id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
4349
শামসুর রাহমান
আন্ধারে হারিয়ে পথ
মানবতাবাদী
আন্ধারে হারিয়ে পথ বেদিশা ঘুরেছি কতকাল জটিল অরণ্যে, গণকবরের বিরানায়; খাদে আর চোরাবালিতে হঠাৎ পা হড়কে পড়ে যেতে যেতে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছি। রক্তপায়ী বাদুড়ের ডানার আঘাতে, চিতাবাঘের থাবার হামলায় সন্ত্রস্ত ছিলাম বহুকাল। কখনো কখনো পথ খোঁজার উদ্যম লুপ্ত হয়েছে, মোহিনী রূপে কত ডাকিনী নিয়েছে ডেকে গুহায় সংহারে অবিচল।হতাশায় চুল ছিঁড়ে, মাথা কুটে শ্মশান ঘাটের কাছে, গোরস্তানে পথক্লেশে পরিশ্রান্ত ঘুমিয়েছি সর্পিনীর ফণার ছায়ায়। অকস্মাৎ তুমি এসে আমাকে প্রকৃত পথ দেখিয়ে সম্মুখে নিয়ে গিয়ে বললে, দ্যাখো, আমাদের গন্তব্যের স্বর্ণচূড়া কাছে এসে গ্যাছে, এইতো অদূরে বেজে ওঠে নহবৎ।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/andhare-harie-poth/
4120
রেদোয়ান মাসুদ
আমি চাইনি এভাবে বিদায় নিতে
প্রেমমূলক
আমি চাইনি এভাবে বিদায় নিতে চাইনি মায়া ভরা ঐ দু চোখে অশ্রু ঝরাতে চাইনি বেচে থেকে দূরে থাকতে এক পলক দেখার জন্য আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে চেয়েছি সকাল বেলা শিশির ভেজা ঘাসে পা ভিজাতে।আমি চাইনি এভাবে অপেক্ষা করতে চাইনি বাশ বাগানের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া অচেনা পথের দিকে চেয়ে থাকতে ধুসর কোন ওড়না জরানো নারীর জন্য বসে থাকতে চেয়েছি বৃষ্টিভেজা দুপুর বেলা আনন্দে ভিজতে।আমি চাইনি মরা কোন নদীর বুকে হাটতে চাইনি গরম বালিতে পা পুড়তে চাইনি গলা শুকিয়ে মরতে জলের তৃষ্ণায় হাহাকার করতে চেয়েছি ঝর্ণায় ফুলে ফেপে ওঠা পানিতে হাবুডুবু খেতে।আমি চাইনি দুঃখের সঙ্গি হতে চাইনি রাতের বেলা কপালে হাত দিয়ে বসে থাকতে চাইনি মনে মনে দুঃস্বপ্ন দেখতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ জেগে উঠতে চেয়েছি আলত ভিজা ঠোটে ঠোট মিলাতে।আমি চাইনি চাঁদনী রাতে একা একা বসে থাকতে চাইনি আলো ভরা জ্যোৎস্নার মাঝে নিরবে কাঁদতে চাইনি রাত জাগা পাখির মত জেগে থাকতে অন্ধকারের মাঝে তোমাকে খুজতে চেয়েছি মরুভুমির বুকে বৃষ্টি নামাতে।আমি চাইনি পথ হারা পথিক হতে চাইনি বাকা পথে হাটতে চাইনি পাথর দিয়ে বুক চাপা দিতে কাটা তারে আবদ্ধ থাকতে চেয়েছি পাথরের বুকে ফুল ফুটাতেআমি চাইনি নদীর মাঝ থেকে ফিরে আসতে চাইনি হেরে গিয়ে বেচে থাকতে চাইনি ব্যর্থতার লজ্জায় মুখ ঢেকে রাখতে না বলা কথাগুলো বুকে চেপে রাখতে চেয়েছি শুধু দুটি নদীর মোহনায় একসাথে ভাসতেআমি চাইনি গোলাপের কাটায় রক্তাক্ত হতে চাইনি শুকনো পাতার মরমর শব্দ শুনতে চাইনি রোদেলা দুপুরে রোদে পুরতে তীব্র শীতে ঠোঁট ফাটাতে চেয়েছি নিশি রাতে এক সূরে গান গাইতে।আমি চাইনি তোমার পথের কাটা হতে চাইনি দুজন দুদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে চাইনি কোন দিন তোমাকে হারাতে নিরবে বুক ফেটে কাঁদতে চেয়েছি শুধু দুটি হৃদয়ের মাঝে ঝর্ণা ঝরাতে।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2174.html
5449
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কবিতার খসড়া
মানবতাবাদী
আকাশে আকাশে ধ্রুবতারায় কারা বিদ্রোহে পথ মাড়ায় ভরে দিগন্ত দ্রুত সাড়ায়, জানে না কেউ। উদ্যমহীন মূঢ় কারায় পুরনো বুলির মাছি তাড়ায় যারা, তারা নিয়ে ঘোরে পাড়ায় স্মৃতির ফেউ।।(কাব্যগ্রন্থঃ ঘুমনেই)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/kobitar-khoshra/
4321
শামসুর রাহমান
অলীক আশার বাণী
চিন্তামূলক
অলীক আশার বাণী শোনাতে আসি নি। গেছি ভুলে সেই মায়াবৃক্ষ, আশা যার নাম; টুপ টাপ ফল পড়বে না, যত ইচ্ছে ঝাঁকি দাও। যা-কিছু সম্বল জমেছিল পুরুষানুক্রমে গ্যাছে সবই, মর্মমূলে দুর্মর কীটের বাসা; আত্মা বন্দী কুহকিনী-চুলে। সঙ্গীরা খোঁয়াড়ে তৃপ্ত; ড্রাগ-অয়াডিক্টের আচরণ কী ক’রে দখল করে সবাইকে? কোথায় শরণ নেব আজ? থাকবো কি হরদম শূন্যতায় ঝুলে?সবখানে চন্দ্রবোড়া, শঙ্খিণী, দাঁড়াশ; পথ নেই পালাবার; পক্ষীরাজ ঘোড়ায় সওয়ার হ’য়ে মেঘে উড়ে যাবে? রূপকথা শুয়োরের ক্লিন্ন চোয়ালেই জীর্ণ হচ্ছে ক্রমাগত। দিনরাত্রি চরম উদ্বেগে কন্টকিত; দশদিকে শুধু মধ্যযুগের বিস্তার, এরকম ব্যাপক সংকটে নেই কারুরই নিস্তার।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/olik-ashar-bani/
618
জয় গোস্বামী
আজ কী নিশ্চিত কী বিদ্যুৎ কী হরিণ এই দৌড়
রূপক
আজ কী নিশ্চিত কী বিদ্যুৎ কী হরিণ এই দৌড় কী প্রান্তর, কী উড়ে যাওয়া ধুলো এই হাত কী ময়ূর এই নৃত্য কী কূপ কী বন্ধ কী জিভ-বেরিয়ে-পড়া এই ঈর্ষা কী অবধারিত কবর সব গর্ত আর পশ্চাদ্বাবনরত পিশাচদের কী হঠাৎ তলিয়ে যাওয়া আজ কী সম্রাজ্ঞী এই ছন্দ শয়তানও যাকে কেনবার কথা কল্পনা করে না
https://banglarkobita.com/poem/famous/1714
876
জসীম উদ্‌দীন
মুক্তিযোদ্ধা-জসীমউদদীন
স্বদেশমূলক
আমি একজন মুক্তি-যোদ্ধা, মৃত্যু পিছনে আগে, ভয়াল বিশাল নখর মেলিয়া দিবস রজনী জাগী । কখনো সে ধরে রেজাকার বেশ, কখনো সে খান-সেনা, কখনো সে ধরে ধর্ম লেবাস পশ্চিম হতে কেনা। কখনো সে পশি ঢাকা-বেতারের সংরক্ষিত ঘরে, ক্ষেপা কুকুরের মরণ-কামড় হানিছে ক্ষিপ্ত স্বরে।আমি চলিয়াছি চির-নির্ভীক অবহেলি সবকিছু নরমুণ্ডের ঢেলা ছড়াইয়া পশ্চাত-পথ পিছু। ভাঙিতেছি স্কুল ভাঙিতেছি সেতু ষ্টিমার জাহাজ লরি, খান-সৈন্যরা যেই পথে যায় আমি সে পথের অরি ওরা ভাড়া-করা ঘৃণ্য গোলাম স্বার্থ-অন্ধ সব, মিথ্যার কাছে বিকাতে এসেছে স্বদেশের বৈভব!আমরা চলেছি রক্ষা করিতে মা-বোনের ইজ্জত, শত শহীদের লোহুতে জ্বালানো আমাদের হিম্মত। ভয়াল বিশাল আঁধার রাত্রে ঘন-অরণ্য ছায়, লুণ্ঠিত আর দগ্ধ-গ্রামের অনল সম্মুখে ধায়। তাহার আলোতে চলিয়াছি পথ, মৃত্যুর তরবার, হস্তে ধরিয়া কাটিয়া চলেছি খান-সেনা অনিবার।এ সোনার দেশে যতদিন রবে একটিও খান-সেনা, ততদিন তব মোদের যাত্রা মুহুর্তে থামিবে না। মাঠগুলি পুনঃ ফসলে ফসলে পরিবে রঙিন বেশ, লক্ষ্মীর ঝাঁপি গড়ায়ে ছড়ায়ে ভরিবে সকল দেশ। মায়ের ছেলেরা হবে নির্ভর, সুখ হাসি ভরা ঘরে, দস্যুবিহীন এদেশ আবার শোভিবে সুষম ভরে।
https://banglapoems.wordpress.com/2016/03/30/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a6%b8%e0%a7%80%e0%a6%ae%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%a8/
1432
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
শাহজালাল এক্সপ্রেসে
প্রেমমূলক
কিছুই জানিনা আমি কোনোই খবর কার মেয়ে কার বোন কার বা প্রেমিকা ? কোথায় চলেছো তুমি ঠিকানা কোথায় বহুদূর চায়ের বাগান ? নগ্ন জলের হাওর ? ট্রেনের জানালা বেয়ে ভেসে যায় বুনো মেঘ উদাস সবুজ বিদ্যুতের ধ্যানী থাম সন্ধানী রাখাল লঞ্চ বাস রোদ আর বৃষ্টির প্রণয় তারাও জানে না তুমি চলেছো কোথায় ? মুখোমুখি বসে শুধু দেখেছি তোমাকে মেয়ে আর, গেঁথে যাচ্ছি কৃষ্ণবর্ণ শব্দের কসুম উত্তরের উদ্বেল বাতাস সাদা ওড়নায় মুখ ঘষে ঘষে তোমাকে অস্থির করে তোলে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকে যতই ধমকাও বাতাস তো শাসন মানে না । তোমার আনত চোখে দুপুরের নীল ঘুম নামে কয়েকটি স্খলিত চুল লুটেপুটে খায় দুটি ঠোঁটের সুষমা সুদূর নীলিমা থেকে ছুটে আসে মেঘ স্টিলের জানালা গলে ছুঁয়ে যায় চুলের বিনুনি হাতের পাতায় বোনা লাল কারুকাজ কাঞ্চনজঙ্ঘার ভোর ঝিলিমিলি করে ওঠে কখনো কখনো কালো চোখে এইভাবে একজোড়া চোখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে কেটে গেলো দশ জুন গোলাপি প্রহর সিলেট স্টেশনে এই কবিতার শেষ একজোড়া চোখ গেলো চোখের গন্তব্যে পিছনে রইলো পড়ে হাহাকারপূর্ণ এক কবির হৃদয় ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1050
2974
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ্যাতি আছে সুন্দরী বলে তার
ছড়া
খ্যাতি আছে সুন্দরী বলে তার, ত্রুটি ঘটে নুন দিতে ঝোলে তার; চিনি কম পড়ে বটে পায়সে স্বামী তবু চোখ বুজে খায় সে– যা পায় তাহাই মুখে তোলে তার, দোষ দিতে মুখ নাহি খোলে তার।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khyati-ache-sundori-bole-tar/
4191
লালন শাহ
সব সৃষ্টি করলো যে জন
চিন্তামূলক
সব সৃষ্টি করলো যে জন তারে সৃষ্টি কে করেছে সৃষ্টি ছাড়া কি রূপে সে সৃষ্টিকর্তা নাম ধরেছে সৃষ্টিকর্তা বলছো যারে লা শরিক হয় কেমন করে ভেবে দেখো পুর্বাপরে সৃষ্টি করলেই শরিক আছে।। চন্দ্র সূর্য যে গঠেছে তার খবর কে করেছে নীরেতে নিরঞ্জন আছে নীরের জন্ম কে দিয়েছে।। স্বরূপ শক্তি হয় যে জনা কে জানে তার ঠিক ঠিকানা জাহের বাতেন যে জানেনা তার মনেতে প্যাঁচ পড়েছে আপনার শক্তির জোরে নিজশক্তির রূপ প্রকাশ করে সিরাজ সাঁই কয় লালন তোরে নিতান্তই ভূতে পেয়েছে।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4421.html
548
কাজী নজরুল ইসলাম
সোহাগ
প্রেমমূলক
গুলশন কো চুম চুম কহতে বুলবুল, রুখসারা সে বে-দরদি বোরকা খুল! হাঁসতি হ্যায় বোস্তাঁ, মস্ত্ হো যা দোস্তাঁ, শিরি শিরাজি সে যা বেহোশ জাঁ। সব কুছ আজ রঙিন হ্যায় সব কুছ মশগুল, হাঁস্‌তি হ্যায় গুল হো কর দোজখ বিলকুল হা রে আশেক মাশুক কি চমনোঁ মে ফুলতা নেই দোবারা ফুল ফুল ফুল ফুল॥  (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sohag/
5375
শ্রীজাত
অনেক
প্রেমমূলক
দাড়িয়ে দুরে। অনেকদিনের চেনা। আজকাল যার সঙ্গে থাকো, সে না।একলা তুমি কফিশপের ভেতর ঝগড়া করে পালিয়ে এলে। সে তাে।দাঁড়িয়ে আছে উল্টো ফুটপাতে আগের মতই ব্রিফকেস হাতেতোমার কফি আসতে দেরি, তারও বাস আসতে মিনিট পাঁচেক আরও।আজকাল যার সঙ্গে থাকো, হঠাৎ মনে হচ্ছে ফুরিয়ে গেছে কথা।।আজ ফের সেই ঝগড়াঝাটি করে। বসেছ কফিশপের ভেতরে।উল্টো দিকের ফুটপাতে যে, তাকে ডাকবে নাকি, সময় যদি থাকে?আঙ্গুল দিয়ে নাড়ছে চামচ, মানে। ভাবছ সে লােক যাবে কতক্ষণেআসলে তার অনেক আগেই যাওয়া আগের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে হাওয়াপ্রাক্তন বর, প্রেমিক ভবিষ্যতের! আজকাল তাদের আকসার এসব ঘটে—
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%95-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4/
5511
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বোধন
মানবতাবাদী
হে মহামানব, একবার এসো ফিরে শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে, এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার; লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার। এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি; কোথাও নেইকো পার মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল, এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল, ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো, হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো। ব্যাহত জীবনযাত্রা, চুপি চুপি কান্না বও বুকে, হে নীড়-বিহারী সঙ্গী! আজ শুধু মনে মনে ধুঁকে ভেবেছ সংসারসিন্ধু কোনোমতে হয়ে যাবে পার পায়ে পায়ে বাধা ঠেলে। তবু আজো বিস্ময় আমার- ধূর্ত, প্রবঞ্চক যারা কেড়েছে মুখের শেষ গ্রাস তাদের করেছ মা, ডেকেছ নিজের সর্বনাশ। তোমার ক্ষেতের শস্য চুরি ক'রে যারা গুপ্তকক্ষতে জমায় তাদেরি দু'পায়ে প্রাণ ঢেলে দিলে দুঃসহ ক্ষমায়; লোভের পাপের দুর্গ গম্বুজ ও প্রাসাদে মিনারে তুমি যে পেতেছ হাত; আজ মাথা ঠুকে বারে বারে অভিশাপ দাও যদি, বারংবার হবে তা নিস্ফল- তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল। তুমি তো প্রহর গোনো, তারা মুদ্রা গোনে কোটি কোটি, তাদের ভাণ্ডার পূর্ণ; শূন্য মাঠে কঙ্কাল-করোটি তোমাকে বিদ্রূপ করে, হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে- কুজ্ঝটি তোমার চোখে, তুমি ঘুরে ফেরো দুর্বিপাকে। পৃথিবী উদাস, শোনো হে দুনিয়াদার! সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু-কালো পাহাড় দগ্ধ হৃদয়ে যদিও ফেরাও ঘাড় সামনে পেছনে কোথাও পাবে না পার: কি করে খুলবে মৃত্যু-ঠেকানো দ্বার- এই মুহূর্তে জবাব দেবে কি তার? লক্ষ লক্ষ প্রাণের দাম অনেক দিয়েছি; উজাড় গ্রাম। সুদ ও আসলে আজকে তাই যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য চাই। কৃপণ পৃথিবী, লোভের অস্ত্র দিয়ে কেড়ে নেয় অন্নবস্ত্র, লোলুপ রসনা মেলা পৃথিবীতে বাড়াও ও-হাত তাকে ছিঁড়ে নিতে। লোভের মাথায় পদাঘাত হানো- আনো, রক্তের ভাগীরথী আনো। দৈত্যরাজের যত অনুচর মৃত্যুর ফাঁদ পাতে পর পর; মেলো চোখ আজ ভাঙো সে ফাঁদ- হাঁকো দিকে দিকে সিংহনাদ। তোমার ফসল, তোমার মাটি তাদের জীয়ন ও মরণকাঠি তোমার চেতনা চালিত হাতে। এখনও কাঁপবে আশঙ্কাতে? স্বদেশপ্রেমের ব্যাঙ্গমা পাখি মারণমন্ত্র বলে, শোনো তা কি? এখনো কি তুমি আমি স্বতন্ত্র? করো আবৃত্তি, হাঁকো সে মন্ত্রঃ শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার! তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়- হিসাব কি দিবি তার? প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা, ভেঙেছিস ঘরবাড়ি, সে কথা কি আমি জীবনে মরণে কখনো ভুলতে পারি? আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই। শোন্ রে মজুতদার, ফসল ফলানো মাটিতে রোপণ করব তোকে এবার। তারপর বহুশত যুগ পরে ভবিষ্যতের কোনো যাদুঘরে নৃতত্ত্ববিদ্ হয়রান হয়ে মুছবে কপাল তার, মজুতদার ও মানুষের হাড়ে মিল খুঁজে পাওয়া ভার। তেরোশো সালের মধ্যবর্তী মালিক, মজুতদার মানুষ ছিল কি? জবাব মেলে না তার। আজ আর বিমূঢ় আস্ফালন নয়, দিগন্তে প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়; আজকের নৈঃশব্দ হোক যুদ্ধারম্ভের স্বীকৃতি। দুহাতে বাজাও প্রতিশোদের উন্মত্ত দামামা, প্রার্থনা করোঃ হে জীবন, যে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা- আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি, প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের তুষার-গলানো উত্তাপ। টুকরে টুকরো ক'রে ছেঁড়ো তোমার অন্যায় আর ভীরুতার কলঙ্কিত কাহিনী। শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে একত্রিত হোক আমাদের সংহতি। তা যদি না হয় মাথার উপরে ভয়ঙ্কর বিপদ নামুক, ঝড়ে বন্যায় ভাঙুক ঘর; তা যদি না হয়, বুঝবো তুমি মানুষ নও- গোপনে গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও। ভারতবর্ষ মাটি দেয়নিকো, দেয় নি জল দেয় নি তোমার মুখেতে অন্ন, বাহুতে বল পূর্বপুরুষ অনুপস্থিত রক্তে, তাই ভারতবর্ষে আজকে তোমার নেইকো ঠাঁই।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/274
5103
শামসুর রাহমান
মাতাল
সনেট
মদিরা করিনি স্পর্শ, অথচ মাতাল হ’য়ে আছি দিনরাত; নিত্য কুৎসাকারীদের জিভের খোরাক আমি, কেউ কেউ ক্রোধে আমাকে পুড়িয়ে করে খাক। আমার করোটি জুড়ে কবিতার সোনালী মৌমাছি প্রায়শ গুঞ্জন তোলে; অচিন পাখিরা নাচানাচি করে হৃৎবাগানে আমার। গূঢ় রহস্যের ডাক নিশীথে নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে বলে, ‘ভরা থাক তোমার প্রেমের পাত্র। যদি থাকে, তাহ’লেই বাঁচি!মাতাল, মাতাল আমি সুনিশ্চিত। কারো অপবাদ দেবো না উড়িয়ে হেসে, তবে বলি দৃঢ় কণ্ঠস্বরে- বিত্তের লালসা নয়, চপল খ্যাতির মোহ নয়, প্রতাপশালীর সীমাহীন তীব্র ক্ষমতার সাধ কিংবা ধর্মান্ধতা নয়, সত্যি আমাকে মাতাল করে প্রকৃত কবিতা আর সুপ্রিয়ার প্রগাঢ় প্রণয়।   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/matal/
5870
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সেই লেখাটা
চিন্তামূলক
সেই লেখাটা লিখতে হবে, যে লেখাটা লেখা হয়নি এর মধ্যে চলছে কত রকম লেখালেখি এর মধ্যে চলছে হাজার-হাজার কাটাকুটি এর মধ্যে ব্যস্ততা, এর মধ্যে হুড়োহুড়ি এর মধ্যে শুধু কথা রাখা আর কথা রাখা শুধু অন্যের কাছে, শুধু ভদ্রতার কাছে, শুধু দীনতার কাছে কত জায়গায় ফিরে আসবো বলে আর ফেরা হয়নি অর্ধ-সমাপ্ত গানের ওপর এলিয়ে পড়েছিল ঘুম মেলায় গে উষ্ণতা ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম শোধ দেওয়া হয়নি সে ঋণ এর মধ্যে চলেছে প্রতিদিন জেগে ওঠা ও জাগরণ থেকে ছুটি এর মধ্যে চলেছে আড়চোখে মানুষের মুখ দেখাদেখি এর মধ্যে চলছে স্রোতের বিপরীত দিক ভেবে স্রোতেই ভেসে যাওয়া শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা ব্যস্ততম মুহূর্তের মধ্যেও একটা ঝড়ে-ওড়া শুকনো পাতা শুধু অপেক্ষা সেই লেখাটা লিখতে হবে, যে লেখাটা লেখা হয়নি!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1819
3847
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শক্তির সীমা
নীতিমূলক
কহিল কাঁসার ঘটি খন্‌ খন্‌ স্বর— কূপ,তুমি কেন খুড়া হলে না সাগর? তাহা হলে অসংকোচে মারিতাম ডুব, জল খেয়ে লইতাম পেট ভরে খুব। কূপ কহে,সত্য বটে ক্ষুদ্র আমি কূপ, সেই দুঃখে চিরদিন করে আছি চুপ। কিন্তু বাপু, তার লাগি তুমি কেন ভাব! যতবার ইচ্ছা যায় ততবার নাবো— তুমি যত নিতে পার সব যদি নাও তবু আমি টিঁকে রব দিয়ে-থুয়ে তাও।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shoktir-sima/
3586
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ২
প্রেমমূলক
সারাদিন গিয়েছিনু বনে ফুলগুলি তুলেছি যতনে । প্রাতে মধুপানে রত মুগ্ধ মধুপের মতো গান গাহিয়াছি আনমনে । এখন চাহিয়া দেখি , হায় , ফুলগুলি শুকায় শুকায় । যত চাপিলাম মুঠি পাপড়িগুলি গেল টুটি — কান্না ওঠে , গান থেমে যায় । কী বলিছ সখা হে আমার — ফুল নিতে যাব কি আবার । থাক্‌ বঁধু , থাক্‌ থাক্‌ , আর কেহ যায় যাক , আমি তো যাব না কভু আর । শ্রান্ত এ হৃদয় অতি দীন , পরান হয়েছে বলহীন । ফুলগুলি মুঠা ভরি মুঠায় রহিবে মরি , আমি না মরিব যত দিন ।Mrs. Browning (অনূদিত কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-2/
4945
শামসুর রাহমান
প্রকৃতির কাছে
সনেট
জীবনানন্দীয় পরিবেশে অপরাহ্নে পাশাপাশি, মনে পড়ে, ছায়াচ্ছন্নতায় আমরা ছিলাম বসে মাঝে-মধ্যে গাছ থেকে শুক্‌নো পাতা পড়ছিলো খসে; উচ্ছ্বসিত বিকেলের রঙ এবং তোমার হাসি একাকার, প্রকৃতির কাছে আজো কিসের প্রত্যাশী আমরা ভাবছিলাম। দেখি, হংস-হংসী ঠোঁট ঘষে পরস্পর উড়ে যায় বিল ছেড়ে; মগজের কোষে কোষে কী মদির শিখা জ্বলে, বাজে স্বেচ্ছাচারী বাঁশি।আমিতো পারিনি হতে বনহংস, তুমিও পারোনি বনহংসী হতে সে বিলের ধারে। পাঁশুটে ভব্যতা আঁকড়ে ছিলাম ব’সে চুপচাপ, যদিও শিরায় উঠেছিলো জেগে শত পালতোলা মাতাল তরণী। বুঝতে পারিনি, হায় তোমার সত্তায় ব্যাকুলতা, কী-যে ছিলো তোমার চোখের দুটি অসিত হীরায়।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prokritir-kache/
2857
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কণিকা
নীতিমূলক
যথার্থ আপনকুষ্মাণ্ডের মনে মনে বড়ো অভিমান, বাঁশের মাচাটি তার পুষ্পক বিমান। ভুলেও মাটির পানে তাকায় না তাই, চন্দ্রসূর্যতারকারে করে 'ভাই ভাই'। নভশ্চর ব'লে তাঁর মনের বিশ্বাস, শূন্য-পানে চেয়ে তাই ছাড়ে সে নিশ্বাস। ভাবে, 'শুধু মোটা এই বোঁটাখানা মোরে বেঁধেছে ধরার সাথে কুটুম্বিতাডোরে; বোঁটা যদি কাটা পড়ে তখনি পলকে উড়ে যাব আপনার জ্যোতির্ময় লোকে।' বোঁটা যবে কাটা গেল, বুঝিল সে খাঁটি--- সূর্য তার কেহ নয়, সবই তার মাটি।হাতে-কলমেবোলতা কহিল, এ যে ক্ষুদ্র মউচাক, এরই তরে মধুকর এত করে জাঁক! মধুকর কহে তারে, তুমি এসো ভাই, আরো ক্ষুদ্র মউচাক রচো দেখে যাই॥গৃহভেদআম্র কহে, একদিন, হে মাকাল ভাই, আছিনু বনের মাঝে সমান সবাই; মানুষ লইয়া এল আপনার রুচি--- মূল্যভেদ শুরু হল, সাম্য গেল ঘুচি॥গরজের আত্মীয়তাকহিল ভিক্ষার ঝুলি টাকার থলিরে, আমরা কুটুম্ব দোঁহে ভুলে গেলি কি রে? থলি বলে, কুটুম্বিতা তুমিও ভুলিতে আমার যা আছে গেলে তোমার ঝুলিতে॥কুটুম্বিতাকেরোসিন-শিখা বলে মাটির প্রদীপে, ভাই ব'লে ডাকো যদি দেব গলা টিপে। হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা; কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা॥উদারচরিতানাম্প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন ফুটিয়াছে ছোটো ফুল অতিশয় দীন। ধিক্-ধিক্ করে তারে কাননে সবাই; সূর্য উঠি বলে তারে, ভালো আছি ভাই?।অসম্ভব ভালোযথাসাধ্য-ভালো বলে, ওগো আরো-ভালো, কোন্ স্বর্গপুরী তুমি করে থাকো আলো? আরো-ভালো কেঁদে কহে, আমি থাকি হায় অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্ষায়॥প্রত্যক্ষ প্রমাণবজ্র কহে, দূরে আমি থাকি যতক্ষণ আমর গর্জনে বলে মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের জ্যোতি বলি মোর জ্যোতি রটে, মাথায় পড়িলে তবে বলে--- 'বজ্র বটে!'ভক্তিভাজনরথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম--- ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি', মূর্তি ভাবে 'আমি দেব'--- হাসে অন্তর্যামী॥ উপকারদম্ভশৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির, লিখে রেখো, এক ফোঁটা দিলেম শিশির॥সন্দেহের কারণ'কত বড়ো আমি' কহে নকল হীরাটি। তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি॥অকৃতজ্ঞধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে, ধ্বনি-কাছে ঋণী সে যে পাছে ধরা পড়ে॥নিজের ও সাধারণেরচন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে, কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে॥মাঝারির সতর্কতাউত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে॥নতিস্বীকারতপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়, তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়, অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে॥কর্তব্যগ্রহণকে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি--- শুনিয়া জগত্‍‌ রহে নিরুত্তর ছবি। মাটির প্রদীপ ছিল; সে কহিল, স্বামী, আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি॥ধ্রুবাণি তস্য নশ্যন্তিরাত্রে যদি সূর্যশোকে ঝরে অশ্রুধারা সূর্য নাহি ফেরে, শুধু ব্যর্থ হয় তারা॥মোহনদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ও পারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। নদীর ও পার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে--- কহে, যাহা কিছু সুখ সকলই ও পারে॥ফুল ও ফলফুল কহে ফুকারিয়া, ফল, ওরে ফল, কত দূরে রয়েছিস বল্ মোরে বল্! ফল কহে মহাশয়, কেন হাঁকাহাঁকি--- তোমারই অন্তরে আমি নিরন্তর থাকি॥প্রশ্নের অতীতহে সমুদ্র, চিরকাল কী তোমার ভাষা? সমুদ্র কহিল, মোর অনন্ত জিজ্ঞাসা। কিসের স্তব্ধতা তব ওগো গিরিবর? হিমাদ্রি কহিল, মোর চিরনিরুত্তর॥মোহের আশঙ্কাশিশু পুষ্প আঁখি মেলি হেরিল এ ধরা--- শ্যামল, সুন্দর, স্নিগ্ধ, গীতগন্ধ-ভরা; বিশ্বজগতেরে ডাকি কহিল, হে প্রিয়, আমি যতকাল থাকি তুমিও থাকিয়ো॥চালকঅদৃষ্টেরে শুধালেম, চিরদিন পিছে অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে? সে কহিল, ফিরে দেখো। দেখিলেম থামি, সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি॥
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/konika/
1862
পূর্ণেন্দু পত্রী
বাকী থেকে যায়
চিন্তামূলক
ফুলের আলোয় রাঙা দিগন্তে দুয়ারহীন ছুটে অভ্রের কুচির মতো সফলতা মাটি থেকে খুঁটে অমল-বরণ রাতে সকল অমরাবতী লুটে মানুষ কত কী পায় রৌদ্রে ও জ্যোৎস্নায় সমস্ত পাওয়ার পরও তবু তার বাকী থেকে যায় একটি চুম্বন। কন্ঠে, কর্ণে, নির্বাচিত মুক্তামালা গাঁথা শিরোপরে স্বর্ণময় ছাতা কে বসেছ রাজার আসনে? পৃথিবীর ঘাসে ঘাসে অবিরত ক্ষত খুঁড়ে খুঁড়ে কার ঘোড়া ছুটে চলে পৃথিবী শাসনে? ও কার গোপন শয্যা সোমত্ত গোপিনী দিয়ে সাজানো বাগান? হাউইয়ের মতো এক পরিতৃপ্ত হাই তুলে কে যেন আকাশে গায় গান? এইরূপে মানুষের যাবতীয় অভিলাষগুলি রৌদ্র ও জ্যোৎস্নার মধ্যে ডালিম ফলের মতো পাকে। সমস্ত পাওয়ার পরও মানুষের তবু বাকী থাকে কোনোখানে একটি চুম্বন। যখন সকল জামা পরা শেষ, মাথায় মুকুট, যখন সকল সুখে পুষ্ট ওষ্ঠপুট তৃষ্ণার কলসুগুলি ভরে গেছে চরিতার্থতায় অকষ্মাৎ মানুষের মনে পড়ে যায় বিসর্জনে ডুবে গেছে কবে কত প্রতিমা ও পরম লগন মনে পড়ে বাকী আছে, মনে পড়ে বাকী রয়ে গেছে কোনোখানো একটি চুম্বন।
https://banglarkobita.com/poem/famous/481
2660
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ এই দিনের শেষে
ভক্তিমূলক
আজ এই দিনের শেষে সন্ধ্যা যে ওই মানিকখানি পরেছিল চিকন কালো কেশে গেঁথে নিলেম তারে এই তো আমার বিনিসুতার গোপন গলার হারে। চক্রবাকের নিদ্রানীরব বিজন পদ্মাতীরে এই সে সন্ধ্যা ছুঁইয়ে গেল আমার নতশিরে নির্মাল্য তোমার আকাশ হয়ে পার; ওই যে মরি মরি তরঙ্গহীন স্রোতের 'পরে ভাসিয়ে দিল তারার ছায়াতরী; ওই যে সে তার সোনার চেলি দিল মেলি রাতের আঙিনায় ঘুমে অলস কায়; ওই যে শেষে সপ্তঋষির ছায়াপথে কালো ঘোড়ার রথে উড়িয়ে দিয়ে আগুন-ধূলি নিল সে বিদায়; একটি কেবল করুণ পরশ রেখে গেল একটি কবির ভালে; তোমার ওই অনন্ত মাঝে এমন সন্ধ্যা হয় নি কোনোকালে, আর হবে না কভু। এমনি করেই প্রভু এক নিমেষের পত্রপুটে ভরি চিরকালের ধনটি তোমার ক্ষণকালে লও যে নূতন করি। পদ্মা, ২৭ মাঘ, ১৩২১
https://banglarkobita.com/poem/famous/1944
5568
সুকুমার রায়
আদুরে
ছড়া
যাদুরে আমার আদুরে গোপাল, নাকটি নাদুস থোপ্‌না গাল, ঝিকিমিকি চোখ মিট্‌মিটি চায়, ঠোঁট দুটি তায় টাট্‌কা লাল । মোমের পুতুল ঘুমিয়ে থাকুক্‌ দাঁত মেলে আর চুল খুলে- টিনের পুতুল চীনের পুতুল কেউ কি এমন তুলতুলে ? গোব্‌দা গড়ন এমনি ধরন আব্‌দারে কেউ ঠোঁট ফুলোয় ? মখমলি রং মিষ্টি নরম- দেখ্‌ছ কেমন হাত বুলোয় ! বল্‌বি কি বল্‌ হাব্‌লা পাগল আবোল তাবোল কান ঘেঁষে, ফোক্‌লা গদাই যা বলবি তাই ছাপিয়ে পাঠাই “সন্দেশে”
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
641
জয় গোস্বামী
ওরা ভস্মমুখ
রূপক
ওরা ভস্মমুখ। ওরা নির্বাপিত। ওরা ধূম্রনাসা কাঠ অনেক পাঁকের নীচে আধপোড়া কাঠ হয়ে ওরা পালিয়ে ঘুরেছে কতক্ষণ। এক একটি ক্ষণের সঙ্গে এক এক শতক পার হল এখন আমার কাজ ওদের বিছানাগুলি খোঁড়া ওদের সযত্নে শুইয়ে গায়ে চাপা দেওয়া চাদর কম্বল নয়–মাটি ওরা মা বাবার মতো। ওদের অস্থি-র খোঁজ পেতে শত শত গোর গর্ত বাঙ্কার ফক্স-হোল খুঁড়ে খুঁড়ে তাই এত ক্রোধ কান্না শোক ভস্ম ঘাঁটি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1727
3897
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রান্তি
সনেট
সুখশ্রমে আমি , সখী , শ্রান্ত অতিশয় ; পড়েছে শিথিল হয়ে শিরার বন্ধন । অসহ্য কোমল ঠেকে কুসুমশয়ন , কুসুমরেণুর সাথে হয়ে যাই লয় । স্বপনের জালে যেন পড়েছি জড়ায়ে । যেন কোন্ অস্তাচলে সন্ধ্যাস্বপ্নময় রবির ছবির মতো যেতেছি গড়ায়ে , সুদূরে মিলিয়া যায় নিখিলনিলয় । ডুবিতে ডুবিতে যেন সুখের সাগরে কোথাও না পাই ঠাঁই , শ্বাস রুদ্ধ হয় — পরান কাঁদিতে থাকে মৃত্তিকার তরে । এ যে সৌরভের বেড়া , পাষাণের নয় — কেমনে ভাঙিতে হবে ভাবিয়া না পাই , অসীম নিদ্রার ভারে পড়ে আছি তাই ।  (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shranti/
1010
জীবনানন্দ দাশ
গোধূলি সন্ধির নৃত্য
চিন্তামূলক
দরদালানের ভিড়- পৃথিবীর শেষে যেইখানে প'ড়ে আছে- শব্দহীন- ভাঙ্গা- সেইখানে উঁচু-উঁচু হরীতকী গাছের পিছনে হেমন্তের বিকেলের সূর্য গোল- রাঙা-চুপে-চুপে ডুবে যায়- জ্যোৎস্নায়। পিপুলের গাছে ব'সে পেঁচা শুধু একা চেয়ে দ্যাখে; সোনার বলের মতো সূর্য আর রূপার ডিবের মতো চাঁদের বিখ্যাত মুখ দেখা।হরীতকী শাখাদের নিচে যেন হীরের স্ফুলিঙ্গ আর স্ফটিকের মতো শাদা জলের উল্লাসঃ নৃমুণ্ডের আবছায়া- নিস্তব্ধতা- বাদামী পাতার ঘ্রাণ- মধুকুপী ঘাস।কয়েকটি নারী যেন ঈশ্বরীর মতোঃ পুরুষ তাদেরঃ কৃতকর্ম নবীন; খোঁপার ভিতরে চুলেঃ নরকের নবজাত মেঘ, পায়ের ভঙ্গির নিচে হঙকঙের তৃণ।সেখানে গোপন জল ম্লান হ'য়ে হীরে হয় ফের, পাতাদের উৎসরণে কোন শব্দ নাই; তবু তারা টের পায় কামানের স্থবির গর্জনে বিনষ্ট হতেছে সাংহাই।সেইখানে যুথচারী কয়েকটি নারী ঘনিষ্ঠ চাঁদের নিচে চোখ আর চুলের সংকেতে মেধাবিনী; দেশ আর বিদেশের পুরুষেরা যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে আর উঠিবে না মেতে।প্রগাঢ় চুম্বন ক্রমে টানিতেছে তাহাদের তুলোর বালিশে মাথা রেখে আর মানবীয় ঘুমে স্বাদ নেই; এই নিচু পৃথিবীর মাঠের তরঙ্গ দিয়ে ওই চূর্ণ ভূখণ্ডের বাতাসে- বরুণে ক্রুর পথ নিয়ে যায় হরীতকী বনে- জ্যোৎস্নায়। যুদ্ধ আর বাণিজ্যের বেলোয়ারি রৌদ্রের দিন শেষ হ'য়ে গেছে সব; বিনুনিতে নরকের নির্বাচন মেঘ, পায়ের ভঙ্গির নিচে বৃশ্চিক কর্কট- তুলা- মীন।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/godhuliir-sondhir-nritto/
5932
সৈয়দ শামসুল হক
তার মৃত্যু
শোকমূলক
ইজদানি মারা গেছে বিমান-পতনে । স্পর্ধা ছিল পৃথিবীকে মুঠো করে ধরে নরোম সুগোল এক কমলালেবুর মতো। মাথা ভরা ছিল তার বইয়ের মলাট, টাই, নাম আর নকটান ভিউ, সম্ভবতঃ আলো ছিল গজ দুই নাইলন সুতো; মারা গেল অল্প বয়সেই অনেক ওপর থেকে নানা চাপ হাওয়া সাঁতারিয়ে। তোমরা এখনো যারা যাবে কোনো চায়ের বিকেলে সদাশয়া মহিলার কাছে; -একদিন সমবেত শোক করা গেছে- আজকে আসেনি ওরা? চায়ে চিনি নেই? কথা আর হাওয়া এই- র‌্যাবো কি মাতাল কোনো কিশোর লেখক? যাই বলো ক কতো সে বড্ড বেয়াড়া। -জেনে রেখো, ইজাদানি সুক্ষ্ম দেহে পেছনেই আছে॥
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/tar-mrityu/
638
জয় গোস্বামী
এসেছিলে, তবু আসো নাই
প্রেমমূলক
যেভাবে বৃষ্টির জল তোড়ে বয়ে যায় ঢালুদিকে সেইভাবে, আমার জীবন আজ অধোগামী।সালোয়ার একটু উঁচু ক’রে তুমি সেই জল ভেঙে ভেঙে রাস্তা পার হয়ে গেলে— এত যত্নে, সাবধানে, যেন বা জলের গায়ে আঘাত না লাগে!পড়ন্ত জীবন শুধু মনে রাখবে অপরূপ চলে যাওয়াটিকে।
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/eschile/
3807
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রক্তমাখা দন্তপংক্তি হিংস্র সংগ্রামের
মানবতাবাদী
রক্তমাখা দন্তপংক্তি হিংস্র সংগ্রামের শত শত নগরগ্রামের অন্ত্র আজ ছিন্ন ছিন্ন করে; ছুটে চলে বিভীষিকা মূর্ছাতুর দিকে দিগন্তরে। বন্যা নামে যমলোক হতে, রাজ্যসাম্রাজ্যের বাঁধ লুপ্ত করে সর্বনাশা স্রোতে। যে লোভ-রিপুরে লয়ে গেছে যুগে যুগে দূরে দূরে সভ্য শিকারীর দল পোষমানা শ্বাপদের মতো, দেশবিদেশের মাংস করেছে বিক্ষত, লোলজিহ্বা সেই কুকুরের দল অন্ধ হয়ে ছিঁড়িল শৃঙ্খল, ভুলে গেল আত্মপর; আদিম বন্যতা তার উদ্‌বারিয়া উদ্দাম নখর পুরাতন ঐতিহ্যের পাতাগুলা ছিন্ন করে, ফেলে তার অক্ষরে অক্ষরে পঙ্কলিপ্ত চিহ্নের বিকার। অসন্তুষ্ট বিধাতার ওরা দূত বুঝি, শত শত বর্ষের পাপের পুঁজি ছড়াছড়ি করে দেয় এক সীমা হতে সীমান্তরে, রাষ্ট্রমদমত্তদের মদ্যভান্ড চূর্ণ করে আবর্জনাকুণ্ডতলে। মানব আপন সত্তা ব্যর্থ করিয়াছে দলে দলে, বিধাতার সংকল্পের নিত্যই করেছে বিপর্যয় ইতিহাসময়। সেই পাপে আত্মহত্যা-অভিশাপে আপনার সাধিছে বিলয়। হয়েছে নির্দয় আপন ভীষণ শত্রু আপনার 'পরে, ধূলিসাৎ করে ভুরিভোজী বিলাসীর ভাণ্ডারপ্রাচীর। শ্মশানবিহারবিলাসিনী ছিন্নমস্তা,মুহূর্তেই মানুষের সুখস্বপ্ন জিনি বক্ষ ভেদি দেখা দিল আত্মহারা, শতস্রোতে নিজ রক্তধারা নিজে করি পান। এ কুৎসিত লীলা যবে হবে অবসান, বীভৎস তান্ডবে এ পাপযুগের অন্ত হবে, মানব তপস্বীবেশে চিতাভস্মশয্যাতলে এসে নবসৃষ্টি-ধ্যানের আসনে স্থান লবে নিরাসক্তমনে-- আজি সেই সৃষ্টির আহ্বান ঘোষিছে কামান।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rakhamakha-dantapnte-hesha-sagama/
4954
শামসুর রাহমান
প্রতীক্ষায় প্রতিক্ষণ
প্রেমমূলক
আমরা যখন ভেসে যাচ্ছিলাম নানা কথার স্রোতে, তখনও তুমি বলোনি, আজ সন্ধেবেলা তুমি আসবে। আমরা দু’জন মুগ্ধাবেশে বলছিলাম ভাসমান মেঘের কথা, সদ্য উড়তে-শেখা পক্ষী শাবকের কথা, এমন একটি বাড়ির কথা বলছিলাম, যার অবস্থান গাছপালা, লতাগুল্মময় টিলার উপর। সেই বিনীত, বাংলো প্যাটার্নের বাড়িতে থাকবো শুধু আমরা দু’জন। কেউ আমাদের নির্জনতার দ্বারে হানবে না আঘাত। তুমি বললে কণ্ঠস্বরে মাধুর্যের ঢেউ খেলিয়ে, ‘এই শোনো, তুমি কখনো কবিতা পড়বে, আমি শুনব তন্ময় হ’য়ে, আর আমি পড়বো তোমার নতুন লেখা কোন কবিতা তুমি শুনবে আনন্দিত চিত্তে, আমি পড়তে গিয়ে হোঁচট খেলে, তুমি মৃদু হাসবে। কখনো তোমার মাথা টেনে নেব কোলে, আমার চুল ছড়িয়ে পড়বে তোমার সারা মুখে। আমার আদরে তোমার চোখে নামবে ঘুম। আমাদের স্বপ্নের বাড়িতে বয়ে যাবে আমাদের দিনগুলো, রাতগুলো, যেন গুণীর তান।তুমি চৈত্র-দুপুরে তোমার একাকিত্বের কথা বললে, আমি বললাম আমার ভেতরকার হু হু হাওয়া আর হাহাকারের কথা। কিন্তু আমরা কেউ কারো কথার নিঃসীম শূন্যতাকে ধারণ করতে পারিনি। এক ধরনের অভিমান তোমার মনে ঝুলে রইল সব কালো মেঘ হয়ে। আবার আজ তুমি আসবে আমার ঘরে। আমি সেই সম্ভাবনার কথা ভেবে বসন্ত ঋতুকে নিবেদন করলাম, আজ আসতে হবে আমার ঘরের ভেতর, নার্সারির গোলাপগুলোকে আমার অতিথি হওয়ার আবেদন জানালাম; কোকিল এবং দোয়েলের কাছে খবর পাঠালাম আমার ঘরকে সুরেলা করার জন্যে। এভাবেই সাজাবো আমার ছোট ঘরটিকে। তুমি আসবে তো তোমার সৌন্দর্যের তরঙ্গ তুলে, সুরভি ছড়িয়ে হাওয়ায়? আমি সেই কখন থেকে তোমার প্রতীক্ষায় প্রতিক্ষণ কখনো ধনুকের ছিলা, কখনো চাতকের তৃষিত ডাক।   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/protikkhay-protikkhon/
4551
শামসুর রাহমান
কবিতার মৃত্যুশোক
সনেট
আমিতো অজস্র কবিতার মৃত্যুশোক পুষে রাখি, মৃত্যুশোককালীন আঁধারে নির্বিকার ফেরেস্তারা দ্যাখেন আমার মদ্যপান। মদিরার স্বচ্ছ ধারা আমার ভেতরে বয়ে গেলে পর নিজেকে একাকী, ব্যথিত একাকী লাগে আরো, চুপচাপ বসে থাকি, কখনো চড়িয়ে গলা এলেবেলে কথা বলি, যারা আশপাশে থাকে, তারা নিজেরাও নয় বাক্যহারা; আমার চোখের ভুল দ্যুতিতে কেউবা পড়ে ফাঁকি।কবিতার মৃত্যুশোক ফিকে হলে নিভৃত টেবিলে কাগজ কলম নিয়ে বসি। অকস্মাৎ চোখে স্মৃতি ভেসে ওঠে, যেন শান্ত জলের উপরিভাগে সদ্য মৃত মাছ। কখনো আমার অস্তিত্বের গূঢ় নীলে খৃষ্টপূর্ব সভ্যতার মতো কিছু প্রবল প্রতীতি নিয়ে জেগে উঠতে চায়, বুঝি ওরা অলৌকিক পদ্ম।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobitar-mrittyushok/
2309
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
কালিদাস
সনেট
কবিতা-নিকুঞ্জে তুমি পিককুল-পতি। কার গো না মজে মনঃ ও মধুর স্বরে? শুনিয়াছি লোক মুখে আপনি ভারতী, সৃজি মায়াবলে সরঃ বনের ভিতরে, নব নাগরীর বেশে তুষিলেন বরে তোমায়;অমৃত রসে রসনা সিকতি, আপনার স্বর্ণ বীণা অরপিলা করে!— সত্য কি হে এ কাহিনী, কহ, মহামতী? মিথ্যা বা কি বলে বলি! শৈলেন্দ্র-সদনে, লভি জন্ম মন্দাকিনী (আনন্দ জগতে!) নাশেন কলুষ যথা এ তিন ভূবনে; সঙ্গীত-তরঙ্গ তব উথলি ভারতে (পূণ্যভূমি!) হে কবীন্দ্র, সুধা বরিষ্ণে, দেশ-দেশান্তরে কর্ণ তোষে সেই মতে!
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/kalidas/
4957
শামসুর রাহমান
প্রত্যাশা জেগে নয়
চিন্তামূলক
এখন রোদের যৌবনের তাপ নেই, এটাই তো অনিবার্য পড়ন্ত বেলায়। প্রত্যুষের আনকোরা ক্ষণে মাথা ক’রে হেঁটে চলা দীর্ঘকাল ক্লান্তিকেই করে আলিঙ্গন, জানা আছে যুগ যুগান্তের পথচারীদের। এই যে পথিক আমি হেঁটেছি বিস্তর, সে-তো গোধূলি বেলায় পৌঁছে গেছে।এ চলার পথে কত প্রিয় মুখ থুবড়ে পড়েছে দিগ্ধিদিক, বেদনার্ত দাঁড়িয়েছি ক্ষণকাল, ফের অন্বিষ্টের প্রলোভনে দ্রুত করেছি চলার ভঙ্গি, হোঁচটে হোঁচটে পায়ে ঢের দগদগে ক্ষত ত্বরিত হয়েছে সৃষ্টি, তবু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অব্যাহত রেখেছি যাত্রার রীতি। হবে কি আখেরে ক্লান্ত মাথা মুকুটে শোভিত?বস্তুত চলার পথে ধূলিকণা জমেছে শরীরে ঢের আর চোখ দুটো ক্লান্তির গহন কুয়াশায় সমাচ্ছন্ন, তবু হেঁটে চলেছি দৌড়ের করুণ, অস্পষ্ট, ব্যর্থ ভঙ্গিমায়। এ খেলায় জয়ের প্রত্যাশা শুধু ধুধু মরীচিকা জানি, তবু আখেরে কোথাও পৌঁছে যাওয়ার প্রত্যাশা জেগে রয়।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prottyasha-jege-noy/
3146
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তারা ও আঁখি
প্রেমমূলক
কাল সন্ধ্যাকালে ধীরে সন্ধ্যার বাতাস , বহিয়া আনিতেছিল ফুলের সুবাস । রাত্রি হ ' ল , আঁধারের ঘনীভূত ছায়ে পাখিগুলি একে একে পড়িল ঘুমায়ে । প্রফুল্ল বসন্ত ছিল ঘেরি চারি ধার আছিল প্রফুল্লতর যৌবন তোমার , তারকা হাসিতেছিল আকাশের মেয়ে , ও আঁখি হাসিতেছিল তাহাদের চেয়ে । দুজনে কহিতেছিনু কথা কানে কানে , হৃদয় গাহিতেছিল মিষ্টতম তানে । রজনী দেখিনু অতি পবিত্র বিমল , ও মুখ দেখিনু অতি সুন্দর উজ্জ্বল । সোনার তারকাদের ডেকে ধীরে ধীরে , কহিনু , “ সমস্ত স্বর্গ ঢালো এর শিরে! ” বলিনু আঁখিরে তব “ ওগো আঁখি-তারা , ঢালো গো আমার ' পরে প্রণয়ের ধারা । ”                     — Victor Hugo (অনূদিত কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tara-o-akhi/
3865
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুচি
চিন্তামূলক
রামানন্দ পেলেন গুরুর পদ– সারাদিন তার কাটে জপে তপে, সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুরকে ভোজ্য করেন নিবেদন, তার পরে ভাঙে তাঁর উপবাস যখন অন্তরে পান ঠাকুরের প্রসাদ। সেদিন মন্দিরে উৎসব– রাজা এলেন, রানী এলেন, এলেন পণ্ডিতেরা দূর দূর থেকে, এলেন নানাচিহ্নধারী নানা সম্প্রদায়ের ভক্তদল। সন্ধ্যাবেলায় স্নান শেষ করে। রামানন্দ নৈবেদ্য দিলেন ঠাকুরের পায়ে– প্রসাদ নামল না তাঁর অন্তরে, আহার হল না সেদিন। এমনি যখন দুই সন্ধ্যা গেল কেটে, হৃদয় রইল শুষ্ক হয়ে, গুরু বললেন মাটিতে ঠেকিয়ে মাথা, "ঠাকুর, কী অপরাধ করেছি।’ ঠাকুর বললেন, "আমার বাস কি কেবল বৈকুণ্ঠে। সেদিন আমার মন্দিরে যারা প্রবেশ পায় নি আমার স্পর্শ যে তাদের সর্বাঙ্গে, আমারই পাদোদক নিয়ে প্রাণপ্রবাহিণী বইছে তাদের শিরায়। তাদের অপমান আমাকে বেজেছে; আজ তোমার হাতের নৈবেদ্য অশুচি।’ "লোকস্থিতি রক্ষা করতে হবে যে প্রভু’ ব’লে গুরু চেয়ে রইলেন ঠাকুরের মুখের দিকে। ঠাকুরের চক্ষু দীপ্ত হয়ে উঠল; বললেন, "যে লোকসৃষ্টি স্বয়ং আমার, যার প্রাঙ্গণে সকল মানুষের নিমন্ত্রণ, তার মধ্যে তোমার লোকস্থিতির বেড়া তুলে আমার অধিকারে সীমা দিতে চাও এতবড়ো স্পর্ধা!’ রামানন্দ বললেন, "প্রভাতেই যাব এই সীমা ছেড়ে, দেব আমার অহংকার দূর করে তোমার বিশ্বলোকে।’ তখন রাত্রি তিন-প্রহর, আকাশের তারাগুলি যেন ধ্যানমগ্ন। গুরুর নিদ্রা গেল ভেঙে; শুনতে পেলেন, "সময় হয়েছে, ওঠো, প্রতিজ্ঞা পালন করো।’ রামানন্দ হাতজোড় করে বললেন, "এখনো রাত্রি গভীর, পথ অন্ধকার, পাখিরা নীরব। প্রভাতের অপেক্ষায় আছি।’ ঠাকুর বললেন, "প্রভাত কি রাত্রির অবসানে। যখনি চিত্ত জেগেছে, শুনেছ বাণী, তখনি এসেছে প্রভাত। যাও তোমার ব্রতপালনে।’ রামানন্দ বাহির হলেন পথে একাকী, মাথার উপরে জাগে ধ্রুবতারা। পার হয়ে গেলেন নগর, পার হয়ে গেলেন গ্রাম। নদীতীরে শ্মশান, চণ্ডাল শবদাহে ব্যাপৃত। রামানন্দ দুই হাত বাড়িয়ে তাকে নিলেন বক্ষে। সে ভীত হয়ে বললে, "প্রভু, আমি চণ্ডাল, নাভা আমার নাম, হেয় আমার বৃত্তি, অপরাধী করবেন না আমাকে।’ গুরু বললেন, "অন্তরে আমি মৃত, অচেতন আমি, তাই তোমাকে দেখতে পাই নি এতকাল, তাই তোমাকেই আমার প্রয়োজন– নইলে হবে না মৃতের সৎকার।’ চললেন গুরু আগিয়ে। ভোরের পাখি উঠল ডেকে, অরুণ-আলোয় শুকতারা গেল মিলিয়ে। কবীর বসেছেন তাঁর প্রাঙ্গণে, কাপড় বুনছেন আর গান গাইছেন গুন্‌ গুন্‌ স্বরে। রামানন্দ বসলেন পাশে, কণ্ঠ তাঁর ধরলেন জড়িয়ে। কবীর ব্যস্ত হয়ে বললেন, "প্রভু, জাতিতে আমি মুসলমান, আমি জোলা, নীচ আমার বৃত্তি।’ রামানন্দ বললেন, "এতদিন তোমার সঙ্গ পাই নি বন্ধু, তাই অন্তরে আমি নগ্ন, চিত্ত আমার ধুলায় মলিন, আজ আমি পরব শুচিবস্ত্র তোমার হাতে– আমার লজ্জা যাবে দূর হয়ে।’ শিষ্যেরা খুঁজতে খুঁজতে এল সেখানে, ধিক্‌কার দিয়ে বললে, "এ কী করলেন প্রভু!’ রামানন্দ বললেন, "আমার ঠাকুরকে এতদিন যেখানে হারিয়েছিলুম আজ তাঁকে সেখানে পেয়েছি খুঁজে।’ সূর্য উঠল আকাশে আলো এসে পড়ল গুরুর আনন্দিত মুখে। কাব্যগ্রন্থ -  পুনশ্চ
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shuchi/
2097
মহাদেব সাহা
এক
প্রেমমূলক
এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না একবার তোমাকে দেখতে পাবো এই নিশ্চয়তাটুকু পেলে- বিদ্যাসাগরের মতো আমিও সাঁতরে পার হবো ভরা দামোদর … কয়েক হাজার বার পাড়ি দেবো ইংলিশ চ্যানেল; তোমাকে একটিবার দেখতে পাবো এটুকু ভরসা পেলে অনায়াসে ডিঙাবো এই কারার প্রাচীর, ছুটে যবো নাগরাজ্যে পাতালপুরীতে কিংবা বোমারু বিমান ওড়া শঙ্কিত শহরে। যদি জানি একবার দেখা পাবো তাহলে উত্তপ্ত মরুভূমি অনায়াসে হেঁটে পাড়ি দেবো, কাঁটাতার ডিঙাবো সহজে, লোকলজ্জা ঝেড়ে মুছে ফেলে যাবো যে কোনো সভায় কিংবা পার্কে ও মেলায়; একবার দেখা পাবো শুধু এই আশ্বাস পেলে এক পৃথিবীর এটুকু দূরত্ব আমি অবলীলাক্রমে পাড়ি দেবো। তোমাকে দেখেছি কবে, সেই কবে, কোন বৃহস্পতিবার আর এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95-%e0%a6%95%e0%a7%8b%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%9b%e0%a6%b0-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%bf-%e0%a6%a8%e0%a6%be/
3591
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৭
শোকমূলক
বেঁচেছিল, হেসে হেসে খেলা করে বেড়াত সে– হে প্রকৃতি, তারে নিয়ে কী হল তোমার! শত রঙ-করা পাখি, তোর কাছে ছিল না কি– কত তারা, বন, সিন্ধু, আকাশ অপার! জননীর কোল হতে কেন তবে কেড়ে নিলি! লুকায়ে ধরার কোলে ফুল দিয়ে ঢেকে দিলি! শত-তারা-পুষ্প-ময়ী মহতী প্রকৃতি অয়ি, নাহয় একটি শিশু নিলি চুরি ক’রে– অসীম ঐশ্বর্য তব তাহে কি বাড়িল নব? নূতন আনন্দকণা মিলিল কি ওরে? অথচ তোমারি মতো বিশাল মায়ের হিয়া সব শূন্য হয়ে গেল একটি সে শিশু গিয়া।Victor Hugo (অনূদিত কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-7/
1957
বিনয় মজুমদার
আমার আশ্চর্য ফুল
প্রেমমূলক
আমার আশ্চর্য ফুল, যেন চকোলেট, নিমিষেই গলাধঃকরণ তাকে না ক’রে ক্রমশ রস নিয়ে তৃপ্ত হই, দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিষ্কারে, প্রেমে। অনেক ভেবেছি আমি, অনেক ছোবল নিয়ে প্রাণে জেনেছি বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে, কাকে বলে নীল- আকাশের হৃদয়ের; কাকে বলে নির্বিকার পাখি। অথবা ফড়িঙ তার স্বচ্ছ ডানা মেলে উড়ে যায়। উড়ে যায় শ্বাস ফেলে যুবকের প্রানের উপরে। আমি রোগে মুগ্ধ হয়ে দৃশ্য দেখি, দেখি জানালায় আকাশের লালা ঝরে বাতাসের আশ্রয়ে আশ্রয়ে। আমি মুগ্ধ; উড়ে গেছ; ফিরে এসো, ফিরে এসো , চাকা, রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো। আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথীবীর সব আকাশে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4058.html
1373
তসলিমা নাসরিন
শেখো
নীতিমূলক
দুদিনের জীবন নিয়ে আমাদের কত রকম ঢঙ কিছুক্ষণ পরই তো ঢঙ ঢঙ ঘণ্টা বাজবে! চোখে তখন আর রঙ নেই, সব সাদা কালো, জঙ ধরা ত্বকে জাঁকালো অসুখ হাঁটবে, অসুখ তো নয়, সঙ। কিছুতে কি আর ফিরে পাবো চোখে, চোখের আলো! বাদ দাও না ওইসব অহেতুক অহং, যতদিন বাঁচো, ভালোবাসো। ভালো। যতসব বোমা আর ভড়ং প্রজাতি কি কোনওকালে টিকেছে এভাবে! হলে আস্ত মানুষখেকো! এবার একটু শেখো। ভলোবাসতে শেখো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2008
5606
সুকুমার রায়
গ্রীষ্ম (ঐ এল বৈশাখ)
ছড়া
ঐ এল বৈশাখ, ঐ নামে গ্রীষ্ম, খাইখাই রবে যেন ভয়ে কাঁপে বিশ্ব ! চোখে যেন দেখি তার ধুলিময় অঙ্গ, বিকট কুটিলজটে ভ্রুকুটির ভঙ্গ, রোদে রাঙা দুই আঁখি শুকায়েছে কোটরে, ক্ষুধার আগুন যেন জ্বলে তার জঠরে ! মনে হয় বুঝি তার নিঃশ্বাস মাত্রে তেড়ে আসে পালাজ্বর পৃথিবীর গাত্রে ! ভয় লাগে হয় বুঝি ত্রিভুবন ভস্ম- ওরে ভাই ভয় নাই পাকে ফল শস্য ! তপ্ত ভীষণ চুলা জ্বালি নিজ বক্ষে পৃথিবী বসেছে পাকে, চেয়ে দেখ চক্ষে,- আম পাকে, জাম পাকে, ফল পাকে কত যে, বুদ্ধি যে পাকে কত ছেলেদের মগজে !
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/grishmo-oi-elo-boishakh/
922
জীবনানন্দ দাশ
আকাশে সাতটি তাঁরা-জীবনানন্দ থেকে গ্রন্থিত
স্বদেশমূলক
ছেলে: আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে ব’সে থাকি; বাংলার নীল সন্ধ্যা-কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে; আমার চোখের পরে আমার মুখের পরে চুল তার ভাসে; পৃথিবীর কোনো পথে এ কন্যারে দেখিনিকো-দেখি নাই অত অজস্রচুলের চুমা হিজলে, কাঁঠালে , জামে ঝরে অবিরত, জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর চুলের বিন্যাসে। মেয়ে: পৃথিবীর কোনো পথে: নরম ধানের গন্ধ-কলমীর ঘ্রাণ, কিশোরের পায়ের- দলা মুথাঘাস, – লাল লাল বটের ফলের ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা- এরই মাঝে বাংলার প্রাণ । আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি পাই টের। ছেলে: আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে : যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি, /সেই নারীর মতো ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠেছে। মেয়ে: ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে সেই সমুদ্রপারের কাহিনী, রামধনু রঙের কাচের জানালা, ময়ূরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায় কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দুর কক্ষ ও কক্ষান্তরের ক্ষণিক আভাস- আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়! তোমার নগ্ন নির্জন হাত । ছেলে: রাতের বাতাস আসে আকাশের নক্ষত্রগুলো জ্বলন্ত হয়ে ওঠে যেন কারে ভালোবেসেছিলাম- সমস্ত শরীর আকাশ রাত্রি নক্ষত্র-উজ্জ্বল হয়ে উঠছে তাই আমি টের পাই সেই নগ্ন হাতের গন্ধের সেই মহানুভব অনিঃশেষ আগুনের রাতের বাতাসে শিখানীলাভ এই মানবহৃদয়ের সেই অপর মানবীকে। সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে, বলিল: মেয়ে: তোমারে চাই : বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি- কুয়াশার পাখনায়- সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক জোনাকির দেহ হতে- খুঁজেছি তোমারে সেইখানে- ছেলে: নতুন সৌন্দর্য এক দেখিয়াছি- সকল অতীত ঝেড়ে ফেলে- নতুন বসন্ত এক এসেছে জীবনে ; শালিখেরা কাঁপিতেছে মাঠে মাঠে- সেইখানে শীত শীত শুধু- তবুও আমার বুকে হৃদয়ের বনে কখন অঘ্রান রাত শেষ হ’ল- পৌষ গেল চ’লে যাহারে পাইনি রোমে বেবিলনে, সে এসেছে ব’লে। মেয়ে: তুমি এই রাতের বাতাস ,বাতাসের সিন্ধু-ঢেউ তোমার মতন কেউ নাই আর। অন্ধকার নিঃসাড়তার মাঝখানে তুমি আনো প্রাণে .সমুদ্রের ভাষা, ব্যথিত জলের মতন, রাতের বাতাস তুমি,- বাতাসের সিন্ধু- ঢেউ, তোমার মতন কেউ নাই আর। ছেলে: তোমার মুখের দিকে তাকালে এখনো আমি সেই পৃথিবীর সমুদ্রের নীল, নক্ষত্র, রাত্রির জল, যুবাদের ক্রন্দন সব- শ্যামলী, করেছি অনুভব। তোমার সৌন্দর্য নারি, অতীতের দানের মতন। ধর্মাশোকের স্পষ্ট আহ্বানের মতো আমাদের নিয়ে যায় ডেকে তোমার মুখের স্নিগ্ধ প্রতিভার পানে। মেয়ে: আমরা কিছু চেয়েছিলাম প্রিয়; নক্ষত্র মেঘ আশা আলোর ঘরে ঐ পৃথিবীর সূর্যসাগরে, ভেবেছিলাম, পেয়ে যাবে প্রেমের স্পষ্ট গতি সত্য সূর্যালোকের মতন;- ছেলে: সবার ওপর তোমার আকাশপ্রতিম মুখে রয়েছে সফল সকালের রৌদ্র। সৃষ্টি ও সমাজের বিকেলের অন্ধকারের ভিতর সকালবেলার প্রথম সূর্য-শিশিরের মতো সেই মুখ ; জানে না কোথায় ছায়া পড়েছে আমার জীবনে, সমস্ত অমৃতযোগের অন্তরীক্ষে। আমাদের ভালোবাসা পথ কেটে নেবে এই পৃথিবীতে ;- আমরা দুজনে এই বসে আছি আজ-ইচ্ছাহীন ;- শালিক পায়রা মেঘ পড়ন্ত বেলার এই দিন চারিদিকে ;- এখানে গাছের পাতা যেতেছে হলুদ হ’য়ে- নিঃশব্দে উল্কার মতো ঝ’রে একদিন তুমি এসে তবু এই হলুদ আঁচল রেখে ঘাসের ভিতরে শান্তি পাবে ।
https://banglapoems.wordpress.com/2009/08/26/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a8/
547
কাজী নজরুল ইসলাম
সেবক
স্বদেশমূলক
সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়, নেই কি রে কেউ সত্যসাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়? শিকলগুলো বিকল করে পায়ের তলায় মাড়ায়, – বজ্র-হাতে জিন্দানের ওই ভিত্তিটাকে নাড়ায়? নাজাত -পথের আজাদ মানব নেই কি রে কেউ বাঁচা, ভাঙতে পারে ত্রিশ কোটি এই মানুষ-মেষের খাঁচা? ঝুটার পায়ে শির লুটাবে, এতই ভীরু সাঁচা? – ফন্দি-কারায় কাঁদছিল হায় বন্দি যত ছেলে, এমন দিনে ব্যথায় করুণ অরুণ আঁখি মেলে, পাবক-শিখা হস্তে ধরি কে তুমি ভাই এলে? ‘সেবক আমি’ – হাঁকল তরুণ কারার দুয়ার ঠেলে। দিন-দুনিয়ায় আজ খুনিয়ার রোজ-হাশরের মেলা, করছে অসুর হক-কে না-হক, হক-তায়ালায় হেলা! রক্ষ-সেনার লক্ষ আঘাত বক্ষে বড়োই বেঁধে, রক্ষা করো, রক্ষা করো, উঠতেছে দেশ কেঁদে। নেই কি রে কেউ মুক্তি-সেবক শহিদ হবে মরে, চরণ-তলে দলবে মরণ ভয়কে হরণ করে, ওরে        জয়কে বরণ করে – নেই কি এমন সত্য-পুরুষ মাতৃ-সেবক ওরে? কাঁপল সে স্বর মৃত্যু-কাতর আকাশ-বাতাস ছিঁড়ে, বাজ পড়েছে, বাজ পড়েছে ভারতমাতার নীড়ে! দানব দলে শাস্তি আনে নাই কি এমন ছেলে? একী দেখি গান গেয়ে ওই অরুণ আঁখি মেলে পাবক-শিখা হস্তে ধরে কে বাছা মোর এলে? ‘মা গো আমি সেবক তোমার! জয় হোক মা-র।’ হাঁকল তরুণ কারার-দুয়ার ঠেলে! বিশ্বগ্রাসীর ত্রাস নাশি আজ আসবে কে বীর এসো ঝুট শাসনে করতে শাসন, শ্বাস যদি হয় শেষও। – কে আজ বীর এসো। ‘বন্দি থাকা হীন অপমান!’ হাঁকবে যে বীর তরুণ, – শির-দাঁড়া যার শক্ত তাজা, রক্ত যাহার অরুণ, সত্য-মুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের, খোদার রাহায় জান দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের। দেশের পায়ে প্রাণ দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের, সত্য-মুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের। হঠাৎ দেখি আসছে বিশাল মশাল হাতে ও কে? ‘জয় সত্যম্’ মন্ত্র-শিখা জ্বলছে উজল চোখে। রাত্রি-শেষে এমন বেশে কে তুমি ভাই এলে? ‘সেবক তোদের, ভাইরা আমার! – জয় হোক মা-র!’ হাঁকল তরুণ কারার দুয়ার ঠেলে!(বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sebok/
1450
নবারুণ ভট্টাচার্য
কালবেলা
মানবতাবাদী
যুবকেরা গেছে উৎসবে যুবতীরা গেছে ভোজসভায় অরণ্য গেছে বনানীর খোঁজে গরীব জুটেছে শোকসভায়। গয়নারা গেছে নীরব লকারে বন্যপ্রাণীরা অভয়ারণ্যে বিমান উড়েছে আকাশের খোঁজে গরীবরা শুধু হচ্ছে হন্যে। পুরুষেরা গেছে নিভৃত মিনারে গর্ভবতীরা প্রসূতিসদনে কুমিরেরা গেছে নদীর কিনারে গরীব জমছে নানা কোণে কোণে। বিপ্লব গেছে নেতাদের খোঁজে যুবকেরা গেছে উৎসবে যুবতীরা গেছে বিশিষ্ট ভোজে গরীবের হায় কী হবে?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3-%e0%a6%ad%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%b0/
2805
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই জ্যোৎস্নারাতে জাগে আমার প্রাণ
ভক্তিমূলক
এই জ্যোৎস্নারাতে জাগে আমার প্রাণ; পাশে তোমার হবে কি আজ স্থান। দেখতে পাব অপূর্ব সেই মুখ, রইবে চেয়ে হৃদয় উৎসুক, বারে বারে চরণ ঘিরে ঘিরে ফিরবে আমার অশ্রুভরা গান?সাহস করে তোমার পদমূলে আপনারে আজ ধরি নাই যে তুলে, পড়ে আছি মাটিতে মুখ রেখে, ফিরিয়ে পাছে দাও হে আমার দান। আপনি যদি আমার হাতে ধরে কাছে এসে উঠতে বল মোরে, তবে প্রাণের অসীম দরিদ্রতা এই নিমেষেই হবে অবসান।বোলপুর, ২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ei-jyotsnarate-jage-amar-pran/
2611
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরিহরণীয়
নীতিমূলক
মৃত্যু কহে, পুত্র নিব; চোর কহে ধন। ভাগ্য কহে, সব নিব যা তোর আপন। নিন্দুক কহিল, লব তব যশোভার। কবি কহে, কে লইবে আনন্দ আমার?  (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/oporihorniyo/
1901
পূর্ণেন্দু পত্রী
সে আছে সৃজন সুখে
চিন্তামূলক
সে আছে সৃজন-সুখে নিজস্ব কর্ষণে তাকে অত ভীড়ে, অত লোকালয়ে, খররৌদ্রপাতে তোমাদের দু-বেলার সংঘাতে ও সঙ্গের চত্বরে সহসা ডেকো না। যেহেতু সে তোমাদেরই একান্ত আপন শুভাকাঙ্গী, সমর্থনকারী তোমাদেরই রক্তচিহ্ন রেখেছে সে কপালের ত্রিশূল-রেখায়। সে আছে সৃজন-সুখে সুখ মানে উলুধ্বনি নয়! সে নিমগ্ন হয়ে আছে সময়ের বিনষ্ট ফাটলে। পরিপক্ক দ্রাক্ষা নয় তার প্রিয় অন্বেষণ দ্রাক্ষার গভীর অগ্নিমূল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1180
2758
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশার আলোকে
ভক্তিমূলক
আশার আলোকে জ্বলুক প্রাণের তারা, আগামী কালের প্রদোষ-আঁধারে ফেলুক কিরণধারা।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ashar-aloke/
2029
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
বারো মাস তিথি যত
প্রকৃতিমূলক
বার মাস তিথি যত। একে একে হয় গত।। বার মাস সাত বার। আসে যায় বার বার।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4151.html
2302
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
কবি-মাতৃভাষা
সনেট
নিজাগারে ছিল মোর অমূল্য রতন অগণ্য ; তা সবে আমি অবহেলা করি, অর্থলোভে দেশে দেশে করিনু ভ্রমণ, বন্দরে বন্দরে যথা বাণিজ্যের তরী | কাটাইনু কতকাল সুখ পরিহরি, এই ব্রতে, যথা তপোবনে তপোধন, অশন, শয়ন ত্যাজে, ইষ্টদেবে স্মরি, তাঁহার সেবায় সদা সঁপি কায় মন | বঙ্গকুল-লক্ষ্মী মোরে নিশার স্বপনে কহিলা-- 'হে বত্স, দেখি তোমার ভকতি, সুপ্রসন্ন তব প্রতি দেবী সরস্বতী! নিজ গৃহে ধন তব, তবে কি কারণে ভিখারী তুমি হে আজি, কহ ধন-পতি? কেন নিরানন্দ তুমি আনন্দ-সদনে?'
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/post20160702063932/
1886
পূর্ণেন্দু পত্রী
যূথী ও তার প্রেমিকেরা
চিন্তামূলক
আকাশে বাতাসে তুমুল দ্বন্দ্ব কে আগে কাড়বে যূথীর গন্ধ কার হাতে বড় নখ। স্বর্গে মর্তে যে যার গর্তে যূথীকে গলার মালায় পরতে ভীষণ উত্তেজক।। মেঘের ভঙ্গী গোঁয়ার মহিষ রোদ রাগী ঘোড়া, সুর্ঘ সহিস, বজ্র বানায় বোমা। বিদ্যুৎ চায় বিদীর্ণ মাটি গাছে গাছে খাড়া সড়কি ও লাঠি নদী গিরি বন ভয়ে অচেতন থ্রম্বসিসের কোম।। আকাশে বাতাসে তুমুল যুদ্ধ যে যার গর্তে ভীষণ ক্ষুদ্ধ নখে ধার, মুখে গ্রাস। কেবল যূথীই জানে না সঠিক কে তার পরমাশ্চর্য প্রেমিক চোখে জল, বুকে ত্রাস।
https://banglarkobita.com/poem/famous/486
1643
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বন্ধুর স্মরণে
শোকমূলক
ওকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে, ওকে আজ শ্বেতচন্দনের ফোঁটা দাও, ওকে পট্টবসনে সাজাও; ওকে বলো, এইখানে সমাপ্ত ওর কাজ, ও এখন যেতে পারে। ও যাবে কোথায়, কার উদ্যানের ঝাড়ে ওর জন্যে ফুটেছে গোলাপ? এর মধ্যে উঠল কেন গোলাপের কথা? ও খুব ভালই জানে, কারও উদ্যানে গোলাপ নেই, আছে তার ধারণা কেবল; আছে মাটি, আছে রৌদ্র, এবং আঁজলায় কিছু জল। তা হলে ছলনা ছাড়ো, ওকে যেতে দাও। ও যাবে কোথায়? ও কি সত্যিই কোথাও যেতে চায়? হায়, তুমিও জানো না কিছু? সর্প অভিমান থেকে ও বিমুক্ত আজ, তাই বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্য এখন ওকে ডাকে। ওই দ্যাখো, সূর্য ওরই প্রশস্তি রচনা করে রাখে, সমুদ্রের তরঙ্গে পা ঠোকে ওর ঘোড়া।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1558
973
জীবনানন্দ দাশ
এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে
সনেট
এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে শান্তি আসে মানুষের মনে; এখানে সবুজ শাখা আঁকাবাঁকা হলুদ পাখিরে রাখে ঢেকে; জামের আড়ালে সেই বউকথাকওটিরে যদি ফেল দেখে একবার — একবার দু’পহর অপরাহ্নে যদি এই ঘুঘুর গুঞ্জনে ধরা দাও — তাহলে অনন্তকাল থাকিতে যে হবে এই বনে; মৌরির গন্ধমাখা ঘাসের শরীরে ক্লান্ত দেহটিরে রেখে আশ্বিনের ক্ষেতঝরা কচি কচি শ্যামা পোকাদের কাছে ডেকে রব আমি চকোরীর সাথে যেন চকোরের মতন মিলনে;উঠানে কে রূপবতী খেলা করে — ছাড়ায়ে দিতেছে বুঝি ধান শালিখের; ঘাস থেকে ঘাসে ঘাসে খুঁটে খুঁটে খেতেছে সে তাই; হলুদ নরম পায়ে খয়েরি শালিখগুলো ডরিছে উঠান; চেয়ে দ্যাখো সুন্দরীরে : গোরোচনা রূপ নিয়ে এসেছে কি রাই! নীলনদে — গাঢ় রৌদ্রে — কবে আমি দেখিয়াছি — করেছিল স্নান
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ekhaney-ghughur-dakey-opranhey/
5830
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বয়েস
প্রেমমূলক
আমার নাকি বয়েস বাড়ছে? হাসতে হাসতে এই কথাটা স্নানের আগে বথরুমে যে কবার বললুম! এমন ঘোর একলা জায়গায় দুপাক নাচলেও ক্ষতি নেই তো- ব্যায়াম করে রোগা হবো, সরু ঘেরের প্যান্ট পরবো ? হাসতে হাসতে দম পেটে যায়, বিকেলবেলায় নীরার কাছে বলি, আমার বয়েস বাড়ছে, শুনছো তো? ছাপা হয়েছে! সত্যি সত্যি বুকের লোম, জুলপি, দাড়ি কাঁচায় পাকা- এই যে চেয়ে দ্যাখো দেখে সবাই বলবে না কি ছেলেটা কই, ও তো লোকটা! এ সব খুব শক্ত ম্যাজিক, ছেলে কীভাবে লোক হয়ে যায় লোকেরা ফের বুড়ো হবেই এবং মরবে, আমিও মরবো আরও খনিকটা ভালোবেসে, আরও কয়েকটা পদ্য লিলে আমিও ঠিক মরে যাবো- কী, তাই না? ঘুরতে ঘুরতে কোথায় এলুম, এ জায়গাটা এত অচেনা আমার ছিল বিশাল রাজ্য, তার বইরেও এত অসীম শরীরময় গান-বাজনা, পলক ফেলতেও মায়া জাগে এই ভ্রমণটা বেশ লাগলো, কম কিছু তো দেখা হলো না অন্ধকারও মধুর লাগে, নীরা, তোমার হাতটা দাও তো সুগন্ধ নিই। নীরা, শুধু তোমার কাছে এসেই বুঝি সময় আজো থেমে আছে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1790
2098
মহাদেব সাহা
এক কোটি বছর তোমাকে দেখি না
প্রেমমূলক
এক কোটি বছর হয় তোকাকে দেখি না একবার তোমাকে দেখতে পাবো এই নিশ্চয়তাটুকু পেলে- বিদ্যাসাগরের মতো আমিও সাঁতরে পার হবো ভরা দামোদর কয়েক হাজার বার পাড়ি দেবো ইংলিশ চ্যানেল; তোমাকে একটিবার দেখতে পাবো এটুকু ভরসা পেলে অনায়াসে ডিঙাবো এই কারার প্রাচীর, ছুটে যবো নাগরাজ্যে পাতালপুরীতে কিংবা বোমারু বিমান ওড়া শঙ্কিত শহরে। যদি জানি একবার দেখা পাবো তাহলে উত্তপ্ত মরুভূমি অনায়াসে হেঁটে পাড়ি দেবো, কাঁটাতার ডিঙাবো সহজে, লোকলজ্জা ঝেড়ে মুছে ফেলে যাবো যে কোনো সভায় কিংবা পার্কে ও মেলায়; একবার দেখা পাবো শুধু এই আশ্বাস পেলে এক পৃথিবীর এটুকু দূরত্ব আমি অবলীলাক্রমে পাড়ি দেবো। তোমাকে দেখেছি কবে, সেই কবে, কোন বৃহস্পতিবার আর এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1378
5318
শামসুর রাহমান
স্বপ্নে আমার মনে হলো
রূপক
রাগী মোষপালের মতো ধেয়ে আসছে আকাশজোড়া মেঘদল আর সেই কবে থেকে আমি হেঁটে চলেছি কাঁটাভরা পথে, চলেছি অভীষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। অবিরত রক্ত ঝরছে অতিশয় ক্লান্ত দুটো পা থেকে। বেয়াড়া ক্লান্তি আর অমাবস্যা-হতাশার চোখ রাঙানিতে জব্দ হয়ে ত্বরিত এই গাছতলায় লুটিয়ে পড়লে বেঁচে যাই।অথচ একরোখা জেদ আমাকে ঠেলে দেয় সামনের দিকে ঘুটঘুটি অন্ধকার, মেঘের বাজখাঁই ধমক এক লহমায় অগ্রাহ্য ক’রে এগোতে থাকি। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎপ্রবাহ আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। বিদ্যুল্লতাকে ধন্যবাদ জানাতে থাকি প্রতিটি পদক্ষেপে।অকস্মাৎ আমার ব্যাকুল দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত অনন্য প্রকৃতি-শোভিত তপোবন। আমার দু’চোখ সঙ্গীতধারায় রূপান্তরিত অপরূপ নক্ষত্রে যেন, কী এক আমন্ত্রণ আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় তপোবনের ভেতর। অভিভূত দেখি একজন অনিন্দ্যসুন্দর তাপস উপবিষ্ট উঁচু, দ্যুতি-ছড়ানো আসনে এবং অদূরে তাঁর মুখোমুখি বেশ নিচু আসনে বসে আছেন ক’জন তাপস। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি তাকিয়ে থাকি সেই স্বর্গীয় দৃশ্যের দিকে।কারা যেন আমাকে সরিয়ে দিতে চাইলো সেখান থেকে। উচ্চাসনে উপবিষ্ট তাপস অঙ্গুলি নির্দেশে আমাকে এগিয়ে আসার সঙ্কেত জানিয়ে দূরের একটি আসন দেখিয়ে দিলন। তাঁর ঔদার্যে হতবাক আমি উজ্জ্বল সাহসে বললাম, ‘এই অধমকে আপনি আপনার পদতলে ঠাঁই দিন গুরুদেব হে বিশ্বকবি।‘ অন্যান্য আসনে উপবিষ্ট স্তম্ভিত কবিবৃন্দ চেয়ে থাকেন আমার দিকে, চকিতে মুছে যায় দৃশ্য। আমি স্বপ্নহারা মেঘে ভাসতে থাকি!   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shopne-amar-mone-holo/
4624
শামসুর রাহমান
কোথাও কেউ নেই
চিন্তামূলক
আকাশে চঞ্চল মেঘের কারুকাজ, বর্ষা সেতারের বাজালো ঝালা আজ। একটি সুর শুধু শুনছি ঘুরে ফিরে- সে সুর বাজে যেন আঁধার চিরে চিরে। বাইরে কিছু আর যায় না জানি দেখা, কোথাও কেউ নেই, ত্রিলোকে আমি একা।বজ্রে কেঁপে উঠি, বিরহ মেলে দল; হৃদয়ে ঝরে জল কেবলি অবিরল। কৌতূহলে হাত বাড়াই ডানে বামে, আঁধারে শূব্যতা, হতাশা বুকে নামে। বাইরে কিছু আর যায় না জানি দেখা, কোথাও কেউ নেই, ত্রিলোকে আমি একা।আমার পৌরুষ অবুঝ পাখি হয়ে আঁধারে মুখ রেখে কাঁদে না লোকালয়ে। তবুও মেঘেদের অকূল হুতাশনে স্মৃতির লোকালয়ে পড়ছে কাকে মনে? বাইরে কিছু আর যায় না জানি দেখা, কোথাও কেউ নেই, ত্রিলোকে আমি একা।আকাশ ঢেকে গেছে নীলাম্বরে আজ, ভাবছো কোন ছলে করবে তুমি সাজ? আপন অঙ্গ তো চেনাই হলো দায়। কী মেঘে বিদ্যুৎ লুকিয়ে ভীরু পায়? কেমন করে বলো নামবে তুমি পথে! পারতে যদি সেই নীলাম্বরী হতে!আমার অঙ্গনে সিক্ত এলোচুলে আঁচলে মুছে মুখ দাঁড়ালে নাকি ভুলে? আমার অঙ্গন আঁধারে হলো বন, নিয়েছি বুক পেতে জলের দংশন! বাইরে কিছু যায় না জানি দেখা, কোথাও কেউ নেই, ত্রিলোকে আমি একা।  (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kothao-keu-nei/
5448
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কনভয়
মানবতাবাদী
হঠাৎ ধূলো উড়িয়ে ছুটে গেল যুদ্ধফেরত এক কনভয়ঃ ক্ষেপে-ওঠা পঙ্গপালের মতো রাজপথ সচকিত ক'রে আগে আগে কামান উঁচিয়ে, পেছনে নিয়ে খাদ্য আর রসদের সম্ভার। ইতিহাসের ছাত্র আমি. জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম ইতিহাসের দিকে। সেখানেও দেখি উন্মত্ত এক কনভয় ছুটে আসছে যুগযুগান্তের রাজপথ বেয়ে। সামনে ধূম-উদ্গীরণরত কামান, পেছনে খাদ্যশস্য আঁকড়ে-ধরা জনতা- কামানের ধোঁয়ার আড়ালে আড়ালে দেখলাম, মানুষ। আর দেখলাম ফসলের প্রতি তাদের পুরুষানুক্রমিক মমতা। অনেক যুগ, অনেক অরণ্য,পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে তারা এগিয়ে আসছে; ঝল্‌সানো কঠোর মুখে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/277
6029
হেলাল হাফিজ
কোমল কংক্রিট
রূপক
জলের আগুনে পুড়ে হয়েছি কমল, কী দিয়ে মুছবে বলো আগুনের জল। ১৫.১১.৮০
https://banglarkobita.com/poem/famous/102
837
জসীম উদ্‌দীন
নক্সী কাঁথার মাঠ - দুই
কাহিনীকাব্য
(দুই)এক কালা দতের কালি যা দ্যা কলম লেখি, আর এক কালা চক্ষের মণি, যা দ্যা দৈনা দেখি,       ---ও কালা, ঘরে রইতে দিলি না আমারে | --- মুর্শিদা গানএই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল, কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল! কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া, তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া | জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু, গা-খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু | বাদল-ধোয়া মেঘে কে গো মাখিয়ে দেছে তেল, বিজলী মেয়ে পিছলে পড়ে ছড়িয়ে আলোর খেল | কচি ধানের তুলতে চারা হয়ত কোনো চাষী, মুখে তাহার ছড়িয়ে গেছে কতকটা তার হাসি |কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি, কালো দতের কালি দিয়েই কেতাব কোরাণ লেখি | জনম কালো, মরণ কালো, কালো ভূবনময় ; চাষীদের ওই কালো ছেলে সব করেছে জয় |সোনায় যে জন সোনা বানায়, কিসের গরব তার' রঙ পেলে ভাই গড়তে পারি রামধণুকের হার | কালোয় যে-জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন, তারি পদ-রজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন | সোনা নহে, পিতল নহে, নহে সোনার মুখ, কালো-বরণ চাষীর ছেলে জুড়ায় যেন বুক | যে কালো তার মাঠেরি ধান, যে কালো তার গাঁও! সেই কালোতে সিনান করি উজল তাহার গাও |আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানী, খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি | জারীর গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে, 'শাল-সুন্দী-বেত' যেন ও, সকল কাজেই লাগে | বুড়োরা কয়, ছেলে নয় ও, পাগাল লোহা যেন, রূপাই যেমন বাপের বেটা, কেউ দেখেছ হেন? যদিও রূপা নয়কো রূপাই, রূপার চেয়ে দামী, এক কালেতে ওরই নামে সব গাঁ হবে নামী |
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-2/
602
গোলাম মোস্তফা
বনভোজন
ছড়া
নুরু, পুশি, আয়েশা, শফি সবাই এসেছে আম বাগিচার তলায় যেন তারা হেসেছে। রাঁধুনিদের শখের রাঁধার পড়ে গেছ ধুম, বোশেখ মাসের এই দুপুরে নাইকো কারো ঘুম। বাপ মা তাদের ঘুমিয়ে আছে এই সুবিধা পেয়ে, বনভোজনে মিলেছে আজ দুষ্টু কটি মেয়ে। বসে গেছে সবাই আজি বিপুল আয়োজনে, ব্যস্ত সবাই আজকে তারা ভোজের নিমন্ত্রণে। কেউবা বসে হলদি বাটে কেউবা রাঁধে ভাত, কেউবা বলে দুত্তুরি ছাই পুড়েই গেল হাত। বিনা আগুন দিয়েই তাদের হচ্ছে যদিও রাঁধা, তবু সবার দুই চোখেতে ধোঁয়া লেগেই কাঁদা। কোর্মা পোলাও কেউবা রাঁধে, কেউবা চাখে নুন, অকারণে বারে বারে হেসেই বা কেউ খুন। রান্না তাদের শেষ হল যেই, গিন্নী হল নুরু, এক লাইনে সবাই বসে করলে খাওয়া শুরু। ধূলোবালির কোর্মা-পোলাও আর সে কাদার পিঠে, মিছিমিছি খেয়া সবাই, বলে- বেজায় মিঠে। এমন সময় হঠাৎ আমি যেই পড়েছি এসে, পালিয়ে গেল দুষ্টুরা সব খিলখিলিয়ে হেসে।নুরু, পুশি, আয়েশা, শফি সবাই এসেছে আম বাগিচার তলায় যেন তারা হেসেছে। রাঁধুনিদের শখের রাঁধার পড়ে গেছ ধুম, বোশেখ মাসের এই দুপুরে নাইকো কারো ঘুম। বাপ মা তাদের ঘুমিয়ে আছে এই সুবিধা পেয়ে, বনভোজনে মিলেছে আজ দুষ্টু কটি মেয়ে। বসে গেছে সবাই আজি বিপুল আয়োজনে, ব্যস্ত সবাই আজকে তারা ভোজের নিমন্ত্রণে। কেউবা বসে হলদি বাটে কেউবা রাঁধে ভাত, কেউবা বলে দুত্তুরি ছাই পুড়েই গেল হাত। বিনা আগুন দিয়েই তাদের হচ্ছে যদিও রাঁধা, তবু সবার দুই চোখেতে ধোঁয়া লেগেই কাঁদা। কোর্মা পোলাও কেউবা রাঁধে, কেউবা চাখে নুন, অকারণে বারে বারে হেসেই বা কেউ খুন। রান্না তাদের শেষ হল যেই, গিন্নী হল নুরু, এক লাইনে সবাই বসে করলে খাওয়া শুরু। ধূলোবালির কোর্মা-পোলাও আর সে কাদার পিঠে, মিছিমিছি খেয়া সবাই, বলে- বেজায় মিঠে। এমন সময় হঠাৎ আমি যেই পড়েছি এসে, পালিয়ে গেল দুষ্টুরা সব খিলখিলিয়ে হেসে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4379.html
2185
মহাদেব সাহা
দয়ার্দ্র আঁচল
প্রেমমূলক
শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় এখানে বাঁচাতে পারি মাথা লজ্জা ভয়ে এখানে লুকাতে পারি মুখ, এই নিবিড় আশ্রয় আর কোনখানে পাবো। সবখানে যকন আমার নামে রটে কুৎসার কালি সবাই নিন্দায় ওঠে মেতে, ছিছি করে, টিটকারি দেয় যখন আমাকে এই অশ্লীল বিদ্রূপ আর শীতল উপেক্ষা করে মর্মাহত, তখনো দাঁড়াই এসে এই আঁচলের স্নিগ্ধ ছায়ায়। যখন দেখতে পাই কোথাও যাবার মতো কোনো স্থান নেই কেউ ফিরে তাকায় না আর, খোলে না দরোজা যখন দুচোখে কেবল আমি অন্ধকার দেখি তখনো কেবল তোমারই আঁচলখানি হয়ে ওঠে দয়ার্দ্র, কোমল। তোমারই আঁচলখানি তখন মুছিয়ে দেয় মুখ সকলের উপেক্ষার ধুলোবালি খুব যত্নে ঝেড়ে মুখে দেয়, আমার রক্তাক্ত বুকে বেঁধে দেয় নরম ব্যাণ্ডেজ তোমার আঁচলখানি সেই গ্রীষ্মে হয়ে ওঠে ছাতা। যখন দেখেছি আমি সবখানে ভয়ানক কাঁটা, কারো কাছে মেলে নাই ঠাঁই, কারো চোখে দেখি নাই সামান্যও করুণার ধারা একবারো কেউ বাড়ায়নি স্নেহমাখা একখানি হাত, তখন আবার আমি রোদে পুড়ে ফিরে আসি তোমারই ছায়ায়। তোমারই আঁচলখানি মুছে দেয় সেই ব্যর্থতায় গ্লানি আর ক্লান্তির ঘাম, হয়ে ওঠে এই রুক্ষ মরুভূমি ঢেকে এক রম্য তৃণাঞ্চল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/370
4819
শামসুর রাহমান
তোমার যাবার আগে
সনেট
সব কিছু ঠিকঠাক, আজই তুমি যাবে দ্বিপ্রহরে বায়ুযানে; আমার অবুঝ মনোকষ্ট, দীর্ঘশ্বাস অথবা চোখের জল ক্ষণে ক্ষণে খুসখুসে কাশ করবে না পথ অবরোধ আর কবিতার ঘরে হবে না এখন হরতাল। দিয়েছি বারণ করে সবাইকে, আমার না-লেখা কবিতারা আজ নীল পাখি হয়ে উড়বে তোমার খুব কাছে। ঝিলমিল করলে কোথাও কিছু ভেবো আমার আনন্দ ঝরে।আজ কবিতার খাতাটিকে সাক্ষী রেখে দিচ্ছি কথা- তোমার যাবার আগে আর পরে মন খারাপের ভেলা ভাসবে না কোনোক্রমে, জেনো কাটাবো সময় গান শুনে ক্যাসেট প্লেয়ারে, আড্ডা দিয়ে। মনোব্যথা মেঘদলে, পাখির ডানায় হবে নীল, তুমি ফের ফিরে এসে দেখবে আমার মুখ কত দীপ্ত হয়।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-jabar-age/
4858
শামসুর রাহমান
দেহতত্ত্ব
চিন্তামূলক
কখনো নিইনি কোনো গুরুর নিকট দীক্ষা, দেহে ভস্ম মেখে বৃক্ষতলে ধূপ ধূনা জ্বেলে জোরেশোরে চিমটা বাজিয়ে লোক জড়ো করিনি কস্মিনকালে। মানবতাবাদী বাউলের তরিকায় নিত্যদিন দেহের বন্দনা করি; গীত রচনায় নিমজ্জিত, দোতারা ছাড়াই ঘুরি এ ভবের হাটে। ক্লান্ত হলে জিরোই দিঘির ঘাটে, মল্লিকার বনে, যাই ছুটে তোমার দেহের তীরে উন্মুখর পিপাসা মেটাতে।মাঝে-মধ্যে দেহমন কেমন বিষাদে ছন্নছাড়, নতঝুঁটি মোরগের মতো চেয়ে থাকি শূন্যতায়; দেহের ক্রন্দন ঘন কুয়াশা ছড়ায়, হয়ে যাই দীর্ঘশ্বাস। হে অতুলনীয়া গৌরী, তোমার দেহের পুশিদা মোকামে যে অপূর্ব পদ্ম আছে, কালেভদ্রে তার ঘ্রাণ নিয়ে দাঁড় বাই কাব্যের গহীন গাঙে।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dehototto/
5204
শামসুর রাহমান
শকুন ও কোকিলের কাহিনী
রূপক
প্রবহমান নদীতীরে একটি নয়নাভিরাম বৃক্ষ নানাজনের হিংসার পাত্র হয়ে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়িয়ে ছিলো। গাছটিতে এক ঝাঁক কোকিল মহানন্দে করতো বাস।ওদের গানের সুরে পার্শ্ববর্তী নদীর ঢেউ উঠতো নেচে প্রায়শই। সহসা একদিন কোত্থেকে ক’টি শকুন উড়ে এসে জুড়ে বসে উৎপাতে উঠলো মেতে। কোকিলেরা ভড়কে যায়।মারমুখো শকুনদের হামলায় সবুজ গাছের নিচে বয়ে যায় রক্তিম স্রোত, অনেক কোকিলের লাশে ছেয়ে যায় ভেজা মাটি। তবে কি বৃক্ষচূড়ায় কায়েম হলো শকুনের কর্তৃত্ব?তিন-চারবার সূর্য আকাশ থেকে উধাও হওয়ার পর কোকিলের ঝাঁক গান গাইতে শুরু করে নতুন প্রেরণায়। ওদের ডানা আর ঠোঁটের ঝাপটায় শকুনেরা জখম-কলঙ্কিত পাখা আর মাথা নিয়ে পড়ি মরি করে পালালো দূরে অন্য কোনওখানে। কোকিলের গানে নাচে প্রফুল্ল নদী।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shokun-o-kokiler-kahini/
1583
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চতুর্দিকে অন্ধকার
মানবতাবাদী
চতুর্দিকে অন্ধকার, তারই মধ্যে এখানে-ওখানে কয়েকটি বাড়িতে আলো জ্বলে, টিভি চলে, হাস্যমুখে ভাষ্যকার বলে– বিদ্যুতের উৎপাদন আজ বিকেলে যথেষ্ঠ ছিল না। যারা শোনে, তারা ভাবে, বটে? যেমন সংবাদপত্রে, তেমনি দেখছি টিভিতেও রটে উল্টাপাল্টা গুজব!–তাদের ফ্রিজের ভিতরে ল্যাংড়া আমি, মাখন, সন্দেশ, ডিম, ব্রয়লার চিকেন টাটকা থেকে যায়। চতুর্দিকে অন্ধকার, তারই মধ্যে একটি-দুটি শৌখিন পাড়ায় আলোর বন্যায় ভাসতে থাকে বাড়িঘর। ঐগুলি কাদের বাড়ি? সম্ভবত ঈশ্বরের তৃতীয় পক্ষের পুত্র ও কন্যার। কে যেন বলতেন, “আগে সম্পদ বাড়াও, তা নইলে দারিদ্র্য ছাড়া আর কিচ্ছুই দেখছি না…ইয়ে… বণ্টন করবার মতো।” তখন বক্তৃতা শুনে হাততালি দিতুম, প্রত্যেকে ভাবতুম, এ-সবই যৎপরোনাস্তি যুক্তিযুক্ত কথা। সত্যিই তো, দেশে সম্পদ যদি না বাড়ে, কী হবে দারিদ্র্য বেঁটে দিয়ে। হিসেবে গরমিল ছিল, সেইটে বুঝে শেষে ইদানীং আমরা কিন্তু তাতেই সম্মত। তেত্রিশ বছর ধরে প্রতীক্ষায় থাকতে-থাকতে হাড়ে দুব্বো গজাবার বেশি বাকি নেই। সেই কারণে বলছি, আপাতত যা বণ্টন করা যায়, তা-ই করুন, এই দারিদ্র্যই বাঁটা হোক, তার সঙ্গে অন্ধকারও হোক। অবস্থা যা দেখছি, তাতে সর্বাঙ্গীণ সেটাই মানাবে। চতুর্দিকে অন্ধকার, তারই মধ্যে ইতস্তত আলো দেখতে-দেখতে ইদানীং একটাই ভাবনা জাগে; মনে হয়, এর চেয়ে বরং সবাই একসঙ্গে অমবস্যার ভিতরে ঢোকা ভাল। একসঙ্গে আনন্দ করা ভাগ্যে যদি না-ই থাকে তো শোক সবাই একসঙ্গে করা যাবে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1606
5156
শামসুর রাহমান
যদিও লোকটা অসুস্থ
প্রেমমূলক
বেশ কিছুদিন হলো, বহুদিন হলো অসুস্থতা চঞ্চুতে রেখেছে বিদ্ধ করে লোকটিকে। এখন সে পড়ে না সংবাদপত্র, কতদিন কবিতার বই সস্নেহে আলতো ছুঁয়ে রেখে দেয়, কখনো হয় না পড়া, মাঝে মাঝে খুব কষ্ট ক’রে একটি কি দু’টি কবিতা অথবা ‘ছিন্ন পত্রাবলী’ থেকে এক আধ পাতা চেখে নেয়, রোগাক্রান্ত ক্লান্ত চোখ বুঁজে আসে; শোণিতে শর্করা হেতু দুর্বল শরীর, মনে পড়ে- সমানবয়সী বন্ধু কেউ কেউ গত, কেউ কেউ ধুঁকছে অসুখে ইদানীং তারই মতো। সাড়ে তিন বছরের পৌত্রী এসে যখন জড়িয়ে ধরে গলা, কথা বলে শৈশবের স্নিগ্ধ স্বরে, অসুস্থ লোকটা কেমন সজীব হয়ে ওঠে, মৃত্যুচিন্তা অস্তাচলে যায়। উৎসুক অথচ ক্ষীণ দৃষ্টি মেলে তাকায় শিশুর দিকে, যে সম্পদ কিংবা বিষাদ বোঝে না, ফুটে থাকে কনকচাঁপার মতো। এই বয়সেও এ বিবর্ণ কালেও যে তাকে ভালোবাসে, যখন সে চলে আসে কোনো সন্ধেবেলা, তাকে দেখলেই চিত্তময় রঙিন ফোয়ারা উচ্ছুসিত হয়, তার কণ্ঠস্বর একবার শুনলেই আরো বহুকাল বাঁচবার সাধ জাগে, তার গভীর মনোজ শুশ্রূষায় জীবনের বহু ক্ষত সেরে যায়, অন্ধকার ফুঁড়ে বৃত্ত-চাঁদ ওঠে রুগ্ন মনের দিগন্তে, লোকটার মনে হয়, বিপন্নতা জীবনকে করে উপরূপ।   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jodio-lokta-osustho/
3766
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যত বড়ো হোক ইন্দ্ৰধনু সে
রূপক
যত বড়ো হোক ইন্দ্ৰধনু সে সুদূর-আকাশে-আঁকা, অামি ভালোবাসি, মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/joto-boro-hok-indrodhonu-she/
3943
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাত ভাই চম্পা
ছড়া
সাতটি চাঁপা সাতটি গাছে, সাতটি চাঁপা ভাই— রাঙা - বসন পারুলদিদি, তুলনা তার নাই। সাতটি সোনা চাঁপার মধ্যে সাতটি সোনা মুখ, পারুলদিদির কচি মুখটি করতেছে টুক্‌টুক্‌। ঘুমটি ভাঙে পাখির ডাকে, রাতটি যে পোহালো— ভোরের বেলা চাঁপায় পড়ে চাঁপার মতো আলো। শিশির দিয়ে মুখটি মেজে মুখখানি বের করে কী দেখছে সাত ভায়েতে সারা সকাল ধ'রে। দেখছে চেয়ে ফুলের বনে গোলাপ ফোটে - ফোটে, পাতায় পাতায় রোদ পড়েছে, চিক্‌চিকিয়ে ওঠে। দোলা দিয়ে বাতাস পালায় দুষ্টু ছেলের মতো, লতায় পাতায় হেলাদোলা কোলাকুলি কত। গাছটি কাঁপে নদীর ধারে ছায়াটি কাঁপে জলে— ফুলগুলি সব কেঁদে পড়ে শিউলি গাছের তলে। ফুলের থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখতেছে ভাই বোন— দুখিণী এক মায়ের তরে আকুল হল মন। সারাটা দিন কেঁপে কেঁপে পাতার ঝুরুঝুরু, মনের সুখে বনের যেন বুকের দুরুদুরু। কেবল শুনি কুলুকুলু একি ঢেউয়ের খেলা। বনের মধ্যে ডাকে ঘুঘু সারা দুপুরবেলা। মৌমাছি সে গুনগুনিয়ে খুঁজে বেড়ায় কাকে, ঘাসের মধ্যে ঝিঁ ঝিঁ করে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে। ফুলের পাতায় মাথা রেখে শুনতেছে ভাই বোন— মায়ের কথা মনে পড়ে, আকুল করে মন। মেঘের পানে চেয়ে দেখে— মেঘ চলেছে ভেসে, রাজহাঁসেরা উড়ে উড়ে চলেছে কোন্‌ দেশে। প্রজাপতির বাড়ি কোথায় জানে না তো কেউ, সমস্ত দিন কোথায় চলে লক্ষ হাজার ঢেউ। দুপুর বেলা থেকে থেকে উদাস হল বায়, শুকনো পাতা খ'সে প'ড়ে কোথায় উড়ে যায়! ফুলের মাঝে দুই গালে হাত দেখতেছে ভাই বোন— মায়ের কথা পড়ছে মনে, কাঁদছে পরান মন। সন্ধে হলে জোনাই জ্বলে পাতায় পাতায়, অশথ গাছে দুটি তারা গাছের মাথায়। বাতাস বওয়া বন্ধ হল, স্তব্ধ পাখির ডাক, থেকে থেকে করছে কা - কা দুটো - একটা কাক। পশ্চিমেতে ঝিকিমিকি, পুবে আঁধার করে— সাতটি ভায়ে গুটিসুটি চাঁপা ফুলের ঘরে। ‘গল্প বলো পারুলদিদি' সাতটি চাঁপা ডাকে, পারুলদিদির গল্প শুনে মনে পড়ে মাকে। প্রহর বাজে, রাত হয়েছে, ঝাঁ ঝাঁ করে বন— ফুলের মাঝে ঘুমিয়ে প'ল আটটি ভাই বোন। সাতটি তারা চেয়ে আছে সাতটি চাঁপার বাগে, চাঁদের আলো সাতটি ভায়ের মুখের পরে লাগে। ফুলের গন্ধ ঘিরে আছে সাতটি ভায়ের তনু— কোমন শয্যা কে পেতেছে সাতটি ফুলের রেণু। ফুলের মধ্যে সাত ভায়েতে স্বপ্ন দেখে মাকে— সকাল বেলা ‘জাগো জাগো' পারুলদিদি ডাকে। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sat-vai-chompa/
1071
জীবনানন্দ দাশ
নাবিকী
চিন্তামূলক
হেমন্ত ফু্রায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে ; এ-রকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে সময়ের কুয়াশায় ; মাঠের ফসলগুলো বার বার ঘরে তোলা হ’তে গিয়ে তবু সমুদ্রের পারের বন্দরে পরিচ্ছন্নভাবে চলে গেছে। মৃত্তিকার ওই দিক আকাশের মুখোমুখি যেমন সাদা মেঘের প্রতিভা ; এই দিকে ঋণ, রক্ত, লোকসান, ইতর, খাতক ; কিছু নেই তবু – তবুও অপেক্ষাতুর ; হৃদয়স্পন্দন আছে – তাই অহরহ বিপদের দিকে অগ্রসর ; পাতালের মত দেশ পিছে ফেলে রেখে নরকের মত শহরে কিছু চায় ; কী যে চায়। যেন কেঊ দেখেছিল খণ্ডাকাশ যতবার পরিপূর্ণ নীলিমা হয়েছে, যতবার রাত্রির আকাশ ঘিরে স্মরনীয় নক্ষত্র এসেছে, আর তাহাদের মতো নরনারী যতবার তেমন জীবন চেয়েছিলো, যত নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে গেছে রৌদ্রের আকাশে, নদীর ও নগরীর মানুষের প্রতিশ্রুতির পথে যত নিরুপম সূর্যলোক জ্ব’লে গেছে – তার ঋণ শোধ ক’রে দিতে গিয়ে এই অনন্ত রৌদ্রের অন্ধকার। মানবের অভিজ্ঞতা এ-রকম। অভিজ্ঞতা বেশি ভাল হ’লে তবু ভয় পেতে হ’তো ? মৃত্যু তবে ব্যসনের মতো মনে হ’তো ? এখন ব্যসন কিছু নেই। সকলেই আজ এই বিকেলের পরে এক তিমির রাত্রির সমুদ্রের যাত্রীর মতন ভালো-ভালো নাবিক ও জাহাজের দিগন্তর খুঁজে পৃথিবীর ভিন্ন-ভিন্ন নেশনের নিঃসহায় প্রতিভূর মতো পরস্পরকে বলে, ‘হে নাবিক, হে নাবিক তুমি - সমুদ্র এমন সাধু, নীল হ’য়ে – তবুও মহান মরুভূমি ; আমরাও কেউ নেই -‘ তাহাদের শ্রেণী যোনি ঋণ রক্ত রিরংসা ও ফাঁকি উঁচু – নিচু নর নারী নিক্তিনিরপেক্ষ হ’য়ে আজ মানবের সমাজের মতন একাকী নিবিড় নাবিক হ’লে ভাল হয় ; হে নাবিক, হে নাবিক, জীবন অপরিমেয় নাকি!
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/nabiki/
1776
পূর্ণেন্দু পত্রী
আশ্চর্য
প্রেমমূলক
একটি নারীর মাঝে অকস্মাৎ খুঁজে পায় কেউ আশ্চর্যের নীলিমাকে। দৃশ্যহীন ঘন অন্ধকারে নক্ষত্ররাজিরা গেছে আকাশে সোনালী শিল্প রুয়ে তার স্নিগ্ধ সুষমার মোহাচ্ছন্ন ঘ্রাণ নিতে নিতে ঘুমের মতন জাগে। ঘুমোতে দেয় না স্তব্ধতারে। একে একে আবরণ পূজার ফুলের মতো ঝরে। তারপর সেই দুটি অপরুপ লজ্জার ভঙ্গিমা একে অপরের বন্য বাসনাকে বাহু দিয়ে বেঁধে একে অপরের মুখে নিজের দেহের অন্ন দিয়ে যে শয্যা স্রোতের মতো তাতেই নিদ্রিত থাকে শুয়ে। একটি নারীর মাঝে অকস্মাৎ খুঁজে পায় কেউ ক্ষণিকের নীলিমাকে। কঠিন প্রভাত খর রোদে রজনীর খেলাধুলা দ্রুতহাতে যত দেয় ধুয়ে, আবার পুষ্পিত হয়ে ওঠে তবু পৃথিবীর রাত।
https://banglarkobita.com/poem/famous/333
5829
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বনর্মমর
প্রেমমূলক
সেই পথ দিয়ে ফিরে যাওয়া পড়ে আছে মিহিন কাচের মতো জ্যোৎস্না শুকনো পাতার শব্দ এমন নিঃসঙ্গ সেইসব পাতা ভেঙে ভেঙে ভেঙে ভেঙে ভেঙে চলে যেতে যেতে যেতে যেতে যেতে বাতাসের স্পর্শ যেন কার যেন কার যেন কার যেন কার? মনেও পড়ে না ঠিক যেন কার অঙ্গুলি এই মুখে, রুক্ষ মুখে, আমার চিবুকে, এই কর্কম চিবুকে ঠোঁটে, ঠোঁটের ওপরে, এবং ঠোঁটের নিচে চোখের দু’পাশে যে কালো দাগ সেখানেও যেন কার, যেন কার কোমল অঙ্গুলি? কপালে হিঙ্গুল টিপ, নীলরঙা হাসি পেছনে তাকাই আর দেখা যায় না জ্যোৎস্না নেই, বোবা কালা অন্ধকার শুকনো পাতার শব্দ… সেই পথ দিয়ে ফিরে যাওয়া, ফিরে যেতে যেতে যেতে!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1841
1284
জীবনানন্দ দাশ
১৩৩৩
প্রেমমূলক
তোমার শরীর ,- তাই নিয়ে এসেছিলে একবার;- তারপর,- মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন দিকে জানিনি তা,- হয়েছে মলিন চক্ষু এই;- ছিঁড়ে গেছি- ফেড়ে গেছি ,- পৃথিবীর পথ হেঁটে হেঁটে কত দিন রাত্রি গেছে কেটে ! কত দেহ এল,- গেল, - হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিয়েছি ফিরায়ে সব;- সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে নক্ষত্রের তলে ব’সে আছি,- সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে নিয়া তুমি কি আসিবে কাছে প্রিয়া ! তোমার শরীর,- তাই নিয়ে এসেছিলে একবার;- তারপর,- মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন দিকে,-ফ’লে গেছে কতবার, ঝ’রে গেছে তৃণ ! আমারে চাও না তুমি আজ আর,- জানি ; তোমার শরীর ছানি মিটায় পিপাসা কে সে আজ ! – তোমার রক্তের ভালোবাসা দিয়েছ কাহারে ! কে বা সেই !- আমি এই সমুদ্রের পারে ব’সে আছি একা আজ ,- ঐ দূর নক্ষত্রের কাছে আজ আর প্রশ্ন নাই ,- মাঝরাতে ঘুম লেগে আছে চক্ষে তার ,- এলোমেলো রয়েছে আকাশ ! উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খলা !- তারি তলে পৃথিবীর ঘাস ফ’লে ওঠে ,- পৃথিবীর তৃণ ঝ’রে পড়ে ,- পৃথিবীর রাত্রি আর দিন কেটে যায় ! উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খলা,- তারি তলে হায় ! জানি আমি – আমি যাব চ’লে তোমার অনেক আগে; তারপর ,- সমুদ্র গাহিবে গান বহুদিন,- আকাশে আকাশে যাবে জ্ব’লে নক্ষত্র অনেক রাত আরো নক্ষত্র অনেক রাত আরো !- ( যদিও তোমারো রাত্রি আর দিন শেষ হবে একদিন কবে ! ) আমি চ’লে যাব,- তবু,- সমুদ্রের ভাষা রয়ে যাবে,- তোমার পিপাসা ফুরাবে না,- পৃথিবীর ধুলো – মাটি – তৃণ রহিবে তোমার তরে , রাত্রি আর দিন রয়ে যাবে ;- রয়ে যাবে তোমার শরীর , আর এই পৃথিবীর মানুষের ভিড় । আমারে খুঁজিয়াছিলে তুমি একদিন,- কখন হারায়ে যাই – এই ভয়ে নয়ন মলিন করেছিলে তুমি !- জানি আমি;- তবু ,এই পৃথিবীর ফসলের ভূমি আকাশের তারার মতন ফলিয়া ওঠে না রোজ ; দেহ ঝরে , ঝ’রে যায় মন তার আগে ! এই বর্তমান ,- তার দু’পায়ের দাগে মুছে যায় পৃথিবীর’পর একদিন হয়েছে যা – তার রেখা ,- ধূলার অক্ষর ! আমারে হারায়ে আজ চোখ ম্লান করিবে না তুমি,- জানি আমি ;- পৃথিবীর ফসলের ভূমি আকাশের তারার মতন ফলিয়া ওঠে না রোজ ;- দেহ ঝরে ,তার আগে আমাদের ঝ’রে যায় মন! আমার পায়ের তলে ঝ’রে যায় তৃণ ,- তার আগে এই রাত্রি দিন পড়িতেছে ঝ’রে! এই রাত্রি,- এই দিন রেখেছিলে ভ’রে তোমার পায়ের শব্দে ,- শুনেছি তা আমি ! কখন গিয়েছে তবু থামি সেই শব্দ !- গেছ তুমি চ’লে সেই দিন-সেই রাত্রি ফুরায়েছে ব’লে! আমার পায়ের তলে ঝরে নাই তৃণ ,- তবু সেই রাত্রি আর দিন প’ড়ে গেল ঝ’রে!- সেই রাত্রি- সেই দিন- তোমার পায়ের শব্দে রেখেছিলে ভ’রে ! জানি আমি, খুঁজিবে না আজিকে আমারে তুমি আর ;- নক্ষত্রের পারে যদি আমি চ’লে যাই, পৃথিবীর ধুলো মাটি কাঁকরে হারাই যদি আমি ,- আমারে খুঁজিতে তবু আসিবে না আজ; তোমার পায়ের শব্দ গেল কবে থামি আমার এ নক্ষত্রের তলে ।- জানি তবু- নদীর জলের মতো পা তোমার চলে;- তোমার শরীর আজ ঝরে রাত্রির ঢেউয়ের মতো কোনো এক ঢেউয়ের উপরে ! যদি আজ পৃথিবীর ধুলো মাটি কাঁকরে হারাই যদি আমি চলে যাই নক্ষত্রের পারে,- জানি আমি, তুমি আর আসিবে না খুঁজিতে আমারে ! তুমি যদি রহিতে দাঁড়ায়ে !- নক্ষত্র সরিয়া যায়,- তবু যদি তোমার দুপায়ে হারায়ে ফেলিতে পথ-চলার পিপাসা !- একবার ভালোবেসে – যদি ভালোবাসিতে চাহিতে তুমি সেই ভালবাসা! আমার এখানে এসে যেতে যদি থামি !- কিন্তু তুমি চ’লে গেছ, তবু কেন আমি রয়েছি দাঁড়ায়ে ! নক্ষত্র সরিয়া যায়,-তবু কেন আমার এ পায়ে হারায়ে ফেলেছি পথ-চলার পিপাসা ! একবার ভালোবেসে কেন আমি ভালোবাসি সেই ভালোবাসা ! চলিতে চাহিয়াছিলে তুমি একদিন আমার এ-পথে ,- কারণ , তখন তুমি ছিলে বন্ধুহীন । জানি আমি,- আমার নিকটে তুমি এসেছিলে তাই । তারপর,- কখন খুঁজিয়া পেলে কারে তুমি !- তাই আস নাই আমার এখানে তুমি আর! একদিন কত কথা বলেছিলে ,- তবু বলিবার সেইদিনো ছিল না তো কিছু ;- তবু সেদিন আমার এ পথে তুমি এসেছিলে ,- বলেছিলে যত কথা,- কারণ , তখন তুমি ছিলে বন্ধুহীন ; আমার নিকটে তুমি এসেছিলে তাই ; তারপর-  কখন খুঁজিয়া পেলে কারে তুমি,- তাই আস নাই! তোমার দু’চোখ দিয়ে একদিন কতবার চেয়েছ আমারে । আলো –অন্ধকারে তোমার পায়ের শব্দ কতবার শুনিয়াছি আমি ! নিকটে – নিকটে আমি ছিলাম তোমার তবু সেইদিন,- আজ রাত্রে আসিয়াছি নামি এই দূর সমুদ্রের জলে! যে-নক্ষত্র দেখ নাই কোনোদিন , দাঁড়ায়েছি আজ তার তলে ! সারাদিন হাঁটিয়াছি আমি পায়ে পায়ে বালকের মতো এক,- তারপর,- গিয়েছি হারায়ে সমুদ্রের জলে , নক্ষত্রের তলে ! রাত্রে,- অন্দজকারে ! -তোমার পায়ের শব্দ শুনিব না তবু আজ,- জানি আমি,- আজ তবু আসিবে না খুঁজিতে আমারে ! তোমার শরীর ,- তাই নিয়ে এসেছিলে একবার;- তারপর,- মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন দিকে জানিনি তা,- হয়েছে মলিন চক্ষু এই;- ছিঁড়ে গেছি- ফেড়ে গেছি ,- পৃথিবীর পথ হেঁটে হেঁটে কত দিন রাত্রি গেছে কেটে ! কত দেহ এল,- গেল, - হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিয়েছি ফিরায়ে সব;- সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে নক্ষত্রের তলে ব’সে আছি,- সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে নিয়া তুমি কি আসিবে কাছে প্রিয়া !
https://banglarkobita.com/poem/famous/882
5042
শামসুর রাহমান
বৃষ্টি
প্রেমমূলক
একটি স্বপ্নের মাঝখানে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়; দৃষ্টি মেলে দেখি তখনও শেষ রাতের হাত আকাশের কোমড়ে জড়ানো। বাইরে বৃষ্টির মৃদু শব্দ, আমার মনে নামে বিষণ্নতার নিস্তব্ধ কুয়াশা।স্বপ্নে তোমাকেই দেখছিলাম। আমরা, তুমি আর আমি, একটি ফুটফুটে জ্যোৎস্নাপ্রতিম বালিকার জন্যে সাজাচ্ছিলাম ঘর, কোত্থেকে হিংসুটে এক ঝড় বুনো ষাঁড়ের মতো তছনছ ক’রে দিলো সব, আমরা একপাল শূয়োরের পায়ের তলায় ভীষণ জব্দ। একটি মালা আমাদের দু’জনের হাতে জড়িয়ে যাচ্ছিল মমতায়; কাঁচের মতো স্বপ্ন গেল ভেঙে।হাত মুখ ধুয়ে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় একজন চীনা কবির কবিতা পড়ার চেষ্টা করি; বার বার দেয়ালে, বাইরে ঝাপসা ঘরবাড়ি আর গাছপালায় দৃষ্টি যায়। মনের বিষণ্নতা অধিকতর ঘন হয় এবং তখনও তোমার অশ্রু-ফোঁটার মতো বৃষ্টি ঝরছে টিপ টিপ টিপ টিপ টিপ টিপ…   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bristi/
4425
শামসুর রাহমান
ঈদকার্ড, ১৯৭৭
প্রেমমূলক
হঠাৎ হারিয়ে ফেলি যদি দৃষ্টিশক্তি কোনোদিন, তবুও তোমাকে আমি দেখবো সর্বদা সবখানে। যদি পক্ষাঘাতে হই হীনবল, চলৎশক্তিহীন, তথাপি নিশ্চিত আমি ছুটে যাবো তোমারই বাগানে, যেখানে থাকবে বসে তুমি সবুজ মেঘের মতো ঘাসে কিংবা ডাল থেকে অন্যমনে তুলে নেবে ফুল। যদি কোনো দ্রুত ধাবমান যান কিংবা দৃষ্ট ক্ষত কেড়ে নেয় আমার দু’হাত, তবু তোমাকে ব্যাকুল বাঁধবো নিবিড় আলিঙ্গনে। যদি ওষ্ঠ মুছে যায় নিষ্ঠুর ফুৎকারে কারো, তবু গাঢ় করবো চুম্বন তোমার মদির তাপময় অস্তিত্বের কিনারায় বারংবার, যদি স্তদ্ধ হয়ে যায় এই হৃৎস্পন্দন আমার, তবুও শিরাপুঞ্জে প্রতি রক্তকণিকায় তোমাকে ধারণ করে একা পড়ে থাকবো শয্যায়।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/eidkard-1977/
5764
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
চতুরের ভূমিকা
প্রেমমূলক
কিছু উপমার ফুল নিতে হবে নিরুপমা দেবী যদিও নামের মধ্যে বেখেছেন আসল উপমা ক্ষণিক প্রশ্রয়-তুষ্টি চায় আজ সামান্য এ কবি, রবীন্দ্রনাথেরও আপনি চপলতা করেছেন ক্ষমা। যদিও প্রত্যহ আসে অগণিত সুঠাম যুবক নানা উপহার আনে সময় সাগর থেকে তুলে আমি তো আনি নি কিছু চম্পা কিংবা কুর্চি কুরুবক সাজাতে চেয়েছি শুধু স্পর্শহীন উপমার ফুলে। আকাশে অনেক সজ্জা, তবু স্থির আকাশের নীল সামান্য এ সত্যটুকু, শোনাতে চেয়েছি আপনাকে শব্দ আর অলঙ্কারে খুঁজে খুঁজে জীবনের মিল দেখিছি সমস্ত সাধ অন্য এক বুকে সুপ্ত থাকে। আশা করি এতক্ষণে এঁকেছি আমার পটভূমি। যদি অনুমতি হয় আজ থেকে শুরু হোক, তুমি।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/147
1837
পূর্ণেন্দু পত্রী
দৈববাণী
চিন্তামূলক
বৃক্ষ হবো চারপাশে আলোকিত জলের বাঁক জলের গভীরে নারীর সাজবদলের মতো দৃশ্য দৃশ্যের গভীরে সুগম্ভীর ঘন্টাধ্বনি মাতৃজঠর থেকে আমরা শুনে আসছি এই সব দৈববাণী। ব্রাক্ষ্ম মুহুর্তের রাঙা আবীরের মতো আমাদের ভ্রমণ হবে ভূ-পৃষ্ঠময় ঋষিকুমারের মতো আমরা খচিত হবো দুর্লভ প্রবালে নানা রকমের লাল দেয়ালে কালো অক্ষরে নানা রকমের কালো দেয়ালে লাল অক্ষরে নানা রকমের গাঢ় এবং ফিকে পতাকার মিছিলে, দুন্দুভিতে মাতৃজঠর থেকে শুনে আসছি দৈববাণী। আহলাদে লাফিয়ে উঠেছে দুশো বছরের পুরনো কার্পেটের ধুলো উন্মাদ নেচে উঠেছে বাঁশবাগান, ঘুটের দেয়াল ভাঙা তক্তাপোষের পেরেক। গম্বুজ থেকে গম্বুজে, রেলব্রীজ থেকে সাঁকোয় এবং ফ্লাইওভারে রেডিও থেকে টিভিতে, ট্রাকটরে, ইঞ্জিনে গরুর গাড়ির কান্নায় ভিটামিনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এইসব দৈববানী। বৃক্ষের কালো চিমনিগুলো এখন উগরে চলেছে শোকবার্তা বৃক্ষকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে জলের উদ্দাম গীটার জলের ভিতরের দৃশ্যবলীতে ঢুকে পড়েছে জন্ডিসের হাত। দেখতে দেখতে যাদের বয়স ছিল আঠারো, এখন আটচল্লিশ, পঞ্চদশীরা প্রৌঢ়া, চামড়া ফেটে বল্কল, চোখে ছানি, হাঁটুতে ঘুণ। উড়ন্ত পাখিরা হাওয়ার ভিতরে হিমের ফোঁটার মতো মুমূর্ষ! আর ক্রমশ সূর্যাসে-র দিকে হেলে পড়ছে মহীয়ান সব ভাস্কর্য বেঁকে যাচ্ছে পিতৃপুরুষের আজানুলম্বিত খিলান ক্রমশ শঙ্খধ্বনির চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ঠিকানাহীন শিয়াল-কুকুরের ডাক। সমস্ত দৈববানীর গায়ে পিত্তি, পরগাছা এবং পোকামাকড়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1214
5374
শ্যামল চন্দ্র দাস
এক সাথে সব বাংলা অক্ষর ও যুক্তাক্ষর অনুশীলন
নীতিমূলক
The quick brown fox jumps over the lazy dog এ যেমন ইংরেজি সব অক্ষর আছে তেমনি নিচের পংতি গুলোতে বাংলা সব অক্ষর ও যুক্তাক্ষর আছে। যারা বাংলা দ্রুত টাইপ করতে চান পংতি গুলো তাদের অনুশীলনে সাহায্য করবে।হৃদয়ের চঞ্চলতা বন্ধে ব্রতী হলে জীবন পরিপূর্ণ হবে নানা রঙের ফুলে। কুঞ্ঝটিকা প্রভঞ্জন শঙ্কার কারণ লণ্ডভণ্ড করে যায় ধরার অঙ্গন। ক্ষিপ্ত হলে সাঙ্গ হবে বিজ্ঞজনে বলে শান্ত হলে এ ব্রহ্মাণ্ডে বাঞ্ছিতফল মেলে। আষাঢ়ে ঈশান কোনে হঠাৎ ঝড় উঠে গগন মেঘেতে ঢাকে বৃষ্টি নামে মাঠে ঊষার আকাশে নামে সন্ধ্যার ছায়া ঐ দেখো থেমে গেছে পারাপারে খেয়া। শরৎ ঋতুতে চাঁদ আলোয় অংশুমান সুখ দুঃখ পাশা পাশি সহ অবস্থান। যে জলেতে ঈশ্বর তৃষ্ণা মেটায় সেই জলেতে জীবকুলে বিনাশ ঘটায়। রোগ যদি দেহ ছেড়ে মনে গিয়ে ধরে ঔষধের সাধ্য কি বা তারে সুস্থ করে ?
https://banglapoems.wordpress.com/2013/09/29/%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b2-%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%82%e0%a6%a4%e0%a6%bf/
1020
জীবনানন্দ দাশ
চলছি উধাও
প্রেমমূলক
চলছি উধাও, বল্গাহারা,- ঝড়ের বেগে ছুটি ! শিকল কে সে বাঁধছে পায়ে! কোন্‌ সে ডাকাত ধরছে চেপে টুটি! -আঁধার আলোর সাগর-শেষে প্রেতের মতো আসছে ভেসে! আমার দেহের ছায়ার মতো, জড়িয়ে আছে মনের সনে, যেদিন আমি জেগেছিলাম, -সে-ও জেগেছে আমার মনে! আমার মনের অন্ধকারে ত্রিশূলমূলে,-দেউলদ্বারে কাটিয়েছে সে দুরন্ত কাল ব্যর্থ- পূজার পুষ্প ঢেলে! স্বপন তাহার সফল হবে আমায় পেলে, -আমায় পেলে! রাত্রি-দিবার জোয়ার স্রোতে নোঙর-ছেঁড়া হৃদয় হ’তে জেগেছে সে হালের নাবিক,- চোখের ধাঁধায়,- ঝড়ের ঝাঁঝে,- মনের মাঝে,- মানের মাঝে ! আমার চুমোর অন্বেষণে প্রিয়ার মতো আমার মনে অঙ্কহারা কাল ঘুরেছে কাতর দুটি নয়ন তুলে, চোখের পাতা ভিজিয়ে তাহার আমার অশ্রু-পাথার-কূলে! ভিজে মাঠের অন্ধকারে কেঁদেছে মোর সাথে হাতটি রেখে হাতে! দেখিনি তার মুখখানি তো,- পাইনি তারে টের, জানিনি হায় আমার বুকে আশেক,-অসীমের জেগে আছে জনম-ভোরের সূতিকাগার থেকে! কত নতুন শরাবশালায় নাবনু একে একে! সরাইখানার দিলপিয়ালায় মাতি কাটিয়ে দিলাম কত খুশির রাতি! জীবন-বীণার তারে তারে আগুন-ছড়ি টানি গুলজারিয়া এল গেল কত গানের রানি,- নাশপাতি-গাল গালে রাখি কানে কানে করলে কানাকানি শরাব-নেশায় রাঙিয়ে দিল আঁখি! -ফুলের ফাগে বেহুঁশ হলি নাকি! হঠাৎ কখন স্বপন-ফানুস কোথায় গেল উড়ে! -জীবন মরু- মরীচিকার পিছে ঘুরে ঘুরে ঘায়েল হ’য়ে ফিরল আমার বুকের ক্যারাভেন,- আকাশ-চরা শ্যেন! মরু-ঝড়ের হাহাকারে মৃগতৃষার লাগি প্রাণ যে তাহার রইল তবু জাগি ইবলিসেরি সঙ্গে তাহার লড়াই হ’ল শুরু! দরাজ বুকে দিল্‌ যে উড়ু- উড়ু ! -ধূসর ধূ ধূ দিগন্তরে হারিয়ে- যাওয়া নার্গিসেরি শোভা থরে থরে উঠল ফুটে রঙিন-মনোলোভা! অলীক আশার,-দূর-দুরশার দুয়ার ভাঙার তরে যৌবন মোর উঠল নেচে রক্তমুঠি,-ঝড়ের ঝুঁটির’ পরে! পিছে ফেলে টিকে থাকার ফাটক- কারাগারে, ভেঙে শিকল,- ধ্বসিয়ে ফাঁড়ির দ্বার চলল সে যে ছুটে! শৃঙ্খল কে বাধল তাহার পায়ে,- চুলের ঝুঁটি ধরল কে তার মুঠে! বর্শা আমার উঠল ক্ষেপে খুনে, হুমকি আমার উঠল বুকে রুখে! দুশমন কে পথের সুমুখে। -কোথায় কে বা! এ কোন মায়া! মোহ এমন কার! বুকে আমার বাঘের মতো গর্জাল হুঙ্কার! মনের মাঝের পিছুডাকা উঠল বুঝি হেঁকে,- সে কোন সুদূর তারার আলোরে থেকে মাথার পরের খাঁ খাঁ মেঘের পাথারপুরী ছেড়ে নেমে এল রাত্রিদিবার যাত্রা-পথে কে রে! কী তৃষা তার!... কী নিবেদন!... মাগছে কিসের ভিখ্‌!... উদ্যত পথিক হঠাৎ কেন যাচ্ছে থেমে,- আজকে হঠাৎ থামতে কেন হয়! -এই বিজয়ী কার কাছে আজ মাগছে পরাজয়! পথ- আলেয়ার খেয়ায় ধোঁয়ায় ধ্রুবতারার মতন কাহার আঁখি আজকে নিল ডাকি হালভাঙা এই ভুতের জাহাজটারে! মড়ার খুলি,-পাহাড়-প্রমাণ হাড়ে বুকে তাহার জ’মে গেছে কত শ্মশান-বোঝা! আক্রোশে হা ছুটছিল সে একরোখা,- এক সোজা চুম্বকেরি ধ্বংসগিরির পানে, নোঙর-হারা মাস্তুলেরি টানে! প্রেতের দলে ঘুরেছিল প্রেমের আসন পাতি,- জানে কি সে বুকের মাঝে আছে তাহার সাথী! জানে কি সে ভোরের আকাশ,- লক্ষ তারার আলো তাহার মনের দূয়ার-পথেই নিরিখ হারালো! জানেনি সে তোহার ঠোঁটের একটি চুমোর তরে কোন্‌ দিওয়ানার সারেং কাঁদে নয়নে নীর ঝরে! কপোত-ব্যথা ফাটে রে- কার অপার গগন ভেদি! তাহার বুকের সীমার মাঝেই কাঁদছে কয়েদি কোন্‌ সে অসীম আসি! লক্ষ সাকীর প্রিয় তাহার বুকের পাশাপাশি প্রেমের খবর পুছে কবের থেকে কাঁদতে আছে,- ‘পেয়ালা দে রে মুঝে!’
https://banglarkobita.com/poem/famous/899
971
জীবনানন্দ দাশ
একদিন যদি আমি
সনেট
একদিন যদি আমি কোনো দূর বিদেশের সমুদ্রের জলে ফেনার মতন ভাসি শীত রাতে — আসি নাকো তোমাদের মাঝে ফিরে আর — লিচুর পাতার ‘পরে বহুদিন সাঁঝে যেই পথে আসা-যাওয়া করিয়াছি, — একদিন নক্ষত্রের তলে কয়েকটা নাটাফল তুলে নিয়ে আনারসী শাড়ির আচঁলে ফিঙার মতন তুমি লঘু চোখে চলে যাও জীবনের কাজে, এই শুধু… বেজির পায়ের শব্দ পাতার উপড়ে যদি বাজে সারারাত… ডানার অস্পষ্ট ছায়া বাদুড়ের ক্লান্ত হয়ে চলেযদি সে পাতার ‘পরে, — শেষ রাতে পৃথিবীর অন্ধকারে শীতে তোমার ক্ষীরের মতো মৃদু দেহ — ধূসর চিবুক, বাম হাত চালতা গাছের পাশে খোড়ো ঘরে স্নিগ্ধ হয়ে ঘুমায় নিভৃতে, তবুও তোমার ঘুম ভেঙে যাবে একদিন চুপে অকস্মাৎ তুমি যে কড়ির মালা দিয়েছিলে — সে হার ফিরাযে দিয়ে দিতে যখন কে এক ছায়া এসেছিল… দরজায় করেনি আঘাত।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ekdin-jodi-aami/
1327
তসলিমা নাসরিন
ছিলে
প্রেমমূলক
একটু আগে তুমি ছিলে, ভীষণরকম ছিলে, নদীটার মত ছিলে, নদীটা তো আছে, পুকুরটা আছে, খালটা আছে। এই শহরটার মত, ওই গ্রামটার মত ছিলে। ঘাসগুলোর মত, গাছগুলোর মত। ছিলে তুমি, হাসছিলে, কথা বলছিলে, ধরা যাক কাঁদছিলেই, কিন্তু কাঁদছিলে তো, কিছু একটা তো করছিলে, যা কিছুই করো না কেন, ছিলে তো! ছিলে তো তুমি, একটু আগেই ছিলে। কিছু ঘটলো না কোথাও, কিছু হলো না, হঠাৎ যদি এখন বলো যে তুমি নেই! কেউ এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলে যে তুমি নেই, বসে আছি, লিখছি বা কিছু, রান্নাঘরে লবঙ্গ আছে কি না খুঁজছি, আর অমনি শুনতে হল তুমি নেই। তুমি নেই, কোথাও নেই, তুমি নাকি একেবারে নেইই, তোমাকে নাকি চাইলেই আর কোনওদিন দেখতে পাবো না! আর কোনওদিন নাকি কথা বলবে না, হাসবে না, কাঁদবে না, খাবে না, দাবে না, ঘুমোবে না, জাগবে না, কিছুই নাকি আর করবে না! যত ইচ্ছে বলে যাও যে তুমি নেই, যত ইচ্ছে যে যার খুশি বলুক, কোনও আপত্তি নেই আমার, কেন থাকবে, আমার কী! তোমাদের বলা না বলায় কী যায় আসে আমার! আমার শুধু একটাই অনুরোধ, করজোড়ে একটা অনুরোধই করি, আমাকে শুধু বিশ্বাস করতে বোলো না যে তুমি নেই।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1972
4733
শামসুর রাহমান
জীবনের নানা বাঁকে
চিন্তামূলক
সন্ধ্যাবেলা হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যে পৌঁছে যাই, বুঝতে পারি না। আচমকা অচেনা একটি পাখি এই পথচারী আমাকে আলতো ছুঁয়ে উড়ে চলে গেলো না জানি কোথায় আর নিজেরই অজ্ঞাতে কেঁপে উঠে, মুহূর্তে শুকিয়ে যায় তালু, পদযুগল গেঁথে যায় মৃত্তিকায়।তবু আমি মাটি থেকে কোনওমতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফের সামনের দিকে হেঁটে যেতে শুরু করি। পুরনো দিনের কোনও গীত গাইবার চেষ্টা করি আর আকাশের মেঘের আড়ালে পূর্ণিমার চাঁদ আবিষ্কারে খুব মনোযোগী হই।ঘর ছেড়ে দূরে, বহু দূরে ঘুরে ঘুরে অতিশয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি এখন। যাত্রাকালে মনে হয়েছিলো হীরা, মোতি পেয়ে যাবো ডানে বামে, নক্ষত্রের সুকোমল ঝড় জানাবে অভিবাদন কবিকে এবং আমি শক্রদের উপহাস, বক্রোক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে হাসিমুখে বসবো কীর্তির সিংহাসনে। না, আমি কখনও এমনকি ভুলক্রমেও কখনও আত্মগরিমায় ডুবে থাকবো না। যারা আমার স্খলন, ক্রটি দিয়েছেন দেখিয়ে সর্বদা, হাসিমুখে সর্বদা মাথায় পেতে নেবো জীবনের নানা বাঁকে।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jiboner-nana-bake/
476
কাজী নজরুল ইসলাম
যুগের আলো
রূপক
নিদ্রা-দেবীর মিনার-চুড়ে মুয়াজ্জিনের শুনছি আরাব, – পান করে নে প্রাণ-পেয়ালায় যুগের আলোর রৌদ্র-শারাব! উষায় যারা চমকে গেল তরুণ রবির রক্ত-রাগে, যুগের আলো! তাদের বলো, প্রথম উদয় এমনি লাগে! সাতরঙা ওই ইন্দ্রধনুর লাল রংটাই দেখল যারা, তাদের গাঁয়ে মেঘ নামায়ে ভুল করেছে বর্ষা-ধারা। যুগের আলোর রাঙা উদয়, ফাগুন-ফুলের আগুন-শিখা, সীমন্তে লাল সিঁদুর পরে আসছে হেসে জয়ন্তিকা!   (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/juger-alo/
2811
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই সে পরম মূল্য
ভক্তিমূলক
এই সে পরম মূল্য আমার পুজার— না পূজা করিলে তবু শাস্তি নাই তার।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ei-she-porom-mulyo/
4542
শামসুর রাহমান
কবি (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
সনেট
শহরে হৈ হল্লা দৈনন্দিন, যানবাহনের ঢল পথে পথে, দিকে দিকে ফুৎকার, চিৎকার, চলে স্মার্ট নাটক শিল্পিত স্টেজে, হোটেলে স্বপ্নিল কনসার্ট; মেলায় নাগরদোলা, ডুগডুগি, বানরের দল। হঠাৎ এলেন ভিনদেশী মল্লবীর, দৃপ্তবল; সমস্ত শহর ঘোরে তার পায়ে পায়ে সারাক্ষণ, পুষ্পবৃষ্টি চতুর্দিকে; মন্ত্রমুগ্ধ জনসাধারণ। নতুন সার্কাস পার্টি ফেলে তাঁবু, নগর চঞ্চল।বস্তুত চৌদিকে লাফালাফি, লোফালুফি, ক্ষিপ্র কেনাবেচা; ম্যাজিক ম্যাজিক বলে কেউ পোড়া ঘাসে বেজায় লুটিয়ে পড়ে, কারো কণ্ঠে ফানুস ফানুস ধ্বনি বাজে। চলেছেন একজন একলা মানুষ সবার অলক্ষ্যে জনাকীর্ণ পথে আস্তে সুস্থে দীপ্র শব্দের গুঞ্জনে পূর্ণ যেন বা হাঁটেন পরবাসে।  (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobi-matal-hritwik/
1652
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বৃদ্ধের স্বভাবে
চিন্তামূলক
“এককালে আমিও খুব মাংস খেতে পারতুম, জানো হে; দাঁত ছিল, মাংসে তাই আনন্দ পেতুম। তোমার ঠানদিদি রোজ কব্জি-ডোবা বাটিতে, জানো হে, না না, শুধু মাংস নয়, মাংস মাছ ইত্যাদি আমায় (রান্নাঘর নিরামিষ, তাই রান্নাঘরের দাওয়ায়) সাজিয়ে দিতেন। আমি চেটেপুটে নিত্যই খেতুম। সে-সব দিনকাল ছিল আলাদা, জানো হে, হজমের শক্তি ছিল, রাত্তিরে সুন্দর হত ঘুম।” মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি, রোগা ঢ্যাঙা বৃদ্ধ এক তার পাতের উপরে দিব্য জমিয়েছে মাংসের পাহাড়। যদিও খাচ্ছে না। শুধু মাংসল স্মৃতির তীব্র মোহে ক্রমাগত বলে যাচ্ছে–‘জানো হে, জানো হে’!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1692
5632
সুকুমার রায়
নাচের বাতিক
হাস্যরসাত্মক
বয়স হল অষ্টআশি, চিমসে গায়ে ঠুন্‌কো হাড়, নাচছে বুড়ো উল্টোমাথায়- ভাঙলে বুঝি মুন্ডু ঘাড়! হেঁইয়ো ব'লে হাত পা ছেড়ে পড়ছে তেড়ে চিৎপটাং, উঠছে আবার ঝট্পটিয়ে এক্কেবারে পিঠ সটান্। বুঝিয়ে বলি, 'বৃদ্ধ তুমি এই বয়েসে কর্‌ছ কি? খাও না খানিক মশলা গুলে হুঁকোর জল আর হরতকী। ঠান্ডা হবে মাথায় আগুন, শান্ত হবে ছটফ্‌টি-' বৃদ্ধ বলে, 'থাম্ না বাপু সব তাতে তোর পট্‌পটি! ঢের খেয়েছি মশ্‌লা পাঁচন, ঢের মেখেছি চর্বি তেল, তুই ভেবেছিস আমায় এখন চাল্ মেরে তুই করবি ফেল?' এই না ব'লে ডাইনে বাঁয়ে লম্ফ দিয়ে হুশ ক'রে হঠাৎ খেয়ে উল্টোবাজি ফেললে আমায় 'পুশ' করে। 'নাচলে অমন উল্টো রকম, আবার বলি বুঝিয়ে তায়, রক্তগুলো হুড়হুড়িয়ে মগজ পানে উজিয়ে যায়।' বললে বুড়ো, 'কিন্তু বাবা, আসল কথা সহজ এই- ঢের দেখেছি পরখ্ করে কোথাও আমার মগজ নেই। তাইতে আমরা হয় না কিছু- মাথায় যে সব ফক্কিফাঁক- যতটা নাচি উল্টো নাচন, যতই না খাই চর্কিপাক।বলতে গেলাম 'তাও কি হয়'- অম্নি হঠাৎ ঠ্যাং নেড়ে আবার বুড়ো হুড়মুড়িয়ে ফেললে আমায় ল্যাং মেরে। ভাবছি সবে মারব ঘুঁষি এবার বুড়োর রগ্ ঘেঁষে, বললে বুড়ো 'করব কি বল্ ? করায় এ সব অভ্যেসে। ছিলাম যখন রেল-দারোগা চড়্‌তে হত ট্রেইনেতে চলতে গিয়ে ট্রেনগুলো সব পড়ত প্রায়ই ড্রেইনেতে। তুব্‌ড়ে যেত রেলের গাড়ি লাগত গুঁতো চাক্কাতে, ছিটকে যেতাম যখন তখন হঠাৎ এক এক ধাক্কাতে। নিত্যি ঘুমাই এক চোখে তাই, নড়লে গাড়ি- অম্নি 'বাপ্- এম্-নি ক'রে ডিগ্‌বাজিতে এক্কেবারে শুন্য লাফ। তাইতে হল নাচের নেশা, হঠাৎ হঠাৎ নাচন পায়, বসতে শুতে আপ্‌নি ভুলে ডিগ্‌বাজি খাই আচম‌্কায়! নাচতে গিয়ে দৈবে যদি ঠ্যাং লাগে তোর পাজরাতে, তাই বলে কি চটতে হবে? কিম্বা রাগে গজ্‌রাতে?' আমিও বলি, 'ঘাট হয়েছে তোমার খুরে দন্ডবৎ! লাফাও তুমি যেমন খুশি, আমরা দেখি অন্য পথ।'
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/nacher-batik/
5222
শামসুর রাহমান
শিকি জ্যোৎস্নার আলো
মানবতাবাদী
নখ দিয়ে কুটি কুটি পারি না ছিঁড়তে আকাশের ছড়ানো ত্রিপল কিংবা সাধ্য নেই পাহাড়ের চূড়া নিমেষে গুঁড়িয়ে দিই, পোড়াই কোরিয়া হাসিমুখে, ফোটাই সাধের ফুল ইচ্ছেমতো গোলাপ বাগানে আর এক চুমুকে সমুদ্রের সব জল শুষে নিই নিপুণ খেলার ছলে, পরাক্রান্ত সিমুমের ঝুঁটি মুঠোর ভেতর ধরি, ঝরাই শ্রাবণ সাহারায়, আম গাছে কালো জাম ফলাই চতুর কোনো শ্রমে, সার্কাসের বিনীত পশুর মতো উঠবে বসবে চন্দ্র-সূর্য তর্জনীর ইশারায় সাধ্যাতীত সবি।অকুণ্ঠ কবুল করি শিখিনি এমন মন্ত্র যার বলে আমার বাঁশির সুরে শহরের সমস্ত ইঁদুর, রাঙা টুকটুকে সব ছেলেমেয়ে হবে অনুগামী, কৃতকর্মে অনুতপ্ত পৌরসভা চাইবে মার্জনী। যে রুটিতে বুভুক্ষার শুক্‌নো ছায়া পড়ে প্রতিদিন, হতে পারি অংশীদার তার সন্ধ্যার নিঃসঙ্গ কোণে; যে অঞ্জলি পেতে চায় তৃষ্ণার পানীয়, কয়েকটি বিন্দু তারও শুষে নিতে পারি শিকি জ্যোৎস্নার আলোয় আত্মার ঊষর জিভে…অথবা যেমন খুশি পারি আঁকতে স্বর্গের নকশা। বিশ্বভ্রাতৃত্বের বোল জানি জীবনে বাজানো চলে, যেমন গভীর তানপুরা গুণীর সহজ স্পর্শে মিড়ে মিড়ে অর্থময়, পারি ঈশ্বরকে চমকে দিতে হৃদয়ের ধ্রুপদী আলাপে।   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shiki-jotsnar-alo/
2529
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
হারিয়ে এসেছি কবে শৈশবের সেই খেলাঘর
প্রেমমূলক
হারিয়ে এসেছি কবে শৈশবের সেই খেলাঘর খেলা খেলা সাজ-গোজ, বউ আমি আর তুমি বর নকল কবুল বলা, মিছে বর – মিছে বধুবেশ তবুও কী সুখী-সুখী ভাব নিয়ে খেলা হতো শেষ ।।হাজার বাহানা করে পালাতাম আমি খেলা ফেলে তুমি ছাড়া বরাসনে কোনো ভাবে আর কেউ এলে তখন তুমিও তাতে মনে মনে খুশী হতে বেশ ।।ধনীর দুলালী আমি, তুমি না-কি অতি সাধারণ কিশোরী দিনেই তাই পুড়ে গেলো বিরহে এ-মন ।সেদিন পারোনি তুমি সামাজিক বাধা ভেঙে দিতে কেন আজো কাঁদি আমি, পারোনি তো তার খোঁজ নিতে সোনার খাঁচাটি ফেলে আমি খুঁজি হারানো আবেশ !!০৫/ ০১/ ২০১৯
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/hariye-eshechhi-kobe-shoishober-shei-khelaghor/
3772
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যদি ইচ্ছা কর তবে কটাক্ষে হে নারী
সনেট
যদি ইচ্ছা কর তবে কটাক্ষে হে নারী, কবির বিচিত্র গান নিতে পার কাড়ি আপন চরণপ্রান্তে; তুমি মুগ্ধচিতে মগ্ন আছ আপনার গৃহের সংগীতে। স্তবে তব নাহি কান, তাই স্তব করি, তাই আমি ভক্ত তব, অনিন্দ্যসুন্দরী। ভুবন তোমারে পূজে, জেনেও জান না; ভক্তদাসীসম তুমি কর আরাধনা খ্যাতিহীন প্রিয়জনে। রাজমহিমারে যে করপরশে তব পার’ করিবারে দ্বিগুণ মহিমান্বিত, সে সুন্দর করে ধূলি ঝাঁট দাও তুমি আপনার ঘরে। সেই তো মহিমা তব, সেই তো গরিমা– সকল মাধুর্য চেয়ে তারি মধুরিমা।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jodi-iccha-koro-tobe-kotakkhe-he-nari/
5389
শ্রীজাত
রংমশাল
প্রেমমূলক
অনেকদিনের উপােসী ঠোঁট না-হয় তাকে না আটকালে বরং তােমার জমিয়ে রাখা আগুন দিও রংমশালে…এক ডাকে সক্কলে চেনে। লুঙ্গি থেকে চম্পাহাটি সে কেন রােজ তােমার কোলে খুঁজতে আসে শীতলপাটি?তুমিও তেমন, ঠান্ডা ভীষণ রােদে দেওয়াই হয়নি তােমায় উনিশ হল। তফাত বােঝাে, রংমশালে, দেওয়াল বােমায়?আজ দেওয়ালি। পাড়ায় টুনি।। চরকি হাউই তুবড়ি দারুণ! হঠাৎ যদি সামনে আসে, আবার বলবে, “রাস্তা ছাড়ুন?রাস্তা দিতেই চাইছে তাে সে ঝাকড়া চুলে সলতে পাকাও কাছে এলেই বারুদসীমা যাচ্ছে না আর দূরে থাকাও।ওর ভেতরে বারুদ ভর্তি। রঙিন, যখন অন্যে জালে। ওদের কিন্তু তিন পুরুষের ব্যবসা আছে রংমশালের।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b0%e0%a6%82%e0%a6%ae%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4/
3738
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল
নীতিমূলক
আগা বলে, আমি বড়ো, তুমি ছোটো লোক। গোড়া হেসে বলে, ভাই, ভালো তাই হোক। তুমি উচ্চে আছ ব’লে গর্বে আছ ভোর, তোমারে করেছি উচ্চ এই গর্ব মোর।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mul/
1374
তসলিমা নাসরিন
শেষ পর্যন্ত
চিন্তামূলক
না, কলকাতা শেষপর্যন্ত তুমিও আমার কোনও সমাধান নও তুমিও আমার প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর নও। বিশ্বাস কী, তুমিও যে কোনও মুহূর্তে হয়ে উঠতে পারো যে কোনও শহরের মত লম্পট, কপট। যে কোনও মুহূর্তে বেছে নিতে পারো হার্দিক চারদিক ছেড়ে অমানবিক পারমাণবিক দিক। বিশ্বাস কী, মঞ্চে মঞ্চে তোমার ওই নাটক হয়ত নাটকই কৃচ্ছসাধনের দিকে ভালো করে তাকালেই দেখব কৃত্রিমতা, ফাঁকি। বিশ্বাসী কী! তোমার কাছে বাঁচতে এলে তুমিও যদি উষ্ণতা হারিয়ে ফেলো, মুখ ফিরিয়ে আর সব শহরের মত নিষ্ঠুরতা দেখাও! ভালোবাসো বলো, বলো ভালোবাসো, আসলে বাসো না! তোমার সুন্দরগুলোর পিছন-দরজায় উঁকি দিয়ে যেদিন দেখে ফেলবো কুৎসিতের ডাঁই! যদি জেনে ফেলি মুখে যাই বলো না কেন, আসলে তুমি তাকেই দিচ্ছ যার আছে, আর যার নেই তাকে ঠকিয়েই যাচ্ছে! প্রতিদিন! যদি দেখি তলে তলে তুমিও সন্ত্রাসে ব্যস্ত, মনে মনে একটা খুনী তুমি! যদি মন ওঠে! মন যদি ওঠে! তোমার থেকে মন ওঠা মানে ব্রম্মাণ্ড থেকে ওঠা, তুমি নেই মানে কিছু নেই, শেষ খড়কুটোটুকু নেই। তুমি তো স্বপ্ন, তুমি স্বপ্ন, তুমি স্বপ্ন হয়েই থাকো আমি পৃথিবীর পথে তোমাকে নিয়ে হেঁটে বেড়াবো, এক শহর থেকে আরেক শহরে, কোনও শহরই যে আপন নয় আমি জানবো, আমি জানবো দূরে কোথাও একটি শহর আছে, কলকাতা নাম, দূরে কোথাও একটি শহর আছে, আমার শহর, জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল শহর, অনিন্দ্য সুন্দর শহর, একটি শহর আছে, কলকাতা নাম একটি শহর আছে আমার শহর, আমার ভালোবাসার শহর। শেষ পর্যন্ত আমি জানি তুমি আমার কোনও সুখ নও, ওম শান্তি নও। তবু স্বপ্ন আছে, প্রাণে স্বপ্ন আছে, স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বুঝি বাঁচে? স্বপ্ন আছে থাক, কলকাতা দূরে থাক।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1966
740
জয় গোস্বামী
শিরচ্ছেদ, এখানে, বিষয়
মানবতাবাদী
শিরচ্ছেদ, এখানে, বিষয়। মাটি তাই নরম, কোপানো। সমস্ত প্রমাণ শুষছে ভয় কখনো বোলো না কাউকে কী জানো, বা, কতদূর জানো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1763
4657
শামসুর রাহমান
খোঁপায় সাজায় লাল ফুল
চিন্তামূলক
বসন্ত, এখন আমি যুবা নই আর, উচ্ছ্বাস আমাকে মানায় না, এখন যুবক যুবতীরা সহজেই তোমার শোভায় মেতে ওঠে দিগ্ধিদিক।যখন গাছের ডালে জ্বলজ্বলে পুষ্পরাজি দেখা দেয়, আর সুরে সুরে তারুণ্যের বিজয় ঘোষিত হয়, পরিবেশ যেন রবীন্দ্রনাথের গীতসুধা হয়ে যায় লহমায়।জীবনে বঞ্চনা আছে, আছে অত্যাচার, অবিচার, প্রতারণা, তবু যখন হাওয়ায় দুলে ওঠে গাছের সবুজ পাতা, রঙিন ফুলের শোভা হৃদয়ের গভীরে বেহেস্তি আলো আনে।ঘরে ঘরে, হে বসন্ত, তোমার উদ্দেশে গীতিমালা, কবিতা এখন নিবেদিত, নৃত্যশিল্পী বিচিত্র মুদ্রায় তুলে ধরে ক্ষণে ক্ষণে তোমাকেই। ওগো ঋতুরাজ ঘরে ঘরে তোমারই বন্দনা আজ।সচ্ছল ঘরেই শুধু এখন নন্দিত নও তুমি, চেয়ে দ্যাখো তোমার রঙিন চোখ মেলে, শহরের ঘিঞ্জি এক মহল্লার দীন ঘরে একজন কুট্রি যুবা সঙ্গিনীর খোঁপায় সাজায় লাল ফুল।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khopai-sajay-lal-ful/
3535
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বহু কোটি যুগ পরে
ছড়া
বহু কোটি যুগ পরে সহসা বাণীর বরে জলচর প্রাণীদের কণ্ঠটা পাওয়া যেই সাগর জাগর হল কতমতো আওয়াজেই। তিমি ওঠে গাঁ গাঁ করে; চিঁ চিঁ করে চিংড়ি; ইলিস বেহাগ ভাঁজে যেন মধু নিংড়ি; শাঁখগুলো বাজে, বহে দক্ষিণে হাওয়া যেই; গান গেয়ে শুশুকেরা লাগে কুচ-কাওয়াজেই।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bohu-koti-jug-pore/
868
জসীম উদ্‌দীন
বিদায়
কাহিনীকাব্য
কিছুদিন বাদে আদিল কহিল, “গান ত হইল শেষ, সোনার বরণী সকিনা আমার চল আজ নিজ দেশ। তোমার জীবনে আমার জীবনে দুখের কাহিনী যত, শাখায় লতায় বিস্তার লভি এখন হয়েছে গত। চল, ফিরে যাই আপনার ঘরে শূন্য শয্যা তথা, শুষ্ক ফুলেরা ছাড়িছে নিশ্বাস স্মরিয়া তোমার কথা।” শুনিয়া সকিনা ফ্যাল ফ্যাল করি চাহিল স্বামীর পাানে, সে যেন আরেক দেশের মানুষ বোঝে না ইহার মানে। আদিল কহিল“সেথায় তোমার হলুদের পাটাখানি, সে শুভ দিনের রঙ মেখে গায় ডাকিছে তোমারে রাণী, উদাস বাতাস প্রবেশ করিয়া শূূনো কলসীর বুকে, তোমার জন্যে কাঁদিছে কন্যে শত বিরহের দুখে। মাটির চুলা যে দুরন্ত বায়ে উড়ায়ে ভস্মরাশ, ফাটলে ফাটরে চৌচির হয়ে ছাড়িছে বিরহ শ্বাস। কন্যা-সাজানী সীমলতা সেথা রোপেছিলে নিজ হাতে। রৌদ্রে-দাহনে মলিন আজিকে কেবা জল দিবে তাতে। চল, ফিরে যাই আপনার ঘরে, সেথায় সুখের মায়া। পাখির কুজনে ঝুমিছে সদাই গাছের শীতল ছায়া। ক্ষণেক নীরব রহিয়া সকিনা শুধাল স্বামীরে তার, “কোথা সেই ঘর আশ্রয়-ছায়া মিলিবে জীবনে আর ? অভাগিনী আমি প্রতি তিলে তিলে নিজেরে করিয়া দান, কত না দুঃখের দাহনে কিরনু সে ঘরের সন্ধান। সে ঘর আমার জনমের মত পুড়িয়া হয়েছে ছাই, আমার সমুখে শুষ্ক মরু যে ছাড়ে আগুনের হাই।” আদিল কহিল, “সে মরুতে আজি বহিছে মেঘের ধারা, তুমি সেথা চল নকসা করিয়া রচিবে তৃণের চারা। সেথা অনাগত শিশু কাকলীর ফুটিবে মধুর বোল, নাচিবে দখিন বসন্ত বায় দোলায়ে সুখের দোল।” “মিথ্যা লইয়া কতকাল পতি প্রবোধিব আপনায় ?” ম্লান হাসি হেসে শুধায় সকিনা, “দুঃখের দাহনায় অনেক সহিয়া শিখেছি বন্ধু, মিছার বেসাতি করি, ভবের নদীতে ফিরিছে কতই ভাগ্যবানের তরী। সেথায় আমার হলনাক ঠাঁই, দুঃখ নাহি যে তায়, সান্ত্বনা রবে, অসত্য লয়ে ঠকাইনি আপনায়। কোন ঘরে মোরে নিয়ে যাবে পতি?যেথায় সমাজনীতি, প্রতি তিলে তিলে শাসনে পিষিয়া মরিছে জীবন নিতি। না ফুটিতে যেথা প্রেমের কুসুম মরিছে নিদাঘ দাহে, না ফুটিতে কথা অধরে শুকায় বিভেদের কাঁটা রাহে। সাদ্দাদ সেথা নকল ভেস্ত গড়িয়া মোহের জালে, দম্ভে ফিরেছে টানিছে ছিঁড়িছে আজিকার এই কালে। সে দেশের মোহ হইতে যে আজি মুক্ত হয়েছি আমি, স্বার্থক যেন লাগিছে যে দুখ সয়েছি জীবনে, স্বামী। কোন ঘরে তুমি নিয়ে যাবে পতি, কুলটার দুর্নাম, যেথায় জ্বলিছে শত শিখা মেলি অফুরান অবিরাম। যেথায় আমার অপাপ-বিদ্ধ শিশু সন্তান তরে, দিনে দিনে শুধু রচে অপমান নানান কাহিনী করে। যেথায় থাপড়ে নিবিছে নিমেষে বাসরের শুভ বাতি. মিলন মালিকা শুকায় যেখানে শেষ না হইতে রাতি। যেথায় মিথ্যা সম্মান অর খ্যাতি আর কুলমান, প্রেম-ভালবাসা স্নেহ-মায়া পরে হানিছে বিষের বাণ। সেথায় আমার ঘর কোথা পতি ? মোরে ছায়া দিতে হায়, নাই হেন ঠাঁই রীতি নীতি ঘেরা তোমাদের দুনিয়ায়। এ জীবনে আমি ঘরই চেয়েছিনু সে ঘরের মোহ দিয়ে, কেউ নিল হাসি, কেউ নিল দেহ কেউ গেল মন নিয়ে। ঘর ত কেহই দিল না আমারে, মিথ্যা ছলনাজাল, পাতিয়া জীবনে নিজেরে ভুলায়ে রাখি আর কতকাল।” আদিল কহিল, “আমিও জীবনে অনেক দুঃখ সয়ে, নতুন অর্থ খুঁজিয়া পেয়েছি তোমার কাহিনী লয়ে। আর কোন খ্যাতি, কোন গৌরব, কোন যশ কুলমান, আমাদের মাঝে আনিতে নারিবে এতটুকু ব্যবধান। বিরহ দাহনে যশ কুলমান পোড়ায় করেছি ছাই, তোমার জীবন স্বর্ণ হইয়া উজলিছে সেথা তাই। চল ঘরে যাই, নতুন করিয়া গড়িব সমাজনীতি, আমাদের ভালবাসী দিয়ে সেথা রচিব নতুন প্রীতি, সে ঘর বন্ধু, এখনো রচিত হয় নাই কোনখানে, সে প্রীতি ফুটিবে আমারি মতন কোটি কোটি প্রাণদানে। তুমি ফিরে যাও আপনার ঘরে, রহিও প্রতীক্ষায়. হয়ত জীবনে আবার মিলন হইবে তোমা-আমায়।’ “কারে সাথে করে ফিরে যাব ঘরে ? শূন্য বাতাস তথা, ফুঁদিয়ে এ বুকে আগুন জ্বালাবে ইন্ধনি মোর ব্যথা।” “একা কেন যাবে ?”সকিনা যে কহে, “এই যে তোমার ছেলে, এরে সাথে করে লইও সেথায় নতুন জীবন মেলে। দিনে দিনে তারে ভুলে যেতে দিও জনম দুখিনী মায়, শিখাইও তারে, মরিয়াছে মাতা জীবনের ঝোড়ো বায়। কহিও, দারুণ বনের বাঘে যে খায়নি তাহারে ধরে, মনের বাঘের দংশনে সে যে মরিয়াছে পথে পড়ে। এতদিন পতি, তোমার আশায় ছিনু আমি পথ চেয়ে, আঁচলের ধন সঁপিলাম পায় আজিকে তোমারে পেয়ে। কতেকদিন সে কাঁদিবে হয়ত অভাগী মায়ের তবে, সে কাঁদব তুমি সহ্য করিও আর এক শুভ স্মরে। মোর জীবনের বিগত কাহিনী মোর সাথে সাথে ধায়, তাহারা আঘাত হানিবে না সেই অপাপ জীনটায়। বড় আদরের মোর তোতামণি তারে যাও সাথে নিয়ে, আমারি মতন পালিও তাহারে বুকের আদর দিয়ে।” এই কথা বলি অভাগী সকিনা ছেলেরে স্বামীর হাতে, সঁপিয়া যে দিতে নয়নের জল লুকাইল নিরালাতে। তোতামণি কয়, “মাগো, মা আমার লক্ষী আমার মা, তোমারে ছাড়িয়া কোথাও যে মোর পরাণ টিকিবে না। কোন বনবাসে আমারে মা তুমি আজিকে সঁপিয়া দিয়া, কি করিয়া তুমি জীবন কাটাবে একেলা পরাণ নিয়া।” “বাছারে! সে সব শুধাসনে মোরে, এটুকু জানিস সার, ছেলের শুভের লাগিয়া সহিতে বহু দুখ হয় মার। রজনী প্রভাতে মা বোল বলিয়া আর না জুড়াবি বুক, শতেক দুখের দাহন জুড়াতে হেরিব না চাঁদ মুখ। তবু বাছা তোরে ছাড়িতে হইবে, জনম দুখিনী মার, সাধ্য হল না বক্ষে রাখিতে আপন ছেলেরে তার।” ছেলেরে আঁচলে জড়ায়ে সকিনা কাঁদিল অনেকক্ষণ, তারপর কোন দৃঢতায় যেন বাঁধিয়া লইল মন। উসাদ কন্ঠে কহিল স্বামীকে, “ফিরে যাও, নিজ ঘরে, মোদের মিলন বাহিরে হল না রহিল হৃদয় ভরে। আমার লাগিয়া উদাসী হইয়া ফিরিয়াছ গাঁয় গাঁয়, এই সান্ত্বনা রহিল আমার সমুখ জীবনটায়। যাহার লাগিয়া এমন করিয়া অমন পরাণ করে, আজি জানিলাম, তাহারো পরাণ আমারো লাগিয়া ঝরে। এ সুখ আমার দুখ-জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, সারাটি জনম তপস্যা করি শোধ নাহি হবে তার। এই স্মরণের শক্তি আমারে চালাবে সমুখ পানে, যে অজানা সুর মোহ বিস্তারি নিশিদিন মোর টানে।” “প্রাণের সকিনা ?” আদিল শুধায়, “সে তব জীবনটায়, আমার তরেতে এতটুকু ঠাই নাহি কোন তরুছায় ?” “আছে, আছে পতি, “সকিনা যে কহে, “হায়রে যাহারে পাই, তাহারে আবার হারাইতে সখা, বড় যে আরাম তাই। ফুলেরে ডাকিয়া পুছিনু সেদিন, “ফুল ! তুমি বল কার ? ফুলে কহে, যারে কিছু না দিলাম আমি যে সবটা তার। শুধালাম পুন; বল বল ফুল ! সব তুমি দিলে যারে, সেকি আজ হাসে বরণে সুবাসে তোমার দানের ভাবে ? “সে আমার কাছে কিছু পায় নাই। ফুল কহে ম্লান হাসি, ‘পদ্মের বনে ফিরিছে সারসী কুড়ায়ে শামুক রাশি। পুছিলাম পুন ফুল !তুমি বল কোথায় সবতি তব ? ফুল কহে, যারে কিছু দেই নাই সেথা মোর চিরভব। এ জীবনে মোর এই অভিশাপ যারে কিছু দিতে যাই, কর্পুর সম উবে যায় তাহা, হাতে না লইতে তাই। যে আমারে চাহে যতটা করিয়া আমি হই তত তার, ইচ্ছা করিয়া আমি যে জীবনে কিছু নারি হতে কার। যে আমারে পায় তাহার নিশীথে চির অনিদ্রা জাগে, ফুলশয্যা যে কন্টকক্ষত তাহার জীবনে লাগে। সাপের মাথায় চরণ রাখিয়া চলে সে আঁধার রাতে, দুখের মুকুট মাথায় পরিয়া বিষের ভান্ড হাতে। নিকটে করিয়া যে আমারে চাহে আমি তার বহুদূর, দূরের বাঁশীতে বেজে ওঠে নিতি প্রীতি মিলনের সুর। ফুলের কাহিনী স্মরিযা পতি গো, অনেক শিখেছি আজ, স্বেচ্ছায় তাই হাসিয়া নিলাম বিরহ মেঘের বাজ। নিকটে তোমারে পেতে চেয়েছিনু, সাধ হল না তাই, দূরের বাঁশীরে দূরে রেখে দেখি বুকে তারে যদি পাই। গলে না লইতে শুকাল মালিকা, মিলন রাতের মোহে, চিরশূণ্যতা ভরেছি এ বুকে দোঁহে আকড়িয়া দোঁহে। আজ তাই পতি, বড় আশা করে তোমারে পাঠাই দূরে, সেই শূন্যতা ভরে যদি ওঠে আমার বুকের সুরে। আদিল কহিল, প্রাণের সকিনা, সারাটি জনম ভরে, দুখের সাগরে সাঁতার কেটেছ কেবলি আমার তরে। আজকে তোমার কোন সাধ হতে তোমারে না দিব বাধা, স্বেচ্ছায় আমি বরিয়া নিলাম এই বিরহের কাঁদা। বিদায়ের কালে বল অভাগিনী, কোথায় বাঁধিবে ঘর, কোন ছায়াতরু শীতলিত সেই সুদূর তেপান্তর? ম্লান হাসি হেসে কহিল সকিনা, আমার মতন হায়, অনেক সহিয়া ঘুমায়েছে সারা জীবনে ঝড়িয়ায়; কবর খুঁড়িয়া বাহির করিয়া তাদের কাহিনী মালা, বক্ষে পরিয়া প্রতি পলে পলে বুঝিব তাদের জ্বালা। যত ভাঙা ঘর শুষ্ক কুসুম, দলিত তৃষিত মন, সেথায় আমার যোগ সাধনের রচিব যে ধানাসন। সেইখানে পতি বরষ বরষ রহিব তপস্যায়, খুঁজিব নতুন কথা যা শুনিলে সব দুখ দূরে যায়। জানি না সে কোন কথা-অমৃত, কোন সে মধুর ভাষা, তবু আজ মোর নিশিদিশি ভরি জাগিতেছে মনে আশা; সে কথার আমি পাব সন্ধান, দুঃখ দাহন মাঝে, হয়ত বেদন-নাশন কখন গোপনে সেখা রোজে। একান্ত মনে বসি ধ্যানাসনে একটি একটি ধরি, মোর ব্যথাগুলি সবার ব্যথার সঙ্গে মিশাল করি; পরতে পরতে খুলিয়া খুলিয়া দিনের পরেতে দিন, খুঁজিয়া দেখিব কোথা আছে সেই কথামৃতের চিন। যদি কোন কোন সন্ধান মেলে, সে মধুর সুর নিয়া, নতুন করিয়া গড়িব আবার আমাদের এ দুনিয়া। সেইদিন পতি ফিরিয়া যাইব আবার তোমার ঘরে, অভাগীরে যদি ভালবাস সখা, থেকো প্রতীক্ষা করে। বিদায়ের আগে ও চরণে শেষ ছালাম জানায়ে যাই, দোয়া করো মোরে, এই সাধনায় সিদ্ধি যেন গো পাই। আর যদি কভু ফিরে নাহি আসি, ব্যথার দাহনানলে, জানিও, অভাগী মরিয়াছে সেথা নিরাশায় জ্বলে জ্বলে। আজি এ জীবন বিষে বিষায়িত, প্রেম, ভালবাসা, মায়া, বেড়িয়া নাচিছে গোর কুজঝট কদাকার প্রেত ছায়া। জ্বলিছে বহ্নি দিকে দিগনে-, তীব্র লেলিহা তার, খোদার আরশ কুরছির পরে মূর্চ্ছিছে বারবার। দিন রজনীর দুইটি ভান্ড পোরা যে তীব্র বিষে, মাটির পেয়ালা পূর্ণ করিয়া উঠেছে গগন দিশে। তারকা-চন্দ্রে জ্বলিছে তাহার তীব্র যে হুতাশন, তারি জ্বালা হতে নিস্তার মোর না হইল কোনক্ষণ। সন্ধ্যা সকাল তারি শিখা লয়ে আকাশের দুই কোলে, মারণ মন্ত্র ফুকারি ফুকারি যুগল চিতা যে জ্বলে। তাই এ জীবন সরায়ে লইনু তোমার জীবন হতে, আমারে ভাসিতে দাও পতি, সেই কালিয়-দহের স্রোতে। *** *** বাপের সঙ্গে চলিয়াছে ছেলে, ফিরে চায় বারে বারে, পারিত সে যদি দুটি চোখ বরি টেনে নিয়ে যেত মারে। পাথরের মত দাঁড়ায়ে সকিনা, স্তব্ধ যে মহাকাল, খুঁজিয়া না পায় অভাগিনী তরে সান্ত্বনা ভাষাজাল। চরণ হইতে চলার চক্র খসিয়া খসিয়া পড়ে, নয়ন হইতে অশ্রুর ধারা নিশির শিশিরে ঝরে। তিনু ফকিরের সারিন্দা বাজে, আয়রে দুষ্কু আয়, পাতাল ফুঁড়িয়া দুনিয়া ঘুরিয়া আকাশের নিরালায়। আয়রে দুস্কু, কবরের ঘরে হাজার বছর ঘুরে, ছিলি অচেতন আজকে আয়রে আমার গানের সুরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/495
2975
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ্যাতি নিন্দা পার হয়ে জীবনের এসেছি প্রদোষে
চিন্তামূলক
খ্যাতি নিন্দা পার হয়ে জীবনের এসেছি প্রদোষে, বিদায়ের ঘাটে আছি বসে। আপনার দেহটারে অসংশয়ে করেছি বিশ্বাস, জরার সুযোগ পেয়ে নিজেরে সে করে পরিহাস, সকল কাজেই দেখি কেবলি ঘটায় বিপর্যয়, আমার কর্তৃত্ব করে ক্ষয়; সেই অপমান হতে বাঁচাতে যাহারা অবিশ্রাম দিতেছে পাহারা, পাশে যারা দাঁড়ায়েছে দিনান্তের শেষ আয়োজনে, নাম না’ই বলিলাম তাহারা রহিল মনে মনে। তাহারা দিয়েছে মোরে সৌভাগ্যের শেষ পরিচয়, ভুলায়ে রাখিছে তারা দুর্বল প্রাণের পরাজয়; এ কথা স্বীকার তারা করে খ্যাতি প্রতিপত্তি যত সুযোগ্য সক্ষমদের তরে; তাহারাই করিছে প্রমাণ অক্ষমের ভাগ্যে আছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সেই দান। সমস্ত জীবন ধরে খ্যাতির খাজনা দিতে হয়, কিছু সে সহে না অপচয়; সব মূল্য ফুরাইলে যে দৈন্য প্রেমের অর্ঘ্য আনে অসীমের স্বাক্ষর সেখানে।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khyati-ninda-par-hoye-jiboner-esechi-prodoshe/
1141
জীবনানন্দ দাশ
ভোর ও ছয়টি বমারঃ ১৯৪২
চিন্তামূলক
কোথাও বাইরে গিয়ে চেয়ে দেখি দু'চারটে পাখি। ঘাসের উপরে রোদে শিশিরে শুকায় নিজেদের ক্ষেতে ধান- চার পাঁচজন লোক মানবের মতন একাকী। মাটিরও তরঙ্গ স্বর্গীয় জ্যামিতির প্রত্যাশায় মিশে গেছে অতীত ও আজকের সমস্ত আকাশে।দিগন্তে কি ধর্মঘট?- চিম্‌নি... পাখির মতন অনায়াসে নীলিমায় ছড়ায়েছে। এখানে নদীর স্থির কাকচক্ষু জলে ঘুরুনো সিঁড়ির মত আকাশ পর্যন্ত মেঘ সব উঠে গেছে।- অনুভব করে প্রকৃতির সাথে মিলিত হতেই, অমিলনের সূর্যরোল জ্যোতির্ময় এলুমিনিয়ম অনুভব ক'রে আমি দুই তিন চার পাঁচ ছয়টি এরোপ্লেন গুনে নীলিমা দেখার ছিলে শতাব্দীর প্রেতাত্মাকে দেখছি অরুণে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/vor-o-choity-bomar-1942/
998
জীবনানন্দ দাশ
কোথাও মঠের কাছে
সনেট
কোথাও মঠের কাছে — যেইখানে ভাঙা মঠ নীল হয়ে আছে শ্যাওলায় — অনেক গভীর ঘাস জমে গেছে বুকের ভিতর, পাশে দীঘি মজে আছে — রূপালী মাছের কন্ঠে কামনার স্বর যেইখানে পটরানী আর তার রূপসী সখীরা শুনিয়াছে বহু বহু দিন আগে — যেইখানে শঙ্খমালা কাঁথা বুনিয়াছে সে কত শতাব্দী আগে মাছরাঙা — ঝিলমিল — কড়ি খেলা ঘর; কোন্‌ যেন কুহকীর ঝাঁড়ফুঁকে ডুবে গেছে সব তারপর একদিন আমি যাব দু-প্রহরে সেই দূর প্রান্তরের কাছে,সেখানে মানুষ কেউ যায় নাকে — দেখা যায় বাঘিনীর ডোরা বেতের বনের ফাঁকে — জারুল গাছের তলে রৌদ্র পোহায় রূপসী মৃগীর মুখ দেখা যায়, — শাদা ভাঁট পুষ্পের তোড়া আলোকতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোণফু বাসকের গায়; তবুও সেখানে আমি নিয়ে যাবো একদিন পাটকিলে ঘোড়া যার রূপ জন্মে — জন্মে কাঁদায়েছে আমি তারে খুঁজিব সেথায়।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kothaow-motther-kasey/
1338
তসলিমা নাসরিন
দুঃখবতী মা
মানবতাবাদী
মা'র দুঃখগুলোর ওপর গোলাপ-জল ছিটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল, যেন দুঃখগুলো সুগন্ধ পেতে পেতে ঘুমিয়ে পড়ে কোথাও ঘুমটি ঘরের বারান্দায়, কুয়োর পাড়ে কিম্বা কড়ইতলায়। সন্ধেবেলায় আলতো করে তুলে বাড়ির ছাদে রেখে এলে দুঃখগুলো দুঃখ ভুলে চাঁদের সঙ্গে খেলত হয়তো বুড়িছোঁয়া খেলা। দুঃখরা মা'কে ছেড়ে কলতলা অব্দি যায়নি কোনওদিন। যেন এরা পরম আত্মীয়, খানিকটা আড়াল হলে বিষম একা পড়ে যাবেন মা; কাদায় পিছলে পড়বেন, বাঘে-ভালুকে খাবে, দুষ্ট জিনেরা গাছের মগডালে বসিয়ে রাখবে মা'কে- দুঃখগুলো মা'র সঙ্গে নিভৃতে কী সব কথা বলত... কে জানে কী সব কথা মা'কে দুঃখের হাতে সঁপে বাড়ির মানুষগুলো অসম্ভব স্বস্তি পেত। দুঃখগুলোকে পিঁড়ি দিত বসতে, লেবুর শরবত দিত, বাটায় পান দিত, দুঃখগুলোর আঙুলের ডগায় চুন লেগে থাকত... ওভাবেই পাতা বিছানায় দুঃখগুলো দুপুরের দিকে গড়িয়ে নিয়ে বিকেলেই আবার আড়মোড়া ভেঙে অজুর পানি চাইত, জায়নামাজও বিছিয়ে দেওয়া হত ঘরের মধ্যিখানে। দুঃখগুলো মা'র কাছ থেকে একসুতো সরেনি কোনওদিন। ইচ্ছে ছিল লোহার সিন্দুকে উই আর তেলাপোকার সঙ্গে তেলোপোকা আর নেপথলিনের সঙ্গে ওদের পুরে রাখি। ইচ্ছে ছিল বেড়াতে নিয়ে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের জলে, কেউ জানবে না, ভাসিয়ে দেব একদিন কচুরিপানার মতো, খড়কুটোর মতো, মরা সাপের মতো ভাসতে ভাসতে দুঃখরা চলে যাবে কুচবিহারের দিকে... ইচ্ছে ছিল দুঃখগুলো মা'র সঙ্গে শেষ অব্দি কবর অব্দি গেছে, তুলে নিয়ে কোথাও পুঁতে রাখব অথবা ছেঁড়া পুঁতির মালার মতো ছুড়ব রেললাইনে, বাঁশঝাড়ে, পচা পুকুরে। হল কই? মা ঘুমিয়ে আছেন, মা'র শিথানের কাছে মা'র দুঃখগুলো আছে, নিশুত রাতেও জেগে আছে একা একা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/410
542
কাজী নজরুল ইসলাম
সুরা নসর
ভক্তিমূলক
(শুরু করিলাম) ল'য়ে নাম আল্লার করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।আসিয়াছে আল্লার শুভ সাহায্য বিজয়! দেখিবে - আল্লার ধর্মে এ জগৎময় যত লোক দলে দলে করিছে প্রবেশ, এবে নিজ পালক সে প্রভুর অশেষ প্রচার হে প্রসংশা কৃতজ্ঞ অন্তরে, কর ক্ষমা প্রার্থনা তাঁহার গোচরে। করেন গ্রহন তিনি সবার অধিক ক্ষমা আর অনুতাপ-যাচ্ঞা সঠিক।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/suura-nosor/
1100
জীবনানন্দ দাশ
পৃথিবী রয়েছে ব্যস্ত
সনেট
পৃথিবী রয়েছে ব্যস্ত কোন্‌খানে সফলতা শক্তির ভিতর, কোন্‌খানে আকাশের গায়ে রূঢ় মনুমেন্ট উঠিতেছে জেগে, কোথায় মাস’ল তুলে জাহাজের ভিড় সব লেগে আছে মেঘে, জানি নাকো, আমি এই বাংলার পাড়াগাঁয়ে বাধিঁয়াছি ঘর: সন্ধ্যায় যে দাঁড়কাক উড়ে যায় তালবনে- মুখে দুটো খড় নিয়ে যায়-সকালে যে নিমপাখি উড়ে আসে কাতর আবেগে নীল তেঁতুলের বনে- তেমনি করুণা এক বুকে আছে লেগে; বইচির মনে আমি জোনাকির রূপ দেখে হয়েছি কাতর;কদমের ডালে আমি শুনেছি যে লক্ষ্মীপেঁচা গেয়ে গেছে গান নিশুতি জ্যোৎস্না রাতে, -টুপ টুপ টুপ টুপ্‌ সারারাত ঝরে শুনেছি শিশিরগুলো –ম্লান মুখে গড় এসে করেছে আহ্বান ভাঙা সোঁদা ইটগুলো,– তারি বুকে নদী এসে কি কথা মর্মরে; কেউ নাই কোনোদিকে- তবু যদি জ্যোৎস্নায় পেতে থাক কান শুনিবে বাতাসে শব্দ : ‘ঘোড়া চড়ে কই যাও হে রায়রায়ন –’
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/prithibi-royese-byasto/