id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
2337
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
পরলোক
সনেট
আলোক-সাগর-রূপ রবির কিরণে, ডুবে যথা প্রভাতের তারা সুহাসিনী ;– ফুটে যথা প্রেমামোদে, আইলে যামিনী, কুসুম-কুলের কলি কুসুম-যৌবনে ;– বহি যথা সুপ্রবাহে প্রবাহ-বাহিনী, লভে নিরবাণ সুখে সিন্ধুর চরণে,--- এই রূপে ইহ লোক—শাস্ত্রে এ কাহিনী— নিরস্তর সুখরূপ পরম রতনে পায় পরে পর-লোকে, ধরমের বলে । হে ধৰ্ম্ম, কি লোভে তবে তোমারে বিস্মরি, চলে পাপ-পথে নর, ভুলি পাপ-ছলে ? সংসার-সাগর-মাঝে তব স্বর্ণতরি তেয়াগি, কি লোভে ডুবে বাতময় জলে ? দু দিন বাঁচিতে চাহে, চির দিন মরি ?
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/porolok/
951
জীবনানন্দ দাশ
এ-সব কবিতা আমি যখন লিখেছি
সনেট
এ-সব কবিতা আমি যখন লিখেছি বসে নিজ মনে একা; চালতার পাতা থেকে টুপ — টুপ জ্যোৎস্নায় ঝরছে শিশির; কুয়াশায় সি’র হয়ে ছিল স্নান ধানসিড়ি নদীটির তীরে; বাদুড় আধাঁর ডানা মেলে হিম জ্যোৎস্নায় কাটিয়াছে রেখা আকাঙ্খার; নিভু দীপ আগলায়ে মনোরমা দিয়ে গেছে দেখা সঙ্গে তার কবেকার মৌমাছির…. কিশোরীর ভিড় আমের বউল দিল শীতরাতে; — আনিল আতার হিম ক্ষীর; মলিন আলোয় আমি তাহাদের দেখিলাম, — এ কবিতা লেখাতাহাদের ম্লান মনে কবে, তাহাদের কড়ির মতন ধূসর হাতের রূপ মনে করে; তাহাদের হৃদয়ের তরে। সে কত শতাব্দী আগে তাহাদের করুণ শঙ্খের মতো স্তন তাহাদের হলুদ শাড়ি — ক্ষীর দেহ — তাহাদের অপরূপ মন চলে গেছে পৃথিবীর সব চেয়ে শান্ত হিম সান্ত্বনার ঘরে : আমার বিষন্ন স্বপ্নে থেকে থেকে তাহাদের ঘুম ভেঙে পড়ে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/e-shob-kobita-aami-jokhon-likechi/
3069
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জড়ায়ে আছে বাধা ছাড়ায়ে যেতে চাই
ভক্তিমূলক
জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই, ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে। মুক্তি চাহিবারে তোমার কাছে যাই চাহিতে গেলে মরি লাজে। জানি হে তুমি মম জীবনে শ্রেয়তম, এমন ধন আর নাহি যে তোমা-সম, তবু যা ভাঙাচোরা ঘরেতে আছে পোরা ফেলিয়া দিতে পারি না যে।তোমারে আবরিয়া ধুলাতে ঢাকে হিয়া মরণ আনে রাশি রাশি, আমি যে প্রাণ ভরি তাদের ঘৃণা করি তবুও তাই ভালোবাসি। এতই আছে বাকি, জমেছে এত ফাঁকি, কত যে বিফলতা, কত যে ঢাকাঢাকি, আমার ভালো তাই চাহিতে যবে যাই ভয় যে আসে মনোমাঝে।২২ শ্রাবণ, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/joraye-ache-badha-charaye-jete-chai/
1121
জীবনানন্দ দাশ
বর্ষ-আবাহন
ভক্তিমূলক
ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে দীপ্ত নীলে, শুভ্র রাগে প্রভাত রবি উঠলো জেগে দিব্য পরশ পেয়ে, নাই গগণে মেঘের ছায়া যেন স্বচ্ছ স্বর্গকায়া ভুবন ভরা মুক্ত মায়া মুগ্ধ-হৃদয় চেয়ে।অতীত নিশি গেছে চ'লে চিরবিদায় বার্তা ব'লে কোন আঁধারের গভীর তলে রেখে স্মৃতিলেখা, এসো-এসো ওগো নবীন চ'লে গেছে জীর্ণ মলিন- আজকে তুমি মৃত্যুবিহীন মুক্ত সীমারেখা।#অগ্রন্থিত কবিতা
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/borsho-abahon/
2598
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনেক হাজার বছরের
ভক্তিমূলক
অনেক হাজার বছরের মরু-যবনিকার আচ্ছাদন যখন উৎক্ষিপ্ত হল, দেখা দিল তারিখ-হারানো লোকালয়ের বিরাট কঙ্কাল;-- ইতিহাসের অলক্ষ্য অন্তরালে ছিল তার জীবনক্ষেত্র। তার মুখরিত শতাব্দী আপনার সমস্ত কবিগান বাণীহীন অতলে দিয়েছে বিসর্জন। আর, যে-সব গান তখনো ছিল অঙ্কুরে, ছিল মুকুলে, যে বিপুল সম্ভাব্য সেদিন অনালোকে ছিল প্রচ্ছন্ন অপ্রকাশ থেকে অপ্রকাশেই গেল মগ্ন হয়ে-- যা ছিল অপ্রজ্বল ধোঁওয়ার গোপন আচ্ছাদনে তাও নিবল। যা বিকাল, আর যা বিকাল না,-- দুই-ই সংসারের হাট থেকে গেল চলে একই মূল্যের ছাপ নিয়ে। কোথাও রইল না তার ক্ষত, কোথাও বাজল না তার ক্ষতি। ঐ নির্মল নিঃশব্দ আকাশে অসংখ্য কল্প-কল্পান্তরের হয়েছে আবর্তন। নূতন নূতন বিশ্ব অন্ধকারের নাড়ি ছিঁড়ে জন্ম নিয়েছে আলোকে, ভেসে চলেছে আলোড়িত নক্ষত্রের ফেনপুঞ্জে; অবশেষে যুগান্তে তারা তেমনি করেই গেছে যেমন গেছে বর্ষণশান্ত মেঘ, যেমন গেছে ক্ষণজীবী পতঙ্গ। মহাকাল, সন্ন্যাসী তুমি। তোমার অতলস্পর্শ ধ্যানের তরঙ্গ-শিখরে উচ্ছ্রিত হয়ে উঠছে সৃষ্টি আবার নেমে যাচ্ছে ধ্যানের তরঙ্গতলে। প্রচণ্ড বেগে চলেছে ব্যক্ত অব্যক্তের চক্রনৃত্য, তারি নিস্তব্ধ কেন্দ্রস্থলে তুমি আছ অবিচলিত আনন্দে। হে নির্মম, দাও আমাকে তোমার ঐ সন্ন্যাসের দীক্ষা। জীবন আর মৃত্যু, পাওয়া আর হারানোর মাঝখানে যেখানে আছে অক্ষুব্ধ শান্তি সেই সৃষ্টি-হোমাগ্নিশিখার অন্তরতম স্তিমিত নিভৃতে দাও আমাকে আশ্রয়।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/anak-hajar-busare/
2205
মহাদেব সাহা
ফুটেছে ফুল, বিরহী তবু চাঁদ
প্রকৃতিমূলক
ফুটেছে ফুল ঠোঁটের মতো লাল আকাশে চাঁদ- বিরহী চিরকাল; কে যেন একা গাইছে বসে গান সন্ধ্যা নামে, দিনের অবসান। দুর পাহাড়ে শান্ত মৃদু পায়ে রাত্রি নামে স্তব্ধ নিঝুম গাঁয়ে; শূন্যে ভাসে মেঘের জলাশয় এই জীবনে সবকিছুইতো সয়। বিরহী চাঁদ মোমের মতো গলে বুকের মাঝে কিসের আগুন জ্বলে; মন পড়ে রয় কোন অজানালোকে নিজেকেই সে পোড়ায় নিজের শোকে। ফুটেছে ফুল ঠোঁটের মতো লাল বিরহী চাঁদ বিরহী চিরকাল; ফুটেছে ফুল বিরহী তবু চাঁদ, বাইরে আলো, ভেতরে অবসাদ
https://banglarkobita.com/poem/famous/1406
420
কাজী নজরুল ইসলাম
বার্ষিক সওগাত
রূপক
বন্ধু গো সাকি আনিয়াছ নাকি বরষের সওগাত – দীর্ঘ দিনের বিরহের পরে প্রিয়-মিলনের রাত। রঙিন রাখি, শিরীন শারাব, মুরলী, রবাব, বীণ, গুলিস্তানের বুলবুল পাখি, সোনালি রুপালি দিন। লালা-ফুল সম দাগ-খাওয়া দিল, নার্গিস-ফুলি আঁখ, ইস্পাহানির হেনা-মাখা হাত, পাতলি কাঁখ! নৈশাপুরের গুলবদনির চিবুক গালের টোল, রাঙা লেড়কির ভাঙা ভাঙা হাসি, শিরীন শিরীন বোল। সুরমা-কাজল স্তাম্বুলি চোখ, বসোরা গুলের লালি, নব বোগাদাদি আলিফ-লায়লা, শাজাদি জুলফ-ওয়ালি। পাকা খর্জুর, ডাঁশা আঙ্গুর, টোকো-মিঠে কিসমিস, মরু-মঞ্জীর আব-জমজম,যবের ফিরোজা শিস। আশা-ভরা মুখ,তাজা তাজা বুক, নৌ-জোয়ানির গান, দুঃসাহসীর মরণ-সাধনা, জেহাদের অভিযান। আরবের প্রাণ, ফারেসের বাজু নৌ-তুর্কির, দারাজ দিলীর আফগানি দিল, মূরের জখমি শির। নীল দরিয়ায় মেসেরের আঁসু, ইরাকের টুটা তখ্‌ত, বন্দী শামের জিন্দান-খানা, হিন্দের বদবখ্‌ত! – তাঞ্জাম-ভরা আঞ্জাম এ যে কিছুই রাখনি বাকি, পুরানো দিনের হাতে বাঁধিয়াছ নতুন দিনের রাখি।… চোখের পানির ঝালর-ঝুলানো হাসির খাঞ্চাপোশ – যেন অশ্রুর গড়খাই-ঘেরা দিল্‌খোস ফেরদৌস – ঢাকিয়ো বন্ধু তব সওগাতি-রেকাবি তাহাই দিয়ে, দিবসের জ্বালা ভুলে যেতে চাই রাতের শিশির পিয়ে ! বেদনার বানে সয়লাব সব, পাইনে সাথির হাত, আনো গো বন্ধু নূহের কিশতি– ‘বার্ষিকী সওগাত!’[কৃষ্ণনগর ২৫ অগ্রহায়ণ,১৩৩৩] (জিঞ্জির কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/barshuk-sowgat/
923
জীবনানন্দ দাশ
আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে
সনেট
আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে বসে থাকি; কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে-আসিয়াছে শান- অনুগত বাংলার নীল সন্ধ্যা-কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে; আমার চোখের পরে আমার মুখের পরে চুল তার ভাসে; পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখেনিকো দেখি নাই অত অজস্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত, জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর চুলের বিন্যাসেপৃথিবীর কোনো পথে; নরম ধানের গন্ধ-কলমীর ঘ্রাণ, হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা সরপুটিদের মৃদু ঘ্রাণ, কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত-শীত হাতখান, কিশোরের পায়ে- দলা মুথাঘাস,-লাল লাল বটের ফলের ব্যথিত গন্ধের ক্লান- নীরবতা-এরি মাঝে বাংলার প্রাণ; আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি পাই টের।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/akashey-shat-ti-tara-jokhon-utheche-futey/
1255
জীবনানন্দ দাশ
সেইদিন এই মাঠ
চিন্তামূলক
সেইদিন এই মাঠ স্তব্ধহবে নাকো জানি---এই নদী নক্ষত্রের তলে সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন---সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আ ঝরে ! আমি চলে যাব ব ’লে চালতাফুল কি অর ভিজিবে না শিশিরের জলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে? লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে? সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে !           চারি দিকে শান্ত বাতি---ভিজে গন্ধ---মৃদু কলরব; খেয়ানৌকাগুলো এসে লেগেছে চরের খুব কাছে; পৃথিবীর এই গল্প বেঁচে রবে চিরকাল; এশিরিয়া ধুলো আজ---বেবিলন ছাই হয়ে আছে ।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/sheidin-ai-math/
478
কাজী নজরুল ইসলাম
রক্তাম্বরধারিণী মা
মানবতাবাদী
রক্তাম্বর পর মা এবার জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন। দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন বাজে তরবারি ঝনন-ঝন। সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেল মা গো জ্বাল সেথা জ্বাল কাল্-চিতা। তোমার খড়গ-রক্ত হউক স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা। এলোকেশে তব দুলুক ঝন্‌ঝা কাল-বৈশাখী ভীম তুফান, চরণ-আঘাতে উদ্গারে যেন আহত বিশ্ব রক্ত-বান। নিশ্বাসে তব পেঁজা-তুলো সম উড়ে যাক মা গো এই ভুবন, অ-সুরে নাশিতে হউক বিষ্ণু চক্র মা তোর হেম-কাঁকন। টুটি টপে মারো অত্যাচারে মা, গল-হার হোক নীল ফাঁসি, নয়নে তোমার ধূমকেতু-জ্বালা উঠুক সরোষে উদ্ভাসি। হাসো খলখল, দাও করতালি, বলো হর হর শঙ্কর! আজ হতে মা গো অসহায় সম ক্ষীণ ক্রন্দন সম্বর। মেখলা ছিঁড়িয়া চাবুক করো মা, সে চাবুক করো নভ-তড়িৎ, জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে লালে-লাল হোক শ্বেত হরিৎ। নিদ্রিত শিবে লাথি মারো আজ, ভাঙো মা ভোলার ভাঙ-নেশা, পিয়াও এবার অ-শিব গরল নীলের সঙ্গে লাল মেশা। দেখা মা আবার দনুজ-দলনী অশিব-নাশিনী চণ্ডি রূপ; দেখাও মা ঐ কল্যাণ-করই আনিতে পারে কি বিনাশ-স্তূপ। শ্বেত শতদল-বাসিনী নয় আজ রক্তাম্বরধারিণী মা, ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/roctoshorodhony/
2036
মলয় রায়চৌধুরী
কুর্মিটোলা, জেহানাবাদ, ১৯৮৯, সন্ধ্যা
মানবতাবাদী
মা শুকনো কচুরিপানার মাঝে, রান্নাঘরে, সায়াপরা অবস্হায়, পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন, চুল খোলা ছিল শীত-মিশেল হেমন্তে বাঁ হাতে ভাঙা বয়ামে উড়ন্ত ঘোড়া, আঁচলগিঁটে মেঘ-ভেজা উল্কার হলুদ টুকরো থেকে খড়ের নৌকো ভাসালেন, উদাস, বালকদের হল্লায় কুর্চিকুসুম এবার ওনার কী দশা হবে জানি আবদুল, গফুরের ভাই, খবরটা প্রথম দিল কিন্তু মা হাল ছেড়ে দিলেন, ভুরুর ধুলোয় ঝাপসা সংসার কালী ঠাকুরের প্রদীপের তেলে কেন যে লুকিয়ে রাখেছিলেন মুর্শিদাবাদী খুদ আর ভাঙামুগ খানিক রোদমাখা ত্বক, অপরিচিত ভয়ে, গালে হাত রেখে, নাম ভুলে ছেন গরাদের স্যাঁতসেতে ছায়া পড়েছে ঝুরিনরম মুখে মগজ একেবারে ল্যাংটো থিরথিরে শিশিরে, ওঁর হাসির মতন দেখতে রোগা কৃষ্ণসার তুষারে কাঠের জুতো পায়ে, আকাশমুখো নেকড়েরা, সারাদিন কেঁদেছেন পুরুতমশায় ছুঁচে টানা রক্ত নিলেন হাত থেকে ঠোঁটের কোণায় কষ্ট, হাঁপিয়ে উঠছেন সিঁড়ি চড়তে ২৭ মার্চ ১৯৮৯
https://banglarkobita.com/poem/famous/1148
1203
জীবনানন্দ দাশ
শিরীষের ডালপালা
চিন্তামূলক
শিরীষের ডালপালা লেগে আছে বিকেলের মেঘে, পিপুলের ভরা বুকে চিল নেমে এসেছে এখন; বিকেলের শিশুসুর্যকে ঘিরে মায়ের আবেগে করুণ হয়েছে ঝাউবন। নদীর উজ্জ্বল জল কোরালের মতো কলবরে ভেসে নারকোলবনে কেড়ে নেয় কোরালীর ভ্রূণ; বিকেল বলেছে এই নদীটিকে: ‘শান্ত হতে হবে–’ অকূল সুপুরিবন স্থির জলে ছায়া ফেলে এক মাইল শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে। তার মুখ মনে পড়ে এ-রকম স্নিগ্ধ পৃথিবীর পাতাপতঙ্গের কাছে চলে এসে; চারিদিকে রাত্রি নক্ষত্রের আলোড়ন এখন দয়ার মতো; তবুও দয়ার মানে মৃত্যুতে স্থির হয়ে থেকে ভুলে যাওয়া মানুষের সনাতন মন।
https://banglarkobita.com/poem/famous/962
2627
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অল্পেতে খুশি হবে
ছড়া
অল্পেতে খুশি হবে দামোদর শেঠ কি। মুড়কির মোয়া চাই, চাই ভাজা ভেটকি।আনবে কট্‌কি জুতো, মট্‌কিতে ঘি এনো, জলপাইগুঁড়ি থেকে এনো কই জিয়োনো– চাঁদনিতে পাওয়া যাবে বোয়ালের পেট কি।চিনেবাজারের থেকে এনো তো করমচা, কাঁকড়ার ডিম চাই, চাই যে গরম চা, নাহয় খরচা হবে মাথা হবে হেঁট কি।মনে রেখো বড়ো মাপে করা চাই আয়োজন, কলেবর খাটো নয়– তিন মোন প্রায় ওজন। খোঁজ নিয়ো ঝড়িয়াতে জিলিপির রেট কী।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/olpete-khushi-hobe/
5839
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ভালোবাসা
প্রেমমূলক
ভালোবাসা নয় স্তনের ওপরে দাঁত? ভালোবাসা শুধু শ্রাবণের হা-হুতাশ? ভালোবাসা বুঝি হৃদয় সমীপে আঁচ? ভালোবাসা মানে রক্ত চেটেছে বাঘ! ভালোবাসা ছিল ঝর্ণার পাশে একা সেতু নেই আকাশে পারাপার ভালাবাসা ছিল সোনালি ফসলে হওয়া ভালোবাসা ছিল ট্রেন লাইনের রোদ। শরীর ফুরোয় ঘামে ভেসে যায় বুক অপর বহুতে মাথা রেখে আসে ঘুম ঘুমের ভিতরে বারবার বলি আমি ভালোবাসাকেই ভালবাসা দিয়ে যাবো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1874
1971
বিনয় মজুমদার
মানুষ
মানবতাবাদী
দেবভাষার ব্যাকরণ অনুসারে মানুষসৃষ্টি করা হয় । দেবভাষার ব্যাকরণ একখানা ‘সমগ্র ব্যাকরণ কৌমুদী’ । পাঠক দেখুন দেবভাষায় একটি শব্দ নেই ‘মনোলীন’ শব্দটি নেই । শব্দরা সব দেবদেবী । দেবভাষায় মনোলীন শব্দদেবতাটি নেই । এইবার আমি মনোলীন শব্দটি লিখছি । তাহলে ভবিষ্যতে মনোলীন শব্দদেবতাটি সৃষ্টি হবে – দেখতেহবে মানুষের মতো । দেবভাষার ব্যাকারণে ‘গদাধর’ শব্দটি আছে । কিনতু ‘গদাধরা’ শব্দটি নেই । তাহলে ‘গদাধরা’ শব্দদেবীটিকে বানানো সম্ভব । গদাধরা শব্দদেবীটির চেহারা মেয়েমানুষের মতো ।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4062.html
3111
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জুতা-আবিষ্কার
নীতিমূলক
কহিলা হবু, `শুন গো গোবুরায়, কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র--- মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায় ধরণী-মাঝে চরণ-ফেলা মাত্র! তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি, রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি। আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি, রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি! শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার, নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর।' শুনিয়া গোবু ভাবিয়া হল খুন, দারুণ ত্রাসে ঘর্ম বহে গাত্রে। পণ্ডিতের হইল মুখ চুন, পাত্রদের নিদ্রা নাহি রাত্রে। রান্নাঘরে নাহিকো চড়ে হাঁড়ি, কান্নাকাটি পড়িল বাড়িমধ্যে, অশ্রুজলে ভাসায়ে পাকা দাড়ি কহিলা গোবু হবুর পাদপদ্মে, `যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে, পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!' শুনিয়া রাজা ভাবিল দুলি দুলি, কহিল শেষে, `কথাটা বটে সত্য--- কিন্তু আগে বিদায় করো ধুলি, ভাবিয়ো পরে পদধুলির তত্ত্ব। ধুলা-অভাবে না পেলে পদধুলা তোমরা সবে মাহিনা খাও মিথ্যে, কেন বা তবে পুষিনু এতগুলা উপাধি-ধরা বৈজ্ঞানিক ভৃত্যে? আগের কাজ আগে তো তুমি সারো, পরের কথা ভাবিয়ো পরে আরো।' আঁধার দেখে রাজার কথা শুনি, যতনভরে আনিল তবে মন্ত্রী যেখানে যত আছিল জ্ঞানীগুণী দেশে বিদেশে যতেক ছিল যন্ত্রী। বসিল সবে চশমা চোখে আঁটি, ফুরায়ে গেল উনিশ পিপে নস্য। অনেক ভেবে কহিল, `গেলে মাটি ধরায় তবে কোথায় হবে শস্য?' কহিল রাজা, `তাই যদি না হবে, পণ্ডিতেরা রয়েছ কেন তবে?' সকলে মিলি যুক্তি করি শেষে কিনিল ঝাঁটা সাড়ে সতেরো লক্ষ, ঝাঁটের চোটে পথের ধুলা এসে ভরিয়ে দিল রাজার মুখ বক্ষ। ধুলায় কেহ মেলিতে নারে চোখ, ধুলার মেঘে পড়িল ঢাকা সূর্য। ধুলার বেগে কাশিয়া মরে লোক, ধুলার মাঝে নগর হল উহ্য। কহিল রাজা, `করিতে ধুলা দূর, জগত্‍‌ হল ধুলায় ভরপুর!' তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁক মশক কাঁখে একুশ লাখ ভিস্তি। পুকুরে বিলে রহিল শুধু পাঁক, নদীর জলে নাহিক চলে কিস্তি। জলের জীব মরিল জল বিনা, ডাঙার প্রাণী সাঁতার করে চেষ্টা--- পাঁকের তলে মজিল বেচা-কিনা, সর্দিজ্বরে উজাড় হল দেশটা। কহিল রাজা, `এমনি সব গাধা ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা!' আবার সবে ডাকিল পরামর্শে; বসিল পুন যতেক গুণবন্ত--- ঘুরিয়া মাথা হেরিল চোখে সর্ষে, ধুলার হায় নাহিক পায় অন্ত। কহিল, `মহী মাদুর দিয়ে ঢাকো, ফরাশ পাতি করিব ধুলা বন্ধ।' কহিল কেহ, `রাজারে ঘরে রাখো, কোথাও যেন থাকে না কোনো রন্ধ্র। ধুলার মাঝে না যদি দেন পা তা হলে পায়ে ধুলা তো লাগে না।' কহিল রাজা, `সে কথা বড়ো খাঁটি, কিন্তু মোর হতেছে মনে সন্ধ, মাটির ভয়ে রাজ্য হবে মাটি দিবসরাতি রহিলে আমি বন্ধ।' কহিল সবে, `চামারে তবে ডাকি চর্ম দিয়া মুড়িয়া দাও পৃথ্বী। ধূলির মহী ঝুলির মাঝে ঢাকি মহীপতির রহিবে মহাকীর্তি।' কহিল সবে, `হবে সে অবহেলে, যোগ্যমতো চামার যদি মেলে।' রাজার চর ধাইল হেথা হোথা, ছুটিল সবে ছাড়িয়া সব কর্ম। যোগ্যমতো চামার নাহি কোথা, না মিলে তত উচিত-মতো চর্ম। তখন ধীরে চামার-কুলপতি কহিল এসে ঈষত্‍‌ হেসে বৃদ্ধ, `বলিতে পারি করিলে অনুমতি, সহজে যাহে মানস হবে সিদ্ধ। নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।' কহিল রাজা, `এত কি হবে সিধে, ভাবিয়া ম'ল সকল দেশ-শুদ্ধ!' মন্ত্রী কহে, `বেটারে শূল বিঁধে কারার মাঝে করিয়া রাখো রুদ্ধ।' রাজার পদ চর্ম-আবরণে ঢাকিল বুড়া বসিয়া পদোপান্তে। মন্ত্রী কহে, `আমারো ছিল মনে কেমনে বেটা পেরেছে সেটা জানতে।' সেদিন হতে চলিল জুতা পরা--- বাঁচিল গোবু, রক্ষা পেল ধরা।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/juta-abiskar/
4019
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হরপণ্ডিত বলে ব্যঞ্জন সন্ধি এ
ছড়া
হরপণ্ডিত বলে, “ব্যঞ্জন সন্ধি এ, পড়ো দেখি, মনুবাবা, একটুকু মন নিয়ে।’মনোযোগহন্ত্রীর বেড়ি আর খন্তির ঝংকার মনে পড়ে; হেঁসেলের পন্থার ব্যঞ্জন-চিন্তায় অস্থির মন তার। থেকে থেকে জল পড়ে চক্ষুর কোণ দিয়ে।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/horpondit-bole-byanjon-sondhi-e/
2152
মহাদেব সাহা
টিভিতে লেনিনের মূর্তি অপসারনের দৃশ্য দেখে
মানবতাবাদী
কাকে ভালোবাসে, কাকে করে প্রত্যাখ্যান, না বুঝেই কাকে বা পরায় মালা, কাকে ছুঁড়ে ফেলে। এই মূঢ় মানুষেরা বোঝেনা কিছুই, মূর্তি ভাঙে, উন্মত্ত উল্লাসে মাতে এমনকি ফেলে না চোখের জল যার জন্য প্রকৃতই হাজার বছর কাঁদবার কথা; বিশ শতক শেষের এই পৃথিবীকে আজ বড়ো অবিম্বাসী বলে বোধ হয়, মানুসের কোনো মহৎ কীর্তি আর ত্যাগের স্বাক্ষর ধারণ করে না এই কুটিল সময়- আজ সে কেবল শূন্যতাকে গাঢ় আলিঙ্গন করে, পৃথিবীর এই আদিম আঁধারে বুঝি যায়, সবই অস্ত যায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/368
3688
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মনে পড়ে শৈলতটে তোমাদের নিভৃত কুটির
চিন্তামূলক
মনে পড়ে, শৈলতটে তোমাদের নিভৃত কুটির; হিমাদ্রি যেথায় তার সমুচ্চ শান্তির আসনে নিস্তব্ধ নিত্য, তুঙ্গ তার শিখরের সীমা লঙ্ঘন করিতে চায় দূরতম শূন্যের মহিমা। অরণ্য যেতেছে নেমে উপত্যকা বেয়ে; নিশ্চল সবুজবন্যা, নিবিড় নৈ:শব্দ্যে রাখে ছেয়ে ছায়াপুঞ্জ তার। শৈলশৃঙ্গ-অন্তরালে প্রথম অরুণোদয়-ঘোষণার কালে অন্তরে আনিতে স্পন্দ বিশ্বজীবনের সদ্যস্ফূর্ত চঞ্চলতা। নির্জন বনের গূঢ় আনন্দের যত ভাষাহীন বিচিত্র সংকেতে লভিতাম হৃদয়েতে যে বিস্ময় ধরণীর প্রাণের আদিম সূচনায়। সহসা নাম-না-জানা পাখিদের চকিত পাখায় চিন্তা মোর যেত ভেসে শুভ্রহিমরেখাঙ্কিত মহানিরুদ্দেশে। বেলা যেত,লোকালয় তুলিত ত্বরিত করি সুপ্তোত্থিত শিথিল সময়। গিরিগাত্রে পথ গেছে বেঁকে, বোঝা বহি চলে লোক,গাড়ি ছুটে চলে থেকে থেকে। পার্বতী জনতা বিদেশী প্রাণযাত্রার খন্ড খন্ড কথা মনে যায় রেখে, রেখা-রেখা অসংলগ্ন ছবি যায় এঁকে। শুনি মাঝে মাঝে অদূরে ঘণ্টার ধ্বনি বাজে, কর্মের দৌত্য সে করে প্রহরে প্রহরে। প্রথম আলোর স্পর্শ লাগে, আতিথ্যের সখ্য জাগে ঘরে ঘরে। স্তরে স্তরে দ্বারের সোপানে নানারঙা ফুলগুলি অতিথির প্রাণে। গৃহিণীর যত্ন বহি প্রকৃতির লিপি নিয়ে আসে আকাশে বাতাসে। কলহাস্যে মানুষের স্নেহের বারতা যুগযুগান্তের মৌনে হিমাদ্রির আনে সার্থকতা।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mana-par-shalutata-tumadar-kutera/
4917
শামসুর রাহমান
পারবো নাকি পূর্ণিমার চাঁদ এনে
মানবতাবাদী
আমি কি প্রত্যহ ভীতসন্ত্রস্ত মানুষে হয়ে কাটাবো সময়? আমাকে মোড়ল আর তার স্যাঙাত এবং তল্পিবাহকেরা দেখাবে রক্তিম চোখ যখন তখন আর আমি মাথা হেঁট করে দূরে চলে যাবো আর গৃহকোণে লুকাবো নিজেকে। তাহলে আমি কি এভাবেই কাটাবো এখানে দিনরাত? বালিশে লুকিয়ে মুখ নিজেকে ধিক্কার দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে ছিঁড়বো মাথার চুল? অমাবস্যা-রাতে হবো আত্মাঘাতী?কী আমার দান এ সমাজে? আমি কি পেরেছি বদলাতে সমাজের চেহারা নিজের সাধ অনুসারে? পেরেছি কি ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিতে কুসংস্কার?পারিনি এখনও আমি আমার কাছের মানে অন্তরঙ্গ জনদের ভাবনা-চিন্তাকে ঠিক আমার ধারায় এনে সমাজের চেহারায় আলোর ঝলক সৃষ্টি করে নিজেরা ক্রমশ ধন্য হতে।আসন্ন সন্ধ্যায় অন্ধকারে ছিঁড়ে আমরা কি পারবো না পূর্ণিমার চাঁদ এনে আমাদের সব অকল্যাণ মুছে ফেলে আগামীকে কল্যাণের আলোয় প্রদীপ্ত করে এক নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করে ধন্য হতে?
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/parbo-naki-purnimar-chad-ene/
1998
বিষ্ণু বিশ্বাস
এক বৃদ্ধের গল্প
চিন্তামূলক
সূর্য ধীরে নিভে গেল। আকাশে গোলাপি একটা রঙ আস্তে অন্ধকারে হারাল। এক বৃদ্ধকে ঘিরে আমরা বসে আছি কিছু তরুণ তরুণী। বহুকালের প্রাচীন। ও আমাদের কিছু বলবে ভেবেছে, অথবা, আমরা কিছু শুনব অপেক্ষায় রয়েছি। আমরা কোনো কথাই বলছি না। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ- বৃদ্ধটির। নাভীপদ্মে সঞ্চিত যেন বহুকালের গাঁজাময় গেজানো ধোঁয়া সে অসীমে ফুঁকে দিল। ‘আমি নেই, হয়ত ছিলাম’, শুরু হল এইভাবে তার কথা। সে মরে গেছে কি বেঁচে আছে, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না তখন। কে জানে, সে হয়ত শেষ থেকে শুরু করেছিল। তবে তার গল্প শুরু হলো সে সময় যে সময়টিতে কেউ আমরা আর তৈরি নই এই গল্পটি শোনবার জন্য। কিন্তু শুরুতেই একটি প্রাচীন তরবারির কর্মসিদ্ধির কথা বলে, সে আমাদের থমকে দিয়েছে। তারপর কবেকার ওর জীর্ণ ব্যাগ থেকে রাশি রাশি ঝরা পাতার মতো টাকা -টাকা, একে একে, মুঠো মুঠো বের করল, আর তাতে আগুন জ্বালাল। পৃথিবীর যতসব সুগন্ধি বৃক্ষের পত্র, পোড়া মাংস আর ধূপগন্ধের মতো, চন্দন বনের হাওয়ায় কোথায় যেন হারিয়ে গেল সেইসব। আমরা আবার ব্যাকুল হলাম- কী বলে, শুনবো ভেবে ঠিক তখুনি সে তার পলকা দাড়িতে কিছুক্ষণ হাত বুলালো, মাথা থেকে টুপিটি পকেটে নিল এবং হাসল, তীব্র মৃদুস্বরে বলল, ‘এবার তোমরা’। তারপর দ্রুত ভিড়ের ভেতর কোথায় সে ডুব দিল কোনদিন, তারপরে, তাকে আমরা আর দেখি নি।২১/২২.১১.৯২
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/01/%e0%a6%8f%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a7%83%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%81-%e0%a6%ac%e0%a6%bf/
4034
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাস্যদমনকারী গুরু
ছড়া
হাস্যদমনকারী গুরু– নাম যে বশীশ্বর, কোথা থেকে জুটল তাহার ছাত্র হসীশ্বর। হাসিটা তার অপর্যাপ্ত, তরঙ্গে তার বাতাস ব্যাপ্ত, পরীক্ষাতে মার্কা যে তাই কাটেন মসীশ্বর। ডাকি সরস্বতী মাকে,– “ত্রাণ করো এই ছেলেটাকে, মাস্টারিতে ভর্তি করো হাস্যরসীশ্বর।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hassyodomonkari-guru/
5953
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
আকাশপ্রদীপ
প্রেমমূলক
আলোর শহর চমকে উঠল অন্ধকারে আসতে আসতে বৃদ্ধ হল গাছের পাতা জং ধরা ট্রাম কোথায় যেন আনমনা আজ হারিয়ে গেল তোমার দেওয়া অঙ্ক খাতাতুমিও কোথাও হারিয়ে গেছ, আর আসো না। আয়না-কোণায় ঘুমিয়ে থাকে মনমরা টিপ শূন্য ঘরে পর্দা ওড়ে, বই জমে যায়… বন্ধু আমার বুকের ভেতর একলা ব-দ্বীপসব তো আছে। তবুও কেন কিচ্ছুটি নেই? আতসবাজির আলোয় কেন রাত কাটে না? একলা পাগল ঘুমিয়ে থাকে পথের পাশে… তার দু চোখের স্বপ্নগুলো ভীষণ চেনাবাদবাকি সব ক্লান্ত ঋতুর মেরুন শহর যার পাশে রোজ বইতে থাকে বৃদ্ধা নদী এই শহরের কোথাও আছো – মনকে বোঝাই – অন্ধকারে তাই তো জ্বলে আকাশপ্রদীপ
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%aa-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%8e-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d/
3055
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছয়
চিন্তামূলক
অতিথিবৎসল, ডেকে নাও পথের পথিককে তোমার আপন ঘরে, দাও ওর ভয় ভাঙিয়ে। ও থাকে প্রদোষের বস্‌তিতে, নিজের কালো ছায়া ওর সঙ্গে চলে কখনো সমুখে কখনো পিছনে, তাকেই সত্য ভেবে ওর যত দুঃখ যত ভয়। দ্বারে দাঁড়িয়ে তোমার আলো তুলে ধরো, ছায়া যাক মিলিয়ে, থেমে যাক ওর বুকের কাঁপন।  বছরে বছরে ও গেছে চলে তোমার আঙিনার সামনে দিয়ে, সাহস পায় নি ভিতরে যেতে, ভয় হয়েছে পাছে ওর বাইরের ধন হারায় সেখানে। দেখিয়ে দাও ওর আপন বিশ্ব তোমার মন্দিরে, সেখানে মুছে গেছে কাছের পরিচয়ের কালিমা, ঘুচে গেছে নিত্যব্যবহারের জীর্ণতা, তার চিরলাবণ্য হয়েছে পরিস্ফুট।  পান্থশালায় ছিল ওর বাসা, বুকে আঁকড়ে ছিল তারই আসন, তারই শয্যা, পলে পলে যার ভাড়া জুগিয়ে দিন কাটালো কোন্‌ মুহূর্তে তাকে ছাড়বে ভয়ে আড়াল তুলেছে উপকরণের। একবার ঘরের অভয় স্বাদ পেতে দাও তাকে বেড়ার বাইরে।আপনাকে চেনার সময় পায় নি সে, ঢাকা ছিল মোটা মাটির পর্দায়; পর্দা খুলে দেখিয়ে দাও যে, সে আলো, সে আনন্দ, তোমারই সঙ্গে তার রূপের মিল। তোমার যজ্ঞের হোমাগ্নিতে তার জীবনের সুখদুঃখ আহুতি দাও, জ্বলে উঠুক তেজের শিখায়, ছাই হোক যা ছাই হবার।       হে অতিথিবৎসল, পথের মানুষকে ডেকে নাও ঘরে, আপনি যে ছিল আপনার পর হয়ে সে পাক্‌ আপনাকে। শান্তিনিকেতন, ২৪ অক্টোবর ১৯৩৫
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chhoy/
1249
জীবনানন্দ দাশ
সূর্যসাগরতীরে
চিন্তামূলক
সূর্যের আলো মেটায় খোরাক কার; সেই কথা বুঝা ভার অনাদি যুগের অ্যামিবার থেকে আজিকে ওদের প্রাণ গড়িয়া উঠিল কাফ্রির মতো সূর্যসাগরতীরে কালো চামড়ার রহস্যময় ঠাস বুনোনিটি ঘিরে।চারিদিকে স্থির-ধুম্র নিবিড় পিড়ামিড যদি থাকে- অনাদি যুগের অ্যামিবার থেকে আজিকে মানবপ্রাণ সূর্যতাড়সে ভ্রুণকে যদিও করে ঢের ফলবান- তবুও আমরা জননী বলিবো কাকে? গড়িয়া উঠিলো মানবের দল সূর্যসাগরতীরে কালো আত্মার রহস্যময় ভুলের বুনুনি ঘিরে।গ্রন্থ: মহাপৃথিবী
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/surjosagortire/
2193
মহাদেব সাহা
না-লেখা কবিতাগুলি
চিন্তামূলক
পথে পথে ঘুরে দেখি না, না, হারিয়ে যায়নি একটিও না-লেখা কবিতা- আছে আগুনে, ইথারে, বাষ্পে, বকটি মৌলিক পদার্থে, ণক্ষেত্রে, সমুদ্রে, আকামে আছে এই না-লেখা কবিতা। দেখি তাকে কারো চোখে হয়ে আছে দুফোঁটা নিবিড় অশ্রু, কারো বুকে অবিরাম তপ্ত দীর্ঘশ্বাস্ত কোথাওবা ফুটে আছে সবচেয়ে সুদৃশ্য গোলাপ সূনীল আকাশে রাশি রাশি তারা; সব মানুষের বুকের ভেতরে আছে যে অনন্ত ফল্গুধারা স্বচ্ছ সরোবর, স্নেহমমতার স্বর্ণখনি অলিখিত আমার কবিতাগুলি সেই নায়েগ্রার জলের প্রপাত এই না-লেখা কবিতা দেখি মাঝে মাঝে একাকী ঝর্নার জলে ভেজায় বিশুস্ক কণ্ঠ যেন তৃষ্ণার্ত হরিণ, যা কিছু সুন্দর, অপরূপ, কদাকার তার দিকে তাকিয়েও মনে হয় একেকটি না-লেখা কবিতা; তারা কখনো দেকেনি মুখ আলো-বাতাসের কোথায় যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কোথাওবা হয়ে আছে সবুজ প্রেইরী, কোথাওবা ছায়াঘেরা শান্ত বনস্পতি, এই না-লেখা কবিতা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/477
2713
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার কাছে শুনতে চেয়েছ
চিন্তামূলক
শ্রীমান ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কল্যাণীয়েষুআমার কাছে শুনতে চেয়েছ গানের কথা; বলতে ভয় লাগে, তবু কিছু বলব। মানুষের জ্ঞান বানিয়ে নিয়েছে আপন সার্থক ভাষা। মানুষের বোধ অবুঝ, সে বোবা, যেমন বোবা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। সেই বিরাট বোবা আপনাকে প্রকাশ করে ইঙ্গিতে, ব্যাখ্যা করে না। বোবা বিশ্বের আছে ভঙ্গি, আছে ছন্দ, আছে নৃত্য আকাশে আকাশে। অণুপরমাণু অসীম দেশে কালে বানিয়েছে আপন আপন নাচের চক্র, নাচছে সেই সীমায় সীমায়; গড়ে তুলছে অসংখ্য রূপ। তার অন্তরে আছে বহ্নিতেজের দুর্দাম বোধ সেই বোধ খুঁজছে আপন ব্যঞ্জনা, ঘাসের ফুল থেকে শুরু ক'রে আকাশের তারা পর্যন্ত। মানুষের বোধের বেগ যখন বাঁধ মানে না, বাহন করতে চায় কথাকে,-- তখন তার কথা হয়ে যায় বোবা, সেই কথাটা খোঁজে ভঙ্গি, খোঁজে ইশারা, খোঁজে নাচ, খোঁজে সুর, দেয় আপনার অর্থকে উলটিয়ে, নিয়মকে দেয় বাঁকা ক'রে। মানুষ কাব্যে রচে বোবার বাণী। মানুষের বোধ যখন বাহন করে সুরকে তখন বিদ্যুচ্চঞ্চল পরমাণুপুঞ্জের মতোই সুরসংঘকে বাঁধে সীমায়, ভঙ্গি দেয় তাকে, নাচায় তাকে বিচিত্র আবর্তনে। সেই সীমায়-বন্দী নাচন পায় গানে-গড়া রূপ। সেই বোবা রূপের দল মিলতে থাকে। সৃষ্টির অন্দরমহলে, সেখানে যত রূপের নটী আছে ছন্দ মেলায় সকলের সঙ্গে নূপুর-বাঁধা চাঞ্চল্যের দোলযাত্রায়। আমি যে জানি এ-কথা যে-মানুষ জানায় বাক্যে হোক সুরে হোক, রেখায় হোক, সে পণ্ডিত। আমি যে রস পাই, ব্যথা পাই, রূপ দেখি, এ-কথা যার প্রাণ বলে গান তারি জন্যে, শাস্ত্রে সে আনাড়ি হলেও তার নাড়িতে বাজে সুর। যদি সুযোগ পাও কথাটা নারদমুনিকে শুধিয়ো, ঝগড়া বাধাবার জন্যে নয়, তত্ত্বের পার পাবার জন্যে সংজ্ঞার অতীতে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-kasa-sunta-chase/
993
জীবনানন্দ দাশ
কেন মিছে নক্ষত্রেরা
প্রকৃতিমূলক
কেন মিছে নক্ষত্রেরা আসে আর? কেন মিছে জেগে ওঠে নীলাভ আকাশ? কেন চাঁদ ভেসে ওঠেঃ সোনার ময়ূরপঙ্খী অশ্বত্থের শাখার পিছনে? কেন ধুলো সোঁদা গন্ধে ভরে ওঠে শিশিরের চুমো খেয়ে- গুচ্ছে গুচ্ছে ফুটে ওঠে কাশ? খঞ্জনারা কেন নাচে? বুলবুলি দুর্গাটুনটুনি কেন ওড়াওড়ি করে বনে বনে? আমরা যে কমিশন নিয়ে ব্যস্ত- ঘাটি বাঁধি- ভালিবাসি নগর ও বন্দরের শ্বাস ঘাস যে বুতের নীচে ঘাস শুধু- আর কিছু নয় আহা- মোটের যে সবচেয়ে বড় এই মানব্জীবনে খঞ্জনারা নাচে কেন তবে আর- ফিঙা বুলবুলি কেন উড়াউড়ি করে বনে বনে?
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kani-miche-noakkhatrera/
2191
মহাদেব সাহা
দৈন্য
প্রেমমূলক
কিনেছি অনেক দামী উপহার বহু মনোহর কাগজের ফুল; ভালোবাসা দিয়ে হয় নাই কেনা একখানি মেঘ একটি বকুল! জমাজমি আর গৃহ আসবাব অধিক মূল্যে করে রাখি ক্রয়, শুধু কিনি নাই কানা কড়ি দিয়ে একজোড়া চোখ একটি হৃদয়!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1488
4671
শামসুর রাহমান
গদ্য সনেট_ ৬
প্রেমমূলক
বুকের কাছে একগুচ্ছ নীল ফুল ফুটল, আমি ওদের নাম রাখলাম অভিমান। ফুলগুলোর ভেতরে অকস্মাৎ অজস্র কাঁটা গজিয়ে আমাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে প্রায় উন্মত্ততার খাদের ধারে নিয়ে গেল। আমি কি বলিনি আমাকে তুমি এভাবে দণ্ড দিও না কখনো, যা আমার রক্ত শুষে নেয় ড্রাকুলার মতো? তোমার কথা ভেবে ভেবে আমি আজ প্রতি মুহূর্তে আতশবাজি হয়ে জ্বলেছি, হয়েছি ফিনিক্স পাখি।তোমাকে ঘিরে আমার স্বপ্নেরা মেতেছে সুফী-নৃত্যে আমার অন্তরের তন্তুজাল থেকে বেরিয়ে এসেছে শব্দের ঝাঁক, সেসব শব্দকে তোমার প্রিয়ংবদা সহচরী বানিয়ে নিজেকে বুভুক্ষু রেখেছি। অথচ তুমি উদাসীনতায় মজে একটি শব্দও খরচ করলে না কিছুতেই, এখন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির মতো অনিদ্রায় ভুগছি।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/godyo-sonet-6/
3763
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যখন জলের কল
ছড়া
যখন জলের কল হয়েছিল পলতায় সাহেবে জানালো খুদু, ভরে দেবে জল তায়। ঘড়াগুলো পেত যদি শহরে বহাত নদী, পারেনি যে সে কেবল কুমোরের খলতায়।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jokhon-joler-kol/
3598
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিবসনা
সনেট
ফেলো গো বসন ফেলো — ঘুচাও অঞ্চল । পরো শুধু সৌন্দর্যের নগ্ন আবরণ সুরবালিকার বেশ কিরণবসন । পরিপূর্ণ তনুখানি বিকচ কমল , জীবনের যৌবনের লাবণ্যের মেলা । বিচিত্র বিশ্বের মাঝে দাঁড়াও একেলা । সর্বাঙ্গে পড়ুক তব চাঁদের কিরণ , সর্বাঙ্গে মলয় – বায়ু করুক সে খেলা । অসীম নীলিমা – মাঝে হও নিমগন তারাময়ী বিবসনা প্রকৃতির মতো । অতনু ঢাকুক মুখ বসনের কোণে তনুর বিকাশ হেরি লাজে শির নত । আসুক বিমল উষা মানবভবনে , লাজহীনা পবিত্রতা — শুভ্র বিবসনে ।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bibosona/
4712
শামসুর রাহমান
ছন্নছাড়া ধূলিঝড়ে
চিন্তামূলক
অকস্মাৎ বাষট্রির এই ছন্নছাড়া ধূলিঝড়ে একি লণ্ডভণ্ড কাণ্ড। আকাশটা বুঝি ভাঙল কাচের বাসনের মতো আর গাছপালাগুলোর মাতন যেন ক্ষ্যাপা সন্ন্যাসীর নাচ, শেকড় বাকড় ছেড়ে দেবে ছুট। মুখের উপর তোমার চুলের ঝাপ্টা। আমি পথ দেখি না, আকাশ অথবা চলন্ত যান-কিছুই দেখি না, এই দুরু অনুভবে আমার কেবল তুমি। কখন যে বিদ্যুতের মতো ঝল্‌সে উঠে নেমে গেলে পথে, আমার চাতক ব্যাকুলতা তোমাকে পেল না খুঁজে।অন্ধ ভিখারির ব্যগ্রতায় নিঃশব্দে কুড়াতে থাকি টুকরো টুকরো কথা, তোমার বিব্রত দীর্ঘশ্বাস, ভাঙাচোরা আমার স্বপ্নের ফিসফিস।বাষট্রির এই ছন্নছাড়া ধূলিঝড়ে কোথায় খুঁজব ডেরা? নিজের শরীর থেকে মুঠো মুঠো ছাই উড়িয়ে, ফুরিয়ে আয়ু-রেণু টলতে টলতে আজ এইতো আমার পথ চলা।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/chonnochara-dhulijhore/
1319
তসলিমা নাসরিন
কাঁপন ১৯
প্রেমমূলক
আমি ততটা যুবতী নই যতটা ছিলাম আগে কিন্তু তত তো বৃদ্ধা নই যত আমি হব। তোমার স্পর্শে যদি এ শরীর জাগে, তুমি যে হও সে হও, কোনও দ্বিধা নেই, শোবো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1989
1864
পূর্ণেন্দু পত্রী
বিলাপ
চিন্তামূলক
হারানো অতীত হানা দেয় ফিরে ফিরে। পরিমাপ করি আজ কী সর্বস্বান্ত। নিশ্বাসে বায়ু, তবু নিঃশেষ আয়ু, প্রাণের প্রবল কলকোলাহল শান্ত। জাগ্রত আছে যে দুটি-একটি স্নায়ু। তারাও বিলাপ বিলায় অশ্রুনীরে। দেখি দিগন্তে মুছে গেছে দিকপ্রান্ত আকাশ বইছে আঁধারকে নতশিরে। দু’হাতে কালের মন্দিরা বাজে নিত্য। বাসনা-বহুল জীবনেই শুধু বিঘ্ন। চীৎকার করে সন্তোগাতুর চিত্ত আত্মার কাছে আত্মকেন্দ্র ঘিরে। প্রাণাম্বেষণে যারা বেশী উদ্বিগ্ন তারা নির্জনে হেঁটে যায় মন্দিরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/482
2344
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম সর্গ
মহাকাব্য
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি, কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে, পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি রাঘবারি? কি কৌশলে, রাক্ষসভরসা ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে — অজেয় জগতে — ঊর্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা? বন্দি চরণারবিন্দ, অতি মন্দমতি আমি, ডাকি আবার তোমায়, শ্বেতভুজে ভারতি! যেমতি, মাতঃ, বসিলা আসিয়া, বাল্মীকির রসনায় (পদ্মাসনে যেন) যবে খরতর শরে, গহন কাননে, ক্রৌঞ্চবধূ সহ ক্রৌঞ্চে নিষাদ বিঁধিলা, তেমতি দাসেরে, আসি, দয়া কর, সতি। কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে? নরাধম আছিল যে নর নরকুলে চৌর্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে, মৃ্ত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি! হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর কাব্যরত্নাকর কবি! তোমার পরশে, সুচন্দন-বৃক্ষশোভা বিষবৃক্ষ ধরে! হায়, মা, এহেন পুণ্য আছে কি এ দাসে? কিন্তু যে গো গুণহীন সন্তানের মাঝে মূঢ়মতি, জননীর স্নেহ তার প্রতি সমধিক। ঊর তবে, ঊর দয়াময়ি বিশ্বরমে! গাইব, মা, বীররসে ভাসি, মহাগীত; ঊরি, দাসে দেহ পদছায়া। — তুমিও আইস, দেবি তুমি মধুকরী কল্পনা! কবির ঢিত্ত-ফুলবন-মধু লয়ে, রচ মধুচক্র, গৌড়জন যাহে আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।কনক-আসনে বসে দশানন বলী — হেমকূট-হৈমশিরে শৃঙ্গবর যথা তেজঃপুঞ্জ। শত শত পাত্রমিত্র আদি সভাসদ, নতভাবে বসে চারি দিকে। ভূতলে অতুল সভা — স্ফটিকে গঠিত; তাহে শোভে রত্নরাজি, মানস-সরসে সরস কমলকুল বিকশিত যথা। শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, স্তম্ভ সারি সারি ধরে উচ্চ স্বর্ণছাদ, ফণীন্দ্র যেমতি, বিস্তারি অযুত ফণা, ধরেন আদরে ধরারে। ঝুলিছে ঝলি ঝালরে মুকুতা, পদ্মরাগ, মরকত, হীরা; যথা ঝোলে (খচিত মুকুলে ফুল) পল্লবের মালা ব্রতালয়ে। ক্ষণপ্রভা সম মুহুঃ হাসে রতনসম্ভবা বিভা — ঝলসি নয়নে! সুচারু চামর চারুলোচনা কিঙ্করী ঢুলায়; মৃণালভুজ আনন্দে আন্দোলি চন্দ্রাননা। ধরে ছত্র ছত্রধর; আহা হরকোপানলে কাম যেন রে না পুড়ি দাঁড়ান সে সভাতলে ছত্রধর-রূপে!— ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ মুরতি, পাণ্ডব-শিবির দ্বারে রুদ্রেশ্বর যথা শূলপাণি! মন্দে মন্দে বহে গন্ধে বহি, অনন্ত বসন্ত-বায়ু, রঙ্গে সঙ্গে আনি কাকলী লহরী, মরি! মনোহর, যথা বাঁশরীস্বরলহরী গোকুল বিপিনে! কি ছার ইহার কাছে, হে দানবপতি ময়, মণিময় সভা, ইন্দ্রপ্রস্থে যাহা স্বহস্তে গড়িলা তুমি তুষিতে পৌরবে?এহেন সভায় বসে রক্ষঃকুলপতি, বাক্যহীন পুত্রশোকে! ঝর ঝর ঝরে অবিরল অশ্রুধারা — তিতিয়া বসনে, যথা তরু, তীক্ষ্ণ শর সরস শরীরে বাজিলে, কাঁদে নীরবে। কর জোড় করি, দাঁড়ায় সম্মুখে ভগ্নদূত, ধূসরিত ধূলায়, শোণিতে আর্দ্র সর্ব কলেবর। বীরবাহু সহ যত যোধ শত শত ভাসিল রণসাগরে, তা সবার মাঝে একমাত্র বাঁচে বীর; যে কাল তরঙ্গ গ্রাসিল সকলে, রক্ষা করিল রাক্ষসে— নাম মকরাক্ষ, বলে যক্ষপতি সম। এ দূতের মুখে শুনি সুতের নিধন, হায়, শোকাকুল আজি রাজকুলমণি নৈকষেয়! সভাজন দুঃখী রাজ-দুঃখে। আঁধার জগৎ, মরি, ঘন আবরিলে দিননাথে! কত ক্ষণে চেতন পাইয়া, বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, কহিলা রাবণ;—“নিশার স্বপনসম তোর এ বারতা, রে দূত! অমরবৃন্দ যার ভুজবলে কাতর, সে ধনুর্ধরে রাঘব ভিখারী বধিল সম্মুখ রণে? ফুলদল দিয়া কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলী তরুবরে? হা পুত্র, হা বীরবাহু, বীর-চূড়ামণি! কি পাপে হারানু আমি তোমা হেন ধনে? কি পাপ দেখিয়া মোর, রে দারুণ বিধি, হরিলি এ ধন তুই? হায় রে, কেমনে সহি এ যাতনা আমি? কে আর রাখিবে এ বিপুল কুল-মান এ কাল সমরে! বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে নাশে বৃক্ষে, হে বিধাতঃ, এ দুরন্ত রিপু তেমতি দুর্বল, দেখ, করিছে আমারে নিরন্তর! হব আমি নির্মূল সমূলে এর শরে! তা না হলে মরিত কি কভু শূলী শম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম, অকালে আমার দোষে? আর যোধ যত— রাক্ষস-কুল-রক্ষণ? হায়, সূর্পণখা, কি কুক্ষণে দেখেছিলি, তুই অভাগী, কাল পঞ্চবটীবনে কালকূটে ভরা এ ভুজগে? কি কুক্ষণে (তোর দুঃখে দুঃখী) পাবক-শিখা-রূপিণী জানকীরে আমি আনিনু এ হৈম গেহে? হায় ইচ্ছা করে, ছাড়িয়া কনকলঙ্কা, নিবিড় কাননে পশি, এ মনের জ্বালা জুড়াই বিরলে! কুসুমদাম-সজ্জিত, দীপাবলী-তেজে উজ্জ্বলিত নাট্যশালা সম রে আছিল এ মোর সুন্দরী পুরী! কিন্তু একে একে শুখাইছে ফুল এবে, নিবিছে দেউটি; নীরব রবাব, বীণা, মুরজ, মুরলী; তবে কেন আর আমি থাকি রে এখানে? কার রে বাসনা বাস করিতে আঁধারে?”এইরূপে বিলাপিলা আক্ষেপে রাক্ষস– কুলপতি রাবণ; হায় রে মরি, যথা হস্তিনায় অন্ধরাজ, সঞ্জয়ের মুখে শুনি, ভীমবাহু ভীমসেনের প্রহারে হত যত প্রিয়পুত্র কুরুক্ষেত্র-রণে!তবে মন্ত্রী সারণ (সচিবশ্রেষ্ঠ বুধঃ) কৃতাঞ্জলিপুটে উঠি কহিতে লাগিলা নতভাবে; — “হে রাজন্, ভুবন বিখ্যাত, রাক্ষসকুলশেখর, ক্ষম এ দাসেরে! হেন সাধ্য কার আছে বুঝায় তোমারে এ জগতে? ভাবি, প্রভু দেখ কিন্তু মনে;— অভ্রভেদী চূড়া যদি যায় গুঁড়া হয়ে বজ্রাঘাতে, কভু নহে ভূধর অধীর সে পীড়নে। বিশেষতঃ এ ভবমণ্ডল মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত। মোহের ছলনে ভুলে অজ্ঞান যে জন।”উত্তর করিলা তবে লঙ্কা-অধিপতি;— “যা কহিলে সত্য, ওহে অমাত্য-প্রধান সারণ! জানি হে আমি, এ ভব-মণ্ডল মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত। কিন্তু জেনে শুনে তবু কাঁদে এ পরাণ অবোধ। হৃদয়-বৃন্তে ফুটে যে কুসুম, তাহারে ছিঁড়িলে কাল, বিকল হৃদয় ডোবে শোক-সাগরে, মৃণাল যথা জলে, যবে কুবলয়ধন লয় কেহ হরি।”এতেক কহিয়া রাজা, দূত পানে চাহি, আদেশিলা,— “কহ, দূত, কেমনে পড়িল সমরে অমর-ত্রাস বীরবাহু বলী?”প্রণমি রাজেন্দ্রপদে, করযুগ জুড়ি, আরম্ভিলা ভগ্নদূত;— “হায়, লঙ্কাপতি, কেমনে কহিব আমি অপূর্ব কাহিনী? কেমনে বর্ণিব বীরবাহুর বীরতা?— মদকল করী যথা পশে নলবনে, পশিলা বীরকুঞ্জর অরিদল মাঝে ধনুর্ধর। এখনও কাঁপে হিয়া মম থরথরি, স্মরিলে সে ভৈরব হুঙ্কারে! শুনেছি, রাক্ষসপতি, মেঘের গর্জনে; সিংহনাদে; জলধির কল্লোলে; দেখেছি দ্রুত ইরম্মদে, দেব, ছুটিতে পবন– পথে; কিন্তু কভু নাহি শুনি ত্রিভুবনে, এহেন ঘোর ঘর্ঘর কোদণ্ড-টঙ্কারে! কভু নাহি দেখি শর হেন ভয়ঙ্কর!—পশিলা বীরেন্দ্রবৃন্দ বীরবাহু সহ রণে, যূথনাথ সহ গজযূথ যথা। ঘন ঘনাকারে ধূলা উঠিল আকাশে,— মেঘদল আসি যেন আবরিলা রুষি গগনে; বিদ্যুৎঝলা-সম চকমকি উড়িল কলম্বকুল অম্বর প্রদেশে শনশনে!— ধন্য শিক্ষা বীর বীরবাহু! কত যে মরিল অরি, কে পারে গণিতে?এইরূপে শত্রুমাঝে যুঝিলা স্বদলে পুত্র তব, হে রাজন্! কত ক্ষণ পরে, প্রবেশিলা, যুদ্ধে আসি নরেন্দ্র রাঘব। কনক-মুকুট শিরে, করে ভীম ধনুঃ, বাসবের চাপ যথা বিবিধ রতনে খচিত,”— এতেক কহি, নীরবে কাঁদিল ভগ্নদূত, কাঁদে যথা বিলাপী, স্মরিয়া পূর্বদুঃখ! সভাজন কাঁদিলা নীরবে।অশ্রুময়-আঁখি পুনঃ কহিলা রাবণ, মন্দোদরীমনোহর;— “কহ, রে সন্দেশ– বহ, কহ, শুনি আমি, কেমনে নাশিলা দশাননাত্মজ শূরে দশরথাত্মজ?” “কেমনে, হে মহীপতি,” পুনঃ আরম্ভিল ভগ্নদূত, “কেমনে, হে রক্ষঃকুলনিধি, কহিব সে কথা আমি, শুনিবে বা তুমি? অগ্নিময় চক্ষুঃ যথা হর্যক্ষ, সরোষে কড়মড়ি ভীম দন্ত, পড়ে লম্ফ দিয়া বৃষস্কন্ধে, রামচন্দ্র আক্রমিলা রণে কুমারে! চৌদিকে এবে সমর-তরঙ্গ উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি বায়ু সহ নির্ঘোষে! ভাতিল অসি অগ্নিশিখাসম ধূমপুঞ্জসম চর্মাবলীর মাঝারে অযুত! নাদিল কম্বু অম্বুরাশি-রবে!— আর কি কহিব, দেব? পূর্বজন্মদোষে, একাকী বাঁচিনু আমি! হায় রে বিধাতঃ, কি পাপে এ তাপ আজি দিলি তুই মোরে? কেন না শুইনু আমি শরশয্যোপরি, হৈমলঙ্কা-অলঙ্কার বীরবাহু সহ রণভূমে? কিন্তু নহি নিজ দোষে দোষী। ক্ষত বক্ষঃস্থল মম, দেখ, নৃপমণি, রিপু-প্রহরণে; পৃষ্ঠে নাহি অস্ত্রলেখা।” এতেক কহিয়া স্তব্ধ হইল রাক্ষস মনস্তাপে। লঙ্কাপতি হরষে বিষাদে কহিলা; “সাবাসি, দূত! তোর কথা শুনি, কোন্ বীর-হিয়া নাহি চাহে রে পশিতে সংগ্রামে? ডমরুধ্বনি শুনি কাল ফণী কভু কি অলসভাবে নিবাসে বিবরে? ধন্য লঙ্কা, বীরপুত্রধারী! চল, সবে,— চল যাই, দেখি, ওহে সভাসদ-জন, কেমনে পড়েছে রণে বীর-চূড়ামণি বীরবাহু; চল, দেখি জুড়াই নয়নে।”উঠিলা রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে, কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন- সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা— মনোহরা পুরী! হেমহর্ম্য সারি সারি পুষ্পবন মাঝে; কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃ-ছটা; তরুরাজি; ফুলকুল— চক্ষু-বিনোদন, যুবতীযৌবন যথা; হীরাচূড়াশিরঃ দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি, বিবিধ রতনপূর্ণ; এ জগৎ যেন আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে, রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে, জগত-বাসনা তুই, সুখের সদন।দেখিলা রাক্ষসেশ্বর উন্নত প্রাচীর— অটল অচল যথা; তাহার উপরে, বীরমদে মত্ত, ফেরে অস্ত্রীদল, যথা শৃঙ্গধরোপরি সিংহ। চারি সিংহদ্বার (রুদ্ধ এবে) হেরিলা বৈদেহীহর; তথা জাগে রথ, রথী, গজ, অশ্ব, পদাতিক অগণ্য। দেখিলা রাজা নগর বাহিরে, রিপুবৃন্দ, বালিবৃন্দ সিন্ধুতীরে যথা, নক্ষত্র-মণ্ডল কিম্বা আকাশ-মণ্ডলে। থানা দিয়া পূর্ব দ্বারে, দুর্বার সংগ্রামে, বসিয়াছে বীর নীল; দক্ষিণ দুয়ারে অঙ্গদ, করভসম নব বলে বলী; কিংবা বিষধর, যবে বিচিত্র কঞ্চুক- ভূষিত, হিমান্তে অহি ভ্রমে, ঊর্ধ্ব ফণা— ত্রিশূলসদৃশ জিহ্বা লুলি অবলেপে! উত্তর দুয়ারে রাজা সুগ্রীব আপনি বীরসিংহ। দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে— হায় রে বিষণ্ণ এবে জানকী-বিহনে, কৌমুদী-বিহনে যথা কুমুদরঞ্জন শশাঙ্ক! লক্ষ্মণ সঙ্ঘে, বায়ুপুত্র হনু, মিত্রবর বিভীষণ। এত প্রসরণে, বেড়িয়াছে বৈরিদল স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী, গহন কাননে যথা ব্যাধ-দল মিলি, বেড়ে জালে সাবধানে কেশরিকামিনী,— নয়ন–রমণী রূপে, পরাক্রমে ভীমা ভীমাসমা! অদূরে হেরিলা রক্ষঃপতি রণক্ষেত্র। শিবাকুল, গৃধিনী, শকুনি, কুক্কুর, পিশাচদল ফেরে কোলাহলে।কাব্য গ্রন্থঃ -মেঘনাদবধ কাব্য
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/post20161119022334/
2450
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
শত প্রশ্ন
হাস্যরসাত্মক
ক্রিকেট মানে যদি ঝিঁঝিঁ পোকা হয় ফুটবল মানে কেন তেলাপোকা নয়? ব্যাট মানে যদি চামচিকে হয় বল মানে তবে কেন ইন্দুর নয়? ‘হায়’ মানে যদি কী খবর হয় হুতাশ মানে কেন ভালো আছ নয়? স্যান্ডেল মানে যদি চন্দন হয় জুতা মানে তবে কেন সেগুন নয়? লং মানে যদি লম্বা হয় এলাচি মানে কেন বেঁটে নয়? রাগ মানে যদি কার্পেট হয় গোস্বা মানে কেন বিছানা নয়? লাভ মানে যদি ভালোবাসা হয় লোকসান কেন তবে খুনোখুনি নয়? বুক মানে যদি বই হয় পেট মানে কেন খাতা নয়? লাফ মানে যদি হাসাহাসি হয় ঝাঁপ মানে কেন কাঁপাকাপি নয়? পেপার মানে যদি গোলমরিচ হয় ম্যাগাজিন মানে কেন জিরা –বাটা নয়? টক মানে যদি কথা হয় ঝাল মানে কেন তবে বার্তা নয়? টি মানে যদি চা হয় ইউ মানে কেন কফি নয়? মামা মানে যদি আম্মু হয় মামী মানে কেন আব্বু নয়? গান মানে যদি বন্দুক হয় বাজনা মানে কেন রাইফেল নয় ফুল মানে যদি বেকুব হয় কলি মানে তবে কেন গাধা নয়? গুন মানে যদি গুণ্ডা হয় ভাগ মানে তবে কেন বদমাশ নয়? আই মানে যদি চোখ হয় জে মানে কেন তবে নাক নয়? পি মানে যদি হিস্যু করা হয় কিউ মানে তবে কেন “ইয়ে” করা নয়? এরকম কত প্রশ্ন,চোখে ঘুম নাই উত্তর খুঁজতে আমি কার কাছে যাই?
https://banglarkobita.com/poem/famous/2043
2137
মহাদেব সাহা
গোলাপ, তোমার মর্ম
রূপক
গোলাপ বিষয়ে কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি প্রেমিকের মতো কোনো গভীর মুগ্ধতা- আমার তেমন কিছু নেই; গোলাপের কাছে আমি পর্যটক, বিদেশী পথিক বড়ো জোর এমন সম্পর্ক হে বন্ধু বিদুয়, দেখা হবে। আমি তাই গোলপকে গোলাপ বলি না বলি মহিমার ফুল, বলি মৃত্যু, বলি মর্মান্তিক। সম্পূর্ণ নির্দোষ নগ্ন, আঙুলে কাঁটার কালো ক্ষত কালো বিষ, কালো অন্ধ প্যারিসের পতের ভিক্ষুক, পাপী ঘোর গৃহত্যাগী। গোলাপ সম্পকে ঠিক নদীর মতন সম্পূর্ণ ধারণা কিছু নেই গোলাপ বিষয়ৈ জ্ঞান বড়ো অসম্পূর্ণ, গোলাপ, তোমাকে ঠিক বুঝতে পারি না। হয়তো নদী সম্পর্কে আমার এক ধরনের দুর্বলতা আছে কোথাও কোনোভাবে নদীর কাছে বাঁধা পড়েছি, তাই বলে গোলপবিরোধী আমি নই এখনো বহু রাত আমি গোলাপের স্বপ্নে ঘুমাতে পারি না দৃঢ়বন্ধে জপটে ধরি গোলাপ, গোলাপ ভেবে ঘুম ও মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা গোলাপ বস্তুত এই ঘুমের মঘ্যে স্বপ্ন; জেগে উঠেই গোলাপ দেখি রক্তমাখা, গোলাপ দেখি কলুষকালো গোলাপ দেখি গভীর গোপন অসুস্থতায় অবসন্ন, মর্মে ভীষণ বিষের ফণা। সেই একবার বাল্যে আমি গোলপ ছুঁয়ে সংজ্ঞা হারিয়েছিলাম আরো একবার কৈশোরে গোলাপ দেখে আতঙ্কিত, তারপর পর্যটনে নেমে একে একে গোলাপ বিষয়ৈ এই অভিজ্ঞতা। এখন গোলাপ বিষয়ে আমার তেমন কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি নেই গোলাপ বিষয়ে আমার জ্ঞান বড়ো অস্বচ্ছ, বড়ো অগভীর তাকে যতোটা জানি সে মাত্রই একজন পর্যটকের মতো কিংবা একজন কৃষকের মতো। এক সময় গোলাপের মধ্যে আমি নদীর কুলুকুলু কান্না শুনেছিলাম মানুষের বিশুদ্ধ আত্মপ্রকাশের শিল্প দেখেছিলাম গোলাপের সৌন্দর্যে। সেই মুগ্ধতা এখন আমার নেই, সত্যি বলছি গোলাপ বিষয়ে এখন আমি সাধারণ একজন কৃষক মাত্র; ঠিক গোলাপ নয় আমি অরণ্য-উদ্ভিদ খুঁজতে এসেছি হয়তো পাথর তুলতে এসেছি তবু আমি গোলাপকে গোলাপ বলি না বলি স্বপ্ন, বলি মৃত্যু, বলি মর্মান্তিক।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1371
1066
জীবনানন্দ দাশ
নগ্ন নির্জন হাত
প্রেমমূলক
আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে: আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার। যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে অথচ যার মুখ আমি কোনাদিন দেখিনি, সেই নারীর মতো ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠেছে। মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা সেই নগরীর এক ধুসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে। ভারতসমুদ্রের তীরে কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে আজ নেই, কোনা এক নগরী ছিল একদিন, কোন এক প্রাসাদ ছিল; মূল্যবান আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ; পারস্য গালিচা, কাশ্মিরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল, আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্খা, আর তুমি নারী- এই সব ছিল সেই জগতে একদিন। অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল, অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিল, মেহগনির ছায়াঘর পল্লব ছিল অনেক; অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল; অনেক কমলা রঙের রোদ; আর তুমি ছিলে; তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না, খুঁজি না। ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে সেই সমুদ্রপারের কাহিনী, অপরূপ খিলানও গম্বুজের বেদনাময় রেখা, লুপ্ত নাশপারিত গন্ধ, অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধুসর পান্ডুলিপি, রামধনু রঙের কাচের জানালা, ময়ুরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায় কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের ক্ষণিক আভাস- আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়। পর্দায়, গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ, রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ! তোমর নগ্ন নির্জন হাত; তোমার নগ্ন নির্জন হাত।
https://banglarkobita.com/poem/famous/948
6021
হেলাল হাফিজ
ইদানিং জীবন যাপন
চিন্তামূলক
আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন, প্রাত্যহিক সব কাজ ঠিক-ঠাক করে চলেছেন খাচ্ছেন-দাচ্ছেন, অফিসে যাচ্ছেন, প্রেসক্লাবে আড্ডাও দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে কষ্টেরা আমার সারাটা বিকেল বসে দেখেন মৌসুমী খেলা, গোল স্টেডিয়াম যেন হয়ে যায় নিজেই কবিতা। আজকাল আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই থাকেন, অঙ্কুরোদ্‌গম প্রিয় এলোমেলো যুবকের অতৃপ্ত মানুষের শুশ্রূষা করেন। বিরোধী দলের ভুল মিছিলের শোভা দেখে হাসেন তুমুল, ক্লান্তিতে গভীর রাতে ঘরহীন ঘরেও ফেরেন, নির্জন নগরে তারা কতিপয় নাগরিক যেন কতো কথোপকথনে কাটান বাকিটা রাত, অবশেষে কিশোরীর বুকের মতন সাদা ভোরবেলা অধিক ক্লান্তিতে সব ঘুমিয়ে পড়েন। আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন, মোটামুটি সুখেই আছেন। প্রিয় দেশবাসী; আপনারা কেমন আছেন? ২.১০.৮০
https://banglarkobita.com/poem/famous/94
4228
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেম দিতে থাকো
প্রেমমূলক
মালবিকা স্তন দাও, দুই স্তনে মাখামাখি করি। যেভাবে পর্বতশীর্ষে টেনে আনি বুকের পাঁজরে সেইভাবে নদী আনি গহ্বরে বুকের, মালবিকা দেহ দাও আলিঙ্গন করি, যেভাবে পর্বত-নদী করি আলিঙ্গন, সেইভাবে, মালবিকা বৃদ্ধে সুখ দাও- অজপা রেখো না তাকে, প্রেম দিতে থাকো।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/prem-dite-thako/
2622
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অমলধারা ঝরনা যেমন
ভক্তিমূলক
অমলধারা ঝরনা যেমন স্বচ্ছ তোমার প্রাণ, পথে তোমার জাগিয়ে তুলুক আনন্দময় গান। সম্মুখেতে চলবে যত পূর্ণ হবে নদীর মতো, দুই কূলেতে দেবে ভ’রে সফলতার দান।    (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/omoldhara-jhorna-jemon/
78
আবিদ আনোয়ার
দুই যোদ্ধার কাহিনী
চিন্তামূলক
আমি যার প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি এক উলঙ্গ সাঁওতাল: কেবল শিশ্নের কাছে ঝুলে আছে একপ্রস্ত খাটাশের ছাল; ধনুক বাগিয়ে তিনি হেঁটে যান তাক-করে লক্ষ্যভেদী তীর, বুক ভরা চুল আর পাথরের বাহু, উরু ও জঙ্ঘায় তিনি রীতিমতো বীর ।'তোমরা কোনঠে বাহে' বলে যদি ডাক দেন কখনো হঠাৎ বল্লমের ফলা হয়ে চোখের পলকে উত্তোলিত হতে পারে লক্ষ লক্ষ হাত!পক্ষান্তরে একা আমি যৌবনেই লোলচর্ম, নানাবিধ ব্যামোয় কাতর, উপরন্তু মগজের প্রতিকোষে, মেধায়-মননে সারাক্ষণ লেগে আছে নান্দনিক জ্বর ।স্বপ্নে ও বাস্তবে এই চিত্রকল্প পেয়েছে আমাকে যখন যেদিকে যাই পিছে পিছে যায়, ঘুমের গভীরে ঢুকে কুটিল কৌশলে উমেদার গুপ্তচর থাকে পাহারায় ।কোথাও পালিয়ে যাবো সে-গুড়েও বালি; অগত্যা দিয়েছি ছুঁড়ে নিদারুণ ক্ষোভে ঝটকা-থুতুর মতো গোটাকয় কলমের কালি ।
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/dui-joddhar-kahini/
2899
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাল যবে সন্ধ্যাকালে বন্ধুসভাতলে
সনেট
কাল যবে সন্ধ্যাকালে বন্ধুসভাতলে গাহিতে তোমার গান কহিল সকলে সহসা রুধিয়া গেল হৃদয়ের দ্বার– যেথায় আসন তব, গোপন আগার। স্থানভেদে তব গান– মূর্তি নব নব– সখাসনে হাস্যোচ্ছ্বাস সেও গান তব, প্রিয়াসনে প্রিয়ালাপ, শিশুসনে খেলা– জগতে যেথায় যত আনন্দের মেলা সর্বত্র তোমার গান বিচিত্র গৌরবে আপনি ধ্বনিতে থাকে সরবে নীরবে। আকাশে তারকা ফুটে, ফুলবনে ফুল, খনিতে মানিক থাকে– হয় নাকো ভুল। তেমনি আপনি তুমি যেখানে যে গান রেখেছ, কবিও যেন রাখে তার মান।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kal-jabe-sondhyakale-bondhusovatole/
4821
শামসুর রাহমান
তোমার সান্নিধ্যে
সনেট
তোমার সান্নিধ্যে আমি, হা কপাল, কখনো পারি না ছুটে যেতে ইচ্ছেমতো। অথচ আমার মধ্যে রোজ একটি ঈগল দূর তোমার আসমানের খোঁজ নেয়ার তৃষ্ণায় ডানা ঝাপটায়। হায়, মনোলীনা কী করে হৃদয় পাবো বলো তোমার শরীর বিনা? প্রত্যহ সযত্নে তুমি চুল বাঁধো, কারো সাজগোজে, এখন তা-নয় কিছুতেই আমার দৃষ্টির ভোজ। পড়ে আছি রুক্ষ একা, সঙ্গী শুধু মর্চে-পড়া বাণী।তুমি কি এখনো আসবে না? শিরাপুঞ্জে বাজাবে না মত্ত মঞ্জীরের ধ্বনি? সে কোন্‌ দ্বিধার বেড়াজাল ঘিরেছে তোমাকে আজ? কোন্‌ ভীতি কুন্ডলী পাকায় পথে পথে? মনে কি পড়ে না একজন, চিরচেনা, তিমির-শংকিল রাতে একাকিনী দূর শাল তাল তমালের বনে গ্যাছে বারংবার প্রেমের ডেরায়?   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-sannidhye/
1315
তসলিমা নাসরিন
কাঁপন ১৫
প্রেমমূলক
সাঁতার কাটতে আসছো না যে! ব্যস্ত বুঝি কাজে? যুবক তুমি কাকে দিচ্ছ ফাঁকি! ভাটির দিন তো শেষ হয়েছে আমার, জোয়ার শুধু বাকি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1985
5551
সুকান্ত ভট্টাচার্য
স্মারক
মানবতাবাদী
আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায় তবুও পড়িবে মনে, চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে হৃদয়ের আঙ্গিনায় রজনীগন্ধা বনে, তবুও পড়িবে মনে। বলাকার পাখা আজও যদি উড়ে সুদূর দিগঞ্চলে বন্যার মহাবেগে, তবুও আমার স্তব্ধ বুকের ক্রন্দন যাবে মেলে মুক্তির ঢেউ লেগে, মুক্তির মহাবেগে। বাসরঘরের প্রভাতের মতো স্বপ্ন মিলায় যদি বিনিদ্র কলরবে তবুও পথের শেষ সীমাটুকু চিরকাল নিরবধি পার হয়ে যেতে হবে, বিনিদ্র কলরবে। মদিরাপাত্র শুষ্ক যখন উৎসবহীন রাতে বিষণ্ণ অবসাদে বুঝি বা তখন সুপ্তির তৃষা ক্ষুব্ধ নয়নপাতে অস্থির হয়ে কাঁদে, বিষণ্ণ অবসাদে। নির্জন পথে হঠাৎ হাওয়ার আসক্তহীন মায়া ধূলিরে উড়ায় দূরে, আমার বিবাগী মনের কোণেতে কিসের গোপন ছায়া নিঃশ্বাস ফেলে সুরে; ধূলিরে উড়ায় দূরে। কাহার চকিত-চাহনি-অধীর পিছনের পানে চেয়ে কাঁদিয়া কাটায় রাতি, আলেয়ার বুকে জ্যোৎস্নার ছবি সহসা দেখিতে পেয়ে জ্বালে নাই তার বাতি, কাঁদিয়া কাটায় রাতি। বিরহিণী তারা আঁধারের বুকে সূর্যেরে কভু হায় দেখেনিকো কোনো ক্ষণে। আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায় হয়তো পড়িবে মনে, রজনীগন্ধা বনে।।   (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/sarok/
873
জসীম উদ্‌দীন
বৈরাগী আর বোষ্টমী যায়
গীতিগাথা
কোথা হতে এলো রসের বৈরাগী আর বোষ্টমী, আকাশ হতে নামল কি চান হাসলাপরা অষ্টমী। চেকন চোকন বোষ্টমী তার ঝটরা মাথায় দীঘল কেশ, খেজুর গাছের বাগড়া যেমন পূব হাওয়াতে দুলছে বেশ। পাছা পেড়ে শাড়িখানি পাছা বেয়ে যায় পড়ে, বৈরাগী কয়, তারির সাথে ফাঁস লাগায় যাই মরে। মুখখানি তার ডাগর ডোগর ঘষামাজা কলসখানি। বৈরাগী কয় গলায় বেঁধে মাপতে পারি গাঙের পানি। সঙ্গে চলে বৈরাগী তার তেল কুচ কুচ নধর কায়, গয়লা বাড়ির ময়লা বাছুর রোদ মেখেছ সকল গায়। আকাশেরও কালো মেঘে প্রভাতেরি পড়ছে আলো, সামনে লয়ে পূর্ণিমা চাঁদ অমাবস্যা যায় কি ভাল। হাতে তাহার ঘুব ঘুমা ঘুম বাজে রসের একতারা, বৈরাগী বউর রূপের গাঙ্গে মুর্চ্ছি সে সুর হয় হারা। বৈরাগী যে চলছে পথে চলছে রসের রূপখানি, বৈরাগী তার একতারাতে চলছে তারি সুর হানি। হিসেব লেখে বেনের ছেলে অঙ্কে তাহার হয় যে ভুল, নুন মাপিতে চুন মেপে কয় বৈরাগিনীর হয় না তুল। বৈরাগী আর বোষ্টমী যায়-মহাজনের থামছে খাতা, থামছে পালা থামছে পাথর, ওরা দুজন নয়কো যা-তা। সিকে কড়ায় পোয়া কড়ায় ছিল যেথায় হিসাব নিকাশ, একতারারি ঝঙ্কারেতে আনল সেথার কি অবকাশ। কৃষ্ণশোকে রাই মরিল, তমাল লতা মুরছে পড়ে, সাজী মশায় বান ডাকালমহাজনী খাতার পরে। চলতে পথে সবার ঘরে হুকোর মাথায় আগুন জ্বলে। বৈরাগী ভাই! বসো বসো তামাক খেয়েই যেয়ো চলে। চলতে পথে বাটায় বাটায় পান ভরা হয় সবার ঘরে, বউরা বলে, বোষ্টমী সই পান সেজেছি তোমার তরে। বৈরাগী আর বোষ্টমী যায়, রবিবারের দিনটি নাকি একতারারি ঝঙ্কারেতে গায়ের পথে যায় গো ডাকি। ঘুব ঘুমা ঘুম বাজনা বাজে অবসরের ঘন্টাখানি, পথের মাঝে যেইবা শুনে অমনি ছাড়ে কাজের ঘানি। গাঁয়ের ধারে বটের তলে বৈরাগী আর বোষ্টমী গায়, একতারারি তারে তারে সুরের পরে সুর মূরছায়। ঘাসের বোঝা ফেলছে চাষী হালের গরু বেপথ যায়, মান সায়রের কলমিনী শাম-সায়রো ভাসছে হায়। যাক গরু আজ পরের ক্ষেতে, ধান নিড়ান থাক না ভাই, শ্যাম গেছে আজ ব্রজ ছেড়ে কেমন করে বাঁচবে রাই? গান গেয়ে যে বৈরাগী যায় গাঁয়ের পথে অনেক দূর, মাঠের কাজে কৃষাণ ছেলের বুকের মাঝে কানছে সুর। গানে গানে দেখছে যেন দুধারে ধান সবুজ সাচা, মাঝ দিয়ে যায় বৈরাগিনী মুখখানি তার কাঁচা কাঁচা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/768
3851
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শরতে আজ কোন্‌ অতিথি
প্রকৃতিমূলক
শরতে আজ কোন্‌ অতিথি এল প্রাণের দ্বারে। আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে। নীল আকাশের নীরব কথা শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা বেজে উঠুক আজি তোমার বীণার তারে তারে।শস্যখেতের সোনার গানে যোগ দে রে আজ সমান তানে, ভাসিয়ে দে সুর ভরা নদীর অমল জলধারে। যে এসেছে তাহার মুখে দেখ্‌ রে চেয়ে গভীর সুখে, দুয়ার খুলে তাহার সাথে বাহির হয়ে যা রে। (শান্তিনিকেতন, ১৮ ভাদ্র, ১৩১৬)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sarate-aaj-kon-atithi/
5804
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নীরা
প্রেমমূলক
নীরা, তুমি নিরন্নকে মুষ্টিভিক্ষা দিলে এইমাত্র আমাকে দেবে না? শ্মশানে ঘুমিয়ে থাকি, ছাই-ভস্ম খাই, গায়ে মাখি নদী-সহবাসে কাটে দিন এই নদী গৌতম বুদ্ধকে দেখেছিল পরবর্তী বারুদের আস্তরণও গায়ে মেখেছিল এই নদী তুমি!বড় দেরি হয়ে গেল, আকাশে পোশাক হতে বেশি বাকি নেই শতাব্দীর বাঁশবনে সাংঘাতিক ফুটেছে মুকুল শোনোনি কি ঘোর দ্রিমি দ্রিমি? জলের ভিতর থেকে সমুত্থিত জল কথা বলে মরুভূমি মেরুভূমি পরস্পর ইশারায় ডাকে শোনো, বুকের অলিন্দে গিয়ে শোনো হে নিবিড় মায়াবিনী, ঝলমলে আঙুল তুলে দাও। কাব্যে নয়, নদীর শরীরে নয়, নীরা চশমা-খোলা মুখখানি বৃষ্টিজলে ধুয়ে কাছাকাছি আনো নীরা, তুমি নীরা হয়ে এসো!এখন অসুখ নেই, এখন অসুখ থেকে সেরে উঠে পরবর্তী অসুখের জন্য বসে থাকা। এখন মাথার কাছে জানলা নেই, বুক ভরা দুই জানলা, শুধু শুকনো চোখ দেয়ালে বিশ্রাম করে, কপালে জলপট্টির মতো ঠাণ্ডা হাত দূরে সরে গেছে, আজ এই বিষম সকালবেলা আমার উত্থান নেই, আমি শুয়ে থাকি, সাড়ে দশটা বেজে যায়।প্রবন্ধ ও রম্যরচনা, অনুবাদ, পাঁচ বছর আগের শুরু করা উপন্যাস, সংবাদপত্রের জন্য জল-মেশানো গদ্য থেকে আজ এই সাড়ে দশটায় আমি সব ভেঙেচুরে উঠে দাঁড়াতে চাই–অন্ধ চোখ, ছোট চুল–ইস্ত্রিকরা পোশাক ও হাতের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলে আমি এখন তোমার বাড়ির সামনে, নীরা থুক্‌ করে মাটিতে থুতু ছিটিয়ে‌ বলি : এই প্রাসাদ একদিন আমি ভেঙে ফেলবো! এই প্রাসাদে এক ভারতবর্ষব্যাপী অন্যায়। এখান থেকে পুনরায় রাজতন্ত্রের উৎস। আমি ব্রীজের নিচে বসে গম্ভীর আওয়াজ শুনেছি, একদিন আমূলভাবে উপড়ে নিতে হবে অপবিত্র সফলতা।কবিতায় ছোট দুঃখ, ফিরে গিয়ে দেখেছি বহুবার আমার নতুন কবিতা এই রকম ভাবে শুরু হয় : নীরা, তোমায় একটি রঙিন সাবান উপহার দিয়েছি শেষবার; আমার সাবান ঘুরবে তোমার সারা দেশে। বুক পেরিয়ে নাভির কাছে মায়া স্নেহে আদর করবে, রহস্যময় হাসির শব্দে ক্ষয়ে যাবে, বলবে তোমার শরীর যেন অমর না হয়…অসহ্য! কলম ছুঁড়ে বেরিয়ে আমি বহুদূর সমুদ্রে চলে যাই, অন্ধকারে স্নান করি হাঙর-শিশুদের সঙ্গে ফিরে এসে ঘুম চোখ, টেবিলের ওপাশে দুই বালিকার মতো নারী, আমি নীল-লোভী তাতার বা কালো ঈশ্বর-খোঁজা নিগ্রোদের মতো অভিমান করি, অভিমানের স্পষ্ট শব্দ, আমার চা-মেশানো ভদ্রতা হলুদ হয়!এখন, আমি বন্ধুর সঙ্গে সাহাবাবুদের দোকানে, এখন বন্ধুর শরীরে ইঞ্জেকশন ফুঁড়লে আমার কষ্ট, এখন আমি প্রবীণ কবির সুন্দর মুখ থেকে লোমশ ভ্রুকুটি জানু পেতে ভিক্ষা করি, আমার ক্রোধ ও হাহাকার ঘরের সিলিং ছুঁয়ে আবার মাটিতে ফিরে আসে, এখন সাহেব বাড়ীর পার্টিতে আমি ফরিদপুরের ছেলে, ভালো পোষাক পরার লোভ সমেত কাদা মাখা পায়ে কুৎসিত শ্বেতাঙ্গিনীকে দু’পাটি দাঁত খুলে আমার আলজিভ দেখাই, এখানে কেউ আমার নিম্নশরীরের যন্ত্রনার কথা জানে না। ডিনারের আগে ১৪ মিনিটের ছবিতে হোয়াইট ও ম্যাকডেভিড মহাশূন্যে উড়ে যায়, উন্মাদ! উন্মাদ! এক স্লাইস পৃথিবী দূরে, সোনার রজ্জুতে বাঁধা একজন ত্রিশঙ্কু। কিন্তু আমি প্রধান কবিতা পেয়ে গেছি প্রথমেই, ৯, ৮, ৭, ৬, ৫…থেকে ক্রমশ শূন্যে এসে স্তব্ধ অসময়, উলটোদিকে ফিরে গিয়ে এই সেই মহাশূন্য, সহস্র সূর্যের বিস্ফোরণের সামনে দাঁড়িয়ে ওপেনহাইমার প্রথম এই বিপরীত অঙ্ক গুনেছিল ভগবৎ গীতা আউড়িয়ে? কেউ শূন্যে ওঠে কেউ শূন্যে নামে, এই প্রথম আমার মৃত্যু ও অমরত্বের ভয় কেটে যায়, আমি হেসে বন্দনা করি : ওঁ শান্তি! হে বিপরীত সাম্প্রতিক গণিতের বীজ তুমি ধন্য, তুমি ইয়ার্কি, অজ্ঞান হবার আগে তুমি সশব্দ অভ্যুত্থান, তুমি নেশা, তুমি নীরা, তুমিই আমার ব্যক্তিগত পাপমুক্তি। আমি আজ পৃথিবীর উদ্ধারের যোগ্যসিঁড়ির মুখে কারা অমন শান্তভাবে কথা বললো? বেরিয়ে গেল দরজা ভেজিয়ে, তবু তুমি দাঁড়িয়ে রইলে সিঁড়িতে রেলিং-এ দুই হাত ও থুত্‌নি, তোমায় দেখে বলবে না কেউ থির বিজুরি তোমার রঙ একটু ময়লা, পদ্মপাতার থেকে যেন একটু চুরি, দাঁড়িয়ে রইলে নীরা, তোমায় দেখে হঠাৎ নীরার কথা মনে পড়লো।নীরা, তোমায় দেখি আমি সারা বছর মাত্র দু’দিন দোল ও সরস্বতী পূজোয়–দুটোই খুব রঙের মধ্যে রঙের মধ্যে ফুলের মধ্যে সারা বছর মাত্র দু’দিন– ও দুটো দিন তুমি আলাদা, ও দুটো দিন তুমি যেন অন্য নীরা বাকি তিনশো তেষট্টি বার তোমায় ঘিরে থাকে অন্য প্রহরীরা। তুমি আমার মুখ দেখোনি একলা ঘরে, আমি আমার দস্যুতা তোমার কাছে লুকিয়ে আছি, আমরা কেউ বুকের কাছে কখনো কথা বলিনি পরস্পর, চোখের গন্ধে করিনি চোখ প্রদক্ষিণ– আমি আমার দস্যুতা তোমার কাছে লুকিয়ে আছি, নীরা তোমায় দেখা আমার মাত্র দু’দিন।নীরা, তোমায় দেখে হঠাৎ নীরার কথা মনে পড়লো। আমি তোমায় লোভ করিনি, আমি তোমায় টান মারিনি সুতোয় আমি তোমার মন্দিরের মতো শরীরে ঢুকিনি ছল ছুতোয় রক্তমাখা হাতে তোমায় অবলীলায় নাশ করিনি; দোল ও সরস্বতী পূজোয় তোমার সঙ্গে দেখা আমার–সিঁড়ির কাছে আজকে এমন দাঁড়িয়ে রইলে নীরা, তোমার কাছে আমি নীরার জন্য রয়ে গেলাম চিরঋণী।চাঁদের নীলাভ রং, ওইখানে লেগে আছে নীরার বিষাদ ও এমন কিছু নয়, ফুঁ দিলেই চাঁদ উড়ে যাবে যে রকম সমুদ্রের মৌসুমিতা, যে রকম প্রবাসের চিঠি অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানালো আঁচলে বৃষ্টির শব্দ, ভুরুর বিভঙ্গে লতা পাতা ও যে বহুদূর, পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর ওখানে কী করে যাবো, কী করে নীরাকে খুঁজে পাবো?অক্ষরবৃত্তের মধ্যে তুমি থাকো, তোমাকে মানায় মন্দাক্রান্তা, মুক্ত ছন্দ, এমনকি চাও শ্বাসাঘাত দিতে পারি, অনেক সহজ কলমের যে-টুকু পরিধি তুমি তাও তুচ্ছ করে যদি যাও, নীরা, তুমি কালের মন্দিরে ঘন্টধ্বনি হয়ে খেলা করো, তুমি সহাস্য নদীর জলের সবুজে মিশে থাকো, সে যে দূরত্বের চেয়ে বহুদূর তোমার নাভির কাছে জাদুদণ্ড, এ কেমন খেলা জাদুকরী, জাদুকরী, এখন আমাকে নিয়ে কোন রঙ্গ নিয়ে এলি চোখ-বাঁধা গোলকের ধাঁধায়!
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%87-sunil-gangopadha/
2966
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খেয়া
সনেট
খেয়া নৌকা পারাপার করে নদীস্রোতে, কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে। দুই তীরে দুই গ্রাম আছে জানাশোনা, সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা। পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব কত সর্বনাশ, নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস, রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে, সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা, উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা— শুধু হেথা দুই তীরে, কেবা জানে নাম, দোঁহাপানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম। এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে, কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kheya/
3392
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাষাণে পাষাণে তব
প্রকৃতিমূলক
পাষাণে পাষাণে তব শিখরে শিখরে লিখেছ, হে গিরিরাজ, অজানা অক্ষরে কত যুগযুগাস্তের প্রভাতে সন্ধ্যায় ধরিত্রীর ইতিবৃত্ত অনন্ত-অধ্যায়। মহান সে গ্রন্থপত্র, তারি এক দিকে কেবল একটি ছত্রে রাখিবে কি লিখে—তব শৃঙ্গশিলাতলে দুদিনের খেলা, অামাদের কজনের আনন্দের মেলা।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pashane-pashane-tobo/
2561
রফিক আজাদ
বৃষ্টি
মানবতাবাদী
১. খররৌদ্রময় এই দিন— শ্যামল বাংলায় বুঝি ফের নেমে আসে খরা! খরতাপে রুদ্ধশ্বাসক্ষুদ্র এই গ্রামীণ শহর, এ রকম এই দিনে চেতনায়ও খরার প্রদাহ— নির্বাচনে হেরে-যাওয়া প্রার্থী যেন: বিরক্ত, বিব্রত; এ রকম দুঃসময়ে এল বৃষ্টির শব্দের মতো সুখকর এই পত্র—প্রাগের প্রাচীর থেকে উড়ে! কুপিত, বিব্রতকর এই রোদে খামটি খুলিনি; আমি তো অপেক্ষা জানি: এই খররৌদ্রে কখনো কি প্রিয় বান্ধবীর লেখা চিঠি খোলা চলে? অতএব, রেখে দিই যত্ন করে নিজস্ব ড্রয়ারে! ১১ জুলাই রাতে অকস্মাৎ বৃষ্টি নেমে এল যেন দীর্ঘদিন পর হঠাৎ হারিয়ে-যাওয়া আমার সন্তান ঘরে ফিরে এল। বাইরে এখন বৃষ্টি, বৃষ্টির স্নিগ্ধতা বহু দিন পর যেন আমার হূদয়ে প্রীত মধ্যযুগ ভরে দিয়ে গেল!এখনো বাইরে বৃষ্টি: জানালায় জলের প্রপাত— এই বুঝি প্রকৃষ্ট সময় যখন প্রশান্ত মন, হূদয়ে যখন আর খেদ নেই কোনো, ভারাতুর নয় আর মন, ক্রোধ নেই, ঘৃণা নেই—অবিশ্বাস্য শান্তিপ্রিয় আজ এই মাঞ্চুরীয় রাখাল বালক; হূদয়ে কোনোই শোক নেই—শোকানুভূতিও নেই— অসম্ভব শান্ত আজ—সমাহিত—আমার হূদয়! নষ্ট করে ফেলে-দেয়া জীবনের জন্য নেই কোনো শোচনা ও তাপ;—বৃষ্টির সৌগন্ধে ভরে আছে মন! মনে হচ্ছে আমার মতন সুখী কেউ নেই আর পৃথিবীর কোনো প্রান্তে ১১ জুলাই এই রাতে!২. এখন আপনার চিঠি খোলা যায় এই পরিবেশে: এ কী করেছেন! খামে ভরে কেউ কারুকে পাঠায় গোবি-সাহারার দীর্ঘ হাহাকার, চীনের প্রাচীর? স্তব্ধ হয়ে থাকি চিঠি পড়ে: সারাটা দুনিয়া জুড়ে মানুষের এত দুঃখ—এর থেকে পরিত্রাণ নেই? —বৃষ্টির প্রপাত শুনে, গাছের সবুজে চোখ রেখে শিশুদের গালে চুমো খেয়ে আমরা পারি না ফের এই দুঃখী গ্রহটির অন্তর্গত অসুখ সারাতে?
http://kobita.banglakosh.com/archives/1605.html
5946
সৈয়দ শামসুল হক
পরানের গহীন ভিতর-৮
সনেট
আমারে তলব দিও দ্যাখো যদি দুঃখের কাফন তোমারে পিন্ধায়া কেউ অন্যখানে যাইবার চায় মানুষ কি জানে ক্যান মোচড়ায় মানুষের মন, অহেতুক দুঃখ দিয়া কেউ ক্যান এত সুখ পায়? নদীরে জীবন কই, সেই নদী জল্লাদের মতো ক্যান শস্য বাড়িঘর জননীর শিশুরে ডুবায়? যে তারে পরান কই, সেই ব্যাক্তি পাইকের মতো আমার উঠানে ক্যান নিলামের ঢোলে বাড়ি দ্যায়? যে পারে উত্তর দিতে তার খোঁজে দিছি এ জীবন, দ্যাখা তার পাই নাই, জানা নাই কি এর উত্তর। জানে কেউ? যে তুমি আমার সুখ, তুমিই কি পারো আমারে না দুঃখ দিয়া? একবার দেখি না কেমন? কেমন না যায়া তুমি পারো দেখি অপরের ঘর?- অপর সন্ধান করে চিরকাল অন্য ঘর কারো।।
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/poraner-gohin-bhitor-8/
2636
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অস্পষ্ট
চিন্তামূলক
আজি ফাল্গুনে দোলপূর্ণিমারাত্রি, উপছায়া-চলা বনে বনে মন আবছা পথের যাত্রী। ঘুম-ভাঙানিয়া জোছনা-- কোথা থেকে যেন আকাশে কে বলে, "একটুকু কাছে বোসো না।' ফিস্‌ফিস্‌ করে পাতায় পাতায়, উস্‌খুস্‌ করে হাওয়া। ছায়ার আড়ালে গন্ধরাজের তন্দ্রাজড়িত চাওয়া। চন্দনিদহে থইথই জল ঝিক্‌ঝিক্‌ করে আলোতে, জামরুলগাছে ফুলকাটা কাজে বুনুনি সাদায় কালোতে। প্রহরে প্রহরে রাজার ফটকে বহুদূরে বাজে ঘণ্টা। জেগে উঠে বসে ঠিকানা-হারানো শূন্য-উধাও মনটা। বুঝিতে পারি নে কত কী শব্দ-- মনে হয় যেন ধারণা, রাতের বুকের ভিতরে কে করে অদৃশ্য পদচারণা। গাছগুলো সব ঘুমে ডুবে আছে, তন্দ্রা তারায় তারায়, কাছের পৃথিবী স্বপ্নপ্লাবনে দূরের প্রান্তে হারায়। রাতের পৃথিবী ভেসে উঠিয়াছে বিধির নিশ্চেতনায়, আভাস আপন ভাষার পরশ খোঁজে সেই আনমনায়। রক্তের দোলে যে-সব বেদনা স্পষ্ট বোধের বাহিরে ভাবনাপ্রবাহে বুদ্‌বুদ্‌ তারা, স্থির পরিচয় নাহি রে। প্রভাত-আলোক আকাশে আকাশে এ চিত্র দিবে মুছিয়া, পরিহাসে তব অবচেতনার বঞ্চনা যাবে ঘুচিয়া। চেতনার জালে এ মহাগহনে বস্তু যা-কিছু টিঁকিবে, সৃষ্টি তারেই স্বীকার করিয়া স্বাক্ষর তাহে লিখিবে। তবু কিছু মোহ, কিছু কিছু ভুল জাগ্রত সেই প্রাপণার প্রাণতন্তুতে রেখায় রেখায় রঙ রেখে যাবে আপনার। এ জীবনে তাই রাত্রির দান দিনের রচনা জড়ায়ে চিন্তা-কাজের ফাঁকে ফাঁকে সব রয়েছে ছড়ায়ে ছড়ায়ে। বুদ্ধি যাহারে মিছে বলে হাসে সে যে সত্যের মূলে আপন গোপন রসসঞ্চারে ভরিছে ফসলে ফুলে। অর্থ পেরিয়ে নিরর্থ এসে ফেলিছে রঙিন ছায়া-- বাস্তব যত শিকল গড়িছে, খেলেনা গড়িছে মায়া।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/yasputtay/
3531
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বসন্তের হাওয়া যবে অরণ্য মাতায়
প্রকৃতিমূলক
বসন্তের হাওয়া যবে অরণ্য মাতায় নৃত্য উঠে পাতায় পাতায়। এই নৃত্যে সুন্দরকে অৰ্ঘ্য দেয় তার, "ধন্য তুমি" বলে বার বার।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bosonter-hawa-jobe-oronyo-matai/
376
কাজী নজরুল ইসলাম
পরশ পূজা
প্রেমমূলক
আমি     এদেশ হতে বিদায় যেদিন নেব প্রিয়তম, আর     কাঁদবে এ বুক সঙ্গীহারা কপোতিনী সম, তখন     মুকুর পাশে একলা গেহে আমারই এই সকল দেহে চুমব আমি চুমব নিজেই অসীম স্নেহে গো, আহা     পরশ তোমার জাগছে যে গো এই সে দেহে মম।         তখন তুমি নাইবা প্রিয় নাই বা রলে কাছে। জানব আমার এই সে দেহে এই সে দেহে গো তোমার    বাহুর বুকের শরম-ছোঁয়ার কাঁপন লেগে আছে। তখন    নাই বা আমার রইল মনে কোনখানে মোর দেহের বনে জড়িয়ে ছিলে লতার মতন আলিঙ্গনে গো, আমি    চুমোয় চুমোয় ডুবাব এই সকল দেহ মম, এদেশ হতে বিদায় যেদিন নেব প্রিয়তম।(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/porosh-puja/
1909
পূর্ণেন্দু পত্রী
স্থির হয়ে বসে আছি
চিন্তামূলক
স্থির হয়ে বসে আছি, তবু কলরোল। মাছি জানে, ছাই-হওয়া সিগারেট জানে, কতখানি স্থির। করতলে ভাগ্যরেখা, ইতিহাসে রাজার গৌরব, মাটিতে সমাধি জলের ভিতরে গুড় আত্মহত্যা শুয়ে থাকে যতখানি স্থির, মানুষের ছা-পোষা সংসারে বদ্ধমূল নানাবিধ ভ্রানি-র মতন স্থির হয়ে বসে আছি, তবু কলরোল। কাউকে দেখিনা, শুধু জনশূণ্য পথে একা হাওয়া হাঁটে, গাছ মাথা নাড়ে কাউকে দেখি না, শুধু বিমানের সাদা ডানা, বিধ্বস্ত গর্জনে লজ্জিতা নারীর মতো মেঘ সরে যায়, ঘন ছায়া নামে বনে পৃথিবী হঠাৎ দরিদ্রের মতো ম্লান, কাক কেঁদে ওঠে। লিখি না, আঁকি না, কোনো ভাঙাগড়া খেলাধূলা নেই তবু কলরোল। ডাকাডাকি আকাশে মাটিতে, ক্রমাগত অনবরতই সভাসমিতির খাম, আমন্ত্রন ও অভিবাদনে ক্রমাগত অনবরতই দাঁড়ানো, দৌড়ানো, ছুটোছুটি দোলাদুলি ঢেউয়ে লোকালয়ে। ট্রেনের টিকিট যারা কেটে আনে কাউকে চিনি না। রিজার্ত কামরার সুখ, অতিথিশালার চাবি, আয়না, বাথরুম যথেচ্ছ ভ্রমণ সেরে ভোরবেলা না-ভাঙার ঘুম, দীর্ঘ স্বপ্নের তালিকা ক্রমাগত অনবরতই কেউ ডাকে, করস্পর্শে মনে হয় আত্মীয়স্বজন যেতে হয়, থেকে যাই, কার কাছে থাকি তা জানি না। যে সম্রদ্রে কোনদিন ওলোট-পালোট হয়নি চুল যে পাহাড় বহুদিন বিবাগী বন্ধুর মতো দুরদেশে ছিল তারই কাছে স্টপেজ, স্টেশন, মেলামেশা, অঢেল আমোদ। মধ্যরাতে ছৌ-নাচ, মানুষের ভগ্ন দেহে দেবতার মুখোশ পেখম কাড়া-নাকড়ার শব্দে কেঁপে ওঠে দশদিক, চতুর্থ প্রহর মন্দিরে মন্ত্রের মতো ধ্বনি জাগে, যাগযজ্ঞে আছি মনে হয় ঝর্ণা নামে রক্তস্রোতে, অব্যক্ত ও অব্যাহতিহীন কলরোল শুধু কলরোল। আত্মপ্রকাশের এক গাঢ় ইচ্ছা হটাৎ আকাশ ছুঁয়ে ফুটে উঠবার এক গাঢ়তর অসুখ ও জ্বর বুকের ভিতরে এনে জড়ো করে ক্রমাগত, অনবরতই, রাশীকৃত গাছপালা, শুকনো হাড়, শিকড়-বাকড়, নৌকোর ভাঙা দাঁড়, অফুরন্ত কালো জল ও সুর্যকিরণ। স্থির হয়ে বসে আছি তবু কলরোল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1242
4430
শামসুর রাহমান
উদয়াস্ত দেখি ছায়া
চিন্তামূলক
কোথায় ভাসাব ভেলা? দূরন্ত জলের ধ্বনি শুনে কত বেলা গেল, তবুও আপন মাটির বিরাগ মূর্ত, ঠাঁই নেই ভাই প্রাণের পাড়ায় তাই জানি না কখন কে হারায়। ভয়ে চোখে চোখ রাখি, হাঁটুর বিবরে ঢাকি মুখ, বাঁচার ভাবনা ক্লান্ত হয়ে ফেরে মনে। যাবো না যেখানে কোনোদিন স্বপ্ন তার তেড়ে আসে কুকুরের মতো, মাচার সংসারে রাতে (নিজেকে শুনিয়ে বলি) যতটুকু পারো দেখে নাও মুখ, কে জানে কখন হবে ভোর, কেউ হয়তো তোমার ঝিমানো দুপুরে খুলবে না দোর।কলাইয়ের শূন্য মাঠে কাঁপে সাদা ঢেউ, কে যাবি ঘরের পানে সূর্য-নেভা টানে গোধূলির গরু-ডাকাপথ খরস্রোতা নদী, ফাঁকা সাঁঝে কে দেখাবে আলো? বাজে শুধু ধু-ধু জলধ্বনি ওরে নেই ফিরে যাওয়ার উঠোন। উদয়াস্ত দেখি ছায়া বন্ধ্যা জলে, কাকে পেতে চায় এ হাওয়ার ক্ষুধা। প্রত্যহের পথ প্রাণের তৃষ্ণায় কেঁদে তারা সমকালীন দু’জন তবু উঠল গাছ বেয়ে মানুষ শঙ্খিনী। প্রতিযোগিতার শ্রমে যার দুটি আর্ত ক্লান্ত চোখ। দেখে নিল অন্তিম আকাশ, তার নীল হাহাকার যাবে কতদূর?ভাসমান পশু আর নির্বাক মানুষ ক্যামেরার স্বদেশী খোরাক, অনেক অনেক দূরে শস্যের শিবির… নির্বোধ আশায় আর মজে না যে মন, কত বেলা গেল… কী করে ফিরব ঘরে, কোন ঘাটে ভিড়ে আবার চাঁদের অভিবাদন গ্রহণ?বৈঠায় মারিনি পাখি, শোনো ভুলে কোনো অমোঘ প্রহরে,তবু কেন তবু কেন এই জলের মরণ?   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/udoyasto-dekhiachi/
5239
শামসুর রাহমান
শেষ চেয়ারের গদি ছেড়ে
স্বদেশমূলক
যখন প্রথম দেখি সেই স্বল্পভাষী, প্রায় নিঝুম, নিঃশব্দ, কিছুতেই বুঝিনি অন্তরে তার উদ্দাম, বিদ্রোহী যুবক লুকানো ছিল। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই- বয়সে আমার চেয়ে বেশ ছোট হওয়া সত্ত্বেও ক্রমশ কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাকে আমি শ্রেয় বলে মেনে নিই, যদিও সে হেসে আমার শ্রেয়তা মেনে নিত তার পরিচিতদের সকলের কাছে।মনে পড়ে, বহুদিন আগে সেই যুবা, শাহাদত চৌধুরী এবং তাঁর এক জ্বলজ্বলে বিদ্রোহী বান্ধব সন্ধ্যাবেলা হলেন হাজির এক বিদ্রোহী কাজের মতলব নিয়ে আর সেই সঙ্গে তাদের কথায় ফুটে ওঠে অপরূপ ফুলঝুরি। মুগ্ধ হয়ে শুনি আগামীর নবীন দলিল।শাহাদত চৌধুরী নিজের অন্তরের জ্বলন্ত আগুন প্রিয় মাতৃভূমির কল্যাণে করেছেন অর্পণ সর্বদা হাসিমুখে। তাঁর দেশপ্রেমের স্বাক্ষর আমার স্মৃতিকে চিরদিন করতে উজ্জ্বল, যেমন বিশিষ্ট হাসি তার ভেসে থাকে, যখন কাজের শেষে চেয়ারের গদি ছেড়ে যেতেন একদা।  (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shesh-chearer-godi-chere/
5297
শামসুর রাহমান
সেই কবেকার ঋণ
চিন্তামূলক
এখন একটি নয়, দু’টি নয়, তিনটিও নয়, একপাল চিত্রল হরিণ আসে শহরের অখ্যাত গলিতে, আসে সাবলীলভাবে। বনবাসকালীন বন্যতা এখনো যায়নি মুছে, ইট পাথরের কাছে যেন ভয় করবার কিছু নেই, যেন ওদের আহত করবে না কোনো অস্ত্র, পড়বে না মোটরকারের নিচে কিংবা বাজারে দেবে না বেচে কেউ শস্তা দামে। আস্তে সুস্থে ওর এই ছায়াচ্ছন্ন গলিতে প্রবেশ করে আরআমার বাড়িকে ঝিল ভেবে বিশ্রামের প্রত্যাশায় উঠোনে ঘাসের মতো স্বপ্ন ডোবে। এইসব প্রাণী কী করে এখানে এল, এই প্রশ্ন আমাকে কেবলি ঠোকরাতে থাকে, অকস্মাৎ স্তব্ধ তার মধ্য থেকে ছন্দিত গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে আসে একটি হরিণ- বলে, ‘শুধে দিতে চাই আজ সেই কবেকার ঋণ।    (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/se-kobekar-rin/
4028
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হারিয়ে যাওয়া
শোকমূলক
ছোট্ট আমার মেয়ে সঙিনীদের ডাক শুনতে পেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচের তলায় যাচ্ছিল সে নেমে অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে, থেমে থেমে। হাতে ছিল প্রদীপখানি, আঁচল দিয়ে আড়াল ক'রে চলছিল সাবধানী।।আমি ছিলাম ছাতে তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে। হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে, উঠে দেখতে গেলাম ছুটে। সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে প্রদীপটা তার নিভে গেছে বাতাসেতা। শুধাই তারে, 'কী হয়েছে বামি?' সে কেঁদে কয় নীচে থেকে, 'হারিয়ে গেছি আমি!’তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে ফিরে গেছি ছাতে মনে হল আকাশ-পানে চেয়ে, আমার বামির মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে নীলাম্বরের আঁচলখানি ঘিরে দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চিলছে ধীরে ধীরে। নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি, আকাশ ভরে উঠত কেঁদে, "হারিয়ে গেছি আমি!'
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hariye-jaoya/
1605
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
তোমাকে বলেছিলাম
প্রেমমূলক
তোমাকে বলেছিলাম, যত দেরীই হোক, আবার আমি ফিরে আসব। ফিরে আসব তল-আঁধারি অশথগাছটাকে বাঁয়ে রেখে, ঝালোডাঙার বিল পেরিয়ে, হলুদ-ফুলের মাঠের উপর দিয়ে আবার আমি ফিরে আসব। আমি তোমাকে বলেছিলাম। আমি তোমাকে বলেছিলাম, এই যাওয়াটা কিছু নয়, আবার আমি ফিরে আসব। ডগডগে লালের নেশায় আকাশটাকে মাতিয়ে দিয়ে সূর্য যখন ডুবে যাবে, নৌকার গলুইয়ে মাথা রেখে নদীর ছল্‌ছল্‌ জলের শব্দ শুনতে-শুনতে আবার আমি ফিরে আসব। আমি তোমাকে বলেছিলাম। আজও আমার ফেরা হয়নি। রক্তের সেই আবেগ এখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। তবু যেন আবছা-আবছা মনে পড়ে, আমি তোমাকে বলেছিলাম।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1684
1119
জীবনানন্দ দাশ
বনের চাতক-মনের চাতক
প্রেমমূলক
বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায়- মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায়! ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে- সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে অবেলায়!পুবের হাওয়ায় হাপর জ্বলে, আগুনদানা ফাটে! কোন্ ডাকিনীর বুকের চিতায় পচিম আকাশ টাটে! বাদল-বৌয়ের চুমার মৌয়ের সোয়াদ চেয়ে চেয়ে বনের চাতক-মনের চাতক চলছে আকাশ বেয়ে, ঘাটের ভরা কলসি ও-কার কাঁদছে মাঠে মাঠে!ওরে চাতক, বনের চাতক, আয় রে নেমে ধীরে নিঝুম ছায়া-বৌরা যেথা ঘুমায় দীঘি ঘিরে, 'দে জল!' ব'লে ফোঁপাস কেন? মাটির কোলে জল খবর-খোঁজা সোজা চোখের সোহাগে ছল্‌ছল্ ! মজিস নে রে আকাশ-মরুর মরীচিকার তীরে! মনের চাতক, হতাশ উদাস পাখায় দিয়ে পাড়ি কোথায় গেলি ঘরের কোণের কানাকানি ছাড়ি? ননীর কলস আছে রে তার কাঁচা বুকের কাছে, আতার ক্ষীরের মতো সোহাগ সেথায় ঘিরে আছে! আয় রে ফিরে দানোয়-পাওয়া, আয় রে তাড়াতাড়ি।বনের চাতক, মনের চাতক আসে না আর ফিরে, কপোত-ব্যথা বাজায় মেঘের শকুনপাখা ঘিরে! সে কোন্ ছুঁড়ির চুড়ি আকাশ-শুঁড়িখানায় বাজে! চিনিমাখা ছায়ায় ঢাকা চুনীর ঠোঁটের মাঝে লুকিয়ে আছে সে-কোন্ মধু মৌমাছিদের ভিড়ে!
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/boner-chatok-moner-chatok/
3678
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভোলানাথের খেলার তরে
রূপক
ভোলানাথের খেলার তরে খেলনা বানাই অামি। এই বেলাকার খেলাটি তার ওই বেলা যায় থামি।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/volanather-khelar-tore/
3491
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি
ভক্তিমূলক
বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি, সে কি সহজ গান। সেই সুরেতে জাগব আমি দাও মোরে সেই কান। ভুলব না আর সহজেতে, সেই প্রাণে মন উঠবে মেতে মৃত্যুমাঝে ঢাকা আছে যে অন্তহীন প্রাণ। সে ঝড় যেন সই আনন্দে চিত্তবীণার তারে সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত নাচাও যে ঝংকারে। আরাম হতে ছিন্ন ক'রে সেই গভীরে লও গো মোরে অশান্তির অন্তরে যেথায় শান্তি সুমহান। ( তিনধরিয়া, ২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bajre-tomar-baje-bashi/
5904
সুবোধ সরকার
শাড়ি
মানবতাবাদী
বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা এতো শাড়ি একসঙ্গে সে জীবনে দেখেনি।আলমারির প্রথম থাকে সে রাখলো সব নীল শাড়িদের হালকা নীল একটা কে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমার আকাশ দ্বিতীয় থাকে রাখল সব গোলাপীদের একটা গোলাপীকে জড়িয়ে সে বলল, ‘ তোর নাম অভিমান’ তৃতীয় থাকে তিনটি ময়ূর, যেন তিন দিক থেকে ছুটে আসা সুখ তেজপাতা রং যে শাড়িটার, তার নাম দিল বিষাদ । সারা বছর সে শুধু শাড়ি উপহার পেল এত শাড়ি সে কি করে এক জীবনে পড়বে ?কিন্তু বছর যেতে না যেতেই ঘটে গেল সেই ঘটনাটা সন্ধের মুখে মেয়েটি বেরিয়েছিল স্বামীর সঙ্গে, চাইনিজ খেতে । কাপড়ে মুখ বাঁধা তিনটি ছেলে এসে দাঁড়ালো স্বামীর তলপেটে ঢুকে গেল বারো ইঞ্চি ওপর থেকে নীচে। নীচে নেমে ডান দিকে । যাকে বলে এল । পড়ে রইলো খাবার, চিলি ফিস থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছে । -এর নাম রাজনীতি, -বলেছিল পাড়ার লোকেরা ।বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা একদিন দুপুরে শাশুড়ি ঘুমিয়ে, সমস্ত শাড়ি বের করে ছতলার বারান্দা থেকে উড়িয়ে দিল নীচের পৃথিবীতে । শাশুড়ি পড়িয়ে দিয়েছেন তাকে সাদা থান উনিশ বছরের একটা মেয়ে সে একা ।কিন্তু সেই থানও এক ঝটকায় খুলে নিল তিনজন, পাড়ার মোড়ে একটি সদ্য নগ্ন বিধবা মেয়ে দৌড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে, ‘বাঁচাও’ পেছনে তিনজন, সে কি উল্লাস, নির্বাক পাড়ার লোকেরা ।বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা….
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/04/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a7%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7-%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0/
2959
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষুদ্র আমি
সনেট
বুঝেছি বুঝেছি , সখা , কেন হাহাকার , আপনার’পরে মোর কেন সদা রোষ । বুঝেছি বিফল কেন জীবন আমার — আমি আছি , তুমি নাই , তাই অসন্তোষ । সকল কাজের মাঝে আমারেই হেরি — ক্ষুদ্র আমি জেগে আছে ক্ষুধা লয়ে তার , শীর্নবাহু – আলিঙ্গনে আমারেই ঘেরি করিছে আমার হায় অস্থিচর্ম সার । কোথা নাথ , কোথা তব সুন্দর বদন — কোথায় তোমার নাথ , বিশ্ব – ঘেরা হাসি । আমারে কাড়িয়া লও , করো গো গোপন — আমারে তোমারে মাঝে করো গো উদাসী । ক্ষুদ্র আমি করিতেছে বড়ো অহংকার , ভাঙো নাথ , ভাঙো নাথ , অভিমান তার ।।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khudro-ami/
1995
বিষ্ণু দে
সুজলা সুফলা
স্বদেশমূলক
সুজলা সুফলা সেই মলয়শীতলা ধরণীভরণী বন্দনীয় মাতৃভূমি ঋষি (ও হাকিম) বঙ্কিমচন্দ্রের সেই গণ-স্তোত্রগান এখনও হয়তো আনন্দের শীর্ষ-চূড়ে কোনো সভায় স্বয়ম্ রবিঠাকুরের সুরে সর্বাঙ্গ শিহরে অচৈতন্য শব্ দব্রহ্মে ধনী সমকণ্ঠে ওঠে সহস্রের গান, পাশের দূরের দেহমনে সমভাব, মৈত্রী — রাখীবন্ধনে শপথে | সে-গান প্রাণের রন্ধ্রে, মন জাগে ধ্রুব ছন্দে, গানে ভাবের সমুদ্র থেকে ভাষা ওঠে দোঁহে একাকার, ষেমন অন্তরে দেহ জাগে, দেহে স্বপ্নের প্রয়াণে ভাষা ওঠে সফেন চঞ্চল নৃত্যে | পরমুহূর্তে আবার কাশীমিত্রঘাটে দেখ, যিনি ভব্য সুশোভন সদা অসামান্য দিব্যকান্তি কবি, আমাদের ভাগ্য গণি, নগ্নবক্ষে সদ্যস্নাত ! — সুখদা বরদা দেশে, পথে ||
http://kobita.banglakosh.com/archives/4104.html
6016
হেলাল হাফিজ
অস্ত্র সমর্পণ
স্বদেশমূলক
মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার। নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে। বিরোধী নিধন শেষে কতোদিন অকারণে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখেছি তোমাকে বারবার কতোবার। মনে আছে, আমার জ্বালার বুক তোমার কঠিন বুকে লাগাতেই গর্জে উঠে তুমি বিস্ফোরণে প্রকম্পিত করতে আকাশ, আমাদের ভালবাসা মুহূর্তেই লুফে নিত অত্যাচারী শত্রুর নি:শ্বাস। মনে পড়ে তোমার কঠিন নলে তন্দ্রাতুর কপালের মধ্যভাগ রেখে, বুকে রেখে হাত কেটে গেছে আমাদের জঙ্গলের কতো কালো রাত! মনে আছে, মনে রেখো আমাদের সেই সব প্রেম-ইতিহাস। অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে মানুষকে ভালোবাসা ভালোবাসি বলে। যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন, যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে ভেঙে সেই কালো কারাগার আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার। ১৫.২.৭২
https://banglarkobita.com/poem/famous/88
6069
হেলাল হাফিজ
হিরণবালা
প্রেমমূলক
হিরণবালা তোমার কাছে দারুন ঋণী সারা জীবন যেমন ঋণী আব্বা এবং মায়ের কাছে। ফুলের কাছে মৌমাছিরা বায়ুর কাছে নদীর বুকে জলের খেলা যেমন ঋণী খোদার কসম হিরণবালা তোমার কাছে আমিও ঠিক তেমনি ঋণী। তোমার বুকে বুক রেখেছি বলেই আমি পবিত্র আজ তোমার জলে স্নান করেছি বলেই আমি বিশুদ্ধ আজ যৌবনে এই তৃষ্ণা কাতর লকলকে জিভ এক নিশীথে কুসুম গরম তোমার মুখে কিছু সময় ছিলো বলেই সভ্য হলো মোহান্ধ মন এবং জীবন মুক্তি পেলো। আঙুল দিয়ে তোমার আঙুল ছুঁয়েছিলাম বলেই আমার আঙুলে আজ সুর এসেছে, নারী-খেলার অভিজ্ঞতার প্রথম এবং পবিত্র ঋণ তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখে সত্যি কি আর শোধ হয়েছে?
https://banglarkobita.com/poem/famous/138
2377
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মেঘনাদবধ কাব্য (৩য় সর্গ)
মহাকাব্য
প্রমোদ-উদ্যানে কাঁদে দানব-নন্দিনী প্রমীলা, পতি-বিরহে কাতরা যুবতী। অশ্রুআঁখি-বিধুমুখী ভ্রমে ফুলবনে কভু,ব্রজ-কুঞ্জ-বনে,হায়রে, যেমনি ব্রজবালা,নাহি হেরি কদম্বের মূলে পীতধড়া পীতাম্বরে,অধরে মূরলী। অবচয়ি ফুল-চয়ে সে নিকুঞ্জ বনে, বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি,সখীরে সম্ভাষি কহিলা প্রমীলা সতী; “এইত তুলিনু ফুলরাশি; চিকনিয়া গাঁথিনু,স্বজনি, ফুলমালা;কিন্তু কোথা পাব সে চরণে, পুস্পাঞ্জলি দিয়া যাহে চাহি পূজিবারে; কে বাঁধিল মৃগরাজে বুঝিতে না পারি। চল,সখি, লঙ্কাপুরে যাই মোরা সবে।” কহিল বাসন্তী সখী;–“কেমনে পশিবে লঙকাপুরে আজি তুমি? অলঙ্ঘ্য সাগর- সম রাঘবীয় চমূ বেড়িছে তাহারে; লক্ষ লক্ষ রক্ষঃ- অরি ফিরিছে চৌদিকে অস্ত্রপাণি,দন্ডপাণি দন্ডধর যথা” রুষিলা দানব-বালা প্রমীলা রূপসী;– “কি কহিলি, বাসন্তি? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি, বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে, কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি? দানব-নন্দিনী আমি,রক্ষ-কুল-বধূ; রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,– আমি কি ডরাই,সখি,ভিখারী রাঘবে? পশিব লঙ্কায় আজি নিজ ভূজ-বলে; দেখিব কেমনে মোরে নিবারে নৃমনি? যথা বায়ু-সখা সহ দাবানল গতি দুর্ব্বার,চলিলা সতী পতির উদ্দেশে। টলিল কনক-লঙ্কা, গর্জ্জিল জলধি; ঘনঘনাকারে রেণু উড়িল চৌদিকে;– কিন্তু নিশা-কালে কবে ধূম-পুঞ্জ পারে আবরিতে অগ্নি-শিখা? অগ্নিশিখা-তেজে চলিলা প্রমীলা দেবী বামা-বল-দলে। কতক্ষনে উতরিলা পশ্চিম দুয়ারে বিধুমুখী। একবারে শত শঙ্খ ধরি ধ্বনিলা, টঙ্কারি রোষে শত ভীম ধনুঃ, স্ত্রীবৃন্দ; কাঁপিল লঙকা আতঙ্কে; কাঁপিল মাতঙ্গে নিষাদী; রথে রথী; তুরঙ্গমে সাদীবর; সিংহাসনে রাজা;অবরোধে কুলবধূ; বিহঙ্গম কাঁপিল কুলায়ে; পর্ব্বত-গহ্বরে সিংহ; বন-হস্তী বনে ডুবিল অতল জলে জলচর যত ; শিবিরে বসেন প্রভু রঘু-চুড়ামণি করপুটে শূর-সিংহ লক্ষণ সম্মুখে, পাশে বিভীষণ সখা, আর বীর যত, রুদ্র-কুল-সমতেজঃ,ভৈরব মুরতি । সহসা নাদিল ঠাট; ‘জয় রাম’-ধ্বনি উঠিল আকাশ-দেশে ঘোর কোলাহলে, সাগর-কল্লোল যথা; ত্রস্তে রক্ষোরথী, দাশরথি-পানে চাহি, কহিলা কেশরী,– “চেয়ে দেখ,রাঘবেন্দ্র, শিবির-বাহিরে। নিশীথে কি ঊষা আসি উতরিলা হেথা?” বিস্ময়ে চাহিলা সবে শিবির-বাহিরে। “ভৈরবীরূপিণী বামা,” কহিলা নৃমণি, “দেবী কি দানবী,সখে, দেখ নিরখিয়া; মায়াময় লঙ্কা-ধাম; পূর্ণ ইন্দ্রজালে; কামরূপী তবাগ্রজ। দেখ ভাল করি; এ কুহক তব কাছে অবিদিত নহে। শুভক্ষণে, রক্ষোবর,পাইনু তোমারে আমি। তোমা বিনা,মিত্র,কে আর রাখিবে এ দুর্ব্বল বলে,কহ,এ বিপত্তি-কালে? রামের চির-রক্ষণ তুমি রক্ষঃপুরে;” হেনকালে হনু সহ উতরিলা দূতী শিবিরে। প্রণমি বামা কৃতাঞ্জলিপুটে, (ছত্রিশ রাগিণী যেন মিলি এক তানে;) কহিলা; “প্রণমি আমি রাঘবের পদে, আর যত গুরুজনে;— নৃ-মুন্ড-মালিনী নাম মম;দৈত্যবালা প্রমীলা সুন্দরী, বীরেন্দ্র-কেশরী ইন্দ্রজিতের কামিনী, তাঁর দাসী।” আশীষিয়া, বীর দাশরথি সুধিলা; “কি হেতু,দূতি, গতি হেথা তব? বিশেষিয়া কহ মোরে, কি কাজে তুষিব তোমার ভর্ত্রিনী,শুভে? কহ শীঘ্র করি;” উত্তরিলা ভীমা-রূপী; “বীর-শ্রেষ্ঠ তুমি, রঘুনাথ; আসি যুদ্ধ কর তাঁর সাথে; নতুবা ছাড়হ পথ; পশিবে রূপসী স্বর্ণলঙ্কাপুরে আজি পূজিতে পতিরে।” এতেক কহিয়া বামা শিরঃ নোয়াইলা, প্রফুল্ল কুসুম যথা (শিশির মন্ডিত) বন্দে নোয়াইয়া শিরঃ মন্দ-সমীরণে; উত্তরিলা রঘুপতি; ”শুন, সুকেশিনী, বিবাদ না করি আমি কভু অকারণে। অরি মম রক্ষ-পতি; তোমরা সকলে কুলবালা,কুলবধূ; কোন অপরাধে বৈরি-ভাব আচরিব তোমাদেরসাথে? আনন্দে প্রবেশ লঙ্কা নিঃশঙ্ক হৃদয়ে”। এতেক কহিয়া প্রভু কহিলা হনুরে;– “দেহ ছাড়ি পথ, বলি। অতি সাবধানে, শিষ্ট আচরণে তুষ্ট কর বামা-দলে।” প্রণমিয়া সীতানাথে বাহিরিলা দূতী হাসিয়া কহিলা মিত্র বিভীষণ “দেখ, প্রমীলার পরাক্রম দেখ বাহিরিয়া, রঘুপতি;দেখ, দেব, অপূর্ব কৌতুক। না জানি এ বামা-দলে কে আঁটে সমরে ভীমারূপী, বীর্য্যবতী চামুন্ডা যেমতি– রক্তবীজ-কুল-অরি?” কহিলা রাঘব;– ”চল, মিত্র, দেখি তব ভ্রাতৃ-পুত্র-বধূ।” যথা দূর দাবানল পশিলে কাননে, অগ্নিময় দশ দিশ; দেখিলা সম্মুখে রাঘবেন্দ্র বিভা-রাশি নির্ধূম আকাশে, সুবর্নি বারিদপুঞ্জে; শুনিলা চমকি কোদন্ড-ঘর্ঘর ঘোর,ঘোড়া-দড়বড়ি, হুহুঙ্কার,কোষে বদ্ধ অসির ঝনঝনি। সে রোলের সহ মিশি বাজিছে বাজনা, ঝড় সঙ্গে বহে যেন কাকলী লহরী; উড়িছে পতাকা —রত্ন-সঙ্কলিত-আভা; মন্দগতি আস্কন্দিতে নাচে বজী রাজী; বোলিছে ঘুঙ্ঘুরাবলী ঘুনু ঘুনু বোলে। গিরিচূড়াকৃতি ঠাট দাঁড়ায় দুপাশে অটল,চলিছে মধ্যে বামা-কুল-দল; উপত্যকা-পথে যথা মাতঙ্গিনী-যূথ, গরজে পূরিয়া দেশ, ক্ষিতি টলমলি। সর্ব-অগ্রে উগ্রচন্ডা নৃ-মুন্ডমালিনী, কৃষ্ণ-হয়ারূঢ়া ধনী, ধ্বজ-দন্ড করে হৈমময়; তার পাছে চলে বাদ্যকরী, বিদ্যাধরী-দল যথা, হায় রে ভূতলে অতুলিত; বীণা বাঁশী, মৃদঙ্গ, মন্দিরা- আদি যন্ত্র বাজে মিলি মধুর নিক্কণে; তার পাছে শূল-পাণি বীরাঙ্গনা-মাঝে প্রমীলা,তারার দলে শশিকলা যথা; চলি গেলা বামাকুল। কেহ টঙ্কারিলা শিঞ্জিনী; হুঙ্কারি কেহ উলঙ্গিলা অসি; আস্ফালিলা শূলে কেহ; হাসিলা কেহ বা অট্টহাসে টিটকারি; কেহ বা নাদিলা, গহন বিপিনে যথা নাদে কেশরিণী, বীর-মদে, কাম-মদে উন্মাদ ভৈরবী; লক্ষ্য করি রক্ষোবরে, কহিলা রাঘব;– ”কি আশ্চর্য্য, নৈকষেয়? কভু নাহি দেখি, কভু নাহি শুনি হেন এ তিন ভুবনে; নিশার স্বপন আজি দেখিনু কি জাগি?” উত্তরিলা বিভীষণ; ”নিশার স্বপন নহে এ,বৈদেহী-নাথ,কহিনু তোমারে। কালনেমি নামে দৈত্য বিখ্যাত জগতে সুরারি,তনয়া তার প্রমীলা সুন্দরী। মহাশক্তি-সম তেজে;দম্ভোলি-নিক্ষেপী সহস্রাক্ষে যে হর্ষ্যক্ষ বিমুখে সংগ্রামে, সে রক্ষেন্দ্রে,রাঘবেন্দ্র,রাখে পদতলে বিমোহিনী,দিগম্বরী যথা দিগম্বরে;” লঙ্কার কনক-দ্বারে উতরিলা সতী প্রমীলা। বাজিল শিঙ্গা,বাজিল দুন্দুভি ঘোর রবে;গরজিল ভীষণ রাক্ষস, প্রলয়ের মেঘ কিম্বা করীযুথ যথা; উচ্চৈস্বরে কহে চন্ডা নৃ-মুন্ডমালিনী;— ”কাহারে হানিস্ অস্ত্র,ভীরু,এ আঁধারে? নহি রক্ষোরিপু মোরা, রক্ষঃ-কুল-বধূ, খুলি চক্ষুঃ দেখ চেয়ে।” অমনি দুয়ারী টানিল হুড়ুকা ধরি হুড় হুড় হড়ে; বজ্রশব্দে খুলে দ্বার। পশিলা সুন্দরী আনন্দে কনক লঙ্কা জয় জয় রবে। ==========
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/meghnadbodh-kabya-third-section/
1343
তসলিমা নাসরিন
নারী-জন্ম
মানবতাবাদী
তাদের জন্য আমার করুণা হয় যারা নারী নয় দুর্ভাগাদের জন্য আমার দুঃখ হয়, যারা নারী নয়। অবিশ্বাস্য এই শিল্প, অতুলনীয় শিল্প এই নারী, বিশ্বের বিস্ময়, বিচিত্রিতা। আমি নারী, বারবার চাই, শতবার চাই নারী হতে, নারী হয়ে জন্ম নিতে। সহস্র জন্ম চাই আমি, নারী জন্ম চাই। নারীর প্রেম চাই, তার কামরসে স্নান চাই, মৈথুন চাই। মৈথুনে মোহাচ্ছত হতে হতে মরিয়া হয়ে চাই একটি শিশু, আমার তীব্র প্রচণ্ড চাওয়া তীব্রতর হতে থাকে যতক্ষণ না আমার নারী-শরীরটিই শুক্রাণুর জন্ম দিচ্ছে। একটি ভ্রূণ আমার জরায়ুতে। নারী-শিশু জন্ম দেব আমি, আমি নারী, জন্ম দেব নারী-শিশু। আমি ভালোবাসছি সর্বদর্শী সর্বময়ী সর্বব্যাপিনী শাশ্বতী নারীশক্তি। ভালোবাসছি নারীশিশু, কিশোরী, তরুণী, যুবতী, বৃদ্ধা। হিরন্ময়ী ইচ্ছাময়ী প্রাণবতী হৃদয়বতী আবর্তিত হতে হতে বিবর্তিত হতে হতে সম্রাজ্ঞী হতে হতে গোটা ব্রম্মাণ্ডের ঈশ্বরী হচ্ছে। ভালোবাসছি আমাকে! নারীকে। নারী-জন্মকে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2017
321
কাজী নজরুল ইসলাম
জাগরণী
মানবতাবাদী
কোরাস্:— ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী, সন্তান দ্বারে উপবাসী, দাও মানবতা ভিক্ষা দাও! জাগো গো,জাগো গো, তন্দ্রা-অলস জাগো গো, জাগো রে! জাগো রে! ১ মুক্ত করিতে বন্দিনী মা'য় কোটি বীরসুত ঐ হেরো ধায় মৃত্যু-তোরণ-দ্বার-পানে— কার টানে? দ্বার খোলো দ্বার খোলো! একবার ভুলে ফিরিয়া চাও। কোরাস্:— ভিক্ষা দাও... ২ জননী আমার ফিরিয়া চাও! ভাইরা আমার ফিরিয়া চাও! চাই মানবতা, তাই দ্বারে কর হানি মা গো বারেবারে— দাও মানবতা ভিক্ষা দাও! পুরুষ-সিংহ জাগো রে! সত্যমানব জাগো রে। বাধা-বন্ধন-ভয়-হারা হও সত্য-মুক্তি-মন্ত্র গাও! কোরাস্:— ভিক্ষা দাও... ৩ লক্ষ্য যাদের উৎপীড়ন আর অত্যাচার, নর-নারায়ণে হানে পদাঘাত জেনেছে সত্য-হত্যা সার। অত্যাচার! অত্যাচার!! ত্রিশ কোটি নর-আত্মার যারা অপমান হেলা করেছে রে শৃঙ্খল গলে দিয়েছে মা'র— সেই আজ ভগবান তোমার! অত্যাচার! অত্যাচার!! ছি-ছি-ছি-ছি-ছি-ছি-নাই কি লাজ— নাই কি আত্মসম্মান ওরে নাই জাগ্রত ভগবান কি রে আমাদেরো এই বক্ষোমাঝ? অপমান বড় অপমান ভাই মিথ্যার যদি মহিমা গাও! কোরাস্:— ভিক্ষা দাও... ৪ আল্লায় ওরে হকতা'লায় পায়ে ঠেলে যারা অবহেলায়, আজাদ-মুক্ত আত্মারে যারা শিখায়ে ভীরুতা করেছে দাস— সেই আজ ভগবান তোমার! সেই আজ ভগবান তোমার! সর্বনাশ! সর্বনাশ! ছি-ছি নির্জীব পুরবাসী আর খুলো না দ্বার! জননী গো! জননী গো! কার তরে জ্বালো উৎসব-দীপ? দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!! মঙ্গল-ঘট ভেঙে ফেলো, সব গেল মা গো সব গেল! অন্ধকার! অন্ধকার! ঢাকুক এ মুখ অন্ধকার! দীপ নেবাও! দীপ নেবাও। কোরাস্:— ভিক্ষা দাও... ৫ ছি ছি ছি ছি এ কি দেখি গাহিস তাদেরি বন্দনা-গান, দাস সম নিস হাত পেতে দান! ছি-ছি-ছি ছি-ছি-ছি ওরে তরুণ ওরে অরুণ! নরসুত তুমি দাসত্বের এ ঘৃণ্য চিহ্ন মুছিয়া দাও! ভাঙিয়া দাও, এ-কারা এ-বেড়ি ভাঙিয়া দাও! কোরাস্:— ভিক্ষা দাও... ৬ পরাধীন বলে নাই তোমাদের সত্য-তেজের নিষ্ঠা কি! অপমান সয়ে মুখ পেতে নেবে বিষ্ঠা ছি? মরি লাজে, লাজে মরি! এক হাতে তোরে 'পয়জার' মারে আর হাতে ক্ষীর সর ধরি! অপমান সে যে অপমান! জাগো জাগো ওরে হতমান! কেটে ফেলো লোভী লুব্ধ রসনা, আঁধারে এ হীন মুখ লুকাও! কোরাস্:— ভিক্ষা দাও... ৭ ঘরের বাহির হয়ো না আর, ঝেড়ে ফেলো হীন বোঝার ভার, কাপুরুষ হীন মানবের মুখ ঢাকুক লজ্জা অন্ধকার। পরিহাস ভাই পরিহাস সে যে, পরাজিতে দিতে মনোব্যথা—যদি জয়ী আসে রাজ-রাজ সেজে। পরিহাস এ যে নির্দয় পরিহাস! ওরে কোথা যাস বল কোথা যাস ছি ছি পরিয়া ভীরুর দীন বাস? অপমান এত সহিবার আগে হে ক্লীব, হে জড়, মরিয়া যাও! কোরাস্:— ভিক্ষা দাও... ৮ পুরুষসিংহ জাগো রে! নির্ভীক বীর জাগো রে! দীপ জ্বালি কেন আপনারি হীন কালো অন্তর কালামুখ হেন হেসে দেখাও! নির্লজ্জ রে ফিরিয়া চাও! আপনার পানে ফিরিয়া চাও! অন্ধকার! অন্ধকার! নিশ্বাস আজি বন্ধ মা'র অপমানে নির্মম লাজে, তাই দিকে দিকে ক্রন্দন বাজে— দীপ নেবাও! দীপ নেবাও! আপনার পানে ফিরিয়া চাও! কোরাস্:— ভিক্ষা দাও...
https://banglarkobita.com/poem/famous/834
1620
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
না রাম, না গঙ্গা
ব্যঙ্গাত্মক
তিনি না-জানেন রাম, না-জানেন গঙ্গা। না-চেনেন মাটি, না-চেনেন মানুষ। মাটি বলতে তিনি নির্বাচনকেন্দ্র বোঝেন, এবং মানুষ বলতে ভোটার। রামপুরের মাটি যে সাত ফুট জলের তলায় শুয়ে আছে, এ খবরে তাঁর সুনিদ্রার কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি, কেননা রামপুর তাঁর নির্বাচনকেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু গঙ্গানগরের গুটি-তিন বাচ্চা এবং জনাকয় থুত্থুড়ে বুড়োবুড়ি যে বানের জলে ভেসে গিয়াছে, এই খবর পেয়ে তাঁকে ঘুমের বড়ি খেতে হয়েছিল। কিন্তু ঘুম ভাঙবার পরে এখন আবার তাঁর শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। কেননা তিনি জানেন যে, বাচ্চাদের ভোটাধিকার নেই, বেওং যে গ্রাম থেকে নিকটতম পোলিং বুথটিও অন্তত আড়াই মাইল দূরে, পারতপক্ষে বুড়োরা সেখানে ভোট দেয় না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1607
3714
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মান অপমান উপেক্ষা করি দাঁড়াও
নীতিমূলক
মান অপমান উপেক্ষা করি দাঁড়াও, কণ্টকপথ অকুণ্ঠপদে মাড়াও, ছিন্ন পতাকা ধূলি হতে লও তুলি। রুদ্রের হাতে লাভ করো শেষ বর, আনন্দ হোক দুঃখের সহচর, নিঃশেষ ত্যাগে আপনারে যাও ভুলি।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/man-opoman-upekkha-kori-darao/
2061
মহাদেব সাহা
আমার ফেলতে হবে আরো অশ্রুজল
মানবতাবাদী
আমার ফেলতে হবে আরো অশ্রুজল, আমাকে ভাঙতে হবে আরো দীর্ঘ পথ আমি জানি আমার ঝরাতে হবে আরো রক্ত ঘাম; অন্য কারো কথা আমি বলতে পারি না, তবে আমার ঠিকই জানি আরো অনেক মোছাতে হবে নগ্ন পদতল, সবার পায়ের নিচে আরো বহু হতে হবে ঘাস আমাকে সরাতে হবে আরো অনেক পথের তীক্ষ্ণ কাঁটা; আমি জানি না হলে আমার এই ব্যর্থ হাতে ফুটবে না কোনো তুচ্ছ ফুল, আমাকে সরাতে হবে অনেক পাথর, আমাকে খুলতে হবে অনেক দরোজা আমার পেরুতে হবে অনেক বন্ধুর গিরি-খাত, আমার করতে হবে একা জেগে অনেক দুঃখের রাত্রি ভোর; আর কারো কথা আমি বলতে পারি না তবে এ ছাড়া আমার কোনো পরিত্রাণ নেই গহীন জঙ্গলে হিংস্র বাঘের সামনে কতো আমাকে পড়তে হবে আরো ভয়াল দৈত্যের মুখে বুক বেঁধে সাহসে দাঁড়াতে হবে জানি, না হলে আমার হাতে ফুটবে না একটি কমল। আমাকে মাড়াতে হবে আরো অনেক দুয়ার, পথে পথে আমাকে ছড়াতে হবে চেরি আরো আমাকে মোছাতে হবে চোখ, আমার করতে হবে আরো বহু ক্ষতের শুশ্রূষা, আরো আমাকে ছড়াতে হবে পথে পথে, আরো নিঃশেষে পোড়াতে হবে নিজের জীবন আমার সইতে হবে আরো কঠিন আঘাত, আমার বইতে হবে আরো দুঃখভার, আমার ফেলতে হব আরো অশ্রুজল, আমার করতে হবে আরো লণ্ডভণ্ড ঘর ও সংসার আরো ছিন্নভিন্ন করতে হবে এই গেরস্থালি, ভিতর-বাহির। আমার তাহলে ছেড়ে ছুঁড়ে নেমে যেতে হবে সব ফেলে, বুদ্ধের মতন চলে যেতে হবে সব ফেলে, যদি একটিও তুচ্ছ ফুল ফোটাতে চাই তাহলে ফেলতে হবে আরো অশ্রু তাহলে আমার তুলে নিতে হবে হাতে ভিক্ষাপাত্র, ছিড়ে ফেলতে হবে সব প্রিয় আকর্ষণ, সব স্নেহমায়ার বন্ধন ভুলে যেতে হবে সন্তানের অশ্রুভেজা চোখ তাহলে আমার আর একবারও পেছন ফিরে তাকালে চলবে না, চলে যেতে হবে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1434
2220
মহাদেব সাহা
ভালোবাসা মরে গেছে গত গ্রীষ্মকালে
প্রেমমূলক
ভালোবাসা মরে গেছে গত গ্রীষ্মকালে উদ্যত বাহুর চাপে, ধুলোমাটি কাদা লেগে গায়ে শীতেতাপে ঝরে গেছে তার বর্ণ, মেধা স্পর্শ করে আশি এই প্রেমহীন নারীর শরীর মৃত চুল, উত্তাপবিহীন কিছু বয়সের ধুলো, নীলাঞ্জনশোভিত নারীর মুখ ফিকে থির পলকবিহীন দুই চোখ খেয়ে গেছে পৌষের দুই বুড়ো কাক তাহাকেই ধরে আছি, বেঁধে আছি অসহায় স্তব্ধ আলিঙ্গনে ; সহু বছরের এই রোদবৃষ্টিজলে, ঝড়ে, কুয়াশায় নষ্ট হয়ে গেছে প্রেম, মুখের গড়ন তার, দেহের বাঁধন অজন্তা মূর্তি লাস্য, শিল্পের মতন সেই গূঢ় সম্ভষণ তার কতোখানি বাকি আছে?অবশিষ্ট আছে? তাহারা কি থাকে কেউ অনাদরে উপেক্ষায় সারাদিনে একবেলা জলঢালা মৌন কেয়ারিতে অজ্ঞাত নফর, তাহারা কি থাকে? স্পর্শহীন, পরিচর্যহীন একাকী নিঃসঙ্গ আর কতোকাল দগ্ধ হবে প্রেম।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1456
1674
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
যাওয়া
চিন্তামূলক
মাটিতে চোখ রেখে ঘুরে বেড়াত লোকটা, কখনও আকাশ দেখেনি। এখন খাটিয়ার উপরে চিতপটাং হয়ে সে শুয়ে আছে, আর আশ মিটিয়ে আকাশ দেখছে। জীবনে কখনও ফুলের স্বপ্ন দেখেনি লোকটা, অষ্টপ্রহর শুধু ভাতের গন্ধে হন্যে হয় ঘুরত। এখন তার তেলচিটে বালিশের দু’দিকে দুটো রজনীগন্ধার বাণ্ডিল ওরা সাজিয়ে দিল। এতকাল সে অন্যের বোঝা হয়ে বেড়াত। আর আজ তারই নীচে কোমরে-গামছা চার বেহারা। আকাশ দেখতে-দেখতে, ফুলের গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে লোকটা এখন গঙ্গার হাওয়া খেতে যাচ্ছে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1609
261
কাজী নজরুল ইসলাম
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
ভক্তিমূলক
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদআজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমণ, হাত মেলাও হাতে, তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী সেই গরিব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদঢাল হৃদয়ের তশতরীতে শিরনি তৌহিদের, তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত হয় মনে উম্মীদ।তোরে মারল' ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/ramjaner-gojol/
5350
শামসুর রাহমান
হে আমার বাল্যকাল
সনেট
হে আমার বাল্যকাল তুমি সে কেমন মাল্যদান দেখেছিলে খুব বিস্ফারিত চোখে শহুরে সন্ধ্যায়? সে মালার ফুলগুলি স্মৃতির মতন ভেসে যায় মনোজ তীর্থের তীরে, যেন বা পাপড়িরা অফুরান- শতাব্দী শতাব্দী ধরে ঝরে যাবে, বেদনার্ত গান গাইবে জীবন জুড়ে। পথচারী যখন হারায় দিকচিহ্ন, এবং স্মৃতির সঙ্গে বিষণ্ণ ছায়ায় কথোপকথন করে, পথ হয়ে আরো সুনসান।সে পথ পতিতা নাকি ভগ্নী নান, তার চুলচেরা হিসের উভীষ্ট নয়, শুধু দেখি রুক্ষ, পোড়া মাটি আশপাশে- সূর্যাস্তের বর্ণচ্ছটাময়, সুপ্রাচীন রণক্ষেত্র, তরমুজের ফালি, ভাঁড়ের করোটি, ছেঁড়া জুতো এক পাটি; বাল্যকাল, তুমি কেন প্রতিদিন আনো রেলগাড়ি কাটা ঘুড়ি, বাতাসা ও জামবাটি?   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/he-amar-balyokal/
2040
মলয় রায়চৌধুরী
লালসেলাম হায়
মানবতাবাদী
মুখের গহ্বরে এক জান্তব গোঙানিডাক চলাফেরা করে জেলহাজতের ভিড়ে ত্রিকালজ্ঞ ভিড় দেখে চমকে উঠি এরা কারা হাতকড়া পরে ঠাঠা হাসে সারাদিন বাইরে যারা রয়ে গেল ঝুঁকিয়ে দাঁতাল-মাথা তারাই বা কারা জল্লাদের ছেড়ে দেয়া প্রশ্বাস বুক ভরে টানে চাই না এসব ধন্ধ মশারি খাটিয়ে বিছানায় সাপ নারীর বদলে নৌকোর গলুই থেকে ছুরি হাতে জ্যোৎস্নায় বুকের ওপরে বসবে লুঙিপরা রোমশ সারেঙ নাসারন্ধ্র থেকে বন্দুকের ধোঁয়া “বল শালা শকুন্তলার আঙটি কোন মাছে আছে” জানি তবু বলতে পারি না মুখের ভেতর আঙটি জিভের তলায় আমি লুকিয়ে রেখেছি। ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩৯২
https://banglarkobita.com/poem/famous/1153
4786
শামসুর রাহমান
তুমি আজ অধিরাজ
ভক্তিমূলক
(হুমায়ুন আজাদের উদ্দেশে)গ্যয়েটের ফাউস্টের মতোই কাটছে প্রধানত ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে জীবন তোমার। জ্ঞানার্জনে অক্লান্ত সাধক তুমি, উপরন্তু কাব্য রচনায় সিদ্ধিলাভ করেছো এবং প্রতিক্রিয়াবিরোধী ব’লেই ওরা অশুভ তিমিরে তোমার বিশুদ্ধ রক্ত বইয়ে দিয়েছে হিংস্রতায়।বিদ্যা, যতটুকু জানা আছে, মানসের শ্রীবৃদ্ধির বস্তুত অপরিহার্য শ্রেষ্ঠ উপাদান। তুমি তাই আভা তার দিয়েছো ছড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসুক শিক্ষার্থীদের মনে নিত্যদিন। সমাজের নানা বয়সের আগ্রহী পুরুষ, নারী তোমার জ্ঞানের ছোঁয়া পেয়ে আলোকিত হয়ে ঢের বস্তুত কৃতজ্ঞ বোধ করেছেন যখন তখন। মূর্খেরা ভেবেছে তুমি অস্ত্রাঘাতে নিষ্প্রাণ হ’লেই নিভে যাবে তোমার সৃষ্টির আলোমালা, অথচ জানে না ওরা সর্বদা সজীব তুমি, অমর তোমার প্রোজ্জ্বল রচনাবলি। তোমার শরীর কোনওকালে মৃত্তিকায় বিলুপ্ত হলেও যুগ যুগ জ্বলজ্বলে রয়ে যাবে বাংলার দালান, কুটিরে, নদীর ঢেউয়ে। দেশপ্রেমী প্রতিটি প্রাণের আসনে হে কবি হুমায়ুন তুমি আজ অধিরাজ।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tumi-aj-odhraj/
902
জীবনানন্দ দাশ
অনির্বাণ
প্রেমমূলক
সর্বদাই এরকম নয়, তবু মাঝে মাঝে মনে হয় কোন দূর উত্তরসাগরে কোনো ঢেউ নেই; তুমি আর আমি ছাড়া কেউ সেখানে ঢোকার পথ হারিয়ে ফেলেছেনেই নীলকণ্ঠ পাখিদের ডানা গুঞ্জরণ ভালোবেসে আমাদের পৃথিবীর এই রৌদ্র; কলকাতার আকাশে চৈত্রের ভোরে যেই নীলিমা হঠাৎ এসে দেখা দেয় মিলাবার আগে এইখানে সে আকাশ নেই; রাতে নক্ষত্রেরা সে রকম আলোর গুঁড়ির মতো অন্ধকার অন্তহীন নয়।তবুও আকাশ আছেঃ অনেক দূরের থেকে নির্নিমেষ হয়ে নক্ষত্র দু’-একজন চেয়ে থাকে চেয়ে থাকে আমাদের দিকে- যেন টের পায়পৃথিবীর কাছে আমাদের সব কথা -সব কথা বলা ডাভেন্ট্রিডোমেই টাসে স্টেফানিতে যুদ্ধ শান্তি বিরতি নিয়তির ফাঁদে চিরদিন বেধে গিয়ে ব্যহত রণনে শব্দের অপরিমেয় অচল বালির মরুভূমি সৃষ্টি করে গেছে; -কোনো কথা কোনো গানকাউকেই বলে নাই; কোন গান পাখিরাও গায় নাই।তাই এই পাখিহীন নীলিমাবিহীন শাদা স্তব্ধতার দেশে তুমি আর আমি দুই বিভিন্ন রাত্রির দিক থেকে যাত্রা করে উত্তরের সাগরের দীপ্তির ভিতরে এখন মিশেছিএখন বাতাসে শব্দ নেই-তবু শুধু বাতাসের শব্দ হয় বাতাসের মত সময়ের কোনো রৌদ্র নেই, তবু আছে কোনো পাখি নেই, তবু রৌদ্রে সারাদিন হংসের আলোর কণ্ঠ র’য়ে গেছে; কোন রাণী নেই-তবু হংসীর আশার কণ্ঠ এইখানে সাগরের রৌদ্রে সারা দিন।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/onirban/
3745
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মেঘদূত
সনেট
নিমেষে টুটিয়া গেল সে মহাপ্রতাপ। ঊর্ধ্ব হতে একদিন দেবতার শাপ পশিল সে সুখরাজ্যে, বিচ্ছেদের শিখা করিয়া বহন; মিলনের মরীচিকা, যৌবনের বিশ্বগ্রাসী মত্ত অহমিকা মুহূর্তে মিলায়ে গেল মায়াকুহেলিকা খররৌদ্রকরে। ছয় ঋতু সহচরী ফেলিয়া চামরছত্র, সভাভঙ্গ করি সহসা তুলিয়া দিল রঙ্গযবনিকা— সহসা খুলিয়া গেল, যেন চিত্রে লিখা, আষাঢ়ের অশ্রুপ্লুত সুন্দর ভুবন। দেখা দিল চারি দিকে পর্বত কানন নগর নগরী গ্রাম—বিশ্বসভামাঝে তোমার বিরহবীণা সকরুণ বাজে।  (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/meghdut/
2027
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
পড়ালেখা করে যেই
নীতিমূলক
লেখা পড়া করে যেই। গাড়ী ঘোড়া চড়ে সেই।। লেখা পড়া যেই জানে। সব লোক তারে মানে।। কটু ভাষী নাহি হবে। মিছা কথা নাহি কবে।। পর ধন নাহি লবে। চিরদিন সুখে রবে।। পিতামাতা গুরুজনে। সেবা কর কায় মনে।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4147.html
4235
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ভ্রম
চিন্তামূলক
ভ্রম -- শক্তি চট্টোপাধ্যায়আসলে তুমি ক্ষুদ্র ছোট, ফুলের মত বাগানে ফোটো, বিরহে যদি দাঁড়িয়ে ওঠো ভূতের মত দেখায়, আসলে কেউ বড় হয়না, বড়র মত দেখায় |
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/bhrome/
1918
পূর্ণেন্দু পত্রী
হালুম
রূপক
মাথায় মুকুটটা পরিয়ে দিতেই রাজা হয়ে গেলেন তিনি। আর সিংহাসনে পাছা রেখেই হাঁক পাড়লেন হালুম। অমনি মন্ত্রীরা ছুটলো ঘুরঘুট্টি বনে হরিণের মাংস সেকতে সেনাপতিরা ছুটলো খলখলে সমুদ্রে ফিস-ফ্রাইয়ের খোঁজে কোতোয়ালরা ছুটলো হাটে-বাজারে যেখান থেকে যা আনা যায় উপড়ে বরকন্দাজেরা ক্ষেত খামার ল্ড ভণ্ড করে বানালো ফ্রুটল্যলাড। রাজা সরলেন ব্রেক ফাস্ট। তারপরেই সিং-দুয়ারে বেজে উঠলো সাত-মণ সোনার ঘন্টা। এবার রাজদরবার। আসমুদ্র-হিমাচরের ন্যাংটো, আধ-ন্যাংটো জন্তু-জানোয়ারের ঝাঁক পিলপিলিয়ে জড়ো হল রাজ-চত্বরে। মন্ত্রী জানালো, প্রভু! জনতা হাজির। ওরা প্রসাদ পেতে চায় আপনার অমৃত ভাষণের। অমনি উত্তরে, দক্ষিণে, পুবে, পশ্চিমে, ঈশানে, নৈঋতে, গাছে, পাতায়, শিশিরে, শ্মশানে, ধুলোয়, ধোয়ায়, কুয়াশায় আকাশে, বাতাসে, হাড়ে, মাসে, পেটে, পাঁজরে গর্জন করে উঠলো, সাড়ে সাতমো অ্যামপ্লিফায়ার -হালুম।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1318
1829
পূর্ণেন্দু পত্রী
তোমারই সঙ্গে
প্রেমমূলক
তোমারি সঙ্গে যুদ্ধ প্রহরে প্রহরে তোমারই সঙ্গে সন্ধি, তোমারই মূর্তি নির্মাণে আমি নিজেকে করেছি পাথর চূর্ণ। সর্বনাশের পাশা নিয়ে খেলা দুজনের, অথচ লক্ষ্য শান্তি। আক্রমণের তীর ও ধনুকে জ্বলছে ক্ষমার সৌরদীপ্তি। তোমার মৃত্যু যখন আমার কান্নায় তুমি উল্লাসে পদ্ম, আমার মৃত্যু যখন তোমাকে ছিঁড়ছে আমি মুখরিত শঙ্খ। প্রহরে প্রহরে নিহত হয়েও আমরা অগ্নিপালকে রক্তিম, পরস্পরের নিঃস্বতা পরিপূরণে অর্জন করি প্রজ্ঞা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1193
1574
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
খেলোয়াড়ের টুপি
চিন্তামূলক
হাটের গণ্ডগোল থেকে মানুষ যেমন তার ঘরের পথে পা বাড়ায়, কথাগুলিও এমন তেমনি পা বাড়িয়েছে শব্দ থেকে শব্দহীনতার দিকে। চতুর্দিকে এখন ফিরে যাবার, ফিরিয়ে নেবার পালা। ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত অনুতপ্ত সন্তানের মতো গন্ধ দিরে যাচ্ছে ফুলের মধ্যে, আর এতক্ষণ যা আলোয় ঝলমল করছিল, সেই মন্দিরচূড়া থেকে তাঁর শেষ হিরণ্ময় বল্লমকে ফের ফিরিয়ে নিচ্ছে সূর্যদেব। অন্ধকার থেকে দৃশ্যগুলি একে-একে আলোর বৃত্তে নেমে এসেছিল। যে যেমন দেখতে চায়, দিনভর সে তেমন দেখেছে। কিন্তু আর নয়, হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া যাবতীয় টুপি যেভাবে খেলোয়াড়ের মাথায় ফিরে আসে, ঠিক তেমনিভাবে সব দৃশ্য এখন আবার মিছিল বেঁধে অন্ধকারের মধ্যে ফিরবে। মাস্তুল থেকে নেমে আসছে বাদাম, দুর্গশীর্ষের লৌহদণ্ড থেকে ঝুলে পড়ছে পতাকা, স্তনসন্ধির অন্ধকারে মুখ ঢাকবার জন্যে রণক্ষেত্র থেকে সৈনিকও এখন ফিরে যাচ্ছে তার নিজস্ব নারীর কাছে। চতুর্দিকেই এখন ফিরে যাবার, ফিরিয়ে নেবার শব্দহীন আয়োজন। মেলার মাঠে ছড়িয়ে রাখা তার খেলাগুলিকে আবার বাক্সে তুলে রাখছে দোকানি। রাত হয়েছে, তারও এখন ঘরে ফেরার পালা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1561
4416
শামসুর রাহমান
ইচ্ছেটাও মৃত
মানবতাবাদী
কে যেন ঠুকরে দিল খুব জোরে ঘুমন্ত আমাকে আপাদ মস্তক। চোখ খুলতেই দেখি, একি পুবে ও পশ্চিমে, উত্তর দক্ষিণে ভয়ঙ্কর দাঁত-নখ বের-করা অন্ধকার- বসে আছে বিকট শকুন এক, যার চঞ্চু থেকে ঝরছে শোণিত। ‘মানবতা হয়েছে শিকার তার’, কারা যেন গলিপথে হেঁটে যেতে-যেতে বলে গেল ভয়ার্ত গলায়। শয্যা ছেড়ে উঠতে চেয়েও ব্যর্থ আমি, এক ফোঁটা আলো নেই কোনওখানে।বহুদিন হ’ল শহরে ও গ্রামে, কোনওখানে কারও ঠোঁটে হাসি নেই, এমনকি শিশুরাও হঠাৎ হাসতে ভুলে গেছে যেন কোন্‌ অশুভ সংকেতে। আমি আজ কলমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শুনি হাহাকার, খাতার সফেদ পাতা কেঁপে ওঠে নিরন্ত ফোঁপানি এবং শৃংখলিত কারও ঝাঁকুনিতে যেন। কে আজ সহায়? এই হিংস্র অন্ধকারে, হে বিদ্রোহী কবি, আজকাল আপনাকে বড় বেশি মনে পড়ছে আমার ক্ষণে ক্ষণে, আপনি তো ঢের আগে কারার লৌহকপাট তুমুল ভাঙার, লোপাট করার আর জোর সে হ্যাঁচকা টানে গারদগুলোকে, ওহো, প্রলয় দোলায় দুলিয়ে কঠোব কুশাসন সমাপ্তির মন্ত্র জপিয়ে ছিলেন দেশবাসীদের দিকে দিকে শহরে ও পাড়াগাঁয়।এই বুনো তিমিরে আপনি কবি পুনরায় সূর্যের মতোই চোখ মেলে বাবরি দুলিয়ে ঝোড়ো বেগে এই জ্যৈষ্ঠে চলে এলে ভণ্ডদের ক্রূর খেলা হবে শেষ, পশ্চাতগামীর ভুয়ো জয়ঢাক যাবে থেমে তিমির-বিনাশী প্রগতির দীপ্ত সুরে। আমরা এখনও ব্যর্থতার কাদায় আকণ্ঠ ডুবে আছি, হয়ে যাচ্ছি ক্রমে কাদার পুতুল!শুভবাদী পুষ্পগুলি ঝরে যায় অতিশয় দ্রুত, জানি আজ জাঁহাবাজ দানোদের পায়ের টোকায় বিচূর্ণ, বিধ্বস্ত কত বিদ্যাপীঠ, বোবা কান্নায় ত্রিলোক কম্পমান! মূঢ়, মূর্খদের থুতু, বাচালতা তাড়িয়ে বেড়ায় বস্তুত ধীমানদের সর্বক্ষণ, পথে ও বিপথে পড়ে থাকে লাশ, শুধু লাশ। কারও দিকে কারও তাকাবার ইচ্ছেটাও মৃত।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/icchetao-mrito/
4750
শামসুর রাহমান
ডায়েরির একটি পাতা
চিন্তামূলক
সকালের রোদে এই সাতই আশ্বিনে আরো একটি দিন এলো জানাতে সাদর সম্ভাষণ। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে চাদরে পা ঘষি, অন্যমনে আঙুল চালিয়ে দিই চুলে কোথাও উজ্জ্বল মোটরের হর্ন বেজে ওঠে (শুনি) চেনা শব্দ হরেক রকম। টিক টিক ঘরি বাজে, ঠিক ঠিক টিকটিকি সাড়া দেয় সহযোগী তন্ময় নিষ্ঠায়। বাথরুমে গড়ায় কলের পানি, বারান্দায় দেখি হাওয়ায় টবের ফুলে সে কী গলাগলি।আলোলাগা ভালোলাগা বেলা খেলা করে সত্তার প্রাঙ্গণে -বেঁচে আছি।আলনায় ঝোলানো আমার ইজের কামিজ সাদা দেয়ালের ফুল, টেবিলে পুরানো ছবি, শুকনো ফল, দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম, অসমাপ্ত কবিতার পাণ্ডুলিপি, বই সবকিছু ঝলমলিয়ে ওঠে আশ্বিনের রোদ্দুরে এবং মনে হয় থাকব এখানে চিরদিন।যখন পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে রুটি মাখনের ঘ্রাণ, সোনালি চায়ের সুগন্ধ, চূড়ির শব্দ, দরজায় আড়ালে তোমার কণ্ঠস্বর ছোঁয় প্রাণ, ভাবি কী সুন্দর এই বেঁচে থাকা…   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/daerir-ekti-pata/
5317
শামসুর রাহমান
স্বপ্নজীবী
রূপক
নিদ্রার জরায় ছিঁড়ে বেরোয় স্বপ্ন কানকো উন্টিয়ে মাছ পরখ করার মতো স্বপ্নের বিশ্লেষণে মনোযোগী হই অস্পষ্টস্মৃত ভগ্মংগুলো পিছলে যায় মাছেরই ধরনে তারা- ঝোপের ভেতর থেকে লাফিয়ে পড়ে বেড়াল রাত্রি আর বেড়ালের এমন ফষ্টিনষ্টি কখনো দেখিনি অবশ্য স্বপ্নজীবী জাগরণের পরেও মাথা ফাঁকা দেখলে সিঁধেল চোর স্বপ্ন আবার ঢুকে পড়ে হঠাৎ চোখের পশ্চাদ্দেশে হাত বুলোয় নাক ঘষে তখন বিশ্ব এবং আমার পরিচয়ের উপর যবনিকা পতন বালিশ চুমো খায় মাথাকে মাথা হাওয়াকে আর হাওয়া আমার চুল চোখ কান নাক পাঁজর নখ বুকের রোমরাজি আর নিদ্রাতুর শিশ্নকে শিশ্ন স্বপ্নের ছ্যাঁদায় সুড়সুড়ি দেয় এবং স্বপ্ন এখন রজস্বলা   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/swopnojibi/
4655
শামসুর রাহমান
খেলনার দোকানের সামনে ভিখিরি
মানবতাবাদী
বড় রাস্তা, ঘুপচি গলি, ঘিঞ্জি বস্তি, ভদ্রপাড়া আর ফলের বাজার ঘুরে খেলনার দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। কাচের আড়ালে দেখি কাঠের পুতুল, রেলগাড়ি, ছক-কাটা বাড়ি, আরবি ঘোড়া এক জোড়া, উড়ন্ত পাখির মতো এরোপ্লেন, টিনের সেপাই। ভালুক বাজায় ব্যান্ড, বাঁকা-শিং হরিণের পাশে বাঘের অঙ্গার জ্বলে, বিকট হা করে আছে সিংহ সারি সারি রয়েছে সাজানো ওহো হরেক রকম বাজনা বাঁশি বাদশা বেগম আর উজির নাজির।আমার পিরান নেই, পাগড়ি নেই লালমুখো সেই উজিরের ম’তো, নাগরা নেই পায়। এখন দুপুরে লেপ্টে আছে পৃথিবীর গায়। কয়েকটি যুবককে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওরা-লোকে বলে রাত্রিদিন তারা নেহাই হাতুড়ি দিয়ে ইচ্ছেমতো চেয়েছে গড়তে কত কিছু, দেশকে নতুন করে গড়ে পিটে নিতে চেয়েছে হুজ্জত সব জ্বলন্ত জোয়ান। বুঝি তাই ঢিট করে দেবে ওরা যৌবনের গোঁয়ার ইচ্ছাকে।“গান বন্ধ কর্‌ তোরা, নর্তকী নাচের মুদ্রা ভোল”- “এমন হুকুমনামা জারী হলে সংস্কৃতি সদনে আমরা গোল্লায় যাব এবং দাঁতাল বর্বরতা সদর্পে তুলবে মাথা প্রাগৈতিহাসিক কূপ থেকে” হেঁটে যেতে যেতে বলব কয়েকটি সুবেশ যুবক। ইচ্ছে হয় মুখ ঘষি খেলনার দোকানের কাচে বড় ইচ্ছে হয় ঘষি দুটি চোখ। যে-বিড়িটা কানে গুঁজে ভোরে বেরিয়ে পড়েছি পথে তাই টানি সুখে এখানে দাঁড়িয়ে ঠায় দুপুরের ঠাঠা রোদে। যদি ছুঁয়ে দেখি স্বচ্ছ কাচ সূর্যসেঁকা আত্মায় আরাম পাবো কিছু মনে হয়; দেখি মেঘেরা পালায় দৌড়ে যেমন ছেলের দল ছুটে যায় পাঠশালা ছুটি হয়ে গেলে। এ দুপুরে নিজের ছায়াকে দেখে কাচে ঘুরে-ফিরে কেন শুধু গাঁয়ের নদীকে মনে পড়ে?গাঁয়ের নদীর তীরে একজন বাউল আমাকে একদিন ‘এদেশে আলোর কথা ভুলে থাকে লোক; বড় বেশি অন্ধকার ঘাঁটে আর নখের আঁচড়ে গোলাপ-কলিজা ছেঁড়ে পরস্পর’-বলেছিল হেসে। নৌকোর গলুইয়ে বসে বুঝিনি সেদিন তার কথা, আমি শুধু মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিলাম তাকিয়ে তার দুটি উদাস চোখের দিকে; শুনতে পেলাম নদীর শব্দের সাথে মিশে গেছে বাউলের স্বর।ডেপুটি হাকিম নই, নই কোনো ভবঘুরে কবি; পথের গোলাম আমি, বুঝেছ হে, অলীক হুকুমে চৈত্ররাতে ফুটপাতে শুই। ঠ্যাং দুটি একতারা হয়ে বাজে তারাপুঞ্জে, মর্মরিত স্বপ্নের মহলে বাউলের কথামৃত স্বপ্নে হয় আমের বউল।‘দ্যাখো দ্যাখো হাড্ডিসার লোকটার মুখের কী ছিরি, কেতমন বিচ্ছিরি লাগে, দ্যাখো কত নোংরা’ বলে দুটি তরুণী কলের পুতুলের মতো হেঁটে গেল চলে। উঁচু বুক দেখে ভাবি পেশোয়ারি উজ্জ্বল দোকানে দূর থেকে দেখছি তাজ্জব হয়ে টসটসে ফল। নিজেকে কুচ্ছিত ভেবে লজ্জা পেলে সদর রাস্তায় আমাদের চলে? উপরে আকাশ জ্বলে নির্বিকার। যে ভদ্দরলোক এ মুহূর্তে এক খিলি পান কিনে পুরল শৌখিন মুখে সে অশ্লীল গল্পের নায়ক হতে পারে সহজেই। হতে পারে বেশ্যার দালাল। বেইমান দুনিয়ায় খুনসুটি, ভালবাসাবাসি বুঝি না কিছুই-নাকি বিলকুল বুড় হাবড়া আমি হয়ে গেছি এতদিনে। কী যে ভাবি এত হাবিজাবি!আমার জীবন নয় সুখের পানসি ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে যাবে অথবা নেইকো’ কোনো তালুক মুলুক দু’হাতে ওড়াব ব’সে। পুণ্যলোভী দাতার দয়ায় জীবনে সম্বল শুধু কয়েকটি তামার পয়সা। গতকাল ফ্রকপরা যে-মেয়েটি একটি দু’আনি হাসিমুখে দিয়েছিল এই হতচ্ছাড়া ভিখিরিকে, কাচের আড়ালে রাখা ফুটফুটে পুতুলের মুখে হঠাৎ পেলাম খুঁজে রাঙা তার মুখের আদল -আমার মাবুদ তাকে খোশহাল বেগম করুন।যে লোকটা সারাদিন পাখি বেচে গড়েছে সংসার, হলুদ পাখির মতো যার বউ, সে কেন গলায় পরে ফাঁস? সে লাশ পচার আগে মৃত এক পাখি বউটিকে নিশীথে কাঁদাতে এসে দ্যাখে, হা কপাল, আনন্দে উচ্ছল নারী হয়েছে উৎসব দ্বিধাহীন, আয়নায় কাজল পরা দুটি চোখ ক্ষুধায় উজ্জ্বল। ‘দূর হ এখান থেকে হা-ভাতে ভিখিরি কোথাকার আঁস্তাকুড়ে বেছেন আস্তানা, নোংরা খুঁটে খা-গে’- দোকানি খেঁকিয়ে ওঠে। খেলনা ফেলনা নয় জানি, এখন এখান থেকে, আল্লা, যাব কোন জাহান্নামে! খেলনা ফেলনা নয়। ফলের বাজার, পুতুলের স্থির চোখ…পীরের মাজার হৈচৈ মানুষের ভিড়,গাঁয়ের নদীর তীর গুঞ্জরিত বাউলের স্বরে… গেরস্তপাড়ায় বেশ্যাবৃত্তি, ভালুক বাজায় ব্যান্ড, খেলনা ফেলনা নয়… বাজনা বাজে, ফলের বাজার, ফ্রকপরা ফুটফুটে মেয়েটির একটি দু’আনি হাতের চেটোয় নাচে, কাচের আড়ালে দুই যোদ্ধা, সেপাই রাঙায় চোখ, ভদ্দপাড়ায় বাজনা বাজে, “আস্তাকুড়ে বেছে নে আস্তানা’, খেলনা ফেলনা নয় …   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khelnar-dokaner-samne-vikhiri/
4209
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চাবি
প্রেমমূলক
আমার কাছে এখনো পড়ে আছে তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি কেমন করে তোরংগ আজ খোলো?থুতনিপরে তিল তো তোমার আছে এখন? ও মন নতুন দেশে যাবি? চিঠি তোমায় হঠাত্‍ লিখতে হলো ।চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে রেখেছিলাম, আজই সময় হলো - লিখিও, উহা ফিরত্‍ চাহো কিনা?অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো লিখিও, উহা ফিরত্‍ চাহো কি না?
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/chabi/
4628
শামসুর রাহমান
কোথায় তুমি_
প্রেমমূলক
একটি বনে সন্ধ্যেবেলা ঢুকে পড়েই মুষড়ে পড়ি, হঠাৎ ভীষণ ক্লান্ত লাগে। বন্য ঘ্রাণে ধরলো নেশা তড়িঘড়ি। আগুন-রঙা স্বপ্ন জ্বলে তরুণ বাঘের পায়ের দাগে, বনের মধ্যে মিশমিশে এক রাত্রি এল ক্রমান্বয়ে। রাস্তাগুলি কোথায় এখন? চতুর্দিকে বনভূমি। তোমার খোঁজে বনবাদাড়ে মত্ত হয়ে ঘুরবো আমি চিরদিনই? আমার দুঃখ-আলোয় ধৌত কৌমুদিনী কোথায় তুমি? কোথায় তুমি? কোথায় তুমি?বনের মধ্যে হাঁটছি একা, বড় একা, নগ্ন পায়ে ফুটছে কাঁটা বারে বারে। হঠাৎ যেন শুঁড়ের মতো কিসের ঘায়ে ধরলো জ্বালা সত্তা জুড়ে বেবুন, বেবুন অন্ধকারে। দীর্ঘ ঘাসে জখমি মৃগের রোঁয়া কাঁপে, দিক-ঠিকানা লুপ্ত সবই; চতুদিকে বনভূমি। তোমার জন্যে কোন্‌ পুরনো অভিশাপে কাঁদবো আমি চিরদিনই? আমার থেকে সরে যাওয়া কৌমুদিনী কোথায় তুমি? কোথায় তুমি? কোথায় তুমি?   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kothai-tumi/
225
কাজী নজরুল ইসলাম
আমার কালো মেয়ে
ভক্তিমূলক
আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে কে দিয়েছে গালি তারে কে দিয়েছে গালি রাগ করে সে সারা গায়ে মেখেছে তাই কালি।যখন রাগ করে মোর অভিমানী মেয়ে আরো মধুর লাগে তাহার হাসিমুখের চেয়ে কে কালো দেউল করে আলো অনুরাগের প্রদীপ জ্বালি।পরেনি সে বসনভূষণ, বাঁধেনি সে কেশ তারি কাছে হার মানে রে ভুবনমোহন বেশ।রাগিয়ে তারে কাঁদি যখন দুখে দয়াময়ী মেয়ে আমার ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকে আমার রাগী মেয়ে, তাই তারে দিই জবা ফুলের ডালি।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/amar-kal-meye/
724
জয় গোস্বামী
মরা ডাল
প্রেমমূলক
আমি কোনও দস্যুতা পারি নাবসে থাকি চুপ করে চেয়ারেতোমার জীবনে হয়তো এবার এমন কোনও লোক এসে গেছে যে অনেক সবলতা পারেশুভার্থী ছিলাম আর শুভার্থী থাকব চিরকাল চুপ করে গাছের তলায় ঝরে থাকব মরা একটা ডাল
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/mora-dal/
5439
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আসন্ন আঁধারে
চিন্তামূলক
নিশুতি রাতের বুকে গলানো আকাশ ঝরে – দুনিয়ায় ক্লান্তি আজ কোথা? নিঃশব্দে তিমির স্রোত বিরক্ত-বিস্বাদে প্রগল্‌ভ আলোর বুকে ফিরে যেতে চায়। -তবে কেন কাঁপে ভীরু বুক? স্বেদ-সিক্ত ললাটের শেষ বিন্দুটুকু প্রখর আলোর সীমা হতে বিচ্ছিন্ন করেছে যেন সাহারার নীরব ইঙ্গিতে। কেঁদেছিল পৃথিবীর বুক। গোপনে নির্জনে ধাবমান পুঞ্জ পুঞ্জ নক্ষত্রের কাছে পেয়েছিল অতীত বারতা? মেরুদণ্ড জীর্ণ তবু বিকৃত ব্যথায় বার বার আর্তনাদ করে আহত বিক্ষত দেহ, -মুমূর্ষু চঞ্চল, তবুও বিরাম কোথা ব্যগ্র আঘাতের।প্রথম পৃথিবী আজ জ্বলে রাত্রিদিন আবাল্যের সঞ্চিক দাহনে চিরদিন দ্বন্দ্ব চলে জোয়ার ভাঁটায়, আষাঢ়ের ক্ষুব্ধ-ছায়া বসন্তের বুকে এসে পড়েছিল একদিন- উদ্‌ভ্রান্ত পৃথিবী তাই ছুটেছে পিছনে আলোরে পশ্চাতে ফেলি, দুরে- বহু দূরে যত দূরে দৃষ্টি যায় – চেয়ে দেখি ঘিরেছে কুয়াশা। উড়ন্ত বাতাসে আজ কুমেরু কঠিন কোথা হতে নিয়ে এল জড় অন্ধকার, -এই কি পৃথিবী? একদিন জ্বলেছিল বুকের জ্বালায় – আজ তার শব দেহ নিঃস্পন্দ অসাড়।।   (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/asonno-adhare/
1142
জীবনানন্দ দাশ
ভোর হয়
প্রেমমূলক
ভোর হয়, কি যেন আমাকে দিতে চায় শেষরাত— কোন আভা, পূর্বাভাস? হয়তোবা শেষরাত আমাকে দিতে চায় তার ভোর হয়ে ওঠা। নিদ্রা থেকে জেগে ওঠা পাখি, দু’ একবার ডাক দিয়ে, চুপ ক’রে থেকে নিজ অনুক্রমিক ডাকের মধ্যকার নীরবতা মন দিয়ে শোনে; তারপর পুনরায় ডাকে। তুমি দেখো শব্দ অনুক্রমিক, অস্থায়ী, কিন্তু দু’টি শব্দের মধ্যকার নীরবতা স্থায়ী, স্থায়ী। শেষরাতে কোনো ধ্বনি একটানা নয় সব ধ্বনি প্রতিধ্বনিহীন— থেমে-থেমে ডাকে ডাকের মাঝখানের কসমিক স্থির নীরবতা সব ধ্বনি থেমে-থেমে, কান পেতে, শোনে। গাছে গাছে পল্লবের মধ্যখানে শূন্য...শূন্যস্থান, রাত্রিভর জেগে থাকা মানুষের চোখ ভেদ ক’রে, গভীর আত্মার মধ্যে, বেদনার মধ্যে, ঢুকে যায়। কোনও বাস্তবতা থেকে ছিটকে এসে জল স্বপ্ন-মধ্যে ঢোকে শেষরাতে। সকাল নদীতে আগে হয়। গড়িয়ে গড়িয়ে নদী থেকে উঠে আসা কুয়াশার ভেপু— দশদিকে শোনা গেলে, মাটিতে, ভূমিতে, ভোর হয়... এ শহর কসমিক শেষরাত পার হয়ে কসমপলিটন হয়ে ওঠে। তখন তোমাকে ভোর, অন্ধকার কেটে যাওয়া গভীর সুস্থতা, মানুষের জ্ঞানের চেয়ে ভিন্ন জ্ঞান, আলো, অন্য এক সুস্থিরতা, পরম আনন্দ দিতে চায়। তোমার ভিতরে শূন্যস্থান— আরো বহু ভিতরের শূন্যস্থান থেকে এসে শেষরাতে— ভোরবেলা, যেন, পূর্ণ হয়… যেন, সত্যি পূর্ণ হয়।— (অগ্রন্থিত কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/bhor-hoy/