id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
54
|
আনিসুল হক
|
ম’রে যেতে সাধ হয়
|
প্রেমমূলক
|
শাহানা, তুমি গোলাপী জামা প’রে জীবন্ত গোলাপের মতো
ক্যাম্পাসে এসো না, আমার খারাপ লাগে।সখী পরিবৃতা হয়ে মোগল-দুহিতার মতো
করিডোরে অমন ক’রে হেঁটো না, আমার খারাপ লাগে।শাহানা, তুমি চিবুক নাড়িয়ে
রাঙা মাড়িতে
দুধ শাদা হাতে
লালিম জিহ্বায়
গিটারের তারের মতো বেজে উঠো না —
দরদালান কেঁপে উঠে, ঢিল পড়ে বুকের পুকুরে,
কাঁপে পানি থিরিথিরি, আমার খারাপ লাগে।শাহানা, তুমি টিফিন আওয়ারে ক্লাসরুমে ব’সে
অমন করে রাধার মতো দীর্ঘ চুল মেলে দিও না
অন্ধকার করে আসে সারাটা আকাশ
নিবে যায় সবগুলি নিয়ন
কালো মেঘের উপমা দিতে আমার ভালো লাগে না।শাহানা, তুমি ক্যাফেটেরিয়ায় নিরেট চায়ের কাপে
ওই দুটি ঠোঁট রেখো না;
নিদাঘ খরার পোড়ে ঠোঁটের বাগান,
মরুভূর মতো জ্বলে তৃষ্ণার্ত সবুজ;আমার মরে যেতে সাধ হয়।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1693.html
|
1797
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কলকাতা
|
প্রকৃতিমূলক
|
কলকাতা বড় কিউবিক।
যেন পিকাশোর ইজেলে-তুলিতে
গর গরে রাগে ভাঙা।
কলকাতা সুররিয়ালিষ্ট।
যেন শাগালের নীলের লালের
গৃঢ় রহস্যে রাঙা।
কলকাতা বড় অস্থির।
যেন বেঠোফেন ঝড়ে খুঁজছেন।
সিমফনি কোনো শান্তির।
কলকাতা এক স্কাল্পচার।
রদাঁর বাটালি পাথরে কাটছে
পেশল-প্রাণের কান্তি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1172
|
3846
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শক্তির শক্তি
|
নীতিমূলক
|
দিবসে চক্ষুর দম্ভ দৃষ্টিশক্তি লয়ে,
রাত্রি যেই হল সেই অশ্রু যায় বয়ে!
আলোরে কহিল—আজ বুঝিয়াছি ঠেকি
তোমারি প্রসাদবলে তোমারেই দেখি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shoktir-shokti/
|
2554
|
রফিক আজাদ
|
আমাকে খুঁজো না বৃথা
|
স্বদেশমূলক
|
আমাকে খুঁজো না বৃথা কাশ্মীরের স্বচ্ছ ডাল হ্রদে,
সুইৎসারল্যান্ডের নয়নলোভন কোনো পর্যটন স্পটে,
গ্রান্ড ক্যানালের গন্ডোলায়ও নয়,
খুঁজো না ফরাসি দেশে_ পারীর কাফেতে, মধ্যরাতে;
রাইন বা মাইনের তীরে, সুবিস্তীর্ণ ফলের বাগানে. . .
আমাকে খুঁজো না জাম্বো জেটে,
দ্রুতগামী যাত্রীবাহী জাহাজের কিংবা কোনো
বৃহৎ সমুদ্রগামী যাত্রীবাহী জাহাজের ডেকে. . .
ভুল করে অন্ধ গলি-ঘুঁজি পার হয়ে, যদি এই
আঁধার প্রকোষ্ঠে আসো
দেখবে উবুড় হয়ে বাংলার এই মানচিত্রে
মুখ থুবড়ে প'ড়ে আছে চলি্লশ বছর. . .
আমার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ঠেকে আছে
পদ্মার ওপর
এবং আমার দু'চোখের অবিরল ধারা বয়ে গিয়ে
কানায়-কানায় ভ'রে দিচ্ছে সব ক'টি শুষ্ক নদী,
এবং দেখতে পাবে
শ্যামল শস্যের মাঠ
আমার বুকের নিচে আগলে রেখেছি. . .
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/361
|
2801
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
এ জন্মের সাথে লগ্ন স্বপ্নের জটিল সূত্র যবে
|
চিন্তামূলক
|
এ জন্মের সাথে লগ্ন স্বপ্নের জটিল সূত্র যবে
ছিঁড়িল অদৃশ্যঘাতে, সে মুহূর্তে দেখিনু সম্মুখে
অজ্ঞাত সুদীর্ঘ পথ অতি দূর নিঃসঙ্গের দেশে
নিরাসক্ত নির্মমের পানে। অকস্মাৎ মহা একা
ডাক দিল একাকীরে প্রলয় তোরণ চূড়া হতে ।
অসংখ্য অপরিচিত জ্যোতিষ্কের নিঃশব্দতা মাঝে
মেলিনু নয়ন; জানিলাম একাকীর নাই ভয়,
ভয় জনতার মাঝে; একাকীর কোনো লজ্জা নাই,
লজ্জা শুধু যেথা সেথা যার তার চক্ষুর ইঙ্গিতে।
বিশ্বসৃষ্টিকর্তা একা, সৃষ্টিকাজে আমার আহ্বানবিরাট নেপথ্যলোকে তাঁর আসনের ছায়াতলে।
পুরাতন আপনার ধ্বংসোন্মুখ মলিন জীর্ণতা
ফেলিয়া পশ্চাতে, রিক্তহস্তে মোরে বিরচিতে হবে
নূতন জীবনচ্ছবি শূন্য দিগন্তের ভূমিকায়। (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/e-jonmer-sathe-logno-shopner-jotil-sutro-jobe/
|
937
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আমি হাত প্রসারিত করে দেই
|
চিন্তামূলক
|
আমি হাত প্রসারিত ক'রে দেই বায়ুর ভিতরে,
অনেক জীবাণূ এসে রোমকূপে জমে-
এই এক আলোড়ন রয়ে গেছে পৃথিবীতে।
মানুষের অন্তরেও এ- রকম;
কোনো এক রমনীকে দেখে প্রীতি,
কোনো জননায়কের অবয়ব দেখে বিস্ময়,
কোনো বিষয়ীর জানুর উপরে হাত রেখে দিয়ে আশা।এইসব অনুভব তবু আজ কীলক লিপির পরে ভোরের আলোয়
অতীত রাত্রির পরিভাষা।
কেন না মানুষ- বায়ু, রোমকূপ, জীবাণুর মতো নয়!
ইহাদের সরলতা শিশুর মতন
মানুষ অনেকদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকে
ক্রমশই হ'য়ে যায় বিশদ অতল;এইসব ইতিহাস পরম্পরা বুঝে
আমার হৃদয় থেকে বিচুর্ণ কাচের খণ্ড খুঁজে
বুঝে গেঝি মরণ কি। অথবা জীবন কেন অধিক বিশদ নিয়ন্ত্রণ।সকল রঙের শিখা একসাথে মিলে গিয়ে হ'য়ে যায় শাদা।
একটি জমাট ঢিলে বহুতর বিরোধের বাধা
অনেক আবহ তার বুকের ভিতরে ধ'রে রেখে
মানুষ ও বহ্মাণ্ডের পরমায়ু নিম্রীল বাতাসে
লাঙ্গুল ঘুরায়ে অগ্নির অক্ষরে ফেলে এঁকে।#অগ্রন্থিত কাব্যসমগ্র
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/haat-prosarito/
|
4996
|
শামসুর রাহমান
|
বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা
|
স্বদেশমূলক
|
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।
মমতা নামের প্রুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড়
ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে
শিউলিশৈশবে 'পাখী সব করে রব' ব'লে মদনমোহন
তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,
অবিচ্ছিন্ন পরস্পর মমতায় লীন,
ঘুরেছি কাননে তাঁ নেচে নেচে, যেখানে কুসুম-কলি সবই
ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।
আজন্ম আমার সাথী তুমি,
আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ'ড়ে পলে পলে,
তাইতো ত্রিলোক আজ সুনন্দ জাহাজ হয়ে ভেড়ে
আমারই বন্দরে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/589
|
825
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ১২
|
কাহিনীকাব্য
|
বার
রাইত তুই যা রে পোহাইয়ে |
বেলা গে ল সন্ধ্যা হৈল—ও হৈলরে! গৃহে জ্বালাও বাতি,
না জানি অবলার বন্ধু আসবেন কত রাতিরে!
রাইত তুই—যা পোহাইয়ে
রাইত না এক পরের হৈল, ও হৈলরে! তারায় জ্বলে বাতি ;
রান্ধিয়া বাড়িয়া অন্ন জাগ্ ব কত রাতিরে ;
রাইত তুই যারে—যা পোহাইয়ে |
রাইত না দুই পরের হৈল ও হৈলরে, ডালে ডাকে শুয়া
অঞ্চল বিছায়া নারী কাটে চেকন গুয়ারে |
রাইত তুই যারে—যা পোহাইয়ে |
রাইত না প্রভাত হৈল—ও হৈলরে, কোকিল করে কুয়া,
খুইলে দাও মন্দিরার কেওয়াড় লাগুক শিতল হাওয়ারে |
রাইত তুই যারে—যা পোহাইয়ে |
. — রাখালী গান
রূপাই গিয়াছে ‘কাইজা’ করিতে সেই ত সকাল বেলা,
বউ সারাদিন পথ পানে চেয়ে, দেখেছে লোকার মেলা |
কত লোক আসে কত লোক যায়, সে কেন আসে না আজ,
তবে কি তাহার নসিব মন্দ, মাথায় ভাঙিবে বাজ!
বালাই, বালাই, ওই যে ওখানে কালো গাঁর পথ দিয়া,
আসিছে লোকটি, ওই কি রূপাই ? নেচে ওঠে তার হিয়া |
এলে পরে তারে খুব বকে দিবে, মাথায় ছোঁয়াবে হাত,
কিরা করাইবে লড়ায়ের নামে হবে না সে আর মাৎ |
আঁচলে চোখেরে বার বার মাজে, নারে না সে ত ও নয়,
আজকে তাহার কপালে কি আছে, কে তাহা ভাঙিয়া কয় |
লোহুর সাগরে সাতার কাটিয়া দিবস শেষের বেলা,
রাত্র-রাণীর কালো আঁচলেতে মুছিল দিনের খেলা |
পথে যে আঁধার পড়িল সাজুর মনে তার শত গুণ,
রাত এসে তা ব্যথার ঘায়েতে ছিটাইল যেন নুন!
ঘরের মেঝেতে সপটি ফেলায়ে বিছায়ে নক্সী-কাঁথা,
সেলাই করিতে বসিল যে সাজু একটু নোয়ায়ে মাথা |
পাতায় পাতায় খস্ খস্ খস্, শুনে কান খাড়া করে,
যারে চায় সে ত আসেনাক শুধু ভুল করে করে মরে |
তবু যদি পাতা খানিক না নড়ে, ভাল লাগেনাক তার ;
আলো হাতে লয়ে দূর পানে চায়, বার বার খুলে দ্বার |
কেন আসে নারে! সাজুর যদি গো পাখা আজ বিধি,
উড়িয়া যাইয়া দেখিয়া আসিত তাহার সোনার নিধি |
নক্সী-কাঁথায় আঁকিল যে সাজু অনেক নক্সী-ফুল,
প্রথমে যেদিন রূপারে সে দেখে, সে খুশির সমতুল |
আঁকিল তাদের বিয়ের বাসর, আঁকিল রূপার বাড়ি,
এমন সময় বাহিরে কে দেখে আসিতেছে তাড়াতাড়ি |
দুয়ার খুলিয়া দেখিল সে চেয়ে—রূপাই আসিছে বটে,
”এতক্ষণে এলে ? ভেবে ভেবে যেগো প্রাণ নাই মোর ঘটে |
আর জাইও না কাইজা করিতে, তুমি যাহাদের মারো,
তাদের ঘরে ত আছে কাঁচা বউ, ছেলেমেয়ে আছে কারো |”
রূপাই কহিল কাঁদিয়া, “বউগো ফুরায়েছে মোর সব,
রাতে ঘুম যেতে শুনিবে না আর রূপার বাঁশীর রব |
লড়ায়ে আজিকে কত মাথা আমি ভাঙিয়াছি দুই হাতে,
আগে বুঝি নাই তোমারো মাথার সিঁদুর ভেঙেছে তাতে |
লোহু লয়ে আজ সিনান করেছি, রক্তে ভেসেছে নদী,
বুকের মালা যে ভেসে যাবে তাতে আগে জানিতাম যদি!
আঁচলের সোনা খসে যাবে পথে আগে যদি জানতাম,
হায় হায় সখি, নারিনু বলিতে কি যে তবে করিতাম !”
বউ কেঁদে কয়, “কি হয়েছে বল, লাগিয়াছে বুঝি কোথা,
দেখি ! দেখি !! দেখি !!! কোথায় আঘাত, খুব বুঝু তার ব্যথা !”
“লাগিয়াছে বউ, খুব লাগিয়াছে, নহে নহে মোর গায়,
তোমার শাড়ীর আঁচল ছিঁড়েছে, কাঁকন ভেঙেছে হায়!
তোমার পায়ের ভাঙিয়াছে খাড়ু ছিঁড়েছে গলার হার,
তোমার আমার এই শেষ দেখা, বাঁশী বাজিবে না আর |
আজ ‘কাইজায়’ অপর পক্ষে খুন হইয়াছে বহু |
এই দেখ মোর কাপড়ে এখনো লাগিয়া রহিছে লহু |
থানার পুলিশ আসিছে হাঁকিয়া পিছে পিছে মোর ছুটি,
খোঁজ পেলে পরে এখনি আমার ধরে নিয়ে যাবে টুঁটি |
সাথীরা সকলে যে যাহার মত পালায়েছে যথা-তথা,
আমি আসিলাম তোমার সঙ্গে সেরে নিতে সব কথা |
আমার জন্য ভাবিনাক আমি, কঠিন ঝড়িয়া-বায়,
যে গাছ পড়িল, তাহার লতার কি হইবে আজি হায়!
হায় বনফুল, যেই ডালে তুই দিয়েছিলি পাতি বুক,
সে ডালেরি সাথে ভাঙিয়া পড়িল তোর সে সকল সুখ |
ঘরে যদি মোর মা থাকিত আজ তোমারে সঙ্গে করি,
বিনিদ্র রাত কাঁদিয়া কাটাত মোর কথা স্মরি স্মরি!
ভাই থাকিলেও ভাইয়ের বউরে রাখিত যতন করি,
তোমার ব্যথার আধেকটা তার আপনার বুকে ভরি |
আমি যে যাইব ভাবিনাক, সাথে যাইবে কপাল-লেখা,
এযে বড় ব্যথা! তোমারো কপালে এঁকে গেনু তারি রেখা!”
সাজু কেঁদে কয়, “সোনার পতিরে তুমি যে যাইবে ছাড়ি,
হয়ত তাহাতে মোর বুকখানা যাইতে চাহিবে ফাড়ি |
সে দুখেরে আমি ঢাকিয়া রাখিব বুকের আঁচল দিয়া,
এ পোড়া রূপেরে কি দিয়া ঢাকিব—ভেবে মরে মোর হিয়া |
তুমি চলে গেলে পাড়ার লোকে যে চাহিবে ইহার পানে,
তোমার গলার মালাখানি আমি লুকাইব কোন্ খানে!”
রূপা কয়, “সখি দীন দুঃখীর যারে ছাড়া কেহ নাই,
সেই আল্লার হাতে আজি আমি তোমারে সঁপিয়া যাই |
মাকড়ের আঁশে হস্তী যে বাঁধে, পাথর ভাসায় জলে,
তোমারে আজিকে সঁপিয়া গেলাম তাঁহার চরণ তলে |”
এমন সময় ঘরের খোপেতে মোরগ উঠিল ডাকি,
রূপা কয়, “সখি! যাই—যাই আমি—রাত বুঝি নাই বাকি!”
পায়ে পায়ে পায়ে কতদূর যায় ; সাজু কয়, “ ওগো শোন,
আর কি গো নাই মোর কাছে তব বলিবার কথা কোন ?
দীঘল রজনী—দীঘল বরষ—দীঘল ব্যথার ভার,
আজ শেষ দিনে আর কোন কথা নাই তব বলিবার ?”
রূপা ফিরে কয়, “না কাঁদিয়া সখি, পারিলামনাক আর,
ক্ষমা কর মোর চোখের জলের নিশাল দেয়ার ধার |”
“এই শেষ কথা!” সাজু কহে কেঁদে, “বলিবে না আর কিছু ?”
খানিক চলিয়া থামিল রূপাই, কহিল চাহিয়া পিছু,
“মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যদি কোন ব্যথা লাগে,
দুটি কালো চোখ সাজাইয়া নিও কাল কাজলের রাগে |
সিন্দুরখানি পরিও ললাটে—মোরে যদি পড়ে মনে,
রাঙা শাড়ীখানি পরিয়া সজনি চাহিও আরশী-কোণে |
মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যতনে বাঁধিও চুল,
আলসে হেলিয়া খোপায় বাঁধিও মাঠের কলমী ফুল |
যদি একা রাতে ঘুম নাহি আসে—না শুনি আমার বাঁশী,
বাহুখানি তুমি এলাইও সখি মুখে মেখে রাঙা হাসি |
চেয়ো মাঠ পানে—গলায় গলায় দুলিবে নতুন ধান ;
কান পেতে থেকো, যদি শোনো কভু সেখায় আমার গান |
আর যদি সখি, মোরে ভালবাস মোর তরে লাগে মায়া,
মোর তরে কেঁদে ক্ষয় করিও না অমন সোনার কায়া!”
ঘরের খোপেতে মোরগ ডাকিল, কোকিল ডাকিল ডালে,
দিনের তরণী পূর্ব-সাগরে দুলে উঠে রাঙা পালে |
রূপা কহে, “তবে যাই যাই সখি, যেটুকু আধার বাকি,
তারি মাঝে আমি গহন বনেতে নিজেরে ফেলিব ঢাকি |”
পায়ে পায়ে পায়ে কতদূর যায়, তবু ফিরে ফিরে চায় ;
সাজুর ঘরেতে দীপ নিবু নিবু ভোরের উতল বায় |
******************
নিশাল = অবিরাম
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/815
|
4322
|
শামসুর রাহমান
|
অলৌকিক আলোর ভ্রমর
|
মানবতাবাদী
|
আমি কি দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠি? হায়েনা রাত্রিকে
দাঁতে ছিঁড়ে হেসে ওঠে, পথে শত শত
ট্রাক থেকে উপচে পড়ে লাশ।
যারা বেঁচে আছে তারা সব
শবের মতোই, হয়তো বা ভস্মমূর্তি, টোকা দিলে
ঝ’রে যাবে, কোথাও বাতির চোখ নেই।
দুঃসময় ঘোড়ায় সওয়ার হ’য়ে ছোটে ইতস্তত,
তার চাবুকের ঘায়ে আর্তনাদ করে এ শহর
বাংলার রূপসী নদী, গ্রাম, শস্যক্ষেত সমুদয়;
মেঘের কিনারা থেকে চুঁইয়ে পড়ে অবিরল বিষাদের জল
এবং সন্তানহারা জননীর মতো শোকস্তব্ধ মুখে আজও
ব’সে আছে রাত্রিদিন আমার এদেশ।
ভঙ্গুর দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে পঙ্গু আর অন্ধের মিছিল,
শহরে ও গ্রামে দীর্ঘ থেকে
দীর্ঘতর হয় বিভ্রান্তির বহুরূপী ছায়া, ক্রূর
শক্রদের হট্ররোল বাড়ে ক্রমাগত আর মিত্রেরা নিঃসাড়,
চন্দ্রাহত রেস্তোরাঁয় অসার বচসা,
অজ্ঞানতা গ্রাস করে দশ দিক; মূঢ়তার মেঘে
ঢাকা প’ড়ে যায়
অগণিত শহীদের মুখ।
ঘাতকেরা আমাকে খুঁড়তে বলে আমারই কবর,
সম্ভবত সুসময় দেখা আর হ’লো না আমার।
শহীদেরা আজ শুধু অসহায় নাম, যা এখন কেউ আর
আবৃত্তির যোগ্য বিবেচনা
করে না তেমন?
বুঝি তাই মধ্যরাতের নূর হোসেনের কবরের
সোঁদা মাটি ফুঁড়ে কান্নাপ্রায়
আওয়াজ বেরোয়া-
“তবে কেন আমার তরুণ বুকে হায়েনার দাঁত বিদ্ধ হ’লো
তবে কেন আমার স্বপ্নেরা আজ শেয়ালের মলে
মিশে যায় অবলীলাক্রমে?
তবে কেন হায় মুক্তিযুদ্ধ শকুনের চঞ্চুতে কয়েদি হয়?”
বাংলার কবি আমি নগণ্য, গরিব;
আহত আমার ডানা, উড়তে অক্ষম
মেঘলোক; আমার হৃদয় পড়ে, বৃষ্টির ফোঁটার মতো পড়ে,
প্রিয় নূর, তোমার বুকের রক্ত নিরন্তর। আমার কবিতা
ভিজে ওঠে বার বার, ধুলো মুছে যায়,
স্বচ্ছ হয় পবিত্র চোখের মতো আর এবাদতে
আকাশকে ছোঁয়, পুনরায়
তোমার সাহসে জ্ব’লে ওঠে
আমার শব্দের পথে, বাড়ির কার্নিশে, নিসর্গের বুদোয়ারে,
তারুণ্যের বুকে, শুভ সমাবেশে অলৌকিক আলোর ভ্রমর। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/oloukik-alor-vromor/
|
3402
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পুরাতন
|
প্রকৃতিমূলক
|
হেথা হতে যাও পুরাতন,
হেথায় নতুন খেলা আরম্ভ হয়েছে ।
আবার বাজিছে বাঁশি, আবার উঠিছে হাসি,
বসন্তের বাতাস বয়েছে ।
সুনীল আকাশ-'পরে শুভ্র মেঘ থরে থরে
শ্রান্ত যেন রবির আলোকে,
পাখিরা ঝাড়িছে পাখা, কাঁপিছে তরুর শাখা,
খেলাইছে বালিকা-বালকে।।
সমুখের সরোবরে আলো ঝিকিমিকি করে,
ছায়া কাঁপিতেছে থরথর--
জলের পানেতে চেয়ে ঘাটে বসে আছে মেয়ে,
শুনিছে পাতার মরমর ।
কী জানি কত কী আশে চলিয়াছে চারি পাশে
কত লোক কত সুখে দুখে,
সবাই তো ভুলে আছে, কেহ হাসে কেহ নাচে--
তুমি কেন দাঁড়াও সমুখে!
বাতাস যেতেছে বহি তুমি কেন রহি রহি
তারি মাঝে ফেল দীর্ঘশ্বাস!
সুদূরে বাজিছে বাঁশি, তুমি কেন ঢাল আসি
তারি মাঝে বিলাপ-উচ্ছ্বাস!
উঠিছে প্রভাতরবি, আঁকিছে সোনার ছবি,
তুমি কেন ফেল তাহে ছায়া!
বারেক যে চলে যায় তারে তো কেহ না চায়,
তবু তার কেন এত মায়া!
তবু কেন সন্ধ্যাকালে জলদের অন্তরালে
লুকায়ে ধরার পানে চায়,
নিশীথের অন্ধকারে পুরানো ঘরের দ্বারে
কেন এসে পুন ফিরে যায়!
কী দেখিতে আসিয়াছ-- যাহা-কিছু ফেলে গেছ
কে তাদের করিবে যতন!
স্মরণের চিহ্ন যত ছিল পড়ে দিন-কত
ঝ'রে-পড়া পাতার মতন--
আজি বসন্তের বায় একেকটি করে হায়
উড়ায়ে ফেলিছে প্রতিদিন,
ধূলিতে মাটিতে রহি হাসির কিরণে দহি
ক্ষণে ক্ষণে হতেছে মলিন ।
ঢাকো তবে ঢাকো মুখ, নিয়ে যাও দুঃখ সুখ,
চেয়ো না, চেয়ো না ফিরে ফিরে--
হেথায় আলয় নাহি-- অনন্তের পানে চাহি
আঁধারে মিলাও ধীরে ধীরে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/puraton/
|
1390
|
তারাপদ রায়
|
দিন
|
মানবতাবাদী
|
আমরা যারা দিন আনি, দিন খাই,
আমরা যারা হাজার হাজার দিন খেয়ে ফেলেছি,
বৃষ্টির দিন, মেঘলা দিন, কুয়াশা ঘেরা দিন,
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অধীর প্রতীক্ষারত দিন,
অপমানে মাথা নিচু করে চোরের মত চলে যাওয়া দিন,
খালি পেট, ছেঁড়া চটি, ঘামে ভেজা দিন,
নীল পাহাড়ের ওপারে, সবুজ বনের মাথায় দিন,
নদীর জলের আয়নায়, বড় সাহেবের ফুলের বাগানে দিন,
হৈ হৈ অট্টহাসিতে কলরোল কোলাহল ভরা দিন,
হঠাত্ দক্ষিণের খোলা বারান্দায় আলো ঝলমলে দিন –
এই সব দিন আমরা কেমন করে এনেছিলাম, কিভাবে,
কেউ যদি হঠাত্ জানতে চায়, এরকম একটা প্রশ্ন করে,
আমরা যারা কিছুতেই সদুত্তর দিতে পারবো না, কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবো না
কি করে আমরা দিন এনেছিলাম,
কেন আমরা দিন আনি, কেন আমরা দিন খাই,
কেমন করে আমরা দিন আনি, দিন খাই।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b0%e0%a6%be/
|
3565
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাহু
|
সনেট
|
কাহারে জড়াতে চাহে দুটি বাহুলতা--
কাহারে কাঁদিয়া বলে, 'যেয়ো না, যেয়ো না!'
কেমনে প্রকাশ করে ব্যাকুল বাসনা,
কে শুনেছে বাহুর নীরব আকুলতা!
কোথা হতে নিয়ে আসে হৃদয়ের কথা,
গায়ে লিখে দিয়ে যায় পুলক-অক্ষরে ।
পরশে বহিয়া আনে মরমবারতা,
মোহ মেখে রেখে যায় প্রাণের ভিতরে ।
কণ্ঠ হতে উতারিয়া যৌবনের মালা
দুইটি আঙুলে ধরি তুলি দেয় গলে ।
দুটি বাহু বহি আনে হৃদয়ের ডালা,
রেখে দিয়ে যায় যেন চরণের তলে ।
লতায়ে থাকুক বুকে চির-আলিঙ্গন,
ছিঁড়ো না, ছিঁড় না দুটি বাহুর বন্ধন ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bahu/
|
885
|
জসীম উদ্দীন
|
রূপ
|
চিন্তামূলক
|
রূপেরে কহিনু ডাকি
হায় রূপ! তুমি কেন চলে যাও,
তুমি কেন একখানে
স্থির হয়ে রহিতে না পাও!
তুমি কি জান না রূপ,
আঁখিতে কাজল-লতা একেঁ,
তরুণীরা তোমারে ধরিতে পাতে ফাঁদ-
দশন মুকুতা মালা দিয়ে
জড়ায়ে হাসির রাঙা চাঁদ
তুমি কি জান না রূপ, বাহুর বিজলী লতা দুটি,
বাহুরে ছাড়িয়া যদি যায়;
লহর পহর জাগে বসি
শাড়ীর সুনীল দরিয়ায়।
তুমি কি জান না রূপ,
দেহের ধূপের পাত্র ভরি,
তোমা লাগি হোম-মন্ত্র
ধ্বনিছে দিবস বিভাবরী;
কত যে হইল প্রাণবলি
কত যে হইল তনুক্ষয়,
হায় রূপ! চিরচঞ্চল রূপ!….
তবু তুমি কাহারো ত হলে নয়।
তোমার তনুর হাওয়া লাগি
প্রেম-ফুল ফুটিয়া টুটিয়া মরে যায়,
কথার কাকলি ওড়ে পথে
সোহাগে আগরে মূরছায়।
রূপ! তুমি রূপ! কারো লাগি থামিলে না কোন পথ বাঁকে
একটি আশিষ-কণা, একটু করুণা-বারি,
দয়া করে নাহি দিলে কাকে।
রূপেরে কহিনু ডাকি,
শোন রূপ, আমাদের কলূষ অন্তর,
তোমারে ছুঁইতে যেয়ে হায়
আমাদের ধরণীর ধূলিরে মাখাই তব গায়;
শিশুরা সরল মন,
চোখে মুখে স্বরগের চুমু লেগে আছে,
তুমি কি পার না রূপ! কিছুদিন রহিবারে
খেলাঘরে তাহাদের কাছে?
ফুলেরা তাদেরও চেয়ে ভাল,
হাসিমুখে চেয়ে থাকে খালি, কথা নাহি জানে,
পাখিরা বনের পাখি
ডালে ডালে মধুর কাকলি করে ফেরে;
তুমি কি তাদের মাঝে
কিছুদিন রহিতে পার না রূপ!
তোমার চলার পথ ছেড়ে?
রূপেরে কহিনু ডেকে আরো,
হায় রূপ! চিরচঞ্চল রূপ,
দেহ হতে দেহ পানে ধাও,
তোমা হেরি এত কথা জাগে মোর মনে;
তোমার কি কোন কথা নাই?
আমরা তোমারে চাহি, তুমি কি কারেও নাহি চাও!
আরো কহিলাম তারে, রূপ! তুমি
তনুতে তনুতে বাসা বাঁধি,
রজনী প্রভাতে চলে যাও;
তোমার নাহিক তৃপ্তি-
কি চেয়ে কি যেন নাহি পাও।
তোমার হাতের বর-মালা
নিশীথে পরায়ে কারো গলে
প্রভাতে খুলিয়া লয়ে যাও;
কারে যে বেসেছ ভাল
তুমি তা জান না বলে রূপ,
কেবলি সমুখ পানে ধাও।
বড় যে অভাগা রূপ,
বড় যে অবলা রূপ,
জানে না কি করে কথা বলে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/743
|
1869
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
বুঝলে রাধানাথ
|
রূপক
|
একটা সাইকেল থাকলে বড় ভালো হতো
বুঝলে, রাধানাথ,
আরো ভালো হতো একটা মোটরবাইক থাকলে।
কাঠের বাকসে কুতকুতে খরগোস
সে-রকম আতুপুতু দিনকাল নয় এখন।
আগে নিজের কাছে নিজের গড়গড়ার নলের মতো
লম্বা হয়ে শুয়ে থাকতো মানুষ।
এখন ৩৬ রকম বায়নাক্কা
বুঝলে রাধানাথ,
মানুষের এখন ৫২ রকম উবু-জলন্ত খিদে।
এক একটা মানুষের ড্রয়িংরুম এখন দিল্লিতে
বাথরুম ত্রিবান্দ্রমে
বেডরুম ৩২/এ গুলু ওস্তাগর লেনে।
এক একটা মানুষকে এখন একই সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে
মেথর, ম্যাজিস্ট্রেট এবং মন্ত্রী।
টেলিফোন নামিয়ে রাখলে টেলেকস
টেলেকস ফুরিয়ে গেলে টেলিগ্রাম
ব্যস্ত স্টেনোর আঙুলের মতো
এ থেকে ওয়াই
ওয়াই থেকে এফ
এফ থেকে জি কিংবা জেড পর্যন্ত
মানুষের মারদাঙ্গা দৌড়।
নিজস্ব রেলগাড়ি ছাড়া,
বুঝলে রাধানাথ
এত সব লাঞ্চ এবং ডিনার
এত সব ক্লাব, কনফারেন্স, সেমিনার
এত সব সিড়ি, সুড়ঙ্গ এবং রঙ্গীন চোরাবালির কাছে
ঝট ঝট পৌছনো বড় হাঙ্গামার ব্যাপার।
একটা অ্যামবাসাডার থাকলে বড় ভালো হতো
বুঝলে রাধানাথ,
আরো ভালো হতো ছেলেবেলার শালিকের মতো
একটা পোষা হেলিকপ্টার থাকলে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1284
|
11
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
উনিশে
|
স্বদেশমূলক
|
বুকের রক্ত মুখে তুলে যারা মরে
ওপারে ঢাকায় এপারের শিলচরে
তারা ভালোবাসা-বাংলাভাষার জুড়ি—
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সিঁদুর কুড়িয়ে নেওয়া যায় এক আলো
প্রাণের পুণ্যে হয়ে ওঠে জমকালো
সে-আলোয় দেয় মারের সাগর পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সে-আলো টলে না মৃত্যুর কালো ঝড়ে
তর্জনি তুলে জেগে থাকে ঘরে ঘরে,
দুলিয়ে গলায় তাজা বুলেটের মালা
পার হয়ে শত শ্মশান ও কারবালা
হাজার মুখের মিছুলে দিয়েছে পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন বুকের রক্ত মুখে তুলে যারা মরে
ওপারে ঢাকায় এপারের শিলচরে
তারা ভালোবাসা-বাংলাভাষার জুড়ি—
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সিঁদুর কুড়িয়ে নেওয়া যায় এক আলো
প্রাণের পুণ্যে হয়ে ওঠে জমকালো
সে-আলোয় দেয় মারের সাগর পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সে-আলো টলে না মৃত্যুর কালো ঝড়ে
তর্জনি তুলে জেগে থাকে ঘরে ঘরে,
দুলিয়ে গলায় তাজা বুলেটের মালা
পার হয়ে শত শ্মশান ও কারবালা
হাজার মুখের মিছুলে দিয়েছে পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%89%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a7%87-%e0%a6%ab%e0%a7%87%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf/
|
3416
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পোড়ো বাড়ি শূন্য দালান
|
চিন্তামূলক
|
পোড়ো বাড়ি শূন্য দালান--
বোবা স্মৃতির চাপা কাঁদন হুহু করে,
মরা-দিনের-কবর-দেওয়া ভিতের অন্ধকার
গুমরে ওঠে প্রেতের কন্ঠে সারা দুপুরবেলা।
মাঠে মাঠে শুকনো পাতার ঘূর্ণিপাকে
হাওয়ার হাঁপানি।
হঠাৎ হানে বৈশাখী তার বর্বরতা
ফাগুনদিনের যাবার পথে।সৃষ্টিপীড়া ধাক্কা লাগায়
শিল্পকারের তুলির পিছনে।
রেখায় রেখায় ফুটে ওঠে
রূপের বেদনা
সাথিহারার তপ্ত রাঙা রঙে।
কখনো বা ঢিল লেগে যায় তুলির টানে;
পাশের গলির চিক-ঢাকা ওই ঝাপসা আকাশতলে
হঠাৎ যখন রণিয়ে ওঠে
সংকেতঝংকার,
আঙুলের ডগার 'পরে নাচিয়ে তোলে মাতালটাকে।
গোধূলির সিঁদুর ছায়ায় ঝ'রে পড়ে
পাগল আবেগের
হাউই-ফাটা আগুনঝুরি।বাধা পায়, বাধা কাটায় চিত্রকরের তুলি।
সেই বাধা তার কখনো বা হিংস্র অশ্লীলতায়,
কখনো বা মন্দির অসংযমে।
মনের মধ্যে ঘোলা স্রোতের জোয়ার ফুলে ওঠে,
ভেসে চলে ফেনিয়ে-ওঠা অসংলগ্নতা।
রূপের বোঝাই ডিঙি নিয়ে চলল রূপকার
রাতের উজান স্রোত পেরিয়ে
হঠাৎ-মেলা ঘাটে।
ডাইনে বাঁয়ে সুর-বেসুরের দাঁড়ের ঝাপট চলে,
তাল দিয়ে যায় ভাসান-খেলা শিল্পসাধনার।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/purabare-sunna-dalan/
|
1464
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
আমার
|
প্রেমমূলক
|
এ না হলে বসন্ত কিসের? দোলা চাই অভ্যন্তরে,
মনের ভিতর জুড়ে আরো এক মনের মর্মর,
পাতা ঝরা, স্বচক্ষে স্বকর্ণে দেখা চাঁদ, জ্যোৎস্নাময়
রাতের উল্লাসে কালো বিষ । এ না হলে বসন্ত কিসের ?গাছের জরায়ু ছিঁড়ে বেরিয়েছে অপিচ্ছিল বোধ,
ওর মুখে কুমারীর খুন, প্রসূতির প্রসন্ন প্রসূন ।
কন্ঠ ভরে করি পান পরিপূর্ণ সে-পাত্র বিষের,
চাই পূর্ণ শিশিরে নির্ঘুম । এ না হলে বসন্ত কিসের?নিজের জলেই টলমল করে আঁখি,
তাই নিয়ে খুব বিব্রত হয়ে থাকি।চেষ্টা করেও রাখতে পারি না ধরে-
ভয় হয় আহা, এই বুঝি যায় পড়ে।এমনিই আছি নদীমাতৃক দেশে,
অশ্রুনদীর সংখ্যা বাড়াবো শেষে?
আমার গঙ্গা আমার চোখেই থাক্
আসুক গ্রীষ্ম মাটি-ফাটা বৈশাখ।দোষ নেই যদি তখন যায় সে ঝরে,
ততদিন তাকে রাখতেই হবে ধরে।সেই লক্ষেই প্রস্তুতি করে সারা,
লুকিয়েছিলাম গোপন অশ্রুধারা।কিন্তু কবির বিধি যদি হন বাম,
কিছুতে পূর্ণ হয় না মনস্কাম।
মানুষ তো নয় চির-সংযমে সাধা,
তাই তো চোখের অশ্রু মানে না বাঁধা।আমার জলেই টলমল করে আঁখি,
তোমার চোখের অশ্রু কোথায় রাখি।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%9f%e0%a6%b2%e0%a6%ae%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%81%e0%a6%96%e0%a6%bf-%e0%a6%a8%e0%a6%bf/
|
807
|
জসীম উদ্দীন
|
তারাবি
|
ভক্তিমূলক
|
তারাবি নামাজ পড়িতে যাইব মোল্লাবাড়িতে আজ,
মেনাজদ্দীন, কলিমদ্দীন, আয় তোরা করি সাজ।
চালের বাতায় গোঁজা ছিল সেই পুরাতন জুতা জোড়া,
ধুলাবালু আর রোদ লেগে তাহা হইয়াছে পাঁচ মোড়া।
তাহারি মধ্যে অবাধ্য এই চরণ দুখানি ঠেলে,
চল দেখি ভাই খলিলদ্দীন, লুন্ঠন-বাতি জ্বেলে।
ঢৈলারে ডাক, লস্কর কোথা, কিনুরে খবর দাও।
মোল্লাবাড়িতে একত্র হব মিলি আজ সার গাঁও।
গইজদ্দীন গরু ছেড়ে দিয়ে খাওয়ায়েছে মোর ধান,
ইচ্ছা করিছে থাপপড় মারি, ধরি তার দুটো কান।
তবু তার পাশে বসিয়া নামাজ পড়িতে আজিকে হবে,
আল্লার ঘরে ছোটোখাটো কথা কেবা মনে রাখে কবে!
মৈজদ্দীন মামলায় মোরে করিয়াছে ছারেখার,
টুটি টিপে তারে মারিতাম পেলে পথে কভু দেখা তার।
আজকে জামাতে নির্ভয়ে সে যে বসিবে আমার পাশে,
তাহারো ভালর তরে মোনাজাত করিব যে উচ্ছাসে।
মাহে রমজান আসিয়াছে বাঁকা রোজার চাঁদের ন্যায়,
কাইজা ফেসাদ সব ভুলে যাব আজি তার মহিমায়।
ভুমুরদি কোথা, কাছা ছাল্লাম আম্বিয়া পুঁথি খুলে,
মোর রসুলের কাহিনী তাহার কন্ঠে উঠুক দুলে।
মেরহাজে সেই চলেছেন নবী, জুমজুমে করি স্নান,
অঙ্গে পরেছে জোছনা নিছনি আদমের পিরহান।
নুহু আলায়হুছালামের টুপী পরেছেন নবী শিরে,
ইবরাহিমের জরির পাগরী রহিয়াছে তাহা ঘিরে।
হাতে বাঁধা তার কোরান-তাবিজ জৈতুন হার গলে,
শত রবিশশী একত্র হয়ে উঠিয়াছে যেন জ্বলে।
বুরহাকে চড়ে চলেছেন নবী কন্ঠে কলেমা পড়ি,
দুগ্ধধবল দূর আকাশের ছায়াপথ রেখা ধরি।
আদম ছুরাত বামধারে ফেলি চলে নবী দূরপানে,
গ্রহ-তারকার লেখারেখাহীন ছায়া মায়া আসমানে।
তারপর সেই চৌঠা আকাশ, সেইখানে খাড়া হয়ে,
মোনাজাত করে আখেরী নবীজী দুহাত উর্ধ্বে লয়ে।
এই যে কাহিনী শুনিতে শুনিতে মোল্লা বাড়ির ঘরে,
মহিমায় ঘেরা অতীত দিনেরে টানিয়া আনিব ধরে।
বচন মোল্লা কোথায় আজিকে সরু সুরে পুঁথি পড়ি,
মোর রসুলের ওফাত কাহিনী দিক সে বয়ান করি।
বিমারের ঘোরে অস্থির নবী, তাঁহার বুকের পরে,
আজরাল এসে আসন লভিল জান কবজের তরে।
আধ অচেতন হজরত কহে, এসেছ দোস্ত মোর,
বুঝিলাম আজ মোর জীবনের নিশি হয়ে গেছে ভোর
একটুখানিক তবুও বিমল করিবারে হবে ভাই!
এ জীবনে কোন ঋণ যদি থাকে শোধ করে তাহা যাই।
***
***
মাটির ধরায় লুটায় নবীজী, ঘিরিয়া তাহার লাশ,
মদিনার লোক থাপড়িয়া বুক করে সবে হাহুতাশ।
আব্বাগো বলি, কাঁদে মা ফাতিমা লুটায়ে মাটির পরে,
আকাশ ধরনী গলাগলি তার সঙ্গে রোদন করে।
এক ক্রন্দন দেখেছি আমরা বেহেস্ত হতে হায়,
হাওয়া ও আদম নির্বাসিত যে হয়েছিল ধরাছায়;
যিশু-জননীর কাঁদন দেখেছি ভেসে-র পায়া ধরে,
ক্রুশ বিদ্ধ সে ক্ষতবিক্ষত বেটার বেদন স্মরে।
আরেক কাঁদন দেখেছি আমরা নির্বাসী হাজেরার,
জমিনের পরে শেওলা জমেছে অশ্রু ধারায় তার;
সবার কাঁদন একত্রে কেউ পারে যদি মিশাবার,
ফাতিমা মায়ের কাঁদনের সাথে তুলনা মেলে না তার।
আসমান যেন ভাঙ্গিয়া পড়িল তাহার মাথায় হায়,
আব্বা বলিতে আদরিয়া কেবা ডাকিয়া লইবে তায়।
গলেতে সোনার হারটি দেখিয়া কে বলিবে ডেকে আর,
নবীর কনের কন্ঠে মাতাগো এটি নহে শোভাদার।
সেই বাপজান জনমের মত গিয়াছে তাহার ছাড়ি।
কোন সে সুদূর গহন আঁধার মরণ নদীর পাড়ি।
জজিরাতুল সে আরবের রাজা, কিসের অভাব তার,
তবু ভুখা আছে চার পাঁচদিন, মুছাফির এলো দ্বার।
কি তাহারে দিবে খাইবারে নবী, ফাতেমার দ্বারে এসে;
চারিটি খোরমা ধার দিবে মাগো কহে এসে দীন বেশে।
সে মাহভিখারী জনমের মত ছাড়িয়া গিয়াছে তায়,
আব্বাগো বলি এত ডাক ডাকে উত্তর নাহি হায়।
এলাইয়া বেশ লুটাইয়া কেশ মরুর ধূলোর পরে,
কাঁদে মা ফাতেমা, কাঁদনে তাহার খোদার আরশ নড়ে।
কাঁদনে তাহার ছদন সেখের বয়ান ভিজিয়া যায়,
গৈজদ্দীন পিতৃ-বিয়োগ পুন যেন উথলায়!
খৈমুদ্দীন মামলায় যারে করে ছিল ছারেখার,
সে কাঁদিছে আজ ফাতিমার শোকে গলাটি ধরিয়া তার।
মোল্লাবাড়ির দলিজায় আজি সুরা ইয়াসিন পড়ি,
কোন দরবেশ সুদূর আরবে এনেছে হেথায় ধরি।
হনু তনু ছমু কমুরে আজিকে লাগিছে নূতন হেন,
আবুবক্কর ওমর তারেখ ওরাই এসেছে যেন।
সকলে আসিয়া জামাতে দাঁড়াল, কন্ঠে কালাম পড়ি,
হয়ত নবীজী দাঁড়াল পিছনে ওদেরি কাতার ধরি।
ওদের মাথার শত তালী দেওয়া ময়লা টুপীর পরে,
দাঁড়াইল খোদা আরশ কুরছি ক্ষনেক ত্যাজ্য করে।
***
মোল্লাবাড়িতে তারাবি নামাজ হয় না এখন আর,
বুড়ো মোল্লাজি কবে মারা গেছে, সকলই অন্ধকার।
ছেলেরা তাহার সুদূর শহরে বড় বড় কাজ করে,
বড় বড় কাজে বড় বড় নাম খেতাবে পকেট ভরে।
সুদূর গাঁয়ের কি বা ধারে ধার, তারাবি জামাতে হায়,
মোমের বাতিটি জ্বলিত, তাহা যে নিবেছে অবহেলায়।
বচন মোল্লা যক্ষ্মা রোগেতে যুঝিয়া বছর চার,
বিনা ঔষধে চিকিৎসাহীন নিবেছে জীবন তার।
গভীর রাত্রে ঝাউবনে নাকি কন্ঠে রাখিয়া হায়,
হোসেন শহিদ পুঁথিখানি সে যে সুর করে গেয়ে যায়।
ভুমুরদি সেই অনাহারে থেকে লভিল শূলের ব্যথা,
চীৎকার করি আছাড়ি পিছাড়ি ঘুরিতে যে যথা তথা।
তারপর সেই অসহ্য জ্বালা সহিতে না পেরে হায়,
গলে দড়ি দিয়ে পেয়েছে শানি- আম্রগাছের ছায়।
কাছা ছাল্লাম পুঁথিখানি আজো রয়েছে রেহেল পরে,
ইদুরে তাহার পাতাগুলি হায় কেটেছে আধেক করে।
লঙ্কর আজ বৃদ্ধ হয়েছে, চলে লাঠিভর দিয়ে,
হনু তনু তারা ঘুমায়েছে গায়ে গোরের কাফন নিয়ে।
সারা গ্রামখানি থম থম করে স্তব্ধ নিরালা রাতে;
বনের পাখিরা আছাড়িয়া কাঁদে উতলা বায়ুর সাথে।
কিসে কি হইল, কি পাইয়া হায় কি আমরা হারালাম,
তারি আফসোস শিহরি শিহরি কাঁপিতেছে সারা গ্রাম।
ঝিঁঝিরা ডাকিছে সহস্র সুরে, এ মূক মাটির ব্যথা,
জোনাকী আলোয় ছড়ায়ে চলিছে বন-পথে যথা তথা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/786
|
4764
|
শামসুর রাহমান
|
তবে কি বৃথাই আমি
|
সনেট
|
তবে কি বৃথাই আমি তোমার ইঙ্গিতে দিগ্ধিদিক
ঘুরেছি ধারালো শীতে, দুঃসহ গরমে এতকাল?
হায় কী বিভ্রমে ম’জে দিনরাত্রি এক মজা খাল
সেচে সেচে দুহাতে তুলেছি কাদা নদী ভেবে ঠিক।
চতুর্দিকে কৌতূহলী লোকজন ‘ধিক, তোকে ধিক’
বলে উৎপীড়ক চোখ রাখে আমার ওপর, গাল
দিয়ে কেউ কেউ গদ্যে করে আমাকে নাকাল।
যত পারে ওরা গাত্র ঝাল তুমুল মিটিয়ে নিক।আমার বলার কিছু নেই, নিঃসঙ্গ থাকব বসে
অন্তরালে, ছায়ায় ভেতর থেকে যদি সুন্দরীর
আভাস চকিতে ফোটে, আলোড়নে কিছু পাতা খসে
পড়ে, তবে আমি তার উদ্দেশ্যে বলব সুনিবিড়
কণ্ঠস্বরে, তোমাকেই ঈশ্বরি মেনেছি আমি, তাই,
মনিরত্ন কিংবা ভস্ম যা-ই দাও, কোনো খেদ নাই। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tobe-ki-brithai-ami/
|
4069
|
রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী
|
চাষী
|
মানবতাবাদী
|
সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,
দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।
দধীচি কি তাহার চেয়ে সাধক ছিল বড়?
পুণ্য অত হবে নাক সব করিলে জড়।
মুক্তিকামী মহাসাধক মুক্ত করে দেশ,
সবারই সে অন্ন জোগায় নাইক গর্ব লেশ।
ব্রত তাহার পরের হিত, সুখ নাহি চায় নিজে,
রৌদ্র দাহে শুকায় তনু, মেঘের জলে ভিজে।
আমার দেশের মাটির ছেলে, নমি বারংবার
তোমায় দেখে চূর্ণ হউক সবার অহংকার।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4884.html
|
2109
|
মহাদেব সাহা
|
একেবারে ডুবে যেতে চাই
|
চিন্তামূলক
|
কবিতার মদে ডুবে যেতে চাই, নিমজ্জিত
হয়ে যেতে চাই-
আপাদমস্তক ডুবে যেতে চাই এই ঘোরে,
টাইটানিকের চেয়েও বেশি অতল গভীরে
পুরেপুরি নিমজ্জিত হয়ে যেতে চাই-
গলূই-মাস্তুলসহ একেবারে ডুবে যেতে চাই এই জলে।
পুরোপুরি ডুবে যেতে চাই এই কবিতার মদে, এই ওষ্ঠে,
সমুদ্রের চেয়েও বড়ো একটি কাচের গ্লাসে-
আপাদমস্তক ডুবে যেতে চাই এই ঘোরে, এই আচ্ছন্নতায়
মেঘে গোধূলিতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1379
|
5930
|
সৈয়দ শামসুল হক
|
এখন মধ্যরাত
|
প্রেমমূলক
|
এখন মধ্যরাত।
তখন দুপুরে রাজপথে ছিলো মানুষের পদপাত।
মিছিলে মিছিলে টলমল ছিলো সারাদিন রাজধানী।
এখন কেবল জননকূল ছল বুড়িগঙ্গার পানি
শান্ত নীরব
নিদ্রিত সব।
ওই একজন জানালায় রাখে তার বিনিদ্র হাত
ছিলো একদিন তার
উজ্জ্বল দিন, ছিলো যৌবন ছিলো বহু চাইবার।
সারা রাত চষে ফিরেছে শহর খুঁজেছে সে ভালোবাসা।
পেতেছে সে হাত জীবনের কাছে ছিলো তারও প্রত্যাশা পাওয়া না পাওয়ার
প্রশ্নে হাওয়ার
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে এখন সারারাত হাহাকার।পথে ওড়ে ধুলো, ছাই ওড়ে শুধু পথে যে আগুন ছিলো
একদা সে জ্বেলে ছিলো।
হৃদয়ে এখন সৌধের ভাঙা টুকরো আছাড় খায়।
আলো নিভে যায়, নিভে যায় আলো একে একে জানালায়।
থেমে যায় গান
তারপরও প্রাণ
বাঁশিটির মতো বেজে চলে যেন সবই আছে সবই ছিলো।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/ekhon-modhyoraat/
|
6017
|
হেলাল হাফিজ
|
অহংকার
|
প্রেমমূলক
|
বুকের সীমান্ত বন্ধ তুমিই করেছো
খুলে রেখেছিলাম অর্গল,
আমার যুগল চোখে ছিলো মানবিক খেলা
তুমি শুধু দেখেছো অনল।
তুমি এসেছিলে কাছে, দূরেও গিয়েছো যেচে
ফ্রিজ শটে স্থির হয়ে আছি,
তুমি দিয়েছিলে কথা, অপারগতার ব্যথা
সব কিছু বুকে নিয়ে বাঁচি।
উথাল পাথাল করে সব কিছু ছুঁয়ে যাই
কোনো কিছু ছোঁয় না আমাকে,
তোলপাড় নিজে তুলে নিদারুণ খেলাচ্ছলে
দিয়ে যাই বিজয় তোমাকে।
১৩.১০.৮০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/90
|
2235
|
মহাদেব সাহা
|
মানুষই মহৎ শিল্প
|
চিন্তামূলক
|
এতো ধ্বনিময় কণ্ঠ আমি কখনো শুনিনি কোনো
পাখিদের কাছে
কোনো নদী এমন মধুর কলগীতি
শোনায়নি আর কোনোদিন
যা এই শুনেছি আমি চিরদিন মানুষের মুখে
এতো প্রিয় সম্বোধন, এমন হৃদয়বোধ্য ভাষা
কেবল মানুষ ছাড়া কারো কাছে পাইনি কখনো!
এই যে নীলিমা সেও মানুষের মতো এতো স্নেহ
কভু ঝরাবে না
এই যে প্রকৃতি সেও কারো দুঃখে হবে না তো এমন কাতর,
বুক পেতে এমন আঘাত নেবে, হাত পেতে বিষ
কেবল মানুষ ছাড়া আর কোনো
প্রাণী কি উদ্ভিদ কেউ নেই!
কোনো গোলাপের বুকে এতো কোমলতা আমি
কখনো দেখিনি
যা এই দেখেছি আমি চিরদিন মানুষের বুকে!
মানুষের হৃদয়ের মতো এমন সবুজ তৃন
তৃণক্ষেত্র ফোটেনি কখনো
চোখের জলের
মতো এতো আর্দ্র
কোনো শিশির দেখিনি ঝরে রাতে,
এতো হৃদয়সম্পন্ন কোনো নিবিড় বকুল
আমি পাইনি কোথাও
এমন বেদনা শুধু দেখেছি তো মানুষেরই বুকে
দুঃখে সুখে তাই বারবার ফিরে যাই মানুষের কাছে!
এতো অনুভূতিময় চোখ কোনো ভাস্কর্যেরও চোখে আমি
কখনো দেখিনি
কোনো কুসুমের দিকে চেয়ে দেখিনি তো এমন বিষাদ
যা এই দেখেছি আমি চিরদিন মানুষের চোখে
শিল্পের অধিক কিছু দুঃখের অনল!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1491
|
964
|
জীবনানন্দ দাশ
|
একটি নক্ষত্র আসে
|
প্রেমমূলক
|
একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চ’লে
ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে
সে আসবে মনে হয়; – আমার দুয়ার অন্ধকারে
কখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে!
হঠাৎ কখন সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতে
সকল সমুদ্র সূর্য সত্বর তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি হতে পারে
সে এসে এগিয়ে দেয়;
শিয়রে আকাশ দূর দিকে
উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র গ্রহের আলোড়নে
অঘ্রানের রাত্রি হয়;
এ-রকম হিরন্ময় রাত্রি ইতিহাস ছাড়া আর কিছু রেখেছে কি মনে।
শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন
জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ;
চারিদিকে ঘর বাড়ি পোড়ো-সাঁকো সমাধির ভিড়;
সে অনেক ক্লান্তি ক্ষয় অবিনশ্বর পথে ফিরে
যেন ঢের মহাসাগরের থেকে এসেছে নারীর
পুরোনো হৃদয় নব নিবিড় শরীরে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/442
|
4495
|
শামসুর রাহমান
|
একদা
|
প্রেমমূলক
|
সতেজ ঘাসের মতো চকচকে এক ঘোড়া দৌড়ে এসে
একটা জলাশয়ের সামনে দাঁড়ালো।
তখনো তার কেশর থেকে, ক্ষুর থেকে মুছে যায়নি সূর্যাস্তের রঙ।টলটলে জলের দিকে গ্রীবা বাড়িয়ে
দেখলো সে, আধখানা চাঁদ বন্দিনি রাজকন্যার মতো
চেয়ে আছে তার চোখের প্রতি।
বনের ঘন কালো আকাশের নিষ্পলক চেয়ে থাকা-
সব কিছু অমান্য করে সে
তার মুখ বাড়িয়ে দিলো জলাশয়ে, জলপানের জন্যে নয়,
বন্দিনি রাজকন্যার ওষ্ঠে চুম্বন আঁকার জন্যে।শীতল পানির স্পর্শ নিয়ে ফিরে এল ওর মুখ
অচুম্বিত, বিচূর্ণিত চাঁদ
প্রত্যাবর্তন করে তার নিজস্ব অবয়বে।
তেজী আর চকচকে ঘোড়াটার কেশর থেকে
ঝরতে থাকে বিন্দু বিন্দু
জলের মতো স্বপ্ন আর
স্বপ্নের মতো জল।রহস্যময় বনের দিকে তাকিয়ে
হঠাৎ ঘোড়াটার মনে পড়ে গেল
সেই ভুলুণ্ঠিত তেজস্বী সওয়ারের কথা, একদা যে তার পিঠে বসে
ঘুরে বেড়াতো দূর-দূরান্তে,
যার হাতে ছিল ভালোবাসার পতাকা
আর মাথায় সূর্যের মতো উষ্ণীষ। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekoda/
|
2633
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অসাধ্য চেষ্টা
|
নীতিমূলক
|
শক্তি যার নাই নিজে বড়ো হইবারে
বড়োকে করিতে ছোটো তাই সে কি পারে? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/osaddhyo-chesta/
|
705
|
জয় গোস্বামী
|
ফুটকড়াই
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
পরির পাশে পরির বোন,
দাঁড়িয়ে আছে কতক্ষণ।জ্বর থেকে তো উঠল কাল,
রোদের তাপে মুখটি লাল।লম্বা লাইন ইস্কুলের,
দাও দারোয়ান গেট খুলে।পরির পাশে পরির মা-ও,
বলছে, ঠাকুর রোদ কমাও,আবার অসুখ করবে ওর
নষ্ট হবে একবছর।বয়স কত ? বয়ঃক্রম ?
সেসব ভাবার সময় কম।ভর্তি হবার জন্য আজ,
টেষ্টে বসাই পরির কাজ।পরি তো নয়, পরির বোন,
পাঁচ বছরের কম এখন।এদিক তাকায়, ওদিক চায়;
গোরু বসছে গাছতলায়একটা কুকুর দৌড়ে যায়,
ট্যাক্সি গাড়ি পাশ কাটায়গাড়ি থামায় নীল পুলিশ…
কী ভাবছিস রে ? কী ভাবছিস ?এ বি সি ডি, ওয়ান টু আর
ভুল করিস না, খবরদার !ভুল করিস না লক্ষ্মীটি,
‘ছি’ দেবে কাকপক্ষিটি।ভুল করিস না, ধরছি পা’য়
মা কী করে মুখ দেখায়।না যদি পাস অ্যাডমিশন,
কোন চুলোতে যাই তখন।পাশের বাড়ির বাপটুও,
দেখবি কেমন দেয় দুয়ো।চায় না তো মা আর কিছুই,
নম্বর চায়-আনবি তুই।নাম হবে তোর খুব বড়,
নামের পাশে নম্বরওবাড়তে বাড়তে সাতশো মন,
না হবে তোর যতক্ষণদাঁড়িয়ে থাকবি, দাঁড়িয়ে থাক,
লাল সাদা আর নীল পোশাক।পরির দিদি, পরির বোন
কতক্ষণ আর কতক্ষণওই খুলেছে, ওই তো, চল,
রোদ পোড়া সব পরির দলটুম্পি, টিমা, মম, টোকাই
মাথায় মাথায় পিন ঢোকাই।ফুটকড়াই, ফুটকড়াই,
ঠিক ডাটা ঠিক ফিড করাই।ব্যস, হয়েছে প্রোগ্রামিং,
তিড়িং বিড়িং তিড়িং বিংবন্ধ এখন, জোর সে চল,
কোর্সে কোর্সে এগিয়ে চলঊর্ধ গগনে বাজে মাদল
মাথার ওপর যাঁতার কল
ফুটফুটে সব ছাত্রীদল
ছাত্রদল
চল রে চল
এই তো চাই, ফুটকড়াই।পরির পাশে পরির বোন,
দাঁড়িয়ে আছে কতক্ষণ।জ্বর থেকে তো উঠল কাল,
রোদের তাপে মুখটি লাল।লম্বা লাইন ইস্কুলের,
দাও দারোয়ান গেট খুলে।পরির পাশে পরির মা-ও,
বলছে, ঠাকুর রোদ কমাও,আবার অসুখ করবে ওর
নষ্ট হবে একবছর।বয়স কত ? বয়ঃক্রম ?
সেসব ভাবার সময় কম।ভর্তি হবার জন্য আজ,
টেষ্টে বসাই পরির কাজ।পরি তো নয়, পরির বোন,
পাঁচ বছরের কম এখন।এদিক তাকায়, ওদিক চায়;
গোরু বসছে গাছতলায়একটা কুকুর দৌড়ে যায়,
ট্যাক্সি গাড়ি পাশ কাটায়গাড়ি থামায় নীল পুলিশ…
কী ভাবছিস রে ? কী ভাবছিস ?এ বি সি ডি, ওয়ান টু আর
ভুল করিস না, খবরদার !ভুল করিস না লক্ষ্মীটি,
‘ছি’ দেবে কাকপক্ষিটি।ভুল করিস না, ধরছি পা’য়
মা কী করে মুখ দেখায়।না যদি পাস অ্যাডমিশন,
কোন চুলোতে যাই তখন।পাশের বাড়ির বাপটুও,
দেখবি কেমন দেয় দুয়ো।চায় না তো মা আর কিছুই,
নম্বর চায়-আনবি তুই।নাম হবে তোর খুব বড়,
নামের পাশে নম্বরওবাড়তে বাড়তে সাতশো মন,
না হবে তোর যতক্ষণদাঁড়িয়ে থাকবি, দাঁড়িয়ে থাক,
লাল সাদা আর নীল পোশাক।পরির দিদি, পরির বোন
কতক্ষণ আর কতক্ষণওই খুলেছে, ওই তো, চল,
রোদ পোড়া সব পরির দলটুম্পি, টিমা, মম, টোকাই
মাথায় মাথায় পিন ঢোকাই।ফুটকড়াই, ফুটকড়াই,
ঠিক ডাটা ঠিক ফিড করাই।ব্যস, হয়েছে প্রোগ্রামিং,
তিড়িং বিড়িং তিড়িং বিংবন্ধ এখন, জোর সে চল,
কোর্সে কোর্সে এগিয়ে চলঊর্ধ গগনে বাজে মাদল
মাথার ওপর যাঁতার কল
ফুটফুটে সব ছাত্রীদল
ছাত্রদল
চল রে চল
এই তো চাই, ফুটকড়াই।পরির পাশে পরির বোন,
দাঁড়িয়ে আছে কতক্ষণ।জ্বর থেকে তো উঠল কাল,
রোদের তাপে মুখটি লাল।লম্বা লাইন ইস্কুলের,
দাও দারোয়ান গেট খুলে।পরির পাশে পরির মা-ও,
বলছে, ঠাকুর রোদ কমাও,আবার অসুখ করবে ওর
নষ্ট হবে একবছর।বয়স কত ? বয়ঃক্রম ?
সেসব ভাবার সময় কম।ভর্তি হবার জন্য আজ,
টেষ্টে বসাই পরির কাজ।পরি তো নয়, পরির বোন,
পাঁচ বছরের কম এখন।এদিক তাকায়, ওদিক চায়;
গোরু বসছে গাছতলায়একটা কুকুর দৌড়ে যায়,
ট্যাক্সি গাড়ি পাশ কাটায়গাড়ি থামায় নীল পুলিশ…
কী ভাবছিস রে ? কী ভাবছিস ?এ বি সি ডি, ওয়ান টু আর
ভুল করিস না, খবরদার !ভুল করিস না লক্ষ্মীটি,
‘ছি’ দেবে কাকপক্ষিটি।ভুল করিস না, ধরছি পা’য়
মা কী করে মুখ দেখায়।না যদি পাস অ্যাডমিশন,
কোন চুলোতে যাই তখন।পাশের বাড়ির বাপটুও,
দেখবি কেমন দেয় দুয়ো।চায় না তো মা আর কিছুই,
নম্বর চায়-আনবি তুই।নাম হবে তোর খুব বড়,
নামের পাশে নম্বরওবাড়তে বাড়তে সাতশো মন,
না হবে তোর যতক্ষণদাঁড়িয়ে থাকবি, দাঁড়িয়ে থাক,
লাল সাদা আর নীল পোশাক।পরির দিদি, পরির বোন
কতক্ষণ আর কতক্ষণওই খুলেছে, ওই তো, চল,
রোদ পোড়া সব পরির দলটুম্পি, টিমা, মম, টোকাই
মাথায় মাথায় পিন ঢোকাই।ফুটকড়াই, ফুটকড়াই,
ঠিক ডাটা ঠিক ফিড করাই।ব্যস, হয়েছে প্রোগ্রামিং,
তিড়িং বিড়িং তিড়িং বিংবন্ধ এখন, জোর সে চল,
কোর্সে কোর্সে এগিয়ে চলঊর্ধ গগনে বাজে মাদল
মাথার ওপর যাঁতার কল
ফুটফুটে সব ছাত্রীদল
ছাত্রদল
চল রে চল
এই তো চাই, ফুটকড়াই।পরির পাশে পরির বোন,
দাঁড়িয়ে আছে কতক্ষণ।জ্বর থেকে তো উঠল কাল,
রোদের তাপে মুখটি লাল।লম্বা লাইন ইস্কুলের,
দাও দারোয়ান গেট খুলে।পরির পাশে পরির মা-ও,
বলছে, ঠাকুর রোদ কমাও,আবার অসুখ করবে ওর
নষ্ট হবে একবছর।বয়স কত ? বয়ঃক্রম ?
সেসব ভাবার সময় কম।ভর্তি হবার জন্য আজ,
টেষ্টে বসাই পরির কাজ।পরি তো নয়, পরির বোন,
পাঁচ বছরের কম এখন।এদিক তাকায়, ওদিক চায়;
গোরু বসছে গাছতলায়একটা কুকুর দৌড়ে যায়,
ট্যাক্সি গাড়ি পাশ কাটায়গাড়ি থামায় নীল পুলিশ…
কী ভাবছিস রে ? কী ভাবছিস ?এ বি সি ডি, ওয়ান টু আর
ভুল করিস না, খবরদার !ভুল করিস না লক্ষ্মীটি,
‘ছি’ দেবে কাকপক্ষিটি।ভুল করিস না, ধরছি পা’য়
মা কী করে মুখ দেখায়।না যদি পাস অ্যাডমিশন,
কোন চুলোতে যাই তখন।পাশের বাড়ির বাপটুও,
দেখবি কেমন দেয় দুয়ো।চায় না তো মা আর কিছুই,
নম্বর চায়-আনবি তুই।নাম হবে তোর খুব বড়,
নামের পাশে নম্বরওবাড়তে বাড়তে সাতশো মন,
না হবে তোর যতক্ষণদাঁড়িয়ে থাকবি, দাঁড়িয়ে থাক,
লাল সাদা আর নীল পোশাক।পরির দিদি, পরির বোন
কতক্ষণ আর কতক্ষণওই খুলেছে, ওই তো, চল,
রোদ পোড়া সব পরির দলটুম্পি, টিমা, মম, টোকাই
মাথায় মাথায় পিন ঢোকাই।ফুটকড়াই, ফুটকড়াই,
ঠিক ডাটা ঠিক ফিড করাই।ব্যস, হয়েছে প্রোগ্রামিং,
তিড়িং বিড়িং তিড়িং বিংবন্ধ এখন, জোর সে চল,
কোর্সে কোর্সে এগিয়ে চলঊর্ধ গগনে বাজে মাদল
মাথার ওপর যাঁতার কল
ফুটফুটে সব ছাত্রীদল
ছাত্রদল
চল রে চল
এই তো চাই, ফুটকড়াই।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ab%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a6%95%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%9c%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
|
432
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বে-শরম
|
ভক্তিমূলক
|
আরে আরে সখী বারবার ছি ছি
ঠারত চঞ্চল আঁখিয়া সাঁবলিয়া।
দুরু দুরু গুরু গুরু কাঁপত হিয়া উরু
হাথসে গির যায় কুঙ্কুম-থালিয়া।
আর না হোরি খেলব গোরি
আবির ফাগ দে পানি মে ডারি
হা প্যারি –
শ্যাম কী ফাগুয়া
লাল কী লুগুয়া
ছি ছি মোরি শরম ধরম সব হারি
মারে ছাতিয়া মে কুঙ্কুম বে-শরম বানিয়া। (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/be-shorom/
|
4389
|
শামসুর রাহমান
|
আমার সত্তা শ্লোক হয়ে
|
প্রেমমূলক
|
তোমার আমার মধ্যে ক্রমাগত রচিত হচ্ছে মাইল মাইলব্যাপী
তৃষ্ণার্ত জিহ্বার মতো গা ছমছম প্রান্তর। অদূরে
অনেক ক্ষুধার্ত শকুন
অপেক্ষমাণ, আর আমি ওদের দৃষ্টি থেকে,
শবগন্ধী চঞ্চু থেকে নিজেকে আড়াল করে হাঁটছি
ভারি পা টেনে টেনে।
কোথাও এমন কোনো পাখি নেই,
যার গানে দিকগুলি মাধুর্যের আভায় হবে রঙিন,
নেই কোনো ঝরনা, যার ছলছলে হাসি
আমার ক্লান্ত তৃষ্ণার অন্ধকারকে
মুছে ফেলবে নিমেষে।
এখন আমি তোমার দিকে মুখ রেখে এই বেয়াড়া প্রান্তর
পেরুনোর জন্যে বিশ্রামের কোটর
তছনছ করে ফেলেছি,
আমার স্বস্তি ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়েছে এক দূরন্ত ঈগল,
তার ডানার ঝাপটা আমার নিত্যসঙ্গী।
আমি কী করে না দেখে থাকব সেই তোমাকে
যার মধ্যে মেদুর অপরাহ্নে
অলৌকিককে গ্রীবা বাড়াতে দেখেছি,
যার মধ্যে শুনেছি সুন্দর ভবিষ্যতের নিঃশ্বাস,
যার কণ্ঠে শুনেছি মৃত্যু-ভোলানো উচ্চারণ?’
আমি কী করে না দেখে থাকব সেই তোমাকে,
যার চোখ আমার প্রৌঢ়ত্বের অন্তরালে ধ্রুবতারা;
যার ওষ্ঠে সেই নদীর গান শুনি, যাকে আমি
দেখেছিলাম
অনেক আগে, সূর্যোদয় পেরিয়ে
গাছগাছালির ঘ্রাণ নিতে নিতে,
যার বুকের দ্যুতি কখনো আমাকে অন্ধ করে,
কখনোবা চক্ষুষ্মান, যার শরীরের প্রতিটি বাঁকে
সদ্য যুবার মতো মুখ রাখে আমার বাসনা?
এখন আমি আমার একাকিত্বের প্রবাসে
তলোয়ার মাছের মতো
নিয়ত সন্ধানী আর উদাস-নিষ্ঠুর।মনে পড়ে
ঈষৎ উজ্জ্বল লাল বারান্দায় তুমি দাঁড়ানো-
আমি দেখছি তোমাকে, যেমন বয়স্ক বাজপাখি
চোখ তুলে চাঁদ। তুমি সেই মুহূর্তগুলিকে সাজালে
বিদেশী কবিতার পঙ্ক্তিমালায়;
সেই শব্দগুচ্ছে ছিল না কোনো বিদায়ী শ্লোকের বিচ্ছুরণ,
অথচ আমি বিচ্ছেদকে ডানা মেলতে দেখলাম
ঈষৎ উজ্জ্বল দীর্ঘ বারান্দায়
আমার অস্তিত্বে তোমার হাতের অন্তরঙ্গ তাপ সঞ্চয় করে
দৃষ্টিতে তুমিময় ছবি গেঁথে,
পথ চলি, ভালোবাসায় দেখি সত্যের মুখ।দূর থেকে আমি হাত নাড়ি, তোমার স্মৃতির ভোরে বিভোর
এখন তোমার সান্নিধ্য থেকে নির্বাসিত আমি আর
অন্ধকার কুকুরের মতো
লেহন করছে আমাকে। মাঝে-মধ্যে এই রাত্রি
জন্মান্ধ গায়কের সুরে বেজে ওঠে
আমার শিরায় শিরায়, আশ্চর্য এক ফোয়ারা
আমার ভেতরে তরলিত মণিরত্ন ছড়াতে থাকে,
এবং তোমার অনেকানেক আসা-যাওয়া
স্মৃতির ঝোপঝাড়ে জোনাকি।
‘কখনো নয়, বিলুপ্তি, মনে-না-পড়া, ফিরব না’
ঝরে আমার চোখের পাতায়, স্বপ্নে তোমার শরীর
লতাগুল্মময়, পাতালে ভাসে,
আমাকে ছোঁয় তোমার কণ্ঠস্বর,
আমার সমগ্র সত্তা শ্লোক হয়ে জড়িয়ে যায়
তোমার কণ্ঠস্বরে, আমার হৃদয়
মরীচিকার মতো কাঁপে শূন্যতায়, রুক্ষ শূন্যতায়। (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-sotta-shlok-hoye/
|
146
|
আলাউদ্দিন আল আজাদ
|
স্মৃতিস্তম্ভ
|
স্বদেশমূলক
|
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো ! যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরের মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটকা ধুলায় চূর্ণ যে পদ-প্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য ।
ইটের মিনার
ভেঙেছে ভাঙুক ! ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চারকোটি পরিবার ।এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রু ?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং
এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার ? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল ?
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক । একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায় ।
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নাম ।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর ।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/02/21/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ad-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%86/
|
2034
|
মলয় রায়চৌধুরী
|
এ কেমন বৈরী
|
মানবতাবাদী
|
ভাবা যায় ? কোনো প্রতিপক্ষ নেই !
সবকটা আধমরা হয়ে আজ শুয়ে আছে জুতোর তলায় ?
কিছুই করিনি আমি
কেবল মুখেতে হাত চাপা দিয়ে চিৎকার করেছি থেকে থেকে
হাহাহা হাহাহা হাহা হাহা
পিস্তল কোমরে বাঁধা তেমনই ছিল সঙ্গোপনে
ক্ষুর বা ভোজালি বের করিনিকো
বোমাগুলো শান্তিনিকেতনি ব্যাগে চুপচাপ যেমন-কে-তেমন পড়ে আছে
আমি তো আটঘাট বেঁধে ভেবেছি বদলা নেবো নিকেশ করব একে-একে
সকলেই এত ভিতু জানতে পারিনি
একা কেউ যুঝতে পারে না বলে দল বেঁধে ঘিরে ধরেছিল
এখন ময়দান ফাঁকা
তাবৎ মাস্তান আজ গোরুর চামড়ায় তৈরি জুতোর তলায়
কিংবা পালিয়েছে পাড়া ছেড়ে কোনো জ্ঞাতির খামারে
আমি তো বিধর্মী যুবা এদের পাড়ার কেউ নই
জানালার খড়খড়ি তুলে তবু যুবতীরা আমার ভুরুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে
ছ্যাঃ এরকম জয় চাইনি কখনো
এর চেয়ে সামনে শিখণ্ডী রেখে জেতা ছিল ভালো
ভেবেছি চেংঘিজ খান যে-লাগাম ছেড়েছে মৃত্যুর কিছু পরে
তার রাশ টেনে নিয়ে চুরমার করে দেবো এইসব জাল-জুয়াচুরি
আগুন লাগিয়ে দেবো মাটিতে মিশিয়ে দেবো ধুরন্ধর গঞ্জ-শহর
কিন্তু আজ সমগ্র এলাকা দেখি পড়ে আছে পায়ের তলায় ।
৪ মাঘ ১৩৯১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1147
|
5085
|
শামসুর রাহমান
|
মন্তাজ
|
রূপক
|
এই তো হরিণ ছোটে, রত্নরাজি ওড়ায় সুতীক্ষ্ম খুরে, ফুলের মেঘের
নরম সংকেত জেগে ওঠে; মুঞ্জরিত গুপ্ত ক্ষেত। আবেগের
গলায় পা রেখে দেখেছিতো, তবু জলজ্যান্ত স্বর
সোনালি ঘন্টার মতো বাজে চতুর্দিকে আর ঘর
বাড়ি উল্টোপাল্টা ছুটে যেতে চায় আকাশের সুনীল মহলে।
আপিশ ফটক ছেড়ে পথে নামি, ঠিক সন্ধে হ’লে,
কখনো বা আরো পরে বাড়ি ফিরি, বাসের টিকিটে
আলতামিরার চিত্র, শিং উঁচানো রৈখিক বাইসন, খিটখিটে
বুড়োটা ভীষণ উক্তিময়, হঠাৎ চোয়ালে তার গাছের বাকল পরা
রমণী ঝিকিয়ে ওঠে, নিসঙ্গ আমার কাঁধে। কড়া
নাড়লেই দরজাটা যাবে খুলে যথারীতি, জামা-
জুতো ছেড়ে লম্বা হবো কিছুক্ষণ। ঘনিষ্ঠ পা’জামা
চোখের পলকে শূন্যে তাঁবু হয়, ওড়ে; কী প্রাচীন হ্ণদে ঝুঁকে
মজি ছায়াবিলাসে, সহসা কারা যেন লাঠি ঠোকে
কঠিন মাটিতে, আসে তেড়ে দুর্বার চাদ্দিক থেকে।
আমি তো নিবিয়ে আলো শুয়ে পড়ি চাদরে গা ঢেকে।চোখ বুজলেই দেখি পিতৃপুরুষের কবরস্থানের খুব
ডাগর ডোগর ঘাস, সবুজ ছাগল; ডাবা হুঁকো ক্ষিপ্র ডুব
দিয়ে সরোবরে মানস হংসের মতো প্লুত শোভা
রচনার পরে নাচতে নাচতে দোতারার কুয়াশায়
আমার বাড়িটা একি প্রকাশ্যেই মহিলার মুখ হ’য়ে যায়। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/montaj/
|
1166
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প
|
চিন্তামূলক
|
আঁধারে হিমের আকাশের তলে
এখন জ্যোতিষ্কে কেউ নেই।
সে কারা কাদের এসে বলেঃ
এখন গভীর পবিত্র অন্ধকার;
হে আকাশ, হে কালশিল্পী, তুমি আর
সূর্য জাগিয়ো না;
মহাবিশ্বকারুকার্য, শক্তি, উৎস, সাধঃ
মহনীয় আগুনের কি উচ্ছিত সোনা?
তবুও পৃথিবী থেকে-
আমরা সৃষ্টির থেকে নিভে যাই আজঃ
আমরা সূর্যের আলো পেয়ে
তরঙ্গ কম্পনে কালো নদী
আলো নদী হয়ে যেতে চেয়ে
তবুও নগরে যুদ্ধে বাজারে বন্দরে
জেনে গেছি কারা ধন্য,
কারা স্বর্ণ প্রাধান্যের সূত্রপাত করে।তাহাদের ইতিহাস-ধারা
ঢের আগে শুরু হয়েছিলো;
এখনি সমাপ্ত হতে পারে,
তবুও আলেয়াশিখা আজো জ্বালাতেছে
পুরাতন আলোর আঁধারে।আমাদের জানা ছিলো কিছু;
কিছু ধ্যান ছিলো;
আমাদের উৎস-চোখে স্বপ্নছটা প্রতিভার মতো
হয়তো-বা এসে পড়েছিলো;
আমাদের আশা সাধ প্রেম ছিলো;- নক্ষত্রপথের
অন্তঃশূন্যে অন্ধ হিম আছে জেনে নিরে
তবুও তো ব্রহ্মান্ডের অপরূপ অগ্নিশিল্প জাগে;
আমাদেরো গেছিলো জাগিয়ে
পৃথিবীতে;
আমরা জেগেছি-তবু জাগাতে পারি নি;
আলো ছিলো- প্রদীপের বেষ্টনী নেই;
কাজ ছিল- শুরু হলো না তো;
হাহলে দিনের সিঁড়ি কি প্রয়োজনের?
নিঃস্বত্ব সূর্যকে নিয়ে কার তবে লাভ!
সচ্ছল শাণিত নদী, তীরে তার সারস-দম্পতি
ঐ জল ক্লান্তিহীন উৎসানল অনুভব ক’রে ভালোবাসে;
তাদের চোখের রং অনন্ত আকৃতি পায় নীলাভ আকাশে;
দিনের সূর্যের বর্ণে রাতের নক্ষত্র মিশে যায়;
তবু তারা প্রণয়কে সময়কে চিনেছে কি আজো?
প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কে এসে চেনায়!
মারা মানুষ ঢের ক্ররতর অন্ধকূপ থেকে
অধিক আয়ত চোখে তবু ঐ অমৃতের বিশ্বকে দেখেছি;
শান্ত হয়ে স্তব্ধ হয়ে উদ্বেলিত হয়ে অনুভব ক’রে গেছি
প্রশান্তিই প্রাণরণনের সত্য শেষ কথা, তাই
চোখ বুজে নীরবে থেমেছি।
ফ্যাক্টরীর সিটি এসে ডাকে যদি,
ব্রেন কামানের শব্দ হয়,
লরিতে বোঝাই করা হিংস্র মানবিকী
অথবা অহিংস নিত্য মৃতদের ভিড়
উদ্দাম বৈভবে যদি রাজপথ ভেঙে চ’লে যায়,
ওরা যদি কালোবাজারের মোহে মাতে,
নারীমূল্যে অন্ন বিক্রি ক’রে,
মানুষের দাম যদি জল হয়, আহা,
বহমান ইতিহাস মরুকণিকার
পিপাসা মেটাতে
ওরা যদি আমাদের ডাক দিয়ে যায়-
ডাক দেবে, তবু তার আগে
আমরা ওদের হাতে রক্ত ভুল মৃত্যু হয়ে হারায়ে গিয়েছি?জানি ঢের কথা কাজ স্পর্শ ছিলো, তবু
নগরীর ঘন্টা-রোল যদি কেঁদে ওঠে,
বন্দরে কুয়াশা বাঁশি বাজে,
আমরা মৃত্যুর হিম ঘুম থেকে তবে
কী ক’রে আবার প্রাণকম্পনলোকের নীড়ে নভে
জ্বলন্ত তিমিরগুলো আমাদের রেণুসূর্যশিখা
বুখে নিয়ে হে উড্ডীন ভয়াবহ বিশ্বশিল্পলোক,
মরণে ঘুমোতে বাধা পাব?-
নবীন নবীন জঞ্জাতকের কল্লোলের ফেনশীর্ষে ভেসে
আর একবার এসে এখানে দাঁড়াব।
যা হয়েছে- যা হতেছে- এখন যা শুভ্র সূর্য হবে
সে বিরাট অগ্নিশিল্প কবে এসে আমাদের ক্রোড়ে ক’রে লবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/mrittu-shwopno-shongkolpo/
|
3501
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বন-ফুল (দ্বিতীয় সর্গ)
|
কাহিনীকাব্য
|
যেও না! যেও না!
দুয়ারে আঘাত করে কে ও পান্থবর?
‘কে ওগো কুটীরবাসি !
দ্বার খুলে দাও আসি! ’
তবুও কেন রে কেউ দেয় না উত্তর?
আবার পথিকবর আঘাতিল ধীরে!
“বিপন্ন পথিক আমি, কে আছে কুটিরে?”
তবুও উত্তর নাই,
নীরব সকল ঠাঁই—
তটিনী বহিয়া যায় আপনার মনে!
পাদপ আপন মনে
প্রভাতের সমীরণে
দুলিছে, গাইছে গান সরসর স্বনে!
সমীরে কুটীরশিরে
লতা দুলে ধীরে ধীরে
বিতরিয়া চারি দিকে পুষ্পপরিমল!
আবার পথিকবর
আঘাতে দুয়ার-‘পর—
ধীরে ধীরে খুলে গেল শিথিল অর্গল।
বিস্ফারিয়া নেত্রদ্বয়
পথিক অবাক্ রয়,
বিস্ময়ে দাঁড়ায়ে আছে ছবির মতন।
কেন পান্থ, কেন পান্থ,
মৃগ যেন দিক্ভ্রান্ত
অথবা দরিদ্র যেন হেরিয়া রতন!
কেন গো কাহার পানে
দেখিছ বিস্মিত প্রাণে—
অতিশয় ধীরে ধীরে পড়িছে নিশ্বাস?
দারুণ শীতের কালে
ঘর্মবিন্দু ঝরে ভালে,
তুষারে করিয়া দৃঢ় বহিছে বাতাস!
ক্রমে ক্রমে হয়ে শান্ত
সুধীরে এগোয় পান্থ,
থর থর করি কাঁপে যুগল চরণ—
ধীরে ধীরে তার পরে
সভয়ে সংকোচভরে
পথিক অনুচ্চ স্বরে করে সম্বোধন—
‘সুন্দরি! সুন্দরি!’ হায়।
উত্তর নাহিক পায়!
আবার ডাকিল ধীরে “সুন্দরি! সুন্দরি!”
শব্দ চারি দিকে ছুটে,
প্রতিধ্বনি জাগি উঠে,
কুটীর গম্ভীরে কহে ‘সুন্দরি! সুন্দরি! ’
তবুও উত্তর নাই,
নীরব সকল ঠাঁই,
এখনো পৃথিবী ধরা নীরবে ঘুমায়!
নীরব পরণশালা,
নীরব ষোড়শী বালা,
নীরবে সুধীর বায়ু লতারে দুলায়!
পথিক চমকি প্রাণে
দেখিল চৌদিক-পানে—
কুটীরে ডাকিছে কেও “কমলা! কমলা!’
অবাক্ হইয়া রহে,
অস্ফুটে কে ওগো কহে?
সুমধুর স্বরে যেন বালকের গলা!
পথিক পাইয়া ভয়,
চমকি দাঁড়ায়ে রয়,
কুটীরের চারি ভাগে নাই কোনজন!
এখনো অস্ফুটস্বরে
‘কমলা! কমলা!’ ক'রে
কুটীর আপনি যেন করে সম্ভাষণ!
কে জানে কাহাকে ডাকে,
কে জানে কেন বা ডাকে,
কেমনে বলিব কেবা ডাকিছে কোথায়?
সহসা পথিকবর
দেখে দণ্ডে করি ভর
‘কমলা! কমলা!’
বলি শুক গান গায়!
আবার পথিকবর
হন ধীরে অগ্রসর,
‘সুন্দরি! সুন্দরি!’
বলি ডাকিয়া আবার!
আবার পথিক হায়
উত্তর নাহিক পায়,
বসিল ঊরুর ‘পরে সঁপি দেহভার!
সঙ্কোচ করিয়া কিছু
পান্থবর আগুপিছু
একটু একটু করে হন অগ্রসর!
আনমিত করি শিরে
পথিকটি ধীরে ধীরে
বালার নাসার কাছে সঁপিলেন কর!
হস্ত কাঁপে থরথরে,
বুক ধুক্ ধুক্ করে,
পড়িল অবশ বাহু কপোলের ‘পর—
লোমাঞ্চিত কলেবরে
বিন্দু বিন্দু ঘর্ম ঝরে,
কে জানে পথিক কেন টানি লয় কর!
আবার কেন কি জানি
বালিকার হস্তখানি
লইলেন আপনার করতল-'পরি—
তবুও বালিকা হায়
চেতনা নাহিক পায়—
অচেতনে শোক জ্বালা রয়েছে পাশরি!
রুক্ষ রুক্ষ কেশরাশি
বুকের উপরে আসি
থেকে থেকে কাঁপি উঠে নিশ্বাসের ভরে!
বাঁহাত আঁচল-'পরে
অবশ রয়েছে পড়ে
এলো কেশরাশি মাঝে সঁপি ডান করে।
ছাড়ি বালিকার কর
ত্রস্ত উঠে পান্থবর
দ্রুতগতি চলিলেন তটিনীর ধারে,
নদীর শীতল নীরে
ভিজায়ে বসন ধীরে
ফিরি আইলেন পুন কুটীরের দ্বারে।
বালিকার মুখে চোখে
শীতল সলিল-সেকে
সুধীরে বালিকা পুন মেলিল নয়ন।
মুদিতা নলিনীকলি
মরমহুতাশে জ্বলি
মুরছি সলিলকোলে পড়িল যেমন—
সদয়া নিশির মন
হিম সেঁচি সারাক্ষণ
প্রভাতে ফিরায়ে তারে দেয় গো চেতন।
মেলিয়া নয়নপুটে
বালিকা চমকি উঠে
একদৃষ্টে পথিকেরে করে নিরীক্ষণ।
পিতা মাতা ছাড়া কারে
মানুষে দেখে নি হা রে,
বিস্ময়ে পথিকে তাই করিছে লোকন!
আঁচল গিয়াছে খ'সে,
অবাক্ রয়েছে ব'সে
বিস্ফারি পথিক-পানে যুগল নয়ন!
দেখেছে কভু কেহ কি
এহেন মধুর আঁখি?
স্বর্গের কোমল জ্যোতি খেলিছে নয়নে—
মধুর-স্বপনে-মাখা
সারল্য-প্রতিমা-আঁকা
‘কে তুমি গো?’ জিজ্ঞাসিছে যেন প্রতিক্ষণে।
পৃথিবী-ছাড়া এ আঁখি
স্বর্গের আড়ালে থাকি
পৃথ্বীরে জিজ্ঞাসে ‘কে তুমি?কে তুমি?'
মধুর মোহের ভুল,
এ মুখের নাই তুল—
স্বর্গের বাতাস বহে এ মুখটি চুমি!
পথিকের হৃদে আসি
নাচিছে শোণিত রাশি,
অবাক্ হইয়া বসি রয়েছে সেথায়!
চমকি ক্ষণেক-পরে
কহিল সুধীর স্বরে
বিমোহিত পান্থবর কমলাবালায়,
‘সুন্দরি, আমি গো পান্থ
দিক্ভ্রান্ত পথশ্রান্ত
উপস্থিত হইয়াছি বিজন কাননে!
কাল হতে ঘুরি ঘুরি
শেষে এ কুটীরপুরী
আজিকার নিশিশেষে পড়িল নয়নে!
বালিকা! কি কব আর,
আশ্রয় তোমার দ্বার
পান্থ পথহারা আমি করি গো প্রার্থনা।
জিজ্ঞাসা করি গো শেষে
মৃতে লয়ে ক্রোড়দেশে
কে তুমি কুটীরমাঝে বসি সুধাননা?’
পাগলিনীপ্রায় বালা
হৃদয়ে পাইয়া জ্বালা
চমকিয়া বসে যেন জাগিয়া স্বপনে।
পিতার বদন-‘পরে
নয়ন নিবিষ্ট ক'রে
স্থির হ'য়ে বসি রয় ব্যাকুলিত মনে।
নয়নে সলিল ঝরে,
বালিকা সমুচ্চ স্বরে
বিষাদে ব্যাকুলহৃদে কহে ‘পিতা— পিতা’ ।
কে দিবে উত্তর তোর,
প্রতিধ্বনি শোকে ভোর
রোদন করিছে সেও বিষাদে তাপিতা।
ধরিয়া পিতার গলে
আবার বালিকা বলে
উচ্চৈস্বরে “পিতা— পিতা” , উত্তর না পায়!
তরুণী পিতার বুকে
বাহুতে ঢাকিয়া মুখে,
অবিরল নেত্রজলে বক্ষ ভাসি যায়।
শোকানলে জল ঢালা
সাঙ্গ হ'লে উঠে বালা,
শূন্য মনে উঠি বসে আঁখি অশ্রুময়!
বসিয়া বালিকা পরে
নিরখি পথিকবরে
সজল নয়ন মুছি ধীরে ধীরে কয়,
‘কে তুমি জিজ্ঞাসা করি,
কুটীরে এলে কি করি—
আমি যে পিতারে ছাড়া জানি না কাহারে!
পিতার পৃথিবী এই,
কোনদিন কাহাকেই
দেখি নি তো এখানে এ কুটীরের দ্বারে!
কোথা হতে তুমি আজ
আইলে পৃথিবীমাঝ?
কি ব'লে তোমারে আমি করি সম্বোধন?
তুমি কি তাহাই হবে
পিতা যাহাদের সবে
‘মানুষ’ বলিয়া আহা করিত রোদন?
কিংবা জাগি প্রাতঃকালে
যাদের দেবতা ব'লে
নমস্কার করিতেন জনক আমার?
বলিতেন যার দেশে
মরণ হইলে শেষে
যেতে হয়, সেথাই কি নিবাস তোমার?—
নাম তার স্বর্গভূমি,
আমারে সেথায় তুমি
ল'য়ে চল, দেখি গিয়া পিতায় মাতায়!
ল'য়ে চল দেব তুমি আমারে সেথায়।
যাইব মায়ের কোলে,
জননীরে মাতা ব'লে
আবার সেখানে গিয়া ডাকিব তাঁহারে।
দাঁড়ায়ে পিতার কাছে
জল দিব গাছে গাছে,
সঁপিব তাঁহার হাতে গাঁথি ফুলহারে!
হাতে ল'য়ে শুকপাখি
বাবা মোর নাম ডাকি
‘কমলা’ বলিতে আহা শিখাবেন তারে!
লয়ে চল, দেব, তুমি সেথায় আমারে!
জননীর মৃত্যু হ'লে,
ওই হোথা গাছতলে
রাখিয়াছিলেন তাঁরে জনক তখন!
ধবলতুষার ভার
ঢাকিয়াছে দেহ তাঁর,
স্বরগের কুটীরেতে আছেন এখন!
আমিও তাঁহার কাছে করিব গমন!’
বালিকা থামিল সিক্ত হয়ে আঁখিজলে
পথিকেরও আঁখিদ্বয়
হ'ল আহা অশ্রুময়,
মুছিয়া পথিক তবে ধীরে ধীরে বলে,
‘আইস আমার সাথে,
স্বর্গরাজ্য পাবে হাতে,
দেখিতে পাইবে তথা পিতায় মাতায়।
নিশা হল অবসান,
পাখীরা করিছে গান,
ধীরে ধীরে বহিতেছে প্রভাতের বায়!
আঁধার ঘোমটা তুলি
প্রকৃতি নয়ন খুলি
চারি দিক ধীরে যেন করিছে বীক্ষণ—
আলোকে মিশিল তারা,
শিশিরের মুক্তাধারা
গাছ পালা পুষ্প লতা করিছে বর্ষণ!
হোথা বরফের রাশি,
মৃত দেহ রেখে আসি
হিমানীক্ষেত্রের মাঝে করায়ে শয়ান,
এই লয়ে যাই চ'লে,
মুছে ফেল অশ্রুজলে—
অশ্রুবারিধারে আহা পূরেছে নয়ান!’
পথিক এতেক কয়ে
মৃত দেহ তুলে লয়ে
হিমানীক্ষেত্রের মাঝে করিল প্রোথিত।
কুটীরেতে ধীরি ধীরি
আবার আইল ফিরি,
কত ভাবে পথিকের চিত্ত আলোড়িত।
ভবিষ্যৎ-কলপনে
কত কি আপন মনে
দেখিছে, হৃদয়পটে আঁকিতেছে কত—
দেখে পূর্ণচন্দ্র হাসে
নিশিরে রজতবাসে
ঢাকিয়া, হৃদয় প্রাণ করি অবারিত—
জাহ্নবী বহিছে ধীরে,
বিমল শীতল নীরে
মাখিয়া রজতরশ্মি গাহি কলকলে—
হরষে কম্পিত কায়,
মলয় বহিয়া যায়
কাঁপাইয়া ধীরে ধীরে কুসুমের দলে—
ঘাসের শয্যার 'পরে
ঈষৎ হেলিয়া পড়ে
শীতল করিছে প্রাণ শীত সমীরণ—
কবরীতে পুষ্পভার
কে ও বাম পাশে তার,
বিধাতা এমন দিন হবে কি কখন?
অদৃষ্টে কি আছে আহা!
বিধাতাই জানে তাহা
যুবক আবার ধীরে কহিল বালায়,
‘কিসের বিলম্ব আর?
ত্যজিয়া কুটীরদ্বার
আইস আমার সাথে, কাল বহে যায়!’
তুলিয়া নয়নদ্বয়
বালিকা সুধীরে কয়,
বিষাদে ব্যাকুল আহা কোমল হৃদয়—
‘কুটীর! তোদের সবে
ছাড়িয়া যাইতে হবে,
পিতার মাতার কোলে লইব আশ্রয়।
হরিণ! সকালে উঠি
কাছেতে আসিত ছুটি,
দাঁড়াইয়া ধীরে ধীরে আঁচল চিবায়—
ছিঁড়ি ছিঁড়ি পাতাগুলি
মুখেতে দিতাম তুলি
তাকায়ে রহিত মোর মুখপানে হায়!
তাদের করিয়া ত্যাগ যাইব কোথায়?
যাইব স্বরগভূমে,
আহা হা! ত্যজিয়া ঘুমে
এতক্ষণে উঠেছেন জননী আমার—
এতক্ষণে ফুল তুলি
গাঁথিছেন মালাগুলি,
শিশিরে ভিজিয়া গেছে আঁচল তাঁহার—
সেথাও হরিণ আছে,
ফুল ফুটে গাছে গাছে,
সেখানেও শুক পাখি ডাকে ধীরে ধীরে!
সেথাও কুটীর আছে,
নদী বহে কাছে কাছে,
পূর্ণ হয় সরোবর নির্ঝরের নীরে।
আইস! আইস দেব! যাই ধীরে ধীরে!
আয় পাখি! আয় আয়!
কার তরে রবি হায়,
উড়ে যা উড়ে যা পাখি! তরুর শাখায়!
প্রভাতে কাহারে পাখি!
জাগাবি রে ডাকি ডাকি
‘কমলা!’ ‘কমলা!’ বলি মধুর ভাষায়?
ভুলে যা কমলা নামে,
চলে যা সুখের ধামে,
‘কমলা!’ ‘কমলা!’ ব'লে ডাকিস নে আর।
চলিনু তোদের ছেড়ে, যা শুক শাখায় উড়ে—
চলিনু ছাড়িয়া এই কুটীরের দ্বার।
তবু উড়ে যাবি নে রে,
বসিবি হাতের ‘পরে?
আয় তবে, আয় পাখি, সাথে সাথে আয়,
পিতার হাতের ‘পরে
আমার নামটি ধ'রে—
আবার আবার তুই ডাকিস সেথায়।
আইস পথিক তবে কাল বহে যায়”।
সমীরণ ধীরে ধীরে
চুম্বিয়া তটিনীনীরে
দুলাইতে ছিল আহা লতায় পাতায়—
সহসা থামিল কেন প্রভাতের বায়?
সহসা রে জলধর
নব অরুণের কর
কেন রে ঢাকিল শৈল অন্ধকার করে?
পাপিয়া শাখার ‘পরে ললিত সুধীর স্বরে
তেমনি কর-না গান, থামিলি কেন রে?
ভুলিয়া শোকের জ্বালা
ওই রে চলিছে বালা।
কুটীর ডাকিছে যেন ‘যেয়ো না— যেয়ো না!’
তটিনীতরঙ্গকুল
ভিজায়ে গাছের মূল
ধীরে ধীরে বলে যেন ‘যেয়ো না! যেয়ো না’ —
বনদেবী নেত্র খুলি
পাতার আঙ্গুল তুলি
যেন বলিছেন আহা ‘যেয়ো না!— যেয়ো না!’ —
নেত্র তুলি স্বর্গ-পানে
দেখে পিতা মেঘযানে
হাত নাড়ি বলিছেন ‘যেয়ো না!— যেয়ো না!’ —
বালিকা পাইয়া ভয়
মুদিল নয়নদ্বয়,
এক পা এগোতে আর হয় না বাসনা—
আবার আবার শুন
কানের কাছেতে পুন
কে কহে অস্ফুট স্বরে ‘যেয়ো না!— যেয়ো না!’ (বন-ফুল কাব্যোপন্যাস)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bon-ful-ditio-sorgo/
|
2051
|
মহাদেব সাহা
|
আফ্রিকা, তোমার দুঃখ বুঝি
|
মানবতাবাদী
|
আফ্রিকার বুকের ভেতর আমি শুনতে পাই এই
বাংলাদেশের হাহাকার
বাংলাদেশের বুকের ভেতর আফ্রিকার কান্না;
এশিয়া-আফ্রিকা দুইবোন, দুই গরিব ঘরের মেয়ে!
আফ্রিকার কালো মানচিত্র
যেন বাংলাদেশেরই দারিদ্রপীড়িত গ্রাম,
আফ্রিকার দিকে তাকালে তাই আমার
এই নিপীড়িত বাংলার কথাই মনে পড়ে
হয়তো আফ্রিকার কোনো কবিও বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে
তার আর্ত স্বদেশের কথাই ভাবে,
ঔপনিবেশিক সভ্যতা যাকে নাম দিয়েছিলো অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ;
কিন্তু আফ্রিকার মানুষের বুকে আজ আলোর মশাল,
আফ্রিকার চোখে স্বপ্ন!
আমি দেখতে পাই এঙ্গোলার কৃষকের মতোই
বাংলাদেশের ভূমিহীন চাষীও
মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলেছে আকাশে
সে-হাত শোষণের বিরুদ্ধে দুর্জয় হাতিয়ার;
আজ এশিয়া তাকিয়ে আছে আফ্রিকার দিকে
এশিয়ার দিকে আফ্রিকা,
এই কালো মানুষের ধারা এসে মিশেছে এশিয়া-আফ্রিকার গ্রামে;
জানি দারিদ্র্য আমাদের উভয়ের সাধারণ পোশাক
বহু যুগের বিদেশী শাসনের ক্ষতচিহ্ন আমাদের উভয়ের কপালে
তাই আফ্যিকার বুকে যখন রক্ত ঝরে
তখন এই বাংলাদেশের মাটিতেও শিশির-ভেজা ঘাস
মনে হয় রক্তমাখা,
ইথিওপিয়া কিংবা নামিবিয়ার পল্লীতে যখন জেগে ওঠে
সাহসী মানুষ
তখন এই বাংলায়ও প্রাণের জোয়ার জাগে পদ্মা-মেঘনায়;
আফ্রিকা, তোমার দুঃখ বুঝি
আমি জানি বর্ণবাদি শাসনের হাত
একদিন ভেঙে দেবে এই মানুষেরই মহৎ সংগ্রাম
আমি জানি এশিয়া ও আফ্রিকার ঘরে ঘরে একদিন উড়বেই
বিপ্লবের লাল পতাকা,
বাংলার স্বপ্নভ্রষ্ট ফুল তাই তো তাকিয়ে আছে
আফ্রিকার অরণ্যের দিকে-
সেদিন একটি পাখির মতো উড়ে যাবো মেঘমুক্ত আফ্রিকার
সুনীল আকাশে
পদ্মার পাড় থেকে আফ্রিকার স্বচ্ছতোয়া নদীটির পাশে
দেখবো মাথার উপরে দ্বিতীয় আকাশ নেই , আছে শুধু
এশিয়া ও আফ্রিকার অভিন্ন আকাশ!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1355
|
3761
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যখন গগনতলে
|
রূপক
|
যখন গগনতলে
অাঁধারের দ্বার গেল খুলি
সোনার সংগীতে উষা
চয়ন করিল তারাগুলি। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jokhon-gogontole/
|
2625
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অলস সময়-ধারা বেয়ে
|
মানবতাবাদী
|
অলস সময়-ধারা বেয়ে
মন চলে শূন্য-পানে চেয়ে।
সে মহাশূন্যের পথে ছায়া-আঁকা ছবি পড়ে চোখে।
কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে
সুদীর্ঘ অতীতে
জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে।
এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল,
এসেছে মোগল;
বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল,উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।
শূন্যপথে চাই,
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।
নির্মল সে নীলিমায় প্রভাতে ও সন্ধ্যায় রাঙালো
যুগে যুগে সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আলো।
আরবার সেই শূন্যতলে
আসিয়াছে দলে দলে
লৌহবাঁধা পথে
অনলনিশ্বাসী রথে
প্রবল ইংরেজ,
বিকীর্ণ করেছে তার তেজ।
জানি তারো পথ দিয়ে বয়ে যাবে কাল,
কোথায় ভাসায়ে দেবে সাম্রাজ্যের দেশবেড়া জাল;
জানি তার পণ্যবাহী সেনা
জ্যোতিষ্কলোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না।মাটির পৃথিবী-পানে আঁখি মেলি যবে
দেখি সেথা কলকলরবে
বিপুল জনতা চলে
নানা পথে নানা দলে দলে
যুগ যুগান্তর হতে মানুষের নিত্য প্রয়োজনে
জীবনে মরণে।
ওরা চিরকাল
টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল,
ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।
ওরা কাজ করে
নগরে প্রান্তরে।
রাজছত্র ভেঙে পড়ে,রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে,
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে,
রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।
ওরা কাজ করে
দেশে দেশান্তরে,
অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের সমুদ্র-নদীর ঘাটে ঘাটে,
পঞ্জাবে বোম্বাই-গুজরাটে।
গুরুগুরু গর্জন গুন্গুন্ স্বর
দিনরাত্রে গাঁথা পড়ি দিনযাত্রা করিছে মুখর।
দুঃখ সুখ দিবসরজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-‘পরে
ওরা কাজ করে। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/olos-somy-dhara-beye/
|
4485
|
শামসুর রাহমান
|
একটি ফ্রিজ শটের জন্যে
|
চিন্তামূলক
|
এ কেমন চলে যাওয়া উড়িয়ে রুমাল কাকডাকা
দুপুরে একাকী দূরে, বিন্দু হয়ে যাওয়া? দুটি পাখি
ছিল ডালে; শাখাচারী পক্ষীদ্বয় দু’ ফোঁটা চোখের
পানি যেন। ভুরুর মতন ঝিল, শিকের আড়ালে
কতিপয় প্রাণী আর রঙিন চাঞ্চল্য আপাতত
ভাস্কর্য আমার মনে। দুপুরেই চৌরাহায় আজ
হঠাৎ গোধূলি আসে ব্যেপে। একটু আগেই ছিলে
আমার হাতকে সভ্যতার চারু কারুকাজ ক’রে।
এখনো কাটেনি ঘোর সান্নিধ্যের; মদ্যপের মতো
সম্মুখে তাকিয়ে আছি; আশপাশে ধুম বিলাবাট্টা
হয় হোক, নেই চোখ কান সেদিকে আমার। প্রাণ
গুণীর পুষ্পিত তান তোমার সৌরভে। এই পাখি,
পাতার টোপর-পরা গাছ, আমাদের প্রসারিত
ব্যগ্র হাত কেন ফ্রিজ শট হয়ে যায়না নিমেষে? (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-friz-shoter-jonyo/
|
4436
|
শামসুর রাহমান
|
উল্টো দিকে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন
|
প্রেমমূলক
|
অন্ধের মতোন আমি অন্ধদের মধ্যে সারাক্ষণ
হাতড়ে বেড়াই কী-যে বুঝি না নিজেই।
পুরোনো চিঠির খাম? চকচকে শূন্য থালা, নাকি
টগর, মল্লিকা ফুটফুটে?
দলছুট কাকাতুয়া? রঙিন টিকিট?
কোথাও না-পাওয়া
কখনো না-দেখা
মানুষের হৃৎপিণ্ডের মতো থর থর কোনো প্রাণী?
মেঘের জঙ্গল থেকে নেমে আসা এবং হাওয়ায়
ভাসা নানারঙা ঘোড়াদের ফুল্ল দানাপানি? শোনো,
যা হোক একটা কিছু হাতে
এলে, ছুঁতে গেলে স্মৃতিময়, স্মৃতিহীন
যে-কোনো জিনিশ,
স্বস্তি পাবো ভেবে ঘুরি সবখানে। কখনো বাড়াই হাত ডানে,
কখনো-বা যাই বাঁয়ে, একটানা খুঁজি।
মাঝে-মধ্যে প্রশ্ন করি-দোটানায়
এভাবে ফুরোবে তবে জীবনের পুঁজি রুক্ষ পথে, বধিরের
আস্তানার?
বিবর্ণ যুগল চেয়ারের অভ্যন্তর থেকে
ভেসে আসে স্বর
এখানে খুঁজো না কিছু, হবে প্রতিহত।
দেয়ালে সন্তের চোখ, ধারালো, সুদুর-
চোখ ডেকে বলে
এখানে খুঁজো না কিছু, হবে প্রতিহত।
তুমি শত লোক হয়ে খুঁজলেও আহতের ব্যান্ডেজের মতো
সান্তনা পাবে না।
ফিরে যাও, তুমি ফিরে যাও।
ভয়-পাওয়া শিশুর মতোন
ভয় চোখ ঢেকে থাকে পাঁজরের ভেতরে, আমার,
বলে শিউরোনো কণ্ঠস্বরেঃ
এখানে খুঁজো না কিছু অন্ধ নিকেতনে,
ফিরে যাও, তুমি ফিরে যাও।মানুষের হৃদয়ের ভেতরে চালিয়ে দিয়ে খুব
কম্প্রমান পাঁচটি আঙুল
ভীষণ পাথুরে কিছু করি অনুভব, বাড়ে উপদ্রব।
গোলাপের গল্প শুনে সাত তাড়াতাড়ি
গোলাপ বাগানে যাই, দরজা পেরিয়ে বুঝি, রকের বাশিন্দা
অতিশয় ধাপ্পাবাজ সে কথক। কীটের পাহাড়ে
গৌতম বুদ্ধের পোজে
বাহারী পোশাক পরে বসে আছে সঙ, কোলে তার
কংকালের ভায়োলিন, তার চক্ষুদ্বয়
পাখির পুরীষে ঢাকা, আমি
দ্রুত ফিরে এসে দেখি ক্রমাগত উল্টো দিকে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ulto-dike-chute-jacche-tren/
|
4829
|
শামসুর রাহমান
|
দাগ
|
মানবতাবাদী
|
“না, আমি কস্মিনকালে তোমার এ নৈঃসঙ্গ্য ঘোচাতে
পারবো না”, বলে তুমি সেই ছোট ঘরটি গোছাতে
মন দিলে। এটা-সেটা নেড়ে চেড়ে তুলে নিলে দুল
বালিশের নিচে থেকে, পরলে আবার। এলোচুল
সহযে বিন্যস্ত হলো; পরিচিত গন্ধমাখা ঘরে
বিধ্বস্ত স্নায়ূর রাজ্য, বন্দী আমি ভয়ের নিগড়ে!বুঝি তাই অকস্মাৎ বুকে টেনে নিলাম তোমাকে
সংক্রামক হতাশায়। বললামঃ “হত্যা করো তাকে,-
আমার এ নৈঃসঙ্গ্যকে; তোমার স্বপ্নের পাটাতনে
তুলে নাও হাত ধরে। বাকল-বঞ্চিত গাছ বনে
যেমন দাঁড়িয়ে থাকে তেম্নি তুমি থাকে আজ পাশে,
আলিঙ্গনই জানি রক্ষাকবচ এমন সর্ব নাশে।“নৈঃসঙ্গ্য হত্যায় মেতে খুলে নিলে দুল, নিরুত্তাপ
বালিশে নামলো কালো উচ্ছল প্রপাত। কার ছাপ
খুঁজি তবু সবখানে? উন্মীলিত তোমার দু’চোখ
আমার চোখের নিচে, যেন দুটি সভ্যতার শোক
ভ্রষ্টলগ্নে শুধু কাঁপে পাশাপাশি। দু’চোখের তটে
সে মুহূর্তে দেখি মহাপ্লাবনের দাগ জেগে ওঠে। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dag/
|
4697
|
শামসুর রাহমান
|
ঘৃণায় নয়
|
মানবতাবাদী
|
অতীতের মায়াবী পাহাড় থেকে এ বর্তমানের
নিবিড় উপত্যকায় এসে দেখি জীবন ফিরিয়ে
আছে মুখ অন্ধকারে। একজন বৃদ্ধ গাঢ় স্বরে
বললেন হাত ছুঁড়েঃ “সৌন্দর্য, মহত্ত্ব সত্য আরসদ্গুণ ইত্যাদি রক্ষা করো, রক্ষা করো এ বাগান-
যেখানে পাখির গান শিল্পের প্রতীক খোঁজে প্রতি
লাল নীল ফুলে স্তব্ধ পাথরে মনের অস্তরাগে,
যেখানে হাতের মুঠো ভরে যায় সোনালি পালকে।“অন্ধকার জীবনের বাগানে নিগ্রোর মতো শুধু
আর্তনাদ করে ওঠে, মহত্ত্ব পিছল নর্দমায়
ভেসে যায়, সৌন্দর্য কবরে পচে, সত্য অবিরাম
উদ্ভ্রান্ত ভিখিরী হয়ে ঘোরে মনীষার মন্বন্তরে।আমার শয্যায় দেখি অজস্র মৃত্যুর ছায়া আর
হাজার হাজার ঘোড়া খুরের আঘাতে, কেশরের
আন্দোলনে আবার জাগাতে চায় মৃত শতাব্দীকে
আমার শরীরে, চোখে। আমি ছিন্নভিন্ন অন্ধকারে।একমুঠো তারা দিয়ে যদি কেউ আমার পকেট
ভরে দেয় কিংবা কতিপয় জনপ্রিয় খেলনা দেয়
হাতে তুলে-তবু আমি হাতের শিকড় দেব মেলে
জীবনের সমৃদ্ধ মাটিতে, স্বর হবো আশ্চর্যের।
ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকাকে কাগজের মতো
যদি গুঁজে দেয় কেউ হাতে, টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে
এক ফুঁয়ে পারবো না হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে সব।
কেননা শিখিনি ঘৃণা, বস্তুত ঘৃণায় নয় জানি,প্রেমেই মানুষ বাঁচে। চিরদিন বিমুগ্ধ নিষ্ঠায়
তাই শাদা চাঁদ কাফ্রি-রাত্রির প্রেমিকা পৃথিবীতে। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ghrinar-noy/
|
4362
|
শামসুর রাহমান
|
আমার অন্তর জুড়ে শহুরে-গ্রামীণ সুরধারা
|
প্রকৃতিমূলক
|
এ এমন কাল বন্ধ চোখ খুলতেই দেখি
শরীর-জ্বালানো তেজ নিয়ে
আমাদের পোড়ায় কখনও, কখনও-বা
উত্তেজিত করে খুব ছড়াতে দ্রোহের অগ্নিশিখা।দিনরাত বৃষ্টিধারা দেয় না ভাসিয়ে নানা শহর ও গ্রাম।
কখনও-সখনও বর্ষা, যতদূর জানি,
কোনও কোনও কবির, লেখার
খাতার উন্মুখ পাতা বর্ষার ধারায় সেজে ওঠে।বয়স হয়েছে ঢের। জীবনের নানা
ক্রূর ঘাত-প্রতিঘাতে কেউ-কেউ ভণ্ড বান্ধবের
পোশাকে দিয়েছে হানা অতর্কিতে। যখন পেয়েছি
টের, ততদিনে বড় দেরি হয়ে গেছে; বয়ে গেছে কৃত্রিমতা।
আমার এ বয়সে ও কখনও দাদা, নানা
বাবা, চাচাদের জন্মস্থান পাড়াতলী
গ্রামে যাই ঢের পথ পেয়েছি মেঘনা নদী। ছলছলে জল,
ক্ষেতের সবুজ ঢেউ চোখে কত স্বপ্ন দিত জ্বেলে।শ্রাবণের রাতে শুয়ে বিছানায় অথবা টেবিলে
একলা নিঃশব্দে ঝুঁকে কবিতা লেখার কালে চোখে
হঠাৎ ঝলসে ওঠে জননীর মুখ। হাতে তাঁর, মনে হ’ল,
ঝলসিত কোরানশরিফ। ঘরে ভাসে স্বর্গীয় সুরের রেশ।
কখন যে শরতের জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে
এসে দাঁড়িয়েছি একা হাওয়ায় দোলানো
ফসলের ক্ষেতের সান্নিধ্যে, বুঝ উঠতে পারিনি-
যেন কেউ দেখাচ্ছে আমাকে স্নেহভরে এই দৃশ্য।শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি চাঁদ
হাসছে কৌতুকে এই শহুরে লোককে দেখে, যার
সমস্ত শরীর ফুঁড়ে কী সহজে বেরুচ্ছে গ্রামীণ রূপ।
আমার অন্তর জুড়ে শহুরে-গ্রামীণ সুরধারা। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-ontor-jure-shohure-gramin-surdhara/
|
2425
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
অভাগার কাহিনী
|
ছড়া
|
১ লা থাকি একলা শুই
নিজের কাপড় নিজেই ২
খাটাখাটনি রাত্রি ৩
সঙ্গী খালি মুড়ির টিন।
চেষ্টা করি বাঁ ৪
পাছ দিয়ে সব পাচার।
বাইরে গেলে চান্দি ৬
এতো বেয়াদপ কেমনে হয়?
ঝগড়া করিস আমার ৭
ভাগ ব্যাটা তুই জলদি ৮
মাঝে মাঝে লাগে ভয়
কেউ দেখি আর মানুষ ৯
সবার মাঝেই অসন্তোষ
যত ১০ এই নন্দঘোষ?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2028
|
1263
|
জীবনানন্দ দাশ
|
স্বপ্ন
|
চিন্তামূলক
|
পাণ্ডুলিপি কাছে রেখে ধূসর দীপের কাছে আমি
নিস্তব্ধ ছিলাম ব’সে;
শিশির পড়িতেছিল ধীরে-ধীরে খ’সে;
নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামিউড়ে গেলো কুয়াশায়,- কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো।
তাহারি পাখার হাওয়া প্রদীপ নিভায়ে গেলো বুঝি?
অন্ধকার হাতড়ায়ে ধীরে-ধীরে দেশলাই খুঁজি;
যখন জ্বলিবে আলো কার মুখ দেখা যাবে বলতে কি পারো?কার মুখ?- আমলকী শাখার পিছনে
শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ একদিন দেখেছিলো, আহা,
সে-মুখ ধূসরতম আজ এই পৃথিবীর মনে।তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,
পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,
মানুষ র’বে না আর, র’বে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখনঃ
সেই মুখ আর আমি র’বো সেই স্বপ্নের ভিতরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shawpno/
|
1772
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আমি কি ধরিত্রীযোগ্য
|
চিন্তামূলক
|
আমি কি ধরিত্রীযোগ্য?
এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে তার
অসুখের ঘূণ-লাগা শরীরের অসি’-মজ্জা হাড়।
তাকে ঘিরে আছে মেঘ
তাকে ঘিরে ব্যাধের উল্লাস।
অক্ষর অন্বিষ্ঠ তার,
হাতের মুঠোয় মরা ঘাস।
প্রকৃতির হাত থেকে মানুষ নিয়েছে কেড়ে নিজের থাবায়
সংক্রামক কুয়াশা ও হিম
মানুষের হাত থেকে কখন নিয়েছে কেড়ে বিরক্ত সময়
অন্ধকার চিনবার মঙ্গল পিদিম।
কাঁটায় ছিঁড়েছে হাত
লুকনো রক্তের ফোঁটা লেগে
পান্ডুলিপি ভিজে একাকার।
আমি কি ধরিত্রীযোগ্য?
এই প্রশ্নে সে এখন সেতারের ছিঁড়ে যাওয়া তার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1185
|
3512
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বর এসেছে বীরের ছাঁদে
|
ছড়া
|
বর এসেছে বীরের ছাঁদে,
বিয়ের লগ্ন আটটা।
পিতল-আঁটা লাঠি কাঁধে,
গালেতে গালপাট্টা।
শ্যালীর সঙ্গে ক্রমে ক্রমে
আলাপ যখন উঠল জমে,
রায়বেঁশে নাচ নাচের ঝোঁকে
মাথায় মারলে গাঁট্টা।
শ্বশুর কাঁদে মেয়ের শোকে,
বর হেসে কয়– “ঠাট্টা’! (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bor-eseche-birer-chade/
|
272
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
কাবেরী-তীরে
|
প্রেমমূলক
|
কর্ণাটের গঙ্গা-পূত কাবেরীর নীরে
প্রভাতে সিনানে আসে শ্যামা বেণিবর্ণা
কর্ণাটকুমারী এক, নাম মেঘমালা।
সিনানের আগে নিতি কাহার উদ্দেশে
চামেলি চম্পক ফুল তরঙ্গে ভাসায়।
ভিনদেশি বুঝি এক বণিক কুমার
হেরিয়া সে এণাক্ষীরে তরণি ভিড়ায়ে
রহে সেই ঘাটে বসি,যেতে নাহি চায়।
স্নান-স্নিগ্ধা শ্যামলীর স্নিগ্ধতর রূপে
ডুবে যায় আঁখি তার, কন্ঠে ফোটে গান –
(কর্ণাটি সামন্ত – তেতালা)
কাবেরী নদীজলে কে গো বালিকা।
আনমনে ভাসাও চম্পা শেফালিকা॥
প্রভাত সিনানে আসি আলসে
কঙ্কণ তাল হানো কলসে,
খেলে সমীরণ লয়ে কবরীর মালিকা॥
দিগন্তে অনুরাগে নবারুণ জাগে
তব জল ঢলঢল করুণা মাগে।
ঝিলম রেবা নদীতীরে
মেঘদূত বুঝি খুঁজে ফিরে
তোমারেই তন্বী শ্যামা কর্ণাটিকা॥
দ্বিধাহীনা মেঘমালা জানিত না লাজ
কুন্ঠাহীন মুখে তার ছিল না গুন্ঠন!
গান শুনি কুমারের কাছে আসি কহে –
কারে খোঁজে মেঘদূত? হে বিদেশি কহো!
কহিতে কহিতে চাহি কুমারের চোখে
কী যেন হেরিয়া মুখে বেধে যায় কথা।
সেদিন প্রথম যেন আপনারে হেরি,
আপনি সে উঠিল চমকি! দেহে তার
লজ্জা আসি টেনে দিল অরুণ আঙিয়া!
ভরা ঘট লয়ে ঘরে ফিরে! নিশি রাতে
সুরের সুতায় গাঁথে কথার মুকুল।–(নাগ স্বরাবলী – তেতালা)
এসো চিরজনমের সাথি।
তোমারে খুঁজেছি দূর আকাশে জ্বালায়ে চাঁদের বাতি॥
খুঁজেছি প্রভাতে, গোধূলি-লগনে, মেঘ হয়ে আমি খুঁজেছি গগনে,
ঢেকেছে ধরণি আমার কাঁদনে অসীম তিমির রাতি॥
ফুল হয়ে আছে লতায় জড়ায়ে মোর অশ্রুর স্মৃতি
বেণুবনে বাজে বাদল নিশীথে আমারই করুণগীতি!
শত জনমের মুকুল ঝরায়ে ধরা দিতে এলে আজি মধুবায়ে
বসে আছি আশা-বকুলের ছায়ে বরণের মালা গাঁথি॥
গান গাহি চমকিয়া ওঠে মেঘমালা।
আপনারে ধিক্কারে সে মরিয়া মরমে –
যদি কেহ শুনে থাকে তাহার এ গান,
কী ভাবিবে যদি শোনে বিদেশি বণিক!
সেদিন কাবেরীতীরে এল মেঘমালা
বেলা করি। গাঁয়ের বধূরা একে একে
সিনান সারিয়া ফিরে গেছে গৃহকাজে।
বণিককুমার খোঁজে কী যেন মানিক!
নীল শাড়ি পরি তন্বী মেঘমালা আসে
শ্লথগতি মদালসা, বিলম্বিতা বেণি।
বণিককুমার চাহি ওপারের পানে,
গাহে গান, – না দেখার ভান করি যেন। –
(নীলাম্বরী – তেতালা)
নীলাম্বরী শাড়ি পরি, নীল যমুনায় কে যায়, কে যায়, কে যায়।
যেন জলে চলে থল-কমলিনী, ভ্রমর নূপুর হয়ে বোলে পায় পায়॥
কলসে কঙ্কণে রিনিঠিনি ঝনকে চমকায় উন্মন চম্পাবনকে,
দলিত অঞ্জন নয়নে ঝলকে পলকে খঞ্জন হরিণী লুকায়॥
অঙ্গের ছন্দে পলাশ, মাধবী, অশোক ফোটে,
নূপুর শুনি বনতুলসীর মঞ্জরি উলসিয়া ওঠে!
মেঘ-বিজড়িত রাঙা গোধূলি নামিয়া এল বুঝি পথ ভুলি।
তাহারই অঙ্গ-তরঙ্গ-বিভঙ্গে কূলে কূলে নদীজল উথলায়॥
মেঘমালা কুমারের আঁখি ফিরাইতে
কত রূপে শব্দ করে কলসে কঙ্কণে।
সাঁতারিয়া কাবেরীর শান্ত বক্ষ মাঝে
অশান্ত তরঙ্গ তোলে! বণিক কুমার
হাসি তীরে আসি কহে, ‘অঞ্চলের ফুল
অকারণে নদীজলে ভাসাও বালিকা।
ও ফুল আমারে দাও! দেবতা তোমার
প্রসন্ন হবেন, পাবে মনোমতো বর।’
মেঘমালা আঁচলের ফুলগুলি লয়ে
নদীজলে ভাসাইয়া – ঘটে জল ভরি
চলে এল ঘরপানে, চাহিল না ফিরে –
দেখিল না কার দুটি আঁখি আঁখিনীরে
ভরে গেছে কূলে কূলে। ঘরে ফিরে আসি
মেঘমালা আপনার মনে মনে কাঁদে –(নারায়ণী–আদ্ধা-কাওয়ালি)
রহি রহি কেন সেই মুখ পড়ে মনে।
ফিরায়ে দিয়াছি যারে অনাদরে অকারণে॥
উদাস চৈতালি দুপুরে মন উড়ে যেতে চায় সুদূরে
যে বনপথে সে ভিখারি-বেশে করুণা জাগায়েছিল সকরুণ নয়নে॥
তার বুকে ছিল তৃষ্ণা, মোর ঘটে ছিল বারি।
পিয়াসি ফটিকজল জল পাইল না গো ঢলিয়া পড়িল হায় জলদ নেহারি॥
তার অঞ্জলির ফুল পথধূলিতে ছড়ায়েছি সেই ব্যথা নারি ভুলিতে।
অন্তরালে যারে রাখিনু চিরদিন অন্তর জুড়িয়া কেন কাঁদে সে গোপনে॥
জলে আর যায় নাকো কর্ণাট কুমারী
চলে গেল তরি বাহি বিদেশি কুমার
তরণি ভরিয়া তার নয়নের নীরে!
সেদিন নিশীথে ঝড় বাদলের খেলা,
মেঘমালা চেয়ে আছে বাতায়ন খুলি
কাবেরী নদীর পানে! ঘন অন্ধকারে
বিজলি-প্রদীপ জ্বালি কোন বিরহিণী
খুঁজে যেন তারই মতো দয়িতে তাহার।
কাঁদিয়া কাঁদিয়া কবে পড়ে যে ঘুমায়ে,
ঘুমায়ে স্বপন দেখে গাহিছে বিদেশি –
(মিশ্র নারায়ণী – তেতালা)
নিশি রাতে রিম-ঝিম-ঝিম বাদল নূপুর
বাজিল ঘুমের মাঝে সজল মধুর।
দেয়া গরজে বিজলি চমকে জাগাইল ঘুমন্ত প্রিয়তমকে
আধ ঘুম-ঘোরে চিনিতে নারি ওরে
কে এল, কে এল বলে ডাকিছে ময়ূর।
দ্বার খুলি পড়শি কৃষ্ণা মেয়ে আছে চেয়ে মেঘের পানে আছে চেয়ে।
কারে দেখি আমি কারে দেখি, মেঘলা আকাশ, না ওই মেঘলা মেয়ে।
ধায় নদীজল মহাসাগর পানে বাহিরে ঝড় কেন আমায় টানে
জমাট হয়ে আছে বুকের কাছে নিশিথ আকাশ যেন মেঘ-ভারাতুর॥
মেঘমালা চমকিয়া জাগি ছুটে যায়
পাগলিনিপ্রায় নদীতীরে। ডাকি ফেরে
ঝড় বাদলের সাথে কন্ঠ মিশাইয়া –
‘কুমার! কুমার! কোথা প্রিয়তম মোর!
লয়ে যাও মোরে তব সোনার তরিতে!’
হারাইয়া গেল তার ক্ষীণ কন্ঠস্বর
অনন্ত যুগের বিরহিণীর কাঁদন
যে পথে হারায়ে যায়। আজও মোরা শুনি
কাবেরীর জল-ছলছল অশ্রু-মাখা
কর্ণাটিকা রাগিণীতে তাহারই বেদনা॥(মনোরঞ্জনী – তেতালা-ঢিমা)
ওগো বৈশাখী ঝড়! লয়ে যাও অবেলায়
ঝরা এ মুকুল।
লয়ে যাও আমার জীবন,– এই পায়ে দলা ফুল॥
ওগো নদীজল! লহো আমারে
বিরহের সেই মহা পাথারে
চাঁদের পানে চাহি যে পারাবার,
অনন্তকাল কাঁদে বেদনা-ব্যাকুল॥
ওরে মেঘ! মোরে সেই দেশে রেখে আয়
যে দেশে যায় না শ্যাম মথুরায়,
ভরে না বিষাদ-বিষে এ-জীবন
যে দেশের ক্ষণিকের ভুল॥ (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/kaberi-tire/
|
245
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ইন্দু-প্রয়াণ
|
শোকমূলক
|
(কবি শরদিন্দু রায়ের অকালমৃত্যু উপলক্ষ্যে)বাঁশির দেবতা! লভিয়াছ তুমি হাসির অমর-লোক,
হেথা মর-লোকে দুঃখী মানব করিতেছি মোরা শোক!
অমৃত-পাথারে ডুব দিলে তুমি ক্ষীরোদ-শয়ন লভি,
অনৃতের শিশু মোরা কেঁদে বলি, মরিয়াছ তুমি কবি!
হাসির ঝঞ্ঝা লুটায়ে পড়েছে নিদাঘের হাহাকারে,
মোরা কেঁদে বলি, কবি খোয়া গেছে অস্ত-খেয়ার পারে!আগুন-শিখায় মিশেছে তোমার ফাগুন-জাগানো হাসি,
চিতার আগুনে পুড়ে গেছ ভেবে মোরা আঁখি-জলে ভাসি।
অনৃত তোমার যাহা কিছু কবি তাই হয়ে গেছে ছাই,
অমৃত তোমার অবিনাশী যাহা আগুনে তা পুড়ে নাই।
চির-অতৃপ্ত তবু কাঁদি মোরা, ভরে না তাহাতে বুক,
আজ তব বাণী আন্-মুখে শুনি, তুমি নাই, তুমি মূক।অতি-লোভী মোরা পাই না তৃপ্তি সুরভিতে শুধু ভাই,
সুরভির সাথে রূপ-ক্ষুধাতুর ফুলেরও পরশ চাই।
আমরা অনৃত তাই তো অমৃতে ভরে ওঠে নাকো প্রাণ,
চোখে জল আসে দেখিয়া ত্যাগীর আপনা-বিলানো দান।
তরুণের বুকে হে চির-অরুণ ছড়ায়েছ যত লালি,
সেই লালি আজ লালে লাল হয়ে কাঁদে, খালি সব খালি!কাঁদায়ে গিয়াছ, নবরূপ ধরে হয়তো আসিবে ফিরে,
আসিয়া আবার আধ-গাওয়া গান গাবে গঙ্গারই তীরে,
হয়তো তোমায় চিনিব না, কবি, চিনিব তোমার বাঁশি,
চিনিব তোমার ওই সুর আর চল-চঞ্চল হাসি।
প্রাণের আলাপ আধ-চেনাচেনি দূরে থেকে শুধু সুরে,
এবার হে কবি, করিব পূর্ণ ওই চির-কবি-পুরে।…ভালোই করেছ ডিঙিয়া গিয়াছ নিত্য এ কারাগার,
সত্য যেখানে যায় নাকো বলা, গৃহ নয় সে তোমার।
গিয়াছ যেখানে শাসনে সেখানে নহে নিরুদ্ধ বাণী,
ভক্তের তরে রাখিয়ো সেখানে আধেক আসনখানি।
বন্দী যেখানে শুনিবে তোমার মুক্তবদ্ধ সুর, –
গঙ্গার কূলে চাই আর ভাবি কোথা সেই থসুর-পুর!গণ্ডির বেড়ি কাটিয়া নিয়াছ অনন্তরূপ টানি,
কারও বুকে আছ মূর্তি ধরিয়া, কারও বুকে আছ বাণী।
সে কি মরিবার? ভাঙি অনিত্যে নিত্য নিয়াছ বরি,
ক্ষমা করো কবি, তবু লোভী মোরা শোক করি, কেঁদে মরি।
না-দেখা ভেলায় চড়িয়া হয়তো আজিও সন্ধ্যাবেলা
গঙ্গার কুলে আসিয়া হাসিছ দেখে আমাদের খেলা!হউক মিথ্যা মায়ার খেলা এ তবুও করিব শোক,
‘শান্তি হউক’ বলি যুগে যুগে ব্যথায় মুছিব চোখ!
আসিবে আবারও নিদাঘ-শেষের বিদায়ের হাহাকার,
শাঙনের ধারা আনিবে স্মরণে ব্যাথা-অভিষেক তার।
হাসি নিষ্ঠুর যুগে যুগে মোরা স্নিগ্ধ অশ্রু দিয়া,
হাসির কবিরে ডাকিব গভীরে শোক-ক্রন্দন নিয়া। (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/indu-proyan/
|
5888
|
সুবোধ সরকার
|
এক
|
প্রেমমূলক
|
থানার বড়বাবু আমায় বলতো পাঁঠা
ছােটবাবু পেছনে লাথি মেরে বলতাে, যা তাে সিগারেট নিয়ে আয়
যেদিন মাইনে পেতাম, আমার দাদা এসে
সব টাকা কেড়ে নিয়ে যেত
আর তুমি, তােমার সঙ্গে আমার ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হল
একদিনও আমাকে ভালােবাসলে না, আদর করলে না।।গােলাপ টোলাপ না, আমার রাইফেল দেখতে খুব ভালাে লাগত
কী লম্বা, মুখটা ছুঁচলাে, গুডুম গুডুম
ভয় লাগত, ভালােও লাগত।
বড়বাবু যখন কোমর থেকে রিভলবার খুলে টেবিলে রাখত
আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম, কী সুন্দর দেখতে!কিন্তু কী যে হল সেদিন সন্ধেবেলায়, কী করে ফেললাম।
কোথা থেকে কে যেন একটা মেয়েছেলেকে ধরে আনল
বড়বাবু আমাকে দিয়ে মদ আনাল
ছােটবাবু আমাকে বলল যা মেয়েছেলেটার ঘরে যা
আমি গেলাম, সত্যি বলছি তােমাকে, তুমি আমার বউ
মেয়েছেলেটার গায়ে কী জোর, আমি পারছিলাম না
তারপর বড়বাবু এল, মেয়েছেলেটার ঘাড়ে মারল
অজ্ঞান হয়ে শুয়ে পড়ল, তারপর আমি ওর কাপড় খুললাম।পরের পরের দিন কাগজে কাগজে আমার ছবি
মেয়েছেলেটা আমাকেই দেখিয়ে দিল।
তুমি বিশ্বাস কর, তুমি আমার কতদিনের বউ
মাইরি বলছি, আমার মনে মনে ইচ্ছে হয়েছিল
উঠেও বসেছিলাম মেয়ে ছেলেটার বুকের উপর।
হঠাৎ তার মুখটা দেখে কষ্ট হল
একবার চোখ খুলে মেয়েলােকটা আমাকে দেখল
কি চোখে বাবা, আমার গা গুলিয়ে উঠল।তারপর বড় বাবু আর ছােট বাবু আমাকে সরিয়ে দিয়ে
বলল, তুই একটা ছাগল, যা, গেটে গিয়ে দাড়া
আমি এক ঘন্টা, দুঘণ্টা গেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম
আমি দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বসে পড়েছিলাম টুলে
টুলে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।তারপর তুমি সব শুনেছ, কাগজে আমার ছবি দেখেছ।
লোকে বলে আমার চাকরি চলে গেছে।
জেল হবে।
কতদিন তোমাকে দেখতে পাবো না।আমি খুব বোকা বলে তুমি আমাকে একদিনও আদর করনি।
আমি যখন জেলে থাকব, একদিন, অন্তত একদিন।
আমাকে দেখতে এসো।
একটু এঁচোড়ের তরকারি নিয়ে এসো, কত দিন ভালো কোন
খাবার খাইনি। বুড়ো মা-টাকে একটু দেখাবে।
তোমরা ভালো থেকো। তুমি ভালো থেকো।ইতি
তোমার নিধিরাম
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95-%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%b8%e0%a6%9f%e0%a7%87%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a0%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b/
|
4573
|
শামসুর রাহমান
|
কাজ
|
প্রেমমূলক
|
তুমি কি কলেজ স্ট্রিটে ঘুরছ এখন? নাকি নিউ
মার্কেটে করছ বেশ কেনাকাটা প্রিয় বান্ধবীর
সঙ্গে ঘুরে ঘুরে খর রোদে? কলকাতায় বড়ো ভিড়,
তোমার কি ভালো লাগে দম আটকানো কোনো ভিউ?এই যে এখানে তুমি নেই, এখন আমার কাছে
চিরচেনা এ শহর বড়ো জনশূন্য নিষ্প্রদীপ
মনে হয়, যেন ঢাকা আজ পরেনি কপালে টিপ
শোকে; ফুল নয়, অশ্রুবিন্দু ফুটে আছে সব গাছে।কোথাও যাবার নেই; সময় পাথর হয়ে চেপে
আছে বুকে, মাকড়সা জাল বোনে দু’চোখে আমার
ক্রমাগত, প্রায় ধৃতরাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা আজ
তোমার অভাবে। খবরের কাগজে হৃদয় ছেপে
তোমারই বন্দনা গাই; এলো বুঝি পাতালে নামার
সময়, তোমার প্রতীক্ষায় মগ্ন থাকাটাই কাজ। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kaj/
|
2033
|
মলয় রায়চৌধুরী
|
আলো
|
চিন্তামূলক
|
আবলুশ অন্ধকারে তলপেটে লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ি
পিছমোড়া করে বাঁধা হাতকড়া স্যাঁসেঁতে ধুলো-পড়া মেঝে
আচমকা কড়া আলো জ্বলে উঠে চোখ ধাঁধায়
তক্ষুনি নিভে গেলে মুখে বুট জুতো পড়ে দু-তিনবার
কষ বেয়ে রক্ত গড়াতে থাকে টের পাই
আবার তীব্র আলো মুহূর্তে জ্বলে উঠে নিভে যায়
গরম লোহার রড খালি পিঠে মাংস ছেঁচে তোলে
আমাকে ল্ষ করে চারিদিক থেকে আলো ঝলসে ওঠে ফের
আপনা থেকেই চোখ কুঁচকে যায় দেখতে পাই না কাউকে
একসঙ্গে সব আলো আরেকবার নিভে গেলে
পরবর্তী আক্রমণ সহ্য করার জন্যে নিজেকে তৈরি করে নিই।
২ মাঘ ১৩৯১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1152
|
4791
|
শামসুর রাহমান
|
তুমি বলেছিলে
|
মানবতাবাদী
|
দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।
পুড়ছে দোকান-পাট, কাঠ,
লোহা-লক্কড়ের স্তূপ, মসজিদ এবং মন্দির।
দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।
বিষম পুড়ছে চতুর্দিকে ঘর-বাড়ি।
পুড়ছে টিয়ের খাঁচা, রবীন্দ্র রচনাবলি, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার,
মানচিত্র, পুরনো দলিল।
মৌচাকে আগুন দিলে যেমন সশব্দে
সাধের আশ্রয় ত্যাগী হয়
মৌমাছির ঝাঁক,
তেমনি সবাই
পালাচ্ছে শহর ছেড়ে দিগ্বিদিক। নবজাতককে
বুকে নিয়ে উদ্ভ্রান্ত জননী
বনপোড়া হরিণীর মত যাচ্ছে ছুটে।
অদূরে গুলির শব্দ, রাস্তা চষে জঙ্গী জীপ। আর্ত
শব্দ সবখানে। আমাদের দু'জনের
মুখে খরতাপ। আলিঙ্গনে থরো থরো
তুমি বলেছিলে,
'আমাকে বাঁচাও এই বর্বর আগুন থেকে, আমাকে বাঁচাও,
আমাকে লুকিয়ে ফেলো চোখের পাতায়
বুকের অতলে কিংবা একান্ত পাঁজরে
আমাকে নিমেষে শুষে নাও
চুম্বনে চুম্বনে।'
দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার,
আমাদের চৌদিকে আগুন,
গুলির ইস্পাতী শিলাবৃষ্টি অবিরাম।
তুমি বলেছিলে
আমাকে বাঁচাও।
অসহায় আমি তাও বলতে পারিনি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/585
|
814
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ০১
|
কাহিনীকাব্য
|
এক
বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী,
উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি |
— রাখালী গান
এই এক গাঁও, ওই এক গাঁও — মধ্যে ধু ধু মাঠ,
ধান কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ |
এ-গাঁও যেন ফাঁকা ফাঁকা, হেথায় হোথায় গাছ ;
গেঁয়ো চাষীর ঘরগুলি সব দাঁড়ায় তারি পাছ |
ও-গাঁয় যেন জমাট বেঁধে বনের কাজল কায়া,
ঘরগুলিরে জড়িয়ে ধরে বাড়ায় বনের মায়া |
এ-গাঁও চেয়ে ও-গাঁর দিকে, ও-গাঁও এ-গাঁর পানে,
কতদিন যে কাটবে এমন, কেইবা তাহা জানে!
মাঝখানেতে জলীর বিলে জ্বলে কাজল-জল,
বক্ষে তাহার জল-কুমুদী মেলছে শতদল |
এ-গাঁর ও-গাঁর দুধার হতে পথ দুখানি এসে,
জলীর বিলের জলে তারা পদ্ম ভাসায় হেসে!
কেউবা বলে — আদ্যিকালের এই গাঁর এক চাষী,
ওই গাঁর এক মেয়ের প্রেমে গলায় পরে ফাঁসি ;
এ-পথ দিয়ে একলা মনে চলছিল ওই গাঁয়ে,
ও-গাঁর মেয়ে আসছিল সে নূপুর-পরা পায়ে!
এইখানেতে এসে তারা পথ হারায়ে হায়,
জলীর বিলে ঘুমিয়ে আছে জল-কুমুদীর গায়ে |
কেইবা জানে হয়তো তাদের মাল্য হতেই খসি,
শাপলা-লতা মেলছে পরাগ জলের উপর বসি |
মাঠের মাঝের জলীর বিলের জোলো রঙের টিপ,
জ্বলছে যেন এ-গাঁর ও-গাঁর বিরহেরি দীপ !
বুকে তাহার এ-গাঁর ও-গাঁর হরেক রঙের পাখি,
মিলায় সেথা নতুন জগৎ নানান সুরে ডাকি |
সন্ধ্যা হলে এ-গাঁর পাখি ও-গাঁর পানে ধায়,
ও-গাঁর পাখি এ-গাঁয় আসে বনের কাজল ছায় |
এ-গাঁর লোকে নাইতে আসে, ও-গাঁর লোকেও আসে
জলীর বিলের জলে তারা জলের খেলায় ভাসে |
এ-গাঁও ও-গাঁও মধ্যে ত দূর — শুধুই জলের ডাক,
তবু যেন এ-গাঁয় ও-গাঁয় নেইকো কোন ফাঁক |
ও-গাঁর বধু ঘট ভরিতে যে ঢেউ জলে জাগে,
কখন কখন দোলা তাহার এ-গাঁয় এসে লাগে |
এ-গাঁর চাষী নিঘুম রাতে বাঁশের বাঁশীর সুরে,
ওইনা গাঁয়ের মেয়ের সাথে গহন ব্যথায় ঝুরে!
এ-গাঁও হতে ভাটীর সুরে কাঁদে যখন গান,
ও-গাঁর মেয়ে বেড়ার ফাঁকে বাড়ায় তখন কান |
এ-গাঁও ও-গাঁও মেশামেশি কেবল সুরে সুরে ;
অনেক কাজে এরা ওরা অনেকখানি দূরে |
এ-গাঁর লোকে দল বাঁধিয়া ও-গাঁর লোকের সনে,
কাইজা ফ্যাসাদ্ করেছে যা জানেই জনে জনে |
এ-গাঁর লোকেও করতে পরখ্ ও-গাঁর লোকের বল,
অনেকবারই লাল করেছে জলীর বিলের জল |
তবুও ভাল, এ-গাঁও ও-গাঁও, আর যে সবুজ মাঠ,
মাঝখানে তার ধূলায় দোলে দুখান দীঘল বাট ;
দুই পাশে তার ধান-কাউনের অথই রঙের মেলা,
এ-গাঁর হাওয়ায় দোলে দেখি ও-গাঁয় যাওয়ার ভেলা |
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/804
|
3811
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রসগোল্লার লোভে
|
হাস্যরসাত্মক
|
রসগোল্লার লোভে
পাঁচকড়ি মিত্তির
দিল ঠোঙা শেষ করে
বড়ো ভাই পৃথ্বির।
সইল না কিছুতেই
যকৃতের নিচুতেই
যন্ত্র বিগড়ে গিয়ে
ব্যামো হল পিত্তির।
ঠোঙাটাকে বলে, “পাজি
ময়রার কারসাজি।’
দাদার উপরে রাগে–
দাদা বলে, “চিত্তির!
পেটে যে স্মরণসভা
আপনারি কীর্তির।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rosgollar-love/
|
4923
|
শামসুর রাহমান
|
পিঁপড়ের দ্বীপে
|
সনেট
|
নৈশ ভোজনের পর মার্কিন টাইম ম্যাগজিন
উল্টেপাল্টে তুলে নিই ডিফোর রবিনসন ক্রূশো,
কিছুক্ষণ ঘুরি তার সঙ্গে; কী অদ্ভুত বেশভূষো
নিজের শরীরে দেখি, ছাগগন্ধে এই ঘুমহীন
রাত্রি ভরপুর, অকস্মাৎ পিঁপড়ের ঝাঁক ধেয়ে
আসে চতুর্দিকে থেকে। অতিকায় ওরা, টেলিফোন
তার, খাট, দেয়ালের মাঠ, যেন অত্যন্ত গোপন
ষড়যন্ত্রে বুঁদ হয়ে, উঠছে চেয়ার বেয়ে বেয়ে।পিঁপড়েগুলি চকচকে লাল গ্রেনেডের মতো,
যে কোনো মুহূর্তে ওরা ভীষণ পড়বে ফেটে, ঘর
নিমেষে কাঠের গুঁড়ো হবে, জলপাইরঙ জীপে
চেপে এসে আমার হদিশ কেউ পাবে না, আহত
আমি রইবো ঢাকা ভগ্নতূপে, দুঃস্বপ্নের এ প্রহর
এত দীর্ঘ কেন? কেন বন্দী আমি পিঁপড়ের দ্বীপে? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/piprer-dipe/
|
1805
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কোনো
|
চিন্তামূলক
|
একালের কোনো কোনো যুবক বা যুবতীর মুখে
সেকালের মোমমাখা ঝাড়লন্ঠন স্তম্ভ ও গম্বুজ দেখা যায়।
দেখে হিংসা জাগে।মানুষ এখন যেন কোনো এক বড় উনোনের
ভাত-ডাল-তরকারির তলপেটে ডাইনীর চুলের
আগুনকে অহরহ জ্বালিয়ে রাখার
চেলা কাঠ, কাঠ-কয়লা-ঘুটে।
মানুষ এখন তার আগেকার মানুষ-জন্মের
কবচ, কুণ্ডল, হার, শিরস্ত্রাণ, বর্ম ও মুকুট
বৃষের মতন কাঁধ, সিংহ-কটি, অশ্বের কদম
পিঠে তৃণ, চোখে অহংকার
সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একটা গগলস্ পেয়ে খুশি।
প্লাসটিকের মানিব্যাগ, নাইলনের জামা পেয়ে খুশি।
বোবা টেলিফোন পুষে তরতাজা বিল পেয়ে খুশি।
চারকোণা সংসারের চতুর্দিকে গ্রীল এটেঁ খুশি।
বনহংসী উড়ে যায়, সে বাতাসে কাশের কথুক
এয়ারকুলারে সেই বাতাসের বাসী গন্ধ পেয়ে বড় খুশি।একালের কোনো কোনো যুবক বা যুবতীকে দেখে
অতীতের রাজশ্রীর, হর্ষবর্ষনের মতো লাগে।
দেখে হিংসা জাগে।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%95%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%95-%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%a4%e0%a7%80-%e0%a6%aa%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%8d/
|
4347
|
শামসুর রাহমান
|
আত্মপ্রতিকৃতি
|
চিন্তামূলক
|
আমি তো বিদেশী নই, নই ছদ্মবেশী বাসভূমে-
তবে কেন পরিচয় অন্ধকার ঘরে রাজা, কেন
দেশের দশের কাছে সারাটা জীবন ডুগডুগি
বাজিয়ে শোনাব কথা, নাচাব বানর ফুটপাতে?
কেন তবে হরবোলা সেজে সারাক্ষণ হাটে মাঠে
বাহবা কুড়াব কিংবা স্টেজে খালি কালো রুমালের
গেরো খুলে দেখাব জীবন্ত খরগোশ দর্শকের
সকৌতুক ভিড়ে? কেন মুখে রঙ মেখে হব সঙ?না, তারা জানে না কেউ আমার একান্ত পরিচয়
আমি কে? কী করি সারাক্ষণ সমাজের চৌহদ্দিতে?
কেন যাই চিত্রপ্রদর্শনী, বারে, বইয়ের দোকানে,
তর্কের তুফান তুলি বুদ্ধিজীবী বন্ধুর ডেরায়?
না, তারা জানে না কেউ।অথচ নিঃসঙ্গ বারান্দায়
সন্ধ্যা, এভেন্যুর মধ্যরাত্রির স্তব্ধতা, সার্কাসের
আহত ক্লাউন আর প্রাচীনের অতন্দ্র বিড়াল,
কলোনির জীবনমথিত ঐকতান, অপ্সরীর
তারাবেঁধা কাঁচুলি, গলির অন্ধ বেহালাবাদক
ব্রাকের সুস্থির মাছ, সেঁজার আপেল জানে কত।
সহজে আমাকে, জানে কবরের দুর্বিনীত ফুল। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/attoprotikriti/
|
2462
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
অস্তি-নাস্তির পদ্য
|
চিন্তামূলক
|
কোথায় যাবো সাঁই-
ভেতর থেকে যন্ত্রণা দেয় দ্বিতীয় সংকেত
কোন জমিনে চাষ দেবো যে - কোথায় সোনার খেতঘরের পাশে ঘর-
শুদ্ধবাদী চেঁচিয়ে কয় - ঢুকিসনে বর্বর
দেখেও না কোথায় বসে হাসেন পরাশর
অঙ্গে অঙ্গে আঘাত করে শাস্ত্রজীবীর বেতকোথায় যাবো সাঁই
ডাঙাতে বাঘ জলে কুমির মধ্যখানে ঠাইকালের পরে কাল-
ঊর্ধ্বলোকে তাকিয়ে রই বিবস্ত্র কঙ্কাল
অলৌকিকের দ্যুলোক জুড়ে আলোর কী আকাল
রন্ধ্রে রন্ধ্রে নাচে আমার লৌকিকতার প্রেত
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/osti-nastir-podyo/
|
546
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সুরা লাহাব
|
ভক্তিমূলক
|
(শুরু করিলাম) ল'য়ে নাম আল্লার
করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।ধ্বংস হোক্ আবু লাহাবের বাহুদ্বয়,
হইবে বিধ্বস্ত তাহা হইবে নিশ্চয়।
করেছে অর্জ্জন ধন সম্পদ সে যাহা
কিছু নয়, কাজে তার লাগিবে না তাহা।
শিখাময় অনলে সে পশিবে ত্বরায়
সাথে তার সে অনল-কুন্ডে যাবে হায়
জায়া তার - অপবাদ-ইন্ধন বাহিনী,
তাহার গলায় দড়ি বহিবে আপনি।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sura-lahab/
|
3242
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুর্বোধ
|
প্রেমমূলক
|
তুমি মোরে পার না বুঝিতে?
প্রশান্তবিষাদভরে দুটি আঁখি প্রশ্ন করে
অর্থ মোর চাহিছে খুঁজিতে,
চন্দ্রমা যেমন-ভাবে স্থিরনতমুখে
চেয়ে দেখে সমুদ্রের বুকে।। কিছু আমি করি নি গোপন।
যাহা আছে সব আছে তোমার আঁখির কাছে
প্রসারিত অবারিত মন।
দিয়েছি সমস্ত মোর করিতে ধারণা,
তাই মোরে বুঝিতে পার না? এ যদি হইত শুধু মণি,
শত খন্ড করি তারে সযত্নে বিবিধাকারে
একটি একটি করি গণি
একখানি সূত্রে গাঁথি একখানি হার
পরাতেম গলায় তোমার।। এ যদি হইত শুধু ফুল,
সুগোল সুন্র ছোট, উষালোকে ফোটো-ফোটো,
বসন্তের পবনে দোদুল-
বৃন্দ হতে সযত্নে আনিতাম তুলে,
পরায়ে দিতাম কালো চুলে।। এ যে সখী ,সমস্ত হৃদয়।
কোথা জল কোথা কূল, দিক হয়ে যায় ভুল,
অন্তহীন রহস্যনিলয়।
এ রাজ্যের আদি অন্ত নাহি জান রানী,
এ তবু তোমার রাজধানী।। কী তোমারে চাহি বুঝাইতে?
গভীর হৃদয়-মাঝে নাহি জানি কী যে বাজে
নিশিদিন নীরব সংগীতে,
শব্দহীন স্তব্ধতায় ব্যাপিয়া গগন
রজনীর ধ্বনির মতন।।
এ যে সুখ হইত শুধু সুখ,
কেবল একটি হাসি অধরের প্রান্তে আসি
আনন্দ করিত জাগরূক।
মুহূর্তে বুঝিয়া নিতে হৃদয়বারতা,
বলিতে হতো না কোনো কথা।। এ যদি হইত শুধু দুখ
দুটি বিন্দু অশ্রুজল দুই চক্ষে ছলছল,
বিষন্ন অধর , স্নায়ুমুখ-
প্রত্যেক্ষ দেখিতে পেতে অন্তরের ব্যথা,
নীরবে প্রকাশ হত কথা।।
এ যে সখী,হৃদয়ের প্রেম-
সুখদুখবেদনার আদি অন্ত নাহি যার,
চিরদৈন্য,চিরপূর্ণ হেম।
নব নব ব্যাকুলতা জাগে নূতন - নূতনালোকে
পাঠ করো রাত্রিদিন ধরে।
বুঝা যায় আধো প্রেম,আধখানা মন-
সমস্ত কে বুঝেছে কখন।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/durvod/
|
739
|
জয় গোস্বামী
|
শাসকের প্রতি
|
মানবতাবাদী
|
আপনি যা বলবেন
আমি ঠিক তাই কোরবো
তাই খাবো
তাই পরবো
তাই গায়ে মেখে ব্যাড়াতে যাবো
কথাটি না বলে
বললে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকবো সারা রাত
তাই থাকবো
পরদিন যখন বলবেন
এবার নেমে এসো
তখন কিন্তু লোক লাগবে আমাকে নামাতে
একা একা নামতো পারবো না
ও টুকু পারি নি বলে
অপরাধ নেবেন না যেন
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1687.html
|
311
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
চিরন্তনী প্রিয়া
|
প্রেমমূলক
|
এসো এসো এসো আমার চির-পুরানো!
বুক জুড়ে আজ বসবে এসো হৃদয়-জুড়ানো!
আমার চির-পুরানো! পথ বিপথে কতই আমার নিত্য নূতন বাঁধন এসে যাচে,
কাছে এসেই অমনি তারা পুড়ে মরে আমার আগুন আঁচে।
তারা এসে ভালোবাসার আশায়
একটুকুতেই কেঁদে ভাসায়,
ভীরু তাদের ভালোবাসা কেঁদেই ফুরানো।
বিজয়িনী চিরন্তনী মোর!
একা তুমিই হাস বিজয়-হাসি দীপ দেখিয়ে পথে ঘুরানো। তুমি যেদিন মুক্তি দিলে হেসে বাঁধন কাটলে আপন হাতে,
প্রেম-গরবি আপন প্রেমের জোরে,
জানতে আমায় সইবে না কেউ বইবে না ভার
হার মেনে সে আসতে হবে আবার তোমার দোরে। গরবিনি! গর্ব করে এই কপালে লিখলে জয়ের টিকা
‘চঞ্চল এই বাঁধন-হারায় বাঁধতে পারে এক এ সাহসিকা!’
প্রিয়! তাই কি আমার ভালোবাসা
সবাই বলে সর্বনাশা,
এই ধূমকেতু মোর আগুন-ছোঁয়া বিশ্ব-পোড়ানো?
সর্বনাশী চপল প্রিয়া মোর!
তবে অভিশাপের বুকে তুমিই হাসবে এসো
নয়ন ঝুরানো॥ (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/chirontoni-priya/
|
3522
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বলিয়াছিনু মামারে
|
ছড়া
|
বলিয়াছিনু মামারে–
তোমারি ঐ চেহারাখানি কেন গো দিলে আমারে।
তখনো আমি জন্মিনি তো, নেহাত ছিনু অপরিচিত,
আগেভাগেই শাস্তি এমন, এ কথা মনে ঘা মারে।
হাড় ক’খানা চামড়া দিয়ে ঢেকেছে যেন চামারে। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boliachinu-mamare/
|
1132
|
জীবনানন্দ দাশ
|
বিস্ময়
|
চিন্তামূলক
|
কখনো বা মৃত জনমানবের দেশে
দেখা যাবে বসেছে কৃষাণঃ
মৃত্তিকা-ধূসর মাথা
আপ্ত বিশ্বাসে চক্ষুষ্মান।কখনো ফুরুনো ক্ষেতে দাঁড়ায়েছে
সজারুর গর্তের কাছে;
সেও যেন বাবলার কান্ড এক
অঘ্রাণের পৃথিবীর কাছে।সহসা দেখেছি তারে দিনশেষেঃ
মুখে তার সব প্রশ্ন সম্পূর্ণ নিহত;
চাঁদের ও-পিঠ থেকে নেমেছে এ পৃথিবীর
অন্ধকার ন্যুব্জতার মতো।সে যেন প্রস্তরখন্ড…স্থির-
নড়িতেছে পৃথিবীর আহ্নিক আবর্তের সাথে;
পুরাতন ছাতকুড়ো ঘ্রাণ দিয়ে
নবীন মাটির ঢেউ মাড়াতে-মাড়াতে।তুমি কি প্রভাতে জাগ?
সন্ধ্যায় ফিরে যাও ঘরে?
আস্তীর্ণ শতাব্দী ব’হে যায়নি কি
তোমার মৃত্তিকাঘন মাথার উপরে?কী তারা গিয়েছে দিয়ে-
নষ্ট ধান? উজ্জীবিত ধান?
সুষুম্না নাড়ীর গতি-অজ্ঞাত;
তবু আমি আরো অজ্ঞান
যখন দেখেছি চেয়ে কৃষাণকে
বিশীর্ণ পাগড়ী বেঁধে অস্তাক্ত আলোকে
গঙ্গাফড়িঙের মতো উদ্বাহু
মুকুর উঠেছে জেগে চোখে;-যেন এই মৃত্তিকার গর্ভ থেকে
অবিরাম চিন্তারাশি- নব-নব নগরীর আবাসের থাম
জেগে অঠে একবার;
আর একবার ঐ হৃদয়ের হিম প্রাণায়াম।সময়ঘড়ির কাছে রয়েছে অক্লান্তি শুধুঃ
অবিরল গ্যাসে আলো, জোনাকীতে আলো;
কর্কট, মিথুন, মীন, কন্যা, তুলা ঘুরিতেছে;-
আমাদের অমায়িক ক্ষুধা তবে কোথায় দাঁড়ালো
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/bishmoy/
|
5977
|
হুমায়ুন আজাদ
|
এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়
|
মানবতাবাদী
|
তেমন যোগ্য সমাধি কই ?
মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো
অথবা সুনীল-সাগর-জল-
সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই !
তাইতো রাখি না এ লাশ
আজ মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,
হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/403
|
4112
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
হে
|
চিন্তামূলক
|
সারারাত স্বপ্ন দেখি, সারাদিন স্বপ্ন দেখি
যে-রকম আকাশ পৃথিবী দ্যাখে, পৃথিবী আকাশ,
একবার অন্ধকারে, একবার আলোর ছায়ায়
একবার কুয়াশা-কাতর চোখে, একবার গোধুলির ক্লান্ত রোদে-
সারারাত স্বপ্ন দেখি-সারাদিন স্বপ্ন দেখি।
একখানি সুদূরের মুখ জ্ব’লে থাকে চেতনার নীলে,
কে যেন বাদক সেই স্বপ্নের ভেতরে তোলে বিষাদের ধ্বনি
আঁকে সেই প্রিয়মুখে-সুদূরের মুখে
বর্ণময় রঙিন বিষাদ।ফিরে আয় বোলে ডাকি- সে বাদক উদাসিন থামে না তবুও…
সারারাত স্বপ্ন দেখি, সারাদিন স্বপ্ন দেখি-
স্বপ্নের ভেতরে তুমি হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
চোখের সমুখে আজ কেন এসে দাঁড়ালে নিঠুর!
কেন ওই রক্তে-মাংসে, কেন ওই নশ্বর ত্বকের আবরণে
এসে আজ শুধোলে কুশল?হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
হৃদয়ের কূল ভেঙে কেন আজ এতো জল ছড়ালো শরীরে
কেন আজ বাতাসে বসন্ত দিন ফিরে এলো কুয়াশার শীতে!কে সেই বংশীবাদক স্বপ্নের শিয়রে বসে বাজাতেন বাঁশি
বেদনার ধ্বনি তুলে রাত্রি দিন, সে আজ হারালো কোথায়?বেদনার রঙ দিয়ে আমি যারে আঁকি
হৃদয়ের রক্ত দিয়ে আমি যারে আঁকি
আমার কষ্ট দিয়ে, আমার স্বপ্ন দিয়ে যে আমার নিভৃত নির্মাণ
সেই তুমি- হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
মর্মমূল ছিঁড়ে এসে ঠাঁই নিলে কেন এই মাংসের বুকে!
কেন ওই বৃক্ষতলে, কেন ওই নদীর নিকটে এসে বোলে গেলে
তোমার ঠিকানা!আমি তো প্রার্থনাগুলো শস্যের বীজের মতো দিয়েছি ছড়িয়ে
জল তাকে পুষ্টি দেবে, মাটি তাকে ভূমি দেবে, তুমি তার গভীর ফসল-
বাতাসে তুলোর মতো তুমি তবে উড়ে এলে কেন!
কেন আজ পোড়া তুষের গন্ধে শুধু জন্মের কথা মনে পড়ে!
শৈশব কৈশোর এসে মিশে থাকে ফাল্গুনের তুমুল হাওয়ায়
একটি রাত্রি কেন হয়ে ওঠে এতো দীর্ঘ দীর্ঘ রাত?হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
দু’চোখে ভাঙন নিয়ে কেন এই রুক্ষ দুঃসময়ে এলে
কেন সমস্ত আরতির শেষে আজ এলে শূন্য দুখানি হাত!
কেন এলে, বিষণ্ন সুন্দর, তুমি কেন এলে?
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b9%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a6/
|
2770
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ইঁটের গাদার নিচে
|
ছড়া
|
ইঁটের গাদার নিচে
ফটকের ঘড়িটা।
ভাঙা দেয়ালের গায়ে
হেলে-পড়া কড়িটা।
পাঁচিলটা নেই, আছে
কিছু ইঁট সুরকি।
নেই দই সন্দেশ,
আছে খই মুড়কি।
ফাটা হুঁকো আছে হাতে,
গেছে গড়গড়িটা।
গলায় দেবার মতো
বাকি আছে দড়িটা। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/iter-gadar-niche/
|
921
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আকাশে চাঁদের আলো
|
প্রেমমূলক
|
১
আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ
বাতাসে ঘুঘুর ডাক—অশত্থে ঘুঘুর ডাক—হৃদয়ে ঘুঘু যে ডাকে—নরম ঘুঘুর ডাক আজ
তুমি যে রয়েছ কাছে—ঘাসে যে তোমার ছায়া—তোমার হাতের ছায়া—তোমার শাড়ির ছায়া ঘাসে
আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ২
কেউ যে কোথাও নেই—সকলে গিয়েছে মরে—সকলে গিয়েছে চলে—উঠান রয়েছে শুধু একা
শিশুরা কাঁদে না কেউ—রুগিরা হাঁপায় না তো—বুড়োরা কয় না কথা : থুবড়ো ব্যথার কথা যত
এখানে সকাল নাই—এখানে দুপুর নাই—এখানে জনতা নাই—এখানে সমাজ নাই—নাইকো মূর্খ ধাঁধা কিছু
আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ৩
আর তো ক্লান্তি নাই—নাইকো চেষতা আজ—নাইকো রক্ত ব্যথা—বিমূঢ় ভিড়ের থেকে নিয়েছি জীবন ভরে ছুটি
হেঁটেছি অনেক পথ—আমার ফুরালো পথ—এখানে সকল পথ তোমার পায়ের পথে গিয়েছে নীলাভ ঘাসে মুছে
তুমি যে রয়েছ কাছে—ঘাসে যে তোমার ছায়া—তোমার হাতের ছায়া—তোমার শাড়ির ছায়া ঘাসে
আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/akashey-chader-alo/
|
3588
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৪
|
প্রেমমূলক
|
প্রভাতে একটি দীর্ঘশ্বাস
একটি বিরল অশ্রুবারি
ধীরে ওঠে, ধীরে ঝরে যায়,
শুনিলে তোমার নাম আজ।
কেবল একটুখানি লাজ–
এই শুধু বাকি আছে হায়।
আর সব পেয়েছে বিনাশ।
এক কালে ছিল যে আমারি
গেছে আজ করি পরিহাস।Aubre De Vere (অনূদিত কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-4/
|
3960
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সুখ
|
চিন্তামূলক
|
আজি মেঘমুক্ত দিন; প্রসন্ন আকাশ
হাসিছে বন্ধুর মতো; সুন্দর বাতাস
মুখে চক্ষে বক্ষে আসি লাগিছে মধুর--
অদৃশ্য অঞ্চল যেন সুপ্ত দিগ্বধূর
উড়িয়া পড়িছে গায়ে। ভেসে যায় তরী
প্রশান্ত পদ্মার স্থির বক্ষের উপরি
তরল কল্লোলে। অর্ধমগ্ন বালুচর
দূরে আছে পড়ি, যেন দীর্ঘ জলচর
রৌদ্র পোহাইছে শুয়ে। ভাঙা উচ্চতীর;
ঘনচ্ছায়াপূর্ণ তরু; প্রচ্ছন্ন কুটির;
বক্র শীর্ণ পথখানি দূর গ্রাম হতে
শস্যক্ষেত্র পার হয়ে নামিয়াছে স্রোতে
তৃষার্ত জিহ্বার মতো। গ্রামবধূগণ
অঞ্চল ভাসায়ে জলে আকণ্ঠমগন
করিছে কৌতুকালাপ। উচ্চ মিষ্ট হাসিজলকলস্বরে মিশি পশিতেছে আসি
কর্ণে মোর। বসি এক বাঁকা নৌকা-'পরি
বৃদ্ধ জেলে গাঁথে জাল নতশির করি
রৌদ্রে পিঠ দিয়া। উলঙ্গ বালক তার
আনন্দে ঝাঁপায়ে জলে পড়ে বারম্বার
কলহাস্যে; ধৈর্যময়ী মাতার মতন
পদ্মা সহিতেছে তার স্নেহ-জ্বালাতন।
তরী হতে সম্মুখেতে দেখি দুই পার--
স্বচ্ছতম নীলাভ্রের নির্মল বিস্তার;
মধ্যাহ্ন-আলোকপ্লাবে জলে স্থলে বনে
বিচিত্র বর্ণের রেখা; আতপ্ত পবনে
তীর উপবন হতে কভু আসে বহি
আম্রমুকুলের গন্ধ, কভু রহি রহি
বিহঙ্গের শ্রান্ত স্বর। আজি বহিতেছে
প্রাণে মোর শান্তিধারা-- মনে হইতেছে
সুখ অতি সহজ সরল, কাননের
প্রস্ফুট ফুলের মতো, শিশু-আননের
হাসির মতন, পরিব্যাপ্ত বিকশিত--
উন্মুখ অধরে ধরি চুম্বন-অমৃত
চেয়ে আছে সকলের পানে বাক্যহীন
শৈশববিশ্বাসে চিররাত্রি চিরদিন।
বিশ্ববীণা হতে উঠি গানের মতন
রেখেছে নিমগ্ন করি নিথর গগন।
সে সংগীত কী ছন্দে গাঁথিব, কী করিয়া
শুনাইব, কী সহজ ভাষায় ধরিয়া
দিব তারে উপহার ভালোবাসি যারে,
রেখে দিব ফুটাইয়া কী হাসি আকারে
নয়নে অধরে, কী প্রেমে জীবনে তারেকরিব বিকাশ। সহজ আনন্দখানি
কেমনে সহজে তারে তুলে ঘরে আনি
প্রফুল্ল সরস। কঠিন আগ্রহভরে
ধরি তারে প্রাণপণে-- মুঠির ভিতরে
টুটি যায়। হেরি তারে তীব্রগতি ধাই--
অন্ধবেগে বহুদূরে লঙ্ঘি চলি যাই,
আর তার না পাই উদ্দেশ। চারি দিকে
দেখে আজি পূর্ণপ্রাণে মুগ্ধ অনিমিখে
এই স্তব্ধ নীলাম্বর স্থির শান্ত জল,
মনে হল সুখ অতি সহজ সরল।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20150129105406/
|
39
|
অসীম সাহা
|
পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মঘাতী রক্তপাত
|
স্বদেশমূলক
|
কাল রাতে ওরা আমার দেহ থেকে সিরিঞ্জ সিরিঞ্জ রক্ত তুলে নিয়েছে
আমাকে ওরা এক নিঃসঙ্গ অন্ধকার রাতের থমথমে নিস্তব্ধতার মধ্যে
বেঁধে রেখে বলেছে, ‘শাট আপ। কথা বললেই গুলি করব!’তখনই সমস্ত পৃথিবী কাঁপিয়ে, সমস্ত চরাচর, বনভূমি কাঁপিয়ে
একটা ভয়ানক হাহাকার, মৃতদের কলরোল উড়ে এসে
আমার বুকের কাছে আছড়ে পড়েছে;
আমি কেঁপে উঠেছি।আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে আমার মায়ের মুখ
একটি নিঃসঙ্গ একাকী প্রদীপের নিচে বেদনায় নুয়ে থাকা
আমার জন্মদাত্রীর এলায়িত দেহের ভঙ্গিমা
চৌকাঠে এলোমেলো বাতাসের আঘাতে উদাসীন
আমার প্রিয়তমা, আমার সন্তান, আমার একমাত্র উত্তরাধিকার।
এইসব ভাবতে ভাবতে আমার রক্তের ভেতরে জেগে উঠেছে
এক পরাজিত সৈনিকের আহত, ক্ষতবিক্ষত, ক্লান্ত-দেহের
অস্বাভাবিক স্থবিরতা।অথচ আমাকে থামলে চলবে না।
আমার সামনে কোটি কোটি মানুষের গগনবিদারী চিৎকার
আমার সামনে বিস্তৃত দিগন্তের নিচে অনাবিল সবুজ ধানের ক্ষেত
আমার সামনে পাকা ধানের মতো জীবনের
অবিরত সম্ভাবনার সোনালী ভাঁড়ারআমার চোখে জল নেমে আসে।
আমি অনেকদিন অসম্ভব বৃষ্টির বিপুল জ্যোৎস্নার মধ্যে
শিশুর মতো খেলতে পারি নি
দুরন্ত বলের মতো সহস্র স্বপ্নের মধ্যে আমার নিবিড় প্রেম
অশ্ব হয়ে ছুটতে পারে নি কোনোদিকে
শুধু রক্তলাল এ জীবন বহতা নদীর মতো
প্রয়োজনে ছুটে গেছে দৃশ্য থেকে অদৃশ্যের দিকে।
বুকের ভিতরে জেগে উঠেছে শতাব্দীর নীল আর্তনাদ
জেগে উঠেছে শোষণের সহস্র কাহিনীশৃঙ্খলিত জীবনের মর্মঘাতী অতীত যাতনা।
সাথে সাথে আমার শিথিল হাত
জড়াতে জড়াতে মুুষ্টিবদ্ধ ইস্পাতে পরিণত হয়েছে
আমার কম্পিত করতলে ঘেমে উঠেছে শতাব্দী-লাঞ্ছিত মানুষের
এক অসম্ভব উজ্জ্বল রাসায়নিক বাল্ব।
আমি এক্ষুণি আমার বাল্ব ছুঁড়ে দেব
আজ কোন পরিত্রাণ নেই
কাল রাতে তোমরা আমার দেহ থেকে সিরিঞ্জ সিরিঞ্জ রক্ত তুলে নিয়েছ
আজ তার প্রতিশোধ
এক ফোঁটা রক্তের বিনিময়ে তোমাদের এক-একটা জীবনকে
আমি আমার স্বপ্নের আঘাতে ভেঙে টুকরো করে দেব।
আমার বুকের ভিতরে এক নিঃশংসয় নগরীর প্রজ্বলিত আভা
আমার বুকের ভিতরে একটি সমান পৃথিবীর সবুজ মানচিত্র
আমি এখন ইচ্ছে করলেই সমস্ত পৃথিবীকে
আমার হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারি,
শুধু প্রয়োজন প্রতিটি ঐতিহাসিক রক্তবিন্দুর কাছ থেকে
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস জেনে নেওয়া
আমি সেই রক্তবিন্দু থেকে সম্মুখের ইতিহাস অবধি
নিজের রক্তবিন্দুকে প্রবাহিত করে দিতে চাই
আমি একটি রক্তপাতহীন পৃথিবীর জন্যে
এই মুহূর্তে পৃথিবীর
মর্মঘাতী রক্তপাত করে যেতে চাই।
|
https://www.bangla-kobita.com/asimsaha/prithibir-shobcheye-mormoghati-roktopat/
|
4460
|
শামসুর রাহমান
|
এক রাতে হযরত ওসমান
|
মানবতাবাদী
|
কে আমাকে এমন সতর্ক করে আজ বারংবার
ভয়ার্ত রাত্তিরে? ঘোড়াগুলি আস্তাবলে
করছে চিৎকার,
উটেরা উৎকর্ণ বড়। ওরা টের পায়,
ঘোর অমঙ্গল কাছে এলে ওরা টের পেয়ে যায়।
বেদনার্ত চোখ মেলে দেখি
আকাশে বিদ্যুচ্চমক ঘন ঘন,
অথচ বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই।আমি কি ছিলাম অন্ধ অথবা বধির?
আমার বিরুদ্ধে কত হাত
মরুভূর জহরিলা সাপের মতন
তুলেছে ব্যাপক ফণা ক্রমাগত, দেখতে পাইনি। কেউ কেউ
বলেছে আমার চতুর্দিকে ভয়ংকর ফাঁদ পাতা,
অথচ দিইনি কান রটনায় কোনোদিন। ওরা
আমার রক্তের লোভে ঘোরে
রাত্রিদিন শ্বাপদের মতো অন্তরালে,
কখনো প্রকাশ্যে জনসভা ক’রে শাসায় আমাকে-
যেন আমি অপরাধী আপাদমস্তক, যেন আমি
প্রিয় স্বদেশের জন্যে ফেলিনি মাথার ঘাম পায়ে,
আরববাসীর ধুধু পানিকষ্ট দ্রুত
লাঘবের জন্যে যেন
করিনি খনন কূপ শহরে শহরে,
গ্রাম-গ্রামান্তরে।একবার ভেবে দেখ হে নগরবাসী
কে আমি, কী কাজ আমি করেছি নিঃশব্দে এতকাল।
বাজাইনি ঢাক ঢোল, আত্মপ্রচারের
মোহে নগরকে
কখনো দিইনি মুড়ে রঙিন কাগজে।
নিজেই নিজের কথা বলা
সমীচীন নয় কোনোকালে, তবু কিছু কথা বলি,
কেননা অত্যন্ত ক্ষীণ জানি জনস্মৃতি।
জনগণ যাতে সুখী হয়,
সেজন্যে এ-আমি
করেছি নির্মাণ পথ, বাঁধ, সুস্নিগ্ধ সরাই;
করেছি সত্যের জন্যে রোকেয়ার সঙ্গে
ন’বছর নির্বাসিত জীবনযাপন;
শত বিপর্যয়ে
রেখেছি নিজেকে খাড়া মসজিদের মিনারের মতো।
মানব কল্যাণ আর প্রগতি সর্বদা
ছিল ধ্রুবতারা
আমার জীবনে, কিন্তু যারা নিত্য বিপক্ষে আমার
করে কানাঘুষা,
দেয় অপবাদ
স্বজনপ্রীতি আর আমার সকল কাজে ধরে
খুঁত সর্বক্ষণ তারা
কলঙ্ক লেপন করে আমার নামের অবয়বে,
যেমন অবুঝ শিশু দোয়াত উপুড় করে সফেদ কাগজে
খেলাচ্ছলে। আমার বিরুদ্ধে ওরা নানান ফিকিরে
নিয়ত খেপিয়ে তোলে অগণিত মানুষকে শুধু।
আমার সকল কীর্তি যেন উটের পায়ের ছাপ
মরুর বালিতে-বাতাসের ঝটকায় মুছে যায়
নিমেষেই; হত্যাকারীগণ
হচ্ছে তৈরি অন্ধকারে, শানাচ্ছে বিষাক্ত হাতিয়ার
এবং অপ্রতিরোধ্য ওরা আসবেই দলে দলে
জোট বেঁধে বর্বর নেশায় মেতে। কিন্তু তারা মূঢ় অর্বাচীন;
জানে না যে-রক্ত ধারা বইবে আজ আমার শরীর থেকে তার
গতি থামবে না কোনোকোলে।
এই রক্তস্রোত
অবিরল বয়ে যাবে দশকে দশকে আর শতকে শতকে। (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ek-rate-hozrot-osman/
|
4279
|
শতাব্দী রায়
|
স্বাধীনতা
|
মানবতাবাদী
|
পাঁচ বছরের মেয়েটি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলো- বাবা, স্বাধীনতা মানে কি?
বাবা বলেছিলো- স্বাধীনতা মানে, এই আমরা যা কিছু বলতে পারি, যা খুশি করতে পারি, কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই, আমার ইচ্ছেতে আমি চলতে পারি।
মেয়েটি বলেছিলো- তাহলে আজ থেকে আমিও স্বাধীনতা।
বাবা বললো- না। প্রথমত স্বাধীনতা নয়, তুমি স্বাধীন। কিন্তু এখন নয়। তুমি এখন ছোট। স্বাধীনতা পেয়ে কি করবে? বড় হও। বড় হলে স্বাধীনতা আপনাআপনি আসবে। বড় হলেই তুমি স্বাধীন।
মেয়েটি বাবাকে জিজ্ঞেস করলো- বাবা, মা কবে বড় হবে?
|
https://banglapoems.wordpress.com/2016/08/14/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%80-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
2984
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গহির নীদমে
|
ভক্তিমূলক
|
গহির নীদমে বিবশ শ্যাম মম,
অধরে বিকশত হাস,
মধুর বদনমে মধুর ভাব অতি
কিয়ে পায় পরকাশ !
চুম্বনু শত শত চন্দ্ৰ বদন রে,
তবহুঁ ন পূরল আশ,
অতি ধীরে ময় হৃদয়ে রাখনু
নহি নহি মিটল তিয়াষ।
শ্যাম, সুখে তুঁহু নীদ যাও পহু
মঝু এ প্রেমময় উরসে,
অনিমিখ নয়নে সারা রজনী
হেরব মুখ তব হরষে।শ্যাম, মুখে তব মধুর অধরমে
হাস বিকাশত কায়,
কোন্ স্বপন অব দেখত মাধব,
কহবে কোন্ হমায়!
এ মুখ স্বপনে মৈক কি দেখত
হরষে বিকশত হাসি?
শ্যাম, শ্যাম মম, কৈসে শোধব
তুঁহুক প্রেমঋণ রাশি!
জনম জনম মম প্রাণ পূর্ণ করি
থাক হৃদয় করি আলা,
তুঁহুক পাশ রহি হাসয়ি হাসয়ি
সহব সকল দুখ জ্বালা।
বিহঙ্গ, কাহ তু বোলন লাগলি?
শ্যাম ঘুমায় হমারা,
রহ রহ চন্দ্রম, ঢাল ঢাল, তব
শীতল. জোছন-ধারা!তারা-মালিনী মধুরা যামিনী
ন যাও ন যাও বালা,
নিরদয় রবি, অব কাহ তু আওলি
আনলি বিরহক জ্বালা!
হমার সারা জীবন জনি ইহ
রজনী রহত সমান,
হেরয়ি হেরয়ি শ্যামমুখচ্ছবি
প্রাণ ভইত অবসান!
ভানু কহত অব “রবি অতি নিষ্ঠুর,
নলিন-মিলন অভিলাষে
কত শত নারীক মিলন টুটাওত,
ডারত বিরহ-হুতাশে!”(ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gohir-nidme/
|
6056
|
হেলাল হাফিজ
|
মানবানল
|
প্রেমমূলক
|
আগুন আর কতোটুকু পোড়ে ?
সীমাবদ্ধ ক্ষয় তার সীমিত বিনাশ,
মানুষের মতো আর অতো নয় আগুনের সোনালি সন্ত্রাস।
আগুন পোড়ালে তবু কিছু রাখে
কিছু থাকে,
হোক না তা শ্যামল রঙ ছাই,
মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না
কিচ্ছু থাকে না,
খাঁ খাঁ বিরান, আমার কিছু নাই।
৭.২.৮১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/127
|
2668
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আজি গন্ধবিধুর সমীরণে
|
প্রকৃতিমূলক
|
আজিগন্ধবিধুর সমীরণে
কারসন্ধানে ফিরি বনে বনে।
আজি ক্ষুব্ধ নিলাম্বর-মাঝে
এ কি চঞ্চল ক্রন্দন বাজে।
সুদূর দিগন্তের সকরুণ সংগীত
লাগে মোর চিন্তায় কাজে--
আমি খুঁজি কারে অন্তরে মনে
গন্ধবিধুর সমীরণে।
ওগোজানি না কী নন্দনরাগে
সুখেউৎসুক যৌবন জাগে।
আজি আম্রমুকুলসৌগন্ধে,
নব- পল্লব-মর্মর ছন্দে,
চন্দ্র-কিরণ-সুধা-সিঞ্চিত অম্বরে
অশ্রু-সরস মহানন্দে
আমি পুলকিত কার পরশনে
গন্ধবিধুর সমীরণে।
বোলপুর, ফাল্গুন, ১৩১৬
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/635
|
3224
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুঃখশিখার প্রদীপ জ্বেলে
|
চিন্তামূলক
|
দুঃখশিখার প্রদীপ জ্বেলে
খোঁজো আপন মন,
হয়তো সেথা হঠাৎ পাবে
চিরকালের ধন। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dukhoshikhar-prodip-jele/
|
1183
|
জীবনানন্দ দাশ
|
রবীন্দ্রনাথ
|
ভক্তিমূলক
|
অনেক সময় পাড়ি দিয়ে আমি অবশেষে কোন এক বলয়িত পথে
মানুষের হৃদয়ের প্রীতির মতন এক বিভা
দেখেছি রাত্রির রঙে বিভাসিত হয়ে থেকে আপনার প্রাণের প্রতিভা
বিচ্ছুরিত ক'রে দেয় সঙ্গীতের মত কণ্ঠস্বরে!
হৃদয়ে নিমীল হয়ে অনুধ্যান করে
ময়দানবের দ্বীপ ভেঙে ফেলে স্বভাবসূর্যের গরিমাকে।
চিন্তার তরঙ্গ তুলে যখন তাহাকে
ডেকে যায় আমাদের রাত্রির উপরে-
পঙ্কিল ইঙ্গিত এক ভেসে ওঠে নেপথ্যের অন্ধকারেঃ আরো ভূত
আধেক মানব
আধেক শরীর- তবু অধিক গভীরতর ভাবে এক শব।নিজের কেন্দ্রিক গুণে সঞ্চারিত হয়ে ওঠে আপনার নিরালোকে ঘোরে
আচ্ছন্ন কুহক, ছায়া কুবাতাস;- আধো চিনে আপনার যাদু চিনে নিতে
ফুরাতেছে- দাঁড়াতেছে- তুমি তাকে স্থির প্রেমিকের মত অবয়ব দিতে
সেই ক্লীববিভূতিকে ডেকে গেলে নিরাময় অদিতির ক্রোড়ে।
অনন্ত আকাশবোধে ভরে গেলে কালের দু'ফুট মরুভূমি।
অবহিত আগুনের থেকে উঠে যখন দেখেছ সিংহ, মেষ, কন্যা, মীন
ববিনে জড়ানো মমি- মমি দিয়ে জড়ানো ববিন,-
প্রকৃতির পরিবেদনার চেয়ে বেশি প্রামাণিক তুমি
সামান্য পাখি ও পাতা ফুল
মর্মরিত ক'রে তোলে ভয়াবহভাবে সৎ অর্থসঙ্কুল।
যে সব বিস্রস্ত অগ্নি লেলিহান হয়ে ওঠে উনুনের অতলের থেকে
নরকের আগুনের দেয়ালকে গড়ে,
তারাও মহৎ হয়ে অবশেষে শতাব্দীর মনে ভেতরে
দেয়ালে অঙ্গার, রক্ত, এক্যুয়ামেরিন আলো এঁকে
নিজেদের সংগঠিত প্রাচীরকে ধূলিসাৎ ক'রে
আধেক শবের মত স্থির;
তবুও শবের মত বিশেষ অধীরঃ
প্রসারিত হতে চায় ব্রহ্মান্ডের ভোরে;
সেইসব মোটা আশা, ফিকে রং, ইতর মানুষ,
ক্লীবকৈবল্যের দিকে যুগে যুগে যাদের পাঠাল দরায়ুস।সে সবের বুক থেকে নিরুত্তেজ শব্দ নেমে গিয়ে
প্রশ্ন করে যেতেছিল সে সময়ে নাবিকের কাছেঃ
সিন্ধু ভেঙে কত দূর নরকের সিঁড়ি নেমে আছে?-
ততদূর সোপানের মত তুমি পাতালের প্রতিভা সেঁধিয়ে
অবারিতভাবে সাদা পাখির মতন সেই ঘুরুনো আধারে
নিজে প্রমাণিত হয়ে অনুভব করেছিলে শোচনার সীমা
মানুষের আমিষের ভীষণ ম্লানিমা,
বৃহস্পতি ব্যাসে শুক্র হোমরের হায়রাণ হাড়ে
বিমুক্ত হয় না তবু- কি ক'রে বিমুক্ত তবু হয়ঃ
ভেবে তারা শুক্ল অস্থি হ'ল অফুরন্ত সূর্যময়।অতএব আমি আর হৃদয়ের জনপরিজন সবে মিলে
শোকাবহ জাহাজের কানকাটা টিকিটের প্রেমে
রক্তাভ সমুদ্র পারি দিয়ে এই অভিজ্ঞের দেশে
প্রবেশ ক'রেছি তার ভূখণ্ডের তিসি ধানে তিলে।
এখানে উজ্জ্বল মাছে ভ'রে আছে নদী ও সাগরঃ
নীরক্ত মানুষের উদ্বোধিত করে সব অপরূপ পাখি;
কেউ কাকে দূরে ফেলে রয় না একাকী।
যে সব কৌটিল্য, কুট, নাগার্জুন কোথাও পায়নি সদুত্তর-
এইখানে সেই সব কৃতদার, ম্লান দার্শনিক
ব্রহ্মাণ্ডের গোল কারুকার্য আজ রূপালি, সোনালি মোজায়িক।
একবার মানুষের শরীরের ফাঁস থেকে বা'র হয়ে তুমিঃ
(যে শরীর ঈশ্বরের চেয়ে কিছু কম গরীয়ান)
যে কোনো বস্তুর থেকে পেতেছে সস্মিত সম্মান;
যে কোনো সোনার বর্ণ সিংহদম্পতির মরুভূমি,
অথবা ভারতী শিল্পী একদিন যেই নিরাময়
গরুড় পাখির মূর্তি গড়েছিল হাতীর ধূসরতর দাঁতে,
অথবা যে মহীয়সী মহিলারা তাকাতে তাকাতে
নীলিমার গরিমার থেকে এক গুরুতর ভয়
ভেঙে ফেলে দীর্ঘছন্দে ছায়া ফেলে পৃথিবীর পরে,-
কবিতার গাঢ় এনামেল আজ সেই সব জ্যোতির ভিতরে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/robindronath/
|
615
|
জয় গোস্বামী
|
আইনশৃঙ্খলা
|
মানবতাবাদী
|
(‘নন্দীগ্রামে, আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য, আজ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ ১৪ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলনে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর বক্তব্যের অংশ।)কপালে স্টিকার আঁটা : সুকুমার গিরি ।
বুকে মস্ত ছ্যাঁদা নিয়ে চিত হয়ে আছে
তমলুক হাস্পাতালে ।
ঢাক্তার বুঝেছেন
এ লোকটাকে বেডে তুলতে গেলেই
এক্ষুনি মরে যাবে ।
ঠিক । গেল তাই । কিন্তু, ছেলে তার
বুঝছে না এখনো ।
বলছে, ‘বাবু, পায়ে পড়ি,
বাবাকে বাঁচান’ ।
ডাক্তার কি করবে আর!
ওর ছেলে জানেও না
লিডারের কয়েকটি কথায়
নির্দেশিত আমাদের শোয়া বসা
হাঁটা চলা মরা আর বাঁচা—
আমাদের কাজ শুধু মর্গা আর হাসপাতালে
পুলিশের গুলি খাওয়া মৃতদেহ হয়ে
‘আইনশৃঙ্খলা’ রক্ষা করা।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র(‘নন্দীগ্রামে, আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য, আজ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ ১৪ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলনে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর বক্তব্যের অংশ।)কপালে স্টিকার আঁটা : সুকুমার গিরি ।
বুকে মস্ত ছ্যাঁদা নিয়ে চিত হয়ে আছে
তমলুক হাস্পাতালে ।
ঢাক্তার বুঝেছেন
এ লোকটাকে বেডে তুলতে গেলেই
এক্ষুনি মরে যাবে ।
ঠিক । গেল তাই । কিন্তু, ছেলে তার
বুঝছে না এখনো ।
বলছে, ‘বাবু, পায়ে পড়ি,
বাবাকে বাঁচান’ ।
ডাক্তার কি করবে আর!
ওর ছেলে জানেও না
লিডারের কয়েকটি কথায়
নির্দেশিত আমাদের শোয়া বসা
হাঁটা চলা মরা আর বাঁচা—
আমাদের কাজ শুধু মর্গা আর হাসপাতালে
পুলিশের গুলি খাওয়া মৃতদেহ হয়ে
‘আইনশৃঙ্খলা’ রক্ষা করা।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র(‘নন্দীগ্রামে, আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য, আজ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ ১৪ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলনে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর বক্তব্যের অংশ।)কপালে স্টিকার আঁটা : সুকুমার গিরি ।
বুকে মস্ত ছ্যাঁদা নিয়ে চিত হয়ে আছে
তমলুক হাস্পাতালে ।
ঢাক্তার বুঝেছেন
এ লোকটাকে বেডে তুলতে গেলেই
এক্ষুনি মরে যাবে ।
ঠিক । গেল তাই । কিন্তু, ছেলে তার
বুঝছে না এখনো ।
বলছে, ‘বাবু, পায়ে পড়ি,
বাবাকে বাঁচান’ ।
ডাক্তার কি করবে আর!
ওর ছেলে জানেও না
লিডারের কয়েকটি কথায়
নির্দেশিত আমাদের শোয়া বসা
হাঁটা চলা মরা আর বাঁচা—
আমাদের কাজ শুধু মর্গা আর হাসপাতালে
পুলিশের গুলি খাওয়া মৃতদেহ হয়ে
‘আইনশৃঙ্খলা’ রক্ষা করা।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র(‘নন্দীগ্রামে, আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য, আজ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ ১৪ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলনে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর বক্তব্যের অংশ।)কপালে স্টিকার আঁটা : সুকুমার গিরি ।
বুকে মস্ত ছ্যাঁদা নিয়ে চিত হয়ে আছে
তমলুক হাস্পাতালে ।
ঢাক্তার বুঝেছেন
এ লোকটাকে বেডে তুলতে গেলেই
এক্ষুনি মরে যাবে ।
ঠিক । গেল তাই । কিন্তু, ছেলে তার
বুঝছে না এখনো ।
বলছে, ‘বাবু, পায়ে পড়ি,
বাবাকে বাঁচান’ ।
ডাক্তার কি করবে আর!
ওর ছেলে জানেও না
লিডারের কয়েকটি কথায়
নির্দেশিত আমাদের শোয়া বসা
হাঁটা চলা মরা আর বাঁচা—
আমাদের কাজ শুধু মর্গা আর হাসপাতালে
পুলিশের গুলি খাওয়া মৃতদেহ হয়ে
‘আইনশৃঙ্খলা’ রক্ষা করা।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%87%e0%a6%a8%e0%a6%b6%e0%a7%83%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
|
5959
|
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
|
পুজো
|
প্রেমমূলক
|
আমার যা কিছু, আজ শেষ হয়ে এল
অন্ধের থেকে জোৎস্নাকে ধার করি
কোথায় কে যেন উঁচু করে টিপ পরে!
মাথা নিচু করে সময় পেরোয় ঘড়িআকাশে আবার পুজোর বৃষ্টি আসে
প্যান্ডেলে আসে রাত জাগবার চোখ
ফুটপাথে হাঁটে তোমার প্রেমিক যত
তাঁদের দু হাতে আজ কাশফুল হোকপৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি
তোমার পুজোকে নিজের শরৎ ভাবি
এ শহর ক্রমে বাঁশের কেল্লা হল
চুম্বন হল বোনাসে নতুন দাবিদূর থেকে এল বন্ধুর মতো অটো
শপিং-এ তোমার মনে এল সোনা-মাটি
আঙুলে জড়িয়ে কবেকার মেঘমালা
বকুল জমায় অন্ধ কলকাতাটিআমিও অন্ধ, বিশ্বাস করো তুমি
হাতের স্পর্শে কী কঠিন লাগে চেনা
আকাশ কপালে উঁচু করে চাঁদ পরে
দেখলে, তোমার কিছু মনে পড়বে না।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8b-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%8e-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%80/
|
1467
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
আমার জলেই টলমল করে আঁখি
|
প্রেমমূলক
|
নিজের জলেই টলমল করে আঁখি,
তাই নিয়ে খুব বিব্রত হয়ে থাকি।চেষ্টা করেও রাখতে পারি না ধরে-
ভয় হয় আহা, এই বুঝি যায় পড়ে।এমনিই আছি নদীমাতৃক দেশে,
অশ্রুনদীর সংখ্যা বাড়াবো শেষে?
আমার গঙ্গা আমার চোখেই থাক্
আসুক গ্রীষ্ম মাটি-ফাটা বৈশাখ।দোষ নেই যদি তখন যায় সে ঝরে,
ততদিন তাকে রাখতেই হবে ধরে।সেই লক্ষেই প্রস্তুতি করে সারা,
লুকিয়েছিলাম গোপন অশ্রুধারা।কিন্তু কবির বিধি যদি হন বাম,
কিছুতে পূর্ণ হয় না মনস্কাম।
মানুষ তো নয় চির-সংযমে সাধা,
তাই তো চোখের অশ্রু মানে না বাঁধা।আমার জলেই টলমল করে আঁখি,
তোমার চোখের অশ্রু কোথায় রাখি।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/post20161117123056/
|
4498
|
শামসুর রাহমান
|
একদিন দুপুরে
|
মানবতাবাদী
|
সজনে গাছের ডালে পাখি ডাকে ডবকা দুপুরে, গায় গান
পাড়ার মাস্তান,
নেশাভাঙ করে আর হিজড়া ধরনে
নাচে, যেন ওরা মায়াবনে
দেবদূত দেখে খুব প্রাণিত এখন।
গলি থেকে তরুণী বেরোয়া একা, ফেরিঅলা ডেকে
যায় দুপুরকে চিরে-চিরে;
অকস্মাৎ কেমন চাঞ্চল্য জাগে মানুষের ভিড়ে,
ট্রাফিক পুলিশ উচ্চকিত, বাঁশি বাজে, কী বিপন্ন বিহ্বলতা
চতুর্দিকে, ট্রাকের তলায় চাপা পড়েছে উদোম মানবতা। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekdin-dupure/
|
3043
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চির-আমি
|
চিন্তামূলক
|
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা-কেনা, মিটিয়ে দেব লেনা-দেনা
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে -
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।যখন জমবে ধুলা তানপুরাটার তারগুলায়,
কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়,
ফুলের বাগান ঘন ঘাসের পরবে সজ্জা বনবাসের,
শ্যাওলা এসে ঘিরবে দিঘির ধারগুলায় -
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।যখন এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে,
কাটবে গো দিন যেমন আজও দিন কাটে।
ঘাটে ঘাটে খেয়ার তরী এমনি সেদিন উঠবে ভরি,
চরবে গোরু, খেলবে রাখাল ওই মাঠে।
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।তখন কে বলে গো, সেই প্রভাতে নেই আমি?
সকল খেলায় করবে খেলা এই-আমি।
নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহুর ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই-আমি।
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।(কাব্যগ্রন্থঃ সঞ্চয়িতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chiro-ami/
|
935
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আমি কবি-সেই কবি
|
চিন্তামূলক
|
আমি কবি-সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আন্মনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে!
মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে!
বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে!
দাদুরী-কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি!স্বপন-সুরার ঘোরে
আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা ক'রে!
জন্ম ভরিয়া সে কোন্ হেঁয়ালি হল না আমার সাধা-
পায় পায় নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় ধাঁধা!
-নিমেষে পাসরি এই বসুধার নিয়তি-মানার বাধা
সারাটি জীবন খেয়ালের খোশে পেয়ালা রেখেছি ভ'রে!ভুঁয়ের চাঁপাটি চুমি
শিশুর মতন, শিরীষের বুকে নীরবে পড়ি গো নুমি!
ঝাউয়ের কাননে মিঠা মাঠে মাঠে মটর-ক্ষেতের শেষে
তোতার মতন চকিতে কখন আমি আসিয়াছি ভেসে!
-ভাটিয়াল সুর সাঁঝের আঁধারে দরিয়ার পারে মেশে,-
বালুর ফরাশে ঢালু নদীটির জলে ধোঁয়া ওঠে ধূমি!বিজন তারার সাঁঝে
আমার প্রিয়ের গজল-গানের রেওয়াজ বুঝি বা বাজে!
প'ড়ে আছে হেথা ছিন্ন নীবার, পাখির নষ্ট নীড়!
হেথায় বেদনা মা-হারা শিশুর, শুধু বিধবার ভিড়!
কোন্ যেন এক সুদূর আকাশ গোধূলিলোকের তীর
কাজের বেলায় ডাকিছে আমারে, ডাকে অকাজের মাঝে!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ami-kobi-shei-kobi/
|
2420
|
মাহবুবুল আলম চৌধুরী
|
কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি
|
স্বদেশমূলক
|
ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে—রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য—বাংলার জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য
আলাওলের ঐতিহ্য
কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের
সাহিত্য ও কবিতার জন্য
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
পলাশপুরের মকবুল আহমদের
পুঁথির জন্য
রমেশ শীলের গাথার জন্য,
জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে
ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল
নজরুলের “খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি।”
এ দুটি লাইনের জন্য
দেশের মাটির জন্য,
রমনার মাঠের সেই মাটিতে
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত।
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোনো ছেলের বুকের রক্ত।
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটি রক্তকণা
রমনার সবুজ ঘাসের উপর
আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে।
এক একটি হীরের টুকরোর মতো
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন
বেঁচে থাকলে যারা হতো
পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ
যাদের মধ্যে লিংকন, রকফেলার,
আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল
যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল
শতাব্দীর সভ্যতার
সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ,
সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে
আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি।
যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে
যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে
আমরা তাদের কাছে
ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ।
আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে।আমরা জানি ওদের হত্যা করা হয়েছে
নির্দয়ভাবে ওদের গুলি করা হয়েছে
ওদের কারো নাম তোমারই মতো ওসমান
কারো বাবা তোমারই বাবার মতো
হয়তো কেরানি, কিংবা পূর্ব বাংলার
নিভৃত কোনো গাঁয়ে কারো বাবা
মাটির বুক থেকে সোনা ফলায়
হয়তো কারো বাবা কোনো
সরকারি চাকুরে।
তোমারই আমারই মতো
যারা হয়তো আজকেও বেঁচে থাকতে
পারতো,
আমারই মতো তাদের কোনো একজনের
হয়তো বিয়ের দিনটি পর্যন্ত ধার্য হয়ে গিয়েছিল,
তোমারই মতো তাদের কোনো একজন হয়তো
মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত চিঠিখানা এসে পড়বার আশায়
টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ দিতে গিয়েছিল।
এমন এক একটি মূর্তিমান স্বপ্নকে বুকে চেপে
জালিমের গুলিতে যারা প্রাণ দিল
সেই সব মৃতদের নামে
আমি ফাঁসি দাবি করছি।যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্যে
আমি ফাঁসি দাবি করছি
যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যে
ফাঁসি দাবি করছি
যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে
সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।
আমি তাদের বিচার দেখতে চাই।
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।পাকিস্তানের প্রথম শহীদ
এই চল্লিশটি রত্ন,
দেশের চল্লিশ জন সেরা ছেলে
মা, বাবা, নতুন বৌ, আর ছেলে মেয়ে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক একটি
সংসার গড়ে তোলা যাদের
স্বপ্ন ছিল
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার,
যাদের স্বপ্ন ছিল আণবিক শক্তিকে
কী ভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়
তার সাধনা করার,যাদের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের
‘বাঁশিওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর
একটি কবিতা রচনা করার,
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা আমার
যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়েছ
সেখানে হাজার বছর পরেও
সেই মাটি থেকে তোমাদের রক্তাক্ত চিহ্ন
মুছে দিতে পারবে না সভ্যতার কোনো পদক্ষেপ।যদিও অগণন অস্পষ্ট স্বর নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করবে
তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘণ্টা ধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের ঐতিহাসিক মৃত্যুক্ষণ
ঘোষণা করবে।
যদিও ঝঞ্ঝা-বৃষ্টিপাতে—বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে
তবু তোমাদের শহীদ নামের ঔজ্জ্বল্য
কিছুতেই মুছে যাবে না।খুনি জালিমের নিপীড়নকারী কঠিন হাত
কোনো দিনও চেপে দিতে পারবে না
তোমাদের সেই লক্ষদিনের আশাকে,
যেদিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব
ন্যায়-নীতির দিন
হে আমার মৃত ভাইরা,
সেই দিন নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকারে
ভেসে আসবে
সেই দিন আমার দেশের জনতা
খুনি জালিমকে ফাঁসির কাষ্ঠে
ঝুলাবেই ঝুলাবে
তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।চট্টগ্রাম, ১৯৫২
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/02/21/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%a6%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%80/
|
5472
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
ঠিকানা
|
মানবতাবাদী
|
ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু
ঠিকানার সন্ধান,
আজও পাও নি? দুঃখ যে দিলে করব না অভিমান?
ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু,
পথে পথে বাস করি,
কখনো গাছের তলাতে
কখনো পর্ণকুটির গড়ি।
আমি যাযাবর, কুড়াই পথের নুড়ি,
হাজার জনতা যেখানে, সেখানে
আমি প্রতিদিন ঘুরি।
বন্ধু, ঘরের খুঁজে পাই নাকো পথ,
তাইতো পথের নুড়িতে গড়ব
মজবুত ইমারত।
বন্ধু, আজকে আঘাত দিও না
তোমাদের দেওয়া ক্ষতে,
আমার ঠিকানা খোঁজ ক'রো শুধু
সূর্যোদয়ের পথে।
ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,
রুশ ও চীনের কাছে,
আমার ঠিকানা বহুকাল ধ'রে
জেনো গচ্ছিত আছে।
আমাকে কি তুমি খুঁজেছ কখনো
সমস্ত দেশ জুড়ে?
তবুও পাও নি? তাহলে ফিরেছ
ভুল পথে ঘুরে ঘুরে।
আমার হদিশ জীবনের পথে
মন্বন্তর থেকে
ঘুরে গিয়েছে যে কিছু দূর গিয়ে
মুক্তির পথে বেঁকে।
বন্ধু, কুয়াশা, সাবধান এই
সূর্যোদয়ের ভোরে;
পথ হারিও না আলোর আশায়
তুমি একা ভুল ক'রে।
বন্ধু, আজকে জানি অস্থির
রক্ত, নদীর জল,
নীড়ে পাখি আর সমুদ্র চঞ্চল।
বন্ধু, সময় হয়েছে এখনো
ঠিকানা অবজ্ঞাত
বন্ধু, তোমার ভুল হয় কেন এত?
আর কতদিন দুচক্ষু কচ্লাবে,
জালিয়ানওয়ালায় যে পথের শুরু
সে পথে আমাকে পাবে,
জালালাবাদের পথ ধ'রে ভাই
ধর্মতলার পরে,
দেখবে ঠিকানা লেখা প্রত্যেক ঘরে
ক্ষুব্ধ এদেশে রক্তের অক্ষরে।
বন্ধু, আজকে বিদায়!
দেখেছ উঠল যে হাওয়া ঝোড়ো,
ঠিকানা রইল,
এবার মুক্ত স্বদেশেই দেখা ক'রো।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/259
|
5021
|
শামসুর রাহমান
|
বাসরের ফুল
|
চিন্তামূলক
|
হে নির্বোধ, কে তুই রঙিন পঞ্জিকা খুলে ব’সে
আছিস সে কবে থেকে? কেন ক্যালেন্ডারের তারিখে
নির্নিমেষ দৃষ্টি তোর খরাদগ্ধ, বর্ষণপ্রত্যাশী,
নিঃস্ব কৃষকের মতো? যার প্রতীক্ষায় তুই এই
অবেলায় রেখেছিস দোর খুলে, মানে না সে কোনো
পঞ্জিকার নির্দেশ কখনো, ক্যালেন্ডারের সংকেত
সর্বদা অগ্রাহ্য তার কাছে। আছে তার স্বরচিত
রীতিনীতি, যদি তাকে বাস্তবিক রীতি বলা যায়।কখন পড়বে তার পদচ্ছাপ কোন সে চৌকাঠে,
সহজ নয় তা’বলা। কী খেয়ালে মেতে সে চকিতে
শ্রদ্ধাস্পদ, ধীর অধ্যাপকের বিরলকেশ, দামি
মাথায় কৌতুকী গাট্রা মেরে বিহ্বল, বিবরবাসী
যুবকের মগজের কোষে ছড়ায় অনল আর
তার শিকারির মতো হাতে দেয় বাসরের ফুল। (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/basorer-ful/
|
827
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ১৪
|
কাহিনীকাব্য
|
চৌদ্দ
উইড়া যায়রে হংস পক্ষি পইড়া রয়রে ছায়া ;
দেশের মানুষ দেশে যাইব—কে করিবে মায়া |
— মুর্শিদা গান
আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে,
নীরবে বসিয়া কোন্ কথা যেন কহিতেছে কানে কানে |
মধ্যে অথই শুনো মাঠখানি ফাটলে ফাটলে ফাটি,
ফাগুনের রোদে শুকাইছে যেন কি ব্যথারে মূক মাটি!
নিঠুর চাষীরা বুক হতে তার ধানের বসনখানি,
কোন্ সে বিরল পল্লীর ঘরে নিয়ে গেছে হায় টানি !
বাতাসের পায়ে বাজেনা আজিকে ঝল মল মল গান,
মাঠের ধূলায় পাক খেয়ে পড়ে কত যেন হয় ম্লান!
সোনার সীতারে হরেছে রাবণ, পল্লীর পথ পরে,
মুঠি মুঠি ধানে গহনা তাহার পড়িয়াছে বুঝি ঝরে!
মাঠে মাঠে কাঁদে কলমীর লতা, কাঁদে মটরের ফুল,
এই একা মাঠে কি করিয়া তারা রাখিবেগো জাতি-কুল |
লাঙল আজিকে হয়েছে পাগল, কঠিন মাটিরে চিরে,
বুকখানি তার নাড়িয়া নাড়িয়া ঢেলারে ভাঙিবে শিরে |
তবু এই-গাঁও রহিয়াছে চেয়ে, ওই-গাঁওটির পানে,
কতদিন তারা এমনি কাটাবে কেবা তাহা আজ জানে |
মধ্যে লুটায় দিগন্ত-জোড়া নক্সী-কাঁথার মাঠ ;
সারা বুক ভরি কি কথা সে লিখি, নীরবে করিছে পাঠ!
এমন নাম ত শুনিনি মাঠের? যদি লাগে কারো ধাঁধাঁ,
যারে তারে তুমি শুধাইয়া নিও, নাই কোন এর বাঁধা |
সকলেই জানে সেই কোন্ কালে রূপা বলে এক চাষী,
ওই গাঁর এক মেয়ের প্রেমেতে গলায় পড়িল ফাঁসি |
বিয়েও তাদের হয়েছিল ভাই, কিন্তু কপাল-লেখা,
খন্ডাবে কেবা? দারুণ দুঃখ ভালে এঁকে গেল রেখা |
রূপা একদিন ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে গেল দূর দেশে,
তারি আশা-পথে চাহিয়া চাহিয়া বউটি মরিল শেষে |
মরিবার কালে বলে গিয়েছিল — তাহার নক্সী-কাঁথা,
কবরের গায়ে মেলে দেয় যেন বিরহিণী তার মাতা!
বহুদিন পরে গাঁয়ের লোকেরা গভীর রাতের কালে,
শুনিল কে যেন বাজাইছে বাঁশী বেদনার তালে তালে |
প্রভাতে সকলে দেখিল আসিয়া সেই কবরের গায়,
রোগ পাণ্ডডুর একটি বিদেশী মরিয়া রয়েছে হায়!
শিয়রের কাছে পড়ে আছে তার কখানা রঙীন শাড়ী,
রাঙা মেঘ বেয়ে দিবসের রবি যেন চলে গেছে বাড়ি!
সারা গায় তার জড়ায়ে রয়েছে সেই নক্সী-কাঁথা,—
আজও গাঁর লোকে বাঁশী বাজাইয়া গায় এ করুণ গাথা |
কেহ কেহ নাকি গভীর রাত্রে দেখেছে মাঠের পরে,—
মহা-শূণ্যেতে উড়িয়াছে কেবা নক্সী-কাথাটি ধরে ;
হাতে তার সেই বাঁশের বাঁশীটি বাজায় করুণ সুরে,
তারি ঢেউ লাগি এ-গাঁও ও-গাঁও গহন ব্যথায় ঝুরে |
সেই হতে গাঁর নামটি হয়েছে নক্সী-কাঁথার মাঠ,
ছেলে বুড়ো গাঁর সকলেই জানে ইহার করুণ পাঠ |
শেষ
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/817
|
1522
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
স্বাধীনতা উলঙ্গ কিশোর
|
মানবতাবাদী
|
জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উল্ঙ্গ শিশুর মত
বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও।
তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে,
প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে,
মিছিলে মিছিলে; তুমি বেঁচে থাকো, তুমি দীর্ঘজীবী হও।
তোমার হা-করা মুখে প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে
সূর্যাস্ত অবধি হরতাল ছিল একদিন,
ছিল ধর্মঘট, ছিলো কারখানার ধুলো।
তুমি বেঁচেছিলে মানুষের কলকোলাহলে,
জননীর নাভিমূলে ক্ষতচিহ্ন রেখে
যে তুমি উল্ঙ্গ শিশু রাজপথে বেরিয়ে এসেছো,
সে-ই তুমি আর কতদিন ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা’ বলে
ঘুরবে উলঙ্গ হয়ে পথে পথে সম্রাটের মতো?
জননীর নাভিমূল থেকে ক্ষতচিহ্ন মুছে দিয়ে
উদ্ধত হাতের মুঠোয় নেচে ওঠা, বেঁচে থাকা
হে আমার দূঃখ, স্বাধীনতা, তুমিও পোশাক পরো;
ক্ষান্ত করো উলঙ্গ ভ্রমণ, নয়তো আমারো শরীরি থেকে
ছিঁড়ে ফেলো স্বাধীনতা নামের পতাকা।
বলো উলঙ্গতা স্বাধীনতা নয়,
বলো দূঃখ কোনো স্বাধীনতা নয়,
বলো ক্ষুধা কোন স্বাধীনতা নয়,
বলো ঘৃণা কোন স্বাধীনতা নয়।
জননীর নাভিমূল ছিন্ন-করা রক্তজ কিশোর তুমি
স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তুমি বেঁচে থাকো
আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রেমে, বল পেন্সিলের
যথেচ্ছ অক্ষরে,
শব্দে,
যৌবনে,
কবিতায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/post20161117122206/
|
2931
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কেন (সঞ্চয়িতা)
|
সনেট
|
কেন গো এমন স্বরে বাজে তার বাঁশি -
মধুর সুন্দর রূপে কেঁদে ওঠে হিয়া,
রাঙা অধরের কোণে হেরি মধুহাসি
পুলকে যৌবন কেন উঠে বিকশিয়া!
কেন তনু বাহুডোরে ধরা দিতে চায়,
ধায় প্রাণ দুটি কালো আঁখির উদ্দেশে -
হায়, যদি এত লজ্জা কথায় কথায়,
হায়, যদি এত শ্রান্তি নিমেষে নিমেষে!
কেন কাছে ডাকে যদি মাঝে অন্তরাল,
কেন রে কাঁদায় প্রাণ সবই যদি ছায়া!
আজ হাতে তুলে নিয়ে ফেলে দিবে কাল -
এরই তরে এত তৃষ্ণা, এ কাহার মায়া!
মানবহৃদয় নিয়ে এত অবহেলা -
খেলা যদি, কেন হেন মর্মভেদী খেলা!
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/keno-sanchayita/
|
4233
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
ভালো, এই ভালো
|
প্রেমমূলক
|
ভালো, এই ভালো, এই সম্পর্কে জটিল
হাওয়া লাগা।
কতদিনে হবে? মুক্তি, ওই তার ছিঁড়ে
দেয়াল ডিঙিয়ে
ভেঙে নয় কোনকিছু, শক্তি ভেঙে নয়
সম্মুখে সর্বস্ব বাধা–তাও ভেঙে নয়
শুধু ডানা পেলে উড়ে অথবা ডিঙিয়ে
ছিঁচকে কাজ, যা করে নির্বোধ চোর
তাই করে, শুধু তাই করে
আর কিছু নয়
আর কিছু করতেও পারে না।।
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/bhalo-ei-bhalo/
|
629
|
জয় গোস্বামী
|
আর কারো ময়ূর যাবে না
|
চিন্তামূলক
|
আর কারো ময়ূর যাবে না
আমার সম্পূর্ণ খাতা–সাপ
এবার যে ‘দ’ আকার বাজ পড়ে, তাতে
সাপগুলো দগ্ধে পুড়ে ঝলসে এঁকেবেঁকে
জীবন পেয়েছে
ওদের আমি খালে বিলে পাহাড়ে জঙ্গলে
ছেড়ে দিই, ওদেরকে দেখে ময়ুরেরা
ধড়ফড় দৌড়য় আর দেহ থেকে শত শত চোখ
খসে পড়ে
রাত্রিবেলা আমার খাতায়
মাথা তোলে হানাবাড়ি, চাঁদ
দেখি তার ছাদে ও পাঁচিলে
ঝটপট লাফিয়ে উঠছে ওইসব ঝাঁঝরা ময়ূর
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1722
|
4431
|
শামসুর রাহমান
|
উদ্দাম আসবো ফিরে
|
চিন্তামূলক
|
চমৎকার পাখি পুষি, নিজে স্বপ্নপোষ্য হয়ে আছি
আজ অব্দি, মাঝে-মধ্যে গান ধরি, শব্দ গাঁথি কিছু
আমার ভেতরে যে নিমগ্ন কর্মচারী মাথা নিচু
ক’রে থাকে তার মেদমজ্জা চাটে পুপ্ত নীল মাছি।
অলপ্পেয়ে পদাবলী একটি মনের কাছাকাছি
পৌঁছুতে চেয়েও কায়ক্লেশে ঝরে যায় অন্তরালে,
একটি দীপ্তশ্রী মুখ সরে যায়, এ মুখ বাড়ালে
আমার সর্বস্ব গেছে তবু এই পৃথিবীতে বাঁচি।সে কবে শ্রাবণঘন যূথীগন্ধী সায়াহ্নের কাছে
অকথিত কিছু কথা, কিছু নীরবতা সমর্পণ
ক’রে চলে গেছে বহুদূরে। এই জীর্ণ অন্ধকার
পিঞ্জরে একাকী আমি, শুধু তাকে মনে পড়ে, নাচে
স্বপ্নস্মৃতি, মৃত্যুর পরেও ছিঁড়ে বেবাক কাফন
উদ্দাম আসবো ফিরে যদি ডাকে সে আবার। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/uddam-asbo-fire/
|
3854
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শা-জাহান
|
চিন্তামূলক
|
এ কথা জানিতে তুমি ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান,
কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান।
শুধু তব অন্তরবেদনা
চিরন্তন হয়ে থাক্, সম্রাটের ছিল এ সাধনা
রাজশক্তি বজ্রসুকঠিন
সন্ধ্যারক্তরাগসম তন্দ্রাতলে হয় হোক লীন
কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস
নিত্য-উচ্ছ্বসিত হয়ে সকরুণ করুক আকাশ,
এই তব মনে ছিল আশ।
হীরামুক্তামানিক্যের ঘটা
যেন শুন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা
যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক,
শুধু থাক্
একবিন্দু নয়নের জল
কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল
এ তাজমহল॥ হায় ওরে মানবহৃদয়,
বার বার
কারো পানে ফিরে চাহিবার
নাই যে সময়,
নাই নাই।
জীবনের খরস্রোতে ভাসিছ সদাই
ভুবনের ঘাটে ঘাটে---
এক হাতে লও বোঝা, শুন্য করে দাও অন্য হাটে।
দক্ষিণের মন্ত্রগুঞ্জরণে
তব কুঞ্জবনে
বসন্তের মাধবীমঞ্জরি
যেই ক্ষণে দেয় ভরি
মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল---
বিদায়গোধুলি আসে ধুলায় ছড়ায়ে ছিন্ন দল।
সময় যে নাই,
আবার শিশিররাত্রে তাই
নিকুঞ্জে ফুটায়ে তোল নব কুন্দরাজি
সাজাইতে হেমন্তের অশ্রুভরা আনন্দের সাজি।
হায় রে হৃদয়,
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।
নাই নাই, নাই যে সময়॥ হে সম্রাট্, তাই তব শঙ্কিত হৃদয়
চেয়েছিল করিবারে সময়ের হৃদয়হরণ
সৌন্দর্যে ভুলায়ে।
কণ্ঠে তার কী মালা দুলায়ে
করিলে বরণ
রূপহীন মরণেরে মৃত্যুহীন অপরূপ সাজে!
রহে না যে
বিলাপের অবকাশ
বারো মাস,
তাই তব অশান্ত ক্রন্দনে
চিরমৌনজাল দিয়ে বেঁধে দিলে কঠিন বন্ধনে।
জ্যোত্স্নারাতে নিভৃত মন্দিরে
প্রেয়সীরে
যে নামে ডাকিতে ধীরে ধীরে
সেই কানে-কানে ডাকা রেখে গেলে এইখানে
অনন্তের কানে।
প্রেমের করুণ কোমলতা,
ফুটিল তা
সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে॥ হে সম্রাট্ কবি,
এই তব হৃদয়ের ছবি,
এই তব নব মেঘদূত,
অপূর্ব অদ্ভুত
ছন্দে গানে
উঠিয়াছে অলক্ষ্যের পানে---
যেথা তব বিরহিণী প্রিয়া
রয়েছে মিশিয়া
প্রভাতের অরুণ-আভাসে,
ক্লান্তসন্ধ্যা দিগন্তের করুণ নিশ্বাসে,
পূর্ণিমায় দেহহীন চামেলীর লাবণ্যবিলাসে,
ভাষার অতীত তীরে
কাঙাল নয়ন যেথা দ্বার হতে আসে ফিরে ফিরে।
তোমার সৌন্দর্যদূত যুগ যুগ ধরি
এড়াইয়া কালের প্রহরী
চলিয়াছে বাক্যহারা এই বার্তা নিয়া---
`ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া!' চলে গেছ তুমি আজ,
মহারাজ---
রাজ্য তব স্বপ্নসম গেছে ছুটে,
সিংহাসন গেছে টুটে,
তব সৈন্যদল
যাদের চরণভরে ধরণী করিত টলমল
তাহাদের স্মৃতি আজ বায়ুভরে
উড়ে যায় দিল্লির পথের ধূলি-'পরে।
বন্দীরা গাহে না গান,
যমুনাকল্লোল-সাথে নহবত মিলায় না তান।
তব পুরসুন্দরীর নূপুরনিক্কণ
ভগ্ন প্রাসাদের কোণে
ম'রে গিয়ে ঝিল্লিস্বনে
কাঁদায় রে নিশার গগন।
তবুও তোমার দূত অমলিন,
শ্রান্তিক্লান্তিহীন,
তুচ্ছ করি রাজ্য-ভাঙাগড়া,
তুচ্ছ করি জীবনমৃত্যুর ওঠাপড়া,
যুগে যুগান্তরে
কহিতেছে একস্বরে
চিরবিরহীর বাণী নিয়া---
`ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া!' মিথ্যা কথা! কে বলে যে ভোল নাই?
কে বলে রে খোল নাই
স্মৃতির পিঞ্জরদ্বার?
অতীতের চির-অস্ত-অন্ধকার
আজিও হৃদয় তব রেখেছে বাঁধিয়া?
বিস্মৃতির মুক্তিপথ দিয়া
আজিও সে হয়নি বাহির?
সমাধিমন্দির এক ঠাঁই রহে চিরস্থির,
ধরার ধূলায় থাকি
স্মরণের আবরণে মরণেরে যত্নে রাখে ঢাকি।
জীবনেরে কে রাখিতে পারে!
আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।
তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে
নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে।
স্মরণের গ্রন্থি টুটে
সে যে যায় ছুটে
বিশ্বপথে বন্ধনবিহীন।
মহারাজ, কোনো মহারাজ্য কোনোদিন
পারে নাই তোমারে ধরিতে।
সমুদ্রস্তনিত পৃথ্বী, হে বিরাট, তোমারে ভরিতে
নাহি পারে---
তাই এ ধরারে
জীবন-উত্সব-শেষে দুই পায়ে ঠেলে
মৃত্পাত্রের মত যাও ফেলে।
তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহত্,
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার
বারম্বার।
তাই
চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।
যে প্রেম সম্মুখপানে
চলিতে চালাতে নাহি জানে,
যে প্রেম পথের মধ্যে পেতেছিল নিজসিংহাসন,
তার বিলাসের সম্ভাষণ
পথের ধূলার মতো জড়ায়ে ধরেছে তব পায়ে---
দিয়েছ তা ধূলিরে ফিরায়ে।
সেই তব পশ্চাতের পদধূলি-'পরে
তব চিত্ত হতে বায়ুভরে
কখন সহসা
উড়ে পড়েছিল বীজ জীবনের মাল্য হতে খসা।
তুমি চলে গেছ দূরে,
সেই বীজ অমর অঙ্কুরে
উঠেছে অম্বর-পানে,
কহিছে গম্ভীর গানে---
`যত দূর চাই
নাই নাই সে পথিক নাই।
প্রিয়া তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছাড়ি দিল পথ,
রুধিল না সমুদ্র পর্বত।
আজি তার রথ
চলিয়াছে রাত্রির আহ্বানে
নক্ষত্রের গানে
প্রভাতের সিংহদ্বার-পানে।
তাই
স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি,
ভারমুক্ত সে এখানে নাই।'
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sha-jahan/
|
391
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
প্রণয়-ছল
|
প্রেমমূলক
|
কত ছল করে সে বারেবারে দেখতে আসে আমায়।
কত বিনা-কাজের কাজের ছলে চরণ দুটি আমার দোরেই থামায়॥
জানলা আড়ে চিকের পাশে
দাঁড়ায় এসে কিসের আশে,
আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে,
গাল দুটিকে ঘামায়।
অনামিকায় জড়িয়ে আঁচল
দুরু দুরু বুকে
সবাই যখন ঘুমে মগন তখন আমায় চুপে চুপে
দেখতে এসেই মল বাজিয়ে দৌড়ে পলায়
রঙ খেলিয়ে চিবুক গালের কূপে।
দোর দিয়ে মোর জলকে চলে
কাঁকন মারে কলস-গলে
অমনি চোখোচোখি হলে
চমকে ভুঁয়ে নখটি ফোটায়, চোখ দুটিকে নামায়।
সইরা হাসে দেখে ছুঁড়ির দোর দিয়ে মোর
নিতুই নিতুই কাজ-অকাজে হাঁটা।
করবে কী ও? রোজ যে হারায় আমার পথেই
শিথিল বেণির দুষ্টু মাথার কাঁটা!
একে ওকে ডাকার ভানে
আনমনা মোর মনটি টানে,
চলতে চাদর পরশ হানে
আমারও কী নিতুই পথে তারই বুকের জামায়॥
পিঠ ফিরিয়ে আমার পানে দাঁড়ায় দূরে
উদাসনয়ান যখন এলোকেশে,
জানি, তখন মনে মনে আমার কথাই
ভাবতেছে সে, মরেছে সে আমায় ভালোবেসে।
বই হাতে সে ঘরের কোণে
জানি আমার বাঁশিই শোনে,
ডাকলে রোষে আমার পানে
নয়না হেনেই রক্তকমল-কুঁড়ির সম চিবুকটি তার নামায়॥ (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/pronoy-chol/
|
4346
|
শামসুর রাহমান
|
আত্মজৈবনিক
|
মানবতাবাদী
|
যুদ্ধবাজ সাইরেনে উচ্চকিত কৈশোর আমার
গলির বিধ্বস্ত ঘরে। গুলির শব্দের প্রতীক্ষায়
কেটেছে ভুতুড়ে রাত্রি অন্ধকারে এবং তামার
মতো দিন খাকির প্রতাপে কাঁপে শান্তির ভিক্ষায়।যৌবন দুর্ভিক্ষ-বিদ্ধ, দাঙ্গাহাঙ্গামায় ভাঙে দেশ,
এদিকে নেতার কণ্ঠে নির্ভেজাল স্বদেশী আকুতি
ভাষা খোঁজে। আদর্শের ভরাডুবি, মহাযুদ্ধ শেষ,
মঞ্চ তৈরিঃ কে হবে নায়ক তবে? করি কার স্তুতি?সগৌরবে ঢাক-ঢোল বাজালো সে ধ্বংসের উৎসবে
যারা তারা কেউ পেলে শিরোপ, কেউবা পতনের
ঝাঁ-ঝাঁ স্মৃতি; বহু মাঠ গেলো ভরে নামহীন শবে।
পচা মাংস দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে বেশ্যার স্তনের
উষ্ণতার মনস্তাপ মাখে যে- লোকটা মগজেই
ঘোরে তার শবাধার, একগাছি দড়ি কিংবা ক্ষুর-
যা-কিছু হননপ্রিয়, যা-কিছু অত্যন্ত সহজেই
জীবনকে করে তোলে অর্থহীন জীর্ণ আস্তাকুঁড়।চতুর বক্তৃতাবলী, প্রচারণা, সংঘের ধূর্তামি
ছাড়া কল্কে পাওয়া ভার! বুক বেঁধে নির্বোধ সাহসে
বিবর্ণ স্যাণ্ডেল পায়ে ঘুরেছি ধুলোয় রোজ আমিঃ
হা-ঘরে বন্ধুর খোঁজে কতদিন বেড়িয়েছি চষে
সারাটা শহর। অন্ধকারে কতো আনোরারা, বামী
ইতস্তত গেছে ডুবে- দেখেছি স্বচক্ষে আর কষে
দিয়েছি বিড়িতে টান একাকিত্বে যখন তখন।
স্বরণের আঠা দিয়ে হতাশ প্রেমের জলছবি
সেঁটেছি সত্তার ফ্রেমে। মধ্যপথে কেড়েছেন মন
রবীন্দ্রঠাকুর নন, সম্মিলিত তিরিশের কবি।কখনো শুনিনি পার্কে বসে হরিণের ডাক কিংবা
পরীর আশ্চর্য স্তন আনেনি মোহের জ্যোৎস্না চোখে,
জানালার শক্ত শিকে কোনোদিন। নিজেকে প্রতিভা-
বান ভেবে ঘেঁটেছি নন্দনতত্ত্ব, যা বলুক লোকেস্বপ্নে শুধু হাঁসের ঝাপট দেখি কশাইখানায়ঃ
মনে হয় স্ট্রেচারের ক্যানভাসে পড়ে আছি একা,
কানে আসে কানাঘুষো, যেতে যেতে কে যেন জানায়ঃ
এইতো বেজেছে ঘণ্টা, হবে না কখনো আর দেখা।বতিচেলী নারী নয়, মাতিসের রমণীর মতো
তেমন কাউকে নয়, যে-হোক সে-হোক নারীকেই
পাশে নিয়ে রাস্তায় হাঁটবো ভেবে সুখে অবিরত
হঠাৎ নিজেরাই পায়ে মেরেছি কুড়াল। মেরে খেইহারিয়েছি জীবনের। মধ্যে মধ্যে ইচ্ছে হয় বলি
জীবন, থামোহে বাপু, শুনেছি তোমার বাচালতা
অনর্গল বহুদিন; এবার দিয়েছি জলাজ্ঞলি
মেরুদণ্ডহীন, ক্লীব আশাকে তোমার। যে ব্যর্থতা
আমাকে শাসায় নিত্য, আমি তারই অগ্নিকুণ্ডে জ্বলি।
তোমরা আসবে কেউ? খোঁজো যারা ক্ষিপ্র সার্থকতা!যেহেতু যথেষ্ট নই ভদ্রলোক তাই জবুথবু
সমাজের মোড়লেরা যথারীতি করেছে বিদায়
ওহে অর্ধচন্দ্র দিয়ে। কোনোমতে সামলে নিয়ে তবু
প্রতিবাদ করবো কি করবো না, পড়েছি দ্বিধায়।একদিন নিত্যসঙ্গী ছিল যারা তারা ডানে বামে
সরে পড়ে, আমি শুধু যাইনে কোথাও। চোখে ভ্রম,
আরেক যুদ্ধের ছায়া যৌবনের অপরাহ্ণে নামে
এবং জীবন জানি সারাক্ষণ সিসিফস-শ্রম। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/atmojoibonik/
|
5920
|
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
|
বলছিলাম কী
|
মানবতাবাদী
|
বলছিলাম–
না, থাক্ গে।
যা হচ্ছে হোক, কে খণ্ডাবে
লেখা থাকলে ভাগ্যে।
পাকানো জট,
হারানো খেই,
চতুর্দিকের দৃষ্যপট
এখনও সে-ই–
শক্ত করে আঁকড়ে-ধরা
চেয়ারের সেই হাতল।
বিষম ভয়, কখন হয়
ক্ষমতার হাতবদল।
বলছিলাম–
না, থাক্ গে!
কী আসে যায় হাতে নাতে
প্রমাণ এবং সাক্ষ্যে।
মোড়লেরা ব্যস্ত বেজায়
যে যার কোলে ঝোল টানতে।
সারটা দেশ হাপিত্যেশে,
পান্তা ফুরোয় নুন আনতে।
চোর-বাটপার
সাধুর ভেখে
ফাঁদে কারবার
আড়াল থেকে–
হাতিয়ে জমি, বানিয়ে বাড়ি
করছে টাকা কাঁড়ি কাঁড়ি
কতক সাদা কতক কালো
মারছে কার খোরাক কে।
জানি না যখন কোনো কিছুই
বলাই ভালো
জী-আজ্ঞে।
বলছিলাম কী–
থাক্ গে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4445.html
|
3991
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্ত্রীর বোন চায়ে তার
|
হাস্যরসাত্মক
|
স্ত্রীর বোন চায়ে তার
ভুলে ঢেলেছিল কালি,
“শ্যালী’ ব’লে ভর্ৎসনা
করেছিল বনমালী।
এত বড়ো গালি শুনে
জ্ব’লে মরে মনাগুনে,
আফিম সে খাবে কিনা
সাত মাস ভাবে খালি,
অথবা কি গঙ্গায়
পোড়া দেহ দিবে ডালি। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/strir-bon-chaye-tar/
|
401
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ [তিরোভাব]
|
ভক্তিমূলক
|
এ কী বিস্ময়! আজরাইলেরও জলে ভর-ভর চোখ!
বে-দরদ দিল্ কাঁপে থর-থর যেন জ্বর-জ্বর শোক।
জান-মরা তার পাষাণ-পাঞ্জা বিলকুল ঢিলা আজ,
কব্জা নিসাড়, কলিজা সুরাখ , খাক চুমে নীলা তাজ ।
জিব্রাইলের আতশি পাখা সে ভেঙে যেন খান খান,
দুনিয়ার দেনা মিটে যায় আজ তবু জান আন্-চান!
মিকাইল অবিরল
লোনা দরিয়ার সবই জল
ঢালে কুল মুল্লুকে , ভীম বাতে খায় অবিরল ঝাউ দোল।
এ কি দ্বাদশীর চাঁদ আজ সেই? সেই রবিয়ল আউওল ?
২
ঈশানে কাঁপিছে কৃষ্ণ নিশান, ইস্রাফিলের ও প্রলয়-বিষাণ আজ
কাতরায় শুধু! গুমরিয়া কাঁদে কলিজা-পিষানো বাজ!
রসুলের দ্বারে দাঁড়ায়ে কেন রে আজাজিল শয়তান?
তারও বুক বেয়ে আঁশু ঝরে, ভাসে মদিনার ময়দান!
জমিন্-আশমান জোড়া শির পাঁও তুলি তাজি বোর্রাক্ ,
চিখ্ মেরে কাঁদে ‘আরশে’ র পানে চেয়ে, মারে জোর হাঁক!
হুরপরি শোকে হায়
জল- ছলছল চোখে চায়।
আজ জাহান্নমের বহ্নি-সিন্ধু নিবে গেছে ক্ষরি জল,
যত ফিরদৌসের নার্গিস-লালা ফেলে আঁশু-পরিমল।
৩
মৃত্তিকা-মাতা কেঁদে মাটি হল বুকে চেপে মরা লাশ,
বেটার জানাজা কাঁদে যেন – তাই বহে ঘন নাভি-শ্বাস!
পাতাল-গহ্বরে কাঁদে জিন, পুন মলো কি রে সোলেমান ?
বাচ্চারে মৃগী দুধ নাহি দেয়, বিহগীরা ভোলে গান!
ফুল পাতা যত খসে পড়ে, বহে উত্তর-চিরা বায়ু,
ধরণির আজ শেষ যেন আয়ু, ছিঁড়ে গেছে শিরা স্নায়ু!
মক্কা ও মদিনায়
আজ শোকের অবধি নাই!
যেন রোজ-হাশরের ময়দান, সব উন্মাদসম ছুটে।
কাঁপে ঘন ঘন কাবা , গেল গেল বুঝি সৃষ্টির দম টুটে।৪
নকিবের তূরী ফুৎকারি আজ বারোয়াঁর সুরে কাঁদে,
কার তরবারি খান খান করে চোট মারে দূরে চাঁদে?
আবুবকরের দর দর আঁশু দরিয়ার পারা ঝরে,
মাতা আয়েষার কাঁদনে মুরছে আশমানে তারা ডরে!
শোকে উন্মাদ ঘুরায় উমর ঘূর্ণির বেগে ছোরা,
বলে ‘আল্লার আজ ছাল তুলে নেব মেরে তেগ্ , দেগে কোঁড়া ।’
হাঁকে ঘন ঘন বীর –
‘হবে, জুদা তার তন শির,
আজ যে বলিবে নাই বেঁচে হজরত – যে নেবে রে তাঁরে গোরে।’
আজ দারাজ দস্তে তেজ হাতিয়ার বোঁও বোঁও করে ঘোরে!
৫
গুম্বজে কে রে গুমরিয়া কাঁদে মসজিদে মস্জিদে?
মুয়াজ্জিনের হোশ্ নাই, নাই জোশ চিতে, শোষ হৃদে!
বেলালেরও আজ কণ্ঠে আজান ভেঙে যায় কেঁপে কেঁপে,
নাড়ি-ছেঁড়া এ কী জানাজার ডাক হেঁকে চলে ব্যেপে ব্যেপে!
উস্মানের আর হুঁশ নাই কেঁদে কেঁদে ফেনা উঠে মুখে,
আলি হাইদর ঘায়েল আজি রে বেদনার চোটে ধুঁকে!
আজ ভোঁতা সে দুধারি ধার
ওই আলির জুলফিকার !
আহা রসুল-দুলালি আদরিণী মেয়ে মা ফাতেমা ওই কাঁদে,
‘কোথা বাবাজান।’ বলি মাথা কুটে কুটে এলোকেশ নাহি বাঁধে!
৬
হাসান-হুসেন তড়পায় যেন জবে-করা কবুতর,
‘নানাজান কই!’ বলি খুঁজে ফেরে কভু বার কভু ঘর।
নিবে গেছে আজ দিনের দীপালি, খসেছে চন্দ্র-তারা,
আঁধিয়ারা হয়ে গেছে দশ দিশি, ঝরে মুখে খুন-ঝারা!
সাগর-সলিল ফোঁপায়ে উঠে সে আকাশ ডুবাতে চায়,
শুধু লোনা জল তার আঁশু ছাড়া কিছু রাখিবে না দুনিয়ায়।
খোদ খোদা সে নির্বিকার,
আজ টুটেছে আসনও তাঁর!
আজ সখা মহ্বুবে বুকে পেতে দুখে কেন যেন কাঁটা বেঁধে,
তারে ছিনিবে কেমনে যার তরে মরে নিখিল সৃষ্টি কেঁদে!৭
বেহেশ্ত সব আরাস্তা আজ, সেথা মহা ধুম-ধাম,
গাহে হুরপরি যত, ‘সাল্লালাহু আলায়হি সাল্লাম।’
কাতারে কাতারে করজোড়ে সবে দাঁড়ায়ে গাহিছে জয়, –
ধরিতে না পেরে ধরা-মা-র চোখে দর দর ধারা বয়।
এসেছে আমিনা আবদুল্লা কি, এসেছে খদিজা সতী?
আজ জননীর মুখে হারামণি-পাওয়া-হাসা হাসে জগপতি!
‘খোদা, একী তব অবিচার!’
বলে কাঁদে সুত ধরা-মা-র।
আজ অমরার আলো আরও ঝলমল, সেথা ফোটে আরও হাসি,
শুধু মাটির মায়ের দীপ নিভে গেল, নেমে এল অমা-রাশি
আজ স্বরগের হাসি ধরার অশ্রু ছাপায়ে অবিশ্রাম
ওঠে একী ঘন রোল – ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লাম।’
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/fateh-e-doaj-dohom-tirovab/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.