id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
1443
নবারুণ ভট্টাচার্য
আমাকে
চিন্তামূলক
কে আমার হৃদ্‌পিণ্ডের ওপরে মাথা রেখে ঘুমোয় কে আমাকে দুধ ও ভাতের গন্ধ দিয়ে আড়াল করে কে আমার মাটি যেখানে আমি বৃষ্টির মতো শুষে যাই আমি যখন দূষিত আকাশে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে উড়ি আমার পালকে ছাই জমে জমে ধূসর হয়ে যায় তখন আমার সামনে সবুজ গাছ হয়ে ওঠে কে কে আমাকে চোখের পাতা বন্ধ করে আড়াল করে কে আমাকে আগুন দিয়ে মশালের মতো জ্বালায় কে আমার পৃথিবী যার ভেতরে আমি লাভার মতো ফুটতে থাকি আমি যখন পথ থেকে গলিতে তাড়া খেতে খেতে দৌড়ই আমার পায়ের তলায় হাইওয়ে, আলপথ সব ফুরিয়ে যায় তখন আমার সামনে আশ্রয় হয়ে ওঠে কে এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমার ওপরে অনেক অত্যাচার করতে হবে এত অত্যাচার করার ক্ষমতা, দুর্ভাগ্যবশত, কোনো শোষক, নিপীড়ক বা রাষ্ট্রমেশিন এখনও জানে না যখন জানবে তখন আমার প্রশ্নের সংখ্যাও অনেক বেড়ে যাবে আমি প্রশ্নগুলোকে ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগোতেই থাকব আমাকে দেখা যাক বা না যাক প্রশ্নগুলো ফেটে অনেক সপ্তর্ষিমণ্ডল আকাশে দেখা যাবে।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%95-%e0%a6%a8%e0%a6%ac/
262
কাজী নজরুল ইসলাম
ওই ঘর ভুলানো সুরে
প্রেমমূলক
ওই ঘর ভুলানো সুরে কে গান গেয়ে যায় দূরে তার সুরের সাথে সাথে মোর মন যেতে চায় উড়ে।তার সহজ গলার তানে সে ফুল ফোটাতে জানে তার সুরে ভাটির টানে নব জোয়ার আসে ঘুরে।তার সুরের অনুরাগে বুকে প্রণয়-বেদন জাগে বনে ফুলের আগুন লাগে ফুল সুধায় ওঠে পুরে।বুঝি সুর সোহাগে ওরই পায় যৌবন কিশোরী হিয়া বুঁদ হয়ে গো নেশায় তার পায়ে পায়ে ঘুরে।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/oi-ghor-vulano-surey/
4553
শামসুর রাহমান
কবির আভায় প্রজ্বলিত
চিন্তামূলক
ইদানিং কখনও কখনও হঠাৎ কী-যে হয়, আমার চোখের সামনে কিছু ছবি ঝলসে ওঠে, যেগুলো বড় বেখাপ্পা, বেগানা। সেসব ছবি আমাকে ঘিরে ঘুরতে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তখন আমার বেহুঁশ হওয়ার উপক্রম। নিজেকে সামলে রাখি কোনও মতে।ক্ষণিক পরে নিজেকে দেখতে পাই একটি বাগানে। বাগানের সৌন্দর্য এমনই, যা’ বর্ণনা করা আমার সাধ্যাতীত, শুধুউ অসামান্য কোনও শিল্পী তার চিত্রে ফোটাতে সক্ষম সেই সৃষ্টি। আমার বিস্ময় মুছে যাওয়ার আগেই দেখি আমি পড়ে আছি এক হতশ্রী ভাগাড়ে।কে আমাকে মুক্তি দেবে এই ভয়ঙ্কর পরিবেশ থেকে? আমি কি এখানে পচতে থাকবো? অবিরাম বমি কি আমাকে বেহুঁশ করে ফেলবে? দুশ্চিন্তায় অবসন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি প্রফুল্ল সারস আমাকে তার ডানায় আশ্রয় দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেলো মেঘলোকে।কখন যে মেঘলোক থেকে অপরূপ এক উদ্যানে এসে গাছতলায় ঠাঁই পেলাম, টের পাইনি। নিজেকে কেমন পরিবর্তিত মনে হলো। একি! আমার ভেতর এক পরিবর্তিত ব্যক্তিকে অনুভব করি। অজানা কে যেন আড়াল থেকে আমাকে কবির আভায় জ্বলজ্বল্ব করে!  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobir-avay-projjolito/
3538
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাঁশি
স্বদেশমূলক
কিনু গোয়ালার গলি। দোতলা বাড়ির লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর পথের ধারেই। লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি, মাঝে মাঝে স্যাঁতাপড়া দাগ। মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি সিদ্ধিদাতা গণেশের দরজার 'পরে আঁটা। আমি ছাড়া ঘরে থাকে আর একটি জীব এক ভাড়াতেই, সেটা টিকটিকি। তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু, নেই তার অন্নের অভাব॥         বেতন পঁচিশ টাকা, সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি। খেতে পাই দত্তদের বাড়ি ছেলেকে পড়িয়ে। শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই, সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসি, আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে। এঞ্জিনের ধস্ ধস্, বাঁশির আওয়াজ, যাত্রীর ব্যস্ততা, কুলি-হাঁকাহাঁকি। সাড়ে-দশ বেজে যায়, তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার॥  ধলেশ্বরী-নদীতীরে পিসিদের গ্রাম--- তাঁর দেওরের মেয়ে, অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক। লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল--- সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে। মেয়েটা তো রক্ষে পেলে, আমি তথৈবচ। ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া--- পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর॥                          বর্ষা ঘনঘোর। ট্রামের খরচা বাড়ে, মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়। গলিটার কোণে কোণে জমে ওঠে, পচে ওঠে আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি, মাছের কান্‌কা, মরা বেড়ালের ছানা--- ছাইপাঁশ আরো কত কী যে। ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া মাইনের মতো, বহু ছিদ্র তার। আপিসের সাজ গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন, সর্বদাই রসসিক্ত থাকে। বাদলের কালো ছায়া স্যাঁত্‍‌সেঁতে ঘরটাতে ঢুকে কলে পড়া জন্তুর মতন মূর্ছায় অসাড়! দিনরাত, মনে হয়, কোন্ আধমরা জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।               গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু--- যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শৌখিন মেজাজ। কর্নেট বাজানো তার শখ। মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে এ গলির বীভত্‍‌স বাতাসে--- কখনো গভীর রাতে, ভোরবেলা আলো-অন্ধকারে, কখনো বৈকালে ঝিকিমিকি আলো-ছায়ায়। হঠাত্‍‌ সন্ধ্যায় সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান, সমস্ত আকাশে বাজে অনাদি কালের বিরহবেদনা। তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে এ গলিটা ঘোর মিছে দুর্বিষহ মাতালের প্রলাপের মতো। হঠাত্‍‌ খবর পাই মনে, আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই। বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে এক বৈকুণ্ঠের দিকে॥         এ গান যেখানে সত্য অনন্ত গোধুলিলগ্নে সেইখানে বহি চলে ধলেশ্বরী, তীরে তমালের ঘন ছায়া--- আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা ক'রে, তার পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর॥২৫ আষাঢ় ১৩৩৯ সূত্রঃ পরিশেষ
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bashi/
5530
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মেজদাকে _ মুক্তির অভিনন্দন
ভক্তিমূলক
তোমাকে দেখেছি আমি অবিচল, দৃপ্ত দুঃসময়ে ললাটে পড়ে নি রেখা ক্রূরতম সংকটেরও ভয়ে; তোমাকে দেখেছি আমি বিপদেও পরিহাস রত দেখেছি তোমার মধ্যে কোনো এক শক্তি সুসংহত৷ দুঃখ শোকে, বারবার অদৃষ্টের নিষ্ঠুর আঘাতে অনাহত, আত্মমগ্ন সমুদ্যত জয়ধ্বজা হাতে৷ শিল্প ও সাহিত্যরসে পরিপুষ্ট তোমার হৃদয় জীবনকে জানো তাই মান নাকো কোনো পরাজয়; দাক্ষিণ্যে সমৃদ্ধ মন যেন ব্যস্ত ভাগীরথী জল পথের দু’ধারে তার ছড়ায় যে দানের ফসল, পরোয়া রাখে না প্রতিদানের তা এমনি উদার, বহুবার মুখোমুখি হয়েছে সে বিশ্বাসহন্তার৷ তবুও অক্ষুণ্ণ মন, যতো হোক নিন্দা ও অখ্যাতি সহিষ্ণু হৃদয় জানে সর্বদা মানুষের জ্ঞাতি, তাইতো তোমার মুখে শুনে বাণপ্রস্থের ইঙ্গিত মনেতে বিস্ময় মানি, শেষে হবে বিরক্তির জিত? পৃথিবীকে চেয়ে দেখ, প্রশ্ন ও সংশয়ে থরো থরো, তোমার মুক্তির সঙ্গে বিশ্বের মুক্তিকে যোগ করো॥১৯৪৪ সালে সুকান্তর মেজদা রাখাল ভট্টাচার্য গ্রেপ্তার হন৷ তাঁর মুক্তি উপলক্ষে সুকান্ত এই কবিতাটি লেখেন৷
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/mejdake-muktir-ovinondon/
1690
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
শেষ প্রার্থনা
চিন্তামূলক
জীবন যখন রৌদ্র-ঝলোমল, উচ্চকিত হাসির জের টেনে, অনেক ভালোবাসার কথা জেনে, সারাটা দিন দুরন্ত উচ্ছ্বল নেশার ঘোরে কাটল। সব আশা রাত্রি এলেই আবার কেড়ে নিও, অন্ধকারে দু-চোখ ভরে দিও আর কিছু নয়, আলোর ভালোবাসা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1629
3479
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফুলদানি হতে একে একে
চিন্তামূলক
ফুলদানি হতে একে একে আয়ুক্ষীণ গোলাপের পাপড়ি পড়িল ঝরে ঝরে। ফুলের জগতে মৃত্যুর বিকৃতি নাহি দেখি। শেষ ব্যঙ্গ নাহি হানে জীবনের পানে অসুন্দর। যে মাটির কাছে ঋণী আপনার ঘৃণা দিয়ে অশুচি করে না তারে ফুল, রূপে গন্ধে ফিরে দেয় ম্লান অবশেষ। বিদায়ের সকরুণ স্পর্শ আছে তাহে; নাইকো ভর্ৎসনা। জন্মদিনে মৃত্যুদিনে দোঁহে যবে করে মুখোমুখি দেখি যেন সে মিলনে পূর্বাচলে অস্তাচলে অবসন্ন দিবসের দৃষ্টিবিনিময়-- সমুজ্জ্বল গৌরবের প্রণত সুন্দর অবসান।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/fuldani-hata-ake-ake/
1726
পাবলো নেরুদা
নিঃসঙ্গ মৃত্যু
চিন্তামূলক
অনুবাদঃ অসিত সরকারনির্জন কবরখানা স্মৃতিস্তম্ভগুলো নিঃশব্দ অস্থিতে পরিপূর্ণ, অন্ধকার সংকীর্ণ গুহার মধ্যে দিয়ে হৃদয় আসে যায়ঃ যেন জন্মলগ্ন এক জাহাজের খোলের মধ্যে আমরা মারা গেলাম যেন হৃদয়ের অতলান্তে আমরা তলিয়ে গেলাম যেন সত্তার আপন অস্তিত্বে আমরা মিশে গেলাম। অজস্র মৃতদেহ ক্লেদাক্ত হিমেল পা, পাঁজরে পাঁজরে জড়ানো মৃত্যু, পবিত্র একটা শব্দের মতো কুকুরবিহীন তীক্ষ্ণ চিতকারের মতো অশ্রু কিংবা বৃষ্টির আর্দ্রতায় ফুলে ওঠা কবরে নানা ঘন্টাধ্বনির মতো। কখনও কখনও, একা, আমি দেখি কফিনগুলো খোলা পালে বিবর্ণ মৃতদের বয়ে নিয়ে চলেছে, মৃত কুন্তলে জড়ানো নারী, দেবদূতের মতো শুভ্র রুটিওয়ালা, বিষণ্ন কেরানীবধূ, কফিনগুলো নেমে গেলো মৃত্যুর খাড়াই নদীতে, মদিরার মতো রক্তবর্ণ গাঢ় নদী, দারুণ খরস্রোতা, মৃত্যুর শব্দে পালগুলো ফুলে উঠছে পালগুলো ফুলে উঠছে মৃত্যুর নিঃশব্দ ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে। মৃত্যু এসে পৌঁছালো কলশব্দমুখর নদীবেলায় পা-বিহীন একটা জুতোর মতো, মানুষবিহীন একটা পোশাকের মতো আংটি আর আঙুলবিহীন হাতে কড়া নাড়বে বলে সে এসে পৌঁছালো এসে পৌঁছালো মুখবিহীন জিভবিহীন কন্ঠস্বরবিহীন কন্ঠে চিতকার করবে বলে। কখনও প্রতিধ্বনিত হয় না তার পদপাতের শব্দ। গাছের পাতার মতো তার পোশাকের খস্‌খস্‌ শব্দ। আমি ঠিক জানি না, আমি খুব অল্পই বুঝি, আমি খুব কমই দেখি তবু আমার মনে হয় তার গানের রঙ তরল বেগুনে, যে রঙ মাটির সঙ্গে মিশে যায়, কেননা মৃত্যুর মুখ মৃত্যুর অপলক চোখের দৃষ্টি অবিকল সবুজ, বেগুনে পাতার বিদীর্ণ আর্দ্রতায় উন্মত্ত শীতের রঙ বিষণ্ন ধূসর। অথচ পল্লবের ছদ্মবেশে মৃত্যু পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চলে যায় মৃতের খোঁজে মাটি থেকে লাফিয়ে ওঠে, মৃত্যু পল্লবে মুখ ঢাকে, মৃত্যুর জিভ খোঁজে শবদেহ, মৃত্যুর ছুঁচ খোঁজে সুতো। মৃত্যু আমাদের দোলনার আশেপাশে সস্তা মাদুরে, কালো কম্বলে মৃত্যু মাথা গুঁজে থাকে, তারপর সহসা উধাও- বিষণ্ন শব্দে চাদর দুলিয়ে সে চলেযায় আর বিছানাগুলো পাল তুলে ভেসে যায়বন্দরের দিকে যেখানে সম্রাটের মতো সুসজ্জিত পোশাকে অপেক্ষা করে থাকে মৃত্যু।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3938.html
1204
জীবনানন্দ দাশ
শীত শেষ
প্রেমমূলক
আজ রাতে শেষ হ'য়ে গেল শীত- তারপর কে যে এলো মাঠে-মাঠে খড়ে হাঁস গাভী শাদা-প্লেট আকাশের নীল পথে যেন মৃদু মেঘের মতন, ধানের সোনার ছড়া নাই মাঠে- ইঁদুর তবুও আর যাবে নাকো ঘরেতাহার রূপালি রোম একবার জ্যোৎস্নায় সচকিত ক'রে যায় মন, হৃদয়ে আস্বাদ এলো ফড়িঙের- কীটেরও যে- ঘাস থেকে ঘাসে-ঘাসে তাই নির্জন ব্যাঙের মুখে মাকড়ের জালে তারা বরং এ অধীর জীবনছেড়ে দেবে- তবু আজ জ্যোৎস্নায় সুখ ছাড়া সাধ ছাড়া আর কিছু নাই; আছে নাকি আর কিছু? পাতা খড়কুটো দিয়ে যে-আগুন জ্বেলেছে হৃদয় গভীর শীতের রাতে- ব্যথা কম পাবে ব'লে- সেই সমারোহ আর চাই?জীবন একাকী আজো- ব্যথা আজো- এখন করি না তবু বিয়োগের ভয় এখন এসেছে প্রেম;- কার সাথে? কোন্‌ খানে? জানি নাকো;- তবু সে আমারে মাঠে-মাঠে নিয়ে যায়- তারপর পৃথিবীর ঘাস পাতা ডিম নীড়ঃ সে এক বিস্ময়এ-শরীর রোগ নখ মুখ চুল- এ-জীবন ইহা যাহা ইহা যাহা নয়; রঙিন কীটের মতো নিজের প্রাণের সাধে একরাত মাঠে জেগে রয়
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shiit-shesh/
835
জসীম উদ্‌দীন
নক্সী কাঁথার মাঠ - তেরো
কাহিনীকাব্য
(তেরো)একটি বছর হইয়াছে সেই রূপাই গিয়াছে চলি, দিনে দিনে নব আশা লয়ে সাজুরে গিয়াছে ছলি | কাইজায় যারা গিয়াছিল গাঁয়, তারা ফিরিয়াছে বাড়ী, শহরের জজ, মামলা হইতে সবারে দিয়াছে ছাড়ি | স্বামীর বাড়ীতে একা মেয়ে সাজু কি করে থাকিতে পারে, তাহার মায়ের নিকটে সকলে আনিয়া রাখিল তারে | একটি বছর কেটেছে সাজুর একটি যুগের মত, প্রতিদিন আসি, বুকখানি তার করিয়াছে শুধু ক্ষত |ও-গাঁয়ে রূপার ভাঙা ঘরখানি মেঘ ও বাতাসে হায়, খুঁটি ভেঙে আজ হামাগুড়ি দিয়ে পড়েছে পথের গায় | প্রতি পলে পলে খসিয়া পড়িছে তাহার চালের ছানি, তারও চেয়ে আজি জীর্ণ শীর্ণ সাজুর হৃদয়খানি | রাত দিন দুটি ভাই বোন যেন দুখেরই বাজায় বীণ | কৃষাণীর মেয়ে, এতটুকু বুক, এতটুকু তার প্রাণ, কি করিয়া সহে দুনিয়া জুড়িয়া অসহ দুখের দান! কেন বিধি তারে এত দুখ দিল, কেন, কেন, হায় কেন, মনের-মতন কাঁদায় তাহারে “পথের কাঙালী” হেন ?সোঁতের শেহলা ভাসে সোঁতে সোঁতে, সোঁতে সোঁতে ভাসে পানা, দুখের সাগরে ভাসিছে তেমনি সাজুর হৃদয়খানা | কোন্ জালুয়ার মাছ সে খেয়েছে নাহি দিয়ে তায় কড়ি, তারি অভিশাপ ফিরেছে কি তার সকল পরাণ ভরি ! কাহার গাছের জালি কুমড়া সে ছিঁড়েছিল নিজ হাতে, তাহারি ছোঁয়া কি লাগিয়াছে আজ তার জীবনের পাতে ! তোর দেশে বুঝি দয়া মায়া নাই, হা-রে নিদারুণ বিধি কোন্ প্রাণে তুই কেড়ে নিয়ে গেলি তার আঁচলের নিধি | নয়ন হইতে উড়ে গেছে হায় তার নয়নের তোতা, যে ব্যাথারে সাজু বহিতে পারে না, আজ তা রাখিবে কোথা ?এমনি করিয়া কাঁদিয়া সাজুর সারাটি দিবস কাটে, আমেনে কভু একা চেয়ে রয় দীঘল গাঁয়ের বাটে | কাঁদিয়া কাঁদিয়া সকাল যে কাটে---দুপুর কাটিয়া যায়, সন্ধ্যার কোলে দীপ নিবু-নিবু সোনালী মেঘের নায়ে | তবু ত আসে না ! বুকখানি সাজু নখে নখে আজ ধরে, পারে যদি তবে ছিঁড়িয়া ফেলায় সন্ধ্যার কাল গোরে | মেয়ের এমন দশা দেখে মার সুখ নাই কোন মনে, রূপারে তোমরা দেখেছ কি কেউ, শুধায় সে জনে জনে | গাঁয়ের সবাই অন্ধ হয়েছে, এত লোক হাটে যায়, কোন দিন কিগো রূপাই তাদের চক্ষে পড়ে নি হায় ! খুব ভাল করে খোঁজে যেন তারে, বুড়ী ভাবে মনে মনে, রূপাই কোথাও পলাইয়া আছে হয়ত হাটের কোণে | ভাদ্র মাসেতে পাটের বেপারে কেউ কেউ যায় গাঁরষ নানা দেশে তারা নাও বেয়ে যায় পদ্মানদীর পার | জনে জনে বুড়ী বলে দেয়, “দেখ, যখন যখানে যাও, রূপার তোমরা তালাস লইও, খোদার কছম খাও |” বর্ষার শেষে আনন্দে তারা ফিরে আসে নায়ে নায়ে, বুড়ী ডেকে কয়,  “রূপারে তোমরা দেখ নাই কোন গাঁয়ে !” বুড়ীর কথার উত্তর দিতে তারা নাহি পায় ভাষা, কি করিয়া কহে, আর আসিবে না যে পাখি ছেড়েছে বাসা |চৈত্র মাসেতে পশ্চিম হতে জন খাটিবার তরে, মাথাল মাথায় বিদেশী চাষীরা সারা গাঁও ফেলে ভরে | সাজুর মায়ে যে ডাকিয়া তাদের বসায় বাড়ির কাছে, তামাক খাইতে হুঁকো এনে দ্যায়, জিজ্ঞাসা করে পাছে ; “তোমরা কি কেউ রূপাই বলিয়া দেখেছ কোথাও কারে, নিটল তাহার গঠন গাঠন, কথা কয় ভারে ভারে |” এমনি করিয়া বলে বুড়ী কথা, তাহারা চাহিয়া রয়,--- রুপারে যে তারা দেখে নাই কোথা, কেমন করিয়া কয় ! যে গাছ ভেঙেছে ঝড়িয়া বাতাসে কেমন করিয়া হায়, তারি ডালগুলো ভেঙে যাবে তারা কঠোর কুঠার-ঘায় ?কেউ কেউ বলে, “তাহারি মতন দেখেছিন একজনে, আমাদের সেই ছোট গাঁয় পথে চলে যেতে আনমনে |” “আচ্ছা তাহারে সুধাও নি কেহ, কখন আসিবে বাড়ী, পরদেশে সে যে কোম্ প্রাণে রয় আমার সাজুরে ছাড়ি ?” গাঙে-পড়া-লোক যেমন করে তৃণটি আঁকড়ি ধরে, তেমনি করিয়া চেয়ে রয় বুড়ী তাদের মুখের পরে | মিথ্যা করেই তারা বলে, “সে যে আসিবে ভাদ্র মাসে, খবর দিয়েছে, বুড়ী যেন আর কাঁদে না তাহার আশে |” এত যে বেদনা তবু তারি মাঝে একটু আশার কথা, মুহুর্তে যেন মুছাইয়া দেয় কত বরষের ব্যথা | মেয়েরে ডাকিয়া বার বার কহে, “ভাবিস না মাগো আর, বিদেশী চাষীরা কয়ে গেল মোর---খবর পেয়েছে তার |” মেয়ে শুধু দুটি ভাষা-ভরা আঁখি ফিরাল মায়ের পানে ; কত ব্যথা তার কমিল ইহাতে সেই তাহা আজ জানে | গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল, আসিল ভাদ্র মাস, বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস |আজকে আসিবে কালকে আসিবে, হায় নিদারুণ আশা, ভোরের পাখির মতন শুধুই ভোরে ছেড়ে যায় বাসা | আজকে কত না কথা লয়ে যেন বাজিছে বুকের বীনে, সেই যে প্রথম দেখিল রূপারে বদনা-বিয়ের দিনে | তারপর সেই হাট-ফেরা পথে তারে দেখিবার তরে, ছল করে সাজু দাঁড়ায়ে থাকিত গাঁয়ের পথের পরে | নানা ছুতো ধরি কত উপহার তারে যে দিত আনি, সেই সব কথা আজ তার মনে করিতেছে কানাকানি | সারা নদী ভরি জাল ফেলে জেলে যেমনি করিয়া টানে, কখন উঠায়, কখন নামায়, যত লয় তার প্রাণে ; তেমনি সে তার অতীতেরে আজি জালে জালে জড়াইয়া টানে, যদি কোন কথা আজিকার দিনে কয়ে যায় নব-মানে |আর যেন তার কোন কাজ নাই, অতীত আঁধার গাঙে, ডুবারুর মত ডুবিয়া ডুবিয়া মানক মুকুতা মাঙে | এতটুকু মান, এতটুকু স্নেহ, এতটুকু হাসি খেলা, তারি সাথে সাজু ভাসাইতে চায় কত না সুখের ভেলা ! হায় অভাগিনী ! সে ত নাহি জানে আগে যারা ছিল ফুল, তারাই আজিকে ভুজঙ্গ হয়ে দহিছে প্রাণের মূল | যে বাঁশী শুনিয়া ঘুমাইত সাজু, আজি তার কথা স্মরি, দহন নাগের গলা জড়াইয়া একা জাগে বিভাবরী |মনে পড়ে আজ সেই শেষ দিনে রূপার বিদায় বাণী--- “মোর কথা যদি মনে পড়ে তবে পরিও সিঁদুরখানি |” আরও মনে পড়ে, “দীন দুঃখীর যে ছাড়া ভরসা নাই, সেই আল্লার চরণে আজিকে তোমারে সঁপিয়া যাই |”হায় হায় পতি, তুমি ত জান না কি নিঠুর তার মন ; সাজুর বেদনা সকলেই শোনে, শোনে না সে একজন | গাছের পাতারা ঝড়ে পরে পথে, পশুপাখি কাঁদে বনে, পাড়া প্রতিবেশী নিতি নিতি এসে কেঁদে যায় তারি সনে | হায় রে বধির, তোর কানে আজ যায় না সাজুর কথা ; কোথা গেলে সাজু জুড়াইবে এই বুক ভরা ব্যথা | হায় হায় পতি, তুমি ত ছাড়িয়া রয়েছ দূরের দেশে, আমার জীবন কি করে কাটিবে কয়ে যাও কাছে এসে ! দেখে যাও তুমি দেখে যাও পতি তোমার লাই-এর লতা, পাতাগুলি তার উনিয়া পড়েছে লয়ে কি দারুণ ব্যথা | হালের খেতেতে মন টিকিত না আধা কাজ ফেলি বাকি, আমারে দেখিতে বাড়ি যে আসিতে করি কতরূপ ফাঁকি | সেই মোরে ছেড়ে কি করে কাটাও দীর্ঘ বরষ মাস, বলিতে বলিতে ব্যথার দহনে থেমে আসে যেন শ্বাস |নক্সী-কাঁথাটি বিছাইয়া সাজু সারারাত আঁকে ছবি, ও যেন তাহার গোপন ব্যথার বিরহিয়া এক কবি | অনেক সুখের দুঃখের স্মৃতি ওরি বুকে আছে লেখা, তার জীবনের ইতিহাসখানি কহিছে রেখায় রেখা | এই কাঁথা যবে আরম্ভ করে তখন সে একদিন, কৃষাণীর ঘরে আদরিনী মেয়ে সারা গায়ে সুখ-চিন | স্বামী বসে তার বাঁশী বাজায়েছে, সিলাই করেছে সেজে ; গুন গুন করে গান কভু রাঙা ঠোঁটেতে উঠেছে বেজে |সেই কাঁথা আজো মেলিয়াছে সাজু যদিও সেদিন নাই, সোনার স্বপন আজিকে তাহার পুড়িয়া হয়েছে ছাই |খুব ধরে ধরে আঁকিল যে সাজু রূপার বিদায় ছবি, খানিক যাইয়া ফিরে ফিরে আসা, আঁকিল সে তার সবি | আঁকিল কাঁথায়---আলু থালু বেশে চাহিয়া কৃষাণ-নারী, দেখিছে তাহার স্বামী তারে যায় জনমের মত ছাড়ি | আঁকিতে আঁকিতে চোখে জল আসে, চাহনি যে যায় ধুয়ে, বুকে কর হানি, কাঁথার উপরে পড়িল যে সাজু শুয়ে | এমনি করিয়া বহুদিন যায়, মানুষে যত না সহে, তার চেয়ে সাজু অসহ্য ব্যথা আপনার বুকে বহে | তারপর শেষে এমনি হইল, বেদনার ঘায়ে ঘায়ে, এমন সোনার তনুখানি তার ভাঙিল ঝরিয়া-বায়ে | কি যে দারুণ রোগেতে ধরিল, উঠিতে পারে না আর ; শিয়রে বসিয়া দুঃখিনী জননী মুছিল নয়ন-ধার | হায় অভাগীর একটি মানিক ! খোদা তুমি ফিরে চাও, এরে যদি নিবে তার আগে তুমি মায়েরে লইয়া যাও ! ফিরে চাও তুমি আল্লা রসুল ! রহমান তব নাম, দুনিয়ায় আর কহিবে না কেহ তারে যদি হও বাম !মেয়ে কয়, “মাগো ! তোমার বেদনা আমি সব জানি, তার চেয়ে যেগো অসহ্য ব্যথা ভাঙে মোর বুকখানি ! সোনা মা আমার ! চক্ষু মুছিয়া কথা শোন, খাও মাথা, ঘরের মেঝেয় মেলে ধর দেখি আমার নক্সী-কাঁথা ! একটু আমারে ধর দেখি মাগো, সূঁচ সুতা দাও হাতে, শেষ ছবি খানা এঁকে দেখি যদি কোন সুখ হয় তাতে |” পাণ্ডুর হাতে সূঁচ লয়ে সাজু আঁকে খুব ধীরে ধীরে, আঁকিয়া আঁকিয়া আঁখিজল মুছে দেখে কত ফিরে ফিরে |কাঁথার উপরে আঁকিল যে সাজু তাহার কবরখানি, তারি কাছে এক গেঁয়ো রাখালের ছবিখানি দিল টানি ; রাত আন্ধার কবরের পাশে বসি বিরহী বেশে, অঝোরে বাজায় বাঁশের বাঁশীটি বুক যায় জলে ভেসে | মনের মতন আঁকি এই ছবি দেখে বার বার করি, দুটি পোড়া চোখ বারবার শুধু অশ্রুতে উঠে ভরি | দেখিয়া দেখিয়া ক্লান্ত হইয়া কহিল মায়েরে ডাকি, “সোনা মা আমার! সত্যিই যদি তোরে দিয়ে যাই ফাঁকি ; এই কাঁথাখানি বিছাইয়া দিও আমার কবর পরে, ভোরের শিশির কাঁদিয়া কাঁদিয়া এরি বুকে যাবে ঝরে ! সে যদি গো আর ফিরে আসে কভু, তার নয়নের জল, জানি জানি মোর কবরের মাটি ভিজাইবে অবিরল | হয়ত আমার কবরের ঘুম ভেঙে যাবে মাগো তাতে, হয়ত তাহারে কাঁদাইতে আমি জাগিব অনেক রাতে | এ ব্যথা সে মাগো কেমনে সহিবে, বোলো তারে ভালো করে, তার আঁখি জল ফেলে যেন এই নক্সী-কাঁথার পরে | মোর যত ব্যথা, মোর যত কাঁদা এরি বুকে লিখে যাই, আমি গেলে মোর কবরের গায়ে এরে মেলে দিও তাই ! মোর ব্যথা সাথে তার ব্যথাখানি দেখে যেন মিল করে, জনমের মত সব কাঁদা আমি লিখে গেনু কাঁথা ভরে |” বলিতে বলিতে আর যে পারে না, জড়াইয়া আসে কথা, অচেতন হয়ে পড়িল যে সাজু লয়ে কি দারুণ ব্যথা |কানের কাছেতে মুখ লয়ে মাতা ডাক ছাড়ি কেঁদে কয়, “সাজু সাজু ! তুই মোরে ছেড়ে যাবি এই তোর মনে লয় ?” “আল্লা রসুল ! আল্লা রসুল !” বুড়ী বলে হাত তুলে, “দীন দুঃখীর শেষ কান্না এ, আজিকে যেয়ো না ভুলে !” দুই হাতে বুড়ী জড়াইতে চায় আঁধার রাতের কালি, উতলা বাতাস ধীরে ধীরে বয়ে যায়, সব খালি ! সব খালি !! “সোনা সাজুরে, মুখ তুলে চাও, বলে যাও আজ মোরে, তোমারে ছাড়িয়া কি করে যে দিন কাটিবে একেলা ঘরে !”দুখিনী মায়ের কান্নায় আজি খোদার আরশ কাঁপে, রাতের আঁধার জড়াজড়ি করে উতল হাওয়ার দাপে |
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-13/
1867
পূর্ণেন্দু পত্রী
বুকে লেবুপাতার বাগান
রূপক
গত মাসের কাগজে আমাকে ঘোষণা করা হয়েছে মৃত। একাধিক ময়না তদন্তের রিপোর্ট ঘেটে ঘেটে ওরা খুজেছে লেবুপাতার গন্ধ আর রুপোলী ডট পেন। যেহেতু লেবুপাতার গন্ধেই আমি প্রথম পেয়েছিলাম পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার স্বাদ। আর ঐ রুপোলী ডট্ পেন আমাকে শিখিয়েছিল অক্ষর দিয়ে কিভাবে গড়তে হয় শাখা-প্রশাখাময় জীবন। গত মাসের কাগজে মৃত ঘোষনার পরেও ওরা কিন্তু তন্ন তন্ন খুঁজে বেড়াচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত দামাল শালবন। ওদের বুট জুতোয় থ্যেৎলে যাচ্ছে সুর্যকিরণে জেগে ওঠা জল, মানুষের মধ্যে যাতায়াতকারী সাঁকো। আমি এখন উদয় এবং অন্তের মাঝামাঝি এক দিগন্তে। হাতে রুপোলী ডট পেন বুকে লেবুপাতার বাগান
https://banglarkobita.com/poem/famous/1218
2497
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
পরিমার্জন বাকি
প্রেমমূলক
ভালোবাসার আর একটা নাম কষ্ট কষ্ট আমার বড় আপন - ভালোবাসা পর ভালোবাসা বাইরে থাকে, কষ্ট নিয়ে বাঁচে এ অন্তর ।।মেঘের কাঁদন ফুরালে হয় আকাশটা উজ্জ্বল । হৃদয় কাঁদলে কেউ দেখে না ভালোবাসা বাইরে থেকে মোছে চোখের জল । অন্তরের আকাশে আমার মেঘ বেঁধেছে চিরদিনের ঘর ।।সুখী সুখী মুখে যাদের ভালোবাসা-বাসি ধন্য বলে মানতে গিয়ে দেখি --- অন্তর ঢেকে রেখে তারা মুখে আনে হাসি ।সময় কেবল অভিনয়ের, জীবনটা কষ্টের । মনের মধ্যে মন পুড়িয়ে জ্বলে ওঠা সেই হাসিও শুধু বিনষ্টের । নষ্ট এই আগুনে আমার কষ্ট আহ কী অবিনশ্বর ।। ২/ ১১/ '১৬
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/post20161127080430/
3017
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘন কাঠিন্য রচিয়া শিলাস্তূপে
স্বদেশমূলক
ঘন কাঠিন্য রচিয়া শিলাস্তূপে দূর হতে দেখি আছে দুর্গমরূপে। বন্ধুর পথ করিনু অতিক্রম— নিকটে আসিনু, ঘুচিল মনের ভ্রম। আকাশে হেথায় উদার আমন্ত্রণ, বাতাসে হেথায় সখার আলিঙ্গন, অজানা প্রবাসে যেন চিরজানা বাণী প্রকাশ করিল আত্মীয়গৃহখানি।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ghono-kathonyo-rochia-shilastupe/
4559
শামসুর রাহমান
কমা সেমিকোলনের ভিড়ে
চিন্তামূলক
বিচিত্র হিংসুক ভিড় শিল্পকে প্রচণ্ড লাথি মেরে, তীব্র কোলাহল করে বোধগুলি আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো, যেন ছেঁড়া হলুদ কাগজ। ক্রমাগত সময় তাড়িত তারা, ঘোরে ঘূর্ণিপথে, বাঁশিগুলি তাদের রোমশ হাতে গুঁড়ো হয়, চতুর্দিকে শুধু বেজে ওঠে ক্যানাস্তারা। জীবন দু’হাতে ঢাকে কান!কমা সেমিকোলনের ভিড়ে এ জীবন কখনো বা ঢ্যাঙা এক শূন্যতায় ভীষণ হাঁপিয়ে ওঠে, পালাই পালাই বলে রোজ প্রহর হত্যার দায়মুক্ত হতে চায়, মুখ থুবড়ে পড়ে দেখি কেমন খুঁড়িয়ে হেঁটে স্মরণীয়ভাবে গলি আর এভেনিউ নিঃসঙ্গ পেরিয়ে যায়, বেলাশেষে হয়তোবা ঝুলে থাকে বাসে। ডানে কিংবা বামে লতাগুল্ম, তৃণদল কিছুই পড়ে না চোখে, নিরুপায় রক্তচক্ষু মেলে দূর নীলনবঘনে।“এ-ও ভালো শুকনো ডালে ঝুলে ঝুলে তুমি প্রতিদিন রাজহাঁস হওয়ার রুটিন-বাঁধা স্বপ্নে মশগুল, এ-ও ভালো রঙরেজিনীর কিছু রঙ ধার নিয়ে কদাচিৎ নিজের আত্মার চিত্র মনোহারী করার নিখুঁত প্রয়াসে নিমগ্ন থাকা, ছুঁড়ে ফেলে দেয়া দূরে নিরঙ বুরুশ- এ-ও ভালো; ভালো এই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা মরজগতের শিল্প সব, চেয়ে দেখা যা-কিছু লুকানো রহস্যের রুপালি আধারে, ভালো কমা সেমিকোলনের ভিড়ে “নিমজ্জন। অতঃপর নানান ফুলের ডাঁটা নিয়ে শূন্য বুকে বেপরোয়া নিদ্রা যাওয়া ভালো, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পালা এলেই নিশ্চিত জেনো চুকে যাবে সব পাট। দ্যাখো সারাক্ষণ কারা যেন সুন্দর পাখির ঝাঁক প্রত্যহ দু’বেলা পোড়াচ্ছে ফার্ণেসে” বলে এ জীবন ভাঙ্গা হাঁটু গেড়ে বসে গৃহকোণে আর মাথা রাখে স্বপ্নহীন ক্ষুধিত দেয়ালে।   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/koma-semikoloner-vire/
2011
বুদ্ধদেব বসু
রুপান্তর
চিন্তামূলক
দিন মোর কর্মের প্রহারে পাংশু, রাত্রি মোর জ্বলন্ত জাগ্রত স্বপ্নে | ধাতুর সংঘর্ষে জাগো, হে সুন্দর, শুভ্র অগ্নিশিখা, বস্তুপুঞ্জ বায়ু হোক, চাঁদ হোক নারী, মৃত্তিকার ফুল হোক আকাশের তারা | জাগো, হে পবিত্র পদ্ম, জাগো তুমি প্রাণের মৃণালে, চিরন্তনে মুক্তি দাও ক্ষণিকার অম্লান ক্ষমায়, ক্ষণিকেরে কর চিরন্তন | দেহ হোক মন, মন হোক প্রাণ, প্রাণেহোক মৃত্যুর সঙ্গম, মৃত্যু হোক দেহ প্রাণ, মন
http://kobita.banglakosh.com/archives/4136.html
4018
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হম সখি দারিদ নারী
ভক্তিমূলক
হম সখি দারিদ নারী ! জনম অবধি হম পীরিতি করনু মোচনু লোচন - বারি । রূপ নাহি মম , কছুই নাহি গুণ দুখিনী আহির জাতি , নাহি জানি কছু বিলাস - ভঙ্গিম যৌবন গরবে মাতি । অবলা রমণী , ক্ষুদ্র হৃদয় ভরি পীরিত করনে জানি ; এক নিমিখ পল , নিরখি শ্যাম জনি সোই বহুত করি মানি । কুঞ্জ পথে যব নিরখি সজনি হম , শ্যামক চরণক চীনা , শত শত বেরি ধূলি চুম্বি সখি , রতন পাই জনু দীনা । নুঠুর বিধাতা , এ দুখ - জনমে মাঙব কি তুয়া পাশ ! জনম অভাগী , উপেখিতা হম , বহুত নাহি করি আশ ,— দূর থাকি হম রূপ হেরইব , দূরে শুনইব বাঁশি । দূর দূর রহি সুখে নিরীখিব শ্যামক মোহন হাসি । শ্যাম - প্রেয়সি রাধা ! সখিলো ! থাক' সুখে চিরদিন ! তুয়া সুখে হম রোয়ব না সখি অভাগিনী গুণ হীন । অপন দুখে সখি , হম রোয়ব লো , নিভৃতে মুছইব বারি । কোহি ন জানব , কোন বিষাদে তন - মন দহে হমারি । ভানু সিংহ ভনয়ে , শুন কালা দুখিনী অবলা বালা— উপেখার অতি তিখীনি বাণে না দিহ না দিহ জ্বালা ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ham-sake-daredi-nare/
341
কাজী নজরুল ইসলাম
তোমায় যেমন করে ডেকেছিল
ভক্তিমূলক
তোমায় যেমন করে ডেকেছিল আরব মরুভূমি; ওগো আমার নবী প্রিয় আল আরাবী, তেমনি করে ডাকি যদি আসবে নাকি তুমি।।যেমন কেঁদে দজলা ফোরাত নদী ডেকেছিল নিরবধি, হে মোর মরুচারী নবুয়তধারী, তেমনি করে কাঁদি যদি আসবে নাকি তুমি।।যেমন মদিনা আর হেরা পাহাড় জেগেছিল আশায় তোমার হে হযরত মম, হে মোর প্রিয়তম, তেমনি করে জাগি যদি আসবে নাকি তুমি।।মজলুমেরা কাবা ঘরে কেঁদেছিল যেমন করে, হে আমিনা- লালা, হে মোর কামলীওয়ালা, তেমনি করে চাহি যদি আসবে নাকি তুমি।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/toay-jemon-korey-dekechiley/
4217
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
তুচ্ছ, তুচ্ছ এইসব
চিন্তামূলক
তুচ্ছ এইসব–এই জানালা কপাট গোরস্থান তুচ্ছ, তুচ্ছ এইসব, ভালোবাসা, ভালো-মন্দে বাসা তুচ্ছ, তুচ্ছ, এইসব জানালা কপাট গোরস্থান…তারপর, কে আছো মন্দিরে? মন্দিরে ভিতে কি ফড়িং? ভালোবাসা মানে এক হিম অন্ধকার খুঁজে নিয়ে পুঁতে ফেলা অশ্লীল ডালিমতারপর, কে আছো মন্দিরে? আমি যাই ভিত্তি খুঁড়ে খুঁড়ে আমি যাই ভিত্তি খুঁড়ে খুঁড়ে…
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/tuchchho-tuchchho-eishob/
1602
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
তার চেয়ে
নীতিমূলক
সকলকে জ্বালিয়ে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে বরং আজন্ম যেমন জ্বলছ ধিকিধিকি, একা দিনরাত্রি তেমনি করে জ্বলতে থাকো, জ্বলতে-জ্বলতে ক্ষয়ে যেতে থাকো, দিনরাত্রি অর্থাৎ মুখের কশ বেয়ে যতদিন রক্ত না গড়ায়। একদিন মুখের কশ বেয়ে রক্ত ঠিক গড়িয়ে পড়বে। ততদিন তুমি কী করবে? পালিয়ে-পালিয়ে ফিরবে নাকি? পালিয়ে-পালিয়ে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে বরং আজন্ম যেমন আছ, একা পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দিনরাত্রি তেমনি করে জ্বলতে থাকো, জ্বলতে-জ্বলতে ক্ষয়ে যেতে থাকো, দিনরাত্রি অর্থাৎ নিয়তি যতদিন ঘোমটা না সরায়। নিয়তির ঘোমটা একদিন হঠাৎ সরবে। সরে গেলে তুমি কী করবে? মুখে রক্ত, চোখে অন্ধকার নিয়ে তাকে বলবে নাকি “আর যে না-জ্বলি”? না না, তা বোলো না। তার চেয়ে বরং বোলো, “আমি দ্বিতীয় কাউকে না-জ্বালিয়ে একা-একা জ্বলতে পেরেছি, সে-ই ভাল; আগুনে হাত রেখে তবু বলতে চেয়েছি, ‘সবকিছু সুন্দর’– সে-ই ভাল।” বোলো যে, এ ছাড়া কিছু বলবার ছিল না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1635
2797
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক
ভক্তিমূলক
এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক; চৈতন্যের শুভ্র জ্যোতি ভেদ করি কুহেলিকা সত্যের অমৃত রূপ করুক প্রকাশ। সর্বমানুষের মাঝে এক চিরমানবের আনন্দকিরণ চিত্তে মোর হোক বিকীরিত। সংসারের ক্ষুব্ধতার স্তব্ধ ঊর্ধ্বলোকে নিত্যের যে শান্তিরূপ তাই যেন দেখে যেতে পারি, জীবনের জটিল যা বহু নিরর্থক, মিথ্যার বাহন যাহা সমাজের কৃত্রিম মূল্যেই, তাই নিয়ে কাঙালের অশান্ত জনতা দূরে ঠেলে দিয়ে এ জন্মের সত্য অর্থ স্পষ্ট চোখে জেনে যাই যেন সীমা তার পেরোবার আগে।  (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/e-amir-aboron-sohoje-skholito-hoye-jak/
4904
শামসুর রাহমান
নো এক্সিট
চিন্তামূলক
আমাকে যেতেই হবে যদি, তবে আমি যীশুর মতন নগ্ন পদে চলে যেতে চাই। কাঁধে ক্রূশকাঠ থাকতেই হবে কিংবা কাঁটার মুকুট মাথায় পরতে হবে, এটা কোনো কাজের কথা না। এসব মহান অলংকার আমার দরকার নেই। বাস্তবিক আমি এক হাত নীল ট্রাউজারের পকেটে রেখে অন্য হাত নেড়ে নেড়ে সিঁড়ি বেয়ে ‘আচ্ছা চলি, তাহলে বিদায়’ ব’লে একটি উচ্ছিষ্ট রাত্রি ফেলে রেখে নির্জন পেছনে অত্যন্ত নিভৃত নিচে, শিরদাঁড়াময় নক্ষত্রটোলার পত্রপত্রালির ঈষৎ দুলুনি নিয়ে খুব নিচে চলে যেতে চাই।অবশ্য সহজ নয় এভাবে চকিতে চলে যাওয়া। ত্র্যাশট্রেতে টুকরো টুকরো মৃত সিগারেট, শূন্য গ্লাশগুলো বৈধব্যে নিস্তব্ধ আর টেবিলে বেজায় উল্টোপাল্টা পান্ডুলিপি -প্রস্থানের আগে এই সব খুঁটিনাটি বেকুব অত্যন্ত আর্তস্বরে কিছু ডাক দেয়।তখন আমার বুকে তিন লক্ষ টিয়ে তুমুল ঝাঁপিয়ে পড়ে, কয়েক হাজার নাঙা বিকট সন্যাসী চিমটে বাজাতে থাকে চতুর্ধারে, পাঁচশো কামিনী দুলুনিপ্রবণ স্তন বের করে ধেই ধেই নাচ শুরু করে। আর আমি চোখ-কান বন্ধ ক’রে সাত তাড়াতাড়ি বিদায় বিদায় ব’লে ক্ষিপ্র দৌড়বাজের মতন ছুটে যাই, ছুটে যাই দূরে অবিরত। ইচ্ছে হলেও প্রবল কাউকে দিই না অভিশাপ; এতদিনে জেনে গেছি আমার কর্কশ অভিশাপেকোনো নারী গাছ কিংবা প্রতিধ্বনি হবে না কখনো, অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয় ফেলবে না হারিয়ে নৌকোয় কোনো শকুন্তলা, এমন কি খসবে না একটিও পালক বিবাগী মরালের। সার্কাস ফুরিয়ে গেলে এক্রোব্যাট অথবা ক্লাউন সবাই বিষণ্ন হয় অগোচরে হয়তো বা। কেউ ছেড়ে চুল, অন্ধকার তাঁবুর ভেতর কেউ খায় হাবুডুবু দুঃস্বপ্নের ক্ষুধার্ত কাদায়,কেউ বা একটি লাল বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে কৈশোরের সমকামী প্রহরে প্রবেশ করে, বমিতে ভাসায় মাটি কেউ, কেউ উত্তপ্ত প্রলাপে!হে আমার বন্ধুগণ, দোহাই আপনাদের, দেরি সইছে না; দিন বলে দিন, তা’হলে আমি কি এই সার্কাসের কেউ? আপনারা যে যাই বলুন, এই গা ছুঁয়ে বলছি মাঝে-মধ্যে, না, ঠিক হলো না, প্রায়শই বলা চলে, নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। স্বজনের লাশ কবরে নামিয়ে চটপটঢোক ঢোক গিলতে পারি মদ খুব ধোঁয়াটে আড্ডায়, প্রিয়তম বন্ধু আত্মহত্যা করেছে শুনেও নিদারুণ মানসিক নিপট খরায় অবৈধ সংগম ক’রে ঘামে নেয়ে উঠতে পারি সহজ অভ্যাসে।আমাকে যেতেই হবে যদি, তবে আমি যীশুর মতন নগ্ন পদে চলে যেতে চাই। অথচ হঠাৎ একজন তারস্বরে বলে ওঠে, ‘নো এক্সিট, শোনো তোমার গন্তব্য নেই কোনো’। না থাকুক, তবু যাবো, দিব্যি হাত নেড়ে নেড়ে চলে যাবো, কেউবাধা দিতে এলে বিষম শাসিয়ে দেবো, লেট মি এলোন, স’রে দাঁড়াও সবাই…… লক্ষ্মী কি অলক্ষ্মী আমি চাই না কিছুই, চাই শুধু যেতে চাই।   (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/no-exit/
5694
সুকুমার রায়
সন্দেশ
ছড়া
সন্দেশের গন্ধে বুঝি দৌড়ে এল মাছি? কেন ভন্ ভন্ হাড় জ্বালাতন ছেড়ে দেওনা বাঁচি! নাকের গোড়ায় সুড়সুড়ি দাও শেষটা দিবে ফাঁকি? সুযোগ বুঝে সুড়–ৎ করে হুল ফোটাবে নাকি?
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/sondesh/
481
কাজী নজরুল ইসলাম
রবির জন্মতিথি
স্বদেশমূলক
রবির জন্মতিথি কয়জন জানে? অঙ্ক কষিয়া পেয়েছ কি বিজ্ঞানে? ধ্যানী যোগী দেখেছে কি? জ্ঞানী দেখিয়াছে? ঠিকুজি আছে কি কোনো জ্যোতিষীর কাছে? নাই – নাই ! কত কোটি যুগ মহাব্যোমে আলো অমৃত দিয়ে ধ্রুব রবি ভ্রমে! জানে না জানে না। উদয় ও অস্ত তাঁর সে শুধু লীলাবিলাস, গোপন বিহার। রবি কি অস্ত যায়? অন্ধ মানব রবি ডুবে গেল বলে করে কলরব। রবি শাশ্বত, তাঁর নিত্য প্রকাশ রূপ ধরি পৃথিবীতে ক্ষণিক বিলাস করিয়া চলিয়া যায় জ্যোতির্লোকে, এখনও দ্রষ্টা নেহারে তাঁর চোখে। এই সুরভির ফুল রস-ভরা ফল রবির গলিত প্রেমবৃষ্টির জল কবিতা ও গান সুর-নদী হয়ে বয় রবি যদি মরে যায় পৃথিবী কি রয়! জন্ম হয়নি যাহার জ্যোতির্লোকে, তন্দ্রা টুটেনি যাহার অন্ধ চোখে, রবির জন্মতিথি দেখেনি সে-জন আজও তার কাছে রবি অপ্রয়োজন। কবি হয়ে এল রবি এই বাংলায় দেখিল বুঝিল বলো কতজন তাঁয়? রবি দেখে পেয়েছে যে আলোক প্রথম তাঁরই মাঝে লভে রবি প্রথম জনম। নিরক্ষর ও নিস্তেজ বাংলায় অক্ষরজ্ঞান যদি সকলেই পায়, অ-ক্ষর অব্যয় রবি সেই দিন সহস্র করে বাজাবেন তাঁর বীণ। সেদিন নিত্য রবির জন্মতিথি হইবে। মানুষ দিবে তাঁরে প্রেমপ্রীতি।  (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/robir-jonmotithi/
3876
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ কথা (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
সনেট
মনে হয় কী একটি শেষ কথা আছে , সে কথা হইলে বলা সব বলা হয় । কল্পনা কাঁদিয়া ফিরে তারি পাছে পাছে , তারি তরে চেয়ে আছে সমস্ত হৃদয় । শত গান উঠিতেছে তারি অন্বেষণে , পাখির মতন ধায় চরাচরময় । শত গান ম'রে গিয়ে , নূতন জীবনে একটি কথায় চাহে হইতে বিলয় । সে কথা হইলে বলা নীরব বাঁশরি , আর বাজাব না বীণা চিরদিন - তরে । সে কথা শুনিতে সবে আছে আশা করি , মানব এখনো তাই ফিরিছে না ঘরে । সে কথায় আপনারে পাইব জানিতে , আপনি কৃতার্থ হব আপন বাণীতে ।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shesh-kotha-kori-o-komol/
3726
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মিলের চুমকি গাঁথি ছন্দের পাড়ের মাঝে মাঝে
রূপক
মিলের চুমকি গাঁথি ছন্দের পাড়ের মাঝে মাঝে অকেজো অলস বেলা ভরে ওঠে শেলাইয়ের কাজে। অর্থভরা কিছুই-না চোখে ক’রে ওঠে ঝিল্‌মিল্‌ ছড়াটার ফাঁকে ফাঁকে মিল। গাছে গাছে জোনাকির দল করে ঝলমল; সে নহে দীপের শিখা, রাত্রি খেলা করে আঁধারেতে টুকরো আলোক গেঁথে গেঁথে। মেঠো গাছে ছোটো ছোটো ফুলগুলি জাগে; বাগান হয় না তাহে, রঙের ফুটকি ঘাসে লাগে। মনে থাকে, কাজে লাগে, সৃষ্টিতে সে আছে শত শত; মনে থাকবার নয়, সেও ছড়াছড়ি যায় কত। ঝরনায় জল ঝ’রে উর্বরা করিতে চলে মাটি; ফেনাগুলো ফুটে ওঠে, পরক্ষণে যায় ফাটি ফাটি। কাজের সঙ্গেই খেলা গাঁথা– ভার তাহে লঘু রয়, খুশি হন সৃষ্টির বিধাতা।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/miler-chumki-gathi-chonder-parer-majhe-majhe/
4088
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সে তো হেমলক বিষ
মানবতাবাদী
যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা। জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে ক্রমশঃ উঠছে ফুটে ক্ষয়রোগ, রোগেরপ্রকোপ একদার অন্ধকারে ধর্ম এনে দিয়েছিল আলো, আজ তার কংকালের হাড় আর পঁচা মাংসগুলো ফেরি কোরে ফেরে কিছু স্বার্থাণ্বেষী ফাউল মানুষ- সৃষ্টির অজানা অংশ পূর্ণ করে গালগল্প দিয়ে। আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সে তো হেমলকবিষ। ধর্মান্ধের ধর্ম নেই, আছে লোভ, ঘৃণ্য চতুরতা, মানুষের পৃথিবীকে শত খণ্ডে বিভক্ত করেছে তারা টিকিয়ে রেখেছে শ্রেণীভেদ ঈশ্বরের নামে। ঈশ্বরের নামে তারা অনাচার করেছে জায়েজ। হা অন্ধতা! হা মুর্খামি! কতোদূর কোথায় ঈশ্বর! অজানা শক্তির নামে হত্যাযজ্ঞ কতো রক্তপাত, কত যে নির্মম ঝড় বয়ে গেল হাজার বছরে! কোন্ সেই বেহেস্তের হুর আর তহুরাশরাব? অন্তহীন যৌনাচারে নিমজ্জিত অনন্ত সময়? যার লোভে মানুষও হয়ে যায় পশুর অধম। আর কোন দোজখ বা আছে এর চেয়ে ভয়াবহ ক্ষুধার আগুন সে কি হাবিয়ার চেয়েখুব কম? সে কি রৌরবের চেয়ে নম্র কোন নরোমআগুন? ইহকাল ভুলে যারা পরকালে মত্ত হয়েআছে চলে যাক সব পরপারে বেহেস্তে তাদের আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে, দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায় আগামীর স্বপ্নে মুগ্ধ বুনে যাবো সমতার বীজ
http://kobita.banglakosh.com/archives/1438.html
2786
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উদ্বোধন
মানবতাবাদী
প্রথম যুগের উদয়দিগঙ্গনে প্রথম দিনের উষা নেমে এল যবে প্রকাশপিয়াসি ধরিত্রী বনে বনে শুধায়ে ফিরিল, সুর খুঁজে পাবে কবে। এসো এসো সেই নব সৃষ্টির কবি নবজাগরণ-যুগপ্রভাতের রবি। গান এনেছিলে নব ছন্দের তালে তরুণী উষার শিশিরস্নানের কালে, আলো-আঁধারের আনন্দবিপ্লবে। সে গান আজিও নানা রাগরাগিণীতে শুনাও তাহারে আগমনীসংগীতে যে জাগায় চোখে নূতন দেখার দেখা। যে এসে দাঁড়ায় ব্যাকুলিত ধরণীতে বননীলিমার পেলব সীমানাটিতে, বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা। অবাক আলোর লিপি যে বহিয়া আনে নিভৃত প্রহরে কবির চকিত প্রাণে, নব পরিচয়ে বিরহব্যথা যে হানে বিহ্বল প্রাতে সংগীতসৌরভে, দূর-আকাশের অরুণিম উৎসবে। যে জাগায় জাগে পূজার শঙ্খধ্বনি, বনের ছায়ায় লাগায় পরশমণি, যে জাগায় মোছে ধরার মনের কালি মুক্ত করে সে পূর্ণ মাধুরী-ডালি। জাগে সুন্দর, জাগে নির্মল, জাগে আনন্দময়ী-- জাগে জড়ত্বজয়ী। জাগো সকলের সাথে আজি এ সুপ্রভাতে, বিশ্বজনের প্রাঙ্গণতলে লহো আপনার স্থান-- তোমার জীবনে সার্থক হোক নিখিলের আহ্বান।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/udbadan/
1524
নির্মলেন্দু গুণ
স্বাধীনতা,
স্বদেশমূলক
একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’ এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না, এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না, এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না৷ তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি? তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হদৃয় মাঠখানি? জানি, সেদিনের সব স্মৃতি ,মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত কালো হাত৷ তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ কবির বিরুদ্ধে কবি, মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ, বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল, উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান, মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ … ৷ হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি, শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প৷ সেই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর৷ না পার্ক না ফুলের বাগান, — এসবের কিছুই ছিল না, শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়৷ আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল এই ধু ধু মাঠের সবুজে৷ কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক, লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক, পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক৷ হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে আর তোমাদের মত শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে৷ একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্যে কী ব্যাকুল প্রতীক্ষা মানুষের: “কখন আসবে কবি?’ “কখন আসবে কবি?’ শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷ তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী? গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের৷
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%87-%e0%a6%b6%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a7%80%e0%a6%ad%e0%a6%be/
3622
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বুদ্ধির আকাশ যবে সত্যে সমুজ্জ্বল
নীতিমূলক
বুদ্ধির আকাশ যবে সত্যে সমুজ্জ্বল, প্রেমরসে অভিষিক্ত হৃদয়ের ভূমি— জীবনতরুতে ফলে কল্যাণের ফল, মাধুরীর পুষ্পগুচ্ছে উঠে সে কুসুমি।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/buddhir-akash-jobe-sotte-somujjal/
4514
শামসুর রাহমান
এমন কুটিল অন্ধকারে
মানবতাবাদী
এমন কুটিল অন্ধকারে হঠাৎ কোথায় যাব? জানোই তো রাগী শুয়োরের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে পরিবেশ সকল সময়। তবে আমি কোথায় খুঁজব শান্তিনিকেতন?এখন দেখছ না কি শুধু শীতাতপ- নিয়ন্ত্রিত নতুন মোটরকারে জ্বলজ্বলে দুপুরে ঘুরছে মাথায় মুকুট-পরা সাঙ্যাৎ খুনীর সঙ্গে? কান খাড়া রাখলেই গলি কিংবা রাজপথ থেকে ঠিক নিয়ত আসছে ভেসে জালিমের হুঙ্কার এবং অসহায় উৎপীড়িত নরনারীদের আর্তনাদ।দুপুরেও অমাবস্যা তুখোড় মোড়ল ইদানীং। অসহায় কুমারীর সম্ভ্রম রক্ষাই দায়; শহরে ও গ্রামে কত যে নারীর জীবনের আলো নরপশুদের থাবার দাপটে নিভে গেছে, কে তার হিসেব রাখে?তবুও মানুষ ঘর বাঁধে, আসমানে নক্ষত্রের মাইফেল বসলে দেখতে চায়। শিশুকে জড়ায় বুকে আর কান পাতে দূর থেকে ভেসে-আসা বাউলের গান অথবা বাঁশির সুরে, ভালবাসে দয়িতাকে ডাগর জ্যোৎস্নায়।  (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/emon-kutil-ondhokare/
5380
শ্রীজাত
প্রস্তাব
চিন্তামূলক
ঠিক যেরকম আজকে তোমার মুখের উপর পড়ন্ত রোদ্দুর। আমারও খুব ইচ্ছে পাঁচিল শ্যাওলা ধরা, সন্ধ্যা ভেঙ্গে চুরঠিক যে রকম কাঁদলে তোমার অফিস ফেরত রুমাল জানে সব আমারও বেশ মেঘ করেছে, ব্যালকনিতে আষাঢ়ে বিপ্লব।ঠিক যে রকম বারুদের তোমার বন্ধু না তাও আগুন চেয়েছ। আমারও আজ ফুলকি দেখে আর না-পেরে ঠিকরে পড়ে চোখঠিক যে রকম মেসেজ লিখে ডিলিট আবার ওপাশ ফিরে শুই আমারও রোজ ভাল লাগে না, বিরক্তিকর সামান্য তর্ক।ঠিক যেরকম তোমার মুখে এলাচ সুবাস, গলার কাছে ঘাম। আমারও সব ভুল পথে যায়। সঙ্গে কেবল পুরনাে ডাকনাম।ঠিক যেরকম মেট্রোতে রােজ মুখ বুজে সব ভুলতে চাওয়ার ছল আমারও দিন ব্যর্থ তা পায়, সন্ধে বুকে ক্লান্ত মফস্বল….ঠিক যেরকম ঝাপসা দেখা, বারান্দায় কাটতে থাকে রাত তাকিয়ে দ্যাখো, নীচে আমি ফুটপাতে ঠায় দাড়িয়ে আছি। ঠিক করে নাও, ধরবে আমার হাত?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4/
5623
সুকুমার রায়
তেজিয়ান
ছড়া
চলে খচ্‌খচ্ রাগে গজ্‌গজ্ জুতো মচ্‌মচ্ তানে, ভুরু কট্‌মট্ ছড়ি ফট্‌ফট্ লাথি চট্‌পট্ হানে। দেখে বাঘ-রাগ লোকে 'ভাগ ভাগ' করে আগভাগ থেকে, বয়ে লাফ ঝাঁপ বলে 'বাপ্ বাপ্' সবে হাবভাব দেখে। লাথি চার চার খেয়ে মার্জার ছোটে যার যার ঘরে, মহা উৎপাত ক'রে হুটপাট্ চলে ফুটপাথ্ পরে। ঝাড়ু–বর্দার হারুসর্দার ফেরে ঘরদ্বার ঝেড়ে, তারি বালতিএ- দেখে ফাল্ দিয়ে আসে পালটিয়ে তেড়ে। রেগে লালমুখে হেঁকে গাল রুখে মারে তাল ঠুকে দাপে, মারে ঠন্‌ঠন্ হাড়ে টন্‌টন্ মাথা ঝন ঝন কাঁপে! পায়ে কলসিটে! কেন বাল্‌তিতে মেরে চাল দিতে গেলে? বুঝি ঠ্যাং যায় খোঁড়া ল্যাংচায় দেখে ভ্যাংচায় ছেলে।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/tejiyan/
5708
সুকুমার রায়
হুঁকোমুখো হ্যাংলা
ছড়া
হুঁকোমুখো হ্যাংলা          বাড়ি তার বাংলা মুখে তার হাসি নাই দেখেছ? নাই তার মানে কি?      কেউ তাহা জানে কি? কেউ কভু তার কাছে থেকেছ? শ্যামাদাস মামা তার      আফিঙের থানাদার, আর তার কেহ নাই এ-ছাড়া - তাই বুঝি একা সে        মুখখানা ফ্যাকাশে, ব'সে আছে কাঁদ'-কাঁদ' বেচারা? থপ্ থপ্ পায়ে সে         নাচত যে আয়েসে, গালভরা ছিল তার ফুর্তি, গাইতো সে সারা দিন      'সারে গামা টিমটিম্' আহ্লাদে গদ-গদ মূর্তি। এই তো সে দুপ'রে        বসে ওই উপরে, খাচ্ছিল কাঁচকলা চটকে - এর মাঝে হল কি?       মামা তার মোলো কি? অথবা কি ঠ্যাং গেল মটকে? হুঁকোমুখো হেঁকে কয়,      'আরে দূর, তা তো নয়, দেখছ না কিরকম চিন্তা? মাছি মারা ফন্দি এ       যত ভাবি মন দিয়ে - ভেবে ভেবে কেটে যায় দিনটা। বসে যদি ডাইনে,         লেখে মোর আইনে - এই ল্যাজে মাছি মারি ত্রস্ত; বামে যদি বসে তাও,      নহি আমি পিছপাও, এই ল্যাজে আছে তার অস্ত্র। যদি দেখি কোনো পাজি      বসে ঠিক মাঝামাঝি কি যে করি ভেবে নাহি পাই রে - ভেবে দ্যাখ একি দায়       কোন্ ল্যাজে মারি তায় দুটি বৈ ল্যাজ মোর নাই রে।'
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/hukomukho-hyengla/
800
জসীম উদ্‌দীন
গল্পবুড়ো
ছড়া
গল্পবুড়ো, তোমার যদি পেটটি ভরে রূপকথা সব গিজ গিজ গিজ করে, আর যদি না চলতে পার, শোলক এবং হাসির, ছড়ার, পড়ার কথার ভরে; যদি তোমার ইলি মিলি কিলি কথা খালি খালি ছড়িয়ে যেতে চায় সে পথের ধারে, তবে তুমি এখানটিতে দাঁড়িয়ে গিয়ে ডাক দিও ভাই- ডাক দিও ভাই! মোদের পূর্নিমারে। যদি তোমার মিষ্টি মুখের মিষ্টি কথা আদর হয়ে ছড়িয়ে যেতে চায় যে পথের কোণে, কথা যদি চুমোর মত-ফুলের মত, রঙিন হয়ে চায় হাসিতে ফোটে ফুলের সনে; যতি তোমার রাঙা কথা রামধনুকের রঙের মত, ছড়িয়ে পড়ে কালো মেঘের গায়ে, যদি তোমার হলদে কথা হলদে পাখির পাখার পরে সোয়ার হয়ে, ছড়িয়ে পড়ে সরষে ফুলের হলদে হাওয়ার বায়ে; যদি তোমার সবুজ কথা শস্যক্ষেতের দিগন্তরে, ছড়িয়ে যেতে চায় যে বারে বারে; তবে তুমি এখানটিতে দাঁড়িয়ে গিয়ে, ডাক দিও ভাই! ডাক দিও ভাই! মোদের পূর্ণিমারে! গল্পবুড়ো! আবার যদি গাজীর গানের দলটি নিয়ে, নাচের নূপুর জড়িয়ে পায়ে, গাজীর আশা ঘুরিয়ে বায়ে, খঞ্জনীতে সুরটি দিয়ে, রূপকথারি আসর গড় সুদূর কোন গাঁয়ে; চন্দ্রভান রাজার মেয়ে আবার যদি নেমে আসে, ঘুমলি চোখের পাতার পরে তোমার গানের বায়ে; আবার যদি মদন কুমার সপ্ত-ডিঙা সাজিয়ে নিয়ে, দেয় গো পাড়ি কালাপানি-পূবান পানি পেরিয়ে গিয়ে, ক্ষীর-সাগরের অপর পারে মধুমালার দেশেঃ- দুধে ধবল আলতা বরণ রাজার কনে ঘুমায় হেসে হেসে, পাঁচ মানিকের পঞ্চ প্রদীপ পাহারা দেয় হাতের পায়ের আর শিয়রের দেশে- আবার যদি গাঁয়ের যত ছেলের মেয়ের, বোনের ভায়ের মায়ের ঝিয়ের সবার বুকের সে রূপকথার সে রূপ-সাগর আনতে টেনে পরাণ তোমার কান্দে বারে বারে; তবে তুমি ডাক দিও ভাই! ডাক দিও ভাই! ডাক দিও ভাই! মোদের পূর্নিমারে!
https://banglarkobita.com/poem/famous/577
1767
পূর্ণেন্দু পত্রী
আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে
চিন্তামূলক
সাইকেল রিকশায় চেপে আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে সূর্যের নিকটে। যেহেতু আমার সাদা গাড়ি নেই, রণ-পাও নেই যেহেতু আমার লাল গাড়ি নেই, বকস-আপিস নেই যেহেতু আমার নীল গাড়ি নেই, পদোন্নতি নেই সাইকেল রিকশায় চেপে আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে সূর্যের নিকটে। মানুষ ও আকাশের মাঝখানে কোনো ব্রীজ নেই পাড়াগাঁয়ে যে-রকম বাঁশের নরম সাঁকো থাকে। শিরীষ ছায়ায় ঢাকা একফালি স্টেশন অথবা খুব সরু বাস স্টপও নেই কোনো নক্ষত্রের কাছে পৌছবার। হঠাৎ জরুরী কোনো ইনজেকশন নিতে হয় যদি? হঠাৎ বোধের নাড়ি ছিড়ে যদি রক্তপাত হয়? হঠাৎ বিশ্বাস যদি নিভে যায় মারাত্মক ফুঁয়ে? মানুষ তখন কার কাছে গিয়ে বলবে- বাঁচাও? যেহেতু আমার সাদা সুটকেশে সব আছে, অগ্নিকণা নেই যেহেতু আমার নীল পাসপোর্ট সব আছে, অস্ত্রাগার নেই যেহেতু আমার খাঁকী হোল্ড-অলে সব আছে, অমরতা নেই সাইকেল রিকশায় চেপে আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে সূর্যের নিকটে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1272
5801
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নিজের কানে কানে
চিন্তামূলক
এক এক সময় মনে হয়, বেঁচে থেকে আর লাভ নেই এক এক সময় মনে হয় পৃথিবীটাকে দেখে যাবো শেষ পর্যন্ত! এক এক সময় মানুষের ওপর রেগে উঠি অথচ ভালোবাসা তো কারুকে দিতে হবে জন্তু-জানোয়ার গাছপালাদের আমি ওসব দিতে পারি না এক এক সময় ইচ্ছে হয় সব কিছু ভেঙেচুরে লন্ডভন্ড করে ফেলি আবার কোনো কোনো বিরল মুহূর্তে ইচ্ছে হয় কিছু এককটা তৈরি করে গেলে মন্দ হয় না। হঠাৎ কখনো দেখতে পাই সহস্র চোখ মেলে তাকিয়ে আছে সুন্দর কেউ যেন ডেকে বলছে, এসো এসো, কতক্ষণ ধরে বসে আমি তোমার জন্য মনে পড়ে বন্ধুদের মুখ, যারা শত্রুদের, যারাও হয়তো কখনো আবার বন্ধু হবে নদীর বিনারে গিয়ে মনে পড়ে নদীর চেয়েও উত্তাল সুগভীর নারীকে সন্ধের আকাশ কী অকপট, বাতাসে কোনো মিথ্যে নেই, তখন খুব আস্তে, ফিসফিস করে, প্রায় নিজেরই কানে-কানে বলি, একটা মানুষ জন্ম পাওয়া গেল, নেহাৎ অ-জটিল কাটলো না!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1813
3026
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চতুর্থ সর্গ
কাহিনীকাব্য
"এ তবে স্বপন শুধু, বিম্বের মতন আবার মিলায়ে গেল নিদ্রার সমুদ্রে! সারারাত নিদ্রার করিনু আরাধনা-- যদি বা আইল নিদ্রা এ শ্রান্ত নয়নে, মরীচিকা দেখাইয়া গেল গো মিলায়ে! হা স্বপ্ন, কি শক্তি তোর, এ হেন মূরতি মুহূর্ত্তের মধ্যে তুই ভাঙ্গিলি, গড়িলি? হা নিষ্ঠুর কাল, তোর এ কিরূপ খেলা-- সত্যের মতন গড়িলি প্রতিমা, স্বপ্নের মতন তাহা ফেলিলি ভাঙ্গিয়া? কালের সমুদ্রে এক বিম্বের মতন উঠিল, আবার গেল মিলায়ে তাহাতে? না না, তাহা নয় কভু, নলিনী, সে কি গো কালের সমুদ্রে শুধু বিম্বটির মত! যাহার মোহিনী মূর্ত্তি হৃদয়ে হৃদয়ে শিরায় শিরায় আঁকা শোণিতের সাথে, যত কাল রব বেঁচে যার ভালবাসা চিরকাল এ হৃদয়ে রহিবে অক্ষয়, সে বালিকা, সে নলিনী, সে স্বর্গপ্রতিমা, কালের সমুদ্রে শুধু বিম্বটির মত তরঙ্গের অভিঘাতে জন্মিল মিশিল? না না, তাহা নয় কভু, তা যেন না হয়! দেহকারাগারমুক্ত সে নলিনী এবে সুখে দুখে চিরকাল সম্পদে বিপদে আমারই সাথে সাথে করিছে ভ্রমণ। চিরহাস্যময় তার প্রেমদৃষ্টি মেলি আমারি মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া। রক্ষক দেবতা সম আমারি উপরে প্রশান্ত প্রেমের ছায়া রেখেছে বিছায়ে। দেহকারাগারমুক্ত হইলে আমিও তাহার হৃদয়সাথে মিশাব হৃদয়। নলিনী, আছ কি তুমি, আছ কি হেথায়? একবার দেখা দেও, মিটাও সন্দেহ! চিরকাল তরে তোরে ভুলিতে কি হবে? তাই বল্ নলিনী লো, বল্ একবার! চিরকাল আর তোরে পাব না দেখিতে, চিরকাল আর তোর হৃদয়ে হৃদয় পাব না কি মিশাইতে, বল্ একবার। মরিলে কি পৃথিবীর সব যায় দূরে? তুই কি আমারে ভুলে গেছিস্ নলিনি? তা হোলে নলিনি, আমি চাই না মরিতে। তোর ভালবাসা যেন চিরকাল মোর হৃদয়ে অক্ষয় হোয়ে থাকে গো মুদ্রিত-- কষ্ট পাই পাব, তবু চাই না ভুলিতে! তুমি নাহি থাক যদি তোমার স্মৃতিও থাকে যেন এ হৃদয় করিয়া উজ্জ্বল! এই ভালবাসা যাহা হৃদয়ে মরমে অবশিষ্ট রাখে নাই এক তিল স্থান, একটি পার্থিব ক্ষুদ্র নিশ্বাসের সাথে মুহূর্ত্তে না পালটিতে আঁখির পলক ক্ষণস্থায়ী কুসুমের সুরভের মত শূন্য এই বায়ুস্রোতে যাইবে মিশায়ে? হিমাদ্রির এই স্তব্ধ আঁধার গহ্বরে সময়ের পদক্ষেপ গণিতেছি বসি, ভবিষ্যৎ ক্রমে হইতেছে বর্ত্তমান, বর্ত্তমান মিশিতেছে অতীতসমুদ্রে। অস্ত যাইতেছে নিশি, আসিছে দিবস, দিবস নিশার কোলে পড়িছে ঘুমায়ে। এই সময়ের চক্র ঘুরিয়া নীরবে পৃথিবীরে মানুষেরে অলক্ষিতভাবে পরিবর্ত্তনের পথে যেতেছে লইয়া, কিন্তু মনে হয় এই হিমাদ্রীর বুকে তাহার চরণ-চিহ্ন পড়িছে না যেন। কিন্তু মনে হয় যেন আমার হৃদয়ে দুর্দ্দাম সময়স্রোত অবিরামগতি, নূতন গড়ে নি কিছু, ভাঙ্গে নি পুরাণো। বাহিরের কত কি যে ভাঙ্গিল চূরিল, বাহিরের কত কি যে হইল নূতন, কিন্তু ভিতরের দিকে চেয়ে দেখ দেখি-- আগেও আছিল যাহা এখনো তা আছে, বোধ হয় চিরকাল থাকিবে তাহাই! বরষে বরষে দেহ যেতেছে ভাঙ্গিয়া, কিন্তু মন আছে তবু তেমনি অটল। নলিনী নাইকো বটে পৃথিবীতে আর, নলিনীরে ভালবাসি তবুও তেমনি। যখন নলিনী ছিল, তখন যেমন তার হৃদয়ের মূর্ত্তি ছিল এ হৃদয়ে, এখনো তেমনি তাহা রয়েছে স্থাপিত। এমন অন্তরে তারে রেখেছি লুকায়ে, মরমের মর্ম্মস্থলে করিতেছি পূজা, সময় পারে না সেথা কঠিন আঘাতে ভাঙ্গিবারে এ জনমে সে মোর প্রতিমা, হৃদয়ের আদরের লুকানো সে ধন! ভেবেছিনু এক বার এই-যে বিষাদ নিদারুণ তীব্র স্রোতে বহিছে হৃদয়ে এ বুঝি হৃদয় মোর ভাঙ্গিবে চূরিবে-- পারে নি ভাঙ্গিতে কিন্তু এক তিল তাহা, যেমন আছিল মন তেমনি রয়েছে! বিষাদ যুঝিয়াছিল প্রাণপণে বটে, কিন্তু এ হৃদয়ে মোর কি যে আছে বল, এ দারুণ সমরে সে হইয়াচে জয়ী। গাও গো বিহগ তব প্রমোদের গান, তেমনি হৃদয়ে তার রবে প্রতিধ্বনি! প্রকৃতি! মাতার মত সুপ্রসন্ন দৃষ্টি যেমন দেখিয়াছিনু ছেলেবেলা আমি, এখনো তেমনি যেন পেতেছি দেখিতে। যা কিছু সুন্দর, দেবি, তাহাই মঙ্গল, তোমার সুন্দর রাজ্যে হে প্রকৃতিদেবি তিল অমঙ্গল কভু পারে না ঘটিতে। অমন সুন্দর আহা নলিনীর মন, জীবন সৌন্দর্য্য, দেবি তোমার এ রাজ্যে অনন্ত কালের তরে হবে না বিলীন। যে আশা দিয়াছ হৃদে ফলিবে তা দেবি, এক দিন মিলিবেক হৃদয়ে হৃদয়। তোমার আশ্বাসবাক্যে হে প্রকৃতিদেবি, সংশয় কখনো আমি করি না স্বপনে! বাজাও রাখাল তব সরল বাঁশরী! গাও গো মনের সাধে প্রমোদের গান! পাখীরা মেলিয়া যবে গাইতেছে গীত, কানন ঘেরিয়া যবে বহিতেছে বায়ু, উপত্যকাময় যবে ফুটিয়াছে ফুল, তখন তোদের আর কিসের ভাবনা? দেখি চিরহাস্যময় প্রকৃতির মুখ, দিবানিশি হাসিবারে শিখেছিস্ তোরা! সমস্ত প্রকৃতি যবে থাকে গো হাসিতে, সমস্ত জগৎ যবে গাহে গো সঙ্গীত, তখন ত তোরা নিজ বিজন কুটীরে ক্ষুদ্রতম আপনার মনের বিষাদে সমস্ত জগৎ ভুলি কাঁদিস না বসি! জগতের, প্রকৃতির ফুল্ল মুখ হেরি আপনার ক্ষুদ্র দুঃখ রহে কি গো আর? ধীরে ধীরে দূর হোতে আসিছে কেমন বসন্তের সুরভিত বাতাসের সাথে মিশিয়া মিশিয়া এই সরল রাগিণী। একেক রাগিণী আছে করিলে শ্রবণ মনে হয় আমারি তা প্রাণের রাগিণী-- সেই রাগিণীর মত আমার এ প্রাণ, আমার প্রাণের মত যেন সে রাগিণী! কখন বা মনে হয় পুরাতন কাল এই রাগিণীর মত আছিল মধুর, এমনি স্বপনময় এমনি অস্ফুট-- পাই শুনি ধীরি ধীরি পুরাতন স্মৃতি প্রাণের ভিতরে যেন উথলিয়া উঠে!" ক্রমে কবি যৌবনের ছাড়াইয়া সীমা, গম্ভীর বার্দ্ধক্যে আসি হোলো উপনীত! সুগম্ভীর বৃদ্ধ কবি, স্কন্ধে আসি তার পড়েছে ধবল জটা অযত্নে লুটায়ে! মনে হোতো দেখিলে সে গম্ভীর মুখশ্রী হিমাদ্রি হোতেও বুঝি সমুচ্চ মহান্! নেত্র তাঁর বিকীরিত কি স্বর্গীয় জ্যোতি, যেন তাঁর নয়নের শান্ত সে কিরণ সমস্ত পৃথিবীময় শান্তি বরষিবে। বিস্তীর্ণ হইয়া গেল কবির সে দৃষ্টি, দৃষ্টির সম্মুখে তার, দিগন্তও যেন খুলিয়া দিত গো নিজ অভেদ্য দুয়ার। যেন কোন দেববালা কবিরে লইয়া অনন্ত নক্ষত্রলোকে কোরেছে স্থাপিত-- সামান্য মানুষ যেথা করিলে গমন কহিত কাতর স্বরে ঢাকিয়া নয়ন, "এ কি রে অনন্ত কাণ্ড, পারি না সহিতে!" সন্ধ্যার আঁধারে হোথা বসিয়া বসিয়া, কি গান গাইছে কবি, শুন কলপনা। কি "সুন্দর সাজিয়াছে ওগো হিমালয় তোমার বিশালতম শিখরের শিরে একটি সন্ধ্যার তারা! সুনীল গগন ভেদিয়া, তুষারশুভ্র মস্তক তোমার! সরল পাদপরাজি আঁধার করিয়া উঠেছে তাহার পরে; সে ঘোর অরণ্য ঘেরিয়া হুহুহু করি তীব্র শীতবায়ু দিবানিশি ফেলিতেছে বিষণ্ণ নিশ্বাস! শিখরে শিখরে ক্রমে নিভিয়া আসিল অস্তমান তপনের আরক্ত কিরণে প্রদীপ্ত জলদচূর্ণ। শিখরে শিখরে মলিন হইয়া এল উজ্জ্বল তুষার, শিখরে শিখরে ক্রমে নামিয়া আসিল আঁধারের যবনিকা ধীরে ধীরে ধীরে! পর্ব্বতের বনে বনে গাঢ়তর হোলো ঘুমময় অন্ধকার। গভীর নীরব! সাড়াশব্দ নাই মুখে, অতি ধীরে ধীরে অতি ভয়ে ভয়ে যেন চলেছে তটিনী সুগম্ভীর পর্ব্বতের পদতল দিয়া! কি মহান্! কি প্রশান্ত! কি গম্ভীর ভাব! ধরার সকল হোতে উপরে উঠিয়া স্বর্গের সীমায় রাখি ধবল জটায় জড়িত মস্তক তব ওগো হিমালয় নীরব ভাষায় তুমি কি যেন একটি গম্ভীর আদেশ ধীরে করিছ প্রচার! সমস্ত পৃথিবী তাই নীরব হইয়া শুনিছে অনন্যমনে সভয়ে বিস্ময়ে। আমিও একাকী হেথা রয়েছি পড়িয়া, আঁধার মহা-সমুদ্রে গিয়াছি মিশায়ে, ক্ষুদ্র হোতে ক্ষুদ্র নর আমি, শৈলরাজ! অকূল সমুদ্রে ক্ষুদ্র তৃণটির মত হারাইয়া দিগ্বিদিক্, হারাইয়া পথ, সভয়ে বিস্ময়ে, হোয়ে হতজ্ঞানপ্রায় তোমার চরণতলে রয়েছি পড়িয়া। ঊর্দ্ধ্বমুখে চেয়ে দেখি ভেদিয়া আঁধার শূন্যে শূন্যে শত শত উজ্জ্বল তারকা, অনিমিষ নেত্রগুলি মেলিয়া যেন রে আমারি মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া। ওগো হিমালয়, তুমি কি গম্ভীর ভাবে দাঁড়ায়ে রয়েছ হেথা অচল অটল, দেখিছ কালের লীলা, করিছ গননা, কালচক্র কত বার আইল ফিরিয়া! সিন্ধুর বেলার বক্ষে গড়ায় যেমন অযুত তরঙ্গ, কিছু লক্ষ্য না করিয়া কত কাল আইল রে, গেল কত কাল হিমাদ্রি তোমার ওই চক্ষের উপরি। মাথার উপর দিয়া কত দিবাকর উলটি কালের পৃষ্ঠা গিয়াছে চলিয়া। গম্ভীর আঁধারে ঢাকি তোমার ও দেহ কত রাত্রি আসিয়াছে গিয়াছে পোহায়ে। কিন্তু বল দেখি ওগো হিমালয়গিরি মানুষসৃষ্টির অতি আরম্ভ হইতে কি দেখিছ এইখানে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে? যা দেখিছ যা দেখেছ তাতে কি এখনো সর্ব্বাঙ্গ তোমার গিরি উঠে নি শিহরি? কি দারুণ অশান্তি এই মনুষ্যজগতে-- রক্তপাত, অত্যাচার , পাপ কোলাহল দিতেছে মানবমনে বিষ মিশাইয়া! কত কোটি কোটি লোক, অন্ধকারাগারে অধীনতাশৃঙ্খলেতে আবদ্ধ হইয়া ভরিছে স্বর্গের কর্ণ কাতর ক্রন্দনে, অবশেষে মন এত হোয়েছে নিস্তেজ, কলঙ্কশৃঙ্খল তার অলঙ্কাররূপে আলিঙ্গন ক'রে তারে রেখেছে গলায়! দাসত্বের পদধূলি অহঙ্কার কোরে মাথায় বহন করে পরপ্রত্যাশীরা! যে পদ মাথায় করে ঘৃণার আঘাত সেই পদ ভক্তিভরে করে গো চুম্বন! যে হস্ত ভ্রাতারে তার পরায় শৃঙ্খল, সেই হস্ত পরশিলে স্বর্গ পায় করে। স্বাধীন, সে অধীনেরে দলিবার তরে, অধীন, সে স্বাধীনেরে পূজিবারে শুধু! সবল, সে দুর্ব্বলেরে পীড়িতে কেবল-- দুর্ব্বল, বলের পদে আত্ম বিসর্জ্জিতে! স্বাধীনতা কারে বলে জানে সেই জন কোথায় সেই অসহায় অধীন জনের কঠিন শৃঙ্খলরাশি দিবে গো ভাঙ্গিয়া, না, তার স্বাধীন হস্ত হোয়েছে কেবল অধীনের লৌহপাশ দৃঢ় করিবারে। সবল দুর্ব্বলে কোথা সাহায্য করিবে-- দুর্ব্বলে অধিকতর করিতে দুর্ব্বল বল তার-- হিমগিরি, দেখিছ কি তাহা? সামান্য নিজের স্বার্থ করিতে সাধন কত দেশ করিতেছে শ্মশান অরণ্য, কোটি কোটি মানবের শান্তি স্বাধীনতা রক্তময়পদাঘাতে দিতেছে ভাঙ্গিয়া, তবুও মানুষ বলি গর্ব্ব করে তারা, তবু তারা সভ্য বলি করে অহঙ্কার! কত রক্তমাখা ছুরি হাসিছে হরষে, কত জিহ্বা হৃদয়েরে ছিঁড়িছে বিঁধিছে! বিষাদের অশ্রুপূর্ণ নয়ন হে গিরি অভিশাপ দেয় সদা পরের হরষে, উপেক্ষা ঘৃণায় মাখা কুঞ্চিত অধর পরঅশ্রুজলে ঢালে হাসিমাখা বিষ! পৃথিবী জানে না গিরি হেরিয়া পরের জ্বালা, হেরিয়া পরের মর্ম্মদুখের উচ্ছ্বাস, পরের নয়নজলে মিশাতে নয়নজল-- পরের দুখের শ্বাসে মিশাতে নিশ্বাস! প্রেম? প্রেম কোথা হেথা এ অশান্তিধামে? প্রণয়ের ছদ্মবেশ পরিয়া যেথায় বিচরে ইন্দ্রিয়সেবা, প্রেম সেথা আছে? প্রেমে পাপ বলে যারা, প্রেম তারা চিনে? মানুষে মানুষে যেথা আকাশ পাতাল, হৃদয়ে হৃদয়ে যেথা আত্ম-অভিমান, যে ধরায় মন দিয়া ভাল বাসে যারা উপেক্ষা বিদ্বেষ ঘৃণা মিথ্যা অপবাদে তারাই অধিক সহে বিষাদ যন্ত্রণা, সেথা যদি প্রেম থাকে তবে কোথা নাই-- তবে প্রেম কলুষিত নরকেও আছে! কেহ বা রতনময় কনকভবনে ঘুমায়ে রয়েছে সুখে বিলাসের কোলে, অথচ সুমুখ দিয়া দীন নিরালয় পথে পথে করিতেছে ভিক্ষান্নসন্ধান! সহস্র পীড়িতদের অভিশাপ লোয়ে সহস্রের রক্তধারে ক্ষালিত আসনে সমস্ত পৃথিবী রাজা করিছে শাসন, বাঁধিয়া গলায় সেই শাসনের রজ্জু সমস্ত পৃথিবী তাহার রহিয়াছে দাস! সহস্র পীড়ন সহি আনত মাথায় একের দাসত্বে রত অযুত মানব! ভাবিয়া দেখিলে মন উঠে গো শিহরি-- ভ্রমান্ধ দাসের জাতি সমস্ত মানুষ। এ অশান্তি কবে দেব হবে দূরীভূত! অত্যাচার-গুরুভারে হোয়ে নিপীড়িত সমস্ত পৃথিবী, দেব, করিছে ক্রন্দন! সুখ শান্তি সেথা হোতে লয়েছে বিদায়! কবে, দেব, এ রজনী হবে অবসান? স্নান করি প্রভাতের শিশিরসলিলে তরুণ রবির করে হাসিবে পৃথিবী! অযুত মানবগণ এক কণ্ঠে, দেব, এক গান গাইবেক স্বর্গ পূর্ণ করি! নাইক দরিদ্র ধনী অধিপতি প্রজা-- কেহ কারো কুটীরেতে করিলে গমন মর্য্যাদার অপমান করিবে না মনে, সকলেই সকলের করিতেছে সেবা, কেহ কারো প্রভু নয়, নহে কারো দাস! নাই ভিন্ন জাতি আর নাই ভিন্ন ভাষা নাই ভিন্ন দেশ, ভিন্ন আচার ব্যাভার! সকলেই আপনার আপনার লোয়ে পরিশ্রম করিতেছে প্রফুল্ল-অন্তরে। কেহ কারো সুখে নাহি দেয় গো কণ্টক, কেহ কারো দুখে নাহি করে উপহাস! দ্বেষ নিন্দা ক্রূরতার জঘন্য আসন ধর্ম্ম-আবরণে নাহি করে গো সজ্জিত! হিমাদ্রি, মানুষসৃষ্টি-আরম্ভ হইতে অতীতের ইতিহাস পড়েছ সকলি, অতীতের দীপশিখা যদি হিমালয় ভবিষ্যৎ অন্ধকারে পারে গো ভেদিতে তবে বল কবে, গিরি, হবে সেই দিন যে দিন স্বর্গই হবে পৃথ্বীর আদর্শ! সে দিন আসিবে গিরি, এখনিই যেন দূর ভবিষ্যৎ সেই পেতেছি দেখিতে যেই দিন এক প্রেমে হইয়া নিবদ্ধ মিলিবেক কোটি কোটি মানবহৃদয়। প্রকৃতির সব কার্য্য অতি ধীরে ধীরে, এক এক শতাব্দীর সোপানে সোপানে-- পৃথ্বী সে শান্তির পথে চলিতেছে ক্রমে, পৃথিবীর সে অবস্থা আসে নি এখনো কিন্তু এক দিন তাহা আসিবে নিশ্চয়। আবার বলি গো আমি হে প্রকৃতিদেবি যে আশা দিয়াছ হৃদে ফলিবেক তাহা, এক দিন মিলিবেক হৃদয়ে হৃদয়। এ যে সুখময় আশা দিয়াছ হৃদয়ে ইহার সঙ্গীত, দেবি, শুনিতে শুনিতে পারিব হরষচিতে ত্যজিতে জীবন!" সমস্ত ধরার তরে নয়নের জল বৃদ্ধ সে কবির নেত্র করিল পূর্ণিত! যথা সে হিমাদ্রি হোতে ঝরিয়া ঝরিয়া কত নদী শত দেশ করয়ে উর্ব্বরা। উচ্ছ্বসিত করি দিয়া কবির হৃদয় অসীম করুণা সিন্ধু পোড়েছে ছড়ায়ে সমস্ত পৃথিবীময়। মিলি তাঁর সাথে জীবনের একমাত্র সঙ্গিনী ভারতী কাঁদিলেন আর্দ্র হোয়ে পৃথিবীর দুখে, ব্যাধশরে নিপতিত পাখীর মরণে বাল্মীকির সাথে যিনি করেন রোদন! কবির প্রাচীননেত্রে পৃথিবীর শোভা এখনও কিছু মাত্র হয় নি পুরাণো? এখনো সে হিমাদ্রির শিখরে শিখরে একেলা আপন মনে করিত ভ্রমণ। বিশাল ধবল জটা, বিশাল ধবল শ্মশ্রু, নেত্রের স্বর্গীয় জ্যোতি, গম্ভীর মূরতি, প্রশস্ত ললাটদেশ, প্রশান্ত আকৃতি তার মনে হোত হিমাদ্রির অধিষ্ঠাতৃদেব! জীবনের দিন ক্রমে ফুরায় কবির! সঙ্গীত যেমন ধীরে আইসে মিলায়ে, কবিতা যেমন ধীরে আইসে ফুরায়ে, প্রভাতের শুকতারা ধীরে ধীরে যথা ক্রমশঃ মিশায়ে আসে রবির কিরণে, তেমনি ফুরায়ে এল কবির জীবন। প্রতিরাত্রে গিরিশিরে জোছনায় বসি আনন্দে গাইত কবি সুখের সঙ্গীত। দেখিতে পেয়েছে যেন স্বর্গের কিরণ, শুনিতে পেয়েছে যেন দূর স্বর্গ হোতে, নলিনীর সুমধুর আহ্বানের গান। প্রবাসী যেমন আহা দূর হোতে যদি সহসা শুনিতে পায় স্বদেশ-সঙ্গীত, ধায় হরষিত চিতে সেই দিক্ পানে, একদিন দুইদিন যেতেছে যেমন চলেছে হরষে কবি সেই দেশ হোতে স্বদেশসঙ্গীতধ্বনি পেতেছে শুনিতে। এক দিন হিমাদ্রির নিশীথ বায়ুতে কবির অন্তিম শ্বাস গেল মিশাইয়া! হিমাদ্রি হইল তার সমাধিমন্দির, একটি মানুষ সেথা ফেলে নি নিশ্বাস! প্রত্যহ প্রভাত শুধু শিশিরাশ্রুজলে হরিত পল্লব তার করিত প্লাবিত! শুধু সে বনের মাঝে বনের বাতাস, হুহু করি মাঝে মাঝে ফেলিত নিশ্বাস! সমাধি উপরে তার তরুলতাকুল প্রতিদিন বরষিত কত শত ফুল! কাছে বসি বিহগেরা গাইত গো গান, তটিনী তাহার সাথে মিশাইত তান।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chatortha-ago/
2454
মুহম্মদ নূরুল হুদা
শাহবাগ নেই শুধু শাহবাগ মোড়ে
স্বদেশমূলক
চলো ভাই চলো বোন চলো শাহবাগ মহানগরীর মুখ চলো শাহবাগ মহাজনতার মুখ চলো শাহবাগ প্রজন্মের জয়ী মুখ চলো শাহবাগপিজি আর জাদুঘর পাশে শাহবাগ নজরুল জয়নুল পাশে শাহবাগ জনকের বজ্রধ্বনি পাশে শাহবাগ সার্বভৌম হে তর্জনী পাশে শাহবাগশাহবাগ নেই শুধু শাহবাগ মোড়ে শাহবাগ নেই শুধু ঢাকার শহরে শাহবাগ নেই শুধু নগর-বাংলায় যেখানে বাঙালি যায়, শাহবাগ যায়অলিগলি তেপান্তর আজ শাহবাগ পাখপাখালির ডানা আজ শাহবাগ মেঠোপথ বালুচর আজ শাহবাগ বাঙালির পথচিহ্ন আজ শাহবাগরবীন্দ্রনাথের বাংলা আজ শাহবাগ নজরুলের জয় বাংলা আজ শাহবাগ মুজিবের জয় বাংলা আজ শাহবাগ জনতার জয় বাংলা আজ শাহবাগচলো ভাই চলো বোন চলো শাহবাগ এ বাংলার জলস্থল চলো শাহবাগ এ বাংলার নভোতল চলো শাহবাগ এ বাংলার প্রতি ইঞ্চি চলো শাহবাগখুনির বিচার আছে আছে শাহবাগ জনতার রায় আছে আছে শাহবাগ ফাঁসির মঞ্চ আছে আছে শাহবাগ রাজা নেই রাণী নেই আছে শাহবাগচলো ভাই চলো বোন চলো শাহবাগ হাতে হাত কাঁধে কাঁধ চলো শাহবাগ শ্লোগানে ও গানে গানে চলো শাহবাগ গণতন্ত্র জপমন্ত্র চলো শাহবাগআরেকবার বাহান্ন চলো শাহবাগ আরেকবার একাত্তর চলো শাহবাগ আরেকবার পুণ্যবাংলা চলো শাহবাগ আরেকবার সাম্যবাদ চলো শাহবাগসকালে সূর্য জ্বলে চলো শাহবাগ দুপুরে শৌর্য জ্বলে চলো শাহবাগ বিকেলে জনতা জ্বলে চলো শাহবাগদিনে আলো রাতে আলো আলো শাহবাগ১০-১৪.০২.২০১৩
https://banglapoems.wordpress.com/2013/03/12/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%97-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a7%e0%a7%81-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%97-%e0%a6%ae%e0%a7%8b/
4658
শামসুর রাহমান
খোলা উঠোন জুড়ে
মানবতাবাদী
এই যে খোলা উঠোন জুড়ে চলছে নৃত্য, গানের সুরে দুলছে সত্যি গেরস্তদের বসতবাড়ি। নাচ জমেছে ডানে বামে। কাছের, দূরের সবার প্রাণে।হঠাৎ কিছু মন্দ লোকের অত্যাচারে নৃত্য-গানের আসর ভাঙে। লাঠির বাড়ি মাথায় পড়ে শিল্পীজনের। নারী, পুরুষ প্রাণের ভয়ে কাঁপতে থাকে।কিন্তু ক’জন তরুণ রুখে দাঁড়ায় এবং তাদের রণমূর্তি দেখে গুণ্ডারা সব লেজ গুটিয়ে পালায় দূরে। খানিক পরে বসলো হেসে গানের আসর, নাচের পালা।সেখানে কেউ কখনও আর নাটক কিংবা গানের আসর পণ্ড করে দেয়ার খায়েশ নিয়ে লাঠি হাতে আসেনি। নৃত্য-গীতের আসর জমে, জিন্দাবাদ।  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khola-uthon-jure/
4788
শামসুর রাহমান
তুমি কি আসবে ফের
প্রেমমূলক
ভোরের গোলাপ দ্যাখো মেলেছে কী পূর্ণ দৃষ্টি তাজা, টেবিলে রোদের গাথা, হলতে পর্দা দোলে মাত্রাবৃত্তে; উড়িয়ে-আঁচল, ঢেউ তুলে বায়ুস্তরে একাকিনী তুমি কি আসবে ফের সান্নিধ্যে আমার? বাগানে পাখির ঝাঁকে, পাতায়-পাতায় আনন্দের গুঞ্জরণ, আলনায় শার্ট আর পাজামায় জাগে শিহরণ অব্যক্ত স্বপ্নের মতো। সুগন্ধি নিঃশ্বাস নিয়ে তুমি কি আসবে ফের সান্নিধ্যে আমার? পুরোনো কবরে সাদা কবুতর ঝরিয়ে পালক উড়ে যায় আসমানে, গোর-খোদকের শক্ত হাতে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে গন্ধরাজ, মাধুর্যে সুস্মিতা, তুমি কি আসবে ফের সান্নিধ্যে আমার? এই তো ডালিম গাছে কত যে স্বপ্নিল টেলিগ্রাম, টেলিফোন যেন মেঘচর পাখি বিমুগ্ধ উড্ডীন, তোমার চন্দ্রালোকিত কণ্ঠস্বর হওয়ায় ঝরিয়ে তুমি কি আসবে ফের সান্নিধ্যে আমার? বৃষ্টিতে পাখির কান্না, আমার হাতের নখ থেকে ভুরু থেকে, ওষ্ঠতট থেকে নিঃসঙ্গতার মতন বৃষ্টি ঝরে অবিরল, কালো বৃষ্টি-জাল ছিন্ন করে তুমি কি আসবে ফের সান্নিধ্যে আমার? যে-দরজা নেই তা খোলার জন্যে একটি সোনালি চাবি পেয়ে গেছি গোধূলিতে, একজন আলুথালু কিশোর সারস হাতে রয়েছে দাঁড়িয়ে-সেই পথে তুমি কি আসবে ফের সান্নিধ্যে আমার? রেশমি পতাকা হয়ে ওড়ে খবর কাগজ আর কফির বাতিল কৌটো, পিলসুজ স্বপ্নে ভরপুর; কবি শব্দহীনতার ছায়ায় ঘুমোয়, বাণী হয়ে তুমি কি আসবে ফের সান্নিধ্যে আমার?   (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tumi-ki-asbe-fire/
4910
শামসুর রাহমান
পথে যেতে যেতে
চিন্তামূলক
আজ ভোরবেলা থেকে মন ভালো নেই। কিছুতেই পড়াশুনা লাগছে না ভাল, এমনকি পদ্য লিখে মন খারাপের ঘন মেঘ পারি না উড়িয়ে দিতে। রিকশায় চলেছি লেক সার্কাসের মোড়ে; অভ্র-গুঁড়ো ঝরায় আকাশ, সন্ধ্যা হয় হয়, বেপরোয়া ঢঙে ক’জন যুবক হাঁটে ফুটপাতে, বেজে ওঠে শিস মাঝে মাঝে। মনে পড়ে হৃদয়ের উঠোনে আমার এখনো পূর্ণিমা জ্বলে, জ্বলবে কি আরও কিছুকাল? সে কেমন আছে? কি করছে ভেজা ধোঁয়াটে সন্ধ্যায়? আমাকে কি মনে পড়ে তার, যখন সে বসে থাকে বারান্দায় খুব একাকিনী, হাতে আধপড়া বই, কিংবা কাঠবিড়ালির খেলা দেখে কাটায় সময়, দাঁতে চেপে আঙুল অতীত নিয়ে বোনে তন্তুজাল? যেন আমি হাড়কাঠে গলা দিয়ে বসে আছি, কাকে জানাব আমার কথা? কে বুঝবে ভাষাহীন ভাষা? রাস্তায় ঝিমোচ্ছে বসে লোলচর্ম অসুস্থ মহিষ।   (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pothe-jete-jete/
3705
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাকাল
হাস্যরসাত্মক
গৌরবর্ণ নধর দেহ, নাম শ্রীযুক্ত রাখাল, জন্ম তাহার হয়েছিল, সেই যে-বছর আকাল। গুরুমশায় বলেন তারে, "বুদ্ধি যে নেই একেবারে; দ্বিতীয়ভাগ করতে সারা ছ'মাস ধরে নাকাল।" রেগেমেগে বলেন, "বাঁদর, নাম দিনু তোর মাকাল।"  নামটা শুনে ভাবলে প্রথম বাঁকিয়ে যুগল ভুরু; তারপর সে বাড়ি এসে নৃত্য করলে শুরু। হঠাৎ ছেলের মাতন দেখি সবাই তাকে শুধায়, এ কী! সকলকে সে জানিয়ে দিল, নাম দিয়েছেন গুরু-- নতুন নামের উৎসাহে তার বক্ষ দুরুদুরু।  কোলের 'পরে বসিয়ে দাদা বললে কানে-কানে, "গুরুমশায় গাল দিয়েছেন, বুঝিসনে তার মানে!" রাখাল বলে, "কখ্‌খোনো না, মা যে আমায় বলেন সোনা, সেটা তো গাল নয় সে কথা পাড়ার সবাই জানে। আচ্ছা, তোমায় দেখিয়ে দেব, চলো তো ঐখানে।"  টেনে নিয়ে গেল তাকে পুকুরপাড়ের কাছে, বেড়ার 'পরে লতায় যেথা মাকাল ফ'লে আছে। বললে, "দাদা সত্যি বোলো, সোনার চেয়ে মন্দ হল? তুমি শেষে বলতে কি চাও, গাল ফলেছে গাছে।" "মাকাল আমি" ব'লে রাখাল দু হাত তুলে নাচে।  দোয়াত কলম নিয়ে ছোটে, খেলতে নাহি চায়, লেখাপড়ায় মন দেখে মা অবাক হয়ে যায়। খাবার বেলায় অবশেষে দেখে ছেলের কাণ্ড এসে-- মেঝের 'পরে ঝুঁকে প'ড়ে খাতার পাতাটায় লাইন টেনে লিখছে শুধু-- মাকালচন্দ্র রায়।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/makal/
5673
সুকুমার রায়
ভূতুড়ে খেলা
ছড়া
পরশু রাতে পষ্ট চোখে দেখনু বিনা চশমাতে, পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জোছনাতে৷ কচ্ছে খেলা মায়ের কোলে হাত পা নেড়ে উল্লাসে, আহলাদেতে ধুপধুপিয়ে কচ্ছে কেমন হল্লা সে৷ শুনতে পেলাম ভূতের মায়ের মুচকি হাসি কট্‌কটে— দেখছে নেড়ে ঝুন্‌টি ধ'রে বাচ্চা কেমন চট্‌পটে৷ উঠছে তাদের হাসির হানা কাষ্ঠ সুরে ডাক ছেড়ে, খ্যাঁশ্‌ খ্যাঁশানি শব্দে যেন করাত দিয়ে কাঠ চেরে! যেমন খুশি মারছে ঘুঁষি, দিচ্ছে কষে কানমলা, আদর করে আছাড় মেরে শূন্যে ঝোলে চ্যাং দোলা৷ বলছে আবার, "আয়রে আমার নোংরামুখো সুঁটকো রে, দেখনা ফিরে প্যাখনা ধরে হুতোম–হাসি মুখ করে! ওরে আমার বাঁদর–নাচন আদর–গেলা কোঁত্‌কা রে! অন্ধবনের গন্ধ–গোকুল, ওরে আমার হোঁত্‌কা রে! ওরে আমার বাদলা রোদে জষ্টি মাসের বিষ্টি রে, ওরে আমার হামান–ছেঁচা যষ্টিমধুর মিষ্টি রে৷ ওরে আমার রান্না হাঁড়ির কান্না হাসির ফোড়নদার, ওরে আমার জোছনা হাওয়ার স্বপ্নঘোড়ার চড়নদার৷ ওরে আমার গোবরা গণেশ ময়দাঠাসা নাদুস্‌ রে, ছিঁচকাঁদুনে ফোক্‌লা মানিক, ফের যদি তুই কাঁদিস রে—" এই না ব'লে যেই মেরেছে কাদার চাপটি ফট্‌ ক'রে, কোথায় বা কি, ভূতের ফাঁকি মিলিয়ে গেল চট্‌ ক'রে!
https://banglarkobita.com/poem/famous/603
364
কাজী নজরুল ইসলাম
নিকটে
রূপক
বাদলা-কালো স্নিগ্ধা আমার কান্ত এল রিমঝিমিয়ে, বৃষ্টিতে তার বাজল নুপূর পায়জোরেরই শিঞ্জিনী যে। ফুটল উষার মুখটি অরুণ, ছাইল বাদল তাম্বু ধরায়; জমল আসর বর্ষা-বাসর, লাও সাকি লাও ভর-পিয়ালায়। ভিজল কুঁড়ির বক্ষ-পরাগ হিম-শিশিরের আমেজ পেয়ে হমদম! হরদম দাও মদ, মস্ত্ করো গজল গেয়ে! ফেরদৌসের ঝরকা বেয়ে গুল-বাগিচায় চলচে হাওয়া, এই তো রে ভাই ওক্ত খুশির, দ্রাক্ষারসে দিলকে নাওয়া। কুঞ্জে জরীন ফারসি ফরাস বিছিয়েচে আজ ফুলবালারা, আজ চাই-ই চাই লাল-শিরাজি স্বচ্ছ-সরস খোর্মা-পারা! মুক্তকেশী ঘোর-নয়না আজ হবে গো কান্তা সাকি, চুম্বন এবং মিষ্টি হাতের মদ পেতে তাই ভরসা রাখি! কান্তা সাথে বাঁচতে জনম চাও যদি কওসর-অমিয়, সুর বেঁধে বীণ সারেঙ্গিতে খুবসে শিরীন শরাব পিয়ো! খুঁজবে যেদিন সিকান্দারের বাঞ্ছিত আব্-হায়াত কুঁয়ায়, সন্ধান তার মিলবে আশেক দিল-পিয়ারার ওষ্ঠ চুমায়! খামখা তুমি মরছ কাজী শুষ্ক তোমার শাস্ত্র ঘেঁটে, মুক্তি পাবে মদখোরের এই আল-কিমিয়ার পাত্র চেটে!   (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/nikote/
1272
জীবনানন্দ দাশ
হাওয়ার রাত
প্রেমমূলক
গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল-অসংখ্য নক্ষত্রের রাত ; সারা রাত বির্স্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে; মশারিটা ফুলে উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো, কখনো বিছানা ছিঁড়ে নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে, এক-একবার মনে হচ্ছিল আমার-আধো ঘুমের ভিতর হয়তো- মাথার উপরে মশারি নেই আমার স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো উড়ছে সে! কাল এমন চমৎকার রাত ছিল। সমস্ত মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল-আকাশে একতিন ফাঁক ছিল না; পৃথিবীর সমস্ত ধূরস প্রিয় মৃতদের মুখও সেই নক্ষত্রের ভিতর দেখেছি আমি; অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চূড়ায় প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির-ভেজা চোখের মতো ঝলমল করছিল সমস্ত নক্ষত্রেরা; জ্যোৎস্নারাতে বেবিলনের রাণীর ঘাড়ের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার শালের মতো জ্বলজ্বল করছিল বিশাল আকাশ! কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিল। যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার হাজার বছর আগে মরে গিয়েছে তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে; যে রূপসীদের আমি এশিরিয়ার, মিশরে বিদিশায় মরে যেতে দেখেছি কাল তারা অতিদূরে আকাশের সীমানার কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে করে কাতারে কাতের দাঁড়িয়ে গেছে যেন- মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য? জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য? প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য? আড়ষ্ট-অভিভূত হয়ে গেছি আমি, কাল রাতের প্রবল নীল অত্যাচার আমাকে ছিঁড়ে ফেলেছে যেন; আকাশের বিরামহীন বিস্তীর্ণ ডানার ভিতর পৃথিবী কীটের মতো মুছে গিয়েছে কাল! আর উত্তুঙ্গ বাতাস এসেছে আকাশের বুক থেকে নেমে আমার জানালার ভিতর দিয়ে, শাঁই শাঁই করে, সিংহের হুঙ্কারে উৎক্ষিপ্ত হরিৎ প্রান্তরের অজস্র জেব্রার মতো! হৃদয় ভরে গিয়েছে আমার বিস্তীর্ণ ফেল্টের সবুজ ঘাসের গন্ধে, দিগন্ত-প্লাবিত বলীয়ান রৌদ্রের আঘ্রাণে মিলনোন্মত্ত বাঘিনীর গর্জনের মতো অন্ধকারের চঞ্চল বিরাট সজীব রোমশ উচ্ছ্বাসে, জীবনের দুর্দান্ত নীল মত্ততায়! আমার হৃদয় পৃথিবী ছিঁড়ে উড়ে গেল, নীল হাওয়ার সমুদ্রে স্ফীত মাতাল বেলুনের মতো গেল উড়ে, একটা দূর নক্ষত্রের মাস্তুলকে তারায়-তারায় উড়িয়ে নিয়ে চলল একটা দুরন্ত শকুনের মতো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/942
6004
হুমায়ূন আহমেদ
যদি মন কাঁদে
প্রেমমূলক
যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো চলে এসো এক বরষায় এসো ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে জল ভরা দৃষ্টিতে এসো কমলো শ্যামলো ছায় চলে এসো এক বরষায়যদিও তখনো আকাশ থাকবে বৈরি কদমও গুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরী উতলা আকাশ মেঘে মেঘে হবে কালো ঝলকে ঝলকে নাচিবে বজলি আলো তুমি চলে এসো চলে এসো এক বরষায়নামিবে আঁধার বেলা ফুরাবার পরে মেঘমল্লার বৃষ্টিরো মনে মনে কদমও গুচ্ছ খোপায় জড়ায়ে নিয়ে জল ভরা মাঠে নাচিব তোমায় নিয়ে চলে এসো তুমি চলে এসো এক বরষায় ।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4909.html
2004
বীথি চট্টোপাধ্যায়
একা
প্রেমমূলক
আমার চোখে বসন্ত দারুণ চৈত্রমাস চতুর্দিকে শিমূল-পলাশ কৃষ্ণচূড়ার ত্রাস।ঝড় উঠেছে নিখুঁত কালো বৃষ্টি ভেজা রাত আঁচল দিয়ে দুঃখ ঢাকি কোথায় তোমার হাত ?তব্ধ যদি ভালোবাসা প্রেমের-কম্পন ফিরিয়ে দাও কিশোরীকাল প্রথম চুম্বন।ভালোবাসার আগুন ঝড়ে চাইনি কোনো দাম অশ্রুবিহীন চক্ষু হল প্রেমের পরিণাম।এই সময়েই ভিন্ন হলে এমন চৈত্রমাস ভালোবাসার ফুটছে কলি, ফাল্গুন বাতাস!এই যে চোখ এই যে প্রেম, এই যে হা-হুতাশ এই বসন্তে দেবো কাকে প্রেমের আস্বাস ?আমার চোখে বসন্ত দারুণ চৈত্রমাস ভালোবাসা বাসার পরে, ভাঙলে বিশ্বাস!
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a5%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a7%8b%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a7%9f/
5455
সুকান্ত ভট্টাচার্য
খাদ্য সমস্যার সমাধান
মানবতাবাদী
বন্ধুঃ ঘরে আমার চাল বাড়ন্ত তোমার কাছে তাই, এলাম ছুটে, আমায় কিছু চাল ধার দাও ভাই।            মজুতদারঃ দাঁড়াও তবে, বাড়ির ভেতর একটু ঘুরে আসি, চালের সঙ্গে ফাউও পাবে ফুটবে মুখে হাসি।            মজুদতারঃ এই নাও ভাই, চালকুমড়ো আমায় খাতির করো, চালও পেলে কুমড়ো পেলে লাভটা হল বড় ।। (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/khadyo-somosyar-somadhan/
4905
শামসুর রাহমান
নৌকা কাহিনী
রূপক
কিছুক্ষণের জন্যে, এই ধরো চব্বিশ-ঘণ্টাব্যাপী, একটা জোয়ার এসেছিল। লোকগুলো আনন্দ। টগবগে ছন্দোমায় কোনো কবিতা যেমন মাতিয়ে রাখে সবাইকে, তেমনি। একটি নৌকা, ছিপছিপে, ঔদার্যে অলংকৃত, জলে ভাসতে ভাসতে ওদে, যারা তীরে দাঁড়িয়ে দূরে থেকে দেখছিল খেলাচ্ছলে ঢেউয়ে ঢেউয়ে নৌকায় দোলা, বলে, “অনুপম সূর্যোদয় দেখাব তোমাদের। তোমরা ভরাট গলায় জয়ধ্বনি দাও”। নদীতীরে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকগুলোর মনের গহনে তখনো সূর্যোদয় দেখার সাধ আড়মোরা ভাঙেনি। নৌকা মানুষের নিঃস্পৃহতার ধূসর ধাক্কায় অনেকক্ষণ ঘুরপাক খেলো মাঝ-নদীতে। তারপর জলকন্যার মতো দিলো ডুব। প্রতিশ্রুতি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তে মুক্তোর দ্যুতি ছড়ায়।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nouka-kahini/
5687
সুকুমার রায়
শুনেছ কি বলে গেল
ছড়া
শুনেছ কি বলে গেল সীতানাথ বন্দ্যো? আকাশের গায়ে নাকি টকটক গন্ধ? টকটক থাকে নাকো হ'লে পরে বৃষ্টি- তখনও দেখেছি চেটে একেবারে মিষ্টি।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/shunecho-ki-bole-gelo/
5012
শামসুর রাহমান
বাজপাখি
সনেট
ক্রূর ঝড় থেমে গ্যাছে, এখন আকাশ বড়ো নীল- গাছের সবুজ পাতা কেঁপে কেঁপে অত্যন্ত সুষম বিন্যাসে আবার স্থির। খরগোশের চঞ্চল উদ্যম আশপাশে, বাজপাখি উঁচু চূড়া থেকে অনাবিল আনন্দে তাকায় চতুর্দিকে, কোনো নিষ্ঠুর দুঃশীল চিন্তা নেই আপাতত, বিস্তর বয়স, চোখে কম দ্যাখে, নখ উদ্যমরহিত, বুকে গোপন জখম, তবুও ডরায় তাকে নিম্নচারী পাখির মিছিল।পাহাড়ে পড়েছে তার ছায়া কতদিন, মাঝ-মাঝে এখনো সে করে যাত্রা মেঘলোকে, যখন হাঁপায় অন্তরালে গুটিয়ে ঘর্মাক্ত ক্লান্ত ডানা, চোখ বুজে- দুঃস্বপ্ন দখল করে তাকে, শোকাবহ সুর বাজে বুকের ভেতরে, কিন্তু নিমেষেই চৈত্র পূর্ণিমায় চোখ তার ভাবময়, ডাকে তাকে কে যেন গম্বুজে।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bajpakhi/
348
কাজী নজরুল ইসলাম
দহনমালা
প্রেমমূলক
হায় অভাগি! আমায় দেবে তোমার মোহন মালা? বদল দিয়ে মালা, নেবে আমার দহন-জ্বালা? কোন ঘরে আজ প্রদীপ জ্বেলে ঘরছাড়াকে সাধতে এলে গগনঘন শান্তি মেলে, হায়! দু-হাত পুরে আনলে ও কি সোহাগ-ক্ষীরের থালা আহা দুখের বরণ ডালা? পথহারা এই লক্ষ্মীছাড়ার পথের ব্যথা পারবে নিতে? করবে বহন, বালা? লক্ষ্মীমণি! তোমার দিকে চাইতে আমি নারি, দু-চোখ আমার নয়ন জলে পুরে, বুক ফেটে যায় তবু এ-হার ছিঁড়তে নাহি পারি, ব্যথাও দিতে নারি, – নারী! তাই যেতে চাই দূরে। ডাকতে তোমায় প্রিয়তমা দু-হাত জুড়ে চাইছি ক্ষমা, চাইছি ক্ষমা চাইছি ক্ষমা গো! নয়ন-বাঁশির চাওয়ার সুরে বনের হরিণ বাঁধবে বৃথা লক্ষ্মী গহনবালা। কল্যাণী! হায় কেমনে তোমায় দেব যে-বিষ পান করেছি নীলের নয়ন-গালা।  (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/dohonmala/
3351
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পথিক আমি
ভক্তিমূলক
পথিক আমি। পথ চলতে চলতে দেখেছি পুরাণে কীর্তিত কত দেশ আজ কীর্তি-নিঃস্ব। দেখেছি দর্পোদ্ধত প্রতাপের অবমানিত ভগ্নশেষ, তার বিজয় নিশান বজ্রাঘাতে হঠাৎ স্তব্ধ অট্টহাসির মতো গেছে উড়ে; বিরাট অহংকার হয়েছে সাষ্টাঙ্গে ধুলায় প্রণত, সেই ধুলার 'পরে সন্ধ্যাবেলায় ভিক্ষুক তার জীর্ণ কাঁথা মেলে বসে, পথিকের শ্রান্ত পদ সেই ধুলায় ফেলে চিহ্ন,-- অসংখ্যের নিত্য পদপাতে সে চিহ্ন যায় লুপ্ত হয়ে। দেখেছি সুদূর যুগান্তর বালুর স্তরে প্রচ্ছন্ন, যেন হঠাৎ ঝঞ্ঝার ঝাপটা লেগে কোন্‌ মহাতরী হঠাৎ ডুবল ধূসর সমুদ্রতলে, সকল আশা নিয়ে, গান নিয়ে, স্মৃতি নিয়ে। এই অনিত্যের মাঝখান দিয়ে চলতে চলতে অনুভব করি আমার হৃৎস্পন্দনে অসীমের স্তব্ধতা।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prothek-ame/
4831
শামসুর রাহমান
দালান
চিন্তামূলক
আমার বাসার চতুর্দিকে দালান উঠছে ক্রমে মাতব্বদের মতো মাথা উঁচু করে। ইদানীং সচ্ছলতা, বোঝা যায়, শিস্‌ দিচ্ছে পাড়ায়-পাড়ায়। অবশ্য একথা তত প্রাসঙ্গিক নয়; দশজন আঙুল ডুবিয়ে ঘিয়ে বসবাস করলে টাটায় না কখনও আমার চোখ। এ রকমভাবে অতি দ্রুত দালান ওঠার ফলে আগেকার অনেক কিছুই পড়ে না আমার চোখে আর। প্রতিদিন যে তরুণী বারান্দায় দাঁড়াতো উদ্দাম চুলে, যেসব বালক একটি প্রাঙ্গণে ফুটবল খেলে হতো খুশি, আর দেখতাম তালগাছে চিল, দাঁড়কাক, কতিপয় ভিন্ন পাখি সহজে বিশ্রাম নিতো, তারা সকলেই অদৃশ্য সম্প্রতি; দুঃখ হয়। ল্যাণ্ডস্কেপের সন্ধানে এখন মনের অভ্যন্তরে আমি দৃষ্টি মেলে দিই।   (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dalan/
3614
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিশ্বের আলোকলুপ্ত তিমিরের অন্তরালে এল
চিন্তামূলক
বিশ্বের আলোকলুপ্ত তিমিরের অন্তরালে এল মৃত্যুদূত চুপে চুপে, জীবনের দিগন্ত আকাশে যত ছিল সূক্ষ্ম ধূলি স্তরে স্তরে দিল ধৌত করি ব্যথার দ্রাবক রসে দারুণ স্বপ্নের তলে তলে চলেছিল পলে পলে দৃঢ়হস্তে নিঃশব্দে মার্জনা । কোন্‌ক্ষণে নটলীলা-বিধাতার নব নাট্যভূমে উঠে গেল যবনিকা। শূন্য হতে জ্যোতির তর্জনী স্পর্শ দিল একপ্রান্তে স্তম্ভিত বিপুল অন্ধকারে, আলোকের থরহর শিহরণ চমকি চমকি ছুটিল বিদ্যুৎবেগে অসীম তন্দ্রার স্তূপে স্তূপে, দীর্ণ দীর্ণ করি’ দিল তারে। গ্রীষ্মরিক্ত অবলুপ্ত নদীপথে অকস্মাৎ প্লাবনের দুরন্ত ধারায় বন্যার প্রথম নৃত্য শুষ্কতার বক্ষে বিসর্পিয়া ধায় যথা শাখায় শাখায়;—সেইমতো জাগরণশূন্য আঁধারের গূঢ় নাড়ীতে নাড়ীতে, অন্তঃশীলা জ্যোতির্ধারা দিল প্রবাহিয়া। আলোকে আঁধারে মিলি চিত্তাকাশে অর্ধস্ফুট অস্পষ্টের রচিল বিভ্রম। অবশেষে দ্বন্দ্ব গেল ঘুচি’। পুরাতন সম্মোহের স্থূল কারা-প্রাচীর বেষ্টন, মুহূর্তেই মিলাইল কুহেলিকা। নূতন প্রাণের সৃষ্টি হোলো অবারিত স্বচ্ছ শুভ্র চৈতন্যের প্রথম প্রত্যূষ অভ্যুদয়ে। অতীতের সঞ্চয়-পুঞ্জিত দেহখানা, ছিল যাহা আসন্নের বক্ষ হতে ভবিষ্যের দিকে মাথা তুলি’ বিন্ধ্যগিরি ব্যবধান সম, আজ দেখিলাম প্রভাতের অবসন্ন মেঘ তাহা, স্রস্ত হয়ে পড়ে দিগন্ত বিচ্যুত। বন্ধমুক্ত আপনারে লভিলাম সুদূর অন্তরাকাশে ছায়াপথ পার হয়ে গিয়ে অলোক আলোকতীর্থে সূক্ষ্মতম বিলয়ের তটে।  (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bissher-aloklupto-timirer-ontorale-elo/
5602
সুকুমার রায়
গল্প বলা
হাস্যরসাত্মক
'এক যে রাজা'–'থাম্ না দাদা, রাজা নয় সে, রাজ পেয়াদা৷' 'তার যে মাতুল'–'মাতুল কি সে?— সবাই জানে সে তার পিশে৷' 'তার ছিল এক ছাগল ছানা'— 'ছাগলের কি গজায় ডানা?' 'একদিন তার ছাতের 'পরে'— 'ছাত কোথা হে টিনের ঘরে?' 'বাগানের এক উড়ে মালী'— 'মালী নয়তো! মেহের আলী৷' 'মনের সাধে গাইছে বেহাগ'— 'বেহাগ তো নয়! বসন্ত রাগ৷''থও না বাপু ঘ্যাঁচা ঘেঁচি'— 'আচ্ছা বল, চুপ করেছি৷' 'এমন সময় বিছনা ছেড়ে, হঠাৎ মামা আস্‌ল তেড়ে, ধর্‌ল সে তার ঝুঁটির গোড়া'— 'কোথায় ঝুঁটি? টাক যে ভরা৷' 'হোক না টেকো তোর তাতে কি? লক্ষীছাড়া মুখ্যু ঢেঁকি! ধর্‌ব ঠেসে টুঁটির 'পরে, পিটব তোমার মুণ্ড ধ'রে— কথার উপর কেবল কথা, এখন বাপু পালাও কোথা?'
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/golpo-bola/
2563
রফিক আজাদ
ভালোবাসার সংজ্ঞা
প্রেমমূলক
ভালোবাসা মানে দুজনের পাগলামি, পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা; ভালোবাসা মানে জীবনের ঝুঁকি নেয়া, বিরহ-বালুতে খালিপায়ে হাঁটাহাঁটি; ভালোবাসা মানে একে অপরের প্রতি খুব করে ঝুঁকে থাকা; ভালোবাসা মানে ব্যাপক বৃষ্টি, বৃষ্টির একটানা ভিতরে-বাহিরে দুজনের হেঁটে যাওয়া; ভালোবাসা মানে ঠাণ্ডা কফির পেয়ালা সামনে অবিরল কথা বলা; ভালোবাসা মানে শেষ হয়ে-যাওয়া কথার পরেও মুখোমুখি বসে থাকা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/150
3028
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চরণ
সনেট
দুখানি চরণ পড়ে ধরণীর গায়, দুখানি অলস রাঙা কোমল চরণ । শত বসন্তের স্মৃতি জাগিছে ধরায়, শতলক্ষ কুসুমের পরশস্বপন । শত বসন্তের যেন ফুটন্ত অশোক ঝরিয়া মিলিয়া গেছে দুটি রাঙা পায় । প্রভাতের প্রদোষের দুটি সূর্যলোক অস্ত গেছে যেন দুটি চরণছায়ায় । যৌবনসংগীত পথে যেতেছে ছড়ায়ে, নূপুর কাঁদিয়া মরে চরণ জড়ায়ে - নৃত্য সদা বাঁধা যেন মধুর মায়ায় । হোথা যে নিঠুর মাটি, শুষ্ক ধরাতল - এসো গো হৃদয়ে এসো, ঝুরিছে হেথায় লাজরক্ত লালসার রাঙা শতদল ।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/choron/
4225
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
পোড়ামাটি
প্রেমমূলক
দূরে যাও থেকো না এখানে চিরদিন উড়ন্ত শাম্পানে ছন্নছাড়া চিঠি তো পুড়েছে একতাড়া আগুনে পুড়েছে শত পাড়াদূরে যাও থেকো না এখানে দূরে যাও থেকো না এখানে কাকে পাও?
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/poramati/
5561
সুকুমার রায়
অবাক কাণ্ড
হাস্যরসাত্মক
শুন্‌ছ দাদা! ঐ যে হোথায় বদ্যি বুড়ো থাকে, সে নাকি রোজ খাবার সময় হাত দিয়ে ভাত মাখে? শুন্‌ছি নাকি খিদেও পায় সারাদিন না খেলে? চক্ষু নাকি আপনি বোজে ঘুমটি তেমন পেলে?চল্‌তে গেলে ঠ্যাং নাকি তার ভূয়েঁর পরে ঠেকে? কান দিয়ে সব শোনে নাকি? চোখ দিয়ে সব দেখে? শোয় নাকি সে মুণ্ডটাকে শিয়র পানে দিয়ে? হয় না কি হয় সত্যি মিথ্যা চল্‌ না দেখি গিয়ে!
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/obak-kando/
1424
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
বিবাগী পুরুষ
প্রেমমূলক
তোমার শিকড় আছে, আছে প্রিয় জোসনার বাঁধন আমি তো বন্ধনহীন হয়তো-বা শিকড়বিহীন আমার অস্তিত্ব জুড়ে শুন্যতার অসীম স্তব্ধতা দূর অরন্যের দীর্ঘশ্বাস আমি কাকে পরাব বন্ধন ? শিকড়ের সন্ধানে যার কাটে দিন কুড়িয়ে মাটির গন্ধ মেখে দেবো তার স্নিগ্ধ চুলে ! আমি তো সংসারছেঁড়া পথের মানুষ জন্ম জন্ম কেটে গেল হাহাকার বুকে যে আমাকে দিয়েছিল অন্ধকারে আলোকিত ঘরের খবর আমি তাকে করেছি বিবাগী । আমাকে দিও না কেউ বন্ধনের মায়া তার বুকে জ্বলে উঠবে চিতার আগুন ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1017
657
জয় গোস্বামী
খোঁজ
রূপক
ঘরের কুকুর ঢুকল ঘরে, গোঁফে সন্দেহের রোঁয়া শুঁকে-শুঁকে ফিরে গেল। কোনও দেহ পড়ে নেই আর। দ্যাখেনি সে,বারান্দায় কাটা মাথা রয়ে গেছে প্রভুজি, তোমার।
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/khoj/
3084
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জল
চিন্তামূলক
ধরাতলে চঞ্চলতা সব-আগে নেমেছিল জলে । সবার প্রথম ধ্বনি উঠেছিল জেগে তারি স্রোতোবেগে । তরঙ্গিত গতিমত্ত সেই জল কলোল্লোলে উদ্‌বেল উচ্ছল শৃঙ্খলিত ছিল স্তব্ধ পুকুরে আমার , নৃত্যহীন ঔদাসীন্যে অর্থহীন শূন্যদৃষ্টি তার । গান নাই , শব্দের তরণী হোথা ডোবা , প্রাণ হোথা বোবা । জীবনের রঙ্গমঞ্চে ওখানে রয়েছে পর্দা টানা , ওইখানে কালো বরনের মানা । ঘটনার স্রোত নাহি বয় , নিস্তব্ধ সময় । হোথা হতে তাই মনে দিত সাড়া সময়ের বন্ধ-ছাড়া ইতিহাস-পলাতক কাহিনীর কত সৃষ্টিছাড়া সৃষ্টি নানামতো । উপরের তলা থেকে চেয়ে দেখে না-দেখা গভীরে ওর মায়াপুরী এঁকেছিনু মনে । নাগকন্যা মানিকদর্পণে সেথায় গাঁথিছে বেণী , কুঞ্চিত লহরিকার শ্রেণী ভেসে যায় বেঁকে বেঁকে যখন বিকেলে হাওয়া জাগিয়া উঠিত থেকে থেকে । তীরে যত গাছপালা পশুপাখি তারা আছে অন্যলোকে , এ শুধু একাকী । তাই সব যত কিছু অসম্ভব কল্পনার মিটাইত সাধ , কোথাও ছিল না তার প্রতিবাদ । তার পরে মনে হল একদিন , সাঁতারিতে পেল যারা পৃথিবীতে তারাই স্বাধীন , বন্দী তারা যারা পায় নাই । এ আঘাত প্রাণে নিয়ে চলিলাম তাই ভূমির নিষেধগণ্ডি হতে পার । অনাত্মীয় শত্রুতার সংশয় কাটিল ধীরে ধীরে , জলে আর তীরে আমারে মাঝেতে নিয়ে হল বোঝাপড়া । আঁকড়িয়া সাঁতারের ঘড়া অপরিচয়ের বাধা উত্তীর্ণ হয়েছি দিনে দিনে , অচেনার প্রান্তসীমা লয়েছিনু চিনে । পুলকিত সাবধানে নামিতাম স্নানে , গোপন তরল কোন্‌ অদৃশ্যের স্পর্শ সর্ব গায়ে ধরিত জড়ায়ে । হর্ষ-সাথে মিলি ভয় দেহময় রহস্য ফেলিত ব্যাপ্ত করি । পূর্বতীরে বৃদ্ধ বট প্রাচীন প্রহরী গ্র ন্থি ল শিকড়গুলো কোথায় পাঠাত নিরালোকে যেন পাতালের নাগলোকে । এক দিকে দূর আকাশের সাথে দিনে রাতে চলে তার আলোকছায়ার আলাপন , অন্য দিকে দূর নিঃশব্দের তলে নিমজ্জন কিসের সন্ধানে অবিচ্ছিন্ন প্রচ্ছন্নের পানে । সেই পুকুরের ছিনু আমি দোসর দূরের বাতায়নে বসি নিরালায় , বন্দী মোরা উভয়েই জগতের ভিন্ন কিনারায় ; তার পরে দেখিলাম , এ পুকুর এও বাতায়ন — এক দিকে সীমা বাঁধা , অন্য দিকে মুক্ত সারাক্ষণ । করিয়াছি পারাপার যত শত বার ততই এ তটে-বাঁধা জলে গভীরের বক্ষতলে লভিয়াছি প্রতি ক্ষণে বাধা-ঠেলা স্বাধীনের জয় , গেছে চলি ভয় ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jaluy/
5587
সুকুমার রায়
কাতুকুতু বুড়ো
হাস্যরসাত্মক
আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার, কাতুকুতু বুড়োর কাছে যেও না খবরদার! সর্বনেশে বৃদ্ধ সে ভাই যেও না তার বাড়ি— কাতুকুতুর কুলপি খেয়ে ছিঁড়বে পেটের নাড়ি। কোথায় বাড়ি কেউ জানে না, কোন্‌ সড়কের মোড়ে, একলা পেলে জোর ক’রে ভাই গল্প শোনায় প’ড়ে। বিদ্‌ঘুটে তার গল্পগুলো না জানি কোন দেশী, শুনলে পরে হাসির চেয়ে কান্না আসে বেশি। না আছে তার মুণ্ডু মাথা না আছে তার মানে, তবুও তোমায় হাসতে হবে তাকিয়ে বুড়োর পানে। কেবল যদি গল্প বলে তাও থাকা যায় সয়ে, গায়ের উপর সুড়সুড়ি দেয় লম্বা পালক লয়ে। কেবল বলে, “হোঃ হোঃ হোঃ, কেষ্টদাসের পিসি— বেচ্‌ত খালি কুমড়ো কচু হাঁসের ডিম আর তিসি। ডিমগুলো সব লম্বা মতন, কুমড়োগুলো বাঁকা, কচুর গায়ে রঙ‐বেরঙের আল্‌পনা সব আঁকা। অষ্ট প্রহর গাইত পিসি আওয়াজ করে মিহি, ম্যাও ম্যাও ম্যাও বাকুম বাকুম ভৌ ভৌ ভৌ চীঁহি।” এই না বলে কুটুত্‍‌ ক’রে চিম্‌টি কাটে ঘাড়ে, খ্যাংরা মতন আঙুল দিয়ে খোঁচায় পাঁজর হাড়ে। তোমায় দিয়ে সুড়সুড়ি সে আপনি লুটোপুটি, যতক্ষণ না হাসবে তোমার কিচ্ছুতে নাই ছুটি।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/katukutu-buro/
2103
মহাদেব সাহা
একবার ভালোবেসে দেখো
প্রেমমূলক
তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর এই মুখে কবিতা ফুটবে না, এই কণ্ঠ আবৃতি করবে না কোনো প্রিয় পঙ্‌ক্তিমালা তাহলে শুকিয়ে যাবে সব আবেগের নদী। আমি আর পারবো না লিখতে তাহলে ...অনবদ্য একটি চরণ, একটিও ইমেজ হবে না রচিত, তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো তবে কবিতার পান্ডুলিপি জুড়ে দেখা দেবে ঘুরে ঘুরে অনাবৃষ্টি, খরা। তুমি যদি না তাকাও এই চোখ দেখবে না কিছু উজ্জ্বল আলোর ভোর ঘন অন্ধকারে ঢেকে যাবে, সন্ধ্যাতারা মনে হবে মৃত নিষ্পলক চোখ যদি ফিরে না তাকাও মর্মে আর পল্লবিত হবে না কবিতা। তুমি যদি না দাও চুম্বন এই মুখে ফুটবে না ভাষা মরা গাঙে জাগবে না ঢেউ, দুই তীরে প্রাণের স্পন্দন, হবে না শস্যের মাঠে শ্রাবণের ব্যাপক বর্ষণ হৃদয়ে হৃদয়ে আর অঙ্কুরিত হবে না কবিতা, বাজবে না গান। তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর প্রকৃতই আমি আগের মতন পারবো না লিখতে কবিতা আমার আঙুলে আর খেলবে না জাদুর ঝিলিক, এই শাদা পৃষ্ঠা জুড়ে ফুটবে না জুঁই আর চাঁপা। একবার ভালোবেসে দেখো, একবার কাছে ডেকে দেখো আবার আগের মতো কীভাবে ফুটাই এক লক্ষ একটি গোলাপ অনায়াসে কীভাবে আবার অনুভূতি করি সঞ্চারিত, একবার ভালোসেবে দেখো আবার কীভাবে লিখি দুহাতে কবিতা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1423
633
জয় গোস্বামী
এই শেষ পায়রা
মানবতাবাদী
শান্তির পতাকা। ঘাড়ে পোঁতা। কিন্তু তার ছুঁচালো লোহার দণ্ড ঘাড়ে ঢুকে থামে না--এগোয়। খোঁজে শিরদাঁড়া--ইলেকট্রোড। পায়। ছোঁয়। গর্ত করে আর দিন চলে যায় শতলক্ষ বছরের পার তারপর যারা আসে, তারা দেখে বসে আছে একটু মনুষ্যমূর্তি, কাঁধে পাখি-- দুজনই অঙ্গার!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1723
4915
শামসুর রাহমান
পাখি
রূপক
একটি পাখিকে খুঁজছি সেই কবে খেকে শহরের গালিঘুঁজিতে আনাচে কানাচে সবখানে তন্ন তন্ন করে খুঁজছি কী সুন্দর দেখতে সেই পাখি আর গলায় স্বর্গীয় গানপাখিটাকে খুঁজতে খুঁজতে আমার মাথায় আলাস্কার এক স্তূপ বরফ একটা নেকড়ে বরফ চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়ার জন্য খাটিয়ে দেয় হিংস্রতার পালশহুরে গাছের পাতায় পাতায় রাখি কড়া নজর প্রতিটি জানলায় বুলাই চোখ দীর্ঘ ঘাস সরিয়ে দেখতে চাই সেই পাখির নাচানাচি হায় আমার মনেই পড়েনি সে মৃত অনেক আগেই   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pakhi/
2494
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
নতুন গান
প্রেমমূলক
সেদিন সন্ধ্যা-রাতে একটি কাগজ দিয়েছিলে হাতে, এক পিঠে তার লেখা ভালোবাসা অন্য পিঠে ঘৃণা ------ জানতে চেলাম দুটোই নেবো কি না ?। বাড়ছিলো রাত--- মেঘের ফাঁকে তারার লুকোচুরি তারার আলোয় তোমার দু'চোখ তীক্ষ্ণ ঝিলিক ছুরি । কোন খানে যে বিঁধলো এসে --- হায়রে তা জানি না ।। মধ্যরাতে বৃষ্টি নেমে এলো তখন তোমার দৃষ্টি এলোমেলো বুকের কোথায় গুমরে উঠে এমন কান্না পেলো ? জানতে চেলাম, সুখের ব্যাথা --- ব্যাথার সুখে মিশে প্রেমেই না কি ঘৃণায় এমন তৃষ্ণা মেটায় বিষে ? রাত্রি শেষের পলকা আঁধার রইলো জবাবহীনা ।।[৩১-৭-২০১৪]
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/notun-gaan/
2666
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ মনে হয় সকলেরই মাঝে
ভক্তিমূলক
আজ মনে হয় সকলেরই মাঝে তোমারেই ভালোবেসেছি। জনতা বাহিয়া চিরদিন ধরে শুধু তুমি আমি এসেছি। দেখি চারি দিক-পানে কী যে জেগে ওঠে প্রাণে– তোমার আমার অসীম মিলন যেন গো সকল খানে। কত যুগ এই আকাশে যাপিনু সে কথা অনেক ভুলেছি। তারায় তারায় যে আলো কাঁপিছে সে আলোকে দোঁহে দুলেছি।তৃণরোমাঞ্চ ধরণীর পানে আশ্বিনে নব আলোকে চেয়ে দেখি যবে আপনার মনে প্রাণ ভরি উঠে পুলকে। মনে হয় যেন জানি এই অকথিত বাণী, মূক মেদিনীর মর্মের মাঝে জাগিছে সে ভাবখানি। এই প্রাণে-ভরা মাটির ভিতরে কত যুগ মোরা যেপেছি, কত শরতের সোনার আলোকে কত তৃণে দোঁহে কেঁপেছি।প্রাচীন কালের পড়ি ইতিহাস সুখের দুখের কাহিনী– পরিচিতসম বেজে ওঠে সেই অতীতের যত রাগিণী। পুরাতন সেই গীতি সে যেন আমার স্মৃতি, কোন্‌ ভাণ্ডারে সঞ্চয় তার গোপনে রয়েছে নিতি। প্রাণে তাহা কত মুদিয়া রয়েছে কত বা উঠিছে মেলিয়া– পিতামহদের জীবনে আমরা দুজনে এসেছি খেলিয়া।লক্ষ বরষ আগে যে প্রভাত উঠেছিল এই ভুবনে তাহার অরুণকিরণকণিকা গাঁথ নি কি মোর জীবনে? সে প্রভাতে কোন্‌খানে জেগেছিনু কেবা জানে। কী মুরতি-মাঝে ফুটালে আমারে সেদিন লুকায়ে প্রাণে! হে চির-পুরানো,চিরকাল মোরে গড়িছ নূতন করিয়া। চিরদিন তুমি সাথে ছিলে মোর, রবে চিরদিন ধরিয়া।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aj-mone-hoy-sokoleri-majhe/
4383
শামসুর রাহমান
আমার ব্রত
চিন্তামূলক
তরুণ উজ্জ্বল তিনজন কবি গাঢ় সায়াহ্নকে ঝাঁঝালো দুপুর করে আমার পড়ার ঘরে এসে বলে, ‘ওরা আপনার দিকে ছুঁড়েছে বিস্তর কাদা খোলা পথে শাঁসালো মণ্ডপে; আমরা তা কিছুতেই আর মেনে নেবো না, জবাব দিতে চাই এই নোংরা, ক্লিন্ন আচরণটির। স্পষ্টত ওদের চোখে ছিল উষ্মা আর বেদনার ঈষৎ গোধূলি। আমি হেসে কবিতা ঢেউয়ে ভেসে চকিতে উত্তর-আধুনিক।আমার পড়ার ঘরে তিনজন তরুণ কবির অস্তমিত ক্ষোভ ভালো লাগে, জমে ওঠে দিব্যি ষড়জে নিখাদে আলাপ এখনকার কবিতা বিষয়ে। ওরা নিলে বিদায় ফুরফুরে মনে, উদার আকাশে মগ্ন হই, নক্ষত্রপাড়ার গুঞ্জরণ শুনি, তার কথা মনে পড়ে; ভাবি, কাদাতেই ফুল ফোটানো আমার ব্রত।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-broto/
4691
শামসুর রাহমান
ঘুড়ি
রূপক
একটি নকশা-কাটা ঘুড়ি হাওয়া আর মেঘে মেঘে উড়তে উড়তে চকিতে লাটাই-লগ্ন গতিময় সুতো প্রতিদ্বন্দ্বী লাটাবাজের তীক্ষ্ণ সুতোর আঁচড়ে ভাসতে ভাসতে কোথায় যে কত দূরে লীন হ’ল, জানতে পারেনি নকশা-কাটা সেই ঘুড়ির মালিক।বেদনার্ত সেই লোক ভেবে, জেগে তিন দিনরাত হারানো ঘুড়িটি সৃষ্টি করেছিল স্বপ্নাদ্য আদলে হয়তো-বা, অপরূপ এক নকশা ছিল ঘুড়ির সত্তায়। ঘুম নেই চোখে তার, নিরানন্দ বসে থাকে এক কোণে, কী-যে ভাবে আকাশকুসুম, নিজেও কি জানে সেই লোক? শুধু বয় হাহাকার।নিজেকে পীড়িত করে প্রায়শ উপোসে, দিনরাত কী-যে ভাবে মানুষটি, বোঝা দায়। কোনও এক অমাবস্যা-রাতে, কী আশ্চর্য, নিরালোক ঘর তার হয়ে ওঠে জ্যোৎস্নাময়, শিরায় শিরায় ছন্দ নেচে ওঠে, হাত সৃষ্টির দোলায় মশগুল এবং অনিন্দ ঘুড়ি জন্ম নিতে থাকে।  (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ghuri/
4449
শামসুর রাহমান
এ শহরে এক কোণে
সনেট
এ শহরে এক কোণে নিরিবিলি করে বসবাস একজন লোক, প্রায়শই কী জানি কীসের ঝোঁকে শব্দ দিয়ে ভরে খাতা, ফলে কবি তাকে বলে লোকে। কেউ কেউ আসে তার কাছে নিতে মনের সুবাস নিজেরই অজ্ঞাতে আর সুন্দরের, শিবের আভাস পেয়ে যায়। লোকটা কখনো কারো খোলা পথে কাঁটা বিছায় নি, অমঙ্গল করে নি কামনা কারো, ঝাঁটা মারে নি কাউকে ক্রোধে, চিত্ত তার সুনীল আকাশ।তবু তাকে গঞ্জনা সইতে হয়, শজারু খোঁচায় যখন তখন, ঠাট্রা-তামাশার উৎস হয় কোনো কোনো আড্ডা, গুলজার চায়ের আসরে। লোকটার কসুর সে দিনরাত সুরছুট পরিবেশে, হায়, সুরের সাধনা করে! বিপক্ষের শত উপেক্ষার হিমে স্থির আর দিশেহারা নয় তারিফে কখনো।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/e-shohore-ek-kone/
4294
শামসুর রাহমান
অথচ করোনি মাথা নত
ভক্তিমূলক
(হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে)তিমির-বিলাসী যারা তারা অন্ধকারে মাথা গুঁজে থাকে সর্বক্ষণ। তুমি বন্ধু, আলোপ্রিয়,- বুঝি তাই জীবনের প্রায় সকল প্রহর কাটিয়েছো জ্ঞান আহরণে আর বিভিন্ন খাতার পাতা সাজিয়েছো সৃজন-মুখর পঙ্‌ক্তিমালা দিয়ে। এভাবেই কেটে গেছে কত না বিনিদ্র রাত।অথচ করোনি অবহেলা কোনওদিন ছাত্রদের, দিয়েছো উজাড় ক’রে জ্ঞানের ভাণ্ডার। ওরা সব তোমার উৎসুক, প্রিয় শিক্ষার্থী সবাই নিবেদন করেছে সশ্রদ্ধ ভালোবাসা। ধন্য তুমি; জানলে না যদিও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাজপথে, চায়ের দোকানে, এবং পণ্ডিতদের প্রতিটি আসরে, কবি-সংঘে, গ্রামে-গঞ্জে, উদ্দীপ্ত মিছিলে আজ হচ্ছে উচ্চারিত তোমার হীরার মতো জ্বলজ্বলে নাম। এই নাম স্বদেশের সীমানা পেরিয়ে এখন তো প্রস্ফুটিত দেশ-দেশান্তরে।তুমি যে অম্লান অবদান রেখেছো গচ্ছিত জাতির ভাণ্ডারে তার বিনিময়ে কতিপয় সন্ত্রাসীর দাগাবাজ অস্ত্রাঘাতে হয়েছো ভীষণ জর্জরিত অথচ করোনি মাথা নত, রেখেছো উন্নত সর্বক্ষণ।তোমার সুপ্রিয়া কোহিনূর, জীবন সঙ্গিনী, কন্যাদ্বয় মৌলি, স্মিতা, পুত্র অনন্য এখন তোমাকে হারিয়ে দিশেহারা; শূন্যতার নিপীড়নে দূর দিগন্তের দিকে দৃষ্টি মেলে দিচ্ছে বারবার। হায়, আজ তাদের প্রশস্ত সেই তোমার বুকেই টেনে নাও। অতীতের ধরনে স্নেহের জ্যোৎস্না ওদের অস্তিত্বে মেখে দাও, দাও আজও। দেবে নাকি মেঘ থেকে কিংবা আলগোছে গোধূলির অপসৃয়মাণ আভা থেকে চুম্বনের ছাপটুকু?   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/othocho-koroni-matha-noto/
2335
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
নিশাকালে নদী-তীরে বট-বৃক্ষ-তলে শিব-মন্দির
সনেট
রাজসূয়-যজ্ঞে যথা রাজাদল চলে রতন-মুকুট শিরে ; আসিছে সঘনে অগন্য জোনাকীব্রজ, এই তরুতলে পূজিতে রজনী-যোগে বৃষভ-বাহনে। ধূপরূপ পরিমল অদূর কাননে পেয়ে, বহিতেছে তাহে হেথা কুতূহলে মলয় ; কৌমুদী, দেখ, রজত-চরণে বীচি-রব-রূপ পরি নূপুর, চঞ্চলে নাচিছে; আচাৰ্য্য-রূপে এই তরু-পতি উচ্চারিছে বীজমন্ত্র। নীরবে অম্বরে, তারাদলে তারানাথ করেন প্রণতি (বোধ হয়) আরাধিয়া দেবেশ শঙ্করে ! তুমিও, লো কল্লোলিনি, মহাব্ৰতে ব্ৰতী,— সাজায়েছ, দিব্য সাজে, বর-কলেবরে !
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/nishakale-nodi-tire-boto-brikkho-tole-shib-mondir/
3549
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাতাবির চারা
প্রকৃতিমূলক
একদিন শান্ত হলে আষাঢ়ের ধারা বাতাবির চারা আসন্ন-বর্ষণ কোন্‌ শ্রাবণ প্রভাতে রোপন করিলে নিজহাতে আমার বাগানে। বহুকাল গেল চলি; প্রখর পৌষের অবসানে কুহেলি ঘুচাল যবে কৌতূহলী ভোরের আলোকে, সহসা পড়িল চোখ,-- হেরিনু শিশিরে ভেজা সেই গাছে কচিপাতা ধরিয়াছে, যেন কী আগ্রহে কথা কহে, যে-কথা আপনি শুনে পুলকেতে দুলে; যেমন একদা কবে তমসার কূলে সহসা বাল্মীকি মুনি আপনার কণ্ঠ হতে আপন প্রথম ছন্দ শুনি' আনন্দ সঘন গভীর বিস্ময়ে নিমগন। কোথায় আছ না-জানি এ সকালে কী নিষ্ঠুর অন্তরালে, -- সেথা হতে কোনো সম্ভাষণ পরশে না এ প্রান্তের নিভৃত আসন। হেনকালে অকস্মাৎ নিঃশব্দের অবহেলা হতে প্রকাশিল অরুণ আলোতে এ কয়টি কিশলয়। এরা যেন সেই কথা কয় বলিতে পারিতে যাহা তবু না বলিয়া চলে গেছে প্রিয়া। সেদিন বসন্ত ছিল দূরে আকাশ জাগেনি সুরে, অচেনার যবনিকা কেঁপেছিল ক্ষণে ক্ষণে তখনো যায়নি সরে দুরন্ত দক্ষিণ সমীরণে। প্রকাশের উচ্ছৃঙ্খল অবকাশ না ঘটিতে পরিচয় না রটিতে, ঘণ্টা গেল বেজে অব্যক্তের অনালোকে সায়াহ্নে গিয়েছ সভা ত্যেজে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bataber-chara/
4642
শামসুর রাহমান
ক্ষেত
সনেট
কী আমার দখলে রয়েছে? কোন্‌ জমি আজ ফসলসজ্জিতু বলা যায়, আমারই এলাকা? কোন্‌ নদীতীর, সাঁকো কিংবা বালুচর, তমালের বন আমার নিজের? সেই কবে দূরে সাধের জাহাজ ভাসিয়েছিলাম, মনে পড়ে। মাঝিমাল্লাদের গান যেখানে শোনেনি কেউ-লোনা ঢেউ, জলচর প্রাণী, দ্বীপস্থিত বৃক্ষ, শ্যামা, কেউ- সেখানে সন্ধানী দৃষ্টি মেলে, মনে হয়, ফলিয়েছি অলৌকিক ধান।অথচ এখন, যতদূর চোখ যায়, দেখি শুধু ফসলবিহীন মাঠ বুভূক্ষুর মতো করে ধু ধু। তবে কি যথেষ্ট শ্রম করিনি কখনো? ফসলের স্বপ্নই দেখেছি শুধু প্রতিদিন মোহন বিলাসে? করিনি কর্ষণ অবিরত কিংবা নিজস্ব ক্ষেতের পরাগাছা নিড়াইনি? তাই ক্ষেত ছেয়ে গ্যাছে ঘাসে?   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khet/
2501
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রত্যাশায়
মানবতাবাদী
মহামান্য আদালত --- অধীনের বিনীত নালিশ আমি যাকে চিনিও না দেখিওনি যাকে কোনো দিন সে কি করে হলো এই অধীনের বৈধ প্রতিনিধি ভৌতিক বিন্যাসে কেন চাপে এই ঘাড়ে রোজ ঋণ বাদী হতে এসে হই কি কারণে নিজেই বিবাদী কাকে টাকা দিয়ে আজ গৌরীসেন চেটে-পুটে খায় ফসল ফলানো হাত শ্রম দেয়া মুঠি থেকে খুন ফরিয়াদ এই --- যদি সদুত্তর কিছু পাওয়া যায়আমি এক হাইল্যা চাষা দিন আনা দিন খাওয়া নিদেন মজুর ভয়ে ভয়ে কথা কই --- ভয় আছে ছোট-বড় হাজার জুজুর আপনিতো অভয় দাতা নিক্তি হাতে বিদ্যমান পরম হুজুর
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/protyashay/
3620
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বুড়ি
ছড়া
এক যে ছিল চাঁদের কোণায় চরকা - কাটা বুড়ি পুরাণে তার বয়স লেখে সাতশো হাজার কুড়ি । সাদা সুতোয় জাল বোনে সে হয় না বুনন সারা পণ ছিল তার ধরবে জালে লক্ষ কোটি তারা । হেনকালে কখন আঁখি পড়ল ঘুমে ঢুলে , স্বপনে তার বয়সখানা বেবাক গেল ভুলে । ঘুমের পথে পথ হারিয়ে , মায়ের কোলে এসে পূর্ণ চাঁদের হাসিখানি ছড়িয়ে দিল হেসে । সন্ধেবেলায় আকাশ চেয়ে কী পড়ে তার মনে । চাঁদকে করে ডাকাডাকি , চাঁদ হাসে আর শোনে । যে - পথ দিয়ে এসেছিল স্বপন - সাগর - তীরে দু - হাত তুলে সে - পথ দিয়ে চায় সে যেতে ফিরে । হেনকালে মায়ের মুখে যেমনি আঁখি তোলে চাঁদে ফেরার পথখানি যে তক্‌খনি সে ভোলে । কেউ জানে না কোথায় বাসা , এল কী পথ বেয়ে , কেউ জানে না , এই মেয়ে সেই আদ্যিকালের মেয়ে । বয়সখানার খ্যাতি তবু রইল জগৎ জুড়ি — পাড়ার লোকে যে দেখে সেই ডাকে , ' বুড়ি বুড়ি ' । সব - চেয়ে যে পুরানো সে , কোন্‌ মন্ত্রের বলে সব - চেয়ে আজ নতুন হয়ে নামল ধরাতলে । (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/buri/
1466
নির্মলেন্দু গুণ
আমার জন্ম
স্বদেশমূলক
তপ শেষে যখন বাল্মীকি তাঁর মুদিত নয়ন খুলিলেন, দেখিলেন লব নেই; চোখের সমুখে দিগন্তবিস্তৃত ধু-ধু শূন্য তপোবন প’ড়ে আছে৷ ‘কোথা লব, কোথা লব? ফিরে আয়৷’ ডাকিলেন মুনি, ফিরে এলো প্রতিধ্বনি, শিশু লব দিলো না উত্তর৷ এ কোন্ বিধির লীলা, ভাবিলেন চিন্তক্লীষ্ট মুনি: ‘শুন্য হাতে কী মুখে যাইব আজ সেই পূণ্যাশ্রমে, – যেখানে অকল্পনীয় লব-হীন সীতার জীবন৷’ যোগসিদ্ধ ঋষি তিনি, দৈববিদ্যা করায়ত্ত তাঁর, যদি সেই তপলব্ধ দৈবজ্ঞান করিলে প্রয়োগ মাতৃকোল পূর্ণ হয়, তৃপ্ত করে সীতার হদৃয়– তবে তাই হোক–, মহামন্ত্রে জন্ম নিল দেবশিশু৷ পেলো প্রাণ-চঞ্চলতা অবিকল লবের মতোন৷ যেহেতু নির্মিত কুশে, তার নাম রাখা হলো কুশ৷ না আমি নির্মিত নই বাল্মীকির কাল্পনিক কুশে, আমাকে দিয়েছে জন্ম রক্তঝরা অমর একুশে৷
https://banglarkobita.com/poem/famous/194
4667
শামসুর রাহমান
গদ্য সনেট_ ২
চিন্তামূলক
বাড়িতে ঢুকলেই তুমি দেখবে সব আছে ঠিকঠাক, সিঁড়ি, কুত্রিম ঝরনাধারায় কেলিপরায়ণ মাছ, সোফাসেট, শয়নকক্ষ, স্নানঘর এবং গাড়িবারান্দা, সর্বোপরি রবীন্দ্র রচনাবলী। তোমার দু’টি চোখ যাকে খুঁজে বেড়াবে অনুপস্থিতির আলো-আঁধারিতে, যার হৃদয়-নিঙড়ানো কবিতার কোনো কোনো চরণ অকস্মাৎ ভ্রমর হয়ে গুঞ্জরণ তুলবে মনে, তাকে দেখবে না কোথাও।টেলিফোন উঠলে বেজে লোকটা পড়ি মরি তুলবে রিসিভার, ভুল নম্বরের ধাক্কা খেয়ে সে কিছুক্ষণ থাকবে বসে, চেয়ারে একলা ঘরে, উল্টোপাল্টে দেখবে কিছু কবিতার বই। টেলিফোনে লোকটার কণ্ঠস্বর শুনেও তুমি বুঝতে পারবে না সে কেমন ছিল, এলে বস্তুত হবে মাটির নিচে থেকে তোলা ভাঙাচোরা মূর্তির মুখোমুখি।  (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/godyo-sonet-2/
4100
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
গুচ্ছ কবিতা
প্রেমমূলক
থাকুক তোমার একটু স্মৃতি থাকুক একলা থাকার খুব দুপুরে একটি ঘুঘু ডাকুক দিচ্ছো ভীষণ যন্ত্রণা বুঝতে কেন পাছো না ছাই মানুষ আমি, যন্ত্র না! চোখ কেড়েছে চোখ উড়িয়ে দিলাম ঝরা পাতার শোক।
https://banglarkobita.com/poem/famous/526
4901
শামসুর রাহমান
নীরবই থাকবো আজ
সনেট
নীরবই থাকবো আজ। হে মেয়ে তোমার যত সাধ গালমন্দ দাও, দাও অপবাদ, চোখের আগুন ঝরাও আমার সত্তা জুড়ে, যত পারো; করো খুন আমাকে, দেবো না বাধা, জানাবো না কোনো প্রতিবাদ। আমাকে হেলায় তুমি ত্যাগ করে যাবে বলে খাদ জেগে ওঠে চতুর্ধারে যেন গিলে খাবে নিমেষেই। তোমার নিষ্ঠুরতায় দ্রুত হারিয়ে ফেলছি খেই জীবনের; সময়-যাপন, মনে হয়, কী বিস্বাদ।আমিতো তোমার হাতে আমার হৃৎপিন্ড থেকে ছেঁড়া একটি গোলাপ, খুব টকটকে, করেছি অর্পণ; তোমার চলার পথে দিয়েছি উড়িয়ে স্বপ্নঘেরা রঙিন নিশান সংখ্যাহীন আর যখন তখন পাঠিয়ে কপোত কিছু তোমারই উদ্দেশে দূর নীলে নিবদ্ধ রেখোছ দৃষ্টি, তবু তুমি বিভীষিকা দিলে।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nirobi-thakbo-aaj/
116
আল মাহমুদ
ঊনসত্তরের
স্বদেশমূলক
ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক ! শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে দুয়োর বেঁধে রাখ। কেন বাঁধবো দোর জানালা তুলবো কেন খিল ? আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে ফিরবে সে মিছিল। ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিয়ুরকে ডাক। কোথায় পাবো মতিয়ুরকে ঘুমিয়ে আছে সে ! তোরাই তবে সোনামানিক আগুন জ্বেলে দে।ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক ! শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে দুয়োর বেঁধে রাখ।কেন বাঁধবো দোর জানালা তুলবো কেন খিল ? আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে ফিরবে সে মিছিল।ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিয়ুরকে ডাক।কোথায় পাবো মতিয়ুরকে ঘুমিয়ে আছে সে ! তোরাই তবে সোনামানিক আগুন জ্বেলে দে।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8a%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9b%e0%a7%9c%e0%a6%be-%e0%a7%a7-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%81/
1822
পূর্ণেন্দু পত্রী
তাজমহল ১৯৭৫
প্রেমমূলক
বহুদিন একভাবে শুয়ে আছো, ভারতসম্রাট। বহুদিন মণিমুক্তো, মহফিল, তাজা ঘোড়া, তরুণ গোলাপ এবং স্থাপত্য নিয়ে ভাঙাগড়া সব ভুলে আছো। সর্বান্তঃকরণ প্রেম, যা তোমার সর্বোচ্ছ মুকুট, তাও ভুলে গেছো নাকি? পাথরের ঢাকনা খুলে কখনো কি পাশে এসে মমতাজ বসে কোনোদিন? সুগন্ধী স্নানের সব পুরাতন স্মৃতিকথা বলাবলি হয় কি দুজনে? জানি প্রতি জোৎস্নারাতে তোমার উঠোনে বড় ঘোর কলরব ক্যামেরার কালো ভীড়, আলুথালু ফুতিফার্তা, পিকনিক, ট্রানজিসটারে গান তবু তো যমুনা সেই দুঃখের বন্ধুর মতো কাছাকাছি ঠিকই রয়ে গেছে। হারানো উদ্যানে গাঢ় মেলামেশা মনে পড়ে গেলে দুজনে কি কোনোদিন বেরিয়েছ নিমগ্ন ভ্রমণে আকাশ ও ধরণীর চুম্বনের মতো কোনো স্থানে? বহুদিন একভাবে শুয়ে আছো, ভারতসম্রাট। দেওয়ান-ই-খাসের ধুলো ভারতের যতটুকু সাম্প্রতিক ইতিহাস জানে তুমি তার সামান্য জান না, আছো ভ্রান্তিতে ও ভয়ে। আওরঙ্গজেবের ঘোড়া মারা গেছে এবং সে নিজে, কেউ বলেনি তোমাকে? সবচেয়ে দুর্ধর্ষতম বীরত্বেরও ঘাড়ে একদিন মৃত্যুর থাপ্পড় পড়ে সবচেয়ে রক্তপায়ী তলোয়ার ও ভাঙে মরচে লেগে এই সত্যকথাটুকু কোনো মেঘ.কোনো বৃষ্টি, কোনো নীল নক্ষত্রের আলো তোমাকে বলেনি বুঝি? তাই আছো ভ্রান্তিতে ও ভয়ে, শব্দহীন গাঢ় ঘুমে, প্রিয়তমা পাশে শুয়ে, ভুলে গেছে সেও সঙ্গীহীন তারও চোখে নিদ্রা নেই, সে এখনো মর্মান্তিক জানে তুমি বন্দী, পুত্রের শিকলে। বহুদিন একভাবে শুয়ে আছো, ভারতসম্রাট। আওরঙ্গজেবের ঘোড়া মারা গেছে, মারা যেতে হয়। এখন নিশ্বাস নিতে পারো তুমি, নির্বিঘ্ন প্রহর পরষ্পর কথা বলো, স্পর্শ করো, ডাকো প্রিয়তমা! সর্বান্তঃকরণ প্রেম সমস্ত ধ্বংসের পরও পৃথিবীতে ঠিক রয়ে যায়। ঠিক মতো গাঁথা হলে ভালোবাসা স্থির শিল্পকলা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1232
1495
নির্মলেন্দু গুণ
পৃথিবী
প্রকৃতিমূলক
তুমি ডেকেছিলে, আমি চলে এসেছিলাম একা । কোনো কিছু সঙ্গে নিইনি, সঙ্গে করে নিইনি পানীয়, তিল-তিসি-তামা বা বিছানা বালিশ, তুমি বলেছিলে সব পাওয়া যাবে, --এ শহর নেশার ও নারীর । তুমি ডেকেছিলে, জননীর কোমল বিছানা ছেড়ে চলে এসেছিলাম, শুধু তোমার ডাকে । পেছন থেকে অদৃশ্য নিয়তি এসে পাপের পিচ্ছিল লেজ টেনে ধরেছিল । সর্বশেষ স্পর্শের আনন্দে উন্মাতাল মায়ের বিছানা জড়িয়ে ধরেছিল তার শিশুকে । দীর্ঘশ্বাসের শব্দে এলোমেলো হয়েছিল জন্মের প্রথম চুল, সাজানো ভুবন ফেলে চলে এসেছিলাম একা; শুধু তোমার ডাকে । -শুদু তোমার ডাকে । তুমি ডেকেছিলে, পরীর বাগান ছেড়ে চলে এসেছিলাম । তুমি ডেকেছিলে, কোমল কিচেন ছেড়ে চলে এসেছিলাম । তুমি ডেকেছিলে, শুঁড়িখানার মাতাল আনন্দ ছেড়ে চলে এসেছিলাম একা, শুধু তোমার জন্যে । তুমি মাটির ফোঁটার একটি তিলক দিয়ে আমাকে ভোলাতে চাও? আমি খাদ্য চাই ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মতো, দ্রৌপদীর মতো বস্ত্র চাই, চাই সর্বগ্রাসী প্রেম, চাই শূর্পণখার মতো নারী, চাই আকন্ঠ নিমগ্ন নেশা, চাই দেশী মদ । আমার সমস্ত ক্ষুধা তোমাকে মিটাতে হবে, হে পৃথিবী, তুমি বলেছিলে অভাব হবে না, এ-পৃথিবী নেশা ও নারীর, আমি চলে এসেছিলাম একা, শুধু তোমার জন্যে ।
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/post20161117112549/
2402
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সায়ংকালের তারা
সনেট
কার সাথে তুলনিবে,লো সুর-সুন্দরি, ও রূপের ছটা কবি এ ভব-মণ্ডলে? আছে কি লো হেন খনি,যার গর্ভে ফলে রতন তোমার মত,কহ,সহচরি গোধূলির?কি ফণিনী,যার সু-কবরী সাজায় সে তোমা সম মণির উজ্জ্বলে?--- ক্ষণমাত্র দেখি তোমা নক্ষত্র-মণ্ডলে কি হেতু?ভাল কি তোমা বাসে না শর্ব্বরী? হেরি অপরূপ রূপ বুঝি ক্ষুণ্ণ মনে মানিনী রজনী রাণী,তেঁই অনাদরে না দেয় শোভিতে তোমা সখীদল-সনে, যবে কেলি করে তারা সুহাস-অম্বরে? কিন্তু কি অভাব তব,ওলো বরাঙ্গনে,--- ক্ষণমাত্র দেখী মুখ,চির আঁখি স্মরে!
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/sayngkaler-tara/
3875
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ কথা
চিন্তামূলক
রাগ কর নাই কর, শেষ কথা এসেছি বলিতে তোমার প্রদীপ আছে, নাইকো সলিতে। শিল্প তার মূল্যবান, দেয় না সে আলো, চোখেতে জড়ায় লোভ, মনেতে ঘনায় ছায়া কালো অবসাদে। তবু তারে প্রাণপণে রাখি যতনেই, ছেড়ে যাব তার পথ নেই। অন্দকারে অন্ধদৃষ্টি নানাবিধ স্বপ্ন দিয়ে ঘেরে আচ্ছন্ন করিয়া বাস্তবেরে। অস্পষ্ট তোমারে যবে ব্যগ্রকণ্ঠ ডাক দিই অত্যুক্তির স্তবে তোমারে লঙ্ঘন করি সে-ডাক বাজিতে থাকে সুরে তারি উদ্দেশে আজো যে রয়েছে দূরে। হয়তো সে আসিবে না কভূ, তিমিরে আচ্ছন্ন তুমি তারেই নির্দেশ কর তবু। তোমার এ দূত অন্ধকার গোপনে আমার ইচ্ছারে করিয়া পঙ্গু গতি তার করেছে হরণ, জীবনের উৎসজলে মিশায়েছ মাদক মরণ। রক্তে মোর যে-দূর্বল আছে শঙ্কিত বক্ষের কাজে তারেই সে করেছে সহায়, পশুবাহনের মতো মোহভার তাহারে বহায়। সে যে একান্তই দীন, মূল্যহীন, নিগড়ে বাঁধিয়া তারে আপনারে বিড়ম্বিত করিতেছ পূর্ণ দান হতে, এ প্রমাদ কখনো কি দেখিবে আলোতে। প্রেম নাহি দিয়ে যারে টানিয়াছ উচ্ছিষ্টের লোভে সে-দীন কি পার্শ্বে তব শোভে। কভু কি জানিতে পাবে অসম্মানে নত এই প্রাণ বহন করিছে নিত্য তোমারি আপন অসম্মান। আমারে যা-পারিলে না দিতে সে-কার্পণ্য তোমারেই চিরদিন রহিল বঞ্চিতে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shas-katha/
1233
জীবনানন্দ দাশ
সুদর্শনা (অপ্রকাশিত)
প্রেমমূলক
সুদর্শনা মিশে যায় অন্ধকার রাতে নদীর এ পারে বসে একদিনও দেখে নি ওপার প্রকৃতি চায় নি সেই মেয়েটি এ আলো আর রাত্রির আঘাতে পৃথিবীকে কূট চোখে দেখে নেবে- বুঝে নেবে জীবনের গ্লানি অন্ধকারচায় নি সে কলমীর ফুলভরা রক্তাক্ত প্রান্তরে অথবা চিন্তায় রূঢ় ক্ষম সৎ পাণ্ডূলিপি যা খণ্ডন করে মৃত্যুকে দেবার আগে এইসব একবার তুলে নেবে হাতেপ্রথম ঢেউয়ের থেকে দূর সুচনার মতো নদীর ভিতরে অরবে সে চলে যায়-এক খণ্ড রাত্রি মনে হয় পৃথিবীর রাত্রিকে যেন তার অনন্তের কাছে সব হাঁস ঘুমালেও নক্ষত্রালোকিত হংসী আছে সমুদ্রের পারে এসে বড়ো চাঁদ- এর চেয়ে নির্জন বিস্ময় দেখেনিকো কোনোদিন; অনেক পবনে মৌমাছিদের ভিড় যদিও খেয়েছে ঢের আকাশের বাতাসের মতন শরীর তবু সে শরীর নয়- মাংসের চোখে দেখা নক্ষত্রেরা নয় তার তরে।।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shudorshona-oprokashito/
2662
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়
প্রকৃতিমূলক
আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা। নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা। আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে, উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে, আজ কিসের তরে নদীর চরে চখাচখির মেলা। ওরে যাবো না আজ ঘরে রে ভাই, যাবো না আজ ঘরে! ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ নেব রে লুঠ করে। যেন জোয়ার জলে ফেনার রাশি বাতাসে আজ ফুটেছে হাসি, আজ বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশি কাটবে সারা বেলা। sসালঃ ১৩১৩
https://banglarkobita.com/poem/famous/57
2818
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটি একটি করে তোমার
ভক্তিমূলক
একটি একটি করে তোমার পুরানো তার খোলো, সেতারখানি নূতন বেঁধে তোলো। ভেঙে গেছে দিনের মেলা, বসবে সভা সন্ধ্যাবেলা, শেষের সুর যে বাজাবে তার আসার সময় হল– সেতারখানি নূতন বেঁধে তোলো।দুয়ার তোমার খুলে দাও গো আঁধার আকাশ-‘পরে, সপ্তলোকের নীরবতা আসুক তোমার ঘরে। এতদিন যে গেয়েছ গান আজকে তারি হোক অবসান, এ যন্ত্র যে তোমার যন্ত্র সেই কথাটাই ভোলো। সেতারখানি নূতন বেঁধে তোলো।তিনধরিয়া, ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ekti-ekti-kore-tomar/
1196
জীবনানন্দ দাশ
শঙ্খমালা
প্রেমমূলক
কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে, বলিল, তোমারে চাই: বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি- কুয়াশার পাখনায়- সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক জোনাকির দেহ হতে-খুজেছি তোমারে সেইখানে- ধূসর পেচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে ধানসিড়ি বেয়ে-বেয়ে সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে তোমারে খুঁজছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে। দেখিলাম দেহ তার বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা; সন্ধ্যার আঁধারে ভিজে শিরীষের ডালে যেই পাখি দেয় ধরা- বাঁকা চাঁদ থাকে যার মাথার উপর, শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ শোনে যার স্বর। কড়ির মতন সাদা মুখ তার; দুইখানা হাত তার হিম; চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম চিতা জ্বলে: দক্ষিণ শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায় সে আগুনে হায়। চোখে তার যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার! স্তন তার করুণ শঙ্খের মতো – দুধে আর্দ্র-কবেকার শঙ্খিনীমালার! এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।
https://banglarkobita.com/poem/famous/947
5783
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ঝর্ণার পাশে
রূপক
ঝর্ণার ডুব দিয়ে দেখি নিচে একটা তলোয়ার একটুও মর্চে পড়েনি, অতসী ফুলের মতো আভা আমার হাতের ছোঁয়ায় হঠাৎ ভেঙে গেলে তার ঘুম তুলে নিয়ে উঠে আসি, চুপ করে বসে থাকি কিচুক্ষন কাছাকাছি আর কেউ নেই যেন ঝর্ণাটাই আমার হাতের মুঠোয়, রৌদ্রে দেখছি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাঝে মাজে এক-একটা ঝিলিকে চোখ ঝলসে যায় মনে হয় না বহু ব্যবহৃত, ঠিক কুমারীর মতন কোথাও ঘোড়ার ক্ষুর বা রক্তের দাগ নেই, শান্ত বনস’লী মাঝে-মাঝে অনৈতিহাসিক হাওয়া একটি মৌটুসী খুব ডাকাডাকি করছে তার সঙ্গিনীকে জলের চঞ্চল শব্দ তাকে সঙ্গতি দেয় আমার চোখের সামনে হু-হু করে পিছিয়ে যেতে থাকে সময় কয়েকটি শতাব্দী গাছের শুকনো পাতার মতন উড়তে থাকে সেই রকম একটা শুকনো পাতা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে নাকের কাছে এনে গন্ধ শুঁকি মনে পড়ে, অথচ ঠিক মনে পড়ে না শুকনো পাতাগুলি আমি নৌকোর মতন ভাসিয়ে দিই ঝর্ণার জলে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1835
1154
জীবনানন্দ দাশ
মহাগ্রহণ
চিন্তামূলক
অনেক সংকল্প আশা নিভে মুছে গেল; হয়তো এমনই শুরু হবে। আজকের অবস্থান ফুরিয়ে যাবে কি নতুন ব্যাপ্তির অনুভবে। মানুষ এ পৃথিবীতে ঢের দিন আছে; সময়ের পথে ছায়া লীন হয়নি এখনও তার, তবুও সে মরুর ভিতরে একটি বৃক্ষের মত যেন যুক্তিহীন; সফলতা অন্বেষণ ক’রে হারিয়ে ফেলেছে প্রাণ, নিকেতন, জল; প্রেম নেই, শূন্যলোকে সত্য-লাভ তার অর্ধসত্য অসত্যের মতন নিস্ফল। ভুলের ভিতর থেকে ভুলে গ্লানির ভিতর থেকে গ্লানির ভিতরে মানুষ যে গ্রহণের সূর্যে চলেছে তা; তবে শাশ্বত গ্রহণ সৃষ্টি করে!কাব্যগ্রন্থ - আলোপৃথিবী
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/mohagrohon/
3910
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সতী
সনেট
সতীলোকে বসি আছে কত পতিব্রতা, পুরাণে উজ্জ্বল আছে যাঁহাদের কথা। আরো আছে শত লক্ষ অজ্ঞাতনামিনী খ্যাতিহীনা কীর্তিহীনা কত-না কামিনী— কেহ ছিল রাজসৌধে কেহ পর্ণঘরে, কেহ ছিল সোহাগিনী কেহ অনাদরে; শুধু প্রীতি ঢালি দিয়া মুছি লয়ে নাম চলিয়া এসেছে তারা ছাড়ি মর্তধাম। তারি মাঝে বসি আছে পতিতা রমণী মর্তে কলঙ্কিনী, স্বর্গে সতীশিরোমণি। হেরি তারে সতীগর্বে গরবিনী যত সাধ্বীগণ লাজে শির করে অবনত। তুমি কী জানিবে বার্তা, অন্তর্যামী যিনি তিনিই জানেন তার সতীত্বকাহিনী।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/soti/
4811
শামসুর রাহমান
তোমার জন্মদিন
প্রেমমূলক
মোরগের গর্বিত ঝুঁটি, স্বপ্নে-দেখা রক্তিম ফুলের উন্মীলন, অন্ধকার ঠেলে ঘোষণা করে, আজ তোমার জন্মদিন। আমার হৃদয়ের রোদের ঝলক পবিত্র, ভাস্বর আয়াতের ছন্দে জানায়, আজ তোমার জন্মদিন।জানলার পাশে দাঁড়ানো গাছের ডালে বসে-থাকা পাখির শিস স্তব্ধতাকে চমকিয়ে শোনালো, আজ তোমার জন্মদিন। ঘরে হঠাৎ ঢুকে-পড়া ভ্রমর গুন্‌গুনিয়ে বলে গেল আজ তার জন্মদিন, যার চোখে চোখ রাখলে মনে হয়- পৃথিবীতে নেমে এসেছে স্বর্গসিঁড়ি।আজ নার্সের অ্যাপ্রনের মতো সারসের শরীর আরো বেশি শাদা আজ উজ্জ্বল, সূর্যের আবীর আরো বেশি রঙিন হয়ে প্রতিবিম্বিত দিনের গালে, নদী আরো বেশি নদী; আজ ফুলের স্তবকগুলো আনন্দের, রবীন্দ্রনাথের গান অধিক রাবিন্দ্রিক এবং আকাশের অধিক দূরের আকাশ। আয়ুষ্মতী শব্দটি প্রকৃতির কণ্ঠে উদারা মুদারায় বাজতে থাকে অষ্টপ্রহর। তোমার জন্মদিন দেখছে, আমি সেই কবে থেকে টেবিলে ঝুঁকে উদ্যমকে ফোঁটা ফোঁটা মুক্তোয় রূপান্তরিত করে একটি কবিতা লিখছি, যার পর্বে পর্বে তোমার সুগন্ধি নিঃশ্বাস, স্তনের ওঠা-নামা আর চুলের ছায়া। আমার অসমাপ্ত কবিতাকে দুরন্ত হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে দূরের ফ্ল্যাটে গিয়ে চুপিসারে গুঁজে দিতে চায় তোমার ব্লাউজের ভেতর। তোমার জন্মদিন আমার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে সকালবেলা, পায়ের কাছে জাগিয়ে তুলছে একটি ঝর্ণা।আজ তোমার জন্মদিন। কী উপহার কিনবো তোমার জন্যে? শাড়ি-টাড়ি? না কি ফুলের তোড়া? অথচ এই সবকিছুই বড় মামুলি।কী সেই উপহার, যার তুলনায় হীরের নেকলেসও অতিশয় তুচ্ছ? হৃদয়, যা আমি আগেই অর্পণ করেছি তোমাকে কোনো এক দুপুরে অতীত বর্তমান মুছে-দেয়া বিহ্বলতায়। তবু আর কিছু নয়, কেবল এই ধুক পুক করা বুক নিয়ে দাঁড়াতে চাই তোমার সামনে। আমাদের সম্পর্কের ওপর ফুল ঝরুক, ঝরুক স্বর্গশিশির। তোমার জন্মদিন সবার অগোচরে কী উন্মুখ চুমো খাচ্ছে আমাকে তোমার মতোই।   (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-jonmodin/
5386
শ্রীজাত
ভূতের
প্রেমমূলক
অন্ধকারের ছমছমে হাত, চমকে গেছে গা। কে তার পিঠে হাত রেখেছে? ‘অমন করে না’কে বলে রে? চেনা গলি? আবছা মুখে সে ছাদের ধারে হাত বাড়িয়ে ধরতে এসেছে।কাঁদছিলো বেশি আপন মনে, জোরসে অভিমান… এমন সময় ঠান্ডা হাতে ওড়না ধরে টান।যেমন ভূতের ভয় পেতে তুই, ঠিক হয়েছে, বল? সন্ধে বেলায় একলা ছাদে কাঁদতে আসার ফল।জানিস তুই, তবুও তাকে টান মেরেছে ছাদ বেশ হয়েছে। ভূতের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদে!
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ad%e0%a7%82%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4/
58
আবিদ আনোয়ার
অভিযাত্রীর খেরোখাতা
চিন্তামূলক
দেখে নিয়ো এই মাতাল তরণি হারাবে না কোনো অপকুয়াশার ঘোরে: অবচেতনের গহীনেও দেখি প্রোজ্জ্বল বাতিঘর! ঘূর্ণির মহাসমুদ্রে ঘুরে-ঘুরে অবশেষে ঠিকই পেয়ে যাবে বন্দর।বাঁধা বৃত্তের পরিধি পেরোয় কেন্দ্রাপসারী ঘোড়া অসম্ভবের দড়ি ছেঁড়ে তবু সরল রেখায় ছোটে, এলোমেলো কিছু ডিগবাজি আর দুলকির নামও চাল; আপাত বেতাল ভাঁড়ের তামাশা অর্থের পায়ে লোটে।কালোয়াত, তুমি কতদূর যাবে কেন্দ্র তোমাকে টানে! বৃত্তাবদ্ধ জীবনের কিছু হলো কি সম্প্রসার? প্রবীণ ব্যাঙমা ছানি-পড়া চোখে বিস্ময়ে চেয়ে দেখে: নবীন পাখিরা চিরায়ত খড়ে গড়ে আজও সংসার।
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/abhijatrir-kherokhata/
5962
হাসন রাজা
আমি না লইলাম
ভক্তিমূলক
আমি না লইলাম আল্লাজির নাম। না কইলাম তার কাম। বৃথা কাজে হাছন রাজায় দিন গুয়াইলাম।। ভবের কাজে মত্ত হইয়া দিন গেল গইয়া। আপন কার্য না করিলাম, রহিলাম ভুলিয়া।। নাম লইব নাম লইব করিয়া আয়ু হইল শেষ। এখনও না করিলাম প্রাণ বন্ধের উদ্দেশ।। আশয় বিষয় পাইয়া হাছন (তুমি) কর জমিদারি। চিরকাল থাকিবেনি হাছনরাজা লক্ষ্মণছিরি।। কান্দে কান্দে হাছন রাজা, কী হবে উপায়। হাসরের দিন যখন পুছিবে খোদায়।। ছাড় ছাড় হাছন রাজা, এই ভবের আশ। (কেবল) এক মনে চিন্তা কর, হইতাম বন্ধের দাস।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4480.html
3884
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ সঞ্চয়
রূপক
দিনান্তবেলায় শেষের ফসল দিলেম তরী 'পরে, এ-পারে কৃষি হল সারা, যাব ও-পারের ঘাটে। হংসবলাকা উড়ে যায় দূরের তীরে, তারার আলোয়, তারি ডানার ধ্বনি বাজে মোর অন্তরে। ভাঁটার নদী ধায় সাগরপানে কলতানে, ভাবনা মোর ভেসে যায় তারি টানে। যা-কিছু নিয়ে চলি শেষ সঞ্চয় সুখ নয় সে, দুঃখ সে নয়, নয় সে কামনা, শুনি শুধু মাঝির গান আর দাঁড়ের ধ্বনি তাহার স্বরে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20160517031935/
3062
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছুটির দিনে
ছড়া
ওই দেখো মা, আকাশ ছেয়ে মিলিয়ে এল আলো, আজকে আমার ছুটোছুটি লাগল না আর ভালো। ঘণ্টা বেজে গেল কখন, অনেক হল বেলা। তোমায় মনে পড়ে গেল, ফেলে এলেম খেলা। আজকে আমার ছুটি, আমার শনিবারের ছুটি। কাজ যা আছে সব রেখে আয় মা তোর পায়ে লুটি। দ্বারের কাছে এইখানে বোস, এই হেথা চোকাঠ— বল্‌ আমারে কোথায় আছে তেপান্তরের মাঠ। ওই দেখো মা, বর্ষা এল ঘনঘটায় ঘিরে, বিজুলি ধায় এঁকেবেঁকে আকাশ চিরে চিরে। দেব্‌তা যখন ডেকে ওঠে থর্‌থরিয়ে কেঁপে ভয় করতেই ভালোবাসি তোমায় বুকে চেপে। ঝুপ্‌ঝুপিয়ে বৃষ্টি যখন বাঁশের বনে পড়ে কথা শুনতে ভালোবাসি বসে কোণের ঘরে। ওই দেখো মা, জানলা দিয়ে আসে জলের ছাট— বল্‌ গো আমায় কোথায় আছে তেপান্তরের মাঠ। কোন্‌ সাগরের তীরে মা গো, কোন্‌ পাহাড়ের পারে, কোন্‌ রাজাদের দেশে মা গো, কোন্‌ নদীটির ধারে। কোনোখানে আল বাঁধা তার নাই ডাইনে বাঁয়ে? পথ দিয়ে তার সন্ধেবেলায় পৌঁছে না কেউ গাঁয়ে? সারা দিন কি ধূ ধূ করে শুকনো ঘাসের জমি? একটি গাছে থাকে শুধু ব্যাঙ্গমা - বেঙ্গমী? সেখান দিয়ে কাঠকুড়ুনি যায় না নিয়ে কাঠ? বল্‌ গো আমায় কোথায় আছে তেপান্তরের মাঠ। এমনিতরো মেঘ করেছে সারা আকাশ ব্যেপে, রাজপুত্তুর যাচ্ছে মাঠে একলা ঘোড়ায় চেপে। গজমোতির মালাটি তার বুকের ‘পরে নাচে— রাজকন্যা কোথায় আছে খোঁজ পেলে কার কাছে। মেঘে যখন ঝিলিক মারে আকাশের এক কোণে দুয়োরানী - মায়ের কথা পড়ে না তার মনে? দুখিনা মা গোয়াল - ঘরে দিচ্ছে এখন ঝাঁট, রাজপুত্তুর চলে যে কোন্‌ তেপান্তরের মাঠ। ওই দেখো মা, গাঁয়ের পথে লোক নেইকো মোটে, রাখাল - ছেলে সকাল করে ফিরেছে আজ গোঠে। আজকে দেখো রাত হয়েছে দিস না যেতে যেতে, কৃষাণেরা বসে আছে দাওয়ায় মাদুর পেতে। আজকে আমি নুকিয়েছি মা, পুঁথিপত্তর যত— পড়ার কথা আজ বোলো না। যখন বাবার মতো। বড়ো হব তখন আমি পড়ব প্রথম পাঠ— আজ বলো মা, কোথায় আছে তেপান্তরের মাঠ। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chutir-dine/