id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
1395
|
তারাপদ রায়
|
প্রিয়তমাসু
|
প্রেমমূলক
|
অনেকদিন পর কাগজ-কলম নিয়ে বসে
প্রথম একটা চাঁদের ছবি আঁকি, সঙ্গে কিছু মেঘ।তারপর যথেষ্ট হয়নি ভেবে গোটা তিনেক পাখি,
ক্রমশ একটা দেবদারু ও কয়েকটা কলাগাছ,
অবশেষে অনেকগুলি ছানাসহ একটা বেড়াল,
এইসব এঁকে এঁকে তবুও
কাগজের নীচে চার আঙুল জায়গা বাকি থাকে :
সেখানে প্রথমে লিখি, শ্রীচরণেষু
তার নীচে সবিনয় নিবেদন।এবং কিছুক্ষণ পরে
সবিনয় নিবেদন কেটে লিখি প্রিয়তমাসু।
এবং একটু পরেই বুঝতে পারি
জীবনে এই প্রথম, প্রথমবার প্রিয়তমাসু লিখলাম।প্রিয়তমাসু,
তুমি তো জানো না
জীবনে তোমাকে কোনদিন ঠিকমতো সম্বোধন করা হলো না।প্রিয়তমাসু,
তুমি তো জানো না
জীবনে তোমাকে কোনোদিন ঠিকমতো ভালোবাসা হলো না।
শুধু হিজিবিজি ছবি, চাঁদ, মেঘ,
সবিনয় নিবেদন কাটাকুটি করে চিরদিন তোমার কাছে পৌঁছোনো।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%a4%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%81-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
4010
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্মৃতি (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
সনেট
|
সে ছিল আরেক দিন এই তরী-’পরে,
কন্ঠ তার পূর্ণ ছিল সুধাগীতিস্বরে।
ছিল তার আঁখি দুটি ঘনপক্ষ্মচ্ছায়,
সজল মেঘের মতো ভরা করুণায়।
কোমল হৃদয়খানি উদ্বেলিত সুখে,
উচ্ছ্বসি উঠিত হাসি সরল কৌতুকে।
পাশে বসি ব’লে যেত কলকণ্ঠকথা,
কত কী কাহিনী তার কত আকুলতা!
প্রত্যুষে আনন্দভরে হাসিয়া হাসিয়া
প্রভাত-পাখির মতো জাগাত আসিয়া।
স্নেহের দৌরাত্ম্য তার নির্ঝরের প্রায়
আমারে ফেলিত ঘেরি বিচিত্র লীলায়।
আজি সে অনন্ত বিশ্বে আছে কোন্খানে
তাই ভাবিতেছি বসি সজলনয়ানে। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/smriti-choitali/
|
1798
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কাকে দিয়ে যাব
|
প্রেমমূলক
|
কাকে দিয়ে যাব এই জলরাশি, দুকুল প্লাবন
কাকে দিয়ে যাব ভাঙা তীর
বিপদসংকুল বাঁশী যদি বাজে মধ্যরাত চিরে?
কে নেবে অঞ্জলি ভরে এই জল, পিছল সংসার
অসুখের মতো এই রক্তচিহ্নহীন ধুসরতা?
সুয়ে, শুয়ে, ভেঙে পড়ে বৃক্ষ, তরুলতা
যাদের শিকড় ছিল মাটির গভীরে বদ্ধমুল,
রক্তজাত ফুল
আকাশকে উপহার দিয়েছে প্রত্যেক শুভদিনে
পৃথিবীকে উপভোগ্য স্নেহ ও মমতা।
মহীরুহ শুয়ে আছে ঘাসে,
সোঁদা গন্ধ সরল বিশ্বাসে।
কাকে দিয়ে যাব এত ক্ষত, অক্ষমতা?
যে নেবে সে জয়ী হবে জানি
যে নেবে সে বিপন্নও হবে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1228
|
2980
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে
|
ভক্তিমূলক
|
১
গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে,
নিভৃত নিরালা ঠাঁই, লেশমাত্র আলো নাই,
লুকানো এ প্রেমসাধ গোপনে নিবসে,
শুদ্ধ যবে ভালোবাসা নয়নে তোমার,
ঈষৎ প্রদীপ্ত হয়, উচ্ছ্বসয়ে এ-হৃদয়,
ভয়ে ভয়ে জড়সড় তখনি আবার।
২
শূন্য এই মরমের সমাধি-গহ্বরে,
জ্বলিছে এ প্রেমশিখা চিরকাল-তরে,
কেহ না দেখিতে পায়, থেকেও না থাকা প্রায়,
নিভিবারও নাম নাই নিরাশার ঘোরে।
৩
যা হবার হইয়াছে– কিন্তু প্রাণনাথ!
নিতান্ত হইবে যবে এ শরীরপাত,
আমার সমাধি-স্থানে কোরো নাথ কোরো মনে,
রয়েছে এ এক দুঃখিনী হয়ে ধরাসাৎ।
৪
যত যাতনা আছে দলুক আমায়,
সহজে সহিতে নাথ সব পারা যায়,
কিন্তু হে তুমি-যে মোরে, ভুলে যাবে একেবারে
সে কথা করিতে মনে হৃদি ফেটে যায়।
৫
রেখো তবে এই মাত্র কথাটি আমার,
এই কথা শেষ কথা, কথা নাহি আর,
(এ দেহ হইলে পাত, যদি তুমি প্রাণনাথ,
প্রকাশো আমার তরে তিলমাত্র শোক,
ধর্মত হবে না দোষী দোষিবে না লোক–
কাতরে বিনয়ে তাই, এই মাত্র ভিক্ষা চাই,
কখনো চাহি নে আরো কোনো ভিক্ষা আর)
যবে আমি যাব ম’রে, চির এ দুঃখিনী তরে,
বিন্দুমাত্র অশ্রুজল ফেলো একবার–
আজন্ম এত যে ভালোবেসেছি তোমায়,
সে প্রেমের প্রতিদান একমাত্র প্রতিদান,
তা বই কিছুই আর দিয়ো না আমায়।George Gordon Byron
(অনুবাদ কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/govir-govirtomo-hridoyprodeshe/
|
1442
|
নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
|
কাজের লোক
|
নীতিমূলক
|
মৌমাছি, মৌমাছি
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই।ওই ফুল ফোটে বনে
যাই মধু আহরণে
দাঁড়াবার সময় তো নাই।ছোট পাখি, ছোট পাখি
কিচিমিচি ডাকি ডাকি
কোথা যাও বলে যাও শুনি।এখন না কব কথা
আনিয়াছি তৃণলতা
আপনার বাসা আগে বুনি।পিপীলিকা, পিপীলিকা
দলবল ছাড়ি একা
কোথা যাও, যাও ভাই বলি।শীতের সঞ্চয় চাই
খাদ্য খুঁজিতেছি তাই
ছয় পায়ে পিলপিল চলি।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/615.html
|
4532
|
শামসুর রাহমান
|
কড়া নেড়ে যাবে
|
মানবতাবাদী
|
মারী ও মড়কে পুড়ে-পুড়ে হাড়
কালি হলো আর জটিল সড়কে
হেঁটে হেঁটে পায়ে ক্ষত বেড়ে যায়;
দান্তের মতো নরকে ভ্রমণ অব্যাহত।খাঁ-খাঁ জ্যোৎস্নায় নগ্নিকা দেখি
শুকোতে দিচ্ছে ছেঁড়া শাড়ি তার।
বিশীর্ণ শিশু ঘন-ঘন করে
মায়ের শূন্য হাতের তালুতে দৃষ্টিপাত।চরাচরব্যাপী হাহাকার শুনে,
অধিবাস্তব পালা দেখে আজ
রাত্তিলোভী চাঁদ ওঠে না তো
রোগা কেরানির আপিস কামাই করার মতো।মল্লিকা বনে দিনরাত্তির
কবর খুঁড়ছে শবসাধকেরা;
ছিঁচকাঁদুনের দল মর্শিয়া
গেয়ে এলেবেলে করে প্রস্থান অস্তাচলে।আর কিছু আমি পারি না-ই পারি,
অন্তত আজ কথা দিতে পারি-
আমার কবিতা কড়া নেড়ে যাবে
ঘুমন্ত সব নিঝুম বাড়িতে একলা হাতে। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kora-nere-jabe/
|
5918
|
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
|
প্রস্তাব ১৯৪০
|
মানবতাবাদী
|
প্রভু, যদি বলো অমুক রাজার সাথে লড়াই
কোনো দ্বিরুক্তি করব না, নেব তীরধনুক।
এমনি বেকার, মৃত্যুকে ভয় করি থোড়াই,
দেহ না চললে, চলবে তোমার কড়া চাবুক। হা-ঘরে আমরা, মুক্ত আকাশ ঘর-বাহির।
হে প্রভু, তুমিই শেখালে পৃথিবী মায়া কেবল-
তাই তো আজকে নিয়েছি মন্ত্র উপবাসীর,
ফলে নেই লোভ, তোমার গোলায় তুলি ফসল। হে সওদাগর, সেপাই-সান্ত্রী সব তোমার।
দয়া ক’রে শুধু মহামানবের বুলি ছড়াও–
তারপরে, প্রভু, বিধির করুণা আছে অপার।
জনগণমতে বিধিনিষেধের বেড়ি পরাও। অস্ত্র মেলে নি এতদিন, তাই ভেঁজেছি তান।
অভ্যাস ছিল তীরধনুকের ছেলেবেলায়।
শত্রুপক্ষ যদি আচমকা ছোঁড়ে কামান–
বলব, বৎস! সভ্যতা যেন থাকে বজায়। চোখ বুজে কোনো কোকিলের দিকে ফেরাব কান।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4457.html
|
3812
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রাজপুতানা
|
মানবতাবাদী
|
এই ছবি রাজপুতানার;
এ দেখি মৃত্যুর পৃষ্ঠে বেঁচে থাকিবার
দুর্বিষহ বোঝা।
হতবুদ্ধি অতীতের এই যেন খোঁজা
পথভ্রষ্ট বর্তমানে অর্থ আপনার,
শূন্যেতে হারানো অধিকার।
ঐ তার গিরিদুর্গে অবরুদ্ধ নিরর্থ ভ্রূকুটি
ঐ তার জয়স্তম্ভ তোলে ক্রুদ্ধ মুঠি
বিরুদ্ধ ভাগ্যের পানে।
মৃত্যুতে করেছে গ্রাস তবুও যে মরিতে না জানে,
ভোগ করে অসম্মান অকালের হাতে
দিনে রাতে,
অসাড় অন্তরে
গ্লানি অনুভব নাহি করে,
আপনারি চাটুবাক্যে আপনারে ভুলায় আশ্বাসে--
জানে না সে,
পরিপূর্ণ কত শতাব্দীর পণ্যরথ
উত্তীর্ণ না হতে পথ
ভগ্নচক্র পড়ে আছে মরুর প্রান্তরে,
ম্রিয়মাণ আলোকের প্রহরে প্রহরে
বেড়িয়াছে অন্ধ বিভাবরী
নাগপাশে; ভাষাভোলা ধূলির করুণা লাভ করি
একমাত্র শান্তি তাহাদের।
লঙ্ঘন যে করে নাই ভোলামনে কালের বাঁধের
অন্তিম নিষেধসীমা--
ভগ্নস্তূপে থাকে তার নামহীন প্রচ্ছন্ন মহিমা;
জেগে থাকে কল্পনার ভিতে
ইতিবৃত্তহারা তার ইতিহাস উদার ইঙ্গিতে।
কিন্তু এ নির্লজ্জ কারা! কালের উপেক্ষাদৃষ্টি-কাছে
না থেকেও তবু আছে।
একি আত্মবিস্মরণমোহ,
বীর্যহীন ভিত্তি-'পরে কেন রচে শূন্য সমারোহ।
রাজ্যহীন সিংহাসনে অত্যুক্তির রাজা,
বিধাতার সাজা।
হোথা যারা মাটি করে চাষ
রৌদ্রবৃষ্টি শিরে ধরি বারো মাস,
ওরা কভু আধামিথ্যা রূপে
সত্যেরে তো হানে না বিদ্রূপে।
ওরা আছে নিজ স্থান পেয়ে;
দারিদ্র৻ের মূল্য বেশি লুপ্তমূল্য ঐশ্বর্যের চেয়ে।
এদিকে চাহিয়া দেখো টিটাগড়।
লোষ্ট্রে লৌহে বন্দী হেথা কালবৈশাখীর পণ্যঝড়।
বণিকের দম্ভে নাই বাধা,
আসমুদ্র পৃথ্বীতলে দৃপ্ত তার অক্ষুণ্ন মর্যাদা।
প্রয়োজন নাহি জানে ওরা
ভূষণে সাজায়ে হাতিঘোড়া
সম্মানের ভান করিবার,
ভুলাইতে ছদ্মবেশী সমুচ্চ তুচ্ছতা আপনার।
শেষের পংক্তিতে যবে থামিবে ওদের ভাগ্যলিখা,
নামিবে অন্তিম যবনিকা,
উত্তাল রজতপিণ্ড-উদ্ধারের শেষ হবে পালা,
যন্ত্রের কিঙ্করগুলো নিয়ে ভস্মডালা
লুপ্ত হবে নেপথ্যে যখন,
পশ্চাতে যাবে না রেখে প্রেতের প্রগল্ভ প্রহসন।
উদাত্ত যুগের রথে বল্গাধরা সে রাজপুতানা
মরুপ্রস্তরের স্তরে একদিন দিল মুষ্টি হানা;
তুলিল উদ্ভেদ করি কলোল্লোলে মহা-ইতিহাস
প্রাণে উচ্ছ্বসিত, মৃত্যুতে ফেনিল; তারি তপ্তশ্বাস
স্পর্শ দেয় মনে, রক্ত উঠে আবর্তিয়া বুকে--
সে যুগের সুদূর সম্মুখে
স্তব্ধ হয়ে ভুলি এই কৃপণ কালের দৈন্যপাশে-
জর্জরিত, নতশির অদৃষ্টের অট্টহাসে,
গলবদ্ধ পশুশ্রেণীসম চলে দিন পরে দিন
লজ্জাহীন।
জীবনমৃত্যুর দ্বন্দ্ব-মাঝে
সেদিন যে দুন্দুভি মন্দ্রিয়াছিল তার প্রতিধ্বনি বাজে
প্রাণের কুহরে গুমরিয়া। নির্ভয় দুর্দান্ত খেলা,
মনে হয়, সেই তো সহজ, দূরে নিক্ষেপিয়া ফেলা
আপনারে নিঃসংশয় নিষ্ঠুর সংকটে। তুচ্ছ প্রাণ
নহে তো সহজ; মৃত্যুর বেদিতে যার কোনো দান
নাই কোনো কালে সেই তো দুর্ভর অতি,
আপনার সঙ্গে নিত্য বাল্যপনা দুঃসহ দুর্গতি।
প্রচণ্ড সত্যেরে ভেঙে গল্পে রচে অলস কল্পনা
নিষ্কর্মার স্বাদু উত্তেজনা,
নাট্যমঞ্চে ব্যঙ্গ করি বীরসাজে
তারস্বর আস্ফালনে উন্মত্ততা করে কোন্ লাজে।
তাই ভাবি হে রাজপুতানা,
কেন তুমি মানিলে না যথাকালে প্রলয়ের মানা,
লভিলে না বিনষ্টির শেষ স্বর্গলোক;
জনতার চোখ
দীপ্তিহীন
কৌতুকের দৃষ্টিপাতে পলে পলে করে যে মলিন।
শঙ্করের তৃতীয় নয়ন হতে
সম্মান নিলে না কেন যুগান্তের বহ্নির আলোতে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rajputana/
|
1274
|
জীবনানন্দ দাশ
|
হাজার বর্ষ আগে
|
প্রেমমূলক
|
সেই মেয়েটি এর থেকে নিকটতর হ’লো না :
কেবল সে দূরের থেকে আমার দিকে একবার তাকালো
আমি বুঝলাম
চকিত হয়ে মাথা নোয়ালো সে
কিন্তু তবুও তার তাকাবার প্রয়োজন – সপ্রতিভ হয়ে
সাত-দিন আট-দিন ন-দিন দশ-দিন
সপ্রতিভ হয়ে — সপ্রতিভ হয়ে
সমস্ত চোখ দিয়ে আমাকে নির্দিষ্ট করে
অপেক্ষা করে — অপেক্ষা ক’রে
সেই মেয়েটি এর চেয়ে নিকটতর হ’লো না
কারণ, আমাদের জীবন পাখিদের মতো নয়
যদি হ’ত
সেই মাঘের নীল আকাশে
(আমি তাকে নিয়ে) একবার ধবলাটের সমুদ্রের দিকে চলতাম
গাঙশালিখের মতো আমরা দু’টিতে
আমি কোন এক পাখির জীবনের জন্য অপেক্ষা করছি
তুমি কোন এক পাখির জীবনের জন্য অপেক্ষা করছো
হয়তো হাজার হাজার বছর পরে
মাঘের নীল আকাশে
সমুদ্রের দিকে যখন উড়ে যাবো
আমাদের মনে হবে
হাজার হাজার বছর আগে আমরা এমন উড়ে যেতে চেয়েছিলাম।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/hajar-borsho-agey/
|
1713
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
হেমলতা
|
প্রেমমূলক
|
কিছু কথা অন্ধকারে বিদেশে ঘুরছে,
কিছু কথা বাতাসে উড়ছে,
কিছু কথা আটকে আছে পাথরের তলে,
কিছু কথা ভেসে যাচ্ছে কাঁসাইয়ের জলে,
পুড়তে-পড়তে শুদ্ধ হয়ে উঠছে কিছু কথা।
হেমলতা,
তুমি কথা দিয়েছিলে, আমি দিতে এখনও পারিনি,
তাই বলে ছাড়িনি
আজও হাল।
বাতাসে আগুনে জলে উদয়াস্ত আজও মায়াজাল
টেনে যাচ্ছি, জোড়-মেলানো কথা
যদি পাই, তোমাকেই দেব। হেমলতা,
এক্ষুনি ভেঙে না তুমি ঘর।
ধৈর্য ধরো, ভিক্ষা দাও আর মাত্র কয়েকটি বছর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1585
|
956
|
জীবনানন্দ দাশ
|
এই পথ দিয়ে
|
চিন্তামূলক
|
এই পথ দিয়ে কেউ চ'লে যেতো জানি
এই ঘাস
নীলাকাশ_
এ সব শালিখ সোনালি ধান নরনারীদের
ছায়া-কাটাকুটি কালো রোদে
সে তার নিজের ছায়া ফেলে উবে যেতো;
আসন্ন রাত্রির দিকে সহসা দিনের আলো নষ্ট হ'য়ে গেলে
কোথাও নতুন ভোর র'য়ে গেছে জেনে
সে তার নিজের সাধ রৌদ্র স্বর্ণ সৃষ্টি করেছিলো।তবু্ও রাত্রির দিকে চোখ তার পড়েছিলো ব'লে
হে আকাশ, হে সময়, তোমার আলোকবর্ষব্যাপ্তি শেষ হ'লে
যখন আমার মৃত্যু হবে
সময়ের বঞ্চনায় বিরচিত সে -এক নারীর
অবলা নারীর মতো চোখ মনে রবে।#জীবনান্দদাশের অগ্রন্থিত কবিতা
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ei-poth-diye/
|
5937
|
সৈয়দ শামসুল হক
|
পরানের গহীন ভিতর-১০
|
সনেট
|
কে য্যান কানতে আছে- তার শব্দ পাওয়া যায় কানে,
নদীও শুকায়া যায়, আকালের বাতাস ফোঁপায়,
মানুষেরা বাড়িঘর বানায় না আর এই খানে,
গোক্ষুর লতায়া ওঠে যুবতীর চুলের খোঁপায়।
বুকের ভিতর থিকা লাফ দিয়া ওঠে যে চিক্কুর,
আমি তার সাথে দেই শিমুলের ফুলের তুলনা,
নিথর দুফুর বেলা, মরা পাখি, রবি কি নিষ্ঠুর,
আগুন লাগায়া দিবে, হবে খাক, তারি এ সূচনা।
অথচ আমারে কও একদিন এরও শ্যাষ আছে-
আষাঢ়ের পুন্নিমার আশা আর এ দ্যাশে করি না,
চক্ষু যে খাবলা দিয়া খায় সেই পাখি বসা গাছে,
অথচ খাড়ায়া থাকি, এক পাও কোথাও নড়ি না।
সকল কলস আমি কালঘাটে শূণ্য দেইখাছি,
তারে না দেইখাছি তাই দ্যাখনের চক্ষু দিতে রাজি।।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/poraner-gohin-bhitor-10/
|
4846
|
শামসুর রাহমান
|
দুলছে হাওয়ায় তাজ
|
রূপক
|
বেজায় ছোটোখাটো একটি
পক্ষীশাবক মাটিতে প্রায় গড়াতে
গড়াতে এগোচ্ছিল। ওকে দেখে
বড় মায়া হ’ল। জানি না কী ঘটবে ওর
ভবিষ্যতে। এই খুদে পাখি কি কাঁটাবন,
ইট-পাথর কিংবা কারও পায়ের আঘাত
পারবে সইতে? পারবে কি
বেঁচে থাকতে শেষতক?কিছুদিন পর সেই একই পথ অতিক্রম
করার কালে কে যেন আমার
কানে সুর ঢেলে করল উচ্চারণ, শোনো
হে পথিক, তুমি যে অসহায় ক্ষুদ্র
পক্ষীশাবকটিকে দেখে করুণায় আপ্লুত হয়েছিলে
অবেলায়, দ্যাখো চেয়ে ঐ গাছটির উঁচু ডালে
কেমন যুবরাজের ধরনে বসে আছে। দ্যাখো ওর
মাথায় কেমন দুলছে হাওয়ায় তাজ। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dulche-hawai-taj/
|
5360
|
শামসুর রাহমান
|
১৪০০ সালের সূচনায়
|
মানবতাবাদী
|
জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে সারারাত সহবাস করে
বেদনা ভুলতে গিয়ে আরো বেশি বেদনার্ত হই।
১৪০০ সালের আশা সত্তাময় মেখে নিতে চেয়ে
ক্রামগত বুনো অন্ধকারে ডুবে যাই।ক’দিন দু’চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই, চর্তুদিকে বিভীষিকা
নানান মুখোশ পরে নাচ জুড়ে দেয়, অন্ধকারে
আমার একান্ত পাশে মৃত্যু শুয়ে তাকে,
হিয়ায়িত মিসাইল যেন।হায়, সোমালিয়ায় মরছে কারা? মানুষ, মানুষ।
হায়, বসনিয়ায় মরছে কারা? মানুষ, মানুষ।
হায়, বসনিয়ায় ধর্ষিতা কারা? মায়েরা, বোনেরা।
বোম্বে, আর দিল্লী নগরীতে খুন হলো কারা? মানুষ, মানুষ।
ভোলায় আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরেছিল কারা? মানুষ, মানুষ।
প্রচ্ছন্ন মানিকগঞ্জে ধর্ষিতা হয়েছে কারা? মায়েরা বোনেরা।
সেখানে লুণ্ঠিত কারা? মানুষ, মানুষ।
এখানে লুণ্ঠিত কারা? মানুষ, মানুষ।‘মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়’-
মানবতা প্রায়শই ব্যধভূমিতে চলেছে, হায়।মৃত্যু প্রতিদিন খবরের কাগজে নিজের মুখ
পাখি-ডাকা সকালে দেখতে পেয়ে নিজেই আঁৎকে ওঠে খুব;
তবু মৃত্যু নিজেকে সাজিয়ে রাখে কম্পিউটারের
ঝকঝকে হরফে এবং বিজ্ঞাপিত হয় ভাঙনপ্রবণ বিশ্বময়।আমরা কি মৃত্যুর ফরমাশ খেটে নিত্যদিন মনুষ্যত্ব
শ্মশানে ও গোরস্থানে ফেলে রেখে মানুষের প্রাণ
লুটে নেবে? ১৪০০ সালের সূচনায় বিশ্ববাসী
এসো আজ আমরা সবাই হৃদয়ের গানে গানে
গোধূলির মেঘ থেকে রক্তচিহ্ন আর ষড়যন্ত্রকারীদের
কালো খাতা থেকে সব আতঙ্কের নকশা মুছে ফোলি।
চারণ কবিরা সুরে দশ দিগন্তে রটিয়ে দিন-
‘সকল মানুষ, বৃক্ষ-লতাগুল্ম, পশুপাশি শান্তিতে থাকুক। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/1400-saler-suchonay/
|
404
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বঁধু মিটিলনা সাধ
|
প্রেমমূলক
|
বঁধু, মিটিলনা সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়
তাই আবার বাসিতে ভালো আসিব ধরায়।আবার বিরহে তব কাঁদিব
আবার প্রণয় ডোরে বাঁধিব
শুধু নিমেষেরি তরে আঁখি দুটি ভ’রে
তোমারে হেরিয়া ঝ’রে যাব অবেলায়।যে গোধূলি-লগ্নে নববধূ হয় নারী
সেই গোধূলি-লগ্নে বঁধু দিল আমারে গেরুয়া শাড়িবঁধু আমার বিরহ তব গানে
সুর হয়ে কাঁদে প্রাণে প্রাণে
আমি নিজে নাহি ধরা দিয়ে
সকলের প্রেম নিয়ে দিনু তব পায়।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bodhu-mitilona-sadh/
|
2072
|
মহাদেব সাহা
|
আমি কেন এ-রকম
|
চিন্তামূলক
|
আমি যেন কী রকম সব কিছুতেই কী রকম
একটা ছেলেমানুষি-মানুষি ভাব
একটা দুঃখিত দুঃখিত ভাব, লজ্জা লজ্জা ভাব,
বুকের ভিতর আমি ধরে রাখি দুঃখের শিশির
পিতৃপুরুষের সেই বাক্যহীন অন্ধকার,
সেই ডুবুন্ত নৌকার দৃশ্য
আমার এ-বুক যেন ভুবন মাঝির সেই শ্যাওলা-পরা ঘাট
আমি প্রতি রাতে শেষ তারা ডুবে যাওয়া লক্ষ্য করে কাঁদি
তবু প্রকাশ্যে এমন আমি এ-রকম
এই ছেলে মানুষি মানুষি ভাব, লজ্জা লজ্জা ভাব!
আমি দুঃখিত হলেও লোকে ভাবে ও কিচ্ছু না শুধু
দুঃখ দুঃখ ভাব
আমি কাঁদলেও কান্না কান্না ভাব বলে ভাবে,
ভালোবাসলেও আমি ধরে নেয় মাত্র ছেলেখেলা
আমি কেন এ-রকম
এই ছেলেমানুষি-মানুষি ভাব, লজ্জা লজ্জা ভাব
আমি কেন অহঙ্কারে হাঁটতে পারি না
দশ হাত ফুলিয়ে বুকের ছাতি,
আমার দুঃখের কথা, লালসার কথা, এই নারীলিপ্সার কথা
কেন সিঃসঙ্কোচে বলতে পারি না,
কেন অবিশ্বাসী হাসি হেসে বলতে পারি না
পাপ বলে কিছু নাই,
আমি ক্ষতিগ্রস্থ হলে, অপমান হলে
জল ছুঁয়ে, ভূমি স্পর্শ করে, নারীর অঙ্গ ছুঁয়ে
কেন আমি কাউকে পারি না দিতে ভয়ঙ্কর ক্রূর অভিশাপ!
আমি কেন এ-রকম সব কিছুতেই
এই ছেলেমানুষি-মানুষি ভাব, লাজুক লাজুক ভাব।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1447
|
5766
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
চায়ের
|
চিন্তামূলক
|
লণ্ডনে আছে লাস্ট বেঞ্চির ভীরু পরিমল,
রথীন এখন সাহিত্যে এক পরমহংস
দীপু তো শুনেছি খুলেছে বিরাট কাগজের কল
এবং পাঁচটা চায়ের বাগানে দশআনি অংশ
তদুপরি অবসর পেলে হয় স্বদেশসেবক; আড়াই ডজন আরশোলা ছেড়ে ক্লাস ভেঙেছিল পাগলা অমল
সে আজ হয়েছে মস্ত অধ্যাপক!
কি ভয়ংকর উজ্জ্বল ছিল সত্যশরণ
সে কেন নিজের কণ্ঠ কাটলো ঝকঝকে ক্ষুরে –
এখনো ছবিটি চোখে ভাসলেই জাগে শিহরণ
দূরে চলে যাবে জানতাম, তবু এতখানি দূরে ?গলির চায়ের দোকানে এখন আর কেউ নেই
একদা এখানে সকলে আমরা স্বপ্নে জেগেছিলাম
এক বালিকার প্রণয়ে ডুবেছি এক সাথে মিলে পঞ্চজনেই
আজ এমনকি মনে নেই সেই মেয়েটিরও নাম।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%8b/
|
1978
|
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
|
ছেড়েছি
|
প্রেমমূলক
|
দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়-চাপা দিন
চাঁদের মতো স্বপ্ন সরে যায়
রোপওয়ে ধরে পৌঁছে যাই আমি
মোহনা থেকে অন্য মোহনায়লবণহ্রদে মিষ্টি ঘর বাড়ি
আকাশে উড়ে ল্যাংড়া কোনো ঘোড়া
বাঁকুড়া থেকে কিনেছি কম দামে
হাত-পা-মাথা শিল্প দিয়ে মোড়াশিল্প দিয়ে ধুয়েছি চোখ মুখ
শিল্প মেখে খেয়েছি কত ভাত
মধ্যিখানে শিল্প ছিল বলে
এড়িয়ে গেছি অনেক সংঘাতঅহিংসাই গর্ভ থেকে তাও
পায়ের নীচে জন্ম নিল ঘাস
আমাকে তুমি জন্তু ভেবেছিলে
তোমাকে আমি ভাবিনি মিনিবাসকখনো তাই দেইনি রুট ম্যাপ
বলেছি—যাও, ইচ্ছে মতো ঘোরো
শুধু তাই নয় যৌন কাতরতা
কাতর হয়ে রয়েছে অন্তরওশূন্য মুখে চুমু খাওয়ার স্মৃতি
তাকেও তাড়া করছে নিশিদিন
ক্লান্ত ভেবে দিয়েছি যাকে জল
তৃষ্ণা তাকে করেছে ক্ষমাহীনচেয়েছি চাল ক্ষমার মতো করে
পেয়েছি পোকামাকড়, লতাপাতা
দেয়াল ছুঁয়ে বুঝেছি ইঁটগুলো
কয়েদিদের ভাগ্য নির্মাতাবন্দিদশা কামড়ে ধরো দাঁতে
প্রণাম করো নির্মাতার পায়ে
তোমাকে আমি বিস্কুটের মতো
ডুবিয়ে নেব ডাবল-হাফ চায়েচামচে দিয়ে তুলব তারপরে
দেখব তুমি নরম নাকি শক্ত
ভালোবাসার অন্য মানে নেই
রক্তে শুধু মিশতে থাকে রক্তরক্তবীজ তোমারই সন্তান
সম্পর্কে আমারও কেউ হয়
চালালে ছুরি ফিনকি দিয়ে ধারা
গড়িয়ে যায়…তবুও অব্যয়আমাকে তুমি খরচা করে তােড়ে
ফুরিয়ে ফেল ভীষণ অপচয়ে
রক্ত, এত রক্ত দেখে আমি
বোবার মতাে সিঁটিয়ে আছি ভয়েগর্ত খুঁড়ে বেরিয়ে আসা সার
ঢুকতে হবে অন্য কোনও ঘােরে
পাহাড় থেকে উপচে ওঠা জল
ঝরনা শুষে নিচ্ছে প্রাণভরেহিংসে, বড় হিংসে করি ওকে
ত্রিভুজ থেকে একটা কোনও বাহু
সরিয়ে নিয়ে লাঠির মতাে ধরি
আমাকে ধরে আদর করে রাহুকেতুর কথা বলাও লােকসান
অনুভূতির অন্ধকার ঘরে
ও এতখানি নিঃস্ব, বেপরােয়া
যতটা পারে শ্লীলতাহানি করেবানিয়ে ছাড়ে সমাজচ্যুত ঢপ
ছাড়ার আগে ধরিয়ে দেয় নেশা
রাস্তা, এঁদোগলিতে, ফুটব্রিজে
কুকুর ডাকে, শুনতে পাই হ্রেষাচাবুক কোনও চাবুক চাই না তাে
পক্ষীরাজ, আমি তােমার ডানা
আমাকে তুমি মিশিয়ে দাও মেঘে
তুমি তাে নও বাঁকুড়া থেকে আনানা যদি তবে মাটিতে ঠোকো ক্ষুর
তুমি তাে নও কেবলই ভঙ্গিমা
বিশ্বরূপ দেখতে চাইছি না
দেখাও অনুতাপের পরিসীমাযেখানে জলদস্যুগুলাে সব
দাঁড়িয়ে থাকে যেন বা জলঘট
মাংস আর চর্বি মিলেমিশে
চেতনা, চৈতন্য, যানজটমুক্তিপথে সাধক নয় একা
বাঁ পাশে তার সাধনসঙ্গিনী
চিনিনি চোখে কুয়াশা ছিল বলে
কুয়াশা, আমি তোমার কাছে ঋণীধার বাকির ভিতরও হুল্লোড়
ছুটছে কাঁচা শ্যাম্পেনের মতাে
আকাশ থেকে বাতিল হওয়া তারা
মাটিতে নেমে এসেও বিব্রতবোঝে না লোকে কি ভাবে মুখ বুজে
সহ্য করে প্রেমের অপমান
ভাষার চক্রান্তে মেনে নেয়
দানের পাশে বসানো প্রতিদানমানি না, আমি মানিনি কোন দিন
কল্পতরু—নিজেও কল্পনা
ছিনিয়ে নেবে হ্যাঁচকা টান দিয়ে
দিও না কানে অন্য কারও সােনালাগুক রং মাটির মূর্তিতে
পলকে জ্বলে উঠুক ত্রিনয়ন
খয়েরি, নীল, গোলাপি মিথ্যায়
সত্য শুধু—ভবতারিণী মাহারিয়ে যারা ফেলেছে—পাক পথ
প্রশ্ন যারা করেছে—উত্তর
বরফ যদি ডুবতে চায় মদে
মৃত্যু তুমি হয়ো না তৎপরপাথর মেলে ধরুক বিষদাঁত
তুলুক ফণা নিথর কালাে জলও
বর্তমান তবুও ঘটমান
আমাকে প্রভু শিকাগো যেতে বলাে…পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a7%9c%e0%a7%87%e0%a6%9b%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%ac-%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ad%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b6%e0%a6%be-%e0%a6%ac/
|
159
|
আহসান হাবীব
|
ছড়া
|
ছড়া
|
ঝাউয়ের শাখায় শন শন শন
মাটিতে লাটিম বন বন বন
বাদলার নদী থৈ থৈ থৈ
মাছের বাজার হৈ হৈ হৈ।
ঢাকিদের ঢাক ডুমডুমাডুম
মেঘে আর মেঘে গুড়ুমগুড়ুম
দুধকলাভাত সড়াত সড়াত
আকাশে বাজে চড়াৎ চড়াৎ।
ঘাস বনে সাপ হিস হিস হিস
কানে কানে কথা ফিস ফিস ফিস
কড়কড়ে চটি চটাস চটাস
রেগেমেগে চড় ঠাস ঠাস ঠাস।
খোপের পায়রা বকম বকম
বিয়েমজলিশ গম গম গম
ঘাটের কলসি বুট বুট বুট
আঁধাঁরে ইঁদুর কুট কুট কুট।
বেড়ালের ছানা ম্যাও ম্যাও ম্যাও
দু দিনের খুকু ওঁয়াও ওঁয়াও।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3801.html
|
3889
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শেষের কবিতা
|
ভক্তিমূলক
|
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্য উধাও।
জাগিছে অন্তরীক্ষে হৃদয় স্পন্দন
চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল
তুলে নিল দ্রুত রথে
দু’সাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম।
আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়;
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।কোনদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
বসন্ত বাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রাণে, বিস্মৃতি প্রাদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা স্বপ্নে মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর সেই মৃত্যুঞ্জয় –
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলাম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু বিদায়।তোমায় হয়নি কোন ক্ষতি।
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত মুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক তাহারি আরতি
হোক তবে সন্ধ্যা বেলা-
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগ বেগে
ভ্রষ্ট্র নাহি হবে তার কোন ফুল নৈবদ্যের থালে।
তোমার মানস ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর ত’ষায়
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে বচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু বিদায়।মোর লাগি করিয়ো না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠা আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সে ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে
সে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গন্ডুষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম,
ওগো নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shesher-kobita/
|
903
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অনুপম ত্রিবেদী
|
শোকমূলক
|
এখন শীতের রাতে অনুপম ত্রিবেদীর মুখ জেগে ওঠে।
যদিও সে নেই আজ পৃথিবীর বড়ো গোল পেটের ভিতরে
সশরীরে; টেবিলের অন্ধকারে তবু এই শীতের স্তব্ধতা
এক পৃথিবীর মৃত জীবিতের ভিড়ে সেই স্মরণীয় মানুষের কথা
হৃদয়ে জাগায়ে যায়; টেবিলে বইয়ের স্তুপ দেখে মনে হয়
যদিও প্লেটোর থেকে রবি ফ্রয়েড নিজ নিজ চিন্তার বিষয়
পরিশেষ করে দিয়ে শিশিরের বালাপোশে অপরূপ শীতে
এখন ঘুমায়ে আছে—তাহাদের ঘুম ভেঙে দিতে
নিজের কুলুপ এঁটে পৃথিবীতে—ওই পারে মৃত্যুর তালা
ত্রিবেদী কি খোলে নাই? তান্ত্রিক উপাসনা মিস্টিক ইহুদী কাবালা
ঈশার শবোত্থান—বোধিদ্রুমের জন্ম মরণের থেকে শুরু ক’রে
হেগেল ও মার্কস : তার ডান আর বাম কান ধ’রে
দুই দিকে টেনে নিয়ে যেতেছিল; এমন সময়
দু পকেটে হাত রেখে ভ্রুকুটির চোখে নিরাময়
জ্ঞানের চেয়েও তার ভালো লেগে গেল মাটি মানুষের প্রেম;
প্রেমের চেয়েও ভালো মনে হল একটি টোটেম :
উটের ছবির মতো—একজন নারীর হৃদয়ে;
মুখে-চোখে আকুতিতে মরীচিকা জয়ে
চলেছে সে; জড়ায়েছে ঘিয়ের রঙের মতো শাড়ি;
ভালো ক’রে দেখে নিলে মনে হয় অতীব চতুর দক্ষিণরাঢ়ী
দিব্য মহিলা এক; কোথায় সে আঁচলের খুঁট;
কেবলই উত্তরপাড়া ব্যাণ্ডেল কাশীপুর বেহালা খুরুট
ঘুরে যায় স্টালিন, নেহেরু, ব্লক, অথবা রায়ের বোঝা ব’য়ে,
ত্রিপাদ ভূমির পরে আরো ভূমি আছে এই বলির হৃদয়ে?
তা হলে তা প্রেম নয়; ভেবে গেল ত্রিবেদীর হৃদয়ের জ্ঞান।
জড় ও অজড় ডায়ালেক্টিক্ মিলে আমাদের দু দিকের কান
টানে ব’লে বেঁচে থাকি—ত্রিবেদীকে বেশি জোরে দিয়েছিল টান। (মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/onupom-tribedi/
|
353
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
দুপুর-অভিসার
|
প্রেমমূলক
|
যাস কোথা সই একলা ও তুই অলস বৈশাখে?
জল নিতে যে যাবি ওলো কলস কই কাঁখে? সাঁঝ ভেবে তুই ভর-দুপুরেই দু-কূল নাচায়ে
পুকুরপানে ঝুমুর ঝুমুর নূপুর বাজায়ে
যাসনে একা হাবা ছুঁড়ি,
অফুট জবা চাঁপা-কুঁড়ি তুই!
দ্যাখ্ রং দেখে তোর লাল গালে যায়
দিগ্বধূ ফাগ থাবা থাবা ছুঁড়ি,
পিক-বধূ সব টিটকিরি দেয় বুলবুলি চুমকুড়ি –
ওলো বউল-ব্যাকুল রসাল তরুর সরস ওই শাখে॥
দুপুর বেলায় পুকুর গিয়ে একূল ওকূল গেল দুকূল তোর,
ওই চেয়ে দ্যাখ পিয়াল-বনের দিয়াল ডিঙে এল মুকুল-চোর।
সারং রাগে বাজায় বাঁশি নাম ধরে তোর ওই,
রোদের বুকে লাগল কাঁপন সুর শুনে ওর সই।
পলাশ অশোক শিমূল-ডালে
বুলাস কি লো হিঙুল গালে তোর?
আ – আ মলো যা! তাইতে হা দ্যাখ,
শ্যাম চুমু খায় সব সে কুসুম লালে
পাগলি মেয়ে! রাগলি নাকি? ছি ছি দুপুর-কালে
বল কেমনে দিবি সরস অধর-পরশ সই তাকে? (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/dupur-ovisar/
|
4131
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
জোৎস্না রাতে
|
প্রেমমূলক
|
যদি কখনও জোৎস্না রাতে
আমার কথা মনে পড়ে
এত তাঁরার মাঝে আমায়
কিভাবে খুজে নিবে?
আমি তখন মিশে যাবো
সকল তারার মাঝে,
শত চেষ্টা করেও তুমি
আমাকে পাবেনা কো খুজে।
যদি হন্য হয়ে ঘুর তুমি
অন্য কোন গ্রহে,
যেথায় যাও সেথায় তুমি
পাবেনা কো খুজে।
যদি যাও মঙ্গল গ্রহে
আমার দেখা পেতে
আমি তখন মিশে যাবো
মঙ্গল গ্রহের সাথে।
মঙ্গল গ্রহে না পেয়ে যদি
চলে যাও চাঁদে,
চাঁদেও আমায় পাবেনা কো
ফিরবে খালি হাতে।
পৃথিবীতে ফিরে আবার তুমি
আমায় খুজতে থাক
খবর পাবে আমি নেই আর
এই পৃথিবীর মাঝে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2192.html
|
755
|
জয় গোস্বামী
|
স্বেচ্ছা
|
মানবতাবাদী
|
ওরা তো জমি দিয়েছে স্বেচ্ছায়
ওরাতো ঘর ছেড়েছে স্বেচ্ছায়
লাঠির নিচে ওরা তো স্বেচ্ছায়
পেতেছে পিঠ, নীচু করেছে মাথা
তোমরা কেন দেখতে পাও না তা
দেখেছি, সবই দেখেছি স্বেচ্ছায়
বাধ্য হয়ে দেখেছি স্বেচ্ছায়
মানব অধিকারের শবদেহ
বানের জলে দেখেছি ভেসে যায়
রাজ-আদেশে হাতকড়া-পড়ানো
রক্তঝরা গণতন্ত্রটিকে
প্রহরীদল হাঁটিয়ে নিয়ে যায়
প্রহরীদল মশানে নিয়ে যায়
আমরা সব দাঁড়িয়ে রাজপথে
দেখেছি, শুধু দেখেছি — স্বেচ্ছায়
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1685.html
|
2972
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
খোকার রাজ্য
|
ছড়া
|
খোকার মনের ঠিক মাঝখানটিতে
আমি যদি পারি বাসা নিতে—
তবে আমি একবার
জগতের পানে তার
চেয়ে দেখি বসি সে নিভৃতে।
তার রবি শশী তারা
জানি নে কেমনধারা
সভা করে আকাশের তলে,
আমার খোকার সাথে
গোপনে দিবসে রাতে
শুনেছি তাদের কথা চলে।
শুনেছি আকাশ তারে
নামিয়া মাঠের পারে
লোভায় রঙিন ধনু হাতে,
আসি শালবন -' পরে
মেঘেরা মন্ত্রণা করে
খেলা করিবারে তার সাথে।
যারা আমাদের কাছে
নীরব গম্ভীর আছে,
আশার অতীত যারা সবে,
খোকারে তাহারা এসে
ধরা দিতে চায় হেসে
কত রঙে কত কলরবে।
খোকার মনের ঠিক মাঝখান ঘেঁষে
যে পথ গিয়েছে সৃষ্টিশেষে
সকল-উদ্দেশ-হারা
সকল-ভূগোল-ছাড়া
অপরূপ অসম্ভব দেশে—
যেথা আসে রাত্রিদিন
সর্ব-ইতিহাস-হীন
রাজার রাজত্ব হতে হাওয়া,
তারি যদি এক ধারে
পাই আমি বসিবারে
দেখি কারা করে আসা-যাওয়া।
তাহারা অদ্ভুত লোক,
নাই কারো দুঃখ শোক,
নেই তারা কোনো কর্মে কাজে,
চিন্তাহীন মৃত্যুহীন
চলিয়াছে চিরদিন
খোকাদের গল্পলোক-মাঝে।
সেথা ফুল গাছপালা
নাগকন্যা রাজবালা
যাহা খুশি তাই করে,
সত্যেরে কিছু না ডরে,
সংশয়েরে দিয়ে যায় ফাঁকি। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khokar-rajyo/
|
6041
|
হেলাল হাফিজ
|
নিখুঁত স্ট্র্যাটেজী
|
মানবতাবাদী
|
পতন দিয়েই আমি পতন ফেরাবো বলে
মনে পড়ে একদিন জীবনের সবুজ সকালে
নদীর উলটো জলে সাঁতার দিয়েছিলাম।
পতন দিয়েই আমি পতন ফেরাবো বলে
একদিন যৌবনের শৈশবেই
যৌবনকে বাজি ধরে
জীবনের অসাধারণ স্কেচ এঁকেছিলাম।
শরীরের শিরা ও ধমনী থেকে লোহিত কণিকা দিয়ে আঁকা
মারাত্মক উজ্জ্বল রঙের সেই স্কেচে
এখনো আমার দেখো কী নিখুঁত নিটোল স্ট্র্যাটেজী।
অথচ পালটে গেলো কতো কিছু,–রাজনীতি,
সিংহাসন, সড়কের নাম, কবিতার কারুকাজ,
কিশোরী হেলেন।
কেবল মানুষ কিছু এখনো মিছিলে, যেন পথে-পায়ে
নিবিড় বন্ধনে তারা ফুরাবে জীবন।
তবে কি মানুষ আজ আমার মতন
নদীর উলটো জলে দিয়েছে সাঁতার,
তবে কি তাদের সব লোহিত কণিকা
এঁকেছে আমার মতো স্কেচ,
তবে কি মানুষ চোখে মেখেছে স্বপন
পতন দিয়েই আজ ফেরাবে পতন।
৪.১.৭৪
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/113
|
2921
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কৃতীর প্রমাদ
|
নীতিমূলক
|
টিকি মুণ্ডে চড়ি উঠি কহে ডগা নাড়ি,
হাত-পা প্রত্যেক কাজে ভুল করে ভারি।
হাত-পা কহিল হাসি, হে অভ্রান্ত চুল,
কাজ করি আমরা যে, তাই করি ভুল। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kritir-promad/
|
312
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
চিরশিশু
|
মানবতাবাদী
|
নাম-হারা তুই পথিক-শিশু এলি অচিন দেশ পারায়ে।
কোন্ নামের আজ প’রলি কাঁকনম বাঁধনহারায় কোন্ কারা এ।।
আবার মনের মতন ক’রে
কোন্ নামে বল ডাক্ব তোরে!
পথ-ভোলা তুই এই সে ঘরে
ছিলি ওরে এলি ওরে
বারে বারে নাম হারায়ে।।
ওরে যাদু ওরে মাণিক, আঁধার ঘরের রতণ-মাণি!
ক্ষুধিত ঘর ভ’রলি এনে ছোট্ট হাতের একটু ননী।
আজ যে শুধু নিবিড় সুখে
কান্না-সায়র উথলে বুকে,
নতুন নামে ডাকতে তোকে
ওরে ও কে কন্ঠ র”খে’
উঠছে কেন মন ভারায়ে!
অস্ত হ’তে এলে পথিক উদয় পানে পা বাড়ায়ে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/848
|
662
|
জয় গোস্বামী
|
জগতে
|
স্বদেশমূলক
|
জগতে আনন্দযজ্ঞে
পেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
মিলেছি চোর সাধু ডাকাতপেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
জগতে আনন্দযজ্ঞে
জেনেছি নাচন কোঁদন সার
কিছুতেই টলবে না সংসারকিছুতেই টলবে না সংসার
জগতে আনন্দযজ্ঞে
রাখিনি গুড় গুড় ঢাক ঢাক
আমরা ভাত ছড়ালেই কাকআমরা ভাত ছড়ালেই কাক
জগতে আনন্দযজ্ঞে
যেখানে যা রাখবি তা রাখ
আমরা চিচিং চিচিং ফাঁকআমরা চিচিং চিচিং ফাঁক
আমাদের যা ইচ্ছে হোক গে
জগতে আনন্দযজ্ঞে
আমরা সব হারানো লোক
আকাশে ভাসিয়ে দিলাম চোখসাগরে ভাসিয়ে দিলাম চোখ
যা রে যা চোখ ভেসে যা দূর
আমার দূরের পলাশপুর
যেখানে বাংলাদেশের মন
ঘুমোলো মা-হারা ভাই বোনযেখানে সাত কাকে দাঁড় বায়
সুরের ময়ূরপঙ্খী না’য়
যেখানে হাওয়ায় হাওয়ায় ডাকে
ও গান মালঞ্চী কন্যাকে
মাধব মালঞ্চী কন্যাকেও তারে উড়িয়ে নিলো পাখা
ও তার বৃষ্টিতে মুখ ঢাকা
অঝোর বৃষ্টিতে মুখ ঢাকাতখন ভেসেছে নৌকাটি
হাওয়ায় ভেসেছে নৌকাটি
তলায় বাংলাদেশের মাটিমাটিতে আমরা কয়েকজন
আমরাই নির্ধনীয়ার ধন
পেয়েছি রাজকুমারীর মন
আরে যা রাজকুমারীর মনজানি না থাকবে কতক্ষণ
নাকি সে যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রজগতে আনন্দযজ্ঞে
পেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
মিলেছি চোর সাধু ডাকাতপেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
জগতে আনন্দযজ্ঞে
জেনেছি নাচন কোঁদন সার
কিছুতেই টলবে না সংসারকিছুতেই টলবে না সংসার
জগতে আনন্দযজ্ঞে
রাখিনি গুড় গুড় ঢাক ঢাক
আমরা ভাত ছড়ালেই কাকআমরা ভাত ছড়ালেই কাক
জগতে আনন্দযজ্ঞে
যেখানে যা রাখবি তা রাখ
আমরা চিচিং চিচিং ফাঁকআমরা চিচিং চিচিং ফাঁক
আমাদের যা ইচ্ছে হোক গে
জগতে আনন্দযজ্ঞে
আমরা সব হারানো লোক
আকাশে ভাসিয়ে দিলাম চোখসাগরে ভাসিয়ে দিলাম চোখ
যা রে যা চোখ ভেসে যা দূর
আমার দূরের পলাশপুর
যেখানে বাংলাদেশের মন
ঘুমোলো মা-হারা ভাই বোনযেখানে সাত কাকে দাঁড় বায়
সুরের ময়ূরপঙ্খী না’য়
যেখানে হাওয়ায় হাওয়ায় ডাকে
ও গান মালঞ্চী কন্যাকে
মাধব মালঞ্চী কন্যাকেও তারে উড়িয়ে নিলো পাখা
ও তার বৃষ্টিতে মুখ ঢাকা
অঝোর বৃষ্টিতে মুখ ঢাকাতখন ভেসেছে নৌকাটি
হাওয়ায় ভেসেছে নৌকাটি
তলায় বাংলাদেশের মাটিমাটিতে আমরা কয়েকজন
আমরাই নির্ধনীয়ার ধন
পেয়েছি রাজকুমারীর মন
আরে যা রাজকুমারীর মনজানি না থাকবে কতক্ষণ
নাকি সে যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রজগতে আনন্দযজ্ঞে
পেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
মিলেছি চোর সাধু ডাকাতপেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
জগতে আনন্দযজ্ঞে
জেনেছি নাচন কোঁদন সার
কিছুতেই টলবে না সংসারকিছুতেই টলবে না সংসার
জগতে আনন্দযজ্ঞে
রাখিনি গুড় গুড় ঢাক ঢাক
আমরা ভাত ছড়ালেই কাকআমরা ভাত ছড়ালেই কাক
জগতে আনন্দযজ্ঞে
যেখানে যা রাখবি তা রাখ
আমরা চিচিং চিচিং ফাঁকআমরা চিচিং চিচিং ফাঁক
আমাদের যা ইচ্ছে হোক গে
জগতে আনন্দযজ্ঞে
আমরা সব হারানো লোক
আকাশে ভাসিয়ে দিলাম চোখসাগরে ভাসিয়ে দিলাম চোখ
যা রে যা চোখ ভেসে যা দূর
আমার দূরের পলাশপুর
যেখানে বাংলাদেশের মন
ঘুমোলো মা-হারা ভাই বোনযেখানে সাত কাকে দাঁড় বায়
সুরের ময়ূরপঙ্খী না’য়
যেখানে হাওয়ায় হাওয়ায় ডাকে
ও গান মালঞ্চী কন্যাকে
মাধব মালঞ্চী কন্যাকেও তারে উড়িয়ে নিলো পাখা
ও তার বৃষ্টিতে মুখ ঢাকা
অঝোর বৃষ্টিতে মুখ ঢাকাতখন ভেসেছে নৌকাটি
হাওয়ায় ভেসেছে নৌকাটি
তলায় বাংলাদেশের মাটিমাটিতে আমরা কয়েকজন
আমরাই নির্ধনীয়ার ধন
পেয়েছি রাজকুমারীর মন
আরে যা রাজকুমারীর মনজানি না থাকবে কতক্ষণ
নাকি সে যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রজগতে আনন্দযজ্ঞে
পেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
মিলেছি চোর সাধু ডাকাতপেয়েছি হাত সাফাইয়ের হাত
জগতে আনন্দযজ্ঞে
জেনেছি নাচন কোঁদন সার
কিছুতেই টলবে না সংসারকিছুতেই টলবে না সংসার
জগতে আনন্দযজ্ঞে
রাখিনি গুড় গুড় ঢাক ঢাক
আমরা ভাত ছড়ালেই কাকআমরা ভাত ছড়ালেই কাক
জগতে আনন্দযজ্ঞে
যেখানে যা রাখবি তা রাখ
আমরা চিচিং চিচিং ফাঁকআমরা চিচিং চিচিং ফাঁক
আমাদের যা ইচ্ছে হোক গে
জগতে আনন্দযজ্ঞে
আমরা সব হারানো লোক
আকাশে ভাসিয়ে দিলাম চোখসাগরে ভাসিয়ে দিলাম চোখ
যা রে যা চোখ ভেসে যা দূর
আমার দূরের পলাশপুর
যেখানে বাংলাদেশের মন
ঘুমোলো মা-হারা ভাই বোনযেখানে সাত কাকে দাঁড় বায়
সুরের ময়ূরপঙ্খী না’য়
যেখানে হাওয়ায় হাওয়ায় ডাকে
ও গান মালঞ্চী কন্যাকে
মাধব মালঞ্চী কন্যাকেও তারে উড়িয়ে নিলো পাখা
ও তার বৃষ্টিতে মুখ ঢাকা
অঝোর বৃষ্টিতে মুখ ঢাকাতখন ভেসেছে নৌকাটি
হাওয়ায় ভেসেছে নৌকাটি
তলায় বাংলাদেশের মাটিমাটিতে আমরা কয়েকজন
আমরাই নির্ধনীয়ার ধন
পেয়েছি রাজকুমারীর মন
আরে যা রাজকুমারীর মনজানি না থাকবে কতক্ষণ
নাকি সে যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর যাবে বিসর্জন
ও ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9c%e0%a6%97%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%af%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a7%87-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac/
|
1990
|
বিষ্ণু দে
|
তিনটি কাঠবিড়ালী
|
মানবতাবাদী
|
অনেক দিনের অনেক যত্নে কমিয়েছি সন্ত্রাস।
এদিকে আমার ছুটি শেষ হ’ল প্রায়,
আজ তিনটেতে গাছ থেকে নেমে বসেছিলো জানলায়।
এত ভীরু এত বিনীত কেন যে! এরাই তো ছিল খাস
সমুদ্র-জয়ী সীতা-সন্ধানী সেতুবন্ধের সঙ্গী;
দীন সজ্জন সাহসী উত্সাহিত
মজুরেরই মত ভঙ্গী।
এরা কেন ভয়ে ডালে-ডালে ঘোরে আজ?
এরা কোনও কালে করেনি তো লাফঝাঁপ
রামরাজত্বে সরকারি রামদাস!
যদিচ এদেরই কোমল অঙ্গে পাঁচ-আঙুলের ছাপ।
অনেক যত্নে নামিয়েছি আজ গাছ থেকে জানলায়
ভাবছি এখন কি ক’রে বাঁচাব এদের এ-বিশ্বাস!
হোটেল ছাড়ার সময় হয়েছে প্রায়।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4123.html
|
3666
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভীরু
|
মানবতাবাদী
|
কেন এ কম্পিত প্রেম, অয়ি ভীরু, এনেছ সংসারে--
ব্যর্থ করি রাখিবে কি তারে।
আলোকশঙ্কিত তব হিয়া
প্রচ্ছন্ন নিভৃত পথ দিয়া
থেমে যায় প্রাঙ্গণের দ্বারে।হায়, সে যে পায় নাই আপন নিশ্চিত পরিচয়,
বন্দী তারে রেখেছে সংশয়।
বাহিরে সামান্য বাধা সেও
সে-প্রেমেরে কেন করে হেয়,
অন্তরেও তার পরাজয়।ওই শোনো কেঁপে ওঠে নিশীথরাত্রির অন্ধকার,
আহ্বান আসিছে বারম্বার।
থেকো না ভয়ের অন্ধ ঘেরে,
অবজ্ঞা করিয়ো দুর্গমেরে,
জিনি লহো সত্যেরে তোমার।নিষ্ঠুরকে মেনে লহো সুদুঃসহ দুঃখের উৎসাহে,
প্রেমের গৌরব জেনো তাহে।
দীপ্তি দেয় রুদ্ধ অশ্রুজল,
নষ্ট আশা হয় না নিষ্ফল,
সমুজ্জল করে চিত্তদাহে।শীর্ণ ফুল রৌদ্রে পুড়ে কালো হয়, হোক-না সে কালো--
দীন দীপে নিবুক-না আলো।
দুর্বল যে মিথ্যার খাঁচায়
নিত্যকাল কে তারে বাঁচায়,
মরে যাহা মরা তার ভালো।আঘাত বাঁচাতে গিয়ে বঞ্চিত হবে কি এ-জীবন,
শুধিবে না দুর্মূল্যের পণ।
প্রেম সে কি কৃপণতা জানে,
আত্মরক্ষা করে আত্মদানে--
ত্যাগবীর্যে লভে মুক্তিধন।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/beru/
|
307
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
চিঠি
|
ছড়া
|
[ছন্দ :- “এই পথটা কা-টবো
পাথর ফেলে মা-রবো”]ছোট্ট বোনটি লক্ষ্মী
ভো ‘জটায়ু পক্ষী’!
য়্যাব্বড়ো তিন ছত্র
পেয়েছি তোর পত্র।
দিইনি চিঠি আগে,
তাইতে কি বোন রাগে?
হচ্ছে যে তোর কষ্ট
বুঝতেছি খুব পষ্ট।
তাইতে সদ্য সদ্য
লিখতেছি এই পদ্য।
দেখলি কী তোর ভাগ্যি!
থামবে এবার রাগ কি?
এবার হতে দিব্যি
এমনি করে লিখবি!
বুঝলি কী রে দুষ্টু
কী যে হলুম তুষ্টু
পেয়ে তোর ওই পত্র –
যদিও তিন ছত্র!
যদিও তোর অক্ষর
হাত পা যেন যক্ষর,
পেটটা কারুর চিপসে,
পিঠটে কারুর ঢিপসে,
ঠ্যাংটা কারুর লম্বা,
কেউ বা দেখতে রম্ভা!
কেউ যেন ঠিক থাম্বা,
কেউ বা ডাকেন হাম্বা!
থুতনো কারুর উচ্চে,
কেউ বা ঝুলেন পুচ্ছে!
এক একটা যা বানান
হাঁ করে কী জানান!
কারুর গা ঠিক উচ্ছের,
লিখলি এমনি গুচ্ছের!
না বোন, লক্ষ্মী, বুঝছ?
করব না আর কুচ্ছো!
নইলে দিয়ে লম্ফ
আনবি ভূমিকম্প!
কে বলে যে তুচ্ছ!
ওই যে আঙুর গুচ্ছ!
শিখিয়ে দিল কোন্ ঝি
নামটি যে তোর জন্টি?
লিখবে এবার লক্ষ্মী
নাম ‘জটায়ু পক্ষী!’
শিগগির আমি যাচ্চি,
তুই বুলি আর আচ্ছি
রাখবি শিখে সব গান
নয় ঠেঙিয়ে – অজ্ঞান!
এখনও কি আচ্ছু
খাচ্ছে জ্বরে খাপচু?
ভাঙেনি বউদির ঠ্যাংটা।
রাখালু কি ন্যাংটা?
বলিস তাকে, রাখালী!
সুখে রাখুন মা কালী!
বৌদিরে কোস দোত্তি
ধরবে এবার সত্যি।
গপাস করে গিলবে
য়্যাব্বড়ো দাঁত হিলবে!
মা মাসিমায় পেন্নাম
এখান হতেই করলাম!
স্নেহাশিস এক বস্তা,
পাঠাই, তোরা লস তা!
সাঙ্গ পদ্য সবিটা?
ইতি। তোদের কবি-দা। (ঝিঙেফুল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/chithi/
|
2336
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
নূতন বৎসর
|
সনেট
|
ভূত-রূপ সিন্ধু-জলে গড়ায়ে পড়িল
বৎসর, কালের ঢেউ, ঢেউর গমনে।
নিত্যগামী রথচক্র নীরবে ঘুরিল
আবার আয়ুর পথে। হৃদয়-কাননে,
কত শত আশা-লতা শুখায়ে মরিল,
হায় রে, কব তা কারে, কব তা কেমনে!
কি সাহসে আবার বা রোপিব যতনে ।
সে বীজ, যে বীজ ভূতে বিফল হইল!
বাড়িতে লাগিল বেলা ; ডুবিবে সত্বরে
তিমিরে জীবন-রবি। আসিছে রজনী,
নাহি যার মুখে কথা বায়ু-রূপ স্বরে ;
নাহি যার কেশ-পাশে তারা-রূপ মণি ;
চির-রুদ্ধ দ্বার যার নাহি মুক্ত করে
ঊষা,—তপনের দূতী, অরুণ-রমণী!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/nuton-btsor/
|
2357
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
বাল্মীকি
|
সনেট
|
স্বপনে ভ্রমিনু আমি গহন কাননে
একাকী ৷ দেখিনু দূরে যুব এক জন,
দাঁড়ায়ে তাহার কাছে প্রাচীন ব্রাহ্মণ---
দ্রোণ যেন ভয়-শূন্য কুরুক্ষেত্র-রণে ৷
''চাহিস্ বধিতে মোরে কিসের কারণে?''
জিজ্ঞাসিলা দ্বিজবর মধুর বচনে ৷
''বধি তোমা হরি আমি লব তব ধন,''
উত্তরিলা যুব জন ভীম গরজনে ৷---
পরিবরতিল স্বপ্ন ৷ শুনিনু সত্বরে
সুধাময় গীত-ধ্বনি,আপনি ভারতী,
মোহিতে ব্রহ্মার মনঃ,স্বর্ণ বীণা করে,
আরম্ভিলা গীত যেন---মনোহর অতি!
সে দুরন্ত যুব জন,সে বৃদ্ধের বরে,
হইল,ভারত,তব কবি-কুল-পতি!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/valmiki/
|
3703
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মহাস্বপ্ন
|
প্রকৃতিমূলক
|
পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন,
নিদ্রামগ্ন মহাদেব দেখিছেন মহান্ স্বপন্।
বিশাল জগৎ এই প্রকাণ্ড স্বপন সেই,
হৃদয়সমুদ্রে তাঁর উঠিতেছে বিম্বের মতন।
উঠিতেছে চন্দ্র সূর্য, উঠিতেছে আলোক আঁধার,
উঠিতেছে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের জ্যোতি-পরিবার।
উঠিতেছে, ছুটিতেছে গ্রহ উপগ্রহ দলে দলে,
উঠিতেছে ডুবিতেছে রাত্রি দিন, আকাশের তলে ।
একা বসি মহাসিন্ধু চিরদিন গাইতেছে গান,
ছুটিয়া সহস্র নদী পদতলে মিলাইছে প্রাণ।
তটিনীর কলরব, লক্ষ নির্ঝরের ঝর ঝর,
সিন্ধুর গম্ভীর গীত, মেঘের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
ঝটিকা করিছে হা হা আশ্রয়-আলয় তার ছাড়ি
বাজায়ে অরণ্যবীণা ভীমবল শত বাহু নাড়ি,
রুদ্র রাগ আলাপিয়া গড়ায়ে পড়িছে হিমরাশ
পর্বতদৈত্যের যেন ঘনীভূত ঘোর অট্টহাস,
ধীরে ধীরে মহারণ্য নাড়িতেছে জটাময় মাথা--
ঝর ঝর মর মর উঠিতেছে সুগম্ভীর গাথা।
চেতনার কোলাহলে দিবস পুরিছে দশ দিশি,
ঝিল্লিরবে একমন্ত্র জপিতেছে তাপসিনী নিশি,
সমস্ত একত্রে মিলি ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া চারি ভিত
উঠাইছে মহা-হৃদে মহা এক স্বপনসংগীত।
স্বপনের রাজ্য এই স্বপন-রাজ্যের জীবগণ
দেহ ধরিতেছে কত মুহুর্মুহু নূতন নূতন।
ফুল হয়ে যায় ফল, ফুল ফল বীজ হয় শেষে,
নব নব বৃক্ষ হয়ে বেঁচে থাকে কানন-প্রদেশে।
বাষ্প হয়, মেঘ হয়, বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিবারিধারা
নির্ঝর তটিনী হয়, ভাঙি ফেলে শিলাময় কারা।
নিদাঘ মরিয়া যায়, বরষা শ্মশানে আসি তার
নিবায় জলন্ত চিতা বরষিয়া অশ্রুবারিধার।
বরষা হইয়া বৃদ্ধ শ্বেতকেশ শীত হয়ে যায়,
যযাতির মতো পুন বসন্তযৌবন ফিরে পায়।
এক শুধু পুরাতন, আর সব নূতন নূতন
এক পুরাতন হৃদে উঠিতেছে নূতন স্বপন।
অপূর্ণ স্বপন-সৃষ্ট মানুষেরা অভাবের দাস,
জাগ্রত পূর্ণতা-তরে পাইতেছে কত না প্রয়াস।
চেতনা ছিঁড়িতে চাহে আধো-অচেতন আবরণ--
দিনরাত্রি এই আশা, এই তার একমাত্র পণ।
পূর্ণ আত্মা জাগিবেন, কভু কি আসিবে হেন দিন?
অপূর্ণ জগৎ-স্বপ্ন ধীরে ধীরে হইবে বিলীন?
চন্দ্র-সূর্য-তারকার অন্ধকার স্বপ্নময়ী ছায়া
জ্যোতির্ময় সে হৃদয়ে ধীরে ধীরে মিলাইবে কায়া।
পৃথিবী ভাঙিয়া যাবে, একে একে গ্রহতারাগণ
ভেঙে ভেঙে মিলে যাবে একেকটি বিম্বের মতন।
চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ চেয়ে জ্যোতির্ময় মহান্ বৃহৎ
জীব-আত্মা মিলাইবে একেকটি জলবিম্ববৎ।
কভু কি আসিবে, দেব, সেই মহাস্বপ্ন-ভাঙা দিন
সত্যের সমুদ্র-মাঝে আধো সত্য হয়ে যাবে লীন?
আধেক প্রলয়জলে ডুবে আছে তোমার হৃদয়--
বলো, দেব, কবে হেন প্রলয়ের হইবে প্রলয়।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mohashopno/
|
3805
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যৌবন – স্বপ্ন
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমার যৌবনস্বপ্নে যেন ছেয়ে আছে বিশ্বের আকাশ ।
ফুলগুলি গায়ে এসে পড়ে রূপসীর পরশের মতো ।
পরানে পুলক বিকাশিয়া বহে কেন দক্ষিণা বাতাস
যেথা ছিল যত বিরহিণী সকলের কুড়ায়ে নিশ্বাস !
বসন্তের কুসুমকাননে গোলাপের আঁখি কেন নত ?
জগতের যত লাজময়ী যেন মোর আঁখির সকাশ ?
কাঁপিছে গোলাপ হয়ে এসে , মরমের শরমে বিব্রত !
প্রতি নিশি ঘুমাই যখন পাশে এসে বসে যেন কেহ ,
সচকিত স্বপনের মতো জাগরণে পলায় সলাজে ।
যেন কার আঁচলের বায় উষার পরশি যায় দেহ ,
শত নূপুরের রুনুঝুনু বনে যেন গুঞ্জরিয়া বাজে ।
মদির প্রাণের ব্যাকুলতা ফুটে ফুটে বকুলমুকুলে ;
কে আমারে করেছে পাগল — শূন্যে কেন চাই আঁখি তুলে !
যেন কোন্ উর্বশীর আঁখি চেয়ে আছে আকাশের মাঝে ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/joubon-swopno/
|
1928
|
প্রেমেন্দ্র মিত্র
|
কাগজ বিক্রী
|
চিন্তামূলক
|
হাঁকে ফিরিওলা— কাগজ বিক্রী,
পুরানো কাগজ চাই!
ঘরের কোণেতে সঞ্চিত যত
তাড়াগুলি হাতড়াই |
পুরানো কাগজ চাই |
বহুদিন ধরে জঞ্জাল বাড়ে
সের দরে বেচি তাই |
কেমন করিয়া একটি তাহার
হঠাত্ নজরে পড়ে,
দেখি সমুদ্রে যাত্রী-জাহাজ
কোথাও ডুবিল ঝড়ে |
হঠাত্ নজরে পড়ে,
আবার কোথায় মানুষের মাথা,
বিকাল খুলির দরে |নিরুদ্দেশ কে সন্তান লাগি
ঘোষিছে পুরস্কার,
মৃত্যুঞ্জয় অমৃত কারা
রিছে আবিষ্কার |
ঘোষিছে পুরস্কার,
পলাক খুনে লুকায়ে কোথায়
চাই যে হদিস্ তার |কোন সে বধুর বুকের আগুন
ভিতর করিয়া খাক্,
অবশেষে লাগে বসনে তাহার,
পুড়ে গেল সাতপাক |
ভিতর করিয়া খাক্,
কোন্ সে গিরির গরল অনল
ঘটাল দুর্বিপাক |হারানো তারিখ ফিরে আসে ফের
পুরানো কাগজ পড়ি ;
আমার নয়নে সহসা পোহায়
সে দিনের বিভাবরী |
পুরানো কাগজ পড়ি,
রাখিল ধরনী সেই দিনটির
পায়ের চিহ্ন ধরি |সে পদচিহ্ন কোথায় মিলাল
তারপর নাহি খোঁজ!
মানুষের ঘরে সকলের বড়
উত্সব নওরোজ |
তারপরে নাহি খোঁজ ;
যাত্রী জাহাজে ডুবিল যে, বুঝি,
তারো ঘরে আজি ভোজ |রক্তে ছোপান অশ্রুতে ভেজা
পুরাতন যত খাতা,
সব জঞ্জাল আজিকে, হলেও
রঙীন সুতোয় গাঁথা |
পুরাতন যত খাতা,
তাতে কোন্ দিন কি দাগ লাগিল
কে বৃথা ঘামায় মাথা |হাঁকে ফিরিওয়ালা, কাগজ বিক্রী,
পুরানো কাগজ চাই |
ঘর ভরি যত মিছে জঞ্জাল
জমাবার নাই ঠাঁই |
পুরানো কাগজ চাই ;
আদর যহার ফুরালো, তাদেরে
সের দরে বেচ ভাই
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4002.html
|
3428
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রত্যহ প্রভাতকালে ভক্ত এ কুকুর
|
চিন্তামূলক
|
প্রত্যহ প্রভাতকালে ভক্ত এ কুকুর
স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে আসনের কাছে
যতক্ষণে সঙ্গ তার না করি স্বীকার
করস্পর্শ দিয়ে।
এটুকু স্বীকৃতি লাভ করি
সর্বাঙ্গে তরঙ্গি উঠে আনন্দপ্রবাহ।
বাক্যহীন প্রাণীলোক-মাঝে
এই জীব শুধু
ভালো মন্দ সব ভেদ করি
দেখেছে সম্পূর্ণ মানুষেরে;
দেখেছে আনন্দে যারে প্রাণ দেওয়া যায়
যারে ঢেলে দেওয়া যায় অহেতুক প্রেম,
অসীম চৈতন্যলোকে
পথ দেখাইয়া দেয় যাহার চেতনা।
দেখি যবে মূক হৃদয়ের
প্রাণপণ আত্মনিবেদন
আপনার দীনতা জানায়ে,
ভাবিয়া না পাই ও যে কী মূল্য করেছে আবিষ্কার
আপন সহজ বোধে মানবস্বরূপে;
ভাষাহীন দৃষ্টির করুণ ব্যাকুলতা
বোঝে যাহা বোঝাতে পারে না,
আমারে বুঝায়ে দেয়– সৃষ্টি-মাঝে মানবের সত্য পরিচয়। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prottyoho-provatkale-vokto-e-kukur/
|
750
|
জয় গোস্বামী
|
স্নান
|
প্রেমমূলক
|
সংকোচে জানাই আজ: একবার মুগ্ধ হতে চাই।
তাকিয়েছি দূর থেকে। এতদিন প্রকাশ্যে বলিনি।
এতদিন সাহস ছিল না কোনো ঝর্ণাজলে লুণ্ঠিত হবার –
আজ দেখি অবগাহনের কাল পেরিয়ে চলেছি দিনে দিনে …
জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছো।
তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে ব’লে যে-প্রেমিক
ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান
হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে।
আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি
ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি
আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল
অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?
শোনো, আমি রাত্রিচর। আমি এই সভ্যতার কাছে
এখনো গোপন ক’রে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;
সমস্ত যৌবন ধ’রে ব্যধিঘোর কাটেনি আমার। আমি একা
দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,
জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোস্নার ধারণা দেব ব’লে
এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।
দ্যাখো, সেই মরুরাত্রি চোখ থেকে চোখে আজ পাঠালো সংকেত –
যদি বুঝে থাকো তবে একবার মুগ্ধ করো বধির কবিকে;
সে যদি সংকোচ করে, তবে লোকসমক্ষে দাঁড়িয়ে
তাকে অন্ধ করো, তার দগ্ধ চোখে ঢেলে দাও অসমাপ্ত চুম্বন তোমার…
পৃথিবী দেখুক, এই তীব্র সূর্যের সামনে তুমি
সভ্য পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত ক’রে রেখে
উন্মাদ কবির সঙ্গে স্নান করছো প্রকাশ্য ঝর্ণায়।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1671.html
|
3639
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়
|
ভক্তিমূলক
|
বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয় ।অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ । এই বসুধার
মৃত্তিকার পাত্রখানি ভরি বারম্বার
তোমার অমৃত ঢালি দিবে অবিরত
নানাবর্ণগন্ধময় । প্রদীপের মতো
সমস্ত সংসার মোর লক্ষ বর্তিকায়
জ্বালায়ে তুলিবে আলো তোমারি শিখায়
তোমার মন্দির-মাঝে । ইন্দ্রিয়ের দ্বার
রুদ্ধ করি যোগাসন, সে নহে আমার ।
যে-কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে গন্ধে গানে
তোমার আনন্দ রবে তার মাঝখানে ।মোহ মোর মুক্তিরূপে উঠিবে জ্বলিয়া,
প্রেম মোর ভক্তিরূপে রহিবে ফলিয়া ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/biyragy-sadana-muki-sa-amar-ny/
|
4408
|
শামসুর রাহমান
|
আশ্চর্য
|
প্রেমমূলক
|
আমার সত্তায় উদ্ভাসিত রৌদ্রী একটি সকাল,
অস্তিত্বের তটরেখা গুঞ্জরিত সানাইয়ের সুর
ক্ষণে ক্ষণে; দাঁত মাজি, চেয়ে দেখি এইতো অদূরে
উঠোনে কুড়োয় খুশি হল্দে পাখি, অসুখী বেড়াল
আমার লেপের নিচে খোঁজে উষ্ণ গুহা; নিম ডাল
নেচে ওঠে অকস্মাৎ। বহুদূর দেশ থেকে এসে
কখনো ফিরে না-যাওয়া বৃদ্ধলোক লাঠি হাতে, হেসে
কুশল শুধান পড়শির-গলিময় ইন্দ্রজাল।আমার পায়ের নিচে পড়ে আছে খবর কাগজ
নীরব বিশ্বের মতো। কফি খাই, আশ্চর্যের ধূপে
সমাচ্ছন্ন কবিতার খাতা খুলি, বাস্তবের সীমা
ছিঁড়ে ফেলি ফালা ফালা, ছকস্থিত অশ্ব আর গজ
সুনীল প্রান্তরে ছোটে আশ্চর্যের তরঙ্গের রূপে-
সব চে আশ্চর্য তুমি হে আমার আপন প্রতিমা। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ashcorjo/
|
1267
|
জীবনানন্দ দাশ
|
স্বাতীতারা
|
প্রেমমূলক
|
স্বাতীতারা, কবে তোমায় দেখেছিলাম কলকাতাতে আমি
দশ-পনেরো বছর আগে; সময় তখন তোমার চুলে কালো
মেঘের মতন লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালাল
তোমার নিশিত নারীমুখের-জানো তো অন্তর্যামী।
তোমার মুখ; চারিদিকে অন্ধকারে জলের কোলাহল।
কোথাও কোনো বেলাভূমির নিয়ন্তা নেই-গভীর বাতাসে
তবুও সব রণক্লান্ত অবসন্ন নাবিক ফিরে আসে।
তারা যুবা, তারা মৃত; মৃত্যু অনেক পরিশ্রমের ফল।
সময় কোথাও নিবারিত হয় না, তবু, তোমার মুখের পথে
আজও তাকে থামিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছ- নারি
হয়তো ভোরে আমরা সবাই মানুষ ছিলাম, তারই
নিদর্শনের সূর্যবলয় আজকের এই অন্ধ জগতে।
চারিদিকে অলীক সাগর জ্যাসন ওডিসিয়ূস ফিনিশিয়
সার্থবাহের অধীর আলো- ধর্মাশোকের নিজের তো নয়, আপতিত কাল
আমরা আজও বহন করে, সকল কঠিন সমুদ্রে প্রবাল
লুটে তোমার চোখের বিষাদ ভৎসর্না…. প্রেম নিভিয়ে দিলাম প্রিয়।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shatitara/
|
4600
|
শামসুর রাহমান
|
কী পরীক্ষা নেবে_
|
প্রেমমূলক
|
কী পরীক্ষা নেবে তুমি আর বারবার?
হাতে জপমালা নেই, তবু
আমি তো তোমার নাম মন্ত্রের মতন
করি উচ্চারণ সর্বক্ষণ। যেখানে তোমার ছায়া
স্বপ্নিল বিলাসে
অপূর্ব লুটিয়ে পড়ে, সেখানে আমার ওষ্ঠ রেখে
অনেক আলোকবর্ষ যাপন করতে পারি, তোমারই উদ্দেশে
সাঁতার না জেনেও নিঃশঙ্ক দ্বিধাহীন
গহন নদীতে নেমে যেতে পারি।
তোমার সন্ধানে ক্রোশ ক্রোশ দাউ দাউ পথ হেঁটে
অগ্নিশুদ্ধ হতে পারি, পারি
বুকের শোণিতে ফুল ফোটাতে পাষাণে।
যখন পাথরে হাত রাখি,
পাথর থাকে না আর অরূপ পাথর,
হয়ে যায় প্রতিমা তোমার।
যখন বৃক্ষের দিকে দৃষ্টি মেলে দিই,
বৃক্ষ হয় তোমার শরীর।
প্রত্যহ তোমার প্রতীক্ষায় এক বুক উপদ্রব নিয়ে থাকি,
ব্যাকুলতা বারবার সিঁদ কেটে ঢোকে,
হৃদয়ের ঘরগেরস্থালি, বনস্থলীলুটহ য়ে যায়
প্রত্যহ তোমার প্রতীক্ষায়, আমি তাই তুমি ছাড়া কারুর জন্যেই
পারি না অপেক্ষা করতে আর।ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়েছি তোমার ওষ্ঠজাম, তুমি না থাকলে
আমার সকল চুমো যাবে বনবাসে,
তোমার অমন হাত স্পর্শ ক’রে ছুঁয়েছি স্বর্গের
মল্লিকাকে, তুমি চ’লে গেলে
আমার ছোঁয়ার মতো অন্য কোনো হাত থাকবে না আর।
এর পরও অনুরাগ নিক্তিতে মাপতে চাও, চাও
আমার পরীক্ষা নিতে নানা অছিলায়?আর কি ভোগ চাও? এক একে নির্দ্বিধায়
সবি তো দিয়েছি।
হৃদয়ের আসবাবপত্তর সবি তো
স্বেচ্ছায় বিলিয়ে দিতে চাই, তবু কেন যাবতীয়
সম্পদ আমার
ক্রোক করবে বলে নিত্য আমাকে শাসাও?
আমি তো তোমাকে সুখ দিতে চেয়ে কেবলি নিজের
অসুখ বাড়াই।মাটি ছুঁয়ে বলছি এখন,
এই বৃক্ষমূলে আমি শীর্ণ হই, অন্ন আনি নিজে,
কান্নায় ধোওয়াই পদযুগ।
কী পরীক্ষা নেবে তুমি আর বারবার?
আমার সম্মুখে তুলে ধরো বিষপাত্র,
নিষ্পলক দ্বিধাহীন নিমেষে উজাড় করে দেবো।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ki-porikha-nebe/
|
5358
|
শামসুর রাহমান
|
হোমারের স্বপ্নময় হাত
|
চিন্তামূলক
|
এখন আমার আশে-পাশে কেউ নেই। ঘর অন্ধকার নয়, একটা
বাতি জ্বলছে। অনুগ্র আলো যেন জাল; আমি স্বেচ্ছা-
বন্দি হয়ে আছি সেই জালে। কেউ নেই আমার পাশে, মুখোমুখি
দাঁড়িয়ে নেই কাউ। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলছে না এই
মুহূর্তে। মুহূর্তেগুলো থেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝরছে
আমার ওপর। সময় বয়ে চলেছে একটানা, আমার আয়ুর পুঁজি
ক্ষইয়ে দিয়ে। এখন কোনো বইয়ের পাতায় চোখ বুলোতে
পর্যন্ত ইচ্ছে করছে না, অথচ বইয়ের প্রতি আমার আকর্ষণ
অত্যন্ত তীব্র। প্রহরে-প্রহরে বই থেকে আমি শোষণ করে নিই
আনন্দ, সমৃদ্ধ হয়ে উঠি দিনের পর দিন।
এখন আমার আশে-পাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না এখন যদি
খাতা খুলে লিখতে শুরু করি, কেউ ঢুকে পড়বে না আমার
ঘরে, কিংবা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে দেখবে না কি আমি
লিখছি। কোনো উঁকি ঝুঁকি মারবে না কেউ। চারপাশে এখন
নিভাঁজ নিঃসঙ্গতা। আমার একাকীত্ব জলচর প্রাণীর মতো
আলো পোহাচ্ছে। একটু আগে আমার বিচ্ছেদ ঘটেছে
স্বপ্নের সঙ্গে, হয়তো এজন্যেই একটা শূন্যতাবোধ
আপাতত দখল করে নিয়েছে আমাকে। স্বপ্ন ভেঙে গেলে
খুব একলা লাগে। কী স্বপ্ন দেখছিলাম আমি? ঘুম
যখন শরীরকে ত্যাগ করে যায়, তখন কোনো কোনো স্বপ্নের
কথা খুব স্পষ্ট মনে থাকে, যেন চোখ বন্ধ করলেই সেই
স্বপ্ন আবার দেখতে পাবো। এমন কিছু স্বপ্ন দেখি যা
স্বপ্নের মতোই মিলিয়ে যায় অন্তহীন অস্পষ্টতায়।
আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। যারা স্বপ্নকে অর্থহীন
বলে উড়িয়ে দেয়, আমি তাদের কেউ নই। আমি স্বপ্নকে
অর্থময় মনে করি। স্বপ্ন বিশ্লেষণে অপটু বলেই সকল
স্বপ্ন আমাদের কাছে অর্থহীন। কী স্বপ্ন দেখছিলাম
আমি? সব কিছু মনে নেই, আবছা হয়ে গেছে অনেক
কিছুই। বহু পথ হেঁটে আমি প্রবেশ করেছি একটা
পুরনো নিঝুম বাড়িতে। ঠিক প্রবেশ করেছি, বলা
যাবে না, বাড়িটার বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ছি, অনেকক্ষণ
থেকে; কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ আসছে না।
তবে কি কোনো বাসিন্দা নেই এই নিঝুম বাড়িতে?
দরজা খুললো না দেখে সেখান থেকে অন্য দিকে রওয়ানা
হলাম। তারপর নিজেকে দেখতে পেলাম জনশূন্য,
ধুধু প্রান্তরে। জমি ফেটে চৌচির। কোথাও এক ডগা ঘাস
নেই, এক ফোঁটা পানি নেই। শুধু ঝিঁঝি পোকার
ডাকের মতো একটা শব্দ উঠে আসছে মাটি থেকে। হঠাৎ
যেন মাটি ফুঁড়ে বেরুলো একটা কালো মানুষ। মানুষ
না বলে কংকাল বলাই ভালো। লোকটা মাটির ওপর
বসে পড়লো এবং কোত্থেকে যেন একটা শিশু এসে বসলো ওর
কোল জুড়ে। হাড়-জিরজিরে শিশুটির দু’চোখে জীবনের
দ্রুত পলায়নের দৃশ্য। সেই লোকটা আর শিশুটিকে
দেখে মনে হলো যেন মৃত্যু শুয়ে আছে মৃত্যুর কোলে।
আর কী কী দেখেছিলাম। মনে পড়ছে না।
কিছুতেই মনে পড়ছে না।
স্বপ্নটির কী অর্থ দাঁড়ায় আমি জানি না। স্বপ্ন বিশ্লেষণের
ক্ষমতা থেকে আমি বঞ্চিত। এই স্বপ্ন কেন দেখলাম?
অনেকদিন থেকে একটা বাড়ি খুঁজছি বলেই কি সেই
পুরনো, নিঝুম বাড়িটা দেখা দিলো আমার স্বপ্নে, যে বাড়ি
আমি আগে কখনও দেখিনি? সংবাদপত্রে দেখা
ইথিওপিয়ার অনাহারী মানুষের ফটোগ্রাফই আবার আমার
স্বপ্নে হানা দিলো নতুন করে? এ প্রশ্নের উত্তর আমার
জানা নেই। জোর দিয়ে কিছুই বলতে পারব না। এই
স্বপ্নের অন্তরালে অন্য কোনো গূঢ়ার্থ কি নিহিত?
এই স্বপ্ন আমাকে একলা করে দিয়েছে। এখন আমার আশে-
পাশে কেউ নেই। স্বপ্ন দেখতে আমার ভালো লাগে।
ঘুমের মরুভূমিতে স্বপ্ন তো মরূদ্যান। হারিয়ে-যাওয়া কিছু
চিত্রের খোঁজে স্বপ্ন দ্যাখে আমার কণ্ঠনালী, নাভিমূল,
বাহু, নখ, মাথার চুল। কখনও-কখনও স্বপ্ন আর বাস্তবের
মধ্যে আমি কোনো ভেদচিহ্ন খুঁজে পাই না। কুলুঙ্গিতে
তুলে রাখা কবেকার সবুজাভ দোয়াত ফেরেশতা হয়ে
আমার সঙ্গে কথা বলে যখন, তখন বুঝতে পারি না আমি স্বপ্নের
আচ্ছন্নতায় মজে আছি নাকি বাস্তবের চবুতরায় দাঁড়িয়ে
কবুতর ওড়াচ্ছি একের পর এক।
এখন আমার মাথার ভেতর সুকণ্ঠ কোনো পাখির মতো গান
গাইছে এই শহর। লোকগীতির এই শহর, ডিসকো
নাচের শহর, দোয়া-দরুদ আর মোনাজাতের শহর, ভিখারির শহর,
বেশ্যা দালালের শহর, রাশি-রাশি মিথ্যা বাগানের
শহর, ক্রুশবিদ্ধ সত্যের শহর, বিক্ষোভ মিছিলের শহর,
স্লোগান-ঝংকৃত শহর, কবির মৌচাকের মতো শহর,
শেষ রাত্রির বাইজীর মতো এই শহর। এই মুহূর্তে আমি
যা স্পর্শ করবো তা উন্মোচিত হবে নতুন তাৎপর্য নিয়ে।
গাছের বাকল হবে তরুণীর ত্বক, পথের ধূলো রূপান্তরিত
হবে রাজা সোলেমানের খনির মর্ণিরতা, ভিখারিণীর
কানি হবে সালোমের লাস্যময়ী পট্রবস্ত্র। এখন আমি নিজেকে
স্বর্শ করলে আমার ভেতর থেকে শত-শত ময়ূর
বেরিয়ে এসে পেখম ছড়িয়ে দেবে উঠোন জুড়ে। যদি এখন
আমি খাতার শাদা পাতা স্পর্শ করি, তাহলে সেখানে
বইবে অলকানন্দা, গড়ে উঠবে আর্ডেনের বন, লতাগুল্মে
ঝলসে উঠবে হোমারের স্বপ্নময় হাত। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/homarer-swapnomoy-hat/
|
3596
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি
|
চিন্তামূলক
|
বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী--
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;
মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।
সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে
অক্ষয় উৎসাহে--
যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াইয়া আনি।
জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই যত পারি ভিক্ষালব্ধ ধনে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/viprola-a-pretevar-kutotku-jani/
|
2135
|
মহাদেব সাহা
|
কোনো ফুলের বাগান নেই
|
প্রেমমূলক
|
আমাদের কোনো ফুলের বাগান নেই, তবু
পৃথিবীর এই দুঃসময়ে নীলা তার টবটিতে
ফুটিয়েছে রজনীগন্ধার কটি কলি,
বারান্দার সঙ্কীর্ণ আলোক আর অপ্রচুর বাতাস
সত্ত্বেও
কেমন ফুটেছে তার হাসি, সজীব ডালটি যেন
মনেহয় স্বচ্ছেন্দে উঠেছে বেড়ে হৃদয়ের উর্বর
মাটিতে;
দুবেলা আমাকে সে দেখায় তার রজনীগন্ধার এই
চারা,
বলে-আলো ও বাতাসহীন প্রতিকূল পরিবেশেও
দেখো
কেমন ফুটেছে এই প্রকৃতির ফুল!
প্রত্যুত্তরে আমি আজো বলিনি কিছুই শুধু
নীরবে তাকিয়ে
থাকা ছাড়া;
তাই আমার মুখের দিকে চেয়ে রজনীগন্ধার ভীরু
ডালটির মতো
সেও যেন হয়ে পড়ে খুবই সঙ্কুচিত,
কেননা নীলা তো জানে আমার ফুলের
প্রতি চিরকালই
সীমাহীন দুর্বলতা আছে
তবু রজনীগন্ধার দিকে চেয়ে আমার মুখে একটিও
কেন প্রশংসা
ফুটলো না?
কী করে বোঝাই আমি অন্তহীন নীরবতা ছাড়া এর
যোগ্য কী
প্রশংসা হতে পারে,
কী করে বোঝাই তাকে এই ফুল ফোটানো সাফল্য
কতোটা!
যখন সে বারান্দায় তার মাটির
টবটি জুড়ে ফুটিয়েছে এই হার্দ্য,
অনবদ্য ফুল
তখন পৃথিবী জুড়ে তৈরি হচ্ছে মানুষ বিধ্বংসী বোমা,
ক্ষেপনাস্ত্র, ভয়াল বারুদ
এই রজনীগন্ধার পাশাপাশি একই সাথে পৃথিবীতে
অঙ্কুরিত হচ্ছে মারণাস্ত্রের ভীষণ নখর,
রজনীগন্ধার চেয়ে আরো দ্রুত চোখের
নিমিষে ছেয়ে যাচ্ছে
পৃথিবীর অস্ত্রশালা দাঁত, নখ ও হিংস্র থাবায়
সেজন্যই এমন ফুলের দিকে চেয়ে একটিও প্রশংসার
বাক্য
স্ফোটে না,
শুধু মনে হয় সমস্ত পৃথিবীময় মানুষের
হৃদয়ে যদি জন্ম নিতো
রজনীগন্ধার এই কলি!
তাই নীলাকে বলিনি
পৃথিবীর এই দুঃসময়ে আজ এরূপ একটি ফুল
ফোটানো যে কতোটা কঠিন
আর তার সার্থকতা বিজ্ঞান ও মেধার কৃতিত্বের
চেয়েও মহৎ!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1370
|
4110
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
মনে পড়ে সুদূরের মাস্তুল
|
প্রেমমূলক
|
পেছনে তাকালে কেন মূক হয়ে আসে ভাষা !
মনে পড়ে সেই সব দুপুরের জলাভূমি,
সেই সব বেতফল, বকুল কুড়ানো ভোর,
আহা সেই রাঙাদির আঁচলতলের উত্তাপ,
মনে পড়ে...
মনে পড়ে, বন্দরে সেই সব কালোরাত,
ঈগলের মতো ডানা সেই বিশাল গভীর রাতে,
একটি কিশোর এসে চুপি চুপি সাগরের কূলে
দাঁড়াতো একাকী
তন্ময় চোখে তার রাশি রাশি বিস্ময় নিয়ে।
কবে তারে ডাক দিয়ে নিয়ে গেলো যৌবন সুচতুর,
কবে তারে ডেকে নিলো মলিন ইটের কালো সভ্যতা !
সবুজ ছায়ার নিচে ঘুমে চোখ ঢুলে এলে
মা যাকে শোনাতো সেই তুষারদেশের কথা,
তার চোখে আজ এতো রাতজাগা ক্লান্তির শোক !
পেছনে তাকালে কেন নিরবতা আসে চোখে !
মনে পড়ে- জ্যোৎস্নায় ঝলোমলো বালুচর,
একটি কিশোর- তার তন্ময় দুটি চোখে
রাশি রাশি কালোজল- সুদূরের মাস্তুল
মনে পড়ে...
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/528
|
515
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সকল পথের বন্ধু
|
ভক্তিমূলক
|
হে আনন্দ-প্রেম-রসঘন, মধুরম, মনোহর!
একী মদিরার আবেশে নেশায় কাঁপে তনু থরথর!
হৃদি-পদ্মিনী নিঙাড়িয়া বঁধু –
আনিতে চাও কি অমৃতমধু,
উদাসীন মনে আন একী সুরভিত বন-মর্মর!
ঘন অরণ্য-আড়ালে কে হাস প্রিয় জ্যোতিসুন্দর!কৃষ্ণা তিথির আড়ালে আমার চাঁদ লুকাইয়াছিলে!
আমি ভেবেছিনু, আমি কালো, তুমি তাই প্রেম নাহি দিলে।
বুঝি নাই, রসময়, তব খেলা
ভয় হত, যদি কর অবহেলা।
বেণুকা বাজায়ে পথে এনে হায় কোথা তুমি লুকাইলে?
দেখেছ কি দেহে কাদা, অন্তরে রাধারে নাহি দেখিলে?তব অভিসার-পথ রুধিয়াছে কে যেন ভয়ংকর!
দিগ্দিগন্তে অন্ধ করেছে বাধার তুফান ঝড়।
সীতার মতন কে যেন গো কেশ ধরে
আঁধার পাতালে লইয়া গিয়াছে মোরে।
জড়াইয়া যেন শত শত নাগ বিষাক্ত অজগর
দংশেছে মোরে, বিষে জরজর! – তবু, ওগো মনোহর –ডাকিনি তোমায়, যদি এই বিষ তব শ্রীঅঙ্গে লাগে!
এই পঙ্ক, এ মালিন্য যদি বাধা আনে অনুরাগে।
বলেছি, ‘বন্ধু, সরে যাও, সরে যাও,
আমার এ ক্লেশে আমারে কাঁদিতে দাও।’
আমার দুখ ‘লু’ হাওয়ার জ্বালা না আনে গোলাপ-বাগে!
ক্ষমা কোরো মোরে, ভুল বুঝিয়ো না, যদি অভিমান জাগে!জানি তুমি মোরে জড়ায়ে ধরেছ প্রকাশ-ব্রহ্মরূপে,
আমার বক্ষে চেতনানন্দ হয়ে কাঁদ চুপে চুপে!
হৃদি-শতদল কাঁপে মোর টলমল,
মোর চোখে ঝরে তোমার অশ্রুজল!
বক্ষে জড়ায়ে আন প্রেমলোকে, নামিয়া অন্ধকূপে,
অমৃত স্বরূপে হে প্রিয়তম আনন্দ-স্বরূপে!আঁধারে আলোকে যখন যে পথ টানে, তুমি থাক কাছে।
অরণ্যপথে তব আনন্দ কুরঙ্গ হয়ে নাচে!
আমার তীর্থ-মরুপথে ছায়া হয়ে
সাথে সাথে চলো আঙুরের রস লয়ে,
পথের বালুকা পাখির পালক ফুল হয়ে ফুটিয়াছে!
চোখে জল, বুকে মধু বলে – ‘বঁধু, আছে আছে, সাথে আছে!’ (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sokol-pother-bondhu/
|
5422
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
অতি কিশোরের ছড়া
|
ছড়া
|
তোমরা আমায় নিন্দে ক’রে দাও না যতই গালি,
আমি কিন্তু মাখছি আমার গালেতে চুনকালি,
কোনো কাজটাই পারি নাকো বলতে পারি ছড়া,
পাশের পড়া পড়ি না ছাই পড়ি ফেলের পড়া।
তোতো ওষুধ গিলি নাকো, মিষ্টি এবং টক
খাওয়ার দিকেই জেনো আমার চিরকালের সখ।
বাবা-দাদা সবার কাছেই গোঁয়ার এবং মন্দ,
ভাল হয়ে থাকার সঙ্গে লেগেই আছে দ্বন্দ্ব ।
পড়তে ব’সে থাকে আমার পথের দিকে চোখ,
পথের চেয়ে পথের লোকের দিকেই বেশী ঝোঁক।
হুলের কেয়ার করি নাকো মধুর জন্য ছুটি,
যেখানে ভিড় সেখানেতেই লাগাই ছুটোছুটি।
পণ্ডিত এবং বিজ্ঞজনের দেখলে মাথা নাড়া,
ভাবি উপদেশের ষাঁড়ে করলে বুঝি তারা।
তাইতো ফিরি ভয়ে ভয়ে, দেখলে পরে তর্ক,
বুঝি কেবল গোময় সেটা,- নয়কো মধুপর্ক।
ভুল করি ভাই যখন তখন, শোধরাবার আহ্লাদে
খেয়ালমতো কাজ করে যাই, কস্ট পাই কি সাধে ?
সোজাসুজি যা হয় বুঝি, হায় অদৃস্ট চক্র!
আমার কথা বোঝে না কেউ পৃথিবীটাই বক্র।। (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/oti-kisorer-chora/
|
410
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বন্ধন
|
চিন্তামূলক
|
অনন্তকাল এ-অনন্তলোকে
মন-ভোলানোরে তার খুঁজে ফিরে মন।
দক্ষিণা-বায় চায় ফুল-কোরকে ;
পাখি চায় শাখী, লতা-পাতা-ঘেরা বন।
বিশ্বের কামনা এ – এক হবে দুই ;
নূতনে নূতনতর দেখিবে নিতুই॥
তোমারে গাওয়াত গান যার বিরহ
এড়িয়ে চলার ছলে যাচিয়াছ যায়,
এল সেই সুদূরের মদির-মোহ
এল সেই বন্ধন জড়াতে গলায়।
মালা যে পরিতে জানে, কন্ঠে তাহার
হয় না গলার ফাঁসি চারু-ফুলহার॥
জলময়, নদী তবু নহে জলাশয়,
কূলে কূলে বন্ধন তবু গাহে গান ;
বুকে তরণির বোঝা কিছু যেন নয়–
সিন্ধুর সন্ধানী চঞ্চল-প্রাণ।
দুই পাশে থাক তব বন্ধন-পাশ,
সমুখে জাগিয়া থাক সাগর-বিলাস॥
বিরহের চখাচখি রচে তারা নীড়,
প্রাতে শোনে নির্মল বিমানের ডাক ;
সেই ডাকে ভোলে নীড়, ভোলে নদীতীর,
সন্ধ্যায় গাহে : ‘এই বন্ধন থাক’!
আকাশের তারা থাক কল্পলোকে,
মাটির প্রদীপ থাক জাগর-চোখে॥ (ঝড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bondhon/
|
4558
|
শামসুর রাহমান
|
কবির নির্বাসন
|
রূপক
|
আমার চোখ কি আমার কাছ থেকে
নির্বাসিত হয়েছে
নইলে কেন আমি কোন কিছু
দেখতে পাচ্ছি না?
আমার কণ্ঠ কি আমার কাছে থেকে
নির্বাসিত হয়েছে?
নইলে কেন আমার কণ্ঠ থেকে সত্য কি মিথ্যা কিছুই
উচ্চারিত হচ্ছে না?আমার পা দুটো কি আমার কাছ থেকে
নির্বাসিত হয়েছে?
নইলে কেন ওরা সামনের দিকে
এগোতে পারছে না?আমার হাত দুটো কি আমার কাছ থেকে
নির্বাসিত হয়েছে?
নইলে কেন ওরা এত লঙ্কাকাণ্ডের পরেও
মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে না?আমার কলম কি আমার কাছ থেকে
নির্বাসিত হয়েছে?
নইলে কেন আমি খাতার পাতায় উচ্চারণের স্তবক
ফোটাতে পারছি না? (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobir-nirbason/
|
6046
|
হেলাল হাফিজ
|
পৃথক পাহাড়
|
প্রেমমূলক
|
আমি আর কতোটুকু পারি ?
কতোটুকু দিলে বলো মনে হবে দিয়েছি তোমায়,
আপাতত তাই নাও যতোটুকু তোমাকে মানায়।
ওইটুকু নিয়ে তুমি বড় হও,
বড় হতে হতে কিছু নত হও
নত হতে হতে হবে পৃথক পাহাড়,
মাটি ও মানুষ পাবে, পেয়ে যাবে ধ্রুপদী আকাশ।
আমি আর কতোটুকু পারি ?
এর বেশি পারেনি মানুষ।
৯.১০.৮০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/118
|
6001
|
হুমায়ূন আহমেদ
|
তিনি
|
চিন্তামূলক
|
এক জরাগ্রস্থ বৃদ্ধ ছিলেন নিজ মনে
আপন ভুবনে।
জরার কারণে তিনি পুরোপুরি বৃক্ষ এক।
বাতাসে বৃক্ষের পাতা কাঁপে
তাঁর কাঁপে হাতের আঙ্গুল।
বৃদ্ধের সহযাত্রী জবুথবু-
পা নেই,শুধু পায়ের স্মৃতি পড়ে আছে।
সেই স্মৃতি ঢাকা থাকে খয়েরি চাদরে।
জরাগ্রস্থ বৃদ্ধ ভাবে চাদরের রঙটা নীল হলে ভাল ছিল।
স্মৃতির রং সব সময় নীল।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1121.html
|
5859
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
শুধু কবিতার জন্য
|
চিন্তামূলক
|
শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার
জন্য কিছু খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধেবেলা
ভুবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য
অপলক মুখশ্রীর শান্তি একঝলক;
শুধু কবিতার জন্য তুমি নারী, শুধু
কবিতার জন্য এতো রক্তপাত, মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাত
শুধু কবিতার জন্য, আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়।
মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা, শুধু
কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1902
|
208
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আগমনী
|
স্বদেশমূলক
|
একি রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন–
ঝন রনরন রন ঝনঝন!
সেকি দমকি দমকি
ধমকি ধমকি
দামা-দ্রিমি-দ্রিমি গমকি গমকি
ওঠে চোটে চোটে,
ছোটে লোটে ফোটে
বহ্নি-ফিনিকি চমকি চমকি
ঢাল-তলোয়ারে খনখন!
একি রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন
রণ ঝনঝন ঝন রণরণ!হৈ হৈ রব
ঐ ভৈরব
হাঁকে, লাখে লাখে
ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে
লাল গৈরিক-গায় সৈনিক ধায় তালে তালে
ওই পালে পালে,
ধরা কাঁপে দাপে।
জাঁকে মহাকাল কাঁপে থরথর!
রণে কড়কড় কাড়া-খাঁড়া-ঘাত,
শির পিষে হাঁকে রথ-ঘর্ঘর-ধ্বনি ঘররর!
'গুরু গরগর' বোলে ভেরী তূরী,
'হর হর হর'
করি চীৎকার ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন!
ওঠে ঝন্ঝা ঝাপটি দাপটি সাপটি
হু-হু-হু-হু-হু-হু-শনশন!
ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন!তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ খল খল খল
নাচে রণ-রঙ্গিণী সঙ্গিনী সাথে,
ধকধক জ্বলে জ্বলজ্বল
বুকে মুখে চোখে রোষ-হুতাশন!
রোস্ কোথা শোন্!ঐ ডম্বরু-ঢোলে ডিমিডিমি বোলে,
ব্যোম মরুৎ স-অম্বর দোলে,
মম-বরুণ কী কল-কল্লোলে চলে উতরোলে
ধ্বংসে মাতিয়া তাথিয়া তাথিয়া
নাচিয়া রঙ্গে! চরণ-ভঙ্গে
সৃষ্টি সে টলে টলমল!ওকি বিজয়-ধ্বনি সিন্ধু গরজে কলকল কল কলকল!
ওঠে কোলাহল,
কূট হলাহল
ছোটে মন্থনে পুন রক্ত-উদধি,
ফেনা-বিষ ক্ষরে গলগল!
টলে নির্বিকার সে বিধাত্রীরো গো
সিংহ-আসন টলমল!
কার আকাশ-জোড়া ও আনত-নয়ানে
করুণা-অশ্রু ছলছল!বাজে মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁজর ঝম্ঝম,
নাচে ধূর্জটি সাথে প্রমথ ববম্ বম্বম্!
লাল লালে-লাল ওড়ে ঈশানে নিশান যুদ্ধের,
ওঠে ওঙ্কার রণ-ডঙ্কার,
নাদে ওম্ ওম্ মহাশঙ্খ বিষাণ রুদ্রের!
ছোটে রক্ত-ফোয়ারা বহ্নির বান রে!
কোটি বীর-প্রাণ
ক্ষণে নির্বাণ
তবু শত সূর্যের জ্বালাময় রোষ
গমকে শিরায় গম্গম্!
ভয়ে রক্ত-পাগল প্রেত পিশাচেরও
শিরদাঁড়া করে চন্চন্!
যত ডাকিনী যোগিনী বিস্ময়াহতা,
নিশীথিনী ভয়ে থম্থম্!
বাজে মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁঝর ঝম্ঝম্!ঐ অসুর-পশুর মিথ্যা দৈত্য-সেনা যত
হত আহত করে রে দেবতা সত্য!
স্বর্গ, মর্ত, পাতাল, মাতাল রক্ত-সুরায়;
ত্রস্ত বিধাতা,
মস্ত পাগল পিনাক-পাণি স-ত্রিশূল প্রলয়-হস্ত ঘুরায়!
ক্ষিপ্ত সবাই রক্ত-সুরায়! চিতার উপরে চিতা সারি সারি,
চারিপাশে তারি
ডাকে কুক্কুর গৃহিনী শৃগাল!
প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!
প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!!
আজ রণ-রঙ্গিণী জগৎমাতার দেখ্ মহারণ,
দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে দশ প্রহরণ!
পদতলে লুটে মহিষাসুর,
মহামাতা ঐ সিংস-বাহিনী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকে–
শাশ্বত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!
'নাই দানব
নাই অসুর,–
চাইনে সুর,
চাই মানব!'–
বরাভয়-বাণী ঐ রে কার
শুনি, নহে হৈ রৈ এবার! ওঠ্ রে ওঠ্,
ছোট্ রে ছোট্!
শান্ত মন,
ক্ষান্ত রণ!– খোল্ তোরণ,
চল্ বরণ
করব্ মা'য়;
ডর্ব কায়?
ধরব পা'য় কার্ সে আর,
বিশ্ব-মা'ই পার্শ্বে যার?
আজ আকাশ-ডোবানো নেহারি তাঁহারি চাওয়া,
ঐ শেফালিকা-তলে কে বালিকা চলে?
কেশের গন্ধ আনিছে আশিন-হাওয়া!
এসেছে রে সাথে উৎপলাক্ষী চপলা কুমারী কমলা ঐ,
সরসিজ-নিভ শুভ্র বালিকা
এল বীণা-পাণি অমলা ঐ! এসেছে গনেশ,
এসেছে মহেশ,
বাস্রে বাস্!
জোর উছাস্!!
এল সুন্দর সুর-সেনাপতি,
সব মুখ এ যে চেনা-চেনা অতি!
বাস্ রে বাস্ জোর উছাস্!! হিমালয়! জাগো! ওঠো আজি,
তব সীমা লয় হোক।
ভুলে যাও শোক– চোখে জল ব'ক
শান্তির– আজি শান্তি-নিলয় এ আলয় হোক!
ঘরে ঘরে আজি দীপ জ্বলুক!
মা'র আবাহন-গীত্ চলুক!
দীপ জ্বলুক!
গীত চলুক!!
আজ কাঁপুক মানব-কলকল্লোলে কিশলয় সম নিখিল ব্যোম্!
স্বা-গতম্!
স্বা-গতম্!!
মা-তরম্!
মা-তরম্!!
ঐ ঐ ঐ বিশ্ব কণ্ঠে
বন্দনা- বাণী লুণ্ঠে-'বন্দে মাতরম্!!!
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/agmni/
|
459
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মিলন-মোহনায়
|
প্রেমমূলক
|
হায় হাবা মেয়ে, সব ভুলে গেলি দয়িতের কাছে এসে!
এত অভিমান এত ক্রন্দন সব গেল জলে ভেসে !
কূলে কূলে এত ভুলে ফুলে কাঁদা আছড়ি পিছাড়ি তোর,
সব ফুলে গেলি যেই বুকে তোরে টেনে নিল মনোচোর!
সিন্ধুর বুকে লুকাইলি মুখ এমনই নিবিড় করে,
এমনই করিয়া হারাইলি তুই আপনারে চিরতরে –
যে দিকে তাকাই নাই তুই নাই! তোর বন্ধুর বাহু
গ্রাসিয়াছে তোরে বুকের পাঁজরে – ক্ষুধাতুর কাল রাহু!বিরহের কূলে অভিমান যার এমন ফেনায়ে উঠে,
মিলনের মুখে সে ফিরে এমনই পদতলে পড়ে লুটে?
এমনই করিয়া ভাঙিয়া পড়ে কি বুক-ভাঙা কান্নায়,
বুকে বুক রেখে নিবিড় বাঁধনে পিষে গুঁড়ো হয়ে যায়?
তোর বন্ধুর আঙুলের ছোঁয়া এমনই কি জাদু জানে,
আবেশে গলিয়া অধর তুলিয়া ধরিলি অধর পানে!
একটি চুমায় মিটে গেল তোর সব সাধ সব তৃষা,
ছিন্ন লতার মতন মুরছি পড়িলি হারায়ে দিশা!
– একটি চুমার লাগি
এতদিন ধরে এত পথ বেয়ে এলি বেয়ে এলি কি রে হতভাগি?গাঙ-চিল আর সাগর-কপোত মাছ ধরিবার ছলে,
নিলাজি লো, তোর রঙ্গ দেখিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে জলে।
দুধারের চর অবাক হইয়া চেয়ে আছে তোর মুখে,
সবার সামনে লুকাইলি মুখ কেমনে বঁধুর বুকে?
নীলিম আকাশে ঝুঁকিয়া পড়িয়া মেঘের গুণ্ঠন ফেলে
বউ-ঝির মতো উঁকি দিয়ে দেখে কুতূহলী-আঁখি মেলে।‘সাম্পান’-মাঝি খুঁজে ফেরে তোর ভাটিয়ালি গানে কাঁদি,
খুঁজিয়া নাকাল দুধারের খাল – তোর হেরেমের বাঁদি!
হায় ভিখারিনি মেয়ে,
ভুলিলি সবারে, ভুলিলি আপনা দয়িতেরে বুকে পেয়ে!
তোরই মতো নদী আমি নিরবধি কাঁদি রে প্রীতম লাগি,
জন্ম-শিখর বাহিয়া চলেছি তাহারই মিলন মাগি!
যার তরে কাঁদি – ধার করে তারই জোয়ারের লোনা জল
তোর মতো মোর জাগে না রে কভু সাধের কাঁদন-ছল।
আমার অশ্রু একাকী আমার, হয়তো গোপনে রাতে
কাঁদিয়া ভাসাই, ভেসে ভেসে যাই মিলনের মোহানাতে,
আসিয়া সেথায় পুনঃ ফিরে যাই। – তোর মতো সব ভুলে
লুটায়ে পড়ি না – চাহে না যে মোরে তারই রাঙ্গা পদমূলে!
যারে চাই তারে কেবলই এড়াই কেবলই দি তারে ফাঁকি ;
সে যদি ভুলিয়া আঁখি পানে চায় ফিরাইয়া লই আঁখি!
–তার তীরে যবে আসি
অশ্রু-উৎসে পাষাণ চাপিয়া অকারণে শুধু হাসি!
অভিমানে মোর আঁখিজল জমে করকা-বৃষ্টি সম,
যারে চাই তারে আঘাত হানিয়া ফিরে যায় নির্মম!
একা মোর প্রেম ছুটিবে কেবলই নিচু প্রান্তর বেয়ে,
সে কভু ঊর্ধ্বে আসিবে না উঠে আমার পরশ চেয়ে –
চাহি না তাহারে! বুকে চাপা থাকা আমার বুকের ব্যথা,
যে বুক শূন্য নহে মোরে চাহি – হব নাকো ভার সেথা!
সে যদি না ডাকে কী হবে ডুবিয়া ও-গভীর কালো নীরে,
সে হউক সুখী, আমি রচে যাই স্মৃতি-তাজ তার তীরে!
মোর বেদনার মুখে চাপিয়াছি নিতি যে পাষাণ-ভার!
তা দিয়ে রচিব পাষাণ-দেউল সে পাষাণ-দেবতার!কত স্রোতধারা হারাইছে কূল তার জলে নিরবধি,
আমি হারালাম বালুচরে তার, গোপন-ফাল্গুনদী! (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/milon-mohnay/
|
2055
|
মহাদেব সাহা
|
আমার এ-ভয় অন্যরকম
|
চিন্তামূলক
|
তোমরা সবাই ভয় পাও এই বাইরে যেতে
দুয়ার খুলে বাইরে যেতে
পথ পেরোতে
গাড়ির ভিড়ে বড়ো রাস্তা পার হতে যেই পা বাড়ালে
ভয় পাও এই আগুন দেখে
বারুদ দেখে
দোজখ দেখে ভীষণ রকম গজব দেখে খোদাতালার
তোমরা সবাই ভয় পাও এই দাঙ্গা দেখে
মড়ক লাগলে মহামারী এমনি কিছুর
ভয় পাও ঠিক রাত-বিরেতে অন্ধকারে
যাকে তাকে দেখলে হঠাৎ
হয় পাও এই সাপের বাঘের
চোর-ডাকাতের দৈত্যদানা জলপুলিশের
অনেক কিছুর ভয় তোমাদের
ভয় তোমাদের বাইরে কেবল চেখের ওপার,
আমার এ-ভয় অন্যরকম
অন্য কিছুর
আমার কিছুর
আমার এ-ভয় বাইরে তো নয়
ঘরের ভিতর নিজের ভিতর
আমার এ-ভয় নিজেকে ভয়
আমার এ-ভয় শোবার ঘরে বাথরুমটির
ঠাণ্ডা জলের টবের ভিতর
দাড়ি কাটার লম্বা ক্ষুরে
চায়ের কাপে কাঁটা-চামচে
আমার এ-ভয় আলমারিতে
বইয়ের তাকে ফুলদানিতে
মুখ দেখবার আয়না খুলে ড্রয়ার খুলে
আমার এ-ভয়
আমার এ-ভয় শত্রুকে নয় প্রিয়ার চোখে
নরম ঠোঁটে
নিজের দুটি করে মাঝে নখের ভিতর
আমার এ-ভয় অন্যরকম অন্যরকম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1464
|
2431
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
চাবি ইংরেজি
|
হাস্যরসাত্মক
|
-চাবি ইংরেজি কী?
-কী।
-চাবি ইংরেজি।
-বললাম তো।
-কী বললে?
-চাবি ইংরেজি।
-কখন বললে?
-এখন বললাম।
-কী বললে?
-ঠিক বলেছ।
-ঠিক বলেছি?
-হ্যাঁ।
-কী ঠিক বলেছি?
-চাবি ইংরেজি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2027
|
251
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
উমর ফারুক
|
স্তোত্রমূলক
|
তিমির রাত্রি - 'এশা'র আযান শুনি দূর মসজিদে।
প্রিয়-হারা কার কান্নার মতো এ-বুকে আসিয়ে বিঁধে!
আমির-উল-মুমেনিন,
তোমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন।
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী?
ও-আযান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?
মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্ববান?
আবার লুটায়ে পড়ি।
'সেদিন গিয়াছে' - শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।
উমর! ফারুক! আখেরি নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু!
আহ্বান নয় - রূপ ধরে এস - গ্রাসে অন্ধতা-রাহু!
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!
সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ।
শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি
আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!
ইসলাম - সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি?
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।
আজ বুঝি - কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর-
'মোরপরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর।'
* * * * * * * * * *
অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি
খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক' নুয়ে,
ঊর্ধ্বের যারা - পড়ছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে।
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ
করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ।
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে।
হেরি পশ্চাতে চাহি-
তুমি চলিয়াছ রৌদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি।
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা বলেছে শত্রু শেষে-
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে!
হায় রে, আধেক ধরার মালিক আমির-উল-মুমেনিন
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো 'খবুজ' রুটি
একটি মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু তিন মুঠি।
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি!
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,
সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে।
কিছুদূর যেতে উঠ হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, 'ভাই
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে,
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।'
...ভৃত্য দস্ত চুমি
কাঁদিয়া কহিল, 'উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?'
খলিফা হাসিয়া বলে,
'তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে।
রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, 'উমর! ওরে
করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।'
কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই।
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু, মোর অধিকার নাই।
আরাম সুখের, -মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা।
ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা।
ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা,
কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দী' বিশ্ববীণা।
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব-
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, 'জয় জয় হে মানব।'
* * * * * * * * * *
তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনি ক' কারে ভয়,
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়।
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,
তাই মহাবীর খালদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান,
সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না।
* * * * * * * * * *
মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,
মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা - সেদিন সে বিভাবরী
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুদাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে
কাঁদিতেছে আর দুখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়,
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকুলে চায়।
শুনিয়া সকল - কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে
বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে,
বলিলে, 'এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের 'পরে,
আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে'।
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,
বলিলে, 'বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা!
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি' - চলিলে নিশীথ রাতে
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে!
এত যে কোমল প্রাণ,
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক' অপমান!
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে
মেরেছ দোররা, মরেছে পুত্রে তোমার চোখের পরে!
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি-
'অপরাধ করে তোরি মতো স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।'
আবু শাহমার গোরে
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে।
খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,
'কোথায় খলিফা' কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে,
রৌদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে।
হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট!
অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।
(সংক্ষেপিত)
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/861
|
5652
|
সুকুমার রায়
|
বর্ষার কবিতা
|
ছড়া
|
কাগজ কলম লয়ে বসিয়াছি সদ্য,
আষাঢ়ে লিখিতে হবে বরষার পদ্য।
কি যে লিখি কি যে লিখি ভাবিয়া না পাই রে,
হতাশে বসিয়া তাই চেয়ে থাকি বাইরে।
সারাদিন ঘনঘটা কালো মেঘ আকাশে,
ভিজে ভিজে পৃথিবীর মুখ খানা ফ্যাকাশে।
বিনা কাজে ঘরে বাঁধা কেটে যায় বেলাটা,
মাটি হল ছেলেদের ফুটবল খেলাটা।
আপিসের বাবুদের মুখে নাই ফুর্তি,
ছাতা কাঁধে জুতা হাতে ভ্যাবাচ্যাকা মূর্তি।
কোনখানে হাটু জল কোথা ঘন কর্দম -
চলিতে পিছল পথে পড়ে লোকে হর্দম।
ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদ্গদ্,
গান করে সারারাত অতিশয় বদ্খদ্।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/borshar-kobita/
|
1108
|
জীবনানন্দ দাশ
|
প্যারাডিম
|
চিন্তামূলক
|
সময়ের সুতো নিয়ে কেটে গেছে ঢের দিন
এক আধবার শুধু নিশিত ক্ষমতা
এনেছিল,- তারপরে নিভে- মিশে গেছে;
হৃদয় কাটাল কান।
বালুঘড়ি ব'লে গেলঃ সময় রয়েছে ঢের
সেই সুর দূর এক আশ্চর্য কক্ষের
চোখের ভিতরে গিয়ে স্বর্ণ দীনারের
অমোঘ বৃত্তের মত রূপ নিয়ে নড়ে।
বালুঘড়ি ব'লে গেলঃ সময় রয়েছে ঢের
সময় রয়েছে ঢের ইহাদের- উহাদের;
সমুদ্রের বালি আর আকাশের তারার ভিতরে
চ'লেছে গাধার পিঠ- সিংহ, মেষ, বিদূষ্ক,
মূর্খ আর রূপসীর বিবাহ ঘটক,
ক্রীতদাস কাফরী তেল ব'য়ে আনে।
সময় রয়েছে ঢের- সময় রয়েছে ঢের
সরবপ্রাহের সব অগণন গণিকারা জানে।চারিদিকে মৃগয়ার কলরব- সময়ের বীজ।
অনেক শিকারী আজ নেমেছে আলোকে।
আমিও সূর্যের তেজ দেখে গেছি বহুক্ষণ
ভারুই পাখির মত চোখে;
ঘুরুনো আলোয় ঘুরে সংস্করে;- উড়িবার হেতু
যদিও নেইক' কিছু ক্ষিতিজ রেখার পথে আর।
বহু আগে রণ ক'রে গিয়েছিল বুদ্ধ আর মার;
অগ্নির অক্ষরে তবু গঠিত হয়েছে আজো সেতু।
ব্রহ্মার ডিমের সাথে একসাথে জন্মেছিল যারা ভালোবেসে
সেই স্বর্গ নরককে আবার ক্ষালন ক'রে- প্রমাণিত দেশে
তারাই তো রেখে দেবে,- মাঝখানে যদিও র'য়েছে আজ রক্তিম সাগর,
বিশ্বাসীরা চোখ বুজে ব'য়ে নেয় মুণ্ড আর কংকালের কেতু।
সম্রাটের সৈনিকেরা পথে পথে চ'রে
খুঁজে ফেরে কোন এক শুভলাঞ্ছন; সফেন কাজের ঢেউয়ে মৃত্যু আছে- জানে;
তার আগে র'য়ে গেছে জীবন-মৃত্যুর অমিলন;
যেনো কোনো নরকের কর্নিশের থেকে ধীরে উঠে
কোনো এক নিম্নতর আঁধারের বিজৃম্ভিম কাক
আবার সাজাতে পারে দু'মুহূর্ত ময়ূরের মতন পোষাক,
সৈকতে বালির কণা নক্ষত্রের রোলে যদি এক সাথে জুটে
আবছায়া, অগ্নিভয়, অন্ধকার- সময়ের হাত ঠেলে ফেলে
অনাবিল অন্ত"সার নিতে দেয় খুঁটে।সৈনিকের সম্রাটেরা স্থিরতর- তবু;
চারিদিকে মাতালের সাবলীল কাজ শেষ হ'লে
প্রতিধ্বনিত আর থাকে নাক' যখন আকাশে
জলের উপরে হেঁটে মায়বীর মত যায় চ'লে।
(গভীর সৌকর্য দেখে মানবীয় আত্মা জাগে জন্তুদের ভিড়ে;)
অবিস্মরণীয় সব ইতিহাস পর্যায়ের দিকে
চেয়ে দেখে সর্বদাই পৃথিবীর প্রবীণ জ্ঞানীকে
ডেকে আনে তারা নিত্য নতুন তিমিরে;
নিপুণ ছেলের হাতে লাটিমের মত ঘোরে' দ্বৈপায়ন বলে
ঘুরায়ে নিবিড় সেই প্যারাডিমটিরে।'যখন চিনির দাম বেড়ে গেছে ভয়ঙ্কর
রাতা খায় সেচ্ছায় নুনের পরিজ।
সমস্ত ভণ্ডুল হয়ে গেল পৃথিবীর,
মসৃন টেবিলে ব'সে খেলে যায় ব্রিজ।
জীবঙ্কে স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের মত মেনে নিয়ে
মঞ্চে বক্তৃতা দেয় কর গুণে- কুকুর ক্ষেপিরে'।
ব'লে গেল অত্যন্ত অদ্ভুত এক টুপিব্যবসায়ী নেমে এসে;
যেখানে সম্ভ্রম করা সমুচিত সেখানে ভাঁড়ের মত হেসে।'সমস্ত সভার মাঝে তারপর
দম আর থাকে নাক' কোনো কুকুরের;
একটি মাছিও আর বসে নাক' বক্তার নাকে
একটি মশাও তাকে পায় নাক' টের;
এবং পায়ের নিচে পৃথিবীরো মাটি আর নেই
তবু সবি পাওয়া যাবে চালানির মাল ছাড়ালেই।'
ব'লে গেল অত্যন্ত অদ্ভুত এক টুপিব্যবসায়ী নেমে এসে;
যেখানে সম্ভ্রম করা সমুচিত সেখানে ভাঁড়ের মত হেসে।'আমরা সকলে জানি বানরাজা নক্ষত্রের থেকে
সে জাহাজ এসে গেছে মুগশিরা তারকার দিকে;
হয়তো শরমা তাকে তুলে ধ'রে সারমেয়দের
নিকটে পাঠায়ে দেবে নির্জন তারিখে।
সম্প্রতি রুটিন তবে শেষ ক'রে- ঘুমাবার পরে
আবার সে দেখা দেবে আমাদের স্বাভাবিক সুবিধার তরে।'
ব'লে গেল অত্যন্ত অদ্ভুত এক টুপিব্যবসায়ী নেমে এসে;
যেখানে সম্ভ্রম করা সমুচিত সেখানে ভাঁড়ের মত হেসে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/paradim/
|
5048
|
শামসুর রাহমান
|
বেশি বাকি নেই
|
চিন্তামূলক
|
দেখতে দেখতে ফ্ল্যাটে, গাছগাছালিতে খোলা মনের ভেতরে
হেমন্ত দিনের ছায়া, যাবার সময় হয়ে এল।
সে কখন থেকে তাড়া দিচ্ছে, অথচ এখনো
সুটকেস গোছানো হয়নি।
হ্যান্ডব্যাগ খালি পড়ে আছে। তাড়াহুড়ো
ক’রে খুঁটিনাটি সব জিনিসপত্তর
হ্যান্ডব্যাগে পুরে দিতে গিয়ে
রাজ্যের ঝামেলা।
বাদামি ফ্লাস্কটা কই? পুতুলেরা মেঝেতে গড়ায়।বড় ঘরে একা, বৃষ্টি ভেজা গন্ধ, কার দীর্ঘশ্বাস
ঘাড় ছুঁয়ে যায়?
তড়িঘড়ি সুটকেসে শার্ট, ট্রাউজার, পাণ্ডুলিপি
ইত্যাদি ভরার পরে সুটকেস কিছুতেই বন্ধ
করতে পারি না আর সবচেয়ে মুশ্কিলে
পড়েছি পুতুল নিয়ে। কাকে ছেড়ে কাকে নেব? তাছাড়া হঠাৎ
জুতো জোড়া কী করে যে এরকম ছোট হয়ে গেল,অত্যন্ত কুণ্ঠিত হয়ে আছি
সমাপ্তি ঈষৎ উঁকি দিয়ে যায় কৌতূহলে ধুলো ওড়ে।
‘তোমাকে যেতেই হবে? কণ্ঠস্বর শুনে
পেছনে তাকিয়ে দেখি, একটি তরুণী
বড় বড় চোখ মেলে দেখছে আমাকে।
মনে পড়ে, কতকাল দেখিনি তন্বীকে, লাল টিপ
স্মৃতির মতোই জ্বলে, সমগ্র সত্তায় তার মেঘমেদুরতা।
বাঁধা-ছাঁদা কী নিপুণ সেরে
ময়ূরপঙ্খীর মতো সে এগিয়ে এসে বলে-‘কত তুচ্ছ কাজে
বেলা গেল, অথচ কিছুই বলা হলো না আমার।
আমারও কি বলবার মতো ছিল কোনো কথা? চুলে
চিরুনি চালিয়ে ছুটি, সময় তো বেশি বাকি নেই। (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/beshi-baki-nai/
|
1714
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
হেলং
|
প্রকৃতিমূলক
|
এ যেন আরণ্য প্রেত-রাত্রির শিয়রে এক মুঠো
জ্যোৎস্নার অভয়।
অন্তত তখন তা-ই মনে হয়েছিল
সুন্দরী হেলং, সেই পাহাড়িয়া বৃষ্টির তিমিরে।
সকাল থেকেই সূর্য নিখোঁজ। দক্ষিণে
স্পর্ধিত পাহাড়। বাঁয়ে অতল গড়খাই
উন্মাদ হাওয়ার মাতামাতি
শীর্ণ গিরিপথে।
যেন কোনো রূপকথার হৃতমণি অন্ধ অজগর
প্রচণ্ড আক্রোশে তার গুহা থেকে আথালি-পাথালি
ছুটে আসে; শত্রু তার পলাতক জেনে
নিজেকে দংশন হানে, আর
মৃত্যুর পাখসাট খায় পাথরে-পাথরে।
উপরে চক্রান্ত চলে ক্রূর দেবতার। ত্রস্ত পায়ে
নীচে নেমে আর-এক বিস্ময়।
এ কেমন অলৌকিক নিয়মে নিষ্ঠুর
ঝঞ্চা প্রতিহত, হাওয়া নিশ্চুপ এখানে।
নিত্যকার মতোই দোকানি
সাজায় পসরা, চাষি মাঠে যায়, গৃহস্থ-বাড়ির
দেয়ালে চিত্রিত পট, শান্ত গাঁওবুড়া
গল্প বলে চায়ের মসলিসে।
দুঃখের নেপথ্যে স্থির, আনন্দের পরম আশ্রয়
প্রাণের গভীরে মগ্ন, ক্ষমায় সহাস্য গিরিদরি–
সুন্দরী হেলং।
অন্তত তখন তা-ই মনে হয়েছিল
তোমাকে, হেলং, সেই পাহাড়িয়া বৃষ্টির তিমিরে।
এবং এখনও মনে হয়,
তীব্রতম যন্ত্রণার গভীরে কোথাও
নিত্য প্রবাহিত হয় সেই আনন্দের স্রোতস্বিনী
যে জাগায় দারুণ ভয়ের
মর্মকষে শান্ত বরাভয়।।
মনে হয়, রক্তরং এই রঙ্গমঞ্চের আড়ালে
রয়েছে কোথাও
নেপথ্য-নাটকে স্থির নির্বিকার নায়ক-নায়িকা,
দাঁড়ে টিয়াপাখি, শান্তি টবের অর্কিডে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1705
|
3912
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সত্য মোর অবলিপ্ত সংসারের বিচিত্র প্রলেপে
|
চিন্তামূলক
|
সত্য মোর অবলিপ্ত সংসারের বিচিত্র প্রলেপে,
বিবিধের বহু হস্তক্ষেপে, অযত্নে অনবধানে
হারালো প্রথম রূপ, দেবতার আপন স্বাক্ষর
লুপ্ত প্রায়; ক্ষয়-ক্ষীণ জ্যোতির্ময় আদি মূল্য তার।
চতুষ্পথে দাঁড়াল সে ললাটে পণ্যের ছাপ নিয়ে
আপনারে বিকাইতে, অঙ্কিত হতেছে তার স্থান
পথে-চলা সহস্রের পরীক্ষা-চিহ্নিত তালিকায়।
হেনকালে একদিন আলো-আঁধারের সন্ধি-স্থলে
আরতি শঙ্খের ধ্বনি যে-লগ্নে বাজিল সিন্ধুপারে,
মনে হোলো, মুহূর্তেই থেমে গেল সব বেচাকেনা,
শান্ত হল আশা-প্রত্যাশার কোলাহল। মনে হোলো,
পরের মুখের মূল্য হতে মুক্ত, সব চিহ্ন-মোছাঅসজ্জিত আদি-কৌলীন্যের শান্ত পরিচয় বহি
যেতে হবে নীরবের ভাষাহীন সংগীত-মন্দিরে
একাকীর একতারা হাতে। আদিম সৃষ্টির যুগে
প্রকাশের যে আনন্দ রূপ নিল আমার সত্তায়
আজ ধূলিমগ্ন তাহা, নিদ্রাহারা রুগ্ন বুভুক্ষার
দীপধূমে কলঙ্কিত। তারে ফিরে নিয়ে চলিয়াছি
মৃত্যুস্নানতীর্থতটে সেই আদি নির্ঝরতলায় ।
বুঝি এই যাত্রা মোর স্বপ্নের অরণ্যবীথিপারে
পূর্ব ইতিহাসধৌত অকলঙ্ক প্রথমের পানে।
যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে
কখনো বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয় হুংকারে,
কখনো বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে
শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসব প্রাঙ্গণে। (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sotyo-mor-obolipto-songsare-bichitro-prolepe/
|
716
|
জয় গোস্বামী
|
বৃষ্টি
|
স্বদেশমূলক
|
কে মেয়েটি হঠাৎ প্রণাম করতে এলে ?
মাথার ওপর হাত রাখিনি
তোমার চেয়েও সসংকোচে এগিয়ে গেছি
তোমায় ফেলে
ময়লা চটি, ঘামের গন্ধ নোংরা গায়ে,
হলভরা লোক, সবাই দেখছে তার মধ্যেও
হাত রেখেছ আমার পায়েআজকে আমি বাড়ি ফিরেও স্নান করিনি
স্পর্শটুকু রাখব বলে
তোমার হাতের মুঠোয় ভরা পুস্করিণী
পরিবর্তে কী দেব আর ? আমার শুধু
দু’ চার পাতা লিখতে আসাসর্বনাশের এপার ওপার দেখা যায় না
কিন্তু আমি দেখতে পেলাম, রাঙা আলোয়
দাঁড়িয়ে আছে সে-ছন্দ, সে-কীর্তিনাশা ।
অচেনা ওই মেয়ের চোখে যে পাঠাল
দু’-এক পলক বৃষ্টিভেজা বাংলা ভাষা ।কবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুনকে মেয়েটি হঠাৎ প্রণাম করতে এলে ?
মাথার ওপর হাত রাখিনি
তোমার চেয়েও সসংকোচে এগিয়ে গেছি
তোমায় ফেলে
ময়লা চটি, ঘামের গন্ধ নোংরা গায়ে,
হলভরা লোক, সবাই দেখছে তার মধ্যেও
হাত রেখেছ আমার পায়েআজকে আমি বাড়ি ফিরেও স্নান করিনি
স্পর্শটুকু রাখব বলে
তোমার হাতের মুঠোয় ভরা পুস্করিণী
পরিবর্তে কী দেব আর ? আমার শুধু
দু’ চার পাতা লিখতে আসাসর্বনাশের এপার ওপার দেখা যায় না
কিন্তু আমি দেখতে পেলাম, রাঙা আলোয়
দাঁড়িয়ে আছে সে-ছন্দ, সে-কীর্তিনাশা ।
অচেনা ওই মেয়ের চোখে যে পাঠাল
দু’-এক পলক বৃষ্টিভেজা বাংলা ভাষা ।কবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a7%83%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ad%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b7%e0%a6%be-%e0%a6%9c/#respond
|
553
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
স্মরণে
|
প্রেমমূলক
|
আজ নতুন করে পড়ল মনে মনের মতনে
এই শাঙন সাঁঝের ভেজা হাওয়ায়, বারির পতনে।
কার কথা আজ তড়িৎ-শিখায়
জাগিয়ে গেল আগুন লিখায়,
ভোলা যে মোর দায় হল হায়
বুকের রতনে।
এই শাঙন সাঁঝের ভেজা হাওয়ায়, বারির পতনে।
আজ উতল ঝড়ের কাতরানিতে গুমরে ওঠে বুক
নিবিড় ব্যথায় মূক হয়ে যায় মুখর আমার মুখ।
জলো হাওয়ার ঝাপটা লেগে
অনেক কথা উঠল জেগে
পরান আমার বেড়ায় মেগে
একটু যতনে।
এই শাঙন সাঁঝের ভেজা হাওয়ায়, বারির পতনে। (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sorone/
|
1440
|
দেবব্রত সিংহ
|
তেজ
|
মানবতাবাদী
|
‘মু জামবনির কুঁইরি পাড়ার শিবু কুঁইরির বিটি সাঁঝলি বটে।’কাগজওয়ালারা বইললেক,
“উঁ অতটুকু বইললে হবেক কেনে?
তুমি এবারকার মাধ্যমিকে পত্থম হইছ।
তোমাকে বইলতে হবেক আরো কিছু।”পঞ্চায়েতের অনি বৌদি, পধান, উপপধান, এইমেলে, এম.পি-
সব একেবারে হামলিয়ে পড়ল আমাদের মাটির কুঁইড়েঘরে।জামবনি ইস্কুলের হেডমাস্টার
কোন বিহান বেলায় টিনের আগর খুইলে,
হেইকে, ডেইকে, ঘুম ভাঙাই- খবরটা যখন পথম শুনালেক
তখন মাকে জড়াই শুয়ে ছিলুম আমি।
কুঁড়াঘরের ঘুটঘুইটা আঁধারে হেডমাস্টার মশাইরে দেইখে
চোখ কচালে মায়ের পারা আমিও হাঁ – হয়ে ভাইবে ছিলেম।
-একি স্বপন দেখছি নাকি-
স্যার বইলল, এটা স্বপুন লয়, স্বপুন লয়, সত্যি বইটে।
কথাটো শুইনে কেঁইনদে ভাসায়েছিলুম আমরা মা বিটি।আজ বাপ বেঁইচে থাইকলে
আমি মানুষটাকে দেখাইতে পাইত্থম। দেখাইতে পাইতত্থেম বহুত কিছু-
আমার বুকের ভিতর
যে তেজালো সইনঝা বাতিটা জ্বালায়ে ছিল মানুষটা।
সেই বাতিটা আজকে কেমন আমাদের কুঁইড়ে ঘরটাকে আলো কইরেছে।
সেটো দেখাইতে পাইত্থম।আপনারা বইলছেন বটে
“তুমাদের মতো মেইয়ারা যদি উঠে আসে তবে ভারতবর্ষ উঠে আসে।”
কথাটা খুবই সত্যি, কিন্তু
উঠে আসার রাস্তাটা যে এখোন তৈয়ার হয় নাই।
খাড়া পাহাড়ে উঠা যে কি জিনিস।
বহুত দম লাগে। বহুত ত্যাজ লাগে…আমি জামবনির কুঁইরি পাড়ার শিবু কুঁইরির বিটি সাঁঝলি।
যখন থেকে হুঁশ হইছে তখন থেকে শুইনে আসছি
“বিটি না মাটি’
ঠাকুমা বইলথক্,
পরের ঘরে হেঁইসেল ঠেইলবেক্ তার আবার লিখাপড়া’গাঁয়ের বাবুরা বইলথক্
“দ্যাখ সাঁঝলি – মন খারাপ কইরলি তো হেইরে গেলি।
শুন যে যা বইলছে বলুক্। সে সব কথা এক কানে সিধালে
আর এক কানে বার কইরে দিবি।’তখ্যান বাবুপাড়ার দেঘইরা ঘরে কামিন খাইটতক মা।
ক্ষয় রোগের তাড়সে-মায়ের গতরটা ভাঙে নাই অতোটা।
মাঝে মইধ্যে জ্বরটর আইত বটে, জ্বর এলে মা
চুপচাপ এঙনাতে তালাই পাইতে শুইয়ে থাইকতো।
মনে আছে সে ছিল এক জাঁড় কালের সকাল।
রোদ উঠেছিল ঝলমলানি ঝিঙা ফুলা রোদ।
আমি সে রোদে পিঠ দিয়া গা দুলাই পড়ছিলাম
ইতিহাস…
কেলাস সেভেনের সামন্ত রাজাদের ইতিহাস।দে ঘরের গিন্নি লোক পাঠাইছিল বারকতক।
মায়ের জ্বর সে তারা শুইনতে নাই চায়!
আমাদের দিদি বুঢ়ি তখনো বাঁইচে।
ছেঁড়া কম্বল মুড়হি দিয়ে বিড়ি ফুকছিল বুড়হি।
শেষতক্ বুড়হি সেদিন পড়া থেকে উঠাই
মায়ের কাইজ টুকুন কইরতে পাঠাই ছিল বাবু ঘরে।পুরানো ফটক ঘেরা উঠান-অতোবড়ো দরদালান- অতোবড়ো বারান্দা,
সব ঝাঁট ফাট দিয়ে সাফ সুতরো করে আসছিলুম চইলে,
দেঘইরে গিন্নি নাই ছাইড়ল্যাক, একগাদা এটাকাটা-জুঠা বাসন
আমার সামনে আইনে ধইরে দিলেক। বইল্লুম
“আমি তোমাদের জুঠা বাসন ধুইতে লাইরবো,”
বাবু গিন্নির সেকি রাগ’-
“কি বইল্লি তুই যতবড়ো মু লয় তত বড়ো কথা? জানিস,
তর মা, তর মায়ের মা, তার মায়ের মা সবাই এতক্কাল
আমাদের জুঠা বাসন ধুয়ে গুজারে গ্যালো
আর তুই আমাদের জুঠা বাসন ধুইতে লাইরবি!”
বল্লুম “হ আমি তোমাদের জুঠা বাসন ধুইতে লাইরবো।
তোমরা লোক দেখে লাওগা। আমি চইল্লোম”
কথাটো বইলে গটগট গটগট কইরে বাবু গিন্নির মুখের সামনে
আমি বেড়োই চইলে আইলম।”তা বাদে সে লিয়ে কি কাইন্ড। কি ঝাম্যালা।
বেলা ডুবলে মাহাতোদের ধান কাট্টে বাপ ঘরে ফিরে আইলে
দুপাতা লিখাপড়া করা লাত্নির ছোট মুখে বড়ো থুতির কথা
সাতকাহন কইরে বইলেছিল বুড়হি দিদি।মা কুনো রা কাড়ে নাই।
আঘর মাসের সইন্ ঝা বেলাই এঙ্গ্নাতে আগুন জ্বেইলে
গা-হাত-পা সেঁকছিল মা।একমাথা ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকানো বাপের পেটানো পাথরের মুখটা
ঝইলকে উঠেছিল আগুনের আঁচে।
আমি বাপের অমুন চেহারা কুনোদিন দেখি লাই।
বাপ সেদিন মা আর দিদি বুড়ির সমুখে আমাকে কাইছে ডেইকে
মাথায় হাত বুলাই গম্ গইমা গলায় বইলেছিল –যা কইরেছিস্! বেশ্ কইরেছিস্।
শুন্, তর মা, তর মায়ের মা, তার মায়ের মা- সবাই কইরেছে কামিনগিরি।
বাবুঘরে গতর খাটাই খাইয়েছে। তাইতে হইছে টা কি।
তাতে হইছে টা কি! ই-কথাটো মনে রাখবি সাঝ্লি,
তুই কিন্তু কামিন হবার লাগে জম্মাস লাই।
যত বড় লাট সাহেবই হোক কেনে কারু কাছে মাথা নোয়াই
নিজের ত্যাজ বিকাবি লাই।
এই ত্যাজ টুকুর ল্যাইগে লিখাপড়া শিখাচ্ছি তুকে।
না হলে আমাদের মতো হা-ভাতা মানুষের ঘরে আর আছে টা কি?”আমি জামবনির কুইরি পাড়ার শিবু কুইরির বিটি সাঁঝলি,
কবেকার সেই কেলাস সেভেনের কথা ভাবতে যায়ে
কাগজওয়ালা টিভিওয়ালাদের সামনে এখুন কি যে বলি…তালপাতার রদ দিয়ে ঘেরা গোবুর লতার এঙ্গনাতে লুকে এখন লুকাকার।
তার মাঝে বাঁশি বাজাই, জিপগাড়িতে চেইপে
আগুপিছু পুলিশ লিয়ে মন্ত্রী আইল্যাক ছুটে।
‘কুথায় সাঁঝলি কুইরি কুথায়’, বইলতে বইলতে
বন্দুকধারী পুলিশ লিয়ে সুজা আমাদের মাটির কুইড়ে ঘরে,হেডমাস্টার বইললে ‘পনাম কর, সাঁঝলি পনামকর’
মন্ত্রী তখন পিঠ চাপড়াইল্যাক। পিঠ চাপরাই বইল্লেক,
“তুমি কামিন খেইটে মাইধ্যমিকে পথম হইছ,
তাই তুমারে দেইখতে আইলম্, সত্যিই বড় গরীব অবস্থা বটে।
তুমাদের মতো মিয়ারা যাতে উঠে আসে
তার লাগেই তো আমাদের পার্টি, তার লাগেই তো আমাদের সরকার।
– এই লাও, দশ হাজার টাকার চেকটা এখুন লাও।
শুন আমরা তুমাকে আরো ফুল দিব, সম্মর্ধ্বনা দিব,
আরো দ্যাদার টাকা তুলে দিব।–
এই টিবির লোক, কাগুজের লোক, কারা আছেন, ই-দিকে আসেন।“তক্ষুনি ছোট বড় কতরকমের সব ঝইলকে উঠল ক্যামেরা,
ঝইলকে উঠল মন্ত্রীর মুখ। না না মন্ত্রী লয়, মন্ত্রী লয়,
ঝইলকে উঠল আমার বাপের মুখ।
গন্ গনা আগুনের পারা আগুন মানুষের মুখ।
আমি তক্ষুনি বইলে উঠলম-
“না না ই টাকা আমার নাই লাইগব্যাক। আর আপনারা
যে আমায় ফুল দিব্যান, সম্মর্ধ্বনা দিব্যান বইলছেন তাও আমার নাই লাইগব্যাক।’মন্ত্রী তখন ঢোক গিলল্যাক।
গাঁয়ের সেই দেঘইর্যা গিন্নির বড় ব্যাটা এখুন পাটির বড় ল্যাতা।
ভিড় ঠেলে সে আইসে বইলল্যাক-
“ ক্যানে, কি হইছেরে সাঁঝলি,
তুই তো আমাদের বাড়ি কামিন ছিলি।
বল তর কি কি লাইগব্যাক, বল, তর কি কি লাইগব্যাক খুলে বল খালি,”বইল্ লম –
“ আমার পারা শয়ে শয়ে আর অনেক সাঁঝলি আছে।
আর শিবু কুইরির বিটি আছে গাঁ গিরামে। তারা যদ্দিন
অন্ধকারে পইড়ে থাইকবেক তারা যদ্দিন লিখ-পড়ার লাগে কাঁইদে বুলব্যাক্।
তদ্দিন কুনো বাবুর দয়া আমার নাই লাইগব্যাক্। শুইনছ্যান আপনারা
তদ্দিন কুনো বাবুর দয়া আমার নাই লাইগ্ ব্যাক।“
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4195.html
|
2271
|
মহাদেব সাহা
|
সবাই ফেরালে মুখ
|
প্রেমমূলক
|
সবখানে ব্যর্থ হয়ে যদি যাই
তুমিও ফেরাবে মুখ স্নিগ্ধ বনভূমি
ক্ষুধায় কাতর তবু দেবে না কি অনাহারী মুখে দুটি ফল?
বড়োই ব্যথিত যদি কোনো স্নেহ ঝরাবে না অনন্ত নীলিমা!
সবাই ফেরাবে মুখ একে একে, হয়তোবা শুষ্ক হবে
সব সমবেদনার ধারা
তুমিও কি চিরপ্রবাহিণী নদী দেবে না এ-তৃষিত অঞ্জলি
ভরে জল?
আমার মাথায় যদি ঝরবে না কোনো শান্তিবারি তবে
কেন মেঘদল!
সব সেবাশ্রম, স্বাস্থ্যনিবাস যদি করে অবহেলা, রোগে একফোঁটা
না দেয় ওষুধ
তোমার ভেষজবিদ্যা দিয়ে আমাকে কি সুস্থ করে তুলবে না প্রকৃতি?
খোলা রাখবে না স্যান্যাটোরিয়াম?
উদ্ভিদ দেবে না ঘ্রাণ নাকে মুখে যাতে পুনরায় জ্ঞান ফিরে আসে।
উৎসবের সব বাঁশি যদি থেমে যায়,
কেউ দয়াপরবশ হয়ে আর না শুনায় গান
পাখি তুমি শোনাবে না তোমার কূজন কলগীতি
পাতার মর্মরে বেজে উঠবে না ভৈরবী বেহাগ!
যদি সবার লাঞ্ছনা পাই, সকলের রুক্ষ আচরণ
তুমিও কি মোছাবে না মুখ, তোমারও আঁচলখানি
হবে নাকি দয়ার্দ্র রুমাল?
সবাই ফেরলে মুখ তুমি ফেরায়ো না, দুঃখ পাবো!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1495
|
3145
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তারকার আত্মহত্যা
|
চিন্তামূলক
|
জ্যোতির্ময় তীর হতে আঁধার সাগরে
ঝাঁপায়ে পড়িল এক তারা ,
একেবারে উন্মাদের পারা ।
চৌদিকে অসংখ্য তারা রহিল চাহিয়া
অবাক হইয়া --
এই - যে জ্যোতির বিন্দু আছিল তাদের মাঝে
মুহুর্তে সে গেল মিশাইয়া ।
যে সমূদ্রতলে
মনোদুঃখে আত্মঘাতী
চির - নির্বাপিত - ভাতি
শত মৃত তারকার
মৃতদেহ রয়েছে শয়ান
সেথায় সে করেছে পয়ান ।
কেন গো , কী হয়েছিল তার ।
একরার শুধালে না কেহ --
কী লাগি সে তেয়াগিল দেহ ।
যদি কেহ শুধাইত
আমি জানি কী যে সে কহিত ।
যতদিন বেঁচে ছিল
আমি জানি কী তারে দহিত ।
সে কেবল হাসির যন্ত্রণা ,
আর কিছু না !
জ্বলন্ত অঙ্গারখণ্ড ঢাকিতে আঁধার হৃদি
অনিবার হাসিতেই রহে ,
যত হাসে ততই সে দহে ।
তেমনি , তেমনি তারে হাসির অনল
দারুণ উজ্জল --
দহিত , দহিত তারে , দহিত , কেবল ।
জ্যোতির্ময় তারাপূর্ণ বিজন তেয়াগি
তাই আজ ছুটেছে সে নিতান্ত মনের ক্লেশে
আঁধারের তারাহীন বিজনের লাগি ।
কেন গো তোমরা যত তারা
উপহাস করি তারে হাসিছ অমন ধারা ।
তোমাদের হয় নি তো ক্ষতি ,
যেমন আছিল আগে তেমনি রয়েছে জ্যোতি ।
সে কি কভু ভেবেছিল মনে -
( এত গর্ব আছিল কি তার ) ।
আপনারে নিবাইয়া তোমাদের করিবে আঁধার ।
গেল , গেল , ডুবে গেল , তারা এক ডুবে গেল ,
আঁধারসাগরে --
গভীর নিশীথে
অতল আকাশে ।
হৃদয় , হৃদয় মোর , সাধ কি রে যায় তোর
ঘুমাইতে ওই মৃত তারাটির পাশে
ওই আঁধারসাগরে
এই গভীর নিশীথে
ওই অতল আকাশে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tarokar-atahta/
|
5963
|
হাসন রাজা
|
এগো মইলা
|
ভক্তিমূলক
|
এগো মইলা, তোমার লাগিয়ে হাছন রাজা বাউলা।
ভাবতে ভাবতে হাছন রাজা হইল এমন আউলা।।
দিনে রাইতে উঠে মনে, প্রেমানলের শওলা।
আর কত সহিব প্রাণে, তুই বন্ধের জ্বালা।।
সোনার রং অঙ্গ আমার, হইয়াছে রে কালা।
অন্তরে বাহিরে আমার জ্বলিয়ে রহিল কয়লা।।
লোকে বলে হাছন রাজা হইল রে আজুলা।
হাতে তলি দিয়া গিল্লা, করেরে কট মুল্লা।।
আজুলা হইয়া হাছন রাজায় বলে আল্লা।
বারে বারে বলে, লাইলাহা ইল্লাল্লা।
নাচে নাচে হাছন রাজা হইয়া ফানা ফিল্লা।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4478.html
|
1926
|
প্রণবকুমার চট্টোপধ্যায়
|
ধন্য শাহবাগ-প্রণবকুমার চট্টোপধ্যায়
|
মানবতাবাদী
|
তোমরা পেরেছ ভাই ,আমরা পারি নি! লজ্জায় লজ্জারও মাথা কাটা যায়
ভয়ের জানালাগুলো খুলে দিতে বড় ভয়, চোখ বড় বড় করা জল্লাদবাহিনী
শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে; তবু দ্বিধাহীন যে মানুষগুলো আজ পথের উপর
এক হয় মানবতা বোধে ,আমরা কী পারি তাকে দূরে ঠেলে দিতে?
কিছুই পারি না তবু, ভেসে যাচ্ছে সব চোখ জলের ধারায়…ভুলে গেছি কাঁটাতার, ভুলে গেছি অভেদ্য পাঁচিল
আমরা মানুষ শুধু একই মা-ভাষা নিয়ে এই পৃথিবীর
যে সব অসভ্য লোক ধর্মের ছুরি নিয়ে ঘোরে
আমরা রয়েছি সব চেতনা-মশাল নিয়ে হাতে
রুখে দিতে ব্যাভিচার; যত তারা শক্তিমানই হোক
পদ্মা-মেঘনা ছুঁয়ে ভাগীরথী আজ উতরোল
ধন্য শাহবাগ আর ধন্য সব তরুণ-তরুণী
আমৃত্যু তোমার পাশে আছে দোস্তো আমার দু`হাত
এটুকু সম্বল আর এটুকুই নাও আজ ,সেলাম তোমায় শাহবাগকলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ থেকে
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/03/12/%e0%a6%a7%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%97-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%ac%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9a/
|
635
|
জয় গোস্বামী
|
একটি বৃষ্টির সন্ধ্যা
|
প্রেমমূলক
|
চোখ, চলে গিয়েছিল, অন্যের প্রেমিকা, তার পায়ে।
যখন, অসাবধানে, সামান্যই উঠে গেছে শাড়ি—
বাইরে নেমেছে বৃষ্টি। লন্ঠন নামানো আছে টেবিলের নীচে, অন্ধকারে
মাঝে মাঝে ভেসে উঠেছে লুকোনো পায়ের ফর্সা আভা…অন্যায় চোখের নয়। না তাকিয়ে তার কোনো উপায় ছিল না।
সত্যিই ছিল না? কেন?—হুহু করে বৃষ্টিছাট ঢুকে আসে ঘরে
সত্যিই ছিল না? কেন?—কাঁটাতারে ঝাঁপায় ফুলগাছ
সত্যিই ছিল না? কেন?—অনধিকারীর সামনে থেকেসমস্ত লুকিয়ে নেয় নকশা-কাটা লেসের ঝালর…
এখন থেমেছে বৃষ্টি। এখন এ-ঘর থেকে উঠে গেছে সেও।
শুধু, ফিরে আসছে হাওয়া। শুধু, এক অক্ষমের চোখের মতন
মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে টেবিলের তলার লন্ঠন।
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/ekti-besti-sondda/
|
317
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ছলকুমারী
|
প্রেমমূলক
|
কত ছল করে সে বারে বারে দেখতে আসে আমায়।
কত বিনা-কাজের কাজের ছলে চরণ দুটি
আমার দোরেই থামায়। জানলা-আড়ে চিকের পাশে
দাঁড়ায় এসে কীসের আশে,
আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে
অনামিকায় জড়িয়ে আঁচল গাল দুটিকে ঘামায়। সবাই যখন ঘুমে মগন দুরুদুরু বুকে তখন
আমায় চুপে চুপে
দেখতে এসেই মল বাজিয়ে দৌড়ে পলায়,
রং খেলিয়ে চিবুক গালের কূপে!
দোর দিয়ে মোর জলকে চলে
কাঁকন হানে কলস-গলে!
অমনি চোখাচোখি হলে
চমকে ভুঁয়ে নখটি ফোটায়, চোখ দুটিকে নামায়। সইরা হাসে দেখে তাহার দোর দিয়ে মোর
নিতুই নিতুই কাজ-অকাজে হাঁটা,
করবে কী ও? রোজ যে হারায় আমার দোরেই
শিথিল বেণির দুষ্টু মাথার কাঁটা! একে ওকে ডাকার ভানে
আনমনা মোর মনটি টানে,
কী যে কথা সেই তা জানে
ছল-কুমারী নানান ছলে আমারে সে জানায়। পিঠ ফিরিয়ে আমার পানে দাঁড়ায় দূরে
উদাস নয়ান যখন এলোকেশে,
জানি, তখন মনে মনে আমার কথাই ভাবতেছে সে,
মরেছে সে আমায় ভালোবেসে! বই-হাতে সে ঘরের কোণে
জানি আমার বাঁশিই শোনে,
ডাকলে রোষে আমার পানে,
নয়না হেনেই রক্তকমল-কুঁড়ির সম চিবুকটি তার নামায়। (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/choiti-hawa/
|
5763
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ঘুম ভাঙার পর
|
চিন্তামূলক
|
ঘুম ভাঙার পর যেন আমার মন ভালো হয়ে যায়।
হলুদ-তেল মাখা একটি সকাল,
ঝর্নার জলে বৃষ্টিপাতের মতন শব্দ
ঝুল বারান্দার সামনের বাগানে কেউ হাসছে
শীতের রোদ্দুরের মতন।কিছু ভাঙছে, কিছু খসে যাচ্ছে
বইয়ের পাতায় কার আঙুল, এখুনি যাবে অন্য পাতায়।
দিগন্ত থেকে ভেসে আসছে বিসর্জনের সুর
ঘুম ভাঙার পর যেন আমার মন ভালো হয়ে যায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/sunilgangopadhyay/ghum-vangar-por/
|
428
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বিধুরা পথিকপ্রিয়া
|
প্রেমমূলক
|
আজ নলিন-নয়ান মলিন কেন বলো সখী বলো বলো।
পড়ল মনে কোন্ পথিকের বিদায় চাওয়া ছলছল?
বলো সখী বলো বলো
মেঘের পানে চেয়ে চেয়ে বুক ভিজালে চোখের জলে,
ওই সুদূরের পথ বেয়ে কি দূরের পথিক গেছে চলে –
আবার ফিরে আসবে বলে গো?
স্বর শুনে কার চমকে ওঠ? আ-হা!
ও লো ও যে বিহগ-বেহাগ নির্ঝরিণীর কল-কল।
ও নয় লো তার পায়ের ভাষা, আ-হা,
শীতের শেষের ঝরা-পাতার বিদায় ধ্বনি ও,
কোন কালোরে কোন ভালোরে বাসলে ভালো, আ-হা!
খুঁজছ মেঘে পরদেশি কোন পলাতকার নয়ন-অমিয়?
চুমছ কারে? ও নয় তোমার চির-চেনার চপল হাসির আলো-ছায়া,
ও যে গুবাক-তরুর চিকন পাতায় বাদল-চাঁদের মেঘলা মায়া।
ওঠো পথিক-পূজারিনি উদাসিনী বালা!
সে যে সবুজ-দেশের অবুঝ পাখি কখন এসে যাচবে বাঁধন,
কে জানে ভাই, ঘরকে চলো।
ও কী? চোখে নামল আবার বাদল-ছায়া ঢলঢল?
চলো সখি ঘরকে চলো।(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bidhura-pothikpriya/
|
5790
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
দুটি অভিশাপ
|
রূপক
|
সমুদ্রের জলে আমি থুতু ফেলেছিলাম
কেউ দেখেনি, কেউ টের পায়নি
প্রবল ঢেউ-এর মাথায় ফেনার মধ্যে
মিশে গিয়েছিল আমার থুতু
তবু আমার লজ্জা হয়, এতদিন পর আমি শুনতে পাই
সমুদ্রের অভিশাপ।
মেল ট্রেনের গায়ে আমি খড়ি দিয়ে এঁকেছিলাম
নারীর মুখ
কেউ দেখেনি, কেউ টের পায়নি
এমনকি, সেই নারীরও চোখের তারা আঁকা ছিল না
এক স্টেশন পার হবার আগেই বৃষ্টি, প্রবল বৃষ্টি
হয়তো বৃষ্টির জলে ধুয়ে গিয়েছিল আমার খড়ির শিল্প
তবু আমার লজ্জা হয়, এতদিন পর আমি শুনতে পাই
মেল ট্রেনের অভিশাপ।
প্রতিদিন পথ চলা কি পথের বুকে পদাঘাত?
নারীর বুকে দাঁত বসানো কি শারীরিক আক্রমণ?
শীতের সকালে খেঁজুর-রস খেতে ভালো-লাগা
কি শোষক সমাজের প্রতিনিধি হওয়া?
প্রথম শৈশবে সরস্বতী-মূর্তিকে আলিঙ্গন করা কি পাপ?
এ-সব বিষয়ে আমি মনস্থির করতে পারিনি
কিন্তু আমি স্পষ্ট শুনতে পাই
সমুদ্র ও মেল ট্রেনের অভিশাপ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1865
|
106
|
আবুল হাসান
|
নিঃসঙ্গতা
|
চিন্তামূলক
|
অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!
অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভীড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!
একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!
|
https://banglapoems.wordpress.com/2008/05/09/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%83%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a8/
|
3042
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চিন্তাহরণ দালালের বাড়ি
|
হাস্যরসাত্মক
|
চিন্তাহরণ দালালের বাড়ি
গিয়ে
একশো টাকার একখানি নোট
দিয়ে
তিনখানা নোট আনে সে
দশ টাকার।
কাগজ্-গন্তি মুনফা যতই
বাড়ে
টাকার গন্তি লক্ষ্মী ততই
ছাড়ে,
কিছুতে বুঝিতে পারে না
দোষটা কার। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chintahoron-dalaler-bari/
|
4239
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
যখন
|
প্রেমমূলক
|
বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে, নৌকা টলোমলো
কূল ছেড়ে আজ অকূলে যাই এমনও সম্বল
নেই নিকটে – হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি,তাই কি মনে জাগে
পোড়োবাড়ির স্মৃতি? আমার স্বপ্নে-মেশা দিনও?
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, চলচ্ছক্তিহীন।
বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন-পানে একা
দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা
হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে
আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে
কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ করে
ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a6%96%e0%a6%a8-%e0%a6%ac%e0%a7%83%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b2%e0%a7%8b-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%9f/#respond
|
2170
|
মহাদেব সাহা
|
তোমাকে ডাকার স্বাধীনতা
|
প্রেমমূলক
|
সমস্ত শহর করে তোলপাড়
গ্রীসীয় যুবার মতো ভুঁড়ে দেবো শব্দের মাতাল নিনাদ
আমার প্রেমিকা, প্রিয়তমা নারী
উদ্দেশে তোমার;
তোমাকে ডাকবো আমি নির্লজ্জ গেঁয়োর মতো
সমবেত অগ্রজের মুখোমুখি বসে-
দীর্ঘদিন বলি না প্রেমিকা,
বলি না গোলাপ
কতোদিন আনি না মুখে প্রেয়সী নারীর নাম
যেন উচ্চারণে অস্পষ্ট শিশুর মতো
কতিপয় শব্দ ছিলো সীমাহীন দূরত্বে আমার,
আজ বর্ষণের রাতে আমি বুঝি প্রথম কৃষাণ
শতাব্দীর অকর্ষিত মাটি ভেদ করি
কতোদিন তোমাকে আনি না মুখে প্রেম,
প্রিয় স্বাধীনতা, রম্য গোলাপ
যুদ্ধক্ষেত্রে গ্রেনেডের শব্দে, মাইনের মুখর সঙ্গীতে
শত্রুর রণদামামায় শুনতাম কবিতার পরিচিত পঙ্ক্তি,
একঝাঁক রাইফেলের শব্দে ঝরে পড়ে অসংখ্য খুলির মালা
যেন প্রিয়ার হাতে রডোডেনড্রনগুচ্ছ
আজ এ-বৎসরের শেষ রবিবারে, যুদ্ধ শেষে
তোমাকে ডাকার স্বাধীনতা
প্রিয়তমা প্রেমিকা আমার!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/373
|
1710
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
হাইওয়ে
|
প্রকৃতিমূলক
|
বিঘের পর বিঘে এখন
সাদা, সটান
রজনীগন্ধার চাষ চলেছে।
খাল, বিল আর
হাজা-মজা পুকুরের ইজারা নিয়ে
ফোটানো হচ্ছে পদ্ম।
অভদ্রা বর্ষাকাল,
শেয়ালে চাটে বাঘের গাল,
উঠোনে এক-হাঁটু কাদা।
অল্প-একটু রোদ উঠতেই
গালফোলা গোবিন্দ সামন্তের বুড়ি-ঠাক্মা তাই
পিচঢালা
হাইওয়ের উপরে তার
সাড়ে তিন কাঠা জমির ধান শুকিয়ে নিচ্ছে।
গোবিন্দ কোথায়?
জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে,
যেহেতু এখন ‘জমিতে আর কিছুই নাই, বাবু’, তাই
হাওড়ার ছেলে গোবিন্দ গিয়ে
মেদিনীপুরের দেউলিয়াবাজারের চায়ের দোকানে
কাজ নিয়েছে।
নদী পেরুলে কোলাঘাট,
কোলাঘাট ছাড়ালে দেউলিয়াবাজার।
সেখানে
বাস থেকে নেমে
উইকএণ্ডের শৌখিন বাবুরা
গোবিন্দ সামন্তের মালিকের দোকান থেকে
একঠোঙা মুড়ি,
বিটনুন-ছেটানো দু-দুটো আলুর চপ, আর
একভাঁড় চা খেয়ে ফের বাসে ওঠে।
তারপর
কেউ ঝাড়গ্রাম, কেউ টাটানগর, কেউ
জুনপুট কি দিঘার দিকে
চলে যায়।
রজনীগন্ধা আর পদ্মগুলো
ঝুড়ি-বোঝাই হয়ে ট্রাকে ওঠে; তারপর
ট্রাক-বোঝাই হয়ে
বিয়েবাড়ি, জয়ন্তী-অনুষ্ঠানের মঞ্চ আর মড়ার খাটিয়ে
সাজাবার জন্যে
হাওড়া ব্রিজ আর নতুনবাজারের ফুলের দোকানে চলে আসে।
কিন্তু বুড়ি-ঠাক্মা তার ধান কিছুতেই
ছাড়তে চায় না।
এন. এইচ. সিক্সের উপরে সারা দুপুর সে তার
ধান আগলে বসে থাকে।
আর
তেরপলে-ঢাকা ট্রাক দেখলেই
লাঠি উঁচিয়ে
কাক তাড়াবার ভঙ্গিতে বলে–হুশ্!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1613
|
90
|
আবিদ আনোয়ার
|
ভূত-পেত্নী নিজেই যখন বদ্যি
|
হাস্যরসাত্মক
|
তেঁতুল গাছে পেত্নী নাচে তবলা বাজায় ভূতে--
দুপুর রাতে ভিরমি খেলো ছিদাম মাঝির পুতে ।
ভূতকে ডেকে পেত্নী বলে: হ্যাঁগো,
অই যে দেখো গাছের তলায় ভয় পেয়েছে কে গো!ভূত তো ভেবে পায় না কিছু: কী করা যায়, হাঁরে,
এখন আমি রাত-বিরেতে বদ্যি ডাকি কারে?
এরচে' বরং মন্ত্র পড়ে ঝেড়েই দেখি নিজে--
ধুত্তরি যা, ভুলেই গেছি ভূতের ঝাড়া কী যে!পেত্নী বলে: এই পেয়েছি, একটুখানি রসো,
শেওড়া-পাতার কষ লাগিয়ে নাকের ডগায় ঘষো!
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/bhut-petni-nijei-jokhon-bodyi/
|
2242
|
মহাদেব সাহা
|
মেঘ দেখার দুঃখ, গোলাপ দেখার ব্যাকুলতা
|
চিন্তামূলক
|
কী করে বলি এই মেঘ দেখর দুঃখ, এই গোলাপ দেখার
ব্যাকুলতা-
কিন্তু আমিও যখন মেঘের দিকে তাকাই দেখি কালিদাসই
দেখছেন বিরহী যক্ষকে,
হঠাৎ মন ভরে যায় বহু যুগের ওপার থেকে আসা বর্ষণে:
এই গোলাপ দেখর কথা আমার হয়তো বলাই হবে না
কিন্তু যখান গোলাপের দিকে তাকাই দেখি ব্রেক
তাকিয়ে আছেন গেলোপের রুগ্নতার দিকে,
কিংবা রিলকে আয়ত্ত করে চলেছেন একটি শ্বেতগোলাপ,
কী করে বলি এই মেঘ দেখার দুঃখ, এই
গোলাপ দেখার ব্যাকুলতা!
মেঘ দেখতে দেখতে আমি যে কখন মেঘদূতের ভেতর ডুবে যাই,
বিরহকাতর যক্ষের জন্য ভারী হয়ে ওঠে এই বুক
কিংবা গোলাপের দিকে তাকাতেই চোখে ভেসৈ ওঠে
রিলকের মুখটি,
এই মেঘ দেখার দুঃখ, এই গোলাপ দেখার ব্যাকুলতা
কাউকে বলাই হবে না ;
আমি যখন এই প্রকৃতির দিকে তাকাই দেখি রবীন্দ্রনাথ
দেখছেন প্রকৃতির নীলাম্বরী
সেই ব্যকুল বসন্তে আমারও দুচোখ জলে ভরে যায় -
এই মেঘ, এই গোলাপ আমারও অলিখিত কবিতা।
যখন মানুষের সুদ্ধতার কথা ভাবি দেখি দাঁড়িয়ে আছেন
ব্যথিত বোদলেয়ার
শহরের রাত্রির দিকে তাকালে মনে হয় জীবনানন্দ দাশ দেখছেন
লিবিয়ার জঙ্গল,
যখন একজন বিপ্লবীর দিকে তাকাই দেখি দুচোখে
মায়াকোভস্কির স্বপ্ন
আর্ত স্বদেশের দিকে তাকিয়ে আমিও নেরুদার কথাই ভাবি,
কেউ জানে না একটি ফুলের মৃত্যু দেখে, একটি পাখির ক্রন্দন দেখে
আমারও হৃদয় পৃথিবীর আহত কবিদের মতোই হাহাকার
করে ওঠে।
একটি ফুল দেখে আমিও একজন প্রেমিকের মতোই পরাজিত
হতে ভালোবাসি
একটি ঝরাফুলের দুঃখ বুকে নিয়ে যে-কোনো ব্যথিত কবির
মতোই সারাদনি ঘুরে বেড়াই,
আসলে সে-কথাগুলোই বলা হয়নি, বলা হয়নি;
মানুষের সমাজে এই বৈষম্য দেখে আমিও একজন
বিপ্লবীর মতোই শ্রেনীসংগ্রামের জন্য তৈরি হই,
এই জরা বার্ধক্য দেখে কতোবার বুদ্ধের মতোই
ব্যথিত হয়ে উঠি;
কিন্তু কী করে বলবো এইসব মেঘ দেখার দুঃখ, এইসব
গোলাপ দেখার ব্যাকুলতা!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1362
|
3175
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমার প্রেম যে বইতে পারি এমন সাধ্য নাই
|
ভক্তিমূলক
|
তোমার প্রেম যে বইতে পারি
এমন সাধ্য নাই।
এ সংসারে তোমার আমার
মাঝখানেতে তাই
কৃপা করে রেখেছ নাথ
অনেক ব্যবধান–
দুঃখসুখের অনেক বেড়া
ধনজনমান।আড়াল থেকে ক্ষণে ক্ষণে
আভাসে দাও দেখা–
কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে
রবির মৃদু রেখা।
শক্তি যারে দাও বহিতে
অসীম প্রেমের ভার
একেবারে সকল পর্দা
ঘুচায়ে দাও তার।না রাখ তার ঘরের আড়াল
না রাখ তার ধন,
পথে এনে নিঃশেষে তায়
কর অকিঞ্চন।
না থাকে তার মান অপমান,
লজ্জা শরম ভয়,
একলা তুমি সমস্ত তার
বিশ্বভুবনময়।এমন করে মুখোমুখি
সামনে তোমার থাকা,
কেবলমাত্র তোমাতে প্রাণ
পূর্ণ করে রাখা,
এ দয়া যে পেয়েছে তার
লোভের সীমা নাই–
সকল লোভে সে সরিয়ে ফেলে
তোমায় দিতে ঠাঁই।তিনধরিয়া, ১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomar-prem-je-boite-pari-emon-sadhyo-nai/
|
5816
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
পাওয়া
|
প্রেমমূলক
|
অন্ধকারে তোমার হাত
ছুঁয়ে
যা পেয়েছি, সেইটুকুই তো পাওয়া
যেন হঠাৎ নদীর প্রান্তে
এসে
এক আঁজলা জল মাথায় ছুঁইয়ে যাওয়া।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1775
|
1950
|
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
|
রাজার উপর রাজা
|
ভক্তিমূলক
|
গাছ পুঁতিলাম ফলের আশায়,
পেলাম কেবল কাঁটা।
সুখের আশায় বিবাহ করিলাম
পেলাম কেবল ঝাঁটা ||
বাসের জন্য ঘর করিলাম
ঘর গেল পুড়ে।
বুড়ো বয়সের জন্য পুঁজি করিলাম
সব গেল উড়ে ||
চাকুরির জন্যে বিদ্যা করিলাম,
ঘটিল উমেদারি।
যশের জন্য কীর্ত্তি করিলাম,
ঘটিল টিটকারী ||
সুদের জন্য কর্জ্জ দিলাম,
আসল গেল মারা।
প্রীতির জন্য প্রাণ দিলাম,
শেষে কেঁদে সারা ||
ধানের জন্য মাঠ চষিলাম,
হলো খড় কুটো ||
পারের জন্য নৌকা করিলাম,
নৌকা হলো ফুটো ||
লাভের জন্য ব্যবসা করিলাম,
সব লহনা বাকি।
সেটাম দিয়া আদালত করিলাম,
ডিক্রীর বেলায় ফাঁকি ||
তবে আর কেন ভাই, বেড়াও ঘুরে,
বেড়ে ভবের হাট।
ঘূর্ণী জলে নৌকা যেমন, ঝড়ের কুটো,
জ্বলন্ত আগুনের কাঠ ||
মুখে বল হরিনাম ভাই,
হৃদে ভাব হরি!
এ ব্যবসায় লোকসান নেই ভাই,
এসো লাভে ঘর ভরি ||
এ গুণেতে শত লাভ,
শত গুণে হাজার।
হাজারেতে লক্ষ লাভ,
ভারি ফলাও কারবার ||
ভাই বল হরি, হরি বোল,
ভাঙ্গ ভবের হাট!
রাজার উপর হওগে রাজা
লাট সাহেবের লাট ||
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1731.html
|
4045
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হৃদয়ধর্ম
|
সনেট
|
হৃদয় পাষাণভেদী নির্ঝরের প্রায়,
জড়জন্তু সবাপানে নামিবারে চায়।
মাঝে মাঝে ভেদচিহ্ন আছে যত যার
সে চাহে করিতে মগ্ন লুপ্ত একাকার।
মধ্যদিনে দগ্ধদেহে ঝাঁপ দিয়ে নীরে
মা ব’লে সে ডেকে ওঠে স্নিগ্ধ তটিনীরে।
যে চাঁদ ঘরের মাঝে হেসে দেয় উঁকি
সে যেন ঘরেরই মেয়ে শিশু সুধামুখী।
যে-সকল তরুলতা রচি উপবন
গৃহপার্শ্বে বাড়িয়াছে, তারা ভাইবোন।
যে পশুরে জন্ম হতে আপনার জানি,
হৃদয় আপনি তারে ডাকে ‘পুঁটুরানী’।
বুদ্ধি শুনে হেসে ওঠে, বলে—কী মূঢ়তা!
হৃদয় লজ্জায় ঢাকে হৃদয়ের কথা। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hridoydhormo/
|
2849
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ওরে আমার কর্মহারা, ওরে আমার সৃষ্টিছাড়া
|
চিন্তামূলক
|
ওরে আমার কর্মহারা, ওরে আমার সৃষ্টিছাড়া,
ওরে আমার মন রে, আমার মন।
জানি নে তুই কিসের লাগিকোন্ জগতে আছিস জাগি–
কোন্ সেকালের বিলুপ্ত ভুবন।
কোন্ পুরানো যুগের বাণী অর্থ যাহার নাহি জানি
তোমার মুখে উঠছে আজি ফুটে।
অনন্ত তোর প্রাচীন স্মৃতি কোন্ ভাষাতে গাঁথছে গীতি,
শুনে চক্ষে অশ্রুধারা ছুটে।
আজি সকল আকাশ জুড়ে যাচ্ছে তোমার পাখা উড়ে,
তোমার সাথে চলতে আমি নারি।
তুমি যাদের চিনি ব’লে টানছ বুকে, নিচ্ছ কোলে,
আমি তাদের চিনতে নাহি পারি।আজকে নবীন চৈত্রমাসে পুরাতনের বাতাস আসে,
খুলে গেছে যুগান্তরের সেতু।
মিথ্যা আজি কাজের কথা, আজ জেগেছে যে-সব ব্যথা
এই জীবনে নাইকো তাহার হেতু।
গভীর চিত্তে গোপন শালা সেথা ঘুমায় যে রাজবালা
জানি নে সে কোন্ জনমের পাওয়া।
দেখে নিলেম ক্ষণেক তারে, যেমনি আজি মনের দ্বারে
যবনিকা উড়িয়ে দিল হাওয়া।
ফুলের গন্ধ চুপে চুপে আজি সোনার কাঠি-রূপে
ভাঙালো তার চিরযুগের ঘুম।
দেখছে লয়ে মুকুর করে আঁকা তাহার ললাট-‘পরে
কোন্ জনমের চন্দনকুঙ্কুম।আজকে হৃদয় যাহা কহে মিথ্যা নহে, সত্য নহে,
কেবল তাহা অরূপ অপরূপ।
খুলে গেছে কেমন করে আজি অসম্ভবের ঘরে
মর্চে-পড়া পুরানো কুলুপ।
সেথায় মায়াদ্বীপের মাঝে নিমন্ত্রণের বীণা বাজে,
ফেনিয়ে ওঠে নীল সাগরের ঢেউ,
মর্মরিত-তমাল-ছায়ে ভিজে চিকুর শুকায় বায়ে–
তাদের চেনে, চেনে না বা কেউ।
শৈলতলে চরায় ধেনু, রাখালশিশু বাজায় বেণু,
চূড়ায় তারা সোনার মালা পরে।
সোনার তুলি দিয়ে লিখা চৈত্রমাসের মরীচিকা
কাঁদায় হিয়া অপূর্বধন-তরে।গাছের পাতা যেমন কাঁপে দখিনবায়ে মধুর তাপে
তেমনি মম কাঁপছে সারা প্রাণ।
কাঁপছে দেহে কাঁপছে মনে হাওয়ার সাথে আলোর সনে,
মর্মরিয়া উঠছে কলতান।
কোন্ অতিথি এসেছে গো, কারেও আমি চিনি নে গো
মোর দ্বারে কে করছে আনাগোনা।
ছায়ায় আজি তরুর মূলে ঘাসের ‘পরে নদীর কূলে
ওগো তোরা শোনা আমায় শোনা–
দূর-আকাশের-ঘুম-পাড়ানি মৌমাছিদের-মন-হারানি
জুঁই-ফোটানো ঘাস-দোলানো গান,
জলের-গায়ে-পুলক-দেওয়া ফুলের-গন্ধ-কুড়িয়ে-নেওয়া
চোখের পাতে-ঘুম-বোলানো তান।শুনাস নে গো ক্লান্ত বুকের বেদনা যত সুখের দুখের —
প্রেমের কথা– আশার নিরাশার।
শুনাও শুধু মৃদুমন্দ অর্থবিহীন কথার ছন্দ,
শুধু সুরের আকুল ঝংকার।
ধারাযন্ত্রে সিনান করি যত্নে তুমি এসো পরি
চাঁপাবরন লঘু বসনখানি।
ভালে আঁকো ফুলের রেখা চন্দনেরই পত্রলেখা,
কোলের ‘পরে সেতার লহো টানি।
দূর দিগন্তে মাঠের পারে সুনীল-ছায়া গাছের সারে
নয়নদুটি মগ্ন করি চাও।
ভিন্নদেশী কবির গাঁথা অজানা কোন্ ভাষার গাথা
গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া গাও। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ore-amar-kormohara-ore-amar-srishtichara/
|
2
|
অতুলপ্রসাদ সেন
|
জল বলে চল, মোর সাথে চল
|
ভক্তিমূলক
|
জল বলে চল, মোর সাথে চল
তোর আঁখিজল, হবে না বিফল, কখনো হবে না বিফল।
চেয়ে দেখ মোর নীল জলে শত চাঁদ করে টল মল।
জল বলে চল, মোর সাথে চল।
বধু রে আন তরা করি, বধুরে আন তরা করি,
কূলে এসে মধু হেসে ভরবে গাগরী,
ভরবে প্রেমের হৃদ কলসি, করবে ছল ছল।
জল বলে চল, মোর সাথে চল।
মোরা বাহিরে চঞ্চল, মোরা অন্তরে অতল,
সে অতলে সদা জ্বলে রতন উজল।
এই বুকে, ফোটে সুখে, হাসিমুখে শতদল,
নহে তীরে, এই নীরে, গভীরে শীতল।
জল বলে চল, মোর সাথে চল।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4247.html
|
4338
|
শামসুর রাহমান
|
আগুনে রেখেছো হাত
|
প্রেমমূলক
|
‘আগুনে রেখেছো হাত, পুড়ে যাবে আপাদমস্তক’
ব’লে সে সাগ্নিকা কাঁপে ক্রমাগত দার্পিত আক্রোশে;
ঝরায় আগুন, মণিহারা সর্পিণীর মতো ফোঁসে।
দিইনি উত্তর কোনো, বোবা হ’য়ে ছিলাম নিছক।
এ কেমন রূপ মোহিনীর দেখে ফেলি আচানক?
অমন মধুর হাসি যার ঠোঁটে ক্ষণে ক্ষণে খেলা
করে, যাকে মমতার প্রতিমূর্তি ভাবি সারাবেলা
সে কেন উগরে দ্যায় কালকূট আজ অনর্থক?আসলে আমি কি ভন্ড, প্রতারক, অত্যন্ত পতিত?
কী এক বিভ্রমে ম’জে নিজেকেই করেছি শিকার
খেলাচ্ছলে; বুঝি তাই সময়ের কাছে প্রতারিত
এই আমি অকস্মাৎ হারিয়ে ফেলেছি স্বাধিকার।
সে-ও কি আমাকে ফেলে রক্তচক্ষু শক্রর দঙ্গলে
যাবে চ’লে নিতম্ব দুলিয়ে দূর গহীন জঙ্গলে? (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/agunr-rekhecho-hat/
|
936
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আমি যদি হতাম
|
প্রেমমূলক
|
আমি যদি হতাম বনহংস,
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনো এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে
ধানক্ষেতের কাছে
ছিপছিপে শরের ভিতর
এক নিরালা নীড়ে;
তাহলে আজ এই ফাল্পুনের রাতে
ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে
আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে
আকাশের রুপালি শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম-
তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন-
নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালি ফুলের মতো অজস্র তারা,
শিরীষ বনের সবুজ রোমশ নীড়ে
সোনার ডিমের মতো
ফাল্গুনের চাঁদ।
হয়তো গুলির শব্দঃ
আমাদের তির্যক গতিস্রোত,
আমাদের পাখায় পিস্টনের উল্লাস,
আমাদের কন্ঠে উত্তর হাওয়ার গান!
হয়তো গুলির শব্দ আবারঃ
আমাদের স্তব্ধতা,
আমাদের শান্তি।
আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না:
থাকত না আজকের জীবনের টুকরো টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার;
আমি যদি বনহংস হতাম,
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনো এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে
ধানক্ষেতের কাছে ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/943
|
5188
|
শামসুর রাহমান
|
রুটিন
|
রূপক
|
তাঁকে চেনে না এমন কেউ নেই এ শহরে
তিনি থাকেন
সবচেয়ে অভিজাত এলাকায় হাঁটেন মোজাইক করা মেঝেতে
বসেন ময়ূর সিঙ্ঘাসনসুলভ পদিমোড়া চেয়ারে
খ্যাতি তাঁর পায়ের কাছে কুকুরের মত
কুঁই কুঁই শব্দে লেজ নাচায়
হলফ করে বলতে পারি আমাদের আগামী
বংশধররা বাধ্যতামূলকভাবে পড়বে তাঁর সচিত্র জীবনী
স্কুল কলেজে সমাজ রাষ্ট্র জগৎসংসার বিষয়ক তাঁর হ্যাণ্ডবুক
সুকান্ত লাইনো টাইপে
প্রকাশিত হবে বছরের পর বছর
আর এওতো অবধারিত যে তাঁর জন্মবার্ষিকী এবং
মৃত্যুবার্ষিকীতে আপামর জনসাধারণ
ভোগ করবেন সরকারি ছুটিআমাদের এই পঙ্গু দেশ যাতে তিন লাফে এলাহি
পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে পারে
সেজন্যে রাত জেগে তিনি দেখেন বন্যায় ভেসে যাওয়া
ছাগলের পেটের মত ঢোসকা নিবন্ধ
ফজরে দশ মিনিট নামাজ পড়ার পর তিনি
পনেরো মিনিট তেলাওয়াত করেন কোরান পাক
খুরপি আর ঝারি হাতে
আধঘণ্টা বাগান করেন
দুর্লভ জাতের গোলাপ ফোটানোই তার লক্ষ্য
এক ঘন্টা কাটে তাঁর
ব্রেকফাস্টা করে খবরের কাগজ পড়ে
আর ডেটারজেন্ট সুবাসিত সাফসুতরো বাথরুমে
তিনি দশটা পাঁচটা অফিস করেন নিয়মিত
ক্লাবের টেনিসকোর্টে কাটান ঘণ্টা দেড়েক
ছেলেমেয়েদের আদর করেন পনেরো মিনিট
ঘড়ি ধরে ঘরের বউকে সোহাগ করেন ত্রিশ মিনিট
পরের বউকে নব্বই মিনিটমাশাল্লা মজবুত তাঁর গাঁথুনি
ইস্পাতি গড়ন অথচ
মাখনের মত নরম তাঁর মন
প্রত্যহ তিনি পরিবগুর্বোদের জন্যে দুঃখ করেন
পাক্বা তিন মিনিট। (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/rutin/
|
2721
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার ফুলবাগানের ফুলগুলিকে
|
চিন্তামূলক
|
আমার ফুলবাগানের ফুলগুলিকে
বাঁধব না আজ তোড়ায়,
রঙ-বেরঙের সুতোগুলো থাক্,
থাক্ পড়ে ঐ জরির ঝালর।
শুনে ঘরের লোকে বলে,
"যদি না বাঁধ জড়িয়ে জড়িয়ে
ওদের ধরব কী করে,
ফুলদানিতে সাজাব কোন্ উপায়ে?"
আমি বলি,
"আজকে ওরা ছুটি-পাওয়া নটী,
ওদের উচ্চহাসি অসংযত,
ওদের এলোমেলো হেলাদোলা
বকুলবনে অপরাহ্নে,
চৈত্রমাসের পড়ন্ত রৌদ্রে।
আজ দেখো ওদের যেমন-তেমন খেলা,
শোনো ওদের যখন-তখন কলধ্বনি,
তাই নিয়ে খুশি থাকো।"
বন্ধু বললে,
"এলেম তোমার ঘরে
ভরা পেয়ালার তৃষ্ণা নিয়ে।
তুমি খ্যাপার মতো বললে,
আজকের মতো ভেঙে ফেলেছি
ছন্দের সেই পুরোনো পেয়ালাখানা
আতিথ্যের ত্রুটি ঘটাও কেন?"
আমি বলি, "চলো না ঝরনাতলায়,
ধারা সেখানে ছুটছে আপন খেয়ালে,
কোথাও মোটা, কোথাও সরু।
কোথাও পড়ছে শিখর থেকে শিখরে,
কোথাও লুকোল গুহার মধ্যে।
তার মাঝে মাঝে মোটা পাথর
পথ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বর্বরের মতো,
মাঝে মাঝে গাছের শিকড়
কাঙালের মতো ছড়িয়েছে আঙুলগুলো,
কাকে ধরতে চায় ঐ জলের ঝিকিমিকির মধ্যে?"
সভার লোকে বললে,
"এ যে তোমার আবাঁধা বেণীর বাণী,
বন্দিনী সে গেল কোথায়?"
আমি বলি, "তাকে তুমি পারবে না আজ চিনতে,
তার সাতনলী হারে আজ ঝলক নেই,
চমক দিচ্ছে না চুনি-বসানো কঙ্কণে।"
ওরা বললে, "তবে মিছে কেন?
কী পাবে ওর কাছ থেকে?"
আমি বলি, "যা পাওয়া যায় গাছের ফুলে
ডালে পালায় সব মিলিয়ে।
পাতার ভিতর থেকে
তার রঙ দেখা যায় এখানে সেখানে,
গন্ধ পাওয়া যায় হাওয়ার ঝাপটায়।
চারদিকের খোলা বাতাসে
দেয় একটুখানি নেশা লাগিয়ে।
মুঠোয় করে ধরবার জন্যে সে নয়,
তার অসাজানো আটপহুরে পরিচয়কে
অনাসক্ত হয়ে মানবার জন্যে
তার আপন স্থানে।"
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-fullbaganer-full-gulika/
|
592
|
গোবিন্দচন্দ্র দাস
|
জন্মভূমি
|
স্বদেশমূলক
|
জননী গো জন্মভূমি তোমারি পবন
দিতেছে জীবন মোরে নিশ্বাসে নিশ্বাসে!
সুন্দর শশাঙ্কমুখ, উজ্জ্বল তপন,
হেরেছি প্রথমে আমি তোমারি আকাশে।
ত্যাজিয়ে মায়ের কোল, তোমারি কোলেতে
শিখিয়াছি ধূলি‐খেলা, তোমারি ধূলিতে।
তোমারি শ্যামল ক্ষেত্র অন্ন করি দান
শৈশবের দেহ মোর করেছে বর্ধিত।
তোমারি তড়াগ মোর রাখিয়াছে প্রাণ,
দিয়ে বারি, জননীর স্তন্যের সহিত।
জননীর করাঙ্গুলি করিয়া ধারণ,
শিখেছি তোমারি বক্ষে বাড়াতে চরণ।
তোমারি তরুর তলে কুড়ায়েছি ফল,
তোমারি লতার ফুলে গাঁথিয়াছি মালা।
সঙ্গীদের সঙ্গে সুখে করি কোলাহল,
তোমারি প্রান্তরে আসি করিয়াছি খেলা।
তোমারি মাটিতে ধরি জনকের কর,
শিখেছি লিখিতে আমি প্রথম অক্ষর।
ত্যাজিয়া তোমার কোল যৌবনে এখন,
হেরিলাম কত দেশ কত সৌধমালা।
কিন্তু তৃপ্ত না হইল এ দগ্ধ নয়ন,
ফিরিয়া দেখিতে চাহে তব পর্ণশালা।
তোমার প্রান্তর নদী, পথ, সরোবর,
অন্তরে উদিয়া মোর জুড়ায় অন্তর।
তোমাতে আমার পিতা পিতামহগণ,
জন্মেছিল একদিন আমারই মতন।
তোমারি এ বায়ু তাপে তাঁহাদের দেহ
পুষেছিলে, পুষিতেছ আমায় যেমন।
জন্মভূমি জননী আমার যথা তুমি,
তাঁহাদেরও সেইরূপ তুমি—মাতৃভূমি।
তোমারি ক্রোড়েতে মোর পিতামহগণ
নিদ্রিত আছেন সুখে জীবলীলা‐শেষে
তাঁদের শোণিত, অস্থি সকলি এখন
তোমার দেহের সঙ্গে গিয়েছে মা মিশে।
তোমার ধূলিতে গড়া এ দেহ আমার
তোমার ধূলিতে কালে মিশাবে আবার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/438
|
4544
|
শামসুর রাহমান
|
কবিতা লিখতে গিয়ে
|
চিন্তামূলক
|
কবিতা লিখতে গিয়ে প্রায়শ হোঁচট খাই আজ, ধন্দ লাগে
বার বার, আর অমাবস্যা নামে খাতার পাতায়
যখন তখন, তুমি সাক্ষী। কী ক’রে ফিরিয়ে আনি
পূর্ণিমাকে? জানি না সে মন্ত্র, শুধু ক্ষ্যাপা বাউলের
মতো ঘুরি গেরুয়া রঙের লুপ্ত লিরিকের পথে।
অন্ধত্ব আসন্ন জেনে আলোর ঝর্ণায় স্নান করি অবিরাম।বাগানের ফুল ছেঁড়া হচ্ছে অবিরত, মাস্তানের
মরশুম চতুর্দিকে। ইদানীং ঘাতকেরা নির্ধারণ করে
আমাদের ভবিষ্যৎ নীল নক্শা টেবিলে ছড়িয়ে।
শতাব্দীর গোধূলিতে মহত্বের ধড় থেকে মুন্ডু ছিঁড়ে নিয়ে
লোফালুফি চিলে চন্ডালের আস্তানায়; এভাবেই
সব কিছু সকলের সহনীয় হ’য়ে যায়, অমাবস্যা বলে
নির্বোধের সমাবেশে। বসন্তের পিঠে
হঠাৎ বসিয়ে ছোরা কে দুর্বৃত্ত ধুলো ছুঁড়ে দিয়েছে চম্পট।বর্বর পোড়ায় মনীষীর জ্ঞানলিপি হাড়হিম
শীতরাতে উত্তাপের লোভে।
এই শতাব্দীর সেরা গ্রন্থগুলি গণ শৌচাগারে
নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তবু আমি কেন কবিতার জন্য
নিজেকেই করি ক্ষয়, ধুলোয় মেশাই; তুমি বলেছিলে
বটে,
ধৈর্য হারিয়ো না; তাই আজও হাতে
রয়েছি কলম ধ’রে। সর্বক্ষণ ভয়-যদি কেউ এ তাণ্ডবে
আমার কলম কেড়ে নেয়। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobita-likhte-gie/
|
2937
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কোথায়
|
প্রেমমূলক
|
হায় কোথা যাবে !
অনন্ত অজানা দেশ , নিতান্ত যে একা তুমি ,
পথ কোথা পাবে !
হায় , কোথা যাবে !
কঠিন বিপুল এ জগৎ ,
খুঁজে নেয় যে যাহার পথ ।
স্নেহের পুতলি তুমি সহসা অসীমে গিয়ে
কার মুখে চাবে ।
হায় , কোথা যাবে !
মোরা কেহ সাথে রহিব না ,
মোরা কেহ কথা কহিব না ।
নিমেষ যেমনি যাবে , আমাদের ভালোবাসা
আর নাহি পাবে ।
হায় , কোথা যাবে !
মোরা বসে কাঁদিব হেথায় ,
শূন্যে চেয়ে ডাকিব তোমায় ;
মহা সে বিজন মাঝে হয়তো বিলাপধ্বনি
মাঝে মাঝে শুনিবারে পাবে ,
হায় , কোথা যাবে !
দেখো , এই ফুটিয়াছে ফুল ,
বসন্তেরে করিছে আকুল ,
পুরানো সুখের স্মৃতি বাতাস আনিছে নিতি
কত স্নেহভাবে ,
হায় , কোথা যাবে !
খেলাধূলা পড়ে না কি মনে ,
কত কথা স্নেহের স্মরণে ।
সুখে দুখে শত ফেরে সে - কথা জড়িত যে রে ,
সেও কি ফুরাবে !
হায় , কোথা যাবে !
চিরদিন তরে হবে পর ,
এ - ঘর রবে না তব ঘর ।
যারা ওই কোলে যেত , তারাও পরের মতো ,
বারেক ফিরেও নাহি চাবে ।
হায় , কোথা যাবে !
হায় , কোথা যাবে !
যাবে যদি , যাও যাও , অশ্রু তব মুছে যাও ,
এইখানে দুঃখ রেখে যাও ।
যে বিশ্রাম চেয়েছিলে , তাই যেন সেথা মিলে —
আরামে ঘুমাও ।
যাবে যদি , যাও । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kothai/
|
2449
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
রাজকন্যা ও রাজপুত্র
|
হাস্যরসাত্মক
|
গল্প পুরো সত্য
গহীন এক জঙ্গলে থাকতো বড় দৈত্য।
ভাটার মত চোখ ছিল তার মুলার মত দাঁত
ঢেঁকির মত পা ছিল আর গাছের মত হাত।
সেই রাজ্যের রাজকন্যা কাজল কালো চোখ
রূপ দেখে তার মুগ্ধ ছিল রাজ্যের সব লোক।
একদিন সেই রাজকন্যা রাজপ্রাসাদের ছাদে
সখী নিয়ে কাজল বরণ চুলগুলো তার বাঁধে।
হাউ মাউ খাউ বলে হঠাৎ সেই দৈত্য ছুটে আসে
সখীরা সব পালায় ভয়ে রইল না কেউ পাশে।
দৈত্য তখন রাজকন্যার চুলের মুঠি ধরে
টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল জঙ্গলে তার ঘরে।
রাজকন্যা হারিয়ে গেছে রাজ্যে নামে শোক
মাথা চাপড়ে কাঁদতে থাকে রাজ্যের সব লোক।
ভিনদেশি এক রাজপুত্র খবর পেয়ে আসে
বলল তখন ভয় নেই গো আমি আছি পাশে।
পথে পথে ঘুরে বেড়ায় রাজপুত্র সেই
রাজকন্যা খুঁজে বেড়ায় কোথাও দেখা নেই।
বনের পশু, গাছের পাখি নদীর মাঝে মাছ
নীল আকাশে সাদা মেঘ বনের মাঝে গাছ।
রাজকন্যার হদিস নেই রাজ্যতে হই চই।
সবার শেষে গহীন বনে রাজপুত্র যায়
মৌমাছিদের মুখে তখন দৈত্যের খোঁজ পায়।
রাজপুত্র ছুটে চলল হাতে তলোয়ার
ভয়ংকর সেই দৈত্যকে মারতে হবে তার।
কী ভয়ানক যুদ্ধ হল নেই তুলনা তার
পাহাড় নদী পড়ল ধসে সবকিছু ছারখার
দৈত্য শেষে মারা পড়ল মাথা পড়ল কাটা
রক্ত মুছে রাজপুত্র করল শুরু হাঁটা।
ঘরের মাঝে বন্দি ছিল রাজকন্যা সেই
রাজপুত্র বলল তারে আর তো ভয় নেই।
রাজকন্যা মুক্ত হল মুখে মধুর হাসি
বলল, ওগো রাজপুত্র তোমায় ভালোবাসি।
গল্প শুনে মুগ্ধ সবাই, নিজের ঘরে যায়
ছোট্ট টুকুন একাই শুধু মাথাটা চুলকায়।
ভাইকে বলে, ভাইয়া তুই একটা কথা বল,
রাজকন্যা কেন দিল না একখান মিসকল?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2048
|
1577
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
গুরু যা বলেন
|
মানবতাবাদী
|
মস্ত বড় মিরগেলটাকে বঁড়শিতে গাঁথবার জন্যে
ফাতনার উপরে চোখ রেখে
শ্রীমন্ত সেই সকাল থেকে
ঘাটের রানায় বসে আছে।
আসলে ওই মাছটাই যে তাকে টোপ গিলিয়ে গেঁথে রেখেছে,
শ্রীমন্ত তা জানে না।
সকাল ছ’টা অব্দি খুনের আসামি রামদেও কাহারকে
পাহারা দেবার জন্যে
রাত-দশটায় যে-লোকটা
থানা-হাজতের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিল,
পাথুরে করিডরে যতই না কেন বুট বাজাক,
সেই মহেশ্বরপ্রসাদও জানে না যে,
পুরোপুরি আট ঘণ্টার জন্যে সে নিজেই এখন বন্দি।
টেকো-কালোয়ার ঘনশ্যামের দ্বিতীয় পক্ষের বউ ইদানিং আর
কারণে-অকারণে
জানলায় গিয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু
ঘনশ্যামের লোহার কারবারও ওদিকে প্রায়
বেহাত হবার উপক্রম।
অষ্টপ্রহর ঘরে মধ্যে ঘুরঘুর করছে যে ঘনশ্যাম,
সে জানে না যে, তার
জোয়ান বউকে জানলা থেকে হটাতে গিয়ে
সে নিজেই এখন তার কারবার থেকে হটে গিয়েছে।
লোডশেডিং, লিফ্ট বন্ধ, তবু
চটপট তাঁর চাকরি-জীবনের সাততলায়
উঠতে চেয়েছিলেন
জায়াণ্ট ট্রান্সপোর্টের ছোট-সাহেব শ্রীহেরম্বনাথ বিশ্বাস।
হায়, তিনিও জানতেন না যে,
এক-এক লাফে সিঁড়ির তিন-ধাপ টপকাতে গিয়ে তাঁর
মাথাটা হঠাৎ ঝন্ করে ঘুরে উঠবে, এবং
তৎক্ষণাৎ গন্তব্য স্থানের ঠিকানা পাল্টে তিনি
সাততলার বদলে
পার্ক স্ট্রিটের এক নার্সিং হোমে পৌঁছে যাবেন।
সিঁড়ি ভাঙা বন্ধ। ডাক্তারবাবু জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাড়িতেও তাঁর
শোবার খাটটাকে এবারে
দোতলা থেকে একতলায় নামিয়ে আনলে ভাল হয়।
আমাদের পাড়ার গোষ্ঠবাবু সেদিন বলেছিলেন যে,
তাঁর গুরু যা বলেন, ঠিকই বলেন।
গুরু কী বলেন, সান্ধ্য আড্ডার সঙ্গীরা তা জানবার জন্যে
হামলে পড়ায়
খুব একচোট হেসে নিয়ে, তারপর
হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর হয়ে গিয়ে
গোষ্ঠবাবু বললেন, “কাউকে আবার বোলো না যেন,
এমনিতে তো এ-সব কথা কাউকে বলতে নেই,
নেহাত তোমরা জানতে চাও তাই বলছি।
আমার গুরু বলেন যে,
শুয়োরের বাচ্চারা কেউ কিস্সু জানে না।”
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1562
|
5059
|
শামসুর রাহমান
|
ভাবিনি এমন
|
সনেট
|
ভাবিনি এমন ভয়ঙ্কর অন্ধকার তীক্ষ্ণ দাঁত
বের করে দেশকে করবে গ্রাস। ঢ্যাঙা, ক্ষিপ্ত ঘোড়া
চারপায়ে করে তছনছ দেখি দেশজোড়া
চলে কুশাসন লম্বকর্ণদের, ভীষণ সংঘাত
পথে পথে, স্বামীহারা নারী আজ করে অশ্রুপাত
কত ঘরে, সংগ্রামী মানুষ মরে গুলির বৃষ্টিতে,
প্রবল ঝাঁকুনি লাগে মানবিকতার দৃঢ় ভিতে
শ্রেয়োবোধ লুপ্তপ্রায়, সহিংসতা নাচে দিন-রাত।যেদিকে তাকাই দেখি মাটি ফুঁড়ে বেরোয় অদ্ভুত
প্রাণী দলে দলে, যেন বিকট গণ্ডার, যায় ছুটে
মানুষের পেট চিরে ফেলার উদ্দেশ্যে, এইসব
হিংস্র মূর্তি সংহার করবে যারা তাদের নিখুঁত
প্রক্রিয়া হয়েছে শুরু অন্তরালে, ওরা লুটে-পুটে
খাবে না কিছুই শুধু বাজাবে সৃষ্টির কলরব। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/vabini-emon/
|
214
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আড়াল
|
প্রেমমূলক
|
আমি কি আড়াল করিয়া রেখেছি তব বন্ধুর মুখ?
না জানিয়া আমি না জানি কতই দিয়াছি তোমায় দুখ।
তোমার কাননে দখিনা পবন
এনেছিল ফুল পূজা-আয়োজন,
আমি এনু ঝড় বিধাতার ভুল – ভণ্ডুল করি সব,
আমার অশ্রু-মেঘে ভেসে গেল তব ফুল-উৎসব।
মম উৎপাতে ছিঁড়েছে কি প্রিয়, বক্ষের মণিহার?
আমি কি এসেছি তব মন্দিরে দস্যু ভাঙিয়া দ্বার?
আমি কি তোমার দেবতা-পূজার
ছড়ায়ে ফেলেছি ফুল-সম্ভার?
আমি কি তোমার স্বর্গে এসেছি মর্ত্যের অভিশাপ
আমি কি তোমার চন্দ্রের বুকে কালো কলঙ্ক-ছাপ?
ভুল করে যদি এসে থাকি ঝড়, ছিঁড়িয়া থাকি মুকুল,
আমার বরষা ফুটায়েছে অনেক অধিক ফুল!
পরায়ে কাজল ঘন বেদনার
ডাগর করেছি নয়ন তোমার,
কূলের আশায়, ভাঙিয়া করেছি সাত সাগরের রানি,
সে দিয়াছে মালা, আমি সাজায়েছি নিখিল সুষমা-ছানি।দস্যুর মতো হয়তো খুলেছি লাজ-অবগুণ্ঠন,
তব তরে আমি দস্যু, করেছি ত্রিভুবন লুণ্ঠন!
তুমি তো জান না, নিখিল বিশ্ব
কার প্রিয়া লাগি আজিকে নিঃস্ব?
কার বনে ফুল ফোটাবার লাগি ঢালিয়াছি এত নীর,
কার রাঙা পায়ে সাগর বাঁধিয়া করিয়াছি মঞ্জীর।
তুমি না চাহিতে আসিয়াছি আমি – সত্য কি এইটুক?
ফুল ফোটা-শেষে ঝরিবার লাগি ছিলে না কি উৎসুক?
নির্মম-প্রিয়-নিষ্ঠুর হাতে
মরিতে চাহনি আঘাতে আঘাতে?
মরিতে চাহনি আঘাতে আঘাতে?
তুমি কি চাহনি কেহ এসে তব ছিঁড়ে দেয় গাঁথা-মালা?
পাষাণের মতো চাপিয়া থাকিনি তোমার উৎস-মুখে,
আমি শুধু এসে মুক্তি দিয়াছি আঘাত হানিয়া বুকে!
তোমার স্রোতেরে মুক্তি দানিয়া
স্রোতমুখে আমি গেলাম ভাসিয়া।
রহিবার যে – সে রয়ে গেল কূলে, সে রচুক সেথা নীড়!
মম অপরাধে তব স্রোত হল পুণ্য তীর্থ-নীর!
রূপের দেশের স্বপন-কুমার স্বপনে আসিয়াছিনু,
বন্দিনী! মম সোনার ছোঁয়ায় তব ঘুম ভাঙাইনু।
দেখ মোরে পাছে ঘুম ভাঙিয়াই,
ঘুম না টুটিতে তাই চলে যাই,
যে আসিল তব জাগরণ-শেষে মালা দাও তারই গলে,
সে থাকুক তব বক্ষে – রহিব আমি অন্তর-তলে।
সন্ধ্যা-প্রদীপ জ্বালায়ে যখন দাঁড়াবে আঙিনা-মাঝে,
শুনিয়ো কোথায় কোন তারা-লোকে কার ক্রন্দন বাজে!
আমার তারার মলিন আলোকে
ম্লান হয়ে যাবে দীপশিখা চোখে,
হয়তো অদূর গাহিবে পথিক আমারই রচিত গীত –
যে গান গাইয়া অভিমান তব ভাঙাতাম সাঁঝে নিতি।
গোধূলি-বেলায় ফুটিবে উঠানে সন্ধ্যামণির ফুল,
তুলসী-তলায় করিতে প্রণাম খুলে যাবে বাঁধা চুল।
কুন্তল-মেঘ-ফাঁকে অবিরল
অকারণে চোখে ঝরিবে গো জল,
সারা শর্বরী বাতায়নে বসি নয়ন-প্রদীপ জ্বালি
খুঁজিবে আকাশে কোন তারা কাঁপে তোমারে চাহিয়া খালি।
নিষ্ঠুর আমি – আমি অভিশাপ, ভুলিতে দিব না, তাই
নিশ্বাস মম তোমারে ঘিরিয়া শ্বসিবে সর্বদাই।
তোমারে চাহিয়া রচিনু যে গান
কণ্ঠে কণ্ঠে লভিবে তা প্রাণ,
আমার কণ্ঠে হইবে নীরব, নিখিল-কণ্ঠ-মাঝে
শুনিবে আমারই সেই ক্রন্দন সে গান প্রভাতে সাঁঝে! (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/aral/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.