id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
642
জয় গোস্বামী
কবিকন্যা
শোকমূলক
শক্তির মেয়ের সঙ্গে প্রেম করব স্বপ্ন ছিল যুবক বয়সে শ্রোতার আসনে বসে মঞ্চে দেখা শক্তিকে দু’বার। কন্যাটিকে একবারও নয়। তবু ইচ্ছে,ইচ্ছে-সার,মন গাছের গোড়ায় ঢাললেই ফুল ফুটতে দেরির কী আছে! শক্তিদা বলার মতো সম্পর্ক যখন হল তখনও কবিকে সীমাহীন দূরের সম্ভ্রমে রাখি।ভালোবাসি আরো সীমাহারা। কর্মসূত্রে যে-সাক্ষাৎ,তাকে রেখে আসি কর্মস্থলে। বাড়িতে একবার যাওয়া, জন্মদিন ভিড়ে সরগরম। শুনেছি কন্যাটি পড়ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু’বার যাদবপুরে তার আগেই মুখ পুড়িয়েছি অতএব ওদিকে না… অনত্র সন্ধান করা ভাল… দেখলাম একবার মাত্র।শেষযাত্রা চলেছে কবির… ফুল ভরতি লরির ওপরে ফাল্গুনের হেলে পড়া রোদ সে-দুহিতা হাত দিয়ে আড়াল করছে বাবার মুখের সামনে থেকে… সেই দেখা শ্রেষ্ঠ দেখা।শোকার্ত মুখটিও মনে নেই। মনে আছে হাতখানি।জগতের সকল কবির কন্যা সে-ই – সকলের আঘাত, বিপদ আটকায় সে-হাতপাখা-আজ বুকুনেরই মুখে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আত্মজাকে দেখতে পাই- যখন বুকুন ওড়না দিয়ে ট্যাক্সির জানলায় আসা রোদ থেকে আমাকে বাঁচায়।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রশক্তির মেয়ের সঙ্গে প্রেম করব স্বপ্ন ছিল যুবক বয়সে শ্রোতার আসনে বসে মঞ্চে দেখা শক্তিকে দু’বার। কন্যাটিকে একবারও নয়। তবু ইচ্ছে,ইচ্ছে-সার,মন গাছের গোড়ায় ঢাললেই ফুল ফুটতে দেরির কী আছে! শক্তিদা বলার মতো সম্পর্ক যখন হল তখনও কবিকে সীমাহীন দূরের সম্ভ্রমে রাখি।ভালোবাসি আরো সীমাহারা। কর্মসূত্রে যে-সাক্ষাৎ,তাকে রেখে আসি কর্মস্থলে। বাড়িতে একবার যাওয়া, জন্মদিন ভিড়ে সরগরম। শুনেছি কন্যাটি পড়ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু’বার যাদবপুরে তার আগেই মুখ পুড়িয়েছি অতএব ওদিকে না… অনত্র সন্ধান করা ভাল… দেখলাম একবার মাত্র।শেষযাত্রা চলেছে কবির… ফুল ভরতি লরির ওপরে ফাল্গুনের হেলে পড়া রোদ সে-দুহিতা হাত দিয়ে আড়াল করছে বাবার মুখের সামনে থেকে… সেই দেখা শ্রেষ্ঠ দেখা।শোকার্ত মুখটিও মনে নেই। মনে আছে হাতখানি।জগতের সকল কবির কন্যা সে-ই – সকলের আঘাত, বিপদ আটকায় সে-হাতপাখা-আজ বুকুনেরই মুখে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আত্মজাকে দেখতে পাই- যখন বুকুন ওড়না দিয়ে ট্যাক্সির জানলায় আসা রোদ থেকে আমাকে বাঁচায়।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
2393
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সংস্কৃত
সনেট
কাণ্ডারী-বিহীন তরি যথা সিন্ধু-জলে সহি বহু দিন ঝড়, তরঙ্গ-পীড়নে, লভে কূল কালে, মন্দ পবন-চালনে; সে সুদশা আজি তব সুভাগ্যের বলে, সংস্কৃত, দেব-ভাষা মানব-মণ্ডলে, সাগর-কল্লোল-ধ্বনি, নদের বদনে, বজ্রনাদ, কম্পবান্ বীণা-তার-গণে! রাজাশ্রম আজি তব ! উদয়-অচলে, কনক-উদয়াচলে, আবার, সুন্দরি, বিক্রম-অাদিত্যে তুমি হের লো হরষে, নব আদিত্যের রূপে ! পুৰ্ব্বে-রূপ ধরি, ফোট পুনঃ পুর্ব্বরূপে, পুনঃ পূৰ্ব্ব-রসে এত দিনে প্রভাতিল দুখ-বিভাবরী ; ফোট মনানন্দে হাসি মনের সরসে ।
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/sanskrit/
2826
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একাকিনী
প্রেমমূলক
একাকিনী বসে থাকে আপনারে সাজায়ে যতনে। বসনে ভূষণে যৌবনেরে করে মূল্যবান। নিজেরে করিবে দান যার হাতে সে অজানা তরুণের সাথে এই যেন দূর হতে তার কথা-বলা। এই প্রসাধনকলা, নয়নের এ-কজ্জললেখা, উজ্জ্বল বসন্তীরঙা অঞ্চলের এ-বঙ্কিমরেখা মণ্ডিত করেছে দেহ প্রিয়সম্ভাষণে। দক্ষিণপবনে অস্পষ্ট উত্তর আসে শিরীষের কম্পিত ছায়ায়। এইমতো দিন যায়, ফাগুনের গন্ধে ভরা দিন। সায়াহ্নিক দিগন্তের সীমন্তে বিলীন কুঙ্কুম-আভায় আনে উৎকণ্ঠিত প্রাণে তুলি' দীর্ঘশ্বাস-- অভাবিত মিলনের আরক্ত আভাস।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akake/
1954
বিনয় মজুমদার
অনেক কিছুই তবু
চিন্তামূলক
অনেক কিছুই তবু বিশুদ্ধ গণিত শাস্ত্র নয় লিখিত বিশ্লিষ্ট রূপ গণিতের অআকখময় হয় না, সে সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত গণিতসূত্রের নির্যাস দর্শনটুকু প্রয়োগ ক’রেই বিশ্লেষণ করা একমাত্র পথ, গণিতশাস্ত্রীয় দর্শনের বহির্ভূত অতিরিক্ত দর্শন সম্ভবপর নয়। সেহেতু ঈশ্বরী, দ্যাখো গণিতের ইউনিট পাউন্ড সেকেন্ড ফুট থেমে থাকে চুপে, এদের নিয়মাবদ্ধ সততা ও অসততা মনস্তত্ত্বে বর্তমান ইউনিট রূপে আলোকিত ক’রে রাখে বিশ্বের ঘটনাবলী, চিন্তনীয় বিষয়গুলিকে সিরিজের কতিপয় টার্মের চরিত্র ফুটে চরিত্র নির্দিষ্ট করে আগামীর দিকে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4023.html
3539
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাঁশি (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
প্রকৃতিমূলক
ওগো , শোনো কে বাজায় ! বনফুলের মালার গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায়। অধর ছুঁয়ে বাঁশিখানি         চুরি করে হাসিখানি , বঁধুর হাসি মধুর গানে প্রাণের পানে ভেসে যায় । ওগো শোনো কে বাজায় ! কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি বাঁশির মাঝে গুঞ্জরে , বকুলগুলি আকুল হয়ে বাঁশির গানে মুঞ্জরে । যমুনারই কলতান          কানে আসে , কাঁদে প্রাণ , আকাশে ঐ মধুর বিধু কাহার পানে হেসে চায় ! ওগো শোনো কে বাজায় !   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bashi-kori-o-komol/
3976
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সে লড়াই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই
মানবতাবাদী
সে লড়াই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই যে যুদ্ধে ভাইকে মারে ভাই।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/se-lorai-ishwarer-biruddhe-lorai/
3059
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছায়াছবি
প্রকৃতিমূলক
আমার প্রিয়ার সচল ছায়াছরি সজল নীলাকাশে। আমার প্রিয়া মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যাতারায় লুকিয়ে দেখে কাকে, সন্ধ্যাদীপের লুপ্ত আলো স্মরণে তার ভাসে। বারিঝরা বনের গন্ধ নিয়া পরশহারা বরণমালা গাঁথে আমার প্রিয়া। আমার প্রিয়া ঘন শ্রাবণধারায় আকাশ ছেয়ে মনের কথা হারায়, আমার প্রিয়ার আঁচল দোলে নিবিড় বনের শ্যামল উচ্ছ্বাসে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sahasave/
4002
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বপ্ন হঠাৎ উঠল রাতে
ছড়া
স্বপ্ন হঠাৎ উঠল রাতে প্রাণ পেয়ে, মৌন হতে ত্রাণ পেয়ে। ইন্দ্রলোকের পাগ্‌লাগারদ খুলল তারই দ্বার, পাগল ভুবন দুর্দাড়িয়া ছুটল চারিধার– দারুণ ভয়ে মানুষগুলোর চক্ষে বারিধার, বাঁচল আপন স্বপন হতে খাটের তলায় স্থান পেয়ে।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/swapno-hotat-uthlo-rate/
4538
শামসুর রাহমান
কদাকার মূর্তির ভিতর থেকে
চিন্তামূলক
যেয়ো না, দাঁড়াও ভাই। খানিক দাঁড়ালে, আশা করি, বড় বেশি ক্ষতি হবে না তোমার। দেখছ তো এই আমি একলা পথের ধারে পড়ে আছি বড় অসহায়কখনও ইঙ্গিতে, কখনও-বা উঁচিয়ে গলার স্বর পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণে লুব্ধ হয়ে পড়ি বারবার জ্ঞাতসারে, কখনও আজান্তে। অকস্মাৎ পায়ের পুরনো ক্ষত বেদনা-কাতর হয়ে ওঠে।হঠাৎ পায়ের ক্ষত আমার দৃষ্টিতে কেন যেন স্বর্গের পুষ্পের মতো ফুটে ওঠে। তা হ’লে কি আমি উন্মাদের অবিকল ছায়ারূপে প্রতিভাত বর্তমানে? বেলা শেষ হলে ফের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাব গর্তে!গর্তে ঢুকে যাব-যাব করতেই আকাশে চাঁদের মায়াময় মুখ দেখে আমি নিজের ভিতর পরিবর্তনের ছোঁয়া অনুভব করি। যেন আমি কদাকর মূর্তির ভিতর থেকে সুন্দরের প্রিয় আবির্ভাব!   (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kodakar-murtir-bhitor-theke/
2711
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে
ভক্তিমূলক
আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে বিশাল ভবে প্রাণের রথে বাহির হতে পারব কবে। প্রবল প্রেমে সবার মাঝে ফিরব ধেয়ে সকল কাজে, হাটের পথে তোমার সাথে মিলন হবে, প্রাণের রথে বাহির হতে পারব কবে।নিখিল আশা-আকাঙক্ষা-ময় দুঃখে সুখে, ঝাঁপ দিয়ে তার তরঙ্গপাত ধরব বুকে। মন্দভালোর আঘাতবেগে, তোমার বুকে উঠব জেগে, শুনব বাণী বিশ্বজনের কলরবে। প্রাণের রথে বাহির হতে পারব কবে।১ আষাঢ়, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-ekla-ghorer-aral-venge/
1084
জীবনানন্দ দাশ
পটভূমি
চিন্তামূলক
আকাশ ভ'রে যেন নিখিল বৃক্ষ ছেয়ে তারা জেগে আছে কূলের থেকে কূলে; মানব্জাতির দু-মুহূর্তের সময়-পরিসর অধীর অবুঝ শিশুর শব্দ তুলে চেয়ে দেখে পারাপারের ব্যাপ্ত নক্ষত্রেরা আগুন নিয়ে বিষম, তবু অক্ষত স্থির জীবনে আলোকিত। ওদের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন হ'য়ে তবু মানুষ যেদিন প্রথম এই পৃথিবী পেয়েছিল সেই সকালের সাগর সূর্য অনমনীয়তা আমাদের আজ এনেছে যেই বিষম ইতিহাসে- যেখানে গ্লানি হিংসা উত্তরাধিকারের ব্যথা মানুষ ও তার পটভূমির হিসেবে গরমিল রয়েছে ব'লে কখনো পরিবর্তনীয় নয়? মানুষ তবু সময় চায় সিদ্ধকাম হ'তেঃ অনেক দীর্ঘ অসময়- অনেক দুঃসময়। চারিদিকে সৈন্য বণিক কর্মী সুধী নটীর মিছিল ঘোরে মুখ ফেরাবার আগে- তাদের সবের সহগামীর মতো ইতিহাসের প্রথম উৎস থেকে দেখেছি মানুষ কেবলি ব্যাহত হয়েও তবু ভবিষ্যতের চক্রবালের দিকে কোথাও সত্য আছে ভেবে চলেছে আপ্রাণঃ পটভূমির থেকে নদীর রক্ত মুছে মুছে বিলীন হয় যেমন সেসব পটভূমির স্থান।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/potobhumi/
4654
শামসুর রাহমান
খেলনা
সনেট
আমার মেয়েকে দেখি বাড়িটার আনাচে কানাচে বেড়ায় আপন মনে, ফ্রক-পরা। খেলাঘরে তার রকমারি খেলনা নিয়ে সকাল-বিকাল মেতে আছে। দেখি রোজ ঘটা করে পুতুলের বিয়ে দেয় আর ছোটায় কাঠের ঘোড়া তেপান্তরে, সমুদ্রে ভাসায় সপ্তডিঙা। মায়ের গজ্ঞনা কিংবা পিতার নিষেধ মানে না কিছুই, শুধু পুতুল-ভাঁড়ের তামাশায় হাসে, নাচে ছড়ার ঘরোয়া ছন্দে, নেই কোনো খেদ।আমারও খেলার শখ আশৈশব, খলনার রূপক স্বকালে করেছে ভিড়, তাই দৃশ্যান্তরে খলনাগুলি কতিপয় শস্তা বুলি আর নষ্ট ধারণার ছক মনে হয়। সংসার-জলার কাদা ঘেঁটে ছেঁকে তুলি রঙচটা ভাঙা মূর্তি-মন আর বসে না খেলায়, খেলনা ফেলে বসে থাকি নিরুপায় আজ অবেলায়।   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khelna/
5779
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
জীবন ও জীবনের মর্ম
চিন্তামূলক
জীবন ও জীবনের মর্ম মুখোমুখি দাঁড়ালে আমি ভুল বুঝতে পারি আমার ক্ষামা চাইতে ইচ্ছে হয়। বুদ্ধের বুকের হাঁস হানা ঝাপটায়, আমি মাংসলোভী বিশাল বৃক্ষের ছায়া জলে ভাসে-আমি তমস্বান হয়ে ছুটে গেছি আমি ভুল বুঝতে পারি- বিস্মৃতিকে কতবার মনে ভেবেছি বিষন্নতা ট্রেন লাইনের পশে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে বনবাসী হরিণ কয়লা খনির ভিতরের অপরাহ্নের মতন উদসীনতা আমাকে নদীর পাশেও স্রোতহীন রেখেছে চঞ্চল হাওয়ায় উড়ে গেছে কৃতঘ্নতার হাসি আমি ভুল বুঝতে পারি আমার ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে হয়! জীবন ও জীবনের মর্ম মুখোমুখি দাঁড়ালে, সেই মুহূর্তের বিশাল জ্যোৎস্না যাবতীয় পার্থিব ম্যাজিকের তাঁবুর মতন ঝড়ে উল্টে যায় মেঘ জলস্তম্ভ হতে গিয়েও ফেটে ইলশেগুঁড়ি হয়ে ছড়ায় সমগ্র কৈশোর কালের নদীর পার থেকে ছিটকে পড়ে যায় শুনটানার মানুষ বারো বছরের জন্মদিনে আমার কপালে মায়েমায়ের আঙ্গুল ছোঁয়া লাল টিপ মুছে গিয়েছিল কন্নায়, মুছে যায়নি। এখন আমার ভরতবর্ষের মতন ললাটে সেই কাশ্মীর, অর্থাৎ দ্বিধা আমি ভুল বুঝতে পারি আমার ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে হয়।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1861
4163
রেদোয়ান মাসুদ
শুধু আসেনা ফিরে
প্রেমমূলক
কত রাত জেগেছি আমি হেটেছি কতটা পথ, কত চোখের জল ফেলেছি আমি দিয়েছি ঝড়িয়ে সব। জীবনে যত স্বপ্ন ছিল ছিল যত সাধ, সব কিছু বিলিয়ে দিয়েছি তোমার জন্য পথে বসেছি আমি আজ। হেটে চলছি,চলব যতদিন থাকে পায়ে রদ। যত আঘাত দিতে পার দিতে থাক সব, শত আঘাত মাথা পেতে নিব যদি পাই তোমার মত। জীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত ভুলবোনা তোমার দেখানো পথ, বুকের ভিতর জমানো কষ্টে ধরে রাখবো তোমার ফেলা যাওয়া স্মৃতিগুলো সব। আশায় আশায় দিন কেটে যায় কেটে যায় দুঃস্বপ্নের রাত, থেকে যায় হৃদয়ের মাঝে দুঃখগুলো শুধু আসেনা ফিরে সেই হাসিমাখা দিনগুলো আজ।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2145.html
1885
পূর্ণেন্দু পত্রী
যুদ্ধ
চিন্তামূলক
যে আমাকে অমরতা দেবে সে তোমার ছাপাখানা নয়, সে আমার সত্তার সংগ্রাম নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1198
4557
শামসুর রাহমান
কবির ডায়েরী
চিন্তামূলক
সকালে ফাউস্ট পড়লাম, কিছুক্ষণ তরতাজা সংবাদপত্রও বটে, সদ্য-দেখা যুদ্ধার্ত পোলিশ ফিল্মের নানান শট মনে পড়ে। করি ঘষামাজা পঙক্তিমালা কবিতায়, জানালায় মেফিস্টোফিলিস হাসে, পা দোলায় ঘন ঘন, তার উত্তোলিত ভুরু সর্বক্ষণ জপে মৃত্যু, কখনো বা হঠাৎ দাঁড়িয়ে আমাকে শোনায় তত্ত্ব রাশি রাশি। ভেনাসের ঊরু অকস্মাৎ উদ্ভাসিত কিংবা প্ল্যাটো দিলেন বাড়িয়েতাঁর হাত মগজের কোষে কোষে। বেহুলা কখন আসে লখিন্দরময় ভেলা নিয়ে খলখলে জলে, নিজেই বিস্মিত হই। চিত্রকল্প যখন তখন নেচে ওঠে চতুষ্পার্শ্বে, দেয়ালের থেকে কত ছলে হঠাৎ বেরিয়ে আসে চিত্রমালা, শূন্য থেকে আসে, যেমন মেঘের পরে জমে মেঘ। দুপুরে চৈনিকরেস্তোরাঁয় তিনজন তীক্ষ্ম সমালোচকের পাশে বসে আস্তে সুস্থে করলাম মধ্যাহ্ন ভোজন, ঠিক বুঝতে পারিনি কী যে ওঁরা তিব্বতী মন্ত্রের মতো আউড়ে গেলেন কিছুক্ষণ নিশ্চল জ্যাকেট হয়ে, বোঝালেন কী কী বস্তু নিরঞ্জন সাহিত্যসম্মত। বেরুলে নতুন বই কিছুকাল থাকি ভয়ে ভয়ে।রিভিউ মুদ্রিত হলে কোথায় নতুন পাণ্ডুলিপি আপনার বলবে কি প্রকাশক কিংবা সম্পাদক ‘আগামী সংখ্যায় অবশ্যই লেখা চাই’, বলে ছিপি খোলা সোড়া বোতলের মতো হবেন কি? ধ্বক করে ওঠে বুক অকস্মাৎ। থাক, আপাতত বেলা থাক আড্ডা দিয়ে বাদ্য শুনে, স্বপ্নলোকে ছুঁড়ে ঢেলা। প্রায়শই গাঢ় সন্ধ্যা উপহার দেয় কিছু কথা, লতাগুল্ময় উৎস থেকে উচ্ছ্বসিত জ্যোৎস্নামাখা। ঝরণার মতোন হাসি, আধফোটা স্বপ্ন, ব্যাকুলতা।চোখ বুজলেই দেখি কালো বধ্যভুমির উপরে একটি রহস্যময় পাখি উড়ে উড়ে গান গায় সারারাত। কবেকার মিউজিসিয়ান আস্তে করে প্রবেশ আমার ঘরে, ধুলো ঝাড়ে শরীরের, খায়, মদ চামড়ার থলে শূন্য করে। তার বেহালার তারে আদি কান্না, সুপ্রাচীন স্মৃতি বাজে, আমি তাকে ঘরে রেখে নামি পথে। ফুটপাত, গাছ, অন্ধকার, বেশ্যার চোখের মতো রেস্তোঁরার আলো শুধু ডাকেআমাকেই, যে আমি তাদের আপনজন আর আমার নিবাস এখানেই, এই সত্য হয় গান অস্তিত্বের মাঠে, পুনরায় মধ্যরাতে ফিরে আসি ঘরে, কড়া নাড়ি, শুতে যাই, দেখি বিধ্বস্ত বাগান ঘরময়, পরাভুত নগরীর দেয়াল, মিনার স্মৃতির অরণ্য চিরে জাগে, শব্দের বুদ্বুদ নাচে শিরায় শিরায়, হয় পঙক্তিমালা, যেন আদিবাসী আমি নগ্ন, নতজানু অন্ধকারে রহেস্যর কাছে। ঘুমঘোরে ভাবি ফের অর্ফিয়ুস বাজাবে কি বাঁশি?   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobir-dayeri/
390
কাজী নজরুল ইসলাম
প্রণয় নিবেদন
প্রেমমূলক
লো কিশোরী কুমারী! পিয়াসি মন তোমার ঠোঁটের একটি গোপন চুমারই॥ অফুট তোমার অধর ফুলে কাঁপন যখন নাচন তুলে একটু চাওয়ায় একটু ছুঁলে গো! তখন      এ-মন যেমন কেমন-কেমন কোন্ তিয়াসে কোঙারি? – ওই     শরম-নরম গরম ঠোঁটের অধীর মদির ছোঁয়ারই। বুকের আঁচল মুখের আঁচল বসন-শাসন টুটে ওই       শঙ্কা-আকুল কী কী আশা ভালোবাসা ফুটে সই? নয়ন-পাতার শয়ন-ঘেঁসা ফুটচে যে ওই রঙিন নেশা ভাসা-ভাসা বেদনমেশা গো! ওই     বেদন-বুকে যে সুখ চোঁয়ায় ভাগ দিয়ো তার কোঙারই! আমার     কুমার হিয়া মুক্তি মাগে অধর ছোঁয়ায় তোমারই॥ (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/pronoy-nibedon/
2495
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
নিছক পদ্য - কঠিন সত্য
স্বদেশমূলক
ঠাকুর মায়ের ঝুলি থেকে উঠে আসা আমি নই আমাকে রাক্ষস আখ্যা দিয়েছিলো বর্বরের দল দানব বা দৈত্য বলে গালি দেয়া মিথ্যুকের বই বানানো গল্পের বুলি, কোনোদিন হবে না সফল আমার শিশুকে আমি শেখবো না মিথ্যের ভাষণ --- শেখাবো আমার পূর্বপুরুষেরা - কালো মানুষেরা ভূমিপুত্র ছিলো, এই ভূমিতেই তাদের আসন চিরস্থায়ী ছিলো আর সে আমার সত্য দিয়ে ঘেরাকোনো রাজপুত্র নয়, কেউ নয় স্বর্গলোকবাসী লুটেরা দস্যুর দল ভয়ঙ্কর স্বভাব-আগ্রাসী রক্ত পিপাসায় মত্ত ছিলো তারা গণ-হন্তারক বহিরাগতের দল, অশ্বারোহী, অস্ত্রের ধারক--- ছিলো না কৃষির জ্ঞান মাটি থেকে ফলাতে ফসল শেখেনি, আথচ তারা নিয়েছিলো মাটির দখল ভূমিপুত্রদের তারা শূদ্র আর অচ্ছুৎ বানিয়ে রেখেছিলো মিথ্যে যতো সাস্ত্রাচার সংস্কার দিয়েমানুষের সভ্যতার হত্যাকারী দেবলোক থেকে আসেনি সে সত্য আজ জেনে গেছে কালো মানুষেরা আমাদের শিশুরাও সেই সত্যে শানাবে নিজেকে জানাবে এ মাটি তার। নয় কোনো দস্যুদের ডেরা------------ ০৭ / ০৮ / ২০১৫
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/nichhok-podyo-kothin-shotyo/
1852
পূর্ণেন্দু পত্রী
প্রতিদ্বন্দ্বী! এসো যুদ্ধ হবে
রূপক
ডালিম ফুলের লাল জার্সি পেয়ে গেছি প্রতিদ্বন্দ্বী! এসো যুদ্ধ হবে। অনন্ত হালদার এসে বলে গেল তুমি নাকি এক তরফা আশী বছরের ইজারা নিয়েছেঅ এই পৃথিবীর সব হাততালি। ধনুস্টঙ্কারের মতো তুমি নাকি বেঁকে গেছ মালা পেয়ে, মালা পেয়ে পেয়ে? অথচ জানো কাল তোমার ছায়াকে কারা পুড়িয়েছে তংসাবতী খালে। আগামী বৈশাখে সাত লক্ষ গোলাপের জনসভা ডেকেছে আমাকে এবং সভার শেষে মশালের শোভাযাত্রা, বনে বনে ক্ষেপেছে পলাশ। নক্ষত্রের কনফারেন্সে মেঘেরো মিছিল করে হেঁটেছিলো কাল সারারাত প্রত্যেকের হাতে চিল জ্যোৎস্না কালিতে লেখা জ্বলজ্বলে পোস্টার- সেই যুবকের হাতে তুলে দেবো এইবার পৃথিবীর ভার ভালোবাসা পাবে বলে কলকাতার সব কাঁটাতার ছিড়ে খুড়ে হেঁটেছে যে হিউয়েন সাঙের মতো একনিষ্ঠতায় ডালিম ফুলের দিকে, যে ডালিম ফুল ঘোরতর অন্ধকার প্রথম ভোরের মতো আবীরের আলো দিতে জানে। ডালিম ফুলের লাল জার্সি পেয়ে গেছি। প্রতিদ্বন্দ্বী! এসো যুদ্ধ হবে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1309
3037
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চাহিছ বারে বারে
রূপক
চাহিছ বারে বারে আপনারে ঢাকিতে— মন না মানে মানা, মেলে ডানা আঁখিতে।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chahicho-bare-bare/
4141
রেদোয়ান মাসুদ
নিরিবিলি বলছি কথা
প্রেমমূলক
নিরিবিলি বলছি কথা তোমার পাশে বসে একা একা বলছি কথা তোমার কানে কানে। নিরিবিলি ভাবছি একা তোমার হৃদয়ে বসে একা একা বলছি কথা তোমায় ভালবেসে।নদীর ধারে বসে একা আঁকছি তোমার ছবি মনে মনে ভাবি তোমায় পরান ভরে দেখি।জ্যাৎস্না রাতে চেয়ে আছি দূর আকাশের দিকে তোমায় খুজি ঐ আকাশে লক্ষ তাঁরার মাঝে।পুকুরে পরছে গাছের ছায়া তাকিয়ে থাকি সেখানে তোমায় খুজি ঐ ছায়াতে শাড়ীর আঁচলে।কোকিল ডাকে বন-জঙ্গলে কুহুকুহু করে তোমায় খুজি সুরের মাঝে জাইগো হারিয়েমেঘ জমেছে দূর আকাশে যায়যে এদিক-ওদিক চলে তোমার খুজি মেঘের মাঝে তাকিয়ে অবুঝ চোখে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2214.html
3604
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিরাট মানবচিত্তে
চিন্তামূলক
বিরাট মানবচিত্তে অকথিত বাণীপুঞ্জ অব্যক্ত আবেগে ফিরে কাল হতে কালে মহাশূন্যে নীহারিকাসম। সে আমার মনঃসীমানার সহসা আঘাতে ছিন্ন হয়ে আকারে হয়েছে ঘনীভূত, আবর্তন করিতেছে আমার রচনাকক্ষপথে।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/birat-manobchitte/
846
জসীম উদ্‌দীন
নিশিতে যাইও ফুলবনে
প্রেমমূলক
নিশিতে যাইও ফুলবনে রে ভোমরা নিশিতে যাইও ফুলবনে। জ্বালায়ে চান্দের বাতি আমি জেগে রব সারা রাতি গো; কব কথা শিশিরের সনে রে ভোমরা! নিশিতে যাইও ফুলবনে। যদিবা ঘুমায়ে পড়ি- স্বপনের পথ ধরি গো, যেও তুমি নীরব চরণে রে ভোমরা! (আমার ডাল যেন ভাঙে না, আমার ফুল যেন ভাঙে না, ফুলের ঘুম যেন ভাঙে না)। যেও তুমি নীরব চরণে রে ভোমরা! নিশিতে যাইও ফুলবনে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/801
543
কাজী নজরুল ইসলাম
সুরা নাস
ভক্তিমূলক
(শুরু করিলাম) ল'য়ে নাম আল্লার করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।বল, আমি তাঁরি কাছে মাগি গো শরণ সকল মানবে যিনি করেন পালন। কেবল তাঁহারি কাছে - ত্রিভুবন মাঝ সবার উপাস্য যিনি রাজ- অধিরাজ। কুমন্ত্রণা দানকারী "খান্নাস" শয়তান মানব দানব হ'তে চাহি পরিত্রাণ।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/suura-nas/
3725
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মিলনদৃশ্য
সনেট
হেসো না, হেসো না তুমি বুদ্ধি-অভিমানী! একবার মনে আনো ওগো ভেদজ্ঞানী, সে মহাদিনের কথা, যবে শকুন্তলা বিদায় লইতেছিল স্বজনবৎসলা জন্মতপোবন হতে—সখা সহকার, লতাভগ্নী মাধবিকা, পশুপরিবার, মাতৃহারা মৃগশিশু, মৃগী গর্ভবতী, দাঁড়াইল চারি দিকে; স্নেহের মিনতি গুঞ্জরি উঠিল কাঁদি পল্লবমর্মরে, ছলছল মালিনীর জলকলস্বরে; ধ্বনিল তাহারি মাঝে বৃদ্ধ তপস্বীর মঙ্গলবিদায়মন্ত্র গদ্‌গদগম্ভীর। তরুলতা পশুপক্ষীনদনদীবন নরনারী সবে মিলি করুণ মিলন।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/milondrisshyo/
92
আবিদ আনোয়ার
যা তুই ফিরে যা পাখি
চিন্তামূলক
আমার ডাকনাম ধরে ডেকে ওঠে সুদূরের পাখি অমর্ত্য যমজ ভগ্নি সে আমার কালো সহোদরা জন্মলগ্নে এই হাতে বেঁধে দিয়ে রাখী অচেনা সুদূর কোন্ মায়ালোকে উড়ে গেছে অনঙ্গ অধরা।আমি একা বেড়ে উঠি রূপে-রসে মত্ত যুবরাজ পেরিয়ে মায়ের স্নেহ, লালচক্ষু পিতার শাসন স্বরচিত সংবিধানে গড়ে নিয়ে রঙিন স্বরাজ একে একে জয় করি যৌবনের গন্ধে-ভরা দারুচিনি বন।খেয়েছি নারীর মধু, এর চেয়ে বেশি তার ছলনার বিষ; মধ্যবিত্ত মনে গেঁথে স্বামীত্বের বিপুল ব্যর্থতা সুখের বিবর্ণ মুখে সাধ্যমতো মেরেছি পালিশ, দুঃখকে নিয়েছি মেনে অনিবার্য রূঢ় বাস্তবতা।এর মানে বলতে হবে সুখে-দুখে জীবন সুন্দর: কুষ্ঠরোগী হেসে ওঠে মিষ্টি কোনো স্মৃতির জোছনায়, নুলো ও ঠুঁটোর নারী সন্ততিতে ভরে তোলে পল্লবের ঘর; কামরুলের কিষানীরা নিরিবিলি বিলি কাটে চুলের বন্যায়।যা তুই ফিরে যা পাখি, কালো পাখি, এখন যাবো না-- আগে তো দু’হাত ভরে জীবনের লুটে নিই সোনা!
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/ja-tui-fire-pakhi/
3680
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মংপু পাহাড়ে
প্রকৃতিমূলক
কুজ্‌ঝটিজাল যেই সরে গেল মংপু-র নীল শৈলের গায়ে দেখা দিল রঙপুর। বহুকেলে জাদুকর, খেলা বহুদিন তার, আর কোনো দায় নেই, লেশ নেই চিন্তার। দূর বৎসর-পানে ধ্যানে চাই যদ্‌দূর দেখি লুকোচুরি খেলে মেঘ আর রোদ্‌দুর। কত রাজা এল গেল, ম'ল এরই মধ্যে, লড়েছিল বীর, কবি লিখেছিল পদ্যে। কত মাথা-কাটাকাটি সভ্যে অসভ্যে, কত মাথা-ফাটাফাটি সনাতনে নব্যে। ঐ গাছ চিরদিন যেন শিশু মস্ত, সূর্য-উদয় দেখে, দেখে তার অস্ত। ঐ ঢালু গিরিমালা, রুক্ষ ও বন্ধ্যা, দিন গেলে ওরই 'পরে জপ করে সন্ধ্যা। নিচে রেখা দেখা যায় ঐ নদী তিস্তার, কঠোরের স্বপ্নে ও মধুরের বিস্তার। হেনকালে একদিন বৈশাখী গ্রীষ্মে টানাপাখা-চলা সেই সেকালের বিশ্বে রবিঠাকুরের দেখা সেইদিন মাত্তর, আজি তো বয়স তার কেবল আটাত্তর-- সাতের পিঠের কাছে একফোঁটা শূন্য-- শত শত বরষের ওদের তারুণ্য। ছোটো আয়ু মানুষের, তবু একি কাণ্ড, এটুকু সীমায় গড়া মনোব্রহ্মাণ্ড-- কত সুখে দুখে গাঁথা, ইষ্টে অনিষ্টে, সুন্দর কুৎসিতে, তিক্তে ও মিষ্টে, কত গৃহ-উৎসবে, কত সভাসজ্জায়, কত রসে মজ্জিত অস্থি ও মজ্জায়, ভাষার-নাগাল-ছাড়া কত উপলব্ধি, ধেয়ানের মন্দিরে আছে তার স্তব্ধি। অবশেষে একদিন বন্ধন খণ্ডি অজানা অদৃষ্টের অদৃশ্য গণ্ডি অন্তিম নিমেষেই হবে উত্তীর্ণ। তখনি অকস্মাৎ হবে কি বিদীর্ণ এত রেখা এত রঙে গড়া এই সৃষ্টি, এত মধু-অঞ্জনে রঞ্জিত দৃষ্টি। বিধাতা আপন ক্ষতি করে যদি ধার্য নিজেরই তবিল-ভাঙা হয় তার কার্য, নিমেষেই নিঃশেষ করি ভরা পাত্র বেদনা না যদি তার লাগে কিছুমাত্র, আমারই কী লোকসান যদি হই শূন্য-- শেষক্ষয় হলে কারে কে করিবে ক্ষুণ্ন। এ জীবনে পাওয়াটারই সীমাহীন মূল্য, মরণে হারানোটা তো নহে তার তুল্য। রবিঠাকুরের পালা শেষ হবে সদ্য, তখনো তো হেথা এক অখণ্ড অদ্য জাগ্রত রবে চির-দিবসের জন্যে এই গিরিতটে, এই নীলিম অরণ্যে। তখনো চলিবে খেলা নাই যার যুক্তি-- বার বার ঢাকা দেওয়া, বার বার মুক্তি। তখনো এ বিধাতার সুন্দর ভ্রান্তি-- উদাসীন এ আকাশে এ মোহন কান্তি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/munpu-pahara/
5705
সুকুমার রায়
হিংসুটি
ছড়া
এক ছিল দুষ্টু মেয়ে— বেজায় হিংসুটে , আর বেজায় ঝগড়াটি। তার নাম বলতে গেলেই তো মুশকিল, কারণ ঐ নামে শান্ত লক্ষ্মী পাঠিকা যদি কেউ থাকেন, তাঁরা তো আমার উপর চটে যাবেন। হিংসুটির দিদি বড় লক্ষ্মী মেয়ে— যেমন কাজে কর্মে, তেমনি লেখাপড়ায়। হিংসুটির বয়েস সাত বছর হ'য়ে গেল, এখনও তার প্রথম ভাগই শেষ হল না— আর তার দিদি তার চাইতে মোটে এক বছরের বড়, সে এখনই "বোধোদয়" আর "ছেলেদের রামায়ণ" পড়ে ফেলেছে, ইংরিজি ফার্স্টবুক তার কবে শেষ হয়ে গেছে। হিংসুটি কিনা সবাইকে হিংসে করে, সে তো দিদিকেও হিংসে করত। দিদি স্কুলে যায়, প্রাইজ পায়— হিংসুটি খালি বকুনি খায় আর শাস্তি পায়। দিদি যেবার ছবির বই প্রাইজ পেলে আর হিংসুটি কিচ্ছু পেলে না, তখন যদি তার অভিমান দেখতে! সে সারাটি দিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে গাল ফুলিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে ব'সে রইল— কারও সঙ্গে কথাই বলল না। তারপর রাত্রিবেলায় দিদির অমন সুন্দর বইখানাকে কালি ঢেলে, মলাট ছিঁড়ে, কাদায় ফেলে নষ্ট করে দিল। এমন দুষ্টু হিংসুটে মেয়ে।হিংসুটির মামা এসেছেন, তিনি মিঠাই এনে দু'বোনকেই আদর ক'রে খেতে দিয়েছেন। হিংসুটি খানিকক্ষণ তার দিদির খাবারের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভ্যাঁ ক'রে কেঁদে ফেলল। মাম ব্যস্ত হয়ে বললেন, "কি রে, কী হ'ল? জিভে কামড় লাগল নাকি?" হিংসুটির মুখে আর কথা নেই, সে কেবলই কাঁদছে। তখন তার মা এক ধমক দিয়ে বললেন, "কী হয়েছে বল্‌ না!" তখন হিংসুটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "দিদির ঐ রসমুণ্ডিটা তাকে আমারটার চাইতেও বড়।" তাই শুনে দিদি তাড়াতাড়ি নিজের রসমুণ্ডিটা তাকে দিয়ে দিল। অথচ হিংসুটি নিজে যা খাবার পেয়েছিল তার অর্ধেক সে খেতে পারল না— নষ্ট ক'রে ফেলে দিল। দিদির জন্মদিনে দিদির নতুন জামা, নতুন কাপড় আস্‌লে হিংসুটি তাই নিয়ে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলে। একদিন হিংসুটি তার মায়ের আলমারি খুলে দেখে কি— লাল জামা গায়ে, লাল জুতা পায়ে, টুক্‌টুকে রাঙা পুতুল বাক্সের মধ্যে শুয়ে আছে। হিংসুটি বলল, "দেখেছ! দিদি কি দুষ্টু! নিশ্চয়ই মামার কাছ থেকে পুতুল আদায় করেছে— আবার আমায় না দেখিয়ে মায়ের কাছে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।" তখন তার ভয়ানক রাগ হল। সে ভাবল, "আমি তো ছোট বোন, আমারই তো পুতুল পাওয়া উচিত। দিদি কেন মিছিমিছি পুতুল পানে?" এই ভেবে সে পুতুলটাকে উঠিয়ে নিল।কি সুন্দর পুতুল! কেমন মিট্‌মিটে চোখ, আর ফুট্‌ফুটে মুখ, কেমন কচি কচি হাত পা, আর টুক্‌টুকে জামা কাপড়! যত সব ভালো ভালো জিনিস সব কিনা দিদি পাবে! হিংসুটির চোখ ফেটে জল এল। সে রেগে পুতুলটাকে আছড়িয়ে মাটিতে ফেলে দিল। তাতেও তার রাগ গেল না; সে একটা ডাণ্ডা নিয়ে ধাঁই ধাঁই ক'রে পুতুলটাকে মারতে লাগল। মারতে মারতে তার নাক মুখ হাত পা ভেঙে, তার জামা কাপড় ছিঁড়ে— আবার তাকে বাক্সের মধ্যে ঠেসে সে রাগে গরগর করতে করতে চলে গেল। বিকেলবেলা মামা এসে তাকে ডাকতে লাগলেন আর বললেন, "তোর জন্য কি এনেছি দেখিস্‌নি?" শুনে হিংসুটি দৌড়ে এল, "কই মামা, কী এনেছ দাও না।" মামা বললেন, "মার কাছে দেখ্‌ গিয়ে কেমন সুন্দর পুতুল এনেছি।" হিংসুটি উৎসাহে নাচতে লাগল, মাকে বলল, "কোথায় রেখেছ মা?" মা বললেন, "আলমারিতে আছে।" শুনে ভয়ে হিংসুটির বুকের মধ্যে ধড়াস্‌ ধড়াস্‌ করে উঠল। সে কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, "সেটার কি লাল জামা আর লাল জুতো পরান— মাথায় কালো কালো কোঁকড়ানো চুল ছিল?" মা বললেন, "হ্যাঁ, তুই দেখেছিস্‌ নাকি?"হিংসুটির মুখে আর কথা নেই! সে খানিকক্ষণ ফ্যাল্‌ফ্যাল্‌ ক'রে তাকিয়ে তারপর একেবারে ভ্যাঁ ক'রে কেঁদে এক দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। এর পরে যদি তার হিংসে আর দুষ্টুমি না কমে, তবে আর কী ক'রে কমবে?
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/hinsuti/
4727
শামসুর রাহমান
জাতিসংঘে অবিরল তুষার ঝরলে
মানবতাবাদী
জাতিসংঘে অবিরল তুষার ঝরলে পৃথিবীতে বসন্তের ফুল চাপা পড়বে না। বাংলাদেশে ভূমিহীন চাষীর সংসার ছারখার হলেও নিশ্চিত জাতিসংঘে প্রার্থনার ঘরে নিমগ্নতা থাকবে অটুট।কে সুন্দরী ডলারের শূন্য মালা গাঁথে স্বপ্নের গহনে? নিউইয়ের্কের পূর্ণ সুপার মার্কেটে ঝলমলে দ্রব্যের জগতে মনে পড়ে, তাকে মনে পড়ে, নিগ্রো ঘেটোর মতন। হৃদয় আমার অকস্মাৎ আর্তনাদ করে ঘোর অবেলায়।এখানে কী করে মনে পড়ে তাকে? কেমন নাছোড় খাপছাড়া মন, তাই অবচেতনায় চিত্রল হরিণ চিতাবাঘ, তার কী ফুল্ল শরীর ভেসে ওঠে বারংবার। আমার দু’দিকে বাহরাইন, বাহামা বার্বাডোস, পারমাণবিক ভস্মরাশি কে ছড়াল কোথায় কোন সে পাতালের নির্জন অতলে, নিঝুম সীমান্তে দিল হানা কারা উর্দি-পরা তা নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি। এরই মাঝে সহসা সে উঠে আসে আফ্রোদিতির মতন শরীরে স্বপ্নের ফেনা নিয়ে।মেশিন দলিল দস্তাবেজ সংঘ সংস্থা ব্যক্তিকে নিয়ত টানে কী ধূসর নামহীনতায়। জাতিসংঘ পরিণামহীন দেবতার মতো ডানা ঝাপটায় শূন্যতায়। জাতিসংঘের ঠক বন্ধ হলেও তৃতীয় বিশ্বে নবজাতকের নতুন চিৎকার বেজে উঠবে নিয়ত, শীর্ণ হাত প্রসারিত হবে ক্রমে সভ্যতার দিকে।   (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jatisonghe-obirol-tushar-jhorle/
1980
বিভাস রায় চৌধুরী
সমস্ত
চিন্তামূলক
এই যে আমি মরতে চাই মরতে চাই’ বলে সহ্য করি ময়লা পশু মায়াবী ম্যানহোলেকখনও আমি শব্দ ভেঙে মর্ম ছুঁতে যাইনি চাইনি কিছু পাইনি কিছু চাইনি, কিছু পাইনি।এই যে আমি স্বপ্নকামী জ্বরের ঠোঁটে বিষ। বীর্যপাত, তরল চাঁদ দেখছি ভাগ্যিসকখনো আমি বমির ঝুঁকে গলন প্রিয় মেম রাত জেগেছি, সঙ্গী সাদা বিদায়ী কনডম।ঘুমাও পাখি, আমার হাতে চমকপ্রদ পেন। কাটছি লেখা, হাঁটছি সুখে সঘন শ্যাম্পেন।সব বুঝেছি, সব মুছেছি বুঝলি খোকা খুকু! খিদের দেশে ল্যাজ বেড়েছে। ছন্দ, মানে কুকুরতাই তার টুঁটি কামড়ে ধরে হিংস্র হয়ে যাই। একটা-দুটো ফুল এনেছে। আমারই বনসাইএই যে আমি বামন, তবু বাল্য প্রেমে ভরা। চাঁদ ধরতে পারিনি, তুমি বকো বসুন্ধরা।প্রভু আমার, প্রিয় আমার পেছনে প্রিয় পাখি! সমস্ত পাগল আমি নগ্ন করে আঁকি…
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a6%b2-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
3245
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুষ্টু
ছড়া
তোমার কাছে আমিই দুষ্টু ভালো যে আর সবাই । মিত্তিরদের কালু নিলু ভারি ঠাণ্ডা ক - ভাই ! যতীশ ভালো , সতীশ ভালো , ন্যাড়া নবীন ভালো , তুমি বল ওরাই কেমন ঘর করে রয় আলো । মাখন বাবুর দুটি ছেলে দুষ্টু তো নয় কেউ — গেটে তাদের কুকুর বাঁধা করতেছে ঘেউ ঘেউ । পাঁচকড়ি ঘোষ লক্ষ্মী ছেলে , দত্তপাড়ার গবাই , তোমার কাছে আমিই দুষ্টু ভালো যে আর সবাই । তোমার কথা আমি যেন শুনি নে কক্‌খনোই , জামাকাপড় যেন আমার সাফ থাকে না কোনোই ! খেলা করতে বেলা করি , বৃষ্টিতে যাই ভিজে , দুষ্টুপনা আরো আছে অমনি কত কী যে ! বাবা আমার চেয়ে ভালো ? সত্যি বলো তুমি , তোমার কাছে করেন নি কি একটুও দুষ্টুমি ? যা বল সব শোনেন তিনি , কিচ্ছু ভোলেন নাকো ? খেলা ছেড়ে আসেন চলে যেমনি তুমি ডাকো ? (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dushtu/
5739
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি
ভক্তিমূলক
প্রিয় ইন্দিরা, তুমি বিমানের জনলায় বসে, গুজরাটের বন্যা দেখতে যেও না এ বড় ভয়ঙ্কর খেলা ক্রুদ্ধ জলের প্রবল তোলপাড়ের উপড়ে গেছে রেললাইন চৌচির হয়েছে ব্রীজ, মৃত পশুর পেটের কাছে ছন্নছাড়া বালক তরঙ্গে ভেসে যায় বৃদ্ধের চশমা, বৃক্ষের শিখরে মানুষের আপৎকালীন বন্ধুত্ব এইসব টুকরো দৃশ্য- এক ধরনের সত্য, আংশিক, কিন্তু বড় তীব্র বিপর্যয়ের সময় এই সব আংশিক সত্যই প্রধান হয়ে ওঠে ইন্দিরা, লক্ষ্মীমেয়ে, তোমার এ-কথা ভোলা উচিত নয় মেঘের প্রাসাদে বসে তোমার করুণ কন্ঠস্বরেও কোনো সার্বজনীন দু:খ ধ্বনিত হবে না তোমার শুকনো ঠোঁট, কতদিন সেখানে চুম্বনের দাগ পড়েনি, চোখের নিচে গভীর কালো ক্লান্তি, ব্যর্থ প্রেমিকার মতো চিবুকের রেখা কিন্তু তুমি নিজেই বেছে নিয়েছো এই পথ তোমার আর ফেরার পথ নেই প্রিয়দর্শিনী, তুমি এখন বিমানের জনলায় বসে উড়ে এসো না জলপাইগুড়ি, আসামের আকাশে এ বড় ভয়ঙ্কর খেলা আমি তোমাকে আবার সাবধান করে দিচ্ছি- উঁচু থেকে তুমি দেখতে পাও মাইল মাইল শূন্যতা প্রকৃতির নিয়ম ও নিয়মহীনতার সর্বনাশা মহিমা নতুন জলের প্রবাহ, তেজে স্রোত-যেন মেঘলা আকাশ উল্টো হয়ে শুয়ে আছে পৃথিবীতে মাঝে মাঝে দ্বীপের মতন বাড়িও কান্ডহীন গাছের পল্লবিত মাথা ইন্দিরা, তখন সেই বন্যার দৃশ্য দেখেও একদিন তোমার মুখ ফস্কে বেরিয়ে যেতে পারে, বাঃ, কী সুন্দর
https://banglarkobita.com/poem/famous/1853
3151
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তিনকড়ি তোল্‌পাড়িয়ে উঠল পাড়া
ছড়া
তিনকড়ি। তোল্‌পাড়িয়ে উঠল পাড়া, তবু কর্তা দেন না সাড়া! জাগুন শিগ্‌গির জাগুন্‌। কর্তা। এলারামের ঘড়িটা যে চুপ রয়েছে, কই সে বাজে– তিনকড়ি। ঘড়ি পরে বাজবে, এখন ঘরে লাগল আগুন। কর্তা। অসময়ে জাগলে পরে ভীষণ আমার মাথা ধরে– তিনকড়ি। জানলাটা ঐ উঠল জ্বলে, ঊর্ধ্বশ্বাসে ভাগুন। কর্তা। বড্ড জ্বালায় তিনকড়িটা– তিনকড়ি। জ্বলে যে ছাই হল ভিটা, ফুটপাথে ঐ বাকি ঘুমটা শেষ করতে লাগুন।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tinkori-tolpariye-uthlo-para/
4955
শামসুর রাহমান
প্রতীতি আসেনি
চিন্তামূলক
প্রতীতি আসেনি আজো, শুধু গৃহপালিত স্বপ্নের তদারকে বেলা যায়। অস্তিত্বকে ভাটপাড়া থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসে, চিকণ কথার বিদ্যুল্লতা থেকে দূরে উল্টো পাল্টা চিত্রকল্পে দিয়েছি পা মেলে। বশংবদ নক্ষত্রেরা আত্মায় জানায় দাবি, দেখি।সবসুদ্ধ কয়েক শ’, তারও বেশি সুকণ্ঠ কোকিল হত্যা করে, বহু লক্ষ প্রজাপতি ছিঁড়ে, পাপিয়াকে সোৎসাহে নির্বংশ করে, লোকটা সদর্পে হেঁটে গেলো রোমশ ছত্রিশ ইঞ্চি ঠুকে ঠুকে। সময়ের ছাদ ধসে যেতে চায়, দেখলাম ভূতগ্রস্ত নগ্নতায়।শতাব্দীর ফসিল জমানো কতো কবির পাঁজরে। মধ্যে মধ্যে হাতড়াই স্বর্গের চৌকাঠ, বসে বসে দিনের উদ্বেল স্তন খুঁটি; ভাবি, নিস্তাপ সন্ধ্যার মেঘমালা, ফুলের নিশ্বাস, বৃক্ষ ছায়া, দাঁড়বন্দী পাখিটার টলটলে চোখগুলো আমাকে কবিতা দেবে কিছু? দশটি আঙুলে খুঁটি নিজেরই পাঁজর।প্রতীতি আসেনি আজো, প্রেম আসে মরালের মতো, ডানা ঝাপটিয়ে বসে চিত্তহারী প্রচ্ছন্ন মাস্তুলে। ভাটপাড়া থেকে দূরে ভালবাসা তুমি থাকবে কি? মেলবে কি পাখা এই ভূতগ্রস্ত কলঙ্কী পাঁজরে?   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prititi-aseni/
4148
রেদোয়ান মাসুদ
ভাগ্য
প্রেমমূলক
ওটা তোমার জন্য নয় ওখানে হাত দিও না পুড়ে যাবে সে হাত। ওটা বিধাতার লিখন ওটার নাম কপাল। ঐখানে লেখা ছিল তুমি ছিলে না আমার। কখনও চোখ তুলে দেখতে পারিনি কি ছিল লেখা ওখানে? তাই হয়তো মিলেছিলাম কোন এক মোহনায়। এখন আবার দু’চোখে দু’টি নদী, দু’দিকে প্রহাহিত হয় অবিরাম ঝর্নার মত। এখন বুঝে নিলাম ওখানে লেখা ছিল না। তাই হয়তো তুমি আর আমি আর একই নীড়ে ভিড়তে পারলাম না। এর জন্য আফসোস করোনা ওটার নাম ভাগ্য! ওখানে যা লেখা থাকে ওটাই সবার প্রাপ্য।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2129.html
4406
শামসুর রাহমান
আলো অন্ধকার
প্রেমমূলক
বৃষ্টির সেহ্‌রা পরে ফ্ল্যাটবাড়িটা দাঁড়ানো রাস্তার ধারে। তোমার ড্রইরুমে আমরা দুজন গল্প করছি এটা সেটা নিয়ে, মাঝে মাঝে পড়ছি কবিতা। কখনো জীবনানন্দের দারুচিনি দ্বীপের ভেতর আমার প্রবেশ, কখনো বা আলিঙ্গনরহিত অঙ্গে অঙ্গে ইয়েটস-এর শাদা পাখির পাখার ঝাপট আর সমুদ্রের ফেনা ছুঁয়ে যাওয়া। এক সময় চায়ে চুমুক দিতে দিতে ছন্দ বিষয়ে তোমার কৌতুহল চড় ইয়ের আঙ্গিক।আমার কাছ থেকে তুলে নিচ্ছিলে জবাব, যেমন পাখি ফলমূল চঞ্চু দিয়ে। টিপয়ে শূন্য চায়ের কাপ আর স্ন্যাকস-এর ভগ্নাংশ; তখনো বৃষ্টির বাজনা থামে নি। সোফায় গা এলিয়ে হঠাৎ তুমি বললে, ‘ধরা যাক তোমার ডান হাত আমার হাতে এসে নীড় বাঁধলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধরনে, তখন কী করবে তুমি?’চমকে উঠলাম। আমিতো সেই কবে থেকে প্রবেশ করতে চাই তোমার একলা ভেতরে, জাগিয়ে তুলতে চাই তোমার অত্যন্ত ভেতরকার তোমাকে আর তোমার সত্তায় সরাসরি মিশিয়ে দিতে চাই আমার সত্তা। জীবনানন্দের কাব্যসম্ভার থেকে চোখ তুলে তুমি তাকালে আমার মধ্যবিত্ত সংস্কারে আরণ্যক ঝড় জাগিয়ে। তোমার দৃষ্টি এবং হাসিতে ক্রমাগত কাঁপতে থাকে কয়েক শতাব্দীর আলো-অন্ধকার।   (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/alo-ondhokar/
2965
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খুব তার বোলচাল
ছড়া
খুব তার বোলচাল, সাজ ফিট্‌ফাট্‌, তক্‌রার হলে আর নাই মিট্‌মাট্‌। চশমায় চম্‌কায়, আড়ে চায় চোখ– কোনো ঠাঁই ঠেকে নাই কোনো বড়ো লোক।–   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khub-tar-bolchal/
3464
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রেম
সনেট
নিবিড়তিমির নিশা, অসীম কান্তার, লক্ষ দিকে লক্ষ জন হইতেছে পার। অন্ধকারে অভিসার, কোন্‌ পথপানে কার তরে, পান্থ তাহা আপনি না জানে। শুধু মনে হয় চিরজীবনের সুখ এখনি দিবেক দেখা লয়ে হাসিমুখ। কত স্পর্শ কত গন্ধ কত শব্দ গান কাছ দিয়ে চলে যায় শিহরিয়া প্রাণ। দৈবযোগে ঝলি উঠে বিদ্যুতের আলো, যারেই দেখিতে পাই তারে বাসি ভালো— তাহারে ডাকিয়া বলি—ধন্য এ জীবন, তোমারি লাগিয়া মোর এতেক ভ্রমণ। অন্ধকারে আর সবে আসে যায় কাছে, জানিতে পারি নে তারা আছে কি না আছে।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prem/
2530
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
হে আমার আড়ষ্টতা
চিন্তামূলক
শিশির-পাতের মতো শব্দেরা জড়িয়ে ধরে বুক এফোঁড় ওফোঁড় বেঁধে অশরীরী হিমের চাবুক অথচ আমি তো চাই জ্বলন্ত আগুন মেলে শুতে ঘুমের মতন ধোঁয়া হতে চাই দহনের তাপ ছুঁতে ছুঁতে নক্ষত্রেরা গলে গলে অগনিত অক্ষরের মেলায় সহজে মিশে যায় --- ঘুম জুড়ে ধোঁয়া জুড়ে নষ্ট চিত্র বানিয়ে বানিয়ে আমাকে দেখায় তবু আমি অন্য উত্তাপের খোঁজে নাড়া-চাড়া করি এক নিঃসঙ্গ ম্যাচের কাঠি নিয়ে অগনিত অক্ষরের বিচিত্র বর্ণের ছবি সাজিয়ে সাজিয়ে আমি চাই ভিন্ন এক রহস্যের শরীর বানাতে যেখানে ম্যাচের কাঠি জ্বেলে দেবো আমি ক্ষিপ্র হাতে শরীর তখন এক জ্বলন্ত বিছানা হয়ে গিয়ে আমাকে জড়াবে --- আমি ভাবি --- শুধু ভাবি কিন্তু তবু ভাবনার বুক চিরে অশরীরী হিম উঠে এসে আমাকে আড়ষ্ট করে --- কাকে বলি ক্ষমা করো প্রভু ---- শিশির পাতের শব্দ সম্মোহের মায়াবী আবেশে আমাকে আচ্ছন্ন করে --- ঝিমাই ঝিমাই যেন আমি আর নাই হে আমার আড়ষ্টতা ক্ষমা করো দোহাই দোহাই
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/he-amar-aroshtota/
4153
রেদোয়ান মাসুদ
ভালোবাসি
প্রেমমূলক
শুধু একটি বার বলো ভালোবাসি তোমাকে আর কোনদিন ভালোবাসতে হবে না। মরুভূমির তপ্ত বালিতেও পা দিতে হবে না। আমার জন্য তোমকে নিশি রাতে পা ভিজাতে হবে না। আকাশ বাতাস শুনুক তোমার প্রতিধ্বনি। সবাই জানুক কেউ আমাকে ভালোবেসেছিল। আমার হৃদয়ের ডাকে কেউ সাড়া দিয়েছিলো। শুধু এতটুকুই আমি চাই, এর চেয়ে বেশি চাই না। কাছে আসো বা না আসো, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। হৃদয়কে না হয় একটি বার হলেও সান্তনা দিতে পারব কেউতো অন্তত একটি বার হলেও প্রাণের ছোয়া দিয়েছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও শুকিয়ে যাওয়া নদীতে আবার ঝড়ের বেগে অশ্রুর বন্যা বয়েছিল। শুধু এতটুকুই আমি চাই, এর চেয়ে বেশি চাই না। এর জন্য তুমি কি চাও? হয়তোবা আমি তোমাকে আকাশের চাঁদটি এনে দিতে পারবোনা পূর্ব দিকে উঠা সূর্যটিকেও হাতে তুলে দিতে পারবোনা। কিন্তু পারবো তোমার জন্য আমি রজনীর পর রজনী জেগে থাকতে পারবো আজীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করতে। হয়তো আমার এই শুন্য হৃদয়ে এক সময় কেউ স্থান করে নিবে কিন্তু তুমিতো আর আমার হলে না। কি হবে ভরে এই শুন্য হৃদয় ? আমি তো চাইনি অন্য কেউ এসে আমার হৃদয়ে গোলাপ ফুটাক পোড়া মন আবার সতেজ হয়ে উঠুক। আমি চেয়েছি শুধু তোমার মুখ থেকে একটি বার হলেও প্রতিধ্বনি হয়ে বেজে উঠুক একটি শব্দ ‘ভালোবাসি’ শুধু এতটুকুই আমি চাই, এর চেয়ে বেশি চাই না।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2226.html
1677
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
যুদ্ধক্ষেত্রে, এখনও সহজে
চিন্তামূলক
রাত্রিগুলি এখনও বাঘের মতো পিছু নেয়। স্বপ্নগুলি এখনও নিদ্রার পিঠে ছুরি মেরে হেসে ওঠে। সতর্ক ছিলাম, তবু কিছু চিহ্ন এখানে-ওখানে থেকে গিয়েছিল। পেট্রোলে-ভিজোনো ন্যাকড়া, দেশলাই-কাঠির টুকরো, এইসব। স্মৃতিগুলি তারই সূত্র ধ’রে হাওয়া শুঁকতে শুঁকতে, পা টিপে পা টিপে হেঁটে আসে; জানালার ধারে নিঃশব্দে দাঁড়ায়। অতর্কিতে হো-হো শব্দ ছুটে যায় অন্ধকার থেকে অন্ধকারে। অর্থাৎ এখনও মরে যাইনি। এখনও বাতাসে পুরনো যুদ্ধ হানা দেয়। রাত্রিগুলো স্বপ্নগুলি স্মৃতিগুলি চতুর্দিকে কখনও জন্তুর মতো, কখনও দস্যুর মতো, কখনও-বা ধূর্ত জেদি গোয়েন্দার মতো ঘোরাফেরা করে। অন্ধকারে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চলতে থাকে সারাক্ষণ। অর্থাৎ এখনও আমি বেঁচে আছি। চৌমাথায় যে-লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, বস্তুত আমাকে সে-ও চোখে-চোখে রাখছে, আমি তার হিংসার ভিতরে বেঁচে আছি। এবং তুমিও আছ, নারী। আছ, তাই অসংখ্য শত্রুর সঙ্গে এই যুদ্ধ কিছুটা তাৎপর্য পায়, তাই যুদ্ধক্ষেত্রে আমি এখনও সহজে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে হাওয়ায় শব্দ করে চুম্বন রটিয়ে দিতে পারি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1593
1049
জীবনানন্দ দাশ
তোমরা স্বপ্নের হাতে ধরা দাও
সনেট
তোমরা স্বপ্নের হাতে ধরা দাও—আকাশের রৌদ্র ধুলো ধোঁয়া থেকে স’রে এইখানে চ’লে এসো; পৃথিবীর পথে আমি বহুদিন তোমাদের কথা শুনিয়াছি—তোমাদের ম্লান-মুখ দেখিয়াছি—তোমাদের ক্লান্ত রক্তাক্ততা দেখিয়াছি কত দিন—ব্যথিত ধানের মতো বুক থেকে পড়িতেছে ঝ’রে তোমাদের আশা শান্তি, ম্লান মেঘে সোনালি চিলের মতো কলরব ক’রে মিছে কেন ফেরো আহা—পৃথিবীর পথ থেকে হে বিষণ্ন, হে ক্লান্ত জনতা তোমরা স্বপ্নের ঘরে চ’লে এসো—এখানে মুছিয়া যাবে হৃদয়ের ব্যথা সন্ধ্যার বকের মতো চ’লে এসো ধূসর স্তনের মতো শান্ত পথ ধরে।চারিদিকে রাত্রিদিন কলরব ক’রে যায় দাঁড়কাক বাদুরের মতো পৃথিবীর পথে ওই—সেখানে কি ক’রে তবে শান্তি পা’বে মানুষ বলো তো ? এখানে গোধূলি নষ্ট হয় নাকো কোনোদিন;—কয়লার মতো রং—ম্লান পশ্চিমের মেঘে ওই লেগে আছে চিরদিন; কড়ির মতন শাদা করুণ উঠান প’ড়ে আছে চিরকাল; গোধূলি নদীর জলে রূপসীর মতো মুখখানা দেখে ধীরে—ধীরে—আরো ধীরে শান্তি ঝরে, স্বপ্ন ঝরে আকাশের থেকে।।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/tomra-shwopner-hatey-dhora-dao/
2950
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু
ভক্তিমূলক
ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু, পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু॥ এই-যে হিয়া থরোথরো কাঁপে আজি এমনতরো এই বেদনা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু॥ এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু, পিছন-পানে তাকাই যদি কভু। দিনের তাপে রৌদ্রজ্বালায় শুকায় মালা পূজার থালায়, সেই ম্লানতা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু॥
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kanti-amar-khamakoro-probo/
1961
বিনয় মজুমদার
একটি গান
চিন্তামূলক
X=0 এবং Y=0 বা X=0=Y বা X=Y শূন্য 0 থেকে প্রানী X ও Y সৃষ্টি হলো এই ভাবে বিশ্ব সৃষতি শুরু হয়েছিলো।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4025.html
2531
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
অন্ধ বধূ
মানবতাবাদী
পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী! আস্তে একটু চলনা ঠাকুর-ঝি — ওমা, এ যে ঝরা-বকুল ! নয়? তাইত বলি, বদোরের পাশে, রাত্তিরে কাল — মধুমদির বাসে আকাশ-পাতাল — কতই মনে হয় । জ্যৈষ্ঠ আসতে কদিন দেরি ভাই — আমের গায়ে বরণ দেখা যায় ? —অনেক দেরি? কেমন করে’ হবে ! কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে, দখিন হাওয়া —বন্ধ কবে ভাই ; দীঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে — শেওলা-পিছল — এমনি শঙ্কা লাগে, পা-পিছলিয়ে তলিয়ে যদি যাই! মন্দ নেহাৎ হয়না কিন্তু তায় — অন্ধ চোখের দ্বন্ধ চুকে’ যায়! দুঃখ নাইক সত্যি কথা শোন্ , অন্ধ গেলে কী আর হবে বোন? বাঁচবি তোরা —দাদা তো তার আগে? এই আষাড়েই আবার বিয়ে হবে, বাড়ি আসার পথ খুঁজে’ না পাবে — দেখবি তখন —প্রবাস কেমন লাগে ? —কী বল্লি ভাই, কাঁদবে সন্ধ্যা-সকাল ? হা অদৃষ্ট, হায়রে আমার কপাল ! কত লোকেই যায় তো পরবাসে — কাল-বোশেখে কে না বাড়ি আসে ? চৈতালি কাজ, কবে যে সেই শেষ ! পাড়ার মানুষ ফিরল সবাই ঘর, তোমার ভায়ের সবই স্বতন্তর — ফিরে’ আসার নাই কোন উদ্দেশ ! —ঐ যে হথায় ঘরের কাঁটা আছে — ফিরে’ আসতে হবে তো তার কাছে ! এই খানেতে একটু ধরিস ভাই, পিছল-ভারি — ফসকে যদি যাই — এ অক্ষমার রক্ষা কী আর আছে ! আসুন ফিরে’ — অনেক দিনের আশা, থাকুন ঘরে, না থাক্ ভালবাসা — তবু দুদিন অভাগিনীর কাছে! জন্ম শোধের বিদায় নিয়ে ফিরে’ — সেদিন তখন আসব দীঘির তীরে। ‘চোখ গেল ঐই চেঁচিয়ে হ’ল সারা। আচ্ছা দিদি, কি করবে ভাই তারা — জন্ম লাগি গিয়েছে যার চোখ ! কাঁদার সুখ যে বারণ তাহার — ছাই! কাঁদতে গেলে বাঁচত সে যে ভাই, কতক তবু কমত যে তার শোক! ‌‌‍‍‍‌’চোখ’ গেল– তার ভরসা তবু আছে — চক্ষুহীনার কী কথা কার কাছে ! টানিস কেন? কিসের তাড়াতাড়ি — সেই তো ফিরে’ যাব আবার বাড়ি, একলা-থাকা-সেই তো গৃহকোণ — তার চেয়ে এই স্নিগ্ধ শীতল জলে দুটো যেন প্রাণের কথা বলে — দরদ-ভরা দুখের আলাপন পরশ তাহার মায়ের স্নেহের মতো ভুলায় খানিক মনের ব্যথা যত ! এবার এলে, হাতটি দিয়ে গায়ে অন্ধ আঁখি বুলিয়ে বারেক পায়ে — বন্ধ চোখের অশ্রু রুধি পাতায়, জন্ম-দুখীর দীর্ঘ আয়ু দিয়ে চির-বিদায় ভিক্ষা যাব নিয়ে — সকল বালাই বহি আপন মাথায় ! — দেখিস তখন, কানার জন্য আর কষ্ট কিছু হয় না যেন তাঁর। তারপরে – এই শেওলা-দীঘির ধার — সঙ্গে আসতে বলবনা’ক আর, শেষের পথে কিসের বল’ ভয় — এইখানে এই বেতের বনের ধারে, ডাহুক-ডাকা সন্ধ্যা-অন্ধকারে — সবার সঙ্গে সাঙ্গ পরিচয়। শেওলা দীঘির শীতল অতল নীরে — মায়ের কোলটি পাই যেন ভাই ফিরে’!
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/post20160508040036/
4458
শামসুর রাহমান
এক দশক পরে
চিন্তামূলক
একটি দশক ছিল প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো, কিছু বা কাটায় কীর্ণ, সেয়ানা কীটের লোভ ছিল জেগে সাপের মণির মতো, গণিকার প্রসাধন-চটা বিশীর্ণ মুখের মতো ছিল রোগ শোক, বিলাপে পড়েনি ভাটা, যদিও আনন্দ ধ্বনি প্রাণে বুনেছে সৌন্দর্য, খৃষ্টপূর্ব শতকের গোধুলি এসেছে নেমে সোনালি কুয়াশা হয়ে আর হরিণের ছালে ডোরাকাটা বাঘের মুখের লালা ঝরেছে নিয়ত।একটি দশক আমি তার কথা জানতে পারিনি। সে-কথা লুকোনো ছিল রোদপেড়ো পাতার আড়ালে, লতাগুল্মে, পর্যটক মেঘে দরবারী কানাড়ার পরতে পরতে, সূর্যাস্তের অবসন্ন বিশদ মোটিফে, ঈগল এবং রাগী সাপের বিবাদে।একটি দশক আমি তার কথা জানতে পারিনি, অথচ ছিল সে আশপাশে বিকশিত রাগিনীর মতো। অকস্মাৎ একটি গভীর রাত চন্দ্রমল্লিকার সৌরভ বিলায় পোড়-খাওয়া অস্তিত্বের অলিতে গলিতে, নৈশ ঘ্রাণে ভরপুর স্বরের চুমোয় প্লাস্টারের মতো খসে পড়ে দীর্ঘ দশটি বছর। বয়সে গোলাপ ফোটে, সহসা যযাতি পুরুরবা হয়ে যায়, ধাবমান পাঁচটি ঘোড়ার ঘাম আর মুখের কবোষ্ণ ফেনা ঝরে শিরায় শিরায়, আমার প্রতিটি রোমকূপ নিমেষেই ময়ূরের চোখ হয়। এক দশকের দ্বিধা আর সংশয়ের সূর্যাস্তের পরে বস্তুত সত্তার মৌন তটে অপরূপ সখ্যে জেগে ওঠে দুলিয়ে চিত্রিত মাথা মনসার গৌরবের মতো এক অনার্য সভ্যতা।  (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ek-doshok-pore/
4958
শামসুর রাহমান
প্রত্যাশার প্রহর
মানবতাবাদী
আমার চাতক-মন সেই কবে থেকে প্রত্যাশার প্রহর কাটায় ধ্যানে, মাঝে মাঝে তার কী খেয়াল হয়, টেলিফোন রিসিভার তুলে বলে যায় এলেবেলে কথা, যদিও ওপারে কেউ নেই শ্রবণের প্রতীক্ষায়। এই খেলা কেন যে মাতিয়ে তোলে আমাকে প্রায়শ-এ বাধ্যতা।আমি কি প্রকৃত কোনও শুভ সংবাদের আশায় নিজের সঙ্গে কৃষ্ণকায় এই বর্তমানে ক্রীড়াপরায়ণ হয়ে উঠেছি এমন? মাঝে মাঝে শুনছি কলিংবেল, ছুটে যাই হন্তদন্ত হয়ে। দরজাটা খুলে দাঁড়ালেই স্রেফ খাঁখাঁ শূন্যতার দেখা পেয়ে কিছুক্ষণ খুব স্তব্ধ হয়ে থাকি।সন্ত্রাসের ধ্বনি ভেসে আসে প্রতিদিন, চতুর্দিক থেকে বাড়িঘর, ধুলো, মাটি, গাছগাছালি এবং ল্যাম্পেস্ট, ওভারব্রিজ বমি করে হাহাকার আর অমাবস্যা-রাতে অগণিত মৃতদেহ মাথা নত করে হেঁটে যায় কে জানে কোথায়! পথে বিকট গহ্বর!এই অন্ধকার, এই হাহাকার থেকে, হায়, নেই কি নাজাত আমাদের? কতবার টেলিফোন তুলে কেবল নিজের সঙ্গে অভিনয় করে যাব? এভাবেই আপন সত্তার সঙ্গে অভিনয় করে যাব আর কতকাল? আমি চাই পথে আজ প্রাণবন্ত সব মানুষের আসা-যাওয়া, গাছে গাছে কোকিলের সুরের মহিমা।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prottyashar-prohor/
4026
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হার-জিত
নীতিমূলক
ভিমরুলে মৌমাছিতে হল রেষারেষি, দুজনায় মহাতর্ক শক্তি কার বেশি। ভিমরুল কহে, আছে সহস্র প্রমাণ তোমার দংশন নহে আমার সমান। মধুকর নিরুত্তর ছলছল-আঁখি— বনদেবী কহে তারে কানে কানে ডাকি, কেন বাছা, নতশির! এ কথা নিশ্চিত বিষে তুমি হার মানো, মধুতে যে জিত।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/har-jit/
238
কাজী নজরুল ইসলাম
আল্লার রাহে ভিক্ষা দাও
মানবতাবাদী
(‘ফি সবিলিল্লাহ্’)মোর  পরম-ভিক্ষু আল্লার নামে চাই ভিক্ষা দাও গো মাতা পিতা বোন ভাই, দাও ভিখারিরে ভিক্ষা দাও। মোর   পরম-ডাকাত ঘরের দুয়ার খুলি হরিয়া আমার সর্বস্ব সে দিয়াছে ভিক্ষাঝুলি, তাঁর মহাদান সেই ঝুলি কাঁধে তুলি এসেছি ভিখারি, হে ধনী, ফিরিয়া চাও। আল্লার নামে ভিক্ষা দাও। হে ধনিক, তাঁর পাইয়াছ বহু দান, রত্ন মানিক ভোগ যশ সম্মান, তব প্রাসাদের চারিদিকে ভিখারিরা প্রসাদ মেগেছে ক্ষুধার অন্ন, চায়নি তোমার হিরা। বলো, বলো, সেই নিরন্নদের মুখে অন্ন দিয়াছ? কেঁদেছ তাদের দুখে? লজ্জা ঢাকিয়া নগ্ন দেহের তার মুক্তি, পেয়েছে তোমার মুক্তি-হার? তব আত্মার আত্মীয় যারা, তারা ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাঙালের বেশে কাঁদে তব দরজায় – তাড়ায় তাদেরে গাল দিয়ে দরওয়ান, তুমিও মানুষ, কাঁদে না তোমার প্রাণ? হিরা মানিকের পাষাণ পরিয়া তুমি কি পাষাণ হলে? তোমার আত্মা কাঁদে না তোমার দুয়ারে মানুষ মলে? পাওনি শান্তি, আনন্দ প্রেম – জানি আমি তাহা জানি, তোমার অর্থ ঢাকিয়া রেখেছে তোমার চোখের পানি! কাঙালিনি মা-র বুকে ক্ষুধাতুর শিশু তোমার দুয়ারে কাঁদে শোনো, ওই শোনো। ভিক্ষা দাও না, রাশি রাশি হিরা মণি তুলে রাখো আর গোনো। এ টাকা তোমার রবে না, বন্ধু জানি, এ লোভ তোমারে নরকে লইবে টানি। ‘আর্শ’ আসন টলিয়াছে আল্লার, শুনি ক্ষুধিতের কাঙালের হাহাকার। তাই সে পরম-ভিক্ষু ভিক্ষা চায় ভিখারির মারফতে তব দরজায়। ক্ষমা পাবে তুমি, আজিও সময় আছে, ভিক্ষা না দিলে পুড়িবে অগ্নি-আঁচে। মৃত্যুর আর দেরি নাই তব – ফিরে চাও ফিরে চাও, পরম-ভিক্ষু মোর আল্লার নামে – দরিদ্র উপবাসীরে ভিক্ষা দাও। ওগো জ্ঞানী, ওগো শিল্পী, লেখক, কবি, তোমরা দেখেছ ঊর্ধ্বের শশী রবি। তোমরা তাঁহার সুন্দর সৃষ্টিরে রেখেছ ধরিয়া রসায়িত মন ঘিরে। তোমাদের এই জ্ঞানের প্রদীপ-মালা করে নাকো কেন কাঙালের ঘর আলা? এত জ্ঞান এত শক্তি, বিলাস সে কি? আলো তার দূর কুটিরে যায় না কোন সে শিলায় ঠেকি?যাহারা বুদ্ধিজীবী, সৈনিক হবে না তাহারা কভু, তারা কল্যাণ আনেনি কখনও তারা বুদ্ধির প্রভু। তাহাদের রস দেবার তরে কি লেখনী করিছ ক্ষয়? শতকরা নিরানব্বই জন তারা তব কেহ নয়? এই দরিদ্র ভিখারিরা আজ অসহায় গৃহহারা ‘আলো দাও’ বলে কাঁদিছে দুয়ারে – ভিক্ষা পাবে না তারা? অজ্ঞান-তিমিরান্ধকারের ইহারা বদ্ধ জীব, উৎপীড়কের পীড়নে পীড়িত দলিত বদ্‌-নসিব। তোমাদের আছে বিপুল শক্তি, কৃপণ হইয়া তবে কেন সহ মানুষের অপমান, মানুষ কি দাস রবে? আমার পিছনে পীড়িত আত্মা অগণন জনগণ অসহ জুলুম যন্ত্রণা পেয়ে করিতেছে ক্রন্দন। পরম-ভিক্ষু আদেশ দিলেন, ভিক্ষা চাহিতে, তাই এই অগণন জনগণ তরে আসিয়াছি দ্বারে, ভাই! ভোলো ভয়, দূর করো কৃপণতা, পাষাণে প্রাণ জাগাও, ভিখারির ঝুলি পূর্ণ হইবে, তোমরা ভিক্ষা দাও। তোমরা কি দলপতি, তোমরা কি নেতা? শুনেছি, তোমরা কল্যাণকামী মহান উদারচেতা। তোমাদের কাছে ভিক্ষা চাহিব চরম আত্মদান, চাহিব তোমার অভিনন্দন-মালা, যশ,খ্যাতি, প্রাণ।চাহিব তোমার গোপন ইচ্ছা আত্ম-প্রতিষ্ঠার, চাহিব ভিক্ষা তোমার সর্ব লোভ ও অহংকার। পরম ভিক্ষু পাঠায়েছে মোরে, দাও সে ভিক্ষা দাও। আপনার সব লোভ ও তৃষ্ণা তাঁহারে বিলায়ে দাও! তিনি নিরভাব, পূর্ণ। ভিক্ষা চাহেন, এ তাঁর সাধ, শালুক ফুটায়ে যেমন তাহারই প্রেম-প্রীতি চায় চাঁদ। যশ খ্যাতি আর অহংকারের লোভ তাঁরে দিলে ভিখ, ফিরে পাবে তাঁর মহাদান, হবে মহানেতা নির্ভীক! নিজেরা আত্মা ত্যাগ করে মহা ত্যাগের পথ দেখাও! ভিক্ষা চাহে এ ভিখারি, ভিক্ষা দাও গো ভিক্ষা দাও! তুমি কে? তুমি মদোন্মত্ত মানবের যৌবন, তুমি বারিদের ধারাজল, মহা গিরির প্রস্রবণ। তুমি প্রেম, তুমি আনন্দ, তুমি ছন্দ মূর্তিমান, তুমিই পূর্ণ প্রাণের প্রকাশ, রুদ্রের অভিযান! যুগে যুগে তুমিই অকল্যাণেরে করিয়াছ সংহার, তুমিই বৈরাগী, বক্ষের প্রিয়া ত্যজি ধরো তলোয়ার! জরাজীর্ণের যুক্তি শোন না, গতি শুধু সম্মুখে, মৃত্যুরে প্রিয় বন্ধুর সম জড়াইয়া ধরো বুকে। তোমরাই বীর সন্তান, যুগে যুগে এই পৃথিবীর, হাসিয়া তোমরা ফুলের মতন লুটায়েছ নিজ শির।দেহেরে ভেবেছ ঢেলার মতন, প্রাণ নিয়ে কর খেলা, তোমারই রক্তে যুগে যুগে আসে অরুণ-উদয়-বেলা। তোমাদের কাছে ভিক্ষা চাহিতে আঁখি ভরে উঠে জলে, তোমরা যে পথে চল, কেঁদে আমি লুটাই সে পথতলে। তোমাদেরই প্রাণ ভিক্ষা চাহিতে এসেছি ভিখারি আমি, ভিক্ষা চাহিতে পাঠাল সর্ব– জাতির পরম স্বামী। তোমরা শহিদ, তোমরা অমর, নিতি আনন্দধামে তোমরা খেলিবে, তোমাদের তরে তাঁর কৃপা নিতি নামে। তোমরাই আশা-ভরসা জাতির স্বদেশের সেনাদল, তোমরা চলিলে, আনন্দে ধরা কেঁপে ওঠে টলমল। তোমরা প্রবাহ, তোমরা শক্তি, তোমরা জীবনধারা, তোমাদেরই স্রোত যুগে যুগে ভাঙে সব বন্ধন-কারা। তুষার হইয়া কেন আছ আজও, আগুন উঠেছে জ্বলে, দিগ্‌দিগন্ত কাঁপাইয়া, ছুটে এসো সবে দলে দলে। তোমরা জাগিলে ঘুচে যাবে সব ক্লৈব্য ও অবসাদ, পরম-ভিক্ষু এক আল্লার পুরিবে সেদিন সাধ। আর কেহ ভিখ দিক বা না দিক তোমরা ভিক্ষা দাও, সাম্য শান্তি আসিবে না যদি তোমরা ফিরে না চাও। নহি নেতা, রাজনৈতিক, প্রেম- ভিক্ষা আমার নীতি। পৃথিবী স্বর্গ, পৃথিবীতে ফের জাগুক স্বর্গ-প্রীতি। অসম্ভবেরে সম্ভব করা জাগো নবযৌবন। ভিক্ষা দাও গো, এ ধরা হউক আল্লার গুলশন। (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/allar-rahe-vikkha-dao/
5885
সুফিয়া কামাল
সাঁঝের মায়া
প্রকৃতিমূলক
অনন্ত সূর্যাস্ত-অন্তে আজিকার সূর্যাস্তের কালে সুন্দর দক্ষিণ হস্তে পশ্চিমের দিকপ্রান্ত-ভালে দক্ষিণা দানিয়া গেল, বিচিত্র রঙের তুলি তার_ বুঝি আজি দিনশেষে নিঃশেষে সে করিয়া উজাড় দানের আনন্দ গেল শেষ করি মহাসমারোহে। সুমধুর মোহে ধীরে ধীরে ধীরে প্রদীপ্ত ভাস্কর এসে বেলাশেষে দিবসের তীরে ডুবিল যে শান্ত মহিমায়, তাহারি সে অস্তরাগে বসন্তের সন্ধ্যাকাশ ছায়। ওগো ক্লান্ত দিবাকর! তব অস্ত-উৎসবের রাগে হেথা মর্তে বনানীর পল্লবে পল্লবে দোলা লাগে। শেষ রশ্মিকরে তব বিদায়ের ব্যথিত চুম্বন পাঠায়েছ। তরুশিরে বিচিত্র বর্ণের আলিম্পন করিয়াছে উন্মন অধীর মৌনা, বাক্যহীনা, মূক বক্ষখানি স্তব্ধ বিটপীর। তারো চেয়ে বিড়ম্বিতা হেথা এক বন্দিনীর আঁখি উদাস সন্ধ্যায় আজি অস্তাচল-পথপরি রাখি ফিরাইয়া আনিতে না পারে দূর হতে শুধু বারে বারে একান্ত এ মিনতি জানায় : কখনও ডাকিয়ো তারে তোমার এ শেষের সভায়! সাঙ্গ হলে সব কর্ম, কোলাহল হলে অবসান, দীপ-নাহি-জ্বালা গৃহে এমনি সন্ধ্যায় যেন তোমার আহ্বান গোধূলি-লিপিতে আসে। নিঃশব্দ নীরব গানে গানে, পূরবীর সুরে সুরে, অনুভবি তারে প্রাণে প্রাণে মুক্তি লবে বন্দী আত্মা-সুন্দরের স্বপ্নে, আয়োজনে, নিঃশ্বাস নিঃশেষ হোক পুষ্প-বিকাশের প্রয়োজনে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/20.html
5327
শামসুর রাহমান
স্বাতন্ত্র্য
চিন্তামূলক
আমি কি স্বতন্ত্র্য কেউ? নাকি আগাগোড়া একই ছাঁচে গড়াপেটা? আ দশজনের প্রতিভু? নিয়ন্ত্রিত নড়া চড়া, দমদেওয়া বিবর্ণ পুতুল? বুলবুল ভুলক্রমে জানালার গ্রিলে এস বুকের রেশম মেলে দিলে আমার নিজের বুক বেশি ধুক ধুক করবে না? অগোচরে থেকে যাবে সংবাদপত্রের অন্তরালে জলকন্যা? কবিতা আমাকে অবহেলা ছুঁড়ে দিয়ে নিছক কর্পূর, তুব উঠবো না কেঁপে?অকাম্য এমন পরিণাম; ঠিক ঠাক দাগ মেপে ওষুধ খাওয়ার মতো জীবন যাপন খাক হোক চুল্লীতে, আমার চাই খাদের কিনারে ঝুলে-থাকা অত্যন্ত বিপজ্জানকভাবে কিংবা দ্রোহী সমুদ্রের মধ্যখানে,বড় একা, ক্ষুধার করাতে ফালা ফালা, মৃত্যুর চোয়ালে ব’সে ঝটকায় পাখি টেনে আনা।  (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/satontro/
1134
জীবনানন্দ দাশ
বেড়াল
রূপক
সারাদিন একটা বেড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে কেবলি আমার দেখা হয়: গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে; কোথাও কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর তারপর সাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন হয়ে আছে দেখি; কিন্তু তবুও তারপর কৃষ্ণচূড়ার গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছে, সারাদিন সূর্যের পিছনে পিছনে চলেছে সে। একবার তাকে দেখা যায়, একবার হারিয়ে যায় কোথায়। হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান-রঙের সূর্যের নরম শরীরে শাদা থাবা বুলিয়ে বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তাকে; তারপর অন্ধকারকে ছোট ছোট বলের মতো থাবা দিয়ে লুফে আনল সে সমন্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/951
2881
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কর্ম
চিন্তামূলক
ভৃত্যের না পাই দেখা প্রাতে । দুয়ার রয়েছে খোলা ,                স্নানজল নাই তোলা , মূর্খাধম আসে নাই রাতে । মোর ধৌত বস্ত্রখানি              কোথা আছে নাহি জানি , কোথা আহারের আয়োজন ! বাজিয়া যেতেছে ঘড়ি            বসে আছি রাগ করি — দেখা পেলে করিব শাসন । বেলা হলে অবশেষে              প্রণাম করিল এসে , দাঁড়াইল করি করজোড় । আমি তারে রোষভরে           কহিলাম , “ দূর হ রে , দেখিতে চাহি নে মুখ তোর । ” শুনিয়া মূঢ়ের মতো                ক্ষণকাল বাক্যহত মুখে মোর রহিল সে চেয়ে — কহিল গদ্‌গদস্বরে ,                 “ কালি রাত্রি দ্বিপ্রহরে মারা গেছে মোর ছোটো মেয়ে । ” এত কহি ত্বরা করি                গামোছাটি কাঁধে ধরি নিত্যকাজে গেল সে একাকী । প্রতি দিবসের মতো                ঘষা মাজা মোছা কত , কোনো কর্ম রহিল না বাকি ।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kormo/
1806
পূর্ণেন্দু পত্রী
কোনো কোনো যুবক যুবতী
চিন্তামূলক
একালের কোনো কোনো যুবক বা যুবতীর মুখে সেকালের মোমমাখা ঝাড়লন্ঠন স্তম্ভ ও গম্বুজ দেখা যায়। দেখে হিংসা জাগে। মানুষ এখন যেন কোনো এক বড় উনোনের ভাত-ডাল-তরকারির তলপেটে ডাইনীর চুলের আগুনকে অহরহ জ্বালিয়ে রাখার চেলা কাঠ, কাঠ-কয়লা-ঘুটে। মানুষ এখন তার আগেকার মানুষ-জন্মের কবচ, কুণ্ডল, হার, শিরস্ত্রাণ, বর্ম ও মুকুট বৃষের মতন কাঁধ, সিংহ-কটি, অশ্বের কদম পিঠে তৃণ, চোখে অহংকার সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একটা গগলস্ পেয়ে খুশি। প্লাসটিকের মানিব্যাগ, নাইলনের জামা পেয়ে খুশি। বোবা টেলিফোন পুষে তরতাজা বিল পেয়ে খুশি। চারকোণা সংসারের চতুর্দিকে গ্রীল এটেঁ খুশি। বনহংসী উড়ে যায়, সে বাতাসে কাশের কথুক এয়ারকুলারে সেই বাতাসের বাসী গন্ধ পেয়ে বড় খুশি। একালের কোনো কোনো যুবক বা যুবতীকে দেখে অতীতের রাজশ্রীর, হর্ষবর্ষনের মতো লাগে। দেখে হিংসা জাগে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1301
5013
শামসুর রাহমান
বাড়ি
চিন্তামূলক
নিজের বাড়িতে আমি ভয়ে ভয়ে হাঁটি, পাছে কারো নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে। যদি কারো তিরিক্ষি মেজাজ জ্বলে ওঠে ফস্‌ করে যথাবিধি, সেই ভয়ে আরো জড়োসড়ো হয়ে থাকি সারাক্ষণ। আমার যে-কাজ নিঃশব্দে করাই ভালো। বাড়িতে বয়স্ক যারা, অতি পুণ্যলোভী, রেডিয়োতে শোনে তার ধর্মের কাহিনী। মক্ষিরাণী। সংসারে কেবলি বাড়ে শিশুর বাহিনী। মেথর পাড়ায় বাজে ঢাক-ঢোল, লাউডস্পীকারে কান ঝালাপালা আর আজকাল ঠোঙ্গায় সংস্কৃতি ইতস্তত বিতরিত, কম্‌তি নেই কালের বিকারে। বুকে শুধু অজস্র শব্দের ঝিলিমিলি। যে-সুকৃতি জমেনি কিছুই তার কথা ভেবে মাথা করি হেঁট, ঘুমায় পুরোনো বাড়ি, জ্বলে দূরে তারার সেনেট।   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bari/
164
আহসান হাবীব
শরতে
প্রকৃতিমূলক
ফূল ফুল তুল তুল গা ভেজা শিশিরে, বুল বুল মশগুল, কার গান গাহিরে? তর বর উঠে পর রাত ভোর দেখ না? হাত তুলে প্রাণ খুলে স্রষ্টারে ডাক না.. ঝিক মিক দশ দিক নাই পিক পাপিয়া.. সাদা বক চক চক উড়ে যায় ডাকিয়া.. বিল ঝিল খিল খিল লাল নীল বরণে, গাছে গাছে ফিঙ্গে নাচে চঞ্জল চরনে। ভেজা ভেজা তাজা তাজা শেফালির সুবাসে, শিশুদল কোলাহল করে নানা হরষে। টিদার জরিপার শ্যাম শাড়ী অঙ্গে এ্যলো কেশে এলো হেসে শরত এ বঙ্গে..
http://kobita.banglakosh.com/archives/3806.html
4575
শামসুর রাহমান
কাদামাখা অবেলায়
চিন্তামূলক
এখনও এখানে অশেষ পুঞ্জীভূত গ্রাম ও শহরে কুটির অট্রালিকায়, রাজপথে আর অলিতে গলিতে আর শহরতলিতে টিনশেড কলোনিতে মধ্যযুগের বেঘোর অন্ধকার।জংধরা এক টিনের তোরঙে ওরা পুরুষানুক্রমে রেখেছে ঊর্ধ্ব তুলে পোকা দংশিত আদ্যিকালের পুঁথি। কখনো সখনো অতি ভক্তিতে মজে জীর্ণ কেতাব মাথায় ঠেকায় শুধু।ছেঁড়া কাঁথা আর মলিন বালিশ পেতে ঘুমায় নোংরা ভাড়াটে বাড়িতে ওরা। সেই কবেকার তুরানী স্বপ্ন আজও কেরানি মনের তল্লাটে দ্যায় উঁকি। সাতপুরুষের ভিটায় ময়াল সাপ।আয়েশী স্বভাবে এখনও অটুট কিছু; অথচ অভাব পোষা বেড়ালের মতো পায়ে পায়ে ঘোরে। সোনাদানা, ঘটি-বাটি বন্ধক রেখে জুড়ায় জঠরজ্বালা, বসন্ত দিনে দেনায় ডুবেছে মাথা।শিরায় শিরায় জুয়োর বনেদী নেশা, বোঝে না নিজেই দাবার নিরঙ ঘুঁটি। আত্মায় জমে ইট-সুরকির কণা, হঠাৎ কখনো গহন সন্ধেবেলা মনে পড়ে যায় বনতুলসীর ঘ্রাণ।যুক্তিকে ওরা পাঠিয়েছে বনবাসে, এখানে চিরায়ু ভাববিলাসের যুগ।জ্ঞানীর বাণীতে কখনো পাতে না কান, শুধু চুমো খায় আলখাল্লায় তাঁর। নানা মরীচিকা দেখে দেখে কাটে বেলা।অতীতের পানা পুকুরে প্রেতের মতো সকাল-সন্ধ্যা বুড়বুড়ি কাটে মন। শ্যাওলা-বিছানো বদ্ধ পানিতে ভাসে রঙ-বেরঙের কিংবদন্তি কত, কিংবদন্তি লেহনে ধন্য ওরা।পঞ্জিকা আর গঞ্জিকা সম্বল করে ওরা ধরে গায়েবী ঘোড়ায় বাজি। চারপাশে জ্বেলে লোবান, আগরবাতি পুরানো ক্ষতের গন্ধ মুছতে চায়, হৃদয় ওদের উদ্ভট হানাবাড়ি।সম্মুখে খোল রাস্তার সংকেত, ওরা পড়ে যায় বিচ্ছিরিভাবে পথে, হাঁটুভাঙা ভীরু হরিণের মতো ধু-ধু ডানে বাঁয়ে দ্যাখে নেকড়ের শত চোখ। কে তুলবে টেনে কাদামাখা অবেলায়?   (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kadamakha-obelay/
5769
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
চেনার মুহূর্ত
ভক্তিমূলক
বহু অর্চনা করেছি তোমায়, এখন ইচ্ছে টেনে চোখ মারি হে বীণাবাদিনী, তুমিও তো নারী, ক্ষমা করো এই বাক-ব্যবহার তুমি ছাড়া আর এমন কে আছে, যার কাছে আমি দাস্য মেনেছি- এবার আমাকে প্রশ্রয় দাও, একবার আমি ছিনা টান করি। একবার এই পাংশুবেলায় তুমি হয়ে ওঠো শরীরী প্রতিমা অনেক দেখেছি দুনিয়া বাহার, এবার ফুঁদিয়ে নেভাই গরিমা হলুদকে বলা রক্তিম হতে-ভাষাভ্রান্তির এই উপহাস মানুষকে বড় বিমূঢ় করেছে, এবার অস্ত্র দুঃখ-দহন। জানি না কোথায় পড়েছিল বীজ, পৃথিবীতে এত ভুল অরণ্য দুঃখ সুখের খেলায় দেখেছি বারবার আসে প্রগাঢ় তামস তোমার রূপের মায়াবী বিভায় একবার জ্বালো ক্ষণ-বিদ্যুৎ চোখ যেন আর চিনতে ভোলে না, তুমি জানো আমি কত অসহায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1787
5711
সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
নিছক
প্রেমমূলক
দু’আনা তার দুঃখ ছিল। চোদ্দো আনা সুখ জানালাপারের গন্ধমাখা। চম্পাবরণ মুখ সেও যদি যায় ঝাপসা হয়ে সমীকরণ স্পষ্ট দু’আনা তার সুখ বাঁচে ‘আর চোদ্দো আনা কষ্টকন্যে মুখে কিছুই বলাে না কন্যে তােমার সকল ছলনাডাইনির মতন চুল এলাে করে ওইভাবে জানালার পাশে বসে আছিস কেন? কী হয়েছে তাের, রাগ? আধ ঘণ্টা বসে আছি। চুপ করে। চলে যাব? রাগ করব কার উপরে? ঠিক এই কথাটাই আমি জানতে চাইছিলাম। রাগ করছিস কার উপরে? আমি রাগ করিনি। আমার কথা বলতে ভাল লাগছে না, আর কিছু বলবি? না বলব না কিছু। আমি চললাম, তাের রােদ পােহানাে দেখার জন্য আমি বসে থাকতে পারব না। কোথায় যাবি এখন? জাহান্নামে, তােকে বলব কেন? রাগলে তাের কানগুলাে বেগুনি হয়ে যায়, জানিস সেটা? বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! একটা কবিতা শােনাবি? পারব না।চম্পাবরণ রােদ নেমেছে ঠিক দুক্কুরবেলা চম্পাবরণ কন্যে তােমার চক্ষে মেঘের খেলাশাড়িটা পরে তােকে বেশ কেমন একটা ইয়ে লাগছে। ইয়েটা কী? জঘন্য লাগছে বলতে বাধছে বুঝি? তাের মুখেও কিছু আটকায় তা হলে! জানিস না, বড়রা কি বলেছেন, “সত্যম ব্রুয়াত, প্রিয়ম বড়ুয়া”। অপ্রিয় সত্য বলতে নেই আসলে। জঘন্য লাগছে তাে? আমি কি তাই বললাম? আসলে শাড়ি পরে তােকে অন্যরকম লাগছে। বিকেলবেলার রােদটা সরে গেলে বােধ হয় তােকে আবার তাের মতন লাগবে। এখন কার মতন লাগছে? তাের মতনই, তবু যেন তুই নয়। আচ্ছা, তাের চুলগুলাে কি মেঘবরণ? রাজকন্যা বলছিস আমাকে? তাই কখনও বলতে পারি! রাজা-গজার খুব আকাল দেশে। শেষ অবধি রাজপুত্তুর জোটাবি কোথা থেকে? রাখাল ছেলে কি জুটবে না এক-আধটা? ঠাকুরমার ঝুলি হাতড়ে দ্যাখ, পেতেও পারিস। আসলে তাকে বোধ হয় খুব সুন্দর লাগছে আর মনে হচ্ছে তুই অনেক দূরে। ট্রাম লাইনের উপরে, ওটা কী পাখি রে? কাক নয়, চড়ুই, শালিখও নয় দেখছি। এই শহরে পাখি বলতে আর একটাই। ওটা মন পাখি।চোখের কোণে মুকুতা দোলে হাসলে করে আলাে নীলাম্বরী উপচানাে তার কেশের বরণ কালােকনুইতে ব্যান্ড-এজ লাগিয়েছিস কেন? কেটে গেছে। কাটল কী করে? একটা কঠিন ক্যাচ নিতে গিয়ে। এখনও ক্রিকেট খেলে যাচ্ছিস? পরীক্ষার ক’টা দিন বাকি? পরীক্ষার সঙ্গে ক্রিকেটের সম্পর্ক যে ব্যস্তানুপাতিক সেটা জানা ছিল না তাে! সেভেনথ পেপারের প্রিপারেশন কেমন হয়েছে? ফেল করব ওটাতে। আর এইটথ পেপার? ডাহা ফেল। বলতে একটুও লজ্জা করছে না আমার মতন খারাপ ছাত্র কিছু না থাকলে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি যে লাটে উঠবে। বছর বছর একজামিনেশন ফিজ দিয়ে টিকিয়ে রেখেছি তাে আমরাই। ক’ঘন্টা পড়ছিস দিনে? সারা রাত। সকালে প্রথম ট্রামটাকে রওনা করে দিয়ে তবে ঘুমােতে যাই।। সারা রাত পড়ছিস? সারা রাত জাগছি অন্তত। কী করিস, সারা রাত জেগে? ঘুমিয়ে পড়লে কলকাতা শহরকে খুব বােকা বােকা লাগে। ল্যাম্পপােস্টগুলাে হাই তােলে মাঝে মাঝে। আমার পড়ার টেবিলের সামনে যে জানলাটা, ওটার ঠিক উল্টোদিকের রাস্তায় একটা টিউবওয়েল আছে। ওইটা ঘুমের মধ্যে খুব ককথা বলে। তখন নেড়িগুলো এইসা ধমক লাগায় কী বলবো! সারা রাত এইসব পাগলামি? পাগলামি কেন হবে, এ ছাড়াও পরীক্ষায় পাস করার জন্য কত কসরত করি। কাল রাতেই খাতা ভর্তি করে তাের নাম লিখেছি, প্রতি পাতায় ১০৮ বার। কেন? তাের মতন ভাল ছাত্রী আমাদের ডিপার্টমেন্টে আর আছেটা কে? যদি তাের নাম জপ করে উতরে যাই কোনওমতে। শুধুই তাই? না, এছাড়াও আছে। তাের নামটা লিখলে বেশ লাগে দেখতে।কন্যে কন্যে চম্পাবরণ কাজল চক্ষু বশীকরণপরীক্ষার পরে কী করবি? ইচ্ছে আছে জেএনইউতে পড়ার। তুই কিছু ভেবেছিস? ভাবার কিছু নেই তাে। পরের বার পরীক্ষা দেবার জন্য আবার তৈরি হব। তুই সত্যি দিল্লি চলে যাবি? যদি সুযােগ পাই, যাব। পারবিই না যেতে। কাকু কিছুতেই তাের মতন একটা পুঁচকে মেয়েকে দিল্লিতে একা থাকতে দেবেন না। আমি তাের থেকে তিন সপ্তাহের বড় বয়সে এটা মনে রাখিস। আর দিল্লিতে একা থাকব কেন? মাসির বাড়ি আছে তাে। কেন, মাসি দিল্লিতে থাকেন কেন? আর জায়গা পেলেন না থাকার! মাসির দিল্লিতে থাকার কারণটা খুব সহজ। মেসােমশাই থাকেন ওইখানে তাই। কিন্তু তাের এত রাগ কেন দিল্লির উপরে? তুই দিল্লিতে যেতে চাইছিস কেন? পড়াশুনাে করবার জন্য। পড়াশুনাে করার জন্য কলকাতা ছেড়ে চলে যাবি? হ্যাঁ যাব। তুই জানিস, তুই চলে গেলে কলকাতা শহর মুখ গােমড়া করে বসে থাকবে, ভিক্টোরিয়ার পরি ঘুরবে না আর ফুচকাওয়ালারা কবিরাজি ওষুধের কোঅপারেটিভ স্টোর খুলবে? আর তুই কী করবি? তাের সঙ্গে আমার কী? আমি কিছুই করব না।করব নাই বা কেন? সারাদিন ক্রিকেট খেলব, রােজ বিকেলে দুটো করে এগ রােল খাব সেনাপতির দোকান থেকে আর সারা রাত্তির ফুটপাথের সাথে গল্প করব। যা ইচ্ছে করব, যা খুশি করব। কী দরকার তাের এত পড়াশোনা করার শুনি? তুই সারাদিন ক্রিকেট খেলবি, সারা রাত ফুটপাথের সঙ্গে গল্প করবি, বছর বছর পরীক্ষা দিবি, যা ইচ্ছে করবি। আমি যদি পড়াশােনা করে চাকরি না করি, রােজ বিকেলে তােকে দু’টো করে এগ রােল খাওয়াবে কে?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%9b%e0%a6%95-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%aa/
5961
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
শেষ
প্রেমমূলক
বছর শেষের অ্যালবামে চৈত্র এসে আজ থামেছোট্ট শহর, ঘুম-বাড়ি বুকের তলায় রেলগাড়িঝড় না ওঠা এক বছর তোমায় মনে নেই তো ওরএকলা দুপুর দোকলা ট্রাম আমিও তো ঠিক তাই ছিলামতাই ছিলাম বাস স্টপেজ বিষ মেশানো রোদের তেজ এখন সাজায় চৈত্র সেলআটকে যাওয়া পাতালরেল… বাদাম মুড়ির এক ঠোঙা…রাত্রি জুড়ে চাঁদ তোমায় ঠুকরে মারে। শুধুই মার…তবুও তোমার নিউ ইয়ার ঝড় ফেরতের সাহস পাকপাল্টে দাঁড়াও হে বৈশাখ
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%8e-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%80/
5313
শামসুর রাহমান
স্বপ্ন গুঁজে দেয়
মানবতাবাদী
তোমরা আমাকে বুঝি পোষমানা পশু বানিয়ে রাখতে চাও খাঁচার ভেতর? এ জীবনে যা কিছু গৌরবময় তার প্রতি উদাসীন নিত্য খুঁটব আহার্য আর নিজেরই পুরীষে রাত্রিদিন দেব গড়াগড়ি, মাছি বসবে শরীরে যখন তখন, তাড়াবার ইচ্ছাটুকু নির্বাপিত, জমবে আত্মায় শুধু আলস্যের ক্লেদ- এই তো তোমরা চাও, হে আমার প্রাণের স্বজন।আমার স্বপ্নের চারপাশে ছারপোকা ঘোরে, মৃত নক্ষত্রের ছায়া ফিসফিসে কণ্ঠস্বরে কথা বলে কবিতার মেরুন খাতার কানে কানে। সেই কবে কাঁদতে ভুলেছি বলে ফাঁকা দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকি সবুজ ডোবায় নিজের মুখের দিকে। একটি বিষণ্ন পাখি কেঁদে উড়ে যায়।আমার বুকের ডান দিক থেকে বারুদের ঝাঁ ঝাঁ গন্ধ ঝরে যায়, আমার দু’চোখে রক্তছিটা শব্দহীন কলরব করে আর করতলে দুঃস্বপ্নের কাকের করোটি নেচে ওঠে বারে বারে। কোকিলের গানের আশায় কান পাতি, ঘাতকের পদধ্বনি মেরুদণ্ডে হিম মেখে দেয়।আত্যস্ত কঠিন আজ প্রকৃত কবির মতো কণ্ঠে অসত্যের কোলাহল থামিয়ে সত্যের পূর্ণিমায় চতুর্দিক উদ্‌ভাসিত করা। ক্ষিপ্র নেকড়ের কাছে সিংহের চকিত আত্মসমর্পণ অতি শোচনীয় দৃশ্য বটে। রক্তে নেই তারাবাতি-দ্যুতি, তাৎপর্যের আভা ক্রমাগত বহু দূরে সরে যায়। তোমরা দেখছ যাকে এমন বিপন্ন গোধূলিতে, সে-তো আমি নয়। কোথাও সোনালী ঘন্টা বাজে, জাগরণ; খাঁচার ইস্পাতি শিক বেঁকে যায় একে একে, খুলে যায় দ্বার, যেন সূর্যোদয়, এবং শেকল খসে, ছটে যাই বর্শার মতোই উদ্দাম, স্বাধীন; পায়ে মেঘ চুমো খায়, নিরায় শিরায় ভোরবেলাকার রৌদ্র রং ময়ূরের নাচ। ডানাঅলা কে বার্তাবাহক অগোচরে আমার মুঠোয় কিছু স্বপ্ন গুঁজে দেয়।  (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/swapno-guje-dei/
4371
শামসুর রাহমান
আমার কন্ঠস্বর
চিন্তামূলক
আমার চোখের আলো এখনো তো নয় খুব ক্ষীণ- ঘরবাড়ি, গাছপালা, নদী, খোলা পথ, বন্ধ দ্বার, নানা জীবজন্তু দেখি, পাথরের নিচে লোকটার গেরস্থালি, তা-ও দেখি, দৃশ্যাবলী দেখি প্রতিদিন। যদিও বয়স ত্বকে ধুলোরাশি ছড়াচ্ছে মলিন, তবু ও শ্রবণশক্তি অতিশয় প্রখর আমার, এখনো জিভের কাজ চলে নিয়মিত, এই ঘাড় পাহাড়ের মতো, আজো কণ্ঠস্বর তেজী, ক্ষমাহীন।তবে কেন বারংবার দেখেও অনেককিছু আজ না দেখার করি ভান? কেন সাজি বিহ্বল বধির? কেন কণ্ঠস্বর রাখি চেপে সর্বক্ষণ? আর আমি বোবা-কালা সেজে থাকবো না-এ স্বরের কারুকাজ পৌঁছে দেবো মেঘনা নদীর নিচে ব্যাকুল অধীর পাহাড়ে পাহাড়ে-কন্ঠস্বর হবেই সর্বত্রগামী।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-konthoswar/
266
কাজী নজরুল ইসলাম
কবির মুক্তি
ব্যঙ্গাত্মক
মিলের খিল খুলে গেছে! কিলবিল করছিল, কাঁচুমাচু হয়েছিল – কেঁচোর মতন – পেটের পাঁকে কথার কাতুকুতু! কথা কি ‘কথক’ নাচ নাচবে চৌতালে ধামারে? তালতলা দিয়ে যেতে হলে কথাকে যেতে হয় কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে তালের বাধাকে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে! এই যাঃ! মিল হয়ে গেল! ও তাল-তলার কেরদানি – দুত্তোর! মুরগিছানার চিলের মতন টেকো মাথায় ঢিলের মতন পড়বে এইবার কথার বাণ্ডিল। ছন্দ এবার কন্ধকাটা পাঁঠার মতন ছটফটাবে। লটপটাবে লুচির লেচির আটার মতন! অক্ষর আর যক্ষর টাকা গোনার মতো গুনতে হবে না – অঙ্কলক্ষ্মীর ভয়ে কাব্যলক্ষ্মী থাকতেন কুঁকড়োর মতন কুঁকড়ে! ভাবতেন, মিলের চিল কখন দেবে ঠুকরে! আবার মিল!– গঙ্গার দু-ধারে অনেক মিল, কটন মিল, জুট মিল, পেপার মিল – মিলের অভাব কী? কাব্যলোকে মিল থাকবে কেন? ওকে ধুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দাও! ওখানেও যে মিল আছে! ধুলো যদি কুলোয় যায় চুলোয় যায়, হুলো ভুলোয় যদি ল্যাজে মাখে! ল্যাজ কেটে বেঁড়ে করে দেব! এঁড়ে দামড়া আছে যে! আমার মিল আসছে! – মুশকিল আসান।অঙ্কলক্ষ্মীকে মানা করেছিলাম, মিলের শাড়ি কিনতে। অঙ্কলক্ষ্মীর জ্বালায় পঙ্কলক্ষ্মী পদ্ম আর ফোটে না! তা বলতে গেলে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যাবে। এ কবিতা যদি পড়ে গায়ে ধানি লংকা ঘষে দেবে! – আজ যে বিনা প্রয়াসেই অনুপ্রাসের পাল পেয়েছি দেখছি! মিল আসছে – যেন মিলানের মেলায় মেমের ভিড়! নাঃ! – কবিতা লিখি। তাকে দেখেছিলাম – আমার মানসীকে ভেটকি মাছের মতো চেহারা! আমাকে উড়ে বেহারা মনে করেছিল! শাড়ির সঙ্গে যেন তার আড়ি। কাঁখে হাঁড়ি – মাথায় ধামা। জামা ব্লাউজ শেমিজ পরে না। দরকার বা কি? তরকারি বেচে! সরকারি ষাঁড়ের মতন নাদুস-নুদুস! চিচিঙ্গের মতন বেণি দুলছিল।সে যে-দেশের, সে-দেশে আঁচলের চল নাই! চলেন গজ-গমনে। পায়ে আলতা নাই, চালতার রং। নাম বললে – ‘আজুলি’ আমি বললাম – ‘ধ্যেৎ, তুমি কাজুলি।’ হাতে চুড়ি নাই, তুড়ি দেয় আর মুড়ি খায়। গলায় হার নাই, ব্যাগ আছে। পায়ে গোদ, আমি বলি, ‘প্যাগোডা’ সুন্দরী! গান গাই, ‘ওগো মরমিয়া!’ ও ভুল শোনে! ও গায় – ‘ওগো বড়ো মিয়াঁ!’ থাকত হাতে ‘এয়ার গান!’ ও গায় গেঁয়ো সুরে, চাঁপা ফুল কেয়ার গান। – দাঁতে মিশি, মাঝে মাঝে পিসি বলতে ইচ্ছা করে। ডাগর মেয়েরা আমাকে যে হাঙর ভাবে। হৃদয়ে বাঁকুড়ার দুর্ভিক্ষ! ভিক্ষা চাই না, শিক্ষা দিয়ে দেবে। তাই ধরেছি রক্ষাকালীর চেড়িকে। নেংটির আবার বকেয়া সেলাই! কবিতে লেখার মশলা পেলেই হল তা না-ই হল গরম মশলা। – নাঃ, ঘুম আসছে, রান্নাঘরের ধূম আসছে। বউ বলে, নাক ডাকছে, না শাঁখ ডাকছে। আবার মিল আসছে – ঘুম আসছে – দুম্বা ভেড়ার দুম আসছে! -----------------------শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/kabir-mukti/
3840
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রৌদ্রতাপ ঝাঁঝাঁ করে
প্রেমমূলক
রৌদ্রতাপ ঝাঁঝাঁ করে জনহীন বেলা দুপহরে। শূন্য চৌকির পানে চাহি, সেথায় সান্ত্বনালেশ নাহি। বুক ভরা তার হতাশের ভাষা যেন করে হাহাকার। শূন্যতার বাণী ওঠে করুণায় ভরা, মর্ম তার নাহি যায় ধরা। কুকুর মনিবহারা যেমন করুণ চোখে চায়— অবুঝ মনের ব্যথা করে হায়-হায়— কী হল যে, কেন হল কিছু নাহি বোঝে, দিনরাত ব্যর্থ চোখে চারি দিকে খোঁজে। চৌকির ভাষা যেন আরো বেশি করুণ কাতর, শূন্যতার মূক ব্যথা ব্যাপ্ত করে প্রিয়হীন ঘর।   (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/roudrotap-jhajha-kore/
2002
বিষ্ণু বিশ্বাস
রাতের সঙ্গীত
চিন্তামূলক
(রুকু ও কমলকে)গভীর সমুদ্রের নোনা হাড় নোনা দাঁতে তৃষ্ণা আমার জল দেবে একটু আমাকে শীতল জলের প্রাণ? শ্যাওলা শাড়ির বহু বহু নারী তোমাদের ঝর্ণাধারা শত শত পতাকার মতো হলদে সঙ্গীত হবে যখন ভোর হবে, ভোরের আকাশের নীল চোখে গান বন্ধ হোক, আপাতত থেমে যাক কোলাহল কলস্বরে কাটে দুপুর বিকাল গভীর রাতে আদ্য জলের তৃষ্ণা আমার নোনা হাড় নোনা দাঁতের।থেমে থাক, লাল লাল বোতলে সৌগন্ধ স্থির জলভারে অপূর্ব অন্তর উৎসারিত শান্ত কান্ত জল তোমাদের আর নোনা হাড়ের আঘাতে ঝরুক আদর? নোনা দাঁতে নোনা হাড়ে। তারপরে সাগরের অজানা গুহায় মানব আমি দাঁড়াব এসে সম্মুখে তোমার তোমাদের ঝর্ণাধারা শাদা শাদা পতাকার মতো হলদে সঙ্গীত হবে যখন ভোর হবে ভোরের আকাশের নীল চোখে।
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/01/%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%81-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d/
1812
পূর্ণেন্দু পত্রী
গাছপালাগুলো
রূপক
গাছপালাগুলো যেন কেমন হয়ে গেছে আজকাল। কেউ কেউ স্মান করেনি কতদিন কেউ কেউ চুল কাটেনি কতদিন কেউ কেউ বাসি জামাকাপড় পরে আছে কতদিন। মনে হয় মাঝরাতে ঘুসঘুসে জ্বর হয় কারো কারো কারো কারো হাঁপানির শ্বাসকষ্ট শুনতে পাই মাঝরাতে স্বপ্নের মধ্যে এপাশ-ওপাশ আইঢাই করে কেউ কেউ। কেউ কেউ নিশ্বাস ফেলে আগুনে হাপরের মতো। গাছপালাগুলো সত্যি সত্যি কেমন হয়ে গেছে আজকাল। একটু সব্য-ভব্য হ। বাইরে যখন ঝড়-ঝাপটার ওলোট-পালোট হাওয়া ঘরে শুয়ে বসে থাক দুদণ্ড। দেখছিস তো দিনকাল খারাপ মেঘে মেঘে দলা পাকাচ্ছে গোপন ফিসফাস দেখছিস তো ইট চাপা পড়ে ঘাসের রঙ হলুদ। দেখছিস তো যে-পাখি উড়তে চায় তার ডানায় রক্ত। একটু সাবধান সতর্ক হ। সে-সব কথা কানে ঢোকে নাকি বাবুদের? উড়নচন্ডের মতো কেবল ঘুরছে আর পুড়ছে, যেন এক একটি বদরাগী বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র। এক-একদিন না চেঁচিয়ে পারি না। -ও হতভাগারা! যাচ্ছিস কোন চুলোয়? -ভাঙতে। -কী? -সেই সব থাম, যাদের গায়ে সাত শতাব্দীর ফাটল। -তারপর? -সেই সব পাথর, যাদের দেবতা সাজিয়ে আরতি হচ্ছে ভুল মন্ত্রে। -তারপর? -সেই সব তালা, যার ভিতরে ডাঁই হয়ে আছে যুগ যুগান্তের লুটের মাল। -তাহলে ফুল ফোটাবি কবে? -আগে আগে- গা লাগিয়ে অরণ্যহই পরাস্ত অন্ধকারের কবর খুঁড়ি এঁদো জঙ্গলে তারপর ডালপালা ঝাঁপিয়ে ফুল ফুলের মশাল জ্বালিয়ে আহলাদে আটখানা হৈ হৈ উৎসব। -তবে মরগে যা! মরে আকাশ পিদিম হ। এই বলে আমি খিল তুলে দিই আমার খিড়কি দরজায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1208
3278
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নদীপথে
প্রকৃতিমূলক
গগন ঢাকা ঘন মেঘে, পবন বহে খর বেগে। অশনি ঝনঝন ধ্বনিছে ঘন ঘন, নদীতে ঢেউ উঠে জেগে। পবন বহে খর বেগে। তীরেতে তরুরাজি দোলে আকুল মর্মর-রোলে। চিকুর চিকিমিকে চকিয়া দিকে দিকে তিমির চিরি যায় চলে। তীরেতে তরুরাজি দোলে। ঝরিছে বাদলের ধারা বিরাম-বিশ্রামহারা। বারেক থেমে আসে, দ্বিগুণ উচ্ছ্বাসে আবার পাগলের পারা ঝরিছে বাদলের ধারা। মেঘেতে পথরেখা লীন, প্রহর তাই গতিহীন। গগন-পানে চাই, জানিতে নাহি পাই গেছে কি নাহি গেছে দিন; প্রহর তাই গতিহীন। তীরেতে বাঁধিয়াছি তরী, রয়েছি সারা দিন ধরি। এখনো পথ নাকি অনেক আছে বাকি, আসিছে ঘোর বিভাবরী। তীরেতে বাঁধিয়াছি তরী। বসিয়া তরণীর কোণে একেলা ভাবি মনে মনে– মেঝেতে শেজ পাতি সে আজি জাগে রাতি, নিদ্রা নাহি দুনয়নে। বসিয়া ভাবি মনে মনে। মেঘের ডাক শুনে কাঁপে, হৃদয় দুই হাতে চাপে। আকাশ-পানে চায়, ভরসা নাহি পায়, তরাসে সারা নিশি যাপে, মেঘের ডাক শুনে কাঁপে। কভু বা বায়ুবেগভরে দুয়ার ঝনঝনি পড়ে। প্রদীপ নিবে আসে, ছায়াটি কাঁপে ত্রাসে, নয়নে আঁখিজল ঝরে, বক্ষ কাঁপে থরথরে। চকিত আঁখি দুটি তার মনে আসিছে বার বার। বাহিরে মহা ঝড়, বজ্র কড়মড়, আকাশ করে হাহাকার। মনে পড়িছে আঁখি তার। গগন ঢাকা ঘন মেঘে, পবন বহে খর বেগে। অশনি ঝনঝন ধ্বনিছে ঘন ঘন, নদীতে ঢেউ উঠে জেগে। পবন বহে আজি বেগে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/427.html
3932
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমালোচক
ছড়া
বাবা নাকি বই লেখে সব নিজে। কিছুই বোঝা যায় না লেখেন কী যে! সেদিন পড়ে শোনাচ্ছিলেন তোরে, বুঝেছিলি? - বল্‌ মা, সত্যি করে। এমন লেখায় তবে বল্‌ দেখি কী হবে।।তোর মুখে মা, যেমন কথা শুনি তেমন কেন লেখেন নাকো উনি। ঠাকুরমা কি বাবাকে কক্‌খনো রাজার কথা শোনায় নিকো কোনো? সে-সব কথাগুলি গেছেন বুঝি ভুলি?স্নান করতে বেলা হল দেখে তুমি কেবল যাও, মা, ডেকে ডেকে - খাবার নিয়ে তুমি বসেই থাকো, সে কথা তাঁর মনেই থাকে নাকো। করেন সারা বেলা লেখা-লেখা খেলা।।বাবার ঘরে আমি খেলতে গেলে তুমি আমায় বল 'দুষ্টু' ছেলে! বকো আমায় গোল করলে পরে, 'দেখছিস নে লিখছে বাবা ঘরে!' বল্‌ তো, সত্যি বল্‌ , লিখে কী হয় ফল।।আমি যখন বাবার খাতা টেনে লিখি বসে দোয়াত কলম এনে - ক খ গ ঘ ঙ হ য ব র, আমার বেলা কেন, মা, রাগ কর! বাবা যখন লেখে কথা কও না দেখে।।বড়ো বড়ো রুল-কাটা কাগোজ নষ্ট বাবা করেন না কি রোজ? আমি যদি নৌকো করতে চাই অম্‌নি বল 'নষ্ট করতে নাই'। সাদা কাগজে কালো করলে বুঝি ভালো ?  (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/somalochok/
2979
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গব্বুরাজার পাতে ছাগলের কোর্‌মাতে
হাস্যরসাত্মক
গব্বুরাজার পাতে ছাগলের কোর্‌মাতে যবে দেখা গেল তেলা- পোকাটা রাজা গেল মহা চ’টে, চীৎকার করে ওঠে,– “খানসামা কোথাকার বোকাটা।’ মন্ত্রী জুড়িয়া পাণি কহে, “সবই এক প্রাণী।’ রাজার ঘুচিয়া গেল ধোঁকাটা। জীবের শিবের প্রেমে একদম গেল থেমে মেঝে তার তলোয়ার ঠোকাটা।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gobburjar-pate-chagoler-kormate/
4305
শামসুর রাহমান
অন্ধকার থেকে আলোয়
চিন্তামূলক
মধ্যরাতে কোনার ছোট ঘরে টেবিল-ল্যাম্প জ্বলতেই আমার কলম বিরক্তিতে বেজায় খুসখুস করতে লাগল ডান হাতের তিন আঙুলের চাপে। কলমটিকে যত রাখতে চাই টেবিলে ততই যেন ওর জেদ চেপে যায়, সরে না কিছুতেই। কে যেন জেদ ধরেছে শূন্য পাতাটি ভ’রে তুলবেই অক্ষরে।যতই কলমটিকে লুকিয়ে রাখতে চাই চোখের আড়ালে টেবিলের ড্রয়ারে, কিছু বইপত্রের নিচে কবর দিয়ে তত বেশি লাফিয়ে ওঠে সে আমার হাতে। মুচকি হাসে যেন বেজায় পেয়েছে মজা। কলমের কাণ্ড দেখে হাসব নাকি কাঁদব ঠিক করা মুশকিল ভীষণ। মনে হল, অদূরে গাছের ডালে এক হল্‌দে পাখি আমার দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে কৌতুকী হাসি।পাখিটি কি ভাবছে ভ্যাবাচ্যাকা-খাওয়া লোকটা জীবনের প্রায় শেষ সীমানায় পৌছে ভীষণ হাবুডুবু খাচ্ছে? গাছতলায় এসে গলায় দেবে কি দড়ি? কে জানে? আবার আনন্দের কত মেলা বসে নানা দিকে-আলোর ফোয়ারা ফোটে। এই তো আরও আচানক দিগ্বিদিক যুবক, যুবতী জ্বলজ্বলে নিশান কাঁধে নিয়ে হতাশার তিমির তাড়িয়ে বালক, বালিকা, বৃদ্ধ, বৃদ্ধার মুখে ফোটায় হাসি।   (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ondhokar-theke-aloi/
2907
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কী কথা বলিব বলে
ভক্তিমূলক
কী কথা বলিব বলে বাহিরে এলেম চলে, দাঁড়ালেম দুয়ারে তোমার– ঊর্ধ্বমুখে উচ্চরবে বলিতে গেলেম যবে কথা নাহি আর। যে কথা বলিতে চাহে প্রাণ সে শুধু হইয়া উঠে গান। নিজে না বুঝিতে পারি, তোমারে বুঝাতে নারি, চেয়ে থাকি উৎসুক-নয়ান।তবে কিছু শুধায়ো না– শুনে যাও আনমনা, যাহা বোঝ, যাহা নাই বোঝ। সন্ধ্যার আঁধার-পরে মুখে আর কণ্ঠস্বরে বাকিটুকু খোঁজো। কথায় কিছু না যায় বলা, গান সেও উন্মত্ত উতলা। তুমি যদি মোর সুরে নিজ কথা দাও পুরে গীতি মোর হবে না বিফলা।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ki-kotha-bolibo-bole/
4335
শামসুর রাহমান
আকাশে অনেক মুখ
মানবতাবাদী
এ কেমন সন্ধ্যা ঘিরে ধরেছে আমার প্রিয় এই শহরকে আজ। চতুর্দিকে গুঁড়িয়ে পড়ছে ঘরবাড়ি। নরনারী, শিশুদের বুকফাটা কান্নায় কাঁপছে পথঘাট, গাছপালা। এই তো নিজেকে আমি ইট, পাথরের স্তূপ থেকে আহত শরীর তুলে দেখি আশেপাশে, সবদিকে অগণিত লাশ, কোনও কোনও স্থানে ভাঙা পুতুল-জড়ানো হাতে নিষ্প্রাণ বালিকা। আমাদের ছোট ঘরবাড়ি খুঁজে খুঁজে আখেরে অধিকতর ক্লান্ত শরীরে অজানা জায়গায় ভগ্নস্তূপে বসে পড়ি। হঠাৎ সমুখে একটি ধূসর খাতা দেখে দ্রুত হাতে তুলে দিই। আবিষ্কৃত খাতার প্রথম দুটি পাতা গায়েব হলেও অবশিষ্ট বেশ কটি পাতা জুড়ে রয়েছে কবিতা, সত্যি বলতে কী, কতিপয় পদ্য পড়তেই উদ্ভাসিত প্রকৃত কবির পরিচয়। কখন যে রাত ওর কোমল শরীর নিয়ে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে, অদূরে গাছের পাতাময় ডাল থেকে পাখির নিঝুম গান ঝরে জ্যোৎস্নার ধরনে। ভেসে ওঠে আকাশে অনেক মুখ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/427
5560
সুকুমার রায়
অন্ধ মেয়ে
চিন্তামূলক
গভীর কালো মেঘের পরে রঙিন ধনু বাঁকা, রঙের তুলি বুলিয়ে মেঘে খিলান যেন আঁকা! গবুজ ঘাসে রোদের পাশে আলোর কেরামতি রঙিন্ বেশে রঙিন্ ফুলে রঙিন্ প্রজাপতি! অন্ধ মেয়ে দেখ্ছে না তা – নাইবা যদি দেখে- শীতল মিঠা বাদল হাওয়া যায় যে তারে ডেকে! শুনছে সে যে পাখির ডাকে হরয কোলাকুলি মিষ্ট ঘাসের গন্ধে তারও প্রাণ গিয়েছে ভুলি! দুঃখ সুখের ছন্দে ভরা জগৎ তারও আছে, তারও আধার জগৎখানি মধুর তারি কাছে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/343
1429
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
মেঘের আড়ালে
প্রেমমূলক
তোমাকে ভোলার সাধ্য নাই তাই বারবার ফিরে আসা তোমার দরজায় তুমি থাকো অন্তরালে ছায়ার ভিতরে মেঘ হয়ে উড়ে যাও মেঘের আড়ালে হাহাকার করে উঠে তোমার গেটের পাশে পড়ে থাকি চৈত্রের আকাশ ভেঙে ঝাঁক ঝাঁক বৃষ্টি নামে মৃত্তিকায় পাথরে শিলায় তোমার উদাস চোখ হয়তো-বা চেয়ে থাকে সুদূর পথের প্রান্তে পড়ে থাকা একজোড়া চোখে আমার হৃদয় ছিঁড়ে সহসাই জ্বলে ওঠে অগ্নিময় শিখা এশিয়ার শান্ত দূর করুণ শহর পুড়ে যায় আগুনের নীল উত্তাপে ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1047
399
কাজী নজরুল ইসলাম
ফাতেমা দুলাল কাঁদে
ভক্তিমূলক
ফোরাতের পানিতে নেমে ফাতেমা দুলাল কাঁদে অঝোর নয়নে রে। দু'হাতে তুলিয়া পানি ফেলিয়া দিলেন অমনি পড়িল কি মনে রে।।দুধের ছাওয়াল আসগর এই পানি ছাহিয়ে রে দুষ্মনের তীর খেয়ে বুকে ঘুমাল খুন পিয়ে রে, শাদীর নওশা কাসেম শহীদ এই পানি বহনে রে।।এই পানিতে মুছিল রে হাতের মেহেদী সকীনার, এই পানিরই ঢেউয়ে ওঠে তারি মাতম হাহাকার, শহীদানের খুন মিশে আছে এই পানিরই সনে রে।।বীর আব্বাসের বাজু শহীদ হলো এরি তরে রে, এই পানি বিহনে জয়নাল খিমায় তৃষ্ণায় মরে রে, শোকে শহীদ হলেন হোসেন জয়ী হয়েও রণে রে।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/fatema-dulal-kadey/
4051
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে নিস্তব্ধ গিরিরাজ
সনেট
হে নিস্তব্ধ গিরিরাজ, অভ্রভেদী তোমার সংগীত তরঙ্গিয়া চলিয়াছে অনুদাত্ত উদাত্ত স্বরিত প্রভাতের দ্বার হতে সন্ধ্যার পশ্চিমনীড়-পানে দুর্গম দুরূহ পথে কী জানি কী বাণীর সন্ধানে! দুঃসাধ্য উচ্ছ্বাস তব শেষ প্রান্তে উঠি আপনার সহসা মুহূর্তে যেন হারায়ে ফেলেছে কণ্ঠ তার, ভুলিয়া গিয়াছে সব সুর — সামগীত শব্দহারা নিয়ত চাহিয়া শূন্যে বরষিছে নির্ঝরিণীধারা।হে গিরি,যৌবন তব যে দুর্দম অগ্নিতাপবেগে আপনারে উৎসারিয়া মরিতে চাহিয়াছিল মেঘে সে তাপ হারায়ে গেছে, সে প্রচণ্ড গতি অবসান — নিরুদ্দেশ চেষ্টা তব হয়ে গেছে প্রাচীন পাষাণ। পেয়েছ আপন সীমা, তাই আজি মৌন শান্ত হিয়া সীমাবিহীনের মাঝে আপনারে দিয়েছ সঁপিয়া।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/he-nistobdho-giriraj/
5060
শামসুর রাহমান
ভায়োলেন্স
মানবতাবাদী
শুধু কি ক্ষয়িষ্ণু গ্রামে-গঞ্জে লাঠিসোটা গজরানো বাবরি (ঝড়মত্ত বৃক্ষচূড়া) ভাটা-চোখ, শক্ত কব্জি, রামদা সড়কি আফ্রিকার জুলুদের মতো নেচে ওঠে সংহার নেশায়?শহুরে গলিতে, চোরাস্তায় আলোকিত ফোয়ারার কাছাকাছি, তাড়ি-বুঁদ, শূন্য-হাঁড়ি মহল্লায় হৈ-হল্লা, দাঁত-নখ খিঁচানো প্রহর কটমট তাকায় চৌদিকে, যেন ডালকুত্তা। ইস্তিকরা কাপড়ের মতো কলোনীও অকস্মাৎ বন্দুকের নল, তপ্ত ধোঁয়াময় হয়, রক্তবমি করে সারি সারি ফ্ল্যাটে শহরে শহরে নানা দেশে ঋতুতে ঋতুতে। মেঘে মেঘে অন্ধকার পাতালে এবং দূর পবর্ত শিখরে ধূ ধূ মরুবক্ষে কালান্তক স্বরে অস্ত্র হেঁকে যায়। জলপাইরঙ কিংবা খাকি ইউনিফর্মের ভিড় গোলাপ বাগানে, আপেল বাগানে, শস্যক্ষেতে। রাশি রাশি ভারি বুট পাথরে কাদায় বাজে বনবাদাড়ে এবং সংখ্যাহীন হেলমেটে মাইল মাইল-ব্যাপী সূর্যমুখী ঘন ছায়াচ্ছন্ন হয়ে যায়।মনের ভেতরে খণ্ড প্রলয়ের উন্মত্ত ঝাপটায় মধ্যবিত্ত প্রেমিকের চোখে ওথেলোর ভীষণ সবুজ চোখ নিমেষে প্রবেশ করে, অতিশয় কর্কশ রাত্রির কিনারায় বিচুর্ণ স্বপ্নের মতো, একরাশ বিমর্দিত জুঁইয়ের মতোন প্রেমিকা নিঃসাড় পড়ে থাকে। নানা রাষ্ট্র, বিশেষত উন্নতি-ঊর্মিল, আদিবাসীদের মতো মদির উল্লাসে ধূপ-ধুনো অথবা আগরবাতি জ্বেলে নিয়ত বন্দনা করে নানাধর্মী বোমাকেই। সুদুর দিগন্ত, লোকালয়, দ্বীপপুঞ্জ মুছে-ফেলা। ঝড়ের পরেও কোনোদিন কূল পাবো কি পাবো না। না জেনেই সঙ্গীহীন, পানির দংশনে জর্জরিত একা, প্রায় ক্ষয়ে-যাওয়া মান্দাস আকঁড়ে ধরে ভেসে চলি ক্ষুধার্ত সমুদ্রের ভেসে চলি।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/violens/
948
জীবনানন্দ দাশ
উদয়াস্ত (অগ্রন্থিত)
চিন্তামূলক
সূর্যের উদয় সহসা সমস্ত নদী চমকিত ক'রে ফেলে- অকস্মাৎ দ্যাখা দিয়ে- চ'লে যায়; হাড়ের ভিতরে মেঘেদের অন্ধকার; স্তম্ভিত বন্ধুর মতো ভোর এইখানে সাধু রাত্রির হাত ধ'রে তাকে শ্রেয়তর চালানির মূল জেনে নিখিলের- মৃত মাংসের স্তুপ চারিদিকে; তার মাঝে ধন্বন্তরি, কালনেমি কিছু চায়; দুস্তর চাদর গায়ে অন্ধ বাতাসের। সূর্য তবু- সূর্য যেন জ্যোতি প্রতিবিম্ব রেখে গেছে তরবারে- ভাঁড়ের হৃদয়ে, ধর্মোশোকের মনে।করজোড়ে ভাবে তারা; ঝলিছে সারস শব ঢের বৈতরনী তরঙ্গের দিকে ভেসে যেতে- যেতে লোকোত্তর সূর্যের আমোদে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/udoyasto/
3079
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মবাসরের ঘটে
চিন্তামূলক
জন্মবাসরের ঘটে নানা তীর্থে পুণ্যতীর্থবারি করিয়াছি আহরণ, এ কথা রহিল মোর মনে। একদা গিয়েছি চিন দেশে, অচেনা যাহারা ললাটে দিয়েছে চিহ্ন "তুমি আমাদের চেনা' ব'লে। খসে পড়ে গিয়েছিল কখন পরের ছদ্মবেশ; দেখা দিয়েছিল তাই অন্তরের নিত্য যে মানুষ; অভাবিত পরিচয়ে আনন্দের বাঁধ দিল খুলে। ধরিনু চিনের নাম, পরিনু চিনের বেশবাস। এ কথা বুঝিনু মনে, যেখানেই বন্ধু পাই সেখানেই নবজন্ম ঘটে। আনে সে প্রাণের অপূর্বতা। বিদেশী ফুলের বনে অজানা কুসুম ফুটে থাকে-- বিদেশী তাহার নাম, বিদেশে তাহার জন্মভূমি, আত্মার আনন্দক্ষেত্রে তার আত্মীয়তা অবারিত পায় অভ্যর্থনা।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/janmobashara-gatay/
3139
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তব জন্মদিবসের দানের উৎসবে
চিন্তামূলক
তব জন্মদিবসের দানের উৎসবে বিচিত্র সজ্জিত আজি এই প্রভাতের উদয়-প্রাঙ্গণ। নবীনের দানসত্র কুসুমে পল্লবে অজস্র প্রচুর। প্রকৃতি পরীক্ষা করি দেখে ক্ষণে ক্ষণে আপন ভাণ্ডার, তোমারে সম্মুখে রাখি পেল সে সুযোগ। দাতা আর গ্রহীতার যে সংগম লাগি বিধাতার নিত্যই আগ্রহ আজি তা সার্থক হল, বিশ্বকবি তাহারি বিস্ময়ে তোমারে করেন আশীর্বাদ— তাঁর কবিত্বের তুমি সাক্ষীরূপে দিয়েছ দর্শন বৃষ্টিধৌত শ্রাবণের নির্মল আকাশে ।   (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tobo-jonmodiboser-daner-utsobe/
5408
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
পাল্কীর গান
ছড়া
পাল্কী চলে! পাল্কী চলে! গগন-তলে আগুন জ্বলে!স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গায়ে যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারাময়রামুদি চক্ষু মুদি’ পাটায় ব’সে ঢুলছে ক’ষে।দুধের চাঁছি শুষছে মাছি, উড়ছে কতক ভনভনিয়ে। আসছে কা’রা হন্ হনিয়ে? হাটের শেষে রুক্ষ বেশে ঠিক দু’পুরে ধায় হাটুরে!কুকুর গুলো শুঁকছে ধূলো, ধুঁকছে কেহ ক্লান্ত দেহ।গঙ্গা ফড়িং লাফিয়ে চলে; বাঁধের দিকে সূর্য্য ঢলে।পাল্কী চলে রে, অঙ্গ টলেরে! আর দেরি কত? আর কত দূর?
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/palkir-gaan/
4978
শামসুর রাহমান
বড় দীর্ঘ সময়
চিন্তামূলক
পথ শক্ত অথচ মসৃণ ছিল অনেকটা, হেঁটে যেতে যেতে যেতে অকস্মাৎ পা দু’টি কাদায় ডুবে যায়। মনে হল সম্ভবত ডুবে যাব আপাদমস্তক। দম বন্ধ হয়ে এল প্রায়, কোনও মতে মাথা উঁচু রেখে শ্বাস নিতে থাকি, সজোরে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ি।আবার নতুন ছাঁদে পথ চলা সম্মুখে কায়েম রাখি, আরও কতদূর যেতে হবে, কোন্‌ বিপদের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা ওঁৎ পেতে আছে, কে আমাকে বলে দেবে এই কৃষ্ণপক্ষে? পদযুগ বিগড়ানো, মাথার উপর ঘোরে খাপছাড়া পাখি।পাখিটা কি অশুভ সঙ্কেত কোনও? নাকি ভীষণ বেয়াড়া মাংসভুক? অতিশয় ক্লান্তি দুটি চোখ বুজলেই অতিপয় অচেনা চেহারা ভয়ঙ্কর বিকৃত আদলে দেখা দেয় বার বার, কেড়ে নেয় স্বস্তি; দৃষ্টি জ্বেলে নিই ফের।‘শোনও পথচারী, এখানেই এই বিয়াবানে যাত্রা থামিও না, ওঠো, মুছে ফেলে ক্লান্তির কুয়াশা যত পারও জোর কদমে এগোও’,-মেঘমালা চিরে যেন কার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। গোধূলির রঙ মুছে যাওয়ার আগেই ত্বরিত কদমে হাঁটি স্বপ্নাদ্য স্বর্ণিল আস্তানার অভিমুখে।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/boro-dirgho-somoy/
5636
সুকুমার রায়
নূতন বৎসর
ছড়া
'নূতন বছর ! নূতন বছর !' সবাই হাঁকে সকাল সাঁঝে আজকে আমার সূর্যি মামার মুখটি জাগে মনের মাঝে । মুস্কিলাসান করলে মামা, উস্কিয়ে তার আগুনখানি, ইস্কুলেতে লাগ্‌ল তালা, থাম্‌ল সাধের পড়ার ঘানি । এক্‌জামিনের বিষম ঠেলা চুক্‌ল রে ভাই ঘুচ্ল জ্বালা, নূতন সালের নূতন তালে হোক্‌ তবে আস 'হকির' পালা । কোন্‌খানে কোন্‌ মেজের কোণে, কলম কানে, চশমা নাকে, বিরামহারা কোন্‌ বেচারা দেখেন কাগজ, ভয় কি তাঁকে ? অঙ্কে দিবেন হকির গোলা, শঙ্কা ত নাই তাহার তরে, তঙ্কা হাজার মিলুক তাঁহার, ডঙ্কা মেরে চলুন ঘরে । দিনেক যদি জোটেন খেলায় সাঁঝের বেলায় মাঠের মাঝে, 'গোল্লা' পেয়ে ঝোল্লা ভরে আবার না হয় যাবেন কাজে ! আয় তবে আয়, নবীন বরষ ! মলয় বায়ের দোলায় দুলে, আয় সঘনে গগন বেয়ে, পাগলা ঝড়ের পালটি তুলে । আয় বাংলার বিপুল মাঠে শ্যামল ধানের ঢেউ খেলিয়ে, আয়রে সুখের ছুটির দিনে আম-কাঁটালের খবর নিয়ে ! আয় দুলিয়ে তালের পাখা, আয় বিছিয়ে শীতল ছায়া, পাখির নীড়ে চাঁদের হাটে আয় জাগিয়ে মায়ের মায়া । তাতুক না মাঠ, ফাটুক না কাঠ, ছুটুক না ঘাম নদীর মত, জয় হে তোমার, নূতন বছর ! তোমার যে গুণ, গাইব কত ? পুরান বছর মলিন মুখে যায় সকলের বালাই নিয়ে, ঘুচ্‌ল কি ভাই মনের কালি সেই বুড়োকে বিদায় দিয়ে ? নূতন সালে নূতন বলে, নূতন আশায়, নুতন সাজে, আয় দয়ালের নাম লয়ে ভাই, যাই সকলে যে যার কাজে !
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/nuton-botsor/
5203
শামসুর রাহমান
লোকটার কাহিনী
চিন্তামূলক
একজন লোক, যার চালচুলো নেই, ঝরে গ্যাছে ফুটো পকেটের বিবর্ণ মানি ব্যাগের মতো যার সংসার যে স্বপ্নের ভগ্নাংশ কুড়োতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় বারংবার, ট্রাফিক-অরণ্যে পরীর আর্তনাদ শুনতে শুনতে, পালাতে পালাতে অবসন্ন সন্ধ্যার ঠোঁটে ওষ্ঠে চেপে কোথাও এক কোণে ঘুমোতে চায় কিছুক্ষণ। তার শুকনো মুখে ঝরে স্মৃতির মতো একরাশ পাতা, হাওয়া এলোমেলো করে দেয় রুক্ষ চুল, কয়েকটি পাখি ভীষণ হল্লা করে বিকেলকে কাঁপিয়ে ওড়ে দিগ্ধিদিক। সে হয় অবসাদগ্রস্ত, তার মুখ নিদ্রার স্তনে গচ্ছিত,- যেন কোনো প্রৌঢ় মণিরত্নের ঠিকরোনো আলোর মতো ব্যাকুলতায় মুখ ঘষে তন্বী-সত্তায় এবং তার নিজেকে মনে হয় ভাঙা বাবুই পাখির বাসার মতো।লোকটা সন্ধ্যাকে সমুদ্র ভেবে ভাসায় নিজস্ব জলযান, গাভিন গাভির মতো পালে লাগে দিগন্তের ঘ্রাণ, অকস্মাৎ সে দ্যাখে, গলুইয়ে এক তরুণী, জল-ছুঁই-ছুঁই তার চুল, মসৃণ, ছন্দিত হাত, চোখে পৌরাণিক সৌন্দর্যের বিস্ময়, দৃষ্টি তারই দিকে নিবদ্ধ, সে সোনালি বর্শিতে বিদ্ধ। লোকটা রত্নদ্বীপের জাগরণ অনুভব করে নিজের ভেতরে আর তন্বীর সামনে নতজান, হয়ে সে বলে- আমাকে দিয়েছো তুমি নতুনের সাহস, যৌবনের অহংকার।লোকটার কাহিনী, যদি কাহিনী বলা যায় একে, এখানে শেষ হলেই ছিল ভালো, মোটামুটি তৃপ্তিকর। কিন্তু তা হওয়ার নয় কস্মিনকালেও। অন্য পরিণাম ওঁৎ পেতে আছে তার জন্যে, ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে যে কোনো সময়- যেমন তার নৌকো হঠাৎ ফুটো হয়ে যাবে কিংবা সে নিজেই পুড়িয়ে ফেলবে নিজস্ব চন্দ্রোপণ জলযান অথবা দু’দিকে বিস্মৃত যুগল পথের কোনটিকে ঠিক পথ ভেবে এগোবে, মনস্থির করতে না পেরেকেবলি পথের ধারে যাবে আর ফিরে আসবে বারে বারে। হয়তো সে সারাক্ষণ পার্কের বেঞ্চিতে বসে আরাধনা করবে নীরবতার আর সন্ধ্যামালতীর সান্নিধ্যের স্বপ্ন দেখবে ঝিমুতে ঝিমুতে অথবা বিস্কুট চিবুতে চিবুতে, হয়তো বা মন দেবে মূলো আর গাজর ফলানোয়, গো-পালনে, হেঁটে যাবে সর্ষে ক্ষেত্রের ভেতরে, জোনাকিতে ছেয়ে যাবে সমস্ত শরীর কোনো কোনো রাতেকিংবা পতঙ্গরূপে সকাল-সন্ধ্যা উড়ে বেড়াবে ছমছমে পোড়োবাড়ি আর গোরস্তানে। কাহিনীর সমাপ্তির তাগিদে। লোকটার সম্ভাব্য পরিণামের যে কোনো একটি, যার যেমন ইচ্ছে, বেছে নিতে পারে। আপত্তি জানানোর জন্যে সে একটা আঙুলও নাড়বে না।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/loktar-kahini/
3230
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুই
মানবতাবাদী
শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে। বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’ কহিলাম আমি, ‘তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই – চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই। শুনি রাজা কহে, ‘বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা, পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা – ওটা দিতে হবে।’ কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি সজল চক্ষে, ‘করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি। সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া, দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!’ আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে, কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবে।’পরে মাস-দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে – করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে। এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে, তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে। সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য – কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য। ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি। হাটে মাঠে বাটে এইমত কাটে বছর পনেরো-ষোলো, একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হল।।নমোনমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি! গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি। অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধুলি – ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি। পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ – স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল নিশীথশীতলস্নেহ। বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে। দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে – কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথতলা করি বামে, রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।।ধিক্ ধিক্ ওরে, শত ধিক্ তোরে নিলাজ কুলটা ভূমি, যখনি যাহার তখনি তাহার – এই কি জননী তুমি! সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাক-পাতা! আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ – পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ! আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন, তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন! ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন – কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন! কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ী, ক্ষুধাহরা সুধারাশি। যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী – হলে দাসী।।বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি – প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে সেই আমগাছ একি! বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা, একে একে মনে উদিল স্মরণে বালককালের কথা। সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম, অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম। সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন – ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন। সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে, দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে। ভাবিলাম মনে, বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা। স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।।হেনকালে হায় যমদূতপ্রায় কোথা হতে এল মালী। ঝুঁটিবাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি। কহিলাম তবে, ‘আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব – দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব।’ চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ; বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ – শুনে বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, ‘মারিয়া করিব খুন।’ বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ। আমি কহিলাম, ‘শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!’ বাবু কহে হেসে, ‘বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!’ আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোরে ঘটে – তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।।শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে। বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’ কহিলাম আমি, ‘তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই – চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই। শুনি রাজা কহে, ‘বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা, পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা – ওটা দিতে হবে।’ কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি সজল চক্ষে, ‘করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি। সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া, দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!’ আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে, কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবে।’পরে মাস-দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে – করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে। এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে, তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে। সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য – কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য। ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি। হাটে মাঠে বাটে এইমত কাটে বছর পনেরো-ষোলো, একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হল।।নমোনমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি! গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি। অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধুলি – ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি। পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ – স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল নিশীথশীতলস্নেহ। বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে। দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে – কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথতলা করি বামে, রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।।ধিক্ ধিক্ ওরে, শত ধিক্ তোরে নিলাজ কুলটা ভূমি, যখনি যাহার তখনি তাহার – এই কি জননী তুমি! সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাক-পাতা! আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ – পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ! আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন, তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন! ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন – কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন! কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ী, ক্ষুধাহরা সুধারাশি। যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী – হলে দাসী।।বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি – প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে সেই আমগাছ একি! বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা, একে একে মনে উদিল স্মরণে বালককালের কথা। সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম, অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম। সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন – ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন। সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে, দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে। ভাবিলাম মনে, বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা। স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।।হেনকালে হায় যমদূতপ্রায় কোথা হতে এল মালী। ঝুঁটিবাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি। কহিলাম তবে, ‘আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব – দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব।’ চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ; বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ – শুনে বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, ‘মারিয়া করিব খুন।’ বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ। আমি কহিলাম, ‘শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!’ বাবু কহে হেসে, ‘বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!’ আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোরে ঘটে – তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%98%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a5/
4082
রুদ্র গোস্বামী
বৃষ্টি
প্রেমমূলক
বৃষ্টি বৃষ্টি জলে জলে জোনাকি আমি সুখ যার মনে তার নাম জানো কী ?মেঘ মেঘ চুল তার অভ্রের গয়না নদী পাতা জল চোখ ফুলসাজ আয়না। বৃষ্টি বৃষ্টি কঁচুপাতা কাঁচ নথ মন ভার জানালায় রাতদিন দিনরাত।ঘুম নেই ঘুম নেই ছাপজল বালিশে হাঁটুভাঙা নোনা ঝিল দুচোখের নালিশে।বৃষ্টি বৃষ্টি জলেদের চাঁদনি দে সোনা এনে দে মন সুখ রোশনি।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a7%83%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a7%8b/
1453
নাজিম মাহমুদ
জাগো হে বাংলার জনতা- নাজিম মাহ্‌মুদ
স্বদেশমূলক
জাগো হে বাংলার জনতা বলো মানুষ মানুষের জন্য ধর্ম বিভেদ বিষ জীর্ন করো পুন্য এ জীবন ধন্য স্বাপদে ভরা জনারণ্যে এ জঘন্য করো দূর আমাদের পাপ অগন্য।।বলো হোয়ো নাকো হিংসায় মত্ত বলো বলো সবে মানবতা সত্য পৃথিবীটাকে বদলে দাও নব এক শতক সমাগত।জ্ঞানের প্রদীপ আজ জ্বালো এই আমাদের বাংলাদেশে সৈনিক লহো তুলে ঝান্ডা চেতনার  নব উন্মেষে তোমারই আঘাতে অবশেষে যাবে ভেসে যারা এখনও অন্ধ অচৈতন্য।।বলো হয়োনাকো …. শতক সমাগত।মৌলবাদের কোন ঠাঁই নাই এই আমাদের বাংলাদেশে সৈনিক লহো তুলে ঝান্ডা চেতনার  নব উন্মেষে তোমারই আঘাতে অবশেষে যাবে ভেসেযারা করেছে ধর্ম পূঁজিপণ্য।।বলো হয়োনাকো …শতক সমাগত। (এটি স্বননের সম্মেলক সঙ্গীত)
https://banglapoems.wordpress.com/2013/11/09/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a7%8b-%e0%a6%b9%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%ae/
594
গোলাম কিবরিয়া পিনু
আঁতুড়ঘর -গোলাম কিবরিয়া পিনু
স্বদেশমূলক
গৃহ থেকে বহুদূরে চলে যাওয়ার পরও আমি গৃহে ফিরে আসি আমি সেই কপোত ডানা দুটি আমার প্রত্যাবর্তনপ্রবণসাদামাটা গৃহকোণ আমার পছন্দ ঘরে ফিরে আসার জন্য আমি কাতরআমার বসতভিটে আমি চিনি বাস্তুভিটে ও খামারবাড়ি আমি চিনি মর্মঘাতি আঘাতের পরও আমার গৃহজারিত গন্ধ আমার গায়ে লেগে থাকে গৃহহীন করে প্রভুরা আমাকে টেনে নিয়ে যাবে? –পারবে না!শুধু কি সংসার-সুখ ও গার্হস্থ্য সুখের জন্য স্বগৃহে স্বচ্ছন্দ বোধ করি? যেখানেই যাই–আমার গৃহাভিমুখে আমার মুখ ও যাত্রা অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ধ্বংস হওয়ার পরও ফিরে আসি বন্যায় ভেসে যাওয়ার পরও ফিরে আসি ঝড় ও টর্নোডেতে মুচড়ে যাওয়ার পরও ফিরে আসি আমি চোরাস্রোতে নিমজ্জিত হই না জীবনের যেকোনো নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে জীবনের তাৎপর্য উপলব্ধি করিপরতন্ত্র নিয়ে যন্ত্র হয়ে যেতে চাই না পরশাসিত শাসন আমি দেখেছি পোঁ ধরা স্বভাব আমার ধাতে নেই গুমটি ঘরের বদলে আমার বাঁচোয়া উঠান আছে আমার নিজস্ব পতাকা আছে নিজের জমিতে নিজে চাষ করিনিজের ভূখণ্ড যেন হাতছাড়া না হয়ে যায়– হুমকি ও ভয় দেখানোর লোক থাকলেও তাদের পরোয়া করি না, প্রতিরোধের তৃষ্ণা সবসময়ে জাগিয়ে রাখি কোনো সমুদ্রের জল সে তৃষ্ণা মিটাতে পারে না।টিকে থাকি নিজের দু’পায়ে ভর রেখে পথসংলগ্ন থাকি সহজে স্খলিত হই না মোড় ঘোরার সময়ে পিছলে যাই না মাথা উঁচু করে হাঁটি ঠেকিয়ে রাখার জন্য গতিরোধ করা হয় জমাট বরফের উপর হেঁটে হেঁটে আসিলোভী, নোংরা ও স্বার্থপর ব্যক্তির গন্ধ শুকি দুষ্টপ্রকৃতির কোনো অশরীরী কাল্পনিক শয়তানের ভারী জুতার তলায় আমি থাকি না !সযত্নে সঞ্চিত ও রক্ষিত স্বপ্ন নিয়ে ভূগর্ভ খুঁড়ে আমি বের হই! লাল লাল দাগ আমার শরীরে! গৃহে ফিরি কিন্তু গৃহপালিত নই নিজের ভাষা ও ধ্বনিতত্ব বুঝি প্রকৃতিপ্রত্যয় বুঝি আমার সভ্যতা কী–তা আমি ভুলি না আমারও আছে সংস্কৃতিমান।আমার অভিধান ও শব্দকোষ আছে আমার চিরায়ত সাহিত্য নিয়ে আমিও উঁকি দেই –আগামীর সূর্যালোকে। শুধু ব্রতচারী নৃত্য নয় নৃত্যের বহুবিধ মুদ্রা আমি জানি একতারা থেকে করতাল থেকে বাঁশিতে কী সুর জেগে ওঠে কণ্ঠে কণ্ঠে কত গান কখনো হয় না ম্রিয়মাণ!আমি আমার নদীর জোয়ার জানি মরানদীটা আরও মরে যাচ্ছে–তাও চিনি আমি আমার হাওড়-বাঁওড় চিনি সমুদ্রের তরঙ্গোচ্ছাস চিনি।কীভাবে শিশিরকণা জমে কীভাবে বৃষ্টিফোঁটা পড়ে কীভাবে মেঘ কেটে যায়–তা জানিবন্যাপীড়িত হয়ে কীভাবে মরুময় কষ্টের মুখে চৌচির হয়ে যাই তা কি আমি বুঝি না?লালমাটি-তিলকমাটির প্রান্তর নিয়ে এঁটেলমাটির জলকাদা মেখে পলিমাটির জমি নিয়ে স্বপ্ন-ফসল ফলাই আমি আমার গাছগাছালির ছায়াস্নিগ্ধ হয়ে অংশুমালা হয়ে সূর্যতাপ গ্রহণ করি বীজতলায অঙ্কুরমুখী হয়ে জীবন্ত হয়ে উঠি শিকড়-মূলরোম থেকে যে বৃক্ষ বেড়ে ওঠে–সেখানে আমার স্পর্শ থাকে কুসুমকোরক থেকে প্রসবন পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়ে রাখা অরণ্যপুষ্প থেকে রবিশস্যের গন্ধে আমি প্রাণশক্তি পাই জিয়নকাঠির স্পর্শ পাই আমার চৈতন্য ও সংবেদনা নিয়ে আমি ফিরে আসিগৃহে ফিরে আসা মানে উৎসে ফিরে আসা গৃহে ফিরে আসা মানে সৃষ্টিমূলে ফিরে আসা গৃহে ফিরে আসা মানে আদ্যবীজে ফিরে আসা যেখানে আমার উত্থান হয়েছিল যেখানে আমার অভ্যুদয় হয়েছিল যেখানে আমার উম্মীলন হয়েছিল যেখানে আমার বিস্তার হয়েছিলযেখানে আমার আঁতুড়ঘর যেখান থেকে পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম এখানে অবতীর্ণ হওয়া মানে ধরাধামে ফিরে আসাসেই সূতিকাঘর কীভাবে ভুলি ?
https://banglapoems.wordpress.com/2018/09/12/%e0%a6%86%e0%a6%81%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a7%9c%e0%a6%98%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%bf/
2726
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার মিলন লাগি তুমি
ভক্তিমূলক
আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে। তোমার চন্দ্র সূর্য তোমায় রাখবে কোথায় ঢেকে। কত কালের সকাল-সাঁঝে তোমার চরণধ্বনি বাজে, গোপনে দূত গৃহ-মাঝে গেছে আমায় ডেকে।ওগো পথিক, আজকে আমার সকল পরাণ ব্যেপে থেকে থেকে হরষ যেন উঠছে কেঁপে কেঁপে যেন সময় এসেছে আজ, ফুরালো মোর যা ছিল কাজ - বাতাস আসে, হে মহারাজ, তোমার গন্ধ মেখে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-milon-lagi-tumi/
42
অসীম সাহা
যাও
প্রেমমূলক
যে প্রশস্ত পথের সন্ধান তুমি পেয়েছো সেই পথ ধরে তুমি সামনের দিকে এগিয়ে যাও প্রলয়ের অন্ধকার তোমার পথরোধ করে দাঁড়াবে না!শুধু আয়নায় একবার নিজেকে দেখে নিও; বিভক্ত কাচের দুপাশে দুরকমের তুমি আর নেপথ্যের হাহা অন্ধকারে আমি একা! তুমি আর একবার বুঝে নাও- প্রশস্ত পথ ধরে তুমি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে কিনা? আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি : অন্তত আমার প্রলয়ের অন্ধকার কিছুতেই তোমার পথরোধ করে দাঁড়াবে না!যদি তুমি পারো তবে যাও- তুমি যাও।!
https://www.bangla-kobita.com/asimsaha/jao/
561
কাজী নজরুল ইসলাম
হুল ও ফুল
মানবতাবাদী
ওরা কয়, ‘আগে ফুল ফুটাইতে,                     এখন ফুটাও হুল!’ আমি কই, ‘যদি হুল না ফুটাই                      ফুটিবে কি তবে fool?’ বন্ধু, মিথ্যা অপত্য-স্নেহে                           আপত্তি নাহি করি ধর্ম লয়েছে অধর্ম নাম,                           সত্য গিয়াছে মরি! গাঁয়ের বউঝি জল নিতে যায়                       মেছুড়ে বুঝিতে নারে, গাল দেয় রেগে – ইহাদেরই দোষে                    মাছ বসে নাকো চারে! ভোগী বলে, ‘বাবা, কেন কাঁদ তুমি,                 মামা নহে তব চাষা, ধনীর দুঃখ দেখ নাকো, একী                       একঘেয়ে ভালোবাসা!’ ‘আল্লা বলান’ বলি। ওরা বলে –                    ‘দালানে তা আসে কেন? টাকাওয়ালাদের কী করে চিনিলে,                     তুমি তো আল্লা চেন!’ ওরা বলে, ‘মোরা টাকার পুকুর                     দুয়ারে খুঁড়িয়া রাখি, উহারাই তার দু-এক কলশি                         জল ভরে নেয় নাকি?’ আরও বলে, ‘দিই কলশিতে জল                     দিই না তো সাথে দড়ি, আমরা কী জানি, কেন এ পুকুরে                     ওরা ডুবে যায় মরি?’ ওরা বলে, ‘চাষা খাইতে পায় না–                    আর জন্মের পাপ, পাওনা সুদের নালিশ করিলে                         ওরা কেন দেয় শাপ?’ মোরা যত দিই উত্তর তার                          ওরা ‘দুত্তোর’ কহে, বলে ‘জমিদারি স্বত্ব আমার,                         তোমার মামার নহে।’ মোরা বলি, ‘কত ইম্পিরিয়াল                        ব্যাংকে তোমার টাকা!’ ওরা বলে, ‘কোনো কাজে তা লাগে না,                (বাবা) ফিক্‌স্‌ড ডিপোজিটে রাখা!’ মোরা বলি, ‘মোরা যাব না, মোদের                  প্রাপ্য যা তা না পেলে!’ ওরা বলে, ‘কেন জেলে যাবে, বাবা,                  ভদ্রলোকের ছেলে!’ আমি বলি, ‘জাগ, দৈত্যরে মার,                    দা নিয়ে দুয়ার খুল।’ ওরা বলে, ‘বাঘ হলে কেন বন-                     বাগিচার বুলবুল?’ আমি বলি, ‘কেন অসত্য বল,                      ভ্রান্ত পথ দেখাও?’ ওরা বলে, ‘আহ্‌‌, চুপ করো কবি,                   ফুল শোঁকো, মধু খাও!’ আমি বলি, ‘চোর ঢুকিয়াছে ঘরে,                    মারো তারে পায়ে দলে!’ ওরা বলে, ‘বাঁশুরিয়া! বাঁশি কেন                    বংশদণ্ড হলে!’ ওরা বলে, ‘দাদা, এতদিন তুমি                      বেশ তো ঘুমায়ে ছিলে! কখন হইল ‘ইনসমনিয়া’?                          সারা দেশ জাগাইলে!’ আমি বলি, ‘দেশ জাগে যদি, কেন                   তোমাদের ডর লাগে?’ ওরা বলে, ‘আসে রাম-দা লইয়া।                    রামদা বলিত আগে!’ কে যে বলে ঠিক, কে বলে বেঠিক,                  ঠিকে ভুল হয় কার? চাষা ও মজুরে ঠকাইয়া খায়                        দুনিয়ার ঠিকাদার! ‘ওরা তো বলে না, তুমি কেন বল,                  কেন তব মাথাব্যথা?’ জিজ্ঞাসে সাধু। – আমি বলি, ‘কহে                   ওদেরই আত্মা কথা!’ হায় রে দুনিয়া দেখি মৌলানা                        মৌলবিতে একাকার, আমি একা হেথা কাফের রে দাদা                     আমি একা গুনাগার! গুনাগারি দেয় বণিকেরা নাকি,                      চাষারাই করে লাভ, ধনী যেন সদা তৃষিত, এবং                        চাষা সদা কচি ডাব! শুনেছি সেদিন ধনিক-সভায়–                       নতুন আইন হবে, চাষাদের দা, দাঁত আর নখ                        খেঁটে লাঠি নাহি রবে। আমি বলি, ‘হয়ে অভাবে স্বভাব                     নষ্ট, হয়েছে চোর!’ ওরা বলে, ‘তাই বল, তাই চুরি                     হয় না বাড়িতে তোর!’ আমি বলি, ‘খেয়ো না এ কদন্ন,                     হালালি অন্ন খাও!’ ওরা বলে, ‘তুমি এদেরই দালালি                     করে বুঝি টাকা পাও?’ ‘যার যত তলা দালান, সে তত                     আল্লা-তালার প্রিয়–’ ওরা কয়। আমি বলি, ‘বেশ করে                    সে তালায় তালা দিয়ো!’ আমি ভিক্ষুক কাঙালের দলে –                       কে বলে ওদের নীচ? ভোগীরা স্বর্গে যাবে, যদি খায়                       ওদের পানের পিচ! ওরা হাসে, ‘এ কি কবিতার ভাষা?                   বস্তিতে থাক বুঝি?’ আমি কই, ‘আজও পাইনি পুণ্য-                     বস্তির পথ খুঁজি! দোওয়া করো, যেন ওই গরিবের                     কর্দমাক্ত পথে যেতে পারি, এই ভোগ-বিলাসীর                      পাপ-নর্দমা হতে!’   (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/hul-o-ful/
4884
শামসুর রাহমান
নিজের অজ্ঞাতেই
মানবতাবাদী
একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগে চোখ কচলাতে কচলাতে দেখি আমার জন্মশহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তা শত শত গণ্ডারে ভরে গেছে। কে জানে কোত্থেকে এসেছে এ পশুর দল। হঠাৎ গণ্ডারের ভরাট মিছিল থেকে উচ্চারিত হলো, “কে রে তুই বেল্লিক, বুরবক আমাদের পশু বলে গাল দিচ্ছিস? বড় তো আস্পর্ধা তোর! এক্ষুণি তোর টুঁটি ছিঁড়ে কাকপক্ষীকে খেতে দেবো আর উপড়ে নেবো চোখ। সারা জীবন পথ হাতড়াতে হাতড়াতে কাটবে। বুঝলি বেয়াদব?”জানলা থেকে গণ্ডারের বিপুল মিছিল দেখে আর ওদের ক্রুদ্ধ বক্তব্য শুনে পিলে চমকে তো গেলোই, শিরার উষ্ণ রক্ত শীতল হয়ে গেলো এক লহমায়। আচমকা কানে এলো এক ঘোষণা,-“হে নগরবাসী, যা বলছি মন দিয়ে শোনো। তোমাদের শহর এখন আমাদের দখলে। কেমন ক’রে গণ্ডার-প্রভুদের দাসত্ব পালনের সুযোগ তোমরা পেলে তা জানার প্রয়োজন নেই। তোমরা এমনই অথর্ব, এরকমই নিষ্কর্মা যে, কারও না কারও প্রভুত্ব স্বীকার না করলে তোমাদের উদরের অন্ন হজম হয় না। তাই এখন গণ্ডার-প্রভুদের গোলাম তোমরা। হ্যাঁ, তোরা আমাদের দাসত্ব করলেই থাকবি সুখে, মেদ জমবে তোদের শরীরে।জানলা দিয়ে ভোরবেলার রোদ আমার ঘুমন্ত মুখের ওপর খেলা করতেই আমি জেগে উঠলাম। জানলা রাস্তায় দৃষ্টি দিয়ে গণ্ডারের মিছিল খুঁজি। না, তেমন কিছু নেই কোথাও। সত্যি কি নেই? কেন যেন মাথায়, কপালে হাত চলে গেলো নিজের অজ্ঞাতেই একটি কি দু’টি শিঙের উদ্দেশে।  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nijer-oggatei/
4442
শামসুর রাহমান
এ কি আমাদেরই দেশ_
মানবতাবাদী
পায়ের তলায় মাটি আজকাল বড় জাহাঁবাজ, হিংস্র হয়ে উঠেছে, আকাশ যখন তখন চোখ রাঙায় এবং মনে হয় এ রকম ভয়াবহ অন্ধকার নামেনি কখনও চারদিক লুপ্ত ক’রে রক্ত-পানি-করা হিম অর্থহীনতায় আর। মানবের, মানবীর মুখচ্ছদ এইমতো নির্বিকার পাথর-স্বরূপ দেখিনি কখনও আগে। হাটে, মাঠে, ঘাটে হেঁটে যায় ওরা, যেন পুতুলের নিষ্প্রাণ মিছিল!এ কি আমাদের দেশ, যে-দেশে একদা জনসাধারণ শহরে ও গ্রামে শান্তির ছায়ায় বসবাস করেছে, দেখেছে রূপের স্বপ্ন নির্বিঘ্ন নিদ্রার অপরূপ কোমল উদ্যানে? এ কি সেই বাংলাদেশ, কণ্ঠে যার দুলেছে গৌরবদৃপ্ত বিজয়ের মালা মুক্তিযোদ্ধা, ত্যাগী নেতা, সাধারণ মানুষের অনন্য সাধনে।শোণিত-সাগর থেকে জেগে-ওঠা স্বাধীনতা-পদ্মটিকে যারা ছিঁড়ে-খুঁড়ে লাঞ্ছিত করার খায়েশে মেতেছে ঠারে ঠোরে এমন কি মাঝে মাঝে স্পষ্টতই, তাদের তোয়াজে মেতে থাকে নানান পাড়ার নানা মোড়ল এখন। ফন্দি আঁটে ছদ্মবেশী অস্ত্রাঘাতে প্রগতির তেজী ঘোড়াটিকে খোঁড়া ক’রে দেয়ার খায়েশে। আমাদের কত না নিঝুম স্বপ্ন থেঁত্‌লে যাচ্ছে বুটের তলায়, কত যে পদ্যের পঙক্তি বেঘোরে গুমরে মরে কবির খাতায় প্রখর দুপুরে আর নিশীথের বিরান প্রহরে। শব্দমালা কখনও করুণ ফোঁপানিতে কম্পমান, কখনও-বা নজরুলী দুলে-ওঠা বাবরির ধরনে রাগী, আগুনের আলিঙ্গনে রাঙা। আগুনের তাপ কমে এলে স্বদেশের বেদনার্ত মুখ ভেসে ওঠে।যেন স্বপ্নে আমার চকিতে মনে হ’ল- দিব্যি পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর দক্ষিণ, ডান-বাম সব দিকে উচ্চারিত প্রগতির জয়বার্তা, ঐ তো ওড়ে আসমানে কল্যাণের প্রশান্ত পতাকা- চারদিক থেকে নর-নারী, শিশু ছুটে আসছে সবাই। দীর্ঘস্থায়ী অমাবস্যা পলাতক, কোনও গ্রীক দেবীর মুখের মতো চাঁদ হাসে আকাশের নীলে।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/e-ki-amaderi-desh/
490
কাজী নজরুল ইসলাম
রুবাইয়াত-ই- হাফিজ- ৪
ভক্তিমূলক
চন্দ্র- সূর্য রাত্রি দিবা বিচিত্র সে আবেগ ভরে ওগো প্রিয়, দেখি- তোমার ধূলির 'পরে প্রণাম করে! হৃদয় আঁখির সাধ হতে মোর করো না গো নিরাশ মোরে, রইবে ন্দূরে- বসিয়ে আমায়, প্রতীক্ষার ঐ অগ্নি পরে?
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rubaiyat-e-hafiz-4/
244
কাজী নজরুল ইসলাম
আসিবে তুমি জানি প্রিয়
প্রেমমূলক
আসিবে তুমি জানি প্রিয় আনন্দে বনে বসন্ত এলো ভুবন হল সরসা, প্রিয়-দরশা, মনোহর।বনানতে পবন অশান্ত হল তাই কোকিল কুহরে, ঝরে গিরি নির্ঝরিণী ঝর ঝর।ফুল্ল যামিনী আজি ফুল সুবাসে চন্দ্র অতন্দ্র সুনীল আকাশে আনন্দিত দীপান্নিত অম্বর।অধীর সমীরে দিগঞ্চল দোলে মালতী বিতানে পাখি পিউ পিউ বোলে অঙ্গে অপরূপ ছন্দ আনন্দ-লহর তোলে দিকে দিকে শুনি আজ আসিবে রাজাধিরাজ প্রিয়তম সুন্দর।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/asibey-tumi-jani-pria/
3173
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার দয়া যদি
ভক্তিমূলক
তোমার দয়া যদি চাহিতে নাও জানি তবুও দয়া করে চরণে নিয়ো টানি। আমি যা গড়ে তুলে আরামে থাকি ভুলে সুখের উপাসনা করি গো ফলে ফুলে– সে ধুলা-খেলাঘরে রেখো না ঘৃণাভরে, জাগায়ো দয়া করে বহ্নি-শেল হানি। সত্য মুদে আছে দ্বিধার মাঝখানে, তাহারে তুমি ছাড়া ফুটাতে কে বা জানে। মৃত্যু ভেদ করি’ অমৃত পড়ে ঝরি’, অতল দীনতার শূন্য উঠে ভরি’ পতন-ব্যথা মাঝে চেতনা আসি বাজে, বিরোধ কোলাহলে গভীর তব বাণী।
http://kobita.banglakosh.com/archives/469.html
1340
তসলিমা নাসরিন
নষ্ট মেয়ে
মানবতাবাদী
ওরা কারো কথায় কান দেয় না, যা ইচ্ছে তাই করে, কারও আদেশ উপদেশের তোয়াককা করে না, গলা ফাটিয়ে হাসে, চেঁচায়, যাকে তাকে ধমক দেয় নীতি রীতির বালাই নেই, সবাই একদিকে যায়, ওরা যায় উল্টোদিকে একদম পাগল! কাউকে পছন্দ হচ্ছে তো চুমু খাচ্ছে, পছন্দ হচ্ছে না, লাত্থি দিচ্ছে লোকে কি বলবে না বলবে তার দিকে মোটেও তাকাচ্ছে না। ওদের দিকে লোকে থুতু ছোড়ে, পেচ্ছাব করে ওদের ছায়াও কেউ মাড়ায় না, ভদ্রলোকেরা তো দৌড়ে পালায়। নষ্ট মেয়েদের মাথায় ঘিলু বলতেই নেই, সমুদ্রে যাচ্ছে, অথচ ঝড় হয় না তুফান হয় একবারও আকাশটা দেখে নিচ্ছে না। ওরা এরকমই, কিছুকে পরোয়া করে না গভীর অরণ্যে ঢুকে যাচ্ছে রাতবিরেতে, চাঁদের দিকেও দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে! আহ, আমার যে কী ভীষণ ইচ্ছে করে নষ্ট মেয়ে হতে। (এ কবিতাও ইংরেজি থেকে অনুবাদ)
https://banglarkobita.com/poem/famous/2020
4023
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাতে-কলমে
নীতিমূলক
বোলতা কহিল, এ যে ক্ষুদ্র মউচাক, এরই তরে মধুকর এত করে জাঁক! মধুকর কহে তারে, তুমি এসো ভাই, আরো ক্ষুদ্র মউচাক রচো দেখে যাই।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hate-kolome/
5435
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আঠারো বছর বয়স
মানবতাবাদী
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি। আঠারো বছর বয়সের নেই ভয় পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা, এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়- আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা। এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে, প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে। আঠরো বছর বয়স ভয়ঙ্কর তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা, এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা। আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান, দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার ক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ। আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে অবিশ্র্রান্ত; একে একে হয় জড়ো, এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো। তব আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি, এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে, বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে। এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয় পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে, এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়- এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/281
406
কাজী নজরুল ইসলাম
বড়োদিন
মানবতাবাদী
বড়োলোকদের ‘বড়োদিন’ গেল, আমাদের দিন ছোটো, আমাদের রাত কাটিতে চায় না, ক্ষিদে বলে, ‘নিধে! ওঠো!’ খেটে খুটে শুতে খাটিয়া পাই না, ঘরে নাই ছেঁড়া কাঁথা, বড়োদের ঘরে কত আসবাব, বালিশ বিছানা পাতা! অর্ধনগ্ন-নৃত্য করিয়া বড়োদের রাত কাটে, মোদের রক্ত খেয়ে মশা বাড়ে, গায়ে আরশুলা হাঁটে। আঁচিলের মতো ছারপোকা লয়ে পাঁচিল ধরিয়া নাচি, মাল খেয়ে ওরা বেসামাল হয়, মোরা কাশি আর হাঁচি! নানারূপ খানা খেতেছে, ষণ্ড অণ্ড ভেড়ার টোস্ট, কুলুকুলু করে আমাদের পেট, যেন ‘হনলুলু কোস্ট’। চৌরঙ্গিতে বড়োদিন হইয়াছে কী চমৎকার, গৌরজাতির ক্ষৌরকর্ম করেছে! অমত কার? মদ খেয়ে বদহজম হইয়া বাঙালির মেয়ে ধরে, শিক্ষাও পায় শিখ-বাঙালির থাপ্পড় লাথি চড়ে! এ কি সৈনিক-ধর্ম, এরাই রক্ষী কি এদেশের? সর্বলোকের ঘৃণ্য ইহারা, কলঙ্ক ব্রিটিশের। যে সৈনিকের হাত চাহে অসহায় নারী পরশিতে,চাহে নারীর ধর্ম নিতে, বীর ব্রিটিশের কামান যে নাই সেই হাত উড়াইতে। হায় রে বাঙালি, হায় রে বাংলা, ভাত-কাঙালের দেশ, মারের বদলে মার দেয় নাকো, তারা বলদ ও মেষ! মান বাঁচাইতে প্রাণ দিতে নারে, পলাইয়া যায় ঘরে, ঊর্ধ্বের মার আগুন আসিছে সেই ভীরুদের তরে! পলাইয়া এরা বাঁচিবে না কেউ! হাড় খাবে, মাস খাবে, শেষে ইহাদের চামড়ায় দেখো ডুগডুগিও বাজাবে! পথের মাতাল মাতা-ভগ্নীর সম্মান নেয় কেড়ে, শাস্তি না দিয়ে মাতালের, এরা পলায় সে পথ ছেড়ে। কোন ফিল্মের দর্শক ওরা, ঝোপের ইঁদুর বেজি, ইহাদের চেয়ে ঘরের কুকুর, সেও কত বেশি তেজি! মানবজাতির ঘৃণ্য ভীরুরা, কাঁপে মৃত্যুর ডরে, প্রাণ লয়ে ঢুকে খোপের ভিতর, দিনে দশবার মরে! বড়োদিন দেখে ছোটো মন হায় হতে চাহে নাকো বড়ো, হ্যাট কোট দেখে পথ ছেড়ে দেয় ভয়ে হয়ে জড়সড়! পচে মরে হায় মানুষ, হায় রে পঁচিশে ডিসেম্বর! কত সম্মান দিতেছে প্রেমিক খ্রিস্টে ধরার নর! ধরেছিলে কোলে ভীরু মানুষের প্রতীক কি মেষশিশু? আজ মানুষের দুর্গতি দেখে কোথায় কাঁদিছ জিশু!  (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/borodin/