id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
36
অসীম সাহা
আমলা-নামা
ব্যঙ্গাত্মক
কিছু কিছু আমলা আছে তাদের বড়ো গামলা আছে তাতেই বহন করেন তারা মাল। তাদের অনেক পাওয়ার আছে অনেককিছু খাওয়ার আছে কুমির এনে তারাই কাটেন খাল। কেউ বা আবার খোদার খাসি কেউ বা আবার বাঘের মাসি কেউ বা আবার বিক্রি করেন দেশ। কেউ বা আবার মিষ্টি হেসে পাচার করেন সব বিদেশে দেশটা তখন হয় যে পুরো শেষ। আমলা নামক এই খুনিরা লাঞ্ছনা দেয়, যে গুণীরা জ্বালায় আলো সবার মনের মাঝে। তাঁদের ওরা আঘাত করে আগুন জ্বালায় তাঁদের ঘরে তবু তারা বহাল থাকে কাজে। যে আমলারা দেশপ্রেমিক তারাই ঘোরে এদিক-ওদিক পায় না তারা, তাদের যেটা ন্যায্য তার বদলে ভাগ্যে জোটে চাকরি থেকে রিজাইন মোটে মন্ত্রী সাহেব তাদের করেন ত্যাজ্য। ন্যায়ের বিচার পায় না তারা মাথার উপর প্রবল খাড়া পদোন্নতি হয় না তাদের ভাগ্যে। এই কথা আর লিখবো কতো সবাই বুঝুন নিজের মতো লিখবো না আর দুখের কথা, থাক গে।
https://www.bangla-kobita.com/asimsaha/amlanama/
445
কাজী নজরুল ইসলাম
মধুকর মঞ্জীর বাজে
প্রকৃতিমূলক
মধুকর মঞ্জীর বাজে বাজে গুন্‌ গুন্‌ মঞ্জুল গুঞ্জরণে মৃদুল দোদুল নৃত্যে বন শবরী মাতে কুঞ্জবনে।বাজায়ছে সমীর দখিনা পল্লবে মর্মর বীণা বনভুমি ধ্যান-আসীনা সাজিল রাঙা কিশলয় বসনে।ধূলি-ধূসর প্রান্তর পরেছিল গৈরিক সন্ন্যাসী সাজ নব দূর্বাদল শ্যাম হলো আনন্দে আজ।লতিকা বিতানে ওঠে ডাকি মুহু মুহু ঘুমহারা পাখি নব নীল অঞ্জন মাখি উদাসী আকাশ হাসে চাঁদের সনে।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/modhukor-monjir-bajey/
2360
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভারত-ভূমি
সনেট
কে না লোভে, ফণিনীর কুন্তলে যে মণি ভূপতিত তারারূপে, নিশাকালে ঝলে ? কিন্তু কৃতান্তের দূত বিষদন্তে গণি, কে করে সাহস তারে কেড়ে নিতে বলে ? হায় লো ভারত-ভূমি! বৃথা স্বর্ণ-জলে ধুইলা বরাঙ্গ তোর, কুরঙ্গ-নয়নি, বিধাতা ? রতন সিঁথি গড়ায়ে কৌশলে, সাজাইলা পোড়া ভাল তোর লো, যতনি! নহিস্ লো বিষময়ী যেমতি সাপিনী; রক্ষিতে অক্ষম মান প্রকৃত যে পতি ; পুড়ি কামানলে, তোরে করে লো অধীনী (হা ধিক্!) যবে যে ইচ্ছে, যে কামী দুৰ্ম্মতি! কার শাপে তোর তরে, ওলো অভাগিনি, চন্দন হইল বিষ;সুধা তিত অতি ?
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/bharat-bhumi/
3655
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভাগ্যরাজ্য
চিন্তামূলক
আমার এ ভাগ্যরাজ্যে পুরানো কালের যে প্রদেশ, আয়ুহারাদের ভগ্নশেষ সেথা পড়ে আছে পূর্বদিগন্তের কাছে। নিঃশেষ করেছে মূল্য সংসারের হাটে, অনাবশ্যকের ভাঙা ঘাটে জীর্ণ দিন কাটাইছে তারা অর্থহারা। ভগ্ন গৃহে লগ্ন ঐ অর্ধেক প্রাচীর; আশাহীন পূর্ব আসক্তির কাঙাল শিকড়জাল বৃথা আঁকড়িয়া ধরে প্রাণপণে বর্তমান কাল। আকাশে তাকায় শিলালেখ, তাহার প্রত্যেক অস্পষ্ট অক্ষর আজ পাশের অক্ষরে ক্লান্ত সুরে প্রশ্ন করে, "আরো কি রয়েছে বাকি কোনো কথা, শেষ হয়ে যায় নি বারতা।" এ আমার ভাগ্যরাজ্যে অন্যত্র হোথায় দিগন্তরে অসংলগ্ন ভিত্তি-'পরে করে আছে চুপ অসমাপ্ত আকাঙক্ষার অসম্পূর্ণ রূপ। অকথিত বাণীর ইঙ্গিতে চারিভিতে নীরবতা-উৎকণ্ঠিত মুখ রয়েছে উৎসুক। একদা যে যাত্রীদের সংকল্পে ঘটেছে অপঘাত, অন্য পথে গেছে অকস্মাৎ, তাদের চকিত আশা, স্থকিত চলার স্তব্ধ ভাষা জানায়, হয় নি চলা সারা-- দুরাশার দূরতীর্থ আজো নিত্য করিছে ইশারা। আজিও কালের সভা-মাঝে তাদের প্রথম সাজে পড়ে নাই জীর্ণতার দাগ, লক্ষ্যচ্যুত কামনায় রয়েছে আদিম রক্তরাগ। কিছু শেষ করা হয় নাই, হেরো, তাই সময় যে পেল না নবীন কোনোদিন পুরাতন হতে-- শৈবালে ঢাকে নি তারে বাঁধা-পড়া ঘাটে-লাগা স্রোতে; স্মৃতির বেদনা কিছু, কিছু পরিতাপ, কিছু অপ্রাপ্তির অভিশাপ তারে নিত্য রেখেছে উজ্জ্বল; না দেয় নীরস হতে মজ্জাগত গুপ্ত অশ্রুজল। যাত্রাপথ-পাশে আছ তুমি আধো-ঢাকা ঘাসে-- পাথরে খুদিতেছিনু, হে মূর্তি, তোমারে কোন্‌ ক্ষণে কিসের কল্পনে। অপূর্ণ তোমার কাছে পা না উত্তর। মনে যে কী ছিল মোর যেদিন ফুটিত তাহা শিল্পের সম্পূর্ণ সাধনাতে শেষ-রেখাপাতে, সেদিন তা জানিতাম আমি; তার আগে চেষ্টা গেছে থামি। সেই শেষ না-জানার নিত্য নিরুত্তরখানি মর্ম-মাঝে রয়েছে আমার; স্বপ্নে তার প্রতিবিম্ব ফেলি সচকিত আলোকের কটাক্ষে সে করিতেছে কেলি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bakharajj/
3180
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার সাথে নিত্য বিরোধ
ভক্তিমূলক
তোমার সাথে নিত্য বিরোধ আর সহে না– দিনে দিনে উঠছে জমে কতই দেনা। সবাই তোমায় সভার বেশে প্রণাম করে গেল এসে, মলিন বাসে লুকিয়ে বেড়াই মান রহে না। কী জানাব চিত্তবেদন, বোবা হয়ে গেছে যে মন, তোমার কাছে কোনো কথাই আর কহে না। ফিরায়ো না এবার তারে লও গো অপমানের পারে, করো তোমার চরণতলে চির-কেনা।
http://kobita.banglakosh.com/archives/463.html
1287
টুটুল দাস
তৃণভোজী
প্রেমমূলক
মৃত্যুর আরেক নাম বৃত্ত বৃহত্তম জ্যা’তে টাঙিয়ে দাও পুরানো অন্তর্বাস।বুকের গভীরতা খুঁজতে যে হাত ঢুকেছে সরস্বতীপূজার ব্লাউজে সে হাতের জলন্ত মোমবাতিতে আর যাই পুড়ুক শব্দগুচ্ছ পুড়বে না।শীত, বর্ষা, হেমন্ত, দুর্গাপূজা, ১৫ই আগষ্ট একেকটা রাতের দর একেক রকম; দর জানা না থাকলেও আমরা দর কষতে ভালোবাসি।দুটো ফুলের একসাথে মোহনার দিকে ভেসে যাবার নামই – প্রেম। উজানের দিকে তো অনাহার।কাকভোরে খিদে পায়নি, কাম পেয়েছে।একবার বাসন্তি রঙা ঠোঁট ছুঁয়েছিলাম সেই থেকে আমার এলার্জি, সমস্ত আমিষের মধ্যেই অধিকারের দুর্গন্ধ পাই। টুটুল দাসের কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a4%e0%a7%83%e0%a6%a3%e0%a6%ad%e0%a7%8b%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b8/
4852
শামসুর রাহমান
দৃশ্যাবলী
সনেট
প্রতিদিন কত কিছু চোখে পড়েঃ পথঘাট, যান, এবং দোকানপাট, ঝকঝকে, মানুষের ভিড়, রেস্তোরাঁ, শ্যামল পার্ক, নৌকোময় শান্ত নদীতীর চিড়িয়খানার বন্দী পশুপাখী, পুরোনো অর্গান। পথে কৃষ্ণচূড়ার বিদ্রোহ, একজন বর্ষীয়ান নিঃশব্দে পোহান স্মৃতি, তাঁর গলকস্বলের ভাঁজে চুমু খায় ভোরবেলা; বেহালাবাদক মাঝে মাঝে দেখা দেয়, নোংরা গলিটাও হয়ে ওঠে ঐকতান।দৃশ্যে পরেও দৃশ্য, ভিন্ন ভিন্ন, কেমন সুদূর অগোচরে থেকে যায়। কল্পনায় জাগে দীপাবলি, খৃষ্টপূর্ব কোনো কুমারীর হস্তধৃত পদ্মকলি, মায়াবী মানস হংস, সরোবর; বিপুল বৈভবে জেগে ওঠে সামান্যের অবয়ব কখনো বা, তবে হে মেয়ে তোমাকে স্বপ্নে দেখাটাই সবচে মধুর।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/drishyaboli/
3417
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকারভেদ
নীতিমূলক
বাবলাশাখারে বলে আম্রশাখা, ভাই, উনানে পুড়িয়া তুমি কেন হও ছাই? হায় হায়, সখী, তব ভাগ্য কী কঠোর! বাবলার শাখা বলে, দুঃখ নাহি মোর। বাঁচিয়া সফল তুমি, ওগো চূতলতা, নিজেরে করিয়া ভস্ম মোর সফলতা।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prokarved/
2138
মহাদেব সাহা
গোলাপের বংশে জন্ম
চিন্তামূলক
আমরা কেউ সঙ্ঘসেবকের দলে নেই, আমরা চিরদহনদাহনপ্রিয় মানুষের জন্ম সহোদর আমরা কবি ও কামুক আমরা পূণ্যাত্মা সন্ন্যাসী আমরা সামাজিক স্বাস্থ্যসুখবঞ্চিত স্বাধীন আমাদের হাতে শুদ্ধ-সংরক্ত গোলাপ তবু কাঁটার আঘাতে ক্ষত আহত অস্থির এই শোকে সুখে বড়ো ভালো আছি, বড়ো ভালো আছি যেন এই ছায়াতে মায়াতে। মধ্যরাতে আমাদের দাম্পত্যবিবাহ, সবুজ শরীর সেই মেয়েদের সঙ্গে সমারোহ কিন্তু পুনর্জন্ম নাই; একবার জন্মাই মরে যাই। গোলাপ ও কবির মধ্যে এটুকু সৌহার্দ, এইটুকু মিল এইভাবে হাওয়ায় হারাবে। এই ভাঙা ইট, পাথরের ধুলো, পরিপার্শ্ব এই মলিন মধুর তারা কতো অদম্য উড্ডীন, কতো পূর্ণতার দিকে যাত্রা কতো সিংহবাহী সেসবে চাঞ্চল্যহীন আরো সহজ ও গভীর উদাসীন আমরা চিরগহনগাহনপ্রিয় তোমাদেরই জন্ম সহোদর! আমরা বন্দী কোথাও নিশ্চিত বন্দী তবু ঠিক কারো কাছে নয় ফেরার সময় কিছু জন্মমৃত্যু খেলা, কিছু প্রাকৃত তন্ময় পথের উপরে সেই লাটবন্দী দাম্পত্যবিবাহ সেইখানে পাথর কুপিয়ে কিছু নদী খাল বন্দর বানানো, তা ছাড়া তেমন কোনো স্পষ্ট বাসা নেই, যা আছে তা উশকো খুশকো গলির ভিতর তেমন গরিব নই ভাঙা বাসা রেখেছি অম্লান আমাদের অসীম অনন্ত অপচয় মধ্যরাতে দাম্পত্য বিবাহ আর প্রাকৃত তন্ময় জমিসুদ্ধ কেঁপে ওঠে কোনো কোনো রাতে এই বিবাহবাসর কিন্তু কোনো প্রাপ্তির অধিক কাম্য গচ্ছিত রাখিনি বিদায়ে কাঁদাবে! শুধু ফেরার সময় মায়া মানুষের মতো, যেন সুখস্পর্শ যেন অন্ধকারে সম্ভাব্য আলোর এক অদৃশ্য আগ্রহ যেন সবুজ শিকারী আমাদের এই বুকে এতোটুকু মায়া শুধু স্পর্শ করে আছে এতোটুকু ভালোবাসায় খেয়েছে হয়তো এইখানে কোনো এক ছায়াতে মায়াতে আমরা বন্দী হয়ে আছি! তা ছাড়া অন্য কোনোখানে স্বচ্ছ চিহ্ন রাখি নাই আমাদের পা বড়ো মায়াবী হেঁটে যায় চিহ্নও রাখে না। দেয়ালে যেটুকু পড়ে মুখ থেকে মধ্যবর্তী দুপুরের ছায়া সে-ছায়াও অপরাহ্নে মেলাবে, আমরা জন্মাই মরে যাই আত্মায় আত্মজ কিছু নাই গোলাপের বংশে জন্ম আমাদের, আমরা কবি, আমরা সকাম সন্ন্যাসী, আমরা অসংলগ্ন গৃহস্ত মানুষ কোনো কোনো রাতে কেঁপে ওঠে আমাদের অনন্ত বাসর আমরা কবি আমর চিরদহনদাহনপ্রিয় তোমাদেরই জন্ম সহোদর!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1502
2637
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অস্ফুট ও পরিস্ফুট
নীতিমূলক
ঘটিজল বলে, ওগো মহাপারাবার, আমি স্বচ্ছ সমুজ্জ্বল, তুমি অন্ধকার। ক্ষুদ্র সত্য বলে, মোর পরিষ্কার কথা, মহাসত্য তোমার মহান্‌ নীরবতা।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/osfuto-o-porisfuto/
4017
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হম যব না রব সজনী
ভক্তিমূলক
হম যব না রব, সজনী, নিভৃত বসন্তনিকুঞ্জবিতানে       আসবে নির্মল রজনী— মিলনপিপাসিত আসবে যব, সখি,       শ্যাম হমারি আশে, ফুকারবে যব ‘রাধা রাধা’       মুরলি ঊরধ শ্বাসে, যব সব গোপিনী আসবে ছুটই        যব হম আওব না, যব সব গোপিনী জাগবে চমকই        যব হম জাগব না, তব কি কুঞ্জপথ হমারি আশে        হেরবে আকুল শ্যাম। বন বন ফেরই সো কি ফুকারবে        ‘রাধা রাধা’ নাম। না যমুনা, সো এক শ্যাম মম,        শ্যামক শত শত নারী— হম যব যাওব শত শত রাধা        চরণে রহবে তারি। তব্ সখি যমুনে, যাই নিকুঞ্জে,        কাহে তয়াগব দে। হমারি লাগি এ বৃন্দাবনমে কহ,       সখি, রোয়ব কে। ভানু কহে চুপি, মানভরে রহে,       আও বনে ব্রজনারী— মিলবে শ্যামক থরথর আদর,       ঝরঝর লোচনবারি॥
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ham-jab-na-rab-sajane/
5863
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সহজ
রূপক
কেমন সহজ আমি ফোটালাম একলক্ষ ফুল হঠাৎ দিলাম জ্বেলে কয়েকটা সুর্য চাঁদ তারা আবার খেয়াল হলে এক ফুঁয়ে নেভালাম সেই জ্যোৎস্না (মনে পড়ে কোন্‌‌ জ্যোৎস্না?) নেভালাম সেই রোদ (তাও মনে পড়ে?) নিন্দুকে নানান কথা আমাকে দেখিয়ে বলবে, বিশ্বাস করো না। হয়তো বলবে শিশু কংবা নির্বোধ অথবা ম্যাজিকওয়ালা- ছেঁড়া তাঁবু ফাটা বজনা, নানান সেলাই করা কালো কোর্তা গায়ে লোকটা কি মরণ খেলা খেলাচ্ছে আহা রে ঐ মেয়েটার চোখে, দর্শক ভুলছে না, হাসছে; আহা, শুধু অবঝ মেয়েটা মায়ার ওষুখে ভুগছে; বিশ্বাস করো না। দেখরে নিন্দুক দেখ, বামহাতে কনিষ্ঠ আঙউলে ত্রিজগৎ ধরে আছি কেমন সহজে, আমাকে অবাক চোখে দেখছে চেয়ে অন্ধকার, সমুদ্র, পাহাড় শুধু কি তোরাই ভুললি বিস্ময়ের ভাষা! আমার বাড়িতে আসবি, দেখবি সে কি আজব বাড়ি? মাথার উপরে ছাদ-চেয়ে দেখ, চারদিকে, দেয়াল রাখিনি, তোরাই দেয়াল ঘেরা, বুকে স্বপ্ন, শ্লেষ্মা নিয়ে চিরকাল থাকবি সাবধানে আঙুলে বয়স গুণে-শখ করে সে দেয়ালে নানা ছবি এঁকে আমার বাড়িতে দেখ অনুগত ভৃত্যের মতন নানান জাতের হাওয়া ঘুরছে ফিরছে, ঝুল ঝাড়ছে ছাতের কার্নিসে। নানান রঙের টান দিয়ে দেখছে, ব্যস্ত দিন রাত। আমি বসে ছবি আঁকছি দেয়ালবিহীন ঘরে মেয়েটির চোখে বাইরের ছবির চেয়ে চোখের মণিতে ছবি কেমন সহজ! তোরাই নির্বোধ শিশু, ফিরে যা নিন্দুক- আমাকে ম্যাজিকওয়ালা বললে তুমি বিশ্বাস করো না।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/287
1682
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
রৌদ্রের বাগান
প্রকৃতিমূলক
কেন আর কান্নার ছায়ায় অস্ফুট ব্যথার কানে কানে কথা বলো, বেলা বয়ে যায়, এসো এই রৌদ্রের বাগানে। এসো অফুরন্ত হাওয়ায়,– স্তবকিত সবুজ পাতার কিশোর মুঠির ফাঁকে ফাঁকে সারাটা সকাল গায়ে গায়ে যেখানে টগর জুঁই আর সূর্যমুখীরা চেয়ে থাকে। এসো, এই মাঠের উপরে খানিক সময় বসে থাকি, এসো, এই রৌদ্রের আগুনে বিবর্ণ হলুদ হাত রাখি। এই ধুধু আকাশের ঘরে এমন নীরব ছলোছলো করুণাশীতল হাসি শুনে ঘরে কে ফিরতে চায় বলো। এই আলো-হাওয়ার সকাল– শোনো ওগো সুখবিলাসিনী, কতদিন এখানে আসিনি, কত হাসি কত গান আশা দূরে ঠেলে দিয়ে কতকাল হয়নি তোমায় ভালোবাসা। কেন আর কান্নার ছায়ায় অস্ফুট ব্যথার কানে কানে কথা বলো, বেলা বয়ে যায়, এসো এই রৌদ্রের বাগানে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1627
4405
শামসুর রাহমান
আলাদা এক রাজ্য
রূপক
এই যে কবি ভর দুপুরে হন্তদন্ত হয়ে এখন যাচ্ছো কোথায় কোন্‌ ঠিকানা লক্ষ্য ক’রে? উশকো খুশকো ঢেউ-খেলানো লম্বা চুলের নিচে আছে মস্ত দামি মগজ বটে, সেখানে এক ফুল-বাগানে গানের পাখি সৃষ্টি করে সুরের আলো।হায়রে কবি, ধুলোয় তোমার পাঞ্জাবি আর পায়জামাটা ধূসর হলো, তবু হাঁটা থামছে না যে। আর কতটা পথ তোমাকে হাঁটতে হবে? দুপুরটি কি বিকেল হবে? নাকি কালো সন্ধ্যা হয়ে ভেঙচি কেটে ভয় দেখাবে ক্লান্ত এই পথচারীকে! কবি তুমি পথ হারালে বেলা শেষে?পথ হারালে যাবে কোথায় এ শহরে আলোবিহীন কোন্‌ অজানা আস্তানেতে? কেউ কি তোমার হাতটি ধ’রে নিয়ে যাবে শান্তিময়ী কারও কাছে, যার মোহিনী ছোঁয়ায় তুমি ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাবে ? কবি তোমার মনে তখন ফুলের মতো পদ্য কোনও উঠবে ফুটে।এইতো দ্যাখো কবি, তোমার কল্পনাকে ধনী ক’রে চতুর্দিকে আঁধার ছিঁড়ে জ্বলে ওঠে হাজার বাতি, এখন তুমি এই শহরে রাজা বটে। হাতে একটি কলম পেলে আলাদা এক রাজ্য জানি উঠবে গড়ে।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/alada-ek-rajyo/
1693
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
সন্ধ্যাসংগীত, প্রভাতসংগীত
চিন্তামূলক
বায়বীয় চাঁদকে নিয়ে এই আমাদের শেষ কবিতা, আমরা লিখে দিলাম। সময়ের জল-বিভাজিকায় দাঁড়িয়ে মানবীয় চাঁদকে নিয়ে এই আমাদের প্রথম কবিতা। দূর থেকে চাঁদকে যাঁরা ভালবেসেছিলেন, সেই প্রাচীন কবি ও প্রেমিকদের আমরা শেষ বংশধর। কাছে গিয়ে তার মৃত ওষ্ঠে যাঁরা প্রেমে-প্রত্যয়ে-সংশয়ে-দ্বিধায় আলোড়িত জীবনের তপ্ত চুম্বন স্থাপনা করবেন, সেই নবীন কবি ও প্রেমিকদের আমরা জনক। আমরাই সমাপ্তি, এবং আমরাই সূচনা। একটা কল্প শেষ হয়ে গেল (কল্প, ন কল্পনা?), আজ আর-এক কল্পের আরম্ভ। একটা ভাবনা শেষ হয়ে গেল, আজ আর-এক ভাবনার শুরু। দুই কল্পের, দুই ভাবনার, একই জন্মে দুই জীবনের মিলন-লগ্নে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। দেখতে পাচ্ছি– আমাদের একদিকে আজ পূর্ণগ্রাস, অন্যদিকে পূর্ণিমা
https://banglarkobita.com/poem/famous/1594
4471
শামসুর রাহমান
একটি কবিতার জন্য
রূপক
বৃক্ষের নিকটে গিয়ে বলি ; দয়াবান বৃক্ষ তুমি একটি কবিতা দিতে পারো ? বৃক্ষ বলে আমার বাকল ফুঁড়ে আমার মজ্জায় যদি মিশে যেতে পারো, তবে হয়তো বা পেয়ে যাবে একটি কবিতা ! জীর্ণ দেয়ালের কানে বলি ; দেয়াল আমাকে তুমি একটি কবিতা দিতে পারো ? পুরোনো দেয়াল বলে শ্যাওলা-ঢাকা স্বরে, এই ইঁট সুরকির ভেতর যদি নিজেকে গুঁড়িয়ে দাও, তবে হয়তো বা পেয়ে যাবে একটি কবিতা ! একজন বৃদেধের নিকট গিয়ে বলি, নতজানু, হে প্রাচীন দয়া ক'রে দেবেন কি একটি কবিতা ? স্তব্ ধতার পর্দা ছিঁড়ে বেজে ওঠে প্রাজ্ঞ কণ্ঠে - যদি আমার মুখের রেখাবলী তুলে নিতে পারো নিজের মুখাবয়বে, তবে হয়তো বা পেয়ে যাবে একটি কবিতা। কেবল কয়েক ছত্র কবিতার জন্যে এই বৃক্ষ, জরাজীর্ণ দেয়াল এবং বৃদ্ধের সম্মুখে নতজানু আমি থাকবো কতোকাল ? বলো কতোকাল ?
https://banglarkobita.com/poem/famous/590
4827
শামসুর রাহমান
দর্পণে প্রতিফলিত
রূপক
দর্পণে প্রতিফলিত এই মুখ কার? সত্যি কার? এ আমারই নাকি অন্য কারও? যতদূর মনে হয়, এ আমার নয়। এ রকম অচেনা, বেগানা মুখ কী ক’রে আমার হতে পারে? এই মুখমণ্ডলে কী গাঢ় রেখাবলী প্রস্ফুটিত, চোখ দুটো স্লান অতিশয়।এ কার চেহারা আমি বয়ে বেড়াচ্ছি এখন? ইচ্ছে হয়, এক্ষুণি বাতিল কাগজের মতো ছিঁড়ে ফেলে দিই ডাস্টবিনে। হামেশা সাবানে ঘষলেও কদাকার, জাঁহাবাজ, হিংস্র চিহ্নগুলি কখনও যাবে না মুছে। ধিক, তোকে ধিক, ব’লে এক পাখি উড়ে যায় ভাসমান মেঘে।দর্পণে প্রতিফলিত এই মুখ কফিলের? নাকি অনিলের? বড়ুয়ার? রিচার্ডের বুঝি? নয়, নয়, এদের কারুর নয়। যদি বলি বনের পশুর, তাহ’লে তারাও সমস্বরে প্রতিবাদে ভীষণ পড়বে ফেটে, বলবে ‘কোনো না, অপমান আমাদের। আমরা পারিনি হ’তে হিংস্র এই মতো’।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dorpone-protifolito/
3636
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বৈজ্ঞানিক
ছড়া
যেম্‌নি মা গো গুরু গুরু মেঘের পেলে সাড়া যেম্‌নি এল আষাঢ় মাসে বৃষ্টিজলের ধারা, পুবে হাওয়া মাঠ পেরিয়ে যেম্‌নি পড়ল আসি বাঁশ-বাগানে সোঁ সোঁ করে বাজিয়ে দিয়ে বাঁশি— অম্‌নি দেখ্‌ মা, চেয়ে— সকল মাটি ছেয়ে কোথা থেকে উঠল যে ফুল এত রাশি রাশি। তুই যে ভাবিস ওরা কেবল অম্‌নি যেন ফুল, আমার মনে হয় মা, তোদের সেটা ভারি ভুল। ওরা সব ইস্‌কুলের ছেলে, পুঁথি-পত্র কাঁখে মাটির নীচে ওরা ওদের পাঠশালাতে থাকে। ওরা পড়া করে দুয়োর-বন্ধ ঘরে, খেলতে চাইলে গুরুমশায় দাঁড় করিয়ে রাখে। বোশেখ-জষ্টি মাসকে ওরা দুপুর বেলা কয়, আষাঢ় হলে আঁধার করে বিকেল ওদের হয়। ডালপালারা শব্দ করে ঘনবনের মাঝে, মেঘের ডাকে তখন ওদের সাড়ে চারটে বাজে। অমনি ছুটি পেয়ে আসে সবাই ধেয়ে, হলদে রাঙা সবুজ সাদা কত রকম সাজে। জানিস মা গো, ওদের যেন আকাশেতেই বাড়ি, রাত্রে যেথায় তারাগুলি দাঁড়ায় সারি সারি। দেখিস নে মা, বাগান ছেয়ে ব্যস্ত ওরা কত! বুঝতে পারিস কেন ওদের তাড়াতাড়ি অত? জানিস কি কার কাছে হাত বাড়িয়ে আছে। মা কি ওদের নেইকো ভাবিস আমার মায়ের মতো? (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boiggyanik/
373
কাজী নজরুল ইসলাম
পথিক বঁধু
প্রেমমূলক
আজ   নলিন-নয়ান মলিন কেন বলো সখী বলো বলো! পড়ল মনে কোন্ পথিকের বিদায়-চাওয়া ছলছল? বলো সখী বলো বলো!!      মেঘের পানে চেয়ে চেয়ে বুক ভিজালে চোখের জলে, ওই সুদূরের পথ বেয়ে কি চেনা-পথিক গেছে চলে ফিরে আবার আসব বলে গো? স্বর শুনে কার চমকে ওঠ (আহা), ওগো ওযে বিহগ-বেহাগ, নির্ঝরিণীর কলকল। ও নয় গো তার পায়ের ভাষা (আহা) শীতের শেষের শুকনো পাতার ঝরে পড়ার বিদায়-ধ্বনি ও; কোন্ কালোরে কোন্ ভালোরে বাসলে ভালো (আহা) পরদেশি কোন্ শ্যামল বঁধুর শুনচ বাঁশি সারাক্ষণই গো? চুমচো কারে? ও নয় তোমার পথিক-বধুঁর চপল হাসি হা-হা, তরুণ ঝাউয়ের কচি পাতায় করুণ অরুণ কিরণ ও যে (আ-হা)! দূরের পথিক ফিরে নাকো আর (আহা আ-হা) ও সে সবুজ দেশের অবুঝ পাখি কখন এসে যাচবে বাঁধন, চলো সখী ঘরকে চলো! ও কী? চোখে নামল কেন মেঘের ছায়া ঢল ঢল॥(পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/pothik-bodhu/
4653
শামসুর রাহমান
খুলোনা এ মুখ
রূপক
তোমাকে দেখলে ভয় পাই খুব, বুকের ভেতর অশ্বক্ষুরের প্রখর শব্দ, জাগে কলরব প্রাকারে প্রকারে। ক্রূদ্ধ মশাল, কাঁপে থরথর ঘুমধরা হাড়, চোখে ভাসমান বেকসুর শব।তোমার অমন ভবিষ্যময় চোখে তাকালেই পারমাণবিক ভস্ম আমাকে করে দ্রুত গ্রাস হাতড়ে হাতড়ে কোনো সূত্রের পাই না যে খেই, পায়ের তলায় মাটি অস্থির, বর্বিত ত্রাস।দোহাই তোমার এক্ষুণি ফের খুলোনা এ মুখ। ফস ক’রে তুমি কী যে ব’লে দেবে, দেয়ালের দিকে তর্জনী তুলে স্তোত্র পাঠের উদাত্ত সুখ চোখে নেবে কিছু হয়তো আনবে কাল-রাত্রিকে।তোমার ভীষণ ভাবী কথনের নেই কোনো দাম মাঠে কি পার্কে, কলোনীতে, মেসে, গলির গুহায়। আত্মাকে ঢেকে খবর-কাগজে যারা অবিরাম প্রমত্ত তারা দেয়ালে কিছুই দেখে না তো, হায়।অন্যে বুঝুক না বুঝুক আমি জানি ঐ ঠোঁট নড়লেই কালবৈশাখী দেবে দিগন্তে হানা, প্রলয়ের সেনা গোপনে বাঁধবে নির্দয় জোট হত্যার সাথে, ঝাপটাবে খুব নিয়তির ডানা।তুমি বলেছিলে, জননী তোমার কুক্কুরী-রূপ পাবে একদিন, জনক সর্বনাশের বলয়ে ঘুরপাক খেয়ে হবেন ভীষণ একা, নিশ্চুপ; নগরে ধ্বনিত হবে শোকগীতি লম্বিত লয়ে। দেবতা তোমার জিহ্বায় কেমন অভিশাপ ঘিরে দিয়েছেন, তার ছায়ায় প্রতিটি গহন উক্তি ধ্বংস রটায় আধা-মনস্ক মানুষের ভিড়ে খুলবে না মুখ-এলো করি এই চরম চুক্তি।   (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khulona-e-mukh/
141
আল মাহমুদ
লোকে যাকে প্রেম নাম কহে
চিন্তামূলক
এই গতির মধ্যে মনে হয় কি যেন একটা স্থির হয়ে থাকে। আমাদের চারিদিকে যখন কোনো গতিকেই আমরা থামাতে পারছি না। সবকিছুই, না কলম না চিন্তা, এমন কি দীর্ঘজীবী বিপ্লবও মুখ থুবড়ে দ্রুত পেছনে হটে গিয়ে ক্রেনের আংটাকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে– মহামতি অনড় লেনিনের মূর্তের গলায় উপড়ে ফেলার শিকল পরাতে। তখন কেন মনে হবে এমন একটা কিছু আছে যা টলছে না? দ্যাখো তোমার মেয়েটিকে দ্যাখো, দুদিন আগেও যে কাঁটা বেছে না দিলে সরষে দেয়া পদ্মার ইলিশ পর্যন্ত মুখে তুলতে পারতো না এখন সে প্রেমের সাথে সাক্ষাতের জন্য উত্তর গোলার্ধের উত্তর প্রান্তে একাকী উড়াল দিতে টিকেট হাতে নাচছে। কত দ্রুত আমাদের হাত গলে বেরিয়ে যাওয়াশিশুরা বিশ্বের ভারসাম্যের দিকে ঘাড় নুইয়ে দৌড়ে গেল। আর আমরা ভাবলাম গতিই জীবন। গতিই যদি জীবন তবে তোমার আমার মধ্যে সুস্থিরতা কি আর অবশিষ্ট থাকে? এখন তুমি একটা চাদরে নকশা তুলছ। আর আমি দেখছি তোমার সর্বাঙ্গে লাবণ্যের ঘামে স্থিরছায়ার স্থবিরতা। তোমার আত্মার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে তোমার অমৃতের আধার দুটি। যা সন্তানের লেহনে, পানে আর তৃপ্তিতে অফুরন্ত। ও আমার অবাধ্য দৃষ্টি, তুমি স্থিরতার বেদীর ওপর এই বিশ্বময়ীকে দ্যাখো। লোকে যাকে সুখে ও যন্ত্রণায় প্রেম নাম কহে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3761.html
5653
সুকুমার রায়
বলব কি ভাই
ছড়া
বল্‌ব কি ভাই হুগ্‌লি গেলুম বলছি তোমায় চুপি চুপি- দেখ্‌তে পেলাম তিনটে শুয়োর মাথায় তাদের নেইকো টুপি।।   (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/bolbo-ki-vai/
5200
শামসুর রাহমান
লেয়ার্টেস
মানবতাবাদী
এই ছিল তবে আমার ভাগ্যে মধ্যদুপুরে বিনা মেঘে এই বিপুল বজ্রপাত? পিতা হত আর পিতৃশোকেই ভগ্নী আমার উন্মাদিনী সে হয়েছে আকস্মৎ।কত ঝঞ্ঝায় কত যে প্লাবনে কেটেছে আমার মাতৃস্নেহের ছায়াহীন শৈশব। বিকৃত শত মুখোশের ঢঙে নাচে অবিরত অধিবাস্তব নাট্যের কুশীলব।নাছোড় অশেষ দাবানল জ্বলে শিরায় শিরায়, হৃদয়ের শত ফুল্‌কি দুচোখে ওড়ে। তীক্ষ্ণ অসির সূচিমুখ আমি করছি পরখ, শক্র কোথায় কোন্‌ প্রান্তরে ঘোরে?আমার নিরাহ বয়েসী পিতার লাশ ওরা খুব তাড়াহুড়ো করে মাটিতে রেখেছে ঢেকে। রক্তের ঋণ শোধার জন্যে মনে হয় তিনি আর্ত কণ্ঠে আমাকেই যান ডেকে।আজীবন শুধু রাজসেবা করে জনক আমার বার্ধক্যেই হলেন অসির বলি। জঘন্য এই হত্যা আমাকে দেয় ধিক্কায়, আমি নিজস্ব ধোঁয়াটে নরকে জ্বলি।ভগ্নী আমার কালের বৃন্তে স্বর্গ কুসুম, মেলেছিল তার প্রতিটি পাপড়ি সুখে। রাজার কুমার কী জানি কেমন বাজালো বেহাগ, দুঃখ-ফলানো ঢেউ ওঠে তার বুকে। চৈতি রাতের স্বপ্নে মগ্ন যুবরাজ তাকে শোনালো ব্যাকুল মদির গুজ্ঞরণ। সোনালী নদীর মত সেই স্বর শুনে হয়ে গেল একটি মেলডি তরুণীর তনুমন।দর্শনঘেঁষা বাক্যবিলালসী বুদ্ধিজীবী সে, দিশাহারা যেন মননের সংকটে। ভগ্নী শোনেনি বারণা আমার, রাখেনি মিনতি- পড়ল জড়িয়ে ঊর্ণার ক্রুর জটে।কোন্‌ ইঙ্গিতে অপাপবিদ্ধ তরুণীর প্রতি কুমার করেছে নিষ্ঠুর আচরণ? নিশ্বাসে তার পুষ্পপোড়ানো গ্রীষ্মের দাহ, ভাষায় প্রাকৃত বৃশ্চিক-দংশন।সারল্য তার পায়নিকো ক্ষমা, মগজের কোষে অপ্রকৃতি গায় বড় এলোমেলো গান। তন্বী শরীরে জলচুম্বন, নিখাদ পূররী, ভুঁইচাপা আর জলবিছুটির ঘ্রাণ!রাজার বাগানে সাপ তোলে তার চক্কর-আঁকা ফুটন্ত মাথা; ঘাতক, গুপ্তচর আশপাশে ঘোরে, করে কানাঘুষো। মারি ও মড়কে কংকাল হয় কত লোক লস্কর।দশকে দশকে বাটপাড় আর ঘোড়ল দালাল, লুটেরার পাল আসে পালটিয়ে রূপ। ইতরজনের বহ্বারম্ভ সাধু সজ্জন ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে আজ বড় নিশ্চুপ। কানকখা শুনে মিত্রকা আমি শক্র ভেবেছি, সত্তা আমার হীন দ্বৈরথে মাতে। যে-জাল নিজেই বিছিয়েছি ষড়যন্ত্রে ব্যাপক, অসহায় আমি আটকা পড়েছি তাতে।জোর যার তার মুলুক সত্য, দুর্ভোগ বাড়ে গণমানুষের, খরাকবলিত দেশ। ঘুচাবো দীনতা, এমন সাধ্য নেই একতিল, আমি নগণ্য ব্যর্থ লেয়ার্টেস। রাজার কুমার হয়তো পারতো দুর্গ প্রাকারে জ্বালাতে সূর্য অমাবস্যার রাতে, কিন্তু এখানে কেবলি শবের ছড়াছড়ি আর বীর যুবরাজ নিহত আমারই হাতে।   (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/leartes/
715
জয় গোস্বামী
বিবাহের আগে শেষ দেখা
প্রেমমূলক
একসময় মনে হত কোনওদিন তোমাকে পাব না একসময় মনে হত ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায় আজকে শেষবার আমি তোমাকে পেলাম কালকের পর থেকে আমাকে নেবে না আর তুমি দুপুর ফুরিয়ে এল। এইবার ফিরে আসবে বাড়ির সবাই। আর একবার, আর একবার, এসো__ প্রথম দিনের মতো আবার পুড়িয়ে করো ছাই !
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/bibaher-age-shes-dekha/
3189
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
থাকে সে কাহালগাঁয়
ছড়া
থাকে সে কাহালগাঁয়; কলুটোলা আফিসে রোজ আসে দশটায় এক্কায় চাপি সে। ঠিক যেই মোড়ে এসে লাগাম গিয়েছে ফেঁসে, দেরি হয়ে গেল ব’লে ভয়ে মরে কাঁপি সে– ঘোড়াটার লেজ ধ’রে করে দাপাদাপি সে।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/thake-se-kahalgai/
5352
শামসুর রাহমান
হে পাখি, শহুরে পাখি
সনেট
চেতনায় ঝরে ঝরে সুর থেমে গেলো অকস্মাৎ। জানাজানি হবার মতন কিন্তু কিছুই ঘটেনি, দূর থেকে আসা সে সুরের দাম ক’পেনি করিনি যাচাই, শুধু এক জ্বলজ্বলে অভিঘাত স্মৃতিস্রোতে নিয়ে ঘুরি মনুষ্য সমাজে। দিনরাত কেটে যায় যথারীতি আহারে বিহারে কি নিদ্রায়, মাঝে-মাঝে সেই সুর চেতনায় ডানা ঝাপটায় এবং অব্যক্ত কবিতার মতো করে অশ্রুপাত।হে পাখি শহুরে পাখি, তুমিও করেছো বড়ো ভুল- এর কোনো ছিলো না দরকার, সাদামাটা শত কাজে ছিলাম জড়িয়ে নিত্য; তুমিও পল্লবে, দূর নীলে অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন ছিলে। তোমার এ সুর কী ব্যাকুল করেছে আমাকে আজ। যদি সুর থেমে যাবে সাঁঝে, তবে কেন হৃদয়ে আমার তুমি ডেকে উঠেছিলে?   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/he-pakhi-shohure-pakhi/
4234
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ভিতর-বাইরে বিষম যুদ্ধ
প্রেমমূলক
ইচ্ছে ছিলো তোমার কাছে ঘুরতে-ঘুরতে যাবোই আমার পুবের হাওয়া। কিন্তু এখন যাবার কথায় কলম খোঁজে অস্ত্র কোথায় এবং এখন তোমার পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা কুঞ্জলতায় রক্তমাখা চাঁদ ঢেকেছে আকুল চোখ ও মুখের মলিন আজকে তোমার ভিতর-বাইরে বিষম যুদ্ধ পুবের হাওয়া।।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/bhitor-baire-bishom-juddho/
407
কাজী নজরুল ইসলাম
বধূ-বরণ
প্রেমমূলক
এতদিন ছিলে ভূবনের তুমি আজ ধরা দিলে ভবনে, নেমে এলে আজ ধরার ধূলাতে ছিলে এতদিন স্বপনে! শুধু শোভাময়ী ছিলে এত দিন কবির মানসে কলিকা নলিন, আজ পরশিলে চিত্ত- পুলিন বিদায় গোধূলি- লগনে। ঊষার ললাট-সিন্দুর-টিপ সিথিঁতে উড়াল পবনে।। প্রভাতে ঊষা কুমারী, সেজেছে সন্ধ্যায় বধূ ঊষসী, চন্দন- টোপা- তারা- কলঙ্কে ভ'রেছে বে-দাগ- মু'শশী। মুখর মুখ আর বাচাল নয়ন লাজ সুখে আজ যাচে গুন্ঠন, নোটন- কপোতি কন্ঠে এখন কূজন উঠিছে উছসি'। এতদিন ছিলে শুধু রূপ- কথা, আজ হ'লে বধূ রূপসী।। দোলা চঞ্চল ছিল এই গেহ তব লটপট বেণী ঘা'য়, তারি সঞ্চিত আনন্দে ঝলে ঐ ঊর- হার মনিকায়। এ ঘরের হাসি নিয়ে যাও চোখে, সে গৃহ- দ্বীপ জ্বেলো এ আলোকে, চোখের সলিল থাকুক এ-লোকে- আজি এ মিলন মোহানায় ও- ঘরের হাসি বাশিঁর বেহাগ কাঁদুক এ ঘরে সাহানায়।। বিবাহের রঙ্গে রাঙ্গা আজ সব, রাঙ্গা মন, রাঙ্গা আভরণ, বলো নারী- "এই রক্ত- আলোকে আজ মম নব জাগরণ!" পাপে নয় পতি পুণ্যে সুমতি থাকে যেন, হ'য়ো পতির সারথি। পতি যদি হয় অন্ধ, হে সতী, বেঁধো না নয়নে আবরণ অন্ধ পতিরে আঁখি দেয় যেন তোমার সত্য আচরণ।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/161
21
অমিতাভ দাশগুপ্ত
বুকের
স্বদেশমূলক
যত দূরেই যাচ্ছি .           তোদের পায়ের শব্দ পাচ্ছি। তোরা আমার সঙ্গ ছাড়িস না, আঁচল পেতে আছেন বসে .                   ঐ আমাদের মা, একজোটে ঐ দুঃখিনীটির ঘরের দাওয়ায় যাবো .                            খুঁদকুড়ো যা পাই, সব্বাই খাবো।মাটি এখন জংলা ঐখানে ঠায় আছেন বসে .                           দুঃখিনী মা বাংলা, মায়ের দুধের মতন সরল ভাষা, এবার থেকে হোক আমাদের নিত্যি যাওয়া-আসা। .                                      যাচ্ছি মানে আসছি দূর থেকে কার পায়ের শব্দ শ্রবণে টের পাচ্ছি।যতই আকাশ গর্জায়, তোদের আমার অস্থি মাংস মজ্জায় ফিনিক দিয়ে উঠছে তবু .          বুকের বাংলা ভাষা— এবার থেকে ঐখানে হোক নিত্যি যাওয়া-আসা।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন যত দূরেই যাচ্ছি .           তোদের পায়ের শব্দ পাচ্ছি। তোরা আমার সঙ্গ ছাড়িস না, আঁচল পেতে আছেন বসে .                   ঐ আমাদের মা, একজোটে ঐ দুঃখিনীটির ঘরের দাওয়ায় যাবো .                            খুঁদকুড়ো যা পাই, সব্বাই খাবো।মাটি এখন জংলা ঐখানে ঠায় আছেন বসে .                           দুঃখিনী মা বাংলা, মায়ের দুধের মতন সরল ভাষা, এবার থেকে হোক আমাদের নিত্যি যাওয়া-আসা। .                                      যাচ্ছি মানে আসছি দূর থেকে কার পায়ের শব্দ শ্রবণে টের পাচ্ছি।যতই আকাশ গর্জায়, তোদের আমার অস্থি মাংস মজ্জায় ফিনিক দিয়ে উঠছে তবু .          বুকের বাংলা ভাষা— এবার থেকে ঐখানে হোক নিত্যি যাওয়া-আসা।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b7%e0%a6%be-amitava-dashgupta/
1005
জীবনানন্দ দাশ
খুঁজে তারে মরো মিছে
সনেট
খুঁজে তারে মরো মিছে — পাড়াগাঁর পথে তারে পাবে নাকো আর; রয়েছে অনেক কাক এ উঠানে — তবু সেই ক্লান্ত দাঁড়কাক নাই আর; — অনেক বছর আগে আমে জামে হৃষ্ট এক ঝাঁক দাঁড়কাক দেখা যেত দিন-রাত, — সে আমার ছেলেবেলাকার কবেকার কথা সব; আসিবে না পৃথিবীতে সেদিন আবার: রাত না ফুরাতে সে যে কদমের ডাল থেকে দিয়ে যেত ডাক, — এখনো কাকের শব্দে অন্ধকার ভোরে আমি বিমনা, অবাক তার কথা ভাবি শুধু; এত দিনে কোথায় সে? কি যে হলো তার কোথায় সে নিয়ে গেছে সঙ্গে করে সেই নদী, ক্ষেত, মাঠ, ঘাস, সেই দিন, সেই রাত্রি, সেই সব ম্নান চুল, ভিজে শাদা হাত সেইসব নোনা গাছ, করমচা, শামুক গুগলি, কচি তালশাসঁ সেইসব ভিজে ধুলো, বেলকুড়ি ছাওয়া পথ, ধোয়া ওঠা ভাত, কোথায় গিয়েছে সব? — অসংখ্য কাকের শব্দে ভরিছে আকাশ ভোর রাতে — নবান্নের ভোরে আজ বুকে যেন কিসের আঘাত!
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/khuje-tare-moro-michhe/
2412
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
হিড়িম্বা
সনেট
উজলি ঠৌদিক এবে রূপের কিরণে, বীরেশ ভীমের পাশে কর যোড় করি দাঁড়াইলা,প্রেম-ডোরে বাঁধা কায় মনে হিড়িম্বা;সুবর্ণ-কান্তি বিহঙ্গী সুন্দরী কিরাতের ফাঁদে যেন!ধাইল কাননে গন্ধামোদে অন্ধ অলি,আনন্দে গুঞ্জরি,--- গাইল বাসন্তামোদে শাখার উপরি মধুমাখা গীত পাখী সে নিকুঞ্জ-বনে। সহসা নড়িল বন ঘোর মড়মড়ে, মদ-মত্ত হস্তী কিম্বা গণ্ডার সরোষে পশিলে বনেতে,বন যেই মতে নড়ে! দীর্ঘ-তাল-তুল্য গদা ঘুরায়ে নির্ঘোষে, ছিন্ন করি লতা-কুলে ভাঙি বৃক্ষ রড়ে, পশিল হিড়িম্ব রক্ষঃ----রৌদ্র ভগ্নী-দোষে।
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/hirimba/
2546
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
তোতা পাখি
ছড়া
আতা গাছে তোতা পাখি ডালিম গাছে মউ, কথা কও না কেন বউ ? কথা কব কী ছলে, কথা কইতে গা জ্বলে !
http://kobita.banglakosh.com/archives/15.html
2391
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
শ্যামা-পক্ষী
সনেট
আঁধার পিঞ্জরে তুই,রে কুঞ্জ-বিহারি বিহঙ্গ, কি রঙ্গে গীত গাইস্ সুস্বরে ? ক মোরে, পূর্ব্বের সুখ কেমনে বিস্মরে মনঃ তোর ? বুঝা রে, যা বুঝিতে না পারি! সঙ্গীত-তরঙ্গ-সঙ্গে মিশি কি রে ঝরে অদৃশ্যে ও কারাগারে নয়নের বারি? রোদন-নিনাদ কি রে লোকে মনে করে মধুমাখা গীত-ধ্বনি, অজ্ঞানে বিচারি? কে ভাবে, হৃদয়ে তোর কি ভাব উথলে?— কবির কুভাগ্য তোর, আমি ভাবি মনে। দুখের আঁধারে মজি গাইস্ বিরলে তুই,পাখি, মজায়ে রে মধু-বরিষণে! কে জানে যাতনা কত তোর ভব-তলে ? মোহে গন্ধে গন্ধরস সহি হুতাশনে!
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/shyama-pokkhi/
4871
শামসুর রাহমান
নন্দনতত্ত্বের বই
চিন্তামূলক
বেলাশেষে পড়ছেন তিনি নন্দনতত্ত্বের বই গভীর অভিনিবেশে। তিনি আইডিয়ার অথই সমুদ্রে নাবিক সুপ্রাচীন। জানি দেশজোড়া খ্যাতি তাঁর পাণ্ডিত্যের, মনীষার; আর বন্ধুবর্গ, জ্ঞাতি সকলেই জানে তাঁর চক্ষুদ্বয় ঘোরে নিরিবিলি বইয়ের পাতায়, তত্ত্ব ও তথ্যের খুব ঝিলিমিলি দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে। কদাচিৎ তিনি চোখ তুলে বই থেকে তাকান আকাশে আর দিব্যি ভুলেথাকেন প্রায়শ নাওয়া খাওয়া। নিজেকে আড়ালে রেখে ধুন্দুমার হট্ররোল থেকে প্রায় সব কিছু থেকে নিভৃতে করেন ধ্যান-সুন্দরের। মানে তাঁর ডানে বামে তাকাবার নেই মহলত। কোনো সুর কানে ভেসে এলে দূর থেকে হন সচকিত, তারপর আবার পড়েন ঝুঁকে অগণিত ছাপার অক্ষরে। বইয়ের পাতায় তিনি সৌন্দর্য খোঁজেন রাত্রিদিন, দ্যাখেন যাচাই ক’রে কী বলেন রসিক রাসকিন অথবা কেনেথ ক্লার্ক। অথচ খেয়াল নেই কবে আড়ালে আত্মঙ্গ তাঁর হলো তম্বী রূপের বৈভবে!  (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nondontotter-boi/
43
অ্যালেন গিন্সবার্গ
আমার বিষণ্ন সত্তা
চিন্তামূলক
কখনও কখনও আমার চোখ রক্তাভ হয়ে এলে আরসিএ ভবনের একেবাও উপরে উঠে যাই, আমার পৃথিবীর দিকে অপলক চেয়ে থাকি, ম্যানহাটান — ভবনগুলো, সড়কগুলো, যেখানে রয়েছে আমার সফলতা ছাদের ঘর, বিছানাপত্র, ঠান্ডা জলের ফ্ল্যাট — ফিফথ এভিন্যু, যার নিচে মনে করতে পারি, পিঁপড়ের সারির মতো গাড়ী, ছোট ছোট হলুদ ট্যাক্সি, লোকজন উলের ফুটকির মতো চলমান— সেতুর দৃশ্যশ্রেণী, ব্রুকলীন-মেশিনের ওপরের সূর্য ওঠা, সূর্য চলে যায় নিউ জার্সির দিকেযেখানে জন্ম আমার প্যাটারসনে, যেখানে খেলেছি পিঁপড়ের সাথে— পরবর্তী ভালবাসা ফিফটিন স্ট্রীট, লোয়ার ইস্ট সাইড, একসময় ব্রংসের দুরের পথের রূপকথার মতো টান — পথগুলো এই সড়কের গভীরে লুকিয়ে সংক্ষেপ করেছে আমার ইতিহাস, অনুপস্থিতি এবং হারলেমে আমার উল্লাস — সূর্য আলো ছড়ায় আমার প্রতিটি জিনিসের ওপর চোখের পলকে সরে যায় দিগন্তে আমার অন্তিম অনন্তের মধ্যে— যার উপাদন জল। বিষণ্ন মনে, এলিভেটরে উঠি, চলে যাই নিচে, চিন্তান্বিত, ফুটপাত দিয়ে হাঁটি সব মানুষের পুরু চশমার গভীরে, মুখের দিকে তাকিয়ে, প্রশ্ন ক’রে ক’রে কার আছে ভালবাসা এবং থেমে যাই হতবুদ্ধি, মোটরগাড়ীর জানালার সামনে দাঁড়িয়ে যাই নীরব ভাবনায় ফিফথ এভিন্যু বরাবর গাড়ীর বহর আসে-যায় পেছন রোধ ক’রে দাঁড়িয়ে যাই মুহূর্তের জন্য যখন… সময় ঘরে ফেরার, দুপুরের রান্নার, রেডিওতে রোমান্টিক যুদ্ধের সংবাদ শোনার; সমস্ত সচলতা থেমে যায় হেঁটে চলি অস্তিত্বের সীমাহীন বিষণ্নতায়, দালানের মধ্য দিয়ে ব’য়ে যায় কোমলতা, বাস্তবতার অবয়ব স্পর্শ করে আমার আঙুলের ডগা, অশ্রুর রেখায় পূর্ণ সারাটা মুখ,কিছু জানালার আয়নায়— সন্ধ্যায়— যেখানে আকাক্সক্ষা নেই কোনো— বনবন মিষ্টির জন্য— কিংবা পোশাক পাবার বা জাপানী বোধের বাতির ঢাকনায় — চারপাশের চশমায় দ্বিধান্বিত আমি, সড়কে সংগ্রাম ক’রে চলে পুরুষেরা ব্যাগ, সংবাদপত্র, টাই, সুন্দর সব স্যুট নিয়ে আকাক্ষার দিকে নারী-পুরুষ ধেয়ে চলে ফুটপাতের ওপরে, লালবাতি ঘড়িতে গতি আনে আর সচলতা প্রতিবন্ধকের — এইসব সড়কগুলো চলে গেছে আড়াআড়ি, ভেঁপুর আওয়াজে দীর্ণ,বিস্তৃত এভিন্যু দিয়ে উঁচু উঁচু ভবনে ঠাঁসা অথবা বস্তিতে আবৃত থেমে থাকা জ্যাম বরাবর গাড়ী আর ইঞ্জিনের গর্জনে দারুণ বেদনার্ত হয়ে গ্রামাঞ্চলে, এই সমাধিস্থলে এই নিস্তব্ধতায় মৃত্যু- বিছানায় অথবা পাহাড়ে দেখেছি একদিন, কখনও পাইনি ফিরে বা চাইনি স্মরণে আনবার— যেখানে আমার দেখা ম্যানহাটান হারিয়ে যাবে নিশ্চিত।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3767.html
2831
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এবার নীরব করে দাও
ভক্তিমূলক
এবার  নীরব করে দাও হে তোমার মুখর কবিরে। তার  হৃদয়-বাঁশি আপনি কেড়ে বাজাও গভীরে। নিশীথরাতের নিবিড় সুরে বাঁশিতে তান দাও হে পুরে যে তান দিয়ে অবাক কর’ গ্রহশশীরে।যা-কিছু মোর ছড়িয়ে আছে জীবন-মরণে, গানের টানে মিলুক এসে তোমার চরণে। বহুদিনের বাক্যরাশি এক নিমেষে যাবে ভাসি, একলা বসে শুনব বাঁশি অকূল তিমিরে।৩০ চৈত্র, ১৩১৬ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ebar-nirob-kore-dao/
3372
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পশ্চাতের নিত্যসহচর, অকৃতার্থ হে অতীত
সনেট
পশ্চাতের নিত্যসহচর, অকৃতার্থ হে অতীত, অতৃপ্ত তৃষ্ণার যত ছায়ামূর্তি প্রেতভূমি হতে নিয়েছ আমার সঙ্গ, পিছু-ডাকা অক্লান্ত আগ্রহে আবেশ-আবিল সুরে বাজাইছ অস্ফুট সেতার, বাসাছাড়া মৌমাছির গুন গুন গুঞ্জরণ যেন পুষ্পরিক্ত মৌনী বনে। পিছু হতে সম্মুখের পথে দিতেছ বিস্তীর্ণ করি’ অস্ত শিখরের দীর্ঘ ছায়া নিরন্ত ধূসর পাণ্ডু বিদায়ের গোধূলি রচিয়া। পশ্চাতের সহচর, ছিন্ন করো স্বপ্নের বন্ধন; রেখেছ হরণ করি’ মরণের অধিকার হতেবেদনার ধন যত, কামনার রঙিন ব্যর্থতা, মৃত্যুরে ফিরায়ে দাও। আজি মেঘমুক্ত শরতের দূরে-চাওয়া আকাশেতে ভারমুক্ত চির পথিকের বাঁশিতে বেজেছে ধ্বনি, আমি তারি হব অনুগামী।   (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/poshchater-nityosohochor-okritarther-he-otit/
3023
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘুমের তত্ব
ছড়া
জাগার থেকে ঘুমোই , আবার ঘুমের থেকে জাগি — অনেক সময় ভাবি মনে কেন , কিসের লাগি ? আমাকে , মা , যখন তুমি ঘুম পাড়িয়ে রাখ তখন তুমি হারিয়ে গিয়ে তবু হারাও নাকো । রাতে সূর্য , দিনে তারা পাই নে , হাজার খুঁজি । তখন তা'রা ঘুমের সূর্য , ঘুমের তারা বুঝি ? শীতের দিনে কনকচাঁপা যায় না দেখা গাছে , ঘুমের মধ্যে নুকিয়ে থাকে নেই তবুও আছে । রাজকন্যে থাকে , আমার সিঁড়ির নিচের ঘরে । দাদা বলে , ' দেখিয়ে দে তো । ' বিশ্বাস না করে । কিন্তু , মা , তুই জানিস নে কি আমার সে রাজকন্যে ঘুমের তলায় তলিয়ে থাকে , দেখি নে সেইজন্যে । নেই তবুও আছে এমন নেই কি কত জিনিস ? আমি তাদের অনেক জানি , তুই কি তাদের চিনিস ? যেদিন তাদের রাত পোয়াবে উঠবে চক্ষু মেলি সেদিন তোমার ঘরে হবে বিষম ঠেলাঠেলি । নাপিত ভায়া , শেয়াল ভায়া , ব্যাঙ্গমা বেঙ্গুমী ভিড় ক'রে সব আসবে যখন কী যে করবে তুমি ! তখন তুমি ঘুমিয়ে পোড়ো আমিই জেগে থেকে নানারকম খেলায় তাদের দেব ভুলিয়ে রেখে । তার পরে যেই জাগবে তুমি লাগবে তাদের ঘুম , তখন কোথাও কিচ্ছুই নেই সমস্ত নিজ্‌ঝুম ।   (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ghumer-totto/
3365
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরিচয় (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
নীতিমূলক
দয়া বলে, কে গো তুমি মুখে নাই কথা? অশ্রুভরা আঁখি বলে, আমি কৃতজ্ঞতা।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/porichoy-konika/
12
অমিতাভ দাশগুপ্ত
এই
মানবতাবাদী
আজ রাতে .          যখন চারপাশ সুনসান, মশারির অনের নিচু থেকে .                  অম্লজান টানার শব্দ, গলি-উপগলি-কানাগলির শিরায়, টানেলে .                                     ঝুপঝাপ অন্ধকার, গাড়িবারান্দার নীচে .                     ঘর-ছুট্ মানুষ আর আকাশের অশ্রুর লবণ মিলে-মিশে একাকার, .                           শ্যামবাজারের পঞ্চমুখী মোহনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ঘোড়ার লেজের ওপর .                           ঘনঘন ছিপ্ টি মারছে বিদ্যুৎ বেশ্যার থালার ওপর .                    মাংসভুক পুলিশের থাবা, শ্মশানে-শ্মশানে চিতার আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে থাকা মানুষজনের হাতে হাতে ভোলাবাবার ধোঁয়াটে প্রসাদ, তিন ইঁটের উনুনে টগবগ শাকপাতায় ত্রিনয়ন রেখে ফুটপাথের অন্নপূর্ণা, তাকে ঘিরে .            কয়েকটি হাভাতে-জাতকের ছায়া পাতালের দরজায় ঘাতক, হাসপাতালের দরজায় মরণ . . . ঠিক তখনই .           আমি তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি, জুলিয়াস সিজার! তোমাকে তিনবার মুকুট সাধা হয়েছিল। তিনবার তুমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে। কাস্ কা, ব্রুটাস, অ্যান্টনিদের ভীড় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধ .                                 তোমার পায়ের শব্দ, আগুনের কপাট-খোলা সব কটি চুল্লি এখন তোমার হাঁ-মুখ, আকাশ-প্রেমিক সোনালি অ্যাপার্টমেন্ট-এর মাথায় জ্বল জ্বল তোমার লাল চোখ,চিমনির ধোঁয়ায় গঙ্গার জলে বেবিফুডহীন শিশুদিবসের কালো আকাশে তোমার নিশ্বাসের বিষ, কলকাতার প্রতিটি মানুষের ঘাড়ের ওপর .              নেকড়ের মত গড়িয়ে ওঠা তোমার উল্লাস আমার হাতে তুলে নিয়েছি এই একাঘ্ন এই ক্ষমাহীন কলম যা দিয়ে আজ রাতে আমি তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছি, .                             জুলিয়াস সিজার!তোমার শববাহকেরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরম অধীরতায় পাথুরে রাস্তায় জুতোর নালের শব্দ তুলছে, কালো কাপড় তোমাকে ঢেকে দেবে বলে অতিকায় ডানা মেলে .                  ছটফট করছে হাওয়ায় হাওয়ায়, হাজা-মজা মানুষের হাতে হাতে উঠে আসছে .                     প্রত্নের পাথর, কুষ্ঠরোগীর শক্ত মুঠি .              পাল্টে যাচ্ছে গ্রেনেডে, তোমার মধ্যরাতের সুরায় মিশে যাচ্ছে নিহত ভূমিপুত্রের বুক ভেঙে উঠে আসা .                                        আর্সেনিক, তোমার প্রিয় গোলাপের পাপড়ির আড়ালে অপেক্ষায় স্থির বজ্রকীট, ভিখারি ক্রীতদাস ধর্ষিতা কিশোরী অপমানিত বিদূষকদের চোখ আর আমার চিঠির প্রতিটি অক্ষর নিবু নিবু লণ্ঠনের আলোয় তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কত কল্পান্তের শেষে টেনে নিয়ে এসেছে আজ এই রাতে বলির বাজনায় ঝা ঝা মশানভাঙার মাটিতে।এই স্পার্টাকাস-রাত আর এই একাঘ্নী চিঠি তোমার শববাহকদের সঙ্গে শেষবারের মতো কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিচ্ছে, .                    জুলিয়াস সিজার!কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন আজ রাতে .          যখন চারপাশ সুনসান, মশারির অনের নিচু থেকে .                  অম্লজান টানার শব্দ, গলি-উপগলি-কানাগলির শিরায়, টানেলে .                                     ঝুপঝাপ অন্ধকার, গাড়িবারান্দার নীচে .                     ঘর-ছুট্ মানুষ আর আকাশের অশ্রুর লবণ মিলে-মিশে একাকার, .                           শ্যামবাজারের পঞ্চমুখী মোহনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ঘোড়ার লেজের ওপর .                           ঘনঘন ছিপ্ টি মারছে বিদ্যুৎ বেশ্যার থালার ওপর .                    মাংসভুক পুলিশের থাবা, শ্মশানে-শ্মশানে চিতার আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে থাকা মানুষজনের হাতে হাতে ভোলাবাবার ধোঁয়াটে প্রসাদ, তিন ইঁটের উনুনে টগবগ শাকপাতায় ত্রিনয়ন রেখে ফুটপাথের অন্নপূর্ণা, তাকে ঘিরে .            কয়েকটি হাভাতে-জাতকের ছায়া পাতালের দরজায় ঘাতক, হাসপাতালের দরজায় মরণ . . . ঠিক তখনই .           আমি তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি, জুলিয়াস সিজার! তোমাকে তিনবার মুকুট সাধা হয়েছিল। তিনবার তুমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে। কাস্ কা, ব্রুটাস, অ্যান্টনিদের ভীড় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধ .                                 তোমার পায়ের শব্দ, আগুনের কপাট-খোলা সব কটি চুল্লি এখন তোমার হাঁ-মুখ, আকাশ-প্রেমিক সোনালি অ্যাপার্টমেন্ট-এর মাথায় জ্বল জ্বল তোমার লাল চোখ,চিমনির ধোঁয়ায় গঙ্গার জলে বেবিফুডহীন শিশুদিবসের কালো আকাশে তোমার নিশ্বাসের বিষ, কলকাতার প্রতিটি মানুষের ঘাড়ের ওপর .              নেকড়ের মত গড়িয়ে ওঠা তোমার উল্লাস আমার হাতে তুলে নিয়েছি এই একাঘ্ন এই ক্ষমাহীন কলম যা দিয়ে আজ রাতে আমি তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছি, .                             জুলিয়াস সিজার!তোমার শববাহকেরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরম অধীরতায় পাথুরে রাস্তায় জুতোর নালের শব্দ তুলছে, কালো কাপড় তোমাকে ঢেকে দেবে বলে অতিকায় ডানা মেলে .                  ছটফট করছে হাওয়ায় হাওয়ায়, হাজা-মজা মানুষের হাতে হাতে উঠে আসছে .                     প্রত্নের পাথর, কুষ্ঠরোগীর শক্ত মুঠি .              পাল্টে যাচ্ছে গ্রেনেডে, তোমার মধ্যরাতের সুরায় মিশে যাচ্ছে নিহত ভূমিপুত্রের বুক ভেঙে উঠে আসা .                                        আর্সেনিক, তোমার প্রিয় গোলাপের পাপড়ির আড়ালে অপেক্ষায় স্থির বজ্রকীট, ভিখারি ক্রীতদাস ধর্ষিতা কিশোরী অপমানিত বিদূষকদের চোখ আর আমার চিঠির প্রতিটি অক্ষর নিবু নিবু লণ্ঠনের আলোয় তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কত কল্পান্তের শেষে টেনে নিয়ে এসেছে আজ এই রাতে বলির বাজনায় ঝা ঝা মশানভাঙার মাটিতে।এই স্পার্টাকাস-রাত আর এই একাঘ্নী চিঠি তোমার শববাহকদের সঙ্গে শেষবারের মতো কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিচ্ছে, .                    জুলিয়াস সিজার!
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%87-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%a4-amitava-dashgupta/
1178
জীবনানন্দ দাশ
যে কামনা নিয়ে
প্রেমমূলক
যে কামনা নিয়ে মধুমাছি ফেরে বুকে মোর সেই তৃষা! খুঁজে মরি রূপ, ছায়াধূপ জুড়ি, রঙের মাঝারে হেরি রঙডুবি! পরাগের ঠোঁটে পরিমল-গুঁড়ি,- হারায়ে ফেলি গো দিশা! আমি প্রজাপতি-মিঠা মাঠে মাঠে সোঁদালে সর্ষেক্ষেতে; -রোদের সফরে খুঁজি নাকো ঘর, বাঁধি নাকো বাসা-কাঁপি থরথর। অতসী ছুঁড়ির ঠোঁটের উপর শুঁড়ির গেলাসে মেতে! আমি দক্ষিণা-দুলালীর বীণা,পউষ-পরশ-হারা! ফুল-আঙিয়ার আমি ঘুমভাঙা! পিয়াল চুমিয়া পিলাই গো রাঙা পিয়ালার মধু,- তুলি রাতজাগা হোরীর হা রা রা সাড়া! আমি গো লালিমা,-গোধূলির সীমা,- বাতাসের ‘লাল’ ফুল। দুই নিমেষের তরে আমি জ্বালি নীল আকাশের গোলাপী দেয়ালি! আমি খুশরোজী,-আমি গো খেয়ালি, চঞ্চল,- চুলবুল। বুকে জ্বলে মোর বাসর দেউটি,-মধু-পরিণয়-রাতি! তুলিছে ধরণী বিধবা-নয়ন -মনের মাঝারে মদনমোহন মিলননদীর নিধুর কানন রেখেছে রে মোর পাতি !
https://banglarkobita.com/poem/famous/919
1948
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ভাই ভাই
মানবতাবাদী
(সমবেত বাঙ্গালিদিগের সভা দেখিয়া) ১ এক বঙ্গভূমে জনম সবার, এক বিদ্যালয়ে জ্ঞানের সঞ্চার, এক দুঃখে সবে করি হাহাকার, ভাই ভাই সবে, কাঁদ রে ভাই। এক শোকে শীর্ণ সবার শরীর, এক শোকে বয় নয়নের নীর, এক অপমানে সবে নতশির, অধম বাঙ্গালি মোরা সবাই || ২ নাহি ইতিবৃত্ত নাহিক গৌরব, নাহি আশা কিছু নাহিক বৈভব, বাঙ্গালির নামে করে ছিছি রব, কোমল স্বভাব, কোমল দেহ। কোমল করেতে ধর কমলিনী, কোমল শয্যাতে, কোমল শিঞ্জিনী, কোমল শরীর, কোমল যামিনী, কোমল পিরীতি, কোমল স্নেহ || ৩ শিখিয়াছ শুধু উচ্চ চীৎকার! “ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!” সার দেহি দেহি দেহ বল বার বার না পেলে গালি দাও মিছামিছি। দানের অযোগ্য চাও তবু দান, মানের অযোগ্য রাখ তবু মান, বাঁচিতে অযোগ্য রাখ তবু প্রাণ, ছিছি  ছিছি  ছিছি! ছি  ছি  ছি  ছি। ৪ কার উপকার করেছ সংসারে? কোন্ ইতিহাসে তব নাম করে? কোন্ বৈজ্ঞানিক বাঙ্গালির ঘরে? কোন্ রাজ্য তুমি করেছ জয়? কোন্ রাজ্য তুমি শাসিয়াছ ভাল? কোন্ মারাথনে ধরিয়াছ ঢাল? এই বঙ্গভূমি এ কাল সে কাল অরণ্য, অরণ্য অরণ্যময় || ৫ কে মিলাল আজি এ চাঁদের হাট? কে খুলিল আজি মনের কপাট? পড়াইব আজি এ দুঃখের পাঠ, শুন ছি ছি রব, বাঙ্গালি নামে, য়ুরোপে মার্কিনে ছিছি ছিছি বলে, শুন ছিছি ছিছি রব, হিমালয়তলে, শুন ছিছি ছিছি রব, সমুদ্রের জলে, স্বদেশে, বিদেশে, নগরে, গ্রামে || ৬ কি কাজ বহিয়া এ ছার জীবনে, কি কাজ রাখিয়া এ নাম ভুবনে, কলঙ্ক থাকিতে কি ভয় মরণে? চল সবে মরি পশিয়া জলে। গলে গলে ধরি, চল সবে মরি, সারি সারি সারি, চল সবে মরি, শীতল সলিলে এ জ্বালা পাসরি, লুকাই এ নাম সাগরতলে ||
https://banglarkobita.com/poem/famous/930
2502
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রাগৈতিহাসিক
চিন্তামূলক
অতীত যেখানে শুরু সেই পথে হেঁটে যেতে যেতে নৃমুণ্ডের মাঠ আর রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে হাত রেখে দেখি সেদিনের মানুষের দহনের ইতিহাস লেখা আছে নির্বাক পাথরে বৃক্ষের কঙ্কালে আর ফসিলের দোকানে দোকানে সেই পথে যেতে যেতে আস্ত এক চাঁদ ঢুকে আমার খুলিতে কল্পনার দরোজায় তোমাকে হাজির করে দিলো এসব আমার ভালো লাগে না মোটেই - তবু পাশাপাশি চলি যেতে যেতে মনে হয় তুমিও দোকানে ঝুলে ছিলে বাঁকানো সলাকা বিদ্ধ মাংসের ফসিল হয়ে আমার পাশেই মাংস শব্দটায় এক জৈবিক আস্বাদ আছে বলেই দৈবাৎ আদিম ইচ্ছের রাতে জেগে উঠি সেকালের তুমি আর আমিদু'জনে যুদ্ধের সাজে - তখনো প্রস্তর যুগ আসেনি এ পৃথিবীতে তাই- যৌনগন্ধী অস্ত্র দিয়ে পরস্পর হয়ে যাই শিকার-শিকারী তারপর ক্লান্ত দুই প্রাগৈতিহাসিক নর-নারী নৈশভোজ সারি বসে শুক্রের তরল স্যুপ জরায়ুর ঝোল আর কোষবদ্ধ ডিমে ডিমের ভিতরে আমি কুসুমের হাসি খুঁজি - যে হাসি ফোটেনিযৌনতার দাহ দিয়ে পোড়ানো এ পথ আর কত দূর গেছে সে হিসেব মেলাবার প্রয়োজনে তুমি আর আমি খুঁড়ে খুঁড়ে পৃথিবীর ছবি আঁকি সূর্যের জন্মের কাল থেকে শুরু করে অথচ কেবল সূর্য আঁকার পরেই দেখি বিস্ময়ে দু'জন পৃথিবীর আয়ু মাপা থেকে ঢের বড় এক মানবিক কাজ মস্তিষ্কের কোষে কোষে পাপবোধ জন্মাবার পোশাক পরানো ক্ষুধা আয় যৌনতার মত যেটা প্রাকৃতিক নয়
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/pragoitihashik/
2864
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি
ভক্তিমূলক
কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি যাব   অকারণে ভেসে কেবল ভেসে, ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী কোথায়     যেতেছি কোন্‌ দেশে সে কোন্‌ দেশে। কূলহারা সেই সমুদ্র-মাঝখানে শোনাব গান একলা তোমার কানে, ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন-হারা আমার সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।আজো সময়  হয় নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি। ওগো  ওই-যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে। মলিন আলোয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখি আপন      কুলায়-মাঝে সবাই এল ফিরে। কখন তুমি আসবে ঘাটের ‘পরে বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে। অস্তরবির শেষ আলোটির মতো তরী    নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে।বোলপুর, ৩০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kotha-chilo-ek-torite-kebol-tumi-ami/
3866
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুন সখি বাজত বাঁশি
ভক্তিমূলক
শুন সখি , বাজত বাঁশি গভীর রজনী , উজল কুঞ্জপথ , চন্দ্রম ডারত হাসি । দক্ষিণপবনে কম্পিত তরুগণ , তম্ভিত যমুনাবারি , কুসুমসুবাস উদাস ভইল , সখি , উদাস হৃদয় হমারি । বিগলিত মরম , চরণ খলিতগতি , শরম ভরম গয়ি দূর , নয়ন বারিভর , গরগর অন্তর , হৃদয় পুলকপরিপূর । কহ সখি , কহ সখি , মিনতি রাখ সখি , সো কি হমারই শ্যাম ? মধুর কাননে মধুর বাঁশরি বজায় হমারি নাম ? কত কত যুগ সখি , পুণ্য করনু হম , দেবত করনু ধেয়ান , তব ত মিলল সখি , শ্যামরতন মম , শ্যাম পরানক প্রাণ । শ্যাম রে , শুনত শুনত তব মোহন বাঁশি , জপত জপত তব নামে , সাধ ভইল ময় দেহ ডুবায়ব চাঁদউজল যমুনামে ! ‘ চলহ তুরিত গতি শ্যাম চকিত অতি , ধরহ সখীজন হাত , নীদমগন মহী , ভয় ডর কছু নহি , ভানু চলে তব সাথ । '
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shun-shake-baj-bashe/
1027
জীবনানন্দ দাশ
ছায়া-প্রিয়া
প্রেমমূলক
দুপুররাতে ও কার আওয়াজ! গান কে গাহে,- গান না! কপোত-বধূ ঘুমিয়ে আছে নিঝুম ঝিঁঝির বুকের কাছে; অস্তচাঁদের আলোর তলে এ কার তবে কান্না! গান কে গাহে,- গান না! শার্শি ঘরের উঠছে বেজে, উঠছে কেঁপে পর্দা! বাতাস আজি ঘুমিয়ে আছে জল-ডাহুরের বুকের কাছে; এ কোন্‌ বাঁশি শার্শি বাজায় এ কোন হাওয়া ফর্দা দেয় কাঁপিয়ে পর্দা! নূপুর কাহার বাজল রে ঐ! কাঁকন কাহার কাঁদল! পুরের বধূ ঘুমিয়ে আছে দুধের শিশুর বুকের কাছে; ঘরে আমার ছায়া-প্রিয়া মায়ার মিলন ফাঁদল! কাঁকন যে তার কাঁদল! খসখসাল শাড়ি কাহার! উস্‌খুসাল চুল গো! পুরের বধূ ঘুমিয়ে আছে দুধের শিশুর বুকের কাছে: জুল্‌পি কাহার উঠল দুলে! -দুলল কাহার দুল গো! উস্‌খুসাল চুল গো! আজকে রাতে কে ঐ এল কালের সাগর সাতরি ! জীবন-ভোরের সঙ্গিনী সেই,- মাঠে ঘাটে আজকে সে নেই ! কোন তিয়াশায় এল রে হায় মরণপারের যাত্রী ! -কালের সাগর সাতরি ! কাঁদছে পাখি পউষনিশির তেপান্তরের বক্ষে! ওর বিধবা বুকের মাঝে যেন গো কার কাঁদন বাজে! ঘুম নাহি আজ চাঁদের চোখে, নিদ্‌ নাহি মোর চক্ষে! তেপান্তরের বক্ষে! এল আমার ছায়া-প্রিয়া, কিশোরবেলার সই গো! পুরের বধূ ঘুমিয়ে আছে দুধের শিশুর বুকের কাছে; মনের মধু-মনোরমা,- কই গো সে মোর- কই গো! কিশোরবেলার সই গো! ও কার আওয়াজ হাওয়ায় বাজে! গান কে গাহে, গান না! কপোত-বধূ ঘুমিয়ে আছে বনের ছায়ায়,-মাঠের কাছে; অস্তচাঁদের আলোর তলে এ কার তবে কান্না! গান কে গাহে,-গান না!
https://banglarkobita.com/poem/famous/903
3849
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শত্রুতাগৌরব
নীতিমূলক
পেঁচা রাষ্ট্র করি দেয় পেলে কোনো ছুতা, জান না আমার সাথে সূর্যের শত্রুতা!   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shotrutagourob/
2990
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গান (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
প্রেমমূলক
ওগো       কে যায় বাঁশরি বাজায়ে ! আমার ঘরে কেহ নাই যে ! তারে       মনে পড়ে যারে চাই যে ! তার        আকুল পরান বিরহের গান বাঁশি বুঝি গেল জানায়ে ! আমি        আমার কথা তারে জানাব কী করে , প্রাণ কাঁদে মোর তাই যে ! কুসুমের মালা গাঁথা হল না , ধূলিতে পড়ে শুকায় রে ! নিশি হয় ভোর , রজনীর চাঁদ মলিন মুখ লুকায় রে ! সারা বিভাবরী কার পূজা করি যৌবনডালা সাজায়ে ! ওই       বাঁশিস্বরে হায় প্রাণ নিয়ে যায় , আমি কেন থাকি হায় রে ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gan-kori-o-komol/
962
জীবনানন্দ দাশ
এইসব ভাল লাগে
সনেট
(এই সব ভালো লাগে) : জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের সোনালি রোদ এসে আমারে ঘুমাতে দেখে বিছানায়,—আমার কাতর চোখ, আমার বিমর্ষ ম্লান চুল – এই নিয়ে খেলা করে: জানে সে যে বহুদিন আগে আমি করেছি কি ভুল পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমাহীন গাঢ় এক রূপসীর মুখ ভালোবেসে, পউষের শেষ রাতে আজো আমি দেখি চেয়ে আবার সে আমাদের দেশে ফিরে এল; রং তার কেমন তা জানে অই টসটসে ভিজে জামরুল, নরম জামের মতো চুল তার, ঘুঘুর বুকের মতো অস্ফুট আঙুল; – পউষের শেষ রাতে নিমপেঁচাটির সাথে আসে সে যে ভেসেকবেকার মৃত কাক: পৃথিবীর পথে আজ নাই সে তো আর; তবুও সে ম্লান জানালার পাশে উড়ে আসে নীরব সোহাগে মলিন পাখনা তার খড়ের চালের হিম শিশিরে মাখায়; তখন এ পৃথিবীতে কোনো পাখি জেগে এসে বসেনি শাখায়; পৃথিবীও নাই আর; দাঁড়কাক একা — একা সারারাত জাগে; কি বা হায়, আসে যায়, তারে যদি কোনোদিন না পাই আবার। নিমপেঁচা তবু হাঁকে : ‘পাবে নাকো কোনোদিন, পাবে নাকো কোনোদিন, পাবে নাকো কোনোদিন আর।’
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/eei-shob-valo-lagey/
2890
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাঁধে মই বলে কই ভূঁইচাপা গাছ
ছড়া
কাঁধে মই, বলে “কই ভূঁইচাপা গাছ’, দইভাঁড়ে ছিপ ছাড়ে, খোঁজে কইমাছ, ঘুঁটেছাই মেখে লাউ রাঁধে ঝাউপাতা– কী খেতাব দেব তায় ঘুরে যায় মাথা।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kadhe-moi-bole-koi-vuichapa-gach/
3016
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘট ভরা
প্রকৃতিমূলক
আমার এই ছোটো কলসখানি সারা সকাল পেতে রাখি ঝরনাধারার নিচে। বসে থাকি একটি ধারে শেওলাঢাকা পিছল কালো পাথরটাতে। ঘট ভরে যায় বারে বারে-- ফেনিয়ে ওঠে, ছাপিয়ে পড়ে কেবলি। সবুজ দিয়ে মিনে-করা শৈলশ্রেণীর নীল আকাশে ঝর্‌ঝরানির শব্দ ওঠে দিনে রাতে। ভোরের ঘুমে ডাক শোনে তার গাঁয়ের মেয়েরা। জলের শব্দ যায় পেরিয়ে বেগনি রঙের বনের সীমানা, পাহাড়তলির রাস্তা ছেড়ে যেখানে ঐ হাটের মানুষ ধীরে ধীরে উঠছে চড়াইপথে, বলদ দুটোর পিঠে বোঝাই শুকনো কাঠের আঁটি; রুনুঝুনু ঘণ্টা গলায় বাঁধা। ঝর্‌ঝরানি আকাশ ছাপিয়ে ভাবনা আমার ভাসিয়ে নিয়ে কোথায় চলে পথহারানো দূর বিদেশে। রাঙা ছিল সকালবেলার প্রথম রোদের রং উঠল সাদা হয়ে। বক উড়ে যায় পাহাড় পেরিয়ে। বেলা হল ডাক পড়েছে ঘরে। ওরা আমায় রাগ ক'রে কয় "দেরি করলি কেন?" চুপ করে সব শুনি; ঘট ভরতে হয় না দেরি সবাই জানে, উপচে-পড়া জলের কথা বুঝবে না তো কেউ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gat-vura/
3339
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নৈবেদ্য
ভক্তিমূলক
তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি রজনীর শুভ্র অবসানে ;কিছু আর নাহি বাকি, নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি, নাই অভিমান, নাই দীনকান্না, নাই গর্বহাসি, নাই পিছে ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানি ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/noibedyo/
4275
শঙ্খ ঘোষ
সবিনয়
মানবতাবাদী
আমি তো আমার শপথ রেখেছি অক্ষরে অক্ষরে যারা প্রতিবাদী তাদের জীবন দিয়েছি নরক করে। দাপিয়ে বেড়াবে আমাদের দল অন্যে কবে না কথা বজ্র কঠিন রাজ্যশাসনে সেটাই স্বাভাবিকতা । গুলির জন্য সমস্ত রাত সমস্ত দিন খোলা বজ্র কঠিন রাজ্যে এটাই শান্তি শৃঙ্খলা । যে মরে মরুক, অথবা জীবন কেটে যাক শোক করে— আমি আজ জয়ী, সবার জীবন দিয়েছি নরক করে ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%9f-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a6%e0%a6%a8-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
736
জয় গোস্বামী
রেণু মা, আমার ঘরে তক্ষক ঢুকেছে
রূপক
রেণু মা, আমার ঘরে তক্ষক ঢুকেছে তক্‌-খো, তক্‌-খো–তার ডাক রেনু মা, সংকেতগাছ দূরে দাঁড়িয়েছে জ্যোৎস্না লেগে পুড়ে গেছে কাক আমি সে-গাছের ডালে, দড়ি ভেবে, সর্প ধরে উঠি সর্প থেকে বিষ খসে যায় রেণু মা, তোমার হাতে তালি বাজে–রাতের আকাশে ডানা মেলে জ্যোতির্ময় তক্ষক পালায়
https://banglarkobita.com/poem/famous/1760
1441
দেবব্রত সিংহ
শিকড়
মানবতাবাদী
কেঁদুলির মেলা পেরাই তখেন আমাদে রাঙামাটির দেশে ফাগুনা হাওয়া বইছে, কচি পলাশের পারা রোদ উঠেছে ঝলমলা, সেই রোদ ধুলা পথে কানা বাউলের আখড়ায় যাতে যাতে থমকে দাঁড়ালেক মাস্টর, কিষ্টনগরের সুধীর মাস্টর, বললেক, ‘তুই হরিদাসীর লাতি কানুবাগাল না?” গরুবাথানের গোরুপাল খুলে গাছতলাতে বাঁশি ফুঁকতে যাইয়ে আমি ফিক করে হাস্যে ফেলেছি। মাস্টর বললেক, ‘শুন তোকে একটা কাজ করতে হবেক’। বললম, কাজ টো কি বঠে? বললেক, ‘তোকে একটা ছবি আঁকে দিতে হবেক’, ই বাবা! ছবি আবার কী আঁকব হে আমি গােরুবাগালি আর বাঁশি ফুঁকা ছাড়া আর ত কিছু জানি নাই । মাস্টর নাছোড়, ঝোলা হাতড়ে বললেক, ‘এই লে রং, এই লে তুলি এই লে কাগজ।’ সক্কাল বেলা গোরুবাথানের মাঠে এক পাল গাইগোরুর মাঝে আমি হা হয়ে ভাল্যে, বললম, বাবুদে ইসকুলডাঙাতে দেখগা যাইয়ে আমার পারা কত ছেলেপিলেরা বসে বসে ছবি আঁকছে, দেদার ছবি। মাস্টর শুনলেক নাই কিছুই। বললেক, ‘উয়াদে ছবি অনেক আছে আমার ঝোলাতে লে লে দেরি করিস না তুই একটা গাছের ছবি আঁক দেখনি অজয়ের পাড়ে এত ফুল ফুটেছে পলাশের তুই আমাকে একটা পলাশ গাছের ছবি আঁকে দে।” আমি আর কি করি অত বড় মানুষ অমন করে বলছে ই দেখে শেষতক কাগজ নিয়ে বসে গেলম গরুবাথানের ধুলাতে হেলাবাড়ি ছাড়ে বাঁশি ফেলে তুলি ধরলম হাতে, তাবাদে ভাবতে ভাবতে একসমতে অজয় লদীর পাড়ের একটা আদ্দা পলাশ গাছ’কে উপড়াই লিইয়ে আস্যে কৌটা ভর্তি রঙে চুবাই বসাই দিলম মাস্টরের কাগজে, কি হইছে কে জানছে বললম, হেই লাও তুমার ছবি। ছবি দেখে চোখের পাতনা লড়ে নাই মাস্টরের আলোপনা মুখে মাস্টর বললেক, ‘তুই ই কি করলি ই কি ছবি আঁকলি?’ বললম, কেনে, কি হইছে। মাস্টর বললেক, পলাশ ফুলের গাছ টা না হয় বুঝলম গাছের তলায় মাটির ভিতরে তুই ই সব আঁকিবুকি কি আঁকলি?’ বললম, উগুলা শিকড় বঠে হে মাস্টর চিনতে লারছ, তুমি শিকড় চিনতে লারছ! মাস্টর তখন ঝোলা উবুড় করে যত ছবি সব দিলেক ঢাল্যে, দেখলম কতরকমের সব গাছের ছবি তার একটাতেও শিকড় নাই, আমি অবাক, বললম, হে মাস্টর, ই গুলা কি গাছ বঠে হে-? বাবুদে ঘরের স্কুলে পড়ে ছেলেপেলারা ইসব কি আঁকছে? মাস্টর কোনো রা নাই কাড়লেক আমার আঁকা ছবির দিকে ভালতে ভালতে একটা কথা শুদালেক, ‘তুই গাছের সঙ্গে শিকড় কেনে আঁকলি ? বললম, ই বাবা, বড় আশ্চয্যি শুনালে বঠে গাছ আছে শিকড় নাই ই কখনঅ হয় নাকি? তুমি বলঅ, শিকড় ছাড়া কি গাছ বাঁচে? জানঅ মাস্টর, বাপ বলথক ‘ছােটোলােক মােটোলােক যে যা বলছে বলুক আমরা কি জানিস, আমরা হলম শিকড়ের লোক আমরা হলম শিকড়ের লোক।’
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%9c-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%ac%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%82%e0%a6%b9/
2876
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কমল ফুটে অগম জলে
নীতিমূলক
কমল ফুটে অগম জলে, তুলিবে তারে কেবা। সবার তরে পায়ের তলে তৃণের রহে সেবা।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/komol-fute-ogom-jole/
3987
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্কুল-পালানে
চিন্তামূলক
মাস্টারি-শাসনদুর্গে সিঁধকাটা ছেলে ক্লাসের কর্তব্য ফেলে জানি না কী টানে ছুটিতাম অন্দরের উপেক্ষিত নির্জন বাগানে । পুরোনো আমড়াগাছ হেলে আছে পাঁচিলের কাছে , দীর্ঘ আয়ু বহন করিছে তার পুঞ্জিত নিঃশব্দ স্মৃতি বসন্তবর্ষার । লোভ করি নাই তার ফলে , শুধু তার তলে সে সঙ্গরহস্য আমি করিতাম লাভ যার আবির্ভাব অলক্ষ্যে ব্যাপিয়া আছে সর্ব জলে স্থলে । পিঠ রাখি কুঞ্চিত বল্কলে যে পরশ লভিতাম জানি না তাহার কোনো নাম ; হয়তো সে আদিম প্রাণের আতিথ্যদানের নিঃশব্দ আহ্বান , যে প্রথম প্রাণ একই বেগ জাগাইছে গোপন সঞ্চারে রসরক্তধারে মানবশিরায় আর তরুর তন্তুতে , একই স্পন্দনের ছন্দ উভয়ের অণুতে অণুতে । সেই মৌনী বনস্পতি সুবৃহৎ আলস্যের ছদ্মবেশে অলক্ষিতগতি সূক্ষ্ম সম্বন্ধের জাল প্রসারিছে নিত্যই আকাশে , মাটিতে বাতাসে , লক্ষ লক্ষ পল্লবের পাত্র লয়ে তেজের ভোজের পানালয়ে । বিনা কাজে আমিও তেমনি বসে থাকি ছায়ায় একাকী , আলস্যের উৎস হতে চৈতন্যের বিবিধ দিগ্‌বাহী স্রোতে আমার সম্বন্ধ চরাচরে বিস্তারিছে অগোচরে কল্পনার সূত্রে বোনা জালে দূর দেশে দূর কালে । প্রাণে মিলাইতে প্রাণ সে বয়সে নাহি ছিল ব্যবধান ; নিরুদ্ধ করে নি পথ ভাবনার স্তূপ ; গাছের স্বরূপ সহজে অন্তর মোর করিত পরশ । অনাদৃত সে বাগান চায় নাই যশ উদ্যানের পদবীতে । তারে চিনাইতে মালীর নিপুণতার প্রয়োজন কিছু ছিল নাকো । যেন কী আদিম সাঁকো ছিল মোর মনে বিশ্বের অদৃশ্য পথে যাওয়ার আসার প্রয়োজনে ।          কুলগাছ দক্ষিণে কুয়োর ধারে , পুবদিকে নারিকেল সারে সারে , বাকি সব জঙ্গল আগাছা । একটা লাউয়ের মাচা কবে যত্ন ছিল কারো , ভাঙা চিহ্ন রেখে গেছে পাছে । বিশীর্ণ গোলকচাঁপা-গাছে পাতাশূন্য ডাল অভুগ্নের ক্লিষ্ট ইশারার মতো । বাঁধানো চাতাল ; ফাটাফুটো মেঝে তার , তারি থেকে গরিব লতাটি যেত চোখে-না-পড়ার ফুলে ঢেকে । পাঁচিল ছ্যাৎলা-পড়া ছেলেমি খেয়ালে যেন রূপকথা গড়া কালের লেখনি-টানা নানামতো ছবির ইঙ্গিতে , সবুজে পাটলে আঁকা কালো সাদা রেখার ভঙ্গিতে । সদ্য ঘুম থেকে জাগা প্রতি প্রাতে নূতন করিয়া ভালো-লাগা ফুরাত না কিছুতেই । কিসে যে ভরিত মন সে তো জানা নেই । কোকিল দোয়েল টিয়ে এ বাগানে ছিল না কিছুই , কেবল চড়ুই , আর ছিল কাক । তার ডাক সময় চলার বোধ মনে এনে দিত । দশটা বেলার রোদ সে ডাকের সঙ্গে মিশে নারিকেল-ডালে দোলা খেত উদাস হাওয়ার তালে তালে । কালো অঙ্গে চটুলতা , গ্রীবাভঙ্গি , চাতুরী সতর্ক আঁখিকোণে , পরস্পর ডাকাডাকি ক্ষণে ক্ষণে — এ রিক্ত বাগানটিরে দিয়েছিল বিশেষ কী দাম । দেখিতাম , আবছায়া ভাবনায় ভালোবাসিতাম ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/eskul-palanu/
917
জীবনানন্দ দাশ
অশ্বত্থ বটের পথে
সনেট
অশ্বত্থ বটের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী; ছড়ায়েছি খই ধান বহুদিন উঠানের শালিখের তরে; সন্ধ্যায় পুকুর থেকে হাঁসটিরে নিয়ে আমি তোমাদের ঘরে গিয়েছি অনেক দিন দেখিয়াছি ধূপ জ্বালো, ধরো সন্ধ্যাবাতি থোড়ের মতন শাদা ভিজে হাতে,- এখুনি আসিবে কিনা রাতি বিনুনি বেঁধেছ তাই-কাঁচাপোকাটিপ তুমি কপালের 'পরে পড়িয়াছ-তারপর ঘুমায়েছঃ কল্কাপাড় আঁচলটি ঝরে পানের বাটার 'পরে; নোনার মতো নম্র শরীরটি পাতিনির্জন পালঙ্কে তুমি ঘুমায়েছ,- বউকথাকওটির ছানা নীল জামরুল নীড়ে- জ্যোৎস্নায়- ঘুমায়ে রয়েছে যেন, হায়, আর রাত্রি মাতা-পাখাটির মতো ছড়ায়ে রয়েছে তার ডানা। আজ আমি ক্লান্ত চোখে ব্যবহৃত জীবনের ধূলোয় কাঁটায় চ'লে গেছি বহুদূরে;-দ্যাখোনিকো, বোঝোনিকো করনিকো মানা; রূপসী শঙ্খের কৌটা তুমি যে গো প্রাণহীন- পানের বাটায়।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/oshwattho-boter-pothe/
5945
সৈয়দ শামসুল হক
পরানের গহীন ভিতর-৭
সনেট
নদীর কিনারে গিয়া দেখি নাও নিয়া গ্যাছে কেউ অথচ এই তো বান্ধা আছিল সে বিকাল বেলায়। আমার অস্থির করে বুঝি না কে এমন খেলায়, আমার বেবাক নিয়া শান্তি নাই, পাচে পাছে ফেউ। পানির ভিতরে য্যান ঘুন্নি দিয়া খিলখিল হাসে যত চোর যুবতীরা, গ্যারামের শ্যাষ সীমানায় বটের বৈরাগী চুল, ম্যাঘে চিল হারায় বারায়, বুকের ভিতরে শিস দিয়া সন্ধা হাঁটে আশেপাশে। এখন কোথায় যাই, এইখানে বড় সুনসান, মানুষের দুঃখ আছে, জগতের আছে কিনা জানি না- জগৎ এমনভাবে হয়া যায় হঠাৎ অচিনা। মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান, আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার। আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।।
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/poraner-gohin-bhitor-7/
4090
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
ইশতেহার
মানবতাবাদী
পৃথিবীতে মানুষ তখনও ব্যক্তিস্বার্থে ভাগ হয়ে যায়নি । ভুমির কোনো মালিকানা হয়নি তখনো । তখনো মানুষ শুধু পৃথিবীর সন্তান । অরন্য আর মরুভূমির সমুদ্র আর পাহাড়ের ভাষা তখন আমরা জানি । আমরা ভূমিকে কর্ষন করে শস্য জন্মাতে শিখেছি । আমরা বিশল্যকরনীর চিকিৎসা জানি আমরা শীত আর উত্তাপে সহনশীল ত্বক তৈরি করেছি আমাদের শরীরের । আমরা তখন সোমরস, নৃত্য আর শরীরের পবিত্র উৎসব শিখেছি । আমাদের নারীরা জমিনে শস্য ফলায় আর আমাদের পুরুষেরা শিকার করে ঘাই হরিন। আমরা সবাই মিলে খাই আর পান করি । জ্বলন্ত আগুনকে ঘিরে সবাই আমরা নাচি আর প্রশংসা করি পৃথিবীর । আমরা আমাদের বিস্ময় আর সুন্দরগুলোকে বন্দনা করি । পৃথিবীর পূর্নিমা রাতের ঝলোমলো জ্যোৎস্নায় পৃথিবীর নারী আর পুরুষেরা পাহাড়ের সবুজ অরন্যে এসে শরীরের উৎসব করে । তখন কী আনন্দরঞ্জিত আমাদের বিশ্বাস । তখন কী শ্রমমুখর আমাদের দিনমান । তখন কী গৌরবময় আমাদের মৃত্যু । তারপর – কৌমজীবন ভেঙে আমরা গড়লাম সামন্ত সমাজ । বন্যপ্রানীর বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রগুলো আমরা ব্যবহার করলাম আমাদের নিজের বিরুদ্ধে । আমাদের কেউ কেউ শ্রমহীনতায় প্রশান্তি খুঁজে পেতে চাইলো । দুর্বল মানুষেরা হয়ে উঠলো আমাদের সেবার সামগ্রী । আমাদের কারো কারো তর্জনী জীবন ও মৃত্যুর নির্ধারন হলো । ভারী জিনিস টানার জন্যে আমরা যে চাকা তৈরি করেছিলাম তাকে ব্যবহার করলাম আমাদের পায়ের পেশীর আরামের জন্যে । আমাদের বন্য অস্ত্র সভ্যতার নামে গ্রাস করে চললো মানুষের জীবন ও জনপদ । আমরা আমাদের চোখকে সুদূরপ্রসারী করার জন্যে দূরবীন আর সূক্ষ্ নিরীক্ষনের জন্যে অনুবীক্ষন তৈরি করলাম । আমাদের পায়ের গতি বর্ধন করলো উড়ন্ত বিমান । আমাদের কন্ঠস্বর বর্ধিত হলো, আমাদের ভাষা ও বক্তব্য গ্রন্থিত হলো, আমরা রচনা করলাম আমাদের অগ্রযাত্রার ইতিহাস । আমাদের মস্তিষ্ককে আরো নিখুঁত ও ব্যপক করার জন্যে আমরা তৈরি করলাম কম্পিউটার । আমাদের নির্মিত যন্ত্র শৃঙ্খলিত করলো আমাদের আমাদের নির্মিত নগর আবদ্ধ করলো আমাদের আমাদের পুঁজি ও ক্ষমতা অবরুদ্ধ করলো আমাদের আমাদের নভোযান উৎকেন্দ্রিক করলো আমাদের । অস্তিত্ব রক্ষার নামে আমরা তৈরী করলাম মারনাস্ত্র । জীবনরক্ষার নামে আমরা তৈরি করলাম জীবনবিনাশী হাতিয়ার । আমরা তৈরি করলাম পৃথিবী নির্মূল-সক্ষম পারমানবিক বোমা । একটার পর একটা খাঁচা নির্মান করেছি আমরা । আবার সে খাঁচা ভেঙে নতুন খাঁচা বানিয়েছি – খাঁচার পর খাঁচায় আটকে পড়তে পড়তে খাঁচার আঘাতে ভাঙতে ভাঙতে, টুকরো টুকরো হয়ে আজ আমরা একা হয়ে গেছি । প্রত্যেকে একা হয়ে গেছি । কী ভয়ংকর এই একাকীত্ব ! কী নির্মম এই বান্ধবহীনতা ! কী বেদনাময় এই বিশ্বাসহীনতা ! এই সৌরমন্ডলের এই পৃথিবীর এক কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে যে-শিশুর জন্ম । দিগন্তবিস্তৃত মাঠে ছুটে বেড়ানোর অদম্য স্বপ্ন যে-কিশোরের । জ্যোৎস্না যাকে প্লাবিত করে । বনভূমি যাকে দুর্বিনীত করে । নদীর জোয়াড় যাকে ডাকে নশার ডাকের মতো । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ঔপনিবেশিক জোয়াল গোলাম বানানোর শিক্ষাযন্ত্র । অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এক হৃদয়হীন ধর্মের আচার । অথচ যাকে শৃঙ্খলিত করা হয়েছে স্বপ্নহীন সংস্কারে । যে-তরুন উনসত্তরের অন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যে-তরুন অস্ত্র হাতে স্বাধীনতাযুদ্ধে গিয়েছে যে-তরুনের বিশ্বাস, স্বপ্ন, সাধ, স্বাধীনতা-উত্তরকালে ভেঙে খান খান হয়েছে, অন্তবে রক্তাক্ত যে-তরুন নিরুপায় দেখেছে নৈরাজ্য, প্রতারনা আর নির্মমতাকে । দুর্ভিক্ষ আর দুঃশাসন যার নির্ভৃত বাসনাগুলো দুমড়ে মুচড়ে তছনছ করেছে যে-যুবক দেখেছে এক অদৃশ্য হাতের খেলা দেখেছে অদৃশ্য এক কালোহাত যে-যুবক মিছিলে নেমেছে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছে আকন্ঠ মদের নেশায় চুর হয়ে থেকেছে অনাহারে উড়নচন্ডী ঘুরছে যে-যুবক ভয়ানক অনিশ্চয়তা আর বাজির মুখে ছুঁড়ে দিয়েছে নিজেকে যে-পুরুষ এক শ্যমল নারীর সাথে জীবন বিনিময় করেছে যে-পুরুষ ক্ষুধা, মৃত্যু আর বেদনার সাথে লড়ছে এখনো, লড়ছে বৈষম্য আর শ্রেনীর বিরুদ্ধে – সে আমি । আমি একা । এই ব্রক্ষ্মান্ডের ভিতর একটি বিন্দুর মতো আমি একা । আমার অন্তর রক্তাক্ত । আমার মস্তিষ্ক জর্জরিত । আমার স্বপ্ন নিয়ন্ত্রিত । আমার শবীর লাবন্যহীন । আমার জীভ কাটা । তবু এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন আমাকে কাতর করে আমাকে তড়ায়... আমাদের কৃষকেরা শূন্য পাকস্থলি আর বুকের ক্ষয়কাশ নিয়ে মাঠে যায় । আমাদের নারীরা ক্ষুধায় পীড়িত, হাড্ডিসার । আমাদের শ্রমিকেরা স্বাস্থহীন । আমাদের শিশুরা অপুষ্ট, বীভৎস-করুন । আমাদের অধিকাংশ মানুষ ক্ষুধা, অকালমৃত্যু আর দীর্ঘশ্বাসের সমুদ্রে ডুবে আছে । পৃথিবীর যুদ্ধবাজ লোকদের জটিল পরিচালনায় ষড়যন্ত্রে আর নির্মমতায়, আমরা এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা আর চরম অসহায়ত্বের আবর্তে আটকে পড়েছি । কী বেদনাময় এই অনিশ্চয়তা ! আর চরম অসহায়ত্বের আবর্তে আটকা পড়েছি । কী বেদনাময় এই অনিশ্চয়তা ! কী বিভৎস এই ভালোবাসাহীনতা ! কী নির্মম এই স্বপ্নহীনতা ! আজ আমরা আবার সেই বিশ্বাস আর আনন্দকে ফিরে পেতে চাই আজ আমরা আবার সেই সাহস আর সরলতাকে ফিরে পেতে চাই আজ আমরা আবার সেই শ্রম আর উৎসবকে ফিরে পেতে চাই আজ আমরা আবার সেই ভালোবাসা আর প্রশান্তিকে ফিরে পেতে চাই আজ আমরা আবার সেই স্বাস্থ্য আর শরীরের লাবন্যকে ফিরে পেতে চাই আজ আমরা আবার সেই কান্নাহীন আর দীর্ঘশ্বাসহীন জীবনের কাছে যেতে চাই আর আমরা শোষন আর ষঠতা অকালমৃত্যু আর ক্ষুধার যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতে চাই । আমাদের সমৃদ্ধ এই বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাময় এই শিল্পসম্ভার নিয়ে আমাদের দূরলক্ষ্য আর সুক্ষ্ম বীক্ষন নিয়ে আমাদের দ্বন্ধময় বেগবান দর্শন নিয়ে আমরা ফিরে যাবো আমাদের বিশ্বাসের পৃথিবীতে আমাদের শ্রম, উৎসব, আনন্দ আর প্রশান্তির পৃথিবীতে । পরমানুর সঠিক ব্যবহার আমাদের শস্যের উৎপাদন প্রয়োজনতুল্য করে তুলবে, আমাদের কারখানাগুলো কখনোই হত্যার অস্ত্র তৈরি করবে না, আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান নিরোগ করবে পৃথিবীকে; আমাদের মর্যদার ভিত্তি হবে মেধা, সাহস আর শ্রম । আমাদের পুরুষেরা সুলতানের ছবির পুরুষের মতো স্বাস্থ্যবান, কর্মঠ আর প্রচন্ড পৌরষদীপ্ত হবে । আমাদের নারীরা হবে শ্রমবতী, লক্ষীমন্ত আর লাবন্যময়ী । আমাদের শিশুরা হবে পৃথিবীর সুন্দরতম সম্পদন। আমরা শস্য আর স্বাস্থের, সুন্দর আর গৌরবের কবিতা লিখবো । আমরা গান গাইবো আমাদের বসন্ত আর বৃষ্টির বন্দনা করে । আমরা উৎসব করবো শস্যের আমরা উৎসব করবো পূর্নিমার আমরা উৎসবা করবো আমাদের গৌরবময় মৃত্যু আর বেগমান জীবনের । কিন্তু – এই স্বপ্নের জীবনে যাবার পথ আটকে আছে সামান্য কিছু মানুষ । অস্ত্র আর সেনা-ছাউনিগুলো তাদের দখলে । সমাজ পরিচালনার নামে তারা এক ভয়ংকর কারাগার তৈরী করেছে আমাদের চারপাশে । তারা ক্ষুধা দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে তারা বস্ত্রহীনতা দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে তারা গৃহহীনতা দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে তারা জুলুম দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে বুলেট দিয়ে বন্দী করেছে । তারা সবচেয়ে কম শ্রম দেয় আর সবচে বেশি সম্পদ ভোগ করে; তারা সবচে ভালো খাদ্যগুলো খায় আর সবচে দামি পোশাকগুলো পরে । তাদের পুরুষদের শরীর মেদে আবৃত, কদাকার; তাদের মেয়েদের মুখের ত্বক দেখা যায় না, প্রসাধনে ঢাকা; তারা আলস্য আর কর্মহীনতায় কাতর, কুৎসিত । তারা আমাদের জীভ কেটে নিতে চায় তারা আমাদের চোখ উপড়ে ফেলতে চায় তারা আমাদের মেধা বিকৃত করতে চায় তারা আমাদের শ্রবন বধির করে দিতে চায় তারা আমাদের পেশীগুলো অকেজো করে দিতে চায় আমাদের সন্তানদেরও তারা চায় গোলাম বানাতে ; একদা অরন্যে যেভাবে অতিকায় বন্যপ্রানী হত্যা করে আমরা অরন্যজীবনে শান্তি ফিরিয়ে এনেছি, আজ এইসব অতিকায় কদাকার বন্যমানুষগুলো নির্মুল করে আমরা আবার সমতার পৃথিবী বানাবো সম্পদ আর আনন্দের পৃথিবী বানাবো শ্রম আর প্রশান্তির পৃথিবী বানাবো ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/319
5604
সুকুমার রায়
গোঁফ চুরি
হাস্যরসাত্মক
হেড আফিসের বড়বাবু লোকটি বড় শান্ত, তার যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কখনো জান্‌ত? দিব্যি ছিলেন খোসমেজাজে চেয়ারখানি চেপে, একলা বসে ঝিম্‌ঝিমিয়ে হটাত্‍‌ গেলেন ক্ষেপে! আঁত্‍‌কে উঠে হাত‐পা ছুঁড়ে চোখটি ক’রে গোল! হটাত্‍‌ বলেন, “গেলুম গেলুম, আমায় ধ’রে তোল!” তাই শুনে কেউ বদ্যি ডাকে, কেউ‐বা হাঁকে পুলিশ, কেউ‐বা বলে, “কামড়ে দেবে সাবধানেতে তুলিস।” ব্যস্ত সবাই এদিক‐ওদিক করছে ঘোরাঘুরি— বাবু হাঁকেন, “ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি!” গোঁফ হারানো! আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি? গোঁফ জোড়া তো তেমনি আছে, কমে নি এক রত্তি। সবাই তাঁরে বুঝিয়ে বলে, সামনে ধরে আয়না, মোটেও গোঁফ হয় নি চুরি, কক্ষনো তা হয় না।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/gof-churi/
4734
শামসুর রাহমান
জীবশ্ম
মানবতাবাদী
ঘরের জন্যেই ঘুরি, সারাদিনমান ঘুরি, অথচ কোথাও চার দেয়ালের কিংবা জ্যোৎস্না-ছাওয়া, রৌদ্রের গুঞ্জনময় কোনো ছাদের নিশ্চিন্তি নেই। থিয়েটার গিয়ে দেখি, হায়, এ কেমন বেয়াড়া উদ্ভট স্থান? মঞ্চ নেই, অভিনেতা নেই, নেই দর্শকের ভিড়। একজন বিড়বিড় বিষম অস্পষ্ট কী একটা পড়ছেন, খুব দ্রুত ওল্টাচ্ছেন পাতা, হয়তো বা নাট্যকার, কিন্তু পান্ডুলিপি তাঁর বর্ণমালাহীন। কী-যে হয়, আমি বাগানের কাছে যেতে চেয়ে নিষ্পাদপ মরুন গভীরে চলে যাই। নক্ষত্রপ্রতিম পত্রপূর্ণ গাছ দেখবো না কোনখানে, এ কেমন বেখাপ্পা বসতি?ওখানে কে পড়ে আছে, অধো মুখ, দোমড়ানো টিনের মতন? কাটা সেপাইয়ের ভাগ্যের ভূগোল কাঁটাতার-দীর্ণ, নির্দয় কর্দমময়। তার কাছে ফুল হাতে যাই, ফুল ধুলো হ’য়ে যায়। তবে কি আমিও ধস্‌-আতংকিতখনি-শ্রমিকের মতো ভূ-গর্ভস্থ কয়লার দেয়ালে ভীষণ আটকা পড়ে গেছি উদ্ধারের অতীত? তবে কি আঙুল রক্তাক্ত ক’রে লুপ্ত হবো খনিজ আড়ালে? যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সে-জমিনও আজ যথেষ্ট অনড় নয়, খুঁটিগুলো কেবলি এলিয়ে পড়ে। দৃঢ় ভূমি কোথাও কি নেই? যেদিকে তাকাই, সাগর শুকিয়ে যায়, ঝরনা রূপান্তরিত পাষাণে, মায়ের সিন্দুক প্রতিধ্বনিময় গুহা, অশরীরী তান্ডবে দুঃস্বপ্নাকীর্ণ। তাকালে গাছের দিকে, পাতা পোড়া মাটি হয়ে ঝরে, শেকড় সাপের মতো ফণা তুলে আসে। এমন কি তোমাকেও দেখি না মিটিয়ে তৃষ্ণা, পাছে তোমার গহন ঐ নয়ন পল্লব ভস্মীভূত হয়, তুমি নিমেষে জীবাশ্ম হয়ে যাও।   (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jiboshmo/
2773
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইতিহাসবিশারদ গণেশ ধুরন্ধর
হাস্যরসাত্মক
ইতিহাসবিশারদ গণেশ ধুরন্ধর ইজারা নিয়েছে একা বম্বাই বন্দর। নিয়ে সাতজন জেলে দেখে মাপকাঠি ফেলে– সাগরমথনে কোথা উঠেছিল চন্দর, কোথা ডুব দিয়ে আছে ডানাকাটা মন্দর।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/itihasbisharod-gonesh-dhurondor/
1625
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
নিতান্ত কাঙাল
চিন্তামূলক
নিতান্তই ক্লান্ত লোকটা শুধু ছোট্ট একটা ঘরের কাঙাল। দক্ষিণের জানলা দিয়ে ধুধু অফুরন্ত মাঠ দেখবে। আর পশ্চিমের জানলা দিয়ে লাল সূর্য-ডোবা সন্ধ্যার বাহার। নিতান্তই ক্লান্ত লোকটা। শুধু ছোট্ট একটা ঘরের কাঙাল! নিতান্তই ক্লান্ত লোকটা। তাই মিষ্টি একটা মেয়ের কাঙ্গাল। যে তাকে খুনসুটি করে প্রায়ই রাত জাগাবে। বলবে, ‘কোন দিশি লোক তুমি তা বোঝা শক্ত। কাল আনতে হবে আলতা এক শিশি।’ নিতান্তই শান্ত লোকটা। তাই মিষ্টি একটা মেয়ের কাঙ্গাল। নিতান্তই ভ্রান্ত লোকটা। হায়, অল্প-একটু সুখের কাঙাল। রৌদ্রে, জলে, উদ্দাম হাওয়ায় ঢের ঘুরেছে। বুঝল না এখনও ইচ্ছার আগুনে খেয়ে জ্বাল একটু-সুখে তৃপ্তি নেই কোনো! নিতান্তই ভ্রান্ত লোকটা। হায়, অল্প-একটু সুখের কাঙাল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1688
5353
শামসুর রাহমান
হে প্রিয় কল্পনালতা
প্রেমমূলক
কখনো কখনো ওরা আসে না, আবার কখনো বা যুদ্ধ-ফেরতা সৈনিকের মতো এসে পড়ে, রচে শোভা শূন্যতায়; মগজের পুকুরে সাঁতারপ্রিয় হৃদয়ের তন্ত্রী কী রুদ্র ঝংকারে ছিঁড়ে সুবিস্তৃত রৌদ্রের ভেতরে যায়, যন্ত্রী হ’য়ে ঘোরে, শাড়ির পাড়ের মতো রাঙা পথে, পতিত বাগানে। বাউল বাউল ব’লে রসালো জ্যোৎস্নায় খুব মেতে ওঠে গানে।ওরা অলৌকিক ম্যানিফেস্টোর ডানায় ভর ক’রে দ্রুত বিলি হ’য়ে যায় শহরের আনাচে কানাচে। গুঞ্জরিত ঘরে ঘরে এবং স্থানীয় আঁদ্রে ব্রেতো করলে কৃপা বেহদ গাঁওয়ার সব লজিকের বুকে-পিঠে রূপালি চাবুক হেনে আনকোরা রব তুলে খিল ভরপুর জ্যোৎস্নায় বেবাক স্বপ্নাহত হয়। দুস্থ চন্ডীমন্ডপের বুলির আড়ালে কতিপয় শব্দ জাগে বলীয়ান নব্যতায়, কবিসংঘ পেয়ে যায় বিরল ভুবন, স্বপ্নাদ্য বলাই যায়। রঙিন কুপনহাতে নিয়ে টপলেস পরীরা আঁধারে পরিচারিকার মতো ব্যস্ততায় সঞ্চারিণী; মেঝে ফুঁড়ে ভৌতিক আলোয় উঠে আসে অবিরত অপরূপ শব আর শুয়োরের মুণ্ডু। পিরিচে যুল স্তন, যাত্রী সবুজের দিকে ক্রমাগত। বইয়ের কবরে কে ঘুমায়? রাত্রি চোলিতে নক্ষত্র গেঁথে চন্দ্রমাকে আনে বুদোয়ারে নিরিবিলি প্লুত দৃষ্টি হেনে; অতিশয় মৌন হাড়ে জ্যোৎস্না বোনে অন্তহীন কিংবদন্তী। এই তো প্রফুল্ল জোনাকিরা গুল্মলতায় খেলে লুকোচুরি-বনময় কী আদিম ক্রীড়া।হে প্রিয় কল্পনালতা এসো তুমি উন্মাদিনী ওফেলিয়া সেজে আমার এলসিমোরে, হে দয়িতা, পাখাবতী, শবাকীর্ণ ষ্টেজে।   (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/he-priyo-kolponalota/
822
জসীম উদ্‌দীন
নকশী কাঁথার মাঠ – ০৯
কাহিনীকাব্য
নয় মত্স চেনে গহিন গম্ভ পঙ্খী চেনে ডাল ; মায় সে জানে বিটার দরদ যার কলিজার শ্যাল! নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ ; জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত | . — গাজীর গান আষাঢ় মাসে রূপীর মায়ে মরল বিকার জ্বরে, রূপা সাজু খায়নি খানা সাত আট দিন ধরে | লালন পালন যে করিত “ঠোঁটের” আধার দিয়া, সেই মা আজি মরে রূপার ভাঙল সুখের হিয়া | ঘামলে পরে যে তাহারে করত আবের পাখা ; সেই শাশুড়ী মরে, সাজুর সব হইল ফাঁকা | সাজু রূপা দুই জনেতে কান্দে গলাগলি ; গাছের পাতা যায় যে ঝরে, ফুলের ভাঙে কলি | এত দুখের দিনও তাদের আস্তে হল গত, আবার তারা সুখেরি ঘর বাঁধল মনের মত |
https://banglarkobita.com/poem/famous/812
1368
তসলিমা নাসরিন
রুদ্র
প্রেমমূলক
প্রিয় রুদ্র,প্রযত্নেঃ আকাশ, তুমি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলে। তুমি কি এখন আকাশ জুড়ে থাকো? তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও? তুলোর মতো, পাখির মতো? তুমি এই জগত্সংসার ছেড়ে আকাশে চলে গেছো। তুমি আসলে বেঁচেই গেছো রুদ্র। আচ্ছা, তোমার কি পাখি হয়ে উড়ে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না? তোমার সেই ইন্দিরা রোডের বাড়িতে, আবার সেই নীলক্ষেত, শাহবাগ, পরীবাগ, লালবাগ চষে বেড়াতে? ইচ্ছে তোমার হয় না এ আমি বিশ্বাস করি না, ইচ্ছে ঠিকই হয়, পারো না। অথচ এক সময় যা ইচ্ছে হতো তোমার তাই করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারারাত না ঘুমিয়ে গল্প করতে – করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারাদিন পথে পথে হাটতে – হাটতে। কে তোমাকে বাধা দিতো? জীবন তোমার হাতের মুঠোয় ছিলো। এই জীবন নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলেছো। আমার ভেবে অবাক লাগে, জীবন এখন তোমার হাতের মুঠোয় নেই। ওরা তোমাকে ট্রাকে উঠিয়ে মিঠেখালি রেখে এলো, তুমি প্রতিবাদ করতে পারোনি।আচ্ছা, তোমার লালবাগের সেই প্রেমিকাটির খবর কি, দীর্ঘ বছর প্রেম করেছিলে তোমার যে নেলী খালার সাথে? তার উদ্দেশ্যে তোমার দিস্তা দিস্তা প্রেমের কবিতা দেখে আমি কি ভীষণ কেঁদেছিলাম একদিন! তুমি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছো, এ আমার সইতো না। কি অবুঝ বালিকা ছিলাম! তাই কি? যেন আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দু’জন জন্মেছি দু’জনের জন্য। যেদিন ট্রাকে করে তোমাকে নিয়ে গেলো বাড়ি থেকে, আমার খুব দম বন্ধ লাগছিলো। ঢাকা শহরটিকে এতো ফাঁকা আর কখনো লাগেনি। বুকের মধ্যে আমার এতো হাহাকারও আর কখনো জমেনি। আমি ঢাকা ছেড়ে সেদিন চলে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। আমার ঘরে তোমার বাক্সভর্তি চিঠিগুলো হাতে নিয়ে জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম। আমাদের বিচ্ছেদ ছিলো চার বছরের। এতো বছর পরও তুমি কী গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে গিয়েছিলে! সেদিন আমি টের পেয়েছি।আমার বড়ো হাসি পায় দেখে, এখন তোমার শ’য়ে শ’য়ে বন্ধু বেরোচ্ছে। তারা তখন কোথায় ছিলো? যখন পয়সার অভাবে তুমি একটি সিঙ্গারা খেয়ে দুপুর কাটিয়েছো। আমি না হয় তোমার বন্ধু নই, তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম বলে। এই যে এখন তোমার নামে মেলা হয়, তোমার চেনা এক আমিই বোধ হয় অনুপস্থিত থাকি মেলায়। যারা এখন রুদ্র রুদ্র বলে মাতম করে বুঝিনা তারা তখন কোথায় ছিলো?শেষদিকে তুমি শিমুল নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতে। বিয়ের কথাও হচ্ছিলো। আমাকে শিমুলের সব গল্প একদিন করলে। শুনে … তুমি বোঝোনি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এই ভেবে যে, তুমি কি অনায়াসে প্রেম করছো! তার গল্প শোনাচ্ছো ! ঠিক এইরকম অনুভব একসময় আমার জন্য ছিলো তোমার! আজ আরেকজনের জন্য তোমার অস্থিরতা। নির্ঘুম রাত কাটাবার গল্প শুনে আমার কান্না পায় না বলো? তুমি শিমুলকে নিয়ে কি কি কবিতা লিখলে তা দিব্যি বলে গেলে! আমাকে আবার জিজ্ঞেসও করলে, কেমন হয়েছে। আমি বললাম, খুব ভালো। শিমুল মেয়েটিকে আমি কোনোদিন দেখিনি, তুমি তাকে ভালোবাসো, যখন নিজেই বললে, তখন আমার কষ্টটাকে বুঝতে দেইনি। তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি ঠিকই কিন্তু আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে তাকে বিলোবার জিনিস নয়।আকাশের সঙ্গে কতো কথা হয় রোজ! কষ্টের কথা, সুখের কথা। একদিন আকাশভরা জোত্স্নায় গা ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের। তুমি দু চারটি কষ্টের কথা বলে নিজের লেখা একটি গান শুনিয়েছিলে। “ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিও”। মংলায় বসে গানটি লিখেছিলে। মনে মনে তুমি কার চিঠি চেয়েছিলে? আমার? নেলী খালার? শিমুলের? অনেক দিন ইচ্ছে তোমাকে একটা চিঠি লিখি। একটা সময় ছিলো তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম। তুমিও লিখতে প্রতিদিন। সেবার আরমানিটোলার বাড়িতে বসে দিলে আকাশের ঠিকানা। তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে ক’দিন বলো? দিন তো ফুরোয়। আমার কি দিন ফুরোচ্ছে না? তুমি ভালো থেকো। আমি ভালো নেই।ইতি, সকালপুনশ্চঃ আমাকে সকাল বলে ডাকতে তুমি। কতোকাল ঐ ডাক শুনি না। তুমি কি আকাশ থেকে সকাল, আমার সকাল বলে মাঝে মধ্যে ডাকো? নাকি আমি ভুল শুনি?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a4%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a0%e0%a6%bf-taslima-nasreen/
3713
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাধো
মানবতাবাদী
রায়বাহাদুর কিষনলালের স্যাকরা জগন্নাথ, সোনারুপোর সকল কাজে নিপুণ তাহার হাত। আপন বিদ্যা শিখিয়ে মানুষ করবে ছেলেটাকে এই আশাতে সময় পেলেই ধরে আনত তাকে; বসিয়ে রাখত চোখের সামনে, জোগান দেবার কাজে লাগিয়ে দিত যখন তখন; আবার মাঝে মাঝে ছোটো মেয়ের পুতুল-খেলার গয়না গড়াবার ফরমাশেতে খাটিয়ে নিত; আগুন ধরাবার সোনা গলাবার কর্মে একটুখানি ভুলে চড়চাপড়টা পড়ত পিঠে, টান লাগাত চুলে। সুযোগ পেলেই পালিয়ে বেড়ায় মাধো যে কোন্‌খানে ঘরের লোকে খুঁজে ফেরে বৃথাই সন্ধানে। শহরতলির বাইরে আছে দিঘি সাবেককেলে সেইখানে সে জোটায় যত লক্ষ্মীছাড়া ছেলে। গুলিডাণ্ডা খেলা ছিল, দোলনা ছিল গাছে, জানা ছিল যেথায় যত ফলের বাগান আছে। মাছ ধরবার ছিপ বানাত, সিসুডালের ছড়ি; টাট্টুঘোড়ার পিঠে চড়ে ছোটাত দড়্‌বড়ি। কুকুরটা তার সঙ্গে থাকত, নাম ছিল তার বটু-- গিরগিটি আর কাঠবেড়ালি তাড়িয়ে ফেরায় পটু। শালিখপাখির মহলেতে মাধোর ছিল যশ, ছাতুর গুলি ছড়িয়ে দিয়ে করত তাদের বশ। বেগার দেওয়ার কাজে পাড়ায় ছিল না তার মতো, বাপের শিক্ষানবিশিতেই কুঁড়েমি তার যত। বড়োলোকের ছেলে ব'লে গুমর ছিল মনে, অত্যাচারে তারই প্রমাণ দিত সকলখনে। বটুর হবে সাঁতারখেলা, বটু চলছে ঘাটে, এসেছে যেই দুলালচাঁদের গোলা খেলার মাঠে অকারণে চাবুক নিয়ে দুলাল এল তেড়ে; মাধো বললে, "মারলে কুকুর ফেলব তোমায় পেড়ে।" উঁচিয়ে চাবুক দুলাল এল, মানল নাকো মানা, চাবুক কেড়ে নিয়ে মাধো করলে দুতিনখানা। দাঁড়িয়ে রইল মাধো, রাগে কাঁপছে থরোথরো, বললে, "দেখব সাধ্য তোমার, কী করবে তা করো।" দুলাল ছিল বিষম ভীতু, বেগ শুধু তার পায়ে; নামের জোরেই জোর ছিল তার, জোর ছিল না গায়ে।দশবিশজন লোক লাগিয়ে বাপ আনলে ধরে, মাধোকে এক খাটের খুরোয় বাঁধল কষে জোরে। বললে, "জানিসনেকো বেটা, কাহার অন্ন ধারিস, এত বড়ো বুকের পাটা, মনিবকে তুই মারিস। আজ বিকালে হাটের মধ্যে হিঁচড়ে নিয়ে তোকে, দুলাল স্বয়ং মারবে চাবুক, দেখবে সকল লোকে।" মনিববাড়ির পেয়াদা এল দিন হল যেই শেষ। দেখলে দড়ি আছে পড়ি, মাধো নিরুদ্দেশ। মাকে শুধায়, "এ কী কাণ্ড।" মা শুনে কয়, "নিজে আপন হাতে বাঁধন তাহার আমিই খুলেছি যে। মাধো চাইল চলে যেতে; আমি বললেম, যেয়ো, এমন অপমানের চেয়ে মরণ ভালো সেও।" স্বামীর 'পরে হানল দৃষ্টি দারুণ অবজ্ঞার; বললে, "তোমার গোলামিতে ধিক্‌ সহস্রবার।" ছেলে মেয়ে চলল বেড়ে, হল সে সংসারী; কোন্‌খানে এক পাটকলে সে করতেছে সর্দারি। এমন সময় নরম যখন হল পাটের বাজার মাইনে ওদের কমিয়ে দিতেই, মজুর হাজার হাজার ধর্মঘটে বাঁধল কোমর; সাহেব দিল ডাক; বললে, "মাধো, ভয় নেই তোর, আলগোছে তুই থাক্‌। দলের সঙ্গে যোগ দিলে শেষ মরবি-যে মার খেয়ে।" মাধো বললে, "মরাই ভালো এ বেইমানির চেয়ে।" শেষপালাতে পুলিশ নামল, চলল গুঁতোগাঁতা; কারো পড়ল হাতে বেড়ি, কারো ভাঙল মাথা। মাধো বললে, "সাহেব, আমি বিদায় নিলেম কাজে, অপমানের অন্ন আমার সহ্য হবে না যে।" চলল সেথায় যে-দেশ থেকে দেশ গেছে তার মুছে, মা মরেছে, বাপ মরেছে, বাঁধন গেছে ঘুচে। পথে বাহির হল ওরা ভরসা বুকে আঁটি, ছেঁড়া শিকড় পাবে কি আর পুরোনো তার মাটি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/madu/
5907
সুব্রত পাল
পাগলা, ফাঁদে পা
প্রেমমূলক
পাগলা, সমুদ্দুর ! ভাসবি যদি চল্‌ – মেঘ ভাবলে মেঘ। জল ভাবলে জল।জ্বলতে এত সুখ চোখ জ্বলছে আজ – রূপ ভাবলে রূপ। সাজ ভাবলে সাজ।পাগলা, খালি গায় আছড়ে পড়ে চাঁদ – যোগ ভাবলে যোগ। বাদ ভাবলে বাদ।খেলতে মানা নেই সাজিয়ে নিয়ে ছক – চুপ ভাবলে চুপ। বক্‌ ভাবলে বক্‌।পাগলা, হট্টগোল ! শান্ত হয়ে বোস্‌ – গুণ ভাবলে গুণ। দোষ ভাবলে দোষ।সকালে তাজা প্রাণ সন্ধ্যে বেলা লাশ – দূর ভাবলে দূর। পাশ ভাবলে পাশ।পাগলা, হাতের পাঁচ ধরবি যদি ধর – প্রেম ভাবলে প্রেম। ঘর ভাবলে ঘর।আদর ছুঁয়ে মন শরীর পেতে চায় – বুক ভাবলে বুক। আয় ভাবলে আয়।পাগলা, ফাঁদে পা, এবার কিস্তিমাৎ – দিন ভাবলে দিন। রাত ভাবলে রাত।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%a6%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b2/
851
জসীম উদ্‌দীন
পল্লী বর্ষা
প্রকৃতিমূলক
আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘেরআড়ে, কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে। কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়, ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়! বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়, সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়। কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা তারি স্রোতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া! হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি, নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন দিঠি! চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন বাটে, না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন ঘাটে! কোন্ সে বিরল বুনো ঝাউ শাখে বুনিয়া গোলাপী শাড়ী, – হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি! দিকে দিগেনে- যতদূর চাহি, পাংশু মেঘেরজাল পায়ে জড়াইয়া পথে দাঁড়ায়েছে আজিকার মহাকাল। গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়, – গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়! কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি, কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাঁকা বাঁধেকসি কসি। কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল। মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীরসুরে, আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে। লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল, কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভুল। তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে- আমীর সাধুর নাও, বহুদেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজগাঁও। ডাব্বা হুঁকাও চলিয়াছে ছুটি এর হতে ওর হাতে, নানান রকম রসি বুনানও হইতেছে তার সাথে। বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে, এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপকথা আঁকে! যেন ও বৃদ্ধ, গাঁয়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা, বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা। বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রসি, সমুদ্রকলি শিকা বুনাইয়া নীরবে দেখিছেবসি। কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি, তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী নকসা টানি। বৈদেশী কোন্ বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে, মিঠে-সুরি-গান কাঁপিয়ে রঙিন ঠোঁটের বাঁধন ছেঁড়ে। আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে, বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/post20160508091423/
1001
জীবনানন্দ দাশ
কোনোদিন দেখিব না তারে আমি
সনেট
কোনোদিন দেখিব না তারে আমি: হেমন্তে পাকিবে ধান, আষাঢ়ের রাতে কালো মেঘ নিঙড়ায়ে সবুজ বাঁশের বন গেয়ে যাবে উচ্ছ্বাসের গান সারারাত, — তবু আমি সাপচরা অন্ধ পথে — বেনুবনে তাহার সন্ধান পাবো নাকে: পুকুরের পাড়ে সে যে আসিবে না কোনোদিন হাঁসিনীর সাথে, সে কোনো জ্যোৎস্নায় আর আসিবে না — আসিবে না কখনো প্রভাতে, যখন দুপুরে রোদে অপরাজিতার মুখ হয়ে থাকে ম্লান, যখন মেঘের রঙে পথহারা দাঁড়কাক পেয়ে গেছে ঘরের সন্ধান, ধূসর সন্ধ্যায় সেই আসিবে না সে এখানে; — এইখানে ধুন্দুল লতাতে জোনাকি আসিবে শুধু: ঝিঁঝিঁ শুধু; সারারাত কথা কবে ঘাসে আর ঘাসে বাদুড় উড়িবে শুধু পাখনা ভিজায়ে নিয়ে শান্ত হয়ে রাতের বাতাসে; প্রতিটি নক্ষত্র তার স’ান খুঁজে জেগে রবে প্রতিটির পাশে নীরব ধূসর কণা লেগে রবে তুচ্ছ অনূকণাটির শ্বাসে অন্ধকারে — তুমি, সখি চলে গেলে দূরে তবু; — হৃদয়ের গভীর বিশ্বাসে অশ্বত্থের শাখা ঐ দুলিতেছে; আলো আসে, ভোর হয়ে আসে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kono-din-dekhibo-naa-tarey-aami/
4506
শামসুর রাহমান
এখানে রেখেছি লিখে
মানবতাবাদী
আমার স্বপ্নের ঘাটে বৃষ্টি পড়ে, টগবগে সাদা ঘোড়া পা ঠোকে পিছল মাটিতে, যদি সে পড়ে যায় মুখ থুবড়ে, পাতাগুলি সসম্ভ্রমে ঢেকে দেবে তাকে। বজরায় কে বধূ রয়েছে ব’সে সালংকারা? তার মনোভার পারে না সরিয়ে দিতে স্তব্ধ নিশীথের জলধারা।আমার স্বপ্নের ঘাটে ঈশ্বর পুত্রের আংরাখা বুকে চেপে নারী করে অশ্রুপাত, তার ওপর নক্ষত্র ঝরে, দেবদূত ওড়ে আর চারণ কবির কণ্ঠস্বরে সৃষ্টি হয় জ্যোৎস্নাস্নাত মানবিক গাথা। জগৎ সংসারে প্রতি যুগে মানব সন্তান কত ক্রুশবিদ্ধ হয়, রক্ত মুছে যায় তাণ্ডবে, আমেন।২ ‘কবিকে পোছে না কেউ,’ ব’লে এক গলির মাস্তান গুলী ছোঁড়ে মেঘের মুলুকে। কুকুরেরা চিৎকারে বমন করে ভীতি। কবি কিশোরের পাণ্ডুলিপি গুণ্ডার পায়ের নিচে কবুতরছানা। এই দৃশ্য দেখে কিছু দু’চোখে অঞ্জনমাখা ভণ্ড ধর্মাশ্রয়ী হো হো হাসে, উহাদের হিংস্র দাঁতে জ্যোৎস্নাও পারে না দিতে সৌন্দর্য প্রলেপ। ছিন্নবেশ উন্মাদের অট্রহাসি বরং অধিক রমণীয় মনে হয়। বসিয়া বিজনে কেন একা মনে কবি বৃষ্টিতে ভেজাও দুঃখ? কেন বুকের ভেতরে জ্বালা প্রগাঢ় আগুন ছন্নছাড়া প্রার্থনায়?৩ বয়স ঢলেছে বটে পশ্চিম আকাশে, তবু শব্দবোধ সঠিক হ’ল না মঞ্জরিত। দুরাশায় করেছি মেঘের চাষ দারুণ খরায়। চোখমুখ হায়, জ্বলে পুড়ে যায় রোদের ছ্যাঁকায়। বৃষ্টিহীন দীর্ঘ দিবসের ভস্মকণা দু’চোখে ফোটায় পিন। দুঃস্থ কৃষকের, মজুরের চালডাল চকিতে নেপোয় দেয় মেরে।এ শ্রাবণে হায়রে এমন ঘন ঘোর বরিষায় ফুটোময় টিনের ছাদের তলায় এভাবে প্রাণাধিক বিবি বাচ্চা নিয়ে বাস করা দায়।আত্মত্যাগী, রুক্ষ বুদ্ধিজীবী ঢাউস বইয়ের পাতা চেখে নিজেকে বলেন আজো বলেন জনসভায় ধারালো ভাষায়, ‘এ সংকটে মার্কসীয় দর্শন ছাড়া মুক্তি নেই কোনো। কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো সবার মুখস্থ থাকা চাই। সমাজতন্ত্রের কথা অমৃত সমান, শ্রেণীচ্যুত কবি ভনে, শোনো পুণ্যবান।৪ কীভাবে যে বেঁচে আছি পিশাচ নগরে! দিনদুপুরেই দেখি গুম হ’য়ে যায় লোক, নগররক্ষীরা নিদ্রাতুর, পাহারা ভরসাছুট, সকলেই নিষ্ক্রিয় দর্শক। পচা মাংসের দুর্গন্ধ বেড়ে যায়; যে কোনো মুহূর্তে অন্ধকার ঘাড়ে নিয়ে ভিক্ষুর মুদ্রায় আমি চলে যেতে পারি, বহু পথ ঘুরে টলটলে দিঘির কিনারে এসে শান্তিজল আঁজলায় তুলে নেব, হাওয়ায় উড়বে বৈকালী চীবর।৫ এখানে রেখেছি লিখে নিজেকে নানান ছাঁদে, ছোঁও, ছুঁয়ে দেখো, আমার হৃৎপিণ্ড কীরকম বেজে ওঠে নিরিবিলি। শব্দগুলি মিলনপ্রয়াসী রমণীর মতো বুক উন্মোচন ক’রে দেবে। কেউ গৈরিক বাউল হ’য়ে একতারা হাতে এক পাক ঘুরে এ গহন দুপুরে উঠবে গেয়ে গান, কেউ ত্র্যাকর্ডিয়নের রীডে তার আঙুল নাচাবে। এই লেখা অকস্মাৎ আর্তস্বরে ব’লে দেবে হৃদয়ের উষ্ণ-অশ্রুজলে- আমার শৈশব আর আমার কৈশোর সেই কবে বিক্রি হ’য়ে গেছে কোলাহলে আঁশটে হাটে; যৌবন যে বাজেয়াপ্ত হ’ল কবে, নিজেই জানি না। খুঁজে দেখো, আমার স্পন্দিত বুকে স্তরময় বিষাদের খনি।এখানে রেখেছি লিখে অন্যমনস্কভাবে, নাকি গৃঢ় ঘোরে সে গাছের কথা, নিষ্পত্র যে, যার ডালে ভুলেও বসে না কোনো পাখি, যে দাঁড়িয়ে থাকে দিনভরা রাতভর বজ্রাহত অভিমানে।   (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekhane-rekhechi-likhe/
4115
রেদোয়ান মাসুদ
আবদার
প্রেমমূলক
আমাকে একটু ঘুমাতে দাও সেই কত রাত ঘুমাতে পারি না। আমাকে এক ফোটা জল দাও সেই কতকাল বৃষ্টি দেখি না। আমাকে একটু অক্সিজেন দাও সেই কতকাল শ্বাস প্রশ্বাস চলে না। আমাকে একটু জ্যোৎস্না দাও সেই কতকাল আলো দেখি না। আমাকে এক বিন্দু শিশির দাও সেই কতকাল পা ভিজাতে পারি না। আমাকে একটি গোলাপ দাও সেই কতকাল গন্ধ নেই না। আমাকে একটু্ শ্রোত দাও সেই কতকাল নদীতে ভাসি না। আমাকে একটু স্পর্শ দাও সেই কতকাল তোমাকে ছুই না। আমাকে একটি আকাশ দাও সেই কতকাল মনের সুখে উড়ি না। আমাকে একটি পথ দাও সেই কতকাল তোমাকে নিয়ে হাটি না। আমাকে একটি চাঁদ দাও সেই কতকাল তোমাকে নিয়ে হাসি না। আমাকে একটি আয়না দাও সেই কতকাল তোমাকে দেখিনা। আমাকে একটি মোহনা দাও সেই কতকাল দুজন এক হই না। আমাকে একটু ভালোবাসার সুযোগ দাও সেই কতকাল ভালবাসতে পারি না।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2086.html
1638
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রিয়তমাসু
প্রেমমূলক
তুমি বলেছিলে ক্ষমা নেই, ক্ষমা নেই। অথচ ক্ষমাই আছে। প্রসন্ন হাতে কে ঢালে জীবন শীতের শীর্ণ গাছে। অন্তরে তার কোনো ক্ষোভ জমা নেই। তুমি বলেছিলে, তমিস্রা জয়ী হবে। তমিস্রা জয়ী হলো না। দিনের দেবতা ছিন্ন করেছে অমারাত্রির ছলনা; ভরেছে হৃদয় শিশিরের সৌরভে। তুমি বলেছিলে, বিচ্ছেদই শেষ কথা। শেষ কথা কেউ জানে? কথা যে ছড়িয়ে আছে হৃদয়ের সব গানে, সবখানে; তারও পরে আছে বাঙময় নীরবতা। এবং তুষার মৌলি পাহাড়ে কুয়াশা গিয়েছে টুটে, এবং নীলাভ রৌদ্রকিরণে ঝরে প্রশান্ত ক্ষমা, এবং পৃথিবী রৌদ্রকে ধরে প্রসন্ন করপুটে। দ্যাখো, কোনোখানে কো্নো বিচ্ছেদ নেই। আছে অনন্ত মিলনে অমেয় আনন্দ, প্রিয়তমা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1689
1668
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
মিলিত মৃত্যু
নীতিমূলক
বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়। বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে। বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো। অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায় অনায়াসে সম্মতি দিও না। কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়, তারা আর কিছুই করে না, তারা আত্মবিনাশের পথ পরিস্কার করে। প্রসঙ্গত, শুভেন্দুর কথা বলা যাক। শুভেন্দু এবং সুধা কায়মনোবাক্যে এক হতে গিয়েছিল। তারা বেঁচে নেই। অথবা মৃন্ময় পাকড়াশি। মৃন্ময় এবং মায়া নিজেদের মধ্যে কোনো বিভেদ রাখেনি। তারা বেঁচে নেই। চিন্তায় একান্নবর্তী হতে গিয়ে কেউই বাঁচে না। যে যার আপন রঙ্গে বেঁচে থাকা ভাল, এই জেনে- মিলিত মৃত্যুর থেকে বেঁচে থাকা ভাল, এই জেনে- তা হলে দ্বিমত হওঁ। আস্থা রাখো দ্বিতীয় বিদ্যায়। তা হলে বিক্ষত হও তর্কের পাথরে। তা হলে শানিত করো বুদ্ধির নখর। প্রতিবাদ করো। ঐ দ্যাখো কয়েকটি অতিবাদী স্থির অভিন্নকল্পনাবুদ্ধি যুবক-যুবতী হেঁটে যায়। পরস্পরের সব ইচ্ছায় সহজে ওরা দিয়েছে সম্মতি। ওরা আর তাকাবে না ফিরে! ওরা একমত হবে, ওরা একমত হবে, ওরা একমত হতে-হতে কুতুবের সিঁড়ি বেয়ে উর্ধ্বে উঠে যাবে, লাফ দেবে শূন্যের শরীরে। ২৪ ফাল্গুন, ১৩৬৭
https://banglarkobita.com/poem/famous/1671
3174
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার দয়া যদি চাহিতে নাও জানি
ভক্তিমূলক
তোমার দয়া যদি চাহিতে নাও জানি তবুও দয়া করে চরণে নিয়ো টানি। আমি যা গড়ে তুলে আরামে থাকি ভুলে সুখের উপাসনা করি গো ফলে ফুলে– সে ধুলা-খেলাঘরে রেখো না ঘৃণাভরে, জাগায়ো দয়া করে বহ্নি-শেল হানি।সত্য মুদে আছে দ্বিধার মাঝখানে, তাহারে তুমি ছাড়া ফুটাতে কে বা জানে। মৃত্যু ভেদ করি’ অমৃত পড়ে ঝরি’, অতল দীনতার শূন্য উঠে ভরি’ পতন-ব্যথা মাঝে চেতনা আসি বাজে, বিরোধ কোলাহলে গভীর তব বাণী।২২ শ্রাবণ, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomar-doya-jodi-chahite-nao-jani/
4609
শামসুর রাহমান
কৃষ্ণপক্ষে অসহায় পঙ্‌ক্তিমালা মহিমাবিহীন যীশু
মানবতাবাদী
এ কী? এই শহরের গাছগুলি ক্ষণে ক্ষণে রক্ত বমি ক’রে প্রবল ভাসিয়ে দিচ্ছে পথ ঘাট, মাঝে মাঝে থামছে খানিক, পরমুহূর্তেই ফের ফিন্‌কি দিয়ে রক্ত ঝরে, যেন ওরা ভীষণ আক্রোশে ছুড়ে দিচ্ছে লাল থুতু। শুধু কি আক্রোশ? নাকি ভয়ানক বিবমিষা আজ করেছে দখল এই নগরের বৃক্ষসমাজকে! ইচ্ছে হল ছুটে যাই। তাদের নিকট, সেবা শুশ্রূষায় মুছে ফেলি রোগের মলিন ছায়া, বৃক্ষসমাজের বর্তমান অস্তিত্বের ধূসরতা অকৃত্রিম সবুজে বদলে দিই, ডেকে আনি ফের পলাতক কোকিলকে রোগমুক্ত সতেজ পাতার আস্তানায়। আমি তো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল অথবা জীবনানন্দ নই, কেন আমার নাছোড় আবেদনে পীড়িত গাছের পাতা আবার সবুজ আভা ফিরে পাবে? কেন কোকিল আসবে ফিরে নাগরিক বিপন্ন গাছের মজলিশে সুর ঝরাতে আবার?মাথা নিচু ক’রে ফিরে যাচ্ছি শ্যামলীর অবসন্ন গলিমুখে; অকস্মাৎ পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে, দেখি- মাটি ফুঁড়ে আগুনের জ্বলজ্যান্ত ঢেলা চৌদিকে ছিটিয়ে পড়ে, এ কী! নড়ে ওঠে সুপ্রাচীন ডাইনোসরের মাথা, হিংস্র দাঁতগুলো নিমেষে আমাকে গেঁথে ফেলে, যেন আমি মহিমাবিহীন যীশু!  (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/krishnopokkhe-osohay-pongktimala-mohimabihin-jishu/
1348
তসলিমা নাসরিন
প্রত্যাশা
প্রেমমূলক
কারুকে দিয়েছ অকাতরে সব ঢেলে সেও অন্তত কিছু দেবে ভেবেছিলে। অথচ ফক্কা, শূন্যতা নিয়ে একা পড়ে থাকো আর দ্রুত সে পালায় দূরে ভালবেসে কিছু প্রত্যাশা করা ভুল। আলোকিত ঘর হারিয়ে ধরেছ অন্ধকারের খুঁটি যারা যায় তারা হেসে চলে যায়, পেছনে দেখে না ফিরে। তলা ঝেড়ে দিলে, যদিও জোটেনি কানাকড়ি কিছু হাতে তুমি অভুক্ত, অথচ তোমার সম্পদ খায় তারা যাদের বেসেছ নিংড়ে নিজেকে ভাল। ঠকতেই হবে ভালবেসে যদি গোপনে কিছুর করো প্রত্যাশা কোনও, এমনকি ভালবাসাও পাবার আশা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/409
4731
শামসুর রাহমান
জীবন কেটেই গেল প্রায়
চিন্তামূলক
জীবন কেটেই গেল প্রায়, তবু এই স্বদেশের রৌদ্র ছায়া, জ্যোৎস্নাধারা, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা নদীর তীর, আপনজনের মধুর সংসর্গ ছেড়ে যাওয়ার ভাবনা কখনও দিইনি ঠাঁই এমনকি মনের গহন কন্দরেও। কারও সাতে-পাঁচে নেই আমি, কখনও দিইনি ছাই কারও বাড়া ভাতে, শুধু একাকী নিজের ঘরে লিখেছি কবিতা।আমার অনেক প্রিয়জন উচ্চাশায় মজে জ্বলজ্বলে এক জীবনের সন্ধ্যানে দিয়েছে পাড়ি ভিন্‌ দেশে, আমি রয়ে গেছি এই প্রিয় বাংলায় আমার বিপদের উদ্যত বর্শা, বন্দুকের মুখে, কাটিয়েছি কত না বিনিদ্র থরথর রাত, এমনকি রক্তরাঙা ঢের দ্বিপ্রহর। বিভীষিকা জীবনের গায়ে পড়া ইয়ার এখন!বুক খুব ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে হাঁটে পথে সিটি বাজাতে বাজাতে সন্ত্রাসের জগতের কত যে মোড়ল, কে তার হিসের রাখে? ধর্মের আড়ালে কত কট্রর সন্ত্রাসী মাঠে ময়দানে, সরকারী ক্যামেরায় দাপট দেখিয়ে বলে, ‘এক্ষুণি বিদায় হও, যাও জাহান্নামেঃ তোমাদের ঠাঁই নেই আমাদের মুলুকে এখন।‘যখন নিঝুম বিষণ্নতা আমাকে দখল করে, দু’পাশের গাছপালা, গোলাপ, চামেলি কৃষ্ণচূড়া, চন্দ্রমল্লিকা এবং বুড়িগঙ্গা, মেঘনা নদীর তীর, শ্যামলীর নীড়, পাড়াতলী গাঁয়ের কাজল মাটি বলে সমস্বরে,- ‘আমাদের ছেড়ে প্রিয় কবি যেও না কোথাও, তুমি আমাদের একান্ত আপন। আমি কাদের প্রস্তাব নেব মেনে?
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jibon-ketei-gelo-prai/
3231
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুই আমি
ছড়া
বৃষ্টি কোথায় নুকিয়ে বেড়ায় উড়ো মেঘের দল হয়ে , সেই দেখা দেয় আর - এক ধারায় শ্রাবণ - ধারার জল হয়ে । আমি ভাবি চুপটি করে মোর দশা হয় ওই যদি ! কেই বা জানে আমি আবার আর - একজনও হই যদি ! একজনারেই তোমরা চেন আর - এক আমি কারোই না । কেমনতরো ভাবখানা তার মনে আনতে পারোই না । হয়তো বা ওই মেঘের মতোই নতুন নতুন রূপ ধরে কখন সে যে   ডাক দিয়ে যায় , কখন থাকে চুপ করে । কখন বা সে পুবের কোণে আলো - নদীর বাঁধ বাঁধে , কখন বা সে আধেক রাতে চাঁদকে ধরার ফাঁদ ফাঁদে । শেষে তোমার ঘরের কথা মনেতে তার যেই আসে , আমার মতন হয়ে আবার তোমার কাছে সেই আসে । আমার ভিতর লুকিয়ে আছে দুই রকমের দুই খেলা , একটা সে ওই আকাশ - ওড়া , আরেকটা এই ভুঁই - খেলা । (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dui-ami/
4255
শঙ্খ ঘোষ
খাল
প্রেমমূলক
ভাঙা নৌকো পড়ে আছে খালের কিনারভরা এখন সন্ধ্যার শত নাম; তুমি আমি মুখোমুখি নই আর। অবসাদ দিয়েছিলে মনে পড়ে, শুধু মনে পড়ে না কখন অপরের হাত ধরে চলে গেছ নদীর জোয়ারে।চারিদিকে সব জল ঠিক আছে নীরবতাময়। মাঝে-মাঝে যেন কোনো হঠাৎ শুশুক ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যায় ব্যবহৃত সময়ের টান— আমি যার নাম জানি সে কি জানে আমার হৃদয়?খাল থেকে ছোটো খাল আরো ছোটো ছোটো সব খালের ভিতরে কিছু আর মুখোমুখি নয় আড়ালে অদৃশ্য জালে ঢাকা আছে বীজাণুর কাল— এখন নদীর দিকে ভালোবাসা প্রতিহত হয়।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
5122
শামসুর রাহমান
মুদ্রিত করেছি ভালবাসা
মানবতাবাদী
যদি বলি কবিতার দিকে মুখ রেখে কাটিয়েছি কতকাল, মিথ্যা বলা হবে? যে কোনো ছুতোয় তার বুকে ঝুঁকে থাকি অপলক, বসি গিয়ে বৃক্ষচূড়ে কপোত-কপোত যথা-মাথায় থাকুন মাইকেল- তার প্রতি ভালবাসা মুদ্রিত করেছি সারাবেলা। কপোতাক্ষ নদীটির তীরে বসে মনে হয়, হায়, প্রকৃত কবিতা আজও আমার নিকট থেকে দূরে সরে আছে পর্দানশিনের লাস্যে; আমার ব্যথিত হৃদয়ের চিতাগ্নিতে এইমাত্র ছিটিয়ে দিয়েছি কিছু জল; ধোঁয়া ওঠে, কী ভীষণ চোখ জ্বালা করে! কমিউনিস্ট ইস্তাহার, বলা যায়, নব্য প্রেরণায় মুখস্ত করেছি; তবু অক্ষরের কেয়ারিতে দেখে গোলাপের পেলবতা, পক্ষীর কটাক্ষ, ভ্রমরের আড়িপাতা, কবিতাকে যত্রতত্র করেছি চুম্বন।   (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/mudrito-korechi-valobasha/
3233
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুই পাখি
রূপক
খাঁচার পাখি ছিল     সোনার খাঁচাটিতে বনের পাখি ছিল বনে। একদা কী করিয়া     মিলন হল দোঁহে, কী ছিল বিধাতার মনে। বনের পাখি বলে,  খাঁচার পাখি ভাই, বনেতে যাই দোঁহে মিলে। খাঁচার পাখি বলে-- বনের পাখি, আয় খাঁচায় থাকি নিরিবিলে।' বনের পাখি বলে-- "না, আমি     শিকলে ধরা নাহি দিব।' খাঁচার পাখি বলে-- "হায়, আমি     কেমনে বনে বাহিরিব!' বনের পাখি গাহে বাহিরে বসি বসি বনের গান ছিল যত, খাঁচার পাখি পড়ে শিখানো বুলি তার-- দোঁহার ভাষা দুইমতো। বনের  পাখি বলে, খাঁচার পাখি ভাই, বনের গান গাও দিখি। খাঁচার পাখি বলে, বনের পাখি ভাই, খাঁচার গান লহো শিখি। বনের পাখি বলে-- না, আমি     শিখানো গান নাহি চাই।' খাঁচার পাখি বলে-- "হায়, আমি     কেমনে বন-গান গাই।' বনের পাখি বলে, "আকাশ ঘননীল, কোথাও বাধা নাহি তার।' খাঁচার পাখি বলে, "খাঁচাটি পরিপাটি কেমন ঢাকা চারি ধার।' বনের পাখি বলে, "আপনা ছাড়ি দাও মেঘের মাঝে একেবারে।' খাঁচার পাখি বলে, নিরালা সুখকোণে বাঁধিয়া রাখো আপনারে!' বনের পাখি বলে-- "না, সেথা     কোথায় উড়িবারে পাই!' খাঁচার পাখি বলে-- "হায়, মেঘে     কোথায় বসিবার ঠাঁই!' এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালোবাসে তবুও কাছে নাহি পায়। খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে, নীরবে চোখে চোখে চায়। দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে, বুঝাতে নারে আপনায়। দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা, কাতরে কহে, "কাছে আয়!' বনের পাখি বলে--না, কবে     খাঁচার রুধি দিবে দ্বার। খাঁচার পাখি বলে--হায়, মোর     শকতি নাহি উড়িবার। শাহাজাদপুর  ১৯ আষাঢ়  ১২৯৯ কাব্যগ্রন্থ - সোনার তরী
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/two-birds/
4956
শামসুর রাহমান
প্রত্যাশা ছিল না কোনো
সনেট
প্রত্যাশা ছিল না কোনো, তবু যেন কে ঐন্দ্রজালিক হঠাৎ ঘটিয়ে দিল চোখের পলকে এই সব আশ্চর্য আমার জন্যে-এই অলৌকিক কলরব, দুয়ারে পুষ্পক রথ, অন্তরে নিভৃত মাঙ্গলিক। এই যে তোমার মুখোমুখি বসে আছি শীতাতপ নিয়ান্ত্রিত ঘরে নিরিবিলি, দেবব্রত গানে গানে মুহূর্তগুলোকে অনুপম সাজিয়ে দিচ্ছেন, প্রাণে সুদূরের তৃষ্ণা জাগে, ঘর করে সুন্দরের জপ।যেন দিব্যনদীতীরে পেয়ে গ্যাছে ঠাঁই ভগ্নস্বাস্থ্য এই কবি। নিজের সৌন্দর্য নিয়ে করোনি বড়াই কোনোদিন, কিন্তু আমি তোমার বাহির-অন্তরের রূপে মুগ্ধ, ‘মাঝে-মধ্যে ছন্নছাড়া লোকটা আসতো এখানে’, বলবে কেউ কেউ, ‘সে তো করতো লড়াই অশুভের সঙ্গে, মুহূর্তের মুক্তো কুড়াতে সে ঢের!   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prottasha-chilo-na-kono/
704
জয় গোস্বামী
প্রেমিক
প্রেমমূলক
তুমি আমাকে মেঘ ডাকবার যে বইটা দিয়েছিলে একদিন আজ খুলতেই দেখি তার মধ্যে এক কোমর জল। পরের পাতায় গিয়ে সে এক নদীর অংশ হয়ে দূরে বেঁকে গেছে।আমাকে তুমি উদ্ভিদ ভরা যে বইটা দিয়েছিলে আজ সেখানে এক পা-ও এগোনো যাচ্ছে না, এত জঙ্গল। গাছগুলো এত বড় হয়েছে যে মাটিতে আলো আসতে দিচ্ছে না।তুমি আমাকে ঝর্ণা শেখবার যে বইটা দিয়েছিলে আজ সেখানে মস্ত এক জলপ্রপাত লাফিয়ে পড়ছে সারাদিন।এমনকি তোমার দেওয়া পেজ-মার্কের সাদা পালকটাও যে বইতে রেখেছিলাম, সেখানে আজ কত সব পাখি উড়ছে, বসছে, সাঁতার কাটছে। তোমার দেওয়া সব বই এখন মরুভূমি আর পর্বতমালা, সব বই আজ সূর্য, সব বই দিগন্ত …অথচ আজকেই যে আমার লাইব্রেরি দেখতে আসছে বন্ধুরা আমার পড়াশোনা আছে কিনা জানার জন্য! তাদের আমি কী দেখাবো? তাদের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবো আমি!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রতুমি আমাকে মেঘ ডাকবার যে বইটা দিয়েছিলে একদিন আজ খুলতেই দেখি তার মধ্যে এক কোমর জল। পরের পাতায় গিয়ে সে এক নদীর অংশ হয়ে দূরে বেঁকে গেছে।আমাকে তুমি উদ্ভিদ ভরা যে বইটা দিয়েছিলে আজ সেখানে এক পা-ও এগোনো যাচ্ছে না, এত জঙ্গল। গাছগুলো এত বড় হয়েছে যে মাটিতে আলো আসতে দিচ্ছে না।তুমি আমাকে ঝর্ণা শেখবার যে বইটা দিয়েছিলে আজ সেখানে মস্ত এক জলপ্রপাত লাফিয়ে পড়ছে সারাদিন।এমনকি তোমার দেওয়া পেজ-মার্কের সাদা পালকটাও যে বইতে রেখেছিলাম, সেখানে আজ কত সব পাখি উড়ছে, বসছে, সাঁতার কাটছে। তোমার দেওয়া সব বই এখন মরুভূমি আর পর্বতমালা, সব বই আজ সূর্য, সব বই দিগন্ত …অথচ আজকেই যে আমার লাইব্রেরি দেখতে আসছে বন্ধুরা আমার পড়াশোনা আছে কিনা জানার জন্য! তাদের আমি কী দেখাবো? তাদের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবো আমি!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
4840
শামসুর রাহমান
দুই বন্ধুর কথা
স্বদেশমূলক
শাহেদ বিষণ্ন স্বরে মুখোমুখি বসে-থাকা প্রিয় সতীশকে বলে, ‘কেন তুমি আজকাল এরকম কিছু শব্দ ব্যবহার করো যেগুলো কখনও আগে উচ্চারণ করতে না? আমাদের ব্যবহৃত কিছু বিশিষ্ট বিদেশী শব্দ মুসলমানেরা ব্যবহার করে যাতে বাংলার আভাস নেই মোটে!‘শুনতে শুনতে উর্দু শব্দ মুখে অবলীলাক্রমে চলে আসে। কী করবো, বলো ভাই?’ সতীশ সলজ্জ কণ্ঠস্বরে বলে ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে। শাহেদের কণ্ঠস্বরে বেদনার রেশ জেগে থাকে। সতীশের হাতে হাত রেখে বলে শাহেদ, ‘শোনো হে বন্ধু, ছাড়ো এই রীতি, নিজের বৈশিষ্ট্য থেকে হয়ো না বিচ্যুত কোনও কালে।‘এরপর কেটে গেছে কিছুদিন। শহরে ও গ্রামে ঘোর, হিংস্র অমাবস্যা নেমে আসে সংখ্যালঘুদের জীবনে সহসা। কোনও কোনও পুরুষের প্রাণ ঝরে যায়, যুবতীর মানহানি ঘটে ক্রূর মনুষ্যরূপের অন্তরালে লুক্কায়িত লোভী পশুর ধর্ষণে। শাহেদ দেখতে যায় সতীশকে প্রায়শই, সাহস জোগায় সবাইকে। শাহেদের আরচণ আর আশাবাদী কথামালা জাগায় সাহস সতীশের ভাবনায়। উপরন্তু নিজেও সে এই দেশ যা তার আপন জন্মভূমি, এর সোঁদা মাটি ছেড়ে যাবে না কোথাও কোনও দিন ডেরা বেঁধে নেয়ার প্রফুল্ল বাসনায়। সতীশের কথামালা থেকে ইদানিং উর্দু, ফার্সি শব্দাবলী ঝরে গেছে।  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dui-bondhur-kotha/
3292
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
না চেয়ে যা পেলে তার যত দায়
চিন্তামূলক
না চেয়ে যা পেলে তার যত দায় পুরাতে পার না তাও, কেমনে বহিবে চাও যত কিছু সব যদি তার পাও!   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/na-cheye-ja-pele-tar-joto-dai/
3674
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভোতনমোহন স্বপ্ন দেখেন
ছড়া
ভোতনমোহন স্বপ্ন দেখেন, চড়েছেন চৌঘুড়ি। মোচার খোলার গাড়িতে তাঁর ব্যাঙ দিয়েছেন জুড়ি। পথ দেখালো মাছরাঙাটায়, দেখল এসে চিংড়িঘাটায়– ঝুম্‌কো ফুলের বোঝাই নিয়ে মোচার খোলা ভাসে। খোকনবাবু বিষম খুশি খিল্‌খিলিয়ে হাসে।উত্তরায়ণ, ৫। ৯। ৩৮ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/votonmohon-swapno-dekhen/
2409
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সূর্য্য
সনেট
এখনও আছে লোক দেশ দেশান্তরে দেব ভাবি পূজে তোমা, রবি দিনমণি, দেখি তোমা দিবামুখে উদয়-শিখরে, লুটায়ে ধরণীতলে, করে স্তুতি-ধ্বনি ; আশ্চর্যের কথা, সূৰ্য্য, এ না মনে গণি। অসীম মহিমা তব, যখন প্রখরে শোভ তুমি, বিভাবসু, মধ্যাহ্নে অম্বরে সমুজ্জ্বল করজালে আবরি মেদিনী ! অসীম মহিমা তব, অসীম শকতি, হেম-জ্যোতিঃ-দাতা তুমি চন্দ্র-গ্রহ-দলে ; উর্ব্বরা তোমার বীর্য্যে সতী বসুমতী ; বারিদ, প্রসাদে তব, সদা পূর্ণ জলে ;— কিন্তু কি মহিমা তাঁর, কহ, দিনপতি, কোটি রবি শোভে নিত্য যাঁর পদতলে!
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/shurjo/
1328
তসলিমা নাসরিন
জীবনের কথা
প্রেমমূলক
জীবন এত ছোট কেন! এত ছোট কেন জীবন! ছোট কেন এত! জীবনের ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়, হলিই যদি, এত ছোট হলি কেন! এর রূপ রস গন্ধ ঘ্রাণ উপভোগ করতে দে, দিলিই যদি জগতকে হাতে। ভালোবাসা যদি শেখালিই, তবে পেতে দিস না কেন, দিতে দিস না কেন সাধ মিটিয়ে! খালি চলে যাস, খালি ফুরিয়ে যাস। জীবন খসে যাক ধসে যাক জীবন জাহান্নামে যাক, চলো ভুলে যাই জীবন ফুরোচ্ছে সে কথা, ভুলে যাই মৃত্যু বলে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘাড়ের ওপর বসে আছে। চলো ভালোবাসি, চলো বেঁচে থাকি, প্রচণ্ড বেঁচে থাকি হৃদয় বাঁচিয়ে রাখি হৃদয়ের তাপে যেমনই ভাঙাচোরা হোক জীবন, চলো জীবনের কথাই বলি, চুম্বনে চুম্বনে শুকোতে থাকা শরীরকে ভিজিয়ে রাখি, তরতাজা রাখি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2007
5649
সুকুমার রায়
বন্দনা
ভক্তিমূলক
নমি সত্য সনাতন নিত্য ধনে, নমি ভক্তিভরে নমি কায়েমনে। নমি বিশ্বচরাচর লোকপতে নমি সর্বজনাশ্রয় সর্বগতে। নমি সৃষ্টি-বিধারণ শক্তিধরে, নমি প্রাণপ্রবাহিত জীব জড়ে। তব জ্যোতিবিভাসিত বিশ্বপটে মহাশুন্যতলে তব নাম রটে। কত সিন্ধুতরঙ্গিত ছন্দ ভরে কত স্তব্ধ হিমাচল ধ্যান করে। কত সৌরভ সঞ্চিত পুষ্পদলে কত সূর্য বিলুন্ঠিত পাদতলে। কত বন্দনঝঙ্কৃত ভক্তচিতে নমি বিশ্ব বরাভয় মৃত্যুজিতে।  (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/bondona/
4966
শামসুর রাহমান
প্রেমিকের গুণ
সনেট
কেমন প্রেমিক আমি? বহু দীর্ঘ বছরের পর এ প্রশ্ন তুলছে মাখা অন্ধকার মনের বিবরে। তুমিও আমার প্রতি, হায়, তারাও এমন ক’রে আজকাল মাঝে-মাঝে, মনে হয়, প্রশ্নের উত্তর একান্ত জরুরি- নইলে একটি দেয়াল নিমেষেই ভীষণ দাঁড়িয়ে যাবে আমাদের মধ্যে। হয়তো ভাবো কোনো কোনো বিক্ষুব্ধ প্রহরে, আমি কী এমন পাবো এই খাপছাড়া লোকটার কাছে বস্তুত যা নেইঅন্যের আয়ত্তে আজ? প্রেমিকের গুণাবলী কী-যে জানি না সঠিক কিছু, শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। যখন আমাকে দ্যাখো তুমি, আমার হৃদয়ে বাঁশি বেজে ওঠে, চোখে জাগে নতুন সভ্যতা, দীপ্র বীজে ধনী হয় মনোভূমি। তোমারই উদ্দেশে দুটি হাত বাড়াই, আবার থামি, পাছে করো ঘৃণা অকস্মাৎ।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/premiker-gun/
5063
শামসুর রাহমান
ভালো লাগে
চিন্তামূলক
কৈশোরে পৌঁছে মাত্র দু’চার দিনের ফারাকে একে একে বাপ-মা দু’জনকেই হারিয়ে ফেলে মুতালিব আলি। প্রথমে এক ব্যাপক অমাবস্যা কাফনের মতো এঁটে গেল ওর সত্তায়। কিন্তু একদিন শরতের রোদ্দুর ওর কৈশোরকে হাত ধরে পৌঁছে দিলো যৌবনে। মধ্য যৌবনে মুতালিব আলির ঘরে এল এক-গা চমকিলা যৌবন নিয়ে এক কনে। ওকে দেখলে অবশ্য কু’চবরণ কন্যার মেঘবরণ চুলের কথা মনে পড়েনা। কিন্তু একেবারে ফ্যালনাও নয় সে মেয়ের রূপ। এক ধরনের মাধুর্য ওর সারা মুখ জুড়ে খেলা করে বিকেলবেলার আলোর মতো। একদিন মুতালিব আলির খালি ঘরে তার ঘরণীর কোলে মাণিকের আভা ছড়িয়ে খোকা এল। দিন যায়, খোকা মায়ের কোল ছেড়ে উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় যায়। মিছিলে আওয়াজ তোলে, সে আওয়াজে দোলে সারি সারি কুর্শি, চলে জোর কদম। গুলি খায়, লুটিয়ে পড়ে ভবিষ্যতের দিকে মুখ রেখে।বুকের একমাত্র মাণিককে হারিয়ে মা বিলাপ করে। মুতালিব আলি কাঁচা-পাকা চুলভর্তি মাথা নিয়ে বসে থাকেন রঁদ্যার মূর্তির মতো। কাল, বিখ্যাত শুশ্রুষাকারী, তাকে মাঝে মধ্যে রক্তকরবীর গুচ্ছ এবং কোত্থেকে উড়ে-আসা পাখির পুচ্ছ থেকে চোখ সরাতে দেয় না। মুতালিব আলি অফিসে যান, সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় গুনগুনিয়ে সুর ভাঁজেন পুরানো গানের।এক হেমন্তসন্ধ্যায় মুতালিব আলির গৃহিনী, জয়তুন খাতুন, বুকের বাঁদিকটা চেপে ধরে টলে পড়লেন, সারা দুনিয়া দুলে উঠলো খোকার শৈশবের দোলনার মতো! তারপর আর তিনি উঠে দাঁড়াননি গা ঝাড়া দিয়ে। মুতালিব আলি এখন একা, ভীষণ একা, একেবারে একা। এখন তার জীবন যেন খুব সান্নাটা এক গোরস্তান। দিন যায়, চুলে আরো বেশি পাক ধরে, মুখের ভাঁজগুলি হয় গাঢ়তর। দিন যায়, পূর্ণিমারাতে বলক-দেওয়া দুধের ফেনার মতো জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে উঠোনে, জানলা গলে লুটিয়ে পড়ে খাঁখাঁ বিছানায়। দক্ষিণ দিক থেকে এক ঝাঁক স্বপ্নের মতো হাওয়া আসে, ভালো লাগে, মুতালিব আলির ভালো লাগে।   (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/valo-lage/
987
জীবনানন্দ দাশ
কার্তিক মাঠের চাঁদ (মাঠের গল্প)
প্রেমমূলক
জেগে ওঠে হৃদয়ে আবেগ ,- পাহাড়ের মতো ওই মেঘ সঙ্গে লয়ে আসে মাঝরাতে কিংবা শেষরাতের আকাশে যখন তোমারে !- মৃত সে পৃথিবী এক আজ রাতে ছেড়ে দিল যারে ! ছেঁড়া- ছেঁড়া শাদা মেঘ ভয় পেয়ে গেছে সব চ’লে তরাসে ছেলের মতো ,- আকাশে নক্ষত্র গেছে জ্ব’লে অনেক সময়,- তারপর তুমি এলে, মাঠের শিয়রে ,-চাঁদ ;- পৃথিবীতে আজ আর যা হবার নয়, একদিন হয়েছে যা,- তারপর হাতছাড়া হয়ে হারায়ে ফুরায়ে গেছে,- আজো তুমি তার স্বাদ লয়ে আর একবার তবু দাঁড়ায়েছে এসে ! নিড়নো হয়েছে মাঠ পৃথিবীর চারদিকে, শস্যের ক্ষেত চষে- চষে গেছে চাষা চ’লে; তাদের মাটির গল্প- তাদের মাঠের গল্প সব শেষ হ’লে অনেক তবুও থাকে বাকি,- তুমি জান – এ- পৃথিবী আজ জানে তা কি !
https://banglarkobita.com/poem/famous/873
5502
সুকান্ত ভট্টাচার্য
প্রিয়তমাসু
স্বদেশমূলক
সীমান্তে আজ আমি প্রহরী। অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম ক'রে আজ এখানে এসে থমকে দাড়িয়েছি- স্বদেশের সীমানায়। ধূসর তিউনিসিয়া থেকে স্নিগ্ধ ইতালী, স্নিগ্ধ ইতালী থেকে ছুটে গেছি বিপ্লবী ফ্রান্সে নক্ষত্রনিয়ন্ত্রিত নিয়তির মতো দুর্নিবার, অপরাহত রাইফেল হাতে; - ফ্রান্স থেকে প্রতিবেশী বার্মাতেও। আজ দেহে আমার সৈনিকের কড়া পোশাক, হাতে এখনো দুর্জয় রাইফেল, রক্তে রক্তে তরঙ্গিত জয়ের আর শক্তির দুর্বহ দম্ভ, আজ এখন সীমান্তের প্রহরী আমি। আজ নীল আকাশ আমাকে পাঠিয়েছে নিমন্ত্রণ, স্বদেশের হাওয়া বয়ে এনেছে অনুরোধ, চোখের সামনে খুলে ধরেছে সবুজ চিঠি : কিছুতেই বুঝি না কী ক'রে এড়াব তাকে? কী ক'রে এড়াব এই সৈনিকের কড়া পোশাক? যুদ্ধ শেষ। মাঠে মাঠে প্রসারিত শান্তি, চোখে এসে লাগছে তারই শীতল হাওয়া, প্রতি মুহূর্তে শ্লথ হয়ে আসে হাতের রাইফেল, গা থেকে খসে পড়তে চায় এই কড়া পোশাক, রাত্রে চাঁদ ওঠে : আমার চোখে ঘুম নেই। তোমাকে ভেবেছি কতদিন, কত শত্রুর পদক্ষেপ শোনার প্রতীক্ষার অবসরে, কত গোলা ফাটার মুহূর্তে। কতবার অবাধ্য হয়েছে মন, যুদ্ধজয়ের ফাঁকে ফাঁকে কতবার হৃদয় জ্বলেছে অনুশোচনার অঙ্গারে তোমার আর তোমাদের ভাবনায়। তোমাকে ফেলে এসেছি দারিদ্র্যের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছি দুর্ভিক্ষের আগুনে, ঝড়ে আর বন্যায়, মারী আর মড়কের দুঃসহ আঘাতে বাব বার বিপন্ন হয়েছে তোমাদের অস্তিত্ব। আর আমি ছুটে গেছি এক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আর এক যুদ্ধক্ষেত্রে। জানি না আজো, আছ কি নেই, দুর্ভিক্ষে ফাঁকা আর বন্যায় তলিয়ে গেছে কিনা ভিটে জানি না তাও। তবু লিখছি তোমাকে আজ : লিখছি আত্মম্ভর আশায় ঘরে ফেরার সময় এসে গেছে। জানি, আমার জন্যে কেউ প্রতীক্ষা ক'রে নেই মালায় আর পতাকায়, প্রদীপে আর মঙ্গলঘটে; জানি, সম্বর্ধনা রটবে না লোক মুখে, মিলিত খুসিতে মিলবে না বীরত্বের পুরস্কার। তবু, একটি হৃদয় নেচে উঠবে আমার আবির্ভাবে সে তোমার হৃদয়। যুদ্ধ চাই না আর, যুদ্ধ তো থেমে গেছে; পদার্পণ করতে চায় না মন ইন্দোনেশিয়ায় আর সামনে নয়, এবার পেছনে ফেরার পালা। পরের জন্যে যুদ্ধ করেছি অনেক, এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্যে। প্রশ্ন করো যদি এত যুদ্ধ ক'রে পেলাম কী? উত্তর তার- তিউনিসিয়ায় পেয়েছি জয়, ইতালীতে জনগণের বন্ধুত্ব, ফ্রান্সে পেয়েছি মুক্তির মন্ত্র; আর নিষ্কণ্টক বার্মায় পেলাম ঘরে ফেরার তাগাদা। আমি যেন সেই বাতিওয়ালা, সে সন্ধ্যায় রাজপথে-পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ্য, নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1107
5211
শামসুর রাহমান
শব্দের সংস্রবে কতকাল
চিন্তামূলক
শব্দের সংস্রবে কতকাল কেটে গেছে, মেলামেশা ভালোবাসাবাসি হয়েছে শব্দের সঙ্গে বারে বারে। দূর থেকে ওরা কেউ কেউ বহুক্ষণ আড়চোখে তাকিয়ে থেকেছে, কতদিন কানামাছি খেলার প্রস্তাব রেখে দিয়েছে সম্পট অকস্মাৎ আমাকে কিছু না বলে। ধুলো কিংবা মেঘের আড়ালে দূর দিগন্তের দিকে পলায়নপর কাউকে কাউকে আমি উপড়ে এনেছি, বলা যায়, মায়াবী উদ্যান থেকে। কেউ কেউ এমনই নাছোড়, মধ্যপথে তর্ক জোড়ে, কে কোন পরিধি ভালোবাসে বিশদ বুঝিয়ে দ্যায় যুক্তি বিশ্লেষণে। আজকাল, হা কপাল, কোকিলও উকিল হয়ে যায়। বাঁচাই ভাষার ঝরণাধারা। শত নুড়ি, লতাগুল্ম-রঙধনু, কখনো বা খরবেগ চোরা টান থাকে, মাধুর্যের উন্মীলন, বাঘের হুংকার, নবজাতকের স্পন্দমান বুক অথবা লাশের পাশে প্রহর যাপন, পুরোনো বাড়িতে গিয়ে কাউকে না পাওয়া, মর্চেপড়া চাঁদ, স্বাস্থ্যেজ্জ্বল শবাগার থাকে ভাষার চঞ্চল ওষ্ঠে। শব্দের ওপারে গোরখোদক পরখ করে মাটি সন্ধ্যেবেলা, কুকুর প্রভুর দিকে চেয়ে থাকে জ্বলজ্বেল চোখে, একাকী কর্কশ খুনী হাত ধোয় ঝরণাতলে, জননী কন্যায় চুল বাঁধে, বালক ওড়ায় দ্বিপ্রহরে কত সাবানের রঙিন বুদ্ধুদ, পড়ার টেবিলে কেউ এলোকেশী মাথা রেখে স্বপ্ন দ্যাখে, দ্যাখে শাদা ঘোড়া ছুটে যায় অভ্রের প্রান্তরে, পায়ে তার সোনার মুকুট, জলোচ্ছ্বাস,প্রেমিকের মুঠো থেকে প্রেমিকার হাত ছিঁড়ে যায়। ভোরে অপরাহ্নে, চন্দ্রালোকে স্মিত ডানা-অলা ডাকপিয়ন দোলনচাঁপা চিঠি তাড়া তাড়া রেখে আসে লাল বাক্সে, উড়ে উড়ে ফেরে মেঘলোকে, ভীষণ শুকিয়ে-যাওয়া ইঁদারার মতো কিছু মাঝে মধ্যে হাহাকার করে আমার ভেতরে।যদি উচ্চারিত হলে সর্বদা আমার দৃষ্টিপথে একটি খয়েরী বাড়ি উদ্ভাসিত হয়, গেটে যার যুগল রূপালি ছুরি ঝোলে সারাক্ষণ। যখন অথবা বলে কেউ, একটি সুদীর্ঘ পথ, আজোজ্বলা, মনে পড়ে যায়। কাগজে আনলে তুলে অন্যমনে ভ্রমণ নামক শব্দটিকে, আরক্ত কোমল গালে ঝুলে-থাকা কালো চুল, ভেজা চোখ, পুরনো পুকুর, অশ্চিমে সূর্যের হারাকিরি, ফসলবিহীন মাঠ ঘেঁষে রেল লাইনের ধারে বহুদূরে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া, রাজসিক গাছের গুঁড়িয়ে বসে থাকা, খঞ্জের মোহন যানে চেপে কয়েক মাইল সাবলীল চলে যাওয়া, হঠাৎ পাখির সম্ভাষণ, মাধুর্যের স্পর্শ-লাগা, স্মৃতিতে চাঞ্চল্য আনে। অধিকন্তু মানে রৌদ্রঝলসিত বাবুই পাখির বাসা, সূর্যের ভেতর পিকাসোর হাত, মেঘদল নেরুদার সঙ্গীতমুখর পাণ্ডুলিপি, আদিগন্ত চাইকোভস্কির হংসমালা, পাথুরে বেঞ্চিতে সেজানের জাগরণ, জ্যোৎস্নালোকে ধাবমান বুনো অশ্বপাল। হায় মধ্যরাতে ঘুমহীন মুহূর্তের ঝরে-পড়া, বুক-চেরা দীর্ঘশ্বাস, এমন একটি ঘর যেখানে জ্বলে না আলো অনেক বছর, তাকে ছেড়ে এসে পুনরায় বড় একা ঘরহীন ঘরে ফেরা।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shobder-sosrobe-kotokal/
5019
শামসুর রাহমান
বার্ধক্যে জসীমউদ্দীন
চিন্তামূলক
গলায় জড়ানো তাঁর শাপলা রঙের মাফলার, কষ্ট পান প্রায়শই বাতে, কফ নিত্যসঙ্গী, কখনো হাঁপান সিঁড়ি ভেঙে। এ কেমন একাকিত্ব এলো ব্যেপে অস্তিত্বের উড়ানির চরে? প্রহরে-প্রহরে শুধু দাগ মেপে নানান ওষুধ খেয়ে ধুধু সময়ের খালে লগি ঠেলা নক্ষত্রবিহীন এ গোধূলি কালে।আপাতত কিছুতেই নেই মন, শিশু বৈকালী সাহিত্য সভা, জয়নুলী চিত্রকলা, ইতল-বিতল, রক্তজবা, দূর থেকে-আসা কবিয়াল, কিংবা বিশ্বের খবর- কিছুই টানে না তাঁকে। মাঝে-মধ্যে নিষ্প্রদীপ দাদির কবর ভেসে ওঠে, ভেসে ওঠে ছায়াবৃত মাঠ, খাল, বিল, কবেকার বিশুদ্ধ কোকিল। তাকান কখনও ভেজা চোখে শিল্পিত শীতলপাটি শোভিত দেয়ালে। ঘরে ঢোকে অকস্মাৎ চড়ুই দম্পতি, চঞ্চলতা ছড়ায় ড্রইংরুমে। খয়েরি শালের খুঁট মেঝেতে গড়ায়, নীবরতা হীরের মতন জ্বলে, একটি অনুপস্থিতি ঝুঁকে থাকে তাঁর বিমর্ষ শিশিরময় বুকে।কোথাও নিঝুম হ্রদে লাল পদ্ম ফুটে আছে আজ, হঠাৎ ভাবেন তিনি। খ্যাতির আওয়াজ অন্ধকারে খড়মের শব্দ যেন এবং জীবন যুগপৎ অর্থময়, অর্থহীন, বেদেনীর শাড়ি মতন ভাসমান গহীন গাঙের জলে। ঠোঁটে বর্তমান, ভূত, ভবিষ্যৎ-সংকলিত হাসি ফোটে।‘আমাকে নিও না তুমি’, কবিতা আবৃত্তি করবার ধরনে বলেন যাকে, তার হাত জানালার গ্রিলে, হাতে কালো পাখি ডেকে যায় শব্দহীন অবিরত। আদিগন্ত ঘন কুয়াশায় শূন্য নাও ভাসে, চেয়ার অর্পিত শ্লথ হাতে অস্তরাগ নেমে আসে। করোটিতে ছিলো তাঁর কী ব্যাপক চর-থরথর কাইজার চিত্রনাট্য, গাথার ছন্দের মতো সোনার গতর গ্রাম্য যুবতীর, মাছলোভী মাছরাঙা, সারিগান। স্বপ্ন-কণা-ধান ঝরেছে করোটি জুড়ে, ডানা-অলা বাইসাইকেলে চেপে কোন্‌ শাশ্বতের বনে গেলেন পেছনে ফেলে সব কিছু? তাঁর সে চাকার কিছু নাক্ষত্রিক ধূলো কেমন রাঙিয়ে দেয় আমার চোখের পাতা আর চুলগুলো।   (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bardhokke-josimuddin/
4050
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে তরু, এ ধরাতলে
প্রকৃতিমূলক
হে তরু, এ ধরাতলে রহিব না যবে তখন বসন্তে নব পল্লবে পল্লবে তোমার মর্মরধ্বনি পথিকেরে কবে, "ভালো বেসেছিল কবি বেঁচে ছিল যবে।"   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/he-toru-e-dhoratole/
3486
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বউ নিয়ে লেগে গেল
ছড়া
বউ নিয়ে লেগে গেল বকাবকি রোগা ফণী আর মোটা পঞ্চিতে, মণিকর্ণিকা-ঘাটে ঠকাঠকি যেন বাঁশে আর সরু কঞ্চিতে। দুজনে না জানে এই বউ কার, মিছেমিছি ভাড়া বাড়ে নৌকার, পঞ্চি চেঁচায় শুধু হাউহাউ,– “পারবিনে তুই মোরে বঞ্চিতে।’ বউ বলে, “বুঝে নিই দাউদাউ মোর তরে জ্বলে ঐ কোন্‌ চিতে।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bou-niye-lege-gelo/
2475
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
কিছু হাইকু
মানবতাবাদী
।।১।। নেমেছে হিম এবারো ফুটবে কি ঘোড়ার ডিম ।।২।। সত্য তাই হাজারো বার শোনা মিথ্যেটাই ।।৩।। অশ্বডিম পাড়তে অশ্বিনী ধরেছে ঝিম ।।৪।। আমলা চাই মামলা দিতে লাখো কামলা চাই ।।৫।। ঘটিয়ে দাও ঘটনা না ঘটুক রটিয়ে দাও
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/kichhu-haiku/