক্রমে মাটির সাথে মিশে
যাচ্ছিলাম-
তবু তাকে বলতে পারিনি বাংরার প্রিয় শেখ মুজিব
তোমার রক্ত নিয়েও বাংলায় চালের দাম কমেনি
তোমার বুকে গুলি চালিয়েও কাপড় সস্তা হয়নি এখানে,
দুধের শিশু এখনো না খেয়ে মরছে কেউ থামাতে পারি না
বলতে পারিনি তাহলে রাসেলের মাথার খুলি মেশিনগানের
গুলিতে উড়ে গেল কেন?
তোমাকে কিভাবে বলবো তোমার নিষ্ঠুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে
প্রথমে জয়বাংলা, তারপরে একে একে ধর্মনিরপেক্ষতা
একুশে ফেব্রুয়ারী ও বাংলাভাষাকে হত্যা করতে উদ্রত
হলো তারা,
এমনকি একটি বাঙালী ও বাংলাভাষাকে হত্যা করতে উদ্যত
হলো তারা,
এমনকি একটি বাঙালী ফুল ও একটি বাঙালী পাখিও রক্ষা পেলো না।
এর বেশি আর কিছুই তুমি জানতে চাওনি বাংলার প্রিয়
সন্তান শেখমুজিব!
কিন্তু আমি তো জানি ১৫ই আগষ্টের সেই ভোরবেলা
প্রথমে এই বাংলার কাক, শালিক ও খঞ্জনাই
আকাশে উড়েছিলো
তার আগে বিমানবাহিনীর একটি বিমানও ওড়েনি,
তোমার সপক্ষে একটি গুলিও বের হয়নি কোনো কামান থেকে
বরং পদ্মা-মেঘনাসহ সেদিন বাংলার প্রকৃতিই একযোগে
কলরোল করে উঠেছিলো।
আমি তো জানি তোমাকে একগুচ্ছ গোলাপ ও স্বণৃচাঁপা
দিয়েই কী অনায়াসে হত্যা করতে পারতো,
তবু তোমার বুকেই গুলির পর গুলি চালালো ওরা
তুমি কি তাই টলতে টলতে টলতে টলতে বাংলার ভবিষ্যৎকে
বুকে জড়িয়ে সিঁড়ির উপর পড়ে গিয়েছিলে?
শেখ মুজিব সেই ছবির ভিতর এতোক্ষণ স্থির তাকিয়ে থেকে
মনে হলো এবার ঘুমিয়ে পড়তে চান
আর কিছুই জানতে চান না তিনি;
তবু শেষবার ঘুমিয়ে পড়ার আগে তাকে আমার বলতে
ইচ্ছে করছিলো
সারা বাংলায় তোমার সমান উচ্চতার আর কোনো
লোক দেখিনি আমি।
তাই আমার কাছে বার্লিনে যখন একজন ভায়োলিন্তবাদক
বাংলাদেশ সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলো আমি
আমার বুক-পকেট থেকে ভাঁজ-করা একখানি দশ
টাকার নোট বের করে শেখ মুজিবের ছবি দেখিয়েছিলাম
বলেছিলাম, দেখো এই বাংলাদেশ;
এর বেশি বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি আর কিছুই জানি না!
আমি কি বলতে পেরেছিলাম, তার শেষবার ঘুমিয়ে পড়ার
আগে আমি কি বলতে পেরেছিলাম?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1347
|
1538
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
অরণ্য-বাংলোয় রাত্রি
|
রূপক
|
নাকারা নাকারা কারা কারা…
ঘুমের গহ্বর থেকে মধ্যরাতে জেগে উঠল পাড়া
অরণ্যের অন্দর-মহলে।
আকাশ নির্মল নয়, কিছু জ্যোৎস্না ছড়াবার ছলে
জলেস্থলে চতুর্গুণ রহস্য ছড়ায়
হলুদ বর্ণের চাঁদ। কে যায়, কে মধ্যরাতে
দ্রুত হাতে
বিপদের সংকেত বাজিয়ে দিয়ে চলে যায়?
সমগ্র সত্তায় খেয়ে নাড়া
উৎকর্ণ অরণ্য শোনে : নাকারা নাকারা কারা কারা…
কিসের বিপদ? আজও অগ্নির বলয় দেখে হটে যেতে যেতে
পর্বতসানুর ভুট্টাক্ষেতে
ফিরে এসেছিল নাকি হাতির দঙ্গল?
অথবা ঝরনার জল
খেতে এসেছিল ধূর্তবাঘ?
জ্যোৎস্না ও আঁধার ষড়যন্ত্র করে ফুটিয়েছে হল্দে-কালো দাগ
বাংলোর উঠোনে। রাংচিতের জানলায়
একবার দাঁড়িয়ে ফের ক্ষিপ্র পায়ে কারা নেমে যায়
নীচের জঙ্গলে? সারা
অরণ্যের চিত্তে বাজে : নাকারা নাকারা কারা কারা…
কিছু কি জানাচ্ছে কেউ? কী জানাচ্ছে? পালাও-পালাও…
শত্রু আসছে, সরে যাও–
এই কথা? ধূমল আকাশে
কুয়াশায় আচ্ছন্ন সমুদ্রজলে ভাসে
হলুদ বর্ণের চাঁদ! খাদের স্যাঁতস্যাঁতে মাটি, পচা ঘাসপাতার জঞ্জাল
পায়ের তলায় চেপে দীর্ঘ শাল
দাঁড়িয়ে রয়েছে স্থির অন্ধকারে। হান্টিং পয়েন্ট থেকে দেখা যায়,
চল্লিশ মেইল দূরে নিয়নের প্রগল্ভ ঝঞ্চায়
হাসছে কিরিবুরু, বিশ্বকর্মার শহর।
কিছু স্তব্ধতার পরে বাতাসে আবার শুকনো ডালপালার স্বর
জেগে ওঠে। আবার ঝরনার জলধারা
খাদের ভিতরে বুনো খরগোশের পিপাশা মেটায়।
জানি না কে এসেছিল, স্বপ্নের ভিতরে শুধু দোলা দিয়ে যায়
নাকারা নাকারা কারা কারা…
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1568
|
4746
|
শামসুর রাহমান
|
টেবিলে জমাট মেঘ
|
চিন্তামূলক
|
টেবিলে জমাট মেঘ এক খণ্ড যেন স্বপ্নে বুঁদ,
কিংবা অভিশপ্ত গ্রীক দেবীদের কেউ সারাক্ষণ
মুক্তির প্রহর গুণে গুণে ক্লান্ত, ঘুমে অচেতন,
এক্ষুণি উঠবে জেগে এবং সত্তায় তার হবে
মুঞ্জরিত ক্ষণে ক্ষণে বহুবর্ণ গভীর সংগীত।
টেবিল তরঙ্গ হয় বারে বারে মেঘের প্রভাবে।যখন বুলাই হাত মেঘখণ্ডে, তোমাকে প্রবল
মনে পড়ে। টেবিলের স্বপ্নিল মেঘের অন্তরালে
আলোড়নকারী কোনো কণ্ঠস্বর আছে জেনে প্রতি
মুহূর্ত অপেক্ষা করি, কখন তোমার অস্তিত্বের
সুর হবে গুঞ্জরিত, কখন এ ঘর পুনরায়
ইডেনের লতাগুল্মে যাবে ছেয়ে, দূর সমুদ্রের
সফেন উল্লাসে হবে উচ্ছ্বসিত আর ভেনাসের
পদচ্ছাপ উঠবে জেগে রেণুময় নিঝুম মেঝেতে।টেবিলে জমাট মেঘ বেজে ওঠে স্বপ্নে, জাগরণে।
সর্বদা কম্পিত হাতে তুলে নিই মেঘ, প্রতিবার
প্রতিহত আমি শব্দহীনতায়, জব্দ হই খুব।
তবে কি ওঠেনি বেজে মেঘপুঞ্জ? তবে কি মিথ্যেই
গভীর নিদ্রার হৃদে পড়ে টোল? শিরায় শিরায়
কেন তবে সূর্যোদয় আগণন, কেন ঝাঁক ঝাঁক
গাংচিল সহসা ওড়ে বুকের ভেতরে বারংবার?
আমার নিজস্ব হাড় কেন বেহালার মতো বাজে?টেবিলের এক খণ্ড মেঘে আছে তন্দ্রিল সিম্ফনি
অলৌকিক, বুঝি তাই সুরস্নাত এ ঘর আমার।
দেখেছি কখনো টেবিলের মেঘপুঞ্জে দ্রাক্ষালতা
ক্রমবর্ধমান আর রূপোলি ঝালর চমকায়
ঘন ঘন, কখনো বা মেঘখণ্ডে মৃতকে আরেক
মৃতজন ভীষণ জড়িয়ে পড়ে থাকে স্তব্ধতায়
যমজ ভায়ের মতো। কখনো আবার সামুদ্রিক
মাছের কংকালে গড়া উদ্যান সেখানে জেগে ওঠে।ইদানীং ভয়ে ভয়ে থাকি-যদি এই মেঘখণ্ড
মরাল সংগীত গেয়ে শেষে ডুবে যায় স্তব্ধতায়,
যদি অস্তরাগময় হয়, যদি মৃত শশকের
মতো একা পড়ে থাকে এক কোণে, তাহলে কী হবে? (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tebile-jomat-megh/
|
4861
|
শামসুর রাহমান
|
দ্বিতীয় পাখি
|
প্রকৃতিমূলক
|
আজ থেকে দেখব সকালসন্ধ্যা আমি মেঘেদের,
পাখিদের ভেসে-যাওয়া। আবার দেখব ভালো করে
কী করে গাছের পাতা, ভোরের শিশির পাতা থেকে
ঝরে যায়। বাগানের মৃত্তিকার পোকা মাকড়েরা
কী ভাবে খুশিতে ঘোরাঘুরি করে চেনা এলাকায়,
দেখে নেব। বহুকাল জঙ্গলের মাথায় চাঁদের
মুকুট দেখি নি; ঝিলে মুখ ডুবিয়ে চিত্রল কোনো
হরিণের জলপান অদেখা রয়েছে কতকাল।বড় বেশি হৈ চৈ ছিল চতুর্দিকে, ছিল জামা ধরে
টানাটানি আর গলা ফুলিয়ে বাক্যের ফুলঝুরি
তাৎপর্যহীনভাবে ছোটানো, বাজানো, ডুগডুগি
মেলায়; এখন সঙঘ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে
নদীতীরে কিংবা শাল তাল তমালের বনে ঘোরা,
কবর, কোকিল, ঝর্ণা, পাকদণ্ডি দেখা, শুধু দেখা। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ditio-pakhi/
|
5208
|
শামসুর রাহমান
|
শব্দচেতনা
|
চিন্তামূলক
|
কোনো লুকোছাপা নয়, এর দরকার
আছে বলে মনে করি না।
শব্দ নিয়ে ছ্যাবলামি আমার
ধাতে নেই,-এই শাদা কথাটা আমাকে
সরাসরি বলতেই হচ্ছে। না বললেও চলে বটে,
যা ঘটে ঘটুক, বলে ফেলাটাই ভালো।
আত্মহত্যার বদলে খুদকুশি শব্দটি যদি
বসিয়ে দিই কিংবা বৈমাত্রেয় ভ্রাতা না বলে
বলি সওতেলা ভাই, তাহ’লে কি
আমাকে কেউ দিনদুপুরে হাতকড়া পরিয়ে দেবে?কারগারের পরিবর্তে জিন্দানখানা
অথবা পরম বান্ধবের জায়গায় জিগরি দোস্ত
ব্যবহার করি, তবে কি
বঙ্গীয় শব্দকোষ মানহানি-মামলা করবে আমার বিরুদ্ধে?কখনো যদি মহাফেজখানায় বসে
খোদার বদলে ঈশ্বর এবং পানির বদলে
জল উচ্চরণ করি, তাহলে কি বাজ পড়বে
কারো মাথায়? যদি মুখ থেকে আধা ডজন পুষ্পার্ঘ্য
আর এক ডজন প্রণাম অথবা নমস্কার
বেরিয়ে পড়ে তবে কি নাকে খৎ দিতে হবে সাতবার?আপাতত কিছু শব্দ প্রজাপতির মতো
উড়ে এসে বসছে আমার নাকে, কানে,
ওষ্ঠে আর খোলা বুকের পশমে; আমার
চোখ মুদে আসছে। প্রজাপতিগুলো এক ফাঁকে
ভ্রমর হ’য়ে গুঞ্জরণে
আমার অবসরকে বানিয়ে তুলছে
এক চমৎকার খেলা এবং কনকনে হাওয়ায়
স্পন্দিত ফুল ফোটার বেলা। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shobdochetna/
|
3399
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পুতুল ভাঙা
|
ছড়া
|
' সাত - আটটে সাতাশ ', আমি
বলেছিলাম বলে
গুরুমশায় আমার ‘পরে
উঠল রাগে জ্বলে ।
মা গো , তুমি পাঁচ পয়সায়
এবার রথের দিনে
সেই যে রঙিন পুতুলখানি
আপনি দিলে কিনে
খাতার নিচে ছিল ঢাকা ;
দেখালে এক ছেলে ,
গুরুমশায় রেগেমেগে
ভেঙে দিলেন ফেলে ।
বললেন , ' তোর দিনরাত্তির
কেবল যত খেলা ।
একটুও তোর মন বসে না
পড়াশুনার বেলা! '
মা গো , আমি জানাই কাকে ?
ওঁর কি গুরু আছে ?
আমি যদি নালিশ করি
এক্খনি তাঁর কাছে ?
কোনোরকম খেলার পুতুল
নেই কি , মা , ওঁর ঘরে
সত্যি কি ওঁর একটুও মন
নেই পুতুলের ‘পরে ?
সকাল - সাঁজে তাদের নিয়ে
করতে গিয়ে খেলা
কোনো পড়ায় করেন নি কি
কোনোরকম হেলা ?
ওঁর যদি সেই পুতুল নিয়ে
ভাঙেন কেহ রাগে ,
বল দেখি মা , ওঁর মনে তা
কেমনতরো লাগে ? (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/putul-vanga/
|
1518
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
সেই প্রজাপতি
|
প্রেমমূলক
|
ফুলের মতো দেয়ালটাতে
একটি প্রজাপতি,
দুঃসাহসে বসলো এসে
আলোর মুখোমুখি;
চিত্রিত নয় কালো রঙের
পাখনা দু'টি মেলে ।
এবার বুঝি এলে ?
দেয়াল জুড়ে লাগল তার
ঘরে ফেরার কাঁপন,
প্রাণের মাছে ফিরল বুঝি
চিরকালের আপন ।
ভালোবাসার অর্ঘ্য দিয়ে
মৃত্যুখানি কেনা,
শেষ করেছি প্রথম দিনে
হয়নি শুধু চেনা!
চোখের পাশে দেয়ালটিতে
বসলে তুমি যেই,
হঠাৎ-চেনা পাখার রেণু
আঙ্গুল ভরে নেই ।
এমন করে পরের ঘরে
দেয়ালে কেউ বসে?
হঠাৎ যদি ভালোবাসার
পলেস্তার খসে?
আলিঙ্গনে বন্দী করে
প্রতীক বাহুপাশে,
হঠাৎ যদি এই আমাকে
অন্যে ভালোবাসে?
রুপান্তরে পুড়িবে তোর
ক্লান্ত দু'টি ডানা,
চিত্রিত নয় কালো রঙের
পৃথিবী একটানা ।
আমি কেবল আমি কেবল
আমি কেবল দেখি,
ভালোবাসার দেয়াল জুড়ে
একটি প্রজাপতি ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/310
|
966
|
জীবনানন্দ দাশ
|
একদিন এই দেহ ঘাস
|
সনেট
|
একদিন এই দেহ ঘাস থেকে ধানের আঘ্রাণ থেকে এই বাংলায়
জেগেছিল; বাঙালী নারীর মুখ দেখে রূপ চিনেছিলো দেহ একদিন;
বাংলার পথে পথে হেঁটেছিলো গাঙচিল শালিখের মতন স্বাধীন;
বাংলার জল দিয়ে ধূয়েছিল ঘাসের মতন স্ফুট দেহখানি তার;
একদিন দেখেছিল ধূসর বকের সাথে ঘরে চলে আসে অন্ধকার
বাংলার; কাঁচা কাঠ জ্বলে ওঠে —নীল ধোঁয়া নরম মলিন
বাতাসে ভাসিয়া যায় কুয়াশার করুণ নদীর মতো ক্ষীণ;
ফেনসা ভাতের গন্ধে আম —মুকুলের গন্ধ মিশে যায় যেন বার —বার;এই সব দেখেছিল রূপ যেই স্বপ্ন আনে—স্বপ্নে যেই রক্তাক্ততা আছে,
শিখেছিল, সেই সব একদিন বাংলার চন্দ্রমালা রূপসীর কাছে;
তারপর বেত বনে,জোনাকি ঝিঝির পথে হিজল আমের অন্ধকারে
ঘুরেছে সে সৌন্দর্যের নীল স্বপ্ন বুকে করে,রূঢ় কোলাহলে গিয়ে তারে –
ঘুমন্ত — কন্যারে সেই —জাগাতে যায়নি আর — হয়তো সে কন্যার হৃদয়
শঙ্খের মতন রুক্ষ, অথবা পদ্মের মতো — ঘুম তবু ভাঙিবার নয়।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ekdin-ei-deho-ghash/
|
5333
|
শামসুর রাহমান
|
হতাশার ঘরে
|
সনেট
|
ধুর্তামি, ভণ্ডামি আজ প্রবল বিগ্রহ। অবেলায়
কাদায় ডুবেছে চাকা। একে একে অনেকে স্খলিত,
দিশেহারা; অবশেষে তুমিও কি হবে নিমজ্জিত,
হায়, চোরাবালিতেই? খুঁজবে আশ্রয় সাহারায়?
এখন অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসের বিপুল কিনারায়
ছুটছে লেমিং গুলো; সুচতুর শিকারী হারপুন
দিচ্ছে গেঁথে মুক্তিকামী ভেসে-ওঠা পিঠে কী নিপুণ;
ডোবে দেশ ক্রমশ কৃত্রিম আধ্যাত্মিক ধোঁয়াশায়।কফিন কবর ডাকে প্রতিদিন কোকিলের স্বরে,
অথচ এগুতে হবে ঝেড়ে ফেলে সব পিছুটান।
খ্যাতির বাইজী খুব লাস্যময়ী ঢঙে টানে আর
মূর্খের বন্দনা ফিঙে হ’য়ে নাচে, মস্তির দোকান
হৈহুল্লোড়ে ভরপুর। দুর্বিষহ হতাশার ঘরে
ঠাঁই পাই; গোলক ধাধাঁয় চোখে দেখি অন্ধকার। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/hotashar-ghore/
|
529
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সালাম অস্ত রবি
|
শোকমূলক
|
কাব্য-গীতির শ্রেষ্ঠ স্রষ্ঠা, দ্রষ্ঠা, ঋষি ও ধ্যানী
মহাকবি রবি অস্ত গিয়াছে! বীণা, বেণুকা ও বাণী
নীরব হইল। ধুলির ধরণী জানিনা সে কত দিন
রস- যমুনার পরশ পাবেনা। প্রকৃতি বাণীহীন
মৌন বিষাদে কাঁদিবে ভুবনে ভবনে ও বনে একা;
রেখায় রেখায় রুপ দিবে আর কাহার ছন্দ লেখা?
অপ্রাকৃত মদনে মাধবী চাঁদের জ্যোৎস্না দিয়া
রূপায়িত রসায়িত করিবে কে লেখনী, তুলিকা নিয়া?ব্যাস, বাল্মীকি,কালিদাস, খৈয়াম, হাফিজ ও রুমী
আরবের ইমরুল কায়েস যে ছিলে এক সাথে তুমি!
সকল দেশের সক্ল কালের সকল কবিরে ভাঙ্গি'
তাঁহাদের রুপে রসে রাঙ্গাইয়া, বুঝি কত যুগ জাগি'
তোমারে রচিল রসিক বিধাতা, অপরুপ সে বিলাস,
তব রুপে গুনে ছিল যে পরম সুন্দরের আভাস। এক সে রবির আলোকে তিমির- ভীত এ ভারপ্তবাসী
ভেলেছিল প্রাধীনতা- পিড়ন দুঃখ- দৈন্যরাশি।
যেন উর্ধ্বের বরাভয় তুমি আল্লাহর রহমত,
নিত্য দিয়াছ মৃত এ জাতিরে অমৃত শরবত,
সকল দেশের সব জাতির সকল লোকের তুমি
অর্ঘ্য আনিয়া ধন্য করিলে ভারত- বঙ্গভুমি।।তোমার মরুতে তোমার আলোকে ছায়া- তরু ফুল-লতা
জমিয়া চির স্নিগ্ধ করিয়া রেখেছিল শত ব্যথা।
অন্তরে আর পাইনা যে আলো মানস-গগন-কবি,
বাহিরের রবি হেরিয়া জাগে যে অন্তরে তব ছবি।
গোলাব ঝরেছে, গোলাবি আতর কাঁদিয়া ফিরিছে হায়।
আতরে কাতর করে আরো প্রান, ফুলেরে দেখিতে চায়।ফুলের, পাখির, চাঁদ-সুরুজের নাহি ক' যেমন জাতি,
সকলে তাদেরে ভালোবাসে, ছিল তেমনি তোমার খ্যাতি।
রস-লোক হতে রস দেয় যারা বৃষ্টিধারার প্রায়
তাদের নাহি ক' ধর্ম ও জাতি, সকলে ঘরে যায়
অবারিত দ্বার রস- শিল্পীর, হেরেমেও অনায়াসে
যায় তার সুর কবিতা ও ছবি আনন্দে অবকাশে।ছিল যে তোমার অবারিত দ্বার সকল জাতির গেহে,
তোমারে ভাবিত আকাশের চাঁদ, চাহিত গভীর স্নেহে।
ফুল হারাইয়া আঁচলে রুমালে তোমার সুরভি মাখে
বক্ষে নয়নে বুলায়ে আতর, কেঁদে ঝরাফুল ডাকে।আপন জীবন নিঙ্গাড়ি' যেজন তৃষাতুর জনগণে
দেয় প্রেম রস, অভয় শক্তি বসি' দূর নির্জনে,
মানুষ তাহারি তরে কাঁদে, কাঁদে তারি তরে আল্লাহ,
বেহেশত হতে ফেরেশ্তা কহে তাহারেই বাদশাহ।শত রুপে রঙ্গে লীলা- নিকেতন আল্লার দুনিয়াকে
রাঙ্গায় যাহারা, আল্লার কৃপা সদা তাঁরে ঘিরে থাকে।
তুমি যেন সেই খোদার রহম, এসেছিল রুপ ধরে,
আর্শের ছায়া দেখাইয়া ছিলে রুপের আর্শি ভরে।কালাম ঝরেছে তোমার কলমে, সালাম লইয়া যাও
উর্দ্ধে থাকি' এ পাষান জাতিরে রসে গলাইয়া দাও।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/salam-osto-robi/
|
177
|
উৎপল কুমার বসু
|
নবধারাজলে
|
প্রেমমূলক
|
১মন মানে না বৃষ্টি হলো এত
সমস্ত রাত ডুবো-নদীর পারে
আমি তোমার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল
স্পর্শ করি জলের অধিকারে |এখন এক ঢেউ দোলানো ফুলে
ভাবনাহীন বৃত্ত ঘিরে রাখে—
স্রোতের মতো স্রোতস্বিনী তুমি
যা-কিছু টানো প্রবল দুর্বিপাকেতাদের জয় শঙ্কাহীন এত,
মন মানে না সহজ কোনো জলে
চিরদিনের নদী চলুক, পাখি |
একটি নৌকো পারাপারের ছলেস্পর্শ করে অন্য নানা ফুল
অন্য দেশ, অন্য কোনো রাজার,
তোমার গ্রামে, রেলব্রিজের তলে,
ভোরবেলার রৌদ্রে বসে বাজার |২সেদিন ঝড়ের রাতে তুমি চাঁদ ডুবন্ত, একাকী
দেখেছিলে লক্ষ ঢেউ জলে ভাঙে প্রতিচ্ছায়া — মেঘজটাজাল
খুলে যায় অন্যমনে | এত অলৌকিক অন্ধকার ঘিরেছিল চতুর্দিকে,
এত অলৌকিক বাতাসে মত্ততা যেন বলে গেল ‘কে খোলে কপাট ?
কে যায় বনের যাত্রী— ঝটিকায় তুমি কোথাকার |’
আমি তখন নির্বাক থাকি | চন্দ্রাহত—- তোমার পূর্ণিমা
কখন দিগন্তে ডোবে আমি ততদিনে স্পষ্ট জেনে গেছি |৩এখনি যাবে কি তুমি ফিরে এল বৃষ্টি দুপুরের
মাঠের ওপার থেকে, দু’টি শান্ত গৃহকোণে কিছু জল দিয়ে—
উত্তরে, ধানের ক্ষেতে, যেখানে অদেখা
গতরাত্রির সব ভালোবাসাবাসি— জলে মিশে আছে |
যেখানেই থাকো তুমি একটি পথের রেখা ধ্রুব, কূট, নিশ্চিত শ্রাবণে
তোমাকে সহজ কোনো আলে আলে নিয়ে যায়, যখন সহসা
দুধারে চঞ্চল স্রোত, জল, নদী, কম্পিত ডাহুক,
একটি মুহূর্তে শুধু তুলে নেয় প্রতিচ্ছবি, তোমার ভঙ্গিমা—
আবার সহজে ভাঙে— যেন খেলা কেবলই মেঘের
প্লাবিত ধানের ক্ষেতে বারবার বৃষ্টি দিয়ে যাওয়া – যেন মত্ত
কখনো আঙুল অন্যের করতলে বিঁধেছিল—- অন্য করতলরাখে না প্রেমের ভার, সে প্রাচীন, সে চিরন্তন !
অথচ বর্ষা আসে | আদিগন্ত একাকী মাঠের দৈর্ঘ্য কত—
ভয় কত—-এখনি যাবে কি তুমি ?৪অমন কালো মেঘের দিনে জন্মেছিলেন আমার প্রিয় কবি |
অন্য সকল দিনের মত বৃষ্টি নামল— রোদ উঠল কত
উনি আমায় রক্তে লীন দেবায়তন দেখিয়েছিলেন |যদিও ঐ সিংহাসনে কুয়াশাময় সম্রাটের অস্থিরতা ছিল,
তবু আমি ক্ষমাই চেয়েছিলাম—
যা আমাকে ধন্য করে, প্রিয় কবিকে, মহিষটিকে |নিষ্করুণ মাতাল হাতে ছড়িয়ে থাকা শত বধ্যভূমি |
ভীষণ শব্দে বেজে উঠল মহিষটির দীপ্ত গলা ‘ক্ষমা করুন’,
‘ক্ষমা করুন’ আমি শান্ত, অনুচ্চারিত শব্দে বলেছিলাম |১মন মানে না বৃষ্টি হলো এত
সমস্ত রাত ডুবো-নদীর পারে
আমি তোমার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল
স্পর্শ করি জলের অধিকারে |এখন এক ঢেউ দোলানো ফুলে
ভাবনাহীন বৃত্ত ঘিরে রাখে—
স্রোতের মতো স্রোতস্বিনী তুমি
যা-কিছু টানো প্রবল দুর্বিপাকেতাদের জয় শঙ্কাহীন এত,
মন মানে না সহজ কোনো জলে
চিরদিনের নদী চলুক, পাখি |
একটি নৌকো পারাপারের ছলেস্পর্শ করে অন্য নানা ফুল
অন্য দেশ, অন্য কোনো রাজার,
তোমার গ্রামে, রেলব্রিজের তলে,
ভোরবেলার রৌদ্রে বসে বাজার |২সেদিন ঝড়ের রাতে তুমি চাঁদ ডুবন্ত, একাকী
দেখেছিলে লক্ষ ঢেউ জলে ভাঙে প্রতিচ্ছায়া — মেঘজটাজাল
খুলে যায় অন্যমনে | এত অলৌকিক অন্ধকার ঘিরেছিল চতুর্দিকে,
এত অলৌকিক বাতাসে মত্ততা যেন বলে গেল ‘কে খোলে কপাট ?
কে যায় বনের যাত্রী— ঝটিকায় তুমি কোথাকার |’
আমি তখন নির্বাক থাকি | চন্দ্রাহত—- তোমার পূর্ণিমা
কখন দিগন্তে ডোবে আমি ততদিনে স্পষ্ট জেনে গেছি |৩এখনি যাবে কি তুমি ফিরে এল বৃষ্টি দুপুরের
মাঠের ওপার থেকে, দু’টি শান্ত গৃহকোণে কিছু জল দিয়ে—
উত্তরে, ধানের ক্ষেতে, যেখানে অদেখা
গতরাত্রির সব ভালোবাসাবাসি— জলে মিশে আছে |
যেখানেই থাকো তুমি একটি পথের রেখা ধ্রুব, কূট, নিশ্চিত শ্রাবণে
তোমাকে সহজ কোনো আলে আলে নিয়ে যায়, যখন সহসা
দুধারে চঞ্চল স্রোত, জল, নদী, কম্পিত ডাহুক,
একটি মুহূর্তে শুধু তুলে নেয় প্রতিচ্ছবি, তোমার ভঙ্গিমা—
আবার সহজে ভাঙে— যেন খেলা কেবলই মেঘের
প্লাবিত ধানের ক্ষেতে বারবার বৃষ্টি দিয়ে যাওয়া – যেন মত্ত
কখনো আঙুল অন্যের করতলে বিঁধেছিল—- অন্য করতলরাখে না প্রেমের ভার, সে প্রাচীন, সে চিরন্তন !
অথচ বর্ষা আসে | আদিগন্ত একাকী মাঠের দৈর্ঘ্য কত—
ভয় কত—-এখনি যাবে কি তুমি ?৪অমন কালো মেঘের দিনে জন্মেছিলেন আমার প্রিয় কবি |
অন্য সকল দিনের মত বৃষ্টি নামল— রোদ উঠল কত
উনি আমায় রক্তে লীন দেবায়তন দেখিয়েছিলেন |যদিও ঐ সিংহাসনে কুয়াশাময় সম্রাটের অস্থিরতা ছিল,
তবু আমি ক্ষমাই চেয়েছিলাম—
যা আমাকে ধন্য করে, প্রিয় কবিকে, মহিষটিকে |নিষ্করুণ মাতাল হাতে ছড়িয়ে থাকা শত বধ্যভূমি |
ভীষণ শব্দে বেজে উঠল মহিষটির দীপ্ত গলা ‘ক্ষমা করুন’,
‘ক্ষমা করুন’ আমি শান্ত, অনুচ্চারিত শব্দে বলেছিলাম |
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%89%e0%a7%8e%e0%a6%aa%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%b8/
|
2471
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
কথা ছিলো না কি
|
প্রেমমূলক
|
কথা ছিলো না কি !
নগরীর ওই পারে নেমে গেলে রোদ ---
আশ্চর্য বিকেল হয়ে নরম আঙুলে
আমার গভীরে তুমি বাজাবে সরোদ ---
কথা ছিলো না কি !!গাছের নিবিড় ছায়া ঘাসের শরীরে
ছড়ায় যে ভাবে ধীরে ধীরে
সে ভাবে গড়িয়ে নেমে তোমার আদর
হয়ে যাবে এই বুকে শুক-শারী বোধ ---
কথা ছিলো না কি ।।কথা ছিলো না কি --
তুমি আমি মিলে হয়ে যাবো
সন্ধ্যার আঁচলে জ্বলা প্রথম জোনাকী
কথা ছিল না কি !আঁধার নামার মতো গহন গোপনে
কোথাও হারাবো দেহ-মনে,
যা কিছু না বলা আছে আপন অসুখ
ঠোঁটে ঠোঁটে তাই হবে নীল অনুরোধ ---
কথা ছিলো না কি !!
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/kotha-chhilo-na-ki/
|
4569
|
শামসুর রাহমান
|
কাক
|
রূপক
|
গ্রাম্যপথে পদচিহ্ন নেই। গোঠে গরু
নেই কোন, রাখাল উধাও, রুক্ষ সরু
আল খাঁ খাঁ, পথপার্শ্বে বৃক্ষেরা নির্বাক;
নগ্ন রৌদ্রে চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kak/
|
3679
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভ্রমণী
|
ছড়া
|
মাটির ছেলে হয়ে জন্ম, শহর নিল মোরে
পোষ্যপুত্র ক'রে।
ইঁটপাথরের আলিঙ্গনের রাখল আড়ালটিকে
আমার চতুর্দিকে।
বই প'ড়ে তাই পেতে হত ভ্রমণকারীর দেখা
ছাদের উপর একা।
কষ্ট তাদের, বিপদ তাদের, তাদের শঙ্কা যত
লাগত নেশার মত।
পথিক যে জন পথে পথেই পায় সে পৃথিবীকে,
মুক্ত সে চৌদিকে।
চলার ক্ষুধায় চলতে সে চায় দিনের পরে দিনে
অচেনাকেই চিনে।
লড়াই ক'রে দেশ করে জয়, বহায় রক্তধারা,
ভূপতি নয় তারা।
পলে পলে পার যারা হয় মাটির পরে মাটি
প্রত্যেক পদ হাঁটি--
নাইকো সেপাই, নাইকো কামান, জয়পতাকা নাহি--
আপন বোঝা বাহি
অপথেও পথ পেয়েছে, অজানাতে জানা,
মানে নাইকো মানা--
মরু তাদের, মেরু তাদের, গিরি অভ্রভেদী
তাদের বিজয়বেদী।
সবার চেয়ে মানুষ ভীষণ; সেই মানুষের ভয়
ব্যাঘাত তাদের নয়।
তারাই ভূমির বরপুত্র, তাদের ডেকে কই,
তোমরা পৃথ্বীজয়ী।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bromne/
|
3002
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গান্ধারীর আবেদন
|
গীতিনাটিকা
|
দুর্যোধন। প্রণমি চরণে তাত!
ধৃতরাষ্ট্র। ওরে দুরাশয়,
অভীষ্ট হয়েছে সিদ্ধ?
দুর্যোধন। লভিয়াছি জয়।
ধৃতরাষ্ট্র। এখন হয়েছ সুখী?
দুর্যোধন। হয়েছি বিজয়ী।
ধৃতরাষ্ট্র। অখণ্ড রাজত্ব জিনি সুখ তোর কই
রে দুর্মতি?
দুর্যোধন। সুখ চাহি নাই মহারাজ!
জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।
ক্ষুদ্র সুখে ভরে নাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা
কুরুপতি-- দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধা
জয়রস, ঈর্ষাসিন্ধুমন্থনসঞ্জাত,
সদ্য করিয়াছি পান; সুখী নহি, তাত,
অদ্য আমি জয়ী। পিতঃ, সুখে ছিনু, যবে
একত্রে আছিনু বদ্ধ পাণ্ডবে কৌরবে,
কলঙ্ক যেমন থাকে শশাঙ্কের বুকে
কর্মহীন গর্বহীন দীপ্তিহীন সুখে।
সুখে ছিনু, পাণ্ডবের গাণ্ডীবটঙ্কারে
শঙ্কাকুল শত্রুদল আসিত না দ্বারে।
সুখে ছিনু, পাণ্ডবেরা জয়দৃপ্ত করে
ধরিত্রী দোহন করি' ভ্রাতৃপ্রীতিভরে
দিত অংশ তার-- নিত্য নব ভোগসুখে
আছিনু নিশ্চিন্তচিত্তে অনন্ত কৌতুকে।
সুখে ছিনু, পাণ্ডবের জয়ধ্বনি যবে
হানিত কৌরবকর্ণ প্রতিধ্বনিরবে।
পাণ্ডবের যশোবিম্ব-প্রতিবিম্ব আসি
উজ্জ্বল অঙ্গুলি দিয়া দিত পরকাশি
মলিন কৌরবকক্ষ। সুখে ছিনু, পিতঃ,
আপনার সর্বতেজ করি নির্বাপিত
পাণ্ডবগৌরবতলে স্নিগ্ধশান্তরূপে,
হেমন্তের ভেক যথা জড়ত্বের কূপে।
আজি পাণ্ডুপুত্রগণে পরাভব বহি
বনে যায় চলি-- আজ আমি সুখী নহি,
আজ আমি জয়ী।
ধৃতরাষ্ট্র। ধিক্ তোর ভ্রাতৃদ্রোহ।
পাণ্ডবের কৌরবের এক পিতামহ
সে কি ভুলে গেলি?
দুর্যোধন। ভুলিতে পারি নে সে যে--
এক পিতামহ, তবু ধনে মানে তেজে
এক নহি। যদি হত দূরবর্তী পর
নাহি ছিল ক্ষোভ; শর্বরীর শশধর
মধ্যাহ্নের তপনেরে দ্বেষ নাহি করে,
কিন্তু প্রাতে এক পূর্ব-উদয়শিখরে
দুই ভ্রাতৃসূর্যলোক কিছুতে না ধরে।
আজ দ্বন্দ্ব ঘুচিয়াছে, আজি আমি জয়ী,
আজি আমি একা।
ধৃতরাষ্ট্র। ক্ষুদ্র ঈর্ষা! বিষময়ী
ভুজঙ্গিনী!
দুর্যোধন। ক্ষুদ্র নহে, ঈর্ষা সুমহতী।
ঈর্ষা বৃহতের ধর্ম। দুই বনস্পতি
মধ্যে রাখে ব্যবধান; লক্ষ লক্ষ তৃণ
একত্রে মিলিয়া থাকে বক্ষে বক্ষে লীন;
নক্ষত্র অসংখ্য থাকে সৌভ্রাত্রবন্ধনে--
এক সূর্য, এক শশী। মলিন কিরণে
দূর বন-অন্তরালে পাণ্ডুচন্দ্রলেখা
আজি অস্ত গেল, আজি কুরুসূর্য একা--
আজি আমি জয়ী!
ধৃতরাষ্ট্র। আজি ধর্ম পরাজিত।দুর্যোধন। লোকধর্ম রাজধর্ম এক নহে পিতঃ!
লোকসমাজের মাঝে সমকক্ষ জন
সহায় সুহৃদ্-রূপে নির্ভর বন্ধন।
কিন্তু রাজা একেশ্বর; সমকক্ষ তার
মহাশত্রু, চিরবিঘ্ন, স্থান দুশ্চিন্তার,
সম্মুখের অন্তরাল, পশ্চাতের ভয়,
অহর্নিশি যশঃশক্তিগৌরবের ক্ষয়,
ঐশ্বর্যের অংশ-অপহারী। ক্ষুদ্র জনে
বলভাগ ক'রে লয়ে বান্ধবের সনে
রহে বলী; রাজদণ্ড যত খণ্ড হয়
তত তার দুর্বলতা, তত তার ক্ষয়।
একা সকলের ঊর্ধ্বে মস্তক আপন
যদি না রাখিবে রাজা, যদি বহুজন
বহুদূর হতে তাঁর সমুদ্ধত শির
নিত্য না দেখিতে পায় অব্যাহত স্থির,
তবে বহুজন--'পরে বহুদূরে তাঁর
কেমনে শাসনদৃষ্টি রহিবে প্রচার?
রাজধর্মে ভ্রাতৃধর্ম বন্ধুধর্ম নাই,
শুধু জয়ধর্ম আছে, মহারাজ, তাই
আজি আমি চরিতার্থ-- আজি জয়ী আমি--
সম্মুখের ব্যবধান গেছে আজি নামি
পাণ্ডবগৌরবগিরি পঞ্চচূড়াময়।
ধৃতরাষ্ট্র। জিনিয়া কপটদ্যূতে তারে কোস জয়,
লজ্জাহীন অহংকারী!
দুর্যোধন। যার যাহা বল
তাই তার অস্ত্র, পিতঃ, যুদ্ধের সম্বল।
ব্যাঘ্রসনে নখে দন্তে নহিক সমান,
তাই বলে ধনুঃশরে বধি তার প্রাণ
কোন্ নর লজ্জা পায়? মূঢ়ের মতন
ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুমাঝে আত্মসমর্পণ
যুদ্ধ নহে, জয়লাভ এক লক্ষ্য তার--
আজি আমি জয়ী পিতঃ, তাই অহংকার।
ধৃতরাষ্ট্র। আজি তুমি জয়ী, তাই তব নিন্দাধ্বনি
পরিপুর্ণ করিয়াছে অম্বর অবনী
সমুচ্চ ধিক্কারে।
দুর্যোধন। নিন্দা! আর নাহি ডরি,
নিন্দারে করিব ধ্বংস কণ্ঠরুদ্ধ করি।
নিস্তব্ধ করিয়া দিব মুখরা নগরী
স্পর্ধিত রসনা তার দৃঢ়বলে চাপি
মোর পাদপীঠতলে। 'দুর্যোধন পাপী'
'দুর্যোধন ক্রূরমনা' 'দুর্যোধন হীন'
নিরুত্তরে শুনিয়া এসেছি এতদিন,
রাজদণ্ড স্পর্শ করি কহি মহারাজ,
আপামর জনে আমি কহাইব আজ--
'দুর্যোধন রাজা, দুর্যোধন নাহি সহে
রাজনিন্দা-আলোচনা, দুর্যোধন বহে
নিজ হস্তে নিজ নাম।'
ধৃতরাষ্ট্র। ওরে বৎস, শোন্,
নিন্দারে রসনা হতে দিলে নির্বাসন
নিম্নমুখে অন্তরের গূঢ় অন্ধকারে
গভীর জটিল মূল সুদূরে প্রসারে,
নিত্য বিষতিক্ত করি রাখে চিত্ততল।
রসনায় নৃত্য করি চপল চঞ্চল
নিন্দা শ্রান্ত হয়ে পড়ে; দিয়ো না তাহারে
নিঃশব্দে আপন শক্তি বৃদ্ধি করিবারে
গোপন হৃদয়দুর্গে। প্রীতিমন্ত্রবলে
শান্ত করো, বন্দী করো নিন্দাসর্পদলে
বংশীরবে হাস্যমুখে।
দুর্যোধন। অব্যক্ত নিন্দায়
কোনো ক্ষতি নাহি করে রাজমর্যাদায়;
ভ্রূক্ষেপ না করি তাহে। প্রীতি নাহি পাই
তাহে খেদ নাহি, কিন্তু স্পর্ধা নাহি চাই
মহারাজ! প্রীতিদান স্বেচ্ছার অধীন,
প্রীতিভিক্ষা দিয়ে থাকে দীনতম দীন--
সে প্রীতি বিলাক তারা পালিত মার্জারে,
দ্বারের কুক্কুরে, আর পাণ্ডবভ্রাতারে--
তাহে মোর নাহি কাজ। আমি চাহি ভয়,
সেই মোর রাজপ্রাপ্য-- আমি চাহি জয়
দর্পিতের দর্প নাশি। শুন নিবেদন
পিতৃদেব-- একাল তব সিংহাসন
আমার নিন্দুকদল নিত্য ছিল ঘিরে,
কণ্টকতরুর মতো নিষ্ঠুর প্রাচীরে
তোমার আমার মধ্যে রচি ব্যবধান--
শুনায়েছে পাণ্ডবের নিত্যগুণগান,
আমাদের নিত্য নিন্দা-- এইমতে, পিতঃ,
পিতৃস্নেহ হতে মোরা চিরনির্বাসিত।
এইমতে, পিতঃ, মোরা শিশুকাল হতে
হীনবল-- উৎসমুখে পিতৃস্নেহস্রোতে
পাষাণের বাধা পড়ি মোরা পরিক্ষীণ
শীর্ণ নদ, নষ্টপ্রাণ, গতিশক্তিহীন,
পদে পদে প্রতিহত; পাণ্ডবেরা স্ফীত,
অখণ্ড, অবাধগতি। অদ্য হতে পিতঃ,
যদি সে নিন্দুকদলে নাহি কর দূর
সিংহাসনপার্শ্ব হতে, সঞ্জয় বিদুর
ভীষ্মপিতামহে, যদি তারা বিজ্ঞবেশে
হিতকথা ধর্মকথা সাধু-উপদেশে
নিন্দায় ধিক্কারে তর্কে নিমেষে নিমেষে
ছিন্ন ছিন্ন করি দেয় রাজকর্মডোর,
ভারাক্রান্ত করি রাখে রাজদণ্ড মোর,
পদে পদে দ্বিধা আনে রাজশক্তি-মাঝে,
মুকুট মলিন করে অপমানে লাজে,
তবে ক্ষমা দাও পিতৃদেব-- নাহি কাজ
সিংহাসনকণ্টকশয়নে-- মহারাজ,
বিনিময় করে লই পাণ্ডবের সনে
রাজ্য দিয়ে বনবাস, যাই নির্বাসনে।
ধৃতরাষ্ট্র। হায় বৎস অভিমানী! পিতৃস্নেহ মোর
কিছু যদি হ্রাস হত শুনি সুকঠোর
সুহৃদের নিন্দাবাক্য, হইত কল্যাণ।
অধর্মে দিয়েছি যোগ, হারায়েছি জ্ঞান,
এত স্নেহ। করিতেছি সর্বনাশ তোর,
এত স্নেহ। জ্বালাতেছি কালানল ঘোর
পুরাতন কুরুবংশ-মহারণ্যতলে--
তবু পুত্র, দোষ দিস স্নেহ নাই ব'লে?
মণিলোভে কালসর্প করিলি কামনা,
দিনু তোরে নিজহস্তে ধরি তার ফণা
অন্ধ আমি।-- অন্ধ আমি অন্তরে বাহিরে
চিরদিন-- তোরে লয়ে প্রলয়তিমিরে
চলিয়াছি-- বন্ধুগণ হাহাকাররবে
করিছে নিষেধ, নিশাচর গৃধ্র-সবে
করিতেছে অশুভ চীৎকার, পদে পদে
সংকীর্ণ হতেছে পথ, আসন্ন বিপদে
কণ্টকিত কলেবর, তবু দৃঢ়করে
ভয়ংকর স্নেহে বক্ষে বাঁধি লয়ে তোরে
বায়ুবলে অন্ধবেগে বিনাশের গ্রাসে
ছুটিয়া চলেছি মূঢ় মত্ত অট্টহাসে
উল্কার আলোকে-- শুধু তুমি আর আমি,
আর সঙ্গী বজ্রহস্ত দীপ্ত অন্তর্যামী--
নাই সম্মুখের দৃষ্টি, নাই নিবারণ
পশ্চাতের, শুধু নিম্নে ঘোর আকর্ষণ
নিদারুণ নিপাতের। সহসা একদা
চকিতে চেতনা হবে, বিধাতার গদা
মুহূর্তে পড়িবে শিরে, আসিবে সময়--
ততক্ষণ পিতৃস্নেহে কোরো না সংশয়,
আলিঙ্গন করো না শিথিল, ততক্ষণ
দ্রুত হস্তে লুটি লও সর্ব স্বার্থধন--
হও জয়ী, হও সুখী, হও তুমি রাজা
একেশ্বর।-- ওরে, তোরা জয়বাদ্য বাজা।
জয়ধ্বজা তোল্ শূন্যে। আজি জয়োৎসবে
ন্যায় ধর্ম বন্ধু ভ্রাতা কেহ নাহি রবে--
না রবে বিদুর ভীষ্ম, না রবে সঞ্জয়,
নাহি রবে লোকনিন্দা লোকলজ্জা-ভয়
কুরুবংশরাজলক্ষ্ণী নাহি রবে আর--
শুধু রবে অন্ধ পিতা, অন্ধ পুত্র তার,
আর কালান্তক যম-- শুধু পিতৃস্নেহ
আর বিধাতার শাপ, আর নহে কেহ।
চর। মহারাজ, অগ্নিহোত্র দেব-উপাসনা
ত্যাগ করি বিপ্রগণ, ছাড়ি সন্ধ্যার্চনা,
দাঁড়ায়েছে চতুষ্পথে পাণ্ডবের তরে
প্রতীক্ষিয়া; পৌরগণ কেহ নাহি ঘরে,
পাণ্যশালা রুদ্ধ সব; সন্ধ্যা হল, তবু
ভৈরবমন্দির-মাঝে নাহি বাজে, প্রভু,
শঙ্খঘণ্টা সন্ধ্যাভেরী, দীপ নাহি জ্বলে;
শোকাতুর নরনারী সবে দলে দলে
চলিয়াছে নগরের সিংহদ্বার-পানে
দীনবেশে সজলনয়নে।
দুর্যোধন। নাহি জানে
জাগিয়াছে দুর্যোধন। মূঢ় ভাগ্যহীন!
ঘনায়ে এসেছে আজি তোদের দুর্দিন।
রাজায় প্রজায় আজি হবে পরিচয়
ঘনিষ্ঠ কঠিন। দেখি কতদিন রয়
প্রজার পরম স্পর্ধা-- নির্বিষ সর্পের
ব্যর্থ ফণা-আস্ফালন, নিরস্ত্র দর্পের
হুহুংকার।
[প্রতিহারীর প্রবেশ]
প্রতিহারী। মহারাজ, মহিষী গান্ধারী
দর্শনপ্রার্থিনী পদে।
ধৃতরাষ্ট্র। রহিনু তাঁহারি
প্রতীক্ষায়।
দুর্যোধন। পিতঃ, আমি চলিলাম তবে।
ধৃতরাষ্ট্র। করো পলায়ন। হায়, কেমনে বা সবে
সাধ্বী জননীর দৃষ্টি সমুদ্যত বাজ
ওরে পুণ্যভীত! মোরে তোর নাহি লাজ।
[গান্ধারীর প্রবেশ]
গান্ধারী। নিবেদন আছে শ্রীচরণে। অনুনয়
রক্ষা করো নাথ!
ধৃতরাষ্ট্র। কভু কি অপূর্ণ রয়
প্রিয়ার প্রার্থনা?
গান্ধারী। ত্যাগ করো এইবার--
ধৃতরাষ্ট্র। কারে হে মহিষী?
গান্ধারী। পাপের সংঘর্ষে যার
পড়িছে ভীষণ শান ধর্মের কৃপাণে,
সেই মূঢ়ে।
ধৃতরাষ্ট্র। কে সে জন? আছে কোন্খানে?
শুধু কহো নাম তার।
গান্ধারী। পুত্র দুর্যোধন।
ধৃতরাষ্ট্র। তাহারে করিব ত্যাগ!
গান্ধারী। এই নিবেদন
তব পদে।
ধৃতরাষ্ট্র। দারুণ প্রার্থনা, হে গান্ধারী
রাজমাতা!
গান্ধারী। এ প্রার্থনা শুধু কি আমারি
হে কৌরব? কুরুকুলপিতৃপিতামহ
স্বর্গ হতে এ প্রার্থনা করে অহরহ
নরনাথ! ত্যাগ করো, ত্যাগ করো তারে--
কৌরবকল্যাণলক্ষ্ণী যার অত্যাচারে
অশ্রুমুখী প্রতীক্ষিছে বিদায়ের ক্ষণ
রাত্রিদিন।
ধৃতরাষ্ট্র। ধর্ম তারে করিবে শাসন
ধর্মেরে যে লঙ্ঘন করেছে-- আমি পিতা--
গান্ধারী। মাতা আমি নহি? গর্ভভারজর্জরিতা
জাগ্রহ হৃৎপিণ্ডতলে বহি নাই তারে?
স্নেহবিগলিত চিত্ত শুভ্র দুগ্ধধারে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে নাই দুই স্তন বাহি
তার সেই অকলঙ্ক শিশুমুখ চাহি?
শাখাবন্ধে ফল যথা সেইমত করি
বহু বর্ষ ছিল না সে আমারে আঁকড়ি
দুই ক্ষুদ্র বহুবৃন্ত দিয়ে-- লয়ে টানি
মোর হাসি হতে হাসি, বাণী হতে বাণী,
প্রাণ হতে প্রাণ? তবু কহি, মহারাজ,
সেই পুত্র দুর্যোধনে ত্যাগ করো আজ।
ধৃতরাষ্ট্র। কী রাখিব তারে ত্যাগ করি?
গান্ধারী। ধর্ম তব।
ধৃতরাষ্ট্র। কী দিবে তোমারে ধর্ম?
গান্ধারী। দুঃখ নব নব।
পুত্রসুখ রাজ্যসুখ অধর্মের পণে
জিনি লয়ে চিরদিন বহিব কেমনে
দুই কাঁটা বক্ষে আলিঙ্গিয়া?
ধৃতরাষ্ট্র। হায় প্রিয়ে,
ধর্মবশে একবার দিনু ফিরাইয়ে
দ্যূতবদ্ধ পাণ্ডবের হৃত রাজ্যধন।
পরক্ষণে পিতৃস্নেহ করিল গুঞ্জন
শত বার কর্ণে মোর, 'কী করিলি ওরে!
এক কালে ধর্মাধর্ম দুই তরী-'পরে
পা দিয়ে বাঁচে না কেহ। বারেক যখন
নেমেছে পাপের স্রোতে কুরুপুত্রগণ
তখন ধর্মের সাথে সন্ধি করা মিছে;
পাপের দুয়ারে পাপ সহায় মাগিছে।
কী করিলি হতভাগ্য, বৃদ্ধ বুদ্ধিহত,
দুর্বল দ্বিধায় পড়ি? অপমানক্ষত
রাজ্য ফিরে দিলে তবু মিলাবে না আর
পাণ্ডবের মনে-- শুধু নব কাষ্ঠভার
হুতাশনে দান। অপমানিতের করে
ক্ষমতার অস্ত্র দেওয়া মরিবার তরে।
সক্ষমে দিয়ো না ছাড়ি দিয়ে স্বল্প পীড়া--
করহ দলন। কোরো না বিফল ক্রীড়া
পাপের সহিত; যদি ডেকে আন তারে,
বরণ করিয়া তবে লহো একেবারে।'
এইমত পাপবুদ্ধি পিতৃস্নেহরূপে
বিঁধিতে লাগিল মোর কর্ণে চুপে চুপে
কত কথা তীক্ষ্ণ সূচিসম। পুনরায়
ফিরানু পাণ্ডবগণে; দ্যূতছলনায়
বিসর্জিনু দীর্ঘ বনবাসে। হায় ধর্ম,
হায় রে প্রবৃত্তিবেগ! কে বুঝিবে মর্ম
সংসারের!
গান্ধারী। ধর্ম নহে সম্পদের হেতু,
মহারাজ, নহে সে সুখের ক্ষুদ্র সেতু--
ধর্মেই ধর্মের শেষ। মূঢ়-নারী আমি,
ধর্মকথা তোমারে কী বুঝাইব স্বামী,
জান তো সকলই। পাণ্ডবেরা যাবে বনে,
ফিরাইলে ফিরিবে না, বদ্ধ তারা পণে।
এখন এ মহারাজ্য একাকী তোমার
মহীপতি-- পুত্রে তব ত্যজ এইবার;
নিষ্পাপেরে দুঃখ দিয়ে নিজে পুর্ণ সুখ
লইয়ো না, ন্যায়ধর্মে কোরো না বিমুখ
পৌরবপ্রাসাদ হতে-- দুঃখ সুদুঃসহ
আজ হতে, ধর্মরাজ, লহো তুলি লহো,
দেহো তুলি মোর শিরে।
ধৃতরাষ্ট্র। হায় মহারানী,
সত্য তব উপদেশ, তীব্র তব বাণী।
গান্ধারী। অধর্মের মধুমাখা বিষফল তুলি
আনন্দে নাচিছে পুত্র; স্নেহমোহে ভুলি
সে ফল দিয়ো না তারে ভোগ করিবারে;
কেড়ে লও, ফেলে দাও, কাঁদাও তাহারে।
ছললব্ধ পাপস্ফীত রাজ্যধনজনে
ফেলে রাখি সেও চলে যাক নির্বাসনে,
বঞ্চিত পাণ্ডবদের সমদুঃখভার
করুক বহন।
ধৃতরাষ্ট্র। ধর্মবিধি বিধাতার--
জাগ্রত আছেন তিনি, ধর্মদণ্ড তাঁর
রয়েছে উদ্যত নিত্য; অয়ি মনস্বিনী,
তাঁর রাজ্যে তাঁর কার্য করিবেন তিনি।
আমি পিতা--
গান্ধারী। তুমি রাজা, রাজ-অধিরাজ,
বিধাতার বাম হস্ত; ধর্মরক্ষা-কাজ
তোমা-'পরে সমর্পিত। শুধাই তোমারে,
যদি কোনো প্রজা তব সতী অবলারে
পরগৃহ হতে টানি করে অপমান
বিনা দোষে-- কী তাহার করিবে বিধান?
ধৃতরাষ্ট্র। নির্বাসন।
গান্ধারী। তবে আজ রাজপদতলে
সমস্ত নারীর হয়ে নয়নের জলে
বিচার প্রার্থনা করি। পুত্র দুর্যোধন
অপরাধী প্রভু! তুমি আছ, হে রাজন,
প্রমাণ আপনি। পুরুষে পুরুষে দ্বন্দ্ব
স্বার্থ লয়ে বাধে অহরহ-- ভালোমন্দ
নাহি বুঝি তার; দণ্ডনীতি, ভেদনীতি,
কূটনীতি কত শত, পুরুষের রীতি
পুরুষেই জানে। বলের বিরোধে বল,
ছলের বিরোধে কত জেগে উঠে ছল,
কৌশলে কৌশল হানে-- মোরা থাকি দূরে
আপনার গৃহকর্মে শান্ত অন্তঃপুরে
যে সেথা টানিয়া আনে বিদ্বেষ-অনল,
যে সেথা সঞ্চার করে ঈর্ষার গরল
বাহিরের দ্বন্দ্ব হতে, পুরুষেরে ছাড়ি
অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া নিরুপায় নারী
গৃহধর্মচারিণীর পুণ্যদেহ- 'পরে
কলুষপরুষ স্পর্শে অসম্মানে করে
হস্তক্ষেপ-- পতি-সাথে বাধায়ে বিরোধ
যে নর পত্নীরে হানি লয় তার শোধ,
সে শুধু পাষণ্ড নহে, সে যে কাপুরুষ।
মহারাজ, কী তার বিধান? অকলুষ
পুরুবংশে পাপ যদি জন্মলাভ করে
সেও সহে; কিন্তু, প্রভু, মাতৃগর্বভরে
ভেবেছিনু গর্ভে মোর বীরপুত্রগণ
জন্মিয়াছে-- হায় নাথ, সেদিন যখন
অনাথিনী পাঞ্চালীর আর্তকণ্ঠরব
প্রাসাদপাষাণভিত্তি করি দিল দ্রব
লজ্জা-ঘৃণা-করুণার তাপে, ছুটি গিয়া
হেরিনু গবাক্ষে, তার বস্ত্র আকর্ষিয়া
খল খল হাসিতেছে সভা-মাঝখানে
গান্ধারীর পুত্র পিশাচেরা-- ধর্ম জানে
সেদিন চূর্ণিয়া গেল জন্মের মতন
জননীর শেষ গর্ব। কুরুরাজগণ,
পৌরুষ কোথায় গেছে ছাড়িয়া ভারত!
তোমরা, হে মহারথী, জড়মূর্তিবৎ
বসিয়া রহিলে সেথা চাহি মুখে মুখে,
কেহ বা হাসিলে, কেহ করিলে কৌতুকে
কানাকানি-- কোষমাঝে নিশ্চল কৃপাণ
বজ্রনিঃশেষিত লুপ্তবিদ্যুৎ-সমান
নিদ্রাগত-- মহারাজ, শুন মহারাজ,
এ মিনতি। দূর করো জননীর লাজ,
বীরধর্ম করহ উদ্ধার, পদাহত
সতীত্বের ঘুচাও ক্রন্দন; অবনত
ন্যায়ধর্মে করহ সম্মান-- ত্যাগ করো
দূর্যোধনে।
ধৃতরাষ্ট্র। পরিতাপদহনে জর্জর
হৃদয়ে করিছ শুধু নিষ্ফল আঘাত
হে মহিষী!
গান্ধারী। শতগুণ বেদনা কি, নাথ,
লাগিছে না মোরে? প্রভু, দণ্ডিতের সাথে
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমানে আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তারে প্রাণ
কোনো ব্যথা নাহি পায় তার দণ্ডদান
প্রবলের অত্যাচার। যে দণ্ডবেদনা
পুত্রেরে পার না দিতে সে কারে দিয়ো না;
যে তোমার পুত্র নহে তারো পিতা আছে,
মহা-অপরাধী হবে তুমি তার কাছে
বিচারক। শুনিয়াছি বিশ্ববিধাতার
সবাই সন্তান মোরা-- পুত্রের বিচার
নিয়ত করেন তিনি আপনার হাতে
নারায়ণ; ব্যথা দেন, ব্যথা পান সাথে;
নতুবা বিচারে তাঁর নাই অধিকার,
মূঢ় নারী লভিয়াছি অন্তরে আমার
এই শাস্ত্র। পাপী পুত্রে ক্ষমা কর যদি
নির্বিচারে, মহারাজ, তবে নিরবধি
যত দণ্ড দিলে তুমি যত দোষীজনে,
ধর্মাধিপ নামে, কর্তব্যের প্রবর্তনে,
ফিরিয়া লাগিবে আসি দণ্ডদাতা ভূপে--
ন্যায়ের বিচার তব নির্মমতারূপে
পাপ হয়ে তোমারে দাগিবে। ত্যাগ করো
পাপী দুর্যোধনে।
ধৃতরাষ্ট্র। প্রিয়ে, সংহর, সংহর
তব বাণী। ছিঁড়িতে পারি নে মোহডোর,
ধর্মকথা শুধু আসি হানে সুকঠোর
ব্যর্থ ব্যথা। পাপী পুত্র ত্যাজ্য বিধাতার,
তাই তারে ত্যজিতে না পারি-- আমি তার
একমাত্র। উন্মত্ত-তরঙ্গ-মাঝখানে
যে পুত্র সঁপেছে অঙ্গ তারে কোন্ প্রাণে
ছাড়ি যাব? উদ্ধারের আশা ত্যাগ করি
তবু তারে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরি,
তারি সাথে এক পাপে ঝাঁপ দিয়া পড়ি
এক বিনাশের তলে তলাইয়া মরি
অকাতরে-- অংশ লই তার দুর্গতির,
অর্ধ ফল ভোগ করি তার দুর্মতির,
সেই তো সান্ত্বনা মোর-- এখন তো আর
বিচারের কাল নাই, নাই প্রতিকার,
নাই পথ-- ঘটেছে যা ছিল ঘটিবার,
ফলিবে যা ফলিবার আছে।
[প্রস্থান]
গান্ধারী। হে আমার
অশান্ত হৃদয়, স্থির হও। নতশিরে
প্রতীক্ষা করিয়া থাকো বিধির বিধিরে
ধৈর্য ধরি। যেদিন সুদীর্ঘ রাত্রি-'পরে
সদ্য জেগে উঠে কাল সংশোধন করে
আপনারে, সেদিন দারুণ দুঃখদিন।
দুঃসহ উত্তাপে যথা স্থির গতিহীন
ঘুমাইয়া পড়ে বায়ু-- জাগে ঝঞ্ঝাঝড়ে
অকস্মাৎ, আপনার জড়ত্বের 'পরে
করে আক্রমণ, অন্ধ বৃশ্চিকের মতো
ভীমপুচ্ছে আত্মশিরে হানে অবিরত
দীপ্ত বজ্রশূল, সেইমত কাল যবে
জাগে, তারে সভয়ে অকাল কহে সবে।
লুটাও লুটাও শির-- প্রণম, রমণী,
সেই মহাকালে; তার রথচক্রধ্বনি
দূর রুদ্রলোক হতে বজ্রঘর্ঘরিত
ওই শুনা যায়। তোর আর্ত জর্জরিত
হৃদয় পাতিয়া রাখ্ তার পথতলে।
ছিন্ন সিক্ত হৃৎপিণ্ডের রক্তশতদলে
অঞ্জলি রচিয়া থাক্ জাগিয়া নীরবে
চাহিয়া নিমেষহীন। তার পরে যবে
গগনে উড়িবে ধূলি, কাঁপিবে ধরণী,
সহসা উঠিবে শূন্যে ক্রন্দনের ধ্বনি--
হায় হায় হা রমণী, হায় রে অনাথা,
হায় হায় বীরবধূ; হায় বীরমাতা,
হায় হায় হাহাকার-- তখন সুধীরে
ধুলায় পড়িস লুটি অবনতশিরে
মুদিয়া নয়ন। তার পরে নমো নম
সুনিশ্চিত পরিণাম, নির্বাক্ নির্মম
দারুণ করুণ শান্তি! নমো নমো নম
কল্যাণ কঠোর কান্ত, ক্ষমা স্নিগ্ধতম!
নমো নমো বিদ্বেষের ভীষণা নির্বৃতি!
শ্মশানে ভস্মমাখা পরমা নিষ্কৃতি!
[দুর্যোধন-মহিষী ভানুমতীর প্রবেশ]
ভানুমতী। ইন্দুমুখী, পরভৃতে, লহো তুলি শিরে
মাল্যবস্ত্র অলংকার।
গান্ধারী। বৎসে, ধীরে, ধীরে।
পৌরব ভবনে কোন্ মহোৎসব আজি?
কোথা যাও নব বস্ত্র-অলংকারে সাজি
বধূ মোর?
ভানুমতী। শত্রুপরাভব-শুভক্ষণ
সমাগত।
গান্ধারী। শত্রু যার আত্মীয়স্বজন
আত্মা তার নিত্য শত্রু, ধর্ম শত্রু তার,
অজেয় তাহার শত্রু। নব অলংকার
কোথা হতে হে কল্যাণী?
ভানুমতী। জিনি বসুমতী
ভুজবলে, পাঞ্চালীরে তার পঞ্চপতি
দিয়েছিল যত রত্নমণি-অলংকার--
যজ্ঞদিনে যাহা পরি ভাগ্য-অহংকার
ঠিকরিত মাণিক্যের শত সূচীমুখে
দ্রৌপদীর অঙ্গ হতে, বিদ্ধ হত বুকে
কুরুকুলকামিনীর, সে রত্নভূষণে
আমারে সাজায়ে তারে যেতে হল বনে।
গান্ধারী। হা রে মূঢ়ে, শিক্ষা তবু হল না তোমার--
সেই রত্ন নিয়ে তবু এত অহংকার!
এ কী ভয়ংকরী কান্তি, প্রলয়ের সাজ।
যুগান্তের উল্কাসম দহিছে না আজ
এ মণিমঞ্জীর তোরে? রত্নললাটিকা
এ যে তোর সৌভাগ্যের বজ্রানলশিখা।
তোরে হেরি অঙ্গে মোর ত্রাসের স্পন্দন
সঞ্চারিছে, চিত্তে মোর উঠিছে ক্রন্দন--
আনিছে শঙ্কিত কর্ণে তোর অলংকার
উন্মাদিনী শংকরীর তাণ্ডবঝংকার।
ভানুমতী। মাতঃ, মোরা ক্ষত্রনারী, দুর্ভাগ্যের ভয়
নাহি করি। কভু জয়, কভু পরাজয়--
মধ্যাহ্নগগনে কভু, কভু অস্তধামে,
ক্ষত্রিয়মহিমা-সূর্য উঠে আর নামে।
ক্ষত্রবীরাঙ্গনা, মাতঃ, সেই কথা স্মরি
শঙ্কার বক্ষেতে থাকি সংকটে না ডরি
ক্ষণকাল। দুর্দিন দুর্যোগ যদি আসে,
বিমুখ ভাগ্যেরে তবে হানি উপহাসে
কেমনে মরিতে হয় জানি তাহা দেবী--
কেমনে বাঁচিতে হয় শ্রীচরণ সেবি
সে শিক্ষাও লভিয়াছি।
গান্ধারী। বৎসে, অমঙ্গল
একেলা তোমার নহে। লয়ে দলবল
সে যবে মিটায় ক্ষুধা, উঠে হাহাকার,
কত বীররক্তস্রোতে কত বিধবার
অশ্রুধারা পড়ে আসি-- রত্ন-অলংকার
বধূহস্ত হতে খসি পড়ে শত শত
চূতলতাকুঞ্জবনে মঞ্জরীর মতো
ঝঞ্ঝাবাতে। বৎসে, ভাঙিয়ো না বদ্ধ সেতু,
ক্রীড়াচ্ছলে তুলিয়ো না বিপ্লবের কেতু
গৃহমাঝে-- আনন্দের দিন নহে আজি।
স্বজনদুর্ভাগ্য লয়ে সর্ব অঙ্গে সাজি
গর্ব করিয়ো না মাতঃ! হয়ে সুসংযত
আজ হতে শুদ্ধচিত্তে উপবাসব্রত
করো আচরণ-- বেণী করি উন্মোচন
শান্ত মনে করো, বৎসে, দেবতা-অর্চন।
এ পাপসৌভাগ্যদিনে গর্ব-অহংকারে
প্রতিক্ষণে লজ্জা দিয়ো নাকো বিধাতারে।
খুলে ফেলো অলংকার, নব রক্তাম্বর;
থামাও উৎসববাদ্য, রাজ-আড়ম্বর;
অগ্নিগৃহে যাও, পুত্রী, ডাকো পুরোহিতে--
কালের প্রতীক্ষা করো শুদ্ধসত্ত্ব চিতে্।
যুধিষ্ঠির। আশীর্বাদ মাগিবারে এসেছি, জননী,
বিদায়ের কালে।
গান্ধারী। সৌভাগ্যের দিনমণি
দুঃখরাত্রি-অবসানে দ্বিগুণ উজ্জ্বল
উদিবে হে বৎসগণ! বায়ু হতে বল,
সূর্য হতে তেজ, পৃথ# হতে ধৈর্যক্ষমা
করো লাভ দুঃখব্রত পুত্র মোর! রমা
দৈন্য-মাঝে গুপ্ত থাকি দীন-ছদ্ম-রূপে
ফিরুন পশ্চাতে তব সদা চুপে চুপে,
দুঃখ হতে তোমা-তরে করুন সঞ্চয়
অক্ষয় সম্পদ। নিত্য হউক নির্ভয়
নির্বাসনবাস। বিনা পাপে দুঃখভোগ
অন্তরে জ্বলন্ত তেজ করুক সংযোগ
বহ্নিশিখাদগ্ধ দীপ্ত সুবর্ণের প্রায়।
সেই মহাদুঃখ হবে মহৎ সহায়
তোমাদের। সেই দুঃখে রহিবেন ঋণী
ধর্মরাজ বিধি, যবে শুধিবেন তিনি
নিজহস্তে আত্মঋণ তখন জগতে
দেব নর কে দাঁড়াবে তোমাদের পথে!
মোর পুত্র করিয়াছে যত অপরাধ
খণ্ডন করুক সব মোর আশীর্বাদ
পুত্রাধিক পুত্রগণ! অন্যায় পীড়ন
গভীর কল্যাণসিন্ধু করুক মন্থন।
(দ্রৌপদীকে আলিঙ্গনপূর্বক)
ভূলুণ্ঠিতা স্বর্ণলতা, হে বৎসে আমার,
হে আমার রাহুগ্রস্ত শশী, একবার
তোলো শির, বাক্য মোর করো অবধান।
যে তোমারে অবমানে তারি অপমান
জগতে রহিবে নিত্য, কলঙ্ক অক্ষয়।
তব অপমানরাশি বিশ্বজগন্ময়
ভাগ করে লইয়াছে সর্ব কুলাঙ্গনা--
কাপুরুষতার হস্তে সতীর লাঞ্ছনা।
যাও বৎসে, পতি-সাথে অমলিনমুখ
অরণ্যেরে করো স্বর্গ, দুঃখে করো সুখ।
বধূ মোর, সুদুঃসহ পতিদুঃখব্যথা
বক্ষে ধরি সতীত্বের লভো সার্থকতা।
রাজগৃহে আয়োজন দিবসযামিনী
সহস্র সুখের-- বনে তুমি একাকিনী
সর্বসুখ, সর্বসঙ্গ, সর্বৈশ্বর্যময়,
সকল সান্ত্বনা একা, সকল আশ্রয়,
ক্লান্তির আরাম, শান্তি, ব্যাধির শুশ্রূষা,
দুর্দিনের শুভলক্ষ্ণী, তামসীর ভূষা
উষা মূর্তিমতী। তুমি হবে একাকিনী
সর্বপ্রীতি, সর্বসেবা, জননী, গেহিনী--
সতীত্বের শ্বেতপদ্ম সম্পূর্ণ সৌরভে
শতদলে প্রস্ফুটিয়া জাগিবে গৌরবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gandharir-abedon/
|
5595
|
সুকুমার রায়
|
খাই খাই
|
হাস্যরসাত্মক
|
খাই খাই করো কেন, এসো বসো আহারে—
খাওয়াব আজব খাওয়া, ভোজ কয় যাহারে।
যত কিছু খাওয়া লেখে বাঙালির ভাষাতে,
জড় করে আনি সব— থাক সেই আশাতে।
ডাল ভাত তরকারি ফল-মূল শস্য,
আমিষ ও নিরামিষ, চর্ব্য ও চোষ্য,
রুটি লুচি, ভাজাভুজি, টক ঝাল মিষ্টি,
ময়রা ও পাচকের যত কিছু সৃষ্টি,
আর যাহা খায় লোকে স্বদেশে ও বিদেশে—
খুঁজে পেতে আনি খেতে— নয় বড়ো সিধে সে!
জল খায়, দুধ খায়, খায় যত পানীয়,
জ্যাঠাছেলে বিড়ি খায়, কান ধরে টানিয়ো।
ফল বিনা চিঁড়ে দৈ, ফলাহার হয় তা,
জলযোগে জল খাওয়া শুধু জল নয় তা।ব্যাঙ খায় ফরাসিরা (খেতে নয় মন্দ),
বার্মার ‘ঙাপ্পি’তে বাপ্ রে কি গন্ধ!
মান্দ্রাজী ঝাল খেলে জ্বলে যায় কণ্ঠ,
জাপানেতে খায় নাকি ফড়িঙের ঘণ্ট!
আরশুলা মুখে দিয়ে সুখে খায় চীনারা,
কত কি যে খায় লোকে নাহি তার কিনারা।
দেখে শুনে চেয়ে খাও, যেটা চায় রসনা;
তা না হলে কলা খাও— চটো কেন? বসো না—
সবে হল খাওয়া শুরু, শোনো শোনো আরো খায়—
সুদ খায় মহাজনে, ঘুষ খায় দারোগায়।
বাবু যান হাওয়া খেতে চড়ে জুড়ি-গাড়িতে,
খাসা দেখ ‘খাপ্ খায়’ চাপ্কানে দাড়িতে।
তেলে জলে ‘মিশ খায়’, শুনেছ তা কেও কি?
যুদ্ধে যে গুলি খায় গুলিখোর সেও কি?
ডিঙি চড়ে স্রোতে প’ড়ে পাক খায় জেলেরা,
ভয় পেয়ে খাবি খায় পাঠশালে ছেলেরা;
বেত খেয়ে কাঁদে কেউ, কেউ শুধু গালি খায়,
কেউ খায় থতমত— তাও লিখি তালিকায়।
ভিখারিটা তাড়া খায়, ভিখ্ নাহি পায় রে—
‘দিন আনে দিন খায়’ কত লোক হায় রে।
হোঁচটের চোট্ খেয়ে খোকা ধরে কান্না
মা বলেন চুমু খেয়ে, ‘সেরে গেছে, আর না।’
ধমক বকুনি খেয়ে নয় যারা বাধ্য
কিলচড় লাথি ঘুঁষি হয় তার খাদ্য।
জুতো খায় গুঁতো খায়, চাবুক যে খায় রে,
তবু যদি নুন খায় সেও গুণ গায় রে।
গরমে বাতাস খাই, শীতে খাই হিম্সিম্,
পিছলে আছাড় খেয়ে মাথা করে ঝিম্ঝিম্।কত যে মোচড় খায় বেহালার কানটা,
কানমলা খেলে তবে খোলে তার গানটা।
টোল খায় ঘটি বাটি, দোল খায় খোকারা,
ঘাব্ড়িয়ে ঘোল খায় পদে পদে বোকারা।
আকাশেতে কাৎ হ’য়ে গোঁৎ খায় ঘুড়িটা,
পালোয়ান খায় দেখ ডিগ্বাজি কুড়িটা।
ফুটবলে ঠেলা খাই, ভিড়ে খাই ধাক্কা,
কাশীতে প্রসাদ খেয়ে সাধু হই পাক্কা।
কথা শোনো, মাথা খাও, রোদ্দুরে যেও না—
আর যাহা খাও বাপু বিষমটি খেয়ো না।
‘ফেল্’ ক’রে মুখ খেয়ে কেঁদেছিলে সেবারে,
আদা-নুন খেয়ে লাগো পাশ করো এবারে।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ো নাকো; যেয়ো নাকো ভড়্কে,
খাওয়াদাওয়া শেষ হলে বসে খাও খড়্কে।
এত খেয়ে তবু যদি নাহি ওঠে মনটা—
খাও তবে কচুপোড়া খাও তবে ঘণ্টা।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/khai-khai/
|
573
|
কায়কোবাদ
|
নিবেদন
|
চিন্তামূলক
|
১
আঁধারে এসেছি আমি
আধারেই যেতে চাই !
তোরা কেন পিছু পিছু
আমারে ডাকিস্ ভাই !
আমিতো ভিখারী বেশে
ফিরিতেছি দেশে দেশে
নাহি বিদ্যা, নাহি বুদ্ধি
গুণ তো কিছুই নাই !
২
আলো তো লাগে না ভাল
আধারি যে ভালবাসি !
আমিতো পাগল প্রাণে
কভূ কাঁদি, কভূ হাসি !
চাইনে ঐশ্বর্য-ভাতি, চাইনে যশের খ্যাতি
আমিযে আমারি ভাবে মুগ্ধ আছি দিবানিশি !
৩
অনাদার-অবজ্ঞায়
সদা তুষ্ট মম প্রাণ,
সংসার-বিরাগী আমি
আমার কিসের মান ?
চাইনে আদর স্নেহ, চাইনে সুখের গেহ
ফলমূল খাদ্য মোর
তরুতলে বাসস্থান !
৪
কে তোরা ডাকিস মোরে
আয় দেখি কাছে
কি চাস আমার কাছে
আমি যে ভিখারী হায় !
ধন নাই, জন নাই,, কি দিব তোদেরে ভাই,
আছে শুধু ‘অশ্রু-জল’
তোরা কি তা নিবি হায় !
৫
শোকে তাপে এ হৃদয়
হয়ে গেছে ঘোর কালো ;
আঁধারে থাকিতে চাই
ভাল যে বাসিনে আলো !
আমি যে পাগল কবি, দীনতার পূর্ণ ছবি,
সবি করে ‘দূর ‘দূর’
তোরা কি বাসিস্ ভাল ?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3842.html
|
3340
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নৌকাযাত্রা
|
ছড়া
|
মধু মাঝির ওই যে নৌকোখানা
বাঁধা আছে রাজগঞ্জের ঘাটে ,
কারো কোনো কাজে লাগছে না তো ,
বোঝাই করা আছে কেবল পাটে ।
আমায় যদি দেয় তারা নৌকাটি
আমি তবে একশোটা দাঁড় আঁটি ,
পাল তুলে দিই চারটে পাঁচটা ছটা —
মিথ্যে ঘুরে বেড়াই নাকো হাটে ।
আমি কেবল যাই একটিবার
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার ।
তখন তুমি কেঁদো না মা , যেন
বসে বসে একলা ঘরের কোণে —
আমি তো মা , যাচ্ছি নেকো চলে
রামের মতো চোদ্দ বছর বনে ।
আমি যাব রাজপুত্রু হয়ে
নৌকো - ভরা সোনামানিক বয়ে ,
আশুকে আর শ্যামকে নেব সাথে ,
আমরা শুধু যাব মা তিন জনে ।
আমি কেবল যাব একটিবার
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার ।
ভোরের বেলা দেব নৌকো ছেড়ে ,
দেখতে দেখতে কোথায় যাব ভেসে ।
দুপুরবেলা তুমি পুকুর - ঘাটে ,
আমরা তখন নতুন রাজার দেশে ।
পেরিয়ে যাব তির্পুর্নির ঘাট ,
পেরিয়ে যাব তেপান্তরের মাঠ ,
ফিরে আসতে সন্ধে হয়ে যাবে ,
গল্প বলব তোমার কোলে এসে ।
আমি কেবল যাব একটিবার
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার । (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/noukajatra/
|
593
|
গোবিন্দচন্দ্র দাস
|
ভাওয়াল
|
প্রকৃতিমূলক
|
ভাওয়াল আমার অস্থিমজ্জা
ভাওয়াল আমার প্রাণ!
তাহার শ্যামল বন, মরকত-নিকেতন,
চরে কত পশুপাখী নিশি দিনমান,
মহিষ ভল্লুক বাঘ, প্রজ্জ্বলিত হিংসারাগ
কঙ্করে নখর শৃঙ্গ ক্ষুরে দেয় শাণ।
তার সে পিকের ডাকে, জোস্না জমিয়া থাকে,
যামিনী মূরছা যায় শ্যামা ধরে তান!
খঞ্জন খঞ্জনী নাচে, বনদেবতার কাছে,
পাপিয়া দোয়েল করে মধুমাখা গান।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1747.html
|
5029
|
শামসুর রাহমান
|
বিপন্ন হয়ে যাই
|
সনেট
|
নিজেই নিজের আচরণ নিশ্লেষণ করে খুব
বিস্মিত, বিপন্ন হয়ে যাই। আমার ভেতরকার
কোন্ অন্ধকার স্তর থেকে ক্ষিপ্ত এক জাগুয়ার
হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে। কখনো অতলে দিয়ে ডুব
আমি যেন জলজ সহিংস প্রাণী ছিঁড়ে খুঁড়ে
খাবো পাবো যা সমুখে, লেজের আঘাতে চতুর্দিক
তছনছ করে শেষে নিজেকেই ভয়ঙ্কর শিক
দিয়ে গেঁথে ভব্যতার খোলস ফেলবো ভেঙেচুরে।এই ভাঙচুর লক্ষ্য করে তুমি এর ব্যাখ্যা চেয়ে
আমাকে বৃথাই করো অপ্রস্তুত। কত ব্যাখ্যাতীত
বিষয় রয়েছে ভবে, অমীমাংসা যার অসহায়
করে রাখে মানুষকে, মাঝে মধ্যে অস্তিত্বের ভিত
ভয়ানক কেঁপে ওঠে। কালসন্ধ্যা নেমেছে, হে মেয়ে
ডোবাচ্ছো পীড়ন-গাঙে, আবার ভাসাও কিনারায়। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/biponno-hoye-jai/
|
3063
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ছোটো ফুল
|
সনেট
|
আমি শুধু মালা গাঁথি ছোটো ছোটো ফুলে ,
সে ফুল শুকায়ে যায় কথায় কথায় !
তাই যদি , তাই হোক , দুঃখ নাহি তায় —
তুলিব কুসুম আমি অনন্তের কূলে ।
যারা থাকে অন্ধকারে , পাষাণকারায় ,
আমার এ মালা যদি লহে গলে তুলে ,
নিমেষের তরে তারা যদি সুখ পায় ,
নিষ্ঠুর বন্ধনব্যথা যদি যায় ভুলে !
ক্ষুদ্র ফুল , আপনার সৌরভের সনে
নিয়ে আসে স্বাধীনতা , গভীর আশ্বাস —
মনে আনে রবিকর নিমেষস্বপনে ,
মনে আনে সমুদ্রের উদার বাতাস ।
ক্ষুদ্র ফুল দেখে যদি কারো পড়ে মনে
বৃহৎ জগৎ , আর বৃহৎ আকাশ ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/choto-ful/
|
3561
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাহির হইতে দেখো না এমন করে
|
চিন্তামূলক
|
বাহির হইতে দেখো না এমন করে,
আমায় দেখো না বাহিরে।
আমায় পাবে না আমার দুখে ও সুখে,
আমার বেদনা খুঁজো না আমার বুকে,
আমায় দেখিতে পাবে না আমার মুখে
কবিরে খুঁজিছ যেথায় সেথা সে নাহি রে।সাগরে সাগরে কলরবে যাহা বাজে,
মেঘগর্জনে ছুটে ঝঞ্ঝার মাঝে,
নীরব মন্দ্রে নিশীথ-আকাশে রাজে
আঁধার হইতে আঁধারে আসন পাতিয়া–
আমি সেই এই মানবের লোকালয়ে
বাজিয়া উঠেছি সুখে দুখে লাজে ভয়ে,
গরজি ছুটিয়া ধাই জয়ে পরাজয়ে
বিপুল ছন্দে উদার মন্দ্রে মাতিয়া।যে গন্ধ কাঁপে ফুলের বুকের কাছে,
ভোরের আলোকে যে গান ঘুমায়ে আছে,
শারদ-ধান্যে যে আভা আভাসে নাচে
কিরণে কিরণে হসিত হিরণে হরিতে,
সেই গন্ধই গড়েছে আমার কায়া,
সে গান আমাতে রচিছে নূতন মায়া,
সে আভা আমার নয়নে ফেলেছে ছায়া–
আমার মাঝারে আমারে কে পারে ধরিতে।নর-অরণ্যে মর্মতান তুলি,
যৌবনবনে উড়াই কুসুমধূলি,
চিত্তগুহায় সুপ্ত রাগিণীগুলি,
শিহরিয়া উঠে আমার পরশে জাগিয়া।
নবীন উষার তরুণ অরুণে থাকি
গগনের কোণে মেলি পুলকিত আঁখি,
নীরব প্রদোষে করুণ কিরণে ঢাকি
থাকি মানবের হৃদয়চূড়ায় লাগিয়া।তোমাদের চোখে অঁখিজল ঝরে যবে
আমি তাহাদের গেঁথে দিই গীতরবে,
লাজুক হৃদয় যে কথাটি নাহি কবে
সুরের ভিতরে লুকাইয়া কহি তাহারে।
নাহি জানি আমি কী পাখা লইয়া উড়ি,
খেলাই ভুলাই দুলাই ফুটাই কুঁড়ি,
কোথা হতে কোন্ গন্ধ যে করি চুরি
সন্ধান তার বলিতে পারি না কাহারে।যে আমি স্বপন-মুরতি গোপনচারী,
যে আমি আমারে বুঝিতে বুঝাতে নারি,
আপন গানের কাছেতে আপনি হারি,
সেই আমি কবি। কে পারে আমারে ধরিতে।
মানুষ-আকারে বদ্ধ যে জন ঘরে,
ভূমিতে লুটায় প্রতি নিমেষের ভরে,
যাহারে কাঁপায় স্তুতিনিন্দার জ্বরে,
কবিরে পাবে না তাহার জীবনচরিতে। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bahir-hoite-dekho-na-emon-kore/
|
2375
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মেঘনাদবধ কাব্য (প্রথম সর্গ)
|
মহাকাব্য
|
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি,
কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি? কি কৌশলে, রাক্ষসভরসা
ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে — অজেয় জগতে —
ঊর্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা?
বন্দি চরণারবিন্দ, অতি মন্দমতি
আমি, ডাকি আবার তোমায়, শ্বেতভুজে
ভারতি! যেমতি, মাতঃ, বসিলা আসিয়া,
বাল্মীকির রসনায় (পদ্মাসনে যেন)
যবে খরতর শরে, গহন কাননে,
ক্রৌঞ্চবধূ সহ ক্রৌঞ্চে নিষাদ বিঁধিলা,
তেমতি দাসেরে, আসি, দয়া কর, সতি।
কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে?
নরাধম আছিল যে নর নরকুলে
চৌর্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে,
মৃ্ত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি!
হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর
কাব্যরত্নাকর কবি! তোমার পরশে,
সুচন্দন-বৃক্ষশোভা বিষবৃক্ষ ধরে!
হায়, মা, এহেন পুণ্য আছে কি এ দাসে?
কিন্তু যে গো গুণহীন সন্তানের মাঝে
মূঢ়মতি, জননীর স্নেহ তার প্রতি
সমধিক। ঊর তবে, ঊর দয়াময়ি
বিশ্বরমে! গাইব, মা, বীররসে ভাসি,
মহাগীত; ঊরি, দাসে দেহ পদছায়া।
— তুমিও আইস, দেবি তুমি মধুকরী
কল্পনা! কবির ঢিত্ত-ফুলবন-মধু
লয়ে, রচ মধুচক্র, গৌড়জন যাহে
আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।
কনক-আসনে বসে দশানন বলী —
হেমকূট-হৈমশিরে শৃঙ্গবর যথা
তেজঃপুঞ্জ। শত শত পাত্রমিত্র আদি
সভাসদ, নতভাবে বসে চারি দিকে।
ভূতলে অতুল সভা — স্ফটিকে গঠিত;
তাহে শোভে রত্নরাজি, মানস-সরসে
সরস কমলকুল বিকশিত যথা।
শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, স্তম্ভ সারি সারি
ধরে উচ্চ স্বর্ণছাদ, ফণীন্দ্র যেমতি,
বিস্তারি অযুত ফণা, ধরেন আদরে
ধরারে। ঝুলিছে ঝলি ঝালরে মুকুতা,
পদ্মরাগ, মরকত, হীরা; যথা ঝোলে
(খচিত মুকুলে ফুল) পল্লবের মালা
ব্রতালয়ে। ক্ষণপ্রভা সম মুহুঃ হাসে
রতনসম্ভবা বিভা — ঝলসি নয়নে!
সুচারু চামর চারুলোচনা কিঙ্করী
ঢুলায়; মৃণালভুজ আনন্দে আন্দোলি
চন্দ্রাননা। ধরে ছত্র ছত্রধর; আহা
হরকোপানলে কাম যেন রে না পুড়ি
দাঁড়ান সে সভাতলে ছত্রধর-রূপে!—
ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ মুরতি,
পাণ্ডব-শিবির দ্বারে রুদ্রেশ্বর যথা
শূলপাণি! মন্দে মন্দে বহে গন্ধে বহি,
অনন্ত বসন্ত-বায়ু, রঙ্গে সঙ্গে আনি
কাকলী লহরী, মরি! মনোহর, যথা
বাঁশরীস্বরলহরী গোকুল বিপিনে!
কি ছার ইহার কাছে, হে দানবপতি
ময়, মণিময় সভা, ইন্দ্রপ্রস্থে যাহা
স্বহস্তে গড়িলা তুমি তুষিতে পৌরবে?
এহেন সভায় বসে রক্ষঃকুলপতি,
বাক্যহীন পুত্রশোকে! ঝর ঝর ঝরে
অবিরল অশ্রুধারা — তিতিয়া বসনে,
যথা তরু, তীক্ষ্ণ শর সরস শরীরে
বাজিলে, কাঁদে নীরবে। কর জোড় করি,
দাঁড়ায় সম্মুখে ভগ্নদূত, ধূসরিত
ধূলায়, শোণিতে আর্দ্র সর্ব কলেবর।
বীরবাহু সহ যত যোধ শত শত
ভাসিল রণসাগরে, তা সবার মাঝে
একমাত্র বাঁচে বীর; যে কাল তরঙ্গ
গ্রাসিল সকলে, রক্ষা করিল রাক্ষসে—
নাম মকরাক্ষ, বলে যক্ষপতি সম।
এ দূতের মুখে শুনি সুতের নিধন,
হায়, শোকাকুল আজি রাজকুলমণি
নৈকষেয়! সভাজন দুঃখী রাজ-দুঃখে।
আঁধার জগৎ, মরি, ঘন আবরিলে
দিননাথে! কত ক্ষণে চেতন পাইয়া,
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, কহিলা রাবণ;—
“নিশার স্বপনসম তোর এ বারতা,
রে দূত! অমরবৃন্দ যার ভুজবলে
কাতর, সে ধনুর্ধরে রাঘব ভিখারী
বধিল সম্মুখ রণে? ফুলদল দিয়া
কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলী তরুবরে?
হা পুত্র, হা বীরবাহু, বীর-চূড়ামণি!
কি পাপে হারানু আমি তোমা হেন ধনে?
কি পাপ দেখিয়া মোর, রে দারুণ বিধি,
হরিলি এ ধন তুই? হায় রে, কেমনে
সহি এ যাতনা আমি? কে আর রাখিবে
এ বিপুল কুল-মান এ কাল সমরে!
বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে
একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে
নাশে বৃক্ষে, হে বিধাতঃ, এ দুরন্ত রিপু
তেমতি দুর্বল, দেখ, করিছে আমারে
নিরন্তর! হব আমি নির্মূল সমূলে
এর শরে! তা না হলে মরিত কি কভু
শূলী শম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম,
অকালে আমার দোষে? আর যোধ যত—
রাক্ষস-কুল-রক্ষণ? হায়, সূর্পণখা,
কি কুক্ষণে দেখেছিলি, তুই অভাগী,
কাল পঞ্চবটীবনে কালকূটে ভরা
এ ভুজগে? কি কুক্ষণে (তোর দুঃখে দুঃখী)
পাবক-শিখা-রূপিণী জানকীরে আমি
আনিনু এ হৈম গেহে? হায় ইচ্ছা করে,
ছাড়িয়া কনকলঙ্কা, নিবিড় কাননে
পশি, এ মনের জ্বালা জুড়াই বিরলে!
কুসুমদাম-সজ্জিত, দীপাবলী-তেজে
উজ্জ্বলিত নাট্যশালা সম রে আছিল
এ মোর সুন্দরী পুরী! কিন্তু একে একে
শুখাইছে ফুল এবে, নিবিছে দেউটি;
নীরব রবাব, বীণা, মুরজ, মুরলী;
তবে কেন আর আমি থাকি রে এখানে?
কার রে বাসনা বাস করিতে আঁধারে?”
এইরূপে বিলাপিলা আক্ষেপে রাক্ষস–
কুলপতি রাবণ; হায় রে মরি, যথা
হস্তিনায় অন্ধরাজ, সঞ্জয়ের মুখে
শুনি, ভীমবাহু ভীমসেনের প্রহারে
হত যত প্রিয়পুত্র কুরুক্ষেত্র-রণে!
তবে মন্ত্রী সারণ (সচিবশ্রেষ্ঠ বুধঃ)
কৃতাঞ্জলিপুটে উঠি কহিতে লাগিলা
নতভাবে; — “হে রাজন্, ভুবন বিখ্যাত,
রাক্ষসকুলশেখর, ক্ষম এ দাসেরে!
হেন সাধ্য কার আছে বুঝায় তোমারে
এ জগতে? ভাবি, প্রভু দেখ কিন্তু মনে;—
অভ্রভেদী চূড়া যদি যায় গুঁড়া হয়ে
বজ্রাঘাতে, কভু নহে ভূধর অধীর
সে পীড়নে। বিশেষতঃ এ ভবমণ্ডল
মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত।
মোহের ছলনে ভুলে অজ্ঞান যে জন।”
উত্তর করিলা তবে লঙ্কা-অধিপতি;—
“যা কহিলে সত্য, ওহে অমাত্য-প্রধান
সারণ! জানি হে আমি, এ ভব-মণ্ডল
মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত।
কিন্তু জেনে শুনে তবু কাঁদে এ পরাণ
অবোধ। হৃদয়-বৃন্তে ফুটে যে কুসুম,
তাহারে ছিঁড়িলে কাল, বিকল হৃদয়
ডোবে শোক-সাগরে, মৃণাল যথা জলে,
যবে কুবলয়ধন লয় কেহ হরি।”
এতেক কহিয়া রাজা, দূত পানে চাহি,
আদেশিলা,— “কহ, দূত, কেমনে পড়িল
সমরে অমর-ত্রাস বীরবাহু বলী?”
প্রণমি রাজেন্দ্রপদে, করযুগ জুড়ি,
আরম্ভিলা ভগ্নদূত;— “হায়, লঙ্কাপতি,
কেমনে কহিব আমি অপূর্ব কাহিনী?
কেমনে বর্ণিব বীরবাহুর বীরতা?—
মদকল করী যথা পশে নলবনে,
পশিলা বীরকুঞ্জর অরিদল মাঝে
ধনুর্ধর। এখনও কাঁপে হিয়া মম
থরথরি, স্মরিলে সে ভৈরব হুঙ্কারে!
শুনেছি, রাক্ষসপতি, মেঘের গর্জনে;
সিংহনাদে; জলধির কল্লোলে; দেখেছি
দ্রুত ইরম্মদে, দেব, ছুটিতে পবন–
পথে; কিন্তু কভু নাহি শুনি ত্রিভুবনে,
এহেন ঘোর ঘর্ঘর কোদণ্ড-টঙ্কারে!
কভু নাহি দেখি শর হেন ভয়ঙ্কর!—
পশিলা বীরেন্দ্রবৃন্দ বীরবাহু সহ
রণে, যূথনাথ সহ গজযূথ যথা।
ঘন ঘনাকারে ধূলা উঠিল আকাশে,—
মেঘদল আসি যেন আবরিলা রুষি
গগনে; বিদ্যুৎঝলা-সম চকমকি
উড়িল কলম্বকুল অম্বর প্রদেশে
শনশনে!— ধন্য শিক্ষা বীর বীরবাহু!
কত যে মরিল অরি, কে পারে গণিতে?
এইরূপে শত্রুমাঝে যুঝিলা স্বদলে
পুত্র তব, হে রাজন্! কত ক্ষণ পরে,
প্রবেশিলা, যুদ্ধে আসি নরেন্দ্র রাঘব।
কনক-মুকুট শিরে, করে ভীম ধনুঃ,
বাসবের চাপ যথা বিবিধ রতনে
খচিত,”— এতেক কহি, নীরবে কাঁদিল
ভগ্নদূত, কাঁদে যথা বিলাপী, স্মরিয়া
পূর্বদুঃখ! সভাজন কাঁদিলা নীরবে।
অশ্রুময়-আঁখি পুনঃ কহিলা রাবণ,
মন্দোদরীমনোহর;— “কহ, রে সন্দেশ–
বহ, কহ, শুনি আমি, কেমনে নাশিলা
দশাননাত্মজ শূরে দশরথাত্মজ?”
“কেমনে, হে মহীপতি,” পুনঃ আরম্ভিল
ভগ্নদূত, “কেমনে, হে রক্ষঃকুলনিধি,
কহিব সে কথা আমি, শুনিবে বা তুমি?
অগ্নিময় চক্ষুঃ যথা হর্যক্ষ, সরোষে
কড়মড়ি ভীম দন্ত, পড়ে লম্ফ দিয়া
বৃষস্কন্ধে, রামচন্দ্র আক্রমিলা রণে
কুমারে! চৌদিকে এবে সমর-তরঙ্গ
উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি বায়ু সহ
নির্ঘোষে! ভাতিল অসি অগ্নিশিখাসম
ধূমপুঞ্জসম চর্মাবলীর মাঝারে
অযুত! নাদিল কম্বু অম্বুরাশি-রবে!—
আর কি কহিব, দেব? পূর্বজন্মদোষে,
একাকী বাঁচিনু আমি! হায় রে বিধাতঃ,
কি পাপে এ তাপ আজি দিলি তুই মোরে?
কেন না শুইনু আমি শরশয্যোপরি,
হৈমলঙ্কা-অলঙ্কার বীরবাহু সহ
রণভূমে? কিন্তু নহি নিজ দোষে দোষী।
ক্ষত বক্ষঃস্থল মম, দেখ, নৃপমণি,
রিপু-প্রহরণে; পৃষ্ঠে নাহি অস্ত্রলেখা।”
এতেক কহিয়া স্তব্ধ হইল রাক্ষস
মনস্তাপে। লঙ্কাপতি হরষে বিষাদে
কহিলা; “সাবাসি, দূত! তোর কথা শুনি,
কোন্ বীর-হিয়া নাহি চাহে রে পশিতে
সংগ্রামে? ডমরুধ্বনি শুনি কাল ফণী
কভু কি অলসভাবে নিবাসে বিবরে?
ধন্য লঙ্কা, বীরপুত্রধারী! চল, সবে,—
চল যাই, দেখি, ওহে সভাসদ-জন,
কেমনে পড়েছে রণে বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু; চল, দেখি জুড়াই নয়নে।”
উঠিলা রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে,
কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন
অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন-
সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা— মনোহরা পুরী!
হেমহর্ম্য সারি সারি পুষ্পবন মাঝে;
কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃ-ছটা;
তরুরাজি; ফুলকুল— চক্ষু-বিনোদন,
যুবতীযৌবন যথা; হীরাচূড়াশিরঃ
দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি,
বিবিধ রতনপূর্ণ; এ জগৎ যেন
আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে,
রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে,
জগত-বাসনা তুই, সুখের সদন।
দেখিলা রাক্ষসেশ্বর উন্নত প্রাচীর—
অটল অচল যথা; তাহার উপরে,
বীরমদে মত্ত, ফেরে অস্ত্রীদল, যথা
শৃঙ্গধরোপরি সিংহ। চারি সিংহদ্বার
(রুদ্ধ এবে) হেরিলা বৈদেহীহর; তথা
জাগে রথ, রথী, গজ, অশ্ব, পদাতিক
অগণ্য। দেখিলা রাজা নগর বাহিরে,
রিপুবৃন্দ, বালিবৃন্দ সিন্ধুতীরে যথা,
নক্ষত্র-মণ্ডল কিম্বা আকাশ-মণ্ডলে।
থানা দিয়া পূর্ব দ্বারে, দুর্বার সংগ্রামে,
বসিয়াছে বীর নীল; দক্ষিণ দুয়ারে
অঙ্গদ, করভসম নব বলে বলী;
কিংবা বিষধর, যবে বিচিত্র কঞ্চুক-
ভূষিত, হিমান্তে অহি ভ্রমে, ঊর্ধ্ব ফণা—
ত্রিশূলসদৃশ জিহ্বা লুলি অবলেপে!
উত্তর দুয়ারে রাজা সুগ্রীব আপনি
বীরসিংহ। দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে—
হায় রে বিষণ্ণ এবে জানকী-বিহনে,
কৌমুদী-বিহনে যথা কুমুদরঞ্জন
শশাঙ্ক! লক্ষ্মণ সঙ্ঘে, বায়ুপুত্র হনু,
মিত্রবর বিভীষণ। এত প্রসরণে,
বেড়িয়াছে বৈরিদল স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী,
গহন কাননে যথা ব্যাধ-দল মিলি,
বেড়ে জালে সাবধানে কেশরিকামিনী,—
নয়ন–রমণী রূপে, পরাক্রমে ভীমা
ভীমাসমা! অদূরে হেরিলা রক্ষঃপতি
রণক্ষেত্র। শিবাকুল, গৃধিনী, শকুনি,
কুক্কুর, পিশাচদল ফেরে কোলাহলে।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/meghnadbodh-kabya-first/
|
3065
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ
|
ভক্তিমূলক
|
জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন।
নয়ন আমার রূপের পুরে
সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে
হয়েছে মগন।তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার
বাজাই আমি বাঁশি।
গানে গানে গেঁথে বেড়াই
প্রাণের কান্নাহাসি।
এখন সময় হয়েছে কি।
সভায় গিয়ে তোমায় দেখি
জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব
এ মোর নিবেদন।শিলাইদহ, ৩০ আশ্বিন, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jogote-anondojoggye-amar-nimontron/
|
5691
|
সুকুমার রায়
|
শ্রীশ্রীবর্ণমালাতত্ত্ব
|
ছড়া
|
পড় বিজ্ঞান হবে দিকজ্ঞান ঘুচিবে পথের ধাঁধা
দেখিবে গুণিয়া এ দিন দুনিয়া নিয়ম নিগড়ে বাঁধা।
কহে পন্ডিতে জড়সন্ধিতে বস্তুপিন্ড ফাঁকে
অনু অবকাশে রন্ধ্রে- রন্ধ্রে আকাশ লুকায়ে থাকে।
হেথা হেথা সেথা জড়ের পিন্ড আকাশ প্রলেপে ঢাকা
নয়কো কেবল নিরেট গাঁথন, নয়কো কেবলি ফাঁকা।
জড়ের বাঁধন বদ্ধ আকাশে, আকাশে বাঁধন জড়ে-
পৃথিবী জুড়িয়া সাগর যেমন, প্রাণটি যেমন ধড়ে।;
'ইথার' পাথারে তড়িত বিকারে জড়ের জীবন দোলে,
বিশ্ব - মোহের সুপ্তি ভাঙিছে সৃষ্টির কলরোলে।।শুন শুন বার্তা নুতন, কে যেন স্বপন দিলা
ভাষা প্রাঙ্গণে স্বরে ব্যাঞ্জনে ছন্দ করেন লীলা ।
সৃষ্টি যেথায় জাগে নিরুপায় প্রলয় পয়োধি তীরে
তারি আশেপাশে অন্ধ হুতাশে আকাশ কাঁদিয়া ফিরে।
তাই ক্ষণে ক্ষণে জড়ো ব্যঞ্জনে স্বরের পরশ লাগে
তাই বারেবার মৃদু হাহাকার কলসংগীতে জাগে
স্বরব্যঞ্জন যেন দেহমনে জড়েতে চেতন বাণী
একে বিনা আর থাকিতে না পারে, প্রাণ লয়ে টানাটানি।
দোঁহি ছাড়ি দোঁহে, মূক রহে মোহে, ব্যঞ্জনে নাহি বুলি
স্বরের নিশাসে 'আহা' 'উহু' ভাষে ভাষার বারতা ভুলি।
ছিল অচেতন জগৎ যখন মগন আদিম ধুমে,
অরূপ তিমির স্তব্ধ বধির স্বপ্ন মদির ঘুমে:
আকুল গন্ধে আকাশ কুসুম উদাসে সকল দিশি,
অন্ধ জড়ের বিজন আড়ালে কে যেন রয়েছে মিশি!
স্তিমিত-স্বপ্ন স্বরের বর্ণ জড়ের বাধন ছিড়ি
ফিরে দিশাহারা কোথা ধ্রুবতারা কোথা র্স্বগের সিঁড়ি!
অ আ ই ঈ উ ঊ, হা হি হি হু হু হাল্কা শীতের হাওয়া
অলখচরণ প্রেতের চলন, নিঃশ্বাসে আসা যাওয়া ।
লেখে কি না খেলে ছায়ার আঙুলে বাতাসে বাজায় বীণা
আবেশ বিভোর আফিঙের ঘোর বস্তুত মন্ত্রহীনা।
ভাবে কুল নাই একা আসি যাই যুগে যুগে চিরদিন,
কাল হতে কালে আপনার তালে অনাহত বাধাহীন।।অকুল অতলে অন্ধ অচলে অস্ফুট অমানিশি,
অরূপ আধারে আখি অগোচরে অনুতে অনুতে মিশি।আসে যায় আসে অবশ আয়াশে আবেশ আকুল প্রাণে,
অতি আনমানা করে আনাগোনা অচেনা অজানা টানে,
আধো আধো ভাষা আলেয়ার আসা , আপনি আপনহারা
আদিম আলোতে আবছায়া পথে আকাশগঙ্গা- ধারা।ইচ্ছা বিকল ইন্দ্রিয়দল, জড়িত ইন্দ্রজালে,
ঈশারা আভাসে ঈঙ্গিতে ভাষে রহ-রহ ইহকালে।উড়ে ইতিউতি উতালা আকুতি উসখুস উকিঝুঁকি
উড়ে উচাটন, উড়ু উড়ু মন , উদাসে উধ্বমুখি।এমন একেলা একা একা খেলা একুলে ওকুলে ফের
এপার ওপার এ যে একাকার একেরি একেলা হের।
হেরে একবার সবি একাকার একেরি এলাকা মাঝে
ঐ ওঠে শুনি, ওঙ্কার-ধ্বনি, একুলে ওকুলে বাজে।ওরে মিথ্যা এ আকাশ-চারণ মিথ্যা তোদের খোঁজা,
স্বর্গ তোদের বস্তু সাধনে বহিতে জড়ের বোঝা।
আকাশ বিহানে বস্তু অচল, চলে না জড়ের চাকা,
আদুল আকাশে ফোকলা বাতাস কেবলি আওয়াজ ফাঁকা।সৃষ্টিতত্ত্ব বিচার করনি শাস্ত্র পড়নি দাদা-
জড়ের পিন্ড আকাশে গুলিয়া ঠাসিবে ভাষার কাদা।
শাস্ত্রবিধান কর প্রণিধান ওরে উদাসীন অন্ধ,
ব্যঞ্জনস্বরে যেন হরিহরে কোথাও রবে না দ্বন্দ্ব।
মরমে মরমে সরম পরশে বাতাস লাগিয়ে হাড়ে,
ভাষার প্রবাহে পুলক- কম্পে জড়ের জতো ছাড়ে।
(তবে)আয় নেমে আয়, জড়ের সভায় , জীবন মরণ দোলে,
আয় নেমে আয়, ধরণীধুলায় কীর্তন কলরোলে।
আয় নেমে আয় রূপের মায়ায় অরূপ ইন্দ্রজালে
উল্কা ঝলকে থনল পুলকে আয় রে অশনিতালে।
আয় নেমে আয় কণ্ঠ্য বর্ণে কাকুতি করিছে সবে
আয় নেমে আয় র্ককশ ডাকে প্রভাতে কাকের রবে।নামো নামো নমঃ সৃষ্টি প্রথম কারণ জলধি জলে
স্তব্দ তিমিরে প্রথম কাকলী প্রথম কৌতুহলে।
আদিম তমসে প্রথম বর্ণ কনক কিরণ মালা
প্রথম ক্ষুধিত বিশ্ব জঠরে প্রথম প্রশ্ন জ্বালা।অকূল আঁধারে কুহকপাথারে কে আমি একেলা কবি
হেরি একাকার সকল আকার সকলি আপন ছবি ।
কহে,কই কে গো, কোথায় কবে গো ,কেন বা কাহারে ডাকি?
কহে কহ-কহ , কেন অহরহ ,কালের কবলে থাকি?
কহে কানে কানে করুণ কুজনে কলকল কত ভাষে,
কহে কোলাহলে কলহ কুহরে কাষ্ঠ কঠোর হাসে।
কহে কটঁমট কথা কাটা কাটা -কেওকেটাঁ কহ কারে ?
কাহার কদর কোকিল কণ্ঠে,কুন্দু কুসুম হারে?
কবি কল্পনে কাব্যে কলায় কাহারে করিছ সেবা
কুবের কতন কুঞ্জকাননে, কাঙালি কুটিরে কেবা ।
কায়দা কানুনে ,কার্য কারণে কীর্তিকলাপ মুলে ,
কেতাবে কোরানে কাগজে কলমে কাঁদায়ে কেরানীকুলে ।
কথা কাড়ি -কাড়ি কত কানাকড়ি কাজে কচু কাচকলা
কভু কাছাকোছা কোর্তা কলার কভু কৌপীন ঝোলা ।
কুৎসা -কথনে কুটিলে কৃপণে কুলীন কন্যাদায়ে
কর্মকান্ত কুলিম কান্ত,ক্লিষ্ট কাতর কায়ে ।
কলে কৌশলে ,কপট কোদলে ,কঠিনে কোমলে মিঠে
কেদ কুৎসিত ,কুষ্ঠ কলুষ কিলবিল কৃমি কীটে।
কহ সে কাহার কুহক পাথারু "কে আমি একেলা কবি ?
কেন একাকার সকল আকার সকলি আপন ছবি !"
'ক'-এর কাঁদনে ,কাংস্য-ক্বণনে বর্ণ লভিল কায়া
গহন শুন্যে জড়ের ধাক্কা কালের করাল ছায়া।
সুপ্ত গগনেকরুণ বেদনে বস্তুচেতন জাগে
অকাল ক্ষুধিত খাই খাই রবে বিশ্বে তরাস লাগে
আকাশ অবধি ঠেকিল জলধি,খেয়াল জেগেছে খ্যাপা
কারে খেতে চায় খুজে নাহি পায় দেখ কি বিষম হ্যাপা!
(খালি)কর্তালে কভু কীর্তন খোলে? খোলে দাও চাটিপেটা !
নামাও আসরে 'ক'এর দোসরে, খেঁদেলো খেদেলো খেঁটা।"
কহ মহামুনি কহ খুর শুনি 'খ'য়ের খবর খাঁটি
খামারে খোয়ারে খানায় খন্দে খুজিনু খয়ের ঘাঁটি।
কহেন বচন খুড়ে খন্খন্ পাখালি আঁখির দিঠি
খালি খ্যাঁচাখ্যাঁচি খামচাখামচি খুঁৎখূঁতি খিটিমিটি ।
এখনো খুলেনি মুখের খোলস? এখনো খোলেনি আখি?
নিক খেয়ালে পেখম ধরিয়া, কি খেলা খেলিল পাখি!
এখনও রাখনা ক্ষুধার খবর এখনও শেখনি ভাষা
পঞ্চকোষের মুখের খোসাতে অন্ন দেখনি ঠাসা?
খোল খরতালে খোলসা খেয়ালে 'খোল খোল খোল 'বলে ,
শখের খাঁচার খিড়কী খুলিয়া খঞ্জ খেয়াল চলে।
সে ক্ষুধায় পাখি পেখম খুলিয়া খাঁছায় খেমটা নাচে
আখেরী ক্ষুধায় সখের ভিখারী খাস্তা খাবার যাচে-
প্রখর-ক্ষুধিত তোখড় -খেয়াল -খেপিয়া রুখিল ত্বরা,
চাখিয়া দেখিল, খাসা এ অখিল খেয়ালে-রচিত ধারা ।
খুঁজে সুখে দুখে খেয়ালের ভুলে খেয়ালে নিরখি সবি ,
খেলার খেয়ালে নিখিল -খেয়াল লিখিল খেয়াল ছবি ।
খেলার লীলা খদ্যোৎ-শিখা খেয়াল খধুপ -ধুপে'
শিখী পাখা পরে নিখুত আখরে খচিত খেয়াল রূপে ।
খোদার উপরে খোদকারী করে ওরে ও ক্ষিপ্ত মতি
কীলিয়ে অকালে কাঁঠাল পাকালে আখেরে কি হবে গতি ?
খেয়ে খুরো চাঁটি খোল কহে খাঁটি, 'খাবি খাব ক্ষতি নাই,'
খেয়ালের বাণী করে কানাকানি - 'গতি নাই, গতি নাই।'
নিখিল খেয়াল খসড়া খাতায় লিখিল খেয়াল ছবি
ক্ষণিকের সাথে খেয়ালের মুখে খতিয়া রাখিল সবি।গতি কিসে হবে, চিন্তিয়া তবে বচন শুনিনু খাসা,
পঞ্চ কোষের প্রথম খোসাতে অন্ন রয়েছে ঠাসা!
আত্মার মুখে আদিম -অন্ন তাহে ব্যঞ্জনগুলি
অনুরাগে লাগি,করে ভাগাভাগি মুখে-মুখে দাও তুলি।
এত বলি ঠেলি আত্মারে তুলি তত্ত্বের লগি ধরি,
খেয়ালের প্রাণী রহে চুপ মানি বিস্ময়ে পেট ভারি ।
কবে কেবা জানে গতির গড়ানে গোপন গোমুখী হতে
কোন ভগীরথে গলাল জগতে গতির গঙ্গা স্রোতে।
দেখ আগাগোড়া গণিতের গড়া নিগূঢ় গুণ সবি
গতির আবেগে আগুয়ান বেগে অগণিত গ্রহরবি।
গগনে গগনে গোধুলি লগনে মগন গভীর গানে,
করে গমগম আগম নিগম গুরু গম্ভীর ধ্যানে।
গিরি গহ্বরে অসাধ সাগরে গঞ্জে নগরে-গ্রামে,
গাঁজার গাজনে গোষ্ঠে গহনে গোকুলে গোলকধামে।শুনি সাবধানে কহি কানে কানে শাস্ত্রবচন ধরি
কৌশলে ঋষি কহে কখগঘ কাহারে স্মরণ করে
কয়ে দেখ জল খয়ে শুন্যতল গ'য়ে গতি অহরহ
কভূ জলে ভাসে কভূ সে আকাশে হংস যাহারে কহ ।
আঘাতে যে মারে 'ঘ'কহি তারে হন ধাতু 'ড' করি
তেঁই কখগঘ কৃষ্ণে জানহ হংস-অসুর -অরি।
ব্যঙ্গে রঙ্গে ভ্রুকুটি -ভঙ্গে সঙ্গীত কলরবে
রণহুংকারে ধনুঠংকারে শংকিত কর সবে ।
বিকল অঙ্গে ভগ্নজঙঘ এ কোন পঙ্গু মুনি ?
কেন ভাঙ্গা ঠ্যাংঙে ডাঙায় নামিল বাঙালা মুলুকে শুনি।
রাঙা আঁখি জলে চাঙ্গা হয়ে বলে ডিঙাব সাগর গিরি ,
কেন ঢঙ ধরি ব্যাঙাচির মতো লাঙুল জুড়িয়া ফিরি ?টলিল দুয়ার চিত্তগুহার চকিতে চিচিংফাক
শুনি কলকল ছুটে কোলাহল শুনি চল চল ডাক ।
চলে চঁটপট চকিত চরণ ,চোঁচা চম্পট নৃত্যে
চল চিত্রিত চিরচিন্তন চলে চঞ্চল চিত্তে।
চলে চঞ্চলা চপল চমকে,চারু চৌচির বক্রে।
চলে চন্দ্রমা চলে চরাচর চড়ি চড়কের বক্রে
চলে চকমকি চোখের চাহনে চঞ্চরী চল ছন্দ ,
চলে চিৎকার চাবুক চালনে চপট চাপড়ে চন্ড
চলে চুপি চুপি চতুর চৌর চৌদিকে চাহে ত্রস্ত
চলে চুড়ামণি চর্বে চোষ্যে চটি চৈতনে চোস্ত
চিকন চাদর চিকুর চাঁচর চোখা চালিয়াৎ চ্যাংড়া ,
চলে চ্যাংব্যাং চিতল কাতল চলে চুনোপুটি ট্যাংরা।।ছোটে ছঁটফটি ছায়ার ছমক ছমলীলার ছলে
ছায়ারঙে মিশি ছোটে ছয় দিশি ছায়ার ছাঊনী তলে
ছোটে ছায়াবাহু পিছে পিছে পিছে ছন্দে ছুটেছে রবি
ছয় ঋতু ছোটে ছায়ার ছন্দে ছবির পিছনে ছবি
ছায়াপথ - ছায়ে জ্যোছনা বিছায়ে...
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/shri-shri-bornomala-totto/
|
4377
|
শামসুর রাহমান
|
আমার তৃষ্ণার জল
|
প্রেমমূলক
|
তুমিও ফিরিয়ে নিলে মুখ কম্পিত দ্বিধায়, নাকি
ঘৃণায় গিয়েছো সরে। কতকাল, বলো কতকাল
এমন সুদূরে তুমি সীমাহীন ঔদাস্যের জাল
ছড়িয়ে থাকবে সর্বক্ষণ? আমি কী ব্যাকুল ডাকি
তোমাকেই, আজ আর এমন প্রান্তর নেই বাকি,
নেই কোন নদীতীর কিংবা পথ, অথবা পাতাল
যেখানে যাইনি আমি তোমার সন্ধানে। অন্তরাল
নিজেই করেছো সৃষ্টি, আজ আমি ভীষণ একাকী।তোমার কার্পণ্য কেন মেনে নেবো? কেন যাবো ফিরে
ধূমল তৃষ্ণায় প্রস্রবণ থেকে জলপান বিনা?
এখনতো অন্য কেউ নগ্ন তোমার সত্তার তীরে
তুলছে ফেনিল ঢেউ নিরন্তর, তুমি সে উচ্ছল
আদিমতা বুনো অন্ধকারে উপভোগ করো কিনা
জানতে চাই না, শুধু চাই আমার তৃষ্ণার জল। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-trishnar-jol/
|
5661
|
সুকুমার রায়
|
বিষম ভোজ
|
ছড়া
|
“অবাক কান্ড!” বল্লে পিসী, “এক চাঙাড়ি মেঠাই এল-
এই ছিল সব খাটের তলায়, এক নিমিষে কোথায় গেল?”
সত্যি বটে বললে খুড়ী, “আনলো দু’সের মিঠাই কিনে-
হঠাৎ কোথায় উপসে গেল? ভেল্কিবাজি দুপুর দিনে?”
“দাঁড়াও দেখি” বল্লে দাদা, “কর্ছি আমি এর কিনারা-
কোথায় গেল পটলা ট্যাঁপা – পাচ্ছিনে যে তাদের সাড়া?”
পর্দাঘেরা আড়াল দেওয়া বারান্দাটার ঐ কোণেতে
চল্ছে কি সব ফিস্ ফ্সি্ ফিস্ শুনলে দাদা কানটি পেতে।
পটলা ট্যাঁপা ব্যস্ত দুজন ট্প্টপাটপ্ মিঠাই ভোজে,
হঠাৎ দেখে কার দুটো হাত এগিয়ে তাদের কানটি খোঁজে।
কানের উপর প্যাঁচ্ ঘুরাতেই দু চোখ বেয়ে অশ্রু ছোটে,
গিলবে কি ছাই মুখের মিঠাই ,কান বুঝি যায় টানের চোটে।
পটল বাবুর হোম্রা গলা মিল্ল ট্যাঁপার চিকন সুরে
জাগ্ল করুন রাগরাগিণী বিকট তানে আকাশ জুড়ে। (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/bishom-voj/
|
4866
|
শামসুর রাহমান
|
ধুলোমাখা জলরঙ
|
স্বদেশমূলক
|
১
নব্বই-এর গণআন্দোলন, তার বিজয়, রূপান্তরিত করেছে আমাদের।
তোমাকে দেখলাম ‘জনতার জয়’ মঞ্চে কিছুক্ষণের জন্যে। ভিন্ন এক তুমি
এরই মধ্যে এক ফাঁকে কানে কানে বললে, ‘এই উৎসবে তোমাকে কিছু
উপহার দিতে মন চাইছে। ‘কী? আমার এই প্রশ্ন রৌদে ঝলসে ওঠে
শঙ্খচিলের ডানার মতো। তুমি কোনও উত্তর না দিয়ে ঠোঁটে হাসি খেলিয়ে
কোথায় উধাও। দিন যায়, রাত যায়; উৎসবের আনন্দ এখন ধুলোমাখা
জলরঙ। বর্বরদের পুনরুত্থানের কাল অনেকের আত্মত্যাগকে উপহাস করে
এসে গেল বলে। দিন যায়, দিন যায়। তোমার উপহাস আজও পাইনি।
প্রতিশ্রুতি আর কথা না রাখার মাঝখানে ভাসমান ক’জন শহীদের মুখ।
আমার না পাওয়ার তুচ্ছতায় লজ্জাবনত আমি ক্ষমা প্রার্থী তাঁদের কাছে, যাঁরা
রক্তের কালজয়ী আল্পনা এঁকে দিয়েছেন আমাদের আগামীর করোটি চিহ্নিত
বন্ধুর পথে।২
কত রাত ভালো ঘুম হয় না। চেয়ে চিন্তে আনা মুশকিল, চোখের পাতা
জোড়া লাগে না। বিছানায় শুয়ে থাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনও কখনও বিক্ষুব্ধ
মনে ক্যাপ্টেন আহারের মতো বহুক্ষণ পায়চারি জারি রাখি। দু’চোখে কেউ
যেন শুকনো মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়। পানির ছিটা নয় নিদান। সমুদ্র উথাল
পাথাল করে ভেসে উঠলো অতিকায়, সাদা মবি ডিক? অনেকগুলো প্রেতমূর্তি
নাচতে থাকে ঘরময়। শব্দহীন , উদ্ভট সেই নাচ দেখি শুধু আমি। আরো কত
কিছু ঘটে নির্ঘুম ঘরে; কাউকে বললে, তুমি মেরে উড়িয়ে দেবে, যেন গাঁজাখুরি
গল্প। ভাবি, কবে রাত হবে কাবার? ভাবার আর কিছু থাকে না অনিদ্রার
ক্রুশকাঠে বিদ্ধাবস্থায়। কখনও তুমি আমাকে ঘুমোতে দাও না, কখনও না-
লেখা কবিতা আমার চুলের মুঠি ধরে টান দিয়ে সরায় ঘুমের পাতলা কুয়াশা।
অথচ তোমাদের দু’জনের কাউকেই কাছে পাই না সেসব অত্যাচারী মুহূর্তে।
কবিতা তবুও দয়াপরবশ হয়ে মাঝে-মধ্যে উঁকিঝুঁকি দেয়, তুমি একেবারে ধরা
ছোঁয়ার বাইরে। কতকাল এভাবে না ঘুমিয়ে কাটাতে হবে এই বয়েসী কবিকে?৩
চোখ বন্ধ করলেই সে দেখতে পেতো জঙ্গলের প্রান্তসীমার ঝিল, তৃষ্ণার্ত
হরিণের পাল। ওর হাত প্রসারিত হলেই হাতে চক্ষু ঘষতো রঙ বেরঙের
পাখি। এই মুহূর্তে তার দুটো চোখ রুদ্ধ জানালার মতো, হাতে প্রসারিত হবার
ক্ষমতা গায়েব, এমন নিস্পন্দ। এখন সে মৃত্যুর উপত্যকায়। মাটির নিচে
পোকামাকড় তাকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায়। টেবিলে কিছু বইপত্তর ,
চায়ের শূন্য পেয়ালা, যার গায়ে কিটস্-এর বাড়ি, আর একটি উজাড় শিশি।
কবিতার খাতায় সারিবন্দি হরফ নয়, কাটাকুটির বিক্ষোভ মিছিল। ডাক্তার
ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন আত্মহত্যাকে মুছে ফেলে, ঝুট ঝামেলার
ফাঁকফোকর বন্ধ করার উদ্দেশ্যে। মর্গে পাঠানো হবে না একে একে অনেকে
এসে জড়ো হয়েছে প্রান্তিক বাড়িতে কবিকে শেষবারের মতো এক ঝলক
দেখার জন্যে। কারও কারও বুক ডুকরানো; হু হু বিলাপের সঙ্গে লোবানের
ঘ্রাণ জড়ানো কোরানের আয়াতের ধ্বনি ঊর্ধগামী। রহস্যময়ী একজন কবির
বাড়ির দোরগোড়া থেকেই চলে গেল সকলের অগোচরে। গাছের একরাশ
পাতার প্রশ্ন, ‘কে তুমি নিষ্ঠুরতমা এভাবে ফিরে যাচ্ছো কবিকে এক নজর না
দেখেই?’ ‘একালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা আমি, যার জন্যে কবি মাথা কুটে মরেছে
রাতভর। আমার আগমনের আগেই তার অন্তর্ধান; সে প্রকৃত প্রতীক্ষা
শেখেনি,’ নির্বিকার কণ্ঠস্বর স্পর্শ করে রক্তজবার একগুচ্ছ সজীবপাতাকে, ঝুল
বারান্দাকে।৪
আজকাল চেনা রাস্তাগুলো বড় অচেনা মনে হয়। যে গলিতে ছিল আমার
নিত্যদিনের আসা-যাওয়া তার ভেতরে ঢুকলে একটা লম্বা সাপের সন্ধান পাই,
যাকে দেখিনি কোনওদিন। গলির মোড়ে বসতো যে দোকানদার সে
গরহাজির, ওর জায়গায় অন্য কেউ হিসেবনিকেশে ব্যস্ত, যার চুল তেল
চুকচুকে এবং ঢেউ খেলানো। বহুবার-পড়া কবিতার বইয়ের পঙ্ক্তিমালা
আমার পরিচয়ের গণ্ডি ছড়িয়ে ঝুঁকে থাকে অপরিচয়ের ভরসন্ধ্যায়। বস্তুত এই
ডামাডোলে দুঃসাধ্য কাউকে সঠিক শনাক্ত করা। একজনের মুখ অন্যজনের
মুখে মিশে যাচ্ছে অতি দ্রুত। অচেনা ঘরদোর, ভিডিও ক্লাব, ছাত্রাবাস,
সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সবচেয়ে বেশি অচেনা লাগে নিজেকে, এই অচেনা
আমি-কে নিয়ে কী করি?৫
মধ্যরাতে এক নেকড়ে ধর্ষণ করে স্তব্ধতাকে; চমকে ওঠে শহর, জেগে
থাকা কবির কলম থেমে যায়, ছিনতাইকারীদের আস্তানায় ঝাঁকুনি। চাঁদ
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মেঘের আঁচলে মুখ ঢাকে তাড়াতাড়ি; বিষণ্ন নারীর শাড়ি
থেকে খসে পড়ে লম্পটের রোমশ হাত। নিঃশব্দতার মাঝখানে নেকড়ের পথ
চলা টহলদার পুলিশের নাকের ডগার নিচে। নিমেষে সে পৌঁছে যায় শহরের
শেষপ্রান্তে। ছিনতাইবাজদের আখড়ায় পুনরায় মাতলামি, ইতরামি, লম্পটের
হাত ক্রিয়াশীল। বিনিদ্র কবি জানলা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মনোযোগী কবিতার
খাতায়, গড়ে উপমা, চিত্রকল্প। নিঃসঙ্গ বেগানা এক নেকড়ে প্রগাঢ় ছায়া রেখে
যায় নিশাকালীন রচনায়।৬
শরীরে ফাল্গুনের উজ্জ্বলতা নিয়ে তুমি ভোরবেলা জানালে, ‘আজ বসন্তের
প্রথম দিন। ইচ্ছে হয়, তোমাকে এক গাদা গাঁদা ফুল উপহার দিই। কেন তুমি
এই বিশেষ ফুলের নাম উচ্চারণ করলে? গাঁদা বললে আমার হরিদ্রাভ
পেলবতার কথা মনে পড়ে না, এমনই স্বভাব আমার, গাধা শব্দটি জিভের
ডগায় নাচতে শুরু করে, হয়ত মিলের প্ররোচনা। এ কথা তোমাকে
জানানোর সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে হাসি ছড়িয়ে দিলে, বসন্ত দিনের রঙের
ফোয়ারা। সেই মুহূর্তে তোমার পরনে কি ছিল গাদা ফুল রঙের শাড়ি? ‘এমন
দিনে তোমাকে অন্য কিছু উপহার দেয়ার সাধ জাগে’; আমার উচ্চারিত
শব্দগুচ্ছের জবাবে তোমার ওষ্ঠ থেকে ঝরে, ‘বুঝেছি, আর কিছু বলার দরকার
নেই। কোনও কিছুই আমাদের দূরত্বের সীমা মুছে ফেলতে পারে না। আমরা
দু’জন দাঁড়িয়ে আছি দুই মেরুতে-তুমি উচ্ছ্বসিত বসন্তের রঙিন প্রান্তরে, আমি
প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহের মাঝখানে, চতুর্দিকে নেকড়ের বরফ ফাটানো চিৎকার।
তোমাদের বাসায় অতিথির ভিড়। টেলিফোনী সংলাপে পড়ে ছেদ। ঘরের
মেঝেতে গাঁদা ফুলের স্তূপ। কোথাকার এক গর্দভ দার্শনিক ভঙ্গিতে এসে
তড়িঘড়ি চুমো খেতে শুরু করে ফুলগুলোকে, অনন্ত তার চিবিয়ে খাবার পালা।
গাধার আচরণ আমাকে বিস্ময়ের ওপারে দাঁড় করিয়ে রাখে, বলা যাবে না।৭
তোমাকেই উত্তমর্ণ বলে জানি। তোমার টুকরো টুকরো কথা আমার
কবিতার খাতাকে মুখর করে তোলে। যখন তুমি সামান্য কোনও কথা বলো
আমাকে-এই ধরো, ‘আজ ভোরবেলার মুহূর্তগুলো চমৎকার’ কিংবা ‘কাল তুমি
কোথায় ছিলে সন্ধ্যাবেলা’, তখন কবিতার পঙ্ক্তি জ্বলে ওঠে অবসাদের
অন্ধকারে। বারান্দায় তোমার দাঁড়িয়ে থাকা সৃজনশীলতার খরায় আনে প্রবল
বর্ষণ। তোমার চকিত স্পর্শ আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় এমন কোনো কবিতা,
যা আমার মৃত্যুর পরেও যুবক-যুবতীরা পড়বে মুগ্ধাবেশে। জানতেও পারো না
আমি কীভাবে ক্রমাগত ঋণী চলেছি তোমার কাছে।৮
যখন গোলাপ মাটিতে শুকনো পাপড়ির জটলা, তখন কি আমার নিজের
মৃত্যুর কথা মনে পড়ে? আমার বয়স দ্রুতগামী খরগোশ, অনিবার্য মৃত্যুর দিকে
এগিয়ে যাওয়া। তবু এখন, এই মুহূর্তে বেঁচে আছি, পড়ছি মনের মতো বই,
ভাবতে পারছি তার কথা, যে আমাকে হাত ধরে নিয়ে যায় স্বর্গপথে; ভাবতে
পারছি ফেরেশতাগণ জ্যোৎস্নাপ্লাবিত কণ্ঠে আবৃত্তি করেন আমার কবিতা,
বেঁচে আছি বলেই কান পেতে শুনি সমাজ বদলের দূরাগত ঘণ্টাধ্বনি; আমার
অপন হৃদয় বারবার দুলে ওঠে প্রিয়তমার চোখের চাওয়ায়, দিনরাত্রি হয়ে যায়
গুণীর তান। আমার সদ্যমৃত অনুজ কোনও কোনও মধ্যরাতে দাঁড়িয়ে জেমস
ডিনের ধরনে দরজায় হাত রেখে, যখন লিখি টেবিলে ঝুঁকে, সে পেছন থেকে
চোখ বুলায় আমার পঙ্ক্তিমালায়। আমি তাকে কিছুতেই বলতে পারি না, ‘বস
এখানে আমার পাশে’, অথবা ‘চলে যা’, এই নিষ্ঠুরতাও উচ্চারিত হয় না
মধ্যরাতে। দৃষ্টিভ্রম আমাকে পীড়িত করে। কে যেন দরজা ঠেলে ঘন ঘন ঘরে
ঢোকার জন্যে। মৃত্যু? হ্যাঁ, মৃত্যু প্রত্যহ তার ঠাণ্ডা, বিশীর্ণ, পাথুরে আঙ্গুল দিয়ে
ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে আমাকে। তার কোনও ভব্যতা, সমাজ সচেতনতা কিংবা
বিবেচনাবোধ নেই। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dhulomakha-jolrong/
|
2209
|
মহাদেব সাহা
|
বদলবাড়ি চেনা যায় না
|
মানবতাবাদী
|
তোমার কালো চোখের মতো
পাল্টে গেছে বসতবাড়ি
উদোম চড়া, গাছগাছালি বট-বিরিক্ষ
ওলটপালট সারা বাড়ি একলা এখন,
বাড়ির মধ্যে কালো গাড়ি, এলোমেলো
ভাঙা চাঁদ ও শূলন্য তাঁবু,
শূনো বাড়ির চিহ্ন, চিহ্ন।
তোমার কালো চোখের মতো পাল্টে গেছে শহরতলী
শহরবাড়ি চেনা যায় না, চেনা যায় না
দেয়ালগুলি বদলে গেছে মাটির নিচে
লাল কবরে
শহরতলীর মধ্যে মিশাল এবড়োখেবড়ো
কালো গাড়ি, লাশভরা ট্রাক,
চেনা যায় না বসতবাড়ি, শহরতলী
চেনা যায় না।
তোমার কালো চোখের মতোই
চেনা যায় না, চেনা যায় না।
সারা বাড়ি, সারা শহর
মধ্যে মিশাল এবড়োখেবড়ো
বসতবাড়ি, সারা শহর
নাকাল বাতাস একা একা কেমন ভারী
চেনা যায় না বদলবাড়ি
ভরদুপুরে কোন উড়ো কাক।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1455
|
4040
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হিমালয়
|
প্রকৃতিমূলক
|
যেখানে জ্বলিছে সূর্য, উঠিছে সহস্র তারা, প্রজ্বলিত ধূমকেতু বেড়াইছে ছুটিয়া।
অসংখ্য জগৎযন্ত্র, ঘুরিছে নিয়মচক্রে
অসংখ্য উজ্জ্বল গ্রহ রহিয়াছে ফুটিয়া।
গম্ভীর অচল তুমি, দাঁড়ায়ে দিগন্ত ব্যাপি,
সেই আকাশের মাঝে শুভ্র শির তুলিয়া।
নির্ঝর ছুটিছে বক্ষে, জলদ ভ্রমিছে শৃঙ্গে,
চরণে লুটিছে নদী শিলারাশি ঠেলিয়া।
তোমার বিশাল ক্রোড়ে লভিতে বিশ্রাম-সুখ
ক্ষুদ্র নর আমি এই আসিয়াছি ছুটিয়া।
পৃথিবীর কোলাহল, পারি না সহিতে আর ,
পৃথিবীর সুখ দুখ গেছে সব মিটিয়া ।
সারাদিন, সারারাত, সমুচ্চ শিখরে বসি,
চন্দ্র-সূর্য-গ্রহময় শূন্যপানে চাহিয়া।
জীবনের সন্ধ্যাকাল কাটাইব ধীরে ধীরে,
নিরালয় মরমের গানগুলি গাহিয়া।
গভীর নীরব গিরি, জোছনা ঢালিবে চন্দ্র,
দূরশৈলমালাগুলি চিত্রসম শোভিবে।
ধীরে ধীরে ঝুরু ঝুরু, কাঁপিবেক গাছপালা
একে একে ছোটো ছোটো তারাগুলি নিভিবে।
তখন বিজনে বসি, নীরবে নয়ন মুদি,
স্মৃতির বিষণ্ণ ছবি আঁকিব এ মানসে।
শুনিব সুদূর শৈলে, একতানে নির্ঝারিণী,
ঝর ঝর ঝর ঝর মৃদুধ্বনি বরষে।
ক্রমে ক্রমে আসিবেক জীবনের শেষ দিন,
তুষার শয্যার ' পরে রহিব গো শুইয়া।
মর মর মর মর দুলিবে গাছের পাতা
মাথার উপরে হুহু -- বায়ু যাবে বহিয়া।চোখের সামনে ক্রমে , নিভিবে রবির আলো
বনগিরি নির্ঝরিণী অন্ধকারে মিশিবে।
তটিনীর মৃদুধ্বনি, নিঝরের ঝর ঝর
ক্রমে মৃদুতর হয়ে কানে গিয়া পশিবে।
এতকাল যার বুকে, কাটিয়া গিয়াছে দিন,
দেখিতে সে ধরাতল শেষ বার চাহিব।
সারাদিন কেঁদে কেঁদে -- ক্লান্ত শিশুটির মতো
অনন্তের কোলে গিয়া ঘুমাইয়া পড়িব।
সে ঘুম ভাঙিবে যবে, নূতন জীবন ল'য়ে,
নূতন প্রেমের রাজ্যে পুন আঁখি মেলিব।
যত কিছু পৃথিবীর দুখ,জ্বালা, কোলাহল,
ডুবায়ে বিস্মৃতি-জলে মুছে সব ফেলিব।
ওই যে অসংখ্য তারা, ব্যাপিয়া অনন্ত শূন্য
নীরবে পৃথিবী-পানে রহিয়াছে চাহিয়া।
ওই জগতের মাঝে, দাঁড়াইব এক দিন,
হৃদয় বিস্ময়-গান উঠিবেক গাহিয়া।
রবি শশি গ্রহ তারা, ধূমকেতু শত শত
আঁধার আকাশ ঘেরি নিঃশবদে ছুটিছে।
বিস্ময়ে শুনিব ধীরে, মহাস্তব্ধ প্রকৃতির
অভ্যন্তর হতে এক গীতধ্বনি উঠিছে।
গভীর আনন্দ-ভরে, বিস্ফারিত হবে মন
হৃদয়ের ক্ষুদ্র ভাব যাবে সব ছিঁড়িয়া।
তখন অনন্ত কাল, অনন্ত জগত-মাঝে
ভুঞ্জিব অনন্ত প্রেম মনঃপ্রাণ ভরিয়া।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/himalay/
|
2493
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
নগ্নপদ্য - ১২
|
চিন্তামূলক
|
উল্টো হয়ে ঝুলে আছি অন্ধকারের ডালে
অন্ধকারের লতা-পাতা
খাচ্ছে ছিড়ে গানের খাতা
যাচ্ছে ঢুকে মাংস ফুড়ে ক্ষয়িষ্ণু কঙ্কালে ।।
চোখের থেকে দৃষ্টি ঝুলে অন্ধ
ভাগ্য ভালো বন্ধ-নাকে ঢোকে না দুর্গন্ধ
বোধ ঢেকেছে মগজ-গলা অজস্র জঞ্জালে ।।
রক্ত বড় হীম
সাপের না-কি অভিশাপের
জিহ্বা-চেরা পরিমাপের
লোভ ধরেছে ঝিম ।
দিনের মুখে মুষ্টি হেনে রাত্রি
বলছে ডেকে, দ্যাখ না চেয়ে কে নরকের যাত্রী
বুঝবি আরো সাপ-অভিশাপ একত্রে দংশালে ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/nognopodyo-12/
|
5759
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ক্লান্তির পর
|
প্রেমমূলক
|
আমি তোমার অধর থেকে ওষ্ঠ তুলে তাকিয়ে দেখি মুখের দিকে
তুমি তোমার কোনো কথাই রাখেনি
কথা ছিল কি এমন করে কান্না, এমন
চোখের দুই পাশ মুচড়ে তাকানোর?
কথা ছিল কি বিকেলবেলা ঘড়ির নিচে মায়ার খেলা
আদর পেয়ে মার্জারীর মতো শরীর বাঁকানো?
হাওয়ায় এখন নদীর মতো শব্দ ওঠে
তিনটি কথা বলতে এসে তোমার ঠোঁটে
চোখের মধ্যে দেখতে পেলাম মনোহরণ;
এখন আমার দুঃখ হয় না, রাগ হয় না, ঈর্ষা হয় না
এখন তোমার শরীর থেকে ফুলের গয়না
হাওয়ায় দাও ছড়িয়ে, কেউ এসে তোমায় রক্ষা করুক-
তুমি ভেঙেছো দুঃখ দিনে কঠিন পণ
নদীর শব্দ ছাড়িয়ে এখন বেজে উঠলো মেঘের মতো দুই ডমরু।
সখী, এবার স্পষ্ঠ কথা বলার দিন এসেছে
দু’পাঁচ বছর বাঁচাবো কিনা কেউ জানি না-
আমার কথা শীতের দেশের পাখির মতো ঝরে পড়ে
চিঠি পেয়িছি হিয়েরোগ্লিফিক্স্ অক্ষরের স্বরান্তরে
বরফ ফেটে অকস্মাৎ বেরিয়ে আসে জলস্তম্ভ
আমি যখন তোমার বুকে মুখ ডুবিয়ে গন্ধ শুঁকি
বৃক্ষ তখন আত্মা পায়, বায়ুুতে এসে নিরালম্ব………
ফূলের মধ্যে সূর্যমুখী
ফুটবে আজ দেরিতে খুব, সবুজ ঘরে জ্বলে এখন কমলা আলো
রক্ত আমার অবিশ্বাসী, সন্ধেবেলা দুটো নেশাই লাগলো ভালো
ক্লান্ত মাথা সরিয়ে এনে চোখ রেখিছি তোমার গালে
শরীর খুলে অন্য শরীর, কেন এমন লোভ দেখাল?
কিছুই বলা হলো না, তুমি কথা রাখোনি, দুঃখে অভিমানে
শ্বাসকষ্ট হলো আমার, চোখেও জল এসেছিল।
চোখে সে কথা জানে
আমি
দ্বিধার মধ্যে ডুবে গেলাম!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1886
|
384
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পিলে-পটকা
|
ছড়া
|
উটমুখো সে সুঁটকো হাশিম,
পেট যেন ঠিক ভুঁটকো কাছিম!
চুলগুলো সব বাবুই দড়ি –
ঘুসকো জ্বরের কাবুয় পড়ি!
তিন-কোনা ইয়া মস্ত মাথা,
ফ্যাচকা-চোখো; হস্ত? হাঁ তা
ঠিক গরিলা, লোবনে ঢ্যাঙা!
নিটপিটে ঠ্যাং সজনে ঠ্যাঙা!
গাইতি-দেঁতো, উঁচকে কপাল
আঁতকে ওঠেন পুঁচকে গোপাল!
নাক খাঁদা ঠিক চামচিকেটি!
আর হাসি? দাঁত খামচি সেটি!
পাঁচের মতন থুতনো ব্যাঁকা!
রগঢিলে, হুঁ ভূতনো ন্যাকা!
কান দুটো টান – ঠিক সে কুলো!
তোবড়ানো গাল, টিকটা ছুলো!
বগলা প্রমাণ ঘাড়টি সরু,
চেঁচান যেন ষাঁড় কী গোরু!
চলেন গিজাং উরর কোলা ব্যাং,
তালপাতা তাঁর ক্ষুর-ওলা ঠ্যাং!
বদরাগি তায় এক-খেয়ালি
বাস রে! খেঁকি খ্যাঁক-শেয়ালি!
ফ্যাঁচকা-মাতু, ছিঁচকাঁদুনে,
কয় লোকে তাই মিচকা টুনে!
জগন্নাথী ঠুঁটো নুলো,
লোম গায়ে ঠিক খুঁটোগুলো!
ল্যাবেন্ডিসি নড়বড়ে চাল,
তুবড়ি মুখে চড়বড়ে গাল!
গুজুর-ঘুণে, দেড়-পাঁজুরে,
ল্যাডাগ্যাপচার, ন্যাড়-নেজুড়ে!
বসেন সে হাড়-ভাঙা ‘দ’,
চেহারা দেখেই সব মামা ‘থ’!
গিরগিটে তার ক্যাঁকলেসে ঢং
দেখলে কবে, ‘ধেত, এ যে সং!’
খ্যাঙরা-কাটি আঙলাগুলো,
কুঁদিলে শ্রীমুখ বাংলা চুলো!
পেটফুলো ইয়া মস্ত পিলে,
দৈবাতে তায় হস্ত দিলে
জোর চটিতং, বিটকেলে চাঁই!
ইঁট খাবে নাকো সিঁটকেলে ভাই!
নাক বেয়ে তার ঝরচে সিয়ান,
ময়রা যেমন করছে ভিয়ান!
স্বপন দেখেন হালকা নিঁদে –
কুইনাইন আর কালকাসিঁদে!
বদন সদাই তোলো হাঁড়ি,
গুড়ামুড়ি খান ষোলো আড়ি!
ঠোকরে সবাই ন্যাড়া মাথায় –
শিলাবিষ্টি ছেঁড়া ছাতায়!
রাক্ষুসে ভাত গিলতে পারে
বাপ রে, বিড়াল ডিঙতে নারে!
হন না ভুলেও ঘরের বাহির,
কাঁথার ভিতর জ্বরের জাহির!
পড়বে কি আর, দূর ভূত ছাই,
ওষুধ খেতেই ফুরসত নাই!
বুঝলে? যত মোটকা মিলে
বাগাও দেখি পটকা পিলে!
বাজবে পেটে তাল ভটাভট
নাক ধিনাধিন গাল ফটাফট!
ঢাকডুবাডুব ইড়িং-বিড়িং
নাচবে ফড়িং তিড়িং তিড়িং!
চুপসো গালে গাব গুবাগুব
গুপি-যন্তর বাজবে বাঃ খুব!
দিব্যি বসে মারবে মাছি,
কাশবে এবং হাঁচবে হাঁচি!
কিলবিলিয়ে দুটো ঠ্যাং
নড়বে যেমন ঠুঁটো ব্যাং!! (ঝিঙেফুল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/pile-potka/
|
853
|
জসীম উদ্দীন
|
পালের নাও
|
স্বদেশমূলক
|
পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও-
ঘরে আছে ছোট বোনটি তারে নিয়ে যাও !
কপিল-সারি গাইয়ের দুধ যেয়ো পান করে,
কৌটা ভরি সিঁদুর দেব কপালটি ভরে।
গুরার গায়ে ফুল চন্দন দেব ঘষে ঘষে,
মামা-বাড়ির বলব কথা-শুনো বসে বসে।
কে যাওরে পাল-ভরে কোন দেশে ঘর,
পাছা নায়ে বসে আছে কোন সওদাগর ?
কোন দেশে কোন গাঁয়ে হিরে ফুল ঝরে,
কোন দেশে হিরামন পাখি বাস করে।
কোন দেশে রাজ-কনে, খালি ঘুম যায়,
ঘুম যায় আর হাসে হিম-সিম বায়!
সেই দেশে যাব আমি কিছু নাহি চাই,
ছোট মোর বোনটিরে সাথে যাদি পাই।
পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও-
তোমার যে পালে নাচে ফুলঝুরি বাও-
তোমার যে নার ছই আবের ঢাকনি,
ঝলমল জ্বলিতেছে সোনার বাঁধুনি।
সোনার না’বাঁধনরে তার গোড়ে গোড়ে,
হিরামন পঙ্খির লাল পাখা ওড়ে।
তার পর ওড়েরে ঝালরের হাসি,
ঝলমল জলে জ্বলে রতনের রাশে।
এই নাও বেয়ে যায় কোন সওদাগর,
কয়ে যাও-কয়ে যাও, কোন দেশে ঘর ?
পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও-
ঘরে আছে ছোট বোন তারে নিয়ে যাও।
যে না গাঙে সাতধার করে গলাগলি,
সেথা বাস কুহেলির-লোকে গেছে বলি।
পারাপার দুই নদী-মাঝে বালচুর,
সেইখানে বাস করে চাঁদ-সওদাগর।
এপারে ভুতুমের বাসা ও-পারেতে টিয়া-
সে খানেতে যেয়োনারে নাওখানি নিয়া।
ভাইটাল গাঙ দোলে ভাটী গেঁয়ো সোঁতে,
হবে নারে নাও বাওয়া সেথা কোনমতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/204
|
1881
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
মানুষগুলো এবং
|
চিন্তামূলক
|
মানুষগুলো ফাঁকা টেবিল পেয়ে গিয়ে
ভর্তি চৌবাচ্চার মতো টলমল।
গেলাসগুলো মানুষগুলো পেয়ে গিয়ে
সাবানের ফেনায় টইটম্বুর।
আসে- আসে- মানুষগুলো হয়ে যায় ফিনফিনে গেলাস
গেলাসগুরো শ্যাগালের ছবির উড়ন্ত ছাগল।
আর টেবিলগুলো মেঘপুঞ্জময় অরন্যের গাছ।
ওয়েটারগুলো ছুটে আসে।
উড়ন্ত গেলাসগুলোকে তারা পেড়ে আনে
চাঁদনীরাতের মগডাল থেকে।
জঙ্গলের গাছ কড়া ধমকানি খেয়ে
আবার হয়ে যায় করাত-কাটা কাঠের টেবিল।
আর মানুষগুলো, যারা এতক্ষণ ছিল গেলাসের,
সোনালী মাছের মতো সাঁতার কাটে
পৃথিবীর হাড়হাভাতে হাওয়ায়।
আগুন নেভানো দমকলের ঘন্টাগুলো চেঁচিয়ে ওঠে
-কে যায়?
-আজ্ঞে আমরা,
জলজ্যান্ত দিনের বেলাটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল
খুঁজতে বেরিয়েছি গোটাকতক রাতপেঁচা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1286
|
371
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পথহারা
|
চিন্তামূলক
|
বেলা শেষে উদাস পথিক ভাবে,
সে যেন কোন অনেক দূরে যাবে -
উদাস পথিক ভাবে।
‘ঘরে এস’ সন্ধ্যা সবায় ডাকে,
‘নয় তোরে নয়’ বলে একা তাকে;
পথের পথিক পথেই বসে থাকে,
জানে না সে কে তাহারে চাবে।
উদাস পথিক ভাবে।
বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে
আঁধার মাথায় দিগবধূদের কেশে,
ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে
শৈলমূলে শৈলবালা নাবে -
উদাস পথিক ভাবে।
বাতি আনি রাতি আনার প্রীতি,
বধূর বুকে গোপন সুখের ভীতি,
বিজন ঘরে এখন সে গায় গীতি,
একলা থাকার গানখানি সে গাবে -
উদাস পথিক ভাবে।
হঠাত্ তাহার পথের রেখা হারায়
গহন বাঁধায় আঁধার-বাঁধা কারায়,
পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায়
আর কি পূবের পথের দেখা পাবে
উদাস পথিক ভাবে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/171
|
3529
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বসন্ত-অবসান
|
প্রকৃতিমূলক
|
কখন বসন্ত গেল , এবার হল না গান!
কখন বকুল-মূল ছেয়েছিল ঝরা ফুল ,
কখন যে ফুল-ফোটা হয়ে গেল অবসান !
কখন বসন্ত গেল , এবার হল না গান !
এবার বসন্তে কি রে যুথীগুলি জাগে নি রে !
অলিকুল গুঞ্জরিয়া করে নি কি মধুপান !
এবার কি সমীরণ জাগয় নি ফুলবন ,
সাড়া দিয়ে গেল না তো , চলে গেল ম্রিয়মাণ !
কখন বসন্ত গেল , এবার হল না গান!
যতগুলি পাখি ছিল গেয়ে বুঝি চলে গেল ,
সমীরণে মিলে গেল বনের বিলাপতান ।
ভেঙেছে ফুলের মেলা , চলে গেছে হাসি - খেলা ,
এতক্ষণে সন্ধ্যাবেলা জাগিয়া চাহিল প্রাণ ।
কখন বসন্ত গেল , এবার হল না গান !
বসন্তের শেষ রাতে এসেছি রে শূন্য হাতে ,
এবার গাঁথি নি মালা , কী তোমারে করি দান !
কাঁদিছে নীরব বাঁশি , অধরে মিলায় হাসি ,
তোমার নয়নে ভাসে ছলছল অভিমান ।
এবার বসন্ত গেল , হল না , হল না গান ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bosonto-obosan/
|
4276
|
শঙ্খ ঘোষ
|
সবিনয় নিবেদন
|
মানবতাবাদী
|
আমি তো আমার শপথ রেখেছি
অক্ষরে অক্ষরে
যারা প্রতিবাদী তাদের জীবন
দিয়েছি নরক করে |
দাপিয়ে বেড়াবে আমাদের দল
অন্যে কবে না কথা
বজ্র কঠিন রাজ্যশাসনে
সেটাই স্বাভাবিকতা |
গুলির জন্য সমস্ত রাত
সমস্ত দিন খোলা
বজ্র কঠিন রাজ্যে এটাই
শান্তি শৃঙ্খলা |
যে মরে মরুক, অথবা জীবন
কেটে যাক শোক করে—
আমি আজ জয়ী, সবার জীবন
দিয়েছি নরক করে |
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1133
|
5261
|
শামসুর রাহমান
|
সফেদ পাঞ্জাবি
|
মানবতাবাদী
|
শিল্পী, কবি, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,
খদ্দের, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা,
নিপুণ ক্যামেরাম্যান, অধ্যাপক, গোয়েন্দা, কেরানি,
সবাই এলেন ছুটে পল্টনের মাঠে, শুনবেন
দুর্গত এলাকা প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী
কী বলেন। রৌদ্রালোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু,
যেন মহাপ্লাবনের পর নুহের গভীর মুখ
সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাড়ি
উত্তুরে হাওয়ায় ওড়ে। বুক তাঁর দক্ষিণ বাংলার
শবাকীর্ণ হু-হু উপকূল, চক্ষুদ্বয় সংহারের
দৃশ্যাবলিময়; শোনালেন কিছু কথা, যেন নেতা
নন, অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার। জনসমাবেশে
সখেদে দিলেন ছুঁড়ে সারা খাঁ-খাঁ দক্ষিণ বাংলাকে।
সবাই দেখল চেনা পল্টন নিমেষে অতিশয়
কর্দমাক্ত হয়ে যায়, ঝলছে সবার কাঁধে লাশ
আমরা সবাই লাশ, বুঝিবা অত্যন্ত রাগী কোনো
ভৌতিক কৃষক নিজে সাধের আপনকার ক্ষেত
চকিতে করেছে ধ্বংস, পড়ে আছে নষ্ট শস্যকণা।ঝাঁকা-মুটে, ভিখিরি, শ্রমিক, ছাত্র, সমাজসেবিকা,
শিল্পী, কবি, বুদ্ধিজীবী, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,
নিপুণ ক্যামেরাম্যান, ফিরিঅলা, গোয়েন্দা, কেরানি;
সমস্ত দোকান-পাট, প্রেক্ষাগৃহ, ট্রাফিক পুলিশ,
ধাবমান রিকশা ট্যাক্সি, অতিকায় ডবল ডেকার,
কোমল ভ্যানিটি ব্যাগ আর ঐতিহাসিক কামান,
প্যান্ডেল টেলিভিশন, ল্যাম্পপোস্ট, রেস্তোরাঁ, ফুটপাত
যাচ্ছে ভেসে, যাচ্ছে ভেসে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বঙ্গোপসাগরে।
হায়, আজ একী মন্ত্র জপলেন মৌলানা ভাসানী!বল্লমের মতো ঝল্সে ওঠে তাঁর হাত বারবার
অতি দ্রুত স্ফীত হয়, স্ফীত হয়, মৌলানার সফেদ পাঞ্জাবি,
যেন তিনি ধবধবে একটি পাঞ্জাবি দিয়ে সব
বিক্ষিপ্ত বেআব্রু লাশ কী ব্যাকুল ঢেকে দিতে চান।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sofed-panjabi/
|
5637
|
সুকুমার রায়
|
নেড়া বেলতলায় যায় কবার_
|
হাস্যরসাত্মক
|
রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা তার উপরে বসল রাজা—
ঠোঙাভরা বাদামভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না৷
গায়ে আঁটা গরম জামা পুড়ে পিঠ হচ্ছে ঝামা;
রাজা বলে, 'বৃষ্টি নামা— নইলে কিচ্ছু মিলছে না৷'
থাকে সারা দুপুর ধ'রে ব'সে ব'সে চুপটি ক'রে,
হাঁড়িপানা মুখটি ক'রে আঁকড়ে ধ'রে শ্লেটটুকু;
ঘেমে ঘেমে উঠছে ভিজে ভ্যাবাচ্যাকা একলা নিজে,
হিজিবিজি লিখছে কি যে বুঝছে না কেউ একটুকু৷
ঝাঁ ঝাঁ রোদ আকাশ জুড়ে, মাথাটার ঝাঁঝ্রা ফুঁড়ে,
মগজেতে নাচছে ঘুরে রক্তগুলো ঝনর্ ঝন্;
ঠাঠা–পড়া দুপুর দিনে, রাজা বলে, 'আর বাঁচিনে,
ছুটে আন্ বরফ কিনে ক'চ্ছে কেমন গা ছন্ছন্৷'
সবে বলে, 'হায় কি হল! রাজা বুঝি ভেবেই মোলো!
ওগো রাজা মুখটি খোল–কওনা ইহার কারণ কি?
রাঙামুখ পান্সে যেন তেলে ভাজা আম্সি হেন,
রাজা এত ঘামছে কেন–শুনতে মোদের বারণ কি?'রাজা বলে, 'কেইবা শোনে যে কথাটা ঘুরছে মনে,
মগজের নানান্ কোণে– আনছি টেনে বাইরে তায়,
সে কথাটা বলছি শোন, যতই ভাব যতই গোণ,
নাহি তার জবাব কোনো কূলকিনারা নাইরে হায়!
লেখা আছে পুঁথির পাতে, 'নেড়া যায় বেলতলাতে,'
নাহি কোনো সন্দ তাতে–কিন্তু প্রশ্ন 'কবার যায়?'
এ কথাটা এদ্দিনেও পারোনিকো বুঝতে কেও,
লেখেনিকো পুস্তকেও, দিচ্ছে না কেউ জবাব তায়৷
লাখোবার যায় যদি সে যাওয়া তার ঠেকায় কিসে?
ভেবে তাই না পাই দিশে নাই কি কিচ্ছু উপায় তার?'
এ কথাটা যেমনি বলা রোগা এক ভিস্তিওলা
ঢিপ্ ক'রে বাড়িয়ে গলা প্রণাম করল দুপায় তার৷
হেসে বলে, 'আজ্ঞে সে কি? এতে আর গোল হবে কি?
নেড়াকে তো নিত্যি দেখি আপন চোখে পরিষ্কার—
আমাদেরি বেলতলা সে নেড়া সেথা খেলতে আসে
হরে দরে হয়তো মাসে নিদেন পক্ষে পঁচিশ বার৷'
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/nera-beltolay-jay-kobar/
|
6028
|
হেলাল হাফিজ
|
কে
|
চিন্তামূলক
|
বেরিয়ে যে আসে সে তো এভাবেই আসে,
দুর্বিনীত ধ্রুপদী টংকার তুলে
লন্ডভন্ড করে চলে আসে মৌলিক ভ্রমণে, পথে
প্রচলিত রীতি-নীতি কিচ্ছু মানে না।
আমি এক সেরকম উত্থানের অনুপম কাহিনী শুনেছি।
এমন অনমনীয় পৃথক ভ্রমণে সেই পরিব্রাজকের
অনেক অবর্ণনীয় অভিমান থাকে,
টসটসে রসাল ফলের মতো ক্ষত আর
ব্যক্তিগত ক্ষয়-ক্ষতি থাকে। তাকে তুমুল শাসায়
মূলচ্যুত মানুষের ভুল ভালোবাসা, রাজনীতি,
পক্ষপাতদুষ্ট এক স্টাফ রিপোর্টার। আর তার সহগামী
সব পাখিদের ঈর্ষার আকাশে ভাসে ব্যর্থতার কিচির-মিচির।
এতো প্রতিকূলতায় গতি পায় নিষ্ঠাবান প্রেমিক শ্রমিক,
আমি এক সে রকম পথিকের প্রতিকৃতি নির্ভূল দেখেছি।
ইদানিং চারদিকে সমস্বরে এক প্রশ্ন,–কে? কে? কে?
বেরিয়ে যে আসে সে তো এই পথে এইভাবে আসে, নিপুণ ভঙ্গিতে।
১৫.২.৮২
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/101
|
1106
|
জীবনানন্দ দাশ
|
পেঁচা
|
প্রকৃতিমূলক
|
প্রথম ফসল গেছে ঘরে,
হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে
শুধু শিশিরের জল;
অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে
হিম হয়ে আসে
বাঁশাপাতা– মরা ঘাস — আকাশের তারা!
বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা!
ধানক্ষেতে– মাঠে
জমিছে ধোঁয়াটে
ধারালো কুয়াশা!
ঘরে গেছে চাষা;
ঝিমায়েছে এ পৃথিবী –
তবু টের পাই
কার যেন দুটো চোখে নাই এ ঘুমের
কোনো সাধ!
হলুদ পাতার ভীড়ে ব’সে,
শিশিরের পালক ঘ’ষে ঘ’ষে,
পাখার ছায়ায় শাখা ঢেকে,
ঘুম আর ঘুমন্তের ছবি দেখে দেখে
মেঠো চাঁদ আর মেঠো তারাদের সাথে
জাগে একা অঘ্রানের রাতে
সেই পাখি–
আজ মনে পড়ে
সেদিনও এমনি গেছে ঘরে
প্রথম ফসল;
মাঠে মাঠে ঝরে এই শিশিরের সুর–
কার্তিক কি অঘ্রানের রাত্রির দুপুর!–
হলুদ পাতার ভীড়ে ব’সে,
শিশিরের পালক ঘ’ষে ঘ’ষে,
পাখার ছায়ায় শাখা ঢেকে,
ঘুম আর ঘুমন্তের ছবি দেখে দেখে
মেঠো চাঁদ আর মেঠো তারাদের সাথে
জাগে একা অঘ্রানের রাতে
এই পাখি!
নদীটির শ্বাসে
সে রাতেও হিম হয়ে আসে
বাঁশাপাতা– মরা ঘাস — আকাশের তারা!
বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা!
ধানক্ষেতে– মাঠে
জমিছে ধোঁয়াটে
ধারালো কুয়াশা!
ঘরে গেছে চাষা;
ঝিমায়েছে এ পৃথিবী –
তবু আমি পেয়েছি যে টের
কার যেন দুটো চোখে নাই এ ঘুমের
কোনো সাধ!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/pencha/
|
3723
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মিছে ডাক_–মন বলে, আজ না
|
চিন্তামূলক
|
মিছে ডাক'–মন বলে, আজ না—
গেল উৎসবরাতি,
ম্লান হয়ে এল বাতি,
বাজিল বিসর্জন-বাজনা।
সংসারে যা দেবার
মিটিয়ে দিমু এবার,
চুকিয়ে দিয়েছি তার খাজনা।
শেষ আলো, শেষ গান,
জগতের শেষ দান
নিয়ে যাব—আজ কোনো কাজ না।
বাজিল বিসর্জন-বাজনা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mose-dak-mon-bole-aj-na/
|
2362
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভূত কাল
|
সনেট
|
কোন্ মূল্য দিয়া পুনঃ কিনি ভূত কালে,
----কোন্ মূল্য ----এ মন্ত্রণা কারে লয়ে করি?
কোন্ ধন, কোন্ মুদ্রা, কোন্ মণি-জালে
এ দুর্ল্লভ দ্রব্য-লাভ ? কোন্ দেবে স্মরি,
কোন্ যোগে,কোন্ তপে,কোন্ ধর্ম্ম করি?
আছে কি এমন জন ব্রাহ্মণে,চণ্ডালে,
এ দীক্ষা-শিক্ষার্থে যারে গুরু-পদে বরি,
এ তত্ত্ব-স্বরূপ পদ্ম পাই যে মৃণালে?---
পশে যে প্রবাহ বহি অকূল সাগরে,
ফিরি কি সে আসে পুনঃ পর্ব্বত-সদনে?
যে বারির ধারা ধরা সতৃষ্ণায় ধরে,
উঠে কি সে পুনঃ কভু বারিদাতা ঘনে?---
বর্ত্তমানে তোরে,কাল,যে জন আদরে
তার তুই!গেলে তোরে পায় কোন্ জনে?
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/bhut-kal/
|
4898
|
শামসুর রাহমান
|
নিরুপমার কাছে প্রস্তাব
|
মানবতাবাদী
|
বকুলতলায় যাবে? তুমি বড়ো সন্দেহপ্রবণ,
সেখানে, বিশ্বাস করো, সাপখোপ নেই, মাস্তানের
আড্ডা নেই। বিপদের আবর্তে তোমাকে কোনোদিন
ডোবাতে পারি না। পাখি আসে সেখানে এবং
কয়েকটি প্রজাপতি হয়তো-বা। কবিতার বই
ইচ্ছে করলে আনতে পারো, পাশাপাশি পড়বো দু’জন।সেকেলে টেকেলে যা-ই ভাবো, প্রাণ খুলে যত দুয়ো
দাও আধুনিকা, তবু তোমাকেই বকুলতলায়
নিয়ে যাবো; করো না বারণ। যদি পাখি না-ও ডাকে,
না-ও থাকে এক শিখা ঘাস সেই বকুলতলায়,
তবু নিয়ে যাবো। না, ওভাবে ফিরিয়ে নিও না মুখ,
ভেবো না আমার নেই কালজ্ঞান। বস্তুত আমিওঅনেক উত্তাল দীপ্র মিছিলে শামিল হ’য়ে যাই,
যখন ভিয়েতনামে পড়ে বোমা, আমায় হৃদয়
হয় দগ্ধ গ্রাম মেঘে মেঘে খুনখারাবির চিহ্ন
খুঁজে পাই; উপরন্তু বসন্তের পিঠে ছুরি মেরে
হত্যাকারী সেজে বসে আছি। কেন এ প্রহরে
তোমাকে হঠাৎ দূরে বকুলতলায় যেতে বলি?বহুকাল হলো আমি অতিশয় নষ্ট হয়ে গেছি।
আমার ভেতর এক দুঃস্বপ্ন-দুনিয়া পরিব্যাপ্ত,
ভয়াল নখরময় প্রাণীকুল অন্তর্গত তন্তু
ছিঁড়ে খুঁড়ে খায় সর্বক্ষণ এবং জীবাশ্মগুলো
জ্যান্ত হয়ে ওঠে ভয়াবহভাবে হঠাৎ কখনো।
বহুকাল হলো আমি অতিশয় নষ্ট হয়ে গেছি।
বকুলতলায় ব্যাপ্ত আমার উধাও শৈশবের
উন্মুখর দিনগুলি, সেই রাঙা পবিত্রতা তোমার সত্তায়
মেখে দিতে চাই। তবু, হে মহিলা, তুমি কি যাবে না? (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nirupomar-kache-prostab/
|
1337
|
তসলিমা নাসরিন
|
দুঃখপোষা
|
মানবতাবাদী
|
কান্না রেখে একটুখানি বস
দুঃখ-ঝোলা একেক করে খোল…
দেখাও তোমার গোপন ক্ষতগুলো
এ ক’দিনে গভীর কতো হল।
ও মেয়ে, শুনছ !
বাইরে খানিক মেলে দাও তো এসব
দুঃখ তোমার একদম গেছে ভিজে…
হাওয়ার একটি গুণ চমৎকার
কিছু দুঃখ উড়িয়ে নেয় নিজে।
ও কী গুণছ !
দিন!
দিন তো যাবেই ! দুঃখপোষা মেয়ে !
শুকোতে দাও স্যাঁতস্যাঁতে এ জীবন
রোদের পিঠে, আলোর বিষম বন্যা
হচ্ছে দেখ, নাচছে ঘন বন…
সঙ্গে সুখী হরিণ।
ও মেয়ে হাসো,
নিজের দিকে দু’চোখ দাও, নিজেকে ভালোবাসো।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%83%e0%a6%96%e0%a6%aa%e0%a7%8b%e0%a6%b7%e0%a6%be-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%a4%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b8/
|
2190
|
মহাদেব সাহা
|
দেশপ্রেম
|
চিন্তামূলক
|
তাহলে কি গোলাপেরও দেশপ্রেম নেই
যদি সে সবারে দেয় ঘ্রাণ,
কারো কথামতো যদি সে কেবল আর নাই ফোটে রাজকীয় ভাসে
বরং মাটির কাছে ফোটে এই অভিমানী ফুল
তাহলে কি তারও দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ উঠবে
চারদিকে!
গাছগুলি আদেশ অমান্য করে মাঝে মাঝে
যদি তোলে ঝড়
অতঃপর তাকেও কি দেশদ্রোহী আখ্যায়িত
করে ফেলা হবে!
যদি তারা বাধ্যানুগতের মতো ক্ষমতাকে
না করে কুর্নিশ
তাদের সবুজ শোভা বরঞ্চ বিস্তৃত থাকে
নিষেধের বেড়া ভেদ করে
তাহলে কি গাছগুলি দেশপ্রেম বর্জিত বড়োই!
পাখিরা কি পুনরায় দেশপ্রেম শিখবে সবাই
আর তাই তাদের নিজস্ব গান ছেড়ে তাদেরও শিখতে হবে
দেশাত্মবোধক গানগুলি
যদি তারা অসীম আকাশে উড়ে মাঝে মাঝে ভুলে যায়
আকাশের ভৌগলিক সীমা
তবে কি নীলিমা তারও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন
তুলবে এমন?
কিংবা এ-আবহমান নদী কতোটা দেশকে ভালোবাসে
কোনো ভাবোচ্ছ্বাসে তাও কি জানাতে হবে তাকে?
যদিও সে কখনো কখনো ভাঙে কুল, ভাসায় বসতি
তা বলে কি এই নদী দেশপ্রেমহীন একেবারে?
কোকিলও কি দেশদ্রোহী যদি সে আপন মনে কারো
নাম ধরে ডাকে
কুলও দন্ডিত হবে যদি কিনা সেও কোনো নিষিদ্ধ কবরে
একা নিরিবিলি ঝরে
আর এই আকাশও যদি বা তাকে অকাতরে দেয় স্নিগ্ধ ছায়া,
তাহলে কি আকাশেরও দেশপ্রেম নিয়ে কেউ
কটাক্ষ করবে অবশেষে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1487
|
5565
|
সুকুমার রায়
|
আকাশের গায়ে
|
ছড়া
|
আকাশের গায়ে কিবা রামধনু খেলে,
দেখে চেয়ে কত লোক সব কাজ ফেলে;
তাই দেখে খুঁৎ-ধরা বুড়ো কয় চটে,
দেখছ কি, এই রং পাকা নয় মোটে।। (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/akasher-gaye/
|
5971
|
হুমায়ুন আজাদ
|
আমাকে ছেড়ে যাবার পর
|
প্রেমমূলক
|
আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার,
যেমন হিরোশিমার পর আর কিছুই আগের মতো নেই
উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত।যে কলিংবেল বাজে নি তাকেই মুর্হুমুহু শুনবে বজ্রের মত বেজে উঠতে
এবং থরথর ক’রে উঠবে দরোজাজানালা আর তোমার হৃৎপিন্ড।
পরমুহূর্তেই তোমার ঝনঝন-ক’রে ওঠা এলোমেলো রক্ত
ঠান্ডা হ’য়ে যাবে যেমন একাত্তরে দরোজায় বুটের অদ্ভুদ শব্দে
নিথর স্তব্ধ হ’য়ে যেত ঢাকা শহরের জনগণ।আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।
রাস্তায় নেমেই দেখবে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রতিটি রিকশায়
ছুটে আসছি আমি আর তোমাকে পেরিয়ে চ’লে যাচ্ছি
এদিকে-সেদিকে। তখন তোমার রক্ত আর কালো চশমায় এত অন্ধকার
যেনো তুমি ওই চোখে কোন কিছুই দ্যাখো নি।আমাকে ভালবাসার পর তুমি ভুলে যাবে বাস্তব আর অবাস্তব,
বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য। সিঁড়ি ভেবে পা রাখবে স্বপ্নের চূড়োতে,
ঘাস ভেবে দু-পা ছড়িয়ে বসবে অবাস্তবে,
লাল টুকটুকে ফুল ভেবে খোঁপায় গুঁজবে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন।না-খোলা শাওয়ারের নিচে বারোই ডিসেম্বর থেকে তুমি অনন্তকাল দাঁড়িয়ে
থাকবে এই ভেবে যে তোমার চুলে ত্বকে ওষ্ঠে গ্রীবায় অজস্র ধারায়
ঝরছে বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল।তোমার যে ঠোঁটে চুমো খেয়েছিলো উদ্যমপরায়ণ এক প্রাক্তন প্রেমিক,
আমাকে ভালবাসার পর সেই নষ্ট ঠোঁট খঁসে প’ড়ে
সেখানে ফুটবে এক অনিন্দ্য গোলাপ।আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।
নিজেকে দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত মনে হবে যেনো তুমি শতাব্দীর পর শতাব্দী
শুয়ে আছো হাসপাতালে। পরমুহূর্তেই মনে হবে
মানুষের ইতিহাসে একমাত্র তুমিই সুস্থ, অন্যরা ভীষণ অসুস্থ।শহর আর সভ্যতার ময়লা স্রোত ভেঙে তুমি যখন চৌরাস্তায় এসে
ধরবে আমার হাত, তখন তোমার মনে হবে এ-শহর আর বিংশ শতাব্দীর
জীবন ও সভ্যতার নোংরা পানিতে একটি নীলিমা-ছোঁয়া মৃণালের শীর্ষে
তুমি ফুটে আছো এক নিষ্পাপ বিশুদ্ধ পদ্ম-
পবিত্র অজর।আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো।
তোমার খবরের জন্য যে আমি খুব ব্যাকুল, তা নয়।
তবে ঢাকা খুবই ছোট্ট শহর।
কারো কষ্টের কথা এখানে চাপা থাকে না।শুনেছি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর তুমি খুবই কষ্টে আছো।
প্রত্যেক রাতে সেই ঘটনার পর নাকি আমাকে মনে পড়ে তোমার।
পড়বেই তো, পৃথিবীতে সেই ঘটনা তুমি-আমি মিলেই তো প্রথম
সৃষ্টি করেছিলাম।যে-গাধাটার হাত ধরে তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে সে নাকি এখনো
তোমার একটি ভয়ংকর তিলেরই খবর পায় নি।
ওই ভিসুভিয়াস থেকে কতটা লাভা ওঠে তা তো আমিই প্রথম
আবিষ্কার করেছিলাম।তুমি কি জানো না গাধারা কখনো অগ্নিগিরিতে চড়ে না?
তোমার কানের লতিতে কতটা বিদ্যুৎ আছে,
তা কি তুমি জানতে?
আমিই তো প্রথম জানিয়েছিলাম ওই বিদ্যুতে দপ ক’রে জ্বলে উঠতে পারে মধ্যরাত।
তুমি কি জানো না গাধারা বিদ্যুৎ সম্পর্কে কোনো
খবরই রাখে না?আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো।
যে-গাধাটার সাথে তুমি আমাকে ছেড়ে চ’লে গেলে
সে নাকি ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শয্যাকক্ষে কোনো শারীরিক তাপের
দরকার পড়ে না।
আমি জানি তোমার কতোটা দরকার শারীরিক তাপ।
গাধারা জানে না।
আমিই তো খুঁজে বের করেছিলাম তোমার দুই বাহুমূলে
লুকিয়ে আছে দু’টি ভয়ংকর ত্রিভুজ।
সে- খবর পায় নি গাধাটা।
গাধারা চিরকালই শারীরিক ও সব রকম জ্যামিতিতে খুবই মূর্খ হয়ে থাকে।তোমার গাধাটা আবার একটু রাবীন্দ্রিক।
তুমি যেখানে নিজের জমিতে চাষার অক্লান্ত নিড়ানো, চাষ, মই পছন্দ করো,
সে নাকি আধ মিনিটের বেশি চষতে পারে না।
গাধাটা জানে না
চাষ আর গীতবিতানের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য!তুমি কেনো আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে?
ভেবেছিলে গাড়ি, আর পাঁচতলা ভবন থাকলেই ওষ্ঠ থাকে,
আলিঙ্গনের জন্য বাহু থাকে,
আর রাত্রিকে মুখর করার জন্য থাকে সেই
অনবদ্য অর্গান?শুনেছি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর তুমি খুবই কষ্টে আছো।
আমি কিন্তু কষ্টে নেই; শুধু তোমার মুখের ছায়া
কেঁপে উঠলে বুক জুড়ে রাতটা জেগেই কাটাই, বেশ লাগে,
সম্ভবত বিশটির মতো সিগারেট বেশি খাই।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%b0-humayun-azad/
|
4976
|
শামসুর রাহমান
|
ফোটে বুনো ফুল
|
চিন্তামূলক
|
ছিলাম নিশ্চুপ ব’সে বিকেলে ঘরের এককোণে,
হাতে ছিল আধ-পড়া বই।
হঠাৎ পাশের পুরো খোলা দরজার
নগ্নতাকে যেন চুমো খেয়ে অন্দরে প্রবেশ করে
তিনটি শকুন। কখন যে হাত থেকে
আধ-পড়া বইটি মেঝেতে পড়ে গেলো
জানতে পারিনি; শকুনোর, কী অবাক কাণ্ড, ছিল
বেজায় নিশ্চুপ।অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি অযাচিত
আগত শকুনদের দিকে।
বিস্মিত আমাকে ওরা চকিতে বাংলায়
করে সম্ভাষণ,বলে কিছু ভালো কথা
যা আমি কখনও আগে শুনিনি এবং আরও বেশি
বিস্ময়ের আবর্তে ভীষণ ঘুরপাক খেতে থাকি।আমাকে বেজায় বিহ্বল, হতবাক হ’তে দেখে
তিনটি শকুন
একে অপরের কালো শরীরে লুটিয়ে প’ড়ে দিব্যি
জোরে হেসে হেসে ঘর প্রবল কাঁপিয়ে।
আমাকে হঠাৎ ভীত দেখে ওরা তিন পাখি
নিমেষে অদৃশ্য হয়, আসমানে চাঁদ জেগে ওঠে।কিছুক্ষণ ব’সে আরও ভাবনার মায়াজালে দূরে
কোথায় যে ভ্রমণ করতে থাকি,-বুঝি কি বুঝি না, অকস্মাৎ-
হাতে উঠে আসে প্রিয়সঙ্গী বলপেন। পাশে-রাখা
প্যাডের উন্মুক্ত বুকে ফোটে বুনো ফুল! (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/fote-buno-ful/
|
2247
|
মহাদেব সাহা
|
যাও সঙ্গমে সৎকারে, প্রেমে
|
মানবতাবাদী
|
সঙ্গমে সৎকারে নেমে মানুষের দূরে আরো এক অতিদূরে
চলে যেতে হয়
আরো এক বিশুদ্ধ জল তুলে নিয়ে আপাদমস্তক সিক্ত
করে নিতে হয়। অতৃপ্ত তৃষ্ণা ক্লান্ত, সুখী, শোকমগ্ন
কিংবা শিহরনস্নাত মুখ শিশুদের মতন নিরীহ
তোমরা মানুষ, এই মায়া তোমাকে সম্ভব। এই প্রেমে, এই তৃষ্ণা, এই
সফলতা, এইভাবে একে একে সংজ্ঞাহীন অবগাহনে গমন।
কোনো একদিন এই মায়াময় পথের সীমায় হবে দুজনের মুখোমুখি দেখা
কেউ কাকে শুধাবে না, তবু সেখানে জন্মাবে আবার এই আত্মঘাতী
মানুষের মেধা, মনুষ্যতা
না হলে তোমরা নারী শুধু ঊরুসর্বস্ব অশ্লীল মেয়ে, শুধু স্থূল
সঙ্গমের স্পৃহা
জন্মহনি জন্ম দিয়ে যাবে। মনে হয় তোমাদের একদিন ক্রমান্বয়ে
নেমে যেতে হবে
দূরে, আরো অব্দি দূরে যেতে যেতে সঙ্গমে সৎকারে নেমে
আরো এক বিশুদ্ধ মাটির মর্ম জেনে নিতে হবে। কী সে প্রতিমা
কী সে প্রতীক, তোমরা তাহারও বেশি উদ্দামতা পাবে।
না হলে এ নারী হবে ঊরুর অশ্লীল, কোনো মর্মগ্রাহী নয়
মাত্র গ্রীসের গণিকা, মেয়ে অধর্ম অশ্লীল!
কোনো একদিন, একদিন সঙ্গমে সৎকারে নেমে মানুষের আরো
দূরে, আরো অতি দূরে চলে যেতে হয়।
আরো এক শস্যের সম্মুখে এসে ক্লান্ত করতল মেলে ধরো
আরো এক শস্যের সম্মুখে এসে নতজানু হও আরো এক শস্যের
সম্মুখে এসে
নগ্ন হও তোমরা এখন
তোমরা প্রার্থনা করো হে মানুষ, নগ্ন নতজানু সঙ্গমের সহিষ্ণু মানুষ
সৎকারের সন্তপ্ত মানুষ, তোমরা প্রার্থনা করো
আসন্ন মানুষ যারা তোমাদের সঙ্গমে সৎকারে জন্ম নেবে
তারা যেন জয়ী হয়, তারা যেন না হয় এমন আর বারবার
তোমাদের মতো ব্যর্থ পরাজিত, ব্যর্থ পরাজয়ে নত।
যতোদূর যেতে পারে
নেমে যাও সঙ্গমে সৎকারে প্রেমে সহিষ্ণু মানুষ
সেই এক জলোদ্ভব হোক, শুদ্ধ সনাতন মাটি সেই
মহিমামন্ডিত মর্তোদ্ধার। ক্ষেতময় অপেক্ষায় আছে
তোমাদের শুষ্ক পক্ব পরিণত ধান
নেমে যাও সঙ্গমে-সৎকারে-প্রেমে সহিষ্ণু মানুষ
দূরে, আরো এক অতিদূরে, কাছে ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1508
|
4162
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
শুঁকনো হৃদয়
|
প্রেমমূলক
|
নিজেকে আজ বড় অসহায় মনে হচ্ছে
আজ যেন কিসের অভাব
হৃদয়ে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছে।
কিছুই ভাল লাগছেনা
না কোকিলের সূর,
না সেই মন ভুলানো উত্তাল হাওয়া,
জানালার দিকে তাকিয়ে তাই
আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে আছি।
কই আকাশে তো আজ সূর্যের দেখা নেই?
দূর থেকে গর্জন শুনছি মেঘের
চারিদিকে তাহলে মেঘেই ঘিরে রেখেছে।
যদি একটু আলো দেখতে পেতাম
মনটা না হয় একটু শান্তি পেত।
এইতো সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নেমে আসছে
বাগানে হাসনা হেনার গন্ধ
নাকটি যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
যে গন্ধ এক সময় আমার হৃদয়ে
ভালবাসার ছোয়া লাগিয়ে যেত
কিন্তু আজ বিরক্তিকর মাছের কাটা
যেন গলা আটকে রেখেছে।
পৃথিবীটা আজ সরু হয়ে আসছে
দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
বাইরে দূর্বা ঘাসের উপর
শিশিরের বিন্দু পড়তে শুরু করেছে।
যে শিশিরের ছোঁয়ায়
আমার শরীরে শিহরন জাগত
জীবনে যেন নতুন অধ্যায় সূচীত হতো।
কিন্তু আজ আর সেই শিশির বিন্দুতে
পা রাখতে ইচ্ছে করছে না।
কার ভাললাগে একা একা
সেই অন্ধকারে শিশিরে পা ভিজাতে?
পা কর্দমাক্ত হয়ে যদি পিছলে পরে যাই
কে আমাকে হাত ধরে উঠিয়ে দিবে?
যে হাতের স্পর্শে আমি হারিয়ে যেতাম
কোন এক স্বর্গপুরে।
আজ আর কিছুই ভাল লাগছেনা
পড়ার টেবিলেও মন বসছে না।
ডায়রির পাতা খুলে
কিছু লিখতে হাত বাড়ালাম
কিন্তু কলম আর চলছে না।
হাত কাপছে, পা কাপছে
চোখ দু’টি লাল হয়ে গেছে,
আর একটু হলেই অঝোর ধারায়
বৃষ্টি নাম্বে হৃদয়ের আকাশে।
জানালা দিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল আকাশের দিকে
কি যেন মিটি মিটি করে জলছে,
হয়তো মেঘের ফাকে চাঁদ উকি দিচ্ছে পৃথিবীর দিকে।
হৃদয়ে প্রশান্তির ছোঁয়া
আধো আলো, আধো ছায়ার মত
ফিরে আসতে শুরু করেছে
নতুন কোন আশার আলো।
কিন্তু সবই স্বপ্ন
যে স্বপ্নই বাঁচিয়ে রেখেছে আমায়।
হয়তো সে স্বপ্ন আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাবে
হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণে।
তবুও স্বপ্ন নিয়েই তাকিয়ে আছি
আকাশের দিকে।
কখন চাঁদের দেখা মিলবে ঐ দূর আকাশে
আর মেঘগুলো সব ঝরে পরে
ভিজিয়ে যায় আমার সেই শুকনো হৃদয়টাকে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2240.html
|
5879
|
সুফিয়া কামাল
|
ইতল বিতল
|
ছড়া
|
ইতল বিতল
গাছের পাতা
গাছের তলায় ব্যাঙের মাথা।
বৃষ্টি পড়ে ভাঙ্গে ছাতা
ডোবায় ডুবে ব্যাঙের মাথা।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/28.html
|
1172
|
জীবনানন্দ দাশ
|
যতদিন বেঁচে আছি
|
সনেট
|
যতদিন বেঁচে আছি আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে
অপরাজিতার মতো নীল হয়ে-আরো নীল-আরো নীল হয়ে
আমি যে দেখিতে চাই;- সে আকাশ পাখনায় নিঙড়ায়ে লয়ে
কোথায় ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে,
আমি যে দেখিতে চাই;- আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাসে,
পৃথিবীর পথ ঘুরে বহুদিন অনেক বেদনা প্রাণে সয়ে
ধানসিড়িটির সাথে বাংলার শ্মশানের দিকে যাব বয়ে,
যেইখানে এলোচুলে রামপ্রসাদের সেই শ্যামা আজো আসে,যেইখানে কল্কাপেড়ে শাড়ি পরে কোনো এক সুন্দরীর শব
চন্দন চিতায় চড়ে-আমের শাখায় শুক ভুলে যায় কথা;
যেইখানে সবচেয়ে বেশি রূপ-সবচেয়ে ঘাঢ় বিষন্নতা;
যেখানে শুকায় পদ্মা-বহুদিন বিশালক্ষ্মী যেখানে নীরব;
যেইখানে একদিন শঙ্খমালা চন্দ্রমালা মানিকমালার
কাঁকন বাজিত, আহা, কোনোদিন বাজিবে কি আর!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/joto-din-beche-aasi/
|
3275
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নতিস্বীকার
|
নীতিমূলক
|
তপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়
তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়,
অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে
প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/notishikar/
|
5887
|
সুবোধ সরকার
|
আমি
|
মানবতাবাদী
|
হিন্দু ভারত, জৈন ভারত, বৌদ্ধ ভারত, খ্রিস্টান ভারত,
এতগুলো ভারতের মাঝে দাঁড়িয়ে
আমি ফিরোজা একটি ভারতীয় মেয়ে ।
আপনারা বলতে পারেন, আমি কি দোষ করেছি ?
পৃথিবীর যে কোন দেশের
যে কোন একটি মেয়ের মতো আমি একজনকে
ভালবেসেছিলাম ।
প্রথম যেদিন ওর চোখে চোখ পড়েছিল আমার
আমি জানতাম না ও কে
বিকেল বেলার কলেজ ক্যাম্পাসে যে আলো এসে পড়েছিল
ওর চুলে, তার কোথাও লেখা ছিল ওর ধর্ম ।হিন্দু ভারত, জৈন ভারত, বৌদ্ধ ভারত, খ্রিস্টান ভারত
আপনারা বলতে পারেন আমি কি দোষ করেছি ?আমি যেদিন হাতে মোমবাতি নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম
আমি যেদিন বলে ফেললাম, আমি শরিয়ৎ মানি না
আমি যেদিন বুঝিয়ে দিলাম ভারতবর্ষের মাটিকে
মা বলে জানি, ভারতবর্ষের আকাশকে আকাশ
সেদিন থেকেই শুরু হল অত্যাচার ।হিন্দু ভারত, জৈন ভারত, বৌদ্ধ ভারত, খ্রিস্টান ভারত
আপনারা বলতে পারেন, আমি কি দোষ করেছি
ছেলেটাতো আপনাদের
সে কি দোষ করল ?
আমাকে ভালবাসাই তার দোষ ?ছেলেটার বাড়িতে আপনারা ঢিল ছুঁড়লেন
পার্সেল করে ছেঁড়া চটি পাঠালেন
ওকে হাতে মেরে, ভাতে মেরে
বাড়ির দেয়ালে বড় বড় করে লিখে দিলেন,
‘এসব চলবে না।’লজ্জা করে না আপনাদের, আপনারা এগিয়ে থাকা মানুষ
এম এ পাশ, বি এ পাশ, ডাক্তার, এঞ্জিনিয়র
আমলা, মাস্টার, আপনারাই গণতন্ত্র নিয়ে ভাষণ দেন
আর প্রয়োজন মতো
গণতন্ত্রের টুঁটি টিপে ধরেন ।
ধিক আপনাদের !আমি কি ছোটবেলায় ভোরের আলোয় সরস্বতী পুজোর ফল
. কাটিনি ?
আমি কি স্কুলের বারান্দায় বসে
রাত জেগে আলপনা দিইনি ?
আমি কি পাশের বাড়ির হিন্দু বাবার জন্য রক্ত দিইনি ?
ওদের বাড়ির উঠোনে বসে ওদের ছেলেদের অ আ ক খ
. শেখাইনি ?
আমি আরবি শিখিনি, ফারসি শিখিনি, উর্দু শিখিনি
বাংলাই আমার ভাষা, এই ভাষা আমার ভাত, আমার রুটি
আমার চোখের কাজল, আমার পায়ের ঘুঙুর ।
এই ভাষা আমার গোপন চিঠি, যার অক্ষরে অক্ষরে লেগে আছে
আমার চোখের জল ।আমরা যেদিন বিয়ে করি
সেদিন কফিহাউস গিয়েছিলাম, ও সেদিন
আমাকে ঝোলা ভর্তি করে রবীন্দ্রনাথ কিনে দিয়েছিল
হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে কানে কানে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন
ফিরোজা, তুমি আমার মৃন্ময়ী, তুমি আমার লাবণ্য
তুমি আমার সুচরিতা ।সেদিন রাত্রে কি হয়েছিল জানি না
কি ঘটেছিল ওদের বাড়িতে, কি ঘটেছিল ওদের পাড়ায়, কি
. করেছিল ওদের
বাবাকাকা – সেটা আজও আমি জানি না
কিন্তু তার পরের দিন ওকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি
ও কোথায় চলে গেল আমি জানতে পারিনি ।এই আপনাদের ভারতবর্ষ ?
এই আমাদের ভারতবর্ষ ?আমি একজন সাধারণ মেয়ে
অথচ বাড়িতে পাড়ায় অফিসে পুজোর প্যান্ডেলে
বিয়ে বাড়িতে অন্নপ্রাশনে এখনো আমাকে নিয়ে ফিসফাস
ডাক্তারের কাছে যাই – ফিসফাস
কলেজে ঢুকি – ফিসফাস
বাজারে যাই – ফিসফাস
যে হাউসিং –এ থাকি সেখানেও চলতে থাকে অবিরাম লুকোচুরি ।
ওটা লুকোচুরি নয়, ওটা ফিসফাস নয়
ওটা আপনাদের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক-একটা সুপ্ত গুজরাট ।
যদি আপনাদের হৃদয়
বড় না করেন
আকাশের দিকে আপনারা যদি না তাকান
এই পোড়া দেশে আরও, আরও, আরও
অনেকগুলো পোড়া গুজরাট তৈরি হবে ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%9c%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a7%9f-%e0%a6%ae%e0%a7%87-subodh/
|
3893
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শ্যাম রে, নিপট কঠিন মন তোর
|
ভক্তিমূলক
|
শ্যামরে, নিপট কঠিন মন তোর।
রোয়ত রোয়ত সজনী রাধা
রজনী করত স ভোর।
একলি বিরল কুটীরে বৈঠত
চাহত যমুনা পানে,—
ছল ছল নয়ন, বচন নহি নিকসত,
পরাণ থেহ ন মানে ।
ঘোর গহন নিশি একলি রাধা
যায় কদম তৰুমূলে,
ভূমি শয়ন পর আকুল কুন্তল,
কাঁদই আপন ভূলে।
সহসা চমকয়ি চায় সখী কভু
মগন যখন গৃহ কাজে—ছূটি আসয়ি বোলে “শুনলো, ,
শ্যামক বাঁশরি বাজে।”
আনমনে সো অবলা বালা
বৈসয়ি গুৰুজন মাঝে,
তুয়া নাম বঁধু লিখত ভূমি পর,
চমকি মুছই পুন লাজে।
নিঠুর শ্যামরে, কৈসে অব তুঁহুঁ
রহত দূর মথুরায়—
ঘোর রজনী কৈস গোঁয়ায়সি
কৈস দিবস তব যায় !
কৈস মিটাওসি প্রেম পিপাসা
কঁহা বজাওসি বাঁশি?
পীতবাস তুঁহু কথিরে ছোড়লি,
কথি সো বঙ্কিম হাসি?
কনক হার অব পহিরলি কণ্ঠে,
কথি ফেকলি বন মালা?গোপী হৃদয় অঁধার করলিরে,
সিংহাসন কর অালা;
এ দুখ চিরদিন রহি গল মনমে,
ভানু কহে, ছি ছি কালা!
ঝটিতি আও তুহুঁ হমারি সাথে,
বিরহ ব্যাকুলা বালা । (ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shyam-re-nipot-kothin-mon-tor/
|
1423
|
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
|
বসন্তকে ভালোবাসা
|
প্রেমমূলক
|
বসন্তের বইছে হাওয়া
হৃদয় টলমল
দুলছো তুমি, দুলছি আমি
পৃথিবী চঞ্চল ।
উড়ছে রিকশা উড়ছে যাত্রী
পুড়ছে আমার দেহ
সবুজ আগুন উঠলো জ্বলে
দু’চোখ ভরা মোহ ।
হাসপাতালে রুদ্র রায়ের
গান বাজে, নেই শব
আকাশ নদী কল্লোলিত
সবুজের উৎসব ।
ভালোবাসার বৃষ্টি নামে
পঙ্কিলতার স্রোতে
এই শহরে হাজার হৃদয়
বন্দি তোমার হাতে ।
এক মুহূর্তে হারিয়ে গেলে
বিষাদ হাহাকার
তোমার দু’চোখ আমার চোখে
এক হলো না আর ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1032
|
2687
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আনন্দেরই সাগর থেকে
|
চিন্তামূলক
|
আনন্দেরই সাগর থেকে
এসেছে আজ বান ।
দাঁড় ধরে আজ বোস্ রে সবাই
টান রে সবাই টান্ ।
বোঝা যতই বোঝাই করি
করব রে পার দুখের তরী,
ঢেউয়ের 'পরে ধরব পাড়ি
যায় যদি যাক প্রাণ ।
আনন্দেরই সাগর থেকে
এসেছে আজ বান ।
কে ডাকে রে পিছন হতে,
কে করে রে মানা,
ভয়ের কথা কে বলে আজ --
ভয় আছে সব জানা ।
কোন্ শাপে কোন্ গ্রহের দোষে
সুখের ডাঙায় থাকব বসে;
পালের রশি ধরবো কষি,
চলব গেয়ে গান ।
আনন্দেরই সাগর থেকে
এসেছে আজ বান ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/58
|
5441
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
উদ্বীক্ষণ
|
মানবতাবাদী
|
নগরে ও গ্রামে জমেছে ভিড়
ভগ্ননীড়,-
ক্ষুদিত জনতা আজ নিবিড়।
সমুদ্রে জাগে না বাড়বানল,
কী উচ্ছল,
তীরসন্ধানী ব্যাকুল জল।
কখনো হিংস্র নিবিড় শোকে;
দাঁতে ও নখে-
জাগে প্রতিজ্ঞা অন্ধ চোখে।
তবু সমুদ্র সীমানা রাখে,
দুর্বিপাকে
দিগন্তব্যাপী প্লাবন ঢাকে।
আসন্ন ঝড়ো অরণ্যময়
যে বিস্ময়
ছড়াবে, তার কি অযথা ক্ষয়?
দেশে ও বিদেশে লাগে জোয়ার,
ঘোড়সোয়ার
চিনে নেবে দৃঢ় লোহার,
যে পথে নিত্য সূর্যোদয়
আনে প্রলয়,
সেই সীমান্তে বাতাস বয়;
তাই প্রতীক্ষা- ঘনায় দিন
স্বপ্নহীন।।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/udbikkhon/
|
3394
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পিছু-ডাকা
|
ছড়া
|
যখন দিনের শেষে
চেয়ে দেখি সমুখপানে সূর্য ডোবার দেশে
মনের মধ্যে ভাবি
অস্তসাগর-তলায় গেছে নাবি
অনেক সূর্য-ডোবার সঙ্গে অনেক আনাগোনা,
অনেক দেখাশোনা,
অনেক কীর্তি, অনেক মূর্তি, অনেক দেবালয়,
শক্তিমানের অনেক পরিচয়।
তাদের হারিয়ে-যাওয়ার ব্যাথায় টান লাগে না মনে,
কিন্তু যখন চেয়ে দেখি সামনে সবুজ বনে
ছায়ায় চরছে গোরু,
মাঝ দিয়ে তার পথ গিয়েছে সরু,
ছেয়ে আছে শুক্নো বাঁশের পাতায়,
হাট করতে চলে মেয়ে ঘাসের আঁঠি মাথায়,
তখন মনে হঠাৎ এসে এই বেদনাই বাজে--
ঠাঁই রবে না কোনোকালেই ঐ যা-কিছুর মাঝে।
ঐ যা-কিছুর ছবির ছায়া দুলেছে কোন্কালে
শিশুর-চিত্ত-নাচিয়ে-তোলা ছড়াগুলির তালে--
তিরপূর্নির চরে
বালি ঝুর্ঝুর্ করে,
কোন্ মেয়ে সে চিকন-চিকন চুল দিচ্ছে ঝাড়ি,
পরনে তার ঘুরে-পড়া ডুরে একটি শাড়ি।
ঐ যা-কিছু ছবির আভাস দেখি সাঁঝের মুখে
মর্ত্যধরার পিছু-ডাকা দোলা লাগায় বুকে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pesu-daka/
|
3827
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রাস্তায় চলতে চলতে
|
চিন্তামূলক
|
রাস্তায় চলতে চলতে
বাউল এসে থামল
তোমার সদর দরজায়।
গাইল, "অচিন পাখি উড়ে আসে খাঁচায়;"
দেখে অবুঝ মন বলে--
অধরাকে ধরেছি।
তুমি তখন স্নানের পরে এলোচুলে
দাঁড়িয়েছিলে জানলায়।
অধরা ছিল তোমার দূরে-চাওয়া চোখের
পল্লবে,
অধরা ছিল তোমার কাঁকন-পরা নিটোল হাতের
মধুরিমায়।
ওকে ভিক্ষে দিলে পাঠিয়ে,
ও গেল চলে;
জানলে না এইগানে তোমারই কথা।
তুমি রাগিণীর মতো আস যাও
একতারার তারে তারে।
সেই যন্ত্র তোমার রূপের খাঁচা,
দোলে বসন্তের বাতাসে।
তাকে বেড়াই বুকে ক'রে;
ওতে রঙ লাগাই, ফুল কাটি
আপন মনের সঙ্গে মিলিয়ে।
যখন বেজে ওঠে, ওর রূপ যাই ভুলে,
কাঁপতে কাঁপতে ওর তার হয় অদৃশ্য।
অচিন তখন বেরিয়ে আসে বিশ্বভুবনে,
খেলিয়ে যায় বনের সবুজে
মিলিয়ে যায় দোলনচাঁপার গন্ধে।
অচিন পাখি তুমি,
মিলনের খাঁচায় থাক,
নানা সাজের খাঁচা।
সেখানে বিরহ নিত্য থাকে পাখির পাখায়,
স্থকিত ওড়ার মধ্যে।
তার ঠিকানা নেই,
তার অভিসার দিগন্তের পারে
সকল দৃশ্যের বিলীনতায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rajtay-chalta-chala/
|
5028
|
শামসুর রাহমান
|
বিদায় গান
|
সনেট
|
কেন এ বিদায় গান বারবার শোনাও আমাকে?
কেউ কি কখনো মুমূর্ষের কানে কানে আওড়ায়-
ফুরালো তোমার বেলা মগ্ন আমি স্বপ্নের পাড়ায়,
কেন গুঁড়ো ক’রে দিতে চাও কাচের মতন তাকে?
আমি তো স্বপ্নের পথ্যে ক্রমাগত বাঁচাই সত্তাকে।
জীবন কাটাতে চাই সেই দু’টি চোখের তারায়
চোখ রেখে, অথচ আমার দিকে প্রেত পা বাড়ায়
অন্ধকারে, ঘুরি দিশাহারা ভীষণ নিশির ডাকে।আমাকে বিদায় গান কোনো ছলে শুনিও না আর;
বরং আশ্বাস দাও সান্নিধ্যের এবং চুম্বন
দাও আজ আমার তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠে নিবিড়-মদির।
সে চুন্বনে তপ্ত অন্ধ উদ্বেলিত শেণিতে আমার
উঠবে জেগে অতিদূর শতাব্দীর স্মৃতি-বিস্মরণ
আর নিমেষেই হবে দীপান্বিতা তোমার শরীর। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/biday-gan/
|
1465
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
আমার কিছু স্বপ্ন ছিল
|
প্রেমমূলক
|
আমার কিছু স্বপ্ন ছিল, আমার কিছু প্রাপ্য ছিল,
একখানা ঘর সবার মতো আপন করে পাবার,
একখানা ঘর বিবাহিত, স্বপ্ন ছিল রোজ সকালে
একমুঠো ভাত লঙ্কা মেখে খাবার।সামনে বাগান, উঠোন চাইনি, চেয়েছিলাম
একজোড়া হাঁস, একজোড়া চোখ অপেক্ষমাণ
এই তো আমি চেয়েছিলাম।স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতার, আর কিছু নয়,
তোমায় শুধু অনঙ্গ বউ ডাকার।
চেয়েছিলাম একখানি মুখ আলিঙ্গনে রাখার।অনঙ্গ বউ, অনঙ্গ বউ, এক জোড়া হাঁস,
এক জোড়া চোখ, কোথায়? তুমি কোথায়? কাব্যগ্রন্থঃ দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/amar-kicho-sopno-chlo/
|
875
|
জসীম উদ্দীন
|
মামার বাড়ি
|
ছড়া
|
আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা,
ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামার বাড়ি যাই।
মামার বাড়ি পদ্মপুকুর
গলায় গলায় জল,
এপার হতে ওপার গিয়ে
নাচে ঢেউয়ের দল।
দিনে সেথায় ঘুমিয়ে থাকে
লাল শালুকের ফুল,
রাতের বেলা চাঁদের সনে
হেসে না পায় কূল।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
মামা-বাড়ির ঘর,
আকাশ হতে জোছনা-কুসুম
ঝরে মাথার ‘পর।
রাতের বেলা জোনাক জ্বলে
বাঁশ-বাগানের ছায়,
শিমুল গাছের শাখায় বসে
ভোরের পাখি গায়।
ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি
রঙিন করি মুখ।
কাঁদি-ভরা খেজুর গাছে
পাকা খেজুর দোলে
ছেলেমেয়ে, আয় ছুটে যাই
মামার দেশে চলে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/24
|
2298
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
উৰ্ব্বশী
|
সনেট
|
যথা তুষারের হিয়া, ধবল-শিখরে,
কভু নাহি গলে রবি-বিভার চুম্বনে,
কামানলে ; অবহেলি মন্মথের শরে
রথীন্দ্র, হেরিল, জাগি, শয়ন-সদনে
( কনক-পুতলী যেন নিশার স্বপনে )
উৰ্ব্বশীরে । “কহ, দেবি, কহ এ কিঙ্করে,”—
সুধিলা সম্ভাষি শূর সুমধুর স্বরে,
“কি হেতু অকালে হেথা, মিনতি চরণে ?”
উন্মদা মদন-মদে, কহিলা উৰ্ব্বশী ;
“কামাতুরা আমি, নাথ, তোমার কিঙ্করী ;
সরের সুকান্তি দেখি যথা পড়ে খসি
কৌমুদিনী তার কোলে, লও কোলে ধরি
দাসীরে ; অধর দিয়া অধর পরশি,
যথা কৌমুদিনী কাঁপে, কাঁপি থর থরি।”
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/urbboshi/
|
2644
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই
|
চিন্তামূলক
|
আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই
কিসের বাতাস লেগেছে–
জগৎ-ঘূর্ণি জেগেছে।
ঝলকি উঠেছে রবি-শশাঙ্ক,
ঝলকি ছুটেছে তারা,
অযুত চক্র ঘুরিয়া উঠেছে
অবিরাম মাতোয়ারা।
স্থির আছে শুধু একটি বিন্দু
ঘূর্ণির মাঝখানে–
সেইখান হতে স্বর্ণকমল
উঠেছে শূন্যপানে।
সুন্দরী, ওগো সুন্দরী,
শতদলদলে ভুবনলক্ষ্ণী
দাঁড়ায়ে রয়েছ মরি মরি।
জগতের পাকে সকলি ঘুরিছে,
অচল তোমার রূপরাশি।
নানা দিক হতে নানা দিন দেখি–
পাই দেখিবারে ওই হাসি।জনমে মরণে আলোকে আঁধারে
চলেছি হরণে পূরণে,
ঘুরিয়া চলেছি ঘুরনে।
কাছে যাই যার দেখিতে দেখিতে
চলে যায় সেই দূরে,
হাতে পাই যারে পলক ফেলিতে
তারে ছুঁয়ে যাই ঘুরে।
কোথাও থাকিতে না পারি ক্ষণেক,
রাখিতে পারি নে কিছু–
মত্ত হৃদয় ছুটে চলে যায়
ফেনপুঞ্জের পিছু।
হে প্রেম, হে ধ্রুবসুন্দর,
স্থিরতার নীড় তুমি রচিয়াছ
ঘূর্ণার পাকে খরতর।
দ্বীপগুলি তব গীতমুখরিত,
ঝরে নির্ঝর কলভাষে,
অসীমের চির-চরম শান্তি
নিমেষের মাঝে মনে আসে। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akash-sindhu-majhe-ek-thai/
|
4913
|
শামসুর রাহমান
|
পর্যটন
|
চিন্তামূলক
|
কড়া নেই; ব্যস, এইটুকু যা তফাত। কিছুকাল
ছোট এক ঘরের ভিতরে
আছি, হয়তো
গভীর ভূতলাশ্রয়ী রাজনীতিপরায়ণ কেউ
ধূর্ত ফেউদের খরদৃষ্টির আড়ালে
এরকম করে বসবাস।
নিভৃতে নিজেকে ক্রমাগত
নিজের ভিতরে খুব গুটিয়ে নিয়েছি।আমি কি কারুর ভয়ে ইদানীং এমন আড়াল
খুঁজি রাত্রিদিন?
আস্তে সুস্থে দু’পা
এগিয়ে গেলেই ছুঁতে পারি মল্লিকার শরীরাভা
এবং নিবিষ্ট বসা যায় গুঞ্জরিত
চাখানায় বুলিয়ে ব্যাপক ভ্রাতৃদৃষ্টি শুভবাদী
কথোপকথনে নাক্ষত্রিক নীড় খোঁজা চলে আর
সত্তাময় রাঙা ধূলো নিয়ে ফেরা নিভাঁজ সহজ।কোথাও যাই না; মূর্তিমান সান্ত্রী নেই আশেপাশে,
তবু চতুর্দিকে কী নাছোড় কবন্ধ পাহারা
মাঝে-সাঝে ইচ্ছে হলে পর্দাটা সরিয়ে
জানালার বাইরে তাকাই,
চোখ দিয়ে ছুঁই
গোলাপ, টগর, জুঁই, আকাশ-সাজানো
দূর সাইরেবিয়ার, গোধূলিমাতাল হংসযূথ।
সর্বোপরি পায়চারি নিজের ভেতরকার ছাঁদনাতলায়।কোথাও যাওয়ার নেই, শুধু অন্তর্গত
পথের বিস্ময়মাখা হাওয়া
বয় ভিন্ন স্তরে, নীলিমার স্পর্শ লাগে; অন্ধকারে বিছানায়
শুয়ে ভাবি বাসারির কথা,
সিস্টার্ন চ্যাপেল আর ইরাসমূজের মানবিক দীপ্তিমালা
দুলে ওঠে, অকস্মাৎ একজন পর্যটক, পায়ে তার বৎসরান্তিক
ধূলো, চুল এলোমেলো, খোলা গেরেবান,
দাঁড়ায় দরজা ঘেঁষে, বলে-চলো যাই। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/porjoton/
|
5247
|
শামসুর রাহমান
|
শ্রোতা
|
চিন্তামূলক
|
বিকেল বেলা এখানে এসেই লোকটা কেমন
ভ্যাবাচ্যাকা। এত হৈ চৈ, অথচ কেউ কারও কথা
শুনছে ব’লে মনে হচ্ছে না। শব্দগুলো
ইট পাটকেলেত মতো ঠোকাঠুকি করছে অবিরত।লোকটা শত চেষ্টা ক’রেও কারও দৃষ্টি
ওর দিকে ফেরাতে না পেরে
মুখ বুঁজে দাঁড়িয়ে রইল এক কোণে। সারা মুখে ভর
সন্ধেবেলার
অন্ধকার, মাথার ভেতর অন্ধ পাখির ঠোকর।এখনই অন্ধ বন্ধ কোনো না পাখা,
লোকটা নিজেকে প্রবোধ দেয় চারপাশে
স্তব্ধতার মনোজ জাল ছড়িয়ে। লোকটার মাথা
ক্রমাগত মেঘ স্পর্শ করার বাসনায় স্পর্ধিত হয়।ওদের কিছু কথা শোনাবার ছিল লোকটার,
কিন্তু কেউ কোনো কথা শোনার
ব্যগ্রতাকে নাচায়নি চোখের তারায়
পরিণামহীন হৈ-হল্লাই ওদের অধিপতি।লোকটা আখেরে বলতে-চাওয়া কথাগুলো
বুকের ভেতর গুছিয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়াল এক
ভিড়
গাছপালার মধ্যে। ওর মুখে মুক্ত উচ্চারণ; গাছ, পাখি,
নির্জনতা আর বাংলা লিরিকের মতো চাঁদ তার শ্রোতা। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shrota/
|
1252
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সে কত পুরনো কথা
|
সনেট
|
সে কত পুরনো কথা-যেন এই জীবনের ঢের আগে আরেক জীবন
তোমারে সিঁড়ির পথে তুলে দিয়ে অন্ধকারে যখন গেলাম চুপে
তুমিও ফের নি পিছে-তুমিও ডাকনি আর; আমারও নিবিড় হলো মন
যেন এক দেশলাই জ্বলে গেছে-জ্বলিবেই-হালভাঙ্গা জাহাজের স্তুপে
আমার এ জীবনের বন্দরে;তারপর শান্তি শুধু বেগুনি সাগর-
মেঘের সোনালি চুল- আকাশ উঠেছে ভরে হেলিওট্রোপের মতো রুপেআমার জীবন এই; তোমারও জীবন তাই;এইখানে পৃথিবীর ‘পর
এই শান্তি মানুষের;এই শান্তি,যতদিন ভালোবেসে গিয়েছি তোমারে
কেন যেন লেগুনের মতো আমি অন্ধকারে কোন্ দূর সমুদ্রের ঘরচেয়েছি-চেয়েছি, আহা.. ভালোবেসে না-কেঁদে কে পারে।
তবুও সিঁড়ির পথে তুলে দিয়ে অন্ধকারে যখন গেলাম চলে চুপে
তুমিও দেখনি ফিরে-তুমিও ডাকনি আর-আমিও খুঁজি নি অন্ধকারে
যেন এক দেশলাই জ্বলে গেছে-জ্বলিবেই-হালভাঙ্গা জাহাজের স্তুপে
তোমারে সিঁড়ির পথে তুলে দিয়ে অন্ধকারে যখন গেলাম চলে চুপে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shey-koto-purono-kotha/
|
5271
|
শামসুর রাহমান
|
সরোবর
|
সনেট
|
আজকাল খুব ভোরবেলা উঠে পড়ি, মাঝে মাঝে
দেরি হয়ে যায়। কেন উঠি? এই চোখের অসুখ
বেড়ে গেল যখন, তখন থেকে চোখ, কান বুক
আকাশে আবির মাখা হওয়ার আগেই মাতে কাজে।
ঘুম ভাঙতেই শুনি পাখিদের শিস, আচানক
কোথা থেকে ভেসে আসে বকুল ফুলের গন্ধে, দেখি
আমার নৈঃসঙ্গ্য গাছতলা থেকে দেখছেন একি
মহৎ রবীন্দ্রনাথ। আমি দুর্ভোগের ক্রীড়নক।তোমাকে দেখি না বলে সবকিছু মন খারাপের
স্পর্শে আজ কেমন বিবর্ণ, বড়ো অর্থহীন লাগে।
একুশের বই মেলা টানে না আমাকে, দিনভর
বসে থাকি গৃহকোণে, তৈরি করি এক সরোবর
যার জলে তোমার সুন্দর মুখ দেখি অনুরাগে,
বারবার সেই মুখ সরে গিয়ে ভেসে ওঠে ফের। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sorobor/
|
841
|
জসীম উদ্দীন
|
নক্সী কাঁথার মাঠ - সাত
|
কাহিনীকাব্য
|
(সাত)কান্-কানা-কান্ ছুটল কথা গুন্-গুনা-গুন তানে,
শোন্-শোনা-শোন সবাই শোনে, কিন্তু কানে কানে |
'কি করগো রূপার মাতা? খাইছ কানের মাথা?
ও-দিক যে তোর রূপার নামে রটছে গাঁয়ে যা তা!
আমরা বলি রূপাই এমন সোনার কলি ছেলে,
তার নামে হয় এমন কথা দেখব কি কাল গেলে?'
এই বলিয়া বড়াই বুড়ি বসল বেড়ি দোর,
রূপার মা কয়, 'বুঝিনে বোন কি তোর কথার ঘোর!'
বুড়ি যেন আচমকা হায় আকাশ হতে পড়ে,
'সবাই জানে তুই না জানিস যে কথা তোর ঘরে?'
ও-পাড়ার ও ডাগর ছুঁড়ী, সেখের বাড়ির 'সাজু'
তারে নাকি তোর ছেলে সে গড়িয়ে দেছে বাজু |
ঢাকাই শাড়ী কিন্যা দিছে, হাঁসলী দিছে নাকি,
এত করে এখন কেন শাদীর রাখিস বাকি?'
রূপার মা কয়, 'রূপা আমার এক-রত্তি ছেলে,
আজও তাহার মুখ শুঁকিলে দুধের ঘিরাণ মেলে |
তার নামে যে এমন কথা রটায় গাঁয়ে গাঁয়ে,
সে যেন তার বেটার মাথা চিবায় বাড়ি যায় |'রূপার মায়ের রুঠা কথায় উঠল বুড়ীর কাশ,
একটু দিলে তামাক পাতা, নিলেন বুড়ী শ্বাস |
এমন সময় ওই গাঁ হতে আসল খেঁদির মাতা,
টুনির ফুপু আসল হাতে ডলতে তামাক পাতা |
ক'জনকে আর থামিয়ে রাখে? বুঝল রূপার মা ;
রূপা তাহার সত্যি করেই এতটুকুন না |
বুঝল মায়ে কেন ছেলে এমন উদাস পারা,
হেথায় হোথায় কেবল ঘোরে হয়ে আপন হারা |
ও পাড়ার ও দুখাই মিয়া ঘটকালিতে পাকা,
সাজুর সাথেই জুড়ুর বিয়ে যতকে লাগুক টাকা |শেখ বাড়িতে যেয়ে ঘটক বেকী-বেড়ার কাছে,
দাঁড়িয়ে বলে, 'সাজুর মাগো, একটু কথা আছে |'
সাজুর মায়ে বসতে তারে এনে দিলেন পিঁড়ে,
ডাব্বা হুঁকা লাগিয়ে বলে, 'আস্তে টান ধীরে |'
ঘটক বলে, 'সাজুর মাগো মেয়ে তোমার বড়,
বিয়ের বয়স হল এখন ভাবনা কিছু কর |'
সাজুর মা কয় 'তোমরা আছ ময়-মুরুব্বি ভাই,
মেয়ে মানুষ অত শত বুঝি কি আর ছাই!
তোমরা যা কও ঠেলতে কি আর সাধ্য আছে মোর?'
ঘটক বলে, 'এই ত কথা, লাগবে না আর ঘোর |
ও-পাড়ার ও রূপারে ত চেনই তুমি বোন্,
তার সাথে দাও মেয়ের বিয়ে ঠিক করিয়ে মন |'
সাজুর মা কয়, 'জান ত ভাই! রটছে গাঁয়ে যাতা,
রূপার সাথে বিয়ে দিলে থাকবে না আর মাথা |'ঘটক বলে, 'কাঁটা দিয়েই তুলতে হবে কাঁটা,
নিন্দা যারা করে তাদের পড়বে মুখে ঝাঁটা |
রূপা ত আর নয় এ গাঁয়ে যেমন তেমন ছেলে,
লক্ষ্মীরে দেই বউ বানায়ে অমন জামাই পেলে!'
ঠাটে ঘটক কয় গো কথা ঠোঁট-ভরাভর হাসে ;
সাজুর মায়ের পরাণ তারি জোয়ার-জলে ভাসে |
'দশ খান্দা জমি রূপার, তিনটি গরু হালে,
ধানের-বেড়ী ঠেকে তাহার বড় ঘরের চালে |'
সাজু তোমার মেয়ে যেমন, রূপাও ছেলে তেমন,
সাত গেরামের ঘটক আমি জোড় দেখিনি এমন |'তার পরেতে পাড়ল ঘটক রূপার কুলের কথা,
রূপার দাদার নাম গুনে লোক কাঁপত যথা তথা |
রূপার নানা সোয়েদ-ঘেঁষা, মিঞাই বলা যায়---
কাজী বাড়ির প্যায়দা ছিল কাজল-তলার গাঁয় |
রূপার বাপের রাখত খাতির গাঁয়ের চৌকিদারে,
আসেন বসেন মুখের কথা---গান বজিত তারে |
রূপার চাচা অছিমদ্দী, নাম শোন নি তার?
ইংরেজী তার বোল শুনিলে সব মানিত হার |
কথা ঘটক বলল এঁটে, বলল কখন ঢিলে,
সাজুর মায়ে সবগুলি তার ফেলল যেন গিলে |মুখ দেখে বুঝল ঘটক---লাগছে অষুধ হাড়ে,
বলল, 'তোমার সাজুর বিয়া ঠিক কর এই বারে |'
সাজুর মা কয়, ' যা বোঝ ভাই, তোমরা গ্যা তাই কর,
দেখ যেন কথার আবার হয় না নড়চড় |''আউ ছি ছি!' ঘটক বলে, 'শোনই কথা বোন,
তোমার সাজুর বিয়া দিতে লাগবে কত পণ?
পোণে দিব কুড়ি দেড়েক বায়না দেব তেরো,
চিনি সন্দেশ আগোড়-বাগোড় এই গে ধর বারো |
সবদ্যা হল দুই কুড়ি এ নিতেই হবে বোন,
চাইলে বেশী জামাইর তোমার বেজার হবে মন!'
সাজুর মা কয়, 'ও-সব কথার কি-ইবা আমি জানি,
তোমরা যা কও তাইত খোদার গুকুর বলে মানি |'
সাধে বলে দুখাই ঘটক ঘটকালিতে পাকা,
আদ্য মধ্য বিয়ের কথা সব করিল ফাঁকা |চল্-চলা-চল্ চলল দুখাই পথ বরাবর ধরি,
তাগ্-ধিনা-ধিন্ নাচে যেন গুন্ গুনা গান করি |
দুখাই ঘটক নেচে চলে নাচে তাহার দাড়ি,
বুড়োর বটের শিকড় যেন চলছে নাড়ি নাড়ি ;
লম্ফে লম্ফে চলে ঘটক দম্ভ করে চায়,
লুটের মহল দখল করে চলছে যেন গাঁয়!
ঘটকালিরই টাকা যেন ঝন্-ঝনা-ঝন্ বাজে,
হন্-হানা-হন্ চলল ঘটক একলা পথের মাঝে |
ধানের জমি বাঁয় ফেলিয়া ফেলিয়া, ডাইনে ঘন পাট,
জলীর বিলে নাও বাঁধিয়া ধরল গাঁয়ের বাট |
'কি কর গো রূপার মাতা, ভবছ বসি কিবা,
সাজুর সাথেই ঠিক কইরাছি তোমার ছেলের বিবা |
সহজে কি হয় সে রাজি, একশ টাকা পণ,
এর কমেতে বসেইনাক সাজুর মায়ের মন |আমিও আবার কুড়ি তিনেক উঠিনে তার পরে,
সাজুর মায়ও নাছোড়-বান্দা, দিলাম তখন ধরে ;
আরেক কুড়ি, তয় সে কথা কইল হাসি হাসি,
আমি ভাবি, বিয়ার বুঝি বাজল সানাই বাঁশী |
এখন বলি রূপার মাতা, আড়াই কুড়ি টাকা,
মোর কাছেতে দিবা, কথা হয় না যেন ফাঁকা!
আসব দিয়ে গোপনে তায়, নইলে গাঁয়ের লোকে,
মেজবানী দাও বলে তারে ধরবে চীনে জোঁকে |
বিয়ের দিনে নিবে সে তাই তিরিশ টাকা যেচে,
যারে তারে বলতে পার এই কথাটি নেচে |
চিনি সন্দেশ আগোড়-বাগোড় তার লাগিবে ষোলো,
এই ধরগ্যা রূপার বিয়া আজই যেন হল |'রূপার মায়ের আহ্লাদে প্রাণ ধরেইনাক আর,
ইচ্ছে করে নেচে নেচে বেড়ায় বারে বার |
'ও রূপা তুই কোথায় গেলি? ভাবিসনাক মোটে,
কপাল গুণি বিয়ে যে তোর সাজুর সাথেই জোটে!'
এই বলিয়া রূপার মাতা ছুটল গাঁয়ের পানে,
ঘটক গেল নিজের বাড়ি গুন্-গুনা-গুন্ গানে |
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-7/
|
4273
|
শঙ্খ ঘোষ
|
শবসাধনা
|
চিন্তামূলক
|
বুঝি তোমার চাউনি বুঝি
থাকবে না আর গলিঘুঁজি
থাকবে না আর ছাউনি আমার কোথাও
ও প্রমোটার ও প্রমোটার
তোমার হাতে সব ক্ষমতার
দিচ্ছি চাবি, ওঠাও আমায় ওঠাও |
তুমিই চিরনমস্য, তাই
তোমার পায়ে রত্ন জোটাই
তোমার পায়েই বিলিয়ে দিই শরীর—
যাঁর যা খুশি বলুন তিনি
করবে তুমি কল্লোলিনী
ভরসা কেবল কলসি এবং দড়ির |
আমার বলে রইলো শুধু
বুকের ভেতর মস্ত ধু ধু
দিয়েছি সব যেটুকু ছিল দেবার
ঘর ছেড়ে আজ বাইরে আসি
আমরা কজন অন্তেবাসী
শবসাধনার রাত কাটাব এবার |
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1131
|
582
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
উদ্বোধন
|
স্বদেশমূলক
|
বঙ্গের ছেলে-মেয়ে জাগো, জাগো, জাগো,
পরের করুণা কেন শুধু মাগো—
আপনারে বলে নির্ভর রাখো
হবে জয় নিশ্চয়—
চারিদিকে হেরো কী দুঃখ-দুর্দিন,
কত ভাই বোন অন্ন-বস্ত্র-হীন,
সোনার বাংলা হয়েছে মলিন
কী দীরুণ বেদনায়—
তোমরা জাগিয়া দুঃখ ঘুচালে,
সকলের ব্যথা সকলে বুঝিলে
ত্যাগ, একতায় জাগিয়া উঠিলে,
তবে বঙ্গ রক্ষা পায় |
পৃথিবী জুড়িয়ে যত অভিযান
সকলেই চায় দেশের কল্যাণ (সম্মান)
জননী জন্মভূমির উত্থান,
মানুষ যে সে-ই চায় |
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3868.html
|
205
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
অর্ঘ্য
|
ভক্তিমূলক
|
হায় চির-ভোলা! হিমালয় হতে
অমৃত আনিতে গিয়া
ফিরিয়া এলে যে নীলকণ্ঠের
মৃত্যু-গরল পিয়া!
কেন এত ভালো বেসেছিলে তুমি
এই ধরণির ধূলি?
দেবতারা তাই দামামা বাজায়ে
স্বর্গে লইল তুলি!
হুগলি
৩রা আষাঢ়, ১৩৩২
(চিত্তনামা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/orghyo/
|
1642
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
বকুল, বকুল, বকুল
|
প্রকৃতিমূলক
|
‘সামনে রিফুকর্ম চলছে,
পিছন দিকে রাস্তা বন্ধ!’
এই, ওরা কী যা-তা বলছে!
বকুল, তোমার বুকের গন্ধ
এই অবেলায় মনে পড়ে।
এই অবেলায় বকুল ঝরে
শ্যামবাজারে, ধর্মতলায়,
এবং আমরা তাকেই ধরছি
ফাঁদ পেতে চৌষট্টি কলায়।
এবং আমরা রাস্তাঘাটে
ফুটপাতে আর গড়ের মাঠে
কুড়িয়ে নিচ্ছি ছেলেবেলা।
‘সন্ধ্যারাতে এ কোন্ খেলা?’
এই, ওরা কী যা-তা বলছে!
মাথার মধ্যে ফুলের গন্ধ।
সামনে সেলাই-ফোঁড়াই চলছে,
পিছন দিকে রাস্তা বন্ধ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1573
|
2015
|
ভবানীপ্রসাদ মজুমদার
|
বাংলাটা ঠিক আসে না
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’ কথায়-কথায় হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
ইংলিশে ও ‘রাইমস’ বলে
‘ডিবেট’ করে, পড়াও চলে
আমার ছেলে খুব ‘পজেটিভ’ অলীক স্বপ্নে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।
‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ‘ফাস্ট’ ল্যাঙ্গুয়েজ
হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।
কী লাভ বলুন বাংলা প’ড়ে?
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?
বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না
জানে দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।
বাংলা আবার ভাষা নাকি, নেই কোনও ‘চার্ম’
বেঙ্গলিতে
সহজ-সরল এই কথাটা লজ্জা কীসের মেনে নিতে?
ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক
হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক
বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।
বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে
শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।
কীসের গরব? কীসের আশা?
আর চলে না বাংলা ভাষা
কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।
ইংলিশ বেশ বোমবাস্টিং শব্দে ঠাসা দারুণ ভাষা
বেঙ্গলি ইজ ডিসগাস্টিং, ডিসগাস্টিং সর্বনাশা।
এই ভাষাতে দিবানিশি
হয় শুধু ভাই ‘পি.এন.পি.সি’
এই ভাষা তাই হলেও দিশি, সবাই ভালোবাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
বাংলা ভাষা নিয়েই নাকি এংলা-প্যাংলা সবাই মুগ্ধ
বাংলা যাদের মাতৃভাষা, বাংলা যাদের মাতৃদুগ্ধ
মায়ের দুধের বড়ই অভাব
কৌটোর দুধ খাওয়াই স্বভাব
ওই দুধে তেজ-তাকত হয় না, বাংলাও তাই হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
বিদেশে কী বাংলা চলে? কেউ বোঝে না বাংলা কথা
বাংলা নিয়ে বড়াই করার চেয়েও ভালো নিরবতা।
আজ ইংলিশ বিশ্বভাষা
বাংলা ফিনিশ, নিঃস্ব আশা
বাংলা নিয়ে আজকাল কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
শেক্সপীয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী বা কীটস বা বায়রন
ভাষা ওদের কী বলিষ্ঠ, শক্ত-সবল যেন আয়রন
কাজী নজরুল- রবীন্দ্রনাথ
ওদের কাছে তুচ্ছ নেহাত
মাইকেল হেরে বাংলায় ফেরে, আবেগে-উচছ্বাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5672.html
|
3254
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দেখো চেয়ে গিরির শিরে
|
প্রকৃতিমূলক
|
দেখো চেয়ে গিরির শিরে
মেঘ করেছে গগন ঘিরে,
আর কোরো না দেরি।
ওগো আমার মনোহরণ,
ওগো স্নিগ্ধ ঘনবরন,
দাঁড়াও, তোমায় হেরি।
দাঁড়াও গো ওই আকাশ-কোলে,
দাঁড়াও আমার হৃদয়-দোলে,
দাঁড়াও গো ওই শ্যামল-তৃণ-‘পরে,
আকুল চোখের বারি বেয়ে
দাঁড়াও আমার নয়ন ছেয়ে,
জন্মে জন্মে যুগে যুগান্তরে।
অমনি করে ঘনিয়ে তুমি এসো,
অমনি করে তড়িৎ-হাসি হেসো,
অমনি করে উড়িয়ে দিয়ো কেশ।
অমনি করে নিবিড় ধারা-জলে
অমনি করে ঘন তিমির-তলে
আমায় তুমি করো নিরুদ্দেশ।ওগো তোমার দরশ লাগি
ওগো তোমার পরশ মাগি
গুমরে মোর হিয়া।
রহি রহি পরান ব্যেপে
আগুন-রেখা কেঁপে কেঁপে
যায় যে ঝলকিয়া।
আমার চিত্ত-আকাশ জুড়ে
বলাকা-দল যাচ্ছে উড়ে
জানি নে কোন্ দূর-সমুদ্র-পারে।
সজল বায়ু উদাস ছুটে,
কোথায় গিয়ে কেঁদে উঠে
পথবিহীন গহন অন্ধকারে।
ওগো তোমার আনো খেয়ার তরী,
তোমার সাথে যাব অকূল-‘পরি,
যাব সকল বাঁধন-বাধা-খোলা।
ঝড়ের বেলা তোমার স্মিতহাসি
লাগবে আমার সর্বদেহে আসি,
তরাস-সাথে হরষ দিবে দোলা।ওই যেখানে ঈশান কোণে
তড়িৎ হানে ক্ষণে ক্ষণে
বিজন উপকূলে–
তটের পায়ে মাথা কুটে
তরঙ্গদল ফেনিয়ে উঠে
গিরির পদমূলে,
ওই যেখানে মেঘের বেণী
জড়িয়ে আছে বনের শ্রেণী–
মর্মরিছে নারিকেলের শাখা,
গরুড়সম ওই যেখানে
ঊর্ধ্বশিরে গগন-পানে
শৈলমালা তুলেছে নীল পাখা,
কেন আজি আনে আমার মনে
ওইখানেতে মিলে তোমার সনে
বেঁধেছিলেম বহুকালের ঘর–
হোথায় ঝড়ের নৃত্য-মাঝে
ঢেউয়ের সুরে আজো বাজে
যুগান্তরের মিলনগীতিস্বর।কে গো চিরজনম ভ’রে
নিয়েছ মোর হৃদয় হ’রে
উঠছে মনে জেগে।
নিত্যকালের চেনাশোনা
করছে আজি আনাগোনা
নবীন-ঘন মেঘে।
কত প্রিয়মুখের ছায়া
কোন্ দেহে আজ নিল কায়া,
ছড়িয়ে দিল সুখদুখের রাশি–
আজকে যেন দিশে দিশে
ঝড়ের সাথে যাচ্ছে মিশে
কত জন্মের ভালোবাসাবাসি।
তোমায় আমায় যত দিনের মেলা
লোক-লোকান্তে যত কালের খেলা
এক মুহূর্তে আজ করো সার্থক।
এই নিমেষে কেবল তুমি একা
জগৎ জুড়ে দাও আমারে দেখা,
জীবন জুড়ে মিলন আজি হোক।পাগল হয়ে বাতাস এল,
ছিন্ন মেঘে এলোমেলো
হচ্ছে বরিষন,
জানি না দিগ্দিগন্তরে
আকাশ ছেয়ে কিসের তরে
চলছে আয়োজন।
পথিক গেছে ঘরে ফিরে,
পাখিরা সব গেছে নীড়ে,
তরণী সব বাঁধা ঘাটের কোলে।
আজি পথের দুই কিনারে
জাগিছে গ্রাম রুদ্ধ দ্বারে,
দিবস আজি নয়ন নাহি খোলে।
শান্ত হ রে, শান্ত হ রে প্রাণ–
ক্ষান্ত করিস প্রগল্ভ এই গান,
ক্ষান্ত করিস বুকের দোলাদুলি।
হঠাৎ যদি দুয়ার খুলে যায়,
হঠাৎ যদি হরষ লাগে গায় যায়,
তখন চেয়ে দেখিস আঁখি তুলি। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dekho-cheye-girir-shire/
|
906
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অনেক নদীর জল
|
চিন্তামূলক
|
অনেক নদীর জল উবে গেছে —
ঘরবাড়ি সাকো ভেঙে গেল;
সে সব সময় ভেদ করে ফেলে আজ
কারা তবু কাছে চলে এল
যে সুর্য অয়নে নেই কোনো দিন,
— মনে তাকে দেকা যেত যদি —
যে নারী দেখে নি কেউ — ছ-সাতটি তারার তিমিরে
হৃদয়ে এসেছে সেই নদী।
তুমি কথা বল — আমি জীবন-মৃত্যুর শব্দ শুনি:
সকালে শিশির কণা যে-রকম ঘাসে
অচিরে মরণশীল হয়ে তবু সূর্যে আবার
মৃত্যু মুখে নিয়ে পরদিন ফিরে আসে।
জন্মতারকার ডাকে বার বার পৃথিবীতে ফিরে এসে আমি
দেখেছি তোমার চোখে একই ছায়া পড়ে:
সে কি প্রেম? অন্ধকার? — ঘাস ঘুম মৃত্যু প্রকৃতির
অন্ধ চলাচলের ভিতরে।
স্থির হয়ে আছে মন; মনে হয় তবু
সে ধ্রুব গতির বেগে চলে,
মহা-মহা রজনীর ব্রহ্মান্ডকে ধরে;
সৃষ্টির গভীর গভীর হংসী প্রেম
নেমেছে — এসেছে আজ রক্তের ভিতরে।‘এখানে পৃথিবী আর নেই–‘
ব’লে তারা পৃথিবরি জনকল্যাণেই
বিদায় নিয়েছে হিংসা ক্লান্তির পানে;
কল্যাণ, কল্যাণ; এই রাত্রির গবীরতর মানে।
শান্তি এই আজ;
এইখানে স্মৃতি;
এখানে বিস্মৃতি তবু; প্রেম
ক্রমায়াত আঁধারকে আলোকিত করার প্রমিতি।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/onek-nodir-jol/
|
632
|
জয় গোস্বামী
|
উপহার
|
প্রেমমূলক
|
এই লেখা বুক ভেঙে লিখিতুমি তা বুঝবে না।জানি।ঠিকই।এখন তোমার চতুর্দিক
সদ্য পাওয়া প্রেমিকের আনন্দে উন্মাদ!তোমার কথার আলতো ঠেলা
আমাকে উপহার দিয়ে গেছে
কালো এক অন্ধকার খাদ।
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/upohar/
|
4289
|
শামসুর রাহমান
|
অঙ্গীকার
|
প্রেমমূলক
|
ফিরে যাবো? কেন ফিরে যাবো বারবার?
জানি সিংহদ্বার
পেরুলেই পেয়ে যাবো আকাঙ্ক্ষিত সব
উপচার, যার জন্যে ভীষণের স্তব
করেছি সকালসন্ধ্যা, পেরিয়েছি ঝড়মত্ত নদী, কতো সিঁড়ি,
রক্তাপ্লুত, বারংবার নেমেছি খনিতে। আজো ফিরি
পথে পথে কেইনের মতো। ফিরে যাবো? প্রহরীর
রক্তচক্ষু দেখে ফিরে যাবো? তুমি তবুও বধির
হ’য়ে থাকবে সর্বক্ষণ? ডাকবে না সেখানে, যেখানে
আমার ব্যাকুল পদচ্ছাপ পড়েছিলো স্বপ্নে, মানে
অলৌকিক অভ্যন্তরে। এই রুদ্ধ সিংহদ্বার থেকে
হতাশায় ভগ্নরথ ফেলে রুক্ষ ক্লান্ত মুখ ঢেকে
গেছেন আমার পিতামহগণ ফিরে। আমার শপথ,
প্রাপ্য ছাড়া আমিতো যাবো না ফিরে, থামাবো না রথ। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/onggikar/
|
5078
|
শামসুর রাহমান
|
মঞ্চের মাঝখানে
|
রূপক
|
ভয়ানক ভয় পেয়ে গেছি। এরকম পরিস্থিতি
হবে, যাকে বলে
স্বপ্নেও ভাবিনি কোনো দিন। আমাকে সবাই মিলে
করিয়ে দিয়েছে দাঁড়। এ ব্যাপারে সত্যি বলতে কী,
প্রস্তুতি ছিল না এতটুকু।
এই চোখ ধাঁধানো আলোয়
মনে হলো আমি যেন সুদূর নূহের আমলের জালার ভেতর থেকে বেরিয়ে
এসেছি
অকস্মাৎ,
যেমন ডিমের
সাদাটে খোলস ভেঙে বড় কোন পাখির শাবক
এসে যায় রোদে। চুলে
চিরুনির আঁচড় পড়েনি কতকাল, নখগুলো
দীর্ঘ আর নোংরা, শার্ট বোতামবিহীন। সেই কবে।
স্বপ্নের ভেতর এক জোড়া মোকাসিন
হারিয়ে ফেলেছিলাম, তখন থেকেই নাঙা পায়ে
কেবলি ঘুরছি দিগ্ধিদিক। ট্রাউজার
ঊর্ণনাভ জাল দিয়ে তৈরি, দোমড়ানো-মোচড়ানো।আমাকে বলতে হবে কিছু কথা শ্রোতার উদ্দেশে,
যারা বসে আছেন সমুখে,
বাগানের কেয়ারির ফুলের মতন সারি সারি। কী বলব
এমন যা শুনে তাঁরা মুগ্ধতার ঘোরে
বাহবা দেবেন ঘন ঘন? হলঘর
করতালিময় হয়ে উঠবে নিমেষে? অতিশয়
নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি, ঠোঁট
শিলীভূত বহু আগেকার মৃতদের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে কানে,
সেসব প্রাচীন কণ্ঠস্বর আজ ঠাঁই পেতে চায়
আমার গলায়। আমি কান
বন্ধ করে বোধহীনতায় ডুবে থাকি। কিছুক্ষণ।
এবং উইংস-এর অন্তরালে প্রম্পটার সাজবার ভীষণ হিড়িক
পড়ে যায়। কে কার ওপরে
টেক্কা দিয়ে জোগাবে আমার মুখে নিজেদের কথা,
এ নিয়ে বিস্তর
কিচিরমিচির শোনা গেল। কিন্তু আমি
যদি বলি কোনো কথা তাহলে করব উচ্চারণ
আমার আপন কথা, যতটুকু পারি
নিজেরই ধরনে।আমি মুখ খুলতেই দেখি হলঘরে কোনো সিটে কেউ নেই, কবরখানার
নিস্তব্ধতা ভর করে আছে চতুর্দিকে। নিরর্থক
ভয়ে আমি কাঠ হয়ে ছিলাম এ মঞ্চে সারাক্ষণ। (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/moncher-majhkhane/
|
1975
|
বিনয় মজুমদার
|
সন্তপ্ত কুসুম ফুটে
|
প্রেমমূলক
|
সন্তপ্ত কুসুম ফুটে পুনরায় ক্ষোভে ঝরে যায়।
দেখে কবিকুল এত ক্লেশ পায়, অথচ হেতরু,
তুমি নিজে নির্বিকার, এই প্রিয় বেদনা বোঝো না।
কে ক্থোয় নিভে গেছে তার গুপ্ত কাহিনী জানি।
নিজের অন্তর দেখি, কবিতার কোনো পঙক্তি আর
মনে নেই গোধূলিতে; ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই।
অথবা গৃহের থেকে ভুল বহির্গত কোনো শিশু
হারিয়ে গিয়েছে পথে, জানে না সে নিজের ঠিকানা।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4048.html
|
163
|
আহসান হাবীব
|
রূপকথা
|
ছড়া
|
খেলাঘর পাতা আছে এই এখানে,
স্বপ্নের ঝিকিমিকি আঁকা যেখানে।
এখানে রাতের ছায়া ঘুমের নগর,
চোখের পাতায় ঘুম ঝরে ঝরঝর।
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের,
আকাশের নীল রং ছাউনিতে এর।
পরীদের ডানা দিয়ে তৈরি দেয়াল,
প্রজাপতি রং মাখা জানালার জাল।
তারা ঝিকিমিকি পথ ঘুমের দেশের,
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের।ছোট বোন পারুলের হাতে রেখে হাত,
সাতভাই চম্পার কেটে যায় রাত।
কখনও ঘোড়ায় চড়ে হাতে নিয়ে তীর,
ঘুরে আসি সেই দেশ চম্পাবতীর।
এই খানে আমাদের মানা কিছু নাই,
নিজেদের খুশি মত কাহিনী বানাই।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3794.html
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.