id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
779
|
জসীম উদ্দীন
|
এত হাসি কোথায় পেলে
|
ছড়া
|
এত হাসি কোথায় পেলে
এত কথার খলখলানি
কে দিয়েছে মুখটি ভরে
কোন বা গাঙের কলকলানি।
কে দিয়েছে রঙিন ঠোঁটে
কলমী ফুলের গুলগুলানি।
কে দিয়েছে চলন বলন
কোন সে লতার দোল দুলানী।কাদের ঘরে রঙিন পুতুল
আদরে যে টইটুবানি।
কে এনেছে বরণ ডালায়
পাটের বনের বউটুবানী।
কাদের পাড়ার ঝামুর ঝুমুর
কাদের আদর গড়গড়ানি
কাদের দেশের কোন সে চাঁদের
জোছনা ফিনিক ফুল ছড়ানি।তোমায় আদর করতে আমার
মন যে হলো উড়উড়ানি
উড়ে গেলাম সুরে পেলাম
ছড়ার গড়ার গড়গড়ানি।
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/eto-hashi-kothay-pele/
|
3497
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বন
|
সনেট
|
শ্যামল সুন্দর সৌম্য, হে অরণ্যভূমি,
মানবের পুরাতন বাসগৃহ তুমি।
নিশ্চল নির্জীব নহ সৌধের মতন—
তোমার মুখশ্রীখানি নিত্যই নূতন
প্রাণে প্রেমে ভাবে অর্থে সজীব সচল।
তুমি দাও ছায়াখানি, দাও ফুল ফল,
দাও বস্ত্র, দাও শয্যা, দাও স্বাধীনতা;
নিশিদিন মর্মরিয়া কহ কত কথা
অজানা ভাষার মন্ত্র; বিচিত্র সংগীতে
গাও জাগরণগাথা; গভীর নিশীথে
পাতি দাও নিস্তব্ধতা অঞ্চলের মতো
জননীবক্ষের; বিচিত্র হিল্লোলে কত
খেলা কর শিশুসনে; বৃদ্ধের সহিত
কহ সনাতন বাণী বচন-অতীত। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bon/
|
4754
|
শামসুর রাহমান
|
ডেডেলাস
|
মানবতাবাদী
|
না, আমি বিলাপ করবো না তার জন্যে, যে আমার
নিজের একান্ত অংশ, স্বপ্ন, ভবিশ্যত; যাকে আমি
দেখেছি উঠোনে হাঁটি-হাঁটি পা-পা হেঁটে যেতে
আনন্দের মতো বহুবার। যখন প্রথম তার
মুখে ফুটেছিলো বুলি, কি যে আনন্দিত
হয়েছি সেদিন আমি; যখন জননী তার ওকে
বুকে নিয়ে চাঁদের কপালে চাঁদ আয় টিপ দিয়ে
যা ব’লে পাড়াতো ঘুম, আমি
স্বর্গসুখ পেয়েছি তখন।
কতদিন ওকে
নিজেই দিয়েছি গ’ড়ে পুতুল এবং
বসেছে সে আমার আপনকার পিঠে, ক্ষুদে অশ্বারোহী।
আমার স্নেহের ঘরে সে উঠেছে বেড়ে
ক্রমান্বয়ে,
আজ সে শুধুই স্মৃতি, বেদনার মতো বয়ে যায়
আমার শিরায়।
কোন কোনদিন স্থাপত্যের গূঢ় সুত্র-বিষয়ক চিন্তার সময়
অকস্মাৎ দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে আমার শয্যার পাশে
সুকান্ত তরুণ;
ইকারুস ইকারুস ব’লে ডাকলেই উজ্জ্বীবিত
দেবে সাড়া। কখনো বা মনে হয় আমার নিজের
হাতে গড়া ডানা নিয়ে দেবে সে উড়াল
দূর নীলিমায়
অসম্ভব উঁচুতে আবার।না, আমি বিলাপ করবো না তার জন্যে, স্মৃতি যার
মোমের মতন গলে আমার সত্তায়, চেতনায়।
সর্বদা সতর্ক আমি, বিপদের গন্ধ সিদ্ধ, তাই
বুঝিয়েছিলাম তাকে সাবধানী হ’তে,
যেন সে না যায় উড়ে পেরিয়ে বিপদসীমা কখনো আকাশে।
কিন্তু সে তরুণ, চটপটে, ঝকঝকে, ব্যগ্র অস্থির, উজ্জ্বল,
যখন মেললো পাখা আমার শিল্পের ভরসায়,
গেলো উড়ে ঊর্ধে, আরো ঊর্ধে, বহুদূরে,
সূর্যের অনেক কাছে প্রকৃত শিল্পীর মতো সব
বাধা, সতর্কতা
নিমেষে পেছনে ফেলে, আমি
শংকিত অথচ মুগ্ধ রইলাম চেয়ে
তার দিকে, দেখলাম তাকে
পরিণাম বিষয়ে কেমন
উদাসীন, ক্রর রোদ্রঝলসিত, সাহসী, স্বাধীন।না আমি বিলাপ করবো না তার জন্যে, স্মৃতি যার
মোমের মতন গলে আমার সত্তায়, চেতনায়।যেন আমি এখন উঠেছি জেগে অন্তহীন নির্জন সমুদ্রতীরে একা
আদিম বিস্ময় নিয়ে চোখে। আস্তে আস্তে মনে পড়ে
নানা কথা, মনে পড়ে বাসগৃহ, বহুদূরে ফেলে-আসা কত
স্থাপত্যের কথা আর নারীর প্রণয়। মনে পড়ে,
আমার সন্তান যেতো পাখির বাসার খোঁজে, কখনো কখনো
দেখতো উৎসুক চেয়ে আমার নিজের
বাটালি ছেনির চঞ্চলতা। মনে পড়ে
দেবতার মতো স্তব্ধ আলোচ্ছ্বাস, তরুণের ওড়া
ভয়ংকর অপরূপ দীপ্তিময়তায়। তার পতন নিশ্চিত
বলেই হয়তো আমি তাকে আরো বেশি ভালোবেসেছি তখন।
পিতা আমি, তাই সন্তানের আসন্ন বিলয় জেনে
শোকবিদ্ধ, অগ্নিদগ্ধ পাখির মতন দিশাহারা;
শিল্পী আমি, তাই তরুণের সাহসের ভষ্ম আজ
মৃত্যুঞ্জয় নান্দনিক সঞ্চয় আমার। (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dedelas/
|
2044
|
মল্লিকা সেনগুপ্ত
|
শুভম
|
প্রেমমূলক
|
শুভম তোমাকে অনেকদিন পরে
হটাত দেখেছি বইমেলার মাঠে
গতজন্মের স্মৃতির মতন
ভুলে যাওয়া গানের মতন
ঠিক সেই মুখ, ঠিক সেই ভুরু
শুধুই ঈষৎ পাক ধরা চুল
চোখ মুখ নাক অল্প ফুলেছে
ঠোঁটের কোনায় দামি সিগারেট
শুভম, তুমি কি সত্যি শুভম!মনে পড়ে সেই কলেজ মাঠে
দিনের পর দিন কাটত
কীভাবে সবুজ ঘাসের মধ্যে
অন্তবিহীন সোহাগ ঝগড়া!
ক্রমশই যেন রাগ বাড়ছিল
তুমি চাইতে ছায়ার মতন
তোমার সঙ্গে উঠব বসব
আমি ভাবতাম এতদিন ধরে
যা কিছু শিখেছি, সবই ফেলনা!
সব মুছে দেব তোমার জন্য?তুমি উত্তম-ফ্যান তাই আমি
সৌমিত্রের ভক্ত হব না!
তোমার গোষ্ঠী ইস্টবেঙ্গল
আমি ভুলে যাব মোহনবাগান!
তুমি সুচিত্রা, আমি কণিকার
তোমার কপিল, আমার তো সানি!
তোমার স্বপ্নে বিপ্লব তাই
আমি ভোট দিতে যেতে পারব না!এমন তরজা চলত দুজনে
তবুও তোমার ঘাম গন্ধ
সস্তা তামাক স্বপ্নের চোখ
আমাকে টানত অবুঝ মায়ায়
আমার মতো জেদি মেয়েটিও
তোমাকে টানতো প্রতি সন্ধ্যায়
ফাঁকা ট্রাম আর গঙ্গার ঘাটেতারপর তুমি কম্পিউটার
শেখার জন্য জাপান চললে
আমিও পুণের ফিলমি কোর্সে
প্রথম প্রথম খুব চিঠি লেখা
সাত দিনে লেখা সাতটা চিঠি
ক্রমশ কমল চিঠির সংখ্যা
সপ্তাহে এক, মাসে একটা
ন মাসে ছ মাসে, একটা বছরে
একটাও না… একটাও না…
ডাক বাক্সের বুক খাঁ খাঁ করে
ভুলেই গেছি কতদিন হল,
তুমিও ভুলেছ ঠিক ততদিনতারপর সেই পৌষের মাঠে
হটাত সেদিন বইমেলাতে
দূরে ফেলে আসা গ্রামের মতো
তোমার মুখটা দেখতে পেলাম
শুভম, তুমি কি সত্যি শুভম!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%ad%e0%a6%ae-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%a8/
|
5500
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
প্রস্তুত
|
মানবতাবাদী
|
কালো মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়,
নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায়।
ভীত মন খোঁজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখ;
তাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্তলোক,
কেবলি এখানে মনের দ্বন্দ্ব আগুন ছড়ায়।অবশেষে ভুল ভেঙেছে, জোয়ার মনের কোণে,
তীব্র ভ্রূকুটি হেনেছি কুটিল ফুলের বনে;
আভিশাপময় যে সব আত্মা আজো অধীর,
তাদের সকাশে রেখেছি প্রাণের দৃঢ় শিবির;
নিজেকে মুক্ত করেছি আত্মসমর্পণে।চাঁদের স্বপ্নে ধুয়ে গেছে মন যে-সব দিনে,
তাদের আজকে শত্রু বলেই নিয়েছি চিনে,
হীন র্স্পধারা ধূর্তের মতো শক্তিশেলে
ছিনিয়ে আমায় নিতে পারে আজো সুযোগ পেলে
তাই সতর্ক হয়েছি মনকে রাখি নি ঋণে।অসংখ্য দিন কেটেছে প্রাণের বৃথা রোদনে
নরম সোফায় বিপ্লবী মন উদ্ধোধনে;
আজকে কিন্তু জনতা-জোয়ারে দোলে প্লাবন,
নিরন্ন মনে রক্তিম পথ অনুধাবন,
করছে পৃথিবী পূর্ব-পন্থা সংশোধনে।অস্ত্র ধরেছি এখন সমুখে শত্রু চাই,
মহামরণের নিষ্ঠুর ব্রত নিয়েছি তাই;
পৃথিবী জটিল, জটিল মনের সম্ভাষণ
তাদের প্রভাবে রাখিনি মনেতে কোনো আসন,
ভুল হবে জানি তাদের আজকে মনে করাই।।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/prostut/
|
1568
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
কাম্ সেপটেমবর
|
প্রকৃতিমূলক
|
কনেকটিকাট অ্যাভেনিউয়ের উপরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলুম।
তখন সেপটেমবর মাস,
নতুন বিশ্বে গাছের পাতা তখন হলুদ হয়ে যাচ্ছে।
শেষ রাত্তিরে বৃষ্টি হয়েছিল,
রাস্তার উপরে তার চিহ্ন তখনও মুছে যায়নি।
ইতস্তত জলের বৃত্ত,
তার মধ্যে ঝিকিয়ে উঠছে সকালবেলার রোদ্দুর।
দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমি দেখছিলুম।
কাফেটেরিয়ায় গান বাজছিল:
কাম্ সেপটেমবর।
আমি দেখেছিলুম যে, উত্তর গোলার্ধে শরৎ এসেছে,
গাছের পাতা অগ্নিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে,
এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে,
হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে মেপ্ল আর সাইপ্রিসের পাতা।
আমি ভাবছিলুম যে, এখন শরৎকাল,
পৃথিবীর এখন সাজ ফেরাবার সময়।
কনেটিকাট অ্যাভেনিউয়ের উপরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলুম,
বুক ভরে আমি নিশ্বাস নিচ্ছিলুম,
কাফেটেরিয়ায় গান বাজছিল:
কাম্ সেপটেমবর।
আমার চতুর্দিকে কালো মানুষের ভিড়।
আমার ভীষণ ভাল লাগছিল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1570
|
166
|
আহসান হাবীব
|
স্বদেশ আমার
|
স্বদেশমূলক
|
জেলের সেলে বন্দী ছিলো
মৃতের স্তুপের অন্ধকারে বন্দী ছিলো
বন্দী ছিলো বন্ধ দুয়ার
ভয় থমথম ঘরের মাঝে।
শহর জুড়ে কারফ্যু তার কাফন ছড়ায়
সেই কাফনে বন্দী ছিলো।
ওরা তখন মন্ত্রপুত মশাল নিয়ে নামলো পথে
মৃতের স্তুপে ফোটালো ফুল
নতুন প্রাণে গাঁথলো নতুন দীপাবলি।
আগুন জ্বলে। জ্বলতে থাকে পাশব আঁধার
গ্রাম নগরে রাত পেরিয়ে, রাত পেরিয়ে
রাত পেরিয়ে
সূর্য নামে।
তখন দেখি
আলোর মুকুট মাথায় পরে
ভুবন জুড়ে বাইরে এলো বন্দিনী মা বাংলা আমার
স্বদেশ আমার।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3815.html
|
3567
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিচলিত কেন মাধবীশাখা
|
প্রকৃতিমূলক
|
বিচলিত কেন মাধবীশাখা,
মঞ্জরী কাঁপে থরথর।
কোন্ কথা তার পাতায় ঢাকা
চুপিচুপি করে মরমর। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bicholito-keno-madhobishakha/
|
4639
|
শামসুর রাহমান
|
কোমল গান্ধার
|
মানবতাবাদী
|
স্ফটিক সকালবেলা সে কী জন্ম কান্না দশদিক
জাগানো আমার
এবং কৈশোরে কোনো এক দ্বিপ্রহরে
আমার নেহার
বোনকে হারিয়ে বুকফাটা চিৎকারে আকাশটিকে
চিনেমাটি বাসনের মতো খানখান
করে দিতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সবার অলক্ষ্যে সন্ধ্যেবেলা।
যৌবন আমিও গলা ফাটিয়েছি মিছিলে মিছিলে
আর বর্ণমালাকে কী ক্ষিপ্র মুড়ে ঘৃণা
আর অঙ্গীকারে
দিয়েছি পরায়শ ছুড়ে শক্রর শিবিরে। এতদিনে
বড় ধ’রে এসেছে আমার গলা, প্রায়
বুজে গেছে পানা পুকুরের
মতো, আমি চাই
এখন আমার কণ্ঠে উঠুক নিছক বেজে কোমল গান্ধার। (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/komol-gandhar/
|
5771
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
চোখ বিষয়ে
|
চিন্তামূলক
|
আমি তোমাদের কোন্ অনন্ত ছায়ায়
শুয়ে আছি, শুয়ে রবো, আমি তোমাদের
থেকে বহু দুরে তবু ছায়ার ভিতরে
শুয়ে আছি, জেগে আছি, শিয়রে ও পায়ে
ছায়া পড়ে, ছায়া কাঁপে, চোখের ছায়ায়
মাছ খেলা করে, ভাসে, আমি তোমাদের
মাছের মতন চোখ ছায়ার সাঁতারে
তুলে আনি, তোমাদের গোলাপজামের
মতো চোষ ভালোবাসি, মুখে দিই, দাঁতে
‘তোমাদের’ ভালোবাসাময় চোখগুলি
ভেঙে যায়, মিশে যায়, হেমন্ত বেলায়
শিরীষ ফুলের মতো তোমাদের চোখ
আমাকে পালন করে গোধুলি ছায়ায়।
‘তোমাদের’ শব্দটিতে অনেক কুয়াশা
যেমন শব্দের কাছে নীরবতা ঋণী
যেমন নীরব ফুল সব বন্দনার
চেয়ে শ্রেষ্ঠ, ভ্রষ্ট ফুল যেমন বুকের
কাছে হাত জোড় করে, ছায়ায় শয়ান
ফুল ও বুকের চেয়ে কোমল পাছার
সঙ্গীতের মতো ভঙ্গি যেমন অনেক
দূর মনে হয়, আমি মনের কুয়াশা
‘তোমাদের’ মুখে রাখি, তোমাদের চোখ
কাজলের মতো লাগে, চোখে চোখে ছুঁয়ে
আমি দেখি, শুয়ে থাকি, যেন বিপুলের
ভিতরে নিঃস্বতা কাঁপে, চঞ্চলতা যেন
ছায়ায় গোপন, মুখ মুখশ্রী লুকোয়-
মুখের ভিতরে চোষ ভাঙে মিশে যায়।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1887
|
2014
|
ভবানীপ্রসাদ মজুমদার
|
বাংলাটা
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’ কথায়-কথায় হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
ইংলিশে ও ‘রাইমস’ বলে
‘ডিবেট’ করে, পড়াও চলে
আমার ছেলে খুব ‘পজেটিভ’ অলীক স্বপ্নে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ‘ফাস্ট’ ল্যাঙ্গুয়েজ
হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।
কী লাভ বলুন বাংলা প’ড়ে?
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?
বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না
জানে দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।বাংলা আবার ভাষা নাকি, নেই কোনও ‘চার্ম’ বেঙ্গলিতে
সহজ-সরল এই কথাটা লজ্জা কীসের মেনে নিতে?
ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক
হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক
বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে
শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।
কীসের গরব? কীসের আশা?
আর চলে না বাংলা ভাষা
কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।ইংলিশ বেশ বোমবাস্টিং শব্দে ঠাসা দারুণ ভাষা
বেঙ্গলি ইজ ডিসগাস্টিং, ডিসগাস্টিং সর্বনাশা।
এই ভাষাতে দিবানিশি
হয় শুধু ভাই ‘পি.এন.পি.সি’
এই ভাষা তাই হলেও দিশি, সবাই ভালোবাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।বাংলা ভাষা নিয়েই নাকি এংলা-প্যাংলা সবাই মুগ্ধ
বাংলা যাদের মাতৃভাষা, বাংলা যাদের মাতৃদুগ্ধ
মায়ের দুধের বড়ই অভাব
কৌটোর দুধ খাওয়াই স্বভাব
ওই দুধে তেজ-তাকত হয় না, বাংলাও তাই হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।বিদেশে কী বাংলা চলে? কেউ বোঝে না বাংলা কথা
বাংলা নিয়ে বড়াই করার চেয়েও ভালো নিরবতা।
আজ ইংলিশ বিশ্বভাষা
বাংলা ফিনিশ, নিঃস্ব আশা
বাংলা নিয়ে আজকাল কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।শেক্সপীয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী বা কীটস বা বায়রন
ভাষা ওদের কী বলিষ্ঠ, শক্ত-সবল যেন আয়রন
কাজী নজরুল- রবীন্দ্রনাথ
ওদের কাছে তুচ্ছ নেহাত
মাইকেল হেরে বাংলায় ফেরে, আবেগে-উচছ্বাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%be-%e0%a6%a0%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%be-bhabani-prasad-majumder/
|
274
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
কারার ঐ লৌহকপাট
|
মানবতাবাদী
|
কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান,
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।গাজনের বাজনা বাজা,
কে মালিক, কে সে রাজা,
কে দেয় সাজা মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?
হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান পরবে ফাঁসি,
সর্বনাশী শিখায় এ হীন তথ্য কে রে!ওরে ও পাগলা ভোলা,
দে রে দে প্রলয় দোলা,
গারদগুলা জোরসে ধরে হেচ্কা টানে
মার হাঁক হায়দারী হাঁক, কাধে নে দুন্দুভি ঢাক
ডাক ওরে ডাক, মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে।নাচে ওই কালবোশাখী,
কাটাবী কাল বসে কি
দেরে দেখি ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি
লাথি মার ভাঙ্গরে তালা,
যত সব বন্দী শালায়-আগুন-জ্বালা, আগুন-জ্বালা,
ফেল উপাড়ি।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/karar-oi-loho-kapat/
|
3861
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শীতের প্রবেশ
|
প্রকৃতিমূলক
|
নম, নম, নম নম।
নির্দয় অতি করুণা তোমার
বন্ধু তুমি হে নির্মম,
যা-কিছু জীর্ণ করিবে দীর্ণ
দণ্ড তোমার দুর্দম।
সর্বনাশার নিঃশ্বাস বায়
লাগল ভালে।
নাচল চরণ শীতের হাওয়ায়
মরণতালে।
করব বরণ, আসুক কঠোর,
ঘুচুক অলস সুপ্তির ঘোর,
যাক ছিঁড়ে মোর বন্ধনডোর
যাবার কালে।
ভয় যেন মোর হয় খান্খান্
ভয়েরি ঘায়ে,
ভরে যেন প্রাণ ভেসে এসে দান
ক্ষতির বায়ে।
সংশয়ে মন না যেন দুলাই,
মিছে শুচিতায় তারে না ভুলাই,
নির্মল হব পথের ধুলাই
লাগিলে পায়ে।
শীত, যদি তুমি মোরে দাও ডাক
দাঁড়ায়ে দ্বারে–
সেই নিমেষেই যাব নির্বাক্
অজানা পারে।
নাই দিল আলো নিবে-যাওয়া বাতি,–
শুকনো গোলাপ ঝরা যূথী জাতী,
নির্জন পথ হোক মোর সাথী
অন্ধকারে।
জানি জানি শীত, আমার যে-গীত
বীণায় নাচে
তারে হরিবার কভু কি তোমার
সাধ্য আছে।
দক্ষিণবায়ে করে যাব দান
রবিরশ্মিতে কাঁপিবে সে তান,
কসুমে কুসুমে ফুটিবে সে গান
লতায় গাছে।
যাহা-কিছু মোর তুমি, ওগো চোর,
হরিয়া লবে,
জেনো বারেবারে ফিরে ফিরে তারে
ফিরাতে হবে।
যা-কিছু ধুলায় চাহিবে চুকাতে
ধুলা সে কিছুতে নারিবে লুকাতে,
নবীন করিয়া নবীনের হাতে
সঁপিবে কবে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5758.html
|
4168
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
হারিয়ে গেছে সে
|
প্রেমমূলক
|
হারিয়ে গেছে সে কোন এক মেঘলা দিনে
বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া হয়ে
রোদ্রের সাথে কোন এক ভোরবেলায় কুয়াশা হয়ে
কোন এক শেষ বিকেলে গোধূলি লগনে।
হারিয়ে গেছে সে কোন এক অমাবস্যার রাতে
ভয়ংকর কালো অন্ধকার হয়ে
ঘন কালো মেঘের আড়ালে কোন এক বর্ষা কালে
কোন এক অচেনা নদীর স্রোতের সাথে।
হারিয়ে গেছে সে কোন এক প্রাচীন যুগে
হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা হয়ে
মহাকালের সাথে কোন এক ভয়ানক দিনে
গন্তব্যহীন কোন এক পথের সাথে।
হারিয়ে গেছে সে কোন এক জ্যোৎস্না রাতে
কারো হৃদয়ে আলোকিত করে
সঙ্গী হয়ে কোন এক অদ্ভুত মহামানবের সাথে
কোন এক অভাগাকে অন্ধকারে ফেলে।হারিয়ে গেছে সে কোন এক মেঘলা দিনে
বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া হয়ে
রোদ্রের সাথে কোন এক ভোরবেলায় কুয়াশা হয়ে
কোন এক শেষ বিকেলে গোধূলি লগনে।হারিয়ে গেছে সে কোন এক অমাবস্যার রাতে
ভয়ংকর কালো অন্ধকার হয়ে
ঘন কালো মেঘের আড়ালে কোন এক বর্ষা কালে
কোন এক অচেনা নদীর স্রোতের সাথে।হারিয়ে গেছে সে কোন এক প্রাচীন যুগে
হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা হয়ে
মহাকালের সাথে কোন এক ভয়ানক দিনে
গন্তব্যহীন কোন এক পথের সাথে।হারিয়ে গেছে সে কোন এক জ্যোৎস্না রাতে
কারো হৃদয়ে আলোকিত করে
সঙ্গী হয়ে কোন এক অদ্ভুত মহামানবের সাথে
কোন এক অভাগাকে অন্ধকারে ফেলে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2155.html
|
4839
|
শামসুর রাহমান
|
দুঃখভোগ
|
সনেট
|
যাবে যদি চ’লে যাও, কোরো না খামোকা কালক্ষেপ।
অতীত ফেলতে চাও মুছে ইরেজার দিয়ে ঘ’ষে
সাত তাড়াতাড়ি? এত বিরূপতা শুনি, কার দোষে?
আমাকে সাজালে মস্ত অপরাধী করবো না আক্ষেপ
কোনো দিন। এই যে ভুগছি নিত্য, তোমার ভ্রুক্ষেপ
নেই তাতে কিছুমাত্র। তীরে এসে নৌকা ডুবে যায়
বার বার, বিষ্ফারিত চোখে চেয়ে থাকি অসহায়;
করি না প্রার্থনা আর কার্বাঙ্কলে কৃপার প্রলেপ।কী ক’রে ফেলবে মুছে ওষ্ঠ থেকে চুম্বনের দাগ
এত শীঘ্র? রাত্রিবেলা একা যখন ঘুমাতে যাবে
নিস্তাপ বালিশে মাথা রেখে, ঝেড়ে-ফেলা অনুরাগ
আগুনের হল্কা হ’য়ে রাতভর তোমাকে পোড়াবে।
তোমার বিরুদ্ধে নেই ধিক্কার অথবা অনুযোগ,
আমার জন্যেই থাক মনস্তাপ আর দুঃখভোগ। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dukkhovog/
|
3789
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যে আঁধারে ভাইকে দেখিতে নাহি পায়
|
রূপক
|
যে আঁধারে ভাইকে দেখিতে নাহি পায়
সে আঁধারে অন্ধ নাহি দেখে আপনায়। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/je-adhare-vaike-dekhite-nahi-pai/
|
395
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
প্রলয়োল্লাস
|
মানবতাবাদী
|
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখীর ঝড় !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল,
সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল !
মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে
মহাকালের চণ্ড-রূপে—
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ঙ্কর !
ওরে ঐ হাসছে ভয়ঙ্কর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
ঝামর তাহার কেশের দোলার ঝাপটা মেরে গগন দুলায়,
সর্ব্বনাশী জ্বালা-মুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায় !
বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
দোদুল দোলে !
অট্টরোলের হট্টোগোলে স্তব্ধ চরাচর—
ওরে ঐ স্তব্ধ চরাচর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
দ্বাদশ-রবির বহ্নি-জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন-কটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গ তার ত্রস্ত জটায় !
বিন্দু তাহার নয়ন-জলে
সপ্ত মহা-সিন্ধু দোলে
কপোল-তলে !
বিশ্ব-মায়ের আসন তারি বিপুল বাহুর ‘পর—
হাঁকে ঐ “জয় প্রলয়ঙ্কর !”
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
মাভৈঃ মাভৈঃ ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে !
জরায় মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ঐ বিনাশে !
এবার মহা-নিশার শেষে
আসবে ঊষা অরুণ হেসে
করুণ বেশে |
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু চাঁদের কর,
আলো তার ভরবে এবার ঘর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
ঐ যে মহাকাল সারথি রক্ত-তড়িত চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র-গানে ঝড় তুফানে !
ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে |
গগন-তলের নীল খিলানে !
অন্ধ কারার অন্ধ কূপে
দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে
পাষাণ-স্তূপে !
এই ত রে তার আসার সময় ঐ রথ-ঘর্ঘর—
শোনা যায় ঐ রথ-ঘর্ঘর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
ধ্বংশ দেখে ভয় কেন তোর ? — প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন |
আসছে নবীন—জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন |
তাই সে এমন কেশে বেশে
প্রলয় ব’য়েও আসছে হেসে—
মধুর হেসে !
ভেঙে আবার গ’ড়তে জানে সে চির-সুন্দর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !!
ঐ ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তরে ডর ?
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !—
বধূরা প্রদীপ তুলে ধর !
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর !—
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/352.html
|
584
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
দাদার চিঠি
|
ছড়া
|
আয়রে মনা, ভুতো, বুলী আয়রে তাড়াতাড়ি,
দাদার চিঠি এসেছে আজ, শুনাই তোদের পড়ি |
“কলকাতাতে এসেছি ভাই কালকে সকাল বেলা,
হেথায় কত গাড়ি, ঘোড়া, কত লোকের মেলা |পথের পাশে সারি সারি দু’কাতারে বাড়ি
দিন রাত্তির হুস্ হুস্ করে ছুটেছে রেল গাড়ি |
আমি কি ভাই গেছি বুলে তোদের মলিন মুখ,
মনে পড়লে এখনও যে কেঁপে ওঠে বুক |সেই যে মায়ের জলে ভরা স্নেহের নয়ন দু’টি
সেই যে আমার হাতটি ছেড়ে দিতে চায় নি পুঁটি—
ভূতি মনার আবদারে ভাব, দাদা, কোথায় যাবে?
যদি তুমি যেতে চাও তো সঙ্গে মোদের নেবে |”সেই যে বুলী ঠোঁট কাপায়ে চুলের গোছা ছেড়ে
“যেতে নাহি দিব” ব’লে দাঁড়িয়েছিল দোরে—
সেই যে নলিন ষ্টেশন ঘরে চোখে কাপড় দিয়ে
কাঁদছিলি তুই হাতখানি মোর তোর হাতেতে নিয়ে |সে সব কথা মনে প’ড়ে চোখে আসছে জল
দিনে দিনে কমে যাচ্ছে ভরা বুকের বল |
এসব কথা মায়ের কাছে বলো নাক’ ভাই,
আজকে আমি এখান হ’তে বিদায় হ’তে চাই |আর এক কথা, নিয়মমত লিখো আমায় চিঠি
কেমন আছে ভূতি, মনা, বুলী, ছোট পুঁটি?
মা বাবাকে প্রণাম দিয়ে বলবে আমার কথা,
সিটি কলেজ খুললে আমি ভর্তি হব তথা |
দু’চার দিন আর আছে বাকি, ভাল আছি আমি
আমার হ’য়ে ভাইবোনদের চুমু দিও তুমি |
বিদেশ এলে বুঝতে পারবে কেমন করে প্রাণ,
বুঝেছি ভাই কাকে ব’লে এক রক্তের টান |এখন আমার চোখের কাছে যেন জগত্খানা
ভাসছে নিয়ে ভূতো, পুঁটি, বুলী, ননী, মনা |’
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3859.html
|
6051
|
হেলাল হাফিজ
|
বাম হাত তোমাকে দিলাম
|
মানবতাবাদী
|
এই নাও বাম হাত তোমাকে দিলাম।
একটু আদর করে রেখো, চৈত্রে বোশেখে
খরা আর ঝড়ের রাত্রিতে মমতায় সেবা ওশুশ্রূষা দিয়ে
বুকে রেখো, ঢেকে রেখো, দুর্দিনে যত্ন নিও
সুখী হবে তোমার সন্তান।
এই নাও বাম হাত তোমাকে দিলাম।
ও বড়ো কষ্টের হাত, দেখো দেখো অনাদরে কী রকম
শীর্ণ হয়েছে, ভুল আদরের ক্ষত সারা গায়ে
লেপ্টে রয়েছে, পোড়া কপালের হাত
মাটির মমতা চেয়ে
সম্পদের সুষম বন্টন চেয়ে
মানুষের ত্রাণ চেয়ে
জন্মাবধি কপাল পুড়েছে,
ওকে আর আহত করো না, কষ্ট দিও না
ওর সুখে সুখী হবে তোমার সন্তান।
কিছুই পারিনি দিতে, এই নাও বাম হাত তোমাকে দিলাম।
২৩.৭.৮০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/123
|
5627
|
সুকুমার রায়
|
দিনের হিসাব
|
ছড়া
|
ভোর না হতে পাখিরা জোটে গানের চোটে ঘুমটি ছোটে-
চোখ্টি খোলো, গাত্র তোলো আরে মোলো সকাল হলো।
হায় কি দশা পড়্তে বসা অঙ্ক কষা, কলম ঘষা।
দশটা হলে হট্টগোলে দৌড়ে চলে বই বগলে!
স্কুলের পড়া বিষম তাড়া, কানটি নাড়া বেঞ্চে দাঁড়া
মরে কি বাঁচে! সমুখে পাছে বেত্র নাচে নাকের কাচে।।
খেলতে যে চায় খেল্বে কি ছাই বৈকেলে হায় সময় কি পায়?
খেলাটি ক্রমে যেম্নি জমে দখিনে বামে সন্ধ্যা নামে;
ভাঙ্ল মেলা সাধের খেলা- আবার ঠেলা সন্ধ্যাবেলা-
মুখ্টি হাঁড়ি তাড়াতাড়ি দিচ্ছে পাড়ি যে যার বাড়ি।
ঘুমের ঝোঁকে ঝাপ্সা চোখে ক্ষীণ আলোকে অঙ্ক টোকে ;
ছুটি পাবার সুযোগ আবার আয় রবিবার হপ্তা কাবার!
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/diner-hisab/
|
5805
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নীরা ও জীরো আওয়ার
|
প্রেমমূলক
|
এখন অসুখ নেই, এখন অসুখ থেকে সেরে উঠে
পরবর্তী অসুখের জন্য বসে থাকা। এখন মাথার কাছে
জানলা নেই, বুক ভরা দুই জানলা, শুধু শুকনো চোখ
দেয়ালে বিশ্রাম করে, কপালে জলপট্টির মতো
ঠাণ্ডা হাত দূরে সরে গেছে, আজ এই বিষম সকালবেলা
আমার উত্থান নেই, আমি শুয়ে থাকি, সাড়ে দশটা বেজে যায়।
প্রবন্ধ ও রম্যরচনা, অনুবাদ, পাঁচ বছর আগের
শুরু করা উপন্যাস, সংবাদপত্রের জন্য জল-মেশানো
গদ্য থেকে আজ এই সাড়ে দশটায় আমি সব ভেঙেচুরে
উঠে দাঁড়াতে চাই–অন্ধ চোখ, ছোট চুল–ইস্ত্রিকরা পোশাক ও
হাতের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলে আমি এখন তোমার
বাড়ির সামনে, নীরা থুক্ করে মাটিতে থুতু ছিটিয়ে
বলি : এই প্রাসাদ একদিন আমি ভেঙে ফেলবো! এই প্রাসাদে
এক ভারতবর্ষব্যাপী অন্যায়। এখান থেকে পুনরায় রাজতন্ত্রের
উৎস। আমি
ব্রীজের নিচে বসে গম্ভীর আওয়াজ শুনেছি, একদিন
আমূলভাবে উপড়ে নিতে হবে অপবিত্র সফলতা।
কবিতায় ছোট দুঃখ, ফিরে গিয়ে দেখেছি বহুবার
আমার নতুন কবিতা এই রকম ভাবে শুরু হয় :
নীরা, তোমায় একটি রঙিন
সাবান উপহার
দিয়েছি শেষবার;
আমার সাবান ঘুরবে তোমার সারা দেশে।
বুক পেরিয়ে নাভির কাছে মায়া স্নেহে
আদর করবে, রহস্যময় হাসির শব্দে
ক্ষয়ে যাবে, বলবে তোমার শরীর যেন
অমর না হয়…
অসহ্য! কলম ছুঁড়ে বেরিয়ে আমি বহুদূর সমুদ্রে
চলে যাই, অন্ধকারে স্নান করি হাঙর-শিশুদের সঙ্গে
ফিরে এসে ঘুম চোখ, টেবিলের ওপাশে দুই বালিকার
মতো নারী, আমি নীল-লোভী তাতার বা কালো ঈশ্বর-খোঁজা
নিগ্রোদের মতো অভিমান করি, অভিমানের স্পষ্ট
শব্দ, আমার চা-মেশানো ভদ্রতা হলুদ হয়!
এখন, আমি বন্ধুর সঙ্গে সাহাবাবুদের দোকানে, এখন
বন্ধুর শরীরে ইঞ্জেকশন ফুঁড়লে আমার কষ্ট, এখন
আমি প্রবীণ কবির সুন্দর মুখ থেকে লোমশ ভ্রুকুটি
জানু পেতে ভিক্ষা করি, আমার ক্রোধ ও হাহাকার ঘরের
সিলিং ছুঁয়ে আবার মাটিতে ফিরে আসে, এখন সাহেব বাড়ীর
পার্টিতে আমি ফরিদপুরের ছেলে, ভালো পোষাক পরার লোভ
সমেত কাদা মাখা পায়ে কুৎসিত শ্বেতাঙ্গিনীকে দু’পাটি
দাঁত খুলে আমার আলজিভ দেখাই, এখানে কেউ আমার
নিম্নশরীরের যন্ত্রনার কথা জানে না। ডিনারের আগে
১৪ মিনিটের ছবিতে হোয়াইট ও ম্যাকডেভিড মহাশূন্যে
উড়ে যায়, উন্মাদ! উন্মাদ! এক স্লাইস পৃথিবী দূরে,
সোনার রজ্জুতে
বাঁধা একজন ত্রিশঙ্কু। কিন্তু আমি প্রধান কবিতা
পেয়ে গেছি প্রথমেই, ৯, ৮, ৭, ৬, ৫…থেকে ক্রমশ শূন্যে
এসে স্তব্ধ অসময়, উলটোদিকে ফিরে গিয়ে এই সেই মহাশূন্য,
সহস্র সূর্যের বিস্ফোরণের সামনে দাঁড়িয়ে ওপেনহাইমার
প্রথম এই বিপরীত অঙ্ক গুনেছিল ভগবৎ গীতা আউড়িয়ে?
কেউ শূন্যে ওঠে কেউ শূন্যে নামে, এই প্রথম আমার মৃত্যু
ও অমরত্বের ভয় কেটে যায়, আমি হেসে বন্দনা করি :
ওঁ শান্তি! হে বিপরীত সাম্প্রতিক গণিতের বীজ
তুমি ধন্য, তুমি ইয়ার্কি, অজ্ঞান হবার আগে তুমি সশব্দ
অভ্যুত্থান, তুমি নেশা, তুমি নীরা, তুমিই আমার ব্যক্তিগত
পাপমুক্তি। আমি আজ পৃথিবীর উদ্ধারের যোগ্য
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1892
|
521
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সন্ধ্যাতারা
|
প্রকৃতিমূলক
|
ঘোম্টা-পরা কাদের ঘরের বৌ তুমি ভাই সন্ধ্যাতারা?
তোমার চোখে দৃষ্টি জাগে হারানো কোন্ মুখের পারা।।
সাঁঝের প্রদীপ আঁচল ঝেঁপে
বঁধুর পথে চাইতে বেঁকে
চাউনিটি কার উঠছে কেঁপে
রোজ সাঁঝে ভাই এমনি ধারা।।
কারা হারানো বধূ তুমি অস-পথে মৌন মুখে
ঘনাও সাঁঝে ঘরের মায়া গৃহহীনের শূন্য বুকে।
এই যে নিতুই আসা-যাওয়া,
এমন কর”ণ মলিন চাওয়া,
কার তরে হায় আকাশ-বধু
তুমিও কি আজ প্রিয়-হারা।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/856
|
1764
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আবহমান ভগ্নী-ভ্রাতা
|
স্বদেশমূলক
|
আপন স্বজন দুজন মাতা।
ভালোবাসার সাঁকোর ওপর পা টলমল পা টলমল
পা বাড়ালেই পদ্মা নদী
হাত বাড়ালেই পদ্ম পাতা
এবার পাবো।
আজান-বাজান ভাটিয়ালীর কন্ঠনালীর ছন্দগাথা
প্রবহমান নদীনালায় গুনতে যাবো।
পাঁজর পোড়া গর্ত খোঁড়া হাটের মাঠের ঘরের ঘাটের
সব দরজা জানলা খুলে খুঁজতে যাবো
অগ্নিবরণ ভোরবেলাতে আমরা কজন আবহমান
ভগ্নি-ভ্রাতা।
ডাইনে বাঁয়ে দুই দিকে দুই বাংলা আমার
আপন স্বজন দুজন মাতা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/332
|
1876
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
ময়ূর দিয়েছে
|
প্রেমমূলক
|
একটি ময়ুর তার পেখমের সবটুকু অভ্র ও আবীর দিয়েছে আমাকে।
একটি ময়ূর তার হৃদয়ের বিছানা বালিশে
মশারির টাঙানো খাটে, দরজায়, জানালায়, নীল আয়নায়
অতিথিশালার মতো যখন-তখন এসে ঘুমোবার, হেঁটে বেড়াবার
সুখটুকু, স্বাধীনতাটুকু
সোনার চাবির মতো হাতে তুলে দিয়েছে স্বেচ্ছায়।
এটোঁ কলাপাতা ঘেঁটে অকস্মাৎ জাফরাণের ঘ্রাণ পেয়ে গেলে
ভিখারীরা যে রকম পরিতৃপ্ত হয়,
সে রকমই সুখ পেয়ে হাঁসের মতন ডুবে আছি
হিমে-রোদে, জলে স্থলে, জয়ে পরাজয়ে।
মনে হয় নিমন্ত্রণ পেয়ে গেছি নক্ষত্রলোকের।
কখন অজ্ঞাতসারে পকেটে কে পুরে দিয়ে গেছে ভিসা পাসপোর্ট
সব উড়োজাহাজের এয়ারপোর্টের
সমুদ্রের কিনারের সব কটি উচু মিনারের।
রেশমের, পশমের, মখমলের মতো শান্তি সঙ্গী হয়ে আছে।
একটি ময়ূর তার হৃদয়ের অপর্যাপ্ত অভ্র ও আবীরে
আমার গায়ের আঁশ, ক্ষয়, ক্ষতি, ক্ষত, অক্ষমতা
সব কিছু রাঙিয়ে দিয়েছে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1313
|
3966
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে
|
প্রেমমূলক
|
সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে
অরুণ-বরণ পারিজাত লয়ে হাতে।
নিদ্রিত পুরী, পথিক ছিল না পথে,
একা চলি গেলে তোমার সোনার রথে,
বারেক থামিয়া মোর বাতায়নপানে
চেয়েছিলে তব করুণ নয়নপাতে।
সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে। স্বপন আমার ভরেছিল কোন্ গন্ধে
ঘরের আঁধার কেঁপেছিল কী আনন্দে,
ধুলায় লুটানো নীরব আমার বীণা
বেজে উঠেছিল অনাহত কী আঘাতে।
কতবার আমি ভেবেছিনু উঠি-উঠি
আলস ত্যজিয়া পথে বাহিরাই ছুটি,
উঠিনু যখন তখন গিয়েছ চলে–
দেখা বুঝি আর হল না তোমার সাথে।
সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/509.html
|
3345
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পঞ্চমী
|
প্রেমমূলক
|
ভাবি বসে বসে
গত জীবনের কথা ,
কাঁচা মনে ছিল
কী বিষম মূঢ়তা ।
শেষে ধিক্কারে বলি হাত নেড়ে ,
যাক গে সে কথা যাক গে ।
তরুণ বেলাতে যে খেলা খেলাতে
ভয় ছিল হারবার ,
তারি লাগি , প্রিয়ে , সংশয়ে মোরে
ফিরিয়েছ বার বার ।
কৃপণ কৃপার ভাঙা কণা একটুক
মনে দেয় নাই সুখ ।
সে যুগের শেষে আজ বলি হেসে ,
কম কি সে কৌতুক
যতটুকু ছিল ভাগ্যে ,
দুঃখের কথা থাক্ গে ।
পঞ্চমী তিথি
বনের আড়াল থেকে
দেখা দিয়েছিল
ছায়া দিয়ে মুখ ঢেকে ।
মহা আক্ষেপে বলেছি সেদিন ,
এ ছল কিসের জন্য ।
পরিতাপে জ্বলি আজ আমি বলি ,
সিকি চাঁদিনীর আলো
দেউলে নিশার অমাবস্যার
চেয়ে যে অনেক ভালো ।
বলি আরবার , এসো পঞ্চমী , এসো ,
চাপা হাসিটুকু হেসো ,
আধখানি বেঁকে ছলনায় ঢেকে
না জানিয়ে ভালোবেসো ।
দয়া , ফাঁকি নামে গণ্য ,
আমারে করুক ধন্য ।
আজ খুলিয়াছি
পুরানো স্মৃতির ঝুলি ,
দেখি নেড়েচেড়ে
ভুলের দুঃখগুলি ।
হায় হায় এ কী , যাহা কিছু দেখি
সকলি যে পরিহাস্য ।
ভাগ্যের হাসি কৌতুক করি
সেদিন সে কোন্ ছলে
আপনার ছবি দেখিতে চাহিল
আমার অশ্রুজলে ।
এসো ফিরে এসো সেই ঢাকা বাঁকা হাসি ,
পালা শেষ করো আসি ।
মূঢ় বলিয়া করতালি দিয়া
যাও মোরে সম্ভাষি ।
আজ করো তারি ভাষ্য
যা ছিল অবিশ্বাস্য ।
বয়স গিয়েছে ,
হাসিবার ক্ষমতাটি
বিধাতা দিয়েছে ,
কুয়াশা গিয়েছে কাটি ।
দুখদুর্দিন কালো বরনের
মুখোশ করেছে ছিন্ন ।
দীর্ঘ পথের শেষ গিরিশিরে
উঠে গেছে আজ কবি ।
সেথা হতে তার ভূতভবিষ্য
সব দেখে যেন ছবি ।
ভয়ের মূর্তি যেন যাত্রার সঙ্ ,
মেখেছে কুশ্রী রঙ ।
দিনগুলি যেন পশুদলে চলে ,
ঘণ্টা বাজায়ে গলে ।
কেবল ভিন্ন ভিন্ন
সাদা কালো যত চিহ্ন ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pronchame/
|
2254
|
মহাদেব সাহা
|
লিরিকগুচ্ছ - ০৯
|
প্রেমমূলক
|
তুমি দিয়ে শুরু একটি বাক্য
শেষ তার তুমিহীন-
একেই আমরা বলেছি তো প্রেম,
বিচ্ছেদ চিরদিন।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1391
|
3225
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুঃখহারী
|
ছড়া
|
মনে করো, তুমি থাকবে ঘরে,
আমি যেন যাব দেশান্তরে।
ঘাটে আমার বাঁধা আছে তরী,
জিনিসপত্র নিয়েছি সব ভরি—
ভালো করে দেখ্ তো মনে করি
কী এনে মা, দেব তোমার তরে।
চাস কি মা, তুই এত এত সোনা—
সোনার দেশে করব আনাগোনা।
সোনামতী নদীতীরের কাছে
সোনার ফসল মাঠে ফ'লে আছে,
সোনার চাঁপা ফোটে সেথায় গাছে—
না কুড়িয়ে আমি তো ফিরব না।
পরতে কি চাস মুক্তো গেঁথে হারে —
জাহাজ বেয়ে যাব সাগর-পারে।
সেখানে মা, সকালবেলা হলে
ফুলের ‘পরে মুক্তোগুলি দোলে,
টুপটুপিয়ে পড়ে ঘাসের কোলে—
যত পারি আনব ভারে ভারে।
দাদার জন্যে আনব মেঘে - ওড়া
পক্ষিরাজের বাচ্ছা দুটি ঘোড়া।
বাবার জন্যে আনব আমি তুলি
কনক-লতার চারা অনেকগুলি—
তোর তরে মা, দেব কৌটা খুলি
সাত-রাজার - ধন মানিক একটি জোড়া। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dukkhohari/
|
527
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সাম্যবাদী
|
মানবতাবাদী
|
আদি উপসনালয়-
উঠিল আবার নতুন করিয়া- ভুত প্রেত সমুদয়
তিন শত ষাট বিগ্রহ আর আমুর্তি নতুন করি'
বসিল সোনার বেদীতে রে হায় আল্লার ঘর ভরি'।
সহিতে না পারি' এ দৃশ্য, এই স্রষ্টার অপমান,
ধেয়ানে মুক্তি-পথ খোঁজে নবী, কাঁদিয়া ওঠে পরান।
"খদিজারে কন- আল্লাতালার কসম, কা'বার ঐ
"লাৎ""ওজ্জার" করিবনা পূজা, জানিনা আল্লা বই।
নিজ হাতে যারে করিল সৃষ্টি খড় আর মাটি দিয়া
কোন নির্বোধে পূজিবে তাহারে হায় স্রষ্টা বলিয়া।"
সাধবী পতিব্রতা খদিজাও কহেন স্বামীর সনে--
"দূর কর ঐ লাত-মানাতেরে, পূজে যাজা সব -জনে।
তব শুভ-বরে একেশ্বর সে জ্যোতির্ময়ের দিশা।
পাইয়াছি প্রভু, কাটিয়া গিয়াছে আমার আঁধার নিশা।"
ক্রমে ক্রমে সব কোরেশ জানিল; মোহাম্মদ আমীন
করে নাকো পূজা কা'বার ভূতেরে ভাবিয়া তাদেরে হীন।
গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কন্ফুসিয়াস্? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, য্ত সখ-
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!
বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/533
|
2947
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ক্যামেলিয়া
|
প্রেমমূলক
|
নাম তার কমলা,
দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা।
সে চলেছিল ট্রামে, তার ভাইকে নিয়ে কলেজের রাস্তায় ।
আমি ছিলেম পিছনের বেঞ্চিতে।
মুখের এক পাশের নিটোল রেখাটি দেখা যায়,
আর ঘাড়ের উপর কোমল চুলগুলি খোঁপার নীচে।
কোলে তার ছিল বই আর খাতা।
যেখানে আমার নামবার সেখানে নামা হল না।এখন থেকে সময়ের হিসাব করে বেরোই --
সে হিসাব আমার কাজের সঙ্গে ঠিকটি মেলে না,
প্রায় ঠিক মেলে ওদের বেরোবার সময়ের সঙ্গে,
প্রায়ই হয় দেখা।
মনে মনে ভাবি, আর-কোনো সম্বন্ধ না থাক্,
ও তো আমার সহযাত্রিণী।
নির্মল বুদ্ধির চেহারা
ঝক্ঝক্ করছে যেন।
সুকুমার কপাল থেকে চুল উপরে তোলা,
উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টি নিঃসংকোচ।
মনে ভাবি একটা কোনো সংকট দেখা দেয় না কেন,
উদ্ধার করে জন্ম সার্থক করি --
রাস্তার মধ্যে একটা কোনো উৎপাত,
কোনো-একজন গুণ্ডার স্পর্ধা।
এমন তো আজকাল ঘটেই থাকে।
কিন্তু আমার ভাগ্যটা যেন ঘোলা জলের ডোবা,
বড়ো রকম ইতিহাস ধরে না তার মধ্যে,
নিরীহ দিনগুলো ব্যাঙের মতো একঘেয়ে ডাকে --
না সেখানে হাঙর-কুমিরের নিমন্ত্রণ, না রাজহাঁসের।
একদিন ছিল ঠেলাঠেলি ভিড়।
কমলার পাশে বসেছে একজন আধা-ইংরেজ।
ইচ্ছে করছিল, অকারণে টুপিটা উড়িয়ে দিই তার মাথা থেকে,
ঘাড়ে ধরে তাকে রাস্তায় দিই নামিয়ে।
কোনো ছুতো পাই নে, হাত নিশ্পিশ্ করে।
এমন সময়ে সে এক মোটা চুরোট ধরিয়ে
টানতে করলে শুরু।
কাছে এসে বললুম, ‘ ফেলো চুরোট। ‘
যেন পেলেই না শুনতে,
ধোঁওয়া ওড়াতে লাগল বেশ ঘোরালো করে।
মুখ থেকে টেনে ফেলে দিলেম চুরোট রাস্তায়।
হাতে মুঠো পাকিয়ে একবার তাকালো কট্মট্ ক’রে --
আর কিছু বললে না, এক লাফে নেমে গেল।
বোধ হয় আমাকে চেনে।
আমার নাম আছে ফুটবল খেলায়,
বেশ একটু চওড়া গোছের নাম।
লাল হয়ে উঠল মেয়েটির মুখ,
বই খুলে মাথা নিচু করে ভান করলে পড়বার।
হাত কাঁপতে লাগল,
কটাক্ষেও তাকালে না বীরপুরুষের দিকে।
আপিসের বাবুরা বললে, ‘বেশ করেছেন মশায়। ‘
একটু পরেই মেয়েটি নেমে পড়ল অজায়গায়,
একটা ট্যাক্সি নিয়ে গেল চলে।পরদিন তাকে দেখলুম না,
তার পরদিনও না,
তৃতীয় দিনে দেখি
একটা ঠেলাগাড়িতে চলেছে কলেজে।
বুঝলুম, ভুল করেছি গোঁয়ারের মতো।
ও মেয়ে নিজের দায় নিজেই পারে নিতে,
আমাকে কোনো দরকারই ছিল না।
আবার বললুম মনে মনে,
ভাগ্যটা ঘোলা জলের ডোবা --
বীরত্বের স্মৃতি মনের মধ্যে কেবলই আজ আওয়াজ করছে
কোলাব্যাঙের ঠাট্টার মতো।
ঠিক করলুম ভুল শোধরাতে হবে।খবর পেয়েছি গরমের ছুটিতে ওরা যায় দার্জিলিঙে।
সেবার আমারও হাওয়া বদলাবার জরুরি দরকার।
ওদের ছোট্ট বাসা, নাম দিয়েছে মতিয়া --
রাস্তা থেকে একটু নেমে এক কোণে
গাছের আড়ালে,
সামনে বরফের পাহাড়।
শোনা গেল আসবে না এবার।
ফিরব মনে করছি এমন সময়ে আমার এক ভক্তের সঙ্গে দেখা,
মোহনলাল --
রোগা মানুষটি, লম্বা, চোখে চশম,
দুর্বল পাকযন্ত্র দার্জিলিঙের হাওয়ায় একটু উৎসাহ পায়।
সে বললে, ‘তনুকা আমার বোন,
কিছুতে ছাড়বে না তোমার সঙ্গে দেখা না করে। ‘
মেয়েটি ছায়ার মতো,
দেহ যতটুকু না হলে নয় ততটুকু --
যতটা পড়াশোনায় ঝোঁক, আহারে ততটা নয়।
ফুটবলের সর্দারের ‘পরে তাই এত অদ্ভুত ভক্তি --
মনে করলে আলাপ করতে এসেছি সে আমার দুর্লভ দয়া।
হায় রে ভাগ্যের খেলা!যেদিন নেমে আসব তার দু দিন আগে তনুকা বললে,
‘একটি জিনিস দেব আপনাকে, যাতে মনে থাকবে আমাদের কথা --
একটি ফুলের গাছ। ‘
এ এক উৎপাত। চুপ করে রইলেম।
তনুকা বললে, ‘দামি দুর্লভ গাছ,
এ দেশের মাটিতে অনেক যত্নে বাঁচে। ‘
জিগেস করলেম, ‘নামটা কী?’
সে বললে ‘ক্যামেলিয়া’।
চমক লাগল --
আর-একটা নাম ঝলক দিয়ে উঠল মনের অন্ধকারে।
হেসে বললেম, ‘ ক্যামেলিয়া,
সহজে বুঝি এর মন মেলে না। ‘
তনুকা কী বুঝলে জানি নে, হঠাৎ লজ্জা পেলে,
খুশিও হল।
চললেম টবসুদ্ধ গাছ নিয়ে।
দেখা গেল পার্শ্ববর্তিনী হিসাবে সহযাত্রিণীটি সহজ নয়।
একটা দো-কামরা গাড়িতে
টবটাকে লুকোলেম নাবার ঘরে।
থাক্ এই ভ্রমণবৃত্তান্ত,
বাদ দেওয়া যাক আরো মাস কয়েকের তুচ্ছতা।পুজোর ছুটিতে প্রহসনের যবনিকা উঠল
সাঁওতাল পরগনায়।
জায়গাটা ছোটো। নাম বলতে চাই নে --
বায়ুবদলের বায়ু-গ্রস্তদল এ জায়গার খবর জানে না।
কমলার মামা ছিলেন রেলের এঞ্জিনিয়র।
এইখানে বাসা বেঁধেছেন
শালবনে ছায়ায়, কাঠবিড়ালিদের পাড়ায়।
সেখানে নীল পাহাড় দেখা যায় দিগন্তে,
অদূরে জলধারা চলেছে বালির মধ্যে দিয়ে,
পলাশবনে তসরের গুটি ধরেছে,
মহিষ চরছে হর্তকি গাছের তলায় --
উলঙ্গ সাঁওতালের ছেলে পিঠের উপরে।
বাসাবাড়ি কোথাও নেই,
তাই তাঁবু পাতলেম নদীর ধারে।
সঙ্গী ছিল না কেউ,
কেবল ছিল টবে সেই ক্যামেলিয়া।
কমলা এসেছে মাকে নিয়ে।
রোদ ওঠবার আগে
হিমে-ছোঁওয়া স্নিগ্ধ হাওয়ায়
শাল-বাগানের ভিতর দিয়ে বেড়াতে যায় ছাতি হাতে।
মেঠো ফুলগুলো পায়ে এসে মাথা কোটে,
কিন্তু সে কি চেয়ে দেখে।
অল্পজল নদী পায়ে হেঁটে
পেরিয়ে যায় ও পারে,
সেখানে সিসুগাছের তলায় বই পড়ে।
আর আমাকে সে যে চিনেছে
তা জানলেম আমাকে লক্ষ্য করে না বলেই।একদিন দেখি নদীর ধারে বালির উপর চড়িভাতি করছে এরা।
ইচ্ছে হল গিয়ে বলি, আমাকে দরকার কি নেই কিছুতেই।
আমি পারি জল তুলে আনতে নদী থেকে --
পারি বন থেকে কাঠ আনতে কেটে,
আর, তা ছাড়া কাছাকাছি জঙ্গলের মধ্যে
একটা ভদ্রগোছের ভালুকও কি মেলে না।দেখলেম দলের মধ্যে একজন যুবক --
শর্ট্-পরা, গায়ে রেশমের বিলিতি জামা,
কমলার পাশে পা ছড়িয়ে
হাভানা চুরোট খাচ্ছে।
আর, কমলা অন্যমনে টুকরো টুকরো করছে
একটা শ্বেতজবার পাপড়ি,
পাশে পড়ে আছে
বিলিতি মাসিক পত্র।মুহূর্তে বুঝলেম এই সাঁওতাল পরগনার নির্জন কোণে
আমি অসহ্য অতিরিক্ত, ধরবে না কোথাও।
তখনি চলে যেতেম, কিন্তু বাকি আছে একটি কাজ।
আর দিন-কয়েকেই ক্যামেলিয়া ফুটবে,
পাঠিয়ে দিয়ে তবে ছুটি।
সমস্ত দিন বন্দুক ঘাড়ে শিকারে ফিরি বনে জঙ্গলে,
সন্ধ্যার আগে ফিরে এসে টবে দিই জল
আর দেখি কুঁড়ি এগোল কত দূর।সময় হয়েছে আজ।
যে আনে আমার রান্নার কাঠ
ডেকেছি সেই সাঁওতাল মেয়েটিকে।
তার হাত দিয়ে পাঠাব
শালপাতার পাত্রে।
তাঁবুর মধ্যে বসে তখন পড়ছি ডিটেকটিভ গল্প।
বাইরে থেকে মিষ্টিসুরে আওয়াজ এল, ‘বাবু, ডেকেছিস কেনে। ‘
বেরিয়ে এসে দেখি ক্যামেলিয়া
সাঁওতাল মেয়ের কানে,
কালো গালের উপর আলো করেছে।
সে আবার জিগেস করলে, ‘ডেকেছিস কেনে। ‘
আমি বললেম, ‘ এইজন্যেই। ‘
তার পরে ফিরে এলেম কলকাতায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20160605060453/
|
3900
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সংশয়ী
|
ছড়া
|
কোথায় যেতে ইচ্ছে করে
শুধাস কি মা , তাই ?
যেখান থেকে এসেছিলেম
সেথায় যেতে চাই ।
কিন্তু সে যে কোন্ জায়গা
ভাবি অনেকবার ।
মনে আমার পড়ে না তো
একটুখানি তার ।
ভাবনা আমার দেখে বাবা
বললে সেদিন হেসে ,
' সে - জায়গাটি মেঘের পারে
সন্ধ্যাতারার দেশে । '
তুমি বল , ' সে - দেশখানি
মাটির নিচে আছে ,
যেখান থেকে ছাড়া পেয়ে
ফুল ফোটে সব গাছে । '
মাসি বলে , ' সে - দেশ আমার
আছে সাগরতলে ,
যেখানেতে আঁধার ঘরে
লুকিয়ে মানিক জ্বলে । '
দাদা আমার চুল টেনে দেয় ,
বলে , ' বোকা ওরে ,
হাওয়ায় সে - দেশ মিলিয়ে আছে
দেখবি কেমন করে ?'
আমি শুনে ভাবি , আছে
সকল জায়গাতেই ।
সিধু মাস্টার বলে শুধু
' কোনোখানেই নেই । ' (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/songshoyi/
|
693
|
জয় গোস্বামী
|
পশ্চিমে বাঁশবন
|
চিন্তামূলক
|
পশ্চিমে বাঁশবন। তার ধারে ধারে জল।
বিকেল দাঁড়াল ধানক্ষেতে।
জলে ভাঙা ভাঙা মেঘ। ফিরে আসছে মাছমারা বালকের দল।
খালি গা, কোমরে গামছা, লম্বা ছিপ, ঝুড়ি–
আবছা কোলাহল।
তোমার কি ইচ্ছে করে, এখন ওদের সঙ্গে যেতে?
কয়েদি উত্তর দেয় না। সে শুধু বিকেলটুকু
এঁকে রাখছে ঘরের মেঝেতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1748
|
5738
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ইচ্ছে হয়
|
চিন্তামূলক
|
এমনভাবে হারিয়ে যাওয়া সহজ নাকি
ভিড়ের মধ্যে ভিখারী হয়ে মিশে যাওয়া?
এমনভাবে ঘুরতে ঘুরতে স্বর্গ থেকে ধুলোর মর্ত্যে
মানুষ সেজে এক জীবন মানুষ নামে বেঁচে থাকা?
রূপের মধ্যে মানুষ আছে, এই জেনে কি নারীর কাছে
রঙের ধাঁধা খুঁজতে খুঁজতে টনটনায় চক্ষু-স্নায়ু
কপালে দুই ভুরুর সন্ধি, তার ভিতরে ইচ্ছে বন্দী
আমার আয়ু, আমার ফুল ছেঁড়ার নেশা
নদীর জল সাগরে যায়, সাগর জল আকাশে মেশে
আমার খুব ইচ্ছে হয় ভালোবাসার
মুঠোয় ফেরা!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1805
|
4445
|
শামসুর রাহমান
|
এ কেমন রাত এলো_
|
রূপক
|
সারাদিন কাজ করে সন্ধেবেলা রহমত আলী
গৃহিণীর জন্যে কিছু ফুল নিয়ে বস্তিতে ফেরার
পথে দ্যাখে আসমানে রূপালি টাকার মতো চাঁদ
হাসছে। হঠাৎ এ কী! মিশমিশে অন্ধকার থাবা
দিয়ে ঢেকে ফেলে চতুর্দিক। এ কেমন
তুফান কাঁপিয়ে দিচ্ছে সব কিছু? কেমন ধ্বংসের আলামত?
‘এ কেমন রাত এলো’? রহমত আলী নিজেকেই
প্রশ্ন করে। নড়বড়ে ঘর তার জ্বরতপ্ত রোগীর লাহান
ভীষণ কাঁপছে, যেন এক্ষুণি পানিতে
ভেসে যাবে। তার গৃহিণী রহিমা
বেজায় ভয়ার্ত চোখে তাকায় স্বামীর দিকে আর
কোলের সন্তানটিকে বুকে চেপে ধরে।আসমান বেজায় গর্জনে চতুর্দিক
কাঁপিয়ে তুলছে; রহমত আলী কেঁপে-ওঠা ঘরে
বসে দ্যাখে, বড় জোরে পানি
ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে
দিয়েছে হাঙ্গাম জুড়ে। বুঝি নিমেষেই
সব কিছু ডুবে যাবে, ভেসে যাবে, বুঝিবা নিশ্চিহ্ন
হবে সব কিছু, যাবে মুছে, হায়, সাধের সংসার।
এ কেমন মশারি ধরেছে ঘিরে চতুর্দিক থেকে?
কখন যে ডুবেছে কুটির তার, রহমত বুঝতে পারেনি।
ডুবতে ডুবতে
ঘুমের সজল মায়াজাল থেকে জেগে
রহমত নিজেকে দেখতে পায় কাঠের তক্তায়।
কোথায় সংসার তার? কোথায় রহিমা?
হা কপাল! কোথায় সন্তান? ধোঁয়া, সব কিছু ধোঁয়া। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/e-kemon-rat-elo/
|
3634
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বেলা আটটার কমে
|
হাস্যরসাত্মক
|
বেলা আটটার কমে
খোলে না তো চোখ সে।
সামলাতে পারে না যে
নিদ্রার ঝোঁক সে।
জরিমানা হলে বলে,–
“এসেছি যে মা ফেলে,
আমার চলে না দিন
মাইনেটা না পেলে।
তোমার চলবে কাজ
যে ক’রেই হোক সে,
আমারে অচল করে
মাইনের শোক সে।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bela-attar-kome/
|
1051
|
জীবনানন্দ দাশ
|
তোমাকে (অপ্রকাশিত)
|
প্রকৃতিমূলক
|
একদিন মনে হতো জলের মতন তুমি।
সকালবেলার রোদে তোমার মুখের থেকে বিভা–
অথবা দুপুরবেলা — বিকেলের আসন্ন আলোয়–
চেয়ে আছে — চলে যায় — জলের প্রতিভা।মনে হতো তীরের উপরে বসে থেকে।
আবিষ্ট পুকুর থেকে সিঙাড়ার ফল
কেউ কেউ তুলে নিয়ে চলে গেলে — নীচে
তোমার মুখের মতন অবিকল।নির্জন জলের রঙ তাকায়ে রয়েছে;
স্থানান্তরিত হয়ে দিবসের আলোর ভিতরে
নিজের মুখের ঠান্ডা জলরেখা নিয়ে
পুনরায় শ্যাম পরগাছা সৃষ্টি করে;এক পৃথিবীর রক্ত নিপতিত হয়ে গেছে জেনে
এক পৃথিবীর আলো সব দিকে নিভে যায় বলে
রঙিন সাপকে তার বুকের ভিতরে টেনে নেয়;
অপরাহ্ণে আকাশের রং ফিকে হলে।তোমার বুকের ‘পরে আমাদের পৃথিবীর অমোঘ সকাল;
তোমার বুকের ‘পরে আমাদের বিকেলের রক্তিল বিন্যাস;
তোমার বুকের ‘পরে আমাদের পৃথিবীর রাত;
নদীর সাপিনী, লতা, বিলীন বিশ্বাস।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/tomake/
|
591
|
খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন
|
কানা বগীর ছা
|
ছড়া
|
ঐ দেখা যায় তাল গাছ
ঐ আমাদের গাঁ।
ঐ খানেতে বাস করে
কানা বগীর ছা।
ও বগী তুই খাস কি?
পানতা ভাত চাস কি?
পানতা আমি খাই না
পুঁটি মাছ পাই না
একটা যদি পাই
অমনি ধরে গাপুস গুপুস খাই।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4331.html
|
520
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি
|
শোকমূলক
|
চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসেছিল পথ ভুলে,
ওগো এই গঙ্গার কূলে।
দিশাহারা মাতা দিশা পেয়ে তাই নিয়ে গেছে কোলে তুলে
ওগো এই গঙ্গার কূলে।।
চপল চারণ বেণু-বীণে তা’র
সুর বেঁধে শুধু দিল ঝঙ্কার,
শেষ গান গাওয়া হ’ল না ক’ আর,
উঠিল চিত্ত দুলে,
তারি ডাক-নাম ধ’রে ডাকিল কে যেন অস্ত-তোরণ-মূলে,
ওগো এই গঙ্গার কূলে।।
ওরে এ ঝোড়ো হাওয়ায় কারে ডেকে যায় এ কোন সর্বনাশী
বিষাণ কবির গুমরি’ উঠিল, বেসুরো বাজিল বাঁশী।
আঁখির সলিলে ঝলসানো আঁখি
কূলে কূলে ভ’রে ওঠে থাকি’ থাকি’,
মনে পড়ে কবে আহত এ-পাখী
মৃত্যু-আফিম-ফুলে,
কোন ঝড়-বাদলের এমনি নিশীথে প’ড়েছিল ঘুমে ঢুলে।
ওগো এই গঙ্গার কুলে।।
তার ঘরের বাঁধন সহিল না সে যে চির বন্ধন-হারা,
তাই ছন্দ-পাগলে কোলে নিয়ে দোলে জননী মুক্তধারা!
ও সে আলো দিয়ে গেল আপনারে দহি’,
অমৃত বিলালো বিষ-জ্বালা সহি’,
শেষে শান্তি মাগিল ব্যথা-বিদ্রোহী
চিতার অগ্নি-শূলে!
পুনঃ নব-বীনা-করে আসিবে বলিয়া এই শ্যাম তরুমূলে
ওগো এই গঙ্গার কূলে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/543
|
3381
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পাখিরে দিয়েছ গান, গায় সেই গান
|
ভক্তিমূলক
|
পাখিরে দিয়েছ গান, গায় সেই গান,
তার বেশি করে না সে দান।
আমারে দিয়েছ স্বর, আমি তার বেশি করি দান,
আমি গাই গান।
বাতাসেরে করেছ স্বাধীন,
সহজে সে ভৃত্য তব বন্ধনবিহীন।
আমারে দিয়েছ যত বোঝা,
তাই নিয়ে চলি পথে কভু বাঁকা কভু সোজা।
একে একে ফেলে ভার মরণে মরণে
নিয়ে যাই তোমার চরণে
একদিন রিক্তহস্ত সেবায় স্বাধীন;
বন্ধন যা দিলে মোরে করি তারে মুক্তিতে বিলীন।
পূর্ণিমারে দিলে হাসি;
সুখস্বপ্ন-রসরাশি
ঢালে তাই, ধরণীর করপুট সুধায় উচ্ছ্বাসি।
দুঃখখানি দিলে মোরে তপ্ত ভালে থুয়ে,
অশ্রুজলে তারে ধুয়ে ধুয়ে
আনন্দ করিয়া তারে ফিরায়ে আনিয়া দিই হাতে
দিনশেষে মিলনের রাতে।
তুমি তো গড়েছ শুধু এ মাটির ধরণী তোমার
মিলাইয়া আলোকে আঁধার।
শূন্যহাতে সেথা মোরে রেখে
হাসিছ আপনি সেই শূন্যের আড়ালে গুপ্ত থেকে।
দিয়েছ আমার 'পরে ভার
তোমার স্বর্গটি রচিবার।
আর সকলের তুমি দাও,
শুধু মোর কাছে তুমি চাও।
আমি যাহা দিতে পারি আপনার প্রেমে,
সিংহাসন হতে নেমে
হসিমুখে বক্ষে তুলে নাও।
মোর হাতে যাহা দাও
তোমার আপন হাতে তার বেশি ফিরে তুমি পাও।
পদ্মাতীর, ২৪ মাঘ, ১৩২১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1940
|
3677
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভোলানাথ লিখেছিল
|
হাস্যরসাত্মক
|
ভোলানাথ লিখেছিল,
তিন-চারে নব্বই–
গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই।
তিন চারে বারো হয়,
মাস্টার তারে কয়;
“লিখেছিনু ঢের বেশি”
এই তার গর্বই। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/volanath-likhechilo/
|
4992
|
শামসুর রাহমান
|
বরকতের ফটোগ্রাফ
|
স্বদেশমূলক
|
কবেকার ঘাসঢাকা এক টুকরো জমি, ঝোপঝাড়ের
খাসমহল, ঝকমকে আকাশ
অদৃশ্য ঘরের বারান্দা, অন্তরালবর্তিনী
মায়ের তাকিয়ে-থাকা
ইতিহাসের কোনো ইশারা দেখেনি। সকালবেলার হাওয়া
অবিন্যস্ত করেনি তার চুল। তার দৃষ্টি ছিল
সামনের দিকে, ভোরকে সে সোদরপ্রতিম ভেবেছিল?
বলতে পারব না, আমি বলতে পারব না।
তার উপর দিয়ে ঢেউয়ের মতো গড়িয়ে গেছে
বছরের পর বছর। একটি দোয়েল,
আকাশের সবচেয়ে দূরবর্তী নক্ষত্র, নদী, অমাবস্যা,
জোনাকিপুঞ্জ আর রৌদ্রদগ্ধ রাজপথ
তাকে চিহ্নিত করেছিল ইতিহাসের উজ্জ্বল অংশ হিসেবে,
সে জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি কোনোদিন।সে কি কখনও রাত জেগে কাউকে লিখেছিল চিঠি
অনুরাগের অক্ষর সাজিয়ে? দিঘির জলে পা ডুবিয়ে
তার বিকেল কি সন্ধ্যায় ঢলে পড়েছে
হৃৎপিন্ডের স্পন্দন বাড়ানো প্রতীক্ষায়? সে কি রাজনৈতিক
ইস্তাহার পড়েছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে? তার নাম কি
লেখা ছিল পুলিশের স্থুলোদর খাতায়?
জানালার দিকে ঝুঁকে-থাকা
গাছটিকে প্রশ্ন ক’রে ক’রে ক্লান্ত হ’লেও জানতে পারব না।ভর সন্ধেবেলা বরকতের পুরোনো এক ফটোগ্রাফ
আমার হাতে এসে যাবে, ভাবিনি। তার মায়ের
যত্নের আশ্রয় ছেড়ে সেটি এখন
আমার হাতের উষ্ণতায়। সহজে চোখ ফেরানো
যায় না, যদি বলি, বিস্ময়ের ঘোর নয়,
কোনো চমৎকারিত্ব নয়,
কোনোরকম রোমঞ্চও নয়, শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায়
আমার দৃষ্টি থেকে ছুটে নীলিমায় মিশে গেল,
তবে কি মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেবো আমি?
ঘাস-ঢাকা মাটিতে ফুল ঝরে,
ঘাস-ঢাকা মাটিতে ফুল ঝরে,
ঘাস-ঢাকা মাটিতে ফুল ঝরে।
সুদূরতম এক নক্ষত্র আকাশ থেকে ছুটে এসে
চুমো খেতে চায় ঘাস-ঢাকা, ফুল-মাখা মাটিকে।চমৎকার একটি গল্প বানানো যায় ফটোগ্রাফের
বরকতকে কেন্দ্রবিন্দু ক’রে
মিডলক্লাশ সেন্টিমেন্টের ভিয়েন দিয়ে।
একুশে ফেব্রুয়ারির শপথ, শপথ এই
ফাল্গুনের গুচ্ছ গুচ্ছ পলাশের,আমি সে রকম কিছুই করব না।
সূর্যোদয়ের মতো পবিত্রতাকে মেঘাচ্ছন্ন করার,
অক্ষরের প্রগলভতায় কুয়াশাচ্ছন্ন করার অধিকার
কেউ আমাকে দেয়নি।
‘এই ফটোগ্রাফের দিকে তাকিয়ে
নীরব থাকো, সময় হোক পরিপক্ক ফল, সন্তের ধ্যান’,
বলল আমাকে সন্ধেবেলার মুহূর্তগুলো।নকশা ঘেরা কাচবন্দী বরকতার পুরোনো ফটোগ্রাফ
সময়ের ছুটন্ত খুর থেকে ঝরে-পড়া ধুলোয় বিবর্ণ,
অথচ আমার মনে হলো, সেই ছবির
ভেতর থেকে জ্যোতিকণাগুলো
চক্রাকারে বেরুতে বেরুতে নিমেষে
ছড়িয়ে পড়ল সব খানে। শপথ বর্ণমালার,
কী ক’রে ভর সন্ধেবেলা আমার চতুর্দিকে
আলোর সমুদ্র, আমি বলতে পারব না। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/borkoter-fotograph/
|
1608
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
দুপুরবেলা বিকেলবেলা
|
রূপক
|
।।১।।
কথা ছিল, ঘরে যাব; ‘ঘর হৈল পর্বত প্রমাণ’।
চেয়ে দেখি দিগন্ত অবধি
দুপুরেই এঁকে দিচ্ছ সমস্ত স্বপ্নের অবসান।
বয়সের নদী–
আঁজলায় সামান্য জল তুলে ধরে। বুকের ভিতরে
যতখানি জল, তার চতুর্গুণ নুড়ির ছলনা।
খরায় শুকিয়ে ওঠে ধান।
।।২।।
সারা দুপুর খরায় তোমার ধান পুড়েছে।
বিকেলবেলা
হঠাৎ শুরু উথালপাতাল জলের খেলা।
জল ঘুরে যায়, জল ঘুরে যায় নিখিলবিশ্বচরাচরে–
আমার ঘরে, তোমার ঘরে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1636
|
3611
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিশ্ববীণারবে
|
প্রকৃতিমূলক
|
বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে।
স্থলে জলে নভতলে বনে উপবনে
নদীনদে গিরিগুহা-পারাবারে
নিত্য জাগে সরস সঙ্গীতমধুরিমা,
নিত্য নৃত্যরসভঙ্গিমা।–নব বসন্তে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি মঞ্জুল, অতি মঞ্জুল, শুনি মঞ্জুল গুঞ্জন কুঞ্জে–
শুনি রে শুনি মর্মর পল্লবপুঞ্জে,
পিককূজন পুষ্পবনে বিজনে,
মৃদু বায়ুহিলোলবিলোল বিভোল বিশাল সরোবর-মাঝে
কলগীত সুললিত বাজে।
শ্যামল কান্তার-‘পরে অনিল সঞ্চারে ধীরে রে,
নদীতীরে শরবনে উঠে ধ্বনি সরসর মরমর।
কত দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা ॥আষাঢ়ে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি গম্ভীর, অতি গম্ভীর নীল অম্বরে ডম্বরু বাজে,
যেন রে প্রলয়ঙ্করী শঙ্করী নাচে।
করে গর্জন নির্ঝরিণী সঘনে,
হেরো ক্ষুব্ধ ভয়াল বিশাল নিরাল পিয়ালতমালবিতানে
উঠে রব ভৈরবতানে।
পবন মল্লারগীত গাহিছে আঁধার রাতে,
উন্মাদিনী সৌদামিনী রঙ্গভরে নৃত্য করে অম্বরতলে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা ॥আশ্বিনে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি নির্মল, অতি নির্মল, অতি নির্মল উজ্জ্বল সাজে
ভুবনে নব শারদলক্ষ্ণী বিরাজে।
নব ইন্দুলেখা অলকে ঝলকে
অতি নির্মল হাসবিভাসবিকাশ আকাশনীলাম্বুজ-মাঝে
শ্বেত ভুজে শ্বেত বীণা বাজে–
উঠিছে আলাপ মৃদু মধুর বেহাগতানে,
চন্দ্রকরে উল্লসিত ফুল্লবনে ঝিল্লিরবে তন্দ্রা আনে রে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা ॥বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে।
স্থলে জলে নভতলে বনে উপবনে
নদীনদে গিরিগুহা-পারাবারে
নিত্য জাগে সরস সঙ্গীতমধুরিমা,
নিত্য নৃত্যরসভঙ্গিমা।–নব বসন্তে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি মঞ্জুল, অতি মঞ্জুল, শুনি মঞ্জুল গুঞ্জন কুঞ্জে–
শুনি রে শুনি মর্মর পল্লবপুঞ্জে,
পিককূজন পুষ্পবনে বিজনে,
মৃদু বায়ুহিলোলবিলোল বিভোল বিশাল সরোবর-মাঝে
কলগীত সুললিত বাজে।
শ্যামল কান্তার-‘পরে অনিল সঞ্চারে ধীরে রে,
নদীতীরে শরবনে উঠে ধ্বনি সরসর মরমর।
কত দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা ॥আষাঢ়ে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি গম্ভীর, অতি গম্ভীর নীল অম্বরে ডম্বরু বাজে,
যেন রে প্রলয়ঙ্করী শঙ্করী নাচে।
করে গর্জন নির্ঝরিণী সঘনে,
হেরো ক্ষুব্ধ ভয়াল বিশাল নিরাল পিয়ালতমালবিতানে
উঠে রব ভৈরবতানে।
পবন মল্লারগীত গাহিছে আঁধার রাতে,
উন্মাদিনী সৌদামিনী রঙ্গভরে নৃত্য করে অম্বরতলে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা ॥আশ্বিনে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি নির্মল, অতি নির্মল, অতি নির্মল উজ্জ্বল সাজে
ভুবনে নব শারদলক্ষ্ণী বিরাজে।
নব ইন্দুলেখা অলকে ঝলকে
অতি নির্মল হাসবিভাসবিকাশ আকাশনীলাম্বুজ-মাঝে
শ্বেত ভুজে শ্বেত বীণা বাজে–
উঠিছে আলাপ মৃদু মধুর বেহাগতানে,
চন্দ্রকরে উল্লসিত ফুল্লবনে ঝিল্লিরবে তন্দ্রা আনে রে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা ॥
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a3%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be/
|
5852
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
রাখাল
|
চিন্তামূলক
|
লাল ও সবুজ আলোর মধ্যে অন্তকাল
আমি ডাইনে তাকাই পিছনে ফিরে অন্ধকার গলিতে
অনন্তকাল পিছনে নয়, ডাকদিকে নয়, সবুজ ও লাল-
সুখের মতো ভূবিস্তৃত, ঊরুদ্বয়ে শোকের মতো, দৃষ্টি থেকে ঘুমের মতো
পেরিয়ে যাই, কুসুম এবং ফলের কাছে বীজের মতো
দীক্ষা নিতে,
মৃত্যু থেকে সঙ্গোপনে শুন্য ঘরে, দ্রাক্ষাবনের
ছঅই বাতাস, জ্ঞানী মাথার খুলী, নদীর ভাঙ্গা পাড়ের শুকনো পাতা-
পেরিয়ে যাই মাঝরাতের পাঠশালার হাজার চোখ, ধূসর খাতা,
পেরিয়ে যাই ভূমিকম্প, সূচের সরুগর্ত দিয়ে অনন্তকাল
রেশমী প্যান্ট, কোমরবন্ধ, হাতে চুরুট; তবু আমায় বলো, ‘রাখাল’।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1900
|
1810
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
গাছ
|
প্রকৃতিমূলক
|
রাজকোষের মতো বোঝেই
কুঁড়িতে, পাতায়, শতপুষ্পে, গন্ধের পেখমে।
তবু শিকড়ের চোখে আত্মগোপনকারী যোদ্ধার আত্মসমালোচনা।
নিজের ভিতরে গভীর কোনো জল-উৎস খুঁজতে খুঁজতে
খুঁড়তে খুঁড়তে ক্লান্ত এবং
বিপদাপন্ন।
কখনো কখনো সোনালি মেঘের শিরা-উপশিরাও
তার কাছে করাতের দাঁত।
কখনো কখনো মেঘ সে নিজেই।
মেঘের ভিতরে নিজেকে দীর্ণ করতেই বানিয়ে চলেছে
বজ্র-ডমরুর গুরুগুরু।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1190
|
792
|
জসীম উদ্দীন
|
কাল সে আসিবে
|
প্রেমমূলক
|
কালকে সে নাকি আসিবে মোদের ওপারের বালুচরে,
এ পারের ঢেউ ওপারে লাগিছে বুঝি তাই মনে করে।
বুঝি তাই মনে করে,
বাউল বাতাস টানাটানি করে বালুর আঁচল ধরে।
কাল সে আসিবে, মুখখানি তার নতুন চরের মত,
চখা আর চখী নরম ডানায় মুছায়ে দিয়েছে কত।
চরের চাষীর ধানের খেতের মতই তাহার গা,
কোথাবা হলুদ, আব্ছা হলুদ, কোথাবা হলুদ না।
কাল সে আসিবে, হাসিয়া হাসিয়া রাঙা মুখখানি ভরি,
এপারে আমার পাতার কুটিরে আমি কি বা আজ করি!
কাল সে আসিবে, ওই বালুচরে, ওপারে আমার ঘর,
তাজ পরে নদী-ঘাটের ডিঙা কাঁপে নদীটির পর।
কাল সে আসিবে, নোঙর ছিঁড়িল, দুলিছে নায়ের পাল,
কারে হারায়েছি, কারে যেন আমি দেখি নাই কতকাল।
ওপারেতে চর বালু লয়ে খেলে, উড়ায় বালুর রথ,
ওখানে সে কাল দুটি রাঙা পায়ে ভাঙিয়া যাইবে পথ।
কাল সে আসিবে ওই বালুচরে, আমি কি আবার হায়,
আসমান-তারা শাড়ীখানি আজ উড়াব সারাটি গায়?
রামলক্ষ্মণ শঙ্খ দুগাছি পরিব আবার হাতে,
খোঁপায় জড়াব কিংশুক-কলি, কাজল চোখের পাতে;
গলায় কি আজ পরিতে হইবে পদ্ম-রাগের মালা,
কানাড়া ছান্দে বাঁধিব কি বেনী কপালে সিঁদুর জ্বালা?
কাল সে আসিবে, মিছাই ছিঁড়িছি আঁধারের কালো কেশ,
আজকের রাত পথ ভুলে বুঝি হারাল ঊষার দেশ।
এই বালুচরে আসিবে সে কাল, তরে রাঙা মুখে ভরি,
অফুট ঊষার সোনার কমল আসিবে সোহাগে ধরি।
সে আসিবে কাল, গলায় পরিয়া কুসুম ফুলের হার,
দুখানি নূপুর মুখর হইবে চরণে জড়ায়ে তার।
মাথায় বাঁধিবে দুধালীর লতা কচি সীমপাতা কানে,
বেণুর অধর চুমিয়া চুমিয়া মুখর করিবে গানে।
কাল সে আসিবে, রাই সরিষাল হলদী কোটার শাড়ী,
মটর কনেরে সাথে করে যেন খুলে দেখে নাড়ি নাড়ি।
কাল সে আসিবে ওই বালুচরে, ধারে তার এই নদী,
তারি কূলে মোর ভাঙা কুঁড়ে ঘর, বহুদূরে নয় যদি;
তবু কি তাহার সময় হইবে হেথায় চরণ ধরি,
মোর কুঁড়ে ঘর দিয়ে যাবে হায়, মণি-মানিকেতে ভরি।
সে কি ওই চরে দাঁড়ায়ে দেখিবে বরষার তরুগুলি,
শীতের তাপসী কারে বা স্মরিছে আভরণ গার খুলি?
হয়ত দেখিবে, হয় দেখিবে না;
কাল সে আসিবে চরে,
এপারে আমার ভাঙা ঘরখানি, আমি থাকি সেই ঘরে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/753
|
793
|
জসীম উদ্দীন
|
কাল সে আসিয়াছিল
|
প্রেমমূলক
|
কাল সে আসিয়াছিল ওপারের বালুচরে,
এতখানি পথ হেঁটে এসেছিল কি জানি কি মনে করে।
কাশের পাতায় আঁচড় লেগেছে তাহার কোমল গায়,
দুটি রাঙা পায়ে আঘাত লেগেছে কঠিন পথের ঘায়।
সারা গাও বেয়ে ঘাম ঝরিতেছে, আলসে অবশ তনু,
আমার দুয়ারে দাঁড়াল আসিয়া দেখিয়া অবাক হনু।
দেখিলাম তারে- যার লাগি একা আশা-পথ চেয়ে থাকি,
এই বালুচরে মাথা কুটে কুটে ফুকারিয়া যারে ডাকি।
দেখিলাম তারে- যার লাগিএই উদাস ঝাউ-এর বন,
বরষ বরষ মোর গলা ধরি করিয়াছে ক্রন্দন।
দেখিলাম তারে, তবু কেন হায় বলিতে নারিনু ডাকি,
কোন অপরাধে আমার ললাটে দিলে এত ব্যথা আঁকি!
বলিতে নারিনু, ওগো পরবাসী, দেখিতে এলে কি তাই,
আগুন জ্বেলেছ যেই ঘন-বনে সেকি পুড়ে হল ছাই!
এলে কি দেখিতে-দূর হতে যারে হেনেছিলে বিষ-বাণ,
সে বন বিহগী বেঁচে আছে কিবা জীবনের অবসান!
বলিতে নারিনু, নিঠুর পথিক, কেন এলে মিছামিছি
অলস চরণ, অবশ দেহটি, সারা গায়ে ঘাম, ছি ছি!
এতখানি পথ হাঁটিয়া এসেছে কত না কষ্ট সহি,
তারি কাছে মোর দুখের কাহিনী কেমন করিয়া কহি!
নয়নের জল মুছিয়া ফেলিনু, মুখে মাখিলাম হাসি,
কহিলাম, বুঝি পূর্বের সুরুয সাঁঝেতে উদিল আসি!
আঁচলে তাহারে বাতাস করিণু চরণ দুখানি ধূয়ে,
মাথার কেশেতে মুছাইয়া দিয়ে বসিলাম কাছে নুয়ে!
কহিলাম-বড় ভাগ্য আমার, আজিকার দিনখানি,
এমনি করিয়া রাখাযায় নাকি দুই হাতে যদি টানি!
রবির চলার পথ,
আজিকার তরে ভুলিতে পারে না অস্ত পারের পথ?
কৌটায় ভরে সিঁদুর ত রাখি, আজিকার দিন হায়,
এমনি করিয়া কৌটার মাঝে ভরে কি রাখা না যায়!
এই দিনটিরে মাথায় কেশেতে বেঁধে রাখা যায়নাকি!
মিছেমিছি কত বকিয়া গেলাম ছাই পাশ থাকি থাকি।
শুনে সে কেবল হাসি-মুখে তার আরও মাখাইল হাসি,
সেই রাঙা মুখে- যে মুখেরে আমি এত করে ভালবাসি।
মুখেতে মাখিল হাসি,
সোনা দেহখানি নাড়া দিয়ে গেল বুঝি হাওয়া ফুল-বাসী!
কাল এসেছিল এই বালুচরে আর মোর কুঁড়ে ঘরে-
তার পাশে চলে ছোট্ট নদীটি দুইখানি তীর ধরে।
সেই দুই তীরে রবি-শস্যেতে দিগন্ত গেছে ভরি-
রাই সরিষার জড়াজড়ি করে ফুলের আঁচল ধরি।
তারি এক তীরে বাঁকা পথখানি, দীঘল বালুর লেখা,
সেই পথ দিয়ে এসেছিল কাল আঁকিয়া পায়ের রেখা।
কাল এসেছিল, চখা আর চখী এ ওরে আদর করি,
পাখা নেড়েছিল, তারি ঢেউ লাগি নদী উঠেছিল নড়ি।
তারি ঢেউ বুঝি ভেসে এসেছিল আমার পাতার ঘরে-
বহুদিন পরে পেয়েছিনু তারে শুধু কালিকার তরে।
কালিকার দিন, মেরু- কুহেলির অনন্ত আঁধিয়ারে
শুধু একখানা আলোক- কমল ফুটেছিল এক ধারে।
মহা-সাগরের দিগন্ত-জোড়া ফেন-লহরীর পরে
প্রদীপ-তরনী ভেসে এসেছিল বুঝি এ ব্যথার ঝড়ে!
কালকে তাহারে পেয়েছিনু আমি, হায়, হায়, কত-কাল,
যারে ভাবি এই শূনো বালুচরে চিতায় দিয়েছি জ্বাল;
সেই তারে হায়, দেখিয়া নারিনু খুলিয়া দেখাতে আমি
এই জীবনের যত হাহাকার উঠিয়াছে দিন-যামী, -
যে আগুনে আমি জ্বলিয়া মরেছি, সে-দাবদাহন আনি
কোন্ প্রাণে আমি নারী হয়ে সেই ফুলের তনুতে হানি!
শুধু কহিলাম-পরাণ বন্ধু! তুমি এলে মোর ঘরে,
আমি ত জানিনে কি করে যে আজ তোমারে আদর করে!
বুকে যে তোমারে রাখিব বন্ধু, বুকেতে শ্মাশান জ্বলে;
নয়নে রাখিব! হায়রে অভাগা, ভাসিয়া যাইবে জলে!
কপালে রাখিব! এ ধরার গাঁয়ে আমার কপাল পোড়া;
মনে যে রাখিব! ভেঙে গেছে সে যে কভু নারে লাগে জোড়া!
সে কেবল শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চাহিল আমার পানে;
ও যেন আরেক দেশের মানুষ, বোঝে না ইহার মানে।
সামনে বসায়ে দেখিলাম তারে, দেখিলাম সেই মুখ।
ভাবিলাম ওই সুমেরু হইতে কি করে যে আসে দুখ।
দেখিতে দেখিতে সকাল কাটিল, দুপুরের উঁচু বেলা,
পশ্চিম দেশে গড়ায়ে পড়িল মেঘেতে আঁকিয়া খেলা।
বালুচর হতে বিদায় মাগিল নতুন বকের সারি,
পাখায় পাখায় আকাশের বুকে শেফালীর ফুল নাড়ি।
সে মোরে কহিল“দিন চলে গেল, আমি তবে আজ আসি?
-যার রাঙা মুখ ফুলের মতন, তাতে মাখা মিঠে হাসি।
সে মোরে কহিল, একটি কথায় ভাঙিল স্বপন মোর,
ভাঙিল তাহার সোনার চুড়াটি, ভাঙিল সকল দোর।
সে মোরে কহিল, “শোন তাপসিনি। আজকের মত তবে,
বিদায় হইনু, আবার আসিব মোর খুশী হবে যবে।”
হাসিয়াই তারে কহিলাম, “সখা বিদায় সমস্কার”
অভাগিনী আমি রুষিতে নারিনু নয়ন জলের ধার।
খানিক যাইয়া ফিরিয়া চাহিল, কহিল আমারে, “নারি।
কোন কিছু কয়ে ব্যথা দেছি তোমা, কেন চোখে তব বারি?”
আমি কহিলাম, “সুন্দর সখা, আমার নয়ন ধার-
পাইয়াও যেগো পাইবে তোমারে ভাষা এই বেদনার।’
“ আমি কি নিঠুর?” সে মোরে শুধাল, আমি কহিলাম, “নয়।
ফুলেরো আঘাত গায়ে লাগে যার, কে তারে নিঠুর কয়?
গলায় যাহারে মালা দেই নাক হয়ত মালার ভারে,
তাহার কোমল ফুলের অঙ্গে কোন ব্যথা দিতে পারে ।
ছুঁইনা যাহারে ভয়ে,
ও দেহ-তরুর অফুট কুসুম যদি পড়ে হায় খয়ে।
সে মোরে দিয়েছে এই এত জ্বালা এ-কথা ভাবিব যবে
রোজ-কেয়ামত ভেঙে পড়ে যেন আমার মাথায় তবে।”
“তবে কেন কাঁদ? হায় তাপসিনি।জীবনের ভোরখানি,
কার হেলা পেয়ে আজিকে এনেছ মরণের দেশে টানি।”
আমি কহিলাম-“সোনার বন্ধু এ-মোর ললট-লেখা
কেউ পারিবে না মুছাইয়া দিতে ইহার গভীর রেখা।
মাথার পসরাখানি,
মাথায় লইয়া চলিতে হইবে সমুখে চরণ টানি।
এ-জীবনে কেউ দোসর হবে না, নিবে না করিয়া ভাগ,
এই বুক ভরি জমায়েছি যত তীব্র বিষের দাগ।
তবু বলি সখা। কেন কাঁদি আমি, তোমারে দেখিয়া মোর,
কেন বয়ে যায় শাঙনের ধারা ভাঙিয়া নয়ন দোর।
আমি কাঁদি সখা, তুমি কেন হেথা মানুষ হইয়া এলে-
বিধির গড়া ত সবই পাওয়া যায়, মানুষের নাহি মেলে।
আকাশ গড়েছে শ্যাম-ঘন-নীল, দুধের নবনী মেঘে-
সন্ধ্যা সকাল প্রতিদিন যায় নব নব রুপ মেখে;
যত দুরে যাই তত দুরে পাই, কেউ নাহি করে মানা,
কেউ নাহি পারে কাড়িয়া লইতে মাথার আকাশখানা।
বিধাতা গড়েছে সুন্দর ধরা, কাননে কুসুম-কলি,
কোলে কোলে তার পাখি গাহে গান, গুঞ্জরে মধু অলি।
বাতাস চলেছে ফুল কুড়াইয়া পাখায় জড়ায়ে ঘ্রাণ-
যারে পায় তারে বিলাইয়া যায় ফুল-সখীদের দান।
তটিনী চলেছে গাহি-
তার জলে আজ সম-অধিকার, কারো কোন ব্যধা নাহি।
শুধু মানুষের পায়না মানুষ, নাহি কারো অধিকার,
মানুষ সবারে পাইল এভাবে। মানুষ হল না কার।
কেন তুমি সখা। মানুষ হইলে, অতটুকু দেহ ভরি,
বিশ্ব-জোড়া এ রুপ-পিপাসারে কেন রাখিয়াছ ধরি।
আমি কাঁদি সখা। কেন তুমি নাহি আকাশের মত হলে-
যেখানে যেতাম তোমারে পেতাম.দেখিতাম নানা ছলে।
আকাশের তলে ঘর
যারা বাঁধিয়াছে তাদের তৃষ্ণা অমনি বিপুলতর।
তুমি কেন সখা। কানন হলে না, ফুলের সোহাগ পরি-
রঙিন তোমার দেহ-নীপখানি পুলকে উঠিত ভরি।
বাউল বাতাসে ভাসিয়া যেতাম তোমার ফুলের বনে,
অনন্ত-তুষ্ণা মিটায়ে দিতাম অনন্ত-পাওয়া সনে।
কেন তুমি সখা। মানুষ হইলে। সীমারে বরণ করি-
অসীম ক্ষুধারে সীমার বেড়ার বাহিরে রেখেছ ধরি।
তুমি কেন সখা! এমন হলে না-যত দুরে যাইতাম
আকাশের মত যত দুরে চাহি তোমারেই পাইতাম।
আমি অনন্ত, আমি যে অসীম, অনন্ত মোর ক্ষুধা-
বিপুল এ-দেশে ভাসিয়েছ তুমি একটু সীমার সুধা।
হায় রে মানুষ হায়।
কেমন করিয়া পাব তারে, যারে ধরা ছোঁয়া নাহি যায়।
আমি কাঁদি কেন সুন্দর সখা।তোমারে বলিব খুলি।
এই বেদনায়, কেন তুমি এলে মানুষ হইয়া ভুলি?
যে মানুষ এই ধরারে দেখিছে নীতির চশমা পরি,
যার যাহা পায় তাই লয় সে যে পালায় ওজন করি।
জগৎ জুড়িয়া পাতিয়াছে যারা মনুসংসিতা বই-
আমি কাঁদি সখা! আর কিছু নও তুমি সে মানুষ বই।
জগতের মজা ভারি-
চোখ বেঁধে যারা ধরারে দেখিল তাহাদেরি নাম জারি।
বাহিরে হাসিছে নীতির জগৎ, তাহার আড়ালে বসি,
কাঁদে উভরায় উলঙ্গ নর পরি শাসনের রসি।
সে বলে যে আমি না ভাল মন্দ, আমি নর-নারায়ণ,
মহা-শক্তিরে বাঁধিয়া রেখেছে সংস্কার বন্ধন।
আমি কাঁদি সখা। আমার মাঝারে আছে সে আমার আমি,
মোর সুখে-দুখে মন্দ-ভালোয় সুনাম-কুনামে নামী ;
এ-জগতে কেউ চাহিল না তারে ; এ-মোর পসরাখানি,
যারে দিতে যাই, সেই ফিরে চায় হেলায় নয়ন টানি।
জগতের হাটে তাই
সে মোর আমারে খন্ড করিয়া দোকানে বিকায়ে যাই।
কেউ হাসি চায়, কেউ ভালবাসা, কেউ চায় মিঠে-কথা,
কেউ নিতে চায় নয়নের জল কেউ চায় এর ব্যথা।
শস্যের ক্ষেতে একেলা কৃষাণ বীজ ছড়াইয়া যাই-
কোথা পাপ কোথা পুণ্য ছড়ানু, কোন কিছু মনে নাই।
আমি কাঁদি সখা। হাটে-বেচা সেই খন্ড আমারে লয়ে,
যারে ভালবাসি-তাহার পূজায় কেমনে আনিব বয়ে।
হায় হায় সখা। তুমি কেন হলে হাটের দোকানদার-
খন্ড করিয়া চাহ যারে তুমি পূর্ণ চাহনা তার?
সব কথা মোর শুনে সে কেবল কহিল একটু হাসি-
“মোর যত কথা কব একদিন, আজকের মত আসি?”
পায়ে পায়ে পায়ে যতদুর গেল, নিমেষ রহিনু চেয়ে ;
সন্ধ্যা-তিমিরে কলস ডুবাল সাঁঝের রঙিন মেয়ে।
শূন্য চরের মাতাল বাতাস রাতের কুহেলি-কেশ
নাড়িয়া নাড়িয়া হয়রাণ হয়ে ফিরিল ঊষার দেশ।
কত দিন গেল, কত রাত এলো ঋতুর বসন পরি,
চলে কাল-নটী বরণে বরণে বরষের পথ ধরি।
আজো বসে আছি এই বালুচরে, দুহাত বাড়ায়ে ডাকি
কাল যে আসিল এই বালুচরে, আর সে আসিবে নাকি?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/754
|
4982
|
শামসুর রাহমান
|
বনে জঙ্গলে
|
চিন্তামূলক
|
এই তো আমার নাতি হাঁটি হাঁটি পা পা করে পার
করে দিলো তিনটি বছর। এখনো অক্ষরজ্ঞান তার
হয়নি সঠিক। অবশ্য সে মাঝে-মাঝে আওড়ায়
অ-আ-ক-খম এ-বি সি-ডি, মাতে ছেলেভোলানো ছড়ায়
মায়ের, খালার সঙ্গে। নানা রঙের বই নিয়ে
কখনো সখানো বসে, পড়ে আস্তে ইনিয়-বিনিয়ে,
যেন সে পড় য়া মস্ত। কখনো আমার খুব পুরু
লেন্সের চশমা পরে আর তাকায় টোলের গুরু
মশায়ের ঢঙে। তবে তার বড় বেশি পক্ষপাত
রঙিন ছবির প্রতি। গালিভার, সিন্দাবাদ, সাত
সমুদ্দর তেরো নদী, সিংহ এবং রাক্ষুসে বাঘ,
গণ্ডার, তালুক, বুনো হাতি, উটের পায়ের দাগ
বালিতে দেখতে ভালোবাসে। যখন টিভিতে বন
জঙ্গলের ছবি দ্যাখে, তখন সে খুশিতে কেমন
ডগমগে হয়ে ওঠে। হঠাৎ বায়না ধরে জঙ্গলে যাবার
ঝুলিয়ে বন্দক কাঁধে, যেন আজই করবে সাবাড়
হিংস্র পশুদের, ঘোরে যারা জঙ্গলের আনাচে কানাচে।
কী করে বোঝাই তাকে বস্তুত সে জঙ্গলেই আছে? (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bone-jonggole/
|
1856
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
প্রিয়-পাঠক-পাঠিকাগণ
|
চিন্তামূলক
|
প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ!
এখন থেকে আমার কবিতায় তুমুল ওলোট-পালট।
আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন
দমকলের ঘন্টায় বেহদ্দ বেজে বেজে
বহু শব্দের গা থেকে খসে পড়েছে প্লাস্টার এবং পালিশ।
একদিন সোফিয়া লোরেনের মতো মার কাটারি ছিল যে সব শব্দ
এখন গ্রন্থাবলীর অলিতে গলিতে তাদের হিঁজড়ে-নাচ।
অনেক সম্ভাবনাময় শব্দ এখন পয়লা নম্বেরের বখাটে
সেইসব আনুনো কলমের পাল্লায় পড়ে,
শব্দের পালকিতে চেপে
যারা কোনোদিন বেড়াতে যায়নি ময়ূরভঞ্জের মেঘে।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ!
এখন থেকে আমার কবিতায় বাগান দেখলেই বুঝবেন,
আমি বলতে চাইছি সূর্যসম্ভব সেই ভবিষ্যতেই কথা
যার ব্লু-প্রিন্ট এখনো অন্ধকারের লালায় জবজবে।
আমি কাঁকড়া লিখলেই বুঝবেন
আমার আক্রমণের লক্ষ্য সেই সব মানুষ
কুলকুচির পরও রক্তকণা লেগে থাকে যাদের মাড়িতে।
শোষণের বদলে আমি লিখতে চাই গন্ডুষ
কবির বদলে নুলিয়া
এবং নারীর বদলে চন্দনকাঠ।
আগুনের খর-চাপে মানুষের মগজ থেকে গলে পড়ছে মেধা
অথবা অতিরিক্ত মেধার চাপেই
রক্তছাপে ভরে যাচ্ছে পৃথিবীর গুহসে’র সাদা দেয়াল।
এই নষ্ট ভূ-দৃশ্যমালার দিকে তাকিয়ে আমাদের উচিত
ভাগাড় শব্দটিকে এমন সম্ভ্রান্ত ভঙ্গীতে উচ্চারণ করা
যেন কঠোপনিষদের কোনো মন্ত্র।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1281
|
1981
|
বিমল গুহ
|
কার প্রতীক্ষায় আছো
|
চিন্তামূলক
|
বলো, কার প্রতীক্ষায় আছো হে আমার দুঃখী শব্দাবলী?
আমার ভেতরে নিশিদিন অগণিত শিশু
পাঠশালা যায় আসে বানায় রঙিন স্বপ্ন কবিতার বই
নিপুণ বাঁধাই জরিমোড়া।
নিশিদিন আমার ভেতরে শব্দ নিয়ে লুফোলুফি হয়
কৌতুক জলসায় মাতে গ্রাম্যবধুরা লোকালয়ে, স্বার্থপর
পারিনি তাদের আমি পরাতে এখনো কোনো
সুনিপুন পোশাক-আশাক, পারিনি দুলাতে আজো
কর্ণমূলে লোভনীয় কোনো মণিহার।
কার প্রতীক্ষায় কাটে বেলা? আমার আকাশে ওঠে
অগণিত জ্বলজ্বলে তারা, ওঠে চাঁদ মধ্য-রজনীতে
কোনোদিন ঢেলে দেয় জোৎস্না ঘরময়,
কুয়াশায় ভিজে বুক নাভিমূলে কোমল-কোমল পেলবতা
আড়ষ্ট কপোল-জোড় ভেজাই আদরে নির্দ্বিধায়,
বুলাতে পারিনি তবু পরিত্যক্ত শিয়রে তাদের
কোনোদিনও মোমের আঙুল।
বলো কার প্রতীক্ষায় হে আমার শব্দাবলী গনগনে
জাগ্রত শিশুর কান্না শুনে কাটাও রজনী অবিশ্রাম?
ভেতরে আমার নিশিদিন পদধ্বনি বেজে ওঠে কার,
কার নিত্য আগমন আমাকে ভুলিয়ে রেখে বেশ
নিয়মিত ঘর-গেরস্থালী সাজায় আদরে,বলো
কার প্রতীক্ষায় আছো হে আমার দুঃখী শব্দাবলী
ঘুমহীন?
|
https://banglapoems.wordpress.com/2008/05/18/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%86%e0%a6%9b%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%b2-%e0%a6%97/
|
3234
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুই পারে দুই কূলের আকুল প্রাণ
|
রূপক
|
দুই পারে দুই কূলের আকুল প্রাণ,
মাঝে সমুদ্র অতল বেদনাগান। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dui-pare-dui-kuler-akul-pran/
|
3599
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিবাহের পঞ্চম বরষে
|
চিন্তামূলক
|
বিবাহের পঞ্চম বরষে
যৌবনের নিবিড় পরশে
গোপন রহস্যভরে
পরিণত রসপুঞ্জ অন্তরে অন্তরে
পুষ্পের মঞ্জরি হতে ফলের স্তবকে
বৃন্ত হতে ত্বকে
সুবর্ণবিভায় ব্যাপ্ত করে।
সংবৃত সুমন্দ গন্ধ অতিথিরে ডেকে আনে ঘরে
সংযত শোভায়
পথিকের নয়ন লোভায়।
পাঁচ বৎসরের ফুল্ল বসন্তের মাধবীমঞ্জরি
মিলনের স্বর্ণপাত্রে সুধা দিল ভরি;
মধু সঞ্চয়ের পর
মধুপেরে করিল মুখর।
শান্ত আনন্দের আমন্ত্রণে
আসন পাতিয়া দিল রবাহূত অনাহূত জনে।বিবাহের প্রথম বৎসরে
দিকে দিগন্তরে
শাহানায় বেজেছিল বাঁশি,
উঠেছিল কল্লোলিত হাসি,
আজ স্মিতহাস্য ফুটে প্রভাতের মুখে
নিঃশব্দ কৌতুকে।
বাঁশি বাজে কানাড়ায় সুগম্ভীর তানে
সপ্তর্ষির ধ্যানের আহ্বানে!
পাঁচ বৎসরের ফুল্ল বিকশিত সুখস্বপ্নখানি
সংসারের মাঝখানে পূর্ণতার স্বর্গ দিল আনি।
বসন্তপঞ্চম রাগ আরম্ভেতে উঠেছিল বাজি,
সুরে সুরে তালে তালে পূর্ণ হয়ে উঠিয়াছে আজি,
পুষ্পিত অরণ্যতলে প্রতি পদক্ষেপে
মঞ্জীরে বসন্তরাগ উঠিতেছে কেঁপে। (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bibaher-ponchom-boroshe/
|
934
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আমার এ ছোটো মেয়ে
|
প্রেমমূলক
|
আমার এ ছোটো মেয়ে — সব শেষ মেয়ে এই
শুয়ে আছে বিছানার পাশে –
শুয়ে থাকে —উঠে বসে —পাখির মতন কথা কয়
হামাগুড়ি দিয়ে ফেরে
মাঠে মাঠে আকাশে আকাশেভুলে যাই ওর কথা — আমার প্রথম মেয়ে সেই
মেঘ দিয়ে ভেসে আসে যেন
বলে এসে: ‘বাবা, তুমি ভালো আছ? ভালো আছ? — ভালোবাসো?
হাতখানা ধরি তার:ধোঁয়া শুধু কাপড়ের মতো শাদা মুখখানা কেন!‘ব্যথা পাও? কবে আমি মরে গেছি — আজও মনে কর?’
দুই হাত চুপে চুপে নাড়ে তাই
আমার চোখের ’পরে, আমার মুখের ’পরে মৃত মেয়ে;
আমিও তাহার মুখে দু’হাত বুলাই;
তবু তার মুখ নাই — চোখ চুল নাই।তবু তারে চাই আমি — তারে শুধু — পৃথিবীতে আর কিছু নয়
রক্ত মাংস চোখ চুল — আমার সে মেয়ে
আমার প্রথম মেয়ে — সেই পাখি — শাদা পাখি — তারে আমি চাই;
সে যেন বুঝিল সব — নতুন জীবন তাই পেয়ে
হঠাৎ দাঁড়াল কাছে সেই মৃত মেয়ে।বলিল সে: ‘আমারে চেয়েছ, তাই ছোটো বোনটিরে –
তোমার সে ছোটো-ছোটো মেয়েটিরে এসেছি ঘাসের নিচে রেখে
সেখানে ছিলাম আমি অন্ধকারে এত দিন
ঘুমাতেছিলাম আমি’ — ভয় পেয়ে থেমে গেল মেয়ে,
বলিলাম: ‘আবার ঘুমাও গিয়ে —
ছোটো বোনটিরে তুমি দিয়ে যাও ডেকে।’ব্যথা পেল সেই প্রাণ — খানিক দাঁড়াল চুপে — তারপর ধোঁয়া
সব তার ধোঁয়া হয়ে খসে গেল ধীরে ধীরে তাই,
শাদা চাদরের মতো বাতাসেরে জড়ায় সে একবার
কখন উঠেছে ডেকে দাঁড়কাক —
চেয়ে দেখি ছোটো মেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে খেলে — আর কেউ নাই।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/amar-e-choto-maye/
|
3964
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সুখেতে আসক্তি যার
|
নীতিমূলক
|
সুখেতে আসক্তি যার
আনন্দ তাহারে করে ঘৃণা।
কঠিন বীর্যের তারে
বাঁধা আছে সম্ভোগের বীণা৷ (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sukhete-asokti-jar/
|
5635
|
সুকুমার রায়
|
নিরুপায়
|
হাস্যরসাত্মক
|
বসি বছরের পয়লা তারিখে
মনের খাতায় রাখিলাম লিখে-
"সহজ উদরে ধরিবে যেটুক্,
সেইটুকু খাব হব না পেটুক।"
মাস দুই যেতে খাতা খুলে দেখি,
এরি মাঝে মন লিখিয়াছে একি!
লিখিয়াছে, "যদি নেমন্তন্নে
কেঁদে ওঠে প্রাণ লুচির জন্যে,
উচিত হবে কি কাঁদান তাহারে?
কিম্বা যখন বিপুল আহারে ,
তেড়ে দেয় পাতে পোলাও কালিয়া
পায়েস অথবা রাবড়ি ঢালিয়া-
তখন কি করি, আমি নিরূপায়!
তাড়াতে না পারি, বলি আয় আয়,
ঢুকে আয় মুখে দুয়ার ঠেলিয়া
উদার রয়েছি উদর মেলিয়া!"
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/nirupay/
|
4180
|
লালন শাহ
|
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
|
চিন্তামূলক
|
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।
ধরতে পারলে মনবেড়ি
দিতাম পাখির পায়।আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।
তার উপরে সদর কোঠা
আয়নামহল তায়।খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।কপালের ফ্যার নইলে কি আর
পাখিটির এমন ব্যবহার।
খাঁচা ভেঙ্গে পাখি আমার
কোন বনে পালায়।খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।মন তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে।
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে
ফকির লালন কেঁদে কয়।খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।আরও পড়ুন… বাড়ির কাছে আরশিনগর – লালন শাহ
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4401.html
|
4027
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হার-মানা হার পরাব তোমার গলে
|
ভক্তিমূলক
|
হার-মানা হার পরাব তোমার গলে-
দূরে রব কত আপন বলের ছলে।
জানি আমি জানি ভেসে যাবে আভিমান-
নিবিড় ব্যথায় ফাটিয়া পড়িবে প্রাণ,
শূন্য হিঁয়ার বাঁশিতে বাজিবে গান,
পাষাণ তখন গলিবে নয়নজলে।শতদলদল খুলে যাবে থরে থরে,
লুকানো রবে না মধু চিরদিন-তরে।
আকাশ জুড়িয়া চাহিবে কাহার আঁখি,
ঘরের বাহিরে নীরবে লইবে ডাকি,
কিছুই সেদিন কিছুই রবে না বাকি-
পরম মরণ লভিব চরনতলে।রচনা: শান্তিনিকেতন ৭ বৈশাখ ১৩১৯
রবীন্দ্র রচনাবলী, বিশ্বভারতী ১৩৮৯ সং খণ্ড ১১, পৃ ১৫৩ থেকে সংগৃহীত।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/har-mana-haar-porabo-tomar-gole/
|
4117
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
আমার মা
|
প্রেমমূলক
|
মায়া ভরা হৃদয়টি যার
সে আমার মা।
কত স্নেহ করতো আমায়
মনে পড়ে তা।
মনে কোন কষ্ট থাকলেও
বুঝতে দিত না।
হাসি ভরা মুখটি তার
দেখলে জুড়াত গা।
হাত এগিয়ে বলত আমায়
আয়রে কোলে খোকা।
মুখে দু’টি চুমো দিয়ে
বলত কত কথা।
অসুখ-বিসুখ হলে কোন সময়
টিপে দিত হাত-পা।
সরিষার তেল মেখে আমার
গরম করত গা।
ছেলের কোন কষ্ট দেখলে মায়ের মুখে
হাসি থাকত না।
সারা রাত পাশে বসে থাকত
ঘুম আসত না।
সারা দিন কত পরিশ্রম
করত আমার মা।
শত পরিশ্রমের পরেও মায়ের
ক্লান্তি আসত না।
এত কাজের পরেও মা
নামাজ মিস করত না।
নামাজ পড়ে আবার কাজে
ভিজে যেত সমস্ত গা।
কোথায় গেলি আয়রে খোকা
ভাত খেয়ে যা।
যতক্ষণ না আসতাম খেতে
ডাক থামতো না।
পাশে বসে খাওয়াত ভাত
আর একবার কর হা।
পেট ভরে খেলে ভাত
অসুখ করবে না।
হাটে থেকে ফিরত বাবা
বাজারের ব্যাগ নিয়ে।
সকল বাজার রেখে আবার
বাবাকে বাতাস করত মা।
হাত মুখ ধুয়ে এসো
ক্ষুধা লাগছে না?
বাবাকে ভাত খেতে দিয়ে আবার
ফিরেতে বসে থাকত মা।
যতক্ষণ না ভাত খাওয়া হত বাবার
কোথাও যেত না।
কান্নায় যখন চোখ ভিজাতাম
দৌড়ে আসত মা।
আচল দিয়ে চোখ মুছে দিয়ে বলত
কি হয়েছে খোকা?
হাসি ভরা মুখে তখন
চুমো দিত মা।
মায়ের আদর পেয়ে তাই
কান্না থাকত না।
আজকে শুধু পরছে মনে
মায়ের সকল কথা।
এত আদর কোথায় পাব
মায়ের হাত ছাড়া।
মায়ের কথা লিখব কত আর
শেষ হবে না।
পুরো শরীরের চামড়া উঠিয়ে দিলেও
শোধ হবে না।
যাহার কাছে এত ঋণী
সে আমার মা।
চোখ ভেসে যায় জলে আমার
কান্না থামে না।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2170.html
|
989
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কার্ত্তিকের ভোর- ১৩৫০
|
প্রেমমূলক
|
চারিদিকে ভাঙনের বড় শব্দ,
পৃথিবী ভাঙার কোলাহল;
তবুও তাকালে সূর্য পশ্চিমের দিকে
অস্ত গেলে,... চাঁদের ফসল
পূবের আকাশে
হৃদয় বিহীনভাবে আন্তরিকতা ভালবাসে। তেরোশো পঞ্চাশ সালে কার্ত্তিকের ভোর;
সূর্যালোকিত সব স্থান
যদিও লঙ্গরখানা,
যদিও শ্মশান,
তবুও কল্কির ঘোড়া সরায়ে মেয়েটি তার যুবকের কাছে
সূর্যালোকিত হয়ে আছে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kartiker-vor-1350/
|
4675
|
শামসুর রাহমান
|
গন্ডার গন্ডার
|
মানবতাবাদী
|
বাঁচতে পারবে? কী করে বাঁচবে? চৌদিকে ক্রূর
কী একটা যেন তোমার গন্ধ বেড়াচ্ছে শুঁকে;
বুঝি ছায়াটাও কালো ইস্পাতী নখর-ফলায়
ফেলবে উপড়ে। বাইরে সদাই কতো সুচতুর
ফাঁদ পাতা থাকে, কন্টকময়; সুখে কি অসুখে
নির্বান্ধব, বেখাপ্পা তুমি চলায় বলায়।কাদায় নুড়িতে এবং খোয়ায় নিজের রক্ত
দেখেও তোমার শিরায় গলিতে তুহিন প্রবাহ
বয় না, শুধুই লোহার অনেক হিজিবিজি শিক
চোখে এঁটে দেয় খাঁচার নকশা। আর অলক্ত
ভ্রান্তিবশতঃ মগজের ঝোপে হানে দাবদাহ।
জটিল ধোঁয়াটে স্বপ্নগুহায় ঘোরে বৃশ্চিক।আত্মগোপন করতে কি চাও পাতার লুকোনো
সবুজ দুর্গে? বৃক্ষ মাচায় পাবে আশ্রয়?
সঙ্গ নেবে কি পাতালনিবাসী কাঁকড়া কোনো?
নিসর্গপ্রীতি আর বিপদের বিবাদ চুকোনো
সহজ তো নয়। বস্তুত তুমি খুঁজছো অভয়
তীব্র সত্তা-সঙ্কটে এই বিজনে এখানে।বাদামের খোলে ঢুকেও তোমার নেই নিস্তার।
অলিগলি আর সদর রাস্তা, বাস ডিপো আর
জাহাজঘাটের মাটি ফুঁড়ে ঐ আসছে কেবল
আসছে উড়িয়ে ধুলোবালি ক’রে ত্রাস বিস্তার।
চৌদিক থেকে আসছে নিয়ত রাগী গন্ডার
হাজার হাজার; রৌদ্রে খড়্গ করে ঝলমল।বৃথাই লুকোনো, বরং পাতার দুর্গপ্রাকার
গাছের কোটর কিংবা শুকনো বাদামের খোল
থেকে দ্বিধাহীন বেরিয়ে আসাই শ্রেয় অবশ্য।
গন্ডার শুধু গন্ডারে আজ সব একাকার,
খণ্ডিত তুমি নিরুপায় শোনো ধ্বংসের রোল;
তোমার বিলয়ে ফলবে অন্য কারুর শস্য। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/gondar-gondar/
|
3454
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রশ্নের অতীত
|
নীতিমূলক
|
হে সমুদ্র, চিরকাল কী তোমার ভাষা
সমুদ্র কহিল, মোর অনন্ত জিজ্ঞাসা।
কিসের স্তব্ধতা তব ওগো গিরিবর?
হিমাদ্রি কহিল, মোর চির-নিরুত্তর। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/proshner-otit/
|
5539
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
সব্যসাচী
|
মানবতাবাদী
|
অভুক্ত শ্বাপদচক্ষু নিঃস্পন্দ আঁধারে
জ্বলে রাত্রিদিন।
হে বন্ধু, পশ্চাতে ফেলি অন্ধ হিমগিরি
অনন্ত বাধ্যক্য তব ফেলুক নিঃশ্বাস;
রক্তলিপ্ত যৌবনের অন্তিম পিপাসা
নিষ্ঠুর গর্জনে আজ অরণ্য ধোঁয়ায়
উঠুক প্রজ্বলি'।
সপ্তরথী শোনে নাকো পৃথিবীর শৈশবক্রন্দন,
দেখে নাই নির্বাকের অশ্রুহীন জ্বালা।
দ্বিধাহীন চণ্ডালের নির্লিপ্ত আদেশে।
আদিম কুক্কুর চাহে
ধরণীর বস্ত্র কেড়ে নিতে।
উল্লাসে লেলিহ জিহ্ব লুব্ধ হায়েনারা-
তবু কেন কঠিন ইস্পাত
জরাগ্রস্ত সভ্যতার হৃদপিণ্ড জর্জর,
ক্ষুৎপিপাসা চক্ষু মেলে
মরণের উপসর্গ যেন।
স্বপ্নলব্ধ উদ্যমের অদৃশ্য জোয়ারে
সংঘবদ্ধ বল্মীকের দল।
নেমে এসো- হে ফাল্গুনী,
বৈশাখের খরতপ্ত তেজে
ক্লান্ত দু'বাহু তব লৌহময় হোক
বয়ে যাক শোণিতের মন্দাকিনী স্রোত;
মুমূর্ষু পৃথিবী উষ্ণ, নিত্য তৃষাতুরা,
নির্বাপিত আগ্নেয় পর্বত
ফিরে চায় অনর্গল বিলুপ্ত আতপ।
আজ কেন সূবর্ণ শৃঙ্খলে
বাঁধা তব রিক্ত বজ্রপাণি,
তুষারের তলে সুপ্ত অবসন্ন প্রাণ?
তুমি শুধু নহ সব্যসাচী,
বিস্মৃতির অন্ধকার পারে
ধূসর গৈরিক নিত্য প্রান্তহীন বেলাভুমি 'পরে
আত্মভোলা, তুমি ধনঞ্জয়।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1095
|
3779
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যাওয়া-আসার একই যে পথ
|
রূপক
|
যাওয়া-আসার একই যে পথ
জান না তা কি অন্ধ।
যাবার পথ রোধিতে গেলে
আসার পথ বন্ধ । (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jawa-asar-eki-je-poth/
|
5084
|
শামসুর রাহমান
|
মধ্যরাতে ঝুঁকে থাকে
|
চিন্তামূলক
|
সূর্যাস্তে পাখির ডানা ক্লীর ছবি, দু’চারটে গাছ
অশ্রুপাত করে, কালো মখমলী নিঃসঙ্গ বেড়াল
কুড়ায় আলস্যকণা। নিরালা চায়ের শূন্য কাপ
টেবিলের অত্যন্ত নেতানো তাপ নেয়, এলোমেলো
খাতার পাতায় দীর্ঘশ্বাস; হাওয়া বয়, বল পেন
মৃতের মতোই চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, বুকে বোবা
বহুক্ষণ, চক্ষু স্থির, যেন আমি দেখি না কিছুই
কিছুই যায় না শোনা। সন্ধ্যায় বস্তুত আমার
কোথাও যাবার নেই। ব্যথিত দোয়েল ফিরে গেছে,
কালপুরুষের প্রত্যাখ্যান বেজে ওঠে স্তব্ধতায়।
কোথাও যাবার নেই, একটি অচিন পাখি খুব
আসে আর যায়, তার ছায়া যেন ফিসফিসে স্বরে
দেয়ালকে কিছু বলে। তারপর আমার উপর
মধ্যরাতে ঝুঁকে থাকে সমিধলোলুপ নীরবতা। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/modhyorate-jhuke-thake/
|
3094
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জামাই মহিম এল
|
ছড়া
|
জামাই মহিম এল, সাথে এল কিনি–
হায় রে কেবলই ভুলি ষষ্ঠীর দিনই।
দেহটা কাহিল বড়ো, রাঁধবার নামে,
কে জানে কেন রে, বাপু, ভেসে যায় ঘামে।
বিধাতা জানেন আমি বড়ো অভাগিণী।
বেয়ানকে লিখে দেব, খাওয়াবেন তিনি। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jamai-mohim-elo/
|
3156
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তুমি এবার আমায় লহো
|
ভক্তিমূলক
|
তুমি এবার আমায় লহো হে নাথ, লহো।
এবার তুমি ফিরো না হে–
হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহো।
যে দিন গেছে তোমা বিনা
তারে আর ফিরে চাহি না,
যাক সে ধুলাতে।
এখন তোমার আলোয় জীবন মেলে
যেন জাগি অহরহ।কী আবেশে কিসের কথায়
ফিরেছি হে যথায় তথায়
পথে প্রান্তরে,
এবার বুকের কাছে ও মুখ রেখে
তোমার আপন বাণী কহো।কত কলুষ কত ফাঁকি
এখনো যে আছে বাকি
মনের গোপনে,
আমায় তার লাগি আর ফিরায়ো না,
তারে
আগুন দিয়ে দহো।২৮ চৈত্র, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumi-ebar-may-loho/
|
3202
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দারুণ
|
প্রকৃতিমূলক
|
দারুণ অগ্নিবাণে রে হৃদয় তৃষায় হানে রে॥
রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন
আরাম নাহি যে জানে রে॥
শুষ্ক কাননশাখে ক্লান্ত কপোত ডাকে
করুণ কাতর গানে রে॥
ভয় নাহি, ভয় নাহি। গগনে রয়েছি চাহি।
জানি ঝঞ্ঝার বেশে দিবে দেখা তুমি এসে
একদা তাপিত প্রাণে রে॥
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3-%e0%a6%85%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a3%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8/
|
5913
|
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
|
চিরকুট
|
মানবতাবাদী
|
শতকোটি প্রণামান্তে
হুজুরে নিবেদন এই_
মাপ করবেন খাজনা এ সন
ছিটেফোঁটাও ধান নেই। মাঠেঘাটে কপাল ফাটে
দৃষ্টি চলে যত দূর
খাল শুক্নো বিল শুক্নো
চোখের কোলে সমুদ্দুর। হাত পাতব কার কাছে কে
গাঁয়ে সবার দশা এক
তিন সন্ধে উপোস দিয়ে
খাচ্ছি আজ বুনো শাক। পরনে যা আছে তাতে
ঢাকা যায় না লজ্জা
ঘটি বাটি বেচেছি সব
আছে বলতে ছিল যা। এ দুর্দিনে পাওনা আদায়
বন্ধ রাখুন, মহারাজ
ভিটেতে হাত দেয় না যেন
পাইক বরকন্দাজ। আমরা কয়েক হাজার প্রজা
বাস করি এই মৌজায়
সবাই মিলে পথ খুঁজছি
কেমন করে বাঁচা যায়। পেত জ্বলছে, ক্ষেত জ্বলছে
হুজুর, জেনে রাখুন
খাজনা এবার মাপ না হলে
জ্ব’লে উঠবে আগুন।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4461.html
|
1099
|
জীবনানন্দ দাশ
|
পৃথিবী ও সময়
|
চিন্তামূলক
|
সময়ের উপকণ্ঠে রাত্রি প্রায় হয়ে এল আজ
সূর্যকে পশ্চিমে দেখি সারা শতাব্দীর
অক্লান্ত রক্তের বোঝা গুছায়ে একাকী
তবুও আশার মত মেঘে মেঘে বলয়িত হয়ে
শেষ আলো ঢেলে যায়;- জ্যোতিঃপ্রাণধর্মী সূর্য অই;
একদিন অ্যামিবার উৎসরণ এনেছিল;
জীবনের ফেনশীর্ষ সিন্ধুর কল্লোল এক দিন
মানুষকে পেয়ে;- না-মর্মী মানুষ সেই দিন
ভয় পেত, গুহায় লুকাত,- তবু সূর্যকরোজ্জ্বল
সোনালী মানবী তাকে 'হাঁ' বলাল;- নীল
আকাশ নগরীরেখা দেখা দিল;- শঙ্খ আমলকী
সাগর অলিভবন চেনা গেল রোদ্রের ভিতরে;
শ্বেতাশ্বতর-প্লেটো-আলোকিত পৃথিবীর রূপ
অনাদির দায়ভাগে উৎসারিত রক্তের নদীর
শিয়রে আশার মত জেগে উৎসাহিত সূর্যকরে
সহসা নতুন হিংসা রক্ত গ্লানিমার কাছে প্রতিহত হয়ে
ধীরে ধীরে নিঃশেষে ফুরায়ে গেল তবু।ভাই-বোন-স্মৃতি-শান্তি হননের ঘোরে উদ্বেলিত
বহতা নদীর মত আজো এই পৃথিবী চলেছে।
তবুও তো সেই উদ্ঘাতিনী
নদীরমণীর শব্দ কানে নিয়ে,- প্রাণে
আকাশে জ্যোতিষ্ক জ্বলে হস্তা অভিজিৎ,
অনুরাধা শতভিষা লুব্ধক স্বাতী;
পৃথিবীতে- হৃদয়েরো গতিপথে বর্ণালির আভা
সম্পূর্ণ দীপ্তির মত আলোকিত- ক্রমে আলোকিত হতে চায়।লণ্ডন রুশিয়া গ্রীস দ্বীপপুঞ্জ কলকাতা চীন
অগণন কন্ফারেন্সে বিকীর্ণ য়ুরোপা,
আমেরিকা,- যেন বীতবর্ষণের কৃষ্ণমেঘ নক্ষত্রের পথে;
ক্ষণিক উজ্জ্বল হয়ে ক্লান্তি ক্লেদ ভয় অন্ধকার হতে চায়
এখুনি আবার তবু। প্রকৃতিতে সূর্য আসে, অস্তের আকাশে
চ'লে যায়;- অস্তগতিহীন শুভ্র জনহৃদয়ের
সূর্যনগরীর দিকে যেতে হবে চেতনায় মানুষের সময় চলেছে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/prithibii-o-shomoy/
|
5034
|
শামসুর রাহমান
|
বিস্মিত দৃষ্টিতে
|
চিন্তামূলক
|
বহুক্ষণ হেঁটে, হেঁটে, হেঁটে
কোথায় এসেছি
গায়ে-কাঁটা-দেয়া এই জন্মন্ধ সন্ধ্যায়?
মনে হচ্ছে পশ্চিম আকাশ
কালো বিস্কুটের মতো আর
চাঁদ কোনও বুড়োর ধরনে কতিপয়
ফোকলা দাঁতের আহামরি সৌন্দর্যের
বিদঘুটে বাজারু প্রচারে কী অশ্লীল!বিদঘুটে, হিংসুটে এক বৃক্ষতলে
ক’জন জুয়াড়ি
মেতেছে খেলায় আর কখনও কখনও
তাদের হুল্লোড়ে কেঁপে ওঠে
জমি, যেন গিলে খাবে সেই
ফতুর জুয়াড়িদের। আচানক নারীর কান্নার
ধ্বনি ভেসে আসে ক্ষণে ক্ষণে ঘোর কৃষ্ণ
দিগন্তের বুক চিরে। কে এই নিঃসঙ্গ অনামিকা?কখন যে নিজেকে দেখতে পাই এক
হ্রদের কিনারে,
বড় বেশি অন্ধকার চারদিক থেকে
দাঁত নখ খিঁচিয়ে আসছে। মুখ ঢেকে
রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই।
আমি তো ভেবেছিলাম হ্রদ থেকে উঠে
জাগবে সুন্দরী কেউ হাসি মুখ আর
বসবে আমার পাশে, শোনাবে জলজ
কাহিনী এবং ওষ্ঠ এগিয়ে চুম্বন দেবে এঁকে
আমার এ পিপাসার্ত ঠোঁটে।এরকম কিছুই ঘটেনি, শুধু দেখি
ধু ধু বিরানায় বসে আছি এক বুক
হাহাকার নিয়ে আর ক্ষেপে-যাওয়া চাঁদ
দূর থেকে থুতু, শ্লেষ্মা ছিটিয়ে আমাকে
তুচ্ছতার ভাগাড়ের বাসিন্দা বানাতে
বড় বেশি ব্যগ্র হয়ে ওঠে। আচমকা
আমার ভেতর প্রায় ক্রোধের ধরনে
কী এক আবেগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
মাটি থেকে কিছু ঢেলা কুড়িয়ে ওপরে ছুড়ে দিই
বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখি পুষ্পবৃষ্টি ঝরে অবিরত! (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bishmito-drishtite/
|
2845
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ওগো শীত
|
প্রকৃতিমূলক
|
ওগো শীত, ওগো শুভ্র, হে তীব্র নির্মম,
তোমার উত্তরবায়ু দুরন্ত দুর্দম
অরণ্যের বক্ষ হানে। বনস্পতি যত
থর থর কম্পমান, শীর্ষ করি নত
আদেশ-নির্ঘোষ তব মানে। “জীর্ণতার
মোহবন্ধ ছিন্ন করো’ এ বাক্য তোমার
ফিরিছে প্রচার করি জয়ডঙ্কা তব
দিকে দিকে। কুঞ্জে কুঞ্জে মৃত্যুর বিপ্লব
করিছে বিকীর্ণ শীর্ণ পর্ণ রাশি রাশি
শূন্য নগ্ন করি শাখা, নিঃশেষে বিনাশি
অকাল-পুষ্পের দুঃসাহস।
হে নির্মল,
সংশয়-উদ্বিগ্ন চিত্তে পূর্ণ করো বল।
মৃত্যু-অঞ্জলিতে ভরো অমৃতের ধারা,
ভীষণের স্পর্শঘাতে করো শঙ্কাহারা,
শূন্য করি দাও মন; সর্বস্বান্ত ক্ষতি
অন্তরে ধরুক শান্ত উদাত্ত মুরতি,
হে বৈরাগী। অতীতের আবর্জনাভার,
সঞ্চিত লাঞ্ছনা গ্লানি শ্রান্তি ভ্রান্তি তার
সম্মার্জন করি দাও। বসন্তের কবি
শূন্যতার শুভ্র পত্রে পূর্ণতার ছবি
লেখে আসি’, সে-শূন্য তোমারি আয়োজন,
সেইমতো মোর চিত্তে পূর্ণের আসন
মুক্ত করো রুদ্র-হস্তে; কুজ্ঝটিকারাশি
রাখুক পুঞ্জিত করি প্রসন্নের হাসি।
বাজুক তোমার শঙ্খ মোর বক্ষতলে
নিঃশঙ্ক দুর্জয়। কঠোর উদগ্রবলে
দুর্বলেরে করো তিরস্কার; অট্টহাসে
নিষ্ঠুর ভাগ্যেরে পরিহাসো; হিমশ্বাসে
আরাম করুক ধূলিসাৎ। হে নির্মম,
গর্বহরা, সর্বনাশা, নমো নমো নমঃ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5761.html
|
887
|
জসীম উদ্দীন
|
সবার সুখে
|
নীতিমূলক
|
সবার সুখে হাসব আমি
কাঁদব সবার দুখে,
নিজের খাবার বিলিয়ে দেব
অনাহারীর মুখে।আমার বাড়ির ফুল-বাগিচা,
ফুল সকলের হবে,
আমার ঘরে মাটির প্রদীপ
আলোক দিবে সবে।আমার বাড়ি বাজবে বাঁশি,
সবার বাড়ির সুর,
আমার বাড়ি সবার বাড়ি
রইবে না ক দুর।
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/post20160508085944/
|
5989
|
হুমায়ুন আজাদ
|
বাঙলা ভাষা
|
স্বদেশমূলক
|
শেকলে বাঁধা শ্যামল রূপসী, তুমি-আমি, দুর্বিনীত দাসদাসী-
একই শেকলে বাঁধা প’ড়ে আছি শতাব্দীর পর শতাব্দী।
আমাদের ঘিরে শাঁইশাঁই চাবুকের শব্দ, স্তরে স্তরে শেকলের ঝংকার।
তুমি আর আমি সে-গোত্রের যারা চিরদিন উৎপীড়নের মধ্যে গান গায়-
হাহাকার রূপান্তরিত হয় সঙ্গীতে-শোভায়।
লকলকে চাবুকের আক্রোশ আর অজগরের মতো অন্ধ শেকলের
মুখোমুখি আমরা তুলে ধরি আমাদের উদ্ধত দর্পিত সৌন্দর্য:
আদিম ঝরনার মতো অজস্র ধারায় ফিনকি দেয়া টকটকে লাল রক্ত,
চাবুকের থাবায় সুর্যের টুকরোর মতো ছেঁড়া মাংস
আর আকাশের দিকে হাতুড়ির মতো উদ্যত মুষ্টি।
শাঁইশাঁই চাবুকে আমার মিশ্র মাংসপেশি পাথরের চেয়ে শক্ত হয়ে ওঠে
তুমি হয়ে ওঠো তপ্ত কাঞ্চনের চেয়েও সুন্দর।
সভ্যতার সমস্ত শিল্পকলার চেয়ে রহস্যময় তোমার দু-চোখ
যেখানে তাকাও সেখানেই ফুটে ওঠে কুমুদকহ্লার
হরিণের দ্রুত ধাবমান গতির চেয়ে সুন্দর ওই ভ্রূযুগল
তোমার পিঠে চাবুকের দাগ চুনির জড়োয়ার চেয়েও দামি আর রঙিন
তোমার দুই স্তন ঘিরে ঘাতকের কামড়ের দাগ মুক্তোমালার চেয়েও ঝলোমলো
তোমার ‘অ, আ’ –চিৎকার সমস্ত আর্যশ্লোকের চেয়েও পবিত্র অজর
তোমার দীর্ঘশ্বাসের নাম চন্ডীদাস
শতাব্দী কাঁপানো উল্লাসের নাম মধুসূদন
তোমার থরোথরো প্রেমের নাম রবীন্দ্রনাথ
বিজন অশ্রুবিন্দুর নাম জীবনানন্দ
তোমার বিদ্রোহের নাম নজরুল ইসলাম
শাঁইশাঁই চাবুকের আক্রোশে যখন তুমি আর আমি
আকাশের দিকে ছুঁড়ি আমাদের উদ্ধত সুন্দর বাহু, রক্তাক্ত আঙুল,
তখনি সৃষ্টি হয় নাচের নতুন মুদ্রা;
ফিনকি দেয়া লাল রক্ত সমস্ত শরীরে মেখে যখন আমরা গড়িয়ে পড়ি
ধূসর মাটিতে এবং আবার দাঁড়াই পৃথিবীর সমস্ত চাবুকের মুখোমুখি,
তখনি জন্ম নেয় অভাবিত সৌন্দর্যমন্ডিত বিশুদ্ধ নাচ;
এবং যখন শেকলের পর শেকল চুরমার ক’রে ঝনঝন ক’রে বেজে উঠি
আমরা দুজন, তখনি প্রথম জন্মে গভীর-ব্যাপক-শিল্পসম্মত ঐকতান-
আমাদের আদিগন্ত আর্তনাদ বিশশতকের দ্বিতীয়ার্ধের
একমাত্র গান।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/507
|
5235
|
শামসুর রাহমান
|
শুনি অপরাহ্নে
|
সনেট
|
শুনি অপরাহ্নে অর্ফিয়ূস বাজায় মোহন বাঁশি-
ভাঙাচোরা পৌর পথ, মায় ঘরদোর, শীর্ণ গাছ
কেমন বদলে যায় নিমেষেই আর জোড়ে নাচ
বস্তুপুজ্ঞ দশদিকে। ভালোবাসি, আমি ভালোবাসি
উচ্চারণ ক’রে যেন স্বপ্নময় মেঘলোকে ভাসি;
ভালোবাসি, ভালোবাসি। সে ভালোবাসুক আর না-ই
বাসুক আমাকে, পুরোপুরি না হোক আমার, গাই
তবু তারই গান, আপাতত নই কিছুরই প্রত্যাশী।এই কি যথেষ্ট নয় এই ভালোবাসা, যা শিরায়
শিরায় ঝংকার তোলে, যার টানে আনন্দিত পথ
হাঁটি, কথা বলি পশু পাখি, বৃক্ষলতা পাথরের
সঙ্গে, না চাইতে শক্রূকেও করি ক্ষমা, পক্ষীবৎ
উড়ে যাই, গায়ে মাখি ঘ্রাণ স্মৃতির মরূদ্যানের
এবং নিজেই হই অর্ফিয়ূস দীপ্র নিরালায়? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shuni-opranhe/
|
516
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সতী হারা উদাসী ভৈরব কাঁদে
|
ভক্তিমূলক
|
সতী হারা উদাসী ভৈরব কাঁদে
বিষাণ ত্রিশূল ফেলি গভীর বিষাদে
জটাজুটে গঙ্গা নিস্তরঙ্গা
রাহু যেন গ্রাসিয়াছে ললাটের চাঁদে।দুই করে দেবী-দেহ ধরে বুকে বাঁধে
রোদনের সুর বাজে প্রণব নিনাদে
ভক্তের চোখে আজি ভগবান শঙ্কর
সুন্দরতর হল পড়ি মায়া ফাঁদে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/shoti-hara-udashi-voirob-kadey/
|
5598
|
সুকুমার রায়
|
খুড়োর কল
|
ছড়া
|
কল করেছেন আজবরকম চণ্ডীদাসের খুড়ো—
সবাই শুনে সাবাস বলে পাড়ার ছেলে বুড়ো।
খুড়োর যখন অল্প বয়স— বছর খানেক হবে—
উঠল কেঁদে ‘গুংগা’ বলে ভীষন অট্টরবে।
আর তো সবাই ‘মামা’ ‘গাগা’ আবোল তাবোল বকে,
খুড়োর মুখে ‘গুংগা’ শুনে চম্কে গেল লোকে।
বল্লে সবাই, “এই ছেলেটা বাঁচলে পরে তবে,
বুদ্ধি জোরে এ সংসারে একটা কিছু হবে।”
সেই খুড়ো আজ কল করেছেন আপন বুদ্ধি বলে,
পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা যাবে দেড় ঘণ্টায় চলে।
দেখে এলাম কলটি অতি সহজ এবং সোজা,
ঘণ্টা পাঁচেক ঘাঁটলে পরে আপনি যাবে বোঝা।
বলব কি আর কলের ফিকির, বলতে না পাই ভাষা,
ঘাড়ের সঙ্গে যন্ত্র জুড়ে এক্কেবারে খাসা। সামনে তাহার খাদ্য ঝোলে যার যেরকম রুচি—
মণ্ডা মিঠাই চপ্ কাট্লেট্ খাজা কিংবা লুচি।
মন বলে তায় ‘খাব খাব’, মুখ চলে তায় খেতে,
মুখের সঙ্গে খাবার ছোটে পাল্লা দিয়ে মেতে।
এমনি করে লোভের টানে খাবার পানে চেয়ে,
উত্সাহেতে হুঁস্ রবে না চলবে কেবল ধেয়ে।
হেসে খেলে দু‐দশ যোজন চলবে বিনা ক্লেশে,
খাবার গন্ধে পাগল হয়ে জিভের জলে ভেসে।
সবাই বলে সমস্বরে ছেলে জোয়ান বুড়ো,
অতুল কীর্তি রাখল ভবে চণ্ডীদাসের খুড়ো।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/khuror-kol/
|
1454
|
নাজিম মাহমুদ
|
দুঃসাধ্য
|
চিন্তামূলক
|
বড় বড় ত্যাগ যতো সহজ
ছোটো ছোটো ত্যাগ ততোই কঠিন
বড় ত্যাগে এক ধরনের অহম আছে
ছোটো ছোটো ত্যাগে কোনো ঘোষনা নেই
বড় ত্যাগ প্রত্যাশা করে সহস্র সাধুবাদ
মানুষের করতালি ইতিহাসে স্বাক্ষর
ছোটো ছোটো ত্যাগ কিছুই চায় না
সহজাত সে এক প্রবৃত্তি
দারুন গরমে ট্রেনে জানলার সীট
প্রচণ্ড ভীড়ে বাসের আসন
দীর্ঘ কিউতে নিজ স্থান
অনায়াসে সে ছেড়ে দেয় অচেনা কাউকে
তাঁর প্রয়োজন বেশি একথা ভেবে-
বড় ত্যাগে বড় বড় ইমারৎ ওঠে
হাসপাতাল-স্কুল-কলেজ-এতিমখানা
ছোটো ছোটো ত্যাগ স্ফুলিঙ্গের মতো
একটু জ্বলেই ফুরিয়ে যায়
কেউ তাকে মনেও রাখে না
না যে ছাড়ে, না যে পায়
তবুও অভ্যেসবশত ছোটো ছোটো ত্যাগ
বৃষ্টিতে ছাতা মেলে দেয় অন্যকে
আহার্যের ভাগ দেয় সহযাত্রীকে
কারো অসুবিধায় এগিয়ে যায় দু’পা
বড় ত্যাগ কখনো সখনো কেউ কেউ করে
মানুষের মতো মানুষ না হয়েও তা সে পারে
ছোটো ছোটো ত্যাগের লেখাজোকা নেই
প্রাত্যহিক জীবনের এইসব টুকরো টুকরো ত্যাগ
একজন মানুষকে সনাক্ত করে মানুষ বলে
সেই মানুষ হওয়া সত্যিই সহজ নয়।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2008/05/17/%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%83%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6/
|
3554
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাদশাহের হুকুম
|
মানবতাবাদী
|
বাদশাহের হুকুম,--
সৈন্যদল নিয়ে এল আফ্রাসায়েব খাঁ, মুজফ্ফর খাঁ,
মহম্মদ আমিন খাঁ,
সঙ্গে এল রাজা গোপাল সিং ভদৌরিয়া,
উদইৎ সিং বুন্দেলা।
গুরুদাসপুর ঘেরাই করল মোগল সেনা।
শিখদল আছে কেল্লার মধ্যে,
বন্দা সিং তাদের সর্দার।
ভিতরে আসে না রসদ,
বাইরে যাবার পথ সব বন্ধ।
থেকে থেকে কামানের গোলা পড়ছে
প্রাকার ডিঙিয়ে--
চারদিকের দিক্সীমা পর্যন্ত
রাত্রির আকাশ মশালের আলোয় রক্তবর্ণ।
ভাণ্ডারে না রইল গম, না রইল যব,
না রইল জোয়ারি;--
জ্বালানি কাঠ গেছে ফুরিয়ে।
কাঁচা মাংস খায় ওরা অসহ্য ক্ষুধায়,
কেউ বা খায় নিজের জঙ্ঘা থেকে মাংস কেটে।
গাছের ছাল, গাছের ডাল গুঁড়ো ক'রে
তাই দিয়ে বানায় রুটি।
নরক-যন্ত্রণায় কাটল আট মাস,
মোগলের হাতে পড়ল
গুরদাসপুর গড়।
মৃত্যুর আসর রক্তে হল আকণ্ঠ পঙ্কিল,
বন্দীরা চীৎকার করে
"ওয়াহি গুরু, ওয়াহি গুরু,"
আর শিখের মাথা স্খলিত হয়ে পড়ে
দিনের পর দিন।
নেহাল সিং বালক;
স্বচ্ছ তরুণ সৌম্যমুখে
অন্তরের দীপ্তি পড়েছে ফুটে।
চোখে যেন স্তব্ধ আছে
সকালবেলার তীর্থযাত্রীর গান।
সুকুমার উজ্জ্বল দেহ,
দেবশিল্পী কুঁদে বের করেছে
বিদ্যুতের বাটালি দিয়ে।
বয়স তার আঠারো কি উনিশ হবে,
শালগাছের চারা,
উঠেছে ঋজু হয়ে,
তবু এখনো
হেলতে পারে দক্ষিণের হাওয়ায়।
প্রাণের অজস্রতা
দেহে মনে রয়েছে
কানায় কানায় ভরা।
বেঁধে আনলে তাকে।
সভার সমস্ত চোখ
ওর মুখে তাকাল বিস্ময়ে করুণায়।
ক্ষণেকের জন্যে
ঘাতকের খড়্গ যেন চায় বিমুখ হতে
এমন সময় রাজধানী থেকে এল দূত,
হাতে সৈয়দ আবদুল্লা খাঁয়ের
স্বাক্ষর-করা মুক্তিপত্র।
যখন খুলে দিলে তার হাতের বন্ধন,
বালক শুধাল, আমার প্রতি কেন এই বিচার?
শুনল, বিধবা মা জানিয়েছে
শিখধর্ম নয় তার ছেলের,
বলেছে, শিখেরা তাকে জোর করে রেখেছিল
বন্দী ক'রে।
ক্ষোভে লজ্জায় রক্তবর্ণ হল
বালকের মুখ।
বলে উঠল, "চাইনে প্রাণ মিথ্যার কৃপায়,
সত্যে আমার শেষ মুক্তি,
আমি শিখ।"
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/basahar-hukum/
|
3610
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিশ্বধরণীর বিপুল কুলায়
|
চিন্তামূলক
|
বিশ্বধরণীর এই বিপুল কুলায়
সন্ধ্যা-- তারি নীরব নির্দেশে
নিখিল গতির বেগ ধায় তারি পানে।
চৌদিকে ধূসরবর্ণ আবরণ নামে।
মন বলে, ঘরে যাব--
কোথা ঘর নাহি জানে।
দ্বার খোলে সন্ধ্যা নিঃসঙ্গিনী,
সম্মুখে নীরন্ধ্র অন্ধকার।
সকল আলোর অন্তরালে
বিস্মৃতির দূতী
খুলে নেয় এ মর্তের ঋণ-করা সাজসজ্জা যত--
প্রক্ষিপ্ত যা-কিছু তার নিত্যতার মাঝে
ছিন্ন জীর্ণ মলিন অভ্যাস।
আঁধারে অবগাহন-স্নানে
নির্মল করিয়া দেয় নবজন্ম নগ্ন ভূমিকারে।
জীবনের প্রান্তভাগে
অন্তিম রহস্যপথে দেয় মুক্ত করি
সৃষ্টির নূতন রহস্যেরে।
নব জন্মদিন তারে বলি
আঁধারের মন্ত্র পড়ি সন্ধ্যা যারে জাগায় আলোকে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/beshadaruner-bepul-kulay/
|
2507
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
বাংলা শায়েরী - ১৫৬
|
প্রেমমূলক
|
একজনা কেউ বলেছিলো, জামান তোমার ঠিকানা কী ?
আমি বলি, আমি কে তাই জানতে আজও রইলো বাকি ।
আছি কি নেই সেটাই আগে ফয়সালা হোক নিজের কাছে
হাত দিয়ে এই শরীরটা ছুঁই
চমকে সে কয় কে ওরে তুই ?
আমিও তো বুঝি না সে সত্যি সত্যি আমার নাকি !!
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/bangla-shayeri-156/
|
2995
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গান দিয়ে যে তোমায়
|
ভক্তিমূলক
|
গান দিয়ে যে তোমায় খুঁজি
বাহির মনে
চিরদিবস মোর জীবনে।
নিয়ে গেছে গান আমারে
ঘরে ঘরে দ্বারে দ্বারে,
গান দিয়ে হাত বুলিয়ে বেড়াই
এই ভুবনে।কত শেখা সেই শেখালো,
কত গোপন পথ দেখালো,
চিনিয়ে দিল কত তারা
হৃদ্গগনে।
বিচিত্র সুখদুখের দেশে
রহস্যলোক ঘুরিয়ে শেষে
সন্ধ্যাবেলায় নিয়ে এল
কোন্ ভবনে।৯ শ্রাবণ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gan-diye-je-tomay/
|
4000
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্বদেশদ্বেষী
|
নীতিমূলক
|
কেঁচো কয়, নীচ মাটি, কালো তার রূপ।
কবি তারে রাগ ক’রে বলে, চুপ চুপ!
তুমি যে মাটির কীট, খাও তারি রস,
মাটির নিন্দায় বাড়ে তোমারি কি যশ! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/swadeshdeshi/
|
5752
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
কবিতা মুর্তিমতী
|
চিন্তামূলক
|
শুয়ে আছে বিছানায়, সামনে উম্মুক্ত নীল খাতা
উপুড় শরীর সেই রমণীর, খাটের বাইরে পা দু’খানি
পিঠে তার ভিজে চুল,
এবং সমুদ্রে দু’টি ঢেউ
ছায়াময় ঘরে যেন কিসের সুদন্ধ,
– জানায়
রৌদ্র যেন জলকণা, দূরে নীল নক্ষত্রের দেশ।
কী লেখে সে, কবিতা? না কবিতা রচনা করে তাকে?
সে বড় অসি’র, তার চোখে বড় বেশী অশ্রু আছে
পাশ ফেরা মুখখানি-
এখন স্তব্ধতা মূর্তিমতী-
শাড়ির অমনোযোগে কোমরের নগ্ন বারান্দায়
একটি পাহাড়ী দৃশ্য,
সবুজ সতেজ উপত্যকা
কেন বা নদী ও নয়? অথবা সে অপার্থিবা বুঝি।
কী লেখে সে, কবিতা? না কবিতা রচনা করে তাঁকে?
নগরে হঠাৎ বৃষ্টি, বৃষ্টিতে দুপুর ভেসে যায়
সে দেখেনি, সে শোনেনি কোনো শব্দ
যেন এক দ্বীপ
যেখানে হলুদ বর্ণ রক্তিমকে নিমন্ত্রণে ডাকে
অথবা সে জলকণ্যা
দু’বাহুতে হীরকের আঁশ
ক্রমশ উজ্জল হয় আঙুলে কলম চিক্রার্পিত
কী লেখে যে, কবিতা? না কবিতা রচনা করে তাকে?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1832
|
907
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অনেক মুহূর্ত আমি করেছি ক্ষয় করে
|
প্রেমমূলক
|
অনেক মুহূর্ত আমি করেছি ক্ষয়
করে ফেলে বুঝছি সময়
যদিও অনন্ত, তবু প্রেম যেন অনন্ত নিয়ে নয়।তবু তোমাকে ভালোবেসে
মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে
বুঝেছি অকূলে জেগে রয়
ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি এ হৃদয় ।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/oneyk-muhurto-khoy-korey/
|
29
|
অমিয় চক্রবর্তী
|
বিনিময়
|
চিন্তামূলক
|
তার বদলে পেলে—
সমস্ত ঐ স্তব্ ধ পুকুর
নীল-বাঁধানো স্বচ্ছ মুকুর
আলোয় ভরা জল—
ফুলে নোয়ানো ছায়া-ডালটা
বেগনি মেঘের ওড়া পালটা
ভরলো হৃদয়তল—
একলা বুকে সবই মেলে ||তার বদলে পেলে—
শাদা ভাবনা কিছুই-না-এর
খোলা রাস্তা ধুলো-পায়ের
কান্না-হারা হাওয়া—
চেনা কণ্ঠে ডাকলো দূরে
সব-হারানো এই দুপুরে
ফিরে কেউ-না-চাওয়া |
এও কি রেখে গেলে ||
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3779.html
|
2508
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
বাংলা শায়েরী - ১৮৭
|
প্রেমমূলক
|
কোথায় এলাম তা জানি না জানি শুধু এলাম চলে
তোমার ডাকে এসেছি তাই তুমিই দায়ী বেভুল হলে ।
পথের রেখা কোনো দিনই হয়নি আমার এঁকে রাখা
চলে চলেই পথ গড়েছি, এ পথ তোমার হবে বলে ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/bangla-shayeri-187/
|
2429
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
গলায় দড়ি
|
ছড়া
|
মরি আমি মরি
এই বলে হরি
দিল গলায় দড়ি।
(কী হল? হাসছ কেন?
সমস্যাটা কী?)
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2040
|
763
|
জয় গোস্বামী
|
হোটেলের
|
রূপক
|
তোরা সব উঠে গেলি পাহাড়ে ঝোলানো সরু ব্রীজে-
তোদের ধূসর জামা, ছেঁড়া-ছেঁড়া নীল-সাদা টুপি
ভেসে ভেসে এলো আর হোটেলের সারাঘর ভিজে-
প্যাগোডার মতো ছাদ – তার পাশ দিয়ে চুপি চুপিএমন বিব্রত, সিক্ত ঘরখানি লক্ষ করে তিনখানি ঝাউ ।
সার বেঁধে উঠে যাওয়া পাইনের সবুজ রিবনে
যে-কটি জলের কণা ছিল, তারা হাওয়া লেগে বাতাসে উধাও …
এমন বাতাস যার কোনোদিন ওঠেনি জীবনেসে দ্যাখে : আকাশ থেকে নেমে এসে একজন লামা
মুন্ডিত মাথায় একা বসেছেন তাঁর শুভ্র মঠের শিখরে
রূপোলী ঝলকে জ্বলছে দূরের ঝুলন্ত ব্রীজ, ভাসমান নীল-সাদা জামা
একজন মুগ্ধ শুধু বসে আছে হোটেলের ঘরে ।কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুনতোরা সব উঠে গেলি পাহাড়ে ঝোলানো সরু ব্রীজে-
তোদের ধূসর জামা, ছেঁড়া-ছেঁড়া নীল-সাদা টুপি
ভেসে ভেসে এলো আর হোটেলের সারাঘর ভিজে-
প্যাগোডার মতো ছাদ – তার পাশ দিয়ে চুপি চুপিএমন বিব্রত, সিক্ত ঘরখানি লক্ষ করে তিনখানি ঝাউ ।
সার বেঁধে উঠে যাওয়া পাইনের সবুজ রিবনে
যে-কটি জলের কণা ছিল, তারা হাওয়া লেগে বাতাসে উধাও …
এমন বাতাস যার কোনোদিন ওঠেনি জীবনেসে দ্যাখে : আকাশ থেকে নেমে এসে একজন লামা
মুন্ডিত মাথায় একা বসেছেন তাঁর শুভ্র মঠের শিখরে
রূপোলী ঝলকে জ্বলছে দূরের ঝুলন্ত ব্রীজ, ভাসমান নীল-সাদা জামা
একজন মুগ্ধ শুধু বসে আছে হোটেলের ঘরে ।কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b9%e0%a7%8b%e0%a6%9f%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%98%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac/
|
3748
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মেছুয়াবাজার থেকে পালোয়ান চারজন
|
হাস্যরসাত্মক
|
মেছুয়াবাজার থেকে
পালোয়ান চারজন
পরের ঘরেতে করে
জঞ্জাল-মার্জন।
ডালায় লাগিয়ে চাপ
বাক্সো করেছে সাফ,
হঠাৎ লাগালো গুঁতো
পুলিসের সার্জন।
কেঁদে বলে, “আমাদের
নেই কোনো গার্জন,
ভেবেছিনু হেথা হয়
নৈশবিদ্যালয়–
নিখর্চা জীবিকার
বিদ্যা-উপার্জন।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mechuabazr-theke-palowan-charjon/
|
285
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
খোকার খুশি
|
ছড়া
|
কী যে ছাই ধানাই-পানাই –
সারাদিন বাজছে সানাই,
এদিকে কারুর গা নাই
আজই না মামার বিয়ে!
বিবাহ! বাস, কী মজা!
সারাদিন মণ্ডা গজা
গপাগপ খাও না সোজা
দেয়ালে ঠেসান দিয়ে।
তবু বর হচ্ছিনে ভাই,
বরের কী মুশকিলটাই –
সারাদিন উপোস মশাই
শুধু খাও হরিমটর!
শোনো ভাই, মোদের যবে
বিবাহ করতে হবে –
‘বিয়ে দাও’ বলব, ‘তবে
কিছুতেই হচ্ছিনে বর!’
সত্যি, কও না মামা,
আমাদের অমনি জামা
অমনি মাথায় ধামা
দেবে না বিয়ে দিয়ে?
মামিমা আসলে এ ঘর
মোদেরও করবে আদর?
বাস, কী মজার খবর!
আমি রোজ করব বিয়ে॥(ঝিঙেফুল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/khokar-khushi/
|
687
|
জয় গোস্বামী
|
দুখানি জানুর মতো খোলা
|
প্রেমমূলক
|
দুখানি জানুর মতো খোলা
হাড়িকাঠ
মুখ রাখো তাতে
চোখের পলক ফেলতে মাথা ছিঁটকে চলে যাবে সামনের মাঠে
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1745
|
2354
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
বসন্তে-১
|
ভক্তিমূলক
|
(১) ফুটিল বকুলকুল কেন লো গোকুলে আজি,
কহ তা, স্বজনি?
আইলা কি ঋতুরাজ? ধরিলা কি ফুলসাজ,
বিলাসে ধরণী?
মুছিয়া নয়ন-জল, চল লো সকলে চল,
শুনিব তমাল তলে বেণুর সুরব;---
আইল বসন্ত যদি, আসিবে মাধব!(২) যে কালে ফুটে লো ফুল, কোকিল কুহরে, সই,
কুসুমকাননে,
মুঞ্জরয়ে তরুবলী, গুঞ্জরয়ে সুখে অলি,
প্রেমানন্দ মনে,
সে কালে কি বিনোদিয়া, প্রেমে জলাঞ্জলি দিয়া,
ভুলিতে পারেন, সখি, গোকুলভবন?
চল লো নিকুঞ্জবনে পাইব সে ধন!(৩) স্বন, স্বন, স্বনে শুন, বহিছে পবন, সই,
গহন কাননে,
হেরি শ্যামে পাই প্ৰীত, গাইছে মঙ্গল গীত,
বিহঙ্গমগণে!
কুবলয় পরিমল, নহে এ ; স্বজনি, চল,—
ও সুগন্ধ দেহগন্ধ বহিছে পবন।
হায় লো, শ্যামের বপুঃ সৌরভসদন!(৪) উচ্চ বীচি রবে, শুন, ডাকিছে যমুনা ওই
রাধায়, স্বজনি;
কল কল কল কলে, সুতরঙ্গ দল চলে,
যথা গুণমণি।
সুধাকর-কররাশি সম লো শ্যামের হাসি,
শোভিছে তরল জলে; চল, ত্বরা করি—
ভুলি গে বিরহ-জ্বালা হেরি প্রাণহরি!(৫) ভ্রমর গুঞ্জরে যথা ; গায় পিকবর, সই,
সুমধুর বোলে;
মরমরে পাতাদল; মৃদুরবে বহে জল
মলয় হিল্লোলে;---
কুসুম-যুবতী হাসে, মোদি দশ দিশ বাসে,—
কি সুখ লভিব, সখি, দেখ ভাবি মনে,
পাই যদি হেন স্থলে গোকুলরতনে?(৬) কেন এ বিলম্ব আজি, কহ ওলো সহচরি,
করি এ মিনতি?
কেন অধোমুখে কাঁদ, আবরি বদনচাঁদ,
কহ, রূপবতি?
সদা মোর সুখে সুখী, তুমি ওলো বিধুমুখি,
আজি লো এ রীতি তব কিসের কারণে?
কে বিলম্বে হেন কালে? চল কুঞ্জবনে!(৭) কাঁদিব লো সহচরি, ধরি সে কমলপদ,
চল, ত্বরা করি,
দেখিব কি মিষ্ট হাসে, শুনিব কি মিষ্ট ভাষে,
তোষেন শ্রীহরি
দুঃখিনী দাসীরে; চল, হইমু লো হতবল,
ধীরে ধীরে ধরি মোরে, চল লো স্বজনি ;–
সুধে---মধু শূন্য কুঞ্জে কি কাজ, রমণি?(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/bosonte-1/
|
4878
|
শামসুর রাহমান
|
নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের সৈকতে
|
প্রেমমূলক
|
আমার ভেতর থেকে আশ্চর্য এক যুবক
সামুরাই তরবারির ঝলসানির আঙ্গিকে
বেরিয়ে সরাসরি হেঁটে যায়
তোমার নিবাসে রাস্তার ভিড় আর
কোলাহলের চারদিকে পর্দা টেনে দিয়ে।
তুমি তাকে না দেখে
তাকাও এক স্তূপ ধূসরতার দিকে;
তোমার ভুরুর মাঝখানে দ্বিধাদ্বন্দ্বের দোলক।এই হাত দুটো আমার, দেখ এই
এক জোড়া চোখ, এই ওষ্ঠ আমার;
শোনো, বুকের এই ধুকপুকুনি আমার-এক স্তূপ ধূসরতা
ব্যাকুল কণ্ঠস্বর।সেই কণ্ঠস্বর তোমার হৃদয়কে স্পর্শ করেছে,
মনে হয় না। তুমি জানালার
বাইরে তাকিয়ে আছো, যেন একটি একটি করে গুনছ
পাখির পালক, জেনে নিতে চাইছ গাছের পাতার
রহস্য। তোমার উদাসীনতায় প্রতিহত
কণ্ঠস্বর আত্মসমর্পণ করে স্তব্ধতার হাতে।কিছুতেই তোমাকে বুঝতে পারি না আমি,
যেমন একট বাই চার পাঁচবার পড়বার পরেও
তার মাথামুণ্ড কিছুই
বোধগম্য হয় না নিবিষ্ট পড়ুয়ার।বলেই ফেলি তোমাকে ঘিরে অষ্ট প্রহরের
ছটফটানি আমার ছুটির দরখাস্ত
দাখিল করেছে দিনের আলোকরশ্মি আর নক্ষত্রের কাছে
এবং আমার ভালোবাসা
গ্রীষ্মমণ্ডল ছেড়ে নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের
সৈকতের চিকচিকে বালিতে শুয়ে রোদ পোহায়। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/natishitosno-mondoler-soikote/
|
22
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
মধ্যরাত
|
রূপক
|
মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
দুই ঠোঁট ছিঁড়ে নাও,
চোখের কোটর থেকে নীলপদ্ম তুলে নাও,
নিষিদ্ধ দেরাজ থেকে তুলে নাও বক্র ছুরি-ছররা-কার্তুজ।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
পিকাপে চকিত দেখা রূপস চিতার আলোড়ণে
তোমার শাড়ির ডোরা, হেডলাইট ছুটেছে অস্থির,
ভুটানি মদের গন্ধ খোলা চিলে,
তোমাকে চুম্বন করলে সমুদ্রের নীল জল ভয়ঙ্কর ফুঁসে ওঠে,
খাঁড়ির গর্জনে গ্রীবার সটান ভঙ্গি—
নাভির পাতালে তুমি প্রতি রাত্রে গুম করো একটি যুবক।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
চোখ দুটো দৃষ্টি রাখছে চোখের ওপর
হাত দুটো দৃষ্টি রাখছে হাতের ওপর
গোপন গহ্বর খুলে উবু হয়ে বের করো রেশমের ফাঁস
তুমি বিশালাক্ষী, তুমি মৃত্যু, নীলতারা,
হঠাৎ সশব্দে ফেটে বুক মুখ জ্বেলে দাও ঈর্ষার অ্যাসিডে!মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
এত সরলতা
স্টোভের বুকের পরে নীল ফুল হয়ে বসে থাকা
লাল রিবনের ঘূর্ণি মহল্লায় মহল্লায় ছোরা-চালাচালি
করুণ শাখার মতো কৃশ হাত কতকাল ছুঁইনি তোমাকে
ঘুমের ভিতরে নির্বাসন-দণ্ড দিইনি তোমাকে
শুয়োরের গন্ধে ম ম শালবন—
খয়েরি ফিতার টানে ছুটে যায় লাটাগুড়ি, চালসা ফরেস্ট।
কিছুটা সময় আরো
রুদ্র সাগরের তেল হু হু করে জ্বলে যাচ্ছে
ত্যাপিটালে শব্দ তুলে কেটে যায় হাজার মাইল
স্টিয়ারিং জেদি ঘোড়া অবাধ্য গিয়ার-বাক্সো ব্রেক ধরছে না . . .এই বেলা
টান টান উঠে এসো,
ঘন ঘন দন্তের পীড়নে
ওষ্ঠপুটে ফোটাও প্রবাল,
এই বেলা
ছোখ মুখ খুবলে নাও
. ট্রিগারে তর্জনি রাখো জ্বালাও মাইন
কিছুটা সময় আরো
মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
. পাঁচ . . .
. চার . . .
. তিন . . .কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
দুই ঠোঁট ছিঁড়ে নাও,
চোখের কোটর থেকে নীলপদ্ম তুলে নাও,
নিষিদ্ধ দেরাজ থেকে তুলে নাও বক্র ছুরি-ছররা-কার্তুজ।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
পিকাপে চকিত দেখা রূপস চিতার আলোড়ণে
তোমার শাড়ির ডোরা, হেডলাইট ছুটেছে অস্থির,
ভুটানি মদের গন্ধ খোলা চিলে,
তোমাকে চুম্বন করলে সমুদ্রের নীল জল ভয়ঙ্কর ফুঁসে ওঠে,
খাঁড়ির গর্জনে গ্রীবার সটান ভঙ্গি—
নাভির পাতালে তুমি প্রতি রাত্রে গুম করো একটি যুবক।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
চোখ দুটো দৃষ্টি রাখছে চোখের ওপর
হাত দুটো দৃষ্টি রাখছে হাতের ওপর
গোপন গহ্বর খুলে উবু হয়ে বের করো রেশমের ফাঁস
তুমি বিশালাক্ষী, তুমি মৃত্যু, নীলতারা,
হঠাৎ সশব্দে ফেটে বুক মুখ জ্বেলে দাও ঈর্ষার অ্যাসিডে!মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
এত সরলতা
স্টোভের বুকের পরে নীল ফুল হয়ে বসে থাকা
লাল রিবনের ঘূর্ণি মহল্লায় মহল্লায় ছোরা-চালাচালি
করুণ শাখার মতো কৃশ হাত কতকাল ছুঁইনি তোমাকে
ঘুমের ভিতরে নির্বাসন-দণ্ড দিইনি তোমাকে
শুয়োরের গন্ধে ম ম শালবন—
খয়েরি ফিতার টানে ছুটে যায় লাটাগুড়ি, চালসা ফরেস্ট।
কিছুটা সময় আরো
রুদ্র সাগরের তেল হু হু করে জ্বলে যাচ্ছে
ত্যাপিটালে শব্দ তুলে কেটে যায় হাজার মাইল
স্টিয়ারিং জেদি ঘোড়া অবাধ্য গিয়ার-বাক্সো ব্রেক ধরছে না . . .এই বেলা
টান টান উঠে এসো,
ঘন ঘন দন্তের পীড়নে
ওষ্ঠপুটে ফোটাও প্রবাল,
এই বেলা
ছোখ মুখ খুবলে নাও
. ট্রিগারে তর্জনি রাখো জ্বালাও মাইন
কিছুটা সময় আরো
মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
. পাঁচ . . .
. চার . . .
. তিন . . .
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%a4-%e0%a6%9b%e0%a7%81%e0%a6%81%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a4-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b2-amitav/
|
2753
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আলো তার পদচিহ্ন
|
রূপক
|
আলো তার পদচিহ্ন
আকাশে না রাখে;
চলে যেতে জানে, তাই
চিরদিন থাকে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/alo-tar-podochinho/
|
886
|
জসীম উদ্দীন
|
সকিনা
|
কাহিনীকাব্য
|
দুখের সায়রে সাঁতারিয়া আজ সকিনার তরীখানি,
ভিড়েছে যেখানে, সেতা নাই কূল, শুধুই অগাধ পানি।
গরীবের ঘরে জন্ম তাহার, বয়স বাড়িতে হায়,
কিছু বাড়িল না, একরাশ রূপ জড়াইল শুধু গায়।
সেই রূপই তার শত্রু হইল, পন্যের মত তারে,
বিয়ে দিল বাপ দুই মুঠি ভরি টাকা আধুলির ভারে!
খসম তাহার দাগী-চোর, রাতে রহিত না ঘরে,
হেথায় হোথায় ঘুরিয়া ফিরিত সিদকাঠি হাতে করে।
সারাটি দিবস পড়িয়া ঘুমাত, সকিনার সনে তার,
দেখা যে হইত ক্ষনেকের তরে, মাসে দুই একবার।
সেই কোন তার কল্পিত এক এপরাধ ভেবে মনে,
মারিবার যবে হত প্রয়োজন অতীব ক্রোধের সনে।
এমন স্বামীর বন্ধন ছাড়ি বহু হাত ঘুরি ফিরি,
দুঃখের জাল মেলে সে চলিল জীবনের নদী ঘিরি।
সে সব কাহিনী বড় নিদারুন, মোড়লের দরবার,
উকিলের বাড়ি, থানার হাজত, রাজার কাছারী আর;
ঘন পাট ক্ষেত, দূর বেত ঝাড়, গহন বনের ছায়,
সাপের খোড়লে, বাঘের গুহায় কাটাতে হয়েছে তায়;
দিনেরে লুকায়ে, রাতেরে লুকায়ে সে সব কাহিনী তার,
লিখে সে এসেছে, কেউ কোন দিন জানিবে না সমাচার।
সে কেচ্ছা কোন কবি গাহিবে না কোন দেশে কোন কালে,
সকিনারি শুদা সারাটি জনম দহিবে যে জঞ্জালে।
এত যে আঘাত, এত অপমান, এত লাঞ্ছনা তার,
সবই তার মনে, এতটুকু দাগ লাগে নাই দেহে তার।
দেহ যে তার পদ্মের পাতা, ঘটনার জল-দল,
গড়ায়ে পড়িতে রূপেরে করেছে আরো সে সমুজ্জল।
সে রূপ যাদের টানিয়া আনিল তারা দুই হাত দিয়ে,
জগতের যত জঞ্জাল আনিল জড়াইল তারে নিয়ে।
কেউ দিল তারে বিষের ভান্ড, কেউ বা প্রবঞ্চনা,
কেউ দিল ঘৃণা, কলঙ্ক কালি এনে দিল কোন জনা।
সে রূপের মোহে পতঙ্গ হয়ে যাহারা ভিড়িল হায়,
তারা পুড়িল না অমর করিয়া বিষে বিষাইল তায়।
তাদেরি সঙ্গে আসিল যুবক, তরুণ সে জমিদার,
হাসিখুশী মুখ, সৌম্য মুরতি দেশ-জোড়া খ্যাতি তার।
সে আসি বলিল, সব গ্লানি হতে তোমারে মুক্ত করি,
মোর গৃহে নিয়ে রাণীর বেশেতে সাজাইব এই পরী।
করিলও তাই, যে জাল পাতিয়া রূপ-পিয়াসীর দল,
রেখেছিল তারে বন্দী করিয়া রচিয়া নানান ছল;
সে সব হইতে টানিয়া তাহারে নিয়ে এলো করি বার,
গত জীবনের মুছিয়া ঘটনা জীবন হইতে তার!
মেঘ-মুক্ত সে আকাশের মত দাঁড়াল যখন এসে,
রূপ যেন তারে করিতেছে স্তব সারাটি অঙ্গে ভেসে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/497
|
918
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া যখন লেগেছে
|
সনেট
|
অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া যখন লেগেছে নীল বাংলার বনে
মাঠে মাঠে ফিরি একা: মনে হয় বাংলার জীবনে সঙ্কট
শেষ হয়ে গেছে আজ; — চেয়ে দেখ কতো শত শতাব্দীর বট
হাজার সবুজ পাতা লাল ফল বুকে লয়ে শাখার ব্যজনে
আকাঙ্খার গান গায় — অশ্বত্থেরও কি যেন কামনা জাগে মনে :
সতীর শীতল শব বহু দিন কোলে লয়ে যেন অকপট
উমার প্রেমের গল্প পেয়েছে সে, চন্দ্রশেখরের মতো তার জট
উজ্জ্বল হতেছে তাই সপ্তমীর চাঁদের আজ পুনরাগমনে;মধুকূপী ঘাস-ছাওয়া ধলেশ্বরীটির পাড়ে গৌরী বাংলার
এবার বল্লাল সেন আসিবে না জানি আমি — রায়গুণাকর
আসিবে না — দেশবন্ধু আসিয়াছে ক্ষুরধার পদ্মায় এবার,
কালীগহে ক্লান্ত গাঙশালিখের ভিড়ে যেন আসিয়াছে ঝড়,
আসিয়াছে চন্ডীদাস — রামপ্রসাদের শ্যামা সাথে সাথে তার;
শঙ্খমালা, চন্দ্রমালা : মৃত শত কিশোরীর কঙ্কণের স্বর।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/oshshotthey-sondhyar-hawoa-jokhon-legese/
|
1041
|
জীবনানন্দ দাশ
|
তবু
|
চিন্তামূলক
|
সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী
মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ সময়ের থেকে
উঠে এসে এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার
বছরে বয়সী আমি;
বুদ্ধকে স্বচক্ষে মহানির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে
চ’লে যেতে দেখে— তবু—অবিরল অশান্তির দীপ্তি ভিক্ষা ক’রে
এখানে তোমার কাছে দাঁড়ায়ে রয়েছি;
আজ ভোরে বাংলার তেরোশো চুয়ান্ন সাল এই
কোথাও নদীর জলে নিজেকে গণনা ক’রে নিতে ভুলে গিয়ে
আগামী লোকের দিকে অগ্রসর হ’য়ে যায়; আমি
তবুও নিজেকে রোধ ক’রে আজ থেমে যেতে চাই
তোমার জ্যোতির কাছে; আড়াই হাজার
বছর তা হ’লে আজ এইখানে শেষ হ’য়ে গেছে।নদীর জলের পথে মাছরাঙা ডান বাড়াতেই
আলো ঠিকরায়ে গেছে— যারা পথে চ’লে যায় তাদের হৃদয়ে;
সৃষ্টির প্রথম আলোর কাছে; আহা,
অন্তিম আভার কাছে; জীবনের যতিহীন প্রগতিশীলতা
নিখিলের স্মরণীয় সত্য ব’লে প্রমাণিত হ’য়ে গেছে; দ্যাখো
পাখি চলে, তারা চলে, সূর্য মেঘে জ্ব’লে যায়, আমি
তবুও মধ্যম পথে দাঁড়ায়ে রয়েছি— তুমি দাঁড়াতে বলোনি।
আমাকে দ্যাখোনি তুমি; দেখাবার মতো
অপব্যয়ী কল্পনার ইন্দ্রত্বের আসনে আমাকে
বসালে চকিত হ’য়ে দেখে যেতে যদি— তবু, সে-আসনে আমি
যুগে-যুগে সাময়িক শত্রুদের বসিয়েছি, নারি,
ভালোবেসে ধ্বংস হ’য়ে গেছে তা’রা সব।
এ-রকম অন্তহীন পটভূমিকায়— প্রেমে—
নতুন ঈশ্বরদের বার-বার লুপ্ত হ’তে দেখে
আমারো হৃদয় থেকে তরুণতা হারায়ে গিয়েছে;
অথচ নবীন তুমি।নারি, তুমি সকালের জল উজ্জ্বলতা ছাড়া পৃথিবীর কোনো নদীকেই
বিকেলে অপর ঢেউয়ে খরশান হ’তে
দিতে ভুলে গিয়েছিলে; রাতের প্রখর জলে নিয়তির দিকে
ব’হে যেতে দিতে মনে ছিলো কি তোমার?
এখনও কি মনে নেই?আজ এই পৃথিবীর অন্ধকারে মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস
কেবলি শিথিল হ’য়ে যায়; তবু তুমি
সেই শিথিলতা নও, জানি, তবু ইতিহাসরীতিপ্রতিভার
মুখোমুখি আবছায়া দেয়ালের মতো নীল আকাশের দিকে
ঊর্ধ্বে উঠে যেতে চেয়ে তুমি
আমাদের দেশে কোনো বিশ্বাসের দীর্ঘ তরু নও।তবু
কী যে উদয়ের সাগরের প্রতিবিম্ব জ্ব’লে ওঠে রোদে!
উদয় সমাপ্ত হ’য়ে গেছে নাকি সে অনেক আগে?
কোথাও বাতাস নেই, তবু
মৰ্মরিত হ’য়ে ওঠে উদয়ের সমুদ্রের পারে।
কোনো পাখি
কালের ফোকরে আজ নেই, তবু, নব সৃষ্টিমরালের মতো কলস্বরে
কেন কথা বলি; কোনো নারী
নেই, তবু আকাশহংসীর কণ্ঠে ভোরের সাগর উতরোল। (সাতটি তারার তিমির কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/tobu/
|
1266
|
জীবনানন্দ দাশ
|
স্বভাব
|
প্রেমমূলক
|
যদিও আমার চোখে ঢের নদী ছিলো একদিন
পুনরায় আমাদের দেশে ভোর হ’লে,
তবুও একটি নদী দেখা যেতো শুধু তারপর;
কেবল একটি নারী কুয়াশা ফুরোলে
নদীর রেখার পার লক্ষ্য ক’রে চলে;
সূর্যের সমস্ত গোল সোনার ভিতরে
মানুষের শরীরের স্থিরতর মর্যাদার মতো
তার সেই মূর্তি এসে পড়ে।
সূর্যের সম্পূর্ণ বড় বিভোর পরিধি
যেন তার নিজের জিনিস।
এতদিন পরে সেইসব ফিরে পেতে
সময়ের কাছে যদি করি সুপারিশ
তা’হলে সে স্মৃতি দেবে সহিষ্ণু আলোয়
দু-একটি হেমন্তের রাত্রির প্রথম প্রহরে;
যদিও লক্ষ লোক পৃথিবীতে আজ
আচ্ছন্ন মাছির মত মরে -
তবুও একটি নারী ‘ভোরের নদীর
জলের ভিতরে জল চিরদিন সূর্যের আলোয় গড়াবে’
এ রকম দু-চারটে ভয়াবহ স্বাভাবিক কথা
ভেবে শেষ হ’য়ে গেছে একদিন সাধারণভাবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shovab/
|
5244
|
শামসুর রাহমান
|
শ্বাসকষ্ট
|
চিন্তামূলক
|
হৈ হৈ হাটে কিছু কেনাকাটা কিংবা বেচা
ছিল না আমার মনে। তবু
ঘেঁষাঘেষি, পা মাড়ানো, গুঁতোগুঁতি আমাকে বিব্রত,
বিমর্ষ, বিপন্ন করে। কেউ কেউ রক্তের তিলক
কপালে পরিয়ে দেয়, কেউ বা পাঠায়
লাঠির অরণ্যে, হামেশাই গালি গালাজের বানে
ভাসি, আর কোমরবন্ধের নিচে খুশি
মেরে প্রতিপক্ষ সুখে পানসি ভাসায় নদীবক্ষে পাল তুলে।খুব সাবধানে তাঁবু খাটিয়ে নিজেকে নিরালায়
লুকিয়ে রাখার সাধনায় মগ্ন হই, ভালো থাকি
সূর্যমুখী-ছাওয়া মাঠে, গাছপালা, পাখিদের জলসায়, দিঘির স্নেহের
স্পর্শ নিয়ে, মাঝে মাঝে সাঁঝে দেখি একটি তরুণী
খোঁপা থেকে ফুল খুলে ভাষায় দিঘির জলে, চলে
যায় দিগন্তের দিকে। অন্য কারো পদচ্ছাপ দেখি না কখনো।অকস্মাৎ দুরন্ত ঝঞ্ঝায় এক ঝটকায় সুরক্ষিত
তাঁবু উড়ে যায়, খুঁটিগুলি শূন্যে ওড়ে,
দেবোপম উলঙ্গতা নিয়ে হি হি কাঁপি,
জলজ রাক্ষস তীক্ষ্ণ দাঁত দেখায়, কাচের মতো
ভাঙে প্রতিবোধ, চতুর্দিকে পুনরায়
হট্ররোল জেগে ওঠে; শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে থাকে। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shaskoshto/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.