id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
3299
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নানা দুঃখে চিত্তের বিক্ষেপে
|
চিন্তামূলক
|
নানা দুঃখে চিত্তের বিক্ষেপে
যাহাদের জীবনের ভিত্তি যায় বারংবার কেঁপে,
যারা অন্যমনা,তারা শোনো
আপনারে ভুলো না কখনো।
মৃত্যুঞ্জয় যাহাদের প্রাণ,
সব তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে দীপ যারা জ্বালে অনির্বাণ,
তাহাদের মাঝে যেন হয়
তোমাদেরি নিত্য পরিচয়।
তাহাদের খর্ব কর যদি
খর্বতার অপমানে বন্দী হয়ে রবে নিরবধি।
তাদের সন্মানে মান নিয়ো
বিশ্বে যারা চিরস্মরণীয়।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nana-dukha-cheta-vekhapa/
|
4056
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হে বিশ্বদেব, মোর কাছে তুমি
|
ভক্তিমূলক
|
হে বিশ্বদেব, মোর কাছে তুমি
দেখা দিলে আজ কী বেশে।
দেখিনু তোমারে পূর্বগগনে,
দেখিনু তোমারে স্বদেশে।
ললাট তোমার নীল নভতল
বিমল আলোকে চির-উজ্জ্বল
নীরব আশিস-সম হিমাচল
তব বরাভয় কর।
সাগর তোমার পরশি চরণ
পদধূলি সদা করিছে হরণ,
জাহ্নবী তব হার-আভরণ
দুলিছে বক্ষ’পর।
হৃদয় খুলিয়া চাহিনু বাহিরে,
হেরিনু আজিকে নিমেষে–
মিলে গেছ ওগো বিশ্বদেবতা,
মোর সনাতন স্বদেশে।শুনিনু তোমার স্তবের মন্ত্র
অতীতের তপোবনেতে–
অমর ঋষির হৃদয় ভেদিয়া
ধ্বনিতেছে ত্রিভুবনেতে।
প্রভাতে হে দেব,তরুণ তপনে
দেখা দাও যবে উদয়গগনে
মুখ আপনার ঢাকি আবরণে
হিরণ-কিরণে গাঁথা–
তখন ভারতে শুনি চারি ভিতে
মিলি কাননের বিহঙ্গগীতে
প্রাচীন নীরব কণ্ঠ হইতে
উঠে গায়ত্রীগাথা।
হৃদয় খুলিয়া দাঁড়ানু বাহিরে
শুনিনু আজিকে নিমেষে,
অতীত হইতে উঠিছে হে দেব,
তব গান মোর স্বদেশে।নয়ন মুদিয়া শুনিনু, জানি না
কোন্ অনাগত বরষে
তব মঙ্গলশঙ্খ তুলিয়া
বাজায় ভারত হরষে।
ডুবায়ে ধরার রণহুংকার
ভেদি বণিকের ধনঝংকার
মহাকাশতলে উঠে ওঙ্কার
কোনো বাধা নাহি মানি।
ভারতের শ্বেত হৃদিশতদলে,
দাঁড়ায়ে ভারতী তব পদতলে,
সংগীততানে শূন্যে উথলে
অপূর্ব মহাবাণী।
নয়ন মুদিয়া ভাবীকালপানে
চাহিনু, শুনিনু নিমেষে
তব মঙ্গলবিজয়শঙ্খ
বাজিছে আমার স্বদেশে। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/he-bisshideb-mor-kache-tumi/
|
3916
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে
|
হাস্যরসাত্মক
|
সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে
জুটল চুপিচুপি
গোপেন্দ্র মুস্তুফি।
রাত্রে যখন ফিরল ঘরে
সবাই দেখে তারিফ করে–
পাগড়িতে তার জুতোজোড়া,
পায়ে রঙিন টুপি।
এই উপদেশ দিতে এল–
সব করা চাই এলোমেলো,
“মাথায় পায়ে রাখব না ভেদ’
চেঁচিয়ে বলে গুপি। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sondhebelai-bondhughore/
|
5806
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নীরা তুমি কালের মন্দিরে
|
প্রেমমূলক
|
চাঁদের নীলাভ রং, ওইখানে লেগে আছে নীরার বিষাদ
ও এমন কিছু নয়, ফুঁ দিলেই চাঁদ উড়ে যাবে
যে রকম সমুদ্রের মৌসুমিতা, যে রকম
প্রবাসের চিঠি
অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানালো
আঁচলে বৃষ্টির শব্দ, ভুরুর বিভঙ্গে লতা পাতা
ও যে বহুদূর,
পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর
ওখানে কী করে যাবো, কী করে নীরাকে
খুঁজে পাবো?
অক্ষরবৃত্তের মধ্যে তুমি থাকো, তোমাকে মানায়
মন্দাক্রান্তা, মুক্ত ছন্দ, এমনকি চাও শ্বাসাঘাত
দিতে পারি, অনেক সহজ
কলমের যে-টুকু পরিধি তুমি তাও তুচ্ছ করে
যদি যাও, নীরা, তুমি কালের মন্দিরে
ঘন্টধ্বনি হয়ে খেলা করো, তুমি সহাস্য নদীর
জলের সবুজে মিশে থাকো, সে যে দূরত্বের চেয়ে বহুদূর
তোমার নাভির কাছে জাদুদণ্ড, এ কেমন খেলা
জাদুকরী, জাদুকরী, এখন আমাকে নিয়ে কোন রঙ্গ
নিয়ে এলি চোখ-বাঁধা গোলকের ধাঁধায়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/436
|
1588
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
জলে নামবার আগে
|
চিন্তামূলক
|
সকলে মিলিত হয়ে যেতে চাই আজ
পৃথিবীর মিশকালো ঘরে।
গিয়ে স্থিত হতে চাই, কাঠের জাহাজ
যেমন সুস্থির হয় জলের জঠরে।
কেননা আলোয় যারা করে চলাচল,
ডাঙায় তাদের কাছে বিশ বাঁও জল।
যেন সব ভুলে যাই, কোন্খান থেকে
কত দূরে কোথায় এলাম।
আলোকিত দেবতার মুখ যায় বেঁকে,
প্রেমিক জানে না তার প্রেমিকার নাম।
জীবনে কোথাও ছিল এত বড় দহ,
জানত না মানুষের বাপ-পিতামহ।
অথচ আকাশ নীল। ফুলের প্রণয়
হাওয়ায় সলিলে ওই ভাসে।
ছোঁবার সাহস নেই, যেন খুব ভয়
শিরদাঁড়া বেয়ে উঠে আসে।
যদিও সবাই জানে, খুঁজতে গেলেই
দেখা যাবে, কারও আজ শিরদাঁড়া নেই।
ফলত সবাই যেন যেতে চাই আজ
পৃথিবীর মিশকালো ঘরে।
সবাই লুকোতে চাই; কাঁকড়া কি মাছ
যেমন লুকিয়ে থাকে জলের জঠরে।
এদিকে ডাঙায় যারা করে চলাচল,
ডাঙাই তাদের কাছে বিশ বাঁও জল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1653
|
4688
|
শামসুর রাহমান
|
গোলাপ বাগানে
|
রূপক
|
কত সাধ করে হরফের নীড় সাজিয়ে ছিলাম; তড়পানো
পান্ডুলিপি, বাবুই পাখির বাসা যেন, খর তুফানের তোড়ে
এঁটেল মাটিতে গড়াগড়ি যায়, খড় সমুদয়
কুড়িয়ে আবার জড়ো করি, বিষাদের চোখ জ্বলে
নিরালায়।এখনই কি উদ্যমের সোনালি প্রন্তর ছেড়ে অসহায় চলে
যাব কালো কুটিরে একাকী, অবনত? মুখ ঢেকে
রাখব হাঁটুতে ক্লান্ত, শস্যহারা কৃষকের মতো? প্রত্যাশার
শব পোড়ে ধোঁয়াটে শ্মশানে, ভয়ে চোখ বন্ধ করব না
আর।কলকলে জলে ধুয়ে যাবে জেনেও বালক নদীতীরে গড়ে
সাধের বালির ঘর; আমিও কি অনুরূপ খেলা
নিয়ে মেতে আছি নিত্যদিন প্রতারক ভরসায়
শব্দের অতীত শব্দ ছুঁয়ে ছেনে? আমি এই খেলা ছাড়ব না।আমার ললাটে আজ যৌবনের ভস্মটিকা, রক্তে হিমঝড়
অত্যাসন্ন, কে এক কংকালসার, ভয়ঙ্কর লোক
নিঃশব্দে আমাকে হাত ধ’রে টেনে নিতে চায় হু হু
হাড়ের উদ্যানে, আমি তার সহযাত্রী হ’তে অস্বীকার করি।পুনরায় সকালবেলার রোদ চিকচিক করে মেরামত-করা
হরফের নীড়ে আর অস্ফুট শব্দের শিশু গলা
বাইরে বাড়িয়ে দেয়। এই আয়োজন সঙ্গে নিয়ে
স্বপ্নঙ্কিত পতাকা উড়িয়ে যাব আকাঙ্ঘিত গোলাপ বাগানে। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/golap-bagane/
|
1732
|
পাবলো নেরুদা
|
বিদায় ২
|
প্রেমমূলক
|
এক.
ভালবাসি সেই ভালবাসা যা হতে পারেশাশ্বত
আবার হতে পারে ক্ষণস্হায়ী।
ভালবাসি সেই ভালবাসা যা মুক্তি দিতে চায়
আবার ভালবাসার জন্য।
ভালবাসি সেই স্বর্গীয় ভালবাসা যা নিকটবর্তী হয়
আবার যা দূরে চলে যায়।দুই.
তোমার চোখে চোখ রেখে আমার চোখ আনন্দ পাবে না,
আর আমার বেদনা তোমার সঙ্গে থেকে মনোরম হবে না।
কিন্তু যেখানেই যাই তোমার দৃষ্টি বহন করি
আর যেখানেই ঘুরে বেড়াও বহন কর আমার দুঃখ।
তুমি আমার ছিলে,আমি তোমার। আর কি চাই? দুজনে গড়েছিলাম
চলার পথে একটা বাঁক,যেখান দিয়ে চলে গিয়েছিল ভালবাসা।
তুমি আমার ছিলে,আমি তোমার।তোমার ফলের বাগানে আমি
যে বীজ পুঁতেছিলাম, তার থেকেই তুমি হবে আমার ভালববাসা।
আমি চলে যাই। বিষন্ন আমি : কিন্তু সর্বদাই বিষন্ন আমি।
তোমার দু’বাহু থেকে আমি আসি। জানি না কোথায় যাই।
…তোমার হৃদয় থেকে আমাকে বিদায় জানায় এক শিশু
এবং আমিও তাকে জানায় বিদায়।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3962.html
|
5777
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
জলের সামনে
|
চিন্তামূলক
|
ব্রিজের অনেক নিচে জল, আজ সেইখানে ঝুঁকেছে মানুষ
কখনো মানুষ হয়ে উঠি আমি,
কখনো মানুষ নই,
তবুও সন্ধ্যায়
ব্রিজের খিলান ধরে ঝুঁকে থেকে মনে হয় অবিকল মানুষেরই মতো
মানুষের জল দেখা, জলের মানুষ দেখা
পরস্পর মুখ;
মানুষ দেখেছে জল বহুদিন মানুষ দেখেছে অশ্রজল
মানুষ দেখেছে মুখ অশ্রুভেজা ব্রিজের অনেক নিচে
হিম কালো জলে
কালো জল বহু উর্ধ্বে দেখেছে কান্নায় সিক্ত গোপন কঠিন মুখ
মানুষের মতো।
আ-সমুদ্র দয়াপ্রার্থী আবার বৃষ্টির কাছে অতি পলাতক
কখনো নিথর জলে স্পষ্ট মুখ, কখনো তরঙ্গে ভাঙা হীন মানবীয়।
জলের কিনারে এলে জলের ভিতরে যাওয়া, জলের ভিতরে
মানুষ যখনই যায় একা, তার অলঙ্খ্য শরীর
মাতৃগর্ভবাসসম আগোপন;
অথবা না-হোক এক,
বন্ধু ও সঙ্গিনী
অদূরেই জলযুদ্ধে; একবার ডুব দিয়ে মীনচোখে দেখা
নারীর ঊরুর জোড়, খোলা স্তন কী-রকম আশ্চার্য সরল
জলেরই মতন সেও সজল, নীলের কলো,-সংখ্যতীত জিভে
জল তার সর্ব অঙ্গ লেহন করেছে, ঠিক যে-রকম
মানুষের হাত
জলের ভিতরে গিয়ে নিজের শরীরটাকে চিনে নেয়,
জলের ভিতরে
সহাস্যে পেচ্ছাপ করে লজ্জাহীন বাতাসের মতো জল, পরাগ ছাড়ায়।
কখনো মানুষ সেজে বীয়ার-বাস্কেট নিয়ে বসেছি নারীর
কাছাকাছি সন্ধুতটে সন্ধেবেলা, জ্যোৎস্না ভাঙে লাবণ্য হাওয়ায়
আকাশে অসংখ্য ছিদ্র, ঢেউয়ের চুড়ায় জ্বলে ফস্ফরাস্
দেখেছিল মুখ
অথবা ঢেউয়ের দল মানুষের মুর্খ চেয়ে সার বেঁধে আসে-
এমন উচ্ছল জল, মানুষের মুখ দেখা যেন তার আশৈশব সাধ।
মানুষের ছদ্মবেশে আছি, তাই চোখে আসে অশ্রু
মুখ ঢাকি।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1860
|
5214
|
শামসুর রাহমান
|
শহুরে জ্যোৎস্নায়
|
মানবতাবাদী
|
সেদিন এক ফালি জ্যোৎস্না দেখে চমকে উঠেছিলাম,
যেমন সাপের চকচকে চোখ দেখে পথচারী।
জ্যোৎস্না যে-কোনো স্থানে তন্বীর সুরের মতো গুঞ্জরিত হতে
পারে-
নৈসর্গিক যে কোনো বস্তুতে, যে-কোনো প্রতিষ্ঠানে।
ডিমভরা পাখির বাসায় টলটলে জ্যোৎস্নাঃ শৈশব।
হরিণের পিঠে কিংবা চিতাবাঘের জ্বলজ্বলে চোখে জ্যোৎস্নাঃ
যৌবন।
বারান্দায় হেলান-দিয়ে-থাকা লাঠি আর
পার্কের বিবর্ণ বেঞ্চিতে জ্যোৎস্নাঃ বার্ধক্য।সিগারেটের ধোঁয়ায় বৃত্ত এঁকে প্রায়শই জ্যোৎস্নার কথা ভাবি-
কিছু জ্যোৎস্না আমার সঙ্গে পারফিউমের মতো থাকে সর্বক্ষণ
আর এমনও তো হয়, এক টুকরো বখাটে কাগজ
কোত্থেকে উড়ে আসে, কবিতা হয়, জ্যোৎস্না হয়।আততায়ীর কানপট্রিতে-জ্যোৎস্না ফিক করে হেসে ওঠে।
কখনো রাষ্ট্রদূতের ট্রিম-করা গোঁফে, কখনোবা
বন্দুকের নলে, উদাস প্রান্তরে মৃত সৈনিকের নীল ওষ্ঠে,
শাদা প্রজাপতির মতো বসে থাকে জ্যোৎস্না।
বুনো জ্যোৎস্নায় আমি তাকে কখনো দেখিনি
হয়তো দেখবো না কোনোদিন তার চোখ চন্দ্রালোকে
কীরকম হয়, কীভাবে সে হাঁটে জ্যোৎস্নার ভেতরে
স্বপ্ন-গাঁথা শাড়ি পরে, জানবো না কখনো।আঁজলাভরা জ্যোৎস্না দিয়ে ওজু করে আমি তাকে আবৃত্তি করি
মধ্যরাতে, সহসা এক পাল ঘোড়া, শহুরে জ্যোৎস্নায়
নাচতে নাচতে
আমার সস্মুখে শুয়ে পড়ে, যেন কিছু গল্প আছে ওদের,
এভাবে তাকায়।
মুহূর্তে লুপ্ত ঘোড়া আর ফুলের তোড়ার ব্যবধান।চন্দ্রালোকে কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো কখনো পড়িনি,
পড়লো আরো বেশি ভালো লাগতো কী?
গোইয়ার মগজে খুব রাঙা বিপ্লবী পূর্ণিমা ছিল বুঝি!
জ্যোৎস্নায় বিয়াত্রিচে আর সে একই স্বপ্নের একাকার। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shohure-jyotsnayi/
|
183
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
অ-কেজোর গান
|
প্রকৃতিমূলক
|
ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে আজ মেতে।।
এই রোদ-সোহাগী পউষ-প্রাতে
অথির প্রজাপতির সাথে
বেড়াই কুঁড়ির পাতে পাতে
পুষ্পল মৌ খেতে।
আমি আমন ধানের বিদায়-কাঁদন শুনি মাঠে রেতে।।
আজ কাশ-বনে কে শ্বাস ফেলে যায় মরা নদীর কূলে,
ও তার হলদে আঁচল চ’লতে জড়ায় অড়হরের ফুলে!
ঐ বাবলা ফুলের নাকছবি তার,
গা’য় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চ’লেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।।
আমায় ডেকেছে সে চোখ-ইশারায় পথে যেতে যেতে।।
ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে তাই মেতে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/844
|
1792
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কথা ছিল না
|
চিন্তামূলক
|
কাল রাত্তিরে
সূর্যের মুখে ফুটে উঠেছিল
হো চি-মিনের হাসি।
অথচ কাল রাত্তিরে
সূর্য ওঠার কথা ছিল না।
পরশু বিকেলে
সাত বছরের কালো গোলাপটা
থেতলে গেল
ইস্পাতের লরীতে।
অথচ কালো গোলাপটার
ফুটপাথে ফোটার কথা ছিল না।
আজ সকালে
বন্দুকের শব্দে সাদা হয়ে গেল
সবুজ বন।
অথচ মানুষের মুঠোয়
বন্দুক থাকার কথা ছিল না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1274
|
2356
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
বসন্তের একটি পাখীর প্রতি
|
সনেট
|
নহ তুমি পিক, পাখি, বিখ্যাত ভারতে,
মাধবের বাৰ্ত্তাবহ ; যার কুহরণে
ফোটে কোটি ফুল-পুঞ্জ মঞ্জু কুঞ্জবনে !—
তবুও সঙ্গীত-রঙ্গ করিছ যে মতে
গায়ক, পুলক তাহে জনমে এ মনে !
মধুময় মধুকাল সৰ্ব্বত্র জগতে ,—
কে কোথা মলিন কবে মধুর মিলনে,
বসুমতী সতী যবে রত প্রেমব্রতে?—
দুরন্ত কৃতান্ত-সম হেমন্ত এ দেশে
নিৰ্দ্দয় ; ধরার কষ্টে দুষ্ট তুষ্ট অতি !
না দেয় শোভিতে কভু ফুলরত্মে কেশে,
পরায় ধবল বাস বৈধব্যে যেমতি !—
ডাক তুমি ঋতুরাজে, মনোহর বেশে
সাজাতে ধরায় আসি, ডাক শীঘ্ৰগতি !
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/bosonter-ekati-pakhir-proti/
|
1941
|
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
|
আকাঙ্ক্ষা
|
ভক্তিমূলক
|
(সুন্দরী)
১
কেন না হইলি তুই, যমুনার জল,
রে প্রাণবল্লভ!
কিবা দিবা কিবা রাতি, কূলেতে আঁচল পাতি
শুইতাম শুনিবারে, তোর মৃদুরব ||
রে প্রাণবল্লভ!
২
কেন না হইলি তুই, যমুনাতরঙ্গ,
মোর শ্যামধন!
দিবারাতি জলে পশি, থাকিতাম কালো শশি,
করিবারে নিত্য তোর, নৃত্য দরশন ||
ওহে শ্যামধন!
৩
কেন না হইলি, তুই, মলয় পবন,
ওহে ব্রজরাজ!
আমার অঞ্চল ধরি, সতত খেলিতে হরি,
নিশ্বাসে যাইতে মোর, হৃদয়ের মাঝ ||
ওহে ব্রজরাজ!
৪
কেন না হইলি তুই, কাননকুসুম,
রাধাপ্রেমাধার।
না ছুঁতেম অন্য ফুলে, বাঁধিতাম তোরে চুলে,
চিকণ গাঁথিয়া মালা, পরিতাম হার ||
মোর প্রাণাধার!
৫
কেন না হইলে তুমি, চাঁদের কিরণ,
ওহে হৃষীকেশ!
বাতায়নে বিষাদিনী, বসিতে যবে গোপিনী,
বাতায়নপথে তুমি, লভিতে প্রবেশ ||
আমার প্রাণেশ!
৬
কেন না হইলে তুমি, চিকণ বসন,
পীতাম্বর হরি!
নীলবাস তেয়াগিয়ে, তোমারে পরি কালিয়ে,
রাখিতাম যত্ন কর্যে হৃদয় উপরি ||
পীতাম্বর হরি!
৭
কেন না হইলে শ্যাম, যেখানে যা আছে,
সংসারে সুন্দর।
ফিরাতেম আঁখি যথা, দেখিতে পেতেম তথা,
মনোহর এ সংসারে, রাধামনোহর।
শ্যামল সুন্দর!
(সুন্দর)
১
কেন না হইনু আমি, কপালের দোষে,
যমুনার জল।
লইয়া কম কলসী, সে জল মাঝারে পশি,
হাসিয়া ফুটিত আসি, রাধিকা-কমল-
যৌবনেতে ঢল ঢল ||
২
কেন না হইনু আমি, তোমার তরঙ্গ,
তপননন্দনি!
রাধিকা আসিলে জলে, নাচিয়া হিল্লোল ছলে,
দোলাতাম দেহ তার, নবীন নলিনী-
যমুনাজলহংসিনী ||
৩
কেন না হইনু আমি, তোর অনুরূপী
মলয় পবন!
ভ্রমিতাম কুতূহলে, রাধার কুন্তল দলে,
কহিতাম কানে কানে, প্রণয় বচন-
সে আমার প্রাণধন ||
৪
কেন না হইনু, হায়! কুসুমের দাম,
কণ্ঠের ভূষণ।
এক নিশা স্বর্গ সুখে, বঞ্চিয়া রাধার বুকে,
ত্যজিতাম নিশি গেলে জীবন যাতন-
মেখে শ্রীঅঙ্গচন্দন ||
৫
কেন না হইনু আমি, চন্দ্রকরলেখা,
রাধার বরণ।
রাধার শরীরে থেকে, রাধারে ঢাকিয়ে রেখে,
ভুলাতাম রাধারূপে, অন্যজনমন-
পর ভুলান কেমন?
৬
কেন না হইনু আমি চিকণ বসন,
দেহ আবরণ।
তোমার অঙ্গেতে থেকে, অঙ্গের চন্দন মেখে,
অঞ্চল হইয়ে দুলে, ছুঁতেম চরণ,-
চুম্বি ও চাঁদবদন ||
৭
কেন না হইনু আমি, যেখানে যা আছে,
সংসারে সুন্দর।
কে হতে না অভিলাষে, রাধা যাহা ভালবাসে,
কে মোহিতে নাহি চাহে, রাধার অন্তর-
প্রেম-সুখরত্নাকর?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/936
|
703
|
জয় গোস্বামী
|
প্রেতের মিলননারী নেই
|
প্রেমমূলক
|
সে তাই চন্দ্র ও সূর্য দুটি হাত রেখে
ক্রিয়াশীল আগ্নেয়গিরিকে ভেদ করে
পৃথিবীর সঙ্গে মিলতে চায়--
জিহ্বাহীন মুখ থেকে অতৃপ্ত রমণশব্দ
মেঘ ফেটে গেলে--শোনা যায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1750
|
2443
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
বিলাপ
|
হাস্যরসাত্মক
|
ঘুম থেকে উঠেই কী দেখলাম আজ
কেমন করে করলে তুমি এই সর্বনাশা কাজ?
শাড়ি দিয়ে প্যাঁচ লাগিয়ে গলায় দিলে দড়ি
দুঃখে আমার বুক ফেটে যায় কী এখন করি?
এই দুঃখ এখন আমি কেমনে সইতে পারি?
তুমি কী জানতে না গো,
এইটা আমার মোস্ট ফেবারিট শাড়ি?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2041
|
5765
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
চন্দনকাঠের বোতাম
|
চিন্তামূলক
|
যেমন উপত্যকা থেকে ফিরে এসেছি বহুবার, পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা হয়নি
যেমন হাত অঞ্জলিবদ্ধ করেছি বহুবার, কখনো পার্থনা জানাইনি
যেমন নারীর কাছে মৃত্যুকে সমর্পণ করেছিলাম
মৃত্যুর কাছে নারীকে
যেমন বৃক্ষের কাছে জল্লাদের মতন গিয়েছি কুঠার হাতে
উপকথার কাঠুরেকে করেছি উপহাস
যেমন মানুষের কাছে আমিও মানুষ সেজে থাকতে চেয়েছিলাম
কৃতজ্ঞতার বদলে ফিরিয়ে নিয়েছি মুখ
যেমন স্বপ্নের মধ্যে নিজেকে শৈশব দেখেও চিনতে পারিনি
লোকের মধ্যে শিশুকো আদর করেছি, লৌকিকতাবশত
ডাকবাংলার বন্ধ দরজার সামনে চাবির বদলে হাতুড়ি চেয়েছিলাম
যেমন ঝামরে-পড়া অন্ধকারের মধ্যে থেকে সর্বাঙ্গে ভুসো কালি মেখে
এসেছিলাম আলোর কাছে
যেমন কুকুরের দাঁতে বার-বার ছুঁয়েছি স্তন ও ওষ্ঠসমূহ
যেমন জ্যোৎস্না মধ্য গন্ধরাজ ফুলগাছের পাশে দেখেছিলাম
এক বোবা কালা প্রেত
যেমন বুদ্ধপূর্ণিমার রাত্রে গলা মুচড়ে মেরেছিলাম ধবল হাঁস
কানানা লুকোবার জন্য নতীতে স্নান করতে গিয়েছি
যেমন অন্ধ মেয়েটির কন্ঠস্বর শুনে মনে হয়েছিল
আমার পূর্বজন্মের চেনা
অত্যন্ত মমতায় আমি তাকে উপহার দিয়েছিলাম রূপো বাঁধানো আয়না
যেমন ফিরে আসবো বলেও ফিরে যাইনি বেশ্যার কাছে
সমুদ্রের কাছেও আর যাইনি
ফিরে যাইনি ধলভূমগড়ের লালধুলোর রাস্তায়
দন্ডকারণ্যে নির্বাসিতা ধাইমা’র কাছেও যাওয়া হয়নি
যেমন ঠিকানা হারিয়ে বহু চিঠির উত্তর লেখা হয় না
তবু জেগে থাকে অভিমান
যেমন মায়ের কাছেও গোপন করেছি শরীরের অনেক অসুখ
যেমন মনে মনে গ্রহণ করা অনেক শপথ কেউ শুনতে পায়নি
বলেই মেনে চলিনি
যেমন কাঁটা বেঁধার পর রক্ত দর্শনে সূর্যাস্তের আবহমান
দৃশ্য থেকে ফিরে আসে চোখ;
তেমনই এই চৌতিরিশ বছরে এক ট্রেনের জানালায় মুখ রেখে
আমার চকিতে দিগভ্রম হয়
বৃক্ষসারি ছুটে যায় আমার আপাত গতির বিপরীত দিকে
পুকুরে স্নানের দৃশ্য মুহূর্তের সত্য থেকে পরমুহূর্তের অলৌকিক
আমার বুক টনটন করে ওঠে অথচ নির্দিষ্ট শোক নেই
সান্তনার কথা মনে আসে না
আয়ুর সীমানা কেউ জানে না, তাই মনে হয় অনেক কিছু হারিয়েছি
কিন্তু মুহূর্তের সত্যেরই মতন, সেই মুহূর্তে শুধু মনে পড়ে
কৈশোরে হারিয়েছিলাম অতি প্রিয় একটা চন্দনকাঠের বোতাম
এখনও নাকে আসে তার মৃদু সুগন্ধ
শুধু সেই বোতামটা হারানোর দুঃখে
আমার ঠোঁটে কাতর ক্ষীণ হাসি লেগে থাকে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1824
|
497
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
লিচু
|
ছড়া
|
বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাঁড়া।পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,ও বাবা মড়াত করে
পড়েছি সরাত জোরে।
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
সে ছিল গাছের আড়েই।
ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিলে খুব কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।আমিও বাগিয়ে থাপড়
দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়
লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,
দেখি এক ভিটরে শেয়াল!
ও বাবা শেয়াল কোথা
ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা
দেখে যেই আঁতকে ওঠা
কুকুরও জাড়লে ছোটা!
আমি কই কম্ম কাবার
কুকুরেই করবে সাবাড়!‘বাবা গো মা গো’ বলে
পাঁচিলের ফোঁকল গলে
ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে,
যেন প্রাণ আসলো ধড়ে!যাব ফের? কান মলি ভাই,
চুরিতে আর যদি যাই!
তবে মোর নামই মিছা!
কুকুরের চামড়া খিঁচা
সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
মালীর ঐ পিটুনিগুলা!
কি বলিস? ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা!বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাঁড়া।পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,ও বাবা মড়াত করে
পড়েছি সরাত জোরে।
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
সে ছিল গাছের আড়েই।
ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিলে খুব কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।আমিও বাগিয়ে থাপড়
দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়
লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,
দেখি এক ভিটরে শেয়াল!
ও বাবা শেয়াল কোথা
ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা
দেখে যেই আঁতকে ওঠা
কুকুরও জাড়লে ছোটা!
আমি কই কম্ম কাবার
কুকুরেই করবে সাবাড়!‘বাবা গো মা গো’ বলে
পাঁচিলের ফোঁকল গলে
ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে,
যেন প্রাণ আসলো ধড়ে!যাব ফের? কান মলি ভাই,
চুরিতে আর যদি যাই!
তবে মোর নামই মিছা!
কুকুরের চামড়া খিঁচা
সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
মালীর ঐ পিটুনিগুলা!
কি বলিস? ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা!বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাঁড়া।পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,ও বাবা মড়াত করে
পড়েছি সরাত জোরে।
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
সে ছিল গাছের আড়েই।
ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিলে খুব কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।আমিও বাগিয়ে থাপড়
দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়
লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,
দেখি এক ভিটরে শেয়াল!
ও বাবা শেয়াল কোথা
ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা
দেখে যেই আঁতকে ওঠা
কুকুরও জাড়লে ছোটা!
আমি কই কম্ম কাবার
কুকুরেই করবে সাবাড়!‘বাবা গো মা গো’ বলে
পাঁচিলের ফোঁকল গলে
ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে,
যেন প্রাণ আসলো ধড়ে!যাব ফের? কান মলি ভাই,
চুরিতে আর যদি যাই!
তবে মোর নামই মিছা!
কুকুরের চামড়া খিঁচা
সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
মালীর ঐ পিটুনিগুলা!
কি বলিস? ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%9a%e0%a7%81-%e0%a6%9a%e0%a7%8b%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%a8%e0%a6%9c%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae/
|
5061
|
শামসুর রাহমান
|
ভালো থাকা না থাকা
|
প্রেমমূলক
|
বাইরে তাকিয়ে দেখি
রৌদ্রবিহীন সকাল,
আকাশ এঁটো পানিময় বাসন।
হঠাৎ বেজে উঠলো টেলিফোন, তোমার
কণ্ঠস্বর নিমেষে
আমার মনের ভেতর ছড়িয়ে দিলো
একরাশ রোদ। রিসিভার ক্রেডলে
রাখার আগে
তুমি বললে, ‘ভালো থেকো।দিনকাল যা পড়েছে
ভালো থাকা দায়। তবু
‘ভালো থেকো’ এই শব্দযুগল আমার
চোখের সামনে মেলে দিলো
কিছু সুশ্রী ছবি। পালটে গেল একালবেলার
মুখ, আর সেই মুহূর্তে
জানালার বাইরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়ে ভাবলাম,
নিজের জন্যে না হলেও
কারোর জন্যে আমার ভালো থাকা দরকার।
কিন্তু ব্যাপার হলো এই,
ভালো থাকতে গিয়ে অনেক বাধার দেয়াল গুঁড়িয়ে
আমি এখন বিশাল এক অগ্নিকুণ্ডে
কী প্রবল ঝাঁপিয়ে পড়েছি। (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/valo-thaka-na-thaka/
|
465
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মুক্তিকাম
|
স্বদেশমূলক
|
স্বাগত বঙ্গে মুক্তিকাম!
সুপ্ত বঙ্গে জাগুক আবার লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম!
শোনাও সাগর-জাগর সিন্ধু-ভৈরবী গান ভয়-হরণ, –
এ যে রে তন্দ্রা, জেগে ওঠ তোরা, জেগে ঘুম দেওয়া নয় মরণ!
সপ্ত-কোটি কু-সন্তান তোরা রাখিতে নারিলি সপ্তগ্রাম?
খাসনি মায়ের বুকের রুধির? হালাল খাইয়া হলি হারাম !
মৃত্যু-ভূতকে দেখিলি রে শুধু, দেখিলি না তোরা ভবিষ্যৎ,
অস্ত-আঁধার পার হয়ে আসে নিত্য প্রভাতে রবির রথ!
অহোরাত্রিকে দেখেছে যাহারা সন্ধ্যাকে তারা করে না ভয়,
তারা সোজা জানে রাত্রির পরে আবার প্রভাত হবে উদয়।
দিন-কানা তোরা আঁধারের প্যাঁচা, দেখেছিস শুধু মৃত্যু-রাত,
ওরে আঁখি খোল, দেখ তোরও দ্বারে এসেছে জীবন নব-প্রভাত!
মৃত্যুর ‘ভয়’ মেরেছে তোদেরে, মৃত্যু তোদেরে মারেনি, ভাই!
তোরা মরে তাই হয়েছিস ভূত, আলোকের দূত হলিনে তাই!
জীবন থাকিতে ‘মরে আছি’ বলে পড়িয়া আছিস মড়া-ঘাটে,
সিন্ধু-শকুন নেমেছে রে তাই তোদের প্রাণের রাজ-পাটে!
রক্ত মাংস খেয়েছে তোদের, কঙ্কাল শুধু আছে বাকি,
ওই হাড় নিয়ে উঠে দাঁড়া তোরা ‘আজও বেঁচে আছি’ বল ডাকি!
জীবনের সাড়া যেই পাবে, ভয়ে সিন্ধু-শকুন পালাবে দূর,
ওই হাড়ে হবে ইন্দ্র-বজ্র, দগ্ধ হবে রে বৃত্রাসুর!
এ মৃতের দেশে, অমৃত-পুত্র, আনিবে কি সেই অমৃত-ঢল –
যাতে প্রাণ পেয়ে মৃত সগরের দেশ এ বঙ্গ হবে সচল?
জ্যান্তে-মরা এ ভীরুর ভারতে চাই নাকো মৃত-সঞ্জীবন,
ক্লীবের জীবন-সুধা আনো, করো ভূতের ভবিষ্যৎ সৃজন!
(ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/muktikam/
|
5171
|
শামসুর রাহমান
|
যেখানে পূর্ণিমা-চাঁদ চুমো খাবে
|
মানবতাবাদী
|
এই যে সর্বত্র ভয়ঙ্কর কাঁটাময়
জায়গায় বহু দূর থেকে
হাঁটতে হাঁটতে একা পৌঁছে গেছি
অনিচ্ছা সত্ত্বেই-একি ভবিতব্য শুধু?এগোতে গেলেই চারদিক থেকে সব হিংস্র কাঁটা
বিঁধবে শরীরে আর বৃষ্টির ফোঁটার মতো রক্ত
ঝরবে এবং আমি রক্তহীনতায়
জনহীন ভয়ঙ্কর পথে পড়ে থাকবো নিশ্চিত।হয়তো খানিক পরে মানুষের শোণিতের ঘ্রাণে
ক্ষুধার্ত পশুর ঝাঁক এসে
জুটবে আমাকে ঘিরে। পাশব হামলা অতিশয়
দ্রুত ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে গিলে ফেলে দিব্যি তৃপ্তি পাবে।তবে কি বেগানা এই জনহীন এলাকায় আমার জীবন
অন্তিম নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে
নিভে যাবে ঝড়-ক্ষুব্ধ দিনে কিংবা রাতে?
কাঁটাবন থেকে দ্রুত বেরিয়ে পৌঁছুতে হবে শান্ত আস্তানায়।যাক ছিঁড়ে যাক ক্লান্ত শরীর আমার, তবু যেতে
হবে সেই এলাকায় যেখানে পূর্ণিমা-চাঁদ চুমো
খাবে আসমান, নদী, মাটি আর মানুষকে। চৌদিক কেমন
নিমেষে বদলে ফেলে রূপ। গীতসুধা পান করে নানা প্রাণী। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jekhane-purnima-chad-chumo-khabe/
|
5240
|
শামসুর রাহমান
|
শেষে যা-ই হোক
|
চিন্তামূলক
|
আর কত দূরে নিয়ে যাবে বলো? আর কত পথ
হেঁটে যেতে হবে? থামলেই যদি
ঝোপঝাড় থেকে জাঁহাবাজ পশু লাফিয়ে শরীর
টুঁটি চেপে ধরে, কী হবে আমার? নিরস্ত্র আমি,
এমনকি হাতে অস্ত্র দিলেও কাউকে কখনও
ভুলেও দেবো না আঘাত, এমন শিক্ষা পেয়েছি মা, বাবার কাছে।হঠাৎ একদা কী ক’রে যে আমি খাতার পাতায়
কোন্ ঘোরে ডুবে পঙ্ক্তির পর
পঙ্ক্তি সাজিয়ে লিখে ফেললাম একটি পদ্য
নিজের কাছেই রহস্য হয়ে রইলো সত্যি। যতদূর জানি
আমার বংশে কখনও কারুর কলমের ডগা
ভুলেও করেনি পদ্য রচনা। অবশ্য ছিল শিক্ষার আলো।কী করে যে এক গোধূলি-লগ্নে আমার সমুখে
মুখোমুখি এসে বসলো অচেনা মোহিনী নীরবে
রহস্য-জাল ছড়িয়ে আমার সত্তায়, আমি
তার ইঙ্গিতে সেই যে লেখনী হাতে নিয়ে এক
খেলায় মেতেছি, তার জের আজও
চলছে প্রায়শ বেলা-অবেলায়।গ্রামে ও শহরে লগ্ন আমার জীবন, তাই তো
পুরনো গলির ধুলো আর ধুঁয়ো বমি-করা
কারখানা আর মোটর গাড়ির আওয়াজে মুখর দিনরাত কাটে।
অবশ্য আমি কখনও সখনও আমাদের প্রিয়
পাড়াতলী গাঁয়ে, মেঘনা নদীর নিঝুম শাখায়
নৌকো-ভ্রমণে পানকৌড়ির, মাছরাঙার
রূপ দেখে সুখে কাটাই সময়। পাড়াতলীতেই
দাদা, নানা, বাবা এবং আমার ছেলে শান্তিতে চিরনিদ্রায়
সমাহিত, তাই সেই ভূমি বড়ই পবিত্র প্রিয় এ কবির কাছে।
জানি না আমার সাফল্য কিছু প্রদীপের মতো
জ্বলবে তিমিরে না কি বিফলতা বয়ে নিয়ে সদা
বেঘোরে ঘুরবো এদিক সেদিক। কোনও কিছু আজ
মোহরূপে আর পারে না আমাকে বন্দি করতে। যতদিন বেঁচে
আছি এই ধু ধু ধুলোর জগতে, ততদিন কালি
কলমের খেলা খেলে যাবো ঠিক, শেষে যা-ই হোক। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sheshe-ja-i-hok/
|
173
|
উৎপল কুমার বসু
|
আরো
|
প্রকৃতিমূলক
|
বাতাস শাসন করে ঢেউগুলি । অনন্ত প্রাকার
শুষ্ক তৃণে, ঝাউশাখে । নগর পিছনে ফেলে চলে আসে সহস্র ভিখারি,
অন্ধ লোল ভিখারিনী, ভিক্ষাদাতা ইত্যাদির সার
কেননা ওষ্ঠে দুই করতল স্ফীত করে হাঁক দেয় মুক্তার শিকারি
যেখানে জলের রেখা ধাপে ধাপে দিগন্তে ছড়ায়
যেখানে সৈকত জুড়ে উড়ে চলে ছায়াপত্ররাশি
আমার হোটেল থেকে দেখা গেল — যতখানি তোমাকে দেখায়
কিছু কি গোপন রাখো ? কোনো প্রেমবৈষম্যের হাসি ?প্রতি ধর্ম বলে দেয় : আমি চাই অসম্পূর্ণ পাঠ ।
ঐ মতো মুক্তা বলে । জলের প্লাবনে তব মুক্তার শিকার ।
তরঙ্গে নেমেই আজ বোঝা গেল সমুদ্রকপাটআরো দূরে । যেখানে জলের রঙ লৌহমরিচার
শিকলের মতো লাল । ভিখারির দলে মিশে আমি কি শুনি নি
জলের গভীরে রুদ্ধ শৃঙ্খলের ধ্বনি ?*রাত্রির জোয়ার লেগে নুয়ে পড়ে সৈতকতৃণ
এখন রেখেছি মদ নৃত্যপর মদের গেলাসে
উঠেছি নক্ষত্রহীন গম্বুজে ও সমুদ্রবাতাসে
দূর হতে দেখা যায় অপসর হেমন্তের দিনওতোমাকে অনেক কথা বলা হল । কিছু নেই বাকি ।
হেমন্তের দিনে আর ফাঁক নেই । পাতা হতে পাতার তরল
উচ্ছ্বাস ধাবিত দেখে, হে জীবপালিনি, ঐ অনন্ত শীতল
বাহুবন্ধে ছিঁড়ে পড়ে দেখেছি একাকীচূর্ণ সবিতার দিন ক্রমাগত দূরে সরে যায় ।
যেখানে সৈকততৃণ অর্ধেক আলোকগ্রস্ত অর্ধেক ঢাকা
যেখানে রূপোয়-গড়া সুবর্ণের, তরঙ্গের অতীন্দ্রীয় চাকাআগুন উড়ায় দ্রুত । মৌমাছি কি গতিদিব্যতায়
আবার বসন্তদিনে খুলে ফ্যালে রান্নার হাঁড়ি ।
যখন প্রস্তুত সব, ধোঁয়া ওঠে, ক্ষুধা, কাড়াকাড়ি ।*লাল টালি . . . .শাদা বাড়ি
ঢেউ ওঠে . . . .ঢেউ পড়ো পড়ো
শাদা বালি . . . .শাদা বাড়ি
দুপুরের আলো . . . .ধূ ধূ সূর্যের আলো
শাদা সূর্য ও বালি . . . .শাদা ফেনা ও ফেনার
টানে ঢেউ পড়ো পড়ো . . . .জাগে বালিয়াড়ি
জ্বলে লাল টালি . . . .তোমাদের বাড়ি ।
বাতাস শাসন করে ঢেউগুলি । অনন্ত প্রাকার
শুষ্ক তৃণে, ঝাউশাখে । নগর পিছনে ফেলে চলে আসে সহস্র ভিখারি,
অন্ধ লোল ভিখারিনী, ভিক্ষাদাতা ইত্যাদির সার
কেননা ওষ্ঠে দুই করতল স্ফীত করে হাঁক দেয় মুক্তার শিকারি
যেখানে জলের রেখা ধাপে ধাপে দিগন্তে ছড়ায়
যেখানে সৈকত জুড়ে উড়ে চলে ছায়াপত্ররাশি
আমার হোটেল থেকে দেখা গেল — যতখানি তোমাকে দেখায়
কিছু কি গোপন রাখো ? কোনো প্রেমবৈষম্যের হাসি ?প্রতি ধর্ম বলে দেয় : আমি চাই অসম্পূর্ণ পাঠ ।
ঐ মতো মুক্তা বলে । জলের প্লাবনে তব মুক্তার শিকার ।
তরঙ্গে নেমেই আজ বোঝা গেল সমুদ্রকপাটআরো দূরে । যেখানে জলের রঙ লৌহমরিচার
শিকলের মতো লাল । ভিখারির দলে মিশে আমি কি শুনি নি
জলের গভীরে রুদ্ধ শৃঙ্খলের ধ্বনি ?*রাত্রির জোয়ার লেগে নুয়ে পড়ে সৈতকতৃণ
এখন রেখেছি মদ নৃত্যপর মদের গেলাসে
উঠেছি নক্ষত্রহীন গম্বুজে ও সমুদ্রবাতাসে
দূর হতে দেখা যায় অপসর হেমন্তের দিনওতোমাকে অনেক কথা বলা হল । কিছু নেই বাকি ।
হেমন্তের দিনে আর ফাঁক নেই । পাতা হতে পাতার তরল
উচ্ছ্বাস ধাবিত দেখে, হে জীবপালিনি, ঐ অনন্ত শীতল
বাহুবন্ধে ছিঁড়ে পড়ে দেখেছি একাকীচূর্ণ সবিতার দিন ক্রমাগত দূরে সরে যায় ।
যেখানে সৈকততৃণ অর্ধেক আলোকগ্রস্ত অর্ধেক ঢাকা
যেখানে রূপোয়-গড়া সুবর্ণের, তরঙ্গের অতীন্দ্রীয় চাকাআগুন উড়ায় দ্রুত । মৌমাছি কি গতিদিব্যতায়
আবার বসন্তদিনে খুলে ফ্যালে রান্নার হাঁড়ি ।
যখন প্রস্তুত সব, ধোঁয়া ওঠে, ক্ষুধা, কাড়াকাড়ি ।*লাল টালি . . . .শাদা বাড়ি
ঢেউ ওঠে . . . .ঢেউ পড়ো পড়ো
শাদা বালি . . . .শাদা বাড়ি
দুপুরের আলো . . . .ধূ ধূ সূর্যের আলো
শাদা সূর্য ও বালি . . . .শাদা ফেনা ও ফেনার
টানে ঢেউ পড়ো পড়ো . . . .জাগে বালিয়াড়ি
জ্বলে লাল টালি . . . .তোমাদের বাড়ি ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%b0%e0%a7%8b-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9b%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%89%e0%a7%8e%e0%a6%aa%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a7%81/
|
2021
|
ভাস্কর চক্রবর্তী
|
মৃতসঞ্জীবনী
|
প্রেমমূলক
|
যদি ভালোবাসা, প্রিয়, আমাকে বাঁচাতে পারে বাঁচবো তাহলে-
খসে পড়া তারাগুলো নাহলে আমাকে নিয়ে
মৃত তারাদের দেশে চলে যাবে-
সেখানে সমাধি হবে আমারও বা
লেখা হবে, আজব বিচিত্র এক নীল তারা, চশমাধারী প্রজাপতি,
এখানে ঘুমোচ্ছে সারা জীবনের ঘুমে,
যে তারাটি একা একা ছাতে বসে বুঝতে চেয়েছিল
ভালোবাসা আজো কেন বিক্রি হবে চড়া দামে
ভালোবাসা, রাজারহাটের তিন বেডরুমের মোলায়েম ফ্ল্যাট নাকি কোনো?
শাদা কোনো টাটা সুমো?
হলুদ বালিতে যায় ভরে যায় দেশ-বিদেশ, যাকে তোমরা
মরুভূমি বলো
সে মরুবালিও পথ শুঁকে শুঁকে এসে গেছে আমাদের ঘরে
এসো তুমি ধবধবে বিছানায় দুঘন্টায় ধন্য হও পথের কুটীরে
তিন গ্লাস স্বাধীনতা সঙ্গে পাবে
শুধু তুমি, এখনো কেন যে ভাবো, ভালোবাসা
ভালোবাসা মৃতসঞ্জীবনী
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4215.html
|
5815
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নেই
|
চিন্তামূলক
|
খড়ের চালায় লাউ ডড়া, ওতে কার প্রিয় সাধ লেগে আছে
জলের অনেক নিচে তুলসীমঞ্চ, সেইখানে ছোঁয়া ছিল অনেক প্রণাম
রান্নাঘরটিতে ছিল কিছু ক্ষুধা, কিছু স্নেহ, কিচু দুর্দিনের খুদকুঁড়ো
উঠোনে কয়েকটি পায়ে দাপাদাপি, দু‘খুঁটিতে টান করা ছেঁড়া ডুবে শাড়ি
পাশেই গেয়ালঘর, ঠিক ঠাকুমার মতো সহ্যশীলা নীরব গাভীটি
তাকে ছায়া দিত এক প্রাচীন জামরুল বৃক্ষ, যায় ফল খেয়ে যেত পোকা
পাটের ছবির মতো চুরি করা মাছ কুখে বিড়ালের পালানো দুপুর
সবই যেন দেখা যায়, অথচ কিছুই নেই, চতুর্দিকে জলের কল্লোল
এখন রাত্রির মতো দিন আর রাতগুলি আরও বেশি অতিকায় রাত
জননী মাটির কাছে মানুষের বুক ছিল, মাটিকে ভাসিয়ে গেছে মাটির দেবতা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1814
|
5399
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
ঘুমের রানী
|
গীতিগাথা
|
দেখা হলো ঘুম নগরীর রাজকুমারীর সংগে
সন্ধ্যা বেলায় ঝাপসা ঝোপের ধারে
পরনে তার হাওয়ার কাপড় ওড়না ওড়ে অঙ্গে
দেখলে সে রূপ ভুলতে কি কেউ পারে?চোখ দুটো তার ঢুলু ঢুলু মুখখানি তার পিঠে
আফিম ফুলের রক্তিম হার চুলে
নিশ্বাসে তার হাসনু হেনা হাস্যে মধুর ছিটে
আলগোছে সে আলগা পায়েই বুল।এক যে আছে কুঞ্ঝটিকার দেয়াল ঘেরা কেল্লা
মৌনমুখী সেথায় নাকি থাকে
মন্ত্র পড়ে বাড়ায় কমায় জোনাক পোকার জেল্লা
মন্ত্র পড়ে চাঁদকে সে রোজ ডাকে।তোঁত পোকাতে তাঁত বোনে তার জানলাতে দেয় পর্দা
হুতোম প্যাঁচা প্রহন হাঁকে দ্বারে
ঝর্ণাগুলি পূর্ণ চাঁদের আলোয় হয়ে জর্দা
জলতরঙ্গ বাজনা শোনায় তারে।কালো কাঁচের আর্শিতে সে মুখ দেখে সুস্পষ্ট
আলো দেখে কালো নদীর জলে
রাজ্যেতে তার নেইকো মোটেই স্থায়ী রকম কষ্ট
স্বপন সেথায় বাড়ায় দলে দলে।সন্ধ্যা বেলা অন্ধকারে হঠাৎ হলো দেখা
ঘুম নগরীর রাজকুমারীর সনে
মধুর হেসে সুন্দরী সে বেড়ায় একা একা
মুর্ছা হেনে বেড়ায় গো নির্জনে।
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/gomer-rani/
|
2541
|
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
|
মাধবিকা
|
প্রকৃতিমূলক
|
দখিন হাওয়া---রঙিন হাওয়া, নূতন রঙের ভাণ্ডারী,
জীবন-রসের রসিক বঁধু, যৌবনেরি কাণ্ডারী!
সিন্ধু থেকে সদ্দ বুঝি আসছ আজি স্নান করি'---
গাং-চিলেদের পক্ষধ্বনির শন্ শনানির গান্ ধরি';
মৌমাছিদের মনভুলানি গুনগুনানির সুর ধরে'---
চললে কোথায় মুগ্ধ পথিক, পথটি বেয়ে উত্তরে?
অনেক দিনের পরে দেখা, বছর-পারের সঙ্গী গো,
হোক্ না হাজার ছাড়াছাড়ি, রেখেছ সেই ভঙ্গি তো!
---তেমনি সরস ঠাণ্ডা পরশ, তেমনি গলার হাঁকটি , সেই
দেখতে পেলেই চিনতে পারি, কোনোখানেই ফাঁকটি নেই!
---কোথায় ছিলে বন্ধু আমার, কোন্ মলয়ের বন ঘিরে,'
নারিকেলের কুঞ্জে-বেড়া কোন্ সাগরের কোন্ তীরে!
লকলকে সেই বেতসবীথির বলো তো ভাই কোন্ গলি,
এলা-লতার কেয়াপাতার খবর তো সব মঙ্গলই?
---ভালো কথা, দেখলে পথে সবাই তোমায় বন্দে তো,---
বন্ধু বলে' চিনতে কারো হয়নি তো ভাই সন্দেহ?
নরনারী তোমার মোহে তেমনি তো সব ভুল করে---
তেমনিতর পরস্পরের মনের বনে ফুল ধরে!
আসতে যেতে দীঘির পথে তেমনি নারীর ছল করা;
পথিকবধুর চোখের কোণে তেমনি তো সেই জলভরা?
রঙ্গনে সেই রং তো আছে, অশোকে তাই ফুটছে তো,
শাখায় তারি দুলতে দোলায় তরুণীদল জুটছে তো?
তোমায় দেখে' তেমনি দেখে উঠছে তো সব বিহঙ্গ,
সবুজ ঘাসের শীষটি বেয়ে রয় তো চেয়ে পতঙ্গ?
তেমনি---সবই তেমনি আছে! --- হ'লাম শুনে' খুব খুশী,
প্রাণটা ওঠে চনচনিয়ে, মনটা ওঠে উসখুসি', ---
নূতন রসে রসল হৃদয়, রক্ত চলে চঞ্চলি', ---
বন্ধু তোমায় অর্ঘ্য দিলাম উচ্ছলিত অঞ্জলি।
গ্রহণ করো, গ্রহণ করো---বন্ধু আমার দণ্ডেকের---
জানিনাক আবার কবে দেখা তোমার সঙ্গে ফের।।
|
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/madobika/
|
6018
|
হেলাল হাফিজ
|
আমার কী এসে যাবে
|
প্রেমমূলক
|
আমি কি নিজেই কোন দূর দ্বীপবাসী এক আলাদা মানুষ?
নাকি বাধ্যতামূলক আজ আমার প্রস্থান,
তবে কি বিজয়ী হবে সভ্যতার অশ্লীল স্লোগান?
আমি তো গিয়েছি জেনে প্রণয়ের দারুণ আকালে
নীল নীল বনভূমি ভেতরে জন্মালে
কেউ কেউ চলে যায়, চলে যেতে হয়
অবলীলাক্রমে কেউ বেছে নেয় পৃথক প্লাবন,
কেউ কেউ এইভাবে চলে যায় বুকে নিয়ে ব্যাকুল আগুন।
আমার কী এসে যাবে, কিছু মৌল ব্যবধান ভালোবেসে
জীবন উড়ালে একা প্রিয়তম দ্বীপের উদ্দেশ্যে।
নষ্ট লগ্ন গেলে তুমিই তো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে
সুকঠিন কংক্রিটে জীবনের বাকি পথ হেঁটে যেতে যেতে
বারবার থেমে যাবে জানি
‘আমি’ ভেবে একে-তাকে দেখে।
তুমিই তো অসময়ে অন্ধকারে
অন্তরের আরতির ঘৃতের আগুনে পুড়বে নির্জনে।
আমাকে পাবে না খুঁজে, কেঁদে-কেটে, মামুলী ফাল্গুনে।
৪.৮.৮০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/91
|
2010
|
বুদ্ধদেব বসু
|
মুক্তিযুদ্ধের কবিতা
|
মানবতাবাদী
|
আজ রাত্রে বালিশ ফেলে দাও, মাথা রাখো পরস্পরের বাহুতে,
শোনো দূরে সমুদ্রের স্বর, আর ঝাউবনে স্বপ্নের মতো নিস্বন,
ঘুমিয়ে পোড়ো না, কথা ব’লেও নষ্ট কোরো না এই রাত্রি-
শুধু অনুভব করো অস্তিত্ব।
কেন না কথাগুলোকে বড়ো নিষ্ঠুরভাবে চটকানো হ’য়ে গেছে,
কোনো উক্তি নির্মল নয় আর, কোনো বিশেষণ জীবন্ত নেই;
তাই সব ঘোষণা এত সুগোল, যেন দোকানের জানালায় পুতুল-
অতি চতুর রবারে তৈরি, রঙিন।
কিন্তু তোমরা কেন ধরা দেবে সেই মিথ্যায়, তোমরা যারা সম্পন্ন,
তোমরা যারা মাটির তলায় শস্যের মতো বর্ধিষ্ণু?
বোলো না ‘সুন্দর’, বোলো না ‘ভালোবাসা’, উচ্ছ্বাস হারিয়ে ফেলো না
নিজেদের-
শুধু আবিষ্কার করো, নিঃশব্দে।
আবিষ্কার করো সেই জগৎ, যার কোথাও কোনো সীমান্ত নেই,
যার উপর দিয়ে বাতাস ব’য়ে যায় চিরকালের সমুদ্র থেকে,
যার আকাশে এক অনির্বাণ পুঁথি বিস্তীর্ণ-
নক্ষত্রময়, বিস্মৃতিহীন।
আলিঙ্গন করো সেই জগৎকে, পরষ্পরেরচেতনার মধ্যে নিবিড়।
দেখবে কেমন ছোটো হ’তেও জানে সে, যেন মুঠোর মধ্যে ধ’রে যায়,
যেন বাহুর ভাঁজে গহ্বর, যেখানে তোমরা মুখ গুঁজে আছো
অন্ধকারে গোপনতায় নিস্পন্দ-
সেই একবিন্দু স্থান, যা পবিত্র, আক্রমণের অতীত,
যোদ্ধার পক্ষে অদৃশ্য, মানচিত্রে চিহ্নিত নয়,
রেডিও আর হেডলাইনের বাইরে সংঘর্ষ থেকে উত্তীর্ণ-
যেখানে কিছুই ঘটে না শুধু আছে সব
সব আছে- কেননা তোমাদেরই হৃদয় আজ ছড়িয়ে পড়লো
ঝাউবনে মর্মর তুলে, সমুদ্রের নিয়তিহীন নিস্বনে,
নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে, দিগন্তের সংকেতরেখায়-
সব অতীত, সব ভবিষ্যৎ আজ তোমাদের।
আমাকে ভুল বুঝোনা। আমি জানি, বারুদ কত নিরপেক্ষ,
প্রাণ কত বিপন্ন।
কাল হয়তো আগুন জ্বলবে দারুণ, হত্যা হবে লেলিহান,
যেমন আগে, অনেকবার, আমাদের মাতৃভুমি এই পৃথিবীর
মৃত্তিকায়-
চাকার ঘূর্ণনের মতো পুনরাবৃত্ত।
তবু এও জানি ইতিহাস এক শৃঙ্খল, আরআমরা চাই মুক্তি,
আর মুক্তি আছে কোন পথে, বলো, চেষ্টাহীন মিলনে ছাড়া?
মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন, মানুষের সঙ্গে বিশ্বের-
যার প্রমাণ, যার প্রতীক আজ তোমরা।
নাজমা, শামসুদ্দিন, আর রাত্রির বুকে লুকিয়ে-থাকা যত প্রেমিক,
যারা ভোলোনি আমাদের সনাতন চুক্তি, সমুদ্র আর নক্ষত্রের সঙ্গে,
রচনা করেছো পরস্পরের বাহুর ভাঁজে আমাদের জন্য
এক স্বর্গের আভাস, অমরতায় কল্পনা:
আমি ভাবছি তোমাদের কথা আজকের দিনে, সারাক্ষণ-
সেই একটি মাত্র শিখা আমার অন্ধকারে, আমার চোখের সামনে
নিশান।
মনে হয় এই জগৎ-জোড়া দুর্গন্ধ আর অফুরান বিবমিষার বিরুদ্ধে
শুধু তোমরা আছো উত্তর, আর উদ্ধার।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4141.html
|
2261
|
মহাদেব সাহা
|
লেলিন, এইনাম উচ্চারিত হলে
|
মানবতাবাদী
|
লেনিন, এই নাম উচ্চারিত হলে
রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে প্রাণ;
দেখি ভলগা থেকে নেমে আসে মানবিক উৎসধারা
আমাদের বঙ্গোপসাগরে
আমাদের পদ্মা-মেঘনা ছেয়ে যায় প্রাণের বন্যায়;
লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণহীন একটি গোলাপ
লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণমুক্ত একঝাঁক পাখি,
লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণহীন একটি সমাজ।
ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো যোগ্য প্রতিশব্দ আমি দেখিনি কোথাও
যা হতে পারে লেনিন শব্দের ঠিক স্বচ্ছ অনুবাদ,
মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কখনো যে হতে পারে
সীমাহীন আকাশের মতো
কখনো যে মানুষের এই হাত এতোটা উপরে উঠতে পারে
তোমার আগে কখনো তা কেউ দেখায়নি, কমরেড লেনিন।
তুমিই প্রথম পৃথিবীর মাটিতে উড়িয়ে দিলে সাম্যের পতাকা
এই মাটিতেই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ এভারেস্ট জয়ের
চেয়েও যে কঠিন,
কঠিন যে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে কোনো নতুন দেশের
সন্ধান লাভের চেয়েও
কিংবা কোনো অজ্ঞাত দ্বীপ আবিস্কারের চেয়েও যে দুরূহ
তু তুমি জানতে বলেই এই কাজই বেছে নিয়েছিলে;
তাই তুমি পৃথিবীর মাটিতে উড়ালে প্রথম এই মানুষের মুক্তির পতাকা।
এর আগে মানুষ কোথাও আর প্রকৃতই স্বাধীন ছিলো না
মানুষ তোমারই হাতে এই পেলো প্রথম স্বীকৃতি
তার আগে মেহনতী মানুষের ছিলো না কিছুই;
এবার শস্য তার, শস্যের খামার তার, শিল্প-কারখানাও এবার তাদেরই।
সমরেড লেনিন, এই নাম উচ্চারিত হলে রক্তে খেলে যায়
প্রত্যাশার কী যে বিদ্যুৎ ঝিলিক
ইতিহাস হয়ে ওঠে সচকিত গভরি উজ্জ্বল
দেখতে পাই মানুষের কাছে কীভাবে খুলে যাচ্ছে সম্ভাবনার
একেকটি দুয়ার;
লেনিনের নামে মুহূর্তে শূন্যে ওঠে মানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাত
লেনিনের নামে উড়ে যায় একঝাঁক শান্তি কপোত,
লেনিন নামের, সেদিন মানুষের দেহে ছিলো শোষকের
নিষ্ঠুর দাঁতের চিহ্ন
সেই চিহ্ন সুদুর বাংলায় আজো মানচিত্রের শরীরে ব্যাপক
আরো বহু দেশে মানুষের এই চরম নিগ্রহ ;
তাই যখন তোমার দিকে ফিরে চাই কমরেড লেনিন
মনে হয় আর কোনো ভয় নেই-
শোষণের দিন শেষ পৃথিবীতে মেহনতী মানুষ জেগেছে!
লেনিন এনেছে পৃথিবীতে নবযুগ
কাস্তে-হাতুড়ি সাম্যের সংবাদ,
লেনিন এনেছে ঐক্যের মহামন্ত্র
মানুষের মানুষে মৈত্রীর সেতুবন্ধন
কমরেড লেনিন এই নাম উচ্চারিত হলে
হৃদয়ে হৃদয়ে ওঠে গঢ় শিঞরন, খুলে যায় মানবিক সকল উৎসধারা
ভলগা এসে মোশে এই গৈরিক পদ্মায়-
আকাশ হঠাৎ যেন নিচু হয়ে মাটিকেই জানায় সেলাম,
মানুষের অফুরন্ত প্রাণের জোয়ারে ভেসে ওঠে তোমার মুখ,
কমরেড লেনিন
আমি আর কিছুই দেখি না, সেইদিকে শুধু চেয়ে থাকি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1363
|
3085
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জলযাত্রা
|
ছড়া
|
নৌকো বেঁধে কোথায় গেল, যা ভাই মাঝি ডাকতে
মহেশগঞ্জে যেতে হবে শীতের বেলা থাকতে।
পাশের গাঁয়ে ব্যাবসা করে ভাগ্নে আমার বলাই,
তার আড়তে আসব বেচে খেতের নতুন কলাই।
সেখান থেকে বাদুড়ঘাটা আন্দাজ তিনপোয়া,
যদুঘোষের দোকান থেকে নেব খইয়ের মোয়া।
পেরিয়ে যাব চন্দনীদ' মুন্সিপাড়া দিয়ে,
মালসি যাব, পুঁটকি সেথায় থাকে মায়ে ঝিয়ে।
ওদের ঘরে সেরে নেব দুপুরবেলার খাওয়া;
তারপরেতে মেলে যদি পালের যোগ্য হাওয়া
একপহরে চলে যাব মুখ্লুচরের ঘাটে,
যেতে যেতে সন্ধে হবে খড়কেডাঙার হাটে।
সেথায় থাকে নওয়াপাড়ায় পিসি আমার আপন,
তার বাড়িতে উঠব গিয়ে, করব রাত্রিযাপন।
তিন পহরে শেয়ালগুলো উঠবে যখন ডেকে
ছাড়ব শয়ন ঝাউয়ের মাথায় শুকতারাটি দেখে।
লাগবে আলোর পরশমণি পুব আকাশের দিকে,
একটু ক'রে আঁধার হবে ফিকে।
বাঁশের বনে একটি-দুটি কাক
দেবে প্রথম ডাক।
সদর পথের ঐ পারেতে গোঁসাইবাড়ির ছাদ
আড়াল করে নামিয়ে নেবে একাদশীর চাঁদ।
উসুখুসু করবে হাওয়া শিরীষ গাছের পাতায়,
রাঙা রঙের ছোঁয়া দেবে দেউল-চুড়োর মাথায়। বোষ্টমি সে ঠুনুঠুনু বাজাবে মন্দিরা,
সকালবেলার কাজ আছে তার নাম শুনিয়ে ফিরা।
হেলেদুলে পোষা হাঁসের দল
যেতে যেতে জলের পথে করবে কোলাহল।
আমারও পথ হাঁসের যে-পথ, জলের পথে যাত্রী,
ভাসতে যাব ঘাটে ঘাটে ফুরোবে যেই রাত্রি।
সাঁতার কাটব জোয়ার-জলে পৌঁছে উজিরপুরে,
শুকিয়ে নেব ভিজে ধুতি বালিতে রোদ্দুরে।
গিয়ে ভজনঘাটা
কিনব বেগুন পটোল মুলো, কিনব সজনেডাঁটা।
পৌঁছব আটবাঁকে,
সূর্য উঠবে মাঝগগনে, মহিষ নামবে পাঁকে।
কোকিল-ডাকা বকুল-তলায় রাঁধব আপন হাতে,
কলার পাতায় মেখে নেব গাওয়া ঘি আর ভাতে।
মাখনাগাঁয়ে পাল নামাবে, বাতাস যাবে থেমে;
বনঝাউ-ঝোপ রঙিয়ে দিয়ে সূর্য পড়বে নেমে।
বাঁকাদিঘির ঘাটে যাব যখন সন্ধে হবে
গোষ্ঠে-ফেরা ধেনুর হাম্বারবে।
ভেঙে-পড়া ডিঙির মতো হেলে-পড়া দিন
তারা-ভাসা আঁধার-তলায় কোথায় হবে লীন।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jaljatta/
|
2113
|
মহাদেব সাহা
|
কফিন কাহিনী
|
স্বদেশমূলক
|
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে রঙিন
রক্তমাখা জামা ছিলো হয়ে গেছে ফুল
চোখ দুটি মেঘে মেঘে ব্যথিত বকুল!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে এক শবদেহ
একজন বললো দেখো ভিতরে সন্দেহ
যেমন মানুষ ছিলো মানুষটি নাই
মাটির মানচিত্র হয়ে ফুটে আছে তাই!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর
একজন বললো দেখো ভিতরে কী স্থির
মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে
সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন
হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী
রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1482
|
901
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অনিবার
|
প্রেমমূলক
|
যেখানে রয়েছে আলো পাহাড় জলের সমবায়-
তবুও সেখানে যদি আবিষ্কার করি প্যারাফিন
অনেক মাটির নীচে,- অথবা সেখানে যদি সংগ্রাম-বিলীন
অজস্র অস্পষ্ট মুণ্ড অনুকম্পা হৃদয়ে জাগায়,
তাহ'লে প্রভাত এলে মনিয়া পাখিরা পিছে কি করে' বালক
ভেসে যাবে উজ্জ্বল জলবিম্বের মত হেসে?
কি ক'রে বা নাগরিক নিজের নারীকে ভালোবেসে
জেনে নেবে হেমন্তের সন্ধ্যার আলোকে
গ্যাস আর নক্ষত্রের লিপ্সা থেকে জেগে
যারা চায় তাহাদের কাছে তবু স্মিত সমন্বয়?
মৃথেদ উপেক্ষিত পীত দেহ- বলো,- ক্ষমাময়।
বৃত্তের মতন- এসো,- ঘুরি মোরা বঙ্কিম আবেগে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/onibar/
|
1447
|
নবারুণ ভট্টাচার্য
|
একটি
|
প্রেমমূলক
|
আমার ভালোবাসায় যে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল
সেই মেয়েটি এখন আত্মহত্যা করছে।
নীল ও বিন্দু বিন্দু আমার কপালে ঘাম
তার কাছে আমি গভীর সার্থকতা ছিলাম
আমার তরফে কিছু প্রবঞ্চ নাও বুঝি ছিল
অথবা সে কোনোদিনও সমুদ্র দেখেনি।
সে এখন আত্মহত্যা করছে
তার আঙুল, লুকোনো নরম রক্ত, সাদা গলা
এখনও বেঁচে আছে
শুধু তার চোখের পলক পড়ছে না।
স্থির সম্মতির মতো অপলক আয়নায়
সে এখনও বেঁচে আছে
কোনোদিনও সমুদ্র দেখেনি।
আমাদের একইসঙ্গে সমুদ্রে যাওয়ার কথা ছিল
সে এখনও বেঁচে আছে
এখনও হয়তো যাওয়া যায়
নীল ও তুষারকণা আমার কপালে ঘাম।
এখনও তাকে সারারাত্রি চুমু খাওয়া যায়
এমনকী মৃত্যুর পরেও তাকে সারারাত চুমু খাওয়া যায়
ঘুমন্ত তাকে এত সুন্দর দেখাত
আরও গভীর ঘুমে সৌন্দর্য আরও জন্ম নেয়
কিন্তু সে এখনও বেঁচে আছে
শুধু তার চোখের পলক পড়ছে না।
তার আঙুল কঁপিছে দ্বিধায় ও বিভিন্ন কোণে বসানো পাথরে
নরম রক্ত নিভে যাচ্ছে ভয়ে
সাদা গলার মধ্যে স্বচ্ছ বাতাস ও রাত্রি
আমি এই ঢেউ ও ঝড়ের বিপদসঙ্কেতের কাছে কিছু না
এত ফেনা আর গভীর অন্ধকার প্রবালদ্বীপের মধ্যে
সামুদ্রিক অশ্বের হ্রেষায়
আমার নিজের ঠোঁট নিজেরই অচেনা।
অতল সার্থকতা ছিলাম
মৃত্যু, মরে যাওয়া, মরণের মতো
নীল ও বিন্দু বিন্দু আমার কপালে মুহূর্ত।
আমার ভালোবাসায় যে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল
সেই মেয়েটি এখন আত্মহত্যা করছে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a3-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81/
|
1912
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
স্বপ্নের অসুখ
|
চিন্তামূলক
|
স্বপ্নেরও অসুখ আজকাল।
সে-রকম নির্বিরোধী অমল ধবল পালতোলা স্বপ্ন আর বেড়াতে আসে না
রাত্রিকালে।
আধুনিক স্বপ্নগুলি একালের আঠারো বা উনিশ বছর বয়সের বিরক্তির মতো
সুখী হয় চৌচির চুরমারে।
আগে স্বপ্নে সারারাত চুড়িপরা হাত নিয়ে খেলা
নানান নারীর দেহ সারারাত একটি নারীতে
সরবতের মতো ঢালাঢালি।
স্বপ্নের দেয়ালগুলি আগে সাদা ছিল,
একন সেখানে, ধুমশো সাপের মতো ভয়ংকর ধ্বংসের অক্ষর।
স্বপ্নের নিজস্ব কিছু বাগান বা ঝাউবন দেবদারুবীথি সবাই ছিল
এই সব দৃশ্যে আগে নিরাপদে হেঁটে যাওয়া যেত
এখন সেখানে, অন্ধকার একা বসে দূরের আগুনে হাত সেঁকে।
এখন স্বপ্নেরও মধ্যে দুই মত, সংঘর্ষ দুবেলা
এখন স্বপ্নেরও মধ্যে অস্ত্রাঘাত, আহত চীৎকার
এখন স্বপ্নেরও মধ্যে কারো কারো মর্মান্তিক বিসর্জন অথবা বিদায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/488
|
3543
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাউল
|
ছড়া
|
দূরে অশথতলায়
পুঁতির কণ্ঠিখানি গলায়
বাউল দাঁড়িয়ে কেন আছ ?
সামনে আঙিনাতে
তোমার একতারাটি হাতে
তুমি সুর লাগিয়ে নাচো !
পথে করতে খেলা
আমার কখন হল বেলা
আমায় শাস্তি দিল তাই ।
ইচ্ছে হোথায় নাবি
কিন্তু ঘরে বন্ধ চাবি
আমার বেরোতে পথ নাই ।
বাড়ি ফেরার তরে
তোমায় কেউ না তাড়া করে
তোমার নাই কোনো পাঠশালা ।
সমস্ত দিন কাটে
তোমার পথে ঘাটে মাঠে
তোমার ঘরেতে নেই তালা ।
তাই তো তোমার নাচে
আমার প্রাণ যেন ভাই বাঁচে —
আমার মন যেন পায় ছুটি ।
ওগো তোমার নাচে
যেন ঢেউয়ের দোলা আছে ,
ঝড়ে গাছের লুটোপুটি ।
অনেক দূরের দেশ
আমার চোখে লাগায় রেশ ,
যখন তোমায় দেখি পথে ।
দেখতে পায় যে মন
যেন নাম - না - জানা বন
কোন্ পথহারা পর্বতে ।
হঠাৎ মনে লাগে ,
যেন অনেক দিনের আগে ,
আমি অমনি ছিলেম ছাড়া ।
সেদিন গেল ছেড়ে ,
আমার পথ নিল কে কেড়ে ,
আমার হারাল একতারা ।
কে নিল গো টেনে ,
আমায় পাঠশালাতে এনে ,
আমার এল গুরুমশায় ।
মন সদা যার চলে
যত ঘরছাড়াদের দলে
তারে ঘরে কেন বসায় ?
কও তো আমায় ভাই ,
তোমার গুরুমশায় নাই ?
আমি যখন দেখি ভেবে
বুঝতে পারি খাঁটি ,
তোমার বুকের একতারাটি ,
তোমায় ঐ তো পড়া দেবে ।
তোমার কানে কানে
ওরই গুনগুনানি গানে
তোমায় কোন্ কথা যে কয় !
সব কি তুমি বোঝ ?
তারই মানে যেন খোঁজ
কেবল ফিরে ভুবনময় ।
ওরই কাছে বুঝি
আছে তোমার নাচের পুঁজি ,
তোমার খেপা পায়ের ছুটি ?
ওরই সুরের বোলে
তোমার গলার মালা দোলে
তোমার দোলে মাথার ঝুঁটি ।
মন যে আমার পালায়
তোমার একতারা - পাঠশালায় ,
আমায় ভুলিয়ে দিতে পার ?
নেবে আমায় সাথে ?
এ - সব পণ্ডিতেরই হাতে
আমায় কেন সবাই মার ?
ভুলিয়ে দিয়ে পড়া
আমায় শেখাও সুরে - গড়া
তোমার তালা - ভাঙার পাঠ ।
আর কিছু না চাই ,
যেন আকাশখানা পাই ,
আর পালিয়ে যাবার মাঠ ।
দূরে কেন আছ ?
দ্বারের আগল ধরে নাচো ,
বাউল আমারই এইখানে ।
সমস্ত দিন ধ ' রে
যেন মাতন ওঠে ভ ' রে
তোমার ভাঙন - লাগা গানে । (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/baul/
|
2698
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমগাছ
|
প্রকৃতিমূলক
|
এ তো সহজ কথা ,
অঘ্রানে এই স্তব্ধ নীরবতা
জড়িয়ে আছে সামনে আমার
আমের গাছে ;
কিন্তু ওটাই সবার চেয়ে
দুর্গম মোর কাছে ।
বিকেল বেলার রোদ্দুরে এই চেয়ে থাকি ,
যে রহস্য ওই তরুটি রাখল ঢাকি
গুঁড়িতে তার ডালে ডালে
পাতায় পাতায় কাঁপনলাগা তালে
সে কোন্ ভাষা আলোর সোহাগ
শূন্যে বেড়ায় খুঁজি ।
মর্ম তাহার স্পষ্ট নাহি বুঝি ,
তবু যেন অদৃশ্য তার চঞ্চলতা
রক্তে জাগায় কানে-কানে কথা ,
মনের মধ্যে বুলায় যে অঙ্গুলি
আভাস-ছোঁওয়া ভাষা তুলি
সে এনে দেয় অস্পষ্ট ইঙ্গিত
বাক্যের অতীত ।
ওই যে বাকলখানি
রয়েছে ওর পর্দা টানি
ওর ভিতরের আড়াল থেকে আকাশ-দূতের সাথে
বলা - কওয়া কী হয় দিনে রাতে ,
পরের মনের স্বপ্নকথার সম
পৌঁছবে না কৌতূহলে মম ।
দুয়ার-দেওয়া যেন বাসরঘরে
ফুলশয্যার গোপন রাতে কানাকানি করে ,
অনুমানেই জানি ,
আভাসমাত্র না পাই তাহার বাণী ।
ফাগুন আসে বছরশেষের পারে ,
দিনে-দিনেই খবর আসে দ্বারে ।
একটা যেন চাপা হাসি কিসের ছলে
অবাক শ্যামলতার তলে
শিকড় হতে শাখে শাখে
ব্যাপ্ত হয়ে থাকে ।
অবশেষে খুশির দুয়ার হঠাৎ যাবে খুলে
মুকুলে মুকুলে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amgass/
|
4739
|
শামসুর রাহমান
|
জ্যোৎস্নামাখা মধ্যরাতে
|
চিন্তামূলক
|
জ্যোৎস্নামাখা মধ্যরাতে নিঝুম পথে
একলা আমি যাচ্ছি হেঁটে।
আগে পিছে দৃষ্টি রাখি, কিন্তু কোনও
আদম কোথাও দেয় না দেখা।এই যে আমি বিজন পথে বড় একা
খুঁজছি ডেরা একটু শুধু ক্লান্তি-কণা মুছে নিতে
কিংবা ঘুমের মেঘে ভেসে জড়িয়ে কোনও
সোহাগিনীর দীপ্ত শরীর উধাও হতে।হেঁটে-হেঁটে পথের ধারে একটি গাছের
কাছে গিয়ে ছায়ার আদর গায়ে মেখে
ঋষির ঢঙে বসে পড়ি। হঠাৎ দেখি, সামনে আমার
দাঁড়ানো এক বাউল হাতে একতারাটা ঝুলিয়ে নিয়ে।দেখেই তাকে উঠে দাঁড়াই, শ্রদ্ধা জানাই নুইয়ে মাথা।
চেহারা তার চেনা খুবই, সাধক তিনি লালন সাঁই-
মাথায় আমার হাত রেখে তাঁর স্নেহ বুলিয়ে,
একটি চোখের আলোয় তিনি দেন ভাসিয়ে পথিকটিকে।একতারাকে সুর বানিয়ে লালন এক লালনগীতি
গাইতে গাইতে গেলেন মিশে জ্যোৎস্না-ধোওয়া
চক্রবালে। আমি শুধু মন্ত্রমুগ্ধ চেয়ে থাকি
ধূসর পথে; সাগর মেতে ওঠে মনে, পা চালিয়ে এগিয়ে যাই। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jotsnamakha-moddhorate/
|
3663
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভালোবাসে যারে তার চিতাভস্ম-পানে
|
প্রেমমূলক
|
ভালোবাসে যারে তার চিতাভস্ম-পানে
প্রেমিক যেমন চায় কাতর নয়ানে
তেমনি যে তোমা-পানে নাহি চায় গ্রীস্
তাহার হৃদয় মন পাষাণ কুলিশ
ইংরাজেরা ভাঙিয়াছে প্রাচীর তোমার
দেবতাপ্রতিমা লয়ে গেছে [সিন্ধুপার]
এ দেখে কার না হবে হবে ॥।
ধূমকেতু সম তারা কী কুক্ষণে হায়
ছাড়িয়া সে ক্ষুদ্র দ্বীপ আইল হেথায়
অসহায় বক্ষ তব রক্তময় করি
দেবতা প্রতিমাগুলি লয়ে গেল হরি।George Gordon Byron
(অনুবাদ কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/valobashe-jare-tar-chitavosmo-pane/
|
742
|
জয় গোস্বামী
|
সমুদ্র তো বুড়ো হয়েছেন
|
রূপক
|
সমুদ্র তো বুড়ো হয়েছেন
পিঠের ওপরে কতো ভারী দ্বীপ ও পাহাড়
অভিযাত্রী, তোমার নৌকাই
খেলনার প্রায়
সংকোচ কোরো না তুমি, ওইটুকু ভার
অনায়াসে সমুদ্রকে দিয়ে দেওয়া যায়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1764
|
2294
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ঈশ্বরী পাটনী
|
সনেট
|
কে তোর তরিতে বসি,ঈশ্বরী পটনি?
ছলিতে তোর রে যদি কামিনী কমলে,---
কোথা করী,বাম করে ধরি যারে বলে,
উগরি,গ্রাসিল পুনঃ পূর্ব্বে সুবদনী?
রূপের খনিতে আর আছে কিরে মণি?
এর সম?চেয়ে দেখ,পদ-ছায়া-ছলে,---
কনক কমল ফুল্ল এ নদীর জলে---
কোন্ দেবতারে পূজি,পেলি এ রমণী?
কাঠের সেঁউতি তোর,পদ-পরশনে
হইতেছে স্বর্ণময়!এ এব যুবতী---
নহে রে সামান্যা নারী,এই লাগে মনে;
বলে বেয়ে নদী-পারে যা রে শীঘ্রগতি।
মেগে নিস্,পার করে,বর-রূপ ধনে
দেখায়ে ভকতি শোন্,এ মোর যুকতি!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/ishwari-patoni/
|
2453
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
সেই ছেলে হবে কবে
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে
যারা কোথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।
তর্ক না করে তারা কিলঘুষি দেবে
চোখের পলকে সব কেড়ে ধরে নেবে।
লাঠির আঘাতে তারা মাথা ফাটাবে
শার্টের কলার ধরে পথে হাঁটাবে।
অপমান করে তারা লোক হাসাবে
চাকু দিয়ে ঘা মেরে ভুঁড়ি ফাঁসাবে।
আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে
যাদের ভয়ে সব ঘরেতে রবে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2033
|
3787
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যুগল
|
চিন্তামূলক
|
আমি থাকি একা,
এই বাতায়নে বসে এক বৃন্তে যুগলকে দেখা--
সেই মোর সার্থকতা।
বুঝিতে পারি সে কথা
লোকে লোকে কী আগ্রহ অহরহ
করিছে সন্ধান
আপনার বাহিরেতে কোথা হবে আপনার দান।
তা নিয়ে বিপুল দুঃখে বিশ্বচিত্ত জেগে উঠে,
তারি সুখে পূর্ণ হয়ে ফুটে
যা-কিছু মধুর।
যত বাণী, যত সুর,
যত রূপ, তপস্যার যত বহ্নিলিখা,
সৃষ্টিচিত্তশিখা,
আকাশে আকাশে লিখে
দিকে দিকে
অণুপরমাণুদের মিলনের ছবি।
গ্রহ তারা রবি
যে-আগুন জ্বেলেছে তা বাসনারই দাহ,
সেই তাপে জগৎপ্রবাহ
চঞ্চলিয়া চলিয়াছে বিরহমিলনদ্বন্দ্বঘাতে।
দিনরাতে
কালের অতীত পার হতে,
অনাদি আহ্বানধ্বনি ফিরিতেছে ছায়াতে আলোতে।
সেই ডাক শুনে
কত সাজে সাজিয়েছে আজি এ-ফাল্গুনে
বনে বনে অভিসারিকার দল,
পত্রে পুষ্পে হয়েছে চঞ্চল--
সমস্ত বিশ্বের মর্মে যে-চাঞ্চল্য তারায় তারায়
তরঙ্গিছে প্রকাশধারায়,
নিখিল ভুবনে নিত্য যে-সংগীত বাজে
মূর্তি নিল বনচ্ছায়ে যুগলের সাজে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jugal/
|
4952
|
শামসুর রাহমান
|
প্রতিযোগী
|
প্রেমমূলক
|
আমার যুগল পা রক্তে ভাসে।যেখানে নিজস্ব পদচ্ছাপ
আঁকার সাধ ছিলো আশৈশব,
সেখানে পৌছুনো সহজ নয়।
ছিলো না সম্বল তেমন কিছু
খানিক ছিলো শুধু অহংকার।গড়তে চাইনি তো অকূল নদী,
দিগ্বলয় কিংবা পাহাড়ও নয়।
গড়ার সাধ ছিলো অন্তরালে
একটি চৌকাঠ স্বর্ণময়।তোমাকে প্রতিযোগী ভেবেই আমি
হয়েছি পথচারী অচিন পথে।
তাই কি তুমি সেই রুক্ষ পথে
রক্তপায়ী কাঁটা বিছিয়ে দিলে? (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/protijogi/
|
1207
|
জীবনানন্দ দাশ
|
শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন
|
প্রেমমূলক
|
শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন,
বনলতা সেন।
কোথায় গিয়েছ তুমি আজ এই বেলা
মাছরাঙা ভোলেনি তো দুপুরের খেলা
শালিখ করে না তার নীড় অবহেলা
উচ্ছ্বাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন,
তুমি নাই বনলতা সেন।তোমার মতন কেউ ছিল কি কোথাও?
কেন যে সবের আগে তুমি চলে যাও।
কেন যে সবের আগে তুমি
পৃথিবীকে করে গেলে শূন্য মরুভূমি
(কেন যে সবের আগে তুমি)
ছিঁড়ে গেলে কুহকের ঝিলমিল টানা ও পোড়েন,
কবেকার বনলতা সেন।
কত যে আসবে সন্ধ্যা প্রান্তরে আকাশে,
কত যে ঘুমিয়ে রবো বস্তির পাশে,
কত যে চমকে জেগে উঠব বাতাসে
হিজল জামের
বনে থেমেছে স্টেশনে বুঝি রাত্রির ট্রেন,
নিশুথির বনলতা সেন।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/sesh-holo-jiboner-sob-lenden/
|
510
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
শেষের গান
|
প্রেমমূলক
|
আমার বিদায়-রথের চাকার ধ্বনি ওই গো এবার কানে আসে।
পুবের হাওয়া তাই কেঁদে যায় ঝাউয়ের বনে দিঘল শ্বাসে।
ব্যথায় বিবশ গুলঞ্চ ফুল
মালঞ্চে আজ তাই শোকাকুল,
মাটির মায়ের কোলের মায়া ওগো আমার প্রাণ উদাসে। অঙ্গ আসে অলস হয়ে নেতিয়ে-পড়া অলস ঘুমে,
স্বপনপারের বিদেশিনীর হিম-ছোঁয়া যায় নয়ন চুমে।
হাতছানি দেয় অনাগতা,
আকাশ-ডোবা বিদায়-ব্যথা
লুটায় আমার ভুবন ভরি বাঁধন ছেঁড়ার কাঁদন-ত্রাসে। মোর বেদনার কপূর্রবাস ভরপুর আজ দিগ্বলয়ে,
বনের আঁধার লুটিয়ে কাঁদে হরিণটি তার হারার ভয়ে।
হারিয়ে পাওয়া মানসী হায়
নয়নজলে শয়ন তিতায়,
ওগো, এ কোন্ জাদুর মায়ায় দু-চোখ আমার জলে ভাসে।
আজ আকাশ-সীমায় শব্দ শুনি অচিন পায়ের আসা-যাওয়ার,
তাই মনে হয় এই যেন শেষ আমার অনেক দাবি-দাওয়ার।
আজ কেহ নাই পথের সাথি,
সামনে শুধু নিবিড় রাতি,
আমায় দূরের বাঁশি ডাক দিয়েছে, রাখবে কে আর বাঁধন-পাশে। (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/shesher-gan/
|
3717
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মানসসুন্দরী
|
প্রেমমূলক
|
আজ কোনো কাজ নয়– সব ফেলে দিয়ে
ছন্দ বন্ধ গ্রন্থ গীত– এসো তুমি প্রিয়ে,
আজন্ম-সাধন-ধন সুন্দরী আমার
কবিতা, কল্পনালতা। শুধু একবার
কাছে বোসো। আজ শুধু কূজন গুঞ্জন
তোমাতে আমাতে; শুধু নীরবে ভুঞ্জন
এই সন্ধ্যা-কিরণের সুবর্ণ মদিরা–
যতক্ষণ অন্তরের শিরা-উপশিরা
লাবণ্যপ্রবাহভরে ভরি নাহি উঠে,
যতক্ষণে মহানন্দে নাহি যায় টুটে
চেতনাবেদনাবন্ধ, ভুলে যাই সব–
কী আশা মেটে নি প্রাণে, কী সংগীতরব
গিয়েছে নীরব হয়ে, কী আনন্দসুধা
অধরের প্রান্তে এসে অন্তরের ক্ষুধা
না মিটায়ে গিয়াছে শুকায়ে। এই শান্তি,
এই মধুরতা, দিক সৌম্য ম্লান কান্তি
জীবনের দুঃখ দৈন্য অতৃপ্তির ‘পর
করুণকোমল আভা গভীর সুন্দর।
বীণা ফেলে দিয়ে এসো, মানসসুন্দরী–
দুটি রিক্ত হস্ত শুধু আলিঙ্গনে ভরি
কণ্ঠে জড়াইয়া দাও– মৃণাল-পরশে
রোমাঞ্চ অঙ্কুরি উঠে মর্মান্ত হরষে,
কম্পিত চঞ্চল বক্ষ, চক্ষু ছলছল,
মুগ্ধ তনু মরি যায়, অন্তর কেবল
অঙ্গের সীমান্ত-প্রান্তে উদ্ভাসিয়া উঠে,
এখনি ইন্দ্রিয়বন্ধ বুঝি টুটে টুটে।
অর্ধেক অঞ্চল পাতি বসাও যতনে
পার্শ্বে তব; সমধুর প্রিয়সম্বোধনে
ডাকো মোরে, বলো, প্রিয়, বলো, “প্রিয়তম’–
কুন্তল-আকুল মুখ বক্ষে রাখি মম
হৃদয়ের কানে কানে অতি মৃদু ভাষে
সংগোপনে বলে যাও যাহা মুখে আসে
অর্থহারা ভাবে-ভরা ভাষা। অয়ি প্রিয়া,
চুম্বন মাগিব যবে, ঈষৎ হাসিয়া
বাঁকায়ো না গ্রীবাখানি, ফিরায়ো না মুখ,
উজ্জ্বল রক্তিমবর্ণ সুধাপূর্ণ সুখ
রেখো ওষ্ঠাধরপুটে, ভক্ত ভৃঙ্গ তরে
সম্পূর্ণ চুম্বন এক, হাসি স্তরে স্তরে
সরস সুন্দর; নবষ্ফুট পুষ্প-সম
হেলায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বৃন্ত নিরুপম
মুখখানি তুলে ধোরো; আনন্দ-আভায়
বড়ো বড়ো দুটি চক্ষু পল্লবপ্রচ্ছায়
রেখো মোর মুখপানে প্রশান্ত বিশ্বাসে,
নিতান্ত নির্ভরে। যদি চোখে জল আসে
কাঁদিব দুজনে; যদি ললিত কপোলে
মৃদু হাসি ভাসি উঠে, বসি মোর কোলে,
বক্ষ বাঁধি বাহুপাশে, স্কন্ধে মুখ রাখি
হাসিয়ো নীরবে অর্ধ-নিমীলিত আঁখি।
যদি কথা পড়ে মনে তবে কলস্বরে
বলে যেয়ো কথা, তরল আনন্দভরে
নির্ঝরের মতো, অর্ধেক রজনী ধরি
কত-না কাহিনী স্মৃতি কল্পনালহরী–
মধুমাখা কণ্ঠের কাকলি। যদি গান
ভালো লাগে, গেয়ো গান। যদি মুগ্ধপ্রাণ
নিঃশব্দ নিস্তব্ধ শান্ত সম্মুখে চাহিয়া
বসিয়া থাকিতে চাও, তাই রব প্রিয়া।
হেরিব অদূরে পদ্মা, উচ্চতটতলে
শ্রান্ত রূপসীর মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে
প্রসারিয়া তনুখানি, সায়াহ্ন-আলোকে
শুয়ে আছে; অন্ধকার নেমে আসে চোখে
চোখের পাতার মতো; সন্ধ্যাতারা ধীরে
সন্তর্পণে করে পদার্পণ, নদীতীরে
অরণ্যশিয়রে; যামিনী শয়ন তার
দেয় বিছাইয়া, একখানি অন্ধকার
অনন্ত ভুবনে। দোঁহে মোরা রব চাহি
অপার তিমিরে; আর কোথা কিছু নাহি,
শুধু মোর করে তব করতলখানি,
শুধু অতি কাছাকাছি দুটি জনপ্রাণী,
অসীম নির্জনে; বিষণ্ণ বিচ্ছেদরাশি
চরাচরে আর সব ফেলিয়াছে গ্রাসি–
শুধু এক প্রান্তে তার প্রলয় মগন
বাকি আছে একখানি শঙ্কিত মিলন,
দুটি হাত, ত্রস্ত কপোতের মতো দুটি
বক্ষ দুরুদুরু, দুই প্রাণে আছে ফুটি
শুধু একখানি ভয়, একখানি আশা,
একখানি অশ্রুভরে নম্র ভালোবাসা।
আজিকে এমনি তবে কাটিবে যামিনী
আলস্য-বিলাসে। অয়ি নিরভিমানিনী,
অয়ি মোর জীবনের প্রথম প্রেয়সী,
মোর ভাগ্য-গগনের সৌন্দর্যের শশী,
মনে আছে কবে কোন্ ফুল্ল যূথীবনে,
বহু বাল্যকালে, দেখা হত দুই জনে
আধো-চেনাশোনা? তুমি এই পৃথিবীর
প্রতিবেশিনীর মেয়ে, ধরার অস্থির
এক বালকের সাথে কী খেলা খেলাতে
সখী, আসিতে হাসিয়া, তরুণ প্রভাতে
নবীন বালিকামূর্তি, শুভ্রবস্ত্র পরি
উষার কিরণধারে সদ্য স্নান করি
বিকচ কুসুম-সম ফুল্ল মুখখানি
নিদ্রাভঙ্গে দেখা দিতে, নিয়ে যেতে টানি
উপবনে কুড়াতে শেফালি। বারে বারে
শৈশব-কর্তব্য হতে ভুলায়ে আমারে,
ফেলে দিয়ে পুঁথিপত্র, কেড়ে নিয়ে খড়ি,
দেখায়ে গোপন পথ দিতে মুক্ত করি
পাঠশালা-কারা হতে; কোথা গৃহকোণে
নিয়ে যেতে নির্জনেতে রহস্যভবনে;
জনশূন্য গৃহছাদে আকাশের তলে
কী করিতে খেলা, কী বিচিত্র কথা ব’লে
ভুলাতে আমারে, স্বপ্ন-সম চমৎকার
অর্থহীন, সত্য মিথ্যা তুমি জান তার।
দুটি কর্ণে দুলিত মুকুতা, দুটি করে
সোনার বলয়, দুটি কপোলের ‘পরে
খেলিত অলক, দুটি স্বচ্ছ নেত্র হতে
কাঁপিত আলোক, নির্মল নির্ঝর-স্রোতে
চূর্ণরশ্মি-সম। দোঁহে দোঁহা ভালো করে
চিনিবার আগে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসভরে
খেলাধুলা ছুটাছুটি দুজনে সতত–
কথাবার্তা বেশবাস বিথান বিতত।
তার পরে একদিন– কী জানি সে কবে–
জীবনের বনে যৌবনবসন্তে যবে
প্রথম মলয়বায়ু ফেলেছে নিশ্বাস,
মুকুলিয়া উঠিতেছে শত নব আশ,
সহসা চকিত হয়ে আপন সংগীতে
চমকিয়া হেরিলাম– খেলা-ক্ষেত্র হতে
কখন অন্তরলক্ষ্মী এসেছ অন্তরে,
আপনার অন্তঃপুরে গৌরবের ভরে
বসি আছ মহিষীর মতো। কে তোমারে
এনেছিল বরণ করিয়া। পুরদ্বারে
কে দিয়াছে হুলুধ্বনি! ভরিয়া অঞ্চল
কে করেছে বরিষন নবপুষ্পদল
তোমার আনম্র শিরে আনন্দে আদরে!
সুন্দর সাহানা-রাগে বংশীর সুস্বরে
কী উৎসব হয়েছিল আমার জগতে,
যেদিন প্রথম তুমি পুষ্পফুল্ল পথে
লজ্জামুকুলিত মুখে রক্তিম অম্বরে
বধূ হয়ে প্রবেশিলে চিরদিনতরে
আমার অন্তর-গৃহে– যে গুপ্ত আলয়ে
অন্তর্যামী জেগে আছে সুখ দুঃখ লয়ে,
যেখানে আমার যত লজ্জা আশা ভয়
সদা কম্পমান, পরশ নাহিকো সয়
এত সুকুমার! ছিলে খেলার সঙ্গিনী
এখন হয়েছ মোর মর্মের গেহিনী,
জীবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কোথা সেই
অমূলক হাসি-অশ্রু, সে চাঞ্চল্য নেই,
সে বাহুল্য কথা। স্নিগ্ধ দৃষ্টি সুগম্ভীর
স্বচ্ছ নীলাম্বর-সম; হাসিখানি স্থির
অশ্রুশিশিরেতে ধৌত; পরিপূর্ণ দেহ
মঞ্জরিত বল্লরীর মতো; প্রীতি স্নেহ
গভীর সংগীততানে উঠিছে ধ্বনিয়া
স্বর্ণবীণাতন্ত্রী হতে রনিয়া রনিয়া
অনন্ত বেদনা বহি। সে অবধি প্রিয়ে,
রয়েছি বিস্মিত হয়ে–তোমারে চাহিয়ে
কোথাও না পাই অন্ত। কোন্ বিশ্বপার
আছে তব জন্মভূমি। সংগীত তোমার
কত দূরে নিয়ে যাবে, কোন্ কল্পলোকে
আমারে করিবে বন্দী গানের পুলকে
বিমুগ্ধ কুরঙ্গসম। এই যে বেদনা,
এর কোনো ভাষা আছে? এই যে বাসনা,
এর কোনো তৃপ্তি আছে? এই যে উদার
সমুদ্রের মাঝখানে হয়ে কর্ণধার
ভাসায়েছ সুন্দর তরণী, দশ দিশি
অস্ফুট কল্লোলধ্বনি চির দিবানিশি
কী কথা বলিছে কিছু নারি বুঝিবারে,
এর কোনো কূল আছে? সৌন্দর্য পাথারে
যে বেদনা-বায়ুভরে ছুটে মন-তরী
সে বাতাসে, কত বার মনে শঙ্কা করি,
ছিন্ন হয়ে গেল বুঝি হৃদয়ের পাল;
অভয় আশ্বাসভরা নয়ন বিশাল
হেরিয়া ভরসা পাই বিশ্বাস বিপুল
জাগে মনে– আছে এক মহা উপকূল
এই সৌন্দর্যের তটে, বাসনার তীরে
মোদের দোঁহের গৃহ।
হাসিতেছ ধীরে
চাহি মোর মুখে, ওগো রহস্যমধুরা!
কী বলিতে চাহ মোরে প্রণয়বিধুরা
সীমান্তিনী মোর, কী কথা বুঝাতে চাও।
কিছু বলে কাজ নাই– শুধু ঢেকে দাও
আমার সর্বাঙ্গ মন তোমার অঞ্চলে,
সম্পূর্ণ হরণ করি লহ গো সবলে
আমার আমারে; নগ্ন বক্ষে বক্ষ দিয়া
অন্তর রহস্য তব শুনে নিই প্রিয়া।
তোমার হৃদয়কম্প অঙ্গুলির মতো
আমার হৃদয়তন্ত্রী করিবে প্রহত,
সংগীত-তরঙ্গধ্বনি উঠিবে গুঞ্জরি
সমস্ত জীবন ব্যাপী থরথর করি।
নাই বা বুঝিনু কিছু, নাই বা বলিনু,
নাই বা গাঁথিনু গান, নাই বা চলিনু
ছন্দোবদ্ধ পথে, সলজ্জ হৃদয়খানি
টানিয়া বাহিরে। শুধু ভুলে গিয়ে বাণী
কাঁপিব সংগীতভরে, নক্ষত্রের প্রায়
শিহরি জ্বলিব শুধু কম্পিত শিখায়,
শুধু তরঙ্গের মতো ভাঙিয়া পড়িব
তোমার তরঙ্গ-পানে, বাঁচিব মরিব
শুধু, আর কিছু করিব না। দাও সেই
প্রকাণ্ড প্রবাহ, যাহে এক মুহূর্তেই
জীবন করিয়া পূর্ণ, কথা না বলিয়া
উন্মত্ত হইয়া যাই উদ্দাম চলিয়া।
মানসীরূপিণী ওগো, বাসনাবাসিনী,
আলোকবসনা ওগো, নীরবভাষিণী,
পরজন্মে তুমি কে গো মূর্তিমতী হয়ে
জন্মিবে মানব-গৃহে নারীরূপ লয়ে
অনিন্দ্যসুন্দরী? এখন ভাসিছ তুমি
অনন্তের মাঝে; স্বর্গ হতে মর্তভূমি
করিছ বিহার; সন্ধ্যার কনকবর্ণে
রাঙিছ অঞ্চল; উষার গলিত স্বর্ণে
গড়িছ মেখলা; পূর্ণ তটিনীর জলে
করিছ বিস্তার, তলতল ছলছলে
ললিত যৌবনখানি, বসন্তবাতাসে,
চঞ্চল বাসনাব্যথা সুগন্ধ নিশ্বাসে
করিছ প্রকাশ; নিষুপ্ত পূর্ণিমা রাতে
নির্জন গগনে, একাকিনী ক্লান্ত হাতে
বিছাইছ দুগ্ধশুভ্র বিরহ-শয়ন;
শরৎ-প্রত্যুষে উঠি করিছ চয়ন
শেফালি, গাঁথিতে মালা, ভুলে গিয়ে শেষে,
তরুতলে ফেলে দিয়ে, আলুলিত কেশে
গভীর অরণ্য-ছায়ে উদাসিনী হয়ে
বসে থাক; ঝিকিমিকি আলোছায়া লয়ে
কম্পিত অঙ্গুলি দিয়ে বিকালবেলায়
বসন বয়ন কর বকুলতলায়;
অবসন্ন দিবালোকে কোথা হতে ধীরে
ঘনপল্লবিত কুঞ্জে সরোবর-তীরে
করুণ কপোতকণ্ঠে গাও মুলতান;
কখন অজ্ঞাতে আসি ছুঁয়ে যাও প্রাণ
সকৌতুকে; করি দাও হৃদয় বিকল,
অঞ্চল ধরিতে গেলে পালাও চঞ্চল
কলকণ্ঠে হাসি’, অসীম আকাঙক্ষারাশি
জাগাইয়া প্রাণে, দ্রুতপদে উপহাসি’
মিলাইয়া যাও নভোনীলিমার মাঝে।
কখনো মগন হয়ে আছি যবে কাজে
স্খলিতবসন তব শুভ্র রূপখানি
নগ্ন বিদ্যুতের আলো নয়নেতে হানি
চকিতে চমকি চলি যায়। জানালায়
একেলা বসিয়া যবে আঁধার সন্ধ্যায়,
মুখে হাত দিয়ে, মাতৃহীন বালকের
মতো বহুক্ষণ কাঁদি স্নেহ-আলোকের
তরে– ইচ্ছা করি, নিশার আঁধারস্রোতে
মুছে ফেলে দিয়ে যায় সৃষ্টিপট হতে
এই ক্ষীণ অর্থহীন অস্তিত্বের রেখা,
তখন করুণাময়ী দাও তুমি দেখা
তারকা-আলোক-জ্বালা স্তব্ধ রজনীর
প্রান্ত হতে নিঃশব্দে আসিয়া; অশ্রুনীর
অঞ্চলে মুছায়ে দাও; চাও মুখপানে
স্নেহময় প্রশ্নভরা করুণ নয়ানে;
নয়ন চুম্বন কর, স্নিগ্ধ হস্তখানি
ললাটে বুলায়ে দাও; না কহিয়া বাণী,
সান্ত্বনা ভরিয়া প্রাণে, কবিরে তোমার
ঘুম পাড়াইয়া দিয়া কখন আবার
চলে যাও নিঃশব্দ চরণে।
সেই তুমি
মূর্তিতে দিবে কি ধরা? এই মর্তভূমি
পরশ করিবে রাঙা চরণের তলে?
অন্তরে বাহিরে বিশ্বে শূন্যে জলে স্থলে
সর্ব ঠাঁই হতে সর্বময়ী আপনারে
করিয়া হরণ, ধরণীর একধারে
ধরিবে কি একখানি মধুর মুরতি?
নদী হতে লতা হতে আনি তব গতি
অঙ্গে অঙ্গে নানা ভঙ্গে দিবে হিল্লোলিয়া–
বাহুতে বাঁকিয়া পড়ি, গ্রীবায় হেলিয়া
ভাবের বিকাশভরে? কী নীল বসন
পরিবে সুন্দরী তুমি? কেমন কঙ্কণ
ধরিবে দুখানি হাতে? কবরী কেমনে
বাঁধিবে, নিপুণ বেণী বিনায়ে যতনে?
কচি কেশগুলি পড়ি শুভ্র গ্রীবা-‘পরে
শিরীষকুসুম-সম সমীরণভরে
কাঁপিবে কেমন? শ্রাবণে দিগন্তপারে
যে গভীর স্নিগ্ধ দৃষ্টি ঘন মেঘভারে
দেখা দেয় নব নীল অতি সুকুমার,
সে দৃষ্টি না জানি ধরে কেমন আকার
নারীচক্ষে! কী সঘন পল্লবের ছায়,
কী সুদীর্ঘ কী নিবিড় তিমির-আভায়
মুগ্ধ অন্তরের মাঝে ঘনাইয়া আনে
সুখবিভাবরী! অধর কী সুধাদানে
রহিবে উন্মুখ, পরিপূর্ণ বাণীভরে
নিশ্চল নীরব! লাবণ্যের থরে থরে
অঙ্গখানি কী করিয়া মুকুলি বিকশি
অনিবার সৌন্দর্যেতে উঠিবে উচ্ছ্বসি
নিঃসহ যৌবনে?
জানি, আমি জানি সখী,
যদি আমাদের দোঁহে হয় চোখোচোখি
সেই পরজন্ম-পথে, দাঁড়াব থমকি;
নিদ্রিত অতীত কাঁপি উঠিবে চমকি
লভিয়া চেতনা। জানি মনে হবে মম,
চিরজীবনের মোর ধ্রুবতারা-সম
চিরপরিচয়ভরা ওই কালো চোখ।
আমার নয়ন হতে লইয়া আলোক,
আমার অন্তর হতে লইয়া বাসনা,
আমার গোপন প্রেম করেছে রচনা
এই মুখখানি। তুমিও কি মনে মনে
চিনিবে আমারে? আমাদের দুই জনে
হবে কি মিলন? দুটি বাহু দিয়ে, বালা,
কখনো কি এই কণ্ঠে পরাইবে মালা
বসন্তের ফুলে? কখনো কি বক্ষ ভরি
নিবিড় বন্ধনে, তোমারে হৃদয়েশ্বরী,
পারিব বাঁধিতে? পরশে পরশে দোঁহে
করি বিনিময় মরিব মধুর মোহে
দেহের দুয়ারে? জীবনের প্রতিদিন
তোমার আলোক পাবে বিচ্ছেদবিহীন,
জীবনের প্রতি রাত্রি হবে সুমধুর
মাধুর্যে তোমার, বাজিবে তোমার সুর
সর্ব দেহে মনে? জীবনের প্রতি সুখে
পড়িবে তোমার শুভ্র হাসি, প্রতি দুখে
পড়িবে তোমার অশ্রুজল। প্রতি কাজে
রবে তব শুভহস্ত দুটি, গৃহ-মাঝে
জাগায়ে রাখিবে সদা সুমঙ্গল–জ্যোতি।
এ কি শুধু বাসনার বিফল মিনতি,
কল্পনার ছল? কার এত দিব্যজ্ঞান,
কে বলিতে পারে মোরে নিশ্চয় প্রমাণ–
পূর্বজন্মে নারীরূপে ছিলে কি না তুমি
আমারি জীবন-বনে সৌন্দর্যে কুসুমি,
প্রণয়ে বিকশি। মিলনে আছিলে বাঁধা
শুধু এক ঠাঁই, বিরহে টুটিয়া বাধা
আজি বিশ্বময় ব্যাপ্ত হয়ে গেছ প্রিয়ে,
তোমারে দেখিতে পাই সর্বত্র চাহিয়ে।
ধূপ দগ্ধ হয়ে গেছে, গন্ধবাষ্প তার
পূর্ণ করি ফেলিয়াছে আজি চারি ধার।
গৃহের বনিতা ছিলে, টুটিয়া আলয়
বিশ্বের কবিতারূপে হয়েছ উদয়–
তবু কোন্ মায়া-ডোরে চিরসোহাগিনী,
হৃদয়ে দিয়েছ ধরা, বিচিত্র রাগিণী
জাগায়ে তুলিছ প্রাণে চিরস্মৃতিময়।
তাই তো এখনো মনে আশা জেগে রয়
আবার তোমারে পাব পরশবন্ধনে।
এমনি সমস্ত বিশ্ব প্রলয়ে সৃজনে
জ্বলিছে নিবিছে, যেন খদ্যোতের জ্যোতি,
কখনো বা ভাবময়, কখনো মুরতি।
রজনী গভীর হল, দীপ নিবে আসে;
পদ্মার সুদূর পারে পশ্চিম আকাশে
কখন যে সায়াহ্নের শেষ স্বর্ণরেখা
মিলাইয়া গেছে; সপ্তর্ষি দিয়েছে দেখা
তিমিরগগনে; শেষ ঘট পূর্ণ ক’রে
কখন বালিকা-বধূ চলে গেছে ঘরে;
হেরি কৃষ্ণপক্ষ রাত্রি, একাদশী তিথি,
দীর্ঘ পথ, শূন্য ক্ষেত্র, হয়েছে অতিথি
গ্রামে গৃহস্থের ঘরে পান্থ পরবাসী;
কখন গিয়েছে থেমে কলরবরাশি
মাঠপারে কৃষিপল্লী হতে; নদীতীরে
বৃদ্ধ কৃষাণের জীর্ণ নিভৃত কুটিরে
কখন জ্বলিয়াছিল সন্ধ্যাদীপখানি,
কখন নিভিয়া গেছে– কিছুই না জানি।
কী কথা বলিতেছিনু, কী জানি, প্রেয়সী,
অর্ধ-অচেতনভাবে মনোমাঝে পশি
স্বপ্নমুগ্ধ-মতো। কেহ শুনেছিলে সে কি,
কিছু বুঝেছিলে প্রিয়ে, কোথাও আছে কি
কোনো অর্থ তার? সব কথা গেছি ভুলে,
শুধু এই নিদ্রাপূর্ণ নিশীথের কূলে
অন্তরের অন্তহীন অশ্রু-পারাবার
উদ্বেলিয়া উঠিয়াছে হৃদয়ে আমার
গম্ভীর নিস্বনে।
এসো সুপ্তি, এসো শান্তি,
এসো প্রিয়ে, মুগ্ধ মৌন সকরুণ কান্তি,
বক্ষে মোরে লহো টানি– শোয়াও যতনে
মরণসুস্নিগ্ধ শুভ্র বিস্মৃতিশয়নে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/429.html
|
5027
|
শামসুর রাহমান
|
বিতর্ক
|
মানবতাবাদী
|
থাকুক না; থাকলে দোষ কী? আজ ওদের হটাতে
করা সভা ডেকে
করবে ঘোষণা লাগাতার হরতাল? বলো, কারা
মানববন্ধনে মেতে চাঁদ আর চন্দ্রমল্লিকাকে
কবিতার খাস জমিনের চতুঃসীমা
থেকে দেবেনির্বাসন? না, ওরা থাকবে নিজ নিজ
জায়গায় অটুট। কারো কোনো ক্ষতি নেই;
কবিতার বুকে নিত্য ফুটবে গোলাপ আর দুলবে দোয়েল।কবিতা কি ধুলোবালি থেকে ইস্ত্রি করা
কাপড় বাঁচিয়ে খুব সন্তর্পণে দূরে দূরে
অশোক ফুটিয়ে হেঁটে যাবে অথবা রুমালে নাক ঢেকে
এঁদো বস্তি পার হবে মখমলী চটি পায়ে? যদি
মানুষের বসতিতে হঠাৎ আগুন আগে, তবে কবিতা কি
মাউথ অর্গানে সুর তুলে আর্তনাদ মুছে দেবে?যদি কোনো চিত্রকল্পে বেজে ওঠে কংকালের হাড়,
উপমায় ভীষণ শীতার্ত, খাদ্যহীন, তাপহীন
নারী আর শিশুদের নীল মুখ ভেসে ওঠে, তবে
ঘোর নান্দনিক কম্বুকণ্ঠে উচ্চারিত
হবে কি ধিক্কার? এ প্রশ্ন তুলে যারা
পথে হাঁটে, মিছিলে দুর্বার ছোটে, তারা
উত্তরের প্রতীক্ষায় থাকবে না। রোদ্দুরে মন্দিরা বাজে,
নতুন আঙ্গিকে ওরা হয়ে ওঠে দীপ্ত মানবিক। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bitorko/
|
3785
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যাবার দিনে এই কথাটি
|
চিন্তামূলক
|
যাবার দিনে এই কথাটি
বলে যেন যাই---
যা দেখেছি যা পেয়েছি
তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিঃসমুদ্র-মাঝে
যে শতদল পদ্ম রাজে
তারই মধু পান করেছি
ধন্য আমি তাই---
যাবার দিনে এই কথাটি
জানিয়ে যেন যাই।বিশ্বরূপের খেলাঘরে
কতই গেলেম খেলে,
অপরূপকে দেখে গেলেম
দুটি নয়ন মেলে।
পরশ যাঁরে যায় না করা
সকল দেহে দিলেন ধরা।
এইখানে শেষ করেন যদি
শেষ করে দিন তাই---
যাবার বেলা এই কথাটি
জানিয়ে যেন যাই।
২০ শ্রাবণ, ১৩১৭
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jabar-dine-ei-kothati/
|
4055
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হে বিরাট নদী
|
প্রকৃতিমূলক
|
হে বিরাট নদী,
অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল
অবিচ্ছিন্ন অবিরল
চলে নিরবধি।
স্পন্দনে শিহরে শূন্য তব রুদ্র কায়াহীন বেগে;
বস্তুহীন প্রবাহের প্রচণ্ড আঘাত লেগে
পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুফেনা উঠে জেগে;
ক্রন্দসী কাঁদিয়া ওঠে বহ্নিভরা মেঘে।
আলোকের তীব্রচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া উঠে বর্ণস্রোতে
ধাবমান অন্ধকার হতে;
ঘুর্ণাচক্রে ঘুরে ঘুরে মরে
স্তরে স্তরে
সুর্যচন্দ্রতারা যত
বুদ্বুদের মতো।
হে ভৈরবী, ওগো বৈরাগিণী,
চলেছ যে নিরুদ্দেশ সেই চলা তোমার রাগিণী,
শব্দহীন সুর।
অন্তহীন দূর
তোমারে কি নিরন্তর দেয় সাড়া।
সর্বনাশা প্রেমে তার নিত্য তাই তুমি ঘরছাড়া।
উন্মত্ত সে-অভিসারে
তব বক্ষোহারে
ঘন ঘন লাগে দোলা--ছড়ায় অমনি
নক্ষত্রের মণি;
আঁধারিয়া ওড়ে শূন্যে ঝোড়ো এলোচুল;
দুলে উঠে বিদ্যুতের দুল;
অঞ্চল আকুল
গড়ায় কম্পিত তৃণে,
চঞ্চল পল্লবপুঞ্জে বিপিনে বিপিনে;
বারম্বার ঝরে ঝরে পড়ে ফুল
জুঁই চাঁপা বকুল পারুল
পথে পথে
তোমার ঋতুর থালি হতে।
শুধু ধাও, শুধু ধাও, শুধু বেগে ধাও
উদ্দাম উধাও;
ফিরে নাহি চাও,
যা কিছু তোমার সব দুই হাতে ফেলে ফেলে যাও।
কুড়ায়ে লও না কিছু, কর না সঞ্চয়;
নাই শোক, নাই ভয়,
পথের আনন্দবেগে অবাধে পাথেয় করো ক্ষয়।
যে মুহূর্তে পূর্ণ তুমি সে মুহূর্তে কিছু তব নাই,
তুমি তাই
পবিত্র সদাই।
তোমার চরণস্পর্শে বিশ্বধূলি
মলিনতা যায় ভুলি
পলকে পলকে--
মৃত্যু ওঠে প্রাণ হয়ে ঝলকে ঝলকে।
যদি তুমি মুহূর্তের তরে
ক্লান্তিভরে
দাঁড়াও থমকি,
তখনি চমকি
উচ্ছ্রিয়া উঠিবে বিশ্ব পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুর পর্বতে;
পঙ্গু মুক কবন্ধ বধির আঁধা
স্থুলতনু ভয়ংকরী বাধা
সবারে ঠেকায়ে দিয়ে দাঁড়াইবে পথে;
অণুতম পরমাণু আপনার ভারে
সঞ্চয়ের অচল বিকারে
বিদ্ধ হবে আকাশের মর্মমূলে
কলুষের বেদনার শূলে।
ওগো নটী, চঞ্চল অপ্সরী,
অলক্ষ্য সুন্দরী
তব নৃত্যমন্দাকিনী নিত্য ঝরি ঝরি
তুলিতেছে শুচি করি
মৃত্যস্নানে বিশ্বের জীবন।
নিঃশেষে নির্মল নীলে বিকাশিছে নিখিল গগন।
ওরে কবি, তোরে আজ করেছে উতলা
ঝংকারমুখরা এই ভুবনমেখলা,
অলক্ষিত চরণের অকারণ অবারণ চলা।
নাড়ীতে নাড়ীতে তোর চঞ্চলের শুনি পদধ্বনি,
বক্ষ তোর উঠে রনরনি।
নাহি জানে কেউ
রক্তে তোর নাচে আজি সমুদ্রের ঢেউ,
কাঁপে আজি অরণ্যের ব্যাকুলতা;
মনে আজি পড়ে সেই কথা--
যুগে যুগে এসেছি চলিয়া,
স্খলিয়া স্খলিয়া
চুপে চুপে
রূপ হতে রূপে
প্রাণ হতে প্রাণে।
নিশীথে প্রভাতে
যা কিছু পেয়েছি হাতে
এসেছি করিয়া ক্ষয় দান হতে দানে,
গান হতে গানে।
ওরে দেখ্ সেই স্রোত হয়েছে মুখর,
তরণী কাঁপিছে থরথর।
তীরের সঞ্চয় তোর পড়ে থাক্ তীরে,
তাকাস নে ফিরে।
সম্মুখের বাণী
নিক তোরে টানি
মহাস্রোতে
পশ্চাতের কোলাহল হতে
অতল আঁধারে -- অকূল আলোতে।
এলাহাবাদ, ৩ পৌষ, ১৩২১-রাত্রি
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1920
|
5493
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
পরিবেশন
|
চিন্তামূলক
|
সান্ধ্য ভিড় জমে ওঠে রেস্তোরাঁর দুর্লভ আসরে,
অর্থনীতি, ইতিহাস, সিনেমার পরিচ্ছন্ন পথে –
খুঁজে ফেরে অনন্তের বিলুপ্ত পর্যায়।
গন্ধহীন আনন্দের অন্তিম নির্যাস
এক কাপ চা-এ আর রঙিন সজ্জায়।
সম্প্রতি নীরব হল; বিনিদ্র বাসরে
ধূমপান চলেঃ তবে ভবতরী তাস।
স্মৃতি-ভ্রষ্ট উঞ্ছজীবী চলে কোন মতে।জড়-ভরতের দল বসে আছে পার্কের বেঞ্চিতে,
পবিত্র জাহ্নবী-তীরে প্রার্থী যত বেকার যুবক।
কতক্ষণ? গঞ্জনার বড় তীব্র জ্বালা-
বিবাগী প্রাণের তবু গৃহগত টান।ক্রমে গোঠে সন্ধ্যা নামেঃ অন্তরও নিরালা,
এই বার ফিরে চলো, ভাগ্য সবই মিতে;
দূরে বাজে একটানা রেডিয়োর গান।
এখনো হয় নি শূন্য, ক্রমাগত বেড়ে চলে সখ।ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে, আগমনী পশ্চিমা হাওয়ায়,
সুপ্রাচীন গুরুভক্তি আজো আনে উন্মুক্ত লালসা।
চুপ করে বসে থাকো অন্ধকার ঘরে এক কোণেঃ
রাম আর রাবণের উভয়েরই হাতে তীক্ষ্ণ কশা।। (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/poribeshon/
|
1550
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
উপাসনার সায়াহ্নে
|
চিন্তামূলক
|
ভীষণ প্রাসাদ জ্বলে, যেন চিরকাল জ্বলে সায়াহ্নবেলায়।
অলিন্দ, ঝরোকা, শ্বেতমর্মরের সমস্ত নির্মাণ
জ্বলে ওঠে। আগুনের সুন্দর খেলায়
দাউদাউ জ্বলে হর্ম্য, প্রমোদ-নিকুঞ্জ। কিংবা সাধের তরণী
অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন অন্যপথে ধীরে আগুয়ান
হতে গিয়ে অগ্নিবয়লয়ের দিকে ঘুরে যায়।
মুহূর্তে মাস্তুলে, পালে, পাটাতনে প্রচণ্ড হলুদ
জ্বলে ওঠে।
সাধের তরণী জ্বলে, যেন চিরকাল জ্বলে সায়াহ্নবেলায়।
জানি না কখনও কেউ এমন জ্বলেছে কি না সায়াহ্নবেলায়।
যেমন প্রাসাদ জ্বলে, অলিন্দ, ঝরোকা কিংবা শ্বেতমর্মরের
বিবিধ নির্মাণ। যথা সহসা দাউদাউ
প্রমোদ-নিকুঞ্জ, ঝাউ-বীথিকা, হ্রদের জল, জলের উপরে
সাধের তরণীখানি জ্বলে ওঠে।
যেমন কুটির কিংবা অট্টালিকা কিছুকাল চিত্রের মতন স্থির থেকে তারপর
অগ্নিবলয়ের দিকে চলে যায়।
যেমন পর্বত পশু সহসা সুন্দর হয় বাহিরে ও ঘরে।
যেমন সমস্ত-কিছু জ্বলে, চিরকাল জ্বলে সায়াহ্নবেলায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1651
|
3030
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চলিতে চলিতে চরণে উছলে
|
চিন্তামূলক
|
চলিতে চলিতে চরণে উছলে
চলিবার ব্যাকুলতা—
নূপুরে নূপুরে বাজে বনতলে
মনের অধীর কথা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/cholite-cholite-chorone-uchle/
|
5206
|
শামসুর রাহমান
|
শনাক্ত পত্র
|
চিন্তামূলক
|
সূর্যোদয় কখনো দেখেনি বলে তিনটি যুবক
প্রত্যহ একত্র হয়ে ধর্ণা দেয় সূর্যাস্তের কাছে।
‘সূর্যের চুল্লিতে আমি বহুদিন সেঁকেছি আত্মাকে
উল্টিয়ে পাল্টিয়ে, ওহে, তবু দেখি এখানে-সেখানে
থেকে যায় স্যাঁতেসেঁতে কিছু ভাব। অর্থাৎ এখনও
জীবন খোলেনি তার সবগুলি দ্বার সরাসরি,
বস্তুত হাতের পাঁচ অলক্ষ্যে দিয়েছে রেখে, তাই
পৃথিবীর রকে আজও হামাগুড়ি দিই, কেউ-কেউ‘হাঁটি-হাঁটি পা-পা এইমতো কতো নাবালক ছাঁদে
ক্রমাগত চলেছি হোঁচট খেয়ে প্রতিটি প্রহর।
তালগোল কেবলি পাকিয়ে যায় এই পরজীবী
অস্তিত্বের বিমূর্ত চৌকাঠে। পথে দৌড়ে এসে দেখি
আমার আসার আগে যাত্রীর বান্ডিল নিয়ে ওই
ছেড়ে যায় বাস’- এই বলে সটান মাঠের মরা
ঘাসে শুয়ে দুই-মুখ-ফিরে-আসা সিগারেটে দিল
সুখটান প্রথম যুবক। চেয়ে দ্যাখে প্রায় নেভা
আকাশে সূর্যের স্টোভ সূর্যাস্তের রঙ দেখে তার
মনে পড়ে হঠাৎ মোটরে দেখা মহিলার ঠোঁট।‘ইয়ার বলেছ তোফা। সেই কবে নড়বড়ে টোলে
জল পড়ে পাতা নড়ে মুখস্থ করেছিলুম জন
ত্রিশেক বালক মিলে ঐকতানে প্রশান্ত সকালে,
দুপুরের অন্ধ-করা রোদে আজ কে কোথায়, ওহে,
পড়েছে যে ছিটকে দূরে। ধড়িবাজ যে লোকটা
দেখাল ঘুঘুর ফাঁদ, একদিন সে-ই জানব না
ছিল চেনা সুবোধ বালক, শ্লেটে যার চকখড়ি
বুলাত আদর্শ জীবনের শর্তাবলি প্রথামতো।‘ভুলেছি সবার নাম। তাদের মুখের রেখাটুকু
মুছে গেছে স্মৃতির অস্থির ক্যানভাস থেকে আজ।
সূর্যাস্তের রোগা আলো’-অবজ্ঞার ঢিল ছুড়ে দূরে
দ্বিতীয় কথক ভাবে- ‘রাশেদা ভাবীর ম্লান ঠোঁট।‘নামে কী-বা আসে যায়, বলেছেন, কবি-নাট্যকার;
সত্যি, কী-বা আসে যায় নামে’, বলে তৃতীয় যুবক
ঝাড়ল হাতের ছাই, ‘ধরো এই তোমার নামের
যে-অর্থ দাঁড়ায় তার কতটুকু তুমি? কিন্তু যদি
বলি কেউ আমার নামের খামে মনের খেয়ালে
বসায় তোমার নাম, অথবা আমরা তিনজন
যদি ফের তুলে নিই যে-কোনো তিনটি নাম যার
যেটা ইচ্ছে, তাতে কিছু হবে কি বিশেষ হের-ফের?‘নেমকহারাম নই, দেখেছি তো আরজি পেশ করে
এই জীবনের কাছে রাত্রিদিন, নেপোয় মেরেছে দইটুকু-
আমরা ক’জন শুধু শুকনো মুখে শূন্য হাতে শেষে
প্রত্যহ এসেছি ফিরে রকবাজ সন্তদের ভিড়ে’,
তৃতীয় যুবক ভাবে ‘মধ্যাহ্নের চিৎকারের পরে
এখনও রয়েছে লেগে আকাশের প্যালেটে যে-রঙ,
তাকি নয় উত্তপ্ত সন্ধ্যায় বন্ধ্যা গণিকার ঠোঁট?’‘আমার জীবনে সুখ নেই’, প্রথম যুবক বলে।
‘আমার জীবনে সুখ নেই’, বাতাসে দ্বিতীয় স্বর
নকশা আঁকে হিজিবিজি।। চিন্তার কপাটে পড়ে খিল।
‘আমার জীবনে সুখ নেই’, বলে তৃতীয় কথক।
সূর্যোদয় কখনো দেখেনি বলে তারা তিনজন
সূর্যাস্তের কাছে চেয়েছে শিখতে কিছু জীবনের
রসায়ন। প্রথম যুবক দ্যাখে দ্বিতীয়ের চোখেনেই তার নিজের চোখের মণি, তৃতীয়ের চোখ
সেখানে কাঁপছে মৃদু। দ্বিতীয় কথক দ্যাখে তার
নিজের থ্যাবড়া নাক নিয়েছে প্রথমজন কেড়ে।
হোক না কার্বন কপি পরস্পর, কী-বা আসে যায়
রকবাজ সন্তদের ভিড়ে, ওহে, কী-বা আসে যায়…
প্রাণপণ হেঁকে বলো শূন্যতায় কী-বা আসে যায়। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shonakto-patro/
|
2203
|
মহাদেব সাহা
|
ফিরে আসা গ্রাম
|
স্বদেশমূলক
|
এই গ্রাম প্রতিরাতে হাতছানি দিয়ে ডাকতো আমাকে
উৎকন্ঠিতা প্রেমিকার মতো
কানে কানে শোনাতো কাহিনী,
যুদ্ধক্ষেত্রে মধ্যরাতে কখনো হঠাৎ
স্বদেশ-স্বজনহারা কান্নায় ভরে যেতো বুক
আমার দুঃখিনী গ্রাম কিছুতেই তোমাকে পারিনি ভুলে যেতে;
এই গ্রাম, লতাগুল্ম-আচ্ছাদিত শৈশবের স্মৃতি
অকস্মাৎ মধ্যরাতে ডাকতো আমাকে মৌনস্বরে,
হয়তো তখন আমি শত্রুর সতর্ক গতিবিধি লক্ষ্য করে
ছুঁড়ছি গ্রেনেড, পাতছি মাইন ব্রিজে, কালভার্ট করছি বিলোপ,
কিংবা রয়েছি লুকিয়ে আমি পার্শ্ববর্তী ঝোপে
ওদিকে দাগছে কামান শত্রুসেনা
ক্রলিংরত আমরা তখন তবু ভাবছি তোমারই কথা-
মাথার ওপর শত্রুর বিমান ক্রমাগত দিচ্ছে চকাকর
সেই মধ্যরাতে, এই গ্রাম ডাকতো আমাকে ফিরে যেতে,
রাত্রির নির্জন চাঁদ ভেঙে যেতো জঙ্গীবিমানের শব্দে
সেই অন্ধকারে বসে শুনতাম গ্রামের লিরিক
যেন ভাসতাম স্নেহময়ী জননীর কোলে,
মৃত দিদিমার সান্ধ্য গল্পের আসরে।
কোথায় সে গ্রাম, সবুজচিত্রিত গাছপালা
মাটির নির্মিত বাড়ি, কাঁসার বাসন,
চাল-ডাল-নুন-মরিচের হাটখোলা?
এই কি আমার গ্রাম, মধ্যরাতে যে আমাকে
করতো উন্মন, গাঢ়স্বরে ডাকতো আমার নাম ধরে?
এই কি আমার গ্রাম নরকঙ্কালের অস্থিমালা পরিহিত মাটি,
আমার গ্রাম কি এই ধ্বংসের স্বাক্ষর
বয়ে খাঁটি বধ্যভূমি?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1353
|
2567
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অকর্মার বিভ্রাট
|
নীতিমূলক
|
লাঙল কাঁদিয়া বলে ছাড়ি দিয়ে গলা,
তুই কোথা হতে এলি ওরে ভাই ফলা?
যেদিন আমার সাথে তোরে দিল জুড়ি
সেই দিন হতে মোর মাথা-খোঁড়াখুঁড়ি।
ফলা কহে, ভালো ভাই, আমি যাই খ'সে,
দেখি তুমি কী আরামে থাক ঘরে ব'সে।
ফলাখানা টুটে গেল, হল্খানা তাই
খুশি হয়ে পড়ে থাকে, কোনো কর্ম নাই।
চাষা বলে, এ আপদ আর কেন রাখা,
এরে আজ চলা করে ধরাইব আখা।
হল্ বলে, ওরে ফলা, আয় ভাই ধেয়ে--
খাটুনি যে ভালো ছিল জ্বলুনির চেয়ে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akormar-bibhrat/
|
3873
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শূন্য ঝুলি নিয়ে হায়
|
রূপক
|
শূন্য ঝুলি নিয়ে হায়
ভিক্ষু মিছে ফেরে,
আপনারে দেয় যদি
পায় সকলেরে।
(স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shunyo-jhuli-nie-hai/
|
2045
|
মল্লিকা সেনগুপ্ত
|
শুভম তোমাকে
|
প্রেমমূলক
|
শুভম তোমাকে অনেকদিন পরে
হটাত দেখেছি বইমেলার মাঠে
গতজন্মের স্মৃতির মতন
ভুলে যাওয়া গানের মতন
ঠিক সেই মুখ, ঠিক সেই ভুরু
শুধুই ঈষৎ পাক ধরা চুল
চোখ মুখ নাক অল্প ফুলেছে
ঠোঁটের কোনায় দামি সিগারেট
শুভম, তুমি কি সত্যি শুভম!মনে পড়ে সেই কলেজ মাঠে
দিনের পর দিন কাটত
কীভাবে সবুজ ঘাসের মধ্যে
অন্তবিহীন সোহাগ ঝগড়া!
ক্রমশই যেন রাগ বাড়ছিল
তুমি চাইতে ছায়ার মতন
তোমার সঙ্গে উঠব বসব
আমি ভাবতাম এতদিন ধরে
যা কিছু শিখেছি, সবই ফেলনা!
সব মুছে দেব তোমার জন্য?তুমি উত্তম-ফ্যান তাই আমি
সৌমিত্রের ভক্ত হব না!
তোমার গোষ্ঠী ইস্টবেঙ্গল
আমি ভুলে যাব মোহনবাগান!
তুমি সুচিত্রা, আমি কণিকার
তোমার কপিল, আমার তো সানি!
তোমার স্বপ্নে বিপ্লব তাই
আমি ভোট দিতে যেতে পারব না!এমন তরজা চলত দুজনে
তবুও তোমার ঘাম গন্ধ
সস্তা তামাক স্বপ্নের চোখ
আমাকে টানত অবুঝ মায়ায়
আমার মতো জেদি মেয়েটিও
তোমাকে টানতো প্রতি সন্ধ্যায়
ফাঁকা ট্রাম আর গঙ্গার ঘাটেতারপর তুমি কম্পিউটার
শেখার জন্য জাপান চললে
আমিও পুণের ফিলমি কোর্সে
প্রথম প্রথম খুব চিঠি লেখা
সাত দিনে লেখা সাতটা চিঠি
ক্রমশ কমল চিঠির সংখ্যা
সপ্তাহে এক, মাসে একটা
ন মাসে ছ মাসে, একটা বছরে
একটাও না… একটাও না…
ডাক বাক্সের বুক খাঁ খাঁ করে
ভুলেই গেছি কতদিন হল,
তুমিও ভুলেছ ঠিক ততদিনতারপর সেই পৌষের মাঠে
হটাত সেদিন বইমেলাতে
দূরে ফেলে আসা গ্রামের মতো
তোমার মুখটা দেখতে পেলাম
শুভম, তুমি কি সত্যি শুভম!
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5625.html
|
768
|
জসীম উদ্দীন
|
আমার খোদারে দেখিয়াছি আমি
|
মানবতাবাদী
|
আমার খোদারে দেখিয়াছি আমি
গরীবের কুঁড়ে ঘরে,
দীন দুঃখীর নয়নের জল
যেথায় অঝোরে ঝরে।
অথ্যাচারীর পীড়নের ঘায়,
কত ব্যথাতুর কাদে নিরালায়;
তাদের অশ্রু গড়ায়ে পড়িছে
খোদার মাটির পরে।
তাইত আমরা পড়িনে নামাজ
একা ঘরে নির্জনে,
লোকালয়ে মোরা মসজিদ গড়ি
সব ভাই একাসনে;
জায়নামাজের পাটি আমাদের,
আকাশের চেয়ে বিসতৃত ঢের,
তাই ত আকাশ লুটায়েছে ছের
দুনিয়া মসজিদ ঘরে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/745
|
5919
|
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
|
ফুল ফুটুক না ফুটুক
|
প্রেমমূলক
|
ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।শান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে
তারপর খুলে –
মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে
তারপর তুলে –
যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে
যেন না ফেরে।গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে
একটা দুটো পয়সা পেলে
যে হরবোলা ছেলেটা
কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত
– তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো।লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত
আকাশটাকে মাথায় নিয়ে
এ-গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে
রেলিঙে বুক চেপে ধ’রে
এই সব সাত-পাঁচ ভাবছিল –ঠিক সেই সময়
চোখের মাথা খেয়ে গায়ে উড়ে এসে বসল
আ মরণ ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি !তারপর দাড়ম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।
অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে
দড়িপাকানো সেই গাছ
তখন ও হাসছে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4441.html
|
3775
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যা পায় সকলই জমা করে
|
চিন্তামূলক
|
যা পায় সকলই জমা করে,
প্রাণের এ লীলা রাত্রিদিন।
কালের তাণ্ডবলীলাভরে
সকলই শূন্যেতে হয় লীন। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ja-pai-sokoli-joma-kore/
|
3700
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মর্মবাণী
|
প্রকৃতিমূলক
|
শিল্পীর ছবিতে যাহা মূর্তিমতী,
গানে যাহা ঝরে ঝরনায়,
সে বাণী হারায় কেন জ্যোতি,
কেন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়মুখের কথায়
সংসারের মাঝে
নিরন্তর প্রয়োজনে জনতার কাজে?
কেন আজ পরিপূর্ণ ভাষা দিয়ে
পৃথিবীর কানে কানে বলিতে পারিনে "প্রিয়ে
ভালোবাসি"?
কেন আজ সুরহারা হাসি
যেন সে কুয়াশা মেলা
হেমন্তের বেলা?
অনন্ত অম্বর
অপ্রয়োজনের সেথা অখণ্ড প্রকাণ্ড অবসর,
তারি মাঝে কে তারা অন্য তারকারে
জানাইতে পারে
আপনার কানে কানে কথা।
তপস্বিনী নীরবতা
আসন বিস্তীর্ণ যার অসংখ্য যোজন দূর ব্যেপে
অন্তরে অন্তরে উঠে কেঁপে
আলোকের নিগূঢ় সংগীতে।
খণ্ড খণ্ড দণ্ডে পলে ভারাকীর্ণ চিতে
নাই সেই অসীমের অবসর;
তাই অবরুদ্ধ তার স্বর,
ক্ষীণসত্য ভাষা তার।
প্রত্যহের অভ্যস্ত কথার
মূল্য যার ঘুচে,
অর্থ যায় মুছে।
তাই কানে কানে
বলিতে সে নাহি জানে
সহজে প্রকাশি'
"ভালোবাসি"।
আপন হারানো বাণী, খুঁজিবারে,
বনস্পতি, আসি তব দ্বারে।
তোমার পল্লবপুঞ্জ শাখাব্যূহভার
অনায়াসে হয়ে পার
আপনার চতুর্দিকে মেলেছে নিস্তব্ধ অবকাশ।
সেথা তব নিঃশব্ধ উচ্ছ্বাস
সূর্যোদয় মহিমার পানে
আপনারে মিলাইতে জানে।
অজানা সাগর পার হতে
দক্ষিণের বায়ুস্রোতে
অনাদি প্রাণের যে বারতা
তব নব কিশলয়ে রেখে যায় কানে কানে কথা,--
তোমার অন্তরতম--
সে কথা জাগুক প্রাণে মম;--
আমার ভাবনা ভরি উঠুক বিকাশি
"ভালোবাসি"।
তোমার ছায়ায় বসে বিপুল বিরহ মোরে ঘেরে;
বর্তমান মূহূর্তেরে
অবলুপ্ত করি দেয় কালহীনতায়।
জন্মান্তর হতে যেন লোকান্তরগত আঁখি চায়
মোর মুখে।
নিষ্কারণ দুখে
পাঠাইয়া দেয় মোর চেতনারে
সকল সীমার পারে।
দীর্ঘ অভিসারপথে সংগীতের সুর
তাহারে বহিয়া চলে দূর হতে দূর।
কোথায় পাথেয় পাবে তার
ক্ষুধা পিপাসার,
এ সত্য বাণীর তরে তাই সে উদাসী
"ভালোবাসি"।
ভোর হয়েছিল যবে যুগান্তের রাতি
আলোকের রশ্মিগুলি খুঁজি সাথি
এ আদিম বাণী
করেছিল কানাকানি
গগনে গগনে।
নব সৃষ্টি যুগের লগনে
মহাপ্রাণ-সমুদ্রের কূল হতে কূলে
তরঙ্গ দিয়েছে তুলে
এ মন্ত্রবচন।
এই বাণী করেছে রচন
সুবর্ণকিরণ বর্ণে স্বপন-প্রতিমা
আমার বিরহাকাশে যেথা অস্তশিখরের সীমা।
অবসাদ-গোধূলির ধূলিজাল তারে
ঢাকিতে কি পারে?
নিবিড় সংহত করি এ-জন্মের সকল ভাবনা
সকল বেদনা
দিনান্তের অন্ধকারে মম
সন্ধ্যাতারা সম
শেষবাণী উঠুক উদ্ভাসি--
"ভালোবাসি"।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/marmu-bane/
|
1509
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
মানুষের হৃদয়ে ফুটেছি
|
চিন্তামূলক
|
গতকাল ছিল কালো-লালে মেশা
একটি অদ্ভুত টুনটুনি ।
লাফাচ্ছিল ডাল থেকে ডালে,
পাতার আড়ালে, ফুল থেকে ফুলে ।
তার সোনামুখী ঠোঁট, যেন
কলমের ডগায় বসানো একরত্তি হীরে ।
প্রতিটি আঁচড়ে কেটে ভাগ করছিল
ফুল থেকে মধু, মধু থেকে ফুল;
আমার সমস্ত কলতল ভেসে যাচ্ছিল
রক্তকরবীর মধুস্রোতে ।
আজ সকাল থেকেই রক্তকরবীর ডালে
ফুলের আগুন-জ্বলা হাত;
ফুল তুলছেন এক বৃদ্ধা পূজারিণী ।
তার হাতে রক্তকরবীর নকশা কাটা সাজি ।
মধু নয়, শূন্য বৃন্তে শুভ্রকষধারা ।
কলতলে রক্তকরবীর হু হু কান্না,
আমি কী করব? আমি কী করব?
রক্তকরবীর ডালে আমি তো ফুটিনি ।
আমি পৃথিবীর দুঃখী ফুল,
মানুষের হৃদয়ে ফুটেছি ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/313
|
3135
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তন্নষ্টং যন্ন দীয়তে
|
নীতিমূলক
|
গন্ধ চলে যায়, হায়, বন্ধ নাহি থাকে,
ফুল তারে মাথা নাড়ি ফিরে ফিরে ডাকে।
বায়ু বলে, যাহা গেল সেই গন্ধ তব,
যেটুকু না দিবে তারে গন্ধ নাহি কব। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tonnostong-zonno-diyote/
|
3762
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যখন ছিলেম পথেরই মাঝখানে
|
রূপক
|
যখন ছিলেম পথেরই মাঝখানে
মনটা ছিল কেবল চলার পানে
বোধ হত তাই, কিছুই তো নাই কাছে—
পাবার জিনিস সামনে দূরে আছে।
লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছব এই ঝোঁকে
সমস্ত দিন চলেছি একরোখে।
দিনের শেষে পথের অবসানে
মুখ ফিরে আজ তাকাই পিছু-পানে।
এখন দেখি পথের ধারে ধারে
পাবার জিনিস ছিল সারে সারে।
সামনে ছিল যে দূর সুমধুর
পিছনে আজ নেহারি সেই দূর। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jokhon-chilam-potheri-majhe/
|
5902
|
সুবোধ সরকার
|
রামবাবু
|
মানবতাবাদী
|
আগে আপনাকে ভালো লাগত, রামবাবু
এখন আপনি বদলে গেছেন।
কখনও কখনও আপনাকে কংগ্রেস মনে হত
কখনও সি.পি.এম
কখনও সি.পি.আই
মার্কিন সেনেটে আপনার নাম উঠেছিল
কিন্তু ভিয়েতনামের পক্ষে
আপনি বালিদ্বীপ পর্যন্ত ছুটে গেছেন।বিহারের লছমনপুরে আপনাকে প্রথম দেখি
ততদিনে আপনার স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে গেছেন
বিহারের গ্রাম
আপনি তো ভালোই জানেন, খুব সুবিধের জায়গা নয়
ওখানকার লোকেরা বলে
পাতাল প্রবেশ হল স্রেফ ধাপ্পা
আপনি নাকি
উত্তরপ্রদেশের গ্রামে একটা কুয়োর ভেতর
বউকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলেন।
এখনও সেই কুয়োর ভেতর বসে
মা সীতা কাঁদেন,
তখন গোটা বিহারের মেয়েরা
উত্তরপ্রদেশের মেয়েরা
রান্না করতে করতে কাঁদে
আর চোখ মছে।আগে আপনাকে ভালো লাগত, রামবাবু
কত রাত্রে আমি না খেয়ে
মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছি
শুধু আপনার তীর ধনুকের গল্প শুনতে শুনতে।
ছোটবেলায় আপনার ভাইকেও আমার খুব ভালো লাগত
কী সুন্দর ভাই
এক ডাকে সাড়া দেয়
যে কোনও দরকারে দাদা বললে
ভাই একপায়ে খাড়া।
পরে বড় হয়ে দেখলাম
আপনার ভাই বীর হতে পারে তবে বড্ড মেনিমুখো
দাদার সমস্ত অর্ডার
সাপ্লাই দেওয়াতেই তার সুকৃতি।
আমি যদি আপনার ভাই হতাম
ও.বি.সি-দের মেরে ফেলার আগে বলতাম
দাদা, এ কাজ করিস না,
লঙ্কা পোড়ানোর আগে আমি বলতাম
ঠিক হচ্ছে না, দাদা, ফিরে চল।আপনি এবং আপনার হনুমান
শুধু ভারতবর্ষে নয়
গোটা উপমহাদেশে হয়ে উঠলেন সোশ্যালিজম
মার্কস এঙ্গেলস এলেন
মাও-সে-তুং হো-চি-মিন এলেন
এল শিল্পায়ন পোখরান
কিন্তু আপনি এবং হনুমান এখনও পর্যন্ত
উত্তম-সুচিত্রার চেয়েও জনপ্রিয় জুটি।
কোভালাম বিচ থেকে বনগাঁর সেলুনে
আপনাদের জোড়া ক্যালেন্ডার।আগে আপনাকে ভাল লাগত, রামবাবু
ত্রিপুরায় উপজাতিরা ঢুকে পড়ল
আপনি হনুমানকে দিয়ে খাদ্য পাঠালেন
মরিচঝাঁপি তৈরি হল
আপনি পানীয় জলের ব্যবস্থা করলেন
বাংলাদেশ থেকে পিল পিল করে পিপীলিকারা
চলে এল শিয়ালদায়
আপনি আপনার বৈমাত্রেয় বোন
ইন্দিরার পাশে দাঁড়ালেন, জলপাইগুড়িতে দাঁড়ালেন
অন্ধ্রে গিয়ে দাঁড়ালেন।তখনও আপনি দাঁড়াতেন
আপনাকে নিয়ে লেখা
তুলসীদাসের রামচরিতমানস
আপনিও শুনতেন তখন
আপনার চোখেও বাষ্প ঘনিয়ে আসত।কিন্তু এখন আপনি আর
আপনি নেই, আপনি
আদবানীকে ভুজুং দিচ্ছেন
জয়ললিতাকে ফুচুং।
পাকিস্তান নামে সবচেয়ে বড় বিষফোঁড়াটাকে বলছেন ফুসকুড়ি?
আমি বলব আপনিই নষ্টের গোড়া
বাল্মীকি আপনাকে যতই নরশ্রেষ্ঠ বলুক
নির্মল জলের মত বলুক
আমার সন্দেহ আছে
ওরা যখন অযোধ্যায় গেল
আপনার বাধা দেওয়া উচিৎ ছিল।
বম্বে থেকে বাঙালিকে ধরে ধরে
ফেরত পাঠাল মহারাষ্ট্র
তাহলে উড়িষ্যা থেকে মালয়ালিদের
ফেরত পাঠাক কলিঙ্গরাজ।
কর্ণাটক থেকে তামিলদের
পাঞ্জাব থেকে মারাঠিদের।
সারা দেশ জুড়ে লেগে যাক ফেরত আর ফেরত
এই ফেরত দেওয়ার মারি ও মড়ক
আপনি সামলাতে পারবেন, রামবাবু?বনে থাকার দিনগুলো ভুলে যাবেন না
আপনার বাবার ভুলের জন্য
মনে মনে আপনি বাবাকে ক্ষমা করেননি কোনও দিন
আমি জানি
জঙ্গলে থাকতে আপনার ভালো লাগত না
সেই খারাপ দিনগুলো আপনি মনে করুন
তারও চেয়ে খারাপ দিন
আমাদের সামনে, আপনার হাত কাঁপছে না, ভয় করছে না
আপনার নামে ভারতবর্ষে
হাজার হাজার বালকের নাম
তারা বড়বাজারে, মেটিয়াবুরুজে, চাঁদনিচকের
দোকানে দোকানে কাজ করে
দিনান্তে বাড়িতে আটা কিনে নিয়ে যায়
ধোঁয়াভর্তি উনুনে বসে
তাদের মা রুটি ভেজে দেয়।সারা ভারতবর্ষ জুড়ে
সন্ধে সাড়ে আটটায় কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে
যে বালকেরা এখন
দুটো রুটি নিয়ে বসেছে খাবে বলে
তাদের কে রাম কে রহিম
সেটা আপনার দেখার কথা ছিল নাবাল্মীকির সাথে দেখা হলে বলবেন
রামায়ণের পরবর্তী সংস্করণের আগে
অর্থাৎ প্রেসে পাঠাবার আগে
উনি যেন নতুন করে আর একবার লিখে দেন ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%81-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7-%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0/
|
422
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বিজয়িনী
|
প্রেমমূলক
|
হে মোর রাণি! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।
আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।
আমার সমর-জয়ী অমর তরবারী
দিনে দিনে ক্লানি- আনে, হ’য়ে ওঠে ভারী,
এখন এ ভার আমার তোমায় দিয়ে হারি,
এই হার-মানা-হার পরাই তোমার কেশে।।
ওগো জীবন-দেবী।
আমায় দেখে কখন তুমি ফেললে চোখের জল,
আজ বিশ্বজয়ীর বিপুল দেউল তাইতে টলমল!
আজ বিদ্রোহীর এই রক্ত-রথের চূড়ে,
বিজয়িনী! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে,
যত তৃণ আমার আজ তোমার মালায় পূরে’,
আমি বিজয়ী আজ নয়ন-জলে ভেসে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/852
|
124
|
আল মাহমুদ
|
কালের কলস
|
চিন্তামূলক
|
অনিচ্ছায় কতকাল মেলে রাখি দৃশ্যপায়ী তৃষ্ণার লোচন
ক্লান্ত হয়ে আসে সব, নিসর্গও ঝরে যায় বহুদূর অতল আঁধারে
আর কী থাকলো তবে হে নীলিমা, হে অবগুণ্ঠন
আমার কাফন আমি চাদরের মতো পরে কতদিন আন্দোলিত হবো
কতকাল কতযুগ ধরে
দেখবো, দেখার ভারে বৃষের স্কন্ধের মতোনুয়ে আসে রাত্রির আকাশ?
কে ধারালো বর্শা হেনে অসংখ্য ক্ষতের সৃষ্টি করে সেই কৃষ্ণকায়
ষাঁড়ের শরীরে
আর সে আঘাত থেকে কী-যে ঝরে পড়ে ঠিক এখনো বুঝি না
একি রক্ত, মেদ, অগ্নি কিম্বা শ্বেত আলোঝরে যায়
অবিরাম অহোরাত্র প্রাণ আর কিমাকার ভূগোলে কেবলই–
ঝরে যায় ঝরে যেতে থাকে।
ক্রমে তাও শেষ হলে সে বন্য বৃষভ যেন গলে যায় নিসর্গশোভায়।
তুমি কি সোনার কুম্ভ ঠেলে দিয়ে দৃশ্যের আড়ালে দাঁড়াও
হে নীলিমা, হে অবগুণ্ঠন?
আকাশে উবুড় হয়ে ভেসে যেতে থাকে এক আলোর কলস
অথচ দেখে না কেউ, ভাবে না কনককুম্ভ পানকরে কালের জঠর;
ভাবে না, কারণ তারা প্রতিটি প্রভাতে দেখে ভেসে ওঠে আরেক আধার
ছলকায়, ভেসে যায়, অবিশ্রাম ভেসে যেতে থাকে।
কেমন নিবদ্ধ হয়ে থাকে তারা মৃত্তিকা,সন্তান আর শস্যের ওপরে
পুরুষের কটিবন্ধ ধরে থাকে কত কোটি ভয়ার্ত যুবতী
ঢাউস উদরে তারা কেবলই কি পেতে চায় অনির্বাণ জন্মের আঘাত।
মাংসের খোড়ল থেকে একে একে উড়ে আসে আত্মার চড়ুই
সমস্ত ভূগোল দ্যাখো কী বিপন্ন শব্দে ভরে যায়
ভরে যায়, পূর্ণ হতে থাকে।
এ বিষণ্ণ বর্ণনায় আমি কি অন্তত একটি পংক্তিও হবো না
হে নীলিমা, হে অবগুণ্ঠন?
লোকালয় থেকে দূরে, ধোঁয়া অগ্নি মশলার গন্ধ থেকে দূরে
এই দলকলসের ঝোপে আমার কাফন পরে আমি কতকাল
কাত হয়ে শুয়ে থেকে দেখে যাবো সোনার কলস আর বৃষের বিবাদ?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3750.html
|
5035
|
শামসুর রাহমান
|
বিস্মৃতির ডোবায়
|
প্রেমমূলক
|
বিস্মৃতির ডোবায় আমাকে ছুঁড়ে দিয়ে নিদ্বির্ধায়
সে কি আজ তারাভরা আকাশকে শোভা দ্যাখে, নেয়
গোলাপের ঘ্রাণ কিংবা অন্য কারো আলিঙ্গনে ধরা
দেয় বারবার? না কি শোনে রাতে আমজাদ খাঁর
দরবারী, গাছের সবুজে আর গেরুয়া মাটিতে
বৃষ্টিপাত? বিছানায় নিঃসঙ্গতা ঘুমায় আমার
পাশে আ জপায় আমাকে অন্ধকারে, সে তোমাকে
হেলায় ফেলেছে মুছে দ্রুত জলছবির মতন।মনকে প্রবোধ দিই। জানলার ধারে গিয়ে দেখি
জনহীন পথ বহুদূরে গেছে বৃষ্টির মঞ্জীর
বুকে নিয়ে, গাছে পাখি নিয়েছে আশ্রয় ভেজা গায়ে।
হয়তো সে ভোলে নি আমাকে। যত আমি তাকে ভুলে
থাকতে চাই ততই মুখশ্রী তার মনে পড়ে আর
মনে হয়, দরজায় রয়েছে দাঁড়িয়ে সে প্রতিমা। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bismritir-dobayi/
|
5073
|
শামসুর রাহমান
|
ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই
|
রূপক
|
এই যে আপনি আমার বাসার জানালার ভেতর দিয়ে
দৃষ্টি ছড়িয়ে দিচ্ছেন, কে আপনি? আপনার এই কাজটি কি
তেমন ভালো হচ্ছে? আমার গলার আওয়াজ জানালা থেকে
স’রে গেল। জানালাটি বন্ধ করার সঙ্গেই
একটি বিটকেল আওয়াজ দৌড়ে এসে কোথায়
যেন মিলিয়ে গেল। বাইরের অচেনা ব্যক্তি-
কেউ কি তাকে স’রে যেতে হুকুম দিলেন? কে বলবে?
খানিক পরে কে যেন আমাকে মাথা বুলিয়ে ঘুম পাড়ায়।ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই নিজেকে বেজায় কেমন যেন
বেখাপ্পা মনে হল আর আমার পাশেই
একজন তরুণীকে দেখতে পেয়ে ভড়কে গেলাম। তরুণী
মৃদু হেসে আমাকে মধুর সম্বোধন জানালেন। মুহূর্তে
ঘরের পরিবেশ গেল বদলে। তরুণী
উধাও, পাশের শয্যায় একজন বিকট পাণ্ডা দাঁত কেলিয়ে
হাসছে আর ওর মুখ থেকে ঝুলছে কাঁচা মাংস। তার হাসির
তাড়নায় সারা ঘর গমগম করছে, বেজায় কাঁপছে।খানিক পরে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ ট্রে-হাতে
ঘরে ঢুকলেন। তিনি এমন সালাম জানালেন যে, আমার
হাত সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে আদাব জানাল। তাঁর ট্রেটিও
ছিল বেশ জমকালো। ট্রের খাবারগুলোও জমকালো। এবং
-খানিক পরেই বেজে উঠল রবীন্দ্রসংগীত। এবং
বেশকিছু পরে হাল আমলের কবির কবিতাও বেজে উঠল
রেকর্ডে। হয়তো সন্ধ্যারাতে কিংবা ভোরবেলা গায়ক
গায়িকা হাজির হবেন এই এলাকার সংগীতপ্রেমীর তৃষ্ণা মেটাতে। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/vorbela-ghum-vangtei/
|
3293
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
না জানি কারে দেখিয়াছি
|
প্রেমমূলক
|
না জানি কারে দেখিয়াছি,
দেখেছি কার মুখ।
প্রভাতে আজ পেয়েছি তার চিঠি।
পেয়েছি তাই সুখে আছি,
পেয়েছি এই সুখ–
কারেও আমি দেখাব নাকো সেটি।
লিখন আমি নাহিকো জানি–
বুঝি না কী যে রয়েছে বাণী–
যা আছে থাক্ আমার থাক্ তাহা।
পেয়েছি এই সুখে আজি
পবনে উঠে বাঁশরি বাজি,
পেয়েছি সুখে পরান গাহে “আহা’।পণ্ডিত সে কোথা আছে,
শুনেছি নাকি তিনি
পড়িয়া দেন লিখন নানামতো।
যাব না আমি তাঁর কাছে,
তাঁহারে নাহি চিনি,
থাকুন লয়ে পুরানো পুঁথি যত।
শুনিয়া কথা পাব না দিশে,
বুঝেন কিনা বুঝিব কিসে,
ধন্দ লয়ে পড়িব মহা গোলে।
তাহার চেয়ে এ লিপিখানি
মাথায় কভু রাখিব আনি
যতনে কভু তুলিব ধরি কোলে।রজনী যবে আঁধারিয়া
আসিবে চারি ধারে,
গগনে যবে উঠিবে গ্রহতারা;
ধরিব লিপি প্রসারিয়া
বসিয়া গৃহদ্বারে–
পুলকে রব হয়ে পলকহারা
তখন নদী চলিবে বাহি
যা আছে লেখা তাহাই গাহি,
লিপির গান গাবে বনের পাতা–
আকাশ হতে সপ্তঋষি
গাহিবে ভেদি গহন নিশি
গভীর তানে গোপন এই গাথা।বুঝি না-বুঝি ক্ষতি কিবা,
রব অবোধসম।
পেয়েছি যাহা কে লবে তাহা কাড়ি।
রয়েছে যাহা নিশিদিবা
রহিবে তাহা মম,
বুকের ধন যাবে না বুক ছাড়ি।
খুঁজিতে গিয়া বৃথাই খুঁজি,
বুঝিতে গিয়া ভুল যে বুঝি,
ঘুরিতে গিয়া কাছেরে করি দূর।
না-বোঝা মোর লিখনখানি
প্রাণের বোঝা ফেলিল টানি,
সকল গানে লাগায়ে দিল সুর। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/na-jani-kare-dekhiachi/
|
820
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ০৭
|
কাহিনীকাব্য
|
সাত
“ঘটক চলিল চলিল সূর্য সিংহের বাড়িরে” |
— আসমান সিংহের গান
কান্-কানা-কান্ ছুটল কথা গুন্-গুনা-গুন তানে,
শোন্-শোনা-শোন সবাই শোনে, কিন্তু কানে কানে |
“কি করগো রূপার মাতা? খাইছ কানের মাথা?
ও-দিক যে তোর রূপার নামে রটছে গাঁয়ে যা তা!
আমরা বলি রূপাই এমন সোনার কলি ছেলে,
তার নামে হয় এমন কথা দেখব কি কাল গেলে?”
এই বলিয়া বড়াই বুড়ি বসল বেড়ি দোর,
রূপার মা কয়, “বুঝিনে বোন কি তোর কথার ঘোর!”
বুড়ি যেন আচমকা হায় আকাশ হতে পড়ে,
“সবাই জানে তুই না জানিস যে কথা তোর ঘরে?”
ও-পাড়ার ও ডাগর ছুঁড়ী, সেখের বাড়ির “সাজু”
তারে নাকি তোর ছেলে সে গড়িয়ে দেছে বাজু |
ঢাকাই শাড়ী কিন্যা দিছে, হাঁসলী দিছে নাকি,
এত করে এখন কেন শাদীর রাখিস বাকি?”
রূপার মা কয়, “রূপা আমার এক-রত্তি ছেলে,
আজও তাহার মুখ শুঁকিলে দুধের ঘিরাণ মেলে |
তার নামে যে এমন কথা রটায় গাঁয়ে গাঁয়ে,
সে যেন তার বেটার মাথা চিবায় বাড়ি যায় |”
রূপার মায়ের রুঠা কথায় উঠল বুড়ীর কাশ,
একটু দিলে তামাক পাতা, নিলেন বুড়ী শ্বাস |
এমন সময় ওই গাঁ হতে আসল খেঁদির মাতা,
টুনির ফুপু আসল হাতে ডলতে তামাক পাতা |
ক’জনকে আর থামিয়ে রাখে? বুঝল রূপার মা ;
রূপা তাহার সত্যি করেই এতটুকুন না |
বুঝল মায়ে কেন ছেলে এমন উদাস পারা,
হেথায় হোথায় কেবল ঘোরে হয়ে আপন হারা |
ও পাড়ার ও দুখাই মিয়া ঘটকালিতে পাকা,
সাজুর সাথেই জুড়ুর বিয়ে যতকে লাগুক টাকা |
শেখ বাড়িতে যেয়ে ঘটক বেকী-বেড়ার কাছে,
দাঁড়িয়ে বলে, “সাজুর মাগো, একটু কথা আছে |”
সাজুর মায়ে বসতে তারে এনে দিলেন পিঁড়ে,
ডাব্বা হুঁকা লাগিয়ে বলে, “আস্তে টান ধীরে |”
ঘটক বলে, “সাজুর মাগো মেয়ে তোমার বড়,
বিয়ের বয়স হল এখন ভাবনা কিছু কর |”
সাজুর মা কয় “তোমরা আছ ময়-মুরুব্বি ভাই,
মেয়ে মানুষ অত শত বুঝি কি আর ছাই!
তোমরা যা কও ঠেলতে কি আর সাধ্য আছে মোর?”
ঘটক বলে, “এই ত কথা, লাগবে না আর ঘোর |
ও-পাড়ার ও রূপারে ত চেনই তুমি বোন্,
তার সাথে দাও মেয়ের বিয়ে ঠিক করিয়ে মন |”
সাজুর মা কয়, “জান ত ভাই! রটছে গাঁয়ে যাতা,
রূপার সাথে বিয়ে দিলে থাকবে না আর মাথা |”
ঘটক বলে, “কাঁটা দিয়েই তুলতে হবে কাঁটা,
নিন্দা যারা করে তাদের পড়বে মুখে ঝাঁটা |
রূপা ত আর নয় এ গাঁয়ে যেমন তেমন ছেলে,
লক্ষ্মীরে দেই বউ বানায়ে অমন জামাই পেলে!”
ঠাটে ঘটক কয় গো কথা ঠোঁট-ভরাভর হাসে ;
সাজুর মায়ের পরাণ তারি জোয়ার-জলে ভাসে |
“দশ খান্দা জমি রূপার, তিনটি গরু হালে,
ধানের-বেড়ী ঠেকে তাহার বড় ঘরের চালে |”
সাজু তোমার মেয়ে যেমন, রূপাও ছেলে তেমন,
সাত গেরামের ঘটক আমি জোড় দেখিনি এমন |”
তার পরেতে পাড়ল ঘটক রূপার কুলের কথা,
রূপার দাদার নাম গুনে লোক কাঁপত যথা তথা |
রূপার নানা সোয়েদ-ঘেঁষা, মিঞাই বলা যায়—
কাজী বাড়ির প্যায়দা ছিল কাজল-তলার গাঁয় |
রূপার বাপের রাখত খাতির গাঁয়ের চৌকিদারে,
আসেন বসেন মুখের কথা—গান বজিত তারে |
রূপার চাচা অছিমদ্দী, নাম শোন নি তার?
ইংরেজী তার বোল শুনিলে সব মানিত হার |
কথা ঘটক বলল এঁটে, বলল কখন ঢিলে,
সাজুর মায়ে সবগুলি তার ফেলল যেন গিলে |
মুখ দেখে বুঝল ঘটক—লাগছে অষুধ হাড়ে,
বলল, “তোমার সাজুর বিয়া ঠিক কর এই বারে |”
সাজুর মা কয়, ” যা বোঝ ভাই, তোমরা গ্যা তাই কর,
দেখ যেন কথার আবার হয় না নড়চড় |”
“আউ ছি ছি!” ঘটক বলে, “শোনই কথা বোন,
তোমার সাজুর বিয়া দিতে লাগবে কত পণ?
পোণে দিব কুড়ি দেড়েক বায়না দেব তেরো,
চিনি সন্দেশ আগোড়-বাগোড় এই গে ধর বারো |
সবদ্যা হল দুই কুড়ি এ নিতেই হবে বোন,
চাইলে বেশী জামাইর তোমার বেজার হবে মন!”
সাজুর মা কয়, “ও-সব কথার কি-ইবা আমি জানি,
তোমরা যা কও তাইত খোদার গুকুর বলে মানি |”
সাধে বলে দুখাই ঘটক ঘটকালিতে পাকা,
আদ্য মধ্য বিয়ের কথা সব করিল ফাঁকা |
চল্-চলা-চল্ চলল দুখাই পথ বরাবর ধরি,
তাগ্-ধিনা-ধিন্ নাচে যেন গুন্ গুনা গান করি |
দুখাই ঘটক নেচে চলে নাচে তাহার দাড়ি,
বুড়োর বটের শিকড় যেন চলছে নাড়ি নাড়ি ;
লম্ফে লম্ফে চলে ঘটক দম্ভ করে চায়,
লুটের মহল দখল করে চলছে যেন গাঁয়!
ঘটকালিরই টাকা যেন ঝন্-ঝনা-ঝন্ বাজে,
হন্-হানা-হন্ চলল ঘটক একলা পথের মাঝে |
ধানের জমি বাঁয় ফেলিয়া ফেলিয়া, ডাইনে ঘন পাট,
জলীর বিলে নাও বাঁধিয়া ধরল গাঁয়ের বাট |
“কি কর গো রূপার মাতা, ভবছ বসি কিবা,
সাজুর সাথেই ঠিক কইরাছি তোমার ছেলের বিবা |
সহজে কি হয় সে রাজি, একশ টাকা পণ,
এর কমেতে বসেইনাক সাজুর মায়ের মন |
আমিও আবার কুড়ি তিনেক উঠিনে তার পরে,
সাজুর মায়ও নাছোড়-বান্দা, দিলাম তখন ধরে ;
আরেক কুড়ি, তয় সে কথা কইল হাসি হাসি,
আমি ভাবি, বিয়ার বুঝি বাজল সানাই বাঁশী |
এখন বলি রূপার মাতা, আড়াই কুড়ি টাকা,
মোর কাছেতে দিবা, কথা হয় না যেন ফাঁকা!
আসব দিয়ে গোপনে তায়, নইলে গাঁয়ের লোকে,
মেজবানী দাও বলে তারে ধরবে চীনে জোঁকে |
বিয়ের দিনে নিবে সে তাই তিরিশ টাকা যেচে,
যারে তারে বলতে পার এই কথাটি নেচে |
চিনি সন্দেশ আগোড়-বাগোড় তার লাগিবে ষোলো,
এই ধরগ্যা রূপার বিয়া আজই যেন হল |”
রূপার মায়ের আহ্লাদে প্রাণ ধরেইনাক আর,
ইচ্ছে করে নেচে নেচে বেড়ায় বারে বার |
“ও রূপা তুই কোথায় গেলি? ভাবিসনাক মোটে,
কপাল গুণি বিয়ে যে তোর সাজুর সাথেই জোটে!”
এই বলিয়া রূপার মাতা ছুটল গাঁয়ের পানে,
ঘটক গেল নিজের বাড়ি গুন্-গুনা-গুন্ গানে |
*****
ফুপু = পিসী, বাপের বোন;দাদা = ঠাকুরদাদা
সবদ্যা = সব দিয়া;বিবা = বিবাহ
তয় = তবে
মেজবানী = নিমন্ত্রণ দেওয়া
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/810
|
1404
|
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
|
আষাঢ়ের রাত
|
প্রেমমূলক
|
লণ্ঠনের সামান্য আলোয় অসামান্য হয়ে ওঠে
আষাঢ়ের বৃষ্টিঝরা রাত
বাইরে আঁধার ক্রমে জমে ওঠে , বাতাসের দুপদাপ
বেড়ে বেড়ে সুতীক্ষ্ণ শিসের মতো হয়
এমন সময়ে তুমি দাঁড়ালে দরজায়, সেই তুমি
একদিন যার চোখে রেখেছি এ চোখ
শিমুল ওড়ানো পথে যার হাতে ছুঁয়েছি এ হাত
হোস্টেল পালিয়ে আসা যার ঠোঁটে গোধূলির মসৃণ আলোয়
ছুঁয়েছি এ ঠোঁট ।
বাইরে জলের শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে
পুরোনো প্রেমের মতো গভীর গভীরতর হয়
দাঁড়িয়ে দরোজায় তুমি প্রাচীন মূর্তির মতো একা
তোমার শিথিল চুল ঢেকে দেয় সভ্যতার বিশীর্ণ সত্তাকে
লণ্ঠনের আলো বেয়ে আষাঢ়ের রাত বেড়ে ওঠে ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1020
|
1383
|
তারাপদ রায়
|
এক
|
প্রেমমূলক
|
অনেকদিন দেখা হবে না
তারপর একদিন দেখা হবে।
দুজনেই দুজনকে বলবো,
‘অনেকদিন দেখা হয় নি’।
এইভাবে যাবে দিনের পর দিন
বত্সরের পর বত্সর।
তারপর একদিন হয়ত জানা যাবে
বা হয়ত জানা যাবে না,
যে তোমার সঙ্গে আমার
অথবা আমার সঙ্গে তোমার
আর দেখা হবে না।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
2149
|
মহাদেব সাহা
|
জীবনের পাঠ
|
চিন্তামূলক
|
শুধাই বৃক্ষের কাছে, ‘বলো বৃক্ষ, কীভাবে
চলতে হয় কঠিন সংসারে? তুমি তো দেখেছো
এই পৃথিবীতে অনেক জীবন;
বৃক্ষ বলে, শোনো, এই সহিষ্ণুতাই জীবন’।
বলি আমি উদ্দাম নদীকে, বলো, পুণ্যতোয়া নদী,
কেমন দেখেছো তুমি মানুষের জীবনযাপন?
তুমি তো দেখেছো বহু সমাজ সভ্যতা’;
মৃদু হেসে নদী বলে,
দুঃখের অপর নাম জীবনযাপন’।
যাই আমি কোনো দূর পাহাড়ের কাছে
বলি, শোনো, হে মৌন পাহাড়,
তুমি তো কালের সাক্ষী, বলো না
বাঁচতে হলে কীভাবে ফেলতে হয় এখানে চরণ’?
কেবল দেখায় তার নিজের জীবন।
অবশেষে একটি শিশুকে আমি বুকে নিয়ে বলি,
‘তুমি এই জীবনের কতেটুকু জানো,
কোথায় নিয়েছো তুমি জীবনের পাঠ’?
কেবল শিশুটি বলে, ‘এসো খেলা করি আমরা দুজনে’।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1418
|
5099
|
শামসুর রাহমান
|
মাঝে মাঝে তাকে
|
চিন্তামূলক
|
দূর থেকে দেখে ঈর্ষার তাপ লাগে সত্তায়।
তার এলোমেলো রুক্ষ চুলের ঘন অরণ্যে
হরিণের খেলা,
সোনালি সাপের এঁকে বেঁকে চলা, অথবা কখনো
কাঠুরের চোখ, শাণিত কুঠার দেখেছি সহসা।জ্বলজ্বলে গালে
কর্কশ দাড়ি, ছিপছিপে গায়ে ছেঁড়া পাঞ্জাবী, পায়ে চম্পল
বিবর্ণ আর মুমূর্ষু খুব। রাস্তার ভিড় গহন দুপুরে
চিরে যায় সেই
সতেজ একলা যুবক, যেমন সাগর-জলের বুক কেটে দ্রুত
এগোয় জাহাজ, কেমন অচিন। নিজের ভেতর
জ্বলি অনিবার।ঔদাস্যের
পাল তুলে চলে হাওয়া থেকে কী যে যখন তখন
মোহন মাগনা কুড়িয়ে সে নয়, আবার ফিরিয়ে
দ্যায় সহজেই
শূন্যের হাতে রূপান্তরের ভিন্ন খেলায়, যেন যাদুকর।
আমাকে দ্যাখেনা। আমি তাকে দেখি, যেমন দুপুর।
রোদ্দুর দ্যাখে।তার জ্বলন্ত
মহানিশাময় ক্ষুধার্ত চোখ কোথায় কখন
হয় নিবদ্ধ, কেউ তো জানে না। বুঝি তার চোখে
কিলবিলে কীট, পদ্ম-কোরক! পদযুগল তার অবশ্য এই
শক্ত মাটিতে সচল, অথচ প্রায়শই মাথা মেঘমালা ছোঁয়।কখনো সখনো
থাকতে দ্যায় না আমাকে আমার মধ্যে সে তেজী,
আমাকে আমার গহন ভেতর থেকে টেনে আনে!
বাইরে দাঁড়িয়ে
বড় অসহায়, ভীষণ নগ্ন, আড়ষ্ট লাগে।কিন্তু সে রোজ
ত্রিলোক-বিহারী। দূর থেকে দেখে আমি কি শুধুই
জ্বলতে থাকবো? (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/majhe-majhe-take/
|
1576
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
গল্পের বিষয়
|
চিন্তামূলক
|
আমার তিন বন্ধু অমিতাভ, হরদয়াল আর পরমেশের সঙ্গে
আজকাল একটু
ঘনঘনই আমার দেখা হয়ে যাচ্ছে।
কখনও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানে
কখনও বালিগঞ্জের লেকে,
কখনও বা
উত্তর কলকাতার দেশবন্ধু পার্কের সেই
দেহাতি চা’ওয়ালার দোকানে,
গরম জলে চায়ের বদলে যে রোজ
হোগলা আর শালপাতার সঙ্গে এক-টুকরো
আদাও ফুটিয়ে নেয়।
ভিক্টোরিয়ার বাগানে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের
গল্প হয়।
বালিগঞ্জের লেকের ধারে ছন্নমতি
বালক-বালিকাদের কাণ্ডকারখানা দেখতে-দেখতে আমাদের গল্প হয়।
দেশবন্ধু পার্কের ঘাসের উপরে উবু হয়ে বসে
ভাঁড়ের চা খেতে-খেতে আমাদের
গল্প হয়।
তবে যে-সব বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের গল্প হয়,
তার তাৎপর্য এখনকার মানুষরা ঠিক
বুঝবে না।
আমাদের গল্প হয়
মধ্য-কলকাতার সেই গলিটাকে নিয়ে,
গ্যাসের বাতির সবুজ আলোর মধ্যে
সাঁতার কাটতে-কাটতে
রাত বারোটায় যে হরেক রকম স্বপ্ন দেখত।
আমাদের গল্প হয়
এই শহরের অঘ্রাণের সেই ঘোলাটে আকাশটাকে নিয়ে,
শীলেদের বাড়ির মেঝো-তরফের বড় ছেলের
বিয়ের রাত্তিরে
চিনে কারিগর ডাকিয়ে যাবে
মস্ত-মস্ত আলোর নেকলেস পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমাদের গল্প হয়
কাঞ্চন থিয়েটারের প্রম্টারের সেই মেয়েটিকে নিয়েও,
আমরা প্রত্যেকেই যাকে একদিন
একটি করে গোড়ের মালা উপহার দিয়েছিলুম।
শেষের এই গল্পটা চলবার সময়ে আমরা
কেউই যে কিছুমাত্র
ঈর্ষার জ্বালায় জলিনা, বরং চারজনেই চার
উজবুকের মতো
হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকি,
তার কারণ আর কিছুই নয়, আমরা প্রত্যেকেই খুব
বুড়িয়ে গেছে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1142
|
1639
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমিকের ভূমি
|
প্রেমমূলক
|
চুলের ফিতায় ঝুল-কাঁটাতারে আরও একবার
শেষবার ঝাঁপ দিতে আজ
বড় সাধ হয়। আজ দুর্বল হাঁটুতে
আরও একবার, শেষবার,
নবীন প্রতিজ্ঞা, জোর অনুভব করে নিয়ে ধ্বংসের পাহাড়
বেয়ে টান উঠে যেতে ইচ্ছা হয়
মেঘলোক। মনে হয়, স্মৃতির পাতাল কিংবা অভ্রভেদী পাহাড়ের চূড়া
ব্যতীত কোথাও তার ভূমি নেই।
প্রেমিকের নেই। তাই অতল পাতালে
অথবা পাহাড়ে তার দৃষ্টি ধায়।
মনে হয়, অন্ধকারে কোটি জোনাকির শবদেহ
মাড়িয়ে আবার ঝুল-কাঁটাটারে চুলের ফিতায়…
ভীষণ লাফিয়ে পড়ি। অথবা হাঁটুতে
নবীন রক্তের জোর অনুভব করে নিয়ে যুগল পাহাড়
ভেঙে উঠে যাই মেঘলোকে।
আরও একবার যাই, আরও একবার, শেষবার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1663
|
1796
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
করাত কেটে চলেছে
|
চিন্তামূলক
|
করাত কেটে চলেছে ভিতরে
বাইরে তুলকালাম পিকনিক।
অস্ত্রাঘাতের শব্দে শিউরে উঠল কে?
বাতাস।
এক শ্মশান থেকে আর শ্মশানে ছুটছে কে?
যৌবন।
করাত কেটে চলে ভিতরে
বাইরে তুলকালাম পিকনিক।
পায়ের তলায় গুমরে গুমরে উঠছে কি?
প্লাবন।
মাটির দেয়ালে ক্রমশ লতিয়ে উঠছে কি?
মড়ক।
করাত কেটে চলছে ভিতরে
বাইরে তুলকালাম পিকনিক।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1187
|
3332
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নূতন
|
চিন্তামূলক
|
হেথাও তো পশে সূর্যকর!
ঘোর ঝটিকার রাতে দারুণ অশনিপাতে
বিদীরিল যে গিরিশিখর,
বিশাল পর্বত কেটে পাষাণহৃদয় ফেটে
প্রকাশিল যে ঘোর গহ্বর,
প্রভাতে পুলকে ভাসি বহিয়া নবীন হাসি
হেথাও তো পশে সূর্যকর!
দুয়ারেতে উঁকি মেরে ফিরে তো যায় না সে রে,
শিহরি উঠে না আশঙ্কায়--
ভাঙা পাষাণের বুকে খেলা করে কোন্ সুখে,
হেসে আসে, হেসে চলে যায় ।
হেরো হেরো, হায় হায়, যত প্রতিদিন যায়,
কে গাঁথিয়া দেয় তৃণজাল--
লতাগুলি লতাইয়া বাহুগুলি বিথাইয়া
ঢেকে ফেলে বিদীর্ণ কঙ্কাল ।
বজ্রদগ্ধ অতীতের নিরাশার অতিথের
ঘোর স্তব্ধ সমাধি-আবাস
ফুল এসে পাতা এসে কেড়ে নেয় হেসে হেসে,
অন্ধকারে করে পরিহাস ।
এরা সব কোথা ছিল, কেই বা সংবাদ দিল,
গৃহহারা আনন্দের দল--
বিশ্বে তিল শূন্য হলে অনাহূত আসে চলে,
বাসা বেঁধে করে কোলাহল ।
আনে হাসি, আনে গান, আনে রে নূতন প্রাণ
সঙ্গে করে আনে রবিকর--
অশোক শিশুর প্রায় এত হাসে এত গায়,
কাঁদিতে দেয় না অবসর ।
বিষাদ বিশালকায়া ফেলেছে আঁধার ছায়া,
তারে এরা করে না তো ভয়--
চারি দিক হতে তারে ছোটো ছোটো হাসি মারে,
অবশেষে করে পরাজয়।।
এই-যে রে মরুস্থল দাবদগ্ধ ধরাতল,
এখানেই ছিল পুরাতন--
একদিন ছিল তার শ্যামল যৌবনভার,
ছিল তার দক্ষিণপবন ।
যদি রে সে চলে গেল, সঙ্গে যদি নিয়ে গেল
গীত গান হাসি ফুল ফল,
শুষ্ক স্মৃতি কেন মিছে রেখে তবে গেল পিছে--
শুষ্ক শাখা, শুষ্ক ফুলদল ।
সে কি চায় শুষ্ক বনে গাহিবে বিহঙ্গগণে
আগে তারা গাহিত যেমন,
আগেকার মতো করে স্নেহে তার নাম ধরে
উচ্ছ্বসিবে বসন্তপবন!
নহে নহে, সে কি হয়! সংসার জীবনময়,
নাহি হেথা মরণের স্থান ।
আয় রে নূতন, আয়, সঙ্গে করে নিয়ে আয়
তোর সুখ তোর হাসি গান ।
ফোটা নব ফুলচয়, ওঠা নব কিশলয়,
নবীন বসন্ত আয় নিয়ে ।
যে যায় সে চলে যাক-- সব তার নিয়ে যাক,
নাম তার যাক মুছে দিয়ে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nuton/
|
5836
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ব্যর্থ
|
প্রেমমূলক
|
প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহঙ্কার দেয়
আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি
দুঃখ আমার মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত
ছড়িয়ে যায়
আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে এক
অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীরে পায়ে
হেঁটে যাই
সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার সহ্য হয় না
আমি পথের কুকুরকে বিস্কুট কিনে দিই
রিক্সাওয়ালাকে দিই সিগারেট
অন্ধ মানুষের শাদা লাঠি আমার পায়ের কাছে
খসে পড়ে
আমার দু‘হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ
ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে
মনে হয় খুব আপন
আমি বাড়ি থেকে বেরুই নতুন কাচা
প্যান্ট শার্ট পরে
আমার সদ্য দাড়ি কামানো নরম মুখখানিকে
আমি নিজেই আদর করি
খুব গোপনে
আমি একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ
আমার সর্বাঙ্গে কোথাও
একটুও ময়লা নেই
অহঙ্কারের প্রতিভা জ্যোতির্বলয় হয়ে থাকে আমার
মাথার পেছনে
আর কেউ দেখুক বা না দেখুক
আমি ঠিক টের পাই
অভিমান আমার ওষ্ঠে এনে দেয় স্মিত হাস্য
আমি এমনভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও
আঘাত না লাগে
আমার তো কারুকে দুঃখ দেবার কথা নয়।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%8b/
|
5397
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
কোন্ দেশে
|
স্বদেশমূলক
|
কোন্ দেশেতে তরুলতা
সকল দেশের চাইতে শ্যামল?
কোন্ দেশেতে চলতে গেলেই
দলতে হয় রে দুর্বা কোমল?
কোথায় ফলে সোনার ফসল,
সোনার কমল ফোটেরে?
সে আমাদের বাংলাদেশ,
আমাদেরই বাংলা রেকোথায় ডাকে দোয়েল-শ্যামা
ফিঙে নাচে গাছে গাছে?
কোথায় জলে মরাল চলে,
মরালী তার পাছে পাছে?
বাবুই কোথা বাসা বোনে,
চাতক বারি যাচে রে?
সে আমাদের বাংলাদেশ,
আমাদেরই বাংলা রে!
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/kon-deshe/
|
400
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ [আবির্ভাব]
|
ভক্তিমূলক
|
১
নাই তা জ
তাই লা জ?
ওরে মুসলিম, খর্জুর-শিষে তোরা সাজ!
করে তসলিম হর কুর্নিশে শোর আওয়াজ
শোন কোন মুজ্দা সে উচ্চারে হেরা আজ
ধরা-মাঝ!
উরজ-য়্যামেন নজ্দ হেজাজ তাহামা ইরাক শাম
মেশের ওমান তিহারান স্মরি কাহার বিরাট নাম।
পড়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লাম।
চলে আঞ্জাম
দোলে তাঞ্জাম
খোলে হুর-পরি মরি ফিরদৌসের হাম্মাম !
টলে কাঁখের কলসে কওসর ভর , হাতে আব-জমজম জাম ।
শোন দামাম কামান তামাম সামান নির্ঘোষি কার নাম
পড়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লানম।’
২
মস্ তান !
ব্যস থাম্!
দেখ মশ্গুল আজি শিস্তান-বোস্তান ,
তেগ গর্দানে ধরি দারোয়ান রোস্তাম ।
বাজে কাহারবা বাজা, গুলজার গুলশানগুলশান : পুষ্প-বাটিকা।
গুলফাম !
দক্ষিণে দোলে আরবি দরিয়া খুশিতে সে বাগে-বাগ ,
পশ্চিমে নীলা‘লোহিতে’র খুন-জোশিতে রে লাগে আগ,
মরু সাহারা গোবিতে সব্জার জাগে দাগ!
নূরে কুর্শির
পুরে ‘তূর’ -শির,
দূরে ঘূর্ণির তালে সুর বুনে হুরি ফুর্তির,
ঝুরে সুর্খির ঘন লালি উষ্ণীষে ইরানিদূরানি তুর্কির!
আজ বেদুইন তার ছেড়ে দিয়ে ঘোড়া ছুড়ে ফেলে বল্লম
পড়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাললাম।’
৩
‘সাবে ঈন’
তাবে ঈন
হয়ে চিল্লায় জোর ‘ওই ওই নাবে দীন !
ভয়ে ভূমি চুমে ‘লাত্ মানাত’ -এর ওয়ারেশিন ।
রোয়ে ওয্যা-হোবলইবলিসখারেজিন , –
কাঁপে জীন্ !
জেদ্দার পূবে মক্কা মদিনা চৌদিকে পর্বত,
তারই মাঝে ‘কাবা’ আল্লার ঘর দুলে আজ হর ওক্ত্ ,
ঘন উথলে অদূরে ‘জম-জম’ শরবৎ!
পানি কওসর,
মণি জওহর
আনি ‘জিবরাইল’ আজ হরদম দানে গওহর ,
টানি মালিক-উল-মৌতজিঞ্জির – বাঁধে মৃত্যুর দ্বার লৌহর।
হানি বরষা সহসা ‘মিকাইল’ করে ঊষর আরবে ভিঙা ,
বাজে নব সৃষ্টির উল্লাসে ঘন ‘ইসরাফিল’ -এর শিঙা!৪
জন্ জাল
কঙ্ কাল
ভেদি, ঘন জাল মেকি গণ্ডির পঞ্জার
ছেদি, মরুভূতে একী শক্তির সঞ্চার!
বেদি পঞ্জরে রণে সত্যের ডঙ্কার
ওংকার!
শঙ্কারে করি লঙ্কার পার কার ধনু-টংকার
হুংকারে ওরে সাচ্চা-সরোদে শাশ্বত ঝংকার?
ভূমা- নন্দে রে সব টুটেছে অহংকার!
মর- মর্মরে
নর- ধর্ম রে
বড়ো কর্মরে দিল ইমানের জোর বর্ম রে,
ভর্ দিল্ জান্ – পেয়ে শান্তি নিখিল ফিরদৌসের হর্ম্য রে!
রণে তাই তো বিশ্ব-বয়তুল্লাতে মন্ত্র ও জয়নাদ –
‘ওয়ে মার্হাবা ওয়ে মার্হাবা এয়্ সর্ওয়ারে কায়েনাত !’
৫
শর- ওয়ান
দর্- ওয়ান
আজি বান্দা যে ফেরউন শাদ্দাদ নমরুদ মারোয়ান ;
তাজি বোর্রাক্ হাঁকে আশমানে পর্ওয়ান, –
ও যে বিশ্বের চির সাচ্চারই বোর্হান –
‘কোর-আন’!
‘কোন্ জাদুমণি এলি ওরে’ – বলি রোয়ে মাতা আমিনায়
খোদার হবিবে বুকে চাপি, আহা, বেঁচে আজ স্বামী নাই!
দূরে আব্দুল্লার রুহ্ কাঁদে, “ওরে আমিনারে গমি নাই –দেখো সতী তব কোলে কোন্ চাঁদ, সব ভর-পুর ‘কমি’ নাই।’
‘এয়্ ফর্ জন্দ’ –
হায় হর্দম্
ধায় দাদা মোত্লেব কাঁদি, – গায়ে ধুলা কর্দম!
‘ভাই। কোথা তুই?’ বলি বাচ্চারে কোলে কাঁদিছে হাম্জা দুর্দম!
ওই দিক্হারা দিক্পার হতে জোর-শোর আসে, ভাসে ‘কালাম’ –
‘এয় ‘শাম্সোজ্জোহা বদরোদ্দোজা কামারোজ্জমাঁ’ সালাম!’ (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/fateh-e-doaj-dohom-abirvab/
|
3152
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তুমি
|
প্রেমমূলক
|
তুমি কোন্ কাননের ফুল ,
তুমি কোন্ গগনের তারা !
তোমায় কোথায় দেখেছি
যেন কোন্ স্বপনের পারা !
কবে তুমি গেয়েছিলে ,
আঁখির পানে চেয়েছিলে
ভুলে গিয়েছি ।
শুধু মনের মধ্যে জেগে আছে ,
ঐ নয়নের তারা ।।
তুমি কথা কয়ো না ,
তুমি চেয়ে চলে যাও ।
এই চাঁদের আলোতে
তুমি হেসে গলে যাও ।
আমি ঘুমের ঘোরে চাঁদের পানে
চেয়ে থাকি মধুর প্রাণে ,
তোমার আঁখির মতন দুটি তারা
ঢালুক কিরণ - ধারা ।। (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumi/
|
2311
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
কুক্কুট ও মণি
|
নীতিমূলক
|
খুঁটিতে খুঁটিতে ক্ষুদ কুক্কুট পাইল
একটি রতন;---
বণিকে সে ব্যগ্রে জিজ্ঞাসিল;---
“ঠোঁটের বলে না টুটে, এ বস্তু কেমন?”
বণিক্ কহিল,-“ভাই,
এ হেন অমূল্য রত্ন, বুঝি, দুটি নাই।''
হাসিল কুক্কুট শুনি;---''তণ্ডুলের কণা
বহুমূল্যতর ভাবি;---কি আছে তুলনা?”
“নহে দোষ তোর, মূঢ়, দৈব এ ছলনা,
জ্ঞান-শূন্য করিল গোঁসাই!”
এই কয়ে বণিক ফিরিল।
মূর্খ যে, বিদ্যার মূল্য কভু কি সে জানে?
নর-কুলে পশু বলি লোকে তারে মানে;---
এই উপদেশ কবি দিলা এই ভানে।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/kukkut-o-moni/
|
883
|
জসীম উদ্দীন
|
রাখালের রাজগী
|
প্রেমমূলক
|
রাখালের রাজা! আমাদের ফেলি কোথা গেলে ভাই চলে,
বুক হতে খুলি সোনা লতাগুলি কেন পায়ে দলে?
জানিতেই যদি পথের কুসুম পথেই হইবে বাসি,
কেন তারে ভাই! গলে পরেছিলে এতখানি ভালবাসি?
আমাদের দিন কেটে যাবে যদি গলেতে কাজের ফাঁসি
কেন শিখাইলে ধেনু চরাইতে বাজায়ে বাঁশের বাঁশী?
খেলিবার মাঠ লাঙল বাজায়ে চষিতেই যদি হবে,
গাঁয়ের রাখাল ডাকিয়া সেথায় রাজা হলে কেন তবে?
তুমি চলে গেছ, শুধু কি আমরা তোমারি কাঙাল ভাই!
হারায়েছি গান, গোচরণ মাঠ, বাঁশের বাঁশরী তাই।
সোজাসুজি আজ উধাও চলিতে কোথা সে উধাও মাঠ,
গোখুর ধূলোয় চাঁদোয়া-টাঙানো কোথা সে গাঁয়ের বাট?
চরণ ফেলিতে চরণ চলে না শস্য-খেতের মানা,
খেলিবার মাঠে বড় জমকালো মিলেছে পাটের থানা।
গেঁয়ো শাখী আজ লুটায়ে পড়িছে কাঁচা পাকা ফল-ভারে,
তলে তলে তার মাঠের রাখাল হাট মিলাইতে নারে।
চষা মাঠে আজ লাঙল চলিতে জাগে না ভাটীর গান
সারা দিন খেটে অন্ন কুড়াই, তবু তাতে অকুলান।
ধানের গোলার গর্বেতে আজি ভরে না চাষীর বুক,
টিনের ঘরের আট-চালা বেঁধে রোদে জ্বলে পায় সুখ।
বাছের নায়েতে ছই দিয়ে চাষী পাটের বেপার করে,
দাবাড়ের গরু হালের খেতে যে জোয়াল বহিয়া মরে।
হেমন্ত নদী ঢেউ খেলেনাক সারীর গানের সুরে,
গরু-দৌড়ের মাঠখানি চাষী লাঙলেতে দেছে ফুঁড়ে।
মনে পড়ে ঘর ছোনের ছাউনি, বেড়িয়া চালের বাতা,
কৃষাণ বধূর বুকখানি যেন লাউ এর লতায় পাতা।
তারি পাশে পাশে প্রতি সন্ধ্যায় মাটির প্রদীপ ধরি
কুমারী মেয়েরা আশিস মাগিত গ্রাম-দেবতারে স্মরি।
আজকে সেখানে জ্বলে না প্রদীপ, বাজে না মাঠের গান,
ঘুমলী রাতের প্রহর গণিয়া জাগে না বিরহী প্রাণ।
শূনো বাড়িগুলো রয়েছে দাঁড়ায়ে, ফাটলে ফাটলে তার,
বুনো লতাগুলো জড়ায়ে জড়ায়ে গেঁথেছে বিরহ-হার।
উকুন যাহার গায়ে মারা যায়- থন থন করে তাজা,
এমন গরুরে পালিয়া কৃষাণ নিজেরে বনে না রাজা!
ধানের গোলার গর্ব ভুলেছে, ভুলেছে গায়ের বল,
চক্ষু বুজিয়া খুঁজিছে কোথায় টাকা বানানোর কল।
সারাদিন ভরি শুধু কাজ কাজ আরও চাই আরও-আরও-
ক্ষুধিত মানুষ ছুটিছে উধাও, তৃষ্ণা মেটে না কারও।
পেটে নাই ভাত, মুখে নাই হাসি, রোগে হাড়খানা সার,
প্রেত-পুরি যেন নামিয়া এসেছে বাহিয়া নরক-দ্বার।
হাজার কৃষাণ কাঁদিছে অঝোরে কোথা তুমি মহারাজ?
ব্রজের আকাশ ফাড়িয়া ফাড়িয়া হাঁকিছে বিরহ-বাজ।
আমরা তোমারে রাজা করেছিনু পাতার মুকুট গড়ে,
ছিঁড়ে ফেলে তাহা মণির মুকুট পরিলে কেমন করে?
বাঁশরী বাজায়ে শাসন করেছ মানুষ-পশুর দল,
সুর শুনে তার উজান বহিত কালো যমুনার জল।
কোন প্রাণে সেই বাঁশের বাঁশরী ভেঙে এলি গেঁয়ো বাটে?
কার লোভে তুই রাজা হলি ভাই! মথুরার রাজপাটে?
বাঁশীর শাসন হেলায় সয়েছি, বুনো ফলে দিছি কর,
অসির শাসন কি দিয়ে সহিব, বেচিয়াছি বাড়ি ঘর;
হালের গরুরে নিলামে দিয়েও মিটাতে পারিনি ভুখ,
আধখানা ফলে পেট ভরে যেত- ভেবে ভেবে হয় দুখ;
এত পেয়ে তোর সাধমেটেনাক, দুনিয়া জুড়িয়া ক্ষুধা,
আমরা রাখাল মাঠের কাঙাল যোগাইব তারি সুধা!
শোনরে কানাই! পষ্ট কহিছি, সহিব না মোরা আর,
সীমার বাহিরে সীমা আছে যদি, ধৈর্যেরো আছে বার।
ভাবিয়াছ ওই অসির শাসনে মোরা হয়ে জড়সড়,
নিজের ক্ষুধার অন্ন আনিয়া চরণে করিব জড়?
বাঁশীর শাসন মেনেছি বলিয়া অসিও মানিতে হবে!
শুরু দেয়া-ডাকে কাজরী গেয়েছি, ঝড়েও গাহিব তবে?
বাঁশীর শাসন বুকে যেয়ে লাগে, নত হয়ে আসে শির,
অসির শাসনে মরাদেরো মাঝে জেগে ওঠে শত বীর।
ভাবিয়াছ, মোরা গাঁয়ের রাখাল, নাই কোন হাতিয়ার,
যে লাঙল পারে মাটিরে ফাড়িতে, ভাঙিতেও পারে ঘাড়।
ঝড়ের সঙ্গে লড়িয়াছি মোরা, বাদলের সাথে যুঝি,
বর্ষার সাথে মিতালী পাতায়ে সোনা ধান করি পুঁজি।
* * *
তবুও সেখানে প্রদীপ জ্বালাই ঘন আঁধারের কোলে,
আঁকড়িয়া আছি পল্লীর মাটি কোন্ ক্ষমতার বলে!
জনমিয়া যারা দুখের নদীতে শিখিয়াছে দিতে পাড়ি,
অসির শাসন তরিবে তাহারা যাক না দুদিন চারি।
পষ্ট করিয়া কহিছি কানাই, এখন সময় আছে,
গাঁয়ে ফিরে চল, নতুবা তোমায় কাঁদিতে হইবে পাছে।
জনম-দুখিনী পল্লী-যশোদা আশায় রয়েচে বাঁচি,
পাতায় পাতায় লতায় লতায় লতিয়ে স্নেহের সাজি।
হিয়াখানি তার হানা-বাড়ি সম ফাটলে ফাটলে কাঁদি
বক্ষে লয়েছে তোমারি বিরহ বনের লতায় বাঁধি।
আঁধা পুকুরের পচা কালো জলে মুরছে কমল- রাধা,
কৃষাণ বধূরা সিনান করিতে শুনে যায় তারি কাঁদা।
বেনুবনে তুমি কবে বেঁধেছিলে তোমার বাঁশের বাঁশী,
দখিনা বাতাস আজিও তাহারে বাজাইয়া যায় আসি!
কোমল লতায় দোলনা বাঁধিয়া শাখীরা ডাকিছে সুরে,
আর কত কাল ভুলে রবি ভাই, পাষাণ মথুরা-পুরে?
আমরা ত ভাই! ভেবে পাইনাক তোরি বা কেমন রীত,
একলা বসিয়া কেতাব লিখিস ভুলিয়া মাঠের গীত।
পুঁথিগুলো সব পোড়াইয়া ফ্যাল, দেখে গাও করে জ্বালা,
কেমনে কাটাস সারাদিন তুই লইয়া ইহার পালা?
ওরাই তো তোরে যাদু করিয়াছে, মোরা যদি হইতাম,
ছিঁড়িয়া ছিঁড়িয়া বানাইয়া ঘুড়ির আকাশে উড়াইতাম!
রাজধানী যেরে পরদেশ তোর-ইট কাঠ দিয়ে ঘেরা,
ইট-কাঠ তাই আঁটঘাট বেঁধে মনেও কি দিলি বেড়া?
এত ডাক ডাকি শুনে ন শুনিস, এমনি কঠিন হিয়া-
আমরা রাখাল ভাবিয়া না পাই- গলাইব কিবা দিয়া?
একেলা আমরা মাঠে মাঠে ফিরি, পথে পথে কেঁদে মরি,
আমাদের গান শোনে নারে কেউ, লয়নাক হাত ধরি।
* * *
চল গাঁয়ে যাই, আঁকাবাঁকা পথ ধূলার দোলায় দোলে,
দুধারের খেত কাড়াকাড়ি করে তাহারে লইতে কোলে।
কদম্ব রেণু শিহরিয়া উঠে নতুন পাটল মেঘে,
তমালের বনে বিরহী রাধার ব্যথা-দেয়া যায় ডেকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/781
|
3566
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিকেলবেলার দিনান্তে মোর
|
চিন্তামূলক
|
বিকেলবেলার দিনান্তে মোর
পড়ন্ত এই রোদ
পুবগগনের দিগন্তে কি
জাগায় কোনো বোধ।
লক্ষকোটি আলোবছর-পারে
সৃষ্টি করার যে বেদনা
মাতায় বিধাতারে
হয়তো তারি কেন্দ্র-মাঝে
যাত্রা অামার হবে—
অস্তবেলার আলোতে কি
আভাস কিছু রবে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bikelbelar-dinante-mor/
|
6035
|
হেলাল হাফিজ
|
তৃষ্ণা
|
চিন্তামূলক
|
কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়
কোনো প্রাপ্তির দেয় না পূর্ণ তৃপ্তি
সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তি লালন করে
গোপনে গহীনে তৃষ্ণা তৃষ্ণা তৃষ্ণা।
আমার তো ছিলো কিছু না কিছু যে প্রাপ্য
আমার তো ছিলো কাম্য স্বল্প তৃপ্তি
অথচ এ পোড়া কপালের ক্যানভাসে
আজন্ম শুধু শুন্য শুন্য শুন্য।
তবে বেঁচে আছি একা নিদারুণ সুখে
অনাবিষ্কৃত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বুকে
অবর্ণনীয় শুশ্রূষাহীন কষ্টে
যায় যায় দিন ক্লান্ত ক্লান্ত ক্লান্ত।
৪.৭.৮২
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/108
|
1180
|
জীবনানন্দ দাশ
|
যেই সব শেয়ালেরা
|
প্রেমমূলক
|
যেই সব শেয়ালেরা জন্ম- জন্ম শিকারের তরে,
দিনের বিশ্রুত আলো নিভে গেলে পাহাড়ের বনের ভিতরে
নীরবে প্রবেশ করে,- বার হয়- চেয়ে দেখে বরফের রাশি
জ্যোৎস্নায় প’ড়ে আছে;- উঠিতে পারিত যদি সহসা প্রকাশি
সেই সব হৃদযন্ত্র মানবের মতো আত্মায়ঃ
তা’হলে তাদের মনে যেই এক বিদীর্ণ বিস্ময়
জন্ম নিতো;- সহসা তোমাকে দেখে জীবনের পারে
আমারও নিরভিসন্ধি কেঁপে ওঠে স্নায়ুর আঁধারে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/jei-shob-shealera/
|
1353
|
তসলিমা নাসরিন
|
বাঁচা
|
প্রেমমূলক
|
আমার ভালোবাসা থেকে তুমি বাঁচতে চাইছো,
দৌড়োচ্ছে! যেন তোমাকে ছুঁতে না পারি,
দৌড়োচ্ছে! আর বলছো যে তুমি কচি খোকা নও,
কিশোর নও, যুবক নও, তোমার অনেক বয়স এখন,
তুমি এখন বৃদ্ধ, ধীশক্তি দৃষ্টিশক্তি কমছে, তুমি চাওনা ভালোবাসা এসে তোমার
হৃদপিণ্ডটাকে এখন মারুক, তোমার ঘুম হারাম করুক, তোমাকে এক শরীর ছটফট দিক।
তুমি বাঁচতে চাইছো ভালোবাসার উৎপাত থেকে।
ভাবছো, তোমার বয়স দেখে উল্টোপথে হাঁটবো আমি, মন গুটিয়ে নেব!
ভাবছো, বয়স তোমাকে বাঁচাবে।
কী করে তুমি ভাবলে যে বয়স তোমাকে ভালোবাসা থেকে বাঁচাবে?
বয়স তোমাকে আমার ভালোবাসা থেকে বাঁচাবে না,
ভালোবাসা তোমাকে বাঁচাবে বয়স থেকে।
এসো এখানে, লক্ষ্মী ছেলের মত এসো আমার কাছে, আমার ভালোবাসা নাও।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1997
|
3968
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সুপ্রভাত
|
মানবতাবাদী
|
রুদ্র , তোমার দারুণ দীপ্তি
এসেছে দুয়ার ভেদিয়া ;
বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎবাণ
স্বপ্নের জাল ছেদিয়া ।
ভাবিতেছিলাম উঠি কি না উঠি ,
অন্ধ তামস গেছে কিনা ছুটি ,
রুদ্ধ নয়ন মেলি কি না মেলি
তন্দ্রা-জড়িমা মাজিয়া ।
এমন সময়ে , ঈশান , তোমার
বিষাণ উঠেছে বাজিয়া ।
বাজে রে গরজি বাজে রে
দগ্ধ মেঘের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে
দীপ্ত গগন-মাঝে রে ।
চমকি জাগিয়া পূর্বভুবন
রক্তবদন লাজে রে ।ভৈরব , তুমি কী বেশে এসেছ ,
ললাটে ফুঁসিছে নাগিনী ,
রুদ্র-বীণায় এই কি বাজিল
সুপ্রভাতের রাগিণী ?
মুগ্ধ কোকিল কই ডাকে ডালে ,
কই ফোটে ফুল বনের আড়ালে ?
বহুকাল পরে হঠাৎ যেন রে
অমানিশা গেল ফাটিয়া ;
তোমার খড়্গ আঁধার-মহিষে
দুখানা করিল কাটিয়া ।
ব্যথায় ভুবন ভরিছে ,
ঝর ঝর করি রক্ত-আলোক
গগনে-গগনে ঝরিছে ,
কেহ-বা জাগিয়া উঠিছে কাঁপিয়া
কেহ-বা স্বপনে ডরিছে ।তোমার শ্মশানকিঙ্করদল ,
দীর্ঘ নিশায় ভুখারি ।
শুষ্ক অধর লেহিয়া লেহিয়া
উঠিছে ফুকারি ফুকারি ।
অতিথি তারা যে আমাদের ঘরে
করিছে নৃত্য প্রাঙ্গণ- ‘ পরে ,
খোলো খোলো দ্বার ওগো গৃহস্থ ,
থেকো না থেকো না লুকায়ে —
যার যাহা আছে আনো বহি আনো ,
সব দিতে হবে চুকায়ে ।
ঘুমায়ো না আর কেহ রে ।
হৃদয়পিণ্ড ছিন্ন করিয়া
ভাণ্ড ভরিয়া দেহো রে ।
ওরে দীনপ্রাণ , কী মোহের লাগি
রেখেছিস মিছে স্নেহ রে ।উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ,
‘ ভয় নাই , ওরে ভয় নাই —
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই । ‘
হে রুদ্র , তব সংগীত আমি
কেমনে গাহিব কহি দাও স্বামী —
মরণনৃত্যে ছন্দ মিলায়ে
হৃদয়ডমরু বাজাব ,
ভীষণ দুঃখে ডালি ভরে লয়ে
তোমার অর্ঘ্য সাজাব ।
এসেছে প্রভাত এসেছে ।
তিমিরান্তক শিবশঙ্কর
কী অট্টহাস হেসেছে!
যে জাগিল তার চিত্ত আজিকে
ভীম আনন্দে ভেসেছে ।জীবন সঁপিয়া , জীবনেশ্বর ,
পেতে হবে তব পরিচয় ;
তোমার ডঙ্কা হবে যে বাজাতে
সকল শঙ্কা করি জয় ।
ভালোই হয়েছে ঝঞ্ঝার বায়ে
প্রলয়ের জটা পড়েছে ছড়ায়ে ,
ভালোই হয়েছে প্রভাত এসেছে
মেঘের সিংহবাহনে —
মিলনযঞ্ জে অগ্নি জ্বালাবে
বজ্রশিখার দাহনে ।
তিমির রাত্রি পোহায়ে
মহাসম্পদ তোমারে লভিব
সব সম্পদ খোয়ায়ে —
মৃত্যুর লব অমৃত করিয়া
তোমার চরণে ছোঁয়ায়ে ।('পূরবী' কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/suprabhat/
|
5517
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
ভেজাল
|
হাস্যরসাত্মক
|
ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়,
ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়!
ভেজাল তেল আর ভেজাল চাল, ভেজাল ঘি আর ময়দা,
‘কৌন ছোড়ে গা ভেজাল ভেইয়া, ভেজালসে হায় ফয়দা।’
ভেজাল পোষাক, ভেজাল খাবার, ভেজাল লোকের ভাবনা,
ভেজালেরই রাজত্ব এ পাটনা থেকে পাবনা
ভেজাল কথা- বাংলাতে ইংরেজী ভেজাল চলছে,
ভেজাল দেওয়া সত্যি কথা লোকেরা আজ বলছে।
‘খাঁটি জিনিস’ এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে,
‘ভেজাল’ নামটা খাটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।
কলিতে ভাই ‘ভেজাল’ সত্য ভেজাল ছাড়া গতি নেই,
ছড়াটাতেও ভেজাল দিলাম, ভেজাল দিলে ক্ষতি নেই।। (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/vejal/
|
2131
|
মহাদেব সাহা
|
কোথাও যাইনি আমি
|
প্রকৃতিমূলক
|
হয়তো পেরুনো যাবে
এই সাতটি সমুদ্র আর সাত শত নদী,
কিছু কীভাবে পেরুবো
এই দূর্বাঘাসে ভোরের শিশির
কীভাবে পেরুবো এই নিকোনো উঠোন,
লাউ-কুমড়োর মাচা !
হাজার হাজার মাইল সুদীর্ঘ পথ সহজেই
পার হওয়া যাবে,
কিন্তু তার আগে কীভাবে পার হবো এই
সবুজ ক্ষেতের আল --
ছোট্র বাঁশের সাকো, পার হবো
ঝরে পড়া শিউলি-বকুল !
পাহাড়-পর্বত, বন পার হওয়া হয়তো
তেমন দুঃসাধ্য নয়
কিন্তু কীভাবে পার হবো এই বৃষ্টির ফোঁটা,
একটি শাপলা ফুল,
কীভাবে সত্যই আমি পার হবো এইটুকু
সরু গলিপথ,
কীভাবে পার হবো বহুদিন দেখা এই খেয়াঘাট ।
হয়তো পেরুনো যেতো অসংখ্যা পথের বাধা
মরুভুমি সমুদ্র পর্বত,
আমি পেরুতে পারবো না শিশির-ভেজা
তোমার উঠোন ;
তাই কোথাও যাইনি আমি, এখানেই রয়ে গেছি
তোমাকে জড়িয়ে ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1416
|
983
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কমলালেবু
|
চিন্তামূলক
|
একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/954
|
457
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মানুষ
|
মানবতাবাদী
|
.
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
'পূজারী, দুয়ার খোলো,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ'ল!'
স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ'য়ে যাবে নিশ্চয়!
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, 'দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক' সাত দিন!'
সহসা বন্ধ হ'ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারি ফুকারি' কয়,
'ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!'
মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্
বলে 'বাবা, আমি ভুকা-ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!'
তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা - 'ভ্যালা হ'ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?'
ভুখারী কহিল, 'না বাবা!' মোল্লা হাঁকিল - 'তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ!' গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
ভুখারি ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
'আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা'বলে বন্ধ করনি প্রভু
তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!'
কোথা চেঙ্গিস্, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি'
ও' কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি' মরি'
ও' মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক'রে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ;-গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশি ক'রে প্রতি ধমনীতে রাজে!
আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।
হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান্ জাগিছেন দিবা-রাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্ উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে! ও কে? চন্ডাল? চম্কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হ'তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চন্ডাল, কাল হ'তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
চাষা ব'লে কর ঘৃণা!
দে'খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র'বে চিরকাল।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।
সে মার রহিল জমা-
কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু'চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ'য়েছে কুলি।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,
তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্খানে!
তোমারি কামনা-রাণী
যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি'।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/manush/
|
1487
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
দু_জনের ভাত
|
প্রেমমূলক
|
গত রাত্রির বাসী ভাত খেতে খেতে
মনে কি পড়ে না? পড়ে ।
ভালো কি বাসি না? বাসি ।
শ্লথ টেপ থেকে সারা দিন জল ঝরে,
সেই বেনোজলে এঁটো মুখ ধুয়ে আসি ।
গত রাত্রির বাসী ভাত খেতে খেতে
প্রেম কি জাগে না? জাগে ।
কিছু কি বলি না? বলি ।
তিতাস শিখায় যতটুকু তাপ লাগে,
অনুতাপে আমি তার চেয়ে বেশি গলি ।
গত রাত্রির বাসী ভাত খেতে খেতে
আমি কি কাঁদি না? কাঁদি ।
কাঁচা কাকরুল ভাজার কবিতা লেখি,
বড়-ডেকচিতে দু'জনের ভাত রাঁধি ।
গত রাত্রির বাসী ভাত খেতে-খেতে
কিছু কি ভাবি না? ভাবি ।
ভেবে কি পাই না? পাই ।
তবু কি ফুরায় তুমি-তৃষ্ণার দাবী?
ভাত বলে দেয়, তুমি নাই, তুমি নাই ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/309
|
1080
|
জীবনানন্দ দাশ
|
নির্দেশ
|
রূপক
|
জীর্ণ শীর্ণ মাকু নিয়ে এখন বাতাসে
তামাসা চালাতে আছে পুনরায় সময় একাকী।
তবুও সে ভোরবেলা হরিয়াল পাখি
ধূসর চিতল মাছে- নির্ঝরের ফাঁসে
খেলা ক'রে কাকে দিয়েছিল তবে ফাঁকি?
বসন্তবউরী দুটো এই ব'লে হা-হা ক'রে হাসে।সেই হাসি জ্ব'লে ওঠে নির্ঝরের পরে;
গড়ায়ে গড়ায়ে গোল নুড়ি
উজ্জ্বল মাছের সাথে ভোরের নির্ঝরে
সময়ের মাকুটাকে করে দিল উড়্খুড়্ খুড়ি।
বিরক্ত সময় তাই খুঁজে নিতে গেল কোন বিষয়ান্তরে
নিজের নিয়মাধীন হৃদয়ের জুড়ি।আলো যদি নিভে যায় সময়ের ফুঁয়ে
তা'হ্লে কাহার ক্ষতি- তাহলে কাহার ক্ষতি হবে।
এই কথা ভেবে যায় কালো পাথরের পরে নুয়ে
মৈত্রেয়ী- নাগার্জুন- কৌটিল্য নীরবে।
তিন হয়, চার হয়, পাঁচ হয় তবুও তো দুয়ে আর দুয়ে।
হেঁয়ালী ও নিরসন নির্ঝরের নিক্কণের মত বেঁচে রবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/nirdesh/
|
1951
|
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
|
সংযুক্তা
|
গাথাকাব্য
|
সংযুক্তা1১। স্বপ্ন১নিশীথে শুইয়া, রজত পালঙ্কে
পুষ্পগন্ধি শির, রাখি রামা অঙ্কে,
দেখিয়া স্বপন, শিহরে সশঙ্কে,
মহিষীর কোলে, শিহরে রায়।
চমকি সুন্দরী, নৃপে জাগাইল,
বলে প্রাণনাথ, এ বা কি হইল,
লক্ষ যোধ রণে, যে না চমকিল
মহিষীর কোলে সে ভয় পায়!২উঠিয়া নৃপতি কহে মৃদু বাণী
যে দেখিনু স্বপন, শিহরে পরাণি,
স্বর্গীয়া জননী চৌহনের রাণী
বন্য হস্তী তাঁরে মারিতে ধায়।
ভয়ে ভীত প্রায় রাজেন্দ্রঘরণী
আমার নিকটে আসিল অমনি
বলে পুত্র রাখ, মরিল জননী
বন্যহস্তি-শূণ্ডে প্রাণ বা যায় ||৩ধরি ভীম গদা মারি হস্তিতুণ্ডে
না মানিল গদা, বাড়াইয়া শূণ্ডে
জননীকে ধরি, উঠাইলে মুণ্ডে;
পড়িয়া ভূমেতে বধিল প্রাণ।
কুস্বপন আজি দেখিলাম রাণি,
কি আছে বিপদ কপালে না জানি
মত্ত হস্তী আসি বধে রাজেন্দ্রাণী
আমি পুত্র নারি করিতে ত্রাণ ||৪শুনিয়াছি নাকি তুরস্কের দল
আসিতেছে হেথা, লঙ্ঘি হিমাচল
কি হইবে রণে, ভাবি অমঙ্গল,
বুঝি এ সামান্য স্বপন নয়।
জননীরূপেতে বুঝি বা স্বদেশ
বুঝি বা তুরস্ক মত্ত হস্তী বেশ,
বার বার বুঝি এইবার শেষ!
পৃথ্বীরাজ নাম বুঝি না রয় ||৫শুনি পতিবাণী যুড়ি দুই পাণি
জয় জয় জয়! বলে রাজরাণী
জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজের জয়-
জয় জয় জয়! বলিল বামা।
কার সাধ্য তোমা করে পরাভব
ইন্দ্র চন্দ্র যম বরুণ বাসব।
কোথাকার ছার তুরষ্ক পহ্লব
জয় পৃথ্বীরাজ প্রথিতনামা ||৬আসে আসুক না পাঠান পামর,
আসে আসুক না আরবি বানর,
আসে আসুক না নর না অমর।
কার সাধ্য তব শকতি সয়?
পৃথ্বীরাজ সেনা অনন্ত মণ্ডল
পৃথ্বীরাজভূজে অবিজিত বল
অক্ষয় ও শিরে কিরীট কুণ্ডল
জয় জয় পৃথ্বীরাজের জয় ||৭এত বলি বামা দিল করতালি
দিল করতালি গৌরবে উছলি,
ভূষণে শিঞ্জিনী, নয়নে বিজলি
দেখিয়া হাসিল ভরতপতি।
সহসা কঙ্কণে লাগিল কঙ্কণ,
আঘাতে ভাঙ্গিয়া খসিল ভূষণ,
নাচিয়া উঠিল দক্ষিণ নয়ন,
কবি বলে তালি না দিও সতি ||২। রণসজ্জা।১রণসাজে সাজে চৌহানের বল,
অশ্ব গজ রথ পদাতির দল,
পতাকার রবে, পবন চঞ্চল,
বাজিল বাজনা-ভীষণ নাদ।
ধূলিতে পূরিল গগনমণ্ডল,
ধূলিতে পূরিল যমুনার জল,
ধূলিতে পূরিল অলক কুন্তল,
যথা কূলনারী গণে প্রমাদ ||২দেশ দেশ হতে এলো রাজগণ
স্থানেশ্বর পদে বধিতে যবন
সঙ্গে চতুরঙ্গ সেনা অগণন-
হর হর বলে যতেক বীর।
মদবার2 হতে আইল সমর3
আবু হতে এলো দুরন্ত প্রমর
আর্য্য বীরদল ডাকে হর! হর!
উছলে কাঁপিয়া কালিন্দী-নীর ||৩গ্রীবা বাঁকাইয়া চলিল তুরঙ্গ
শূণ্ড আছাড়িয়া চলিল মাতঙ্গ
ধনু আস্ফালিয়া- শুনিতে আতঙ্গ-
দলে দলে দলে পদাতি চলে।
বসি বাতায়নে কনৌজনন্দিনী
দেখিলা অদূরে চলিছে বাহিনী
ভারত ভরসা, ধরম রক্ষিণী-
ভাসিলা সুন্দরী নয়নজলে ||৪সহসা পশ্চাতে দেখিল স্বামীরে,
মুছিলা অঞ্চলে নয়নের নীরে,
যুড়ি দুই কর বলে “হেন বীরে
রণসাজে আমি সাজাব আজ।”
পরাইল ধনী কবচকুণ্ডল
মুকতার দাম বক্ষে ঝলমল
ঝলসিল রত্ন কিরীট মণ্ডল
ধনু হস্তে হাসে রাজেন্দ্ররাজ ||৫সাজাইয়া নাথে যোড় করি পাণি
ভারতের রাণী কহে মৃদু বাণী
“সুখী প্রাণেশ্বর তোমায় বাখানি
এ বাহিনীপতি চলিলা রণে।
লক্ষ যোধ প্রভু তব আজ্ঞাকারী,
এ রণসাগরে তুমি হে কাণ্ডারী
মথিবে সে সিন্ধু নিয়তি প্রহারি
সেনার তরঙ্গ তরঙ্গসনে ||৬আমি অভাগিনী জনমি কামিনী
অবরোধে আজি রহিনু বন্দিনী
না হতে পেলাম তোমার সঙ্গিনী,
অর্দ্ধাঙ্গ হইয়া রহিনু পাছে।
যবে পশি তুমি সমর-সাগরে
খেদাইবে দূরে ঘোরির বানরে
না পাব দেখিতে, দেখিবে ত পরে,
তব বীরপনা! না রব কাছে ||৭সাধ প্রাণনাথ সাধ নিজ কাজ
তুমি পৃথ্বীপতি মহা মহারাজ
হানি শত্রুশিরে বাসবের বাজ
ভারতের বীর আইস ফিরে।
নহে যদি শম্ভু হয়েন নির্দ্দয়
যদি হয় রণে পাঠানের জয়
না আসিও ফিরে,- দেহ যেন বয়
রণক্ষেত্রে ভাসি শত্রুরুধিরে ||৮কত সুখ প্রভু, ভুঞ্জিলে জীবনে!
কি সাধ বা বাকি এ তিন ভূবনে?
নয় গেল প্রাণ, ধর্ম্মের কারণে?
চিরদিন রহে জীবন কার?
যুগে যুগে নাথ ঘোষিবে সে যশ
গৌরবে পূরিত হবে দিক্ দশ
এ কান্ত শরীর এ নব বয়স
স্বর্গ গিয়ে প্রভু পাবে আবার ||৯করিলাম পণ শুন হে রাজন
নাশিয়া ঘোরীরে, জিতি এই রণ
নাহি যতক্ষণ কর আগমণ,
না খাব কিছু, না করিব পান।
জয় জয় বীর জয় পৃথ্বীরাজ,
লভ পূর্ণ জয় সমরেতে আজ
যুগে যুগে প্রভু ঘোষিবে এ কাজ
হর হর শম্ভো কর কল্যাণ ||১০হর হর হর! বম্ বম্ কালী!
বম্ বম্ বলি রাজার দুলালি,
করতালি দিল- দিল করতালি
রাজরাজপতি ফুল্ল হৃদয়।
ডাকো বামা জয় জয় পৃথ্বীরাজ
জয় জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজ-
জয় জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজ
কর, দুর্গে, পৃথ্বীরাজের জয় ||১১প্রসারিয়া রাজ মহা ভূজদ্বয়ে,
কমনীয় বপু, ধরিল হৃদয়ে,
পড়ে অশ্রুধারা চারি গণ্ড বয়ে,
চুম্বিল সুবাহু চন্দ্রবদনে।
স্মরি ইষ্টদেবে বাহিরিল বীর,
মহাগজপৃষ্ঠে শোভিল শরীর
মহিষীর চক্ষে বহে ঘন নীর।
যে জানে এতই জল নয়নে।১২লুটাইয়া পড়ি ধরণীর তলে
তবু চন্দ্রাননী জয় জয় বলে
জয় জয় বলে- নয়নের জলে
জয় জয় কথা না পায় ঠাই।
কবি বলে মাতা মিছে গাও জয়
কাঁদ যতক্ষণ দেহ প্রাণ রয়,
ও কান্না রহিবে এ ভারতময়
আজিও আমরা কাঁদি সবাই ||৩। চিতারোহণ১কত দিন রাত পড়ে রহে রাণী
না খাইল অন্ন না খাইল পানি
কি হইল রণে কিছুই না জানি,
মুখে বলে পৃথ্বীরাজের জয়।
হেন কালে দূত আসিল দিল্লীতে
রোদন উঠিল পল্লীতে পল্লীতে-
কেহ নারে কারে ফুটিয়া বলিতে,
হায় হায় শব্দ ফাটে হৃদয়!২মহারবে যেন সাগর উছলে
উঠিল রোদন ভারতমণ্ডলে
ভারতের রবি গেল অস্তাচলে
প্রাণ ত গেলই, গেল যে মান।
আসিছে যবন সামাল সামাল
আর যোদ্ধা নাই সে ধরিবে ঢাল?
পৃথ্বীরাজ বীরে হরিয়াছে কাল,
এ ঘোর বিপদে কে করে ত্রাণ ||৩ভূমিশয্যা ত্যজি উঠে চন্দ্রানী,
সখীজনে ডাকি বলিল তখনি,
সম্মুখ সমরে বীরশিরোমণি
গিয়াছে চলিয়া অনন্ত স্বর্গে।
আমি যাইব সেই স্বর্গপুরে,
বৈকুণ্ঠেতে গিয়া পূজিব প্রভুরে,
পূরাও রে সাধ; দুঃখ যাক দূরে,
সাজা মোর চিতা সজনীবর্গে ||৪যে বীর পড়িল সম্মুখ সমরে
অনন্ত মহিমা তার চরাচরে
সে নহে বিজিত; অপ্সরে কিন্নরে,
গায়িতেছে তাহার অনন্ত জয়।
বল সখি সবে জয় জয় বল,
জয় জয় বলি চড়ি গিয়া চল
জ্বলন্ত চিতার প্রচণ্ড অনল,
বল জয় পৃথ্বীরাজের জয় ||৫চন্দনের কাষ্ঠ এলো রাশি রাশি
কুসুমের হার যোগাইল দাসী
রতন ভূষণ কর পরে হাসি
বলে যাব আজি প্রভুর পাশে।
আয় আয় সখি, চড়ি চিতানলে
কি হবে রহিয়ে ভারতমণ্ডলে?
আয় আয় সখি যাইব সকলে
যথা প্রভু মোর বৈকুণ্ঠবাসে ||৬আরোহিলা চিতা কামিনীর দল
চন্দনের কাষ্ঠে জ্বলিল অনল
সুগন্ধে পূরিল গগনমণ্ডল-
মধুর মধুর সংযুক্তা হাসে।
বলে সবে বল পৃথ্বীরাজ জয়
জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজ জয়
করি জয়ধ্বনি সঙ্গে সখীচয়
চলি গেলা সতী বৈকুণ্ঠবাসে ||৭কবি বলে মাতা কি কাজ করিলে
সন্তানে ফেলিয়া নিজে পলাইলে,
এ চিতা অনল কেন বা জ্বালিলে,
ভারতের চিতা, পাঠান ডরে।
সেই চিতানল, দেখিল সকলে
আর না নিবিল ভারতমণ্ডলে
দহিল ভারত তেমনি অনলে
শতাব্দী শতাব্দী শতাব্দী পরে ||
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1745.html
|
5213
|
শামসুর রাহমান
|
শহীদ মিনারকে ওরা গ্রেপ্তার করেছে
|
স্বদেশমূলক
|
দাগী অপরাধী ঠাউরে নিয়ে
শহীদ মিনারকে ওরা গ্রেপ্তার করেছে, গোঁয়ার
শেকলে বেঁধেছে কোমর বজ্র-আঁটুনিতে,
আক্রোশে পরিয়েছে হাতকড়া।যেখানে এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল গীতি, বাউলগুরু
লালনের গান নয়, নয় প্রতিবাদী কবিকণ্ঠে
উচ্চারিত পঙ্ক্তিমালা, তেজী বক্তাদের
আগুন-ঝরানো ভাষণ, শান্তির বাণী।এখন দিনরাত শহীদ মিনার ঘিরে ধ্বনিত
অগণিত বুটের কর্কশ আওয়াজ। শহীদ মিনারে
শত শত স্রোতার মিলন-মেলা নয়, বসেছে হুকুম বরদার
রাইফেলের বৈঠক। শহীদ মিনারে আজ ফুলের স্তবক
প্রগতি, কল্যাণ আর আশাবাদের পতাকা নেই; সেখান
এখন চোখ-রাঙানো উদ্ধত উর্দির ধমক।হায়, এ কেমন কাল এলো জন্মভূমিতে আমার,
যখন নন্দিত ভাষা-সৈনিক,
কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক,
চিত্রকর, সঙ্গীতশিল্পী-সবাই অবাঞ্ছিত
শহীদ মিনারের পবিত্র প্রাঙ্গণে! তবে কি
বায়ান্নোর ভাষা শহীদের আত্মা,
নিরস্ত্র অগণিত জীবিত মানুষ
প্রতিবাদে গর্জে উঠবে না ফের? (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shohid-minarke-ora-greptar-koreche/
|
690
|
জয় গোস্বামী
|
নিজের মুখ
|
প্রেমমূলক
|
নিজের মুখের দিকে তাকাতে পারিনা আয়নায়...
এ মুখ সে দেখেছিল।একদা দিনের পর দিন
এই মুখ চোখ মেলে তাকিয়ে থেকেছে তার দিকেআজ কেউ এই মুখ অ্যাসিডে গলিয়ে দিয়ে যাকযেন আর চেনাই না যায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/nijer-mukh/
|
2430
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
চা বাগান
|
প্রকৃতিমূলক
|
চা বাগানে মেয়েরা কই তুলছে?
ও আচ্ছা
গাছে গাছে টি-ব্যাগ ঝুলছে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2037
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.