id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
278
কাজী নজরুল ইসলাম
কেমনে রাখি আঁখিবারি চাপিয়া
প্রেমমূলক
কেমনে রাখি আঁখিবারি চাপিয়া প্রাতে কোকিল কাঁদে, নিশীথে পাপিয়া।এ ভরা ভাদরে আমারি মরা নদী উথলি উথলি উঠিছে নিরবধি আমার এ ভাঙ্গা ঘাটে আমার এ হূদি তটে চাপিতে গেলে ওঠে দুকুল ছাপিয়া।নিষেধ নাহি মানে আমার এ পোড়া আঁখি জল লুকাব কত কাজল মাখি মাখি ছলনা করে হাসি অমনি জলে ভাসি ছলিতে গিয়া আসি ভয়েতে কাঁপিয়া।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/kamney-rakhi-akhibari-chapia/
2085
মহাদেব সাহা
ইচ্ছাবৃষ্টি
চিন্তামূলক
আমার ভেতর কেমন পাতা থর থর হাওয়া কাঁপছে কাউকে বলবো না আমি কিছুকে বলবো না আমার এখন ইচ্ছে জাগছে! নিজের দিকে চাইলে আমি ধরতে পারি এই রহস্য কোথাও ওলটপালট হচ্ছে কোথাও কোমল মাটি কাঁপছে বুকে কঠিন হাওয়া লাগছে, হাওয়া লাগছে কী রহস্যে জড়িয়ে এমন মেঘ করেছে বৃষ্টি হবে, আমার ধানী জমি জুড়ে রহস্য মেঘ বৃষ্টি হবে আমার এখন ইচ্ছে জাগছে!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1499
1246
জীবনানন্দ দাশ
সূর্যকরোজ্জ্বলা
চিন্তামূলক
আমরা কিছু চেয়েছিলাম প্রিয়; নক্ষত্র মেঘ আশা আলোর ঘরে ঐ পৃথিবীর সূর্যসাগরে দেখেছিলাম ফেনশীর্ষ আলোড়নের পথে মানুষ তাহার ছায়ান্ধকার নিজের জগতে জন্ম নিল- এগিয়ে গেল; - কত আগুন কত তুষার যুগ শেষ করে সে আলোর লক্ষ্যে চলার কোন্‌ শেষ হবে না আর জেনে নিয়ে নির্মল নির্দেশ পেয়ে যাবে গভীর জ্ঞানের, - ভেবেছিলাম, পেয়ে যাবে প্রেমের স্পষ্ট গতি সত্য সূর্যালোকের মতন; - ব’লে গেল মৃত অন্ধকারে জীবিতদের প্রতি।জীবিত, মানে আজ সময়ের পথে বালি শিশির ধুলোর মতো কণা মিলিয়ে তাদের প্রাণের প্রেরণা ক্রমেই চরিতার্থ হতে চায়। চারদিকে নীল অপার্থিবতায় সোনার মতন চিলের ডানায় কোনো খাদ মেশানো নেই, তবু তার প্রাণে কোটি বছর পরে কোনো মানে বার করেছে মন কি প্রকৃতির? মানুষ তবু পাখির চেয়ে ঢের অমৃতলোক হাতের কাছে পেয়ে তবু কি অমৃতের?মানুষ আমি,- মানুষ আমার পাশে হৃদয়ে তার হৃদয় মেশালেও ব্যক্তি আমি ব্যক্তিপুরুষ সে-ও; দ্বীপের মতন একা আমি তুমি; অনন্ত সব পৃথক দ্বীপের একক মরুভূমি: যে যার পরিপূর্ণ অবিশ্বাসে র’য়ে গেছে;- সেখান থেকে ব্যাজস্তূতি কপট প্রণয় ভয় দেখ কেমন উৎসারিত হয়; প্রাণের প্রয়াস রয়েছে তবু, তাই দেখেছি মানুষ অনর্গল অন্ধকারে মরে মানবকে তার প্রতিনিধি রেখে গেছে, - হয়তো একদিন সফলতা পেয়ে যাবে ইতিহাসের ভোরে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shurjokorojjola/
2383
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
রাশি-চক্র
সনেট
রাজপথে,শোভে যথা, রম্য-উপবনে, বিরাম-অ্যালয়বৃন্দ ; গড়িলা তেমতি দ্বাদশ মন্দির বিধি, বিবিধ রতনে, তব নিত্য পথে শূন্যে, রবি, দিনপতি। মাস কাল প্রতি গৃহে তোমার বসতি, গ্রহেন্দ্র ; প্রবেশ তব কখন সুক্ষণে,— কখন বা প্রতিকুল জীব-কুল প্রতি! অাসে এ বিরামালয়ে সেবিতে চরণে গ্রহব্রজ ; প্রজাব্রজ, রাজাসন-তলে পূজে রাজপদ যথা ; তুমি তেজাকর, হৈমময় তেজ-পুঞ্জ প্রসাদের ছলে, প্রদান প্রসন্ন ভাবে সবার উপর। কাহার মিলনে তুমি হাস কুতূহলে, কাহার মিলনে বাম,—শুনি পরস্পর।
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/rashi-chakra/
572
কায়কোবাদ
দেশের বাণী
স্বদেশমূলক
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী? এ দেশের লোক যারা, সকলইতো গেছে মারা, আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি! সে কথা ভাবিতে হায় এ প্রাণ ফেটে যায়, হৃদয় ছাপিয়ে উঠে – চোখ ভরা পানি। কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী! এ দেশের লোক যত বিলাস ব্যসনে রত এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা। দেশ গেল ছারেখারে, এ কথা বলিব কারে? ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা! প্রাণভরা হাহাকার চোখ ভরা অশ্রুধার, এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!
http://kobita.banglakosh.com/archives/3830.html
1436
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
সড়ক
প্রেমমূলক
তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে । পুরোনো বাসষ্টেশন ফেলে ট্রাফিক পয়েন্ট বাঁয়ে ঠেলে উকিলপাড়ার পয়েন্ট ঘুরে তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে । ভালোবাসা হৃদয়পুরে পুজোর গন্ধে শরীর মেখে সন্ধ্যারাতের চাঁদের আলোয় তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে । যানজটহীন এই শহরে শান্তি এবং প্রেমের খোঁজে তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1030
3903
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সখিরে—পিরীত বুঝবে কে
ভক্তিমূলক
সখিরে— পিরী ত বুঝবে কে ? অঁধার হৃদয়ক দুঃখ কাহিনী বোলব , শুনবে কে ? রাধিকার অতি অন্তর বেদন কে বুঝবে অয়ি সজনী কে বুঝবে সখি রোয়ত রাধা কোন দুখে দিন রজনী ? কলঙ্ক রটায়ব জনি সখি রটাও কলঙ্ক নাহিক মানি , সকল তয়াগব লভিতে শ্যামক একঠো আদর বাণী । মিনতি করিলো সখি শত শত বার , তু শ্যামক না দিহ গারি , শীল মান কুল , অপনি সজনি হম চরণে দেয়নু ডারি । সখিলো— বৃন্দাবনকো দুরুজন মানুখ পিরীত নাহিক জানে , বৃথাই নিন্দা কাহ রটায়ত হমার শ্যামক নামে ? কলঙ্কিনী হম রাধা , সখিলো ঘৃণা করহ জনি মনমে ন আসিও তব্‌ কবহুঁ সজনিলো হমার অঁধা ভবনমে । কহে ভানু অব— বুঝবে না সখি কোহি মরমকো বাত , বিরলে শ্যামক কহিও বেদন বৃক্ষে রাখয়ি মাথ ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sakere-perete-bujeba-ka/
1248
জীবনানন্দ দাশ
সূর্যপ্রতিম
চিন্তামূলক
আমরণ কেবলই বিপন্ন হয়ে চলে তারপর যে বিপদ আসে জানি হৃদয়ঙ্গম করার জিনিস; এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। বালুচরে নদীটির জল ঝরে, খেলে যায় সূর্যের ঝিলিক, মাছরাঙা ঝিকমিক্ করে উড়ে যায়, মৃত্যু আর করুণার দুটো তরোয়াল আড়াআড়ি গ’ড়ে ভেঙে নিতে চায় এই সব সাঁকো ঘর বাড়ি; নিজেদের নিশিত আকাশ ঘিরে থাকে।এ রকম হয়েছে অনেক দিন–রৌদ্রে বাতাসে; যারা সব দেখেছিল– যারা ভালোবেসেছিল এই সব–তারা সময়ের সুবিধায় নিলেমে বিকিয়ে গেছে আজ। তারা নেই। এসো আমরা যে যার কাছে–যে যার যুগের কাছে সব সত্য হয়ে প্রতিভাত হয়ে উঠি। নব পৃথিবীকে পেতে সময় চলেছে? হে আবাচী, হে উদীচী, কোথাও পাখির শব্দ শুনি; কোথাও সূর্যের ভোর রয়ে গেছে বলে মনে হয়! মরণকে নয় শুধু– মরণসিন্ধুর দিকে অগ্রসর হয়ে যা-কিছু দেখার আছে আমরাও দেখে গেছি; ভুলে গেছ্‌ স্মরণে রেখেছি। পৃথিবীর বালি রক্ত কালিমার কাছে তারপর আমরা খারিজ হয়ে দোটানার অন্ধকারে তবুও তো চক্ষুস্থির রেখে গণিকাকে দেখায়েছি ফাঁদ; প্রেমিককে শেখায়েছি ফাঁকির কৌশল। শেখাই নি?শতাব্দী আবেশে অস্তে চলে যায়; বিপ্লবী কি স্বর্ণ জমায়। আকন্ঠ মরণে ডুবে চিরদিন প্রেমিক কি উপভোগ করে যায় স্নিগ্ধ সার্থবাহদের ঋণ। তবে এই অলক্ষিতে কোন্‌খানে জীবনের আশ্বাস রয়েছে। আমরা অপেক্ষাতুর; চাঁদের উঠার আগে কালো সাগরের মাইলের পরে আরো অন্ধকার ডাইনি মাইলের পড়ি দেওয়া পাখিদের মতো নক্ষত্রের জোছনায় যোগান দিয়ে ভেসে এ অনন্ত প্রতিপদে তবু চাঁদ ভুলে উড়ে যাওয়া চাই উড়ে যেতে চাই।পিছনের ঢেউগুলো প্রতারণা করে ভেসে গেছে; সামনের অভিভূত অন্তহীন সমুদ্রের মতন এসেছে লবণাক্ত পালকের ডানায় কাতর জাপটার মতো ভেঙে বিশ্বাসহন্তার তো কেউ সমুদ্রের অন্ধকার পথে পড়ে আছে মৃত্যু আজীবন অগণন হল, তবু এ রকমই হবে।‘কেবলই ব্যক্তির–ব্যক্তির মৃত্যু শেষ করে দিয়ে আজ আমরাও মরে গেছি সব–‘ দলিলে না ম’রে তব এ রকম মৃত্যু অনুভব ক’রে তারা হৃদয়বিহীন ভাবে ব্যাপ্ত ইতিহাস সাঙ্গ করে দিতে চেয়ে যতদূর মানুষের প্রাণ অতীতে ম্লানায়মান হয়ে গেছে সেই সীমা ঘিরে জেগে ওঠে উনিশশো তেতাল্লিশ, চুয়াল্লিশ, অনন্তের অফুরন্ত রৌদ্রের তিমিরে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shurjoprotiim/
3527
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বসন্ত পাঠায় দূত
প্রকৃতিমূলক
বসন্ত পাঠায় দূত রহিয়া রহিয়া যে কাল গিয়েছে তার নিশ্বাস বহিয়া।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bosonto-pathai-dut/
2515
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
বৈশাখের প্রথম দিন উপলক্ষে আহ্বান
মানবতাবাদী
আয়-রে আমার গ্রামের মানুষ, আয় আয় রে চলে রাজধানী ঢাকায় দেখবি) তোদের মতো সাজ করেছে কয়েক শ' ধাঙ্গড় । ওরা) জীবনেও হাল চালায়নি চাষ-আবাদের চুল ফেলায়নি ভাঙেনি তো রুক্ষ মাটির একখানি চাঙ্গড় ।।দেখবি কেমন পান্তা খাবে তোদের খাদ্যকে ভেংচাবে নাচবে যেন কৃমির নাচন সব কটা ভাঙ্গড় ।।মুখ দেখাতে লজ্জ্বা বলেই মুখোস পরে থাকে পশুর অধম বলেই পশুর মুখোসে মুখ ঢাকে ।সমবছরে তোমার পাকে একদিনও কি ইলিশ থাকে ? এদের দেখবি ইলিশ ছাড়া ভাঙ্গেই না আঙ্গড় ।।
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/baishakher-prothom-din-upolokkhe-ahban/
1008
জীবনানন্দ দাশ
গল্পে আমি পড়িয়াছি কাঞ্চী কাশী বিদিশার কথা
প্রেমমূলক
গল্পে আমি পড়িয়াছি কাঞ্চী কাশী বিদিশার কথা কোনদিন চোখে দেখি নাই একদিন ভাবিলাম মাঠে মাঠে কুয়াশায় যদি আমি কোনোদিন বিদিশায় যাই—মাঠে মাঠে কুয়াশায় ভাবিলাম এই কথা বহু দিন বহু বহু রাত ধ’রে আমি যদি আমি—কোনোদিন যদি আমি অবন্তীর পথে গিয়ে নামি—পউষের কুয়াশায় সাপের খোলস, পাতা, ডিম প’ড়ে আছে ঘাসে, কেন যে করুণ চোখ পথ ভুলে ভেসে গেল ময়জানি নদীটির পাশে—এসেছে এ কার বজরা ? চারিদিকে শীত নদী : যেন মরুভূমি বজরার জানালায় কার মুখ এই পথে এত দিন পরে কেন তুমি ?কবেকার মাঠ—পথ—মন্দির কুয়াশার ফাঁকে দিল দেখা হৃদয়ে তাতাল বালির মতো তৃষা নদীর আঁধার জলে ভ’রে গেল আমি যে গো দেখেছি বিদিশা।সব কথা মনে পড়ে জলসিড়ি নদী আর জানে না সে কথা নীলাভ ঘাসের পথে জ্যোৎস্নায়।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/golpey-poriachi-aami-kanchi-kashi-bidishar-kotha/
5970
হুমায়ুন আজাদ
আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর
প্রেমমূলক
আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো। তোমার খবরের জন্য যে আমি খুব ব্যাকুল, তা নয়। তবে ঢাকা খুবই ছোট্ট শহর। কারো কষ্টের কথা এখানে চাপা থাকে না। শুনেছি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর তুমি খুবই কষ্টে আছো। প্রত্যেক রাতে সেই ঘটনার পর নাকি আমাকে মনে পড়ে তোমার। পড়বেই তো, পৃথিবীতে সেই ঘটনা তুমি-আমি মিলেই তো প্রথম সৃষ্টি করেছিলাম। যে-গাধাটার হাত ধরে তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে সে নাকি এখনো তোমার একটি ভয়ংকর তিলেরই খবর পায় নি। ওই ভিসুভিয়াস থেকে কতটা লাভা ওঠে তা তো আমিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম। তুমি কি জানো না গাধারা কখনো অগ্নিগিরিতে চড়ে না? তোমার কানের লতিতে কতটা বিদ্যূৎ আছে, তা কি তুমি জানতে? আমিই তো প্রথম জানিয়েছিলাম ওই বিদ্যূতে দপ ক’রে জ্বলে উঠতে পারে মধ্যরাত। তুমি কি জানো না গাধারা বিদ্যূৎ সম্পর্কে কোনো খবরই রাখে না? আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো। যে-গাধাটার সাথে তুমি আমাকে ছেড়ে চ’লে গেলে সে নাকি ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শয্যাকক্ষে কোনো শারীরিক তাপের দরকার পড়ে না। আমি জানি তোমার কতোটা দরকার শারীরিক তাপ। গাধারা জানে না। আমিই তো খুঁজে বের করেছিলাম তোমার দুই বাহুমূলে লুকিয়ে আছে দু’টি ভয়ংকর ত্রিভুজ। সে-খবর পায় নি গাধাটা। গাধারা চিরকালই শারীরিক ও সব রকম জ্যামিতিতে খুবই মূর্খ হয়ে থাকে। তোমার গাধাটা আবার একটু রাবীন্দ্রিক। তুমি যেখানে নিজের জমিতে চাষার অক্লান্ত নিড়ানো, চাষ, মই পছন্দ করো, সে নাকি আধ মিনিটের বেশি চষতে পারে না। গাধাটা জানে না চাষ আর গীতবিতানের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য! তুমি কেনো আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে? ভেবেছিলে গাড়ি, আর পাঁচতলা ভবন থাকলেই ওষ্ঠ থাকে, আলিঙ্গনের জন্য বাহু থাকে, আর রাত্রিকে মুখর করার জন্য থাকে সেই অনবদ্য অর্গান? শুনেছি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর তুমি খুবই কষ্টে আছো। আমি কিন্ত কষ্টে নেই; শুধু তোমার মুখের ছায়া কেঁপে উঠলে বুক জুড়ে রাতটা জেগেই কাটাই, বেশ লাগে, সম্ভবত বিশটির মতো সিগারেট বেশি খাই।
https://banglarkobita.com/poem/famous/398
2065
মহাদেব সাহা
আমার সমুদ্র দেখা, আমার পাহাড় দেখা
প্রকৃতিমূলক
আমার কোনোদিন সমুদ্রদর্শন হয়নি, পাহাড় দেখাও না কেন যে সমুদ্র বা পাহাড় আমাকে এমন বিমুখ করেছে সমুদ্র আমাকে দর্শন দেননি কখনো পাহাড় আমাকে সান্নিধ্য, বাল্টিকের তীরে দাঁড়িয়ে আমি যেমন ধু-ধু জলরাশি ছাড়া কোনো সমুদ্রই দেখতে পাইনি আর তেমনি ময়নামতির পাহাড়েও প্রস্তরীভুত নিস্তব্ধতা, এই আমার পাহাড় কিংবা সমুদ্রদর্শন! হয়তো সমুদ্র দেখতে গিয়েই আমার তখনই মনে পড়ে যায় একটি নিঃসঙ্গ চড়ুই কিংবা কাকের করুণ মৃত্যু কিংবা মাতিসের কোনো নীল চোখের দিকে তাকিয়েই মনে হয় সমুদ্র কখনো কপালকুণ্ডলার আখ্যান জুড়েই উচ্ছল হয়ে ওঠে নীলফেনিল তরঙ্গমালা! কিন্তু আমি তো সমুদ্রই দেখতে চেয়েছিলাম তবুও সমুদ্রের কাছে গিয়ে আমার কখনো সমুদ্র দেখা হয়নি যেমন পাহাড়ের কাছে গিয়ে দেখা হয়নি কোনো নিবিড় পাহাড়কে, আমি সেখানে উচ্চতা ছাড়া পাহাড় বলতে কিছুই দেখিনি! এই সমুদ্র আমাকে চিরদিন বিমুখ করেছে সমুদ্রের গায়ে হাত রেখে তাই তাকে কেমন আছে বলে কুশল প্রশ্ন করতে পারিনি কখনো, যতোবারই তাকিয়েছি ততোবারই মনে হয়েছে ব্যর্থতা এক অর্থে এই ব্যর্থতার নামই সমুদ্র কিংবা পাহাড়; পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে ঈশ্বর জানেন কোথায় যেন কি মিল আছে হযতো তাই পাহাড়কে কখনো আমার মনে হয়েছে তরঙ্গময় সমুদ্রকে শিলাশোভিত; আমি হয়তো সমুদ্রের মধ্যে আরো কোনো পৃথক সমুদ্র সন্ধান করেছিলাম কি না কে জানে পাহাড় কিংবা আকাশের দিকে তাকিয়েও ঠিক তেমনি অন্য কোনো স্বপ্ন-কোনো আভাস তাই এখন কেবল মনে পড়ছে বাল্টিক কিংবা আরব সাগরের কূলে আমি একটিও ঝিনুক কিংবা শঙ্খ কুড়াইনি কখনো ক্যামেরায় সমুদ্রের ছবি তোলার দুঃসাহস করবো কীভাবে সমুদ্রের কাছ থেকে আমি উপহার পেয়েছিলাম সামান্য যা টাকাকড়ি তার নাম ব্যর্থতা; চিরকাল পাহাড় ও সমুদ্রদর্শন করতে গিয়ে আমার লাভের মধ্যে এই কিছু পবিত্র বিষাদ অর্জন! তাই সমুদ্র দেখতে গিয়ে আমার সমুদ্রদর্শন হয়নি পাহাড় দেখতে গিয়ে পাহাড় দেখা, না দেখেছি পাহাড় না দেখেছি সমুদ্র অথচ কী যে দেখতে দেখতে কী যে দেখতে দেখতে আমার কতোবার দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে হয়তো আমি কিছুই দেখিনি সেই না-দেখাটাই ছিলো আমার সমুদ্রদর্শন, আমার পাহাড়-প্রবেশ। সমুদ্রের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে কখন মনে পড়েছে আমার মায়ের অশ্রুভেজা দুটি চোখ সমুদ্রকে তার সেই সিক্ত ও সজল চোখের চেয়ে বিস্তৃত মনে হয়নি আমার, যে চোখ এতো অশ্রু ও মমতা ধারণ করে আছে তার দিকে তাকিয়েই আমি বলেছি এই তো সমুদ্র! হতে পারে সমুদ্রকে এভাবেই আমি ভিন্ন ও পৃথক রূপে দেখে ভীত ও শিহরিত হয়েছিলাম। আবার আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতেই আমার কখন যে বাংলাদেশের একজন ক্ষুধার্ত কিশোরীর মলিন ছেঁড়া শাড়ির কথা মনে পড়ে যায়, বলতে পারবো না আকাশের চেয়ে তার দারিদ্র্যকেই বেশি বড়ো মনে হয় আমার আমি কি করবো, সমুদ্র দর্শনের ঠিক একাগ্রতাই হয়তো আমার নেই কিংবা আকাশ কি পাহাড় দেখার সঠিক মনোযোগ, তাই সমুদ্র দেখতে দেখতে আমার মধ্যে জেগে ওঠে সামান্য একটি চড়ুইয়ের মৃত্যুদৃশ্য আকাশ দেখতে দেখতে আমার মনে হয় আমি বুঝি সারা বাংলাদেশ জুড়ে কেবল বাসন্তীর ছেঁড়া শাড়ি টানানো দেখছি, পাহাড় দেখতে গিয়ে কতোবার যে আমি এমনি আহত হয়ে ফিরে এসেছি সকলে সুদৃশ্য পাহাড় দেখলেও আমি সেসবের কিছুই দেখিনি। তাই এসব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে বললে তখনই কেবল চোখের সামনে পাহাড় ও অকূল সমুদ্র ভেসে ওঠে চোখের জলই আমার মনে হয় সমুদ্র অটল মৌনতাই আমার কাছে পাহাড়; কিন্তু সমুদ্রের সেই পৃথক সুন্দর রূপ আমি স্পষ্ট দেখতে পারিনি কখনো তাই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বারবার আমি দেখেছি জলের দম্ভ অনেকটা মরুভূমির মতোই শূন্য ও ধূসর সে, এখানেই তো বালিরও উদ্ভব পরক্ষনেই সমুদ্রে জাহাজগুলোকে ভাসতে দেখে আমার মনে হয়েছে অনন্তের মধ্যে সাঁতার কাটছে তোমার রাজহাঁস, মাছগুলো এই সমুদ্রের রহস্যের মতোই লাল ও উদাসীন সূর্যাস্ত আর গোধূলিও যেন এই সুমদ্রের মধ্যেই শুয়ে আছে! কখনো এই সমুদ্রের মধ্যেই আমি দেখেছি জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য তারা, চাঁদ ভাসছে সমুদ্রে হঠাৎ সমুদ্রের মধ্যে এই নীলাকাশ দেখে আমি কেমন বিহ্বল ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ি; আর আমার সমুদ্র দেখা হয় না, সমুদ্রের কলতান আমার কাছে মনে হতে থাকে তোমার ব্যাকুল আহ্বান যেন, তাই কেউ যখন পাহাড়ের উচ্চতা মাপতে যায় আমি তখন মৌনতা বিষয়ে ভাবতে থাকি। আমি হয়তো সমুদ্রে ঠিক সমুদ্র দেখতে পাই না পাহাড়ে ঠিক পাহাড়, হয়তো সমুদ্রের চেয়েও কিছু বেশি পাহাড়ের চেয়েও কিছু অধিক আমি সেই সমুদ্র ও পাহাড়কেই হয়তো নাম দিতে চাই কবির তন্ময়তা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1515
5469
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জবাব
মানবতাবাদী
আশংকা নয় আসন্ন রাত্রিকে মুক্তি-মগ্ন প্রতিজ্ঞায় চারিদিকে হানবে এবার অজস্র মৃত্যুকে; জঙ্গী-জনতা ক্রমাগত সম্মুখে৷শত্রুদল গোপনে আজ, হানো আঘাত এসেছে দিন; পতেঙ্গার রক্তপাত আনে নি ক্রোধ, স্বার্থবোধ দুর্দিনে? উষ্ণমন শাণিত হোক সঙ্গীনে৷ক্ষিপ্ত হোক, দৃপ্ত হোক তুচ্ছ প্রাণ কাস্তে ধরো, মুঠিতে এক গুচ্ছ ধান৷ মর্ম আজ বর্ম সাজ আচ্ছাদন করুক : চাই এদেশে বীর উৎপাদন৷শ্রমিক দৃঢ় কারখানায়, কৃষক দৃঢ় মাঠে, তাই প্রতীক্ষা, ঘনায় দিন স্বপ্নহীন হাটে৷ তীব্রতর আগুন চোখে, চরণপাত নিবিড় পতেঙ্গার জবাব দেবে এদেশের জনশিবির॥
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/jobab/
1691
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
সংসার
চিন্তামূলক
সংসার ছড়িয়ে গেছে ইস্টিশানে, পথে ও ফুটপাতে, আমরা আসতে-যেতে দেখতে পাই। আকাশে গোধূলি-লগ্নে বর্ণের সানাই বেজে যায়। মাঝে-মাঝে মধ্যরাতে জানালায় মুখ রেখে ভাবি যে, ভাষায় ফোটাতে পারিনি কোনো-কিছু। এবং দেখি যে, কাঁথাখানিতে নিজেকে ঢেকে নিয়ে সংসার চলেছে তার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে। মানুষ চলেছে পিছু-পিছু।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1535
5230
শামসুর রাহমান
শুধু একটি ভাবনা
রূপক
দেখি প্রত্যহ দুঃখের তটে ভাসে স্বপ্নের রুপালি নৌবহর। বিপদের এই ভীষণ আঁধিতে আজকে আমার একটি ভাবনা শুধুঃ কী করে বাঁচাই স্বপ্নের মায়াতরী?পথের প্রান্তে দেখি দিনরাত একটি বৃক্ষ-পিতৃপুরুষ যেন। মাথা নেড়ে নেড়ে বলেন সদাই- “বাচো, সুখী হও, তোমাদের ভালো হোক। বিপদের এই ভীষণ আঁধিতে আজকে আমার একটি ভাবনা শুধুঃ দিগন্ত-জোড়া প্রলয়ের ঝড়ে কী করে বাঁচাই প্রবীণ বৃক্ষটিকে?আজকাল লোকে যায় না বাগানে, তবু তো ধুলায় গোলাপ বাগান বাঁচে। সেখানে পাখির কণ্ঠে ধ্বনিত হৃদয়-মথিত কতো মানবিক গান। বিপদের এই ভীষণ আঁধিতে আজকে আমার একটি ভাবনা শুধুঃ ফাগুনের স্মৃতি ঝলকিত ফুল কী করে বাঁচাই বারুদের ঘ্রাণ থেকে?আমার মায়ের প্রশান্ত চোখ জেগে রয় রোজ সংসারে নানা কাজে। প্রসারিত তাঁর হাতের মায়ায় অন্ধকারেও জ্বলে ওঠে দীপাবলি। বিপদের এই ভীষণ আঁধিতে আজকে আমার একটি ভাবনা শুধুঃ দিগন্ত-জোড়া প্রলয়ের ঝড়ে কী করে বাঁচাই পুণ্য সে দীপাবলি? পুতুলের মতো আমার মেয়েটা সারাদিনমান পুতুল খেলায় মাতে। ডাকলে কেবলি দৌড়ে পালায়, লাল জুতুয়াটা কোথায় যে পড়ে থাকে। বিপদের এই ভীষণ আঁধিতে আজকে আমার একটি ভাবনা শুধুঃ হিংসুক সেই দৈত্যের থেকে কী করে বাঁচাই খুকির পুতুলগুলি?   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shudhu-ekti-vabna/
1986
বিষ্ণু দে
এবং লখিন্দর!
প্রেমমূলক
হৃদয় তোমাকে পেয়েছি, স্রোতস্বিনী! তুমি থেকে থেকে উত্তাল হয়ে ছোটো, কখনো জোয়ারে আকণ্ঠ বেয়ে ওঠো তোমার সে-রূপ বেহুলার মতো চিনি। তোমার উৎসে স্মৃতি করে যাওয়া আসা মনে-মনে চলি চঞ্চল অভিযানে, সাহচর্যেই চলি, নয় অভিমানে, আমার কথায় তোমারই তো পাওয়া ভাষা। রক্তের স্রোতে জানি তুমি খরতোয়া, ঊর্মিল জলে পেতেছি আসনপিঁড়ি, থৈথৈ করে আমার ঘাটের সিঁড়ি, কখনো-বা পলিচড়া-ই তোমার দোয়া। তোমারই তো গান মহাজনী মাল্লার, কখনো পান্সী-মাঝি গায় ভাটিয়ালি, কখনো মৌন ব্যস্তের পাল্লায়, কখনো-বা শুধু তক্তাই ভাসে খালি। কত ডিঙি ভাঙো, যাও কত বন্দর, কত কী যে আনো, দেখো কত বিকিকিনি, তোমার চলায় ভাসাও, স্রোতস্বিনী,
http://kobita.banglakosh.com/archives/4125.html
295
কাজী নজরুল ইসলাম
গোঁড়ামি ধর্ম নয়
ভক্তিমূলক
শুধুগুণ্ডামি, ভণ্ডামি আর গোঁড়ামি ধর্ম নয়, এই গোঁড়াদের সর্বশাস্ত্রে শয়তানি চেলা কয়। এক সে স্রষ্টা সব সৃষ্টির এক সে পরম প্রভু, একের অধিক স্রষ্টা কোনো সে ধর্ম কহে না কভু। তবু অজ্ঞানে যদি শয়তানে শরিকি স্বত্ব আনে, তার বিচারক এক সে আল্লা –লিখিত আল-কোরানে। মানুষ তাহার বিচার করিতে পারে না, নরকে তারে অথবা স্বর্গে কোন মানুষের শক্তি পাঠাতে পারে? ‘উপদেশ শুধু দিবে অজ্ঞানে’ – আল্লার সে হুকুম, নিষেধ কোরানে – বিধর্মীপরে করিতে কোনো জুলুম। কেন পাপ করে, ভুল পথে যায় মানবজন্ম লয়ে, কেন আসে এই ধরাতে জন্ম-অন্ধ পঙ্গু হয়ে, কেন কেহ হয় চিরদরিদ্র, কেহ চিরধনী হয়, কেন কেউ অভিশপ্ত, কাহারও জীবন শান্তিময়? কোন শাস্ত্রী বা মৌলানা বলো, জেনেছে তাহার ভেদ? গাধার মতন বয়েছে ইহারা শাস্ত্র কোরান বেদ!জীবনে যে তাঁরে ডাকেনিকো, প্রভু ক্ষুধার অন্ন তার কখনো বন্ধ করেননি কেন, কে করে তার বিচার? তাঁর সৃষ্টির উদার আকাশ সকলেরে থাকে ঘিরে, তাঁর বায়ু মসজিদে মন্দিরে সকলের ঘরে ফিরে। তাঁহার চন্দ্র সূর্যের আলো করে না ধর্ম ভেদ, সর্বজাতির ঘরে আসে, কই আনে না তো বিচ্ছেদ! তাঁর মেঘবারি সব ধর্মীর মাঠে ঘাটে ঘরে ঝরে, তাঁহার অগ্নি জ্বলে, বায়ু বহে সকলেরে সেবা করে। তাঁর মৃত্তিকা ফল ফুল দেয় সর্বজাতির মাঠে, কে করে প্রচার বিদ্বেষ তবু তাঁর এ প্রেমের হাটে? কোনো ‘ওলি’ কোনো দরবেশ যোগী কোনো পয়গম্বর, অন্য ধর্মে, দেয়নিকো গালি, – কে রাখে তার খবর? যাহারা গুণ্ডা, ভণ্ড, তারাই ধর্মের আবরণে স্বার্থের লোভে খ্যাপাইয়া তোলে অজ্ঞান জনগণে। জাতিতে জাতিতে ধর্মে ধর্মে বিদ্বেষ এরা আনি আপনার পেট ভরায়, তখ্‌ত চায় এরা শয়তানি। ধর্ম-আন্দোলনের ছদ্মবেশে এরা কুৎসিত, বলে এরা, হয়ে মন্ত্রী, করিবে স্বধর্মীদের হিত। এরা জমিদার মহাজন ধনী নওয়াবি খেতাব পায়, কারও কল্যাণ চাহে না ইহারা, নিজ কল্যাণ চায়। ধনসম্পদ এত ইহাদের, করেছে কি কভু দান? আশ্রয় দেয় গরিবে কি কভু এদের ঘর দালান? ধর্ম জাতির নাম লয়ে এরা বিষাক্ত করে দেশ, এরা বিষাক্ত সাপ, ইহাদেরে মেরে করো সব শেষ। নাই পরমত-সহিষ্ণুতা সে কভু নহে ধার্মিক, এরা রাক্ষস-গোষ্ঠী ভীষণ অসুর-দৈত্যাধিক। উৎপীড়ন যে করে, নাই তার কোনো ধর্ম ও জাতি, জ্যোতির্ময়েরে আড়াল করেছে, এরা আঁধারের সাথি! মানবে মানবে আনে বিদ্বেষ, কলহ ও হানাহানি, ইহারা দানব, কেড়ে খায় সব মানবের দানাপানি। এই আক্ষেপ জেনো তাহাদের মৃত্যুর যন্ত্রণা, মরণের আগে হতেছে তাদের দুর্গতি লাঞ্ছনা। এক সে পরম বিচারক, তাঁর শরিক কেহই নাই, কাহারে শাস্তি দেন তিনি, দেখো দুদিন পরে তা ভাই! মোরা দরিদ্র কাঙাল নির্যাতিত ও সর্বহারা, মোদের ভ্রান্ত দ্বন্দ্বের পথে নিতে চায় আজ যারা আনে অশান্তি উৎপাত আর খোঁজে স্বার্থের দাঁও, কোরানে আল্লা এদেরই কন – ‘শাখা-মৃগ হয়ে যাও।’  (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/gorami-dhormo-noy/
1548
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ঈশ্বর! ঈশ্বর!
চিন্তামূলক
ঈশ্বরের সঙ্গে আমি বিবাদ করিনি। তবুও ঈশ্বর হঠাৎ আমাকে ছেড়ে কোথায় গেলেন? অন্ধকার ঘর। আমি সেই ঘরের জানলায় মুখ রেখে দেখতে পাই, সমস্তা আকাশে লাল আভা, নিঃসঙ্গ পথিক দূর দিগন্তের দিকে চলেছেন। অস্ফুট গলায় বলে উঠি : ঈশ্বর! ঈশ্বর!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1586
2013
ব্রত চক্রবর্তী
মিলিদি
মানবতাবাদী
অনেকদিন পর রাস্তায় তোমাকে দেখলাম, মিলিদি। বুড়ি হয়ে গেছ। না থাক, বর্ণনা। তবে ভারি কষ্ট হলো। কী রূপ ছিল তোমার, একদা। সেই জাঁকজমকের বিয়ে মনে পড়ল। কিন্তু ফিরলে ক’মাস পরেই। স্বামী লোকটার আরেকটা সংসার দেখে, অসহ্য রাগে। তুমি আর যাওনি, সে-ও নেয়নি। তারপর কত বছর। বয়স গা থেকে গড়িয়ে গেল, রূপ, সোনার দিনগুলো। বাপের সংসারে বড়ি দিতে দিতে, কাপড় কাচতে কাচতে, সেলাইয়ের ফোঁড় তুলতে তুলতে। চতুর্দিকে কত বদল তারপর। তুমি রয়ে গেলে সেই অথৈ বিষাদজলে শরীর ডুবিয়ে মন ডুবিয়ে। এই সেদিন গঙ্গার জল গিয়ে পড়ল পদ্মায়, হংকং ঢুকে গেল চিনে, তুমি কই কোনও নতুন ঘটনা নিলে না জীবনে। কী পেলে মিলিদি, এতগুলো বছর? চিনতেই পারনি। নাম ধরে ডাকতে থমকে দাঁড়ালে। অল্প মুখ তুললে। চোখ। আর আমি ভীষণ চমকাই দেখে সিঁথির ধু ধু আলপথের পাশে একচিলতে সিঁদুর, আজও। আজও? ভীষণ রাগ হলো, হঠাৎ। তারপরই অসহায় হয়ে যাই তোমার কথা ভেবে, মিলিদি। ধু ধু আলপথ দেখি, তিলক ফোঁটার মতন ওই একচিলতে সিঁদুর দেখি, আর মনে মনে বলি, দুটো নদী পারল পরস্পরের ঢেউ মেলাতে, দুটো দেশ পারল, আর দুজন মানুষ পারে না?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%80/
589
কুসুমকুমারী দাশ
সাধন পথে
ভক্তিমূলক
এক বিন্দু অমৃতের লাগি কি আকুল পিপাসিত হিয়া, এক বিন্দু শান্তির লাগিয়া কর্মক্লান্ত দুটি বাহু দিয়া— কাজ শুধু করে যায় অন্তরেতে দুরন্ত সাধনা, তুমি তার দীর্ঘ পথে হবে সাথী একান্ত ভাবনা | সে জানে এ আরাধনা কবে তার হইবে সফল ; তব বাণী যেই দিন তারি ভাষা হয়ে ঘুচাবে সকল অন্তরের অহঙ্কার, স্তুতি, নিন্দা, ভয় সেদিন লভিবে শান্তি, সংগ্রামে বিজয় | তোমার স্বরূপে তার রূপ হবে লীন! সেই তার সাধনার পরম সুদিন |
http://kobita.banglakosh.com/archives/3870.html
3330
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নীলুবাবু বলে শোনো নেয়ামৎ দর্জি
হাস্যরসাত্মক
নীলুবাবু বলে, “শোনো নেয়ামৎ দর্জি, পুরোনো ফ্যাশানটাতে নয় মোর মর্জি।’ শুনে নিয়ামৎ মিঞা যতনে পঁচিশটে সম্মুখে ছিদ্র, বোতাম দিল পৃষ্ঠে। লাফ দিয়ে বলে নীলু, “এ কী আশ্চর্যি!’ ঘরের গৃহিণী কয়, “রয় না তো ধর্যি।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nilubabu-bole-shono-neyamot-dorji/
2404
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সিংহ ও মশক
নীতিমূলক
শঙ্খনাদ করি মশা সিংহে আক্রমিল; ভব-তলে যত নর, ত্রিদিবে যত অমর, আর যত চরাচর, হেরিতে অদ্ভুত যুদ্ধ দৌড়িয়া আইল। হুল-রূপ শূলে বীর, সিংহেরে বিঁধিল। অধীর ব্যথায় হরি, উচ্চ-পুচ্ছে ক্রোধ করি, কহিলা;—“কে তুই, কেন বৈরিভাব তোর হেন? গুপ্তভাবে কি জন্য লড়াই?— সম্মুখ-সমর কর্‌; তাই অামি চাই। দেখিব বীরত্ব কত দূর, আঘাতে করিব দর্প-চূর; লক্ষ্মণের মুখে কালি ইন্দ্রজিতে জয়-ডালি, দিয়াছে এ দেশে কবি।” কহে মশা;—“ভীরু, মহাপাপি, যদি বল থাকে, বিষম-প্রতাপি, অন্যায়-ন্যায়-ভাবে, ক্ষুধায় যা পায়, খাবে; ধিক্‌, দুষ্টমতি! মারি তোরে বন-জীবে দিব, রে, কু-মতি।'' হইল বিষম রণ, তুলনা না মিলে; ভীম দুর্য্যোধনে, ঘোর গদা-রণে, হ্রদ দ্বৈপায়নে, তীরস্থ সে রণ-ছায়া পড়িল সলিলে; ডরাইয়া জল-জীবী জল-জন্তুচয়ে, সভয়ে মনেতে ভাবিল, প্রলয়ে বুঝি এ বীরেন্দ্র-দ্বয় এ সৃষ্টি নাশিল! মেঘনাদ মেঘের পিছনে, অদৃশ্য অাঘাতে যথা রণে; কেহ তারে মারিতে না পায়, ভয়ঙ্কর স্বপ্নসম অাসে,—এসে যায়, জর-জরি শ্রীরামের কটক লঙ্কায়। কভু নাকে, কভু কাণে, ত্রিশূল-সদৃশ হানে হুল, মশা বীর। না হেরি অরিরে হরি, মুহুর্মুহুঃ নাদ করি, হইলা অধীর। হায়! ক্রোধে হৃদয় ফাটিল;— গত-জীব মৃগরাজ ভূতলে পড়িল! ক্ষুদ্র শত্রু ভাবি লোক অবহেলে যারে, বহুবিধ সঙ্কটে সে ফেলাইতে পারে;— এই উপদেশ কবি দিলা অলঙ্কারে।
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/singho-o-moshok/
2130
মহাদেব সাহা
কোথাও পাই না দেখা
স্বদেশমূলক
কেবল তোমারই দেখা পাই না কোথাও। যেন তুমি অদৃশ্য অলীক কিছু; স্বপ্নও জানে না কোনো খোঁজ তারও রুপালি পর্দায় কখনো ওঠে না ভেসে তোমার ইমেজ তুমি আছো এতোদূরে স্পর্শগন্ধহীন স্বপ্নেরাও সূক্ষ্ম অগোচরে কেবল তোমারই দেখা পাই না এখন। জনারণ্যে এভেন্যুর উদ্দীপনাময় ভিড়ে কোথাও তোমার দেখা নাই। তুমিই কি সেই অদৃশ্য স্বপ্নের পাখি কিংবা মায়াবী হরিণ ছিলে, আর কোনোখানে নেই, তুমি কি সেই গ্রীক পুরাণকাহিনী? না হলে পাই না কেন কোথাও তোমার দেখা? যদিও প্রত্যহ এ শহর জনসংখ্যার চাপেই অস্থির তার বাহুতে গ্রীবায় গণ্ডে কেবল চলেছে বেয়ে অবিরাম মানুষের ধারা; ফুটপাত, রাজপথ কিংবা বিপণি সিক্ত ও ব্যাকুল এই লোকের বন্যায় তবু তোমার একটি মুখ এ শহরে একান্ত দুর্লভ এমনকি কোনো মনোরম চিত্রশালা কিংবা মিউজিয়াম ঘুরেও কখনো তোমার একটি মুখ হয়নি তো নয়নগোচর শাগালের সুসমৃদ্ধ ঐশ্বর্যশালীন প্রদর্শনী জুড়ে সবার অজান্তে আমি খুঁজেছি তোমার মুখ; তোমারই দুটি চোখ পিকাসোর চিত্রময় অ্যালবাম ব্যেপে করেছি প্রত্যাশা যামিনী কি জয়নুল-কামরুলেও তন্নতন্ন খুঁজেছি তোমায় কি জানি হয়তো তুমি লোকচক্ষুর আড়ালে হয়ে আছো এ-রকমই কোনো মুগ্ধ শিল্পের ব্যঞ্জনা; আমারই ব্যর্থ চোখ দেখতে অক্ষম। হয়তোবা আর সকলেই অতি সহজেই তোমাকে দেখতে পায় কারো ঘরে অনিবার্যভাবে তুমি সন্ধ্যাদীপের মহিমা তাও জানি কিংবা কারো কাতানের কাতর প্রশংসা এমনকি হয়তোবা ফুটে আছো এইরূপই কোনো সংসারের পাশে লোকায়িত টবে, কেবল আমার জানা বা চেনা চাই কি স্বপ্নেরও অন্তরালে! কিছুই দেখতে চাই না তবু সবকিছু দেখি আর কেবল তোমারই পাই না দেখা। কেন যে আমার কাছে তুমি হলে এ-রকমই রূপহীন, বর্ণহীন, এই অবয়বহীন! হঠাৎ পথের মোড়ে দুপুরে কি পড়ন্ত সন্ধ্যায় এই অসংখ্য মুখে একটি মুখও কি রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে না তোমার মুখে অজস্র চোখের একটি চোখও কি অকস্মাৎ আমার সম্মুখে তোমার দুষ্প্রাপ্য চোখ হয়ে উঠতে পারে না তেমন? বলো একটি গোলাপও কি রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে না তোমার মৃদু ঠোঁটে? কিংবা মেঘও কি তোমার মূর্তি পেতে পারে না সহসা সব চিত্রশালা আর ভাস্কর্যের মেলা মুহূর্তে কি তোমার দিব্যদেহ নিয়ে একবারও জানাতে পারে না সম্ভাষন? জলাশয়ে বিচরণরত একটি মরাল তোমার গ্রীবার ভঙ্গি আমাকে কি পারে না দেখাতে? তার অর্থ তুমি কি বলতে চাও তোমার সাক্ষাৎলাভ স্বপ্নেও সম্ভব নয় আর! কিন্তু আমি তো ভালোই জানি তুমি যে মিশেই আছো এ-দেশেরই চিরন্তর শিল্পের ঐতিহ্যে, স্থাপত্য ও দেশজ কলায় তাই না দেখেও হয়তো প্রত্যহ আমি তোমাকেই প্রিয়তমা মানি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1517
3999
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্পষ্টভাষী
নীতিমূলক
বসন্ত এসেছে বনে, ফুল ওঠে ফুটি, দিনরাত্রি গাহে পিক, নাহি তার ছুটি। কাক বলে, অন্য কাজ নাহি পেলে খুঁজি, বসন্তের চাটুগান শুরু হল বুঝি! গান বন্ধ করি পিক উঁকি মারি কয়, তুমি কোথা হতে এলে কে গো মহাশয়? আমি কাক স্পষ্টভাষী, কাক ডাকি বলে। পিক কয়, তুমি ধন্য, নমি পদতলে; স্পষ্টভাষা তব কণ্ঠে থাক বারো মাস, মোর থাক্‌ মিষ্টভাষা আর সত্যভাষ।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/spostovashi/
5307
শামসুর রাহমান
সৌন্দর্যের স্পর্ধা নিয়ে
মানবতাবাদী
অগ্রসরমান, অগ্রসরমান, অগ্রসরমান, অতি দ্রুত চতুর্দিক থেকে নিরেট দেয়াল, সত্তা-চেপে-ধরা, দম-বন্ধ করা; দেয়ালের গায়ে সংখ্যাহীন সনাতনী উদ্যত তর্জনী, নিত্যদিন তার হাসি মুছে-ফেলা। কেউ কেউ ঢেলা ছুঁড়ে মজা লোটে, কেউবা শাসায় সর্বক্ষণ নানা ছলছুতোয়, সে নারী মাথা কোটে বিরূপ বাসায়, ছেঁড়া সুতোয় সেলাই করে পীড়িত যৌবন।কপালে, কোমরে, বুকে, হাতের চেটোয়, দু’টি পায়ে জন্মান্ধ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে বর্বরেরা; অট্রহাসি, উপহাস অবিরত, থুতু এবং দেয়ালঘেরা জীবন হাঁপায় জীর্ণ হাপরের মতো, তৃতীয় প্রহরে তার ফোঁপানিতে উনিশ শো নব্বই সালের ধুকপুক, বুকফাটা আওয়াজ, দূরন্ত বাজপাখি চক্রাকারে উড়ে ঠুকরে ঠুকরে খায় তার আর্ত হৃৎপিণ্ড অবেলায়।অলৌকিক কিছু ঘটবে না। ‘ধিক তোকে, এই ধ্বনি অন্ধকার থেকে উথিত, সে ত্রস্ত ভীত, ক্লান্ত, মূক মুখ হাতে ঢাকতেও পারছে না। গলগল রক্তবৃষ্টি, বিফল গোধূলি, বিচ্ছিন্নতা মহাগ্রাস; এক্ষুনি থামাও নারকীয় ক্রিয়াকর্ম, আলগোছে নামাও তোমরা ওকে পীড়নের মঞ্চ থেকে, ঢেকে দাও ওর কান্নায় উথলে-ওঠা ক্ষত জ্যোৎস্না-চন্দ্রনের মসলিনে কতকাল যন্ত্রণা পাঁজর খুলে নিয়ে সাজাবে কংকালকীর্ণ উদগ্র উদ্যান? ধ্যান তার প্রখর অঙ্কুশে বিদ্ধ, কবিতার ভ্রূণাবস্থা কাটে কালেভদ্রে এ দারুণ জন্মের খরায়। আছড়ায় অস্তিত্বকে শুধু ড্রাগ ত্র্যাডিক্টের মতো।কোথাও প্রহরী নেই, তবু সতর্ক পাহারাদার সবদিকে। সন্ধিগ্ধ, খণ্ডিত আসমান, অবিরত লাঠি ঠোকা, চোখা, একরোখা বল্লমের অন্ধ ক্রোধ; উনুনের পোড়া দাগ কাঁটার্ত চোখের নিচে, আপাতত শায়িতা সে, আহত সৌন্দর্য নিয়ে বিপন্ন, বিব্রত; স্নায়ুগুলো ছটফটে, যেন বাইপাস সার্জারির সুঁচোলো অপেক্ষা, ঝুঁকে-থাকা কিছু পাহাড়ি শকুন, পক্ষীতত্ত্ববিদের বিষয়ে উদাসীন, ছড়ায় আগ্রাসী ছায়া চঞ্চু নেড়ে নেড়ে। মুহূর্তেরা চূর্ণ কাচ, ছেঁড়া-খোঁড়া স্বপ্ন, ভূলুণ্ঠিত সৌন্দর্যের স্পর্ধা নিয়ে সে কি টান টান উঠে দাঁড়াবে আবার?   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/soundorjer-spordha-niye/
3742
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্যুদূত এসেছিল হে প্রলয়ংকর, অকস্মাৎ
চিন্তামূলক
মৃত্যুদূত এসেছিল হে প্রলয়ংকর, অকস্মাৎ তব সভা হতে। নিয়ে গেল বিরাট প্রাঙ্গণে তব; চক্ষে দেখিলাম অন্ধকার; দেখিনি অদৃশ্য আলো আঁধারের স্তরে স্তরে অন্তরে অন্তরে, যে আলোক নিখিল জ্যোতির জ্যোতি; দৃষ্টি মোর ছিল আচ্ছাদিয়া আমার আপন ছায়া। সেই আলোকের সামগান মন্দ্রিয়া উঠিবে মোর সত্তার গভীর গুহা হতে সৃষ্টির সীমান্ত জ্যোতির্লোকে, তারি লাগি ছিল মোর আমন্ত্রণ। লব আমি চরমের কবিত্বমর্যাদা জীবনের রঙ্গভূমে, এরি লাগি সেধেছিনু তান।বাজিল না রুদ্রবীণা নিঃশব্দ ভৈরব নবরাগে, জাগিল না মর্মতলে ভীষণের প্রসন্ন মুরতি তাই ফিরাইয়া দিলে। আসিবে আরেক দিন যবে তখন কবির বাণী পরিপক্ব ফলের মতন নিঃশব্দে পড়িবে খসি’ আনন্দের পূর্ণতার ভারে অনন্তের অর্ঘ্যডালি পরে। চরিতার্থ হবে শেষে জীবনের শেষমূল্য, শেষযাত্রা, শেষনিমন্ত্রণ।   (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mrityudut-esechilo-he-proyongkor-okossmat/
3509
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন্দী
সনেট
দাও খুলে দাও, সখী, ওই বাহুপাশ — চুম্বনমদিরা আর করায়ো না পান । কুসুমের কারাগারে রুদ্ধ এ বাতাস — ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও বদ্ধ এ পরান । কোথায় উষার আলো, কোথায় আকাশ — এ চির পূর্ণিমারাত্রি হোক অবসান! আমারে ঢেকেছে তব মুক্ত কেশপাশ, তোমার মাঝারে আমি নাহি দেখি ত্রাণ । আকুল অঙ্গুলিগুলি করি কোলাকুলি গাঁথিছে সর্বাঙ্গে মোর পরশের ফাঁদ । ঘুমঘোরে শূন্যপানে দেখি মুখ তুলি শুধু অবিশ্রামহাসি একখানি চাঁদ । স্বাধীন করিয়া দাও, বেঁধো না আমায় — স্বাধীন হৃদয়খানি দিব তার পায় ।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bondi/
2720
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার পাচকবর গদাধর মিশ্র
ছড়া
আমার পাচকবর গদাধর মিশ্র, তারি ঘরে দেখি মোর কুন্তলবৃষ্য। কহিনু তাহারে ডেকে,– “এ শিশিটা এনেছে কে, শোভন করিতে চাও হেঁশেলের দৃশ্য?’সে কহিল, “বরিষার এই ঋতু; সরিষার কহে, “কাঠমুণ্ডার নেপালের গুণ্ডার এই তেলে কেটে যায় জঠরের গ্রীষ্ম। লোকমুখে শুনেছি তো, রাজা-গোলকুণ্ডার এই সাত্ত্বিক তেলে পূজার হবিষ্য। আমি আর তাঁরা সবে চরকের শিষ্য।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-pachkobor-godadhor-mishro/
4522
শামসুর রাহমান
ক-এর আঙুল থেকে
সনেট
ক-এর আঙুল থেকে একটি কী পথ বহুদূরে গ্যাছে বেঁকে চিত্রবৎ, বৃক্ষশ্রেণী যেন দেবদূত, পৃথিবীর নিসর্গের বন্দনায় কেমন নিখুঁত সৌন্দর্যে এসেছে নেমে আসমান থেকে নম্র উড়ে। ক-এর ওষ্ঠের তটে তৃষ্ণার্ত হরিণ ঘুরে ঘুরে ফিরে যায় বারংবার জলকষ্টে, হিংস্র পদচ্ছাপ চোখের নিচের বালিয়াড়ি ধরে রাখে, হলদে সাপ, কেবলি দলতে থাকে সাবলীল তার গলা জুড়ে।সে পথের কাছে আজ ক-এর কী বলার আছে? পথ বড় উদাসীন, নিশ্চুপ সর্বদা। তার ভাষা বুঝলেও কখনো দেবো না সাড়া; ক-এর মুখের ভেতরে আদিম জলপরী এবং কিন্নরী নাচে, পাঁজর-প্রান্তরে বুকভাঙা ডাক ঘোড় সওয়ারের। সে-পথ রাখে না মনে কারো চলে-যাওয়া,ফিরে-আসা।  (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ko-er-angul-theke/
5523
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মার্শাল তিতোর প্রতি
মানবতাবাদী
মানবতাবাদী মার্শাল তিতোর প্রতিকমরেড, তুমি পাঠালে ঘোষণা দেশান্তরে, কুটিরে কুটিরে প্রতিধ্বনি,— তুলেছে মুক্তি দারুণ তুফান প্রাণের ঝড়ে তুমি শক্তির অটুট খনি৷ কমরেড, আজ কিষাণ শ্রমিক তোমার পাশে তুমি যে মুক্তি রটনা করো, তারাই সৈন্য : হাজারে হাজারে এগিয়ে আসে তোমার দু’পাশে সকলে জড়ো৷ হে বন্ধু, আজ তুমি বিদ্যুৎ অন্ধকারে সে আলোয় দ্রুত পথকে চেনা : সহসা জনতা দৃপ্ত গেরিলা—অত্যাচারে, দৃঢ় শত্রুর মেটায় দেনা৷ তোমার মন্ত্র কোণে কোণে ফেরে সংগোপনে পথচারীদের ক্ষিপ্রগতি; মেতেছে জনতা মুক্তির দ্বার উদঘাটনে : —ভীরু প্রস্তাবে অসম্মতি৷ ফসলের ক্ষেতে শত্রু রক্ত-সেচন করে, মৃত্যুর ঢেউ কারখানাতে— তবুও আকাশ ভরে আচমকে আর্তস্বরে : শত্রু নিহত স্তব্ধ রাতে৷ প্রবল পাহাড়ে গোপন যুদ্ধ সঞ্চারিত দৃঢ় প্রতিজ্ঞা মুখর গানে, বিপ্লবী পথে মিলেছে এবার বন্ধু তিতো : মুক্তির ফৌজ আঘাত হানে৷ শত্রু শিবিরে লাগানো আগুনে বাঁধন পোড়ে —অগ্নি ইশারা জনান্তিকে! ধ্বংসস্তূপে আজ মুক্তির পতাকা ওড়ে ভাঙার বন্যা চতুর্দিকে৷ নামে বসন্ত, পাইন বনের শাখায় শাখায় গাঢ়-সংগীত তুষারপাতে, অযুত জীবন ঘনিষ্ঠ দেহে সামনে তাকায় : মারণ-অস্ত্র সবল হাতে৷ লক্ষ জনতা রক্তে শপথ রচনা করে— ‘আমরা নই তো মৃত্যুভীত, তৈরি আমরা; যুগোশ্লাভের প্রতিটি ঘরে তুমি আছ জানি বন্ধু তিতো৷’ তোমার সেনানী পথে প্রান্তরে দোসর খোঁজে : ‘কোথায় কে আছ মুক্তিকামী?’ ক্ষিপ্ত করেছে তোমার সে ডাক আমাকেও যে তাইতো তোমার পেছনে আমি॥‘মার্শাল তিতোর প্রতি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪৪৷
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/marshal-titor-proti/
5529
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মৃত্যুজয়ী গান
মানবতাবাদী
নিয়ত দক্ষিণ হাওয়া স্তব্ধ হল একদা সন্ধ্যায় অজ্ঞাতবাসের শেষে নিদ্রাভঙ্গে নির্বীর্য জনতা সহসা আরণ্য রাজ্যে স্তম্ভিত সভয়ে; নির্বায়ুমণ্ডল ক্রমে দুর্ভাবনা দৃঢ়তর করে। দুরাগত স্বপ্নের কী দুর্দিন! মহামারী অন্তরে বিক্ষোভ, সঞ্চারিত রক্তবেগ পৃথিবীর প্রতি ধমনীতেঃ অবসন্ন বিলাসের সঙ্কুচিত প্রাণ। বণিকের চোখে আজ কী দুরন্ত লোভ ঝ'রে পড়েঃ মুহুর্মুহু রক্তপাতে স্বধর্ম সূচনা; ক্ষয়িষ্ণু দিনেরা কাঁদে অনর্থক প্রসব ব্যথায়। নশ্বর পৌষদিন, চারিদিকে ধূর্তের সমতা জটিল আবর্তে শুধু নৈমিত্তিক প্রাণের স্পন্দন; শোকচ্ছন্ন আমাদের সনাতন মন পৃথিবীর সম্ভাবিত অকাল মৃত্যুতেঃ দুর্দিনের সমন্বয়, সম্মুখেতে অনন্ত প্রহর- দৃষ্টিপথ অন্ধকার, সন্দিহান আগামী দিনেরা। গলিত উদ্যম তাই বৈরাগ্যের ভান, কণ্টকিত প্রতীক্ষায় আমাদের অরণ্যবাসর। সহসা জানালায় দেখি দুর্ভিক্ষের স্রোতে জনতা মিছিলে আসে সংঘবদ্ধ প্রাণ- অদ্ভুত রোমাঞ্চ লাগে সমুদ্র পর্বতে; সে মিছিলে শোনা গেল জনতার মৃত্যুজয়ী গান।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/276
557
কাজী নজরুল ইসলাম
হিংসাতুর
চিন্তামূলক
হিংসাই শুধু দেখেছ এ চোখে? দেখ নাই আর কিছু? সম্মুখে শুধু রহিলে তাকায়ে, চেয়ে দেখিলে না পিছু! সম্মুখ হতে আঘাত হানিয়া চলে গেল যে-পথিক তার আঘাতেরই ব্যথা বুকে ধরে জাগ আজও অনিমিখ? তুমি বুঝিলে না, হায়, কত অভিমানে বুকের বন্ধু ব্যথা হেনে চলে যায়!আঘাত তাহার মনে আছে শুধু, মনে নাই অভিমান? তোমারে চাহিয়া কত নিশি জাগি গাহিয়াছে কত গান, সে জেগেছে একা – তুমি ঘুমায়েছ বেভুল আপন সুখে, কাঁটার কুঞ্জে কাঁদিয়াছে বসি সে আপন মনোদুখে, কুসুম-শয়নে শুইয়া আজিকে পড়ে না সেসব মনে, তুমি তো জান না, কত বিষজ্বালা কণ্ঠক-দংশনে! তুমি কি বুঝিবে বালা, যে আঘাত করে বুকের প্রিয়ারে, তার বুকে কত জ্বালা!ব্যথা যে দিয়াছে – সম্মুখে ভাসে নিষ্ঠুর তার কায়া, দেখিলে না তব পশ্চাতে তারই অশ্রু-কাতর ছায়া!.. অপরাধ শুধু মনে আছে তার, মনে নাই কিছু আর? মনে নাই, তুমি দলেছ দুপায়ে কবে কার ফুলহার?কাঁদয়ে কাঁদিয়া সে রচেছে তার অশ্রুর গড়খাই, পার হতে তুমি পারিলে না তাহা, সে-ই অপরাধী তাই? সে-ই ভালো, তুমি চিরসুখী হও, একা সে-ই অপরাধী! কী হবে জানিয়া, কেন পথে পথে মরুচারী ফেরে কাঁদি!হয়তো তোমারে করেছে আঘাত, তবুও শুধাই আজি, আঘাতের পিছে আরও কিছু কি গো ও বুকে ওঠেনি বাজি? মনে তুমি আজ করিতে পার কি –তব অবহেলা দিয়া কত যে কঠিন করিয়া তুলেছ তাহার কুসুম-হিয়া? মানুষ তাহারে করেছ পাষাণ–সেই পাষাণের ঘায় মুরছায়ে তুমি পড়িতেছ বলে সেই অপরাধী হায়? তাহারই সে অপরাধ – যাহার আঘাতে ভাঙিয়া গিয়াছে তোমার মনের বাঁধ!কিন্তু কেন এ অভিযোগ আজি? সে তো গেছে সব ভুলে! কেন তবে আর রুদ্ধ দুয়ার ঘা দিয়া দিতেছে খুলে? শুষ্ক যে-মালা আজিও নিরালা যত্নে রেখেছে তুলি ঝরায়ো না আর নাড়া দিয়ে তার পবিত্র ফুলগুলি! সেই অপরাধী, সেই অমানুষ, যত পার দাও গালি! নিভেছে যে-ব্যথা দয়া করে সেথা আগুন দিয়ো না জ্বালি!‘মানুষ’, ‘মানুষ’শুনে শুনে নিতি কান হল ঝালাপালা! তোমরা তারেই অমানুষ বল – পায়ে দল যার মালা! তারই অপরাধ – যে তার প্রেম ও অশ্রুর অপমানে আঘাত করিয়া টুটায়ে পাষাণ অশ্রু-নিঝর আনে! কবি অমানুষ – মানিলাম সব! তোমার দুয়ার ধরি কবি না মানুষ কেঁদেছিল প্রিয় সেদিন নিশীথ ভরি? দেখেছ ঈর্ষা – পড়ে নাই চোখে সাগরের এত জল? শুকালে সাগর –দেখিতেছ তার সাহারার মরুতল! হয়তো কবিই গেয়েছিল গান, সে কি শুধু কথা – সুর কাঁদিয়াছিল যে – তোমারই মতো সে মানুষ বেদনাতুর! কবির কবিতা সে শুধু খেয়াল? তুমি বুঝিবে না, রানি, কত জ্বাল দিলে উনুনের জলে ফোটে বুদ‍্‍বুদ‍্-বাণী! তুমি কী বুঝিবে, কত ক্ষত হয়ে বেণুর বুকের হাড়ে সুর ওঠে হায়, কত ব্যথা কাঁদে সুর-বাঁধা বীণা-তারে!সেদিন কবিই কেঁদেছিল শুধু? মানুষ কাঁদেনি সাথে? হিংসাই শুধু দেখেছ, দেখনি অশ্রু নয়ন-পাতে? আজও সে ফিরিছে হাসিয়া গাহিয়া? –হায়, তুমি বুঝিবে না, হাসির ফুর্তি উড়ায় যে – তার অশ্রুর কত দেনা!   (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/hingsatur/
2470
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
কথন
নীতিমূলক
বিবেক যখন কড়াও নাড়ে না দুয়ারে তখন কোনোই বিভেদ থাকে কি মানুষে এবং শুয়ারে মাকড়ের ছানা মাকে খেয়ে হয় পুষ্ট নিজে বেঁচে আছে এতেই সে সন্তুষ্ট আপাত এসব সন্তুষ্টির পুলকে অষ্ট চরণে নাচে আর নাচে ভুলেও আসেনা স্মরণে মায়ের মতোই সেও একদিন শূন্য খোলস হবে তো তাকে খেয়ে কিছু অটপেয়ে প্রাণী মাতবেই উৎসবে তো শুয়ার মাকড় ইত্যাদি যত ইতর প্রাণীর ধর্ম মর্মে পোষণ করার পরেও শুধু মানুষের চর্ম বাঁচাতে পারে কি মনুষ্যত্ব --- প্রশ্নটা না-কি হেঁয়ালি জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছোঁড়ে তাই খ্যাপা শেয়ালই জানে না শেয়াল তাকে পণ্ডিত বলে বিদ্রূপ বচনে মূর্খের কাছে সেটাই সত্যি, বোঝা যায় তার রচনে।মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান // ১৫/ ০৪/ '১৭ (১লা বৈশাখ)
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/kathan/
3739
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্তিকা খোরাকি দিয়ে
রূপক
মৃত্তিকা খোরাকি দিয়ে বাঁধে বৃক্ষটারে, আকাশ আলোক দিয়ে মুক্ত রাখে তারে।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mrittika-khoraki-die/
4287
শামসুর রাহমান
অগ্নিপথ
মানবতাবাদী
নদীর ঝাপ্টায় চমকে উঠে তাকাই, উপকূলের ঘুম সত্তা ছেড়ে মেঘমালায় লীনঃ কয়েকটি পাখি চঞ্চুতে রৌদ্রের অকপট সততা নিয়ে আমাকে প্রদক্ষিণ করে, ওদের ডানায় ঢেউয়ের স্বরগ্রাম, চোখে ভবিষ্যতের নীলকান্ত মণির বিচ্ছুরণ, বন্ধুরা কোথায়? আমারতো একসঙ্গে স্তব্ধতাকে গান উপহার দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম পর্যটনে।ডাঙায় নৌযানের টুকরো টাকরা এক বিপর্যয়ের মূক কথক; দূর দিগন্তের গা ধুইয়ে উতরোল জলরাশি; সারা শরীরে মাঝ গাঙের জলজ ঘ্রাণ, মৎস্যঘ্রাণ নিয়ে অবসাদের বালির চিকচিকে শয্যায় শুয়ে আছি, সহযাত্রীরা কোন অন্ধকারে অন্ধকার হয়ে হিংস্র অতীতের দখলে? পাখির চিৎকারে চিন্তা তরঙ্গে নেমে আসে আর্তনাদ ছেড়ে যাওয়ার পরের স্তব্ধতা। গা ঝাড়া দিই জলচর পাখির মতো। আমাকে ফিরে যেতে হবে অনেক আগেকার বিস্ফোরণের বলয়ে, এক অগ্নিপথ থেকে অন্য অগ্নিপথে যেতে হবে হেঁটে। সেখানে এই বিড়ম্বিত ব-দ্বীপের ইতিহাস রাজহাঁসের মতো গ্রীবা তুলে দাঁড়ানো।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ognipoth/
4987
শামসুর রাহমান
বন্ধুকে প্রস্তাব
মানবতাবাদী
এই যে ইয়ার খানিক দাঁড়াও। এমন হনহনিয়ে কোথায় যাচ্ছ? এত তাড়া কিসের মানিক? আখেরে কথায় পৌঁছতে চাও? এতকাল পরে এ-শহরে হঠাৎ তোমার সঙ্গে মোলাকাত; দু-দণ্ড বাতচিত করা যাক কোথাও আরামসে ব’সে যৎকিঞ্চিৎ ভেজানো যাক গলা। নাকি এভাবেই ফুটপাথে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কিস্‌সা খতম করে দেবে, ভেবেছ।চলো না যাই, চা খাই ব’সে আমাদের সেই চেনা চা-খানায়! বিলকুল আগের মতোই আছে বেবাক; শুধু চেয়ার আর টুলগুলো আরও নড়বড়ে হয়েছে, টেবিলগুলো রোঁয়া-ওঠা কুকুরের মতো আরও বয়স্ক। সেই কোঁকড়া-চুল বেয়ারাটা-মনে পড়ে ওর কথা-গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে তিন বছর আগে। আজ থেকে-থেকে কত স্মৃতিই না জাগে তোমার দিকে তাকিয়ে, তোমার ছাই ঝাড়ার ভঙ্গি দেখে।তো, মাই ডিয়ার ফেলো, আজকাল কী হাল-হকিকত তোমার, মঞ্চে-টঞ্চে কেমন বোলচাল দিচ্ছ, বলো। লেখা-টেখার ময়ূরপঙ্খী নাও বাইছ কোন খালে? এখনও কি হর-হামেশা পুরোনো নেশায় মজে মেতে হুজুগে তেমন মালই চালাচ্ছ যা চার যুগ আগেই বস্তাপচা বলে বাতিল করেছে ইউরোপ। দাদাবাদের ভূত আজও কি নামেনি ঘাড় থেকে? উড়ো কথা কানে আসে, তুমি নাকি কবিতা লেখার ফাঁকে-ফাঁকে সস্তা চিটচিটে উপন্যাসের ঊর্ণাজালে পাঠক আটকে কেল্লাফতে করছো। তাহলে কী হিল্লে হবে আমাদের অহল্যা কাব্যেরসত্যি দোস্ত, তোমার রকম-সকম ভালো ঠেকছে না। খাতায় খাতায় আদুরে পায়রার চোস্ত বকবকম বুলি ছিটিয়ে চালাবে আর কতকাল? একদিন যারা তোমার এই কানামাছি খেলা হাতে-নাতে ধরে ফেলবে, তারা বাড়ছে ঘরে-ঘরে। আচ্ছা, তোমার এত কেমন খেয়াল বলো তো, প্রহরে-প্রহরে মিথ্যের সাজি ভরে তুলে কী আনন্দ পাও তুমি? বরং যা কিছু সাচ্চা তার জন্যে উঠোন নিকিয়ে রাখো, মাধুর্যের রঙ ছড়িয়ে আলপনা আঁকো, খুলে রাখো দরজা।এবার তোমার ক্রীতদাস লেখনীকে স্পার্টাকাসের মতো ঘাড় ঝাঁকিয়ে, শক্ত, ঠাণ্ডা শেকল ছিঁড়ে আয়ামে জাহেলিয়াতের দম-বন্ধ করা অন্ধকারে নতুন কথার স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে বলো।   (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bondhuke-prostab/
1717
পাবলো নেরুদা
আর কিছু নয়
চিন্তামূলক
আর কিছু নয় সত্যের সাথে আমার চুক্তি এ পৃথিবীর জন্যে সঞ্চয় করবো আলো আমি যা চাই তা হলো রুটি সংগ্রাম কোনো দিনই অভাব অনুভব করবে না আমার অথচ এখানে যাকিছু ভালোবাসি সবই পেয়েছি যা হারিয়েছি তা হলো নির্জনতা। এখন আমি আর ওই পাথরের ছায়ায় বিশ্রাম নিই না সমুদ্র কাজ করে চলেছে নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে আমার সত্বায়।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3936.html
2605
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপমান-বর
গীতিগাথা
ভক্ত কবীর সিদ্ধপুরুষ খ্যাতি রটিয়াছে দেশে। কুটির তাহার ঘিরিয়া দাঁড়ালো লাখো নরনারী এসে। কেহ কহে 'মোর রোগ দূর করি মন্ত্র পড়িয়া দেহো', সন্তান লাগি করে কাঁদাকাটি বন্ধ্যা রমণী কেহ। কেহ বলে 'তব দৈব ক্ষমতা চক্ষে দেখাও মোরে', কেহ কয় 'ভবে আছেন বিধাতা বুঝাও প্রমাণ করে'।কাঁদিয়া ঠাকুরে কাতর কবীর কহে দুই জোড়করে, 'দয়া করে হরি জন্ম দিয়েছ নীচ যবনের ঘরে-- ভেবেছিনু কেহ আসিবেনা কাছে অপার কৃপায় তব, সবার চোখের আড়ালে কেবল তোমায় আমায় রব। একি কৌশল খেলেছ মায়াবী, বুঝি দিলে মোরে ফাঁকি। বিশ্বের লোক ঘরে ডেকে এনে তুমি পালাইবে নাকি!'ব্রাহ্মণ যত নগরে আছিল উঠিল বিষম রাগি-- লোক নাহি ধরে যবন জোলার চরণধুলার লাগি! চারি পোওয়া কলি পুরিয়া আসিল পাপের বোঝায় ভরা, এর প্রতিকার না করিলে আর রক্ষা না পায় ধরা। ব্রাহ্মণদল যুক্তি করিল নষ্ট নারীর সাথে-- গোপনে তাহারে মন্ত্রণা দিল, কাঞ্চন দিল হাতে।বসন বেচিতে এসেছে কবীর একদা হাটের বারে, সহসা কামিনী সবার সামনে কাঁদিয়া ধরিল তারে। কহিল,'রে শঠ, নিঠুর কপট, কহি নে কাহারো কাছে-- এমনি করে কি সরলা নারীরে ছলনা করিতে আছে! বিনা অপরাধে আমারে ত্যজিয়া সাধু সাজিয়াছ ভালো, অন্নবসন বিহনে আমার বরন হয়েছে কালো!'কাছে ছিল যত ব্রাহ্মণদল করিল কপট কোপ, 'ভণ্ডতাপস, ধর্মের নামে করিছ ধর্মলোপ! তুমি সুখে ব'সে ধুলা ছড়াইছ সরল লোকের চোখে, অবলা অখলা পথে পথে আহা ফিরিছে অন্নশোকে!' কহিল কবীর, 'অপরাধী আমি, ঘরে এসো নারী তবে-- আমার অন্ন রহিতে কেন বা তুমি উপবাসী রবে?'দুষ্টা নারীরে আনি গৃহমাঝে বিনয়ে আদর করি কবীর কহিল, 'দীনের ভবনে তোমারে পাঠাল হরি।' কাঁদিয়া তখন কহিল রমণী লাজে ভয়ে পরিতাপে, 'লোভে পড়ে আমি করিয়াছি পাপ, মরিব সাধুর শাপে।' কহিল কবীর, 'ভয় নাই মাতঃ, লইব না অপরাধ-- এনেছ আমার মাথার ভূষণ অপমান অপবাদ।'ঘুচাইল তার মনের বিকার, করিল চেতনা দান-- সঁপি দিল তার মধুর কণ্ঠে হরিনামগুণগান। রটি গেল দেশে--কপট কবীর, সাধুতা তাহার মিছে। শুনিয়া কবীর কহে নতশির, 'আমি সকলের নীচে। যদি কূল পাই তরণী-গরব রাখিতে না চাহি কিছু-- তুমি যদি থাক আমার উপরে আমি রব সব-নিচু।'রাজার চিত্তে কৌতুক হল শুনিতে সাধুর গাথা। দূত আসি তারে ডাকিল যখন সাধু নাড়িলেন মাথা। কহিলেন, 'থাকি সবা হতে দূরে আপন হীনতা-মাঝে; আমার মতন অভাজন জন রাজার সভায় সাজে!' দূত কহে, 'তুমি না গেলে ঘটিবে আমাদের পরমাদ, যশ শুনে তব হয়েছে রাজার সাধু দেখিবার সাধ।'রাজা বসে ছিল সভার মাঝারে, পারিষদ সারি সারি-- কবীর আসিয়া পশিল সেথায় পশ্চাতে লয়ে নারী। কেহ হাসে কেহ করে ভুরুকুটি, কেহ রহে নতশিরে, রাজা ভাবে--এটা কেমন নিলাজ রমণী লইয়া ফিরে! ইঙ্গিতে তাঁর সাধুরে সভার বাহির করিল দ্বারী, বিনয়ে কবীর চলিল কুটিরে সঙ্গে লইয়া নারী।পথমাঝে ছিল ব্রাহ্মণদল, কৌতুকভরে হাসে-- শুনায়ে শুনায়ে বিদ্রূপবাণী কহিল কঠিন ভাষে। তখন রমণী কাঁদিয়া পড়িল সাধুর চরণমূলে-- কহিল, 'পাপের পঙ্ক হইতে কেন নিলে মোরে তুলে! কেন অধমেরে রাখিয়া দুয়ারে সহিতেছ অপমান!' কহিল কবীর, 'জননী, তুমি যে আমার প্রভুর দান।'২৮ আশ্বিন, ১৩০৬
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/opoman-bor/
4998
শামসুর রাহমান
বলো তো তোমাকে ছেড়ে
প্রেমমূলক
বলো তো তোমাকে ছেড়ে কী করে থাকব এতদিন এ শহরে? শহরের পথ চেনে আমার নিভৃত পদধ্বনি, কোনো পুরনো গলির মোড় জানে আমার জুতোর গন্ধ কী রকম; এ চেনা নগরে কিছুদিন তোমাকে কোথাও খুঁজে পাবো না নিশ্চিত। তোমাকে না দেখে আর তোমার সুরেলা কণ্ঠস্বর না শুনে থাকতে হবে ভাবতেই পারি না, অথচ আমাকে দণ্ডাজ্ঞা মেনে নিতে হবে প্রতিবাদহীন!এখন শহর খুব বিপন্ন, আতঙ্কে কম্পমান; শান্তি-ছাওয়া ছাত্রাবাসে নেকড়ের মতো হানা দেয় জালিম পুলিশ, বুট লাথি মেরে হাওয়ায় ওড়ায় ছাত্রের ভাতের থালা; বন্দুকের বাঁট ভেঙে ফেলে হাত-পা নিদ্রিত শিক্ষার্থীর, ক্রুশবিদ্ধ মানবতা- এরই মধ্যে, প্রিয়তমা, নিরন্তর তোমাকেই ভাবি।  (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bolo-to-tomake-chere/
1705
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
স্বপ্ন-কোরক
মানবতাবাদী
তবু সে হয়নি শান্ত। দীর্ঘ অমাবস্যার শিয়রে যে-রাত্রে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে মলিনলাবণ্য স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার মমতা, যে-রাত্রে সমস্ত তুচ্ছ অর্থহীন কথা গানের মূর্ছনা হয়ে ওঠে, শোক শান্ত হয়, দুঃখ নিভে আসে, যে-রাত্রে শীতার্ত মন ফোটে কল্পনার সুন্দর কুসুম, নামে সান্ত্বনার জল চিন্তার আগুনে, আর আকন্যাকুমারীহিমাচল কপালে জ্যোৎস্নার পঙ্ক মেখে জেগে ওঠে অতলান্ত অন্ধকার সমুদ্রের থেকে,– তখনও দেখলাম তাকে, কী এক অশান্ত আশা নিয়ে সে খোঁজে রাত্রির পারাপার, দুই চোখে তার স্বপ্নের উজ্জ্বলশিখা প্রদীপ জ্বালিয়ে। সে এক পরম শিল্পী। সংশয়-দ্বিধার অন্ধকারে সে-ই বারে-বারে আলোকবর্তিকা জ্বালে, দুঃখ তার পায়ে মাথা কোটে, তারই তো চুম্বনে ফুল ফোটে, সে-ই তো প্রাণের বন্যা ঢালে তুঙ্গভদ্রা, গঙ্গায় কি ভাক্‌রা-নাঙালে। সে এক আশ্চর্য কবি, পাথরের গায়ে সে-ই ব্রহ্মকমল ফোটায়। কী যে নাম, মনে নেই তা তো– আবদুল রহিম কিংবা শংকর মাহাতো, অথবা অর্জুন সিং। মাঠে মাঠে প্রদীপ জ্বালিয়ে সে জাগে সমস্ত রাত স্বপ্নের কোরক হাতে নিয়ে। আমার সমস্ত সুখ, সকল দুঃখের কাছাকাছি সে আছে, আমিও তাই আছি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1630
2140
মহাদেব সাহা
চাই না কোথাও যেতে
স্বদেশমূলক
আমি তো তোমাকে ফেলে চাই না কোথাও যেতে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা মনোরম স্থানে, সমুদ্র-সৈকতে, স্বর্ণদ্বীপে- স্বপ্নেও শিউরে উঠি যখন দেখতে পাই ছেড়ে যাচ্ছি এই মেঠো পথ, বটবৃক্ষ, রাখালের বাঁশি, হঠাৎ আমার বুকে আছড়ে পড়ে পদ্মার ঢেউ আমার দুচোখে শ্রাবণের নদী বয়ে যায়; যখন হঠাৎ দেখি ছেড়ে যাচ্ছি সবুজ পালের নৌকো, ছেড়ে যাচ্ছি ঘরের মেঝেতে আমার মায়ের আঁকা সারি সারি লক্ষ্মীর পা বোবা চিৎকারে আর্তকণ্ঠে বলে উঠি হয়তো তখনই- তোমার বুকের মধ্যে আমাকে লুকিয়ে রাখো আমি এই মাটি ছেড়ে, মাটির সান্নিধ্য ছেড়ে, আকাশের আত্মীয়তা ছেড়ে, চাই না কোথাও যেতে, কোথাও যেতে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/1581.html
3240
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুয়োরানী
ছড়া
ইচ্ছে করে , মা , যদি তুই হতিস দুয়োরানী ! ছেড়ে দিতে এমনি কি ভয় তোমার এ ঘরখানি । ওইখানে ওই পুকুরপারে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে ও যেন ঘোর বনের মধ্যে কেউ কোত্থাও নেই । ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে , শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে থাকব দুজনেই । বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে , আসবে না কেউ তোমার কাছে , দিনরাত্তির কোমর বেঁধে থাকব পাহারাতে । রাক্ষসেরা ঝোপে ঝাড়ে মারবে উঁকি আড়ে আড়ে , দেখবে আমি দাঁড়িয়ে আছি ধনুক নিয়ে হাতে । আঁচলেতে খই নিয়ে তুই যেই দাঁড়াবি দ্বারে অমনি যত বনের হরিণ আসবে সারে সারে । শিঙগুলি সব আঁকাবাঁকা , গায়েতে দাগ চাকা চাকা , লুটিয়ে তারা পড়বে ভুঁয়ে পায়ের কাছে এসে । ওরা সবাই আমায় বোঝে , করবে না ভয় একটুও যে , হাত বুলিয়ে দেব গায়ে , বসবে কাছে ঘেঁষে । ফলসা - বনে গাছে গাছে ফল ধরে মেঘ করে আছে , ওইখানেতে ময়ূর এসে নাচ দেখিয়ে যাবে । শালিখরা সব মিছিমিছি লাগিয়ে দেবে কিচিমিচি , কাঠবেড়ালি লেজটি তুলে হাত থেকে ধান খাবে । দিন ফুরোবে , সাঁঝের আঁধার নামবে তালের গাছে । তখন এসে ঘরের কোণে বসব কোলের কাছে । থাকবে না তোর কাজ কিছু তো , রইবে না তোর কোনো ছুতো , রূপকথা তোর বলতে হবে রোজই নতুন করে । সীতার বনবাসের ছড়া সবগুলি তোর আছে পড়া ; সুর করে তাই আগাগোড়া গাইতে হবে তোরে । তার পরে যেই অশথবনে ডাকবে পেঁচা , আমার মনে একটুখানি ভয় করবে রাত্রি নিষুত হলে । তোমার বুকে মুখটি গুঁজে ঘুমেতে চোখ আসবে বুজে — তখন আবার বাবার কাছে যাস নে যেন চলে ! (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/duorani/
2384
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
রৌদ্র-রস
সনেট
শুনিনু গম্ভীর ধ্বনি গিরির গহ্বরে, ক্ষুধাৰ্ত্ত কেশরী যেন নাদিছে ভীষণে; প্রলয়ের মেঘ যেন গর্জ্জিছে গগনে ; সচূড়ে পাহাড় কাঁপে থর থর থরে, কাঁপে চারি দিকে বন যেন ভূকম্পনে ; উথলে অদূরে সিন্ধু যেন ক্রোধ-ভরে, যবে প্রভঞ্জন আসে নির্ঘোষ ঘোষণে। জিজ্ঞাসিনু ভারতীরে জ্ঞানার্থে সত্বরে! কহিলা মা;---''রৌদ্র নামে রস,রৌদ্র অতি, রাখি আমি,ওরে বাছা,বাঁধি এই স্থলে, (কৃপা করি বিধি মোরে দিলা এ শকতি) বাড়বাগ্নি মগ্ন যথা সাগরের জল। বড়ই কর্কশ-ভাষী,নিষ্ঠুর,দুর্ম্মতি, সতত বিবাদে মত্ত,পুড়ি রোষানলে।''
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/roudro-ros/
4312
শামসুর রাহমান
অপরূপ হাত
চিন্তামূলক
প্রিয় এই শহরের কোনও পথ দিয়ে হেঁটে যাই যখন একাকী ভোরবেলা হাওয়ার আদর উপভোগ করতে করতে আর বিরান বাগান ব’লে মনে হয় পরিবেশ, আর কেন যেন হাহাকার হু হু ক’রে জেগে ওঠে বারবার; নিজেকে কবরস্তানে অনুভব করি।কিছুক্ষণ পরে রোদ শিশুর হাসির মতো জেগে উঠে চুমো খায় সঙ্গীহীন এই পথচ্চারীটিকে। ভাবনার গোরস্তান দ্রুত উবে যায়, মানুষের সাড়া জাগে নানা দিকে আর কার যেন জ্বলজ্বলে ডাক আমাকে আচ্ছন্ন করে। এদিক সেদিক দৃষ্টি মেলে দিই আর কান পাতি।না, কেউ আমাকে ডাকছে না কোনও গলি অথবা কাছের চা-খানায় আপ্যায়ন করার উদ্দেশে। তবু কেন মনে হয় কে যেন ব্যাকুল কণ্ঠস্বরে আমন্ত্রণ ক্রমাগত জানাচ্ছে আমাকে। তাকে অবহেলা করে চলে যাওয়া অনুচিত হবে ব’লে সেদিকে বাড়াই পদযুগ।হায়, এগোতেই দৃষ্টি থেকে ঘরবাড়ি, মুক্ত পার্ক এবং দোকানপাট বেবাক উধাও চতুর্দিকে বালি, শুধু বালি আর আমি ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছি বড় দ্রুত বালির ভেতরে। ক্ষণকাল পরে যেন কার, সম্ভবত কোনও কল্যাণ কামিনী তার অপরূপ হাতে মুক্ত করেন আমাকে অনাবিল হেসে।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/oporup-hat/
1286
টুটুল দাস
তুই,
প্রেমমূলক
মন খারাপের এই যে আকাশ কান্না মুছে যেদিকে তাকাস, কুয়াশা পাবি খুঁজে।অল্পস্বল্প দিনের আলোয় রাস্তা জুড়ে মন্দ ভালোয়, হাঁটিস বুঝে সুঝে।একটা বিকেল ফালতু গেলে হাডুডু আর কাবাডি খেলে, সন্ধ্যে বেলা যাই।পার্কে তখন নেমেছে রাত ছাতার তলে আর দুটো হাত, কোথায় খুঁজে পাই?জ্যোৎস্না নামে শহর জুড়ে একলা হাঁটি লোকের ভিড়ে, কেউ দিলো না ডাকএমনি তেই ভুল ঠিকানা বিশটাকাতে রোল খাবোনা, পকেটে খিদে থাক।শান্ত মেয়ের বাদামবিলাস চোখের নিচে একটু জেলাস, চুরি করবোই আজনুপুর পায়ে অনেক দামি তার বদলে জাহান্নাম-ই, কবিতা দিয়েই সাজ।এই যে আমেজ মধ্যরাতে জোনাকি বসা মেহেন্দি হাতে, লুটিয়ে পড়ে চাঁদবৃষ্টি নামে দিন ফুরালে চাঁদের সাথে ভিজবি বলে, ফাঁকাই আছে ছাদ। টুটুল দাসের কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%87-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%a6-%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b8/
5160
শামসুর রাহমান
যাত্রা
সনেট
কোথায় লুকালে তুমি? বলো কোন্‌ সুদূর পাতালে দিনান্তে পালঙ্কে শুয়ে কাটাও প্রহর প্রিয়তমা? এখানে নেমেছে দশদিকে মৃত্যুর মতন অমা, সেখানে কি কেলিপরায়ণ তুমি স্মিত জ্যোৎস্নাজালে সোনালি মাছের মতো? নাকি তোমার নৌকোর পালে লেগেছে উদ্দাম হাওয়া অজানা সমুদ্রে। কী উপমা দেবো সে যাত্রার আজ? হয়তো মরুর বালি জমা হয়েছে তোমার কালো চোখে রোজ সন্ধ্যা ও সকালে।যেখানে তোমার পদচ্ছাপ প্রস্ফুটিত, বেজে ওঠে কণ্ঠস্বর কিংবা তুমি দর্পণে প্রতিফলিত, গান গাও গুনগুন সুরে, পারি না সেখানে যেতে, তবু সেদিকেই মুখ রেখে পথ হাঁটি। হতাশাই প্রভু সে-পথের জেনেও সর্বদা করি যাত্রা, কাঁটা ফোটে পায়ে; তোমাকেই পাবো, আমি কি এমনই পুণ্যবান?   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jatra/
5418
সলিল চৌধুরী
শপথ
মানবতাবাদী
সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে হরতাল হয়েছিলো সেদিন আকাশে জলভরা মেঘ বৃষ্টির বেদনাকে বুকে চেপে ধরে থমকে দাঁড়িয়েছিলো এই পৃথিবীর আলো বাতাসের অধিকার পেয়ে পায়নি যে শিশু জন্মের ছাড়পত্র তারই দাবী নিয়ে সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে কোন গাছে কোন কুঁড়িরা ফোটেনি কোন অঙ্কুর মাথাও তোলেনি প্রজাপতি যতো আরও একদিন গুটিপোকা হয়েছিলো সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে হরতাল হয়েছিলো তাই গ্রাম নগর মাঠ পাথার বন্দরে তৈরী হও কার ঘরে জ্বলেনি দীপ চির আঁধার তৈরী হও কার বাছার জোটেনি দুধ শুকনো মুখ তৈরী হও ঘরে ঘরে ডাক পাঠাই তৈরী হও জোটবাঁধো মাঠে কিষান কলে মজুর নওজোয়ান জোট বাঁধো এই মিছিল এই মিছিল সবহারার সবপাওয়ার এই মিছিল প্রতিভা আর যশোদা মার রক্তবীজ এই মিছিল স্বামীহারা অনাথিনীর চোখের জল এই মিছিল শিশুহারা মাতাপিতার অভিশাপের এই মিছিল এই মিছিল সবহারার সবপাওয়ার এই মিছিল হও সামিল আমর বুকে এলো যখন কোটি প্রাণের স্বপ্ন কোটি মনের বরফ জমা অগাধ সম্ভাবনা কোটি দেহের ঘৃণার জ্বালা অগ্নিগিরি বুকে কোটি শপথ পাথর জমা গোনে শেষের লগ্ন তবে আমার বজ্রনাদে শোন রে ঘোষনা কোটি দেহের সমষ্টি এই আমিই হিমালয় আমি তোদের আকাশ ছিঁড়ে সূর্য পড়ি ভালে তুচ্ছ করি কুজ্ঝ্বটিকা মেঘের ভ্রুকুটিও জানাই তোদের কারা আছিস ঘৃণ্য পরগাছা কোটি বুকের কলজে ছিঁড়ে রক্ত করিস পান বুকে শ্বাপদ মুখে তোদের অহিংসা অছিলা এবার তবে করবি তো আয় আমার মোকাবিলা
https://banglapoems.wordpress.com/2013/11/09/%e0%a6%b6%e0%a6%aa%e0%a6%a5-%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%b2-%e0%a6%9a%e0%a7%8c%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%80/
3931
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমাপ্তি
সনেট
যদিও বসন্ত গেছে তবু বারে বারে সাধ যায় বসন্তের গান গাহিবারে। সহসা পঞ্চম রাগ আপনি সে বাজে, তখনি থামাতে চাই শিহরিয়া লাজে। যত-না মধুর হোক মধুরসাবেশ যেখানে তাহার সীমা সেথা করো শেষ। যেখানে আপনি থামে যাক থেমে গীতি, তার পরে থাক্‌ তার পরিপূর্ণ স্মৃতি। পূর্ণতারে পূর্ণতর করিবারে, হায়, টানিয়া কোরো না ছিন্ন বৃথা দুরাশায়! নিঃশব্দে দিনের অন্তে আসে অন্ধকার, তেমনি হউক শেষ শেষ যা হবার। আসুক বিষাদভরা শান্ত সান্ত্বনায় মধুরমিলন-অন্তে সুন্দর বিদায়।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/somapti/
4585
শামসুর রাহমান
কালেভদ্রে একটুখানি
প্রেমমূলক
কালেভদ্রে একটুখানি দেখার জন্যে ঘুরে বেড়াই যত্রতত্র, দাঁড়িয়ে থাকি পথের ধারে। রোদের আঁচে গা পুড়ে যায় যখন তখন, জল-আঁচড়ে আত্মা থেকে রক্ত ঝরে; দূর দিগন্ত আস্তেসুস্থে রক্ত চাটে।স্কুটার থেকে নামো যখন রোদ-ঠেকানো চশমা চোখে, যখন তোমার শরীর জুড়ে তাড়ার ছন্দ নেচে ওঠে, ‘ঐ যে এলো, ঐ যে এলো’ বলে ছুটি তোমার দিকে একটু খানি দেখার জন্যে, কুশল বিনিময়ের জন্যে। ‘কখন এলে? নিরালা এই প্রশ্ন ঝরে, শিউলি যেন তোমার ফুল্ল অধর থেকে। ইচ্ছে করে বলি হেসে, ‘দিল্লীজোড়া গোধুলিতে গালিব যখন ছিলেন বেঁচে।কিন্তু এখন আগামী এক শতক-ছোঁয়া হাওয়ায় কাঁপে তোমার খোলা চুলের শিখা। তখন ও কি সেই সময়ে থাকবো আমি? গহন কোনো দুপুরবেলা চোখে নিয়ে কৃষ্ণচূড়ার মোহন আভা ব্যাকুল ছুটে আসবো আবার তোমার কাছে? যখন তুমি ধূসর দূরে বসে থাকো, হিস্পানী এক গিটার বাজে করুণ সুরে মনের ভেতর, যখন তোমার হৃৎকমলে চুপিসারে ভ্রমর কালো ছায়া ফেলে, পানিমগ্ন শিলার মতো অবচেতন নড়ে ওঠে ঠারে ঠোরে, আমার বুকে ধাক্কা লাগে, দদ্মবেশী আদিবাসী বিস্ফোরিত আর্তনাদে। যখন তোমার আঁটো স্তনে জ্যোৎস্না কোমল শুয়ে থাকে, রহস্যময় একলা গাছে নিভৃতে ফল পাকতে থাকে। যখন তোমার গালে জমে রাতের শিশির, কবন্ধ পাঁচ অশ্বারোহী ছুটে বেড়ায় তেপান্তরে। আলতো তোমার হাতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্যে হঠাৎ রোদের ঝলক-লাগা ঝর্ণাধারার মতো তোমার গলার আওয়াজ শোনার জন্যে, খুচরো কিছু চুমোর জন্যে, দুটি বাহুর বন্দরে ঠাঁই পাওয়ার জন্যে, কালেভদ্রে একটুখানি দেখার জন্যে আর কতকাল ভিক্ষু হয়ে পুড়বো রোদে? ভিজবো একা জল-বাজানো পথের মোড়ে?(হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kalevodre-ektukhani/
1592
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
জিম করবেটের চব্বিশ ঘণ্টা
রূপক
সারাটা দিন ছায়া পড়ে। যত দূরে যেখানে যাই, পাহাড় ভাঙি, তাঁবু ওঠাই– ছায়া পড়ে। দৃশ্য অনেক, নেবার পাত্র পৃথিবীতে একটা মাত্র– ছায়া পড়ে। সারা সকাল, সারা দুপুর, সারা বিকেল, সারাটা রাত মনের মধ্যে হলুদ-কালো চতুর একটা ছায়া পড়ে। সারাটা দিন ছায়া পড়ে। এই যে বসি, এই যে উঠি, থেকে-থেকে বাইরে ছুটি– ছায় পড়ে। পিছন-পিছন ঘুরেছি যার, সেই নিয়েছে পিছু আমার– ছায়া পড়ে। সারা সকাল, সারা দুপুর, সারা বিকেল, সারাটা রাত মনের মধ্যে হলুদ-কালো চতুর একটা ছায়া পড়ে। সারাটা দিন ছায়া পড়ে। সকল কাজে, সকল কথায়, জলেস্থলে তরুলতায়– ছায়া পড়ে। এখন আমি বুঝব কিসে শিকার কিংবা শিকারি সে– ছায়া পড়ে। সারা সকাল, সারা দুপুর, সারা বিকেল, সারাটা রাত মনের মধ্যে হলুদ-কালো চতুর একটা ছায়া পড়ে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1654
5370
শেখ ফজলুল করিম
তুলনা
নীতিমূলক
সাত শত ক্রোশ করিয়া ভ্রমণ জ্ঞানীর অন্বেষণে, সহসা একদা পেল সে প্রবীণ কোনো এক মহাজনে। শুধাল, ”হে জ্ঞানী! আকাশের চেয়ে উচ্চতা বেশি কার?” জ্ঞানী বলে, ”বাছা, সত্যের চেয়ে উঁচু নাহি কিছু আর।” পুনঃ সে কহিল, ”পৃথিবীর চেয়ে ওজনে ভারী কি আছে?” জ্ঞানী বলে, ”বাছা, নিষ্পাপ জনে দোষারোপ করা মিছে।” জিজ্ঞাসে পুনঃ, ”পাথরের চেয়ে কি আছে অধিক শক্ত?” জ্ঞানী বলে, ”বাছা, সেই যে হৃদয় জগদীম-প্রেম-ভক্ত।” কহিল আবার, ”অনলের চেয়ে উত্তাপ বেশি কার?” জ্ঞানী বলে, ”বাছা, ঈর্ষার কাছে বহ্নিতাপও ছার।” পুছিল পথিক, ”বরফের চেয়ে শীতর কি কিছু নাই?” জ্ঞানী বলে, ”বাছা স্বজন-বিমুখ হৃদয় যে ঠিক তাই।” শুধাল সে জন, ”সাগর হইতে কে বেশি ধনবান?” জ্ঞানী বলে, ”বাছা, তুষ্ট হৃদয় তারো চেয়ে গরীয়ান।”
http://kobita.banglakosh.com/archives/4337.html
2163
মহাদেব সাহা
তুমি চলে যাবে বলতেই
প্রেমমূলক
তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি- উঠে দাঁড়াতেই দুপুরের খুব গরম হাওয়া বয়, মার্সির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে; দরোজা থেকে যখন এক পা বাড়াও আমি দুই চোখে কিছুই দেখি না- এর নাম তোমার বিদায়, আচ্ছা আসি, শুভরাত্রি, খোদা হাফেজ। তোমাকে আরেকটু বসতে বললেই তুমি যখন মাথা নেড়ে না, না বলো সঙ্গে সঙ্গে সব মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়ে; তুমি চলে যাওয়ার জন্যে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকো তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যায়, তুমি উঠোন পেরুলে আমি কেবল শূন্যতা শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই দেখি না আমার প্রিয় গ্রন্থগুলির সব পৃষ্ঠা কালো কালিতে ঢেকে যায়। অথচ চোখের আড়াল অর্থ কতোটুকু যাওয়া, কতোদূর যাওয়া- হয়তো নীলক্ষেত থেক বনানী, ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট তবু তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে সেই থেকে অবিরাম কেবল পাড় ভাঙার শব্দ শুনি পাতা ঝরার শব্দ শুনি- আর কিছুই শুনি না।
http://kobita.banglakosh.com/archives/1579.html
2397
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সমাপ্তে
সনেট
বিসর্জ্জিব আজি, মা গো, বিস্মৃতির জলে ( হৃদয়-মণ্ডপ, হায়, অন্ধকার করি!) ও প্রতিমা!নিবাইল,দেখ,হোমানলে মনঃ-কুণ্ডে অশ্রু-ধারা মনোদুঃখে ঝরি! শুখাইল দুরদৃষ্ট সে ফুল্ল কমলে, যার গন্ধামোদে অন্ধ এ মনঃ,বিস্মরি সংসারে ধর্ম্ম,কর্ম্ম!ডুবিল সে তরি, কাব্য-নদে খেলাইনু যাহে পদ-বলে অল্প দিন!নারিনু,মা,চিনিতে তোমারে শৈশব,অবোধ আমি!ডাকিলা যৌবনে; (যদিও অধম পুত্র,মা কি ভুলে তারে?) এবে---ইন্দ্রপ্রস্থ ছাড়ি যাই দূর বনে! এই বর,হে রবদে,মাগি শেষ বারে,--- জ্যোতির্ম্ময় কর বঙ্গ---ভারত-রতনে!
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/somapte/
318
কাজী নজরুল ইসলাম
ছাত্রদলের গান
মানবতাবাদী
আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্রদল। মোদের পায়ের তলায় মুর্সে তুফান উর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল। আমরা ছাত্রদল।। মোদের আঁধার রাতে বাধার পথে যাত্রা নাঙ্গা পায়, আমরা শক্ত মাটি রক্তে রাঙাই বিষম চলার ঘায়! যুগে-যুগে রক্তে মোদের সিক্ত হ’ল পৃথ্বীতল! আমরা ছাত্রদল।। মোদরে কক্ষচ্যুত ধুমকেতু-প্রায় লক্ষহারা প্রাণ, আমরা ভাগ্যদেবীর যজ্ঞবেদীর নিত্য বলিদান। যখন লক্ষ্মীদেবী স্বর্গে ওঠেন, আমরা পশি নীল অতল, আমরা ছাত্রদল।। আমরা ধরি মৃত্যু-রাজার যজ্ঞ-ঘোড়ার রাশ, মোদের মৃত্যু লেখে মোদের জীবন-ইতিহাস! হাসির দেশে আমরা আনি সর্বনাশী চোখের জল। আমরা ছাত্রদল।। সবাই যখন বুদ্ধি যোগায়, আমরা করি ভুল। সাবধানীরা বাঁধ বাঁধে সব, আমরা ভাঙি কূল। দার”ণ-রাতে আমরা তর”ণ রক্তে করি পথ পিছল! আমরা ছাত্রদল।। মোদের চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল বক্ষে ভরা বাক্‌, কন্ঠে মোদের কুন্ঠ বিহীন নিত্য কালের ডাক। আমরা তাজা খুনে লাল ক’রেছি সরস্বতীর শ্বেত কমল। আমরা ছাত্রদল।। ঐ দারুণ উপপ্লাবের দিনে আমরা দানি শির, মোদের মাঝে মুক্তি কাঁদে বিংশ শতাব্দীর! মোরা গৌরবেরি কান্না দিয়ে ভ’রেছি মা’র শ্যাম আঁচল। আমরা ছাত্রদল।। আমরা রচি ভালোবাসার আশার ভবিষ্যৎ মোদের স্বর্গ-পথের আভাস দেখায় আকাশ-ছায়াপথ! মোদের চোখে বিশ্ববাসীর স্বপ্ন দেখা হোক সফল। আমরা ছাত্রদল।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/829
5444
সুকান্ত ভট্টাচার্য
এক যে ছিল
ভক্তিমূলক
এক যে ছিল আপনভোলা কিশোর, ইস্কুল তার ভাল লাগত না, সহ্য হত না পড়াশুনার ঝামেলা আমাদের চলতি লেখাপড়া সে শিখল না কোনোকালেই, অথচ সে ছাড়িয়ে গেল সারা দেশের সবটুকু পাণ্ডিত্যকে। কেমন ক’রে?          সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না।।বড়মানুষীর মধ্যে গরীবের মতো মানুষ, তাই বড় হয়ে সে বড় মানুষ না হয়ে মানুষ হিসেব হল অনেক বড়। কেমন ক’রে? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না।।গানসাধার বাঁধা আইন সে মানে নি, অথচ স্বর্গের বাগান থেকে সে চুরি করে আনল তোমার আমার গান। কবি সে, ছবি আঁকার অভ্যাস ছিল না ছোট বয়সে, অথচ শিল্পী ব’লে সে-ই পেল শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সম্মান। কেমন ক’রে ? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না।।মানুষ হল না বলে যে ছিল তার দিদির আক্ষেপের বিষয়, অনেক দিন, অনেক বিদ্রূপ যাকে করেছে আহত; সে-ই একদিন চমক লাগিয়ে করল দিগ্বিজয়। কেউ তাকে বলল, ‘বিশ্বকবি’, কেউ বা ‘কবিগুরু’ উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চারদিক করল প্রণাম। তাই পৃথিবী আজো অবাক হয়ে তাকিয়ে বলছেঃ কেমন ক’রে? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না, এ প্রশ্নের জবাব তোমাদের মতো আমিও খুঁজি।।   (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/ek-je-chilo/
3112
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জ্ঞানের দৃষ্টি ও প্রেমের সম্ভোগ
নীতিমূলক
‘কালো তুমি’— শুনি জাম কহে কানে কানে, যে আমারে দেখে সেই কালো বলি জানে, কিন্তু সেটুকু জেনে ফের কেন জাদু? যে আমারে খায় সেই জানে আমি স্বাদু।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gyaner-dristi-o-premer-somvog/
4037
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হিন্দুমেলার উপহার
স্বদেশমূলক
১ হিমাদ্রি শিখরে শিলাসন - ' পরি , গান ব্যাসঋষি বীণা হাতে করি — কাঁপায়ে পর্বত শিখর কানন , কাঁপায়ে নীহারশীতল বায় ।২ স্তব্ধ শিখর স্তব্ধ তরুলতা , স্তব্ধ মহীরূহ নড়েনাকো পাতা । বিহগ নিচয় নিস্তব্ধ অচল ; নীরবে নির্ঝর বহিয়া যায় ।৩ পূরণিমা রাত — চাঁদের কিরণ — রজতধারায় শিখর , কানন , সাগর-ঊরমি , হরিত-প্রান্তর , প্লাবিত করিয়া গড়ায়ে যায় ।৪ ঝংকারিয়া বীণা কবিবর গায় , ‘ কেন রে ভারত কেন তুই , হায় , আবার হাসিস্‌! হাসিবার দিন আছে কি এখনো এ ঘোর দুঃখে ।৫ দেখিতাম যবে যমুনার তীরে , পূর্ণিমা নিশীথে নিদাঘ সমীরে , বিশ্রামের তরে রাজা যুধিষ্ঠির , কাটাতেন সুখে নিদাঘ-নিশি ।৬ তখন ও - হাসি লেগেছিল ভালো , তখন ও - বেশ লেগেছিল ভালো , শ্মশান লাগিত স্বরগ সমান , মরু উরবরা ক্ষেতের মতো ।৭ তখন পূর্ণিমা বিতরিত সুখ , মধুর উষার হাস্য দিত সুখ , প্রকৃতির শোভা সুখ বিতরিত পাখির কূজন লাগিত ভালো ।৮ এখন তা নয় , এখন তা নয় , এখন গেছে সে সুখের সময় । বিষাদ আঁধার ঘেরেছে এখন , হাসি খুশি আর লাগে না ভালো ।৯ অমার আঁধার আসুক এখন , মরু হয়ে যাক ভারত-কানন , চন্দ্র সূর্য হোক মেঘে নিমগন প্রকৃতি-শৃঙ্খলা ছিঁড়িয়া যাক্‌ ।১০ যাক ভাগীরথী অগ্নিকুণ্ড হয়ে , প্রলয়ে উপাড়ি পাড়ি হিমালয়ে , ডুবাক ভারতে সাগরের জলে , ভাঙিয়া চুরিয়া ভাসিয়া যাক্‌ ।১১ চাই না দেখিতে ভারতেরে আর , চাই না দেখিতে ভারতেরে আর , সুখ-জন্মভূমি চির বাসস্থান , ভাঙিয়া চুরিয়া ভাসিয়া যাক ।১২ দেখেছি সে-দিন যবে পৃথ্বীরাজ , সমরে সাধিয়া ক্ষত্রিয়ের কাজ , সমরে সাধিয়া পুরুষের কাজ , আশ্রয় নিলেন কৃতান্ত-কোলে ।১৩ দেখেছি সে-দিন দুর্গাবতী যবে , বীরপত্নীসম মরিল আহবে বীরবালাদের চিতার আগুন , দেখেছি বিস্ময়ে পুলকে শোকে ।১৪ তাদের স্মরিলে বিদরে হৃদয় , স্তব্ধ করি দেয় অন্তরে বিস্ময় ; যদিও তাদের চিতাভস্মরাশি , মাটির সহিত মিশায়ে গেছে!১৫ আবার সে - দিন(ও) দেখিয়াছি আমি , স্বাধীন যখন এ-ভারতভূমি কী সুখের দিন! কী সুখের দিন! আর কি সেদিন আসিবে ফিরে ?১৬ রাজা যুধিষ্ঠির (দেখেছি নয়নে) স্বাধীন নৃপতি আর্য-সিংহাসনে , কবিতার শ্লোকে বীণার তারেতে , সেসব কেবল রয়েছে গাঁথা!১৭ শুনেছি আবার , শুনেছি আবার , রাম রঘুপতি লয়ে রাজ্যভার , শাসিতেন হায় এ-ভারতভূমি , আর কি সে-দিন আসিবে ফিরে!১৮ ভারত-কঙ্কাল আর কি এখন , পাইবে হায় রে নূতন জীবন ; ভারতের ভস্মে আগুন জ্বলিয়া , আর কি কখনো দিবে রে জ্যোতি ।১৯ তা যদি না হয় তবে আর কেন , হাসিবি ভারত! হাসিবি রে পুনঃ , সে-দিনের কথা জাগি স্মৃতিপটে , ভাসে না নয়ন বিষাদজলে ?২০ অমার আঁধার আসুক এখন , মরু হয়ে যাক ভারত-কানন , চন্দ্র সূর্য হোক মেঘে নিমগন , প্রকৃতি-শৃঙ্খলা ছিঁড়িয়া যাক ।২১ যাক ভাগীরথী অগ্নিকুণ্ড হয়ে , প্রলয়ে উপাড়ি পাড়ি হিমালয়ে , ডুবাক ভারতে সাগরের জলে , ভাঙিয়া চুরিয়া ভাসিয়া যাক্‌ ।২২ মুছে যাক মোর স্মৃতির অক্ষর , শূন্যে হোক লয় এ শূন্য অন্তর , ডুবুক আমার অমর জীবন , অনন্ত গভীর কালের জলে । '
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hindomalar-upahar/
796
জসীম উদ্‌দীন
কৈশর যৌবন দুহু মেলি গেল
চিন্তামূলক
এখনো গন্ধ বন্ধ কোরকে, দুএকটি রাঙা দল, উকি ঝুঁকি দিয়ে পান করিতেছে ভোরের শিশির জল। রঙিন অধরে সরল হাসিটি, বিহান বেলার আগে, মেঘগুলি যেন রঙে ডুগুডুগু ঊষসীর অনুরাগে। এ হাসি এখনি কৌতুক হয়ে নাচিবে নানান ঢঙে, মেঘের আড়ালে কভু লুকোচুরি খেলিবে কতা রঙে। আঁখি দুটি আজো স্বচ্ছ-সরল কাজল দীঘির মত, কারো কলসীর আঘাতে এখনো হয় নাই ঢেউ-ক্ষত। সব কিছু এর মুকুরে এখনো উজ্জ্বল হয়ে ভাসে, যে আসে নিকটে তাহারেই সে যে আদরিয়া ভালবাসে। আরো কিছুদিন পরে এই আঁখি বিদ্যুদ্দাম হয়ে, নৃত্য চপল খেলিয়া বেড়াবে মেঘ হতে মেঘে বয়ে। ওই ভুরু-ধনু আরো বাঁকাইয়া চাহনীর তীরগুলি, কত হতভাগা মৃগেরে বধিবে কাজলের বিষগুলি। ওই বাহু দুটি যুগল মমতা, যে হয় নিকটতর, তাহারি গলায় পরাইয়া দেয় জানে না আপন পর। কিছুদিন পরে ও বাহু লতায় ফুটিবে মোহের ফুল, আকর্ষণের মন্ত্র পড়িয়া ছড়াবে রঙের ভুল। তাহারি বাঁধনে বন্দী হইতে চির জনমের তরে, আসিবে কুমার রূপ-গানে তার অধর বাঁশরী ভরে। বক্ষের পরে আধ-মুকুলিত যুগল কমল দুটি, এখনো সুবাসে ভরে নাই দিক পল্লব দলে ফুটি। কিছুদিন পরে ওই মন্দিরে অনঙ্গ নিজে পশি, ভালবাসিবার মন্ত্র রচিবে ধ্যানের আসনে বসি। মন্ত্র-সিদ্ধ একদন তার ফুল ধনু করি থির, ফিরাবে ঘুরাবে স্বেচ্চায় সেথা স্থাপি এ যুগল তীর। এখনো অফুট কুসুমিত দেহ, জবা কুসুমের দ্যুতি, আনত ঊষার নব-মেঘদলে রাঙিছে রূপের সত্ততি। নিহারে ভূসিথ কুসুম কমল আধেক মুদিত আঁখি, সরসী নাচিছে হরষিত দোলে আরশীতে তারে রাখি। বিহান বেলার আধ ঘুমে পাওয়া আধ স্বপনের স্মৃতি, দূরাগত কোন সুখদ বাঁশীর আবছা মধুর গীতি। সে যেন ঊষার হসিত কপোলে শ্বেত চন্দন ফোঁটা, সে যেন পূজার নিবেদিত ফুল দেবতা চরণে লোটা। আরো ক্ষণকাল দাঁড়াও গো মেয়ে! তোমার সোনার হাসি, আরো ক্ষণকাল দেখে চলে যাই আমি কবি পরবাসী। আরো ক্ষণকাল করগো বেলম, ভোরের শিশির কণা, তাই দিয়ে যদি হয় কভু কোন অমরতা-গীতি বোনা। আমি ক্ষণিকের অতিথি তোমার, তব অনাগত দিনে, জানি জানি এই পথিক সখারে লইতে পাবে না চিনে। ওই দেহ বীণা বাজিবে সেদিন, হাত চোখ মুখ কান, শত তার হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়াবে কুহক গান। তারি ঝঙ্কারে রণিবে ধরণী, ফুলের স্তবক হয়ে, আসিবে পূজারী স্তব-গান গেয়ে ওদেহের দেবালয়ে। তাহাদের তরে রাখিয়া গেলাম আমার আশীর্বাদ, যেন তারা পায় তোমার মাঝারে মোর অপূরিত সাধ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/208
3021
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘাসে আছে ভিটামিন
হাস্যরসাত্মক
ঘাসে আছে ভিটামিন, গোরু ভেড়া অশ্ব ঘাস খেয়ে বেঁচে আছে, আঁখি মেলে পশ্য। অনুকূল বাবু বলে, “ঘাস খাওয়া ধরা চাই, কিছুদিন জঠরেতে অভ্যেস করা চাই– বৃথাই খরচ ক’রে চাষ করা শস্য। গৃহিণী দোহাই পাড়ে মাঠে যবে চরে সে, ঠেলা মেরে চলে যায় পায়ে যবে ধরে সে– মানবহিতের ঝোঁকে কথা শোনে কস্য; দুদিনে না যেতে যেতে মারা গেল লোকটা, বিজ্ঞানে বিঁধে আছে এই মহা শোকটা, বাঁচলে প্রমাণ-শেষ হ’ত যে অবশ্য।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ghase-ache-vitamin/
1712
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
হাসপাতালে–১
চিন্তামূলক
অষ্টপ্রহর কাছাকছি ভনভনাচ্ছে হাজার মাছি, তোর সেদিকে না-দিয়ে কান সব সময়ে সিধে-সটান দাঁড়িয়ে এখন থাকতে হবে। তেমনভাবে দাঁড়িয়ে আমি থাকলুম কই। পাল্লা যখন যে-দিক ঝোঁকে সেইদিকে ব্যাঙ-লাফায় লোকে। লাফাক গে, তুই শক্ত থাকিস সব সময়ে মনে রাখিস নিজের শপথ রাখতে হবে। কিন্তু আমি সকল শপথ রাখলুম কই। বর্ষা কাটছে, এখন আকাশ বলছে, আসছে আশ্বিন মাস। হিসেবপত্র ফেলে রেখে ফিরছে সবাই বিদেশ থেকে– এই ছবিটাই আঁকতে হবে। কিন্তু আমি এমন ছবি আঁকলুম কই।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1137
3388
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাতালে বলিরাজার যত বলীরামরা
ছড়া
পাতালে বলিরাজার যত বলীরামরা, ভূতলেতে ঘাসিরাম আর ঘনশ্যামরা, লড়াই লাগালো বেগে; ভূমিকম্পন লেগে চারিদিকে হাহাকার করে ওঠে গ্রামরা। মানুষ কহিল, “ক্রমে খবর উঠছে জমে, সেটা খুব মজা, তবু মরি কেন আমরা।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/patale-bolirajar-joto-boliramra/
37
অসীম সাহা
এনজিওগ্রাম
রূপক
বাইপাস দিয়ে নতুন রাস্তা ধরে ছুটে যেতে আমার খুব ভালো লাগে! কিন্তু তার জন্যে সংযোগ-সড়ক চাই- হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এরকম ভাবতে-ভাবতে যখন জানলাম, সংকীর্ণ পথের শেষপ্রান্তে ব্যারিকেড দিয়ে বসে আছে রক্তকণিকার জমাটবাঁধা কিছু কেয়াকাঁটার ঝাড়- তখন তাকে অপসারিত করার জন্য সশস্ত্র পুলিসবাহিনীর মতো যখন একা একা খুব দ্রুতবেগে ছুটে গেলো স্প্রিংয়ের কেমিক্যালসজ্জিত কিছু স্বয়ংক্রিয় তার- আমার চোখে নেমে এলো অসমাপ্ত ঘুম! ঘুম ভাঙলে জানতে পারলাম, এরই মধ্যে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটে গেছে কোলাহলমুখরিত হৃদয়ের আন্তরপ্রদেশে;! ২.৭৫ সেন্টিমিটার আকারের অপ্রতিরোধ্য ট্যাংকও তাকে প্রতিহত করতে পারেনি কোথাও! অন্ধকার রাত্রির বাইপাস পার হয়ে অবদমিত একটি হৃদয় শুধু ছুটে গেছে মাধবীলতার বনে, অসংবৃত সুন্দরের কাছে! বেসরকারি গ্রামে গ্রামে আগুনের হলকায় সরে গেছে মৃত্যুর বাইপাসে ধাবমান আর একখানি তরল হৃদয়!!
https://www.bangla-kobita.com/asimsaha/angiogram/
4550
শামসুর রাহমান
কবিতার প্রতি ঢ্যাম্‌না
রূপক
এখন নখরাবাজি ছাড়। লচ্‌ খাওয়া হয়ে গেছে অনেক আগেই; সেই কবে থেকে জোমে আছি আর তোমার জন্যেই আজ আমি এমন উঠাইগিরা। তোমার অশোক ফুল ফোটা পড়েছে আমার চোখে বহুবার, বহুবার দেখেছি ঝুল্‌পি, ছাতি। জিভ ভ্যাঙচানো; বুলিয়েছি হাত ঝাপে। জোড়-খাওয়া তা-ও হয়েছে অনেকবার হে চামর খেপ্‌লু আমার। আমিতো কপাল ফেরে ভিড়েছি তোমার মারকাটারিঅন্দরখানায়। আচমকা থেমে পড়ি, ফের গোড়া থেকে করি শুরু আর এক পা এক পা চলি; তুমি কাছে না থাকলে বলো কী করে হাওয়ায় গেরো বাঁধি? কেন তুমি মাঝে-মধ্যে খামোকা বাতেলা দিতে চাও? আন্‌সান্‌ কথা রাখ চনমনে মেয়ে যদি তুমি আমার এ খোমা-বিলা দেখে সবকিছু গুবলিট করে দিতে যাও, তবে কেন নিয়েছো আমার ছল্‌লা ঘন-ঘন কান্‌কি মেরে? চুস্‌কি তুমি, সাতঘাটে ঘুরেফিরে বেড়ানোই কাজ; স্থিতু হয়ে বসতে পারো না কোথাও সামান্যক্ষণ। এখন হঠাৎ ঠাণ্ডা পানি হবে তুমি, তা হবে না। কেননা হেকোরবাজ নই আমি আজো, যদিও ঢ্যাম্‌না বলা যায় ইদানীং।   (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobitar-proti-dhamna/
914
জীবনানন্দ দাশ
অবশেষে
রূপক
এখানে প্রশান্ত মনে খেলা করে উঁচু উঁচু গাছ। সবুজ পাতার পরে যখন নেমেছে এসে দুপুরের সূর্যের আঁচ নদীতে স্মরণ করে একবার পৃথিবীর সকাল বেলাকে। আবার বিকেল হলে অতিকায় হরিণের মতো শান্ত থাকে। এই সব গাছুগুলো; -যেন কোন দূর থেকে অস্পষ্ট বাতাস বাঘের ঘ্রাণের মতো হৃদয়ে জাগায়ে যায় ত্রাস; চেয়ে দেখ ইহাদের পরস্পর নীলিম বিন্যাস নড়ে উঠে ত্রস্ততায়;- আধো নীল আকাশের বুকে হরিণের মতো দ্রুত ঠ্যাঙের তুরুকে অন্তর্হিত হয়ে যেতে পারে তারা বটে ; একজোটে কাজ করে মানুষেরা যে রকম ভোটের ব্যালটে; তবুও বাঘিনী হয়ে বাতাসকে আলিঙ্গন করে– সাগরের বালি আর রাত্রির নক্ষত্রের তরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/957
3973
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সৃষ্টিলীলাপ্রাঙ্গনের প্রান্তে দাঁড়াইয়া
চিন্তামূলক
সৃষ্টিলীলাপ্রাঙ্গণের প্রান্তে দাঁড়াইয়া দেখি ক্ষণে ক্ষণে তমসের পরপার, যেথা মহা-অব্যক্তের অসীম চৈতন্যে ছিনু লীন। আজি এ প্রভাতকালে ঋষিবাক্য জাগে মোর মনে। করো করো অপাবৃত হে সূর্য,আলোক-আবরণ, তোমার অন্তরতম পরম জ্যোতির মধ্যে দেখি আপনার আত্মার স্বরূপ। যে আমি দিনের শেষে বায়ুতে মিশায় প্রাণবায়ু, ভস্মে যার দেহ অন্ত হবে, যাত্রাপথে সে আপন না ফেলুক ছায়া সত্যের ধরিয়া ছদ্মবেশ। এ মর্তের লীলাক্ষেত্রে সুখে দুঃখে অমৃতের স্বাদ পেয়েছি তো ক্ষণে ক্ষণে, বারে বারে অসীমেরে দেখেছি সীমার অন্তরালে। বুঝিয়াছি,এ জন্মের শেষ অর্থ ছিল সেইখানে, সেই সুন্দরের রূপে, সে সংগীতে অনির্বচনীয়। খেলাঘরে আজ যবে খুলে যাবে দ্বার ধরণীর দেবালয়ে রেখে যাব আমার প্রণাম, দিয়ে যাব জীবনের সে নৈবেদ্যগুলি মূল্য যার মৃত্যুর অতীত।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shete-lilarpashga-dareya/
4134
রেদোয়ান মাসুদ
তোমাকে ভালবাসি
প্রেমমূলক
আমি কখনোও বলবোনা তোমাকে ভালবাসি হৃদয় ডাকছে তোমার কাছে আসি শুধু আমার চোখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখ চোখ কি বলে? তখনই বুঝবে তুমি কতটা ভালবাসি তোমায় আমি।আমি কখনোও বলবোনা তোমাকে ভালবাসি কাছে এসো একবার তোমায় দেখি। শুধু কান দিয়ে নিরবে আমার কথা শুনো শ্রুতি কেমন, কন্ঠ কি বলে ? তখনই বুঝবে তুমি কতটা ভালবাসি তোমায় আমি।আমি কখনোও বলবোনা তোমাকে ভালবাসি কাছে এসো মন খুলে হাসি। শুধু আমার হাতে একবার স্পশ করে দেখ কাপছে তোমার হৃদয় খানি আর তখনই বুঝবে তুমি কতটা ভালবাস আমায় তুমি।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2198.html
975
জীবনানন্দ দাশ
ওগো দরদিয়া
প্রেমমূলক
-ওগো দরদিয়া, তোমারে ভুলিবে সবে,- যাবে সবে তোমারে ত্যজিয়া; ধরণীর পসরায় তোমারে পাবে না কেহ দিনান্তেও খুঁজে, কে জানে রহিবে কোথা নিশিভোরে নেশাখোর আঁখি তব বুজে! -হয়তো সিন্ধুর পারে শ্বেতশঙ্খ ঝিনুকের পাশে তোমার কঙ্কালখানা শুয়ে রবে নিদ্রাহারা উর্মির নিশ্বাসে! চেয়ে রবে নিষ্পলক অতি দূরে লহরীর পানে, গীতিহারা প্রাণ তব হয়তো বা তৃপ্তি পাবে তরঙ্গের গানে! হয়তো বা বনচ্ছায়া লতাগুল্ম পল্লবের তলে ঘুমায়ে রহিবে তুমি নীলশষ্পে শিশিরের দলে; হয়তো বা প্রান্তরের পারে তুমি র’বে শুয়ে প্রতিধ্বনিহারা,- তোমারে হেরিবে শুধু হিমানীর শীর্ণাকাশ,-নীহারিকা,-তারা, তোমারে চিনিবে শুধু প্রেত- জ্যোৎস্না,-বধির জোনাকি! তোমারে চিনিবে শুধু আঁধারের আলেয়ার আঁখি! তোমারে চিনিবে শুধু আকাশের কালো মেঘ-মৌন,-আলোহারা, তোমারে চিনিয়া নেবে তমিস্রার তরঙ্গের ধারা! কিংবা কেহ চিনিবে না,- হয়তো বা জানিবে না কেহ কোথায় লুটায়ে আছে হেমন্তের দিবাশেষে ঘুমন্তের দেহ! -হয়েছিল পরিচয় ধরণীর পান্তশালে যাহাদের সনে, তোমার বিষাদহর্ষ গেঁথেছিলে একদিন যাহাদের মনে, যাহাদের বাতায়নে একদিন গিয়েছিলে পথিক-অতিথি, তোমারে ভুলিবে তারা,- ভুলে যাবে সব কথা,- সবটুকু স্মৃতি! নাম তব মুছে যাবে মুসাফের,-অঙ্গারের পান্ডুলিপিখানি নোনাধরা দেয়ালের বুক থেকে খ’সে যাবে কখন না জানি! তোমার পানের পাত্রে নিঃশেষে শুকায়ে যাবে শেষের তলানি, দন্ড দুই মাছিগুলো করে যাবে মিছে কানাকানি! তারপর উড়ে যাবে দূরে দূরে জীবনের সুরার তল্লাসে, মৃত এক অলি শুধু পড়ে রবে মাতালের বিছানার পাশে! পেয়ালা উপুড় করে হয়তো বা রেখে যাবে কোনো একজন, কোথা গেছে ইয়োসোফ্ জানে না সে,- জানে না সে গিয়েছে কখন। জানে না যে,- অজানা সে,- আরবার দাবি নিয়ে আসিবে না ফিরে,- জানে না যে চাপা পড়ে গেছে সে যে কবেকার কোথাকার ভিড়ে! -জানিতে চাহে না কিছু,-ঘাড় নিচু ক’রে কে বা রাখে আঁখি বুজে অতীত স্মৃতির ধ্যানে, অন্ধকার গৃহকোণে একখানা শূন্য পাত্র খুঁজে! -যৌবনের কোন্ এক নিশীথে সে কবে তুমি যে আসিয়াছিলে বনরাণী। জীবনের বাসন্তী-উৎসবে তুমি যে ঢালিয়াছিলে ফাগরাগ,-আপনার হাতে মোর সুরাপাত্রখানি তুমি যে ভরিয়াছিলে,-জুড়ায়েছে আজ তার ঝাঁঝ,- গেছে ফুরায়ে তলানি। তবু তুমি আসিলে না,- বারেকের তরে দেখা দিলে নাকো হায়! চুপে চুপে কবে আমি বসুধার বুক থেকে নিয়েছি বিদায়- তুমি তাহা জানিলে না,-চলে গেছে মুসাফের, কবে ফের দেখা হবে আহা কে বা জানে! কবরের’ পরে তার পাতা ঝরে,-হাওয়া কাঁদে হা হা!
https://banglarkobita.com/poem/famous/922
984
জীবনানন্দ দাশ
কয়েকটি লাইন
চিন্তামূলক
কেউ যাহা জানে নাই – কোনো এক বাণী – আমি বহে আনি ; একদিন শুনেছ যে- সুর- ফুরায়েছে,- পুরানো তা – কোনো এক নতুন-কিছুর আছে প্রয়োজন , তাই আমি আসিয়াছি,- আমার মতন আর নাই কেউ ! সৃষ্টির সিন্ধুর বুকে আমি এক ঢেউ আজিকার ;- শেষ মুহূর্তের আমি এক;- সকলের পায়ের শব্দের সুর গেছে অন্ধকারে থেমে; তারপর আসিয়াছি নেমে আমি; আমার পায়ের শব্দ শোনো ,- নতুন এ – আর সব হারানো- পুরানো । উৎসবের কথা আমি কহি নাকো , পড়ি নাকো দুর্দশার গান, যে কবির প্রাণ উৎসাহে উঠেছে শুধু ভরে ,- সেই কবি- সে –ও যাবে স’রে; যে কবি পেয়েছে শুধু যন্ত্রণার বিষ শুধু জেনেছে বিষাদ , মাটি আর রক্তের কর্কশ স্বাদ , যে বুঝেছে ,- প্রলাপের ঘোরে যে বকেছে,- সে- ও যাবে স’রে ; একে- একে সবি ডুবে যাবে; - উৎসবের কবি, তবু বলিতে কি পারো যাতনা পাবে না কেউ আরো ? যেই দিন তুমি যাবে চ’লে পৃথিবী গাবে কি গান তোমার বইয়ের পাতা খুলে ? কিংবা যদি গায় ,- পৃথিবী যাবে কি তবু ভুলে একদিন যেই ব্যথা ছিল সত্য তার ? আনন্দের আবর্তনে আজিকে আবার সেদিনের পুরানো আঘাত ভুলিবে সে? ব্যথা যারা স’য়ে গেছে রাত্রি – দিন তাহাদের আর্ত ডান হাত ঘুম ভেঙে জানবে নিষেধ ; সব ক্লেশ আনন্দের ভেদ ভুল মনে হবে; সৃষ্টির বুকের’পরে ব্যথা লেগে রবে, শয়তানের সুন্দর কপালে পাপের ছাপের মত সেই দিনও !- মাঝরাতে মোম যারা জ্বালে, রোগা পায়ে করে পায়চারি, দেয়ালে যাদের ছায়া পড়ে সারি সারি সৃষ্টির দেয়ালে ,- আহ্লাদ কি পায় নাই তারা কোনোকালে ? যেই উড়ো উৎসাহের উৎসবের রব ভেসে আসে – তাই শুনে জাগেনি উতসব ? তবে কেন বিহ্বলের গান গায় তারা!- বলে কেন, আমাদের প্রাণ পথের আহত মাছিদের মতো ! উৎসবের কথা আমি কহি নাকো , পড়ি নাকো ব্যর্থতার গান; শুনি শুধু সৃষ্টির আহ্বান ,- তাই আসি, নানা কাজ তার আমরা মিটায়ে যাই ,- জাগিবার কাল আছে- দরকার আছে ঘুমাবার ;- এই সচ্ছলতা আমাদের ;- আকাশ কহিছে কোন কথা নক্ষত্রের কান্র?- আনন্দের? দুর্দশার ? – পড়ি নাকো । সৃষ্টির আহ্বানে আসিয়াছি । সময় সিন্ধুর মতো : তুমিও আমার মতো সমুদ্রের পানে , জানি, রয়েছ তাকায়ে , ঢেউয়ের হুঁচোট লাগে গায়ে ,- ঘুম ভেঙে যায় বার-বার তোমার – আমার ! জানি না তো কোন কথা কও তুমি ফেনার কাপড়ে বুক ঢেকে , ওপারের থেকে ; সমুদ্রের কানে কোন কথা কই আমি এই পারে – সে কি কিছু জানে? আমিও তোমার মতো রাতের সিন্ধুর দিকে রয়েছি তাকায়ে , ঢেউয়ের হুঁচোট লাগে গায়ে ,- ঘুম ভেঙে যায় বার-বার তোমার আমার । কোথাও রয়েছ , জানি,- তোমারে তবুও আমি ফেলেছি হারায়ে; পথ চলি- ঢেউ ভেজে পায়ে ; রাতের বাতাস ভেসে আসে , নক্ষত্রের’পরে এই হাওয়া যেন  হা-হা করে ! হু-হু ক’রে ওঠে অন্ধকার ! কন রাত্রি – আঁধারের পার আজ সে খুঁজিছে ! কত রাত ঝ’রে গেছে,- নিচে-তারো নিচে কোন রাত – কোন অন্ধকার একবার এসেছিল ,- আসিবে না আর । তুমি এই রাতের বাতাস, বাতাসের সিন্ধু- ঢেউ, তোমার মতন কেউ নাই আর ! অন্ধকার- নিঃসাড়তার মাঝখানে তুমি আনো প্রাণে সমুদ্রের ভাষা , রুধিরে পিপাসা যেতেছ জাগায়ে , ছেঁড়া দেহে – ব্যথিত মনের ঘায়ে ঝরিতেছ জলের মতন ,- রাতের বাতাসে তুমি ,-  বাতাসের সিন্ধু- ঢেউ, তোমার মতন কেউ নাই আর । গান গায় যেখানে সাগর তার জলের উল্লাসে , সমুদ্রের হাওয়া ভেসে আসে যেখানে সমস্ত রাত ভ’রে , নক্ষত্রের আলো পড়ে ঝ’রে যেইখানে , পৃথিবীর কানে শস্য গায় গান , সোনার মতন ধান ফ’লে ওঠে যেইখানে ,- একদিন- হয়তো – কে জানে তুমি আর আমি ঠাণ্ডা ফেনা ঝিনুকের মতো চুপে থামি সেইখানে রবো প’ড়ে !- যেখানে সমস্ত রাত্রি নক্ষত্রের আলো পড়ে ঝ’রে সমুদ্রের হাওয়া ভেসে আসে , গান গায় সিন্ধু তার জলের উল্লাসে । ঘুমাতে চাও কি তুমি ? অন্ধকারে ঘুমাতে কি চাই ?- ঢেউয়ের গানের শব্দ সেখানে ফেনার গন্ধ নাই ? কেহ নাই ,- আঙুলের হাতের পরশ সেইখানে নাই আর ,- রূপ যেই স্বপ্ন আনে ,- স্বপ্ন বুকে জাগায় যে- রস সেইখানে নাই তাহা কিছু ; ঢেউয়ের গানের শব্দ যেখানে ফেনার গন্ধ নাই – ঘুমাতে চাও কি তুমি ? সেই অন্ধকারে আমি ঘুমাতে কি চাই ! তোমারে পাব কি আমি কোনোদিন ? – নক্ষত্রের তলে অনেক চলার পথ, - সমুদ্রের জলে গানের অনেক সুর – গানের অনেক সুর বাজে ,- ফুরাবে এ- সব তবু আমি যেই কাজে ব্যস্ত আজ – ফুরাবে না , জানি ; একদিন তবু তুমি আমার আঁচলখানি টেনে লবে ; যেটুকু করার ছিল সেই দিন হয়ে গেছে শেষ , আমার এ সমুদ্রের দেশ হয়তো হয়েছে স্তব্ধ সেই দিন , - আমার এ নক্ষত্রের রাত হয়তো সরিয়া গেছে – তবু তুমি আসিবে হঠাৎ ; গানের অনেক সুর – গানের অনেক সুর সমুদ্রের জলে , অনেক চলার পথে নক্ষত্রের তলে ! আমার নিকট থেকে , তোমারে নিয়েছে কেটে কখন সময় ! চাঁদ জেগে রয় তারা-ভরা আকাশের তলে , জীবন সবুজ হয়ে ফলে , শিশিরের শব্দে গান গায় অন্ধকার,- আবেগ জানায় রাতের বাতাস ! মাটি ধুলো কাজ করে ,- মাঠে –মাঠে ঘাস নিবিড় – গভীর হয়ে ফলে ! তারা-ভরা আকাশের তলে চাঁদ তার আকাঙ্ক্ষার স্থল খুঁজে লয় ,- আমার নিকট থেকে তোমারে নিয়েছে কেটে যদিও সময় । একদিন দিয়েছিলে যেই ভালোবাসা , ভুলে গেছ আজ তার ভাষা ! জানি আমি ,- তাই আমিও ভুলিয়া যেতে চাই একদিন পেয়েছি যে ভালোবাসা তার স্মৃতি – আর তার ভাষা ; পৃথিবীতে যত ক্লান্তি আছে , একবার কাছে এসে আসিতে চায় না আর কাছে যে- মুহূর্ত ;- একবার হয়ে গেছে , তাই যাহা গিয়েছে ফুরায়ে একবার হেঁটেছে যে ,- তাই যার পায়ে চলিবার শক্তি আর নাই ; সবচেয়ে শীত ,- তৃপ্ত তাই । কেন আমি গান গাই ? কেন এই ভাষা বলি আমি ! – এমন পিপাসা বার-বার কেন জাগে ! প’ড়ে আছে যতটা সময় এমনি তো হয় ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/875
5489
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পত্র
ছড়া
কাশী গিয়ে হু হু ক’রে কাটলো কয়েক মাস তো, কেমন আছে মেজাজ ও মন, কেমন আছে স্বাস্থ্য? বেজায় রকম ঠাণ্ডা সবাই করছে তো বরদাস্ত? খাচ্ছে সবাই সস্তা জিনিস, খাচ্ছে পাঁঠা আস্ত?সেলাই কলের কথাটুকু মেজদার দু’কান স্পর্শ ক’রে গেছে বলেই আমার অনুমান৷ ব্যবস্থাটা হবেই, করি অভয় বর দান; আশা করি, শুনে হবে উল্লসিত প্রাণ৷ এতটা কাল ঠাকুর ও ঝি লোভ সামলে আসতো, এবার বুঝি লোভের দায়ে হয় তারা বরখাস্ত৷চারুটাও হয়ে গেছে বেজায় বেয়াড়া, মাথার ওপরে ঝোলে যা খুশির খাঁড়া৷ নতেদা’র বেড়ে গেছে অঙ্গুলি হাড়া, ঘেলুর পরীক্ষাও হয়ে গেছে সারা; এবার খরচ ক’রে কিছু রেল-ভাড়া মাতিয়ে তুলতে বলি রামধন পাড়া৷এবার বোধহয় ছাড়তে হল কাশী, ছাড়তে হল শৈলর মা, ইন্দু ও ন’মাসি৷ দুঃখ কিসের, কেউ কি সেথায় থাকে বারোমাসই? কাশী থাকতে চাইবে তারা যারা স্বর্গবাসী, আমি কিন্তু কলকাতাতেই থাকতে ভালবাসি৷ আমার যুক্তি শুনতে গিয়ে পাচ্ছে কি খুব হাসি? লেখা বন্ধ হোক তা হলে, এবার আমি আসি॥১৯৪৫ সালে সুকান্ত মেজবৌদি রেণু দেবীর সঙ্গে কাশী বেড়াতে যান৷ সুকান্ত ফিরে এসে শ্যামবাজারের বাড়ি থেকে এই চিঠিটি তাঁকে লিখেছিলেন৷ চিঠিটি রাখাল ভট্টাচার্য স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন৷
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/potro/
1419
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
নির্বাসনে
প্রেমমূলক
তোমাকে করেছি আমি নিজের শাসক আজ তুমি রাজ্যপাট ভক্ত প্রজা ছেড়ে কোন তীর্থে হয়েছো উধাও ? ভ্রাম্যমান তোমার বহর গেছে সাথে এদিকে যে পোড়া মাঠে দুর্গন্ধ ও বমি শুন্য সিংহাসন কাঁদে নির্জন আঁধারে তোমার দেহের গন্ধে বুনো রাত্রি আসে পাহাড়ি সিংহ ডাকে রক্তের গভীরে । তোমার স্তনের ঘাম উদ্ভিন্ন গোলাপ উড়ে যায় অনিচ্ছায় সপ্তর্ষিমণ্ডলে একদিন দিয়েছিলে বিদ্যুৎ উষ্ণতা তার তাপে রক্ত মাংস ছিন্ন হয়ে যায় । তোমার রাজত্বে কেউ বসিয়েছে ঈগল নখর? অবাধ্য হয়েছে কোনো রাজভক্ত প্রজা? রাজ উদ্যানে লেগেছে আগুন ? বলো , কোন অভিমানে নির্বাসিত আজ সুদূর ভুবনে ?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1018
1561
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
কবিতা ‘৭০
চিন্তামূলক
এক-একটা কবিতা যেন সুতানুটি-গোবিন্দপুরের রাত্রিকে ফিরিয়ে আনে। এক-একটি কবিতা যেন অকস্মাৎ টান্‌ মেরে হটিয়ে দেয় ময়দানের সবুজ গালিচা। গঙ্গাসাগরের দিকে অগ্রসরমান যাত্রিবোঝাই নৌকাকে এক-একটি কবিতা যেন রমনীর নখে, ওষ্ঠে, জঙ্ঘাদেশে, হাতের মুদ্রায় বিষাক্ত ফুলের মতো ফোটে। এক-একটি কবিতা যেন ঝড়ের ভিতরে হয়ে ওঠে নিয়তির কণ্ঠস্বর। কয়েকটা দিনের জন্য মফস্বল-বাংলায় সফর সেরে নিয়ে কবিতা আবার এই নগরের কেন্দ্রে ফিরে আসে। দুলে ওঠে ঘর-দুয়ার। যাদুঘর, রঙ্গালয়, ফুটবল-গ্যালারি, স্কাইস্ক্রেপারের পাশে এক-একটি কবিতা গিয়ে হানা দেয়, আর আতঙ্ক ঘনিয়ে ওঠে চারিধারে। এক-একটি কবিতা গিয়ে ফেটে পড়ে চৌরঙ্গিপাড়ায়। বৃক্ষেরা আমূল কাঁপে, ভয়ার্ত পাখিরা ঝঁকে-ঝাঁকে বিপন্ন আশ্রয় ছেড়ে রাত্রির আকাশে উড়ে যায়। ভিতরে তাকাই, ভাবি যা হলে সবাই খুব খুশি হত, যা হলে সমস্ত দিক রক্ষা পেত, আজ কালবৈগুণ্যের ফলে এক-একটি কবিতা যনে কিছুতেই তেমন হচ্ছে না। বাহিরে তাকাই, দেখি হলুদ-সবুজ-লাল হলুদ-সবুজ-লাল ট্রাফিক-বাতির ত্রিনয়ন জ্বলছে নিবছে জ্বলছে নিবছে। অথচ কোথাও কোন যানবাহনের চিহ্ন নেই। ফুটপাতে ভিখারি নেই। রাস্তাগুলি খাঁখাঁ করছে। প্রধান গির্জার গা বেয়ে জ্যোৎস্নার ধারা নেমেছে ফুটপাথে। তারই মধ্যে একদিকে নিরস্তর ট্রাফিক-বাতির দণ্ড চৌমাথায় চোখ মারে। অন্য দিকে বঙ্গোপসাগর থেকে হুহু করে ছুটে আসে হাওয়া; মধ্যরাতে আচমকা কাঁপিয়ে দেয় কলকাতার বুকের পাঁজর।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1597
4136
রেদোয়ান মাসুদ
দুঃখ গাথা
প্রেমমূলক
রাতগুলো নির্ঘুম আমার কাটে শুধু একেলা পথ আমার অফুরন্ত হয় না শেষ এবেলা। হাটতে হাটতে চলেছি আমি গন্তব্য অজানা ঝোপ ঝাড়ে নেই আলো, অন্ধকারের ছায়া। পাখিগুলো কেন আজ বসে আছে নিরালা গান কেন গায়না তারা আজ সন্ধ্যা বেলা। আকাশটি যেন আজ আছে মেঘে ঢাকা কাছে থেকেও কিছুই তাই যায় না দেখা। নিভু নিভু আলো দিত অন্ধকারে জোনাকিরা কেন যেন আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তারা। নদীর কুলে বসেছিলাম শুনতে সূরের মূর্ছনা হঠাৎ ঢেউ এসে কেড়ে নিলো সেই বাসনা। এ বুকের মাঝে দুঃখগুলো বেধেছে বাসা বলার মত নেই কিছু হারিয়ে গেছে ভাষা। মনেতে নেই কোন শান্তি,নেই কোন সান্ত্বনা সবকিছু হারিয়ে গেছে, আছে শুধু দুঃখমালা। বুকের মাঝে সাগর ছিল উঠেছে ঝড় এবেলা চোখের জলে ভাসিয়েছে সব বিদায় বেলা। ঢেউয়ে ঢেউয়ে কাপি আমি সেথায় একেলা চারিদিকে কি হলো আজ কিছুই বুঝি না। সাগরের জলে মিশবে আজ সকল ভালোবাসা মুছে যাবে হৃদয়ে জমে থাকা যত দুঃখ গাথা। রেখে গেলাম তোমার জন্য গোলাপের থোকা নিয়ে গেলাম যন্ত্রণার মত বিঁধে থাকা কাটা। বুকের মাঝে গেঁথে গেলাম নতুন কোন আশা পর জনমে হয় যেন তোমার সাথে দেখা।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2117.html
4266
শঙ্খ ঘোষ
বাবুমশাই
মানবতাবাদী
‘সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা! বেঁচে ছিলাম ব’লেই সবার কিনেছিলাম মাথা আর তাছাড়া ভাইআর তাছাড়া ভাই আমরা সবাই জেনেছিলাম হবে নতুন সমাজ, চোখের সামনে বিপ্লবে বিপ্লবে যাবে খোল-নলিচাযাবে খোল-নলিচা পালটে, বিচার করবে নিচু জনে’ -কিন্তু সেদিন খুব কাছে নয় জানেন সেটা মনে মিত্র বাবুমশয়মিত্র বাবুমশয় বিষয়-আশয় বাড়িয়ে যান তাই মাঝেমধ্যে ভাবেন তাদের নুন আনতে পান্তাই নিত্য ফুরোয় যাদেরনিত্য ফুরোয় যাদের সাধ-আহ্লাদের শেষ তলানিটুকু চিরটা কাল রাখবে তাদের পায়ের তলার কুকুর সেটা হয় না বাবাসেটা হয় না বাবা’ বলেই থাবা বাড়ান যতেক বাবু কার ভাগে কী কম প’ড়ে যায় ভাবতে থাকেন ভাবুক অমনি্ দু’চোখ বেয়েঅমনি্ দু’চোখ বেয়ে অলপ্পেয়ে ঝরে জলের ধারা বলেন বাবু ‘হা, বিপ্লবের সব মাটি সাহারা’ কুমীর কাঁদতে থাকেকুমীর কাঁদতে থাকে ‘আয় আমাকে নামা নামা ব’লে কিন্তু বাপু আর যাব না চরাতে-জঙ্গলে আমরা ঢের বুঝেছিআমরা ঢের বুঝেছি খেঁদীপেচী নামের এসব আদর সামনে গেলেই ভরবে মুখে, প্রাণ ভ’রে তাই সাধো তুমি সে-বন্ধু নাতুমি সে-বন্ধু না, যে ধুপধুনা জ্বলে হাজার চোখে দেখতে পাবে তাকে, সে কি যেমন তেমন লোকে তাই সব অমাত্যতাই। সব অমাত্য পাত্রমিত্র এই বিলাপে খুশী শুঁড়িখানাই কেবল সত্য, আর তো সবই ভূষি ছি ছি হায় বেচারা’ছি ছি হায় বেচারা? শুনুন যাঁরা মস্ত পরিত্রাতা এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা হেঁটে দেখতে শিখুনহেঁটে দেখতে শিখুন ঝরছে কী খুন দিনের রাতের মাথায় আরেকটা কলকাতায় সাহেব আরেকটা কলকাতায় সাহেব বাবুমশয়।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
1356
তসলিমা নাসরিন
ভুল
প্রেমমূলক
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু এখনো কেমন যেন হৃদয় টাটায়- প্রতারক পুরুষেরা এখনো আঙুল ছুঁলে পাথর শরীর বয়ে ঝরনার জল ঝরে। এখনো কেমন যেন কল কল শব্দ শুনি নির্জন বৈশাখে, মাঘ-চৈত্রে- ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু বিশ্বাসের রোদে পুড়ে নিজেকে অঙ্গার করি। প্রতারক পুরুষেরা একবার ডাকলেই ভুলে যাই পেছনের সজল ভৈরবী ভুলে যাই মেঘলা আকাশ, না-ফুরানো দীর্ঘ রাত। একবার ডাকলেই সব ভুলে পা বাড়াই নতুন ভুলের দিকে একবার ভালোবাসলেই সব ভুলে কেঁদে উঠি অমল বালিকা। ভুল প্রেমে তিরিশ বছর গেল সহস্র বছর যাবে আরো, তবু বোধ হবে না নির্বোধ বালিকার।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%9f%e0%a7%87-%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%9b%e0%a7%87-tirish-bosonto-taslima-nasreen/
5755
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কবির মৃত্যু _ লোরকা স্মরণে
মানবতাবাদী
দু’জন খসখসে সবুজ উর্দিপরা সিপাহী কবিকে নিয়ে গেল টানতে টানতে কবি প্রশ্ন করলেন : আমার হাতে শিকল বেঁধেছ কেন? সিপাহী দু’জন উত্তর দিল না; সিপাহী দু’জনেরই জিভ কাটা। অস্পষ্ট গোধুলি আলোয় তাদের পায়ে ভারী বুটের শব্দ তাদের মুখে কঠোর বিষণ্নতা তাদের চোখে বিজ্ঞাপনের আলোর লাল আভা। মেটে রঙের রাস্তা চলে গেছে পুকুরের পাড় দিয়ে ফ্লোরেসেন্ট বাঁশঝাড় ঘুরে- ফসল কাটা মাঠে এখন সদ্যকৃত বধ্যভূমি। সেখানে আরও চারজন সিপাহী রাইফেল হাতে প্রস’ত তাদের ঘিরে হাজার হাজার নারী ও পুরুষ কেউ এসেছে বহু দূরের অড়হর ক্ষেত থেকে পায়ে হেঁটে কেউ এসেছে পাটকলে ছুটির বাঁশি আগে বাজিয়ে কেউ এসেছে ঘড়ির দোকানে ঝাঁপ ফেলে কেউ এসেছে ক্যামেরায় নতুন ফিল্ম ভরে কেউ এসেছে অন্ধের লাঠি ছুঁয়ে ছুঁয়ে জননী শিশুকে বাড়িতে রেখে আসেননি যুবক এনেছে তার যুবতীকে বৃদ্ধ ধরে আছে বৃদ্ধতরর কাঁধ সবাই এসেছে একজন কবির হত্যাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে। খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হলো কবিকে, তিনি দেখতে লাগলেন তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো- কনিষ্ঠায় একটি তিল, অনামিকা অলঙ্কারহীন মধ্যমায় ঈষৎ টনটনে ব্যথা, তর্জনী সঙ্কেতময় বৃদ্ধাঙ্গুলি বীভৎস, বিকৃত- কবি সামান্য হাসলেন, একজন সিপাহীকে বললেন, আঙুলে রক্ত জমে যাচ্ছে হে, হাতের শিকল খুলে দাও! সহস্র জনতার চিৎকারে সিপাহীর কান সেই মুহূর্তে বধির হয়ে গেল। জনতার মধ্য থেখে একজন বৈজ্ঞানিক বললেন একজন কসাইকে, পৃথিবীতে মানুষ যত বাড়ছে, ততই মুর্গী কমে যাচ্ছে। একজন আদার ব্যাপারী জাহাজ মার্কা বিড়ি ধরিয়ে বললেন, কাঁচা লঙ্কাতেও আজকাল তেমন ঝাল নেই! একজন সংশয়বাদী উচ্চারণ করলোন আপন মনে, বাপের জন্মেও এক সঙ্গে এত বেজম্মা দেখিনি, শালা! পরাজিত এম এল এ বললেন একজন ব্যায়ামবীরকে, কুঁচকিতে বড় আমবাত হচ্ছে হে আজকাল! বাদামওয়ালাকে একজন পকেটমারের হাত আকস্মাৎ অবশ হয়ে যায় একজন ঘাটোয়াল বন্যার চিন্তায় আকুল হয়ে পড়ে একজন প্রধানা শিক্ষয়িত্রী তাঁর ছাত্রীদের জানালেন প্লেটো বলেছিলেন… একজন ছাত্র একটি লম্বা লোককে বললো, মাথাটা পকেটে পুরুন দাদা! এক নারী অপর নারীকে বললো, এখানে একটা গ্যালারি বানিয়ে দিলে পারতো… একজন চাষী একজন জনমজুরকে পরামর্শ দেয়, বৌটার মুখে ফোলিডল ঢেলে দিতে পারো না? একজন মানুষ আর একজন মানুষকে বলে, রক্তপাত ছাড়া পৃথিবী উর্বর হবে না। তবু একজন সম্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, এ তো ভুল লোককে এনেছে। ভুল মানুষ, ভুল মানুষ। রক্ত গোধূলির পশ্চিমে জ্যোৎস্না, দক্ষিণে মেঘ বাঁশবনে ডেকে উঠলো বিপন্ন শেয়াল নারীর অভিমানের মতন পাতলা ছায়া ভাসে পুকুরের জলে ঝমঝুমির মতন একটা বকুল গাছের কয়েকশো পাখির ডাক কবি তাঁর হাতের আঙুল থেকে চোখ তুলে তাকালেন, জনতার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখা ও অক্ষর থেকে রক্তমাংসের সমাহার তাঁকে নিয়ে গেল অরণ্যের দিকে ছেলেবেলার বাতাবি লেবু গাছের সঙ্গে মিশে গেল হেমন্ত দিনের শেষ আলো তিনি দেখলেন সেতুর নিচে ঘনায়মান অন্ধকারে একগুচ্ছ জোনাকি দমকা হাওয়ায় এলোমেলো হলো চুল, তিনি বুঝতে পারলেন সমুদ্র থেকে আসছে বৃষ্টিময় মেঘ তিনি বৃষ্টির জন্য চোখ তুলে আবার দেখতে পেলেন অরণ্য অরণের প্রতিটি বৃক্ষির স্বাধীনতা- গাব গাছ বেয়ে মন্থরভাবে নেমে এলো একটি তক্ষক ঠিক ঘড়ির মতন সে সত বার ডাকলো : গঙ্গে সঙ্গে ছয় রিপুর মতন ছ’জন বোবা কালা সিপাহী উঁচিয়ে ধরলো রাইফেল- যেন মাঝখানে রয়েছে একজন ছেলেধরা এমন ভাবে জনতা ক্রুদ্ধস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো ইনকিলাব জিন্দাবাদ! কবির স্বতঃপ্রবৃত্ত ঠোঁট নড়ে উঠলো তিনি অস্ফুট হৃষ্টতায় বললেন : বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! মানুষের মুক্তি আসুক! আমার শিকল খুলে দাও! কবি অত মানুষের মুখের দিকে চেয়ে খুঁজলেন একটি মানুষ নারীদের মুখের দিকে চেয়ে খুঁজলেন একটি নারী তিনি দু’জনকেই পেয়ে গেলেন কবি আবার তাদের উদ্দেশ্যে মনে মনে বললেন, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! মিলিত মানুষ ও প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বিপ্লব! প্রথম গুলিটি তাঁর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল- যেমন যায়, কবি নিঃশব্দে হাসলেন দ্বিতীয় গুলিতেই তাঁর বুক ফুটো হয়ে গেল কবি তবু অপরাজিতের মতন হাসলেন হা-হা শব্দে তৃতীয় গুলি ভেদ করে গেল তাঁর কন্ঠ কবি শান্ত ভাবে বললেন, আমি মরবো না! মিথ্যে কথা, কবিরা সব সময় সত্যদ্রষ্টা হয় না। চতুর্থ গুলিতে বিদীর্ণ হয়ে গেল তাঁর কপাল পঞ্চম গুলিতে মড় মড় করে উঠলো কাঠের খুঁটি ষষ্ঠ গুলিতে কবির বুকের ওপর রাখা ডান হাত ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে গেল কবি হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলেন মাটিতে জনতা ছুটে এলো কবির রক্ত গায়ে মাথায় মাখতে- কবি কোনো উল্লাস-ধ্বনি বা হাহাকার কিছুই শুনতে পেলেন না কবির রক্ত ঘিলু মজ্জা মাটিতে ছিট্‌কে পড়া মাত্রই আকাশ থেকে বৃষ্টি নামলো দারুণ তোড়ে শেষে নিশ্বাস পড়ার আগে কবির ঠোঁট একবার নড়ে উঠলো কি উঠলো না কেউ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেনি। আসলে, কবির শেষ মুহূর্তটি মোটামুটি আনন্দেই কাটলো মাটিতে পড়ে থাকা ছিন্ন হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে চাইলেন, বলেছিলুম কিনা, আমার হাত শিকলে বাঁধা থাকবে না!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1822
988
জীবনানন্দ দাশ
কার্তিক-অঘ্রাণ ১৯৪৬
চিন্তামূলক
পাহাড়, আকাশ, জল অনন্ত প্রান্তরঃ সৃজনের কী ভীষণ উৎস থেকে জেগে কেমন নীরব হয়ে রয়েছে আবেগ; যেন বজ্রবাতাসের ঝড় ছবির ভিতরে স্থির- ছবির ভিতরে আরো স্থির।কোথাও উজ্জ্বল সূর্য আসে; জ্যোতিষ্কেরা জ্ব'লে ওঠে সপ্রতিভ রাতে আদি ধাতু অনাদির ধাতুর আঘাতে নারীশিক্ষা হত যদি পুরুষের পাশেঃ আকাশ প্রান্তর নীল পাহাড়ের মত নক্ষত্র সূর্যের মত বিশ্ব-অন্তর্লীন উজ্জ্বল শান্তির মত আমাদের রাত্রি আর দিন হবে নাকি ব্রহ্মান্ডের লীন কারুকার্যে পরিণত।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kartik-oghran-1946/
2683
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আদিরহস্য
নীতিমূলক
বাঁশি বলে, মোর কিছু নাহিকো গৌরব, কেবল ফুঁয়ের জোরে মোর কলরব। ফুঁ কহিল, আমি ফাঁকি, শুধু হাওয়াখানি— যে জন বাজায় তারে কেহ নাহি জানি।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/adirohosyo/
1641
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ফুলের স্বর্গ
চিন্তামূলক
যৌবনে আনন্দ নেই, যদি তার সমস্ত সম্ভার আমৃত্যু অক্ষয় থাকে। ক্ষয়ে তার শান্তি, জীবনের প্রার্থনা পূরণ। এই অপরূপ প্রথম-গ্রীষ্মের আলস্যের ভারে নম্র আদিগন্ত রৌদ্র-হাওয়া-নীলে সামান্যই সুখ, দুঃখ অসামান্য : সে-ঐশ্বর্যে তার শুধু ব্যর্থ সঞ্চয়ের বিড়ম্বনা বাড়ে। এ-যৌবন রিক্তই না হয় যদি, বঞ্চনায় বাঁচে তিলে তিলে,– শাস্তিও সান্ত্বনা তার, মৃত্যু তার সন্তাপহরণ। সে-মৃত্যু যখনই নামে বিদ্যুৎবিদীর্ণ ঘন মেঘে বৃষ্টির ধারায়, তুচ্ছ যৌবনজড়িমা লজ্জা সব; প্রাণের সমস্ত পাপড়ি মেলে তার দেবতাদুর্লভ আলিঙ্গনে সংকোচের বৃন্ত থেকে খসে পড়ে যাওয়া– সে-ই তো আমার স্বর্গ। প্রত্যাশায় সারারাত্রি জেগে হাওয়ার হাততালি শুনি; হাওয়া, হাওয়া–অফুরন্ত হাওয়া!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1624
1291
টুটুল দাস
রকমারি
প্রেমমূলক
যে ছেলেটার মুদির দোকান বাড়িতে পোষে বিড়ালছানা কে বলেছে? ফকতা পেলে সে ছেলেটা প্রেম কেনে না।প্রেমের মদে মাতাল সবাই মহুয়াও নাকি পাথর দানা পাথর ঘষে আগুনই পাবি ঝলসে বাঁচার উন্মাদনা।বাঁচতে গেলে মৃত্যুও চাই মৃত্যু নাকি ভুল করে না শোবার ঘরে লুকানো মেঘ মেঘের বাড়ি আর যাবোনা।যাবার নামে আত্মগোপন তেমন কোন পথ ছিল না পথের পরে নীল সমুদ্দুর উপত্যকায় একা যেওনা।একা কোথায়, কবিও আছে সাজিয়ে রাখা মুদিখানা যে ছেলেটা কবিতা বেচে তার কি কোন প্রেম ছিলনা?টুটুল দাসের কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf-%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b8/
3682
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মত্ত সাগর দিল পাড়ি গহন রাত্রিকালে
রূপক
মত্ত সাগর দিল পাড়ি গহন রাত্রিকালে ওই যে আমার নেয়ে। ঝড় বয়েছে, ঝড়ের হাওয়া লাগিয়ে দিয়ে পালে আসছে তরী বেয়ে। কালো রাতের কালি-ঢালা ভয়ের বিষম বিষে আকাশ যেন মূর্ছি পড়ে সাগরসাথে মিশে, উতল ঢেউয়ের দল খেপেছে, না পায় তারা দিশে, উধাও চলে ধেয়ে। হেনকালে এ-দুর্দিনে ভাবল মনে কী সে কূলছাড়া মোর নেয়ে। এমন রাতে উদাস হয়ে কেমন অভিসারে আসে আমার নেয়ে। সাদা পালের চমক দিয়ে নিবিড় অন্ধকারে আসছে তরী বেয়ে। কোন্‌ ঘাটে যে ঠেকবে এসে কে জানে তার পাতি, পথহারা কোন্‌ পথ দিয়ে সে আসবে রাতারাতি, কোন অচেনা আঙিনাতে তারি পূজার বাতি রয়েছে পথ চেয়ে। অগৌরবার বাড়িয়ে গরব আপন সাথি বিরহী মোর নেয়ে। এই তুফানে এই তিমিরে খোঁজে কেমন খোঁজা বিবাগী মোর নেয়ে। নাহি জানি পুর্ণ ক'রে কোন্‌ রতনের বোঝা আসছে তরী বেয়ে। নহে নহে, নাইকো মানিক, নাই রতনের ভার, একটি ফুলের গুচ্ছ আছে রজনীগন্ধার, সেইটি হাতে আঁধার রাতে সাগর হবে পার আনমনে গান গেয়ে। কার গলাতে নবীন প্রাতে পরিয়ে দেবে হার নবীন আমার নেয়ে। সে থাকে এক পথের পাশে, অদিনে যার তরে বাহির হল নেয়ে। তারি লাগি পাড়ি দিয়ে সবার অগোচরে আসছে তরী বেয়ে। রুক্ষ অলক উড়ে পড়ে, সিক্ত-পলক আঁখি, ভাঙা ভিতের ফাঁক দিয়ে তার বাতাস চলে হাঁকি দীপের আলো বাদল-বায়ে কাঁপছে থাকি থাকি ছায়াতে ঘর ছেয়ে। তোমরা যাহার নাম জান না তাহারি নাম ডাকি ওই যে আসে নেয়ে। অনেক দেরি হয়ে গেছে বাহির হল কবে উন্মনা মোর নেয়ে। এখনো রাত হয় নি প্রভাত, অনেক দেরি হবে আসতে তরী বেয়ে। বাজবে নাকো তূরী ভেরী, জানবে নাকো কেহ, কেবল যাবে আঁধার কেটে, আলোয় ভরবে গেহ, দৈন্য যে তার ধন্য হবে, পুণ্য হবে দেহ পুলক-পরশ পেয়ে নীরবে তার চিরদিনের ঘুচিবে সন্দেহ কূলে আসবে নেয়ে। কলিকাতা, ৫ ভাদ্র, ১৩২১
https://banglarkobita.com/poem/famous/1917
1381
তারাপদ রায়
আমি লিখিনি
চিন্তামূলক
কোথাও ছাপার ভুল হয়ে গেছে৷ ভীষণ, বিচ্ছিরি এ পদ্য আমার নয়, এই আলপনা, এই পিঁড়ি; এই ছবি আমি তো আঁকিনি, এই পদ্য আমি তো লিখিনি৷ এই ফুল, এই ঘ্রাণ, এই স্বপ্নময়, স্মৃতি নিয়ে এই ছিনিমিনি এই পদ্য আমি তো লিখিনি৷ আমার পুরোনো খাতা, উড়ছে হাওয়ায় ছেঁড়া মলাটের নিচে পোকা কাটা মলিন পাতায় আমের বোলের গন্ধ, ঝরে আছে অমোঘ পলাশ৷ কবেকার সে পলাশ, ধলেশ্বরী নদীটিরে ঘাটে, একা একা ঝরে পড়ে সে কি সেই উনিশশো পঞ্চাশ? মদন জাগলার মাঠে আজও এক বিষন্ন শিমুল গাছ ভরা, পাতা ভরা ভুল৷ স্মৃতি নিয়ে এই ছিনিমিনি কোথাও ভীষণ ভুল হয়ে গেছে, ঐ ছবি আমার নয়, এই পদ্য আমি তো লিখিনি৷
http://kobita.banglakosh.com/archives/3890.html
1934
ফররুখ আহমদ
ঝরোকা
মানবতাবাদী
সকল রুদ্ধ ঝরোকা খুলে দাও খুলে দাও সকল রুদ্ধ দরোজা। আসুক সাত আকাশের মুক্ত আলো আর উচ্ছল আনন্দের মত বাগে এরেমের এক ঝাঁক মৌমাছি .. .. যেন এই সব পাথরের ফুলের মাঝখান থেকে আমি চিনে নিতে পারি রক্তমনির চেয়েও লাল সুনভিত একটি তাজা রক্ত গোলাপ; আমার ব্যথিত আত্মা আর্তনাদ করে উঠলো দাউদের পুত্র সোলায়মানের মতো কেননা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আকাশ আছে পৃথিবীতে চিরন্তন শুধু সত্যের অন্বেষা।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4004.html
5100
শামসুর রাহমান
মাঝে মাঝে মাটিতে
রূপক
মাঝে মাঝে মাটিতে বুক রাখি। আমার হৃৎস্পন্দন আর মাটির বুকের টিপটিপ শব্দের যুগলবন্দি চলে অনেকক্ষণ। মাটিলগ্ন হয়ে থাকবার এই আনন্দ উত্তাল ঢেউয়ের ওপর নৌকো। আজ গুচ্ছ গুচ্ছ ঘাস ভেদ করে আমার বুক যখন মাটিতে পেতে দিলাম, জমি আমাকে শোনাল দীর্ঘ পদধ্বনি। ক’জন লম্বা, শক্ত সমর্থ, কান্তিমান পুরুষের পদযাত্রা আমার পাশ ঘেঁষে। আমি অনন্য কোনও উৎসব-উদ্‌ভাসিত বালকের মতো তাঁদের শনাক্ত করি আমার পূর্বপুরুষ বলে। তাঁরা আমার উদ্দেশে কোনও বাক্য উচ্চারণ না করেই হিলহিলে শস্য ক্ষেতে প্রবেশ করলেন। শস্যের কোরাসে মুগ্ধ আমি মাটিকে আরও বেশি বুকে বাঁধি। খানিক পরে দেখি, আমার মৃতা জননী হেঁটে যেতে-যেতে আমার দিকে তাকালেন অবর্ণনীয় স্নিগ্ধতায়। তাঁকে নির্বাক দেখে আমার কম্পিত ঠোঁট উচ্চারণ করে, ‘মাগো, তুমি আমার সঙ্গে একটি বারও কি কথা বলবে না আর? মার নিশ্চুপতা জায়গাটিকে অধিকতর নির্জনতা নীরবতা দান করে। অসহায় আমি মাটিতে মুখ ঘষি, যেমন শৈশবে ঘষতাম মার বুকে।আমার ঢিপঢিপ বুক মাটিতে লগ্ন। হঠাৎ এ আমি কী অনুভব করছি বুকের নিচে? প্রিয়তমা, এখন মনে হচ্ছে আমার বুকের নিচে তোমার উদ্ভিন, স্ফুরিত স্তনদ্বয়। অথচ তুমি তো এখানে নেই কোথাও এই মুহূর্তে। যখন তুমি ফিরে আসবে এই রুগ্ন আমার কাছে, হাসপাতালের ফ্যাকাশে দেয়াল হয়ে উঠবে নববধূর গালের লালিমা। ফুটপাথ ফুঁড়ে দেবশিশুর মতো দুলবে অজস্র ফুল। তোমার এই না-থাকা ক্রমাগত কালো রঙ ছড়ায় আমার চিদাকাশে।মাটি মাতৃস্নেহে আমার বুকে স্বপ্ন-শস্য ফলায়, টেনে নিতে চায় সোঁদা কোলের গভীরে। জমি নিজের বুকে চিরে আমার ঠোঁটের কাছে এক হাত মুলিবাঁশ তুলে ধরে। মুলিবাঁশে ফুঁ দিই বেনামি ব্যাকুলতায়। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে সুরজাল। আমি সুরবিহ্বল নৃত্যমোহিত ময়ূর।   (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/makhe-majhe-matite/
3161
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে
ভক্তিমূলক
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে। এসো গন্ধে বরনে, এসো গানে। এসো অঙ্গে পুলকময় পরশে, এসো চিত্তে অমৃতময় হরষে, এসো মুগ্ধ মুদিত দু নয়ানে। তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে।এসো নির্মল উজ্জ্বল কান্ত, এসো সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত, এসো এসো হে বিচিত্র বিধানে। এসো দুঃখে সুখে, এসো মর্মে, এসো নিত্য নিত্য সব কর্মে; এসো সকল-কর্ম-অবসানে। তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে।অগ্রহায়ণ, ১৩১৪? (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumi-nobo-rupe-eso-prane/
2031
মলয় রায়চৌধুরী
অভ্রপুষ্প
চিন্তামূলক
মোচড়খোলা আলোয় আকাশকে এক জায়গায় জড়ো করে ফড়িং-ফোসলানো মুসুরিক্ষেতে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন বোলডার-নিতম্ব কবি মরাবাতাসের বদবুমাখা কন্ঠস্বরে ঝরছিল বঁড়শিকেঁচোর কয়েলখোলা গান থেকে এক-সিটিঙে সূর্যের যতখানি রোজগার শেষ হয়ে যায় মধু দিয়ে সেলাই করা মৌচাকে মোতায়েন জেড ক্যাটাগরির ভোঁদড়ের খলিফা-আত্মা সামলাতে প্রদূষণ বিরোধীদের দিকে ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসের হাসি চুয়ে পড়ছিল লিপস্টিক-বোলানো গোধূলি থেকে চুলকুনি-জালে বানানো চামড়ায় ভুটভুটির মাঝি-মেকানিক তখন ফ্রিজের কুমড়োর শীতঘুম থেকে উঠে দু-চার ক্রেট নদী ভরেছে ডতপেনের নীল শিরদাঁড়ায় যার ফলে আঙুলের ডগায় লেগে থাকা স্মৃতিতে খুঁজে পাওয়া গেছে হারানো চাবির বিকল্প এক আয়ুর্বেদিক জ্যোৎস্না মাথার ওপর বয়ে নিয়ে চলেছে বোরখা-ঢাকা মেঘের মধ্যে পালক-খোলা টিয়াদের জোয়ারে হেলান-দেয়া গেঁহুয়াপিঠ ঢেউ পাটনা ৬ জুন ১৯৯৮
https://banglarkobita.com/poem/famous/1146
893
জসীম উদ্‌দীন
হলুদ বাঁটিছে মেয়ে
গীতিগাথা
হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে, হলুদের পাটা হাসিয়া গড়ায় রাঙা অনুরাগে নেয়ে। দুই হাতে ধরি কঠিন পুতারে ঘসিছে পাটার পরে, কাঁচের চুড়ী যে রিনিক ঝিনিকি নাচিছে খুশীর ভরে। দুইটি জঙ্ঘা দুইধারে মেলা কাঠ-গড়া কামনার, তাহার উপর উঠিতে নামিতে সোনার দেহটি তার; মর্দ্দিত দুটি যুগল সারসী শাড়ী সরসীর নীরে, ডুবিতে ভাসিতে পুষ্প ধনুরে স্মরিতেছে ঘুরে ফিরে। হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে, রঙিন ঊষার আবছা হাসিতে আকাশ ফেলিল ছেয়ে। মিহি-সুরী গান গুন গুন করে ঘুরিছে হাসিল ঠোঁটে, খুশীর ভোমরী উড়িয়া শ্রীমুখ-পদ্মের দল লোটে। বিগত রাতের বভস-সুখের মদিরা জড়িত স্মৃতি, সারাটি পাটারে হলুদে জড়ায়ে গড়ায়ে রঙিছে ক্ষিতি। গাছের ডালে যে বুলবুলী বসি ভরিয়া দুখানা পাখ, লিখিয়া হইতে তারি একটুকু মেলিছে সুরেলা ডাক। হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে, হলুদে লিখিত রঙিন কাহিনী গড়াইছে পাটা বেয়ে। ডোল-ভরা ধান, কোল ভরা শিশু, বুক-ভরা মিঠে গান, কোকিল ডাকান আম্র ছায়ায় পাতার কুটীর খান; চাঁদিনী রাতের জোছনা আসিয়া গড়ায় বেড়ার ফাঁকে কৃষাণ কন্ঠে বাঁশীটি বাজিয়া আকাশেতে প্রীতি আঁকে। অর্দ্ধেক রাত নক্সী-কাঁথাটি মেলন করিয়া ধরি, অতি সযতনে আঁকে ফুল-লতা মনের মমতা ভরি। সুখ যেন আসি গড়াইয়া পড়ে, সূতার লতালী ফাঁদে, মাটির ধরায় টেনে নিয়ে আসে গগন বিহারী চাঁদে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/211
4070
রামনিধি গুপ্ত
আসিবে হে প্রাণ কেমনে এখানে
প্রেমমূলক
আসিবে হে প্রাণ কেমনে এখানে | ননদী দীরুণ অতি, আছে সে সন্ধানে || রাখিতে পরাণ মোর, আমি নাহি পারি আর | পিরীতে এই সে হ’লো সংশয় জীবনে || ১ || মদন রোদন করে, বিরস দেখিয়ে মোরে | লাজ ভয় কাল সম দয়া নাহি জানে || ২ || নিদয় বিধাতা যারে, সদয় কে হয় তারে | আমার উপায় ইথে হইবে কেমনে || ৩ || ধিক্ ধিক্ নারীগণে, মিলয়ে পুরুষ সনে | কুল তেয়াগিতে নারে, মরে মন মানে || ৪ ||
http://kobita.banglakosh.com/archives/3852.html
4256
শঙ্খ ঘোষ
চুপ
চিন্তামূলক
এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো শব্দহীন হও শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মরলেখো আয়ু লেখো আয়ুভেঙে পড়ে ঝাউ, বালির উত্থান, ওড়ে ঝড় তোমার চোখের নিচে আমার চোখের চরাচর ওঠে জেগেস্রোতের ভিতরে ঘূর্ণি, ঘূর্ণির ভিতরে স্তব্ধ আয়ু লেখো আয়ু লেখো আয়ু চুপ করো, শব্দহীন হও
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9a%e0%a7%81%e0%a6%aa-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8b-%e0%a6%b6%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%b9%e0%a7%80%e0%a6%a8-%e0%a6%b9%e0%a6%93-shankha-ghosh/
3
অতুলপ্রসাদ সেন
নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন
চিন্তামূলক
নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন, তুই সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন। মূঢ় মন, সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন। নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন। লাগে নি যার পায়ে ধুলি, কি নিবি তার চরণ ধুলি, নয়রে সোনায়, বনের কাঠেই হয় রে চন্দন। মূঢ় মন, হয় রে চন্দন। নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন। এ মোধন মায়ের মতন, দুঃখীটুতেই অধিক যতন, এ ধনেতে ধনি যে জন, সেই তো মহাজন। মূঢ় মন, সেই তো মহাজন। বৃথা তোর কৃচ্ছসাধন, সেবাই নরের শ্রেষ্ঠ সাধন, মানবের পরম তীর্থ দীনের শ্রীচরণ। মূঢ় মন, দীনের শ্রীচরণ। মতামতের তর্কে মত্ত, আছিস ভুলে পরম সত্য, সকল ঘরে সকল নরে আছেন নারায়ণ। মূঢ় মন, আছেন নারায়ণ। নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4249.html
2110
মহাদেব সাহা
এবার বর্ষার জলে
প্রকৃতিমূলক
এবার বর্ষার জলে ধুয়ে নেবো মলিন জীবন ধুয়ে নেবো আপাদমস্তক এই ভিতর-বাহির, নতুন বর্ষার জলে পুনরায় হবো সঞ্জীবিত; আমি চাই কেবল জীবন জুড়ে অঝোর বর্ষণ দিনরাত বৃষ্টিজল, দুইকুল ভরা স্নিগ্ধ নদী, বর্ষার শ্যামল ছায়া, পরিশুদ্ধ বৃষ্টিধারা নব- এবার বর্ষার জলে ধুয়ে নেবো আমার জীবন !
https://banglarkobita.com/poem/famous/1342
850
জসীম উদ্‌দীন
পল্লী জননী
গীতিগাথা
রাত থম থম স্তব্ধ, ঘোর-ঘোর-আন্ধার, নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বিসয়া একেলা জাগিছে মাতা, করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা। শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে, তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে। ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান, এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ? ছোট কুঁড়ে ঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু, শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু। ছেলে কয়, “মারে, কত রাত আছে? কখন সকাল হবে, ভাল যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে?” মা কয়“বাছারে ! চুপটি করিয়া ঘুমা ত একটি বার, ” ছেলে রেগে কয় “ঘুম যে আসে না কি করিব আমি তার ?” পান্ডুর গালে চুমো খায় মাতা, সারা গায়ে দেয় হাত, পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ। নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে, দরগায় মানে দান, ছেলেরে তাহার ভাল কোরে দাও, কাঁদে জননীর প্রাণ। ভাল করে দাও আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর। কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর। বাঁশবনে বসি ডাকে কানা কুয়ো, রাতের আঁধার ঠেলি, বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারীর বন হেলি। চলে বুনোপথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি, দুর ছাই। কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি। যে কথা ভাবিতে পরাণ শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে, বালাই, বালাই, ভালো হবে যাদু মনে মনে জাল বোনে। ছেলে কয়, “মাগো! পায়ে পড়ি বলো ভাল যদি হই কাল, করিমের সাথে খেলিবারে গেলে দিবে না ত তুমি গাল? আচ্ছা মা বলো, এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া এখনি আমারে এত রোগ হোতে করিতে পারি ত খাড়া ?” মা কেবল বসি রুগ্ন ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে, ভাসা ভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে। “শোন মা! আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে, রাখিও ঢ্যাঁপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি শিকা পরে। খেজুরে-গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে, ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পরে।” ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত, বাহিরেতে নাচে জোনাকী আলোয় থম থম কাল রাত। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে, কোন দিন সে যে মায়েরে না বলে গিয়াছিল দুর বনে। সাঁঝ হোয়ে গেল আসেনাকো আই-ঢাই মার প্রাণ, হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলে হর্ষে করিয়া গান। এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে, ওরে মুখপোড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি-সাঁঝে? কত কথা আজ মনে পড়ে মার, গরীবের ঘর তার, ছোট খাট কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার। আড়ঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই, বলেছে আমরা মুসলমানের আড়ঙ দেখিতে নাই। করিম যে গেল? রহিম চলিল? এমনি প্রশ্ন-মালা; উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা। আজও রোগে তার পথ্য জোটেনি, ওষুধ হয়নি আনা, ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা। ঘরের চালেতে ভুতুম ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর, মরণের দুত এল বুঝি হায়। হাঁকে মায়, দুর-দুর। পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডা’ক ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি, কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি। ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে বুড়ো পাতা ঝরে বনে, ফোঁটায় ফোঁটায় পাতা-চোঁয়া জল গড়াইছে তার সনে। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা। সম্মুখে তার ঘোর কুজঝটি মহা-কাল-রাত পাতা। পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেলা, আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/766
2738
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে
প্রেমমূলক
আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে, বাঁকা পথের ডাহিন পাশে, ভাঙা ঘাটের বাঁয়ে। কে জানে এই গ্রাম, কে জানে এর নাম, খেতের ধারে মাঠের পারে বনের ঘন ছায়ে– শুধু আমার হৃদয় জানে সে ছিল এই গাঁয়ে।বেণুশাখারা আড়াল দিয়ে চেয়ে আকাশ-পানে কত সাঁঝের চাঁদ-ওঠা সে দেখেছে এইখানে। কত আষাঢ় মাসে ভিজে মাটির বাসে বাদলা হাওয়া বয়ে গেছে তাদের কাঁচা ধানে। সে-সব ঘনঘটার দিনে সে ছিল এইখানে।এই দিঘি, ওই আমের বাগান, ওই-যে শিবালয়, এই আঙিনা ডাক-নামে তার জানে পরিচয়। এই পুকুরে তারি, সাঁতার-কাটা বারি, ঘাটের পথরেখা তারি চরণ-লেখা-ময়। এই গাঁয়ে সে ছিল কে সেই জানে পরিচয়।এই যাহারা কলস নিয়ে দাঁড়ায় ঘাটে আসি এরা সবাই দেখেছিল তারি মুখের হাসি। কুশল পুছি তারে দাঁড়াত তার দ্বারে লাঙল কাঁধে চলছে মাঠে ওই-যে প্রাচীন চাষি। সে ছিল এই গাঁয়ে আমি যারে ভালোবাসি।পালের তরী কত-যে যায় বহি দখিনবায়ে, দূর প্রবাসের পথিক এসে বসে বকুলছায়ে। পারের যাত্রিদলে খেয়ার ঘাটে চলে, কেউ গো চেয়ে দেখে না ওই ভাঙা ঘাটের বাঁয়ে। আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ami-jare-valobashi-se-chilo-ei-gae/
2467
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
উপাত্তের সন্ধানে
চিন্তামূলক
আদ্যপ্রান্ত কোনোখানে দেহকাব্যে পাবে না তো অনায়াস পাঠ মস্তিষ্কের সূক্ষ্মতম তন্ত্রীতেও ঘটে গেলে হঠাত বিভ্রাট প্রেমিক লম্পট হয় প্রেমিকাও হতে পারে সেরেফ পতিতা দৃষ্টির বিভ্রম নিয়ে কেটে গেলে জন্ম থেকে কবর বা চিতা অপঠিত থেকে যায় দেহকাব্যে সর্গ - অনুসর্গ - পাদটিকা অথবা মুহূর্তে কোনো সংঘটিত অনুকাব্য - ক্ষুদ্রাঙ্ক নাটিকা --- লুকানো বিদ্যুৎ কোনো, ভ্রূকম্পে ভূকম্প কোনো যদি অগোচরে ঘটে যায় তাহলেই ভুল অংক লেখা হবে শাস্ত্রের আকরেদেহকাব্যে অনায়াস পাঠ নেই -- তবু দেখি নিত্য আয়োজন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করা মগজের খোঁয়ারিতে হাতড়ে ফেরে ধন বোঝে না কোথায় ভুল, দেহের ভিতরে দেহ, কিসের সন্ধান --- গানের ভঙ্গিতে শুধু স্বরযন্ত্র গোঙানিতে মুখের ব্যাদান বিপর্যস্ত করে দেয় সুরে স্বরে তত্বে সত্তে বাণীর বিন্যাস হাজার বিচ্যুতি নিয়ে, নামে শুধু সাধু থাকে, কামে হয় দাস কাব্য হয়ে যায় পণ্য, কিনে খায় নাগরিক শিশ্ন কিম্বা যোনি দেহের খোলস তাই বাজারের প্রান্তে পড়ে হারায় লাবনীআসলে এ দেহকাব্যে সত্যের সন্ধান খুঁজে পেয়েছে ক'জন এ প্রশ্ন বাতাসে ঘোরে, জবাব দেবেন কোন সাঁইজ্বী স্বজন০৪ / ১০ / ২০১৭
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/upatter-shondhane/
1915
পূর্ণেন্দু পত্রী
স্মৃতি
প্রেমমূলক
পুরনো পকেট থেকে উঠে এল কবেকার শুকনো গোলাপ । কবেকার ? কার দেওয়া ? কোন মাসে ? বসন্তে না শীতে ? গোলাপের মৃতদেহে তার পাঠযোগ্য স্মৃতিচিহ্ন নেই । স্মৃতি কি আমারও আছে ? স্মৃতি কি গুছিয়ে রাখা আছে বইয়ের তাকের মত, লং প্লেইং রেকর্ড-ক্যাসেটে যে-রকম সুসংবদ্ধ নথীভুক্ত থাকে গান, আলাপচারীতা ?আমার স্মৃতিরা বড় উচ্ছৃঙ্খল, দমকা হাওয়া যেন লুকোচুরি, ভাঙাভাঙি, ওলোটপালটে মহাখুশি দুঃখেরও দুপুরে গায়, গাইতে পারে, আনন্দ-ভৈরবী ।আকাঙ্খার ডানাগুলি মিশে গেছে আকাশের অভ্রে ও আবীরে আগুনের দিনগুলি মিশে গেছে সদ্যজাত ঘাসের সবুজে প্রিয়তম মুখগুলি মিশে গেছে সমুদ্রের ভিতরের নীলে ।স্মৃতি বড় উচ্ছৃঙ্খল, দুহাজার বছরেও সব মনে রাখে ব্যাধের মতন জানে অরণ্যের আদ্যোপান্ত মূর্তি ও মর্মর । অথচ কাল বা পরশু কে ডেকে গোলাপ দিল কিছুতে বলবে না ।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%a1%e0%a6%bc-%e0%a6%89%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a7%83%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%81/
1597
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ঠাকুমা বলতেন
গীতিগাথা
ঠাকুমা বলতেন, “দাদা, খুব বেশি তো আর বাঁচব না, এখন তাই সাধ্যমতো আল্‌গা দিয়ে থাকি। যে অল্প সময় আছে বাকি, দেখতে-দেখতে কেটে যাবে, তোমরা থাকো ভাল। আমি দেখি কী করে আমার আঁচলের গিঁটগুলোকে ধীরেসুস্থে খুলে ফেলা যায়।” (যখনই বলতেন, বড় নম্র একটা আলো ভেসে উঠত শান্ত দুটি অনচ্ছ চক্ষুর জানালায়।) দিদি তো তক্ষুনি রেগে টং বলত, “তুমি যাবে কোথা? দিচ্ছে বা কে যেতে? আমরা চাইছি গল্প শুনতে, আমরা চাইছি খেতে। নাড়ু, বড়ি, আম-কাসুন্দি খেয়ে দিব্যি আছি, বুঝলে তো ঠাকুমা? তুমি বাজে কথা বাদ দিয়ে বরং গল্প বলো, কিংবা সেই বিখ্যাত লাউয়ের-ঘণ্ট রাঁধো মুগডাল ছড়িয়ে, আমরা চাট্টি খেয়ে বাঁচি। মোট কথা গিঁটগুলি তুমি শক্ত করে বাঁধো।” ঠাকুমা বলতেন, “দিদি, যে-লোকটা সব-কিছু ছেড়ে একা চলে গেছে, তার কথা যে বড্ড মনে পড়ে। সে-ও তো বলত, কলকাতা-শহরে চিত্তসুন্দরীর থেকে সুন্দরী যদি-বা থাকে, তার অর্ধেক সুন্দর রান্না কোত্থাও পাবে না।…যার দেখা স্বপ্নে রোজ পাচ্ছি, দিদি, তাকে ছেড়ে আর কি থাকা যায়?” (বলতে-বলতে হাসি ফুটে উঠত ঠাকুমার মুখে, আলো ভাসত দুটি অনচ্ছ চক্ষুর জানালায়।)
https://banglarkobita.com/poem/famous/1566
1914
পূর্ণেন্দু পত্রী
স্বরচিত নির্জনতা
চিন্তামূলক
স্বরচিত নির্জনতা, সযত্ন-সৃজিত নির্জনতা তুমি আছ পার্শ্ববর্তী,কী অপুর্ব সুখ। বাইরে ভুলের হাওয়া বইছে বহুক। পল্লবেরা মরে শুধু পল্লবেরা অবেলায় ঝরে পল্লবেরা কাঁপে গায়ে হতাশার জর বনস’লী ভুলে গেছে নিজস্ব মর্মর। আদিম চীৎকার তুলে কাপালিক মগ্ন মন্ত্র পাঠে অশ্রুধ্বনি নাভীমূলে অবনত শোকে যারা হাঁটে। কেউ যদি চায় বিশ্বটাকে কিনে নেবে এক ভাঁড় বিশৃঙ্খলতায়, ভাবে তো ভাবুক। স্বরচিত নির্জনতা,সযত্ন-সৃজিত নির্জনতা তুমি থাকো পার্শ্ববর্তী স্বর্গে ভরি শূন্যের সিন্দুক।
https://banglarkobita.com/poem/famous/490
5716
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রূপক
কে যেন মনীশকে ডাকলো, মনীশের জাগরণ ভেঙে তবু ভালো, শোনার মতন কেউ নেই সকলেই ঘোর অমাবস্যা দেখতে গিয়েছে সমুদ্রে মনীশেরও পোশাকের মধ্যে আছে অতিশয় শশব্যন্ত অ-মনীশ তার বন্ধু অ-সিদ্ধার্থ, অ-লাবণ্য এরাও গিয়েছে কে যেন মনীশকে ডাকলো, মনীশের জাগরণ ভেঙে- অ-ভালোবাসায় মগ্ন ওরা সব, সকলেই এক হয়ে আছে ও ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখে বাকিটুকু চুনকাম হয় ঘরবাড়ি ভেঙেচুরে সর্বস্ব নতুন অ-ব্যবহৃত ক্রেন অ-মানুষ হয়ে উঁকি মারে কে যেন মনীশকে ডাকলো, মনীশের জাগরন ভেঙে?- মনীশ, মনীশ এসো, টেলিফোন, দূর থেকে কেউ… অ-মনীশ ছুটে এলো, কার জন্য? আমার নয়! অ-লেখা চিঠিও ফিরে যায়, যে-রকম অ-দেখা স্বপ্নের বর্ণচ্ছট ও আমার নয়, এই অ-সময় কেউ ডকবে না বস’ত ঘুমই হয়নি কয়েক রাত, অতি দ্রুত চলছে মেরামত কালই একটা কিছু হবে। সকালেই তৈরি থাকো, তৈরি হও, কাল আগামী কালের জন্য অপেক্ষায় আছে এই জীবনের অ-বিপুল অ-পূর্ণতা অ-মনীশ গেছে তার অ-বন্ধু ও অ-বান্ধবী সকলের কাছে কে যেন মনীশকে ডাকলো, মনীশের জাগরণ ভেঙে? ও আমার নয় এই অ-সময়ে কেউ ডাকবে না।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/288
2737
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি বেসেছিলেম ভালো
প্রকৃতিমূলক
আমি বেসেছিলেম ভালো সকল দেহে মনে এই ধরণীর ছায়া আলো আমার এ জীবনে। সেই যে আমার ভালোবাসা লয়ে আকুল অকূল আশা ছড়িয়ে দিল আপন ভাষা আকাশনীলিমাতে। রইল গভীর সুখে দুখে, রইল সে-যে কুঁড়ির বুকে ফুল-ফোটানোর মুখে মুখে ফাগুনচৈত্ররাতে। রইল তারি রাখি বাঁধা ভাবী কালের হাতে।  (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ami-beshechilam-valo/
727
জয় গোস্বামী
মালতীবালা
প্রেমমূলক
বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো? বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়িবেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলোবেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে? সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে? আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো! স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক।রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই? কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুনবেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো? বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়িবেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলোবেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে? সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে? আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো! স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক।রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই? কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?কবি জয় গোস্বামীর আরও কবিতা পড়তেঃ এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b2/