id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
3431
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রথম চুম্বন
|
সনেট
|
স্তব্ধ হল দশ দিক নত করি আঁখি—
বন্ধ করি দিল গান যত ছিল পাখি।
শান্ত হয়ে গেল বায়ু, জলকলস্বর
মুহূর্তে থামিয়া গেল, বনের মর্মর
বনের মর্মের মাঝে মিলাইল ধীরে।
নিস্তরঙ্গ তটিনীর জনশূন্য তীরে
নিঃশব্দে নামিল আসি সায়াহ্নচ্ছায়ায়
নিস্তব্ধ গগনপ্রান্ত নির্বাক্ ধরায়।
সেইক্ষণে বাতায়নে নীরব নির্জন
আমাদের দুজনের প্রথম চুম্বন।
দিক্-দিগন্তরে বাজি উঠিল তখনি
দেবালয়ে আরতির শঙ্খঘণ্টাধ্বনি।
অনন্ত নক্ষত্রলোক উঠিল শিহরি,
আমাদের চক্ষে এল অশ্রুজল ভরি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prothom-chumbon/
|
1305
|
তসলিমা নাসরিন
|
এগারোই সেপ্টেম্বর
|
মানবতাবাদী
|
উঁচু দুটো বাড়ির পতন মানে উঁচু কিছুর পতন
অহঙ্কারের পতন
মহাশক্তির পরাশক্তির অহঙ্কারের পতন
তিমির গায়ে খলসে মাছের কামড় লাগলে তিমির বুঝি মান যায় না!
সাকুল্যে তিন হাজার মানুষের কথা বলছো!
মৃত্যুর কথা বলছো।
হাউ মাউ করে কাঁদছো যে!
মানুষের জন্য কাঁদছো?
এ তো দেখছি সত্যিই মাছের মায়ের কান্না গো! এত শোক কেন!
এত কেন হাহাকার!
সাগর বানিয়ে দিচ্ছ চোখের জল ফেলতে ফেলতে, মাসের পর মাস ফেলেই যাচ্ছে!,
বছর ধরে ফেলছো।
ক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছো যখন এক ইরাকেই তোমাদের ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়ামের
কারণে ঘরে ঘরে ক্যান্সার হচ্ছে, পঙ্গু শিশু জন্ম নিচ্ছে! আর দশ লক্ষ মানুষ মরে গেল
কেবল আন্তর্জাতিক এমবারগোতে?
ওরা বুঝি মানুষ নয়?
ক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছো রুয়াণ্ডার গৃহযুদ্ধে লক্ষ লোকের মৃত্যুতে,
একটুও তো কাঁদোনি? সৌধ বানাতে চাওনি তো!
রুয়াণ্ডার মানুষ বুঝি মানুষ নয়?
কেবল তোমাদের উঁচু বাড়িতেই ছিল মানুষ!
আসলে ওরাও তো আর আলাদা করে খুব বেশি মানুষ ছিল না, বেশির ভাগই ছিল
দরিদ্র, ইললিগ্যাল ইমিগ্রেন্ট, এশিয়ার, লাতিন আমেরিকার।
(তবে কি মানুষের জন্য নয়, উঁচু বাড়িটার জন্যই কেঁদেছো! মানুষগুলোর কোনও
নিরহঙ্কারী ছোট বাড়ি ধ্বসে মৃত্যু হলে এত তো কাঁদতে না।)
কফোঁটা চোখের জল ফেলেছো বসনিয়ার মৃতদের জন্য?
অনাহারে মরে যাওয়া সোমালিয়ার তিনলক্ষ মানুষের জন্য?
ক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছো যখন তৃতীয় বিশ্বের মানুষ কেবল না খেতে পেয়ে, কেবল
না চিকিৎসা পেয়ে, কেবল খাবার জলের অভাবেই মরে যাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিদিন সহস্র!
খবর রাখো? চোখে পড়ে ওসব?
কেবল উঁচু বাড়ি ভাঙলেই বুঝি চোখে পড়ে, উচু বাড়ির মৃত্যুই চোখে পড়ে,
ছোট বাড়ির, বস্তির, রাস্তার ঘরহীন মানুষ মরলে চোখে পড়ে না!
মৃত্যুটাও, মানুষের মৃত্যুটাও বীভৎসরকম রাজনীতির পাকে পড়ে গেল।
নিরীহ জীবন তো নয়ই, মৃত্যুর মত করুণ কাতর কষ্টকর জিনিসও
শেষপর্যন্ত এই পাক থেকে সামান্যও মুক্তি পেল না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2012
|
237
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আলতা-স্মৃতি
|
প্রেমমূলক
|
ওই রাঙা পায়ে রাঙা আলতা প্রথম যেদিন পরেছিলে,
সেদিন তুমি আমায় কি গো ভুলেও মনে করেছিলে –
আলতা যেদিন পরেছিলে?জানি, তোমার নারীর মনে নিত্য-নূতন পাওয়ার পিয়াস
হঠাৎ কেন জাগল সেদিন, কণ্ঠ ফেটে কাঁদল তিয়াস!
মোর আসনে সেদিন রানি
নূতন রাজায় বরলে আনি,
আমার রক্তে চরণ রেখে তাহার বুকে মরেছিলে –
আলতা যেদিন পরেছিলে।মর্মমূলে হানলে আমার অবিশ্বাসের তীক্ষ্ম ছুরি,
সে-খুন সখায় অর্ঘ্য দিলে যুগল চরণ-পদ্মে পুরি।
আমার প্রাণের রক্তকমল
নিঙড়ে হল লাল পদতল,
সেই শতদল দিয়ে তোমার নতুন রাজায় বরেছিলে –
আলতা যেদিন পরেছিলে।আমায় হেলায় হত্যা করে দাঁড়িয়ে আমার রক্ত-বুকে
অধর-আঙুর নিঙড়েছিলে সখার তৃষা-শুষ্ক মুখে।
আলতা সে নয়, সে যে খালি
আমার যত চুমোর লালি!
খেলতে হোরি তাইতে, গোরি, চরণতরি ভরেছিলে –
আলতা যেদিন পরেছিলে।জানি রানি, এমনি করে আমার বুকের রক্তধারায়
আমারই প্রেম জন্মে জন্মে তোমার পায়ে আলতা পরায়!
এবারও সেই আলতা-চরণ
দেখতে প্রথম পায়নি নয়ন!
মরণ-শোষা রক্ত আমার চরণ-ধারে ধরেছিলে –
আলতা যেদিন পরেছিলে।কাহার পুলক-অলক্তকের রক্তধারায় ডুবিয়ে চরণ
উদাসিনী! যেচেছিলে মনের মনে আমার মরণ?
আমার সকল দাবি দলে
লিখলে ‘বিদায়’ চরণতলে!
আমার মরণ দিয়ে তোমার সখার হৃদয় হরেছিলে –
আলতা যেদিন পরেছিলে। (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/alta-smriti/
|
5050
|
শামসুর রাহমান
|
ব্যক্তিগত রাজা
|
মানবতাবাদী
|
ব্যক্তিগত রাজার কাছে হাঁটু গেড়ে
যাচঞা করি একটি কিছু
ইতল বিতল।
দৃষ্টিতে তাঁর চন্দ্র ধরে, সূর্য ধরে;
জ্বলছে হাতে রক্তজবা
চমৎকার।
শস্য ক্ষেতে তাঁর পতাকা নিত্য ওড়ে,
ফুলের তিনি খুব উদাসীন
অধীশ্বর।সকাল যখন সকাল থেকে
যাচ্ছে স’রে অনেক দূরে
কিংবা কাছে,
রাত্রি আবার রাত্রি থেকে,
আমার করুণ অঞ্জলিতে
অন্ধকারে উঠবে ফুটে পদ্ম কোনো?বুকের ভেতর মাছরাঙা আর
দীপ্ত আঁশের মৎস্য নিয়ে
ঐতো আমার সন্ত রাজা
ফুটপাতে নীল একলা হাঁটেন।
পার্কে ব’সে বেলুন ছাড়েন,
কিংবা বাসের পাদানিতে
ঝুলে ঝুলে যান যে কোথায়!
কখনো ফের জনসভায়
অনেক মুখের একটি মুখে
যান মিশে যান,-
আবার কখন চিমটে বাজান বৃক্ষতলায়।
ব্যক্তিগত রাজা যিনি তিনি বেবাক পোশাক খুলে
ঐ চলেছেন ভেসে ভেসেজ্যোৎস্নাস্রোতে, রৌদ্রমায়ায়।
আমি কি তাঁর অমন গহন ছায়া তুলে
আমার চোখে পাগল হবো?
ঘোর দুপুরে দিলেন ছুঁড়ে কাঁটার মুকুট
নগ্ন হাতে আমার মাথাআ লক্ষ্য ক’রে।
ব্যক্তিগত রাজা আমার অগাধ রোদে
একলা হাঁটেন, একলা হাঁটেন
সত্তাজোড়া অসুখ নিয়ে
একলা হাঁটেন।বৈতরণী অন্ধকারে বনবাদাড়ে
পায়ের রক্তে যন্ত্রণারই পুষ্প এঁকে
একলা হাঁটেন, একলা হাঁটেন
ধূসর কোনো ইস্টিশানে,
মেঘে মেঘে একলা হাঁটেন। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/byaktigoto-raja/
|
2600
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অন্তর মম বিকশিত করো
|
ভক্তিমূলক
|
অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো,
সুন্দর কর হে।
জাগ্রত করো, উদ্যত করো,
নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নরলস নিঃসংশয় করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো,
অন্তরতর হে।যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে,
মুক্ত করো হে বন্ধ,
সঞ্চার করো সকল মর্মে
শান্ত তোমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত করো হে,
নন্দিত করো, নন্দিত করো,
নন্দিত করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ontor-momo-bikoshito-koro/
|
4617
|
শামসুর রাহমান
|
কেবল মৃত্যুই পারে
|
প্রেমমূলক
|
এ-কথা নিশ্চয় তুমি কখনো ভুলেও বলবে না-
‘ভালোবাসতেই হবে, এই মুচলেকা লিখে দাও,
বলে আমি ভন্ ভন্ করেছি তোমার চারপাশে
নিরালায় বরং দিয়েছি স্বাধিকার তোমাকেই
আমাকে গ্রহণ কিংবা বর্জনের। যদি কোনোদিন
ইচ্ছে হয়, চলে যেও; কখনো কোরো না বিবেচনা
পরিণামে কী হবে আমার। চন্দনার ঠোঁটে পেলে
তোমার খবর, কবরের মাটি স্বেচ্ছায় ছোঁবো না।
আমার গায়ের তাপ যদি হয় এক শো পাঁচের
কিছু বেশি, তবু মূর্চ্ছা যাবো না, ঘুরবো স্বাভাবিক।
ট্রেনের টিকিট কেটে অন্য কোনোখানে পাড়ি দেয়া
যাক ভেবে খুব তাড়াহুড়ো করে হোল্ডল বাঁধি না।আমাকে একলা ফেলে চলে গেলে আমি মরে টরে
যাবো না, স্বীকার করি। অন্তত তোমার কাছ থেকে
মিথ্যা বচনের সহযোগিতায় করুণার কণা
কুড়ানোর বিন্দুমাত্র সাধ নেই। নিন্দুকের দল
যা ইচ্ছে রটাক, তুমি বিব্রত হয়ো না এতটুকু।
মানুষ তাকেই ভালোবাসে যাকে ত্যাগ করে যেতে
পারে মূক যন্ত্রণায়। ভেবে নিও, আমার এ ক্ষীণ
পদচিহ্ন যা ছিল তোমার অনুগামী, ঘাসে ঢাকা
পড়ে গ্যাছে; আমার সম্মুখ হতে অপসৃত হলে
তুমি, ইরেজার দিয়ে মুছে ফেলবে সকল কিছু,
এমন জপালে পাখি কান দিও না কস্মিনকালে।
কেবল মৃত্যুই পারে মেয়ে তোমাকে ভুলিয়ে দিতে। (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kebol-mrittui-pare/
|
2574
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অচির বসন্ত হায় এল, গেল চলে
|
প্রেমমূলক
|
অচির বসন্ত হায় এল, গেল চলে–
এবার কিছু কি, কবি করেছ সঞ্চয়।
ভরেছ কি কল্পনার কনক-অঞ্চলে
চঞ্চলপবনক্লিষ্ট শ্যাম কিশলয়,
ক্লান্ত করবীর গুচ্ছ। তপ্ত রৌদ্র হতে
নিয়েছ কি গলাইয়া যৌবনের সুরা–
ঢেলেছ কি উচ্ছলিত তব ছন্দঃস্রোতে,
রেখেছ কি করি তারে অনন্তমধুরা।
এ বসন্তে প্রিয়া তব পূর্ণিমানিশীথে
নবমল্লিকার মালা জড়াইয়া কেশে
তোমার আকাঙক্ষাদীপ্ত অতৃপ্ত আঁখিতে
যে দৃষ্টি হানিয়াছিল একটি নিমেষে
সে কি রাখ নাই গেঁথে অক্ষয় সংগীতে।
সে কি গেছে পুষ্পচ্যুত সৌরভের দেশে। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ochir-bosonto-hai-elo-gelo-chole/
|
3281
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নদীর প্রতি খাল
|
নীতিমূলক
|
খাল বলে, মোর লাগি মাথা-কোটাকুটি,
নদীগুলা আপনি গড়ায়ে আসে ছুটি।
তুমি খাল মহারাজ, কহে পারিষদ,
তোমারে জোগাতে জল আছে নদীনদ। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nodir-proti-khal/
|
3187
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমারে হেরিয়া চোখে
|
প্রেমমূলক
|
তোমারে হেরিয়া চোখে,
মনে পড়ে শুধু, এই মুখখানি
দেখেছি স্বপ্নলোকে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomare-heria-chokhe/
|
3954
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সার্থকতা
|
প্রকৃতিমূলক
|
ফাল্গুনের সূর্য যবে
দিল কর প্রসারিয়া সঙ্গীহীন দক্ষিণ অর্ণবে,
অতল বিরহ তার যুগযুগান্তের
উচ্ছ্বসিয়া ছুটে গেল নিত্য-অশান্তের
সীমানার ধারে;
ব্যথার ব্যথিত কারে
ফিরিল খুঁজিয়া,
বেড়ালো যুঝিয়া
আপন তরঙ্গদল-সাথে।
অবশেষে রজনীপ্রভাতে,
জানে না সে কখন দুলায়ে গেল চলি
বিপুল নিশ্বাসবেগে একটুকু মল্লিকার কলি।
উদ্বারিল গন্ধ তার,
সচকিয়া লভিল সে গভীর রহস্য আপনার।
এই বার্তা ঘোষিল অম্বরে-
সমুদ্রের উদ্বোধন পূর্ণ আজি পুষ্পের অন্তরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sharthakta/
|
2769
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আহ্বানসংগীত
|
মানবতাবাদী
|
ওরে তুই জগৎ-ফুলের কীট,
জগৎ যে তোর শুকায়ে আসিল,
মাটিতে পড়িল খসে--
সারা দিন রাত গুমরি গুমরি
কেবলি আছিস বসে।
মড়কের কণা,নিজ হাতে তুই
রচিলি নিজের কারা,
আপনার জালে জড়ায়ে পড়িয়া
আপনি হইলি হারা।
অবশেষে কারে অভিশাপ দিস
হাহুতাশ করে সারা,
কোণে বসে শুধু ফেলিস নিশাস,
ঢালিস বিষের ধারা।জগৎ যে তোর মুদিয়া আসিল,
ফুটিতে নারিল আর,
প্রভাত হইলে প্রাণের মাঝারে
ঝরে না শিশিরধার।
ফেলিস নিশাস, মরুর বাতাস
জ্বলিস জ্বালাস কত,
আপন জগতে আপনি আছিস
একটি রোগের মতো।
হৃদয়ের ভার বহিতে পার না,
আছ মাথা নত করে--
ফুটিবে না ফুল, ফলিবে না ফল,
শুকায়ে পড়িবে মরে।রোদন,রোদন, কেবলি রোদন,
কেবলি বিষাদশ্বাস--
লুকায়ে, শুকায়ে, শরীর গুটায়ে
কেবলি কোটরে বাস।
নাই কোনো কাজ--মাঝে মাঝে চাস
মলিন আপনা-পানে,
আপনার স্নেহে কাতর বচন
কহিস আপন কানে।
দিবস রজনী মরীচিকাসুরা
কেবলি করিস পান।
বাড়িতেছে তৃষা, বিকারের তৃষা--
ছট্ফট্ করে প্রাণ।
‘দাও দাও’ ব’লে সকলি যে চাস,
জঠর জ্বলিছে ভুখে--
মুঠি মুঠি ধুলা তুলিয়া লইয়া
কেবলি পুরিস মুখে।
নিজের নিশাসে কুয়াশা ঘনায়ে
ঢেকেছে নিজের কায়া,
পথ আঁধারিয়া পড়েছে সমুখে
নিজের দেহের ছায়া।
ছায়ার মাঝারে দেখিতে না পাও,
শব্দ শুনিলে ডর’--
বাহু প্রসারিয়া চলিতে চলিতে,
নিজেরে আঁকড়ি ধর’।
চারি দিকে শুধু ক্ষুধা ছড়াইছে
যে দিকে পড়িছে দিঠ,
বিষেতে ভরিলি জগৎ রে তুই
কীটের অধম কীট।আজিকে বারেক ভ্রমরের মতো
বাহির হইয়া আয়,
এমন প্রভাতে এমন কুসুম
কেন রে শুকায়ে যায়।
বাহিরে আসিয়া উপরে বসিয়া
কেবলি গাহিবি গান,
তবে সে কুসুম কহিবে রে কথা,
তবে সে খুলিবে প্রাণ।
আকাশে হাসিবে তরুণ তপন,
কাননে ছুটিবে বায়,
চারি দিকে তোর প্রাণের লহরী
উথলি উথলি যায়।
বায়ুর হিল্লোলে ধরিবে পল্লব
মরমর মৃদু তান,
চারি দিক হতে কিসের উল্লাসে
পাখিতে গাহিবে গান।
নদীতে উঠিবে শত শত ঢেউ,
গাবে তারা কল কল,
আকাশে আকাশে উথলিবে শুধু
হরষের কোলাহল।
কোথাও বা হাসি কোথাও বা খেলা
কোথাও বা সুখগান--
মাঝে বসে তুই বিভোর হইয়া,
আকুল পরানে নয়ান মুদিয়া
অচেতন সুখে চেতনা হারায়ে
করিবি রে মধুপান।
ভুলে যাবি ওরে আপনারে তুই
ভুলে যাবি তোর গান।
মোহ ছুটিবে রে নয়নেতে তোর,
যে দিকে চাহিবি হয়ে যাবে ভোর,
যাহারে হেরিবি তাহারে হেরিয়া
মজিয়া রহিবে প্রাণ।
ঘুমের ঘোরেতে গাহিবে পাখি
এখনো যে পাখি জাগে নি,
ভোরের আকাশ ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া
উঠিবে বিভাসরাগিণী।
জগৎ-অতীত আকাশ হইতে
বাজিয়া উঠিবে বাঁশি,
প্রাণের বাসনা আকুল হইয়া
কোথায় যাইবে ভাসি।
উদাসিনী আশা গৃহ তেয়াগিয়া
অসীম পথের পথিক হইয়া
সুদূর হইতে সুদূরে উঠিয়া
আকুল হইয়া চায়,
যেমন বিভোর চকোরের গান
ভেদিয়া ভেদিয়া সুদূর বিমান
চাঁদের মরণে মরিতে গিয়া
মেঘেতে হারায়ে যায়।
মুদিত নয়ান, পরান বিভল,
স্তব্ধ হইয়া শুনিবি কেবল,
জগতেরে সদা ডুবায়ে দিতেছে
জগৎ-অতীত গান--
তাই শুনি যেন জাগিতে চাহিছে
ঘুমেতে-মগন প্রাণ।
জগৎ বাহিরে যমুনাপুলিনে
কে যেন বাজায় বাঁশি,
স্বপন-সমান পশিতেছে কানে
ভেদিয়া নিশীথরাশি--এ গান শুনি নি,এ আলো দেখি নি,
এ মধু করিনি পান,
এমন বাতাস পরান পুরিয়া
করে নি রে সুধা দান,
এমন প্রভাত-কিরণ মাঝার
কখনো করি নি স্নান,
বিফলে জগতে লভিনু জনম,
বিফলে কাটিল প্রাণ।
দেখ্ রে সবাই চলেছে বাহিরে
সবাই চলিয়া যায়,
পথিকেরা সবে হাতে হাতে ধরি
শোন্ রে কী গান গায়।
জগৎ ব্যাপিয়া শোন্ রে সবাই
ডাকিতেছে, আয়,আয়--
কেহ বা আগেতে কেহ বা পিছায়ে,
কেহ ডাক শুনে ধায়।অসীম আকাশে স্বাধীন পরানে
প্রাণের আবেগে ছোটে,
এ শোভা দেখিলে জড়ের শরীরে
পরান নাচিয়া ওঠে।
তুই শুধু ওরে ভিতরে বসিয়া
গুমরি মরিতে চাস!
তুই শুধু ওরে করিস রোদন,
ফেলিস দুখের শ্বাস!
ভূমিতে পড়িয়া আঁধারে বসিয়া
আপনা লইয়া রত
আপনারে সদা কোলেতে তুলিয়া
সোহাগ করিস কত!
আর কতদিন কাটিবে এমন,
সময় যে চলে যায়।
ওই শোন্ ওই ডাকিছে সবাই,
বাহির হইয়া আয়!
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ahbansangeet/
|
4832
|
শামসুর রাহমান
|
দিগন্তের বুক চিরে
|
মানবতাবাদী
|
কখনও কখনও আমি একান্তে নিজেকে
বিশ্লেষণ করার ইচ্ছায় গৃহকোণে
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসি,
আকাশ-পাতাল ভাবি, এলোমেলো অনেক ভাবনা
আমাকে বিব্রত করে। বুকশেলফ থেকে
বই টেনে নিই দুশ্চিন্তার মাকড়সা-জাল থেকে মুক্তি পেতে।তবুও নিস্তার নেই যেন, আচমকা ভাবনার
খোলা পথে দেশের দশের ছায়াছবি
রূপায়িত হয়ে
কোন সে পাতালে ঠেলে দেয়, হাবুডুবু
খেতে থাকি। কারও সাতে-পাঁচে নেই, তবু
কেন ঘোর অমাবস্যা ভাবনার মূর্ণিমাকে দ্রুত গ্রাস করে?কী এক আজব খেলা চলছে স্বদেশে ইদানীং,
বুঝেও বুঝি না যেন! আমরা কি
সবাই এখন উলটো পায়ে হাঁটছি কেবল? ব্যতিক্রম কিছু
আছে বটে, তবে তারা এক কোণে ব’সে
থিসিসের মায়াজালে বন্দি হয়ে ক্লান্তির বিস্তীর্ণ কুয়াশায়
পথ, বিপথের ফারাক না বুঝে ঘুরছেন, শুধু ঘুরছেন।
কালেভদ্রে কিছু কলরব শ্রুত হয় পাড়ায় পাড়ায় আর
জাগৃতির ঢেউ দ্রুত বুদ্বুদের মতো
মিশে যায়। এই কি নিয়তি সকলের? ‘নয়, নয়
কখনও তা নয় ধ্বনি জেগে ওঠে দূর দিগন্তের বুক চিরে। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/digonter-buk-chire/
|
4224
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
পাবো প্রেম কান পেতে রেখে
|
প্রেমমূলক
|
বড় দীর্ঘতম বৃক্ষে ব’সে আছো, দেবতা আমার ।
শিকড়ে, বিহ্বল প্রান্তে, কান পেতে আছি নিশিদিন
সম্ভ্রমের মূল কোথা এ-মাটির নিথর বিস্তারে ;
সেইখানে শুয়ে আছি মনে পড়ে, তার মনে পড়ে ?যেখানে শুইয়ে গেলে ধীরে-ধীরে কত দূরে আজ !
স্মারক বাগানখনি গাছ হ’য়ে আমার ভিতরে
শুধু স্বপ্ন দীর্ঘকায়, তার ফুল-পাতা-ফল-শাখা
তোমাদের খোঁড়া-বাসা শূন্য ক’রে পলাতক হলো ।আপনারে খুঁজি আর খুঁজি তারে সঞ্চারে আমার
পুরানো স্পর্শের মগ্ন কোথা আছো ? বুঝি ভুলে গেলে ।
নীলিমা ঔদাস্যে মনে পড়ে নাকো গোষ্ঠের সংকেত ;
দেবতা সুদূর বৃক্ষে, পাবো প্রেম কান পেতে রেখে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/pabo-prem-kaan-pete-rekhe/
|
2107
|
মহাদেব সাহা
|
একুশের কবিতা
|
স্বদেশমূলক
|
ভিতরমহলে খুব চুনকাম, কৃষ্ণচূড়া
এই তো ফোটার আয়োজন
বাড়িঘর কী রকম যেন তাকে হলুদ অভ্যাসবশে চিনি,
হাওয়া একে তোলপাড় করে বলে, একুশের ঋতু!
ধীরে ধীরে সন্ধ্যার সময় সমস্ত রঙ মনে পড়ে, সূর্যাস্তের
ন্নি সরলতা
হঠাৎ আমারই জামা সূর্যাস্তের রঙে ছেয়ে যায়,
আর আমার অজ্ঞাতে কারা আর্তনাদ করে ওঠে রক্তাক্ত রক্তিম
বলে তাকে!
আমি পুনরায় আকাশখানিরে চেয়ে দেখি
নক্ষত্রপুঞ্জের মৌনমেলা,
মনে হয় এঁকেবেঁকে উঠে যাবে আমাদের
ছিন্নভিন্ন পরাস্ত জীবন,
অবশেষে বহুদূরে দিগন্তের দিকচিহ্ন মুছে দিয়ে
ডাক দেবে আমরাই জয়ী!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1348
|
2680
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আত্মসমর্পণ
|
স্বদেশমূলক
|
তোমার আনন্দগানে আমি দিব সুর
যাহা জানি দু-একটি প্রীতি-সুমধুর
অন্তরের ছন্দোগাথা; দুঃখের ক্রন্দনে
বাজিবে আমার কণ্ঠ বিষাদবিধুর
তোমার কণ্ঠের সনে; কুসুমে চন্দনে
তোমারে পূজিব আমি; পরাব সিন্দূর
তোমার সীমন্তে ভালে; বিচিত্র বন্ধনে
তোমারে বাঁধিব আমি, প্রমোদসিন্ধুর
তরঙ্গেতে দিব দোলা নব ছন্দে তানে।
মানব-আত্মার গর্ব আর নাহি মোর,
চেয়ে তোর স্নিগ্ধশ্যাম মাতৃমুখ-পানে
ভালোবাসিয়াছি আমি ধূলিমাটি তোর।
জন্মেছি যে মর্ত-কোলে ঘৃণা করি তারে
ছুটিব না স্বর্গ আর মুক্তি খুঁজিবারে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/412.html
|
2762
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আশীর্বাদ
|
ভক্তিমূলক
|
পঞ্চাশ বছরের কিশোর গুণী নন্দলাল বসুর প্রতি
সত্তর বছরের প্রবীণ যুবা রবীন্দ্রনাথের আশীর্ভাষণ নন্দনের কুঞ্জতলে রঞ্জনার ধারা,
জন্ম-আগে তাহার জলে তোমার স্নান সারা।
অঞ্জন সে কী মধুরাতে
লাগালো কে যে নয়নপাতে,
সৃষ্টি-করা দৃষ্টি তাই পেয়েছে আঁখিতারা। এনেছে তব জন্মডালা অজর ফুলরাজি,
রূপের-লীলালিখন-ভরা পারিজাতের সাজি।
অপ্সরীর নৃত্যগুলি
তুলির মুখে এনেছ তুলি,
রেখার বাঁশি লেখার তব উঠিল সুরে বাজি। যে মায়াবিনী আলিম্পনা সবুজে নীলে লালে
কখনো আঁকে কখনো মোছে অসীম দেশে কালে,
মলিন মেঘে সন্ধ্যাকাশে
রঙিন উপহাসি যে হাসে
রঙজাগানো সোনার কাঠি সেই ছোঁয়ালো ভালে। বিশ্ব সদা তোমার কাছে ইশারা করে কত,
তুমিও তারে ইশারা দাও আপন মনোমত।
বিধির সাথে কেমন ছলে
নীরবে তব আলাপ চলে,
সৃষ্টি বুঝি এমনিতরো ইশারা অবিরত। ছবির 'পরে পেয়েছ তুমি রবির বরাভয়,
ধূপছায়ার চপল মায়া করেছ তুমি জয়।
তব আঁকন-পটের 'পরে
জানি গো চিরদিনের তরে
নটরাজের জটার রেখা জড়িত হয়ে রয়। চিরবালক ভুবনছবি আঁকিয়া খেলা করে,
তাহারি তুমি সমবয়সী মাটির খেলাঘরে।
তোমার সেই তরুণতাকে
বয়স দিয়ে কভু কি ঢাকে,
অসীম-পানে ভাসাও প্রাণ খেলার ভেলা-'পরে। তোমারি খেলা খেলিতে আজি উঠেছে কবি মেতে,
নববালক জন্ম নেবে নূতন আলোকেতে।
ভাবনা তার ভাষায় ডোবা--
মুক্ত চোখে বিশ্বশোভা
দেখাও তারে, ছুটেছে মন তোমার পথে যেতে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aserbat/
|
4689
|
শামসুর রাহমান
|
গৌণ শিল্প
|
চিন্তামূলক
|
আমার ব্যর্থতা, কালো, সাংকেতিক ব্যর্থতা কখনো
লতাপাতা কিংবা পাখপাখালির আড়ালে লুকিয়ে
থাকে, কখনো-বা
ওষ্ঠের কিনারে তিক্ত স্বাদ রেখে যায়।আমার নৈবেন্য নেয় বারবার ব্যর্থতার হা হা এভেনিউ।
শব্দ কতিপয়,
অসফল, দিশেহারা, বুঝি পিতৃমাতৃহীন পথের সন্তান,
এলেবেলে খেলে মৃত অন্ধকারে, ঘুমায় কবরে।
লতাগুল্মময় কবরের পাশে নতজানু কম্পমান, ডাকি
বারবার ঝোড়ো হৃদয়ের তীব্র আর্তি নিয়ে, ওরা
নিঃস্পন্দ নিঃসাড় যেন মেঘের আড়ালে বিকলাঙ্গ চন্দ্রকণা
অথবা এমন লখিন্দর যার গলিত শরীরে
পারবে না চল্কে দিতে প্রাণধারা বেহুলা কখনো।ওদেরতা চমৎকার সেজেগুজে, শার্টের কলার
উল্টিয়ে শোভন আর টুপিতে পালক গুঁজে পথে
বেরুনোর কথা ছিলো,
কথা ছিলো, ওরা যাবে ড্রইংরুমের সুশীতল পরিবেশে,
বসবে সোফায়, লাল গালিচায়, দেবে জুড়ে নিভৃত আলাপ,
কথা ছিলো, ওরা যাবে ভেজা-ভেজা অন্ধকারময় গ্রন্থাগারে,
মেলাবে আপন হাত তত্ত্বপরায়ণ, তথ্যঠাসা অধ্যাপকদের সঙ্গে,
তরুণ তরুণীদের ভিড়ে করবে রগড় পার্কে করিডরে
আলো আঁধারিতে
কাফেটারিয়ায়,
কথা ছিলো, ওড়াবে অজস্র টিয়ে বাণিজ্যিক এলাকার লাল
পেট্রোল পাম্পের কিছু সম্ভ্রান্ত ওপরে,
মধ্যবিত্ত ছাদে, চিলেকোঠায় গলির মোড়ে আর
খবরের কাগজের হুজুগে পাড়ায়,
অথচ এখন ওরা লতাপাতা কিংবা পাখির ডানার
অথবা ঠোঁটের ছায়াচ্ছন্নাতায় গভীর লুকোনো
এবং তাদের সঙ্গে আমার শ্যামল শৈশবের কিছু বেলা
যৌবনের অলৌকিক রথ,
দীপ্র, ভগ্ন, স্মৃতি আচ্ছাদিত, শ্যাওলায় কারুময়,
আমার আশার কীর্তনিয়া
করেছে প্রস্থান গৌণ শিল্পের আড়ালে। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/gouno-shilpo/
|
1388
|
তারাপদ রায়
|
তিনি
|
চিন্তামূলক
|
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি।
চুল আঁচড়াই,দাড়ি কামাই,
কখনও নিজেকে ভাল করে দেখি,
ফিসফিস করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করি,
‘কেমন আছ, তারাপদ?’
কখনও কখনও নিজেকে বলি,
‘ছেষট্টি বছর বয়েস হল,
যদি আর অর্ধেক জীবন বাঁচো,
শতায়ু হবে।’
নিজের রসিকতায় নিজেই হাসি
নিজে অর্থাৎ আমি নিজে এবং আয়নার নিজে।এইরকম ভাবে একদিন,
কথা নেই, বার্তা নেই আয়নার নিজে
কি কৌশলে আয়নার থেকে বেরিয়ে আসে।
আমি তাকে বোঝাই,’এ হয়না , এ হতে পারে না ।’
সে আমাকে বোঝায়,’এ হয়না, এ হতে পারে না ।’আয়নার সামনে এইরকম কথা কাটাকাটি হতে হতে
হঠাৎ সে আমাকে এক ধাক্কায়
আয়নার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়।
তারপর থেকে আমি আয়নার ভিতরে।
আর যার সঙ্গে আপনাদের কথাবার্তা, চলাফেরা,
সে তারাপদবাবু কেউ নন,
তিনি আমার ছায়া।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
5695
|
সুকুমার রায়
|
সম্পাদকের দশা
|
হাস্যরসাত্মক
|
সম্পাদকীয়-
একদা নিশীথে এক সম্পাদক গোবেচারা ।
পোঁটলা পুঁটলি বাঁধি হইলেন দেশছাড়া ।।
অনাহারী সম্পাদকী হাড়ভাঙা খাটুনি সে ।
জানে তাহা ভুক্তভোগী অপরে বুঝিবে কিসে ?
লেখক পাঠক আদি সকলেরে দিয়া ফাঁকি ।
বেচারী ভাবিল মনে- বিদেশে লুকায়ে থাকি ।।
এদিকে ত ক্রমে ক্রমে বৎসরেক হল শেষ ।
'নোটিশ' পড়িল কত 'সম্পাদক নিরুদ্দেশ' ।।
লেখক পাঠকদল রুষিয়া কহিল তবে ।
জ্যান্ত হোক মৃত হোক ব্যাটারে ধরিতে হবে ।।
বাহির হইল সবে শব্দ করি 'মার মার' ।
-দৈবের লিখন, হায়, খণ্ডাইতে সাধ্য কার ।।
একদা কেমনি জানি সম্পাদক মহাশয় ।
পড়িলেন ধরা- আহা দুরদৃষ্ট অতিশয় ।।
তারপরে কি ঘটিল কি করিল সম্পাদক ।
সে সকল বিবরণে নাহি তত আবশ্যক ।।
মোট কথা হতভাগ্য সম্পাদক অবশেষে ।
বসিলেন আপনার প্রাচীন গদিতে এসে ।।
(অর্থাৎ লেখকদল লাঠৌষধি শাসনেতে ।
বসায়েছে তারে পুনঃ সম্পাদকী আসনেতে ।।)
ঘুচে গেছে বেচারীর ক্ষণিক সে শান্তি সুখ ।
লেখকের তাড়া খেয়ে সদা তার শুষ্কমুখ ।।
দিস্তা দিস্তা পদ্য গদ্য দর্শন সাহিত্য প'ড়ে ।
পুনরায় বেচারির নিত্যি নিত্যি মাথা ধরে ।।
লোলচর্ম অস্থি সার জীর্ণ বেশ রুক্ষ্ণ কেশ ।
মুহূর্ত সোয়াস্তি নাই- লাঞ্ছনার নাহি শেষ ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/sompadoker-dosha/
|
5488
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
পটভূমি
|
মানবতাবাদী
|
অজাতশত্রু, কতদিন কাল কাটলো :
চিরজীবন কি আবাদ-ই ফসল ফলবে?
ওগো ত্রিশঙ্কু, নামাবলী আজ সম্বল
টংকারে মূঢ় স্তব্ধ বুকের রক্ত৷কখনো সন্ধ্যা জীবনকে চায় বাঁধতে,
সাদা রাতগুলো স্বপ্নের ছায়া মনে হয়,
মাটির বুকেতে পরিচিত পদশব্দ,
কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি থেকেই অব্যয়৷ভীরু একদিন চেয়েছিল দূর অতীতে
রক্তের গড়া মানুষকে ভালবাসতে;
তাই বলে আজ পেশাদারী কোন মৃত্যু!
বিপদকে ভয়? সাম্যের পুনরুক্তি৷সখের শপথ গলিতে কালের গর্ভে—
প্রপঞ্চময় এই দুনিয়ার মুষ্ঠি,
তবু দিন চাই, উপসংহারে নিঃস্ব
নইলে চটুল কালের চপল দৃষ্টি৷পঙ্গু জীবন; পিচ্ছিল ভীত আত্মা,—
রাত্রির বুকে উদ্যত লাল চক্ষু;
শেষ নিঃশ্বাস পড়ুক মৌন মন্ত্রে,
যদি ধরিত্রী একটুও হয় রক্তিম॥‘পটভুমি’ কবিতাটির রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪২-৪৩৷
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/potvumi/
|
1280
|
জীবনানন্দ দাশ
|
হে হৃদয় (অগ্রন্থিত)
|
চিন্তামূলক
|
হে হৃদয়, একদিন ছিলে তুমি নদী
পারাপারহীন এক মোহনায় তরণীর ভিজে কাঠ
খুঁজিতেছে অন্ধকার স্তব্ধ মহোদধি।
তোমার নির্জন পাল থেকে যদি মরণের জন্ম হয়,
হে তরণী,
কোনো দূর পীত পৃথিবীর বুকে ফাল্গুনিক তবে
ঝরনার জল আজো ঢালুক নীরবে;
বিশীর্ণেরা আঁজলায় ভরে নিক সলিলের মুক্তা আর মণি
অন্ধকার সাগরের মরণকে নিষ্ঠা দিয়ে_ ঊষালোকে মাইক্রোফোনের মতো রবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/oe-hridhoy/
|
5949
|
সৈয়দ শামসুল হক
|
যদি মনে করো
|
চিন্তামূলক
|
যদি মনে করো ভালোবাসা মরে গেছে
যদি মনে করো ভালোবাসা আর নেই
যদি মনে করো ভালোবাসা বলে কখনো ছিল না কিছু—
তখন তাকিয়ে দেখো বাগানের দিকে—
সূর্যের দিকে শিমলতা চেয়ে আছে!
অথবা গাছের গুঁড়িতে পিঁপড়ে বাসা করে দেখে নিয়ো,
বেরিয়েছে ওরা তোমার গলার মতির মালার মতো
দীর্ঘ সারিতে মানুষের দিকে শর্করা সন্ধানে,
যদি মনে করো ভালোবাসা মরে গেছে
ভালোবাসার এই শব্দের মানে ওখানে উল্টে দেখো।
পথের কুকুর শুয়ে থাকে ঘুমে ল্যাম্পপোস্টের নিচে,
ভিখিরি খোঁড়ায় হেঁটে যায় তবু হাত তার পেতে রাখে,
কোথাও কিছুই মরে যায়নি তো,ঘুমে জাগরণে অভাবে অধীরে তবু
রৌদ্রের দিকে।
পাতা ঝরে যায়, পাতা ধরে ওঠে মাঠ,
শাকান্ন তবু পরিতৃপ্তিতে সংশয়ী হাত চাটে—
যদি মনে করো ভালোবাসা বলে কখনো ছিল না কিছু,
অন্তত নিয়ো আমার অন্ন তোমাদের পাতে তুলে।২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, লন্ডন, সকাল সাড়ে আটটা
|
https://banglapoems.wordpress.com/2016/10/04/%e0%a6%af%e0%a6%a6%e0%a6%bf-%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8b-%e0%a6%b8%e0%a7%88%e0%a7%9f%e0%a6%a6-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%8f%e0%a6%b0/
|
1556
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
একদিন এইসব হবে, তাই
|
চিন্তামূলক
|
একদিন সমস্ত যোদ্ধা বিষণ্ণ হবার মন্ত্র শিখে যাবে।
একদিন সমস্ত বৃদ্ধ দুঃখহীন বলতে পারবে, যাই।
একদিন সমস্ত ধর্ম অর্থ পাবে ভিন্ন রকমের।
একদিন সমস্ত শিল্পী কল্পনার প্রতিমা বানাবে।
একদিন সমস্ত নারী চোখের ইঙ্গিতে বলবে, এসো।
একদিন সমস্ত ধর্মযাজকের উর্দি কেড়ে নিয়ে
নিষ্পাপ বালক বলবে, হাহা।
একদিন এইসব হবে বলেই এখনও
সূর্য ওঠে, বৃষ্টি পড়ে, এবং কবিতা লেখা হয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1552
|
5483
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
দেশলাই কাঠি
|
মানবতাবাদী
|
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি নাঃ
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ-
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলস্থূল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন-
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ
আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন-
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে-
আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছ বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে , গ্রামে- দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না:
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই শেষবারের মতো!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/264
|
3191
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে
|
ভক্তিমূলক
|
দয়া দিয়ে হবে গো মোর
জীবন ধুতে–
নইলে কি আর পারব তোমার
চরণ ছুঁতে।
তোমায় দিতে পূজার ডালি
বেড়িয়ে পড়ে সকল কালি,
পরান আমার পারি নে তাই
পায়ে থুতে।এতদিন তো ছিল না মোর
কোনো ব্যথা,
সর্ব অঙ্গে মাখা ছিল
মলিনতা।
আজ ওই শুভ্র কোলের তরে
ব্যাকুল হৃদয় কেঁদে মরে
দিয়ো না গো, দিয়ো না আর
ধুলায় শুতে।কলিকাতা, ২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/doya-diye-hobe-go-mor-jibon-dhute/
|
4567
|
শামসুর রাহমান
|
কাঁহাতক
|
চিন্তামূলক
|
দু’টুকরো, তিন টুকরো, চার টুকরো পাঁচ টুকরো
বহু টুকরো দিনভর রাতভর। এভাবেই কৈ মাছের নাচ
নেচে, নিজের রক্ত নিজে ছেঁচে বেশ কিছু গড়বড়
ক’রে বেঁচে আছে। ওর কাছে
কীসের যে কী দাম;
বিষের নাকি লোকশ্রুত অমৃতের, বোঝা দায়। কাম ওকে প্রায়শই
গনগনে লোহা বানায়; অথচ
তেমন সরোবর কই, যেখানে মনোমুগ্ধকর শীতলতা?আসলে ওসব বাজে কথা, আকাট মূর্খের
বুজরুকি। জানে না, কোন্ কাজে কোন্ ঝুঁকি, শরীর
টরীর সব নয়। অন্য কিছু অবশ্যই আছে। গাছে
বাকল থাকে, ফল মূলও লভ্য। ডালই একমাত্র, বাকি
সব ফক্কিকার, এমন ভাবার সুযোগ নেই সভ্য
মানুষের। শীঘ্র চ’লে যাবে ভেবে দীর্ঘ জীবনের আকাংক্ষা
দোলায় মাথা, ভোলায় নশ্বরতা। ‘যা’ কিছু
পেলাম সীমিত এ জীবনে তাকেই সেলাম’
বলে সে প্রীত, মাটির ঢেলা ছুঁড়ে দেয় দূরে সূর্য ডুবুডুবু
বেলায়। বয়স ফুরোচ্ছে, কালের বায়স কর্কশ সুরে
দেয় জানান। তাতে কী? দুধে-ভাতে নাই বা গেলো
থাকা। একেবারে ভূখা নয়, রুখা সুখা খাচ্ছে দু’বেলা।এরও বেশি কিছু চাই ওর। কীসের জন্যে হাহাকার সত্তা জুড়ে?
আগুন রঙের অশ্বক্ষুরে উঠুক বেজে
জমিন; খাল শুকোলে কী করে থাকবে মীন? নতুন কাল
ডেকে আনার ইন্দ্রজাল কোথায়? কোনো মন্ত্র কেউ কি
জানে না? যন্ত্রণা, সাপ-কামড়ানো যন্ত্রণা আপাদমস্তক।
চামড়া ফুঁড়ে গল গল বেরোয় বিষ। কাঁহাতক আর সইবে সে? (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kahatok/
|
4803
|
শামসুর রাহমান
|
তোমাকেই ডেকে ডেকে
|
প্রেমমূলক
|
এখন তোমার ঘুম নিশীথের দিঘিতে নিটোল
পদ্ম আর তোমার নিদ্রিত যৌবনের পূর্ণিমায়
উদ্ভসিত বন্ধ ঘর। আমার চোখের পাতা জুড়ে
নেই আজ নিদ্রার কুসুম, জ্বালাধরা চোখ মেলে
কাটাই প্রহর, শুনি প্রতারক জ্যোৎস্নার প্রভাবে
স্তব্ধ নিসর্গকে অপ্রস্তুত করে আচানক কাক
ডেকে ওঠে। আমার খাতার পাতা অসমাপ্ত এক
চতুর্দশপদী বুকে নিয়ে জুড়ে দিয়েছে মাতম।কখন যে ভাঙবে তোমার ঘুম পাবো নাকো টের,
যদি না জানাও টেলিফোনে; রাত পোশাকের ভাঁজে
ভাঁজে জমে স্বপ্নের ভগ্নাংশ। সেই কণাগুলি খুব
সন্তর্পণে পারব কি কুড়োতে বিহানে কোনো দিন
তোমার ঘুমের অন্তরালে, স্বপ্নে চিড় না ধরিয়ে?
তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি! (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomakei-deke-deke/
|
5690
|
সুকুমার রায়
|
শ্রীগোবিন্দ-কথা
|
হাস্যরসাত্মক
|
আমি অর্থাৎ শ্রীগোবিন্দ মানুষটি নই বাঁকা!
যা বলি তা ভেবেই বলি, কথায় নেইক ফাঁকা।
এখনকার সব সাহেবসুবো, সবাই আমায় চেনে
দেখ্তে চাও ত দিতে পারি সাটিফিকেট এনে।
ভাগ্য আমায় দেয়নি বটে করতে বি-এ পাশ,
তাই বলে কি সময় কাটাই কেটে ঘোড়ার ঘাস?
লোকে যে কয় বিদ্যে আমার 'কথামালা'ই শেষ-
এর মধ্যে সত্যি কথা নেইক বিন্দুলেশ।
ওদের পাড়ার লাইব্রেরিতে কেতাব আছে যত
কেউ পড়েছে তন্নতন্ন করে আমায় মতো?
আমি অর্থাৎ শ্রীগোবিন্দ এমনি পড়ার যম
পড়াশুনো নয়ক আমার কারুর চেয়ে কম।
কতকটা এই দেখেশিখে কতক পড়েশুনে,
কতক হয়ত স্বাভাবিকী প্রতিভারই গুণে
উন্নতিটা করছি যেমন আশ্চর্য তা ভারি,
নিজের মুখে সব কথা তার বলতে কি আর পারি?
বলে গেছেন চন্ডীপতি কিংবা অন্য কেউ
"আকাশ জুড়ে মেঘের বাসা, সাগরভরা ঢেউ,
জীবনটাও তেমনি ঠাসা কেবল বিনা কাজে-
যেদিক দিয়ে খরচ করি সেই খরচই বাজে!"
আমি অর্থাৎ শ্রীগোবিন্দ চলতে ফিরতে শুতে
জীবনটাকে হাঁকাই নেকো মনের রথে জুতে।হাইড্রোজেনের দুই বাবাজি অক্সিজেনের এক
নৃত্য কবেন গলাগলি কান্ডখানা দেখ্,
আহাদেতে এক্সা হলে গলে হলেন জল
এই সুযোগে সুবোধ শিশু "শ্রীগোবিন্দ" বল্।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/shri-gobindo-kotha/
|
4842
|
শামসুর রাহমান
|
দুপুর প্রবেশ করে
|
সনেট
|
দুপুর প্রবেশ করে আমার ভেতরে, কী উদ্দাম
হাওয়া একরাশ বুকে পায় ঠাঁই। সে আছে এখানে
আমার নিকটে বসে, যার কণ্ঠ মৃদু কথা-গানে
পল্লবিত মাঝে মধ্যে এই স্তব্ধতায় ছিমছাম
পরিবেশে, শুধু চেয়ে থাকা কখনো বা, তার নাম
ধূপের মতোন জ্বলে আমার শিরায়। কী যে মানে
অমন দৃষ্টির আজো বুঝতে পারিনি, কিন্তু দানে
দানে ভরিয়েছে সে আমাকে। আগে কী শূন্য ছিলাম।তবু কি শূন্যতা মুছে যায়? তবে কেন রিক্ত সুর
বেজে ওঠে বারংবার? কেন মনে হয়,আমি শুধু
তার রাজধানী থেকে দূরে চলে যাচ্ছি নির্বাসনে
মুকুট বিহীন একা? দেখি পড়ে আছি খুব ধূ ধূ
পাথুরে জমিনে, কণ্টকিত গুল্মে দীর্ণ চোখ, মনে
প্রেত-নৃত্য। সে-ও যেন বিবাগিনী উদাস দুপুর।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dupure-probesh-kore/
|
3595
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিপদে মোরে রক্ষা করো
|
ভক্তিমূলক
|
বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে
নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।
সহায় মোর না যদি জুটে
নিজের বল না যেন টুটে,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি
লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
এ নহে মোর প্রার্থনা,
তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
আমার ভার লাঘব করি
নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়।
নম্রশিরে সুখের দিনে
তোমারি মুখ লইব চিনে,
দুখের রাতে নিখিল ধরা
যেদিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/556.html
|
1921
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
হে প্রসিদ্ধ অমরতা
|
চিন্তামূলক
|
হে প্রসিদ্ধ অমরতা
কী সুন্দর তোমার ভ্রুকুটি
ঘরের বাহিরে ডেকে এনে
ভাঙো ঘর, স্থিরতার খুঁটি।
ধবংসের আগুনে জলে ঝড়ে
তুমি রাখো মায়াবী দর্পণ
মহিমার স্পর্শ যারা চায়
রক্তপাতে তাদের তর্পণ
হে প্রসিদ্ধ অমরতা
কী উজ্জল তোমার পেরেক
বিদ্ধ ও নিহত হয় যারা
কেবল তাদেরই অভিষেক।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1243
|
514
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সই ভালো করে বিনোদ-বেণী
|
প্রেমমূলক
|
সই, ভালো করে বিনোদ-বেণী বাঁধিয়া দে
মোর বঁধু যেন বাঁধা থাকে বিননী-ফাঁদে।সই চপল পুরুষ সে, তাই কুরুশ-কাঁটায়
রাখিব খোঁপার সাথে বিঁধিয়া লো তায়
তাহে রেশমী জাল বিছায়ে দে ধরিতে চাঁদে।বাঁধিতে সে বাঁধন হারা বনের হরিণ
জড়ায়ে দে জরীন্ ফিতা মোহন ছাঁদেপ্রথম প্রণয় রাগের মত আল্তা রঙে
রাঙায়ে দে চরণ মোর এমনি ঢঙে
সই পায়ে ধরে বঁধু যেন আমারে সাধে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/shoi-valo-korey-binod-beni/
|
4178
|
লালন শাহ
|
এসব দেখি কানার হাট বাজার
|
চিন্তামূলক
|
এসব দেখি কানার হাট বাজার
বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা
আর এক কানা মন আমার।।পণ্ডিত কানা অহংকারে
মাতবর কানা চোগলখোরে।
সাধু কানা অন বিচারে
আন্দাজে এক খুঁটি গেড়ে,
চেনে না সীমানা কার।।এক কানা কয় আর এক কানারে
চল এবার ভবপারে।
নিজে কানা পথ চেনে না
পরকে ডাকে বারে বার।।কানায় কানায় উলামিলা
বোবাতে খায় রসগোল্লা।
লালন তেমনি মদনা কানা
ঘুমের ঘোরে দেয় বাহার।।আরও পড়ুন… মিলন হবে কত দিনে – লালন শাহ
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4429.html
|
1309
|
তসলিমা নাসরিন
|
এসেছি অস্ত যেতে
|
প্রেমমূলক
|
পুবে তো জন্মেছিই, পুবেই তো নেচেছি, যৌবন দিয়েছি,
পুবে তো যা ঢালার, ঢেলেইছি
যখন কিছু নেই, যখন কাঁচা পাকা, যখন চোখে ছানি, ধুসর ধুসর,
যখন খালি খালি, যখন খাঁ খাঁ — এসেছি অস্ত যেতে পশ্চিমে।
অস্ত যেতে দাও অস্ত যেতে দাও দাও অস্ত যেতে
না দিলে স্পর্শ করো, একটু স্পর্শ করো, স্পর্শ করো একটুখানি
লোমকূপে বুকে
স্পর্শ করো ত্বকের মরচে তুলে ত্বকে, চুমু খাও,
কণ্ঠদেশ চেপে ধরো, মৃত্যুর ইচ্ছেটিকে মেরে ফেলো,
সাততলা থেকে ফেলো! স্বপ্ন দাও, বাঁচাও।
পুবের শাড়ির আঁচলটি বেঁধে রেখে পশ্চিমের ধুতির কোঁচায়
রঙ আনতে যাবো আকাশপারে,
যাবে কেউ? পশ্চিম থেকে পুবে,
দক্ষিণ থেকে উত্তরে ঘুরে ঘুরে
এই তো যাচ্ছি আনতে উৎসবের রঙ, আর কারও ইচ্ছে হলে চলো,
কারও ইচ্ছে হলে আকাশদুটোকে মেলাতে, চলো।
মিলে গেলে অস্ত যাবো না, ওই অখণ্ড আকাশে আমি অস্ত যাবো না,
কাঁটাতার তুলে নিয়ে গোলাপের বাগান করব, অস্ত যাবো না,
ভালোবাসার চাষ হবে এইপার থেকে ওইপার, দিগন্তপার
সাঁতরে সাঁতরে এক করে দেবো গঙ্গা পদ্মা ব্রহ্মপুত্র, অস্ত যাব না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1962
|
915
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অবসরের গান
|
প্রকৃতিমূলক
|
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে ;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার ,- চোখণ ,- তার শিশিরের ঘ্রাণ ,
তাদের আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান ,
দেহের স্বাদের কথা কয় ;-
বিকালের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট ক’রে দেবে তার সাধের সময় !
চারিদিকে এখন সকাল,-
রোদের নরম রং শিশুর গালের মতো লাল !
মাঠের ঘাসের’পরে শৈশবের ঘ্রাণ ,-
পাড়াগাঁর পথে ক্ষান্ত উৎসবের পড়েছে আহ্বান !
চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল !
প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে থেকে আসিতেছে ভেসে
পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাঁড়ারের দেশে !
শরীর এলায়ে আসে এইখানে ফলন্ত ধানের মতো ক’রে
যেঁই রোদ একবার এসে শুধু চ’লে যায় তাহার ঠোঁটের চুমো ধ’রে
আহ্লাদের অবসাদে ভ’রে আসে আমার শরীর,
চারিদিকে ছায়া – রোদ – ক্ষুদ – কুঁড়া – কার্তিকের ভিড় ;
চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে, এখানে হতেছে স্নিগ্ধ কান,
পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে রূপশালী – ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ !
আমি সেই সুন্দরীরে দেখে লই- নুয়ে আছে নদীর এপারে
বিয়োবার দেরি নাই ,- রূপ ঝ’রে পড়ে তার,-
শীত এসে নষ্ট করে দিয়ে যাবে তারে৪ !
আজো তবু ফুরায়নি বৎসরের নতুন বয়স ,
মাঠে মাঠে ঝ’রে পড়ে কাঁচা রোদ ,- ভাঁড়ারের রস !
মাছির গানের মতো অনেক অলস শব্দ হয়
সকালবেলার রৌদ্রে : কুঁড়েমির আজিকে সময় ।
গাছের ছায়ার তলে মদ লয়ে কোন ভাঁড় বেঁধেছিল ছড়া !
তার সব কবিতার শেষ পাতা হবে আজ পড়া ;
ভুলে গিয়ে রাজ্য – জয়- সাম্রজ্যের কথা
অনেক মাটির তলে যেঁই মদ ঢাকা ছিল তুলে লব তার শীতলতা ,
ডেকে লব আইবুড় পাড়াগাঁর মেয়েদের সব;-
মাঠের নিস্তেজ রোদে নাচ হবে ,-
শুরু হবে হেমন্তের নরম উৎসব ।
হাতে হাত ধ’রে ধ’রে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে ঘুরে
কার্তিকের মিঠা রোদে আমাদের মুখ যাবে পুড়ে ;
ফলন্ত ধানের গন্ধে- রঙে তার- স্বাদে তার ভ’রে যাবে আমাদের
সকলের দেহ ;
রাগ কেহ করিবে না – আমাদের দেখে হিংসা করিবে না কেহ ।
আমাদের অবসর বেশি নয়, - ভালোবাসা আহ্লাদের অলস সময়
আমাদের সকলের আগে শেষ হয়
দূরের নদীর মতো সুর তুলে অন্য এক ঘ্রাণ – অবসাদ-
আমাদের ডেকে লয়,- তুলে লয় আমাদের ক্লান্ত মাথা – অবসন্ন হাত ।
তখন শস্যের গন্ধ ফুরায়ে গিয়েছে ক্ষেতে – রোদ গেছে প’ড়ে,
এসেছে বিকেলবেলা তার শান্ত শাদা পথ ধ’রে;
তখন গিয়েছে থেমে ওই কুঁড়ে গেঁয়োদের মাঠের রগড় ;
হেমন্ত বিয়ায়ে গেছে শেষ ঝরা মেয়ে তার শাদা মরা শেফালির বিছানার’পর;
মদের ফোঁটার শেষ হয়ে গেছে এ মাঠের মাটির ভিতর !
তখন সবুজ ঘাস হয়ে গেছে শাদা সব, হয়ে গেছে আকাশ ধবল ,
চ’লে গেছে পাড়াগাঁর আইবুড় মেয়েদের দল !
২
পুরানো পেঁচারা সব কোটরের থেকে
এসেছে বাহির হয়ে অন্ধকার দেখে
মাঠের মুখের’পরে ;
সবুজ ধানের নিচে – মাটির ভিতরে
ইঁদুরেরা চ’লে গেছে – আঁটির ভিতর থেকে চ’লে গেছে চাষা ;
শস্যের ক্ষেতের পাশে আজ রাতে আমাদের জেগেছে পিপাসা !
ফলন্ত মাঠের’পরে আমরা খুঁজি না আজ মরণের স্থান ,
প্রেম আর পিপাসার গান
আমরা গাহিয়া যাই পাড়াগাঁর ভাঁড়ের মতন !
ফসল- ধানের ফলে যাহাদের মন
ভ’রে উঠে উপেক্ষা করিয়া গেছে সাম্রাজ্যেরে , অবহেলা ক’রে গেছে
পৃথিবীর সব সিংহাসন –
আমাদের পাড়াগাঁর সেইসব ভাঁড় –
যুবরাজ রাজাদের হাড়ে আজ তাহাদের হাড়
মিশে গেছে অন্ধকারে অনেক মাটির নিচে পৃথিবীর তলে !
কোটালের মতো তারা নিঃশ্বাসের জলে
ফুরায়নি তাদের সময় ;
পৃথিবীর পুরোহিতদের মতো তারা করে নাই ভয় !
প্রণয়ীর মতো তারা ছেঁড়েনি হৃদয়
ছড়া বেঁধে শহরের মেয়েদের নামে !-
চাষাদের মতো তারা ক্লান্ত হয়ে কপালের ঘামে
কাটায়নি – কাটায়নি কাল !
অনেক মাটির নিচে তাদের কপাল
কোনো এক সম্রাটের সাথে
মিশিয়া রয়েছে আজ অন্ধকার রাতে !
যোদ্ধা – জয়ী – বিজয়ীর পাঁচ ফুট জমিনের কাছে- পাশাপাশি –
জিতিয়া রয়েছে আজ তাদের খুলির অট্টহাসি !
অনেক রাতের আগে এসে তারা চলে গেছে ,- তাদের দিনের
আলো হয়েছে আঁধার ,
সেসব গেঁয়ো কবি- পাড়াগাঁর ভাঁড় ,-
আজ এই অন্ধকারে আসিবে কি আর ?
তাদের ফলন্ত দেহ শুষে লয়ে জন্মিয়াছে আজ এই ক্ষেতের ফসল ;
অনেক দিনের গন্ধে ভরা ঐ ইঁদুরেরা জানে তাহা ,- জানে তাহা
নরম রাতের হাতে ঝরা এই শিশিরের জল !
সে সব পেঁচারা আজ বিকালের নিশ্চলতা দেখে
তাহাদের নাম ধ’রে যায় ডেকে ডেকে ।
মাটির নিচের থেকে তারা
মৃতের মাটির স্বপ্নে ন’ড়ে উঠে জানায় কি অদ্ভুত ইশারা !
আঁধারের মশা আর নক্ষত্র তা জানে ,-
আমরাও আসিয়াছি ফসলের মাঠের আহ্বানে ।
সূর্যের আলোর দিন ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীর যশ পিছে ফেলে
শহর- বন্দর-বস্তি- কারখানা দেশলাইয়ে জ্বেলে
আসিয়াছি নেমে এই ক্ষেতে ;
শরীরের অবসাদ – হৃদয়ের জ্বর ভুলে যেতে ।
শীতল চাঁদের মতো শিশিরের ভিজা পথ ধ’রে
আমরা চলিতে চাই, তারপর যেতে চাই ম’রে
দিনের আলোয় লাল আগুনের মুখে পুড়ে মাছির মতন ;
অগাধ ধানের রসে আমাদের মন
আমরা ভরিতে চাই গেঁয়ো কবি- পাড়াগাঁর ভাঁড়ের মতন !
-জমি উপড়ায়ে ফেলে চলে গেছে চাষা
নতুন লাঙল তার প’ড়ে আছে- পুরানো পিপাসা
জেগে আছে মাঠের উপরে :
সময় হাঁকিয়া যায় পেঁচা ওই আমাদের তরে !
হেমন্তের ধান ওঠে ফ’লে ,-
দুই পা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃথিবীর কোলে ।
আকাশের মেঠোপথে থেমে ভেসে চলে চাঁদ ;
অবসর আছে তার,- অবোধের মতন আহ্লাদ
আমাদের শেষ হবে যখন সে চ’লে যাবে পশ্চিমের পানে ,-
এটুকু সময় তাই কেটে যাক রূপ আর কামনার গানে !
৩
পুরানো ক্ষেতের গন্ধে এইখানে ভরেছে ভাঁড়ার ;
পৃথিবীর পথে গিয়ে কাজ নাই ,- কোনো কৃষকের মতো দরকার নাই দূরে
মাঠে গিয়ে আর !
রোধ – অবরোধ – ক্লেশ – কোলাহল শুনিবার নাহিকো সময়,-
জানিতে চাই না আর সম্রাট সেজেছে ভাঁড় কোনখানে ,-
কোথায় নতুন ক’রে বেবিলন ভেঙে গুঁড়ো হয় !
আমার চোখের পাশে আনিও না সৈন্যদের মশালের রং
দামামা থামায়ে ফেল,- পেঁচার পাখার মতো অন্ধকারে ডুবে যাক রাজ্য
আর সাম্রাজ্যের সং !
এখানে নাহিকো কাজ ,- উৎসাহের ব্যথা নাই , উদ্যমের নাহিকো ভাবনা ;
এখানে ফুরায়ে গেছে মাথার অনেক উত্তেজনা ।
অলস মাছির শব্দে ভ’রে থাকে সকালের বিষণ্ণ সময়,
পৃথিবীরে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয় !
সকল পড়ন্ত রোদ চারিদিকে ছুটি পেয়ে জমিতেছে এইখানে এসে
গ্রীষ্মের সমুদ্র থেকে চোখের ঘুমের গান আসিতেছে ভেসে ,
এখানে পালঙ্কে শুয়ে কাটিবে অনেক দিন –
জেগে থেকে ঘুমাবার সাধ ভালোবেসে ।
এখানে চকিত হ’তে হবে নাকো ,- ত্রস্ত হয়ে পড়িবার নাহিকো সময় ;
উদ্যমের ব্যথা নাই ,- এইখানে নাই আর উৎসাহের ভয় !
এইখানে কাজ এসে জমে নাকো হাতে ,
মাথায় চিন্তার ব্যথা হয়না জমাতে !
এখানে সৌন্দর্য এসে ধরিবে না হাত আর ,-
রাখিবে না চোখ আর নয়নের’পর ;
ভালোবাসা আসিবে না ,-
জীবন্ত কৃমির কাজ এখানে ফুরায়ে গেছে মাথার ভিতর !
অলস মাছির শব্দে ভ’রে থাকে সকালের বিষণ্ণ সময় ,
পৃথিবীরে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয় ;
সকল পড়ন্ত রোদ চারিদিকে ছুটি পেয়ে জমিতেছে এইখানে এসে,
গ্রীষ্মের সমুদ্র থেকে চোখের ঘুমের গান আসিতেছে ভেসে ,
এখানে পালঙ্কে শুয়ে কাটিবে অনেক দিন জেগে থেকে ঘুমাবার
সাধ ভালোবেসে !
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/879
|
3453
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রশ্ন-রবীন্দ্রনাথ
|
ভক্তিমূলক
|
ভগবান , তুমি যুগে যুগে দূত , পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে ,
তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে ‘, বলে গেল ‘ভালোবাসো —
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো ‘ ।
বরণীয় তারা , স্মরণীয় তারা , তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে ।আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে ,
আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে ।
আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে । কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে , বাঁশি সংগীতহারা ,
অমাবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে ,
তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে —
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু , নিভাইছে তব আলো ,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ , তুমি কি বেসেছ ভালো ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/proshna/
|
3696
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান
|
ভক্তিমূলক
|
মরণ রে ,
তুঁহু মম শ্যামসমান ।
মেঘবরণ তুঝ , মেঘজটাজুট ,
রক্ত কমল কর , রক্ত অধর - পুট ,
তাপ - বিমোচন করুণ কোর তব
মৃত্যু - অমৃত করে দান ।
তুঁহু মম শ্যামসমান ।
মরণ রে ,
শ্যাম তোঁহারই নাম !
চির বিসরল যব নিরদয় মাধব
তুঁহু ন ভইবি মোয় বাম ,
আকুল রাধা - রিঝ অতি জরজর ,
ঝরই নয়ন দউ অনুখন ঝরঝর ।
তুঁহু মম মাধব , তুঁহু মম দোসর ,
তুঁহু মম তাপ ঘুচাও ,
মরণ , তু আও রে আও ।
ভুজপাশে তব লহ সম্বোধয়ি ,
আঁখিপাত মঝু আসব মোদয়ি ,
কোরউপর তুঝ রোদয়ি রোদয়ি ,
নীদ ভরব সব দেহ ।
তুঁহু নহি বিসরবি , তুঁহু নহি ছোড়বি ,
রাধাহৃদয় তু কবহুঁ ন তোড়বি ,
হিয় হিয় রাখবি অনুদিন অনুখন ,
অতুলন তোঁহার লেহ ।
দূর সঙে তুঁহু বাঁশি বজাওসি ,
অনুখন ডাকসি , অনুখন ডাকসি
রাধা রাধা রাধা ।
দিবস ফুরাওল , অবহুঁ ম যাওব ,
বিরহতাপ তব অবহুঁ ঘুচাওব ,
কুঞ্জবাট'পর অবহুঁ ম ধাওব ,
সব কছু টুটইব বাধা ।
গগন সঘন অব , তিমিরমগন ভব ,
তড়িত চকিত অতি , ঘোর মেঘরব ,
শালতালতরু সভয় তবধ সব ,
পন্থ বিজন অতি ঘোর —
একলি যাওব তুঝ অভিসারে ,
যাক পিয়া তুঁহু কি ভয় তাহারে ,
ভয় বাধা সব অভয় মুরতি ধরি ,
পন্থ দেখাওব মোর ।
ভানুসিংহ কহে — ছিয়ে ছিয়ে রাধা ,
চঞ্চল হৃদয় তোহারি ,
মাধব পহু মম , পিয় স মরণসে
অব তুঁহু দেখ বিচারি ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/moron-re-tuh-mom-shyam-soman/
|
4243
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
যে-পথে
|
চিন্তামূলক
|
যদি সারাদিন তাঁকে কাছে পাওয়া যেতো
শুনেছি ছিলেন তিনি গাছের বাকলে গা এলিয়ে
যতটুকু ছায়া তাঁর প্রয়োজন, ছিলো ততটুকু
দক্ষিণ হাওয়ায় উড়ে শুকনো পাতা আসে তাঁর কাছে
যেন নিবেদন, যেন মন্ত্র ভাষা ছিন্নভিন্ন মালা
তাঁর জন্য ঐ দূর মাঠের রোদ্দুরেও ছিলো জ্বালা
কিছুটা রোদ্দুরে হেঁটে, খালি পায়ে পড়েছেন শুয়ে –
নিদ্রা নয়, ধ্যান নয়, বেদনার ব্যথার ভিতরে
মনোকষ্ট বুকে নিয়ে শুয়ে রয়েছেন একা একা ।যদি সারাদিন তাঁকে কাছে পাওয়া যেতো
কাছে পেতে গেলে কাছে যেতে হয়, এভাবে চলে না
হাতের সমস্ত সেরে, ধুয়ে-মুছে সংসার, সমাধি –
গুছিয়ে-গাছিয়ে রেখে, সাধে ঢেকে – তবে যদি যাও
দেখবে, দাঁড়িয়ে আছে গাছ একা দৃষ্টি ক’রে নিচু
যেতেও হয়নি তাঁকে, এসেছিলেন তিনি সময়ে
গেছেন সময়ে চলে, সেই পথে, যে-পথে যাবার ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%a5%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a7%8b%e0%a6%aa/#respond
|
3157
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তুমি কি কেবল ছবি শুধু পটে লিখা
|
চিন্তামূলক
|
তুমি কি কেবল ছবি শুধু পটে লিখা।
ওই যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভিড়
আকাশের নীড়;
ওই যে যারা দিনরাত্রি
অলো-হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী
গ্রহ তারা রবি
তুমি কি তাদেরি মতো সত্য নও।
হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি।
চিরচঞ্চলের মাঝে তুমি কেন শান্ত হয়ে রও।
পথিকের সঙ্গ লও
ওগো পথহীন।
কেন রাত্রিদিন
সকলের মাঝে থেকে সবা হতে আছ এত দূরে
স্থিরতার চির অন্তঃপুরে।
এই ধূলি
ধূসর অঞ্চল তুলি
বায়ুভরে ধায় দিকে দিকে;
বৈশাখে সে বিধবার আভরণ খুলি
তপস্বিনী ধরণীরে সাজায় গৈরিকে;
অঙ্গে তার পত্রলিখা দেয় লিখে
বসন্তের মিলন-উষায়,
এই ধূলি এও সত্য হায়;
এই তৃণ
বিশ্বের চরণতলে লীন
এরা যে অস্থির, তাই এরা সত্য সবি--
তুমি স্থির, তুমি ছবি,
তুমি শুধু ছবি।
একদিন এই পথে চলেছিলে আমাদের পাশে।
বক্ষ তব দুলিত নিশ্বাসে;
অঙ্গে অঙ্গে প্রাণ তব
কত গানে কত নাচে
রচিয়াছে
আপনার ছন্দ নব নব
বিশ্বতালে রেখে তাল;
সে যে আজ হল কত কাল।
এ জীবনে
আমার ভুবনে
কত সত্য ছিলে।
মোর চক্ষে এ নিখিলে
দিকে দিকে তুমিই লিখিলে
রূপের তুলিকা ধরি রসের মুরতি।
সে-প্রভাতে তুমিই তো ছিলে
এ-বিশ্বের বাণী মূর্তিমতী।
একসাথে পথে যেতে যেতে
রজনীর আড়ালেতে
তুমি গেলে থামি।
তার পরে আমি
কত দুঃখে সুখে
রাত্রিদিন চলেছি সম্মুখে।
চলেছে জোয়ার-ভাঁটা আলোকে আঁধারে
আকাশ-পাথারে;
পথের দুধারে
চলেছে ফুলের দল নীরব চরণে
বরনে বরনে;
সহস্রধারায় ছোটে দুরন্ত জীবন-নির্ঝরিণী
মরণের বাজায়ে কিঙ্কিণী।
অজানার সুরে
চলিয়াছি দূর হতে দূরে--
মেতেছি পথের প্রেমে।
তুমি পথ হতে নেমে
যেখানে দাঁড়ালে
সেখানেই আছ থেমে।
এই তৃণ, এই ধূলি-- ওই তারা, ওই শশী-রবি
সবার আড়ালে
তুমি ছবি, তুমি শুধু ছবি।
কী প্রলাপ কহে কবি।
তুমি ছবি?
নহে নহে, নও শুধু ছবি।
কে বলে রয়েছ স্থির রেখার বন্ধনে
নিস্তব্ধ ক্রন্দনে।
মরি মরি, সে আনন্দ থেমে যেত যদি
এই নদী
হারাত তরঙ্গবেগ,
এই মেঘ
মুছিয়া ফেলিত তার সোনার লিখন।
তোমার চিকন
চিকুরের ছায়াখানি বিশ্ব হতে যদি মিলাইত
তবে
একদিন কবে
চঞ্চল পবনে লীলায়িত
মর্মর-মুখর ছায়া মাধবী-বনের
হত স্বপনের।
তোমায় কি গিয়েছিনু ভুলে।
তুমি যে নিয়েছ বাসা জীবনের মূলে
তাই ভুল।
অন্যমনে চলি পথে, ভুলি নে কি ফুল।
ভুলি নে কি তারা।
তবুও তাহারা
প্রাণের নিশ্বাসবায়ু করে সুমধুর,
ভুলের শূন্যতা-মাঝে ভরি দেয় সুর।
ভুলে থাকা নয় সে তো ভোলা;
বিস্মৃতির মর্মে বসি রক্তে মোর দিয়েছ যে দোলা।
নয়নসম্মুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই;
আজি তাই
শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল
তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে
তব সুর বাজে মোর গানে;
কবির অন্তরে তুমি কবি,
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।
তোমারে পেয়েছি কোন্ প্রাতে,
তার পরে হারায়েছি রাতে।
তার পরে অন্ধকারে অগোচরে তোমারেই লভি।
নও ছবি, নও তুমি ছবি।
এলাহাবাদ, ৩ কার্তিক, ১৩২১-রাত্রি
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1918
|
2199
|
মহাদেব সাহা
|
পাখির শয়ন
|
চিন্তামূলক
|
কতোটা সতর্ক হয়ে জল হয় মেঘের শরীর, ক নিয়মে
মুয়ে থাকে পাখি
ঘাসে, পুরু বাতাসের ভাঁজে, খোলা পুষ্প পল্লবের ছাদে
এই তো পাখিরা বেশ, হিংসা দ্বেষ কিছু নেই তার।
পাখি বড়ো স্বভাব সজ্জন মেলে আছে শরীরের সীমা
কেমন উদাস নগ্ন ওরা পাখি, তাই মানে অরণ্য-আবাস
এমনটি শব্দ আছে পাখির শয়ন বলো
ভেঙে যাবে ভয়ে!
পাখি তো শয়ন করে যেভাবে জলের বেগ কোনোখানে
হয়ে যায় নম্র নতজানু
যে নিয়মে বৃক্ষের শরীর ফেটে জন্ম নেয় ফুল
দেহের সমস্ত লজ্জা খুলে দিয়ে সেভাবে শয়ন করে পাখি।
ওরা তো শয়ন জানে, শয়নের লজ্জা তাই নেই!
কীভাবে চোখের নিচে অনায়াসে ধরে রাখে ঘুমের কম্পন
ওরা পাখি, সুখূ ওরা
সবুজ শব্দের চিহ্ন পান করে চলে যায় কুয়াশার
গাঢ় কোলাহলে
এই তো শয়ন এই পাকিরই শয়ন
আমার চেয়েও ভালো শুয়ে থাকে পাখি!
এই তো শয়ন শিল্পরীতি, পাখিরাই জানে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1489
|
775
|
জসীম উদ্দীন
|
উজান গাঙের নাইয়া
|
প্রেমমূলক
|
কইবার নি পাররে নদী
গেছে কতদূর?
যে কূল ধইরা চলেরে নদী
সে কূল ভাইঙ্গা যায়,
আবার আলসে ঘুমায়া পড়ে
সেই কূলেরি গায়;
আমার ভাঙা কূলে ভাসাই তরীরে
যদি পাই দেখা বন্ধুর।
নদীর পানি শুনছি নাকি
সায়র পানে ধায়,
আমার চোখের পানি মিলব যায়া
কোন সে দরিয়ায়
সেই অজানা পারের লাইগারে
আমার কান্দে ভাটির সুর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/796
|
4426
|
শামসুর রাহমান
|
ঈর্ষা-বিছা
|
প্রেমমূলক
|
তোমার সঙ্গে দেখা হলো কোন্ দশকে ?
নাকি সুদূর ধূসর কোনও ভিন শতকে ?
তখন তুমি এই আমাকে চিনতে পেরেছিলে কি ?
আমি তোমায় চিনতে পেরে হ্রদের দিএক গিয়েছিলাম।কিন্তু তুমি অচেনা এক যুবার সাথে
গল্পে মেতে ছিল বটে। আমি তোমার
দৃষ্টিপথে পড়িনি যে, বুঝতে আমার
হয়নি কষ্ট। হয়তো খানিক চিন্তে পেরে
ইচ্ছে করেই অবহেলা করেছিলে। এখন কিছু
পুষ্প জানি ঝরেছিলো মাটির বুকে।আচ্ছা তুমি এই আমাকে এমন ঝাঁ ঝাঁ
অবহেলা করলে কেন ? না হয় আমি
ক্ষয়ে গেছি কালের চড়ে, কিন্তু আমার
মন এখনও সজীব কোনও ফুলের মতোই
রয়ে গেছে। এই তো আমি তোমায় দেখে
অনেক পরে হয়ে গেছি আবার যুবা সন্ধ্যা রাতে!কিন্তু তুমি এই আমাকে রাখলে দূরে
হেলায় ঠেলে। মেতে আছো যুবার সঙ্গে
হ্রদের ধারে। জানি না কোন্ সুখের টানে
যাচ্ছো ভেসে! ঈর্ষা-বিছা আমায় জ্বালায় ক্ষণে ক্ষণে! (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/irsha-bicha/
|
944
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ইহাদেরি কানে
|
প্রেমমূলক
|
একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে – একবার বেদনার পানে
অনেক কবিতা লিখে চলে গেলো যুবকের দল;
পৃথিবীর পথে-পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে
শুনিল আধেক কথা – এই সব বধির নিশ্চল
সোনার পিত্তল মূর্তি: তবু, আহা, ইহাদেরি কানে
অনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চলে গেলো যুবকের দল:
একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে – একবার বেদনার পানে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ihaderi-kaane/
|
823
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ১০
|
কাহিনীকাব্য
|
দশ
বড় ঘর বান্দাছাও মোনাভাই বড় করছাও আশা
রজনী প্রভাতের কালে পঙ্খী ছাড়বে বাসা |
. — মুর্শীদা গান
নতুন চাষা ও নতুন চাষাণী পাতিল নতুন ঘর,
বাবুই পাখিরা নীড় বাঁধে যথা তালের গাছের পর |
মাঠের কাজেতে ব্যস্ত রূপাই, নয়া বউ গেহ কাজে,
দুইখান হতে দুটি সুর যেন এ উহারে ডেকে বাজে |
ঘর চেয়ে থাকে কেন মাঠ পানে, মাঠ কেন ঘর পানে,
দুইখানে রহি দুইজন আজি বুঝিছে ইহার মানে |
আশ্বিন গেল, কার্তিক মাসে পাকিল খেতের ধান,
সারা মাঠ ভরি গাহিতেছে কে যেন হল্ দি-কোটার গান |
ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়িছে বায়,
কলমীলতায় দোলন লেগেছে, হেসে কূল নাহি পায় |
আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে,
মাঝে মাঠখানি চাদর বিছায়ে হলুদ বরণ ধানে |
আজকে রূপার বড় কাজ—কাজ—কোন অবসর নাই,
মাঠে যেই ধান ধরেনাক আজি ঘরে দেবে তারে ঠাঁই |
সারা মাঠে ধান, পথে ঘাটে ধান উঠানেতে ছড়াছড়ি,
সারা গাঁও ভরি চলেছে কে কবি ধানের কাব্য পড়ি |
আজকে রূপার মনে পড়েনাক শাপলার লতা দিয়ে,
নয়া গৃহিনীর খোঁপা বেঁধে দিত চুলগুলি তার নিয়ে |
সিঁদুর লইয়া মান হয়নাক বাজে না বাঁশের বাঁশী,
শুধু কাজ—কাজ, কি যাদু-মন্ত্র ধানেরা পড়িছে আসি |
সারাটি বরষা কে কবি বসিয়া বেঁধেছে ধানের গান,
কত সুদীর্ঘ দিবস রজনী করিয়া সে অবসান |
আজকে তাহার মাঠের কাব্য হইয়াছে বুঝি সারা,
ছুটে গেঁয়ো পাখি ফিঙে বুলবুল তারি গানে হয়ে হারা |
কৃষাণীর গায়ে গহনা পরায় নতুন ধানের কুটো ;
এত কাজ তবু হাসি ধরেনাক, মুখে ফুল ফুটো ফুটো!
আজকে তাহার পাড়া-বেড়ানর অবসর মোটে নাই,
পার খাড়ুগাছি কোথা পড়ে আছে, কেবা খোঁজ রাখে ছাই!
অর্ধেক রাত উঠোনেতে হয় ধানের মলন মলা,
বনের পশুরা মানুষের কাজে মিশায় গলায় গলা |
দাবায় শুইয়া কৃষাণ ঘুমায়, কৃষাণীর কাজ ভারি,
ঢেকির পারেতে মুখর করিছে একেলা সারাটি বাড়ি |
কোন দিন চাষী শুইয়া শুইয়া গাহে বিরহের গান,
কৃষাণের নারী ঘুমাইয়া পড়ে, ঝাড়িতে ঝাড়িতে ধান |
হেমন্ত চাঁদ অর্ধেক হেলি জ্যোত্স্নার জাল পাতি,
টেনে টেনে তারে হয়রান হয়ে ডুবে যায় রাতারাতি |
এমনি করিয়া ধানের কাব্য হইয়া আসিল সারা,
গানের কাব্য আরম্ভ হল সারাটা কৃষাণ পাড়া!
রাতেরে উহারা মানিবে না যেন, নতুন গলার গানে,
বাঁশী বাজাইয়া আজকে রাতের করিবে নতুন মানে |
আজিকে রূপার কোন কাজ নাই, ঘুম হতে যেন জাগি,
শিয়রে দেখিছে রাজার কুমারী তাহারই ব্যথার ভাগী |
সাজুও দেখিছে কোথাকার যেন রাজার কুমার আজি,
ঘুম হতে তারে সবে জাগায়েছে অরুণ-আলোয় সাজি |
নতুন করিয়া আজকে উহারা চাহিছে এ ওর পানে,
দীর্ঘ কাজের অবসর যেন কহিছে নতুন মানে!
নতুন চাষার নতুন চাষাণী নতুন বেঁধেছে ঘর,
সোহাগে আদরে দুটি প্রাণ যেন করিতেছে নড়নড়!
বাঁশের বাঁশীতে ঘুণ ধরেছিল, এতদিন পরে আজ,
তেলে জলে আর আদরে তাহার হইল নতুন সাজ |
সন্ধ্যার পরে দাবায় বসিয়া রূপাই বাজায় বাঁশী,
মহাশূণ্যের পথে সে ভাসায় শূণ্যের সুররাশি!
ক্রমে রাত বাড়ে, বউ বসে দূরে, দুটি চোখ ঘুমে ভার,
“পায়ে পড়ি ওগো চলো শুতে যাই, ভাল লাগে নাক আর |”
রূপা ত সে কথা শোনেই নি যেন, বাঁশী বাজে সুরে সুরে,
“ঘরে দেখে যারে সেই যেন আজি ফেরে ওই দূরে দূরে |”
বউ রাগ করে, “দেখ, বলে রাখি, ভাল হবেনাক পরে,
কালকের মত কর যদি তবে দেখিও মজাটি করে |
ওমনি করিয়া সারারাত আজি বাজাইবে যদি বাঁশী,
সিঁদুর আজিকে পরিব না ভালে, কাজল হইবে বাসি |
দেখ, কথা শোন, নইলে এখনি খুলিব কানের দুল,
আজকে ত আমি খোঁপা বাঁধিব না, আলগা রহিবে চুল |”
বেচারী রূপাই বাঁশী বাজাইতে এমনি অত্যাচার,
কৃষাণের ছেলে! অত কিবা বোঝে, তখনই মানিল হার |
কহে জোড় করে, “শোন গো হুজুর, অধম বাঁশীর প্রতি,
মৌন থাকার কঠোর দণ্ড অন্যায় এ যে অতি |
আজকে ও-ভালে সিঁদুর দিবে না, খুলিবে কানের দুল,
সন্ধ্যে হবে না সিঁদুরে রঙের—ভোরে হাসিবে না ফুল!
এক বড় কথা! আচ্ছা দেখাই, ওরে ও অধম বাঁশী,
এই তরুণীর অধরের গানে তোমার হইবে ফাঁসী!”
হাতে লয়ে বাঁশী বাজাইল রূপা মাঠের চিকন সুরে,
কভু দোলাইয়া বউটির ঠোঁটে কভু তারে ঘুরে ঘুরে |
বউটি যেন গো হেসে হয়রান, কহে ঠোঁটে ঠোঁট চাপি,
“বাঁশীর দণ্ড হইল, কিন্তু যে বাজাল সে পাপী?”
পুনঃ জোর করে রূপা কহে, “এই অধমের অপরাধ,
ভয়ানক যদি, দণ্ড তাহার কিছু কম নিতে সাধ!”
রূপার বলার এমনি ভঙ্গী বউ হেসে কুটি কুটি,
কখনও পড়িছে মাটিতে ঢলিয়া, কভু গায়ে পড়ে লুটি |
পরে কহে, “দেখো, আরও কাছে এসো, বাঁশীটি লও তো হাতে,
এমনি করিয়া দোলাও ত দেখি নোলক দোলার সাথে!”
বাঁশী বাজে আর নোলক যে দোলে, বউ কহে আর বার,
“আচ্ছা আমার বাহুটি নাকিগো সোনালী লতার হার?
এই ঘুরালেম, বাজাও ত দেখি এরি মত কোন সুর,”
তেমনি বাহুর পরশের মত বাজে বাঁশী সুমধুর!
দুটি করে রাঙা ঠোঁটখানি টেনে কহে বউ, “এরি মত,
তোমার বাঁশীতে সুর যদি থাকে বাজাইলে বেশ হত |”
চলে মেঠো বাঁশী দুটি ঠোঁট ছুঁয়ে কলমী ফুলের বুকে,
ছোট চুমু রাখি চলে যেন বাঁশী, চলে সে যে কোন লোকে
এমনি করিয়া রাত কেটে যায় ; হাসে রবি ধীরি ধীরি,
বেড়ার ফাঁকেতে উঁকি মেরে দেখি দুটি খেয়ালীর ছিরি |
সেদিন রাত্রে বাঁশী শুনে শুনে বউটি ঘুমায়ে পড়ে,
তারি রাঙা মুখে বাঁশী-সুরে রূপা বাঁকা চাঁদ এনে ধরে |
তারপরে খুলে চুলের বেণীটি বার বার করে দেখে,
বাহুখানি দেখে নাড়িয়া নাড়িয়া বুকের কাছেতে রেখে |
কুসুম-ফুলেতে রাঙা পাও দুটি দেখে আরো রাঙা করি,
মৃদু তালে তালে নিঃশ্বাস লয়, শুনে মুখে মুখ ধরি |
ভাবে রূপা, ও-যে দেহ ভরি যেন এনেছে ভোরের ফুল,
রোদ উঠিলেই শুকাইয়া যাবে, শুধু নিমিষের ভুল!
হায় রূপা, তুই চোখের কাজলে আঁকিলি মোহন ছবি,
এতটুকু ব্যথা না লাগিতে যেরে ধুয়ে যাবে তোর সবি!
ওই বাহু আর ওই তনু-লতা ভাসিছে সোঁতের ফুল,
সোঁতে সোঁতে ও যে ভাসিয়া যাইবে ভাঙিয়া রূপার কূল!
বাঁশী লয়ে রূপা বাজাতে বসিল বড় ব্যথা তার মনে,
উদাসীয়া সুর মাথা কুটে মরে তাহার ব্যথার সনে |
ধারায় ধারায় জল ছুটে যায় রূপার দুচোখ বেয়ে,
বইটি তখন জাগিয়া উঠিল তাহার পরশ পেয়ে |
“ওমা ওকি? তুমি এখনো শোওনি! খোলা কেন মোর চুল?
একি! দুই পায়ে কে দেছে ঘষিয়া রঙিন কুসুম ফুল?
ওকি! ওকি!! তুমি কাঁদছিলে বুঝি! কেন কাঁদছিলে বল?”
বলিতে বলিতে বউটির চোখ জলে করে ছল ছল!
বাহুখানা তার কাঁধ পরে রাখি রূপা কয় মৃদু সুরে,
“শোন শোন সই, কে যেন তোমায় নিয়ে যেতে চায় দূরে!”
“সে দূর কোথায়?” “অনেক—অনেক—দেশ যেতে হয় ছেড়ে,
সেথা কেউ নাই শুধু আমি তুমি আর সেই সে অচেনা ফেরে |
তুমি ঘুমাইলে সে এসে আমায় কয়ে যায় কানে কানে,
যাই—যাই—ওরে নিয়ে যাই আমি আমার দেশের পানে
বল, তুমি সেথা কখনও যাবে না, সত্যি করিয়া বল!”
“নয়! নয়! নয়!” বউ কহে তার চোখ দুটি ছল ছল |
রূপা কয় “শোন সোনার বরণি, আমার এ কুঁড়ে ঘর,
তোমার রূপের উপহাস শুধু করে সারা দিনভর |
তুমি ফুল! তব ফুলের গায়েতে বহে বিহানের বায়ু,
আমি কাঁদি সই রোদ উঠিলে যে ফুরাবে রঙের আয়ু |
আহা আহা সখি, তুমি যাহা কর, মোর মনে লয় তাই,
তোমার ফুলের পরাণে কেবল দিয়া যায় বেদনাই |”
এমন সময় বাহির হইতে বছির মামুর ডাকে,
ধড়মড় করি উঠিয়া রূপাই চাহিল বেড়ার ফাঁকে |
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/813
|
4278
|
শতাব্দী রায়
|
ও মেয়ে
|
মানবতাবাদী
|
ও মেয়ে তোর বয়স কত?
: কি জানি গো,মা থাকলে বলে দিত।
সেই যে বারে দাঙ্গা হল,শয়ে শয়ে লোক
মরল,
হিন্দুদের ঘর জ্বলল, মুসলমানের রক্ত ঝরল,
তখন নাকি মা পোয়াতি,দাঙ্গা আমার
জন্মতিথি।
ও মেয়ে তোর বাবা কোথায়?
: মা বলেছে,গরিব দের বাবা হারায়
কেউ তো বলে বাপটা আমার হারামি ছিল।
মায়ের জীবন নষ্ট করে,অন্য গাঁয়ে ঘর বাঁধল।
মা বলত, শিবের দয়াই তোকে পেলাম,
শিবকেই তাই বাপ ডাকলাম।
ও মেয়ে তোর প্রেমিক আছে?
ছেলেরা ঘোরে ধারে-কাছে?
: প্রেমিক কি গো?মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে?
স্বপ্ন দেখাই দিন দুপুরে?
চুড়ি কাজল মেলাতে কেনায়,
ঝোপের ধারে জামা খোলায়?
এসব নন্দ কাকা করেছে দুবার
প্রেমিক ওকেই বলব এবার।
ও মেয়ে তোর পদবি কি?
: বাপই নাকি দেয় শুনেছি
পদবী থাকলে ভাত পাওয়া যায়?
বাপের আদর কাঁদায় হাসায়
ওটা কি বাজারে মেলে?
কিনব তবে দু-দশে দিলে
দামী হলে চাই না আমার
থাক তবে ও বাপ-ঠাকুরদার
ও মেয়ে তুই রূপসী?
:লোকে বলে ডাগর গতর সর্বনাশী
রুপ তো নয়, চোখের ধাঁধা।
যৌবনেতে কুকুরী রাঁধা।
পুরুষ চোখের ইশারা আসে,
সুযোগ বুঝে বুকে পাছায় হাত ও ঘষে।
রুপ কি শুধুই মাংসপেশী?
তবে তো আমি খুব রূপসী।
ও মেয়ে তোর ধর্ম কি রে?
: মেয়েমানুষের ধর্ম কি গো?
সব কিছু তো শরীর ঘিরে,
সালমা বলে ধর্মই সমাজ বানায়,
সন্ধেবেলা যখন দাঁড়াই
কেউ তো বলে না,হিন্দু নাকি?
সবাই বলে,কতই যাবি?
বিছানা নাকি ধর্ম মেলায়
শরীর যখন শরীর খেলায়
তাই ভাবছি এবার থেকে ধর্ম বলব শরীর বা বিছানাকে।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2016/08/14/%e0%a6%93-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%80-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
165
|
আহসান হাবীব
|
স্বদেশ
|
স্বদেশমূলক
|
এই যে নদী
নদীর জোয়ার
নৌকা সারে সারে,
একলা বসে আপন মনে
বসে নদীর ধারে
এই ছবিটি চেনা।
মনের মধ্যে যখন খুশি
এই ছবিটি আঁকি
এক পাশে তার জারুল গাছে
দু’টি হলুদ পাখি,এমনি পাওয়া এই ছবিটি
কড়িতে নয় কেনা।
মাঠের পরে মাঠ চলেছে
নেই যেন এর শেষ
নানা কাজের মানুষগুলো
আছে নানান বেশ,
মাঠের মানুষ যায় মাঠে আর
হাটের মানূষ হাটে,
দেখে দেখে একটি ছেলের
সারাটাদিন কাটে।
এই ছেলেটির মুখ
সারাদেশের সব ছেলেদের
মুখেতে টুকটুক।
কে তুমি ভাই,
প্রশ্ন করি যখন,
ভালবাসার শিল্পী আমি,
বলবে হেসে তখন।
এই যে ছবি এমনি আঁকা
ছবির মত দেশ,
দেশের মাটি দেশের মানুষ
নানান রকম বেশ,
বাড়ি বাগান পাখ-পাখালি
সব মিলে এক ছবি,
নেই তুলি নেই রং তবুও
আঁকতে পারি সবই।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3799.html
|
4548
|
শামসুর রাহমান
|
কবিতার অস্তঃপুরে
|
রূপক
|
যেতে চাই, আকৈশোর মগ্নতায়, অতি সন্তর্পণে
স্বপ্নের নীলাভ সাঁকো বেয়ে
কবিতার অন্তঃপুরে যেতে চাই। হয়তো সেখানে
রহস্যের ফটক পেরিয়ে
দেখবো আছেন সেই আমর বাগানে
নয়জন ভুবন-মোহিনী;
নয়টি নিবিড় নীল চেয়ারে হেলান দিয়ে বুনছেন কিছু
অন্তহীন সোনালি সূতোয়।ফুলগুলি (হল্দে, লাল, সুনীল, বেগুনি)
বাতাসে নর্তকী যেন। কেবলি হোঁচট খাই, সার্চ লাইটের
ঝাঁ-ঝাঁ আলো দেখাবো না পথ জানি, তবু যেতে চাই
উজিয়ে সকল বাধা প্রেমিকের মতো।
হয়তো সেখানে
দেখবো রাস্তার ধারে চিতাবাঘ সূর্যমুখী ফুলে
মুখ রেখে বাঘিনীর স্মৃতি আনে ডেকে
কিংবা কাকাতুয়া কোনো দাঁড়টাকে তার
বানিয়ে চাঁদের নৌকো আহলাদে দুলছে সর্বদাই।
রঙিন ধুলোর পথে মনে হবে বিকেলের আলো
সুন্দরবনের
তরুণ জ্বলন্ত বাঘ হয়ে ফের নেমেছে নদীতে!দেখবো চকিতে,
কয়েকটি ঘোড়া দ্রুত কাকে যাচ্ছে নিয়ে,-
বৃষ্টির সুরের মতো আরক্ত কাঁকরে খুর বাজে,
খুর বাজে শুধু।সুবচনী হাঁস নিয়ে খেলছে বালক, জানালার
অনেক বাইরে ঝুঁকে ডাকছে মা বেলা গেলো বলে।
বারান্দায় একা বসে কে এক প্রবীণ ভদ্রলোক
নিমগ্ন দান্তের কাব্যে, সূর্যাস্তের গাঁদা ফুল-রঙ
বিশুষ্ক ফলের মতো মুখে পড়ে; জানু বেয়ে তার
একটি চঞ্চল শিশু উঠছে নামছে বার বার।ইহুদীটা শহরের বাড়িগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে উড়ে,
থলি কাঁধে, জীর্ণ টুপি নড়ছে মাথায়। কোনোমতে
কাকের চোখকে দিয়ে ফাঁকি
কেউবা ছিঁড়ছে রুটি, ক দিনের বাসি, নড়বড়ে
পাঁচিলের ধার ঘেঁষে। কাকগুলি পাখা ঝাপটায়
নগরের সুবিশাল নীলপক্ষ ঘড়ির আয়নায়।ছাদের চূড়োয় বুঝি একা কেউ বাজায় বেহালা
ভুল সুরে। মধ্যরাতে উলঙ্গ গাধার পিঠে কেউ
গান গায় তারস্বরে। কী যেন পুড়ছে ভয়ানক
শব্দ করে, সভ্যতার বিশ্বস্ত দলিল হয়তোবা।
নিমেষেই সমস্ত শহর
দেখবো কী করে হয়ে যায় ফণিমনসার বন
-এইতো মিশ্রিত চিত্র (সব নয়) সেখানে ছড়ানো।মেঘ রৌদ্র, এভেনিউ টেলিগ্রাফ তার ইত্যাদির নাম ধরে
ডেকে-ডেকে যাবো চলে ঐ কবিতার অন্তঃপুরে। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobitar-ostopure/
|
3984
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সোনার
|
রূপক
|
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা–
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে–
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।
আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহ করুণা করে।ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা–
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে–
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।
আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহ করুণা করে।ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a4%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a5-%e0%a6%a0%e0%a6%be/
|
2539
|
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
|
নাগকেশর
|
চিন্তামূলক
|
চিত্ততলে যে নাগবালা ছড়িয়ে ছিঁগে কেশের কেশর কাঁদছে
অফুরন্ত অশ্রুধারা সহস্রবার নাসার বশের বাঁধছে ;
মানিক-হারা পাগল-পারা যে বেদনা বাজছে তাহার বক্ষে
পলে-পলে পলক বেয়ে অলক ছেয়ে ঝরছে যাহা চক্ষে ;
দুঃখে ভাঙা বক্ষে যাহা নশ্চিসিয়া সকাল-সাঁঝে টুটছে
মহাকালের সোপানতলে নাগকেশরের ফুল হয়ে তাই ফুটছে।মন-মাতালে যে নাগবালা রতন-জ্বালা কক্ষে বসে হাসছে
দীপ্তি যাহার নেত্রপথে শুভ্র-শুচি দৃষ্টি হয়ে আসছে ;
মুক্তামানিক সবার মাঝে বিলিয়ে দিয়ে উল্লাসে যে চঞ্চল,
উদ্বেলিত সিন্ধুসম দুলছে যাহার উচ্ছ্বসিত অঞ্চল ;
বিশ্বভূবন পূর্ণ করে যে আনন্দ শঙ্খস্বরে উঠছে
মহাকালের সোপানতলে নাগকেশরের ফুল হয়ে তাই ফুটছে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/naghkeshor/
|
5789
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
তোমার কাছেই
|
প্রেমমূলক
|
সকাল নয়, তবু আমার
প্রথম দেখার ছটফটানি
দুপুর নয়, তবু আমার
দুপুরবেলার প্রিয় তামাশা
ছিল না নদী, তবুও নদী
পেরিয়ে আসি তোমার কাছে
তুমি ছিলে না তবুও যেন
তোমার কাছেই বেড়াতে আসা!
শিরীষ গাছে রোদ লেগেছে
শিরীষ কোথায়, মরুভূমি!
বিকেল নয়, তবু আমার
বিকেলবেলর ক্ষুৎপিপাসা
চিঠির খামে গন্ধ বকুল
তৃষ্ণা ছোটে বিদেশ পানে
তুমি ছিলে না তবুও যেন
তোমার কাছেই বেড়াতে আসা!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1838
|
1312
|
তসলিমা নাসরিন
|
কলকাতা তুই তোর হৃদয়
|
মানবতাবাদী
|
সবখানেই পুঁজিবাদের হাতি হাঁটছে, সবখানেই সাম্রাজ্যবাদ
মাথায় পাগড়ি পরে বসে আছে
তুমি একবিন্দু পিঁপড়ে কামড় দিলে টেরও পায় না কেউ
তেমন কিছু পারো না কেবল লালসার জিভ দেখতে পারো
বেলায় বেলায় জিভের একশটা মরা মৌমাছি পারো
মুখে মুখে কৃত্রিম হাসি দেখতে পারো
হাসির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই আস্ত কঙ্কালের খুলি দেখে আঁতকে উঠতে পারো
মানুষের শরীরগুলো তুমি আর দেখতে পাচ্ছো না শরীরগুলো
এখন কাগজ এখন ডলার-ইউরো-পাউণ্ড লিমোজিনে চড়ছে কনকর্ডে উঠছে
মাসে মাসে আরমানি কিনছে গ্রীষ্মকালে সমুদ্র সেরে আসছে
এদের বুক খুলে খুলে দেখে এসেছো হৃদয় নেই
খুলি খুলে দেখেছো মস্তিস্ক নেই
চোখ খুলে দেখেছো দৃষ্টিহীন
হাত রাখতেই হাতের মধ্যে পচা মাংস আর পুঁজ উঠে আসছে
এরা অনেককাল মৃত
অনেককাল এরা কোনও শ্বাস নেয় না।
তুমি যখন এদের ফেলে দৌড়ে উল্টোদিকে পালাচ্ছে!
দেখ ভিড় দেখ কয়েক কোটি জলজ্যান্ত মানুষ এদের অনুসরণ করছে
মানুষগুলো পাথর-পাথর হাতে তোমাকে ভিড়ের মধ্যে টেনে নিতে চাইছে
তুমি সন্ত্রস্ত তুমি সজোরে সরোষে ছাড়িয়ে নিচ্ছো নিজেকে
পাথর-পাথর জিভগুলো চুকচুক শব্দ করছে
পাথর-পাথর চোখগুলোয় করুণা
তুমি পালাচ্ছো--
প্রাণপণ দৌড়ে এবার শহর ছাড়ছো তুমি মানুষ খুঁজছো তুমি
রক্তমাংসের মানুষ
মানুষ খুঁজছো হন্যে হয়ে যে মানুষ গান গায়
যে মানুষ স্বপ্ন দেখে যে মানুষ ভালোবাসে
উন্মাদের মত মানুষ খুঁজছো
খুঁজছো
একটি শহর খুঁজছো যে শহরের হৃদয় বলে কিছু আছে
এখনও কিছু অবশিষ্ট আছে তিল পরিমাণ হলেও আছে
তুমি দৌড়োচ্ছে! যেন শত বছর ধরে শত শতাব্দি ধরে দৌড়োচ্ছে!
ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োচ্ছে! তোমার চুল উড়ছে চুলে জট বাঁধছে চুলে পাক ধরছে
তোমার ত্বকে ধুলো লাগছে ভাঁজ পড়ছে
চোখের কোলে কালি পড়ছে
পায়ে জুতো নেই পায়ে কাদা পায়ে কাঁটা পায়ে রক্ত
তুমি খুঁজে পেলে শেষে পেলে
হাঁপাতে হাঁপাতে তুমি থামলে শ্বাস নিলে
তুমি কলকাতায় থেমেছো মেয়ে
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1967
|
5757
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
কৃত্তিবাস
|
শোকমূলক
|
ছিলে কৈশোর যৌবনের সঙ্গী, কত সকাল,
কত মধ্যরাত,
সমস্ত হল্লার মধ্যে ছিল সুতো বাঁধা,
সংবাদপত্রের খুচরো গদ্য
আর প্রইভেট টিউশানির টাকার অর্ঘ্য
দিয়েছি তোমাকে, দিয়েছি ঘাম,
ঘোরঘুরি, ব্লক, বিজ্ঞাপন, নবীন কবির
কম্পিত বুক, ছেঁড়া পাঞ্জাবি
ও পাজামা পরে কলেজপালানো দুপুর,
মনে আছে মোহনবাগান
লেনের টিনের চালের ছাপাখানায়
প্রুফ নিয়ে বসে থাকা ঘন্টার পর
ঘন্টা, প্রেসের মালিক কলতেন,
খোকা ভাই, অত চার্মিনার খেও না,
গা দিয়ে মড়া পোড়ার গন্ধ বেরোয়, তখন
আমরা প্রায়ই যেতাম
শ্মশানে, শরতের কৌতুক ও শক্তির
দুর্দান্তপনা, সন্দীপনের চোখ মচকানো,
এর কী দুরন্ত নাচ
সমরেন্দ্র, তারাপদ আর উৎপলের
লুকোচুরি, খোলা হাস্য
জমে উঠেছিল এক নদীর কিনারে,
ছিটকে উঠেছিল জল, আকাশ
ছেয়েছিল লাল রঙের ধুলোয়, টলমল
করে উঠেছিল দশ দিগন্ত, তারপর
আমরা ব্যক্তিগত জাতীয় সঙ্গীত
গাইতে-গাইতে বাতাস সাঁতরে চলে
গেলাম নিরুদ্দেশে
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1810
|
6049
|
হেলাল হাফিজ
|
প্রস্থান
|
প্রেমমূলক
|
এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো৷
এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তাল পাখাটা
খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো৷
ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত
ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিয়ো৷
কোন কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে
কোন স্মৃতিটা উস্কানি দেয় ভাসতে বলে প্রেমের বানে
পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো৷
আর না হলে যত্ন করে ভুলেই যেয়ো, আপত্তি নেই৷
গিয়ে থাকলে আমার গেছে, কার কী তাতে?
আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি ভুল করেছি,
নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?
এক জীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,
এক মানবী কতোটা আর কষ্ট দেবে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/121
|
5825
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
প্রবাসের শেষে
|
স্বদেশমূলক
|
যমুনা, আমার হাত ধরো, স্বর্গে যাবো।
এসো, মুখে রাখো মুখ, চোখে চোখ, শরীরে শরীর
নবীনা পাতার মতো শুদ্ধরূপ, এসো
স্বর্গ খুব দুরে নয়, উত্তর সমুদ্র থেকে যে রকম বসন্ত প্রবাসে
উড়ে আসে কলস্বর, বাহু থেকে শীতের উত্তাপ
যে রকম অপর বুকের কাছে ঋণী হয়; যমুনা, আমার হাত ধরো,
স্বর্গে যাবো।
আমার প্রবাস আজ শেষ হলো, এরকম মধুর বিচ্ছেদ
মানুষ জানেনি আর। যমুনা আমার সঙ্গী-সহস্র রুমাল
স্বর্গের উদ্দেশ্যে ওড়ে; যমুনা তোমায় আমি নক্ষত্রের অতি প্রতিবেশী
করে রাখি, আসলে কি স্বাতী নক্ষত্রের সেই প্রবাদ মাখানো অশ্রূ তুমি নও?
তুমি নও ফেলে আসা লেবুর পাতার ঘ্রাণে জ্যোৎস্নাময় রাত?
তুমি নও ক্ষীণ ধূপ? তুমি কেউ নও
তুমিই বিস্মৃতি, তুমি শব্দময়ী, বর্ণ-নারী, স্তন ও জঙ্ঘায় নারী তুমি,
ভ্রমণে শয়নে তুমি সকল গ্রনে’র যুক্ত প্রণয় পিপাসা
চোখের বিশ্বাসে নারী, স্বেদে চুলে, নোখের ধুলোয়
প্রত্যেক অণুতে নারী, নারীর ভিতরে নারী, শূণ্যতায় সহাস্য সুন্দরী,
তুমিই গায়ত্রী ভাঙা মণীষার উপহাস, তুমি যৌবনের
প্রত্যেক কবির নীরা, দুনিয়ার সব দাপাদাপি ক্রুদ্ধ লোভ
ভুল ও ঘুমের মধ্যে তোমার মাধুরী ছুঁয়ে নদীর তরঙ্গ
পাপীকে চুম্বন করো তুমি, তাই দ্বার খোলে স্বর্গের প্রহরী।
তুমি এ রকম? তুমি কেউ নও
তুমি শুধু আমার যমুনা।
হাত ধরো, স্বরবৃত্ত পদক্ষেপে নাচ হোক, লজ্জিত জীবন
অন্তরীক্ষে বর্ণনাকে দৃশ্য করে, এসো হাত ধরো।
পৃথিবীতে বড় বেশী দুঃখ আমি পেয়ে গেছি, অবিশ্বাসে
আমি খুনী, আমি পাতাল শহরে জালিয়াৎ, আমি অরণ্যেব
পলাতক, মাংসের দোকানে ঋণী, উৎসব ভাঙার ছদ্মবেশী গুপ্তচর।
তবুও দ্বিধায় আমি ভুলি নি স্বর্গের পথ, যে রকম প্রাক্তন স্বদেশ।
তুমি তো জানো না কিছু, না প্রেম, না নিচু স্বর্গ, না জানাই ভালো
তুমিই কিশোরী নদী, বিস্মৃতির স্রোত, বিকালের পুরস্কার……
আয় খুকী, স্বর্গের বাগানে আজ ছুটোছুটি করি।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1872
|
3301
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নাম তার ডাক্তার ময়জন
|
হাস্যরসাত্মক
|
নাম তার ডাক্তার ময়জন।
বাতাসে মেশায় কড়া পয়জন।
গণিয়া দেখিল, বড়ো বহরের
একখানা রীতিমতো শহরের
টিঁকে আছে নাবালক নয়জন।
খুশি হয়ে ভাবে, এই গবেষণা
না জানি সবার কবে হবে শোনা,
শুনিতে বা বাকি রবে কয়জন। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nam-tar-daktar-moyjon/
|
3311
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নিজের হাতে উপার্জনে
|
নীতিমূলক
|
নিজের হাতে উপার্জনে
সাধনা নেই সহিষ্ণুতার।
পরের কাছে হাত পেতে খাই,
বাহাদুরি তারি গুঁতার।
কৃপণ দাতার অন্নপাকে
ডাল যদি বা কমতি থাকে
গাল-মিশানো গিলি তো ভাত–
নাহয় তাতে নেইকো সুতার।
নিজের জুতার পাত্তা না পাই,
স্বাদ পাওয়া যায় পরের জুতার। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nijer-hate-uparjone/
|
328
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
জীবন-বন্দনা
|
মানবতাবাদী
|
গাহি তাহাদের গান-
ধরণীর হাতে দিল যারা আনি' ফসলের ফরমান।
শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে
ত্রস্তা ধরণী নজরানা দেয় ডালি ভ'রে ফুলে-ফলে!
বন্য শ্বাপদ-সঙ্কুল জরা-মৃত্যু-ভীষণা ধরা
যাদের শাসলে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহারা।
যারা বর্বর হেথা বাঁধে ঘর পরম অকুতোভয়ে
বনের ব্যাঘ্র ময়ূর সিংহ বিবরের ফণী ল'য়ে।
এল দুর্জয় গতি-বেগ-সম যারা যাযাবর-শিশু
-তারাই গাহিল নব প্রেম-গান ধরণী-মেরীর যিশু-
যাহাদের চলা লেগে
উল্কার মত ঘুরিছে ধরণী শূন্যে অমিত বেগে!খেয়াল-খুশীতে কাটি' অরণ্য রচিয়া অমরাবতী
যাহারা করিল ধ্বংস সাধপ্ন পুনঃ চঞ্চলমতি,
জীবন-আবেগে রুধিতে না পারি' যারা উদ্ধত-শির
লঙ্ঘিতে গেল হিমালয়, গেল শুষিতে সিন্ধু-নীর।
নবীন জগৎ সন্ধানে যারা ছুটে মেরু অভিযানে,
পক্ষ বাঁধিয়া উড়িয়া চলেছে যাহারা ঊর্ধ্বপানে!
তবুও থামে না যৌবন বেগ, জীবনের উল্লাসে
চ'লেছে চন্দ্র-মঙ্গল-গ্রহে স্বর্গে অসীমাকাশে।
যারা জীবনের পসরা বহিয়া মৃত্যুর দ্বারে দ্বারে
করিতেছে ফিরি, ভীম রণভূমে প্রান বাজি রেখে হারে।
আমি-মরু-কবি-গাহি সেই বেদে বেদুঈনদের গান,
যুগে যুগে যারা করে অকারণ বিপ্লব-অভিযান।
জীবনের আতিশয্যে যাহারা দারুন উগ্রসুখে
সাধ করে নিল গরল-পিয়ালা, বর্শা হানিল বুকে!
আষাঢ়ের গিরি-নিঃস্রাব-সম কোনো বাধা মানিল না,
বর্বর বলি' যাহাদের গালি পাড়িল ক্ষুদ্রমনা,
কূপ-মন্ডুক 'অসংযমী'র আখ্যা দিয়াছে যারে,
তারি তরে ভাই গান রচে' যাই, বন্দনা করি তারে।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/jibon-bondona/
|
2491
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
দুই টুকরো ছড়া
|
স্বদেশমূলক
|
১) ১৯৪৭ অতঃপর
-------------------------------------
আমার চালায় বিয়োলো গাই
সেই সুবাদে খালাতো ভাই ।আমার চালায় গাই থাকবে
দুধ দোয়ানোর ঠাই থাকবে
ঘাস খাওয়াবো দুধ দোয়াবো
দুধের মালিক ভাই থাকবে ।
ভাই-এ ভাই-এ গলায় গলায়
নিজে বলে আমায় বলায়
এমন আপন খালাতো ভাই ।।২) ১৯৭১ অতঃপর
-------------------------------------
আমার পুকুর আমারই মাছ
আমার বোনা জাল
সে জাল দিয়ে পুকুর থেকে
মাছ ধরেছি কাল । কাটতে পিয়াজ কান্না হলো
হাত পুড়িয়ে রান্না হলো
কিন্তু সালুন গেলো কোথায়
পাইনা খুঁজে তাল,
আমার মাথায় বাসন রেখে
দাদা গেলেন সালুন চেখে
তারই স্বাদে রইলো মেখে
আমার ঠোঁটে ঝাল ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/dui-tukro-chhora/
|
5684
|
সুকুমার রায়
|
লোভী ছেলে
|
ছড়া
|
কি ভেবে যে আপন মনে
হাসি আসে ঠোঁটের কোণে,-আধ আধ ঝাপসা বুলি
কোন কথা কয়না খুলি ।বসে বসে একলা নিজে
লোভী ছেলে ভাবেন কি যে-শুধু শুধু চামচ চেটে
মনে মনে সাধ কি মেটে ?একটুখানি মিষ্টি দিয়ে
রাখ আমায় চুপ করিয়ে,নইলে পরে চেঁচিয়ে জোরে
তুলব বাড়ি মাথায় ক'রে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/lovii-chele/
|
4409
|
শামসুর রাহমান
|
আষাঢ়ী পূর্ণিমায়
|
প্রেমমূলক
|
পুনরায় চুপিসারে দয়ার্দ্র আষাঢ়ী পূর্ণিমায়
দেখা হলো আমাদের, যেন ক্লাশ-পালানো দু’জন
ছাত্রছাত্রী সেরে নিয়ে অন্তরঙ্গ সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ
জ্যোৎস্নার চুম্বন নিয়ে দেহমনে চীনা রেস্তোরাঁয়
খুঁজে নিই অস্থায়ী আশ্রয়। নিভৃতির প্রত্যাশায়
একটি কেবিনে ঢুকি; দৃষ্টিপথে তোমার যৌবন
আশ্চর্য ঝলসে ওঠে, সরোবরে চাঁদিনী যেমন;
হৃদয়ে হরিণী এক হাঁটে চর্যাপদের ভাষায়।সহজে পাই না এরকম মুহূর্তের উপহার
এ শহরে; কেবলি জড়িয়ে যাই সুকঠিন লতা
আর ক্যাকটাসে, সারা শরীর, দু’চোখ ছিঁড়ে ফেটে
যেতে চায়। এরই মধ্যে কালেভদ্রে ভুল লোকাচার
এ মিলন উদগ্র মরুর বুকে মরূদ্যান যথা-
যতদিন বেঁচে আছি, অন্তত এভাবে যাক কেটে। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ashari-purnimai/
|
833
|
জসীম উদ্দীন
|
নক্সী কাঁথার মাঠ - ছয়
|
কাহিনীকাব্য
|
(ছয়)ঘরেতে রূপার মন টেকে না যে, তরলা বাঁশীর পারা,
কোন বাতাসেতে ভেসে যেতে চায় হইয়া আপন হারা |
কে যেন তার মনের তরীরে ভাটির করুণ তানে,
ভাটিয়াল সোঁতে ভাসাইয়া নেয় কোন্ সে ভাটার পানে |
সেই চিরকেলে গান আজও গাহে, সুরখানি তার ধরি,
বিগানা গাঁয়ের বিরহিয়া মেয়ে আসে যেন তরি!
আপনার গানে আপনার প্রাণ ছিঁড়িয়া যাইতে চায়,
তবু সেই ব্যথা ভাল লাগে যেন, একই গান পুনঃ গায় |
খেত-খামারেতে মন বসেনাকো ; কাজে কামে নাই ছিরি,
মনের তাহার কি যে হল আজ ভাবে তাই ফিরি ফিরি |
গানের আসরে যায় না রূপাই সাথীরা অবাক মানে,
সারাদিন বসি কি যে ভাবে তার অর্থ সে নিজে জানে!
সময়ের খাওয়া অসময় খায়, উপোসীও কভু থাকে,
'দিন দিন তোর কি হল রূপাই' বার বার মায় ডাকে |
গেলে কোনখানে হয়তো সেথাই কেটে যায় সারা দিন,
বসিলে উঠেনা উঠিলে বসেনা, ভেবে ভেবে তনু ক্ষীণ |
সবে হাটে যায় পথ বরাবর রূপা যায় ঘুরে বাঁকা,
খালার বাড়ির কাছ দিয়ে পথ, বাঁশ-পাতা দিয়ে ঢাকা |পায়ে-পায় ছাই বাঁশ-পাতাগুলো মচ্ মচ্ করে বাজে ;
কেউ সাথে নেই, তবু যে রূপাই মরে যায় যেন লাজে |
চোরের মতন পথে যেতে যেতে এদিক ওদিক চায়,
যদিবা হঠাৎ সেই মেয়েটির দুটি চোখে চোখ যায় |
ফিরিবার পথে খালার বাড়ির নিকটে আসিয়া তার,
কত কাজ পড়ে, কি করে রূপাই দেরি না করিয়া আর |
কোনদিন কহে, 'খালামা, তোমার জ্বর নাকি হইয়াছে,
ও-বাড়ির ওই কানাই আজিকে বলেছে আমার কাছে |
বাজার হইতে আনিয়াছি তাই আধসেরখানি গজা |'
'বালাই! বালাই! জ্বর হবে কেন? রূপাই, করিলি মজা ;
জ্বর হলে কিরে গজা খায় কেহ?' হেসে কয় তার খালা,
'গজা খায়নাক, যা হোক এখন কিনে ত হইল জ্বালা ;
আচ্ছা না হয় সাজুই খাইবে |' ঠেকে ঠেকে রূপা কহে,
সাজু যে তখন লাজে মরে যায়, মাথা নিচু করে রহে |কোন দিন কহে, 'সাজু কই ওরে, শোনো কিবা মজা, খালা!
আজকের হাটে কুড়ায়ে পেয়েছি দুগাছি পুঁতির মালা ;
এক ছোঁড়া কয়, 'রাঙা সূতো' নেবে? লাগিবে না কোন দাম ;
নিলে কিবা ক্ষতি, এই ভেবে আমি হাত পেতে রইলাম |
এখন ভাবছি, এসব লইয়া কিবা হবে মোর কাজ,
ঘরেতে থাকিলে ছোট বোনটি সে ইহাতে করিত সাজ |
সাজু ত আমার বোনেরই মতন, তারেই না দিয়ে যাই,
ঘরে ফিরে যেতে একটু ঘুরিয়া এ-পথে আইনু তাই |'এমনি করিয়া দিনে দিনে যেতে দুইটি তরুণ হিয়া,
এ উহারে নিল বরণ করিয়া বিনে-সূতী মালা দিয়া |এর প্রাণ হতে ওর প্রাণে যেয়ে লাগিল কিসের ঢেউ,
বিভোর কুমার, বিভোর কুমারী, তারা বুঝিল না কেউ |
---তারা বুঝিল না, পাড়ার লোকেরা বুঝিল অনেকখানি,
এখানে ওখানে ছেলে বুড়ো মিলে শুরু হল কানাকানি |সেদিন রূপাই হাট-ফেরা পথে আসিল খালার বাড়ি,
খালা তার আজ কথা কয়নাক, মুখখানি যেন হাঁড়ি |
'রূপা ভাই এলে?' এই বলে সাজু কাছে আসছিল তাই,
মায় কয়, 'ওরে ধাড়ী মেয়ে, তোর লজ্জা শরম নাই?'
চুল ধরে তারে গুড়ুম গুড়ুম মারিল দু'তিন কিল,
বুঝিল রূপাই এই পথে কোন হইয়াছে গরমিল |মাথার বোঝাটি না-নামায়ে রূপা যেতেছিল পথ ধরি,
সাজুর মায়ে যে ডাকিল তাহারে হাতের ইশারা করি ;
'শোন বাছা কই, লোকের মুখেতে এমন তেমন শুনি,
ঘরে আছে মোর বাড়ন্ত মেয়ে জ্বলন্ত এ আগুনি |
তুমি বাপু আর এ-বাড়ি এসো না |' খালা বলে রোষে রোষে,
'কে কি বলে? তার ঘাড় ভেঙে দেব!' রূপা কহে দম কসে |
'ও-সবে আমার কাজ নাই বাপু, সোজা কথা ভালবাসি,
সারা গাঁয়ে আজ ঢি ঢি পড়ে গেছে, মেয়ে হল কুল-নাশী |'সাজুর মায়ের কথাগুলি যেন বঁরশীর মত বাঁকা,
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মনে দিয়ে যায় তীব্র বিষের ধাকা |
কে যেন বাঁশের জোড়-কঞ্চিতে তাহার কোমল পিঠে,
মহারোষ-ভরে সপাং সপাং বাড়ি দিল গিঠে গিঠে |
টলিতে টলিতে চলিল রূপাই একা গাঁর পথ ধরি,
সম্মুখ হতে জোনাকীর আলো দুই পাশে যায় সরি |রাতের আঁধারে গালি-ভরা বিষে জমাট বেঁধেছে বুঝি,
দুই হাতে তাহা ঠেলিয়া ঠেলিয়া চলে রূপা পথ খুঁজি |
মাথার ধামায় এখনও রয়েছে দুজোড়া রেশমী চুরী,
দুপায়ে তাহারে দলিয়া রূপাই ভাঙিয়া করিল গুঁড়ি |
টের সদাই জলীর বিলেতে দুহাতে ছুঁড়িয়া ফেলি,
পথ থুয়ে রূপা বেপথে চলিল, ইটা খেতে পাও মেলি |
চলিয়া চলিয়া মধ্য মাঠেতে বসিয়া কাঁদিল কত,
অষ্টমী চাঁদ হেলিয়া হেলিয়া ওপারে হইল গত |প্রভাতে রূপাই উঠিল যখন মায়ের বিছানা হতে,
চেহারা তাহার আধা হয়ে গেছে, চেনা যায় কোন মতে |
মা বলে, 'রূপাই কি হলরে তোর?' রূপাই কহে না কথা
দুখিনী মায়ের পরাণে আজিকে উঠিল দ্বিগুণ ব্যথা |
সাত নয় মার পাঁচ নয় এক রুপাই নয়ন তারা,
এমনি তাহার দশা দেখে মায় ভাবিয়া হইল সারা |
শানাল পীরের সিন্নি মানিল খেতে দিল পড়া-পানি,
হেদের দৈন্য দেখিল জননী, দেখিলনা প্রাণখানি |
সারা গায়ে মাতা হাত বুলাইল চোখে মুখে দিল জল,
বুঝিল না মাতা বুকের ব্যথার বাড়ে যে ইহাতে বল |আজকে রূপার সকলি আঁধার, বাড়া-ভাতে ওড়ে ছাই,
কলঙ্ক কথা সবে জানিয়াছে, কেহ বুঝি বাকি নাই |
জেনেছে আকাশ, জেনেছে বাতাস, জেনেছে বনের তরু ;
উদাস-দৃষ্টি য়ত দিকে চাহে সব যেন শূনো মরু |চারিদিক হতে উঠিতেছে সুর, ধিক্কার! ধিক্কার!!
শাঁখের করাত কাটিতেছে তারে লয়ে কলঙ্ক ধার |
ব্যথায় ব্যথায় দিন কেটে গেল, আসিল ব্যথার সাঁজ,
পূবে কলঙ্কী কালো রাত এল, চরণে ঝিঁঝির ঝাঁজ!
অনেক সুখের দুখের সাক্ষী বাঁশের বাঁশীটি নিয়ে,
বসিল রূপাই বাড়ির সামনে মধ্য মাঠেতে গিয়ে |মাঠের রাখাল, বেদনা তাহার আমরা কি অত বুঝি ;
মিছেই মোদের সুখ-দুখ দিয়ে তার সুখ-দুখ খুঁজি |
আমাদের ব্যথা কেতাবেতে লেখা, পড়িলেই বোঝা যায় ;
যে লেখে বেদনা বে-বুঝ বাঁশীতে কেমন দেখাব তায়?
অনন্তকাল যাদের বেদনা রহিয়াছে শুধু বুকে,
এ দেশের কবি রাখে নাই যাহা মুখের ভাষায় টুকে ;
সে ব্যথাকে আমি কেমনে জানাব? তবুও মাটিতে কান ;
পেতে রহি কভু শোনা যায় কি কহে মাটির প্রাণ!
মোরা জানি খোঁজ বৃন্দাবনেতে ভগবান করে খেলা,
রাজা-বাদশার সুখ-দুখ দিয়ে গড়েছি কথার মালা |
পল্লীর কোলে নির্ব্বাসিত এ ভাইবোনগুলো হায়,
যাহাদের কথা আধ বোঝা যায়, আধ নাহি বোঝা যায় ;
তাহাদেরই এক বিরহিয়া বুকে কি ব্যথা দিতেছে দোল,
কি করিয়া আ দেখাইব তাহা, কোথা পাব সেই বোল?
---সে বন-বিহগ কাঁদিতে জানে না, বেদনার ভাষা নাই,
ব্যাধের শায়ক বুকে বিঁধিয়াছে জানে তার বেদনাই |বাজায় রূপাই বাঁশীটি বাজায় মনের মতন করে,
যে ব্যথা সে বুকে ধরিতে পারেনি সে ব্যথা বাঁশীতে ঝরে |
বাজে বাঁশী বাজে, তারি সাথে সাথে দুলিছে সাঁজের আলো ;
নাচে তালে তালে জোনাকীর হারে কালো মেঘে রাত-কালো |
বাজাইল বাঁশী ভাটিয়ালী সুরে বাজাল উদাস সুরে,
সুর হতে সুর ব্যথা তার চলে যায় কোন দূরে!
আপনার ভাবে বিভোল পরাণ, অনন্ত মেঘ-লোকে,
বাঁশী হতে সুরে ভেসে যায় যেন, দেখে রূপা দুই চোখে |
সেই সুর বয়ে চলেছে তরুণী, আউলা মাথার চুল,
শিথিল দুখান বাহু বাড়াইয়াছিঁড়িছে মালার ফুল |
রাঙা ভাল হতে যতই মুছিছে ততই সিঁদুর জ্বলে ;
কখনও সে মেয়ে আগে আগে চলে, কখনও বা পাছে চলে |
খানিক চলিয়া থামিল করুণী আঁচলে ঢাকিয়া চোখ,
মুছিতে মুছিতে মুছিতে পারে না, কি যেন অসহ শোক!
করুণ তাহার করুণ কান্না আকাশ ছাইয়া যায়,
কি যে মোহের রঙ ভাসে মেঘে তাহার বেদনা-ঘায় |
পুনরায় যেন খিল খিল করে একগাল হাসি হাসে,
তারি ঢেউ লাগি গগনে গগনে তড়িতের রেখা ভাসে |কখনও আকাশ ভীষণ আঁধার, সব গ্রাসিয়াছে রাহু,
মহাশূণ্যের মাঝে ভেসে উঠে যেন দুইখানি বাহু!
দোলে-দোলে-বাহু তারি সাথে যেন দোলে-দোলে কত কথা,
'ঘরে ফিরে যাও, মোর তরে তুমি সহিও না আর ব্যথা |'
মুহূর্ত পরে সেই বাহু যেন শূণ্যে মিলায় হায়---
রামধনু বেয়ে কে আসে ও মেয়ে, দেখে যেন চেনা যায়!
হাসি হাসি মুখ গলিয়া গলিয়া হাসি যায় যেন পড়ে,
সার গায়ে তার রূপ ধরেনাক, পড়িছে আঁচল ঝরে |
কণ্ঠে তাহার মালার গন্ধে বাতাস পাগল পারা,
পায়ে রিনি ঝিনি সোনার নূপুর বাজিয়া হইছে সারা ;হঠাৎ কে এল ভীষণ দস্যু---ধরি তার চুল মুঠি,
কোন্ আন্ধার গ্রহপথ বেয়ে শূণ্যে সে গেল উঠি |
বাঁশী ফেলে দিয়ে ডাক ছেড়ে রূপা আকাশের পানে চায়,
আধা চাঁদখানি পড়িছে হেলিয়া সাজুদের ওই গাঁয় |
শুনো মাঠে রূপা গড়াগড়ি যায়, সারা গায়ে ধূলো মাখে,
দেহেরে ঢাকিছে ধূলো মাটি দিয়ে, ব্যথারে কি দিয়ে ঢাকে!
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-6/
|
3080
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জবাবদিহি
|
চিন্তামূলক
|
কবি হয়ে দোল-উৎসবে
কোন্ লাজে কালো সাজে আসি,
এ নিয়ে রসিকা তোরা সবে
করেছিলি খুব হাসাহাসি।
চৈত্রের দোল-প্রাঙ্গণে
আমার জবাবদিহি চাই
এ দাবি তোদের ছিল মনে,
কাজ ফেলে আসিয়াছি তাই।
দোলের দিনে, সে কী মনের ভুলে,
পরেছিলাম যখন কালো কাপড়,
দখিন হাওয়া দুয়ারখানা খুলে
হঠাৎ পিঠে দিল হাসির চাপড়।
সকল বেলা বেড়াই খুঁজি খুঁজি
কোথা সে মোর গেল রঙের ডালা,
কালো এসে আজ লাগালো বুঝি
শেষ প্রহরে রঙহরণের পালা।
ওরে কবি, ভয় কিছু নেই তোর--
কালো রঙ যে সকল রঙের চোর।
জানি যে ওর বক্ষে রাখে তুলি
হারিয়ে-যাওয়া পূর্ণিমা ফাল্গুনী--
অস্তরবির রঙের কালো ঝুলি,
রসের শাস্ত্রে এই কথা কয় শুনি।
অন্ধকারে অজানা-সন্ধানে
অচিন লোকে সীমাবিহীন রাতে
রঙের তৃষা বহন করি প্রাণে
চলব যখন তারার ইশারাতে,
হয়তো তখন শেষ-বয়সের কালো
করবে বাহির আপন গ্রন্থি খুলি
যৌবনদীপ--জাগাবে তার আলো
ঘুমভাঙা সব রাঙা প্রহরগুলি।
কালো তখন রঙের দীপালিতে
সুর লাগাবে বিস্মৃত সংগীতে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jubabdehe/
|
3463
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রিয়া
|
সনেট
|
শত বার ধিক্ আজি আমারে, সুন্দরী,
তোমারে হেরিতে চাহি এত ক্ষুদ্র করি।
তোমার মহিমাজ্যোতি তব মূর্তি হতে
আমার অন্তরে পড়ি ছড়ায় জগতে।
যখন তোমার ‘পরে পড়ে নি নয়ন
জগৎ-লক্ষ্মীর দেখা পাই নি তখন।
স্বর্গের অঞ্জন তুমি মাখাইলে চোখে,
তুমি মোরে রেখে গেছ অনন্ত এ লোকে।
এ নীল আকাশ এত লাগিত কি ভালো,
যদি না পড়িত মনে তব মুখ-আলো।
অপরূপ মায়াবলে তব হাসি-গান
বিশ্বমাঝে লভিয়াছে শত শত প্রাণ।
তুমি এলে আগে-আগে দীপ লয়ে করে,
তব পাছে পাছে বিশ্ব পশিল অন্তরে। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/priya/
|
5310
|
শামসুর রাহমান
|
স্থানান্তর
|
চিন্তামূলক
|
এটাই তো শেষ কিস্তি প্যাক-করা লটহরের, এরপর
কিছুই আমার থাকবে না
এখানে। না প্লেট, না পিরিচ, বুক শেলফ। পেট্রোলের
গন্ধ জোরে চেঁচায় গলিতে, কিছু চিহ্ন থেকে যাবে
ভিন্ন রূপে; তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে
কে যাচ্ছে? নির্বাল্ব ঘর,একা
মাঝ-ঘরে দাঁড়িয়ে রয়েছি, যেন গুহার ভেতরে
আদিম পুরুষ।
শ্রাবণ সন্ধ্যায়
লাগবে বৃষ্টির ছাঁট জানালায়, শারদীয় রোদ
দেবে গড়াগড়ি মেঝে জুড়ে, মাঝে-মাঝে
হাওয়া দরকার
থুতনি নাড়িয়ে দেবে খোলা
বারান্দায় চকোলেট-রঙ বিড়ালিনী, ছানা ওর
দুধ খাবে কার্নিশে বসবে কবুতর—
দেখবো না।
হঠাৎ ঝিকিয়ে ওঠে মনে
কবিতার অক্ষরের মতো স্মৃতি,—
মখমলী চটিতে লুটিয়ে-পরা শাড়ি,
জ্যোৎস্নারাতে কারো কী মদির
তাকানো, হৃদয়প্লাবী গান। শেষ বেলা
ফ্যালে দীর্ঘশ্বাস, তাড়াতাড়ি
চলো, সিঁড়ি বড় অন্ধকার, মালাগাড়ি গলিতে প্রতীক্ষাস্তব্ধ,
নীড়ভাঙা পাখির ধরনে আমি কোথায় চলেছি?আরো কিছুক্ষণ এ জায়গায় দাঁড়াবার
কিংবা বসবার, চতুর্দিকে
তাকাবার সাধ জাগে নাকি? দেয়ালটা চুঁয়ে দেখি
একবার? এখনো চড়ুই দু’টি কড়িকাঠের ফোকরে আনে
খড়কুটো, নিরর্থক চোখ খচ্খচ্
করে, রুমালটা কই? সিমেন্ট ও বালি,
ইট চুন জানবে না কোনোদিন এই বাড়ি ছেড়ে
কে গেল? কোথায় গেল? কেন যেতে হলো? (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sthanantor/
|
55
|
আবদুন নুর তুষার
|
আমরা এখন কয়েকটি অক্ষর
|
স্বদেশমূলক
|
আমরা এখন কয়েকটি অক্ষর
বিদেশী ভাষায় মুঠোফোনের অক্ষরালাপ
আমরা এখন ইনবক্সে পত্রশিল্পীআমাদের আলিঙ্গন, চুম্বন, আবেগের আতিশয্য
হৃদকম্স্পপন, স্পর্শ , গন্ধ বিবর্জিত এখন ।আমরা এখন স্মার্টফোনে
ইমোটিকন আর ডুডল
ভাইবার আর হোয়াটসঅ্যাপ এ
কিছু লেনদেন।আমরা অমানবিক উইন্ডোজ,
আই ও এস আর অ্যান্ড্রয়েড এর দাস।
আমরা কথা বলি না
আমাদের আঙ্গুল কথা বলে।
আমরা অমানবিক প্রেমে ডুবে থাকা
মানব মানবী।আমার তবু মানুষ হতে ইচ্ছে করে।
ইচ্ছে করে জড়িয়ে থাকি তোমার কোমর,
বৃষ্টিভেজা বিকেল বেলা
এক পেয়ালা চায়ে ছোঁয়াই যুগলওষ্ঠ!হাতে হাত রেখে হাঁটি
এক রিকশায় জড়োসড়ো বসি শীতের ভোরে
ইচ্ছে করে মুঠোর মধ্যে তোমায় ধরি
আর কিছু নয়!তোমার নাকফুল বাঁধা দিক আমায়
কানের দুল বিরক্ত করুক
তোমার বেশী কাছে গেলে!
তোমার নুপুর এর শব্দে সচকিত হোক
পাশের ঘরের প্রতিবেশী!
ঘরময় ছড়িয়ে থাকুক
মালা থেকে ঝরে পড়া মুক্তা
আর নুপুরের ঘন্টি।অমানবিক এই জীবনে
ঘটেনা সেসব কিছুই
আমরা অক্ষর হয়ে থেকে যাই
আর আমাদের বিব্রত করে
চার্জ শেষ হয়ে আসা
মোবাইল ডিভাইস।আমাদের দারিদ্রসীমা ছুঁয়ে যায়
ইন্টারনেট আর ফোনের বিল।আমার তবু স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে
ইচ্ছে করে বন্ধু হতে, মানুষ হতে!
তোমার মানুষ।!!
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/09/09/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a7%81/
|
4065
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হেরি অহরহ তোমারি বিরহ
|
ভক্তিমূলক
|
হেরি অহরহ তোমারি বিরহ
ভুবনে ভুবনে রাজে হে।
কত রূপ ধ’রে কাননে ভূধরে
আকাশে সাগরে সাজে হে।
সারা নিশি ধরি তারায় তারায়
অনিমেষ চোখে নীরবে দাঁড়ায়,
পল্লবদলে শ্রাবণধারায়
তোমারি বিরহ বাজে হে। ঘরে ঘরে আজি কত বেদনায়
তোমারি গভীর বিরহ ঘনায়,
কত প্রেমে হায় কত বাসনায়
কত সুখে দুখে কাজে হে।
সকল জীবন উদাস করিয়া
কত গানে সুরে গলিয়া ঝরিয়া
তোমারি বিরহ উঠিছে ভরিয়া
আমার হিয়ার মাঝে হে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/529.html
|
3452
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রশ্ন - সঞ্চয়িতা
|
ভক্তিমূলক
|
কো তুঁহুঁ বোলবি মোয় ।
হৃদয়মাহ মঝু জাগসি অনুখন,
আঁখউপর তুঁহুঁ রচলহি আসন।।
অরুণ নয়ন তব মরমসঙে মম
নিমিখ ন অন্তর হোয়।।হৃদয়কমল তব চরণে টলমল,
নয়নযুগল মম উছলে ছলছল--
প্রেমপূর্ণ তনু পুলকে ঢলঢল
চাহে মিলাইতে তোয়।।বাঁশরিধ্বনি তুহ অমিয়গরল রে,
হৃদয় বিদারয়ি হৃদয় হরল রে,
আকুল কাকলি ভুবন ভরল রে--
উতল প্রাণ উতরোয়।।হেরি হাসি তব মধুঋতু ধাওল,
শুনয়ি বাঁশি তব পিককুল গাওল,
বিকল ভ্রমরসম ত্রিভুবন আওল--
চরণকমলযুগ ছোঁয়।।গোপবধূজন বিকশিতযৌবন,
পুলকিত যমুনা, মুকুলিত উপবন--
নীলনীর'পরে ধীর সমীরণ
পলকে প্রাণমন খোয়।।তৃষিত আঁখি তব মুখ'পর বিহরই,
মধুর পরশ তব রাধা শিহরই--
প্রেমরতন ভরি হৃদয় প্রাণ লই
পদতলে আপনা থোয়।।কো তুঁহুঁ কো তুঁহুঁ সব জন পুছয়ি
অনুদিন সঘন নয়নজল মুছয়ি--
যাচে ভানু, সব সংশয় ঘুচয়ি
জনম চরণ'পর গোয়।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/proshno-sanchayita/
|
1902
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
সেই
|
প্রেমমূলক
|
আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।শোনো।
পাহাড়টা, আগেই বলেছি
ভালোবেসেছিলো মেঘকে
আর মেঘ কি ভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে
বানিয়ে তুলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকরা
সে তো আগেই শুনেছো।
সেদিন ছিলো পাহাড়টার জন্মদিন।
পাহাড় মেঘকে বললে
– আজ তুমি লাল শাড়ি পরে আসবে।মেঘ পাহাড়কে বললে
– আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে।
ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম নদী
পুরুষেরা জ্বলন্ত কাঠ।
সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে
পাহাড় ছিলো মেঘের ঢেউ-জলে।
হঠাৎ,
আকাশ জুড়ে বেজে উঠলো ঝড়ের জগঝম্প
ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাই এর ভঙ্গিতে ছুটে এল
এক ঝাঁক হাওয়া
মেঘের আঁচলে টান মেরে বললে
– ওঠ্ ছুঁড়ি! তোর বিয়ে ।এখনো শেষ হয়নি গল্পটা।
বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়েটা হয়ে গেলো ঠিকই
কিন্তু পাহাড়কে সে কোনোদিন ভুলতে পারলনা।
বিশ্বাস না হয় তো চিরে দেখতে পারো
পাহাড়টার হাড়-পাঁজর,
ভিতরে থৈথৈ করছে
শত ঝর্ণার জল।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%9f%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81-%e0%a6%aa/
|
1482
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
তুমি চলে যাচ্ছো
|
প্রেমমূলক
|
তুমি চলে যাচ্ছো, নদীতে কল্লোল তুলে লঞ্চ ছাড়ছে,
কালো ধুঁয়ার ধস ধস আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে
তোমার ক্লান্ত অপস্রিয়মাণ মুখশ্রী,-সেই কবে থেকে
তোমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছি।তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার চলে যাওয়া কিছুতেই
শেষ হচ্ছে না, সেই কবে থেকে তুমি যাচ্ছো, তবু
শেষ হচ্ছে না, শেষ হচ্ছে নাবাতাসের সঙ্গে কথা বলে, বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলে
ধলেশ্বরীর দিকে চোখ ফিরাতেই তোমাকে আবার দেখলুম;
আবার নতুন করে তোমার চলে যাওয়ার শুরু।তুমি চলে যাচ্ছো, নদীতে কল্লোল তুলে লঞ্চ ছাড়ছে,
কালো ধুঁয়ার ফাঁকে ফাঁকে তোমার ক্লান্ত অপস্রিয়মাণ
মুখশ্রী, যেন আবার সেই প্রথমবারের মতো তোমার চলে যাওয়া।
তুমি চলে যাচ্ছো, আমি দুই চোখে তোমার চলে যাওয়ার
দিকে তাকিয়ে রয়েছি, তাকিয়ে রয়েছি।তুমি চলে যাচ্ছো, নদীতে কান্নার কল্লোল,
তুমি চলে যাচ্ছো, বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ,
তুমি চলে যাচ্ছো, চৈতন্যে অস্থির দোলা, লঞ্চ ছাড়ছে,
টারবাইনের বিদ্যুৎগতি ঝড় তুলছে প্রাণের বৈঠায়।
কালো ধুঁয়ার দুরত্ব চিরে চিরে ভেসে উঠছে তোমার
অপস্রিয়মাণ মুখশ্রী, তুমি ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠছো।
তোমার চলে যাওয়া কিছুতেই শেষ হচ্ছে না,
তিন হাজার দিন ধরে তুমি যাচ্ছো, যাচ্ছো আর যাচ্ছো।তুমি চলে যাচ্ছো, আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে তরঙ্গিত
নদীর জ্যোৎস্নায়, কালো রাজহংশের মতো তোমার নৌকো
কাশ বনের বুক চিরে চিরে আখ ক্ষেতের পাশ দিয়ে
যাচ্ছে অজানা ভুবনের ডাকে। তুমি চলে যাচ্ছো,
আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে আকাশের মতো।হে তরঙ্গ, হে সর্বগ্রাসী নদী, হে নিষ্ঠুর কালো নৌকো,
তোমরা মাথায় তুলে যাকে নিয়ে যাচ্ছো
সে আমার কিছুই ছিলো না, তবু কেন সন্ধ্যার আকাশ
এরকম ভেঙ্গে পড়লো নদীর জ্যোৎস্নায়?
ভেঙ্গে পড়লো জলের অতলে? তুমি চলে যাচ্ছো বলে?তুমি চলে যাচ্ছো, ল্যাম্পপোস্ট থেকে খসে পড়ছে বাল্ব,
সমস্ত শহর জুড়ে নেমে আসছে মাটির নিচের গাঢ় তমাল তমশা।
যেন কোনো বিজ্ঞ যাদুকর কালো স্কার্ফ দিয়ে এ শহর
দিয়েছে মুড়িয়ে। দু’একটি বিষণ্ণ ঝিঁঝিঁ ছাড়া আর কোনো গান নেই,
শব্দ নেই, জীবনের শিল্প নেই, নেই কোনো প্রাণের সঞ্চার।
এ শহর অন্ধ করে তুমি চলে যাচ্ছো অন্য এক দুরের নগরে,
আমি সেই নগরীর কাল্পনিক কিছু আলো চোখে মেখে নিয়ে
তোমার গন্তব্যের দিকে, নিলীমায় তাকিয়ে রয়েছি।তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার বিদায়ী চোখে, চশমায় নূহের প্লাবন।
তুমি চলে যাচ্ছো, বিউগলে বিষণ্ণ সুর ঝড় তুলছে
অন্তর্গত অশোক কাননে। তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার পশ্চাতে
এক রিক্ত, নিঃস্ব মৃতের নগরী পড়ে আছে।অনন্ত অস্থির চোখে বেদনার মেঘ জমে আছে,
তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারি না।
তোমাকে দেখার নামে তোমার চতুর্দিকে পরিপার্শ্ব দেখি,
বিমান বন্দরে বৃষ্টি, দ’চোখ জলের কাছে ছুটে যেতে চায়,
তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারি নাতুমি চলে যাচ্ছো, আমার কবিতাগুলো শরবিদ্ধ
আহত সিংহের ক্ষোভ বুকে নিয়ে পড়ে আছে একা।তুমি চলে যাচ্ছো, কতোগুলো শব্দের চোখে জল।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/tumi-chole-zaccho/
|
4874
|
শামসুর রাহমান
|
নরমুণ্ডের নৃত্যে
|
মানবতাবাদী
|
স্ফটিক পাত্রে রুপালি পানীয়
কাঁপছে তরল জ্যোৎস্নার মতো,
অঞ্জলি ভরা ফুলের পরাগ
অঙ্গার হলো চোখ ফেরাতেই।
পিপাসায় জ্বলি এবং আমিও
চরম ক্ষতির বোঝা টেনে চলি।জ্ঞানের গরিমা উঁচু মিনারের
চূড়ো না ছুঁতেই হারিয়েছে খেই;
সকালসন্ধে দর্শন খুঁড়ে
এনেছি চকিত চতুর মুষিক।তুমি যা-ই বলো চরাচরে আজও
অলীক ঘটনা ঘটছে সদ্য।
জ্ঞানীণ্ডণীদের নাকের তলায়
অহরত কত খেল চমকায়
কে তার ভাষ্য দেবে নির্ভুল?
ত্রিলোকে তেমন মল্লিনাথের,
ঈশ্বর জানে, দেখা মেলা ভার।কালো মহাদেশ অনিশ্চিতের
নাগরদোলায় ঘুরছে সদাই
এবং অযুত তারার মুলুকে
মহাশূন্যের সেনা দেয় হানা।ভালুকের কড়া দাপটে ঈগল
ক্ষুব্ধ চিত্তে ঝাপটায় ডানা;
সমানে-সমানে কোলাকুলি তাই
বিমূঢ় সিংহ খাচ্ছে বিষম।শীর্ষ মেলাটি বুদ্বুদ যেন
এক লহমার ফুৎকারে ফাটে;
থাকবে বজায় ঠাণ্ডা লড়াই।সিংহমশাই ছয় মোড়লের
হাটে যেতে চান, কিন্তু সহসা
পথ আগলায় শক্রপক্ষ।
দিনকাল বড় বেয়াড়া এখন-
এমনকি তার শুকনো হাড়ের,
হায়রে কপাল, আশ্বাস নেই।
গাত্র বাঁচিয়ে পুণ্যবানেরা
পথ চলে বটে দৈনন্দিন,
কিন্তু তাঁদের শান্ত সকাল,
অলস দুপুর অমাবস্যার
কুটিল আঁধারে হচ্ছে বিলীন।হাবেভাবে তাঁরা এত সমাহিত,
ঈশ্বর যেন বন-ভোজনের
ঠাণ্ডা আমেজে মগ্ন এখন।নরমুণ্ডের ভয়াল নৃত্যে
চলছে যখন স্বপ্ন হনন,
দুঃস্বপ্নের ঊর্ণাজালেই
দার্শনিকের প্রবীণ কণ্ঠে
মানবতা আনে অযুত যুগের
সূর্যোদয়ের প্রেমঘন ভাষা। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/normunder-nritte/
|
4896
|
শামসুর রাহমান
|
নিয়ন্ত্রণ
|
চিন্তামূলক
|
সন্ত্রাসে বসন্ত কম্পমান; হনুমান লম্ফ ঝম্প দিয়ে
নিমেষে বাগান লন্ড ভন্ড করে, সন্ত ভীত, ম্ফীত
অন্ডকোষে পড়ে চাপ। প্রাণ যায়, মুত্রাশয় ফেটে
যাবে বুঝি পাইপের মতো; আকাঙ্খারা ছাই হ’য়ে
ওড়ে চতুর্দিকে, পুনরায় জড়ো করা অসম্ভব।
এখন কবন্ধদের গুঁতো খেতে খেতে কাঁটাবনে
হাঁটা ছাড়া উপায় কি আর? অন্ধকার দশদিক,
হাড়মাস গলে, চঞ্চু-নখরের ঘায়ে জব্দ চোখ।স্ববশে কিছুই নেই। নিয়ন্ত্রণ, শুধু নিয়ন্ত্রণ
যত্রতত্র, বাল্যকাল, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব কন্টকিত
নিয়ন্ত্রণে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করা, মুখ খুলে, হায়,
স্পর্ধিত এগিয়ে যাওয়া প্রবল বারণ। জিভ টেনে
ছিঁড়ে ফেলে দেয়ার উদ্দেশ্যে কত সান্ত্রী মোতায়েন।
নিয়ন্ত্রিত কত কিছু, এমনকি স্বপ্নও নিয়ন্ত্রিত। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/niontron/
|
4151
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
ভালবাসি তোমায়
|
প্রেমমূলক
|
ভালবাসি তোমায় প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনে
তোমার দেহের প্রতিটি রঞ্জে রঞ্জে।
তোমার হাসি, তোমার কান্যা
তোমার দু চোখের অশ্রুর বন্যা
আমার হৃদয়ে বহে ভালবাসার বন্যা।
তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
তোমার বাগানের ফুলের সুভাস
যেন আমার দেহের নতুন পরশ।
তোমার ঐ দু’টি টানা টানা চোখ
হাসি ভরা মিষ্টি মুখ
আমাকে ভুলায় দুনিয়ার যত সুখ।
তোমার ঐ হাতের নরম পরশ
লিপিস্টিক মাখা কমলার মত ঠোঁট
হৃদয়ে আমার শিহরিত করে বাড়ায় আবেগ।
দূর্বা ঘাসের উপর পড়া তোমার পায়ের স্পর্শ
নদীতে গোসল করার সেই দৃশ্য
সবই আমার হৃদয়ে জাগায় হর্ষ।
তোমার রূপ আর গুনের কথা
শেষ হবেনা কখনও বলা
তোমার হেলেদুলে চলার অভ্যাস
কথা বলার মাঝে উড়ুউড়ু ভাব
হৃদয়ে যেন ভালবাসারই আভাস।
তোমার ওড়না মেলে বাতাসে ওড়া
আর চুলগুলো বাতাসে দোলার দৃশ্য
যেন ডানাকাটা পরীদের মত।
ভাললাগার সবকিছু যেন তোমারি আচলে
কি করে তোমায় ছাড়ি বল এই ভুবনে
তুমি মিশে গেছো আমার দেহের প্রতিটি
রক্ত বিন্দুতে, হৃদয়ের অতল গভীরে
তাইতো ভালবাসি তোমায় প্রতিটি ক্ষনে ক্ষনে
তোমার দেহের প্রতিটি রঞ্জে রঞ্জে
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2224.html
|
3336
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নূতন জন্মদিনে
|
চিন্তামূলক
|
নূতন জন্মদিনে
পুরাতনের অন্তরেতে
নূতনে লও চিনে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nuton-jonmodine/
|
947
|
জীবনানন্দ দাশ
|
উদয়াস্ত
|
চিন্তামূলক
|
পৃথিবীতে ঢের দিন বেঁচে থেকে যখন হয়েছে পূর্ণ সময়ের অভিপ্রায়-
আগাগোড়া জীবনের দিক চেয়ে কে আবার আয়ু চায়?
যদিও চোখের ঘুম ভুলে গিয়ে মননের অহঙ্কারে চর্বি জ্বালায়অপ্রেমিক, কোনো কিছু শেষ সত্য জেনে নেবে বিষয়ের থেকে।
তবু কোনো জাদুকর পুরানো স্ফটিক তার যায় নাই রেখে।
সময় কাটাতে হয় ব্যবহৃত হস্তাক্ষরে চীবরের ছায়াপাত দেখে। অথবা উদ্রিক্ত যারা হয় নাক'- চিরকাল থাকে সমীচীন,-
তাহাদের মুণ্ড যেন কালো হাঁড়ি- মাচার উপরে সমাসীন;
মৃত্যু নাই তাহাদের;- জানে সব দেবী, পরী, জিন। আর যারা বহুদিন পৃথিবীতে মেধে- মনে- ছিল কর্মক্ষম,
তারপর বুড়ো হয়ে স্মরণ করিতে চায় অবলুপ্ত মলয়াচলমঃ
তাদের হৃদয়ে ঢের মেষ আছে নাই কোনো শুভ্রঘ্রাণ গম। পৃথিবীতে ঢের দিন বেঁচে থেকে যখন হয়েছে পূর্ণ সময়ের অভিপ্রায়-
আগাগোড়া জীবনের দিক চেয়ে কে আবার আয়ু চায়?
কন্যা তুলা কর্কটের বৃশ্চিকের আবার ঘটুক সমবায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/udayosto/
|
3294
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নাই
|
প্রকৃতিমূলক
|
নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা। খেলো খেলো তব নীরব ভৈরব খেলা ॥
যদি ঝ’রে পড়ে পড়ুক পাতা, ম্লান হয়ে যাক মালা গাঁথা,
থাক্ জনহীন পথে পথে মরীচিকাজাল ফেলা ॥
শুষ্ক ধুলায় খসে-পড়া ফুলদলে ঘূর্ণী-আঁচল উড়াও আকাশতলে।
প্রাণ যদি কর মরুসম তবে তাই হোক– হে নির্মম,
তুমি একা আর আমি একা, কঠোর মিলনমেলা ॥
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%b0%e0%a6%b8-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be/
|
2162
|
মহাদেব সাহা
|
তুমি ও কবিতা
|
প্রেমমূলক
|
তোমার সাথে প্রতিটি কথাই কবিতা, প্রতিটি
মুহুর্তেই উৎসব-
তুমি যখন চলে যাও সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর
সব আলো নিবে যায়,
বইমেলা জনশূন্য হয়ে পড়ে,
কবিতা লেখা ভুলে যাই।
তোমার সান্নিধ্যের প্রতিটি মুহূর্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো
মনোরম
একেটি তুচ্ছ বাক্যালাপ অন্তহীন নদীর কল্লোল,
তোমার একটুখানি হাসি অর্থ এককোটি বছর
জ্যোৎস্নারাত
তুমি যখন চলে যাও পৃথিবীতে আবার হিমযুগ
নেমে আসে;
তোমার সাথে প্রতিটি কতাই কবিতা, প্রতিটি গোপন কটাক্ষই
অনিঃশেষ বসন্তকাল
তোমার প্রতিটি সম্বোধন ঝর্নার একেকটি কলধ্বনি,
তোমার প্রতিটি আহ্বান একেকটি
অনন্ত ভোরবেলা।
তাই তুমি যখন চলে যাও মুহূর্তে সব নদীপথ
বন্ধ হয়ে যায়
পদ্মার রুপালি ইলিশ তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে,
পুষ্পোদ্যান খাঁখাঁ মরুভূমি হয়ে ওঠে;
যতোক্ষণ তুমি থাকো আমার নিকটে থাকে
সপ্তর্ষিমণ্ডল
মাথার ওপরে থাকে তারাভরা রাতের আকাশ,
তুমি যতোক্ষণ থাকো আমার এই হাতে
দেখি ইন্দ্রজাল
আঙুলে বেড়ায় নেচে চঞ্চল হরিণ;
তুমি এলে খুব কাছে আসে সুদূর নীলিমা
তোমার সান্নিধ্যের প্রতিটি মুহূর্ত সঙ্গীতের
অপূর্ব মূর্ছনা
যেন কারো অবিরল গাঢ় অশ্রুপাত;
তোমার সাথে প্রতিটি বাক্য একেকটি কবিতা
প্রতিটি শব্দ শুভ্র শিশির।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1404
|
5131
|
শামসুর রাহমান
|
মেধার কিরণে স্নান করে
|
চিন্তামূলক
|
মেধার কিরণে স্নান করে শব্দাবলী ফিরে আসে
আপন নিরালা ঘাটে, কখনো বিস্তর মেঠো পথ
এবং সুদূর সাঁকো পেরিয়ে, ঔদাস্যে
ফুটপাতে গায় গান, কখনো বা দরদালানের
দেয়াল, রেস্তোরাঁ, পুলিশের পিঠ বেয়ে উঠে পড়ে
কাঠবিড়ালীর মতো নিঝুম ভঙ্গিতে।
মধ্যরাতে জ্যোৎস্না-ধোয়া চা-খানায় ফোকটে চা খেয়ে
গলিতে আড়াল খোঁজে ওরা, প্রত্যুষে সংবাদপত্রে
শিস দেয় অকস্মাৎ মেধার সম্ভ্রম ভুলে দিয়ে।মেধার কিরণে স্নান করে শব্দাবলী
উঠোনে বেড়ায় নেচে, ঘরে
প্রহরে প্রহরে শুয়ে-বসে, হামাগুড়ি দিয়ে আর
মেঝেতে গড়িয়ে
কাটায় সময়। কখনো বা
স্বপ্নের ঝরণায় মুখ রেখে দূর ঝুলন্ত উদ্যানে
বাড়ায় স্বপ্নার্দ্র হাত, অন্তরালে অজস্র বেহালা
বেজে ওঠে।শব্দের ভেতরে শব্দ অবলুপ্ত সভ্যতায় স্মৃতির মতোন
জেগে থাকে, উড়ে যায় মেঘে, যেন হাওয়ায় হরিণ ওড়ে
এক পাল। সভ্যতার দ্বিপ্রহর কখনো প্রোজ্জ্বল মরীচিকা,
কখনো বা ঐন্দ্রজালিকের ভুল খেলা
বিশ্বব্যাপী জনসমাবেশে। যখন সিংহের পায়ে
মরুসীমা শিহরিত হয়, স্ফীত কেশরে কেশরে
সমাহিত সাম্রাজ্যের দিকগুলি সুনীল শোভায়
প্রস্ফুটিত বারংবার, জগৎ-সংসার
নানা গুঞ্জরণে
দৃশ্যে দৃশ্যে অর্থ আর অর্থহীনতায় ক্রমাগত
অত্যন্ত দোদুল্যমান। শব্দাবলী সভ্যতার স্তর,
শোকগাথা আর্তরব কত
বিপুল ধ্বংসের।
রেস্কিউ পার্টির উদ্ধারের অতীত সে ধ্বংসলীলা, মনে রেখো।
তরুণ কবির থর থর হৃদয়ের মতো কিছু
অদৃশ্য পলাশ জ্বলে দ্বিপ্রহরে। ফাল্গুনের পথে
ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, মুখচ্ছবি বহু গান। দুপুরেই
অকস্মাৎ চুতর্দিকে কেমন আঁধার হয়ে আসে।
মেধার কিরণে স্নান করে শব্দাবলী অন্ধকারে
কাকে ডাকে? উন্মুথিত নগর, বনানী উপত্যকা
এবং পাহাড়ি পথ স্বপ্নে কথা বলার মতোন
সাড়া দেয়, শব্দাবলী অভ্যাসের সীমা ছিঁড়ে যায়। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/medhar-kirone-snan-kore/
|
3058
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ছাড়িস নে ধরে থাক এঁটে
|
মানবতাবাদী
|
২১ আষাঢ়, ১৩১৭
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/691
|
769
|
জসীম উদ্দীন
|
আমার বন্ধু বিনোদিয়ারে
|
প্রেমমূলক
|
আমার বন্ধু বিনোদিয়ারে
প্রাণ বিনোদিয়া;
আমি আর কতকাল রইব আমার
মনেরে বুঝাইয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
কি ছিলাম, কি হইলাম সইরে, কি রূপ হেরিয়া,
আমি নিজেই যাহা বুঝলাম না সই, কি কব বুঝাইয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
চোখে তারে দেখলাম সইরে! পুড়ল তবু হিয়া,
আমার নয়নে লাগিলে আনল নিবাইতাম কাঁদিয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
মরিব মরিব সইরে যাইব মরিয়া,
আমার সোনা বন্ধুর রূপ দিও গরলে গুলিয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
আগে যদি জানতাম বন্ধু যাইবা ছাড়িয়া,
আমি ছাপাইয়া রাখতাম তোমার পাঁজর চিরিয়ারে;
প্রাণ বিনোদিয়া।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/794
|
5704
|
সুকুমার রায়
|
হারিয়ে পাওয়া
|
ছড়া
|
ঠাকুরদাদার চশমা কোথা ?
ওরে গণ্শা, হাবুল, ভোঁতা,
দেখ্না হেথা, দেখ্না হোথা- খোঁজ না নিচে গিয়ে ।কই কই কই? কোথায় গেল ?
টেবিল টানো, ডেস্কও ঠেল,
ঘরদোর সব উলটে ফেল- খোঁচাও লাঠি দিয়ে ।খুঁজছে মিছে কুঁজোর পিছে,
জুতোর ফাঁকে, খাটের নিচে,
কেউ বা জোরে পর্দা খিঁচে- বিছনা দেখে ঝেড়ে-লাফিয়ে ঘুরে হাঁফিয়ে ঘেমে
ক্লান্ত সবে পড়্ল থেমে,
ঠাকুরদাদা আপনি নেমে আসেন তেড়েমেড়ে ।বলেন রেগে, "চশমাটা কি
ঠাং গজিয়ে ভাগ্ল নাকি ?
খোঁজার নামে কেবল ফাঁকি- দেখছি আমি এসে !"যেমন বলা দারূণ রোষে,
কপাল থেকে অম্নি খ'সে
চশমা পড়ে তক্তপোশে- সবাই ওঠে হেসে !
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/hariye-paowa/
|
3496
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বধূ
|
প্রেমমূলক
|
ঠাকুরমা দ্রুততালে ছড়া যেত প ' ড়ে —
ভাবখানা মনে আছে — “ বউ আসে চতুর্দোলা চ ' ড়ে
আম কাঁঠালের ছায়ে ,
গলায় মোতির মালা , সোনার চরণচক্র পায়ে । ”
বালকের প্রাণে
প্রথম সে নারীমন্ত্র আগমনীগানে
ছন্দের লাগাল দোল আধোজাগা কল্পনার শিহরদোলায় ,
আঁধার-আলোর দ্বন্দ্বে যে প্রদোষে মনেরে ভোলায় ,
সত্য-অসত্যের মাঝে লোপ করি সীমা
দেখা দেয় ছায়ার প্রতিমা ।
ছড়া-বাঁধা চতুর্দোলা চলেছিল যে-গলি বাহিয়া
চিহ্নিত করেছে মোর হিয়া
গভীর নাড়ীর পথে অদৃশ্য রেখায় এঁকেবেঁকে ।
তারি প্রান্ত থেকে
অশ্রুত সানাই বাজে অনিশ্চিত প্রত্যাশার সুরে
দুর্গম চিন্তার দূরে দূরে ।
সেদিন সে কল্পলোকে বেহারাগুলোর পদক্ষেপে
বক্ষ উঠেছিল কেঁপে কেঁপে ,
পলে পলে ছন্দে ছন্দে আসে তারা আসে না তবুও ,
পথ শেষ হবে না কভুও ।
সেকাল মিলাল । তার পরে , বধূ-আগমনগাথা
গেয়েছে মর্মরচ্ছন্দে অশোকের কচি রাঙা পাতা ;
বেজেছে বর্ষণঘন শ্রাবণের বিনিদ্র নিশীথে ;
মধ্যাহ্নে করুণ রাগিণীতে
বিদেশী পান্থের শ্রান্ত সুরে ।
অতিদূর মায়াময়ী বধূর নূপুরে
তন্দ্রার প্রত্যন্তদেশে জাগায়েছে ধ্বনি
মৃদু রণরণি ।
ঘুম ভেঙে উঠেছিনু জেগে ,
পূর্বাকাশে রক্ত মেঘে
দিয়েছিল দেখা
অনাগত চরণের অলক্তের রেখা ।
কানে কানে ডেকেছিল মোরে
অপরিচিতার কণ্ঠ স্নিগ্ধ নাম ধ ' রে —
সচকিতে
দেখে তবু পাই নি দেখিতে ।
অকস্মাৎ একদিন কাহার পরশ
রহস্যের তীব্রতায় দেহে মনে জাগাল হরষ ;
তাহারে শুধায়েছিনু অভিভূত মুহূর্তেই ,
“ তুমিই কি সেই ,
আঁধারের কোন্ ঘাট হতে
এসেছ আলোতে! ”
উত্তরে সে হেনেছিল চকিত বিদ্যুৎ ;
ইঙ্গিতে জানায়েছিল , “ আমি তারি দূত ,
সে রয়েছে সব প্রত্যক্ষের পিছে ,
নিত্যকাল সে শুধু আসিছে ।
নক্ষত্রলিপির পত্রে তোমার নামের কাছে
যার নাম লেখা রহিয়াছে
অনাদি অজ্ঞাত যুগে সে চড়েছে তার চতুর্দোলা ,
ফিরিছে সে চির-পথভোলা
জ্যোতিষ্কের আলোছায়ে ,
গলায় মোতির মালা , সোনার চরণচক্র পায়ে । ”
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/budu/
|
286
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
খোকার গপ্প বলা
|
ছড়া
|
মা ডেকে কন, ‘খোকন-মণি! গপ্প তুমি জানো?
কও তো দেখি বাপ!’
কাঁথার বাহির হয়ে তখন জোর দিয়ে এক লাফ
বললে খোকন, ‘গপপ জানি, জানি আমি গানও!’
বলেই খুদে তানসেন সে তান জুড়ে জোর দিল –
‘একদা এক হাড়ের গলায় বাঘ ফুটিয়াছিল!’
মা সে হেসে তখন
বলেন, ‘উহুঁ, গান না, তুমি গপ্প বলো খোকন!’
ন্যাংটা শ্রীযুত খোকা তখন জোর গম্ভীর চালে
সটান কেদারাতে শুয়ে বলেন, “সত্যিকালে
এক যে ছিল রাজা আর মা এক যে ছিল রানি,
হাঁ মা আমি জানি,
মায়ে পোয়ে থাকত তারা,
ঠিক যেন ওই গোঁদলপাড়ার জুজুবুড়ির পারা!
একদিন না রাজা –
ফড়িং শিকার করতে গেলেন খেয়ে পাঁপড়ভাজা!
রানি গেলেন তুলতে কলমি শাক
বাজিয়ে বগল টাক ডুমাডুম টাক!
রাজা শেষে ফিরে এলেন ঘরে
হাতির মতন একটা বেড়াল-বাচ্চা শিকার করে।
এসে রাজা দেখেন কিনা বাপ!
রাজবাড়িতে আগড় দেওয়া, রানি কোথায় গাপ!
দুটোয় গিয়ে এলেন রাজা সতরোটার সে সময়!
বলো তো মা-মণি তুমি, খিদে কি তায় কম হয়?
টাটি-দেওয়া রাজবাড়িতে ওগো,
পান্তাভাত কে বেড়ে দেবে?
খিদের জ্বালায় ভোগো!
ভুলুর মতন দাঁত খিঁচিয়ে বলেন তখন রাজা,
নাদনা দিয়ে জরুর রানির ভাঙা চাই-ই মাজা।
এমন সময় দেখেন রাজা আসচে রানি দৌড়ে
সারকুঁড় হতে ক্যাঁকড়া ধরে রাম-ছাগলে চড়ে!
দেখেই রাজা দাদার মতন খিচমিচিয়ে উঠে –”
‘হাঁরে পুঁটে!’
বলেই খোকার শ্রীযুত দাদা সটান
দুইটি কানে ধরে খোকার চড় কসালেন পটাম্।
বলেন, ‘হাঁদা! ক্যাবলাকান্ত! চাষাড়ে।
গপ্প করতে ঠাঁই পাওনি চণ্ডুখুড়ি আষাঢ়ে?
দেব নাকি ঠ্যাংটা ধরে আছাড়ে?
কাঁদেন আবার! মারব এমন থাপড়,
যে কেঁদে তোমার পেটটি হবে কামার শালার হাপর!’
চড় চাপড় আর কিলে,
ভ্যাবাচ্যাকা খোকামণির চমকে গেল পিলে!
সেদিনকারের গপ্প বলার হয়ে গেল রফা,
খানিক কিন্তু ভেড়ার ভ্যাঁ ডাক শুনেছিলুম তোফা! (ঝিঙেফুল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/kholar-goppo-bola/
|
5997
|
হুমায়ূন আহমেদ
|
আমি খুব অল্প কিছু চাই
|
প্রেমমূলক
|
আমাকে ভালবাসতে হবে না,
ভালবাসি বলতে হবে না.
মাঝে মাঝে গভীর আবেগ
নিয়ে আমার ঠোঁট
দুটো ছুয়ে দিতে হবে না.
কিংবা আমার জন্য রাত
জাগা পাখিও
হতে হবে না.
অন্য সবার মত আমার
সাথে রুটিন মেনে দেখা
করতে হবে না. কিংবা বিকেল বেলায় ফুচকাও
খেতে হবে না. এত
অসীম সংখ্যক “না”এর ভিড়ে
শুধু মাত্র একটা কাজ
করতে হবে আমি যখন
প্রতিদিন এক বার “ভালবাসি” বলব
তুমি প্রতিবার
একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেলে একটু
খানি আদর মাখা
গলায় বলবে “পাগলি”
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4538.html
|
4525
|
শামসুর রাহমান
|
কখনও কোথাও
|
চিন্তামূলক
|
সেই কবে কাকে যেন কথা দিয়েছিলাম, আবার আসবই।
কখন কোথায় দেখা হবে, ছন্নছাড়া
এই আমি জানাতে পারিনি। সুকোমল
দুটি হাত ছেড়ে চলে গেছি নিরুদ্দেশে।আমার তো আজও পথ চলার বিরাম
নেই, নানা দিকে যাত্রা করি,
হই মুখোমুখি কত চেনা,
অচেনা জনের, শুধু দেখি না দেখতে যাকে চাই।
নতুন পথের দিশা খুঁজে এগিয়েছি বহুবার,
কত না সকাল সন্ধ্যারাগে পরিণত
হয়েছে, কেটেছে রাত অজানা জায়গায়,
হিসাব রাখিনি।সম্মুখে চলার দৃঢ় ভরসায় পথ হাঁটি,
দূর দিগন্তের দিকে চোখ
রেখে চলি, অথচ বিস্মিত
পথচারী আমি দেখি শুধুঘুরছি, ঘুরছি একই সীমানায়। কে পাখি পাখার
ঝাপ্টায় আহত করে আমাকে এবং
আওড়ায় বার বার, ‘শোনো হে পথিক,
প্রকৃত কোথাও কারও কোনও যাওয়া নেই’। (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kokhono-kothao/
|
5392
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
ইলশে গুঁড়ি
|
ছড়া
|
ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি
ইলিশ মাছের ডিম|
ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
দিনের বেলায় হিম|
কেয়াফুলে ঘুণ লেগেছে,
পড়তে পরাগ মিলিয়ে গেছে,
মেঘের সীমায় রোদ হেসেছে
আলতা-পাটি শিম্|
ইলশে গুঁড়ি হিমের কুঁড়ি,
রোদ্দুরে রিম্ ঝিম্|
হালকা হাওয়ায় মেঘের ছাওয়ায়
ইলশে গুঁড়ির নাচ, -
ইলশে গুঁড়ির নাচন্ দেখে
নাচছে ইলিশ মাছ|
কেউ বা নাচে জলের তলায়
ল্যাজ তুলে কেউ ডিগবাজি খায়,
নদীতে ভাই জাল নিয়ে আয়,
পুকুরে ছিপ গাছ|
উলসে ওঠে মনটা, দেখে
ইলশে গুঁড়ির নাচ| ইলশে গুঁড়ি পরীর ঘুড়ি
কোথায় চলেছে,
ঝমরো চুলে ইলশে গুঁড়ি
মুক্তো ফলেছে!
ধানেক বনে চিংড়িগুলো
লাফিয়ে ওঠে বাড়িয়ে নুলো;
ব্যাঙ ডাকে ওই গলা ফুলো,
আকাশ গলেছে,
বাঁশের পাতায় ঝিমোয় ঝিঁঝিঁ,
বাদল চলেছে| মেঘায় মেঘায় সূর্য্যি ডোবে
জড়িয়ে মেঘের জাল,
ঢাকলো মেঘের খুঞ্চে-পোষে
তাল-পাটালীর থাল|
লিখছে যারা তালপাতাতে
খাগের কলম বাগিয়ে হাতে
তাল বড়া দাও তাদের পাতে
টাটকা ভাজা চাল;
পাতার বাঁশী তৈরী করে'
দিও তাদের কাল| খেজু পাতায় সবুজ টিয়ে
গড়তে পারে কে?
তালের পাতার কানাই ভেঁপু
না হয় তাদের দে|
ইলশে গুঁড়ি - জলের ফাঁকি
ঝরছে কত বলব তা কী?
ভিজতে এল বাবুই পাখী
বাইরে ঘর থেকে; -
পড়তে পাখায় লুকালো জল
ভিজলো নাকো সে| ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি!
পরীর কানের দুল,
ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি!
ঝরো কদম ফুল|
ইলশে গুঁড়ির খুনসুড়িতে
ঝাড়ছে পাখা - টুনটুনিতে
নেবুফুলের কুঞ্জটিতে
দুলছে দোদুল দুল্;
ইলশে গুঁড়ি মেঘের খেয়াল
ঘুম-বাগানের ফুল|
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/ilshe-guri/
|
2333
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
নিকুঞ্জবনে
|
ভক্তিমূলক
|
(১) যমুনা পুলিনে আমি ভ্রমি একাকিনী,
হে নিকুঞ্জবন,
না পাইয়া ব্রজেশ্বরে, আইনু হেথা সত্বরে,
হে সখে, দেখাও মোরে ব্রজের রঞ্জন!
সুধাংশু সুধার হেতু, বাঁধিয়ে আশার সেতু,
কুমুদীর মনঃ যতা উঠে গো গগনে,
হেরিতে মুরলীধর--- রূপে যিনি শশধর---
আসিয়াছি আমি দাসী তোমার সদনে---
তুমি হে অম্বর, কুঞ্জবর, তব চাঁদ নন্দের নন্দন!(২) তুমি জান কত ভাল বাসি শ্যামধনে
আমি অভাগিনী;
তুমি জান, সুভাজন, হে কুঞ্জকুল রাজন,
এ দাসীরে কত ভাল বাসিতেন তিনি!
তোমার কুসুমালয়ে যবে গো অতিথি হয়ে,
বাজায়ে বাঁশরী ব্রজ মোহিত মোহন,
তুমি জান কোন ধনী শুনি সে মধুর ধ্বনি,
অমনি আসি সেবিত ও রাঙা চরণ,
যথা শুনি জলদ-নিনাদ ধায় রড়ে প্রমদা শিখিনী।(৩) সে কালে---জ্বলে রে মনঃ স্মরিলে সে কথা,
মঞ্জু কুঞ্জবন,---
ছায়া তব সহচরী সোহাগে বসাতো ধরি
মাধবে অধীনী সহ পাতি ফুলাসন;
মুঞ্জরিত তরুবলী, গুঞ্জরিত যত অলি,
কুসুম-কামিনী তুলি ঘোমটা অমনি,
মলয়ে সৌরভধন বিতরিত অনুক্ষণ,
দাতা যথা রাজেন্দ্রনন্দিনী---গন্ধামোদে মোদিয়া কানন!(৪) পঞ্চস্বরে কত যে গাইত পিকবর
মদন-কীর্ত্তন,---
হেরি মম শ্যাম-ধন ভাবি তারে নবঘন,
কত যে নাচিত সুখে শিখিনী, কানন,---
ভুলিতে কি পারি তাহা, দেখেছি শুনেছি যাহা?
রয়েছে সে সব লেখা রাধিকার মনে।
নলিনী ভুলিবে যবে রবি-দেবে, রাধা তবে
ভুলিবে, হে মঞ্জু কুঞ্জ, ব্রজের রঞ্জনে।
হায় রে, কে জানে যদি ভুলি যবে আসি গ্রাসিবে শমন।(৫) কহ, সখে, জান যদি কোথা গুণমণি---
রাধিকারমণ?
কাম-বঁধু যথা মধু তুমি হে শ্যামের বঁধু
একাকী আজি গো তুমি কিসের কারণ,---
হে বসন্ত, কোথা আজি তোমার মদন?
তব পদে বিলাপিনী কাঁদি আমি অভাগিনী,
কোথা মম শ্যামমণি---কহ কুঞ্জবর!
তোমার হৃদয় দয়া, পদ্মে যথা পদ্মালয়া,
বধো না রাধার প্রাণ না দিয়া উত্তর!
মধু কহে, শুন ব্রজাঙ্গনে, মধুপুরে শ্রীমধুসূদন!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/nikunjabone/
|
2718
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার না-বলা বাণীর ঘন যামিনীর মাঝে
|
ভক্তিমূলক
|
আমার না-বলা বাণীর ঘন যামিনীর মাঝে
তোমার ভাবনা তারার মতন বাজে ॥
নিভৃত মনের বনের ছায়াটি ঘিরে
না-দেখা ফুলের গোপন গন্ধ ফিরে,
আমার লুকায় বেদনা অঝরা অশ্রুনীরে--
অশ্রুত বাঁশি হৃদয়গহনে বাজে ॥
ক্ষণে ক্ষণে আমি না জেনে করেছি দান
তোমায় আমার গান।
পরানের সাজি সাজাই খেলার ফুলে,
জানি না কখন নিজে বেছে লও তুলে--
তুমি অলখ আলোকে নীরবে দুয়ার খুলে
প্রাণের পরশ দিয়ে যাও মোর কাজে ॥
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-na-bala-banir-gan-jamener-maja/
|
2080
|
মহাদেব সাহা
|
আর কার কাছে পাবো
|
প্রেমমূলক
|
এতোটুকু স্নেহ আর মমতার জন্য আমি কতোবার
নিঃস্ব কাঙালের মতো সবুজ বৃক্ষের কাছে যাই-
হে বৃক্ষ আমাকে তুমি এতোটুকু ভালোবাসা দাও,
বনস্পতি আমাকে দেখিয়ে দেয় তোমার দুচোখ
বলে, ওই দুটি নিবিড় চোখের কাছে যাও।
কতোবার এতোটুকু ভালোবাসা চেয়ে আমি
নির্জন নদীর কাচে যাই-
বলি, পুণ্যতোয়া নদী, আর কিছু নয়,
আমাকে একটু তুমি সহানুভূতির স্পর্শ দাও,
নদী আমাকে দেখিয়ে দেয় তোমার ঠিকানা
বলে, গাছপালা, নদী বন রেখে তার কাছে যাও।
আমি এই ভালোবাসা চেয়ে বহুবার চঞ্চল ঝর্নার
কাছে যাই
হাত পেতে তার কাছে চাই এই তৃষ্ণার শীতল জলধারা,
সে আমাকে বলে, তোমার শুস্ক বুক
যদি একটু ভেজাতে চাও-
সজল বর্ষার মেঘ কিংবা ওই স্নিগ্ধ
জলাশয় ফেলে
ছুটে যাও তার কাছ, পাবে জল ক্লানি-,
পিপাসার।
ভেবো না যাইনি আমি আর কোনোখানে
বৃক্ষ, পত্র, অরণ্য, উদ্ভিদ, পাখি, প্রকৃতির কাছে
এতোটুকু ভালোবাসা চেয়ে কতোদিন
করেছি অপেক্ষা
অবশেষে এসেছি তোমার কাছে-
তুমি যদি না দাও আশ্রয়,
যদি না হয় আর্দ্র তোমার হৃদয়
তোমার এমন অনুভূতিশীল দুটি চোখ যদি
না বোঝে আমার দুঃখ-
তাহলে কীভাবে বলো নদী আর বৃক্ষের কাছে
স্নেহচ্ছায়া পাবো!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1328
|
3390
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পাবনায় বাড়ি হবে
|
ছড়া
|
পাবনায় বাড়ি হবে, গাড়ি গাড়ি ইঁট কিনি,
রাঁধুনিমহল-তরে করোগেট-শীট্ কিনি।
ধার ক’রে মিস্ত্রির সিকি বিল চুকিয়েছি,
পাওনাদারের ভয়ে দিনরাত লুকিয়েছি,
শেষে দেখি জানলায় লাগে নাকো ছিট্কিনি।
দিনরাত দুড়্দাড়্ কী বিষম শব্দ যে,
তিনটে পাড়ার লোক হয়ে গেল জব্দ যে,
ঘরের মানুষ করে খিট্ খিট্ খিট্কিনি।কী করি না ভেবে পেয়ে মথুরায় দিনু পাড়ি,
বাজে খরচের ভয়ে আরেকটা পাকাবাড়ি
বানাবার মতলবে পোড়ো এক ভিট কিনি।
তিনতলা ইমারত শোভা পায় নবাবেরই,
সিঁড়িটা রইল বাকি চিহ্ন সে অভাবেরই,
তাই নিয়ে গৃহিণীর কী যে নাক-সিট্কিনি।শান্তিনিকেতন, ৫ বৈশাখ, ১৩৪৪
(খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pabnai-bari-hobe/
|
723
|
জয় গোস্বামী
|
ভূপৃষ্ঠের ধাতব মলাটে
|
রূপক
|
ভূপৃষ্ঠের ধাতব মলাটে
দাঁড়িয়েছে ইস্পাতের ঘাস
রাত্রি ঢেকে শুয়েছে আকাশ
না-পড়া বিদ্যুৎশাস্ত্র হাতে
ক্রীতদাস চলে যায় কারাগার হারাতে হারাতে
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1755
|
952
|
জীবনানন্দ দাশ
|
এই কি সিন্ধুর হাওয়া
|
চিন্তামূলক
|
এই কি সিন্ধুর হাওয়া? রোদ আলো বনানীর বুকের বাতাস
কোথায় গভীর থেকে আসে!
অগণন পাখী উড়ে চ'লে গেলে তবু নীলাকাশ
কথা বলে নিজের বাতাসে।রাঙা মেঘ- আদি সূর্য- স্বাভাবিক সামাজিক ব্যবহার সব
ফুরিয়ে গিয়েছে কত দূরে।
সে অনেক মানবীয় কাল ভেঙে এখন বিপ্লব
নতুন মানব-উৎস কোথাও রয়েছে এই সুরে।যাযাবর ইতিহাসসহ পথ চিনে নিতে চায়।
অনেক ফ্যাক্টরি ফোর্ট ব্যাঙ্কারেরো আত্নস্থ মনের
অমার ভিতরে অমা রজনীর ভূকম্পনে কথা বলে যায়ঃ
আলো নেই, তবু তার অভিগমনের।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ei-kii-shindhur-hawoa/
|
5279
|
শামসুর রাহমান
|
সারা জীবনই গোধূলির-আকাশ
|
চিন্তামূলক
|
১
জংধরা তোরঙের ঢোস্কা জঠর থেকে বের করে নেড়ে-চড়ে উল্টে-পাল্টে
দেখি ওদের। চমৎকার ঝনৎকাররহিত, উজ্জ্বলতা গানের, বহুকাল এক বিঘৎ
ডোবায় কচুরিপানার জটলায় ছিল মশক-ডিম্বের সংশ্রমে। রোদ্রে শুকিয়ে, ঘষে
ঘষে অনেক আগেকার রূপোর টাকার মতো বাজিয়ে দেখি, বোবা। শোভা না
ল্যক, ধ্বনির ও ধাত্রী নয়, এ তো ভারী মুশকিল। ঢিল ছুঁড়ি অন্ধকার রাত্রির
ঝিলে, কম্পন তোলে নিমজ্জিত নুড়ি। দৈবের উপহারের আশায় উপবিষ্ট,
তীর্থের কাক; খনি ভেবে নিজেকেই খুঁড়ি, মনে পড়ে আগুন-চুরির পরান। কী
দণ্ড শেষতক লভ্য? খণ্ড খণ্ড হবে হৃৎপিণ্ড, পুড়তে থাকব অষ্টপ্রহরাদ্রোহের
উপঢোকন। বাতাস ভূমিহীন চাষির দীর্ঘশ্বাস, পায়ের তলায় হিংস্র ঘাস;
মড়াখেকোদের নাকী চিৎকারে অস্তিত্বের ভিত কাঁপে গেরস্তের। মর্চেধরা
শব্দগুলো সাফ সুফ করে ওদের জংকৃত করার প্রয়াস গুলীবিদ্ধ বেলে হাঁস, চরে
মুখ থুবড়ে পড়ে। যা বলাতেই চাই ওদের দিয়ে, সাধ্যি নেই বলার। এই সময়ের
ছটফটানি, ধুকপুকানি, তর্জন গর্জন ধরাণের শক্তি ওদের লাপাত্তা। “এই
পেয়েছি” বলে ধরতে চাই কোনও শব্দকে, কিন্তু প্রতিবার যায় পিছলে, ভেজা
সাবান। প্রাণপণ খুঁজি যোগ্য শব্দ ভাসমান ঝাঁকে। খুঁজতে খুঁজতে সব
পুঁজিপাটা খুইয়ে দেখি সারা জীবনই গোধূলি-আকাশ।২
যাবতীয় স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে বসি নিভৃত প্রহরে, যেমন মেলায়
নিক্রেতা রকমারি খেলনা সাজিয়ে অপেক্ষমান। দাঁড়ানো সারে সারে, কখনও
ওলটপালট, সে এক যজ্ঞ। শালপাতা সামনে, বলা কওয়া নেই, অ-আ, ক-খ
বসে যায় পঙ্ক্তি ভোজনে। পেট পুরে খেয়ে দেয়ে প্রশ্ন করে, ‘বলো, কী বর
চাও?’ ওদের ঢেকুর, হাই, খুনসুটি আর রঙিন তামাশার ঝাঁকুনিতে আমার
চাওয়ার আইটাই। রাত নির্ঘুম? স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণের কোরিওগ্রাফ। রক্তচোষা
বাদুড় দূর থেকে লক্ষ করে আমাকে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অকস্মাৎ বাজায়
এই বিনিদ্রকে শিকার। অক্ষরমালা ওর সহযোগী, অথচ আমারও উদ্ধার। দুপুর
রাতে তরবারির ঝলসানি ওরা, চোখে চমক। অক্ষর নিমেষে জোনাকি, নেভে
আমার মুঠোয়। মুঠো খুললেই জ্বলে ওঠা পুনরায়, আলোবিন্দুসমুদয় খুব চেনা
একজন, যাকে বারবার স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষা ছলাৎছল নদী। তার মুখ নেমে
আসে আমার উৎসুক মুখে ঘুমের আগে, ওর প্রেমার্দ্র ঠোঁট আমার ওষ্ঠে
মেঘনিবিড় ছায়া মাখে জাগরণের মুহূর্তে। রক্তচোষা বাদুড় অপসৃত।৩
যেখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, সেখানেই দখলি। আমার কান ঘেঁষে যাওয়া
পরিযায়ী পাখি এক লহমায় ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান। চুলে নক্ষত্রের নাচ,
জ্যামিতিক গাছ ধারণ করে কোজাগরী জ্যোৎস্না, গলে গলে পড়ে সাধুর্য।
কয়েক ঘণ্টা পরে উঠবে টকটকে সূর্য, শিরায় টগবগানি। এক খণ্ড বড়সড়
পোয়াতি জমি অচিরে করবে প্রসব। ধান, পাট, গম, যব, ভুট্রা, আলু, আদা,
সর্ষে-কোনো ফসলসম্ভার নেবে সূর্যের চুম্বন, হাওয়ার আলিঙ্গন? সে জমি
আমার লক্ষ্যবস্তু বহু প্রহরের, তাকে দেখি জ্যোতির্বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে। নিয়মিত
নিড়াই, আগাছাগুলো মৃত সৈনিক। পানি গড়ায়, স্ফীতি-মৃত্তিকা-যোনি; হঠাৎ
জমির ওপর ধর্ষিতা নারীর ছিন্নদেহ, উনিশ শ’ একাত্তরটি সূঁচ-বসানো স্তন,
বৃদ্ধের বুলেটে ঝাঁঝরা বুক, বন্দুকের বাঁটে শিশুর থ্যাঁতলানো মুখ, গেরিলার
উত্তোলিত বাহু আর ফাঁকে ফাঁকে শৌর্যের সূর্যমুখী।৪
ওর টিমটিমে জীবনে চন্দ্রোদয় সেই তন্বী। লাগাতার খরার পর জলাধারের
পাড়-ভাঙা উচ্ছ্বাস, অজস্র ফুলের রঙবেরঙের চাউনি। সারাক্ষণ মুখিয়ে থাকা
লোকজনের হট্ররোলে দু’জনের একান্ত ছাউনি, দোয়েল শ্যামার সুরে ঘেরা,
তারার ঝিলিকে ভরপুর। কখনও হৃদয় উপচেপড়া আনন্দ জোয়ার, কখনও
সত্তা-খাককরা যন্ত্রণার দাউ দাহ। সব ছেড়েছুড়ে ওরা এখন ভবিতব্যের
সাম্পানে সওয়ার। তরুণী ওকে হৃদয়ের রক্তোৎপল উপহার দিয়ে বলে, ‘এ
আমার বহু যুগের উত্তরাধিকার, গ্রহণ করো। তুমি কি জানো কেন তোমাকে
ভালোবাসি?’ লোকটার কথা, ‘কী করে জানবো? আগাগোড়া ব্যাপারটাই
রহস্যে-পোরা এক উদ্ভিন্ন তোড়া। ‘ঠিক তা’ নয়, তুমি স্বদেশের মাটিতে
ছড়িয়ে দিতে পারো তোমার সবগুলো হাড়, এ জন্যেই আমার এই
ভালোবাসা। তখন দিগন্ত ছোঁয়া খোলা পথে ঘরহারা, ছন্নছাড়া বাউলের গলা
থেকে ঝরতে থাকে উদাস দেহতত্ত্বের শিশির ফোঁটা।৫
জীবনের গাঁটছড়া বাঁধা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে। তপ্ত, শীতল, শুষ্ক, দ্রবীভূত।
কখনও আকাশ-ফাড়ানো তোলপাড়, কখনও বা দুধের শরবত স্তব্ধতা। মাঝে
মাঝে আলোর ঝকমকানি আর সাবেকি অন্ধকার পাশাপাশি। রাতবিরেতে
সাপের ফোঁসফোঁসানি, ডাকসাইটে মস্তানের অশ্লীল চিৎকার, ছোরা বসানো,
হাঁকডাক আর সাহিত্যিক পিম্পের নষ্টামির ভেতর দিয়ে আমার হাঁটা।
সদ্যোজাত আতঙ্কের কানাগলিতে আমি একা, হকচকানো; মেরুদণ্ডে
আলাস্কার ঈষৎ গলিত বরফ জলের চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়া। বিশ্রাম আমাকে শাদা
অ্যাপ্রন পরা সেবিকার যত্নে শুইয়ে দেয় শয্যায়, অথচ অন্তর্গত গোঙানি ক্ষয়ে
যাওয়া রেকর্ডের একই রেখায় ঘূর্ণমান। বিছানায় বিষ পিঁপড়ে, কাঁকড়া বিছে,
শুঁড় দোলানো আরশোলা আর টিকটিকির ভিড়। চোখের পলকে খাট ছোঁয়
কড়িকাঠ, পলেস্তারা চেপে ধরে আমাকে, গনগনে আংটায় আটকানো গলা,
কণ্ঠস্বরে কখনো গ্যালাক্সির নিস্তব্ধতা কখনো আদিম মানবের বিনিদ্র গোঙানি।
ঘর আমাকে গিলতে আসে ডানাসরের আক্রোশে। কালো পাখি ঠোকর মারে
বারবার, দু’হাতে মুখ ঢাকি। কী করে এ ঘরে এতকাল আমার বসবাস?
আকাশ মুঠো মুঠো ঘাস, ঘাসে লেপ্টে থাকা নীরবতা। সহজিয়া শ্রমে ঘস্ ঘস্
কাটছে ঘাস বিদ্যুৎ রঙের কৃষক।৬
‘কবিতা শুনব’, একটি ফুটফুটে শিশুর ঝলমলে আব্দার বিস্ময়ের
ঢেউগড়ায় সত্তায় ওর মন ভোলানোর আশায় হাতে তুলে দিলাম লাল বল,
চিত্তহারী বল দ্রুত সোফার তলায়। পথ চলতি বানরঅলার সাত তালিমারা
ঝোলা আর ডুগডুগির প্রতি ওকে মনোযোগ করার চেষ্টাতেও নাকাল। ভাবি,আমি কি নক্ষত্রের ঝাড়, জ্যোৎস্নার ঝালর আর মেঘের মেদুরতা দিয়ে মেটাবো
শিশুর দাবি? নাছোড় সে, কবিতা শোনায় ইচ্ছা বুলবুলির অবিরাম শিস।
আখেরে আমার অসমাপ্ত কবিতা আড়ালে রেখে শিশুটিকে খুব কাছে ডেকে ওর
চাঞ্চল্যের রঙিন পথে একটা শাদা কাগজ দোলনার মতো দোলাতে থাকি।৭
হাওয়ায় আমার আজন্ম অধিকার, কিন্তু ফুসফুস টেনে নিতে ব্যর্থ
প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। ধাত্রীর হাতে নাড়ি কাটার দিন থেকেই এই খুঁত। শ্বাস
হারানোর শঙ্কায় সকাল-সন্ধ্যা ছটফটে মুহূর্তগুলো কোনওমতে জড়ো করে
বাঁচা। কলকব্জায় রঙচটা খাঁচা, লোহা-লক্কড়, বসন্তকে নীরব করে দেয়া
কীটনাশক, লজ্ঝড় বাস-ট্রাকের পোড়া ডিজেলের অবিরত বমি; ব্যাপক
দূষণে প্রকৃতি সূতিকাগ্রস্ত, শোচনীয় নারী। ঘোর অমাবস্যায় মোগল বেগম
সাহেবাদের হাম্মামে ভীষণ হানিকর, উৎকট, পূতিগন্ধময় চটচটে নর্দমার
পানি, দ্রাবিড় যুগ থেকে ছুটে আসা। অগুনতি মুমূর্ষু মাছ আর পাখির ঝাঁক
স্তূপীকৃত। আমার আক্রান্ত ফুসফুস হাওয়া টানতে গিয়ে অপদস্থ, ফুলে ফুলে
ওঠে, জীর্ণ হাঁপর। কাপড় চোপড় ঠিকঠাক, মানানসই, অথচ অস্তিত্বের
কাকতাড়ুয়ার রং ঢং। অতিকায় মাকড়সার জালে আমি চিৎপটাং।
সাহসিকতার কোনও ভড়ং ছিল না, অথচ কতিপয় চামচিকা চক্কর কাটে
চতুর্দিকে, আঁটে লাথি মারার ফন্দি। এই বন্দিত্ব থেকে পরিত্রাণ পাব কবে?
স্বর্গীয় এক পাখি কানে কানে বলে, ‘ঝট্কা মেরে জাল ছিঁড়ে উঠে দাঁড়াও
সটান; এক্ষুণি তোমার অভিষেক। ফাঁকা পথে, সাক্ষী অন্তর্যামী, আমাকে
মৃদঙ্গের সুরে ক্রমাগত ডেকেই চলেছে আগামী। দোমড়ানো, মোচড়ানো
ফুসফুস এগোতে দিলেই হয়। যতদিন না কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস জরুরি, ততদিন
আমার ছুটে যাওয়া ম্যারাথন দৌড়বাজের ধরনে। বহুদূরে বিরাট দ্বীপাধার
প্রজ্বলনের আকাঙ্ক্ষায় আমার অপেক্ষায়। মশাল নিতে পারব কি ততদূর?৮
হাতকড়া একজোড়া হাতকড়া ঝন্ঝনিয়ে বেজে ওঠে, পক্ষীর ক্রেঙ্কার।
নাছোড় হাতকড়া ঝোলে, দোলে সারাক্ষণ, স্বপ্নের ভেতরেও। প্রতিবেশীরা
সবাই কম বেশি দ্যাখে এই দৃশ্য-আমার চক্ষুদ্বয় অপ্রকৃতিস্থ দ্যুতি নিয়ে নিবদ্ধ
সম্মুখে, নড়বে না এক চুলও, আর দু’টি অদৃশ্য বেখাপ্পা আলঙ্কার। আমার
হাতের কবজি প্রসারিত স্বেচ্ছাসেবকের ভঙ্গিতে যেন হাতকড়ায় স্থাপিত
সেবাশ্রম। হাতকড়া অতিকায় করোটির ফাঁকা অক্ষি কোটরের মতো নেচে
বেড়ায় এখানে সেখানে। আমি, অচিকিৎস্য স্বপ্নচর, ধ্বংস আর সৃজনের মধ্য
দিয়ে হেঁটে যাই ষড়ঋতুতে। সঙ্গে সঙ্গে যায় এক জোড়া হাতকড়া।৯
রাজকীয় বেলেল্লাপনা, হট্রগোল, সংশয়ের ফণা, বিশ্বাসের অট্রালিকায়
ভয়ঙ্কর সব ফাটল, যে-কোনও মুহূর্তে ধস কিংবা সংহারী ঢল নামতে পারে,
নেমেই গ্যাছে, শহরবাহারী পশুদের উল্লাস। নিজেরাও যাবে তলিয়ে, জানে
না। প্রাক্তন বিশ্বাস আঁকড়ে ধরি যখন তখন, যদিও এই প্রায় প্রলয়তুল্য
ভাঙচুরের মত্ততায় নিঃশ্বাস নেয়া অসাধ্য। যত তাণ্ডবই চলুক, তেড়ে আসুক
পিশাচের দল, এখুনি ভদ্রাসন ছেড়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। দুর্বহ
নিঃসঙ্গতা একশ’ আট ডিগ্রি রৌদ্রে পড়ে থাকা শবের ফাটা ত্বকের মতো
চড়চড় করছে। নিজের সঙ্গেই কথা বলা জোরে জোরে, মাথা ঘোরে, মগজের
ভেতরে হঠাৎ হঠাৎ করে অমানিশা। বেদিশা ঘুরি আলোছুট ঘরে; বাঁচার কী
সার্থকতা? আমি কি লাগছি কারও কোনও কাজে? কলিংবেল বাজে দরজা খুলে
দেখি, শূন্যতার ছায়া। স্যুইচ জমাট, স্পর্শহীন। অদূরে এক চিলতে জনশূন্য,
প্যাচপেচে মাঠ। গেটে ড্রাইভারহীন বেবি ট্যাক্সি ধুঁকছে, কোথাও যাবার কেউ
নেই। ম্যাক্সিপরা কে একজন ছায়ায় বিলীন, এই দিন মেফিস্টোফিলিসের মতো
মুখোশধারী, আত্মাচোর। ইশ্ ব্যাটাচ্ছেলে মরেও না, শক্রদের আক্ষেপ
দিনভর, রাতভর। লেপ মুড়ি দিয়ে শোয়া, বেসিনে হাতমুখ ধোয়া, পাতাল
থেকে অবিশ্বাস্য কবিতার পঙ্ক্তি ছেঁকে তোলা, পরবাস্তবতার ভাষ্য রচনা,
মাঝে-মধ্যে উপহাস্য হওয়া, রাত্রির পর রাত্রি জাগা, দূরের যাত্রী হওয়া
কখনও, এই বেঁচে থাকা কী জন্যে? কার জন্যে? আবছা স্মৃতিকে অনুসরণ করে
দিন যায়। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sara-jiboni-godhulir-akash/
|
2263
|
মহাদেব সাহা
|
শস্যযাত্রা
|
চিন্তামূলক
|
তোমাকে ধরবে না এই কালো পাটকেলে কামিজে
খুলে এই অস্থায়ী পোশাক পঁচিশ-বছর-ভেজা জরাজীর্ণ পাখা
আঁধারে রোদ্দুরে জমা শ্লেষ্মা-বসা বুকের ভিতরে
অন্য বুক তুলে নিয়ে
অন্য স্তব্ধ বিস্মিত হৃদয়, হৃদয়হরণ ভালোবাসা ও প্রত্যয়ে
তোমাকে ধরবো এই মেদমজ্জা মাংসের ভিতরে, অন্য পারে।
এই হাত হবে না তখন আর স্থুল মাংসের প্রতীক
পাবে স্বতন্ত্র আকৃতি
তারও অধিক ব্যঞ্জনা, কোনো শুভার্থী সন্ন্যাসী, কোনো
কামমুক্ত স্বতন্ত্র পুরুষ
কোনো সৃষ্টিস্পর্শ মর্মমুখরতা, কোনো আদিম সন্ন্যাস!
ততো দিন শুধু ভ্রমণের কাল অর্থাৎ ততোদিন তোমার অপেক্ষা।
এই অপেক্ষায় অপেক্ষায় পাখা আরো জীর্ণ হবে
চোখ আরো হবে অন্ধ অনুজ্জ্বল
আরো ক্ষীণ অবসন্ন হবে প্রাণ হবে অধিক বিবর্ণ
ওষ্ঠাগত,
শৈশব থেকে এ যৌবন অর্থাৎ বন্দী থেকে এ বাউল
এক স্বপ্ন থেকে জাগরণ
চালাক চতুর ভিন্ন এক দেশের বাসিন্দা ;
সেও কালো পাটকেলে কামিজ এই যৌবনের ঘামমাখা কাঁথা
এও বদলাতে হবে, এই পঁচিশ-বছর-ভেজা জরাজীর্ণ পাখা
যৌবনের ছেঁড়া এই বেশবাস ফেলে পুনরায় শৈশবের দিকে যাত্রা,
শস্যারম্ভ
তুমুল সন্ন্যাসী তবু শুভার্থী স্বাধীন,
তখন তোমার চুলে সমস্ত শরীরে এই সোনালি শস্যের
স্পর্শ এঁকে দেবো আর
দেখো নারী বাঘ ঈশ্বর ও স্বর্গীয় বিষ নিঃসঙ্কোচে মানুষের
মতন খেয়েছি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1511
|
990
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কিশোরের প্রতি
|
প্রেমমূলক
|
যৌবনের সুরাপাত্র গরল-মদির
ঢালোনি অধরে তব, ধরা-মোহিনীর
উর্ধ্বফণা মায়া-ভুজঙ্গিনী
আসে নি তোমার কাম্য উরসের পথটুকু চিনি,
চুমিয়া চুমিয়া তব হৃদয়ের মধু
বিষবহ্নি ঢালেনিকো বাসনার বধূ
অন্তরের পানপাত্রে তব;
অম্লান আনন্দ তব, আপ্লুত উৎসব,
অশ্রুহীন হাসি,
কামনার পিছে ঘুরে সাজোনি উদাসী।
ধবল কাশের দলে, আশ্বিনের গগনের তলে
তোর তরে রে কিশোর, মৃগতৃষ্ণা কভু নাহি জ্বলে!
নয়নে ফোটে না তব মিথ্যা মরুদ্যান।
অপরূপ রূপ-পরীস্থান
দিগন্তের আগে
তোমার নির্মেঘ-চক্ষে কভু নাহি জাগে!
আকাশকুসুবীথি দিয়া
মাল্য তুমি আনো না রচিয়া,
উধাও হও না তুমি আলেয়ার পিছে
ছলাময় গগনের নিচে!
-রূপ-পিপাসায় জ্বলি মৃত্যুর পাথারে
স্পন্দহীন প্রেতপুরদ্বারে
করোনিকো করাঘাত তুমি
সুধার সন্ধানে লক্ষ বিষপাত্র চুমি
সাজোনিকো নীলকন্ঠ ব্যাকুল বাউল!
অধরে নাহিকো তৃষ্ণা, চক্ষে নাহি ভুল,
রক্তে তব অলক্ত যে পরে নাই আজও রানী,
রুধির নিঙাড়ি তব আজও দেবী মাগে নাই রক্তিম চন্দন।
কারাগার নাহি তব, নাহিকো বন্ধন;
দীঘল পতাকা, বর্শা তন্দ্রাহারা প্রহরীর লও নি তুলিয়া,
-সুকুমার কিশোরের হিয়া!
-জীবনসৈকতে তব দুলে যায় লীলায়িত লঘুনৃত্য নদী,
বক্ষে তব নাচে নিকো যৌবনের দুরন্ত জলধি;
শূল-তোলা শম্ভূর মতন
আস্ফালিয়া উঠে নাই মন
মিথ্যা বাধা-বিধানের ধ্বংসের উল্লাসে!
তোমার আকাশে
দ্বাদশ সূর্যের বহ্নি ওঠেনিকো জ্বলি
কক্ষচ্যুত উল্কাসম পড়েনিকো স্খলি,
কুজ্ঝটিকা-আবর্তের মাঝে
অনির্বাণ স্ফুলিঙ্গের সাজে!
সব বিঘ্ন সকল আগল
ভাঙিয়া জাগোনি তুমি স্পন্দন-পাগল
অনাগত স্বপ্নের সন্ধানে
দুরন্ত দুরাশা তুমি জাগাও নি প্রাণে।
নিঃস্ব দুটি অঞ্জলির আকিঞ্চন মাগি
সাজোনিকো দিকভোলা দিওয়ানা বৈরাগী!
পথে পথে ভিক্ষা মেগে কাম্য কল্পতরু
বাজাওনি শ্মশান-ডমরু!
জ্যোৎস্নাময়ী নিশি তব, জীবনের অমানিশা ঘোর
চক্ষে তব জাগেনি কিশোর!
আঁধারের নির্বিকল্প রূপ,
স্পন্দহীন বেদনার কূপ
রুদ্ধ তব বুকে;
তোমার সম্মুখে
ধরিত্রী জাগিছে ফুল্ল-সুন্দরীর বেশে,
নিত্য বেলাশেষে
যেই পুষ্প ঝরে,
যে বিরহ জাগে চরাচরে,
গোধূলির অবসানে শ্লোকম্লান সাঁঝে,
তাহার বেদনা তব বক্ষে নাহি বাজে,
আকাঙ্খার অগ্নি দিয়া জ্বালো নাই চিতা,
ব্যথার সংহিতা
গাহ নাই তুমি!
দরিয়ার তীর ছাড়ি দেখ নাই দাব-মরুভূমি
জ্বলন্ত নিষ্ঠুর!
নগরীর ক্ষুব্ধ বক্ষে জাগে যেই মৃত্যুপ্রেতপুর,
ডাকিনীর রুক্ষ অট্টহাসি
ছন্দ তার মর্মে তব ওঠে না প্রকাশি!
সভ্যতার বীভৎস ভৈরবী
মলিন করে নি তব মানসের ছবি,
ফেনিল করেনি তব নভোনীল, প্রভাতের আলো,
এ উদভ্রান্ত যুবকের বক্ষে তার রশ্মি আজ ঢালো, বন্ধু, ঢালো!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/892
|
3213
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দিনের প্রহরগুলি হয়ে গেল পার
|
চিন্তামূলক
|
দিনের প্রহরগুলি হয়ে গেল পার
বহি কর্মভার।
দিনান্ত ভরিছে তরী রঙিন মায়ায়
আলোয় ছায়ায়। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/diner-prohorguli-hoye-gelo-par/
|
1760
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আত্মচরিত ০২
|
প্রেমমূলক
|
বৃষ্টি এলে ষোলো বছর বয়সটা ভিজতে ভিজতে
ফিরে আসে আবার।
পায়ের তলায় বন্যার জল, রুপোর মল পরা ঢেউ
মখমল মাটি, শামুক, কাটা, পায়ের রক্তের দাগ,
সব ফিরে আসে আবার।
কার যেন ভিজে চুলের ডাকাডাকি, আকাশময়
যেন একটাই কাজর-পরা চোখ।
চাঁপা ফুলের গন্ধ পুড়তে থাকে দুপুরবেলার রোদে
আমি তার হাহাকারের হাত ধরে ঘুরে বেড়াই।
সেই হাহাকার কতবার তোমার ভেজানো ঘরের দরজার
শিকল ধরে দিয়েছে টান
আঁচলটুকু ধরতে দিয়ে বাকি সব লুকিয়ে রাখতে
লজ্জার কৌটোয়,
চোখের আয়নায় একটু মুখ দেখতে দিয়ে বাকি সব।
সেন্টমাখানো রুমাল কোমরে গুঁজে
স্বপ্নে বেড়াতে আসতে রোজ ।
স্বপ্নে আঁচলহীন ছিলে তুমি।
স্বপ্নে লজ্জাহীন ছিল গোপন চিঠির খসড়াগুলো।
দিনের আলোয় তাদের অশ্নীলতা
ছেঁড়া পাতা হয়ে উড়ে যেতো বাজবরণের ঝোপে।
বৃষ্টি এলে ষোলো বছর বয়সটা ফিরে আসে আবার
আবার আকাশময় এক কাজলপরা চোখ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1224
|
5772
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ছবি খেলা
|
প্রেমমূলক
|
মনে আছে সেই রাত্রি? সেই চাকভাঙা
মধুর মতন জ্যোৎস্না
উড়ো উড়ো পেঁজা মেঘ অলীক গর্ভের প্রজাপতি
দুগ্ধবর্ণ বাতাসের কখনো স্পর্শ ও ছবি খেলা
মিনারের মতোন পাঁচটি প্রচীন সুউচ্চ গাছ,
সেই
মানবিক চষা মাঠ, তিনটি দিগন্ত দূর, আরও দূর
পুকুরের ঢালু পাড়ে তুমি শুয়ে ছিলে
মনে আছে সেই রাত্রি, সঠিক পথেই ঠিক
ভুল করে যাওয়া?
বুকে কেউ চোখ ঘষে, ঊরুদ্বয়ে, ভেঙে যায় ঘুম
হঠাৎ প্রবাসী গল্প, ফিসফাস, শব্দ এসে
শব্দকে লুকোয়
অশ্রুর লবণ থেকে উঠে আসে স্মৃতিকথা, পিঠে
কাঁকর ও তৃণাঙ্কুর, অথচ এমন রাত্রি, এমন
জ্যোৎস্না মৃদু ঢেউ
কখনো দেখোনি কেউ, সমস্ত শরীরে আলো যেন
খুব জলের গভীরে
সাবলীল ভেসে যাওয়া, কত দেশ কত
নদী এমনকি
মনুষজন্ম পার হয়ে এসে
যেমন ফুলের বুকে ঘ্রাণ কিংবা ঘ্রান ছেঁচে
জন্ম নেয় ফুল
মনে পড়ে সেই রাত্রি? সঠিক পথেই ঠিক
ভুল করে যাওয়া?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1833
|
4423
|
শামসুর রাহমান
|
ঈগল এবং আমি
|
রূপক
|
আমাকে প্রায়শ এক স্বাস্থ্যেজ্জ্বল স্বর্ণাভ ঈগল
উপহাস করে দূর পর্বতশিখর থেকে; ঠারে
ঠোরে দ্যাখে দাগাবাজ অসুখ আমাকে বারে বারে
বেড়াল-ইঁদুর খেলা খেলে, আর করে বেদখল-
রোদে ঘুরে বেড়ানো বৃষ্টিতে ঝিম ভেজা-এ সকল
ছোট ছোট সুখ থেকে। তার সঙ্গে শীতসাঁঝে হিম
সয়ে বাগিচায় বসা কি কঠিন, চোখের পিদিম
এখনই নিভল বলে, গ্রর্ন্থপাঠ হতেছে নিশ্চলস্বর্ণপ্রভ হে ঈগল জেনেছি তোমার তকব্বরি
প্রসিদ্ধ জগতে, কিন্তু জেনে রাখো আমিও চূড়ায়
আমি পক্ষী, যেখানে পুষ্পিত করে বসবাস গৌরী
আমার আপন মনে; তোমার মতোই অধীশ্বার
আছি, করায়ত্ত যার রত্নদ্বীপ, তারার গুঁড়ায়
গড়া, যার তীরে বাঁধা ইচ্ছাতরী এক অনশ্বর। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/igol-ebong-ami/
|
1725
|
পাবলো নেরুদা
|
দুপুরের বুকে ঝুকে
|
প্রেমমূলক
|
অনুবাদ:চয়ন খায়রুল হাবিবদুপুরের বুকে ঝুকে পড়ে বিষন্নতার জাল ছুড়েছিলাম
তোমার সাগর-নিল চোখের জলে
ওখানে গনগনে হলকায় আমার একাকিত্ত্ব বাড়ে
ডুবন্তের হাত তড়পায় বানের জলের তোড়ে
তোমার অন্যমনস্ক চোখে আমি লাল সংকেত পাঠিয়েছি
চাহনি দুলেছিল সাগরবেলাতে দাঁড়ানো বাতিঘরে
দুরের নারি তুমি কেবল অন্ধকার ধরো
শঙ্কাপারে আশঙ্কা থরো থরো
দুপুরের বুকে ঝুকে বিশ্ননতার জাল ছুড়েছিলাম
সেই সাগরে আছড়ে পড়ে তোমারই সাগর-নিল চোখ
তোমার সাথে সঙ্গম
অনেকটা রাতচরা পাখিদের দানা খুটে খুটে খাওয়া
রাত সওয়ার এখন ছায়াবতি ঘোড়ার জিনে
রাত মাটিতে বুনেছে রাতের নিল টাসেল ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3984.html
|
342
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ
|
ভক্তিমূলক
|
তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ ক্ষমা কর হজরত।
ভুলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ, তোমার দেখানো পথ ॥ ক্ষমা কর হজরত।বিলাস-বিভব দলিয়াছ পায় ধূলি সম তুমি, প্রভু,
তুমি চাহ নাই আমরা হইব বাদশা-নবাব কভু।
এই ধরণীর ধন-সম্ভার - সকলের তাহে সম অধিকার;
তুমি বলেছিলে ধরণীতে সবে সমান পুত্র-বৎ ॥ ক্ষমা কর হজরত।তোমার ধর্মে অবিশ্বাসীরে তুমি ঘৃণা নাহি ক’রে
আপনি তাদের করিয়াছ সেবা ঠাঁই দিয়ে নিজ ঘরে।
ভিন্ ধর্মীর পূজা-মন্দির, ভাঙিতে আদেশ দাওনি, হে বীর,
আমরা আজিকে সহ্য করিতে পারিনাকো পর-মত ॥ ক্ষমা কর হজরত।তুমি চাহ নাই ধর্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি,
তলোয়ার তুমি দাও নাই হাতে, দিয়াছ অমর বাণী।
মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা
সার করিয়াছি ধর্মন্ধতা,
বেহেশ্ত্ হ’তে ঝরে নাকো আর তাই তব রহমত ॥
তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ ক্ষমা কর হজরত।
ভুলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ, তোমার দেখানো পথ ॥ ক্ষমা কর হজরত।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/tomar-banire-korini-grohan/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.