id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
3874
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শূন্য পাতার অন্তরালে
|
রূপক
|
শূন্য পাতার অন্তরালে
লুকিয়ে থাকে বাণী,
কেমন করে আমি তারে
বাইরে ডেকে আনি।
যখন থাকি অন্যমনে
দেখি তারে হৃদয়কোণে,
যখন ডাকি দেয় সে ফাঁকি—
পালায় ঘোমটা টানি। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shunno-patar-ontorale/
|
1199
|
জীবনানন্দ দাশ
|
শব
|
চিন্তামূলক
|
যেখানে রূপালি জ্যোৎস্না ভিজিতেছে শরের ভিতর,
যেখানে অনেক মশা বানায়েছে তাহাদের ঘর;
যেখানে সোনালি মাছ খুঁটে-খুঁটে খায়
সেই সব নীল মশা মৌন আকাঙ্ক্ষায়?
নির্জন মাছের রঙে যেইখানে হ’য়ে আছে চুপ
পৃথিবীর একপাশে একাকী নদীর গাঢ় রূপ;
কান্তারের একপাশে যে-নদীর জল
বাবলা হোগলা কাশে শুয়ে-শুয়ে দেখিছে কেবল
বিকালের লাল মেঘ; নক্ষত্রের রাতের আঁধারে
বিরাট নীলাভ খোঁপা নিয়ে যেন নারী মাথা নাড়ে
পৃথিবীর অন্য নদী; কিন্তু এই নদী
রাঙা মেঘ- হ্লুদ-হলুদ জ্যোৎস্না; চেয়ে দ্যাখো যদি;
অন্য সব আলো আর অন্ধকার এখানে ফুরালো;
লাল নীল মাছ মেঘ- ম্লান নীল জ্যোৎস্নার আলো
এইখানে; এইখানে মৃণালিনী ঘোষালের শব
ভাসিতেছে চিরদিনঃ নীল লাল রূপালি নীরব।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shob/
|
4182
|
লালন শাহ
|
তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে
|
মানবতাবাদী
|
তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে ।।একটা পাগলামি করে
জাত দেয় সে অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে
আবার হরি বলে পড়ছে ঢলে
ধূলার মাঝে ।।একটা নারকেলের মালা
তাতে জল তোলা ফেলা করঙ্গ সে
পাগলের সঙ্গে যাবি পাগল হবি
বুঝবি শেষে ।।পাগলের নামটি এমন
বলিতে অধীন লালন হয় তরাসে
চৈতে নিতে অদ্বৈ পাগল
নাম ধরে সে ।।তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে….. !!
আরও পড়ুন… এসব দেখি কানার হাট বাজার – লালন শাহ
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4427.html
|
1519
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
স্বপ্ন নব-ভৌগোলিক শিখা
|
চিন্তামূলক
|
এখন আমার বয়স কত হবে? একশ? নব্বই? আশি?
হায়রে আমার বেশি-বয়সের স্বপ্ন, আমার একশ হবে না ।
আমি ময়মনসিংহের কবি, নীরার একান্ত বাধ্য স্বামী,
আমার বয়স পঁয়ত্রিশ, আমি ঢাকায় এসেছি স্বরচিত
কবিতা পড়তে । আমার বড় ভাই পশ্চিম বাংলার,
আমি স্বদেশের মায়ায় জড়ানো কবি ।আয়াতুল্লা খোমিনির মতো আমার মাথার চুলে ব্রহ্মজীবী
শুভ্র-কাশদল, ফাল্গুনের হাওয়ায় মাতাল শাল-গজারীর
সবুজ পাতার ঝিলিমিলি আমার দু'চোখে ।
আমার দু'হাতে ধর্ম, দাঙ্গা,
আর প্রলম্বিত সামরিক শাসনের কালো শৃঙ্খলের দাগ ।
পায়ে এঁটেল মাটির মায়া, বুকে প্রিয়-নিধনের ক্ষত ।
আমি মেঘের আড়ালে ইন্দ্রজিৎ, আমি জন্মযোদ্ধা ।
আমি যুদ্ধে-যুদ্ধে, বিপ্লবে-বিপ্লবে...,আমার পেছনে দগ্ধ
ইতিহাসের ট্রাজিক উল্লাস; তবু জানি আমার সম্মুখে আছে
পৃথিবী কাঁপানো স্বপ্ন, আছে নব-ভৌগোলিক শিখা ।আমার বয়স যখন বাড়বে, তখন প্রতিটি সূর্যোদয়ে
সূর্যমুখীর মতন একটি-একটি ক'রে পাপড়ি মেলবে
আমার প্রতিটি কবিতার ভিতর-বেলার বর্ণ ।আজ যে আঙুরগুলো আমি মাটির ভিতরে পুঁতে রেখে যাচ্ছি,
একদিন তার নেশায় মাতাল হবে ভবিষ্যতের বাংলা আমার ।
তখন আমার বয়স কত হবে?
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/post20161117015029/
|
1800
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কাঠের পায়ে সোনার নূপুর
|
চিন্তামূলক
|
পাগুলো কাঠের
আর নূপুরগুলো সোনার
এইভাবেই সাজানো মঞ্চে নাচতে এসেছি আমরা
একটু আগে ছুটে গেল যে হলুদ বনহরিনী
ওর পায়ের চেটোয় সাড়ে তিনশো কাঁটা।
সারাটা বিকেল ও শুয়েছিল রক্তপাতের ভিতরে
সারাটা বিকেল ওকে ক্ষতবিক্ষত করেছে
স্মৃতির লম্বা লম্বা পেরেক।
অথচ নাচের ঘন্টা বাজতেই
এক দৌড়ে আগুনের ঠিক মাঝখানে।
বাইরে যখন জলজ্যান্ত দিন
সিঁড়ির বাঁকে বাঁকে তখন কালশিটে অন্ধকার।
যে-সব জানলার উপরে আমাদের গভীর বিশ্বাস
তাদের গা ছুয়েই যতো রাজ্যের ঝড়-বৃষ্টির মেঘ।
অথচ এইসব ভয়-ভাবনার ভিতরেই আমাদের মহড়া
আমাদের ক্লারিওনেট
আমাদের কাঠের পায়ে সোনার নুপুর
আমাদের ডোন্ট-কেয়ার নাচ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1173
|
1015
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ঘাসের বুকের থেকে
|
সনেট
|
ঘাসের বুকের থেকে কবে আমি পেয়েছি যে আমার শরীর –
সবুজ ঘাসের থেকে; তাই রোদ ভালো লাগে — তাই নীলাকাশ
মৃদু ভিজে সকরুণ মনে হয়; — পথে পথে তাই এই ঘাস
জলের মতন স্নিগ্ধ মনে হয়, — কউমাছিদের যেন নীড়
এই ঘাস; — যত দূর যাই আমি আরো যত দূর পৃথিবীর
নরম পায়ের তলে যেন কত কুমারীর বুকের নিঃশ্বাস
কথা কয় — তাহাদের শান — হাত খেলা করে — তাদের খোঁপায় এলো ফাঁস
খুলে যায় — ধূসর শাড়ির গন্ধে আসে তারা — অনেক নিবিড়পুরোনো প্রাণের কথা কয়ে যায় — হৃদয়ের বেদনার কথা –
সান্ত্বনার নিভৃত নরম কথা — মাঠের চাঁদের গল্প করে –
আকাশের নক্ষত্রের কথা কয়; — শিশিরের শীত সরলতা
তাহাদের ভালো লাগে, — কুয়াশারে ভালো লাগে চোখের উপরে;
গরম বৃষ্টির ফোঁটা ভালো লাগে; শীত রাতে — পেঁচার নম্রতা;
ভালো লাগে এই যে অশ্বথ পাতা আমপাতা সারারাত ঝরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ghasher-buke-theke/
|
129
|
আল মাহমুদ
|
না ঘুমানোর দল
|
প্রকৃতিমূলক
|
নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতো চাদঁ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে এলেম ঘর
ঘুমন্ত এই মস্ত শহর করছিলো থরথ ।
মিনারটাকে দেখছি যেন দাড়িয়ে আছেন কেউ,
পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ ?
চৌকিদারের হাক শুনে যেই মোড় ফিরেছি বায় –
কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিল আয় আয়।
পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দিঘীটার পাড়
এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার ।
আমায় দেখে কলকলিয়ে দীঘির কালো জল
বললো, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল-
পকেট থেকে খুলো তোমার পদ্য লেখার ভাজঁ
রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য হবে আজ ।
দীঘির কথায় উঠলো হেসে ফুল পাখিদের সব
কাব্য হবে, কাব্য হবে- জুড়লো কলরব ।
কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3740.html
|
1365
|
তসলিমা নাসরিন
|
যেহেতু তুমি, যেহেতু তোমার
|
প্রেমমূলক
|
তোমার কপালের ভাঁজগুলোকেও আমি লক্ষ করছি যে আমি ভালোবাসি,
ভালোবাসি কারণ ওগুলো তোমার ভাঁজ,
তোমার গালের কাটা দাগটাকেও বাসি, যেহেতু দাগটা তোমার
আমার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া তোমার বিরক্ত দৃষ্টিটাকেও ভালোবাসছি,
যেহেতু দৃষ্টিটা তোমারই।
তোমার বিতিকিচ্ছিজ্ঞর টালমাটাল জীবনকেও পলকহীন দেখি, তোমার বলেই দেখি।
তোমাকে দেখলেই আগুনের মত ছুটে যাই তোমার কাছে, তুমি বলেই,
হাত বাড়িয়ে দিই, তুমি বলেই তো,
হাত বাড়িয়ে রাখি, সে হাত তুমি কখনও স্পর্শ না করলেও রাখি, সে তুমি বলেই তো।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1993
|
5873
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
স্পর্শটুকু নাও
|
প্রেমমূলক
|
স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ
ছেঁড়া পৃষ্ঠা উড়ে যায়, না-লেখা পৃষ্ঠাও কিছু ওড়ে
হিমাদ্রি-শিখর থেকে ঝুঁকে-জড়া জলাপ্রপাতের সবই আছে
শুধু যেন শব্দরাশি নেই
স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ
ভোর আনে শালিকেরা, কোকিল ঘুমন্ত, আর
জেগে আছে দেবদারু বন
নীলিমার হিম থেকে খসে যায় রূপের কিরীট
স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ
বেলা গেল, শোনোনি কি ছেলেমানুষীরা কোনো
ভুল করা ডাক?
এপারে মৃত্যুর হাতছাছি আর অন্য পারে
অমরত্ব কঠিন নীরব
‘মনে পড়ে?’ এই ডাক কতকাল, কত শতাব্দীর
জলে ধুয়ে যায় স্মৃতি, কার জল কোন জল
কবেকার উষ্ণ প্রস্রবণ
স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1782
|
892
|
জসীম উদ্দীন
|
সোনার বরণী কন্যা
|
প্রেমমূলক
|
সোনার বরণী কন্যা সাজে নানা রঙ্গে,
কালো মেঘ যেন সাজিলরে।
সিনান করিতে কন্যা হেলে দুলে যায়,
নদীর ঘাটেতে এসে ইতি উতি চায়।
বাতাসে উড়িছে শাড়ী, ঘুরাইয়া চোখ,
শাসাইল তারে করি কৃত্রিম রোখ।
হলুদ মাখিয়া কন্যা নামে যমুনায়,
অঙ্গ হলুদ হইয়া জলে ভাইসা যায়।
ডুবাইয়া দেহ জলে থাকে চুপ করে,
জল ছুঁড়ে মারে কভু আকাশের পরে।
খাড়ু জলে নাইমা কন্যা খাড়ুমাঞ্জন করে,
আকাশের রামধনু হেলেঢুলে পড়ে।
তারপরে বাহু দুটি মেলে জলধারে,
ঘুরাইল ফিরাইল কত লীলাভরে।
বাহু দুটি মাজে কন্যা অতি কৌতুহলে,
খসিয়া পড়িছে রূপ সোনালিয়া জলে।
অঞ্জলি পরি জল অধরে ছুঁড়িছে,
জলন্ত অঙ্গার হতে ফুলকি উড়িছে।
খুলিয়া কুন্তলভার ছড়াইল জলে,
আকাশ নামিল যেন সমুদ্দুরের কোলে।
দু-হাত বিধায়ে চুলে যত মাঞ্জন করে,
মেঘেতে বিজলী যেন ফেরে লীলাভরে।
গলা জলে নেমে কন্যা গলা মাঞ্জন করে,
ঢেউগুলি টলমল মালার ফুলের
কর্ণফুলের ভূষণ লয়ে কোন ঢেউ
খোঁপার কুসুম লোভে কেউ হাসে গায়
সিনান করিয়া কন্যা উঠে জল হতে,
তরল লাবনী ধারা ঝরে অঙ্গ স্রোতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/750
|
2794
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ঊর্মি, তুমি চঞ্চলা
|
প্রকৃতিমূলক
|
ঊর্মি, তুমি চঞ্চলা
নৃত্যদোলায় দাও দোলা,
বাতাস আসে কী উচ্ছ্বাসে—
তরণী হয় পথভোলা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/urmi-tumi-chonchola/
|
5088
|
শামসুর রাহমান
|
মরুভূমি-বিষয়ক পংক্তিমালা
|
চিন্তামূলক
|
মাঝে-মধ্যে স্বপ্নে আমি মরুভূমি দেখি, মরুভূমি
অতিকায় তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠের মতো প্রসারিত আমার সত্তায়।
বিদীর্ণ বেহালা, ছিন্ন ভিন্ন বেশভূষা, মর্চে-পড়া
নীল পানপাত্র আর ঘোড়ার করোটি নিয়ে ধুধু বালিয়াড়ি
পড়ে থাকে; পশুরাজ নিঃসঙ্গ রাজার মতো করে বিচরণ-
জ্যোৎস্না তার দু’চোখে, কেশরে।
মরুভূমি ক্রমশ বিস্তৃত হয় স্বপ্নের ভেতরে, কখনো-বা
স্বপ্নটাই মরুভূমি। আমি,
স্বপ্ন, মরুভূমি একাকার মাঝে-মাঝে
আমার জীবন, যে-জীবন পিছনে এসেছি ফেলে বহুকাল আগে,
স্বপ্নের ভেতরে জ্বলে যেন মরীচিকা; বর্তমান নিরুদ্দেশ।
একটি বিশাল প্রাণীভূক পুষ্প আমাকে ভীষণ
আকর্ষণ করে,
তার অভ্যন্তরে চলে যেতে থাকি দ্রুত শোকগাথা
আওড়াতে আওড়াতে-
সেই পুষ্পটিকে বর্তমান বলে শান্ত করতে
ইচ্ছে হয়, ভবিষ্যত একজন অন্ধ উদাসীন
শিল্পীর মতন বালিয়াড়ি জুড়ে রবার বাজায়
এবং পায়ের কাছে তার
উটের কংকাল আর সাপের খোলস পড়ে থাকে।
মরুভূমি ক্রমাগত আমাকে করছে গ্রাস পৌরানিক প্রাণীর মতন
আর কী অবাক কাণ্ড ঘুমোতে গেলেই মনে হয়
শুয়ে আছি মরুর বালিতে,
মাথার উপরে কালো বৃশ্চিকের মতো সূর্য জ্বলে
এবং আমার ডান দিকে ফণিমনসার বন,
বাঁদিকে নিয়ত পলায়নপর মরুদ্যান। (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/moruvumi-bishoyok-pongktimala/
|
5780
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
জুয়া
|
চিন্তামূলক
|
অত্যান্ত ঠান্ডা মাথায় জীবন বদলে নিলাম আমি ও নিখিলেশ,
হাতঘড়ি ও কলম, পকেট বই, রুমাল-
রেডিওতে পাঁচটা বাজলো, আচ্ছা কাল
দেখা হবে,- বিদায় নিলাম,- সন্ধেবেলার রক্তবর্ণ বাতাস ও শেষ
শীতের মধ্যে, একা সিঁড়ি দিয়ে নামবার
সময় মনে পড়লো- ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার
এসবও বদলানো দরকার, যেমন মুখভঙ্গী ও দুঃখ, হাসির মুহূর্ত
নিখিলেশ ক্রুদ্ধ ও উদাসীন, এবং কিছুটা ধূর্ত।
হাল্কা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আমি নিখিলেশ হয়ে বহুদূর
হেঁটে গেলাম, নতুন গোধূলি ও রাত্রি, বাড়ি ও দরজা এমনটি অন্তঃপুর
ঘুঁমোবার আগে চুরুট, ঘুমের গভীরতা ও জাগরণ-
ছ’লক্ষ অ্যালার্ম ঘড়ি কলকাতার হিম আস্তরণ
ভাঙার আগেই আমি, অর্থাৎ নিখিলেশ, টেলিফোনে নিখিলেশ
অর্থাৎ সুনীলকে
ডেকে বলি, তুই কি রোড কন্ডেন্স্ড্ মিল্কে
চা খেতিস? বদ গন্ধ, তা হোক! আমি অর্থাৎ পুরোনো সুনীল,
নিখিলেশ এখন,
তোর অর্থাৎ পুরোনো নিখিল অর্থাৎ নতুন সুনীলের সিংহাসন
এবং হৃঃপিন্ড ও শোণিত
পেতে চাই, তোর পুরোনো ভবিষ্যৎ কিংবা আমার নতুন অতীত
তোর নতুন অতীতের মধ্যে, আমার পুরোনো ভবিষ্যতে
(কিংবা তোর ভবিষ্যতে আমার অতীত কোনো পঞ্চম অতীত ভবিষ্যতে)
কিংবা তোর নিঃসঙ্গতা, আমার না-বেঁচে-থাকা হৈ-হৈ জগতে
দু’রকম স্মৃতি ও বিস্মরণ, যেন স্বপ্ন কিংবা স্পপ্ন বদলের
বীয়ার ও রামের নেশা, বন্ধুহীন, বন্ধু ও দলের
আড়ালে প্রেম ও প্রেমহীনতা, দুঃখ ও দুঃখের মতো অবিশ্বাস
জীবনের তীব্র চুপ, যে-রকম মৃতের নিঃশ্বাস,-
লোভ ও শান্তির মুখোমুখি এসে আমার পূজা ও নারীহত্যা
তোর দিকে, রক্ত ও সৃষ্টির মধ্যে আমি অগত্যা
প্রেমিকার দিকে যাবো, স্তনের ওপরে মুখ, মুখ নয়, ধ্যান ও অসি’রতা
এক জীবনে, ঊরুর সামনে ঊরু, ঊরু নয়, যোনির সামনে লিঙ্গ, অশরীরী,
ঘৃণা ও মমতা
অসম্ভব তান্ডব কিংবা চেয়ে দেখা মুহূর্তের রৌদ্রে কোনো কুরূপা অস্পরী
শীত করলে অন্ধকারে শোবে। দুপুরে হঠাৎ রাস্তায় আমি তোকে
সুনীল সুনীল বলে ডেকে উঠবো, পুরোনো আমার নামে, দেখতে চাই চোখে
একশো আট পল্লব কাঁপে কি না, কতটা বাতাস লাগে গালে ও হৃদয়ে
ক’হাজার আলপিন, কত রূপান্তর জন্মে, শোকে পরাজয়ে,
সুখ, সুখ নয় পাপ, পাপ নয়, দোলে, দোলে না, ভাঙে, ভাঙে না, মৃত্যু, স্রোতে
আমি, ও আমার মতো, আমার মতো ও আমি, আমি নয়,
এক জীবন দৌড়াতে দৌড়াতে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1888
|
5196
|
শামসুর রাহমান
|
লড়ছি সবাই
|
চিন্তামূলক
|
মিশমিশে ঘোর অন্ধকারে
কনুই দিয়ে ধাক্কা মারে,
রহিম পড়ে রামের ঘাড়ে,
কেউবা দেখি চুপিসারে
অন্য কারুর জায়গা কাড়ে
পাচ্ছি তা টের হাড়ে হাড়ে।
লাইন থেকে সরছি ক্রমে সরছি।জল খেয়েছি সাতটি ঘাটে,
ফল পেয়েছি বাবুর হাটে,
কিন্তু সে-ফল পোকায় কাটে,
ঘুণ ধরেছে নক্শি খাটে,
কানাকড়ি নেইকো গাঁটে,
চলছি তবু ঠাটে বাটে,
রোজানা ধার করছি শুধুই করছি।পক্ষিরাজের ভাঙা ডানা,
রাজার কুমার হলো কানা।
দিনদুপুরে দৈত্যপানা
মানুষগুলো দিচ্ছে হানা,
নিত্য চলে ঘানি টানা,
জগৎ-জোড়া খন্দখানা-
হোঁচট খেয়ে পড়ছি কেবল পড়ছি।২
ফসল ক্ষেতে পোকা পড়ে,
ঘর উড়ে যায় ঘূর্ণিঝড়ে,
মাতম ওঠে ঘরে ঘরে।
কত ভিটায় ঘুঘু চরে,
কঙ্কালেরা এই শহরে
বাঁচার জন্যে ধুঁকছে ম’রে।
বাঁচার লড়াই লড়ছি, সবাই লড়ছি। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/lorchi-sobai/
|
3250
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দেওয়া নেওয়া
|
প্রকৃতিমূলক
|
বাদল দিনের প্রথম কদমফুল
আমায় করেছ দান,
আমি তো দিয়েছি ভরা শ্রাবণের
মেঘমল্লার গান।
সজল ছায়ার অন্ধকারে
ঢাকিয়া তারে
এনেছি সুরে শ্যামল খেতের
প্রথম সোনার ধান।আজ এনে দিলে যাহা
হয়তো দিবে না কাল,
রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।
স্মৃতিবন্যার উছল প্লাবনে
আমার এ গান শ্রাবণে শ্রাবণে
ফিরিয়া ফিরিয়া বাহিবে তরণী
ভরি তব সম্মান।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dayua-nayua/
|
1209
|
জীবনানন্দ দাশ
|
শ্মশানের দেশে তুমি আসিয়াছ
|
সনেট
|
শ্মশানের দেশে তুমি আসিয়াছ — বহুকাল গেয়ে গেছ গান
সোনালি চিলের মতো উড়ে উড়ে আকাশের রৌদ্র আর মেঘে, —
লক্ষ্মীর বাহন যেই স্নিগ্ধ পাখি আশ্বিনের জ্যোৎস্নার আবেগে
গান গায় — গুনিয়াছি রাখিপূর্ণিমার রাতে তোমার আহ্বান
তার মতো; আম চাঁপা কদমের গাছ থেকে গাহে অফুরান
যেন স্নিগ্ধ ধান ঝরে.. অনন — সবুজ শালি আছে যেন লেগে
বুকে তব; বল্লালের বাংলায় কবে যে উঠলে তুমি জেগে;
পদ্মা, মেঘনা, ইছামতী নয় শুধু — তুমি কবি করিয়াছ স্নানসাত সমুদ্রের জলে, — ঘোড়া নিয়ে গেছ তুমি ধূম নারীবেশে
অর্জুনের মতো, আহা, — আরো দূর স্মান নীল রূপের কুয়াশা
ফুঁড়েছ সুপর্ন তুমি — দূর রং আরো দূর রেখা ভালোবেসে;
আমাদের কালীদাহ — গাঙুড় — গাঙের চিল তবু ভালোবাসা
চায় যে তোমার কাছে — চায়, তুমি ঢেলে দাও নিজেরে নিঃশেষে
এই দহে — এই চুর্ণ মঠে — মঠে — এই জীর্ণ বটে বাঁধো বাসা।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shoshaner-deshe-tumi-ashiaso/
|
3869
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শুভক্ষণ
|
ছড়া
|
ওগো মা,
রাজার দুলাল যাবে আজি মোর
ঘরের সমুখপথে,
আজি এ প্রভাতে গৃহকাজ লয়ে
রহিব বলো কী মতে।
বলে দে আমায় কী করিব সাজ,
কী ছাঁদে কবরী বেঁধে লব আজ,
পরিব অঙ্গে কেমন ভঙ্গে
কোন্ বরনের বাস।
মা গো, কী হল তোমার, অবাক নয়নে
মুখপানে কেন চাস।
আমি দাঁড়াব যেথায় বাতায়নকোণে
সে চাবে না সেথা জানি তাহা মনে--
ফেলিতে নিমেষ দেখা হবে শেষ,
যাবে সে সুদূর পুরে,
শুধু সঙ্গের বাঁশি কোন্ মাঠ হতে
বাজিবে ব্যাকুল সুরে।
তবু রাজার দুলাল যাবে আজি মোর
ঘরের সমুখপথে,
শুধু সে নিমেষ লাগি না করিয়া বেশ
রহিব বলো কী মতে।ওগো মা,
রাজার দুলাল গেল চলি মোর
ঘরের সমুখপথে,
প্রভাতের আলো ঝলিল তাহার
স্বর্ণশিখর রথে।
ঘোমটা খসায়ে বাতায়নে থেকে
নিমেষের লাগি নিয়েছি মা দেখে,
ছিঁড়ি মণিহার ফেলেছি তাহার
পথের ধুলার 'পরে।
মা গো, কী হল তোমার, অবাক নয়নে
চাহিস কিসের তরে!
মোর হার-ছেঁড়া মণি নেয় নি কুড়ায়ে,
রথের চাকায় গেছে সে গুঁড়ায়ে
চাকার চিহ্ন ঘরের সমুখে
পড়ে আছে শুধু আঁকা।
আমি কী দিলেম কারে জানে না সে কেউ--
ধুলায় রহিল ঢাকা।
তবু রাজার দুলাল গেল চলি মোর
ঘরের সমুখপথে--
মোর বক্ষের মণি না ফেলিয়া দিয়া
রহিব বলো কী মতে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shuvokkhon/
|
4066
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হেলাভরে ধুলার _পরে
|
রূপক
|
হেলাভরে ধুলার 'পরে
ছড়াই কথাগুলো।
পায়ের তলে পলে পলে
গুঁড়িয়ে সে হয় ধুলো। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/helavore-dhular-pore/
|
5184
|
শামসুর রাহমান
|
রাজনীতি
|
সনেট
|
রাজনীতি আজকাল ধূর্ত, খল, ভ্রষ্ট, নীতিহীন
অতিশয়; রাজনীতি বড়োই কর্কশ, মিথ্যা বুলি
প্রায়শই সহিংসতা, মানুষের চোখে কড়া ঠুলি
পরিয়ে ঘোরানো, উপহার দেয়া ছলনার দিন।
রাজনীতি এমনকি সুন্দরীর মুখকেও খুব
কঠিন বিকৃত করে তোলে নিমেষে এবং চোখে
মুখে তার জ্বেলে দেয় চৈত্রদাহ, তখন ত্রিলোকে
প্রেমিক অনুপস্থিত, জলাশয়ে প্রেমও দেয় ডুব!তবুও বিবর্ণ জীবনের কাঠামোয় রাজনীতি
চাই আজ আমরা সবাই সুস্থতা ও প্রগতির
স্থির লক্ষ্যে, যেখানে ছলনা নেই, নেই কোনো ভীতি
ভ্রষ্টাচার, অকল্যাণ, আস্ফালন মারণাস্ত্র আর
সযত্নে লালিত সন্ত্রাসীর, যেখানে প্রেমিক নীড়
পেয়ে যায় অকর্কশ সুস্মিতা সত্তায় দয়িতার। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/rajniti/
|
1240
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সূর্য নক্ষত্র নারী (২)-বেলা অবেলা কালবেলা -
|
প্রেমমূলক
|
চারিদিকে সৃজনের অন্ধকার র’য়ে গেছে, নারী,
অবতীর্ণ শরীরের অনুভূতি ছাড়া আরো ভালো
কোথাও দ্বিতীয় সূর্য নেই, যা জ্বালালে
তোমার শরীর সব অলোকিত ক’রে দিয়ে স্পষ্ট ক’রে দেবে কোনো কালে
শরীর যা র’য়ে গেছে।
এই সব ঐশী কাল ভেঙে ফেলে দিয়ে
|
https://banglapoems.wordpress.com/2012/10/11/%e0%a6%b8%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a7%a8-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be/
|
2290
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
আশ্বিন মাস
|
সনেট
|
সু-শ্যামাঙ্গ বঙ্গ এবে মহাব্রতে রত।
এসেছেন ফিরে উমা, বৎসরের পরে,
মহিষমৰ্দ্দিনীরূপে ভকতের ঘরে;
বামে কমকায়া রমা, দক্ষিণে আয়ত-
লোচনা বচনেশ্বরী, স্বর্ণবীণা করে;
শিখীপৃষ্ঠে শিখীধ্বজ, যাঁর শরে হত
তারক—অসুরশ্রেষ্ঠ; গণ-দল যত,
তার পতি গণদেব, রাঙা কলেবরে
করি-শিরঃ; —আদিব্রহ্ম বেদের বচনে ।
এক পদ্মে শতদল৷ শত রূপবতী—
নক্ষত্রমণ্ডলী যেন একত্রে গগনে!—
কি আনন্দ! পূৰ্ব্ব কথা কেন কয়ে, স্মৃতি,
আনিছ হে বারি-ধারা আজি এ নয়নে?—
ফলিবে কি মনে পুনঃ সে পূর্ব্ব ভকতি?
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/aswin-mas/
|
2741
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আয় রে বসন্ত
|
প্রকৃতিমূলক
|
আয় রে বসন্ত, হেথা
কুসুমের সুষমা জাগা রে
শান্তিস্নিগ্ধ মুকুলের
হৃদয়ের গোপন আগারে।
ফলেরে আনিবে ডেকে
সেই লিপি যাস রেখে,
সুবর্ণের তুলিখানি
পর্ণে পর্ণে যতনে লাগা রে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ai-re-bosonto/
|
276
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
কুহেলিকা
|
চিন্তামূলক
|
নিত্য কথায় কুহেলিকায় আড়াল করি আপনারে।
সবাই যখন মত্ত হেথায় পান ক’রে মোর সুরের সুরা
সব-চেয়ে মোর আপন যে জন স-ই কাঁদে গো তৃষ্ণাতুরা।
আমার বাদল-মেঘের জলে ভর্ল নদী সপ্ত পাথার,
ফটিক-জলের কণ্ঠে কাঁদে তৃপ্তি-হারা সেই হাহাকার!
হায় রে, চাঁদের জ্যোৎস্না-ধারায় তন্দ্রাহারা বিশ্ব-নিখিল,
কলঙ্ক তার নেয় না গো কেউ, রইল জু’ড়ে চাঁদেরি দিল!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/819
|
1036
|
জীবনানন্দ দাশ
|
জীবনে অনেক দূর
|
চিন্তামূলক
|
জীবনে অনেক দূর সময় কাটিয়ে দিয়ে- তারপর তবু
চলার কিছুটা আরো পথ আছে টের পাই;-
সুমুখে বিস্ময়;-
দেখেছি সূর্যের আলো মাঝে মাঝে জলের কম্পন;
আশ্বিনের ঘন নীল আশ্চর্য আকাশে
দেখেছি আরোহী হাঁস বাষ্পের ভিতর থেকে আসে
হংসীর অনিমেষ দেহ লক্ষ্য ক’রে,
মিশে যায় খুব স্বচ্ছ আলোর ভিতরে।
কোথায় ফুরিয়ে যায় তারা সব- থেকে সফল।
অগ্নির উৎসের মতো সৃষ্টি নির্ঝর থেকে জেগে
আমারও শরীর মন মিশে যেতে চেয়েছে আবেগে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/jiboney-onek-dur/
|
1230
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সিন্ধুসারস
|
প্রকৃতিমূলক
|
দু-এক মুহূর্তে শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে তুমি আর আমি
হে সিন্ধুসারস,
মালাবার পাহাড়ের কোল ছেড়ে অতি দূর তরঙ্গের জানালায় নামি
নাচিতেছে টারান্টেলা- রহস্যের; আমি এই সমুদ্রের পারে চুপে থামি
চেয়ে দেখি বরফের মতো শাদা ডানা দু’টি আকাশের গায়
ধবল ফেনার মতো নেচে উঠে পৃথিবীরে আনন্দ জানায়।
মুছে যায় পাহাড়ের শিঙে-শিঙে গৃধিনীর অন্ধকার গান,
আবার ফুরায় রাত্রি, হতাশ্বাস; আবার তোমার গান করিছে নির্মাণ
নতুন সমুদ্র এক, শাদা রৌদ্র, সবুজ ঘাসের মতো প্রাণ
পৃথিবীর ক্লান্ত বুকে; আবার তোমার গান
শৈলের গহ্বর থেকে অন্ধকার তরঙ্গেরে করিছে আহ্বান।
জানো লি অনেক যুগ চ’লে গেছে? ম’রে গেছে অনেক নৃপতি?
অনেক সোনার ধার ঝ’রে গেছে জানো না কি? অনেক গহন ক্ষতি
আমাদের ক্লান্ত ক’রে দিয়ে গেছে- হারায়েছি আনন্দের গতি;
ইচ্ছা, ছিন্তা, স্বপ্ন, ব্যথা, ভবিষ্যৎ, বর্তমান- এই বর্তমান
হৃদয়ে বিরস গান গাহিতেছে আমাদের- বেদনার আমার সন্তান?
জানি পাখি, শাদা পাখি, মালাবার ফেলার সন্তান,
তুমি পিছে চাহো নাকো, তোমার অতীত নেই, স্মৃতি নেই,
বুকে নেই আকীর্ণ ধূসর
পাণ্ডুলিপি; পৃথিবীর পাখিদের মতো নেই শীতরাতে
ব্যথা আর কুয়াশার ঘর।
যে-রক্ত ঝরেছে তারে স্বপ্নে বেঁধে কল্পণার নিঃসঙ্গ প্রভাত
নেই তব; নেই নিম্নভূমি- নেই আনন্দের অন্তরালে
প্রশ্ন আর চিন্তার আঘাত।
স্বপ্ন তুমি দ্যাখোনি তো- পৃথিবীর সব পথ সব সিন্ধু ছেড়ে দিয়ে একা
বিপরীত দ্বীপে দূরে মায়াবীর আরশিতে হয় শুধু দেখা
রূপসীর সাথে এক; সন্ধ্যার নদীর ঢেউয়ে আসন্ন গল্পের মতো রেখা
প্রাণে তার- ম্লান চুল, চোখ তার হিজল বনের মতো কালো;
একবার স্বপনে তারে দেখে ফেলে পৃথিবীর সব স্পষ্ট আলো
নিভে গেছে যেখানে সোনার মধু ফুরায়েছে, ক’রে না বুনন
মাছি আর; হলুদ পাতার গন্ধে ভ’রে ওঠে শালিকের মন,
মেঘের দুপুর ভাসে- সোনালি চিলের বুক হয় উন্মন
মেঘের দুপুরে, তাহা, ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে;
সেখানে আকাশে কেউ নেই আর, নেই আর পৃথিবীর ঘাসে।
তুমি সেই নিস্তব্ধতা চেনো নাকো; অথাবা রক্তের পথে
পৃথিবীর ধূলির ভিতরে
জানো নাকো আজো কাঞ্চী বিদিশার মুখশ্রী মাছির মতো ঝরে;
সৌন্দর্য রাখিছে হাত অন্ধকার ক্ষুধার বিবরে;
গভীর নীলাভতম ইচ্ছা চেষ্টা মানুষের- ইন্দ্রধনূ ধরিবার ক্লান্ত আয়োজন
হেমন্তের কুয়াশায় ফুরাতেছে অল্পপ্রাণ দিনের মতন।
এইসব জানো নাকো প্রবালপঞ্জর ঘিরে ডাজান উল্লাসে;
রৌদ্রে ঝিলমিল করে শাদা ডানা শাদা ফেনা- শিশুদের পাশে
হেলিওট্রোপের মতো দুপুরের অসীম আকাশ!
ঝিকমিক করে রৌদ্রের বরফের মতো শাদা ডানা,
যদিও এ-পৃথিবীর স্বপ্ন ছিন্তা সব তার অচেনা অজানা।
চঞ্চল শরের নীড়ে কবে তুমি- জম্ন তুমি নিয়েছিলে কবে,
বিষণ্ণ পৃথিবী ছেড়ে দলে-দলে নেমেছিলে স’বে
আরব সমুদ্রে, আর চীনের সাগরে- দূর ভারতের সিন্ধুর উৎসবে।
শীতার্ত এ-পৃথিবীর আমরণ চেষ্টা ক্লান্তি বিহ্বলতা ছিঁড়ে
নেমেছিলে কবে নীল সমুদ্রের নীড়ে।
ধানের রসের গল্প পৃথিবীর- পৃথিবীর নরম অঘ্রাণ
পৃথিবীর শঙ্খমালা নারী সেই- আর তার প্রেমিকের ম্লান
নিঃসঙ্গ মুখের রূপ, বিশুষ্ক তৃণের মতো প্রাণ,
জানিবে না, কোনোদিন জানিবে না; কলরব ক’রে উড়ে যায়
শত স্নিগ্ধ সূর্য ওরা শাশ্বত সূর্যের তীব্রতায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/sindhu-sarosh/
|
1009
|
জীবনানন্দ দাশ
|
গুবরে ফড়িং শুধু উড়ে যায় আজ
|
প্রেমমূলক
|
গুবরে ফড়িং শুধু উড়ে যায় আজ এই সন্ধ্যার বাতাসে,
খড়কুটা ঝড়ে শুধু শাইকের মুখ থেকে চুপে।
আবার শালিখা, সেই খড়গুনো কুড়ায় নিশ্চুপে।
সন্ধ্যার লাল শিরা মৃদু চোখে ঘরে ফিরে আসে
ঘুঘুর নরম ডাকে—নীরব আকাশে
নক্ষত্রেরা শান্তি পায়—পউষের কুয়াশায় ধূপে
পুঁয়ের সবুজ রাঙা লতা আছে ডুবে।
এ কোমল স্নিগ্ধ হিম সান্ত্বনার মাসে
চোখে তার শান্তি শুধু—লাল লাল ফলে বুক আছে দেখ ভ’রে।
গুবরে ফড়িং কই উড়ে যায় আজ এই সন্ধ্যার বাতসে,
খড়কুটা ঝরে শুধু শালিখের মুখ থেকে চুপে
আবার শালিখ অই খড়গুনো কুড়ায় নিশ্চুপে।
সন্ধ্যার লাল শিরা মৃদু চোখে ঘরে ফিরে আসে
তবুও তোমারে আমি কোনোদিন পাব নাকো অসীম আকাশে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/gubrey-foring-shudhu-urey-jai-aaj/
|
3829
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রাহুর মতন মৃত্যু
|
চিন্তামূলক
|
রাহুর মতন মৃত্যু
শুধু ফেলে ছায়া,
পারে না করিতে গ্রাস জীবনের স্বর্গীয় অমৃত
জড়ের কবলে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
প্রেমের অসীম মূল্য
সম্পূর্ণ বঞ্চনা করি লবে
হেন দস্যু নাই গুপ্ত
নিখিলের গুহা-গহ্বরেতে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সব-চেয়ে সত্য ক’রে পেয়েছিনু যারে
সব-চেয়ে মিথ্যা ছিল তারি মাঝে ছদ্মবেশ ধরি,
অস্তিত্বের এ কলঙ্ক কভু
সহিত না বিশ্বের বিধান
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সব-কিছু চলিয়াছে নিরন্তর পরিবর্তবেগে,
সেই তো কালের ধর্ম।মৃত্যু দেখা দেয় এসে একান্তই অপরিবর্তনে,
এ বিশ্বে তাই সে সত্য নহে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
বিশ্বেরে যে জেনেছিল আছে ব’লে
সেই তার আমি
অস্তিত্বের সাক্ষী সেই,
পরম আমির সত্যে সত্য তার
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি । (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rahur-moton-mrittyu/
|
2533
|
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
|
কর্ম
|
চিন্তামূলক
|
শক্তি মায়ের ভৃত্য মোরা- নিত্য খাটি নিত্য খাই,
শক্ত বাহু, শক্ত চরণ, চিত্তে সাহস সর্বদাই।
ক্ষুদ্র হউক, তুচ্ছ হউক, সর্ব সরম-শঙ্কাহীন---
কর্ম মোদের ধর্ম বলি কর্ম করি রাত্রি দিন।
চৌদ্দ পুরুষ নিঃস্ব মোদের - বিন্দু তাহে লজ্জা নাই,
কর্ম মোদের রক্ষা করে অর্ঘ্য সঁপি কর্মে তাই।
সাধ্য যেমন - শক্তি যেমন - তেমনি অটল চেষ্টাতে--
দুঃখে-সুখে হাস্যমুখে কর্ম করি নিষ্ঠাতে।
কর্মে ক্ষুধার অন্ন যোগায়, কর্মে দেহে স্বাস্থ্য পাই;
দুর্ভাবনায় শান্তি আনে --- নির্ভাবনায় নিদ্রা যাই।
তুচ্ছ পরচর্চাগ্লানি--- মন্দ ভালো--- কোন্ টা কে---
নিন্দা হতে মুক্তি দিয়া হাল্কা রেখে মনটাকে।
পৃথ্বি-মাতার পুত্র মোরা, মৃত্তিকা তার শয্যা তাই;
পুষ্পে-তৃণে বাসটি ছাওয়া, দীপ্তি-হাওয়া ভগ্নী-ভাই।
তৃপ্তি তাঁরি শস্যে-জলে ক্ষুত্ পিপাসা দুঃসহ।
মুক্ত মাঠে যুক্ত করে বন্দি তাঁরেই প্রত্যহ।
ক্ষুদ্র নহি - তুচ্ছ নহি - ব্যর্থ মোরা নই কভু।
অর্থ মোদের দাস্য করে - অর্থ মোদের নয় প্রভু।
স্বর্ণ বল, রৌপ্য বল, বিত্তে করি জন্মদান,
চিত্ত তবু রিক্ত মোদের নিত্য রহে শক্তিমান।
কীর্তি মোদের মৃত্তিকাতে প্রত্যহ রয় মুদ্রিত,
শুণ্য' পরে নিত্য হের স্তোত্র মোদের উদ্গীত।
সিন্ধুবারি পণ্য বহি' ধন্য করে তৃপ্তিতে,
বহ্নি' মোদের রুদ্র প্রতাপ ব্যক্ত করে দীপ্তিতে।
বিশ্ব জুড়ি' সৃষ্টি মোদের, হস্ত মোদের বিশ্বময়,
কাণ্ড মোদের, সর্বঘটে - কোন্ খানে তা দৃষ্য নয়?
বিশ্বনাথের যজ্ঞশালে কর্মযোগের অন্ত নাই,
কর্ম সে যে ধর্ম মোদের, -- কর্ম চাহি -- কর্ম চাই।
|
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/kormoo/
|
1059
|
জীবনানন্দ দাশ
|
দীপ্তি
|
প্রেমমূলক
|
তোমার নিকট থেকে
যত দূর দেশে
আমি চলে যাই
তত ভালো।
সময় কেবলই নিজ নিয়মের মতো- তবু কেউ
সময়স্রোতের ‘পরে সাঁকো
বেঁধে দিতে চায়;
ভেঙ্গে যায়;
যত ভাঙ্গে তত ভালো।
যত স্রোত বয়ে যায়
সময়ের
সময়ের মতন নদীর
জলসিঁড়ি, নীপার, ওডার, রাইন, রেবা, কাবেরীর
তুমি তত বহে যাও,
আমি তত বহে চলি,
তবুও কেহই কারু নয়।
আমরা জীবন তবু।
তোমার জীবন নিয়ে তুমি
সূর্যের রশ্মির মতো অগণন চলে
রৌদ্রের বেলার মতো শরীরের রঙ্গে
খরতর নদী হয়ে গেলে
হয়ে যেতে।
তবু মানুষী হয়ে
পুরুষের সন্ধান পেয়েছ;
পুরুষের চেয়ে বড় জীবনের হয়তো বা।আমিও জীবন তবু-
ক্বচিৎ তোমার কথা ভেবে
তোমার সে শরীরের থেকে ঢের দূরে চলে গিয়ে
কোথাও বিকেলবেলা নগরীর উৎসারণে উচল সিঁড়ির
উপরে রৌদ্রের রঙ জ্বলে ওঠে- দেখে
বুদ্ধের চেয়েও আরো দীন সুষমার সুজাতার
মৃত বৎসরে বাঁচায়েছে
কেউ যেন;
মনে হয়,
দেখা যায়।কেউ নেই-স্তব্ধতায়; তবুও হৃদয়ে দীপ্তি আছেদিন শেষ হয় নি এখনও।
জীবনের দিন- কাজ
শেষ হতে আজও ঢের দেরি।
অন্ন নেই। হ্রৃদয়বিহীনভাবে আজ
মৈত্রেয়ী ভূমার চেয়ে অন্নলোভাতুর।
রক্তের সমুদ্র চারি দিকে;
কলকাতা থেকে দূর
গ্রিসের অলিভ বন
অন্ধকার।
অগণন লোক মরে যায়;
এম্পিডোক্লেসের মৃত্যু নয়-
সেই মৃত্যু ব্যসনের মতো মনে হয়।
এ ছাড়া কোথাও কোনো পাখি
বসন্তের অন্য কোনো সাড়া নেই
তবু এক দীপ্তি রয়ে গেছে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/diptii/
|
4499
|
শামসুর রাহমান
|
একশ চার ডিগ্রী জ্বর
|
রূপক
|
কে যেন আমাকে মাছে মত তেল ছাড়াই
ভাজছে ভাজছে ভাজছে হঠাৎ
কামারের হাপরের নিচে জ্বলজ্বলে পেটা লোহার কথা
মনে পড়ল আমার
এখন আমি বলা যেতে পারে টগবগে
আগ্নেয়গিরির তাপে ভয়াবহভাবে
ঝলসানো আদিম গুহামানবের মত
আমার ভেতর সেদ্ধ হচ্ছে কিছু বনমুরগী আর রাজহাঁসআমি আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে
প্রবেশ করেছি এক তন্দুরে
অঙ্গারগুলো তুতেন খামেনের মণিরত্ন হয়ে
নাচছে আমার চতুর্দিকেবলা নেই কওয়া নেই কোত্থেকে এক সুন্দরী
দাঁড়াল আমার সামনে
তার চুল লাল
চোখ লাল
স্তন লাল
লাল তার ঊরু আর নিতম্ব অগ্নিশিখা তার বগলের চুল
সেই লালচুল সুন্দরী আমার দুচোখে হৃদ্যতাবশত
সামনে ছুঁড়তে থাকে ত্রন্তার জ্বলন্ত রক্তজবা
দেখতে পেলাম সুন্দরীর শুধু একটিমাত্র স্তন এবং
তার সঙ্গী স্তনটি যে জায়গায় থাকার কথা সেখানে
জমাট হয়ে আছে বৃদ্ধার ফোকলা হাসি
অসহ্য উত্তাপের মধ্য থেকে
আমি বিকশিত হচ্ছি আগুন রঙের ফুলের মত
আমার মাথাটা এখন রবারের বেলুন
চিল বালিহাঁস আর ঈগলকে নিচে রেখে দিব্যি
উঠে যাচ্ছে ক্রমাগত উপরে উঠে যাচ্ছে
বেলুনের সুতাগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার যোগাড়
এক ঝটকায় ঝরে গেছে আমার বয়স
যেমন খসে পড়ে পুরোনো দালানের চুনবালি
এখন আমি শিশু
বালিশের ফোকরে আটকানো আমার মাথা
ক’দিন ক’রাত্রি ধরে ক্রমাগত কখনো
এপাশ ওপাশ করছি ঝড়ে-পড়া নৌকোর মত
কখনো কতরাচ্ছি একজন রাগী ফেরেশতা
আমাকে ঘন ঘন চাবকাচ্ছে আগুনের চাবুক দিয়েব্যাপক দাবানলে আমার সঙ্গে সঙ্গে পুড়ছে আমার
অন্তর্গত এক পড়শী
আমার সঙ্গে পুড়ছে প্যারাডিসো হ্যামলেট গীতাজ্ঞলি
ডাস ক্যাপিটাল বনলতা সেন পদ্মনদীর মাঝি
ইয়েটস-এর পত্রাবলি গোলাপসুন্দরী আর
আবদুল করিম খাঁর যমুনাকে তীরআমার মাথার ভেতরে আলতা বাদুড় চালতা বাদুড়
অসংখ্য বাদুড়ের ডানা ঝাপটানি ঢোসকা মাতালের
পদধ্বনি মস্তানের বিলা আওয়াজ
আমি শুনতে পাচ্ছি সুন্দরবনের চিতাবাঘের অট্রহাসি
প্রসব যন্ত্রণাবিদ্ধ এক নারীর গোলাপী হাসি
আমি শুনতে পাচ্ছি
সেপিয়া রঙের বিবর্ণ ফটোগ্রাফগুলো থেকে বেরিয়ে এসে
আমার চেনা আত্মীয়স্বজন তারস্বরে
আমাকে ডাকতে শুরু করেছে আমি শুনতে পাচ্ছি
আমার আগেকার দিনগুলোর এক দয়িতা আমাকে চটকাচ্ছে
আর আমার গৃহিণীর নির্ঘুম অসহায় হাতে
জ্বরের চার্ট বাতিল শাসনতন্ত্রের মত কম্পমান। (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/eksho-char-digree-jor/
|
282
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
খালেদ
|
ছড়া
|
খালেদ! খালেদ! শুনিতেছে নাকি সাহারার আহা-জারি?
কত ‘ওয়েসিস’ রচিল তাহার মরু-নয়নের বারি।
মরীচিকা তার সন্ধানী-আলো দিকে দিকে ফেরে খুঁজি
কোন নিরালায় ক্লান্ত সেনানী ডেরা গাড়িয়াছ বুঝি!
বালু-বোররাকে সওয়ার হইয়া ডাক দিয়া ফেরে ‘লু’,
তব তরে হায়! পথে রেখে যায় মৃগীরা মেশক-বু!
খর্জুর-বীথি আজিও ওড়ায় তোমার জয়ধ্বজা,
তোমার আশায় বেদুইন-বালা আজিও রাখিছে রোজা।
‘মোতাকারিব’-এর ছন্দে উটের সারি দুলে দুলে চলে,
দু-চোখ তাদের দিশাহারা পথে আলেয়ার মতো জ্বলে।
‘খালেদ! খালেদ!’পথ-মঞ্জিলে ক্লান্ত উটেরা কহে,
“বণিকের বোঝা বহা তো মোদের চিরকেলে পেশা নহে!”
‘সুতুর-বানের’ বাঁশি শুনে উট উল্লাস-ভরে নাচে,
ভাবে, নকিবের বাঁশরির পিছে রণ-দামামাও আছে।
ন্যুব্জ এ পিঠ খাড়া হত তার সওয়ারের নাড়া পেয়ে,
তলওয়ার তির গোর্জ নেজায় পিঠ যেত তার ছেয়ে।
খুন দেখিয়াছে, তূণ বহিয়াছে, নুন বহেনিকো কভু!* * *বালু ফেড়ে ওঠে রক্ত-সূর্য ফজরের শেষে দেখি,
দুশমান-খুনে লাল হয়ে ওঠে খালেদি আমামা এ কী!
খালেদ! খালেদ! ভাঙিবে নাকি ও হাজার বছরি ঘুম?
মাজার ধরিয়া ফরিয়াদ করে বিশ্বের মজলুম!–
শহিদ হয়েছ? ওফাত হয়েছে? ঝুটবাত! আলবত!
খালেদের জান কব্জ করিবে ওই মালেকুল-মৌত?
বছর গিয়াছে গেছে শতাব্দী যুগযুগান্ত কত,
জালিম৯ পারসি রোমক রাজার জুলুম সে শত শত
রাজ্য ও দেশ গেছে ছারেখারে! দুর্বল নরনারী
কোটি কোটি প্রাণ দিয়াছে নিত্য কত্ল-গাহেতে তারই!
উৎপীড়িতের লোনা আঁসু-জলে গলে গেল কত কাবা,
কত উজ তাতে ডুবে মলো হায়, কত নূহ্ হল তাবা!সেদিন তোমার মালেকুল-মৌত কোথায় আছিল বসি?
কেন সে তখন জালিম রাজার প্রাসাদে প্রাসাদে পশি
বেছে বেছে ওই ‘সঙ্গ্-দিল’দের কব্জ করেনি জান?
মালেকুল-মৌত সেদিনও মেনেছে বাদশাহি ফরমান!–
মক্কার হাতে চাঁদ এল যবে তকদিরে আফতাব
কুল-মখলুক দেখিতে লাগিল শুধু ইসলামি খাব,
শুকনো খবুজ খোর্মা চিবায়ে উমর দারাজ-দিল
ভাবিছে কেমন খুলিবে আরব দিন-দুনিয়ার খিল, –
এমন সময় আসিল জোয়ান হাথেলিতে হাথিয়ার,
খর্জুর-শিষে ঠেকিয়াছে গিয়া উঁচা উষ্ণীয় তার!
কব্জা তাহার সব্জা হয়েছে তলওয়ার-মুঠ ডলে,
দু-চোখ ঝালিয়া আশায় দজ্লা ফোরাত পড়িছে গলে!
বাজুতে তাহার বাঁধা কোর-আন, বুকের দুর্মদ বেগ,
আলবোরজের চূড়া গুঁড়া-করা দস্তে দারুণ তেগ।
নেজার৪ ফলক উল্কার সম উগ্রগতিতে ছোটে,
তির খেয়ে তার আশমান-মুখে তারা-রূপে ফেনা ওঠে।
দারাজ দস্ত যেদিকে বাড়ায় সেইদিক পড়ে ভেঙে,
ভাস্কর-সম যেদিকে তাকায় সেইদিক ওঠে রেঙে!
ওলিদের বেটা খালেদ সে বীর যাহার নামের ত্রাসে
পারস্য-রাজ নীল হয়ে উঠে ঢলে পড়ে সাকি-পাশে!
রোম-সম্রাট শারাবের জাম -হাতে থরথর কাঁপে,
ইস্তাম্বুলি বাদশার যত নজ্জুম আয়ু মাপে!
মজলুম যত মোনাজাত করে কেঁদে কয় “এয়্ খোদা,
খালেদের বাজু-শমশের রেখো সহি-সালামতে সদা।”
আজরাইলও সে পারেনি এগুতে যে আজাজিলের আগে,
ঝুঁটি ধরে তার এনেছে খালেদ, ভেড়ি ধরে যেন বাঘে!
মালেকুল-মৌত করিবে কব্জ রু্হ্ সেই খালেদের?–
হাজার হাজার চামড়া বিছায়ে মাজারে ঘুমায় শের!খালেদ! খালেদ! ফজর হল যে, আজান দিতেছে কৌম,
ওই শোনো শোনো –”আস্সালাতু খায়র মিনান্নৌম!”
যত সে জালিম রাজা-বাদশারে মাটিতে করেছে গুম
তাহাদেরই সেই খাকেতে খালেদ করিয়া তয়ম্মুখ
বাহিরিয়া এসো, হে রণ-ইমাম, জামায়েত আজ ভারী!
আরব, ইরান, তুর্ক, কাবুল দাঁড়ায়েছে সারি সারি!
আব-জমজম উথলি উঠিছে তোমার ওজুর তরে,
সারা ইসলাম বিনা ইমামেতে আজিকে নামাজ পড়ে!
খালেদ! খালেদ! ফজরে এলে না, জোহরকাটানু কেঁদে,
আসরে ক্লান্ত ঢুলিয়াছি শুধু বৃথা তহ্রিমা বেঁধে!
এবে কাফনের খেলকা পরিয়া চলিয়াছি বেলা-শেষে,
মগ্রেবের আজ নামাজ পড়িব আসিয়া তোমার দেশে!
খালেদ! খালেদ! সত্য বলিব, ঢাকিব না আজ কিছু,
সফেদ দেও আজ বিশ্ববিজয়ী, আমরা হটেছি পিছু!
তোমার ঘোড়ার খুরের দাপটে মরেছে যে পিপীলিকা,
মোরা আজ দেখি জগৎ জুড়িয়া তাহাদেরই বিভীষিকা!
হঠিতে হঠিতে আসিয়া পড়েছি আখেরি গোরস্থানে,
মগ্রেব-বাদে এশার১ নামাজ পাব কিনা কে সে জানে!
খালেদ! খালেদ! বিবস্ত্র মোরা পরেছি কাফন শেষে,
হাথিয়ার-হারা, দাঁড়ায়েছি তাই তহ্রিমা বেঁধে এসে!ইমামতি তুমি করিবে না জানি, তুমি গাজি মহাবীর,
দিন-দুনিয়ার শহিদ নোয়ায় তোমার কদমে শির!
চারিটি জিনিস চিনেছিলে মতুমি, জানিতে না হের-ফের,
আল্লা, রসুল, ইসলাম আর শের-মারা শমশের!
খিলাফত তুমি চাওনিকো কভু চাহিলে – আমরা জানি, –
তোমার হাতের বে-দেরেগ৩ তেগ অবহেলে দিত আনি!উমর যেদিন বিনা অজুহাতে পাঠাইল ফরমান, –
“সিপাহ্-সালার খালেদ পাবে না পূর্বের সম্মান,
আমার আদেশ – খালেদ ওলিদ সেনাপতি থাকিবে না,
সাদের অধীনে করিবে যুদ্ধ হয়ে সাধারণ সেনা!”
ঝরা জলপাই-পাতার মতন কাঁপিতে কাঁপিতে সাদ,
দিল ফরমান, নফসি নফসি জপে, গণে পরমাদ!
খালেদ! খালেদ! তাজিমের সাথে ফরমান পড়ে চুমি
সিপাহ-সালারের সকল জেওরখুলিয়া ফেলিলে তুমি।
শিশুর মতন সরল হাসিতে বদন উজালা করি
একে একে সব রেখে দিলে তুমি সাদের চরণ পরি!
বলিলে, “আমি তো সেনাপতি হতে আসিনি, ইবনে সাদ,
সত্যের তরে হইব শহিদ, এই জীবনের সাধ!
উমরের নয়, এ যে খলিফার ফরমান, ছি ছি আমি
লঙ্ঘিয়া তাহা রোজ-কিয়ামতে হব যশ-বদনামি?”
মার মুখো যত সেনাদলে ডেকে ইঙ্গিতে বুঝাইলে,
কুর্নিশ করি সাদেরে, মামুলি সেনাবাসে ডেরা নিলে!
সেনাদের চোখে আঁসু ধরে না কো, হেসে কেঁদে তারা বলে, –
“খালেদ আছিল মাথায় মোদের, এবার আসিল কোলে!”
মক্কায় যবে আসিলে ফিরিয়া, উমর কাঁদিয়া ছুটে,
এ কী রে, খলিফা কাহার বক্ষে কাঁদিয়া পড়িল লুটে!
“খালেদ! খালেদ!” ডাকে আর কাঁদে উমর পাগল-প্রায়
বলে, “সত্যই মহাবীর তুই, বুসা দিই তোকে, আয়!
তখ্তের পর তখ্ত যখন তোমার তেগের আগে
ভাঙিতে লাগিল, হাতুড়ি যেমন বাদামের খোসা ভাঙে, –
ভাবিলাম বুঝি তোমারে এবার মুগ্ধ আরব-বাসী
সিজদা করিবে, বীরপূজা বুঝি আসিল সর্বনাশী!
পরীক্ষা আমি করেছি খালেদ, ক্ষমা চাই ভাই ফের,
আজ হতে তুমি সিপাহ-সালার ইসলাম জগতের!”খালেদ! খালেদ! কীর্তি তোমার ভুলি নাই মোরা কিছু,
তুমি নাই তাই ইসলাম আজ হটিতেছে শুধু পিছু।
পুরানো দামামা পিটিয়া পিটিয়া ছিঁড়িয়ে গিয়াছে আজ,
আমামা অস্ত্র ছিল নাকো তবু দামামা ঢাকিত লাজ!
দামামা তো আজ ফাঁসিয়া গিয়াছে, লজ্জা কোথায় রাখি,
নামাজ রোজার আড়ালেতে তাই ভীরুতা মোদের ঢাকি!
খালেদ! খালেদ! লুকাব না কিছু, সত্য বলিব আজি,
ত্যাগী ও শহিদ হওয়া ছাড়া মোরা আর সব হতে রাজি!
রীশ-ই বুলন্দ্, শেরওয়ানি, চোগা, তসবি ও টুপি ছাড়া
পড়ে নাকো কিছু, মুসলিম-গাছ ধরে যত দাও নাড়া!* * *খালেদ! খালেদ! সবার অধম মোরা হিন্দুস্থানি,
হিন্দু না মোরা মুসলিম তাহা নিজেরাই নাহি জানি!
সকলে শেষে হামাগুড়ি দিই, –না, না, বসে বসে শুধু
মুনাজাত৬করি, চোখের সুমুখে নিরাশা-সাহারা ধুধু!
দাঁড়ায়ে নামাজ পড়িতে পারি না, কোমর গিয়াছে টুটি,
সিজদা করিতে ‘বাবা গো’বলিয়া ধূলিতলে পড়ি লুটি!
পিছন ফিরিয়া দেখি লাল-মুখ আজরাইলের ভাই,
আল্লা ভুলিয়া বলি, “প্রভু মোর তুমি ছাড়া নাই।”
টক্কর খেতে খেতে শেষে এই আসিয়া পড়েছি হেথা,
খালেদ! খালেদ! রি রি করে বুকে পরাধীনতার ব্যথা!
বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনও বসে
বিবি-তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকা ও হাদিস চষে!
হানফী, ওহাবী, লা-মজহাবীর৯ তখনও মেটেনি গোল,
এমন সময় আজাজিল এসে হাঁকিল, ‘তল্পি তোল!’ভিতরের দিকে যত মরিয়াছি, বাহিরের দিকে তত
গুনতিতে মোড়া বাড়িয়া চলেছি গোরু ছাগলের মতো!
খালেদ! খালেদ! এই পশুদের চামড়া দিয়ে কি তবে
তোমার পায়ের দুশমন-মারা দুটো পয়জারও হবে?
হায় হায় হায়, কাঁদে সাহারায় আজিও তেমনই ও কে?
দজলা-ফোরাত নতুন করিয়া মাতম করিছে শোকে!
খর্জুর পেকে খোর্মা হইয়া শুকায়ে পড়েছে ঝুরে
আঙুর বেদানা নতুন করিয়া বেদনার রসে পুরে।
এক রাশ শুখো আখরোট আর বাদাম ছাড়াতে লয়ে
আঙুল ছেঁচিয়া মুখ দিয়া চুষে মৌনা আরবি-বউয়ে!
জগতের সেরা আরবের তেজি যুদ্ধ-তাজির চালে
বেদুইন-কবি সংগীত রচি নাচিতেছে তালে তালে!
তেমনই করিয়া কাবার মিনারে চড়িয়া মুয়াজ্জিন
আজানের সুরে বলে, কোনোমতে আজও বেঁচে আছে দ্বীন!
খালেদ! খালেদ! দেখো দেখো ওই জমাতের পিছে কারা
দাঁড়ায়ে রয়েছে, নড়িতে পারে না, আহা রে সর্বহারা!
সকলের পিছে নহে বটে তবু জমাত-শামিল নয়,
উহাদের চোখে হিন্দের মতো নাই বটে নিদ্-ভয়!
পিরানের সব দামন ছিন্ন, কিন্তু সে সম্মুখে
পেরেশান৪ ওরা তবু দেখিতেছি ভাঙিয়া পড়েনি দুখে!
তকদির বেয়ে খুন ঝরে ওই উহারা মেসেরি বুঝি।
টলে তবু চলে বারে বারে হারে বারে বারে ওরা যুঝি।
এক হাতে বাঁধা হেম-জিঞ্জির আর এক হাত খোলা
কী যেন হারামি নেশার আবেশে চক্ষু ওদের ঘোলা!ও বুঝি ইরাকি? খালেদ! খালেদ! আরে মজা দেখো, ওঠো,
শ্বেত-শয়তান ধরিয়াছে আজ তোমার তেগের মুঠো!
দুহাতে দুপায়ে আড়-বেড়ি দেওয়া ও কারা চলিতে নারে,
চলিতে চাহিলে আপনার ভায়ে পিছন হইতে মারে।
মরদের মতো চেহারা ওদের স্বাধীনের মতো বুলি,
অলস দু-বাজু দু-চোখ সিয়াহ অবিশ্বাসের ঠুলি!
শামবাসী৭ ওরা সহিতে শেখেনি পরাধীনতার চাপ,
তলওয়ার নাই, বহিছে কটিতে কেবল শূন্যে খাপ!
খালেদ! খালেদ! মিসমার হল তোমার ইরাক শাম,
জর্ডন নদে ডুবিয়াছে পাক জেরুজালেমের নাম!
খালেদ! খালেদ! দুধারি তোমার কোথা সেই তলোয়ার?
তুমি ঘুমায়েছ, তলোয়ার তব সে তো নহে ঘুমাবার!
জং ধরেনিকো কখনও তাহাতে জঙ্গের খুনে নেয়ে,
হাথেলিতে তব নাচিয়া ফিরেছে যেন বেদুইন মেয়ে!
খাপে বিরামের অবসর তার মেলেনি জীবনে কভু,
জুলফিকার৩ সে দুখান হয়েছে, ও তেগ টুটেনি তবু।
তুমি নাই তাই মরিয়া গিয়াছে তরবারিও কি তব?
হাত গেছে বলে হাত-যশও গেল? গল্প এ অভিনব!
খালেদ! খালেদ! জিন্দা হয়েছে আবার হিন্দা৪ বুড়ি,
কত হামজারে মারে জাদুকরি, দেশে দেশে ফেরে উড়ি!ও কারা সহসা পর্বত ভেঙে তুহিন স্রোতের মতো,
শত্রুর শিরে উন্মদবেগে পড়িতেছে অবিরত!
আগুনের দাহে গলিছে তুহিন আবার জমিয়া উঠে,
শির উহাদের ছুটে গেল হায়! তবু নাহি পড়ে টুটে!
ওরা মরক্কো মরদের জাত মৃত্যু মুঠার পরে,
শত্রুর হাতে শির দিয়া ওরা শুধু হাতে পায়ে লড়ে!
খালেদ! খালেদ! সর্দার আর শির পায় যদি মূর
খাসা জুতো তারা করিবে তৈরি খাল দিয়া শত্রুর!খালেদ! খালেদ! জাজিরাতুল সে আরবের পাক মাটি
পলিদ হইল, খুলেছে এখানে যুরোপ পাপের ভাঁটি!
মওতের দারু পিইলে ভাঙে না হাজার বছরি ঘুম?
খালেদ! খালেদ! মাজার আঁকড়ি কাঁদিতেছে মজলুম।খোদার হাবিব বলিয়া গেছেন আসিবেন ইসা ফের,
চাই না মেহেদি, তুমি এসো বীর হাতে নিয়ে শমশের।কৃষ্ণনগর,
২১ অগ্রহায়ণ, ’৩৩
(জিঞ্জির কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/khaled/
|
1044
|
জীবনানন্দ দাশ
|
তার স্থির প্রেমিকের নিকট
|
প্রেমমূলক
|
বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই,- -আমি বলিনাতো।
কারো লাভ আছে;– সকলেরই;– হয়তো বা ঢের।
ভাদ্রের জ্বলন্ত রৌদ্রে তবু আমি দূরতর সমুদ্রের জলে
পেয়েছি ধবল শব্দ– বাতাসতাড়িত পাখিদের।মোমের প্রদীপ বড়ো ধীরে জ্ব’লে– ধীরে জ্বলে আমার টেবিলে;
মনীষার বইগুলো আরো স্থির,– শান্ত,– আরাধনাশীল;
তবু তুমি রাস্তার বার হ’লে,- ঘরেরও কিনারে ব’সে টের পাবে নাকি
দিকে-দিকে নাচিতেছে কী ভীষণ উন্মত্ত সলিল।তারি পাশে তোমারে রুধির কোনো বই- কোনো প্রদীপের মতো আর নয়,
হয়তো শঙ্খের মতো সমুদ্রের পিতা হ’য়ে সৈকতের পরে
সেও সুর আপনার প্রতিভায়- নিসর্গের মতোঃ
রূপ–প্রিয়– প্রিয়তম চেতনার মতো তারপরে
তাই আমি ভীষণ ভিড়ের ক্ষোভে বিস্তীর্ণ হাওয়ার স্বাদ পাই;
না হলে মনের বনে হরিণীকে জড়ায় ময়ালঃ
দণ্ডী সত্যাগ্রহে আমি সে-রকম জীবনের করুণ আভাস
অনুভব করি; কোনো গ্লাসিয়ার- হিম স্তব্ধ কর্মোরেন্ট পাল–
বুঝিবে আমার কথা; জীবনের বিদ্যুৎ-কম্পাস অবসানে
তুষার-ধূসর ঘুম খাবে তারা মেরুসমুদ্রের মতো অনন্ত ব্যাদানে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/tar-sthir-premiker-nikot/
|
1317
|
তসলিমা নাসরিন
|
কাঁপন ১৭
|
প্রেমমূলক
|
শরীরের এই হাল, শরীরে গ্রীষ্মকাল!
স্নানের জল আছে? ও যুবক জল আছে তো!
তোর একার জলে না হলে? যুবকের দল কাছে তো!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1987
|
969
|
জীবনানন্দ দাশ
|
একদিন জলসিড়ি নদীর ধারে
|
সনেট
|
একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে
বিশীর্ন বটের নীচে শুয়ে রব- পশমের মত লাল ফল
ঝরিবে বিজন ঘাসে-বাঁকা চাঁদ জেগে রবে- নদীটির জল
বাঙ্গালি মেয়ের মত বিশালাক্ষী মন্দিরের ধূসর কপাটে
আঘাত করিয়া যাবে ভয়ে ভয়ে-তারপর যেই ভাঙ্গা ঘাটে
রূপসীরা আজ আর আসে নাকো,পাট শুধু পচে অবিরল,
সেইখানে কলমির দামে বেধে প্রেতনীর মত কেবল
কাঁদিবে সে সারা রাত-দেখিব কখন কারা এসে আমকাঠেসাজায়ে রেখেছে চিতাঃ বাংলার শ্রাবনের বিস্মিত আকাশ
চেয়ে রবে; ভিজে পেচা শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে কদমের বনে
শোনাবে লক্ষ্মীর গল্প-ভাসানের গান নদী শোনাবে নির্জনে;
চারিদিকে বাংলার ধানী শাড়ি-শাদা শাখা-বাংলার ঘাস
আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ-আপনার মনে
ভাঙ্গিতেছে ধীরে ধীরে-চারিদিকে জীবনের এই সব আশ্চর্য উচ্ছ্বাস-
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ekdin-jolshiri-nodir-dharey/
|
2382
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
রামায়ণ
|
সনেট
|
সাধিনু নিদ্রায় বৃথা সুন্দর সিংহলে।—
স্মৃতি, পিতা বাল্মীকির বৃদ্ধ-রূপ ধরি,
বসিলা শিয়রে মোর ; হাতে বীণা করি,
গাইলা সে মহাগীত, যাহে হিয়া জ্বলে,
যাহে আজু আঁখি হতে অশ্রু-বিন্দু গলে !
কে সে মূঢ় ভূভারতে, বৈদেহি সুন্দরি,
নাদি আর্দ্রে মনঃ যার তব কথা স্মরি,
নিত্য-কান্তি কমলিনী তুমি ভক্তি-জলে!
দিব্য চক্ষুঃ দিলা গুরু;দেখিনু সুক্ষণে
শিলা জলে;কুম্ভকর্ণ পশিল সমরে,
চলিল অচল যেন ভীষণ ঘোষণে,
কাঁপায় ধরায় ঘন ভীম-পদ-ভরে।
বিনাশিলা রামানুজ মেঘনাদে রণে;
বিনাশিলা রঘুরাজ রক্ষোরাজেশ্বরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/ramayon/
|
4838
|
শামসুর রাহমান
|
দুঃখ
|
চিন্তামূলক
|
আমাদের বারান্দায় ঘরের চৌকাঠে
কড়িকাঠে চেয়ারে টেবিলে আর খাটে
দুঃখ তার লেখে নাম। ছাদের কার্নিশ, খড়খড়ি
ফ্রেমের বার্নিশ আর মেঝের ধুলোয়
দুঃখ তার আঁকে চকখড়ি
এবং বুলোয়
তুলি বাঁশি-বাজা আমাদের এই নাটে।আমাদের একরত্তি উঠোনের কোণে
উড়ে-আসা চৈত্রের পাতায়
পাণ্ডুলিপি বই ছেঁড়া মলিন খাতায়
গ্রীষ্মের দুপুরে ঢক্ঢক্
জল-খাওয়া কুঁজোয় গেলাশে, শীত-ঠকঠক
রাত্রির নরম লেপে দুঃখ তার বোনে
নাম
অবিরাম।পিরিচ চামচ আর চায়ের বাটিতে
রোদ্দুরের উল্কি-আঁকা উঠোনের আপন মাটিতে
দুঃখ তার লেখে নাম।চৌকি, পিঁড়ি শতরঞ্জি চাদর মশারি
পাঞ্জাবি তোয়ালে লাল কস্তাপেড়ে শাড়ি
প্রখর কম্বল আর কাঁথায় বালিশে
ঝাপসা তেলের শিশি টুথব্রাশ বাতের মালিশে
দুঃখ তার লেখে নাম।
খুকির পুতুলরানী এবং খোকার পোষমানা
পাখিটার ডানা
মুখ-বুজে-থাকা
সহধর্মিণীর সাদা শাড়ির আঁচলে দুঃখ তার
ওড়ায় পতাকা।
পায়ে-পায়ে-ঘোরা পুষি-বেড়ালের মসৃণ শরীরে
ছাগলের খুঁটি আর স্বপ্নের জোনাকিদের ভিড়ে
বৃষ্টি-ভেজা নিবন্ত উনুনে আর পুরানো বাড়ির
রাত্রিমাখা গন্ধে আর উপোসী হাঁড়ির
শূন্যতায় দুঃখ তার লেখে নাম।হৃদয়ে-লতিয়ে-ওঠা একটি নিভৃততম গানে
সুখের নিদ্রায় কিবা জাগরণে, স্বপ্নের বাগানে,
অধরের অধীর চুম্বনে সান্নিধ্যের মধ্যদিনে
আমার নৈঃশব্দ আর মুখর আলাপে
স্বাস্থ্যের কৌলিন্যে ক্রূর যন্ত্রণার অসুস্থ প্রলাপে,
বিশ্বস্ত মাধুর্যে আর রুক্ষতার সুতীক্ষ্ম সঙ্গিনে
দুর্বিনীত ইচ্ছার ডানায়
আসক্তির কানায় কানায়
বৈরাগ্যের গৈরিক কৌপীনে
দুঃখ তার লেখে নাম।রৌদ্রঝলকিত ভাঙা স্তিমিত আয়নায়
নববর্ষে খুকির বায়নায়
আমার রোদ্দুর আর আমার ছায়ায়
দুঃখ তার লেখে নাম।অবেলায় পাতে-দেয়া ঠাণ্ডা ভাতে
বাল্যশিক্ষা ব্যাকরণ এবং আদর্শ ধারাপাতে
ফুলদানি, বিকৃত স্লেটের শান্ত মেঘলা ললাটে
আর আদিরসাত্মক বইয়ের মলাটে
চুলের বুরুশে চিরুনির নম্র দাঁতে
দুঃখ তার লেখে নাম।কপালের টিপে,
শয্যার প্রবাল দ্বীপে,
জুতোর গুহায় আর দুধের বাটির সরোবরে
বাসনার মণিকণ্ঠ পাখিডাকা চরে
দুঃখ তার লেখে নাম।
বুকের পাঁজর ফুসফুস আমার পাকস্থলিতে
প্লীহায় যকৃতে আর অন্ত্রের গলিতে
দুঃখ তার লেখে নাম।আমার হৃৎপিণ্ডে শুনি দ্রিমিকি দ্রিমিকি দ্রাক্ দ্রাক্
দুঃখ শুধু বাজায় নিপুণ তার ঢাক।
ঐ জীমরতিভরা পিতামহ ঘড়ির কাঁটায়
বার্ধক্য-ঠেকানো ছড়ি, পানের বাটায়
গোটানো আস্তিনে দুমড়ানো পাৎলুনে
কাগজের নৌকা আর রঙিন বেলুনে
দুঃখ তার লেখে নাম।কখনো না-দেখা নীল দূর আকাশের
মিহি বাতাসের
সুন্দর পাখির মতো আমার আশায়
হৃদয়ের নিভৃত ভাষায়
দুঃখ তার লেখে নাম। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dukkho/
|
1940
|
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
|
আকবর শাহের খোষ রোজ
|
গীতিগাথা
|
১
রাজপুরী মাঝে কি সুন্দর আজি।
বসেছে বাজার, রসের ঠাট,
রমণীতে বেচে রমণীতে কিনে
লেগেছে রমণীরূপের হাট ||
বিশালা সে পুরী নবমীর চাঁদ,
লাখে লাখে দীপ উজলি জ্বলে।
দোকানে দোকানে কুলবালাগণে
খরিদদার ডাকে, হাসিয়া ছলে ||
ফুলের তোরণ, ফুল আবরণ
ফুলের স্তম্ভেতে ফুলের মালা।
ফুলের দোকান, ফুলের নিসান,
ফুলের বিছানা ফুলের ডালা ||
লহরে লহরে ছুটিছে গোলাব,
উঠিছে ফুয়ারা জ্বলিছে জল।
তাধিনি তাধিনি নাচিতেছে নটী,
গায়িছে মধুর গায়িকা দল ||
রাজপুরী মাঝে লেগেছে বাজার,
বড় গুলজার সরস ঠাট।
রমণীতে বেচে রমণীতে কিনে
লেগেছে রমণীরূপের হাট ||
কত বা সুন্দরী, রাজার দুলালী
ওমরাহজায়া, আমীরজাদী।
নয়নেতে জ্বালা, অধরেতে হাসি,
অঙ্গেতে ভূষণ মধুর-নাদী ||
হীরা মতি চুণি বসন ভূষণ
কেহ বা বেচিছে কেনে বা কেউ।
কেহ বেচে কথা নয়ন ঠারিয়ে
কেহ কিনে হাসি রসের ঢেউ ||
কেহ বলে সখি এ রতন বেচি
হেন মহাজন এখানে কই?
সুপুরুষ পেলে আপনা বেচিয়ে
বিনামূল্যে কেনা হইয়া রই ||
কেহ বলে সখি পুরুষ দরিদ্র
কি দিয়ে কিনিবে রমণীমণি।
চারি কড়া দিয়ে পুরুষ কিনিয়ে
গৃহেতে বাঁধয়ে রেখ লো ধনি ||
পিঞ্জরেতে পুরি, খেতে দিও ছোলা,
সোহাগ শিকলি বাঁধিও পায়।
অবোধ বিহঙ্গ পড়িবে আটক
তালি দিয়ে ধনি, নাচায়ো তায় ||
২
একচন্দ্রাননী, মরাল-গামিনী,
সে রসের হাটে ভ্রমিছে একা।
কিছু নাহি বেচে কিছু নাহি কিনে,
কাহার(ও) সহিত না করে দেখা ||
প্রভাত-নক্ষত্র জিনিয়া রূপসী,
দিশাহারা যেন বাজারে ফিরে।
কাণ্ডারী বিহনে তরণী যেন বা
ভাসিয়া বেড়ায় সাগরনীরে ||
রাজার দুলালী রাজপুতবালা
চিতোরসম্ভবা কমলকলি।
পতির আদেশে আসিয়াছে হেথা
সুখের বাজার দেখিবে বলি ||
দেখে শুনে বামা সুখী না হইল-
বলে ছি ছি এ কি লেগেছে ঠাট।
কুলনারীগণে, বিকাইতে লাজ
বসিয়াছে ফেঁদে রসের হাট!
ফিরে যাই ঘরে কি করিব একা
এ রঙ্গসাগরে সাঁতার দিয়ে?
এত বলি সতী ধীরি ধীরি ধীরি
নির্গমের দ্বারে গেল চলিয়ে ||
নির্গমের পথ অতি সে কুটিল,
পেঁচে পেঁচে ফিরে, না পায় দিশে।
হায় কি করিনু বলিয়ে কাঁদিল,
এখন বাহির হইব কিসে?
না জানি বাদশা কি কল করিল
ধরিতে পিঞ্জরে, কুলের নারী।
না পায় ফিরিতে নারে বাহিরিতে
নয়নকমলে বহিল বারি ||
৩
সহসা দেখিল সমুখে সুন্দরী
বিশাল উরস পুরুষ বীর।
রতনের মালা দুলিতেছে গলে
মাথায় রতন জ্বলিছে স্থির ||
যোড় করি কর, তারে বিনোদিনী
বলে মহাশয় কর গো ত্রাণ।
না পাই যে পথ পড়েছি বিপদে
দেখাইয়ে পথ, রাখ হে প্রাণ ||
বলে সে পুরুষ অমিয় বচনে
আহা মরি, হেন না দেখি রূপ।
এসো এসো ধনি আমার সঙ্গেতে
আমি আকব্বর-ভারত-ভূপ ||
সহস্র রমণী রাজার দুলালী
মম আজ্ঞাকারী, চরণ সেবে।
তোমা সমা রূপে নহে কোন জন,
তব আজ্ঞাকারী আমি হে এবে ||
চল চল ধনি আমার মন্দিরে
আজি খোষ রোজ সুখের দিন।
এ ভারত ভূমে কি আছে কামনা
বলিও আমারে, শোধিব ঋণ ||
এত বলি তবে রাজারাজপতি
বলে মোহিনীরে ধরিল করে।
যূথপতি বল সে ভূজবিটপে
টুটিল কঙ্কণ তাহার ভরে ||
শূকাল বামার বদন-নলিনী
ডাকি ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি মে দুর্গে।
ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি বাঁচাও জননী!
ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি মে দুর্গে ||
ডাকে কালি কালি ভৈরবী করালি
কৌষিকি কপালি কর মা ত্রাণ।
অর্পণে অম্বিকে চামুণ্ডে চণ্ডিকে
বিপদে বালিকে হারায় প্রাণ ||
মানুষের সাধ্য নহে গো জননি
এ ঘোর বিপদে রক্ষিতে লাজ।
সমর-রঙ্গিণি অসুর-ঘাতিনি
এ অসুরে নাশি, বাঁচাও আজ ||
৪
বহুল পুণ্যেতে অনন্ত শূন্যেতে
দেখিল রমণী, জ্বলিছে আলো।
হাসিছে রূপসী নবীনা ষোড়শী
মৃগেন্দ্র বাহনে, মূরতি কালো ||
নরমুণ্ডমালা দুলিছে উরসে
বিজলি ঝলসে লোচন তিনে।
দেখা দিয়া মাতা দিতেছে অভয়
দেবতা সহায় সহায়হীনে ||
আকাশের পটে নগেন্দ্র-নন্দিনী
দেখিয়া যুবতী প্রফুল্ল মুখ।
হৃদি সরোবর পুলকে উছলে
সাহসে ভরিল, নারীর বুক ||
তুলিয়া মস্তক গ্রীবা হেলাইল
দাঁড়াইল ধনী ভীষণ রাগে।
নয়নে অনল অধরেতে ঘৃণা
বলিতে লাগিল নৃপের আগে ||
ছিছি ছিছি ছিছি তুমি হে সম্রাট্,
এই কি তোমার রাজধরম।
কুলবধূ ছলে গৃহেতে আনিয়া
বলে ধর তারে নাহি শরম ||
বহু রাজ্য তুমি বলেতে লুটিলে,
বহু বীর নাশি বলাও বীর।
বীরপণা আজি দেখাতে এসেছ
রমণীর চক্ষে বহায়ে নীর?
পরবাহুবলে পররাজ্য হর,
পরনারী হর করিয়ে চুরি।
আজি নারী হাতে হারাবে জীবন
ঘুচাইব যশ মারিয়ে ছুরি ||
জয়মল্ল বীরে ছলেতে বধিলে
ছলেতে লুটিয়ে চারু চিতোর।
নারীপদাঘাতে আজি ঘুচাইব
তব বীরপণা, ধরম চোর।
এত বলি বামা হাত ছাড়াইল
বলিতে ধরিল রাজার অসি।
কাড়িয়া লইয়া, অসি ঘুরাইয়া,
মারিতে তুলিল, নবরূপসী ||
ধন্য ধন্য বলি রাজা বাখানিল
এমন কখন দেখিনে নারী।
মানিতেছি ঘাট ধন্য সতী তুমি
রাখ তরবারি ; মানিনু হারি ||
৫
হাসিয়া রূপসী নামাইল অসি,
বলে মহারাজ, এ বড় রস।
পৃথিবীপতির বাড়িল যশ ||
দুলায়ে কুণ্ডল, অধরে অঞ্চল,
হাসে খল খল, ঈষৎ হেলে।
বলে মহাবীর, এই বলে তুমি
রমণীরে বল করিতে এলে?
পৃথিবীতে যারে, তুমি দাও প্রাণ,
সেই প্রাণে বাঁচে, বল হে সবে।
আজি পৃথ্বিনাথ আমার চরণে
প্রাণ ভিক্ষা লও, বাঁচিবে তবে ||
যোড়ো হাত দুটো, দাঁতে কর কুটো
করহ শপথ ভারতপ্রভু।
শপথ করহ হিন্দুললনার
হেন অপমান না হবে কভু ||
তুমি না করিবে, রাজ্যেতে না দিবে
হইতে কখন এ হেন দোষ।
হিন্দুললনারে যে দিবে লাঞ্ছনা
তাহার উপরে করিবে রোষ ||
শপথ করিল, পরশিয়ে অসি,
নারী আজ্ঞামত ভারপ্রভু।
আমার রাজ্যতে হিন্দুললনার
হেন অপমান না হবে কভু ||
বলে শুনি ধনি হইয়াছি প্রীত
দেখিয়া তোমার সাহস বল।
যাহা ইচ্ছা তব মাগি লও সতি,
পূরাব বাসনা, ছাড়িয়া ছল ||
এই তরবারি দিনু হে তোমারে
হীরক-খচিত ইহার কোষ।
বীরবালা তুমি তোমার সে যোগ্য
না রাখিও মনে আমার দোষ ||
আজি হতে তোমা ভগিনী বলিনু,
ভাই তব আমি ভাবিও মনে।
যা থাকে বাসনা মাগি লও বর
যা চাহিবে তাই দেব এখান ||
তুষ্ট হয়ে সতী বলে ভাই তুমি
সম্প্রীত হইনু তোমার ভাষে।
ভিক্ষা যদি দিবা দেখাইয়া দাও
নির্গমের পথ, যাইব বাসে ||
দেখাইল পথ আপনি রাজন্
বাহিরিল সতী, সে পুরী হতে।
সবে বল জয়, হিন্দুকন্যা জয়,
হিন্দুমতি থাক্ ধর্ম্মের পথে ||
৬
রাজপুরী মাঝে, কি সুন্দর আজি
বসেছে বাজার রসের ঠাট।
রমণীতে কেনে রমণীতে বেচে
লেগেছে রমণীরূপের হাট ||
ফুলের তোরণ ফুল আবরণ
ফুলের স্তম্ভেতে ফুলের মালা।
ফুলের দোকান ফুলের নিশান
ফুলের বিছানা ফুলের ডালা ||
নবমীর চাঁদ বরষে চন্দ্রিকা
লাখে লাখে দীপ উজলি জ্বলে ||
দোকানে দোকানে কুলবালগণে
ঝলসে কটাক্ষ হাসিয়া ছলে ||
এ হতে সুন্দর, রমণী-ধবম
আর্য্যনারীরধ্ঁচ্চমর্ম, সতীত্ব ব্রত।
জয় আর্য্য নামে, আজ(ও) আর্য্যধামে
আর্য্যধর্ম্ম রাখে রমণী যত ||
জয় আর্য্যকন্যা এ ভুবন ধন্যা,
ভারতের আলো, ঘোর আঁধারে।
হায় কি কারণে, আর্য্যপুত্রগণে
আর্য্যের ধরম রাখিতে নারে ||
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/927
|
5275
|
শামসুর রাহমান
|
সাবান
|
রূপক
|
পাড়ার দোকান থেকে একটি সাবান কিনে এনে
রেখে দিলো নিজের দেরাজে। মোড়কের ভাঁজ খুলে
প্রায়শই ঘ্রাণ নেয়, আবার গচ্ছিত রাখে স্মিত
হেসে যথাস্থানে, সেই ঘ্রাণ তাকে ন্যালক্ষ্যাপা করে
বারংবার, নিয়ে যায় সময়ের অন্য পারে। কার
গায়ে একরম ঘ্রাণ ছিলো? গোসলের পর খোলা,
ঈষৎ ফাঁপানো চুলে যে আসতো নিঃশব্দে দ্বিপ্রহরে,
তার গায়ে? কখনও-সখনও সোনারুর মতো ঢঙে
চোখ রাখে সাবানের প্রতি, টেবিলে স্থাপিত হলে।
কখনও সে বানাবে না, তবু বস্তুটির খুঁটিনাটি
প্রস্তুতিপর্বের কথা ভাবে, আমদানি রপ্তানির
হিসেবে-নিকেশ করে। কেঠো দেরাজের ভেতরেও
সুঘ্রাণ; করে না এস্তেমাল তাকে, পাছে এ সাবান
পানির সংসর্গে জীবনের মতো দ্রুত ক্ষয়ে যায়। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/saban/
|
1275
|
জীবনানন্দ দাশ
|
হায় চিল
|
প্রেমমূলক
|
হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।
পৃথিবীর রাঙ্গা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো?
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/hay-chil/
|
620
|
জয় গোস্বামী
|
আমরা
|
চিন্তামূলক
|
গাছেদের নাম গাছ
ধুলোদের নাম ধুলো
নদীদের নাম বলতে পারবে গ্রামবাসীরা
কিন্তু ঘরের নাম ঘর দাওয়ার নাম দাওয়া
দাওয়ার ধারে মেয়েটির নাম কী?
তা জানতে হলে তোমাকে নৌকো বাইতে হবে
গুন টানতে হবে
কাঠ কাটতে যেতে হবে বনে
ডাকাতের হাতে পড়তে হবে
বেড়া ডিঙিয়ে পৌঁছতে হবে দাওয়ায়
দাওয়া ডিঙিয়ে ঘরে
ঘরের মধ্যে সে যখন আঁকড়ে নেবে তোমায়
তার ঘূর্ণির মধ্যে তলিয়ে যাওয়া সেই সময়টায়
গাছের উপর আছড়ে পড়বে গাছ
ধূলোর ভেতর থেকে পাকিয়ে উঠবে ধুলিস্তম্ভ
গ্রামের উপর আছড়ে পরবে নদী
তোমার মনে থাকবে না তোমার নাম ছিল পথিক…আমরা তো অল্পে খুশি,
কী হবে দুঃখ করে?
আমাদের দিন চলে যায়
সাধারণ ভাতকাপড়ে।চলে যায় দিন আমাদের
অসুখে ধারদেনাতে
রাত্তিরে দুভায়ে মিলে
টান দিই গঞ্জিকাতে।সবদিন হয়না বাজার,
হলে হয় মাত্রাছাড়া –
বাড়িতে ফেরার পথে
কিনে আনি গোলাপচারা।কিন্তু পুঁতব কোথায়?
ফুল কি হবেই তাতে?
সে অনেক পরের কথা
টান দিই গঞ্জিকাতে।আমরা তো অল্পে খুশি,
কী হবে দুঃখ করে?
আমাদের দিন চলে যায়
সাধারণ ভাতকাপড়ে।মাঝে মাঝে চলেও না দিন
বাড়ি ফিরি দুপুররাতে ;
খেতে বসে রাগ চড়ে যায়
নুন নেই ঠান্ডা ভাতে।রা.গ চড়ে মাথায় আমার
আমি তার মাথায় চড়ি,
বাপব্যাটা দুভায়ে মিলে
সারা পাড়া মাথায় করি।করি তো কার তাতে কী?
আমরা তো সামান্য লোক।
আমাদের ভাতের পাতে
লবণের ব্যবস্থা হোক।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%85%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%87-%e0%a6%96%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a6%bf-%e0%a6%9c%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8/
|
4399
|
শামসুর রাহমান
|
আমি কোথায় এসে পড়েছি
|
রূপক
|
আমার জীবন কখন যে আচমকা
মুছে যাবে, জানা নেই। হোক না যখনই,
দৈবক্রমে যদি দুনিয়ায় ফিরে আসি
হাজার বছর পর শ্যামলীতে, তখন কি খুঁজে
পাবো এই আমার নিজের বাড়িটিকে? কিছুতেই
পড়বে না দৃষ্টিতে বিনীত সেই বাড়ি। বহুতল
শৌখিন মহল কোনও করবে বিরাজ সেই স্থানে। হয়তো-বা
আগেকার চেনা জায়গাটা, মাথা কুটে মরলেও, চিনবো না।আমার নিজের বংশধর কেউ চিনে নিয়ে এই
আমাকে স্বাগত
জানিয়ে শ্রদ্ধাত আভা ছড়িয়ে সানন্দে বসাবে না
অপরূপ আসনে এবং
আমার দু’চোখ ভিজে যাবে কি তখন ঠিক মানুষের
মতো নয়, অথচ মানব-সন্তানের
বিকৃত ধরনের গড়ে-ওঠা জীব যেন নিয়মিত
ওঠে বসে, হাঁটে আর দরজা, জানালা বন্ধ করে, খুলে দেয়সম্ভবত বিলুপ্ত আমার বংশধর। বৃথা আমি
উঠবো সন্ধানে মেতে তাদের কাউকে
এবং হাঁটবো ডানে বামে। প্রশ কি করবো
কখনও সখনও পথচারীদের? নিরুত্তর চলে যাবে ওরা
যে যার গন্তব্যে। প্রকৃতই আছে কি গন্তব্য কোনও?
‘নেই, নেই’ ধ্বনি শুধু কানে এসে ঝরে যায় নির্বাক ধুলায়।এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে দেখি শুধু পাথরের
ঘরবাড়ি, পরিচ্ছন্ন পথঘাট, হায়,
নেই কোনও গাছ-গাছালির
এতটুকু চিহ্ন কোনওখানে। মাঝে মাঝে
চোখে পড়ে পাথরের মূর্তি কিছু সাজানো, গোছানো;
দোকানে পসরা ঢের, অথচ কোথাও এক রত্তি ফুল নেই।এ আমি কোথায় এসে পড়েছি হঠাৎ? বৃষ্টিধারা
কস্মিনকালেও স্নান করিয়ে দেয় না
এই শহরকে, শুধু ধু ধু তাপে বেঁচে আছে এই
নগরের বাসিন্দারা সব, পুতুলের মতো ওরা
পারে না ওঠাতে মাথা কিছুতেই মহীয়ান
লৌহমানবের প্রিয় হুকুমবরদারদের ত্রাসে
দিনরাত। বেহেস্তে করছে বসবাস, সদা মেনে নিতে হয়।মধ্যরাতে ঘুম ভাঙতেই দেখি সারাটা শরীর
ঘামে ভেজা, রাতের স্বপ্নের দানে ভীষণ কাতর হয়ে পড়ি। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ami-kothai-ese-porechi/
|
1743
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
অতিক্রম করে যাওয়া
|
প্রেমমূলক
|
অতিক্রম করে যাওয়া শিল্পের নিয়ম
ঘুটের ছাপের মতো
ক্ষতচিহ্নে ছেয়ে গেছে জীবন, সময়
রক্তের জানালা ভেঙে
তবু সূর্যকরোজ্জাল বাঁশি ডেকে যায়
ঝড়ের রাতের অভিসারে।
অতিক্রম করে যাওয়া
জীবনেরও নিশ্চিত নিয়ম।
পাহাড়ের চুড়োগুলো অতিক্রম করে গেছে
মেঘ।
কোনার্ক-রথের চাকা
বিংশ শতাব্দীর সীমা অতিক্রম করে চলে যায়
আরো দূর শতাব্দীর কাছে।
তুমি খুব ভালোবেসেছিলে
তুমি খুব কাছে এসেছিলে।
এখন তোমারও সৌধ ভেদ করে
চলে যেতে হবে
আরো বড় বেদনার
আরো বড় আগুনের আরতির দিকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1268
|
1391
|
তারাপদ রায়
|
দিন আনি, দিন খাই
|
মানবতাবাদী
|
আমরা যারা দিন আনি, দিন খাই,
আমরা যারা হাজার হাজার দিন খেয়ে ফেলেছি,
বৃষ্টির দিন, মেঘলা দিন, কুয়াশা ঘেরা দিন,
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অধীর প্রতীক্ষারত দিন,
অপমানে মাথা নিচু করে চোরের মত চলে যাওয়া দিন,
খালি পেট, ছেঁড়া চটি, ঘামে ভেজা দিন,
নীল পাহাড়ের ওপারে, সবুজ বনের মাথায় দিন,
নদীর জলের আয়নায়, বড় সাহেবের ফুলের বাগানে দিন,
হৈ হৈ অট্টহাসিতে কলরোল কোলাহল ভরা দিন,
হঠাত্ দক্ষিণের খোলা বারান্দায় আলো ঝলমলে দিন –
এই সব দিন আমরা কেমন করে এনেছিলাম, কিভাবে,
কেউ যদি হঠাত্ জানতে চায়, এরকম একটা প্রশ্ন করে,
আমরা যারা কিছুতেই সদুত্তর দিতে পারবো না, কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবো না
কি করে আমরা দিন এনেছিলাম,
কেন আমরা দিন আনি, কেন আমরা দিন খাই,
কেমন করে আমরা দিন আনি, দিন খাই।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3894.html
|
4935
|
শামসুর রাহমান
|
পূর্বরাগ
|
প্রেমমূলক
|
জেনেছি কাকে চাই, কে এলে চোখে ফোটে
নিমেষে শরতের খুশির জ্যোতিকণা;
কাঁপি না ভয়ে আর দ্বিধার নেই দোলা
এবার তবে রাতে হাজার দীপ জ্বেলে
সাজাবো তার পথ যদি সে হেঁটে আসে।
যদি সে হেঁটে আসে, প্রাণের ছায়াপথ
ফুলের মতো ফুটে তারার মতো ফুটে
জ্বলবে সারারাত, ঝরবে সারারাত।
জেনেছি কাকে চাই, বলি না তার নাম
ভিড়ের ত্রিসীমায়; স্বপ্ন-ধ্বনি শুধু
হৃদয়ে বলে নাম, একটি মৃদু নাম।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/purborag/
|
1580
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
ঘাটশিলা থেকে গয়েরকাটা
|
মানবতাবাদী
|
ঘাটশিলার কাছে
এন. এইচ. সিক্সের কুচকুচে কালো পিঠের উপর থেকে তার
দিনভর-রোদ্দুর-খেয়ে-গরম-হয়ে-ওঠা
শস্যের
শেষ কয়েকটি দানাকে খুব যত্নভরে
খুঁটে তুলতে-তুলতে
সাড়ে পাঁচ কাঠা জমির মালিক এক চাষি আমাকে বলেছিল,
হাইওয়ে হয়ে ইস্তক
এই তাদের একটা মস্ত উপকার হয়েছে যে,
রাস্তার উপরেই
দিব্যি এখন ধান শুনোনো যায়।
সূর্যদেব তখন
সারা আকাশে তার খুনখারাবি রঙের বালতি উপুড় করে দিয়ে
দিগন্ত-রেখার ঠিক নীচেই তাঁর
রক্তবর্ণ মুখখানাকে
আধাআধি লুকিয়ে ফেলেছেন।
সরকার বাহাদুরের কোনো প্রতিনিধি তখন
অকুস্থলে হাজির ছিলেন না।
থাকলে নিশ্চয়ই সরকারি সড়কের এই
অচিন্ত্যপূর্ব উপকারিতার কথা শুনে
তাঁর মুখও সেদিন লজ্জায় লাল হয়ে উঠত।
কিন্তু এন. এইচ. থার্টিওয়ানের উপর দিয়ে যখন আমরা
গয়েরকাটার দিকে এগোচ্ছিলাম,
তখন ধান শুকোবার সময় নয়।
পাশের গাঁয়ের এক চাষি তখন তাই খুব মনোযোগ সহকারে
শাবল দিয়ে খুঁড়ে তুলছিল
হাইওয়ের পিচ।
পিচ দিয়ে কী হবে, জিজ্ঞেস করতেই একগাল হেসে
সে আমাকে জানায় যে,
হাইওয়ে হয়ে ইস্তক আর রাংঝালের দরকার হয় না;
গোটা-গাঁয়ের ফুটো-বালতি আর ফাটা-গামলা এখন
পিচ গলিয়েই দিব্বি মেরামত হয়ে যাচ্ছে।
সরকার বাহাদুরের কোনো প্রতিনিধি সেদিনও
অকুস্থলে হাজির ছিলেন না।
একমাত্র সূর্যদেবই আমাদের কথোপকথনের সাক্ষী।
কিন্তু সূর্যদেব সেদিনও খুব লজ্জা পেয়েছিলেন নিশ্চয়।
গয়েরকাটার আকাশে তিনি আর তাই
খুনখারাবির খেলা দেখাননি।
গাঁয়ের চাষির সঙ্গে যখন আমার কথাবার্তা চলছে,
ফাঁক বুঝে তখন
টুক করে একসময় তিনি আংরাভাসা নদীর জলে তলিয়ে যান।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1542
|
1656
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
ভরদুপুরে
|
প্রকৃতিমূলক
|
হরেক রাস্তা ঘুরতে-ঘুরতে
ভরদুপুরে পুড়তে-পুড়তে
কোথার থেকে কোথায় যাওয়া।
আকাশ থেকে জলের ঝাড়ি
হয়নি উপুড়, গুমোট ভারী,
কোত্থাও নেই কিচ্ছু হাওয়া।
এই, তোরা সব চুপ কেন রে?
আয় না হাসিঠাট্টা করে
পথের কষ্ট খানিক ভুলি।
কেউ হাসে না। ভরদুপুরে
আমরা দেখি আকাশ জুড়ে
উড়ছে সাদা পায়রাগুলি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1537
|
3569
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিচিত্র সাধ
|
ছড়া
|
আমি যখন পাঠশালাতে যাই
আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে,
দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই
ফেরিওলা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে।
‘চুড়ি চা— ই, চুড়ি চাই' সে হাঁকে,
চীনের পুতুল ঝুড়িতে তার থাকে,
যায় সে চলে যে পথে তার খুশি,
যখন খুশি খায় সে বাড়ি গিয়ে।
দশটা বাজে, সাড়ে দশটা বাজে,
নাইকো তাড়া হয় বা পাছে দেরি।
ইচ্ছে করে সেলেট ফেলে দিয়ে
অম্নি করে বেড়াই নিয়ে ফেরি।
আমি যখন হাতে মেখে কালি
ঘরে ফিরি, সাড়ে চারটে বাজে,
কোদাল নিয়ে মাটি কোপায় মালী
বাবুদের ওই ফুল-বাগানের মাঝে।
কেউ তো তারে মানা নাহি করে
কোদাল পাছে পড়ে পায়ের ‘পরে।
গায়ে মাথায় লাগছে কত ধুলো,
কেউ তো এসে বকে না তার কাজে।
মা তারে তো পরায় না সাফ জামা,
ধুয়ে দিতে চায় না ধুলোবালি।
ইচ্ছে করে আমি হতেম যদি
বাবুদের ওই ফুল-বাগানের মালী।
একটু বেশি রাত না হতে হতে
মা আমারে ঘুম পাড়াতে চায়।
জানলা দিয়ে দেখি চেয়ে পথে
পাগড়ি পরে পাহারওলা যায়।
আঁধার গলি, লোক বেশি না চলে,
গ্যাসের আলো মিট্মিটিয়ে জ্বলে,
লণ্ঠনটি ঝুলিয়ে নিয়ে হাতে
দাঁড়িয়ে থাকে বাড়ির দরজায়।
রাত হয়ে যায় দশটা এগারোটা
কেউ তো কিছু বলে না তার লাগি।
ইচ্ছে করে পাহারওলা হয়ে
গলির ধারে আপন মনে জাগি। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bichitro-sadh/
|
2353
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
বর্ষাকাল
|
প্রকৃতিমূলক
|
গভীর গর্জ্জন সদা করে জলধর,
উথলিল নদনদী ধরণী উপর ।
রমণী রমণ লয়ে, সুখে কেলি করে,
দানবাদি দেব, যক্ষ সুখিত অন্তরে।
সমীরণ ঘন ঘন ঝন ঝন রব,
বরুণ প্রবল দেখি প্রবল প্রভাব ।
স্বাধীন হইয়া পাছে পরাধীন হয়,
কলহ করয়ে কোন মতে শান্ত নয়।।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/borshakal/
|
2213
|
মহাদেব সাহা
|
বাউল
|
প্রেমমূলক
|
ভালোবাসা যদি এ-রকমই হয় রক্তমাংস, কাম
লালনেও মিছে লজ্জা পাবো কি, সঙ্কোচে লিখি নাম?
মানুষ লিখেই কতোবার কাটি, মানুষের বেশি নই
কামে-প্রেমে তাই এতো ভার বহি, এমন যাতনা সই!
মানুষে যদি বা মাহাত্ম্য নেই পাষাণেই দেখা হবে
তোমাতে আমাতে আজকাল বাদে এটুকু তো সম্ভবে।
প্রেমের মূল্যে আমাকে ছেড়েছো ঘৃণার মূল্যে দিও
তুমিও জানো না আমিও জানি না কোনখানে স্মরণীয়
প্রিয়ায় আসেনি হিয়ায় এসেছো, কন্যায় কামনায়
চাইনা বলেও যতোবার ভাবি না চাওয়াও কিছু চায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1374
|
6034
|
হেলাল হাফিজ
|
তুমি ডাক দিলে
|
প্রেমমূলক
|
একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থূল অনটন আজম্ন ভেতরে আমার।
তুমি ডাক দিলে
নষ্ঠ কষ্ঠ সব নিমিষেই ঝেড়ে মুছে
শব্দের অধিক দ্রুত গতিতে পৌছুবো
পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল ছোঁব
পথে এতোটুকু দেরিও করবো না।
তুমি ডাক দিলে
সীমাহীন খাঁ খাঁ নিয়ে মরোদ্যান হবো,
তুমি রাজি হলে
যুগল আহলাদে এক মনোরম আশ্রম বানাবো।
একবার আমন্রণ পেলে
সব কিছু ফেলে
তোমার উদ্দেশে দেবো উজাড় উড়াল,
অভয়ারণ্য হবে কথা দিলে
লোকালয়ে থাকবো না আর
আমরণ পাখি হয়ে যাবো, -খাবো মৌনতা তোমার
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/107
|
3179
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমার সঙ্গে আমার মিলন
|
প্রেমমূলক
|
তোমার সঙ্গে আমার মিলন
বাধল কাছেই এসে।
তাকিয়ে ছিলেম আসন মেলে—
অনেক দূরের থেকে এলে,
আঙিনাতে বাড়িয়ে চরণ
ফিরলে কঠিন হেসে—
তীরের হাওয়ায় তরী উধাও
পারের নিরুদ্দেশে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomar-songge-amar-milon/
|
3193
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দাঁয়েদের গিন্নিটি
|
ছড়া
|
দাঁয়েদের গিন্নিটি
কিপ্টে সে অতিশয়,
পান থেকে চুন গেলে
কিছুতে না ক্ষতি সয়।
কাঁচকলা-খোষা দিয়ে
পচা মহুয়ার ঘিয়ে
ছেঁচকি বানিয়ে আনে–
সে কেবল পতি সয়;
একটু করলে “উহুঁ’
যদি এক রতি সয়! (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dayeder-ginniti/
|
1308
|
তসলিমা নাসরিন
|
এমন ভেঙ্গে চুরে ভালো কেউ বাসেনি আগে
|
প্রেমমূলক
|
কী হচ্ছে আমার এসব!
যেন তুমি ছাড়া জগতে কোনও মানুষ নেই, কোনও কবি নেই, কোনও পুরুষ নেই, কোনও
প্রেমিক নেই, কোনও হৃদয় নেই!
আমার বুঝি খুব মন বসছে সংসারকাজে?
বুঝি মন বসছে লেখায় পড়ায়?
আমার বুঝি ইচ্ছে হচ্ছে হাজারটা পড়ে থাকা কাজগুলোর দিকে তাকাতে?
সভা সমিতিতে যেতে?
অনেক হয়েছে ওসব, এবার অন্য কিছু হোক,
অন্য কিছুতে মন পড়ে থাক, অন্য কিছু অমল আনন্দ দিক।
মন নিয়েই যত ঝামেলা আসলে, মন কোনও একটা জায়গায় পড়ে রইলো তো পড়েই রইল।
মনটাকে নিয়ে অন্য কোথাও বসন্তের রঙের মত যে ছিটিয়ে দেব, তা হয় না।
সবারই হয়ত সবকিছু হয় না, আমার যা হয় না তা হয় না।
তুমি কাল জাগালে, গভীর রাত্তিরে ঘুম থেকে তুলে প্রেমের কথা শোনালে,
মনে হয়েছিল যেন স্বপ্ন দেখছি
স্বপ্নই তো, এ তো একরকম স্বপ্নই,
আমাকে কেউ এমন করে ভালোবাসার কথা বলেনি আগে,
ঘুমের মেয়েকে এভাবে জাগিয়ে কেউ চুমু খেতে চায়নি
আমাকে এত আশ্চর্য সুন্দর শব্দগুচ্ছ কেউ শোনায়নি কোনওদিন
এত প্রেম কেউ দেয়নি,
এমন ভেঙে চুরে ভালো কেউ বাসেনি।
তুমি এত প্রেমিক কী করে হলে!
কী করে এত বড় প্রেমিক হলে তুমি? এত প্রেম কেন জানো? শেখালো কে?
যে রকম প্রেম পাওয়ার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করেছি, স্বপ্ন দেখেছি, পাইনি
আর এই শেষ বয়সে এসে যখন এই শরীর খেয়ে নিচ্ছে একশ একটা অসুখ-পোকা
যখন মরে যাবো, যখন মরে যাচ্ছি — তখন যদি থোকা থোকা প্রেম এসে ঘর ভরিয়ে দেয়,
মন ভরিয়ে দেয়, তখন সবকিছুকে স্বপ্নই তো মনে হবে,
স্বপ্নই মনে হয়।
তোমাকে অনেক সময় রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয় না,
হঠাৎ ঝড়ে উড়ে হৃদয়ের উঠোনে
যেন অনেক প্রত্যাশিত অনেক কালের দেখা স্বপ্ন এসে দাঁড়ালে।
আগে কখনও আমার মনে হয়নি ঘুম থেকে অমন আচমকা জেগে উঠতে আমি আসলে
খুব ভালোবাসি
আগে কখনও আমার মনে হয়নি কিছু উষ্ণ শব্দ আমার শীতলতাকে একেবারে পাহাড়ের
চুড়োয় পাঠিয়ে দিতে পারে
আগে কখনও আমি জানিনি যে কিছু মোহন শব্দের গায়ে চুমু খেতে খেতে আমি রাতকে
ভোর করতে পারি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1982
|
576
|
কায়কোবাদ
|
বিদায়ের শেষ চুম্বন
|
প্রেমমূলক
|
( ১ )
আবার, আবার সেই বিদায়-চুম্বন,
আলেয়ার আলো প্রায়,
আঁধারে ডুবায়ে যায়,
স্মৃতিটি রাখিয়া হায় করিতে দাহন!( ২ )
বিদায়-চুম্বন,
উভয়েরি প্রাণে করে অগ্নি বরিষণ,
উভয়ে উভয় তরে,
আকুলি ব্যাকুলি করে,
উভয়েরি হৃদিস্তরে যাতনা-ভীষণ!
এমনি কঠোর হায় বিদায়-চুম্বন!( ৩ )
প্রণয়ের মধুমাখা প্রথম চুম্বনে,
শুধু সুখ সমুল্লাস ;
এতে ঘন হাহুতাশ,
কেবলি যে বহে হায় উভয়েরি মনে!( ৪ )
সে চুম্বনে এ চুম্বনে কি দিব তুলনা,
সে স্বর্গের পরিমল,
এ মর্তের হলাহল,
তাহাতে উল্লাস, এতে কেবলি যাতনা!( ৫ )
সে যে শরতের স্নিগ্ধ সুধাংশু-কিরণ,
মুহুর্তে মাতায় ধরা,
এ যে শুধু ক্লেশ ভরা
বৈশাখের ঘন ঘোর ঝটিকা ভীষণ!
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3844.html
|
2361
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভাষা
|
সনেট
|
মূঢ় সে, পণ্ডিতগণে তাহে নাহি গণি,
কহে যে, রূপসী তুমি নহ, লো সুন্দরি
ভাষা!—শত ধিক্ তারে! ভুলে সে কি করি,
শকুন্তলা তুমি, তব মেনকা জননী ?
রূপ-হীনা দুহিতা কি, মা যার অপ্সরী ?—
বীণার রসনা-মূলে জন্মে কি কুধ্বনি ?
কবে মন্দ-গন্ধ শ্বাস শ্বাসে ফুলেশ্বরী
নলিনী ? সীতারে গর্ভে ধরিলা ধরণী ।
দেব-যোনি মা তোমার ; কাল নাহি নাশে
রূপ তাঁর ; তবু কাল করে কিছু ক্ষতি ।
নব রস-সুধা কোথা বয়েসের হাসে ?
কালে সুবর্ণের বর্ণ ম্লান, লো যুবতি!
নব শশিকলা তুমি ভারত-আকাশে,
নব-ফুল বাক্য-বনে, নব মধুমতী।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/bhasha/
|
1281
|
জীবনানন্দ দাশ
|
হেমন্ত
|
প্রকৃতিমূলক
|
আজ রাতে মনে হয়
সব কর্মক্লান্তি অবশেষে কোনো এক অর্থ শুষে গেছে।
আমাদের সব পাপ- যদি জীব কোনো পাপ ক’রে থাকে পরস্পর
কিংবা দূর নক্ষত্র গুল্ম, গ্যাস, জীবানুর কাছে-
হিয়েছে ক্ষয়িত হয়ে।
বৃত্ত যেন শুদ্ধতায় নিরুত্তর কেন্দ্রে ফিরে এল
এই শান্ত অঘ্রাণের রাতে।
যতদূর চোখ যায় বিকোশিত প্রান্তরের কুয়াশায় ব্যাস
শাদা চাদরের মত কুয়াশার নিচে শুয়ে!
হরিতকী অরণ্যের থেকে চুপে সঞ্চারিত হয়ে
নিশীথের ছায়া যেন মেধাবী প্রশান্তি এক রেখে গেছে
প্রতিধ্বনিহীন, হিম পৃথিবীর পিঠে।
সুষুপ্ত হরিব- লোষ্ট্র; মৃত্যু আজ; ব্যাঘ্র মৃত; মৃত্যুর ভিতরে অমায়িক।
জলের উপর দিয়ে চ’লে যায় তারা; তবু জল
স্পর্শ করে নাক’ সিংহদুয়ারের মত জেগে ওঠে ইন্দ্রধনু
তাহাদের যেতে দেয়; অদ্ভুত বধির চোখে তবু তারা
অভ্যর্থনা করে নাক’ আজ আর আলোর বর্বর জননীকে।বাংলার শস্যহীন ক্ষেতের শিয়রে
মৃত্যু, বড়, গোল চাঁদ;
গভীর অঘ্রাণ এসে দাঁড়ায়েছে।
অনন্য যোদ্ধার মত এসেছে সে কতবার
দিনের ওপারে সন্ধ্যা- ঋতুর ভিতরে প্লাবী হেমন্তকে
দৃষ্ট প্রত্যঙ্গের মত এই স্ফীত পৃথিবীতে
ছুরির ফলার মত টেনে নিয়ে।
বেবিলন থেকে বিলম্বিত এসপ্লানেডে
বিদীর্ণ চীনের থেকে এই শীর্ণ এককড়িপুরে
মানুষের অরুন্তুদ চেষ্টার ভিতরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/haymento/
|
5849
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
যদি
|
স্বদেশমূলক
|
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভুমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।
ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত
এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম
এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ করে থাকে নদীকে প্রণাম
এখনো নদীর বুকে
মোচার খোলায় ঘুরে
লুঠেরা, ফেরারী ।
শহরে বন্দরে এত অগ্নি-বৃষ্টি
বৃষ্টিতে চিক্কণ তবু এক একটি অপরূপ ভোর,
বাজারে ক্রুরতা, গ্রামে রণহিংসা
বাতাবি লেবুর গাছে জোনাকির ঝিকমিক খেলা
বিশাল প্রাসাদে বসে কাপুরুষতার মেলা
বুলেট ও বিস্পোরণ
শঠ তঞ্চকের এত ছদ্মবেশ
রাত্রির শিশিরে কাঁপে ঘাস ফুল–
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে
নিথর দীঘির পারে বসে আছে বক
আমি কি ভুলেছি সব
স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক ?
আমি কি দেখিনি কোন মন্থর বিকেলে
শিমুল তুলার ওড়াওড়ি ?
মোষের ঘাড়ের মতো পরিশ্রমী মানুষের পাশে
শিউলি ফুলের মতো বালিকার হাসি
নিইনি কি খেজুর রসের ঘ্রাণ
শুনিনি কি দুপুরে চিলের
তীক্ষ্ণ স্বর ?
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ…
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো… ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a6%a6%e0%a6%bf-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%a8-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%93-sunil-gangopadhay/
|
5016
|
শামসুর রাহমান
|
বামনের দেশে
|
মানবতাবাদী
|
মেঘম্লান চন্দ্রালোকে ক’জন বামন শুদ্ধাচারী
যাজকের জোব্বা গায়ে মহত্তম যুগের স্মরণে
জুটেছে রাস্তার মোড়ে। “দ্যাখো এই পৃথিবীকে দ্যাখো,
আমাদের কীর্তিমান অগ্রজেরা জোগালেন যাকে
স্মরণীয় দিনের মহিমা, যাকে নাটকের শেষ
দৃশ্যের বিক্ষুব্ধ নায়কের মতো শোকে ত্যাগ করে
কালান্তরে করলেন নিঃশব্দে প্রস্থান, তাকে নোঃরা
করেছে অজস্র জন্তু, পবিত্রতা বিগত সুদূর
শতাব্দীর মতো অনাত্মীয়। মোট কথা, ইতিমধ্যে
সযত্নে লালিত সেই পৃথিবীর কতটুকু আর
অবশিষ্ট ধ্যাননেত্রে? হাসি পায়, যখন সম্প্রতি
দেখি কনিষ্ঠেরা শুধু অবিশ্বাস্য ছলে সরাসরি
মৃত্যুকে উপেক্ষা করে জীবনকে পরায় মুকুট।
অথচ জানে না তারা তাদেরও নিস্তার নেই সেই
ধ্বংসের প্রহার থেকে, হবে শবাগার জীবনের
সমস্ত বৈভব। সে বিপুল অর্থহীন অপচয়ে
তারাও নিশ্চিত লিপ্ত আজীবন। তারাই ইন্ধন”বলে সেই বামনেরা বাজালো ভ্রান্তির ডুগডুগি।
দূর হ হতাশা,
যা তুই নচ্ছার! জীবনের ত্রিসীমায়
দেখাবিনে মুখ আর, যা তুই ফিরে যা!
মৃত্যুর গোলামি করগে যা, আমরাতো সর্বক্ষণ
জীবনের স্তবে আন্দোলিত,
মজ্জাগত উৎসবের উজ্জ্বল চিৎকার।
সময়ের স্বগতকথনে বার বার
কান পাতি, প্রাজ্ঞ পদাবলী, প্রতীকের উচ্চারণ, রূপাভাস,
গাঁথি মগজের কতো শাণিত ফলকে!সাধারণ হলেও অন্তত
অতিশয় লঘুমতি যুবা নই, অলৌকিক মন্ত্রের মায়ায়
কবরের ধুলিকে বানাই
নক্ষত্রের ফেনা, যত পারি দূরে রাখি
অনুশোচনার মলময়
কীটের স্বৈরিতা! অমরত্ব কাকে বলে জানি না তা,
সে-জ্ঞানে উৎসাহ কম, বাছা-বাছা ভাষ্যকার তার
দিয়েছেন যে-ব্যাখ্যা তাতেও
কখনো ওঠেনি মন। পিতৃপুরুষেরা
ধারণার যে ক’বিঘে জমিতে লাঙল চষে কিছু
শাক-সবজি, সাধের আনাজ
তুলেছেন ঘরে, সেগুলো রোচেনি মুখে।আমরা নতুন শব্দ ছুঁড়ে দিই সময়ের মুখে,
সেই শব্দে মুগ্ধ হয়ে কোনো স্থির সহজ সিদ্ধান্তে
না-এসেই আমরা অনেকবার সাগ্রহে হয়েছি পার কতো
স্বল্পজীবী নালিমার সাঁকো!বলা যায় না করে অধিক বাক্যব্যয়
বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের সঙ্গে ক্রমাগত
বিখ্যাত বসন্ত শুধু করছে বিশ্বাসঘাতকতা।
ভুলেছে স্বধর্ম তার, আমাদের আকাঙ্ক্ষার ডালে
দেয় না ফুলের গুচ্ছ, পক্ষান্তরে চৈতন্যের আনাচে কানাচে
সর্বদা দিতেছে ছুঁড়ে তিরস্কার। নষ্ট বাগানের
ভ্রষ্ট কিছু পাখি।
কবরখানার গান গেয়ে-গেয়ে নিজেরাই ছায়া হয়ে যায়।
এ শহরে চতুর্দিকে ভিড়, চতুর্দিকে
বামনেরা জটলা পাকায়
এবং চাঁদের নখ উপড়ে আনবে ভেবে তারা
গুটিয়ে জোব্বার হাতা এলাহী রগড় করে শেষে
থুতু ছুঁড়ে দেয়
আকাশের মুখে।মহামান্য বামনেরা সময়ের বিবাহ-বাসরে
অতিথির ভূমিকায় ক্লান্ত হয়ে কন্যাপক্ষ সাজেঃ
অনেক মোড়লি করে-গাঁয়ে না মানুক
তাতে কী বা এসে যায়
সভায় আনতে গিয়ে কনে
আলমারি থেকে টেনে আনে সম্পন্ন ফরাসে এক
প্রাচীন কংকাল!
তারপর বনেদি কেতায় হেসে ওঠে,
যেন তীব্র ফুর্তির প্রগল্ভ পিচকারি
ছুঁড়ে দিলো দুঃস্বপ্নের সংখ্যাহীন বিন্দু,
অন্দরে-বাহিরে
লণ্ডভণ্ড সব,
পণ্ড হলো বিবাহ-বাসর।বাদ দাও শৃগালের বিখ্যাত ধূর্তামি,
মুখোশের বিচিত্র কল্পনা বাদ দাও।
তুমি কি মিথ্যার জালে পারবে ধরতে
অতর্কিতে উল্লিখিত সত্যের ঈগল
কোনোদিন? পারবে কি সময়ের ত্বক
ছিঁড়ে ফুঁড়ে জন্ম দিতে সোনালি আপেল-
মাংস যার জানবে না অবক্ষয়, শুধু
চৈতন্যের নিঃসংশয় প্রভাবে সে-ফল
চেনা পরিবেশে পাবে শিল্পের মহিমা!পথে ছুটি দিশাহারা, ফতোবাবুদের
ভিড় দেখি ছত্রভঙ্গ। বিভ্রান্তি চৌদিকে
প্রত্যহ ছড়িয়ে পড়ে প্রবাদের মতো।
পিকাসের গার্নিকা ম্যূরাল মনে পড়ে-
ক্রুদ্ধ সেই ঘোড়াটার আর্তনাদ যেন
আমাদের কাল। আমরা ভয়ার্ত চোখে
ধূর্ত মর্ত্যজীবীদের করুণা কুড়াই
অহর্নিশ। অগোচরে স্বপ্নের ঘোড়াকে
ঝোঁটিয়ে বেড়াই, ভাবি তাকে তাড়ালেই
থাকা যাবে নিশ্চিন্তির সম্পন্ন কোটরে।অথচ অবাক লাগে যখন স্বপ্নের গলিঘুঁজি
পেরিয়ে ব্রোজ্ঞের তপ্ত চত্বরে দাঁড়াই,
বাঁচবার চেষ্টা করি তীব্র বক্তব্যের
অন্তরঙ্গতায়,
সামনে তাকিয়ে দেখি পরিবর্তনের
টগবগ ঘোড়া
থমকে দাঁড়ায় নৈঃশব্দ্যের ক্ষণস্থায়ী প্রাঙ্গণের
এক কোণে, এবং মাথায় তার স্বপ্নের কিরীট
সম্মোহনে একান্ত নির্ভর।
হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে মুহূর্তে লাফিয়ে পড়ে সুতীক্ষ্ণ বাতাসে
এবং তখন
ক্ষুধার্ত চোয়ালে তার বাস্তবের খড়কুটো নড়ে!যেদিকে তাকাই
নিশ্চয়তা কিছু নেই। দুর্যোগের দিনে
মাদুলি তাবিজ তুকতাক নিয়ে মেতে আছে যারা,
সর্বক্ষণ যারা
পশুদের দাসত্বে বিলীন,
যাদের আত্মায় শুধু পশুদের বিষ্ঠা স্তূপীকৃত-
ভদ্রমহোদয়গণ, তাদের নিষ্ঠায়
তিলমাত্র করি না সন্দেহ,
অথচ নিশ্চিত তারা লোকালয় ছেড়ে
কবরখানায় খোঁজে স্বেচ্ছা নির্বাসন
বস্তুত নিজেরই অগোচরে।চতুর্দিকে যে বিচিত্র চিত্রশালা দেখি রাত্রিদিন
তাতে সবি ব্যঙ্গচিত্র। চোখ জুড়ে আছে কিমাকার
জীবনমথিত দৃশ্যঃ বিশিষ্ট প্রতিভাবানদের
আত্মার সদগতি করে সম্মিলিত শৃগাল ভালুক
ফিরে আসে ময়লা গুহায়। নির্বোধেরা সারাক্ষণ
গড়ছে এমন সিঁড়ি যা-দেখে শিউরে ওঠে দূরে
ভূশণ্ডীর কাক। দুঃস্বপ্নের জোড়াতালি দিয়ে-দিয়ে
লিখেছে প্রাচীরপত্র সর্বনাশ বড় জাঁক করে।
পৃথিবীর সব কিছু ধোপানীর গালগল্প ভেবে
পথে বসে হতবুদ্ধি হয়ে যাই বামনের দেশে। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bamoner-deshe/
|
1994
|
বিষ্ণু দে
|
মনে হয় প্রত্যেকে লেনিন
|
মানবতাবাদী
|
তোমাদেরও মনে হয়, মনে হয় তোমারও প্রত্যেকে লেনিন ?
লাজুক সুকান্ত ওই কথাটাই বলেছিল কৈশোর সংরাগে বহুদিন আগে –
সহজ কিশোর বিনম্র কবি বাংলায় তার কথা শতবর্ষে জাগে |
কারণ লেনিন নন দেবতা বা পুরাণ-নায়ক, তিনি একালের বীর,
স্থির ধীর, ভাবুক, আত্মস্থ, নেতা, মানবিক ; নিজেকে জাহির
কখনোই করেননি ; এমনকি কোন্ এক সভাঘরে স্বয়ং লেনিন
লেনিনিস্ট অত্যুক্তিতে শোনা যায় উঠে যান সংকোচে বিরাগে |
তাই আজ মনে হয় যদি সারা দেশ ভাবে, ভাবেপ্রতিদিন
সাধারণ মানুষেরা, সকলেই, নিত্য ভাবে দীন হই নই কভু হীন,
তাহলে হয়তো প্রতি মাস হবে অক্টোবর, প্রতিদিন প্রত্যেকে লেনিন |
শুনেছি যে লেনিনেরও সাধ ছিল একদিন সকলেই হ’য়ে যাবে
শতায়ু লেনিন ||
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4102.html
|
2640
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আইডিয়াল নিয়ে থাকে
|
ছড়া
|
আইডিয়াল নিয়ে থাকে, নাহি চড়ে হাঁড়ি।
প্রাক্টিক্যাল লোকে বলে, এ যে বাড়াবাড়ি।
শিবনেত্র হল বুঝি, এইবার মোলো–
অক্সিজেন নাকে দিয়ে চাঙ্গা ক’রে তোলো। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aidial-nie-thake/
|
270
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
কাণ্ডারী হুশিয়ার!
|
মানবতাবাদী
|
১
দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার!
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভূলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার!!
২
তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান!
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে, নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার!!
৩
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!
৪
গিরি-সংকট, ভীরু যাত্রীরা, গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ
কান্ডারী! তুমি ভূলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
‘করে হানাহানি, তবু চল টানি’, নিয়াছ যে মহাভার!
৫
কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙ্গালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।
৬
ফাঁসির মঞ্চে যারা গেয়ে গেল জীবনের জয়গান,
আসি’ অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?
আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রান?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুঁশিয়ার!
কৃষ্ণনগর; ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৩
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/827
|
630
|
জয় গোস্বামী
|
ঈশ্বর
|
প্রেমমূলক
|
— ‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’
বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে— ‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’
বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান— ‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’
পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি— ‘উড়বে?– আচ্ছা, ছিঁড়ে দেয় যদি পাখা?’
পড়তে পড়তে ধরে নেব ওর শাখা— ‘যদি শাখা থেকে নীচে ফেলে দেয় তোকে?’
কী আর করব? জড়িয়ে ধরব ওকেইবলো কী বলব, আদালত, কিছু বলবে কি এরপরও?
— ‘যাও, আজীবন অশান্তি ভোগ করো!’কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুন— ‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’
বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে— ‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’
বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান— ‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’
পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি— ‘উড়বে?– আচ্ছা, ছিঁড়ে দেয় যদি পাখা?’
পড়তে পড়তে ধরে নেব ওর শাখা— ‘যদি শাখা থেকে নীচে ফেলে দেয় তোকে?’
কী আর করব? জড়িয়ে ধরব ওকেইবলো কী বলব, আদালত, কিছু বলবে কি এরপরও?
— ‘যাও, আজীবন অশান্তি ভোগ করো!’কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুন— ‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’
বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে— ‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’
বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান— ‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’
পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি— ‘উড়বে?– আচ্ছা, ছিঁড়ে দেয় যদি পাখা?’
পড়তে পড়তে ধরে নেব ওর শাখা— ‘যদি শাখা থেকে নীচে ফেলে দেয় তোকে?’
কী আর করব? জড়িয়ে ধরব ওকেইবলো কী বলব, আদালত, কিছু বলবে কি এরপরও?
— ‘যাও, আজীবন অশান্তি ভোগ করো!’কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুন— ‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’
বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে— ‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’
বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান— ‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’
পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি— ‘উড়বে?– আচ্ছা, ছিঁড়ে দেয় যদি পাখা?’
পড়তে পড়তে ধরে নেব ওর শাখা— ‘যদি শাখা থেকে নীচে ফেলে দেয় তোকে?’
কী আর করব? জড়িয়ে ধরব ওকেইবলো কী বলব, আদালত, কিছু বলবে কি এরপরও?
— ‘যাও, আজীবন অশান্তি ভোগ করো!’কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%88%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%aa/#comments
|
4491
|
শামসুর রাহমান
|
একটি মুক্তো
|
প্রেমমূলক
|
“একটি স্বপ্নের পথে হেঁটে গিয়েছি সমুদ্রতীরে”,
বলে তুমি দিয়েছিলে স্বপ্নটির নিখুঁত বর্ণনা।
কী যে নাম সমুদ্রের ছিল না তোমার জানা, শুধু
ঝাউবীথি, গোধূলি, ক’জন ভদ্রলোক ছিল চেনা।একটি ঝিনুক তুমি দিলে বাড়িয়ে সবার হাতে
একে একে, হতশ্রী ঝিনুকটিকে ওরা দূরে ছুঁড়ে
ফেলে দিলো অবহেলে। সযত্নে কুড়িয়ে নিয়ে তার
বুক চিরে বের করি একটি অনিন্দ্য মুক্তো শেষে।দিনান্তে আমার করতলে মুক্তো দেখে সকলেই
বড় বেশি ঈর্ষাতুর হয়ে নাল ঠুকে বাঁকা চোখে
তাকালো আমার দিকে, তুমি আস্তে সুস্থে হেঁটে
দাঁড়াল আমার বাম পাশে। কনে-দেখা আলো চুমো
খেলো আমাদের, অকস্মাৎ তুমি হলে স্বয়ম্বরা-
মেতে থাকে পরস্পর বিবাহের অধিক বিবাহে। (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-mukto/
|
3082
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জয়ধ্বনি
|
চিন্তামূলক
|
যাবার সময় হলে জীবনের সব কথা সেরে
শেষবাক্যে জয়ধ্বনি দিয়ে যাব মোর অদৃষ্টেরে।
বলে যাব, পরমক্ষণের আশীর্বাদ
বারবার আনিয়াছে বিস্ময়ের অপূর্ব আস্বাদ।
যাহা রুগ্ন, যাহা ভগ্ন, যাহা মগ্ন পঙ্কস্তরতলে
আত্মপ্রবঞ্চনাছলে
তাহারে করি না অস্বীকার।
বলি, বারবার
পতন হয়েছে যাত্রাপথে
ভগ্ন মনোরথে;
বারে বারে পাপ
ললাটে লেপিয়া গেছে কলঙ্কের ছাপ;
বারবার আত্মপরাভব কত
দিয়ে গেছে মেরুদণ্ড করি নত;
কদর্যের আক্রমণ ফিরে ফিরে
দিগন্ত গ্লানিতে দিল ঘিরে।
মানুষের অসম্মান দুর্বিষহ দুখে
উঠেছে পুঞ্জিত হয়ে চোখের সম্মুখে,
ছুটি নি করিতে প্রতিকার--
চিরলগ্ন আছে প্রাণে ধিক্কার তাহার।
অপূর্ণ শক্তির এই বিকৃতির সহস্র লক্ষণ
দেখিয়াছি চারি দিকে সারাক্ষণ,
চিরন্তন মানবের মহিমারে তবু
উপহাস করি নাই কভু।
প্রত্যক্ষ দেখেছি যথা
দৃষ্টির সম্মুখে মোর হিমাদ্রিরাজের সমগ্রতা,
গুহাগহ্বরের যত ভাঙাচোরা রেখাগুলো তারে
পারে নি বিদ্রূপ করিবারে--
যত-কিছু খণ্ড নিয়ে অখণ্ডেরে দেখেছি তেমনি,
জীবনের শেষবাক্যে আজি তারে দিব জয়ধ্বনি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jaydane/
|
3467
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রেমের আদিম জ্যোতি আকাশে সঞ্চরে
|
ভক্তিমূলক
|
প্রেমের আদিম জ্যোতি আকাশে সঞ্চরে
শুভ্রতম তেজে,
পৃথিবীতে নামে সেই নানা রূপে রূপে
নানা বর্ণে সেজে।
(স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/premer-adim-jyoti-akashe-sonchore/
|
5290
|
শামসুর রাহমান
|
সে কোন সুদূরে
|
চিন্তামূলক
|
কোনো কোনো ভোর কীভাবে যে শুরু হয়!
লগ কেবিনের বাইরে এলেই পর্বতমালা,
শুভ্র পাগড়ি-পরা কতিপয় সান্ত্রীর মতো
নিথর দাঁড়ানো। তুষারবন্দি হ্রদের সীমানা
পেরিয়ে সহসা ভেসে আসে দূর পর্বতী নিঃশ্বাস।
আমাকে জড়ায় সে কোন সুদূর মরুবাসিনী ছায়া!কাঠবিড়ালিটা কেবিনের দোরে মৃদু ছুটে আসে,
ভিনদেশী এক মানুষের দিকে কেমন তাকায়
আবার পালায়। মনে পড়ে দূরে ফেলে-আসা পথ,
মুখের ওপর চুলের প্লাবন, কালো রাত্তির-আলো করা হাসি।
আমার হৃদয়ে সে কোন সুদূর মরুবাসিনীর ছায়া!জায়গাটা গুণী কম্পোজারের সিম্ফনি যেন।
কফি শপে ভাসে নানা দেশী ভাষা। কারো কারো চোখে
চোখ পড়ে কারো। রুপালি চামচ প্লেটের বাজে আর
বাইরে এখন ঝলমলে দিন। মনে পড়ে সেই
বোস্টনে-দেখ কোন সে বিহানে ফুটপাতে একা
অন্ধ যুবার ত্র্যাকর্ডিয়ানে নিকেল-কুড়ানো সুর।
সত্তায় নামে সে কোন সুদূর মরুবাসিনীর ছায়া!
কোনো কোনো ভোর কীভাবে যে শুরু হয়!
সুকান্ত সেই কিশোরের মুখ করোটি আজকে
আমার টেবিলে করোটি কেবলি চেয়ে থাকে আর
বলে দ্যাখো ঐ কবরেও দ্যাখো পুষ্পের বিপ্লব।
যে যায় অমন উদাস একলা, সে কি একেবারে
একা একা যায়? যায় না কি তার সঙ্গে কিছুটা
আলোছায়া কিছু মনে-পড়া আর বিধুর বেহাগী রেশ?
আমাকে নাওয়ায় সে-কোন সুদূর মরুবাসিনীর ছায়া!কখনো-সখনো ধূসর পূর্ব পুরুষের কালো গোরস্তানের
পাশ দিয়ে আমি শিস দিয়ে যাই, চমকে তাকাই
কখনো হঠাৎ। ছিলেন তো ওরা আটচালা ঘরে,
পুকুরে রোজানা
করতেন ওজু, মসজিদে ছিল যৌথ সেজদা।
পুকুরের দিকে
তাকাতেন আর দেখতেন কিছু মাছের রুপালি লাফ।
আমার ওপরে সে কোন সুদূর মরুবাসিনীর ছায়া!উদাস পুকুর এমন হিংস্র আগে কে জানত?
আমার পায়েও খেয়েছে সে চুমো, নিয়েছে আমার
নানা বয়সে মাথাটার ঘ্রাণ শত শতবার।
হঠাৎ কেন সে আমার বুকের কিশোরকে নিল?
মেটাতে তার সে উনিশ শতকী রহস্যময় খলখলে ক্ষুধা
আমাকেই কেন দিতে হ’ল ভোগ, দিতে হল ভোগ আজ?
আমার দু’চোখে সে কোন সুদূর মরুবাসিনীর ছায়া!ট্রেন থেকে মুখ বাড়িয়ে এবং গুডবাই হাত
নাড়তে নাড়তে চলে যাই আমি ছায়ার মতোই।
কোথায় যে যাই। আকাশের চাঁদ মাতালের চোখ,
আমার মগজে দাবানল আর সত্তার সব তন্তু ছিন্ন-
একটু শান্তি পাব কি কোথাও এমন দগ্ধ
পারিপার্শ্বেকে? সম্মুখে নেই ওয়েসিস কোনো, শুধু মরুভূমি
উগড়ে দিচ্ছে বিষধর সাপ আর নৃসিংহ দারুণ উগ্রতায়।
আমার নিয়তি সে কোন সুদূর মরুবাসিনীর ছায়া! (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/se-kon-sudure/
|
4024
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা
|
প্রেমমূলক
|
“হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা
ওগো তপন তোমার স্বপন দেখি যে,করিতে পারি নে সেবা।’
শিশির কহিল কাঁদিয়া,
“তোমারে রাখি যে বাঁধিয়া
হে রবি,এমন নাহিকো আমার বল।
তোমা বিনা তাই ক্ষুদ্র জীবন কেবলি অশ্রুজল।’“আমি বিপুল কিরণে ভুবন করি যে আলো,
তবু শিশিরটুকুরে ধরা দিতে পারি
বাসিতে পারি যে ভালো।’
শিশিরের বুকে আসিয়া
কহিল তপন হাসিয়া,
“ছোটো হয়ে আমি রহিব তোমারে ভরি,
তোমার ক্ষুদ্র জীবন গড়িব
হাসির মতন করি।’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hai-gogon-nohile-tomare-dhoribe-ke-ba/
|
2047
|
মহাদেব সাহা
|
অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প
|
চিন্তামূলক
|
অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প, আমি তাকে
দুঃখভরা নকশীকাঁথার মতো আমার শরীরে
করেছি সেলাই,
বড়োই যাতনাময় তবু তার নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে আমি
বুঝেছি কেমন এই প্রবাহিত তোমাদের অটুট জীবন
চারধারে, কেমন সুস্থতা
তার মাঝে ক্রমাগত অন্তঃসারশূন্যতার কী গভীর ধস ও ফাটল!
অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প তার কাছে থেকেই তো আমি
প্রথম শিখেছি তোমার মুখের সাথে গোলাপের কোথায় অমিল
কিংবা এই চলচ্ছক্তিহীনতার মধ্যে কী প্রখর অন্তহীন ধাবমান আমি
আর সিরিঞ্জের রক্তিম ওষুধই কখনো কখনো
কীভাবে তোমার সূক্ষ্ম অনুভূতি হয়;
অসুস্থতা আমাকে দিয়েছো গাঢ় অবিমিশ্র এ কোন চেতনা
যতোই তাকাই চোখ মেলে মনে হয়
ওষুধের একেকটি মৃদু ফোঁটা স্মৃতির ভিতরে রাত্রিদিন
ঝরে কোন বিরল শিশির
শুভ্র নার্স যাকে আমি চিরকাল ভেবেছি শুশ্রূষা
মানুষের ক্ষত ও আহত দেহময় উদ্বেলিত কোমল বর্ষণ
বলে চিনি,
অসুস্থতা তাই তারও কণ্ঠে আমি শুনেছি কোরাস
আমার সকল ঘরময় কখনো দেখেছি তাকে অপেরার মতন
উদ্দাম
এলায়িত ভঙ্গি আর নৃত্যপরায়ণ-
না হলে তাকেই বুকে নিয়ে
কীভাবে এমন আছি দীর্ঘ রাত্রি মগ্ন ও মোহিত
কখনো কখনো এই অসুস্থতাকে মনে হয় প্রিয়তমা প্রেমিকার
চেয়ে আরো বেশি
মনে হয় অনুরক্ত বুঝি কোনো লাজুক তরুণী সে যে
খুব সন্তর্পণে শান্তধীর কিংবা দ্বিধায় আমার শরীরে
তার অলৌকিক স্পর্শ রেখে যায়
এই অসুস্থতা আমাকে দিয়েছে তার নগ্নদেহ, নগ্ন শিহরন
আর তার ব্যাকুলতাময় ঊরু, জঙ্ঘা, স্তন ও শোণিত।
তার দিকে চেয়ে দেখি আমার সম্মুখে
বয়ে যায় কল্লোলিত জীবনদেবতা
আমার সামান্য এই ছিটেফোটা পরমায়ুটুকু কেবল তারই তো দেখি
করুণাধারায় সিক্ত
আমি এই অসুস্থতা তোমাকে পেয়েই কতো যে না-পাওয়াগুলি সহজে ভুলেছি!
তোমার ট্রান্সপেরেন্ট উদার চক্ষুদ্বয়ে দেখা যায়
প্রজ্জ্বলিত ঐশ্বরিক মেধা
তোমার মুখের দিকে চেয়ে আমি তাই মনে মনে ভাবি
তুমি কি মৃত্যুর কাছ থেকে এই সূর্যাস্তের ছায়া, মুগ্ধ টিপ
আর এই সূক্ষ্ম শিল্পের কাজ-করা বিদায়খচিত সুবর্ণপদক
এনেছো আমার জন্য?
যার একদিকে উদাত্ত আহ্বান আর
অন্যদিকে গাঢ় বিস্মরণ!
অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প আমি জানি
তোমার একটি তুচ্ছ ব্রণের দাগও এতো বেশি চেনা
আমার আত্মাকে যতো শুদ্ধ হতে বলি, বলি বীজন জড়তামুক্ত হও
তার মুখ ততো নৈঃশব্দ্যের দিকে ঘুরে যায়
আর সেই অস্পষ্ট বিলীয়মান কন্ঠস্বরে যেন মনে হয় শুনি
আমার এ রুগ্নতার ভিতর দিয়েই সভ্যতা ও ইতিহাসই
চায় আজ মৌলিক শুশ্রূষা!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1514
|
4759
|
শামসুর রাহমান
|
তট ভাঙার জেদ
|
মানবতাবাদী
|
বলতে ভাল লাগে, আমার পূর্বপুরুষগণ
মেঘনা নদীর তীরবর্তী পাড়াতলী গাঁয়ের
বাসিন্দা ছিলেন। তাঁদের ছোট বড় কুঁড়ে ঘর
এখন নিশ্চিহ্ন, কিন্তু পুকুর আর পাকা মসজিদটি
আজ অব্দি রয়ে গেছে সগৌরবে। আমার
পিতার সৃষ্ট একটি দালান আর ইশকুল এখনও
দাঁড়ানো মাথা উঁচু করে। দু’তিন বছর অন্তর
আমরা একবার যাই পূর্বপুরুষদের স্মৃতির মঞ্জিলে।দাদাজান, নানাজান, আব্বা আর চার চাচা, আমার
এক সন্তানের এবং আরও কারও কারও কবর রয়েছে সেখানে। রাত্তিরে
নিষ্প্রদীপ সেই উদাস কবরস্থানে জোনাকিরা ছড়ায় আলো
আর ঝিঁঝিঁ পোকা একটানা সুর হয়ে ঝরে চৌদিকে।
পূর্বপুরুষদের কদিমি পুকুর আত্মজকে আমার
গিলেছে সেই কবে। এক ভরদুপুরে। আজও স্বগ্রামে গেলে
অতীত এবং বর্তমানের প্রতি নির্বিকার পুকুরটির কিনারে
গিয়ে বসি। গাছ গাছালি ঘেরা এই
জলাশয় সাক্ষী, এখানেই একাত্তরে হিংস্রতার তাড়া-খাওয়া
সন্ত্রস্ত হরিণের মতো জন্মশহর থেকে ছুটে এখানেই
নিয়েছিলাম ঠাঁই। এই পুকুর আমাকে দেখলেই, মনে হয়,
হাসে বাঁকা হাসি; তবু দিয়েছে যুগল কবিতা উপহার।
আমাদের পাড়াতলী গাঁয়ে ইলেকট্রিসিটি এখনও
গরহাজির, অরণ্যের ঘোর অন্ধকার
বিরাজমান এখানকার রাতগুলো। নিশীথের
তিমির রোদেলা দুপুরেও অনেকের মনের
ডোবায় ভাসমান, অথচ গাভীর ওলান
থেকে নিঃসৃত দুধের ধারার মতোই সারল্য ওদের।শহরে লালিত পালিত এই আমার সত্তায় পাড়াতলী গাঁয়ের
পূর্বপুরুষদের শোণিতধারা প্রবহমান
মেঘনার স্রোতের মত। বুঝি তাই সমাজের বহুমুখী নিপীড়ন,
নির্দয় শাসকদের সন্ত্রাস আমার ভেতর
মেঘনার উত্তাল তরঙ্গমালা হয়ে জেগে ওঠে প্রতিবাদ,
এগিয়ে চলার তেজ, প্রতিক্রিয়ার অনড় তট ভাঙার জেদ। (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tot-vangar-jed/
|
2114
|
মহাদেব সাহা
|
কবি ও কৃষ্ণচুড়া
|
প্রেমমূলক
|
চৈত্রে হয়তো ফোটেনি কৃষ্ণচুড়া
তাতে ক্ষতি নেই; তোমার ঠোঁটেই দেখি
এসেছে আবার কৃষ্ণচুড়ার ঋতু
তুমি আছে তাই অভাব বুঝিনি তার;
না হলে চৈত্রে কোথায়ইবা পাবো বলো
কৃষ্ণচুড়ার অযাচিত উপহার,
বর্ষায় সেই ফুটবে কদম ফুল
তোমার খোঁপায় চৈত্রেই আনাগোনা।
তাই সন্দেহে চোখ মেলে কেউ কেউ
তাকায় কোথায় ফুটেছে কৃষ্ণচুড়া,
কেউ খোঁজে এই নিরিবিলি ফুলদানি;
চৈত্রে কোথাও ফোটেনি কৃষ্ণচুড়া
কিন্তু ফুটেছে তোমার দুইটি ঠোঁটে,
কবির দুচোখ এড়াতে পারেনি, তাই
ধরা পড়ে গেছে কবিতার পংতিতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1369
|
28
|
অমিয় চক্রবর্তী
|
বড়োবাবুর কাছে নিবেদন
|
চিন্তামূলক
|
তালিকা প্রস্তুত
কী কী কেড়ে নিতে পারবে না-
হই না নির্বাসিত-কেরানি।
বাস্তুভিটে পৃথিবীটার সাধারণ অস্তিত্ব।
যার এক খন্ড এই ক্ষুদ্র চাকরের আমিত্ব।
যতদিন বাঁচি, ভোরের আকাশে চোখ জাগানো,
হাওয়া উঠলে হাওয়া মুখে লাগানো।
কুয়োর ঠান্ডা জল, গানের কান, বইয়ের দৃষ্টি
গ্রীষ্মের দুপুরে বৃষ্টি।
আপন জনকে ভালোবাসা,
বাংলার স্মৃতিদীর্ণ বাড়ি-ফেরার আশা।
তাড়াও সংসার, রাখলাম,
বুকে ঢাকলাম
জন্মজন্মান্তরের তৃপ্তি যার যোগ প্রাচীন গাছের ছায়ায়
তুলসী-মন্ডপে, নদীর পোড়ো দেউলে, আপন ভাষার কন্ঠের মায়ায়।
থার্ডক্লাসের ট্রেনে যেতে জানলায় চাওয়া,
ধানের মাড়াই, কলা গাছ, কুকুর, খিড়কি-পথ ঘাসে ছাওয়া।
মেঘ করেছে, দু-পাশে ডোবা, সবুজ পানার ডোবা,
সুন্দরফুল কচুরিপানার শঙ্কিত শোভা,
গঙ্গার ভরা জল; ছোটো নদী; গাঁয়ের নিমছায়াতীর-
হায়, এও তো ফেরা-ট্রেনের কথা।
শত শতাব্দীর
তরু বনশ্রী
নির্জন মনশ্রী :
তোমায় শোনাই, উপস্থিত ফর্দে আরো আছে-
দূর-সংসারে এলো কাছে
বাঁচবার সার্থকতা।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3775.html
|
2041
|
মল্লিকা সেনগুপ্ত
|
আপনি
|
মানবতাবাদী
|
ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল
দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গমবোনা শুরু
করেছিল
আর্যপুরুষের ক্ষেতে, যে লালন
করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে ?
আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক,
কে শ্রমিক নয়
নতুনযন্ত্রের যারা মাসমাইনের
কারিগর
শুধু তারা শ্রম করে !
শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল
সেই শ্রমিকগৃহিণী
প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে,
খাবার বানায়
হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয় !
আপনি বলুন মার্কস, শ্রম কাকে বলে !
গৃহশ্রমে মজুরী হয়না বলে মেয়েগুলি শুধু
ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে
আর কমরেড শুধু যার
হাতে কাস্তে হাতুড়ি !
আপনাকে মানায় না এই অবিচার
কখনো বিপ্লব হলে
পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য হবে
শ্রেণীহীন রাস্ট্রহীন আলোপৃথিবীর
সেই দেশে
আপনি বলুন মার্কস,
মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী
হবে ?
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%b8-mallika-sengupta/
|
3929
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সময়হারা
|
ছড়া
|
খবর এল , সময় আমার গেছে ,
আমার-গড়া পুতুল যারা বেচে
বর্তমানে এমনতরো পসারী নেই ;
সাবেক কালের দালানঘরের পিছন কোণেই
ক্রমে ক্রমে
উঠছে জমে জমে
আমার হাতের খেলনাগুলো ,
টানছে ধুলো ।
হাল আমলের ছাড়পত্রহীন
অকিঞ্চনটা লুকিয়ে কাটায় জোড়াতাড়ার দিন ।
ভাঙা দেয়াল ঢেকে একটা ছেঁড়া পর্দা টাঙাই ;
ইচ্ছে করে , পৌষমাসের হাওয়ার তোড়টা ভাঙাই ;
ঘুমোই যখন ফড়্ফড়িয়ে বেড়ায় সেটা উড়ে ,
নিতান্ত ভুতুড়ে ।
আধপেটা খাই শালুক-পোড়া ; একলা কঠিন ভুঁয়ে
চেটাই পেতে শুয়ে
ঘুম হারিয়ে ক্ষণে ক্ষণে
আউড়ে চলি শুধু আপন-মনে —
“ উড়কি ধানের মুড়কি দেব , বিন্নে ধানের খই ,
সরু ধানের চিঁড়ে দেব , কাগমারে দই । ”
আমার চেয়ে কম-ঘুমন্ত নিশাচরের দল
খোঁজ নিয়ে যায় ঘরে এসে , হায় সে কী নিষ্ফল ।
কখনো বা হিসেব ভুলে আগে মাতাল চোর ,
শূন্য ঘরের পানে চেয়ে বলে , “ সাঙাত মোর ,
আছে ঘরে ভদ্র ভাষায় বলে যাকে দাওয়াই ?”
নেই কিছু তো , দু-এক ছিলিম তামাক সেজে খাওয়াই ।
একটু যখন আসে ঘুমের ঘোর
সুড়সুড়ি দেয় আরসুলারা পায়ের তলায় মোর ।
দুপুরবেলায় বেকার থাকি অন্যমনা ;
গিরগিটি আর কাঠবিড়ালির আনাগোনা
সেই দালানের বাহির ঝোপে ;
থামের মাথায় খোপে খোপে
পায়রাগুলোর সারাটা দিন বকম্-বকম্ ।
আঙিনাটার ভাঙা পাঁচিল , ফাটলে তার রকম-রকম
লতাগুল্ম পড়ছে ঝুলে ,
হলদে সাদা বেগনি ফুলে
আকাশ-পানে দিচ্ছে উঁকি ।
ছাতিমগাছের মরা শাখা পড়ছে ঝুঁকি
শঙ্খমণির খালে ,
মাছরাঙারা দুপুরবেলায় তন্দ্রানিঝুম কালে
তাকিয়ে থাকে গভীর জলের রহস্যভেদরত
বিজ্ঞানীদের মতো ।
পানাপুকুর , ভাঙনধরা ঘাট ,
অফলা এক চালতাগাছের চলে ছায়ার নাট ।
চক্ষু বুজে ছবি দেখি — কাৎলা ভেসেছে ,
বড়ো সাহেবের বিবিগুলি নাইতে এসেছে ।
ঝাউগুঁড়িটার'পরে
কাঠঠোকরা ঠক্ঠকিয়ে কেবল প্রশ্ন করে ।
আগে কানে পৌঁছত না ঝিঁঝিঁপোকার ডাক ,
এখন যখন পোড়ো বাড়ি দাঁড়িয়ে হতবাক্
ঝিল্লিরবের তানপুরা-তান স্তব্ধতা-সংগীতে
লেগেই আছে একঘেয়ে সুর দিতে ।
আঁধার হতে না হতে সব শেয়াল ওঠে ডেকে
কল্মদিঘির ডাঙা পাড়ির থেকে ।
পেঁচার ডাকে বাঁশের বাগান হঠাৎ ভয়ে জাগে ,
তন্দ্রা ভেঙে বুকে চমক লাগে ।
বাদুড়-ঝোলা তেঁতুলগাছে মনে যে হয় সত্যি ,
দাড়িওয়ালা আছে ব্রহ্মদত্যি ।
রাতের বেলায় ডোমপাড়াতে কিসের কাজে
তাক্ধুমাধুম বাদ্যি বাজে ।
তখন ভাবি , একলা ব ' সে দাওয়ার কোণে
মনে-মনে ,
ঝড়েতে কাত জারুলগাছের ডালে ডালে
পির্ভু নাচে হাওয়ার তালে ।
শহর জুড়ে নামটা ছিল , যেদিন গেল ভাসি
হলুম বনগাঁবাসী ।
সময় আমার গেছে ব ' লেই সময় থাকে পড়ে ,
পুতুল গড়ার শূন্য বেলা কাটাই খেয়াল গ ' ড়ে ।
সজনেগাছে হঠাৎ দেখি কমলাপুলির টিয়ে —
গোধূলিতে সুয্যিমামার বিয়ে ;
মামি থাকেন , সোনার বরন ঘোমটাতে মুখ ঢাকা ,
আলতা পায়ে আঁকা ।
এইখানেতে ঘুঘুডাঙার খাঁটি খবর মেলে
কুলতলাতে গেলে ।
সময় আমার গেছে ব ' লেই জানার সুযোগ হল
‘ কলুদ ফুল ' যে কাকে বলে , ওই যে থোলো থোলো
আগাছা জঙ্গলে
সবুজ অন্ধকারে যেন রোদের টুক্রো জ্বলে ।
বেড়া আমার সব গিয়েছে টুটে ;
পরের গোরু যেখান থেকে যখন খুশি ছুটে
হাতার মধ্যে আসে ;
আর কিছু তো পায় না , খিদে মেটায় শুকনো ঘাসে ।
আগে ছিল সাট্ন্ বীজে বিলিতি মৌসুমি ,
এখন মরুভূমি ।
সাত পাড়াতে সাত কুলেতে নেইকো কোথাও কেউ
মনিব যেটার , সেই কুকুরটা কেবল ই ঘেউ-ঘেউ
লাগায় আমার দ্বারে ; আমি বোঝাই তারে কত ,
আমার ঘরে তাড়িয়ে দেবার মতো
ঘুম ছাড়া আর মিলবে না তো কিছু —
শুনে সে লেজ নাড়ে , সঙ্গে বেড়ায় পিছু পিছু ।
অনাদরের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে পিঠের ‘ পরে
জানিয়ে দিলে , লক্ষ্মীছাড়ার জীর্ণ ভিটের ‘ পরে
অধিকারের দলিল তাহার দেহেই বর্তমান ।
দুর্ভাগ্যের নতুন হাওয়া-বদল করার স্থান
এমনতরো মিলবে কোথায় । সময় গেছে তারই ,
সন্দেহ তার নেইকো একেবারেই ।
সময় আমার গিয়েছে , তাই গাঁয়ের ছাগল চরাই ;
রবিশস্যে ভরা ছিল , শূন্য এখন মরাই ।
খুদকুঁড়ো যা বাকি ছিল ইঁদুরগুলো ঢুকে
দিল কখন ফুঁকে ।
হাওয়ার ঠেলায় শব্দ করে আগলভাঙা দ্বার ,
সারাদিনে জনামাত্র নেইকো খরিদ্দার ।
কালের অলস চরণপাতে
ঘাস উঠেছে ঘরে আসার বাঁকা গলিটাতে ।
ওরই ধারে বটের তলায় নিয়ে চিঁড়ের থালা
চড়ুইপাখির জন্যে আমার খোলা অতিথশালা ।
সন্ধে নামে পাতাঝরা শিমূলগাছের আগায় ,
আধ-ঘুমে আধ-জাগায়
মন চলে যায় চিহ্নবিহীন পস্টারিটির পথে
স্বপ্নমনোরথে ;
কালপুরুষের সিংহদ্বারের ওপার থেকে
শুনি কে কয় আমায় ডেকে —
“ ওরে পুতুলওলা
তোর যে ঘরে যুগান্তরের দুয়ার আছে খোলা ,
সেথায় আগাম-বায়না-নেওয়া খেলনা যত আছে
লুকিয়ে ছিল গ্রহণ-লাগা ক্ষণিক কালের পাছে ;
আজ চেয়ে দেখ্ , দেখতে পাবি ,
মোদের দাবি
ছাপ-দেওয়া তার ভালে ।
পুরানো সে নতুন আলোয় জাগল নতুন কালে ।
সময় আছে কিংবা গেছে দেখার দৃষ্টি সেই
সবার চক্ষে নেই —
এই কথাটা মনে রেখে ওরে পুতুলওলা ,
আপন-সৃষ্টি-মাঝখানেতে থাকিস আপন-ভোলা ।
ওই যে বলিস , বিছানা তোর ভুঁয়ে চেটাই পাতা ,
ছেঁড়া মলিন কাঁথা —
ওই যে বলিস , জোটে কেবল সিদ্ধ কচুর পথ্যি —
এটা নেহাত স্বপ্ন কি নয় , এ কি নিছক সত্যি ।
পাস নি খবর , বাহান্ন জন কাহার
পাল্কি আনে — শব্দ কি পাস তাহার ।
বাঘনাপাড়া পেরিয়ে এল ধেয়ে ,
সখীর সঙ্গে আসছে রাজার মেয়ে ।
খেলা যে তার বন্ধ আছে তোমার খেলনা বিনে ,
এবার নেবে কিনে ।
কী জানি বা ভাগ্যি তোমার ভালো ,
বাসরঘরে নতুন প্রদীপ জ্বালো ;
নবযুগের রাজকন্যা আধেক রাজ্যসুদ্ধ
যদি মেলে , তা নিয়ে কেউ বাধায় যদি যুদ্ধ ,
ব্যাপারখানা উচ্চতলায় ইতিহাসের ধাপে
উঠে পড়বে মহাকাব্যের মাপে ।
বয়স নিয়ে পণ্ডিত কেউ তর্ক যদি করে
বলবে তাকে , একটা যুগের পরে
চিরকালের বয়স আসে সকল-পাঁজি-ছাড়া
যমকে লাগায় তাড়া । ” এতক্ষণ যা বকা গেল এটা প্রলাপমাত্র —
নবীন বিচারপতি ওগো , আমি ক্ষমার পাত্র ;
পেরিয়ে মেয়াদ বাঁচে তবু যে-সব সময়হারা
স্বপ্নে ছাড়া সান্ত্বনা আর কোথায় পাবে তারা ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sumayhara/
|
5482
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
দেয়ালিকা
|
মানবতাবাদী
|
এক
দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে
লিখি কথা।
আমি যে বেকার, পেয়েছি লেখার
স্বাধীনতা।দুই
সকালে বিকালে মনের খেয়ালে
ইঁদারায়
দাঁড়িয়ে থাকলে অর্থটা তার
কি দাঁড়ায়?তিন
কখন বাজল ছ’টা
প্রাসাদে প্রাসাদে ঝলসায় দেখি
শেষ সূর্যের ছটা –
স্তিমিত দিনের উদ্ধত ঘনঘটা।চার
বেজে চলে রেডিও
সর্বদা গোলমাল করতেই
‘রেডি’ ও।পাঁচ
জাপানী গো জাপানী
ভারতবর্ষে আসতে কি শেষ
ধরে গেল হাঁপানী?ছয়
জার্মানী গো জার্মানী
তুমি ছিলে অজেয় বীর
এ কথা আজ আর মানি!সাত
হে রাজকন্যে
তোমার জন্যে
এ জনারণ্যে
নেইকো ঠাঁই-
জানাই তাই।আট
আঁধিয়ারে কেঁদে কয় সল্তেঃ
‘চাইনে চাইনে আমি জ্বলতে।’ (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/deyalika/
|
3217
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দিয়েছ প্রশ্রয় মোরে, করুণানিলয়
|
সনেট
|
দিয়েছ প্রশ্রয় মোরে, করুণানিলয়,
হে প্রভু, প্রত্যহ মোরে দিয়েছ প্রশ্রয়।
ফিরেছি আপন-মনে আলসে লালসে
বিলাসে আবেশে ভেসে প্রবৃত্তির বশে
নানা পথে, নানা ব্যর্থ কাজে– তুমি তবু
তখনো যে সাথে সাথে ছিলে মোর প্রভু,
আজ তাহা জানি। যে অলস চিন্তা-লতা
প্রচুরপল্লবাকীর্ণ ঘন জটিলতা
হৃদয়ে বেষ্টিয়া ছিল, তারি শাখাজালে
তোমার চিন্তার ফুল আপনি ফুটালে
নিগূঢ় শিকড়ে তার বিন্দু বিন্দু সুধা
গোপনে সিঞ্চন করি। দিয়ে তৃষ্ণা-ক্ষুধা,
দিয়ে দণ্ড-পুরস্কার সুখ-দুঃখ-ভয়
নিয়ত টানিয়া কাছে দিয়েছ প্রশ্রয়। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/diecho-proshroy-more-korunaniloy/
|
3815
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রাজা ও রানী
|
ছড়া
|
এক যে ছিল রাজা
সেদিন আমায় দিল সাজা ।
ভোরের রাতে উঠে
আমি গিয়েছিলুম ছুটে ,
দেখতে ডালিম গাছে
বনের পিরভু কেমন নাচে ।
ডালে ছিলেম চড়ে ,
সেটা ভেঙেই গেল পড়ে ।
সেদিন হল মানা
আমার পেয়ারা পেড়ে আনা ,
রথ দেখতে যাওয়া ,
আমার চিঁড়ের পুলি খাওয়া ।
কে দিল সেই সাজা ,
জান কে ছিল সেই রাজা ?
এক যে ছিল রানী
আমি তার কথা সব মানি ।
সাজার খবর পেয়ে
আমায় দেখল কেবল চেয়ে ।
বললে না তো কিছু ,
কেবল মুখটি করে নিচু
আপন ঘরে গিয়ে
সেদিন রইল আগল দিয়ে ।
হল না তার খাওয়া ,
কিংবা রথ দেখতে যাওয়া ।
নিল আমায় কোলে
সাজার সময় সারা হলে ।
গলা ভাঙা - ভাঙা
তার চোখ - দুখানি রাঙা ।
কে ছিল সেই রানী
আমি জানি জানি জানি । (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/raja-o-rani/
|
130
|
আল মাহমুদ
|
নোলক
|
স্বদেশমূলক
|
আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
-হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।
বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে
শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছড়িয়ে থাকে।
জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক
সবুজ বনের হরিৎ টিয়ে করে রে ঝিকমিক।
বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই,
আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে যেতে চাই।
কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন
আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ।
সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি নাতো!
ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো
বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক
হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।
এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা
আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3711.html
|
5762
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
গুহাবাসী
|
প্রেমমূলক
|
-চলে যাবে? সময় হয়েছে বুঝি?
-সময় হয়নি, তাই চলে যাওয়া ভালো
-এসো না এখনো এই গুহার ভিতরে খুঁজি
পড়ে আছে কিনা কোনো চুপচাপ আলো
-অথবা দু‘জনে চলো বাইরে যাই?
-আমার এ নির্বাসন-দণ্ড আজ শেষ হবে?
ওসব হেঁয়ালি আমি বুঝি না, তোমাকেসবার
মধ্যে চাই
-বহূদিন জনারণ্যে কাটিয়েছি, উৎসবে-পরবে
পিঁপড়ের মতো আমি খুঁটেখুঁটে জমিয়েছি সুখ
উপভোগ
একদিন স্বচ্ছ এক হ্রদে দেখি আকস্মাৎ কার দীর্ঘছায়া
খুব কাছে
এদিকে ওদিকে চাই, কেউ নেই,
তবে কি আমারই মনোরোগ?
বস্তুর সৃষ্টির মধ্যে কাল-ঋণী ছায়া পড়ে আছে।
অন্ধকারে ছায়া নেই, তাই আমি গুহার আাঁধারে
-আমাকে ডেকেছো কেন এই অবেলায়?
-ভেবেছি হয়তো ভুল, নরীর সুষমা বুঝি পারে
ভেঙে দিতে আলস্যের শীত, যদি স্পর্শের খেলায়
মুহূর্তে বিমূর্তে হয়, যদি চোখ….
-তবে তাই হোক, তবে তাই হোক
ভুল ভাঙা শুরু হতে দেরি করা ঠিক নয়
বিশেষত অন্ধকারে
-অন্ধকারে ফুল হলে ফুটে ওঠে নিষিদ্ধ লঘু লোভ
শৈশবের সব দুঃখ যে রকম ফিরে পেতেচাই
বার-বার
তুমিও দুঃখেরই মতো বড় প্রিয়, এই ওষ্ঠ বুক
-ওসব জানি না, দুঃখ বিংবা ছায়াটায়া এখণ থাকুক
ভুল ভাঙবার নামে আরও কিছু
ভুলকরা
এমন মধুর খেলা আর নেই
-তা হলে এবার বুঝলে,
গুহাটিকে মায়া বলে
উড়িয়ে দেওয়াটা হলো
এ জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ
ভুল!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1811
|
5958
|
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
|
নৌকা
|
প্রেমমূলক
|
কে যেন আজ ডাকল তোমায় অন্ধকারে
জলের অতীত স্পর্শ কি আর সবাই পারে?রূপকথাটির দৈত্য ছিল বক্ষ জুড়ে
এক পৃথিবী যেমন করে সূর্য ঘুরেআমার থেকে পৌঁছতে চায় তোমার কাছে
বুঝতে পারে অন্য কোথাও অর্থ আছেএই আলো এই অন্ধকারের বাইরে কোথাও
আমায় তুমি কোটর থেকে বের করে নাওগাছের আঙুল সাজিয়ে তোলো ফুলের ফোঁটায়
যেমন করে একলা পাখি সূর্য ওঠায়ঠিক সেভাবে আমার বুকের দৈত্য মারো
সারিয়ে তোলো বাজ পোড়া এই অন্ধকারওঋণ নিয়ে এই ভোরবেলাকার পত্রটুকুর
সহজ জলে উপছে ওঠে আমার পুকুরনৌকা চলে তার শরীরে আপন মনে…আমার সবই তোমার হল এই শ্রাবণে
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a7%8c%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%8e-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%80/
|
14
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
ওকে
|
মানবতাবাদী
|
ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!চরায়-বড়ায় খই ফুটেছে তপ্ত খোলা
পাথর মাটি পাথর,
গোয়ালে গাই বিইয়েছে
তার দুধ বাঁটে নেই এক পো,
পুকুর-নদীর জল শুকিয়ে বাষ্প,
কোলে কলসি, কাঁখে কলসি কাতার কাতার
ছা বৌ জোয়ান মদ্দ ভাতারচলছে চলছে—
এক মূকাভিনয়
তার খেজুরের মাথার ওপর খাঁড়ার মতো দাঁড়িয়ে দ্যাখে
অলপ্পেয়ে সময়।ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!লে লে ছে আনা লে যা লিবি ছে আনা
আমি রাজার ভাতিজা—এসেছি সদর থেকে
গাঁও বুড়ো থেকে ঘরের ঝিয়ারি,
বাল-বাচ্চাও শুধোয়—
তুমি কোঁচড়ো এনেছো কি ?
এনেছি—এনেছি প্রতিশ্রুতি।
আমি এনেছি টি আর, জি আর
সেচ প্রকল্প, সার, গোরু,
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।
এই আমিন, এদিকে এসো,
ওরা যা বলে, সবটা টোকো
খুব ভালো করে মাপো-জোকো
যত দাবি আছে মোটা সরু—
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।হাড়ের ওপর মাই কামড়ে
টিংটিঙে প্যাকাটি—
ফটো খিঁচুন প্রেস,
মজা পুকুরে পেট ফুলো ঢোল
শ্যামলী ধবলী—
ফটো খিঁচুন প্রেস.
এমন মাটি মায়ের আঁচল
এখন গর্ত-খোদল-ফাটল,
ছাতিফাটার মাঠ
হা হা খিদে দিচ্ছে ঝাঁট,
মুখে মুখোশ এঁটে নিস,
হিস্ হিস্ হিস্ হিস্
জমি-জিরেত জ্বালিয়ে
ধা ধা কালকেউটের বিষ।
হট্ যা হট্ টিয়ে টা
এই সিরিঙ্গী মেয়েটাওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!চরায়-বড়ায় খই ফুটেছে তপ্ত খোলা
পাথর মাটি পাথর,
গোয়ালে গাই বিইয়েছে
তার দুধ বাঁটে নেই এক পো,
পুকুর-নদীর জল শুকিয়ে বাষ্প,
কোলে কলসি, কাঁখে কলসি কাতার কাতার
ছা বৌ জোয়ান মদ্দ ভাতারচলছে চলছে—
এক মূকাভিনয়
তার খেজুরের মাথার ওপর খাঁড়ার মতো দাঁড়িয়ে দ্যাখে
অলপ্পেয়ে সময়।ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!লে লে ছে আনা লে যা লিবি ছে আনা
আমি রাজার ভাতিজা—এসেছি সদর থেকে
গাঁও বুড়ো থেকে ঘরের ঝিয়ারি,
বাল-বাচ্চাও শুধোয়—
তুমি কোঁচড়ো এনেছো কি ?
এনেছি—এনেছি প্রতিশ্রুতি।
আমি এনেছি টি আর, জি আর
সেচ প্রকল্প, সার, গোরু,
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।
এই আমিন, এদিকে এসো,
ওরা যা বলে, সবটা টোকো
খুব ভালো করে মাপো-জোকো
যত দাবি আছে মোটা সরু—
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।হাড়ের ওপর মাই কামড়ে
টিংটিঙে প্যাকাটি—
ফটো খিঁচুন প্রেস,
মজা পুকুরে পেট ফুলো ঢোল
শ্যামলী ধবলী—
ফটো খিঁচুন প্রেস.
এমন মাটি মায়ের আঁচল
এখন গর্ত-খোদল-ফাটল,
ছাতিফাটার মাঠ
হা হা খিদে দিচ্ছে ঝাঁট,
মুখে মুখোশ এঁটে নিস,
হিস্ হিস্ হিস্ হিস্
জমি-জিরেত জ্বালিয়ে
ধা ধা কালকেউটের বিষ।
হট্ যা হট্ টিয়ে টা
এই সিরিঙ্গী মেয়েটাওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%93%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%9b%e0%a7%81%e0%a6%81%e0%a7%9f%e0%a7%8b-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%9b%e0%a7%81%e0%a6%81%e0%a7%9f%e0%a7%8b-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%9b%e0%a6%bf%e0%a6%83-amitava-dashgu/
|
5197
|
শামসুর রাহমান
|
লালনের গান
|
চিন্তামূলক
|
যখন তোমার বাহুর বাসরে
মগ্ন ছিলাম চন্দ্রিত চন্দ্রায়,
আলো-আঁধারির চকিত সীমায়,
লালনের গান দূর হতে এলো ভেসে।
সে গানের ধ্বনি স্তব্ধ সায়রে
ফোটায় নিবিড় অজস্র শতদল।
ধুলোয় উধাও সে গানের কলি
গ্রামছাড়া পথে মনের মানুষ খোঁজে।শৈশব-গাঁথা জামতলা আর
কনক দুপুরে শ্রাবণ দিঘির ডুব,
ঘোরলাগা ভোর, অভিজ্ঞ সাঁঝ-
সবি আছে বুঝি স্মৃতির অভ্রে ডুবে।কে আসে ঘাসের স্তব্ধ সবুজে
নীরবে নগ্ন শুভ্র চরণ ফেলে?
সে-যে সেই গান স্পন্দনে যার
আঁধারেও চির মনের মুকুল জ্বলে।অবচেতনার গহন ধারায়
তারাময় মনে জাগে স্বপ্নের পলি।
একটি চাঁপার বিন্দুতে মেশে
সব দ্বন্দ্বের ঘূর্ণিত অবসান।সে গানের সুর জীবনে ঝরায়
জুঁই-চামেলির অরূপ সুরভি আজও
অস্তরাগের ধ্যানী বাসনায়
জ্বলে ওঠে ক্কীণ দীপ্ত চন্দ্রকলা।কাল মন্থনে চেতনায় জাগে
অতীতের দ্বীপ, স্মৃতির প্রবালে লাল।
বর্তমানের মুক্ত আধারে
ভবিষ্যতের দীপাবলি ওঠে ভেসে।সে-গানের ধ্বনি ফিরে ফিরে আসে
মর্ত্যজীবীর রঙিন ধুলোর পথে-
তারই মাধুর্যে ঋতুতে ঋতুতে
রৌদ্রছায়ায় শান্ত বাগানে বাঁচি।সে-গান আমার বৈশাখী দিনে
যাত্রী-প্রাণের তৃষ্ণার সরোবর।
তারই টানে চলি বাকাচোরা পথে-
লালনের গান স্মৃতির দোসর সে-যে। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/laloner-gan/
|
1526
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
হাসানের
|
সনেট
|
প্রেমিকারা নয়, নাম ধরে যারা ডাকে তারা ঝিঁঝি,
তাদের যৎসামান্য পরিচয় জানা থাকা ভালো;
বলতেই মৃত্তিকারা বক্ষ চিরে তোমাকে দেখালো–;
অভ্যন্তরে কী ব্যাকুল তুমি পড়ো ডুয়িনো এলিজি ।
কবরে কী করে লেখো? মাটি কি কাগজ? খাতা?
ভালোবেসে উস্কে দিই প্রাণের পিদিম, এই নাও,
অনন্ত নক্ষত্র তুমি, অন্ধকারে আমাকে সাজাও
ফের মাতৃগর্ভে, বলো দেবদূত প্রেমিকা কি মাতা?
এইসব ঝিঁঝি পোকা, এরা কি ঈশ্বর নাকি পাখি,
উদ্বাস্তু উন্মুল মোক্ষ, যৌবনের, কোন পাত্রে রাখি?পাপে-পুণ্যে এ পৃথিবী, এই প্রাণ তারচে অধিকে ।
আমি আছি, তুমি নেই–,এইভাবে দু’জন দু’দিকে
অপসৃত; -তাই তো নশ্বর নারী কবির বিশ্বাসে,
ভালোবেসে যাকে ছুঁই, সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে…।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d/
|
2366
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মলয় মারুত
|
ভক্তিমূলক
|
(১) শুনেছি মলয় গিরি তোমার আলয়—
মলয় পবন!
বিহঙ্গিনীগণ তথা গায়ে বিদ্যাধরী যথা,
সঙ্গীত সুধায় পূরে নন্দনকানন; কুসুমকুলকামিনী, কোমলা কমলা জিনি,
সেবে তোমা, রতি যথা সেবেন মদন!(২) হায়, কেনে ব্রজে আজি ভ্ৰমিছ হে তুমি—
মন্দ সমীরণ?
যাও সরসীর কোলে, দোলাও মৃদু হিল্লোলে
সুপ্রফুল্ল নলিনীরে—প্রেমানন্দ মন!
ব্ৰজ-প্রভাকর যিনি ব্ৰজ আজি ত্যজি তিনি,
বিরাজেন অস্তাচলে—নন্দের নন্দন!(৩) সৌরভ রতন দানে তুষিবে তোমারে
আদরে নলিনী;
তব তুল্য উপহার কি আজি আছে রাধার?
নয়ন আসারে, দেব, ভাসে সে দুঃখিনী!
যাও যথা পিকবধূ— বরিষে সঙ্গীত-মধু,—
এ নিকুঞ্জে কাঁদে আজি রাধা বিরহিণী।(৪) তবে যদি, সুভগ, এ অভাগীর দুঃখে
দুঃখী তুমি মনে,
যাও আশু, আশুগতি, যথা ব্ৰজকুলপতি—
যাও যথা পাবে, দেব, ব্রজের রতনে!
রাখার রোদনধ্বনি বহ যথা শ্যামমণি—
কহ তাঁরে মরে রাধা শ্যামের বিহনে!(৫) যাও চলি, মহাবলি, যথা বনমালী–
রাধিকা-বাসন;
তুঙ্গ শৃঙ্গ দুষ্টমতি, রোধে যদি তব গতি,
মোর অনুরোধে তারে ভেঙো, প্রভঞ্জন!
তরুরাজ যুদ্ধ আশে, তোমারে যদি সম্ভাষে--
ব্রজাঘাতে যেও তায় করিয়া দলন!(৬) দেখি তোমা পীরিতের ফাঁদ পাতে যদি
নদী রূপবতী;
মজো না বিভ্রমে তার, তুমি হে দূত রাধার,
হেরো না, হেরো না দেব কুসুম যুবতী!
কিনিতে তোমার মন, দিবে সে সৌরভধন,
অবহেলি সে ছলনা, যেয়ো আশুগতি!(৭) শিশিরের নীরে ভাবি অশ্রুবারিধারা,
ভুলো না, পবন!
কোকিলা শাখা উপরে, ডাকে যদি পঞ্চস্বরে,
মোর কিরে---শীঘ্র করে ছেড়ো সে কানন!
স্মরি রাধিকার দুঃখ, হইও সুখে বিমুখ—
মহৎ যে পরদুঃখে দুঃখী সে সুজন!(৮) উতরিবে যবে যথা রাধিকারমণ,
মোর দূত হয়ে,
কহিও গোকুল কাঁদে হারাইয়া শ্যামচাঁদে---
রাধার রোদনধ্বনি দিও তাঁরে লয়ে;
আর কথা আমি নারী শরমে কহিতে নারি,---
মধু কহে, ব্রজাঙ্গনে, আমি দিব কয়ে।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/moloy-marut/
|
3053
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চৈত্রের সেতারে বাজে
|
প্রকৃতিমূলক
|
চৈত্রের সেতারে বাজে
বসন্তবাহার,
বাতাসে বাতাসে উঠে
তরঙ্গ তাহার। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/choitrer-setare-baje/
|
4006
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্বর্গ হইতে বিদায়
|
চিন্তামূলক
|
ম্লান হয়ে এল কণ্ঠে মন্দারমালিকা,
হে মহেন্দ্র, নির্বাপিত জ্যোতির্ময় টিকা
মলিন ললাটে। পুণ্যবল হল ক্ষীণ,
আজি মোর স্বর্গ হতে বিদায়ের দিন,
হে দেব, হে দেবীগণ। বর্ষ লক্ষশত
যাপন করেছি হর্ষে দেবতার মতো
দেবলোকে। আজি শেষ বিচ্ছেদের ক্ষণে
লেশমাত্র অশ্রুরেখা স্বর্গের নয়নে
দেখে যাব এই আশা ছিল। শোকহীন
হৃদিহীন সুখস্বর্গভূমি, উদাসীন
চেয়ে আছে। লক্ষ লক্ষ বর্ষ তার
চক্ষের পলক নহে; অশ্বত্থশাখার
প্রান্ত হতে খসি গেলে জীর্ণতম পাতা
যতটুকু বাজে তার, ততটুকু ব্যথা
স্বর্গে নাহি লাগে, যবে মোরা শত শত
গৃহচ্যুত হতজ্যোতি নক্ষত্রের মতো
মুহূর্তে খসিয়া পড়ি দেবলোক হতে
ধরিত্রীর অন্তহীন জন্মমৃত্যুস্রোতে।
সে বেদনা বাজিত যদ্যপি, বিরহের
ছায়ারেখা দিত দেখা, তবে স্বরগের
চিরজ্যোতি ম্লান হত মর্তের মতন
কোমল শিশিরবাষ্পে-- নন্দনকানন
মর্মরিয়া উঠিত নিশ্বসি, মন্দাকিনী
কূলে কূলে গেয়ে যেত করুণ কাহিনী
কলকণ্ঠে, সন্ধ্যা আসি দিবা-অবসানে
নির্জন প্রান্তর-পারে দিগন্তের পানে
চলে যেত উদাসিনী, নিস্তব্ধ নিশীথ
ঝিল্লিমন্ত্রে শুনাইত বৈরাগ্যসংগীত
নক্ষত্রসভায়। মাঝে মাঝে সুরপুরে
নৃত্যপরা মেনকার কনকনূপুরে
তালভঙ্গ হত। হেলি উর্বশীর স্তনে
স্বর্ণবীণা থেকে থেকে যেন অন্যমনে
অকস্মাৎ ঝংকারিত কঠিন পীড়নে
নিদারুণ করুণ মূর্ছনা। দিত দেখা
দেবতার অশ্রুহীন চোখে জলরেখা
নিষ্কারণে। পতিপাশে বসি একাসনে
সহসা চাহিত শচী ইন্দ্রের নয়নে
যেন খুঁজি পিপাসার বারি। ধরা হতে
মাঝে মাঝে উচ্ছ্বসি আসিত বায়ুস্রোতে
ধরণীর সুদীর্ঘ নিশ্বাস-- খসি ঝরি
পড়িত নন্দনবনে কুসুমমঞ্জরী।
থাকো স্বর্গ হাস্যমুখে, করো সুধাপান
দেবগণ। স্বর্গ তোমাদেরি সুখস্থান--
মোরা পরবাসী। মর্তভূমি স্বর্গ নহে,
সে যে মাতৃভূমি-- তাই তার চক্ষে বহে
অশ্রুজলধারা, যদি দু দিনের পরে
কেহ তারে ছেড়ে যায় দু দণ্ডের তরে।
যত ক্ষুদ্র, যত ক্ষীণ, যত অভাজন,
যত পাপীতাপী, মেলি ব্যগ্র আলিঙ্গন
সবারে কোমল বক্ষে বাঁধিবারে চায়--
ধূলিমাখা তনুস্পর্শে হৃদয় জুড়ায়
জননীর। স্বর্গে তব বহুক অমৃত,
মর্তে থাক্ সুখে দুঃখে অনন্তমিশ্রিত
প্রেমধারা-- অশ্রুজলে চিরশ্যাম করি
ভূতলের স্বর্গখণ্ডগুলি। হে অপ্সরী,
তোমার নয়নজ্যোতি প্রেমবেদনায়
কভু না হউক ম্লান-- লইনু বিদায়।
তুমি কারে কর না প্রার্থনা, কারো তরে
নাহি শোক। ধরাতলে দীনতম ঘরে
যদি জন্মে প্রেয়সী আমার, নদীতীরে
কোনো-এক গ্রামপ্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটিরে
অশ্বত্থছায়ায়, সে বালিকা বক্ষে তার
রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভাণ্ডার
আমারি লাগিয়া সযতনে। শিশুকালে
নদীকূলে শিবমূর্তি গড়িয়া সকালে
আমারে মাগিয়া লবে বর। সন্ধ্যা হলে
জ্বলন্ত প্রদীপখানি ভাসাইয়া জলে
শঙ্কিত কম্পিত বক্ষে চাহি একমনা
করিবে সে আপনার সৌভাগ্যগণনা
একাকী দাঁড়ায়ে ঘাটে। একদা সুক্ষণে
আসিবে আমার ঘরে সন্নত নয়নে
চন্দনচর্চিত ভালে রক্তপট্টাম্বরে,
উৎসবের বাঁশরীসংগীতে। তার পরে
সুদিনে দুর্দিনে, কল্যাণকঙ্কণ করে,
সীমন্তসীমায় মঙ্গলসিন্দূরবিন্দু,
গৃহলক্ষ্মী দুঃখে সুখে, পূর্ণিমার ইন্দু
সংসারের সমুদ্রশিয়রে। দেবগণ,
মাঝে মাঝে এই স্বর্গ হইবে স্মরণ
দূরস্বপ্নসম, যবে কোনো অর্ধরাতে
সহসা হেরিব জাগি নির্মল শয্যাতে
পড়েছে চন্দ্রের আলো, নিদ্রিতা প্রেয়সী
লুণ্ঠিত শিথিল বাহু, পড়িয়াছে খসি
গ্রন্থি শরমের-- মৃদু সোহাগচুম্বনে
সচকিতে জাগি উঠি গাঢ় আলিঙ্গনে
লতাইবে বক্ষে মোর-- দক্ষিণ অনিল
আনিবে ফুলের গন্ধ, জাগ্রত কোকিল
গাহিবে সুদূর শাখে। অয়ি দীনহীনা,
অশ্রু-আঁখি দুঃখাতুর জননী মলিনা,
অয়ি মর্ত্যভূমি। আজি বহুদিন পরে
কাঁদিয়া উঠেছে মোর চিত্ত তোর তরে।
যেমনি বিদায়দুঃখে শুষ্ক দুই চোখ
অশ্রুতে পুরিল, অমনি এ স্বর্গলোক
অলস কল্পনাপ্রায় কোথায় মিলালো
ছায়াচ্ছবি। তব নীলাকাশ, তব আলো,
তব জনপূর্ণ লোকালয়, সিন্ধুতীরে
সুদীর্ঘ বালুকাতট, নীল গিরিশিরে
শুভ্র হিমরেখা, তরুশ্রেণীর মাঝারে
নিঃশব্দ অরুণোদয়, শূন্য নদীপারে
অবনতমুখী সন্ধ্যা-- বিন্দু-অশ্রুজলে
যত প্রতিবিম্ব যেন দর্পণের তলে
পড়েছে অসিয়া। হে জননী পুত্রহারা,
শেষ বিচ্ছেদের দিনে যে শোকাশ্রুধারা
চক্ষু হতে ঝরি পড়ি তব মাতৃস্তন
করেছিল অভিষিক্ত, আজি এতক্ষণ
সে অশ্রু শুকায়ে গেছে। তবু জানি মনে
যখনি ফিরিব পুন তব নিকেতনে
তখনি দুখানি বাহু ধরিবে আমায়,
বাজিবে মঙ্গলশঙ্খ, স্নেহের ছায়ায়
দুঃখে-সুখে-ভয়ে-ভরা প্রেমের সংসারে
তব গেহে, তব পুত্রকন্যার মাঝারে
আমারে লইবে চিরপরিচিতসম--
তার পরদিন হতে শিয়রেতে মম
সারাক্ষণ জাগি রবে কম্পমান প্রাণে,
শঙ্কিত অন্তরে, ঊর্ধ্বে দেবতার পানে
মেলিয়া করুণ দৃষ্টি, চিন্তিত সদাই
যাহারে পেয়েছি তারে কখন হারাই।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20150129112229/
|
2341
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
পুরুলিয়া
|
সনেট
|
পাষাণময় যে দেশ, সে দেশে পড়িলে
বীজকুল, শস্য তথা কখন কি ফলে?
কিন্তু কত মনানন্দ তুমি মোরে দিলে,
হে পুরুল্যে!দেখাইয়া ভকত-মণ্ডলে!
শ্ৰীভ্রষ্ট সরস সম, হায়, তুমি ছিলে,
অজ্ঞান-তিমিরাচ্ছন্ন এ দূর জঙ্গলে;
অজ্ঞান-তিমিরাচ্ছন্ন এ দূর জঙ্গলে;
এবে রাশি রাশি পদ্ম ফোটে তব জলে,
পরিমল-ধনে ধনী করিয়া অনিলে!
প্রভুর কি অনুগ্রহ! দেখ ভাবি মনে,
(কত ভাগ্যবান্ তুমি কব তা কাহারে?)
রাজাসন দিলা তিনি ভূপতিত জনে!
উজলিলা মুখ তব বঙ্গের সংসারে;
বাড়ুক সৌভাগ্য তব এ প্রার্থনা করি,
ভাসুক সত্যতা-স্রোতে নিত্য তব তরি।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/puruliya/
|
375
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পথের দিশা
|
মানবতাবাদী
|
চারিদিকে এই গুণ্ডা এবং বদমায়েসির আখ্ড়া দিয়ে
রে অগ্রদূত, চ’লতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?
পারবি যেতে ভেদ ক’রে এই বক্র-পথের চক্রব্যুহ?
উঠবি কি তুই পাষাণ ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ?
আজকে প্রাণের গো-ভাগাড়ে উড়ছে শুধু চিল-শকুনি,
এর মাঝে তুই আলোকে-শিশু কোন্ অভিযান ক’রবি, শুনি?
ছুঁড়ছে পাথর, ছিটায় কাদা, কদর্যের এই হোরি-খেলায়
শুভ্র মুখে মাখিয়ে কালি ভোজপুরীদের হট্ট-মেলায়
বাঙলা দেশও মাত্ল কি রে? তপস্যা তার ভুললো অরুণ?
তাড়িখানার চীৎকারে কি নাম্ল ধুলায় ইন্দ্র বরুণ?
ব্যগ্র-পরান অগ্রপথিক,কোন্ বাণী তোর শুনাতে সাধ?
মন্ত্র কি তোর শুন্তে দেবে নিন্দাবাদীর ঢক্কা-নিনাদ?
নর-নারী আজ কন্ঠ ছেড়ে কুৎসা-গানের কোরাস্ ধ’রে
ভাবছে তা’রা সুন্দরেরই জয়ধ্বনি ক’রছে জোরে?
এর মাঝে কি খবর পেলি নব-বিপ্লব-ঘোড়সাওয়ারী
আসছে কেহ? টুট্ল তিমির, খুল্ল দুয়ার পুব-দয়ারী?
ভগবান আজ ভূত হ’ল যে প’ড়ে দশ-চক্র ফেরে,
যবন এবং কাফের মিলে হায় বেচারায় ফিরছে তেড়ে!
বাঁচাতে তায় আসছে কি রে নতুন যুগের মানুষ কেহ?
ধুলায় মলিন, রিক্তাভরণ, সিক্ত আঁখি, রক্ত দেহ?
মসজিদ আর মন্দির ঐ শয়তানদের মন্ত্রণাগার,
রে অগ্রদূত, ভাঙতে এবার আসছে কি জাঠ কালাপাহাড়?
জানিস যদি, খবর শোনা বন্ধ খাঁচার ঘেরাটোপে,
উড়ছে আজো ধর্ম-ধ্বজা টিকির গিঁঠে দাড়ির ঝোপে!
নিন্দাবাদের বৃন্দাবনে ভেবেছিলাম গাইব না গান,
থাকতে নারি দেখে শুনে সুন্দরের এই হীন অপমান।
ক্রুদ্ধ রোষে রুদ্ধ ব্যথায় ফোঁপায় প্রাণে ক্ষুদ্ধ বাণী,
মাতালদের ঐ ভাঁটিশালায় নটিনী আজ বীণাপাণি!
জাতির পারণ-সিন্ধু মথি’ স্বার্থ-লোভী পিশাচ যারা
সুধার পাত্র লক্ষ্মীলাভের ক’রতেছে ভাগ-বাঁটোয়ারা,
বিষ যখন আজ উঠল শেষে তখন কারুর পাইনে দিশা,
বিষের জ্বালায় বিশ্ব পুড়ে, স্বর্গে তাঁরা মেটান তৃষা!
শ্মাশন-শবের ছাইয়ের গাদায় আজকে রে তাই বেড়াই খুঁজে,
ভাঙন-দেব আজ ভাঙের নেশায় কোথায় আছে চক্ষু বুঁজে!
রে অগ্রদূত, তরুণ মনের গহন বনের রে সন্ধানী,
আনিস্ খবর, কোথায় আমার যুগান্তরের খড়্পপাণি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/541
|
4417
|
শামসুর রাহমান
|
ইতিহাস মিথ্যার কুহক ছিঁড়ে
|
মানবতাবাদী
|
ভোরবেলা ঘুমছেঁড়া চোখে দেখি, এ কী
ঘোর অমাবস্যা-রাত, হায়,
আমার শহরটিকে রেখেছে গ্রেপ্তার ক’রে। তবে কি সকালে
আজ এই নিঝুম দিবসে সূর্য আর
দেখাবে না মুখ? প্রকৃতির বুক জুড়ে
মহররমের নিস্তব্ধ মাতম মাথা কোটে সর্বক্ষণ।নেই, তিনি নেই, আর রাজধানী, শ্যামল পাড়াগাঁ,
মফস্বলে; জগতের কোথাও পাবে না
কেউ খুঁজে তাঁকে, যে পুরুষ
ছিলেন আকাশ-ছোঁয়া দীপ্ত অস্তিত্বের
অধিকারী। বাংলার কতিপয় শক্র তাঁর প্রাণ
করেছে হরণ তস্করের
ধরনের বিপথামী অস্ত্রধারী কুটিল আন্ধার। বুঝি তাই
অন্ধকার চতুর্দিকে বিষধর অজগর রূপে প্রতিষ্ঠিত!এই যে কখনও স্বদেশের গাছপালা, নদীনালা,
পথ ঘাট, ষড়ঋতু বুক চাপড়ায়,
অশ্রুপাত করে তাঁরই জন্যে আজও, হয়তো অনেকে
বোঝে না, পায় না টের। কেউ কেউ পায়।
তিনি তো প্রশস্ত বুকে তাঁর প্রিয় বাংলাকে ধারণ
করেছেন আমৃত্যু, সেবায় তার ছিলেন সর্বদা ব্রতী, যেমন বাগান
গড়ে তোলে রোদে পুড়ে বৃষ্টি ধারায় প্রায়শ স্নাত
হয়ে নিবেদিতপ্রাণ বাগবান। তারই কী আশ্চর্য প্রতিদান
যীশুর ধরনে পেয়ে গেলে তুমি। তবে ইতিহাস
চিরকাল মিথ্যার কুহক ছিঁড়ে গাইবে সত্যের জয়গান। (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/itihash-mithyar-kuhok-chire/
|
5207
|
শামসুর রাহমান
|
শব্দ
|
চিন্তামূলক
|
সেই কবে থেকে শব্দ আমাকে স্বস্তি দেয় না,
মস্তিতে রাখে বন্দী, ঘুমোতে দেয় না শান্তিতে, ক্রুদ্ধ
পাখির মতো
একটানা ঠোকরাতে থাকে সকাল সন্ধ্যা, ঘোরায়
অবিরত বনবাদাড়ে, আলো আঁধারে,
তৃষ্ণায় জিভ বেরিয়ে-আসা মাছে, যেখানে
গ্রাম্য বধূর লাশ পশুর লোভের করাতে অপভ্রংশ,
সনাক্ত করণের পরপারে। শব্দ আমাকে হাতছানি দিয়ে
ডেকে নিয়ে নাকানি চুবানি খাওয়ায় খানাখন্দে।কখনো কখনো প্রতিশোধ আমার মধ্যে
লকলকে আগুন, হঠাৎ
কোনো কোনো শব্দের গাল পুড়িয়ে দিই, কান
মুচড়ে দিই, যেমন কোনো যন্ত্রী সুর বাঁধার সময়
বাদ্যযন্ত্রের কান। আবার কখনো
লাঠির ডগার ঘোরাই বনবন, তপ্ত কড়াইয়ে ভাজি,
করাই সেবন কবিরাজী তেতো বড়ি, নেহাইয়ে ফেলে
বার বার মারি হাতুড়ির বাড়ি, কাস্তে দিয়ে কর্কশ কাটি।রাত্রির জঠরে দাঁড়ানো শেয়ালের চোখ থেকে,
বরজাশ্রয়ী পানপাতা থেকে, অনূঢ়ার স্তন থেকে, ঈগল
আর সাপের অমীমাংসিত বিবাদ থেকে, ভোরের
স্পর্শ-লাগা
ডিমের কুসুম থেকে, সন্ন্যসীর পিঙ্গল জটা, অমিততেজ
শহীদের বুকের গোলাপ ফুটো, মগরেবে হঠাৎ-দেখা
সিজদারত মানুষের চন্দ্রাকৃতি, সুরাইয়ের ছায়া,
পূর্বপুরুষদের অস্পষ্ট পদধ্বনি আর
বল্লমবিদ্ধ গলার আর্তনাদ থেকে টপকে পড়ে শব্দ।
শব্দ ত্র্যারিয়েলের রেশমপ্রতিম
পাখার আন্দোলনের সত্য।
শব্দ জলাভূমির ধারে গোধূলিতে
ক্যালিবানের আলস্যময় শয়নের সত্য।
অর্ধপশু অর্ধমানবের রোমশ হাতে
নির্জন জল ঝকঝকে আয়নার মতো
টুকরো টুকরো হয় এবং আমি বেলা অবেলায়
জোড়া লাগনোর খেলায় মেতে উঠি। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shobdo/
|
940
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আলোপৃথিবী
|
চিন্তামূলক
|
ঢের দিন বেঁচে থেকে দেখেছি পৃথিবীভরা আলো
তবুও গভীর গ্লানি ছিল কুরুবর্ষে রোমে ট্রয়ে;
উত্তরাধিকার ইতিহাসের হৃদয়ে
বেশি পাপ ক্রমেই ঘনালো।সে গরল মানুষ ও মনীষীরা এসে
হয়তো বা একদিন ক’রে দেবে ক্ষয়;
আজ তবু কন্ঠে বিষ রেখে মানবতার হৃদয়
স্পষ্ট হতে পারে পরস্পরকে ভালবেসে।কোথাও রয়েছে যেন অবিনশ্বর আলোড়নঃ
কোনো এক অন্য পথে- কোন্ পথে নেই পরিচয়;
এ মাটির কোলে ছাড়া অন্য স্থানে নয়;
সেখানে মৃত্যুর আগে হয় না মরণ।আমাদের পৃথিবীর বনঝিরি জলঝিরি নদী
হিজল বাতাবী নিম বাবলার সেখানেও খেলা
করেছে সমস্ত দিন; হৃদয়কে সেখানে করে না অবহেলা
ফেনিল বুদ্ধির দৌড়;- আজকের মানবের নিঃসঙ্গতা যদিসেসব শ্যামল নীল বিস্তারিত পথে
হ’তে চায় অন্য কোনো আলো কোনো মর্মের সন্ধানী,
মানুষের মন থেকে কাটবে না তা হ’লে যদিও সব গ্লানি
তবু আলো ঝল্কাবে অন্য এক সূর্যের শপথে।আমাদের পৃথিবীর পাখালী ও নীলডানা নদী
আমলকী জামরুল বাঁশ ঝাউয়ে সেখানেও খেলা
করেছে সমস্ত দিন;- হৃদয়কে সেখানে করে না অবহেলা
বুদ্ধির বিচ্ছিন্ন শক্তি;- শতকের ম্লান চিহ্ন ছেড়ে দিয়ে যদিনরনারী নেমে পড়ে প্রকৃত ও হৃদয়ের মর্মরিত হরিতের পথে-
অশ্রু রক্ত নিস্ফলতা মরণের খণ্ড খণ্ড গ্লানি
তাহ’লে রবে;- তবু আদি ব্যথা হবে কল্যাণী
জীবনের নব নব জলধারা- উজ্জ্বল জগতে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/aloprithibii/
|
5809
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নীরার অসুখ
|
প্রেমমূলক
|
নীরার অসুখ হলে কলকাতার সবাই বড় দুঃখে থাকে
সূর্য নিভে গেলে পর, নিয়নের বাতিগুলি হঠাৎ জ্বলার আগে জেনে নেয়
নীরা আজ ভালো আছে?
গীর্জার বয়স্ক ঘড়ি, দোকানের রক্তিম লাবণ্য–ওরা জানে
নীরা আজ ভালো আছে!
অফিস সিনেমা পার্কে লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে মুখে রটে যায়
নীরার খবর
বকুলমালার তীব্র গন্ধ এসে বলে দেয়, নীরা আজ খুশি
হঠাৎ উদাস হাওয়া এলোমেলো পাগ্লা ঘন্টি বাজিয়ে আকাশ জুড়ে
খেলা শুরু করলে
কলকাতার সব লোক মৃদু হাস্যে জেনে নেয়, নীরা আজ বেড়াতে গিয়েছে।
আকাশে যখন মেঘ, ছায়াচ্ছন্ন গুমোট নগরে খুব দুঃখ বোধ।
হঠাৎ ট্রামের পেটে ট্যাক্সি ঢুকে নিরানন্দ জ্যাম চৌরাস্তায়
রেস্তোরাঁয় পথে পথে মানুষের মুখ কালো, বিরক্ত মুখোস
সমস্ত কলকাতা জুড়ে ক্রোধ আর ধর্মঘট, শুরু হবে লণ্ডভণ্ড
টেলিফোন পোস্টাফিসে আগুন জ্বালিয়ে
যে-যার নিজস্ব হৃৎস্পন্দনেও হরতাল জানাবে–
আমি ভয়ে কেঁপে উঠি, আমি জানি, আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই, গিয়ে বলি,
নীরা, তুমি মন খারাপ করে আছো?
লক্ষ্মী মেয়ে, একবার চোখে দাও, আয়না দেখার মতো দেখাও ও-মুখের মঞ্জরী
নবীন জনের মতো কলহাস্যে একবার বলো দেখি ধাঁধার উত্তর!
অমনি আড়াল সরে, বৃষ্টি নামে, মানুষেরা সিনেমা ও খেলা দেখতে
চলে যায় স্বস্তিময় মুখে
ট্রাফিকের গিঁট খোলে, সাইকেলের সঙ্গে টেম্পো, মোটরের সঙ্গে রিক্সা
মিলেমিশে বাড়ি ফেরে যা-যার রাস্তায়
সিগারেট ঠোঁটে চেপে কেউ কেউ বলে ওঠে, বেঁচে থাকা নেহাৎ মন্দ না!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1869
|
2148
|
মহাদেব সাহা
|
জাহাজের মতো
|
প্রেমমূলক
|
জাহাজ যেমন ডাকে সেইভাবে ডাক দিও তুমি
তোমার ছাড়ার আগে একবার হর্নখানি দিও
সকল বন্ধন ছিঁড়ে তোমার বন্ধন তুলে নেবো,
একটি সামান্য ব্যাগ কিংবা তাও ফেলে দিতে পারি।
তুমি তো জাহাজ নও জলের টিকিট কেন নেবে
অধিক ইলিশপ্রিয় ছিলে যদি জলে বাসই ভালো
তবুও পারো না তুমি, দূরের জাহাজখানি পারে।
আমার জন্মের আগে জল ছিলো জাহাজও কি ছিলো?
হয়তো এমনি ছিলো সমুদ্রের স্বাভাবিক সাঁকো
হয়তো এমনি ছিলো সমুদ্রের স্বাভাবিক সাঁকো
মানুষের কিছু নেই ঘরবাড়ি জলেরই তো পাড়ে,
তুমি যদি ডাক দাও জাহাজের ডেক খুব প্রিয়।
ডেকে তো উদ্ভিদ নেই জলের উদ্বেগ কিছু আছে
তবু তো উদ্বেগ আছে দূরের জাহাজখানি জানে
তুমি তো ডাকোনি কাছে, ভালোবেসে জাহাজই ডেকেছে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1485
|
3592
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৮
|
প্রেমমূলক
|
নিদাথের শেষ গোলাপ কুসুম
একা বন আলো করিয়া,
রূপসী তাহার সহচরীগণ
শুকায়ে পড়েছে ঝরিয়া।
একাকিনী আহা, চারি দিকে তার
কোনো ফুল নাহি বিকাশে,
হাসিতে তাহার মিশাইতে হাসি
নিশাস তাহার নিশাসে।
বোঁটার উপরে শুকাইতে তোরে
রাখিব না একা ফেলিয়া–
সবাই ঘুমায়, তুইও ঘুমাগে
তাহাদের সাথে মিলিয়া।
ছড়ায়ে দিলাম দলগুলি তোর
কুসুমসমাধিশয়নে
যেথা তোর বনসখীরা সবাই
ঘুমায় মুদিত নয়নে।
তেমনি আমার সখারা যখন
যেতেছেন মোরে ফেলিয়া
প্রেমহার হতে একটি একটি
রতন পড়িছে খুলিয়া,
প্রণয়ীহৃদয় গেল গো শুকায়ে
প্রিয়জন গেল চলিয়া–
তবে এ আঁধার আঁধার জগতে
রহিব বলো কী বলিয়া।Moore (অনূদিত কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-8/
|
5900
|
সুবোধ সরকার
|
মৃত্যুর আগে তুমি কাজলপরেছিলে
|
প্রেমমূলক
|
তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
কিন্তু তোমার আঁচলে নদীর
আত্মজীবনী লেখা রইল |
বিচানার নীচ থেকে কয়েক লক্ষ কর্কট
বিছানা-সমেত
তোমাকে তুলে নিয়ে চলেছে মহাকাশযানে |
ম়ৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে তাও তুমি কাজল
পড়েছ,
কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার
মুখে এক চামচ জল
হ্যাঁ, আমি এক চামচ জল হয়ে
এক চামচ অন্তর্জলী হয়ে, এক চামচ
অঞ্জলি হয়ে,
তোমার ভেতরে একটা পূর্ণিমায়
ভেসে যাওয়া
বিমানবন্দরে আমি বসে থাকতে চেয়েছিলাম
|
আমি বলেছিলাম এটা বিমানবন্দর নয়
এটা একটা গ্রাম,
লোকে বিরহী বলে ডাকে
এখানেই আমরা জীবনে প্রথম চুম্বন
করেচিলাম
তুমি ছিলে চাবুকের মত তেজি এবং সটান
বেতস পাতার মতো ফার্স্ট ইয়ার
এবং সেনসুয়াল কাঠবেড়ালি
বৃষ্টিতে ভিজলে তোমাকে আন্তিগোনের
মতো দেখাত |
আমি ছিলাম গাঙচিল,
দু’লাইন কাফকা পড়া অসংগঠিত আঁতেল |
তুমি যমুনার একটা অংশ চেড়ে চলে যাচ্ছ
ডাক্তার তোমার হাতের
শিরা খুঁজে পায়নি |
দোষ তোমার নয়, ডাক্তারের
এতবার তোমার শরীর ফুটো করেছিল ওরা
ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার
ফুটো করেনি আমেরিকা
কিন্তু তোমার ধমনী আসলে একটা নদীর
আত্মজীবনী
তুমি তিস্তার একটা ঢেউ
ছেড়ে চলে যাচ্ছ
আমার মাছরাঙা সেই ঢেউয়ের ভেতর
আটকে গেছে |
সেই মাছরাঙার ঠোঁটে তোমার সংসার
বোরো যেখানে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স
না পড়ে পড়ছে সাতটি তারার
.
তিমির
|
কিন্তু আমি নদীর পলিমাটি মেখে ,
হারে রে রে রে রে
একদিন শহরে ঢুকে পড়েছিলাম
কার্জন পার্কে শুয়ে কালপুরুষের
সঙ্গে তর্ক করেছি
এসে দাঁড়ালেন বাত্সায়ন এবং নিৎসে
কালপুরুষ বলল, নাও, দুই মহান খচ্চর
এসে গেছে,
যৌনতা এবং মৃত্যু
ওরা দুই সহোদর,
কে তোমাকে বেছে নেয় সেটাই
তোমার
. সেমিফাইনাল
ডব্লু, ডব্লু, ডব্লু ড্যাশ ডটকম |
রাত দুটোর এ্যাম্বুলেন্সের ভেতর
বসে আমি তোমার
হাত দুটি ধরে বলেছিলাম, বলো কোথায়
কষ্ট ?
তুমি বলেছিলে, কৃষ্ণচূড়ায়, পারমানবিক
পলিমাটিতে
তোমার অসংখ্য জুঁইফিলে জ্বালা করছে |
হাত থেকে একটানে চ্যানেল
খুলে ফেলে বললে,
আমাকে বাঁচাও, ভালবাসা,
আমি বাঁচতে চাই |
পৃথিবীতে আমি একটু শিউলির গন্ধ
পেতে পারি ?
আমার নাক থেকে রাইস টিউব সরিয়ে দাও
|
আমি বললাম এটা ইনটেনসিভ কেয়ার
ইউনিট,
এখানে কোনও শিউলি গাছ নেই |
তুমি বললে, ছেলেটা কোথায় গেল, কার
সঙ্গে গেল ?
ওকে একটু দেখো,রাত
করে বাড়ি ফিরো না |
নার্সিংহোমের বারান্দায়
বলে আমি একা, একেবারে একা
‘দ্য এম্পারার অফ অল ম্যালাডিজ’ পড়ছিলাম
|
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার,
তুমি ঠিক বলেছ
অন্ধকারে দাবা খেলছেন সারা পৃথিবীর
অনকোলজিস্ট
উল্টোদিকে এ্যান্টিচেম্বার ড্রাগ-
মাফিয়ারা বসে আছে
মানুষের গভীরতম দুঃখ যাদের ব্যবসা |
তুমি আমাকে বারবার বলতে সিগারেট
খেও না
আমি উড়িয়ে দিয়ে বলতাম, আমরা সবাই
চিমনি সুইপার
আমরা কার্বনের সঙ্গে প্রণয় আর প্রণয়ের
সঙ্গে
মেটাস্টেসিস বহন করে চলেছি |
কে একদিন
রাস্তা থেকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসবে
তার আগে আজ, এখনই, আমি প্রজাপতিদের
সঙ্গে দৌড়তে চাই,
আজ, এখনই মিলন করতে চাই, আশিরনখ মিলন
দেবতা না চড়ুই, কে দেখে ফেলল, কিছু
যায় আসে না |
মনে নেই আমরা একবার
ভাঙা মসজিদে ঢুকেছিলাম
প্রচুর সাপের ভিতর
আল্লা পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছিলেন |
বললেন, আয় পৃথিবীতে যাদের কোনও
জায়গা নেই
আমি তাদের জুন্নত এবং জাহানারার
মাঝখানে
এখটা বিকেল
বাঁচিয়ে রেখেছি ভালবাসার জন্য
গাছ থেকে ছিড়ে আনা আপেলে কামড়
দিবি বলে |
তুমি তমসার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
কিন্তু তোমার আঁচল ধরে টানছে ছেলের
উচ্চমাধ্যমিক |
ছেলে বলছে, মা,
আমাকে কুজ্ঝটিকা বানান
বলে দিয়ে যাও
আইসিইউ-তে কেউ কুজ্ঝটিকা বানান
বলতে পারে না |
ছেলের বাবা বসে আছে, মেডিক্যাল
বোর্ড বসেছে বারোতলায়
যেন হাট বসেছে বক্সিগঞ্জে,
পদ্মাপারে |
কে যেন বলল, আরে বেরিয়ে আসুন
তো ফার্নেস থেকে,
এরা পিঁপড়ে ধরতে পারে না, কর্কট
ধরবে ?
একটা পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে গগনবাবুর
পুকুরে
কেমোথেরাপির পর তোমাকে গোয়ায়
নিয়ে গিয়েছিলাম |
একটা কোঙ্কনি কবিকে বললে,
‘পানকৌড়ি দেখাও’,
একটা পর্তুগিজ
গ্রামে গিয়ে কী দেখেছিলে আমাকে বলনি |
তুমি জলঢাকার একটা অংশ
ছেড়ে চলে যাচ্ছ
যে বড় বড় টিপ পরতে তারা গাইছে, আমায়
মুক্তি আলোয় আলোয় |
তুমি সুবর্ণরেখার একটা অংশ
ছেড়ে চলে যাচ্ছ
তোমার লিপস্টিক বলছে, আমাদের
নিয়ে চলো আয়না |
তুমি রোরো নামে একটা চাইবাসার
নদী ছেড়ে চলে যাচ্ছ
সে বলছে, মা দাঁড়াও, স্কুল
থেকে এক্ষিনি মার্কশিট তুলে আসছি |
তুমি ভল্ গা নামে একটা নদীর অংশ
ছেড়ে চলে যাচ্ছ
পারস্যের রানি আতোসা তোমায় ডাকছে
পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর স্তন ছিল
রানি আতোসার
কাটা হয়েছিল খড়গ দিয়ে, কেটেছিল এক
গ্রিক ক্রিতদাস |
ইস্তানবুলের নদী বসফরাস
ছেড়ে তুমি চলে যাচ্ছ
তোমার এক পা ইউরোপ, এক পা এশিয়া |
তুমি জিপসিদের হাটে তেজপাতা-
মোড়ানো ওষুধ আনতে চলেছ
ইহুদি মেয়েরা তোমাকে নিয়ে গুহায়
ঢুকে গেল |
জিপসিরাই পৃথিবীতে প্রথম ব্যথার ওষুধ
কুড়িয়ে পেয়েছে
তোমার বিশ্বাস ছিল শেষ ওষুধটাও ওরাই
কুড়িয়ে আনবে |
শেষ একটা ওষুধের জন্য
গোটা মানবজাতি দাঁড়িয়ে আছে
য়ে সেটা কুড়িয়ে আনবে, সে বলবে,
দাঁড়াও
আমি একটা আগুনের মধ্যে দিয়ে আসছি
বাবাকে বারণ
করো হাসপাতালে বসে রাত জাগতে |
আমাকে য়দি কোনও ম্যাটাডোর
বা মার্সিডিজ ধাক্কা না মারে
ভোর হওয়ার আগে আমি যে করে হোক
শহরে ঢুকব |
এমন একটা অসুখ যার কোনও ‘আমরা ওরা’
নেই
ভিখিরি এবং প্রেসিডেন্টকে একই ড্রাগ
নিতে হবে |
ডাক্তার, ভাল যদি নাই পারোষ এত সুঁচ
ফোটালে কেন ?
সুঁচগুলো একবার নিজের
পশ্চাতে ফুটিয়ে দেখলে হত না ?
তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ,
সত্যি চলে যাচ্ছ—–
রোরো তোমার আঁচল ধরে আছে,
আমি তোমার রোদ্দুর |
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4189.html
|
5096
|
শামসুর রাহমান
|
মা তার ছেলের প্রতি
|
মানবতাবাদী
|
এখন আমি বড় ক্লান্ত, আমার দৃষ্টি ক্রমশ
ধূসর হয়ে আসেছ। সন্ধ্যার
সোনালি-কালো প্রহরে ভাবছি, বাচ্চু,
কতদিন তোর সঙ্গে আমার দেখা নেই।
দিনের এই হট্রগোল আর
চেঁচামেচিতে কতজনের গলা শুনি,
কিন্তু তোর কণ্ঠস্বর আমি শুনিনা।তোর তিন ভাই প্রায় রোজানা আমার কাছে আসে,
আরেকজনের কাছেই থাকি দিনরাত।
শুধু তুই কালেভদ্রে আসিস, মাঝে-মধ্যে
টেলিফোনে শুনি তোর গলা।
আমি জানি তুই তোর নাম মিলিয়ে দিয়েছিস
গাছের পাতায়, ফসলের শীর্ষে,
মেঘনা নদীতে, অলি গলি আর অ্যাভিনিউতে
শহীদের স্মৃতিসৌধে, মৌন মিছিলে।
বাচ্চু তুই সবখানেই আছিস,
শুধু দূরে সরে গিয়েছিস আমার কাছ থেকে।আমার ইন্দ্রধনু বয়সে তোকে আমি
পেটে ধরেছি দশ মাস দশ দিন, তোর-নাড়ি-ছেঁড়া
চিৎকার এখনো মনে পড়ে আমার।
মনে পড়ে তোর হামাগুড়ির, মুখের প্রথম বুলি।
হাঁটি হাঁটি পা-পা ক’রে তুই
চলে যেতি ঘর থেকে বারান্দায়, তোর মৃদু তাড়ায়
রেলিঙ থেকে উড়ে যেত পাখি,
আমি দেখতাম দুচোখ ভ’রে।
কখনো কখনো ফোরাত নদীর ধারে
তীরে তীরে ঝাঁঝরা-হয়ে যাওয়া কাচবন্দি
দুলদুলের দিকে এক দৃষ্টিতে তুই
তাকিয়ে থাকতিস, যেন ভবিষ্যতের দিকে আটকা পড়েছে।
তোর দুটো চোখ।
জ্বরে তোর শরীর পুড়ে গেলে,তুই আমার
হাত নিয়ে রাখতিস তোর কপালে,
তোর কাছ থেকে আমাকে এক দণ্ডের জন্যেও
কোথাও যেতে দিসনি কখনো।
অথচ আজ তুই নিজেই
আমার নিকট থেকে যোজন যোজন দূরে বিলীয়মান।
বাচ্চু, তোর নাড়ি-নক্ষত্র আমার নখদর্পণে,
কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়,
তোর পরিচয়ের আবছা ঝালর কতটা দুলে ওঠে আমার চোখে?
তোর এখনকার কথা ভাবলে
হজরত ঈশা আর বিবি মরিয়মের কথা মনে পড়ে যায়।
যখন ওরা তাঁকে কাঁটার মুকুট পরিয়ে
কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিল ক্রুশকাঠ,
কালো পেরেকে বিদ্ধ করেছিল সারা শরীর
তখন তাঁর কাছে ছিলেন না মাতা মরিয়ম।
তোর আর আমার মধ্যেওএকাকিত্বের খর নদী, আমি সেই নদী কিছুতেই
পাড়ি দিতে পারি না।
তোর কথা ভেবে ইদানীং আমি বড় ভয় পাই, বাচ্চু।
তাই বারবার ইসমে আজম পড়ে
তোর বালা মুসিবত তাড়িয়ে বেড়াই।
তুই তোর নিজস্ব সাহস, স্বপ্ন আর আকাঙ্খাগুলিকে
আগলিয়ে রাখ, যেমন আমি তোকে রাখতাম
তোর ছেলেবেলায়। (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ma-tar-cheler-proti/
|
3624
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বৃক্ষবন্দনা
|
ভক্তিমূলক
|
অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান
প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ,
ঊর্ধ্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা
ছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ-'পরে; আনিলে বেদনা
নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে। সেদিন অম্বর-মাঝে
শ্যামে নীলে মিশ্রমন্ত্রে স্বর্গলোকে জ্যোতিষ্কসমাজে
মর্তের মাহাত্ম্যগান করিলে ঘোষণা। যে জীবন
মরণতোরণদ্বার বারম্বার করি উত্তরণ
যাত্রা করে যুগে যুগে অনন্তকালের তীর্থপথে
নব নব পান্থশালে বিচিত্র নূতন দেহরথে,
তাহারি বিজয়ধ্বজা উড়াইলে নিঃশঙ্ক গৌরবে
অজ্ঞাতের সম্মুখে দাঁড়ায়ে। তোমার নিঃশব্দ রবে
প্রথম ভেঙেছে স্বপ্ন ধরিত্রীর, চমকি উল্লসি
নিজেরে পড়েছে তার মনে-- দেবকন্যা দুঃসাহসী
কবে যাত্রা করেছিল জ্যোতিঃস্বর্গ ছাড়ি দীনবেশে
পাংশুম্লান গৈরিকবসন-পরা,খণ্ড কালে দেশে
অমরার আনন্দেরে খণ্ড খণ্ড ভোগ করিবারে,
দুঃখের সংঘাতে তারে বিদীর্ণ করিয়া বারে বারে
নিবিড় করিয়া পেতে। মৃত্তিকার হে বীর সন্তান,
সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তিদান
মরুর দারুণ দুর্গ হতে;যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে;
সন্তরি সমুদ্র-ঊর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরে
শ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায়,
দুস্তর শৈলের বক্ষে প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়
বিজয়-আখ্যানলিপি লিখি দিলে পল্লব-অক্ষরে
ধূলিরে করিয়া মু্গ্ধ, চিহ্নহীন প্রান্তরে প্রান্তরে
ব্যাপিলে আপন পন্থা। বাণীশূন্য ছিল একদিন
জলস্থল শূন্যতল, ঋতুর উৎসবমন্ত্রহীন--
শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয়,
যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয়,
সুরের বিচিত্র বর্ণে আপনার দৃশ্যহীন তনু
রঞ্জিত করিয়া নিল, অঙ্কিল গানের ইন্দ্রধনু
উত্তরীর প্রান্তে প্রান্তে । সুন্দরের প্রাণমূর্তিখানি
মৃত্তিকার মর্তপটে দিলে তুমি প্রথম বাখানি
টানিয়া আপন প্রাণে রূপশক্তি সূর্যলোক হতে,
আলোকের গুপ্তধন বর্ণে বর্ণে বর্ণিলে আলোতে।
ইন্দ্রের অপ্সরী আসি মেঘে হানিয়া কঙ্কণ
বাষ্পপাত্র চূর্ণ করি লীলানৃত্যে করেছে বর্ষণ
যৌবন অমৃতরস, তুমি তাই নিলে ভরি ভরি
আপনার পুত্রপুষ্পপুটে, অনন্তযৌবনা করি
সাজাইলে বসুন্ধরা। হে নিস্তব্ধ, হে মহাগম্ভীর,
বীর্যেরে বাঁধিয়া ধৈর্যে শান্তিরূপ দেখালে শক্তির;
তাই আসি তোমার আশ্রয়ে শান্তিদীক্ষা লভিবারে
শুনিতে মৌনের মহাবানী; দুশ্চিন্তার গুরুভারে
নতশীর্ষ বিলুণ্ঠিতে শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব--
প্রাণের উদার রূপ,রসরূপ নিত্য নব নব,
বিশ্বজয়ী বীররূপ ধরণীর, বাণীরূপ তার
লভিতে আপন প্রাণে। ধ্যানবলে তোমার মাঝার
গেছি আমি, জেনেছি, সূর্যের বক্ষে জ্বলে বহ্নিরূপে
সৃষ্টিযজ্ঞে যেই হোম, তোমার সত্তায় চুপে চুপে
ধরে তাই শ্যামস্নিগ্ধরূপ; ওগো সূর্যরশ্মিপায়ী,
শত শত শতাব্দীর দিনধেনু দুহিয়া সদাই
যে তেজে ভরিলে মজ্জা, মানবেরে তাই করি দান
করেছ জগৎজয়ী; দিলে তারে পরম সম্মান;
হয়েছে সে দেবতার প্রতিস্পর্ধী-- সে অগ্নিচ্ছটায়
প্রদীপ্ত তাহার শক্তি বিশ্বতলে বিস্ময় ঘটায়
ভেদিয়া দুঃসাধ্য বিঘ্নবাধা। তব প্রাণে প্রাণবান,
তব স্নেহচ্ছায়ায় শীতল, তব তেজে তেজীয়মান,
সজ্জিত তোমার মাল্যে যে মানব, তারি দূত হয়ে
ওগো মানবের বন্ধু, আজি এই কাব্য-অর্ঘ্য ল'য়ে
শ্যামের বাঁশির তানে মুগ্ধ কবি আমি
অর্পিলাম তোমায় প্রণামী।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bikkha-bandana/
|
530
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সাহেব ও মোসাহেব
|
হাস্যরসাত্মক
|
সাহেব কহেন, “চমৎকার! সে চমৎকার!”
মোসাহেব বলে, “চমৎকার সে হতেই হবে যে!
হুজুরের মতে অমত কার?”সাহেব কহেন, “কী চমৎকার,
বলতেই দাও, আহা হা!”
মোসাহেব বলে, “হুজুরের কথা শুনেই বুঝেছি,
বাহাহা বাহাহা বাহাহা!”সাহেব কহেন, “কথাটা কি জান? সেদিন -”
মোসাহেব বলে, “জানি না আবার?
ঐ যে, কি বলে, যেদিন -”সাহেব কহেন, “সেদিন বিকেলে
বৃষ্টিটা ছিল স্বল্প।”
মোসাহেব বলে, “আহা হা, শুনেছ?
কিবা অপরুপ গল্প!”সাহেব কহেন, “আরে ম’লো! আগে
বলতেই দাও গোড়াটা!”
মোসাহেব বলে, “আহা-হা গোড়াটা! হুজুরের গোড়া!
এই, চুপ, চুপ ছোঁড়াটা!”সাহেব কহেন, “কি বলছিলাম,
গোলমালে গেল গুলায়ে!”
মোসাহেব বলে, “হুজুরের মাথা! গুলাতেই হবে।
দিব কি হস্ত বুলায়ে?”সাহেব কহেন, “শোনো না! সেদিন
সূর্য্য উঠেছে সকালে!”
মোসাহেব বলে, “সকালে সূর্য্য? আমরা কিন্তু
দেখি না কাঁদিলে কোঁকালে!”সাহেব কহেন, “ভাবিলাম, যাই,
আসি খানিকটা বেড়ায়ে,”
মোসাহেব বলে, “অমন সকাল! যাবে কোথা বাবা,
হুজুরের চোখ এড়ায়ে!”সাহেব কহেন, “হ’ল না বেড়ানো,
ঘরেই রহিনু বসিয়া!”
মোসাহেব বলে, “আগেই বলেছি! হুজুর কি চাষা,
বেড়াবেন হাল চষিয়া?”সাহেব কহেন, “বসিয়া বসিয়া
পড়েছি কখন ঝিমায়ে!”
মোসাহেব বলে, “এই চুপ সব! হুজুর ঝিমান!
পাখা কর, ডাক নিমাইএ”সাহেব কহেন, “ঝিমাইনি, কই
এই ত জেগেই রয়েছি!”
মোসাহেব বলে, “হুজুর জেগেই রয়েছেন, তা
আগেই সবারে কয়েছি!”সাহেব কহেন, “জাগিয়া দেখিনু, জুটিয়াছে যত
হনুমান আর অপদেব!”
“হুজুরের চোখ, যাবে কোথা বাবা?”
প্রণামিয়া কয় মোসাহেব।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sahebomemsaheb/
|
3715
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মানবহৃদয়ের বাসনা
|
সনেট
|
নিশীথে রয়েছি জেগে ; দেখি অনিমেখে ,
লক্ষ হৃদয়ে সাধ শূন্যে উড়ে যায় ।
কত দিক হতে তারা ধায় কত দিকে !
কত – না অদৃশ্যকায়া ছায়া – আলিঙ্গন
বিশ্বময় কারে চাহে , করে হায় – হায় ।
কত স্মৃতি খুঁজিতেছে শ্মশানশয়ন —
অন্ধকারে হেরো শত তৃষিত নয়ন
ছায়াময় পাখি হয়ে কার পানে ধায় ।
ক্ষীণশ্বাস – মুমূর্ষুর অতৃপ্ত বাসনা
ধরণীর কূলে কূলে ঘুরিয়া বেড়ায় ।
উদ্দেশে ঝরিছে কত অশ্রুবারিকণা ,
চরণ খুঁজিয়া তারা মরিবারে চায় ।
কে শুনিছে শত কোটি হৃদয়ের ডাক !
নিশীথিনী স্তব্ধ হয়ে রয়েছে অবাক । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/manobhridoyer-basna/
|
1270
|
জীবনানন্দ দাশ
|
হরিণেরা
|
প্রকৃতিমূলক
|
স্বপ্নের ভিতরে বুঝি–ফাল্গুনের জ্যোৎস্নার ভিতরে।
দেখিলাম পলাশের বনে খেলা করে
হরিণেরা; রূপালি চাঁদের হাত শিশিরে পাতায়;
বাতাস ঝরিছে ডানা — মুক্তা ঝ’রে যায়
পল্লবের ফাঁকে ফাঁকে-বনে বনে-হরিণের চোখে;
হরিণেরা খেলা করে হাওয়া আর মুক্তার আলোকে।
হীরের প্রদীপ জ্বেলে শেফালিকা বোস যেন হাসে
হিজল ডালের পিছে অগণন বনের আকাশে,–
বিলুপ্ত ধূসর কোন পৃথিবীর শেফালিকা, আহা,
ফাল্গুনের জ্যোৎস্নায় হরিণেরা জানে শুধু তাহা।
বাতাস ঝাড়িছে ডানা, হীরা ঝরে হরিণের চোখে–
হরিণেরা খেলা করে হাওয়া আর হীরার আলোকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/950
|
4282
|
শহীদ কাদরী
|
বাংলা কবিতার ধারা
|
রূপক
|
কে যেন চিৎকার করছে প্রাণপণে `গোলাপ! গোলাপ!’
ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়ছে তার সুমসৃণ লালা,
`প্রেম, প্রেম’ বলে এক চশমা-পরা চিকণ যুবক
সাইকেল-রিকশায় চেপে মাঝরাতে ফিরছে বাড়ীতে,
`নীলিমা, নিসর্গ, নারী’- সম্মিলিত মুখের ফেনায়
পরস্পর বদলে নিলো স্থানকাল, দিবস শর্বরী হলো
সফেদ পদ্মের মতো সূর্য উঠলো ফুটে গোধূরির রাঙা হ্রদে
এবং স্বপ্নের অভ্যন্তরে কবিদের নিঃসঙ্গ করুণ গণ্ডদেশে
মহিলার মতো ছদ্মবেশে জাঁদরেল নপুংসক এক
ছুড়ে মারলো সুতীক্ষ্ণ চুম্বন।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4169.html
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.