id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
4607
|
শামসুর রাহমান
|
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
|
মানবতাবাদী
|
এদেশে হায়েনা, নেকড়ের পাল,
গোখরো, শকুন, জিন কি বেতাল
জটলা পাকায় রাস্তার ধারে।
জ্যান্ত মানুষ ঘুমায় ভাগাড়ে।অথচ তোমার চুল খুলে দাও তুমি।
এদেশে কতো যে ফাঁকির আছিলা,
কালোবাজারের অপরূপ লীলা।
আত্মহত্যা গুম খুন আর
ফটকা বাজার-সব একাকার।এখনও খোঁপায় ফুল গুঁড়ে দাও তুমি।মড়ক-মারির কান্নার রোল
সারা দেশটার পাল্টায় ভোল।
হা-ভাতে ছোঁড়ারা হুজুরের দোরে
সোনালি আমের মরশুমে ঘোরে।
এখনও তোমার বাহু মেলে দাও তুমি।এদেশে আ’মরি যখন-তখন
বারো ভূতে খায় বেশ্যার ধন।
পান নাকো হুঁকো জ্ঞানীণ্ডণীজন,
প্রভুরা রাখেন ঠগেদের মন।
এখনও গানের সুরে ভেসে যাও তুমি।এদেশে নেতারা হাওদায় চ’ড়ে
শিকার গাঁথেন বাক্যের শরে,
আসলের চেয়ে মেকিটাই দামি।
বিচিত্র দেশ, কৃতজ্ঞ আমিএখনও যে মেয়ে হাসি জ্বেলে দাও তুমি। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kritoggota-sikar/
|
1614
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
ধ্বংসের আগে
|
সনেট
|
তবে ব্যর্থ হোক সব। উৎসব-উজ্জ্বল রজনীর
সমস্ত সংগীত তবে কেড়ে নাও, নিত্য-সহচর
ব্যর্থবীর্য শয়তানের আবির্ভাব হোক। তারপর
পাতালের সর্বনাশা অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে
দৃঢ় হাতে টেনে দাও যবনিকা। নির্মম অস্থির
পদক্ষেপে আনো ভয়, বিস্বাদ বেদনা ঢেলে দাও;
ঢালো গ্লানি, ঢালো মৃত্যু, শিল্পীর বেহালা ভেঙে ফেলে
অন্ধকার রঙ্গমঞ্চে অট্টহাসি দু’হাতে ছড়াও।
কেননা আমি তো শিল্পী। যে-মন্ত্রে সমস্ত হাহাকার
ব্যর্থ হয়। মজ্জামাংস জোড়া লাগে ছিন্নভিন্ন হাড়ে,
যে-মন্ত্রে উজ্জ্বল রক্ত নেমে আসে অস্থি-র পাহাড়ে
প্রাণের রক্তিম ফুল ফুটে ওঠে মৃত্যুহীন গাছে,
সে-মন্ত্র আমার জানা,–তাই মৃত্যু হানো যতবার
যে জানে প্রাণের মন্ত্র, কতটুকু মৃত্যু তার কাছে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1622
|
2884
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কল্পনামধুপ
|
সনেট
|
প্রতিদিন প্রাতে শুধু গুন্ গুন্ গান ,
লালসে অলস-পাখা অলির মতন ।
বিকল হৃদয় লয়ে পাগল পরান
কোথায় করিতে যায় মধু অন্বেষণ ।
বেলা বহে যায় চলে — শ্রান্ত দিনমান ,
তরুতলে ক্লান্ত ছায়া করিছে শয়ন ,
মুরছিয়া পড়িতেছে বাঁশরির তান ,
সেঁউতি শিথিলবৃন্ত মুদিছে নয়ন ।
কুসুমদলের বেড়া , তারি মাঝে ছায়া ,
সেথা বসে করি আমি কল্পমধু পান —
বিজনে সৌরভময়ী মধুময়ী মায়া ,
তাহারি কুহকে আমি করি আত্মদান —
রেণুমাখা পাখা লয়ে ঘরে ফিরে আসি
আপন সৌরভে থাকি আপনি উদাসী । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kolponamodhup/
|
4340
|
শামসুর রাহমান
|
আজ কার কাছে
|
প্রেমমূলক
|
আজ কার কাছে উন্মোচন করি আমার হৃদয়?
এই যে বাড়ির কাছে গাছপালা দাঁড়ানো সেগুলো
এখন সবুজ মনে হচ্ছে না তেমন, আকাশের
নীলিমা, নক্ষত্র আকর্ষণহারা, যে গায়ক পাখি
রেলিঙে বসলো এসে তার শিস কেমন বেসুরো
লাগে আর মহান দান্তের কাব্যগ্রন্থ ‘নরক’-এর
মাত্র দু’তিনটি পঙ্ক্তি পড়ার পরেই রেখে দিই,
রবীন্দ্রনাথের গানও আন্দোলিত করে না আমাকে।এ শহর থেকে তুমি বিদায় নেওয়ার পর এই
অত্যন্ত করুণ হাল হয়েছে আমার, প্রিয়তমা।
হৈ-হৈ বইমেলা, মানুষের ভিড়, আড্ডা, মদ্যপান-
কিছুই লাগে না ভালো। একা একা থাকি, নিজেকেই
ছন্নছাড়া প্রেতপ্রায় মনে হয়। নিভৃতে হৃদয়
খুঁড়ি, ঘুরি, খুঁজি আমাদের অন্তরঙ্গ ক্ষণগুলি। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/aj-kar-kache/
|
5442
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
উদ্যোগ
|
স্বদেশমূলক
|
বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।
মূঢ় শত্রুকে হানো স্রোত রুখে, তন্দ্রাকে করো ছিন্ন,
একাগ্র দেশে শত্রুরা এসে হয়ে যাক নিশ্চিহ্ন।
ঘরে তোল ধান, বিপ্লবী প্রাণ প্রস্তুত রাখ কাস্তে,
গাও সারিগান, হাতিয়ারে শান দাও আজ উদয়াস্তে।
আজ দৃঢ় দাঁতে পুঞ্জিত হাতে প্রতিরোধ করো শক্ত,
প্রতি ঘাসে ঘাসে বিদ্যুৎ আসে জাগে সাড়া অব্যক্ত।
আজকে মজুর হতুড়ির সুর ক্রমশই করে দৃপ্ত,
আসে সংহতি; শত্রুর প্রতি ঘৃণা হয় নিক্ষিপ্ত।
ভীরু অন্যায় প্রাণ-বন্যায় জেনো আজ উচ্ছেদ্য,
বিপন্ন দেশে তাই নিঃশেষে ঢালো প্রাণ দুর্ভেদ্য!
সব প্রস্তুত যুদ্ধের দূত হানা দেয় পুব-দরজায়,
ফেনী ও আসামে, চট্টগ্রামে ক্ষিপ্ত জনতা গর্জায়।
বন্ধু, তোমারা ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।। (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/udyog/
|
3633
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বেদনায় সারা মন
|
ছড়া
|
বেদনায় সারা মন
করতেছে টনটন্
শ্যালী কথা বলল না
সেই বৈরাগ্যে।
মরে গেলে ট্রাস্টিরা
করে দিক বণ্টন
বিষয়-আশয় যত–
সবকিছু যাক গে।
উমেদারি-পথে আহা
ছিল যাহা সঙ্গী–
কোথা সে শ্যামবাজার
কোথা চৌরঙ্গি–
সেই ছেঁড়া ছাতা চোরে
নেয় নাই ভাগ্যে–
আর আছে ভাঙা ঐ
হ্যারিকেন লণ্ঠন,
বিশ্বের কাজে তারা
লাগে যদি লাগ্ গে। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bedonai-sara-mon/
|
963
|
জীবনানন্দ দাশ
|
একটি কবিতা
|
প্রেমমূলক
|
আমার আকাশ কালো হ'তে চায় সময়ের মির্মম আঘাতে
জানি, তবু ভোরে রাত্রে, এই মহাসময়ের কাছে
নদী খেত বনানীর ঝাউয়ের ঝরা সোনার মতন
সূর্য তারাবীথির সমস্ত অগ্নির শক্তি আছে।
হে সুবর্ণ, হে গভীর গতির প্রবাহ,
আমি মন সচেতন;- আমার শরীর ভেঙ্গে ফেলে
নতুন শরীর করো -নারীকে যে উজ্জ্বল প্রাণনে
ভালোবেসে আভা আলো শিশিরের উৎসের মতন
সজ্জন স্বর্ণের মতো শিল্পীর হাতের থাকে নেমে
হে আকাশ, হে সময়গ্রন্থি সনাতন,
আমি জ্ঞান আলো গান মহিলাকে ভালোবেসে আজ;
সকলের নীলকন্ঠ পাখি জল সূর্যের মতন।
#বেলা অবেলা কালবেলা
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ekti-kobita/
|
5458
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
চট্টগ্রামঃ ১৯৪৩
|
মানবতাবাদী
|
ক্ষুদার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম-
চট্টগ্রামঃ বীর চট্টগ্রাম!
বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা
আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে
বিদ্যুৎপ্রবাহ আনে, আনে আজ চেতনার দিন।
চট্টগ্রামঃ বীর চট্টগ্রাম!
এখনো নিস্তব্ধ তুমি
তাই আজো পাশবিকতার
দুঃসহ মহড়া চলে,
তাই আজো শত্রুরা সাহসী।
জানি আমি তোমার হৃদয়ে
অজস্র ঔদার্য আছে; জানি আছে সুস্থ শালীনতা
জানি তুমি আঘাতে আঘাতে
এখনও স্তিমিত নও, জানি তুমি এখনো উদ্দাম-
হে চট্টগ্রাম!
তাই আজো মনে পড়ে রক্তাক্ত তোমাকে
সহস্র কাজের ফাঁকে মনে পড়ে শার্দূলের ঘুম
অরণ্যের স্বপ্ন চোখে, দাঁতে নখে প্রতিজ্ঞা কঠোর।
হে অভুক্ত ক্ষুদিত শ্বাপদ-
তোমার উদ্যত থাবা, সংঘবদ্ধ প্রতিটি নখর
এখনো হয় নি নিরাপদ।
দিগন্তে দিগন্তে তাই ধ্বনিত গর্জন
তুমি চাও শোণিতের স্বাদ-
যে স্বাদ জেনেছে স্তালিনগ্রাদ।
তোমার সংকল্পস্রোতে ভেসে যাবে লোহার গরাদ
এ তোমার নিশ্চিত বিশ্বাস।
তোমার প্রতিজ্ঞা তাই আমার প্রতিজ্ঞা, চট্টগ্রাম!
আমার হৃৎপিণ্ডে আজ তারি লাল স্বাক্ষর দিলাম।।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/post20160509035904/
|
2511
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
বাবার স্মরণে
|
শোকমূলক
|
সকালের খবরের কাগজটা নিয়ে আর
কারো সাথে টানাটানি হয় না,
''একটু থাম না খোকা, শিরোনামগুলো দেখি,''
এ কথা এখন কেউ কয় না ।
প্রতি ভোরে কাগজটা দরোজায় পড়ে থাকে
চেয়ে দেখি যেই ---
বড় বেশী মনে পড়ে, বাবা তোমাকেই ।।কাজে বের হতে গেলে, কাঁধে হাত রেখে,
বলো না এখন তুমি, ''সাবধানে যাস,''
থমকে দাঁড়িয়ে তবু অপেক্ষা করি ---
বুক ভরে জমে ওঠে গাঢ় নিঃশ্বাস ।
পথে যেতে সারা-পথ ভাবি আর ভাবি
কেন চলে যেতে হয়, কেন তুমি নেই ।।রাতে ঘরে ফিরে দেখি --- দরোজায় এসে
''এতো দেরী হয় কেন'' -- বলছে না কেউ,
থমকে দাঁড়িয়ে তবু অপেক্ষা করি ---
যদি ফেরে হারানো সে সময়ের ঢেউ !
জেগে জেগে সারা রাত নীরবেই কাঁদি
একা নীরবতা আর, একা আমি এই ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/babar-shorone/
|
5693
|
সুকুমার রায়
|
সঙ্গীহারা
|
ছড়া
|
সবাই নাচে ফূর্তি করে সবাই করে গান,
একলা বসে হাঁড়িচাঁচার মুখটি কেন ম্লান ?
দেখ্ছ নাকি আমার সাথে সবাই করে আড়ি-
তাইত আমার মেজাজ খ্যাপা মুখটি এমন হাঁড়ি ।
তাও কি হয় ! ঐ যে মাঠে শালিখ পাখি ডাকে
তার কাছে কৈ যাওনিকো ভাই শুধাওনিতো তাকে !
শালিখ পাখি বেজায় ঠ্যাঁটা চেঁচায় মিছিমিছি,
হল্লা শুনে হাড় জ্বলে যায় কেবল কিচিমিচি ।
মিষ্টি সুরে দোয়েল পাখি জুড়িয়ে দিল প্রাণ
তার কাছে কৈ বস্লে নাতো শুনলে না তার গান ।
দোয়েল পাখির ঘ্যান্ঘ্যানানি আর কি লাগে ভালো ?
যেমন রূপে তেমন গুণে তেমনি আবার কালো ।
রূপ যদি চাও যাও না কেন মাছরাঙার কাছে,
অমন খাসা রঙের বাহার আর কি কারো আছে ?
মাছরাঙা ? তারেও কি আর পাখির মধ্যে ধরি
রকম সকম সঙের মতন, দেমাক দেখে মরি ।
পায়রা ঘুঘু কোকিল চড়াই চন্দনা টুনটুনি
কারে তোমার পছন্দ হয়, সেই কথাটি শুনি !
এই গুলো সব ছ্যাবলা পাখি নেহাৎ ছোট জাত-
দেখলে আমি তফাৎ হাটি অমনি পঁচিশ হাত ।
এতক্ষণে বুঝতে পারি ব্যাপারখানা কি যে-
সবার তুমি খুঁৎ পেয়েছ নিখুঁৎ কেবল নিজে !
মনের মতন সঙ্গী তোমার কপালে নাই লেখা
তাইতে তোমায় কেউ পোঁছে না তাইতে থাক একা ।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/shongihara/
|
5570
|
সুকুমার রায়
|
আনন্দ
|
ভক্তিমূলক
|
যে আনন্দ ফুলের বাসে,
যে আনন্দ পাখির গানে,
যে আনন্দ অরুণ আলোয়,
যে আনন্দ শিশুর প্রাণে,
যে আনন্দ বাতাস বহে,
যে আনন্দ সাগরজলে,
যে আনন্দ ধুলির কণায়,
যে আনন্দ তৃণের দলে,
যে আনন্দ আকাশ ভরা ,
যে আনন্দ তারায় তারায়,
যে আনন্দ সকল সুখে,
যে আনন্দ রক্তধারায়
সে আনন্দ মধুর হয়ে
তোমার প্রাণে পড়ুক ঝরি,
সে আনন্দ আলোর মত
থাকুক তব জীবন ভরি।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
4085
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
অবেলায় শঙ্খধ্বনি
|
মানবতাবাদী
|
অতোটা হৃদয় প্রয়োজন নেই,
কিছুটা শরীর কিছুটা মাংস মাধবীও চাই।
এতোটা গ্রহণ এতো প্রশংসা প্রয়োজন নেই
কিছুটা আঘাত অবহেলা চাই প্রত্যাখান।
সাহস আমাকে প্ররোচনা দেয়
জীবন কিছুটা যাতনা শেখায়,
ক্ষুধা ও খরার এই অবেলায়
অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই।
বুকে ঘৃণা নিয়ে নীলিমার কথা
অনাহারে ভোগা মানুষের ব্যথা
প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই-
করুণাকাতর বিনীত বাহুরা ফিরে যাও ঘরে।
নষ্ট যুবক ভ্রষ্ট আঁধারে কাঁদো কিছুদিন
কিছুদিন বিষে দহনে দ্বিধায় নিজেকে পোড়াও
না হলে মাটির মমতা তোমাতে হবে না সুঠাম,
না হলে আঁধার আরো কিছুদিন ভাসাবে তোমাকে।
অতোটা প্রেমের প্রয়োজন নেই
ভাষাহীন মুখ নিরীহ জীবন
প্রয়োজন নেই- প্রয়োজন নেই
কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই কিছুটা আঘাত
রক্তে কিছুটা উত্তাপ চাই, উষ্ণতা চাই
চাই কিছু লাল তীব্র আগুন।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/317
|
360
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
নবযুগ
|
মানবতাবাদী
|
-বিশ বৎসর আগে
তোমার স্বপ্ন অনাগত ‘নবযুগ’-এর রক্তরাগে
রেঙে উঠেছিল। স্বপ্ন সেদিন অকালে ভাঙিয়া গেল,
দৈবের দোষে সাধের স্বপ্ন পূর্ণতা নাহি পেল!
যে দেখায়েছিল সে মহৎ স্বপ্ন, তাঁরই ইঙ্গিতে বুঝি
পথ হতে হাত ধরে এনেছিলে এই সৈনিকে খুঁজি?
কোথা হতে এল লেখার জোয়ার তরবারি-ধরা হাতে
কারার দুয়ার ভাঙিতে চাহিনু নিদারুণ সংঘাতে।–
হাতের লেখনী, কাগজের পাতা নহে ঢাল তলোয়ার,
তবুও প্রবল কেড়ে নিল দুর্বলের সে অধিকার!
মোর লেখনীর বহ্নিস্রোত বাধা পেয়ে পথে তার
প্রলয়ংকর ধূমকেতু হয়ে ফিরিয়া এল আবার!
ধূমকেতু-সম্মার্জনী মোর করে নাই মার্জনা
কারও অপরাধ ; অসুরে নিত্য হানিয়াছে লাঞ্ছনা!-
হারাইয়া গেনু ধুমকেতু আমি দু-দিনের বিস্ময়,
মরা তারাসম ঘুরিয়া ফিরিনু শূন্য আকাশময়।সে যুগের ওগো জগলুল! আমি ভুলিনি তোমার স্নেহ,
স্মরণে আসিত তোমার বিরাট হৃদয়, বিশাল দেহ।
কত সে ভুলের কাঁটা দলি, কত ফুল ছড়াইয়া তুমি,
ঘুরিয়া ফিরেছ আকুল তৃষায় জীবনের মরুভূমি।
আমি দেখিতাম, আমার নিরালা নীল আশমান থেকে
চাঁদের মতন উঠিতেছ, কভু যাইতেছ মেঘ ঢেকে।
সুদূরে থাকিয়া হেরিতাম তব ভুলের ফুলের খেলা,
কে যেন বলিত, এ চাঁদ একদা হইবে পারের ভেলা।সহসা দেখিনু, এই ভেলা যাহাদের পার করে দিল,
যে ভেলার দৌলত ও সওদা দশ হাতে লুটে নিল,
বিশ্বাসঘাতকতা ও আঘাত-জীর্ণ সেই ভেলায়
উপহাস করে তাহারাই আজ কঠোর অবহেলায়!
মানুষের এই অকৃতজ্ঞতা দেখি উঠি শিহরিয়া,
দানীরে কি ঋণী স্বীকার করিল এই সম্মান দিয়া?
যত ভুল তুমি করিয়াছ, তার অনেক অধিক ফুল
দিয়াছ রিক্ত দেশের ডালায়, দেখিল না বুলবুল!
যে সূর্য আলো দেয়, যদি তার আঁচ একটুকু লাগে,
তাহারই আলোকে দাঁড়ায়ে অমনি গাল দেবে তারে রাগে?
নিত্য চন্দ্র সূর্য; তারাও গ্রহণে মলিন হয়;
তাই বলে তার নিন্দা করা কি বুদ্ধির পরিচয়?
এই কী বিচার লোভী মানুষের? বক্ষে বেদনা বাজে,
অর্থের তরে অপমান করে আপনার শির-তাজে!
দুঃখ কোরো না, ক্ষমা করো, ওগো প্রবীণ বনস্পতি!
যার ছায়া পায় তারই ডাল কাটে অভাগা মন্দমতি।আমি দেখিয়াছি দুঃখীর তরে তোমার চোখের পানি,
এক আল্লাহ্ জানেন তোমারে, দিয়াছ কী কোরবানি!
এরা অজ্ঞান, এরা লোভী, তবু ইহাদেরে করো ক্ষমা,
আবার এদেরে ডেকে আল্লার ঈদ্গাহে করো জমা।
শপথ করিয়া কহে এ বান্দা তার আল্লার নামে,
কোনো লোভ কোনো স্বার্থ লইয়া দাঁড়াইনি আমি বামে।
যে আল্লা মোরে রেখেছেন দূরে সব চাওয়া পাওয়া হতে,
চলিতে দেননি যিনি বিদ্বেষ-গ্লানিময় রাজপথে,
যে পরম প্রভু মোর হাতে দিয়া তাঁহার নামের ঝুলি,
মসনদ হতে নামায়ে, দিলেন আমারে পথের ধূলি,
সেই আল্লার ইচ্ছায় তুমি ডেকেছ আমারে পাশে!–
অগ্নিগিরির আগুন আবার প্রলয়ের উল্লাসে
জাগিয়ে উঠেছে, তাই অনন্ত লেলিহান শিখা মেলি,
আসিতে চাহিছে কে যেন বিরাট পাতাল-দুয়ার ঠেলি,
অনাগত ভূমিকম্পের ভয়ে দুনিয়ায় দোলা লাগে,
দ্যাখো দ্যাখো শহিদান ছুটে আসে মৃত্যুর গুলবাগে!
কে যেন কহিছে, ‘বান্দা আর এক বান্দার হাত ধরো,
মোর ইচ্ছায় ওর ইচ্ছারে তুমি সাহায্য করো,’
তাই নবযুগ আসিল আবার। রুদ্ধ প্রাণের ধারা
নাচিছে মুক্ত গগনের তলে দুর্দম মাতোয়ারা।
এই নবযুগ ভুলাইবে ভেদ, ভায়ে ভায়ে হানাহানি,
এই নবযুগ ফেলিবে ক্লৈব্য ভীরুতারে দূরে টানি।
এই নবযুগ আনিবে জরার বুকে নবযৌবন,
প্রাণের প্রবাহ ছুটিবে, টুটিবে জড়তার বন্ধন।
এই নবযুগ সকলের, ইহা শুধু আমাদের নহে,
সাথে এসো নওজোয়ান! ভুলিয়া থেকো না মিথ্যা মোহে।
ইহা নহে কারও ব্যাবসার, স্বদেশের স্বজাতির এ যে,
শোনো আশমানে এক আল্লার ডঙ্কা উঠিছে বেজে।মোরা জনগণ, শতকরা মোরা নিরানব্বই জন,
মোরাই বৃহৎ, সেই বৃহতের আজ নবজাগরণ।
ক্ষুদ্রের দলে কে যাবে তোমরা ভোগবিলাসের লোভে?
আর দেরি নাই, ওদের কুঞ্জ ধূলিলুন্ঠিত হবে!
আছে হাদের বৃহতের তৃষা, নির্ভয় যার প্রাণ,
সেই বীরসেনা লয়ে জয়ী হবে নবযুগ-অভিযান।
আল্লার রাহে ভিক্ষা চাহিতে নবযুগ আসিয়াছে,
মহাভিক্ষুরে ফিরায়ো না, দাও যার যাহা কিছু আছে।
জাগিছে বিরাট দেহ লয়ে পুন সুপ্ত অগ্নিগিরি,
তারই ধোঁয়া আজ ধোঁয়ায়ে উঠেছে আকাশভুবন ঘিরি।
একী এ নিবিড় বেদনা
একী এ বিরাট চেতনা
জাগে পাষাণের শিরায় শিরায়, সাথে জনগণ জাগে,
হুংকারে আজ বিরাট, ‘বক্ষে কার পা-র ছোঁয়া লাগে,
কোন মায়াঘুমে ঘুমায়ে ছিলাম, বুঝি সেই অবসরে
ক্ষুদ্রের দল বৃহতের বুকে বসে উৎপাত করে!
মোর অণুপরমাণু জনগণ জাগো, ভাঙো ভাঙো দ্বার,
রুদ্র এসেছে বিনাশিতে আজ ক্ষুদ্র অহংকার।’ (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/nobojug/
|
1247
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সূর্যতামসী
|
চিন্তামূলক
|
কোথাও পাখির শব্দ শুনি;
কোনো দিকে সমুদ্রের সুর;
কোথাও ভোরের বেলা র’য়ে গেছে – তবে।
অগণন মানুষের মৃত্যু হ’লে – অন্ধকারে জীবিত ও মৃতের হৃদয়
বিস্মিতের মতো চেয়ে আছে;
এ কোন সিন্ধুর সুর:
মরণের – জীবনের?
এ কি ভোর?
অনন্ত রাত্রির মতো মনে হয় তবু।
একটি রাত্রির ব্যথা সয়ে -
সময় কি অবশেষে এ-রকম ভোরবেলা হয়ে
আগামী রাতের কালপুরুষের শস্য বুকে ক’রে জেগে ওঠে?
কোথাও ডানার শব্দ শুনি;
কোন দিকে সমুদ্রের সুর -
দক্ষিণের দিকে,
উত্তরের দিকে,
পশ্চিমের পানে?সৃজনের ভয়াবহ মানে;
তবু জীবনের বসন্তের মতন কল্যাণে
সূর্যালোকিত সব সিন্ধু-পাখিদের শব্দ শুনি;
ভোরের বদলে তবু সেইখানে রাত্রি করোজ্জ্বল
ভিয়েনা, টোকিও, রোম, মিউনিখ – তুমি?
সার্থবাহ, সার্থবাহ, ওইদিকে নীল
সমুদ্রের পরিবর্তে আটলাণ্টিক চার্টার নিখিল মরুভূমি!
বিলীন হয় না মায়ামৃগ – নিত্য দিকদর্শিন;
যা জেনেছে – যা শেখেনি -
সেই মহাশ্মশানের গর্ভাঙ্কে ধূপের মত জ্ব’লে
জাগে না কি হে জীবন – হে সাগর -
শকুন্ত-ক্রান্তির কলরোলে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shurjotamshi/
|
3409
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পূজার সাজ
|
ছড়া
|
আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি,
পূজার সময় এল কাছে।
মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই,
আনন্দে দু-হাত তুলি নাচে।
পিতা বসি ছিল দ্বারে, দুজনে শুধালো তারে,
‘কী পোশাক আনিয়াছ কিনে। '
পিতা কহে, ‘আছে আছে তোদের মায়ের কাছে,
দেখিতে পাইবি ঠিক দিনে। '
সবুর সহে না আর— জননীরে বার বার
কহে, ‘মা গো, ধরি তোর পায়ে,
বাবা আমাদের তরে কী কিনে এনেছে ঘরে
একবার দে না মা, দেখায়ে। '
ব্যস্ত দেখি হাসিয়া মা দুখানি ছিটের জামা
দেখাইল করিয়া আদর।
মধু কহে, ‘আর নেই?' মা কহিল, ‘আছে এই
একজোড়া ধুতি ও চাদর। '
রাগিয়া আগুন ছেলে, কাপড় ধুলায় ফেলে
কাঁদিয়া কহিল, ‘চাহি না মা,
রায়বাবুদের গুপি পেয়েছে জরির টুপি,
ফুলকাটা সাটিনের জামা। '
মা কহিল, ‘মধু, ছি ছি, কেন কাঁদ মিছামিছি,
গরিব যে তোমাদের বাপ।
এবার হয় নি ধান, কত গেছে লোকসান,
পেয়েছেন কত দুঃখতাপ। তবু দেখো বহু ক্লেশে তোমাদের ভালোবেসে
সাধ্যমত এনেছেন কিনে।
সে জিনিস অনাদরে ফেলিলি ধূলির ‘পরে—
এই শিক্ষা হল এতদিনে। '
বিধু বলে, ‘এ কাপড় পছন্দ হয়েছে মোর,
এই জামা পরাস আমারে। '
মধু শুনে আরো রেগে ঘর ছেড়ে দ্রুতবেগে
গেল রায়বাবুদের দ্বারে।
সেথা মেলা লোক জড়ো, রায়বাবু ব্যস্ত বড়ো;
দালান সাজাতে গেছে রাত।
মধু যবে এক কোণে দাঁড়াইল ম্লান মনে
চোখে তাঁর পড়িল হঠাৎ।
কাছে ডাকি স্নেহভরে কহেন করুণ স্বরে
তারে দুই বাহুতে বাঁধিয়া,
‘কী রে মধু, হয়েছে কী। তোরে যে শুক্নো দেখি। '
শুনি মধু উঠিল কাঁদিয়া,
কহিল, ‘আমার তরে বাবা আনিয়াছে ঘরে
শুধু এক ছিটের কাপড়। '
শুনি রায়মহাশয় হাসিয়া মধুরে কয়,
‘সেজন্য ভাবনা কিবা তোর। '
ছেলেরে ডাকিয়া চুপি কহিলেন, ‘ওরে গুপি,
তোর জামা দে তুই মধুকে। '
গুপির সে জামা পেয়ে মধু ঘরে যায় ধেয়ে
হাসি আর নাহি ধরে মুখে।
বুক ফুলাইয়া চলে— সবারে ডাকিয়া বলে,
‘দেখো কাকা! দেখো চেয়ে মামা!
ওই আমাদের বিধু ছিট পরিয়াছে শুধু,
মোর গায়ে সাটিনের জামা। '
মা শুনি কহেন আসি লাজে অশ্রুজলে ভাসি
কপালে করিয়া করাঘাত,
‘হই দুঃখী হই দীন কাহারো রাখি না ঋণ,
কারো কাছে পাতি নাই হাত।
তুমি আমাদেরই ছেলে ভিক্ষা লয়ে অবহেলে
অহংকার কর ধেয়ে ধেয়ে!
ছেঁড়া ধুতি আপনার ঢের বেশি দাম তার
ভিক্ষা-করা সাটিনের চেয়ে।
আয় বিধু, আয় বুকে, চুমো খাই চাঁদমুখে,
তোর সাজ সব চেয়ে ভালো।
দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে
ছিটের জামাটি করে আলো। ' (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/puja-saj/
|
4215
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
ছেলেটা
|
চিন্তামূলক
|
ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে
মানুষ ছিলো নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো ।
অন্ধ ছেলে, বন্ধ ছেলে, জীবন আছে জানলায়
পাথর কেটে পথ বানানো , তাই হয়েছে ব্যর্থ ।
মাথায় ক্যারা , ওদের ফেরা যতোই থাক রপ্ত
নিজের গলা দুহাতে টিপে বরণ করা মৃত্যু
ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে
মানুষ ছিলো নরম, কেটে , ছড়িয়ে দিলে পারতো।
পথের হদিস পথই জানে, মনের কথা মত্ত
মানুষ বড় শস্তা , কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%9f%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a7%8b%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af/#respond
|
2416
|
মাকিদ হায়দার
|
এখন
|
চিন্তামূলক
|
(কবি মাহমুদ আল জামানকে, শ্রদ্ধাসহ)প্রথমে ওয়েব সাইটে দেখুন,
না হলে ফ্যাক্সে খোঁজ নিন৷
তারপরেও যদি না পাওয়া যায়
তাহলে সার্চ করুন ইন্টারনেটে৷
এই বলে তিনি
দ্রুত পায়ে চলে এলেন
অফিসের গেটে
দাঁড়ানো গাড়ীর কাছে৷বোশেখের তপ্তরোদে
চারিদিক যখন পুড়ে ছারখার
তখন কাউকে কিছু না জানিয়ে
গাড়ীর মালিক
পায়ে হেঁটে
কিছুদূর যেতে না যেতেই
সেই লোকটির সাথে দেখা,
যাকে তিনি
একটু আগেই ধরতে চেয়েছিলেন
ইন্টারনেটে
ফ্যাক্সে
ওয়েব সাইটে৷ধৃত লোকটি বললেন–কণ্ঠ ভোটে
পার্লামেন্ট পাশ করে দিয়েছে
এখন থেকে আমরা সকলেই
গাইতে পারবোপুরাতন জাতীয় সংগীত৷
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%a6-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b0/
|
5642
|
সুকুমার রায়
|
পাকাপাকি
|
ছড়া
|
আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে,
কাঁচা ইট পাকা হয় পোড়ালে তা আগুনে।
রোদে জলে টিকে রঙ পাকা কই তাহারে।
ফলারটি পাকা হয় লুচি দই আহারে।
হাত পাকে লিখে লিখে, চুল পাকে বয়সে,
জ্যাঠামিতে পাকা ছেলে বেশি কথা কয় সে।
লোকে কয় কাঁঠাল সে পাকে নাকি কিলিয়ে?
বুদ্ধি পাকিয়ে তোলে লেখাপড়া গিলিয়ে!
কান পাকে ফোড়া পাকে, পেকে করে টন্টন্-
কথা যার পাকা নয়, কাজে তার ঠন্ঠন্
রাঁধুনী বসিয়া পাকে পাক দেয় হাঁড়িতে,
সজোরে পাকালে চোখ ছেলে কাঁদে বাড়িতে।
পাকায়ে পাকায়ে দড়ি টান হয়ে থাকে সে।
দুহাতে পাকালে গোফঁ তবু নাহি পাকে সে।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/pakapaki/
|
5118
|
শামসুর রাহমান
|
মিশ্ররাগ
|
প্রেমমূলক
|
খর রৌদ্রের নিথর প্রহরে
শ্রাবণের ঘন মেঘ দেবে বলেছিলে।
তৃষিত চোখের আর্তি ঝরিয়ে
চেয়ে থাকি দূর অসীম শূন্যে, নীলে।ঘন সমারোহে পুঞ্জ পুঞ্জ
মেঘের জটলা দূর আকাশের পাড়ে;
যেন একপাল কালো মেঘ তেড়ে
লাফ দিয়ে পড়ে শুভ্র মেঘের ঘাড়ে।হৃদয়ে মরুর বালি ওড়ে আজ,
দারুণ তৃষ্ণা রুক্ষ সত্তা জুড়ে।
ছায়া খুঁজে ফিরি পাথুরে মাটিতে,
কখন যে মেঘ বাতাসে গিয়েছে উড়ে।দুপুর-রৌদ্রে তোমার ছায়ায়
নিজের ছায়াকে সহযে মিলাতে চাই।
কোন্ সে আগুন শুষে নিয়ে গেছে
স্নিগ্ধ ছায়াকে-পড়ে আছে শুধু ছাই!হাজার যুগের প্রেমিকের কতো
বাসনা দগ্ধ হৃদয়ে বেঁধেছে বাসা-
সেই গুরুভার বই দিনরাত,
পথের ক্লান্তি ভোলায় ছায়ার আশা।গৌরাঙ্গীর দেহের বাগানে
চোখের লুব্ধ ভ্রমরের জয়গান।
শিরায় শিরায় সেতারের ঝালা,
রক্তের প্রতি কণা চায় মহাদান।জ্বলজ্বলে দুটি স্বর্ণ কুম্ভ
কানায় কানায় যৌবন-জলে ভরা।
জীবনের স্বরে ছলকিয়ে ওঠে,
সীমাহীন পথে সে-জল ক্লান্তিহরা!স্নান সেরে এলে কুন্তল ধারা
ঝরতো একদা গুরু নিতম্ব’ পরে।
কালিয়া আঁধার কনক চাঁদার
শরণ নিতো যে-তা-ও আজ মনে পড়ে!আমার প্রাণের খর বৈশাখে
মেঘে মেঘে আনো বিপুল বৃষ্টিধারাঃ
হৃদয়ের কূলে সিক্ত হাওয়ায়
কাশফুল হবে খুশিতে আত্মহারা।কতকাল আর কাটাবো বিষাদে
দিনরাত শুধু স্মৃতি সম্বল করে?
মাঝ মাঝে তাই বিচ্ছেদ ভেবে
বেহুঁশ বেতাল নামি নরকের ঘরে।দৈব দয়ায় বহুকাল পরে
হয়তো আসবে মিলনের মহাক্ষণ।
কিন্তু তখন কোন্ বনে, হায়,
হরিণ-ক্ষিপ্র তোমার সে যৌবন? (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/mishrorag/
|
2186
|
মহাদেব সাহা
|
দান
|
প্রেমমূলক
|
আমি চাই একটি ছোটো নদী,
তুমি দাও অসীম সমুদ্দুর-
আমার চাওয়া শ্যামল মাটির ঘর,
তুমি দেখাও রাজার অন্তঃপুর।
আমি চাই একটুখানি ছায়া,
তুমি দাও স্নিগ্ধ নীলাকাশ-
আমার চাই একটু সবুজ জমি,
তুমি করো অনন্তে চাষবাস।
আমি চাই কোনো সজল মেঘ,
তুমি বলো অনন্ত অম্বর-
আমি চাই একটি স্নেহের হাত,
তুমি দেখাও বিশ্বচরাচর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1333
|
4083
|
রুদ্র গোস্বামী
|
বৃষ্টি সোনা তোকে
|
প্রেমমূলক
|
বৃষ্টি বৃষ্টি
জলে জলে জোনাকি
আমি সুখ যার মনে
তার নাম জানো কী ?মেঘ মেঘ চুল তার
অভ্রের গয়না
নদী পাতা জল চোখ
ফুলসাজ আয়না।বৃষ্টি বৃষ্টি
কঁচুপাতা কাঁচ নথ
মন ভার জানালায়
রাতদিন দিনরাত।ঘুম নেই ঘুম নেই
ছাপজল বালিশে
হাঁটুভাঙা নোনা ঝিল
দুচোখের নালিশে।বৃষ্টি বৃষ্টি
জলেদের চাঁদনি
দে সোনা এনে দে
মন সুখ রোশনি।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4625.html
|
2568
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অকৃতজ্ঞ
|
নীতিমূলক
|
ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে,
ধ্বনি কাছে ঋণী সে যে পাছে ধরা পড়ে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/okritoggo/
|
3424
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রতিধ্বনি
|
চিন্তামূলক
|
অয়ি প্রতিধ্বনি,
বুঝি আমি তোরে ভালোবাসি,
বুঝি আর কারেও বাসি না।
আমারে করিলি তুই আকুল ব্যাকুল,
তোর লাগি কাঁদে মোর বীণা।
তোর মুখে পাখিদের শুনিয়া সংগীত,
নির্ঝরের শুনিয়া ঝর্ঝর,
গভীর রহস্যময় অরণ্যের গান,
বালকের মধুমাখা স্বর,
তোর মুখে জগতের সংগীত শুনিয়া,
তোরে আমি ভালোবাসিয়াছি;
তবু কেন তোরে আমি দেখিতে না পাই,
বিশ্বময় তোরে খুঁজিয়াছি।
চিরকাল---চিরকাল----
তুই কি রে চিরকাল
সেই দূরে রবি,
আধো সুরে গাবি শুধু গীতের আভাস,
তুই চিরকবি।
দেখা তুই দিবি না কি? নাহয় না দিলি
একটি কি পুরাবি না আশ?
কাছে হতে একবার শুনিবারে চাই
তোর গীতোচ্ছ্বাস।
অরণ্যের পর্বতের সমুদ্রের গান,
ঝটিকার বজ্রগীতস্বর,
দিবসের প্রদোষের রজনীর গীত,
চেতনার নিদ্রার মর্মর,
বসন্তের বরষার শরতের গান,
জীবনের মরণের স্বর,
আলোকের পদধ্বনি মহা অন্ধকারে
ব্যাপ্ত করি বিশ্বচরাচর,
পৃথিবীর চন্দ্রমার গ্রহ-তপনের,
কোটি কোটি তারার সংগীত,
তোর কাছে জগতের কোন্ মাঝখানে
না জানি রে হতেছে মিলিত।
সেইখানে একবার বসাইবি মোরে
সেই মহা-আঁধার নিশায়,
শুনিব রে আঁখি মুদি বিশ্বের সংগীত
তোর মুখে কেমন শুনায়।জোছনায় ফুলবনে একাকী বসিয়া থাকি,
আঁখি দিয়া অশ্রুবারি ঝরে--
বল্ মোরে বল্ অয়ি মোহিনী ছলনা,
সে কি তোরি তরে?
বিরামের গান গেয়ে সায়াহ্নের বায়
কোথা বহে যায়--
তারি সাথে কেন মোর প্রাণ হু হু করে,
সে কি তোরি তরে?
বাতাসে সৌরভ ভাসে, আঁধারে কত-না তারা,
আকাশে অসীম নীরবতা--
তখন প্রাণের মাঝে কত কথা ভেসে যায়,
সে কি তোরি কথা?
ফুলের সৌরভগুলি আকাশে খেলাতে এসে
বাতাসেতে হয় পথহারা,
চারিদিকে ঘুরে হয় সারা,
মার কোলে ফিরে যেতে চায়,
ফুলে ফুলে খুঁজিয়া বেড়ায়,
তেমনি প্রাণের মাঝে অশরীরী আশাগুলি
ভ্রমে কেন হেথায় হোথায়--
সেকি কি তোরে চায়?
আঁখি যেন কার তরে পথ-পানে চেয়ে আছে
দিন গনি গনি,
মাঝে মাঝে কারো মুখে সহসা দেখে সে যেন অতুল রূপের প্রতিধ্বনি,
কাছে গেলে মিলাইয়া যায়
নিরাশের হাসিটির প্রায়--
সৌন্দর্যে মরীচিকা এ কাহার মায়া,
এ কি তোরি ছায়া!জগতের গানগুলি দূর-দূরান্তর হতে
দলে দলে তোর কাছে যায়,
যেন তারা বহ্নি হেরি পতঙ্গের মতো
পদতলে মরিবারে চায়!
জগতের মৃত গানগুলি
তোর কাছে পেয়ে নব প্রাণ,
সংগীতের পরলোক হতে
গান যেন দেহমুক্ত গান।
তাই তার নব কণ্ঠধ্বনি
প্রভাতের স্বপনের প্রায়,
কুসুমের সৌরভের সাথে
এমন সহজে মিশে যায়।আমি ভাবিতেছি বসে গানগুলি তোরে
না জানি কেমনে খুঁজে পায়--
না জানি কোথায় খুঁজে পায়।
না জানি কী গুহার মাঝারে
অস্ফুট মেঘের উপবনে,
স্মৃতি ও আশায় বিজড়িত
আলোক-ছায়ার সিংহাসনে,
ছায়াময়ী মূর্তিখানি আপনে আপনি মিশি
আপনি বিস্মিত আপনায়,
কার পানে শূন্যপানে চায়!
সায়াহ্নে প্রশান্ত রবি স্বর্ণময় মেঘমাঝে
পশ্চিমের সমুদ্রসীমায়
প্রভাতের জন্মভূমি শৈশব পুরব-পানে
যেমন আকুল নেত্রে চায়,
পুরবের শূন্যপটে প্রভাতের স্মৃতিগুলি
এখনো দেখিতে যেন পায়,
তেমনি সে ছায়াময়ী কোথা যেন চেয়ে আছে
কোথা হতে আসিতেছে গান--
এলানো কুন্তলজালে সন্ধ্যার তারকাগুলি গান শুনে মুদিছে নয়ান।
বিচিত্র সৌন্দর্য জগতের
হেথা আসি হইতেছে লয়।
সংগীত, সৌরভ, শোভা জগতে যা-কিছু আছে
সবি হেথা প্রতিধ্বনিময় ।
প্রতিধ্বনি, তব নিকেতন,
তোমার সে সৌন্দর্য অতুল,
প্রাণে জাগে ছায়ার মতন--
ভাষা হয় আকুল ব্যাকুল।
আমরণ চিরদিন কেবলি খুঁজিব তোরে
কখনো কি পাব না সন্ধান?
কেবলি কি রবি দূরে, অতি দূর হতে
শুনিব রে ওই আধো গান?
এই বিশ্বজগতের মাঝখানে দাঁড়াইয়া
বাজাইবি সৌন্দর্যের বাঁশি,
অনন্ত জীবনপথে খুঁজিয়া চলিব তোরে,
প্রাণমন হইবে উদাসী।
তপনেরে ঘিরি ঘিরি যেমন ঘুরিছে ধরা,
ঘুরিব কি তোর চারি দিকে?
অনন্ত প্রাণের পথে বরষিবি গীতধারা,
চেয়ে আমি রব অনিমিখে।
তোরি মোহময় গান শুনিতেছি অবিরত,
তোরি রূপ কল্পনায় লিখা--
করিস নে প্রবঞ্চনা সত্য করে বল্ দেখি
তুই তো নহিস মরীচিকা?
কত বার আর্ত স্বরে শুধায়েছি প্রাণপণে,
অয়ি তুমি কোথায়--কোথায়--
অমনি সুদূর হতে কেন তুমি বলিয়াছ
‘কে জানে কোথায়’?
আশাময়ী, ও কী কথা তুমি কি আপনহারা--
আপনি জান না আপনায়?
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/protiddhoni/
|
2038
|
মলয় রায়চৌধুরী
|
দুটি বিশ্ব
|
মানবতাবাদী
|
আমরা তো জানি রে আমরা সেরে ওঠার অযোগ্য
তাই বলে বৃষ্টির প্রতিধ্বনিতে ভেজা তোদের কুচুটে ফুসফুসে
গোলাপি বর্ষাতি গায়ে কুঁজো ভেটকির ঝাঁক সাঁতরাবে কেন
তোদের নাকি ধমনীতে ছিল ছাইমাখা পায়রাদের একভাষী উড়াল
শুনেছি অন্ধের দিব্যদৃষ্টি মেলে গাবদাগতর মেঘ পুষতিস
বগলে গুঁজে রাখতিস গাধার চিল্লানিতে ঠাসা রোজনামচা
আর এখন বলছিস ভোটদান তো দানবীর কর্ণও করেননি
কে না জানে শববাহকরাই চিরকাল অমর হয়েছে
ঔরসের অন্ধকারে কথা বলার লোক পেলি না বলে
ঘড়িঘরহীন শহরে ওয়ান-শত প্রেমিকা খুঁজলি
কী রে তোদের কি ঢিক ঢিকানা নেই না রক্তের দোষ
যে বলিপড়া আয়নায় চোপরদিন লোলচর্ম প্রতিবিম্ব পড়ে
ছি ছি ছি নিঃশ্বাস ফেলে সেটাই আবার প্রশ্বাস হিসাবে ফেরত চাস
আমি তো ভেবেছিলুম তোরা সন্দেহ করার অধিকার প্রয়োগ করবি
তা নয় সারা গায়ে প্রাগৈতিহাসিক চুল নিয়ে ঢুং ঢুং তুলো ধুনছিস
শুভেচ্ছা রইল তোরা যেন দুঃশাসনের হাত দুটো পাস
যা দিয়ে ধোঁয়ার দুর্গে বসে ফুলঝুরির ফিনকি গুনবি
২৭ এপ্রিল ২০০০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1150
|
5151
|
শামসুর রাহমান
|
যদি তুমি ফিরে না আসো
|
প্রেমমূলক
|
তুমি আমাকে ভুলে যাবে, আমি ভাবতেই পারি না।
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি
আছো এই সংসারে, হাঁটছো বারান্দায়, মুখ দেখছো
আয়নায়, আঙুলে জড়াচ্ছো চুল, দেখছো
তোমার সিঁথি দিয়ে বেরিয়ে গেছে অন্তুহীন উদ্যানের পথ, দেখছো
তোমার হাতের তালুতে ঝলমল করছে রূপালি শহর,
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি অস্তিত্বের ভূভাগে ফোটাচ্ছো ফুল
আমি ভাবতেই পারি না।
যখনই ভাবি, হঠাৎ কোনো একদিন তুমি
আমাকে ভুলে যেতে পারো,
যেমন ভুলে গেছো অনেকদিন আগে পড়া
কোনো উপন্যাস, তখন ভয়
কালো কামিজ প’রে হাজির হয় আমার সামনে,
পায়চারি করে ঘন ঘন মগজের মেঝেতে,
তখন
একটা বুনো ঘোড়া খুরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে আমাকে,
আর আমার আর্তনাদ ঘুরপাক খেতে খেতে
অবসন্ন হয়ে নিশ্চুপ এক সময়, যেমন
ভ্রষ্ট পথিকের চিৎকার হারিয়ে যায় বিশাল মরুভূমিতে।
বিদায় বেলায় সাঝটাঝ আমি মানি না
আমি চাই ফিরে এসো তুমি
স্মৃতি বিস্মৃতির প্রান্তর পেরিয়ে
শাড়ীর ঢেউ তুলে,সব অশ্লীল চিৎকার
সব বর্বর বচসা স্তব্দ করে
ফিরে এসো তুমি, ফিরে এসো
স্বপ্নের মতো চিলেকোঠায়
মিশে যাও স্পন্দনে আমার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/424
|
773
|
জসীম উদ্দীন
|
আলাপ
|
প্রেমমূলক
|
ঘুমপাড়ানী ঘুমের দেশে ঘুমিয়ে দুটি আঁখি,
মুখেতে তার কে দিয়েছে চাঁদের হাসি মাখি।
পা মেজেছে চাঁদের চুমোয়, হাতের ঘুঠোয় চাঁদ,
ঠোঁট দুটিতে হাসির নদীর ভাঙবে বুঝি বাঁধ।
মাথায় কালো চুলের লহর পড়ছে এসে মুখে,
ঝাঁকে ঝাঁকে ভোমর যেন উড়ছে ফুলের বুকে।
এই খুকীটির সঙ্গে আমার আলাপ যদি হয়,
সাগর-পারের ঝিনুক হয়ে ভাসব সাগরময় ;
রঙিন পাখির পালক হয়ে ঝরব বালুর চরে,
শঙ্খমোতির মালা হয়ে দুলব টেউএর পরে।
তবে আমি ছড়ার সুরে ছড়িয়ে যাব বায়,
তবে আমি মালা হয়ে জড়াব তার গায়।
এই খুকীটি আমায় যদি একটু আদর করে,
একটি ছোট কথা শোনায় ভালবাসায় ভরে ;
তবে আমি বেগুন গাছে টুনটুনীদের ঘরে,
যত নাচন ছড়িয়ে আছে আনব হরণ করে :
তবে আমি রুপকথারি রুপের নদী দিয়ে,
চলে যাব সাত-সাগরে রতন মানিক নিয়ে ;
তবে আমি আদর হয়ে জড়াব্ তার গায়,
নুপুর হয়ে ঝুমুর ঝুমুর বাজব দুটি পায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/202
|
1285
|
টুটুল দাস
|
জৈবিক
|
প্রেমমূলক
|
যেদিকে চোখ ফেরালে মরুভূমি
যেখানে হাত বাড়ালে কাঁটাতার
সেদিকে মানুষ হেঁটেছে কমই
জমেছে অগোছালো আবদার।জমেছে খুচরো-খাচরা নালিশ
ভেসে যায় বাসি ফুলের মালা
আমার বৃষ্টিতেই মজলিশ
তোর আবার বৃষ্টির ঘরে তালা।ঘর বলতেই সিঙ্গেল চৌকি
মশারি জুড়ে অভিমানের দাগ
দুরত্বের নাম অভিমান কি?
যোগ ছেড়ে তুই বেছে নিলি ভাগ।ভাগ দিয়ে কি রাত কষা যায়?
রাতের ভিতর পোড়া শব্দের বাস
পোড়ার মতো আগুন কোথায়
আগুন দিয়েই কবিতা করি চাষ।চাষের জমি পতিত পরে আছে
অনাবৃষ্টি , স্মৃতির গায়ে কালি
বৃষ্টি পেলে রাখবো কার কাছে?
ফাটল জুড়ে অজৈব প্রেম ঢালি।টুটুল দাসের কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9c%e0%a7%88%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%85%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%a8%e0%a7%80-tutul-das/
|
5575
|
সুকুমার রায়
|
আলোছায়া
|
ছড়া
|
হোক্না কেন যতই কালো
এমন ছায়া নাইরে নাই -
লাগ্লে পরে রোদের আলো
পালায় না যে আপনি ভাই!
শুষ্কমুখে আঁধার ধোঁয়া
কঠিন হেন কোথায় বল্,
পাগল যাতে হাসির ছোঁয়া
আপনি গলে হয় না জল।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/510
|
3563
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাহিরে বস্তুর বোঝা
|
নীতিমূলক
|
বাহিরে বস্তুর বোঝা,
ধন বলে তায়।
কল্যাণ সে অন্তরের
পরিপূর্ণতায়। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bahire-bostur-bojha/
|
5743
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
এক একদিন উদাসীন
|
চিন্তামূলক
|
এমনও তো হয় কোনোদিন
পৃথিবী বন্ধবহীন
তুমি যাও রেলব্রীজে এক-
ধূসর সন্ধ্যায় নামে ছায়া
নদীটিও স্থিরকায়া
বিজনে নিজের সঙ্গে দেখা।
ইস্টিশানে অতি ক্ষীণ আলো
তাও কে বেসেছে ভালো
এত প্রিয় এখন দ্যুলোক
হে মানুষ, বিস্মৃত নিমেষে
তুমিও বলেছো হেসে
বেঁচে থাকা স্বপ্নভাঙা শোক!
মনে পড়ে সেই মিথ্যে নেশা?
দাপটে উল্লাসে মেশা
অহঙ্কারী হাতে তরবারী
লোভী দুই চক্ষু চেয়েছিল
সোনার রূপোর ধুলো
প্রভুত্বের বেদী কিংবা নারী!
আজ সবকিছু ফেলে এলে
সূর্য রক্তে ডুবে গেলে
রেলব্রীজে একা কার হাসি?
হাহাকার মেশা উচ্চারণে
কে বলে আপন মনে
আমি পরিত্রাণ ভালোবাসি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1821
|
2588
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অনন্ত পথে
|
চিন্তামূলক
|
বাতায়নে বসি ওরে হেরি প্রতিদিন
ছোটো মেয়ে খেলাহীন, চপলতাহীন,
গম্ভীর কর্তব্যরত, তৎপরচরণে
আসে যায় নিত্যকাজে; অশ্রুভরা মনে
ওর মুখপানে চেয়ে হাসি স্নেহভরে।
আজি আমি তরী খুলি যাব দেশান্তরে;
বালিকাও যাবে কবে কর্ম-অবসানে
আপন স্বদেশে; ও আমারে নাহি জানে,
আমিও জানি নে ওরে—দেখিবারে চাহি
কোথা ওর হবে শেষ জীবসূত্র বাহি।
কোন্ অজানিত গ্রামে কোন্ দূরদেশে
কার ঘরে বধূ হবে, মাতা হবে শেষে,
তার পরে সব শেষ—তারো পরে, হায়,
এই মেয়েটির পথ চলেছে কোথায়! (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ononto-pothe/
|
5543
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
সিপাহী বিদ্রোহ
|
স্বদেশমূলক
|
হঠাৎ দেশে উঠল আওয়াজ- “হো-হো, হো-হো, হো-হো”
চমকে সবাই তাকিয়ে দেখে- সিপাহী বিদ্রোহ!
আগুন হয়ে সারাটা দেশ ফেটে পড়ল রাগে,
ছেলে বুড়ো জেগে উঠল নব্বই সন আগেঃ
একশো বছর গোলামিতে সবাই তখন ক্ষিপ্ত,
বিদেশীদের রক্ত পেলে তবেই হবে তৃপ্ত!
নানাসাহেব, তাঁতিয়াটোপি, ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মী-
সবার হাতে অস্ত্র, নাচে বনের পশু-পক্ষী।
কেবল ধনী, জমিদার, আর আগের রাজার ভক্ত
যোগ দিল, তা নয়কো, দিল গরীবেরাও রক্ত!
সবাই জীবন তুচ্ছ করে, মুসলমান ও হিন্দু,
সবাই দিতে রাজি তাদের প্রতি রক্তবিন্দু;
ইতিহাসের পাতায় তোমরা পড় কেবল মিথ্যে,
বিদেশীরা ভুল বোঝাতে চায় তোমাদের চিত্তে।
অত্যাচারী নয়কো তারা, অত্যাচারীর মুণ্ডু
চেয়েছিল ফেলতে ছিঁড়ে জ্বালিয়ে অগ্নিকুণ্ডু।
নানা জাতের নানান সেপাই গরীব এবং মূর্খঃ
সবাই তারা বুঝেছিল অধীনতার দুঃখ;
তাইতো তারা স্বাধীনতার প্রথম লড়াই লড়তে
এগিয়েছিল, এগিয়েছিল মরণ বরণ করতে!আজকে যখন স্বাধীন হবার শেষ লড়াইয়ের ডঙ্কা
উঠেছে বেজে, কোনোদিকেই নেইকো কোনো শঙ্কা;
জব্বলপুরে সেপাইদেরও উঠছে বেজে বাদ্য
নতুন ক’রে বিদ্রোহ আজ, কেউ নয়কো বাধ্য,
তখন এঁদের স্মরণ করো, স্মরণ করো নিত্য-
এঁদের নামে, এঁদের পণে শানিয়ে তোলো চিত্ত।
নানাসাহেব, তাঁতিয়াটোপি, ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মী,
এঁদের নামে, দৃপ্ত কিশোর, খুলবে তোমার চোখ কি? (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/sipahi-bidroho/
|
1415
|
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
|
তুমিহীন দিন
|
প্রেমমূলক
|
জানালাটা খুলতেই শীতের সোনালী ভোর আমার গ্রীবায়
দু’বাহু জড়িয়ে বলে, নেই, সে তো নেই
নিঃশব্দ আকাশ বলে, নেই
পাতাঝরা শাখা বলে, নেই
রোদের চিকন ছায়া , সেও বলে , নেই
তোমার অস্তিত্ব তবু তুমিহীন ঘরে বলে ওঠে
সকাল গড়িয়ে যায় ওঠো
হাত ধরে টেনে টেনে অবশেষে অভিমান করে
কিছুক্ষণ বসে থাকে অদূর চেয়ারে
কখনো- বা উদাসীন দু’চোখ বুলায়
আকাশের বিশাল প্রচ্ছদে
তারপর উঠে এসে মশারিটা তুলে ফেলে
তোয়ালেটা ভাঁজ করে রাখে আলনায়
অতঃপর সন্তর্পণে শিয়রে নিবিড় বসে
আমার চুলের যত অলিগলি মেঠোপথে
নিপুণ আঙুল তার বেড়াতে বেরোয়
এইভাবে কাটে দিন তুমিহীন একাকী প্রহর ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1035
|
1235
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সুরঞ্জনা
|
প্রেমমূলক
|
সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছ;
পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন;
কালো চোখ মেলে ওই নীলিমা দেখেছ;
গ্রীক হিন্দু ফিনিশিয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন
শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা-নগরীরর গায়ে
কী চেয়েছে? কী পেয়েছে ?— গিয়েছে হারায়ে।
বয়স বেড়েছে ঢের নরনারীদের,
ঈষৎ নিভেছে সূর্য নক্ষত্রের আলো;
তবুও সমুদ্র নীল: ঝিনুকের গায়ে আলপনা;
একটি পাখির গান কী রকম ভালো।
মানুষ কাউকে চায় — তার সেই নিহত উজ্জ্বল
ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোন সাধনার ফল।
মনে পড়ে কবে এক তারাভরা রাতের বাতাসে
ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্রের সাথে
উতরোল বড়ো সাগরের পথে অন্তিম আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রাণে
তবুও কাউকে আমি পারিনি বোঝাতে
সেই ইচ্ছা সঙ্ঘ নয় শক্তি নয় কর্মীদের সুধীদের বিবর্ণতা নয়,
আরো আলো: মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়।
যেন সব অন্ধকার সমুদ্রের ক্লান্ত নাবিকেরা।
মক্ষিকার গুঞ্জনের মতো এক বিহ্বল বাতাসে
ভূমধ্যসারলীন দূর এক সভ্যতার থেকে
আজকের নব সভ্যতায় ফিরে আসে;–
তুমি সেই অপরূপ সিন্ধু রাত্রি মৃতদের রোল
দেহ দিয়ে ভালোবেসে, তবু আজ ভোরের কল্লোল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/964
|
4535
|
শামসুর রাহমান
|
কতকাল পরে
|
রূপক
|
কতকাল পরে কণ্ঠে তোমার মেয়ে
বইয়ে দিয়েছ চকিতে ঝরনাধারা,
যেন শীতার্ত প্রহরে পেয়েছে ফিরে
প্রাণের শিহর মৃত পুষ্পের চারা।কী করে তোমার রূপ বর্ণনা করি?
তোমার দু’চোখ কী-যে সুন্দর, ভাবি।
স্তনের ডৌল স্বর্গেয় উদ্ভাস,
সোনালি চূড়ায় আমার কি আছে দাবি?ক্রমে যাবে বেড়ে অন্যের প্রাণবীজ
হয়তো আচরে তোমার গর্ভাশয়ে।
বন্ধ্যা সময়ে তুমি বসন্ত-ফুল,
আমার জীবন চিহ্নিত শুধু ক্ষয়ে।
আমার বাগান মুমূর্ষ ইদানীং
কর্কশ সব ঘাতকের তাণ্ডবে;
সত্তায় বয়ে দুঃস্বপ্নের ছায়াবড় এক ঘুরি শহুরে এ রৌরবে।
শ্বেত সন্ত্রাস ঘরে ঘরে দেয় হানা,
রঙিন পুতুল ভেঙে যায় পদাঘাতে।
শুভ অশুভের দ্বন্দ্ব প্রবল আজ,
শত কংকাল হত্যাযজ্ঞে মাতে।তুমি নেই পাশে, শূন্য এ ঘর মরু,
হৃদয় আমার শোকের অমিতাচার।
তোমার চোখের পাতায়, উষ্ণ ঠোঁটে
অশরীরী হয়ে চুমো দিই বারবার।আমি যে রকম তোমার জন্যে আজও
করি ছটফট কৈ মাছটির মতো,
আমার জন্যে তুমি কি তেমন হও?
হও না বলেই আমি যে ভাগ্যহত।বলো এ কেমন যুগ-সংকটে হলো
তোমার আমার অস্ফুট পরিচয়।
অতীতের শত স্বৈরাচারীর প্রেত
বর্তমানের শিরায় ছড়ায় ভয়।আমাদের এই প্রেমের মধ্যদিনে
নামে প্রত্যহ মেশিনগানের ছায়া;
কাঁদানে গ্যাসের ব্যাপক ধূম্রজালে
কোথায় উধাও আয়ত চোখের মায়া!একনায়কের বুটের তলায় পড়ে
থেঁতলে যাচ্ছে ক্রমশ স্বপ্নগুলি,
তার বোম্বেটে সহচর কতিপয়
ছুড়ে দেয় দূরে শূন্যে মড়ার খুলি।চৌদিক আজ কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা,
বর্বরদল ঘুরছে সগৌরবে;
অন্য কোথাও আশ্রয় খোঁজা বৃথা,
তোমাকে না দেখে আমার মৃত্যু হবে? (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kotokal-pore/
|
436
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বোমার ভয়
|
স্বদেশমূলক
|
বোমার ভয়ে বউ, মা, বোন, নেড়রি গেঁড়রি লয়ে
দিগ্বিদিকে পলায় ভীরু মানুষ মৃত্যু ভয়ে!
কোনখানে হায় পলায় মানুষ, মৃত্যু কোথায় নাই?
পলাতকের দল! বলে যাও সে-দেশ কোথায় ভাই?
মানুষ মরে একবার, সে দুবার মরে নাকো,
হায় রে মানুষ! তবু কেন মৃত্যুর ভয় রাখ।
আরেক দেশে পালিয়া তোমার মৃত্যুভয় কি যাবে?
মৃত্যু – ভ্রান্তি দিবানিশি তোমায় ভয় দেখাবে।
না মরিয়া বীরের মতো মৃত্যু আলিঙ্গিয়া,
তিলে তিলে মরে ভীরু যে যন্ত্রণা নিয়া,
সে যাতনার চেয়ে বোমার আগুন স্নিগ্ধ আরও!
মরণ আসে বন্ধু হয়ে, মরতে যদি পার
তেমন মরণ। দেখবে সেদিন সবে,
পৃথ্বী হবে নতুন আবার মৃত্যু-মহোৎসবে।আল্লাহ্ ভগবানের আমরা যদি আশ্রয় পাই,
সেই সে পরম অভয়াশ্রমে মৃত্যুর ভয় নাই!
যেতে পার তাঁর কাছে ছুটে তুমি প্রবল তৃষ্ণা লয়ে?
তাঁহারে ছুঁইলে ছোঁবে না তোমারে কখনও মৃত্যুভয়ে!
সেখানে যাওয়ার ট্রেন কোন ইস্টিশনে সে পাওয়া যায়?
সে প্ল্যাটফর্ম দেখেছ কি কভু? দেখনিকো তুমি হায়!
যেখানেই তুমি পালাও, মৃত্যু সাথে সাথে দৌড়াবে!
জানিয়াও কেন অকারণে মৃত্যুর ভয়ে খাবি খাবে?
দেখেছি ভীষণ মানুষের স্রোত ভীষণ শাস্তি সয়ে,
চলেছে অজানা অরণ্যে যেন ভীতি-উন্মাদ হয়ে!
পুরুষের রূপে দেখাছি বউমা করে কোণ ঠাসাঠাসি,
আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিয়া বাক্স বোঁচকা পোঁটলা রাশি।
যাহারা যাইতে পারিল না, পড়ে রহিল অর্থাভাবে
সঞ্চিত নাই অর্থ, কোথায় ক্ষুধার অন্ন পাবে?
তাহাদের কথা ভাবিল না কেউ, ধরিল না কেহ হাতে,
কেহ বলিল না, ‘মরিতে হয়তো এসো মরি এক সাথে!’
কেহ বলিল না, ‘কেন পলাইব, এসো দল বেঁধে রই,
সংঘবদ্ধ হইয়া আমরা এসো সৈনিক হই।’
ক্ষুদ্র অস্ত্র লয়ে কি করিয়া যুদ্ধ করিছে চীন?
অস্ত্র ধরিতে পারে না, যাহারা অন্তরে বলহীন।
যাহারা নির্যাতিত মানবেরে রক্ষা করিতে চায়,
আকাশ হইতে নেমে আসে, হাতে অস্ত্র তারাই পায়!
বোমার ভয় এ নহে, ইহা ক্লীব ভীরুর মৃত্যুভয়,
ইহারা ধরার বোঝা হয়ে আছে, ইহারা মানুষ নয়।যে দেশে তাদের জন্ম সে দেশ ছেড়ে এরা পরদেশে,
কেমন করিয়া খায় দায়, মুখ দেখায়, বেড়ায় হেসে?
অর্থের চাকচিক্য দেখায়, হায় রে লজ্জাহীন,
ইহাদেরই শিরে বোমা যেন পড়ে, ইহারা হোক বিলীন!
বোমা দেখেনিকো, শব্দ শোনেনি, শুধু তার নামে প্রেমে
এদের সর্ব অঙ্গ ব্যাকুল হইয়া উঠেছে ঘেমে!
জীবন আর যৌবন যার আছে, সেই সে মৃত্যুহীন,
গোরস্তানের শ্মশানের ভূত যারা ভীরু যারা দীন!
কেন বেঁচে আছে এরা পৃথিবীরে ভারাক্রান্ত করে?
ইহাদেরই শিরে পড়ে যেন যদি বোমা কোনোদিন পড়ে!নওজোয়ানরা এসো দলে দলে বীর শহিদান সেনা;
তোমরা লভিবে অমর-মৃত্যু, কোনো দিন মরিবে না!
ইতিহাসে আর মানবস্মৃতিতে আছে তাহাদেরই নাম,
যারা সৈনিক, দৈত্যের সাথে করেছিল সংগ্রাম!
যারা ভীরু, তারা কীটের মতন কখন গিয়েছে মরে,
তাদের কি কোনো স্মৃতি আছে, কেউ তাদের কি মনে করে?
ক্ষুদ্র-আত্মা নিষ্প্রাণ এরা, ইহারা গেলেই ভালো,
ভিড় করেছিল নিরাশা-আঁধার, এবার আসিবে আলো!
দেশের জাতির সৈনিক যদি কোনো দিন জয় আনে,
এই আঁধারের জীব যদি ফিরে আসে আলোকের পানে,
ইহাদের কাঁধে লাঙল বাঁধিয়া জমি করাইয়ো চাষ,
তবে যদি হয় চেতনা এদের, হয় যদি ভয় হ্রাস!
চল্লিশ কোটি মানুষ ভারতে, এক কোটি হোক সেনা,
কোনো পরদেশি আসিবে না, কোনো বিদেশিরা রহিবে না!
বিরাট বিপুল দেশ আমাদের, কার এত সেনা আছে,
ভারত জুড়িয়া যু্দ্ধ করিবে? পরাজয় লভিয়াছে,
এই মৃত্যুর ভয় শুধু, এরা রোগে ভুগে পচে মরে,
তবু লভিবে না অমৃত ইহারা মৃত্যুর হাত ধরে!
সংঘবদ্ধ হয়ে থাকা ভাই শ্রেষ্ঠ অস্ত্র ভবে,
এই অস্ত্রেই সর্ব অসুর দানব বিনাশ হবে,
চল্লিশ কোটি মানুষ মারিতে কোথা পাবে গোলাগুলি,
সর্বভয়ের রাক্ষস পশু পালাবে লাঙ্গুল তুলি।
বোমা যদি আসে, দেখে যাব মোরা বোমা সে কেমন চিজ,
তাহারই ধ্বনিতে ধ্বংস হইবে সর্ব ক্লৈব্য-বীজ!
যাহারা জন্ম-সৈনিক, তারা ছুটে এসো দলে দলে,
শক্তি আসিবে পৃথিবী কাঁপিবে আমাদের পদতলে।
আমরা যুঝিয়া মরি যদি সব ভীরুতা হইবে লয়,
পৃথিবীতে শুধু বীর-সেনাদের জয় হোক, হোক জয়। (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bomar-voy/
|
1675
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
যাবতীয় ভালোবাসাবাসি
|
প্রেমমূলক
|
এক-একবার মনে হয় যে
এই জীবনের যাবতীয় ভ্রমণ বোধহয়
ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু
ঠিক তখনই
আমার চোখের সামনে হঠাৎ খুলে যায়
সেই রাস্তা,
যার ধুলো উড়িয়ে আমি কখনও হাঁটিনি।
এক-একবার মনে হয় যে,
যাবতীয় ভালবাসাবাসির ঝামেলা বোধহয়
মিটিয়ে ফেলতে পেরেছি। কিন্তু
ঠিক তখনই আবার
হৃৎপিণ্ড মুচড়ে দিয়ে হঠাৎ
জেগে ওঠে অভিমান।
যাদের চিনি না, তাদের কথা আমি
কী করে বলব? কিন্তু
যাদের চিনেছিলুম, তাদের কথাও যে
বলতে পারিনি,
মধ্যরাতে এই কথাটা ভাবতে-ভাবতে আমি
বিছানা ছেড়ে
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই।
আমি দেখতে পাই যে,
আধডোবা জাহাজের মতো এই শহরটা
ঘুমের মধ্যে
তলিয়ে যাচ্ছে, আর
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝুপ্সি যত গাছ। অথচ
ঠিক তখনই
আকাশ জুড়ে ঝড় বইছে, আর
হাওয়ার ঝাপটে কেঁপে উঠছে লক্ষ-লক্ষ তারা।
কলকাতার এক রাজপথে
যাকে একদিন দেখতে পেয়েছিলুম,
ভাদ্রমাসের আকাশ জুড়ে
উলঙ্গ সেই দৈবশিশুর মুখচ্ছবি তখন আমার
চোখের সামনে ভাসতে থাকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1534
|
3300
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নাম তার চিনুলাল
|
হাস্যরসাত্মক
|
নাম তার চিনুলাল
হরিরাম মোতিভয়,
কিছুতে ঠকায় কেউ
এই তার অতি ভয়।
সাতানব্বই থেকে
তেরোদিন ব’কে ব’কে
বারোতে নামিয়ে এনে
তবু ভাবে, গেল ঠকে।
মনে মনে আঁক কষে,
পদে পদে ক্ষতি-ভয়।
কষ্টে কেরানি তার
টিঁকে আছে কতিপয়। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nam-tar-chinulal/
|
366
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
নিরুদ্দেশের যাত্রী
|
রূপক
|
নিরুদ্দেশের পথে যেদিন প্রথম আমার যাত্রা হল শুরু।
নিবিড় সে-কোন্ বেদনাতে ভয়-আতুর এ বুক কাঁপল দুরু-দুরু।
মিটল না ভাই চেনার দেনা, অমনি মু্হুর্মুহু
ঘরছাড়া ডাক করলে শুরু অথির বিদায়-কুহু
উহু উহু উহু!
হাতছানি দেয় রাতের শাঙন,
অমনি বাঁধে ধরল ভাঙন –
ফেলিয়ে বিয়ের হাতের কাঙন –
খুঁজে বেড়াই কোন আঙনে কাঁকন বাজে গো!
বেরিয়ে দেখি ছুটছে কেঁদে বাদলি হাওয়া হু হু!
মাথার ওপর দৌড়ে টাঙন, ঝড়ের মাতন, দেয়ার গুরু গুরু।পথ হারিয়ে কেঁদে ফিরি, ‘আর বাঁচিনে! কোথায় প্রিয়,
কোথায় নিরুদ্দেশ?’
কেউ আসে না, মুখে শুধু ঝাপটা মারে নিশীথ-মেঘের
আকুল চাঁচর কেশ। ‘তাল-বনা’তে ঝঞ্ঝা তাথই হাততালি দেয় বজ্রে বাজে তূরী,
মেখলা ছিঁড়ি পাগলি মেয়ে বিজলি-বালা নাচায় হিরের চুড়ি
ঘুরি ঘুরি ঘুরি
ও সে সকল আকাশ জুড়ি! থামল বাদল রাতের কাঁদা,
হাসল, আমার টুটল ধাঁধা,
হঠাৎ ও কার নূপুর শুনি গো?
থামল নূপুর, ভোরের তারা বিদায় নিল ঝুরি।
আমি এখন চলি সাঁঝের বধূ সন্ধ্যাতারার চলার পথে গো!
আজ অস্তপারের শীতের বায়ু কানের কাছে বইছে ঝুরু-ঝুরু। (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/niruddesher-jatri/
|
4072
|
রামনিধি গুপ্ত
|
পিরীতি না জানে সখী
|
প্রেমমূলক
|
পিরীতি না জানে সখী (সখি), সে জন সুখী বল কেমনে ?
যেমন তিমিরালয় দেখ দীপ বিহনে ||
প্রেমরস সুধাপান, নাহি করিল যে জন,
বৃথায় তার জীবন, পশু সম গণনে || ১ ||
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3850.html
|
232
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আমি যার নূপুরের ছন্দ
|
প্রেমমূলক
|
আমি যার নূপুরের ছন্দ, বেণুকার সুর
কে সেই সুন্দর, কে?
আমি যার বিলাস যমুনা, বিরহ বিধুর
কে সেই সুন্দর, কে?যাহার গলে আমি বনমালা
আমি যার কথার কুসুমডালা
না দেখা সুদূর
কে সেই সুন্দর, কে?যার শিখীপাখা লেখনী হয়ে
গোপনে মোরে কবিতা লেখায়
সে রহে কোথায় হায়?আমি যার বরষার আনন্দ কেকা
নৃত্যের সঙ্গিনী দামিনীরেখা
যে মম অঙ্গের কাঁকন-কেয়ূর
কে সেই সুন্দর, কে?
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/ami-zar-nupur/
|
5157
|
শামসুর রাহমান
|
যন্ত্রণা
|
প্রেমমূলক
|
আমার ছেলেটা জ্বরে ধুঁকছিলো,জ্বলছিলো তার
চোখ দুটো, টকটকে কৃষ্ণচূড়া। কী ভেবে নিলাম
ছোট হাত মুঠোর ভিতর আর ছুঁয়ে দেখলাম
কপালটা যাচ্ছে পুড়ে, হাঁপাচ্ছে সে এবং মাথার
ব্যথায় কাতর খুব। শুকনো ঠোঁট পাখির ছানার
দুরু দুরু বুক যেন, টের পাই। বাইরে উদ্দাম
হাওয়া, দরজায়, জানালার দিচ্ছে হানা অবিরাম।
কেবলি শিউরে উঠি ডাক্তারকে ডাকবো আবার?কৃষ্ণচূড়া তাকালো আমার চোখে। “খুব বেশি তোর
কষ্ট হচ্ছে খোকা? মাথাটা বুলিয়ে দিই, ঘুমো তুই”
বললাম। সাড়া শব্দ নেই কোনো, বেড়ালটা হাই
তোলে বসে এক কোণে। নিদ্রোহীন ভাবি, হায় ভোর
কি হবে না আর? পারবো না ওর যন্ত্রণা কিছুই
নিতে আমি! যন্ত্রণায় আমরা নিঃসঙ্গ সর্বদাই। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jontrona/
|
148
|
আসাদ চৌধুরী
|
প্রথম কবি তুমি, প্রথম বিদ্রোহী
|
স্বদেশমূলক
|
মাত্র পা রেখেছ কলেজে সেই বার,
শব্দ দিয়ে গাঁথো পূর্ব সীমান্তে
সাহসী ‘সীমান্ত’।
দ্বিজাতিতত্ত্বের লোমশ কালো থাবা
শ্যামল সুন্দর সোনার বাংলাকে
করেছে তছনছ, গ্রাম ও জনপদে
ভীতির সংসার, কেবল হাহাকার।
টেবিলে মোমবাতি কোমল কাঁপা আলো
বাহিরে বৃষ্টির সুরেলা রিমঝিম_
স্মৃতির জানালায় তোমার মৃদু টোকা।
রূপার সংসারে অতিথি সজ্জন
শিল্পী কতজন হিসেব রাখিনি তো!
স্মরণে ওস্তাদ_ গানের মমতাজ।
দারুণ উচ্ছ্বাস, সামনে চা’র কাপ
প্রধান অতিথি তো আপনি, বলবেন_
কিন্তু তার আগে এ ঘোর বরষায়
সমানে বলছেন নিজের সব কথা।
ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটে
ভাষণ, প্রতিবাদ_ যাত্রা, থিয়েটার
রমেশ শীল আর আবুল ফজলের,
কলিম শরাফীর সাহসী আচরণ
কী হলো? কী হয়েছে? আজ তো আপনার
মুখে যে খৈ ফোটে! স্বপ্ন-স্মৃতি দোলে।
দ্বিজাতিতত্ত্বের কবর খুঁড়ছো
সঙ্গী বেড়ে চলে, সঙ্গে সঙ্গীত
নাটক, সাহিত্য, সাম্প্রদায়িকতা
ঘেঁষতে পারছে না, আপনি লিখবেন
অমর কবিতাটি জ্বরের ঘোরে, একা
প্রেসের ছোট ঘরে_ আঙুল কাঁপছিল?
কর্ণফুলী সেও জোয়ারে ফুঁসছিল_
নদীরা চঞ্চল সাগরে মিশবে যে।
ঢাকা ও কলকাতা, সুচক্রদণ্ডী
কুনতি, কুমিল্লা কোথায় নেই কবি?
সেই তো শুভ শুরু, শহীদ মিনারের
আকুল হাতছানি, মিশেছে সাভারে
অটল স্থাপনায়।
এই কি শেষ তবে?
প্রতিটি অর্জন ধুলায় মিশে যায়,
নতুন উৎপাত মৌলবাদ আর
জঙ্গীবাদ আসে, পশ্চিমের থেকে,
মানবাধিকারের লালিত বাণী যেনই
স্বেচ্ছাচারিতার প্রতাপ চৌদিকে_
দৃপ্ত পায়ে কবি কাতারে মিছিলের
কারফু কার ফুঁতে ওমন ক’রে ভাগে?
কবি কি দেখছেন প্রমিত বাংলার
করুণ হালচাল? ভাষণে, সংলাপে
সিনেমা, থিয়েটারে ছোট্ট পর্দার
যাদুর বাক্সতে এ কোন বাংলার
মাতম ছড়াছড়ি? হায় রে মূলধারা!
প্রথম কবি তুমি, প্রথম বিদ্রোহী
এমন দুর্দিনে তাই তো মনে পড়ে
তোমার হাসি মুখ, তোমার বরাভয়
ভীরুতা চারদিকে, তুমিও নেই পাশে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/382
|
5588
|
সুকুমার রায়
|
কানা-খোঁড়া সংবাদ
|
হাস্যরসাত্মক
|
পুরাতন কালে ছিল দুই রাজা,
নাম ধাম নাহি জানা,
একজন তার খোড়া অতিশয়,
অপর ভূপতি কানা।
মন ছিল খোলা, অতি আলো ভোলা
ধরমেতে ছিল মতি,
পর ধনে সদা ছিল দোঁহাকার
বিরাগ বিকট অতি।
প্রতাপের কিছু নাহি ছিল ত্রুটি
মেজাজ রাজারি মত,
শুনেছি কেবল, বুদ্ধিটা নাকি
নাহি ছিল সরু তত,
ভাই ভাই মত ছিল দুই রাজা,
না ছিল ঝগড়াঝাঁটি,
হেনকালে আসি তিন হাত জমি
সকল করিল মাটি।
তিন হাত জমি হেন ছিল, তাহা
কেহ নাহি জানে কার,
কহে খোঁড়া রায় "এক চক্ষু যার
এ জমি হইবে তার"।'
শুনি কানা রাজা ক্রোধ করি কয়
"আরে অভাগার পুত্র,
এ জমি তোমারি- দেখ না এখনি
খুলিয়া কাগজ পত্র"।
নক্সা রেখেছে এক বছর
বাক্সে বাঁধিয়া আঁটি,
কীট কুটমতি কাটিয়া কাটিয়া
করিয়াছে তারে মাটি ;
কাজেই তর্ক না মিটিল হায়
বিরোধ বাধিল ভারি,
হইল য্দ্দু হদ্দ মতন
চৌদ্দ বছর ধরি।
মরিল সৈন্য, ভাঙিল অস্ত্র,
রক্ত চলিল বহি,
তিন হাত জমি তেমনি রহিল,
কারও হার জিত নাহি
তবে খোঁড়া রাজা কহে, হায় হায়,
তর্ক নাহিক মিটে,
ঘোরতর রণে অতি অকারণে
মরণ সবার ঘটে"
বলিতে বলিতে চঁটাৎ করিয়া
হঠাৎ মাথায় তার
অদ্ভুত এক বুদ্ধি আসিল
অতীব চমৎকার।
কহিল তখন খোঁড়া মহারাজ,
শুন মোর কানা ভাই,
তুচ্ছ কারণে রক্ত ঢালিয়া
কখনও সুযশ নাই।
তার চেয়ে জমি দান করে ফেল
আপদ শান্তি হবে।"
কানা রাজা কহে, খাসা কথা ভাই,
কারে দিই কহ তবে।"
কহেন খঞ্জ, " আমার রাজ্যে
আছে তিন মহাবীর-
একটি পেটুক, অপর অলস,
তৃতীয় কুস্তিগীর।
তোমার মুলুক কে আছে এমন
এদের হারাতে পারে?-
সবার সমুখে তিন হাত জমি
বকশিস দিব তারে।
কানা রাজা কহে ভীমের দোসর
আছে ত মল্ল মম,
ফালাহারে পটু, পঁচাশি পেটুক
অলস কুমড়া সম।
দেখা যাবে কার বাহাদুরি বেশি
আসুক তোমার লোক;
যে জিতিবে সেই পাবে এই জমি-
খোড়া বলে, তাই হোক।
পড়িল নোটিস ময়দান মাঝে
আলিশান সভা হবে,
তামাসা দেখিতে চারিদিক হতে
ছুটিয়া আসিল সবে।
ভয়ানক ভিড়ে ভরে পথঘাট,
লোকে হল লোকাকার,
মহা কোলাহল দাড়াবার ঠাই
কোনোখানে নাহি আর।
তারপর ক্রমে রাজার হুকুমে
গোলমাল গেল থেমে,
দুইদিক হতে দুই পালোয়ান
আসরে আসিল নেমে।
লম্ফে ঝম্ফে যুঝিল মল্ল
গজ-কচ্ছপ হেন,
রুষিয়া মুষ্টি হানিল দোহায়-
বজ্র পড়িল যেন!
গুঁতাইল কত ভোঁতাইল নাসা
উপাড়িল গোফ দাড়ি,
যতেক দন্ত করিল অন্ত
ভীষণ চাপটি মারি
তারপরে দোঁহে দোঁহারে ধরিয়া
ছুঁড়িল এমনি জোরে,
গোলার মতন গেল গো উড়িয়া
দুই বীর বেগভরে।
কিহল তাদের কেহ নাহি জানে
নানা কথা কয় লোকে,
আজও কেহ তার পায়নি খবর,
কেহই দেখেনি চোখে।
যাহোক এদিকে, কুস্তির শেষে
এল পেটুকের পালা,
যেন অতিকায় ফুটবল দুটি,
অথবা ঢাকাই জালা।
ওজনেতে তারা কেহ নহে কম,
ভোজনেতে ততোধিক,
বপু সুবিপুল, ভুড়ি বিভীষন-
ভারি সাতমন ঠিক।
অবাক দেখিছে সভার সকলে
আজব কান্ড ভারি-
ধামা ধামা লুচি নিমেষে ফুরায়
দই ওঠে হাঁড়ি হাঁড়ি!
দাড়ি পাল্লায় মাপিয়া সকলে
দেখে আহারের পরে ,
দুজনেই ঠিক বেড়েছে ওজনে
সাড়ে তিন মন করে।
কানা রাজা বলে একি হল জ্বালা,
আক্কেল নাই কারো ,
কেহ কি বোঝেনা সোজা কথা এই,
হয় জেতো নয় হারো।"
তার পর এল কুঁড়ে দুই জন
ঝাকার উপর চড়ে,
সভামাঝে দোহে শুয়ে চিৎপাত
চুপ চাপ রহে পড়ে।
হাত নাহি নাড়ে, চোখ নাহি মেলে,
কথা নাই কারো মুখে,
দিন দুই তিন রহিল পড়িয়া,
নাসা গীত গাহি সুখে।
জঠরে যখন জ্বলিল আগুন,
পরান কণ্ঠাগত,
তখন কেবল মেলিয়া আনন
থাকিল মড়ার মত।
দয়া করে তবে সহৃদয় কেহ
নিকটে আসিয়া ছুটি
মুখের নিকটে ধরিল তাদের
চাটিম কদলি দুটি।
খঞ্জের লোকে কহিল কষ্টে,
"ছাড়িয়া দে নারে ভাই"
কানার ভৃত্য রহিল হা করে
মুখে তার কথা নাই ।
তখন সকলে কাষ্ঠ আনিয়া
তায় কেরোসিন ঢালি,
কুড়েদের গায়ে চাপাইয়া রোষে
দেশলাই দিল জ্বালি।
খোঁড়ার প্রজাটি বাপরে বলিয়া
লাফ দিয়া তাড়াতাড়ি
কম্পিত পদে চম্পট দিল
একেবারে সভা ছাড়ি।
দুয়ো বলি সবে দেয় করতালি
পিছু পিছু ডাকে "ফেউ"?
কানার অলস বলে কি আপদ
ঘুমুতে দিবিনা কেঊ?
শুনে সবে বলে "ধন্য ধন্য
কুঁড়ে-কুল চুড়ামণি!"
ছুটিয়া তাহারে বাহির করিল
আগুন হইতে টানি।
কানার লোকের গুণপনা দেখে
কানা রাজা খুসী ভারি,
জমিতে দিলেই আরও দিল কত,
টাকাকড়ি ঘরবাড়ি।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/kana-khora-shongbad/
|
3089
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জান তুমি রাত্তিরে
|
হাস্যরসাত্মক
|
জান তুমি, রাত্তিরে
নাই মোর সাথি আর–
ছোটোবউ, জেগে থেকো,
হাতে রেখো হাতিয়ার।
যদি করে ডাকাতি,
পারিনে যে তাকাতেই,
আছে এক ভাঙা বেত
আছে ছেঁড়া ছাতি আর।
ভাঙতে চায় না ঘুম,
তা না হলে দুমাদুম্
লাগাতেম কিল ঘুষি
চালাতেম লাথি আর। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jano-tumi-rattire/
|
5234
|
শামসুর রাহমান
|
শুধু প্রশ্নে বিদ্ধ আমি
|
চিন্তামূলক
|
শুধু প্রশ্নে আমি, উড্ডীন যে-প্লেন কোনো দিন
পারে না নামতে নিচে এরোড্রমে, ঘোরে দিগ্ধিদিক,
গুঁড়ো হয় বিস্ফোরণে, অথবা নিখোঁজ তারই মতো
উত্তর দেয় না ধরা মননের মায়াবী গণ্ডিতে।
বরং ঘোরায় নিত্য কত ছলে, পড়ি খানা-খন্দে,
আবর্তে তলিয়ে যাই, মাথা ঠুকি পাথুরে গুহায়।গাছ কি শিউরে ওঠে ঠাণ্ডা ভয়ে যখন শরীর
থেকে তার পাতাগুলি ঝরে যায় অথবা আনন্দে
উল্লসিত পাখির চোখে সোনালি শস্যের মাঠ কোনো
কখনো ওঠে কি জ্ব’লে স্বপ্নের মোহন আমন্ত্রণে?
মাছ কি বিতৃষ্ণ হয়ে মগ্ন হয় আত্মনিপীড়নে
কোনো ক্ষণে জলের বাগানে চায় পাখির কোরাস?
নিজেকে নিঃসঙ্গ ভেবে পথের কুকুর ফুটপাতে
রাত্রির নেশায় মত্ত খোঁজে কোন একান্ত সুহৃদ?সন্দেহ ক্রমশ কেন হতাশায় হয়ে যায় লীন
বুদ্ধির জটিল চৌমাথায়? অনিদ্রার আক্রমণে
বেসিনে আরশোলা দেখে আঁতকে কেন উঠি মধ্যরাতে
মুখ ধুতে গিয়ে, কেন ভাবি কাফ্কার নায়কের
পরিণা, বিপন্ন অস্তিত্ব যার বুকে হেঁটে হেঁটে
শুনতে চেয়েছে জ্যোৎস্না-চমকিত বেহালার সুর,
চেয়েছে খুঁজতে সম্পর্কের অবলুপ্ত তন্তুজাল।শুধু প্রশ্নে বিদ্ধ আমি আজীবন, উত্তরের প্লেন
নামে না ঘাঁটিতে কোনো, থামে না তর্কের কোলাহল। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shudhu-proshne-biddho-ami/
|
3555
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বার বার সখি বারণ করনু
|
ভক্তিমূলক
|
বার বার, সখি, বারণ করনু ন যাও মথুরাধাম
বিসরি প্রেমদুখ রাজভোগ যথি করত হমারই শ্যাম।
ধিক্ তুঁহু দাম্ভিক, ধিক্ রসনা ধিক্, লইলি কাহারই নাম।
বোল ত সজনি, মথুরা‐অধিপতি সো কি হমারই শ্যাম।
ধনকো শ্যাম সো, মথুরাপুরকো, রাজ্যমানকো হোয়।
নহ পীরিতিকো, ব্রজকামিনীকো, নিচয় কহনু ময় তোয়।
যব তুঁহু ঠারবি সো নব নরপতি জনি রে করে অবমান—
ছিন্নকুসুমসম ঝরব ধরা‐’পর, পলকে খোয়ব প্রাণ।
বিসরল বিসরল সো সব বিসরল বৃন্দাবনসুখসঙ্গ—
নব নগরে, সখি, নবীন নাগর— উপজল নব নব রঙ্গ।
ভানু কহত, অয়ি বিরহকাতরা, মনমে বাঁধহ থেহ—
মুগুধা বালা, বুঝই বুঝলি না হমার শ্যামক লেহ॥
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bar-bar-sake-barun-karun/
|
408
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বন্দনা-গান
|
স্বদেশমূলক
|
শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারই॥
তাদেরই উষ্ণ শোণিত বহিছে আমাদেরও এই শিরা-মাঝে,
তাদেরই সত্য-জয়-ঢাক আজি মোদেরই কণ্ঠে ঘন বাজে।
সম্মান নহে তাহাদের তরে ক্রন্দন-রোল দীর্ঘশ্বাস,
তাহাদেরই পথে চলিয়া মোরাও বরিব ভাই ওই বন্দি-বাস॥
শিকলে যাদের ...
মুক্ত বিশ্বে কে কার অধীন? স্বাধীন সবাই আমরা ভাই।
ভাঙিতে নিখিল অধীনতা-পাশ মেলে যদি কারা, বরিব তাই।
জাগেন সত্য ভগবান যে রে আমাদেরই এই বক্ষ-মাঝ,
আল্লার গলে কে দেবে শিকল, দেখে নেব মোরা তাহাই আজ॥
শিকলে যাদের ...
কাঁদিব না মোরা, যাও কারা-মাঝে যাও তবে বীর-সংঘ হে,
ওই শৃঙ্খলই করিবে মোদের ত্রিশ কোটি ভ্রাতৃ-অঙ্গ হে।
মুক্তির লাগি মিলনের লাগি আহুতি যাহারা দিয়াছে প্রাণ
হিন্দু-মুসলিম চলেছি আমরা গাহিয়া তাদেরই বিজয়-গান
শিকলে যাদের ... (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bondona-gan/
|
5737
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ইচ্ছে
|
চিন্তামূলক
|
কাচের চুড়ি ভাঙার মতন মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে
দুটো চারটে নিয়ম কানুন ভেঙে ফেলি
পায়ের তলায় আছড়ে ফেলি মাথার মুকুট
যাদের পায়ের তলায় আছি, তাদের মাথায় চড়ে বসি
কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতই ইচ্ছে করে অবহেলায়
ধর্মতলায় দিন দুপুরে পথের মধ্যে হিসি করি।
ইচ্ছে করে দুপুর রোদে ব্লাক আউটের হুকুম দেবার
ইচ্ছে করে বিবৃতি দিই ভাঁওতা মেলে জনসেবার
ইচ্ছে করে ভাঁওতাবাজ নেতার মুখে চুনকালি দিই।
ইচ্ছে করে অফিস যাবার নাম করে যাই বেলুড় মঠে
ইচ্ছে করে ধর্মাধর্ম নিলাম করি মুর্গীহাটায়
বেলুন কিনি বেলুন ফাটাই, কাঁচের চুড়ি দেখলে ভাঙি...
ইচ্ছে করে লণ্ডভণ্ড করি এবার পৃথিবীটাকে
মনুমেন্টের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বলি
আমার কিছু ভাল্লাগে না।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1852
|
3457
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রাণ
|
সনেট
|
মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!
ধরায় প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত,
বিরহ মিলন কত হাসি-অশ্রু-ময় -
মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত
যদি গো রচিতে পারি অমর-আলয়!
তা যদি না পারি, তবে বাঁচি যত কাল
তোমাদেরি মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই,
তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল
নব নব সংগীতের কুসুম ফুটাই।
হাসিমুখে নিয়া ফুল, তার পরে হায়
ফেলে দিয়ো ফুল, যদি সে ফুল শুকায়।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pran/
|
2091
|
মহাদেব সাহা
|
এই জীবন
|
প্রেমমূলক
|
এই একরত্তি জীবনে বলো না কীভাবে সম্ভব ভালোবাসা
তার জন্য চাই আরো দীর্ঘ অনন্ত জীবন,
ভালোবাসা কীভাবে সম্ভব, অতিশয় ছোটো এ জীবন
একবার প্রিয় সম্বোধন করার আগেই
শেষ হয় এই স্বল্প আয়ু-
হয়তো একটি পরিপূর্ণ চুম্বনেরও সময় মেলে না
করস্পর্শ করার আগেই নামে বিচ্ছেদের কালো যবনিকা;
এতো ছোটো সামান্য জীবনের কীভাবে হবেই ভালোবাসা
ভালোবাসি কথাটি বলতেই হয়তোবা কেটে যাবে সমস্ত জীবন,
হয়তোবা তেমার চোখের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই
লেগে যাবে অনেক বছর
হয়তো তোমার কাছে একটি প্রেমের চিঠি লিখতেই
শেষহয়ে যাবে লক্ষ লক্ষ নিদ্রাহীন রাত;
তোমার সম্মুখে বসে প্রথম একটি শব্দ উচ্চারণ করতেই
শেষ হয়ে যাবে কতো কৈশোর-যৌবন,
ঘনাবে বার্ধক্য, কেশরাজি উড়াবে মাথায়
সেই ধূসর পতাকা;
এইটুকু ছোট্ট জীবন, এখানে সম্ভব নয় ভালোবাসা
তার জন্য চাই আরো অনেক জীবন, অনন্ত সময়
তোমাকে ভালোবাসার জন্য জানি তাও খুবই স্বল্প ও সংক্ষিপ্ত মনে হবে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1595.html
|
87
|
আবিদ আনোয়ার
|
বিপ্রলব্ধ প্রেমিকের সংলাপ
|
প্রেমমূলক
|
আমার কদর্য হাতে ছোঁবো না এ শুদ্ধতম ফুল--
এমন মুগ্ধতাবশে দূরে স'রে দেখি
ধরা দিলে যাকে সে তো প্রকৃতই দাঁতাল শুয়োর
তোমার সৌন্দর্য খুঁড়ে খোঁজে তার প্রিয় কন্দমূল।'ভালোবাসি' এই শব্দে ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ শুনি আমি;
কিন্নরীর পিছে ঘোরে কার্তিকের কামার্ত কুকুর--
এসব জানালে তুমি শোনাবেই মুখস্ত সংলাপ:
"চিনি না আপনে কেডা, ও আমার বিবাহিত স্বামী!"হায় স্বামী কলমা-পড়া, হে সমাজ, হায়রে বিবাহ!
বৃন্তচ্যুত কত ফুল ভালোবেসে নিথর ফুলদানি
সহজে বিকিয়ে যায় -- কেউ কেউ নিপুণা পার্বতী;
পড়ে শুধু দেবদাস, একা কাঁদে চিতাগ্নির দাহ ।
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/biprolobdho-premiker-shonglap/
|
3577
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিদায় (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
সনেট
|
হে তটিনী, সে নগরে নাই কলস্বন
তোমার কণ্ঠের মতো; উদার গগন,
অলিখিত মহাশাস্ত্র, নীল পত্রগুলি
দিক হতে দিগন্তরে নাহি রাখে খুলি;
শান্ত স্নিগ্ধ বসুন্ধরা শ্যামল অঞ্জনে
সত্যের স্বরূপখানি নির্মল নয়নে
রাখে না নবীন করি— সেথায় কেবল
একমাত্র আপনার অন্তর সম্বল
অকূলের মাঝে। তাই ভীতশিশুপ্রায়
হৃদয় চাহে না আজি লইতে বিদায়
তোমা-সবাকার কাছে। তাই প্রাণপণে
আঁকড়িয়া ধরিতেছে আর্ত আলিঙ্গনে
নির্জনলক্ষ্মীরে। শুভশান্তিপত্র তব
অন্তরে বাঁধিয়া দাও, কণ্ঠে পরি লব। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bidai-choitali/
|
3272
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ধ্রুবসত্য
|
নীতিমূলক
|
আমি বিন্দুমাত্র আলো, মনে হয় তবু
আমি শুধু আছি আর কিছু নাই কভু।
পলক পড়িল দেখি আড়ালে আমার
তুমি আছ হে অনাদি আদি অন্ধকার! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dhrubosotyo/
|
845
|
জসীম উদ্দীন
|
নিমন্ত্রণ
|
প্রকৃতিমূলক
|
তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
ছোট গাঁওখানি- ছোট নদী চলে, তারি একপাশ দিয়া,
কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া;
ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী
পারের খবর টানাটানি করি;
বিনাসুতি মালা গাথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া;
বাঁকা ফাঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া।
তুমি যাবে ভাই- যাবে মোর সাথে, ছোট সে কাজল গাঁয়,
গলাগলি ধরি কলা বন; যেন ঘিরিয়া রয়েছে তায়।
সরু পথ খানি সুতায় বাঁধিয়া
দূর পথিকেরে আনিছে টানিয়া,
বনের হাওয়ায়, গাছের ছায়ায়, ধরিয়া রাখিবে তায়,
বুকখানি তার ভরে দেবে বুঝি, মায়া আর মমতায়!
তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে – নরম ঘাসের পাতে
চম্বন রাখি অধরখানিতে মেজে লয়ো নিরালাতে।
তেলাকুচা – লতা গলায় পরিয়া
মেঠো ফুলে নিও আঁচল ভরিয়া,
হেথায় সেথায় ভাব করো তুমি বুনো পাখিদের সাথে,
তোমার গায়ের রংখানি তুমি দেখিবে তাদের পাতে।
তুমি যদি যাও আমাদের গাঁয়ে, তোমারে সঙ্গে করি
নদীর ওপারে চলে যাই তবে লইয়া ঘাটের তরী।
মাঠের যত না রাখাল ডাকিয়া
তোর সনে দেই মিতালী করিয়া
ঢেলা কুড়িইয়া গড়ি ইমারত সারা দিনমান ধরি,
সত্যিকারের নগর ভুলিয়া নকল নগর গড়ি।
তুমি যদি যাও – দেখিবে সেখানে মটর লতার সনে,
সীম আর সীম – হাত বাড়াইলে মুঠি ভরে সেই খানে।
তুমি যদি যাও সে – সব কুড়ায়ে
নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে,
খাব আর যত গেঁঢো – চাষীদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে,
হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব দুইজনে।
তুমি যদি যাও – শালুক কুড়ায়ে, খুব – খুব বড় করে,
এমন একটি গাঁথিব মালা যা দেখনি কাহারো করে,
কারেও দেব না, তুমি যদি চাও
আচ্ছা না হয় দিয়ে দেব তাও,
মালাটিরে তুমি রাখিও কিন্তু শক্ত করিয়া ধরে,
ও পাড়াব সব দুষ্ট ছেলেরা নিতে পারে জোর করে;
সন্ধ্যা হইলে ঘরে ফিরে যাব, মা যদি বকিতে চায়,
মতলব কিছু আঁটির যাহাতে খুশী তারে করা যায়!
লাল আলোয়ানে ঘুঁটে কুড়াইয়া
বেঁধে নিয়ে যাব মাথায় করিয়া
এত ঘুষ পেয়ে যদি বা তাহার মন না উঠিতে চায়,
বলিব – কালিকে মটরের শাক এনে দেব বহু তায়।
খুব ভোর ক’রে উঠিতে হইবে, সূয্যি উঠারও আগে,
কারেও ক’বি না, দেখিস্ পায়ের শব্দে কেহ না জাগে
রেল সড়কের ছোট খাদ ভরে
ডানকিনে মাছ কিলবিল করে;
কাদার বাঁধন গাঁথি মাঝামাঝি জল সেঁচে আগে ভাগে
সব মাছগুলো কুড়ায়ে আনিব কাহারো জানার আগে।
ভর দুপুরেতে এক রাশ কাঁদা আর এক রাশ মাছ,
কাপড়ে জড়ায়ে ফিরিয়া আসিব আপন বাড়ির কাছ।
ওরে মুখ – পোড়া ওরে রে বাঁদর।
গালি – ভরা মার অমনি আদর,
কতদিন আমি শুনি নারে ভাই আমার মায়ের পাছ;
যাবি তুই ভাই, আমাদের গাঁয়ে যেথা ঘন কালো গাছ।
যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।
ঘন কালো বন – মায়া মমতায় বেঁধেছে বনের বায়।
গাছের ছায়ায় বনের লতায়
মোর শিশুকাল লুকায়েছে হায়!
আজি সে – সব সরায়ে সরায়ে খুজিয়া লইব তায়,
যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গায়।
তোরে নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে ঘন-পল্লব তলে
লুকায়ে থাকিস্, খুজে যেন কেহ পায় না কোনই বলে।
মেঠো কোন ফুল কুড়াইতে যেয়ে,
হারাইয়া যাস্ পথ নাহি পেয়ে;
অলস দেহটি মাটিতে বিছায়ে ঘুমাস সন্ধ্যা হলে,
সারা গাঁও আমি খুজিয়া ফিরিব তোরি নাম বলে বলে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/776
|
1032
|
জীবনানন্দ দাশ
|
জীবন অথবা মৃত্যু চোখে রবে
|
সনেট
|
জীবন অথবা মৃত্যু চোখে র’বে – আর এই বাংলার ঘাস
র’বে বুকে; এই ঘাস:সীতারাম রাজারাম রামনাথ রায়-
ইহাদের ঘোড়া আজো অন্ধকারে এই ঘাস ভেঙে চ’লে যায়-
এই ঘাস:এরি নিচে কস্কাবতী শঙ্খশালা করিতেছে বাস:
তাদের দেহের গন্ধ,চাঁপা ফুল-মাখা স্নান চুলের বিন্যাস
ঘাস আজো ঢেকে আছে : যখন হেমন- আসে গৌড় বাংলায়
কার্তিকের অপরাহ্নে হিজলের পাতা শাদা উঠানের গায়
ঝ’রে পড়ে, পুকুরের ক্লান্ত জল ছেড়ে দিয়ে চ’লে যায় হাঁস,আমি এ ঘাসের বুকে শুয়ে থাকি – শালিখ নিয়েছে নিঙড়ায়ে
নরম হলুদ পায়ে এই ঘাস; এ সবুজ ঘাসের ভিতরে
সোঁদা ধুলো শুয়ে আছে- কাঁচের মতন পাখা এ ঘাসের গায়ে
ভেরেন্ডাফুলের নীল ভোমরারা বুলাতেছে – শাদা দুধ ঝরে
করবীর : কোন্ এক কিশোরী এসে ছিঁড়ে নিয়ে চ’লে গেছে ফুল,
তাই দুধ ঝরিতেছে করবীর ঘাসে – ঘাসে : নরম ব্যাকুল।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/jibon-othoba-mrittu-robey/
|
3802
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যোগিয়া
|
প্রেমমূলক
|
বহুদিন পরে আজি মেঘ গেছে চলে ,
রবির কিরণসুধা আকাশে উথলে ।
স্নিগ্ধ শ্যাম পত্রপুটে আলোক ঝলকি উঠে
পুলক নাচিছে গাছে গাছে ।
নবীন যৌবন যেন প্রেমের মিলনে কাঁপে ,
আনন্দ বিদ্যুৎ - আলো নাচে ।
জুঁই সরোবরতীরে নিশ্বাস ফেলিয়া ধীরে
ঝরিয়া পড়িতে চায় ভুঁয়ে ,
অতি মৃদু হাসি তার , বরষার বৃষ্টিধার
গন্ধটুকু নিয়ে গেছে ধুয়ে ।
আজিকে আপন প্রাণে না জানি বা কোন্খানে
যোগিয়া রাগিণী গায় কে রে ।
ধীরে ধীরে সুর তার মিলাইছে চারি ধার ,
আচ্ছন্ন করিছে প্রভাতেরে ।
গাছপালা চারি ভিতে সংগীতের মাধুরীতে
মগ্ন হয়ে ধরে স্বপ্নছবি ।
এ প্রভাত মনে হয় আরেক প্রভাতময় ,
রবি যেন আর কোনো রবি ।
ভাবিতেছি মনে মনে কোথা কোন্ উপবনে
কী ভাবে সে গান গাইছে না জানি ,
চোখে তার অশ্রুরেখা একটু দেছে কি দেখা ,
ছড়ায়েছে চরণ দুখানি ।
তার কি পায়ের কাছে বাঁশিটি পড়িয়া আছে —
আলোছায়া পড়েছে কপোলে ।
মলিন মালাটি তুলি ছিঁড়ি ছিঁড়ি পাতাগুলি
ভাসাইছে সরসীর জলে ।
বিষাদ - কাহিনী তার সাধ যায় শুনিবার
কোন্খানে তাহার ভবন ।
তাহার আঁখির কাছে যার মুখ জেগে আছে
তাহারে বা দেখিতে কেমন ।
এ কী রে আকুল ভাষা ! প্রাণের নিরাশ আশা
পল্লবের মর্মরে মিশালো ।
না জানি কাহারে চায় তার দেখা নাহি পায়
ম্লান তাই প্রভাতের আলো ।
এমন কত - না প্রাতে চাহিয়া আকাশপাতে
কত লোক ফেলেছে নিশ্বাস ,
সে - সব প্রভাত গেছে , তারা তার সাথে গেছে
লয়ে গেছে হৃদয় - হুতাশ !
এমন কত না আশা কত ম্লান ভালোবাসা
প্রতিদিন পড়িছে ঝরিয়া ,
তাদের হৃদয় - ব্যথা তাদের মরণ - গাথা
কে গাইছে একত্র করিয়া ,
পরস্পর পরস্পরে ডাকিতেছে নাম ধরে ,
কেহ তাহা শুনিতে না পায় ।
কাছে আসে , বসে পাশে , তবুও কথা না ভাষে ,
অশ্রুজলে ফিরে ফিরে যায় ।
চায় তবু নাহি পায় , অবশেষে নাহি চায় ,
অবশেষে নাহি গায় গান ,
ধীরে ধীরে শূন্য হিয়া বনের ছায়ায় গিয়া
মুছে আসে সজল নয়ান । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jogiya/
|
4374
|
শামসুর রাহমান
|
আমার ক্ষুধার্ত চক্ষুদ্বয়
|
প্রেমমূলক
|
এখন বাইরে রাত্রি তপোক্লিষ্ট বিমর্ষ নানের
পোশাকের মতো আর সুদূর কোথাও সন্ন্যাসীর
অস্থায়ী ধুমল আস্তানায় আস্তে ঝরছে শিশির,
প’ড়ে থাকে কতিপয় চিহ্ন উদাস অন্তর্ধানের।
নিশীথ রপ্তানি করে প্রসিদ্ধ সুরভি বাগানের
দূর-দূরান্তরে, ক্লান্ত মগজের ভেতরে রাত্তির
ডোরাকাটা বাঘ, জেব্রা, ঝিলঘেঁষা হরিণের ভিড়
নিয়ে গাঢ়, শিহরিত ঘাস পুরানো গোরস্তানের।ঘুমন্ত পৃথিবী মধ্যরাতে, আমি ধুধু অনিদ্রায়
কাটাই প্রহর একা ঘরে আর তুমি দেশান্তরে
সুখান্বেষী তোমার শরীরে মিলনের চন্দ্রোদয়;
না, আমি মানিনা এই দূরত্বের ক্রুর অন্তরায়।
যদিও দুস্তর ব্যবধান, তবু প্রতিটি প্রহরে
তোমারই শিয়রে জ্বলে আমার ক্ষুধার্ত চক্ষুদ্বয়। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-khudarto-chokkhudoy/
|
3940
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সাঙ্গ হয়েছে রণ
|
প্রেমমূলক
|
সাঙ্গ হয়েছে রণ।
অনেক যুঝিয়া অনেক খুঁজিয়া
শেষ হল আয়োজন।
তুমি এসো এসো নারী,
আনো তব হেমঝারি।
ধুয়ে-মুছে দাও ধূলির চিহ্ন,
জোড়া দিয়ে দাও ভগ্ন-ছিন্ন,
সুন্দর করো সার্থক করো
পুঞ্জিত আয়োজন।
এসো সুন্দরী নারী,
শিরে লয়ে হেমঝারি।হাটে আর নাই কেহ।
শেষ করে খেলা ছেড়ে এনু মেলা,
গ্রামে গড়িলাম গেহ।
তুমি এসো এসো নারী,
আনো গো তীর্থবারি।
স্নিগ্ধহসিত বদন-ইন্দু,
সিঁথায় আঁকিয়া সিঁদুর-বিন্দু
মঙ্গল করো সার্থক করো
শূন্য এ মোর গেহ।
এসো কল্যাণী নারী,
বহিয়া তীর্থবারি।বেলা কত যায় বেড়ে।
কেহ নাহি চাহে খররবিদাহে
পরবাসী পথিকেরে।
তুমি এসো এসো নারী,
আনো তব সুধাবারি।
বাজাও তোমার নিষ্কলঙ্ক
শত-চাঁদে-গড়া শোভন শঙ্খ,
বরণ করিয়া সার্থক করো
পরবাসী পথিকেরে।
আনন্দময়ী নারী,
আনো তব সুধাবারি।স্রোতে যে ভাসিল ভেলা।
এবারের মতো দিন হল গত
এল বিদায়ের বেলা।
তুমি এসো এসো নারী,
আনো গো অশ্রুবারি।
তোমার সজল কাতর দৃষ্টি
পথে করে দিক করুণাবৃষ্টি,
ব্যাকুল বাহুর পরশে ধন্য
হোক বিদায়ের বেলা।
অয়ি বিষাদিনী নারী,
আনো গো অশ্রুবারি।আঁধার নিশীথরাতি।
গৃহ নির্জন, শূন্য শয়ন,
জ্বলিছে পূজার বাতি।
তুমি এসো এসো নারী,
আনো তর্পণবারি।
অবারিত করি ব্যথিত বক্ষ
খোলো হৃদয়ের গোপন কক্ষ,
এলো-কেশপাশে শুভ্র-বসনে
জ্বালাও পূজার বাতি।
এসো তাপসিনী নারী,
আনো তর্পণবারি। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sango-hoyeche-rono/
|
2988
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গাড়িতে মদের পিপে
|
ছড়া
|
গাড়িতে মদের পিপে ছিল তেরো-চোদ্দো,
এঞ্জিনে জল দিতে দিল ভুলে মদ্য।
চাকাগুলো ধেয়ে করে ধানখেত-ধ্বংসন,
বাঁশি ডাকে কেঁদে কেঁদে “কোথা কানু জংশন’–
ট্রেন করে মাতলামি নেহাত অবোধ্য,
সাবধান করে দিতে কবি লেখে পদ্য। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/garite-moder-pipe/
|
4395
|
শামসুর রাহমান
|
আমি কি এমনই নষ্ট
|
প্রেমমূলক
|
আমি কি এমনই নষ্ট? পুঁজ ঝরে নাসারন্ধ্র থেকে,
কষ বেয়ে রক্ত পড়ে সারাক্ষণ? সমস্ত শরীরে
দগদগে ক্ষত আর কিল্বিলে পোকা, ভাবো তুমি?
আমাকে উগরে দিয়ে মৃত্যু কিয়দ্দূরে ব’সে আছে
ফুলবাবু, ভুল ক’রে আনাড়ি তস্কর-প্রায় নিয়ে
গিয়েছিলো শুইয়ে দিতে পুরানো কবরে। আমি কথা
বল্লে বুঝি শ্মশানের ধোঁয়া তোমার দু’চোখে জ্বালা
ধরায়, গড়ায় মেঝেময় পশুর গলিত শব।তা’ না হ’লে কেন তুমি থাকতে পারো না বেশিক্ষণ
সান্নিধ্যে আমার? কাছে গেলে হঠাৎ ইলেকট্রিক
শক্-খাওয়া ধরনে কেমন ছিট্কে দূরে স’রে যাও।
নরকের ফুটন্ত গন্ধক-গন্ধ পাও? মুখ থেকে
অম্লজল বেরোয়, ফোরায়া যেন; সে পানিতে খাই
হাবুডুবু, ভেসে যাই, চলে হাঙরের স্বৈরাচার। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ami-ki-emoni-noshto/
|
2629
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অসম্পূর্ণ সংবাদ
|
নীতিমূলক
|
চকোরী ফুকারি কাঁদে, ওগো পূর্ণ চাঁদ,
পণ্ডিতের কথা শুনি গনি পরমাদ!
তুমি নাকি একদিন রবে না ত্রিদিবে,
মহাপ্রলয়ের কালে যাবে নাকি নিবে!
হায় হায় সুধাকর, হায় নিশাপতি,
তা হইলে আমাদের কী হইবে গতি!
চাঁদ কহে, পণ্ডিতের ঘরে যাও প্রিয়া,
তোমার কতটা আয়ু এসো শুধাইয়া। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/osompurno-songbad/
|
3837
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রূপে ও অরূপে গাঁথা
|
চিন্তামূলক
|
রূপে ও অরূপে গাঁথা
এ ভুবনখানি—
ভাব তারে সুর দেয়,
সত্য দেয় বাণী।
এসো মাঝখানে তার,
অানো ধ্যান আপনার
ছবিতে গানেতে যেথা
নিত্য কানাকানি। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rupe-o-orupe-gatha/
|
3859
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শিশুর জীবন
|
ছড়া
|
ছোটো ছেলে হওয়ার সাহস
আছে কি এক ফোঁটা,
তাই তো এমন বুড়ো হয়েই মরি।
তিলে তিলে জমাই কেবল
জমাই এটা ওটা,
পলে পলে বাক্স বোঝাই করি।
কালকে-দিনের ভাবনা এসে
আজ-দিনেরে মারলে ঠেসে
কাল তুলি ফের পরদিনের বোঝা।
সাধের জিনিস ঘরে এনেই
দেখি, এনে ফল কিছু নেই
খোঁজের পরে আবার চলে খোঁজা।
ভবিষ্যতের ভয়ে ভীত
দেখতে না পাই পথ,
তাকিয়ে থাকি পরশু দিনের পানে,
ভবিষ্যৎ তো চিরকালই
থাকবে ভবিষ্যৎ ,
ছুটি তবে মিলবে বা কোন্খানে?
বুদ্ধি-দীপের আলো জ্বালি
হাওয়ায় শিখা কাঁপছে খালি,
হিসেব করে পা টিপে পথ হাঁটি।
মন্ত্রণা দেয় কতজনা,
সূক্ষ্ম বিচার-বিবেচনা,
পদে-পদে হাজার খুঁটিনাটি।
শিশু হবার ভরসা আবার
জাগুক আমার প্রাণে,
লাগুক হাওয়া নির্ভাবনার পালে,
ভবিষ্যতের মুখোশখানা
খসাব একটানে,
দেখব তারেই বর্তমানের কালে।
ছাদের কোণে পুকুরপারে
জানব নিত্য-অজানারে
মিশিয়ে রবে অচেনা আর চেনা;
জমিয়ে ধুলো সাজিয়ে ঢেলা
তৈরি হবে আমার খেলা,
সুখ রবে মোর বিনামূল্যেই কেনা।
বড়ো হবার দায় নিয়ে, এই
বড়োর হাটে এসে
নিত্য চলে ঠেলাঠেলির পালা।
যাবার বেলায় বিশ্ব আমার
বিকিয়ে দিয়ে শেষে
শুধুই নেব ফাঁকা কথার ডালা!
কোন্টা সস্তা, কোন্টা দামি
ওজন করতে গিয়ে আমি
বেলা আমার বইয়ে দেব দ্রুত,
সন্ধ্যা যখন আঁধার হবে
হঠাৎ মনে লাগবে তবে
কোনোটাই না হল মনঃপুত।
বাল্য দিয়ে যে-জীবনের
আরম্ভ হয় দিন
বাল্যে আবার হোক-না তাহা সারা।
জলে স্থলে সঙ্গ আবার
পাক-না বাঁধন-হীন,
ধুলায় ফিরে আসুক-না পথহারা।
সম্ভাবনার ডাঙা হতে
অসম্ভবের উতল স্রোতে
দিই-না পাড়ি স্বপন-তরী নিয়ে।
আবার মনে বুঝি না এই,
বস্তু বলে কিছুই তো নেই
বিশ্ব গড়া যা খুশি তাই দিয়ে।
প্রথম যেদিন এসেছিলেম
নবীন পৃথ্বীতলে
রবির আলোয় জীবন মেলে দিয়ে,
সে যেন কোন্ জগৎ-জোড়া
ছেলেখেলার ছলে,
কোথাত্থেকে কেই বা জানে কী এ!
শিশির যেমন রাতে রাতে,
কে যে তারে লুকিয়ে গাঁথে,
ঝিল্লি বাজায় গোপন ঝিনিঝিনি।
ভোরবেলা যেই চেয়ে দেখি,
আলোর সঙ্গে আলোর এ কী
ইশারাতে চলছে চেনাচিনি।
সেদিন মনে জেনেছিলেম
নীল আকাশের পথে
ছুটির হাওয়ায় ঘুর লাগাল বুঝি!
যা-কিছু সব চলেছে ওই
ছেলেখেলার রথে
যে-যার আপন দোসর খুঁজি খুঁজি।
গাছে খেলা ফুল-ভরানো
ফুলে খেলা ফল-ধরানো,
ফলের খেলা অঙ্কুরে অঙ্কুরে।
স্থলের খেলা জলের কোলে,
জলের খেলা হাওয়ার দোলে,
হাওয়ার খেলা আপন বাঁশির সুরে।
ছেলের সঙ্গে আছ তুমি
নিত্য ছেলেমানুষ,
নিয়ে তোমার মালমসলার ঝুলি।
আকাশেতে ওড়াও তোমার
কতরকম ফানুস
মেঘে বোলাও রঙ-বেরঙের তুলি।
সেদিন আমি আপন মনে
ফিরেছিলেম তোমার সনে,
খেলেছিলেম হাত মিলিয়ে হাতে।
ভাসিয়েছিলেম রাশি রাশি
কথায় গাঁথা কান্নাহাসি
তোমারই সব ভাসান-খেলার সাথে।
ঋতুর তরী বোঝাই কর
রঙিন ফুলে ফুলে,
কালের স্রোতে যায় তারা সব ভেসে।
আবার তারা ঘাটে লাগে
হাওয়ায় দুলে দুলে
এই ধরণীর কূলে কূলে এসে।
মিলিয়েছিলেম বিশ্ব-ডালায়
তোমার ফুলে আমার মালায়
সাজিয়েছিলেম ঋতুর তরণীতে,
আশা আমার আছে মনে
বকুল কেয়া শিউলি -সনে
ফিরে ফিরে আসবে ধরণীতে।
সেদিন যখন গান গেয়েছি
আপন মনে নিজে,
বিনা কাজে দিন গিয়েছে চলে,
তখন আমি চোখে তোমার
হাসি দেখেছি যে,
চিনেছিলে আমায় সাথি বলে।
তোমার ধুলো তোমার আলো
আমার মনে লাগত ভালো,
শুনেছিলেম উদাস-করা বাঁশি।
বুঝেছিলে সে-ফাল্গুনে
আমার সে-গান শুনে শুনে
তোমারও গান আমি ভালোবাসি।
দিন গেল ঐ মাঠে বাটে,
আঁধার নেমে প’ল;
এপার থেকে বিদায় মেলে যদি
তবে তোমার সন্ধেবেলার
খেয়াতে পাল তোলো,
পার হব এই হাটের ঘাটের নদী।
আবার ওগো শিশুর সাথি,
শিশুর ভুবন দাও তো পাতি,
করব খেলা তোমায় আমায় একা।
চেয়ে তোমার মুখের দিকে
তোমায়, তোমার জগৎটিকে
সহজ চোখে দেখব সহজ দেখা। (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shishur-jibon/
|
856
|
জসীম উদ্দীন
|
পুর্ব্বরাগ
|
কাহিনীকাব্য
|
দীঘিতে তখনো শাপলা ফুলেরা হাসছিলো আনমনে,
টের পায়নিক পান্ডুর চাঁদ ঝুমিছে গগন কোণে ।
উদয় তারার আকাশ-প্রদীপ দুলিছে পুবের পথে,
ভোরের সারথী এখনো আসেনি রক্ত-ঘোড়ার রথে।
গোরস্থানের কবর খুঁড়িয়া মৃতেরা বাহির হয়ে,
সাবধান পদে ঘুরিছে ফিরিছে ঘুমন্ত লোকালয়ে।
মৃত জননীরা ছেলে মেয়েদের ঘরের দুয়ার ধরি,
দেখিছে তাদের জোনাকি আলোয় ক্ষুধাতুর আঁখি ভরি।
মরা শিশু তার ঘু্মন্ত মার অধরেতে দিয়ে চুমো,
কাঁদিয়া কহিছে, “জনম দুখিনী মারে, তুই ঘুমো ঘুমো।”
ছোট ভাইটিরে কোলেতে তুলিয়া মৃত বোন কেঁদে হারা,
ধরার আঙনে সাজাবে না আর খেলাঘরটিরে তারা।
দুর মেঠো পথে প্রেতেরা চলেছে আলেয়ার আলো বলে,
বিলাপ করিছে শ্মশানের শব ডাকিনী যোগীনি লয়ে।
রহিয়া রহিয়া মড়ার খুলিতে বাতাস দিতেছে শীস,
সুরে সুরে তার শিহরি উঠিছে আঁধিয়ারা দশধিশ।
আকাশের নাটমঞ্চে নাচিছে অন্সরী তারাদল,
দুগ্ধ ধবল ছায়াপথ দিয়ে উড়াইয়ে অঞ্চল।
কাল পরী আর নিদ্রা পরীরা পালঙ্ক লয়ে শিরে,
উড়িয়া চলেছে স্বপনপুরীর মধুবালা-মন্দিরে।
হেনকালে দুর গ্রামপথ হতে উঠিল আজান-গান ।
তালে তালে তার দুলিয়া উঠিল স্তব্ধএ ধরাখান।
কঠিন কঠোর আজানের ধবনি উঠিল গগন জুড়ে।
সুরেরে কে যেন উঁচু হতে আরো উঁচুতে দিতেছে ছুঁড়ে।
পু্র্ব গগনে রক্ত বরণ দাঁড়াল পিশাচী এসে,
ধরণী ভরিয়া লহু উগারিয়া বিকট দশনে হেসে।
ডাক শুনি তার কবরে কবরে পালাল মৃতের দল,
শ্মাশানঘাটায় দৈত্য দানার থেমে গেল কোলাহল।
গগনের পথে সহসা নিবিল তারার প্রদীপ মালা
চাঁদ জ্বলে জ্বলে ছাই হয়ে গেল ভরি আকাশের থালা।
তখনো কঠোর আজান ধ্বনিছে, সাবধান সাবধান!
ভয়াল বিশাল প্রলয় বুঝিবা নিকটেতে আগুয়ান।
ওরে ঘুমন্ত-ওরে নিদ্রিত-ঘুমের বসন খোল,
ডাকাত আসিয়া ঘিরিয়াছে তোর বসত-বাড়ির টোল।
শয়ন-ঘরেতে বাসা বাঁধিয়াছে যত না সিঁধেল চোরে,
কন্ঠ হইতে গজমতি হার নিয়ে যাবে চুরি করে।
শয়ন হইতে জাগিল সোজন, মনে হইতেছে তার
কোন অপরাধ করিয়াছে যেন জানে না সে সমাচার।
চাহিয়া দেখিল, চালের বাতায় ফেটেছে বাঁশের বাঁশী,
ইঁদুর আসিয়া থলি কেটে তার ছড়ায়েছে কড়িরাশি।
বার বার করে বাঁশীরে বকিল, ইদুরের দিল গালি,
বাঁশী ও ইঁদুর বুঝিল না মানে সেই তা শুনিল খালি।
তাড়াতাড়ি উঠি বাঁশীটি লইয়া দুলীদের বাড়ি বলি,
চলিল সে একা রাঙা প্রভাতের আঁকা-বাঁকা পথ দলি।
খেজুরের গাছে পেকেছে খেজুর, ঘনবন-ছায়া-তলে,
বেথুল ঝুলিছে বার বার করে দেখিল সে কুতুহলে।
ও-ই আগডালে পাকিয়াছে আম, ইসরে রঙের ছিরি,
এক্কে ঢিলেতে এখনি সে তাহা আনিবারে পারে ছিঁড়ি।
দুলীরে ডাকিয়া দেখাবে এসব, তারপর দুইজনে,
পাড়িয়া পাড়িয়া ভাগ বসাইবে ভুল করে গণে গণে।
এমনি করিয়া এটা ওটা দেখি বহুখানে দেরি করি,
দুলীদের বাড়ি এসে-পৌঁছিল খুশীতে পরাণ ভরি।
দুলী শোন্ এসে- একিরে এখনো ঘুমিয়ে যে রয়েছিস্?
ও পাড়ার লালু খেজুর পাড়িয়া নিয়ে গেলে দেখে নিস্!
সিঁদুরিয়া গাছে পাকিয়াছে আম, শীগগীর চলে আয়,
আর কেউ এসে পেড়ে যে নেবে না, কি করে বা বলা যায়।
এ খবর শুনে হুড়মুড় করে দুলী আসছিল ধেয়ে,
মা বলিল, এই ভর সক্কালে কোথা যাস্ ধাড়ী মেয়ে?
সাতটা শকুনে খেয়ে না কুলোয় আধেক বয়সী মাগী,
পাড়ার ধাঙড় ছেলেদের সনে আছেন খেলায় লাগি।
পোড়ারমুখীলো, তোর জন্যেতে পাড়ায় যে টেকা ভার,
চুন নাহি ধারি এমন লোকেরো কথা হয় শুনিবার!
এ সব গালির কি বুঝিবে দুলী, বলিল একটু হেসে,
কোথায় আমার বসয় হয়েছে, দেখই না কাছে এসে।
কালকে ত আমি সোজনের সাথে খেলাতে গেলাম বনে,
বয়স হয়েছে এ কথা ত তুমি বল নাই তক্ষণে।
এক রাতে বুঝি বয়স বাড়িল? মা তোমার আমি আর
মাথার উকুন বাছিয়া দিব না, বলে দিনু এইবার।
ইহা শুনি মার রাগের আগুন জ্বলিল যে গিঠে গিঠে,
গুড়ুম গুড়ুম তিন চার কিল মারিল দুলীর পিঠে।
ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে চাহিয়া সোজন দেখিল এ অবিচার,
কোন হাত নাই করিতে তাহার আজি এর প্রতিকার।
পায়ের উপরে পা ফেলিয়া পরে চলিল সমুখ পানে,
কোথায় চলেছে কোন পথ দিয়ে, এ খবর নাহি জানে।
দুই ধারে বন, লতায়-পাতায় পথেরে জড়াতে চায়,
গাছেরা উপরে ঝলর ধরেছে শাখা বাড়াইয়া বায়।
সম্মুখ দিয়া শুয়োর পালাল, ঘোড়েল ছুটিল দূরে,
শেয়ালের ছাও কাঁদন জুড়িল সারাটি বনানী জুড়ে।
একেলা সোজন কেবলি চলেছে কালো কুজঝটি পথ,
ভর-দুপুরেও নামে না সেথায় রবির চলার রথ।
সাপের ছেলম পায়ে জড়ায়েছে, মাকড়ের জাল শিরে,
রক্ত ঝরিছে বেতসের শীষে শরীরের চাম ছিঁড়ে।
কোন দিকে তার ভ্রুক্ষেপ নাই রায়ের দীঘির পাড়ে,
দাঁড়াল আসিয়া ঘন বেতঘেরা একটি ঝোপের ধারে।
এই রায়-দীঘি, ধাপ-দামে এর ঘিরিয়াছে কালো জল,
কলমি লতায় বাঁধিয়া রেখেছে কল-ঢেউ চঞ্চল।
চারধারে এর কর্দম মথি বুনো শুকরের রাশি,
শালুকের লোভে পদ্মের বন লুন্ঠন করে আসি।
জল খেতে এসে গোখুরা সপেরা চিহ্ন এঁকেছে তীরে,
কোথাও গাছের শাখায় তাদের ছেলম রয়েছে ছিঁড়ে।
রাত্রে হেথায় আগুন জ্বালায় নর-পিশাচের দল,
মড়ার মাথায় শিস দিয়ে দিয়ে করে বন চঞ্চল।
রায়েদের বউ গলবন্ধনে মরেছিল যার শাখে,
সেই নিমগাছ ঝুলিয়া পড়িয়া আজো যেন কারে ডাকে!
এইখানে এসে মিছে ঢিল ছুঁড়ে নাড়িল দীঘির জল,
গাছেরে ধরিয়া ঝাঁকিল খানিক, ছিঁড়িল পদ্মদল।
তারপর শেষে বসিল আসিয়া নিমগাছটির ধারে,
বসে বসে কি যে ভাবিতে লাগিল, সেই তা বলিতে পারে।
পিছন হইতে হঠাৎ আসিয়া কে তাহার চোখ ধরি,
চুড়ি বাজাইয়া কহিল, কে আমি বল দেখি ঠিক করি?
ও পাড়ার সেই হারানের পোলা। ইস শোন বলি তবে
নবীনের বোন বাতাসী কিম্বা উল্লাসী তুমি হবেই হবে!
পোড়ামুখীরা এমনি মরুক- আহা, আহা বড় লাগে,
কোথাকার এই ব্রক্ষদৈত্য কপালে চিমটি দাগে।
হয়েছে হয়েছে, বিপিনের খুড়ো মরিল যে গত মাসে,
সেই আসিয়াছে, দোহাই! দোহাই! বাঁচি না যে খুড়ো ত্রাসে!
‘‘ভারি ত সাহস!’’ এই বলে দুলী খিল্ খিল্ করে হাসি,
হাত খুলে নিয়ে সোজনের কাছে ঘেঁষিয়া বসিল আসি।
একি তুই দুলী! বুঝিবা সোজন পড়িল আকাশ হতে,
চাপা হাসি তার ঠোঁটের বাঁধন মানে না যে কোনমতে।
দুলী কহে, দেখ! তুই ত আসিলি, মা তখন মোরে কয়,
বয়স বুঝিয়া লোকের সঙ্গে আলাপ করিতে হয়।
ও পাড়ার খেঁদি পাড়ারমুখীরে ঝেঁটিয়ে করিতে হয়।
আর জগাপিসী, মায়ের নিকটে যা তা বলিয়াছে তারা।
বয়স হয়েছে আমাদের থেকে ওরাই জানিল আগে,
ইচ্ছে যে করে উহাদের মুখে হাতা পুড়াইয়া দাগে।
আচ্ছা সোজন! সত্যি করেই বয়স যদিবা হত,
আর কেউ তাহা জানিতে পারিত এই আমাদের মত?
ঘাড় ঘুরাইয়া কহিল সোজন, আমি ত ভেবে না পাই,
আজকে হঠাৎ বয়স আসিল? আসিলই যদি শেষে,
কথা কহিল না, অবাক কান্ড, দেখি নাই কোনো দেশে।
দুলালী কহিল, আচ্ছা সোজন, বল দেখি তুই মোরে,
বয়স কেমন! কোথায় সে থাকে! আসে বা কেমন করে!
তাও না জানিস! সোজন কহিল, পাকা চুল ফুরফুরে,
লাঠি ভর দিয়ে চলে পথে পথে বুড়ো সে যে থুরথুরে।
দেখ দেখি ভাই, মিছে বলিসনে, আমার মাথার চুলে,
সেই বুড়ো আজ পাকাচুল লয়ে আসে নাইতরে ভুলে?
দুলীর মাথার বেণীটি খুলিয়া সবগুলো চুল ঝেড়ে,
অনেক করিয়া খুঁজিল সোজন, বুড়োনি সেথায় ফেরে!
দুলীর মুখ ত সাদা হয়ে গেছে, যদি বা সোজন বলে,
বয়স আজিকে এসেছে তাহার মাথার কেশেতে চলে!
বহুখন খুঁজি কহিল সোজন-নারে না, কোথাও নাই,
তোর চুলে সেই বয়স-বুড়োর চিহ্ন না খুঁজে পাই!
দুলালী কহিল, এক্ষুণি আমি জেনে আসি মার কাছে
আমার চুলেতে বয়সের দাগ কোথা আজি লাগিয়াছে।
দুলী যেন চলে যায়ই আর কি, সোজন কহিল তারে,
এক্ষুণি যাবি? আয় না একটু খেলিগে বনের ধারে।
বউ-কথা কও গাছের উপরে ডাকছিল বৌ-পাখি,
সোজন তাহারে রাগাইয়া দিল তার মত ডাকি ডাকি।
দুলীর তেমনি ডাকিতে বাসনা, মুখে না বাহির হয়,
সোজনেরে বলে, শেখা না কি করে বউ কথা কও কয়?
দুলীর দুখানা ঠোঁটেরে বাঁকায়ে খুব গোল করে ধরে,
বলে, এইবার শিস দে ত দেখি পাখির মতন স্বরে।
দুলীর যতই ভুল হয়ে যায় সোজন ততই রাগে,
হাসিয়া তখনদুলীর দুঠোট ভেঙে যায় হেন লাগে।
ধ্যেৎ বোকা মেয়ে, এই পারলি নে, জীভটা এমনি করে,
ঠোটের নীচেতে বাঁকালেই তুই ডাকিবি পাখির স্বরে।
এক একবার দুলালী যখন পাখির মতই ডাকে,
সোজনের সেকি খুশী, মোরা কেউ হেন দেখি নাই তাকে।
দেখ, তুই যদি আর একটুকু ডাকিতে পারিস ভালো,
কাল তোর ভাগে যত পাকা জাম হবে সব চেয়ে কালো।
বাঁশের পাতার সাতখানা নথ গড়াইয়া দেব তোরে,
লাল কুঁচ দেব খুব বড় মালা গাঁথিস যতন করে!
দুলী কয়, তোর মুখ ভরা গান, দে না মোর মুখে ভরে,
এই আমি ঠোঁট খুলে ধরিলাম দম যে বন্ধ করে।
দাঁড়া তবে তুই, বলিয়া সোজন মুখ বাড়ায়েছে যবে,
দুলীর মাতা যে সামনে আসিয়া দাঁড়াইল কলরবে।
ওরে ধাড়ী মেয়ে, সাপে বাঘে কেন খায় না ধরিয়া তোরে?
এতকাল আমি ডাইনি পুষেছি আপন জঠরে ধরে!
দাঁড়াও সোজন! আজকেই আমি তোমার বাপেরে ডাকি,
শুধাইব, এই বেহায়া ছেলের শাসি- সে দেবে নাকি?
এই কথা বলে দুলালীরে সে যে কিল থাপ্পড় মারি,
টানিতে টানিতে বুনো পথ বেয়ে ছুটিল আপন বাড়ি।
একলা সোজন বসিয়া রহিল পাথরের মত হায়,
ভাবিবারও আজ মনের মতন ভাষা সে খুঁজে না পায়?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/760
|
3004
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গায়ে আমার পুলক লাগে
|
ভক্তিমূলক
|
গায়ে আমার পুলক লাগে,
চোখে ঘনায় ঘোর,
হৃদয়ে মোর কে বেঁধেছে
রাঙা রাখীর ডোর।
আজিকে এই আকাশতলে
জলে স্থলে ফুলে ফলে
কেমন করে মনোহরণ
ছড়ালে মন মোর।কেমন খেলা হল আমার
আজি তোমার সনে।
পেয়েছি কি খুঁজে বেড়াই
ভেবে না পাই মনে।
আনন্দ আজ কিসের ছলে
কাঁদিতে চায় নয়নজলে,
বিরহ আজ মধুর হয়ে
করেছে প্রাণ ভোর।শিলাইদহ, ২৫ আশ্বিন, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gaye-amar-pulok-lage/
|
79
|
আবিদ আনোয়ার
|
নারান্দির নূরী পাগলি
|
মানবতাবাদী
|
নারান্দির নূরী পাগলি রাতদিন চষে ফেরে সমস্ত শহর,
পথের সম্রাজ্ঞী যেন, বহুকাল পথই তার ঘর।
সে এখন বৃন্তচ্যুত পাপড়ি-ছেঁড়া অবিন্যস্ত ফুল:
পাথুরে ভাস্কর্যে কারা পরিয়েছে ছিঁড়া-তেনা, এলোমেলো চুল।
ক্লেদে ও চন্দনে মাখা পুরুষ্ট উরুতে, অবারিত পিঠে
নিশ্চিত দোররার ঘায়ে চিত্রাঙ্কিত বাদামী কালশিটে।একদা রমণী ছিলো, হয়তো ছিলো স্বামী ও সন্তান,
‘ভাবী’ ডেকে তৃপ্তি পেতো মুদি ও বেপারী থেকে পাড়ার মস্তান;
অথবা হয়নি বিয়ে, ছিলো কোনো বা-বাবার উছল কুমারী,
নয়তো সে অন্ধকারে বেড়ে-ওঠা অন্য কোনো নারী।কী হবে এসব জেনে, এখন অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি মিছেÑ
প্রায়ই দেখি শূন্যমুঠো আগলে রেখে নিতম্বের পিছে
কী এক সম্পদ যেন লুকোতে লুকোতে বলে “দিমু না দিমু না!
চা’য়া কী দেহস বেডা, দোজহের লাকড়ি আমি, দেহা বড় গুণাহ!
তোগোর মতলব জানি: হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ হিঃ হিঃ...
আচ্ছা তবে ক’ তো দেহি এই হাতে কী?কখনো উৎসুক হয়ে কেউ যদি বলে দেখি কী এমন ধন!
মুঠি খুলে নূরী বলে:
ক্যান্ তোর চক্ষু নাই? এই দ্যাখ, আমার যৈবন...
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/narindir-nuri-pagli/
|
2993
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গান গাওয়ালে আমায়
|
ভক্তিমূলক
|
গান গাওয়ালে আমায় তুমি
কতই ছলে যে,
কত সুখের খেলায়, কত
নয়নজলে হে।
ধরা দিয়ে দাও না ধরা,
এস কাছে, পালাও ত্বরা,
পরান কর ব্যথায় ভরা
পলে পলে হে।
গান গাওয়ালে এমনি করে
কতই ছলে যে।কত তীব্র তারে, তোমার
বীণা সাজাও যে,
শত ছিদ্র করে জীবন
বাঁশি বাজাও হে।
তব সুরের লীলাতে মোর
জনম যদি হয়েছে ভোর,
চুপ করিয়ে রাখো এবার
চরণতলে হে,
গান গাওয়ালে চিরজীবন
কতই ছলে যে।রেলপথে, ২৫ শ্রাবণ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gan-gawale-amay/
|
2248
|
মহাদেব সাহা
|
যেতে যেতে অরণ্যকে বলি
|
চিন্তামূলক
|
এমনও অরণ্য তাকে উদ্দাম মর্মর মূর্তি ধরে নেয়া যায়,
বাতাসের অতি দম্ভ বৃক্ষের সমান উঁচু মেঘ, আরো উঁচু
অরণ্যের সীমা
এও শুধু অরণ্যেরই শোভা পায় এতো উঁচু এমন বিশাল
তাই তো মর্মরমূর্তি অরণ্যকে নিঃশব্দ প্রস্তর বলে ভ্রম হয়, মনে হয়
এ নৈঃশব্দ্য প্রস্তরেরই প্রাণ।
অরণ্যও অনেকাংশে জলেরই মতন আস্থাবান অথবা এ জঙ্গমতা
মানুষেরই মতো জন্মগত
মানুষেরই মতো এই স্থিতিগ্রাহ্য পার্থিবতা অরণ্যকে দেখে
মনে হয়
চতুর্দিকে হাত তুলে আমাদেরই আদি কোনো পিতা কোনো
আদিম পুরুষ
রয়েছেন সম্পূর্ণ স্বাধীন সমাসীন, তারই কায়া
এজন্যই অরণ্যকে অনেকাংশে পার্থিব মানুষ যেন লাগে
কখনো কখনো
তাহার ভিতরে বসে দুঃখের গভীর চলাফেরা দীর্ঘ করুণ নিঃশ্বাস
টের পাই
এমন নিশ্চিত ব্যস্ত এতো শব্দহীন এমন নির্জন কোলাহল, ঘুমিয়ে
পড়ার শব্দ
পাথরেরও ঘুম পায়, অরণ্যেরও অবসাদ লাগে,
বৃক্ষের উলঙ্গ মূর্তি আরো গূঢ় অধিক সংযম
আরো খাদ্য পানীয়ের টান এই অবিচ্ছিন্ন বিশুদ্ধ যৌনতা
যা কিনা স্বভাবে বদ্ধ অতি গূঢ় সুদৃঢ় যৌবন, মনে হয়
অরণ্যেতে আছে,
অরণ্যের অধিক অরণ্য সেও হয়তোবা একদিন সৃষ্টি হয়ে যাবে
কিংবা তাও নির্মাণ হয়েই আছে মানুষের সভ্যতার
স্বপ্নের ভিতর
সেই তো প্রস্তর, সেই তাম্র, প্রস্তর যুগের অস্ত্র,
অরণ্য প্রস্তরময়, অরণ্যও আমাদের লোক, তাকেও এভাবে চিনি
মাথায় জড়ানো সাপ পাগড়ির মতোই শাদামাঠা
কখনো পশ্চাৎ থেকে দেখে একান্তই ভিন্ন কেউ এসেছেন
তাও মনে হতে পারে,
আমি জানি আমি এই অরণ্যের খুব বেশি কিছুই জানি না
যতোখানি মানুষেরও জানি নিশ্চিতই অরণ্যেরও ততোটুকু
মাত্র জানা যায়
প্রকৃতই অরণ্য কি অধিক হৃদয়গম্য, পারি, ততোটুকু পারি
অধিক পারি না, ইহার অধিক কোনো কিছুই পারি না।
অরণ্য কি একদিন মানুষেরই মূর্তি ফিরে পবে, এমন
শোকার্ত হবে, দুঃখশীল হবে তার মন
অরণ্যের মনুষ্য স্বভাব মানুষের অরণ্য প্রকৃতি এও কি সম্ভব
অর্থাৎ যা অরণ্য ও আমাদের উভয়েরই সমান অংশে ভাগ!
এই দেখে অরণ্যের নিকট আত্মীয় কেউ অথবা প্রস্তর
আরো মৌন ম্লান হয়ে যাবে
যেতে যেতে ইচ্ছে করে অরণ্যকে একদিন একথা শুধাই,
চলে যেতে যেতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1509
|
5947
|
সৈয়দ শামসুল হক
|
পরানের গহীন ভিতর-৯
|
সনেট
|
একবার চাই এক চিক্কুর দিবার, দিমু তয়?
জিগাই কিসের সুখে দুঃখ নিয়া তুমি কর ঘর?
আঙিনার পাড়ে ফুলগাছ দিলে কি সোন্দর হয়,
দুঃখের কুসুম ঘিরা থাকে যার, জীয়ন্তে কবর।
পাথারে বৃক্ষের তরে ঘন ছায়া জুড়ায় পরান,
গাঙের ভিতরে মাছ সারাদিন সাঁতরায় সুখে,
বাসরের পরে ছায়া য্যান দেহে গোক্ষুর জড়ান,
উদাস সংসারে ব্যথা সারাদিন ঘাই দেয় বুকে।
তবুও সংসার নিয়া তারে নিয়া তুমি কি পাগল,
তোলো লালশাক মাঠে, ফসফস কোটো পুঁটিমাছ,
সাধের ব্যাঞ্জন করো, রান্ধো ক্ষীর পুড়ায়া আঞ্চল,
বিকাল বেলায় কর কুঙ্কুমের ফোঁটা দিয়া সাজ।
ইচ্ছা করে টান দিয়া নিয়া যাই তোমারে রান্ধুনি,
তোমার সুতায় আমি একখান নীল শাড়ি বুনি।।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/poraner-gohin-bhitor-9/
|
5552
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
হদিশ
|
মানবতাবাদী
|
আমি সৈনিক, হাঁটি যুগ থেকে যুগান্তরে
প্রভাতী আলোয়, অনেক ক্লান্ত দিনের পরে,
অজ্ঞাত এক প্রাণের ঝড়ে।বহু শতাব্দী দরে লাঞ্ছিত, পাই নি ছাড়া
বহু বিদ্রোহ দিয়েছে মনের প্রান্ত নাড়া
তবু হতবাক দিই নি সাড়া।আমি সৈনিক, দাসত্ব কাঁদে যুদ্ধে যেতে
দেখেছি প্রাণের উচ্ছ্বাস দূরে ধানের ক্ষেতে
তবু কেন যেন উঠি নি মেতে।কত সান্ত্বনা খুঁজেছি আকাশে গভীর নীলে
শুধু শূন্যতা এনেছে বিষাদ এই নিখিলে
মূঢ় আতঙ্ক জন-মিছিলে।ক্ষতবিক্ষত চলেছি হাজার, তবুও একা
সামনে বিরাট শত্রু পাহাড় আকাশ ঠেকা
কোন সূর্যের পাই নি দেখা।অনেক রক্ত দিয়েছি বিমূঢ় বিনা কারণে
বিরোধী স্বার্থ করেছি পুষ্ট অযথা রণে;
সঙ্গিবিহীন প্রাণধারণে।ভীরু সৈনিক করেছি দলিত কত বিক্ষোভ
ইন্ধন চেয়ে যখনি জ্বলেছে কুবেরীর লোভ
দিয়েছি তখনি জন-খাণ্ডব!একদা যুদ্ধ শুরু হল সারা বিশ্ব জুড়ে,
জগতের যত লুণ্ঠনকারী আর মজুরে,
চঞ্চল দিন ঘোড়ার খুরে।উঠি উদ্ধত প্রাণের শিখরে, চারিদিকে চাই
এল আহ্বান জন-পুঞ্জের শুনি রোশনাই
দেখি ক্রমাগত কাছে উৎরাই।হাতছানি দিয়ে গেল শস্যের উন্নত শীষ,
জনযাত্রায় নতুন হদিশ –
সহসা প্রণের সবুজে সোনার দৃঢ় উষ্ণীষ।। (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/hodish/
|
5578
|
সুকুমার রায়
|
আহ্লাদী
|
হাস্যরসাত্মক
|
হাসছি মোরা হাসছি দেখ, হাসছি মোরা আহ্লাদী,
তিন জনেতে জট্লা ক’রে ফোক্লা হাসির পাল্লা দি।
হাসতে হাসতে আসছে দাদা ,আসছি আমি, আসছে ভাই,
হাসছি কেন কেউ জানে না, পাচ্ছে হাসি হাসছি তাই।
ভাবছি মনে, হাসছি কেন? থাকব হাসি ত্যাগ করে,
ভাবতে গিয়ে ফিকফিকিয়ে ফেলছি হেসে ফ্যাক ক’রে ।
পাচ্ছে হাসি চাপতে গিয়ে, পাচেছ হাসি চোখ বুজে,
পাচ্ছে হাসি চিমটি কেটে নাকের ভিতর নখ গুজে।
হাসছি দেখে চাঁদের কলা জোলার মাকু জেলের দাঁড়
নৌকা ফানুস পিপড়ে মানুষ রেলের গাড়ী তেলের ভাঁড়।
পড়তে গিয়ে ফেলছি হেসে ‘ক খ গ’ আর শ্লেট দেখে-
উঠ্ছে হাসি ভস্ভসিয়ে সোডার মতন পেট থেকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/513
|
759
|
জয় গোস্বামী
|
হৃদপিণ্ড–এক ঢিবি মাটি
|
চিন্তামূলক
|
হৃদপিণ্ড–এক ঢিবি মাটি
তার উপরে আছে খেলবার
হাড়। পাশা। হাড়।
হৃদপিণ্ড, মাটি এক ঢিবি
তার উপরে শাবল কোদাল চালাবার
অধিকার, নিবি?
চাবড়ায় চাবড়ায় উঠে আসা
মাটি মাংস মাটি মাংস মাটি–
পাশা। হাড়। পাশা।
দূরে ক্ষতবিক্ষত পৃথিবী
জলে ভেসে রয়েছে এখনো–
তাকে একমুঠো, একমাটি
হৃদপিণ্ড, দিবি?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1772
|
4152
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
ভালোবাসা মানে
|
প্রেমমূলক
|
ভালোবাসা মানে নতুন কোন কষ্টে জড়ানো
সুখের আশায় দুঃখের সাগরে ঝাপ দেওয়ানো
উত্তাল ঢেউ এর মধ্যে দু’জন একসাথে সাঁতরানো
একজনের সুখে অন্য জনের ভাগ বসানো
একজনের দুঃখে অন্য জনের কাতর হওয়ানো।।
ভালোবাসা মানে দুঃখের মাঝে সুখের ঘ্রাণ নেওয়ানো
সুখের মাঝে দুঃখকে লুকানো
হাসির মাঝে মধু মাখানো
চোখের জলে বুক ভাসানো
কারো জন্য নির্ঘুম রাত কাটানো।।
ভালোবাসা মানে তুমুল ঝড়ের মাঝে পথ পেরোনো
বৃষ্টির মাঝে শরীর ভিজানো
মেঘের মাঝে মুখ লুকানো
গহীন অরণ্যে রাত কাটানো
দুর্গম পাহাড়ে পা আটকানো।।
ভালোবাসা মানে সুখের আশায় দূর আকাশে তাকানো
শত অপবাদের সাথে নিজেকে জড়ানো
জ্যোৎস্না রাতে ছাদে বসে রাত কাটানো
বিরহের ব্যাথায় বুক ফাটানো
দু’জনের মাঝে দুজনকে হারানো।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2131.html
|
3356
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পদ্মায়
|
ছড়া
|
আমার নৌকো বাঁধা ছিল পদ্মানদীর পারে,
হাঁসের পাঁতি উড়ে যেত মেঘের ধারে ধারে--
জানিনে মন-কেমন-করা লাগত কী সুর হাওয়ার
আকাশ বেয়ে দূর দেশেতে উদাস হয়ে যাওয়ার।
কী জানি সেই দিনগুলি সব কোন্ আঁকিয়ের লেখা,
ঝিকিমিকি সোনার রঙে হালকা তুলির রেখা।
বালির 'পরে বয়ে যেত স্বচ্ছ নদীর জল,
তেমনি বইত তীরে তীরে গাঁয়ের কোলাহল--
ঘাটের কাছে, মাঠের ধারে, আলো-ছায়ার স্রোতে;
অলস দিনের উড়্নিখানার পরশ আকাশ হতে
বুলিয়ে যেত মায়ার মন্ত্র আমার দেহে-মনে।
তারই মধ্যে আসত ক্ষণে ক্ষণে
দূর কোকিলের সুর,
মধুর হত আশ্বিনে রোদ্দুর।
পাশ দিয়ে সব নৌকো বড়ো বড়ো
পরদেশিয়া নানা খেতের ফসল ক'রে জড়ো
পশ্চিমে হাট বাজার হতে, জানিনে তার নাম,
পেরিয়ে আসত ধীর গমনে গ্রামের পরে গ্রাম
ঝপ্ঝপিয়ে দাঁড়ে।
খোরাক কিনতে নামত দাঁড়ি ছায়ানিবিড় পাড়ে।
যখন হত দিনের অবসান
গ্রামের ঘাটে বাজিয়ে মাদল গাইত হোলির গান।
ক্রমে রাত্রি নিবিড় হয়ে নৌকো ফেলত ঢেকে,
একটি কেবল দীপের আলো জ্বলত ভিতর থেকে।
শিকলে আর স্রোতে মিলে চলত টানের শব্দ;
স্বপ্নে যেন ব'কে উঠত রজনী নিস্তব্ধ।
পুবে হাওয়ায় এল ঋতু, আকাশ-জোড়া মেঘ;
ঘরমুখো ওই নৌকোগুলোয় লাগল অধীর বেগ।
ইলিশমাছ আর পাকা কাঁঠাল জমল পারের হাটে,
কেনাবেচার ভিড় লাগল নৌকো-বাঁধা ঘাটে।
ডিঙি বেয়ে পাটের আঁঠি আনছে ভারে ভারে,
মহাজনের দাঁড়িপাল্লা উঠল নদীর ধারে।
হাতে পয়সা এল, চাষি ভাব্না নাহি মানে,
কিনে নতুন ছাতা জুতো চলেছে ঘর-পানে।
পরদেশিয়া নৌকোগুলোর এল ফেরার দিন,
নিল ভরে খালি-করা কেরোসিনের টিন;
একটা পালের 'পরে ছোটো আরেকটা পাল তুলে
চলার বিপুল গর্বে তরীর বুক উঠেছে ফুলে।
মেঘ ডাকছে গুরু গুরু, থেমেছে দাঁড় বাওয়া,
ছুটছে ঘোলা জলের ধারা, বইছে বাদল হাওয়া।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/paday/
|
789
|
জসীম উদ্দীন
|
কমলা রাণী
|
গীতিগাথা
|
কমলা রাণীর দীঘি ছিল এইখানে,
ছোট ঢেউগুলি গলাগলি ধরি ছুটিত তটের পানে।
আধেক কলসী জলেতে ডুবায়ে পল্লী-বধূর দল,
কমলা রাণীর কাহিনী স্মরিতে আঁখি হত ছল ছল।
আজ সেই দীঘি শুকায়েছে, এর কর্দমাক্ত বুকে,
কঠিন পায়ের আঘাত হানিয়া গরুগুলি ঘাস টুকে।
জলহীন এই শুষ্ক দেশের তৃষিত জনের তরে।
কোন সে নৃপের পরাণ উঠিল করুণার জলে ভরে।
সে করুণা ধারা মাটির পাত্রে ভরিয়া দেখার তরে,
সাগর দীঘির মহা কল্পনা জাগিল মনের ঘরে।লক্ষ কোদালী হইল পাগল, কঠিন মাটিরে খুঁড়ি,
উঠিল না হায় কল-জল-ধারা গহন পাতাল ফুঁড়ি।
দাও, জল দাও, কাঁদে শিশু মার শুষ্ক কন্ঠ ধরি,
ঘরে ঘরে কাঁদে শূন্য কলসী বাতাসে বক্ষ ভরি।
লক্ষ কোদালী আরো জোরে চলে, কঠিন মাটির থেকে,
শুষ্ক বালুর ধূলি উড়ে বায় উপহাস যেন হেঁকে।কোথায় রয়েছে ভাট ব্রাক্ষণ, কোথায় গণক দল,
জলদী করিয়া গুনে দেখ কেন দীঘিতে ওঠে না জল?
আকাশ হইতে গুণিয়া দেখিও শত-তারা আঁখি দিয়া,
পাতালে গুণিও বাসকি-ফণার মণি-দীপ জ্বালাইয়া।
ঈশানে গুণিও ঈশানী গলের নর-মুন্ডের সনে,
দক্ষিনে গুনো, শাহ মান্দার যেথা সুন্দর বনে।
আকাশ গণিল, পাতাল গণিল, গলিল দশটি দিক,
দীঘিতে কেন যে জল ওঠেনাক বলিতে নারিল ঠিক।নিশির শয়নে জোড়মন্দিরে স্বপন দেখিছে রাণী,
কে যেন আসিয়া শুনাইল তারে বড় নিদারুণ বানী;
সাগর দীঘিতে তুমি যদি রাণী! দিতে পার প্রাণদান,
পাতল হইতে শত ধারা-মেলি জাগিবে জলের বান।
স্বপন দেখিয়া জাগিল যে রাণী, পূর্বের গগন-গায়,
রক্ত লেপিয়া দাঁড়াইল রবি সুদূরের কিনারায়।
শোন শোন ওহে পরাণের পতি ছাড় গো আমার মায়া,
উড়ে চলে যায় আকাশের পাখি পড়ে রয় শুধু ছায়া।পেটরা খুলিয়া তুলে নিল রাণী অষ্ট অলঙ্কার,
রাসমন্ডল শাড়ীর লহরে দেহটি জড়াল তার।
কৌটা খুলিয়া সিঁদুর তুলিয়া পরিল কপাল ভরি,
দুর্গা প্রতিমা সাজিল বুঝি বা দশমীর বাঁশী স্মরি।
ধীরে ধীরে রাণী দাঁড়াইল আসি সাগর দীঘির মাঝে,
লক্ষ লক্ষ কাঁদে নরনারী শুকনো তটের কাছে।
পাতাল হইতে শতধারা মেলি নাচিয়া আসিল জল,
রাণীর দুখানা চরণে পড়িয়া হেসে ওঠে খল খল।
খাড়ু জলে রাণী খুলিয়া ফেলিল পায়ের নুপূর তার,
কোমর জলেতে ছিড়িল যে রাণী কোমরে চন্দ্রহার।
বুক-জলে রাণী কন্ঠে হইতে গজমতি হার খুলে,
কোরের ছেলেটি জয়ধর কোথা দেখে রাণী আঁখি তুলে।
গলাজলে রাণী খোঁপা হতে তার ভাসাল চাঁপার ফুল।
চারিধার হতে কল-জলধারা ভরিল দীঘির কূল।
সেই ধারা সনে মিশে গেল রাণী আর আসিল না ফিরে,
লক্ষ লক্ষ কাঁদে নরনারী আকাশ বাতাস ঘিরে।
***
কমলা রানীর এই সেই দীঘি, কার অভিশাপে আজ,
খুলিয়া ফেলেছে অঙ্গ হইতে জল-কুমুদীর সাজ।
পাড়ে পাড়ে আজ আছাড়ি পড়ে না চঞ্চল ঢেউদল,
পল্লী-বধূর কলসীর ঘায়ে দোলে না ইহার জল।
কমলা রাণীর কাহিনী এখন নাহিক কাহারো মনে,
রাখালের বাঁশী হয় না করুণ নিশীথ উদাস বনে।
শুধু এই গাঁর নূতন বধূরে বরিয়া আনিতে ঘরে,
পল্লীবাসীরা বরণ কুলাটি রেখে যায় এর পরে।
গভীর রাত্রে সেই কুলাখানি মাথায় করিয়া নাকি,
আলেয়ার মত কে এক রূপসী হেসে ওঠে থাকি থাকি।কাব্যগ্রন্থ: মাটির কান্না
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/post20160509060450/
|
2280
|
মহাদেব সাহা
|
স্বভাব
|
চিন্তামূলক
|
আমি কি কিছুর মতো? কারো মতো? কোনো
সদৃশ বস্তুর মতো? যে
আমাকে মেলাবে,
সোনালি ঝর্নার সাথে, সবুজ বৃক্ষের সাতে,
নদী বা তারার সাথে?
আমি কি কিছুর মতো? শিশু ও শিল্পির মতো?
রদাঁর মূর্তির মতো?
হয়তোবা পাখি, হয়তোবা ফুল, হয়তো সে দরবেশ
আমি এ কিসের মতো?- যে
আমাকে মেলাবে;
চাঁদের বর্ণের মতো? টিয়ার চোখের মতো?
অরণ্যে শিলার মতো?
আমি ঠিক কিসের মতন
না ঝর্ণার সদৃশ, পাখির সমান, না বৃক্ষের তুলনা
আমি কি নদীর শব্দ, পাতার শিশির
নাকি কোনো যুবতীর রাঙা অভিমান!
আমাকে যা ভাবো, ধরো হাতের অঙ্গুরি
মেঘ, ভাঁটফুল, সিংহের আকৃতি,
আমি ঠিক কিসের মতন, কার মতো? কোনো
সদৃশ বস্তুর মতো?
আমাকে যা ভাবো, ধরো নদী, ধরো স্তল, ধরো অগ্নি,
আমি বস্তুত স্বভাব।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1462
|
3755
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মৌন
|
সনেট
|
যাহা-কিছু বলি আজি সব বৃথা হয়,
মন বলে মাথা নাড়ি—এ নয়, এ নয়।
যে কথায় প্রাণ মোর পরিপূর্ণতম
সে কথা বাজে না কেন এ বীণায় মম।
সে শুধু ভরিয়া উঠি অশ্রুর আবেগে
হৃদয়আকাশ ঘিরে ঘনঘোর মেঘে;
মাঝে মাঝে বিদ্যুতের বিদীর্ণ রেখায়
অন্তর করিয়া ছিন্ন কী দেখাতে চায়?
মৌন মূক মূঢ়-সম ঘনায়ে আঁধারে
সহসা নিশীথরাত্রে কাঁদে শত ধারে।
বাক্যভারে রুদ্ধকণ্ঠ, রে স্তম্ভিত প্রাণ,
কোথায় হারায়ে এলি তোর যত গান।
বাঁশি যেন নাই, বৃথা নিশ্বাস কেবল—
রাগিনীর পরিবর্তে শুধু অশ্রুজল।
(চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mouno/
|
4292
|
শামসুর রাহমান
|
অজানা পথের ধুলোবালি
|
চিন্তামূলক
|
কে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে অজানা পথের
ধুলোবালি চোখে-মুখে ছড়িয়ে সন্ধ্যায়?
কেন যাচ্ছি? কী হবে সেখানে
গিয়ে? জানা নেই। মাঝে-মাঝে
বিছানায় শুয়ে সাত-পাঁচ ভেবে চলি। অতীতের
কিছু কথা স্মৃতিপটে ভাসে।হঠাৎ ভীষণ শব্দ আমাকে কামড়ে ধরে যেন-
ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। অন্ধকার যেন
আরও বেশি গাঢ় হয়ে যায়, এমনকি নিজ হাত
এতটুকু পড়ছে না স্বদৃষ্টিতে। থেকে
যেতে হ’ল আখেরে সেখানে, যে-স্থানের
সবকিছু বেজায় অজানা!আজকাল প্রায়শই জানাশোনা লোকের মৃত্যুর
খবর বিষণ্ন করে অতিশয় টেলিফোন,
কখনও সংবাদপত্র কিংবা রেডিওর মারফত।
কোনও-কোনও আত্মীয়স্বজন যারা অতি
সাধারণ, নামের জৌলুসহীন, আড়ালেই থাকে।
লক্ষ, কোটি মানুষের মতো।কখনও কখনও আয়নায় নিজের চেহারা দেখে
সহসা চমকে ওঠে। এই আমি আজ
আমার আপনজনদের মাঝে হেসে, খেলে
থাকি; একদিন আচানক মুছে যাব
ধুলো-তখন সত্তা, পদ্য এবং আপনজন-সবই
শুধু অর্থহীন, হাহাকার! (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ojana-pother-dhulobali/
|
5032
|
শামসুর রাহমান
|
বিশদ তদন্তসূত্রে
|
সনেট
|
বিশদ তদন্তসূত্রে জানা গেল ফাল্গুন সন্ধ্যায়-
তোমার হিশেব নাকি, কবি, খুবই পাকা চিরদিন।
বাউল গানের মতো তোমার জীবন উদাসীন,
এই তো জানতো লোকে, তোমাকে অনেকে অসহায়,
বড় জবুথবু বলে করেছে শনাক্ত, তবু, হায়,
সেয়ানা হিশেবীরূপে খ্যাতি রটে তোমার হে কবি।
তোমার হৃদয়ে জ্বলে সর্বদাই যে রক্তকরবী
তাও নাকি হিশেবেরই ফুল? যে কিন্নর গান গায়তোমার ভিতরে ভেলা অবেলায়, যে-ও বুঝি গণিতের
ক্রীতদাস? যে প্রেমিক তোমার কংকাল জুড়ে আছে,
তার হাতে যোগ-বিয়োগের ফলাফলময় খাতা?
অথচ যদ্দুর জানি করেছে উজাড় জীবনের
সমস্ত তবিল তুমি গোপন জুয়ায়, যারা বাঁচে
নিক্তিতে ওজন করে তুমি নও তাদের উদ্গাতা। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bishod-todontosutre/
|
4824
|
শামসুর রাহমান
|
থমকে থেকো না
|
মানবতাবাদী
|
থমকে থেকো না; আর কতকাল এভাবে দাঁড়িয়ে
থাকবে? এগিয়ে যাও। পেছনে হটতে
চাও বুঝি? এখন সে পথ বন্ধ; প্রখর দুপুর
বিকেলের সঙ্গে ঢলাঢলি শুরু করে
দিয়েছে সে কবে, দেখতেই পাচ্ছো। এবার ঝাড়া
দিয়ে ওঠো, নয়তো অন্ধকার
অচিরে করবে গ্রাস তোমাকেই। তখন অরণ্যে একা-একা
কেঁদে বেড়ালেও কেউ করবে না খোঁজ।যদি ভাবো, সময় তোমার
মুঠোয় থাকবে বন্দী সারাক্ষণ, তবে ভয়ঙ্কর
ভুল হয়ে যাবে হিসেবের
হিজিবিজি খাতার পাতায়। পা বাড়াও তাড়াতাড়ি;
তোমাকে ছাড়াই সব কিছু ঠিকঠাক
চলবে, একথা মনে ঠাঁই দিতে পারো অবশ্যই। তবু বলি,
যতদিন আছো
প্রবল আবেগ নিয়ে বাঁচো, শক্রর ব্যুহের দিকে
এগোতে করো না দ্বিধা। অভিমন্যু হলেও তোমার
খেদ থাকা অনুচিত; কেউ কেউ এভাবেই যায়,
যেতে হয়, পরিণাম ছায়া হয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন
মেফিস্টোফিলিস, মুখে হিংস্র হাসি। তোমাকে পাতালে
নিয়ে যাবে, সাধ্য কার? নিজের পাহারাদার তুমি।সবারই কিছু না কিছু পিছুটান থাকে। পুরাকালে
নাবিকেরা গভীর সমুদ্রে নাকি কখনো সখনো
কুহকিনী মোহিনীর গান শুনে চৈতন্যরহিত
দ্রুত ভ্রমে হারাতো জীবন নিরুদ্দেশে। যতদূর
জানা আছে, তুমি নও তেমন নৌজীবী। সামনের
দিকে পা চালাও, দাও ডাক দশদিকে
এমন জোড়ালো কণ্ঠে যাতে
বজেরও লজ্জায় মুখ বন্ধ হয়ে থাকে। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/thomke-theko-na/
|
3632
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বেদনা দিবে যত
|
নীতিমূলক
|
বেদনা দিবে যত
অবিরত
দিয়ো গো।
তবু এ ম্লান হিয়া
কুড়াইয়া
নিয়ো গো।
যে ফুল আনমনে
উপবনে
তুলিলে
কেন গো হেলাভরে
ধুলা-'পরে
ভুলিলে।বিঁধিয়া তব হারে
গেঁথো তারে
প্রিয় গো। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bedona-dibe-joto/
|
4533
|
শামসুর রাহমান
|
কত আর কেটে ছেঁটে
|
চিন্তামূলক
|
কত আর কেটে ছেঁটে রাখব নিজেকে প্রতিদিন
অন্যদের পছন্দমাফিক? নিষেধের কাঁটাতারে
ঘেরা এ জীবন কাতরায় আর নির্দয় প্রহারে
বিবেক আমাকে মোড়ে মোড়ে খুব করেছে মলিন।যদি হতে পারতাম শুধু শিশ্নোদরপরায়ণ
এক জীব কিংবা কোনো বিবাগী সন্ন্যাসী বনচারী,
তাহলে হৃদয় আজ হতো না এমন হঠকারী,
অবিরত করতাম না তালাশ তৃতীয় নয়ন।অচেনা অপর কেউ নয়, যারা আমার আপন
পরিবার পরিজন, তারা চায় আমি পড়ে থাকি
গৃহকোণে, ডানাছাঁটা পাখি নিরন্তর এঁদো ডোবা
আমাকে করুক গ্রাস, ছাঁচে-গড়া জীবন, যাপন
যেন করি আগাগোড়া। তবু প্রতিক্ষণ মনে রাখি-
আমাকে দিয়েছে গৌরী নীলাকাশ, সমুদ্রের শোভা। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/koto-ar-kete-chete/
|
3892
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শ্যাম মুখে তব মধুর অধরমে
|
ভক্তিমূলক
|
শ্যাম , মুখে তব মধুর অধরমে
হাস বিকশিত কায় ?
কোন স্বপন অব দেখত মাধব ,
কহবে কোন হমায় !
নীদমেঘ'পর স্বপনবিজলিসম
রাধা বিলসত হাসি ।
শ্যাম , শ্যাম মম , কৈসে শোধব
তুঁহুক প্রেমঋণরাশি ।
বিহঙ্গ , কাহ তু বোলন লাগলি ?
শ্যাম ঘুমায় হমারা !
রহ রহ চন্দ্রম , ঢাল ঢাল তব
শীতল জোছনধারা ।
তারকমালিনী সুন্দর যামিনী
অবহুঁ ন যাও রে ভাগি ,
নিরদয় রবি , অব কাহ তু আওলি,
জ্বাললি বিরহক আগি ।
ভানু কহত—অব রবি অতি নিষ্ঠুর
নলিনমিলনঅভিলাষে
কত নরনারীক মিলন টুটাওত,
ডারত বিরহহুতাশে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sam-moka-tabu-mudar-adrama/
|
2177
|
মহাদেব সাহা
|
তোমার নিকটে
|
প্রেমমূলক
|
কেবল স্বপ্নের মধ্যে যাতে পারি আমি
তোমার নিকটে-
তা ছাড়া তোমার কাছে পৌঁছবার আর কোনো পথ খোলা নেই;
সম্ভাব্য সকল রাস্তা অবরুদ্ধ, নৌ বা
বিমানপথে
সতত প্রহরা
স্থলপথ জুড়ে অনেক আগেই ঘন
কাঁটাতার,
এখন দেখছি আমাদের দুজনের মাঝে লক্ষ কোটি মাইল দূরত্ব
তোমার নিকটে যাওয়ার পথ এতো দীর্ঘ
এমনি অচেনা
তার চেয়ে বরং কলম্বাস কিংবা ভাস্কো ডা গামার
সমুদ্রযাত্রাও
ছিলো অনেক সহজ;
এই দক্ষিণ মেরুর পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর
মেরুতে
যেতে কোটি কোটি সৌরবর্ষ
হেঁটে যেতে হবে,
নৌপথে সেখানে যেতে
পৃথিবীর সবক’টি মহাসাগর পাড়ি দিতে হবে কয়েক লক্ষ বর
দ্রুততম মহাশূন্য যানেও এই দূরত্ব পেরুতে গেলে
লেগে যাবে আরো অনেক জীবন;
কেবল ঘুমের মধ্যে তোমার দুচোখে স্বপ্ন হয়ে
যেতে পারি আমি
সোনার কাঁকই দিয়ে খুব যত্নে বেঁধে দিতে পারি
ঘন চুল,
সহজে দেখতে পারি তোমার কোমল পায়ে কোথায়
ফুটেছে ঠিক কাঁটা,
ছড়ে গেছে কয়টি আঙুল, দুই ওষ্ঠে শুষে নিতে
পারি সব
রক্ত, পূঁজ, বিষ;
কেবল সেখানে হাত ধরে পাশাপাশি বসতে পারি পার্কের ছায়ায়
কিংবা নির্জন লেকের ধারে,
কোনো মৌন রেস্তরাঁয়
এ ছাড়া তোমার নিবিড় সান্নিধ্য লাভ
কখনো সম্ভব নয়
তোমার আমার নিভৃতে বসার মতো
এতোটুকু নির্জনতা নেই এ শহরে-
একটিও সবুজ উদ্যান নেই, তিতির-শালিক নেই,
যার পাশে নিরিবিলি একটু বসতে পারি,
মৃদু স্বরে একটু করতে পারি বাক্যালাপ
এমনটি পরস্পর সামান্য কুশল বিনিময়।
এই সমস্ত দূরত্ব আর বাধার প্রাচীর ভেদ করে
কেবল স্বপ্নের মধ্যে অনায়অসে
যেতে পারি আমি তোমার নিকটে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1332
|
425
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বিদায়-স্মরণে
|
শোকমূলক
|
পথের দেখা এ নহে গো বন্ধু
এ নহে পথের আলাপন।
এ নহে সহসা পথ-চলা শেষে
শুধু হাতে হাতে পরশন।।
নিমেষে নিমেষে নব পরিচয়ে
হ’লে পরিচিত মোদের হৃদয়ে,
আসনি বিজয়ী-এলে সখা হ’য়ে,
হেসে হ’রে নিলে প্রাণ-মন।।
রাজাসনে বসি’ হওনি ক’ রাজা,
রাজা হ’লে বসি, হৃদয়ে,
তাই আমাদের চেয়ে তুমি বেশী
ব্যথা পেলে তব বিদায়ে।
আমাদের শত ব্যথিত হৃদয়ে
জাগিয়া রহিবে তুমি ব্যথা হ’য়ে,
হ’লে পরিজন চির-পরিচয়ে-
পুনঃ পাব তার দরশন,
এ নহে পথের আলাপন।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bidayshorone/
|
393
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়
|
মানবতাবাদী
|
যায় মহাকাল মূর্ছা যায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়
যায় অতীত
কৃষ্ণ-কায়
যায় অতীত
রক্ত-পায়—
যায় মহাকাল মূর্ছা যায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!
যায় প্রবীণ
চৈতি-বায়
আয় নবীন-
শক্তি আয়!
যায় অতীত
যায় পতিত,
‘আয় অতিথ,
আয় রে আয় –’
বৈশাখী-ঝড় সুর হাঁকায় –
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!
ওই রে দিক্-
চক্রে কার
বক্রপথ
ঘুর-চাকার!
ছুটছে রথ,
চক্র-ঘায়
দিগ্বিদিক
মূর্ছা যায়!কোটি রবি শশী ঘুর-পাকায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!
ঘোরে গ্রহ তারা পথ-বিভোল, –
‘কাল’-কোলে ‘আজ’খায় রে দোল!
আজ প্রভাত
আনছে কায়,
দূর পাহাড়-
চূড় তাকায়।
জয়-কেতন
উড়ছে কার
কিংশুকের
ফুল-শাখায়।
ঘুরছে রথ,
রথ-চাকায়
রক্ত-লাল
পথ আঁকায়।
জয়-তোরণ
রচছে কার
ওই উষার
লাল আভায়,
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়।গর্জে ঘোর
ঝড় তুফান
আয় কঠোর
বর্তমান।
আয় তরুণ
আয় অরুণ
আয় দারুণ,
দৈন্যতায়!
দৈন্যতায়!
ওই মা অভয়-হাত দেখায়
রামধনুর
লাল শাঁখায়!
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!
বর্ষ-সতী-স্কন্ধে ওই
নাচছে কাল
থই তা থই
কই সে কই
চক্রধর,
ওই মায়ায়
খণ্ড কর।
শব-মায়ায়
শিব যে যায়
ছিন্ন কর
ওই মায়ায় —
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়
প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়! (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/probortoker-ghur-chakai/
|
4521
|
শামসুর রাহমান
|
ক এখন
|
সনেট
|
ক এখন একা-একা প্রতিদিন ঘুরছে শহরে।
ফুটপাত ত্র্যাভেনিউ, বিপনী-বিতান, অলিগলি-
কিছুই পড়ে না বাদ। কোন অলৌকিক বনস্থলী
দিয়েছিলো গূঢ় ডাক মধ্যরাতে, তার মনে পড়ে
মাঝে-মধ্যে। ক এখন প্রায়শ আপনকার ঘরে
থাকে না, বসে না চুপচাপ। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে ছুড়ে
হাঁটে, শুধু একা, যেতে চায় দ্রুত বহুদূরে।
শহর থাকুক পড়ে, ক এখন বলে রুক্ষ স্বরে।যতই এগিয়ে যায়, তত সে বিরূপ শহরেই
কী আশ্চর্য, ঘুরপাক খায় এবং নিজেকে তার
বড় অসহায় লাগে, বুকে ভয়ঙ্কর ধূলিঝড়,
জব্দ বীণা, মৃত সিংহ। কখনো হারিয়ে ফেলে খেই
চিন্তার, একাকী থাকে পড়ে রিক্ত ঢিবির ওপর-
যেন সে তুখোড় বিক্রেতার হাতে স্তিমিত শিকার। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ko-ekhon/
|
5729
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
আমার কয়েকটি নিজস্ব শব্দ
|
চিন্তামূলক
|
পরিত্রাণ, তুমি শ্বেত, একটুও ধূসর নও, জোনাকির পিছনে বিদ্যুৎ,
যেমন তোমার চিরকাল
জোনাকির চিরকাল; স্বর্গ থেকে পতনের পর
তোমার অসুখ হলে ভয় পাই, বহু রাত্রি জাগরণ- প্রাচীন মাটিতে
তুমি শেষ উত্তরাধিকার। একাদশী পার হলে-তোমার নিশ্চিত পথ্য হবে।
আমার সঙ্গম নয় কুয়াশায় সমুদ্র ও নদী;
ঐ শব্দ চতুষ্পদ, দ্বিধঅ, কিছুটা উপরে, সার্থকতা যদি উদাসীন;
বিপুল তীর্থের পূণ্য-নয়? সর্বগ্রাস
যেমন জীবন আর জবিনী লেখক।
প্লেনের ভিতরে কান্না এক দেশ থেকে অন্য দেশে উড়িয়ে আনি
একই বুজের মধ্যে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1881
|
2240
|
মহাদেব সাহা
|
মুখের বদলে কোনো মুখোশ রাখবো না
|
চিন্তামূলক
|
সব ছিন্ন হয়ে যাক, এই মিথ্যা মুখ,
এই মুখের মুখোশ
সম্পূর্ণ পড়ুক খুলে;
এই মিথ্যা মানুষের নকল সম্পর্ক, এই
ভোজভাজি
যা যাওয়ার তার সবই খসে যাক,
ঝরে পড়ে যাক,
ছিন্ন হয়ে যাক এই কৃত্রিম ভূগোল,
এই মিথ্যা জলবায়ু;
স্পষ্ট হোক, প্রকাশিত হোক তার নিজস্ব প্রকৃতি
ছিন্ন হোক এই কৃত্রিম বন্ধন,
অদৃশ্য অলীক রজ্জু
থাক শুধু যা কিছু মৌলিক
পদার্থের যা কিছু প্রধন সত্তা;
সব ছিন্ন হয়ে যাক, খসে যাক,
ঝরে পড়ে যাক
থাক শুধু মৌলিক সত্তা, যা কিছু মৌলিক
আমি আর কোথাও কোনো মুখোশ
রাখবো না,
মুখোশ রাখবো না,
মুখোশের সাথে মিথ্যা সম্পর্কের
এই কঠিন কপট রজ্জু
আজ খুলে ফেলে ছিন্ন করে দেবো;
আমি কোনো মুখোশ রাখবো না,
মুখের বদলে কোনো মুখাকৃতি
মোটেও রাখবো না,
সব ছিন্ন হয়ে যাক, চুকে বুকে যাক
শেষ হয়ে যাক
এই মিথ্যা মুখোশ আমি
মোটেও রাখবো না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1325
|
105
|
আবুল হাসান
|
গোলাপের নীচে নিহত হে কবি কিশোর
|
প্রেমমূলক
|
গোলাপের নীচে নিহত হে কবি কিশোর আমিও ভবঘুরেদের প্রধান
ছিলাম ।
জোৎস্নায় ফেরা জাগুয়ারা চাঁদ দাঁতে ফালা ফালা করেছে আমারও
প্রেমিক হৃদয় !
আমিও আমার প্রেমহীনতায় গণিকার কাছে ক্লান্তি
সঁপেছি
বাঘিনীর মুখে চুমু খেয়ে আমি বলেছি আমাকে উদ্ধার দাও !
সক্রেটিসের হেমলক আমি মাথার খুলিতে ঢেলে তবে পান করেছি মৃত্যু
হে কবি কিশোর
আমারও অনেক স্বপ্ন শহীদ হয়েছে জীবনে কাঁটার আঘাত সয়েছি
আমিও ।
হৃদয়ে লুকানো লোহার আয়না ঘুরিয়ে সেখানে নিজেকে দেখেছি
পান্ডুর খুবই নিঃস্ব একাকী !
আমার পয়ের সমান পৃথিবী কোথাও পাইনি অভিমানে আমি
অভিমানে তাই
চক্ষু উপড়ে চড়ুইয়ের মতো মানুষের পাশে ঝরিয়েছি শাদা শুভ্র পালক !
হে কবি কিশোর নিহত ভাবুক, তেমার দুঃখ আমি কি বুঝি না ?
আমি কি জানি না ফুটপাতে কারা করুণ শহর কাঁধে তুলে নেয় ?
তোমার তৃষ্ণা তামার পাত্রে কোন কবিতার ঝিলকি রটায় আমি কি
জানি না
তোমার গলায় কোন গান আজ প্রিয় আরাধ্য কোন করতলও হাতে লুকায়
আমি কি জানি না মাঝরাতে কারা মৃতের শহর কাঁধে তুলে নেয় ?
আমারও ভ্রমণ পিপাসা আমাকে নারীর নাভিতে ঘুরিয়ে মেরেছে
আমিও প্রেমিক ক্রবাদুর গান স্মৃতি সমুদ্রে একা শাম্পান হয়েছি
আবার
সুন্দর জেনে সহোদরকেও সঘন চুমোয় আলুথালু করে খুঁজেছি
শিল্প ।
আমি তবু এর কিছুই তোমাকে দেবো না ভাবুক তুমি সেরে ওঠো
তুমি সেরে ওঠো তোমার পথেই আমাদের পথে কখনও এসো না,
আমাদের পথ
ভীষণ ব্যর্থ আমাদের পথ
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/557
|
2673
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে
|
প্রকৃতিমূলক
|
আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে
গোপন তব চরণ ফেলে
নিশার মতো নীরব ওহে
সবার দিঠি এড়ায়ে এলে।
প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি,
বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি,
নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি
নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে।কূজনহীন কাননভূমি,
দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে,
একেলা কোন্ পথিক তুমি
পথিকহীন পথের ‘পরে।
হে একা সখা, হে প্রিয়তম,
রয়েছে খোলা এ ঘর মম,
সমুখ দিয়ে স্বপনসম
যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে।বোলপুর, আষাঢ়, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aji-shrabon-ghono-gohon-mohe/
|
5547
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
সূচনা
|
স্বদেশমূলক
|
ভারতবর্ষে পাথরের গুরুভারঃ
এহেন অবস্থাকেই পাষাণ বলো,
প্রস্তরীভুত দেশের নীরবতার
একফোঁটা নেই অশ্রুও সম্বলও।
অহল্যা হল এই দেশ কোন্ পাপে
ক্ষুদার কান্না কঠিন পাথরে ঢাকা,
কোনো সাড়া নেই আগুনের উত্তাপে
এ নৈঃশব্দ্য বেঙেছে কালের চাকা।
ভারতবর্ষ! কার প্রতীক্ষা করো,
কান পেতে কার শুনছ পদধ্বনি?
বিদ্রোহে হবে পাথরেরা থরোথরো,
কবে দেখা দেবে লক্ষ প্রাণের খনি?
ভারতী, তোমার অহল্যারূপ চিনি
রামের প্রতীক্ষাতেই কাটাও কাল,
যদি তুমি পায়ে বাজাও ও-কিঙ্কিনী,
তবে জানি বেঁচে উঠবেই কঙ্কাল।
কত বসন্ত গিয়েছে অহল্যা গো-
জীবনে ব্যর্থ তুমি তবু বার বার,
দ্বারে বসন্ত, একবার শুধু জাগো
দুহাতে সরাও পাষাণের গুরুভার।
অহল্যা-দেশ, তোমার মুখের ভাষা
অনুচ্চারিত, তবু অধৈর্যে ভরা;
পাষাণ ছদ্মবেশকে ছেঁড়ার আশা
ক্রমশ তোমার হৃদয় পাগল করা।
ভারতবর্ষ, তন্দ্রা ক্রমশ ক্ষয়
অহল্যা! আজ শাপমোচনের দিন;
তুষার-জনতা বুঝি জাগ্রত হয়-
গা-ঝাড়া দেবার প্রস্তাব দ্বিধাহীন।
অহল্যা, আজ কাঁপে কী পাসাণকায়!
রোমাঞ্চ লাগে পাথরের প্রত্যঙ্গে;
রামের পদস্পর্শ কি লাগে গায়?
অহল্যা, জেনো আমরা তোমার সঙ্গে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1109
|
5800
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নিজের আড়ালে
|
চিন্তামূলক
|
সুন্দর লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজেরই আড়ালে
মানুষ দেখে না
সে খোঁজে ভ্রমর বিংবা
দিগন্তের মেঘের সংসার
আবার বিরক্ত হয়
কতকাল দেখে না আকাশ
কতকাল নদী বা ঝরনায় আর
দেখে না নিজের মুখ
আবর্জনা, আসবাবে বন্দী হয়ে যায়
সুন্দর লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজেরই আড়ালে
রমনীর কাছে গিয়ে
বারবার হয়েছে কাঙাল
যেমন বাতাসে থাকে সুগন্ধের ঋণ
বহু বছরের স্মৃতি আবার কখন মুছে যায়
অসম্ভব অভিমান খুন করে পরমা নারীকে
অথবা সে অস্ত্র তোলে নিজেরই বুকের দিকে
ঠিক যেন জন্মান্ধ তখন
সুন্দর লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজেরই আড়ালে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1800
|
2069
|
মহাদেব সাহা
|
আমি কথা রাখতে পারিনি
|
প্রকৃতিমূলক
|
তোমাদের সাথে কথা হয়েছিলো কচি লাউপাতা,
ঘাসফুল, ভোরের শিশির
বর্ষার স্রোতের ঘূর্ণি, ফুলজোড় নদী,
রাতজাগা চাঁদ, শ্রাবণের উদাস আকাশ
দুকূল ছাপানো জল, ঘন মেঘ, বর্ষনের রাত
কথা হয়েছিলো আমি তোমাদের কথা লিখে রেখে যাবো;
যে কৃষাণ প্রত্যহ সকালে উঠে মাঠে যায়
একা বউটিকে ফেলে,
রাখাল সজল চোখ গাভীগুলো চড়ায় একাকী
ভাটিয়ালি গান গেয়ে যে মাঝি যায় দূর দেশে
যে বাউল রোজ ভোরে আমাদের আঙিনায়
গেয়ে যেতো গান,
তোমাকের কারো কথা লিখতে পারিনি, আঁকতে
পারিনি তোমাদের হৃদয়ের
অনবদ্য ছবি;
কথা হয়েছিলো আমি তোমাদের কাছে ফিরে যাবো
রঙিন গোধূলি, উদার আকাশ, ধানক্ষেত
কচি দূর্বাঘাস
শৈশবের পরিচিত প্রিয় মুক, আলতা-পরা
আমার মায়ের সেই পদচিহ্ন
কাঁসার বাসন, উঠোনের শুভ্র আলপনা
কথা হয়েছিলো, ঠিকই আমাদের কথা হয়েছিলো
আমি তোমাদের কাছে ফিরে যাবো
প্রিয় নদী, প্রিয় দানক্ষেত
ক্ষমা করো লাউপাতা, ভোরের শিশির
আমার মায়ের হাতে চাল-ধোয়া জলের সুগন্ধ
আমি তোমাদের কথা রাখতে পারিনি, আমি কথা
রাখতে পারিনি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1338
|
5810
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নীরার কাছে
|
প্রেমমূলক
|
যেই দরজা খুলে আমি জন্তু থেকে মানুষ হলাম
শরীর ভরে ঘূর্ণি খেললো লম্বা একটি হলদে রঙের আনন্দ
না খুলতেও পারতে তুমি, বলতে পারতে এখন বড় অসময়
সেই না-বলার দয়ায় হলো স্বর্ণ দিন, পুষ্পবৃষ্টি
ঝরে পড়লো বাসনায়।
এখন তুমি অসম্ভব দূরে থাকো, দূরত্বকে সুদূর করো
নীরা, তোমার মনে পড়ে না স্বর্গনদীর পারের দৃশ্য?
যুথীর মালা গলায় পরে বাতাস ওড়ে একলা একলা দুপুরবেলা
পথের যত হা-ঘরে আর ঘেয়ো কুকুর তারাই এখন আমার সঙ্গী।
বুকের ওপর রাখবো এই তৃষিত মুখ, উষ্ণ শ্বাস হৃদয় ছোঁবে
এই সাধারণ সাধটুকু কি শৌখিনতা? ক্ষুধার্তের ভাতরুটি নয়?
না পেলে সে অখাদ্য কুখাদ্য খাবে, খেয়ার ঘাটে কপাল কুটবে
মনে পড়ে না মধ্যরাতে দৈত্যসাজে দরজা ভেঙে কে এসেছিল?
ভুলে যাওয়ার ভেতর থেকে যেন একটি অতসী রং হল্কা এলো
যেই দরজা খুললে আমি জন্তু থেকে মানুষ হলাম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/451
|
3494
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বড়ো কাজ নিজে বহে
|
চিন্তামূলক
|
বড়ো কাজ নিজে বহে
আপনার ভার।
বড়ো দুঃখ নিয়ে আসে
সান্তনা তাহার।
ছোটো কাজ, ছোটো ক্ষতি,
ছোটো দুঃখ যত—
বোঝা হয়ে চাপে, প্রাণ
করে কণ্ঠাগত। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boro-kaaj-nije-bohe/
|
1949
|
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
|
মন এবং সুখ
|
চিন্তামূলক
|
১
এই মধুমাসে, মধুর বাতাসে,
শোন লো মধুর বাঁশী।
এই মধু বনে, শ্রীমধুসূদনে,
দেখ লো সকলে আসি ||
মধুর সে গায়, মধুর বাজায়,
মধুর মধুর ভাষে।
মধুর আদরে, মধুর অধরে,
মধুর মধুর হাসে ||
মধুর শ্যামল, বদন কমল,
মধুর চাহনি তায়। ।
কনক নূপুর, মধুকর যেন,
মধুর বাজিছে পায় ||
মধুর ইঙ্গিতে, আমার সঙ্গেতে,
কহিল মধুর বাণী।
সে অবধি চিতে, মাধুরি হেরিতে,
ধৈরয নাহিক মানি ||
এ সুখ রঙ্গেতে পর লো অঙ্গেতে
মধুর চিকণ বাস।
তুমি মধুফল, পর কানে দুল,
পরাও মনের আশ ||
গাঁথি মধুমালা, পর গোপবালা
হাস লো মধুর হাসি।
চল যথা বাজে, যমুনার কূলে,
শ্যামের মোহন বাঁশী ||
২
চল কথা বাজে, যমুনার কূলে
ধীরে ধীরে ধীরে বাঁশী।
ধীরে ধীরে যথা, উঠিছে চাঁদনি,
স্থল জল পরকাশি ||
ধীরে ধীরে রাই, চল ধীরে যাই,
ধীরে ধীরে ফেল পদ।
ধীরে ধীরে শুন, নাদিছে যমুনা,
কল কল গদ গদ ||
ধীরে ধীরে জলে, রাজহংস চলে,
ধীরে ধীরে ভাসে ফুল।
ধীরে ধীরে বায়ু, বহিছে কাননে
দোলায়ে আমার দুল ||
ধীরে যাবি তথা, ধীরে কবি কথা
রাখিবি দোহার মান।
ধীরে ধীরে তার বাঁশীটি কাড়িবি,
ধীরেতে পূরিবি তান ||
ধীরে শ্যাম নাম, বাঁশীতে বলিবি,
শুনিবে কেমন বাজে।
ধীরে ধীরে চূড়া কাড়িয়ে পরিবি,
দেখিব কেমন সাজে ||
ধীরে বনমালা, গলাতে দোলাবি,
দেখিব কেমন দোলে।
ধীরে ধীরে তার, মন করি চুরি,
লইয়া আসিবি চলে ||
৩
শুন মোর মন মধুরে মধুরে,
জীবন করহ সায়।
ধীরে ধীরে ধীরে, সরল সুপথে,
নিজ গতি রেখ তায় ||
এ সংসার ব্রজ, কৃষ্ণ তাহে সুখ,
মন তুমি ব্রজনারী।
নিতি নিতি তার, বংশীরব শুনি,
হতে চাও অভিসারী ||
যাও যাবে মন, কিন্তু দেখ যেন,
একাকী যেও না রঙ্গে।
মাধুর্য্য ধৈরয, সহচরী দুই,
রেখ আপনার সঙ্গে ||
ধীরে ধীরে ধীরে, কাল নদীতীরে,
ধরম কদম্ব তলে।
মধুর সুন্দর, সুখ নটবর,
ভজ মন কুতূহলে ||
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/928
|
1460
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
আগ্নেয়াস্ত্র
|
প্রেমমূলক
|
পুলিশ স্টেশনে ভিড়,আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্দিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের
শটগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ, যেন দরগার
স্বীকৃত মানৎ; টেবিলে ফুলের মতো মস্তানের হাত।
আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী, প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে
অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্মক
একটি আগ্নেয়াস্ত্র,আমি জমা দেই নি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/198
|
1769
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আমারই তো অক্ষমতা
|
চিন্তামূলক
|
আমারই তো অক্ষমতা
তোমার গোলাপ জানি সারারাত খুলে রেখেছিল
সাদা অন্ধকারে লাল বাঁকা সিঁড়ি দিক নির্নয়ের
সবুজ কম্পাস।
আঙুরবীথির পথ পরীর ডানার মতো উড়ে গেছে
সংগীতের দিকে।
আমার দীক্ষার কথাছিলঐখানে।
পায়ে পায়ে এত সব শিকড়-বাকড়
নাট-বল্টু, জট্ গুল্মটান
পৌছতে পারিনি।
পরাধীনতার চেয়ে ঢের বেশি বেদনার ভার হয়ে উঠেছে এখন
নানাবিধ স্বাধীন শিকল।
অক্ষরের থেকে আলো
বীজের ভিতর থেকে প্রাণকোষ ছিড়ে নিংড়ে নিয়ে
খোসার উৎসব বেশ জমজমাট বাজারে-বন্দরে।
সমুদ্র আড়াল করে সার্কাসের তাঁবু।
অফিউসের বাঁশি
দিকপাল ক্লাউনেরা পা দিয়ে বাজায়।
আমারই তো অক্ষমতা
সৌররশ্মি দুহাতে পেয়েও
গড়িনি কুঠার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1170
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.