id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
5179
শামসুর রাহমান
রঙিন নিশ্বাসের জন্যে
সনেট
খুব একা হাঁটি বোবা কালা অন্ধ বামনের ভিড়ে। নোনা ঘামগন্ধ, মুখ-গহ্বরের কটু গন্ধ ঝাঁকে, ভীষণ দুঃস্বপ্ন যাপি রুদ্ধশ্বাস এ বন্দীশিবিরে। যেখানেই যাই কালো সন্ত্রাস আমাকে ধরে ঘিরে, অনিদ্রার রক্তজবা জ্বলে চোখে, যদি কোনো ফাঁকে দৃষ্টি থেকে মরুভূমি সরে যায়, চেতনাকে ঢাকে বিষলতা, নিশ্বাসও বিকিয়ে যায় এমন তিমিরে।তাহলে কী লাভ বলো, প্রিয়তমা, বিচ্ছিন্নতা পুষে আমাদের দুজনের মধ্যে আর? এসো ভালোবাসি দূরন্ত আবেগে, সব বাধার প্রাকার দ্বিধাহীন ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এসো আমরা পরস্পর শুষে নিই আমাদের অস্তিত্বের সারাৎসার, সুখে ভাসি কিছুকাল, নিশ্বাসকে করে তুলি প্রবল রঙিন।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/rongin-nisshaser-jonye/
6005
হুমায়ূন আহমেদ
রাশান রোলেট
রূপক
টেবিলের চারপাশে আমরা ছ’জন চারজন চারদিকে ; দু’জন কোনাকুনি দাবার বোড়ের মত খেলা শুরু হলেই একজন আরেকজনকে খেয়ে ফেলতে উদ্যত । আমরা চারজন শান্ত, শুধু দু’জন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে । তাদের স্নায়ু টানটান। বেড়ালের নখের মত তাদের হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসবে তীক্ষ্ম নখ । খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছে, আম্পায়ার এখনো আসেনি। খেলার সরঞ্জাম একটা ধবধবে সাদা পাতা আর একটা কলম । কলমটা মিউজিক্যাল পিলো হাতে হাতে ঘুরবে আমরা চারজন চারটা পদ লিখবো । শুধু যে দু’জন নখ বের করে কোনাকুনি বসে আছে তারা কিছু লিখবে না । তারা তাদের নখ ধারালো করবে লেখার মত সময় তাদের কোথায় ? প্রথম কলম পেয়েছি আমি, আম্পায়ার এসে গেছেন। পিস্তল আকাশের দিকে তাক করে তিনি বললেন, এ এক ভয়ংকর খেলা, কবিতার রাশান রোলেট – যিনি সবচে ভালো পদ লিখবেন তাকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলা হবে । আমার হাতে কলম কম্পমান সবচে সুন্দর পদ এসে গেছে আমার মুঠোয়।
http://kobita.banglakosh.com/archives/1115.html
1736
পাবলো নেরুদা
লেবু
চিন্তামূলক
অনুবাদ: ইমন জুবায়েরলেবু ফুল থেকে ঢিলেঢালা ভাবে জ্যোস্নায়, প্রেমের সুদৃঢ় তৃষ্ণার সারৎসার, গন্ধে পরিপূর্ন, লেবু গাছের হলদে উত্থান, লেবুগুলো গাছের কৃত্রিমভবন থেকে নিচের দিকে নড়ছে সংবেদনশীল বানিজ্য! বন্দর এ নিয়ে বৃহৎ বাজার আলোর জন্য ও বর্বর স্বর্ণের জন্য। আমরা অলৌকিকের অর্ধেকটা খুলি, আর, নোনা স্তরের কিনারে জমাট এসিড: সৃষ্টির আদি রস, বিস্ময়কর, অপরিবর্তনীয়, জীবন্ত: কাজেই সজীবতা একটি লেবুর ভিতরে থাকে বেঁচে, খোলশের মিষ্টিগন্ধী আড়তে অনুপাত, অবোধ্য আর কটূ। লেবু কাটতে চাকু একটি ছোট গির্জে রেখে যায়: কুঞ্জকুঠিরগুলি চোখে আন্দাজহীন যা খোলে নোনতা কাচ আলোর দিকে: পোখরাজ ছোট বিন্দুর ওপর উঠছে, বেদিগুলি, সুগন্ধী তোরণ। কাজেই, হাত যখন কাটা লেবু ধরে, অর্ধ-পৃথিবী চামচের ওপর, ব্রহ্মান্ডের স্বর্ন উৎসারিত তোমার স্পর্শে: এক কাপ হলুদ অলৌকিকতায়, একটি স্তন ও স্তনবৃন্ত পৃথিবীকে সুগন্ধে ভরাচ্ছে; ফল উৎপাদনের জোয়ার একটি গ্রহের ছোট আগুন।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3956.html
5462
সুকান্ত ভট্টাচার্য
চিল
মানবতাবাদী
পথ চলতে চলতে হঠাৎ দেখলামঃ ফুটপাতে এক মরা চিল! চমকে উঠলাম ওর করুণ বীভৎস মূর্তি দেখে। অনেক উঁচু থেকে যে এই পৃথিবীটাকে দেখেছে লুণ্ঠনের অবাধ উপনিবেশ; যার শ্যেন দৃষ্টিতে কেবল ছিল তীব্র লোভ আর ছোঁ মারার দস্যু প্রবৃত্তি- তাকে দেখলাম, ফুটপাতে মুখ গুঁজে প'ড়ে। গম্বুজশিখরে বাস করত এই চিল, নিজেকে জাহির করত সুতীক্ষ্ণ চীৎকারে; হালকা হাওয়ায় ডানা মেলে দিত আকাশের নীলে- অনেককে ছাড়িয়েঃ এককঃ পৃথিবী থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে। অনেকে আজ নিরাপদ; নিরাপদ ইঁদুর ছানারা আর খাদ্য-হাতে ত্রস্ত পথচারী, নিরাপদ- কারণ আজ সে মৃত। আজ আর কেউ নেই ছোঁ মারার, ওরই ফেলে-দেওয়া উচ্ছিষ্টের মতো ও পড়ে রইল ফুটপাতে, শুক্‌নো, শীতল, বিকৃত দেহে। হাতে যাদের ছিল প্রাণধারণের খাদ্য বুকের কাছে সযত্নে চেপে ধরা তারা আজ এগিয়ে গেল নির্ভয়ে; নিষ্ঠুর বিদ্রূপের মতো পিছনে ফেলে আকাশচ্যুত এক উদ্ধত চিলকে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/266
2824
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একা আমি ফিরব না আর
ভক্তিমূলক
একা আমি ফিরব না আর এমন করে– নিজের মনে কোণে কোণে মোহের ঘোরে।তোমায় একলা বাহুর বাঁধন দিয়ে ছোটো করে ঘিরতে গিয়ে আপনাকে যে বাঁধি কেবল আপন ডোরে।যখন আমি পাব তোমায় নিখিলমাঝে সেইখনে হৃদয় পাব হৃদয়রাজে। এই   চিত্ত আমার বৃন্ত কেবল তারি ‘পরে বিশ্বকমল; তারি ‘পরে পূর্ণ প্রকাশ দেখাও মোরে।২ আষাঢ়, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/eka-ami-firbo-na-ar/
2197
মহাদেব সাহা
পটভূমি পাল্টে যায়
প্রকৃতিমূলক
পাল্টে যায় পটভূমি, কবিতার থীম, মর্মতল কেঁপে ওঠে, নামে বর্ষা, হিম। রৌদ্র-আলো নিভে যায় নেমে আসে মেঘ হঠাৎ আগুন জ্বলে, ফুরায় আবেগ, ফুলদানি ভেঙে যায় নামে অন্ধকার অনন্ত শূন্যতা ছাড়া কিছু নাই আর। সামান্য আগেও ছিলো এইখানে ফুল মুহূর্তে বর্ষণ-মেঘে ভাসলো দুকূল, আবার কখন দেখি জেগে ওঠে চর ভালোবেসে মানুষেরা বাঁধে এসে ঘর। কিন্তু ফের ঘর ভাঙে, ঘনায় বিচ্ছেদ গোলাপের বনে দেখি জমে ওঠে ক্লেদ, বুকভরা ভালোবাসা হয়ে যায় হিম কেঁদে ওঠে মর্মতল, পাল্টে যায় থীম।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1428
160
আহসান হাবীব
জোনাকিরা
প্রকৃতিমূলক
তারা- একটি দুটি তিনটি করে এলো তখন- বৃষ্টি-ভেজা শীতের হাওয়া বইছে এলোমেলো, তারা- একটি দু’টি তিনটি করে এলো। থই থই থই অন্ধকারে ঝাউয়ের শাখা দোলে সেই- অন্ধকারে শন শন শন আওয়াজ শুধু তোলে। ভয়েতে বুক চেপে ঝাউয়ের শাখা , পাখির পাখাউঠছে কেঁপে কেঁপে । তখন- একটি দু’টি তিনটি করে এসে এক শো দু শো তিন শো করে ঝাঁক বেঁধে যায় শেষে তারা- বললে ও ভাই, ঝাউয়ের শাখা, বললে, ও ভাই পাখি, অন্ধকারে ভয় পেয়েছো নাকি ? যখন- বললে, তখন পাতার ফাঁকে কী যেন চমকালো। অবাক অবাক চোখের চাওয়ায় একটুখানি আলো। যখন- ছড়িয়ে গেলো ডালপালাতে সবাই দলে দলে তখন- ঝাউয়ের শাখায়- পাখির পাখায় হীরে-মানিক জ্বলে। যখন- হীরে-মানিক জ্বলে তখন- থমকে দাঁড়াঁয় শীতের হাওয়া চমকে গিয়ে বলে- খুশি খুশি মুখটি নিয়ে তোমরা এলে কারা? তোমরা কি ভাই নীল আকাশের তারা ?আলোর পাখি নাম জোনাকি জাগি রাতের বেলা, নিজকে জ্বেলে এই আমাদের ভালোবাসার খেলা। তারা নইকো- নইকো তারা নই আকাশের চাঁদ ছোট বুকে আছে শুধুই ভালোবাসার সাধ।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3811.html
5219
শামসুর রাহমান
শারদ বিকেলে, রাত্তিরে
চিন্তামূলক
শারদ বিকেলে মন অকস্মাৎ নেচে ওঠে দূরে কোথাও জীবনসঙ্গিনীকে নিয়ে চ’লে যেতে প্রাত্যহিক এলেবেলে ঝুট-ঝামেলার দাঁত-খিঁচুনি পিছনে ফেলে রেখে।আমরা সদরঘাটে পৌঁছে মোটামুটি সুন্দর একটি নৌকো ভাড়া ক’রে ভুলে গিয়ে সব গ্লানি, অর্থক্ষয়ের দুশ্চিন্তা আর নায়ের নতুন গতি মুছে দিল শারীরিক গ্লানি আমাদের স্বামী-স্ত্রীর।প্রকৃতির পবিত্র চুম্বনে এই আকাশের নিচে জীবনসঙ্গিনী জোহরার চেহারায়, মনে হ’লে, ফুটেছে স্বর্গীয় আভা, যা আগে দেখিনি বহুদিন। চিত্রকর হ’লে সে-মুহূর্তে আঁকতাম প্রাণ খুলে তার ছবি।আকাশে জেগেছে চাঁদ। ভাবি, এই চাঁদ হাজার বছর ধ’রে জাগে, মানবের দৃষ্টি থেকে স’রে যায়, আসে আর যায়। তবু তার রূপ রয়ে যায় চিরদিন। থাকবে কি শেষ তক? এলোমেলো ভাবি আমার গাঁয়ের প্রায় কাছে এসে পৌঁছে গেছি ভেবে নৌকোর মাঝিকে ফিরে যেতে বলি। হায়, এতে জানি না কী ভাবল সে। আমিও যে আচানক এইমতো সিদ্ধান্ত নিলাম-তাকে আমি বোঝার কী করে?মনে হ’ল পূর্বপুরুষদের ভিটেবাড়ি ভুলে বেগানা কোথায় যেন এসে পড়েছি জ্যোৎস্নার মায়াজালে বড় প্রতারিত হয়ে। নিজেকে ধিক্কার দিয়ে মাঝিকে তক্ষুনি নৌকা ফেরাতে জানাই।মাঝি নৌকা ফেরাতেই কারা যেন, মনে হল, বাঁকা হাসি হেসে ভ’রে দিলো চারদিক। শুধু আসমানে ক্ষয়ে-যাওয়া বাঁকা চাঁদ হাসছে কি কাঁদছে কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি।   (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sharod-bikele-rattire/
2476
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
কী জবাব সাঁই
সনেট
কে বাঁশি বাজাস তুই আকাশের মতো উদলা গায় কোমরের ত্যানা যেন উপমেয় মলিন মেঘের বাতাস কেবল কাঁদে হুহু করে অবুঝ বীণায় নদীর ঘাটের কোন কিশোরীর বুকে আবেগের ঘাই লাগে ঘাই লাগে ঘাই লাগে ঢেউ-ভাঙ্গা ঘাই দুপুরের নির্জনতা অবিরাম পুড়ে হয় ছাই বাঁশিকে কাঁদাস তুই না-কি তুই নিজেই কাঁদিস কে তুই কোথার থেকে কতো দূর পথ ভেঙে এলি তরুণ যুবার রূপে --- বিরহের কতো জন্ম বিষ ফোটায় এমন করে ঝরে মরে যাবার চামেলি এক-বুক জলে নামা কিশোরীর মরণের ঘাই প্রশ্ন যদি করে তার জবাব কি দেবে কোনো সাঁই নটে গাছ মুড়োবেই বহুবার জন্ম নিয়ে নিয়ে কাহিনী শেষ না করে --- কোনো সৎ জবাব না দিয়ে
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/ki-jobab-shai/
2565
রফিক আজাদ
যাও, পত্রদূত
প্রেমমূলক
যাও পত্রদূত, বোলো তার কানে-কানে মৃদু স্বরে সলজ্জ ভাষায় এই বার্তা: “কোমল পাথর, তুমি সুর্যাস্তের লাল আভা জড়িয়ে রয়েছো বরতনু; প্রকৃতি জানে না নিজে কতোটা সুন্দর বনভূমি।” যাও, বোলো তার কানে ভ্রমরসদৃশ গুঞ্জরণে, চোখের প্রশংসা কোরো, বোলো সুঠাম সুন্দর শরীরের প্রতি বাঁকে তার মরণ লুকিয়ে আছে, অন্য কেউ নয়, সে আমার আকণ্ঠ তৃষ্ণার জল: চুলের প্রশংসা কোরো, তার গুরু নিতম্ব ও বুক সবকিছু খুব ভালো, উপরন্তু, হাসিটি মধুর! যাও পত্রদূত, বোলো “হে মাধবী, কোমল পাথর, দাঁড়াও সহাস্য মুখে সুদূর মধুর মফঃস্বলে! বিনম্র ভাষায় বোলো, “উপস্থিতি খুবই তো উজ্জ্বল, যুক্তিহীন অন্ধ এক আবেগের মধ্যে, বেড়াজালে, আবদ্ধ হয়েছো উভয়েই, পরস্পর নুয়ে আছো একটি নদীর দিকে—বোলো তাকে, “অচ্ছেদ্য বন্ধন ছিঁড়ে ফেলা সহজ তো নয় মোটে, কোমল পাথর!” যাও পত্রদূত, বোলো—ভালোবাসা গ্রীষ্মের দুপুর? নীরব দৃষ্টির ভাষা-বিনিময়—দিগন্ত সুদূর?
https://banglarkobita.com/poem/famous/357
4339
শামসুর রাহমান
আচমকা কুয়াশা-কাফন
মানবতাবাদী
আচমকা কুয়াশা-কাফন চকচকে দুপুরেই গিলে ফেলে আমাকে চলিষ্ণু ভিড়ে। কয়েকটি হাত লুফে নেয় আমার শরীর এক লহমায় পথের কিনার থেকে এবং ঠেলতে শুরু করে কে জানে কোথায়। এ রকম আচানক ঘটনায় ভীষণ বিব্রত, বলা যেতে পারে, বিপন্ন বোধের দখলে আটকে পড়ি। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন দু’টি চোখ জ্বালা করে।কতিপয় মুণ্ডহীন অস্পষ্ট শরীর বয়ে নিয়ে চলেছে আমাকে কোথায় যে, বোঝা দায়। জীবিত কি আমি, নাকি লাশ হয়ে আজব কবন্ধদের কাঁধে শুয়ে যাচ্ছি লাশকাটা ঘরে? এখানে উত্তর দাতা কেউ নেই।আমি কি দেখছি পথে আমারই রক্তের ফুলঝুরি সত্য ভাষণের অপরাধে? হায়, বেলা অবেলায় ক্রুশবিদ্ধ প্রাণহীন শরীর আমার দেখছে কি কৌতূহলী নরনারী? কে এক সুকণ্ঠী শিল্পী গান গেয়ে আসর মাতাতে গিয়ে খুব বেসুরো আওয়াজ তুলে মূক হয়ে যায়। একজন খ্যাতিমান চিত্রকর সুসময় ফুটিয়ে তোলার রঙে দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে ফেলে।পদে পদে ইচ্ছাকৃত ভ্রম ঘটে সমাজের বিভিন্ন সারিতে, ফলত কান্নায় ভাসে অসহায় নরনারী। গোল টেবিলের অট্রহাসি কনসার্ট হয়ে বাজে যখন তখন! আহা মরি! অমূল্য কাগজে ঘন ঘন দস্তখত চলে নানা ছাঁদে আর কুয়াশা-কাফন নামে, নামতেই থাকে জগতের নানান অঞ্চলে। আমি কোথায় এখন? মার্গে? নাকি ধু ধু চরে?    (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/achomka-kuasha-kafon/
5104
শামসুর রাহমান
মাতাল ঋত্বিক
সনেট
কখনো কখনো মনে হয় আট কোটি লোক শোনে আমার নিভৃত উচ্চারণ, কখনো-বা মনে হয় আমার কথার জন্যে পিপাসার্ত একজনও নয়। প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যা অত্যন্ত একাকী গৃহকোণে বসে শব্দ দাও শব্দ দাও বলে কী গহন বনে, পর্বতে, পাতালে হই নতজানু, করি আয়ুক্ষয় প্রতীকের প্রতীক্ষায়, কম্পমান একটি হৃদয় বিজন সৈকতে সারাক্ষণ রহস্যের ঢেউ গোনে।যে-কথা হৃদয়ে ফোটে, হৃদয়ের ধ্বনির মতন অন্তরঙ্গ বেজে ওঠে, তা যদি না শোনে কেউ কান পেতে কিংবা না বোঝে কখনো, ক্ষতি নেই, নেই খেদ। তোমার উদ্দেশে আমি যখন যা করি উচ্চারণ, সে ধ্বনি তোমার কানে সকল সময় হোক গান; মাতাল ঋত্বিক আমি, প্রেমকথা আমার ঋগ্বেদ।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/matal-hrittik/
4184
লালন শাহ
ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফান্দ পেতে
ভক্তিমূলক
ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফান্দ পেতে। সে কি সামান্য চোর ধরবি কোনা-কাঞ্চিতে।। পাতালে চোরের বহর দেখায় আসমানের উপর তিন তারে করেছে খবর হাওয়ার মূল ধরতে তাতে।।১ কোথা ঘর কি বাসনা কে জানে ঠিক ঠিকানা হাওয়ায় তার বারামখানা শুভ শুভ যোগমতে।।২ চোর ধরে রাখবি যদি হৃদ-গারদ কর গে খাঁটি লালন কয়, নাটিখুঁটি থাকতে কি সে দেয় ছুঁতে।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4419.html
2609
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরাহ্নে এসেছিল জন্মবাসরের আমন্ত্রণে
চিন্তামূলক
অপরাহ্নে এসেছিল জন্মবাসরের আমন্ত্রণে পাহাড়িয়া যত। একে একে দিল মোরে পুষ্পের মঞ্জরি নমস্কারসহ। ধরণী লভিয়াছিল কোন্‌ ক্ষণে প্রস্তর আসনে বসি বহু যুগ বহ্নিতপ্ত তপস্যার পরে এই বর, এ পুষ্পের দান, মানুষের জন্মদিনে উৎসর্গ করিবে আশা করি। সেই বর, মানুষেরে সুন্দরের সেই নমস্কার আজি এল মোর হাতে আমার জন্মের এই সার্থক স্মরণ। নক্ষত্রে-খচিত মহাকাশে কোথাও কি জ্যোতিঃসম্পদের মাঝে কখনো দিয়েছে দেখা এ দুর্লভ আশ্চর্য সম্মান।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/yaprrane-ashechlu-jamobasher-amantna/
4685
শামসুর রাহমান
গেরিলা
স্বদেশমূলক
দেখতে কেমন তুমি? কী রকম পোশাক-আশাক প'রে করো চলাফেরা? মাথায় আছে কি জটাজাল? পেছনে দেখাতে পারো জ্যোতিশ্চক্র সন্তের মতন? টুপিতে পালক গুঁজে অথবা জবরজং, ঢোলা পাজামা কামিজ গায়ে মগডালে এক শিস দাও পাখির মতোই; কিংবা চা-খানায় বসো ছায়াচ্ছন্ন?দেখতে কেমন তুমি? অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে কুলুজি তোমার আঁতিপাঁতি। তোমার সন্ধানে ঘোরে ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য, পাড়ায় পাড়ায়। তন্ন তন্ন করে খোঁজে প্রতি ঘর।পারলে নীলিমা চিড়ে বের করতো তোমাকে ওরা, দিত ডুব গহন পাতালে। তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছো হাত ধরে পরস্পর।সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ-তাড়ানিয়া : তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার।
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/gerila/
708
জয় গোস্বামী
বাংলার গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে
স্বদেশমূলক
১ বাংলার গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, রক্ত গড়িয়ে পড়ছে… কেউ ছুটে গেল খালের ওদিকে বুক ফাটা গলায় কার মা ডাকল : “রবি রে…” উত্তরের পরিবর্তে, অনেকের স্বর মিলে একটি প্রকাণ্ড হাহাকার ঘুরে উঠল… কে রবি? কে পুষ্পেন্দু? ভরত? কাকে খুঁজে পাওয়া গেছে? কাকে আর পাওয়া যায় নি? কাকে শেশ দেখা গেছে ঠেলাঠেলি জনতাগভীরে? রবি তো পাচার হচ্ছে লাশ হয়ে আরও সর লাশেদের ভিড়ে… ২ …বাংলার গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে… পিছনে কুকুর ছুটছে ধর্, ধর্… পিছনে শেয়াল তার পিছু পিছু আসছে ভাণ্ড হাতে রাজ অনুচর এই রক্ত ধরে রাখতে হবে এই রক্ত মাখা হবে সিমেন্টে বালিতে গড়ে উঠবে সারি সারি কারখানা ঘর তারপর চারবেলা ভোঁ লাগিয়ে সাইরেন বাজবে এ কাজ না যদি পার, রাজা তাহলে বণিক এসে তোমার গা থেকে শেষ লজ্জাবস্ত্রটুকু খুলে নিয়ে যাবে ৩ আমার গুরুত্ব ছিল মেঘে প্রাণচিহ্নময় জনপদে আমার গুরুত্ব ছিল… গা ভরা নতুন শস্য নিয়ে রাস্তার দুপশ থেকে চেয়ে থাকা আদিগন্ত ক্ষেতে আর মাঠে আমার গুরুত্ব ছিল… আজ আমার গুরুত্ব শুধু রক্তস্নানরত হাড়িকাঠে! ৪ অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে সূর্য উঠে আসে বন্ধ থাকা ইশ্কুলের গায়ে ও মাথায় রোদ পড়ে রোদ পড়ে মাটি খুড়ে চলা কোদালে, বেলচায় রোদ পড়ে নিখোঁজ বাচ্চার রক্তমাখা স্কুলের পোশাকে… ৫ …না, না, না, না, না— না বলে চিত্কার করছে গাছ না বলে চিত্কার করছে এই গ্রীষ্ম দুপুরের হাওয়া না বলে চিত্কার করছে পিঠে লাশ বয়ে নিয়ে চলা ভ্যান গাড়ি আর আমরা শহরের কয়েকজন গম্ভীর মানুষ ভেবে দেখছি না বলার ভাষারীতি ঠিক ছিল কিনা তাই নিয়ে আমরা কি বিচারে বসতে পারি? ৬ তুমি কি খেজুরি? তুমি ভাঙাবেড়া? সোনাচূড়া তুমি? বার বার প্রশ্ন করি । শেষে মুখে রক্ত উঠে আসে । আমার প্রেমের মতো ছাড়খার হয়ে আছে আজ গোটা দেশ ঘোর লালবর্ণ অবিশ্বাসে । ৭ আমরা পালিয়ে আছি আমরা লুকিয়ে আছি দল বেঁধে এই ইটভাটায় মাথায় কাপড় ঢেকে সন্ধ্যেয় বেরোই মন্টুর আড়তে— মল্লিকের বাইকের পিছন-সিটে বসে আমরা এক জেলা থেকে অপর জেলায় চলে যাই, যখন যেখানে যাই কাজ তো একটাই । লোক মারতে হবে । আপাতত ইটভাঁটায় লুকিয়ে রয়েছি… অস্ত্র নিয়ে… কখন অর্ডার আসে, দেখি । ৮ পিছু ফিরে দেখেছি পতাকা । সেখানে রক্তের চিহ্ন, লাল । ক’বছর আগে যারা তোমাকে সাহায্য করবে বলে ক’বছর আগে যারা তোমার সাহায্য পাবে বলে রক্তিম পতাকটিকে নিজের পতাকা ভেবে কাঁধে নিয়েছিল তাঁদের সবাইকে মুচড়ে দলে পিষে ভেঙে দখল করেছ মুক্তাঞ্চল পতাকাটি সেই রক্তবক্ষ পেতে ধারণ করলেন । তোমার কি মনে পড়ছে রাজা শেষ রাত্রে ট্যাঙ্কের আওয়াজ? মনে পড়ছে আঠারো বছর আগে তিয়েন-আন-মেন? ৯ ভাসছে উপুর হয়ে । মুণ্ডু নেই । গেঞ্জি পড়া কালো প্যান্ট । কোন বাড়ির ছেলে? নব জানে । যারা ওকে কাল বিকেলে বাজারে ধরেছে তার মধ্যে নবই তো মাথা । একদিন নব-র মাথাও গড়াবে খালের জলে, ডাঙায় কাদার মধ্যে উলটে পড়ে থাকবে স্কন্ধকাটা এ এক পুরনো চক্র । এই চক্র চালাচ্ছেন যে-সেনাপতিরা তাঁদের কি হবে? উজ্জ্বল আসনে বসে মালা ও মুকুট পরবে সেসব গর্দান আর মাথা এও তো পুরনো চক্র । কিন্তু তুমি ফিরে দেখ আজ সে চক্র ভাঙার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছে গ্রাম— ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে কলকাতা । ১০ অপূর্ব বিকেল নামছে । রোদ্দুর নরম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা মাঠে । রোদ্দুর, আমগাছের ফাঁক দিয়ে নেমেছে দাওয়ায় । শোকাহত বাড়িটিতে শুধু এক কাক এসে বসে । ডাকতে সাহস হয় না তারও । অনেক কান্নার পর পুত্রহারা মা বুঝি এক্ষুনি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন । যদি ঘুম ভেভে যায় তাঁর!
http://kobita.banglakosh.com/archives/1677.html
3047
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরদিন আছি আমি অকেজোর দলে
চিন্তামূলক
চিরদিন আছি আমি অকেজোর দলে; বাজে লেখা, বাজে পড়া, দিন কাটে মিথ্যা বাজে ছলে। যে গুণী কাটাতে পারে বেলা তার বিনা আবশ্যকে তারে “এসো এসো” ব’লে যত্ন ক’রে বসাই বৈঠকে। কেজো লোকদের করি ভয়, কব্‌জিতে ঘড়ি বেঁধে শক্ত করে বেঁধেছে সময়– বাজে খরচের তরে উদ্‌বৃত্ত কিছুই নেই হাতে, আমাদের মতো কুঁড়ে লজ্জা পায় তাদের সাক্ষাতে। সময় করিতে নষ্ট আমরা ওস্তাদ, কাজের করিতে ক্ষতি নানামতো পেতে রাখি ফাঁদ। আমার শরীরটা যে ব্যস্তদের তফাতে ভাগায়– আপনার শক্তি নেই, পরদেহে মাশুল লাগায়। সরোজদাদার দিকে চাই– সব তাতে রাজি দেখি, কাজকর্ম যেন কিছু নাই, সময়ের ভাণ্ডারেতে দেওয়া নেই চাবি, আমার মতন এই অক্ষমের দাবি মেটাবার আছে তার অক্ষুণ্ন উদার অবসর, দিতে পারে অকৃপণ অক্লান্ত নির্ভর। দ্বিপ্রহর রাত্রিবেলা স্তিমিত আলোকে সহসা তাহার মূর্তি পড়ে যবে চোখে মনে ভাবি, আশ্বাসের তরী বেয়ে দূত কে পাঠালে, দুর্যোগের দুঃস্বপ্ন কাটালে। দায়হীন মানুষের অভাবিত এই আবির্ভাব দয়াহীন অদৃষ্টের বন্দীশালে মহামূল্য লাভ।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chirodin-achi-ami-okejor-dole/
5170
শামসুর রাহমান
যে-তুমি আমার স্বপ্ন
সনেট
পুনরায় জাগরণ, পুল্মঢাকা আমার গুহার আঁধারে প্রবিষ্ট হলো রশ্মিঝর্না, জাগালো কম্পন এমন নিঃসাড় ম্রিয়মান সত্তাতটে। যে-চুম্বন মৃতের পান্ডুর ওষ্ঠে আনে উষ্ণ শিহরণ, তার স্পর্শ যেন পেলাম সহসা এতকাল পরে, আর তৃণহীন বীতবীজ মৃত্তিকায় মদির বর্ষণ দেখালো শস্যের স্বপ্ন। শিরায় শিরায় সঞ্চরণ গোলাপের, নতুন মুদ্রার মতো খর পুণিমার।পাথুরে গুহার কাছে স্বপ্নজাত বনহংসী ওড়ে অপ্সরার ভঙ্গিতে এবং তার পাখার ঝাপটে মৃতপ্রায় সাপ নড়ে ওঠে ফের, মহাশ্চর্য দান পেয়ে যায় কী সহজে, কারুকাজময় ত্বক ফোটে শরীরে নতুন তার। তুমি এলে প্লাবনের পরে, যে-তুমি আমার স্বপ্ন, অন্নজল, অস্তিত্বের গান।    (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/je-tumi-amar-swapno/
1094
জীবনানন্দ দাশ
পাখিরা
প্রকৃতিমূলক
ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে — বসন্তের রাতে বিছানায় শুয়ে আছি; — এখন সে কত রাত!অই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর, স্কাইলাইট মাথার উপর আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে? তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে।শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে, চোখ আর চায় না ঘুমাতে; জানালার থেকে অই নক্ষত্রের আলো নেমে আসে, সাগরের জলের বাতাসে আমার হৃদয় সুস্থ হয়; সবাই ঘুমায়ে আছে সব দিকে — সমুদ্রের এই ধারে কাহাদের নোঙরের হয়েছে সময়? সাগরের অই পারে — আরো দূর পারে কোনো এক মেরুর পাহাড়ে এই সব পাখি ছিল; ব্লিজার্ডের তাড়া খেয়ে দলে দলে সমুদ্রের পর নেমেছিল তারা তারপর — মানুষ যেমন তার মৃত্যুর অজ্ঞানে নেমে পড়ে!বাদামি — সোনালি — শাদা — ফুটফুটে ডানার ভিতরে রবারের বলের মতন ছোট বুকে তাদের জীবন ছিল — যেমন রয়েছে মৃত্যু লক্ষ লক্ষ মাইল ধরে সমুদ্রের মুখে তেমন অতল সত্য হয়ে!কোথাও জীবন আছে — জীবনের স্বাদ রহিয়াছে, কোথাও নদীর জল রয়ে গেছে — সাগরের তিতা ফেনা নয়, খেলার বলের মতো তাদের হৃদয় এই জানিয়াছে — কোথাও রয়েছে পড়ে শীত পিছে, আশ্বাসের কাছে তারা আসিয়াছে।তারপর চলে যায় কোন্‌ এক ক্ষেতে তাহার প্রিয়ের সাথে আকাশের পথে যেতে যেতে সে কি কথা কয়? তাদের প্রথম ডিম জন্মিবার এসেছে সময়! অনেক লবণ ঘেঁটে সমুদ্রের পাওয়া গেছে এ মাটির ঘ্রাণ, ভালোবাসা আর ভালোবাসা সন্তান, আর সেই নীড়, এই স্বাদ — গভীর — গভীর।আজ এই বসন্তের রাতে ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে; অই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর স্কাইলাইট মাথার উপর, আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/pakhira/
4623
শামসুর রাহমান
কোকিলের ডাক
সনেট
বহুদিন পর আজ কোকিলের ডাক শুনলাম বন্ধুর সৌজন্যে টেলিফোনে কথা বলার সময়। তার রিসিভার থেকে আচানক মাদকতাময় কুহু কুহু স্বর এলো ভেসে কানে, যেন শূন্য জাম ভরে ওঠে সাকীর সুরায়, আমি ওমর খৈয়াম যেন, বুঁদ হয়ে যাই। শ্যামলীতে কখনো শুনিনি কোকিলের ডাক, অন্য পাখিদের কাছে আমি ঋণী সর্বদাই, যেহেতু এখানে ওরা আসে ছিমছাম।নিঃসঙ্গ কোকিল কী ব্যাকুল ডাকে সন্ত্রস্ত শহরে বারবার। কাকে ডাকে? কাকে তার খুব প্রয়োজন এ মুহূর্তে ভূতুড়ে দুপুরে? আমার ভেতরকার একজন তারই মতো ডেকে যাচ্ছে প্রতিটি প্রহরে অন্তরতমাকে। এ ভয়ার্ত নগরকে, বলে মন- সুন্দর করেনি ত্যাগ, যতই বাড়ুক অন্ধকার।  (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kokiler-dak/
1377
তসলিমা নাসরিন
হিসেব
প্রেমমূলক
কতটুকু ভালোবাসা দিলে, ক তোড়া গোলাপ দিলে, কতটুকু সময়, কতটা সমুদ্র দিলে, কটি নির্ঘুম রাত দিলে, ক ফোঁটা জল দিলে চোখের — সব যেদিন ভীষণ আবেগে শোনাচ্ছিলে আমাকে, বোঝাতে চাইছিলে আমাকে খুব ভালোবাসো, আমি বুঝে নিলাম তুমি আমাকে এখন আর একটুও ভালোবাসো না। ভালোবাসা ফুরোলেই মানুষ হিসেব কষতে বসে, তুমিও বসেছো। ভালোবাসা ততদিনই ভালোবাসা যতদিন এটি অন্ধ থাকে, বধির থাকে, যতদিন এটি বেহিসেবী থাকে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2005
5968
হুগো ফন হফমান্সথাল
বহির্জীবনের ব্যালাড -, অনুবাদ_ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
গভীর দু চোখ নিয়ে শিশু বড়ো হয় কিছুই জানে না তারা, বড়ো হয়, ফের মরে যায়। মানুষেরা চলে যায় যে-যার রাস্তায় । তেতো ফল একদিন মিষ্টি হয়ে ওঠে মরা পাখিদের মতো ঝরে যায় রাতে কয়েকদিন পড়ে থাকে, ফের মরে যায় । হাওয়া আছে সব সময়, তবু বার বার কত কথা শুনি আমরা কত কথা বলি শরীরের যন্ত্রপাতি সুখ আর দুঃখ ভোগ করে । ঘাসের ভিতর দিয়ে রাস্তা হয়, গ্রাম ও শহর এখানে ওখানে ভরা পুকুর ও গাছপালা, আলো কিছু আছে বিশ্রী লোক, কিছু আছে মড়ার মতন । কেন এরা বেড়ে ওঠে ? কেন পরম্পর দুজন সমান হয় না ? কেন এরা এত সংখ্যাহীন ? কেন একবার হাসি, তার পরই কান্না, শুকনো হাওয়া ? এই সব ছেলেখেলা— আমাদের কাছে আর কতটুকু দামী আমরা ক’জন তবু রয়েছি অসাধারণ, অনন্ত একাকী চিরকাল ভ্ৰাম্যমাণ, কখনো খুঁজিনি কোনো শেষ । এত সব বিচিত্রকে লক্ষ্য করা কেন প্রয়োজন ? যা হোক, সেই তো সব কিছু বলে, যে বলে সায়াহ্ন এই এক শব্দ থেকে ভেসে ওঠে গভীর কাতর স্বর, দুঃখ নিরবধি শূন্য মৌচাক থেকে যে-রকম প্রবাহিত মধু।
https://banglapoems.wordpress.com/2016/03/19/%e0%a6%ac%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a1-%e0%a6%b9%e0%a7%81%e0%a6%97/
73
আবিদ আনোয়ার
চোখেই তোমার মঙ্গা
চিন্তামূলক
"আমি খুঁজি কোনো প্রকৃত কবিকে" বলেছিলে কবে চিরকুটে লিখে সেই থেকে আমি নিজে খুঁজে ফিরি প্রকৃত কবির সংজ্ঞা- ঘেঁটেছি অনেক কাব্যবোধিনি বাস্তবে বহু কবিকেও চিনি ফসল না-হোক কবি ফলিয়েছে উর্বরা মাতা গঙ্গা! নিজেও লিখেছি কম নয় - ঢের ওজনেই হবে দশ-বারো সের: আসলেই আমি প্রাচুর্যময়, চোখেই তোমার মঙ্গা!ঠাকুর জানতো প্রেম জমে ভালো সমিল মাত্রাবৃত্তে; চারিদিকে আজ গদ্যের ঝড় কাব্যকলার বাড়ি পড়োপড় তবুও তোমাকে দেখে কেন আজও দোলা লাগে এই চিত্তে? যা বলে বলুক শত দুর্জনে ভালোবাসা পেলে রবীন্দ্রায়ণে, আমি হতে রাজি তীব্র প্রদাহ সমালোচকের পিত্তে ।তুমি যদি চাও পাহাড় ডিঙাবো প্রয়োজনে ঘোর পাতালেও যাবো শঙ্খচূরের মণি এনে দেবো শুধুই তোমার জন্য- হতে যদি বলো আউল-বাউল চুড়ো করে তবে বেঁধে নেবো চুল শিরে তুলে নেবো মুকুটের মতো আধুনিকতার দৈন্য! কটুগন্ধের 'ক্লেদজ কুসুম' কেড়ে নিয়েছিলো কবিদের ঘুম- তুমি যদি চাও পুত-সৌরভে ভেসে যাক মেকি পণ্য ।
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/chokhei-tomar-monga/
1923
পূর্ণেন্দু পত্রী
হে স্তন্যদায়িনী
চিন্তামূলক
তোমার দুধের মধ্যে এত জল কেন? তোমার দুধের মধ্যে এত ঘন বিশৃঙ্খলা কেন? রক্ত-ঝড়ে না ভেজালে কোনো সুখ দরজা খোলে না। ময়ূরও নাচে না তাকে দু-নম্বরী সেলামী না দিলে। হাতুড়ির ঘায়ে না ফাটালে রাজার ভাঁড়ার থেকে এক মুঠো খুদ খেতে পায় না চড়-ই। স্বপ্নে যারা পেয়ে গেছে সচেতন ফাউন্টেনপেন তাদেরও কলমে দেখ সুর্যকিরণের মতো কোনো কালি নেই। হে স্তন্যদায়িনী তোমার দুধের মধ্যে এত জল কেন? তোমার দুধের মধ্যে প্রতিশ্রুত ভাস্কর্যের পাথর কেবল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1181
4517
শামসুর রাহমান
ওডেলিস্ক
প্রেমমূলক
সে রাতে তুমিই ছিলে ঘরের মিয়ানো অন্ধকারে বিছানায় উন্মোচিত। তোমার বিশদ ডাগর নগ্নতা আমি আকুল আঁজলা ভ’রে পান ক’রে বারবার মৃত্যুকে তফাৎ যাও বলবার দীপ্র অহংকার অর্জন করেছিলাম। নিপোশাক তোমার শরীর জ্যোৎস্না-কমান ধোয়া মসজিদের মতো তখন বস্তুত আমার চোখের নিচে। স্তনপল্লী জ্বলে, যেমন সন্তের জ্যোতিশ্চক্র অবলীলাক্রমে আর তৃষ্ণাতুর ওষ্ঠ রেখে নাভির লেগুনে ভেবেছি তোমার সুদূর প্রপিতামহী কেউ এমনি সাবলীল নগ্নতায় ভেসে কারুর চোখের আভা করেছে দাবি।তোমার শরীর কোথাও নিরালা পথ, মসৃণ অথবা তরঙ্গিত, কোথাও বা সুরভিত ঝোপ, আমার ওষ্ঠ-পথিক ক্রমাগত আঁকে পদচিহ্ন সবখানে। কে জানতো এমন পুরোনো গাঢ়, প্রায় আর্তনাদের মতোই ডাক, শিখাময় ডাক মাংসের আড়ালে থাকে, থাকে লুকোনো এমন বিস্ফোরণ!সেই নিরঞ্জন রাতে আমার তামাম নিঃসঙ্গতা ঈষৎ স্পন্দিত নগ্নতার দিকে হাত দিয়েছিলো বাড়িয়ে এবং তোমার সপ্রাণ চুললগ্ন বেলফুল কী কৌশলে আমার বয়স নিয়েছিল চুরি ক’রে। আমার সকল রোমকূপ পল রবসনী সুরে সে মুহূর্তে গীতপরায়ণ-আমি তোমার দিকেই ছুটে যাই, যেমন ওড়ার বাসনায় ছটফতে পাখি আকাশের নীলে, যেমন লাঙল নগ্ন ফসলাভিলাষী রিক্ত মাঠে।প্রেমিক সেকেলে শব্দ, তবু আমি তাই ইদানীং। তুমি নরকের দ্বার, ত্রিলোকে রটায় অনেকেই, আমি সেই দ্বারে নতজানু, নির্গ্রন্থ পুরুষ এক স্বর্গের প্রকৃত সংজ্ঞা অভিধা ইত্যাদি প্রবল ভাসিয়ে দিই আমার স্বকীয় শোণিতের কোলাহলে। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/odelisk/
4350
শামসুর রাহমান
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, তোমাকে
ভক্তিমূলক
এই যে এখন বসে পুরনো চেয়ারে এবং ঈষৎ ঝুঁকে টেবিলে লিখতে শুরু ক’রে মনে গাছপালা, নদী, জ্যোৎস্নাস্নাত ক্ষেত জেগে ওঠে বয়েসী আমার কিয়দ্দূরে। মাঝে মাঝে পাখি গান গেয়ে ওঠে, জ্যোৎস্না নৃত্যপরায়ণ হয়। এমন সময়ে মনে পড়লো তোমার কথা হে বন্ধু, যে-তুমি সুদূর বিদেশে একা শীতার্ত রাত্তিরে পড়ছো জরুরি বই অথবা লিখছো স্বদেশের পত্রিকার প্রয়োজনে নিয়মিত তুখোড় কলাম, যেগুলোর সাড়া দ্রুত পড়ছে পাঠক-পাঠিকার মজলিশে।হে বন্ধু, তোমার কখনও কি মধ্যরাতে অনুতাপ জেগে ওঠে সাহিত্য-রচনা অবহেলিত হয়েছে বড় বেশি ব’লে? না কি নিজেকে প্রবোধ দাও কাগজে কলম ছোঁয়াবার কালে দেশবাসীদের জাগাবার কাজ অবহেলা করা অনুচিত ভেবে লিখছো নিয়ত?শোনো বন্ধু, যে যাই বলুক, রাশি রাশি লেখক বিস্মৃত হবে ভাবী কালে, অথচ তোমার নাম নিশ্চিত ঘুরবে গুণীজন আর জনতার মুখে যুগে যুগে। এই সত্য উজ্জ্বল তোমার কাছে, বুঝি তাই তুমি প্রায়শই চালাও কলম সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে।জানি বন্ধু, বাংলার মানুষ চিরকাল স্মৃতিপটে রাখবে সাজিয়ে ভালোবেসে, শ্রদ্ধাভরে তোমার অক্ষয় নাম, গাইবে তোমার গান যুগ-যুগান্তর- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি?’ বন্ধু, তোমাকেও ভুলবে না প্রকৃত বাঙালি কোনও কালে।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/abdul-goffar-chowdhury-tomake/
1765
পূর্ণেন্দু পত্রী
আমরা
চিন্তামূলক
মৃত্যুর মুহুর্ত আগে ‘সভাতার সংকট’ এর মতো তীব্র রক্তাক্ত আগুন নিজের পাঁজনে যিনি জালিয়েছিলেন, আমরা তাঁহারই যোগ্য বংশধরগুলি দৈনিকের মাসিকের বার্ষিকের নিউজপ্রিন্টের হলুদ মাঠের পরে গান্ডীবের ভাঙা বাঁট নিয়ে খেলিতেছি অপূর্ব ডাংগুলি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1271
744
জয় গোস্বামী
সিদ্ধি,
চিন্তামূলক
সিদ্ধি, জবাকুসুম সংকাশ মাথার পিছনে ফেটে পড়েদপ করে জ্বলে পূর্বাকাশ (…?) মাথায় রক্ত চড়েসিদ্ধি, মহাদ্যুতি–তার মুখে চূর্ণ হয় যশের হাড়মাসহোমাগ্নিপ্রণীত দুটি হাত আমাতে সংযুক্ত হয়, বলে:বল তুই এই জলেস্থানে কী চাস? কেমনভাবে চাস?আমি নিরুত্তর থেকে দেখি সূর্য ফেটে পড়ে পূর্ণ ছাইছাই ঘুরতে ঘুরতে পুনঃপুন এক সূর্য সহস্র জন্মায়সূর্যে সূর্যে আমি দেখতে পাই ক্ষণমাত্র লেখনী থামছে নাগণেশ, আমার সামনে বসে লিপিবদ্ধ করছেন আকাশচক্রের পিছনে চক্রাকার ফুটে উঠছে ব্রহ্মাজগৎএ দৃশ্যের বিবরণকালে হে শব্দ, ব্রহ্মের মুখ, আমিশরীরে আলোর গতি পাই তোমাকেও এপার ওপারভেদ করি, ফুঁড়ে চলে যাই…আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রসিদ্ধি, জবাকুসুম সংকাশ মাথার পিছনে ফেটে পড়েদপ করে জ্বলে পূর্বাকাশ (…?) মাথায় রক্ত চড়েসিদ্ধি, মহাদ্যুতি–তার মুখে চূর্ণ হয় যশের হাড়মাসহোমাগ্নিপ্রণীত দুটি হাত আমাতে সংযুক্ত হয়, বলে:বল তুই এই জলেস্থানে কী চাস? কেমনভাবে চাস?আমি নিরুত্তর থেকে দেখি সূর্য ফেটে পড়ে পূর্ণ ছাইছাই ঘুরতে ঘুরতে পুনঃপুন এক সূর্য সহস্র জন্মায়সূর্যে সূর্যে আমি দেখতে পাই ক্ষণমাত্র লেখনী থামছে নাগণেশ, আমার সামনে বসে লিপিবদ্ধ করছেন আকাশচক্রের পিছনে চক্রাকার ফুটে উঠছে ব্রহ্মাজগৎএ দৃশ্যের বিবরণকালে হে শব্দ, ব্রহ্মের মুখ, আমিশরীরে আলোর গতি পাই তোমাকেও এপার ওপারভেদ করি, ফুঁড়ে চলে যাই…আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%bf-%e0%a6%9c%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%9c%e0%a6%af/
4129
রেদোয়ান মাসুদ
জানি তুমি আসবে
প্রেমমূলক
জানি তুমি আসবে, দু’চোখে তোমার অশ্রু ঝরবে হৃদয়ে তোমার ভালবাসা জাগবে আমার জন্য তোমার হৃদয় কাদবে যেদিন থাকবোনা আমি থাকবে শুধু তুমি আর সেদিন ই তুমি আমায় খুজবে। জানি তুমি আসবে। জানি তুমি ভালবাসবে !!
http://kobita.banglakosh.com/archives/2107.html
1006
জীবনানন্দ দাশ
গতিবিধি
চিন্তামূলক
সর্বদাই প্রবেশের পথ র'য়ে গেছে; এবং প্রবেশ ক'রে পুনরায় বাহির হবার;- অরণ্যের অন্ধকার থেকে এক প্রান্তরের আলোকের পথে; প্রান্তরের আলো থেকে পুনরায় রাত্রির আঁধারে; অথবা গৃহের তৃপ্তি ছেড়ে দিয়ে নারী, ভাঁড়, মক্ষিকার বারে।এই সব শরীরের বিচরণ। ঘুমায়ে সে যেতে পারে। (সচেতন যাত্রার পথ তবু আরো প্রসারিত। আলো অন্ধকার তার কাছে কিছু নয়।) উট পাখি সারাদিন দিবারৌদ্রে ফিরে বালির ভিতরে মাথা রেখে দিয়ে আপনার অন্ধ পরিচয় হয়তো ভা নিয়ে যায়,- তা' পাখির বিনয়। কোনো এক রমণীকে ভালোবেসে, কোনো এক মরকের দেশে গিয়ে জোর পেয়ে, কোন এক গ্রন্থ প'ড়ে প্রিয় সত্য পেয়ে গেছি ভেবে, অথবা আরেক সত্য সকলকে দিতে গিয়ে অভিভূত হয়ে, শরতের পরিষ্কার রাত পেয়ে সব চেয়ে পোষাকী, উজ্জ্বল- চিন্তা তবু বর্ষারাতে দ্বার থেকে দ্বারে ভিজে কুকুরের মত গাত্রদাহ ঝাড়ে। সমাধির ঢের নিচে- নদীর নিকটে সব উঁচু উঁচু গাছের শিকড় গিয়ে নড়ে।সেইখানে দার্শনিকের দাঁত ক্কাথ পান করে পরিত্যাক্ত মিঠে আলিউ, মরামাস, ইঁদুরের শবের ভিতরে;- জেনে নিয়ে আমরা প্রস্তুত ক'রে নিই নিজেদের; কেননা ভূমিকা ঢের র'য়ে গেছে- বোঝা যাবে (কিছুটা বিনয় যদি থেকে থাকে চোখে)- সূশ্রী ময়ূরও কেন উটপাখি সৃষ্টি ক'রেছিল টানাপোড়েনের সুরে- সূর্যের সপ্তকে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/gotibidhi/
2669
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজি জন্মবাসরের বক্ষ ভেদ করি
চিন্তামূলক
আজি জন্মবাসরের বক্ষ ভেদ করি প্রিয়মৃত্যুবিচ্ছেদের এসেছে সংবাদ; আপন আগুনে শোক দগ্ধ করি দিল আপনারে উঠিল প্রদীপ্ত হয়ে। সায়াহ্নবেলার ভালে অস্তসূর্য দেয় পরাইয়া রক্তোজ্জল মহিমার টিকা, স্বর্ণময়ী করে দেয় আসন্ন রাত্রির মুখশ্রীরে, তেমনি জ্বলন্ত শিখা মৃত্যু পরাইল মোরে জীবনের পশ্চিমসীমায়। আলোকে তাহার দেখা দিল অখন্ড জীবন, যাহে জন্মমৃত্যু এক হয়ে আছে; সে মহিমা উদ্‌বারিল যাহার উজ্জ্বল অমরতা কৃপণ ভাগ্যের দৈন্যে দিনে দিনে রেখেছিল ঢেকে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aje-janmabasher-bakh-bat-kare/
1191
জীবনানন্দ দাশ
লঘু মুহূর্ত
রূপক
এখন দিনের শেষে তিনজন আধো আইবুড়ো ভিখিরীর অত্যন্ত প্রশান্ত হ'লো মন; ধূসর বাতাস খেয়ে এক গাল- রাস্তার পাশে ধূসর বাতাস দিয়ে ক'রে নিলো মুখ আচমন। কেননা এখন তারা যেই দেশে যাবে তাকে রাঙা নদী বলে; সেইখানে ধোপা আর গাধা এসে জলে মুখ দেখে পরস্পরের পিঠে চড়ে যাদুবলে।তবুও যাবার আগে তিনটি ভিখিরী মিলে গিয়ে গোল হ'য়ে বসে গেল তিন মগ চায়ে; একটি উওজির, রাজা, বাকিটা কোটাল, পরস্পরকে তারা নিলো বাৎলায়ে। তবুও এক ভিখিরিনী তিনজন খোঁড়া, খুড়ো, বেয়াইয়ের টানে- অথবা চায়ের মগে কুটুম হয়েছে এই জ্ঞানে মিলে-মিশে গেল রাতা চার জোড়া কানে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/loghu-muhurto/
5494
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পরিশিষ্ট
মানবতাবাদী
অনেক উল্কার স্রোত বয়েছিল হঠাৎ প্রত্যুষে. বিনিদ্র তারার বে পল্লবিত মেঘ ছুঁয়েছিল রশ্মিটুকু প্রথম আবেগে। অকস্মাৎ কম্পমান অশরীরী দিন, রক্তের বাসরঘরে বিবর্ণ মৃত্যুর বীজ ছড়াল আসন্ন রাজপথে। তবু স্বপ্ন নয়ঃ গোদূলীর প্রত্যহ ছায়ায় গোপন স্বার সৃষ্টি কচ্যুত গ্রহ-উপবনেঃ দিগন্তের নিশ্চল আভাস। ভস্মীভূত শ্মশানক্রন্দনে, রক্তিম আকাশচিহ্ন সবেগে প্রস্থান করে যূথ ব্যঞ্জনায়। নিষিদ্ধ কল্পনাগুলি বন্ধ্যা তবু অলক্ষ্যে প্রসব করে অব্যক্ত যন্ত্রণা, প্রথম যৌবন তার রক্তময় রিক্ত জয়টীকা স্তম্ভিত জীবন হতে নিঃশেষে নিশ্চিহ্ন ক'রে দিল। তারপরঃ প্রান্তিক যাত্রায় অতৃপ্ত রাত্রির স্বাদ, বাসর শয্যায় অসম্বৃত দীর্ঘশ্বাস বিস্মরণী সুরাপানে নিত্য নিমজ্জিত স্বগত জাহ্নবীজলে। তৃষ্ণার্ত কঙ্কাল অতীত অমৃত পানে দৃষ্টি হানে কত! সর্বগ্রাসী প্রলুব্ধ চিতার অপবাদে সভয়ে সন্ধান করে ইতিবৃত্ত দগ্ধপ্রায় মনে। প্রেতাত্মার প্রতিবিম্ব বার্ধক্যের প্রকম্পনে লীন, অনুর্বর জীবনের সূর্যোদয়ঃ ভস্মশেষ চিতা। কুজ্ঝটিকা মূর্ছা গেল আলোক-সম্পাতে, বাসনা-উদ্গ্রীব চিন্তা উন্মুখ ধ্বংসের আর্তনাদে। সরীসৃপ বন্যা যেন জড়তার স্থির প্রতিবাদ, মানবিক অভিযানে নিশ্চিন্ত উষ্ণীষ! প্রচ্ছন্ন অগ্ন্যুৎপাতে সংজ্ঞাহীন মেরুদণ্ড-দিন নিতান্ত ভঙ্গুর, তাই উদ্যত সৃষ্টির ত্রাসে কাঁপেঃ পণভারে জর্জরিত পাথেয় সংগ্রাম, চকিত হরিণদৃষ্টি অভুক্ত মনের পুষ্টিকরঃ অনাসক্ত চৈতন্যের অস্থায়ী প্রয়াণ। অথবা দৈবাৎ কোন নৈর্ব্যক্তিক আশার নিঃশ্বাস নগণ্য অঙ্গারতলে খুঁজেছে অন্তিম। রুদ্ধশ্বাস বসন্তের আদিম প্রকাশ, বিপ্রলব্ধ জনতার কুটিল বিষাক্ত প্রতিবাদে প্রত্যহ লাঞ্ছিত স্বপ্ন, স্পর্ধিত আঘাত! সুষুপ্ত প্রকোষ্ঠতলে তন্দ্রাহীন দ্বৈতাচারী নর নিজেরে বিনষ্ট করে উৎসারিত ধূমে, অদ্ভুত ব্যাধির হিমছায়া দীর্ণ করে নির্যাতিত শুদ্ধ কল্পনাকে ; সদ্যমৃত-পৃথিবীর মানুষের মতো প্রত্যেক মানবমনে একই উত্তাপ অবসাদে। তবুও শার্দূল-মন অন্ধকারে সন্ধ্যার মিছিলে প্রথম বিস্ময়দৃষ্টি মেলে ধরে বিষাক্ত বিশ্বাসে। বহ্নিমান তপ্তশিখা উন্মেষিত প্রথম স্পর্ধায়- বিষকন্যা পৃথিবীর চক্রান্তে বিহ্বল উপস্থিত প্রহরী সভ্যতা। ধূসর অগ্নির পিণ্ডঃ উত্তাপবিহীন স্তিমিত মত্ততাগুলি স্তব্ধ নীহারিকা, মৃত্তিকার দাত্রী অবশেষে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1121
2602
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অন্ধকারের পার হতে আনি
রূপক
অন্ধকারের পার হতে আনি প্রভাতসূর্য মন্দ্রিল বাণী, জাগালো বিচিত্রেরে এক আলোকের আলিঙ্গনের ঘেরে।    (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ondhokarer-par-hote-ani/
1126
জীবনানন্দ দাশ
বাতাসের শব্দ এসে
চিন্তামূলক
বাতাসের শব্দ এসে কিছুক্ষণ হরিতকী গাছের শাখায় মিথিরিত হয়ে থেমে যায়, তার মৃত্যু হলো বলে। এক পা দুই পা করে দুই-চার মাইল প্রান্তরের সাথে আরো পরিচিত হলে এমনি প্রান্তর থাকে রৌদ্রময়, শব্দবিহীন, যতক্ষণ অপরাহ্ন বুকের উপরে পড়ে থাকে তার; শালিখ পাখিকে আমি নাম ধরে ডাকি; ছায়া বা অনলোজ্জ্বল পাখিনীকে ডাকে তবুও সে; মানুষের অন্তঃসার অবহেলা করে বিহঙ্গের নিয়মে নির্জন। উনিশশো বেয়াল্লিশ খৃষ্টাব্দের অপরাহ্নে নেই। উনিশশো অনন্তের ভূখণ্ডে, আকাশ মাঝে মাঝে অনুভব করে নিতে চাই; শান্তি নেই; নীললোহিতের প্রতি শেষ অবিশ্বাস আছে কি না আছে ভেবে চেয়ে দেখি: পাখি,রৌদ্র, ঘাস।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/batasher-shobdo-eshe/
1242
জীবনানন্দ দাশ
সূর্য নক্ষত্র নারী - ২
প্রেমমূলক
চারিদিকে সৃজনের অন্ধকার র’য়ে গেছে, নারী, অবতীর্ণ শরীরের অনুভূতি ছাড়া আরো ভালো কোথাও দ্বিতীয় সূর্য নেই, যা জ্বালালে তোমার শরীর সব অলোকিত ক’রে দিয়ে স্পষ্ট ক’রে দেবে কোনো কালে শরীর যা র’য়ে গেছে। এই সব ঐশী কাল ভেঙে ফেলে দিয়ে নতুন সময় গ’ড়ে নিজেকে না গ’ড়ে তবু তুমি ব্রহ্মান্ডের অন্ধকারে একবার জন্মাবার হেতু অনুভব করেছিলে;- জন্ম-জন্মান্তের মৃত স্মরণের সাঁকো তোমার হৃদয় স্পর্শ করে ব’লে আজ আমাকে ইশারাপাত ক’রে গেলে তারি;- অপার কালের স্রোত না পেলে কী ক’রে তবু, নারী তুচ্ছ, খন্ড, অল্প সময়ের স্বত্ব কাটায়ে অঋণী তোমাকে কাছে পাবে- তোমার নিবিড় নিজ চোখ এসে নিজের বিষয় নিয়ে যাবে? সময়ের কক্ষ থেকে দূর কক্ষে চাবি খুলে ফেলে তুমি অন্য সব মেয়েদের আত্ম অন্তরঙ্গতার দান দেখায়ে অনন্তকাল ভেঙ্গে গেলে পরে, যে-দেশে নক্ষত্র নেই- কোথাও সময় নেই আর- আমারো হৃদয়ে নেই বিভা- দেখাবো নিজের হাতে- অবশেষে কী মকরকেতনে প্রতিভা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/552
5180
শামসুর রাহমান
রঞ্জিতাকে মনে রেখে
প্রেমমূলক
রঞ্জিতা তোমার নাম, এতকাল পরেও কেমন নির্ভুল মসৃণ মনে পড়ে যায় বেলা-অবেলায়। রঞ্জিতা তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কোনো কে গ্রীষ্মের দুপুরে দীপ্র কবি সম্মেলনে কলকাতায় ন’বছর আগে, মনে পড়ে?সহজ সৌন্দর্যে তুমি এসে বসলে আমার পাশে। কবি প্রসিদ্ধির অমেয় ভাণ্ডার থেকে রত্নরাজি নিয়ে আজ আর সাজাব না তোমাকে রঞ্জিতা। শুধু বলি, তোমার চোখের মতো অমন সুন্দর চোখ কখনো দেখিনি। ‘বিচ্ছিরি গরম’ বলেই সুনীল খাতা দুলিয়ে আমাকে তুমি হাওয়া দিতে শুরু করেছিলে, সেই হাওয়া একরাশ নক্ষত্রের মতো মমতা ছড়িয়ে দ্যায়। যদি আমি রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী হতাম, তবে বলতাম হে মেয়ে ‘ইহাই বাঙালিত্ব’।কিছুই বলেনি একালের কবি, শুধু মুগ্ধাবেশে দেখেছে তোমার মধ্যে তন্বী গাছ, পালতোলা নৌকো, পদ্মময় দীঘি আর শহরের নিবিড় উৎসব। রঞ্জিতা সান্নিধ্য বড় বেশি মোহময় চিত্রকল্প তৈরি করে, দেখায় স্বপ্নের গ্রীবা-বুঝি তাই আমিও ভেবেছি, ক’দিনের সান্নিধ্যের সুরা পান করে, একান্ত আমারই দিকে বয়েছিল তোমার গোলাপি হৃদয়ের মদির নিঃশ্বাস আর সে বিশ্বাসে আমরা দু’জন অপরাহ্নে পাশাপাশি হেঁটে গেছি কলেজ স্ট্রিটের অলৌকিক ভিড়ে, ফুটপাথে ফুটেছিল মল্লিকা, টগর, জুঁই তোমার হৃদয়ে উন্মীলিত আমারই কবিতা আর চোখের পাতায় শতকের অস্তরাগ। বঞ্জিতা আবার কবে দেখা হবে আমাদের কোন বিকেল বেলার কনে-দেখা আলোর মায়ায়, কোন সে কবি সভায় কিংবা ফুটপাতে? রঞ্জিতা তোমাকে আমি ডেকেছি ব্যাকুল বারংবারডেকেছি আমার। নিজস্ব বিবরে। এই চরাচরব্যাপী অসম্ভব হট্ররোলে অসহায় আমার এ কণ্ঠস্বর কি যাবে না ডুবে? কী করে আমরা ফের হবো মুখোমুখি বিচ্ছন্নতাবোধের পাতালে? ছদ্মবেশী নানাদেশী ঘাতকের খড়্গের ছায়ায় কী করে আমরা চুমো খাব? কী করে হাঁটব আণবিক আবর্জনাময় পথে? ভীষণ গোলকধাঁধা রাজনীতি, আমরা হারিয়ে ফেলি পথ বার বার, পড়ি খানাখন্দে, মতবাদের সাঁড়াশি হঠাৎ উপড়ে ফেলে আমাদের প্রত্যেকের একেকটি চোখ। যে ভূখণ্ডে রঞ্জিতা তোমার আদিবাস, তার মাৎস্যন্যায় দু’চোখের বিষ এবং আমার মধ্যে নেই কোনো বশংবদ ছায়া।হয়তো কখনো আর কলকাতায় যাব না এবং তুমিও ঢাকায় আসবে না। তাহলে কোথায় বলো দেখা হবে আমাদের পুনরায় অচেনা পথের কোন মোড়ে? মস্কো কি পিকিং-এ নয়, ওয়াশিংটনেও নয়, ব্যাঙ্কক জাকার্তা জেদ্দা কি ইস্তামবুল, হামবুর্গ, কোনোখানে নয়। আমরা দু’জন হয়তো মিলিত হবো নামগোত্রহীন উজ্জ্বল রাজধানীতে কোনো, যাকে ডাকব আমরা মানবতা বলে, যেমন আনন্দে নবজাতককে ডাকে তার জনক-জননী।   (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ronjitake-mone-rekho/
5433
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আজিকার দিন কেটে যায়
চিন্তামূলক
আজিকার দিন কেটে যায়,— অনলস মধ্যাহ্ন বেলায় যাহার অক্ষয় মূর্তি পেয়েছিনু খুঁজে তারি পানে চেয়ে আছি চক্ষু বুজে৷ আমি সেই ধনুর্ধর যার শরাসনে অস্ত্র নাই, দীপ্তি মনে মনে, দিগন্তের স্তিমিত আলোকে পূজা চলে অনিত্যের বহ্নিময় স্রোতে৷ চলমান নির্বিরোধ ডাক, আজিকে অন্তর হতে চিরমুক্তি পাক৷ কঠিন প্রস্তরমূর্তি ভেঙে যাবে যবে সেই দিন আমাদের অস্ত্র তার কোষমুক্ত হবে৷ সুতরাং রুদ্ধতায় আজিকার দিন হোক মুক্তিহীন৷ প্রথম বাঁশির স্ফূর্তি গুপ্ত উৎস হতে জীবন‍–সিন্ধুর বুকে আন্তরিক পোতে আজিও পায় নি পথ তাই আমার রুদ্রের পূজা নগণ্য প্রথাই তবুও আগত দিন ব্যগ্র হয়ে বারংবার চায় আজিকার দিন কেটে যায়॥এই কবিতাটি ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ‘সুকান্ত-প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত। পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি। এটি ১৯৪০-এর আগের রচনা।
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/ajikar-din-kete-jay/
4999
শামসুর রাহমান
বসতিতে, মনীষায়
চিন্তামূলক
আজকাল বিছানায় বড় বেশি শুয়ে থাকে একা, বালিশে অনেকক্ষণ মুখ গুঁজে সময় যাপন করে, কড়িকাঠ গোনে। বাড়িটা পুরনো, নড়বড়ে; বুড়ো কাকাতুয়ার বিবর্ণ পালকের মতো রঙ দেয়ালে অস্পষ্ট। পলেস্তরা খসে পড়ে মাঝে-মধ্যে; প্রাচীন পদ্যের ঋদ্ধ পংক্তির মতন কি যেন গুমরে ওঠে ক্ষয়ে-যাওয়া বাঘছালে ইঁদুরের দৌড় কাঠের চেয়ারে শাদা বেড়ালের স্বপ্নাশ্রিত মাথা, খবর কাগজ ঘোর উন্মাদের স্মৃতির মতন লুটোয় মেঝেতে আর দিন যায়, দীর্ঘ বেলা যায়।রোদের জঙ্গলে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে এখন সে গা-গতর এলিয়ে দিয়েছে বিছানায় রৌদ্রদগ্ধ শ্রমিকের মতো। সে কি একবুক অভিমান নিয়ে শুয়ে থাকে, নাকি সত্তাময় অপমান নিয়ে হতে চায় আত্মঘাতী? নানান ফলের প্রতি তার দুর্বলতা আছে ব’লে শিয়রে সাজিয়ে রাখে সযত্নে অলীক ফলমূল। আলস্যের ভায়োলেট মখমলে গুটিসুটি পড়ে থাকে; চোখের পাতায় ঘুম নয়, কিছু তন্দ্রা লেগে থাকে মোহের মতন। স্বপ্নের টানেলে ঘোরে নিরুদ্দেশে, নিজেকে সংশয়মুক্ত রেখে তারই করতলে রাখে মাথা খুব নিটোল আস্থায় যে তার অকুন্ঠ পিঠে আমূল বসিয়ে দেবে ছোরা সুনিশ্চিত। কখনো হঠাৎ তার তন্দ্রার ঝালর কাঁপে, অলিতে-গলিতে রাত্রিদিন নানা কলরব, ছদ্মবেশী শজারুর ভিড় বাড়ে ক্রমাগত আশেপাশে। প্রকৃত ধর্মের চেয়ে ধর্ম-কোলাহলে অত্যন্ত মুখর আজ শহর ও গ্রাম। বিশ্বযুদ্ধে নেই কারো সায় আর, তবু অতিকায় কালো রাজহাঁসের মতন ছায়া ফেলছে সমর বসতিতে, মনীষায়, সভ্যতার মিনারে-মিনারে।  (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bostire-monishay/
5715
সুনির্মল বসু
হবুচন্দ্রের আইন
হাস্যরসাত্মক
হবুচন্দ্র রাজা বলেন গবুচন্দ্রে ডেকে– “আইন জারী করে দিও রাজ্যেতে আজ থেকে, মোর রাজ্যের ভিতর– হোক্ না ধনী, হোক্ না গরীব, ভদ্র কিংবা ইতর, কাঁদতে কেহ পারবে নাক, যতই মরুক শোকে– হাসবে আমার যতেক প্রজা, হাসবে যত লোকে। সান্ত্রী-সেপাই, প্যায়দা, পাইক ঘুরবে ছদ্মবেশে, কাঁদলে কেহ, আনবে বেঁধে, শাস্তি হবে শেষে।” বলে গবু- “হুজুর– ভয় যদি কেউ পায় কখনো দৈত্য, দানা জুজুর, কিম্বা যদি পিছলে পড়ে মুণ্ডু ফাটায় কেহ, গাড়ীর তলে কারুর যদি থেঁতলিয়ে যায় দেহ; কিম্বা যদি কোনো প্রজার কান দুটি যায় কাটা, কিম্বা যদি পড়ে কারুর পিঠের ওপর ঝাঁটা; সত্যিকারের বিপন্ন হয় যদি, তবুও কি সবাই তারা হাসবে নিরবধি ?” রাজা বলেন- “গবু- আমার আইন সকল প্রজার মানতে হবে তবু। কেউ যদি হয় খুন বা জখম, হাড্ডিতে ঘুণ ধরে, পাঁজরা যদি ঝাঁঝরা হয়ে মজ্জা ঝরে পড়ে, ঠ্যাংটি ভাঙে, হাতটি কাটে, ভুঁড়িটি যায় ফেঁসে, অন্ধকারে স্কন্ধ কাটা ঘাড়টি ধরে ঠেসে, কিম্বা যদি ধড়ের থেকে মুণ্ডুটি যায় উড়ে, কাঁদতে কেহ পারবে নাক বিশ্রী বিকট সুরে। হবুচন্দ্রের দেশে– মরতে যদি হয় কখনো, মরতে হবে হেসে।”পিটিয়ে দিলো ঢ্যাঁড়া গবু, রাজার আদেশ পেয়ে– “কাঁদতে কেহ পারবে না আর, পুরুষ কিম্বা মেয়ে; যতই শোকের কারণ ঘটুক হাসতে হবে তবু, আদেশ দিলেন রাজাধিরাজ হবু; রাজার আদেশ কেউ যদি যায় ভুলে, চড়তে হবে শূলে।”সেদিন হতে হবুর দেশে উল্টে গেল রীতি, হররা-হাসির হট্টগোলে, অট্টহাসির অট্টরোলে, জাগলো তুফান নিতি। হাসির যেন ঝড় বয়ে যায় রাজ্যখানি জুড়ে, সবাই হাসে যখন তখন প্রাণ কাঁপানো সুরে। প্যায়দা পাইক ছদ্মবেশে হদ্দ অবিরত, সবাই হাসে আশে পাশে, বিষম খেয়ে ভীষণ হাসে, আস্তাবলে সহিস হাসে, আস্তাকুঁড়ে মেথর, হাসছে যত মুমূর্ষরা হাসপাতালের ভেতর। আইন জেনে সর্বনেশে ঘাটের মড়া উঠছে হেসে, বেতো-রোগী দেঁতো হাসি হাসছে বসে ঘরে; কাশতে গিয়ে কেশো-বুড়ো হাসতে শুরু করে। হাসছে দেশের ন্যাংলাফ্যাচাং হ্যাংলা হাঁদা যত, গোমড়া উদো-নোংরা-ডেঁপো-চ্যাংরো শত শত; কেউ কাঁদে না কান্না পেলেও, কেউ কাঁদে না গাট্টা খেলেও, পাঠশালাতে বেত্র খেয়ে ছাত্রদলে হাসে, কান্না ভুলে শিশুর দলে হাসছে অনায়াসে।রাজা হবু বলেন আবার গবুচন্দ্রে ডাকি, “আমার আদেশ মেনে সবাই আমায় দিলে ফাঁকি ? রাজ্যে আমার কাঁদার কথা সবাই গেল ভুলে, কেউ গেল না শূলে ? একটা লোকো পেলাম না এইবারে শূলে চড়াই যারে। নিয়ম আমার কড়া– প্রতিদিনই একটি লোকের শূলেতে চাই চড়া। যা হোক, আজই সাঁঝের আগে শূলে দেবার তরে– যে করে হোক একটি মানুষ আনতে হবে ধরে।”গবুচন্দ্র বল্লে হেসে চেয়ে রাজার মুখে, “কাঁদতে পারে এমন মানুষ নাই যে এ মুল্লুকে; আমি না হয় নিজেই কেঁদে আইন ভেঙে তবে চড়ব শূলে, মহারাজের নিয়ম রক্ষা হবে। কিন্তু একি, আমিও যে কাঁদতে গেছি ভুলে, কেমন করে চড়ব তবে শূলে ?” রাজা বলেন, “তোমার মত মূর্খ দেখি না-যে, কাঁদতে তুমি ভুলে গেলে এই ক’দিনের মাঝে। এই দ্যাখো না কাঁদে কেমন করে”– এই না বলে হবু রাজা কেঁদে ফেল্লেন জোরে।মন্ত্রী গবু বল্লে তখন, “এবার তবে রাজা– নিজের আইন পালন করুন গ্রহণ করুন সাজা।” বলেন হবু, “আমার হুকুম নড়বে না এক চুল, আমার সাজা আমিই নেব তৈরি কর শূল !”
http://kobita.banglakosh.com/archives/4317.html
3352
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পথিক দেখেছি আমি পুরাণে কীর্তিত কত দেশ
সনেট
পথিক দেখেছি আমি পুরাণে কীর্তিত কত দেশ কীর্তি-নিঃস্ব আজি; দেখেছি অবমানিত ভগ্নশেষ দর্পোদ্ধত প্রতাপের; অন্তর্হিত বিজয়-নিশান বজ্রাঘাতে স্তব্ধ যেন অট্টহাসি; বিরাট সম্মান সাষ্টাঙ্গে সে ধুলায় প্রণত, যে ধুলার পরে মেলে সন্ধ্যাবেলা ভিক্ষু জীর্ণ কাঁথা, যে ধুলায় চিহ্ন ফেলে শ্রান্ত পদ পথিকের, পুনঃ সেই চিহ্ন লোপ করে অসংখ্যের নিত্য পদপাতে। দেখিলাম বালুস্তরে প্রচ্ছন্ন সুদূর যুগান্তর, ধূসর সমুদ্রতলে যেন মগ্ন মহাতরী অকস্মাৎ ঝঞ্ঝাবর্ত বলে লয়ে তার সব ভাষা, সর্ব দিন রজনীর আশা, মুখরিত ক্ষুধাতৃষ্ণা, বাসনা-প্রদীপ্ত ভালবাসা। তবু করি অনুভব বসি’ এই অনিত্যের বুকে , অসীমের হৃৎস্পন্দন তরঙ্গিছে মোর দুঃখে সুখে ।   (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pothik-dekhechi-ami-purane-kirtito-koto-desh/
999
জীবনানন্দ দাশ
কোথায় গিয়েছে
চিন্তামূলক
কোথায় গিয়েছে আজ সেইসব পাখি-আর সেইসব ঘোড়া- সেই শাদা দালানের নারী? বাবলা ফুলের গন্ধে-সোনালি রোদের রঙ্গে ওড়া সেইসব পাখি-আর সেইসব ঘোড়া চলে গেছে আমাদের এ পৃথিবী ছেড়ে; হৃদয় কোথায় বলো-কোথায় গিয়েছে আজ সব অন্ধকার; মৃত নাসপাতিটির মতন নীরব।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kothay-giese/
4508
শামসুর রাহমান
এখানেই বেইলি রোডে
রূপক
(বিপ্রদাশ, বড়ুয়া প্রিয়বরেষু)এখানে বেইলি রোডে তোমরা এসেছো আজ বিনা আমন্ত্রণে ওগো পক্ষীকুল দূরদেশ থেকে জানি আশ্রয়ের খোঁজে; তোমরাও নিরাপত্তা চাও, ধূর্ত শিকারির শর কিংবা গুলি এড়িয়ে বাঁচার সাধ তোমাদেরও বুকে জ্বলে প্রদীপের মতো। এইসব নাগরিক গাছে কেন নিলে ঠাঁই শীতের দুপুরে? পাড়াটা নীরব কিছু, তবু মোটর কারের হর্ন বেজে ওঠে মাঝে মাঝে, কালো ধোঁয়া পথে ভাসমান।যাকে ভালোবাসি, সে কখনো সখনো হঠাৎ পাখি হয়ে নীলিমায় কিংবা কোনো ঝিলে কী খেয়ালে উড়ে যেতে চায় হাফ ধরে এলে শহুরে জীবনে। অনেকেই নির্দয় শহর ছেড়ে অন্য কোনোখানে যাত্রায় আগ্রহী খুব চকচকে ছোরা, বুলেটের ভয়ে; হায়, কেন যে তোমরা এলে এখানে সুন্দর?
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekhanei-baili-road/
3825
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রায়ঠাকুরানী অম্বিকা
ছড়া
রায়ঠাকুরানী অম্বিকা। দিনে দিনে তাঁর বাড়ে বাণীটার লম্বিকা। অবকাশ নেই তবুও তো কোনো গতিকে নিজে ব’কে যান, কহিতে না দেন পতিকে। নারীসমাজের তিনি তোরণের স্তম্ভিকা। সয় নাকো তাঁর দ্বিতীয় কাহারো দম্ভিকা।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/raithakurani-ombika/
4009
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্মৃতি
সনেট
ওই দেহ-পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে যেন কত শত পূর্ব-জনমের স্মৃতি । সহস্র হারানো সুখ আছে ও নয়নে, জন্মজন্মান্তের যেন বসন্তের গীতি । যেন গো আমারি তুমি আত্মবিস্মরণ, অনন্ত কালের মোর সুখ দুঃখ শোক, কত নব জগতের কুসুমকানন, কত নব আকাশের চাঁদের আলোক । কত দিবসের তুমি বিরহের ব্যথা, কত রজনীর তুমি প্রণয়ের লাজ -- সেই হাসি সেই অশ্রু সেই-সব কথা মধুর মুরতি ধরি দেখা দিল আজ । তোমার মুখেতে চেয়ে তাই নিশিদিন জীবন সুদূরে যেন হতেছে বিলীন ।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/smriti/
3239
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুয়ারে তোমার ভিড় ক’রে যারা আছে
রূপক
দুয়ারে তোমার ভিড় ক’রে যারা আছে, ভিক্ষা তাদের চুকাইয়া দাও আগে। মোর নিবেদন নিভৃতে তোমার কাছে– সেবক তোমার অধিক কিছু না মাগে। ভাঙিয়া এসেছি ভিক্ষাপাত্র, শুধু বীণাখানি রেখেছি মাত্র, বসি এক ধারে পথের কিনারে বাজাই সে বীণা দিবসরাত্র।দেখো কতজন মাগিছে রতনধূলি, কেহ আসিয়াছে যাচিতে নামের ঘটা– ভরি নিতে চাহে কেহ বিদ্যার ঝুলি, কেহ ফিরে যাবে লয়ে বাক্যের ছটা। আমি আনিয়াছি এ বীণাযন্ত্র, তব কাছে লব গানের মন্ত্র, তুমি নিজ-হাতে বাঁধো এ বীণায় তোমার একটি স্বর্ণতন্ত্র।নগরের হাটে করিব না বেচাকেনা, লোকালয়ে আমি লাগিব না কোনো কাজে। পাব না কিছুই,রাখিব না কারো দেনা, অলস জীবন যাপিব গ্রামের মাঝে। তরুতলে বসি মন্দ-মন্দ ঝংকার দিব কত কী ছন্দ, যত গান গাব তব বাঁধা তারে বাজিবে তোমার উদার মন্দ্র।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/duare-tomar-vir-kore-jara-ache/
2685
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আধা রাতে গলা ছেড়ে
ছড়া
আধা রাতে গলা ছেড়ে মেতেছিনু কাব্যে, ভাবিনি পাড়ার লোকে মনেতে কী ভাববে। ঠেলা দেয় জানলায়, শেষে দ্বার-ভাঙাভাঙি, ঘরে ঢুকে দলে দলে মহা চোখ-রাঙারাঙি– শ্রাব্য আমার ডোবে ওদেরই অশ্রাব্যে। আমি শুধু করেছিনু সামান্য ভনিতাই, সামলাতে পারল না অরসিক জনে তাই– কে জানিত অধৈর্য মোর পিঠে নাববে!   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/adha-rate-gola-chere/
5251
শামসুর রাহমান
সক্রেটিস ১
চিন্তামূলক
এ-কথা সবাই জানে গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস ব্যতিক্রমী মত প্রকাশের দায়ে নিজহাতে বিষ করেছেন পান কারাগারে। মৃত্যু উঠেছিলো নেচে যখন সে প্রাজ্ঞ ওষ্ঠে কালো মোরগের মতো, বেঁচে ছিলেন গৃহিনী তাঁর, ছিলো ছেঁড়াখোঁড়া সংসারের স্মৃতিচিত্র, হাট-বাজারের সংলাপ, তরুণদের নিয়ত সত্যাভিসারী দৃষ্টিপাত। তখন কি তাঁর পড়েছিলো মনে এইসব খুঁটিনাটি? নাকি জগত সংসারকুটোর মতোই ভেসে গিয়েছিলো তন্দ্রাচ্ছন্ন স্রোতে? অথচ সহজ ছিলো আত্মরক্ষা; যদি সত্য হ’তে ফিরিয়ে নিতেন মুখ, তাহলে নিঃশ্বাস নির্বাসনে যেতনা তখনই, আরো কিছুকাল নিকানো উঠোনে পড়তো পদচ্ছাপ। সবই অধিবাস্তবের প্রহেলিকা জেনেও নিলেন হেমলকী স্বাদ অকম্পিত শিখা।   (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sokretis-1/
1578
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ঘরবাড়ি ও অজস্র ঘটনা
প্রেমমূলক
দৌড়তে দৌড়তে দিন যায়, অতর্কিতে রাত্রি নেমে আসে, তারপরে সে যেতে চায় না আর। কবে যেন সকালবেলায় দেখেছিলি কার নয়নে ভাসে উন্মীলিত পদ্মের বাহার। সে কি গতকল্যের, না গত- জন্মের স্মৃতির একটি কণা? প্রশ্ন করে বিষন্ন সানাই। সামনে রাত্রি, পিছনে নিহত ঘরবাড়ি ও অজস্র ঘটনা, অর্থ তারই বুঝে নিতে চাই।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1555
3907
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সজনি সজনি রাধিকালো
ভক্তিমূলক
সজনি সজনি রাধিকালো দেখ অবহুঁ চাহিয়া, মৃদুল গমন শ্যাম আওয়ে মৃদুল গান গাহিয়া। পিনহ ঝটিত কুমুম হার, পিনহ নীল আঙিয়া। সুন্দরি সিন্দূর দেকে সীঁথি করছ রাঙিয়া। সহচরি সব নাচ নাচ মধুর গীত গাওরে, চঞ্চল মঞ্জীর রাব কুঞ্জ গগন ছাওরে।সজনি অব উজার মঁদির কনক দীপ জ্বালিয়া, সুরভি করছ কুঞ্জ ভবন গন্ধ সলিল ঢালিয়া । মল্লিকা চমেলি বেলি কুসুম তুলহ বালিকা, গাঁথ যূঁথি, গাঁথ জাতি, গাঁথ বকুল মালিকা । তৃষিত-নয়ন ভানুসিংহ কুঞ্জ-পথম চাছিয়া মৃদুল গমন শ্যাম আওয়ে, মৃদুল গান গাহিয়া।    (ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sojoni-sojoni-radhikalo/
3730
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুক্তপথে
প্রেমমূলক
বাঁকাও ভুরু দ্বারে আগল দিয়া, চক্ষু করো রাঙা, ঐ আসে মোর জাত-খোয়ানো প্রিয়া ভদ্র-নিয়ম-ভাঙা। আসন পাবার কাঙাল ও নয় তো আচার-মানা ঘরে- আমি ওকে বসাব হয়তো ময়লা কাঁথার 'পরে। সাবধানে রয় বাজার-দরের খোঁজে সাধু গাঁয়ের লোক. ধুলার বরন ধূসর বেশে ও যে এড়ায় তাদের চোখ। বেশের আদর করতে গিয়ে ওরা রূপের আদর ভোলে- আমার পাশে ও মোর মনোচোরা, একলা এসো চলে। হঠাৎ কখন এসেছ ঘর ফেলে তুমি পথিক বধূ, মাটির ভাঁড়ে কোথায় থেকে পেলে পদ্মাবনের মধু। ভালোবাসি ভাবের সহজ খেলা এসছ তাই শুনে- মাটির পাত্রে নাইকো আমার হেলা হাতের পরশগুণে। পায়ে নূপুর নাই রহিল বাঁধা, নাচেতে কাজ নাই, যে-চলনটি রক্তে তোমার সাধা মন ভোলাবে তাই। লজ্জা পেতে লাগে তোমার লাজ ভূষণ নেইকো বলে, নষ্ট হবে নেই তো এমন সাজ ধুলোর 'পরে চলে। গাঁয়ের কুকুর ফেরে তোমার পাশে, রাখালরা হয় জড়ো, বেদের মেয়ের মতন অনায়াসে টাট্টু ঘোড়ায় চড়ো। ভিজে শাড়ি হাঁটুর 'পরে তুলে পার হয়ে যাও নদী, বামুনপাড়ার রাস্তা যে যাই ভুলে তোমায় দেখি যদি। হাটের দিনে শাক তুলে নাও ক্ষেতে চুপড়ি নিয়ে কাঁধে, মটর কলাই খাওয়াও আঁচল পেতে পথের গাধাটাকে। মান নাকো বাদল দিনের মানা, কাদায়-মাখা পায়ে মাথায় তুলে কচুর পাতাখানা যাও চলে দূর গাঁয়ে। পাই তোমারে যেমন খুশি তাই যেতায় খুশি সেথা। আয়োজনের বালাই কিছু নাই জানবে বলো কে তা। সতর্কতার দায় গুচায়ে দিয়ে পাড়ার অনাদরে এসো ও মোর জাত খোয়ানো প্রিয়ে, মু্ক্ত পথের 'পরে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mukta-protha/
3669
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভূমিকম্প
চিন্তামূলক
হায় ধরিত্রী, তোমার আঁধার পাতালদেশে অন্ধ রিপু লুকিয়েছিল ছদ্মবেশে-- সোনার পুঞ্জ যেথায় রাখ, আঁচলতলে যেথায় ঢাক কঠিন লৌহ, মৃত্যুদূতের চরণধূলির পিণ্ড তারা, খেলা জোগায় যমালয়ের ডাণ্ডাগুলির। উপর তলায় হাওয়ার দোলায় নবীন ধানে ধানশ্রীসুর মূর্ছনা দেয় সবুজ গানে। দুঃখে সুখে স্নেহে প্রেমে স্বর্গ আসে মর্তে নেমে, ঋতুর ডালি ফুল-ফসলের অর্ঘ্য বিলায়, ওড়না রাঙে ধূপছায়াতে প্রাণনটিনীর নৃত্যলীলায়। অন্তরে তোর গুপ্ত যে পাপ রাখলি চেপে তার ঢাকা আজ স্তরে স্তরে উঠল কেঁপে। যে বিশ্বাসের আবাসখানি ধ্রুব ব'লেই সবাই জানি এক নিমেষে মিশিয়ে দিলি ধূলির সাথে, প্রাণের দারুণ অবমানন ঘটিয়ে দিলি জড়ের হাতে। বিপুল প্রতাপ থাক্‌-না যতই বাহির দিকে কেবল সেটা স্পর্ধাবলে রয় না টিঁকে। দুর্বলতা কুটিল হেসে ফাটল ধরায় তলায় এসে-- হঠাৎ কখন দিগ্‌ব্যাপিনী কীর্তি যত দর্পহারীর অট্টহাস্যে যায় মিলিয়ে স্বপ্নমতো। হে ধরণী, এই ইতিহাস সহস্রবার যুগে যুগে উদঘাটিলে সামনে সবার। জাগল দম্ভ বিরাট রূপে, মজ্জায় তার চুপে চুপে লাগল রিপুর অলক্ষ্য বিষ সর্বনাশা-- রূপক নাট্যে ব্যাখ্যা তারি দিয়েছ আজ ভীষণ ভাষায়। যে যথার্থ শক্তি সে তো শান্তিময়ী, সৌম্য তাহার কল্যাণরূপ বিশ্বজয়ী। অশক্তি তার আসন পেতে ছিল তোমার অন্তরেতে-- সেই তো ভীষণ, নিষ্ঠুর তার বীভৎসতা, নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠাহীন তাই সে এমন হিংসারতা।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bumekhapu/
5807
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নীরা তোমার কাছে
প্রেমমূলক
সিঁড়ির মুখে কারা অমন শান্তভাবে কথা বললো? বেরিয়ে গেল দরজা ভেজিয়ে, তবু তুমি দাঁড়িয়ে রইলে সিঁড়িতে রেলিং-এ দুই হাত ও থুত্‌নি, তোমায় দেখে বলবে না কেউ থির বিজুরি তোমার রঙ একটু ময়লা, পদ্মপাতার থেকে যেন একটু চুরি, দাঁড়িয়ে রইলে নীরা, তোমায় দেখে হঠাৎ নীরার কথা মনে পড়লো। নীরা, তোমায় দেখি আমি সারা বছর মাত্র দু’দিন দোল ও সরস্বতী পূজোয়–দুটোই খুব রঙের মধ্যে রঙের মধ্যে ফুলের মধ্যে সারা বছর মাত্র দু’দিন– ও দুটো দিন তুমি আলাদা, ও দুটো দিন তুমি যেন অন্য নীরা বাকি তিনশো তেষট্টি বার তোমায় ঘিরে থাকে অন্য প্রহরীরা। তুমি আমার মুখ দেখোনি একলা ঘরে, আমি আমার দস্যুতা তোমার কাছে লুকিয়ে আছি, আমরা কেউ বুকের কাছে কখনো কথা বলিনি পরস্পর, চোখের গন্ধে করিনি চোখ প্রদক্ষিণ– আমি আমার দস্যুতা তোমার কাছে লুকিয়ে আছি, নীরা তোমায় দেখা আমার মাত্র দু’দিন। নীরা, তোমায় দেখে হঠাৎ নীরার কথা মনে পড়লো। আমি তোমায় লোভ করিনি, আমি তোমায় টান মারিনি সুতোয় আমি তোমার মন্দিরের মতো শরীরে ঢুকিনি ছল ছুতোয় রক্তমাখা হাতে তোমায় অবলীলায় নাশ করিনি; দোল ও সরস্বতী পূজোয় তোমার সঙ্গে দেখা আমার–সিঁড়ির কাছে আজকে এমন দাঁড়িয়ে রইলে নীরা, তোমার কাছে আমি নীরার জন্য রয়ে গেলাম চিরঋণী।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1893
1827
পূর্ণেন্দু পত্রী
তোমার মধ্যে
প্রেমমূলক
তোমার মধ্যে নিষ্ঠুরতা ছিল এনভেলাপে ভূল ঠিকানা তাই তোমার মধ্যে ভালোবাসাও ছিল তারই আগুন জ্বালাচ্ছে দেশলাই। তোমর মধ্যে ভালোবাসাও ছিল লাল হয়েছে ছুরির নীল ধার তোমার মধ্যে নিষ্ঠুরতাও ছিল উপড়ে দিলে টেলিফোনের তার।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1280
1344
তসলিমা নাসরিন
নিঃস্ব
প্রেমমূলক
শরীর তোকে শর্তহীন দিয়েই দিলাম, যা ইচ্ছে তাই কর, মাচায় তুলে রাখ বা মশলা মেখে খা কী যায় আসে আমার তাতে, কিছু কি আর আমার আছে! সেদিন থেকে আমার কিছু আমার নেই, যেদিন থেকে মন পেলি তুই, সবই তোকে দিয়ে থুয়ে নিঃস্ব হয়ে মরে আছি। আমি তোর হাতের মুঠোয়, আমি তোর মনের ধুলোয়, গায়ে পায়ে শক্তি ছিল, নেই। সবই তোর, তুই ঋদ্ধ ভগবান। শরীরটাকে কষ্ট দিলে আমার কেন কষ্ট হবে! এ তো এখন তোরই শরীর। মনটা যদি নষ্ট করিস, ছিঁড়ে ফিরে কুকুর খাওয়াস, ক্ষতি আমার একটুও নেই, ও মন আমি ফেরত নিয়ে কোথায় যাবো! ও মন ধুয়ে জল খাবো কি! ও মন কি আর আমাকে চেনে! আমাকে বাসো ভালো! বাসে এক তোকেই, তোকেই জাদুকর।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1992
6054
হেলাল হাফিজ
ব্যবধান
মানবতাবাদী
অতো বেশ নিকটে এসো না, তুমি পুড়ে যাবে, কিছুটা আড়াল কিছু ব্যবধান থাকা খুব ভালো। বিদ্যুত সুপারিবাহী দু’টি তার বিজ্ঞানসম্মত ভাবে যতোটুকু দূরে থাকে তুমি ঠিক ততোখানি নিরাপদ কাছাকাছি থেকো, সমূহ বিপদ হবে এর বেশী নিকটে এসো না। মানুষ গিয়েছে ভূলে কী কী তার মৌল উপাদান। তাদের ভেতরে আজ বৃক্ষের মতন সেই সহনশীলতা নেই, ধ্রুপদী স্নিগ্ধতা নেই, নদীর মৌনতা নিয়ে মুগ্ধ মানুষ কল্যাণের দিকে আর প্রবাহিত হয় না এখন। আজকাল অধঃপতনের দিকে সুপারসনিক গতি মানুষের সঙ্গত সীমানা ছেড়ে অদ্ভুত নগরে যেন হিজরতের প্রতিযোগিতা। তবু তুমি কাছে যেতে চাও? কার কাছে যাবে? পশু-পাখিদের কিছু নিতে তুমুল উল্লাসে যেন বসবাস করে আজ কুলীন মানুষ। ১০.২.৮২
https://banglarkobita.com/poem/famous/125
4670
শামসুর রাহমান
গদ্য সনেট_ ৫
প্রেমমূলক
অন্তত তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবো আজ, এমন প্রত্যাশার দোয়েল শিস দিয়েছিল বারবার ভাবনার উঠোনে। এইমাত্র ঘড়িতে রাত এগারোটা পঁয়ত্রিশ মিনিটের সঙ্কেত; পাশের শিশুপল্লী ঘুমোচ্ছে, গলি নিঝুম, রাত্রি কালো কফিনের ভিতর শুয়ে আছে, কুয়াশা নামছে তার চোখে। দূরের নক্ষত্রেরা তাকিয়ে রয়েছে কফিনের দিকে, অথচ তোমার টেলিফোন সরোদের তানের ধরনে বেজে ওঠে নি। তুমি কি আসো নি এখনো?আমি আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবো দুর্ভিক্ষকবলিত বিশুষ্ক, করুণ মানুষের মতো ত্রাণসামগ্রীর আশায়? আমার ওপর ছুটে যাচ্ছে নাদির শাহের কেশর দোলানো অশ্বপাল, তৈমুরের নাঙা তলোয়ার আমাকে ক্রমাগত রক্তাক্ত করছে এবং মেরুপ্রদেশের ক্ষুধার্ত নেকড়ের দল আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, আমি আর কত সইব এই স্বৈরাচার?   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/godyo-sonet-5/
5006
শামসুর রাহমান
বাঁশিঅলা
চিন্তামূলক
বলা যেতে পারে- সে-তো আজ নয়, বহুকাল আগে, যখন আমার দেহ মনে কৈশোর নিভৃতে খেলছিল অপরূপ খেলা ভোরবেলা, রৌদ্রময় দ্বিপ্রহর, মেঘঢাকা গাঢ় সন্ধ্যায় আর গভীর রহস্যময় রাতে ছিলাম নিমগ্ন আর কে এক রহস্যময়ী সঙ্গিনী ছিলেন উদ্যানের মায়াপথেসে-রাতে, এখনও মনে পড়ে- দিগন্তের দিকে হেঁটে যেতে যেতে কানে ভেসে এসেছিল কোন্‌ এক বংশীবাদকের মন-জয়-করা সুর! কান পেতে শুনি আমি খুঁজি তাকে দিগ্ধিদিক। শুধু সুর আসে ভেসে, বাদকের দেখা পাইনে কিছুতে।এ কেমন বাঁশি যার সুর ভাসে, অথচ বাদক অদৃশ্য সর্বদা? তার দেখা পাওয়ার আশায় ঘুরি প্রহরে প্রহরে, শুধু তার সুর ভেসে আসে, ছুঁয়ে যায় এই নিবেদিত-প্রাণ আমাকে তবুও অপরূপ শিল্পী তার সবটুকুউ রূপ থেকে দান ক’রে ঝলসিত হতে নন রাজী।তবে কি আমার ঝুলি অপূর্ণই রবে সর্বকাল? যদি আমি মাথা কুটে মরি বাঁশি, তবু তুমি দেবে না কি ঢেলে তোমার সকল সুরের অক্ষয় ডালি আমার কম্পিত অঞ্জলিতে?  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bashiola/
441
কাজী নজরুল ইসলাম
ভীরু
প্রেমমূলক
আমি জানি তুমি কেন চাহ না ক' ফিরে। গৃহকোন ছাড়ি আসিয়াছ আজ দেবতার মন্দিরে। পুতুল লইয়া কাটিয়াছে বেলা আপনারে ল'য়ে শুধু হেলা-ফেলা, জানিতে না, আছে হৃদয়ের খেলা আকুল নয়ন-নীরে, এত বড় দায় নয়নে নয়নে নিমেষের চাওয়া কি রে? আমি জানি তুমি কেন চাহ না ক' ফিরে।।আমি জানি তুমি কেন চাহ না ক' ফিরে। জানিতে না আঁখি আঁখিতে হারায় ডুবে যায় বাণী ধীরে! তুমি ছাড়া আর ছিল না ক' কেহ ছিল না বাহির ছিল শুধু গেহ, কাজল ছিল গো জল ছিল না ও উজল আঁখির তীরে। সে-দিনও চলিতে ছলনা বাজেনি ও চরণ-মঞ্জীরে! আমি জানি তুমি কেন চাহ না ক' ফিরে।।আমি জানি তুমি কেন কহ না ক' কথা! সে দিনও তোমার বনপথে যেতে পায়ে জরাত না লতা! সে-দিনও বেভুল তুলিয়াছ ফুল ফুল বিঁধিতে গো বিঁধেনি আঙুল, মালার সাথে যে হৃদয়ও শুকায় জানিতে না সে বারতা, জানিতে না, কাঁদে মুখর মুখের আড়ালে নিসঙ্গতা। আমি জানি তুমি কেন কহ না ক' কথা।।আমি জানি তব কপটতা, চতুরালি! তুমি জানিতে না, ও কপোলে থাকে ডালিম-দানার লালী। জানিতে না ভীরু রমণীর মন মধুকর-ভারে লতার মতন কেঁপে মরে কথা কন্ঠ জড়ায়ে নিষেধ করে গো খালি, আঁখি যত চায় তত লজ্জায় লজ্জা পাড়ে গো গালি! আমি জানি তব কপটতা, চুরতালি!আমি জানি, ভিরু! কিসের এ বিস্ময়। জানিতে না কভু নিজেরে হেরিয়া নিজেরি করে যে ভয়! পুরুষ পুরুষ- শুনেছিলাম নাম, দেখেছ পাথর করনি প্রণাম, প্রণাম করেছ লুব্ধ দ'কর চেয়েছে চরণ-ছোঁয়া। জানিতে না, হিয়া পাথর পরশি' পরশ-পাথরও হয়! আমি জানি, ভীরু, কিসের এ বিস্ময়।।কিসের তোমার শঙ্কা এ, আমি জানি। পরানের ক্ষুধা দেশের দ'-তীরে করিতেছে কানাকানি! বিকচ বুকের বকুল-গন্ধ পাপড়ি রাখিতে পারে না বন্ধ, যত আপনারে লুকাইতে চাও তত হয় জানাজানি, অপাঙ্গে আজ ভিড় ক'রেছে গো লুকানো যতেক বাণী। কিসের তোমার শঙ্কা, এ আমি জানি।।আমি জানি, কেন বলিতে পার না খুলি'। গোপনে তোমায় আবেদন তার জানায়েছে বুলবুলি। যে-কথা শুনিতে মনে ছিল সাধ, কেমনে সে পেল তারি সংবাদ? সেই কথা বঁধু তেমনি করিয়া বলিল নয়ন তুলি' কে জানিত এত যাদু-মাখা তার ও কঠিন অঙুলি। আমি জানি কেন বলিতে পার না খুলি'।আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা, ব্যথার পরশে হয়েছে তোমার সকল অঙ্গ সোনা! মাটির দেবীরে পরায় ভূষণ সোনার সোনায় কিবা প্র্যোজন? দেহ-কূল ছাড়ি' নেমেছে মনের অকূল নিরঞ্জনা। বেদনা আজিকে রূপেরে তোমার করিতেছে বন্দনা। আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা।।আমি জানি, ওরা বুঝিতে পারে না তোরে। নিশীথে ঘুমালে কুমারী বালিকা, বদূ জাগিয়াছে ভোরে! ওরা সাঁতারিয়া ফিরিতেছে ফেনা শুক্তি যে ডোবে- বুঝিতে পারে না! মুক্তা ফলেছে- আঁখির ঝিনুক ডুবেছে আঁখির লোরে। বোঝা কত ভার হ'লে- হৃদয়ের ভরাডুবি হয়, ওরে, অভাগিনী নারী, বুঝাবি কেমন ক'রে।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/viiru/
6011
হেলাল হাফিজ
অচল প্রেমের পদ্য- ০১-১৩
প্রেমমূলক
০১- “অচল প্রেমের পদ্য” আছি। বড্ড জানান দিতে ইচ্ছে করে, – আছি, মনে ও মগজে গুন্‌ গুন্‌ করে প্রণয়ের মৌমাছি। ০২- “অচল প্রেমের পদ্য” কোনদিন, আচমকা একদিন ভালোবাসা এসে যদি হুট করে বলে বসে,- ‘চলো যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাই’, যাবে? ০৩- “অচল প্রেমের পদ্য” তোমার জন্য সকাল, দুপুর তোমার জন্য সন্ধ্যা তোমার জন্য সকল গোলাপ এবং রজনীগন্ধা। ০৪- “অচল প্রেমের পদ্য” ভালোবেসেই নাম দিয়েছি ‘তনা’ মন না দিলে ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা। ০৫- “অচল প্রেমের পদ্য” তোমার হাতে দিয়েছিলাম অথৈ সম্ভাবনা তুমি কি আর অসাধারণ? তোমার যে যন্ত্রনা খুব মামুলী, বেশ করেছো চতুর সুদর্শনা আমার সাথে চুকিয়ে ফেলে চিকন বিড়ম্বনা। ০৬- “অচল প্রেমের পদ্য” যদি যেতে চাও, যাও আমি পথ হবো চরণের তলে না ছুঁয়ে তোমাকে ছোঁব ফেরাবো না, পোড়াবোই হিমেল অনলে। ০৭- “অচল প্রেমের পদ্য” আমাকে ঠোকর  মেরে দিব্যি যাচ্ছো চলে, দেখি দেখি বাঁ পায়ের চারু নখে চোট লাগেনি তো; ইস্‌! করছো কি? বসো না লক্ষ্মীটি, ক্ষমার রুমালে মুছে সজীব ক্ষতেই এন্টিসেপটিক দুটো চুমু দিয়ে দিই। ০৮- “অচল প্রেমের পদ্য” তুমি কি জুলেখা, শিরী, সাবিত্রী, নাকি রজকিনী? চিনি, খুব জানি তুমি যার তার, যে কেউ তোমার, তোমাকে নাই বা দিলাম ভালোবাসার পূর্ণ অধিকার ০৯- “অচল প্রেমের পদ্য” আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে মানুষের কাছে এওতো আমার এক ধরনের ঋণ। এমনই কপাল আমার অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ১০- “অচল প্রেমের পদ্য” হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি নয় তো গিয়েছি হেরে থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা কে কাকে গেলাম ছেড়ে। ১১- “অচল প্রেমের পদ্য” যুক্তি যখন আবেগের কাছে অকাতরে পর্যুদস্ত হতে থাকে, কবি কিংবা যে কোনো আধুনিক মানুষের কাছে সেইটা বোধ করি সবচেয়ে বেশি সংকোচ আর সঙ্কটের সময়।হয় তো এখন আমি তেমনি এক নিয়ন্ত্রনহীন নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি, নইলে এতদিন তোমাকে একটি চিঠিও লিখতে না পারার কষ্ট কি আমারই কম!মনে হয় মরণের পাখা গজিয়েছে। ১২- “অচল প্রেমের পদ্য” নখের নিচে রেখেছিলাম তোমার জন্য প্রেম, কাটতে কাটতে সব খোয়ালাম বললে না তো, - ‘শ্যাম, এই তো আমি তোমার ভূমি ভালোবাসার খালা, আঙুল ধরো লাঙ্গল চষো পরাও প্রণয় মালা’। ১৩- “অচল প্রেমের পদ্য” তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছ !
https://www.bangla-kobita.com/helalhafiz/ocol-premer-podya/
1101
জীবনানন্দ দাশ
পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে
চিন্তামূলক
পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে ঘুরে গেলে দিন আলোকিত হয়ে ওঠে—রাত্রি অন্ধকার হয়ে আসে; সর্বদাই, পৃথিবীর আহ্নিক গতির একান্ত নিয়ম, এই সব; কোথাও লঙ্ঘন নেই তিলের মতন আজো; অথবা তা হতে হলে আমাদের জ্ঞাতকুলশীল মানবীয় সময়কে রূপান্তরিত হয়ে যেতে হয় কোনো দ্বিতীয় সময়ে; সে-সময় আমাদের জন্যে নয় আজ। রাতের পর দিন—দিনের পরের রাত নিয়ে সুশৃঙ্খল পৃথিবীকে বলয়িত মরুভূমি ব’লে মনে হতে পারে তবু; শহরে নদীতে মেঘে মানুষের মনে মানবের ইতিহাসে সে অনেক সে অনেক কাল শেষ ক’রে অনুভব করা যেতে পারে কোনো কাল শেষ হয় নি কো তবু;—শিশুরা অনপনেয় ভাবে কেবলি যুবক হলো,—যুবকেরা স্থবির হয়েছে, সকলেরি মৃত্যু হবে,—মরণ হতেছে।অগণন অংকে মানুষের নাম ভোরের বাতাসে উচ্চারিত হয়েছিল শুনে নিয়ে সন্ধ্যার নদীর জলের মুহূর্তে সেই সকল মানুষ লুপ্ত হয়ে গেছে জেনে নিতে হয়; কলের নিয়মে কাজ সাঙ্গ হয়ে যায়; কঠিন নিয়মে নিরঙ্কুশভাবে ভিড়ে মানবের কাজ অসমাপ্ত হয়ে থাকে—কোথাও হৃদয় নেই তবু। কোথাও হৃদয় নেই মনে হয়, হৃদয়যন্ত্রের ভয়াবহভাবে সুস্থ সুন্দরের চেয়ে এক তিল অবান্তর আনন্দের অশোভনতায়। ইতিহাসে মাঝে-মাঝে এ-রকম শীত অসারতা নেমে আসে;—চারিদিকে জীবনের শুভ্র অর্থ র’য়ে গেছে তবু, রৌদ্রের ফলনে সোনা নারী শস্য মানুষের হৃদয়ের কাছে, বন্ধ্যা ব’লে প্রমাণিত হয়ে তার লোকোত্তর মাথার নিকটে স্বর্গের সিঁড়ির মতো;—হুন্ডি হাতে অগ্রসর হয়ে যেতে হয়। আমাদের এ-শতাব্দী আজ পৃথিবীর সাথে নক্ষত্রলোকের এই অবিরল সিঁড়ির পসরা খুলে আত্মক্রীড় হলো;—মাঘসংক্রান্তির রাত্রি আজ এমন নিষ্প্রভ হয়ে সময়ের বুনোনিতে অন্ধকার কাঁটার মতন কাকে বোনে? কেন বোনে? কোন হিকে কোথায় চলেছে? এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ে,—ঝাউ শিশু জারুলে হাওয়ার শব্দ থেমে আরো থেমে-থেমে গেলে—আমাদের পৃথিবীর আহ্নিক গতির অন্ধ কন্ঠ শোনা যায়;—শোনো, এক নারীর মতন, জীবন ঘুমায় গেছে; তবু তার আঁকাবাকা অস্পষ্ট শরীর নিশির ডাকের শব্দ শুনে বেবিলনে পথে নেমে উজ্জয়িনী গ্রীসে রেনেসাঁসে রুশে আধো জেগে, তবু, হৃদয়ে বিকিয়ে গিয়ে ঘুমায়েছে আর একবার নির্জন হ্রদের পারে জেনিভার পপলারের ভিড়ে অন্ধ সুবাতাস পেয়ে;—গভীর গভীরতর রাত্রির বাতাসে লোকার্নো হ্বের্সাই মিউনিখ অতলন্তের চার্টারে ইউ-এন-ওয়ের ভিড়ে আশা দীপ্তি ক্লান্তি বাধা ব্যাসকূট বিষ- আরো ঘুম—র’য়ে গেছে হৃদয়ের—জীবনের;—নারী, শরীরের জন্যে আরো আশ্চর্য বেদনা বিমূঢ়তা লাঞ্ছনার অবতার র’য়ে গেছে; রাত এখনো রাতের স্রোতে মিশে থেকে সময়ের হাতে দীর্ঘতম রাত্রির মতন কেঁপে মাঝে-মাঝে বুদ্ধ সোক্রাতেস্‌ কনফুচ লেনিন গ্যেটে হ্যোল্ডেরলিন রবীন্দ্রের রোলে আলোকিত হতে চায়;—বেলজেনের সব-চেয়ে বেশি অন্ধকার নিচে আরো নিচে টেনে নিয়ে যেতে চায় তাকে; পৃথিবীর সমুদ্রের নীলিমায় দীপ্ত হয়ে ওঠে তবু ফেনের ঝর্ণা,—রৌদ্রে প্রদীপ্ত হয়,—মানুষের মন সহসা আকাশে বনহংসী-পাখি বর্ণালি কি রকম সাহসিকয়া চেয়ে দেখে,-সূর্যের কিরণে নিমেষেই বিকীরিত হয়ে ওঠে;—অমর ব্যথায় অসীম নিরুৎসাহে অন্তহীন অবক্ষয়ে সংগ্রামে আশায় মানবের ইতিহাস-পটভূমি অনিকেত না কি? তবু, অগণন অর্ধসত্যের উপরে সত্যের মতো প্রতিভাব হয়ে নব নবীন ব্যাপ্তির সর্গে সঞ্চারিত হয়ে মানুষ সবার জন্যে শুভ্রতার দিকে অগ্রসর হয়ে চায়—অগ্রসর হয়ে যেতে পারে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/prithibii-shurjokey-ghirey/
2638
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আঁখি পানে যবে আঁখি তুলি
প্রেমমূলক
আঁখি পানে যবে আঁখি তুলি দুখ জ্বালা সব যাই ভুলি। অধরে অধরে পরশিয়া প্রাণমন উঠে হরষিয়া। মাথা রাখি যবে ওই বুকে ডুবে যাই আমি মহা সুখে। যবে বল তুমি, “ভালবাসি’, শুনে শুধু আঁখিজলে ভাসি।Heinrich Hein (অনুবাদ কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akhi-pane-jobe-akhi-tuli/
5274
শামসুর রাহমান
সাক্ষাৎকার, মধ্যরাতে
মানবতাবাদী
উনিশশো ছিয়াশির মার্চ মাসে রাত বারোটায় কী উদ্বেল কে যে কড়া নেড়ে ভাঙাল আমার ঘুম, যদিও সুইচ টিপে বেল বাজালেই হতো; প্রায় তেড়ে এসে দেখি সুপ্রাচীন ধরাচূড়া নিয়ে একজন আছেন দাঁড়িয়ে একা, আমার ফ্ল্যাটের দরজায়। আমি তাঁকে ‘ভেতর আসুন’ বলে সোফায় আসন গ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানালাম। পথের কুকুর ডাকে নির্জন রাস্তাকে চমকিয়ে। ‘ঘোর কলি মহাশয়, ছিনতাই হয়ে গেছে সর্বস্ব আমার’ বলে রাতের অতিথি আড়চোখে আমার দৃশ্যমান যা বিষয়-আশয় নিলেন নিপুণ দেখে। ভীতি জাগে মনে, তিনি কি আমাকে শেষে তুখোড় তস্কর ঠাউরে এলেন ফ্ল্যাটে? রত্নহার নাকি গজমোতি হারালেন, অনুগ্রহ করে বলুন তো মান্যবর? ‘ওসব কিছুই নয়, সম্ভ্রমের সবুজিমা’, বলেন বিমূঢ় বিদ্যাপতি।   (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sakhkhatkar-modhyorate/
650
জয় গোস্বামী
কূর্ম চলেছেন
রূপক
কূর্ম চলেছেন। তাঁর পিঠ থেকে হঠাৎ পৃথিবী গড়িয়ে পড়ে যায় শূন্যে সে-গোলক ধরতে, ঘুম ভেঙে, শশক লাফায় আকাশ ঝকঝক করে ওঠে শ্বেতশুভ্র একটি উল্কায়
https://banglarkobita.com/poem/famous/1731
1547
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
আশ্বিনদিবসে
চিন্তামূলক
আশ্বিন বলতেই চোখে ভেসে ওঠে রোদ্দুরের ছবি, চক্রাকারে চিল মাথার উপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যায় মেঘের জানলার দিকে। আশ্বিন বলতেই আলোর-তরঙ্গে-ধোয়া দৃশ্যাবলি চোখের সমুখে দেখতে পাই। দেখি নদী, দেখি নৌকা, গেরুয়া বাদাম স্রোতের দুরন্ত টানে ঘুরে যায়। এমন আশ্বিন ছিল একদা, এখন বাহির-পৃথিবী থেকে তাড়া খেয়ে ভিতরে ঢুকেছে। বাহিরে আঁধার। লোভী, জেদি, কবন্ধ রজনী তার সীমানা বাড়িয়ে চলে আশ্বিন-দিনেও। আমি নিরুপায় তার মধ্যে বসে থাকি, আমি ঠিকই টের পাই বুকের ভিতর দৃশ্যাবলি পুড়ে যায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1604
3232
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুই উপমা
নীতিমূলক
যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে; যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড় পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার। সর্বজন সর্বক্ষণ চলে যেই পথে তৃণগুল্ম সেথা নাহি জন্মে কোনোমতে; যে জাতি চলে না কভু তারি পথ-’পরে তন্ত্র-মন্ত্র-সংহিতায় চরণ না সরে।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dui-upoma/
4537
শামসুর রাহমান
কথার জেরুজালেম
মানবতাবাদী
এখন বলার কিছু নেই আর তাই থাকি আপাতত চুপচাপ, প্রায় বোবা, বলা যায়। তুমিও আগের মতো কথা পুষ্পসারে দাওনা ভরিয়ে ক্ষণে ক্ষণে আমার প্রহর আজ। যদিও কখক নই নিপুণ, তুখোড়, তবু ছিলো দীর্ঘস্থায়ী কথোপকথন আমাদের; ছিলো, মনে পড়ে, প্রহরে প্রহরে।এখন আমার চোখ কথা বলে, প্রতিটি আঙুলে সযত্বে সাজায় শূন্যে কথামালা, আমার বুকের রোমারাজি কথা হয়ে ফোটে থরে থরে পাঁজরে পাঁজরে সর্বক্ষণ কথার পিদিম জ্বলে, হৃদয়ের গাঢ় অন্ধকার অন্য মানে পায়, তাই সহজে খুলি না মুখ আর।এখনো বাসিন্দা আমি স্বপ্নময় জেরুজালেমের। সেখানে নিঃশব্দে পথ চলি, কত যে গলির মোড় ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকে, দীঘল চুলের ছায়া নামে মুখের ওপর জোয়্যরি জ্যোৎস্নায়। রাস্তায় কি ঘরে কেউ বলে না কখনো কথা, শুধু সুরে সুরে জেগে থাকে আদিগন্ত বাখের উৎসব। স্বপ্ন-নগরীতে, বলো, কথার কি দরকার? বরং যুগ যুগ চেয়ে থাকা যায় কারো চোখে চোখ রেখে কথার চেয়েও খুব গভীর ভাষায়, হৃদয় জেরুজালেম জেনে হাঁটা যায় নানান শতকে, কারো হাত ধ’রে স্বপ্নময় জেরুজালেমের পথে। শত ভুল শুধরে নেয়া যায় একটি চুম্বনে, মে চুম্বনে পড়বে ছায়া দীর্ঘ মিনারের জলপাই পল্লবের।এখন তো মেঘমালা, গাছের সতেজ পাতা, বৈশাখী রোন্দুর, শ্রাবণের বৃষ্টিধারা, পাখির অমর্ত্য গান আমাদের হয়ে প্রহরে প্রহরে আমাদের দুজনের হয়ে করবে রচনা নয়া কথার জেরুজালেম। কে বলেছে? একজন কেউ, আছে যার খুব স্বপ্নবিলাসী উদাত্ত পাখা।   (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kothar-jerujalem/
4605
শামসুর রাহমান
কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ
রূপক
কখনও সখনও যে চা-খানায় চা খেতে যাই কিংবা কিছু সময় কাটাতে, সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বলা-কওয়া নেই লোকটা গ্যাঁট হয়ে বসল আমার মুখোমুখি। কোনও কোনও মানুষ আছে যাদের দেখলেই মনে পড়ে পাখির কথা। লোকটা সে ধরনের একজন মানুষ। কেন জানি না, তাকে মনে হলো একটা দাঁড়কাকের মতো, যদিও এই বিশেষ প্রাণীটির সঙ্গে তার কোনও মিল আমি খুঁজে বের করতে পারিনি। পক্ষান্তরে লক্ষ করলাম, ওর ভুরুতে বনস্থলির শ্যামলিমা, হাতের নোংরা নোখ থেকে বেরিয়ে এসেছে গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর লালিমা, ঠোঁটে সমুদ্রতটের নুন, চোখে কবরের ভেতরকার রহস্য। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়ছিল, সে এসেছে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে। আমার চায়ের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে লোকটা তাকাল রাস্তার দিকে, তারপর বলতে শুরু করল একটি কাহিনী; আমি শুনতে চাই কিনা সে-কথা জানতেও চাইল না। কথার বড়শি দিয়ে সে গেঁথে ফেললো আমাকে। কার সাধ্য সেই বড়শি থেকে ছাড়া পায়? তার কথা বলার ধরন থেকে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে উঠল আমার কাছে যে, সে এক প্রাচীন ভ্রমণকারী। নানা ঘাটের পানি খেয়েছে লোকটা। ওর গলায় বহু অতিজ্ঞতার মিশ্র স্বর, এক চিত্ত-আলোড়নকারী ঐকতান। আমার ওপর দিয়ে বয়ে গেল ঢেউয়ের পর ঢেউ। বিচিত্র মশলার ঘ্রাণে ভরে উঠল সেই চা-খানা, আমি অনুভব করলাম পাখির বুকের উত্তাপ, সুদূরতম দ্বীপের ওপর বয়ে যাওয়া হাওয়ার ঝলক, ঝরনার স্বচ্ছ জলের শীতলতা। সে তার কাহিনী শুরু করল এভাবে- এক ঝাঁক দাঁড়কাক এসে বসল উঁচু দেয়ালে, যেন পুঞ্জ পুঞ্জ হিংসা। ওদের পাখায় লেখা আছে একটা শব্দ, প্রতিশোধ। দাঁড়কাকগুলো দশদিক চমকে দিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল, আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল কুচকুচে কালো রঙ। দাঁড়াকাকদের গলা সেই রঙের উৎস। একে একে ওরা উড়ে গেল প্রাসাদটির প্রতি, ফিরে এল একটু পরে; ফের হানা দিল সবাই এক সঙ্গে। চঞ্চুর আঘাতে আঘাতে ওরা ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে চাইল ফটকটিকে। সেই প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে ওরা ভেতরকার রহস্য জেনে নিতে চায়, জেনে নিতে চায় এমন কী আছে প্রাসাদের ভেতরে যা রাখতে হবে সবার চোখের আড়ালে? মোদ্দা কথা, ওরা প্রাসাদটিকে দখল করতে চায়। কিন্তু আপাদমস্তক দামি ধাতুতে মোড়া প্রহরীদের বন্দুকের ধমকে ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল, কালো কালো ছেঁড়া পালকে ছেয়ে গেল চারদিক, দাঁড়াকাকগুলো রাশি রাশি মণ্ডের মতো পড়ে রইল। ফটক ছিদ্র করবার মতো শক্তিমান ছিল না ওদের চঞ্চু। আর ওরা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রহরীদের বর্মের ঝলসানিতে। প্রহরীরা বীরদর্পে দাঁড়কাকের শবের ওপর কুচকাওয়াজ করল কিছুক্ষণ; কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ। দাঁড়কাকদের পরাজয়ের পর দিন যায়, দিন যায়। সময়ের ঠোকরে চিড় ধরে না প্রাসাদের প্রাচীরে। খোলে না ফটক। খুললেও কারও প্রবেশাধিকার নেই সেখানে, শুধুমাত্র নির্বাচিতরাই যেতে পারে ভেতরে। যারা যায় তারা আর ফিরে আসে না। প্রাসাদের প্রাচীরে কিংবা গম্বুজে কাকপক্ষীও বসতে পারে না। দামি ধাতুতে মোড়া প্রহরীরা অষ্টপ্রহর প্রস্তুত। একটা পিঁপড়ে ওদের চোখ এড়িয়ে যাবে, এমন ফাঁকফোকর ওরা রাখেনি কোথাও। প্রাসাদ আছে প্রাসাদের হালে, কখনও কখনও ভেতর থেকে ভেসে আসে নানা বাদ্যরব, নর্তকীদের মঞ্জীর-ধ্বনি। ফটকের বাইরে সকাল সন্ধ্যা প্রহরীরা করে কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ। হঠাৎ একদল শিম্পাঞ্জী সেই প্রাসাদের ওপর চড়াও হলো একদিন। কিন্তু ওদের উৎপাত স্তব্ধ হয়ে গেল এক পশলা বুলেটে একটা আঁচড়ও লাগল না প্রাসাদের গায়ে। পরাভূত শিম্পাঞ্জীদের অনেকেই বেঘোরে প্রাণ হারাল, যারা বেঁচে রইল তাদের বেঁচে না থাকাই ছিল ভালো। কেউ হারাল হাত, কেউ পা, কেউ কেউ হাত-পা দুটোই। প্রহরীদের বর্মে সূর্যের আলোর ঠিকরে পড়ে, ঝলসিত হয় চতুর্দিক। শিম্পাঞ্জীদের শবের ওপর প্রহরীরা বীরদর্পে কুচকাওয়াজ করল কিছুক্ষণ, কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ। শিম্পাঞ্জীদের পরাজয়ের পর দিন যায়, দিন যায়। পূব দিকে সূর্য ওঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়। গাছে পাতা গজায়, পাতা ঝরে যায়। প্রাসাদ থাকে প্রাসাদের হালে; ঝকঝক করে সূর্যের আলোয়, অন্ধকারকে শাসন করে নিজস্ব আলোর ছটায়। শোনা যায় প্রাসাদের ভেতরে বারো মাস তেরো পার্বণ কাটে প্রায় একইভাবে, একই তালে লয়ে। মাঝে-মাঝে গুঞ্জন রটে বাইরে। গুজব গুজবই। তাই ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর লোকের সংখ্যা কম। প্রহরীরা টহল দিয়ে বেড়ায় প্রাসাদের চারদিকে। দিনভর, রাতভর। কোনও কিছু নড়তে চড়তে দেখলেই বলে, হল্ট। সহজে কেউ ঘেঁষে না ফটকের কাছে, দূর থেকে তাকায় আড় চোখে। লোকে বলে, কোনও কোনও মধ্যরাতে প্রাসাদের প্রাচীরগুলি ডুকরে ওঠে ট্রয় নগরীর রমণীদের বিলাপের মতো। শিম্পাঞ্জীদের পরাজয়ের বহু বছর পরে শত শত লোক ছুটে এল প্রাসাদের দিকে লাঠিসোটা আর দা-কুড়াল নিয়ে। মনে হলো জনবন্যায় দেশলাইয়ের বাক্সের মতো ভেসে যাবে প্রাসাদ। কিন্তু ঝাঁক ঝাঁক বুলেট আর কামানের গোলায় বন্যার গতি হলো রুদ্ধ, মৃত্যু এলোপাতাড়ি উপড়ে নিল বহু প্রাণশস্য। যারা এসেছিল প্রাসাদের প্রাচীর চুরমার করার জন্যে, ফটকটিকে কাগজের মতো দুমড়ে ফেলার জন্যে, ব্যর্থ হলো তারা। ওরা এসেছিল একটা সূর্যোদয়ের জন্যে, ফিরে গেল অস্তিত্বময় অমাবস্যা নিয়ে। তখন আমি জ্বলজ্বলে যুবক, সবেমাত্র কুড়ি পেরিয়েছি। আমার হাতের মুঠোয় স্বপ্নের চারাগাছ, চোখে সামুদ্রিক ঢেউয়ের ঝাপটা, আমার সত্তায় ভবিষ্যতের লাবণ্য। যাকগে, মানুষের সেই পরাজয় আমি প্রত্যক্ষ করেছি। এত লাশ আমি এর আগে দেখিনি। চোখে জ্বালা ধরে যায়। মৃতদেহ এত আগুন, কে জানত? চোখ পড়ে যায়। কেউ কেউ বাঁচল পালিয়ে, কিন্তু সেই বাঁচার চেয়ে মরাই ছিল ভালো। আসল পা ছেড়ে কাঠের পা নিয়ে কে বাঁচতে চায়? কে চায় হুইল চেয়ারে বসে ঝিমোতে? চোখের জ্যাতি হারিয়ে দিন যাপনের গ্লানি সইতে কে চায়? প্রিয় সঙ্গীর মুণ্ডুহীন ধড় দেখার পর কেউ সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে না। আপাদমস্তক দামি ধাতুতে মোড়া প্রহরীরা মানুষের লাশের ওপর কুচকাওয়াজ করল কিছুক্ষণ; কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ, কুচকাওয়াজ। সেই পরাস্ত লোকগুলোর মধ্যে ছিল একজন জিপসি। বেখাপ্পা তার জীবনযাত্রা, অদ্ভুত তার আচরণ। ওরা পালিয়ে এসে ডেরা বাঁধল বহুদূরে, নদী তীরে। লোকগুলো বসেছিল গোল হয়ে ফ্রেস্কোর মণ্ডলের মতো। কারও মাথায় ব্যাণ্ডেজ, কারও উড়ে-যাওয়া পায়ের অবশেষে ব্যাণ্ডজ, কারও চোখে ব্যাণ্ডেজ। জিপসিটা বলল, মনমরা হয়ে থেকো না তোমরা। যারা একদিন বীরের মতো প্রবেশ করবে সেই প্রাসাদে আপাদমস্তক দামি ধাতুতে মোড়া প্রহরীদের পরাস্ত করে তারা বাড়ছে গোকুলে। ওরা কারা? জানতে চাইল সবাই। জানি না; তবে ওরা আসবে, দূর দিগন্তের দিকে দৃষ্টি মেলে উত্তর দিল সেই জিপসি। কবে আসবে সেদিন? একটা গুঞ্জন উঠল আহত লোকগুলোর মধ্যে। সেই বিজয়ের দিন কবে আসবে? এই প্রশ্ন তীরের মতো ছুটে গেল জিপসির দিকে। জিপসির চোখে কী একটা ছায়া দুলে ওঠে যেন, আকাশে ঝুলে আছে যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া চোখের মতো চাঁদ। জিপসি স্বপ্নঝলসিত কণ্ঠ বলে, বিজয়ের নির্ধারিত কোনও তারিখ নেই। এটুকু বলে থামল আমার মুখোমুখি বসে-থাকা লোকটা। জিপসির সেই বাণী, বিজয়ের নির্ধারিত কোনও তারিখ নেই, গুঞ্জরিত হতে থাকল চা-খানায়, যেন শুনতে পেলাম আমি। হঠাৎ দাঁড়কাকের মতো লোকটা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, রওনা হলে রাস্তার দিকে। আমি তাকে ডাকলাম, কিন্তু সে ফিরে তাকাল না পর্যন্ত। যেন আমি কোনও ধর্তব্যের মধ্যেই নেই। লোকটার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনও স্বাভাবিকতা ছিল না। খট খট করে একটা শব্দ হচ্ছিল। তখুনি আমি প্রথমবারের মতো লক্ষ্য করলাম, লোকটার একটা পা কাঠের। আর সেই কাঠের পা থেকেই বিজয়ের কোনও নির্ধারিত তারিখ নেই শব্দগুচ্ছ মুঞ্জুরিত হয়ে চা-খানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল চরাচরে।  (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kuchkawaj-kuchkawaj/
5201
শামসুর রাহমান
লোকগুলোর কী হয়েছে
মানবতাবাদী
লোকগুলোর কী হয়েছে বলোতো মুখে কুচকুচে অথবা ধবধবে দাড়ি দেখলেই অথর্ব মোল্লা ঠাউরে নেয় আর উশকো খুশকো চুল ময়লা ট্রাউজার হলুদ উদাসীনতা-ছাওয়া চোখ দেখলেই ছন্নছাড়া পদ্যলিখিয়েকী যে বোঝাতে চায় এই নিদ্রাচারীরা ওরা নিজেরাই তার মর্মেদ্ধার করতে পারবে কি না তা’ নিয়ে বিস্তর জল্পনা কল্পনা করা যেতে পারে ঘুমের জঠরে ক্ষণিক বসবাসকালীন সময়ে কী কী বলা হয় জেগে ওঠার পর অবোধ্য তন্ত্র মন্ত্রওরা বলছে সমাজতন্ত্র কফিনে শায়িত শেষ পেরেক ঠোকা খতম হয়ে এলো ব’লে গির্জার পথেই মুক্তি হতে পারে সাবলীল আমি বলি ব্যান্ডেজবাঁধা মাথা নিয়ে মার্কস এবং লেনিন আকিদা আর মমতায় আগলে রাখছেন সমাজতন্ত্রকে কবরের উপর সূর্যমুখী আশ্বাসের আভা যা বলে বলুক লোকগুলো ওদের কথামালাকে পাথর চাপা দেওয়া নিরর্থক এক ঝটকায় সুন্দরের ঘাড় মটকে দেওয়া সত্য-শিবের পশ্চাদ্দেশে কালি মেখে উদ্বাহু নৃত্য কুবাক্যসমূহকে সুসমাচারের আদলে পেশ ক’রে হাওয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া ওদের পেশাওদের প্রত্যেকের হাতে বিষঝরানো তীরধনুক আমি কি ক্ষমা করতে পারবো ওদের যাদের বাক্যশলাকায় আমার কবিতা জর্জরিত ছটফটানো দুলদুল যেভাবে হোক আগলে রাখা চাই কবিতা আর পবিত্র সব লক্ষ্যবস্তুকেলোকগুলোর যে কী হয়েছে সূর্যের মুখে ওরা আলকাতরা লেপে দিতে উদ্যত নক্ষত্রগুলো উপড়ে ফেললে ওরা হৈ হৈ মরদ লোকগুলোর মুদ্রা আমি ওদেরই ফিরিয়ে দেবো অসম্ভব নিশ্চুপ থাকা এই কালবেলায় আমার কণ্ঠস্বর আজ ঈগলের উড়াল সবখানে   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/lokgulor-ki-hoyeche/
2853
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরে পাখি
প্রকৃতিমূলক
ওরে পাখি, থেকে থেকে ভুলিস কেন সুর, যাস নে কেন ডাকি— বাণীহারা প্রভাত হয় যে বৃথা জানিস নে তুই কি তা।অরুণ-আলোর প্রথম পরশ গাছে গাছে লাগে, কাঁপনে তার তোরই যে সুর পাতায় পাতায় জাগে— তুই যে ভোরের আলোর মিতা জানিস নে তুই কি তা।জাগরণের লক্ষ্মী যে ওই আমার শিয়রেতে আছে আঁচল পেতে, জানিস নে তুই কি তা। গানের দানে উহারে তুই করিস নে বঞ্চিতা!দুঃখরাতের স্বপনতলে প্রভাতী তোর কী যে বলে নবীন প্রাণের গীতা, জানিস নে তুই কি তা।   (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ore-pakhi/
3504
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (ষষ্ঠ সর্গ)
কাহিনীকাব্য
‘কমলা ভুলিবে সেই শিখর কানন, কমলা ভুলিবে সেই বিজন কুটীর— আজ হতে নেত্র! বারি কোরো না বর্ষণ, আজ হতে মন প্রাণ হও গো সুস্থির।অতীত ও ভবিষ্যত হইব বিসমৃত। জুড়িয়াছে কমলার ভগন হৃদয়! সুখের তরঙ্গ হৃদে হয়েছে উত্থিত, সংসার আজিকে হোতে দেখি সুখময়।বিজয়েরে আর করিব না তিরস্কার সংসারকাননে মোরে আনিয়াছে বলি। খুলিয়া দিয়াছে সে যে হৃদয়ের দ্বার, ফুটায়েছে হৃদয়ের অস্ফুটিত কলি!জমি জমি জলরাশি পর্ব্বতগুহায় একদিন উথলিয়া উঠে রে উচ্ছ্বাসে, একদিন পূর্ণ বেগে প্রবাহিয়া যায়, গাহিয়া সুখের গান যায় সিন্ধুপাশে।—আজি হতে কমলার নূতন উচ্ছ্বাস, বহিতেছে কমলার নূতন জীবন। কমলা ফেলিবে আহা নূতন নিশ্বাস, কমলা নূতন বায়ু করিবে সেবন।কাঁদিতে ছিলাম কাল বকুলতলায়, নিশার আঁধারে অশ্রু করিয়া গোপন! ভাবিতে ছিলাম বসি পিতায় মাতায়— জানি না নীরদ আহা এয়েছে কখন।সেও কি কাঁদিতে ছিল পিছনে আমার? সেও কি কাঁদিতে ছিল আমারি কারণ? পিছনে ফিরিয়া দেখি মুখপানে তার, মন যে কেমন হল জানে তাহা মন।নীরদ কহিল হৃদি ভরিয়া সুধায়— ‘শোভনে! কিসের তরে করিছ রোদন?’ আহা হা! নীরদ যদি আবার শুধায়, ‘কমলে! কিসের তরে করিছ রোদন?’বিজয়েরে বলিয়াছি প্রাতঃকালে কাল— একটি হৃদয়ে নাই দুজনের স্থান! নীরদেই ভালবাসা দিব চিরকাল, প্রণয়ের করিব না কভু অপমান।ওই যে নীরজা আসে পরাণ-সজনী, একমাত্র বন্ধু মোর পৃথিবীমাঝার! হেন বন্ধু আছে কি রে নির্দ্দয় ধরণী! হেন বন্ধু কমলা কি পাইবেক আর?ওকি সখি কোথা যাও? তুলিবে না ফুল? নীরজা, আজিকে সই গাঁথিবে না মালা? ওকি সখি আজ কেন বাঁধ নাই চুল? শুকনো শুকনো মুখ কেন আজি বালা?মুখ ফিরাইয়া কেন মুছ আঁখিজল? কোথা যাও, কোথা সই, যেও না, যেও না! কি হয়েছে? বল্‌বি নে— বল্‌ সখি বল্‌! কি হয়েছে, কে দিয়েছে কিসের যাতনা?’‘কি হয়েছে, কে দিয়েছে, বলি গো সকল। কি হয়েছে, কে দিয়েছে কিসের যাতনা— ফেলিব যে চিরকাল নয়নের জল নিভায়ে ফেলিতে বালা মরমবেদনা!কে দিয়েছে মনমাঝে জ্বালায়ে অনল? বলি তবে তুই সখি তুই! আর নয়— কে আমার হৃদয়েতে ঢেলেছে গরল? কমলারে ভালবাসে আমার বিজয়!কেন হলুম না বালা আমি তোর মত, বন হতে আসিতাম বিজয়ের সাথে— তোর মত কমলা লো মুখ আঁখি যত তা হলে বিজয়-মন পাইতাম হাতে!পরাণ হইতে অগ্নি নিভিবে না আর বনে ছিলি বনবালা সে ত বেশ ছিলি— জ্বালালি!— জ্বলিলি বোন! খুলি মর্ম্মদ্বার— কাঁদিতে করিগে যত্ন যেথা নিরিবিলি’।কমলা চাহিয়া রয়, নাহি বহে শ্বাস। হৃদয়ের গূঢ় দেশে অশ্রুরাশি মিলি ফাটিয়া বাহির হতে করিল প্রয়াস— কমলা কহিল ধীরে “জ্বালালি জ্বলিলি!”আবার কহিল ধীরে, আবার হেরিল নীরে যমুনাতরঙ্গে খেলে পূর্ণ শশধর— তরঙ্গের ধারে ধারে রঞ্জিয়া রজতধারে সুনীল সলিলে ভাসে রজন্ময় কর!হেরিল আকাশ-পানে সুনীল জলদযানে ঘুমায়ে চন্দ্রিমা ঢালে হাসি এ নিশীথে। কতক্ষণ চেয়ে চেয়ে পাগল বনের মেয়ে আকুল কত কি মনে লাগিত ভাবিতে!‘ওই খানে আছে পিতা, ওই খানে আছে মাতা, ওই জ্যোৎসনাময় চাঁদে করি বিচরণ দেখিছেন হোথা হোতে দাঁড়ায়ে সংসারপথে কমলা নয়নবারি করিছে মোচন।একি রে পাপের অশ্রু? নীরদ আমার— নীরদ আমার যথা আছে লুক্কায়িত, সেই খান হোতে এই অশ্রুবারিধার পূর্ণ উৎস-সম আজ হল উৎসারিত।এ ত পাপ নয় বিধি! পাপ কেন হবে? বিবাহ করেছি বলে নীরদে আমার ভাল বাসিব না? হায় এ হৃদয় তবে বজ্র দিয়া দিক বিধি করে চুরমার!এ বক্ষে হৃদয় নাই, নাইক পরাণ, একখানি প্রতিমূর্ত্তি রেখেছি শরীরে— রহিবে, যদিন প্রাণ হবে বহমান রহিবে, যদিন রক্ত রবে শীরে শীরে!সেই মূর্ত্তি নীরদের! সে মূর্ত্তি মোহন রাখিলে বুকের মধ্যে পাপ কেন হবে? তবুও সে পাপ— আহা নীরদ যখন বলেছে, নিশ্চয় তারে পাপ বলি তবে!তবু মুছিব না অশ্রু এ নয়ান হোতে, কেন বা জানিতে চাব পাপ কারে বলি? দেখুক জনক মোর ওই চন্দ্র হোতে দেখুন জননী মোর আঁখি দুই মেলি!     নীরজা গাইত ‘চল্‌ চন্দ্রলোকে রবি। সুধাময় চন্দ্রলোক, নাই সেথা দুখ শোক, সকলি সেথায় নব ছবি!ফুলবক্ষে কীট নাই, বিদ্যুতে অশনি নাই, কাঁটা নাই গোলাপের পাশে! হাসিতে উপেক্ষা নাই, অশ্রুতে বিষাদ নাই, নিরাশার বিষ নাই শ্বাসে।নিশীথে আঁধার নাই, আলোকে তীব্রতা নাই, কোলাহল নাইক দিবায়! আশায় নাইক অন্ত, নূতনত্বে নাই অন্ত, তৃপ্তি নাই মাধুর্য্যশোভায়।লতিকা কুসুমময়, কুসুম সুরভিময়, সুরভি মৃদুতাময় যেথা! জীবন স্বপনময়, স্বপন প্রমোদময়, প্রমোদ নূতনময় সেথা!সঙ্গীত উচ্ছ্বাসময়, উচ্ছ্বাস মাধুর্য্যময়, মাধুর্য্য মত্ততাময় অতি। প্রেম অস্ফুটতামাখা, অস্ফুটতা স্বপ্নমাখা, স্বপ্নে-মাখা অস্ফুটিত জ্যোতি!গভীর নিশীথে যেন, দূর হোতে স্বপ্ন-হেন অস্ফুট বাঁশীর মৃদু রব— সুধীরে পশিয়া কানে শ্রবণ হৃদয় প্রাণে আকুল করিয়া দেয় সব।এখানে সকলি যেন অস্ফুট মধুর-হেন, উষার সুবর্ণ জ্যোতি-প্রায়। আলোকে আঁধার মিশে মধু জ্যোছনায় দিশে রাখিয়াছে ভরিয়া সুধায়!দূর হোতে অপ্সরার মধুর গানের ধার, নির্ঝরের ঝর ঝর ধ্বনি। নদীর অস্ফুট তান মলয়ের মৃদুগান একত্তরে মিশেছে এমনি!সকলি অস্ফুট হেথা মধুর স্বপনে-গাঁথা চেতনা মিশান’ যেন ঘুমে। অশ্রু শোক দুঃখ ব্যথা কিছুই নাহিক হেথা জ্যোতির্ম্ময় নন্দনের ভূমে!’আমি যাব সেই খানে পুলকপ্রমত্ত প্রাণে সেই দিনকার মত বেড়াব খেলিয়া— বেড়াব তটিনীতীরে, খেলাব তটিনীনীরে, বেড়াইব জ্যোছনায় কুসুম তুলিয়া!শুনিছি মৃত্যুর পিছু পৃথিবীর সব-কিছু ভুলিতে হয় নাকি গো যা আছে এখানে! ওমা! সে কি করে হবে? মরিতে চাই না তবে নীরদে ভুলিতে আমি চাব কোন্‌ প্রাণে?’কমলা এতেক পরে হেরিল সহসা নীরদ কাননপথে যাইছে চলিয়া— মুখপানে চাহি রয় বালিকা বিবশা, হৃদয়ে শোণিতরাশি উঠে উথলিয়া।নীরদের স্কন্ধে খেলে নিবিড় কুন্তল, দেহ আবরিয়া রহে গৈরিক বসন, গভীর ঔদাস্যে যেন পূর্ণ হৃদিতল— চলিছে যে দিকে যেন চলিছে চরণ।যুবা কমলারে দেখি ফিরাইয়া লয় আঁখি, চলিল ফিরায়ে মুখ দীর্ঘশ্বাস ফেলি। যুবক চলিয়া যায় বালিকা তবুও হায়! চাহি রয় একদৃষ্টে আঁখিদ্বয় মেলি।ঘুম হতে যেন জাগি সহসা কিসের লাগি ছুটিয়া পড়িল গিয়া নীরদের পায়। যুবক চমকি প্রাণে হেরি চারি দিক-পানে পুনঃ না করিয়া দৃষ্টি ধীরে চলি যায়।‘কোথা যাও— কোথা যাও— নীরদ! যেও না! একটি কহিব কথা শুন একবার! মুহূর্ত্ত— মুহূর্ত্ত রও— পুরাও কামনা! কাতরে দুখিনী আজি কহে বার বার!জিজ্ঞাসা করিবে নাকি আজি যুবাবর ‘কমলা কিসের তরে করিছ রোদন?’ তা হলে কমলা আজি দিবেক উত্তর, কমলা খুলিবে আজি হৃদয়বেদন।দাঁড়াও— দাঁড়াও যুবা! দেখি একবার, যেথা ইচ্ছা হয় তুমি যেও তার পর! কেন গো রোদন করি শুধাও আবার, কমলা আজিকে তার দিবেক উত্তর!কমলা আজিকে তার দিবেক উত্তর, কমলা হৃদয় খুলি দেখাবে তোমায়— সেথায় রয়েছে লেখা দেখো তার পর কমলা রোদন করে কিসের জ্বালায়!’‘কি কব কমলা আর কি কব তোমায়, জনমের মত আজ লইব বিদায়! ভেঙ্গেছে পাষাণ প্রাণ, ভেঙ্গেছে সুখের গান— এ জন্মে সুখের আশা রাখি নাক আর!এ জন্মে মুছিব নাক নয়নের ধার! কত দিন ভেবেছিনু যোগীবেশ ধরে ভ্রমিব যেথায় ইচ্ছা কানন-প্রান্তরে।তবু বিজয়ের তরে এত দিন ছিনু ঘরে হৃদয়ের জ্বালা সব করিয়া গোপন— হাসি টানি আনি মুখে এত দিন দুখে দুখে ছিলাম, হৃদয় করি অনলে অর্পণ!কি আর কহিব তোরে— কালিকে বিজয় মোরে কহিল জন্মের মত ছাড়িতে আলয়! জানেন জগৎস্বামী— বিজয়ের তরে আমি প্রেম বিসর্জ্জিয়াছিনু তুষিতে প্রণয়।’এত বলি নীরবিল ক্ষুব্ধ যুবাবর! কাঁপিতে লাগিল কমলার কলেবর, নিবিড় কুন্তল যেন উঠিল ফুলিয়া— যুবারে সম্ভাষে বালা, এতেক বলিয়া—‘কমলা তোমারে আহা ভালবাসে বোলে তোমারে করেছে দূর নিষ্ঠুর বিজয়! প্রেমেরে ডুবাব আজি বিসমৃতির জলে, বিসমৃতির জলে আজি ডুবাব হৃদয়!তবুও বিজয় তুই পাবি কি এ মন? নিষ্ঠুর! আমারে আর পাবি কি কখন? পদতলে পড়ি মোর দেহ কর ক্ষয়— তবু কি পারিবি চিত্ত করিবারে জয়? তুমিও চলিলে যদি হইয়া উদাস—কেন গো বহিব তবে এ হৃদি হতাশ? আমিও গো আভরণ ভূষণ ফেলিয়া যোগিনী তোমার সাথে যাইব চলিয়া।যোগিনী হইয়া আমি জন্মেছি যখন যোগিনী হইয়া প্রাণ করিব বহন। কাজ কি এ মণি মুক্তা রজত কাঞ্চন— পরিব বাকলবাস ফুলের ভূষণ।নীরদ! তোমার পদে লইনু শরণ— লয়ে যাও যেথা তুমি করিবে গমন! নতুবা যমুনাজলে এখনই অবহেলে ত্যজিব বিষাদদগ্ধ নারীর জীবন!’পড়িল ভূতলে কেন নীরদ সহসা? শোণিতে মৃত্তিকাতল হইল রঞ্জিত! কমলা চমকি দেখে সভয়ে বিবশা দারুণ ছুরিকা পৃষ্ঠে হয়েছে নিহিত!কমলা সভয়ে শোকে করিল চিৎকার। রক্তমাখা হাতে ওই চলিছে বিজয়! নয়নে আঁচল চাপি কমলা আবার — সভয়ে মুদিয়া আঁখি স্থির হয়ে রয়।আবার মেলিয়া আঁখি মুদিল নয়নে, ছুটিয়া চলিল বালা যমুনার জলে— আবার আইল ফিরি যুবার সদনে, যুমনা-শীতল জলে ভিজায়ে আঁচলে।যুবকের ক্ষত স্থানে বাঁধিয়া আঁচল কমলা একেলা বসি রহিল তথায়— এক বিন্দু পড়িল না নয়নের জল, এক বারো বহিল না দীর্ঘশ্বাস-বায়।তুলি নিল যুবকের মাথা কোল-পরে— একদৃষ্টে মুখপানে রহিল চাহিয়া। নির্জ্জীব প্রতিমা-প্রায় না নড়ে না চড়ে, কেবল নিশ্বাস মাত্র যেতেছে বহিয়া।চেতন পাইয়া যুবা কহে কমলায়, ‘যে ছুরীতে ছিঁড়িয়াছে জীবনবন্ধন অধিক সুতীক্ষ্ম ছুরী তাহা অপেক্ষায় আগে হোতে প্রেমরজ্জু করেছে ছেদন।বন্ধুর ছুরিকা-মাখা দ্বেষহলাহলে করেছে হৃদয়ে দেহে আঘাত ভীষণ, নিবেছে দেহের জ্বালা হৃদয়-অনলে— ইহার অধিক আর নাইক মরণ!বকুলের তলা হোক্‌ রক্তে রক্তময়! মৃত্তিকা রঞ্জিত হোক্‌ লোহিত বরণে! বসিবে যখন কাল হেথায় বিজয় আচ্ছন্ন বন্ধুতা পুনঃ উদিবে না মনে?মৃত্তিকার রক্তরাগ হোয়ে যাবে ক্ষয়— বিজয়ের হৃদয়ের শোণিতের দাগ আর কি কখনো তার হবে অপচয়? অনুতাপ-অশ্রুজলে মুছিবে সে রাগ?বন্ধুতার ক্ষীণ জ্যোতি প্রেমের কিরণে (রবিকরে হীনভাতি নক্ষত্র যেমন) বিলুপ্ত হয়েছে কি রে বিজয়ের মনে? উদিত হইবে না কি আবার কখন?একদিন অশ্রুজল ফেলিবে বিজয়! একদিন অভিশাপ দিবে ছুরিকারে! একদিন মুছিবারে হইতে হৃদয় চাহিবে সে রক্তধারা অশ্রুবারিধারে!কমলে! খুলিয়া ফেল আঁচল তোমার! রক্তধারা যেথা ইচ্ছা হোক প্রবাহিত! বিজয় শুধেছে আজি বন্ধুতার ধার প্রেমেরে করায়ে পান বন্ধুর শোণিত!চলিনু কমলা আজ ছাড়িয়া ধরায়— পৃথিবীর সাথে সব ছিঁড়িয়া বন্ধন, জলাঞ্জলি দিয়া পৃথিবীর মিত্রতায়, প্রেমের দাসত্ব রজ্জু করিয়া ছেদন!”অবসন্ন হোয়ে পঞ্চল যুবক তখনি, কমলার কোল হোতে পড়িল ধরায়! উঠিয়া বিপিনবালা সবেগে অমনি ঊর্দ্ধহস্তে কহে উচ্চ সুদৃঢ় ভাষায়—‘জলন্ত জগৎ! ওগো চন্দ্র সূর্য্য তারা! দেখিতেছ চিরকাল পৃথিবীর নরে! পৃথিবীর পাপ পুণ্য, হিংসা, রক্তধারা তোমরাই লিখে রাখ জ্বলদ্‌ অক্ষরে!সাক্ষী হও তোমরা গো করিও বিচার!— তোমরা হও গো সাক্ষী পৃথ্বী চরাচর! বহে যাও!— বহে যাও যমুনার ধার, নিষ্ঠুর কাহিনী কহি সবার গোচর!এখনই অস্তাচলে যেও না তপন! ফিরে এসো, ফিরে এসো তুমি দিনকর! এই, এই রক্তধারা করিয়া শোষণ লয়ে যাও, লয়ে যাও স্বর্গের গোচর!ধুস্‌ নে যমুনাজল! শোণিতের ধারে! বকুল তোমার ছায়া লও গো সরিয়ে! গোপন করো না উহা নিশীথ! আঁধারে! জগৎ! দেখিয়া লও নয়ন ভরিয়ে!অবাক হউক্‌ পৃথ্বী সভয়ে, বিস্ময়ে! অবাক হইয়া যাক্‌ আঁধার নরক! পিশাচেরা লোমাঞ্চিত হউক সভয়ে! প্রকৃতি মুদুক ভয়ে নয়নপলক!রক্তে লিপ্ত হয়ে যাক্‌ বিজয়ের মন! বিসমৃতি! তোমার ছায়ে রেখো না বিজয়ে; শুকালেও হৃদিরক্ত এ রক্ত যেমন চিরকাল লিপ্ত থাকে পাষাণ হৃদয়ে!বিষাদ! বিলাসে তার মাখি হলাহল ধরিও সমুখে তার নরকের বিষ! শান্তির কুটীরে তার জ্বালায়ো অনল! বিষবৃক্ষবীজ তার হৃদয়ে রোপিস্‌!দূর হ— দূর হ তোরা ভূষণ রতন! আজিকে কমলা যে রে হোয়েছে বিধবা! আবার কবরি! তোরে করিনু মোচন! আজিকে কমলা যে রে হোয়েছে বিধবা!কি বলিস্‌ যমুনা লো! কমলা বিধবা! জাহ্নবীরে বল্‌ গিয়ে ‘কমলা বিধবা’! পাখী! কি করিস্‌ গান ‘কমলা বিধবা! দেশে দেশে বল্‌ গিয়ে ‘কমলা বিধবা!আয়! শুক ফিরে যা লো বিজন শিখরে, মৃগদের বল্‌ গিয়া উঁচু করি গলা— কুটীরকে বল্‌ গিয়ে, তটিনী,নির্ঝরে— ‘বিধবা হয়েছে সেই বালিকা কমলা!’উহুহু! উহুহু— আর সহিব কেমনে? হৃদয়ে জ্বলিছে কত অগ্নিরাশি মিলি। বেশ ছিনু বনবালা, বেশ ছিনু বনে!— নীরজা বলিয়া গেছে ‘জ্বালালি! জ্বলিলি!’ (বন-ফুল কাব্যোপন্যাস)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bon-ful-soshtho-sorgo/
4357
শামসুর রাহমান
আমরা ক’জন শুধু
মানবতাবাদী
নিজের সঙ্গেই আজ সারাদিন খেলি কানামাছি কী জানি কিসের ঘোরে। মাঝে-মধ্যে কেমন অদ্ভুত মনে হয় নিজেকে নিজেরই কাছে। কী ক’রে যে আছি ভুল ইতিহাস শুনে, মূঢ়দের প্রগতির দূতভেবে নিয়ে; ঐ তো ওরা সর্বক্ষণ পেছনের দিকে টেনে নিতে চায়, মনে ছড়ায় আঁধার মুঠো মুঠো। এসব মুখের কোনো বাস্তবতা নেই, ওরা টিকে আছে মিথ্যা পুঁজি ক’রে কুড়িয়ে ভ্রান্তির খড়কুটো।কোথায় উদ্ধার ব’লে এমনকি ঘুমের ভেতরে ভীষণ চিৎকার ক’রে জেগে উঠি, প’রে নিই ঠুলি দু’চোখে আবার। শুনি কারা প্রকাশ্যে আমারই ঘরে অস্ত্রে দিচ্ছে শান জোরে; আমার গলায় অত্রগুলি নির্ঘাত বসাবে কোনোদিন নীল নক্‌শা অনুসারে, আমরা ক’জন শুধু গেয়ে চলি তারে নারে নারে।   (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amara-kojon-shudhu/
631
জয় গোস্বামী
ঈশ্বর আর প্রেমিকের সংলাপ
প্রেমমূলক
– ‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’ বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে — ‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’ বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান — ‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’ পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি — ‘উড়বে?– আচ্ছা, ছিঁড়ে দেয় যদি পাখা?’ পড়তে পড়তে ধরে নেব ওর শাখা — ‘যদি শাখা থেকে নীচে ফেলে দেয় তোকে?’ কী আর করব? জড়িয়ে ধরব ওকেই বলো কী বলব, আদালত, কিছু বলবে কি এরপরও? — ‘যাও, আজীবন অশান্তি ভোগ করো!’
https://banglarkobita.com/poem/famous/1707
1250
জীবনানন্দ দাশ
সৃষ্টির তীরে
মানবতাবাদী
বিকেলের থেকে আলো ক্রমেই নিস্তেজ হ'য়ে নিভে যায়- তবু ঢের স্মরণীয় কাজ শেষ হ'য়ে গেছেঃ হরিণ খেয়েছে তার আমিষাশী শিকারীর হৃদয়কে ছিঁড়ে; সম্রাটের ইশারায় কঙ্কালের পাশাগুলো একবার সৈনিক হয়েছে; স্বচ্ছল কঙ্কাল হ'য়ে গেছে তারপর; বিলোচন গিয়েছিলো বিবাহ-ব্যাপারে; প্রেমিকেরা সারাদিন কাটায়েছে গণিকার বারে সভাকবি দিয়ে গেছে বাক্‌বিভূতিকে গালাগাল। সমস্ত আচ্ছন্ন সুর একটি ওংকার তুলে বিস্মৃতির দিকে উড়ে যায়। এ-বিকেল মানুষ না মাছিদের গুঞ্জরণময়! যুগে-যুগে মানুষের অধ্যবসায় অপরের সুযোগের মতো মনে হয়। কুইসলিং বানানো কি নিজ নাম- হিটলার সাত কানাকড়ি দিয়ে তাহা কিনে নিয়ে হ'য়ে গেল লালঃ মানুষেরই হাতে তবু মানুষ হতেছে নাজেহাল; পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি। এ-কেমন পরিবেশে র'য়ে গেছি সবে- বাক্‌পতি জন্ম নিয়েছিলো যেই কালে, অথবা সামান্য লোক হেঁটে যেতে চেয়েছিলো স্বাভাবিক ভাবে পথ দিয়ে, কী ক'রে তাহ'লে এ-রকম ফিচেল পাতালে হৃদয়ের জন- পরিজন নিয়ে হারিয়ে গিয়েছে? অথবা যে-সব লোক নিজের সুনাম ভালোবেসে দুয়ার ও পরচুলা না এঁটে জানে না কোনো লীলা, অথবা যে-সব নাম ভালো লেগে গিয়েছিলোঃ আপিলা চাপিলা -রুটি খেতে গিয়ে তারা ব্রেডবাস্কেট খেলো শেষে। এরা সব নিজেদের গণিকা, দালাল, রেস্ত, শত্রুর খোঁজে সাত-পাঁচ ভেবে সনির্বন্ধতায় নেমে আসে; যদি বলি, তারা সব তোমাদের চেয়ে ভালো আছে; অসৎপাত্রের কাছে তবে তারা অন্ধ বিশ্বাসে কথা বলেছিলো ব'লে দুই হাত সতর্কে গুটায়ে হ'য়ে ওঠে কী যে উচাটন! কুকুরের ক্যানারির কান্নার মতনঃ তাজা ন্যাকড়ার ফালি সহসা ঢুকেছে নালি ঘায়ে। ঘরের ভিতরে কেউ খোয়ারি ভাঙছে ব'লে কপাটের জং নিরস্ত হয় না তার নিজের ক্ষয়ের ব্যবসায়ে, আগাগোড়া গৃহকেই চৌচির করেছে বরং; অরেঞ্জপিকোর ঘ্রাণ নরকের সরায়ের চায়ে ক্রমেই অধিক ফিকে হ'য়ে আসে; নানারূপ জ্যামিতিক টানের ভিতরে স্বর্গ মর্ত্য পাতালের কুয়াশায় মতন মিলনে একটি গভীর ছায়া জেগে ওঠে মনে; অথবা তা' ছায়া নয়- জীব নয় সৃষ্টির দেয়ালের 'পরে। আপাদমস্তক আমি আর দিকে তাকায়ে রয়েছি; গগ্যাঁ ছবির মতো- তবু গগ্যাঁ চেয়ে গুরু হাত থেকে বেরিয়ে সে নাকচোখে ক্কচিৎ ফুটেছে টায়ে-টায়ে; নিভে যায়- জ্বলে ওঠে, ছায়া, ছাই, দিব্যযোনি মনে হয় তাকে। স্বাতিতারা শুকতারা সূর্যের ইস্কুল খুলে সে-মানুষ নরক বা মর্ত্যে বহাল হ'তে গিয়ে বৃষ মেষ বৃশ্চিক সিংহের প্রাতঃকাল ভালোবেসে নিয়ে যায় কন্যা মীন মিথুনের কূলে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/srishtir-tirey/
5510
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বৈশম্পায়ন
চিন্তামূলক
আকাশের খাপছাড়া ক্রন্দন নাই আর আষাঢ়ের খেলনা। নিত্য যে পাণ্ডুর জড়তা সথীহারা পথিকের সঞ্চয়। রক্তের বুকভরা নিঃশ্বাস, আঁধারের বুকফাটা চীৎকার- এই নিয়ে মেতে আছি আমরা কাজ নেই হিসাবের খাতাতে। মিলাল দিনের কোনো ছায়াতে পিপাসায় আর কূল পাই না; হারানো স্মৃতির মৃদু গন্ধে প্রাণ কভু হয় নাকো চঞ্চল। মাঝে মাঝে অনাহূত আহ্বান আনে কই আলেয়ার বিত্ত? শহরের জমকালো খবরে হাজিরা খাতাটা থাকে শূন্য। আনমনে জানা পথ চলতে পাই নাকো মাদকের গন্ধ! রাত্রিদিনের দাবা চালেতে আমাদের মন কেন উষ্ণ? শ্মশানঘাটেতে ব' কখনো দেখি নাই মরীচিকা সহসা, তাই বুঝি চিরকাল আঁধারে আমরাই দেখি শুধু স্বপ্ন! বার বার কায়াহীন ছায়ারে ধরেছিনু বাহুপাশে জড়িয়ে, তাই আজ গৈরিক মাটিতে রঙিন বসন করি শুদ্ধ।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1115
483
কাজী নজরুল ইসলাম
রাজ-ভিখারী
মানবতাবাদী
কোন ঘর-ছাড়া বিবাগীর বাঁশি শুনে উঠেছিল জাগি' ওগো চির-বৈরাগী! দাঁড়ালে ধুলায় তব কাঞ্চন-কমল-কানন ত্যাগি'- ওগো চির বৈরাগী।ছিলে ঘুম-ঘোরে রাজার দুলাল, জানিতে না কে সে পথের কাঙ্গাল ফেরে পথে পথে ক্ষুধাতুর-সাথে ক্ষুধার অন্ন মাগি', তুমি সুধার দেবতা 'ক্ষুধা ক্ষুধা' বলে কাঁদিয়া উঠিলে জাগি'- ওগো চির-বৈরাগী!আঙ্গিয়া তোমার নিলে বেদনার গৈরিক-রঙ্গে রেঙ্গে' মোহ ঘুমপুরো উঠিল শিহরি' চমকিয়া ঘুম ভেঙ্গে! জাগিয়া প্রভাতে হেরে পুরবাসী রাজা দ্বারে দ্বারে ফেরে উপবাসী, সোনার অঙ্গ পথের ধুলায় বেদনার দাগে দাগী! কে গো নারায়ন নবরূপে এলে নিখিল-বেদনা-ভাগী- ওগো চির-বৈরাগী!'দেহি ভবিত ভিকষাম' বলি' দাঁড়ালে রাজ-ভিখারী, খুলিল না দ্বার, পেলে না ভিক্ষা, দ্বারে দ্বারে ভয় দ্বারী! বলিলে, 'দেবে না? লহ তবে দান- ভিক্ষাপূর্ণ আমার এ প্রান!'- দিল না ভিক্ষা, নিল না ক' দান, ফিরিয়া চলিলে যোগী। যে-জীবন কেহ লইল না তাহা মৃত্যু লইল মাগি'।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rah-bhikhari/
1585
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিত্রমালা
রূপক
গাঢ় নীল মেঘের এলো খোঁপাটাকে খুলে ফেলতেই নীচের মাটিতে লাফিয়ে নামল নদী। লোহার-হৃদপিণ্ড-নিংড়ানো তার রক্তবর্ণ জলের মধ্যে পোচড়া ডুবিয়ে জঙ্গলের গায়ে ছিটিয়ে দিতেই ফুটে উঠল টকটকে লাল মোরগ-ফুল। জঙ্গলের মধ্যে ছিল ধূমল-বর্ণ হাতির পাল। ক্যানেস্তারা পেটাতে-পেটাতে দিগন্তের দিকে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই আকাশের গায়ে জেগে উঠল পাহাড়। ছবিটা আমার সাধ্যমত সাজিয়ে দিয়েছি। তোমরা যারা ছুটিতে এবার সিংভূমে বেড়াতে যাবে, দু’চোখ ভরে দেখে নিয়ো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1563
1463
নির্মলেন্দু গুণ
আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও
প্রেমমূলক
তোমার পায়ের নিচে আমিও অমর হব, আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।এই নাও আমার যৌতুক, এক-বুক রক্তের প্রতিজ্ঞা। ধুয়েছি অস্থির আত্মা শ্রাবণের জলে, আমিও প্লাবন হব, শুধু চন্দনচর্চিত হাত একবার বোলাও কপালে। আমি জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে উড়াব গাণ্ডীব, তোমার পায়ের কাছে নামাব পাহাড়। আমিও অমর হব, আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।পায়ের আঙুল হয়ে সারাক্ষণ লেগে আছি পায়ে, চন্দনের ঘ্রাণ হয়ে বেঁচে আছি কাঠের ভিতরে। আমার কিসের ভয় ?কবরের পাশে থেকে হয়ে গেছি নিজেই কবর, শহীদের পাশে থেকে হয়ে গেছি নিজেই শহীদ, আমার আঙুল যেন শহীদের অজস্র মিনার হয়ে জনতার হাতে হাতে গিয়েছে ছড়িয়ে। আমার কিসের ভয় ?তোমার পায়ের নিচে আমিও অমর হব, আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও এই দেখো অন্তরাত্মা মৃত্যুর গর্বে ভরপুর, ভোরের শেফালি হয়ে পড়ে আছে ঘাসে। আকন্দ-ধুন্দুল নয়, রফিক-সালাম-বরকত-আমি; আমারই আত্মার প্রতিভাসে এই দেখ আগ্নেয়াস্ত্র, কোমরে কার্তুজ, অস্থি ও মজ্জার মধ্যে আমার বিদ্রোহ, উদ্ধত কপাল জুড়ে যুদ্ধের এ-রক্তজয়টিকা।আমার কিসের ভয় ? তোমার পায়ের নিচে আমিও কবর হব, আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।
https://banglapoems.wordpress.com/2013/02/21/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a7%80-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%93-%e0%a6%a8%e0%a6%bf/
3041
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিত্রা
স্তোত্রমূলক
জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে তুমি বিচিত্ররূপিণী। অযুত আলোকে ঝলসিছ নীল গগনে, আকুল পুলকে উলসিছ ফুলকাননে, দ্যুলোকে ভূলোকে বিলসিছ চলচরণে, তুমি চঞ্চলগামিনী। মুখর নূপুর বাজিছে সুদূর আকাশে, অলকগন্ধ উড়িছে মন্দ বাতাসে, মধুর নৃত্যে নিখিল চিত্তে বিকাশে কত মঞ্জুল রাগিণী। কত না বর্ণে কত না স্বর্ণে গঠিত কত যে ছন্দে কত সংগীতে রটিত কত না গ্রন্থে কত না কণ্ঠে পঠিত তব অসংখ্য কাহিনী। জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে তুমি বিচিত্ররূপিণী।অন্তরমাঝে শুধু তুমি একা একাকী তুমি অন্তরব্যাপিনী। একটি স্বপ্ন মুগ্ধ সজল নয়নে, একটি পদ্ম হৃদয়বৃন্তশয়নে, একটি চন্দ্র অসীম চিত্তগগনে-- চারি দিকে চিরযামিনী। অকূল শান্তি সেথায় বিপুল বিরতি, একটি ভক্ত করিছে নিত্য আরতি, নাহি কাল দেশ, তুমি অনিমেষ মুরতি-- তুমি অচপলদামিনী। ধীর গম্ভীর গভীর মৌনমহিমা, স্বচ্ছ অতল স্নিগ্ধ নয়ননীলিমা স্থির হাসিখানি উষালোকসম অসীমা, অয়ি প্রশান্তহাসিনী। অন্তরমাঝে তুমি শুধু একা একাকী তুমি অন্তরবাসিনী।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20150129104746/
6032
হেলাল হাফিজ
ডাকাত
রূপক
তুমি কে হ? সোনালী ছনের বাড়ি তছনছ করে রাতে নির্বিচারে ঢুকে গেলে অন্দর-মহলে বেগানা পুরুষ, লাজ-শরমের মাথা খেয়ে তুমি কে হে? তোমাকে তো কখনো দেখিনি আগে এ তল্লাটে মারী ও মড়কে, ঝড়ে, কাঙ্ক্ষিত বিদ্রোহে। আমাদের যুদ্ধের বছরে ভিন্‌ গেরামের কতো মানুষের পদচারণায় এ বাড়ি মুখর ছিলো, তোমাকে দেখিনি ত্রি-সীমায়। চতুর বণিক তুমি আঁধারে নেমেছো এই বানিজ্য ভ্রমণে, কে জানে কী আছে পাড়া-পড়শীর মনে! লোভে আর লালসায় অবশেষে আগন্তুক সর্বস্ব হারাবে, কেন না প্রভাত হলে চারদিকে মানুষের ঢল নেমে যাবে। ২.৩.৮৫
https://banglarkobita.com/poem/famous/105
3274
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নগাধিরাজের দূর নেবু-নিকুঞ্জের
চিন্তামূলক
নগাধিরাজের দূর নেবু-নিকুঞ্জের রসপাত্রগুলি আনিল এ শয্যাতলে জনহীন প্রভাতের রবির মিত্রতা, অজানা নির্ঝরিণীর বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটার হিরন্ময় লিপি, সুনিবিড় অরণ্যবীথির নিঃশব্দ মর্মরে বিজড়িত স্নিগ্ধ হৃদয়ের দৌত্যখানি। রোগপঙ্গু লেখনীর বিরল ভাষার ইঙ্গিতে পাঠায় কবি আর্শীবাদ তার।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nogadhirajer-dur-nebu-nikunjer/
3684
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মধ্যাহ্ন
চিন্তামূলক
বেলা দ্বিপ্রহর। ক্ষুদ্র শীর্ণ নদীখানি শৈবালে জর্জর স্থির স্রোতোহীন। অর্ধমগ্ন তরী-পরে মাছরাঙা বসি, তীরে দুটি গোরু চরে শস্যহীন মাঠে। শান্তনেত্রে মুখ তুলে মহিষ রয়েছে জলে ডুবি। নদীকূলে জনহীন নৌকা বাঁধা। শূন্য ঘাটতলে রৌদ্রতপ্ত দাঁড়কাক স্নান করে জলে পাখা ঝটপটি। শ্যামশষ্পতটে তীরে খঞ্জন দুলায়ে পুচ্ছ নৃত্য করি ফিরে। চিত্রবর্ণ পতঙ্গম স্বচ্ছ পক্ষভরে আকাশে ভাসিয়া উড়ে, শৈবালের পরে ক্ষণে ক্ষণে লভিয়া বিশ্রাম। রাজহাঁস অদূরে গ্রামের ঘাটে তুলি কলভাষ শুভ্র পক্ষ ধৌত করে সিক্ত চঞ্চুপুটে। শুষ্কতৃণগন্ধ বহি ধেয়ে আসে ছুটে তপ্ত সমীরণ—চলে যায় বহু দূর। থেকে থেকে ডেকে ওঠে গ্রামের কুকুর কলহে মাতিয়া। কভু শান্ত হাম্বাস্বর, কভু শালিকের ডাক, কখনো মর্মর জীর্ণ অশথের, কভু দূর শূন্য-পরে চিলের সুতীব্র ধ্বনি, কভু বায়ুভরে আর্ত শব্দ বাঁধা তরণীর—মধ্যাহ্নের অব্যক্ত করুণ একতান, অরণ্যের স্নিগ্ধচ্ছায়া, গ্রামের সুষুপ্ত শান্তিরাশি, মাঝখানে বসে আছি আমি পরবাসী। প্রবাসবিরহদুঃখ মনে নাহি বাজে; আমি মিলে গেছি যেন সকলের মাঝে; ফিরিয়া এসেছি যেন আদি জন্মস্থলে বহুকাল পরে—ধরণীর বক্ষতলে পশু পাখি পতঙ্গম সকলের সাথে ফিরে গেছি যেন কোন্‌ নবীন প্রভাতে পূর্বজন্মে, জীবনের প্রথম উল্লাসে আঁকড়িয়া ছিনু যবে আকাশে বাতাসে জলে স্থলে, মাতৃস্তনে শিশুর মতন— আদিম আনন্দরস করিয়া শোষণ।    (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/modhannho/
4261
শঙ্খ ঘোষ
ত্রিতাল
চিন্তামূলক
তোমার কোনো ধর্ম নেই, শুধু শিকড় দিয়ে আঁকড়ে ধরা ছাড়া তোমার কোনো ধর্ম নেই, শুধু বুকে কুঠার সইতে পারা ছাড়া পাতালমুখ হঠাত্ খুলে গেলে দুধারে হাত ছড়িয়ে দেওয়া ছাড়া তোমার কোনো ধর্ম নেই, এই শূন্যতাকে ভরিয়ে দেওয়া ছাড়া। শ্মশান থেকে শ্মশানে দেয় ছুঁড়ে তোমারই ঐ টুকরো-করা-শরীর দু:সময়ে তখন তুমি জানো হলকা নয়, জীবন বোনে জরি। তোমার কোনো ধর্ম নেই তখন প্রহরজোড়া ত্রিতাল শুধু গাঁথা- মদ খেয়ে তো মাতাল হত সবাই কবিই শুধু নিজের জোরে মাতাল !
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
3226
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে
চিন্তামূলক
দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে এসেছে আমার দ্বারে; একমাত্র অস্ত্র তার দেখেছিনু কষ্টের বিকৃত ভান, ত্রাসের বিকট ভঙ্গি যত— অন্ধকার ছলনার ভূমিকা তাহার।যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়। এই হার-জিত-খেলা—জীবনের মিথ্যা এ কুহক— শিশুকাল হতে বিজড়িত পদে পদে এই বিভীষিকা— দুঃখের পরিহাসে ভরা। ভয়ের বিচিত্র চলচ্ছবি— মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে।   (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dukkher-adhare-ratri-bare-bare/
1073
জীবনানন্দ দাশ
নিঃসরণ
চিন্তামূলক
দুর্গের গৌরবে ব'সে প্রাংশু আত্মা ভাবিতেছে টের পূর্বপুরুষের কথাঃ যারা তারে জঙ্ঘা দিল,- তবু আজ তরবার পরিত্যাগ করার ক্ষমতা যারা দিল;- প্রাচীন পাথর তারা এনেছিল পর্বতের থেকে স্থির কিছু গড়িবার প্রয়োজনে; তারপর ধূসর কাপড়ে মুখ ঢেকে চ'লে গেছে;- পিছন পেঁচা যা ওড়ে জ্যোৎস্নায়- সেইখানে তাদের মমতাঘুরিতেছে- ঘুরিতেছে- শত্রু মঙ্গলের মত;- আমার এ শাদা শাটিনের শেমিজও পেতেছে সেই মনস্বিনী শৃঙ্খলাকে টের। এই দুর্গ আজো তাই- ক্রিয়াবান সপ্তমীর চাঁদের শিঙের নিচে হিম লোল- বক্র- নিরুত্তর;- আজই রাতে আমার মৃত্যুর পর নতুন রক্তিম সূর্য এসে প্রয়োজন মেগে নেবে এইখানে লোকশ্রুত ভূমিকম্পের।পূর্যসূরীদের ইচ্ছা অনুশাসনের মত করিতেছে কাজ। প্রাচীন লেখের থেকে অন্ধকারে বিক্ষুব্ধ সমাজ করতালি দিয়ে হাসে; দূরবীনে দেখা যায় যাই সব জ্যোতির্ময় কণা অনন্ত মোমের তেজ নিয়ে নাচে,- সেই সব উচ্চতর রসিক দ্যোতনা মৃত্যুকে বামনের করতলে হরিতকী অন্তত ক'রে দিক আজ।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/nishoron/
2632
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অসহ্য ভালবাসা
প্রেমমূলক
বুঝেছি গো বুঝেছি সজনি,কী ভাব তোমার মনে জাগে,বুক-ফাটা প্রাণ-ফাটা মোর ভালোবাসাএত বুঝি ভালো নাহি লাগে। এত ভালোবাসা বুঝি পার না সহিতে,এত বুঝি পার না বহিতে। যখনি গো নেহারি তোমায়–মুখ দিয়া আঁখি দিয়া   বাহিরিতে চায় হিয়া, শিরার শৃঙ্খলগুলি ছিঁড়িয়া ফেলিতে চায়,ওই মুখ বুকে ঢাকে, ওই হাতে হাত রাখে,কী করিবে ভাবিয়া না পায়,যেন তুমি কোথা আছ  খুঁজিয়া না পায়। মন মোর পাগলের হেন  প্রাণপণে শুধায় যেন,“প্রাণের  প্রাণের মাঝে কী করিলে তোমারে গো পাই,যে ঠাঁই রয়েছে  শূন্য, কী করিলে সে শূন্য পুরাই।” এইরূপে দেহের দুয়ারেমন যবে থাকে যুঝিবারে,তুমি চেয়ে দেখ মুখ-বাগে–এত বুঝি ভালো নাহি লাগে। তুমি চাও যবে মাঝে মাঝেঅবসর পাবে তুমি কাজেআমারে ডাকিবে একবার–কাছে গিয়া বসিব তোমার,মৃদু মৃদু সুমধুর বাণীকব তব কানে কানে রানী। তুমিও কহিবে মৃদু ভাষ,তুমিও হাসিবে মৃদু হাস,হৃদয়ের মৃদু খেলাখেলি–ফুলেতে ফুলেতে হেলাহেলি। চাও তুমি দুঃখহীন প্রেমছুটে যেথা ফুলের সুবাস,উঠে যেথা জোছনালহরী,বহে যেথা বসন্তবাতাস। নাহি চাও আত্মহারা প্রেমআছে যেথা অনন্ত পিয়াস,বহে যেথা চোখের সলিল,উঠে যেথা দুখের নিশ্বাস। প্রাণ যেথা কথা ভুলে যায়,আপনারে ভুলে যায় হিয়া,অচেতন চেতনা যেথায়,চরাচর, ফেলে হারাইয়া। এমন কি কেহ নাই, বল্‌ মোরে বল্‌ আশা,মার্জনা করিবে মোর অতি–অতি ভালোবাসা!
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be/
1661
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
মল্লিকার মৃতদেহ
প্রকৃতিমূলক
উদ্যানে গিয়েছি আমি বারবার। দেখেছি, উদ্যান বড় শান্ত ভূমি নয়। উদ্যানের গভীর ভিতরে ফুলে-ফুলে তরুতে-তরুতে লতায়-পাতায় ভীষণ চক্রান্ত চলে; চক্ষের নিমেষে খুন রক্তপাত নিঃশব্দে সমাধা হয়। উদ্যানের গভীর ভিতরে যত না সৌন্দর্য, তার দশ গুণ বিভীষিকা। উদ্যানে গিয়েছি আমি বারবার। সেখানে কখনও কেহ যেন শান্তির সন্ধানে আর নাহি যায়। যাওয়া অর্থহীন; তার কারণ সেখানে কিছু ফুল নিতান্ত নিরীহ বটে, কিন্তু বাদবাকি ফুলেরা হিংসুক বড়, আত্মরূপরটনায় তারা যেমন উৎসাহী, তত বলবান, হত্যাপরায়ণ। উদ্যানে গিয়েছি আমি বারবার। সেখানে রূপের অহঙ্কার ক্ষমাহীন। সেখানে রঙের দাঙ্গায় নিহত হয় শত-শত দুর্বল কুসুম। আজ প্রত্যুষেই আমি উদ্যানের বিখ্যাত ভিতরে মল্লিকার মৃতদেহ দেখতে পেয়েছি। চক্ষু বিস্ফোরিত, দেহ ছিন্নভিন্ন, বুক তখনও কি উষ্ণ ছিল মল্লিকার? কার নখরের চিহ্ন মল্লিকার বুকে ছিল, কে হত্যা করেছে তাকে, কিছুই জানি না। কিন্তু গোপালের লতা অতখানি এগিয়ে তখন পথের উপরে কেন ঝুঁকে ছিল? এবং রঙ্গন কেন আমাকে দেখেই অত্যন্ত নীরবে হঠাৎ ফিরিয়ে নিল মুখ? আমার বাগানে আরও কতগুলি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবে?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1669
2426
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
অস্ট্রেলিয়া
ব্যঙ্গাত্মক
আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বদরুল মিয়া মাথায় কী পোকা হল গেল অস্ট্রেলিয়া ফোন করে যখন আমি খোঁজ নিতে যাই অবাক ব্যাপার - তার নিশানাই নাই। সহজ সরল মানুষ বদরুল মিয়া পিছলা খেয়ে পড়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া গিয়া।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2026
5109
শামসুর রাহমান
মানবের ব্যাখ্যা
মানবতাবাদী
মানবের ব্যাখ্যা নিয়ে ঘামাই না মাথা আজকাল। মানুষ বিষয়ে কী বলেছে রেনেসাঁস, কাকে বলে মানবতা, শুভাশুভ, দুর্জনের অনাচার, সাধু সন্তের উদার ঐশী পর্যটন, ইত্যাদি কিছুই এখন ভাবিনা আর। সংসারে ক’জন নিরিবিলি অন্ন ভাগ করে খাই, কখনো পান্থনিবাসে ঠাঁই খুঁজি, ঘুর একা একা ভেঙ্গে যাওয়া মেলায় কখনো, নিজের শরীর থেকে পশুগন্ধ মুছে ফেলি কিছু।মানুষ বলেই গোলাপের প্রতি যাই অনুরাগে, সযত্নে পালিশ করি জুতো, মোজা দিই রোদে আর হঠাৎ ভীষণ রেগে যাই, মাঝে মাঝে অভিমান মেঘের মতোন গাঢ় ছেয়ে যায় সমগ্র সত্তায়। মানুষ বলেই মানবীর দিকে তাকাই গহন, স্তব্ধ রাতে হেসে উঠি কখনো খারাপ হয় মন।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/manober-byakkha/
3098
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন পবিত্র জানি
চিন্তামূলক
জীবন পবিত্র জানি, অভাব্য স্বরূপ তার অজ্ঞেয় রহস্য-উৎস হতে পেয়েছে প্রকাশ কোন্‌ অলক্ষিত পথ দিয়ে, সন্ধান মেলে না তার। প্রত্যহ নূতন নির্মলতা দিল তারে সূর্যোদয় লক্ষ ক্রোশ হতে স্বর্ণঘটে পূর্ণ করি আলোকের অভিষেকধারা, সে জীবন বাণী দিল দিবসরাত্রিরে, রচিল অরণ্যফুলে অদৃশ্যের পূজা-আয়োজন, আরতির দীপ দিল জ্বালি নিঃশব্দ প্রহরে। চিত্ত তারে নিবেদিল জন্মের প্রথম ভালোবাসা।প্রত্যহের সব ভালোবাসা তারি আদি সোনার কাঠিতে উঠেছে জাগিয়া, প্রিয়ারে বেসেছি ভালো বেসেছি ফুলের মঞ্জরিকে; করেছে সে অন্তরতম পরশ করেছে যারে। জন্মের প্রথম গ্রন্থে নিয়ে আসে অলিখিত পাতা, দিনে দিনে পূর্ণ হয় বাণীতে বাণীতে, আপনার পরিচয় গাঁথা হয়ে চলে, দিনশেষে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে ছবি, নিজেরে চিনিতে পারে রূপকার নিজের স্বাক্ষরে, তার পরে মুছে ফেলে বর্ণ তার রেখা তার উদাসীন চিত্রকর কালো কালি দিয়ে— কিছু বা যায় না মোছা সুবর্ণের লিপি, ধ্রুবতারকার পাশে জাগে তার জ্যোতিষ্কের লীলা ।   (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jibon-pobitro-jani/
3977
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সেই আমাদের দেশের পদ্ম
রূপক
সেই আমাদের দেশের পদ্ম তেমনি মধুর হেসে ফুটেছে, ভাই, অন্য নামে অন্য সুদূর দেশে।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sei-amader-desher-poddo/
5427
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অভিবাদন
মানবতাবাদী
হে সাথী, আজকে স্বপ্নের দিন গোনা ব্যর্থ নয় তো, বিপুল সম্ভাবনা দিকে দিকে উদ্‌যাপন করছে লগ্ন, পৃথিবী সূর্য-তপস্যাতেই মগ্ন। আজকে সামনে নিরুচ্চারিত প্রশ্ন, মনের কোমল মহল ঘিরে কবোষ্ণ ক্রমশ পুষ্ট মিলিত উন্মাদনা, ক্রমশ সফল স্বপ্নের দিন গোনা। স্বপ্নের বীজ বপন করেছি সদ্য, বিদ্যুৎবেগে ফসল সংঘবদ্ধ! হে সাথী, ফসলে শুনেছো প্রাণের গান? দুরন্ত হাওয়া ছড়ায় ঐকতান। বন্ধু, আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী আমরা গঠন করব নতুন ভিত্তি; তারই সুত্রপাতকে করেছি সাধন হে সাথী, আজকে রক্তিম অভিবাদন।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1100
5761
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
গহন অরণ্যে
চিন্তামূলক
গহন অরণ্যে আর বারবার একা যেতে সাধ হয় না- শুকনো পাতার ভাঙা নিশ্বাসের মতো শব্দ তলতা বাঁশের ছায়া, শালের বল্লরী, সরু পথ কালভার্টে, টিলার জঙ্গলে একা বসে থাকা কী-করম নিঝুম বিষন্ন বড় হিংস্র দুঃখময়। অসংখ্য আত্মার মতো লুকোনো পাখী ও প্রাণী, অপার্থিব নির্জনতা ফুলের সুবর্ণরেখা গন্ধ, সামনে ঢেউ উৎরাই- অসহিষ্ণু জুতোর ভিতরে বালি, শিরদাঁড়া ব্যথা পেতে দ্ধিধা করে কেননা কুকের মধ্যে চাপা হাওয়া, করতলে মুখ। গহন অরণ্যে আর বারবার একা যেতে সাধ হয় না- তবু যেতে হয় বারবার ফিরে যেতে হয়।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1857
4302
শামসুর রাহমান
অনুবাদ
প্রেমমূলক
তোমার ঘুমানো, জেগে-থাকা, হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়া ঘর ছেড়ে কিংবা শীর্ণ ভিখারীর ক্ষয়া হলদে দাঁতে চোখ রাখা, কাজান্তজাকিস পড়া, স্তব্ধ মধ্যরাতে সুদূর গ্রীসের কথা ভাবা, ছিপছিপে নৌকো বাওয়া স্বপ্নের অসীম ঝিলে বুকে নিয়ে স্মৃতিময় হাওয়া, মরণ আবৃত্তিকারী এক ঝাঁক লাল-নীল বুড়ো কাকাতুয়া দেখা, চোখে অতিদূর পূর্ণিমার গুঁড়ো, বেডশীট আঁকড়েধর- সবই কে ধরনের পাওয়া।ধরা যাক অর্থহীন সকল কিছুই, তবু তুমি সযত্নে এসব কোনোদিন হয়তো করবে অনুবাদ। শহুরে প্রচ্ছন্ন গলি, সবুজ পুকুর মহল্লায় প্রত্যহ ভ্রমণকারী জন্মান্ধ কুকুর, বধ্যভূমি, গোধূলিতে বেশ্যার মতন রাঙা, মৃত মুখ, খাদ- এ-ও কি তোমার হাতে দীপ্র অনূদিত হতে চায়?   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/onubad/
5147
শামসুর রাহমান
যখন সে লেখে
সনেট
যখন সে লেখে তার ধমনীতে নেচে নেচে মেশে গোলাপের পাপড়ি একরাশ, টেবিলের গ্রীবা ঘেঁষে জেগে ওঠে বহুবর্ণ অশ্বপাল কেশর দুলিয়ে, দেবদুত মাঝে সাজে দ্যায় তার মাথাটা বুলিয়ে। যখন সে লেখে, দ্যাখে তার শৈশবের খড়স্তূপে খরগোশ নাকের ডগা থেকে ঝাড়ে খড়কুটো চুপে এবং আলেখ্যবৎ আস্তাবলে সহিস ঘুমায়। যখন সে লেখে, দ্যাখে তার পদাবলী উড়ে যায়,একজন তরুণীর কোলে কোমল লুটিয়ে পড়ে, চুমু খায় ওষ্ঠে তার; যখন সে লেখে, সারা ঘরে জীবনের ঠোঁট নড়ে মৃত্যুর নিতম্ব দোলে শাদা। যখন সে লেখে, লাশময় বিধ্বস্ত ট্রেঞ্চের কাদা উঠে আসে চতুপার্শ্বে আর তারই দিকে অবিরত নিঃশব্দে বাড়ায় গ্রীবা বাংলাদেশ হরিণের মতো।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jokhon-se-lekhe/
1409
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
খবরাখবর
প্রেমমূলক
আমি শুধু যাই না কোথাও । মেঘের প্রাসাদ ভেঙে , মেঘেরাও চলে যায় দূরে শোণিতে আগুন জ্বলে , কখনো- বা শ্বৈত্যপ্রবাহ মাটির লালিমা ঢেকে দেয় হিমবাহ বিবস্ত্র মানচিত্রে লেগে থাকে বন্যা মহামারী হাঙ্গামা মড়ক আমি শুধু যাই না কোথাও । অমূর্ত প্রহরে এক বিপন্ন তরুণী তার বুকের দেরাজ খুলে ডাকছে আমায় দ্বিধায় দ্বিধায় কাটে আরো কিছুক্ষণ মলিন দিবস আমি তবু যাই না কোথাও ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1039
1846
পূর্ণেন্দু পত্রী
পাওয়া না-পাওয়ার কানামাছি
চিন্তামূলক
রঙীন রুমালে চোখ দুটো বাঁধা নিজের সঙ্গে নিজের অষ্টপ্রহর- কানামাছি খেলা ভারী চমৎকার ধাঁধা। যাকে ছোঁবার তাকে না ছুঁয়ে আকাশ ধরতে হাত বাড়িয়ে আমি ধুলো মাটির ভূয়ে। হাত বাড়ালে হাতে জলের বদলে শামুক অথচ ভেতরটা পরাগসুদ্ধ ফুলের জন্যে আপাদমস্তক কামুক। সিদুর রঙের কিছু দেখলেই মন উসখুস, ইচ্ছেয় আগুন বিশ্বাসের বাকলে সত্যিই এল ফাল্গুন? কাছে যাই, কাছে গেলেই সব অদলবদল, যথেচ্ছাচার কান্ড রক্তপাতের শব্দে শিউরে ওঠে গাছপালা নদীনালাময় দেশ চেনা ব্রক্ষ্মণ্ড। তবু তো ছুতে হবে কিছু, কাউকে-না কাউকে পুকুরপাড়ের নিমগাছ কি সাগরপারের ঝাউকে। পা নিয়েই সমস্যা, কোথায় রাখি, হয় পাঁক নয় অনিশ্চিতের বালি ভিক্ষের ঝুলিটা তবু যা হোক ভরছে নানারকম ভালো এবং মন্দে সমৃদ্ধ কাঙালী। মনে হচ্ছে কোথাও নেই অথচ আমার চেয়ার টেবিলে আমি ঠিকই আছি রঙীন রুমালে চোখ দুটো বাঁধা নিজের সঙ্গে পাওয়া না-পাওয়ার কানামাছি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1234
1799
পূর্ণেন্দু পত্রী
কাঠঠোকরা
প্রেমমূলক
কুড়োলে কাটার বয়স হয়ে এল। এবার চোখে ছানি, চুলে পাক। এখনো তোর ক্ষিধে মিটল না হারামজাদা? আমি কি গাছ আছি সেই আগের মতো? ছাল ফেটে আটখানা, হাজারটা ক্ষত হাড়ে-মাংসে এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় সেলাই। সুতোটা রঙিন, তাই রক্ষে ফোঁপরা ভেতরটা এড়িয়ে যায় দশজনের চক্ষে। যখন বয়স ছিল, দিয়েছি, যখন যা চেয়েছিস। ঠুকরে খেয়েছিস। চাইলি নদীর মতো শরীর, ভাসতে ডুবতে চাইলি গন্ধ রুমাল, টাটকা ঠোঁট গোলাপে রাঙা, পা ছড়িয়ে শোবার পালঙ্ক, পা ছড়িয়ে বসার ডাঙা। চাইলি মানপত্র সোনার থালায় তুমুল করতালি, কুচিফুল গলার মালায় চাইলি জিরাফের গলা, আকাশ থেকে যা দরকার পাড়বি, চাইলি লম্বা নখ, দ্রৌপদীর শাড়ি কাড়বি রোদ চাইলি রোদ, জ্যোৎস্না চাইলি জ্যোৎস্না সবই তো কাসুন্দির মতো চাটনি এবার একটু থির হয়ে বোস না। তা নয়, কেবল ঠোকর ঠোকর, ঠোঁটের ঘা। খুদ-কুঁড়ো বলতে এখন আছে তো কেবল স্মৃতি হতচ্ছাড়া! তাই খাবি? তো খা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1250
3958
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সিন্ধুপারে
রূপক
পউষ প্রখর শীতে জর্জর, ঝিল্লিমুখর রাতি; নিদ্রিত পুরী, নির্জন ঘর, নির্বাণদীপ বাতি। অকাতর দেহে আছিনু মগন সুখনিদ্রার ঘোরে-- তপ্ত শয্যা প্রিয়ার মতন সোহাগে ঘিরেছে মোরে। হেনকালে হায় বাহির হইতে কে ডাকিল মোর নাম-- নিদ্রা টুটিয়া সহসা চকিতে চমকিয়া বসিলাম। তীক্ষ্ণ শাণিত তীরের মতন মর্মে বাজিল স্বর-- ঘর্ম বহিল ললাট বাহিয়া, রোমাঞ্চকলেবর। ফেলি আবরণ, ত্যজিয়া শয়ন, বিরলসন বেশে দুরু দুরু বুকে খুলিয়া দুয়ার বাহিরে দাঁড়ানু এসে। দূর নদীপারে শূন্য শ্মশানে শৃগাল উঠিল ডাকি, মাথার উপরে কেঁদে উড়ে গেল কোন্‌ নিশাচর পাখি। দেখিনু দুয়ারে রমণীমুরতি অবগুণ্ঠনে ঢাকা-- কৃষ্ণ অশ্বে বসিয়া রয়েছে, চিত্রে যেন সে আঁকা। আরেক অশ্ব দাঁড়ায়ে রয়েছে, পুচ্ছ ভূতল চুমে, ধূম্রবরন, যেন দেহ তার গঠিত শ্মশানধূমে। নড়িল না কিছু, আমারে কেবল হেরিল আঁখির পাশে-- শিহরি শিহরি সর্ব শরীর কাঁপিয়া উঠিল ত্রাসে। পাণ্ডু আকাশে খণ্ড চন্দ্র হিমানীর গ্লানি-মাখা, পল্লবহীন বৃদ্ধ অশথ শিহরে নগ্ন শাখা। নীরব রমণী অঙ্গুলী তুলি দিল ইঙ্গিত করি-- মন্ত্রমুগ্ধ অচেতনসম চড়িনু অশ্ব-'পরি।বিদ্যুৎবেগে ছুটে যায় ঘোড়া-- বারেক চাহিনু পিছে, ঘরদ্বার মোর বাষ্পসমান মনে হল সব মিছে। কাতর রোদন জাগিয়া উঠিল সকল হৃদয় ব্যেপে, কণ্ঠের কাছে সুকঠিন বলে কে তারে ধরিল চেপে। পথের দুধারে রুদ্ধদুয়ারে দাঁড়ায়ে সৌধসারি, ঘরে ঘরে হায় সুখশয্যায় ঘুমাইছে নরনারী। নির্জন পথ চিত্রিতবৎ, সাড়া নাই সারা দেশে-- রাজার দুয়ারে দুইটি প্রহরী ঢুলিছে নিদ্রাবেশে। শুধু থেকে থেকে ডাকিছে কুকুর সুদূর পথের মাঝে-- গম্ভীর স্বরে প্রাসাদশিখরে প্রহরঘন্টা বাজে।অফুরান পথ, অফুরান রাতি, অজানা নূতন ঠাঁই-- অপরূপ এক স্বপ্নসমান, অর্থ কিছুই নাই। কী যে দেখেছিনু মনে নাহি পড়ে, ছিল নাকো আগাগোড়া-- লক্ষ্যবিহীন তীরের মতন ছুটিয়া চলেছে ঘোড়া। চরণে তাদের শব্দ বাজে না, উড়ে নাকো ধূলিরেখা-- কঠিন ভূতল নাই যেন কোথা, সকলি বাষ্পে লেখা। মাঝে মাঝে যেন চেনা-চেনা-মতো মনে হয় থেকে থেকে-- নিমেষ ফেলিতে দেখিতে না পাই কোথা পথ যায় বেঁকে। মনে হল মেঘ, মনে হল পাখি, মনে হল কিশলয়, ভালো করে যেই দেখিবারে যাই মনে হল কিছু নয়। দুই ধারে এ কি প্রাসাদের সারি? অথবা তরুর মূল? অথবা এ শুধু আকাশ জুড়িয়া আমারই মনের ভুল? মাঝে মাঝে চেয়ে দেখি রমণীর অবগুণ্ঠিত মুখে-- নীরব নিদয় বসিয়া রয়েছে, প্রাণ কেঁপে ওঠে বুকে। ভয়ে ভুলে যাই দেবতার নাম, মুখে কথা নাহি ফুটে; হুহু রবে বায়ু বাজে দুই কানে ঘোড়া চলে যায় ছুটে।চন্দ্র যখন অস্তে নামিল তখনো রয়েছে রাতি, পূর্ব দিকের অলস নয়নে মেলিছে রক্ত ভাতি। জনহীন এক সিন্ধুপুলিনে অশ্ব থামিল আসি-- সমুখে দাঁড়ায়ে কৃষ্ণ শৈল গুহামুখ পরকাশি। সাগরে না শুনি জলকলরব, না গাহে উষার পাখি, বহিল না মৃদু প্রভাতপবন বনের গন্ধ মাখি। অশ্ব হইতে নামিল রমণী, আমিও নামিনু নীচে, আঁধার-ব্যাদান গুহার মাঝারে চলিনু তাহার পিছে। ভিতরে খোদিত উদার প্রাসাদ শিলাস্তম্ভ-'পরে, কনকশিকলে সোনার প্রদীপ দুলিতেছে থরে থরে। ভিত্তির গায়ে পাষাণমূর্তি চিত্রিত আছে কত, অপরূপ পাখি, অপরূপ নারী, লতাপাতা নানা-মতো। মাঝখানে আছে চাঁদোয়া খাটানো, মুক্তা ঝালরে গাঁথা-- তারি তলে মণিপালঙ্ক-'পরে অমল শয়ন পাতা। তারি দুই ধারে ধূপাধার হতে উঠিছে গন্ধধূপ, সিংহবাহিনী নারীর প্রতিমা দুই পাশে অপরূপ। নাহি কোনো লোক, নাহিকো প্রহরী, নাহি হেরি দাসদাসী। গুহাগৃহতলে তিলেক শব্দ হয়ে উঠে রাশি রাশি। নীরবে রমণী আবৃত বদনে বসিলা শয্যা-'পরে, অঙ্গুলি তুলি ইঙ্গিত করি পাশে বসাইল মোরে। হিম হয়ে এল সর্বশরীর, শিহরি উঠিল প্রাণ-- শোণিতপ্রবাহে ধ্বনিতে লাগিল ভয়ের ভীষণ তান।সহসা বাজিয়া বাজিয়া উঠিল দশ দিকে বীণা-বেণু, মাথার উপরে ঝরিয়া ঝরিয়া পড়িল পুষ্পরেণু। দ্বিগুণ আভায় জ্বলিয়া উঠিল দীপের আলোকরাশি-- ঘোমটা-ভিতরে হাসিল রমণী মধুর উচ্চহাসি। সে হাসি ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া উঠিল বিজন বিপুল ঘরে-- শুনিয়া চমকি ব্যাকুল হৃদয়ে কহিলাম জোড়করে, "আমি যে বিদেশী অতিথি, আমায় ব্যথিয়ো না পরিহাসে, কে তুমি নিদয় নীরব ললনা, কোথায় আনিলে দাসে।'অমনি রমণী কনকদণ্ড আঘাত করিল ভূমে, আঁধার হইয়া গেল সে ভবন রাশি রাশি ধূপধূমে। বাজিয়া উঠিল শতেক শঙ্খ হুলুকলরব-সাথে-- প্রবেশ করিল বৃদ্ধ বিপ্র ধান্যদূর্বা হাতে। পশ্চাতে তার বাঁধি দুই সার কিরাতনারীর দল কেহ বহে মালা, কেহ বা চামর, কেহ বা তীর্থজল। নীরবে সকলে দাঁড়ায়ে রহিল-- বৃদ্ধ আসনে বসি নীরবে গণনা করিতে লাগিল গৃহতলে খড়ি কষি। আঁকিতে লাগিল কত না চক্র, কত না রেখার জাল, গণনার শেষে কহিল "এখন হয়েছে লগ্ন-কাল'। শয়ন ছাড়িয়া উঠিল রমণী বদন করিয়া নত, আমিও উঠিয়া দাঁড়াইনু পাশে মন্ত্রচালিতমত। নারীগণ সবে ঘেরিয়া দাঁড়ালো একটি কথা না বলি দোঁহাকার মাথে ফুলদল-সাথে বরষি লাজাঞ্জলি। পুরোহিত শুধু মন্ত্র পড়িল আশিস করিয়া দোঁহে-- কী ভাষা কী কথা কিছু না বুঝিনু, দাঁড়ায়ে রহিনু মোহে। অজানিত বধূ নীরবে সঁপিল শিহরিয়া কলেবর হিমের মতন মোর করে তার তপ্ত কোমল কর। চলি গেল ধীরে বৃদ্ধ বিপ্র, পশ্চাতে বাঁধি সার গেল নারীদল মাথায় কক্ষে মঙ্গল-উপচার। শুধু এক সখী দেখাইল পথ হাতে লয়ে দীপখানি-- মোরা দোঁহে পিছে চলিনু তাহার, কারো মুখে নাহি বাণী। কত না দীর্ঘ আঁধার কক্ষ সভয়ে হইয়া পার সহসা দেখিনু সমুখে কোথায় খুলে গেল এক দ্বার। কী দেখিনু ঘরে কেমনে কহিব, হয়ে যায় মনোভুল, নানা বরনের আলোক সেথায়, নানা বরনের ফুল। কনকে রজতে রতনে জড়িত বসন বিছানো কত, মণিবেদিকায় কুসুমশয়ন স্বপ্নরচিত-মতো। পাদপীঠ-'পরে চরণ প্রসারি শয়নে বসিলা বধূ-- আমি কহিলাম, "সব দেখিলাম, তোমারে দেখি নি শুধু।'চারি দিক হতে বাজিয়া উঠিল শত কৌতুকহাসি। শত ফোয়ারায় উছসিল যেন পরিহাস রাশি রাশি। সুধীরে রমণী দু-বাহু তুলিয়া, অবগুণ্ঠনখানি উঠায়ে ধরিয়া মধুর হাসিল মুখে না কহিয়া বাণী। চকিত নয়ানে হেরি মুখপানে পড়িনু চরণতলে, "এখানেও তুমি জীবনদেবতা!' কহিনু নয়নজলে। সেই মধুমুখ, সেই মৃদুহাসি, সেই সুধাভরা আঁখি-- চিরদিন মোরে হাসালো কাঁদালো, চিরদিন দিল ফাঁকি। খেলা করিয়াছে নিশিদিন মোর সব সুখে সব দুখে, এ অজানাপুরে দেখা দিল পুন সেই পরিচিত মুখে। অমল কোমল চরণকমলে চুমিনু বেদনাভরে-- বাধা না মানিয়া ব্যাকুল অশ্রু পড়িতে লাগিল ঝরে। অপরূপ তানে ব্যথা দিয়ে প্রাণে বাজিতে লাগিল বাঁশি। বিজন বিপুল ভবনে রমণী হাসিতে লাগিল হাসি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20150129112842/
1476
নির্মলেন্দু গুণ
কাক
চিন্তামূলক
কাকের মুখে তুলে দিয়েছি নষ্ট ডিম, এ নষ্ট জীবন আমি কার কাছে দেবো? বাসন্তী কোকিল হতে গিয়ে আমি ভুল করে হয়ে গেছি কাক।অথবা ছিলাম কাক, অপরাধে এই জন্মে নষ্ট ডিমের মত হয়েছি মানুষ।এরকম নষ্ট মানুষ আমি কোথায় লুকাবো? কার মুখে তুলে দেবো, জন্মান্তরে ভুল হয়ে যাওয় এরকম মানুষিক কাক?
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/kaak/