id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
3702
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মহারাজা ভয়ে থাকে
|
হাস্যরসাত্মক
|
মহারাজা ভয়ে থাকে
পুলিশের থানাতে,
আইন বানায় যত
পারে না তা মানাতে।
চর ফিরে তাকে তাকে–
সাধু যদি ছাড়া থাকে
খোঁজ পেলে নৃপতিরে
হয় তাহা জানাতে,
রক্ষা করিতে তারে
রাখে জেলখানাতে। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/moharaja-voye-thake/
|
4244
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
যেতে
|
চিন্তামূলক
|
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভাল
এত কালো মেখেছি দু হাতে
এত কাল ধরে।
কখনো তোমার করে, তোমাকে ভাবিনি।
এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে
চাঁদ্ ডাকে আয়, আয়, আয়।
এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে
চিতা কাঠ ডাকে আয়, আয়, আয়।যেতে পারি,
যেকোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো
যাবো
কিন্তু, এখনি যাবো না
তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো
একাকী যাবো না অসময়ে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%81-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%ac/#respond
|
689
|
জয় গোস্বামী
|
নিজের ছেলেকে খুন ক’রে
|
মানবতাবাদী
|
নিজের ছেলেকে খুন ক’রে
ঐ দেখ, চলেছে অভাবী
নিজের মেয়েকে বিক্রি ক’রে
ঐ ফিরে যাচ্ছেন জননী
ওদের সঞ্চয় থেকে ফেরার রাস্তায় পড়ে যায়
অশ্রুর বদলে বালি, পয়সা ও রক্তের চাকতি–গোল
তারপর সমস্ত জল। শুধু ওই গোল গোল পাথরে
আগুন ধকধক করবে একদিন, আর সেই আগুনে পা ফেলে
ক্রোধ শোক দগ্ধ এক জলে ডোবা দেশ
পুনরায়, খুঁজে খুঁজে বেড়াবে পাগল
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1746
|
3433
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রথম পূজা
|
গাথাকাব্য
|
ত্রিলোকেশ্বরের মন্দির।
লোকে বলে স্বয়ং বিশ্বকর্মা তার ভিত-পত্তন করেছিলেন
কোন্ মান্ধাতার আমলে,
স্বয়ং হনুমান এনেছিলেন তার পাথর বহন করে।
ইতিহাসের পণ্ডিত বলেন, এ মন্দির কিরাত জাতের গড়া,
এ দেবতা কিরাতের।
একদা যখন ক্ষত্রিয় রাজা জয় করলেন দেশ
দেউলের আঙিনা পূজারিদের রক্তে গেল ভেসে,
দেবতা রক্ষা পেলেন নতুন নামে নতুন পূজাবিধির আড়ালে—
হাজার বৎসরের প্রাচীন ভক্তিধারার স্রোত গেল ফিরে।
কিরাত আজ অস্পৃশ্য, এ মন্দিরে তার প্রবেশপথ লুপ্ত।
কিরাত থাকে সমাজের বাইরে,
নদীর পূর্বপারে তার পাড়া।
সে ভক্ত, আজ তার মন্দির নেই, তার গান আছে।
নিপুণ তার হাত, অভ্রান্ত তার দৃষ্টি।
সে জানে কী করে পাথরের উপর পাথর বাঁধে,
কী করে পিতলের উপর রুপোর ফুল তোলা যায় —
কৃষ্ণশিলায় মূর্তি গড়বার ছন্দটা কী।
রাজশাসন তার নয়, অস্ত্র তার নিয়েছে কেড়ে ,
বেশে বাসে ব্যবহারে সম্মানের চিহ্ন হতে সে বর্জিত,
বঞ্চিত সে পুঁথির বিদ্যায়।
ত্রিলোকেশ্বর মন্দিরের স্বর্ণচূড়া পশ্চিম দিগন্তে যায় দেখা,
চিনতে পারে নিজেদেরই মনের আকল্প,
বহু দূরের থেকে প্রণাম করে।
কার্তিক পূর্ণিমা, পূজার উৎসব।
মঞ্চের উপরে বাজছে বাঁশি মৃদঙ্গ করতাল,
মাঠ জুড়ে কানাতের পর কানাত,
মাঝে মাঝে উঠেছে ধ্বজা।
পথের দুই ধারে ব্যাপারীদের পসরা —তামার পাত্র, রুপোর অলংকার, দেবমূর্তির পট, রেশমের কাপড়;
ছেলেদের খেলার জন্যে কাঠের ডমরু, মাটির পুতুল, পাতার বাঁশি;
অর্ঘ্যের উপকরণ, ফল মালা ধূপ বাতি, ঘড়া ঘড়া তীর্থবারি।
বাজিকর তারস্বরে প্রলাপবাক্যে দেখাচ্ছে বাজি,
কথক পড়ছে রামায়ণকথা।
উজ্জ্বলবেশে সশস্ত্র প্রহরী ঘুরে বেড়ায় ঘোড়ায় চড়ে;
রাজ-অমাত্য হাতির উপর হাওদায়,
সম্মুখে বেজে চলেছে শিঙা।
কিংখাবে ঢাকা পাল্কিতে ধনীঘরের গৃহিণী,
আগে পিছে কিংকরের দল।
সন্ন্যাসীর ভিড় পঞ্চবটের তলায় —
নগ্ন, জটাধারী, ছাইমাখা;
মেয়েরা পায়ের কাছে ভোগ রেখে যায় —
ফল, দুধ, মিষ্টান্ন, ঘি, আতপতণ্ডুল।
থেকে থেকে আকাশে উঠছে চীৎকারধ্বনি
‘জয় ত্রিলোকেশ্বরের জয়'।
কাল আসবে শুভলগ্নে রাজার প্রথম পূজা,
স্বয়ং আসবেন মহারাজা রাজহস্তীতে চড়ে।
তাঁর আগমন-পথের দুই ধারে
সারি সারি কলার গাছে ফুলের মালা,
মঙ্গলঘটে আম্রপল্লব।
আর ক্ষণে ক্ষণে পথের ধুলায় সেচন করছে গন্ধবারি।
শুক্লত্রয়োদশীর রাত।
মন্দিরে প্রথম প্রহরের শঙ্খ ঘণ্টা ভেরী পটহ থেমেছে।
আজ চাঁদের উপরে একটা ঘোলা আবরণ,
জ্যোৎস্না আজ ঝাপসা —
যেন মূর্ছার ঘোর লাগল।
বাতাস রুদ্ধ —
ধোঁয়া জমে আছে আকাশে,
গাছপালাগুলো যেন শঙ্কায় আড়ষ্ট। কুকুর অকারণে আর্তনাদ করছে,
ঘোড়াগুলো কান খাড়া করে উঠছে ডেকে
কোন্ অলক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ গম্ভীর ভীষণ শব্দ শোনা গেল মাটির নীচে —
পাতালে দানবেরা যেন রণদামামা বাজিয়ে দিলে —
গুরু-গুরু গুরু-গুরু।
মন্দিরে শঙ্খ ঘণ্টা বাজতে লাগল প্রবল শব্দে।
হাতি বাঁধা ছিল,
তারা বন্ধন ছিঁড়ে গর্জন করতে করতে
ছুটল চার দিকে
যেন ঘূর্ণি-ঝড়ের মেঘ।
তুফান উঠল মাটিতে —
ছুটল উট মহিষ গোরু ছাগল ভেড়া
ঊর্ধ্বশ্বাসে পালে পালে।
হাজার হাজার দিশাহারা লোক
আর্তস্বরে ছুটে বেড়ায় —
চোখে তাদের ধাঁধা লাগে,
আত্মপরের ভেদ হারিয়ে কে কাকে দেয় দ'লে।
মাটি ফেটে ফেটে ওঠে ধোঁয়া, ওঠে গরম জল —
ভীম-সরোবরের দিঘি বালির নীচে গেল শুষে।
মন্দিরের চূড়ায় বাঁধা বড়ো ঘণ্টা দুলতে দুলতে
বাজতে লাগল ঢং ঢং।
আচম্কা ধ্বনি থামল একটা ভেঙে-পড়ার শব্দে।
পৃথিবী যখন স্তব্ধ হল
পূর্ণপ্রায় চাঁদ তখন হেলেছে পশ্চিমের দিকে।
আকাশে উঠছে জ্বলে-ওঠা কানাতগুলোর ধোঁয়ার কুণ্ডলী,
জ্যোৎস্নাকে যেন অজগর সাপে জড়িয়েছে।
পরদিন আত্মীয়দের বিলাপে দিগ্বিদিক যখন শোকার্ত
তখন রাজসৈনিকদল মন্দির ঘিরে দাঁড়ালো,
পাছে অশুচিতার কারণ ঘটে।
রাজমন্ত্রী এল, দৈবজ্ঞ এল, স্মার্ত পণ্ডিত এল।দেখলে বাহিরের প্রাচীর ধূলিসাৎ।
দেবতার বেদীর উপরের ছাদ পড়েছে ভেঙে।
পণ্ডিত বললে, সংস্কার করা চাই আগামী পূর্ণিমার পূর্বেই,
নইলে দেবতা পরিহার করবেন তাঁর মূর্তিকে।
রাজা বললেন, ‘সংস্কার করো। '
মন্ত্রী বললেন, ‘ওই কিরাতরা ছাড়া কে করবে পাথরের কাজ।
ওদের দৃষ্টিকলুষ থেকে দেবতাকে রক্ষা করব কী উপায়ে,
কী হবে মন্দিরসংস্কারে যদি মলিন হয় দেবতার অঙ্গমহিমা। '
কিরাতদলপতি মাধবকে রাজা আনলেন ডেকে।
বৃদ্ধ মাধব, শুক্লকেশের উপর নির্মল সাদা চাদর জড়ানো —
পরিধানে পীতধড়া, তাম্রবর্ণ দেহ কটি পর্যন্ত অনাবৃত,
দুই চক্ষু সকরুণ নম্রতায় পূর্ণ।
সাবধানে রাজার পায়ের কাছে রাখলে একমুঠো কুন্দফুল,
প্রণাম করলে স্পর্শ বাঁচিয়ে।
রাজা বললেন, ‘তোমরা না হলে দেবালয়-সংস্কার হয় না। '
‘ আমাদের ‘পরে দেবতার ওই কৃপা'
এই ব'লে দেবতার উদ্দেশে মাধব প্রণাম জানালে।
নৃপতি নৃসিংহরায় বললেন, ‘চোখ বেঁধে কাজ করা চাই,
দেবমূর্তির উপর দৃষ্টি না পড়ে। পারবে?'
মাধব বললে, ‘অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে কাজ করিয়ে নেবেন অন্তর্যামী।
যতক্ষণ কাজ চলবে, চোখ খুলব না। '
বাহিরে কাজ করে কিরাতের দল,
মন্দিরের ভিতরে কাজ করে মাধব,
তার দুই চক্ষু পাকে পাকে কালো কাপড়ে বাঁধা।
দিনরাত সে মন্দিরের বাহিরে যায় না —
ধ্যান করে, গান গায়, আর তার আঙুল চলতে থাকে।
মন্ত্রী এসে বলে, ‘ত্বরা করো, ত্বরা করো —
তিথির পরে তিথি যায়, কবে লগ্ন হবে উত্তীর্ণ।’
মাধব জোড়হাতে বলে, যাঁর কাজ তাঁরই নিজের আছে ত্বরা,
আমি তো উপলক্ষ।’ অমাবস্যা পার হয়ে শুক্লপক্ষ এল আবার।
অন্ধমাধব আঙুলের স্পর্শ দিয়ে পাথরের সঙ্গে কথা কয়,
পাথর তার সাড়া দিতে থাকে।
কাছে দাঁড়িয়ে থাকে প্রহরী।
পাছে মাধব চোখের বাঁধন খোলে।
পণ্ডিত এসে বললে, ‘একাদশীর রাত্রে প্রথম পূজার শুভক্ষণ।
কাজ কি শেষ হবে তার পূর্বে। '
মাধব প্রণাম করে বললে, ‘আমি কে যে উত্তর দেব।
কৃপা যখন হবে সংবাদ পাঠাব যথাসময়ে,
তার আগে এলে ব্যাঘাত হবে, বিলম্ব ঘটবে। '
ষষ্ঠী গেল, সপ্তমী পেরোল —
মন্দিরের দ্বার দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ে
মাধবের শুক্লকেশে।
সূর্য অস্ত গেল। পাণ্ডুর আকাশে একাদশীর চাঁদ।
মাধব দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে,
‘যাও প্রহরী, সংবাদ দিয়ে এসো গে
মাধবের কাজ শেষ হল আজ।
লগ্ন যেন বয়ে না যায়। '
প্রহরী গেল।
মাধব খুলে ফেললে চোখের বন্ধন।
মুক্ত দ্বার দিয়ে পড়েছে একাদশী-চাঁদের পূর্ণ আলো
দেবমূর্তির উপরে।
মাধব হাঁটু গেড়ে বসল দুই হাত জোড় করে,
একদৃষ্টে চেয়ে রইল দেবতার মুখে,
দুই চোখে বইল জলের ধারা।
আজ হাজার বছরের ক্ষুধিত দেখা দেবতার সঙ্গে ভক্তের।
রাজা প্রবেশ করলেন মন্দিরে।
তখন মাধবের মাথা নত বেদীমূলে।
রাজার তলোয়ারে মুহূর্তে ছিন্ন হল সেই মাথা।
দেবতার পায়ে এই প্রথম পূজা, এই শেষ প্রণাম।কাব্যগ্রন্থ - পুনশ্চ
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pratham-puja/
|
967
|
জীবনানন্দ দাশ
|
একদিন কুয়াশার এই মাঠে
|
সনেট
|
একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি;
হৃদয়ের পথ চলা শেষ হল সেই দিন — গিয়েছে যে শান — হিম ঘরে,
অথবা সান্ত্বনা পেতে দেরি হবে কিছু কাল — পৃথিবীর এই মাঠখানি
ভুলিতে বিলম্ব হবে কিছু দিন, এ মাঠের কয়েকটি শালিকের তরে
আশ্চর্য আর বিস্ময়ে আমি চেয়ে রবো কিছু কাল অন্ধকার বিছানার কোলে,
আর সে সোনালি চিল ডানা মেলে দূর থেকে আজো কি মাঠের কুয়াশায়
ভেসে আসে? সেই ন্যাড়া অম্বনে’র পানে আজো চলে যায় সন্ধ্যা সোনার মতো হলে
ধানের নরম শিষে মেঠো ইঁদুরের চোখ নক্ষত্রের দিকে আজো চায়?
সন্ধ্যা হলে? মউমাছি চাক আজো বাঁধে না কি জামের নিবিড় ঘন ডালে,
মউ খাওয়া হয়ে গেলে আজো তারা উড়ে যায় কুয়াশায় সন্ধ্যার বাতাসে –
কতো দূরে যায়, আহা… অথবা হয়তো কেউ চালতার ঝরাপাতা জ্বালে
মধুর চাকের নিচে — মাছিগুলো উড়ে যায়… ঝ’রে পড়ে… ম’রে থাকে ঘাসে –
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ekdin-kuashar-ei-mathey/
|
5730
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
আমার কৈশোর
|
প্রকৃতিমূলক
|
শিউলি ফুলের রাশি শিশিরের আঘাতও সয় না
অন্তর আমার কৈশোরে তারা এ-রকমই ছিল
এখন শিউলি ফুলের খবরও রাখি না অবশ্য
জানি না, তারা স্বভাব বদলেছে কিনা।
আমার কৈশোরে শিউলির বোঁটার রং ছিল শুধু
শিউলির বোঁটারই মতন
কোনো কিছুর সঙ্গেই তার তুলনা চলতো না
আমার কৈশোরে পথের ওপর ঝরে পড়ে থাকা
শিশির মাখা শিউলির ওপর পা ফেললে
পাপ হতে
আমার পাপ কাটাবার জন্য প্রণাম করতাম।
আমার কৈশোরে শিউলির সম্মানে সরে যেত বৃষ্টিময় মেঘ
তখন রেদ্দুর ছিল তাপহীন উজ্জ্বল
দু’হাত ভরা শিউলির ঘ্রাণ নিতে নিতে মনে হতো
আমার কোনো গোপন দু:খ নেই, আমার হৃদয়ে
কোনো দাগ নেই
পৃথিবীর সব আকাশ থেকে বেজে উঠেছে উৎসবের বজনা।
শাদা শিউলির রাশি বড় স্তব্ধ, প্রয়োজনহীন, দেখলেই
বলতে ইচ্ছে করতো,
আমি কারুকে কখনো দু:খ দেবো না-
অন্তত এ-রকমই ছিলো আমার কৈশোরে
এখন অবশ্য শিউলি ফুলের খবরও রাখি না।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1820
|
2204
|
মহাদেব সাহা
|
ফিরে দাও রাজবংশ
|
চিন্তামূলক
|
দূতাবাসে উড়ছে পতাকা
অর্থাৎ স্বাধীন আমরা এ-কথা মানতেই
হয়, রাষ্ট্রীয় সনদ আছে দেশে
দেশে আমরা স্বাধীন;
তবু মনে হয় এ যুগে কোথাও কোনো স্বাধীনতা
নেই, বরং এ যুগে মানুষ যেন
পোষমানা দুর্বল মহিষ, নিজের যৌবন
আজ তার কাছে সবচেয়ে বড়ো অপরাধ, নিজের
বিরেক আজ তার সবচেয়ে
বিদগ্ধ কসাই;
যেখানেই বলো না কেন আমাদের
আজ কোনো স্বাধীনতা নেই,
না কথা বলার, না হাসার, কাঁদার
সবখানে সব দেশে মানুষ আজ স্বাধীনতাহীন
ভীষণ নির্জীব, বিষণ্ন বস্তিতে কিংবা বুর্জোয়া বিলেতে
এখনো প্রত্যহ দেখি গ্রেফতারী
পরোয়ানা হাতে ফেরে নগরপুলিশ;
মানুষ কি পারে তার যৌবনকে ভালোবেসে
বাগানে বেড়াতে
মানুষ কি পারে তার নিজের মনের
শব্দ টেলিগ্রামে ভরে ভরে দূরত্বে পাঠাতে?
মানুষ কি পারে তার নিজের আকৃতি
খুলে স্বচক্ষে দেখতে কখনো?
মানুষ কি আঁকতে পারে নিজের আদলে কোনো
জ্যান্ত বাঘের মুখ? এ যুগে
মানুষ বুঝি বড়ো বেশি কিছুই পারে না
কেবল আইনের হাত ধরে কিছুটা রাস্তা হাঁটা ছাড়া
এ যুগে মানুষ বুঝি
কিছুই পারে না;
অথচ এখথন কোনো রাজা নেই, রাজ্য নেই
কেবল আছে রাজ্যশাসন
আমরা এখন কারো প্রজা নই
প্রজাস্বত্ব সর্বত্র প্রবল
তাই কি আমরা এই প্রজাতন্ত্রে এমন বন্দী স্বাধীন?
তাহলে কি আমরা সবাই আজ বাস
করি পাথরের ঘরে
মানুষ কি কোনোদিনই পারবে না
জন্ম দিতে নিজের যৌবন?
নিজের বুকের মধ্যে পারবে না পুষতে
সে বিশ্বাসের বিশুদ্ধ মৌচাক?
তার চেয়ে আমাদের ফিরে দাও রাজবংশ, রাজকীয়
অলীক বিশ্বাস
রাজকুমার তোমার রক্তে জন্ম নিক
জান্তব যৌবন, যুদ্ধ করে মরি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1472
|
2714
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে
|
ভক্তিমূলক
|
আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে
তখন কে তুমি তা কে জানত।
তখন ছিল না ভয়, ছিল না লাজ মনে,
জীবন বহে যেত অশান্ত।
তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত
যেন আমার আপন সখার মতো,
হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলাম ছুটে
সেদিন কত-না বন-বনান্ত।ওগো, সেদিন তুমি গাইতে যে সব গান
কোনো অর্থ তাহার কে জানত।
শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,
সদা নাচত হৃদয় অশান্ত।
হঠাৎ খেলার শেষে আজ কী দেখি ছবি -
স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,
তোমার চরণপানে নয়ন করি নত
ভুবন দাঁড়িয়ে গেছে একান্ত।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khela-jokhon-chhilo/
|
4758
|
শামসুর রাহমান
|
তখনই হঠাৎ
|
প্রেমমূলক
|
তোমার সান্নিধ্যে কিছুকাল অলৌকিক সরোবরে
কেটেছি সাঁতার, অকস্মাৎ শেষ হলো জলকেলি,
যেমন কেবল আলাপেই সাঙ্গ করেন সঙ্গীত
কোনো গুণী কী খেয়ালে। জানতাম, বিদায়ের পালা
আসবেই একদিন হৃদয়ে ছড়িয়ে রাশি রাশি
তেজস্ক্রিয় ছাই, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ঘটে যাবে
ভয়ংকর অবসান, কখনো ভাবিনি আগে। তুমি
কিংবা আমি কেউ নয় দায়ভাগী এমন সংকটে।যা ঘটেছে কে জানে প্রকৃতপক্ষে তার বিষবীজ
আমাদের অগোচরে আমরা দুজনই পরস্পর
করেছি রোপণ কিনা অসতর্কভাবে? চতুর্দিকে
দৃষ্টি-অন্ধ-করা ঝড়, বেনো জলে লুপ্ত সাঁকো আর
নিরাশ্রয় মৃত পাখি ভাসমান। যখন তোমাকে
আমার সবচে বেশি প্রয়োজন, তখনই হঠাৎ চলে গেলে। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tokhoni-hothat/
|
5338
|
শামসুর রাহমান
|
হাঁটছি হাঁটছি
|
চিন্তামূলক
|
ভোর নেই, দ্বিপ্রহর নেই,
নেই সন্ধ্যা; হাঁটছি, হাঁটছি।
কখন যে বেলা শেষ হয়ে এলো
বস্তুত পাইনি টের। রাত্রি দাঁত, নখ বের করে
আমাকে খাবলে ধরে। কী ভীষণ যন্ত্রণার ফাঁদে
পড়ে কাতরাতে গিয়ে অসহায়, বোবা হয়ে থাকি।পথের ধূসর ধুলো, কালো
কাঁটা ক্ষিপ্ত, বেয়াড়া গাছের,
আমাকে খোঁচাতে থাকে আর
বেধড়ক রক্ত ঝরে অতিশয় ক্লান্ত শরীরের
নানা শিরা ছিঁড়ে-খাঁড়ে। গাছে-বসা কয়েকটি পাখি
ভীত স্বরে কেঁদে ওঠে, হায়, মানবের দুর্দুশায়।এই যে যাত্রায় আমি আজ
পদে পদে বিপর্যস্ত হয়ে
কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি
রেখে ফের হাঁটছি, হাঁটছি, সে কি শুধু অবিরত
ব্যর্থতার ভস্মরাশি সত্তাময় গ্রহণের জন্যে?
যতই ক্লান্তির চাপ থাক, তবু এগোতেই হবে।ঐ তো দূরে যাচ্ছে দেখা চূড়া
অপরূপ আস্তানার, যার
প্রদীপের আভা মুছে ফেলে
দেবে অতীতের ভ্রান্তি, দুর্গন্ধ এবং হাহাকার।
সম্মুখে উঠছে ভেসে অগ্রসর তরুণ, তরুণী,
যারা হাতে আগামীর প্রদীপ, নিশান তুলে নেয়। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/hatchi-hatchi/
|
5548
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
সেপ্টেম্বর _৪৬
|
মানবতাবাদী
|
কলকাতায় শান্তি নেই।
রক্তের কলঙ্ক ডাকে মধ্যরাত্রে
প্রতিটি সন্ধ্যায়।
হৃৎস্পন্দনধ্বনি দ্রুত হয়ঃ
মূর্ছিত শহর।
এখন গ্রামের মতো
সন্ধ্যা হলে জনহীন নগরের পথ;
স্তম্ভিত আলোকস্তম্ভ
আলো দেয় নিতান্ত সভয়ে।
কোথায় দোকানপাট?
কই সেই জনতার স্রোত?
সন্ধ্যার আলোর বন্যা
আজ আর তোলে নাকো
জনতরণীর পাল
শহরের পথে।
ট্রাম নেই, বাস নেই-
সাহসী পথিকহীন
এ শহর আতঙ্ক ছড়ায়।
সারি সারি বাড়ি সব
মনে হয় কবরের মতো,
মৃত মানুষের স্তূপ বুকে নিয়ে পড়ে আছে
চুপ ক'রে সভয়ে নির্জনে।
মাঝে মাঝে শব্দ হয়ঃ
মিলিটারী লরীর গর্জন
পথ বেয়ে ছুটে যায় বিদ্যুতের মতো
সদম্ভ আক্রোশে।
কলঙ্কিত কালো কালো রক্তের মতন
অন্ধকার হানা দেয় অতন্দ্র শহরে;
হয়তো অনেক রাত্রে
পথচারী কুকুরের দল
মানুষের দেখাদেখি
স্বজাতিকে দেখে
আস্ফালন, আক্রমণ করে।
রুদ্ধশ্বাস এ শহর
ছট্ফট করে সারা রাত-
কখন সকাল হবে?
জীয়নকাঠির স্পর্শ
পাওয়া যাবে উজ্জ্বল রোদ্দুরে?
সন্ধ্যা থেকে প্রত্যুষের দীর্ঘকাল
প্রহরে প্রহরে
সশব্দে জিজ্ঞাসা করে ঘড়ির ঘণ্টায়
ধৈর্যহীন শহরের প্রাণঃ
এর চেয়ে ছুরি কি নিষ্ঠুর?
বাদুড়ের মতো কালো অন্ধকার
ভর ক'রে গুজবের ডানা
উৎকর্ণ কানের কাছে
সারা রাত ঘুরপাক খায়।
স্তব্ধতা কাঁপিয়ে দিয়ে
কখনো বা গৃহস্থের দ্বারে
উদ্ধত, অটল আর সুগম্ভীর
শব্দ ওঠে কঠিন বুটের।
শহর মূর্ছিত হয়ে পড়ে।
জুলাই! জুলাই! আবার আসুক ফিরে
আজকের কলকাতার এ প্রার্থনা;
দিকে দিকে শুধু মিছিলের কোলাহল-
এখনো পায়ের শব্দ যাচ্ছে শোনা।
অক্টোবরকে জুলাই হতেই হবে
আবার সবাই দাঁড়াব সবার পাশে,
আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাস
এবারের মতো মুছে যাক ইতিহাস।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/269
|
3573
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিজ্ঞ
|
ছড়া
|
খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা,
খুকি তোমার ভারি ছেলেমানুষ।
ও ভেবেছে তারা উঠছে বুঝি
আমরা যখন উড়েয়েছিলেম ফানুস।
আমি যখন খাওয়া - খাওয়া খেলি
খেলার থালে সাজিয়ে নিয়ে নুড়ি,
ও ভাবে বা সত্যি খেতে হবে
মুঠো করে মুখে দেয় মা, পুরি।
সামনেতে ওর শিশুশিক্ষা খুলে
যদি বলি, ‘খুকি, পড়া করো'
দু হাত দিয়ে পাতা ছিঁড়তে বসে—
তোমার খুকির পড়া কেমনতরো।
আমি যদি মুখে কাপড় দিয়ে
আস্তে আস্তে আসি গুড়িগুড়ি
তোমার খুকি অম্নি কেঁদে ওঠে,
ও ভাবে বা এল জুজুবুড়ি।
আমি যদি রাগ করে কখনো
মাথা নেড়ে চোখ রাঙিয়ে বকি—
তোমার খুকি খিল্খিলিয়ে হাসে।
খেলা করছি মনে করে ও কি।
সবাই জানে বাবা বিদেশ গেছে
তবু যদি বলি ‘আসছে বাবা'
তাড়াতাড়ি চার দিকেতে চায়—
তোমার খুকি এম্নি বোকা হাবা।
ধোবা এলে পড়াই যখন আমি
টেনে নিয়ে তাদের বাচ্ছা গাধা,
আমি বলি ‘আমি গুরুমশাই',
ও আমাকে চেঁচিয়ে ডাকে ‘দাদা'।
তোমার খুকি চাঁদ ধরতে চায়,
গণেশকে ও বলে যে মা গানুশ।
তোমার খুকি কিচ্ছু বোঝে না মা,
তোমার খুকি ভারি ছেলেমানুষ। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/biggo/
|
4806
|
শামসুর রাহমান
|
তোমার কিসের তাড়া ছিলো
|
প্রেমমূলক
|
(মনসুর আহমদ স্মরণে)তোমার কিসের তাড়া ছিলো অত? কেন তুমি সাত
তাড়াতাড়ি এই গুলজার আড্ডা থেকে গুডবাই
বলে চলে গেলে, কেন? হায় করমর্দন বিনাই
নিয়েছো বিদায়, যেন গূঢ় অভিমানে অকস্মাৎ।
না, অমন করে যেতে নেই নিভিয়ে পূর্ণিমা-রাত,
চেয়ার নিঝুম করে টলটলে গ্লাস ফেলে, ছাই,
ঠান্ডা না হতেই ত্র্যাশাক্ট্রেতে। চাই, তোমাকেই চাই,
বলে যে ব্যাকুল ডাকে, তারও হাতে রাখলে না হাত।এখন কোথায় তুমি ঝর্নাতলে নির্মোহ, একেলা
মুখ রাখো? কাদের আসরে খুব মেতে থাকো, বলো?
আমরা কজন আজো, তুমিহীন, বসি এখানেই-
তক্কে-গপ্পে গানে-পানে জমে ওঠে কিছু সন্ধ্যেবেলা।
হঠাৎ তোমাকে দেখি! ভাবি, যদি যাই, ছলোছলো
দুটি চোখে বলবে কি কেউ, না, অমন করে যেতে নেই? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-kiser-tara-chilo/
|
1991
|
বিষ্ণু দে
|
তুমিই মালিনী
|
চিন্তামূলক
|
তুমিই মালিনী, তুমিই তো ফুল জানি ।
ফুল দিয়ে যাও হৃদয়ের দ্বারে, মালিনী,
বাতাসে গন্ধ, উৎস কি ফুলদানি,
নাকি সে তোমার হৃদয়সুরভি হাওয়া ?
দেহের অতীতে স্মৃতির ধূপ তো জ্বালি নি
কালের বাগানে থামে নি কো আসা যাওয়া
ত্রিকাল বেঁধেছ গুচ্ছে তোমার চুলে,
একটি প্রহর ফুলহার দাও খুলে,কালের মালিনী ! তোমাকেই ফুল জানি,
তোমারই শরীরে কালোত্তীর্ণ বাণী,
তোমাকেই রাখী বেঁধে দিই করমূলে
অতীত থাকুক আগামীর সন্ধানী –
তাই দেখে ঐ কাল হাসে দুলে দুলে
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4100.html
|
4121
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
আর কত ভালবাসলে ভালবাসলে আমায়
|
প্রেমমূলক
|
আর কত ভালবাসলে
ভালবাসবে তুমি আমায়?
আর কত কাঁদলে
গলবে তোমার হৃদয়?
আর কত রাত জাগলে
বুঝবে তুমি আমায়?
আর কত অপেক্ষা করলে
শেষ হবে অপেক্ষা আমার?
আর কত দিন কাটলে
আসবে তুমি কাছে আমার?
আর কত পোড়ায়ে
খাটি করবে আমার হৃদয়?
আর কত সাগরে ভাসলে
দেখা দিবে তুমি আমায়?
আর কত পরীক্ষার পর
শেষ হবে আমাকে জানার?
আর কত ভালবাসলে
ভালবাসবে তুমি আমায়?
আর কত কাঁদলে
গলবে তোমার হৃদয়?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2176.html
|
4760
|
শামসুর রাহমান
|
তবু তাকেই
|
প্রেমমূলক
|
কে আমাকে দিন দুপুরে রাত দুপুরে
কাপড় কাচার মতো ক’রে নিঃড়ে নিচ্ছে?
আমার মেদ আমার মজ্জা শুষে নিচ্ছে?
কে আমাকে এভাবে রোজ কষ্ট দিচ্ছে?কে আমাকে পাগল-করা নিঝুম সুরে
ঘর ছড়িয়ে পথের ধারে দিচ্ছে ঠেলে?
মাথার ভেতর পিঁপড়ে শত দিচ্ছে পুরে?
হাত-পা বেঁধে যখন তখন শাস্তি দিচ্ছে?যখন কিছু লিখতে বসি, মত্ত পাখি
ডাকাডাকি করতে থাকে শিরায় শিরায়,
কলম ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ি, মাথা টলে।
কে রোজানা সকল কিছু ভেস্তে দিচ্ছে?চায় না সেতো রাত্রিবেলা ঘুমিয়ে থাকি,
আমার দিকে হাজার বাদুড় দিচ্ছে ছুঁড়ে,
আমাকে সে নিজের কবর খুঁড়তে বলে;
কে আমাকে এভাবে রোজ দন্ড দিচ্ছে?কে আমাকে ব্যস্ত রাখি অস্থিরতায়?
হাতে গুঁজে দিচ্ছে দীর্ঘ ফাসির দড়ি,
কখনো বা রেললাইনে বলছে শুতে,
আজকে আমি ফাঁদে-পড়া জখমি জন্তু।কে আমাকে সব প্রহরে কেবল ভোগায়,
মুঠোয় পুরে দিচ্ছে অঢেল ঘুমের বড়ি?
প্রতি পদেই খাচ্ছি হোঁচট, মুষড়ে পড়ি;
তবু তাকেই চাই যে কাছে অধিকন্তু। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tobu-takei/
|
5504
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
বিক্ষোভ
|
স্বদেশমূলক
|
দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,
হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম।
জানে না তো কেউ পৃথিবী উঠছে কেঁপে
ধরেছে মিথ্যা সত্যের টুঁটি চেপে,
কখনো কেউ কি ভূমিকম্পের আগে
হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে?
যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী,
আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি।
ইতিহাস, জানি নীরব সাক্ষী তুমি,
আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশভূমি,
অনেকে বিরূপ, কানে দেয় হাত চাপা,
তাতেই কি হয় আসল নকল মাপা?
বিদ্রোহী মন! আজকে ক'রো না মানা,
দেব প্রেম আর পাব কলসীর কণা,
দেব, প্রাণ দেব মুক্তির কোলাহলে,
জীন্ ডার্ক, যীশু, সোক্রোটিসের দলে।
কুয়াশা কাটছে, কাটবে আজ কি কাল,
ধুয়ে ধুয়ে যাবে কুৎসার জঞ্জাল,
ততদিনে প্রাণ দেব শত্রুর হাতে
মুক্তির ফুল ফুটবে সে সংঘাতে।
ইতিহাস! নেই অমরত্বের লোভ,
আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ।।(কাব্যগ্রন্থঃ ঘুমনেই)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/bikkhov/
|
5460
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
চারাগাছ
|
মানবতাবাদী
|
ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থাকি:
পাশে এক বিরাট প্রাসাদ
প্রতিদিন চোখে পড়ে;
সে প্রাসাদ কি দুঃসহ স্পর্ধায় প্রত্যহ
আকাশকে বন্ধুত্ব জানায়,
আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখি।
চেয়ে চেয়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি-
এ অট্টালিকার প্রতি ইটের হৃদয়ে
অনেক কাহিনী আছে অত্যন্ত গোপনে,
ঘামের, রক্তের আর চোখের জলের।
তবু এই প্রাসাদকে প্রতিদিন হাজারে হাজারে
সেলাম জানায় লোকে, চেয়ে থাকে বিমূঢ় বিস্ময়ে।
আমি তাই এ প্রাসাদে এতকাল ঐশ্বর্য দেখেছি,
দেখেছি উদ্ধত এক বনিয়াদী কীর্তির মহিমা।
হঠাৎ সেদিন
চকিত বিস্ময়ে দেখি
অত্যন্ত প্রাচীন সেই প্রাসাদের কার্নিশের ধারে
অশ্বত্থ গাছের চারা।
অমনি পৃথিবী
আমার চোখের আর মনের পর্দায়
আসন্ন দিনের ছবি মেলে দিল একটি পলকে।
ছোট ছোট চারাগাছ-
রসহীন খাদ্যহীন কার্নিশের ধারে
বলিষ্ঠ শিশুর মতো বেড়ে ওঠে দুরন্ত উচ্ছাসে।
হঠাৎ চকিতে,
এ শিশুর মধ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ মহীরুহ
শিকড়ে শিকড়ে আনে অবাধ্য ফাটল
উদ্ধত প্রাচীন সেই বনিয়াদী প্রাসাদের দেহে।
ছোট ছোট চারাগাছ-
নিঃশব্দে হাওয়ায় দোলে, কান পেতে শোনে:
প্রত্যেক ইটের নীচে ঢাকা বহু গোপন কাহিনী
রক্তের, ঘামের আর চোখের জলের।
তাই তো অবাক আমি, দেখি যত অশ্বত্থচারায়
গোপনে বিদ্রোহ জমে, জমে দেহে শক্তির বারুদ;
প্রাসাদ-বিদীর্ণ-করা বন্য আসে শিকড়ে শিকড়ে।
মনে হয়, এই সব অশ্বত্থ-শিশুর
রক্তের, ঘামের আর চোখের জলের
ধারায় ধারায় জন্ম,
ওরা তাই বিদ্রোহের দূত।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/251
|
5749
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
কঙ্কাল ও শাদা বাড়ি
|
রূপক
|
শাদা বাড়িটার সামনে আলো-ছায়া-আলো, একটি কঙ্কাল দাঁড়িয়ে
এখন দুপুর রাত অলীক রাত্রির মতো, অররণা রয়েছে খুব ঘুমে-
যে-রকম ঘুম শুধু কুমারীর, যে ঘুম স্পষ্টত খুব নীল;
যে স্তনে লগৈনি দাঁত তার খুব মৃদু ওঠপড়া
তলপেটে একটুও নেই ফাটা.দাগ, এ শরীর আজও ঋণী নয়
এই সেই অরুণা ও রুনি নাম্মী পরা ও অপরা
সুখ ও আসুখ নিয়ে ওষ্ঠাধর, এখন রয়েছে খুব ঘমে
যে-রকম ঘুম শুধু কুমারীর, যে-ঘুম স্পষ্টত খুব নীল।
সন্ন্যাসীর সাহসের মতো আন্ত অন্ধকার, কে তুমি কঙ্কাল-
প্রহরীর মতো, কেন বাধা তিদে চাও? কী তোমার ভাষা?
ছাড়ো পথ, আমি ঐ শাদা বাড়িটার মধ্যে যাবো।
করমচা ফুলেরঘ্রণ আলপিনের মতো এসে গয়ে লাগে
থামের আড়োলে থেকে ছুটে এলো হাওয়া, বহু ঘুমের নিশ্বাস
ভরা হাওয়া
আমি অরুণার ঘুমে এক ঘুম ঘুমোতে চাই আজ মধ্য রাতে
অরুণার শাড়ি ও শায়ার ঘুম, বুকে ঘুম, কুমারী জন্মের
পবিত্র নরম ঘুম, আমি ব্রাহ্মণের মতো তার প্রার্থী।
নিরস্ত্র কঙ্কাল, তুমি কার দূত? তোমার হৃদয় নেই, তুমি
প্রতীক্ষার ভঙ্গি নিয়ে কেন প্রতিরোধ করে আছো?
অরুণা ঘুমন্ত, এই শাদা বাড়িটার দ্বারে তুমি কেন জেগে?
অরুণা ঘুমন্ত, এই শাদা বাড়িটার দ্বরে তুমি কেন জেগে?
তুমি ভ্রমে বদ্ধ, তুমি ওপাশের লাল রঙা প্রাসাদের কাছে যাও
ঐখানে পাশা খেলা হয়, হু-রে-রে চিৎকরে ওঠে হৃদয়ে শকুনির
ঝটাপটি, তুমি যাও
ছাড়ো পথ, আমি এই নিদ্রিত বাড়ির মধ্যে যাবো।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1855
|
3601
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিরহ
|
প্রেমমূলক
|
আমি নিশি - নিশি কত রচিব শয়ন
আকুলনয়ন রে !
কত নিতি - নিতি বনে করিব যতনে
কুসুমচয়ন রে !
কত শারদ যামিনী হইবে বিফল ,
বসন্ত যাবে চলিয়া !
কত উদিবে তপন আশার স্বপন ,
প্রভাতে যাইবে ছলিয়া !
এই যৌবন কত রাখিব বাঁধিয়া ,
মরিব কাঁদিয়া রে !
সেই চরণ পাইলে মরণ মাগিব
সাধিয়া সাধিয়া রে ।
আমি কার পথ চাহি এ জনম বাহি ,
কার দরশন যাচি রে !
যেন আসিবে বলিয়া কে গেছে চলিয়া ,
তাই আমি বসে আছি রে ।
তাই মালাটি গাঁথিয়া পরেছি মাথায়
নীলবাসে তনু ঢাকিয়া ,
তাই বিজন আলয়ে প্রদীপ জ্বালায়ে
একেলা রয়েছি জাগিয়া ।
ওগো তাই কত নিশি চাঁদ ওঠে হাসি ,
তাই কেঁদে যায় প্রভাতে ।
ওগো তাই ফুলবনে মধুসমীরণে
ফুটে ফুল কত শোভাতে !
ওই বাঁশিস্বর তার আসে বার বার ,
সেই শুধু কেন আসে না !
এই হৃদয় - আসন শূন্য যে থাকে ,
কেঁদে মরে শুধু বাসনা ।
মিছে পরশিয়া কায় বায়ু বহে যায় ,
বহে যমুনার লহরী ,
কেন কুহু কুহু পিক কুহরিয়া ওঠে —
যামিনী যে ওঠে শিহরি ।
ওগো যদি নিশিশেষে আসে হেসে হেসে ,
মোর হাসি আর রবে কি !
এই জাগরণে ক্ষীণ বদন মলিন
আমারে হেরিয়া কবে কী !
আমি সারা রজনীর গাঁথা ফুলমালা
প্রভাতে চরণে ঝরিব ,
ওগো আছে সুশীতল যমুনার জল —
দেখে তারে আমি মরিব । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/biroho/
|
5534
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
রেশন কার্ড
|
মানবতাবাদী
|
রঘুবীর একদিন দিতে গিয়ে আড্ডা,
হারিয়ে ফেলল ভুলে রেশনের কার্ডটা;
তারপর খোঁজাখুজি এখানে ও ওখানে,
রঘু ছুটে এল তার রেশনের দোকানে,
সেখানে বলল কেঁদে, হুজুর, চাই যে আটা-
দোকানী বলল হেঁকে, চলবে না কাঁদা-কাঁটা,
হাটে মাঠে-ঘাটে যাও, খোঁজো গিয়ে রাস্তায়
ছুটে যাও আড্ডায়, খোঁজো চারিপাশটায়;
কিংবা অফিসে যাও এ রেশন এলাকার,
আমার মামার পিসে, কাজ করে ছেলে তার,
তার কাছে গেলে পরে সবই ঠিক হয়ে যাবে,
ছ’মাসের মধ্যেই নয়া এক কার্ড পাবে।
রঘুবীর বলে কেঁদে, ছ’মাস কি করব?
ছ’মাস কি উপবাস ক’রে ধুঁকে মরব?
আমি তার করব কী?- দোকানী উঠল রেগে-
যা খুশি তা করো তুমি- বলল সে অতি বেগে;
পয়সা থাকে তো খেও হোটেলে কি মেসেতে,
নইলে সটান্ তুমি যেতে পার দেশেতে।। (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/reshon-kard/
|
6042
|
হেলাল হাফিজ
|
নিরাশ্রয় পাচঁটি আঙুল
|
প্রেমমূলক
|
নিরাশ্রয় পাচঁটি আঙুল তুমি নির্দ্বিধায়
অলংকার করে নাও, এ আঙুল ছলনা জানে না।
একবার তোমার নোলক, দুল, হাতে চুড়ি
কটিদেশে বিছা করে অলংকৃত হতে দিলে
বুঝবে হেলেন, এ আঙুল সহজে বাজে না।
একদিন একটি বেহালা নিজেকে বাজাবে বলে
আমার আঙুলে এসে দেখেছিলো
তার বিষাদের চেয়ে বিশাল বিস্তৃতি,
আমি তাকে চলে যেতে বলিনি তবুও
ফিরে গিয়েছিলো সেই বেহালা সলাজে।
অসহায় একটি অঙ্গুরী
কনিষ্ঠা আঙুলে এসেই বলেছিলো ঘর,
অবশেষে সেও গেছে সভয়ে সলাজে।
ওরা যাক, ওরা তো যাবেই
ওদের আর দুঃখ কতোটুকু? ওরা কি মানুষ?
২.৪.৭০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/114
|
6052
|
হেলাল হাফিজ
|
বেদনা বোনের মত
|
চিন্তামূলক
|
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম
শুধু আমাকেই দেখা যায়,
আলোর প্রতিফলন প্রতিসরণের নিয়ম না জানা আমি
সেই থেকে আর কোনদিন আয়না দেখি না।
জননীর জৈবসারে বর্ধিত বৃক্ষের নিচে
কাঁদতাম যখন দাঁড়িয়ে
সজল শৈশবে, বড়ো সাধ হতো
আমিও কবর হয়ে যাই,
বহুদিন হলো আমি সেরকম কবর দেখি না
কবরে স্পর্ধিত সেই একই বৃক্ষ আমাকে দেখে না।
কারুকার্যময় চারু ঘরের নমুনা দিয়ে
একদিন ভরা ছিল আমার দু’রেটিনার সীমিত সীমানা,
অথচ তেমন কোনো সীমাবদ্ধতাকে আর কখন মানি না।
কী দারুণ বেদনা আমাকে তড়িতাহতের মতো কাঁপালো তুমুল
ক্ষরণের লাল স্রোত আজন্ম পুরোটা ভেতর উল্টে পাল্টে খেলো,
নাকি অলক্ষ্যে এভাবেই
এলোমেলো আমাকে পাল্টালো, নিপুণ নিষ্ঠায়
বেদনার নাম করে বোন তার শুশ্রূষায়
যেন আমাকেই সংগোপনে যোগ্য করে গেলো।
১৬.১.৭৩
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/124
|
386
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পুরববঙ্গ
|
স্বদেশমূলক
|
পদ্ম-মেঘনা-বুড়িগঙ্গা-বিধৌত পূর্ব-দিগন্তে
তরুণ অরুণ বীণা বাজে তিমির বিভাবরী-অন্তে।
ব্রাহ্ম মুহুর্তের সেই পুরবাণী
জাগায় সুপ্ত প্রাণ জাগায় – নব চেতনা দানি
সেই সঞ্জীবনী বাণী শক্তি তার ছড়ায়
পশ্চিমে সুদূর অনন্তে॥
ঊর্মিছন্দা শত-নদীস্রোত-ধারায় নিত্য পবিত্র –
সিনান-শুদ্ধ-পুরববঙ্গ
ঘন-বন-কুন্তলা প্রকৃতির বক্ষে সরল সৌম্য
শক্তি-প্রবুদ্ধ পুরববঙ্গ
আজি শুভলগ্নে তারই বাণীর বলাকা
অলখ ব্যোমে মেলিল পাখা
ঝংকার হানি যায় তারই পুরবাণী
জীবন্ত হউক হিম-জর্জর ভারত
নবীন বসন্তে॥ (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/purbobonggo/
|
5285
|
শামসুর রাহমান
|
সূর্যাবর্ত
|
চিন্তামূলক
|
বাঁচার আনন্দে আমি চেতনার তটে
প্রত্যহ ফোটাই ফুল, জ্বালি দীপাবলি
ধ্যানী অন্ধকারে। আর মৃত্যুকে অমোঘ
জেনেও স্বপ্নের পথে, জেনেও আমার
পৃথিবীতে খুঁজি
জীবনের দান গানে গানে, প্রাণলোকে
খুঁজি ফিরি উপসৃত সুন্দরের স্মৃতি।অভ্যাসের বিবর্ণ দৃষ্টিতে নয়, সৃষ্টির আবেশে
সপ্রেম তাকাই চতুর্দিকে
এই চরাচরে উন্মীলিত
বৈশাখী রৌদ্রের উজ্জীবনে,
উধাও মাঠের প্রান্তে ধ্যানী ঐ গাছের ছায়ায়
আর বনে বনে মর্মরিত খোলা ঊর্মিল হাওয়ায়
নীলিমায় দিই মেলে মানসমরাল।
ব্যাপ্ত এই চরাচরে পতঙ্গ অথবা
নিবিড় গোলাপ-সবি মনে হয় অরূপ রতন।এখনও সূর্যের আলো পৃথিবীরে আসে
যথারীতি, ঝরনার মতন ঝরে সম্পন্ন গৃহীর
নিকানো উঠোনে আর কবরের পুরানো ফাটলে।
প্রদীপ্ত সূর্যের রং লাগে যুবতীর
সলজ্জ রক্তিম গালে, আর
আলো ঝরে নিদ্রাহীন রোগীর শয্যায়।পিচ্ছিল শবের ভোজে মত্ত কৃমি অথবা আজানে
উচ্চকিত সবচেয়ে উঁচু কোনো উজ্জ্বল মিনার-
সবাই অলক্ষ্যে পায় সূর্যের প্রসাদ
সমপরিমাণে;এবং উদার সূর্য উপমা তোমার।
প্রকৃতির টোলে আমি কখনো নিইনি পাঠ, তবু
ঋতুতে ঋতুতে
আমার সত্তার স্বরগ্রাম
কেবলি ধ্বনিত হয়, অবিরাম প্রহরে প্রহরে
এখনও যে ক্লান্ত হলে নিসর্গের কাছে
আশ্চর্যের গ্লাস হাতে যাই,
অবসন্ন চেতনার গোধূলিতে শুনি
সান্ত্বনার ভাষা এখনও রবীন্দ্রনাথ,
সে তোমারি দান।
আমাকে দিয়েছ ভাষা, তার ধ্বনি, প্রতীকী হিল্লোল
অস্তিত্বের তটে আনে কত
ঐশ্বর্যের তরী-পাল-তোলা তরঙ্গের স্মৃতিস্রোত
দীপ্ত জলযান।আমাকে দিয়েছ ভাষা, সে-ভাষা আমার
হৃদয়ের একান্ত স্পন্দনে
প্রাণের নিভৃত উচ্চারণে
শিখা হয়ে জেগে রয় জীবনের মুক্ত দীপাধারে।
এবং নিশ্চিত জানি তোমার বাণীর
দীপ থেকে অন্য এক ভাষার প্রদীপ
জ্বালাব অযুত প্রাণে, জ্বলবে তখন
কত না হীরক সম্ভাবনা সময়ের
বিমূর্ত সন্ধ্যায়।তুমি নও সীমিত শুধুই কোনো পঁচিশে বৈশাখে।
তোমার নামের ঢেউ একটি দিনের
সংকীর্ণ পরিধি ছিঁড়ে পড়েছে ছড়িয়ে
রূপনারানের কূলে, বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘে
অনন্তের শুভ্রতায় তুমি নও সীমিত শুধুই
পঁচিশে বৈশাখে।যেমন রৌদ্রের তাপ জ্যোৎস্নার মদির মায়ালোকে
হাওয়ার নির্ঝরে
অথবা শ্রাবণে
অক্লান্ত বর্ষণে বেঁচে থাকি মাঝে-মাঝে
নিজেরই অজ্ঞাতে,
তেমনি তোমার
কবিতায়, গানে প্রতিধ্বনি হয়ে জাগে
আমাদের সত্তার আকাশ।জীবন যখন ক্রমে কেবলি শুকিয়ে যায়, ডোবে
পাঁকের আবর্তে আর বর্বরের বাচাল আক্রোশে
অবলুপ্ত জ্ঞানীর সুভাষ,
জেনেছি তখন
অলৌকিক পদ্মের মতন
তোমার স্বরণ
উন্মোচিত হয়,
হয় উদ্ভাসিত
অসংখ্য প্রাণের তীর্থে এবং তোমার
গানে গানে মৃত্যুর তুহিন শীতে ফোটে
ফোটে অবিরত
জীবনের পরাক্রান্ত ফুল। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/surjaborto/
|
5850
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
যদি নির্বাসন দাও
|
স্বদেশমূলক
|
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো!
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নিনির্মেষ-
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো।
ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত
এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম
এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ করে থাকে নদীকে প্রণাম
এখনো নদীর বুকে
মোচার খোলায় ঘোরে
লুঠেরা, ফেরারী!
শহরে বন্দরে এত অগ্নি বৃষ্টি
বৃষ্টিতে চিক্কণ তবু এক একটি অপরূপ ভোর
বাজারে ক্রুরতা, গ্রামে রণহিংসা
বাতাবি লেবুর গাছে জোনাকির ঝিকমিক খেলা
বিশাল প্রাসাদে বসে কাপুরুষতার মেলা
বুলেট ও বিস্ফোরণ
শঠ তঞ্চকের এত ছদ্মবেশ
রাত্রির শিশিরে কাঁপে ঘাস ফুল-
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো।
কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে
নিথর দিঘির পাড়ে বসে আছে বক
আমি কি ভুলেছি সব
স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক?
আমি কি দেখিনি কোনো মন্থর বিকেলে
শিমুল তুলোর ওড়াউড়ি?
মোষের ঘাড়ের মত পরিশ্রমী মানুষের পাশে
শিউলি ফুলের মত বালিকার হাসি
নিইনি কি খেজুর রসের ঘ্রাণ
শুনিনি কি দুপুরে চিলের
তীক্ষ স্বর?
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ…
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো।
জুলাই ১৯৭১ : গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1831
|
537
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সুর-কুমার
|
মানবতাবাদী
|
বন্ধু, তোমায় স্বপ্ন-মাঝে ডাক দিল কি বন্দিনী
সপ্ত সাগর তেরো নদীর পার হতে সুর-নন্দিনী!বীণ-বাদিনী বাজায় হঠাৎ যাত্রা-পথের দুন্দুভি,
অরুণ আঁখি কইল সাকি, ‘আজকে শরাব মুলতুবি!’সাগর তোমায় শঙ্খ বাজায়, হাতছানি দেয় সিন্ধু-পার,
গানের ভেলায় চললে ভেসে রূপকথারই রাজকুমার!গানের ভেলায় চললে ভেসে রূপকথারই রাজকুমার!
লয়ে সুরের সোনার কাঠি দিগ্বিজয়ে যাও সেথায়।বন্দী-দেশের আনন্দ-বীর! আনবে তুমি জয় করি
ইন্দ্রলোকের উর্বশী নয় – কণ্ঠলোকের কিন্নরী।শ্বেতদ্বীপের সুর-সভায় আজকে তোমার আমন্ত্রণ,
অস্ত্রে যারা রণ জেতেনি বীণায় তারা জিনল মন।কণ্ঠে আছে আনন্দ-গান, হস্ত-পদে থাক শিকল;
ফুল-বাগিচায় ফুলের মেলা, নাই-বা সেথা ফলল ফল।বৃত্ত-ব্যাসে বন্দী তবু মোদের রবির অরুণ-রাগ
জয় করেছে যন্ত্রাসুরের মানব-মেধের লক্ষ যাগ।ছুটছে যশের যজ্ঞ-ঘোড়া স্পর্ধা-অধীর বিশ্বময়,
তোমার মাঝে দেখব বন্ধু নূতন করে দিগ্বিজয়।বীণার তারে বিমান-পারের বেতার-বার্তা শুনছি ওই
কণ্ঠে যদি গান থাকে গো পিঞ্জরে কেউ বন্ধ নই।চলায় তোমার ক্লান্তি তো নাই নিত্য তুমি ভ্রাম্যমান,
তোমার পায়ে নিত্য নূতন দেশান্তরের বাজবে গান।বধূর মতন বিধুর হয়ে সুদূর তোমায় দেয় গো ডাক,
তোমার মনের এপার থেকে উঠল কেঁদে চক্রবাক!ধ্যান ভেঙে যায় নবীন যোগী, ওপার পানে চায় নয়ন,
মনের মানিক খুঁজে ফের বনের মাঝে সর্বক্ষণ।দূর-বিরহী, পার হয়ে যাও সাত সাগরের অশ্রুজল,
আমরা বলি – যাত্রা তোমার সুন্দর হোক, হোক সফল! (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sur-kumar/
|
5659
|
সুকুমার রায়
|
বিষম কাণ্ড
|
ছড়া
|
কর্তা চলেন, গিন্নী চলেন, খোকাও চলেন সাথে,
তড়্বড়িয়ে বুক ফুলিয়ে শুতে যাচ্ছেন রাতে ।
তেড়ে হন্হন্ চলে তিনজন যেন পল্টন চলে,
সিঁড়ি উঠ্তেই, একি কাণ্ড ! এ আবার কি বলে !
ল্যাজ লম্বা, কান গোল্ গোল্, তিড়িং বিড়িং ছোটে,
চোখ্ মিট্মিট্, কুটুস্ কাটুস্- এটি কোন্জন বটে !
হেই ! হুস্ ! হ্যাস্ ! ওরে বাস্রে মতলবখানা কিরে,
করলে তাড়া যায় না তবু, দেখ্ছে আবার ফিরে ।
ভাবছে বুড়ো, করবো গুঁড়ো ছাতার বাড়ি মেরে,
আবার ভাবে ফস্কে গেলে কাম্ড়ে দেবে তেড়ে ।
আরে বাপ্রে ! বস্ল দেখ দুই পায়ে ভর ক'রে,
বুক দুর দুর বুড়ো ভল্লুর, মোমবাতি যায় প'ড়ে ।
ভীষণ ভয়ে দাঁত কপাটি তিন মহাবীর কাঁপে,
গড়িয়ে নামে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ির ধাপে ধাপে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/bishomo-kando/
|
4213
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
ছিন্নবিচ্ছিন্ন-১
|
চিন্তামূলক
|
তুমুল বৃষ্টিতে সব পাতা ভিজে গেলো
এখনই শুকাতে হবে রোদ্দুর কোথায়?
তিজেলে চড়াতে হবে অন্ন, তা কোথায়?
মানুষ বৃষ্টিতে ভিজে শুকাতেও জানে।
এই অন্ন, পাতা-পত্র, এর অন্য মানে।
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/chinno-bichchhinno-1/
|
3508
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বনের ছায়া
|
প্রকৃতিমূলক
|
কোথা রে তরুর ছায়া , বনের শ্যামল স্নেহ ।
তট-তরু কোলে কোলে সারাদিন কলরোলে
স্রোতস্বিনী যায় চলে সুদূরে সাধের গেহ ;
কোথা রে তরুর ছায়া , বনের শ্যামল স্নেহ ;
কোথা রে সুনীল দিশে বনান্ত রয়েছে মিশে
অনন্তের অনিমিষে নয়ন নিমেষ-হারা ।
দূর হতে বায়ু এসে চলে যায় দূর-দেশে
গীত - গান যায় ভেসে , কোন্ দেশে যায় তারা ।
হাসি , বাঁশি , পরিহাস , বিমল সুখের শ্বাস ,
মেলামেশা বারো মাস নদীর শ্যামল তীরে ;
কেহ খেলে , কেহ দোলে , ঘুমায় ছায়ার কোলে ,
বেলা শুধু যায় চলে কুলুকুলু নদীনীরে ।
বকুল কুড়োয় কেহ , কেহ গাঁথে মালাখানি ;
ছায়াতে ছায়ার প্রায় বসে বসে গান গায় ,
করিতেছে কে কোথায় চুপিচুপি কানাকানি ।
খুলে গেছে চুলগুলি , বাঁধিতে গিয়েছে ভুলি ,
আঙুলে ধরেছে তুলি আঁখি পাছে ঢেকে যায় ,
কাঁকন খসিয়া গেছে , খুঁজিছে গাছের ছায় ।
বনের মর্মের মাঝে বিজনে বাঁশরি বাজে ,
তারি সুরে মাঝে মাঝে ঘুঘু দুটি গান গায় ।
ঝুরু ঝুরু কত পাতা গাহিছে বনের গাথা ,
কত-না মনের কথা তারি সাথে মিশে যায় ।
লতাপাতা কত শত খেলে কাঁপে কত মতো
ছোটো ছোটো আলোছায়া ঝিকিমিকি বন ছেয়ে ,
তারি সাথে তারি মতো খেলে কত ছেলেমেয়ে ।
কোথায় সে গুন গুন ঝরঝর মরমর ,
কোথা সে মাথার'পরে লতাপাতা থরথর ।
কোথায় সে ছায়া আলো , ছেলেমেয়ে খেলাধূলি ,
কোথা সে ফুলের মাঝে এলোচুলে হাসিগুলি ।
কোথা রে সরল প্রাণ , গভীর আনন্দ - গান ,
অসীম শান্তির মাঝে প্রাণের সাধের গেহ ,
তরুর শীতল ছায়া , বনের শ্যামল স্নেহ । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boner-chaya/
|
202
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
অভিশাপ
|
প্রেমমূলক
|
যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মর” কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,-
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদ্নাতে চোখ বুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুজবে।
গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্বে যখন কান্না,
ব’লবে সবাই-“ সেই য পথিক তার শেখানো গান না?’’
আস্বে ভেঙে কান্না!
প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,
কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!
প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি
অশ্র”-হারা কঠিন আঁখি
ঘন ঘন মুছবে-
বুঝ্বে সেদিন বুঝবে!
আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,
তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ-
কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!
শিউলি ঢাকা মোর সমাধি
প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!
বুকের মালা ক’রবে জ্বালা
চোখের জলে সেদিন বালা
মুখের হাসি ঘুচবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি,
থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী!
আসবে শিশির-রাত্রি!
থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন,
থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন,
বঁধুর বুকের পরশনে
আমার পরশ আনবে মনে-
বিষিয়ে ও-বুক উঠবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে না ক আ সে-
তোমার সুখে প’ড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে,
আসবে না ক’ আর সে!
প’ড়বে মনে, মোর বাহুতে
মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে,
মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!
সেই স্মৃতি তো ঐ বিছানায়
কাঁটা হ’য়ে ফুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে,
সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে-
দুলবে তরী রঙ্গে,
প’ড়বে মনে সে কোন্ রাতে
এক তরীতে ছিলেম সাথে,
এমনি গাঙ ছিল জোয়ার,
নদীর দু’ধার এমনি আঁধার
তেম্নি তরী ছুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ,
আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ-
সখার কারা-বন্ধ!
বন্ধু তোমার হান্বে হেলা
ভাঙবে তোমার সুখের মেলা;
দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর,
বইতে প্রাণের শান- এ ভার
মরণ-সনে বুঝ্বে-
বুঝবে সেদিন বুঝ্বে!
ফুট্বে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী,
আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদ্নী-
চৈতী-রাতের চাঁদ্নী।
ঋতুর পরে ফির্বে ঋতু,
সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু!
চাইবে কেঁদে নীল নভো গা’য়,
আমার মতন চোখ ভ’রে চায়
যে-তারা তা’য় খুঁজবে-
বুঝ্বে সেদিন বুঝ্বে!
আস্বে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন,
কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন-
টুটবে যবে বন্ধন!
পড়বে মনে, নেই সে সাথে
বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে-
আপনি গালে যাচবে চুমা,
চাইবে আদর, মাগ্বে ছোঁওয়া,
আপনি যেচে চুমবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত,
সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হ’য়ে শ্রান–
আসবে তখন পান’।
হয়ত তখন আমার কোলে
সোহাগ-লোভে প’ড়বে ঢ’লে,
আপনি সেদিন সেধে কেঁদে
চাপ্বে বুকে বাহু বেঁধে,
চরণ চুমে পূজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/167
|
1333
|
তসলিমা নাসরিন
|
তুষারের ঝড়ে
|
মানবতাবাদী
|
হঠাৎ কে যেন আমাকে ছুড়ে দিল এখানে, তুষারের ঝড়ে
যতদূর চোখ যায়, যতদূর যায় না, চোখ ধাঁধানো সাদা, শুধু সাদা, শুধু সাঁ সাঁ
উদ্বাহু নৃত্য চলছে তুষার-কন্যার, শুকনো পাতার মত আমাকে ওড়াচ্ছে,
পাকে ফেলে খুলে নিচ্ছে গা ঢাকার সবকটা কাপড়।
আমার চুল চোখ,
আমার সব,
আমার সর্বাঙ্গ ঢেকে গেছে তুষারে।
আকাশ নেমে এসেছে একেবারে কাছে, ছুঁতে নিলেই
জীবন্ত একটি ডাল খসে পড়ল,
আকাশ এখন আর আকাশের মত নয়,
মুখ থুবড়ে সেও পড়েছে ঝড়ে।
দুএকটি গাছ হয়ত ছিল কোথাও, ভেঙে ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে তুষার-স্তূপে
প্রকৃতির কাফন আমাকে মুড়িয়ে নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে কোথাও, কোনও গর্তে।
ঠোঁটদুটো কাঁপছে আমার, কান লাল হয়ে আছে, নাকে গালে রক্ত জমে আছে,
হাতের আঙুলগুলো সাদা, হিম হয়ে থাকা সাদা,
আঙুলগুলোকে আঙুল বলে বোধ হচ্ছে না, কয়েক লক্ষ সুঁই যেন বিঁধে আছে আঙুলে,
আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না আর, কিছুকে দেখতে পাচ্ছি না,
সব সাদা, মৃত্যুর মত নৈঃশব্দের মত চন্দ্রমল্লিকার মত
একটু একটু করে রক্তহীন হচ্ছে ত্বক,
একটু একটু করে তীব্র তীক্ষ্ণ শীতার্ত দাঁত আমাকে খেতে খেতে খেতে খেতে
আমার পা থেকে, হাত থেকে উরুর দিকে বাহুর দিকে হৃদপিণ্ডের দিকে উঠে আসছে,
উঠে আসছে।
আমি জমে যাচ্ছি
জমে যাচ্ছি আমি
গোটা আমিটি
বরফের
একটি
পিণ্ড
হয়ে
যাচ্ছি …
ও দেশ, ও কলকাতা, একটু আগুন দিবি?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1965
|
3503
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বন-ফুল (প্রথম সর্গ)
|
কাহিনীকাব্য
|
চাই না জ্ঞেয়ান, চাই না জানিতে
সংসার, মানুষ কাহারে বলে।
বনের কুসুম ফুটিতাম বনে
শুকায়ে যেতাম বনের কোলে!—দীপনির্বাণনিশার আঁধার রাশি করিয়া নিরাস
রজতসুষমাময়,
প্রদীপ্ত তুষারচয়
হিমাদ্রি-শিখর-দেশে পাইছে প্রকাশ
অসংখ্য শিখরমালা বিশাল মহান্;
ঝর্ঝরে নির্ঝর ছুটে, শৃঙ্গ হ'তে শৃঙ্গ উঠে
দিগন্তসীমায় গিয়া যেন অবসান!
শিরোপরি চন্দ্র সূর্য ,
পদে লুটে পৃথ্বীরাজ্য
মস্তকে স্বর্গের ভার করিছে বহন;
তুষারে আবরি শির
ছেলেখেলা পৃথিবীর
ভুরুক্ষেপে যেন সব করিছে লোকন।
কত নদী কত নদ
কত নির্ঝরিণী হ্রদ
পদতলে পড়ি তার করে আস্ফালন!
মানুষ বিস্ময়ে ভয়ে
দেখে রয় স্তব্ধ হয়ে,
অবাক্ হইয়া যায় সীমাবদ্ধ মন!চৌদিকে পৃথিবী ধরা নিদ্রায় মগন,
তীব্র শীতসমীরণে
দুলায়ে পাদপগণে
বহিছে নির্ঝরবারি করিয়া চুম্বন,
হিমাদ্রিশিখরশৈল করি আবরিত
গভীর জলদরাশি
তুষার বিভায় নাশিস্থির ভাবে হেথা সেথা রহেছে নিদ্রিত।
পর্বতের পদতলে
ধীরে ধীরে নদী চলে
উপলরাশির বাধা করি অপগত,
নদীর তরঙ্গকুল
সিক্ত করি বৃক্ষমূল
নাচিছে পাষাণতট করিয়া প্রহত!
চারি দিকে কত শত কলকলে অবিরত
পড়ে উপত্যকা-মাঝে নির্ঝরের ধারা।
আজি নিশীথিনী কাঁদে
আঁধারে হারায়ে চাঁদে
মেঘ-ঘোমটায় ঢাকি কবরীর তারা।
কল্পনে! কুটীর কার তটিনীর তীরে
তরুপত্র-ছায়ে-ছায়ে পাদপের গায়ে- গায়ে
ডুবায়ে চরণদেশ স্রোতস্বিনীনীরে?
চৌদিকে মানববাস নাহিক কোথায়,
নাহি জনকোলাহল
গভীর বিজনস্থল
শান্তির ছায়ায় যেন নীরবে ঘুমায়!
কুসুমভূষিত বেশে
কুটীরের শিরোদেশে
শোভিছে লতিকামালা প্রসারিয়া কর,
কুসুমস্তবকরাশি
দুয়ার-উপরে আসি
উঁকি মারিতেছে যেন কুটীরভিতর!
কুটীরের এক পাশে
শাখাদীপ[১] ধূমশ্বাসে
স্তিমিত আলোকশিখা করিছে বিস্তার।
অস্পষ্ট আলোক, তায়
আঁধার মিশিয়া যায়—
ম্লান ভাব ধরিয়াছে গৃহ-ঘর-দ্বার!
গভীর নীরব ঘর,
শিহরে যে কলেবর!
হৃদয়ে রুধিরোচ্ছ্বাস স্তব্ধ হয়ে বয়—
বিষাদের অন্ধকারে
গভীর শোকের ভারে
গভীর নীরব গৃহ অন্ধকারময়!
কে ওগো নবীনা বালা
উজলি পরণশালা
বসিয়া মলিনভাবে তৃণের আসনে?
কোলে তার সঁপি শির কে শুয়ে হইয়া স্থিরথেক্যে থেক্যে দীর্ঘশ্বাস টানিয়া সঘনে—
সুদীর্ঘ ধবল কেশ
ব্যাপিয়া কপোলদেশ,
শ্বেতশ্মশ্রু ঢাকিয়াছে বক্ষের বসন—
অবশ জ্ঞেয়ানহারা,
স্তিমিত লোচনতারা,
পলক নাহিক পড়ে নিস্পন্দ নয়ন!
বালিকা মলিনমুখে
বিশীর্ণা বিষাদদুখে,
শোকে ভয়ে অবশ সে সুকোমল-হিয়া।
আনত করিয়া শির
বালিকা হইয়া স্থির
পিতার-বদন-পানে রয়েছে চাহিয়া।
এলোথেলো বেশবাস,
এলোথেলো কেশপাশ
অবিচল আঁখিপার্শ্ব করেছে আবৃত!
নয়নপলক স্থির,
হৃদয় পরাণ ধীর,
শিরায় শিরায় রহে স্তব্ধ শোণিত।
হৃদয়ে নাহিক জ্ঞান,
পরাণে নাহিক প্রাণ,
চিন্তার নাহিক রেখা হৃদয়ের পটে!
নয়নে কিছু না দেখে,
শ্রবণে স্বর না ঠেকে,
শোকের উচ্ছ্বাস নাহি লাগে চিত্ততটে!
সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলি,
সুধীরে নয়ন মেলি
ক্রমে ক্রমে পিতা তাঁর পাইলেন জ্ঞান!
সহসা সভয়প্রাণে
দেখি চারিদিক পানে
আবার ফেলিল শ্বাস ব্যাকুলপরান —
কি যেন হারায়ে গেছে,
কি যেন আছে না আছে,
শোকে ভয়ে ধীরে ধীরে মুদিল নয়ন—
সভয়ে অস্ফুট স্বরে সরিল বচন,
"কোথা মা কমলা মোর কোথা মা জননী!"
চমকি উঠিল যেন নীরব রজনী!
চমকি উঠিল যেন নীরব অবনী!
ঊর্মিহীন নদী যথা ঘুমায় নীরবে—
সহসা করণক্ষেপে
সহসা উঠে রে কেঁপে,
সহসা জাগিয়া উঠে চলঊর্মি সবে!
কমলার চিত্তবাপী
সহসা উঠিল কাঁপি
পরানে পরান এলো হৃদয়ে হৃদয়!
স্তব্ধ শোণিতরাশি
আস্ফালিল হৃদে আসি,
আবার হইল চিন্তা হৃদয়ে উদয়!
শোকের আঘাত লাগি
পরাণ উঠিল জাগি,
আবার সকল কথা হইল স্মরণ!
বিষাদে ব্যাকুল হৃদে
নয়নযুগল মুদে
আছেন জনক তাঁর, হেরিল নয়ন।
স্থির নয়নের পাতে পড়িল পলক,
শুনিল কাতর স্বরে ডাকিছে জনক,
"কোথা মা কমলা মোর কোথা মা জননী!"
বিষাদে ষোড়শী বালা চমকি অমনি
(নেত্রে অশ্রুধারা ঝরে)
কহিল কাতর স্বরে
পিতার নয়ন-‘পরে রাখিয়া নয়ন,
"কেন পিতা! কেন পিতা!
এই-যে রয়েছি হেতা" —
বিষাদে নাহিক আর সরিল বচন!
বিষাদে মেলিয়া আঁখি
বালার বদনে রাখি
এক দৃষ্টে স্থিরনেত্রে রহিল চাহিয়া!
নেত্রপ্রান্তে দরদরে,
শোক-অশ্রুবারি ঝরে,
বিষাদে সন্তাপে শোকে আলোড়িত হিয়া!
গভীরনিশ্বাসক্ষেপে
হৃদয় উঠিল কেঁপে,
ফাটিয়া বা যায় যেন শোণিত-আধার!
ওষ্ঠপ্রান্ত থরথরে
কাঁপিছে বিষাদভরে
নয়নপলক-পত্র কাঁপে বার বার—
শোকের স্নেহের অশ্রু করিয়া মোচন
কমলার পানে চাহি কহিল তখন,
‘আজি রজনীতে মা গো!
পৃথিবীর কাছে
বিদায় মাগিতে হবে,
এই শেষ দেখা ভবে!
জানি না তোমার শেষে অদৃষ্টে কি আছে—
পৃথিবীর ভালবাসা
পৃথিবীর সুখ আশা,
পৃথিবীর স্নেহ প্রেম ভক্তি সমুদায়,
দিনকর নিশাকর
গ্রহ তারা চরাচর,
সকলের কাছে আজি লইব বিদায়!
গিরিরাজ হিমালয়!
ধবল তুষারচয়!
অয়ি গো কাঞ্চনশৃঙ্গ মেঘ-আবরণ!
অয়ি নির্ঝরিণীমালা!
স্রোতস্বিনী শৈলবালা!
অয়ি উপত্যকে! অয়ি হিমশৈলবন!
আজি তোমাদের কাছে
মুমূর্ষু বিদায় যাচে,
আজি তোমাদের কাছে অন্তিম বিদায়।
কুটীর পরণশালা
সহিয়া বিষাদজ্বালা
আশ্রয় লইয়াছিনু যাহার ছায়ায়—
স্তিমিত দীপের প্রায়
এত দিন যেথা হায়
অন্তিমজীবনরশ্মি করেছি ক্ষেপণ,
আজিকে তোমার কাছে
মুমূর্ষু বিদায় যাচে,
তোমারি কোলের পরে সঁপিব জীবন!
নেত্রে অশ্রুবারি ঝরে,
নহে তোমাদের তরে,
তোমাদের তরে চিত্ত ফেলিছে না শ্বাস—
আজি জীবনের ব্রত
উদ্যাপন করিব তো,
বাতাসে মিশাবে আজি অন্তিম নিশ্বাস!
কাঁদি না তাহার তরে,
হৃদয় শোকের ভরে
হতেছে না উৎপীড়িত তাহারো কারণ।
আহা হা! দুখিনী বালা
সহিবে বিষাদজ্বালা
আজিকার নিশিভোর হইবে যখন?
কালি প্রাতে একাকিনী
অসহায়া অনাথিনী
সংসারসমুদ্র-মাঝে ঝাঁপ দিতে হবে!
সংসারযাতনাজ্বালা
কিছু না জানিস্, বালা,
আজিও!— আজিও তুই চিনিস নে ভবে!
ভাবিতে হৃদয় জ্বলে,—
মানুষ কারে যে বলে
জানিস্ নে কারে বলে মানুষের মন।
কার দ্বারে কাল প্রাতে
দাঁড়াইবি শূন্যহাতে,
কালিকে কাহার দ্বারে করিবি রোদন!
অভাগা পিতার তোর
জীবনের নিশা ভোর—
বিষাদ নিশার শেষে উঠিবেক রবি
আজ রাত্রি ভোর হলে!
কারে আর পিতা বলে
ডাকিবি, কাহার কোলে হাসিবি খেলিবি?
জীবধাত্রী বসুন্ধরে!
তোমার কোলের ‘পরে
অনাথা বালিকা মোর করিনু অর্পণ!
দিনকর! নিশাকর!
আহা এ বালার ‘পর
তোমাদের স্নেহদৃষ্টি করিও বর্ষণ!
শুন সব দিক্বালা!
বালিকা না পায় জ্বালা
তোমরা জননীস্নেহে করিও পালন!
শৈলবালা! বিশ্বমাতা!
জগতের স্রষ্টা পাতা!
শত শত নেত্রবারি সঁপি পদতলে—
বালিকা অনাথা বোলে
স্থান দিও তব কোলে,
আবৃত করিও এরে স্নেহের আঁচলে!
মুছ মা গো অশ্রুজল!
আর কি কহিব বলো!
অভাগা পিতারে ভোলো জন্মের মতন!
আটকি আসিছে স্বর!—
অবসন্ন কলেবর।
ক্রমশ মুদিয়া, মা গো, আসিছে নয়ন!
মুষ্টিবদ্ধ করতল, শোণিত হইছে জল,
শরীর হইয়া আসে শীতল পাষাণ!
এই— এই শেষবার—
কুটিরের চারি ধার
দেখে লই! দেখে লই মেলিয়া নয়ান!
শেষবার নেত্র ভোরে
এই দেখে লই তোরে
চিরকাল তরে আঁখি হইবে মুদ্রিত!
সুখে থেকো চিরকাল!—
সুখে থেকো চিরকাল!
শান্তির কোলেতে বালা থাকিও নিদ্রিত!’
স্তবধ হৃদয়োচ্ছ্বাস! স্তবধ হইল শ্বাস!
স্তবধ লোচনতারা! স্তবধ শরীর!
বিষম শোকের জ্বালা—
মুর্চ্ছিয়া পড়িল বালা,
কোলের উপরে আছে জনকের শির!
গাইল নির্ঝরবারি বিষাদের গান,
শাখার প্রদীপ ধীরে হইল নির্বাণ!পাদটীকা
ঝাঁপ দাও ↑ হিমালয়ে এক প্রকার বৃক্ষ আছে, তাহার শাখা অগ্নিসংযুক্ত হইলে দীপের ন্যায় জ্বলে, তথাকার লোকেরা উহা প্রদীপের পরিবর্তে ব্যবহার করে। (বন-ফুল কাব্যোপন্যাস)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bon-ful-prothom-sorgo/
|
2709
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার এই ছোটো কলসিটা পেতে রাখি
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমার এই ছোটো কলসিটা পেতে রাখি
ঝরনাধারার নিচে।
বসে থাকি
কোমরে আঁচল বেঁধে,
সারা সকালবেলা,
শেওলা ঢাকা পিছল পাথরটাতে
পা ঝুলিয়ে।
এক নিমেষেই ঘট যায় ভরে
তার পরে কেবলি তার কানা ছাপিয়ে ওঠে,
জল পড়তে থাকে ফেনিয়ে ফেনিয়ে
বিনা কাজে বিনা ত্বরায়;
ঐ যে সূর্যের আলোয়
উপচে-পড়া জলের চলে ছুটির খেলা,
আমার খেলা ঐ সঙ্গেই ছলকে ওঠে
মনের ভিতর থেকে।
সবুজ বনের মিনে-করা
উপত্যকার নীল আকাশের পেয়ালা,
তারি পাহাড়-ঘেরা কানা ছাপিয়ে
পড়ছে ঝরঝরানির শব্দ।
ভোরের ঘুমে তার ডাক শুনতে পায়
গাঁয়ের মেয়েরা।
জলের ধ্বনি
বেগনি রঙের বনের সীমানা যায় পেরিয়ে,
নেমে যায় যেখানে ঐ বুনোপাড়ার মানুষ
হাট করতে আসে,
তরাই গ্রামের রাস্তা ছেড়ে
বাঁকে বাঁকে উঠতে থাকে চড়াই পথ বেয়ে,
তার বলদের গলায়
রুনুঝুনু ঘণ্টা বাজে,
তার বলদের পিঠে
শুকনো কাঠের আঁটি বোঝাই-করা।
এমনি করে
প্রথম প্রহর গেল কেটে।
রাঙা ছিল সকালবেলাকার
নতুন রৌদ্রের রঙ,
উঠল সাদা হয়ে।
বক উড়ে চলেছে পাহাড় পেরিয়ে
জলার দিকে,
শঙ্খচিল উড়ছে একলা
ঘন নীলের মধ্যে,ঊর্ধ্বমুখ পর্বতের উধাও চিত্তে
নিঃশব্দ জপমন্ত্রের মতো।
বেলা হল,
ডাক পড়ল ঘরে।
ওরা রাগ করে বললে,
"দেরি করলি কেন?"
চুপ করে থাকি নিরুত্তরে।
ঘট ভরতে দেরি হয় না
সে তো সবাই জানে;
বিনাকাজে উপচে-পড়া-সময় খোওয়ানো,
তার খাপছাড়া কথা ওদের বোঝাবে কে?
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-ai-soto-kalseta-pata-rakhe/
|
4663
|
শামসুর রাহমান
|
গদ্য সনেট_ ১১
|
রূপক
|
একটা লোক নিয়মিত আমার বাড়ির দিকে
আড়চোখে খানিক তাকিয়ে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে
খোলা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। অবাক কাণ্ড,
সে যখন যায়, তখন গলিতে কাছে ধারে
কাউকে আমি দেখি না; এমন জনশূন্যতা রোজ কী করে হয়,
ভেবে পাই না। লোকটার হাতে কিংবা ঠোঁটে জ্বলন্ত
সিগারেট দেখিনি কোনোদিন; মৃদু হাসির রেখাও
ফোটেনি মুখে কখনো, শুধু পাথুরে কাঠিন্যের প্রাধান্য।লোকটা আমার বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে,
যখন আমি যে কাজই করি-চুপচাপ বসে থাকি, বইয়ের
পাতা ওল্টাই, চিঠি লিখি, কবিতার খসড়া তৈরি করি,
অথবা চা খাই, আমার গায়ে কাঁটা দেয়,
হাত-পা কেন জানি হিম হয়ে আসে, চোখের পিদিম নিভে যেতে চায়;
লোকটা যেদিন এ-পথে হাঁটবে না, সেদিন আমি থাকব না। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/godyo-sonet-11/
|
4022
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হাতে কোনো কাজ নেই
|
নীতিমূলক
|
হাতে কোনো কাজ নেই,
নওগাঁর তিনকড়ি
সময় কাটিয়ে দেয়
ঘরে ঘরে ঋণ করি।
ভাঙা খাট কিনেছিল,
ছ পয়সা খরচা–
শোয় না সে হয় পাছে
কুঁড়েমির চর্চা।
বলে, “ঘরে এত ঠাসা
কিঙ্কর কিঙ্করী,
তাই কম খেয়ে খেয়ে
দেহটারে ক্ষীণ করি।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hate-kono-kaj-nei/
|
1855
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
প্রার্থী
|
ভক্তিমূলক
|
আমাকে একটু আলোক দাও: রোদ মাতাল ভোর
একটু দাও মুক্ত হাওয়া রুদ্ধশ্বাস এ বুকে,
আমি কী দেব, কি দিতে পারি তোমাকে শক্তিমান
তোমাকে দিই কখানা ভাঙা পাঁজরে যত জ্বালা।
আমাকে একটু বর্ষা দাও: দুমুঠো কাটি ধান
একটু দাও ফাল্গুনে রোদ আঁধার ঘোর ঘরে
আমি কী দেব, কি দিতে পারি তোমাকে মহাব্রতী
তোমাকে দিই কোটরাগত দুচোখে যত দাহ।
আমাকে একটু শক্তি দাও: শারের মতো ঋজু
একটু দাও সুখের ছোঁয়া খসা মনে
আমি কী দেব, কি দিতে পারি তোমাকে মহাপ্রাণ
তোমাকে দিই ঘৃণার ক্ষতে রক্তজবার ঝাড়।
আমাকে একটু শান্তি দাও: ফুলের মতো স্বাদ
একটু দাও অবসরের উদয়মুখী আশা।
আমি কী দেব, কি দিতে পারি তোমাকে জ্যোতির্ময়
তোমাকে দিই আকাশ মাটি কাঁপানো কন্ঠস্বর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/328
|
5419
|
সিকান্দার আবু জাফর
|
গতানুগতিক
|
প্রেমমূলক
|
আমার জবাব পেলাম।
তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি কিনা?
না!আমরা যে সমাজের জীব
তারই ধারায় তুমি ভাসমান তৃণ।
ইতিহাস পরিবর্তনের দিন এলে
হৃদয় নিয়ে তুমি খেলবেনা,
আমি জানি।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4209.html
|
2873
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কবি-কাহিনী (প্রথম সর্গ)
|
কাহিনীকাব্য
|
শুন কলপনা বালা, ছিল কোন কবি বিজন কুটীর-তলে। ছেলেবেলা হোতে তোমার অমৃত-পানে আছিল মজিয়া। তোমার বীণার ধ্বনি ঘুমায়ে ঘুমায়ে শুনিত, দেখিত কত সুখের স্বপন। একাকী আপন মনে সরল শিশুটি তোমারি কমল-বনে করিত গো খেলা, মনের কত কি গান গাহিত হরষে, বনের কত কি ফুলে গাঁথিত মালিকা। একাকী আপন মনে কাননে কাননে যেখানে সেখানে শিশু করিত ভ্রমণ; একাকী আপন মনে হাসিত কাঁদিত। জননীর কোল হতে পালাত ছুটিয়া, প্রকৃতির কোলে গিয়া করিত সে খেলা-- ধরিত সে প্রজাপতি, তুলিত সে ফুল, বসিত সে তরুতলে, শিশিরের ধারা ধীরে ধীরে দেহে তার পড়িত ঝরিয়া। বিজন কুলায়ে বসি গাহিত বিহঙ্গ, হেথা হোথা উঁকি মারি দেখিত বালক কোথায় গাইছে পাখী। ফুলদলগুলি, কামিনীর গাছ হোতে পড়িলে ঝরিয়া ছড়ায়ে ছড়ায়ে তাহা করিত কি খেলা! প্রফুল্ল উষার ভূষা অরুণকিরণে বিমল সরসী যবে হোত তারাময়ী, ধরিতে কিরণগুলি হইত অধীর। যখনি গো নিশীথের শিশিরাশ্রু-জলে ফেলিতেন উষাদেবী সুরভি নিশ্বাস, গাছপালা লতিকার পাতা নড়াইয়া ঘুম ভাঙাইয়া দিয়া ঘুমন্ত নদীর যখনি গাহিত বায়ু বন্য-গান তার, তখনি বালক-কবি ছুটিত প্রান্তরে, দেখিত ধান্যের শিষ দুলিছে পবনে। দেখিত একাকী বসি গাছের তলায়, স্বর্ণময় জলদের সোপানে সোপানে উঠিছেন উষাদেবী হাসিয়া হাসিয়া। নিশা তারে ঝিল্লীরবে পাড়াইত ঘুম, পূর্ণিমার চাঁদ তার মুখের উপরে তরল জোছনা-ধারা দিতেন ঢালিয়া, স্নেহময়ী মাতা যথা সুপ্ত শিশুটির মুখপানে চেয়ে চেয়ে করেন চুম্বন। প্রভাতের সমীরণে, বিহঙ্গের গানে উষা তার সুখনিদ্রা দিতেন ভাঙ্গায়ে। এইরূপে কি একটি সঙ্গীতের মত, তপনের স্বর্ণময়-কিরণে প্লাবিত প্রভাতের একখানি মেঘের মতন, নন্দন বনের কোন অপ্সরা-বালার সুখময় ঘুমঘোরে স্বপনের মত কবির বালক-কাল হইল বিগত। --
যৌবনে যখনি কবি করিল প্রবেশ, প্রকৃতির গীতধ্বনি পাইল শুনিতে, বুঝিল সে প্রকৃতির নীরব কবিতা। প্রকৃতি আছিল তার সঙ্গিনীর মত। নিজের মনের কথা যত কিছু ছিল কহিত প্রকৃতিদেবী তার কানে কানে, প্রভাতের সমীরণ যথা চুপিচুপি কহে কুসুমের কানে মরমবারতা। নদীর মনের গান বালক যেমন বুঝিত, এমন আর কেহ বুঝিত না। বিহঙ্গ তাহার কাছে গাইত যেমন, এমন কাহারো কাছে গাইত না আর। তার কাছে সমীরণ যেমন বহিত এমন কাহারো কাছে বহিত না আর। যখনি রজনীমুখ উজলিত শশী, সুপ্ত বালিকার মত যখন বসুধা সুখের স্বপন দেখি হাসিত নীরবে, বসিয়া তটিনীতীরে দেখিত সে কবি-- স্নান করি জোছনায় উপরে হাসিছে সুনীল আকাশ, হাসে নিম্নে স্রোতস্বিনী; সহসা সমীরণের পাইয়া পরশ দুয়েকটি ঢেউ কভু জাগিয়া উঠিছে। ভাবিত নদীর পানে চাহিয়া চাহিয়া, নিশাই কবিতা আর দিবাই বিজ্ঞান। দিবসের আলোকে সকলি অনাবৃত, সকলি রয়েছে খোলা চখের সমুখে-- ফুলের প্রত্যেক কাঁটা পাইবে দেখিতে। দিবালোকে চাও যদি বনভূমি-পানে, কাঁটা খোঁচা কর্দ্দমাক্ত বীভৎস জঙ্গল তোমার চখের 'পরে হবে প্রকাশিত; দিবালোকে মনে হয় সমস্ত জগৎ নিয়মের যন্ত্রচক্রে ঘুরিছে ঘর্ঘরি। কিন্তু কবি নিশাদেবী কি মোহন-মন্ত্র পড়ি দেয় সমুদয় জগতের 'পরে, সকলি দেখায় যেন স্বপ্নের মতন; ঐ স্তব্ধ নদীজলে চন্দ্রের আলোকে পিছলিয়া চলিতেছে যেমন তরণী, তেমনি সুনীল ঐ আকাশসলিলে ভাসিয়া চলেছে যেন সমস্ত জগৎ; সমস্ত ধরারে যেন দেখিয়া নিদ্রিত, একাকী গম্ভীর-কবি নিশাদেবী ধীরে তারকার ফুলমালা জড়ায়ে মাথায়, জগতের গ্রন্থ কত লিখিছে কবিতা। এইরূপে সেই কবি ভাবিত কত কি। হৃদয় হইল তার সমুদ্রের মত, সে সমুদ্রে চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারকার প্রতিবিম্ব দিবানিশি পড়িত খেলিত, সে সমুদ্র প্রণয়ের জোছনা-পরশে লঙ্ঘিয়া তীরের সীমা উঠিত উথলি, সে সমুদ্র আছিল গো এমন বিস্তৃত সমস্ত পৃথিবীদেবী, পারিত বেষ্টিতে নিজ স্নিগ্ধ আলিঙ্গনে। সে সিন্ধু-হৃদয়ে দুরন্ত শিশুর মত মুক্ত সমীরণ হু হু করি দিবানিশি বেড়াত খেলিয়া। নির্ঝরিণী, সিন্ধুবেলা, পর্ব্বতগহ্বর, সকলি কবির ছিল সাধের বসতি। তার প্রতি তুমি এত ছিলে অনুকূল কল্পনা! সকল ঠাঁই পাইত শুনিতে তোমার বীণার ধ্বনি, কখনো শুনিত প্রস্ফুটিত গোলাপের হৃদয়ে বসিয়া বীণা লয়ে বাজাইছ অস্ফুট কি গান। কনককিরণময় উষার জলদে একাকী পাখীর সাথে গাইতে কি গীত তাই শুনি যেন তার ভাঙ্গিত গো ঘুম! অনন্ত-তারা-খচিত নিশীথগগনে বসিয়া গাইতে তুমি কি গম্ভীর গান, তাহাই শুনিয়া যেন বিহ্বলহৃদয়ে নীরবে নিশীথে যবে একাকী রাখাল সুদূর কুটীরতলে বাজাইত বাঁশী তুমিও তাহার সাথে মিলাইতে ধ্বনি, সে ধ্বনি পশিত তার প্রাণের ভিতর। নিশার আঁধার-কোলে জগৎ যখন দিবসের পরিশ্রমে পড়িত ঘুমায়ে তখন সে কবি উঠি তুষারমন্ডিত সমুচ্চ পর্ব্বতশিরে গাইত একাকী প্রকৃতিবন্দনাগান মেঘের মাঝারে। সে গম্ভীর গান তার কেহ শুনিত না, কেবল আকাশব্যাপী স্তব্ধ তারকারা এক দৃষ্টে মুখপানে রহিত চাহিয়া। কেবল, পর্ব্বতশৃঙ্গ করিয়া আঁধার, সরল পাদপরাজি নিস্তব্ধ গম্ভীর ধীরে ধীরে শুনিত গো তাহার সে গান; কেবল সুদূর বনে দিগন্তবালায় হৃদয়ে সে গান পশি প্রতিধ্বনিরূপে মৃদুতর হোয়ে পুন আসিত ফিরিয়া। কেবল সুদূর শৃঙ্গে নির্ঝরিণী বালা সে গম্ভীর গীতি-সাথে কণ্ঠ মিশাইত, নীরবে তটিনী যেত সমুখে বহিয়া, নীরবে নিশীথবায়ু কাঁপাত পল্লব। গম্ভীরে গাইত কবি--"হে মহাপ্রকৃতি, কি সুন্দর, কি মহান্ মুখশ্রী তোমার, শূন্য আকাশের পটে হে প্রকৃতিদেবি কি কবিতা লিখেছে যে জ্বলন্ত অক্ষরে, যত দিন রবে প্রাণ পড়িয়া পড়িয়া তবু ফুরাবে না পড়া; মিটিবে না আশ! শত শত গ্রহ তারা তোমার কটাক্ষে কাঁপি উঠে থরথরি, তোমার নিশ্বাসে ঝটিকা বহিয়া যায় বিশ্বচরাচরে। কালের মহান্ পক্ষ করিয়া বিস্তার, অনন্ত আকাশে থাকি হে আদি জননি, শাবকের মত এই অসংখ্য জগৎ তোমার পাখার ছায়ে করিছ পালন! সমস্ত জগৎ যবে আছিল বালক, দুরন্ত শিশুর মত অনন্ত আকাশে করিত গো ছুটাছুটি না মানি শাসন, স্তনদানে পুষ্ট করি তুমি তাহাদের অলঙ্ঘ্য সখ্যের ডোরে দিলে গো বাঁধিয়া। এ দৃঢ় বন্ধন যদি ছিঁড়ে একবার, সে কি ভয়ানক কাণ্ড বাঁধে এ জগতে, কক্ষচ্ছিন্ন কোটি কোটি সূর্য্য চন্দ্র তারা অনন্ত আকাশময় বেড়ায় মাতিয়া, মণ্ডলে মণ্ডলে ঠেকি লক্ষ সূর্য্য গ্রহ চূর্ণ চূর্ণ হোয়ে পড়ে হেথায় হোথায়; এ মহান্ জগতের ভগ্ন অবশেষ চূর্ণ নক্ষত্রের স্তূপ, খণ্ড খণ্ড গ্রহ বিশৃঙ্খল হোয়ে রহে অনন্ত আকাশে! অনন্ত আকাশ আর অনন্ত সময়, যা ভাবিতে পৃথিবীর কীট মানুষের ক্ষুদ্র বুদ্ধি হোয়ে পড়ে ভয়ে সঙ্কুচিত, তাহাই তোমার দেবি সাধের আবাস। তোমার মুখের পানে চাহিতে হে দেবি ক্ষুদ্র মানবের এই স্পর্ধিত জ্ঞানের দুর্ব্বল নয়ন যায় নিমীলিত হোয়ে। হে জননি আমার এ হৃদয়ের মাঝে অনন্ত-অতৃপ্তি-তৃষ্ণা জ্বলিছে সদাই, তাই দেবি পৃথিবীর পরিমিত কিছু পারে না গো জুড়াইতে হৃদয় আমার, তাই ভাবিয়াছি আমি হে মহাপ্রকৃতি, মজিয়া তোমার সাথে অনন্ত প্রণয়ে জুড়াইব হৃদয়ের অনন্ত পিপাসা! প্রকৃতি জননি ওগো, তোমার স্বরূপ যত দূর জানিবারে ক্ষুদ্র মানবেরে দিয়াছ গো অধিকার সদয় হইয়া, তত দূর জানিবারে জীবন আমার করেছি ক্ষেপণ আর করিব ক্ষেপণ। ভ্রমিতেছি পৃথিবীর কাননে কাননে-- বিহঙ্গও যত দূর পারে না উড়িতে সে পর্ব্বতশিখরেও গিয়াছি একাকী; দিবাও পশে নি দেবি যে গিরিগহ্বরে, সেথায় নির্ভয়ে আমি করেছি প্রবেশ। যখন ঝটিকা ঝঞ্ঝা প্রচণ্ড সংগ্রামে অটল পর্ব্বতচূড়া করেছে কম্পিত, সুগম্ভীর অম্বুনিধি উন্মাদের মত করিয়াছে ছুটাছুটি যাহার প্রতাপে, তখন একাকী আমি পর্ব্বত-শিখরে দাঁড়াইয়া দেখিয়াছি সে ঘোর বিপ্লব, মাথার উপর দিয়া অজস্র অশনি সুবিকট অট্টহাসে গিয়াছে ছুটিয়া, প্রকাণ্ড শিলার স্তূপ পদতল হোতে পড়িয়াছে ঘর্ঘরিয়া উপত্যকা-দেশে, তুষারসঙ্ঘাতরাশি পড়েছে খসিয়া শৃঙ্গ হোতে শৃঙ্গান্তরে উলটি পালটি। অমানিশীথের কালে নীরব প্রান্তরে বসিয়াছি, দেখিয়াছি চৌদিকে চাহিয়া, সর্ব্বব্যাপী নিশীথের অন্ধকার গর্ভে এখনো পৃথিবী যেন হতেছে সৃজিত। স্বর্গের সহস্র আঁখি পৃথিবীর 'পরে নীরবে রয়েছে চাহি পলকবিহীন, স্নেহময়ী জননীর স্নেহ-আঁখি যথা সুপ্ত বালকের পরে রহে বিকসিত। এমন নীরবে বায়ু যেতেছে বহিয়া, নীরবতা ঝাঁ ঝাঁ করি গাইছে কি গান-- মনে হয় স্তব্ধতার ঘুম পাড়াইছে। কি সুন্দর রূপ তুমি দিয়াছ উষায়, হাসি হাসি নিদ্রোত্থিতা বালিকার মত আধঘুমে মুকুলিত হাসিমাখা আঁখি! কি মন্ত্র শিখায়ে দেছ দক্ষিণ-বালারে-- যে দিকে দক্ষিণবধূ ফেলেন নিঃশ্বাস, সে দিকে ফুটিয়া উঠে কুসুম-মঞ্জরী, সে দিকে গাহিয়া উঠে বিহঙ্গের দল, সে দিকে বসন্ত-লক্ষ্মী উঠেন হাসিয়া। কি হাসি হাসিতে জানে পূর্ণিমাশর্ব্বরী-- সে হাসি দেখিয়া হাসে গম্ভীর পর্ব্বত, সে হাসি দেখিয়া হাসে উথল জলধি, সে হাসি দেখিয়া হাসে দরিদ্র কুটীর। হে প্রকৃতিদেবি তুমি মানুষের মন কেমন বিচিত্র ভাবে রেখেছ পূরিয়া, করুণা, প্রণয়, স্নেহ, সুন্দর শোভন—ন্যায়, ভক্তি, ধৈর্য্য আদি সমুচ্চ মহান্-- ক্রোধ, দ্বেষ, হিংসা আদি ভয়ানক ভাব, নিরাশা মরুর মত দারুণ বিষণ্ণ-- তেমনি আবার এই বাহির জগৎ বিচিত্র বেশভূষায় করেছ সজ্জিত। তোমার বিচিত্র কাব্য-উপবন হোতে তুলিয়া সুরভি ফুল গাঁথিয়া মালিকা, তোমারি চরণতলে দিব উপহার!" এইরূপে সুনিস্তব্ধ নিশীথ-গগনে প্রকৃতি-বন্দনা-গান গাইত সে কবি। (কবি-কাহিনী কাব্যোপন্যাস)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kobi-kahini-prothom-sorgo/
|
3031
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চলে যাবে সত্তারূপ
|
চিন্তামূলক
|
চলে যাবে সত্তারূপ
সৃজিত যা প্রাণেতে কায়াতে,
রেখে যাবে মায়ারূপ
রচিত যা আলোতে ছায়াতে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chole-jabe-sottarupe/
|
1206
|
জীবনানন্দ দাশ
|
শীতের রাতের কবিতা
|
চিন্তামূলক
|
গভীর শীতের রাত এই সব,- তবু
চারিদিকে যুবাদের হৃদয়ের জীবনের কথা
মৃত্যুর উপর দিয়ে সাঁকোর মতন
চেয়ে দেখে মরণের অপ্রমেয়তা
সেতুর ছবির মত মিলে গিয়ে জলের ভিতরে
জীবনের জয়-
আর মরণের স্তব্ধতাকে অনুভব করে।
অনুভব করে এই জীবনই মহৎ,
মরণের চেয়ে বড় জীবনের সুর;
যদিও অন্ন আজ ভূমি নয়- তবুও মৈত্রেয়ী
অন্নলোভাতুর;
হৃদয়বিহীনভাবে- দশ বিশ শত কোটি টন
চলে আজ পঙ্গপাল,- নিজেকে উজাড় করে;- জেনে
জীবন হতাশ নয় ব’লেই জীবন।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shiiter-rater-kobita/
|
1646
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
বাতাসি
|
প্রেমমূলক
|
“বাতাসি ! বাতাসি !”—লোকটা ভয়ংকর চেঁচাতে চেঁচাতে
গুমটির পিছন দিকে ছুটে গেল ।
ধাবিত ট্রেনের থেকে এই দৃশ্য চকিতে দেখলুম ।
কে বাতাসি ? জোয়ান লোকটা অত ভয়ংকরভাবে
তাকে ডাকে কেন ? কেন
হাওয়ার ভিতরে বাবরি-চুল উড়িয়ে
পাগলের মতো
“বাতাসি ! বাতাসি !” ব’লে ছুটে যায় ?
টুকরো টুকরো কথাগুলি ইদানিং যেন বড় বেশি—
গোঁয়ার মাছির মতো
জ্বালাচ্ছে । কে যেন কাকে বাসের ভিতরে
বলেছিল, “ভাবতে হবে না,
এবারে দুদ্দাড় করে হেমাঙ্গ ভীষণভাবে উঠে যাবে, দেখে নিস” ।
কে হেমাঙ্গ ? কে জানে, এখন
সত্যিই দুদ্দাড় ক’রে কোথাও উঠে যাচ্ছে কিনা ।
কিংবা সেই ছেলেটা, যে ট্রাম-স্টপে দাঁড়িয়ে পাশের
মেয়েটিকে অদ্ভুত কঠিন স্বরে বলেছিল,
“চুপ করো, না হলে আমি
সেই রকম শাস্তি দেব আবার—” কে জানে
“সেইরকম” মানে কি রকম । আমি ভেবে যাচ্ছি,
ক্রমাগত ভেবে যাচ্ছি, তবু—
গল্পের সবটা যেন নাগালে পাচ্ছি না ।
গল্পের সবটা আমি পাব না নাগালে ।
শুধু শুনে যাব । শুধু এখানে ওখানে,
জনারণ্যে, বাতাসের ভিতরে, হাটেমাঠে,
অথবা ফুটপাথে, কিংবা ট্রেনের জানলায়
টুকরো টুকরো কথা শুনবো, শুধু শুনে যাব । আর
হঠাত্ কখনো কোনো ভুতুড়ে দুপুরে
কানে বাজাবে “বাতাসি ! বাতাসি !”
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1645
|
3418
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রকাশিতা
|
মানবতাবাদী
|
আজ তুমি ছোটো বটে, যার সঙ্গে গাঁঠছড়া বাঁধা
যেন তার আধা।
অধিকারগর্বভরে
সে তোমারে নিয়ে চলে নিজঘরে।
মনে জানে তুমি তার ছায়েবানুগতা--
তমাল সে, তার শাখালগ্ন তুমি মাধবীর লতা।
আজ তুমি রাঙাচেলি দিয়ে মোড়া
আগাগোড়া,
জড়োসড়ো ঘোমটায়-ঢাকা
ছবি যেন পটে আঁকা। আসিবে-যে আর-একদিন,
নারীর মহিমা নিয়ে হবে তুমি অন্তরে স্বাধীন
বাহিরে যেমনি থাক্।
আজিকে এই-যে বাজে শাঁখ
এরি মধ্যে আছে গূঢ় তব জয়ধ্বনি।
জিনি লবে তোমার সংসার, হে রমণী,
সেবার গৌরবে।
যে-জন আশ্রয় তব তোমারি আশ্রয় সেই লবে।
সংকোচের এই আবরণ দূর ক'রে
সেদিন কহিবে-- দেখো মোরে!
সে দেখিবে ঊর্ধ্বে মুখ তুলি
সৃপ্ত হয়ে পড়ে গেছে ধূসর সে কুণ্ঠিত গোধূলি--
দিগন্তের 'পরে স্মিতহাসে
পূর্ণচন্দ্র একা জাগে বসন্তের বিস্মিত আকাশে।
বুঝিবে সে দেহে মনে।
প্রচ্ছন্ন হয়েছে তরু পুষ্পিত লতার আলিঙ্গনে
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prokaseta/
|
3477
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ফুল কোথা থাকে গোপনে
|
চিন্তামূলক
|
ফুল কোথা থাকে গোপনে,
গন্ধ তাহারে প্রকাশে।
প্রাণ ঢাকা থাকে স্বপনে,
গান যে তাহারে প্রকাশে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ful-kotha-thake-gopone/
|
2862
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কত লক্ষ বরষের তপস্যার ফলে
|
প্রেমমূলক
|
কত লক্ষ বরষের তপস্যার ফলে
ধরণীর তলে
ফুটিয়াছে আজি এ মাধবী।
এ আনন্দচ্ছবি
যুগে যুগে ঢাকা ছিল অলক্ষ্যের বক্ষের আঁচলে।
সেইমতো আমার স্বপনে
কোনো দূর যুগান্তরে বসন্তকাননে
কোনো এক কোণে
একবেলাকার মুখে একটুকু হাসি
উঠিবে বিকাশি--
এই আশা গভীর গোপনে
আছে মোর মনে।
শান্তিনিকেতন, ২৬ পৌষ, ১৩২১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1926
|
1793
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কথোপকথন
|
প্রেমমূলক
|
– ধরো কোন একদিন তুমি খুব দূরে ভেসে গেলে
শুধু তার তোলপাড় ঢেউ গুলো আজন্ম আমার
বুকের সোনালি ফ্রেমে পেইন্টিং এর মতো রয়ে গেল।
এবং তা ধীরে ধীরে ধুলোয়, ধোঁয়ায়, কুয়াশায়
পোকামাকড়ের সুখী বাসাবাড়ি হয়ে যায় যদি?– ধরো কোন একদিন যদি খুব দূরে ভেসে যাই
আমারও সোনার কৌটো ভরা থাকবে প্রতিটি দিনের
এইসব ঘন রঙে, বসন্ত বাতাসে, বৃষ্টি জলে।
যখন তখন খুশি ওয়াটার কালারে আঁকা ছবি গুলো
অম্লান ধাতুর মতো ক্রমশ উজ্জ্বল হবে সোহাগী রোদ্দুরে।– তার মানে সত্যি চলে যাবে?– তার মানে কখনো যাবো না।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র-নন্দিনী! আমার খুব ভয় করে ,বড় ভয় করে!
কোনও একদিন বুঝি জ্বর হবে ,দরজা দালান ভাঙ্গা জ্বর
তুষার পাতের মত আগুনের ঢল নেমে এসে
নিঃশব্দে দখল করে নেবে এই শরীরের শহর বন্দর।
বালিশের ওয়াড়ের ঘেরাটোপ ছিঁড়ে ফেলা তুলো
এখন হয়েছে মেঘ,উঁড়ো হাস, সাঁদা কবুতর।
সেই ভাবে জ্বর এসে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে অন্য কোন ভুমন্ডলে
নন্দিনী! আমার খুব ভয় করে ,বড় ভয় করে।– বাজে কথা বকে বকে কি যে সুখ পাও শুভঙ্কর।
সত্যি বুঝি না।
কার জন্যে ছুরি নিয়ে খেলায় মেতেছো?
তুমি কি আমার চোখে রক্তদৃশ্য এঁকে দিতে চাও?– ছুরি কই? ছুরি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি জঙ্গলে
খাঁ খাঁ দুপুরের মত লম্বা ছুরি ছিল বটে কিছুদিন আগে।
তখন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল
তখন যে যুদ্ব দাঙ্গা লুটপাট ডাকাতির সম্ভাবনা ছিল
এখন ভীষন ভয় ছাড়া অন্য কোন প্রতিপক্ষ নেই ।
যুদ্ব নেই কামানের তোপ নেই , অসুখ বিসুখ কিছু নেই
ভয় ছাড়া অন্য কোন বীজানুর মারাত্মক আক্রমন নেই ।– আমার যা কিছু ছিল সবই তো দিয়েছি,শুভঙ্কর।
তোমার বাঘের থাবা তাও ভরে দিয়েছি খাবারে।
চাঁদোয়ার মত ঘন বৃক্ষ ছায়া টাঙ্গিয়ে দিয়েছি
মাথার উপরে,ঠিক আকাশের মাপে মাপে বুনে।
তবুও তোমার এত ভয়?
তবুও কিসের এত ভয়?-সেই ছেলেবেলা থেকে যা ছুয়েছি সব ভেঙ্গে গেছে।
প্রকান্ড ইস্কুলবাড়ি কাচের চিমনির মত ঝড়ে ভেঙ্গে গেল।
একান্নবর্তীর দীর্ঘ দালান-বারান্দা ছেড়া কাগজের
কুচি হয়ে গেল।
কচি হাতে রুয়ে রুয়ে সাজিয়ে ছিলাম এক উৎফুল্ল বাগান
কুরে কুরে খেয়ে গেছে লাল পিঁপড়ে,পোকা ও মাকড়।
একটা পতাকা ছিল, আকাশের অদ্বিতীয় সুর্যের মতন
তর্কে ও বিতর্কে তাও সাত আটটা টুকরো হয়ে গেল ।
গাঁয়ের নদীকে ছুঁয়ে কী ভুল করেছি
নদীর ব্রীজ কে ছুঁয়ে কী ভুল করেছি
কাগজ ও মুদ্রাযন্ত্র ছুয়ে আমি কি ভুল করেছি?
নন্দিনী!
তোমাকে যদি বাগান,পতাকা,ব্রীজ,কাগজের মতন হারাই?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্রভালবাসা, সেও আজ হয়ে গেছে ষড়যন্ত্রময়।
নন্দিনী! এসব কথা তোমার কখনো মনে হয়?
চক্রান্তের মত যেন, সারা গায়ে অপরাধপ্রবনতা মেখে
একটি যুবক আজ যুবতীর কাছাকাছি এসে
সাদা রুমালের গায়ে ফুলতোলা শেখে।
যেন এই কাছে আসা সমাজের পক্ষে খুব বিপজ্জনক।
যেন ওরা আগ্নেয়াস্ত্র পেয়ে গেছে মল্লিকবাগানে
যেন ওরা হাইজ্যাকের নথিপত্র জানে
এসেছে বারুদ ভরে গোপন কামানে।একটি যুবক যদি প্রতিদিন পাখি-রং বিকেলবেলায়
তার কোনো নায়িকার হাতে রাখে হাত
যেন এই কলকাতার মারাত্মক ক্ষতি করে দেবে বজ্রপাত।
কলকাতায় জঙ্গল গজাবে
কলকাতাকে সাপে-খোপে খাবে।
এই সব ফিসফাস, চারিদিকে অবিরল এই সব
ছুঁচোর কেত্তন,
একটি যুবক এসে যুবতীর কাছাকাছি বসেছে যখন।নন্দিনী! তোমার মনে পড়ে?
মামাশ্বশুরের মত বিচক্ষন মুখভঙ্গি করে
একবার এক বুড়ো হাড় এসে প্রশ্ন করেছিল,
মেয়েটির সঙ্গে কেন এত মাখামাখি
মেয়েটির মধ্যে কোন গুপ্তধন আছে-টাছে নাকি?
লুকনো এয়ারপোর্ট আছে?
জাল-নোট ছাপাবার কারখানা আছে?
আন্তর্জাতিক কোন পাকচক্র আছে?
তাহলে কিসের জন্যে ছুঁচ ও সুতোর মত
শীত-গ্রীষ্ম এত কাছে কাছে?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্রতুমিই আমার ধ্বংস হবে তা জানলে
এমন করে কি ভাসাতাম ডিঙ্গি নৌকো?
ভাসাতাম?
তুমি চলে যাবে সমুদ্রে আগে বলনি
তাহলে কি গায়ে মাখাতাম ঝড়-ঝঞ্ঝা?
মাখাতাম?
নুড়িতে-পাথরে নূপুর বাজিয়ে ছোট্ট
জলরেখা ছিলে দুই হাত দিয়ে ধরেছি।
ধরা দিয়েছ।
এখন দুকুল ভরেছে প্রবাহে প্লাবনে
উঁচু মাস্তুলে জাহাজ এসেছে ডাকতে।
ওকে সাড়া দাও।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– লোকে বলে শুনি সেলায়ে তোমার পাকা হাত
ছুঁচ দিয়ে লেখো কবিতা।– গোয়েন্দা নাকি? আমার যা কিছু লুকানো
জানতে হবে কি সবই তা?– তর্ক কোরো না জুড়ে দেবে কিনা এখুনিই
হৃৎপিন্ডের ক্ষতটা।– দিতে পারি তবে মজুরি পড়বে বিস্তর
জোগাতে পারবে অতটা?– কাজ যদি হয় নিখুঁত,পাবেই মজুরী,
ভেবেছো পালাবো গর্তে?– হৃৎপিন্ডের ভিতরে থাকে যে ঝর্ণা
দিতে হবে স্নান করতে।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– খবর্দার! হাত সরিয়ে নাও।
ব্যাগে ভরে নাও টাকাগুলো।
আজ সমস্ত কিছুর দাম দেবো আমি।– কি হচ্ছে কি শুভঙ্কর? কেন এমন পাগলামির ঢেউয়ে দুলছ?
এইজন্যই তোমার উপর রাগ হয় এমন।
মাঝে মাঝে অর্থমন্ত্রীদের মতো গোঁয়ার হয়ে ওঠো তুমি।
কাল কতবার বলেছিলুম, চলো উঠি, চলো উঠি।
আকাশ আলকাতরা হয়ে আসছে, চলো, উঠি।
এখুনি সেনাবাহিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়বে বৃষ্টি, চলো উঠি।
তুমি ঘাসের উপর বুড়ো বটগাছ হয়ে বসে রইলে।
কলকাতা ডুবল, তুমিও ডুবলে
আমাকেও ডোবালে।
কেন আমার কথা শোনো না বল তো?
আমি কি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি
যে সিংহাসনের হাতলে হাত রাখলেই হারিয়ে যাবে স্মৃতিহীন অন্ধকারে?
কলের জলের মতো
ক্যালেন্ডারের তারিখের মতো
বন্যার গায়ে গায়ে খরার মতো
আমি তো তোমার সঙ্গেই আছি। এবং থাকবো।
তাহলে কেন আমার কথা শোনো না শুভঙ্কর?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্রনন্দিনী –
যতক্ষন পাশে থাকো, যতক্ষন ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকি
আমি যেন মেঘে জলে মেশা কোনো আত্মহারা পাখি।
বলতো কি পাখি?শুভঙ্কর –
যতক্ষন পাশে থাকো, যতক্ষন ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকা
উল্কার স্ফুলিঙ্গ দিয়ে অন্ধকারে দীর্ঘ ছবি আঁকা।
বলতো কি ছবি?নন্দিনী –
যতক্ষন কথা বলো, হাসো ও ঝরাও ধারাজল
বীজ থেকে জেগে ওঠে অফুরন্ত গাছ, বনতল।
বলতো কি গাছ?শুভঙ্কর –
যতক্ষন পাশে থাকো ভূমিকম্প, সুখের সন্ত্রাস
পৌঁছে যাই সেখানে, যেখানে বসন্ত বারোমাস।
বলতো কি দেশ?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– তুমি আমার সর্বনাশ করেছ শুভঙ্কর।
কিচ্ছু ভালো লাগে না আমার। কিচ্ছু না।
জ্বলন্ত উনোনে ভিজে কয়লার ধোঁয়া আর শ্বাসকষ্ট
ঘিরে ফেলেছে আমার দশদিগন্ত।
এখন বৃষ্টি নামলেই কানে আসে নদীর পাড় ভাঙার অকল্যাণ শব্দ
এখন জ্যোৎস্না ফুটলেই দেখতে পাই
অন্ধকার শশ্মানযাত্রীর মত ছুটে চলেছে মৃতদেহের খোঁজে।
কিচ্ছু ভালো লাগে না আমার। কিচ্ছু না।
আগে আয়নার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা সাজগোজ
পাউডারে, সাবানে, সেন্টে, সুর্মায়
নিজেকে যেন কেচে ফর্সা করে তোলার মত সুখ।
এখন প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেই
সমস্ত মুখ ভরে যায় গোলমরিচের মতো ব্রণে, বিস্বাদে, বিপন্নতায়।
এখন সমস্ত স্বপ্নই যেন বিকট মুখোশের হাসাহাসি
দুঃস্বপ্নকে পার হওয়ার সমস্ত সাঁকো ভেঙে চুরমার।
কিচ্ছু ভালো লাগে না আমার। কিচ্ছু না।– তুমিও কি আমার সর্বনাশ করনি নন্দিনী?
আগে গোলমরিচের মতো এতটুকু ছিলাম আমি।
আমার এক ফোঁটা খাঁচাকে তুমিই করে দিয়েছ লম্বা দালান।
আগাছার জমিতে বুনে দিয়েছ জ্বলন্ত উদ্ভিদের দিকচিহ্নহীন বিছানা।
এখন ঘরে টাঙানোর জন্যে একটা গোটা আকাশ না পেলে
আমার ভাল লাগে না।
এখন হাঁটা-চলার সময় মাথায় রাজছত্র না ধরলে
আমার ভালো লাগে না।
পৃথিবীর মাপের চেয়ে অনেক বড় করে দিয়েছ আমার লাল বেলুন।
গোলমরিচের মতো এই একরত্তি পৃথিবীকে
আর ভালো লাগে না আমার।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– আমার আগে আর কাউকে ভালবাসনি তুমি?– কেন বাসব না? অনেক।
বিষবৃক্ষের ভ্রমর
যোগাযোগের কুমু
পুতুলনাচের ইতিকথার কুসুম
অপরাজিত-র…..– ইয়ার্কি করো না। সত্যি কথা বলবে।– রোগা ছিপছিপে যমুনাকে ভালোবেসেছিলাম বৃন্দাবনে
পাহাড়ী ফুলটুংরীকে ঘাটশিলায়
দজ্জাল যুবতী তোর্সাকে জলপাইগুড়ির জঙ্গলে
আর সেই বেগমসাহেবা, নীল বোরখায় জরীর কাজ
নাম চিল্কা– আবার বাজে কথার আড়াল তুলছ?– বাজে কথা নয়। সত্যিই।
এদের কাছ থেকেই তো ভালবাসতে শেখা।
অনন্ত দুপুর একটা ঘাস ফড়িং-এর পিছনে
এক একটা মাছরাঙ্গার পিছনে গোটা বাল্যকাল
কাপাসতুলো ফুটছে
সেইদিকে তাকিয়ে দুটো তিনটে শীত-বসন্ত
এইভাবেই তো শরীরের খাল-নালায়
চুইয়ে চুইয়ে ভালবাসার জল।
এইভাবেই তো হৃদয়বিদারক বোঝাপড়া
কার আদলে কি, আর কোনটা মাংস, কোনটা কস্তুরী গন্ধ।
ছেলেবেলায় ভালবাসা ছিল
একটা জামরুল গাছের সঙ্গে।
সেই থেকে যখনই কারো দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই
জামরুলের নিরপরাধ স্বচ্ছতা ভরাট হয়ে উঠেছে
গোলাপী আভার সর্বনাশে,
অকাতর ভালবেসে ফেলি তৎক্ষণাৎ
সে যদি পাহাড় হয়, পাহাড়
নদী হয়, নদী
কাকাতুয়া হলে, কাকাতুয়া
নারী হলে, নারী।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– তোমাদের ওখানে এখন লোডশেডিং কি রকম?
– বোলো না। দিন নেই, রাত নেই, জ্বালিয়ে মারছে।
– তুমি তখন কি করো?
– দরজা খুলে দিই।
জানলা খুলে দিই।
পর্দা খুলে দিই।
আজকাল হাওয়াও হয়েছে তেমনি ফন্দিবাজ।
যেমনি অন্ধকার, অমনি মানুষের ত্রিসীমানা ছেড়ে দৌড়।– তুমি তখন কি করো?
– গায়ে জামা-কাপড় রাখতে পারি না।
সব খুলে দিই,
চোখের চশমা, চুলের বিনুনি, বুকের আঁচল, লাজ-লজ্জা সব।– টাকা থাকলে তোমার নামে নতুন ঘাট বাঁধিয়ে দিতুম কাশী মিত্তিরে
এমন তোমার উথাল-পাতাল দয়া।
তুমি অন্ধকারকে সর্বস্ব, সব অগ্নিস্ফুলিঙ্গ খুলে দিতে পার কত সহজে।
আর শুভঙ্কর মেঘের মত একটু ঝুঁকলেইকি হচ্ছে কি?শুভঙ্কর তার খিদে তেষ্টার ডালপালা নাড়লেইকি হচ্ছে কি?শুভঙ্কর রোদে-পোড়া হরিনের জিভ নাড়ালেইকি হচ্ছে কি?পরের জন্মে দশদিগন্তের অন্ধকার হবো আমি।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– দেখ, অনন্তকাল ঝিঝি পোকার মতো
আমরা কথা বলছি
অথচ কোনো কথায় শেষ হল না এখনও।
একটা লাল গোলাপের কান্নার গল্প
শোনাবে বলেছিলে
কবে বলবে?– চলো উঠি। বড্ড গরম এখানে।– দেখ, অনন্তকাল শুকনো বাঁশপাতার মতো
আমরা ঘুরছি
অথচ কেউ কাউকে ছুঁতে পারলুম না এখনো।
একটা কালো হরিনকে কোজাগরী উপহার
দেওয়ার কথা ছিল
কবে দেবে?– চলো উঠি। বড্ড ঝড়ঝাপটা এখানে।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– তুমি আজকাল বড্ড সিগারেট খাচ্ছ শুভঙ্কর।
– এখুনি ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি।
কিন্তু তার বদলে?– বড্ড হ্যাংলা। যেন খাওনি কখনো ?
– খেয়েছি।
কিন্তু আমার খিদের কাছে সে সব নস্যি।
কিন্তু কলকাতাকে এক খাবলায় চিবিয়ে খেতে পারি আমি।
আকাশটাকে ওমলেটের মত চিরে চিরে
নক্ষত্রগুলোকে চিনেবাদামের মত টুকটাক করে
পাহাড়গুলোকে পাঁপড় ভাজার মত মড়মড়িয়ে
আর গঙ্গা ?
সেতো এক গ্লাস সরবত।– থাক খুব বীরপুরুষ।
– সত্যি তাই।
পৃথিবীর কাছে আমি এইরকম ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ।
কেবল তোমার কাছে এলেই দুধের বালক
কেবল তোমার কাছে এলেই ফুটপাতের নুলো ভিখারী
এক পয়সা, আধ পয়সা কিংবা এক টুকরা পাউরুটির বেশি
আর কিছু ছিনিয়ে নিতে পারি না।– মিথ্যুক।
– কেন ?
– সেদিন আমার সর্বাঙ্গের শাড়ি ধরে টান মারনি ?
– হতে পারে।
ভিখারীদেরর কি ডাকাত হতে ইচ্ছে করে না একদিনও ?– তোমার মধ্যে অনন্তকাল বসবাসের ইচ্ছে
তোমার মধ্যেই জমিজমা ঘরবাড়ি, আপাতত একতলা
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?– একতলা আমার একবিন্দু পছন্দ নয়।
সকাল-সন্ধে চাঁদের সঙ্গে গপ্পোগুজব হবে
তেমন উঁচু না হলে আবার বাড়ি নাকি?– আচ্ছা তাই হবে।
চাঁদের গা-ছুঁয়ে বাড়ি,
রহস্য উপন্যাসের মতো ঘোরানো-প্যাঁচানো সিঁড়ি
বাঁকে বাঁকে সোনালী ফ্রেমে বাঁধানো স্বপ্নদৃশ্য
শিং-সমেত মায়া হরিণের মুন্ডু
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?– কাটা-হরিণ দেয়ালে ঝুলবে, অসহ্য।
হরিণ থাকবে বনে, বন থাকবে আমাদের
খাট পালঙ্কের চারধারে
খাট পালঙ্কের নীচে ছোট্ট একটা পাহাড়
পাহাড়ের পেট চিরে ঝর্ণা– আচ্ছা তাই হবে।
পাহাড়ের পেট চিরে ঝর্ণা, ঝর্ণার পেট চিরে কাশ্মিরী কার্পেট
সিলিং-এ রাজস্থানী-ঝাড় জলের ঝাঁঝরির মত উপুর করা
জানলার গায়ে মেঘ, মেঘের গায়ে ফুরফুরে আদ্দির
পাঞ্জাবি
পাঞ্জাবির গায়ে লক্ষ্ণৌ-ই চিকনের কাজ
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?– মেঘ রোজ রোজ পাঞ্জাবি পরবে কেন?
এক একদিন পরবে বালুচরি শাড়ি কিংবা
খাটাও-এর পাতলা প্রিন্ট
মাথায় বাগান-খোঁপা, খোঁপায় হীরের প্রজাপতি– আচ্ছা তাই হবে।
মেঘ সাজবে জরি-পাড় শাড়িতে
আর তখুনি নহবতখানার সানাই-এ জয়জ়য়ন্তী
আর তখুনি অরণ্যের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বনো জানোয়ারের হাঁক-ডাক
খাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে জেগে উঠবে জলপ্রপাত
শিকারের জন্যে তীর ধনুক, দামামা দুন্দুভি
হাসছো কেন? বলো হাসছো কেন?– তুমি এমনভাবে বলছ
যেন ভালোবাসা মানে সাপে আর নেউলে ভয়াবহ
একটা যুদ্ধ।
ভয় লাগছে।
অন্য গল্প বলো।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– কাল বাড়ি ফিরে কী করলে?
– কাঁদলাম। তুমি?
– লিখলাম।
– কবিতা? কই দেখাও।
– লিখেই কুচিকুচি।
– কেন?
– আমার আনন্দের ভিতরে অনর্গল কথা বলছিল আর্তনাদ
আর্তনাদের ভিতরে গুনগুন গলা ভাঁজছিল অদ্ভুত এক শান্তি
আর শান্তির ভিতরে সমুদ্রের সাঁইসাঁই ঝড়।
যে সব অক্ষর লিখলেই লাল হওয়ার কথা
তারা হয়ে যাচ্ছিল সাদা।
যে সব শব্দ সাদা কাশবন হয়ে দুলবে
তাদের মনে হচ্ছিল শুকনো পাতার ওড়াউড়ি।
বুঝলাম সে ভাষা আমার জানা নেই
যার আয়নায় নিজের মুখ দেখবে ভালোবাসা।– তাই বলে ছিঁড়ে ফেললে?
– বাতাস থেকে একটা অট্টহাসি লাফিয়ে উঠে বললে
পিদিমের সলতে হয়ে আরো কিছুদিন পুড়ে খাক হ।
পুড়ে খাক হ।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– উত্তরোত্তর অত্যন্ত বাজে হয়ে উঠছো তুমি।
আজ থেকে তোমাকে ডাকবো
চুল্লী।
কেন জান? কেবল পোড়াচ্ছ বলে।
সুখের জন্যে হাত পাতলে যা দাও
সে তো আগুনই।– উত্তরোত্তর অত্যন্ত যা-তা হয়ে উঠছো তুমি
আজ থেকে আমিও তোমাকে ডাকবো
জল্লাদ।
কেন জান? কেবল হত্যা করছো বলে।
তোমাকে যা দিতে পারি না, তার দুঃখ
সে তো ছুরিরই ফলা।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্রকালকে এলে না, আজ চলে গেল দিন
এখন মেঘলা, বৃষ্টি অনতিদূরে।
ভয়াল বৃষ্টি, কলকাতা ডুবে যাবে।
এখনো কি তুমি খুঁজছো নেলপালিশ?
শাড়ি পরা ছিল? তাহলে এলে না কেন?
জুতো ছেঁড়া ছিল? জুতো ছেঁড়া ছিল নাকো?
কাজল ছিল না? কি হবে কাজল পরে
তোমার চোখের হরিণকে আমি চিনি।কালকে এলে না, আজ চলে গেল দিন
এখন গোধূলি, এখুনি বোরখা পরে
কলকাতা দুবে যাবে গাঢ়তর হিমে।
এখনো কি তুমি খুঁজছো সেফটিপিন?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্রআমি তোমার পান্থপাদপ
তুমি আমার অতিথশালা ।
হঠাৎ কেন মেঘ চেঁচালো
– দরজাটা কই, মস্ত তালা ?তুমি আমার সমুদ্রতীর
আমি তোমার উড়ন্ত চুল ।
হঠাৎ কেন মেঘ চেঁচালো
– সমস্ত ভুল , সমস্ত ভুল ?আমি তোমার হস্তরেখা
তুমি আমার ভর্তি মুঠো ।
হঠাৎ কেন মেঘ চেঁচালো
– কোথায় যাবি, নৌকো ফুটো ?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র– যে কোন একটা ফুলের নাম বল– দুঃখ ।– যে কোন একটা নদীর নাম বল– বেদনা ।– যে কোন একটা গাছের নাম বল– দীর্ঘশ্বাস ।– যে কোন একটা নক্ষত্রের নাম বল– অশ্রু ।– এবার আমি তোমার ভবিষ্যত বলে দিতে পারি ।– বলো ।– খুব সুখী হবে জীবনে ।শ্বেত পাথরে পা ।সোনার পালঙ্কে গা ।এগুতে সাতমহলপিছোতে সাতমহল ।ঝর্ণার জলে স্নানফোয়ারার জলে কুলকুচি ।তুমি বলবে, সাজবো ।বাগানে মালিণীরা গাঁথবে মালাঘরে দাসিরা বাটবে চন্দন ।তুমি বলবে, ঘুমবো ।অমনি গাছে গাছে পাখোয়াজ তানপুরা,অমনি জোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী ।সুখের নাগর দোলায় এইভাবে অনেকদিন ।তারপরবুকের ডান পাঁজরে গর্ত খুঁড়ে খুঁড়েরক্তের রাঙ্গা মাটির পথে সুড়ঙ্গ কেটে কেটেএকটা সাপপায়ে বালুচরীর নকশানদীর বুকে ঝুঁকে-পড়া লাল গোধূলি তার চোখবিয়েবাড়ির ব্যাকুল নহবত তার হাসি,দাঁতে মুক্তোর দানার মত বিষ,পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে তোমাকেযেন বটের শিকড়মাটিকে ভেদ করে যার আলিঙ্গন ।ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত হাসির রং হলুদধীরে ধীরে তোমার সমস্ত গয়নায় শ্যাওলাধীরে ধীরে তোমার মখমল বিছানাফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে সাদা ।– সেই সাপটা বুঝি তুমি ?– না ।– তবে ?– স্মৃতি ।বাসর ঘরে ঢুকার সময় যাকে ফেলে এসেছিলেপোড়া ধুপের পাশে ।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্রতোমার বন্ধু কে ? দীর্ঘশ্বাস ?আমার ও তাই ।আমার শূন্যতা গননাহীন ।তোমার ও তাই ?দুরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়ডাকলে দরোজায় আসে না কেউ ।অযথা বাশি শুনে বাইরে যাইবাতাসে হাসাহাসি বিদ্রুপের ।তোমার সাজি ছিল, বাগান নেইআমার ও তাই ।আমার নদী ছিল, নৌকা নেইতোমার ও তাই ?তোমার বিছানায় বৃষ্টিপাতআমার ঘরদোরে ধুলার ঝড় ।তোমার ঘরদোরে আমার মেঘআমার বিছানায় তোমার হিম ।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র: এতো দেরী করলে কেন? সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি।– কি করবো বলুন ম্যাডাম? টিউশনি শেষ করে বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। আমার জন্যে তো আর গেইটের বাইরে মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে থাকে না যে ড্রাইভারের কুর্নিশ নিতে নিতে হুট করে ঢুকে পড়বো। তাই ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, কাদা-জল ভেঙ্গে, গরীবের গাড়ি মানে দু’পায়ের উপর ভরসা করেই আসতে হয় আপনার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে। তবে আজ রিক্সায় করে এসেছি নইলে একেবারে কাকভেজা হয়ে যেতাম। রিক্সা খুঁজে পেতেই যা দেরী হলো।: ইস্ বেশ ভিজে গেছো দেখছি। কাছে এসো তো, রুমাল দিয়ে মুছে দিই।– ওহো, আমি তো ভেবেছিলাম তোমার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেবে। ঠিক আছে, রুমালই সই।: না মিস্টার, ওটা ভবিষ্যতের জন্য জমা থাকুক। যখন তোমার বউ হবো তখন ইচ্ছেটা পূরণ হবে।– আচ্ছা। আর যদি তা না হও, তবে আমি বুড়ো বয়েসে পান চিবোতে চিবোতে কোন এক বাদলঘন দিনে বসে বসে রোমন্থন করবো আজকের এই রুমালি ভালোবাসাময় সময়টাকে। নাতিপুতিকে তখন প্রথম প্রেমিকা আর এই রুমালটার গল্প শোনাবো।: প্লিজ, এভাবে বলো না। কেন আমি তোমাকে পাবো না? তুমি কি আমাকে চাও না? আমাকে ভালোবাসো না?– উত্তরটা আসলে একটু কঠিন। তোমাকে চাই আবার চাই না। ভালোবাসি আবার বাসি না।: হেয়াঁলি রাখো। আমি স্পষ্ট জানতে চাই।– তবে শোন। আমার প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামের নির্মম বাস্তবতা তোমার জানা নেই। সেই জীবনে তুমি কখনো অভ্যস্ত হতে পারবেও না। তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?: হ্যাঁ, করো।– একটু আগে একটা টং-এর দোকানের ছাউনিতে গা বাচিয়ে রিক্সা খুঁজছিলাম। খুব শীত শীত লাগছিলো, তখন চা খেয়েছিলাম ভাঙ্গা কাপে। আধধোয়া সে কাপে লেগেছিলো অনেক মেহনতি মানুষের ঠোঁটের ছোঁয়া, লেগেছিলো থুতুও যা এখনো আমার ঠোঁটে লেগে আছে। তুমি কি পারবে সেই ঠোঁটে চুমু খেতে?-তোমার পৌঁছুতে এত দেরী হলো ?-পথে ভিড় ছিল ?-আমারও পৌঁছুতে একটু দেরী হলোসব পথই ফাটা ।-পথে এত ভিড় ছিল কেন ?-শবযাত্রা ? কার মৃত্যু হল ?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a7%8b%e0%a6%aa%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%a8-%e0%a7%a7-%e0%a6%aa%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81-purnendu-patri/
|
3798
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যেদিন উদিলে তুমি, বিশ্বকবি, দূর সিন্ধুপারে
|
চিন্তামূলক
|
যেদিন উদিলে তুমি, বিশ্বকবি, দূর সিন্ধুপারে,
ইংলণ্ডে দিকপ্রান্ত পেয়েছিল সেদিন তোমারে
আপন বক্ষের কাছে, ভেবেছিল বুঝি তারি তুমি
কেবল আপন ধন; উজ্জ্বল ললাট তব চুমি
রেখেছিল কিছুকাল অরণ্যশাখার বাহুজালে,
ঢেকেছিল কিছুকাল কুয়াশা-অঞ্চল-অন্তরালে
বনপুষ্প-বিকশিত তৃণঘন শিশির-উজ্জ্বল
পরীদের খেলার প্রাঙ্গণে। দ্বীপের নিকুঞ্জতল
তখনো ওঠে নি জেগে কবিসূর্য-বন্দনাসংগীতে।
তার পরে ধীরে ধীরে অনন্তের নিঃশব্দ ইঙ্গিতে
দিগন্তের কোল ছাড়ি শতাব্দীর প্রহরে প্রহরে
উঠিয়াছ দীপ্তজ্যোতি মাধ্যাহ্নের গগনের 'পরে;
নিয়েছ আসন তব সকল দিকের কেন্দ্রদেশে
বিশ্বচিত্ত উদ্ভাসিয়া; তাই হেরো যুগান্তর-শেষে
ভারতসমুদ্রতীরে কম্পমান শাখাপুঞ্জে আজি
নারিকেলকুঞ্জবনে জয়ধ্বনি উঠিতেছে বাজি।
শিলাইদহ, ১৩ অগ্রহায়ণ, ১৩২২
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1951
|
3369
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পরের কর্ম-বিচার
|
নীতিমূলক
|
নাক বলে, কান কভু ঘ্রাণ নাহি করে,
রয়েছে কুণ্ডল দুটো পরিবার তরে।
কান বলে, কারো কথা নাহি শুনে নাক,
ঘুমোবার বেলা শুধু ছাড়ে হাঁকডাক। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/porer-kormo-bichar/
|
3368
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পরিত্যক্ত
|
চিন্তামূলক
|
চলে গেল , আর কিছু নাই কহিবার ।
চলে গেল , আর কিছু নাই গাহিবার ।
শুধু গাহিতেছে আর শুধু কাঁদিতেছে
দীনহীন হৃদয় আমার , শুধু বলিতেছে ,
“ চলে গেল সকলেই চলে গেল গো ,
বুক শুধু ভেঙে গেল দলে গেল গো । ”
বসন্ত চলিয়া গেলে বর্ষা কেঁদে কেঁদে বলে ,
“ ফুল গেল , পাখি গেল --
আমি শুধু রহিলাম , সবই গেল গো । ”
দিবস ফুরালে রাতি স্তব্ধ হয়ে রহে ,
শুধু কেঁদে কহে ,
“ দিন গেল , আলো গেল , রবি গেল গো --
কেবল একেলা আমি , সবই গেল গো । ”
উত্তরবায়ুর সম প্রাণের বিজনে মম
কে যেন কাঁদিছে শুধু
“ চলে গেল , চলে গেল ,
সকলেই চলে গেল গো । ”
উৎসব ফুরায়ে গেলে ছিন্ন শুষ্ক মালা
পড়ে থাকে হেথায় হোথায় --
তৈলহীন শিখাহীন ভগ্ন দীপগুলি
ধুলায় লুটায় --
একবার ফিরে কেহ দেখে নাকো ভুলি ,
সবে চলে যায় ।
পুরানো মলিন ছিন্ন বসনের মতো
মোরে ফেলে গেল ,
কাতর নয়নে চেয়ে রহিলাম কত --
সাথে না লইল ।
তাই প্রাণ গাহে শুধু , কাঁদে শুধু , কহে শুধু ,
“ মোরে ফেলে গেল ,
সকলেই মোরে ফেলে গেল ,
সকলেই চলে গেল গো । ”
একবার ফিরে তারা চেয়েছিল কি ?
বুঝি চেয়েছিল ।
একবার ভুলে তারা কেঁদেছিল কি ?
বুঝি কেঁদেছিল ।
বুঝি ভেবেছিল --
লয়ে যাই -- নিতান্ত কি একেলা কাঁদিবে ?
তাই বুঝি ভেবেছিল ।
তাই চেয়েছিল ।
তার পরে ? তার পরে !
তার পরে বুঝি হেসেছিল ।
একফোঁটা অশ্রুবারি মুহূর্তেই শুকাইল ।
তার পরে ? তার পরে !
চলে গেল ।
তার পরে ? তার পরে !
ফুল গেল , পাখি গেল , আলো গেল , রবি গেল ,
সবই গেল , সবই গেল গো --
হৃদয় নিশ্বাস ছাড়ি কাঁদিয়া কহিল ,
“ সকলেই চলে গেল গো ,
আমারেই ফেলে গেল গো । ”
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/proretakti/
|
3534
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বস্ত্রহরণ
|
নীতিমূলক
|
‘সংসারে জিনেছি’ ব’লে দুরন্ত মরণ
জীবন বসন তার করিছে হরণ।
যত বস্ত্রে টান দেয়, বিধাতার বরে।
বস্ত্র বাড়ি চলে তত নিত্যকাল ধ’রে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bostrohoron/
|
5645
|
সুকুমার রায়
|
প্যাঁচা আর প্যাঁচানী
|
ছড়া
|
প্যাঁচা কয় প্যাঁচানী,
খাসা তোর চ্যাঁচানি
শুনে শুনে আন্মন
নাচে মোর প্রাণমন!
মাজা–গলা চাঁচা–সুর
আহলাদে ভরপুর!
গলা–চেরা ধমকে
গাছ পালা চমকে,
সুরে সুরে কত প্যাঁচ
গিট্কিরি ক্যাঁচ্ ক্যাঁচ্!
যত ভয় যত দুখ
দুরু দুরু ধুক্ ধুক্,
তোর গানে পেঁচি রে
সব ভুলে গেছি রে,
চাঁদমুখে মিঠে গান
শুনে ঝরে দু'নয়ান৷
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/pecha-aar-pechani/
|
3450
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রশ্ন
|
চিন্তামূলক
|
চতুর্দিকে বহ্নিবাষ্প শূন্যাকাশে ধায় বহুদূরে,
কেন্দ্রে তার তারাপুঞ্জ মহাকাল-চক্ররথে ঘুরে।
কত বেগ, কত তাপ, কত ভার, কত আয়তন,
সূক্ষ্ম অঙ্কে করেছে গণন
পণ্ডিতেরা লক্ষ কোটি ক্রোশ দূর হতে
দুর্লক্ষ্য আলোতে।
আপনার পানে চাই,
লেশমাত্র পরিচয় নাই।
এ কি কোনো দৃশ্যাতীত জ্যোতি।
কোন্ অজানারে ঘিরি এই অজানার নিত্য গতি।
বহুযুগে বহুদূরে স্মৃতি আর বিস্মৃতি-বিস্তার,
যেন বাষ্পপরিবেশ তার
ইতিহাসে পিণ্ড বাঁধে রূপে রূপান্তরে।
"আমি' উঠে ঘনাইয়া কেন্দ্র-মাঝে অসংখ্য বৎসরে।
সুখদুঃখ ভালোমন্দ রাগদ্বেষ ভক্তি সখ্য স্নেহ
এই নিয়ে গড়া তার সত্তাদেহ;
এরা সব উপাদান ধাক্কা পায়, হয় আবর্তিত,
পুঞ্জিত, নর্তিত।
এরা সত্য কী যে
বুঝি নাই নিজে।
বলি তারে মায়া--
যাই বলি শব্দ সেটা, অব্যক্ত অর্থের উপচ্ছায়া।
তার পরে ভাবি,
এ অজ্ঞেয় সৃষ্টি "আমি' অজ্ঞেয় অদৃশ্যে যাবে নাবি।
অসীম রহস্য নিয়ে মুহূর্তের নিরর্থকতায়
লুপ্ত হবে নানারঙা জলবিম্বপ্রায়,
অসমাপ্ত রেখে যাবে তার শেষকথা
আত্মার বারতা।
তখনো সুদূরে ঐ নক্ষত্রের দূত
ছুটাবে অসংখ্য তার দীপ্ত পরমাণুর বিদ্যুৎ
অপার আকাশ-মাঝে,
কিছুই জানি না কোন্ কাজে।
বাজিতে থাকিবে শূন্যে প্রশ্নের সুতীব্র আর্তস্বর,
ধ্বনিবে না কোনোই উত্তর।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prosno/
|
604
|
চণ্ডীদাস
|
এ ঘোর রজনী
|
প্রেমমূলক
|
এ ঘোর রজনী, মেঘের ঘটা,
কেমনে আইল বাটে?
আঙ্গিনার কোণে তিতিছে বঁধুয়া,
দেখিয়া পরাণ ফাটে।
সই, কি আর বলিব তোরে,
বহু পুণ্যফলে সে-হেন বঁধুয়া
আসিয়া মিলল মোরে।
ঘরে গুরুজন, ননদী দারুণ,
বিলম্বে বাহির হৈনু –
আহা মরি মরি, সংকেত করিয়া
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4387.html
|
3057
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ছলনা
|
চিন্তামূলক
|
সংসার মোহিনী নারী কহিল সে মোরে,
তুমি আমি বাঁধা রব নিত্য প্রেমডোরে।
যখন ফুরায়ে গেল সব লেনা দেনা,
কহিল, ভেবেছ বুঝি উঠিতে হবে না! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/cholona/
|
5402
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
ছিন্নমুকুল
|
শোকমূলক
|
সবচেয়ে যে ছোটো পিঁড়িখানি
সেইখানি আর কেউ রাখেনা পেতে,
ছোট থালায় হয় নাকো ভাত বাড়া,
জল ভরে না ছোট্ট গেলাসেতে;
বাড়ির মধ্যে সব-চেয়ে যে ছোটো
খাবার বেলা কেউ ডাকে না তাকে,
সব-চেয়ে যে শেষে এসেছিল,
তারই খাওয়া ঘুচেছে সব-আগে ।সব-চেয়ে যে অল্পে ছিল খুশি
খুশি ছিল ঘেঁষাঘেঁষির ঘরে,
সেই গেছে, হায়, হাওয়ার সঙ্গে মিশে,
দিয়ে গেছে, জায়গা খালি করে ।
ছেড়ে গেছে পুতুল, পুঁতির মালা,
ছেড়ে গেছে মায়ের কোলের দাবি;
ভয়-তরাসে ছিল যে সব-চেয়ে
সেই খুলেছে আঁধার ঘরের চাবি ।...চ'লে গেছে একলা চুপে চুপে--
দিনের আলো গেছে আঁধার ক'রে;
যাবার বেলা টের পেলো না কেহ,
পারলে না কেউ রাখতে তারে ধ'রে।
চলে গেলো, --পড়তে চোখের পাতা,--
বিসর্জনের বাজনা শুনে বুঝি !
হারিয়ে গেলো--অজানাদের ভিড়ে,
হারিয়ে গেলো-পেলাম না আর খুঁজি।হারিয়ে গেছে--হারিয়ে গেছে, ওরে !
হারিয়ে গেছে বোল-বলা সেই বাঁশি
হারিয়ে গেছে কচি সে মুখখানি,
দুধে-ধোওয়া কচি দাঁতের হাসি।
আঁচল খুলে হঠাৎ স্রোতের জলে
ভেসে গেছে শিউলি ফুলের রাশি ,
ঢুকেছে হায় শশ্মানঘরের মাঝে
ঘর ছেড়ে তাই হৃদয় শশ্মান-বাসী ।সবচেয়ে যে ছোটো কাপড়গুলি
সেগুলি কেউ দেয় না মেলে ছাদে,
যে শয্যাটি সবার চেয়ে ছোটো
আজকে সেটি শূন্যে পড়ে কাঁদে,
সব-চেয়ে যে শেষে এসেছিলো
সে গিয়েছে সবার আগে সরে
ছোট্ট যে জন ছিল রে সব চেয়ে
সে দিয়েছে সকল শূন্য করে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/chinnomukul/
|
127
|
আল মাহমুদ
|
ডাক
|
চিন্তামূলক
|
তোমাকে ডেকেছি বলে আমি
নড়ে ওঠে জগত জঙ্গম
পর্বতও পাঠায় সেলামি
নদী ফেলে সাগরে কদম।ঝাক বেঁধে পাখি উড়ে যায়
চঞ্চুতে আহার্যের স্তব
কথা বলো, হাওয়ার ভাষায়
সীমাহীন নীলিমা নীরব।
আমিও ক্ষুধার্ত বটে আজ
ওষ্ঠে জমা ব্যার্থতার নুন,
জীবন কি ডানারই আওয়াজ
কিংবা কোন উড়ন্ত শকুন?
আজ একটু ঠাঁই দাও মেঘে
সাঁকো বাঁধো শূন্যের ওপর
বুকে টানো মাংসের আবেগে
যেন নিজ সন্তানের জ্বর।আর নয় প্রেম, দাও দয়া
আরোগ্যের গন্ধে ভরা হাত
নিঃসীম আকাশে শ্বেত বয়া
ছোঁয় যেন আমার বরাত।
ভাগ্যেরও অদৃশ্যে বসে যিনি
ঠিক রাখে আত্নার বাদাম।
আমি ঠিক চিনি বা না চিনি
তারই প্রতি অজস্র সালাম।তোমাকে ডেকেছি বলে আমি
নড়ে ওঠে জগত জঙ্গম
পর্বতও পাঠায় সেলামি
নদী ফেলে সাগরে কদম।ঝাক বেঁধে পাখি উড়ে যায়
চঞ্চুতে আহার্যের স্তব
কথা বলো, হাওয়ার ভাষায়
সীমাহীন নীলিমা নীরব।
আমিও ক্ষুধার্ত বটে আজ
ওষ্ঠে জমা ব্যার্থতার নুন,
জীবন কি ডানারই আওয়াজ
কিংবা কোন উড়ন্ত শকুন?
আজ একটু ঠাঁই দাও মেঘে
সাঁকো বাঁধো শূন্যের ওপর
বুকে টানো মাংসের আবেগে
যেন নিজ সন্তানের জ্বর।আর নয় প্রেম, দাও দয়া
আরোগ্যের গন্ধে ভরা হাত
নিঃসীম আকাশে শ্বেত বয়া
ছোঁয় যেন আমার বরাত।
ভাগ্যেরও অদৃশ্যে বসে যিনি
ঠিক রাখে আত্নার বাদাম।
আমি ঠিক চিনি বা না চিনি
তারই প্রতি অজস্র সালাম।তোমাকে ডেকেছি বলে আমি
নড়ে ওঠে জগত জঙ্গম
পর্বতও পাঠায় সেলামি
নদী ফেলে সাগরে কদম।ঝাক বেঁধে পাখি উড়ে যায়
চঞ্চুতে আহার্যের স্তব
কথা বলো, হাওয়ার ভাষায়
সীমাহীন নীলিমা নীরব।
আমিও ক্ষুধার্ত বটে আজ
ওষ্ঠে জমা ব্যার্থতার নুন,
জীবন কি ডানারই আওয়াজ
কিংবা কোন উড়ন্ত শকুন?
আজ একটু ঠাঁই দাও মেঘে
সাঁকো বাঁধো শূন্যের ওপর
বুকে টানো মাংসের আবেগে
যেন নিজ সন্তানের জ্বর।আর নয় প্রেম, দাও দয়া
আরোগ্যের গন্ধে ভরা হাত
নিঃসীম আকাশে শ্বেত বয়া
ছোঁয় যেন আমার বরাত।
ভাগ্যেরও অদৃশ্যে বসে যিনি
ঠিক রাখে আত্নার বাদাম।
আমি ঠিক চিনি বা না চিনি
তারই প্রতি অজস্র সালাম।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%95-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6/
|
3877
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শেষ কথা (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
সনেট
|
মাঝে মাঝে মনে হয়, শত কথা-ভারে
হৃদয় পড়েছে যেন নুয়ে একেবারে।
যেন কোন্ ভাবযজ্ঞ বহু আয়োজনে
চলিতেছে অন্তরের সুদূর সদনে।
অধীর সিন্ধুর মতো কলধ্বনি তার
অতি দূর হতে কানে আসে বারম্বার।
মনে হয় কত ছন্দ, কত-না রাগিণী,
কত-না আশ্চর্য গাথা, অপূর্ব কাহিনী,
যতকিছু রচিয়াছে যত কবিগণে
সব মিলিতেছে আসি অপূর্ব মিলনে—
এখনি বেদনাভরে ফাটি গিয়া প্রাণ
উচ্ছ্বসি উঠিবে যেন সেই মহাগান।
অবশেষে বুক ফেটে শুধু বলি আসি—
হে চিরসুন্দর, আমি তোরে ভালবাসি। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shesh-kotha-choitali/
|
2936
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কো তুঁহু বোলবি মোয়
|
ভক্তিমূলক
|
কো তুঁহু বোলবি মোয় !
হৃদয়মাহ মঝু জাগসি অনুখন ,
আঁখউপর তুঁহু রচলহি আসন ,
অরুণ নয়ন তব মরমসঙে মম
নিমিখ ন অন্তর হোয় ।
কো তুঁহু বোলবি মোয় !
হৃদয়কমল তব চরণে টলমল ,
নয়নযুগল মম উছলে ছলছল ,
প্রেমপূর্ণ তনু পুলকে ঢলঢল
চাহে মিলাইতে তোয় ।
কো তুঁহু বোলবি মোয় !
বাঁশরিধ্বনি তুহ অমিয় গরল রে ,
হৃদয় বিদারয়ি হৃদয় হরল রে ,
আকুল কাকলি ভুবন ভরল রে ,
উতল প্রাণ উতরোয় ।
কো তুঁহু বোলবি মোয় !
হেরি হাসি তব মধুঋতু ধাওল ,
শুনয়ি বাঁশি তব পিককুল গাওল ,
বিকল ভ্রমরসম ত্রিভুবন আওল ,
চরণকমলযুগ ছোঁয় ।
কো তুহু বোলবি মোয় !
গোপবধূজন বিকশিতযৌবন ,
পুলকিত যমুনা , মুকুলিত উপবন ,
নীলনীর'পর ধীর সমীরণ ,
পলকে প্রাণমন খোয়
কো তুঁহু বোলবি মোয় !
তৃষিত আঁখি , তব মুখ'পর বিহরই ,
মধুর পরশ তব রাধা শিহরই ,
প্রেমরতন ভরি হৃদয় প্রাণ লই
পদতলে অপনা থোয় ।
কো তুঁহু বোলবি মোয় !
কো তুঁহু কো তুঁহু সব জন পুছয়ি ,
অনুদিন সঘন নয়নজল মুছয়ি ,
যাচে ভানু , সব সংশয় ঘুচয়ি ,
জনম চরণ'পর গোয় ।
কো তুঁহু বোলবি মোয় !
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ku-tuhu-bulbe-ma/
|
4452
|
শামসুর রাহমান
|
এই তো দাঁড়িয়ে আছি
|
প্রেমমূলক
|
এই তো দাঁড়িয়ে আছি তোমার কাছেই
কিছু কথা বলার আশায়। জানতে কি
চাও সেই কথা
এখনই রাত না পোহাবার
আগেই? কী করে সম্ভব তা? সে-সাধ্য আমার নেই।
অপেক্ষা তোমাকে কিছু করতেই হবে।এই তো আমার হাত ছড়ানো তোমার
দিকেই কখন থেকে-স্পর্শ করো, তুলে
নাও হাত; দেখবে হাতের স্পর্শ যে-কোনও যুবার
চেয়ে কিছু কম স্পষ্ট জলজ্যান্ত নয়।দেখছ তো আমাকে এখন বড় বেশি
কাছ থেকে। পাচ্ছ নাকি উষ্ণ
বিশ্বাস বয়স্ক মানবের? লক্ষ করলেই, হে মানবী,
বুঝবে তোমার গালে, ঠোঁটে পুরুষের চূম্বনের ফুলঝুরি!মেয়ে তুমি আমার মাথায় কিঞ্চিৎ কালির
আভা দেখে চমকে উঠো না। যদি ভেবে
দ্যাখো, ঠিক দেখতে পাবেই পৌরুষের গুণাবলি
এখনও অক্ষুণ্ণ খুব। তোমার কামিনী
প্রাণের বাগান তীব্র প্রস্ফুটিত হবে ঠিক। তুমি
আমাকে বসন্তকালে ধুলোয় লুটিয়ে ফেলে যাবে না নিশ্চিত। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ei-to-darie-achi/
|
3532
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বসুন্ধরা
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমারে ফিরায়ে লহ অয়ি বসুন্ধরে,
কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে,
বিপুল অঞ্চল-তলে। ওগো মা মৃন্ময়ী,
তোমার মৃত্তিকা-মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে রই;
দিগ্বিদিকে আপনারে দিই বিস্তারিয়া
বসন্তের আনন্দের মতো; বিদারিয়া
এ বক্ষপঞ্জর, টুটিয়া পাষাণ-বন্ধ
সংকীর্ণ প্রাচীর, আপনার নিরানন্দ
অন্ধ কারাগার, হিল্লোলিয়া, মর্মরিয়া,
কম্পিয়া, স্খলিয়া, বিকিরিয়া, বিচ্ছুরিয়া,
শিহরিয়া, সচকিয়া আলোকে পুলকে
প্রবাহিয়া চলে যাই সমস্ত ভূলোকে
প্রান্ত হতে প্রান্তভাগে, উত্তরে দক্ষিণে,
পুরবে পশ্চিমে– শৈবালে শাদ্বলে তৃণে
শাখায় বল্কলে পত্রে উঠি সরসিয়া
নিগূঢ় জীবনরসে; যাই পরশিয়া
স্বর্ণশীর্ষে আনমিত শস্যক্ষেত্রতল
অঙ্গুলির আন্দোলনে; নব পুষ্পদল
করি পূর্ণ সংগোপনে সুবর্ণলেখায়
সুধাগন্ধে মধুবিন্দুভারে; নীলিমায়
পরিব্যাপ্ত করি দিয়া মহাসিন্ধুনীর
তীরে তীরে করি নৃত্য স্তব্ধ ধরণীর,
অনন্ত কল্লোলগীতে; উল্লসিত রঙ্গে
ভাষা প্রসারিয়া দিই তরঙ্গে তরঙ্গে
দিক-দিগন্তরে; শুভ্র-উত্তরীয়প্রায়
শৈলশৃঙ্গে বিছাইয়া দিই আপনায়
নিষ্কলঙ্ক নীহারের উত্তুঙ্গ নির্জনে,
নিঃশব্দ নিভৃতে।
যে ইচ্ছা গোপনে মনে
উৎসসম উঠিতেছে অজ্ঞাতে আমার
বহুকাল ধ’রে, হৃদয়ের চারি ধার
ক্রমে পরিপূর্ণ করি বাহিরিতে চাহে
উদ্বেল উদ্দাম মুক্ত উদার প্রবাহে
সিঞ্চিতে তোমায়– ব্যথিত সে বাসনারে
বন্ধমুক্ত করি দিয়া শতলক্ষ ধারে
দেশে দেশে দিকে দিকে পাঠাব কেমনে
অন্তর ভেদিয়া! বসি শুধু গৃহকোণে
লুব্ধ চিত্তে করিতেছি সদা অধ্যয়ন,
দেশে দেশান্তরে কারা করেছে ভ্রমণ
কৌতূহলবশে; আমি তাহাদের সনে
করিতেছি তোমারে বেষ্টন মনে মনে
কল্পনার জালে।
সুদুর্গম দূরদেশ–
পথশূন্য তরুশূন্য প্রান্তর অশেষ,
মহাপিপাসার রঙ্গভূমি; রৌদ্রালোকে
জ্বলন্ত বালুকারাশি সূচি বিঁধে চোখে;
দিগন্তবিস্তৃত যেন ধুলিশয্যা-‘পরে
জ্বরাতুরা বসুন্ধরা লুটাইছে পড়ে
তপ্তদেহ, উষ্ণশ্বাস বহ্নিজ্বালাময়,
শুষ্ককণ্ঠ, সঙ্গহীন, নিঃশব্দ, নির্দয়।
কতদিন গৃহপ্রান্তে বসি বাতায়নে
দূরদূরান্তের দৃশ্য আঁকিয়াছি মনে
চাহিয়া সম্মুখে; চারি দিকে শৈলমালা,
মধ্যে নীল সরোবর নিস্তব্ধ নিরালা
স্ফটিকনির্মল স্বচ্ছ; খণ্ড মেঘগণ
মাতৃস্তনপানরত শিশুর মতন
পড়ে আছে শিখর আঁকড়ি; হিমরেখা
নীলগিরিশ্রেণী-‘পরে দূরে যায় দেখা
দৃষ্টিরোধ করি, যেন নিশ্চল নিষেধ
উঠিয়াছে সারি সারি স্বর্গ করি ভেদ
যোগমগ্ন ধূর্জটির তপোবন-দ্বারে।
মনে মনে ভ্রমিয়াছি দূর সিন্ধুপারে
মহামেরুদেশে– যেখানে লয়েছে ধরা
অনন্তকুমারীব্রত, হিমবস্ত্রপরা,
নিঃসঙ্গ, নিঃস্পৃহ, সর্ব-আভরণহীন;
যেথা দীর্ঘরাত্রিশেষে ফিরে আসে দিন
শব্দশূন্য সংগীতবিহীন; রাত্রি আসে,
ঘুমাবার কেহ নাই, অনন্ত আকাশে
অনিমেষ জেগে থাকে নিদ্রাতন্দ্রাহত
শূন্যশয্যা মৃতপুত্রা জননীর মতো।
নূতন দেশের নাম যত পাঠ করি,
বিচিত্র বর্ণনা শুনি, চিত্ত অগ্রসরি
সমস্ত স্পর্শিতে চাহে– সমুদ্রের তটে
ছোটো ছোটো নীলবর্ণ পর্বতসংকটে
একখানি গ্রাম, তীরে শুকাইছে জাল,
জলে ভাসিতেছে তরী, উড়িতেছে পাল,
জেলে ধরিতেছে মাছ, গিরিমধ্যপথে
সংকীর্ণ নদীটি চলি আসে কোনোমতে
আঁকিয়া বাঁকিয়া; ইচ্ছা করে, সে নিভৃত
গিরিক্রোড়ে সুখাসীন ঊর্মিমুখরিত
লোকনীড়খানি হৃদয়ে বেষ্টিয়া ধরি
বাহুপাশে। ইচ্ছা করে, আপনার করি
যেখানে যা-কিছু আছে; নদীস্রোতোনীরে
আপনারে গলাইয়া দুই তীরে তীরে
নব নব লোকালয়ে করে যাই দান
পিপাসার জল, গেয়ে যাই কলগান
দিবসে নিশীথে; পৃথিবীর মাঝখানে
উদয়সমুদ্র হতে অস্তসিন্ধু-পানে
প্রসারিয়া আপনারে, তুঙ্গ গিরিরাজি
আপনার সুদুর্গম রহস্যে বিরাজি,
কঠিন পাষাণক্রোড়ে তীব্র হিমবায়ে
মানুষ করিয়া তুলি লুকায়ে লুকায়ে
নব নব জাতি। ইচ্ছা করে মনে মনে,
স্বজাতি হইয়া থাকি সর্বলোকসনে
দেশে দেশান্তরে; উষ্ট্রদুগ্ধ করি পান
মরুতে মানুষ হই আরব-সন্তান
দুর্দম স্বাধীন; তিব্বতের গিরিতটে
নির্লিপ্ত প্রস্তরপুরী-মাঝে, বৌদ্ধমঠে
করি বিচরণ। দ্রাক্ষাপায়ী পারসিক
গোলাপকাননবাসী, তাতার নির্ভীক
অশ্বারূঢ়, শিষ্টাচারী সতেজ জাপান,
প্রবীণ প্রাচীন চীন নিশিদিনমান
কর্ম-অনুরত– সকলের ঘরে ঘরে
জন্মলাভ করে লই হেন ইচ্ছা করে।
অরুগ্ণ বলিষ্ঠ হিংস্র নগ্ন বর্বরতা–
নাহি কোনো ধর্মাধর্ম, নাহি কোনো প্রথা,
নাহি কোনো বাধাবন্ধ, নাই চিন্তাজ্বর,
নাহি কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব, নাই ঘর পর,
উন্মুক্ত জীবনস্রোত বহে দিনরাত
সম্মুখে আঘাত করি সহিয়া আঘাত
অকাতরে; পরিতাপ-জর্জর পরানে
বৃথা ক্ষোভে নাহি চায় অতীতের পানে,
ভবিষ্যৎ নাহি হেরে মিথ্যা দুরাশায়–
বর্তমান-তরঙ্গের চূড়ায় চূড়ায়
নৃত্য করে চলে যায় আবেগে উল্লাসি–
উচ্ছৃঙ্খল সে-জীবন সেও ভালোবাসি;
কত বার ইচ্ছা করে সেই প্রাণঝড়ে
ছুটিয়া চলিয়া যাই পূর্ণপালভরে
লঘু তরী-সম।
হিংস্র ব্যাঘ্র অটবীর
আপন প্রচণ্ড বলে প্রকাণ্ড শরীর
বহিতেছে অবহেলে; দেহ দীপ্তোজ্জ্বল
অরণ্যমেঘের তলে প্রচ্ছন্ন-অনল
বজ্রের মতন, রুদ্র মেঘমন্দ্র স্বরে
পড়ে আসি অতর্কিত শিকারের ‘পরে
বিদ্যুতের বেগে; অনায়াস সে মহিমা,
হিংসাতীব্র সে আনন্দ, সে দৃপ্ত গরিমা,
ইচ্ছা করে একবার লভি তার স্বাদ।
ইচ্ছা করে, বারবার মিটাইতে সাধ
পান করি বিশ্বের সকল পাত্র হতে
আনন্দমদিরাধারা নব নব স্রোতে।
হে সুন্দরী বসুন্ধরে, তোমা পানে চেয়ে
কত বার প্রাণ মোর উঠিয়াছে গেয়ে
প্রকাণ্ড উল্লাসভরে; ইচ্ছা করিয়াছে–
সবলে আঁকড়ি ধরি এ বক্ষের কাছে
সমুদ্রমেখলাপরা তব কটিদেশ;
প্রভাত-রৌদ্রের মতো অনন্ত অশেষ
ব্যাপ্ত হয়ে দিকে দিকে, অরণ্যে ভূধরে
কম্পমান পল্লবের হিল্লোলের ‘পরে
করি নৃত্য সারাবেলা, করিয়া চুম্বন
প্রত্যেক কুসুমকলি, করি’ আলিঙ্গন
সঘন কোমল শ্যাম তৃণক্ষেত্রগুলি,
প্রত্যেক তরঙ্গ-‘পরে সারাদিন দুলি’
আনন্দ-দোলায়। রজনীতে চূপে চূপে
নিঃশব্দ চরণে, বিশ্বব্যাপী নিদ্রারূপে
তোমার সমস্ত পশুপক্ষীর নয়নে
অঙ্গুলি বুলায়ে দিই, শয়নে শয়নে
নীড়ে নীড়ে গৃহে গৃহে গুহায় গুহায়
করিয়া প্রবেশ, বৃহৎ অঞ্চলপ্রায়
আপনারে বিস্তারিয়া ঢাকি বিশ্বভূমি
সুস্নিগ্ধ আঁধারে।
আমার পৃথিবী তুমি
বহু বরষের, তোমার মৃত্তিকাসনে
আমারে মিশায়ে লয়ে অনন্ত গগনে
অশ্রান্ত চরণে করিয়াছ প্রদক্ষিণ
সবিতৃমণ্ডল, অসংখ্য রজনীদিন
যুগযুগান্তর ধরি আমার মাঝারে
উঠিয়াছে তৃণ তব, পুষ্প ভারে ভারে
ফুটিয়াছে, বর্ষণ করেছে তরুরাজি
পত্রফুলফল গন্ধরেণু। তাই আজি
কোনো দিন আনমনে বসিয়া একাকী
পদ্মাতীরে, সম্মুখে মেলিয়া মুগ্ধ আঁখি
সর্ব অঙ্গে সর্ব মনে অনুভব করি–
তোমার মৃত্তিকা-মাঝে কেমনে শিহরি
উঠিতেছে তৃণাঙ্কুর, তোমার অন্তরে
কী জীবনরসধারা অহর্নিশি ধরে
করিতেছে সঞ্চরণ, কুসুমমুকুল
কী অন্ধ আনন্দভরে ফুটিয়া আকুল
সুন্দর বৃন্তের মুখে, নব রৌদ্রালোকে
তরুলতাতৃণগুল্ম কী গূঢ় পুলকে
কী মূঢ় প্রমোদরসে উঠে হরষিয়া–
মাতৃস্তনপানশ্রান্ত পরিতৃপ্ত-হিয়া
সুখস্বপ্নহাস্যমুখ শিশুর মতন।
তাই আজি কোনো দিন– শরৎ-কিরণ
পড়ে যবে পক্কশীর্ষ স্বর্ণক্ষেত্র-‘পরে,
নারিকেলদলগুলি কাঁপে বায়ুভরে
আলোকে ঝিকিয়া, জাগে মহাব্যাকুলতা–
মনে পড়ে বুঝি সেই দিবসের কথা
মন যবে ছিল মোর সর্বব্যাপী হয়ে
জলে স্থলে, অরণ্যের পল্লবনিলয়ে,
আকাশের নীলিমায়। ডাকে যেন মোরে
অব্যক্ত আহ্বানরবে শত বার করে
সমস্ত ভুবন; সে বিচিত্র সে বৃহৎ
খেলাঘর হতে, মিশ্রিত মর্মরবৎ
শুনিবারে পাই যেন চিরদিনকার
সঙ্গীদের লক্ষবিধ আনন্দ-খেলার
পরিচিত রব। সেথায় ফিরায়ে লহ
মোরে আরবার; দূর করো সে বিরহ
যে বিরহ থেকে থেকে জেগে ওঠে মনে
হেরি যবে সম্মুখেতে সন্ধ্যার কিরণে
বিশাল প্রান্তর, যবে ফিরে গাভীগুলি
দূর গোষ্ঠে–মাঠপথে উড়াইয়া ধূলি,
তরুঘেরা গ্রাম হতে উঠে ধূমলেখা
সন্ধ্যাকাশে; যবে চন্দ্র দূরে দেয় দেখা
শ্রান্ত পথিকের মতো অতি ধীরে ধীরে
নদীপ্রান্তে জনশূন্য বালুকার তীরে,
মনে হয় আপনারে একাকী প্রবাসী
নির্বাসিত, বাহু বাড়াইয়া ধেয়ে আসি
সমস্ত বাহিরখানি লইতে অন্তরে–
এ আকাশ, এ ধরণী, এই নদী-‘পরে
শুভ্র শান্ত সুপ্ত জ্যোৎস্নারাশি। কিছু নাহি
পারি পরশিতে, শুধু শূন্যে থাকি চাহি
বিষাদব্যাকুল। আমারে ফিরায়ে লহ
সেই সর্ব-মাঝে, যেথা হতে অহরহ
অঙ্কুরিছে মুকুলিছে মুঞ্জরিছে প্রাণ
শতেক সহস্ররূপে, গুঞ্জরিছে গান
শতলক্ষ সুরে, উচ্ছ্বসি উঠিছে নৃত্য
অসংখ্য ভঙ্গিতে, প্রবাহি যেতেছে চিত্ত
ভাবস্রোতে, ছিদ্রে ছিদ্রে বাজিতেছে বেণু
দাঁড়ায়ে রয়েছ তুমি শ্যাম কল্পধেনু,
তোমারে সহস্র দিকে করিছে দোহন
তরুলতা পশুপক্ষী কত অগণন
তৃষিত পরানি যত, আনন্দের রস
কত রূপে হতেছে বর্ষণ, দিক দশ
ধ্বনিছে কল্লোলগীতে। নিখিলের সেই
বিচিত্র আনন্দ যত এক মুহূর্তেই
একত্রে করিব আস্বাদন, এক হয়ে
সকলের সনে। আমার আনন্দ লয়ে
হবে না কি শ্যামতর অরণ্য তোমার,
প্রভাত-আলোক-মাঝে হবে না সঞ্চার
নবীন কিরণকম্প? মোর মুগ্ধ ভাবে
আকাশ ধরণীতল আঁকা হয়ে যাবে
হৃদয়ের রঙে– যা দেখে কবির মনে
জাগিবে কবিতা, প্রেমিকের দু-নয়নে
লাগিবে ভাবের ঘোর, বিহঙ্গের মুখে
সহসা আসিবে গান। সহস্রের সুখে
রঞ্জিত হইয়া আছে সর্বাঙ্গ তোমার
হে বসুধে, জীবস্রোত কত বারম্বার
তোমারে মণ্ডিত করি আপন জীবনে
গিয়েছে ফিরেছে, তোমার মৃত্তিকাসনে
মিশায়েছে অন্তরে প্রেম, গেছে লিখে
কত লেখা, বিছায়েছে কত দিকে দিকে
ব্যাকুল প্রাণের আলিঙ্গন; তারি সনে
আমার সমস্ত প্রেম মিশায়ে যতনে
তোমার অঞ্চলখানি দিব রাঙাইয়া
সজীব বরনে; আমার সকল দিয়া
সাজাব তোমারে। নদীজলে মোর গান
পাবে না কি শুনিবারে কোনো মুগ্ধ কান
নদীকূল হতে? উষালোকে মোর হাসি
পাবে না কি দেখিবারে কোনো মর্তবাসী
নিদ্রা হতে উঠি? আজ শতবর্ষ পরে
এ সুন্দর অরণ্যের পল্লবের স্তরে
কাঁপিবে না আমার পরান? ঘরে ঘরে
কত শত নরনারী চিরকাল ধ’রে
পাতিবে সংসারখেলা, তাহাদের প্রেমে
কিছু কি রব না আমি? আসিব না নেমে
তাদের মুখের ‘পরে হাসির মতন,
তাদের সর্বাঙ্গ-মাঝে সরস যৌবন,
তাদের বসন্তদিনে অকস্মাৎ সুখ,
তাদের মনের কোণে নবীন উন্মুখ
প্রেমের অঙ্কুররূপে; ছেড়ে দিবে তুমি
আমারে কি একেবারে ওগো মাতৃভূমি–
যুগযুগান্তের মহা মৃত্তিকা-বন্ধন
সহসা কি ছিঁড়ে যাবে? করিব গমন
ছাড়ি লক্ষ বরষের স্নিগ্ধ ক্রোড়খানি?
চতুর্দিক হতে মোরে লবে না কি টানি
এই সব তরু লতা গিরি নদী বন,
এই চিরদিবসের সুনীল গগন,
এ জীবনপরিপূর্ণ উদার সমীর,
জাগরণপূর্ণ আলো, সমস্ত প্রাণীর
অন্তরে অন্তরে গাঁথা জীবন-সমাজ?
ফিরিব তোমারে ঘিরি, করিব বিরাজ
তোমার আত্মীয়-মাঝে; কীট পশু পাখি
তরু গুল্ম লতা রূপে বারম্বার ডাকি
আমারে লইবে তব প্রাণতপ্ত বুকে;
যুগে যুগে জন্মে জন্মে স্তন দিয়ে মুখে
মিটাইবে জীবনের শত লক্ষ ক্ষুধা
শত লক্ষ আনন্দের স্তন্যরসসুধা
নিঃশেষে নিবিড় স্নেহে করাইয়া পান।
তার পরে ধরিত্রীর যুবক সন্তান
বাহিরিব জগতের মহাদেশ-মাঝে
অতি দূর দূরান্তরে জ্যোতিষ্কসমাজে
সুদুর্গম পথে। এখনো মিটে নি আশা,
এখনো তোমার স্তন-অমৃত-পিপাসা
মুখেতে রয়েছে লাগি, তোমার আনন
এখনো জাগায় চোখে সুন্দর স্বপন,
এখনো কিছুই তব করি নাই শেষ,
সকলি রহস্যপূর্ণ, নেত্র অনিমেষ
বিস্ময়ের শেষতল খুঁজে নাহি পায়,
এখনো তোমার বুকে আছি শিশুপ্রায়
মুখপানে চেয়ে। জননী, লহ গো মোরে
সঘনবন্ধন তব বাহুযুগে ধরে–
আমারে করিয়া লহ তোমার বুকের–
তোমার বিপুল প্রাণ বিচিত্র সুখের
উৎস উঠিতেছে যেথা, সে গোপন পুরে
আমারে লইয়া যাও– রাখিয়ো না দূরে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/420.html
|
2731
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমি অতি পুরাতন
|
চিন্তামূলক
|
আমি অতি পুরাতন,
এ খাতা হালের
হিসাব রাখিতে চাহে
নূতন কালের।
তবুও ভরসা পাই—
আছে কোনো গুণ,
ভিতরে নবীন থাকে
অমর ফাগুন।
পুরাতন চাঁপাগাছে
নূতনের আশা
নবীন কুসুমে আনে
অমৃতের ভাষা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ami-oti-puraton/
|
828
|
জসীম উদ্দীন
|
নক্সী কাঁথার মাঠ - আট
|
কাহিনীকাব্য
|
(আট)বিয়ের কুটুম এসেছে আজ সাজুর মায়ের বাড়ি,
কাছারী ঘর গুম্-গুমা-গুম্ , লোক হয়েছে ভারি |
গোয়াল-ঘরে ঝেড়ে পুছে বিছান দিল পাতি ;
বসল গাঁয়ের মোল্লা মোড়ল গল্প-গানে মাতি |
কেতাব পড়ার উঠল তুফান ; ---চম্পা কালু গাজী,
মামুদ হানিফ সোনবান ও জয়গুন বিবি আজি ;
সবাই মিলে ফিরছে যেন হাত ধরাধর করি |
কেতাব পড়ার সুরে সুরে চরণ ধরি ধরি |
পড়ে কেতাব গাঁয়ের মোড়ল নাচিয়ে ঘন দাড়ি,
পড়ে কেতাব গাঁয়ের মোল্লা মাঠ-ফাটা ডাক ছাড়ি |কৌতুহলী গাঁয়ের লোকে শুনছে পেতে কান,
জুমজুমেরি পানি যেন করছে তারা পান!
দেখছে কখন মনের সুখে মামুদ হানিফ যায়,
লাল ঘোড়া তার উড়ছে যেন লাল পাখিটির প্রায় |
কাতার কাতার সৈন্য কাটে যেমন কলার বাগ,
মেষের পালে পড়ছে যেন সুন্দর-বুনো বাঘ !
স্বপ্ন দেখে, জয়গুন বিবি পালঙ্কেতে শুয়ে ;
মেঘের বরণ চুলগুলি তার পড়ছে এসে ভূঁয়ে ;
আকাশেরি চাঁদ সূরুজে মুখ দেখে পায় লাজ,
সেই কনেরে চোখের কাছে দেখছে চাষী আজ |
দেখছে চোখে কারবালাতে ইমাম হোসেন মরে,
রক্ত যাহার জমছে আজো সন্ধ্যা মেঘের গোরে ;
কারবালারি ময়দানে সে ব্যথার উপাখ্যান ;
সারা গাঁয়ের চোখের জলে করিয়া গেল সান |উঠান পরে হল্লা-করে পাড়ার ছেলে মেয়ে,
রঙিন বসন উড়ছে তাদের নধর তনু ছেয়ে |
কানা-ঘুষা করত যারা রূপার স্বভাব নিয়ে,
ঘোর কলিকাল দেখে যাদের কানত সদা হিয়ে ;
তারাই এখন বিয়ের কাজে ফিরছে সবার আগে,
ভাভা গড়ার সকল কাজেই তাদের সমান লাগে |
বউ-ঝিরা সব রান্না-বাড়ায় ব্যস্ত সকল ক্ষণ ;
সারা বাড়ি আনন্দ আজ খুশী সবার মন |
বাহিরে আজ এই যে আমোদ দেখছে জনে জনে ;
ইহার চেয়ে দ্বিগুণ আমোদ উঠছে রূপার মনে |
ফুল পাগড়ী মাথায় তাহার 'জোড়া জামা' গায়,
তেল-কুচ্-কাচ্ কালো রঙে ঝলক্ দিয়ে যায় |বউ-ঝিরা সব ঘরের বেড়ার খানিক করে ফাঁক,
নতুন দুলার রূপ দেখি আজ চক্ষে মারে তাক |
এমন সময় শোর উঠিল--- 'বিয়ের যোগাড় কর,
জলদী করে দুলার মুখে পান শরবত ধর |'
সাজুর মামা খটকা লাগায়, 'বিয়ের কিছু গৌণ,
সাদার পাতা আনেনি তাই বেজার সবার মন |'
রূপার মামা লম্ফে দাঁড়ায় দম্ভে চলে বাড়ি ;
সেরেক পাঁচেক সাদার পাতা আনল তাড়াতাড়ি |
কনের খালু উঠিয়া বলে 'সিঁদুর হল ঊনা!'
রূপার খালু আনিয়া দিল যা লাগে তার দুনা!কনের চাচার মন উঠে না, 'খাটো হয়েছে শাড়ী |'
রূপার চাচা দিল তখন 'ইংরাজী বোল ছাড়ি'|
'কিরে বেটা বকিস নাকি?' কনের চাচা হাঁকে,
জালির কলার পাতার মত গা কাঁপে তার রাগে |
'কোথায় গেলি ছদন চাচা, ছমির শেখের নাতি,
দেখিয়ে দেই দুলার চাচার কতই বুকের ছাতি!
বেরো বেটা নওশা নিয়ে, দিব না আজ বিয়া ;'
বলতে যেন আগুন ছোটে চোখ দুটি তার দিয়া |বরপক্ষের লোকগুলি সব আর যে বরের চাচা,
পালিয়ে যেতে খুঁজছে যেন রশুই ঘরের মাচা |মোড়ল এসে কনের চাচায় অনেক করে বলে,
থামিয়ে তারে বিয়ের কথা পাতেন কুতূহলে |
কনের চাচা বসল বরের চাচার কাছে,
কে বলে ঝড় এদের মাঝে হয়েছে যে পাছে!
মোল্লা তখন কলমা পড়ায় সাক্ষী-উকিল ডাকি,
বিয়ে রূপার হয়ে গেল, ক্ষীর-ভোজনী বাকি!তার মাঝেতে এমন তেমন হয়নি কিছু গোল,
কেবল একটি বিষয় নিয়ে উঠল হাসির রোল |
এয়োরা সব ক্ষীর ছোঁয়ায়ে কনের ঠোঁটের কাছে ;
সে ক্ষীর আবার ধরল যখন রূপার ঠোঁটের পাছে ;
রূপা তখন ফেলল খেয়ে ঠোঁট ছোঁয়া সেই ক্ষীর,
হাসির তুফান উঠল নেড়ে মেয়ের দলের ভীড় |
ভাবল রূপাই---অমন ঠোঁটে যে ক্ষীর গেছে ছুঁয়ে,
দোজখ যাবে না খেয়ে তা ফেলবে যে জন ভূঁয়ে |
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-8/
|
1640
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
ফলতায় রবিবার
|
প্রকৃতিমূলক
|
কেউ কি শহরে যাবে? কেউ যাবে? কেউই যাব না।
বরং ঘনিষ্ঠ এই সন্ধ্যার সুন্দর হাওয়া খাব,
বরং লুণ্ঠিত এই ঘাসে-ঘাসে আকণ্ঠ বেড়াব
আমি, অমিতাভ আর সিতাংশু।
সিতাংশু, এই ভাল,
শহরে ফিরব না। দ্যাখো, অমিতাভ, কতখানি সোনা
ডুবে গেল নদীর শরীরে। দ্যাখো, তরঙ্গের গায়ে
নৌকার লণ্ঠন থেকে আলো পড়ে, আলো কাঁপে, আলো
ভেঙে-ভেঙে যায়।
কেউ কি শহরে যাবে? কেউ যাবে? কেউই যাব না।
শহরে প্রচণ্ড ভিড়, অকারণ তুমিল চিৎকার,
লগ্ন নিয়নের বাতি। শহরে ফিরব না কেউ আর।
বরং চুপ করে দেখি, অন্ধকারে নদী কত কালো
হতে পারে, অপচয়ী সূর্য তার সবটুকু সোনা
কী করে ওড়ায়; দেখি মৃদুকণ্ঠ তরঙ্গমালায়
নৌকার লণ্ঠন থেকে আলো পড়ে, আলো কাঁপে, আলো
ভেঙে-ভেঙে যায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1690
|
985
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কাউকে ভালোবেসেছিলাম
|
প্রেমমূলক
|
কাউকে ভালোবেসেছিলাম জানি
তবুও ভালোবাসা,
দুপুরবেলার সূর্যে ভোরের শিশির
নেমে আসা,
ভোরের দিকে হৃদয় ফেরাই
যাই চলে যাই-
নীল সকালে যাই চলে যাই-
একটি নদী একটি অরূণ
শিউলি শিশির পাখি-
'আমরা মায়ার মনের জিনিস
মায়াবিনীর বেলায় শুধু জাগি'
বলছে সে কোন্ ত্রিকোণ থেকে
ছায়ার পরিভাষা।
কাউকে ভালোবেসেছিলাম, জানি,
তবুও ভালোবাসা।
সে কোন্ সুদূর মরুর মনে চলে গেছ
হায়, যাযাবর তুমি,
সেইখানে কি মিলবে বনহংসী বাঁধা বাসা!হায় বলিভূক, কখন ভেবেছিলে
মাটি ছেড়ে দূর আকাশের নীলে
ধূসর ডানার অগ্নি ছেড়ে দিলে
মিটে যাবে মায়াময়ী মাটির পিপাসা।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kaukey-valobeshechilam/
|
3282
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ননীলাল বাবু যাবে লঙ্কা
|
ছড়া
|
ননীলাল বাবু যাবে লঙ্কা;
শ্যালা শুনে এল, তার
ডাক-নাম টঙ্কা।বলে, “হেন উপদেশ তোমারে দিয়েছে সে কে,
আজও আছে রাক্ষস, হঠাৎ চেহারা দেখে
রামের সেবক ব’লে করে যদি শঙ্কা।আকৃতি প্রকৃতি তব হতে পারে জম্কালো,
দিদি যা বলুন, মুখ নয় কভু কম কালো —
খামকা তাদের ভয় লাগিবে আচমকা।
হয়তো বাজাবে রণডঙ্কা।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nonilal-babu-jabe-longka/
|
6033
|
হেলাল হাফিজ
|
তীর্থ
|
প্রেমমূলক
|
কেন নাড়া দিলে?
নাড়ালেই নড়ে না অনেক কিছু
তবু কেন এমন নাড়ালে?
পৃথিবীর তিন ভাগ সমান দু’চোখ যার
তাকে কেন একমাস শ্রাবণ দেখালে!
এক ওভাবে নাড়ালে?
যেটুকু নড়ে না তুমুলভাবে ভেতরে বাহিরে
কেন তাকে সেটুকু নাড়ালে?
ভয় দেখালেই ভয় পায় না অনেকে,
তবু তাকে সে ভয় দেখালে?
যে মানুষ জীবনের সব ক’টি শোক-দ্বীপে গেছে,
সব কিছু হারিয়েই সে মানুষ
হারাবার ভয় হারিয়েছে,
তার পর তীর্থ হয়েছে।
৩.৬.৮০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/106
|
2189
|
মহাদেব সাহা
|
দেখতে চাই
|
স্বদেশমূলক
|
আমাকে দেখাও তুমি দূরের আকাশ, ওই
দূরের পৃথিবী
আমি তো দেখতে চাই কাছের জীবন;
তুমি আমাকে দেখাতে চাও দূর নীহারিকা
সমুদ্র-সৈকত
বিস্তৃত দিগন্তরেখা, দূরের পাহাড়
তুমি চাও আরো দূরে, দূর দেশে
আমাকে দেখাতে কোনো রম্য দ্বীপ, স্নিগ্ধ
জলাশয়
আমি চাই কেবল দেখতে এই চেনা সরোবর,
কাছের নদীটি।
আমাকে দেখাতে চাও বিশাল জগৎ, নিয়ে যেতে
চাও অনন্তের কাছে
আমার দৃষ্টি খুবই সীমাবদ্ধ-
অতো দূরে যায় না আমার চোখ;
কেবল দেখতে চাই জীবনের কাছাকাছি
যেসব অঞ্চল-
দূরের নক্ষত্র থাক তুমি এই নিকটের মানচিত্র
আমাকে দেখাও;
দেখাও নদীর কুল, চালের কুমড়োলতা,
বাড়ির উঠোন
দূরের রহস্য নয়, কেবল বুঝতে চাই
তোমার হৃদয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1419
|
5586
|
সুকুমার রায়
|
কাঠ বুড়ো
|
হাস্যরসাত্মক
|
হাঁড়ি নিয়ে দাড়িমুখো কে–যেন কে বৃদ্ধ
রোদে বসে চেটে খায় ভিজে কাঠ সিদ্ধ ।
মাথা নেড়ে গান করে গুন্ গুন্ সঙ্গীত
ভাব দেখে মনে হয় না–জানি কি পণ্ডিত !
বিড়্ বিড়্ কি যে বকে নাহি তার অর্থ—
'আকাশেতে ঝুল ঝোলে, কাঠে তাই গর্ত ।'
টেকো মাথা তেতে ওঠে গায়ে ছোটে ঘর্ম,
রেগে বলে, 'কেবা বোঝে এ সবের মর্ম ?
আরে মোলো, গাধাগুলো একেবারে অন্ধ,
বোঝেনাকো কোনো কিছু খালি করে দ্বন্দ্ব ।
কোন্ কাঠে কত রস জানে নাকো তত্ত্ব,
একাদশী রাতে কেন কাঠে হয় গর্ত ?'আশে পাশে হিজি বিজি আঁকে কত অঙ্ক
ফাটা কাঠ ফুটো কাঠ হিসাব অসংখ্য ;
কোন্ ফুটো খেতে ভালো, কোন্টা বা মন্দ,
কোন্ কোন্ ফাটলের কি রকম গন্ধ ।
কাঠে কাঠে ঠুকে করে ঠকাঠক শব্দ ।
বলে, 'জানি কোন্ কাঠ কিসে হয় জব্দ ;
কাঠকুঠো ঘেঁটেঘুঁটে জানি আমি পষ্ট,
এ কাঠের বজ্জাতি কিসে হয় নষ্ট ।
কোন্ কাঠ পোষ মানে, কোন কাঠ শান্ত,
কোন্ কাঠ টিম্টিমে, কোন্টা বা জ্যান্ত ।
কোন্ কাঠে জ্ঞান নেই মিথ্যা কি সত্য,
আমি জানি কোন্ কাঠে কেন থাকে গর্ত ।'
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/kath-buro/
|
2444
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
বৃষ্টিতে ভিজে এল
|
ছড়া
|
ছাতা ছাড়া বের হয়েছে গেণ্ডারিয়ার মতি
হঠাৎ দেখি বৃষ্টি এল কী হবে তার গতি?
শার্ট ভিজল প্যান্ট ভিজল ভিজল জুতো জোড়া
মাথা ভিজল ঘাড় ভিজল ভিজল পায়ের গোড়া।
নাক ভিজল চোখ ভিজল ভিজল কানের লতি
বৃষ্টিতে আজ ধরা খেল গেণ্ডারিয়ায় মতি।
ভিজে হল চুপচুপে সে ভিজল সাড়া গা
সবকিছু ভিজলেও তার চুল ভিজল না!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2024
|
363
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
নারী
|
মানবতাবাদী
|
সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।
তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছে যত ফল,
অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।
জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,
সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’।
পুরুষ এনেছে যামিনী-শানি-, সমীরণ, বারিবাহ!
দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীতে হ’য়েছে বধূ,
পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে, নারী যোগায়েছে মধু।
শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল,
নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।
নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।
স্বর্ণ-রৌপ্যভার,
নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হ’য়েছে অলঙ্কার।
নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’
জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!
জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্।
কোন্ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।
পুরুষ হৃদয়-হীন,
মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।
ধরায় যাঁদের যশ ধরে না’ক অমর মহামানব,
বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উৎসব,
খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা,-
লব-কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন ক’রেছে সীতা।
নারী সে শিখা’ল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
দীপ্ত নয়নে পরা’ল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।
অদ্ভুতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
বুকে ক’রে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ!
তিনি নর-অবতার-
পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার।
পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর-
নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর।
সে যুগ হয়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী!
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও , উঠিছে ডঙ্কা বাজি’।
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!
যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।
শোনো মর্ত্যের জীব!
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী
করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্ সে অত্যাচারী?
আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,
মাথার ঘোম্টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!
যে ঘোমটা তোমা’ করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
দূর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!
ধরার দুলালী মেয়ে,
ফির না তো আর গিরিদরীবনে পাখী-সনে গান গেয়ে।
কখন আসিল ‘প্নুটো’ যমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,
ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!
সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হ’তে আছ মরি’
মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী।
ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’!
আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!
পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
লুটায়ে পড়িবে ও চরন-তলে দলিত যমের সাথে!
এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।
সেদিন সুদূর নয়-
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/538
|
2350
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
বঙ্গভাষা
|
সনেট
|
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;--
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি!
অনিদ্রায়, অনাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;--
কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল-কানন!
স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে, --
"ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যারে ফিরি ঘরে।"
পালিলাম আজ্ঞা সুখে' পাইলাম কালে
মাতৃভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/387
|
346
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
|
মানবতাবাদী
|
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি করআসছে এবার অনাগত প্রলয় নেশায় নৃত্য পাগল
সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক ভেনে ভাঙলো আগল
মৃত্যুগহন অন্ধকুপে মহাকালের চন্ডরূপে ধূম্রধূপে
বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর
ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর
তোরা সব জয়ধ্বনি করদ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়
বিন্দু তাহার নয়নজলে সপ্তমহাসিন্ধু দোলে কপোলতলে
বিশ্বমায়ের আসন তারই বিপুল বাহুর পর
হাঁকে ঐ জয় প্রলয়ংকর
তোরা সব জয়ধ্বনি করমাভৈঃ মাভৈঃ জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে
জরায় মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে
এবার মহানিশার শেষে আসবে ঊষা অরুণ হেসে তরুণ বেশে
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশুচাঁদের কর
আলো তার ভরবে এবার ঘর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/tora-shob-joyoddhoni-kor/
|
815
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ০২
|
কাহিনীকাব্য
|
দুই
এক কালা দতের কালি যা দ্যা কলম লেখি,
আর এক কালা চক্ষের মণি, যা দ্যা দৈনা দেখি,
—ও কালা, ঘরে রইতে দিলি না আমারে |
— মুর্শিদা গান
এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,
কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল!
কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া,
তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া |
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু,
গা-খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু |
বাদল-ধোয়া মেঘে কে গো মাখিয়ে দেছে তেল,
বিজলী মেয়ে পিছলে পড়ে ছড়িয়ে আলোর খেল |
কচি ধানের তুলতে চারা হয়ত কোনো চাষী,
মুখে তাহার ছড়িয়ে গেছে কতকটা তার হাসি |
কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি,
কালো দতের কালি দিয়েই কেতাব কোরাণ লেখি |
জনম কালো, মরণ কালো, কালো ভূবনময় ;
চাষীদের ওই কালো ছেলে সব করেছে জয় |
সোনায় যে জন সোনা বানায়, কিসের গরব তার’
রঙ পেলে ভাই গড়তে পারি রামধণুকের হার |
কালোয় যে-জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন,
তারি পদ-রজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন |
সোনা নহে, পিতল নহে, নহে সোনার মুখ,
কালো-বরণ চাষীর ছেলে জুড়ায় যেন বুক |
যে কালো তার মাঠেরি ধান, যে কালো তার গাঁও!
সেই কালোতে সিনান করি উজল তাহার গাও |
আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানী,
খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি |
জারীর গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে,
“শাল-সুন্দী-বেত” যেন ও, সকল কাজেই লাগে |
বুড়োরা কয়, ছেলে নয় ও, পাগাল লোহা যেন,
রূপাই যেমন বাপের বেটা, কেউ দেখেছ হেন?
যদিও রূপা নয়কো রূপাই, রূপার চেয়ে দামী,
এক কালেতে ওরই নামে সব গাঁ হবে নামী |
*****
পাগাল = ইস্পাত
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/805
|
4808
|
শামসুর রাহমান
|
তোমার ঘুম
|
প্রেমমূলক
|
কতকাল তোমার সঙ্গে আমার দেখা নেই,
তোমার কণ্ঠস্বর শুনি না কতকাল। যিশুখৃষ্ট
ক্রুশে বিদ্ধ হবার পর
যতদিন গেছে অস্তাচলে, ততদিন তোমার
চোখের চাওয়া আর
স্পর্শের বিদ্যুচ্চমক থেকে আমি বঞ্চিত, মনে হয়।যখন তোমাকে ফোন করি, তখন
ওপারে একটি ধ্বনি হতে থাকে ক্রমাগত একঘেয়েমির
মতো। কোনো সাড়া মেলে না।
কখনো কেউ রিসিভার তুলে রডিওর ঘোষকের
বলবার ধরন গলায় এনে জানায় তুমি বাড়ি নেই,
আবার কখনো শুনি ঘুমোচ্ছ তুমি।যখন ঘুমোবার কথা নয়, তখন ঘুমোচ্ছ জেনে
কেমন খটকা লাগে। ভাবি তবে কি
তুমি কোনো জাদুবলে রূপকথার সেই
ঘুমন্ত সুন্দরী হয়ে গেলে? আবার ভাবনাকে
অন্য বাঁকে নিয়ে নিজেকে
প্রবোধ দিই, কারো কারো ঘুম রাত থেকে
মধ্য দুপুর অব্দি গড়ায়, গড়াতেই পারে। তাই
এ নিয়ে নালিশ রুজু করা নিরর্থক। বরং
নিজের ভাগ্যকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে
বলি, আমাদের সংযোগের মুহূর্তটাই রাগুগ্রস্ত।অথচ বাদশাহ সুলেমানের আমলের রত্নের মতো
কত মুহূর্ত আমাদের কেটেছে
তোমার ড্রইংরুমে। তখন তোমাকে ব্যাবিলনের
উদ্যানের কোনো মনোরম, দুর্লভ, তম্বী গাছ ভেবে
তাকিয়ে থেকেছি তোমার দিকে। এবং
আমার দৃষ্টিতে বিহ্বলতা পাঠ করে বলেছো,
কী দেখছো অমন ক’রে? সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে
দ্রুত পাতা ওল্টাতাম ম্যাগাজিনের,
অথবা দৃষ্টি মেলে দিতাম তোমার বাগানের দিকে। দূর অতীত
আর বর্তমান বইতো এক লয়ে পাখির গানে।অসহ্য এই বিচ্ছেদ যা আমাকে দিনের পর দিন
রাত্রির পর রাত্রি
তোমার ছায়া নিয়ে তৃপ্ত থাকতে জপায়। এই বিচ্ছেদ
উজিয়ে আমি বেঁচে আছি, একথা ভেবে
নিজেকেই কেমন অপরাধী মনে হয়। অথচ তুমিহীনতা
আমাকে জড়িয়ে রাখে কবিতার সঙ্গে
সারাক্ষণ, যেমন বিশ্বাস
প্রাণের স্পন্দনকে। আর কবিতা তৈরি করে
এমন এক পথ, যে-পথ তোমার আসার
মুহূর্তের জন্য বারবার মরীয়া কণ্ঠস্বর হয়।আজো দুপুরবেলা তোমাকে ফোন করবার পর
ঠাণ্ডা নিঃস্পৃহ এক কণ্ঠস্বর জানালো
তুমি ঘুমিয়ে আছো। সেই কণ্ঠস্বর আমাকে এক ঝটকায়
ছুড়ে দিলে আমার শহরের জনহীন রাস্তায় আর
নৈরাশ্যের সূর্যাস্তের ভেতর। একটা ভয় লিকলিকে
সরীসৃপের ধরনে আমাকে
চাটতে থাকে-তাহ’লে কি আমি অবিরাম ডায়াল
করতে করতে মেথুসেলা হয়ে যাবো? এখন সব পাখি
ঘুমের গুহায় পাখা গুটিয়ে নিঝুম, সকল নদী
ঘুমে প্লাবিত করছে গ্রাম, জনপদ। আমার আয়না জুড়ে
ঘুমিয়ে আছে এক নারী, যে ভুলে গেছে ভালোবাসার
ভাষা। তোমার হৃদয় ঘুমিয়ে পড়েনি তো? (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-ghum/
|
3206
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দিগ্বলয়ে
|
প্রকৃতিমূলক
|
দিগ্বলয়ে
নব শশীলেখা
টুকরো যেন
মানিকের রেখা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/digboloye/
|
5033
|
শামসুর রাহমান
|
বিষাদের সঙ্গে সারাদিন সারারাত
|
মানবতাবাদী
|
বিষাদের সঙ্গে কাটিয়েছি সারাদিন সারারাত, ভোরবেলা
চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে দেখি, এ কী
কেমন নাছোড় বিষণ্নতা ভাসমান, কখন যে
চুমুকে চুমুকে সেই বিষণ্ন পানীয়
আমার নাচার জিভে ছেয়ে গেল আর আমি
নিজের কাছেই যেন কেমন বেগানা হয়ে যাই।বুঝতে পারে কি কেউ কীভাবে ভেতরে তার কোন্
রিপু তাকে হিঁচড়াতে হিঁচড়াতে নিয়ে
যায় সর্বনাশের কন্দরে? এই আমি অসহায়
চেয়ে চেয়ে দেখছি যাপিত জীবনের পাতাগুলি
কী দ্রুত গাছকে ন্যাড়া ক’রে ঝরে গেছে, এই আমি
অচিরেই হয়ে যাব কীট পতঙ্গের উৎসবের উপাদান।হাহাকার তাড়া করে নিয়ত আমাকে আজকাল;
কারা যেন, বস্তুত কঙ্কালসার কতিপয় বুড়ো, ভয়ঙ্কর
ভঙ্গিমায় এগোয় আমার দিকে, তিমির-ছড়ানো
ছমছমে শ্মশানের কালো ছায়া আমার মানসে
ভীষণ দুলতে থাকে, পা দু’টো কে যেন
মাটিতে দিয়েছে পুঁতে, হায়, হয়ে গেছি স্বরহারা।কিছুক্ষণ কেটে গেলে নিজেকে দেখতে পাই রক্তখেকো কিছু
অর্ধপশু অর্ধ-মানবের জটলায়। ওদের বীভৎস চোখ
ক্ষণে ক্ষণে করছে বমন নরকের অগ্নি-ঢ্যালা;-
পুড়ে যাচ্ছি, ছুটে যেতে চাই অন্য দিকে, অন্য কোনও
সুস্নিগ্ধ অভয়াশ্রমে, যেখানে দুঃস্বপ্ন নেই, নেই অর্ধপশু
অর্ধ-মানবের পৈশাচিক স্বৈরাচার, বন্য আইনের হাঁক।
শ্মশানের ছাই উড়ে এসে জুড়ে বসেছে শহরে আমাদের,
বেয়াড়া অস্ত্রের ঝলসানি বারবার
নিরীহ চোখের জ্যোতি নেভানোর শপথ নিয়েছে
যেন, মাস্তানের জোট শ্রেয়বোধ তাড়ানোর,
কল্যাণের দীপ নেভানোর প্রতিযোগিতায় মেতে
উঠেছে বেদম আর শুভবাদী চেতনা হিংসার পদতলে পিষ্ট, ক্লিষ্ট।সময় কি ফুরিয়ে এসেছে সত্যি? আমি কি এমন ভ্রষ্ট, নষ্ট
সমাজের বাসিন্দা হয়েই বাকি সময়ের ধ্বনি
শুনে যাবো? ধুধু গোরস্তানের স্তব্ধতা সারাক্ষণ
বয়ে যাবো? প্রায়শই মধ্যরাতে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম
থেকে কেঁপে জেগে উঠে বোবা হয়ে থাকবো কেবল? তখন কি
ত্বরিত পড়বে মনে একদা দুপুরে-শোনা কোকিলের গান? (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bishader-songge-sararat/
|
5814
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
নীরার হাসি ও অশ্রু
|
প্রেমমূলক
|
নীরার চোখের জল অনেক চোখের অনেক
নীচে
টল্মল্
নীরার মুখের হাসি মুখের আড়াল থেকে
বুক, বাহু, আঙুলে
ছড়ায়
শাড়ির আঁচলে হাসি, ভিজে চুলে, হেলানো সন্ধ্যায় নীরা
আমাকে বাড়িয়ে দেয়, হাস্যময় হাত
আমার হাতের মধ্যে চৌরাস্তায় খেলা করে নীরার কৌতুক
তার ছদ্মবেশ থেকে ভেসে আসে সামুদ্রিক ঘ্রাণ
সে আমার দিকে চায়, নীরার গোধূলি মাখা ঠোঁট থেকে
ঝরে পড়ে লীলা লোধ্র
আমি তাকে প্রচ্ছন্ন আদর করি, গুপ্ত চোখে বলি :
নীরা, তুমি শান্ত হও
অমন মোহিনী হাস্যে আমার বিভ্রম হয় না, আমি সব জানি
পৃথিবী তোলপাড় করা প্লাবনের শব্দ শুনে টের পাই
তোমার মুখের পাশে উষ্ণ হাওয়া
নীরা, তুমি শান্ত হও!
নীরার সহাস্য বুকে আঁচলের পাখিগুলি
খেলা করে
কোমর ও শ্রোণী থেকে স্রোত উঠে ঘুরে যায় এক পলক
সংসারের সারাৎসার ঝলমলিয়ে সে তার দাঁতের আলো
সায়াহ্নের দিকে তুলে ধরে
নাগকেশরের মতো ওষ্ঠাধরে আঙুল ঠেকিয়ে বলে,
চুপ!
আমি জানি
নীরার চোখের জল চোখের অনেক নিচে টল্মল্।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1871
|
3326
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নিষ্কাম পরহিতে কে ইহারে সামলায়
|
ছড়া
|
নিষ্কাম পরহিতে কে ইহারে সামলায়–
স্বার্থেরে নিঃশেষে-মুছে-ফেলা মামলায়।
চলেছে উদারভাবে সম্বল-খোয়ানি–
গিনি যায়, টাকা যায়, সিকি যায় দোয়ানি,
হল সারা বাঁটোয়ারা উকিলে ও আমলায়।
গিয়েছে পরের লাগি অন্নের শেষ গুঁড়ো–
কিছু খুঁটে পাওয়া যায় ভূষি তুঁষ খুদকুঁড়ো
গোরুহীন গোয়ালের তলাহীন গামলায়। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nishkam-porhite-ke-iahare-smalay/
|
4107
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
বাতাসে লাশের গন্ধ
|
মানবতাবাদী
|
আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যূর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে…
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো।
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর,
আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আরষ্ট কুমারী জননী,
স্বাধীনতা – একি হবে নষ্ট জন্ম ?
একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল ?
জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন।
বাতাশে লাশের গন্ধ
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দুলে মাংসের তুফান।
মাটিতে রক্তের দাগ -
চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড়
এ চোখে ঘুম আসেনা। সারারাত আমার ঘুম আসেনা-
তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার,
নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ
মুন্ডহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বিভৎস্য শরীর
ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে। আমি ঘুমুতে পারিনা, আমি
ঘুমুতে পারিনা…
রক্তের কাফনে মোড়া – কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা।
স্বাধীনতা, সে আমার – স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন -
স্বাধীনতা – আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।
ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/148
|
2117
|
মহাদেব সাহা
|
কবিত্ব
|
চিন্তামূলক
|
ঝর্নাকে আমি কখনো থামতে দেখি না
নদীকে দেখি না,
বৃক্ষকে কখনো আমি নিঃশেষিত হতে
মোটেও দেখি না;
আকাশকে কখনো দেখি না আমি শেষ হয়ে যেতে
সমুদ্রকে ফুরিয়ে যেতে কখনো দেখি না,
আমি এই চিরপ্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখাকে বলি
কবিত্ব, কবিত্ব;
অনিঃশেষ এই অগ্নি বুকে নিয়ে জেগে থাকে কবি।
এই অফুরন্ত শোকের উৎসব, এই অবিরাম
আনন্দের অনন্ত মূর্ছনা
এই রাত্রিদিন বেয়ে চলা নদীর অন্তর সত্তাকে বলি
কেবল উৎসকে
কেবল কবিত্ব বলি আমি।
এই অনিঃশেষ অগ্নিশিখা, এই অনন্ত অশেষ
জলপ্রপাত
এই চিরপ্রস্ফুটিত আলোকিত ফুল
এই অনন্ত বিদ্যুৎদুতি,
আমি একেই কবিত্ব বলি,
বলি মানুষের সৃষ্টিপ্রতিভা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1413
|
1835
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
|
ভক্তিমূলক
|
প্রখর তুলির পাশে কতদিন অবনত হয়েছি বিস্ময়ে।
এ কী টান! বিদ্যুতের চেয়ে দ্রুত এ কী বলবান
রেখার সংহত রূপ, রেখা যেন গর্বিত গান্ডীব,
যেন জানে শত্রুপক্ষ, যেন জানে কোথায় সংগ্রাম
এবং বিষাদও জানে, হাহাকারে সঙ্গী হতে জানে।
তখন দিগন্ত ছিল রক্তে ও রক্তিম আকাঙ্খায়
একই সঙ্গে একাকার, দুঃসময় ঘরে ও বাহিরে।
বিশ্বাসের দুর্গ ভাঙে, অবিন্যস্ত বাতাসে ছড়ায়
প্রশ্ন শুধু, প্রশ্ন বীজ প্রশ্ন বৃক্ষ হয়।
সেই দীর্ণ সময়ের দিনগুলি, দগ্ধ রাতগুলি
একটি তুলির কাছে যখনই চেয়েছে বরাভয়,
পেয়েছে বুকের বর্ম, মানচিত্র, দৃপ্ত যাত্রাপথ।
তাঁর কোনো নামাবলী নেই, তিনি নিঃসঙ্গ পথিক
ভ্রমণ বিলাসী তিনি, দুর্গমে দুরূহে নিত্য পাড়ি।
কানাকড়িহীন কিন্তু হাসিতে ঠিকরোয় রত্নকণা,
রাজাধিরাজের মতো এই নিঃস্ব এখনো প্রেরণা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1194
|
794
|
জসীম উদ্দীন
|
কৃষাণী দুই মেয়ে
|
মানবতাবাদী
|
কৃষাণী দুই মেয়ে
পথের কোণে দাঁড়িয়ে হাসে আমার পানে চেয়ে।
ওরা যেন হাসি খুশীর দুইটি রাঙা বোন,
হাসি-খুশীর বেসাত ওরা করছে সারাখন।
ঝাকড়া মাথায় কোঁকড়া চুলে, লেগেছে খড়কুটো,
তাহার নীচে মুখ দুখানি যেন তরমুজফালি দুটো।
সেই মুখেতে কে দুখানি তরমুজেরি ফালি,
একটি মেয়ে লাজুক বড়, মুখর আরেক জন,
লজ্জাবতীর লতা যেন জড়িয়ে গোলাপ বন।
একটি হাসে, আর সে হাসি লুকায় আঁচল কোণে,
রাঙা মুখের খুশী মিলায় রাঙা শাড়ীর সনে।
পউষ-রবির হাসির মত আরেক জনের হাসি,
কুয়াশাহীন আকাশ ভরে টুকরো-মেঘে ভাসি।
চাষীদের ওই দুইটি মেয়ে ঈদের দুটি চাঁদ,
যেই দেখেছি, পেরিয়ে গেল নয়নপুরীর ফাঁদ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/772
|
6006
|
হুমায়ূন আহমেদ
|
সংসার
|
প্রেমমূলক
|
শোন মিলি।
দুঃখ তার বিষমাখা তীরে তোকে
বিঁধে বারংবার।
তবুও নিশ্চিত জানি,একদিন হবে তোর
সোনার সংসার ।।
উঠোনে পড়বে এসে একফালি রোদ
তার পাশে শিশু গুটিকয়
তাহাদের ধুলোমাখা হাতে – ধরা দেবে
পৃথিবীর সকল বিস্ময়।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1126.html
|
2675
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আজিকে গহন কালিমা লেগেছে গগনে
|
ভক্তিমূলক
|
আজিকে গহন কালিমা লেগেছে গগনে, ওগো,
দিক্-দিগন্ত ঢাকি।
আজিকে আমরা কাঁদিয়া শুধাই সঘনে, ওগো,
আমরা খাঁচার পাখি–
হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,
আজি কি আসিল প্রলয়রাত্রি ঘোর।
চিরদিবসের আলোক গেল কি মুছিয়া।
চিরদিবসের আশ্বাস গেল ঘুচিয়া?
দেবতার কৃপা আকাশের তলে কোথা কিছু নাহি বাকি?–
তোমাপানে চাই, কাঁদিয়া শুধাই আমরা খাঁচার পাখি।ফাল্গুন এলে সহসা দখিনপবন হতে
মাঝে মাঝে রহি রহি
আসিত সুবাস সুদূরকুঞ্জভবন হতে
অপূর্ব আশা বহি।
হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,
মাঝে মাঝে যবে রজনী হইত ভোর,
কী মায়ামন্ত্রে বন্ধনদুখ নাশিয়া
খাঁচার কোণেতে প্রভাত পশিত হাসিয়া
ঘনমসী-আঁকা লোহার শলাকা সোনার সুধায় মাখি।–
নিখিল বিশ্ব পাইতাম প্রাণে আমরা খাঁচার পাখি।আজি দেখো ওই পূর্ব-অচলে চাহিয়া, হোথা
কিছুই না যায় দেখা–
আজি কোনো দিকে তিমিরপ্রান্ত দাহিয়া, হোথা
পড়ে নি সোনার রেখা।
হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,
আজি শৃঙ্খল বাজে অতি সুকঠোর।
আজি পিঞ্জর ভুলাবারে কিছু নাহি রে–
কার সন্ধান করি অন্তরে বাহিরে।
মরীচিকা লয়ে জুড়াব নয়ন আপনারে দিব ফাঁকি
সে আলোটুকুও হারায়েছি আজি আমরা খাঁচার পাখি।ওগো আমাদের এই ভয়াতুর বেদনা যেন
তোমারে না দেয় ব্যথা।
পিঞ্জরদ্বারে বসিয়া তুমিও কেঁদো না যেন
লয়ে বৃথা আকুলতা।
হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,
তোমার চরণে নাহি তো লৌহডোর।
সকল মেঘের ঊর্ধ্বে যাও গো উড়িয়া,
সেথা ঢালো তান বিমল শূন্য জুড়িয়া–
“নেবে নি, নেবে নি প্রভাতের রবি’ কহো আমাদের ডাকি,
মুদিয়া নয়ান শুনি সেই গান আমরা খাঁচার পাখি। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ajike-gohon-kalima-legeche-gogone/
|
95
|
আবিদ আনোয়ার
|
সমুদ্রের প্রতি বামন
|
রূপক
|
গর্জমান সমুদ্রের পারে ভরাট পূর্ণিমা--
অসীমের দৃশ্য দেখি আমি আর সীমা ।
পাশে দুই ছায়ামূর্তি - যুগপৎ ক্ষ্যাপা ও নিউটন
পরশ পাথর খোঁজে, নেড়ে দেখে অনির্ণেয় নুড়ির গঠন ।
তরল হাসিতে বড়ো ফেটে পড়ছে সমুদ্রের জল:
তিনভাগ সত্যেরও যেন দুইভাগ করেছে দখল
সেই দম্ভে ফুলে উঠে ছুঁতে চায় আকাশের চাঁদ--
আসলে দেখাতে চায় ব্যাপ্তি তার কতটা অগাধ ।
কে এক সমুদ্রচারী পাখি তার ভেজাকণ্ঠে ডেকে বলে: এ্যাই,
চলো আজ ফিরে যাই, এ-দেখার শেষ কিছু নেই!
সীমা তার পা বাড়ালে চেয়ে দেখি ম্লান হচ্ছে ক্রমশ চন্দ্রিমা,
আমি তার নাম ভুলে তারস্বরে ডেকে উঠি: দাঁড়াও অসীমা...
কী আশ্চর্য চাঁদ নিজে চলে এলো আমার সাথে,
সঙ্গে দুই ছায়ামূর্তি ঘনঘন তাকায় পশ্চাতে ।
সমুদ্রকে ডেকে বলি: এ-রাতের জ্যোৎস্নাটুকু আমারই বেবাক;
তুই বেটা অহংকারী, অন্ধকারে হুমড়ি খেতে থাক ।
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/shomudrer-proti-bamon/
|
4226
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
প্রতিকৃতি
|
প্রেমমূলক
|
শুয়ো না কখনো দিনে মৃত ঝরা বাতিটার পাশে।
ও কার চোখের জল ও কার মুখের মতো ম্লান;
প্রতিকূল হাওয়া এসে দাঁড়ালেই শুরু বালি খসা
খুঁজি সে সোনালি চুল চুল চুল তখনো আকাশে।পাই না; ঘুরায়ে তালু মুছে দেবো চোখের আভাস
হে বিষণ্ণ মর্মরের ফোঁটা যেন নীরবে সাজানো
দেবতা, সুদূর স্মৃতি; প্রতিমা কি প্রচ্ছায়া তোমার।
পুরানো ধূলায় খুঁজি, ধূলা হতে পুরানো হৃদয়ে।কখন ঢেকেছি মুখ আপনার দুঃখ মুছে নিতে
বেদনা, অপর কষ্ট; এবং উজ্জ্বল বাতায়নে
প্রকৃতির সম্ভাবন, স্থিতি, সুখ উত্তাল মৌসুমী...
আতিশয্য দেখে চোখ অকারণ গলে গেছে কিনাজানি না; সে-স্বপ্নে রাতে অবশ্য তন্দ্রায় গাঢ় প্রেম
তোমার মুখের 'পরে, বুকে, নাতিশীতল হৃদয়ে
আমারি চোখের অশ্রু, অকস্মাৎ স্খলিত বিন্যাস...
দুঃখের মুকুর তুমি অন্ধকারে আমার সান্ত্বনা॥
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/protikriti/
|
3757
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যক্ষ
|
চিন্তামূলক
|
হে যক্ষ তোমার প্রেম ছিল বদ্ধ কোরকের মতো,
একান্তে প্রেয়সী তব সঙ্গে যবে ছিল অনিয়ত
সংকীর্ণ ঘরের কোণে, আপন বেষ্টনে তুমি যবে
রুদ্ধ রেখেছিলে তারে দু-জনের নির্জন উৎসবে
সংসারের নিভৃত সীমায়, শ্রাবণের মেঘজাল
কৃপণের মতো যথা শশাঙ্কের রচে অন্তরাল
আপনার আলিঙ্গনে আপনি হারায়ে ফেলে তারে,
সম্পূর্ণ মহিমা তার দেখিতে পায় না একেবারে
অন্ধ মোহাবেশে। বর তুমি পেলে যবে প্রভুশাপে,
সামীপ্যের বন্ধন ছিন্ন হ'ল, বিরহের দুঃখতাপে
প্রেম হ'ল পূর্ণ বিকশিত; জানিল সে আপনারে
বিশ্বধরিত্রীর মাঝে। নির্বাধে তাহার চারিধারে
সন্ধ্যা অর্ঘ্য করে দান বৃষ্টিজলে সিক্ত বনযূথী
গন্ধের অঞ্জলি; নীপনিকুঞ্জের জানাল আকুতি
রেণুভারে মন্থর পবন। উঠে গেল যবনিকা
আত্মবিস্মৃতির, দেখা দিল দিকে দিগন্তরে লিখা
উদার বর্ষার বাণী, যাত্রামন্ত্র বিশ্বপথিকের
মেঘধ্বজে আঁকা, দিগ্বধূ-প্রাঙ্গণ হতে নির্ভীকের
শূন্যপথে অভিসার। আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
দীক্ষা পেলে অশ্রুধৌত সৌম্য বিষাদের; নিত্যরসে
আপনি করিলে সৃষ্টি রূপসীর অপূর্ব মুরতি
অন্তহীন গরিমায় কান্তিময়ী। এক দিন ছিল সেই সতী
গৃহের সঙ্গিনী, তারে বসাইলে ছন্দশঙ্খ রবে
আলোক-আলোকদীপ্ত অলকার অমর গৌরবে
অনন্তের আনন্দ-মন্দিরে। প্রেম তব ছিল বাক্যহীন,
আজ সে পেয়েছে তার ভাষা, আজ তার রাত্রিদিন
সংগীত তরঙ্গে আন্দোলিত। তুমি আজ হলে কবি
মুক্ত তব দৃষ্টিপথে উদ্বারিত নিখিলের ছবি
শ্যামমেঘে স্নিগ্ধচ্ছায়া। বক্ষ ছাড়ি মর্মে অধ্যাসীনা
প্রিয়া তব ধ্যানোদ্ভবা লয়ে তার বিরহের বীণা।
অপরূপ রূপে রচি বিচ্ছেদের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে
তোমার প্রেমের সৃষ্টি উৎসর্গ করিলে বিশ্বজনে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jukhay/
|
2892
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কাগজের নৌকা
|
ছড়া
|
ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে
কাগজ-নৌকাখানি।
লিখে রাখি তাতে আপনার নাম,
লিখি আমাদের বাড়ি কোন গ্রাম
বড়ো বড়ো ক'রে মোটা অক্ষরে
যতনে লাইন টানি।
যদি সে নৌকা আর-কোনো দেশে
আর-কারো হাতে পড়ে গিয়ে শেষে
আমার লিখন পড়িয়া তখন
বুঝিবে সে অনুমানি
কার কাছ হতে ভেসে এল স্রোতে
কাগজ-নৌকাখানি ।।আমার নৌকা সাজাই যতনে
শিউলি বকুলে ভরি।
বাড়ির বাগানে গাছের তলায়
ছেয়ে থাকে ফুল সকাল বেলায়,
শিশিরের জল করে ঝলমল্
প্রভাতের আলো পড়ি।
সেই কুসুমের অতি ছোটো বোঝা
কোন্ দিক-পানে চলে যায় সোজা,
বেলাশেষে যদি পার হয়ে নদী
ঠেকে কোনোখানে যেয়ে -
প্রভাতের ফুল সাঁঝে পাবে কূল
কাগজের তরী বেয়ে ।।আমার নৌকা ভাসাইয়া জলে
চেয়ে থাকি বসি তীরে।
ছোটো ছোটো ঢেউ উঠে আর পড়ে,
রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে,
আকাশেতে পাখি চলে যায় ডাকি,
বায়ু বহে ধীরে ধীরে ।
গগনের তলে মেঘ ভাসে কত
আমারি সে ছোটো নৌকার মতো -
কে ভাসালে তায়, কোথা ভেসে যায়,
কোন দেশে গিয়ে লাগে।
ঐ মেঘ আর তরণী আমার
কে যাবে কাহার আগে ।।বেলা হলে শেষে বাড়ি থেকে এসে
নিয়ে যায় মোরে টানি
আমি ঘরে ফিরি, থাকি কোনে মিশি,
যেথা কাটে দিন সেথা কাটে নিশি,
কোথা কোন্ গাঁয় ভেসে চলে যায়
আমার নৌকাখানি ।
কোন্ পথে যাবে কিছু নাই জানা,
কেহ তারে কভু নাহি করে মানা,
ধ'রে নাহি রাখে, ফিরে নাহি ডাকে -
ধায় নব নব দেশে।
কাগজের তরী, তারি 'পরে চড়ি
মন যায় ভেসে ভেসে ।।রাত হয়ে আসে, শুই বিছানায়,
মুখ ঢাকি দুই হাতে -
চোখ বুঁজে ভাবি এমন আঁধার,
কালী দিয়ে ঢালা নদীর দুধার -
তারি মাঝখানে কোথায় কে জানে
নৌকা চলেছে রাতে।
আকাশের তারা মিটি মিটি করে,
শিয়াল ডাকিছে প্রহরে প্রহরে,
তরীখানি বুঝি ঘর খুঁজি খুঁজি
তীরে তীরে ফিরে ভাসি।
ঘুম লয়ে সাথে চড়েছে তাহাতে
ঘুম-পাড়ানিয়া মাসি ।।(শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kagojer-nouka/
|
2372
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মেঘনাদবথ কাব্য (৫ম সর্গ)
|
মহাকাব্য
|
কুসুম-শয়নে যথা সুবর্ণ-মন্দিরে
বিরাজে বীরেন্দ্র বলী ইন্দ্রজিত,তথা
পশিল কূজন-ধ্বনি সে সুখ-সদনে।
জাগিলা বীর-কুন্জর কুন্জবন-গীতে।
প্রমীলার করপদ্ম করপদ্মে ধরি
রথীন্দ্র, মধুর স্বরে, হায় রে, যেমতি
নলিনীর কানে অলি কহে গুন্জরিয়া
প্রেমের রহস্য কথা, কহিলা (আদরে
চুম্বি নিমীলিত আঁখি )—“ডাকিছে কূজনে,
হৈমবতী ঊষা তুমি,রূপসি, তোমারে
পাখী-কুল; মিল, প্রিয়ে, কমল লোচন
উঠ, চিরানন্দ মোর; সূর্য্যকান্তমণি-
সম এ পরাণ,কান্তে, তুমি রবিচ্ছবি;—-
তেজোহীন আমি তুমি মুদিলে নয়ন;
ভাগ্য-বৃক্ষে ফলোত্তম তুমি হে জগতে
আমার; নয়ন-তারা; মহার্হ রতন;
উঠি দেখ,শশিমুখি,কেমনে ফুটিছে,
চুরি করি কান্তি তব মন্জু কুন্জবনে
কুসুম ;” চমকি রামা উঠিলা সত্বরে;—
গোপিনী কামিনী যথা বেনুর সুরবে;
আবরিলা অবয়ব সুচারু-হাসিনী
শরমে। কহিলা পুনঃ কুমার আদরে;—
“পোহাইল এতক্ষনে তিমির-শর্বরী;
তা না হলে ফুটিতে কি তুমি, কমলিনি,
জুড়াতে এ চক্ষুর্দ্বয়? চল, প্রিয়ে, এবে
বিদায় হইব নমি জননীর পদে;
পরে যথাবিধি পূজি দেব বৈশ্বানরে,
ভীষণ-অশনি-সম শর-বরিষণে
রামের সংগ্রাম-সাধ মিটাব সংগ্রামে।”
সাজিলা রাবণ-বধূ, রাবণ-নন্দন,
অতুল জগতে দোঁহে; বামাকুলোত্তমা
প্রমীলা, পুরুষোত্তম মেঘনাদ বলী;
শয়ন-মন্দির হতে বাহিরিলা দোঁহে—
প্রভাতের তারা যথা অরুনের সাথে;
বাজিল রাক্ষস-বাদ্য; নমিল রক্ষক;
জয় মেঘনাদ উঠিল গগনে;
রতন-শিবিকাসনে বসিলা হরষে
দম্পতী। বহিলা যান যানবাহ- দলে
মন্দোদরী মহিষীর সুবর্ন-মন্দিরে।
প্রবেশিলা অরিন্দম, ইন্দু-নিভাননা
প্রমীলা সুন্দরী সহ,সে স্বর্ণ-মন্দিরে।
ত্রিজটা নামে রাক্ষসী আইল ধাইয়া।
কহিল বীর-কেশরী; ”শুন লো ত্রিজটে,
নিকুম্ভিলা-যজ্ঞ সাঙ্গ করি আমি আজি
যুঝিব রামের সঙ্গে পিতার আদেশে,
নাশিব রাক্ষস-রিপু; তেঁই ইচ্ছা করি
পূজিতে জননী পদ। যাও বার্তা লয়ে;
কহ,পুত্র, পুত্রবধু দাঁড়ায়ে দুয়ারে
তোমার,হে লঙ্কেশ্বরী;” সাষ্টাঙ্গে প্রণমি,
কহিলা শূরে ত্রিজটা, (বিকটা রাক্ষসী)—
”শিবের মন্দিরে এবে রাণী মন্দোদরী,
যুবরাজ; তোমার মঙ্গল-হেতু তিনি
অনিদ্রায়, অনাহারে পূজেন উমেশে;
তব সম পুত্র, শূর,কার এ জগতে?
কার বা এ হেন মাতা?”—এতেক কহিয়া
সৌদামিনী-গতি দূতী ধাইল সত্বরে।
বাহিরিলা লঙ্কেশ্বরী শিবালয় হতে
প্রণমে দম্পতী পদে। হরষে দুজনে
কোলে করি, শিরঃ চুম্বি, কাঁদিলা মহিষী।
কহিলা বীরেন্দ্র; ”দেবি আশীষ দাসেরে।
নিকুম্ভিলা-যজ্ঞ সাঙ্গ করি যথাবিধি,
পশিব সমরে আজি, নাশিব রাঘবে;
শিশু ভাই বীরবাহু; বধিয়াছে তারে
পামর। দেখিব মোরে নিবারে কি বলে?
দেহ পদ-ধূলি, মাতঃ ;তোমার প্রসাদে
নির্ব্বিঘ্ন করিব আজি তীক্ষ্ন শর-জালে
লঙ্কা; বাঁধি দিব আনি তাত বিভীষণে
রাজদ্রোহী; খেদাইব সুগ্রীব অঙ্গদে
সাগর অতল জলে;” উত্তরিলা রাণী,
মুছিয়া নয়ন-জল রতন-আঁচলে;—
“কেমনে বিদায় তোরে করি রে বাছনি;
আঁধারি হৃদয়াকাশ,তুই পূর্ণ শশী
আমার। দুরন্ত রণে সীতাকান্ত বলী;
দুরন্ত লক্ষণ শূর; কাল-সর্প-সম
দয়া-শূন্য বিভীষণ; মত্ত লোভ-মদে,
স্ববন্ধু-বান্ধবে মূঢ় নাশে অনায়াসে,
ক্ষুধায় কাতর ব্যাঘ্র গ্রাসয়ে যেমতি
স্বশিশু; কুক্ষনে,বাছা, নিকষা শাশুড়ী
ধরেছিলা গর্ভে দুষ্টে, কহিনু রে তোরে;
এ কনক-লঙ্কা মোর মজালে দুর্ম্মতি;”
হাসিয়া মায়ের পদে উত্তরিলা রথী;—
কেন, মা ডরাও তুমি রাঘবে লক্ষণে,
রক্ষোবৈরী? দুইবার পিতার আদেশে
তুমুল সংগ্রামে আমি বিমুখিনু দোঁহে
অগ্নিময় শর-জালে; ও পদ-প্রসাদে
চির-জয়ী দেব-দৈত্য-নরের সমরে
এ দাস; জানেন তাত বিভীষণ, দেবি,
তব পুত্র-পরাক্রম; দম্ভোলি-নিক্ষেপী
সহস্রাক্ষ সহ যত দেব-কুল-রথী;
পাতালে নাগেন্দ্র, মর্ত্তে নগেন্দ্র; কি হেতু
সভয় হইলা আজি,কহ, মা, আমারে?
কি ছার সে রাম, তারে ডরাও আপনি?
মুছিয়া নয়ন-জল রতন-আঁচলে,
উত্তরিলা লঙ্কেশ্বরী; ”যাইবি রে যদি;—
রাক্ষস-কুল-রক্ষণ বিরূপাক্ষ তোরে
রক্ষুন এ কাল-রণে; এই ভিক্ষা করি
তার পদ যুগে আমি। কি আর কহিব?
নয়নের তারা হারা করি রে থুইলি
আমায় এ ঘরে তুই;” কাঁদিয়া মহিষী
কহিলা,চাহিয়া তবে প্রমীলার পানে;—
“থাক,মা,আমার সঙ্গে তুমি; জুড়াইব,
ও বিধুবদন হেরি এ পোড়া পরাণ;
বহুলে তারার করে উজ্জ্বল ধরণী।”
বন্দি জননীর পদ বিদায় হইলা
ভীমবাহু কাঁদি রাণী, পুত্র-বধূ সহ,
প্রবেশিলা পুনঃ গৃহে। শিবিকা ত্যজিয়া,
পদ-ব্রজে যুবরাজ চলিলা কাননে—
ধীরে ধীরে রথীবর চলিলা একাকী,
কুসুম-বিব্রিত পথে যজ্ঞশালা মুখে। ===========
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/meghnadbodh-kabya-fifth-section/
|
5020
|
শামসুর রাহমান
|
বালুচরে
|
প্রেমমূলক
|
আমার দুঃখের বালুচরে কাকজ্যোৎস্না দেখে তুমি
ভেবো না সুখের নাও ভিড়েছে আমার ঘাটে। দেখো,
ভালো করে দেখো, এই নিঃসঙ্গতা সঙিন উঁচিয়ে
রেখেছে আমার দিকে; বাতাসে উড়ছে বালিকণা
হা হা স্বরে, নির্জনতা নিজেই ভীষণ ভীত স্ফীত
নদীটির খল খল শব্দে, সঙ্গিবিহীন এক
চখা চক্রাকারে ওড়ে মাথার ওপর অবিরাম-
তার হৃৎকমল ছিঁড়েছে শিকারির হিংস্র ক্রীড়া।এসো না তুমিও এই বালুচরে সতর্ক পাহারা
এড়িয়ে কয়েক ঘণ্টা ভাসিয়ে ময়ূরপঙ্খী নাও।
মহুয়া হবে কি তুমি আধুনিক সাজসজ্জা ছেড়ে?
নিমেষে নদের চাঁদ হয়ে আমি সাজাবো তোমাকে
আমার ব্যাকুল প্রেমে, নাকি চখী হয়ে উড়ে এসে
ডাকবে আমাকে? সেই ডাকে হয়ে যাবো ফুল্ল চখা! (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/baluchore/
|
5371
|
শেখ ফজলুল করিম
|
তুলনায় সমালোচনা
|
নীতিমূলক
|
শত শত ক্রোশ করিয়া ভ্রমণ জ্ঞানীর অন্বেষণে
সহসা একদা পেল সে প্রবীণ কোনো এক মহাজনে।
সুধালো, হে জ্ঞানী, আকাশের চেয়ে উচ্চতা বেশি কার?
জ্ঞানী বলে, বাছা, সত্যের চেয়ে উঁচু নাই কিছু আর।
পুনঃ সে কহিল, পৃথিবীর চেয়ে ওজনে ভারি কি আছে?
জ্ঞানী বলে, বাছা, নিষ্পাপ জনে দোষারোপ করা মিছে।
জিজ্ঞাসে পুনঃ, পাথরের চেয়ে কি আছে অধিক শক্ত?
জ্ঞানী বলে, বাছা, যে হৃদয় হয় জগদীশ প্রেমভক্ত।
কহিল আবার, অনলের চেয়ে উত্তাপ বেশি কার?
জ্ঞানী বলে, বাছা, ঈর্ষার কাছে বহ্নিতাপও ছার।
পুছিল পথিক, বরফের চেয়ে শীতল কি কিছু নাই?
জ্ঞানী বলে, বাছা, স্বজন-বিমুখ হৃদয় যে ঠিক তাই।
সুধালো সে জন, সাগর হইতে কে অধিক ধনবান?
জ্ঞানী বলে, বাছা, তুষ্ট হৃদয় তারো চেয়ে গরীয়ান।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4347.html
|
3229
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুঃস্বপন কোথা হতে এসে
|
ভক্তিমূলক
|
দুঃস্বপন কোথা হতে এসে
জীবনে বাধায় গণ্ডগোল।
কেঁদে উঠে জেগে দেখি শেষে
কিছু নাই আছে মার কোল।
ভেবেছিনু আর-কেহ বুঝি,
ভয়ে তাই প্রাণপণে যুঝি,
তব হাসি দেখে আজ বুঝি
তুমিই দিয়েছ মোরে দোল।এ জীবন সদা দেয় নাড়া
লয়ে তার সুখ দুখ ভয়;
কিছু যেন নাই গো সে ছাড়া,
সেই যেন মোর সমুদয়।
এ ঘোর কাটিয়া যাবে চোখে
নিমেষেই প্রভাত-আলোকে,
পরিপূর্ণ তোমার সম্মুখে
থেমে যাবে সকল কল্লোল।৮ শ্রাবণ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/duswapon-kotha-hote-ese/
|
5403
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
জবা
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমারে লইয়া সুখী হও তুমি ওগো দেবী শবাসনা,
আর খুঁজিও না মানব-শোনিত, আর তুমি খুঁজিও না।
আর মানুষের হৃত্ পিণ্ডটা নিওনা খড়গে ছিঁড়ে,
হাহকার তুমি তুলো না গো আর সুখের নিভৃত নীড়ে।
এই দেখ আমি উঠেছি ফুটিয়া উজলি পুষ্পসভা,
ব্যথিত ধরার হৃত্ পিণ্ডটি আমি যে রক্তজবা।
তোমার চরণে নিবেদিত আমি, আমি যে তোমার বলি,
দৃষ্টি-ভোগের রাঙ্গা খর্পরে রক্ত কলিজা-কলি।
আমারে লইয়া খুশি হও ওগো, নম দেবি নম নম,
ধরার অর্ঘ্য করিয়া গ্রহণ, ধরার শিশুরে ক্ষম।
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/joba/
|
2854
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ওরে মাঝি
|
ভক্তিমূলক
|
ওরে মাঝি, ওরে আমার
মানবজন্মতরীর মাঝি,
শুনতে কি পাস দূরের থেকে
পারের বাঁশি উঠছে বাজি।
তরী কি তোর দিনের শেষে
ঠেকবে এবার ঘাটে এসে।
সেথায় সন্ধ্যা-অন্ধকারে
দেয় কি দেখা প্রদীপরাজি।যেন আমার লাগছে মনে,
মন্দমধুর এই পবনে
সিন্ধুপারের হাসিটি কার
আঁধার বেয়ে আসছে আজি।
আসার বেলায় কুসুমগুলি
কিছু এনেছিলেম তুলি,
যেগুলি তার নবীন আছে
এইবেলা নে সাজিয়ে সাজি।১৮ শ্রাবণ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ore-majhi/
|
2913
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কুঁড়ির ভিতর কাঁদিছে গন্ধ অন্ধ হয়ে
|
রূপক
|
কুঁড়ির ভিতর কাঁদিছে গন্ধ অন্ধ হয়ে–
কাঁদিছে আপন মনে,
কুসুমের দলে বন্ধ হয়ে
করুণ কাতর স্বনে।
কহিছে সে,”হায় হায়,
বেলা যায় বেলা যায় গো
ফাগুনের বেলা যায়।’
ভয় নাই তোর, ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
কিছু নাই তোর ভাবনা।
কুসুম ফুটিবে, বাঁধন টুটিবে,
পুরিবে সকল কামনা।
নিঃশেষ হয়ে যাবি যবে তুই
ফাগুন তখনো যাবে না।কুঁড়ির ভিতরে ফিরিছে গন্ধ কিসের আশে–
ফিরিছে আপনমাঝে,
বাহিরিতে চায় আকুল শ্বাসে
কী জানি কিসের কাজে।
কহিছে সে,”হায় হায়,
কোথা আমি যাই,কারে চাই গো
না জানিয়া দিন যায়।’
ভয় নাই তোর,ভয় নাই ওরে, ভয় নাই,
কিছু নাই তোর ভাবনা।
দখিনপবন দ্বারে দিয়া কান
জেনেছে রে তোর না কামনা।
আপনারে তোর না করিয়া ভোর
দিন তোর চলে যাবে না।কুঁড়ির ভিতরে আকুল গন্ধ ভাবিছে বসে–
ভাবিছে উদাসপারা,
“জীবন আমার কাহার দোষে
এমন অর্থহারা।’
কহিছে সে,”হায় হায়,
কেন আমি বাঁচি,কেন আছি গো
অর্থ না বুঝা যায়।’
ভয় নাই তোর, ভয় নাই ওরে, ভয় নাই,
কিছু নাই তোর ভাবনা।
যে শুভ প্রভাতে সকলের সাথে
মিলিবি, পুরাবি কামনা,
আপন অর্থ সেদিন বুঝিবি–
জনম ব্যর্থ যাবে না।
(উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kurir-vitor-kadiche-gondho-ondho-hoye/
|
1866
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
বিষন্ন জাহাজ
|
প্রেমমূলক
|
আমরা যেখানে বসেছিলাম
তার পায়ের তলায় ছিল নদী
নদীতে ছিল নৌকা
আর দূরে একটা বিষন্ন জাহাজ।
আমি যখন তোমার
তুমি যখন আমার ঠোঁটে বুনে দিচ্ছিলে
যাবজ্জীবনের সুখ
ঠিক সেই সময়ে ডুকরে কেঁদে উঠল জাহাজটা
ভোঁ বাজিয়ে।
তারপর থেকে রোজ
আমাদের যাবজ্জীবন সুখের ভিতরে
একটু একটু করে ঢুকে পড়ছে সেই বিষন্ন জাহাজ
তার সেই ভয়ঙ্কর আর্তনাদ বাজিয়ে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1258
|
4613
|
শামসুর রাহমান
|
কেউ কি এখন
|
প্রেমমূলক
|
কেউ কি এখন এই অবেলায়
আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত?
আমার স্মৃতির ঝোপেঝাড়ে
হরিণ কাঁদে অন্ধকারে,
এখন আমার বুকের ভেতর
শুকনো পাতা, বিষের মতো রাত।দ্বিধান্বিত দাঁড়িয়ে আছি
একটি সাঁকোর কাছাকাছি,
চোখ ফেরাতেই দেখি সাঁকো
এক নিমেষে ভাঙলো অকস্মাৎ।গৃহে প্রবেশ করবো সুখে?
চৌকাঠে যায় কপাল ঠুকে।
বাইরে থাকি নত মুখে
নেকড়েগুলো দেখায় তীক্ষ দাঁত।অপরাহ্নে ভালোবাসা
চক্ষে নিয়ে গহন ভাষা
গান শোনালো সর্বনাশা,
এই কি তবে মোহন অপঘাত?
কেউ কি এখন এই অবেলায়
আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত? (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/keu-ki-ekhon/
|
1858
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
বড়ে গোলাম
|
প্রেমমূলক
|
ফুলের গন্ধে ফোটার জন্যে
নারীর স্পর্শ পাবার জন্যে
ঘুমের মধ্যে কাঁদতে কাঁদতে
আমরা যেদিন যুবক হোলাম।
বাইরে তখন বক্ষে বৃক্ষে
জলে স্থলে অন্তরীক্ষে
আমাদের সেই কান্না নিয়ে
গান গাইছে বড়ে গোলাম।
ফুলের কাছে নারীর কাছে
বুকের বিপুল ব্যথার কাছে
বেদনাবহ যে সব কথা
বলতে গিয়ে ব্যর্থ হোলাম।
তারাই যখন ফিরে আসে
কেউ ললিতে কেউ বিভাসে
স্পন্দনে তার বুঝতে পারি
বুকের মধ্যে বড়ে গোলাম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/484
|
2646
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আকাশপ্রদীপ
|
ছড়া
|
গোধূলিতে নামল আঁধার ,
ফুরিয়ে গেল বেলা ,
ঘরের মাঝে সাঙ্গ হল
চেনা মুখের মেলা ।
দূরে তাকায় লক্ষ্যহারা
নয়ন ছলোছলো ,
এবার তবে ঘরের প্রদীপ
বাইরে নিয়ে চলো ।
মিলনরাতে সাক্ষী ছিল যারা
আজো জ্বলে আকাশে সেই তারা ।
পাণ্ডু-আঁধার বিদায়রাতের শেষে
যে তাকাত শিশিরসজল শূন্যতা-উদ্দেশে
সেই তারকাই তেমনি চেয়েই আছে
অস্তলোকের প্রান্তদ্বারের কাছে ।
অকারণে তাই এ প্রদীপ জ্বালাই আকাশ-পানে —
যেখান হতে স্বপ্ন নামে প্রাণে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akasprodip/
|
2244
|
মহাদেব সাহা
|
মেঘের নদী
|
প্রকৃতিমূলক
|
আকাশে ওই
মেঘের ভরা নদী-
নীল সরোবর
বইছে নিরবধি;
আকাশে মেঘ
স্নিগ্ধ জলাশয়
আজ জীবনে
কেবল দুঃসময়;
আকাশে ওই
স্বর্ণচাঁপার বন,
দূর পাহাড়ে
মেঘের সিংহাসন;
নদীর তলায় চাঁদের বাড়িঘর
একলা কাঁদে
বিরহী অন্তর।
আকাশে ওই
পাখির ডাকঘর
ভালোবাসায়
জড়ায় পরস্পর;
জলের বুকে
চাঁদের ছায়া পড়ে
ডাক শুনি কার
বাহিরে অন্তরে;
আকাশে মেঘ
অথই জলাশয়
এবার গেলে
ফিরবো না নিশ্চয়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1326
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.