id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
3439
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রবীণ ও নবীন
|
নীতিমূলক
|
পাকা চুল মোর চেয়ে এত মান্য পায়,
কাঁচা চুল সেই দুঃখে করে হায়-হায়।
পাকা চুল বলে, মান সব লও বাছা,
আমারে কেবল তুমি করে দাও কাঁচা। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/probin-o-nobin/
|
2156
|
মহাদেব সাহা
|
তাকেই বলি প্রকৃতি
|
প্রকৃতিমূলক
|
ভিতর থেকে হয়ে উঠছে তাকেই বলি প্রকৃতি। বাইরে মেঘবৃষ্টি
ঝড়ো হাওয়া
কেমন শিশুর হাতে কাদামাটিতে গড়া, তার কোনো গ্রহস্ত চেহারা সেই
তারই এক ডাকে কেন আমি এমন ঘর ছেড়ে আসবো!
আমি এখনো মাঝে মাঝেই তৃষ্ণার্ত, নদীর কাছে করুণা চাইতে যাই,
ব্যথিত আমি পাহাড়ের কাছে করুণা চাইতে যাই
হয়তো তাদেরও ভিতরে কোথাও এই মানুষের মতো একটা মন আছে,
সেই মনটাই প্রকৃতি।
না হলে এই সবুজ ঘাস কেন জাজিমের মতো মনে হবে, এই
মেঘ মনে হবে মখমলের মতো
পাখির ভিতর যা পাখিত্ব নদীর ভিতর যা শুদ্ধতা
এর একটা পরিচ্ছন্ন রূপ আছে তাকেই বলি প্রকৃতি।
প্রকৃতি এই কাদামাটিতে গড়া, আঁতুড়ঘরের আবেশ মাখানো গন্ধ
তবু এই উলুকঝুলুক নয়, কোনো কিছু নয়
আরো একটা কিছু ভিতর থেকে গড়ে উঠছে জলমাটি হাওয়া সব মিলেই
এই প্রকৃতি
কখনো এই গাছ, বিদেশী পাম ট্রী, কখনো শাদা আরো
সম্পন্ন শরীর সেইসব ভিন্ন যুবতিরা
তাদের সোনালী চুলের স্বাস্থ্যকেই বলি প্রকৃতি
তবু এশিয়া ও ইওরোপে তেমন ভিন্ন কোনো প্রকৃতি নেই
হয়তো নারীরা এখানে শীতপ্রধান, হয়তো বৃক্ষ কোথাও চিরহরিৎ
এই গাছ-পাথর প্রকৃতি নয় আমি অন্য কারো ডাকে ঘর ছেড়ে এসেছি।
বাইরে এই মেঘবৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া, এই গাছ-পাথর
বহু বছর তাদের পাশাপাশি বেঁচে আছি,
তাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর কিছু নেই
আমার হাতে মেঘ পেয়েছে মহিমা, জল পেয়েছে অবয়ব,
পাথর পেয়েছে পূর্ণতা
এতোদিন এই কাদামাটির সংসারে এই ঝড়ো হাওয়ায়
ভিতর থেকে হয়ে উঠছে এই কাদামাটিতে এই ভালোবাসায়
তাকেই বলি প্রকৃতি, এই বেদনাবিধুর!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1503
|
1831
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
দীপেন বললেই
|
শোকমূলক
|
দীপেন বললেই
একটা প্রকাণ্ড গাছ
ঝড়াকে যার থোড়াই কেয়ার।
একটা চওড়া বাধ
য়ার কাছে নতজানু
সমস্ত প্লাবনের জল।
কি চমৎকার আগুন নিয়ে খেলা করতো
দীপেন
পুড়তো না কিছু
শুধু জলজল করে উঠতো
চারপাশের নুড়ি, পাথর, ধুলোবালি।
কী চমৎকার বাঁশী বাজাতো
দীপেন
সাপের ফণাগুলো
মুখোশ খুলে ছুটে আসতো
আলিঙ্গনের লতাপল্লবে।
দীপেন বললেই
লক্ষ্নৌ এর বাদশাহী রাত,
আমাদের আদি যৌবনের
তুলকালাম দাপাদাপি।
আবার
গানের কলির অলিতে গলিতে
কাকে খুঁজে বেড়ানো।
দীপেন বললেই
ময়দানের ঘাসে
হাজার পতাকার হৈ হৈ হাসি
শুকনো মুখের কুলঙ্গীতে
সার সার প্রদীপ।
দীপেনকে
সব গোপন কথা বলতে পারি আমি।
দীপেনকে
ছুরির ফলায় টুকরো করতে পারি আমি।
বাতিল কাগজের মতো দলা পাকাতে পারি আমি।
দীপেন শুধু বলবে
আয়! বোস হতভাগা
মুখে জয়জয়ন্তী হাসি।
দীপেন
আমি তোর শোকসভায় গিয়েছিলাম।
তুই লম্বা হতে হতে
ভালোবাসার আলোয় ভোরের মতো
রাঙা হতে হতে
ফুলের মালায়
ক্লান্ত হতে হতে
কোথায় যেন চলে যাচ্ছিস।
কোথায়?
তুই বললি
বোস্ হতভাগা। আসছি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1211
|
1054
|
জীবনানন্দ দাশ
|
তোমায় আমি দেখেছিলাম
|
প্রেমমূলক
|
তোমায় আমি দেখেছিলাম ঢের
শাদা কালো রঙ্গের সাগরের
কিনারে এক দেশে
রাতের শেষে–দিনের বেলার শেষে।এখন তোমায় দেখি না তবু আর
সাতটি সাগর তেরো নদীর পার
যেখানে আছে পাঁচটি মরুভূমি
তার ওপারে গেছ কি চ’লে তুমি
ঘাসের শান্তি শিশির ভালোবেসে!বটের পাতায় সে কার নাম লিখে
(গভীরভাবে) ভালোবেসেছিল সে নামটিকে
হরির নাম নয় সে আমি জানি,
জল ভাসে আর সময় ভাসে–বটের পাতাখানি
আর সে নারী কোথায় গেছে ভেসে
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/tomai-aami-dekhesilam/
|
2461
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
অসমাপ্ত গান
|
মানবতাবাদী
|
লক্ষ টাকায় একটি জামা কিনে কী উল্লাসে
এক বেহায়া হাসে ----
আর এক বৃদ্ধা বিবস্ত্রপ্রায়, সেই দোকানের পাশে
হাত বাড়িয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে
একটা টুকরো কাপড় যদি কারো দয়ায় আসে ।।
নিজের গালে চড় কষিয়ে নিজেরে দেই গালি
কোন দেশে তুই জন্ম নিলি কোবতে বনের মালী?
কী ফলালি জনম ভরে তোর কলমের চাষে ??
মাথার উপর ঠ্যাঙের ছায়া দোলায় মহাচোরে
তার গলা তো বড় গলা, পাত্তা দেয় কে তোরে?
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/asomapto-gan/
|
23
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
শুনুন
|
মানবতাবাদী
|
সব সময় বিপ্লবের কথা না ব’লে
যদি মাঝে মাঝে প্রেমের কথা বলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় ইস্তেহার না লিখে
যদি মাঝে মাঝে কবিতা লিখতে চাই—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় দলের কথা না ভেবে
যদি মাঝে মাঝে দেশের কথা ভেবে ফেলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
পাঁচ আর সাত নম্বর ওয়ার্ডে আমাদের ভোট কম ব’লে
সেখানকার মানুষ রাস্তা পাবে কি পাবে না— জানতে চেয়েছিলাম।
আমার জিভ কেটে নেবেন না।
পার্টির ছেলে নয় ব’লে
ইকনমিক্স-এ ফার্স্ট ক্লাস চন্দন
কাজটা পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমার নাক ঘষে দেবেন না।
দাগি বদমায়েশ
আমাদের হয়ে উর্দি বদল করলেই
রেহাই পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমায় জুতোয় মাড়িয়ে যাবেন না।বিশ্বাস করুন কমরেডস
আমি দলছুট নই বিক্ষুব্ধও নই ;
বিশ তিরিশ চল্লিশের গনগনে দিনগুলিতে
কমরেড লেনিন থেকে প্রিয় হো চি মিন
আমাদের যেসব কথা বলেছিলেন,
এই শতকের অন্তিম দশকে দাঁড়িয়ে
আমি স্রেফ সেই কথাগুলো
সেই সব আহত, রক্তিম অথচ একান্ত জরুরি কথাগুলো
আপনাদের সামনে
সরাসরি তুলে ধরতে চাই।
জানতে চাই
অবিশ্বাস আর ঘৃণার
ছোট ছোট জরজা জানালা ভেঙে
আমরা কি একবারের জন্যেও
সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ওপর গিয়ে দাঁড়াতে পারি না
যেখানে
সূর্যের আলো
সব জায়গায় সমানভাবে এসে পড়ে ?কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন সব সময় বিপ্লবের কথা না ব’লে
যদি মাঝে মাঝে প্রেমের কথা বলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় ইস্তেহার না লিখে
যদি মাঝে মাঝে কবিতা লিখতে চাই—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় দলের কথা না ভেবে
যদি মাঝে মাঝে দেশের কথা ভেবে ফেলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
পাঁচ আর সাত নম্বর ওয়ার্ডে আমাদের ভোট কম ব’লে
সেখানকার মানুষ রাস্তা পাবে কি পাবে না— জানতে চেয়েছিলাম।
আমার জিভ কেটে নেবেন না।
পার্টির ছেলে নয় ব’লে
ইকনমিক্স-এ ফার্স্ট ক্লাস চন্দন
কাজটা পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমার নাক ঘষে দেবেন না।
দাগি বদমায়েশ
আমাদের হয়ে উর্দি বদল করলেই
রেহাই পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমায় জুতোয় মাড়িয়ে যাবেন না।বিশ্বাস করুন কমরেডস
আমি দলছুট নই বিক্ষুব্ধও নই ;
বিশ তিরিশ চল্লিশের গনগনে দিনগুলিতে
কমরেড লেনিন থেকে প্রিয় হো চি মিন
আমাদের যেসব কথা বলেছিলেন,
এই শতকের অন্তিম দশকে দাঁড়িয়ে
আমি স্রেফ সেই কথাগুলো
সেই সব আহত, রক্তিম অথচ একান্ত জরুরি কথাগুলো
আপনাদের সামনে
সরাসরি তুলে ধরতে চাই।
জানতে চাই
অবিশ্বাস আর ঘৃণার
ছোট ছোট জরজা জানালা ভেঙে
আমরা কি একবারের জন্যেও
সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ওপর গিয়ে দাঁড়াতে পারি না
যেখানে
সূর্যের আলো
সব জায়গায় সমানভাবে এসে পড়ে ?
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%b8-%e0%a6%85%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ad-dashgupta/
|
2067
|
মহাদেব সাহা
|
আমার স্বপ্নের মধ্যে
|
মানবতাবাদী
|
আমার স্বপ্নের মধ্যে একটি মানুষদ্রুত পায়ে
হেঁটে যায়,
কোনোদিন দেখি তাকে ব্যতিব্যস্ত সাইকেল-আরোহী
ঘরে ঘরে বিলি করে আরক্তিম চিঠি
তাতে খুব বড়ো করে লেখা দুটি শব্দ-স্বাধীনতা এবং বিপ্লব।
আমার স্বপ্নের মধ্যে একটি মানুষআছে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে,
আবর কখনো দেখি একাকী লিখছে বসে বিশাল পোস্টার
কখনো আঁকছে তাতে উত্তেজিত মানুষের মুখ
কখনোবা আঁকছে সে মানুষের পাশে দাঁড় করিয়ে মানুষ
পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা দীর্ঘতম সেতু;
আমার স্বপ্নের মধ্যে একটি মানুষহেঁটে যায় ছায়াছন্ন পথে
কোনাদিন দেখি তাকে রৌদ্রদগ্ধ পথের ওপর,
তাকে মনে হয় ভীষণ সাহসী যেন
স্পার্টাকাসের মতো ছিঁড়ে ফেলে সমস্ত শৃঙ্খল।
কোনোদিন দেখি তাকে আশাহত বসে আছে
একটি আঁধার ঘরে একা
চারপাশে পড়ে আছে অসংখ্য ধূসর পান্ডুলিপি
আর ছবির মলিন অ্যালবাম;
আমার স্বপ্নের মধ্যে একটি মানুষকোনোদিন দেখি তাকে
ক্ষুব্ধ হাতে ভাঙছে সকল কারপ্রাচীরের লোহার দরোজা।
আমার স্বপ্নের মধ্যে একটি মানুষছন্নছাড়া কেমন উদাস
কখনো বিষণ্ন চোখে কেবল তাকিয়ে আছে
আকাশের দিকে-
কোনোদিক দেখি মায়াকোভস্কির সেই অসমাপ্ত পান্ডুলিপি নিয়ে
লিখছে সে মানুষের দুঃখের কবিতা,
কোনোদিন দেখি তাকে খুব মনোযোগ দিয়ে আঁকছে সে
বেগবান বিদ্রোহের পাশে দীপ্তিময় লেনিনের মুখ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1435
|
1654
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
বৃষ্টির পর
|
প্রকৃতিমূলক
|
কিছুটা আলো কালো মেঘের
রেলিঙে ছিল ঝুঁকে।
কিছুটা ছিল আড়ালে, আর
কিছুটা সম্মুখে।
ছবিটা তবু পূর্ণ নয়,
খানিক ছিল বাকি,
পৃথিবী থেকে আকাশে তাই
উড়াল দেয় পাখি।
সারাটা দিন বৃষ্টি আর
বাতাসি আস্ফোটে
ছিল না যার চেতনা, যেন
ধীরে সে জেগে ওঠে।
দিনাবসানে মাঠকোঠার
দরজা ধরে ঠায়
দ্যাখো সে ওই দাঁড়িয়ে আছে
শ্রাবণ-সন্ধ্যায়।
যা কিছু দ্যাখে তাতেই যেন
ভারী অবাক মানে,
বোঝে না ছিল কোথায়, আর
এল সে কোনখানে।
এ যদি সেই পোড়া শহর
তা হলে বলো হেন
অঙ্গে তার এত বাহার
ঝলমলায় কেন।
পৃথিবী যেন পৃথিবী নয়,
আলোর সরোবর;
আলোয় ভাসে বৃক্ষলতা
সমূহ বাড়িঘর।
অবাক হয়ে আকাশে চেয়ে
দাঁড়িয়ে আছে একা,
বোঝে না কেন এমন ছবি
হঠাৎ দিল দেখা।
আকাশে আলো ছড়িয়ে যায়,
বাতাস মধুময়।
নিরুচ্চার কে যেন বলে
চলছে : জয়, জয়!
যেখানে যায়, যেদিকে চায়,
আলোয় মাখামাখি।
সাঁজবেলায় আলোর জলে
সাঁতার কাটে পাখি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1549
|
4555
|
শামসুর রাহমান
|
কবির কল্পনার মায়াবিনী
|
চিন্তামূলক
|
সে যেন আমাকে সদা ছায়ার ধরনে সেঁটে থাকে,
জানি না কিসের জন্যে। তার এই কাণ্ড
আমাকে নিক্ষেপ করে বিরক্তির বেড়াজালে, কিন্তু
কিছুতেই পাই না রেহাই।কখনও কখনও আমি চুল ছিঁড়ে নিজের মাথার
স্বস্তি পেতে চাই, কিন্তু সেই নটবর
অদ্ভুত হাসির বৃষ্টি ছিটিয়ে আমার মনে আরও
বেশি বিরক্তির ঢিল ছুড়ে দেয় শিকারের দেকে।অবশ্য করি না ত্যাগ শেষতক আমার নির্দিষ্ট
কাজ, দিব্যি চালাতেই থাকি কলমের
কাজ, যতক্ষণ ঠিক শব্দ বসে না যথার্থ স্থানে,
মাথায় চলতে থাকে নানাবিধ শব্দের জরুরি আসা-যাওয়া।জানা আছে জ্ঞানীদের নানা বাণী, যেসব কবির
কোনও-কোনও কাজে উপকারী-যেগুলির
প্রয়োগে নতুন পথ খুলে যেতে পারে
এবং সে-পথে হেঁটে যেতে-যেতে নয়া পথ গ’ড়ে ওঠে।একদিন যে-ভাবনা ঠিক পথে জ্বলজ্বলে ক’রে তোলা ঢের
মুশকিল ছিল, সার্থকের হাত ধরা
ছিল যেন অসাধারণ, কবির কল্পনার মায়াবিনী! (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobir-kolponai-mayabini/
|
4376
|
শামসুর রাহমান
|
আমার ছেলেকে
|
চিন্তামূলক
|
খবদ্দার খোকা তুই কোনোদিন শিল্পের মৃগকে
দিবিনে ঘেঁষতে ত্রিসীমায়। বরং ডিঙিয়ে বেড়া
ভাষ্য, টীকা, দর্শনের মহানন্দে নিশ্চিন্দির ডেরা
বাঁধিস মনের মতো। জীবনকে সঁপে দিয়ে ছকে
বাজাবি ঢোলক নিত্য; চাকরির চরম নাটকে
সাজলে বিখুঁত হুঁকোবরদার, সমাজের সেরা
মুরুব্বির তল্পি বয়ে সামলালে নথিপত্র ঘেরা
অস্তিত্বকে, পৌঁছে যাবি উন্নতির প্রশস্ত সড়কে।অক্ষান্তরে শিল্পের আঁতুড়ঘরে আছে কালকূট
হতাশার। রাত্রিদিন বিষাক্ত হাওয়ায় শ্বাস টেনে
কী পাবি অবুঝ তুই? অন্তহীন যন্ত্রণা, বিষাদ
অথবা পতন শুধু। সাফল্যের বিখ্যাত মুকুট
ক’জনের ভাগ্যে জোটে? তার চেয়ে স্থুলচর্ম বেনে,
বীমার দালাল হওয়া ভালো, ভালো ফুর্তির আস্বাদ। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-cheleke/
|
2744
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আর নাই রে বেলা নামল ছায়া
|
প্রেমমূলক
|
আর নাই রে বেলা, নামল ছায়া
ধরণীতে,
এখন চল্ রে ঘাটে কলসখানি
ভরে নিতে।
জলধারার কলস্বরে
সন্ধ্যাগগন আকুল করে,
ওরে ডাকে আমায় পথের ‘পরে
সেই ধ্বনিতে।
চল্ রে ঘাটে কলসখানি
ভরে নিতে।এখন বিজন পথে করে না কেউ
আসা-যাওয়া,
ওরে প্রেম-নদীতে উঠেছে ঢেউ,
উতল হাওয়া।
জানি নে আর ফিরব কিনা,
কার সাথে আজ হবে চিনা,
ঘাটে সেই অজানা বাজায় বীণা
তরণীতে।
চল্ রে ঘাটে কলসখানি
ভরে নিতে।১৩ ভাদ্র, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ar-nai-re-bela-namlo-chaya/
|
4049
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হে জনসমুদ্র, আমি ভাবিতেছি মনে
|
সনেট
|
হে জনসমুদ্র, আমি ভাবিতেছি মনে
কে তোমারে আন্দোলিছে বিরাট মন্থনে
অনন্ত বরষ ধরি। দেবদৈত্যদলে
কী রত্ন সন্ধান লাগি তোমার অতলে
অশান্ত আবর্ত নিত্য রেখেছে জাগায়ে
পাপে-পুণ্যে সুখে-দুঃখে ক্ষুধায়-তৃষ্ণায়
ফেনিল কল্লোলভঙ্গে। ওগো, দাও দাও
কী আছে তোমার গর্ভে– এ ক্ষোভ থামাও।
তোমার অন্তরলক্ষ্মী যে শুভ প্রভাতে
উঠিবেন অমৃতের পাত্র বহি হাতে
বিস্মিত ভুবন-মাঝে, লয়ে বরমালা
ত্রিলোকনাথের কণ্ঠে পরাবেন বালা,
সেদিন হইবে ক্ষান্ত এ মহামন্থন,
থেমে যাবে সমুদ্রের রুদ্র এ ক্রন্দন। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/he-jonsomudro-ami-vabitechi-mone/
|
4927
|
শামসুর রাহমান
|
পুতুল নাচের ইতিকথা
|
সনেট
|
নিজে সে অলক্ষ্যে থাকে, হাতে তার নানাবিধ সুতো,
কলকাঠি, নানা রঙা, নাড়ে চাড়ে যখন তখন,
এবং যেমন খুশি রাত্রিদিন বলায় ওদের দিয়ে টন
টন কথা, আসলে সে নিজেরই একান্ত মনঃপুত
বাছা বাছা শব্দাবলী আওড়ায়; তার ছলছুতো
বোঝা দায়, তারই কণ্ঠস্বর বাজে, কেবল ক’জন
ওরা ঠোঁট নাড়ে, নাচে পুতুলের আত্মীয় স্বজন
পুষ্পাকুল স্টেজে, মাঝে মাঝে হয় বটে তালচ্যুত।এ এক মজার খেলা চলে রাত্রিদিন। এজলাসে
ভারিক্কী বিচারপতী, চুপচাপ, আসামী হাজির।
চতুর উকিলদ্বয় তোতাপাখি। পরিণামহীন
মামলায় শুধু বাদ-বিসম্বাদই সার; চোখে ভাসে
সুতোবন্দী নানাজন, কেউকেটা, উজির, নাজির।
যার হাতে সুতো সেকি নিজেও পুতুল সমাসীন? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/putul-nacher-itikotha/
|
2469
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
এই ভালো
|
প্রেমমূলক
|
এই ভালো - তুমি আছো তুমি হয়ে - আছো অনেকের
আমিও কেমন করে আমি হয়ে আছি চেয়ে দ্যাখো
আকাশ আচ্ছন্ন করা সব মেঘ ঝরে গেলে পরে
আকাশ আকাশ হয়ে একা থাকে আমার মতন
মেঘেরা মাটির হয় - নদী হয় - অথবা সাগর
এই ভালো তুমি আছো - তুমি হয়ে - আছো অনেকেরকখনো আবার মেঘ হতে সাধ হলে চলে এসো
আমার শূন্যতা ছুঁয়ে মেলে দিও আবার নিজেকে০৬ / ১০ / ২০১৭
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/ei-bhalo/
|
2326
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (চতুর্থ সর্গের শেষার্ধ)
|
কাহিনীকাব্য
|
মহানন্দে সুন্দ উপসুন্দাসুর বলী
অমরারি, তুষি যত দৈত্যকুলেশ্বরে
মধুর সম্ভাষে, এবে, সিংহাসন ত্যজি,
উঠিলা,--কুসুমবনে ভ্রমণ প্রয়াসে,
একপ্রাণ দুই ভাই--বাগর্থ যেমতি!
'হে দানব' আরম্ভিলা নিকুম্ভ-কুমার
সুন্দ,--'বীরদলশ্রেষ্ঠ, অমরমর্দ্দন,
যার বাহু-পরাক্রমে লভিয়াছি আমি
ত্রিদিব-বিভব ; শুন, হে সুরারি রথী-
ব্যূহ, যার যাহা ইচ্ছা, সেই তাহা কর |
চিরবাদী রিপু এবে জিনিয়া বিবাদে
ঘোরতর পরিশ্রমে, আরাম সাধনে
মন রত কর সবে |' উল্লাসে দনুজ,
শুনি দনুজেন্দ্র-বাণী, অমনি নাদিল |
সে ভৈরব-রবে ভীত আকাশ-সম্ভবা
প্রতিধ্বনি পলাইলা রড়ে ; মূর্ছা পায়ে
খেচর, ভূচর সহ, পড়িল ভূতলে |
থরথরি গিরিবর বিন্ধ্য মহামতি
কাঁপিলা, কাঁপিলা ভয়ে বসুধা সুন্দরী |
দূর কাম্যবনে যথা বসেন বাসব,
শুনি সে ঘোর ঘর্ঘর, ত্রস্ত হয়ে সবে,
নীরবে এ ওঁর পানে লাগিলা চাহিতে |
চারি দিকে দৈত্যদল চলিলা কৌতুকে,
যথা শিলীমুখ-বৃন্দ, ছাড়ি মধুমতী-
পুরী উড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে আনন্দে গুঞ্জরি
মধুকালে, মধুতৃষা তুষিতে কুসুমে |
মধুকুঞ্জে বামাব্রজরঞ্জন দুজন
ভ্রমিলা, অশ্বিনী-পুত্র-যুগ সম রূপে
অনুপম ; কিম্বা যথা পঞ্চবটি-বনে
রাম রামানুজ, --যবে মোহিনী রাক্ষসী
সূর্পনখা হেরি দোঁহে, মাতিল মদনে!
ভ্রমিতে ভ্রমিতে দৈত্য আসি উতরিলা
যথায় ফুলের মাঝে বসে একাকিনী
তিলোত্তমা | সুন্দ পানে চাহিয়া সহসা
কহে উপসুন্দাসুর,-- 'কি আশ্চর্য্য, দেখ--
দেখ, ভাই, পূর্ণ আজি অপূর্ব সৌরভে
বনরাজী! বসন্ত কি আবার আইল?
আইস দেখি কোন্ ফুল ফুটি আমোদিছে
কানন?' উত্তরে হাসি সুন্দাসুর বলী,--
'রাজ-সুখে সুখী প্রজা ; তুমি, আমি, রথি,
সসাগরা বসুধারে দেবালয় সহ
ভুজবলে জিনি, রাজা ; আমাদের সুখে
কেন না সুখিনী হবে বনরাজী আজি?'
এইরূপে দুইজন ভ্রমিলা কৌতুকে,
না জানি কালরূপিণী ভুজঙ্গিনী রূপে
ফুটিছে বনে সে ফুল, যার পরিমলে
মত্ত এবে দুই ভাই, হায় রে, যেমতি
বকুলের বাসে অলি মত্ত মধুলোভে!
বিরাজিছে ফুলকুল-মাঝে একাকিনী
দেবদূতী, ফুলকুল-ইন্দ্রাণী যেমতি
নলিনী! কমল-করে আদরে রূপসী
ধরে যে কুসুম, তার কমনীয় শোভা
বাড়ে শতগুণ, যথা রবির কিরণে
মণি-আভা! একাকিনী বসিয়া ভাবিনী,
হেন কালে উতরিলা দৈত্যদ্বয় তথা |
চমকিলা বিধুমুখী দেখিয়া সম্মুখে
দৈত্যদ্বয়ে, যথা যবে ভোজরাজবালা
কুন্তী, দুর্ব্বাসার মন্ত্র জপি সুবদনা,
হেরিলা নিকটে হৈম-কিরীটী ভস্করে!
বীরকুল-চূড়ামণি নিকুম্ভ-নন্দন
উভে ; ইন্দ্রসম রূপ--অতুল ভূবনে |
হেরি বীরদ্বয়ে ধনী বিস্ময় মানিয়া
একদৃষ্টে দোঁহা পানে লাগিলা চাহিতে,
চাহে যথা সূর্য্যমুখী সে সূর্য্যের পানে!
'কি আশ্চর্য্য! দেখ, ভাই,' কহিল শূরেন্দ্র
সুন্দ ; 'দেখ চাহি, ওই নিকুঞ্জ-মাঝারে |
উজ্জ্বল এ বন বুঝি দাবাগ্নিশিখাতে
আজি ; কিম্বা ভগবতী আইলা আপনি
গৌরী! চল, যাই ত্বরা, পূজি পদযুগ!
দেবীর চরণ-পদ্ম-সদ্মে যে সৌরভ
বিরাজে, তাহাতে পূর্ণ আজি বনরাজী |'
মহাবেগে দুই ভাই ধাইলা সকাশে
বিবশ | অমনি মধু, মন্মথে সম্ভাষি,
মৃদুস্বরে ঋতুবর কহিলা সত্বরে ;--
'হান তব ফুল-শর, ফুল-ধনু ধরি,
ধনুর্দ্ধর, যথা বনে নিষাদ, পাইলে
মৃগরাজে |' অন্তরীক্ষে থাকি রতিপতি,
শরবৃষ্টি করি, দোঁহে অস্থির করিলা,
মেঘের আড়ালে পশি মেঘনাদ যথা
প্রহারয়ে সীতাকান্ত ঊর্ম্মিলাবল্লভে |
জর জর ফুলশরে, উভয়ে ধরিলা
রূপসীরে | আচ্ছন্নিল গগন সহসা
জীমূত! শোণিতবিন্দু পড়িল চৌদিকে!
ঘোষিল নির্ঘোষে ঘন কালমেঘ দূরে ;
কাঁপিলা বসুধা ; দৈত্য-কুল-রাজলক্ষ্মী,
হায় রে, পূরিলা দেশ হাহাকার রবে!
কামমদে মত্ত এবে উপসুন্দাসুর
বলী, সুন্দাসুর পানে চাহিয়া কহিলা
রোষে ; 'কি কারণে তুমি স্পর্শ এ বামারে,
ভ্রাতৃবধূ তব, বীর?' সুন্দ উত্তরিলা--
'বরিনু কন্যায় আমি তোমার সম্মুখে
এখনি! আমার ভার্য্যা গুরুজন তব ;
দেবর বামার তুমি ; দেহ হাত ছাড়ি |'
যথা প্রজ্বলিত অগ্নি আহুতি পাইলে
আরো জ্বলে, উপসুন্দ--হায়, মন্দমতি--
মহা কোপে কহিল--'রে অধর্ম-আচারি,
কুলাঙ্গার, ভ্রাতৃবধূ মাতৃসম মানি ;
তার অঙ্গ পরশিস্ অনঙ্গ-পীড়নে?'
'কি কহিলি, পামর? অধর্মচারী আমি?
কুলাঙ্গার? ধিক্ তোরে, ধিক্, দুষ্টমতি,
পাপি! শৃগালের আশা কেশরীকামিনী
সহ কেলি করিবার,--ওরে রে বর্ব্বর!'
এতেক কহিয়া রোষে নিষ্কোশিলা অসি
সুন্দাসুর, তা দেখিয়া বীরমদে মাতি,
হুহুঙ্কারি নিজ অস্ত্র ধরিলা অমনি
উপসুন্দ,--গ্রহ-দেষে বিগ্রহ-প্রয়াসী |
মাতঙ্গিনী-প্রেম-লোভে কামার্ত্ত যেমতি
মাতঙ্গ যুঝয়ে, হায়, গহন কাননে
রোষাবেশে, ঘোর রণে কুক্ষণে রণিলা
উভয়, ভুলিয়া, মরি, পূর্ব্বকথা যত!
তমঃসম জ্ঞান-রবি সতত আবরে
বিপত্তি! দোঁহার অস্ত্রে ক্ষত দুইজন,
তিতি ক্ষিতি রক্তস্রোতে, পড়িলা ভূতলে!
কতক্ষণে সুন্দাসুর চেতন পাইয়া,
কাতরে কহিল চাহি উপসুন্দ পানে ;
'কি কর্ম করিনু, ভাই, পূর্ব্বকথা ভুলি?
এত যে করিনু তপঃ ধাতায় তুষিতে ;
এত যে যুঝিনু দোঁহে বাসবের সহ ;
এই কি তাহার ফল ফলিল হে শেষে?
বালিবন্ধে সৌধ, হায়, কেন নির্ম্মাইনু
এত যত্নে? কাম-মদে রত যে দুর্ম্মতি,
সতত এ গতি তার বিদিত জগতে |
কিন্তু এই দুঃখ, ভাই, রহিল এ মনে--
রণক্ষেত্রে শত্রু জিনি, মরিনু অকালে,
মরে যথা মৃগরাজ পড়ি ব্যাধ-ফাঁদে |'
এতেক কহিয়া, হায়, সুন্দাসুর বলী,
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, শরীর ত্যাজিলা
অমরারি, যথা, মরি, গান্ধারীনন্দন,
নরশ্রেষ্ঠ, কুরুবংশ ধ্বংস গণি মনে,
যবে ঘোর নিশাকালে অশ্বথামা রথী
পাণ্ডব-শিশুর শির দিলা রাজহাতে!
মহা শোকে শোকী তবে উপসুন্দ বলী
কহিলা ; 'হে দৈত্যপতি, কিসের কারণে
লুটায় শরীর তব ধরণীর তলে?
উঠ, বীর, চল, পুনঃ দলিগে সমরে
অমর! হে শূরমণি, কে রাখিবে আজি
দানব-কুলের মান, তুমি না উঠিলে?
হে অগ্রজ, ডাকে দাস চির অনুগত
উপসুন্দ ; অল্প দোষে দেষী তব পদে
কিঙ্কর ; ক্ষমিয়া তারে হে বাসবজয়ী,
লয়ে এ বামারে, ভাই, কেলি কর উঠি!'
এইরূপে বিলাপিয়া উপসুন্দ রথী,
অকালে কালের হস্তে প্রাণ সমর্পিলা
কর্মদোষে | শৈলাকারে রহিলা দুজনে
ভূমিতলে, যতা শৈল--নীরব, অচল |
সমরে পড়িল দৈত্য | কন্দর্প অমনি
দর্পে শঙ্খ ধরি ধীর নাদিলা গম্ভিরে |
বহি সে বিজয় নাদ আকাশ সম্ভবা
প্রতিধ্বনি, রড়ে ধনী ধাইলা আশুগা
মহারঙ্গে | তুঙ্গ শৃঙ্গে, পর্ব্বতকন্দরে,
পশিল স্বর-তরঙ্গ | যথা কাম্যবনে
দেব-দল, কতক্ষণে উতরিলা তথা
নিরাকারা দূতী | 'উঠ,' কহিলা সুন্দরী,
'শীঘ্র করি উঠ, ওহে দেবকুলপতি!
ভ্রাতৃভেদে ক্ষয় আজ দানব দুর্জ্জয় |'
যথা অগ্নি-কণা-স্পর্শে বারুদ-কণিক-
রাশি, ইরম্মদরূপে, উঠয়ে নিমিষে
গরজি পবন-মার্গে, উঠিলা তোমতি
দেবসৈন্য শূণ্যপথে! রতনে খচিত
ধ্বজদণ্ড ধরি করে, চিত্ররথ রথী
উন্মীলিলা দেবকেতু কৌতুকে আকাশে |
শোভিল সে কেতু, শোভে ধূমকেতু যথা
তারাশির,--তেজে ভস্ম করি সুররিপু!
বাজাইল রণবাদ্য বাদ্যকর-দল
নিক্কণে | চলিলা সবে জয়ধ্বনি করি |
চলিলেন বায়ুপতি খগপতি যথা
হেরি দূরে নাগবৃন্দ--ভয়ঙ্কর গতি ;
সাপটি প্রচণ্ড দন্ড চলিলা হরষে
শমন ; চলিলা ধনুঃ টঙ্কারিয়া রথী
সেনানী ; চলিলা পাশি ; অলকার পতি,
গদা হস্তে ; স্বর্ণরথে চলিলা বাসব,
ত্বিষায় জিনিয়া ত্বিষাম্পতি দিনমণি |
চলে বাসবীয় চমূ জীমূত যেমতি
ঝড় সহ মহা রড়ে ; কিম্বা চলে যথা
প্রমথনাথের সাথে প্রমথের কুল
নাশিতে প্রলয়কালে, ববম্বম রবে--
ববম্বম রবে যবে রবে শিঙ্গাধ্বনি!
ঘোর নাদে দেবসৈন্য প্রবেশিল আসি
দৈত্যদেশে | যে যেখানে আছিল দানব,
হতাশ তরাসে কেহ, কেহ ঘোর রণে
মরিল! মুহুর্তে, আহা, যত নদ নদী
প্রস্রবণ, রক্তময় হইয়া বহিল!
শৈলাকার শবরাশি গগন পরশে |
শকুনি গৃধিনী যত--বিকট মুরতি--
যুড়িয়া আকাশদেশ, উড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে
মাংসলোভে | বায়ুসখা সুখে বায়ু সহ
শত শত দৈত্যপুরী লাগিলা দহিতে |
মরিল দানব-শিশু, দানব-বনিতা |
হায় রে, যে ঘোর বাত্যা দলে তরু-দলে
বিপিনে, নাশে সে মূঢ় মুকুলিত লতা,
কুসুম-কাঞ্চন-কান্তি! বিধির এ লীলা |
বিলাপী বিলাপধ্বনি জয়নাদ সহ
মিশিয়া পূরিল বিশ্ব ভৈরব আরবে!
কত যে মারিলা যম কে পারে বর্ণিতে?
কত যে চূর্ণিলা, ভাঙ্গি তুঙ্গ শৃঙ্গ, বলী
প্রভঞ্জন ;--তীক্ষ্ণ শরে কত যে কাটিলা
সেনানী ; কত যে যূতনাথ গদাঘাতে
নাশিলা অলকানাথ ; কত যে প্রচেতা
পাশী ; হায়, কে বর্ণিবে, কার সাধ্য এত?
দানব-কুল-নিধনে, দেব-কুল-নিধি
শচিকান্ত, নিতান্ত কাতর হয়ে মনে
দয়াময়, ঘোর নাদে শঙ্খ নিনাদিলা
রণভূমে | দেবসেনা, ক্ষান্ত দিয়া রণে
অমনি, বিনতভাবে বেড়িলা বাসবে |
কহিলেন সুনাসীর গম্ভীর বচনে ;--
'সুন্দ-উপসুন্দাসুর, হে শূরেন্দ্র রথি,
অরি মম, যমালয়ে গেছে দোঁহে চলি
অকালে কপালদোষে | আর কারে ডরি?
তবে বৃথা প্রাণিহত্যা কর কি কারণে?
নীচের শরীরে বীর কভু কি প্রহারে?
অস্ত্র? উচ্চ তরু--সেই ভস্ম ইরম্মদে |
যাক্ চলি নিজালয়ে দিতিসুত যত |
বিষহীন ফণী দেখি কে মারে তাহারে?
আনহ চন্দনকাষ্ঠ কেহ, কেহ ঘৃত ;
আইস সবে দানবের প্রেতকর্ম্ম করি
যথা বিধি | বীর-কুলে সামান্য সে নহে,
তোমা সবা যার শরে কাতর সমরে!
বিশ্বনাশী বজ্রাগ্নিরে অবহেলা করি,
জিনিল যে বাহুবলে দেবকুলরাজে,
কেমনে তাহার দেহ দিবে সবে আজি
খেচর ভূচর জীবে? বীরশ্রেষ্ঠ যারা,
বীরারি পূজিতে রত সতত জগতে!'
এতেক কহিলা যদি বাসব, অমনি
সাজাইলা চিতা চিত্ররথ মহারথী |
রাশি রাশি আনি কাষ্ঠ সুরভি, ঢালিলা
ঘৃত তাহে | আসি শুচি--সর্ব্বশুচিকারী--
দহিলা দানব-দেহ | অনুমৃতা হয়ে,
সুন্দ-উপসুন্দাসুর-মহিষী রূপসী
গেলা ব্রহ্মলোকে,--দোঁহে পতিপরায়ণা |
তবে তিলোত্তমাপানে চাহি সুরপতি
জিষ্ণু, কহিলেন দেব মৃদু মন্দস্বরে ;--
'তারিলে দেবতাকুলে অকূলপাথারে
তুমি ; দলি দানবেন্দ্রে তোমার কল্যাণে,
হে কল্যাণি, স্বর্গলাভ আবার করিনু |
এ সুখ্যাতি তব, সতি, ঘুষিবে জগতে
চিরদিন | যাও এবে (বিধির এ বিধি)
সূর্য্যলোকে ; সুখে পশি আলোক-সাগরে,
কর বাস, যথা দেবী কেশব-বাসনা,
ইন্দুবদনা ইন্দিরা--জলধির তলে |'
চলি গেলা তিলোত্তমা--তারকারা ধনী--
সূর্য্যলোকে | সুরসৈন্য সহ সুরপতি
অমরাপুরীতে হর্ষে পুনঃ প্রবেশিলা |
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/post20160702063313/
|
461
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মুক্ত-পিঞ্জর
|
স্বদেশমূলক
|
ভেদি দৈত্য-কারা
উদিলাম পুন আমি কারা-ত্রাস চির-মুক্ত বাধাবন্ধ-হারা
উদ্দামের জ্যোতি-মুখরিত মহা-গগন-অঙ্গনে –
হেরিনু, অনন্তলোক দাঁড়াল প্রণতি করি মুক্ত-বন্ধ আমার চরণে।
থেমে গেল ক্ষণেকের তরে বিশ্ব-প্রণব-ওংকার,
শুনিল কোথায় বাজে ছিন্ন শৃঙ্খলে কার আহত ঝংকার!
কালের করাতে কার ক্ষয় হল অক্ষয় শিকল,
শুনি আজি তারই আর্ত জয়ধ্বনি ঘোষিল গগন পবন জল স্থল।
কোথা কার আঁখি হতে সরিল পাষাণ-যবনিকা,
তারই আঁখি-দীপ্তি-শিখা রক্ত-রবি-রূপে হেরি ভরিল উদয়-ললাটিকা।
পড়িল গগন-ঢাকে কাঠি,
জ্যোতির্লোক হতে ঝরা করুণা-ধারায় – ডুবে গেল ধরা-মা-র স্নেহ-শুষ্ক মাটি,
পাষাণ-পিঞ্জর ভেদি, ছেদি নভ-নীল –
বাহিরিল কোন্ বার্তা নিয়া পুন মুক্তপক্ষ অগ্নি-জিব্রাইল!
দৈত্যাগার দ্বারে দ্বারে ব্যর্থ রোষে হাঁকিল প্রহরী!
কাঁদিল পাষাণে পড়ি
সদ্য-ছিন্ন চরণ-শৃঙ্খল!
মুক্তি মার খেয়ে কাঁদে পাষাণ-প্রাসাদ-দ্বারে আহত অর্গল!
শুনিলাম – মম পিছে পিছে যেন তরঙ্গিছে
নিখিল বন্দির ব্যথা-শ্বাস –
মুক্তি-মাগা ক্রন্দন-আভাস।
ছুটে এসে লুটায়ে লুটায়ে যেন পড়ে মম পায়ে;
বলে – ‘ওগো ঘরে-ফেরা মুক্তি-দূত!
একটুকু ঠাঁই কিগো হবে না ও ঘরে-নেওয়া নায়ে?’
নয়ন নিঙাড়ি এল জল,
মুখে বলিলাম তবু – ‘বন্ধু! আর দেরি নাই, যাবে রসাতল
পাষাণ-প্রাচীর-ঘেরা ওই দৈত্যাগার,
আসে কাল রক্ত-অশ্বে চড়ি, হেরো দুরন্ত দুর্বার!’ –
বাহিরিনু মুক্ত-পিঞ্জর বুনো পাখি
ক্লান্ত কণ্ঠে জয় চির-মুক্তি ধ্বনি হাঁকি –
উড়িবারে চাই যত জ্যোতির্দীপ্ত মুক্ত নভ-পানে,
অবসাদ-ভগ্ন ডানা ততই আমারে যেন মাটি পানে টানে।
মা আমার! মা আমার! এ কী হল হায়!কে আমারে টানে মা গো উচ্চ হতে ধরার ধূলায়?
মরেছে মা বন্ধহারা বহ্নিগর্ভ তোমার চঞ্চল,
চরণ-শিকল কেটে পরেছে সে নয়ন-শিকল।
মা! তোমার হরিণ-শিশুরে
বিষাক্ত সাপিনি কোন টানিছে নয়ন-টানে কোথা কোন্ দূরে!
আজ তব নীলকণ্ঠ পাখি গীতহারা
হাসি তার ব্যথা-ম্লান, গতি তার ছন্দহীন, বদ্ধ তার ঝরনাপ্রাণধারা!
বুঝি নাই রক্ষীঘেরা রাক্ষস-দেউলে
এল কবে মরু-মায়াবিনী
সিংহাসন পাতিল সে কবে মোর মর্ম-হর্ম্যমূলে!
চরণ-শৃঙ্খল মম যখন কাটিতেছিল কাল –
কোন্ চপলার কেশ-জাল
কখন জড়াতেছিল গতিমত্ত আমার চরণে,
লৌহবেড়ি যত যায় খুলে, তত বাঁধা পড়ি কার কঙ্কণবন্ধনে!
আজ যবে পলে পলে দিন-গণা পথ-চাওয়া পথ
বলে – ‘বন্ধু, এই মোর বুক পাতা, আনো তব রক্ত-পথ-রথ –’
শুনে শুধু চোখে আসে জল,
কেমনে বলিব, ‘বন্ধু! আজও মোর ছিঁড়েনি শিকল!
হারায়ে এসেছি সখা শত্রুর শিবিরে
প্রাণ-স্পর্শমণি মোর,
রিক্ত-কর আসিয়াছি ফিরে!’...
যখন আছিনু বদ্ধ রুদ্ধ দুয়ার কারাবাসে
কত না আহ্বান-বাণী শুনিতাম লতা-পুষ্প-ঘাসে!
জ্যোতির্লোক মহাসভা গগন-অঙ্গন
জানাত কিরণ-সুরে নিত্য নব নব নিমন্ত্রণ!
নাম-নাহি-জানা কত পাখি
বাহিরের আনন্দ-সভায় – সুরে সুরে যেত মোরে ডাকি।
শুনি তাহা চোখ ফেটে উছলাত জল –
ভাবিতাম, কবে মোর টুটিবে শৃঙ্খল,
কবে আমি ওই পাখি-সনে
গাব গান, শুনিব ফুলের ভাষা
অলি হয়ে চাঁপা-ফুলবনে।
পথে যেত অচেনা পথিক,
রুদ্ধ গবাক্ষ হতে রহিতাম মেলি আমি তৃষ্ণাতুর আঁখি নির্নিমিখ!
তাহাদের ওই পথ-চলা
আমার পরানে যেন ঢালিত কী অভিনব সুর-সুধাগলা!
পথ-চলা পথিকের পায়ে পায়ে লুটাত এ মন,
মনে হত, চিৎকারিয়া কেঁদে কই –
‘হে পথিক, মোরে দাও ওই তব বাধামুক্ত অলস চরণ!
দাও তব পথচলা পা-র মুক্তি-ছোঁয়া,
গলে যাক এ পাষাণ, টুটে যাক ও-পরশে এ কঠিন লোহা!’
সন্ধ্যাবেলা দূরে বাতায়নে,
জ্বলিত অচেনা দীপখানি,
ছায়া তার পড়িত এ বন্ধন-কাতর দু-নয়নে!
ডাকিতাম, ‘কে তুমি অচেনা বধূ কার গৃহ-আলো?
কারে ডাক দীপ-ইশারায়?
কার আশে নিতি নিতি এত দীপ জ্বাল?
ওগো, তব ওই দীপ সনে
ভেসে আসে দুটি আঁখি-দীপ কার এ রুদ্ধ প্রাঙ্গণে!’ –
এমনই সে কত মধু-কথা
ভরিত আমার বদ্ধ বিজন ঘরের নীরবতা।
ওগো, বাহিরিয়া আমি হায় এ কী হেরি –
ভাঙা-কারা বাহু মেলি আছে মোর সারা বিশ্ব ঘেরি!
পরাধীনা অনাথিনি জননী আমার –
খুলিল না দ্বার তাঁর,
বুকে তাঁর তেমনই পাষাণ,
পথতরুছায় কেহ ‘আয় আয় জাদু’ বলি জুড়াল না প্রাণ!
ভেবেছিনু ভাঙিলাম রাক্ষস-দেউল
আজ দেখি সে দেউল জুড়ে আছে সারা মর্মমূল!
ওগো, আমি চির-বন্দি আজ,
মুক্তি নাই, মুক্তি নাই,
মম মুক্তি নতশির আজ নতলাজ!
আজ আমি অশ্রুহারা পাষাণ-প্রাণের কূলে কাঁদি –
কখন জাগাবে এসে সাথি মোর ঘূর্ণি-হাওয়া রক্ত-অশ্ব উচ্ছৃঙ্খল আঁধি!
বন্ধু! আজ সকলের কাছে ক্ষমা চাই –
শত্রুপুরীমুক্ত আমি আপন পাষাণপুরে আজি বন্দি ভাই! (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/mukto-pinjor/
|
1068
|
জীবনানন্দ দাশ
|
নব নবীনের লাগি
|
মানবতাবাদী
|
-নব নবীনের লাগি
প্রদীপ ধরিয়া আঁধারের বুকে আমার রয়েছি জাগি!
ব্যর্থ পঙ্গু খর্ব প্রাণের বিকল শাসন ভেঙে,
নব আকাঙক্ষা আশার স্বপনে হৃদয় মোদের রেঙে,
দেবতার দ্বারে নবীন বিধান-নতুন ভিক্ষা মেগে
দাঁড়ায়েছি মোরা তরুণ প্রাণের অরুণের অনুরাগী!
ঝড়ের বাতাস চাই।
-চারিদিক ঘিরে শীতের কুহেলি, -শ্মশানপথের ছাই,
ছড়ায়ে রয়েছে পাহাড় প্রমাণ মৃতের অস্থি খুলি,
কে সাজাবে ঘর দেউলের’পর কঙ্কাল তুলি তুলি?
সূর্য চন্দ্র নিভায়ে কে নেবে জরার চোখের ঠুলি!
-মরার ধরায় জ্যান্ত কখনও মাগিতে যাবে কি ঠাঁই!
ঘুমায়ে কে আছে ঘরে!
মৃতুশিশু-বুকে কল্যাণী পুরকামিনী কি আজ মরে!
কে আছে বসিয়া হতাশ উদাস অলস অন্যমনা?
দোদুল আকাশে দুলিয়া উঠিছে রাঙা অশনির ফণা,
বাজে বাদলের রঙ্গমল্লী. ঝঞ্ঝার ঝঞ্ঝনা!
ফিরিছে বালক-ঘর পলাতক ঝরা পালকের ঝড়ে!
আমরা অশ্বরোহী!-
যাযাবর যুবা, বন্দিনীদের ব্যথা মোরা বুকে বহি,
মানবের মাঝে যে দেবতা আছে আমরা তাহারে বরি ,
মোদের প্রাণের পূজার দেউলে তাহার প্রতিমা গড়ি,
চুয়া-চন্দন-গন্ধ বিলায়ে আমরা ঝরিয়া পড়ি,
সুবাস ছড়াই উশীরের মতো, ধূপের মতন দহি!
গাহি মানবের জয়!
-কোটি কোটি বুকে কোটি ভগবান আঁখি মেলে জেগে রয়!
সবার প্রাণের অশ্রু-বেদনা মোদের বক্ষে লাগে,
কোটি বুকে কোটি দেউটি জ্বলিছে-কোটি কোটি শিখা জাগে,
প্রদীপ নিভায়ে মানবদেবের দেউল যাহারা ভাঙে,
আমরা তাদের শস্ত্র, শাসন, আসন করিব ক্ষয়!
-জয় মানবের জয়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/891
|
88
|
আবিদ আনোয়ার
|
বিস্রস্ত মেঘদূত
|
প্রেমমূলক
|
আমি কোনো যক্ষ নই তবু কেন মনে হয় নির্বাসনে আছি,
আমার বধূয়া থাকে সম্মত রক্ষিতা হয়ে দূর অলকায়--
কাকে তবে পত্র লিখি! যদিও উত্তরমেঘ দক্ষিণেও যায়
এবং এখনও বুঝি: সতত ফোটায় হুল স্মৃতির মৌমাছি।আমার বিরহ নিয়ে কাব্য লিখে নেই আজ সেই কালিদাস--
তবু হে বিস্রস্ত মেঘ, যথাস্থানে পৌঁছে দিও আমার বারতা
অথবা তোমার কাছে আমি চাই আরো একটু বেশি উদারতা:
পারো তো ঝড়ের তেজে উড়িয়ে বাড়িতে নাও অধমের লাশ!
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/bisrosto-meghdoot/
|
1431
|
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
|
যাকে আমি কোনোদিন
|
প্রেমমূলক
|
যাকে আমি কোনোদিন ভালোবেসে করিনি আপন
সে এসেও ফিরে গেছে
অমল কৈশোর তাকে ডাকেনি কখনো
উদ্দাম যৌবন তাকে স্বপ্নাতুর চোখে
করেনি স্পন্দিত
পায়ের আওয়াজ তার ফিরে গেছে দূরগামী
স্টিমারের মতো ।
ফ্যাকাসে সূর্যের নিচে কয়েক বছর পরে
তার সাথে দেখা
কী নিঃসঙ্গতায় ডুবে আছে তার রাত্রি
দিন, শূন্য ব্যথিত হৃদয় , মনে হয় কৃষ্ণপক্ষের এক
থমথমে আকাশ যেন করুণ চিবুকে
ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে আবার কখনো
মনে হয় কালবোশেখের তাড়া খাওয়া পাখি
পড়ে আছে পত্রহীন নির্জন বনের ধারে একা ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1043
|
3823
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রানী, তোর ঠোঁট দুটি মিঠি
|
প্রেমমূলক
|
রানী, তোর ঠোঁট দুটি মিঠি
রানী, তোর মধুখানা দিঠি
রানী, তুই মণি তুই ধন,
তোর কথা ভাবি সারাক্ষণ।
দীর্ঘ সন্ধ্যা কাটে কী করিয়া?
সাধ যায় তোর কাছে গিয়া
চুপিচাপি বসি এক ভিতে
ছোটোছোটো সেই ঘরটিতে।
ছোটো হাতখানি হাতে করে
অধরেতে রেখে দিই ধরে।
ভিজাই ফেলিয়া আঁখিজল
ছোট সে কোমল করতল।Heinrich Hein
(অনুবাদ কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rani-tor-thot-duti-mithi/
|
283
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
খুকী ও কাঠবিড়ালি
|
ছড়া
|
কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?
বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?-ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক,
খাও একা পাও যেথায় যেটুক!
বাতাবি-নেবু সকল্গুলো
একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!
তবে যে ভারি ল্যাজ উঁচিয়ে পুটুস পাটুস চাও?
ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!কাঠবেড়ালি! বাঁদরীমুখী! মারবো ছুঁড়ে কিল?
দেখনি তবে? রাঙাদা'কে ডাকবো? দেবে ঢিল!
পেয়ারা দেবে? যা তুই ওঁচা!
তাইতো তার নাকটি বোঁচা!
হুতমো-চোখী! গাপুস গুপুস!
একলাই খাও হাপুস হুপুস!
পেটে তোমার পিলে হবে! কুড়ি-কুষ্টি মুখে!
হেই ভগবান! একটা পোকা যাস পেটে ওর ঢুকে!ইস। খেয়োনা মস্তপানা ঐ সে পাকাটাও!
আমিও খবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও!
কাঠবেড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি' হবে? বৌদি হবে? হুঁ,
রাঙা দিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না! উঁঃ!এ রাম! তুমি ন্যাংটা পুঁটো?
ফ্রকটা নেবে? জামা দু'টো?
আর খেয়ো না পেয়ারা তবে,
বাতাবি নেবুও ছাড়ুতে হবে!
দাঁত দেখিয়ে দিচ্ছ যে ছুট? অ-মা দেখে যাও!-
কাঠবেড়ালি! তুমি মর! তুমি কচু খাও!
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/khukii-o-kath-biralii/
|
2484
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
ছড়া - ৪
|
মানবতাবাদী
|
অ-য় অজগর তেড়ে আসুক
যা বলতে চায়, ঝেড়ে কাশুক
আ-এর আমে ভাগ দেবোনা
গা পেতে আর দাগ নেবো না
তাইলে কিসের ভয়?
দেখেনি কি পিচ্চিগুলো
দেশের মাটি দেশের ধুলো
ভালোবেসে বুকের জোরে
প্রাণটাকেও তুচ্ছ করে
আনতে পারে জয় ?
আজকে যতোই আসুক তেড়ে
চোয়াল ধরেই ফেলবো ফেড়ে
গিলে খাওয়ার হীন লালসা
বিষের বারুদ পেটে পোষা
হজম হবার নয় ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/chhora-4/
|
463
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মুক্তি-বার
|
প্রেমমূলক
|
লক্ষ্মী আমার! তোমার পথে আজকে অভিসার।
অনেক দিনের পর পেয়েছি মুক্তি-রবিবার।
দিনের পরে দিন গিয়েছে, হয়নি আমার ছুটি,
বুকের ভিতর মৌন-কাঁদন পড়ত বৃথাই লুটি।
আজ পেয়েছি মুক্ত হাওয়া,
লাগল চোখে তোমার চাওয়া,
তাই তো প্রাণে বাঁধ টুটেছে রুদ্ধ কবিতার।
তোমার তরে বুকের তলায়
অনেক দিনের অনেক কথা জমা,
কানের কাছে মুখটি থুয়ে
গোপন সে সব কইব প্রিয়তমা।
এবার শুধু কথায়-গানে রাত্রি হবে ভোর,
শুকতারাতে কাঁপবে তোমার নয়ন-পাতার লোর।
তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি,
মলিন মুখে ফুটবে হাসি,
হিম-মুকুরে উঠবে ভাসি করুণ ছবি তার।(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/muktibar/
|
213
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আজি মনে মনে লাগে হোরী
|
ভক্তিমূলক
|
আজি মনে মনে লাগে হোরী
আজি বনে বনে জাগে হোরী।।
ঝাঁঝর করতাল খরতালে বাজে
বাজে কংকন চুড়ি মৃদুল আওয়াজে
লচকিয়া আসে মুচকিয়া হাসে
প্রেম-উল্লাসে শ্যামল গৌরী।।
আজি কদম্ব তমাল রঙ্গে লালে লাল
হলো কৃষ্ণ ভ্রমর ভ্রমরী
রঙ্গের উজান চলে কালো যমুনার জলে
আবীর রাঙ্গা হলো ময়ূর-ময়ূরী।।
মোর হৃদি বৃন্দাবন যেন রাঙে
রাধা শ্যাম যুগল চরণ রাগে
ও চরণ ধূলি যেন ফাগ হ’য়ে মেশে রে
অন্তরে পড়ে মোর ঝরি’।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/aji-money-money-lagey-hori/
|
2589
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অনন্ত প্রেম
|
প্রেমমূলক
|
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার–
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলন কথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমিররজনী ভেদিয়া তোমারি মুরতি এসে
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি যুগলপ্রেমের স্রোতে
অনাদি কালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে, মিলনমধুর লাজে–
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।আজি সেই চির-দিবসের প্রেম অবসান লভিয়াছে,
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ, নিখিল প্রাণের প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে সকল প্রেমের স্মৃতি–
সকল কালের সকল কবির গীতি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ananto-prem/
|
3616
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিশ্বের হৃদয়-মাঝে
|
চিন্তামূলক
|
বিশ্বের হৃদয়-মাঝে
কবি আছে সে কে।
কুসুমের লেখা তার
বারবার লেখে—
অতৃপ্ত হৃদয়ে তাহা
বারবার মোছে,
অশান্ত প্রকাশব্যথা
কিছুতে না ঘোচে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bissher-hridoy-majhe/
|
3896
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শ্যামা
|
প্রেমমূলক
|
উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণ , গলায় পলার হারখানি ।
চেয়েছি অবাক মানি
তার পানে ।
বড়ো বড়ো কাজল নয়ানে
অসংকোচে ছিল চেয়ে
নবকৈশোরের মেয়ে ,
ছিল তারি কাছাকাছি বয়স আমার ।
স্পষ্ট মনে পড়ে ছবি । ঘরের দক্ষিণে খোলা দ্বার ,
সকালবেলার রোদে বাদামগাছের মাথা
ফিকে আকাশের নীলে মেলেছে চিকন ঘন পাতা ।
একখানি সাদা শাড়ি কাঁচা কচি গায়ে ,
কালো পাড় দেহ ঘিরে ঘুরিয়া পড়েছে তার পায়ে ।
দুখানি সোনার চুড়ি নিটোল দু হাতে ,
ছুটির মধ্যাহ্নে পড়া কাহিনীর পাতে
ওই মূর্তিখানি ছিল । ডেকেছে সে মোরে মাঝে মাঝে
বিধির খেয়াল যেথা নানাবিধ সাজে
রচে মরীচিকালোক নাগালের পারে
বালকের স্বপ্নের কিনারে ।
দেহ ধরি মায়া
আমার শরীরে মনে ফেলিল অদৃশ্য ছায়া
সূক্ষ্ম স্পর্শময়ী ।
সাহস হল না কথা কই ।
হৃদয় ব্যথিল মোর অতিমৃদু গুঞ্জরিত সুরে —
ও যে দূরে , ও যে বহুদূরে ,
যত দূরে শিরীষের ঊর্ধ্বশাখা যেথা হতে ধীরে
ক্ষীণ গন্ধ নেমে আসে প্রাণের গভীরে । একদিন পুতুলের বিয়ে ,
পত্র গেল দিয়ে ।
কলরব করেছিল হেসে খেলে
নিমন্ত্রিত দল । আমি মুখচোরা ছেলে
একপাশে সংকোচে পীড়িত । সন্ধ্যা গেল বৃথা ,
পরিবেশনের ভাগে পেয়েছিনু মনে নেই কী তা ।
দেখেছিনু , দ্রুতগতি দুখানি পা আসে যায় ফিরে ,
কালো পাড় নাচে তারে ঘিরে ।
কটাক্ষে দেখেছি , তার কাঁকনে নিরেট রোদ
দু হাতে পড়েছে যেন বাঁধা । অনুরোধ উপরোধ
শুনেছিনু তার স্নিগ্ধ স্বরে ।
ফিরে এসে ঘরে
মনে বেজেছিল তারি প্রতিধ্বনি
অর্ধেক রজনী ।
তার পরে একদিন
জানাশোনা হল বাধাহীন ।
একদিন নিয়ে তার ডাকনাম
তারে ডাকিলাম ।
একদিন ঘুচে গেল ভয় ,
পরিহাসে পরিহাসে হল দোঁহে কথা-বিনিময় ।
কখনো বা গড়ে-তোলা দোষ
ঘটায়েছে ছল-করা রোষ ।
কখনো বা শ্লেষবাক্যে নিষ্ঠুর কৌতুক
হেনেছিল দুখ ।
কখনো বা দিয়েছিল অপবাদ
অনবধানের অপরাধ ।
কখনো দেখেছি তার অযত্নের সাজ —
রন্ধনে ছিল সে ব্যস্ত , পায় নাই লাজ ।
পুরুষসুলভ মোর কত মূঢ়তারে
ধিক্কার দিয়েছে নিজ স্ত্রীবুদ্ধির তীব্র অহংকারে ।
একদিন বলেছিল , “ জানি হাত দেখা । ”
হাতে তুলে নিয়ে হাত নতশিরে গ নে ছিল রেখা —
বলেছিল , “ তোমার স্বভাব
প্রেমের লক্ষণে দীন । ” দিই নাই কোনোই জবাব ।
পরশের সত্য পুরস্কার
খণ্ডিয়া দিয়েছে দোষ মিথ্যা সে নিন্দার ।
তবু ঘুচিল না
অসম্পূর্ণ চেনার বেদনা ।
সুন্দরের দূরত্বের কখনো হয় না ক্ষয় ,
কাছে পেয়ে না পাওয়ার দেয় অফুরন্ত পরিচয় । পুলকে বিষাদে মেশা দিন পরে দিন
পশ্চিমে দিগন্তে হয় লীন ।
চৈত্রের আকাশতলে নীলিমার লাবণ্য ঘনাল ,
আশ্বিনের আলো
বাজাল সোনার ধানে ছুটির সানাই ।
চলেছে মন্থর তরী নিরুদ্দেশে স্বপ্নেতে বোঝাই ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sama/
|
2908
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কী পাই, কী জমা করি
|
চিন্তামূলক
|
কী পাই, কী জমা করি,
কী দেবে, কে দেবে,
দিন মিছে কেটে যায়
এই ভেবে ভেবে।
চ'লে তো যেতেই হবে—
কী যে দিয়ে যাব
বিদায় নেবার অাগে
এই কথা ভাবো! (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ki-pau-ki-joma-kori/
|
2582
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অতি দূরে আকাশের সুকুমার পান্ডুর নীলিমা
|
প্রকৃতিমূলক
|
অতি দূরে আকাশের সুকুমার পান্ডুর নীলিমা।
অরণ্য তাহারি তলে ঊর্ধ্বে বাহু মেলি
আপন শ্যামল অর্ঘ্য নিঃশব্দে করিছে নিবেদন।
মাঘের তরুণ রৌদ্র ধরণীর ‘পরে
বিছাইল দিকে দিকে স্বচ্ছ আলোকের উত্তরীয়।
এ কথা রাখিনু লিখে
উদাসীন চিত্রকর এই ছবি মুছিবার আগে। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/oti-dure-akasher-sukumar-pandur-nilima/
|
1369
|
তসলিমা নাসরিন
|
লজ্জা ২০০০
|
মানবতাবাদী
|
পূর্ণিমাকে ধর্ষণ করছে এগারোটি মুসলমান পুরুষ, ভর দুপুরে।
ধর্ষণ করছে কারণ পূর্ণিমা মেয়েটি হিন্দু।
পূর্ণিমাকে পূর্ণিমার বাড়ির উঠোনে ফেলে ধর্ষণ করছে তারা।
পূর্ণিমার মাকে তারা ঘরের খুঁটিতে বেঁধে রেখেছে,
চোখদুটো খোলা মার, তিনি দেখতে পাচ্ছেন তার কিশোরী কন্যার বিস্ফারিত চোখ,
যন্ত্রণায় কাতর শরীর।
পূর্ণিমার বোনটি উপুড় হয়ে পড়ে আছে মাকে শক্ত করে ধরে।
উঠোনে হুড়োহুড়ি, পূর্ণিমার মা পাথর-কণ্ঠে মিনতি করছেন, বাবারা, এক সাথে না,
একজন একজন কইরা যাও ওর কাছে।
এগারোটি উত্তেজিত পুরুষাঙ্গে তখন ধর্মের নিশান উড়ছে।
পূর্ণিমার কান্না ছাপিয়ে পূর্ণিমার মার, গ্রামের কুলবধূটির তুমুল চিৎকারে তখন দুপুর
দ্বিখণ্ডিত, তিনি ভিক্ষে চাইছেন বাবাদের কাছে, –‘যা করার আমারে করো, ওরে ছাইড়া দেও।’
মুসলমানেরা পূর্ণিমাকে ছেড়ে দেয়নি,
পূর্ণিমার মাকেও দেয়নি,
ছ বছর বয়সী ছোট বোনটিকেও দেয়নি।
কেন দেবে! সবাই যে ওরা হিন্দু!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2010
|
235
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!
|
মানবতাবাদী
|
আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!
গাইবি আবার কণ্ঠছেঁড়া বিষ-অভিশাপ-সিক্ত গান।
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
আয় রে আমার বাঁধন-ভাঙার তীব্র সুখ
জড়িয়ে হাতে কালকেউটে গোখরো নাগের
পীত চাবুক!
হাতের সুখে জ্বালিয়ে দে তোর সুখের বাসা ফুল-বাগান!
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
বুঝিসনি কি কাঁদায় তোরে তোরই প্রাণের সন্ন্যাসী!
তোর অভিমান হল শেষে তোরই গলার নীল ফাঁসি!
(তোর) হাসির বাঁশি আনলে বুকে যক্ষ্মা-রুগির রক্ত-বান,
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
ফানুস-ফাঁপা মানুষ দেখে, হায় অবোধ
ছুটে এলি ছায়ার আশায়,
মাথায় তেমনি জ্বলছে রোদ।
ফাঁকির ফানুস ছাই হল তোর,
খুঁজিস এখন রোদ-শ্মশান!
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
তুই যে আগুন, জল-ধারা চাস কার কাছে?
বাষ্প হয়ে যায় উড়ে জল সাগর-শোষা তোর আঁচে।
ফুলের মালার হুলের জ্বালায় জ্বলবি কত অগ্নি-ম্লান!
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
অগ্নি-ফণী! বিষ-রসানো জিহ্বা দিয়ে দিস চুমা,
পাহাড়-ভাঙা জাপটানি তোর – ভাবিস সোহাগ-সুখ-ছোঁওয়া!
মৃত্যুও যে সইতে নারে তোর সোহাগের মৃত্যু টান!
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!সুখের লালস শেষ করে দে, স্বার্থপর!
কাল-শ্মশানের প্রেত-আলেয়া! তুই কোথা বল
বাঁধবি ঘর?
ঘর-পোড়ানো ত্রাস-হানা তুই সর্বনাশের লাল-নিশান!
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
তোর তরে নয় শীতল ছায়া,
পান্থ-তরুর প্রেম-আসার,
তুই যে ঘরের শান্তি-শত্রু,
রুদ্র শিবের চণ্ড মার।
প্রেম-স্নেহ তোর হারাম যে রে
কসাই-কঠিন তুই পাষাণ!
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
সাপ ধরে তুই চাপবি বুকে
সইবে না তোর ফুলের ঘা,
মারতে তোকে বাজ পাবে লাজ
চুমুর সোহাগ সইবে না!
ডাক-নামে ডাক তোর তরে নয়,
আহ্বান তোর ভীম কামান।
আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!
ফণীমনসার কাঁটার পুরে
আয় ফিরে তুই কালফণী,
বিষের বাঁশি বাজিয়ে ডাকে নাগমাতা –
‘আয় নীলমণি!’
ক্ষুদ্র প্রেমের শূদ্রামি ছাড়,
ধর খ্যাপা তোর অগ্নি-বাণ!
আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ! (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/ai-re-abar-amar-chiro-tikto-pran/
|
4073
|
রুদ্র গোস্বামী
|
অসুখ
|
প্রেমমূলক
|
আজকাল কি যে উল্টোপাল্টা বায়না শিখেছে ও
যখন তখন এসে বলবে, ওর একটা আকাশ চাই।
আর আমিও বোকার মতো সব কাজ ফেলে
ওর চোখের মাপের আকাশ খুঁজতে থাকি!
শুধু কী তাই! তাতেও আবার ওর আপত্তি।
এটাতে বলে মেঘ ভরতি তো ওটাতে একঘেয়ে আলো।
গোধূলি আকাশ দেখলেই ও আবার লজ্জায় মরে যায়।
আমার হয়েছে জ্বালা, মেঘ থাকবে না রোদ থাকবে না
এমন একটা আকাশ, আমি কোত্থেকে খুঁজে আনব?
গোলাপ হবে অথচ কাঁটা হবে না!
রঙটাও আবার লাল? এমন আবার হয় নাকি!
একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না,
ভালবাসা বুকে এসে বসলেই মানুষ কেন পাখি হতে চায়!
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4623.html
|
598
|
গোলাম কিবরিয়া পিনু
|
মুক্তি
|
স্বদেশমূলক
|
মোল্লাচর থেকে কালাসোনা চর পর্যন্ত হেঁটেছে
কতদিন, বালুচর পাড়ি দিয়ে গিয়েছে উত্তরে
নদীতে সাঁতার
আঁধারের রাত শরীরে মিশানো শিহরনে
পার হয়ে গেছে শত্রু কবলিত রসুলপুরের
বাঁধ, ঠাঁই নিয়েছিল কখনো গোয়াল ঘরে
কখনো পলের পুন্জে, শীতকে করেছে
পরাজিত, উষ্ণ —
আশায় আশায়। ভাসানো ভেলায় গেছে
উজানে স্রোতের বিপরীতে
উলিপুর। দূর নয়, জনতার কাছাকাছি থেকে
রেখেছিল হাত রাইফেলে —
জনতার জন্যে, অরণ্যে ফুটেছে ফুল
বরেণ্যে বলেছে
তাঁকে — ‘মুক্তি’ ‘মুক্তি’।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/03/01/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%bf/
|
5886
|
সুফিয়া কামাল
|
হেমন্ত
|
প্রকৃতিমূলক
|
সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন্ পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে?
আনল ডেকে মটরশুঁটি,
খেসারি আর কলাই ফুলে
আনল ডেকে কুয়াশাকে
সাঁঝ সকালে নদীর কূলে।
সকাল বেলায় শিশির ভেজা
ঘাসের ওপর চলতে গিয়ে
হাল্কা মধুর শীতের ছোঁয়ায়
শরীর ওঠে শিরশিরিয়ে।
আরও এল সাথে সাথে
নুতন গাছের খেজুর রসে
লোভ দেখিয়ে মিষ্টি পিঠা
মিষ্টি রোদে খেতে বসে।
হেমন্ত তার শিশির ভেজা
আঁচল তলে শিউলি বোঁটায়
চুপে চুপে রং মাখাল
আকাশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/294
|
2251
|
মহাদেব সাহা
|
লিরিকগুচ্ছ - ০৩
|
প্রেমমূলক
|
কবির কি আছে আর
ভালোবাসা ছাড়া,
সমস্ত উজাড় করে
হাতে একতারা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1388
|
4924
|
শামসুর রাহমান
|
পিছুটান
|
সনেট
|
সর্বদাই ছিল পণ, যাই বলুক, সর্বক্ষণ
হাঁটবো সামনের দিকে, চলে যাবো সুউচ্চ চূড়ায়
আখেরে একদিন সূর্যাস্তের রঙ মেখে রুক্ষ গায়।
কস্মিনকালেও তাকাবো না ফিরে, মনের মতোন
পথ না-ই থাক, তবু হেঁটে যাবো, যখন তখন
একটি কি দু’টি ফল ছিঁড়ে নেবো ঝরণাতলায়
অঞ্জলি উঠবে ভরে জলে, শুনেছি রূপকথায়-
তাকালে পিছনপানে মানুষের দীপ্র দেহমনশিলীভূত হয়, কোথায় যে জন্মস্থান, কোন বাঁকে
নতুন জাহাজ ভিড়েছিল, কার ওষ্ঠে চুমু, খেয়ে
যাত্রারম্ভ-মুছে যায় সবকিছু। তাকাবো না ফিরে,
করেছি শপথ, তবু সিঁড়ি, অনেক মুখের ভিড়ে
স্বতন্ত্র একটি মুখ, দোচালা, বনানী গান গেয়ে
ওঠে; হায়, প্রত্যেকেরই মর্মঘাতী পিছুটান থাকে। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pichutan/
|
2284
|
মহাদেব সাহা
|
হৃদয়বোধ্য
|
প্রেমমূলক
|
আর কিছুই হই বা না হই
হই যেন ঠিক হৃদয়বোধ্য
এই যে বুকে অশ্রু-আবেগ,
জলের ধারা অপ্রতিরোধ্য;
আকাশে এই মেঘ জমে আর
পাতায় জমে শিশির কণা,
এই জীবনে তুমি আমার
যা কিছু এই সম্ভাবনা।
সব ছেড়েছি তুমিই কেবল
এখন আমার অগ্রগণ্য,
আর কী চাই হই যদি এই
তোমার ভালোবাসায় ধন্য!
সব মুছে যাই, সব ঝরে যায়
কালের ধারা অপ্রতিরোধ্য,
থাকবে না আর অন্য কিছুই
কেবল যা এই হৃদয়বোধ্য।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1327
|
663
|
জয় গোস্বামী
|
জননী এই আঙিনা
|
রূপক
|
জননী এই আঙিনা–আজ
শরীর বটচারা
বাতাস পথবালক, আর
মেয়েটি লণ্ঠন!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1736
|
6025
|
হেলাল হাফিজ
|
কবি ও কবিতা
|
চিন্তামূলক
|
কবির জীবন খেয়ে জীবন ধারণ করে
কবিতা এমন এক পিতৃঘাতী শব্দের শরীর,
কবি তবু সযত্নে কবিতাকে লালন করেন,
যেমন যত্নে রাখে তীর
জেনে-শুনে সব জল ভয়াল নদীর।
সর্বভূক এ কবিতা কবির প্রভাত খায়
দুপুর সন্ধ্যা খায়, অবশেষে
নিশীথে তাকায় যেন বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরী,
কবিকে মাতাল করে
শুরু হয় চারু তোলপাড়,
যেন এক নির্জন বনের কোনো হরিণের লন্ডভন্ড খেলা
নিজেরই ভিতরে নিয়ে সুবাসের শুদ্ধ কস্তুরী।
কবির কষ্ট দিয়ে কবিতা পুষ্ট হয়
উজ্জ্বলতা বাড়ায় বিবেক,
মানুষের নামে বাড়ে কবিতার পরমায়ু
অমরতা উভয়ের অনুগত হয়।
১০.২.৮১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/98
|
2286
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
অর্থ
|
সনেট
|
ভেবো না জনম তার এ ভবে কুক্ষণে,
কমলিনী-রূপে যার ভাগ্য-সরোবরে
না শোভেন মা কমলা সুবর্ণ কিরণে ;–
কিন্তু যে, কম্পনা-রূপ খনির ভিতরে
কুড়ায়ে রতন-ব্ৰজ, সাজায় ভূষণে
স্বভাষা, অঙ্গের শোভা বাড়ায়ে আদরে!
কি লাভ সঞ্চয়ি, কহ, রজত কাঞ্চনে,
ধনপ্রিয় ?বাঁধা রমা চির কার ঘরে ?
তার ধন-অধিকারী হেন জন নহে,
যে জন নিৰ্ব্বংশ হলে বিস্মৃতি-আঁধারে
ডুবে নাম, শিলা যথা তল-শূন্য দলে।
তার ধন-অধিকারী নারে মরিবারে–
রসনা-যন্ত্রের তার যত দিন বহে
ভাবের সঙ্গীত-ধ্বনি, বাঁচে সে সংসারে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/artha/
|
3432
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রথম দিনের সূর্য
|
রূপক
|
প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে_
কে তুমি?
মেলে নি উত্তর।বৎসর বৎসর চলে গেল।
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিমসাগরতীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়_
কে তুমি?
পেল না উত্তর।। (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prothom-diner-surjo/
|
5719
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
অন্তত একবার এ-জীবনে
|
রূপক
|
সুখের তৃতীয় সিঁড়ি ডানপাশে
তার ওপাশে মাধুর্যের ঘোরানো বারান্দা
স্পষ্ট দেখা যায়, এই তো কতটুকুই বা দূরত্ব
যাও, চলে যাও সোজা!
সামনের চাতালটি বড় মনোরম, যেন খুব চেনা
পিতৃপরিচয় নেই, তবু বংশ-মহিমায় গরীয়ান
একটা বাড় গাছ, অনেক পুরোনো
তার নিচে শৈশবের, যৌবনেরর মানত-পুতুল
এত ছায়াময় এই জায়গাটা, যেন ভুলে যাওয়া স্নেহ
ভুল নয়, ছায়া তো রয়েছে।
সদর দরজাটি একেবারে হাট করে রাখা
বড় বেশি খোলা যেন হিংসের মতন নগ্ন
কিংবা জঙ্গলের ফাঁসকল
আসলে তা নয়, পূর্বপুরুষের তহীর্ঘ পরিহাস
লেহার বলটুতে এত সুন্দর সাপানো এত দৃঢ়
আর বন্ধই হয় না!
ভিতরের তেজি আলো প্রথমে যে-সিঁড়িটা দেখায়
সেটা মিথ্যে নয়, দ্বিতীয়টি অন্য শরীকের
বাকি সব দিক, বলা-ই বাহুল্য, মেঘময়।
মনে করো, মল্লিক বাড়ির মতো মৃত কোনো পথিক স’াপত্য
ভাঙা শ্বেত পাথরেরা হাসে, কাঠের ভিতরে নড়ে ঘুণ
কত রক, পরিত্যক্ত দরদালান, চামচিকের থুতু
আর কিছু ছাতা-পড়া জলচৌকি, ঐখানে
লেগে আছে যৌনতার তাপ
ঐখানে লেগে আছে বড় চেনা নশ্বরতা।
তবু সবকিছু দূরে ছোঁয়া যায় না, এমন অসি’র মনোহরণ
মধ্যরাতে ডাকে, তোমাকে, তোমাকে!
দুপুরেও আসা যায়, যদি ভাঙে মোহ
অথবা ঘুমোয় ঈর্ষা পাগলের শুদ্ধতার মতো
তখন কী শান্ত, একা, হৃদয় উতলা
হে আতুর, হে দুঃখী, তুমি এক-ছুটে চলে যাও
ঐ মাধুর্যের বারান্দায়
আর কেউ না-দেখুক, অন্তত একবার এ জীবনে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/289
|
5640
|
সুকুমার রায়
|
পড়ার হিসাব
|
ছড়া
|
ফিরল সবাই ইস্কুলেতে সাঙ্গ হল ছুটি—
আবার চলে বই বগলে সবাই গুটি গুটি।
পড়ার পরে কার কি রকম মনটি ছিল এবার,
সময় এল এখন তারই হিসেবখানা দেবার।
কেউ পড়েছেন পড়ার পুঁথি, কেউ পড়েছেন গল্প,
কেউ পড়েছেন হদ্দমতন, কেউ পড়েছেন অল্প।
কেউ-বা তেড়ে গড়গড়িয়ে মুখস্থ কয় ঝাড়া,
কেউ-বা কেবল কাঁচুমাচু মোটে না দেয় সাড়া।
গুরুমশাই এসেই ক্লাসে বলেন, ‘ওরে গদাই,
এবার কিছু পড়লি? নাকি খেলতি কেবল সদাই?’
গদাই ভয়ে চোখ পাকিয়ে ঘাবড়ে গিয়ে শেষে
বল্লে, ‘এবার পড়ার ঠেলা বেজায় সর্বনেশে—
মামার বাড়ি যেম্নি যাওয়া অম্নি গাছে চড়া,
এক্কেবারে অম্নি ধপাস্— পড়ার মতো পড়া!’
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/porar-hishab/
|
3765
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যখনি যেমনি হোক জিতেনের মর্জি
|
ছড়া
|
যখনি যেমনি হোক জিতেনের মর্জি
কথায় কথায় তার লাগে আশ্চর্যি।অডিটর ছিল জিতু হিসাবেতে টঙ্ক,
আপিসে মেলাতেছিল বজেটের অঙ্ক;
শুনলে সে, গেছে দেশে রামদীন দর্জি,
শুনতে না-শুনতেই বলে “আশ্চর্যি’।যে দোকানি গাড়ি তাকে করেছিল বিক্রি
কিছুতে দাম না পেয়ে করেছে সে ডিক্রি,
বিস্তর ভেবে জিতু উঠল সে গর্জি–
“ভারি আশ্চর্যি।শুনলে, জামাইবাড়ি ছিল বুড়ি ঝিনাদায়,
ছ বছর মেলেরিয়া ভুগে ভুগে চিনা দায়,
সেদিন মরেছে শেষে পুরোনো সে ওর ঝি,
জিতেন চশমা খুলে বলে “আশ্চর্যি’। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jokhon-jemni-hok-jitener-morji/
|
5811
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নীরার জন্য কবিতার ভূমিকা
|
প্রেমমূলক
|
এই কবিতার জন্য আর কেউ নেই, শুধু তুমি, নীরা
এ-কবিতা মধ্যরাত্রে তোমার নিভৃত মুখ লক্ষ্য করে
ঘুমের ভিতরে তুমি আচমকা জেগে উঠে টিপয়ের
থেকে জল খেতে গিয়ে জিভ কামড়ে একমুহূর্ত ভাবলে
কে তোমার কথা মনে করছে এত রাত্রে–তখন আমার
এই কবিতার প্রতিটি লাইন শব্দ অক্ষর কম ড্যাস রেফ্
ও রয়ের ফুট্কি সমেত ছুটে যাচ্ছে তোমার দিকে, তোমার
আধোঘুমন্ত নরম মুখের চারপাশে এলোমেলো চুলে ও
বিছানায় আমার নিশ্বাসের মতো নিঃশব্দ এই শব্দগুলি
এই কবিতার প্রত্যেকটি অক্ষর গুণিনের বাণের মতো শুধু
তোমার জন্য, এরা শুধু তোমাকে বিদ্ধ করতে জানে
তুমি ভয় পেয়ো না, তুমি ঘুমোও, আমি বহু দূরে আছি
আমার ভয়ংকর হাত তোমাকে ছোঁবে না, এই মধ্যরাত্রে
আমার অসম্ভব জেগে ওঠা, উষ্ণতা, তীব্র আকাঙ্খা ও
চাপা আর্তরব তোমাকে ভয় দেখাবে না–আমার সম্পূর্ণ আবেগ
শুধু মোমবাতির আলোর মাতো ভদ্র হিম,
শব্দ ও অক্ষরের কবিতায়
তোমার শিয়রের কাছে যাবে–এরা তোমাকে চুম্বন করলে
তুমি টের পাবে না, এরা তোমার সঙ্গে সারারাত শুয়ে থাকবে
এক বিছানায়–তুমি জেগে উঠবে না, সকালবেলা তোমার পায়ের
কাছে মরা প্রজাপতির মতো এরা লুটোবে। এদের আত্মা মিশে
থাকবে তোমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে, চিরজীবনের মতো
বহুদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা হলে ঝর্ণার জলের মতো
হেসে উঠবে, কিছুই না জেনে। নীরা, আমি তোমার অমন
সুন্দর মুখে বাঁকা টিপের দিকে চেয়ে থাকবো। আমি অন্য কথা
বলার সময় তোমার প্রস্ফুটিত মুখখানি আদর করবো মনে মনে
ঘরভর্তি লোকের মধ্যেও আমি তোমার দিকে
নিজস্ব চোখে তাকাবো।
তুমি জানতে পারবে না–তোমার সম্পূর্ণ শরীরে মিশে আছে
আমার একটি অতি-ব্যক্তিগত কবিতার প্রতিটি শব্দের আত্মা।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1894
|
3469
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রেমের দূতকে পাঠাবে নাথ কবে
|
ভক্তিমূলক
|
প্রেমের দূতকে পাঠাবে নাথ কবে।
সকল দ্বন্দ্ব ঘুচবে আমার তবে। আর-যাহারা আসে আমার ঘরে
ভয় দেখায়ে তারা শাসন করে,
দুরন্ত মন দুয়ার দিয়ে থাকে,
হার মানে না, ফিরায়ে দেয় সবে।সে এলে সব আগল যাবে ছুটে,
সে এলে সব বাঁধন যাবে টুটে,
ঘরে তখন রাখবে কে আর ধরে
তার ডাকে যে সাড়া দিতেই হবে। আসে যখন, একলা আসে চলে,
গলায় তাহার ফুলের মালা দোলে,
সেই মালাতে বাঁধবে যখন টেনে
হৃদয় আমার নেরব হয়ে রবে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/459.html
|
5445
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
একটি মোরগের কাহিনী
|
রূপক
|
একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল
বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে,
ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায়
আরো দু'তিনটি মুরগীর সঙ্গে।
আশ্রয় যদিও মিলল,
উপযুক্ত আহার মিলল না।
সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে
গলা ফাটাল সেই মোরগ
ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত-
তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত।
তারপর শুরু হল তাঁর আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা;
আর্শ্চর্য! সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল
ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার!
তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার-
ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু'তিনটে মানুষ;
কাজেই দুর্বলতার মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে।
খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার!
অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে
বার বার চেষ্টা ক'রল প্রাসাদে ঢুকতে,
প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড।
ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে-
'প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার'!
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল,
একেবারে সোজা চলে এল
ধব্ধবে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে ;
অবশ্য খাবার খেতে নয়
খাবার হিসেবে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/255
|
2991
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গান (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
নাট্যগীতি
|
তুমি পড়িতেছ হেসে তরঙ্গের মতো এসে
হৃদয়ে আমার ।
যৌবনসমুদ্রমাঝে কোন্ পূর্ণিমায় আজি
এসেছে জোয়ার !
উচ্ছল পাগল নীরে তালে তালে ফিরে ফিরে
এ মোর নির্জন তীরে কী খেলা তোমার !
মোর সর্ব বক্ষ জুড়ে কত নৃত্যে কত সুরে
এসো কাছে যাও দূরে শতলক্ষবার ।
তুমি পড়িতেছ হেসে তরঙ্গের মতো এসে
হৃদয়ে আমার ।
জাগরণসম তুমি আমার ললাট চুমি
উদিছ নয়নে ।
সুষুপ্তির প্রান্ততীরে দেখা দাও ধীরে ধীরে
নবীন কিরণে ।
দেখিতে দেখিতে শেষে সকল হৃদয়ে এসে
দাঁড়াও আকুল কেশে রাতুল চরণে —
সকল আকাশ টুটে তোমাতে ভরিয়া উঠে ,
সকল কানন ফুটে জীবনে যৌবনে ।
জাগরণসম তুমি আমার ললাট চুমি
উদিছ নয়নে ।
কুসুমের মতো শ্বসি পড়িতেছ খসি খসি
মোর বক্ষ -' পরে ।
গোপন শিশিরছলে বিন্দু বিন্দু অশ্রুজলে
প্রাণ সিক্ত করে ।
নিঃশব্দ সৌরভরাশি পরানে পশিছে আসি
সুখস্বপ্ন পরকাশি নিভৃত অন্তরে ।
পরশপুলকে ভোর চোখে আসে ঘুমঘোর ,
তোমার চুম্বন , মোর সর্বাঙ্গে সঞ্চরে ।
কুসুমের মতো শ্বসি পড়িতেছ খসি খসি
মোর বক্ষ -' পরে । (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gan-choitali/
|
5503
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
ফসলের ডাকঃ ১৩৫১
|
মানবতাবাদী
|
কাস্তে দাও আমার এ হাতে
সোনালী সমুদ্র সামনে, ঝাঁপ দেব তাতে।
শক্তির উন্মুক্ত হাওয়া আমার পেশীতে
স্নায়ুতে স্নায়ুতে দেখি চেতনার বিদ্যুৎ বিকাশঃ
দু'পায়ে অস্থির আজ বলিষ্ঠ কদম;
কাস্তে দাও আমার এ হাতে।
দু'চোখে আমার আজ বিচ্ছুরিত মাঠের আগুন,
নিঃশব্দে বিস্তীর্ণ ক্ষেতে তরঙ্গিত প্রাণের জোয়ার
মৌসুমী হাওয়ায় আসে জীবনের ডাক;
শহরের চুল্লী ঘিরে পতঙ্গের কানে।
বহুদিন উপবাসী নিঃস্ব জনপদে,
মাঠে মাঠে আমাদের ছড়ানো সম্পদ;
কাস্তে দাও আমার এ হাতে।
মনে আছে একদিন তোমাদের ঘরে
নবান্ন উজাড় ক'রে পাঠিয়েছি সোনার বছরে,
নির্ভাবনার হাসি ছড়িয়েছি মুখে
তৃপ্তির প্রগাঢ় চিহ্ন এনেছি সম্মুখে,
সেদিনের অলক্ষ্য সেবার বিনিময়ে
আজ শুধু কাস্তে দাও আমার এ হাতে।
আমার পুরনো কাস্তে পুড়ে গেছে ক্ষুদার আগুনে,
তাই দাও দীপ্ত কাস্তে চৈতন্যপ্রখর-
যে কাস্তে ঝল্সাবে নিত্য উগ্র দেশপ্রেমে।
জানি আমি মৃত্যু আজ ঘুরে যায় তোমাদেরও দ্বারে,
দুর্ভিক্ষ ফেলেছে ছায়া তোমাদের দৈনিক ভাণ্ডারে;
তোমাদের বাঁচানোর প্রতিজ্ঞা আমার,
শুখু আজ কাস্তে দাও আমার এ হাতে।
পরাস্ত অনেক চাষী; ক্ষিপ্রগতি নিঃশব্দ মরণ-
জ্বলন্ত মৃত্যুর হাতে দেখা গেল বুভুক্ষুর আত্মসমর্পণ,
তাদের ফসল পড়ে, দৃষ্টি জ্বলে সুদূরসন্ধানী
তাদের ক্ষেতের হাওয়া চুপিচুপি করে কানাকানি-
আমাকেই কাস্তে নিতে হবে।
নিয়ত আমার কানে গুঞ্জরিত ক্ষুদার যন্ত্রণা,
উদ্বেলিত হাওয়া আনে মাঠের সে উচ্ছ্বসিত ডাক,
সুস্পষ্ট আমার কাছে জীবনের সুতীব্র সংকেতঃ
তাই আজ একবার কাস্তে দাও আমার এ হাতে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/278
|
780
|
জসীম উদ্দীন
|
ও আমার গহিন গাঙের নায়া
|
প্রেমমূলক
|
ও আমার গহিন গাঙের নায়া,
ও তুমি অফর বেলায় লাও বায়া যাওরে-
কার পানে বা চায়া।
ভাটির দ্যাশের কাজল মায়ায়,
পরাণডা মোর কাইন্দা বেড়ায়রে-
আবছা মেঘে হাতছানি দ্যায়,
কে জানি মোর সয়া।
এই না গাঙের আগের বাঁকে
আমার বধূর দ্যাশ;
কলাবনের বাউরি বাতাস
দোলায় মাথার ক্যাশ;
কওই খবর তাহার লাইগা,
কাইন্দা মরে এক অভাইগারে;
ও তার ব্যথার দেয়া থাইকা থাইকা
ঝরে নয়ন বায়া।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/797
|
2545
|
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
|
কাজের ছেলে
|
ছড়া
|
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল,চিনি-পাতা দৈ,
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।
পথে হেঁটে চলি, মনে মনে বলি, পাছে হয় ভুল;
ভুল যদি হয়, মা তবে নিশ্চয়,”
” ছিঁড়ে দেবে চুল।
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।
বাহবা বাহবা – ভোলা ভুতো হাবা খেলিছে তো বেশ!
দেখিব খেলাতে, কে হারে কে জেতে, কেনা হলে শেষ।
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
ডিম-ভরা বেল, দু’টা পাকা তেল, সরিষার কৈ।
ওই তো ওখানে ঘুরি ধরে টানে, ঘোষদের ননী;
আমি যদি পাই, তা হলে উড়াই আকাশে এখনি!
দাদখানি তেল, ডিম-ভরা বেল, দুটা পাকা দৈ,
সরিষার চাল, চিনি-পাতা ডাল, মুসুরির কৈ!
এসেছি দোকানে-কিনি এই খানে, যত কিছু পাই;
মা যাহা বলেছে, ঠিক মনে আছে, তাতে ভুল নাই!
দাদখানি বেল, মুসুরির তেল, সরিষার কৈ,
চিনি-পাতা চাল, দুটা পাকা ডাল, ডিম ভরা দৈ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/432
|
4777
|
শামসুর রাহমান
|
তিনজন যুবকের গর্জে ওঠা
|
মানবতাবাদী
|
(হরিপদ দত্ত প্রিয়বরেষু)চোখের সম্মুখে আমি বড়সড় একটি বাড়িকে
অতি দ্রুত খসে যেতে দেখছি এখন। এমন তো
ভুলেও ভাবিনি কোনওকালে। বেশ কিছুকাল আগে,
যখন সৌন্দর্য নিয়ে বাড়িটিকে দাঁড়াতে দেখেছি,
করেছি কত না গল্প দিকে দিকে, জনে জনে, আজ
সেই স্মৃতি আমাকে করছে নিত্য ব্যঙ্গ।এ বাড়ির কতিপয় বিভ্রান্ত বাসিন্দা, স্বার্থান্বেষী
যারা, তারা নিভৃত, রহস্যময় স্থানে
গভীর নিশীথে ব’সে নিজেদের মাঝে বাড়িটির
কিছু অংশ অতিশয় ধড়িবাজ ধনীদের হাতে
তুলে দিতে হয়েছে তৎপর। কিয়দ্দূরে বৃক্ষডালে
ব’সে-থাকা পাখিরা বাড়িটির কষ্ট দেখে হাহাকার ক’রে ওঠেগাছের পাখিরা দূর থেকে দ্যাখে বাড়িটির যত
ভালো বাসিন্দার নিত্য-নৈমিত্তিক জীবনধারার
ছবি, কিয়দ্দূর থেকে দ্যাখে আর ভাবে-এই
মানুষেরা এমন দুর্দিনে আচানক
কোথায় দাঁড়াবে গিয়ে? নেবে ঠাঁই? অথচ এরাই
একদিন বাড়িঅলাদের নানা কাজে বাড়িয়েছে হাত।‘এই কি বিধান, হায়? ন্যায় নীতি?’-ব’লে
ওরা শূন্য আসমানে তাকায়, অথচ তিনজন
যুবকের কণ্ঠ গর্জে উঠে করে উচ্চারণ- ‘আর অনাচার,
অবিচার মেনে নিয়ে উঁচু মাথা নিচু
করবো না, করবো না। এই বাণী নুয়ে-পড়া সব
অধিবাসীদের সুপ্ত শোণিতে তরঙ্গ নেচে বলে, ‘হবে জয়। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tinjon-juboker-gorje-otha/
|
5284
|
শামসুর রাহমান
|
সুযোগই দেবো না
|
মানবতাবাদী
|
তোমরা কারা ভিড় জমিয়েছো
এই আগুনের ফুল্কি-ঝরানো দুপুরে? তোমাদের
চেহারা দেখে কেমন যেন ভড়কে যেতে হয়। বিশ্বাস
করো, শত চেষ্টাতেও এমন
মনোভাবকে তাড়ানো যায় না ,
বুক ধক্ ধক্ করতেই থাকে। বড় শীতল হয়ে পড়ি।তোমরা যারা প্রকৃতই বাইরে এবং ভেতরে
সত্যি-সত্যি সুশীল, যাদের দৃষ্টিতে কোমলতা এবং
আচরণে বিচ্ছুরিত সভ্যতার আভা, তাদের
দীর্ঘায়ু এবং কল্যাণ কামনা করি সর্বদা,
তোমাদের চরিত্রের আলোয়
উদ্ভাসিত হোক বন্ধু-বান্ধবের, সমাজের আসর।এখনও তোমাদের পায়ের সঙ্গে
পা মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চাই পুবের সূর্যোদয়ের
দিকে। শরীরে যতই ধুলোর পলেস্তারা লাগুক,
আমার এই চলা থামাবো না।
ঝড় যত তাণ্ডবই ছুড়ে দিক আমার দিকে,
এই যাত্রা অবিচল থাকবে পুরোদমে।আমার শরীরের ক্ষতের দিকে তাকিয়ে কাউকে
করুণাময় বাক্য উচ্চারণের সুযোগই দেবো না। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sujogi-debo-na/
|
4438
|
শামসুর রাহমান
|
উৎসব
|
চিন্তামূলক
|
আজ উৎসবের দিন; চতুর্দিক খুব ঝলমলে
পোশাকে সেজেছে যেন। মিহি বৃষ্টি, দূর আকাশের
ঘন আবলুসী মেঘ আনন্দ-চঞ্চল মানুষের
মুখ ম্লান করে দিতে ব্যর্থ হলো। কোন্ যাদুবলে
এ শহর গলায় আলোর নেকলেস নিয়ে জ্বলে
এমন আন্ধারে? শুধু আমি এ আনন্দ বাসরের
ছটা থেকে বঞ্চিত, ফলত আজ নিজের ঘরের
কোণে একা মগ্ন ধ্যানে; অন্যেরা মেতেছে কোলাহলে।উৎসবের ঝর্নাধারা কী করে করাবে ফুল স্নান
আমাকে যখন আমি বিচ্ছেদের স্রোতের কামড়ে
ক্ষয়ে যাচ্ছি প্রতিক্ষণ? যার নাম করি উচ্চারণ
বারবার জাগরণে, এমনকি স্বপ্নের ভেতরে,
যে আমার অন্তরে বাহিরে নিত্য গুঞ্জরিত গান,
সে নিজেই অন্যত্র উৎসব হয়ে জ্বলে সর্বক্ষণ। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/utsob/
|
4369
|
শামসুর রাহমান
|
আমার এ শহরের চোখ
|
চিন্তামূলক
|
কোথাও ছিল না বৃষ্টিধারা, এ আমার শহরের
অশ্রুপাত; কেঁদে কেঁদে শহরের চোখ দু’টো লাল
আর অতিশয় ফোলা কেন
পারে না বলতে কেউ। কেন তার বুক ঠেলে এত
কান্না ওঠে প্রহরে প্রহতে
এ শহর নিজেও জানে না। আমি শুধু কবিতায়
কিছু অশ্রুকণা জড়ো করি অবেলায় ছোট ঘরে
অরক্ষিত, একা।কখন জানালা দিয়ে প্রজাপতি ঘরে ঢুকে পড়ে
ফুলের পাপড়ির মতো, বসে
আমার গ্রীবায়, যেন সে অশ্রয়প্রার্থী, অসহায়,
নিজেকে বাঁচাতে চায় নিপীড়ন থেকে। এখন সে
কম্পমান, যেমন চারার পাতা দুরন্ত হাওয়ায়।
আমি কি পারব দিতে ওকে বরাভয়?
লুকিয়ে রাখব তাকে স্বপ্নের ভেতর,
আমার নিমগ্ন কবিতার ক্যামোফ্লোজে?যা বলি বিশ্বাস করো-ফুরফুরে চড়ুই অথবা
মাছরাঙা, নিভৃত কোকিল,
দ্যুতিময় মাছ, বৃক্ষলতা, ফলমূল, ফুল
এখন কেউই নিরাপদ নয় আর।যখন বয়স ছিল উনিশ কি বিশ,
তখন থেকেই আমি লিখছি কবিতা
প্রায় ভূতগ্রস্ততায়। কত রাত শব্দের সন্ধানে
প্রত্যুষের কাকের আওয়াজে
চমকে উঠেছি, আধা বোঁজা চোখে স্বপ্নের নগ্নতা
লেপ্টে গেছে কতবার। আমার প্রতিটি
কবিতাকে ওরা সারিবদ্ধ কয়েদীর মতো দাঁড়
করিয়ে ফুলেটবিদ্ধ করে আজ গোধূলিবেলায়
আমার আপন ভালবাসা
সজীব ফলের মতো গহন সবুজ পত্রালিতে
আচ্ছাদিত। কখনও কখনও তার চোখে
চোখ রেখে মনে হয়, এই রূপ কোথাও দেখিনি
কোনো কালে; এমনকি আমি তার চলে যাওয়ার ছায়ার
সঙ্গে প্রেমে ম’জে আছি। ‘এইতো এসেছি
ব’লে সে যখন দাঁড়ায় সম্মুখে, তার দিকে
ঘাতকের হাত প্রসারিত দেখে ভয়ে কেঁপে উঠি।ক’দিন বা আছি আর? তারপর অনন্তের পথে
ছায়া হ’য়ে হেঁটে যাওয়া, হেঁটে যাওয়া, শুধু হেঁটে যাওয়া।
অথচ এখনই বন্ধ দরজাটা ঠেলে
ভেতরে আসতে চায় হন্তারক নরকের কুকুরের মতো
দাঁত নখ ভেজাতে শোণিতে। আমার এ শহরের
চোখ ভরা রক্তাশ্রুতে রাত্রিদিন; কে দেবে মুছিয়ে
তার চোখ চুমোর জ্যোৎস্নায়, কে সে? বলতে পারি না।
তার পদধ্বনি বাজল কি আজ দিগন্তের বুকে
গুণীর তানের মতো? আমার শঙ্কিত কাঁধে দৃঢ়তা অর্পণ
ক’রে বলে উঠবে কি, এ শহরে মৃত্যুর উৎসব বাঁচবে না?শহর ঘুমিয়ে ছিল পরিশ্রান্ত শ্রমিকের মতো।
কবি তার সদ্য লেখা কবিতার পঙ্ক্তিমালা জিভে
খেলিয়ে খেলিয়ে বিছানায় গেছে, স্বপ্নের ভেতর
নদীর কিনারে ব’সে গোণে ক’টি সারস নেমেছে
বালুচরে। নতুন কবিতা তাকে দেয় না ঘুমোতে
মাঝে মাঝে, দপ দপ করে চোখে, শিরায় শিরায়।অকস্মাৎ ২৪টি ঘন্টা বেজে ওঠে দেশ জুড়ে,
কবি শোনে ছন্দোময় ভোরে লেখার টেবিলে ব’সে।
সাহস শব্দটি আজ বিশাল হরফে লেখা হ’ল
সারা দেশে, স্বাধীনতা ২৪টি অনিন্দ্য গোলাপ
হ’য়ে ফোটে জনতার হৃদয়ে এবং খলখল
অন্ধকার কেটে চলে নিরন্তর আলোর তরণী।ঘন্টাধ্বনি প্রতিবাদী কবিতার মতো জাগরণী
মহামন্ত্র শোনায়, নিমিষে শহরে চোখ থেকে
ঘুম মুছে যায়, চেয়ে দেখে ২৪টি মুখ তাজা
ভোরবেলাকার মতো। নদীতে পা ধুয়ে কবি হেঁটে
যায় কিয়দ্দূরে নিতে আলোকিত প্রকৃত নিশ্বাস,
২৪ সংখ্যাটি যে ইন্দ্রজালে হ’লে ইতিহাস। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-e-shohorer-chokh/
|
4986
|
শামসুর রাহমান
|
বন্ধু তুমি অকম্পিত হাতে
|
প্রেমমূলক
|
ডাকতে হয় না, নিজেই সে আসে, টোকা দেয়
মনে, স্মৃতি যার নাম। কখনো কখনো
মুখোমুখি বসে,
পা দোলায় শিস দেয় দোয়েলের মতো কখনোবা
চোখের পানির মতো কী অপ্রতিরোধ্য এসে পড়ে
সবকিছু এলোমেলো করে, এমনকি
পীড়নের ভয়কে তফাৎ যাও বলে। মনে পড়ে,
সেলিম তোমার কথা মাঝে মাঝে খুব
মনে পড়ে। সে কবে প্রথম দেখা হয়েছিল আমাদের?
সেই উনিশশো আটান্নোয়
পুরানো ঢাকায়, অতি পুরাতন বেতার ভবনে।মনে পড়ে বহুদিন গল্পচ্ছলে সিগারেট পুড়ে ছাই হ’তে
দেখেছি আঙুলে
তোমার এবং কত কিছুই তো ছাইয়ের গাদায় ঠাঁই নেয়
ক্রমান্বয়ে, এমনকি অমৃতের সন্তানও সহজে।যে হাসি তোমার ঠোঁটে প্রায়শই বেলা-অবেলায়
দেখেছি ঝিকিয়ে উঠতে, তাতে
বিষাদে করেছি লক্ষ্য দ্রুত পুড়ে-যাওয়া
মানুষের কাহিনীর ঈষৎ ঝলক। অনেকেই, বিশেষত
শিল্পীরা পোড়ায় নিজেদের;
কিন্তু এরকম সাততাড়াতাড়ি কেউ আমার ধরনে
করে না আগুনে সমর্পণ। বন্ধু, তুমি
অকম্পিত হাতে
মোমবাতিটার দু’দিকেই খেলাচ্ছলে
তৈরি করেছিলে শিখা। (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bondhu-tumi-okompito-hate/
|
5864
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
সাবধান
|
মানবতাবাদী
|
আমি সেই মানুষ, আমাকে চেয়ে দ্যাখো
আমি ফিরে এসেছি
আমার কপালে রক্ত;
বাষ্প-জমা গলায় বাস-ওল্টানো ভাঙা রাস্তা দিয়ে
ফিরে এলাম-
আমি মাছহীন ভাতের থালার সামনে বসেছি
আমি দাঁড়িয়েছি চালের দোকানের লাইনে
আমার চুলে ভেজাল তেলের গন্ধ
আমার নিশ্বাস-।
রাস্তায় একটা বাচ্চা ছেলে বমি করলো
আমি ওর মৃত্যুর জন্য দায়ী-
পিছনের দরজায় বস্তাভর্তি টাকা ঘুষ নিচ্ছিল যে লোকটা
আমি তার হত্যার জন্য দায়ী-
আমি পুলিশের বোকামি দেখে প্রকাশ্যে হাসাহাসি করবো
আমি নেহেরুর উইল সম্পর্কে শুনবো ট্রামের লোকের ইয়ার্কি
কম্যুনিষ্টদের শ্লোগানের শবযাত্রা দেখে আমার দয়াও হবে না;
আমি ভয়ের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে জেগে উঠবো মমতায়
আমি মেয়েটির কাছে গিয়ে নিঃশব্দে মুখ চুম্বন করবো
সশরীরে বিছানায় শুয়ে দু’জনে কাঁদবো নানা ধরনে
পরদিন ঠিকঠাক বেঁচে উঠতে হবে, এই জেনে।
আমার গলা পরিস্কার, আমি স্পষ্ট করে কথা বলবো
সমস্ত পৃথিবীর মেঘলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ
ক্রোধ ও কান্নার পর স্নান সেরে শুদ্ধভাবে
আমি
আজ উচ্চারণ করবো সেই পরম মন্ত্র
আমাকে চাঁচাতে না দিলে এ পৃথিবীও আর বাঁচবে না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1904
|
686
|
জয় গোস্বামী
|
দাহ
|
প্রেমমূলক
|
শরীর তো আছে।
কিন্তু শরীরের মধ্যে আর অস্থিগুলি নেই।
নরম উলের বল গড়িয়ে চলেছি
পা দিয়ে যে দিকে মারবে,সেদিকেই যাব
অগ্নিকুন্ডে গিয়ে পড়লে হতভম্ব বসে থাকব।বলব না : জ্বলেছি।
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/daha/
|
4468
|
শামসুর রাহমান
|
একটি অনুপস্থিতি
|
সনেট
|
পৃথিবী এখনো খুব সজীব সুন্দর ভোরবেলা
নতুন মাছের মতো কেলিপরায়ণ, নীলাকাশে
সারস প্রফুল্ল ওড়ে, ঝিলে নামে নিভৃত আশ্বাসে
তৃষ্ণার্ত কোমল প্রাণী বনপ্রান্তে পথিক একেলা
হেঁটে যায়, গেরস্থের উঠোনে শিশুর রাঙা খেলা
জমে অপরাহ্নে রোজ। নিশুত নিশীথে স্বপ্ন আসে
পরাবাস্তবের হরিণের মতো স্মৃতির আভাসে,
ছাদের কার্নিশে একা পাখি ডাকে গভীর সুরেলা।পৃথিবী আনন্দময় বস্তুত এখনো। সুর কাটে
মাঝে মধ্যে, তবু এক দীপ্তিমান উল্লসিত সুর
বয়ে যায় সবখানে। শুধু আমি মানুষের হাটে
একাকী বিষণ্ণ ঘুরি এবং যখন যেখানেই
যাই, সত্তা জুড়ে বাজে সর্বক্ষণ আর্ত অশ্বক্ষুর,
কেননা আমার বিশ্বে আজ আর সে নেই, সে নেই। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-onuposthiti/
|
3609
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিশুদাদা– দীর্ঘবপু, দৃঢ়বাহু, দুঃসহ কর্তব্যে নাহি বাধা
|
চিন্তামূলক
|
বিশুদাদা–
দীর্ঘবপু, দৃঢ়বাহু, দুঃসহ কর্তব্যে নাহি বাধা,
বুদ্ধিতে উজ্জ্বল চিত্ত তার
সর্বদেহে তৎপরতা করিছে বিস্তার।
তন্দ্রার আড়ালে
রোগক্লিষ্ট ক্লান্ত রাত্রিকালে
মূর্তিমান শক্তির জাগ্রত রূপ প্রাণে
বলিষ্ঠ আশ্বাস বহি আনে,
নির্নিমেষ নক্ষত্রের মাঝে
যেমন জাগ্রত শক্তি নিঃশব্দ বিরাজে
অমোঘ আশ্বাসে
সুপ্ত রাত্রে বিশ্বের আকাশে।
যখন শুধায় মোরে, দুঃখ কি রয়েছে কোনোখানে
মনে হয়, নাই তার মানে–
দুঃখ মিছে ভ্রম,
আপন পৌরুষে তারে আপনি করিব অতিক্রম।
সেবার ভিতরে শক্তি দুর্বলের দেহে করে দান
বলের সম্মান। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bishudada-dirghobopu-drirobahu-dusshoho-kortobbye-nahi-badha/
|
3244
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুর্লভ জন্ম
|
সনেট
|
একদিন এই দেখা হয়ে যাবে শেষ,
পড়িবে নয়ন-’পরে অন্তিম নিমেষ।
পরদিনে এইমত পোহাইবে রাত,
জাগ্রত জগৎ-’পরে জাগিবে প্রভাত।
কলরবে চলিবেক সংসারের খেলা,
সুখে দু:খে ঘরে ঘরে বহি যাবে বেলা।
সে কথা স্মরণ করি নিখিলের পানে
আমি আজি চেয়ে আছি উৎসুক নয়ানে।
যাহা-কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়,
সকলই দুর্লভ ব’লে আজি মনে হয়।
দুর্লভ এ ধরণীর লেশতম স্থান,
দুর্লভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ।
যা পাই নি তাও থাক্, যা পেয়েছি তাও,
তুচ্ছ ব’লে যা চাই নি তাই মোরে দাও। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/durlov-jonmo/
|
1749
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
অলৌকিক
|
রূপক
|
অলৌকিক এইভাবে ঘটে।
হঠাৎ একদিন ফাঁক হয়ে যায় সাদাসিধে ঝিনুক,
ভিতর থেকে ঠিকরে বেরোয় সাদা জ্যোৎস্না।
সেদিন মুক্তোর মতো গড়িয়ে এলে আমার হাতে।
অমনি বদলে গেল দৃশ্য।
আমার ডান দিকে ছিল মেঘলা দিন
হয়ে গেল ডালিম-ফাটানো রোদ।
আর বাঁদিকে ছিল ইটের পাঁজা
হয়ে গেল লাল টালির ডাকবাংলো।
অলৌকিক এইভাবে ঘটে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1202
|
5890
|
সুবোধ সরকার
|
একটি
|
মানবতাবাদী
|
বাবা জার্মান, মা থাকত এন্টালির গলিতে
জন্মের সময় ওজন : ২১/২ পাউন্ড, ডাকনাম জিনা
বাড়ির মেয়েরা ডাকে ফুচু, ফুচুমণি, ফুচান…
গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, লেজ নেই।দিনের বেলায় আট টুকরো গরুর মাংস
রাতে একবাটি দুধ। এখন বয়স তিন
আজ পর্যন্ত কাউকে কামড়ায়নি।শুধু গেল বার ভোটের আগে
ধুতিপরা এক ভদ্রলোক এসেছিলেন
করজোড়ে ভোট চাইতেজিনা তাকে তেড়ে গিয়েছিল রাস্তা পর্যন্ত
কামড়ায়নি, কামড়ালে, জিনার বায়োডেটা বলছে :
জিনা নিজেই পাগল হয়ে যেত।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a7%8b%e0%a6%a1%e0%a7%87%e0%a6%9f%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%81/
|
4687
|
শামসুর রাহমান
|
গোরস্তানে কোকিলের করুণ আহ্বান
|
চিন্তামূলক
|
এই যে আমি কে জানে কতদিন, কতকাল পর
সোঁদা মাটির ভেতর থেকে আচানক বেরিয়ে এসে
তাকাচ্ছি এদিক সেদিক, কে এই আমি?
এমন সুনসান এলাকায় কোন্ মানব বলে দেবে কে আমি?থমথমে নৈশ প্রহরে মাটির বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে
কেমন যেন বেখাপ্পা মনে হলো
নিজেকে। আত্মপরিচয় কোথায় কখন যে হঠাৎ
লুপ্ত হয়েছে! নামহীন, ঠিকানাবিহীন, কে
বলবে?মাংসহারা, হাড়সর্বস্ব আমার শরীর কবর থেকে
বেরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নিকেলের মৃত রোদ
আমার প্রবীণ কঙ্কালের সঙ্গে
ইয়ার্কি মারার মতলবে ঘন ঘন
চুমো খায়, সুড়সুড়ি দেয় মাংসবিহীন
বগলে। আমার কঙ্কাল হাঁটতে থাকে দিশাহীন।আমার করুণ কঙ্কাল বিরান গোরস্তানে
অদৃশ্য মহিমায় পথ চলে, দেহলগ্ন মাটি
খসে না কোথাও। হঠাৎ দু’টি কাক কোত্থেকে
উড়ে এসে সওয়ার হয় আমার কাঁধে। চেঁচাতে
চেষ্টা করে প্রাণপণে, অথচ নীরবতা! ভর করে
ওদের ওপর। হঠাৎ তিনটি কোকিল কিয়দ্দূরে
মহানন্দে সুরের ঝরনা সৃষ্টি করে। আমার
কঙ্কাল কারও চোখে পড়ুক না পড়ুক,
কোকিলের সুর সজীব।গলায় বজ্রপ্রায় আওয়াজ এনে
নিজের উপস্থিতি প্রচারে শত চেষ্টা
সত্ত্বেও ব্যর্থ হই বারবার। শরীরের ভীষণ
শুষ্ক, ভঙ্গুর হাড়গুলো শীতার্ত গাছের
পাতার মতো ঝরতে থাকে। আকাশে
নক্ষত্রের ঝাঁক মেতে ওঠে উপহাসে। বিরান
গোরস্তানের স্তব্ধতাকে মাঝে-মধ্যে সঙ্গীতের
আভা দিয়ে
সাজিয়ে তোলে কোকিলের করুণ আহ্বান। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/gorostane-kokiler-korun-ahban/
|
2838
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
এসো হে এসো সজল ঘন বাদলবরিষনে
|
প্রকৃতিমূলক
|
এসো হে এসো, সজল ঘন,
বাদলবরিষনে–
বিপুল তব শ্যামল স্নেহে
এসো হে এ জীবনে।
এসো হে গিরিশিখর চুমি,
ছায়ায় ঘিরি কাননভূমি–
গগন ছেয়ে এসো হে তুমি
গভীর গরজনে।ব্যথিয়ে উঠে নীপের বন
পুলকভরা ফুলে।
উছলি উঠে কলরোদন
নদীর কূলে কূলে।
এসো হে এসো হৃদয়ভরা,
এসো হে এসো পিপাসা-হরা,
এসো হে আঁখি-শীতল-করা
ঘনায়ে এসো মনে।১৭ ভাদ্র, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/eso-he-eso-sojol-ghono-badolborisone/
|
3033
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চাও যদি সত্যরূপে
|
চিন্তামূলক
|
চাও যদি সত্যরূপে
দেখিবারে মন্দ–
ভালোর আলোতে দেখো,
হোয়ো নাকো অন্ধ। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chao-jodi-sotyorup/
|
2172
|
মহাদেব সাহা
|
তোমাকে যাইনি ছেড়ে
|
প্রকৃতিমূলক
|
তোমাকে যাইনি ছেড়ে আম-জাম
কাঁঠালের বন,
অশ্বত্থ-হিজল-বট, ঘুঘু-ডাকা চৈত্রের দুপুর-
এই খেয়াঘাট পার হয়ে কতো আত্মীয়-বান্ধব
চলে গেছে,
এই গাঁয়ের হালট ধরে চলে গেছে নয়াদা
ও রাঙা বৌদি
আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে
কাকিমা ও তার কিশোরী মেয়েটি;
সেই কবে মামাদের এতো বড়ো রায়বাড়ি
শূন্য হয়ে গেছে-
শিশুদি ও উষা পিসিমার কথা আজকাল
বড়ো মনে পড়ে যায়-
তারা কে এখন কোথায় আছেন, শুনেছি
কয়েক বছর আগে শিলিগুড়িতে গত হয়েছেন
আমার জেঠতুতো বড়ো ভাই,
শৈশবের সেইসব সঙ্গী, কতো প্রিয় মুখ
এভাবে এখন দূর স্মৃতি হয়ে গেছে;
তবু তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই, কার
ভয়ে, কার রক্তচক্ষু দেখে,
লোমশ নখর দেখে বলো-
একুশের বইমেলা, শহীদ মিনার,
পয়লা বৈশাখের বটমূল, রমনার মাঠ-
আমার কতো যে প্রিয় তুমি এই বঙ্গোপসাগর,
করতোয়া, ফুলজোড়, অথই উদাস বির,
পুকুরের শাদা রাজহাঁস,
নিবিড় বটের ছায়া, ঘন বাঁশবন।
তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই পিতার সমাধি
বন্ধুর কবর, আজানের ধ্বনি
বাউলের ভজন্তকীর্তন্ত
তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই ধানক্ষেত, মেঠোপথ,
স্বদেশের সবুজ মানচিত্র,
তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই প্রিয় নদী,
প্রিয় ঘাস, ফুল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/476
|
4787
|
শামসুর রাহমান
|
তুমি আমাকে দিয়ে বলিয়ে নাও
|
প্রেমমূলক
|
না, কোনো লুকোছাপা নেই, কখনো কখনো
আমার কোনো কোনো অব্যক্ত ভাবনা
দূর শতাব্দীর আফ্রিকার অন্ধকারের মতো
গুমরে ওঠে, যেন বোবার গোঙানি।
বহু নিশুত রাতের মদিরা আমার শিরায় শিরায়
জমতে থাকে; রোমকূপ ফুঁড়ে প্রবাহিত হ’তে চায়
দিন-দুপুরে,
অথচ কোনো বিস্ফোরণ ঘটে না। কে যেন
শরবিদ্ধ প্রাণীর মতো সারাক্ষণ ভাষাহীন
আর্ত স্বর হ’য়ে আহত উন্মত্ততায় ঘুরতে থাকে
আমার আস্তিত্বের পরতে পরতে।প্রায়শ নিশ্চুপ থাকি, মুখে কথা সরে না সহজে;
নিজের এই অক্ষমতাকে সুফীদের আত্মগত নিস্তব্ধতায়
নিমজ্জন
এবং উপনিষদের দ্বিতীয় পাখির অবিরাম,
অকস্পিত দৃষ্টিপাতের
দৃষ্টান্তের আড়ালে ঢাকতে চেষ্টাশীল আমি।
মাঝে-মধ্যে ভাষার প্রয়োজনীয়তা
অবান্তর মনে হয়। মনের ভেতর ডুবসাঁতার কেটে
মনোমীনের সন্ধানহ শেয়।অথচ তুমি কখনো তোমার চোখের চাউনি,
হাতের নড়া,
শরীরের কোনো বিশেষ ভঙ্গি দিয়ে
এই আমাকে কেমন বাঙ্ময় ক’রে তোলো।
আমার এই চোখ, কান, নাক, হাত,
রোমরাজিময় বুক,
প্রায়-মূক মুখ কথা বলতে থাকে
অবিরল কখনো কখনো।
এই তো সেদিন দুপুরবেলা কী-যে বললে তুমি আর
আমার
কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হলো কথায় ঝর্ণাধারা, ‘এই
ভূমণ্ডল, এই সৌরলোক, বিশ্বমানব-
সবকিছুই আমার।‘ তোমাকে প্রথমবার ‘তুমি আমার’
কথাটি বলতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দের কুশাঙ্কুরে
ভীষণ বিদ্ধ হয়েছিলাম
আড়ষ্ট হ’য়ে এসেছিল আমার জিহ্বা;
কিন্তু সেদিন আমি বার বার উচ্চারণ করলাম
‘তুমি আমার,।
তখন আমাকে প্রগল্ভ মনে হ’তে পারতো।তুমি আমাকে দিয়ে বলিয়ে নাও এমন সব কথা,
যা বলবার আগেও আমার মধ্যে ছিল না।
হ্যাঁ, তুমি আমার ভেতর থেকে বের ক’রে আনো
অভাবিত অনেক কিছু। এবং কতবার তুমি
একটি ইঙ্গিতে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছ অনেক
কবিতা।
তুমি কি আমার কাছে ছিঁচকাঁদুনে প্রেমের পদ্য
প্রত্যাশা করো?
এই ধরো, ন্যাকা ন্যাকা যত সব বুলি যা মুহূর্তেই
অপরিণত উঠতি তরুণ তরুণীদের মন ভেজায়,
স্যাঁত স্যাঁত ক’রে তোলে। না, প্রিয়তমা,
আমাকে দিয়ে ওসব কিছু হবার নয়।অব্যশই আমাকে তুমি কথাদের মাঝে নিয়ে যাবে,
তুমি দেখবে আমাকে খুব কাছ থেকে,
আমার হাত নিয়ে খেলা করবে আর
আমার মগজের কোষ থেকে, হৃদয়ের তন্ত্রী থেকে
টপ্ টপ ক’রে ঝরবে শব্দাবলি
কবিতার খাতার সফেদ পাতায়, সেগুলো
আমার নিজের মতো ক’রেই সাজিয়ে নেব
রাতের শেষ প্রহরে কিংবা আকাশের উষ্ঠে যখন
প্রত্যুষের চুম্বন অঙ্কিত হয়। (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tumi-amake-die-bolie-nao/
|
1851
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
প্রজাপতি ঢুকেছে ভিতরে
|
চিন্তামূলক
|
সেই কবে বাল্যকালে বৃষ্টি হয়েছিল
সেই কবে বৃষ্টিজলে ভিজেছিল লাজুক কদম
সেই কবে কদমের ডালে এক পাখি বসেছিল
সেই পাখি বলেছিলপৃথিবীর ভিতরে আরেক
গর্ভকেশরের মতো গোপনীর পৃথিবী রয়েছে
সেই পৃথিবীর খোঁজে চাঁদ সদাগর
ঝড়ে-জলে ডুবে যাবে জেনেও নিজের নৌবহর
সমুদ্রে ভাসিয়েছিল, ঘর পোড়া আগুনের মতো সাদা ফেনা
সেই ফেনা পুষেছিল বড় বড় রাঘব বোয়াল
সেই সব বোয়ালের পেট চিরে পাওয়া গেল
মানুষের আংটি ভর্তি স্বপ্ন, সুখ, সোনার বিষাদ
সেই সব আংটি, স্বপ্ন, দুঃখ তছনছ করে
প্রজাপতি ঢুকেছে ভিতরে।
পৃথিবীর অতীতের, আগামীকালের
অনেক অজ্ঞাতপ্রায় পান্ডুলিপি, স্থাপত্যের ভাঙা মন্দিরের
ভাস্কর্যের টুকরো-টাকরা
অনেক বিচিত্র কাঁথা, আজন্মের স্মৃতি দিয়ে বোনা
অনেক রঙীন পট, চালচিত্র, প্রতিমা, পুতুল, পোড়ামাটি
নিভৃতে, সাজানো আছে, এ সংবাদ শুনে
ছেচল্লিশ বছরের কোনো এক যুবকের পাঁজরের হাড় ফুটো করে
প্রজাপতি ঢুকেছে ভিতরে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1308
|
488
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
রুবাইয়াত-ই- হাফিজ- ২
|
ভক্তিমূলক
|
তোমার হাতের সকল কাজে
হবে শুভ নিরবধি-
প্রিয়, তোমার ভাগ্যবশে
নিয়তির এই নির্দেশ যদি;
দাও তাহলে পান করে নিই
তোমার দেওয়া শিরীন শরাব,
হ'লেও হব চির-অমর,
হয়ত ও-মদ সুধা-নদী!!
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rubaiyat-e-hafiz-2/
|
1689
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
শুধু যাওয়া
|
চিন্তামূলক
|
কক্ষনো কি তোমাদের কাউকে
এমন কথা বলেছিলুম যে, আমি
পৌঁছে গেছি?
তা হলে তোমরা ধরেই নিয়ো যে,
কথাটা মিথ্যে,
কিংবা আমার বিশ্বাসে অনেক
ভেজাল ছিল।
আমি শুধু যাবার কথাই বলি,
পৌঁছবার কথা বলি না।
আসলে, পৌঁছনোটা যে খুব জরুরী ব্যাপার,
এমন বিশ্বাসই আমার নেই।
যাওয়াতে যারা বিশ্বাস করো,
তারা আমার সঙ্গে চলো।
যারা পৌঁছতে চাও, তারা
এসো না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1611
|
2231
|
মহাদেব সাহা
|
মানবিক বৃক্ষ
|
মানবতাবাদী
|
তোমার মতন কোনো গাছ নেই স্বয়ংসম্পূর্ণ
এই উদার বৃক্ষমূলে নতজানু নবীন তাপস
ক্ষমায় স্নেহে ও প্রেমে কখনো হিংসায়
তুমি বাঁধো বিপুল মজ্জায় তাকে
রক্তে রক্তে তুমি তার লাল তরু, কিংশুক-অশোক
তোমার ছায়ায়, করতলে আভূমি আকাশ নত,
নীল গঢ় নিসর্গসম্ভার
তোমার মতন কোনো পরিপূর্ণ গাছ নেই,
কখনো গভীর রাতে দুঃস্বপ্নে সন্ত্রস্ত যুবা
খোঁজে যে-স্নিগ্ধ গাছ
মনে হয় যদি পাই ডালে ডালে জ্যোৎ্লারাত আলোকিত
ক্রিসমাস বৃক্ষের বিক্রম
কিংবা ফেরারী মানুষ অকস্মাৎ ঘরে ফিরে যার নিচে দাঁড়ায়
স্বস্তিতে
রাস্তায়, পার্কে, গহন অরণ্যে তেমন গাছ কোথায়?
বনজ বৃক্ষরাজি বড়ো ম্লান, একা, নির্জন
ভয়াবহভাবে নীরব, নিরপরাধ, সহানুভূতিহীন
সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে যেন হৃতরাজ্য দণ্ডিত সুলতন,
অধোবধনে দেখছে সব, তার করণীয় কিছু নেই,
এই অক্ষম গাছের নিচে আমাদের এতোচটুকু বয়স কমে না
দুঃখে-সন্তাপে হৃদয়ে হৃদয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ মৈনাক
কাঁদি, চিৎকারে বলি
অধঃপতিত যুবার এই শাসি-ভোগের আগে
তুমি তাকে উদ্ধার করো, গাছ
তোমার জন্মগত অদৃশ্য পোশাক খুলে ফেলো গাছ,
দাঁড়াও সম্মুখে
উজ্জ্বল নীল বাহু মেলে আলোড়নে আজন্ম জড়াও
গাছ তবু চিবরদিন নিঃশব্দ ও অমানবিক।
তোমার মতন কোনো গাছ নেই,
সীতা, তুমি গাছ, জীবনের পরিপূর্ণ তরু
অরণ্যে, প্রকৃতিতে দাঁড়ালেই বুঝি
সীতা, তোমার মতন কোনো গাছ নেই
এমন সম্পূর্ণ, মানবিক।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1476
|
3474
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ফাগুন এল দ্বারে
|
প্রেমমূলক
|
ফাগুন এল দ্বারে,
কেহ যে ঘরে নাই—
পরান ডাকে কারে
ভাবিয়া নাহি পাই। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/fagun-elo-dare/
|
4419
|
শামসুর রাহমান
|
ইতিহাসের মোড়ে দাঁড়িয়ে ডাকছি
|
স্বদেশমূলক
|
দাঁড়িয়ে এক মহান উৎসবের মুখোমুখি। ভিড়, কোলাহল, আনন্দোচ্ছ্বাস,
আলোকসজ্জা ইত্যাদির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ লাগে। এই
আনন্দ, এই হাস্যরোল কি স্পর্শ করছে না আমাকে? উদ্যাপিত হচ্ছে
মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তী। আমাদের গৌরবের বিপুল সূর্যোদয় সারা দেশের
নরনারী এবং শিশুকে চুম্বন করছে। আমি সেই চুম্বনের স্বাদ পাচ্ছি আমার সমগ্র
সত্তায়। এখন আমি গোলাপ, বুলবুল, ভ্রমর এবং স্বর্ণলতাকে ডেকে আনতে
পারি এখানে। আমার ঈষৎ সঙ্কেতে ওরা কথা বলে উঠতে পারে, গাইতে পারে
অনিন্দ্য গান। ওদের ঐকতানে আজকের এই উৎসব পাবে স্বতন্ত্র মাত্রা। এই
তো ওরা উপস্থিত হয়েছে বরণীয় অতিথির মতো। ওরা আমার ইশারার জন্য
অপেক্ষমাণ। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না ওদের। আমার ইঙ্গিত এখনি,
এই মুহূর্তেই, পৌঁছে যাবে ওদের কাছে। বেজে উঠবে বিউগল, ওস্তাদের
সেতার, রাখালের বাঁশি। আমার চোখ, আমার ওষ্ঠ, কাঁধ, বুক, দু’টি হাত
উৎসবের আলোয় উদ্ভাসিত, আমি রূপান্তরিত হচ্ছি একটু-একটু করে। আমি
কি এখন মিকেলেঞ্জোলোর গড়া কোনও ভাস্কর্য যা অপরূপ সৃজনশীলতায়
দেদীপ্যমান, জীবনের ছন্দে স্পন্দিত? আমি নিজেই এক অনন্য উৎসব, যেমন
গুণী সুরের ঝরনা বইয়ে দিয়ে নিজেই হয়ে যান কোনও তান?
মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তী উৎসবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, আমি
কি কথা বলাতে পারবো গত সিকি শতাব্দীকে? পঁচিশটি বছর কি ফোয়ারা হয়ে
উঠবে অপ্রতিরোধ্য উচ্ছ্বাসে? পঁচিশটি বছর কণ্ঠ থেকে কোনও কথা ঝরানোর
আগেই ঈশান কোণ থেকে এক খণ্ড মেঘ আমার ওপর ঝুঁকে বললো, “যে
মানুষটি একজন উৎকৃষ্ট মৃৎশিল্পীর মতো স্বদেশকে প্রতিমা করে তুলতে
চেয়েছিলেন, চার বছর অস্তমিত না হতেই তাঁকে গ্রাস করল তাঁরই সৃষ্টি!” আজ
উৎসবের আনন্দমুখর প্রহরে এই সত্য ভুলে থাকা অপরাধ, গ্রীবা বাড়িয়ে
বললো সরোবরের শ্বেতশুভ্র রাজহাঁস। বাঁশবনের আড়াল থেকে গহিন গাঙের
ঢেউয়ে শব্দের মতো কণ্ঠস্বরে কে যেন বললেন, ‘দুর্ভাগা দেশে এরকমই হয়।
আমাদের কি মনে নেই তাঁর কথা, যিনি মানবগণের অন্তরে ভিন্ন এক রাজ্য
প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়েছিলেন? তাঁরই মাথায় কাঁটার মুকুট পরিয়ে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ
করা হয়েছিল গলগোথায় চোর-ডাকাতদের সঙ্গে। স্বর্নরাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের
এই তো পুরস্কার।
সোনার বাংলা ছেয়ে গেছে গুণ্ডায়-নিখাদ গুণ্ডা, রাজনৈতিক গুণ্ডা, ধর্মীয় গুণ্ডা,
সাহিত্যিক গুণ্ডা আর সাংস্কৃতিক গুণ্ডার তাণ্ডবে উৎকৃষ্টগণ গা ঢাকা দিয়েছেন
অন্তরালে। তাঁদের কথামালা, পরামর্শ গড়াগড়ি যায় আবর্জনার স্তূপে, পশুর
মলে। প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন যেসব
লেখক তাঁদের কলম ছিনিয়ে নেওয়া ষড়যন্ত্র চলছে। রাজনীতি-বিদ্বেষী
বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক কেউ কেউ বস্তাপচা ধোঁয়াটে থিওরি কপচিয়ে কেউ
কেউ ধর্মীয় আখড়ায় ফতোয়া বিতরণ করে চমৎকার মশগুল। অনেকে আবার
‘ফুলচন্দন পড়ুক তাদের মুখে’ বলে ঢোলক বাজাচ্ছে ঋতুতে ঋতুতে।
যে-দেশে রজব আলী চাষির সানকিতে আজ কী শাদা কী লাল কোনও ভাতই
ফুটে থাকে না ফুলের মতো, রজব আলীর বউ রাহেলা ছেঁড়া শাড়ি পড়ে হি
হি কাঁপে শীতে যে-দেশে, যে-দেশে নাছোড় অপুষ্টিতে দৃষ্টি হারায় অগণিত
শিশু, যে-দেশে ফতোয়াবাজদের মধ্যযুগীয় উৎপীড়নে, পাথর ও দোররার
আঘাতে সিলেটের নূরজাহান এবং তারই মতো আরও কোনও কোনও বঙ্গ-
দুহিতার মৃত্যুকালীন আর্তনাদ রোদে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভেজে, বেনো জলে
ভাসে, যে-দেশে ইয়াসমিনের মতো কোমল মেয়ে পুলিশের পৈশাচিক হি-হি
হা-হা ধর্ষণের পরে খুন হয়, সে-দেশে আধুনিকতা এবং উত্তর-আধুনিকতা
নিয়ে বুধবৃন্দ ও কবিকুলের বাহাস এক তুমুল তামাশা ছাড়া আর কিছুই মনে
হয় না। যে-দেশে নকল নায়কের স্তবে অনেকে মাতোয়ারা, ভুল নেতা নিয়ে
হৈ-হুল্লোড়, নাচানাচি যে-দেশে লক্ষণীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্রমাগত নীরব
নিষ্ক্রমণ, যে-দেশে শহীদ জননীর ভাবমূর্তিতে বিষ্ঠা ছুঁড়ে দেয় দালালের দল,
সে-দেশে কোনও উৎসব উদ্যাপন কেমন খাপছাড়া মনে হয়।
তবু মুক্তিযুদ্ধের, স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত মহান উৎসবের
বড়ো প্রয়োজন আমাদের। এই শহর, যাকে আমি আবাল্য ভালোবাসি, এই
স্বাধীন, প্রিয় শহর আমাকে ঠেলে দিচ্ছে বিপন্নতায়, বুঝিবা পাঠাতে চায়
নির্বাসনে, যেমন মহাকবি দান্তেকে পাঠিয়েছিল তাঁর নিজের শহর। চৌদিক
থেকে নিরাপত্তাহীনতার আঁকশি ঘিরে ধরছে আমাকে, তবু আমি আজও অসীম
সাহসে টিকে আছি আপন বসতিতে। এই তো আমি দাঁড়িয়ে আছি এই
আলো-ঝলসিত শহরে পঁচিশ বছরকে কথা বলানোর আশায়। আমার চৌদিকে
প্রবল জনস্রোত। সুপ্রিয়া গৌরী, তুমি এসে দেখে যাও এই অতুলনীয়
দৃশ্যাবলি। আমি আজ ইতিহাসের মোড়ে দাঁড়িয়ে তোমাকে ডাকছি। আমাদের
এগিয়ে যেতে হবে সকল বাধা ডিঙিয়ে, পশ্চাৎপদতার কুহকের হাতছানি
এড়িয়ে নতুন সভ্যতার দিকে। বিজয়োৎসব আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে
অনির্বাণ মশাল। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/itihaser-more-darie-dakchi/
|
2321
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
গোধূলি
|
ভক্তিমূলক
|
(১) কোথা রে রাখাল-চূড়ামণি?
গোকুলের গাভীকুল, দেখ,সখি,শোকাকুল,
না শুনে সে মুরলীর ধ্বনি!
ধীরে ধীরে গোষ্ঠে সবে পশিছে নীরব,—
আইল গোধূলি, কোথা রহিল মাধব! (২) আইল লো তিমির যামিনী;
তরুডালে চক্রবাকী বসিয়া কাঁদে একাকী--
কাঁদে যথা রাধা বিরহিণী!
কিন্তু নিশা অবসানে হাসিবে সুন্দরী;
আর কি পোহাবে কভু মোর বিভাবরী?(৩) ওই দেখ উদিছে গগনে—
জগত-জন-রঞ্জন— সুধাংশু রজনীধন,
প্রমদা কুমুদী হাসে প্রফুল্লিত মনে;
কলঙ্কী শশাঙ্ক, সখি, তোষে লো নয়ন--
ব্রজ-নিষ্কলঙ্ক-শশী চুরি করে মন।(৪) হে শিশির, নিশার আসার!
তিতিও না ফুলদলে ব্রজে আজি তব জলে,
বৃথা ব্যয় উচিত গো হয় না তোমার;
রাধার নয়ন-বারি ঝরি অবিরল,
ভিজাইবে আজি ব্রজে—যত ফুলদল!(৫) চন্দনে চর্চ্চিয়া কলেবর,
পরি নানা ফুলসাজ, লাজের মাথায় বাজ;
মজায় কামিনী এবে রসিক নাগর;
তুমি বিনা, এ বিরহ, বিকট মূরতি,
কারে আজি ব্রজাঙ্গনা দিবে প্রেমারতি?(৬) হে মন্দ মলয় সমীরণ,
সৌরভ ব্যাপারী তুমি, ত্যজ আজি ব্রজভূমি--
অগ্নি যথা জ্বলে তথা কি করে চন্দন?
যাও হে, মোদিত কবলয় পরিমলে,
জুড়াও সুরতক্লান্ত সীমন্তিনী দলে!(৭) যাও চলি, বায়ু-কুলপতি,
কোকিলার পঞ্চস্বর বহ তুমি নিরন্তর--
ব্রজে আজি কাঁদে যত ব্রজের যুবতী!
মধু ভণে, ব্রজাঙ্গনে, করো না রোদন,
পাবে বঁধু---অঙ্গীকারে শ্রীমধুসূদন!(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/godhuli/
|
783
|
জসীম উদ্দীন
|
ও বাজান চল যাই চল
|
মানবতাবাদী
|
ও বাজান, চল, যাই চল
মাঠে লাঙল বাইতে,
গরুর কাঁধে লাঙল দিয়া
ঠেলতে ঠেলতে ঠেলতে।
মোরা লাঙল খুঁড়ে ফসল আনি
পাতাল পাথার হইতে,
সব দুনিয়ার আহার জোগাই
সেই না ফসল হইতে,
আর আমরা কেন খাইতে না পাই
পারো কি কেউ কইতে।
বউ দিয়াছে গলায় দড়ি সাতদিন না খাইতে,
ভুখের জ্বালা সইতে, কবরখানায় রইতে;
এবার লাঙর দিয়ে খুঁড়ি মাটি তারি দেখা পাইতে।
মোরা, মাঠ চিরি ভাই! লাঙল দিয়ে,
মোদের বুক চেরা তার চাইতে,
মাঠ চিরিলে ফসল ফলে,
ও ফসল ফলে না বুক হইতে।
এবার মাটি খুঁড়বরে ভাই, ফসল নাহি পাইতে,
ও মাটি খুঁড়ে দেখব আর কতদূর কবরখানায় যাইতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/747
|
522
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সব্যসাচী
|
স্বদেশমূলক
|
ওরে ভয় নাই আর, দুলিয়া উঠেছে হিমালয়-চাপা প্রাচী,
গৌরশিখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী!
দ্বাপর যুগের মৃত্যু ঠেলিয়া
জাগে মহাযোগী নয়ন মেলিয়া,
মহাভারতের মহাবীর জাগে, বলে ‘আমি আসিয়াছি।’
নব-যৌবন-জলতরঙ্গে নাচে রে প্রাচীন প্রাচী!
বিরাট কালের অজ্ঞাতবাস ভেদিয়া পার্থ জাগে,
গান্ডীব ধনু রাঙিয়া উঠিল লক্ষ লাক্ষারাগে!
বাজিছে বিষাণ পাঞ্চজন্য,
সাথে রথাশ্ব, হাঁকিছে সৈন্য,
ঝড়ের ফুঁ দিয়া নাচে অরণ্য, রসাতলে দোলা লাগে,
দোলায় বসিয়া হাসিছে জীবন মৃত্যুর অনুরাগে!
যুগে যুগে ম’রে বাঁচে পুনঃ পাপ দুর্মতি কুরুসেনা,
দুর্যোধনের পদলেহী ওরা, দুঃশাসনের কেনা!
লঙ্কাকান্ডে কুরুক্ষেত্রে,
লোভ-দানবের ক্ষুধিত নেত্রে,
ফাঁসির মঞ্চে কারার বেত্রে ইহারা যে চির-চেনা!
ভাবিয়াছ, কেহ শুধিবে না এই উৎপীড়নের দেনা?
কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,
আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।
আজি সম্রাট্ কালি সে বন্দী,
কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দী!
কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,
তারি বুক ফেটে আসে নৃসিংহ যারে করে পদাহত!
আজ যার শিরে হানিছে পাদুকা কাল তারে বলে পিতা,
চির-বন্দিনী হতেছে সহসা দেশ-দেশ-নন্দিতা।
দিকে দিকে ঐ বাজিছে ডঙ্কা,
জাগে শঙ্কর বিগত-শঙ্কা!
লঙ্কা সায়রে কাঁদে বন্দিনী ভারত-লক্ষ্মী সীতা,
জ্বলিবে তাঁহারি আঁখির সুমুখে কাল রাবণের চিতা!
যুগে যুগে সে যে নব নব রূপে আসে মহাসেনাপতি,
যুগে যুগে হ’ন শ্রীভগবান্ যে তাঁহারই রথ-সারথি!
যুগে যুগে আসে গীতা-উদ্গাতা
ন্যায়-পান্ডব-সৈন্যের ত্রাতা।
অশিব-দক্ষযজ্ঞে যখনই মরে স্বাধীনতা-সতী,
শিবের খড়গে তখনই মুন্ড হারায়েছে প্রজাপতি!
নবীন মন্ত্রে দানিতে দীক্ষা আসিতেছে ফাল্গুনী,
জাগো রে জোয়ান! ঘুমায়ো না ভূয়ো শান্তির বাণী শুনি-
অনেক দধীচি হাড় দিল ভাই,
দানব দৈত্য তবু মরে নাই,
সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, ব’সে ব’সে কাল গুণি!
জাগো রে জোয়ান! বাত ধ’রে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি!
দক্ষিণ করে ছিঁড়িয়া শিকল, বাম করে বাণ হানি’
এস নিরস্ত্র বন্দীর দেশে হে যুগ-শস্ত্রপাণি!
পূজা ক’রে শুধু পেয়েছি কদলী,
এইবার তুমি এস মহাবলী।
রথের সুমুখে বসায়ো চক্রী চত্রুধারীরে টানি’,
আর সত্য সেবিয়া দেখিতে পারি না সত্যের প্রাণহানি।
মশা মেরে ঐ গরজে কামান-‘বিপ্লব মারিয়াছি।
আমাদের ডান হাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি!’
মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি,
টিকি দাড়ি নিয়ে আজো বেঁচে আছি!
বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,
যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার ম’রে বাঁচি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/544
|
523
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সর্বহারা
|
রূপক
|
ব্যথার সাতার-পানি-ঘেরা
চোরাবালির চর,
ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস
সেই চরে তোর ঘর?
শূন্যে তড়িৎ দেয় ইশারা,
হাট তুলে দে সর্বহারা,
মেঘ-জননীর অশ্র”ধারা
ঝ’রছে মাথার’ পর,
দাঁড়িয়ে দূরে ডাকছে মাটি
দুলিয়ে তর”-কর।।
কন্যারা তোর বন্যাধারায়
কাঁদছে উতরোল,
ডাক দিয়েছে তাদের আজি
সাগর-মায়ের কোল।
নায়ের মাঝি! নায়ের মাঝি!
পাল তু’লে তুই দে রে আজি
তুরঙ্গ ঐ তুফান-তাজী
তরঙ্গে খায় দোল।
নায়ের মাঝি! আর কেন ভাই?
মায়ার নোঙর তোল্।
ভাঙন-ভরা ভাঙনে তোর
যায় রে বেলা যায়।
মাঝি রে! দেখ্ কুরঙ্গী তোর
কূলের পানে চায়।
যায় চ’লে ঐ সাথের সাথী
ঘনায় গহন শাঙন-রাতি
মাদুর-ভরা কাঁদন পাতি’
ঘুমুস্ নে আর, হায়!
ঐ কাঁদনের বাঁধন ছেঁড়া
এতই কি রে দায়?
হীরা-মানিক চাসনি ক’ তুই,
চাস্নি ত সাত ক্রোর,
একটি ক্ষুদ্র মৃৎপাত্র-
ভরা অভাব তোর,
চাইলি রে ঘুম শ্রানি–হরা
একটি ছিন্ন মাদুর-ভরা,
একটি প্রদীপ-আলো-করা
একটু-কুটীর-দোর।
আস্ল মৃত্যু আস্ল জরা,
আস্ল সিঁদেল-চোর।
মাঝি রে তোর নাও ভাসিয়ে
মাটির বুকে চল্!
শক্তমাটির ঘায়ে হউক
রক্ত পদতল।
প্রলয়-পথিক চ’ল্বি ফিরি
দ’লবি পাহাড়-কানন-গিরি!
হাঁকছে বাদল, ঘিরি’ ঘিরি’
নাচছে সিন্ধুজল।
চল্ রে জলের যাত্রী এবার
মাটির বুকে চল্ ।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/832
|
4102
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়
|
চিন্তামূলক
|
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1436.html
|
2940
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কোনো জাপানি কবিতার ইংরাজি অনুবাদ হইতে
|
প্রেমমূলক
|
বাতাসে অশথপাতা পড়িছে খসিয়া,
বাতাসেতে দেবদারু উঠছে শ্বসিয়া।
দিবসের পরে বসি রাত্রি মুদে আঁখি,
নীড়েতে বসিয়া যেন পাহাড়ের পাখি।
শ্রান্ত পদে ভ্রমি আমি নগরে নগরে
বিজন অরণ্য দিয়া পর্বতে সাগরে।
উড়িয়া গিয়াছে সেই পাখিটি আমার,
খুঁজিয়া বেড়াই তারে সকল সংসার।
দিন রাত্রি চলিয়াছি, শুধু চলিয়াছি —
ভুলে যেতে ভুলিয়া গিয়াছি।আমি যত চলিতেছি রৌদ্র বৃষ্টি বায়ে
হৃদয় আমার তত পড়িছে পিছায়ে।
হৃদয় রে, ছাড়াছাড়ি হল তোর সাথে —
এক ভাব রহিল না তোমাতে আমাতে।
নীড় বেঁধেছিনু যেথা যা রে সেইখানে,
একবার ডাক্ গিয়ে আকুল পরানে।
কে জানে, হতেও পারে, সে নীড়ের কাছে
হয়তো পাখিটি মোর লুকাইয়ে আছে।
কেঁদে কেঁদে বৃষ্টিজলে আমি ভ্রমিতেছি —
ভুলে যেতে ভুলিয়ে গিয়েছি।দেশের সবাই জানে কাহিনী আমার।
বলে তারা, ‘এত প্রেম আছে বা কাহার!'
পাখি সে পলায়ে গেছে কথাটি না ব'লে,
এমন তো সব পাখি উড়ে যায় চলে।
চিরদিন তারা কভু থাকে না সমান
এমন তো কত শত রয়েছে প্রমাণ।
ডাকে আর গায় আর উড়ে যায় পরে,
এ ছাড়া বলো তো তারা আর কী বা করে?
পাখি গেল যার, তার এক দুঃখ আছে —
ভুলে যেতে ভুলে সে গিয়াছে!সারা দিন দেখি আমি উড়িতেছে কাক,
সারা রাত শুনি আমি পেচকের ডাক।
চন্দ্র উঠে অস্ত যায় পশ্চিমসাগরে,
পূরবে তপন উঠে জলদের স্তরে।
পাতা ঝরে, শুভ্র রেণু উড়ে চারি ধার —
বসন্তমুকুল এ কি? অথবা তুষার?
হৃদয়, বিদায় লই এবে তোর কাছে —
বিলম্ব হইয়া গেল, সময় কি আছে?
শান্ত হ'রে, একদিন সুখী হবি তবু —
মরণ সে ভুলে যেতে ভোলে না তো কভু! (অনূদিত কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kono-japani-kobitar-ingreji-onubad-hoite/
|
4729
|
শামসুর রাহমান
|
জাভেদ তোমার কথা
|
রূপক
|
জাভেদ, তোমার কথা বেশ কিছুদিন
ধরে আমি ভাবছি প্রত্যহ। কবে কোন্ সালে কোন্ সে শ্রীহীন
পাড়ায় জন্মেছো তুমি, কী যে নাম
সে বিদ্যালয়ের, ছিমছাম
সেনার কদমছাঁট চুলের মতন ঘাসময় অনুপম
উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে যার পড়েছিল তোমার প্রথম
পদচ্ছাপ, কবে বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে
কতিপয় পুস্তকের জ্ঞানগাম্যি চেখে
নিয়েছিলে সডিগ্রী বিদায়, তারপর
জুটিয়ে মাঝারি চাক্রি বে-থা করে বেঁধেছিলে ঘর-
যথারীতি পুত্র কন্যা এনে
বছর বছর, চোখ-বাঁধা বলদের মতো নিত্য ঘানি টেনে
অকালে পাকালে চুল,-এই সব কথা ইতস্তত;
বুঝেছো প্রায়শ ভাবি আজকাল। কত
ঝড়-ঝাপটা, কত যে জাহাজডুবি দেখছো জাভেদ
সচক্ষে, অথচ কোনো নিষ্কুল নির্বেদ
কখনো তোমাকে খুব ভুগিয়েছে বলে
জানা নেই; এড়িয়ে গিয়েছো ঠিক নিঁভাজ কৌশলে।অনেক ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে
তুমি কি মাঝরিদের চেয়ে
কিছু উঁচূ হতে চেয়েছিল বাড়িয়ে নিজস্ব গলা
নিত্য জিয়াফের মতো? ঊর্ধ্বারোহণের ছলাকলা
অনেকেরই আয়ত্তে সম্প্রতি। ধিক, ধিক
জাভেদ তোমাকে ধিক, তুমি বাস্তবিক
সর্বদা মাঝারি রয়ে গেলে। সেই আপিশের সিঁড়ি
বেয়ে ওঠা ক্রমাগত সপ্তাহে ছ’দিন, আর ভীষণ বিচ্ছিরি
গলিতে প্রত্যহ ফিরে আসা,
সুপ্রাচীন কংকালের মতো অস্থায়ী, ক্ষয়িষ্ণ বাসা
নিয়ে পরিণামহীন ভাবনা এবং দূর স্মৃতি
অপ্রেমের খাটস্থিত কাঁথা মুড়ি দিয়ে যথারীতি
ঘুমানো, আবার জেগে ওঠা ভোর, ছড়া
কাটা সন্তানের সঙ্গে আর জবর খবর পড়া
চা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে, আবার আপিশ,
ঘড়ির শাসন, কালি ছিটানো খাতায় আর কিছু ফিস্ ফিস্,
নিত্যদিন নিষ্প্রভ মাইম
দেখিয়ে জাভেদ তুমি নাছোড় লোলুপ ঊর্ণাজালে
বিপন্ন আটকে পড়ে এই মতো জীবন কাটাল।যুগপৎ গবেষণা আর তদন্তের ঘোরে
বারংবার বিশ্লেষণ করে
দেখেছি আসলে
তোমার বৈশিষ্ট্য নেই কোনো, তুমি সাধারণ মাঝারির দলে
রয়ে গেলে আজীবন। কোনো স্বপ্ন, কোনো অভিলাষ
আনেনি খ্যাতির ছটা তোমার আঁধারে। দীর্ঘশ্বাস
হয়ে আছো শুধু
অত্যন্ত নেপথ্যে আর মরুর মতন অতি ধু-ধু
জীবনে চলেছো রয়ে চায়ের কাপের স্পষ্ট ফাটলের মতো
কিছু দাগ; জাভেদ যমজ ভাই আমার, সতত
তুমি কোন্ ত্রাসে
পুরাণ পুতুল হলে নড়বড়ে বিপন্ন নিবাসে
জীবনকে ব্যাধি ভেবে নিজেকেই রূঢ় উপহাস
করছো নিয়ত আর দেখছো কেমন
নিস্পৃহ বিবশ ছন্দে লক্ষ লক্ষ জাভেদের পঙক্তিতে আরো একজন
জাভেদ চলেছে মাথা নিচু করে, যেন প্রেতচ্ছায়া,
গন্তব্যের প্রতি উদাসীন, সম্মুখে বিস্তীর্ণ ইন্দ্রধনু মায়া। (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/javed-tomar-kotha/
|
4879
|
শামসুর রাহমান
|
নান্দনিক সত্যের পাঁচালি
|
রূপক
|
এখনো উনিশ বিশ বছর আগের দ্বিপ্রহর
স্মৃতির উদাস পথে ডেকে যায় সেলুলয়েডের
মমতায়; দৃষ্টিপথে একটি প্রকৃত গ্রাম হয়
আমার নিজস্ব চেনা আরেক পল্লীর সহোদর।
সেই কবেকার উপন্যাস ভিন্ন মাত্রা পায়, দেখি
গ্রামেপথে ওরা দুটি বালক বালিকা ছোটাছুটি
করে, ঘোরে কাশবনে, গহন বর্ষার ভেজে আর
শ্যামল মাটিতে কান পেতে শোনে ট্রেনের আওয়াজ।খদ্ধ সেলুলয়েডের সীমানা পেরিয়ে দুর্গা, অপু
খেলা করে চেতনার নীলিমায়। মিষ্টি-অলা, ভেপু
এবং পুঁতির মালা, মাটির দেয়ালে দিদিমার
রূপকথা-বলা ছায়া কী প্রগাঢ় সত্যজিৎ রূপে
মনের নানান স্তরে জেগে থাকে। ধন্যবাদ তাঁকে,
এখনো শোনান যিনি নান্দনিক সত্যের পাঁচালি। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nandonik-sotyer-panchali/
|
2399
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সাংসারিক জ্ঞান
|
সনেট
|
“কি কাজ বাজায়ে বীণা ; কি কাজ জাগায়ে
সুমধুর প্রতিধ্বনি কাব্যের কাননে ?
কি কাজ গরজে ঘন কাব্যের গগনে
মেঘ-রূপে, মনোরূপ ময়ূরে নাচায়ে ?
স্বতরিতে তুলি তোরে বেড়াবে কি বায়ে
সংসার-সাগর-জলে, স্নেহ করি মনে
কোন জন ?দেবে---অন্ন অৰ্দ্ধ মাত্র খায়ে,
ক্ষুধায় কাতর তোরে দেখি রে তোরণে ?
ছিঁড়ি তার-কুল, বীণা ছুড়ি ফেল দূরে! ”
কহে সাংসারিক জ্ঞান—ভবে বৃহস্পতি ।
কিন্তু চিত্ত-ক্ষেত্রে যবে এ বীজ অস্কুরে,
উপাড়ে ইহায় হেন কাহার শকতি ?
উদাসীন-দশা তার সদা জীব-পুরে,
যে অভাগা রাঙা পদ ভজে, মা ভারতি।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/sangsarik-gyan/
|
2208
|
মহাদেব সাহা
|
বড়ো সুসময় কখনো পাবো না
|
চিন্তামূলক
|
ফুলের পাশেই আছে অজস্র কাঁটার পথ, এই তো জীবন
নিখুঁত নিটোল কোনো মুহূর্ত পাবো না,
এখন বুঝেছি আমি
এভাবেই সাজাতে হবে অপূর্ণ সুন্দর;
একেবারে মনোরম জলবায়ু পাবো না কখনো
থাকবে কুয়াশা-মেঘ, ঝড়েরআভাস
কখনো দুলবে ভেলা
কখনো বিরুদ্ধ স্রোতে দিতে হবে
সুদীর্ঘ সাঁতার,
কুয়াশা ও ঝড়ের মাঝেই
শীতগ্রীষ্মে বেয়ে যেতে হবে এই তরী;
যতোই ভাবি না কেন
সম্পূর্ণ উজ্জল কোনো সুসময় পেলে
ফলাবো সোনালি ধান্য,
সম্পন্ন করবো বসে শ্রেষ্ঠ কাজগুলি-
কিন্তু এমন নিটোল কোনো জীবন পাবো না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1375
|
5748
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
এবার কবিতা লিখে
|
চিন্তামূলক
|
এবার কবিতা লিখে আমি একটা রাজপ্রাসাদ বানাবো
এবার কবিতা লিখে আমি চাই পন্টিয়াক গাড়ি
এবার কবিতা লিখে আমি ঠিক রাষ্ট্রপতি না হলেও
ত্রিপাদ ভূমির জন্য রাখব পা উঁচিয়ে -
মেশপালকের গানে এ পৃথিবী বহুদিন ঋণী!
কবিতা লিখেছি আমি চাই স্কচ, সাদা ঘড়া, নির্ভেজাল ঘৃতে পক্ক
মুর্গীর দু ঠ্যাং শুধু, আর মাংস নয় -
কবিতা লিখেছি তাই আমার সহস্র ক্রীতদাসী চাই -
অথবা একটি নারী অগোপন, যাকে আমি প্রকাশ্য রাস্তায় জানু ধরে
দয়া চাইতে পারি।
লেভেল-ক্রসিং এ আমি দাঁড়ালেই তোপধ্বনি শুনতে চাই
এবার কবিতা লিখে আমি আর দাবী ছাড়ব না
নেড়ি কুত্তা হয়ে আমি পায়ের ধুলোর থেকে গড়াগড়ি দিয়ে আসি
হাড় থেকে রক্ত নিংড়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছি, ভিক্ষা চেয়ে মানুষের
চোখ থেকে মনুষ্যত্ব খুলে -
কপালের জ্বর, থুতু, শ্লেষ্মা থেকে উঠে এসে
মাতাল চন্ডাল হয়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফের ছাই থেকে উঠে এসে
আমার একলা ঘরে অসহায়তার মতো হা হা স্বর থেকে উঠে এসে
কবিতা লেখার সব প্রতিশোধ নিতে দাঁড়িয়েছি ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1885
|
781
|
জসীম উদ্দীন
|
ও তুই যারে আঘাত হানলিরে মনে সেজন
|
প্রেমমূলক
|
ও তুই যারে আঘাত হানলিরে মনে সেজন কি তোর পর,
সে ত তোরি তরে কেন্দে কেন্দে বেড়ায় দেশান্তর;
রে বন্ধু!
তোরি তরে সাজাইলাম বন-ফুলের ঘর,
রে বন্ধু মন-ফুলের ঘর,
ও তুই ভোমর হয়া হানলি কাঁটা সেই না ফুলের পর;
রে বন্ধু!
এক ঘরেতে লাগলে আগুন পোড়ে অনেক ঘর,
মনের আগুন মনই পোড়ায়-নাই কোন দোসর;
রে বন্ধু!
আগে যদি জানতামরে তোর রূপে আগুর জ্বলে,
আমি রূপ থুইয়া আগুনের মালা পরতাম নিজ গলে,
রে বন্ধু!
চিতার অনলে ঝাঁপ দেই যেই জন,
ও তার দেহও পোড়ে, মনও পোড়ে, পোড়ে তার ক্রন্দন;
রে বন্ধু!
রূপের আগুন মনেই লাগে, লাগে না কার গায়,
ও সে মনে মনেই মন জ্বালা কেউ না জানে হায়,
রে বন্ধু!
তীর যদি বেন্ধে গায়ে, তাও তো তোলন যায়,
ও তোর কথার আঘাত কোথায় লাগে কেউ নাহি টের পায়;
রে বন্ধু!কাব্যগ্রন্থ: রঙিলা নায়ের মাঝি
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/post20160509055044/
|
5753
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
কবিতা লেখার চেয়ে
|
চিন্তামূলক
|
কবিতা লেখার চেয়ে কবিতা লিখবো লিবো এই ভাবনা
আরও প্রিয় লাগে
ভোর থেকে টুকটাক কাজ সারি, যেন ঘর ফাঁকা করে
সময়ে সুগন্ধ নিয়ে তৈরি হতে হবে
দরজায় পাহারা দেবে নিস্তব্ধতা, আকাশকে দিতে হবে
নারীর ঊরুর মসৃণতা, তারপর লেখা
হীরক-দ্যুতির মতো টোবল আচ্ছন্ন করে বসে থাকে
কালো রং কবিতার খাতা
আমি শিস দিই, সিগারেট ঠোঁটে, দেশলাই খুঁজি
মনে ফুরফুরে হাওয়া, এবার কবিতা একটি নতুন কবিতা…
তবু আমি কিছুই লিখি না
কলম গড়িয়ে যায়, ঝুপ করে শুয়ে পড়ি, প্রিয় চোখে
দেখি শাদা দেয়ালকে, কবিতার সুখস্বপ্ন
গাঢ় হয়ে আসে, মনে-মনে বলি, লিখবো
লিখবো এত ব্যস্ততা কিসের
কেউ লেখা চাইলে বলি, হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই, কাল দেবো, কাল দেবো
কাল ছোটে পরশু কিংবা তরশু কিংবা পরবর্তী সোমবারের দিকে
কেউ-কেউ বাঁকা সুরে বলে ওঠে, আজকাল গল্প উপন্যাস
এত লিখছেন
কবিতা লেখার জন্য সময়ই পান না।
বুঝি? না?
উত্তর না দিয়ে আমি জনান্তিকে মুখ মুচকে হাসি
ফাঁকা ঘরে, জানলার ওপার দূর
নীলাকাশ থেকে আসে
প্রিয়তম হাওয়া
না-লেখা কবিতাগুলি আমার সর্বঙ্গ
জড়িয়ে আদর করে, চলে যায়, ঘুরে ফিরে আসে
না-হয়ে ওঠার চেয়ে, আধো ফোটা, ওরা খুনসুটি
খুব ভালোবাসে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1808
|
4084
|
রুদ্র গোস্বামী
|
মশাল
|
মানবতাবাদী
|
কন্যা সন্তান প্রসব করার অপরাধে
আসামের যে মেয়েটাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ?
আজ তার মৃত্যু বার্ষিকী।
যে কবি সেদিন তার নিরানব্বইতম কবিতাটি
মেয়েটাকে উৎসর্গ করেছিলেন,
তিনি এখন তার প্রিয় পাঠিকার অনুরোধে লিখছেন বসন্ত গল্প।
যে সংবাদপত্র গুলো সেদিন ফলাও করে ছেপেছিল
মেয়েটার গনগনে আর্তনাদ ,
তাদের প্রত্যেকটা ক্যামেরার ফ্লাশ
আজ তাক করে দাঁড়িয়ে আছে বুদ্ধিজীবী সম্বর্ধনা মঞ্চ ।
যে অধ্যাপক তার অনুগত ছাত্রদের বলেছিলেন,
– “আগুন জ্বালো।”
তিনি তার সদ্য বিবাহিত দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে
এইমাত্র চলে গেলেন সাচ্ছন্দ মধুচন্দ্রিমা যাপনে ।
তুমি কেমন আছো যুবক ?
তুমি কি মশাল জ্বেলেছো ?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4617.html
|
1512
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
যাত্রাভঙ্গ
|
প্রেমমূলক
|
হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই। হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি। তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই। তখন আমি একটু ছোঁব
হাত বাড়িয়ে জড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরণী নায়ে। নায়ের মাঝে বসবো বটে,
না-এর মাঝে শোবো,
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ
দুঃখ দিয়ে ছোঁব।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/zatravong/
|
1883
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
মানুষের কেউ কেউ
|
চিন্তামূলক
|
সবাই মানুষ থাকবে না।
মানুষের কেউ কেউ ঢেউ হবে, কেউ কেউ নদী
প্রকাশ্যে যে ভাঙে ও ভাসায়।
সমুদ্র সদৃশ কেউ, ভয়ঙ্কর তথাপি সুন্দর।
কেউ কেউ সমুদ্রের গর্ভজাত উচ্ছৃঙ্খল মাছ।
কেউ নবপল্লবের শুচ্ছ, কেউ দীর্ঘবাহু গাছ।
সকলেই গাছ নয়, কেউ কেউ লতার স্বভাবে
অবলম্বনের যোগ্য অন্য কোনো বৃক্ষ খুঁজে পাবে।
মানুষ পর্বতচুড়া হয়ে গেছে দেখেছি অনেক
আকাশের পেয়েছে প্রণাম।
মানুষ অগ্নির মতো
নিজে জলে জালিয়েছে বহু ভিজে হাড়
ঘুমের ভিতরে সংগ্রাম।
অনেক সাফল্যহীন মরুভুমি পৃথিবীতে আছে টের পেয়ে
ভীষণ বৃষ্টির মতো মানুষ ঝরেছে অবিরল
খরা থেকে জেগেছে শ্যমল।
মানুষেরই রোদে,
বহু দুর্দিনের শীত মানুষ হয়েছে পার
সার্থকতাবোধে।
সবাই মানুষ থাকবে না।
কেউ কেউ ধুলো হবে, কেউ কেউ কাঁকর ও বালি
খোলামকুচির জোড়াতালি।
কেউ ঘাস, অযত্নের অপ্রীতির অমনোযোগের
বংশানুক্রমিক দুর্বাদল।
আঁধারে প্রদীপ কেউ নিরিবিলি একাকী উজ্জল।
সন্ধ্যায় কুসুমগন্ধ,
কেউ বা সন্ধ্যার শঙ্খনাদ।
অনেকেই বর্ণমালা
অল্প কেউ প্রবল সংবাদ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1236
|
652
|
জয় গোস্বামী
|
কে বেশি কে কম
|
মানবতাবাদী
|
চিনতে পেরে গেছে বলে যার জিভ
কেটে নিল ধর্ষণের পরে
দু’হাতে দু’টো পা ধরে
ছিঁড়ে ফেললো যার শিশুটিকে
ঘাড়ে দু’টো কোপ মেরে যার স্বামীকে
ফেলে রাখলো উঠোনের পাশে
মরা অবধি মুখে জল দিতে দিল না
সেই সব মেয়েদের ভেতরে
যে-শোকাগ্নি জ্বলছে
সেই আগুনের পাশে
এনে রাখো গুলির অর্ডার দেওয়া
শাসকের দু’ঘন্টা বিষাদ
তারপর মেপে দ্যাখো
কে বেশি কে কম
তারপর ভেবে দেখ
কারা বলেছিল
জীবন নরক করব, প্রয়োজনে
প্রাণে মারব, প্রাণে!
এই ব’লে ময়ূর আজ
মুখে রক্ত তুলে
নেচে যায় শ্মশানে শ্মশানে
আর সেই নৃত্য থেকে দিকে দিকে
ছিটকে পড়ে জ্বলন্ত পেখম |
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/151
|
4214
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
ছিন্নবিচ্ছিন্ন-২
|
চিন্তামূলক
|
ছোট্ট হয়েই আছে
আমার, না হয় তোমার, না হয় তাহার বুকের কাছে
দুঃখ নিবিড় একটি ফোঁটায় – দুঃখ চোখের জলে
দুঃখ থাকে ভিখারিনীর একমুঠি সম্বলে।
ছোট্ট হয়েই আছে
একের, না হয় বহুর, না হয় ভিড়ের বুকের কাছে।
একটি ঝিনুক তাকে
জন্ম থেকেই, একটু-আধটু, বাইরে ফেলে রাখে।
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/chinno-bichchhinno-2/
|
1802
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কে খেয়েছে চাঁদ
|
রূপক
|
দাঁতে কামড়িয়ে কে খেয়েছে চাঁদ?
সন্ধেবেলায়?
মহাশুন্যের ছড়ানো টেবিলে
পড়ে আছে যেন ছিরিছাঁদহীন ভাঙা বিস্কুট।
কে খেয়েছে চাঁদ?
ক’দিন আগেও কোজাগরী শাড়ি লুটিয়ে হেঁটেছে
বর-বর্নিনী।
যমুনার মতো চিকন অঙ্গ
বুকে তরঙ্গ, কাঁখে তরঙ্গ
আকাশের ঘাটে স্নান করে গেছে লজ্জা ভাসিয়ে
কলসী ভাসিয়ে।
কে খেয়েছে চাঁদ?
কার তৃষ্ণার উনোনে আগুন জ্বলে উঠেছিল?
আগুন দিয়ে কে মেজেছিল দাঁত?
ইচ্ছা-সুখের কালো ভীমরুল
কাকে কামড়িয়ে করেছিল লাল?
কে কয়েছে চাঁদ?
রত্নের থালা কে এটোঁ করেছে জিভের লালায়?
আলোর কুসুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে মালা
কে গেঁথেছে মিহি মনের সুতোয়?
ফুসলিয়ে তাকে নদীর আড়ালে কে নিয়ে গিয়েছে?
সন্ধেবেলায়?
কে খেয়েছে চাঁদ?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1251
|
370
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পথচারী
|
রূপক
|
কে জানে কোথায় চলিয়াছি ভাই মুসাফির পথচারি,
দু'ধারে দু'কুল দুঃখ-সুখের-মাঝে আমি স্রোত-বারি!
আপনার বেগে আপনি ছুটেছি জন্ম-শিখর হ'তে
বিরাম-বিহীন রাত্রি ও দিন পথ হ'তে আন পথে!
নিজ বাস হ'ল চির-পরবাস, জন্মের ক্ষন পরে
বাহিরিনি পথে গিরি-পর্বতে-ফিরি নাই আর ঘরে।
পলাতকা শিশু জন্মিয়াছিনু গিরি-কন্যার কোলে,
বুকে না ধরিতে চকিতে ত্বরিতে আসিলাম ছুটে চ'লে।
জননীরে ভুলি' যে-পথে পলায় মৃগ-শিশু বাঁশী শুনি',
যে পথে পলায় শশকেরা শুনি' ঝরনার ঝুনঝুনি,
পাখী উড়ে যায় ফেলিয়া কুলায় সীমাহীন নভোপানে,
সাগর ছাড়িয়া মেঘের শিশুরা পলায় আকাশ-যানে,-
সেই পথ ধরি' পলাইনু আমি! সেই হ'তে ছুটে চলি
গিরি দরী মাঠ পল্লীর বাট সজা বাঁকা শত গলি।
-কোন গ্রহ হ'তে ছিঁড়ি
উল্কার মত ছুতেছি বাহিয়া সৌর-লোকের সিঁড়ি!
আমি ছুটে যাই জানিনা কোথায়, ওরা মোর দুই তীরে
রচে নীড়, ভাবে উহাদেরি তীরে এসেছি পাহাড় চিরে।
উহাদের বদূ কলস ভরিয়া নিয়ে যায় মোর বারি,
আমার গহনে গাহন করিয়া বলে সন্তাপ-হারী!
ঊহারা দেখিল কেবলি আমার সলিলের শিতলতা,
দেখে নাই-জ্বলে কত চিতাগ্নি মোর কূলে কূলে কোথা!
-হায়, কত হতভাগী-
আমিই কি জানি- মরিল ডুবিয়া আমার পরশ মাগি'।
বাজিয়াছে মোর তটে-তটে জানি ঘটে-ঘটে কিঙ্কিণী,
জল-তরঙ্গে বেজেছে বধূর মধুর রিনিকি-ঝিনি।
বাজায়েছে বেণু রাখাল-বালক তীর-তরুতলে বসি'।
আমার সলিলে হেরিয়াছে মুখ দূর আকাশের শশী।
জানি সব জানি, ওরা ডাকে মোরে দু'তীরে বিছায়ে স্নেহ,
দীঘি হ'তে ডাকে পদ্মমুখীরা 'থির হও বাঁধি গেহ!'
আমি ব'য়ে যাই- ব'য়ে যাই আমি কুলু-কুলু-কুলু-কুলু
শুনি না- কোথায় মোরই তীরে হায় পুরনারী দেয় উলু!
সদাগর-জাদী মণি-মাণিক্যে বোঝাই করিয়া তরী
ভাসে মর জলে,-'ছল ছল' ব'লে আমি দূরে যাই সরি'।
আঁকড়িয়া ধ'রে দু'তীর বৃথাই জড়ায়ে তন্তুলতা,
ওরা দেখে নাই আবর্ত মর, মোর অন্তর-ব্যথা!
লুকাইয়া আসে গোপনে নিশীথে কূলে মোর অভাগিনী,
আমি বলি 'চল ছল ছল ছল ওরে বধূ তোরে চিনি!
কূল ছেড়ে আয় রে অভিসারিকা, মরণ-অকূলে ভাসি!'
মোর তীরে-তীরে আজো খুঁজে ফিরে তোরে ঘর-ছাড়া বাঁশী।
সে পড়ে ঝাঁপায়-জলে,
আমি পথে ধাই-সে কবে হারায় স্মৃতির বালুকা-তলে!
জানি না ক' হায় চলেছি কোথায় অজানা আকর্ষণে,
চ'লেছি যতই তত সে অথই বাজে জল খনে খনে।
সন্মুখ-টানে ধাই অবিরাম, নাই নাই অবসর,
ছুঁইতে হারাই-এই আছে নাই- এই ঘর এই পর!
ওরে চল চল ছল ছল কি হবে ফিরায়ে আঁখি?
তরি তীরে ডাকে চক্রবাকেরে তরি সে চক্রবাকী!
ওরা সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে যায় কূলের কুলায়-বাসী,
আঁচল ভরিয়া কুড়ায় আমার কাদায়-ছিটানো হাসি।
ওরা চ'লে এক্যায়, আমি জাগি হায় ল'ইয়ে চিতাগ্নি শব,
ব্যথা-আবর্ত মচড় খাইয়া বুকে করে কলরব!
ওরে বেনোজল, ছল ছল ছল ছুটে চল ছুটে চল!
হেথা কাদাজল পঙ্কিল তোরে করিতেছে অবিরল।
কোথা পাবি হেথা লোনা আঁখিজল, চল চল পথচারী!
করে প্রতীক্ষা তোর তরে লোনা সাত-সমুদ্র-বারি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/822
|
5291
|
শামসুর রাহমান
|
সে তার নিজেরই বাসা
|
সনেট
|
এই তার বাসগৃহ ছন্নছাড়া বাগানের ধারে
অনেক বছর ধরে রয়েছে দাঁড়িয়ে রৌদ্রজলে।
এখানে সুন্দর তার হস্তস্পর্শ যার করতলে
রেখে যায় আগোচরে, তাকে আজো তো বনবাদাড়ে
দেখা যায়, হাতে লাঠি, পিঠে বোঝাই সুদূর পাহাড়ে
জনহীন নদীতীরে হাঁটে সে একাকী, পুনরায়
ফিরে আসে একজন ব্যথিত কবির আস্তানায়,
মানে সে বাসায় যার সত্তা লগ্ন বেহালার তারে।সে তার নিজেরই বাসা হঠাৎ পুড়িয়ে ফেলে কিছু
অপরূপ আলো দেখে নিলো। সে আলোয় মর্মমূল
আর্তনাদ করে, তবু সেই উদাসীন, দৃষ্টি নিচু
করে ভস্মারাশি তুলে নেয় মুঠো ভরে পুনর্বার
হাওয়ায় উড়িয়ে দ্যায়। বাসা নেই, দগ্ধ স্মৃতিভার
বেড়ে যায়, মাথার ভেতরে কাঁদে কিছু কালি, ঝুল। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/se-tar-nijeri-basa/
|
4304
|
শামসুর রাহমান
|
অনেক শতাব্দী জুড়ে
|
প্রেমমূলক
|
অনেক শতাব্দী জুড়ে প্রতিক্ষণ আমার হৃদয়
বস্তুত স্পন্দিত হচ্ছে তোমার জন্যেই। বিষণ্নতা
প্রত্যহ আমাকে ঘাট থেকে ঘাটান্তরে নানা কথা
জপিয়েছে, চেয়েছে ফেলতে মুছে ধ্যানের সময়,
যাতে ভুলে থাকি তোমাকেই, তবু আমি সুনিশ্চয়
ভ্রমের গোলকধাঁধা আর বহুরূপী বিরূপতা
উজিয়ে বিস্ময়ে দেখি গোধূলিতে তুমি অবনতা
বঙ্গোপসাগর তীরে আমার জন্যেই, মনে হয়।কখনো মহেঞ্জোদারো অথবা কখনো মথুরায়
ছিলে, পায়ে মল বেজে উঠতো মধুর নিশাকালে,
কখনো সমরখন্দে, কখনো বা বোখারায় জানি
সুরতের রোশ্নি তোমার শায়েরের তারানায়
ঝলসাতো বারবার। কখনো বাংলার মত্ত খালে
বাইতে মহুয়ারূপে আমারই উদ্দেশে তরীখানি। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/onek-shotabdi-jure/
|
119
|
আল মাহমুদ
|
কবিতা
|
চিন্তামূলক
|
কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি–রাবেয়া রাবেয়া–
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি–রাবেয়া রাবেয়া–
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি–রাবেয়া রাবেয়া–
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%ae%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6/
|
378
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পাগল পথিক
|
স্বদেশমূলক
|
এ কোন্ পাগল পথিক ছুটে এল বন্দিনী মা-র আঙিনায়।
ত্রিশ কোটি ভাই মরণ-হরণ গান গেয়ে তাঁর সঙ্গে যায়॥
অধীন দেশের বাঁধন-বেদন
কে এল রে করতে ছেদন?
শিকল-দেবীর বেদির বুকে মুক্তি-শঙ্খ কে বাজায়॥
মরা মায়ের লাশ কাঁধে ওই অভিমানী ভায়ে ভায়ে
বুক-ভরা আজ কাঁদন কেঁদে আনল মরণ-পারের মায়ে।
পণ করেছে এবার সবাই,
পর-দ্বারে আর যাব না ভাই!
মুক্তি সে তো নিজের প্রাণে, নাই ভিখারির প্রার্থনায়॥
শাশ্বত যে সত্য তারই ভুবন ভরে বাজল ভেরি,
অসত্য আজ নিজের বিষেই মরল ও তার নাইকো দেরি।
হিংসুকে নয়, মানুষ হয়ে
আয় রে, সময় যায় যে বয়ে!
মরার মতন মরতে, ওরে মরণভীতু! ক-জন পায়!
ইসরাফিলের শিঙা বাজে আজকে ঈশান-বিষাণ সাথে,
প্রলয়-রাগে নয় রে এবার ভৈরবীতে দেশ জাগাতে।
পথের বাধা স্নেহের মায়ায়
পায় দলে আয় পায় দলে আয়!
রোদন কীসের ? – আজ যে বোধন!
বাজিয়ে বিষাণ উড়িয়ে নিশান আয় রে আয়॥ (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/pagol-pothik/
|
217
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আনন্দময়ীর
|
মানবতাবাদী
|
আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব–শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী? মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে
রক্ত-তৃষার ‘ময়-ভুখা-হু’র কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে।-
অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।
দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।..‘ময় ভুখা হুঁ মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী
কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি!আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব–শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী? মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে
রক্ত-তৃষার ‘ময়-ভুখা-হু’র কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে।-
অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।
দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।..‘ময় ভুখা হুঁ মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী
কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি!আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব–শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী? মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে
রক্ত-তৃষার ‘ময়-ভুখা-হু’র কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে।-
অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।
দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।..‘ময় ভুখা হুঁ মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী
কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%ae%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%a8%e0%a6%9c/
|
2217
|
মহাদেব সাহা
|
ভালো আছি বলি কিন্তু ভালো নেই
|
প্রেমমূলক
|
ভালো আছি বলি কিন্তু ভালো নেই চেয়ে দেখো
আমার ভিতরে কোথায় নেমেছে ধস,
কোথায় নেমেছে ঘোর কালো!
দেখো আমার ভেতরে এখন প্রবল গ্রীষ্মকাল
খরা আর খাদ্যের অভাব; ভালো করে চেয়ে দেখো
আমার ভিতরে সমস্ত কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভগ্ন ও ব্যথিত
ঠিক যে আঁধার তাও নয় মনে হয় মধ্যাহ্নে অকালসন্ধ্যা
অস্তমিত সকল আলোর উৎস;
ভালো আছি বলি কিন্তু ভিতরে যে লেগেছে হতাশা
লেগেছে কোথাও জং আর এই মরচে-পড়া লোহার নিঃশ্বাস
গোলাপ ফুটতে গিয়ে তাই দেখো হয়েছে ক্রন্দন,
হয়েছে কুয়াশা!
আমি কি অনন্তকাল বসে আছি, কেন তাও তো জানি না
চোখে মুখে উদ্বেগের কালি, থেকে থেকে ধূলিঝড়
আতঙ্কের অন্তহীন থাবা; ভিতরে ভীষণ গোলযোগ
ভালো আছি বলি কিন্তু ভালো নেই চেয়ে দেখো
ভিতরে কেমন কোলাহল উদ্যত মিছিল
ঘন ঘন বিক্ষুব্ধ শ্লোগান, ডাক-তার-ব্যাঙ্ক ধর্মঘট
হরতালপ্লাবিত দেখো আমার ভিতরে এই এভেন্যু ও পাড়া,
হঠাৎ থমকে আছে ব্যস্ত পথচারী যেন কারফিউতাড়িত
আমার ভিতরে এই ভাঙাচোরা, দ্বন্দ্ব ও দুর্যোগ;
দেখো অনাহারপীড়িত শিশু
দেখো দলে দলে দুর্ভিক্ষের মুখ
ভালো আছি বলি কিন্তু ভালো নেই চেয়ে দেখো
ভিতরে কী অস্থির উন্মাদ, ভিতরে কী নগ্ন ছেঁড়া ফাড়া!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1525
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.