id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
3360
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পর-বিচারে গৃহভেদ
|
নীতিমূলক
|
আম্র কহে, এক দিন, হে মাকাল ভাই,
আছিনু বনের মধ্যে সমান সবাই—
মানুষ লইয়া এল আপনার রুচি,
মূল্যভেদ শুরু হল, সাম্য গেল ঘুচি। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/por-bichare-grihoved/
|
47
|
আখতারুজ্জামান আজাদ
|
ইতিহাস
|
চিন্তামূলক
|
আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি —
না ঘরে, না বাইরে;
না বাইরে, না ভিতরে;
না ভিতরে, না ইতরে!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি —
না নরের, না নারীর;
না আত্মীয়ের, না আততায়ীর;
না আস্তিকের, না নাস্তিকের;
না কবির, না নবির।আমার গলা নারীর বন্দনাগীত গায়নি,
জিভ থেকে পুরুষের স্তবক বেরোয়নি,
আমার হাত কারো পা ছোঁয়নি,
চোখ কারো ভণ্ডামো এড়ায়নি,
ঠোঁট ঢুকে পড়েনি অপঠোঁটে,
একনায়িকার খামখেয়ালে আমার শরীর করেনি ওঠবস,
আমার মগজ কাউকে দেয়নি পূর্ণ বা খণ্ডকালীন দাসখত!আমার আত্মঘাতে ঘা খেয়ে উঠেছে পেশিবহুল পুরুষও,
আমার বিষবাক্যে চিত্কার করে উঠেছে পূজাপ্রত্যাশী নারীও!ধুতি-টুপিতে টান পড়ায় শীত্কার করে উঠেছে ধর্মজীবী ধার্মিকও,
অজ্ঞাতনামা রোগে রাগান্বিত হয়ে উঠেছে নার্সিসাস নাস্তিকও!অবশেষে,
আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি!তোষামুদে-জন প্রিয় হয় সবার, এই হলো পরিহাস;
তোষামোদ করিনি কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি —
না ঘরে, না বাইরে;
না বাইরে, না ভিতরে;
না ভিতরে, না ইতরে!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি —
না নরের, না নারীর;
না আত্মীয়ের, না আততায়ীর;
না আস্তিকের, না নাস্তিকের;
না কবির, না নবির।আমার গলা নারীর বন্দনাগীত গায়নি,
জিভ থেকে পুরুষের স্তবক বেরোয়নি,
আমার হাত কারো পা ছোঁয়নি,
চোখ কারো ভণ্ডামো এড়ায়নি,
ঠোঁট ঢুকে পড়েনি অপঠোঁটে,
একনায়িকার খামখেয়ালে আমার শরীর করেনি ওঠবস,
আমার মগজ কাউকে দেয়নি পূর্ণ বা খণ্ডকালীন দাসখত!আমার আত্মঘাতে ঘা খেয়ে উঠেছে পেশিবহুল পুরুষও,
আমার বিষবাক্যে চিত্কার করে উঠেছে পূজাপ্রত্যাশী নারীও!ধুতি-টুপিতে টান পড়ায় শীত্কার করে উঠেছে ধর্মজীবী ধার্মিকও,
অজ্ঞাতনামা রোগে রাগান্বিত হয়ে উঠেছে নার্সিসাস নাস্তিকও!অবশেষে,
আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি!তোষামুদে-জন প্রিয় হয় সবার, এই হলো পরিহাস;
তোষামোদ করিনি কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি —
না ঘরে, না বাইরে;
না বাইরে, না ভিতরে;
না ভিতরে, না ইতরে!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি —
না নরের, না নারীর;
না আত্মীয়ের, না আততায়ীর;
না আস্তিকের, না নাস্তিকের;
না কবির, না নবির।আমার গলা নারীর বন্দনাগীত গায়নি,
জিভ থেকে পুরুষের স্তবক বেরোয়নি,
আমার হাত কারো পা ছোঁয়নি,
চোখ কারো ভণ্ডামো এড়ায়নি,
ঠোঁট ঢুকে পড়েনি অপঠোঁটে,
একনায়িকার খামখেয়ালে আমার শরীর করেনি ওঠবস,
আমার মগজ কাউকে দেয়নি পূর্ণ বা খণ্ডকালীন দাসখত!আমার আত্মঘাতে ঘা খেয়ে উঠেছে পেশিবহুল পুরুষও,
আমার বিষবাক্যে চিত্কার করে উঠেছে পূজাপ্রত্যাশী নারীও!ধুতি-টুপিতে টান পড়ায় শীত্কার করে উঠেছে ধর্মজীবী ধার্মিকও,
অজ্ঞাতনামা রোগে রাগান্বিত হয়ে উঠেছে নার্সিসাস নাস্তিকও!অবশেষে,
আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি!তোষামুদে-জন প্রিয় হয় সবার, এই হলো পরিহাস;
তোষামোদ করিনি কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%87%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%86%e0%a6%96%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%9c/
|
5819
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
পুনর্জন্মের সময়
|
চিন্তামূলক
|
নদীর সঙ্গে খেলা শুরু করবার মুহূর্তে
আমার অন্ধকার পছন্দ হয়নি
আমি নক্ষত্রলোককে সংস্কৃত থেকে আনুবাদ করা ভাষায়
ডাক দিয়ে বললাম, আলো দেখাও!
চাঁদের অভিমান হয়েছিল, কিন্তু নীহারিকাপুঞ্জ
নিচু হয়ে এলো
কেনো দৈব-নির্দেশ ছাড়াই বাতাস উড়িয়ে নিলো
নদীটির ওড়না
আমার শরীরে অসহ্য উত্তাপ, আমি
সূর্যলোকোর আগন’ক
শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া খুলে
ঝাঁপ দিলাম
নগ্ন
জলস্রোতে
দু‘পাশে উদগ্রীব অরণ্য, ধোপার কাপড় কাচার
শব্দের মতন হরিণের ডাক
আমাদের ভিজে-ভিজে খেলা শুরু হয়
নদীর ছোট্ট কোমল স্তন ও
পারস্য চুরিকার মতন উরুদ্বয়ে
আমি দিই গরম আদর
তারপর মৃত্যু ও জীবন, জবিন ও মৃত্যু
তারপর জেগে ওঠে নাদ ব্রহ্ম
অন্তরীক্ষে ধ্বনিত হয় ওঁং শান্তি
চুন ভেজানো জলের মতন পাতলা আলোয়
পুনর্জন্মের সময় আমি শুনতে পাই
আমাদের ভবিষ্যৎ সন্তদিদের জন্য অতীত-পুরুষরা
রেখে যাচ্ছে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস ভরা শুভাশিস।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1815
|
5980
|
হুমায়ুন আজাদ
|
গোলাপ ফোটাবো
|
প্রেমমূলক
|
বঙ্কিম গ্রীবা মেলো ঝরনা ছোটাবো।
যুগল পাহাড়ে পাবো অমৃতের স্বাদ,
জ্ব’লে যাবে দুই ঠোঁটে একজোড়া চাঁদ।
সুন্দরীর নৌকো ঢুকাবো বঙ্গোপসাগরে,
অতলে ডুববো উত্তাল আশ্বিনের ঝড়ে।
শিউলির বোঁটা থেকে চুষে নেবো রস,
এখনো আমার প্রিয় আঠারো বয়স।
তোমার পুষ্পের কলি মধুমদগন্ধময়,
সেখানে বিন্দু বিন্দু জমে আমার হৃদয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/406
|
3643
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ব্যাকুল
|
ছড়া
|
অমন করে আছিস কেন মা গো,
খোকারে তোর কোলে নিবি না গো?
পা ছড়িয়ে ঘরের কোণে
কী যে ভাবিস আপন মনে,
এখনো তোর হয় নি তো চুল বাঁধা।
বৃষ্টিতে যায় মাথা ভিজে,
জানলা খুলে দেখিস কী যে—
কাপড়ে যে লাগবে ধুলোকাদা।
ওই তো গেল চারটে বেজে,
ছুটি হল ইস্কুলে যে—
দাদা আসবে মনে নেইকো সিটি।
বেলা অম্নি গেল বয়ে,
কেন আছিস অমন হয়ে—
আজকে বুঝি পাস নি বাবার চিঠি।
পেয়াদাটা ঝুলির থেকে
সবার চিঠি গেল রেখে—
বাবার চিঠি রোজ কেন সে দেয় না?
পড়বে বলে আপনি রাখে,
যায় সে চলে ঝুলি - কাঁখে,
পেয়াদাটা ভারি দুষ্টু স্যায়না।
মা গো মা, তুই আমার কথা শোন্,
ভাবিস নে মা, অমন সারা ক্ষণ।
কালকে যখন হাটের বারে
বাজার করতে যাবে পারে
কাগজ কলম আনতে বলিস ঝিকে।
দেখো ভুল করব না কোনো—
ক খ থেকে মূর্ধন্য ণ
বাবার চিঠি আমিই দেব লিখে।
কেন মা, তুই হাসিস কেন।
বাবার মতো আমি যেন
অমন ভালো লিখতে পারি নেকো,
লাইন কেটে মোটা মোটা
বড়ো বড়ো গোটা গোটা
লিখব যখন তখন তুমি দেখো।
চিঠি লেখা হলে পরে
বাবার মতো বুদ্ধি করে
ভাবছ দেব ঝুলির মধ্যে ফেলে?
কক্খনো না, আপনি নিয়ে
যাব তোমায় পড়িয়ে দিয়ে,
ভালো চিঠি দেয় না ওরা পেলে। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/byakul/
|
3727
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মুকুলের বক্ষোমাঝে
|
চিন্তামূলক
|
মুকুলের বক্ষোমাঝে
কুসুম আঁধারে আছে বাঁধা,
সুন্দর হাসিয়া বহে
প্রকাশের সুন্দর এ বাধা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/miloner-bokkhomajhe/
|
5892
|
সুবোধ সরকার
|
ঘুষ
|
মানবতাবাদী
|
রবীন্দ্ররচনাবলীর নবম খন্ড দিয়ে চাপা দেওয়া সুইসাইড নোট,
ছেলেকে লেখা | লিখে, হাতে ব্লেড নিয়ে
বাথরুমে ঢুকেছিলেন মাস্টারমশাই
দুপুরবেলা কাজের লোক দরজার তলা দিয়ে
রক্ত আসছে দেখে চিত্কার করে ওঠে |
ছেলেকে লেখা এই তার প্রথম এবং শেষ চিঠি :
‘অরণি,
আমি বিশ্বাস করি সন্তান পবিত্র জলের মতো
যদিও তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো নয়
তবু তোমাকেই লিখে রেখে যাই
গত দু’বছর তোমার মায়ের চিকিত্সাবাবদ
আমার যত্সামান্য সঞ্চয় আপাতত নিঃশেষিত
চিকিত্সার ব্যয়ভার আমি আর নিতে পারছিলাম না |
জীবনে তোমার টাকা ছুঁইনি, মরেও ছোঁব না |
আমি আজীবন ছাত্র পড়িয়েছি, জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি |
গত মাসে আমার স্কুলে এক অভিভাবক এসে
ঝুলোঝুলি করেন তাঁর ছেলেকে নেবার জন্য
আমি প্রথম দিন ফিরিয়ে দিই
দ্বিতীয় দিন ফিরিয়ে দিই
তৃতীয় দিন পারিনি | তিনি আমাকে একটা বড় খামে
তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে চলে যান |
সেই টাকায় এই মাসে তোমার মায়ের চিকিত্সা চলছে
জানি না তিনি বাড়ি ফিরবেন কি না কোনও দিন
ফিরলে বোলো, পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকার অধিকার চলে গেছে |
ইতি বাবা’
যখন সারাটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে টাকার ওপর
তখন রবীন্দ্ররচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটা সুইসাইড নোট |
হাসপাতালে গাছের তলায় গা ছমছম করছিল
এগিয়ে গেলাম সাদা কাপড়ে ঢাকা মাস্টারমশাইয়ের দিকে
একটু বেরিয়ে থাকা পা দুটোর দিকে——ওই একটু বেরিয়ে থাকা পা দুটি যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি |
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%98%e0%a7%81%e0%a6%b7-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7-%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0/
|
2422
|
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী
|
পৌষের শীত
|
প্রকৃতিমূলক
|
‘পউষের প্রবল শীত সুখী যেজন।তুলি পাড়ি আছারি শীতের নিবারণ ॥ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক।মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক ॥’
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5756.html
|
1751
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আকস্মাৎ শান্তিনিকেতনে
|
চিন্তামূলক
|
আক্রান্ত পাখির মতো ঘুরে ঘুরে বিপুল রোদনে
চিত্রাঙ্গাদার কন্ঠে এই আর্ত গান।
একি শুধু নাটমঞ্চে ক্ষণিকের খণ্ডদৃশ্য নয়নাভিরাম?
একি শুধু ব্রতচারী অর্জুনের পায়ের পাথরে
কোন এক রমনীর সনির্বদ্ধ পা্রার্থনা, প্রণাম?
এই স্পষ্ট উচ্চারণ আমাদেরও কথা নয় বুঝি?
সামান্য নারীর মধ্যে সর্বান্তঃকরণে যারা খুঁজি
রাজেন্দ্রনন্দিনী,
যারা জানি পৃথিবীর কোনোখানে রয়ে গেছে]
করো দুটি প্রদীপের চোখ
আলো কিংবা আলিঙ্গন দিয়ে
অথবা সকল আলো নিঃশেষে নিভিয়ে
ধুয়ে মুছে দিতে পারে আমাদের নশ্বরতা, সর্বাঙ্গের শোক।
একটি ওষ্ঠের পদ্ম একবার যদি যায় খুলে
এই সব ট্রাম, ট্রেন, টিভি, টেরিলিন
এই সব ধুরব্ধর মাকড়সার মিহিজাল লালায় মৃসৃণ
এই সব আস্তাকুড়, অবিবেচনার ব্যাপ্ত ডামাডোল ভুলে
যারা জানি পেয়ে যাবো শুকনো ঠোঁটে সরবতের স্বাদ
এতো আমাদেরই আর্তনাদ।
আমাদেরও কন্ঠনালী সারেঙ্গীর কিছু সুর জানে,
আমাদেরও বহু কান্না
জলন্ত উল্কা পিণ্ড, ঝরে গেছে শুন্যের শ্মশানে।
দুঃখের উদ্ভিদগুলো ক্রমাগত কঠিন শিকড়ে
বুক চিরে নামে।
অপেক্ষায় অপেক্ষায় ক্রমাগত দীর্ঘ অপেক্ষায়
সাজানো মঞ্চের মতো জেগে আছি পরিপুর্ণ আলোকসজ্জায়
তবু দৃশ্য ফোটে না সেখানে
যেহেতু জানি না কেউ চিত্রাঙ্গদা থাকে কোনখানে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1244
|
5866
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
সুন্দর মেখেছে এত ছাই-ভস্ম
|
প্রকৃতিমূলক
|
সুন্দর মেখেছে এত ছাই-ভস্ম, ভালোই লাগে না
বুঝি পাহাড়ের পায়ে পড়েছিল নীরব গোধূলি
নারী-কলহাস্য শুনে ভয় পেল ফেরার পাখিরা
পাথরের নিচে জল ঘুমে মগ্ন কয়েকশো বছর
মোষের পিঠের মতো, রাত্রির মেঘের মতো কালো
পাথর গড়িয়ে যায়, লম্বা গাছ শব্দ করে শোয়
একজন ক্ষ্যাপা লোক ঝর্নাটিতে জুতোসুদ্ধু নামে
কেউ কোনো দুঃখ পায় না, চতুর্দিকে এমনই স্বাধীন!
সুন্দর মেখেছে এত ছাই-ভস্ম, ভালোই লাগে না
এই যে সবুজ দেশ, এরও মধ্যে রয়েছে খয়েরি
রূপের পাতলা আভা, তার নিচে গহন গভীর
অ্যালুমিনিয়াম-রঙা রোদ্দুরের বিপুল তান্ডব
বনের ভিতরে এত হাসিমুখ ক্ষুধার্ত মানুষ
যে-জন্য এখানে আসা, তার কোনো নাম গন্ধ নেই
সুন্দর মেখেছে এত ছাই-ভস্ম, ভালোই লাগে না
এখানে ছিল না পথ, আজ থেকে যাত্রা শুরু হলো
একটি সঠিক টিয়া নামটি জানিয়ে উড়ে যায়
বিবর্ণ পাতায় ছোঁয়া ভালোবাসা-রিস্মৃতির খেদ
পা-ছড়িয়ে বসে আছে ছাগল-চরানো বোবা ছেলে
উদাসী ছায়ার মধ্যে ভাঙা কাচ, নরম দেশলাই
এইমাত্র ছুটে এল যে-বাতাস তাতে যেন চিরুনির দাঁত
সুন্দর মেখেছে এত ছাই-ভস্ম, ভালোই লাগে না…
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1781
|
4962
|
শামসুর রাহমান
|
প্রভুকে
|
রূপক
|
প্রভু, শোনো, এই অধমকে যদি ধরাধামে পাঠালেই,
তবে কেন হায় করলে না তুমি তোতাপাখি আমাকেই?
দাঁড়ে বসে-বসে বিজ্ঞের মতো নাড়তাম লেজখানি,
তীক্ষ্ণ আদুরে ঠোঁট দিয়ে বেশ খুঁটতাম দানাপানি।
মিলতো সুযোগ বন্ধ খাঁচায় বাঁধা বুলি কুড়োবার,
বইতে হতো না নিজস্ব কথা বলবার গুরুভার। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/provuke/
|
4063
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হে হিমাদ্রি, দেবতাত্মা, শৈলে শৈলে আজিও তোমার
|
সনেট
|
হে হিমাদ্রি, দেবতাত্মা, শৈলে শৈলে আজিও তোমার
অভেদাঙ্গ হরগৌরী আপনারে যেন বারম্বার
শৃঙ্গে শৃঙ্গে বিস্তারিয়া ধরিছেন বিচিত্র মুরতি।
ওই হেরি ধ্যানাসনে নিত্যকাল স্তব্ধ পশুপতি,
দুর্গম দুঃসহ মৌন– জটাপুঞ্জতুষারসংঘাত
নিঃশব্দে গ্রহণ করে উদয়াস্তরবিরশ্মিপাত
পূজাস্বর্ণপদ্মদল। কঠিনপ্রস্তরকলেবর
মহান্-দরিদ্র, রিক্ত, আভরণহীন দিগম্বর,
হেরো তাঁরে অঙ্গে অঙ্গে এ কী লীলা করেছে বেষ্টন–
মৌনেরে ঘিরেছে গান, স্তব্ধেরে করেছে আলিঙ্গন
সফেন চঞ্চল নৃত্য, রিক্ত কঠিনেরে ওই চুমে
কোমল শ্যামলশোভা নিত্যনব পল্লবে কুসুমে
ছায়ারৌদ্রে মেঘের খেলায়। গিরিশেরে রয়েছেন ঘিরি
পার্বতী মাধুরীচ্ছবি তব শৈলগৃহে হিমগিরি। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/he-himadri-debtatma-shoile-shile-ajio-tomar/
|
339
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
তুমি মোরে ভুলিয়াছ
|
প্রেমমূলক
|
তুমি মোরে ভুলিয়াছ তাই সত্য হোক! –
সেদিন যে জ্বলেছিল দীপালি-আলোক
তোমার দেউল জুড়ি – ভুল তাহা ভুল!
সেদিন ফুটিয়াছিল ভুল করে ফুল
তোমার অঙ্গনে প্রিয়! সেদিন সন্ধ্যায়
ভুলে পেরেছিলে ফুল নোটন-খোঁপায়!ভুল করে তুলি ফুল গাঁথি বর-মালা
বেলাশেষে বারে বারে হয়েছ উতলা
হয়তো বা আর কারও লাগি!…আমি ভুলে
নিরুদ্দেশ তরি মোর তব উপকূলে
না চাহিতে বেঁধেছিনু, গেয়েছিনু গান,
নীলাভ তোমার আঁখি হয়েছিল ম্লান
হয়তো বা অকারণে! গোধূলি বেলায়
তোমার ও-আঁখিতলে! হয়তো তোমার
পড়ে মনে, কবে যেন কোন লোকে কার
বধূ ছিলে ; তারই কথা শুধু মনে পড়ে!
–ফিরে যাও অতীতের লোক-লোকান্তরে
এমনই সন্ধ্যায় বসি একাকিনী গেহে!
দুখানি আঁখির দীপ সুগভীর স্নেহে
জ্বালাইয়া থাক জাগি তারই পথ চাহি!
সে যেন আসিছে দূর তারা-লোক বাহি
পারাইয়া অসীমের অনন্ত জিজ্ঞাসা,
সে দেখেছে তব দীপ, ধরণির বাসা!শাশ্বত প্রতীক্ষমানা অনন্ত সুন্দরী!
হায়, সেথা আমি কেন বাঁধিলাম তরি,
কেন গাহিলাম গান আপনা পাসারি?
হয়তো সে গান মম তোমার ব্যথায়
বেজেছিল। হয় তো বা লেগেছিল তার পায়
আমার তরির ঢেউ। দিয়াছিল ধুয়ে
চরণ-অলক্ত তব। হয়তো বা ছুঁয়ে
গিয়েছিল কপোলের আকুল কুন্তল
আমার বুকের শ্বাস। ও-মুখ-কমল
উঠেছিল রাঙা হয়ে। পদ্মের কেশর
ছুঁইলে দখিনা বায়, কাঁপে থরথর
যেমন কমল-দল ভঙ্গুর মৃণালে
সলাজ সংকোচে সুখে পল্লব-আড়ালে,
তেমনই ছোঁয়ায় মোর শিহরি শিহরি
উঠেছিল বারে বারে সারা দেহ ভরি!চেয়েছিলে আঁখি তুলি, ডেকেছিল যেন
প্রিয় নাম ধরে মোর – তুমি জান, কেন!
তরি মম ভেসেছিল যে নয়ন-জলে
কূল ছাড়ি নেমে এলে সেই সে অতলে।
বলিলে,– “অজানা বন্ধু, তুমি কী গো সেই,
জ্বালি দীপ গাঁথি মালা যার আশাতেই
কূলে বসে একাকিনী যুগ যুগ ধরি
নেমে এসো বন্ধু মোর ঘাটে বাঁধ তরি!”বিস্ময়ে রহিনু চাহি ও-মুখের পানে
কী যেন রহস্য তুমি – কী যেন কে জানে –
কিছুই বুঝিতে নারি! আহ্বানে তোমার
কেন জাগে অভিমান, জোয়ার দুর্বার
আমার আঁখির এই গঙ্গা যমুনায়!–
নিরুদ্দেশ যাত্রী, হায়, আসিলি কোথায়?
একি তোর ধেয়ানের সেই জাদুলোক,
কল্পনার ইন্দ্রপুরী? একি সেই চোখ
ধ্রুবতারাসম যাহা জ্বলে নিরন্তর
ঊর্ধ্বে তোর? সপ্তর্ষির অনন্ত বাসর?
কাব্যের অমরাবতী? একি সে ইন্দিরা,তোরই সে কবিতা-লক্ষ্মী? –বিরহ-অধীরা
একি সেই মহাশ্বেতা, চন্দ্রপীড়-প্রিয়া?
উন্মাদ ফরহাদ যারে পাহাড় কাটিয়া
সৃজিতে চাহিয়াছিল – একি সেই শিঁরী?
লায়লি এই কি সেই, আসিয়াছে ফিরি
কায়েসের খোঁজে পুনঃ? কিছু নাহি জানি!
অসীম জিজ্ঞাসা শুধু করে কানাকানি
এপারে ওপারে, হায়!…তুমি তুলি আঁখি
কেবলই চাহিতেছিলে! দিনান্তের পাখি
বনান্তে কাঁদিতেছিল – ‘কথা কও বউ!’
ফাগুন ঝুরিতেছিল ফেলি ফুল-মউ!কাহারে খুঁজিতেছিলে আমার এ চোখে
অবসান-গোধূলির মলিন আলোকে?
জিজ্ঞাসার, সন্দেহের শত আলো-ছায়া
ও-মুখে সৃজিতেছিল কী যেন কি মায়া!
কেবলই রহস্য হায়, রহস্য কেবল,
পার নাই সীমা নাই অগাধ অতল!
এ যেন স্বপনে-দেখা কবেকার মুখ,
এ যেন কেবলই সুখ কেবলই এ দুখ!
ইহারই স্ফুলিঙ্গ যেন হেরি রূপে রূপে,
এ যেন মন্দার-পুষ্প দেব-অলকায়!
যখন সবারে ভুলি। ধরার বন্ধন
যখন ছিঁড়িতে চাহি, স্বর্গের স্বপন
কেবলই ভুলাতে চায়, এই সে আসিয়া
রূপে রসে গন্ধে গানে কাঁদিয়া হাসিয়া
আঁকড়ি ধরিতে চাহে,–মাটির মমতা!
পরান-পোড়েনি শুধু, জানে নাকো কথা !
বুকে এর ভাষা নেই, চোখে নাই জল,
নির্বাক ইঙ্গিত শুদু শান্ত অচপল!
এ বুঝি গো ভাস্করের পাষাণ-মানসী
সুন্দর, কঠিন, শুভ্র। ভোরের ঊষসী,
দিনের আলোর তাপ সহিতে না জানে।
মাঠের উদাসী সুরে বাঁশরির তানে,
বাণী নাই, শুধু সুর, শুধু আকুলতা!
ভাষাহীন আবেদন দেহ-ভরা কথা।
এ যেন চেনার সাথে অচেনার মিশা, –
যত দেখি তত হায় বাড়ে শুধু তৃষা।আসিয়া বসিলে কাছে দৃপ্ত মুক্তানন,
মনে হল – আমি দিঘি, তুমি পদ্মবন!
পূর্ণ হইলাম আজি, হয় হোক ভুল,
যত কাঁটা তত ফুল, কোথা এর তুল?
তোমারে ঘিরিয়া রব আমি কালো জল,
তরঙ্গের ঊর্ধ্বে রবে তুমি শতদল,
পুজারির পুষ্পাঞ্জলিসম। নিশিদিন
কাঁদিব ললাট হানি তীরে তৃপ্তিহীন!
তোমার মৃণাল-কাঁটা আমার পরানে
লুকায়ে রাখিব, যেন কেহ নাহি জানে।
…কত কী যে কহিলাম অর্থহীন কথা,
শত যুগ-যুগান্তের অন্তহীন ব্যথা।শুনিলে সেসব জাগি বসিয়া শিয়রে,
বলিলে, “বন্ধু গো হের দীপ পুড়ে মরে
তিলে তিলে আমাদের সাথে! আর নিশি
নাই বুঝি, দিবা এলে দূরে যাব মিশি!
আমি শুধু নিশীথের।” যখন ধরণি
নীলিমা-মঞ্জুষা খুলি হেরে মুক্তামণি
বিচিত্র নক্ষত্রমালা – চন্দ্র-দীপ জ্বালি,
একাকী পাপিয়া কাঁদে ‘চোখ গেল’খালি,
আমি সেই নিশিথের। – আমি কই কথা,
যবে শুধু ফোটে ফুল, বিশ্ব তন্দ্রাহতা।
হয়তো দিবসে এলে নারিব চিনিতে,
তোমারে করিব হেলা, তব ব্যথা-গীতে
কেবলই পাইবে হাসি সবার সুমুখে,
কাঁদিলে হাসিব আমি সরল কৌতুকে,
মুছাব না আঁখি-জল। বলিব সবায়,
“তুমি শাঙনের মেঘ –যথায় তথায়
কেবলই কাঁদিয়া ফের, কাঁদাই স্বভাব!
আমি তো কেতকী নহি, আমার কি লাভ
ওই শাঙনের জলে? কদম্ব যূথীর
সখারে চাহি না আমি। শ্বেত-করবীর
সখী আমি। হেমন্তের সান্ধ্য-কুহেলিতে
দাঁড়াই দিগন্তে আসি, নিরশ্রু-সংগীতে
ভরে ওঠে দশ দিক! আমি উদাসিনী।
মুসাফির! তোমারে তো আমি নাহি চিনি!”ডাকিয়া উঠিল পিক দূরে আম্রবনে
মুহুমুহু কুহুকুহু আকুল নিঃস্বনে।
কাঁদিয়া কহিনু আমি, “শুন, সখী শুন,
কাতরে ডাকিছে পাখি কেন পুনঃ পুনঃ!
চলে যাব কোন দূরে, স্বরগের পাখি
তাই বুঝি কেঁদে ওঠে হেন থাকি থাকি।
তোমারই কাজল আঁখি বেড়ায় উড়িয়া,
পাখি নয় – তব আঁখি ওই কোয়েলিয়া!”হাসিয়া আমার বুকে পড়িলে লুটায়ে,
বলিলে, –“পোড়ারমুখি আম্রবনচ্ছায়ে
দিবানিশি ডাকে, শুনে কান ঝালাপালা!
জানি না তো কুহু-স্বরে বুকে ধরে জ্বালা!
উহার স্বভাব এই, তোমারই মতন
অকারণে গাহে গান, করে জ্বালাতন!নিশি না পোহাতে বসি বাতায়ন-পাশে
হলুদ-চাঁপার ডালে, কেবলই বাতাসে
উহু উহু উহু করি বেদনা জানায়!
বুঝিতে নারিনু আমি পাখি ও তোমায়!”নয়নের জল মোর গেল তলাইয়া
বুকের পাষাণ-তলে। উৎসারিত হিয়া
সহসা হারাল ধারা তপ্ত মরু-মাঝে।
আপনারে অভিশাপি ক্ষমাহীন লাজে!
কহিনু, “কে তুমি নারী, এ কি তব খেলা?
অকারণে কেন মোর ডুবাইলে ভেলা,
এ অশ্রু-পাথারে একা দিলে ভাসাইয়া?
দুহাতে আন্দোলি জল কূলে দাঁড়াইয়া,
অকরুণা, হাস আর দাও করতালি!অদূরে নৌবতে বাজে ইমন-ভূপালি
তোমার তোরণ-দ্বারে কাঁদিয়া কাঁদিয়া,
– তোমার বিবাহ বুঝি? ওই বাঁশুরিয়া
ডাকিছে বন্ধুরে তব?” যুঝি ঢেউ সনে
শুধানু পরান-পণে।…তুমি আনমনে
বারেক পশ্চাতে চাহি পড়িলে লুটায়ে
স্রোতজলে, সাঁতরিয়া আসি মম পাশে
‘আমিও ডুবিব সাথে’বলিয়া তরাসে
জড়ায়ে ধরিলে মোরে বাহুর বন্ধনে!…
হইলাম অচেতন!… কিছু নাই মনে
কেমনে উঠিনু কূলে!… কবে সে কখন
জড়াইয়া ধরেছিলে মালার মতন
নিশীথে পাথার-জলে, – শুধু এইটুকু
সুখ-স্মৃতি ব্যথা সম চির-জাগরূক
রহিল বুকের তলে!… আর কিছু নাই!…
তোমারে খুঁজিয়া ফিরি এ কূলে বৃথাই,
হে চীর রহস্যময়ী!ও কূলে দাঁড়ায়ে
তেমনই হাসিছ তুমি সান্ধ্য-বনচ্ছায়ে
চাহিয়া আমার মুখে! তোমার নয়ন
বলিছে সদাই যেন, ‘ডুবিয়া মরণ
এবার হল না, সখা! আজও যায় সাধ
বাঁচিতে ধরার পরে। স্বপনের চাঁদ
হয়তো বা দিবে ধরা জাগ্রত এলোকে,
হয়তো নামিবে তুমি অশ্রু হয়ে চোখে,
আসিবে পথিক-বন্ধু হয়ে প্রিয়তম
বুকের ব্যাথায় মোর – পুষ্পে গন্ধ সম!
অঞ্জলি হইতে নামি তোমার পূজার
জড়াইয়া রব বক্ষে হয়ে কণ্ঠহার!’নিশীথের বুক-চেরা তব সেই স্বর,
সেই মুখ সেই চোখ করুণা-কাতর
পদ্মা-তীরে-তীরে রাতে আজও খুঁজে ফিরি!
কত নামে ডাকি তোমা, – “মহাশ্বেতা, শিঁরী,
লায়লি, বকৌলি, তাজ, দেবী, নারী, প্রিয়া!”
– সাড়া নাহি মিলে কারও! ফুলিয়া ফুলিয়া
বয়ে যায় মেঘনার তরঙ্গ বিপুল,
কখনও এ-কূল ভাঙে কখনও ও-কূল!পার হতে নারি এই তরঙ্গের বাধা,
ও যেন ‘এসো না’ বলে পায়ে ধরে-কাঁদা
তোমার নয়ন-স্রোত! ও যেন নিষেধ,
বিধাতার অভিশাপ, অনন্ত বিচ্ছেদ,
স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝে যেন যবনিকা!…
আমাদের ভাগ্যে বুঝি চিররাত্রি লিখা!
নিশীথের চখাচখি, দুইপারে থাকি
দুইজনে দুইজন ফিরি সদা ডাকি!
কোথা তুমি? তুমি কোথা? যেন মনে লাগে,
কত যুগ দেখি নাই! কত জন্ম আগে
তোমারে দেখেছি কোন নদীকূলে গেহে,
জ্বালো দীপ বিষাদিনী ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে!
বারে বারে কাঁপে, আকাশ-দীপিকা
কাঁপে তারারাজি – যেন আঁখি-পাতা তব,–
এইটুকু পড়ে মনে! কবে অভিনব
উঠিলে বিকশি তুমি আমার মাঝে,
দেখি নাই! দেখিব না – কত বিনা কাজে
নিজেরে আড়াল করি রাখিছ সতত
অপ্রকাশ সুগোপন বেদনার মতো।
আমি হেথা কূলে কূলে ফিরি আর কাঁদি,
কুড়ায়ে পাব না কিছু? বুকে যাহা বাঁধি
তোমার পরশ পাব – একটু সান্ত্বনা!
চরণ-অলক্ত-রাঙা দুটি বালুকণা,
একটি নূপুর, ম্লান বেণি-খসা ফুল,
করবীর সোঁদা-ঘষা পরিমল-ধুল,
আধখানি ভাঙা চুড়ি রেশমি কাচের,
দলিত বিশুষ্ক মালা নিশি-প্রভাতের,
তব হাতে লেখা মম প্রিয় ডাক-নাম
লিখিয়া ছিঁড়িয়া-ফেলা আধখানি খাম,
অঙ্গের সুরভি-মাখা ত্যক্ত তপ্ত বাস,
মহুয়ার মদ সম মদির নিশ্বাস
পুরবের পরিস্থান হতে ভেসে-আসা, –
কিছুই পাব না খুঁজি? কেবলই দুরাশা।
কাঁদিবে পরান ঘিরি? নিরুদ্দেশ পানে
কেবলই ভাসিয়া যাব শ্রান্ত ভাটি-টানে?
তুমি বসি রবে ঊর্ধ্বে মহিম-শিখরে
নিষ্প্রাণ পাষাণ-দেবী? কভু মোর তরে
নিষ্প্রাণ পাষাণ-দেবী? কভু মোর তরে
নামিবে না প্রিয়া-রূপে ধরার ধুলায়?
লো কৌতুকময়ী! শুধু কৌতুক-লীলায়
খেলিবে আমারে লয়ে? –আর সবই ভুল?
ভুল করে ফুটেছিল আঙিনায় ফুল?
ভুল করে বলেছিলে সুন্দর? অমনি –
ঢেকেছ দুহাতে মুখ ত্বরিতে তখনই!
বুঝি কেহ শুনিয়াছে, দেখিয়াছে কেহ
ভাবিয়া আঁধার কোণে লীলায়িত দেহ
লুকাওনি সুখে লাজে? কোন শাড়িখানি
পরেছিলে বাছি বাছি সে সন্ধ্যায় রানি?হয়তো ভুলেছ তুমি, আমি ভুলি নাই!
যত ভাবি ভুল তাহা – তত সে জড়াই
সে ভুলে সাপিনিসম বুকে ও গলায়!
বাসি লাগে ফুলমেলা। – ভুলের খেলায়
এবার খোয়াব সব, করিয়াছি পণ।
হোক ভুল, হোক মিথ্যা, হোক এ স্বপন,
–এইবার আপনারে শূন্য রিক্ত করি
দিয়া যাব মরণের আগে! পাত্র ভরি
করে যাব সুন্দরের করে বিষপান!
তোমারে অমর করি করিব প্রয়াণ
মরণের তীর্থযাত্রী!
ওগো, বন্ধু প্রিয়,
এমনই করিয়া ভুল দিয়া ভুলাইয়ো
বারে বারে জন্মে জন্মে গ্রহে গ্রহান্তরে!
ও-আঁখি-আলোক যেন ভুল করে পড়ে
আমার আঁখির পরে। গোধূলি-লগনে
ভুল করে হই বর, তুমি হও কনে
ক্ষণিকের লীলা লাগি! ক্ষণিকের চমকি
অশ্রুর শ্রাবণ-মেঘে হারাইয়া সখী!…তুমি মোরে ভুলিয়াছ, তাই সত্য হোক!
নিশি-শেষে নিভে গেছে দীপালি-আলোক!
সুন্দর কঠিন তুমি পরশ-পাথর
তোমার পরশ লভি হইনু সুন্দর –
– তুমি তাহা জানিলে না!
…সত্য হোক প্রিয়া
দীপালি জ্বলিয়াছিল – গিয়াছে নিভিয়া! (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/tumi-more-vuliacho/
|
216
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আত্মশক্তি
|
মানবতাবাদী
|
এসো বিদ্রোহী মিথ্যা-সূদন আত্মশক্তি বুদ্ধ বীর!
আনো উলঙ্গ সত্যকৃপাণ, বিজলি-ঝলক ন্যায়-অসির।তূরীয়ানন্দে ঘোষো সে আজ
‘আমি আছি’– বাণী বিশ্ব-মাঝ,
পুরুষ-রাজ!
সেই স্বরাজ!জাগ্রত করো নারায়ণ-নর নিদ্রিত বুকে মর-বাসীর;
আত্ম-ভীতু এ অচেতন-চিতে জাগো ‘আমি-স্বামী নাঙ্গা-শির’…এসো প্রবুদ্ধ, এসো মহান
শিশু-ভগবান জ্যোতিষ্মান।
আত্মজ্ঞান-
দৃপ্ত-প্রাণ!জানাও জানাও, ক্ষুদ্রেরও মাঝে রাজিছে রুদ্র তেজ রবির !!
উদয়-তোরণে উড়ুক আত্ম-চেতন-কেতন ‘আমি-আছি’-রকরহ শক্তি-সুপ্ত-মন
রুদ্র বেদনে উদ্বোধন,
হীন রোদন –
খিন্ন-জনদেখুক আত্মা-সবিতার তেজ বক্ষে বিপুলা ক্রন্দসীর!
বলো, নাস্তিক হউক আপন মহিমা নেহারি শুদ্ধ ধীর!কে করে কাহারে নির্যাতন
আত্ম-চেতন স্থির যখন?
ঈর্ষা-রণ
ভীম-মাতন
পদাঘাত হানে পঞ্জরে শুধু আত্ম-বল-অবিশ্বাসীর,
মহাপাপী সেই, সত্য যাহার পর-পদানত আনত শির।জাগাও আদিম স্বাধীন প্রাণ,
আত্মা জাগিলে বিধাতা চান।
কে ভগবান? –
আত্ম-জ্ঞান!গাহে উদ্গাতা ঋত্বিক গান অগ্নি-মন্ত্র শক্তি-শ্রীর।
না জাগিলে প্রাণে সত্য চেতনা, মানি না আদেশ কারও বাণীর !এসো বিদ্রোহী তরুণ তাপস আত্মশক্তিবুদ্ধ বীর,
আনো উলঙ্গ সত্য-কৃপাণ বিজলি-ঝলক ন্যায়-অসির॥ (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/atmoshokti/
|
3664
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভিক্ষা ও উপার্জন
|
নীতিমূলক
|
বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা,
কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।
দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস—
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস।
বিনা চাষে শস্য দিলে কী তাহাতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতী,
আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে নিতান্তই ছাড়ে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vikkha-o-uparjon/
|
1342
|
তসলিমা নাসরিন
|
নারী ৫
|
মানবতাবাদী
|
তিনকূলে কেউ নেই, ডাঙর হয়েই মেয়ে টের পেয়ে যায়
অভাবের হিংস্র দাঁত জীবন কামড়ে ধরে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়।
যুবতী শরীর দেখে গৃহিনীরা সাধ করে ডাকে না বিপদ
বেসুমার খিদে পেটে, নিয়তি দেখিয়েদেয় নারীকে বিপথ।
দুয়ারে ভিক্ষার হাত বাড়ায়ে বেকার নারী তবু বেঁচে থাকে
স্টেশনে কাচারি পেলে গুটিশুটি শুয়ে পড়ে মানুষের ফাঁকে
এইসব লক্ষ করে ধরিবাজ পুরুষেরা মুখ টিপে হাসে
দেখাতে ভাতের লোভ আঁধার নিভৃতে তারা ফন্দি এঁটে আসে।
তিনকূলে কেউ নেই, কোথাও কিছুই নেই, স্বপ্ন শুধু ভাত
শরমের মাথা খেয়ে এভাবেই ধরে নারীদালালের হাত।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1023.html
|
5546
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
সুহৃদবরেষু
|
চিন্তামূলক
|
কাব্যকে জানিতে হয়, দৃষ্টিদোষে নতুবা পতিত
শব্দের ঝঙ্কার শুধু যাহা ক্ষীণ জ্ঞানের অতীত।
রাতকানা দেখে শুধু দিবসের আলোক প্রকাশ,
তার কাছে অর্থহীন রাত্রিকার গভীর আকাশ।
মানুষ কাব্যের স্রষ্টা, কাব্য কবি করে না সৃজন,
কাব্যের নতুন জন্ম, যেই পথ যখনই বিজন।
প্রগতির কথা শুনে হাসি মোর করুণ পর্যায়
নেমে এল (স্বেচ্ছাচার বুঝি বা গর্জায়)।
যখন নতুন ধারা এনে দেয় দুরন্ত প্লাবন
স্বেচ্ছাচার মনে করে নেমে আসে তখনি শ্রাবণ;
কাব্যের প্রগতি–রথ? (কারে কহে বুঝিতে অক্ষম,
অশ্বগুলি ইচ্ছামত চরে খায়, খুঁজিতে মোক্ষম!)
সুজীর্ণ প্রগতি–রথ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উইয়ের জ্বালায়
সারথি–বাহন ফেলি ইতস্তত বিপথে পালায়।
নতুন রথের পথে মৃতপ্রায় প্রবীণ ঘোটক,
মাথা নেড়ে বুঝে, ইহা অ–রাজযোটক॥এই কবিতাটি অরুণাচলকে সুকান্ত পত্রাকারে লিখেছিলেন। রচনার তারিখ ১৩ই কার্তিক ১৩৪৮।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/suhridboreshu/
|
3895
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শ্যামলা
|
ভক্তিমূলক
|
যে-ধরণী ভালোবাসিয়াছি
তোমারে দেখিয়া ভাবি তুমি তারি আছ কাছাকাছি।
হৃদয়ের বিস্তীর্ণ আকাশে
উন্মুক্ত বাতাসে
চিত্ত তব স্নিগ্ধ সুগভীর।
হে শ্যামলা, তুমি ধীর,
সেবা তব সহজ সুন্দর,
কর্মেরে বেষ্টিয়া তব আত্মসমাহিত অবসর। মাটির অন্তরে
স্তরে স্তরে
রবিরশ্মি নামে পথ করি,
তারি পরিচয় ফুটে দিবসশর্বরী
তরুলতিকায় ঘাসে,
জীবনের বিচিত্র বিকাশে।
তেমনি প্রচ্ছন্ন তেজ চিত্ততলে তব
তোমার বিচিত্র চেষ্টা করে নব নব
প্রাণমূর্তিময়,
দেয় তারে যৌবন অক্ষয়। প্রতিদিবসের সব কাজে
সৃষ্টির প্রতিভা তব অক্লান্ত বিরাজে।
তাই দেখি তোমার সংসার
চিত্তের সজীব স্পর্শে সর্বত্র তোমার আপনার। আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে
মাটির যে-গন্ধ উঠে সিক্ত সমীরণে,
ভাদ্রে যে-নদীটি ভরা কূলে কূলে,
মাঘের শেষে যে-শাখা গন্ধঘন আমের মুকুলে,
ধানের হিল্লোলে ভরা নবীন যে-খেত,
অশ্বত্থের কম্পিত সংকেত,
আশ্বিনে শিউলিতলে পূজাগন্ধ যে স্নিগ্ধ ছায়ার,
জানি না এদের সাথে কী মিল তোমার। দেখি ব'সে জানালার ধারে--
প্রান্তরের পারে
নীলাভ নিবিড় বনে
শীতসমীরণে
চঞ্চল পল্লবঘন সবুজের 'পরে
ঝিলিমিলি করে
জনহীন মধ্যাহ্নের সূর্যের কিরণ,
তন্দ্রাবিষ্ট আকাশের স্বপ্নের মতন।
দিগন্তে মন্থর মেঘ, শঙ্খচিল উড়ে যায় চলি
ঊর্ধ্বশূন্যে, কতমতো পাখির কাকলি,
পীতবর্ণ ঘাস
শুষ্ক মাঠে, ধরণীর বনগন্ধি আতপ্ত নিঃশ্বাস
মৃদুমন্দ লাগে গায়ে, তখন সে-ক্ষণে
অস্তিত্বের যে ঘনিষ্ঠ অনুভূতি ভরি উঠে মনে,
প্রাণের যে প্রশান্ত পূর্ণতা, লভি তাই
যখন তোমার কাছে যাই--
যখন তোমারে হেরি
রহিয়াছ আপনারে ঘেরি
গম্ভীর শান্তিতে,
স্নিগ্ধ সুনিস্তব্ধ চিতে,
চক্ষে তব অন্তর্যামী দেবতার উদার প্রসাদ
সৌম্য আশীর্বাদ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/samla/
|
3641
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ব্যর্থ
|
ভক্তিমূলক
|
যদি প্রেম দিল না প্রাণে
কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে?
কেন তারার মালা গাঁথা,
কেন ফুলের শয়ন পাতা,
কেন দখিন হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?। যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চায় এ মুখের পানে?
তবে ক্ষণে ক্ষণে কেন
আমার হৃদয় পাগল হেন,
তরী সেই সাগরে ভাসায় যাহার কূল সে নাহি জানে?।শান্তিনিকেতন
২৮ আশ্বিন ১৩২০(কাব্যগ্রন্থঃ সঞ্চয়িতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/byertho/
|
330
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ঝড়
|
স্বদেশমূলক
|
ঝড় – ঝড় – ঝড় আমি – আমি ঝড় –
শন – শন – শনশন শন –ক্কড়ক্কড় ক্কড় –
কাঁদে মোর আগমনি আকাশ বাতাস বনানীতে।
জন্ম মোর পশ্চিমের অস্তগিরি-শিরে,
যাত্রা মোর জন্মি আচম্বিতে
প্রাচী-র অলক্ষ্য পথ-পানে
মায়াবী দৈত্যশিশু আমি
ছুটে চলি অনির্দেশ অনর্থ-সন্ধানে!
জন্মিয়াই হেরিনু, মোরে ঘিরি ক্ষতির অক্ষৌহিণী সেনা
প্রণমি বন্দিল – ‘প্রভু! তব সাথে আমাদের যুগে যুগে চেনা,
মোরা তব আজ্ঞাবহ দাস –
প্রলয় তুফান বন্যা, মড়ক দুর্ভিক্ষ মহামারি সর্বনাশ!’
বাজিল আকাশ-ঘণ্টা, বসুধা-কাঁসর;
মার্তণ্ডের ধূপদানি – মেঘ-বাষ্প-ধূমে-ধূমে ভরাল অম্বর!
উল্কার হাউই ছোটে, গ্রহ উপগ্রহ হতে ঘোষিল মঙ্গল;
মহাসিন্ধু-শঙ্খে বাজে অভিশাপ-আগমনি কলকল কল কলকল কল কলকল কল!
‘জয় হে ভয়ংকর, জয় প্রলংকর’ নির্ঘোষি ভয়াল
বন্দিল ত্রিকাল-ঋষি।
ধ্যান-ভগ্ন রক্ত-আঁখি আশিস দানিল মহাকাল।
উল্লম্ফিয়া উঠিলাম আকাশের পানে তুলি বাহু,
আমি নব রাহু!
হেরিলাম সেবারতা মহীয়সী মহালক্ষ্মী প্রকৃতির রূপ,
সহসা সে ভুলিয়াছে সেবা, আগমন-ভয়ে মোর
প্রস্তর-শিখার সম নিশ্চল নিশ্চুপ!
অনুমানি যেন কোনো সর্বনাশা অমঙ্গল ভয়
জাগি আছে শিশুর শিয়র-পাশে ধ্যানমগ্না মাতা, শ্বাস নাহি বয়।
মনে হল ওই বুঝি হারা-মাতা মোর! মৌনা ওই জননীর
শুভ্র শান্ত কোলে
– প্রহ্লাদকুলের আমি কাল-দৈত্য-শিশু –
ঝাঁপাইয়া পড়িলাম ‘মা আমার’ বলে।
নাহি জানি কোন্ ফণিমনসার হলাহল-লোকে –
কোন্ বিষ-দীপ-জ্বালা সবুজ আলোকে –
নাগমাতা কদ্রু-গর্ভে জন্মেছি সহস্রফণা নাগ
ভীষণ তক্ষকশিশু! কোথা হয় নাগনাশী জন্মেজয়-যাগ –
উচ্চারিছে আকর্ষণ-মন্ত্র কোন্ গুণী –
জন্মান্তর-পার হতে ছুটে চলি আমি সেই মৃত্যু-ডাক শুনি!
মন্ত্র-তেজে পাংশু হয়ে ওঠে মোর হিংসা-বিষ-ক্রোধ-কৃষ্ণ প্রাণ,
আমার তুরীয় গতি – সে যে ওই অনাদি উদয় হতে
হিংসাসর্প-যজ্ঞমন্ত্র-টান!
ছুটে চলি অনন্ত তক্ষক ঝড় –
শন – শন – শনশন শন
সহসা কে তুমি এলে হে মর্ত্য-ইন্দ্রাণী মাতা,
তব ওই ধূলি-আস্তরণ
বিছায়ে আমার তরে জাতকের জন্মান্তর হতে?
লুকানু ও-অঞ্চল-আড়ালে, দাঁড়ালে আড়াল হয়ে মোর মৃত্যু-পথে!
ব্যর্থ হল অঞ্চল-আড়াল; বহ্নি-আকর্ষণ
মন্ত্র-তেজে ব্যাকুল ভীষণ
রক্তে রক্তে বাজে মোর – শনশন শন –
শন – শন – ওই শুন দূর –
দূরান্তর হতে মাগো, ডাকে মোরে অগ্নি-ঋষি বিষহরি সুর!
জননী গো চলিলাম অনন্ত চঞ্চল,
বিষে তব নীল হল দেহ, বৃথা মা গো দাব-দাহে পুড়ালে অঞ্চল!
ছুটে চলি মহা-নাগ, রক্তে মোর শুনি আকর্ষণী,
মমতা-জননী
দাহে মোর পড়িল মুরছি;
আমি চলি প্রলয়-পথিক – দিকে দিকে মারী-মরু রচি।
ঝড় – ঝড় – ঝড় আমি – আমি ঝড় –
শন – শন – শনশন শন –ক্কড়ক্কড় ক্কড় –
কোলাহল-কল্লোলের হিল্লোল-হিন্দোল –
দুরন্ত দোলায় চড়ি – ‘দে দোল দে দোল’
উল্লাসে হাঁকিয়া বলি, তালি দিয়া মেঘে
উন্মদ উন্মাদ ঘোর তুফানিয়া বেগে!
ছুটে চলি ঝড় – গৃহ-হারা শান্তি-হারা বন্ধ-হারা ঝড় –
স্বেচ্ছাচার-ছন্দে নাচি ! ক্কড়ক্কড় ক্কড়
কণ্ঠে মোর লুণ্ঠে ঘোর বজ্র-গিটকিরি,
মেঘ-বৃন্দাবনে মুহু ছুটে মোর বিজুরির জ্বালা-পিচকিরি!
উড়ে সুখ-নীড়, পড়ে ছায়া-তরু, নড়ে ভিত্তি রাজ-প্রাসাদের,
তুফান-তুরগ মোর উরগেন্দ্র-বেগে ধায়।
আমি ছুটি অশান্ত-লোকের
প্রশান্ত-সাগর-শোষা উষ্ণশ্বাস টানি।
লোকে লোকে পড়ে যায় প্রলয়ের ত্রস্ত কানাকানি!
ঝড় – ঝড় – উড়ে চলি ঝড় মহাবায়-পঙ্খিরাজে চড়ি,
পড়-পড় আকাশের ঝোলা শামিয়ানা
মম ধূলিধ্বজা সনে করে জড়াজড়ি!
প্রমত্ত সাগর-বারি – অশ্ব মম তুফানির খর ক্ষুর-বেগে
আন্দোলি আন্দোলি ওঠে। ফেনা ওঠে জেগে
ঝটিকার কশা খেয়ে অনন্ত তরঙ্গ-মুখে তার !
আমি যেন সাপুড়িয়া মারি মন্ত্র-মার–
ঢেউ-এর মোচড়ে তাই মহাসিন্ধু-মুখে
জল-নাগ-নাগিনিরা আছাড়ি পিছাড়ি মরে ধুঁকে!
প্রিয়া মোর ঘূর্ণিবায়ু বেদুইন-বালা
চূর্ণি চলে ঝঞ্ঝা-চুর মম আগে আগে।
ঝরনা-ঝোরা তটিনীর নটিনি-নাচন-সুখ লাগে
শুষ্ক খড়কুটো ধূলি শীত-শীর্ণ বিদায়-পাতায়
ফাল্গুনী-পরশে তার। – আমার ধমকে নুয়ে যায়
বনস্পতির মহা মহিরুহ, শাল্মলি, পুন্নাগ, দেওদার,
ধরি যবে তার
জাপটি পল্লব-ঝুঁটি, শাখা-শির ধরে দিই নাড়া;
গুমরি কাঁদিয়া ওঠে প্রণতা বনানী,
চচ্চড় করে ওঠে পাহাড়ের খাড়া শির-দাঁড়া!
প্রিয়া মোর এলোমেলো গেয়ে গান আগে আগে চলে;
পাগলিনি কেশে ধূলি চোখে তার মায়া-মণি ঝলে।
ঘাগরির ঘূর্ণা তার ঘূর্ণি-ধাঁধা লাগায় নয়নালোকে মোর।
ঘূর্ণিবালা হাসির হররা হানি বলে – ‘মনোচোর।
ধরো তো আমারে দেখি’ –
ত্রস্ত-বাস হাওয়া-পরি, বেণি তার দুলে ওঠে সুকঠিন মম ভালে ঠেকি।
পাগলিনি মুঠি মুঠি ছুঁড়ে মারে রাঙা পথধূলি,
হানে গায় ঝরনা-কুলুকুচু, পদ্ম-বনে আলুথালু খোঁপা পড়ে খুলি!
আমি ধাই পিছে তার দুরন্ত উল্লাসে;
লুকায় আলোর বিশ্ব চন্দ্র সূর্য তারা পদভর-ত্রাসে!
দীর্ঘ রাজপথ-অজগর সংকুচিয়া ওঠে ক্ষণে ক্ষণে,
ধরণি-কূর্মপৃষ্ঠ দীর্ণ জীর্ণ হয়ে ওঠে মত্ত মোর প্রমত্ত ঘর্ষণে।
পশ্চাতে ছুটিয়া আসে মেঘ ঐরাবত-সেনাদল
গজগতি-দোলা-ছন্দে; স্বরগে বাজে বাদল-মাদল!
সপ্ত সাগর শোষি শুণ্ডে শুণ্ডে তারা–
উপুড় ধরণি-পৃষ্ঠে উগারে নিযুত লক্ষ বারি-তীর-ধারা।
বয়ে যায় ধরা-ক্ষত-রসে
সহস্র পঙ্কিল স্রোত-ধার।
চণ্ডবৃষ্টি-প্রপাত-ধারা-ফুলে
বরষার বুকে ঝলে জল-মালা-হার।
আমি ঝড়, হুল্লোড়ের সেনাপতি; খেলি মৃত্যু-খেলা
ঘূর্ণনীয়া প্রিয়া-সাথে। দুর্যোগের হুলাহুলি মেলা
ধায় মম অশ্রান্ত পশ্চাতে!
মম প্রাণরঙ্গে মাতি নিখিলের শিখী-প্রাণ মুহু-মুহু মাতে!
শ্যাম স্বর্ণ পত্রে পুষ্পে কাঁপে তার অনন্ত কলাপ। –
দারুণ দাপটে মম জেগে ওঠে অগ্নিস্রাব-জ্বলন্ত-প্রলাপ
ভূমিকম্প-জরজর থরথর ধরিত্রীর মুখে!
বাসুকি-মন্দার সম মন্থনে মম সিন্ধুতট ভরে ফেনা-থুকে।
জেগে ওঠে মম সেই সৃষ্টি-সিন্ধু-মন্থন-ব্যথায়
রবি শশী তারকার অনন্ত বুদবুদ! – উঠে ভেঙে যায়
কত সৃষ্টি কত বিশ্ব আমার আনন্দ-গতিপথে।
শিবের সুন্দর ধ্রুব-আঁখি
যমের আরক্ত ঘোর মশাল-নয়ন-দীপ মম রথে।
জয়ধ্বনি বাজে মোর স্বর্গদূত ‘মিকাইলের’ আতশি-পাখায়।
অনন্ত-বন্ধন-নাগ-শিরস্ত্রাণ শোভে শিরে! শিখী-চূড়ায় তায়
শনির অশনি ওই ধূমকেতু-শিখা,
পশ্চাতে দুলিছে মোর অনন্ত আঁধার চিররাত্রি-যবনিকা!
জটা মোর নীহারিকাপুঞ্জ-ধূম পাটল পিঙ্গাস,
বহে তাহে রক্ত-গঙ্গা নিপীড়িত নিখিলের লোহিত নিষ্কাশ।
ঝড় – ঝড় – ঝড় আমি – আমি ঝড় –
ক্কড়ক্কড় ক্কড় –
বজ্র-বায়ু দন্তে-দন্তে ঘর্ষি চলি ক্রোধে!
ধূলি-রক্ত বাহু মম বিন্ধ্যাচল সম রবিরশ্মি-পথ রোধে।
ঝঞ্ঝনা-ঝাপটে মম
ভীত কূর্ম সম
সহসা সৃষ্টির খোলে নিয়তি লুকায়।
আমি ঝড়, জুলুমের জিঞ্জির-মঞ্জীর বাজে ত্রস্ত মম পায়!
ধাক্কার ধমকে মম খান খান নিষিদ্ধের নিরুদ্ধ দুয়ার,
সাগরে বাড়ব লাগে, মড়ক দুয়ার্কি ধরে আমার ধুয়ার!
কৈলাসে উল্লাস ঘোষে ডম্বরু ডিণ্ডিম
দ্রিম দ্রিম দ্রিম!
অম্বর-ডঙ্কার ডামাডোল
সৃজনের বুকে আনে অশ্রু-বন্যা ব্যথা-উতরোল।
ভাণ্ডারে সঞ্চিত মম দুর্বাসার হিংসা ক্রোধ শাপ।
ভীমা উগ্রচণ্ডা ফেলে উল্কারূপী অগ্নি-অশ্রু, সহিতে না পারি মম তাপ!
আমি ঝড়, পদতলে ‘আতঙ্ক’-কুঞ্জর, হস্তে মোর ‘মাভৈঃ’-অঙ্কুশ।
আমি বলি, ছুটে চলো প্রলয়ের লাল ঝাণ্ডা হাতে, –
হে নবীন পরুষ পুরুষ!
স্কন্ধে তোলো উদ্ধত বিদ্রোহ-ধ্বজা; কণ্টক-অশঙ্ক রে নির্ভীক!
পুরুষ ক্রন্দন-জয়ী, – দুঃখ দেখে দুঃখ পায় – ধিক তারে ধিক
আমি বলি, বিশ্ব-গোলা নিয়ে খেলো লুফোলুফি খেলা!
বীর নিক বিপ্লবের লাল-ঘোড়া,
ভীরু নিক পারে-ধাওয়া পলায়ন-ভেলা!
আমি বলি, প্রাণানন্দে পিয়ে নে রে বীর,
জীবন-রসনা দিয়া প্রাণ ভরে মৃত্যু-ঘন ক্ষীর!
আমি বলি, নরকের ‘নার’ মেখে নেয়ে আয় জ্বালা-কুণ্ড সূর্যের হাম্মামে।
রৌদ্রের-চন্দন-শুচি, উঠে বসো গগনের বিপুল তাঞ্জামে!
আমি ঝড় মহাশত্রু স্বস্তি-শান্তি-শ্রীর,
আমি বলি, শ্মশান-সুষুপ্তি শান্তি –
জয়নাদ আমি অশান্তির।
পশ্চিম হইতে পূর্বে ঝঞ্ঝনা-ঝাঁঝর
ঝঞ্ঝা-জগঝম্প ঘোর – বাজায়ে চলেছি ঝড় –
ঝনাৎ ঝনাৎ ঝন
ঝমরঝমরঝন ঝননঝননশন
শনশনশন
হুহু হুহু হুহু –
সহসা কম্পিত-কণ্ঠ-ক্রন্দন শুনি কার – ‘উহু! উহু উহু উহু!’
সজল কাজল-পক্ষ্ম কে সিক্তবসনা একা ভিজে –
বিরহিণী কপোতিনী, এলোকেশ কালোমেঘে পিঁজে।
নয়ন-গগনে তার নেমেছে বাদল, ভিজিয়াছে চোখের কাজল,
মলিন করেছে তার কালো আঁখি-তারা
বায়ে-ওড়া কেতকীর পীত পরিমল!
এ কোন্ শ্যামলী পরি পুবের পরিস্থানে কেঁদে কেঁদে যায় –
নবোদ্ভিন্ন কুঁড়ি-কদম্বের ঘন যৌবন-ব্যথায়!
জেগেছে বালার বুকে এক বুক ব্যথা আর কথা,
কথা শুধু প্রাণে কাঁদে,
ব্যথা শুধু বুকে বেঁধে, মুখে ফোটে শুধু আকুলতা!
কদম্ব তমাল তাল পিয়াল-তলায়
দূর্বাদল-মখমলে শ্যামলী-আলতা তার মুছে মুছে যায়!
বাঁধে বেণি কেয়া-কাঁটা বনে।
বিদেশিনি দেয়াশিনি একমনে দেয়া-ডাক শোনে!
দাদুরির আদুরি কাজরি
শোনে আর আঁখি-মেঘ-কাজল গড়ায়ে
দুখ-বারি পড়ে ঝরঝরি।
ঝিমঝিম রিমঝিম – রিমিরিমি রিম ঝিম
বাজে পাঁইজোর –
কে তুমি পুরবি বালা? আর যেন নাহি পাই জোর
চলা-পায়ে মোর, ও-বাজা আমারও বুকে বাজে।
ঝিল্লির ঝিমানি-ঝিনিঝিনি
শুনি যেন মোর প্রতি রক্ত-বিন্দু-মাঝে!
আমি ঝড়? ঝড় আমি? – না, না, আমি বাদলের বায়!
বন্ধু! ঝড় নাই কোথায়?
ঝড় কোথা? কই? –
বিপ্লবের লাল-ঘোড়া ওই ডাকে ওই –
ওই শোনো, শোনো তার হ্রেষার চিক্কুর,
ওই তার ক্ষুর-হানা মেঘে! –
না, না, আজ যাই আমি, আবার আসিব ফিরে,
হে বিদ্রোহী বন্ধু মোর! তুমি থেকো জেগে!
তুমি রক্ষী এ রক্ত-অশ্বের,
হে বিদ্রোহী অন্তর্দেবতা! – শুনো শুনো মায়াবিনী ওই ডাকে ফের –
পুবের হাওয়ায় –
যায় – যায় – সব ভেসে যায়
পুবের হাওয়ায় –
হায়! – (বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/jhor/
|
3005
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গালির ভঙ্গি
|
নীতিমূলক
|
লাঠি গালি দেয়, ছড়ি, তুই সরু কাঠি!
ছড়ি তারে গালি দেয়, তুমি মোটা লাঠি! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/galir-vonggi/
|
5796
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ধলভূমগড়ে আবার
|
প্রকৃতিমূলক
|
ধলভূমগড়ে আবার ফিরে গেলাম, যেন এক সৃষ্টিছাড়া
লোভে। ওরা আর কেউ নেই। তরুণ শালবৃক্ষটি, যাঁর
মূলে হিসি করেছিলাম, তিনি এখন পরিবার-প্রধান
হয়েছেন। তাঁর চামড়ায় আর তকতকে সবুজ আঁচ দেখা
যায় না। কাঁটা গাছের ঝাড়ে ঐ থোকা শাদা
ফুলগুলোর নাম কী, জানা হলো না এবারও, ফুলমণি নামে
যে মেয়েটি আমার ওষ্ঠ কামড়ে রক্তদর্শন করেছিল, সে
ডুবে মরেছে দূরের সুবর্ণরেখারয়। সেই নদীর শিয়রে এই
শেষ বিকেলে সূর্যের ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরছে এখন। পাঁচটি
বিশাল বর্শা বিধে আছে আকাশের উরুতে, যেন এই
মুহূর্তে এক দুর্ধর্ষ খেলা সাঙ্গ হলো। মহুয়ার দোকানটির
কোমরে ঐ সিমেন্টের বেদি না-থাকা ছিল ভালো।
ঐখানে এক উম্মাদিনী নর্তকী দেখিয়েছিল তার তেজী
স্তনের কাঁপন, তার নিতম্বের গোঠে ঝামড়ে উঠেছিল
অন্ধকার। শালিকের মতন সে চলে যাবার পরও শব্দটা
রেখে গেছে। মাতালের অট্টহাসি থামিয়ে দেয় ট্রেনের হুইস্্ল।
জঙ্গলের মধ্যে তিনশো পা স্তব্ধভাবে হেঁটে এক
শুকনো খাঁড়ির পাশে আমরা তিন বন্ধু হাঁটু গেড়ে বসি।
পুরোনো সৈনিকদের ফিরে আসার কথা ছিল, সর্বাঙ্গ
ক্ষতবিক্ষত, তবু আমরা এসেছি। চিনতে পারো?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/450
|
3116
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জ্যোতিষী
|
ছড়া
|
ওই যে রাতের তারা
জানিস কি , মা , কারা ?
সারাটিখন ঘুম না জানে
চেয়ে থাকে মাটির পানে
যেন কেমনধারা!
আমার যেমন নেইকো ডানা ,
আকাশ - পানে উড়তে মানা ,
মনটা কেমন করে ,
তেমনি ওদের পা নেই বলে
পারে না যে আসতে চলে
এই পৃথিবীর ‘পরে ।
সকালে যে নদীর বাঁকে
জল নিতে যাস কলসী কাঁখে
সজনেতলার ঘাটে ,
সেথায় ওদের আকাশ থেকে
আপন ছায়া দেখে দেখে
সারা পহর কাটে ।
ভাবে ওরা চেয়ে চেয়ে
' হতেম যদি গাঁয়ের মেয়ে
তবে সকাল - সাঁজে
কলসিখানি ধরে বুকে
সাঁতরে নিতেম মনের সুখে
ভরা নদীর মাঝে ' ।
আর আমাদের ছাতের কোণে
তাকায় , যেথা গভীর বনে
রাক্ষসদের ঘরে
রাজকন্যা ঘুমিয়ে থাকে ,
সোনার কাঠি ছুঁইয়ে তাকে
জাগাই শয্যা‘পরে ।
ভাবে ওরা , আকাশ ফেলে
হত যদি তোমার ছেলে ,
এইখানে এই ছাতে
দিন কাটাত খেলায় খেলায়
তার পরে সেই রাতের বেলায়
ঘুমোত তোর সাথে ।
যেদিন আমি নিষুত রাতে
হঠাৎ উঠি বিছানাতে
স্বপন থেকে জেগে
জানলা দিয়ে দেখি চেয়ে
তারাগুলি আকাশ ছেয়ে
ঝাপসা আছে মেঘে ।
বসে বসে ক্ষণে ক্ষণে
সেদিন আমার হয় যে মনে
ওদের স্বপ্ন বলে ।
অন্ধকারের ঘুম লাগে যেই
ওরা আসে সেই পহরেই ,
ভোরবেলা যায় চলে ।
আঁধার রাতি অন্ধ ও যে ,
দেখতে না পায় , আলো খোঁজে ,
সবই হারিয়ে ফেলে ।
তাই আকাশে মাদুর পেতে
সমস্তখন স্বপনেতে
দেখা - দেখা খেলে । (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jyotishi/
|
5869
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
সেই
|
মানবতাবাদী
|
কারাগারের ভিতরে পড়েছিল জোছনা
বাইরে হাওয়া, বিষম হাওয়া
সেই হাওয়ায় নশ্বরতার গন্ধ
তবু ফাঁসির আগে দীনেশ গুপ্ত চিঠি লিখেছিল তার বৌদিকে,
“আমি অমর, আমাকে মারিবার সাধ্য কাহারও নাই।”মধ্যরাত্রির আর বেশি দেরি নেই
প্রহরের ঘণ্টা বাজে, সান্ত্রীও ক্লান্ত হয়
শিয়রের কাছে এসে মৃত্যুও বিমর্ষ বোধ করে।
কনডেমড সেলে বসে প্রদ্যুত ভট্টাচার্য লিখছেন,
“মা, তোমার প্রদ্যুত কি কখনো মরতে পারে ?
আজ চারিদিকে চেয়ে দেখ,
লক্ষ প্রদ্যুত তোমার দিকে চেয়ে হাসছে,
আমি বেঁচেই রইলাম মা, অক্ষয়”কেউ জানত না সে কোথায়,
বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ছেলেটি আর ফেরেনি
জানা গেল দেশকে ভালোবাসার জন্য সে পেয়েছে মৃত্যুদন্ড
শেষ মুহূর্তের আগে ভবানী ভট্টাচার্য
পোস্ট কার্ডে অতি দ্রুত লিখেছিল তার ছোট ভাইকে,
“অমাবস্যার শ্মশানে ভীরু ভয় পায়,
সাধক সেখানে সিদ্ধি লাভ করে,
আজ আমি বেশি কথা লিখব না
শুধু ভাববো মৃত্যু কত সুন্দর।”লোহার শিকের ওপর হাত,
তিনি তাকিয়ে আছেন অন্ধকারের দিকে
দৃষ্টি ভেদ করে যায় দেয়াল, অন্ধকারও বাঙময় হয়
সূর্য সেন পাঠালেন তার শেষ বাণী,
“আমি তোমাদের জন্য কি রেখে গেলাম ?
শুধু একটি মাত্র জিনিস,
আমার স্বপ্ন একটি সোনালি স্বপ্ন,
এক শুভ মুহূর্তে আমি প্রথম এই স্বপ্ন দেখেছিলাম ।”সেই সব স্বপ্ন এখনও বাতাসে উড়ে বেড়ায়
শোনা যায় নিঃশ্বাসের শব্দ
আর সব মরে স্বপ্ন মরে না
অমরত্বের অন্য নাম হয়
কানু, সন্তোষ, অসীম রা…
জেলখানার নির্মম অন্ধকারে বসে
এখনও সেরকম স্বপ্ন দেখছে
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b8%e0%a6%ac-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%8b/
|
2323
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
জয়দেব
|
সনেট
|
চল যাই, জয়দেব, গোকুল-ভবনে
তব সঙ্গে, যথা রঙ্গে তমালের তলে
শিখীপুচ্ছ-চূড়া শিরে, পীতধড়া গলে
নাচে শ্যাম, বামে রাধা— সৌদামিনী ঘনে!
না পাই যাদবে যদি, তুমি কুতূহলে
পূরিও নিকুঞ্জরাজী বেণুর স্বননে।
ভুলিবে গোকুল-কুল এ তোমার ছলে,—
নাচিবে শিখিনী সুখে, গাবে পিকগণে,—
বহিবে সমীর ধীরে সুস্বর-লহরী,—
মৃদুতর কলকলে কালিন্দী আপনি
চলিবে। আনন্দে শুনি সে মধুর ধ্বনি,
ধৈরজ ধরি কি রবে ব্রজের সুন্দরী?
মাধবের রব, কবি, ও তব বদনে,
কে আছে ভারতে ভক্ত নাহি ভাবে মনে?(চতুদ্দর্শপদী কবিতাবলী)
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/joydeb/
|
4198
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
আমাকে
|
প্রেমমূলক
|
ও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও
প্রথমে পোঁড়াও ওই পা দুটি
যা ছলৎ শক্তি হীন ।
তারপর যে হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই
এখন বাহুর ফাদে ফুলের বর
এখন কাঁধের পরে দায়িত্বহীনতা
ওদের পুঁড়িয়ে
এসো , এসো হৃদয়ের কাছে
দাঁড়াও লহমা।
তারপর ,ধংস করো
সত্য মিথ্যা রঙ্গে
শীতে স্তব্ধ জ্ঞান পীট ।
রক্ষা করো, রক্ষা করো দুটি চোখ
হয়ত তাদের এখনো দেখার কিছু কিছু বাকী আছে ।
অশ্রুপাত শেষ হলে , নষ্ট করো আঁখি ।
কুঁড়িয়ো না ফুলো মালা
স্তবক সুগন্ধে আলু থালু প্রিয়কর স্পর্শ
ওর গায়ে লেগে আছে
গঙ্গা জ্বলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত ,স্বেচ্ছাচারী
ও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুনও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও
প্রথমে পোঁড়াও ওই পা দুটি
যা ছলৎ শক্তি হীন ।
তারপর যে হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই
এখন বাহুর ফাদে ফুলের বর
এখন কাঁধের পরে দায়িত্বহীনতা
ওদের পুঁড়িয়ে
এসো , এসো হৃদয়ের কাছে
দাঁড়াও লহমা।
তারপর ,ধংস করো
সত্য মিথ্যা রঙ্গে
শীতে স্তব্ধ জ্ঞান পীট ।
রক্ষা করো, রক্ষা করো দুটি চোখ
হয়ত তাদের এখনো দেখার কিছু কিছু বাকী আছে ।
অশ্রুপাত শেষ হলে , নষ্ট করো আঁখি ।
কুঁড়িয়ো না ফুলো মালা
স্তবক সুগন্ধে আলু থালু প্রিয়কর স্পর্শ
ওর গায়ে লেগে আছে
গঙ্গা জ্বলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত ,স্বেচ্ছাচারী
ও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%8b%e0%a7%9c%e0%a6%be%e0%a6%93-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a7%8b%e0%a6%aa/#respond
|
3550
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাতাসে তাহার প্রথম পাপড়ি
|
নীতিমূলক
|
বাতাসে তাহার প্রথম পাপড়ি
খসায়ে ফেলিল যেই,
অমনি জানিয়ো, শাখায় গোলাপ
থেকেও আর সে নেই। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/batashe-tahar-prothom-papri/
|
1459
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
আক্রোশ
|
প্রেমমূলক
|
আকাশের তারা ছিঁড়ে ফেলি আক্রোশে,
বিরহের মুখে স্বপ্নকে করি জয়ী;
পরশমথিত ফেলে আসা দিনগুলি
ভুলে গেলে এতো দ্রুতো,হে ছলনাময়ী?পোড়াতে পোড়াতে চৌচির চিতা নদী
চন্দনবনে আগ্নির মতো জ্বলে,
ভূকম্পনের শিখরে তোমার মুখ
হঠাৎ স্মৃতির পরশনে গেছে গলে ।ফিরে গেলে তবু প্রেমাহত পাখি একা,
ঝড় কি ছিলো না সেই বিদায়ের রাতে >
ভুলে গেলে এতো দ্রুত, হে ছলনাময়ী,
পেয়েছিলে তাকে অনেক রাত্রিপাতে ।শব্দের চোখে করাঘাত করি ক্রোধে,
জাগাই দিনের ধূসর প্রতিচ্ছবি ।
না-পাওয়া মুখের মুখর সুষমা দিয়ে,
তবুও তোমার ছলনা-আহত কবি
তোমাকেই লেখে, তোমাকেই রচে প্রিয় !
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/akrosh/
|
172
|
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
|
মাতৃভাষা
|
স্বদেশমূলক
|
মায়ের কোলেতে শুয়ে ঊরুতে মস্তক থুয়ে
খল খল সহাস্য বদন।
অধরে অমৃত ক্ষরে আধ আধ মৃদু স্বরে
আধ আধ বচনরচন।।
কহিতে অন্তরে আশা মুখে নাহি কটু ভাষা
ব্যাকুল হয়েছে কত তায়।
মা-ম্মা-মা-মা-বা-ব্বা-বা-বা আবো আবো আবা আবা
সমুদয় দেববাণী প্রায়।।
ক্রমেতে ফুটিল মুখ উঠিল মনের সুখ
একে একে দেখিলে সকল।
মেসো, পিসে, খুড়ো, বাপ জুজু, ভুত, ছুঁচো, সাপ
স্থল জল আকাশ অনল।।
ভাল মন্দ জানিতে না, মল মুত্র মানিতে না,
উপদেশ শিক্ষা হল যত।
পঞ্চমেতে হাতে খড়ি, খাইয়া গুরুর ছড়ি,
পাঠশালে পড়িয়াছ কত।।
যৌবনের আগমনে, জ্ঞানের প্রতিভা সনে,
বস্তুবোধ হইল তোমার।
পুস্তক করিয়া পাঠ, দেখিয়া ভবের নাট,
হিতাহিত করিছ বিচার।।
যে ভাষায় হয়ে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত
বৃদ্ধকালে গান কর মুখে।
মাতৃসম মাতৃভাষা পুরালে তোমার আশা
তুমি তার সেবা কর সুখে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/ishwarchandragupta/matribhasha/
|
4204
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
একবার তুমি
|
প্রেমমূলক
|
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা কর–
দেখবে, নদির ভিতরে, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরে পড়ছে
পাথর পাথর পাথর আর নদী-সমুদ্রের জল
নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল
একবার তুমি ভাল বাসতে চেষ্টা কর ।বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল–ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়
সমস্ত পায়ে-হাঁটা পথই যখন পিচ্ছিল, তখন ওই পাথরের পাল একের পর এক বিছিয়ে
যেন কবিতার নগ্ন ব্যবহার, যেন ঢেউ, যেন কুমোরটুলির সলমা-চুমকি-জরি-মাখা প্রতিমা
বহুদূর হেমন্তের পাঁশুটেনক্ষত্রের দরোজা পর্যন্ত দেখে আসতে পারি ।বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল
চিঠি-পত্রের বাক্স বলতে তো কিছু নেই–পাথরের ফাঁক-ফোকরে রেখে এলেই কাজ হাসিল–
অনেক সময় তো ঘর গড়তেও মন চায় ।মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে
আমাদের সবই দরকার । আমরা ঘরবাড়ি গড়বো–সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো ।রূপোলি মাছ পাথর ঝরাতে-ঝরাতে চলে গেলে
একবার তুমি ভালবাসতে চেষ্টা করো ।
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/ekbar-tumi/
|
5075
|
শামসুর রাহমান
|
ভ্রাতৃসংঘ
|
মানবতাবাদী
|
(অগ্রজ জনাব আজিজুর রাহমান চৌধুরীকে)আমার প্রথম ভাই কান্তিমান, স্কুল-ছুট, সতত বালক
(এমনকি মধ্যবয়সেও)
নবাববাড়ীর নওশা, আলাভোলা, প্রখর, যৌবনে
ছিলেন উড়নচণ্ডী। পরিণীতা, পুত্র রইল পড়ে
এবং হলেন তিনি দেশান্তরী, ঘুরে বেড়ালেন
সার্কাস পার্টির সঙ্গে। সাত ঘাটে আঁজলা ভরিয়ে,
ভিজিয়ে পায়ের পাতা একদিন শেষে
ঘরের উধাও ছেলে ফিরে এলো ঘরে। তারপর
কাটে তাঁর অনুজ্জ্বল বৈচিত্র্যরহিত দিনগুলি
সংসারের ভাঙ্গা
খাঁচায় এবং অকস্মাৎ
কোনো মধ্যরাতে খাঁচার ভিতর থেকে
অস্থির অচিন পাখি উড়ে গেল অনন্তের দিকে।
আমার দ্বিতীয় ভাই, আবাল্যে তুখোড় ডানপিটে,
দীর্ঘকায়, সুদর্শন, পৌরুষে ভাস্বর।
ভ্রমণবিলাসী তিনি কলেজ পালিয়ে মেহগনি বাক্স ভেঙে
ঘুরেছেন দাক্ষিণাত্যে মন্দিরে মন্দিরে, অজন্তার
বিখ্যাত গুহায় আর দিলেন কাটিয়ে
দিল্লিতে ভক্তিতে মজে হজরত নিজামউদ্দীন আউলিয়ার মাজারে
দু’তিন বছর। গত বিশ্বযুদ্ধে পাঠাতেন তারবার্তা
ব্রিটিশ জাহাজ থেকে, মনে পড়ে। হঠাৎ খেয়ালে
জাহাজের খোল ছেড়ে সেই যে এলেন
নিজের ডাঙায় ফিরে, তাকে আর ভোলাতে পারেনি
সমদ্রের গান; এমনকি যে ইহুদি রমণী বিদেশে
ছিলেন দয়িতা, তার ঘাগড়ার রেশমি টান, চোখের কুহক
ফেরাতে পারেনি তাঁকে ভবঘুরে জীবনের বাঁকে
বাঁকে, অনন্তর সমুদ্রের ঢেউ নয়, কোনো রমণীয় শরীরের
চড়াই-উতরাই নয়, তরুণ ঘোড়ার
পেশি-তরঙ্গের প্রতি
কী দুর্মর আকর্ষণ তাঁর। রেসের মরীচিকায়, তাসের আড্ডায়
রেখেছেন জীবন বন্ধক।
এখন যখন তিনি আরমানীটোলার পথ দিয়ে
হেঁটে যান ক্লান্ত, রুগ্ন, ভীষণ একাকী,
যুদ্ধাহত সৈনিকের মতো,
তখন মুখাবয়বে তাঁর ছয় দশকের আর্তি,
বহ্নুদ্যৎসব, হাহাকার,
প্রমাদ, চিৎকার জেগে থাকে অবেলায়।আমার তৃতীয় ভাই ছিলেন মাঝারি গড়নের,
ইস্পাতি শরীর তার ঝলসাত মাঠের রোদ্দুরে গোল্লাছুট
কাবাডি খেলায়,
ক্রোধের ভিমরুল তাঁকে কামড়ালে, কালো কপালের
কাটা দাগ আরও চিকচিকে আর গাঢ় হয়ে যেত।
কখনো কখনো তিনি নাকীসুরে খুব দুলে দুলে
গাইতেন ফিল্মি গান এবং বন-বাদাড়ে একা-একা
কাটত সময় আর বলতেন তাঁর
চোখ ভেসে ওঠে কত
সুন্দর আজীব গাছপালা, জীব-জানোয়ার কিমাকার আর
অতল পাতাল।
যখন এ. আর. পি.-তে লেখালেন নাম,
উর্দি-পরা তাঁকে
দিব্যি বীর-বীর লেগেছিল। ছিলেন অকৃতদার আর
অকস্মাৎ এ কি বজ্রপাত
আমাদের ঘরে-
আমার তৃতীয় ভাই ক্রূর পিত্তশূলে হলেন অকালমৃত
প্রেমিকার চুম্বনবিহীন,
সন্তানের আলিঙ্গনহীন।আমার চতুর্থ ভাই পিতার মিনিয়েচর, তেজী
একরোখা, স্পষ্টভাষা! ন্যায়-অন্যায়ের তুলাদণ্ডে
সর্বদা নিবদ্ধ দৃষ্টি তার, উপার্জনে নিয়ত সংগ্রামশীল,
সামাজিক নিমন্ত্রণে অকুণ্ঠ, উদার;
ভোজনবিলাসী, নীড়প্রিয়
বাবুই পাখির মতো গোছায় সংসার প্রতিদিন।
পুরানো প্রথাম প্রতি নতজানু; এই শতকের
রোদে পিঠ দিয়ে ভালোবাসে মধ্যযুগী মায়াবী আঁধার।
নিত্য সুরে-সাদেকের আলো-আঁধারিতে
করে পাঠ কলমা দরুদ।আমার পঞ্চম ভাই সুকান্ত, সৌজন্যময় আর
রুচিবান এবং সবার প্রীতিসাধনে তৎপর
সর্বক্ষণ, পরমতসহিষ্ণু অথচ সুতাকিক।
গোঁড়ামির প্রতি সায় নেই তার, গ্রন্থপ্রিয় মন
করে বিচরণ মুক্তবুদ্ধির মিনারে, উপরন্তু,
সংগীত-নির্ঝরে স্নাত নিয়মিত, আদালতে
সাজিয়ে কথার পিঠে চোস্ত কথা কুড়ায় বাহবা,
দীপ্ত অধ্যাপকও বটে। বস্তুত সে স্নিগ্ধ বুদ্ধিজীবী।আমার কনিষ্ঠ ভাই চটপটে, বেপরোয়া, বড় ঝলমলে;
নিখুঁত টাইয়ের নট, গায়ে হাল-ফ্যাশনের নানা
পোশাক-আশাক।
আকৈশোর অভিযানে মাতাল। তাই সে
প্রায়শ জমায় পাড়ি দূর দেশে, যেন
কোনো নামহীন দ্বীপ থেকে
আনবে নির্যাস ছেঁকে রহস্যের কিংবা অতল পাতাল থেকে
মণিরত্ন, যেন নিমেষেই নেমে যাবে তুড়ি মেরে
দুর্গম খনিতে একা। নৈরাশ্যের থুতনি নাড়িয়ে দিয়ে জোরে
‘যে যাই বলুক আমি বাণিজ্যেতে যাবোই’ বলে সে
আমার কনিষ্ঠ ভাই ভাসিয়েছে সমদ্রে জাহাজ।কখনো-কখনো ভাবি আমার ভ্রাতৃ-সংঘের কতটুকু আছে
নিহিত আমার মধ্যে? কার চোখ, কার মুখভঙ্গি
হুবহু প্রতিফলিত আমার সত্তায়?
কার কোন আচরণ করি ব্যবহার মুদ্রাদোষের মতন
আমিও অজান্তে মাঝে মাঝে?
আর মাঝে-মধ্যে আমাদের
বংশের প্রাচীন
নামহীন কত পুরুষের অজ্ঞাত জীবনী
মন্ত্রের মতন গুঞ্জরিত হতে চায়
আমার নিজস্ব অবচেতনের রহস্য-শোষক তন্দ্রাচ্ছন্ন স্তরে স্তরে। (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/vratrisonggho/
|
3570
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিচ্ছেদ
|
ছড়া
|
বাগানে ওই দুটো গাছে
ফুল ফুটেছে কত যে,
ফুলের গন্ধে মনে পড়ে
ছিল ফুলের মতো যে।
ফুল যে দিত ফুলের সঙ্গে
আপন সুধা মাখায়ে,
সকাল হত সকাল বেলায়
যাহার পানে তাকায়ে,
সেই আমাদের ঘরের মেয়ে
সে গেছে আজ প্রবাসে,
নিয়ে গেছে এখান থেকে
সকাল বেলার শোভা সে।
একটুখানি মেয়ে আমার
কত যুগের পুণ্য যে,
একটুখানি সরে গেছে
কতখানিই শূন্য যে।
বিষ্টি পড়ে টুপুর টুপুর,
মেঘ করেছে আকাশে,
উষার রাঙা মুখখানি আজ
কেমন যেন ফ্যাকাশে।
বাড়িতে যে কেউ কোথা নেই,
দুয়োরগুলো ভেজানো,
ঘরে ঘরে খুঁজে বেড়াই
ঘরে আছে কে যেন।
ময়নাটি ওই চুপটি করে
ঝিমোচ্ছে সেই খাঁচাতে,
ভুলে গেছে নেচে নেচে
পুচ্ছটি তার নাচাতে।
ঘরের-কোণে আপন-মনে
শূন্য প'ড়ে বিছানা,
কার তরে সে কেঁদে মরে—
সে কল্পনা মিছা না।
বইগুলো সব ছড়িয়ে আছে,
নাম লেখা তায় কার গো।
এম্নি তারা রবে কি হায়,
খুলবে না কেউ আর গো।
এটা আছে সেটা আছে
অভাব কিছু নেই তো—
স্মরণ করে দেয় রে যারে
থাকে নাকো সেই তো। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bicched/
|
4227
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
প্রভু, নষ্ট হয়ে যাই
|
ভক্তিমূলক
|
বার বার নষ্ট হয়ে যাই
প্রভু, তুমি আমাকে পবিত্র
করো, যাতে লোকে খাঁচাটাই
কেনে, প্রভু নষ্ট হয়ে যাই
বার বার নষ্ট হয়ে যাই
একবার আমাকে পবিত্র
করো প্রভু, যদি বাঁচাটাই
মুখ্য, প্রভু, নষ্ট হয়ে যাই!
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/probhu-noshto-hoye-jai/
|
4943
|
শামসুর রাহমান
|
প্রকৃত বোদ্ধা যদি
|
চিন্তামূলক
|
কে তুমি এখন এই অবেলায় আমাকে ঘুমের
শান্তি থেকে জাগিয়ে তুলেছ
অন্ধকারে? বেশ কিছুক্ষণ পরে নানা শব্দের
অনুরণে চোখ দু’টি বুজে এলে কে যেন হঠাৎ
আমাকে খুঁচিয়ে তুলে দেয়; চেয়ে দেখি
কেউ নেই, বাতাসের খুব জোর স্পর্শ থাকি।কিছুক্ষণ ডানে বামে ঘুরে পুনরায় ঘুমোবার
চেষ্টায় প্রলুপ্ত হয়ে চোখের পাতাকে
শান্তি দিতে চেয়ে ব্যর্থ হই। কিছুক্ষণ পরে হাতে
হাল আমলের এক বাক্যগ্রন্থ নিয়ে কেন জানি
ব্যর্থ হই। তবে কি আমাকে পদ্য ত্যাগ
করেছে আখেরে? ঘরে এলোমেলো পায়চারি করি।আমি কি উন্মদ হয়ে যাব? না হলে এমন হাল
হচ্ছে কেন আমার? কবিতা, অনেকেই
জানেন আমার প্রাণ। যদি সে আমাকে
ছেড়ে যায় ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরের মতো, তবে আমি
ঘরে ও বাইরে ঘুরে বেড়ালেও নিষ্প্রাণ পুতুল
হয়ে থেকে যাব আর বকব প্রলাপ।এখনও আমার লেখা কবিতা অনেকে,
যতদূর জানি, দিব্যি ভালোবেসে পড়েন এবং
তাদের বিশেষ অপছন্দ হলে ঠিক জানিয়ে ছাড়েন।
প্রকৃতই বোদ্ধা যারা তারা নিন্দা ছুড়ে
দিলে খেদ নেই কোনও, উপরন্তু বেশ কিছু ভেবে
ভবিষ্যতে শুধরে নেয়ার চেষ্টা থেকে হই না বিরত। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prokito-boddha-jodi/
|
4991
|
শামসুর রাহমান
|
বয়স যতই হোক
|
সনেট
|
বয়স যতই হোক, আজো অমিলের ভিড়ে মিল
খুঁজে ফিরি বন্ধ ঘরে, প্রত্যেকের থেকে অন্তরালে
একটু আলাদা ভাবে থাকি কিছুকাল। কী হারালে
বিনিময়ে কী লভ্য সে-কথা ভেবে কিছু ঢিল
ছোঁড়া যায় নক্ষত্রের আস্তানায়। আলৌকিক ঝিল
আমার ভেতরে উচ্ছ্বসিত, অস্তিত্বের তন্তুজালে
গভীর সরোদ বেজে ওঠে। সে কোন্ সুদূর কালে
ছিলেন আমারই মতো তপোক্লিষ্ট হোমার, ভার্জিল-এ-কথা স্বরণে রেখে নিজেকেই উস্কে দেয়া যায়
মাঝে মধ্যে; তবে এ-ও জানি শূন্য ফাটা কলসের
মতো বেজে ওঠা শুধু আত্মপ্রবঞ্চককে মানায়।
তাই একা, বড়ো একা কাটাই প্রহর কলমের
স্পর্শে মূলহীন লাল-নীল কমলের জাগরণ
দেখে, দেখে মরুবেক্ষ হরিণ-কোমল ঘন বন। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/boyos-jotoi-hok/
|
939
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আলোক পত্র
|
ভক্তিমূলক
|
হে নদী আকাশ মেঘ পাহাড় বনানী,
সৃজনের অন্ধকার অনির্দেশ উৎসের মতন
আজ এই পৃথিবীতে মানুষের মন
মনে হয়; অধঃপতিত এক প্রাণী।
প্রেম তার সব চেয়ে ছায়া, নিরাধার
নিঃস্বতায়- অকৃত্রিম আগুনের মত
নিজেকে না চিনে আজ রক্তে পরিণত
হে আগুন, কবে পাব জ্যোতিঃদীপাধার।
মানুষের জ্ঞানালোক সীমাহীন শক্তি পরিধির
ভিতরে নিঃসীম;
ক্ষমতার লালসায় অহেতুক বস্তুপুঞ্জে হুম;
সূর্য নয়- তারা নয়- ধোঁইয়ার শরীর।এ অঙ্গার অগ্নি হোক, এই অগ্নি ধ্যানালোক হোক;
জ্ঞান হোক প্রেম,- প্রেম শোকাবহ জ্ঞান
হৃদয়ে ধারণ ক’রে সমাজের প্রাণ
অধিক উজ্জ্বল অর্থে করে নিক অশোক আলোক।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/alokpotro/
|
61
|
আবিদ আনোয়ার
|
ঈগল ও ঈশ্বর
|
চিন্তামূলক
|
আকাশে চক্কর কেটে গিরিশৃঙ্গে বসে আছে বিশাল ঈগল
শ্যেনদৃষ্টি দিয়ে চষে আপন ব্রহ্মাণ্ড তার―ডাঙা থেকে জল:
মীনরাজ্যে রাঘবেরা লেজ নাড়ে বিলে কিংবা খাদে,
ছাগ-মেষ-মৃগশিশু অকারণে লাফায় আহ্লাদে,
মায়ের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে কখনো যদি দূরে চলে যায়
ইঙ্গিতে উঁচিয়ে গ্রীবা ডেকে আনে আপন ভাষায়;
ক্ষুধার পীড়নে কারও কখনোবা মনে পড়ে মায়ের ওলান
নিজদায়ে ফিরে এসে মাতৃসুধা অমৃতের মতো করে পান।বুলিয়ে লোলুপ দৃষ্টি মনে-মনে হেসে ওঠে অন্য একজন
সুউচ্চ পৈঠায় বসে গোপনে-গোপনে করে দীর্ঘ নিরীক্ষণ;
মাৎস্যন্যায়ে যে-বোয়াল সরপুঁটিকে করেছে হজম
বিলের সম্রাট ভেবে বোঝে না সে তারও আছে যম।নধর ছাগলছানা এবং ঈগল দু’জনকেই গড়েছেন বিধি
তবুও শেষোক্তজন গুণেমানে ঈশ্বরের যোগ্য প্রতিনিধি:
দু’জনই আকাশচারী নিজ নিজ শিকারের দৃষ্টি থেকে দূরে
অমোঘ থাবায় গেঁথে শেষে তাকে নিয়ে যায় নিজ অন্তঃপুরে―
ক্ষুদ্রতম কীট থেকে পিপীলিকা, নর-নারী, শুণ্ডী-ঐরাবত
সীমিত আয়ুর শেষে কেউবা নরকযানে কেউ চড়ে চারু স্বর্গরথ।জীবের সুখাদ্য জীব―এই মর্মে বোঝা যায় ঈগলের খাঁই,
তিনি কেন সর্বভুক যার কোনো ক্ষুধা-তৃষ্ণা নাই?
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/eagle-o-ishwar/
|
1241
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সূর্য নক্ষত্র নারী - ১
|
প্রেমমূলক
|
তোমার নিকট থেকে সর্বদাই বিদায়ের কথা ছিলো
সব চেয়ে আগে; জানি আমি।
সে-দিনও তোমার সাথে মুখ-চেনা হয় নাই।
তুমি যে এ-পৃথিবীতে র’য়ে গেছো।
আমাকে বলেনি কেউ।
কোথাও জলকে ঘিরে পৃথিবীর অফুরান জল
র’য়ে গেছে;-
যে যার নিজের কাজে আছে, এই অনুভবে চ’লে
শিয়রে নিয়ত স্ফীত সুর্যকে চেনে তারা;
আকাশের সপ্রতিভ নক্ষত্রকে চিনে উদীচীর
কোনো জল কী ক’রে অপর জল চিনে নেবে অন্য নির্ঝরের?
তবুও জীবন ছুঁ’য়ে গেলে তুমি;-
আমার চোখের থেকে নিমেষ নিহত
সূর্যকে সরায়ে দিয়ে।
স’রে যেতো; তবুও আয়ুর দিন ফুরোবার আগে।
নব-নব সূর্যকে কে নারীর বদলে
ছেড়ে দেয়; কেন দেব? সকল প্রতীতি উৎসবের
চেয়ে তবু বড়ো
স্থিরতর প্রিয় তুমি;- নিঃসূর্য নির্জন
ক’রে দিতে এলে।
মিলন ও বিদায়ের প্রয়োজনে আমি যদি মিলিত হতাম
তোমার উৎসের সাথে, তবে আমি অন্য সব প্রেমিকের মতো
বিরাট পৃথিবী আর সুবিশাল সময়কে সেবা ক’রে আত্মস্থ হতাম।
তুমি তা জানো না, তবু, আমি জানি, একবার তোমাকে দেখেছি;-
পিছনের পটভূমিকায় সময়ের
শেষনাগ ছিলো, নেই;- বিজ্ঞানের ক্লান্ত নক্ষত্রেরা
নিভে যায়;- মানুষ অপ্রিজ্ঞাত সে-আমায়; তবুও তাদের একজন
গভীর মানুষী কেন নিজেকে চেনায়!
আহা, তাকে অন্ধকার অনন্তের মতো আমি জেনে নিয়ে, তবু,
অল্পায়ু রঙিন রৌদ্রে মানবের ইতিহাসে কে না জেনে কোথায় চলেছি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/551
|
5379
|
শ্রীজাত
|
ধর্ম
|
চিন্তামূলক
|
এখনওএখনও আসে নতুন লেখা, মগজ থেকে শব্দ নামে ঠোঁটে
এখনও মাথাখারাপ, ঘোড়া দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটেবাচ্চাদের গান শেখাই, ছাত্রপিছু দেড়শো টাকা মোটে
শুঁকে বেড়াই ঘরদুয়ার, কোথাও যদি কিছু একটা জোটেএখনও পাড়া সাজানো হয়। সবাই মিলে ছুটি কাটায় ভোটে
কোনও হাতের ছাপ পড়ে না গান্ধীজির হাসিতে ভরা নোটেএখনও জমে ক্রিকেট ম্যাচ, উত্তেজিত মানুষ নখ খোঁটে
ঘাড়ে রদ্দা পড়লে কথা বেরিয়ে যায় ভেদবমির চোটেএখনও লোকে হাঁপায় আর টিকটিকিরা দেয়ালে মাথা কোটে
এখনও প্রেম জনপ্রিয়। এখনও টবে গোলাপফুল ফোটে…তোমার কথা ভাবলে আজও পুরুষাঙ্গ শক্ত হয়ে ওঠে
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a7%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4/
|
2121
|
মহাদেব সাহা
|
কাফফার বিমর্ষ পৃথিবী
|
চিন্তামূলক
|
একদিন ভোরবেলা যদি সন্ধ্যা হয়
কিংবা মধ্যরাতে ওঠে হঠাৎ ভোরের সূর্য
এই পুরনো মলিন চাঁদ তরল সোনার মতো
গলে গলে পড়ে,
জলাশয়ে পাখিরা সাঁতার কাটে
জলের রুপালি মাছ সহসা হাঁটতে থাকে
এই ফুটপাতে,
তাহলে কি এই দৃশ্যগুলো খুবই উদ্ভট বেখাপ্পা
মনে হবে?
একেবারে অবিশ্বাস্য মনে হবে এই ভোর
হঠাৎ এমন সন্ধ্যা হয়ে গেলে-
মধ্যরাত হয়ে গেলে রৌদ্রতপ্ত দিন,
জলাশয়ে পাখিরা সাঁতার কেটে স্বচ্ছন্দে বেড়ালে
কিংবা মাছগুলি ফুটপাতে যদি হেঁটে যায়!
অথবা হঠাৎ কেউ ঘুম থেকে উঠে যদি দেখে
তার গায়ে পশুর মতন লোম, বাঘের মতন থাবা
মুখে সিংহের ধারালো দাঁত
কিংবা এই উচ্ছ্বসিত নৃত্যের আসর যদি হয়ে যায়
দুগৃম প্রাচীন দুর্গ,
পৌরাণিক অভিশাপ যদি হঠাৎ আবার
সত্য হতে থাকে।
কেউ হয় নিশ্চল পাষাণ,
কেউ দৈত্য, কেউ বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীট,
তাহলে কি খুবই বিস্ময় ঘনাবে দুই চোখে,
মনে পড়ে যাবে কাফফার বিমর্ষ পৃথিবীর কথা?
কিন্তু এই মনোরম পৃথিবীতে কোথাও কি ঘটছে না
এইসব কিছু, কারো হাত, কারো মুখ,
কারো কারো চোখ
সিংহ ও ব্যাঘ্রের নখদন্তের চেয়েও কি ভয়ঙ্কর নয়?
পৃথিবীতে কাফফার অনুরূপ এই পৃথিবী দেকেও তবু কেন
লাগে না মোটেও ধাঁধা আমাদের চোখে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1380
|
1525
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
স্মরণ
|
প্রেমমূলক
|
নাম ভুলে গেছি, দুর্বল মেধা
স্মরণে রেখেছি মুখ;
কাল রজনীতে চিনিব তোমায়
আপাতত স্মৃতিভুক ।ডাকিব না প্রিয়, কেবলি দেখিব
দু’চোখে পরান ভরে;
পূজারী যেমন প্রতিমার মুখে
প্রদীপ তুলিয়া ধরে ।তুমি ফিরে যাবে উড়ন্ত রথে
মাটিতে পড়িবে ছায়া,
মন্দির খুঁড়ে দেখিব তোমায়
মন্দ্রিত মহামায়া ।ভুলে যাব সব সময়-নিপাতে
স্মরণে জাগিয়ে প্রেম,
আঁধারে তখন জ্বলিবে তোমার
চন্দনে মাখা হেম ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81-%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%a3/
|
154
|
আহসান হাবীব
|
আমি কোনো আগন্তুক নই
|
স্বদেশমূলক
|
আসমানের তারা সাক্ষী
সাক্ষী এই জমিনের ফুল, এই
নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী
সাক্ষী এই জারুল জামরুল, সাক্ষী
পূবের পুকুর, তার ঝাকড়া ডুমুরের পালেস্থিরদৃষ্টি
মাছরাঙা আমাকে চেনে
আমি কোনো অভ্যাগত নই
খোদার কসম আমি ভিনদেশী পথিক নই
আমি কোনো আগন্তুক নই
আমি কোনো আগন্তুক নই, আমি
ছিলাম এখানে, আমি স্বাপ্নিক নিয়মে
এখানেই থাকি আর
এখানে থাকার নাম সর্বত্রই থাকা –
সারা দেশে।
আমি কোনো আগন্তুক নই। এই
খর রৌদ্র জলজ বাতাস মেঘ ক্লান্ত বিকেলের
পাখিরা আমাকে চেনে
তারা জানে আমি কোনো অনাত্মীয় নই।
কার্তিকের ধানের মঞ্জরী সাক্ষী
সাক্ষী তার চিরোল পাতার
টলমল শিশির, সাক্ষী জ্যোৎস্নার চাদরে ঢাকা
নিশিন্দার ছায়া
অকাল বার্ধক্যে নত কদম আলী
তার ক্লান্ত চোখের আঁধার
আমি চিনি, আমি তার চিরচেনা স্বজন একজন। আমি
জমিলার মা’র
শূন্য খা খা রান্নাঘর শুকনো থালা সব চিনি
সে আমাকে চেনে
হাত রাখো বৈঠায় লাঙ্গলে, দেখো
আমার হাতের স্পর্শ লেগে আছে কেমন গভীর। দেখো
মাটিতে আমার গন্ধ, আমার শরীরে
লেগে আছে এই স্নিগ্ধ মাটির সুবাস।
আমাকে বিশ্বাস করো, আমি কোনো আগন্তুক নই।
দু’পাশে ধানের ক্ষেত
সরু পথ
সামনে ধু ধু নদীর কিনার
আমার অস্তিত্বে গাঁথা। আমি এই উধাও নদীর
মুগ্ধ এক অবোধ বালক।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3797.html
|
482
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
রাখীবন্ধন
|
প্রকৃতিমূলক
|
সই পাতালো কি শরতে আজিকে স্নিগ্ধ আকাশ ধরণী?
নীলিমা বাহিয়া সওগাত নিয়া নামিছে মেঘের তরণী!অল্কার পানে বলাকা ছুটিছে মেঘ-দূত- মন মোহিয়া
চঞ্চুতে রাঙ্গা কলমীর কুঁড়ি- মরতের ভেট বহিয়া।সখীর গাঁইয়ের সেঁউতি- বোঁটার ফিরোজায় রেঙ্গে পেশোয়াজ
আসমানী আর মৃন্ময়ী সখী মিশিয়াছে মেঠো পথ- মাঝ।আকাশ এনেছে কুয়াশা- উড়ুনী, আসমানী- নীল- সাঁচুলী,
তারকার টিপ, বিজলীর হার, দ্বিতীয় - চাঁদের হাঁসুলী।ঝরা বৃষ্টির ঝরঝর আর পাপিয়া শ্যামার কূজনে
বাজে নহবত আকাশ ভূবনে- সই পাতিয়েছে দু-জনে!আকাশের দাসী সমীরণ আনে শ্বেত পেঁজা- মেঘ ফেনা ফুল,
হেথা জলে থলে কুমুদে আলুথালু ধরা বেয়াকুল।
আকাশ০ গাঙ্গে কি বান ডেকেছে গো, গান গেয়ে চলে বরষা,
বিজুরীর গুণ টেনে টেনে চলে মেঘ- কুমারীরা হরষা।হেথা মেঘ পানে কালো চোখ হানে মাটির কুমার মাঝিরা,
জল ছুড়ে মারে মেঘ-বালা দল, বলে- 'চাহে দেখ পাজীরা!'কহিছে আকাশ, 'ওলো সই, তোর চকোরে পাঠাস নিশিথে,
চাঁদ ছেনে দেবো জোছনা- অমৃত তোর ছেলে যত তৃষিতে।
আমারে পাঠাস সোঁদা- সোঁদা- বাস তোর ও-মাটির সুরভি,
প্রভাত ফুলের পরিমল মধু, সন্ধ্যাবেলার পুরবী!'হাসিয়া উঠিল আলোকে আকাশ, নত হ'ইয়ে এল পুলকে,
লতা-পাতা-ফুলে বাঁধিয়া আকাশে ধরা কয়, 'সই, ভূলোকে
বাঁধা প'লে আজ', চেপে ধরে বুকে লজ্জায় ওঠে কাঁপিয়া,
চুমিল আকাশ নত হ'ইয়ে মুখে ধরণীরে বুকে ঝাঁপিয়া।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rakhi-bondhon/
|
4461
|
শামসুর রাহমান
|
একজন
|
মানবতাবাদী
|
সজীব আঠারোতেই রুক্ষ, তামসিক
প্রতিক্রিয়াশীলতার ব্যাকুল খাদেম,
প্রট্রোডলারের
ঝলকানি-লাগা
খালিশ, নিরেট
ভোগবাদী নেতাদের বাক্চমকে আবিষ্ট,
নাৎসী-আনুগত্যে নতজানু সর্বক্ষণ।
তার করোটিতে
বৃষ্টিপাত-পরবর্তী রামধনু নেই,
জ্যোৎস্নাবিহ্বলতা নেই। সুদূর, গুমোট
আইয়ামে জাহেলিয়াতের
অন্ধকার মাথায় ঘা-ভর্তি
গ্রীষ্মের কুকুর যেন, জিভ বের ক’রে
হাঁপায় কেবল।
সূর্যোদায়-রহিত মনের আস্ফালনে
ধুন্ধুমার ফুঁ দিয়ে নেভায়
মঙ্গল প্রদীপগুলি যখন তখন আর প্রগতির ঋদ্ধ গ্রন্থমালা
আগুনের বুকে ছুঁড়ে ফেলে
হাত সেঁকে নেয় ঘটা ক’রে
উঠতে বসতে করে কার্ল মার্কস-এর মুণ্ডপাত।শহরের ঠেঙাডে প্রহরে গর্দানের রোঁয়া-খাড়া
নেকড়ের মতো ঘোরে রাস্তায় রাস্তায়,
মারণাস্ত্র হাতে মধ্যরাতে দমাদম
লাথি মারে শ্রীমন্ত শুভ-র শান্তিখচিত দরজায়। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekjon/
|
3921
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সব চেয়ে ভক্তি যার
|
নীতিমূলক
|
সব চেয়ে ভক্তি যার
অস্ত্রদেবতারে
অস্ত্র যত জয়ী হয়
আপনি সে হারে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sob-cheye-vokti-jar/
|
1763
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আত্মসমালোচনা
|
চিন্তামূলক
|
এও এক ধরনের অসুখ
এ বোধ, অতৃপ্তির আর অসর্ম্পূতার।
এর জ্বরও ওঠে, নামে, কাঁপায়।
গভীর বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ফেরার পর
এও হয়ে যায় হাড়-পাঁজরের কফ-কাশি।
ভীষণ টঙ্কারের মতো মুহূর্তগুলো
যা বাজে তার ভিতরকার গণনাহীন কাঁপনগুলোকে
চিনিয়ে দিতে, আর ধরার আগেই মিলিয়ে যায়
ক্রমশ দূর প্রতিধ্বনিহীনতায়
হৃতসর্বস্ব হতে হতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1184
|
751
|
জয় গোস্বামী
|
স্নান করে উঠে কতক্ষণ
|
শোকমূলক
|
স্নান করে উঠে কতক্ষণ
ঘাটে বসে আছে এক উন্মাদ মহিলা
মন্দিরের পিছনে পুরনো
বটগাছ। ঝুরি।
ফাটধরা রোয়াকে কুকুর।
অনেক বছর আগে রথের বিকেলে
নৌকো থেকে ঝাঁপ দিয়ে আর ওঠেনি যে-দস্যি ছেলেটা
এতক্ষণে, জল থেকে
সে ওঠে, দৌড় মারে, ঝুরি ধরে খুব দোল খায়
সারা গা শ্যাওলায় ভরা, একটা চোখ মাছে খেয়ে গেছে
কেউ তাকে দেখতে পায় না, মন্দিরের মহাদেবও ঢুলছে গাঁজা খেয়ে
সেই ফাঁকে, এরকম দুপুরবেলায়–
সে এসে মায়ের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা ক’রে যায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1769
|
1786
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
একি অমঙ্গল
|
প্রেমমূলক
|
তোমার হাতে ছুঁচ-সুতোটি
আমার হাতে ফুল
দেখতে পেয়েই আকাশ জুড়ে হিংসা হুলুস্থুল।
তোমার হাতে রঙের বাটি
আমার হাতে তুলি
দেখতে পেয়েই শুকনো মড়া চোখে জ্বালায় চুলি।
তোমার হাতে ধান-দুর্বো
আমার হাতে শাঁখ
দেখতে পেয়েই আকাশ চিরে শকুন পাড়ে হাঁক।
তোমার হাতে জলের ঘাট
আমার ঠোঁটে জল
দেখতে পেয়েই দৈববাণী: এ কি অমঙ্গল!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1206
|
4502
|
শামসুর রাহমান
|
এখন সে কথা থাক
|
রূপক
|
(আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রীতিভাজনেষু)আমার পিতামহের আমলের অনেক পুরনো
এক সিন্দুকের কথা জানি, যার ডালা
খুললেই চকিতে প্রাচীনতা
বিশীর্ণ আঙুল নেড়ে নেড়ে ডাকে রহস্যের স্বরে।
যেন তার অভ্যন্তরে খুব দীর্ঘ পথ আছে গাছগাছালির
সেরেনাদে খুব স্নিগ্ধ, চোখের পাতায় জমে ছায়া,
আছে কিছু তসরের শাড়ির সৌরভ,
ঘাসে ফেলে-যাওয়া কারো পশমের চটি,
সৌন্দর্যমাতাল রুগ্ন খর্বুটে কবির এপিটাফ,
বাছুরের ঘুণ্টি-বাঁধা মেটে গলা, দাদার তসবিহ্-
এরকম ভাষাচর্চা করে সে সিন্দুক।
এখন সে কথা থাক।সাতটি সোনালি মাছ আলোকিত কড়িকাঠ থেকে
নেমে পিয়ানোর রিডে নাচে,
আয়না বেয়ে উদ্বেড়ালের নাকের ডগার নিচে
ব্যালেরিনাদের মতো মোহন বিন্যাস তৈরি করে,
তারপর ঘর ছেড়ে উড়ে যায় দূরে
জানালার পর্দা দুলিয়ে
কুঁড়েঘর, টিনশেড ছুঁয়ে গায়ে মেখে
মেঘেদের রোঁয়া।
পাহাড়ি ঈগল সেই দৃশ্যের চকিত উন্মীলনে
ঈষৎ বিস্মিত হয়ে রহস্যের মর্মমূল স্পর্শ করে
নিজেও সঙ্গীতময় হয়।
সোনালি মাছের গান এখানেই লয়ে নিবিড় মিলিয়ে যাক।প্রাচীন দুর্গের মতো একটি বাড়ির কাছে যাই
মাঝে-মধ্যে,দাঁড়াই সামান্যক্ষণ, এদিক-ওদিক লক্ষ করি,
দূর থেকে জেনে নিতে চাই
বাড়ির ভেতর কতটুকু অন্ধকার কিংবা কতটা আবির
তৈরি হয়। কখনও সে বাড়ি আশাবরী ধরে,
কখনও-বা গায় মধ্যরাতে
দরবারি কানাড়া। একজন থাকে সে বাড়িতে, যাকে
কখনও দেখিনি আমি, যার নরম পায়ের কাছে
শুয়ে থাকে এক জোড়া চিতাবাঘ, কতিপয় নীলাভ ময়ূর
ঘোরে সারাক্ষণ আশেপাশে; মাঝে-মাঝে
তার কণ্ঠস্বর বেজে ওঠে ঝাড়লণ্ঠনের মতো,
সে-ভাষা বুঝি না।
আজ থাকে, সে-বাড়ির কথা
একান্ত বিশদভাবে বলা যাবে কখনও আবার।(হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekhon-se-kotha-thak/
|
2712
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার কাছে রাজা আমার রইল অজানা
|
ভক্তিমূলক
|
আমার কাছে রাজা আমার রইল অজানা।
তাই সে যখন তলব করে খাজানা
মনে করি পালিয়ে গিয়ে দেব তারে ফাঁকি,
রাখব দেনা বাকি।
যেখানেতেই পালাই আমি গোপনে
দিনে কাজের আড়ালেতে, রাতে স্বপনে,
তলব তারি আসে
নিশ্বাসে নিশ্বাসে।
তাই জেনেছি, আমি তাহার নইকো অজানা।
তাই জেনেছি ঋণের দায়ে
ডাইনে বাঁয়ে
বিকিয়ে বাসা নাইকো আমার ঠিকানা।
তাই ভেবেছি জীবন-মরণে
যা আছে সব চুকিয়ে দেব চরণে।
তাহার পরে
নিজের জোরে
নিজেরি স্বত্বে
মিলবে আমার আপন বাসা তাঁহার রাজত্বে।
পদ্মা, ২২ মাঘ, ১৩২১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1939
|
4900
|
শামসুর রাহমান
|
নিষ্পিষ্ট বেহালা
|
সনেট
|
আমার হৃদয় জুড়ে সারাক্ষণ এ কী জলহাওয়া।
আবহকুক্কুট ঘোরে উল্টোপাল্টা, দিকচিহ্নগুলি
সহসা গিয়েছে উড়ে, দরজা, জানালা ঘুলঘুলি
কম্পমান ক্ষণে ক্ষণে। খুব একা কোনো গানে-পাওয়া
লোকের স্বভাবে ঘুরি দিগ্ধিদিক মানুষের হাটে,
কখনো দারুণ জনশূন্যতায়। রুদ্র ভূকম্পন
মাঝে মাঝে আনে শোক; নৌকো, সেতু ছাড়াই গহন
খর নদী পার হতে হবে, হবে যেতে ফুল্ল ঘাটে।স্মৃতি ভেতরে স্মৃতি ক্রিয়াশীল পারম্পর্যহীন-
তছনছ ঘরবাড়ি, ক্ষুধার্ত শহর, ডালপালা,
ছিন্নভিন্ন, তরুণীর স্বেদসিক্ত স্তন, একজন
খোঁড়া লোক, চা খানার নির্জন টেবিল, অন্তরীণ
তেজী যুবা ভেসে ওঠে ডুবে যায় এবং যখন
বিপর্যয় অস্ত যায়, বাজে ফের নিষ্পিষ্ট বেহালা। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nispishto-behala/
|
4194
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
আতাচোরা
|
ছড়া
|
আতাচোরা পাখিরে
কোন তুলিতে আঁকি রে
হলুদ ?
বাঁশ বাগানে যাইনে
ফুল তুলিতে পাইনে
কলুদ
হলুদ বনের কলুদ ফুল
বটের শিরা জবার মূল
পাইতে
দুধের পাহাড় কুলের বন
পেরিয়ে গিরি গোবর্ধন
নাইতে
ঝুমরি তিলাইয়ার কাছে
যে নদিটি থমকে আছে
তাইতে
আতাচোরা পাখিরে
কোন তুলিতে আঁকি রে
—হলুদ ?
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/atachora/
|
1334
|
তসলিমা নাসরিন
|
তোমার কী !
|
প্রেমমূলক
|
বলেছিলে জিনস পরে যেন না ঘুমোই
জিনস পরেই কিন্তু ঘুমোচ্ছি,
ইচ্ছে করেই খুলে রাখছি না।
কেন রাখবো?
আমার যদি ত্বকে অসুখ হয়, সে আমার হবে,
তোমার কী!
তুমি তো আমাকে আর ভালোবাসো না যে আমার কিছু একটা মন্দ হলে তুমি কষ্ট পাবে!
হোক না অসুখ, হোক।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1977
|
5395
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
কালোর আলো
|
নীতিমূলক
|
কালোর বিভায় পূর্ণ ভুবন, কালোরে কি করিস ঘৃণা?
আকাশ-ভরা আলো বিফল কালো আঁখির আলো বিনা।
কালো ফণীর মাথায় মণি,
সোনার আধার আঁধার খনি,
বাসন্তী রং নয় সে পাখীর বসন্তে যে বাজায় বীণা,
কালোর গানে পুলক আনে, অসাড় বনে বয় দখিনা! কালো মেঘের বৃষ্টিধারা তৃপ্তি সে দেয় তৃষ্ণা হরে,
কোমল হীরার কমল ফোটে কালো নিশির শ্যমসায়রে!
কালো অলির পরশ পেলে
তবে মুকুল পাপড়ি মেলে,
তবে সে ফুল হয় গো সফল রোমাঞ্চিত বৃন্ত পরে!
কালো মেঘের বাহুর তটে ইন্দ্রধনু বিরাজ করে। সন্ন্যাসী শিব শ্মশানবাসী,--সংসারী সে কালোর প্রেমে,
কালো মেঘের কটাক্ষেরি ভয়ে অসুর আছে থেমে।
দৃপ্ত বলীর শীর্ষ পরে
কালোর চরণ বিরাজ করে,
পূণ্য-ধারা গঙ্গা হল- সেও তো কালো চরণ ঘেমে,
দুর্বাদলশ্যামের রূপে-- রূপের বাজার গেছে নেমে। প্রেমের মধুর ঢেউ উঠেছে কালিন্দীরি কালো জলে,
মোহন বাঁশীর মালিক যে জন তারেও লোকে কালোই বলে,
বৃন্দাবনের সেই যে কালো--
রূপে তাহার ভুবন আলো,
রাসের মধুর রসের লীলা, -তাও সে কালো তমাল তলে,
নিবিড় কালো কালাপানির কালো জলেই মুক্তা ফলে। কালো ব্যাসের কৃপায় আজো বেঁচে আছে বেদের বাণী,
দ্বৈপায়ন - সেই কৃষ্ণ কবি- শ্রেষ্ঠ কবি তাঁরেই মানি,
কালো বামুন চাণক্যেরে
আঁটবে কে কূট-নীতির ফেরে?
কালো অশোক জগৎ-প্রিয়, রাজার সেরা তাঁরে জানি,
হাবসী কালো লোকমানের মানে আরব আর ইরাণী। কালো জামের মতন মিঠে- কালোর দেশ এই জম্বুদ্বীপে-
কালোর আলো জ্বলছে আজো, আজো প্রদীপ যায় নি নিবে,
কালো চোখের গভীর দৃষ্টি
কল্যানেরি করছে সৃষ্টি,
বিশ্ব-ললাট দীপ-- কালো রিষ্টিনাশা হোমের টিপে,
রক্ত চোখের ঠান্ডা কাজল-- তৈরী সে এই ম্লান প্রদীপে! কালোর আলোর নেই তুলনা- কালোরে কী করিস ঘৃণা!
গগন-ভরা তারার মীনা বিফল- চোখের তারা বীনা,
কালো মেঘে জাগায় কেকা,
চাঁদের বুকেও কৃষন-লেখা,
বাসন্তী রং নয় সে পাখীর বসন্তের যে বাজায় বীণা,
কালোর গানে জীবন আনে নিথর বনে বয় দখিনা!
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/kalor-alo/
|
2855
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কঠিন পাথর কাটি
|
ভক্তিমূলক
|
কঠিন পাথর কাটি
মূর্তিকর গড়িছে প্রতিমা।
অসীমেরে রূপ দিক্
জীবনের বাধাময় সীমা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kothin-pathor-kati/
|
187
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
অকাল-সন্ধ্যা
|
স্বদেশমূলক
|
অকাল-সন্ধ্যা
[জয়জয়ন্তী কীর্তন]খোলো মা দুয়ার খোলো
প্রভাতেই সন্ধ্যা হল
দুপুরেই ডুবল দিবাকর গো।
সমরে শয়ান ওই
সুত তোর বিশ্বজয়ী
কাঁদনের উঠছে তুফান ঝড় গো॥
সবারে বিলিয়ে সুধা,
সে নিল মৃত্যু-ক্ষুধা,
কুসুম ফেলে নিল খঞ্জর গো।
তাহারই অস্থি চিরে
দেবতা বজ্র গড়ে
নাশে ওই অসুর অসুন্দর গো।
ওই মা যায় সে হেসে।
দেবতার উপরে সে,
ধরা নয়, স্বর্গ তাহার ঘর গো॥
যাও বীর যাও গো চলে
চরণে মরণ দলে
করুক প্রণাম বিশ্ব-চরাচর গো।
তোমার ওই চিত্ত জ্বেলে
ভাঙ্গালে ঘুম ভাঙ্গালে
নিজে হায় নিবলে চিতার পর গো।
বেদনার শ্মশান-দহে
পুড়ালে আপন দেহে,
হেথা কি নাচবে না শংকর গো॥আরিয়াদহ
৬ আষাঢ়, ১৩৩২
(চিত্তনামা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/okal-sondhya/
|
1137
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ভাষিত
|
চিন্তামূলক
|
আমার এ-জীবনের ভোরবেলা থেকে-
সে-সব ভূখণ্ড ছিলো চিরদিন কন্ঠস্থ আমার;
একদিন অবশেষে টের পাওয়া গেল
আমাদের স’জনার মতো দাঁড়াবার
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/vashito/
|
2059
|
মহাদেব সাহা
|
আমার জীবনী
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো
মাটির অন্তরে, ধুলোর পাতায়
লিখে রেখে যাবো মেঘের হৃদয়ে,
বৃষ্টির ফোঁটায়,
হাঁসের নরম পায়ে হরিণশিশুর মায়াময়
চোখে;
ফুলের নিবিড় পাপড়িতে আমি লিখে রেখে যাবো
আমার জীবনী-
লিখে রেখে যাবো বৃক্ষের বুকের মধ্যে
পাহাড়ী ঝর্নার ওষ্ঠে,
সবুজ শস্যের নগ্নদেহে।
আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো শিশিরে, ঘাসের
বুকে,
নদীর শরীরে, পদচিহ্ন আঁকা এই পথের ধুলোয়
লিখে রেখে যাবো সংসারের হাসি-কান্নার গভীরে;
আমার জীবনী আমি গেঁথে দিয়ে যাবো ঝরা বকুলের
বিষন্ন মালায়,
বর্ষার উদ্দাম ঢেউয়ে, সবুজ জমিতে,
আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো বিরহীর
দুচোখের জলের ধারায়; আমার জীবনী
আমি লিখবো না দূর নীহারিকালোকে, নক্ষত্রের উজ্জ্বল
অক্ষরে,
আমার জীবনী আমি রেখে দিয়ে যাবো ভোরের
পাখির কন্ঠে,
উদাসীন বাউলের গানে, পথিকের পথের দু’ধারে;
লিখে রেখে যাবো আমার জীবনী আমি
ব্যথিত কবির শ্লোকে,
দুঃখীর সজল আঁখিতে,
আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো
স্বপ্নের খাতায়
সমুদ্র-সৈকতে, অশ্রুজলে-ধোয়া প্রেমিকের
জীবনপঞ্জিতে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1399
|
5077
|
শামসুর রাহমান
|
মগের মুল্লুক না কি_
|
মানবতাবাদী
|
যাচ্ছিলাম একা সুনসান অচেনা রাস্তায় । হঠাৎ
কোত্থেকে ক’জন ডাকাবুকো লোক আমার
ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেউ
টুঁটি চেপে ধরে আমার, কারও মুঠোয়
বন্দি আমার মাথার উস্কো-খুসকো চুল
আর অন্য একজন ক্রমাগত মারছে লাথি।মগের মুল্লুক না কি? কেউ কি নিজের উন্মশহরে
নিরাপদে পথে হেঁটে চলতে
পারবে না? তাকে কি গুণ্ডাদের খঞ্জরের আঘাতে
মুখ থুবড়ে পড়তে হবে খোলা রাস্তায়? জ্যোৎস্নাস্নাত
পথ কি রঞ্জিত হবে নিরপরাধ, কারও সাতে, পাঁচে
না-থাকা, নিরামিষ ধরনের ব্যক্তির রক্তধারায়?কখনও কখনও মনে হয়, আমার প্রিয় শহর
এই ঢাকা রত্নপুরী, এখানে
নগরবাসী সবাই উত্তম চরিত্রের অধিকারী,
প্রত্যেকেই ধীমান, শিল্পকলা-চর্চায় মনোযোগী। কখনও
কখনও কবিমেলা অনুষ্ঠিত হয় অপরূপ উৎসবের
ধরনে, সংবাদ যার রটে যায় দেশ-দেশান্তরে।এই স্বপ্ন, এই অভিলাষ অর্ধসত্য হয়ে রয়
কারও কারও চেতনায়, কেউ কেউ
খেলাঘর ভেঙে গেলে বেদনার্ত চিত্তে কবিতা রচনায়
মাতাল হয়ে খাতার পাতা কখনও নিরাশায়, কখনও-বা-আশায়
বাংলা বর্ণমালার রূপ নানা সাজে সাজিয়ে
আসমানের মেঘে, বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে ভাসায়। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/moger-mulluk-na-ki/
|
149
|
আসাদ চৌধুরী
|
বারবারা বিডলারকে
|
স্বদেশমূলক
|
বারবারা
ভিয়েতনামের উপর তোমার অনুভূতির তরজমা আমি পড়েছি-
তোমার হৃদয়ের সুবাতাস
আমার গিলে-করা পাঞ্জাবিকে মিছিলে নামিয়েছিল
প্রাচ্যের নির্যাতিত মানুষগুলোরজন্যে অসীম দরদ ছিল সে লেখায়
আমি তোমার ওই একটি লেখাই পড়েছি
আশীর্বাদ করেছিলাম, তোমার সোনার দোয়াত কলম হোক।
আমার বড়ো জানতে ইচ্ছে করে বারবারা, তুমি এখন কেমন আছ ?
নিশ্চয়ই তুমি ডেট করতে শিখে গেছ।
গাউনের রঙ আর হ্যাট নিয়ে কি চায়ের টেবিলে মার সঙ্গে ঝগড়া হয়?
অনভ্যস্ত ব্রেসিয়ারের নিচে তোমার হৃদয়কে কি চিরদিন ঢেকে দিলে।
আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে বারবারা।
তোমাদের কাগজে নিশ্চয়ই ইয়াহিয়া খাঁর ছবি ছাপা হয়-
বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখো
ওটা একটা জল্লাদের ছবি
পনেরো লক্ষ নিরস্ত্র লোককে ঠাণ্ডা মাথায় সে হ্ত্যা করেছে
মানুষের কষ্টার্জিত সভ্যতাকে সেগলা টিপে হত্যা করেছে
অদ্ভুত জাদুকরকে দেখ
বিংশ শতাব্দীকে সে কৌশলে টেনে হিঁচড়ে মধ্যযুগে নিয়ে যায়।
দেশলাইয়ের বাক্সর মতো সহজে ভাঙে
গ্রন্থাগার, উপাসনালয়, ছাত্রাবাস,
মানুষের সাধ্যমত ঘরবাড়ি
সাত কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ফুলকে সে বুট জুতোয়
থেতলে দেয়।
২
টু উইমেন ছবিটা দেখেছ বারবারা ?
গির্জার ধর্ষিতা সোফিয়া লোরেনকেদেখে নিশ্চয়ই কেঁদেছিলে
আমি কাঁদিনি, বুকটা শুধু খাঁ খাঁ করেছিল-
সোফিয়া লোরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো বাংলাদেশে
তিরিশ হাজার রমণীর নির্মম অভিজ্ঞতা শুনে
তিনি শিউরে উঠবেন।
অভিধান থেকে নয়
আশি লক্ষ শরণার্থীর কাছে জেনে নাও, নির্বাসনের অর্থ কী ?
জর্জ ওয়াশিংটনের ছবিওলা ডাকটিকেটে খোঁজ থাকবে না স্বাধীনতার
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কাছে এসো-
সাধু অ্যাবের মর্মর মূর্তিকে গণতন্ত্র আর মানবতার জন্য
মালির ঘামে ভেজা ফুলের তোড়া দিয়োনা-
নিহত লোকটি লজ্জায় ঘৃণায় আবার আত্মহত্যা করবে।
বারবারা এসো,
রবিশঙ্করের সুরে সুরে মুমূর্ষু মানবতাকে গাই
বিবেকের জংধরা দরোজায় প্রবল করাঘাত করি
অন্যায়ের বিপুল হিমালয় দেখে এসে ক্রুদ্ধ হই, সংগঠিত হই
জল্লাদের শাণিত অস্ত্র
সভ্যতার নির্মল পুষ্পকে আহত করার পূর্বে,
দর্শন ও সাহিত্যকে হত্যা করার পূর্বে
এসো বারবারা বজ্র হয়ে বিদ্ধ করি তাকে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1102.html
|
4125
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
ঘৃণ্য চোখ
|
প্রেমমূলক
|
তুমিকি কখনও সাগরের ঢেউ দেখনি?
কিভাবে আসরে পড়ে কুলে।
তুমিকি কখনও ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব দেখনি?
কিভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয় মানুষের স্বপ্নগুলোকে।
তুমি কি কখনও দাবানল দেখনি?
কিভাবে পুড়ে শেষ করে দেয় বনজঙ্গলকে।
তোমাকে সেই ঢেউ,ঘূর্ণিঝড়, আর দাবানল দেখতে
এখন আর কিছুই হারাতে হবে না।
শুধু একটি বার আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে দেখ
চোখের জলের ঢেউ আসরে পড়ছে আমার বুকে,
ভয়ে হৃদয়খানি কাপছে থরথর করে,
হৃদয়ের কাপনিতে বেরিয়ে আসছে
সেই আগুনের লাভা, যা আজ
পুড়ে ছাড়খার করে দিচ্ছে পুরো হৃদয়কে।
এরপরও কি তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ঘৃণ্য চোখে?
না’কি আবার আগুন দেবে এই পোড়া দেহে।
আমি যাচ্ছি চলে অন্য কোন গ্রহে
যেথায় গেলে ফিরে না কেউ আর এই দেশে।
থেকো তুমি এই পৃথিবীতে সুখের ঘর বেধে
আমার কথা পড়লে মনে
একবার না হয় “ভালবাসি” বলে ডেকো।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2184.html
|
3364
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পরিচয়
|
প্রকৃতিমূলক
|
একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে
বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে ।
তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি ,
" পরিচয় কোনো আছে নাকি,
যাবে কোনখানে ? "
আমি শুধু বলেছি, " কে জানে !"নদীতে লাগিল দোলা ,বাঁধনে পড়িল টান----
একা বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।
সেই গান শুনি
কুসুমিত তরুতলে তরূন তরূণী
তুলিল অশোক---
মোর হাতে দিয়ে তারা কহিল ," এ আমাদেরই লোক "।
আর কিছু নয়,
সে মোর প্রথম পরিচয় ।।তার পরে জোয়ারের বেলা সাঙ্গ হল.
সাঙ্গ হল তরঙ্গের খেলা ;
কোকিলের ক্লান্ত গানে বিস্মৃত দিনের কথা অকস্মাৎ যেন মনে আনে ;
কনকচাঁপার দল পড়ে ঝুরে;
ভেসে যায় দূরে,
ফাল্গুনের উৎসবরাতির নিমন্ত্রণলিখনপাঁতির
ছিন্ন অংশ তারা অর্থহারা ।ভাঁটার গভীর টানে
তরীখানা ভেসে যায় সমুদ্রের পানে ।
নুতন কালের নব যাত্রী ছেলেমেয়ে
শুধাইছে দূর হতে চেয়ে,
' সন্ধ্যার তারার দিকে
বহিয়া চলেছে তরণী কে ?"
সেতারেতে বাঁধিলাম তার,
গাহিলাম আরবার,
' মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক,
আর কিছু নয়-----
এই হোক শেষ পরিচয় ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/poricoy/
|
4789
|
শামসুর রাহমান
|
তুমি চলে গেলেও
|
প্রেমমূলক
|
আমার এ ছোট ঘরে কিছুক্ষণ বসে চুপচাপ
চলে গেলে তুমি নিশীথকে অধিক আন্ধার করে।
চেয়ে থাকি শূন্য চেয়ারের দিকে ছায়াচ্ছন্ন ঘোরে,
চায়ের পেয়ালা আর্ত বুলবুলি, যেন চায় মাফ
বুকে গান নেই বলে। আমরা দুজন যে-আলাপ
করেছি তোমার প্রস্থানের আগে তা-ই ফের দোরে,
জানালার পর্দায়, বইয়ের র্যাফকে আর ঠাণ্ডা ফ্লোরে
ছায়া হয়ে ঝোলে, রয়ে যায় তোমার প্রাণের ছাপ।তুমি চলে গেলেও কেন যে মনে হয় এই ঘরে
আছো বসে, হাসছে তোমার চোখ, শাড়িটার ভাঁজ
নদীর তীরের মতো; তুমি আছো, যেমন কবিতা
আবৃত্তি করার শেষে ছন্দিত মঞ্জুল রেশ নড়ে
মর্মমূলে, যে রকম মন্দিরের ঘণ্টার আওয়াজ
জমে থাকে স্তব্ধ মাঠে। ভুলে যাই তুমি পরিণীতা (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tumi-chole-geleo/
|
2867
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কন্যাবিদায়
|
চিন্তামূলক
|
জননী, কন্যারে আজ বিদায়ের ক্ষণে
আপন অতীতরূপ পড়িয়াছে মনে
যখন বালিকা ছিলে।
মাতৃক্রোড় হতে
তোমারে ভাসালো ভাগ্য দূরতর স্রোতে
সংসারের।
তার পর গেল কত দিন
দুঃখে সুখে,
বিচ্ছেদের ক্ষত হল ক্ষীণ।এ-জন্মের আরম্ভভূমিকা-- সংকীর্ণ সে
প্রথম উষার মতো-- ক্ষণিক প্রদোষে
মিলাইল লয়ে তার স্বর্ণ কুহেলিকা।
বাল্যে পরেছিলে শুভ্র মাঙ্গল্যের টিকা,
সিন্দূররেখায় হল লীন।
সে-রেখাটি
জীবনের পূর্বভাগ দিল যেন কাটি।
আজ সেই ছিন্নখণ্ড ফিরে এল শেষে
তোমার কন্যার মাঝে অশ্রুর আবেশে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kana-beday/
|
3777
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে
|
ভক্তিমূলক
|
যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে
রইব কত আর।
আর পারি নে রাত জাগতে হে নাথ,
ভাবতে অনিবার।
আছি রাত্রিদিবস ধরে
দুয়ার আমার বন্ধ করে,
আসতে যে চায় সন্দেহে তায়
তাড়াই বারে বারে। তাই তো কারো হয় না আসা
আমার একা ঘরে।
আনন্দময় ভুবন তোমার
বাইরে খেলা করে।
তুমিও বুঝি পথ নাহি পাও,
এসে এসে ফিরিয়া যাও,
রাখতে যা চাই রয় না তাও
ধুলায় একাকার।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/523.html
|
1387
|
তারাপদ রায়
|
জবানবন্দী
|
প্রেমমূলক
|
সত্য বই মিথ্যা বলিব না।
হুজুর, ধর্মাবতার,
প্রয়াতা শান্তিলতার সঙ্গে মদীয়ের
কোনো রকম থারাপ সম্পর্ক ছিলো না
ইহা সত্য যে, একবার মৌরিগ্রাম হইতে
তাহাকে থলকমলের চারা আনিয়া দেই।
আমাদের বংশে স্থলপদ্ম, বকফুল ইত্যাদি
কিছু কিছু গাছ লাগানোর আস্য নাই।
হুজুর, ধর্মাবতার,
আস্য কথাটির অর্থ বলা কঠিন,
সোজা করিয়া বলা যাইতে পারে
ঐ সব গাছ লাগানোর নিষেধ আছে।
যাহা হউক, আশা ছিল প্রতিবেশিনী শান্তিলতা
তাহার পিছনের বাগানে ঐ গাছ লাগাইবে,
প্রতিদিন সকালে আমার দক্ষিণের জানালা দিয়া
থলকমলের শোভা দেখিব্
শান্তিলতা তাহাই করিয়াছিল।
আমিও নিয়মিত শোভা দেখিতাম্
মনের অগোচরে পাপ নাই,
দুই-এক দিন শান্তিলতাকো দেখিতাম।
হুজুর, ধর্মাবতার,
ইহা অপেক্ষা খারাপ সম্পর্ক
তাহার সঙ্গে আমার ছিলো না।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3876.html
|
6064
|
হেলাল হাফিজ
|
লাবণ্যের লতা
|
মানবতাবাদী
|
দুরভিসন্ধির খেলা শেষ হয়ে কোনোদিন
দিন যদি আসে,
এই দেশে ভালোবেসে বলবে মানুষ,
অনন্বিত অসন্তোষ অজারকতার কালে এসে
লাবন্যের লকলকে লতা এক খুব কায়ক্লেশে
একদিন তুলেছিলো বিনয়াবনত মাথা
এতোটুকু ছিলো না দীনতা।
অকুলীন এই দিন শেষ হয়ে কোনোদিন
দিন যদি আসে,
শুভ্রতায় স্নিগ্ধতায় সমুজ্জল মানুষ এদেশে
বলবে সূর্যের দিকে ছিলো সেই লতাটির মুখ
বলবে মাটির সাথে ছিলো তার গাঢ় যোগাযোগ,
কিছু অক্সিজেন সেও দিয়েছিলো
নিয়েছিলো বিষ
বলবে পুষ্পিত কিছু করেছিলো ধূসর কার্নিশ।
ভালোবাসাবাসিহীন এই দিন সব নয়– শেষ নয়
আরো দিন আছে,
ততো বেশি দূরে নয়
বারান্দার মতো ঠিক দরোজার কাছে।
৩০.১০.৮১।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/134
|
5014
|
শামসুর রাহমান
|
বাড়িটা
|
রূপক
|
বাড়িটা গভীর রাতে দেখেছিল বৃষ্টিপাত।
ওর সারা গায়ে বর্ষার তুমুল ছাঁট, খুব
হিসহিসে হাওয়া ক্রমাগত
ক্ষ্যাপাটে ছোবল মারে। মাঠের ভেতরে
অন্ধকারে একলা বাড়িটা আরও বেশি
বাড়ি হয়ে ওঠে,
যেন পৃথিবীর আদি বাড়ি
কংক্রিটের অরণ্যের সংসর্গ ছাড়িয়ে
এই মাঠে থিতু।
এ-বাড়ি ছোঁবে না কাউকেই;
কোনো গূঢ় কথা, কারো ছায়া
ধরে রাখবে না কোনো দিন।
কতকাল থেকে বৃষ্টি, রৌদ্র আর বাতাসে বাড়িটা
পারিপার্শ্বিকের প্রতি উদাসীন আর
সন্ন্যাসীর মতো ধ্যানী।
কখনো সে কারো কারো শৈশব অথবা যৌবনের নিমগাছ
এ বাড়িটা কার? জানা নেই। ডুমুরের
গাছটা এখনও
আছে কি দাঁড়ানো এক কোণে? বাসিন্দারা
লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে,
কেউ কেউ হয়তো খাচ্ছে কফি, কেউবা পুরানো কথা
টেনে আনে,
অন্যজন দেয়ালের দিকে চোখ রেখে
চেয়ারে ভাস্কর্য এক চুপচাপ, পায়ে রাগ টানা,
কান পেতে বৃষ্টি শোনে একা,
বলার কিছুই নেই তার। (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/barita/
|
3630
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বেজি
|
রূপক
|
অনেকদিনের এই ডেস্কো —
আনমনা কলমের কালিপড়া ফ্রেস্কো
দিয়েছে বিস্তর দাগ ভুতূড়ে রেখার ।
যমজ সোদর ওরা যে সব লেখার —
ছাপার লাইনে পেল ভদ্রবেশে ঠাঁই ,
তাদের স্মরণে এরা নাই ।
অক্সফোর্ড ডিক্সনারি , পদকল্পতরু ,
ইংরেজ মেয়ের লেখা ‘ সাহারার মরু '
ভ্রমণের বই , ছবি আঁকা ,
এগুলোর একপাশে চা রয়েছে ঢাকা
পেয়ালায় মডার্ন্ রিভিয়ুতে চাপা ।
পড়ে আছে সদ্যছাপা
প্রুফগুলো কুঁড়েমির উপেক্ষায় ।
বেলা যায় ,
ঘড়িতে বেজেছে সাড়ে পাঁচ ,
বৈকালী ছায়ার নাচ
মেঝেতে হয়েছে শুরু , বাতাসে পর্দায় লেগে দোলা ।
খাতাখানি আছে খোলা । —
আধঘণ্টা ভেবে মরি ,
প্যান্থীজ্ম্ শব্দটাকে বাংলায় কী করি । পোষা বেজি হেনকালে দ্রুতগতি এখানে সেখানে
টেবিল চৌকির নীচে ঘুরে গেল কিসের সন্ধানে —
দুই চক্ষু ঔৎসুক্যের দীপ্তিজ ্ব লা ,
তাড়াতাড়ি দেখে গেল আলমারির তলা
দামি দ্রব্য যদি কিছু থাকে ;
ঘ্রাণ কিছু মিলিল না তীক্ষ্ণ নাকে
ঈপ্সিত বস্তুর । ঘুরে ফিরে অবজ্ঞায় গেল চলে ,
এ ঘরে সকলি ব্যর্থ আরসুলার খোঁজ নেই ব ' লে । আমার কঠিন চিন্তা এই ,
প্যান্থীজ্ম্ শব্দটার বাংলা বুঝি নেই ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/baje/
|
5457
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
ঘুমভাঙার গান
|
মানবতাবাদী
|
মাথা তোল তুমি বিন্ধ্যাচল
মোছ উদ্গত অশ্রুজল
যে গেল সে গেল, ভেবে কি ফল?
ভোল ক্ষত!
তুমি প্রতারিত বিন্ধ্যাচল,
বোঝ নি ধূর্ত চতুর ছল,
হাসে যে আকাশচারীর দল,
অনাহত।
শোন অবনত বিন্ধ্যাচল,
তুমি নও ভীরু বিগত বল
কাঁপে অবাধ্য হৃদয়দল
অবিরত।
কঠিন, কঠোর বিন্ধ্যাচল,
অনেক ধৈর্যে আজো অটল
ভাঙো বিঘ্নকেঃ করো শিকল
পদাহত।
বিশাল, ব্যাপ্ত বিন্ধ্যাচল,
দেখ সূর্যের দর্পানল;
ভুলেছে তোমার দৃঢ় কবল
বাধা যত।
সময় যে হল বিন্ধ্যাচল,
ছেঁড় আকাশের উঁচু ত্রিপল
দ্রুত বিদ্রোহে হানো উপল
শত শত।। (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/ghumvangar-gan/
|
4798
|
শামসুর রাহমান
|
তোমাকে দেখি প্রতিক্ষণ
|
প্রেমমূলক
|
তোমাকে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ দেখতে চাই দু’চোখ ভ’রে
যখন তোমাকে দেখতে পাই না,
তোমার পাশে ব’সে কিছু সময় কাটানো থেকে
বঞ্চিত হই, তখন মনে হয়-
আমি যেন সেই রোগী, যাকে শ্বাসকষ্ট ভোগায়
প্রতি মুহূর্তে। তোমার মুখ অদর্শনের
অন্ধকার তীরে থাকলে
এই মতো অনুভূত হয়,
আমি এক বিয়াবান কন্টকময় পথ
পাড়ি দিচ্ছি দিগভ্রান্ত পথিকের মতো; আমাকে
আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে বহু উদ্ধত ফণিমনসা।
সে-পথে বিষধর সাপের কুণ্ডলী,
হিংস্র জন্তুর আধ-খাওয়া নরদেহ এবং
দৃষ্টি-অন্ধ করা দীর্ঘস্থায়ী আঁধিঝড়।ক্যালেন্ডারের তিন শো পঁয়ষট্রি দিনের তিন শো দিনই
তোমাকে দেখতে পাই না। বাকি দিনগুলি
তোমার দেখা পাই কখনো প্রকাশ্যে, কখনো-বা সঙ্গোপনে।
সতর্ক, ক্রূর দৃষ্টির পাহারা,
নিষেধের সদা উদ্যত তর্জনী,
বাধার দুর্লঙ্ঘ্য কাঁটাতার তোমাকে
দেখতে দেয় না প্রতিদিন। এই বিরূপ সংসারের
অদৃশ্য, অমানবিক নিপীড়নে কাটে আমার দিনরাত্রি।
অনেক বছর
তুমিহীনতায় কেটে গ্যাছে। আমরা কেউ কাউকে
দেখতে পাইনি, যদিও এই একই শহরে ছিলাম দু’জন;
আরো ক’বছর আগে
কেন আমরা আমাদের হইনি? কেন?
তবুও যে শেষ পর্যন্ত মিলিত হলাম আমরা,
একেই পরম সৌভাগ্য জ্ঞান করি।
কঠোর বাধার বেড়া ডিঙিয়ে,
বলা যেতে পারে, তোমাকে দেখি প্রতিদিন,
প্রতিক্ষণ স্বপ্নে, আমার ভাবনার নন্দন-কাননে। (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomake-dekhi-protikkhon/
|
3029
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চলার পথের যত বাধা
|
ভক্তিমূলক
|
চলার পথের যত বাধা
পথবিপথের যত ধাঁধা
পদে পদে ফিরে ফিরে মারে,
পথের বীণার তারে তারে
তারি টানে সুর হয় বাঁধা।
রচে যদি দুঃখের ছন্দ
দুঃখের-অতীত আনন্দ
তবেই রাগিণী হবে সাধা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/cholar-pothe-joto-badha/
|
2970
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
খেলেনা
|
চিন্তামূলক
|
ভাবে শিশু, বড়ো হলে শুধু যাবে কেনা
বাজার উজাড় করি সমস্ত খেলেনা।
বড়ো হলে খেলা যত ঢেলা বলি মানে,
দুই হাত তুলে চায় ধনজন-পানে।
আরো বড়ো হবে না কি যবে অবহেলে
ধরার খেলার হাট হেসে যাবে ফেলে? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khelena/
|
5264
|
শামসুর রাহমান
|
সময়
|
সনেট
|
সময় ক্ষধার্ত বাঘ। পশু, পাখি, উদ্ভিদ, মানুষ
গ্রাম আর জনপদ যা প্রায় গোগ্রাসে গিলে ফেলে
এবং প্রত্যহ খোঁজে নতুন শিকার। চোখে মেলে
চেয়ে থাকে রাত্রিদিন, হিংস্রতায় প্রখর, বহুঁশ।
অশেষ ধ্বংসের কালি মুখে তার মেখেছে কলুষ
যুগে যুগে। জঠরে কি দাঁতে অবাস্তব ক্ষুধা জ্বেলে
ছুটে যায় লোকালয়ে, সভ্যতায়, গেলে অবহেলে
সব কিছু; মহানন্দে ওড়ায় সে জয়ের কানুস।আমাকে ও প্রতিক্ষণ খাচ্ছে আঘাটায়, আমি তার
জ্বলন্ত চোয়ালে বিদ্ধ, যেমন উদ্ধার অসম্ভব
জেনে ও পথিক কোনো পাহাড়ের খোঁচে প্রাণপণে
পাথর আঁকড়ে ঝুলে থাকে। আর যে মানবতার
দায়ভাগ বয়ে চলি তারই টানে করে যাই স্তব
অমৃতের, যদিও বিরাম নেই কালের হননে। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/somoy/
|
1709
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
হলুদ আলোর কবিতা
|
চিন্তামূলক
|
দুয়ারে হলুদ পর্দা। পর্দার বাহিরে ধুধু মাঠ
আকাশে গৈরিক আলো জ্বলে।
পৃথিবী কাঞ্চনপ্রভ রৌদ্রের অনলে
শুদ্ধ হয়।
কারা যেন সংসারের মায়াবী কপাট
খুলে দিয়ে ঘাস, লতা, পাখির স্বভাবে
সানন্দ সুস্থির চিত্তে মিশে গেছে। শান্ত দশ দিক।
দুয়ারে হলুদ পর্দা। আকাশে গৈরিক
আলো কাঁপে। সারাদিন কাঁপে।
আকাশে গৈরিক আলো। হেমন্ত-দিনের মৃদু হাওয়া
কৌতুকে আঙুল রাখে ঘরের কপাটে,
জানালায়। পশ্চিমের মাঠে
মানুষের স্নিগ্ধ কণ্ঠ। কে জানে মানুষ আজও মেঘ
হতে গিয়ে স্বর্ণাভ মেঘের স্থির ছায়া
হয়ে যায় কি না। তার সমস্ত আবেগ
হয়তো সংহত হয় রোদ্দুরের হলুদ উত্তাপে।
আলো কাঁপে। সারাদিন কাঁপে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1703
|
2954
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ক্ষণিকা
|
প্রেমমূলক
|
খোলো খোলো, হে আকাশ, স্তব্ধ তব নীল যবনিকা -
খুঁজে নিতে দাও সেই আনন্দের হারানো কণিকা।
কবে সে যে এসেছিল আমার হৃদয়ে যুগান্তরে
গোধূলিবেলার পান্থ জনশূন্য এ মোর প্রান্তরে
লয়ে তার ভীরু দীপশিখা!
দিগন্তের কোন্ পারে চলে গেল আমার ক্ষণিকা।।(কাব্যগ্রন্থঃ সঞ্চয়িতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khonika/
|
455
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মানস-বধূ
|
প্রেমমূলক
|
যেমন ছাঁচি পানের কচি পাতা প্রজাপতির ডানার ছোঁয়ায়,
ঠোঁট দুটি তার কাঁপন-আকুল একটি চুমায় অমনি নোয়ায়।
জল-ছলছল উড়ু-উড়ু চঞ্চল তার আঁখির তারা,
কখন বুঝি দেবে ফাঁকি সুদূর পথিক-পাখির পারা,
নিবিড় নয়ন-পাতার কোলে,
গভীর ব্যথার ছায়া দোলে,
মলিন চাওয়া (ছাওয়া) যেন দূরের সে কোন্ সবুজ ধোঁয়ায়।
সিঁথির বীথির খসে-পড়া কপোল-ছাওয়া চপল অলক
পলক-হারা, সে মুখ চেয়ে নাচ ভুলেছে নাকের নোলক।
পাংশু তাহার চূর্ণ কেশে,
মুখ মুছে যায় সন্ধে এসে,
বিধুর অধর-সীধু যেন নিঙড়ে কাঁচা আঙুর চোয়ায়।
দিঘল শ্বাসের বাউল বাজে নাসার সে তার জোড়-বাঁশিতে,
পান্না-ক্ষরা কান্না যেন ঠোঁট-চাপা তার চোর হাসি সে।
ম্লান তার লাল গালের লালিম,
রোদ-পাকা আধ-ডাঁশা ডালিম,
গাগরি ব্যথার ডুবায় কে তার টোল খাওয়া গাল-চিবুক-কুয়ায়।
চায় যেন সে শরম-শাড়ির ঘোমটা চিরি পাতা ফুঁড়ি,
আধফোঁটা বউ মউল-বউল, বোলতা-ব্যাকুল বকুল কুঁড়ি
বোল-ভোলা তার কাঁকন চুড়ি
ক্ষীরের ভিতর হিরের ছুরি,
দু-চোখ-ভরা অশ্রু যেন পাকা পিয়াল শালের ঠোঙায়।
বুকের কাঁপন হুতাশ-ভরা, বাহুর বাঁধন কাঁদন-মাখা,
নিচোল বুকের কাঁচল আঁচল স্বপন-পারের পরির পাখা।
খেয়াপারের ভেসে-আসা
গীতির মতো পায়ের ভাষা,
চরণ-চুমায় শিউরে পুলক হিমভেজা দুধ-ঘাসের রোঁয়ায়।
সে যেন কোন্ দূরের মেয়ে আমার কবিমানস-বধূ;
বুকপোরা আর মুখভার তার পিছলে পড়ে ব্যথার মধু।
নিশীথ-রাতের স্বপন হেন,
পেয়েও তারে পাইনে যেন,
মিলন মোদের স্বপন-কূলে কাঁদনভরা চুমায় চুমায়।
নামহারা সেই আমার প্রিয়া, তারেই চেয়ে জনম গোঁয়ায়।(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/manos-bodhu/
|
610
|
জয় গোস্বামী
|
অতীতের দিকে উঠে চলে
|
চিন্তামূলক
|
অতীতের দিকে উঠে চলে
যুদ্ধ শব, হাজার হাজার
শিখরের উপরে তুষার
তাদের পিছনে আলো জ্বেলে
বসে আছে ছোট ছোট বাড়ি
স্বামীপুত্র হারানো সংসার
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1711
|
4264
|
শঙ্খ ঘোষ
|
ফুলবাজার
|
চিন্তামূলক
|
পদ্ম, তোর মনে পড়ে খালযমুনার এপার ওপার
রহস্যনীল গাছের বিষাদ কোথায় নিয়ে গিয়েছিল?
স্পষ্ট নৌকো, ছৈ ছিল না, ভাঙা বৈঠা গ্রাম হারানো
বন্য মুঠোয় ডাগর সাহস, ফলপুলন্ত নির্জনতা
আড়ালবাঁকে কিশোরী চাল, ছিটকে সরে মুখের জ্যোতি
আমরা ভেবেছিলাম এরই নাম বুঝি বা জন্মজীবন |
কিন্তু এখন তোর মুখে কী মৃণালবিহীন কাগজ-আভা
সেদিন যখন হেসেছিলি সত্যি মুখে ঢেউ ছিল না!
আমিই আমার নিজের হাতে রঙিন ক’রে দিয়ে ছিলাম
ছলছলানো মুখোশমালা, সে কথা তুই ভালই জানিস—
তবু কি তোর ইচ্ছে করে আলগা খোলা শ্যামবাজারে
সবার হাতে ঘুরতে-ঘরতে বিন্দু বিন্দু জীবনযাপন?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1127
|
5136
|
শামসুর রাহমান
|
যখন আমার কাছ থেকে
|
সনেট
|
যখন আমার কাছ থেকে চলে যাও তুমি হায়,
আমার হৃদয়ে ক্রূদ্ধ বাজ পাখি সুতীক্ষ্ম চিৎকারে
দীর্ণ করে দশদিক, নখের আঁচড়ে বারে বারে
কুটি কুটি ছেঁড়ে শিরাপুঞ্জ, কী ব্যাপক তমসায়
অন্তর্গত পুষ্পাকুল উদ্যান ভীষণ ডুবে যায়।
যখন আমার কাছ থেকে সরে যাও, বন্ধ দ্বারে
মাথা কোটে একজন অন্ধলোক, খাদের কিনারে
অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে হাঁটে একা, অসহায়।তবু তুমি চলে যাও দূরে তোমাকে যেতেই হয়,
যেমন আকাশ ছেড়ে পাখি প্রত্যাবর্তনের সুর
উন্মুক্ত ডানায় নিয়ে। আমার তো সর্বক্ষণ ভয়-
কখন হারিয়ে ফেলি অকস্মাৎ তোমার মধুর
স্পর্শ, কণ্ঠস্বর, তুমি আসবে না, তবু এ হৃদয়
তোমাকেই ডেকে যায়, ডেকে যাবে বিষণ্ণ দুপুর। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jokhon-amar-kach-theke/
|
2075
|
মহাদেব সাহা
|
আমি তো তোমারই বশ
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমি তো পাখিরও বশ, ভ্রমরের বশ
কেন আমাকে ছাড়িয়া যাও সুস্মিত গোলাপ
বিষণ্ন বাবুই, হে পাখি, হে উদাসীন সরুযুর কাক
তোমরা ছাড়িয়া যাও!
আমাকে ছাড়িয়া যাও সন্ধ্যার শায়িত মাঠ
আজানের হে সুবে সাদেক, আমি তো তোমারই বশ,
তোমাদের সকলেই বশ
তোমরা দুজন বড়ো অভিমানী নারী
আমি তো তোমারই বশ
কালিন্দীর কোন কূলে ভরেছো কলস, কোন তমালের মূলে
ছয়টি কালিমা খুলে করেছো ভূষণ!
সাক্ষী থাকো তুমি হে তৃষ্ণার নদী, হে রাখাল, অশত্থু বাউল
আমি তো তোমারই বশ ওই যে সাতটি হরিৎ তৃণ, সোমত্ত সাতটি তারা
কামিনীর সাতগুচ্ছ চুল, আমি তোমাদেই বশ
টিলায় দাঁড়ানো চাঁদ, যুবক পাহাড়, কালো ধেনু, হে কালো তমসা
আমি তো তোমারি বশ হে শয্যা, হে কালো নয়ন
তবু কেন আমাকে ছাড়িয়া যাও ও দুজন সবুজ রমনী
ও কালো মাঠের গাঁও, ধানের উচ্ছব
কেন তোমারা ছাড়িয়া যাও হে ভিক্ষু, হে আশ্রমের শুভ্র বালিকা
কেন তোমরা ছাড়িয়া যাও হে ভিক্ষু, হে আশ্রমের শুভ্র বালিকা
আমি তো তোমারই বশ,
হে নারী, হে তৃণ, হে পরমা প্রকৃতি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1448
|
4053
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হে প্রিয়, আজি এ প্রাতে
|
ভক্তিমূলক
|
হে প্রিয়, আজি এ প্রাতে
নিজ হাতে
কী তোমারে দিব দান।
প্রভাতের গান?
প্রভাত যে ক্লান্ত হয় তপ্ত রবিকরে
আপনার বৃন্তটির 'পরে;
অবসন্ন গান
হয় অবসান।
হে বন্ধু কী চাও তুমি দিবসের শেষে
মোর দ্বারে এসে।
কী তোমারে দিব আনি।
সন্ধ্যাদীপখানি?
এ-দীপের আলো এ যে নিরালা কোণের,
স্তব্ধ ভবনের।
তোমার চলার পথে এরে নিতে চাও জনতায়?
এ যে হায়
পথের বাতাসে নিবে যায়।
কী মোর শকতি আছে তোমারে যে দিব উপহার।
হোক ফুল, হোক-না গলার হার,
তার ভার
কেনই বা সবে,
একদিন যবে
নিশ্চিত শুকাবে তারা ম্লান ছিন্ন হবে।
নিজ হতে তব হাতে যাহা দিব তুলি
তারে তব শিথিল অঙ্গুলি
যাবে ভুলি--
ধূলিতে খসিয়া শেষে হয়ে যাবে ধূলি।
তার চেয়ে যবে
ক্ষণকাল অবকাশ হবে,
বসন্তে আমার পুষ্পবনে
চলিতে চলিতে অন্যমনে
অজানা গোপন গন্ধে পুলকে চমকি
দাঁড়াবে থমকি,
পথহারা সেই উপহার
হবে সে তোমার।
যেতে যেতে বীথিকায় মোর
চোখেতে লাগিবে ঘোর,
দেখিবে সহসা--
সন্ধ্যার কবরী হতে খসা
একটি রঙিন আলো কাঁপি থরথরে
ছোঁয়ায় পরশমণি স্বপনের 'পরে,
সেই আলো, অজানা সে উপহার
সেই তো তোমার।
আমার যা শ্রেষ্ঠধন সে তো শুধু চমকে ঝলকে,
দেখা দেয়, মিলায় পলকে।
বলে না আপন নাম, পথেরে শিহরি দিয়া সুরে
চলে যায় চকিতে নূপুরে।
সেথা পথ নাহি জানি,
সেথা নাহি যায় হাত, নাহি যায় বাণী।
বন্ধু, তুমি সেথা হতে আপনি যা পাবে
আপনার ভাবে,
না-চাহিতে না-জানিতে সেই উপহার
সেই তো তোমার।
আমি যাহা দিতে পারি সামান্য সে দান--
হোক ফুল, হোক তাহা গান।
শান্তিনিকেতন, ১০ পৌষ, ১৩২১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1922
|
4928
|
শামসুর রাহমান
|
পুরাকালে
|
প্রেমমূলক
|
পুরাকালিএ কে এক বণিক তার সবচেয়ে দামি
মুক্তোটিকে বাগানের মাটির গভীরে
রেখেছিল লুকিয়ে যেখানে
সূর্যের তিমির-দীর্ণ আলো
পৌঁছেনি কখনো,
হৈমন্তী গাছের পাতা ঝরেনি যেখানে।তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছা সেই
মুক্তোর মতোই জ্বলে আমার ভেতর রাত্রিদিন
আর আমি ভাবি এই সৌন্দর্যকে লালন করার
আশ্চর্য সাহস
কে দিল আমাকে? (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/purakale/
|
1623
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
নিজের কাছে স্বীকারোক্তি
|
চিন্তামূলক
|
আমিপাহাড় থেকে পড়তে পড়তে
তোমাকে ধরে বেঁচে রয়েছি, কবিতা।
আমিপাতালে ডুবে মরতে মরতে
তোমাকে ধরে আবার ভেসে উঠেছি।
আমিরাজ্যজয় করে এসেও
তোমার কাছে নত হয়েছি, কবিতা।
আমিহাজার দরজা ভালবেসেও
তোমার বন্ধ দুয়ারে মাথা কুটেছি।
কখনও এর, কখনও ওর দখলে
গিয়েও ফিরি তোমারই টানে, কবিতা।
আমাকে নাকি ভীষণ জানে সকলে,
তোমার থেকে বেশি কে জানে, কবিতা?
আমিভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াই,
গোপন রাখি সকল শোক, কবিতা।
আমিশ্মশানে ফুল ঘটাব, তাই
তোমার বুকে চেয়েছি ঢেউ রটাতে।
আমিসকল সুখ মিথ্যে মানি,
তোমার সুখ পূর্ণ হোক, কবিতা।
আমিনিজের চোখ উপড়ে আনি,
তোমাকে দিই, তোমার চোখ ফোটাতে।
তুমিতৃপ্ত হও, পূর্ণ হও,
জ্বালো ভূলোক, জ্বালো দ্যুলোক, কবিতা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1641
|
4684
|
শামসুর রাহমান
|
গৃহস্মৃতি
|
চিন্তামূলক
|
কিছুতে আসে না ঘুম। রাত,
কালো পাথরের মতো বুকে চেপে আছে
সারাক্ষণ; কান পেতে থাকি
কখন শুনবো তেজী মোরগের ডাক।
যদি ভোর ব্যালে নর্তকীর মতো আসে,
ছড়ায় শিল্পিত আভা আমার খাতায়,
তবে আমি শক্রকেও হেসে, হাত ধরে
নিয়ে যাবো আতিথ্যের ঘাটে, দ্বিগ্রহরে
তার সঙ্গে ভাগ করে খাবো
শাকান্ন এবং ফলমূল! ঘুম নেই
চোখে, বারবার শুধু সাততাড়াতাড়ি
ছেড়ে-আসা ঘরটির কথা মনে পড়ে।সেসব সতেজ চারা গাছ,
যারা উঠেছিল বেড়ে আমার নিবিষ্ট
আদরের মধুর রোদ্দুরে,
সেসব গোলাপ-কুঁড়ি, যারা
আমার স্বপ্নের মতো ছিল স্ফুটোন্মুখ,
তারা কি এখনো বাঁচে
উঠোনের কোণে কোনো কল্যাণী স্পর্শের প্রত্যাশায়?
এখন বাসিন্দা যারা ওরা কি শেকড়ে ঢালে জল?
পাতা ছেঁটে দেয়? যত্ন নেয়
গোলাপ গাছের? ওরা ভোরে
অথবা বিকেলে
গম খেতে দেয় বুনো কবুতদের? মনে সুর্যোদয় নিয়ে
তিনটি তরুণী
এখনো কি সূর্যাস্তের দিকে
মুখ রেখে দাঁড়ায় প্রত্যহ ত্রিবন্দনা হয়ে খোলা
ছাদের হাওয়ায়? ওরা থাকুক শান্তিতে। (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/grihosmriti/
|
5610
|
সুকুমার রায়
|
ছবি ও গল্প
|
হাস্যরসাত্মক
|
ছবির টানে গল্প লিখি নেইক এতে ফাঁকি
যেমন ধারা কথায় শুনি হুবহু তাই আঁকি ।পরীক্ষাতে গোল্লা পেয়ে
হাবু ফেরেন বাড়িচক্ষু দুটি ছানাবড়া
মুখখানি তার হাঁড়িরাগে আগুন হলেন বাবা
সকল কথা শুনেআচ্ছা ক'রে পিটিয়ে তারে
দিলেন তুলো ধুনেমারের চোটে চেঁচিয়ে বাড়ি
মাথায় ক'রে তোলেশুনে মায়ের বুক ফেটে যায়
'হায় কি হল' ব'লেপিসী ভাসেন চোখের জলে
কুট্নো কোটা ফেলেআহ্লাদেতে পাশের বাড়ি
আটখানা হয় ছেলে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/chobi-0-golpo/
|
41
|
অসীম সাহা
|
মৃত্যু-৫
|
চিন্তামূলক
|
মৃত্যু-৫
অসীম সাহাকেউ তো আসেনি কাছে, কেউ তো দেয়নি মুখে একবিন্দু জল,
কেউ তো বলেনি ডেকে, ‘এখন কেমন আছো?’ শুধু অবিরল
চোখ বেয়ে নেমে গেছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুকণা, আর চোখে ঘুম,
শূন্য থেকে নেমে এসে আমাকে দিয়েছে শাস্তি, দিয়েছে হুকুম :
আর কটা দিন থাকো, তারপর আমি এসে নিয়ে যাবো যেখানে নেবার,
এখনো হয়নি কিছু, শুধু কিছু বাকি আছে সাক্ষ্য দেবার।তারপর তোকে আমি শান্তি দেবো, চিরজীবনের মতো শান্তি পাবি তুই,
এবার ঘুমিয়ে পড়্, আমিও দু’চোখ বুজে তোর কাছে শুই।
তারপর শেষরাতে একদিন চার কাঁধে আমরাই নিয়ে যাবো তোকে,
কাঁদবে মানুষ,আর কাঁদবে প্রেয়সী তোর,সন্তানেরা কাঁদবে খুব শোকে।
তবুও যেতেই হবে, মানুষের এই তো নিয়তি আর এই তো সে-গান,
সময় হলেই তবে দেহ থেকে উড়ে যাবে পাখির পরান।
|
https://www.bangla-kobita.com/asimsaha/mrittu-5/
|
2090
|
মহাদেব সাহা
|
এই চৈত্রে
|
প্রকৃতিমূলক
|
এমন চৈত্রের রাতে আমি লিখি শ্রাবনের গান
বর্ষণ থামেনি আজো দুই চোখ জলে ভাসমান,
সবাই উল্লাসে মাতে, চৈত্রনিশি করে উদ্যাপন
আমর ফাল্গুন নেই চৈত্রে নামে অঝোর শ্রাবণ।
এই চৈত্রে আমি বড়ো ভয়ানক মনঃকষ্টে আছি
এতো যে ফুটেছে ফুল আমি তবু দুঃখ পেয়ে বাঁচি,
সকলেই চৈত্রে সব দেখে-শোনে, আয়োজন করে
আমি এই চৈত্রে আরো মরে যাই বাহিরে-ভিতরে।
সবাই এনেছে ফুল, সকরেই শুনেছে আহ্বান
আমাকে ডাকেনি কেউ আমি কারো শুনি নাই গান,
এমন চৈত্রের রাতে দুঃখ পাই, কাঁদে বড়ো মন
সবার ফুলের মাস এই চৈত্রে আমার শ্রাবণ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1438
|
3925
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সভ্যতার প্রতি
|
সনেট
|
দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,
দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি,
গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান,
সেই গোচারণ, সেই শান্ত সামগান,
নীবারধান্যের মুষ্টি, বল্কলবসন,
মগ্ন হয়ে আত্মমাঝে নিত্য আলোচন
মহাতত্ত্বগুলি। পাষাণপিঞ্জরে তব
নাহি চাহি নিরাপদে রাজভোগ নব--
চাই স্বাধীনতা, চাই পক্ষের বিস্তার,
বক্ষে ফিরে পেতে চাই শক্তি আপনার,
পরানে স্পর্শিতে চাই ছিঁড়িয়া বন্ধন
অনন্ত এ জগতের হৃদয়স্পন্দন।
১৯ চৈত্র, ১৩০২
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shobhyotar-proti/
|
2176
|
মহাদেব সাহা
|
তোমার দূরত্ব
|
স্বদেশমূলক
|
তোমার ভালোবাসার দূরত্বের চেয়ে এমন আর কি
দূরত্ব আছে আমার, এমন আর কি
মাইল মাইল দূরত্ব সে তো একখানি মাত্র টিকিটের ব্যবধান
তারপরই উষ্ণ অভর্থ্যনা, তোমার আঁচলে ঘাম মুছে ফেলা।
সে-কথা জানি বলেই তো তোমার ভালোবাসার দূরত্বকেই
কেবল বলি বিচ্ছেদ।
না হলে যতো দূরেই বলো যেতে পারি মাইল মাইল নীলিমা,
মাইল মাইল সমুদ্র-
তার আগে শুধু সঙ্গে নিতে চাই তোমার ভালোবাসা;
এই মূলধনটুকু পেলে আমিও বাণিজ্যে যেতে পারি
বলো তো দেশভ্রমণে বের হয়ে যেতে পারি এইমাত্র
কিন্তু তার আগে আমার ছাড়পত্রে তোমার ভালোবাসার
স্বচ্ছ সীলমোহর আঁকা থাকা চাই-
বিদেশ মানেই তো আর দূরত্ নয়, দূরত্ব তোমার ভালোবাসার
কয়েক হাত ব্যবধান,
তোমার ভালোবাসা থেকে দুই পা সরে দাঁড়ানো
তার চেয়ে কোনো দূরত্ব আমার জানা নেই,
আমার জানা নেই।
আমি যাকে দূরত্ব বলি তা একই কার্নিশের নিচে দাঁড়ানো
বিচ্ছেদ
কিংবা একই কার্পেটের উপর দাঁড়ানো তীব্র শীত
আমাদের মাঝে প্রবাহিত এই হিমবাহকেই আমি বলি
বিদেশ, আমি বলি দূরত্ব।
না হলে সব দূরত্বই তো তোমার চোখের পলকমাত্র
তুমি ফিরে তাকাতেই আমি দেখতে পাবো ঢাকা এয়ারপোর্টে
চক্কর দিচ্ছে আমার বিমান
হ্যালো বাংলাদেশ! আমার চিরসবুজ বাংলাদেশ!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1522
|
75
|
আবিদ আনোয়ার
|
জৈবনিকতা
|
নীতিমূলক
|
অনেক দেখেছি পাঁকাল-বিলাসী কাদাজলে রাজহাঁস,
মসৃণ পাখা রেশমখচিত ছোঁয় না পঙ্কিলতা!
অথবা আমার বালকবেলার মোহময়ী মেথরানী
রূপের ছটায় ভুলে গেছি তার গুয়ের রাজ্যে বাস।পট্টি যখন বাঙলা মদের উৎসবে গোলজার
সে তখন ছিলো পট্টরানীর আসনে অধিষ্ঠিত―
ঘাগড়ায়-লাগা শুদ্র অথবা ভদ্রপাড়ার মল;
“লছমী নাকি রে!” কুশল শুধাতো তবু খোদ জমিদার।কাদায় পদ্ম, চাঁদে কলঙ্ক এ-কথা এখন ক্লিশে,
ময়ূর নিজে কি পেখম গোটায় বিশ্রী পায়ের খেদে?
রূপের দোহাই শুচিবায় ছেড়ে জৈবনিকতা শেখো―
খ্যাতিমান বহু কবিও ভুগেছে উপদংশের বিষে।
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/joibonikota/
|
5428
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
অলক্ষ্যে
|
সনেট
|
আমার মৃত্যুর পর কেটে গেল বৎসর বৎসর;
ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতির ব্যর্থ প্রচেষ্টাও আজ অগভীর,
এখন পৃথিবী নয় অতিক্রান্ত প্রায়ান্ধ স্থবির;
নিভেছে প্রদূম্রজ্বালা, নিরঙ্কুশ সূর্য অনশ্বর ;
স্তব্ধতা নেমেছে রাত্রে থেমেছে নির্ভীক তীক্ষ্ণস্বর-
অথবা নিরন্ন দিন, পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা ;
উদ্ধত বজ্রের ভয়ে নিঃশব্দে মৃত্যুর আনাগোনা,
অনন্য মানবসত্তা ক্রমান্বয়ে স্বল্পপরিসর।
গলিত স্মৃতির বাস্প সেদিনের পল্লব শাখায়
বারম্বার প্রতারিত অস্ফুট কুয়াশা রচনায়;
বিলুপ্ত বজ্রের ঢেউ নিশ্চিত মৃত্যুতে প্রতিহত।
আমার অজ্ঞাত দিন নগণ্য উদার উপেক্ষাতে
অগ্রগামী শূন্যতাকে লাঞ্চিত করেছে অবিরত
তথাপি তা প্রস্ফুটিত মৃত্যুর অদৃশ্য দুই হাতে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1118
|
5987
|
হুমায়ুন আজাদ
|
প্রেমিকার মৃত্যুতে
|
শোকমূলক
|
খুব ভালো চমৎকার লাগছে লিলিআন,
মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে হবো না চৌচির।
তরঙ্গে তরঙ্গে ভ্রষ্ট অন্ধ জলযান
এখন চলবে জলে খুব ধীরস্থির।
অন্য কেউ ঢেলে নিচ্ছে ঠোঁট থেকে লাল
মাংস খুঁড়ে তুলে নিচ্ছে হীরেসোনামণি;
এই ভয়ে কাঁপবে না আকাশপাতাল,
থামবে অরণ্যে অগ্নি আকাশে অশনি।
আজ থেকে খুব ধীরে পুড়ে যাবে চাঁদ,
খুব সুস্থ হয়ে উঠবে জীবনযাপন।
অন্নে জলে ঘ্রাণে পাবো অবিকল স্বাদ,
চিনবো শত্রুর মুখে কারা-বা আপন।
বুঝবো নিদ্রার জন্যে রাত্রি চিরদিন,
যারা থাকে ঘুমহীন তারা গায় গান।
রঙিন রক্তের লক্ষ্য ঠাণ্ডা কফিন;
খুব ভালো চমৎকার লাগছে লিলিআন।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/505
|
2658
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আছে আমার হৃদয় আছে ভরে
|
ভক্তিমূলক
|
আছে আমার হৃদয় আছে ভরে
এখন তুমি যা-খুশি তাই করো।
এমনি যদি বিরাজ অন্তরে
বাহির হতে সকলি মোর হরো।
সব পিপাসার যেথায় অবসান
সেথায় যদি পূর্ণ কর প্রাণ,
তাহার পরে মরুপথের মাঝে
উঠে রৌদ্র উঠুক খরতর। এই যে খেলা খেলছ কত ছলে
এই খেলা তো আমি ভালোবাসি।
এক দিকেতে ভাসাও আঁখিজলে
আরেক দিকে জাগিয়ে তোল হাসি।
যখন ভাবি সব খোয়ালেম বুঝি,
গভীর করে পাই তাহারে খুঁজি,
কোলের থেকে যখন ফেল দূরে
বুকের মাঝে আবার তুলে ধর।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/485.html
|
3181
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমার সাথে নিত্য বিরোধ আর সহে না
|
ভক্তিমূলক
|
তোমার সাথে নিত্য বিরোধ
আর সহে না–
দিনে দিনে উঠছে জমে
কতই দেনা।
সবাই তোমায় সভার বেশে
প্রণাম করে গেল এসে,
মলিন বাসে লুকিয়ে বেড়াই
মান রহে না।কী জানাব চিত্তবেদন,
বোবা হয়ে গেছে যে মন,
তোমার কাছে কোনো কথাই
আর কহে না।
ফিরায়ো না এবার তারে
লও গো অপমানের পারে,
করো তোমার চরণতলে
চির-কেনা।বোলপুর, ২৫ শ্রাবণ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomar-sathe-nityo-birodh-ar-sohe-na/
|
2077
|
মহাদেব সাহা
|
আমিও তো অটোগ্রাফ চাই
|
চিন্তামূলক
|
আমিও তো অটোগ্রাফ চাই, আমিও তো লিখতে চাই
তোমাদেরই নাম হৃদয়ের গভীর খাতায়
তোমাদের একেকটি স্বাক্ষর আমিও খোদাই করতে চাই
স্মৃতিতে, সত্তায়।
শুধু এই মানুষের অনবদ্য নাম জুঁই, চাঁপা, শিউলির মতো
আমিও তো চাই মর্মে ফোটাতে আমার;
ভালেবেসে কেউ যদি লেখে নাম, কেউ যদি
একটিও অটোগ্রাফ এঁকে দেয় এই মলিন কাগজে
তাকে আমি করে তুলি অনন্ত নক্ষত্রময় রাত্রির আকাশ;
আমার তেমন নেই অটোগ্রাফ সংগ্রহের মনোরম খাতা
নীল প্যাড, সুদৃশ্য মলাট
কিন্তু আমি দিতে পারি নীলিমার চেয়েও বিসতৃত
সমুদ্রের চেয়েও গভীর
যে-কোনো সবুজ বনভূমি থেকে অধিক সবুজ
এই আমার হৃদয়-
এর চেয়ে অধিক লেখার যোগ্য আর কোনো পত্র বা
প্রস্তরখণ্ড নেই;
তবু আমিই লিখেছি নাম কাগজে, শিলায়, পত্রে
কখনোবা পাহাড়ের গায়ে
দয়ার্দ্র অনেক প্যডে, সুদৃশ্য খাতায়
কিন্তু আজ মনে হয় ঝরা বকুলেল মতো
আমার নশ্বর নাম করে গেছে তৎক্ষণাৎই সামান্য হাওয়ায়
আর যেটুকুও বাকি ছিলো মুছে গেছে শিশিরে বৃষ্টিতে।
অনেক লিখেছি তবু নাম, তবুও এঁকেছি এই বারবার
ব্যর্থ আমার স্বাক্ষর
আজ বুঝ কোথাও পায়নি সে এতোটুকু শ্যামল অঞ্চল
এতোটুকু স্নিগ্ধ ছায়া, এতোটুকু নিবিড় শুশ্রূষা
আজ তার দিকে সবাই তাকিয়ে দেখ
অজ্ঞাত ও নাম;
কোন প্রাগৈতিহাসিক কালের যেন ভাষা
আমার এ ব্যর্থ হস্তাক্ষর আজ প্রাচীন কালের দুর্বোধ্য শিলালিপির
মতোই ধূসর
মনে হয় কেউ তার চেনে না কোনোই বর্ণমালা।
কিন্তু আমার হৃদয় আজো ধারণ করতে পারে মানুষের
গুচ্ছ গুচ্ছ নাম
সেখানে সবুজ অঞ্চলের কোনোই অভাব নেই
তাই তাতে এখনো সে খোদাই করতে পারে মানুষের প্রিয়
নামগুলি।
প্রকৃতই মানুষের নাম ছাড়া আমি আজো
ফুল, পাখি কিংবা বৃক্ষ এসবের পৃথক পৃথক কোনো নাম
তেমন জানি না,
কিন্তু এখনো সমান আমি রাত জেগে মানুষের নামের বানান
মুখস্ত করতে ভালোবাসি
তাই অটোগ্রাফ আমারই নেয়ার কথা, আমিও তো
অটোগ্রাফ চাই।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1367
|
442
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ভুলিতে পারিনে তাই
|
প্রেমমূলক
|
ভুলিতে পারিনে তাই আসিয়াছি পথ ভুলি
ভোলো মোর সে অপরাধ, আজ যে লগ্ন গোধূলি।এমনি রঙিন বেলায় খেলেছি তোমায় আমায়
খুঁজিতে এসেছি তাই সেই হারানো দিনগুলি।তুমি যে গেছ ভুলে, ছিল না আমার মনে
তাই আসিয়াছি তব বেড়া দেওয়া ফুলবনে
গেঁথেছি কতই মালা এই বাগানের ফুল তুলি
আজও হেথা গাহে গান আমার পোষা বুল্বুলি।চাহ মোর মুখে প্রিয়, এস গো আরও কাছে
হয়তো সে দিনের স্মৃতি তব নয়নে আছে
হয়তো সে দিনের মতই প্রাণ উঠিবে আকুলি।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/vulitey-pariney-tai/
|
2052
|
মহাদেব সাহা
|
আবুল হাসানের জন্য এলিজি
|
শোকমূলক
|
আমারও শীতকাল আসে, আসে হুহু প্রকৃতির জ্বর
কুয়াশায় ভেজে জমি, ভিজে ওঠে তোমার কবর
মনে হয় এই শীতে আমিও বিদেশী!
আমারও সঞ্চয় ছিলো লাল মোজা, পশমের টুপি
ছিলো কাশ্মীরি শালের মিহি কাজ, কিছু হাতে বোনা উলের আদর
আর উষ্ণ জল, সহিষ্ণু যুবতী একজন
ছিলো তার রক্তিম রাখাল;
এই শীতে সেই যে রাখাল গেলো দূর বনে, একজন কবি
গেলো কুয়াশায়
হাতের তালুতে তারা শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে
কই আর কখনো ফিরলো না! আর কখনো ফিরলো না!
শহরে শীতকাল বেশ স্বাস্ত্যকর পিকনিকে পার্টিতে কেটে যায়
সবুজ সবজির ঘ্রাণে হয় ভালো ময়দানে ক্রিকেট
ভোরের রোদুদর মেখে চলে যায় ইস্কুলের ছাতা;
আমারও শীতকাল আসে পাতা ঝরে, পাতা ঝরে যায়!
মনে পড়ে সেই যে রাখাল আর ঘরে ফেরে নাই
সেই যে ব্যথিত কবি বলে গেলো,
আবার আসবো আমি চুলে মেখে কুয়াশার দাগ
তার পথে কতো ঝরলো শিশির, কতো শিউলির শোক ….
আমারও শীতকাল আসে, আসে হুহু প্রকৃতির জ্বর
পাতা ঝরে, পাতা ঝরে যায়!
এমন শৈশব কেন আমি আছি আর তুমি নাই!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1480
|
2542
|
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
|
যৌবন-চাঞ্চল্য
|
চিন্তামূলক
|
ভুটিয়া যুবতি চলে পথ;
আকাশ কালিমামাখা কুয়াশায় দিক ঢাকা।
চারিধারে কেবলই পর্বত;
যুবতী একেলা চলে পথ।
এদিক-ওদিক চায় গুনগুনি গান গায়,
কভু বা চমকি চায় ফিরে;
গতিতে ঝরে আনন্দ উথলে নৃত্যের ছন্দ
আঁকাবাঁকা গিরিপথ ঘিরে।
ভুটিয়া যুবতি চলে পথ।টসটসে রসে ভরপুর--
আপেলের মত মুখ আপেলের মত বুক
পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর;
যৌবনের রসে ভরপুর।
মেঘ ডাকে কড়-কড় বুঝিবা আসিবে ঝড়,
একটু নাহিকো ডর তাতে;
উঘারি বুকের বাস, পুরায় বিচিত্র আশ
উরস পরশি নিজ হাতে!অজানা ব্যাথায় সুমধুর--
সেথা বুঝি করে গুরুগুরু!
যুবতি একেলা পথ চলে;
পাশের পলাশ-বনে কেন চায় অকারণে?
আবেশে চরণ দুটি টলে--
পায়ে-পায়ে বাধিয়া উপলে!
আপনার মনে যায় আপনার মনে গায়,
তবু কেন আনপানে টান?
করিতে রসের সৃষ্টি চাই কি দশের দৃষ্টি?
--স্বরূপ জানেন ভগবান!সহজে নাচিয়া যেবা চলে
একাকিনী ঘন বনতলে--
জানি নাকো তারো কী ব্যাথায়
আঁখিজলে কাজল ভিজায়!
|
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/joubon-chanchollo/
|
1302
|
তসলিমা নাসরিন
|
আরও প্রেম দিও
|
প্রেমমূলক
|
আরও প্রেম দিও আমাকে, এত অল্প প্রেমে আমার হয় না, আমি পারি না।
আরও প্রেম দিও, বেশি বেশি প্রেম দিও
যেন আমি রেখে কুলিয়ে উঠতে না পারি,
যেন চোখ ভরে,
হৃদয়ের সবকটি ঘর যেন ভরে যায়
যেন শরীর ভরে, এই তৃষ্ণার্ত শরীর।
প্রেম দিতে দিতে আমাকে অন্ধ করে দাও,
বধির করে দাও, আমি যেন শুধু তোমাকেই দেখি,
কোনও ঘৃণা, কোনও রক্তপাত যেন আমাকে দেখতে না হয়,
আমি যেন আকাশপার থেকে ভেসে আসা তোমার শুভ্র শব্দগুলো শুনি,
কোনও বোমারু বিমানের কর্কশতা, কারও আর্তনাদ, চিৎকার আমার কানে যেন না
পৌঁছোয়।
দীর্ঘকাল অসুখ আর মৃত্যুর কথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত
দীর্ঘকাল প্রেমহীনতার সঙ্গে পথ চলে আমি ক্লান্ত,
আমাকে শুশ্রুষা দাও, স্নান করিয়ে দাও তোমার শুদ্ধতম জলে।
যদি ভালো না বাসো, তবে বোলো না কিন্তু যে ভালোবাসো না,
মিথ্যে করে হলেও বোলো যে ভালোবাসো,
মিথ্যে করে হলেও প্রেম দিও,
আমি তো সত্যি সত্যি জানবো যে প্রেম দিচ্ছ,
আমি তো কাঁটাকে গোলাপ ভেবে হাতে নেব,
আমি তো টেরই পাবো না আমার আঙুল কেটে গেলে কাঁটায়,
রক্ত শুষে নেবে আঙুল থেকে, এদিকে ভাববো বুঝি চুমৃ খাচ্ছে!।
প্রেম দিও, যত প্রেম সারাজীবনে সঞ্চয় করেছো তার সবটুকু,
কোথাও কিছু লুকিয়ে রেখো না।
আমার তো অল্পতে হয় না, আমার তো যেন তেন প্রেমে মন বসে না,
উতল সমুদ্রের মত চাই, কোনওদিন না ফুরোনো প্রেম চাই,
কলঙ্কী কিশোরীর মত চাই,
কাণ্ডজ্ঞানহীনের মত চাই।
পাগল বলবে তো আমাকে? বলো।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1980
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.