id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
2763
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আষাঢ়
|
প্রকৃতিমূলক
|
নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর,
কালি-মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিছে দেখ্ চাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।।ওই ডাকে শোনো ধেনু ঘনঘন, ধবলীরে আনো গোহালে।
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।
দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্ দেখি
মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি,
রাখালবালক কী জানি কোথায় সারা দিন আজি খোয়ালে।
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।।শোনো শোনো ওই পারে যাবে বলে কে ডাকিছে বুঝি মাঝিরে।
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে।
পুবে হাওয়া বয়, কূলে নেই কেউ,
দু কূল বাহিয়া উঠে পড়ে ঢেউ,
দরদর বেগে জলে পড়ি জল ছলছল উঠে বাজি রে।
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে।।ওগো, আজ তোরা যাস নে গো, তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।
আকাশ আঁধার, বেলা বেশি আর নাহি রে।
ঝরঝর ধারে ভিজিবে নিচোল,
ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল,
ওই বেণুবন দুলে ঘনঘন পথপাশে দেখ্ চাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।। - শিলাইদহ
২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৭
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ashar/
|
847
|
জসীম উদ্দীন
|
নীড়
|
কাহিনীকাব্য
|
গড়াই নদীর তীরে,
কুটিরখানিরে লতা-পাতা-ফুল মায়ায় রয়েছে ঘিরে।
বাতাসে হেলিয়া, আলোতে খেলিয়া সন্ধ্যা সকালে ফুটি,
উঠানের কোণে বুনো ফুলগুলি হেসে হয় কুটি কুটি।
মাচানের পরে সীম-লতা আর লাউ কুমড়ার ঝাড়,
আড়া-আড়ি করি দোলায় দোলায় ফুল ফল যত যার।
তল দিয়ে তার লাল নটেশাক মেলিছে রঙের ঢেউ,
লাল শাড়ীখানি রোদ দিয়ে গেছে এ বাড়ির বধূ কেউ।
মাঝে মাঝে সেথা এঁদো ডোবা হতে ছোট ছোট ছানা লয়ে,
ডাহুক মেয়েরা বেড়াইতে আসে গানে গানে কথা কয়ে!
গাছের শাখায় বনের পাখিরা নির্ভয়ে গান ধরে,
এখনো তাহারা বোঝেনি হেথায় মানুষ বসত করে।
মটরের ডাল, মসুরের ডাল, কালিজিড়া আর ধনে,
লঙ্কা-মরিচ রোদে শুখাইছে উঠানেতে সযতনে।
লঙ্কার রঙ মসুরের রঙ, মটরের রঙ আর,
জিড়া ও ধনের রঙের পাশেতে আলপনা আঁকা কার।
যেন একখানি সুখের কাহিনী নানান আখরে ভরি,
এ বাড়ির যত আনন্দ হাসি আঁকা জীবন- করি।
সাঁঝ সকালের রঙিন মেঘেরা এখানে বেড়াতে এসে,
কিছুখন যেন থামিয়া রয়েছে এ বাড়িরে ভালবেসে।
সামনে তাহার ছোট ঘরখানি ময়ূর পাখির মত,
চালার দুখানা পাখনা মেলিয়া তারি ধ্যানে আছে রত।
কুটিরখানির একধারে বন, শ্যাম-ঘন ছায়াতলে,
মহা-রহস্য লুকাইয়া বুকে সাজিছে নানান ছলে।
বনের দেবতা মানুষের ভয়ে ছাড়ি ভূমি সমতল,
সেথায় মেলিছে অতি চুপি চুটি সৃষ্টির কৌশল;
লতা-পাতা ফুল ফলের ভাষায় পাখিদের বুনো সুরে।
তারি বুকখানি সারা বন বেড়ি ফিরিতেছে সদা ঘুরে।
ইহার পাশেতে ছোট গেহ-খনি, এ বনের বন-রাণী,
বনের খেলায় হয়রান হয়ে শিথিল বসনখানি;
ইহার ছায়ায় মেলিয়া ধরিয়া শুয়ে ঘুম যাবে বলে,
মনের মতন করিয়া ইহারে গড়িয়াছে নানা ছলে।
সে ঘরের মাঝে দুটি পা মেলিয়া বসিয়া একটি মেয়ে ,
পিছনে তাহার কালো চুলগুলি মাটিতে পড়েছে বেয়ে।
দুটি হাতে ধরি রঙিন শিকায় রচনা করিছে ফুল,
বাতাসে সরিয়া মুখে উড়িতেছে কভু দু একটি চুল।
কুপিত হইয়া চুলেরে সরাতে ছিড়িছে হাতের সূতো,
চোখ ঘুরাইয়া সুতোরে শাসায় করিয়া রাগের ছুতো।
তারপর শেষে আপনার মনে আপনি উঠিছে হাসি,
আরো সরু সরু ফুল ফুটিতেছে শিকার জালেতে আসি।
কালো মুখখানি, বন-লতা পাতা আদর করিয়া তায়,
তাহাদের গার যত রঙ যেন মেখেছে তাহার গায়।
বনের দুলালী ভাবিয়া ভাবিয়া বনের শ্যামল কায়া;
জানে না, কখন ছড়ায়েছে তার অঙ্গে বনের ছায়া।
আপনার মনে শিকা বুনাইছে, ঘরের দুখানা চাল,
দুখানা রঙিন ডানায় তাহারে করিয়াছে আবডাল।
আটনের গায়ে সুন্দীবেতের হইয়াছে কারুকাজ
বাজারের সাথে পরদা বাঁধন মেলে প্রজাপতি সাজ।
ফুস্যির সাথে রাঙতা জড়ায়ে গোখুরা বাঁধনে আঁটি,
উলু ছোন দিয়ে ছাইয়াছে ঘর বিছায়ে শীতল পাটি।
মাঝে মাঝে আছে তারকা বাঁধন, তারার মতন জ্বলে,
রুয়ার গোড়ায় খুব ধরে ধরে ফুলকাটা শতদলে।
তারি গায় গায় সিদুরের গুড়ো, হলুদের গুড়ো দিয়ে,
এমনি করিয়া রাঙায়েছে যেন ফুলেরা উঠেছে জিয়ে।
একপাশে আশে ফুলচাং ভাল বলা যায়নাক ত্বরা।
তার সাথে বাঁধা কেলী কদম্ব ফুল-ঝুরি শিকা আর,
আসমান-তারা শিকার রঙেতে সব রঙ মানে হার।
শিকায় ঝুলানো চিনের বাসন, নানান রঙের শিশি,
বাতাসের সাথে হেলিছে দুলিছে রঙে রঙে দিবানিশি।
তাহার নীচেতে মাদুর বিছায়ে মেয়েটি বসিয়া একা,
রঙিন শিকার বাঁধনে বাঁধনে রচিছে ফুলের লেখা।
মাথার উপরে আটনে ছাটনে বেতের নানান কাজ,
ফুলচাং আর শিকাগুলি ভরি দুলিতেছে নানা সাজ।
বনের শাখায় পাখিদের গান, উঠানে লতার ঝাড়
সবগুলো মিলে নির্জ্জনে যেন মহিমা রচিছে তার।
মেয়েটি কিন্তু জানে না এ সব, শিকায় তুলিছে ফুল,
অতি মিহি সুরে গান সে গাহিছে মাঝে মাঝে করি ভুল।
বিদেশী তাহার স্বামীর সহিত গভীর রাতের কালে,
পাশা খেলাইতে ভানুর নয়ন জড়াল ঘুমের জালে।
ঘুমের ঢুলুনী, ঘুমের ভুলুনী-সকালে ধরিয়া তায়,
পাল্কীর মাঝে বসাইয়া দিয়া পাঠাল স্বামীর গাঁয়।
ঘুমে ঢুলু আঁখি, পাল্কী দোলায় চৈতন হল তার,
চৈতন হয়ে দেখে সে ত আজ নহে কাছে বাপ-মার।
এত দরদের মা-ধন ভানুর কোথায় রহিল হায়,
মহিষ মানত করিত তাহার কাঁটা যে ফুটিলে পায়।
হাতের কাঁকনে আঁচড় লাগিলে যেত যে সোনারু বাড়ি,
এমন বাপেরে কোন দেশে ভানু আসিয়াছে আজ ছাড়ি।
কোথা সোহাগের ভাই-বউ তার মেহেদী মুছিলে হায়,
সাপন সীথার সিদুর লইত ঘষিতে ভানুর পায়।
কোথা আদরের মৈফল-ভাই ভানুর আঁচল ছাড়ি,
কি করে আজিকে দিবস কাটিছে একা খেলাঘরে তারি।
এমনি করিয়া বিনায়ে বিনায়ে মেয়েটি করিছে গান,
দূরে বন পথে বউ কথা কও পাখি ডেকে হয়রান।
সেই ডাক আরো নিকটে আসিল, পাশের ধঞ্চে-খেতে
তারপর এলো তেঁতুলতলায় কুটিরের কিনারেতে
মেয়েটি খানিক শিকা তোলা রাখি অধরেতে হাসি আঁকি,
পাখিটিরে সে যে রাগাইয়া দিল বউ কথা কও ডাকি।
তারপর শেষে আগের মতই শিকায় বসাল মন,
ঘরের বেড়ার অতি কাছাকাছি পাখি ডাকে ঘন ঘন।
এবার সে হল আরও মনোযোগী, শিকা তোলা ছাড়া আর,
তার কাছে আজ লোপ পেয়ে গেছে সব কিছু দুনিয়ার।
দোরের নিকট ডাকিল এবার বউ কথা কও পাখি,
বউ কথা কও, বউ কথা কও, বারেক ফিরাও আঁখি।
বউ মিটি মিটি হাসে আর তার শিকায় যে ফুল তোলে,
মুখপোড়া পাখি এবার তাহার কানে কানে কথা বলে।
যাও ছাড়-লাগে, এবার বুঝিনু বউ তবে কথা কয়,
আমি ভেবেছিনু সব বউ বুঝি পাখির মতন হয়।
হয়ত এমনি পাখির মতন এ ডাল ও ডাল করি,
বই কথা কও ডাকিয়া ডাকিয়া জনম যাইবে হরি,
হতভাগা পাখি! সাধিয়া সাধিয়া কাঁদিয়া পাবে না কূল,
মুখপোড়া বউ সারাদিন বসি শিকায় তুলিবে ফুল।
ইস্যিরে মোর কথার নাগর! বলি ও কি করা হয়,
এখনি আবার কুঠার নিলে যে, বসিতে মন না লয়?
তুমি এইবার ভাত বাড় মোর, একটু খানিক পরে,
চেলা কাঠগুলো ফাঁড়িয়া এখনি আসিতেছি ঝট করে।
কখনো হবে না, আগে তুমি বস, বউটি তখন উঠি,
ডালায় করিয়া হুড়ুমের মোয়া লইয়া আসিল ছুটি।
একপাশে দিল তিলের পাটালী নারিকেল লাড়ু আর
ফুল লতা আঁকা ক্ষীরের তক্তি দিল তারে খাইবার।
কাঁসার গেলাসে ভরে দিল জল, মাজা ঘষা ফুরফুরে
ঘরের যা কিছু মুখ দেখে বুঝি তার মাঝে ছায়া পূরে।
হাতেতে লইয়া ময়ূরের পাখা বউটি বসিল পাশে,
বলিল, এসব সাজায়ে রাখিনু কোন দেবতার আশে?
তুমিও এসো না! হিন্দুর মেয়ে মুসলমানের সনে
খাইতে বসিয়া জাত খোয়াইব তাই ভাবিয়াছ মনে?
নিজেরই জাতিটা খোয়াই তাহলেবড় গম্ভীর হয়ে,
টপটপ করে যা ছিল সোজন পুরিল অধরালয়ে।
বউ ততখনে কলিকার পরে ঘন ঘন ফুঁক পাড়ি,
ফুলকি আগুন ছড়াইতেছিল দুটি ঠোট গোলকরি।
দুএক টুকরো ওড়া ছাই এসে লাগছিল চোখে মুখে,
ঘটছিল সেথা রূপান্তর যে বুঝি না দুখে কি সুখে।
ফুঁক দিতে দিতে দুটি গাল তার উঠছিল ফুলে ফুলে,
ছেলেটি সেদিকে চেয়ে চেয়ে তার হাত ধোয়া গেল ভুলে।
মেয়ে এবার টের পেয়ে গেছে, কলকে মাটিতে রাখি,
ফিরিয়া বসিল ছেলেটির পানে ঘুরায়ে দুইটি আঁখি।
তারপর শেষে শিকা হাতে লয়ে বুনাতে বসিল ত্বরা,
মেলি বাম পাশে দুটি পাও তাতে মেহেদীর রঙ ভরা।
নীলাম্বরীর নীল সায়রেতে রক্ত কমল দুটি,
প্রথমভোরের বাতাস পাইয়া এখনি উঠিছে ফুটি।
ছেলেটি সেদিক অনিমেষ চেয়ে, মেয়েটি পাইয়া টের,
শাড়ীর আঁচলে চরণ দুইটি ঢাকিয়া লইল ফের।
ছেলেটি এবার ব্যস্ত হইয়া কুঠার লইল করে,
এখনি সে যেন ছুটিয়া যাইবে চেলা ফাড়িবার তরে।
বউটি তখন পার আবরণ একটু লইল খুলি,
কি যেন খুঁজিতে ছেলেটি আসিয়া বসিল আবার ভুলি।
এবার বউটি ঢাকিল দুপাও শাড়ীর আঁচল দিয়ে,
ছেলেটি সজোরে কলকে রাখিয়া টানিল হুকোটি নিয়ে।
খালি দিনরাত শিকা ভাঙাইবে? হুকোয় ভরেছ জল?
কটার মতন গন্ধ ইহার একেবারে অবিকল।
এক্ষুণি জল ভরিণু হুকায়। দেখ! রাগায়ো না মোরে,
নৈচা আজিকে শিক পুড়াইয়া দিয়েছিলে সাফ করে?
কটর কটর শব্দ না যেন মুন্ড হতেছে মোর,
রান্নাঘরেতে কেন এ দুপুরে দিয়ে দাও নাই দোর?
এখনি খুলিলে? কথায় কথায় কথা কর কাটাকাটি,
রাগি যদি তবে টের পেয়ে যাবে বলিয়া দিলাম খাঁটি!
মিছেমিছি যদি রাগিতেই সখ, বেশ রাগ কর তবে,
আমার কি তাতে, তোমারি চক্ষু রক্ত বরণ হবে।
রাগিবই তবে? আচ্ছা দাঁড়াও মজাটা দেখিয়া লও,
যখন তখন ইচ্ছা মাফিক যা খুশী আমারে কও!
এইবার দেখ! না! না! তবে আর রাগিয়া কি মোর হবে,
আমি ত তোমার কেউ কেটা নই খবর টবার লবে?
বউটি বসিয়াশিকা ভাঙাইতেছে, আর হাসিতেছে খালি,
প্রতিদিন সে ত বহুবার শোনে এমনি মিষ্ট গালি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/758
|
4290
|
শামসুর রাহমান
|
অঙ্গুরি এসেছ তুমি
|
প্রেমমূলক
|
অঙ্গুরি এসেছ তুমি ফিরে অজ্ঞাতবাসের পর
আমার এ ঘরে আজ। বহুদিন ছিলে অন্ধকারে
বস্তুত গা ঢাকা দিয়ে; তোমাকে ভেবেছি বারে বারে,
দেখেছি তোমার স্বপ্ন কত, ইতিমধ্যে বহু ঝড়
ঝাপ্টা গ্যাছে, বিস্মৃতির এক্কা দোক্কা তোমার খবর
সহজে ফেলেছে মুছে কখনো সখনো। কোন্ তারে
কখন লেগেছে সুর পুনরায় কোমল গান্ধারে,
আমিতো পাইনি টের; ছিল খুব হৃদয়ের জ্বর!হে অঙ্গুরি, তোমার শরীরে লতাগুল্ম, বুনো ঘাস,
গৃহত্যাগী যুবকের স্বেদ, ধুলো ইত্যাদির ঘ্রাণ
লেগে আছে, সবচেয়ে বেশি আছে ভালোবাসবার
সাধ ও ক্ষমতা যা সহজে মুমূর্ষুকে পারে প্রাণ-
শক্তি ধার দিতে আর লহমায় দূরের আকাশ
বুকে এনে স্বপ্ন দেখাতেও পারে ঘর বাঁধবার। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/onguri-esecho-tumi/
|
5043
|
শামসুর রাহমান
|
বৃষ্টির দিনে
|
প্রকৃতিমূলক
|
তখন ও চাঞ্চল্যে ক্ষিপ্র হয়নি শহর, ট্রাফিকের
কলতান বাজেনি প্রবল সুরে। টলটলে স্নিগ্ধশ্যাম ঐ
পার্কের শরীর ঘেঁষে যাচ্ছিলাম হেঁটে দ্রুত পায়ে
বর্ষাতিটা গায়ে চেপে। সহসা সরিয়ে
বৃষ্টির ঝালর একজন হাত রেখে
নিঃশব্দে আমার কাঁধে বললেন গাঢ় উচ্চারণেঃ“কোথায় ছুটেছো তুমি হন্তদন্ত হয়ে পরিশ্রমী নাগরিক এমন বর্ষায় ?
বরং পার্কের বঞ্চে সময় কাটাই চলো কথোপকরনে,
চলো পার্কে বৃষ্টির আদর মাখি চোখে-মুখে, সেখানে তুমিও
সুম্নাত গাছের সখ্য পাবে, হাওয়ার অশ্রান্ত ম্যাণ্ডোলীন শুনে
বেঞ্চটাকে মনে হবে সাধের গণ্ডোলা।“এবং তোমাকে বলি শোনো, বার বার
যূথীর সান্নিধ্যে যাওয়া ভালো; মাইল মাইল পথ
বেলা-অবেলায় হেঁটে দেখেছিতো শেষে
সে-পথ কোথায় নিয়ে যায়, কী কল্যাণ হাতে আসে! ট্রাম-লাইনের ধারে
সুকৌশলে হয়তোবা, অপঘাত যেখানে গা ঢাকা দিয়ে থাকে
সিঁধেল চোরের মতো। ট্রাম-লাইনের ক্ষীণ ঘাসের সম্মোহ
ফুরোয়নি বলে আমি শুনলাম ডাক সেই রৌদ্রের নিশির,
এবং নিমেষে ভাসলাম কী রক্তিম সারোবরে!“মাইল মাইল পথ হেঁটে দেখেছি তো অবশেষে
সে-পথ কোথায় নিয়ে যায়, কী কল্যাণ হাতে আসে!
পরিশ্রমী নাগরিক দাঁড়াও এখানে ক্ষণকাল স্তব্ধতায়,
বর্ষায় নিমগ্ন হও, নিসর্গকে করো তীর্থভূমি”
এই বলে প্রবীণ জীবনানন্দ পার্কের শরীর ঘেঁষে একা কোথায়
গেলেন দূরে।জনশূন্য ফুতপাতে চির নিঃসঙ্গতা
মুর্হূতে চোয়াল দিলো মেলে আমন্ত্রণে; চতুর্দিকে
অনাসক্ত বৃষ্টি পড়ে, বর্ষাতির আড়ালে শরীর
সকল বিফল হলো ভেবে ফিনকি হয়ে
যেতে চায় মেঘদলে। দেহ ছাড়ি যেন মোর প্রাণ চলি যায়-
অকস্মাৎ বাতাসে এ কার হাহাকার?ঝড়ের নদীতে একা টলমল নৌকোর মতোই ভেসে চলি
তিমির দুরন্ত ফুটপাতে। চলতেই শঙ্কিল পঙ্কিল বাট,
ঘন-ঘন ঝন-ঝন বজ্র নিপাত। আকাশের কাজল ট্যাঙ্কের থেকে
জল ঝরে অবিরল, বৃষ্টি পড়ে সমস্ত শহরে, বৃষ্টি পড়ে
অপরূপ স্বপ্নের চত্বরে। মনে হয় যুগ-যুগ ভিজে ভিজে
সত্তায় জমেছে দামী, অনুপম শ্যাওলার কারুকাজ, মৎস্য-ঘ্রাণ, আর
সহসা নিজেই যেন হয়ে যাই বৃষ্টিভেজা রাত্রির শহর!অগ্রজ কবির মন্ত্রণায় নিসর্গকে তীর্থভূমি
জ্ঞানে দ্রুত যতোটা এগোই তারও বেশি
নিশ্চিত পিছিয়ে পড়ি বিতৃষ্ণায়, আর চিরকেলে
বর্ষার জানুতে মাথা রেখে রেখে বড়ো ক্লান্ত লাগে।
চোখে-মুখে একরাশ বৃষ্টির আঁচড় নিয়ে ঐ স্নিগ্ধশ্যাম
পার্ক ছেড়ে চলে যাই, বিরক্তিতে ভরপুর, অস্তিত্বের শীর্ষে ক্ষান্তিহীন
বৃষ্টি ঝরঝর ব’য়ে ইহুদির মতো
সর্বদাই ধাবমান, নৈঃসঙ্গ্যের কাঁটায় জর্জর। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/brishtir-dine/
|
2552
|
রজনীকান্ত সেন
|
স্বাধীনতার সুখ
|
নীতিমূলক
|
বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই-
“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই;
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা ‘পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”
বাবুই হাসিয়া কহে- “সন্দেহ কি তায় ?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়;
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4325.html
|
2929
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কেন
|
চিন্তামূলক
|
জ্যোতিষীরা বলে,
সবিতার আত্মদান-যজ্ঞের হোমাগ্নিবেদিতলে
যে জ্যোতি উৎসর্গ হয় মহারুদ্রতপে
এ বিশ্বের মন্দিরমণ্ডপে,
অতিতুচ্ছ অংশ তার ঝরে
পৃথিবীর অতিক্ষুদ্র মৃৎপাত্রের 'পরে।
অবশিষ্ট অমেয় আলোকধারা
পথহারা,
আদিম দিগন্ত হতে
অক্লান্ত চলেছে ধেয়ে নিরুদ্দেশ স্রোতে।
সঙ্গে সঙ্গে ছুটিয়াছে অপার তিমির-তেপান্তরে
অসংখ্য নক্ষত্র হয়ে রশ্মিপ্লাবী নিরন্ত নির্ঝরে
সর্বত্যাগী অপব্যয়,
আপন সৃষ্টির 'পরে বিধাতার নির্মম অন্যায়।
কিংবা এ কি মহাকাল কল্পকল্পান্তের দিনে রাতে
এক হাতে দান ক'রে ফিরে ফিরে নেয় অন্য হাতে।
সঞ্চয়ে ও অপচয়ে যুগে যুগে কাড়াকাড়ি যেন--
কিন্তু, কেন।
তার পরে চেয়ে দেখি মানুষের চৈতন্যজগতে
ভেসে চলে সুখদুঃখ কল্পনাভাবনা কত পথে।
কোথাও বা জ্ব'লে ওঠে জীবন-উৎসাহ,
কোথাও বা সভ্যতার চিতাবহ্নিদাহ
নিভে আসে নিঃস্বতার ভস্ম-অবশেষে।
নির্ঝর ঝরিছে দেশে দেশে--
লক্ষ্যহীন প্রাণস্রোতে মৃত্যুর গহ্বরে ঢালে মহী
বাসনার বেদনার অজস্র বুদ্বুদপুঞ্জ বহি।
কে তার হিসাব রাখে লিখি।
নিত্য নিত্য এমনি কি
অফুরান আত্মহত্যা মানবসৃষ্টির
নিরন্তর প্রলয়বৃষ্টির
অশ্রান্ত প্লাবনে।
নিরর্থক হরণে ভরণে
মানুষের চিত্ত নিয়ে সারাবেলা
মহাকাল করিতেছে দ্যূতখেলা
বাঁ হাতে দক্ষিণ হাতে যেন--
কিন্তু, কেন।
প্রথম বয়সে কবে ভাবনার কী আঘাত লেগে
এ প্রশ্নই মনে উঠেছিল জেগে--
শুধায়েছি, এ বিশ্বের কোন্ কেন্দ্রস্থলে
মিলিতেছে প্রতি দণ্ডে পলে
অরণ্যের পর্বতের সমুদ্রের উল্লোল গর্জন,
ঝটিকার মন্দ্রস্বন,
দিবসনিশার
বেদনাবীণার তারে চেতনার মিশ্রিত ঝংকার,
পূর্ণ করি ঋতুর উৎসব
জীবনের মরণের নিত্যকলরব,
আলোকের নিঃশব্দ চরণপাত
নিয়ত স্পন্দিত করি দ্যুলোকের অস্তহীন রাত।
কল্পনায় দেখেছিনু, প্রতিধ্বনিমণ্ডল বিরাজে
ব্রহ্মাণ্ডের অন্তরকন্দর-মাঝে।
সেথা বাঁধে বাসা
চতুর্দিক হতে আসি জগতের পাখা-মেলা ভাষা।
সেথা হতে পুরানো স্মৃতিরে দীর্ণ করি
সৃষ্টির আরম্ভবীজ লয় ভরি ভরি
আপনার পক্ষপুটে ফিরে-চলা যত প্রতিধ্বনি।
অনুভব করেছি তখনি,
বহু যুগযুগান্তের কোন্ এক বাণীধারা
নক্ষত্রে নক্ষত্রে ঠেকি পথহারা
সংহত হয়েছে অবশেষে
মোর মাঝে এসে।
প্রশ্ন মনে আসে আরবার,
আবার কি ছিন্ন হয়ে যাবে সূত্র তার--
রূপহারা গতিবেগ প্রেতের জগতে
চলে যাবে বহু কোটি বৎসরের শূন্য যাত্রাপথে?
উজাড় করিয়া দিবে তার
পান্থের পাথেয়পত্র আপন স্বল্পায়ু বেদনার--
ভোজশেষে উচ্ছিষ্টের ভাঙা ভাণ্ড হেন?
কিন্তু, কেন।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khano/
|
118
|
আল মাহমুদ
|
কদম ফুলের ইতিবৃত্ত
|
প্রেমমূলক
|
আমি তোমাকে কতবার বলেছি আমি বৃক্ষের মতো অনড় নই
তুমি যতবার ফিরে এসেছ ততবারই ভেবেছ
আমি কদমবৃক্ষ হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকব
কিন্তু এখন দেখ আমি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেও
হয়ে গিয়েছি বৃক্ষের অধিক এক কম্পমান সত্তা
বাঁশি বাজিয়ে ফুঁ ধরেছি আর চতুর্দিক থেকে কেঁদে
উঠেছে রাধারা
আমি কি বলেছিলাম ঘর ভেঙে আমার কাছে এসো
আমি কি বলেছিলাম যমুনায় কলস ভাসিয়ে
সিক্ত অঙ্গে কদমতলায় মিলিত হও ?
আমি তো বলিনি লাজ লজ্জা সংসার সম্পর্কযমুনার জলে
ভাসিয়ে দাও
আমি তো নদীর স্বভাব জানি স্রোত বুঝি কূল ভাঙা বুঝি
কিন্তু তোমাকে বুঝতে বাঁশিতে দেখ কতগুলো ছিদ্র
সব ছিদ্র থেকেই ফুঁ বেরোয়
আর আমার বুক থেকে রক্ত।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3713.html
|
646
|
জয় গোস্বামী
|
কিন্তু আগুনের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াবার কথাটা মনে থাকে যেন
|
প্রেমমূলক
|
কিন্তু আগুনের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াবার কথাটা মনে থাকে যেন!
মাটি ফেটে তলিয়ে যাবার কথাটা
যেন মনে থাকে ভূমিকম্পের ফাটল থেকে হাত বেরিয়ে আসা
আর মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে, ডিঙি মেরে,
সূর্যের পেটে মুখ ঢুকিয়ে দেওয়া
কয়েক যুগ পরে, সূর্য নিভে আকাশ থেকে খসে পড়ল যখন
তখন, আর কিছু না পেয়ে, খিদের চোটে, পরস্পরকে
খেয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবার কথাটাও মনে থাকে যেন…
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1729
|
4
|
অতুলপ্রসাদ সেন
|
বল, বল, বল সবে
|
স্বদেশমূলক
|
বল, বল, বল সবে, শত বীণা-বেণু-রবে,
ভারত আবার জগত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে |
ধর্মে মহান্ হবে, কর্মে মহান্ হবে,
নব দিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পুরবে!
আজও গিরিরাজ রয়েছে প্রহরী,
ঘিরি তিনদিক নাচিছে লহরী,
যায়নি শুকায়ে গঙ্গা গোদাবরী, এখনও অমৃতবাহিনী |
প্রতি প্রান্তর, প্রতি গুহা বন,
প্রতি জনপদ, তীর্থ অগণন, কহিছে গৌরব-কাহিনী |
বিদুষী মৈত্রেয়ী খনা লীলাবতী,
সতি সাবিত্রী সীতা অরুন্ধতী,
বহু বীরবালা বীরেন্দ্র-প্রসূতি, আমরা তাঁদেরই সন্ততি ||
ভোলেনি ভারত, ভোলেনি সে কথা,
অহিংসার বাণী উঠেছিল হেথা,
নানক, নিমাই করেছিল ভাই, সকল ভারত-নন্দনে |
ভুলি ধর্ম-দ্বেষ জাতি-অভিমান,
ত্রিশকোটি দেহ হবে এক প্রাণ, একজাতি প্রেম-বন্ধনে ||
মোদের এ দেশ নাহি রবে পিছে,
ঋষি-রাজকুল জন্মেনি মিছে,
দুদিনের তরে হীনতা সহিছে, জাগিবে আবার জাগিবে |
আসিবে শিল্প-ধন-বাণিজ্য,
আসিবে বিদ্যা-বিনয়-বীর্য, আসিবে আবার আসিবে ||
এস হে কৃষক কুটির-নিবাসী,
এস অনার্য গিরি-বনবাসী,
এস হে সংসারী, এস হে সন্ন্যাসী, —মিল হে মায়ের চরণে |
এস অবনত, এস হে শিক্ষিত,
পরহিত-ব্রতে হইয়া দীক্ষিত, —মিল হে মায়ের চরণে |
এস হে হিন্দু, এস মুসলমান,
এস হে পারসী, বৌদ্ধ, খৃষ্টিয়ান্, —মিল হে মায়ের চরণে ||
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4255.html
|
4171
|
লালন শাহ
|
আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে
|
মানবতাবাদী
|
আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে
দেখ না রে মন চেয়ে।
দেশ-দেশান্তর দৌড়ে এবার
মরিস্ কেন হাঁপিয়ে।।
করে অতি আজব ভাক্কা
গঠেছে সাঁই মানুষ-মক্কা
কুদরতি নূর দিয়ে।
ও তার চার দ্বারে চার নূরের ইমাম
মধ্যে সাঁই বসিয়ে।।
মানুষ-মক্কা কুদরতি কাজ
উঠছে রে আজগুবি আওয়াজ
সাততলা ভেদিয়ে।
আছে সিংহ-দরজায় দ্বারী একজন
নিদ্রাত্যাগী হয়ে।।
দশ-দুয়ারী মানুষ মক্কা
গুরুপদে ডুবে দেখ না
ধাক্কা সামলায়ে।
ফকির লালন বলে, সে যে গুপ্ত মক্কা
আমি ইমাম সেই মিঞে।
ওরে সেথা যাই
কোন পথ দিয়ে।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4425.html
|
468
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দ্যম
|
মানবতাবাদী
|
মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দ্যম
মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল,
মোরা বিধাতার মত নির্ভয়
মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল।।
মোরা আকাশের মত বাঁধাহীন
মোরা মরু সঞ্চার বেদুঈন,
বন্ধনহীন জন্ম স্বাধীন
চিত্তমুক্ত শতদল।।
মোরা সিন্ধু জোঁয়ার কলকল
মোরা পাগলা জোঁয়ার ঝরঝর।
কল-কল-কল, ছল-ছল-ছল
মোরা দিল খোলা খোলা প্রান্তর,
মোরা শক্তি অটল মহীধর।
হাসি গান শ্যাম উচ্ছল
বৃষ্টির জল বনফল খাই-
শয্যা শ্যামল বনতল।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/mora-jhonjhar-moto-uddam/
|
6
|
অতুলপ্রসাদ সেন
|
হও ধরমেতে ধীর
|
স্বদেশমূলক
|
হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর,
হও উন্নত শির, নাহি ভয় |
ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান, হও সবে আগুয়ান,
সাথে আছে ভগবান,—হবে জয় |
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান,
বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান্ ;
দেখিয়া ভারেতে মহা-জাতির উত্থান—জগজন মানিবে বিস্ময়!
তেত্রিশ কোটি মোরা নহি কভু ক্ষীণ,
হতে পারি দীন, তবু নহি মোরা হীন!
ভারতে জনম, পুনঃ আসিবে সুদিন—ঐ দেখ প্রভাত-উদয়!
ন্যায় বিরাজিত যাদের করে, বিঘ্ন পরাজিত তাদের শরে ;
সাম্য কভু নাহি স্বার্থে ডরে—সত্যের নাহি পরাজয় ||
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4257.html
|
920
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আকাশলীনা
|
প্রেমমূলক
|
সুরঞ্জনা, ঐখানে যেয়োনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে – আরও দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়োনাকো আর।
কী কথা তাহার সাথে? – তার সাথে!
আকাশের আড়ালে আকাশে
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ:
তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।
সুরঞ্জনা,
তোমার হৃদয় আজ ঘাস :
বাতাসের ওপারে বাতাস -
আকাশের ওপারে আকাশ।
কবিতা আশ্বিন ১৩৪৪
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/145
|
2596
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অনেক তিয়াষে করেছি ভ্ৰমণ
|
ভক্তিমূলক
|
অনেক তিয়াষে করেছি ভ্ৰমণ
জীবন কেবলি খোঁজা।
অনেক বচন করেছি রচন,
জমেছে অনেক বোঝা।
যা পাই নি তারি লইয়া সাধনা
যাব কি সাগরপার।
যা গাই নি তারি বহিয়া বেদনা
ছিঁড়িবে বীণার তার? (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/onek-tiashe-korechi-vromon/
|
4325
|
শামসুর রাহমান
|
অসামান্য তিথি
|
প্রেমমূলক
|
অনেক বছর আগে আমি ভালোবেসেছিলাম যাদের
তারা আজ অতিশয় আবছা বিবর্ণ ফ্রীজ শটে।
অকস্মাৎ কোনো কোনোদিন ওরা স্মৃতির নিকটে
চাঞ্চল্য প্রার্থনা করে গূঢ় ইন্দ্রজালে শরীরের
খুব কাছে এসে। অশরীরী ছায়ার মতন ফের
করে ব্যবহার নিমেষেই। দৃশ্যপটে কী-যে ঘটে,
ওরা মিশে যায় বায়ুস্তরে; শোনো, বলি অকপটে-
চিরদিন কিছু ছায়ামোহ থেকে যায় মানুষের।কিন্তু তুমি ছায়া নও, নও তুমি অশরীরী কেউ,
তোমার বেদেনী-চোখ, ক্ষীণ কটি আর স্তনভার
নিয়ে তুমি আজো কী সজীব জ্বলজ্বলে উপস্থিতি।
যেখানেই থাকো, যতদূরে বিস্মৃতির ক্রূর ঢেউ
তোমাকে সরিয়ে নিতে পারে না কখনো; বারবার
ফিরে আসে আমাদের কী মদির অসামান্য তিথি। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/osamanyo-tithi/
|
1064
|
জীবনানন্দ দাশ
|
দেশবন্ধু
|
ভক্তিমূলক
|
বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছ নটেশের রঙ্গমল্লী গাঁথা
অশান্ত সন্তান ওগো,- বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদী-মাতা।
কালবৈশাখীর দোলা অনিবার দুলাইতে রক্তপুঞ্জ তব
উত্তাল ঊর্মির তালে,-বক্ষে তবু লক্ষ কোটি পন্নগ-উৎসব
উদ্যত ফণার নৃত্যে আষ্ফালিত ধূর্জটির কন্ঠ-নাগ জিনি,
ত্র্যম্বক-পিনাকে তব শঙ্কাকুল ছিল সদা শত্রু অক্ষৌহিণী।
স্পর্শে তব পুরোহিত, ক্লেদে প্রাণ নিমেষেতে উঠিত সঞ্চারি,
এসেছিলে বিষ্ণুচক্র মর্মন্তুদ,–ক্লৈব্যের সংহারী।
ভেঙেছিলে বাঙালির সর্বনাশী সুষুপ্তির ঘোর,
ভেঙেছিলে ধূলিশ্লিষ্ট শঙ্কিতের শৃঙ্খলের ডোর,
ভেঙেছিলে বিলাসের সুরাভান্ড তীব্র দর্পে,- বৈরাগের রাগে,
দাঁড়ালে সন্ন্যাসী যবে প্রাচীমঞ্চে-পৃথী-পুরোভাগে।
নবীন শাক্যের বেশে, কটাক্ষেতে কাম্য পরিহরি
ভাসিয়া চলিলে তুমি ভারতের ভাব-গঙ্গোত্তরী
আর্ত অর্স্পশ্যের তরে, পৃথিবীর পঞ্চমার লাগি;
বাদলের মন্দ্র সম মন্ত্র তব দিকে দিকে তুলিলে বৈরাগী।
এনেছিলে সঙ্গে করি অবিশ্রাম প্লাবনের দুন্দুভিনিনাদ,
শান্তি-প্রিয় মুমূর্ষুর শ্মশানেতে এনেছিলে আহব-সংবাদ,
গান্ডীবের টঙ্কারেতে মুহুর্মুহু বলেছিলে,- ‘আছি, আমি আছি!
কল্পশেষে ভারতের কুরুক্ষেত্রে আসিয়াছি নব সব্যসাচী।’
ছিলে তুমি দধীচির অস্থিময় বাসবের দম্ভেলির সম,
অলঙ্ঘ্য, অজেয়, ওগো লোকোত্তর, পুরুষোত্তম।
ছিলে তুমি রূদ্রের ডম্বরুরূপে, বৈষ্ণবের গুপীযন্ত্র মাঝে,
অহিংসার তপোবনে তুমি ছিলে চক্রবর্তী ক্ষত্রিয়ের সাজে,-
অক্ষয় কবচধারী শালপ্রাংশু রক্ষকের বেশে।
ফেরুকুল-সঙ্কুলিত উঞ্ছবৃত্তি ভিক্ষুকের দেশে
ছিলে তুমি সিংহশিশু, যোজনান্ত বিহরি একাকী
স্তব্ধ শিলাসন্ধিতলে ঘন ঘন গর্জনের প্রতিধ্বনি মাখি।
ছিলে তুমি নীরবতা-নিষ্পেষিত নির্জীবের নিদ্রিত শিয়রে
উন্মত্ত ঝটিকা সম, বহ্নিমান বিপ্লবের ঘোরে;
শক্তিশেল অপঘাতে দেশবক্ষে রোমাঞ্চিত বেদনার ধ্বনি
ঘুচাতে আসিয়াছিলে মৃত্যুঞ্জয়ী বিশল্যকরণী।
ছিলে তুমি ভারতের অমাময় স্পন্দহীন বিহ্বল শ্মশানে
শব-সাধকের বেশে,-সঞ্জীবনী অমৃত সন্ধানে।
রণনে রঞ্জনে তব হে বাউল, মন্ত্রমুগ্ধ ভারত, ভারতী;
কলাবিৎ সম হায় তুমি শুধু দগ্ধ হলে দেশ-অধিপতি।
বিধিবশে দূরাগত বন্ধু আজ, ভেঙে গেছে বসুধা-নির্মোক,
অন্ধকার দিবাভাগে বাজে তাই কাজরীর শ্লোকে।
মল্লারে কাঁদিছে আজ বিমানের বৃন্তহারা মেঘছত্রীদল,
গিরিতটে, ভূমিগর্ভ ছায়াচ্ছন্ন-উচ্ছ্বাসউচ্ছল।
যৌবনের জলরঙ্গ এসেছিল ঘনস্বনে দরিয়ার দেশে,
তৃষ্ণাপাংশু অধরেতে এসেছিল ভোগবতী ধারার আশ্লেষে।
অর্চনার হোমকুন্ডে হবি সম প্রাণবিন্দু বারংবার ঢালি,
বামদেবতার পদে অকাতরে দিয়ে গেল মেধ্য হিয়া ডালি।
গৌরকানি শঙ্করের অম্বিকার বেদীতলে একা
চুপে চুপে রেখে এল পূঞ্জীভূত রক্তস্রোত-রেখা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/907
|
2591
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অনাগতা
|
চিন্তামূলক
|
এসেছিল বহু আগে যারা মোর দ্বারে,
যারা চলে গেছে একেবারে,
ফাগুন-মধ্যাহ্নবেলা শিরীষছায়ায় চুপে চুপে
তারা ছায়ারূপে
আসে যায় হিল্লোলিত শ্যাম দুর্বাদলে।
ঘন কালো দিঘিজলে
পিছনে-ফিরিয়া-চাওয়া আঁখি জ্বলো জ্বলো
করে ছলোছলো।
মরণের অমরতালোকে
ধূসর আঁচল মেলি ফিরে তারা গেরুয়া আলোকে।যে এখনো আসে নাই মোর পথে,
কখনো যে আসিবে না আমার জগতে,
তার ছবি আঁকিয়াছি মনে--
একেলা সে বাতায়নে
বিদেশিনী জন্মকাল হতে।
সে যেন শেঁউলি ভাসে ক্ষীণ মৃদু স্রোতে,
কোথায় তাহার দেশ
নাই সে উদ্দেশ। চেয়ে আছে দূর-পানে
কার লাগি আপনি সে নাহি জানে।
সেই দূরে ছায়ারূপে রয়েছে সে
বিশ্বের সকল-শেষে
যে আসিতে পারিত তবুও
এল না কভুও।
জীবনের মরীচিকাদেশে
মরুকন্যাটির আঁখি ফিরে ভেসে ভেসে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aunaguta/
|
243
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আশু-প্রয়াণ গীতি
|
শোকমূলক
|
কোরাস্: বাংলার 'শের', বাংলার শির,
বাংলার বাণী, বাংলার বীর
সহসা ও-পারে অস্তমান।
এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহা-ভারতের মহাপ্রয়াণ॥
বাংলার ঋষি বাংলার জ্ঞান বঙ্গবাণীর শ্বেতকমল,
শ্যাম বাংলার বিদ্যা-গঙ্গা অবিদ্যা-নাশী তীর্থ-জল!
মহামহিমার বিরাট পুরুষ শক্তি-ইন্দ্র তেজ-তপন—
রক্ত-উদয় হেরিতে সহসা হেরিনু সে-রবি মেঘ-মগন।
কোরাস্: বাংলার 'শের', বাংলার শির,
বাংলার বাণী, বাংলার বীর
সহসা ও-পারে অস্তমান।
এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহা-ভারতের মহাপ্রয়াণ॥
মদ-গর্বীর গর্ব-খর্ব বল-দর্পীর দর্প-নাশ
শ্বেত-ভিতুদের শ্যাম বরাভয় রক্তাসুরের কৃষ্ণ ত্রাস।
নব ভারতের নব আশা-রবি প্রাচী'র উদার অভ্যুদয়
হেরিতে হেরিতে হেরিনু সহসা বিদায়-গোধূলি গগনময়।
কোরাস্: বাংলার 'শের', বাংলার শির,
বাংলার বাণী, বাংলার বীর
সহসা ও-পারে অস্তমান।
এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহা-ভারতের মহাপ্রয়াণ॥
পড়িল ধসিয়া গৌরীশঙ্কর হিমালয়-শির স্বর্গচূড়,
গিরি কাঞ্চন-জঙ্ঘা গিরিল—বাংলার যবে দিন-দুপুর।
শিশুক-হাঙর শোষিছে রক্ত, মৃত্যু শোষিছে সাগর-প্রাণ—
পরাধীনা মা'র স্বাধীন সুতের মেদ-ধূমে কালো দেশ-শ্মশান।
কোরাস্: বাংলার 'শের', বাংলার শির,
বাংলার বাণী, বাংলার বীর
সহসা ও-পারে অস্তমান।
এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহা-ভারতের মহাপ্রয়াণ॥
অরাজক মারি মড়া-কান্নায় দেশ-জননীর বদ্ধ শ্বাস,
হে দেব-আত্মা! স্বর্গ হইতে দাও কল্যাণ, দাও আভাস,
কেমন করিয়া মৃত্যু মথিয়া মৃত্যুঞ্জয় হয় মানব;
শব হয়ে গেছ, শিব হয়ে এস দেবকী-কারার নীল কেশব।
কোরাস্: বাংলার 'শের', বাংলার শির,
বাংলার বাণী, বাংলার বীর
সহসা ও-পারে অস্তমান।
এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহা-ভারতের মহাপ্রয়াণ॥
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/833
|
5270
|
শামসুর রাহমান
|
সম্পাদক সমীপেষু
|
লিপিমূলক
|
আমরা বাগান চাই আমরা ক’জন অকপট,
শান্তিবাদী ক্লান্ত নাগরিক এমন বাগান চাই
যেখানে ফুলের কাছে সহজে পারবো যেতে, ঘাসে
চিৎ হয়ে শুয়ে দিব্যি পা দুটো নাড়বো অকারণ
মাঝে মাঝে। কী কী ফুল থাকবে বাগানে তার সুদীর্ঘ তালিকা
বলোতো পাঠাতে পারি পৌর সমিতির কাছে। ভদ্রমহোদয়,আমরা বাগান চাই, আমরা ক’জন হতচ্ছাড়া,
যারা মাঝরাস্তা দিয়ে ভাগ্যের ছ্যাকড়া গাড়ি হাঁকাতে হাঁকাতে
বড়ো বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি সম্প্রতি, আমরাই
শহরে বাগান চাই লিরিকের প্রসন্নতা-ছাওয়া;
এবং বিশ্বেস করো আছে আজো চাওয়ার সাহস।২
চেতনপুরে ফুলের চারায় ধরলো নতুন কলি;
ছেঁড়া জামায়, জুতোর গর্তে করছি স্বপ্ন জড়ো।
স্বপ্ন-আভায় স্বর্গ হলো চেনা ময়লা গলি,
হিংসুটে সব মত্ত পথিক সরো তোমরা সরো।
আমরা কিছু দুর্বিনীত বাগান বাগান বলে
কান করেছি ঝালাপালা মানী-গুণীর বটে।
ফুলবাগানের অলীক মালী শুনছি সে কোন্ ছলে
মস্ত বাগান সাজিয়ে দেবে, দৈবে কতোই ঘটে!শিল্পকর্মে আস্থা ছিল বলেই ক্ষুধার দাঁতে
দীর্ণ হয়ে ক্লিন্ন প্রাণে পোড়াই আতশবাজি।
ঘুমাক তারা ঘুমাক সুখে নিদ্রা এলে রাতে,
ঝুলিয়ে কাঁধে মরা পাখি আমরা ঘুরতে রাজি।৩
এমন বাগান চাই যেখানে গেলেই নির্বিবাদে
লতাপাতা জড়ানো ঘোড়ার মূর্তি দেখে অচিরাৎ
ভুলবো দুঃসহ শোক, বস্তুত বাগানে এসে কোনো কোনো দিন-
বুধবার, শুক্রবার, কিংবা রবিবার, হোক না যে কোন দিন,
খুঁজবো অদৃশ্য আরোহীকে লোহার ঘোড়ার পিঠে!
দেখবো বেঞ্চিতে বসে অচেনা কে লোক চুরুটটা
ফুঁকে ফুঁকে ইতস্তত স্মৃতির খোলামকুচি ছড়াচ্ছে প্রচুর।
বুঝি নিঃসঙ্গতা কালো সহোদর তার!আমাদের রমণীর মুখে ফুলের স্তবকগুলি
মেলুক আরক্ত ডানা, আমাদের শিশুদের মুখে
দয়ালু বাতাস দিক চুমু ঘন ঘন, ফুলবাগানের ডাল
মাতাল কবিকে দিক কবিতার পংক্তি উপহার।এবং সেসব ডালে বিষ পিঁপাড়েরা কখনো সদলবলে
বাঁধতে না পারে যেন বাসা; যদি বাঁধে
তাহলে কি করে যাবো বাগানের পথে? কী করে ছেলেরা ডাল
বেয়ে বেয়ে কেবলি হারিয়ে যাবে পাতার জঙ্গলে?ভদ্রমহোদয়! বারো মাস তের পার্বণ-কাতর
লাজুক আত্মাকে বসতিতে যথাযথ
রাখার প্রয়াসে নিত্য উচাটন আমরা কখনো
গুহাকে করিনি ঘর, রাখিনি পানীয় করোটিতে,
আঁকিনি স্বর্গের নক্সা বাঘছালে, তুকতাক মন্ত্রের প্রাচীন
কোনো পুঁথি ছিল না সম্মুখে সর্বক্ষণ। হল্দে
পুঁথির তুলোট পাতা আকাঙ্ক্ষার শবটাকে কখনো পারে কি
দিতে চাপা? একদিন লক্ষ্যে পৌছে যাবো নিরাপদে
আমরা তেমন কেউ নই; দূরে ও নিকটে
প্রকৃতই লক্ষ্য কিছু আছে কিনা সেও তো জানি না।
নানান ফুলের গাছে সুশীতল জল দেবো বলে
দু’বেলা অসীম ধৈর্যে ঝারি হাতে সবাই প্রস্তুত,
অথচ বাগানই নেই, কোথাও বাগান নেই আজ। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sompadok-somipeshu/
|
1161
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মিতাভাষণ
|
চিন্তামূলক
|
তোমার সৌন্দর্য নারী, অতীতের দানের মতন।
মধ্যসাগরের কালো তরঙ্গের থেকে
ধর্মাশোকের স্পষ্ট আহ্বানের মতো
আমাদের নিয়ে যায় ডেকে
শান্তির সঙ্ঘের দিকে — ধর্মে — নির্বাণে;
তোমার মুখের স্নিগ্ধ প্রতিভার পানে।
অনেক সমুদ্র ঘুরে ক্ষয়ে অন্ধকারে
দেখেছি মণিকা-আলো হাতে নিয়ে তুমি
সময়ের শতকের মৃত্যু হলে তবু
দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্রেয়তর বেলাভূমি:
যা হয়েছে যা হতেছে এখুনি যা হবে
তার স্নিগ্ধ মালতী-সৌরভে।
মানুষের সভ্যতার মর্মে ক্লান্তি আসে;
বড়ো বড়ো নগরীর বুকভরা ব্যথা;
ক্রমেই হারিয়ে ফেলে তারা সব সঙ্কল্প স্বপ্নের
উদ্যমের অমূল্য স্পষ্টতা।
তবুও নদীর মানে স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জল, সূর্য মানে আলো :
এখনো নারী মানে তুমি, কত রাধিকা ফুরালো।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/965
|
2871
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কবি-কাহিনী (তৃতীয় সর্গ)
|
কাহিনীকাব্য
|
কত দেশ দেশান্তরে ভ্রমিল সে কবি!
তুষারস্তম্ভিত গিরি করিল লঙ্ঘন, সুতীক্ষ্নকণ্টকময় অরণ্যের বুক মাড়াইয়া গেল চলি রক্তময় পদে। কিন্তু বিহঙ্গের গান, নির্ঝরের ধ্বনি, পারে না জুড়াতে আর কবির হৃদয়। বিহগ, নির্ঝর-ধ্বনি প্রকৃতির গীত-- মনের যে ভাগে তার প্রতিধ্বনি হয় সে মনের তন্ত্রী যেন হোয়েছে বিকল। একাকী যাহাই আগে দেখিত সে কবি তাহাই লাগিত তার কেমন সুন্দর, এখন কবির সেই একি হোলো দশা-- যে প্রকৃতি-শোভা-মাঝে নলিনী না থাকে ঠেকে তা শূন্যের মত কবির নয়নে, নাইক দেবতা যেন মন্দিরমাঝারে। বালার মুখের জ্যোতি করিত বর্দ্ধন প্রকৃতির রূপচ্ছটা দ্বিগুণ করিয়া; সে না হোলে অমবস্যানিশির মতন সমস্ত জগৎ হোত বিষণ্ণ আঁধার। --
জ্যোৎস্নায় নিমগ্ন ধরা, নীরব রজনী। অরণ্যের অন্ধকারময় গাছগুলি মাথার উপরে মাখি রজত জোছনা, শাখায় শাখায় ঘন করি জড়াজড়ি, কেমন গম্ভীরভাবে রোয়েছে দাঁড়ায়ে। হেথায় ঝোপের মাঝে প্রচ্ছন্ন আঁধার, হোথায় সরসীবক্ষে প্রশান্ত জোছনা। নভপ্রতিবিম্বশোভী ঘুমন্ত সরসী চন্দ্র তারকার স্বপ্ন দেখিতেছে যেন! লীলাময় প্রবাহিণী চলেছে ছুটিয়া, লীলাভঙ্গ বুকে তার পাদপের ছায়া ভেঙ্গে চুরে কত শত ধরিছে মূরতি। গাইছে রজনী কিবা নীরব সঙ্গীত! কেমন নীরব বন নিস্তব্ধ গম্ভীর-- শুধু দূর-শৃঙ্গ হোতে ঝরিছে নির্ঝর, শুধু একপাশ দিয়া সঙ্কুচিত অতি তটিনীটি সর সর যেতেছে চলিয়া। অধীর বসন্তবায়ু মাঝে মাঝে শুধু ঝরঝরি কাঁপাইছে গাছের পল্লব। এহেন নিস্তব্ধ রাত্রে কত বার আমি গম্ভীর অরণ্যে একা কোরেছি ভ্রমণ। স্নিগ্ধ রাত্রে গাছপালা ঝিমাইছে যেন, ছায়া তার পোড়ে আছে হেথায় হোথায়। দেখিয়াছি নীরবতা যত কথা কয় প্রাণের মরম-তলে, এত কেহ নয়। দেখি যবে অতি শান্ত জোছনায় মজি নীরবে সমস্ত ধরা রয়েছে ঘুমায়ে, নীরবে পরশে দেহ বসন্তের বায়, জানি না কি এক ভাবে প্রাণের ভিতর উচ্ছ্বসিয়া উথলিয়া উঠে গো কেমন! কি যেন হারায়ে গেছে খুঁজিয়া না পাই, কি কথা ভুলিয়া যেন গিয়েছি সহসা, বলা হয় নাই যেন প্রাণের কি কথা, প্রকাশ করিতে গিয়া পাই না তা খুঁজি! কে আছে এমন যার এ হেন নিশীথে, পুরাণো সুখের স্মৃতি উঠে নি উথলি! কে আছে এমন যার জীবনের পথে এমন একটি সুখ যায় নি হারায়ে, যে হারা-সুখের তরে দিবা নিশি তার হৃদয়ের এক দিক শূন্য হোয়ে আছে। এমন নীরব-রাত্রে সে কি গো কখনো ফেলে নাই মর্ম্মভেদী একটি নিশ্বাস? কর স্থানে আজ রাত্রে নিশীথপ্রদীপে উঠিছে প্রমোদধ্বনি বিলাসীর গৃহে। মুহূর্ত্ত ভাবে নি তারা আজ নিশীথেই কত চিত্ত পুড়িতেছে প্রচ্ছন্ন অনলে। কত শত হতভাগা আজ নিশীথেই হারায়ে জন্মের মত জীবনের সুখ মর্ম্মভেদী যন্ত্রণায় হইয়া অধীর একেলাই হা হা করি বেড়ায় ভ্রমিয়া! --
ঝোপে-ঝাপে ঢাকা ওই অরণ্যকুটীর। বিষণ্ণ নলিনীবালা শূন্য নেত্র মেলি চাঁদের মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া! জানি না কেমন কোরে বালার বুকের মাঝে সহসা কেমন ধারা লেগেছে আঘাত-- আর সে গায় না গান, বসন্ত ঋতুর অন্তে পাপিয়ার কণ্ঠ যেন হোয়েছে নীরব। আর সে লইয়া বীণা বাজায় না ধীরে ধীরে, আর সে ভ্রমে না বালা কাননে কাননে। বিজন কুটীরে শুধু মরণশয্যার 'পরে একেলা আপন মনে রয়েছে শুইয়া। যে বালা মুহূর্ত্তকাল স্থির না থাকিত কভু, শিখরে নির্ঝরে বনে করিত ভ্রমণ—কখনো তুলিত ফুল, কখনো গাঁথিত মালা, কখনো গাইত গান, বাজাইত বীণা-- সে আজ এমন শান্ত, এমন নীরব স্থির! এমন বিষণ্ণ শীর্ণ সে প্রফুল্ল মুখ! এক দিন, দুই দিন, যেতেছে কাটিয়া ক্রমে-- মরণের পদশব্দ গণিছে সে যেন! আর কোন সাধ নাই, বাসনা রয়েছে শুধু কবিরে দেখিয়া যেন হয় গো মরণ। এ দিকে পৃথিবী ভ্রমি সহিয়া ঝটিকা কত ফিরিয়া আসিছে কবি কুটীরের পানে, মধ্যাহ্নের রৌদ্রে যথা জ্বলিয়া পুড়িয়া পাখী সন্ধ্যায় কুলায়ে তার আইসে ফিরিয়া। বহুদিন পরে কবি পদার্পিল বনভূমে, বৃক্ষলতা সবি তার পরিচিত সখা! তেমনি সকলি আছে, তেমনি গাইছে পাখী, তেমনি বহিছে বায়ু ঝর ঝর করি। অধীরে চলিল কবি কুটীরের পানে-- দুয়ারের কাছে গিয়া দুয়ারে আঘাত দিয়া ডাকিল অধীর স্বরে, নলিনী! নলিনী! কিছু নাই সাড়া শব্দ, দিল না উত্তর কেহ, প্রতিধ্বনি শুধু তারে করিল বিদ্রূপ। কুটীরে কেহই নাই, শূন্য তা রয়েছে পড়ি-- বেষ্টিত বিতন্ত্রী বীণা লূতাতন্তুজালে। ভ্রমিল আকুল কবি কাননে কাননে, ডাকিয়া সমুচ্চ স্বরে, নলিনী! নলিনী! মিলিয়া কবির স্বরে বনদেবী উচ্চস্বরে ডাকিল কাতরে আহা, নলিনী! নলিনী! কেহই দিল না সাড়া, শুধু সে শব্দ শুনি সুপ্ত হরিণেরা ত্রস্ত উঠিল জাগিয়া। অবশেষে গিরিশৃঙ্গে উঠিল কাতর কবি, নলিনীর সাথে যেথা থাকিত বসিয়া। দেখিল সে গিরি-শৃঙ্গে, শীতল তুষার-'পরে, নলিনী ঘুমায়ে আছে ম্লানমুখচ্ছবি। কঠোর তুষারে তার এলায়ে পড়েছে কেশ, খসিয়া পড়েছে পাশে শিথিল আঁচল। বিশাল নয়ন তার অর্দ্ধনিমীলিত, হাত দুটি ঢাকা আছে অনাবৃত বুকে। একটি হরিণশিশু খেলা করিবার তরে কভু বা অঞ্চল ধরি টানিতেছে তার, কভু শৃঙ্গ দুটি দিয়া সুধীরে দিতেছে ঠেলি, কভু বা অবাক্ নেত্রে রহিছে চাহিয়া! তবু নলিনীর ঘুম কিছুতেই ভাঙ্গিছে না, নীরবে নিস্পন্দ হোয়ে রয়েছে ভূতলে। দূর হোতে কবি তারে দেখিয়া কহিল উচ্চে, "নলিনী, এয়েছি আমি দেখ্সে বালিকা।" তবুও নলিনী বালা না দিয়া উত্তর শীতল তুষার-'পরে রহিল ঘুমায়ে। কবি সে শিখর-'পরে করি আরোহণ শীতল অধর তার করিল চুম্বন—শিহরিয়া চমকিয়া দেখিল সে কবি না নড়ে হৃদয় তার, না পড়ে নিশ্বাস। দেখিল না, ভাবিল না, কহিল না কিছু, যেমন চাহিয়া ছিল রহিল চাহিয়া। নিদারুণ কি যেন কি দেখিছে তরাসে নয়ন হইয়া গেল অচল পাষাণ। কতক্ষণে কবি তবে পাইল চেতন, দেখিল তুষারশুভ্র নলিনীর দেহ হৃদয়জীবনহীন জড় দেহ তার অনুপম সৌন্দর্য্যের কুসুম-আলয়, হৃদয়ের মরমের আদরের ধন—তৃণ কাষ্ঠ সম ভূমে যায় গড়াগড়ি! বুকে তারে তুলে লয়ে ডাকিল "নলিনী", হৃদয়ে রাখিয়া তারে পাগলের মত কবি কহিল কাতর স্বরে "নলিনী" "নলিনী"! স্পন্দহীন, রক্তহীন অধর তাহার অধীর হইয়া ঘন করিল চুম্বন। --
তার পর দিন হোতে সে বনে কবিরে আর পেলে না দেখিতে কেহ, গেছে সে কোথায়! ঢাকিল নলিনীদেহ তুষারসমাধি-- ক্রমে সে কুটীরখানি কোথা ভেঙ্গে চুরে গেল, ক্রমে সে কানন হোলো গ্রাম লোকালয়, সে কাননে--কবির সে সাধের কাননে অতীতের পদচিহ্ন রহিল না আর। (কবি-কাহিনী কাব্যোপন্যাস)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kobi-kahini-tritio-sorgo/
|
3736
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মুর্খু
|
ছড়া
|
নেই বা হলেম যেমন তোমার
অম্বিকে গোঁসাই ।
আমি তো , মা , চাই নে হতে
পণ্ডিতমশাই ।
নাই যদি হই ভালো ছেলে ,
কেবল যদি বেড়াই খেলে
তুঁতের ডালে খুঁজে বেড়াই
গুটিপোকার গুটি ,
মুর্খু হয়ে রইব তবে ?
আমার তাতে কীই বা হবে ,
মুর্খু যারা তাদেরই তো
সমস্তখন ছুটি ।
তারাই তো সব রাখাল ছেলে
গোরু চরায় মাঠে ।
নদীর ধারে বনে বনে
তাদের বেলা কাটে ।
ডিঙির ' পরে পাল তুলে দেয় ,
ঢেউয়ের মুখে নাও খুলে দেয় ,
ঝাউ কাটতে যায় চলে সব
নদীপারের চরে ।
তারাই মাঠে মাচা পেতে
পাখি তাড়ায় ফসল - খেতে ,
বাঁকে করে দই নিয়ে যায়
পাড়ার ঘরে ঘরে ।
কাস্তে হাতে চুবড়ি মাথায় ,
সন্ধে হলে পরে
ফেরে গাঁয়ে কৃষাণ ছেলে ,
মন যে কেমন করে ।
যখন গিয়ে পাঠশালাতে
দাগা বুলোই খাতার পাতে ,
গুরুমশাই দুপুরবেলায়
বসে বসে ঢোলে ,
হাঁকিয়ে গাড়ি কোন্ গাড়োয়ান
মাঠের পথে যায় গেয়ে গান ,
শুনে আমি পণ করি যে
মুর্খু হব বলে ।
দুপুরবেলায় চিল ডেকে যায় ;
হঠাৎ হাওয়া আসি
বাঁশ - বাগানে বাজায় যেন
সাপ - খেলাবার বাঁশি ।
পুবের দিকে বনের কোলে
বাদল - বেলার আঁচল দোলে ,
ডালে ডালে উছলে ওঠে
শিরীষফুলের ঢেউ ।
এরা যে পাঠ - ভোলার দলে
পাঠশালা সব ছাড়তে বলে ,
আমি জানি এরা তো , মা ,
পণ্ডিত নয় কেউ ।
যাঁরা অনেক পুঁথি পড়েন
তাঁদের অনেক মান ।
ঘরে ঘরে সবার কাছে
তাঁরা আদর পান ।
সঙ্গে তাঁদের ফেরে চেলা ,
ধুমধামে যায় সারা বেলা ,
আমি তো , মা , চাই নে আদর
তোমার আদর ছাড়া ।
তুমি যদি মুর্খু বলে
আমাকে মা না নাও কোলে
তবে আমি পালিয়ে যাব
বাদলা মেঘের পাড়া ।
সেখান থেকে বৃষ্টি হয়ে
ভিজিয়ে দেব চুল ।
ঘাটে যখন যাবে , আমি
করব হুলুস্থূল ।
রাত থাকতে অনেক ভোরে
আসব নেমে আঁধার করে ,
ঝড়ের হাওয়ায় ঢুকব ঘরে
দুয়ার ঠেলে ফেলে ,
তুমি বলবে মেলে আঁখি ,
' দুষ্টু দেয়া খেপল না কি ?'
আমি বলব , ' খেপেছে আজ
তোমার মুর্খু ছেলে । ' (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/murkhu/
|
2398
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সরস্বতী
|
সনেট
|
তপনের তাপে তাপি পথিক যেমতি
পড়ে গিয়া দড়ে রড়ে ছায়ার চরণে ;
তৃষাতুর জন যথা হেরি জলবতী
নদীরে, তাহার পানে ধায় ব্যগ্ৰ মনে
পিপাসা-নাশের আশে ; এ দাস তেমতি,
জ্বলে যবে প্রাণ তার দুঃখের জ্বলনে,
ধরে রাঙা পা দুখানি, দেবি সরস্বতি!---
মার কোল-সম, মা গো, এ তিন ভুবনে
আছে কি আশ্রম আর ? নয়নের জলে
ভাসে শিশু যবে, কে সাম্ভনে তারে ?
কে মোচে আঁখির জল অমনি আঁচলে ?
কে তার মনের খেদ নিবারিতে পারে,
মধুমাখা কথা কয়ে, স্নেহের কৌশলে ?—
এই ভাবি, কৃপাময়ি, ভাবি গো তোমারে!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/saraswati/
|
3518
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বর্ষশেষ
|
সনেট
|
নির্মল প্রত্যুষে আজি যত ছিল পাখি
বনে বনে শাখে শাখে উঠিয়াছে ডাকি।
দোয়েল শ্যামার কণ্ঠে আনন্দ-উচ্ছ্বাস,
গেয়ে গেয়ে পাপিয়ার নাহি মিটে আশ।
করুণ মিনতিস্বরে অশ্রান্ত কোকিল
অন্তরের আবেদনে ভরিছে নিখিল।
কেহ নাচে, কেহ গায়, উড়ে মত্তবৎ,
ফিরিয়া পেয়েছে যেন হারানো জগৎ।
পাখিরা জানে না কেহ আজি বর্ষশেষ,
বকবৃদ্ধ-কাছে নাহি শুনে উপদেশ।
যতদিন এ আকাশে এ জীবন আছে,
বরষের শেষ নাহি তাহাদের কাছে।
মানুষ আনন্দহীন নিশিদিন ধরি
আপনারে ভাগ করে শতখানা করি। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/borshasheshe/
|
3422
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রজাপতি
|
চিন্তামূলক
|
সকালে উঠেই দেখি
প্রজাপতি একি
আমার লেখার ঘরে,
শেলফের 'পরে
মেলেছে নিস্পন্দ দুটি ডানা--
রেশমি সবুজ রঙ, তার 'পরে সাদা রেখা টানা।
সন্ধ্যাবেলা বাতির আলোয় অকস্মাৎ
ঘরে ঢুকে সারারাত
কী ভেবেছে কে জানে তা--
কোনোখানে হেথা
অরণ্যের বর্ণ গন্ধ নাই,
গৃহসজ্জা ওর কাছে সমস্ত বৃথাই।
বিচিত্র বোধের এ ভুবন,
লক্ষকোটি মন
একই বিশ্ব লক্ষকোটি ক'রে জানে
রূপে রসে নানা অনুমানে।
লক্ষকোটি কেন্দ্র তারা জগতের,
সংখ্যাহীন স্বতন্ত্র পথের
জীবনযাত্রার যাত্রী,
দিনরাত্রি
নিজের স্বাতন্ত্র৻রক্ষা-কাজে
একান্ত রয়েছে বিশ্ব-মাঝে।
প্রজাপতি বসে আছে যে কাব্যপুঁথির 'পরে
স্পর্শ তারে করে,
চক্ষে দেখে তারে,
তার বেশি সত্য যাহা তাহা একেবারে
তার কাছে সত্য নয়--
অন্ধকারময়।
ও জানে কাহারে বলে মধু, তবু
মধুর কী সে-রহস্য জানে না ও কভু।
পুষ্পপাত্রে নিয়মিত আছে ওর ভোজ--
প্রতিদিন করে তার খোঁজ
কেবল লোভের টানে,
কিন্তু নাহি জানে
লোভের অতীত যাহা। সুন্দর যা, অনির্বচনীয়,
যাহা প্রিয়,
সেই বোধ সীমাহীন দূরে আছে
তার কাছে।
আমি যেথা আছি
মন যে আপন টানে তাহা হতে সত্য লয় বাছি।
যাহা নিতে নাহি পারে
তাই শূন্যময় হয়ে নিত্য ব্যাপ্ত তার চারি ধারে।
কী আছে বা নাই কী এ,
সে শুধু তাহার জানা নিয়ে।
জানে না যা, যার কাছে স্পষ্ট তাহা, হয়তো-বা কাছে
এখনি সে এখানেই আছে
আমার চৈতন্যসীমা অতিক্রম করি' বহুদূরে
রূপের অন্তরদেশে অপরূপপুরে।
সে আলোকে তার ঘর
যে আলো আমার অগোচর।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prujapute/
|
2564
|
রফিক আজাদ
|
যদি ভালবাসা পাই
|
প্রেমমূলক
|
যদি ভালবাসা পাই আবার শুধরে নেব
জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘপথে
তুলে নেব ঝোলাঝুলি
যদি ভালবাসা পাই শীতের রাতের শেষে
মখমল দিন পাব
যদি ভালবাসা পাই পাহাড় ডিঙ্গাবো
আর সমুদ্র সাঁতরাবো
যদি ভালবাসা পাই আমার আকাশ হবে
দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালবাসা পাই জীবনে আমিও পাব
মধ্য অন্তমিল।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1623.html
|
1606
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
তোমার জন্য ভাবি না
|
চিন্তামূলক
|
তুমি তোমার ছেলেকে
অহোরাত্রি অসংখ্য মিথ্যার বিষ গলিয়েছ।
শৈশবে সে হাসেনি,
কেননা
সমবয়সীদের সে শত্রু বলে জানত।
যৌবনে সে নারীকে ভালবাসেনি,
কেননা
নারীকে সে নরক বলে জানে।
ধীরে-ধীরে সেই অকালবার্ধক্যের দিকে সে এখন
এগিয়ে যাচ্ছে,
চুলগুলিকে যা সাদা করে দেয়,
কিন্তু চিত্তের মালিন্য যা মোচন করতে পারে না।
তোমার জন্য আমার কোনো ভাবনা নেই,
কিন্তু
তোমার ছেলের জন্য আমার বড় দুঃখ হয়।
তুমি তোমার মেয়েকে
অহোরাত্রি অসংখ্য কুৎসার কালি
গিয়িয়েছ।
শৈশবে সে ফুল কুড়ায়নি,
কেননা সে শুনেছিল
প্রত্যেকটা গাছেই আছে একানড়ের বাসা।
যৌবনে তার জানলা দিয়ে বাতাস বয়ে যায়নি,
কেননা
প্রতিবেশীর পুত্রকে সে লম্পট বলে জানে।
ধীরে-ধীরে সে এখন সেইদিকে এগিয়ে যাচ্ছে,
যেখানে
দুপুরগুলি বিকেলের মতো বিষণ্ণ তার
বিকেলগুলি রাত্রির মতো অন্ধকার।
তোমার জন্য আমার কোনো ভাবনা নেই,
কিন্তু
তোমার মেয়ের জন্য আমার বড় দুঃখ হয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1583
|
5851
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
যে আমায়
|
প্রেমমূলক
|
যে আমায় চেনে আমি তাকেই চিনেছি
যে আমায় ভুলে যায়, আমি তার ভুল
গোপন সিন্দুকে খুব যত্নে তুলে রাখি
পুকুরের মরা ঝাঁঝি হাতে নিয়ে বলি,
মনে আছে, জলের সংসার মনে আছে?
যে আমায় চেনে আমি তাকেই চিনেছি!
যে আমায় বলেছিল, একলা থেকো না
আমি তার একাকিত্ব অরণ্যে খুঁজেছি
যে আমায় বলেছিল, অত্যাগসহন
আমি তার ত্রাগ নিয়ে বানিয়েছি শ্লোক
যে আমার বলেছিল, পশুকে মেরো না
আমার পশুত্ব তাকে দিয়েছে পাহারা!
দিন গেছে, দিন যায় যমজ চিন্তায়
যে আমায় চেনে আমি তাকেই চিনেছি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1844
|
2325
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
তারা
|
সনেট
|
নিত্য তোমা হেরি প্রাতে ওই গিরি-শিরে
কি হেতু, কহ তা মোরে, সুচারু-হাসিনি ?
নিত্য অবগাহি দেহ শিশিরের নীরে,
দেও দেখা, হৈমবতি, থাকিতে যামিনী।
বহে কলকল রবে স্বচ্ছ প্রবাহিণী
গিরি-তলে ; সে দর্পণে নিরখিতে ধীরে
ও মুখের আভা কি লো, আইস, কামিনি,
কুসুম-শয়ন থুয়ে সুবর্ণ মন্দিরে?—
কিম্বা, দেহ কারাগার তেয়াগি ভূতলে,
স্নেহ-কারী জন-প্রাণ তুমি দেব-পুরে,
ভাল বাসি এ দাসেরে, আইস এ ছলে
হৃদয় আঁধার তার খেদাইতে দূরে ?
সত্য যদি, নিত্য তবে শোভ নভস্তলে,
জুড়াও এ আঁখি দুটি নিত্য নিত্য ঊরে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/tara/
|
2710
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ
|
ভক্তিমূলক
|
আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ।
খেলে যায় রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত।।কারা এই সমুখ দিয়ে আসে যায় খবর নিয়ে,
খুশি রই আপন মনে- বাতাস বহে সুমন্দ।
সারাদিন আঁখি মেলে দুয়ারে রব একা,
শুভখন হঠাৎ এলে তখনি পাব দেখা।
ততখন ক্ষণে ক্ষণে হাসি গাই আপন-মনে,
ততখন রহি রহি ভেসে আসে সুগন্ধ।।আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ।
খেলে যায় রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত।
আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ।
রচনা: শিলাইদহ ১৭ চৈত্র ১৩১৮
গীতবিতান পূজা ৫৫৯, বিশ্বভারতী ১৩৮০ সং পৃ ২২০ থেকে সংগৃহীত।পাঠান্তর:
গীতিমাল্যে (রবীন্দ্র রচনাবলী, বিশ্বভারতী ১৩৮৯ সং, খণ্ড ১১, পৃ ১৩৪) পঙ্ক্তি ৭ এ 'আপন-মনে' ছিল 'মনে মনে"।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-poth-chaowatei-ananda/
|
5323
|
শামসুর রাহমান
|
স্বর্গে গেলাম দর্শক হিসেবে
|
রূপক
|
(দান্তের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা পূর্বক)
মোল্লা-পুরুত এখনো রটায়
স্বর্গলোকের বিজ্ঞাপন।
নানা মুনি তার নকশা আঁকেন,
ব্যাখ্যা করেন বিজ্ঞজন।দৈব দয়ায় একদিন ঠিক
পৌঁছে গেলাম স্বর্গলোকে।
স্বর্গতো নয়, আমার শহর
দেখতে পেলাম চর্মচোখে।সেখানে ও লোক রাস্তা খুঁড়ছে,
মন্ত্রী হচ্ছে, কিনছে নাম।
চৈত্রদুপুর পুড়ছে সেখানে,
গলছে রাতের মধ্য যাম।ইলেকট্রিকের হঠাৎ-আলোয়
ঘরের জানলা খুলছে কেউ।
ব্যস্ত মানুষ, মন্থর গাড়ি,
বড়ো রাস্তায় ভিড়ের ঢেউ।এয়ারপোর্টে প্লেন নেমে আসে,
ট্রেন চলে যায় শেষ রাত্রে।
সেখানেও দেখি তর্কের থীম
ফকনার কামু কিবা সাত্রে।বক্তা ছড়ান ধরতাই বুলি,
রাজায়-রাজায় বাঁধে লড়াই।
টগবগ করে ফুটছে নিত্য
জটিল মতামতের কড়াই।দোকানে সাজানো বিদেশী কবির
আনকোরা বই দিচ্ছে উঁকি।
ঘটি-বাটি বাঁধা রেখে কেউ
ফটকা বাজারে নিচ্ছে ঝুঁকি।
ডাক্তার এলে ভিজিট চুকিয়ে
গৃহী মোছে তার চোখের খড়খড়ি,
রোগীর শিয়রে শুকনো ফল।তরুণী টেবিলে খাবার সাজায়,
খবর পড়েন বুড়ো হাকিম।
মুড়মুড়ে দুটি টোস্টের ফাঁকে
নিবিড় হলুদ সোনালি ডিম।কফির গন্ধে উন্মন মন,
কাজ্ঞিভেরাম কৌচে লোটে।
প্রেমিকের চোখ বালবের মতো
দীপ্ত ভাষায় ঝলসে ওঠে।রাতের আঁধারে ফুটপাতে আসে
ভিখিরিণী তার নি-ছাদ ঘরে;
ঘাগড়া দুলিয়ে কুষ্ঠরোগীর
ঠোঁট চেপে ধরে কামের জ্বরে!অক্ষর গুণে পংক্তি মেলায়
রাগী যুবকের দলের চাঁই,
ক্ষিপ্রকলায় চিত্র আঁকছে
রঙ ছুঁড়ে দিয়ে আচ্ছেতাই!রবিঠাকুরের গান ভেসে আসে,
হেঁটে যায় লোক সুরের টানে।
পিকাসোর ছবি ড্রইংরুমের
দেয়ালকে দেয় অন্য মানে। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/swarge-gelam-dorshok-hisebe/
|
1313
|
তসলিমা নাসরিন
|
কলকাতার প্রেম
|
প্রেমমূলক
|
তোমাকে তিরিশ তিরিশ লাগে, অথচ তুমি তেষট্টি
তেষট্টি হও, তিরিশ হও তাতে কার কী এলো গেলো
তুমি তুমিই; তেমনই, তোমাকে ঠিক যেমন হলে মানায়।
চোখদুটোর দিকে যখনই তাকাই, মনে হয় ওই চোখ বুঝি দুহাজার বছর ধরে চিনি
ঠোঁটের দিকে, চিবুকের দিকে, হাত বা হাতের আঙুলের দিকে
তাকাতে নিলেই দেখি চিনি
দুহাজার কেন, তারও চেয়ে আগে থেকে চিনি।
এত চিনি যে মনে হয় চাইলেই ওগুলো ছুঁতে পারি, যে কোনও সময়,
রাতে, দুপুরে, এমনকী রাতদুপুরেও।
মনে হয় যখন খুশি যা খুশি করতে পারি ওগুলোকে,
রাত জাগাতে পারি–
চিমটি কাটতে পারি, চুমু খেতে পারি, যেন ওগুলো আমার কিছু।
আমার এই মনে হওয়ার দিকে তিরিশ-তিরিশ তুমি
অনেকবার তো তাকিয়েছো, কিছু বলোনি কিন্তু।
যখন এককেবারে হাওয়া হয়ে যাবো, তখন কেবল
দুহাত ভরে লাল গোলাপ দিলে,
গোলাপের কোনও আলাদা অর্থ কী করে করি!
গোলাপ তো আজকাল যে কেউ হামেশাই যে কাউকে দিচ্ছে, কেবল দিতে হয় বলেই।
আমি কিন্তু অপেক্ষা করছিলাম, কিছু বলো কি না
কিছু বলোনি।
মনে মনেও বলো কিনা দেখছিলাম,
তাও বলোনি।
কেন?
বয়স হলে বুঝি ভালোবাসতে নেই
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1959
|
3449
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রলাপ ৩
|
প্রেমমূলক
|
আয় লো প্রমদা! নিঠুর ললনে
বার বার বল্ কী আর বলি!
মরমের তলে লেগেছে আঘাত
হৃদয় পরাণ উঠেছে জ্বলি!
আর বলিব না এই শেষবার
এই শেষবার বলিয়া লই
মরমের তলে জ্বলেছে আগুন
হৃদয় ভাঙিয়া গিয়াছে সই!
পাষাণে গঠিত সুকুমার ফুল!
হুতাশনময়ী দামিনী বালা!
অবারিত করি মরমের তল
কহিব তোরে লো মরম জ্বালা!
কতবার তোরে কহেছি ললনে!
দেখায়েছি খুলে হৃদয় প্রাণ!
মরমের ব্যথা,হৃদয়ের কথা,
সে-সব কথায় দিস্ নি কান।
কতবার সখি বিজনে বিজনে
শুনায়েছি তোরে প্রেমের গান,
প্রেমের আলাপক প্রেমের প্রলাপ
সে-সব প্রলাপে দিস্ নি কান!
কতবার সখি! নয়নের জল
করেছি বর্ষণ চরণতলে!
প্রতিশোধ তুই দিস্ নিকো তার
শুধু এক ফোঁটা নয়নজলে!
শুধা ওলো বালা! নিশার আঁধারে
শুধা ওলো সখি! আমার রেতে
আঁখিজল কত করেছে গোপন
মর্ত্য পৃথিবীর নয়ন হতে!
শুধা ওলো বালা নিশার বাতাসে
লুটিতে আসিয়া ফুলের বাস
হৃদয়ে বহন করেছে কিনা সে--
নিরাশ প্রেমীর মরম শ্বাস!
সাক্ষী আছ ওগো তারকা চন্দ্রমা!
কেঁদেছি যখন মরম শোকে--
হেসেছে পৃথিবী, হেসেছে জগৎ
কটাক্ষ করিয়া হেসেছে লোকে!
সহেছি সে-সব তোর তরে সখি!
মরমে মরমে জ্বলন্ত জ্বালা !
তুচ্ছ করিবারে পৃথিবী জগতে
তোমারি তরে লো শিখেছি বালা!
মানুষের হাসি তীব্র বিষমাখা
হৃদয় শোণিত করেছে ক্ষয়!
তোমারি তরে লো সহেছি সে-সব
ঘৃণা উপহাস করেছি জয়!
কিনিতে হৃদয় দিয়েছি হৃদয়
নিরাশ হইয়া এসেছি ফিরে;
অশ্রু মাগিবারে দিয়া অশ্রুজল
উপেক্ষিত হয়ে এয়েছি ফিরে।
কিছুই চাহি নি পৃথিবীর কাছে-
প্রেম চেয়েছিনু ব্যাকুল মনে।
সে বাসনা যবে হল না পূরণ
চলিয়া যাইব বিজন বনে!
তোর কাছে বালা এই শেষবার
ফেলিল সলিল ব্যাকুল হিয়া
ভিখারি হইয়া যাইব লো চলে
প্রেমের আশায় বিদায় দিয়া !
সেদিন যখন ধন, যশ, মান,
অরির চরণে দিলাম ঢালিসেইদিন আমি ভেবেছিনু মনে
উদাস হইয়া যাইব চলি।
তখনো হায় রে একটি বাঁধনে
আবদ্ধ আছিল পরাণ দেহ।
সে দৃঢ় বাঁধন ভেবেছিনু মনে
পারিবে না আহা ছিঁড়িতে কেহ!
আজ ছিঁড়িয়াছে, আজ ভাঙিয়াছে,
আজ সে স্বপন গিয়াছে চলি।
প্রেম ব্রত আজ করি উদ্যাপন
ভিখারি হইয়া যাইব চলি!
পাষাণের পটে ও মূরতিখানি
আঁকিয়া হৃদয়ে রেখেছি তুলি
গরবিনি! তোর ওই মুখখানি
এ জনমে আর যাব না ভুলি!
মুছিতে নারিব এ জনমে আর
নয়ন হইতে নয়নবারি
যতকাল ওই ছবিখানি তোর
হৃদয়ে রহিবে হৃদয় ভরি।
কী করিব বালা মরণের জলে
ওই ছবিখানি মুছিতে হবে!
পৃথিবীর লীলা ফুরাইবে আজ,
আজিকে ছাড়িয়া যাইব ভবে!
এ ভাঙা হৃদয় কত সবে আর!
জীর্ণ প্রাণ কত সহিবে জ্বালা!
মরণের জল ঢালিয়া অনলে
হৃদয় পরাণ জুড়াল বালা!
তোরে সখি এত বাসিতাম ভালো
খুলিয়া দেছিনু হৃদয়তল
সে-সব ভাবিয়া ফেলিবি না বালা
শুধু এক ফোঁটা নয়ন জল?
আকাশ হইতে দেখি যদি বালা
নিঠুর ললনে! আমার তরে
এক ফোঁটা আহা নয়নের জল
ফেলিস্ কখনো বিষাদভরে!
সেই নেত্রজলে-- এক বিন্দু জলে
নিভায়ে ফেলিব হৃদয় জ্বালা!
প্রদোষে বসিয়া প্রদোষ তারায়
প্রেম গান সুখে করিব বালা!
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prolap-3/
|
3813
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রাজবিচার
|
নীতিমূলক
|
বিপ্র কহে, রমণী মোর আছিল যেই ঘরে
নিশীথে সেথা পশিল চোর ধর্মনাশ-তরে।
বেঁধেছি তারে, এখন কহো চোরে কী দেব সাজা।'
'মৃত্যু' শুধু কহিলা তারে রতনরাও রাজা।
ছুটিয়া আসি কহিল দূত, 'চোর সে যুবরাজ--
বিপ্র তাঁরে ধরেছে রাতে, কাটিল প্রাতে আজ।
ব্রাহ্মণেরে এনেছি ধরে, কী তারে দিব সাজা?'
'মুক্তি দাও' কহিলা শুধু রতনরাও রাজা।৪ কার্তিক, ১৩০৬
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rajbichar/
|
5643
|
সুকুমার রায়
|
পাগলা দাশু
|
হাস্যরসাত্মক
|
আমাদের স্কুলের যত ছাত্র তাহাদের মধ্যে এমন কেহই ছিল না, যে পাগলা দাশুকে না চিনে। যে লোক আর কাহাকেও জানে না, সেও সকলের আগে দাশুকে চিনিয়া ফেলে। সেবার এক নতুন দারোয়ান আসিল, একেবারে আন্কোরা পাড়াগেঁয়ে লোক, কিন্তু প্রথম যখন সে পাগলা দাশুর নাম শুনিল, তখনই আন্দাজে ঠিক করিয়া লইল যে, এই ব্যক্তিই পাগলা দাশু। কারণ মুখের চেহারায়, কথাবার্তায়, চাল-চলনে বোঝা যাইত যে তাহার মাথায় একটু 'ছিট' আছে। তাহার চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি অনাবশ্যক রকমের বড়, মাথায় একবস্তা ঝাঁকড়া চুল। চেহারাটা দেখিলেই মনে হয়—
ক্ষীণদেহ খর্বকায় মুণ্ডু তাহে ভারি
যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারি।সে যখন তাড়াতাড়ি চলে অথবা ব্যস্ত হইয়া কথা বলে, তখন তাহার হাত পা ছোঁড়ার ভঙ্গী দেখিয়া হঠাৎ কেন জানি চিংড়িমাছের কথা মনে পড়ে।সে যে বোকা ছিল তাহা নয়। অঙ্ক কষিবার সময়, বিশেষত লম্বা লম্বা গুণ-ভাগের বেলায় তাহার আশ্চর্য মাথা খুলিত। আবার এক এক সময় সে আমাদের বোকা বানাইয়া তামাশা দেখিবার জন্য এমন সকল ফন্দি বাহির করিত যে, আমরা তাহার বুদ্ধি দেখিয়া অবাক হইয়া থাকিতাম।'দাশু' অর্থাৎ দাশরথি, যখন প্রথম আমাদের ইস্কুলে ভরতি হয়, তখন জগবন্ধুকে আমাদের 'ক্লাশের ভালো ছেলে' বলিয়া সকলে জানিত। সে পড়াশোনায় ভালো হইলেও, তাহার মতো অমন একটি হিংসুটে ভিজেবেড়াল আমরা আর দেখি নাই। দাশু একদিন জগবন্ধুর কাছে কি একটা ইংরাজি কথার মানে জিজ্ঞাসা করিতে গিয়াছিল। জগবন্ধু তাহাকে খামখা দুকথা শুনাইয়া বলিল, "আমার বুঝি আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই ? আজ একে ইংরাজি বোঝাব, কাল ওর অঙ্ক কষে দেব, পরশু আর একজন আসবেন আর এক ফরমাইস নিয়ে— ঐ করি আর কি !" দাশু সাংঘাতিক চটিয়া বলিল, "তুমি তো ভারি ছ্যাঁচড়া ছোটলোক !" জগবন্ধু পণ্ডিত মশায়ের কাছে নালিশ করিল, "ঐ নতুন ছেলেটা আমায় গালাগালি দিচ্ছে।" পণ্ডিত মহাশয় দাশুকে এমনি ধমক দিয়া দিলেন যে বেচারা একেবারে দমিয়া গেল।আমাদের ইংরাজি পড়াইতেন বিষ্টুবাবু। জগবন্ধু তাঁহার প্রিয় ছাত্র। পড়াইতে পড়াইতে যখনই তাঁহার বই দরকার হয়, তিনি জগবন্ধুর কাছে বই চাহিয়া লন। একদিন তিনি পড়াইবার সময় 'গ্রামার' চাহিলেন, জগবন্ধু তাড়াতাড়ি তাহার সবুজ কাপড়ের মলাট দেওয়া 'গ্রামার' খানা বাহির করিয়া দিল। মাস্টার মহাশয় বইখানি খুলিয়াই হঠাৎ গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "বইখানা কার ?" জগবন্ধু বুক ফুলাইয়া বলিল, "আমার"। মাস্টার মহাশয় বলিলেন, "হুঁ— নতুন সংস্করণ বুঝি ? বইকে-বই একেবারে বদলে গেছে।" এই বলিয়া তিনি পড়িতে লাগিলেন— 'যশোবন্ত দারোগা— লোমহর্ষক ডিটেকটিভ নাটক।' জগবন্ধু ব্যাপারখানা বুঝিতে না পারিয়া বোকার মতো তাকাইয়া রহিল। মাস্টার মহাশয় বিকট রকম চোখ পাকাইয়া বলিলেন, "এই সব জ্যাঠামি বিদ্যে শিখছ বুঝি ?" জগবন্ধু আম্তা আম্তা করিয়া কি যেন বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু মাস্টার মহাশয় এক ধমক দিয়া বলিলেন, "থাক্ থাক্, আর ভালমানুষি দেখিয়ে কাজ নেই— ঢের হয়েছে।" লজ্জায় অপমানে জগবান্ধুর দুই কান লাল হইয়া উঠিল— আমরা সকলেই তাহাতে বেশ খুশি হইলাম। পরে জানা গেল যে, এটিও দাশু ভায়ার কীর্তি, সে মজা দেখিবার জন্য উপক্রমণিকার জায়গায় ঠিক ঐরূপ মলাট দেওয়া একখানা বই রাখিয়া দিয়াছিল।দাশুকে লইয়া আমরা সর্বদাই ঠাট্টাতামাশা করিতাম এবং তাহার সামনেই তাহার বুদ্ধি ও চেহারা সম্বন্ধে অপ্রীতিকর সমালোচনা করিতাম। তাহাতে একদিনও তাহাকে বিরক্ত হইতে দেখি নাই। এক এক সময়ে সে নিজেই আমাদের মন্তব্যের উপর রঙ চড়াইয়া নিজের সম্বন্ধে নানারকম অদ্ভুত গল্প বলিত। একদিন সে বলিল, "ভাই, আমাদের পাড়ায় যখন কেউ আমসত্ত্ব বানায় তখনই আমার ডাক পড়ে। কেন জানিস ?" আমরা বলিলাম, "খুব আমসত্ত্ব খাস বুঝি ?" সে বলিল, "তা নয়। যখন আমতত্ত্ব শুকোতে দেয়, আমি সেইখানে ছাদের উপর বার দুয়েক চেহারাখানা দেখিয়ে আসি। তাতেই, ত্রিসীমানার যত কাক সব ত্রাহি ত্রাহি করে ছুটে পালায় কাজেই আর আমসত্ত্ব পাহারা দিতে হয় না।"একবার সে হঠাৎ পেন্টেলুন পরিয়া স্কুলে হাজির হইল। ঢল্ঢলে পায়জামার মতো পেন্টেলুন আর তাকিয়ার খোলের মতো কোট পরিয়া তাহাকে যে কিরূপ অদ্ভুত দেখাইতেছিল, তাহা সে নিজেই বুঝিতেছিল এবং তাহার কাছে ভারি একটা ব্যাপার বলিয়া বোধ হইতেছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, "পেন্টেলুন পরেছিস্ কেন ?" দাশু এক গাল হাসিয়া বলিল, "ভালো ইংরাজি শিখব ব'লে।" আর একবার সে খামখা নেড়া মাথায় এক পট্টি বাঁধিয়া ক্লাশে আরম্ভ করিল এবং আমরা সকলে তাহা লইয়া ঠাট্টা তামাশা করায় যারপরনাই খুশি হইয়া উঠিল। দাশু আদপেই গান গাহিতে পারে না, তাহার যে তালজ্ঞান বা সুরজ্ঞান একেবারে নাই, একথা সে বেশ জানে। তবু সেবার ইনস্পেক্টার সাহেব যখন ইস্কুল দেখিতে আসেন, তখন আমাদের খুশি করিবার জন্য চিৎকার করিয়া গান শুনাইয়াছিল। আমরা কেহ ওরূপ করিলে সেদিন রীতিমত শাস্তি পাইতাম, কিন্তু দাশু 'পাগলা' বলিয়া তাহার কোনো শাস্তি হইল না।একবার ছুটির পরে দাশু অদ্ভুত এক বাক্স লইয়া ক্লাসে হাজির হইল। মাস্টার মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, "কি দাশু, ও বাক্সের মধ্যে কি আছে ?" দাশু বলিল, "আজ্ঞে, আমার জিনিসপত্র।" জিনিসপত্রটা কিরূপ হইতে পারে, এই লইয়া আমাদের মধ্যে বেশ একটা তর্ক হইয়া গেল। দাশুর সঙ্গে বই, খাতা, পেনসিল, ছুরি সবই তো আছে, তবে আবার জিনিসপত্র কি বাপু? দাশুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, সে সোজাসুজি কোনো উত্তর না দিয়া বাক্সটিকে আঁকড়াইয়া ধরিল এবং বলিল, "খবরদার, আমার বাক্স তোমরা কেউ ঘেঁটো না।" তাহার পর চাবি দিয়া বাক্সটাকে একটুখানি ফাঁক করিয়া, সে তাহার ভিতর দিয়া কি যেন দেখিল, এবং 'ঠিক আছে' বলিয়া গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া বিড় বিড় করিয়া হিসাব করিতে লাগিল। আমি একটুখানি দেখিবার জন্য উঁকি মারিতে গিয়াছিলাম— অমনি পাগলা মহা ব্যস্ত হইয়া তাড়াতাড়ি চাবি ঘুরাইয়া বাক্স বন্ধ করিয়া ফেলিল।ক্রমে আমাদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আরম্ভ হইল। কেহ বলিল, "ওটা ওর টিফিনের বাক্স— ওর মধ্যে খাবার আছে।" কিন্তু একদিনও টিফিনের সময় তাহাকে বাক্স খুলিয়া কিছু খাইতে দেখিলাম না। কেহ বলিল, "ওটা বোধ হয় ওর মানি-ব্যাগ— ওর মধ্যে টাকা পয়সা আছে, তাই ও সর্বদা কাছে কাছে রাখতে চায়। আর একজন বলিল, "টাকা পয়সার জন্য অত বড় বাক্স কেন ? ও কি ইস্কুলে মহাজনী কারবার খুলবে নাকি ?"একদিন টিফিনের সময় দাশু হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া, বাক্সের চাবিটা আমার কাছে রাখিয়া গেল আর বলিল, "ওটা এখন তোমার কাছে রাখো, দেখো হারায় না যেন। আর আমার আসতে যদি একটু দেরি হয়, তবে তোমরা ক্লাশে যাবার আগে ওটা দারোয়ানের কাছে দিও।" এই বলিয়া বাক্সটি দারোয়ানের জিম্মায় রাখিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমাদের উৎসাহ দেখে কে! এতদিনে সুবিধা পাওয়া গিয়াছে, এখন দারোয়ানটা একটু তফাৎ গেলেই হয়। খানিক বাদে দারোয়ান তাহার রুটি পাকাইবার লোহার উনানটি ধরাইয়া, কতকগুলি বাসনপত্র লইয়া কলতলার দিকে গেল। আমরা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, দারোয়ান আড়াল হওয়া মাত্র, আমরা পাঁচ-সাতজনে তাহার ঘরের কাছে সেই বাক্সের উপর ঝুঁকিয়া পড়িলাম। তাহার পর আমি চাবি দিয়া বাক্স খুলিয়া দেখি বাক্সের মধ্যে বেশ ভারি একটা কাগজের পোঁটলা ন্যাকড়ার ফালি দিয়া খুব করিয়া জড়ানো। তাড়াতাড়ি পোঁটলার প্যাঁচ খুলিয়া দেখা গেল, তাহার মধ্যে একখানা কাগজের বাক্স— তাহার ভিতর আর একটা ছোট পোঁটলা। সেটি খুলিয়া একখানা কার্ড বাহির হইল, তাহার এক পিঠে লেখা, 'কাঁচকলা খাও' আর একটি পিঠে লেখা 'অতিরিক্ত কৌতুহল ভালো নয়।' দেখিয়া আমরা এ-উহার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলাম। সকলের শেষে একজন বলিয়া উঠিল, "ছোকরা আচ্ছা যা হোক, আমাদের বেজায় ঠকিয়েছে।" আর একজন বলিল, "যেমন ভাবে বাঁধা ছিল তেমনি করে রেখে দাও, সে যেন টেরও না পায় যে আমরা খুলেছিলাম। তাহলে সে নিজেই জব্দ হবে।" আমি বলিলাম, "বেশ কথা। ও আস্লে পরে তোমরা খুব ভালোমানুষের মতো বাক্সটা দেখাতে বলো আর ওর মধ্যে কি আছে, সেটা বার বার করে জানতে চেয়ো।" তখন আমরা তাড়াতাড়ি কগজপত্রগুলি বাঁধিয়া, আগেকার মতো পোঁটলা পাকাইয়া বাক্সে ভরিয়া ফেলিলাম।বাক্সে চাবি দিতে যাইতেছি, এমন সময় হো হো করিয়া একটা হাসির শব্দ শোনা গেল— চাহিয়া দেখি পাঁচিলের উপরে বসিয়া পাগলা দাশু হাসিয়া কুটিকুটি। হতভাগা এতক্ষণ চুপি চুপি তামাশা দেখিতেছিল। তাখন বুঝিলাম আমার কাছে চাবি দেওয়া, দারোয়ানের কাছে বাক্স রাখা, টিফিনের সময় বাহিরে যাওয়ার ভান করা এ সমস্ত তাহার শয়তানি। খামখা আমাদের আহাম্মক বানাইবার জন্যই সে মিছিমিছি এ কয়দিন ক্রমাগত একটা বাক্স বহিয়া বেড়াইতেছে।সাধে কি বলি 'পাগলা দাশু ?'
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/pagla-dsahu/
|
2363
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মধুকর
|
সনেট
|
শুনি গুন গুন ধ্বনি তোর এ কাননে,
মধুকর,এ পরাণ কাঁদে রে বিষাদে!
ফুল-কুল-বধূ-দলে সাধিস্ যতনে
অনুক্ষণ,মাগি ভিক্ষা অতি মৃদু নাদে,
তুমকী বাজায়ে যথা রাজার তোরণে
ভিখারী,কি হেতু তুই?ক মোরে,কি সাদে
মোমের ভাণ্ডারে মধু রাখিস্ গোপনে,
ইন্দ্র যথা চন্দ্রলোকে,দানব-বিবাদে
সুধামৃত?এ আয়াসে কি সুফল ফলে?
কৃপণের ভাগ্য তোর!কৃপণ যেমতি
অনাহারে,অনিদ্রায়,সঞ্চয়ে বিকলে
বৃথা অর্থ;বিধি-বশে তোর সে দুর্গতি!
গৃহ-চ্যুত করি তোরে,লুটি লয় বলে
পর জন পরে তোর শ্রমের সঙ্গতি!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/modhukor/
|
1976
|
বিনয় মজুমদার
|
সময়ের সাথে এক বাজি ধরে
|
প্রেমমূলক
|
সময়ের সাথে এক বাজি ধরে পরাস্ত হয়েছি ।
ব্যর্থ আকাঙ্খায়, স্বপ্নে বৃষ্টি হয়ে মাটিতে যেখানে
একদিন জল জমে, আকাশ বিস্বিত হয়ে আসে
সেখানে সত্বর দেখি ,মশা জন্মে; অমল প্রতূষে
ঘুম ভেঙ্গে দেখা যায় ; আমাদের মুখের ভিতর
স্বাদ ছিল, তৃপ্তি ছিল জে সব আহার্য প’চে
ইতিহাস সৃষ্টি করে; সুখ ক্রমে ব্যথা হয়ে উঠে ।
অঙ্গুরীয় নীল পাথরের বিচ্ছুরিত আলো
অনুষ্ণো অনির্বাণ , জ্বলে যায় পিপাসার বেগে
ভয় হয় একদিন পালকের মত ঝরে যাব ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4042.html
|
3515
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বরষে বরষে শিউলিতলায়
|
রূপক
|
বরষে বরষে শিউলিতলায়
ব’স অঞ্জলি পাতি,
ঝরা ফুল দিয়ে মালাখানি লহ গাঁথি
এ কথাটি মনে জান’—
দিনে দিনে তার ফুলগুলি হবে মান,
মালার রূপটি বুঝি
মনের মধ্যে রবে কোনোখানে
যদি দেখ তারে খুঁজি।সিন্দুকে রহে বন্ধ,
হঠাৎ খুলিলে আভাসেতে পাও
পুরানো কালের গন্ধ। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boroshe-boroshe-shiulitolai/
|
1762
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আত্মচরিত ০৪
|
চিন্তামূলক
|
নতজানু হয়ে কারো পদতলে বসি, ইচ্ছে করে
অকপটে সব কথা তার সাথে বলাবলি হোক।
খুলে দিই কপাটের খিল
পর্দার আড়াল, ঘন বনবীথি ছায়া, ভিজে ছায়া
নোনাধরা পুরনো পাঁচিন
দেয়ালে কামড়ে থাকা সুপ্রাচীন ঘন অন্ধকার
স্যাঁতলার নানাবিধ মুখভঙ্গী, ফাটলের দাগ
তেল ও জলের দাগ, পান পিক, পিপাসার দাগ
সব চিহ্ন, সব ছারখার
সমস্ত গোপন দুঃখ শোক
অকপটে বলাবলি হোক।
আমাদের কতটুকু প্রয়োজন ছিল পৃথিবীর?
নিজস্ব জননী ছাড়া আমরা কি আর কারও সাধের সন্তান?
আর কারও প্রিয় প্রয়োজন?
সদ্ভাবে ও স্নেহে কারো ভ্রাতা?
আমরা অসুস্থ হলে কোনখানে খুঁজে পাব ত্রাতা?
অবশ্য এ পৃথিবীর বহু জল, মাটি, ধুলো, রোদ, বৃষ্টি, ঘাস
টেনে ছিঁড়ে লুটেপুটে আমরা করেছি ক্ষয়, অপচয় গ্রাস।
তখন ধারণা ছিল আমাদেরই করতলে ভুবনের সব চাষ-বাস।
পৃথিবীর বুকের ভিতরে
উজ্জয়িনী আরেক পৃথিবী
আমাদেরই গড়ে দিতে হবে চমৎকার।
আরেক রকম দেশ, রাজধানী, সমৃদ্ধ নগর
আটচালা, পাঠশালা, স্কুল
খালে জল, মাঠে ধান, ব্রীজ, সাঁকো, বিদ্যুৎ, বাজার
স্টেশনের ডান দিকে শিরীষ গাছের ডালে লুটোপুটি ফুল
উৎসবের মতো দিন
মন্ত্রোচ্চারণের মতো মানুষের মুগ্ধ কন্ঠস্বর
সারা ভু-মণ্ডল জুড়ে একখানি ঘর।
মাটির আঁতুড় ঘরে জন্মলগ্নে ছিল ম্লান প্রদীপের শিখা
আকাশে জ্যোৎস্নার অহমিকা।
শৈশবে ছিল না রথ
ছিল রুক্ষ, রুঢ় তেপান্তর
শৈশবেই জেনে গেছি ঝড়ে ওড়ে কতখানি খড়
ক’খানা সংসার ভাসে কোটালের বানে।
কারা ভাত খাবে বলে কারা ধান ভানে।
অনেক ভিখারী ছিল পথে পথে, কালো কালো হাত
চর্তুর্দিকে হাতড়ায়, যদি পায় কোনখানে সুখের সাক্ষাৎ।
অনেক ভিখারী ছিল, তারা ভিন্ন লোক
ভিন্ন ক্ষুধা, ভিন্নতর সন্ধান ও শোক
ভিন্ন প্রতিজ্ঞায় তারা বেঁধেছিল হাতে রক্তরাখী
যতক্ষণ স্বাধীনতা বাকি
ততক্ষণ রণ।
মৃত্যুতে মহিমাময় হয়ে গেছে তাদের জীবন।
সেই সব মৃত্যুঞ্জয়ী ভিখারীর বংশধরগণ
আজ সোফা, সিগারেট, এয়ারকুলার, সিমেন্টের
সুগন্ধী সেন্টের,
পেট্রোলের, ইনকাম ট্র্যাক্সের দুমুখো খাতায়
অম্লান, অপরিসীম কত সুখ পায়।
বহু সুখী দৃশ্যপট দেখা হল, বহু গৌরবের
মানুষও গাছের মতো কত গন্ধ ছড়ানো আকাশে
গ্রহে, উপগ্রহে, শুন্যে, মহাশুন্যে মরুভুমিতলে
কল্পনার, কৃতিত্বের সার্থকতা আর সৌরভের।
কত রক্তপাতময় দৃশপটও দেখা হল বিমুঢ় লজ্জায়।
হাড়ের ভিতর দিয়ে ছুটে গেল চুরি
স্বাভাবিক মানবতা তামার তারের মতো রোজই হল চুরি।
কত ট্রেন থেমে গেল অনাদৃত, অজ্ঞাত স্টেশনে।
অচরিতার্থতাবোধ প্রসব ব্যথার মতো রয়ে গেল স্থির
মানুষের চেতনার গর্ভের আঁধারে।
আমার সকলই আছে জামা জুতো, ছাতা, টেরিলিন
মেডেল ও মেডেলকে ঝোলাবার সরু সেফটিপিন
মাসান্তে মাসান্তে পে-প্যাকেট
তাতে কেনা হয়ে যায় গ্রীষ্মের বাতাবিলেবু, শীতের জ্যাকেট।
ভিখারীর হাত পেতে আরও কিছু পেয়ে যাই একানি দুয়ানি
বিভিন্ন দয়ালু ব্যক্তি ছুঁয়ে দেয় ছেঁড়া কাঁথাকানি।
নিজের ঘামের নুনও চেটে খাই, পরিতৃপ্ত গাল,
বাহিরে যে থাকে সে তো অসি’সার আজন্ম কাঙাল।
বাহিরে ভিখারী কিন্তু সম্রাট রয়েছে অভ্যন্তরে
লুব্ধ চুরি রক্তে খেলা করে।
উচ্চাকাঙ্খী আঙ্গুলের গাঁটে গাঁটে ছিনতায়ের লোভ
পান থেকে চুন গেলে প্রচণ্ড বিক্ষোভ।
যে দিকে সুন্দর আছে, সুষমামন্ডিত শিল্পলোক
যে দিকে নদীর মুখ, পর্বত চুড়ার অভ্যুদয়
ঊর্ধ্বলোক চিনে নিয়ে যে-দৃষ্টিভঙ্গিতে বীজ বনস্পতি হয়
যে সিন্দুকে ভরা আছে পূর্বপুরুষের রাত্নাগার
যে ওষ্ঠের মন্ত্রপাঠে ধ্রুবপদ বাজে বারবার
বাতাসকে গন্ধ দেয় যে সকল আত্ম ও শরীর
সব চাই, সব তার চাই
আগুনের সব শিখ, সব দগ্ধ ছাই।
কাকে পাপ বলে আমি জানি
কাকে পুণ্যজল বলে জানি
মুকুটের কাঁটা কয়খানি।
অভিজ্ঞতায় বৃদ্ধ, আবেগে বালক,
জাত গোত্রহীন হয়ে ভেসে আছি সময়ের নাড়ীর ভিতরে
উলঙ্গ পালক।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1226
|
2740
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমি হেথায় থাকি
|
ভক্তিমূলক
|
আমি হেথায় থাকি শুধু
গাইতে তোমার গান,
দিয়ো তোমার জগৎসভায়
এইটুকু মোর স্থান।
আমি তোমার ভুবন-মাঝে
লাগি নি নাথ, কোনো কাজে–
শুধু কেবল সুরে বাজে
অকাজের এই প্রাণ।নিশায় নীরব দেবালয়ে
তোমার আরাধন,
তখন মোরে আদেশ কোরো
গাইতে হে রাজন্।
ভোরে যখন আকাশ জুড়ে
বাজবে বীণা সোনার সুরে
আমি যেন না রই দূরে
এই দিয়ো মোর মান।১৬ ভাদ্র, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ami-hethay-thaki/
|
5650
|
সুকুমার রায়
|
বর্ষ গেল বর্ষ এল
|
প্রকৃতিমূলক
|
বর্ষ গেল বর্ষ এল গ্রীষ্ম এলেন বাড়ি-
পৃথ্বী এলেন চক্র দিয়ে এক বছরের পাড়ি ।
সত্যিকারের এই পৃথিবীর বয়স কেবা জানে,
লক্ষ হাজার বছর ধরে চল্ছে একই টানে ।
আপন তালে আকাশ পথে আপনি চলে বেগে,
গ্রীষ্মকালের তপ্তরোদে বর্ষাকালের মেঘে,
শরৎকালের কান্নাহাসি হাল্কা বাদল হাওয়া,
কুয়াশা-ঘেরা পর্দা ফেলে হিমের আসা যাওয়া-
শীতের শেষে রিক্ত বেশে শূন্য করে ঝুলি,
তার প্রতিশোধ ফুলে ফলে বসন্তে লয় তুলি ।
না জানি কোন নেশার ঝোঁকে যুগযুগান্ত ধরে,
ছয়টি ঋতু দ্বারে দ্বারে পাগল হয়ে ঘোরে !
না জানি কোন ঘূর্ণীপাকে দিনের পর দিন,
এমন ক'রে ঘোরায় তারে নিদ্রাবিরামহীন !
কাঁটায় কাঁটায় নিয়ম রাখে লক্ষযুগের প্রথা,
না জানি তার চাল চলনের হিসাব রাখে কোথা !
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/borsha-gelo-borsha-elo/
|
2473
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
কর্ষণনামা
|
প্রেমমূলক
|
তুমি জানো ভালো করে, কর্ষণের শেষ আছে কিনা
আরো ভালো জানো তুমি, কী চেয়েছো প্রেম না-কি ঘৃণা
আমিতো কিছুই নই, বর্গাচাষী ক্ষেত্রের মজুর
সজোরে বিঁধিয়ে ফাল চাষ করি ক্ষেত্র যত দূর
তুমি জানো কতো বার ঘোরে সীতা, কি তোমার সীমা
কী বীজ বোনাতে চাও কিসে বাড়ে তোমার মহিমাতুমি জানো কে তোমার কর্ষিত এ ক্ষেত্রের মালিক
যে বীজ বোনাবে তাও খেয়ে যাবে সে কোন শালিক
কর্ষণেই সুখ যদি সেও শুধু একা জানো তুমি
আমার সুখের কথা না জানে তো না জানুক ভূমীআমারো তা নিয়ে কোনো খেদ নেই, নেই আন্দোলন
যতোই শুনি না কেন উর্বরা সে ক্ষেত্রের ক্রন্দন
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/korshonnama/
|
4008
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্বার্থ
|
সনেট
|
কে রে তুই, ওরে স্বার্থ, তুই কতটুকু,
তোর স্পর্শে ঢেকে যায় ব্রহ্মান্ডের মুখ,
লুকায় অনন্ত সত্য—স্নেহ সখ্য প্রীতি
মুহূর্তে ধারণ করে নির্লজ্জ বিকৃতি,
থেমে যায় সৌন্দর্যের গীতি চিরন্তন
তোর তুচ্ছ পরিহাসে। ওগো বন্ধুগণ,
সব স্বার্থ পূর্ণ হোক। ক্ষুদ্রতম কণা
ভান্ডারে টানিয়া আনো—কিছু ত্যজিয়ো না।
আমি লইলাম বাছি চিরপ্রেমখানি,
জাগিছে যাহার মুখে অনন্তর বাণী
অমৃতে অশ্রুতে মাখা। মোর তরে থাক্
পরিহাস্য পুরাতন বিশ্বাস নির্বাক্।
থাক্ মহাবিশ্ব, থাক্ হৃদয়-আসীনা
অন্তরের মাঝখানে যে বাজায় বীণা। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shartho/
|
4719
|
শামসুর রাহমান
|
জনপথ লেখে
|
মানবতাবাদী
|
ঝেড়ে ফেলে দিতে দেশজোড়া
অনড় পাথর
শুধু রাজধানী নয়, আমাদের প্রতিটি শহর
এবং শহরতলী গ্রাম
ক্রুদ্ধ মানুষের কপালের
শিরার ধরনে করে দপ দপ। কখনো দেখিনি,
তবু তোমাদের কথা ভেবে
আমাদের হৃদয়ের চোখে অশ্রধারা বয়,
স্ফীত হয় বুক। তোমাদের বুক থেকে
রক্তের ঝলক এই মানচিত্রটিকে
আরো বেশি রক্তজবাময় করে তোলে।
এবং শহরতলী, গ্রাম
অধিক পবিত্র হয় তোমাদের অন্তিম নিঃশ্বাসে।দুপুর কী এক সুর দিয়েছিলো বুনে
তোমাদের বুকে, সে সুরের সম্মোহনে
বুক দিলে পেতে দ্বিধাহীন শয়তানের হাতের
মতো বন্দুকের মুখে। ব্যারিকেডে, তেতে-ওঠা পিচে,
দেয়ালে, দিগন্তে যেন পুনরায় লাগে
মুক্তিযোদ্ধাদের তাজা শোণিতের ছাপ।
তোমরা যখন শীতদুপুরে রাস্তায়
মৃত্যুর গহ্বরে, হায়, হচ্ছিলে বিলীন,
তখনই তোমরা আরো বেশি উঠলে বেঁচে
স্বদেশের স্পন্দিত হৃদয়ে। তোমাদের জীবনের
শেষ সুর্যাস্তের আভা, দ্যাখো,
আনে আজকের সূর্যোদয়।কবির কলম নয়, রঙধনু দিয়ে
জনপথ লেখে তোমাদের এপিটাফ;
সূর্যরশ্মি দিয়ে
জনপথ লেখে তোমাদের স্মৃতিময় জয়গাথা। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jonpoth-lekhe/
|
1494
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
পাড়ি
|
প্রেমমূলক
|
মহাত্মা গান্ধীর মতো ভালোবাসা পাড়ি দিচ্ছে সময়ের নড়বড়ে সাঁকো।
আমি তাকে হাত ধরে পরান সখার মতো নিয়ে যাচ্ছি নদীর ওপারে।
স্রোতস্বিনীর জলে কাঁপিতেছে দুু’জনের ছায়া, ভালোবাসা এবং আমার।
তুমি শুধু দূরে বসে আমাদের পার হওয়া দেখো, কর্ত্যব্য করো না।
নীলাঞ্জনে ঢেউ ওঠে, সাঁকোর নিজের জলে জলোচ্ছ্বাসে কুঞ্জ ভেসে যায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/pari/
|
4207
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
কঠিন অনুভব
|
চিন্তামূলক
|
চারধারে তার উপঢৌকন, কিন্তু আছে স্থির,
দুহাত মুঠিবদ্ধ কিন্তু ভিতরে অস্থির।
কেউ তাকে দ্যাখেনি হতে, উচিত ভেবে সব
ফিরিয়ে দিল, তার ছিলো এক কঠিন অনুভব।
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/kothin-onubhob/
|
2159
|
মহাদেব সাহা
|
তাহলে কি ঢেকে যাবে পৃথিবীর মুখ
|
রূপক
|
এই শতকের শেষে নামে শৈত্য, হিমপ্রবাহ এখানে
এশিয়া ও ইওরোপ কাঁপে শীতে, বৃক্ষপত্র ঝরে যায়
ইতিহাস থেকে টুপটাপ খরেস পড়ে পাতা;
এই ভয়ানক দুঃসময়ে কার দিকে বাড়াই বা হাত
বন্ধুরাই শত্রু এখন, হৃদয়েও জমেছে বরফ।
পরফে পড়েছে ঢাকা বার্চবন, তৃনভূমি, বার্লিনের ব্যতিত আকাশ,
মানুষের কীর্তিস্তম্ভ, মানবিক প্রীতি-ভালোবাসা-
অনেক আগেই ঢাকা পড়ে গেছে মূল্যবোধ নামক অধ্যায়,
অবশেষে বিম্বাস ও সাহসের জাহাজটি বরফে আটকে গেছে দূরে।
তাহলে কি পৃথিবীর মানচিত্রই ক্রমশ ঢেকে যাবে উত্তাল বরফে,
ঢেকে যাবে পৃথিবীর চোখ, মুখ, মাথা?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/369
|
1170
|
জীবনানন্দ দাশ
|
যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে রবো
|
সনেট
|
যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে রবো — অন্ধকারে নক্ষত্রের নিচে
কাঁঠাল গাছের তলে হয়তো বা ধলেশ্বরী চিলাইয়ের পাশে –
দিনমানে কোনো মুখ হয়তো সে শ্মশানের কাছে নাহি আসে –
তবুও কাঁঠাল জাম বাংলার- তাহাদের ছায়া যে পড়িছে
আমার বুকের পরে — আমার মুখের পরে নীরবে ঝরিছে
খয়েরী অশথপাতাত — বইচি, শেয়ালকাঁটা আমার এ দেহ ভালোবাসে,
নিবিড় হয়েছে তাই আমার চিতার ছাইয়ে — বাংলার ঘাসে
গভীর ঘাসের গুচ্ছে রয়েছি ঘুমায়ে আমি, — নক্ষত্র নড়িছেআকাশের থেকে দূর-আরো দূর-আরো দূর-নির্জন আকাশে
বাংলার-তারপর অকারণ ঘুমে আমি পড়ে যাই ঢুলে।
আবার যখন জাগি, আমা শ্মশানচিতা বাংলার ঘাসে
ভরে আছে, চেয়ে দেখি,-বাসকের গন্ধ পাই-আনারস ফুলে
ভোমরা উড়িছে,শুনি-গুবরে পোকার ক্ষীণ গুমরানি ভাসিছে বাতাসে
রোদের দুপুর ভরে-শুনি আমি; ইহারা আমার ভালোবাসে-
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/jokhon-mrittur-ghumey-shue-robo/
|
5476
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
দিকপ্রান্তে
|
মানবতাবাদী
|
ভাঙন নেপথ্য পৃথিবীতে;
অদৃশ্য কালের শত্রু প্রচ্ছন্ন জোয়ারে,
অনেক বিপন্ন জীব ক্ষয়িষ্ণু খোঁয়াড়ে
উন্মুখ নিঃশেষে কেড়ে নিতে,
দুর্গম বিষণ্ণ শেষ শীতে।
বীভৎস প্রাণের কোষে কোষে
নিঃশব্দে ধ্বংসের বীজ নির্দিষ্ট আয়ুতে
পশেছে আঁদার রাত্রে- প্রত্যেক স্নায়ুতে;-
গোপনে নক্ষত্র গেছে খসে
আরক্তিম আদিম প্রদোষে।।
দিনের নীলাভ শেষ আলো
জানাল আসন্ন রাত্রি দুর্লক্ষ্য সংকেতে।
অনেক কাস্তের শব্দ নিঃস্ব ধানেক্ষেতে
সেই রাত্রে হাওয়ায় মিলাল;
দিক্প্রান্তে সূর্য চমকাল।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1112
|
233
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আমি হব সকাল বেলার পাখি
|
ছড়া
|
"আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম বাগে
উঠব আমি ডাকি।"সুয্যি মামা জাগার আগে
উঠব আমি জেগে,
'হয়নি সকাল, ঘুমোও এখন',
মা বলবেন রেগে।বলব আমি- 'আলসে মেয়ে
ঘুমিয়ে তুমি থাক,
হয়নি সকাল, তাই বলে কি
সকাল হবে নাক'?আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে ?
তোমার ছেলে উঠবে মা গো
রাত পোহাবে তবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/ami-hobo-sokal-belar-pakhi/
|
67
|
আবিদ আনোয়ার
|
কীর্তনের আসরে একদিন
|
প্রেমমূলক
|
আসর ভরা নারী-পুরুষ,
গাইছে ভালো শিবু কীর্তনিয়া --
বাহুলগ্ন তুমি ও আমি আবেগে আপ্লুত
শিবু যখন বিস্তারিলো রাধার পরকীয়া
হঠাৎ দেখি তোমার হাত আমার মুঠোচ্যূত!দূরের কোনো বাদাড় থেকে বুনো-ফুলের ঘ্রাণ
শুঁকতে গিয়ে চেনা গোলাপ ঠেকছিলো কি বাসি?
শিবুর সুরে শুনছিলে কি বেগানা আহ্বান?
পাশের কোনো বাড়িতে বাজে ব্রজের পোড়া বাঁশি!সেই যে কবে তোমার চোখে পদ্মদীঘি দেখে
ভেবেছিলাম এর গহীনে রত্ন আছে জমা
ডুব-সাঁতারে অতল জলে তুলতে গিয়ে একে
হাতড়ে দেখি কিছু তো নেই, ক্লেদজ নর্দমা!
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/kirtoner-ashore-ekdin/
|
1604
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
তোমাকে নয়
|
প্রেমমূলক
|
যেন কাউকে কটুবাক্য বলবার ভীষণ
প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু না, তোমাকে নয়; কিন্তু না, তোমাকে নয়।
যেন যত দুঃখ আমি পেয়েছি, এবারে
চতুর্গুণ করে তাকে ফিরিয়ে দেবার
প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু না, তোমাকে নয়; কিন্তু না, তোমাকে নয়।
দুই চক্ষু ভেসে গেল রক্তের ধারায়।
দমিত আক্রোশে খুঁড়ি নিজের পাতাল।
দ্যাখো আমি যন্ত্রণায় দাউ-দাউ আগুনে
জ্বলে যাচ্ছি, নেমে যাচ্ছি হিংসার নরকে।
যেন আত্মনিগ্রহের নরকে না-গিয়ে
সমস্ত যন্ত্রণা আজ ফিরিয়ে দেবার
প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু না, তোমাকে নয়; কিন্তু না, তোমাকে নয়…
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1657
|
3284
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নবজাতক
|
মানবতাবাদী
|
নবীন আগন্তুক,
নব যুগ তব যাত্রার পথে
চেয়ে আছে উৎসুক।
কী বার্তা নিয়ে মর্তে এসেছ তুমি;
জীবনরঙ্গভূমি
তোমার লাগিয়া পাতিয়াছে কী আসন।
নরদেবতার পূজায় এনেছ
কী নব সম্ভাষণ।
অমরলোকের কী গান এসেছ শুনে।
তরুণ বীরের তূণে
কোন্ মহাস্ত্র বেঁধেছ কটির 'পরে
অমঙ্গলের সাথে সংগ্রাম-তরে।
রক্তপ্লাবনে পঙ্কিল পথে
বিদ্বেষে বিচ্ছেদে
হয়তো রচিবে মিলনতীর্থ
শান্তির বাঁধ বেঁধে।
কে বলিতে পারে তোমার ললাটে লিখা
কোন্ সাধনার অদৃশ্য জয়টিকা।
আজিকে তোমার অলিখিত নাম
আমরা বেড়াই খুঁজি--
আগামী প্রাতের শুকতারা-সম
নেপথ্যে আছে বুঝি।
মানবের শিশু বারে বারে আনে
চির আশ্বাসবাণী--
নূতন প্রভাতে মুক্তির আলো
বুঝি-বা দিতেছে আনি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nabajatk/
|
3597
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিফল নিন্দা
|
নীতিমূলক
|
‘তোরে সবে নিন্দা করে গুণহীন ফুল’
শুনিয়া নীরবে হাসি কহিল শিমূল,
যতক্ষণ নিন্দা করে, আমি চুপে চুপে
ফুটে উঠি আপনার পরিপূর্ণ রূপে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bifol-ninda/
|
4633
|
শামসুর রাহমান
|
কোনো একজনের জন্যে
|
প্রেমমূলক
|
এতকাল ছিলাম একা আর ব্যথিত,
আহত পশুর অনুভবে ছেঁড়াখোঁড়া।
দুর্গন্ধ-ভরা গুহাহিত রাত নিস্ফল ক্রোধে দীর্ণ,
শীর্ণ হাহাকার ছাড়া গান ছিল না মনে,
জানি প্রাণে ছিল না সতেজ পাতার কানাকানি
এমনকি মরম্নভূমির তীব্রতাও ছিল না ধমনীতে,
স্বপ্ন ছিল না,
ছিল না স্বপ্নের মতো হৃদয়।
কে জানতো এই খেয়ালি পতঙ্গ, শীতের ভোর,
হাওয়ায় হাওয়ায় মর্মরিত গাছ,
ঘাসে-ঢাকা জমি, ছায়া-মাখা শালিক
প্রিয় গানের কলি হয়ে গুঞ্জরিত হবে
ধমনীতে, পেখম মেলবে নানা রঙের মুহূর্তে।
কে জানতো লেখার টেবিলে রাখা বাসি রম্নটি
আর ফলের শুকনো খোসাগুলো
তাকাবে আমার দিকে অপলক
আত্মীয়ের মতো?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/431
|
126
|
আল মাহমুদ
|
জেলগেটে দেখা
|
মানবতাবাদী
|
সেলের তালা খোলা মাত্রই এক টুকরো রোদ এসে পড়লো ঘরের মধ্যে
আজ তুমি আসবে ।
সারা ঘরে আনন্দের শিহরণ খেলছে । যদিও উত্তরের বাতাস
হাড়েঁ কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে বইছে , তবু আমিঠান্ডা পানিতে
হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। পাহারাদার সেন্ট্রিকে ডেকে বললাম,
আজ তুমি আসবে । সেন্ট্রি হাসতে হাসতে আমার সিগ্রেটে
আগুন ধরিয়ে দিল । বলল , বারান্দায় হেটেঁ ভুক বাড়িয়ে নিন
দেখবেন , বাড়ী থেকে মজাদার খাবার আসবে ।
দেখো , সবাই প্রথমে খাবারের কথা ভাবে ।
আমি জানি বাইরে এখন আকাল চলছে । ক্ষুধার্ত মানুষ
হন্যে হয়ে শহরের দিকে ছুটে আসছে । সংবাদপত্রগুলোও
না বলে পারছে না যে এ অকল্পনীয় ।
রাস্তায় রাস্তায় অনাহারী শিশুদের মৃতদেহের ছবি দেখে
আমি কতদিন আমার কারাকক্ষের লোহার জালি
চেপে ধরেছি ।
হায় স্বাধীনতা , অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা
সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম ।
আর আমাকে ওরা রেখেছে বন্দুক আর বিচারালয়ের মাঝামাঝি
যেখানে মানুষের আত্মা শুকিয়ে যায় । যাতে
আমি আমরা উৎস খুঁজে না পাই ।
কিন্তু তুমি তো জানো কবিদের উৎস কি ? আমি পাষাণ কারার
চৌহদ্দিতে আমার ফোয়ারাকে ফিরিয়ে আনি ।
শত দুর্দৈবের মধ্যেও আমরা যেমন আমাদের উৎসকে
জাগিয়ে রাখতাম ।
চড়ুই পাখির চিৎকারে বন্দীদের ঘুম ভাঙছে ।
আমি বারান্দা ছেড়ে বাগানে নামলাম।
এক চিলতে বাগান
ভেজা পাতার পানিতে আমার চটি আর পাজামাভিজিয়ে
চন্দ্রমল্লিকার ঝোপ থেকে একগোছা শাদাআর হলুদ ফুল তুললাম ।
বাতাসে মাথা নাড়িয়ে লাল ডালিয়া গাছ আমাকে ডাকলো ।
তারপর গেলাম গোলাপের কাছে ।
জেলখানার গোলাপ , তবু কি সুন্দর গন্ধ !
আমার সহবন্দীরা কেউ ফুল ছিড়েঁ না , ছিঁড়তেও দেয় না
কিন্তু আমি তোমার জন্য তোড়া বাঁধলাম ।
আজ আর সময় কাটতে চায়না । দাড়ি কাটলাম । বই নিয়ে
নাড়াচাড়া করলাম । ওদিকে দেয়ালের ওপাশে শহর জেগে উঠছে ।
গাড়ীর ভেঁপু রিক্সার ঘন্টাধ্বনি কানেআসছে ।
চকের হোটেলগুলোতে নিশ্চয়ই এখন মাংসেরকড়াই ফুটছে ।
আর মজাদার ঝোল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে
গরীব খদ্দেরদের পাতে পাতে ।
না বাইরে এখন আকাল । মানুষ কি খেতে পায় ?
দিনমজুরদের পাত কি এখন আর নেহারির ঝোলে ভরে ওঠে ?
অথচ একটা অতিকায় দেয়াল কত ব্যবধানই নাআনতে পারে ।
আ , পাখিরা কত স্বাধীন । কেমন অবলীলায় দেয়াল পেরিয়ে যাচ্ছে
জীবনে এই প্রথম আমি চড়ুই পাখির সৌভাগ্যে কাতর হলাম ।
আমাদের শহর নিশ্চয়ই এখন ভিখিরিতে ভরে গেছে ।
সারাদিন ভিক্ষুকের স্রোত সামাল দিতে হয় ।
আমি কতবার তোমাকে বলেছি , দেখো
মুষ্টি ভিক্ষায় দারিদ্র্য দূর হয় না ।
এর অন্য ব্যবস্হা দরকার , দরকার সামাজিক ন্যায়ের ।
দুঃখের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে ।
আ , যদি আমার কথা বুঝতে ।
প্রিয়তমা আমার ,
তোমার পবিত্র নাম নিয়ে আজ সূর্য উদিত হয়েছে । আর
উষ্ণ অধীর রশ্মির ফলা গারদের শিকের ওপর পিছলে যাচ্ছে ।
দেয়ালের ওপাশ থেকে ঘুমভাঙ্গা মানুষেরকোলাহল ।
যারা অধিক রাতে ঘুমোয় আর জাগে সকলের আগে ।
যারা ঠেলে ।
চালায় ।
হানে ।
ঘোরায় ।
ওড়ায় ।
পেড়ায় ।
আর হাত মুঠো করে এগিয়ে যায় ।
সভ্যতার তলদেশে যাদের ঘামের অমোঘ নদী ।
কোনদিন শুকোয় না । শোনো , তাদের কলরব ।
বন্দীরা জেগে উঠছে । পাশের সেলে কাশিরশব্দ
আমি ঘরে ঘরে তোমার না ঘোষণা করলাম
বললাম , আজ বারোটায় আমার ‘দেখা’ ।
খুশীতে সকলেই বিছানায় উঠে বসলো ।
সকলেরই আশা তুমি কোন না কোন সংবাদ নিয়ে আসবে ।
যেন তুমি সংবাদপত্র ! যেন তুমি
আজ সকালের কাড়জের প্রধান শিরোনামশিরা!
সূর্য যখন অদৃশ্য রশ্মিমালায় আমাকে দোলাতে দোলাতে
মাঝ আকাশে টেনে আনলো
ঠিক তখুনি তুমি এলে ।
জেলগেটে পৌছেঁ দেখলাম , তুমি টিফিন কেরিয়ার সামনে নিয়ে
চুপচাপ বসে আছো ।
হাসলে , ম্লান , সচ্ছল ।
কোনো কুশল প্রশ্ন হলো না ।
সাক্ষাৎকারের চেয়ারে বসা মাত্রই তুমিখাবার দিতে শুরু করলে ।
মাছের কিমার একটা বল গড়িয়ে দিয়ে জানালে ,
আবরা ধরপাকড় শুরু হয়েছে ।
আমি মাথা নাড়লাম ।
মাগুর মাছের ঝোল ছড়িয়ে দিতে দিতে কানের কাছে মুখ আনলে ,
অমুক বিপ্লবী আর নেই
আমি মাথা নামালাম । বললে , ভেবোনা ,
আমরা সইতে পারবো । আল্লাহ , আমাদের শক্তি দিন ।
তারপর আমরা পরস্পরকে দেখতে লাগলাম ।
যতক্ষণ না পাহারাদারদের বুটের শব্দ এসে আমাদের
মাঝখানে থামলো ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3763.html
|
1297
|
টোকন ঠাকুর
|
পাখি সম্পর্কিত শেষ কবিতা
|
প্রেমমূলক
|
প্রেম হলে সেই পাখি, যার সোনালি ডানা ছুঁয়ে দেখবার সৌভাগ্য পাওয়া চাই। যার একটি মায়াবী পালক খসিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। প্রেম সেই পাখি, যার চোখের মণিতে সামুদ্রিক নৌকার মাস্তুল দেখা যায়। যার মসৃণ গ্রীবায় নিঃসন্দেহে রোমিও-জুলিয়েট মঞ্চস্থ হতে পারে। প্রেম সেই পাখি, যার ঠোঁট দেখলেই প্রতীয়মাণ হয়- একজন একা মানুষের আত্মজীবনী কী ভয়ঙ্কর পিপাসার্ত! বীভৎস!
যখনই কেউ প্রেমে পড়ে মানে সেই পাখিতে পড়ে। তখন সে প্রেমরূপ পাখির ডানা ছুঁতে চায়। কারণ, তার অবচেতন মন প্রার্থনা করে ডানার নিচে আত্মগোপন। একুশ শতকের যন্ত্রণায় জ্বলেও প্রেমে এরকম আত্মগোপন এখনো উঠে যায়নি। কিন্তু হঠাৎ কোনো পাখি যখন উড়ে যায়, ডানার নিচের ওমে যে আত্মগোপনকারী সে ধপ করে পড়ে যায়। নিঃশব্দে শব্দ হয়, ধপাস!
অর্থাৎ পাখি উড়ে গেলেই প্রেম উড়ে যায়। সেই প্রেম সেই পাখি আর সন্ধান করেও পাওয়া যায় না। এরপর যত পাখি চোখে পড়ে, সব অন্য পাখি। কোনোভাবেই আমি ভুলতে পারি না, সেই পাখি কোথায় গেল- যার অপরিসীম ডানার নিচে একদিন আত্মগোপনে ছিলাম, ওম সম্মেলন করেছিলাম!
আজ যেসব পাখি ওড়াউড়ি করছে, ডালে বসে আলস্য ভাঙছে- এরা তো জানেই না যে, প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করলেও আমি আত্মগোপনে থাকতে ভালোবাসি। ফলে, এখন আমি বুঝতেই পারছি না, কোন পাখিটার ডানার নিচে ওম্ সম্মেলন সফল হবে, সার্থক হবে?
কোন পাখিটা উড়বে না আর, স্বভাব ভেঙে?
|
https://banglapoems.wordpress.com/2017/01/14/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%96%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%a4-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be/
|
1977
|
বিনয় মজুমদার
|
সৃষ্টির উপায়
|
চিন্তামূলক
|
শব্দ ব্রহ্ম । অর্থাৎ শব্দের আকার আছে । ‘সফেদা’ একটি শব্দ- ধ্বনি । এই শব্দের আকার সফেদা ফলটি যেমনি ঠিক তেমনি । এর শব্দতাতিবক প্রমাণ আছে । ‘আতা’ একটি শব্দ- ধ্বনি । আতা শব্দটির চেহারা ঠিক আতা ফলটির মতো । পাঠকআপনিও এইরকম নতুন শব্দ দিয়ে ধ্বনি দিয়ে নতুন ফল বানাতে পারেন।
একটি নতুন শব্দ- ধ্বনি ‘হিবয়া’ । হিবয়া উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে একটি নতুন ফল দেখা যাচ্ছে ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4066.html
|
5477
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
দিনবদলের পালা
|
মানবতাবাদী
|
আর এক যুদ্ধ শেষ,
পৃথিবীতে তবু কিছু জিজ্ঞাসা উন্মুখ।
উদ্দাম ঢাকের শব্দে
সে প্রশ্নের উত্তর কোথায়?
বিজয়ী বিশ্বের চোখ মুদে আসে,
নামে এক ক্লান্তির জড়তা।
রক্তাক্ত প্রান্তর তার অদৃশ্য দুহাতে
নাড়া দেয় পৃথিবীকে,
সে প্রশ্নের উত্তর কোথায়?
তুষারখচিত মাঠে,
ট্রেঞ্চে, শূন্যে, অরণ্যে, পর্বতে
অস্থির বাতাস ঘোরে দুর্বোধ্য ধাঁধায়,
ভাঙা কামানের মুখে
ধ্বংসস্তূপে উৎকীর্ণ জিজ্ঞাসাঃ
কোথায় সে প্রশ্নের উত্তর?
দিগ্বিজয়ী দুঃশাসন!
বহু দীর্ঘ দীর্ঘতর দিন
তুমি আছ দৃঢ় সিংহাসনে সমাসীন,
হাতে হিসেবের খাতা
উন্মুখর এই পৃথিবীঃ
আজ তার শোধ করো ঋণ।
অনেক নিয়েছ রক্ত, দিয়েছ অনেক অত্যাচার,
আজ হোক তোমার বিচার।
তুমি ভাব, তুমি শুধু নিতে পার প্রাণ,
তোমার সহায় আছে নিষ্ঠুর কামান;
জানো নাকি আমাদেরও উষ্ণ বুক, রক্ত গাঢ় লাল,
পেছনে রয়েছে বিশ্ব, ইঙ্গিত দিয়েছে মহাকাল,
স্পীডোমিটারের মতো আমাদের হৃৎপিণ্ড উদ্দাম,
প্রাণে গতিবেগ আনে, ছেয়ে ফেলে জনপদ-গ্রাম,
বুঝেছি সবাই আমরা আমাদের কী দুঃখ নিঃসীম,
দেখ ঘরে ঘরে আজ জেগে ওঠে এক এক ভীম।
তবুও যে তুমি আজো সিংহাসনে আছ
সে কেবল আমাদের বিরাট মায়।
এখানে অরণ্য স্তব্ধ, প্রতীক্ষা-উৎকীর্ণ চারিদিক,
গঙ্গায় প্লাবন নেই, হিমালয় ধৈর্যের প্রতীক;
এ সুযোগে খুলে দাও ক্রূর শাসনের প্রদর্শনী,
আমরা প্রহর শুধু গনি।
পৃথিবীতে যুদ্ধ শেষ, বন্ধ সৈনিকের রক্ত ঢালাঃ
ভেবেছ তোমার জয়, তোমার প্রাপ্য এ জয়মালা;
জানো না এখানে যুদ্ধ-শুরু দিনবদলের পালা।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1105
|
5434
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
আঠারো
|
মানবতাবাদী
|
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়–
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।আঠরো বছর বয়স ভয়ঙ্কর
তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর
এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার
পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার
ক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্র্রান্ত; একে একে হয় জড়ো,
এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।তব আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়–
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।।কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%a0%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%9b%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a7%9f%e0%a6%b8-sukanta-bhattacharya/
|
2076
|
মহাদেব সাহা
|
আমি যখন বলি ভালোবাসি
|
মানবতাবাদী
|
আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন শুদ্ধ হয় জীবন
তখন ভাঙা ঘর আবার জোড়া লাগে,
শিশুদের কচি মুখের ঘ্রাণে বাতাস ভরে যায়
হলুদ চোখ সব সবুজ দেখতে শুরু করে
নদীতীরে জেগে ওঠে নতুন চর;
খরাশেষে বৃষ্টি নামে, আমি যখন বলি ভালোবাসি।
আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন শান্তি- আন্দোলন শুরু হয়
জাতিসঙ্ঘের প্রাসাদচূড়ায় গলতে থাকে বরফ,
লেবাননে বোমা বর্ষণ বন্ধ হয়, প্যালেস্টাইনে ওঠে উল্লাসধ্বনি
রুশ-মার্কিন দীর্ঘ বৈঠকে গৃহীত হয় ক্ষেপণাস্ত্র হ্রাসের সিদ্ধান্ত
তখনই সবচেয়ে নিরাপদ হয়ে ওঠে মানুষের ভবিষ্যত;
বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কমে আসে, আমি যখন বলি ভালোবাসি।
আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন শীতের দেশে আসে বসন্ত
তখন মরা গাঙে ডাকে জোয়ার, চৈত্রের মাঠে শস্যের হাতছানি,
তখন দুকূল-ছাপানো-বর্ষায় চলে পাল তোলা নৌকা
অনেকদিন পর ব্ল্যাক আউটের নিষিদ্ধ শহরে আসে পূর্ণিমা
সব কাঁটাতারের বেড়া হয়ে ওঠে মাধবীলতার বন;
ঘাতকের হাত থেকে ছিটকে পড়ে অস্ত্র, আমি যখন বলি ভালোবাসি।
আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন পৃথিবীতে সব যুদ্ধ থেমে যায়
দুর্ঘটনায় পতিত বিমানের যাত্রীরা নিরাপদে ফিরে আসে,
বড়ো বড়ো শহরগুলোর সবচেয়ে কন্টকিত যানজট মুহূর্তে খুলে যায়
বিবাহ-বিচ্ছেদের সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নেয় সব দম্পতি
মা শিশুর গালে চুমু খায়, ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকারা আবার ঘর বাঁধে;
নবজাতকের কান্নায় ভরে ওঠে পৃথিবী, আমি যখন বলি ভালোবাসি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1437
|
4581
|
শামসুর রাহমান
|
কাল রাতে স্বপ্নে
|
সনেট
|
কাল রাতে স্বপ্নে আমি লালনের আরশি নগর
দেখেছি অনেকক্ষণ, মনে হয়, আলো-আঁধারিতে।
কেমন পড়শি ছিল কাছে, ধারে, কিবা তার ঘর
দোর, মনে নেই, বুঝি দেহ তার রঙিন শাড়িতে
ছিল ঢাকা, চোখ দু’টি টানা টানা, অত্যন্ত গভীর,
ছুঁতে গিয়ে তাকে আমি গহীন গাঙের জলরেখা
যেন বা করেছি স্পর্শ, পরিচিত এই গ্রহটির
কেউ নয়, বুঝি তাই আজো প্রকৃত হয় নি দেখা।লালনের গানের আড়ালে যার পদধ্বনি বাজে,
বাউলের দোতারার সুর যাকে করে বন্ধনীয়,
এ আমি কী করে পাবো তাকে আমার সকল কাজে?
‘সে আছে নদীর পাশে সুর হয়ে, তাকে চিনে নিও,’
বলেই বাউল এক অগোচরে করেন প্রস্থান,
সাথে সাথে আমার নগর হয় লালনের গান। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kal-rate-swapne/
|
3087
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জাগিবার চেষ্টা
|
সনেট
|
মা কেহ কি আছ মোর , কাছে এসো তবে ,
পাশে বসে স্নেহ ক’রে জাগাও আমায় ।
স্বপ্নের সমাধি – মাঝে বাঁচিয়া কী হবে ,
যুঝিতেছি জাগিবারে — আঁখি রুদ্ধ হায় ,
ডেকো না ডেকো না মোরে ক্ষুদ্রতার মাঝে ,
স্নেহময় আলস্যেতে রেখো না বাঁধিয়া ,
আশীর্বাদ করে মোরে পাঠাও গো কাজে —
পিছনে ডেকো না আর কাতরে কাঁদিয়া ।
মোর বলে কাহারেও দেব না কি বল!
মোর প্রাণে পাবে না কি কেহ নবপ্রাণ
করুণা কি শুধু ফেলে নয়নের জল ,
প্রেম কি ঘরের কোণে গাহে শুধু গান!
তবেই ঘুচিবে মোর জীবনের লাজ
যদি মা করিতে পারি কারো কোনো কাজ । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jagibar-chesta/
|
5253
|
শামসুর রাহমান
|
সত্তা তাঁর সুর হয়ে যাচ্ছে ভেসে
|
স্বদেশমূলক
|
একদা যখন জ্বলজ্বলে ছিল তাঁর
সত্তা তাঁকে দেখে
লেগেছিল ভালো আর অন্তর্গত আভা
দশজন থেকে স্পষ্ট করেছিল বিশিষ্ট, আলাদা।কণ্ঠে তাঁর বাংলার মাটি আর নদীর ঢেউয়ের
অপরূপ ধ্বনি জেগে অজস্র শ্রোতাকে
আনন্দিত করেছে এবং আজও জ্যোৎস্নারাতে
অনেকে শুনতে পায় তাঁর গান তৃতীয় প্রহরে।মোমতাজ আলী খান মৃত্যুর পরেও
কখনও কখনও তাঁর সুর
শহরে ও গ্রামে মানুষের হৃদয়ের
গভীরে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সুদূরে নিয়ে যান।এখনও নিষ্ঠুর এই কোলাহলময়,স্বার্থপর
কালে মোমতাজ আলী খানের সন্তান
নানা প্রতিকূল বেড়া ডিঙিয়ে পিতার,
গুরুর সাধের মান রাখবে নিশ্চিত।এইতো গোধূলিলগ্নে দৃষ্টিপথে ভেসে ওঠে-দূরে
দীর্ঘদেহী একজন পুরুষ যাচ্ছেন হেঁটে ধীরে
পেরিয়ে বাঁশের সাঁকো দূরে, বহু দূরে-সত্তা তাঁর
সুর হয়ে যাচ্ছে ভেসে মেঘের অন্তরে। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sotta-tar-sur-hoye-jacche-vese/
|
3346
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পড়েছি আজ রেখার মায়ায়
|
চিন্তামূলক
|
শ্রীযুক্ত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কল্যাণীয়েষু ১
পড়েছি আজ রেখার মায়ায়।
কথা ধনীঘরের মেয়ে,
অর্থ আনে সঙ্গে করে,
মুখরার মন রাখতে চিন্তা করতে হয় বিস্তর।
রেখা অপ্রগল্ভা, অর্থহীনা,
তার সঙ্গে আমার যে ব্যবহার সবই নিরর্থক।
গাছের শাখায় ফুল ফোটানো ফল ধরানো,
সে কাজে আছে দায়িত্ব;
গাছের তলায় আলোছায়ার নাট-বসানো
সে আর-এক কাণ্ড।
সেইখানেই শুকনো পাতা ছড়িয়ে পড়ে,
প্রজাপতি উড়তে থাকে,
জোনাকি ঝিকমিক করে রাতের বেলা।
বনের আসরে এরা সব রেখা-বাহন
হাল্কা চালের দল,
কারো কাছে জবাবদিহি নেই।
কথা আমাকে প্রশ্রয় দেয় না, তার কঠিন শাসন;
রেখা আমার যথেচ্ছাচারে হাসে,
তর্জনী তোলে না।
কাজকর্ম পড়ে থাকে, চিঠিপত্র হারিয়ে ফেলি,
ফাঁক পেলেই ছুটে যাই রূপ-ফলানোর অন্দরমহলে।
এমনি করে, মনের মধ্যে
অনেকদিনের যে-লক্ষ্মীছাড়া লুকিয়ে আছে
তার সাহস গেছে বেড়ে।
সে আঁকছে, ভাবছে না সংসারের ভালোমন্দ,
গ্রাহ্য করে না লোকমুখের নিন্দাপ্রশংসা।২
মনটা আছে আরামে।
আমার ছবি-আঁকা কলমের মুখে
খ্যাতির লাগাম পড়েনি।
নামটা আমার খুশির উপরে
সর্দারি করতে আসেনি এখনো,
ছবি-আঁকার বুক জুড়ে
আগেভাগে নিজের আসনটা বিছিয়ে বসেনি;
ঠেলা দিয়ে দিয়ে বলছে না
"নাম রক্ষা ক'রো।"
অথচ ঐ নামটা নিজের মোটা শরীর নিয়ে
স্বয়ং কোনো কাজই করে না।
সব কীর্তির মুখ্য ভাগটা আদায় করবার জন্যে
দেউড়িতে বসিয়ে রাখে পেয়াদা;
হাজার মনিবের পিণ্ড-পাকানো
ফরমাশটাকে বেদী বানিয়ে স্তূপাকার ক'রে রাখে
কাজের ঠিক সামনে।
এখনো সেই নামটা অবজ্ঞা করেই রয়েছে অনুপস্থিত;--
আমার তুলি আছে মুক্ত
যেমন মুক্ত আজ ঋতুরাজের লেখনী।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prorase-achj-rakhar-mayay/
|
5414
|
সলিল চৌধুরী
|
এক গুচ্ছ চাবি
|
চিন্তামূলক
|
উত্তরাধিকার সূত্রে
পেয়েছি শুধু এক গুচ্ছ চাবি
ছোটো-বড়ো মোটা-বেঁটে
নানারকমের নানা ধরনের চাবি
মা বললেন, যত্ন করে তুলে রেখে দে…তারপর যখন বয়স বাড়লো
জীবন এবং জীবিকার সন্ধানে
পথে নামতে হোল
পকেটে সম্বল শুধু সেই এক গুচ্ছ চাবি
ছোটো বড়ো মোটা বেঁটে
নানারকমের নানা ধরনের চাবি……কিন্তু যেখানেই যাই
সামনে দেখি প্রকান্ড এক দরজা
আর তাতে ঝুলছে
প্রকান্ড এক তালা
পকেট থেকে চাবির গুচ্ছ বের করি
এ চাবি সে চাবি
ঘোরাই ফেরাই-লাগেনা-খোলেনা
শ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরি-
মা দেখেন আর হাসেন
বলেন-‘ওরে তোর-বাবার-হাতেও
ঐ চাবি দিয়ে ঐ দরজাগুলো খোলেনি-
শুনেছি নাকি তাঁর বাবার- হাতে খুলত…আসল কথা কি জানিস?
এ সব চাবি হোল
সততার সত্যের যুক্তির নিষ্ঠার
এসব দরজাগুলো খোলেনা…তবুও তুই ফেলে দিস্ না
তুই যখন চলে যাবি
তোর সন্তানদের হাতে দিয়ে যাস
এসব চাবির গুচ্ছ-হয়তো তাদের হাতে
হয়তো কেন নিশ্চয়ই তাদের হাতে একদিন
ঐসব সততার সত্যের যুক্তির নিষ্ঠার চাবি দিয়ে
জীবনের বন্ধ দরজাগুলো
খুলে যাবে-খুলে যাবেই….’
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4841.html
|
2798
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
এ কথা জানিতে তুমি, ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান
|
ভক্তিমূলক
|
এ কথা জানিতে তুমি, ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান,
কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধন মান।
শুধু তব অন্তরবেদনা
চিরন্তন হয়ে থাক্ সম্রাটের ছিল এ সাধনা।
রাজশক্তি বজ্র সুকঠিন
সন্ধ্যারক্তরাগসম তন্দ্রাতলে হয় হোক লীন,
কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস
নিত্য-উচ্ছ্বসিত হয়ে সকরুণ করুক আকাশ
এই তব মনে ছিল আশ।
হীরা মুক্তামানিক্যের ঘটা
যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা
যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক,
শুধু থাক্
একবিন্দু নয়নের জল
কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল
এ তাজমহল।
হায় ওরে মানবহৃদয়,
বার বার
কারো পানে ফিরে চাহিবার
নাই যে সময়,
নাই নাই।
জীবনের খরস্রোতে ভাসিছ সদাই
ভুবনের ঘাটে ঘাটে--
এক হাটে লও বোঝা, শূন্য করে দাও অন্য হাটে।
দক্ষিণের মন্ত্রগুঞ্জরণে
তব কুঞ্জবনে
বসন্তের মাধবীমঞ্জরী
যেই ক্ষণে দেয় ভরি
মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল,
বিদায় গোধূলি আসে ধুলায় ছড়ায়ে ছিন্নদল।
সময় যে নাই;
আবার শিশিররাত্রে তাই
নিকুঞ্জে ফুটায়ে তোল নব কুন্দরাজি
সাজাইতে হেমন্তের অশ্রুভরা আনন্দের সাজি।
হায় রে হৃদয়,
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।
নাই নাই, নাই যে সময়।
হে সম্রাট, তাই তব শঙ্কিত হৃদয়
চেয়েছিল করিবারে সময়ের হৃদয় হরণ
সৌন্দর্যে ভুলায়ে।
কণ্ঠে তার কী মালা দুলায়ে
করিলে বরণ
রূপহীন মরণেরে মৃত্যুহীন অপরূপ সাজে।
রহে না যে
বিলাপের অবকাশ
বারো মাস,
তাই তব অশান্ত ক্রন্দনে
চিরমৌন জাল দিয়ে বেঁধে দিলে কঠিন বন্ধনে।
জ্যোৎস্নারাতে নিভৃত মন্দিরে
প্রেয়সীরে
যে-নামে ডাকিতে ধীরে ধীরে
সেই কানে-কানে ডাকা রেখে গেলে এইখানে
অনন্তের কানে।
প্রেমের করুণ কোমলতা
ফুটিল তা
সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে।
হে সম্রাট কবি,
এই তব হৃদয়ের ছবি,
এই তব নব মেঘদূত,
অপূর্ব অদ্ভুত
ছন্দে গানে
উঠিয়াছে অলক্ষের পানে
যেথা তব বিরহিণী প্রিয়া
রয়েছে মিশিয়া
প্রভাতের অরুণ-আভাসে,
ক্লান্তসন্ধ্যা দিগন্তের করুণ নিশ্বাসে,
পূর্ণিমায় দেহহীন চামেলির লাবণ্যবিলাসে,
ভাষার অতীত তীরে
কাঙাল নয়ন যেথা দ্বার হতে আসে ফিরে ফিরে।
তোমার সৌন্দর্যদূত যুগ যুগ ধরি
এড়াইয়া কালের প্রহরী
চলিয়াছে বাক্যহারা এই বার্তা নিয়া
"ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া।"
চলে গেছ তুমি আজ
মহারাজ;
রাজ্য তব স্বপ্নসম গেছে ছুটে,
সিংহাসন গেছে টুটে;
তব সৈন্যদল
যাদের চরনভরে ধরণী করিত টলমল
তাহাদের স্মৃতি আজ বায়ুভরে
উড়ে যায় দিল্লীর পথের ধূলি-'পরে।
বন্দীরা গাহে না গান;
যমুনা-কল্লোলসাথে নহবত মিলায় না তান;
তব পুরসুন্দরীর নূপুরনিক্কণ
ভগ্ন প্রাসাদের কোণে
ম'রে গিয়ে ঝিল্লীস্বনে
কাঁদায় রে নিশার গগন।
তবুও তোমার দূত অমলিন,
শ্রান্তিক্লান্তিহীন,
তুচ্ছ করি রাজ্য-ভাঙাগড়া,
তুচ্ছ করি জীবনমৃত্যুর ওঠাপড়া,
যুগে যুগান্তরে
কহিতেছে একস্বরে
চিরবিরহীর বাণী নিয়া
"ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া।"
মিথ্যা কথা-- কে বলে যে ভোল নাই।
কে বলে রে খোল নাই
স্মৃতির পিঞ্জরদ্বার।
অতীতের চির অস্ত-অন্ধকার
আজিও হৃদয় তব রেখেছে বাঁধিয়া?
বিস্মৃতির মুক্তিপথ দিয়া
আজিও সে হয় নি বাহির?
সমাধিমন্দির
এক ঠাঁই রহে চিরস্থির;
ধরায় ধুলায় থাকি
স্মরণের আবরণে মরণেরে যত্নে রাখে ঢাকি।
জীবনেরে কে রাখিতে পারে।
আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।
তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে
নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে।
স্মরণের গ্রন্থি টুটে
সে যে যায় ছুটে
বিশ্বপথে বন্ধনবিহীন।
মহারাজ, কোনো মহারাজ্য কোনোদিন
পারে নাই তোমারে ধরিতে;
সমুদ্রস্তনিত পৃথ্বী, হে বিরাট, তোমারে ভরিতে
নাহি পারে--
তাই এ-ধরারে
জীবন-উৎসব-শেষে দুই পায়ে ঠেলে
মৃৎপাত্রের মতো যাও ফেলে।
তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার
বারম্বার।
তাই
চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।
যে প্রেম সম্মুখপানে
চলিতে চালাতে নাহি জানে,
যে প্রেম পথের মধ্যে পেতেছিল নিজ সিংহাসন,
তার বিলাসের সম্ভাষণ
পথের ধুলার মতো জড়ায়ে ধরেছে তব পায়ে,
দিয়েছ তা ধূলিরে ফিরায়ে।
সেই তব পশ্চাতের পদধূলি-'পরে
তব চিত্ত হতে বায়ুভরে
কখন সহসা
উড়ে পড়েছিল বীজ জীবনের মাল্য হতে খসা।
তুমি চলে গেছ দূরে
সেই বীজ অমর অঙ্কুরে
উঠেছে অম্বরপানে,
কহিছে গম্ভীর গানে--
"যত দূর চাই
নাই নাই সে পথিক নাই।
প্রিয়া তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ
রুধিল না সমুদ্র পর্বত।
আজি তার রথ
চলিয়াছে রাত্রির আহ্বানে
নক্ষত্রের গানে
প্রভাতের সিংহদ্বার পানে।
তাই
স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি,
ভারমুক্ত সে এখানে নাই।'
এলাহাবাদ, ১৪ কার্তিক, ১৩২১-রাত্রি
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1919
|
919
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অস্তচাঁদে
|
প্রেমমূলক
|
ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী!
-অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে কালো নদী,-ঢেউয়ের কলসী,
নিঝঝুম বিছানার’ পরে
মেঘ-বৌ’র খোঁপাখসা জ্যোৎস্নাফুল চুপে চুপে ঝরে,-
চেয়ে থাকি চোখ তুলে -যেন মোর পলাতকা প্রিয়া
মেঘের ঘোমটা তুলে প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া!
সে যেন দেখেছে মোরে জন্মে জন্মে ফিরে ফিরে ফিরে
মাঠে ঘাটে একা একা, -বুনোহাঁস-জোনাকির ভিড়ে!
দুশ্চর দেউলে কোন্-কোন্ যক্ষ-প্রাসাদের তটে,
দূর উর-ব্যাবিলোন-মিশরের মরুভূ-সঙ্কটে,
কোথা পিরামিডতলে,- ঈসিসের বেদিকার মূলে,
কেউটের মতো নীলা যেইখানে ফণা তুলে উঠিয়াছে ফুলে,
কোন্ মন-ভুলানিয়া পথচাওয়া দুলালীর সনে
আমারে দেখেছে জ্যোৎস্না,-চোর চোখে-অলস নয়নে!
আমারে দেখেছে সে যে আসীরীয় সম্রাটের বেশে
প্রাসাদ-অলিন্দে যবে মহিমায় দাঁড়ায়েছি এসে,-
হাতে তার হাত, পায়ে হাতিয়ার রাখি
কুমারীর পানে আমি তুলিয়াছি আনন্দের আরক্তিম আঁখি!
ভোরগেলাসের সুরা,-তহুরা,- করেছি মোরা চুপে চুপে পান,
চকোরজুড়ির মতো কুহরিয়া গাহিয়াছি চাঁদিনীর গান!
পেয়ালায়-পায়েলায় সেই নিশি হয় নি উতলা,
নীল নিচোলের কোলে নাচে নাই আকাশের তলা!
নটীরা ঘুমায়েছিল পুরে পুরে, ঘুমের রাজবধূ,-
চুরি করে পিয়েছিনু ক্রীতদাসী বালিকার যৌবনের মধু!
সম্রাজ্ঞীর নির্দয় আঁখির দর্প বিদ্রূপ ভুলিয়া
কৃষ্ণাতিথি-চাঁদিনীর তলে আমি ষোড়শীর উরু পরশিয়া
লভেছিনু উল্লাস,-উতরোল!-আজ পড়ে মনে
সাধ-বিষাদের খেদ কত জন্মজন্মান্তের,- রাতের নির্জনে!
আমি ছিনু ‘ত্রুবেদুর’ কোন্ দূর ‘প্রভেন্স’-প্রান্তরে!
-দেউলিয়া পায়দল্,-অগোচর মনচোর-মানিনীর তরে
সারেঙের সুর মোর এমনি উদাস রাত্রে উঠিত ঝঙ্কারি!
আঙুরতলায় ঘেরা ঘুমঘোর ঘরখানা ছাড়ি
ঘুঘুর পাখনা মেলি মোর পানে আসিল পিয়ারা;
মেঘের ময়ূরপাখে জেগেছিল এলোমেলো তারা!
-‘অলিভ’ পাতার ফাঁকে চুনচোখে চেয়েছিল চাঁদ,
মিলননিশার শেষে-বৃশ্চিক,- গোক্ষুরাফণা,- বিষের বিস্বাদ!
স্পেইনের ‘সিয়েরা’য় ছিনু আমি দস্যু-অশ্বারোহী-
নির্মম-কৃতান্ত-কাল,-তবু কী যে কাতর- বিরহী!
কোন্ রাজনন্দিনীর ঠোঁটে আমি এঁকেছিনু বর্বর চুম্বন!
অন্দরে পশিয়াছিনু অবেলার ঝড়ের মতন!
তখন রতনশেজে গিয়েছিল নিভে মধুরাতি,
নীল জানালার পাশে-ভাঙা হাটে-চাঁদের বেসাতি।
চুপে চুপে মুখে কার পড়েছিনু ঝুঁকে!
ব্যাধের মতন আমি টেনেছিনু বুকে
কোন্ ভীরু কপোতীর উড়ু উড়ু ডানা!
-কালো মেঘে কেঁদেছিল অস্তচাঁদ-আলোর মোহানা!
বাংলার মাঠে ঘাটে ফিরেছিনু বেণু হাতে একা,
গঙ্গার তীরে কবে কার সাথে হয়েছিল দেখা!
‘ফুলটি ফুটিলে চাঁদিনী উঠিলে’ এমনই রূপালি রাতে
কদমতলায় দাঁড়াতাম গিয়ে বাঁশের বাঁশিটি হাতে!
অপরাজিতার ঝাড়ে- নদীপারে কিশোরী লুকায়ে বুঝি!-
মদনমোহন নয়ন আমার পেয়েছিল তারে খুঁজি!
তারই লাগি বেঁধেছিনু বাঁকা চুলে ময়ূরপাখার চূড়া,
তাহারই লাগিয়া শুঁড়ি সেজেছিনু-ঢেলে দিয়েছিনু সুরা!
তাহারই নধর অধর নিঙাড়ি উথলিল বুকে মধু,
জোনাকির সাথে ভেসে শেষরাতে দাঁড়াতাম দোরে বঁধু!
মনে পড়ে কি তা!-চাঁদ জানে যাহা,- জানে যা কৃষ্ণাতিথির শশী,
বুকের আগুনে খুন চড়ে,-মুখ চুন হ’য়ে যায় একেলা বসি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/902
|
1647
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
বাবুর বাগান
|
রূপক
|
যে যেখানে পারে, সেইখানে থোয়
কেড়েকুড়ে আনে যা সে,
কিছু থাকে তার হাতের মুঠোয়,
কিছু ঝরে যায় ঘাসে।
যে সে রেখেছিল লোহার খাঁচায়,
হয়েছে পাখির দানা
কিছুটা মোরগে ঠুকরিয়ে খায়,
কিছু শালিখের ছানা।
সিঁদকাঠি হাতে গর্ত খুঁড়ছে
এই রাত্রে যে, তার
জানা নেই তারই পিছনে ঘুরছে
তিন জোড়া বাটপার।
যে সেখানে পারে, রাখে সেইখানে
কেড়ে-আনা টাকাকড়ি,
তাই দেখে হাসে বাবুর বাগানে
শ্বেতপাথরের পরি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1135
|
5123
|
শামসুর রাহমান
|
মুর্গী ও গাজর
|
প্রেমমূলক
|
এখন আমার সত্তাময় কত ভীষণ আঁচড়।
কত পৌরাণিক পশু আমার সমগ্রে দাঁত-নখ
বসিয়েছে বারংবার ধুমায়িত ক্রোধে। কী প্রখর
চঞ্চু দিয়ে ঝাঁক ঝাঁক কালো পাখি আমার
ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলেছে বেবাক, কোনোদিন দেখবে না
তুমি, খেদহীন আমি তোমার ধারণা, বিবেচনা
ইত্যাদির পরপারে আস্তে সুস্থে হেঁটে যাবো, চেনা-
শোনা ছিল কোনোদিন আমাদের, এই তো সান্ত্বনা।বিদায়ের ঘণ্টা বাজে হৃদয়ের দিগন্তে এখন।
চড়ায় ঠেকেছে শূন্য রূপসী ময়ূরপঙ্খী নাও,
বৈরী হাওয়া সহসা কাঁপিয়ে দেয় আমার পাঁজর।
দুঃখ নাম্নী যে নিঝুম পল্লী আছে, সেখানে আপন
ডেরা আজো, সংসার পাতো গে তুমি, যাও মেয়ে যাও,
বস্তুত তোমার পথ চেয়ে আছে মুর্গী ও গাজর! (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/murgi-o-gajor/
|
5127
|
শামসুর রাহমান
|
মৃত্যুদন্ড
|
সনেট
|
বেকসুর আমি তবু আমাকেই মৃত্যুদন্ড দিলে।
কী করে তোমার কাছে অপরাধী, এখনো জানি না;
কস্মিকালেও আমি শক্রুতা সাধিনি, শুধু বাণী,
অলৌকিক, প্রেমময়, বাজিয়েছি। সেই সুরে ছিলে
মিশে তুমি বসন্তের পাতার গভীরে, শান্ত ঝিলে,
শস্যক্ষেতে, নীলিমায়। এই কি আমার অপরাধ?
আমার সর্বস্ব দিয়ে রাত্রিদিন একটি নিখাদ
প্রেমস্বপ্ন গড়ি, তা-ও ভেঙে যায় কী ককর্শ ঢিলে।আমাকে পাঠালে নির্বাসনে, দিলে দন্ড ভয়ংকার।
তোমার সান্নিধ্য থেকে, অমন দৃষ্টির থেকে দূরে,
বহুদূরে চকিতে সরিয়ে দিলে-এই শাস্তি, বলো,
মৃত্যুর চেয়েও বেশি, ঢের বেশি নয় কি কঠোর?
তুমি কি দেখতে চাও সর্বদা আমার ছলোছলো
চোখ? চাও আমার হৃদয় খাক কীট কুরে-কুরে? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/mrittyudondo/
|
4979
|
শামসুর রাহমান
|
বড় রাস্তায়
|
রূপক
|
ব্যাপারটা কী
ভেবে দেখেছেন একবারও?
যতবার যাত্রা শুরু করি, ততবারই
পা এসে ঠেকে সর্প কুণ্ডলীর মতো
এক কানাগলিতে।
এমন হবার কথা নয়, তবু হচ্ছে
বারবার একই রকম। কখনো কখনো আমার মনে হয়,
বিসমিল্লাতেই গলদ নিশ্চয়; নইলে
কেন এই পুনরাবৃত্তির গোলক ধাঁধায়
ঘুরপাক খেয়ে মরছি?
সত্যি বলতে কি, এই কৃষ্ণপক্ষে
হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি প্রকৃত পদপ্রদর্শকের
অভাব। সে কবে থেকে সোনার পিঁড়ি শূন্য
পড়ে আছে, বসবার কেউ নেই। বিখ্যাত
পথ প্রদর্শকদের মধ্যে কেউ পর্যটন বিভাগের
সৌজন্য টিকিট নিয়ে গেছেন দীর্ঘমেয়াদী বিদেশ ভ্রমণে,
কেউ বাতে পঙ্গু হয়ে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি,
কেউ বা পোকার খেলছেন অষ্টপ্রহর এবং
মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছেন
আকাশটা ঘোলাজলের ডোবা নাকি স্ফটিকের সমুদ্র।ঢের হয়েছে, আর নয়। সাফ কথা,
কারো বাহারি গুলপট্রিতে আর মজবোনা,
দৃষ্টি নিবদ্ধ করবো না কোনো ভুল সংকেতে,
পদপ্রদর্শক থাক আর নাই থাক
এবার পৌঁছুতে হবেই ভবিষ্যতের মতো বড় রাস্তায়। (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/boro-rastay/
|
4622
|
শামসুর রাহমান
|
কোকিলের গানে
|
চিন্তামূলক
|
আমি তো এখন দূরে, বহুদূরে চলে
যেতে চাই। যদি হেঁটে যেতে হয়, তবু
দ্বিধাহীন চলে যাবো। যদি ঘামে নেয়ে উঠি, তবু
থামাবো না গতি, বেপরোয়া যাত্রী আমি।এই যে হেঁটেছি ইতিমধ্যে ঢের পথ, বাধা পেয়ে
যাইনি ভড়কে কিছুতেই। প্রধানত
আলোয়, অথচ ঘোর অমাবস্যা হলেও যাত্রার
বেগ না থামিয়ে চালিয়েছি পদযুগল
সামনের দিকে আর যখন হঠাৎ হিংস্র কোনও
পাখি এসে হামলা করেছে, ওকে দিয়েছি তাড়িয়ে।ছিল না সহজ কিছু, পদে পদে কত যে বিভ্রম
নানা ছদ্মবেশে এসে মধুর আলাপে
আমাকে ভুলিয়ে সর্বনাশ সাধনের
চোখ-ঝলসানো প্রক্রিয়াকে প্রায়-সফল করেছে
ভেবে চারদিক তীক্ষ্ম হাসি-ঝড়ে ভীষণ কাঁপায়।অকস্মাৎ চোখ খুলে গেলে দেখি এক
নিঝুম কবরস্থানে শুয়ে আছি। নানা ধরনের
কবরের ভেতর কত যে
কাহিনী ঘুমিয়ে আছে, কোন্ গল্পকার
রূপায়িত করতে পারবে সেই অজানাকে? কোকিলের গানে
গুঞ্জরিত হয়ে গোরস্তান আরও বেশি স্তব্ধতায় মগ্ন হয়। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kokiler-gane/
|
365
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
নিত্য প্রবল হও
|
মানবতাবাদী
|
অন্তরে আর বাহিরে সমান নিত্য প্রবল হও!
যত দুর্দিন ঘিরে আসে, তত অটল হইয়া রও!
যত পরাজয়-ভয় আসে, তত দুর্জয় হয়ে ওঠো।
মৃত্যুর ভয়ে শিথিল যেন হয় তলোয়ার-মুঠো।
সত্যের তরে দৈত্যের সাথে করে যাও সংগ্রাম,
রণক্ষেত্রে মরিলে অমর হইয়া রহিবে নাম।
এই আল্লার হুকুম – ধরায় নিত্য প্রবল রবে,
প্রবলেই যুগে যুগে সম্ভব করেছে অসম্ভবে।
ভালোবাসেন না আল্লা, অবিশ্বাসী ও দুর্বলেরে,
‘শেরে-খোদা’ সেই হয়, যে পেয়েছে অটল বিশ্বাসেরে!
ধৈর্য ও বিশ্বাস হারায়, সে মুসলিম নয় কভু,
বিশ্বে কারেও করে নাকো ভয় আল্লাহ্ যার প্রভু!
নিন্দাবাদের মাঝে ‘আল্লাহ্ জিন্দাবাদ’-এর ধ্বনি
বীর শুধু শোনে, কোনো নিন্দায় কোনো ভয় নাহি গণি।
আল্লা পরম সত্য, ভয় সে ভ্রান্তির কারসাজি,
প্রচণ্ড হয় তত পৌরুষ, যত দেখে দাগাবাজি!
ভুলে কি গিয়াছ অসম সাহস নির্ভীক আরবির?
পারস্য আর রোমক সম্রাটের কাটিয়াছে শির!
কতজন ছিল সেনা তাহাদের? অস্ত্র্র কী ছিল হাতে?
তাদের পরম নির্ভর ছিল শুধু এক আল্লাতে।
জয় পরাজয় সমান গণিয়া করেছিল শুধু রণ,
তাদের দাপটে কেঁপে উঠেছিল পৃথিবীর প্রাঙ্গণ!
তারা দুনিয়ার বাদশাহি করেছিল ভিক্ষুক হয়ে,
তারা পরাজিত হয়নি কখনও ক্ষণিকের পরাজয়ে।
হাসিয়া মরেছে করেনি কখনও পৃষ্ঠপ্রদর্শন,
ইসলাম মানে বুঝেছিল তারা অসত্য সাথে রণ।
তারা জেনেছিল, দুনিয়ায় তারা আল্লার সৈনিক,
অর্জন করেছিল স্বাধীনতা নেয়নি মাগিয়া ভিখ!
জয়ী হতে হলে মৃত্যুঞ্জয়ী পুরুষ হইতে হয়,
শত্রু-সৈন্য দেখে কাঁপে ভয়ে, সে তো সেনাপতি নয়!
শত্রু-সৈন্য যত দেখে তত রণ-তৃষ্ণা তার বাড়ে,
দাবানল সম তেজ জ্বলে ওঠে শিরায় শিরায় হাড়ে!
তলোয়ার তার তত তেজ ফোটে যত সে আঘাত খায়,
তত বধ করে শত্রুর সেনা, রসদ যত ফুরায়।
নিরাশ হোয়ো না! নিরাশা ও অদৃষ্টবাদীরা যত
যুদ্ধ না করে হয়ে আছে কেউ আহত ও কেউ হত!যে মাথা নোয়ায়ে সিজদা করেছ এক প্রভু আল্লারে,
নত করিয়ো না সে মাথা কখনও কোনো ভয়ে কোনো মারে!
আল্লার নামে নিবেদিত শির নোয়ায় সাধ্য কার।
আল্লা সে শির বুকে তুলে নেন, কাটে যদি তলোয়ার!
ভীরু মানবেরে প্রবল করিতে চাহেন যে দুনিয়াতে
তাঁরেই ইমাম নেতা বলি আমি, প্রেম মোর তারই সাথে।
আড়ষ্ট নরে বলিষ্ঠ করে যাঁর কথা যাঁর কাজ,
তাঁরই তরে সেনা সংগ্রহ করি, গড়ি তাঁরই শির-তাজ!
গরিবের ঈদ আসিবে বলিয়া যে আত্মা রোজা রাখে,
পরমাত্মার পরমাত্মীয় বলে আমি মানি তাঁকে।
অকল্যাণের দূত যারা, যারা মানুষের দুশমন,
তাদের সঙ্গে যে দুরন্তেরা করিবে ভীষণ রণ –
মোর আল্লার আদেশে তাদেরে ডাক দিই জমায়েতে,
অচেতন ছিল যারা, তারা আসিতেছে সে তীর্থপথে।
আমি তকবীর-ধ্বনি করি শুধু কর্ম-বধির কানে,
সত্যের যারা সৈনিক তারা জমা হবে ময়দানে!
অনাগত ‘নবযুগ’-সূর্যের তুর্য বাজায়ে যাই,
মৃত্যু বা কারাগারের কোনো ভয় দ্বিধা নাই।
একা ‘নবযুগ’-মিনারে দাঁড়ায়ে কাঁদিয়া সকলে ডাকি,
দরমার হাঁস না আসে, আসিবে মুক্তপক্ষ পাখি।
এ পথে ভীষণ বাজপাখি আর নিঠুর ব্যাধের ভীতি,
আলোক-পিয়াসি পাখিরা তবুও আসিছে গাহিয়া গীতি।মৃত্যু-ভয়াক্রান্ত আজিকে বাংলার নরনারী,
তাদের অভয় দিতেই আমরা ধরিয়াছি তরবারি।
আমরা শুনেছি ভীত আত্মার সকরুণ ফরয়্যাদ,
আমরা তাদেরে রক্ষা করিব, এ যে আল্লার সাধ!
আমরা হুকুম-বর্দার তাঁর পাইয়াছি ফরমান,
ভীত নর-নারী তরে অকাতরে দানিব মোদের প্রাণ!
বাজাই বিষাণ উড়াই নিশান ঈশান-কোণের মেঘে,
প্রেম-বৃষ্টি ও বজ্র-প্রহারে আত্মা উঠিবে জেগে!
রাজনীতি করে তৈরি মোদের কুচকাওয়াজের পথ,
এই পথ দিয়ে আসিবে দেখিয়ো আবার বিজয়-রথ।
প্রবল হওয়ার সাধ ও সাধনা যাহাদের প্রাণে আছে,
তাদেরই দুয়ারে হানা দিই আমি, আসি তাহাদেরই কাছে।
সঙ্ঘবদ্ধ হতেছে তাহারা বঙ্গভূমির কোলে,
আমি দেখিয়াছি পূর্ণচন্দ্র তাদেরই ঊর্ধ্বে দোলে! (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/nittyo-probol-hou/
|
3288
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নম্রতা
|
নীতিমূলক
|
কহিল কঞ্চির বেড়া, ওগো পিতামহ
বাঁশবন, নুয়ে কেন পড় অহরহ?
আমরা তোমারি বংশে ছোটো ছোটো ডাল,
তবু মাথা উঁচু করে থাকি চিরকাল।
বাঁশ কহে, ভেদ তাই ছোটোতে বড়োতে,
নত হই, ছোটো নাহি হই কোনোমতে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nomrota/
|
2126
|
মহাদেব সাহা
|
কে
|
প্রেমমূলক
|
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়
বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন
জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান,
কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?
তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা
কে চায় তাহলে আর মানপত্র তোমার হাতের চিঠি পেলে,
তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া
তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো,
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ
কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন,
তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা
বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়,
কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%ac/
|
4124
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
কষ্টগুলো আমারি থাক
|
প্রেমমূলক
|
আমার কষ্টগুলো আমারি থাক
বৃষ্টিগুলো আমার চোখ দিয়েই ঝরুক
ঝর্ণার জলগুলো শুধু আমার হৃদয় দিয়েই বের হোক
সকল জল মিলে ঢেউ উঠলে আমার মনেই উঠুক
আর সেই ঢেউয়ে ভেসে গেলে আমিই যাই।
এ কষ্টের জীবনে অন্যকে জড়িয়ে কি লাভ?
চোখ দিয়ে ঝরা জলের মূল্য যে কত
তা হয়তোবা কোনদিন কল্পনাও করতে পারবেনা
তাই আমিও চাইনা এ নিয়ে ভেবে কারো মাথার উপর
আবার পুরো আকাশটা ভেঙ্গে পড়ুক,
মেঘে ঢেকে চোখ দুটি অন্ধ হোক।
.
সুখের নরম ছোঁয়ায় তোমার হৃদয়ে আবেগের ঝর্ণা বহুক
মুখে চাঁদের হাসিতে চারিদিকে আলোকিত হোক
আমি সব সময় তোমার হৃদয়ে আনন্দের বন্যা দেখতে চাই
যা ছড়িয়ে তোমার পুরো শরীরে ভালবাসার ছোঁয়া লাগুক
পাখিদের গানে গানে মনটা আনন্দে ভরে উঠুক
হাসনাহেনার গন্ধে তোমার চারিপাশ শুভাসিত হোক
জ্যোৎস্না রাতের আলোতে চোখ দু’টি পুলকিত হোক।
.
আর দুনিয়ার যত হতাশা এসে আমাকে জাপটে ধরুক
নষ্ট লোকের মস্ত অপবাদ আমার উপরই লাগুক
রাস্তার যত আবর্জনা এসে আমার শরীরে লাগুক
আমি চাইনা এ আবরণ আমাকে ছাড়িয়ে অন্য কারো শরীরে
স্পর্শ করুক, ব্যাকটেরিয়া লেগে পচন ধরুক,
গোধূলি লগণের আন্ধকারের আবহন চোখে পড়ুক।
.
রংধনুর সাত রঙে তোমার হৃদয়ে ভালবাসার রঙ লাগুক
তবুও তুমি সুখেই থাক, সুখ নিয়েই ভাব
কখনও কষ্টে জর্জরিত এই নষ্ট মনে হানা দিও না।
আমার কষ্টগুলো আমারি থাক
বৃষ্টিগুলো সব আমার চোখ দিয়েই ঝরুক
ঝর্ণার জলগুলো আমার হৃদয় দিয়েই বের হোক
তবুও তোমার হৃদয়ে বিন্দুমাত্র কালো ছায়া স্পর্শ না করুক।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2100.html
|
4570
|
শামসুর রাহমান
|
কাক কাহিনী
|
রূপক
|
একজন কাকের কাহিনী এ শহরে অনেকেই
জানে, গাঁও গেরামেও তার কিছু পরিচিতি আছে
বলে শুনি একদা প্রভাবশালী এই কাক খুব
সাধ করে একটি কোকিল হতে চেয়েছিল, ফলে
চাতুর্য শানিয়ে বোকা বানিয়ে গায়ক পাখিদের
সহজে তাদের ঝানু পুরোহিত সেজে গেলো আর
তার তাঁবেদারি করবার কোকিলের অনটন
হলো না কোথাও, দেখি তার জমজমাট প্রসার।অথচ কাকের খাসলত আগের মতোই থাকে
নোংরা ঘাঁটে, আঁস্তাকুড়ে ঘোরে দিনরাত
ভীষণ কর্কশ ডাকে যথারীতি; প্রতিপত্তি কমে
যাওয়ার দরুণ আজ কোকিল, দোয়েল শ্যামা পাখি,-
যাকে পায় তাকেই ঠোকর মারে তীব্র হিংস্রতায়;
তবুও হয় না বন্ধ সুরমও পাখিদের গান। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kak-kahini/
|
526
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সাবধানী ঘণ্টা
|
মানবতাবাদী
|
রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা।
রুধির-নদীর পার হতে ওই ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা!
বন্ধু গো, সখা, আজি এই নব জয়-যাত্রার আগে
দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে
বন্ধু তোমার ; দাও দাদা দাও তব রূপ-মসি ছানি
অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি!
তোমার নীচতা, ভীরুতা তোমার, তোমার মনের কালি
উদ্গারো সখা বন্ধুর শিরে ; তব বুক হোক খালি!
সুদূর বন্ধু, দূষিত দৃষ্টি দূর করো, চাহো ফিরে,
শয়তানে আজ পেয়েছে তোমায়, সে যে পাঁক ঢালে শিরে!
চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা,
যে ভোগানন্দ দাসেদেরে গালি হানিয়াছ দুই বেলা,
আজি তাহাদেরই বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি!
বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালোবাসিয়াছ বাঁদরামি!
হে অস্ত্রগুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,
পাণ্ডবে দিয়া জয়কেতু, হলে কুক্কুর-কুরু-নেতা!
ভোগ-নরকের নারকীয় দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী,
হারামানন্দে হেরেমে ঢুকেছ হায় হে ব্রহ্মচারী!
তোমার কৃষ্ণ রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত,
সে কমল ঘিরি নেচেছে মরাল কত সহস্র শত, –
কোথা সে দিঘির উচ্ছল জল, কোথা সে কমল রাঙা,
হেরি শুধু কাদা, শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা!
সেই কাদা মাখি চোখে মুখে তুমি সাজিয়াছ ছি ছি সং,
বাঁদর-নাচের ভালুক হয়েছ, হেসে মরি দেখে ঢং।
অন্ধকারের বিবর ছাড়িয়া বাহিরিয়া এসো দাদা,
হেরো আরশিতে – বাঁদরের বেদে করেছে তোমায় খ্যাঁদা!
মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি,
ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানি!
যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভালো, করিয়াছে পূজা নিতি,
তাহাদের হানে অতি লজ্জার ব্যথা আজ তব স্মৃতি।
নপুংসক ওই শিখণ্ডী আজ রথের সারথি তব, –
হানো বীর তব বিদ্রুপ-বাণ, সব বুক পেতে লব
ভীষ্মের সম ; যদি তাহে শর-শয়নের বর লভি,
তুমি যত বল আমিই সে-রণে জিতিব অস্ত্র-কবি!
তুমি জান, তুমি সম্মুখ রণে পারিবে না পরাজিতে,
আমি তব কাল যশোরাহু সদা শঙ্কা তোমার চিতে,
রক্ত-অসির কৃষ্ণ মসির যে কোনো যুদ্ধে, ভাই,
তুমি নিজে জান তুমি অশক্ত, করিয়াছ শুরু তাই
চোরা-বাণ ছোঁড়া বেল্লিকপনা বিনামা আড়ালে থাকি
ন্যক্কার-আনা নপুংসকেরে রথ-সম্মুখে রাখি।
হেরো সখা আজ চারিদিক হতে ধিক্কার অবিরত
ছি ছি বিষ ঢালি জ্বালায় তোমার পুরানো প্রদাহ-ক্ষত!
আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভালো, মোর অপরাধ নহে!
কালীয়-দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালীদহে –
তাহার দাহ তা তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ
তাহারা নাচুক জ্বলুনির চোটে। তুমি পাও কোন সুখ?
দগ্ধ-মুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি!
শিব সুন্দর সত্য তোমার লভিল একী এ গতি?
যদিই অসতী হয় বাণী মোর, কালের পরশুরাম
কঠোর কুঠারে নাশিবে তাহারে, তুমি কেন বদনাম
কিনিছ বন্ধু, কেন এত তব হিয়া দগদগি জ্বালা? –
হোলির রাজা কে সাজাল তোমারে পরায়ে বিনামা-মালা?
তোমার গোপন দুর্বলতারে, ছি ছি করে মসিময়
প্রকাশিলে, সখা, এইখানে তব অতি বড়ো পরাজয়।
শতদল-দলে তুমি যে মরাল শ্বেত-সায়রের জলে।
ওঠো সখা, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুনঃ,
নিন্দার নহ, নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুনো।
ওঠো সখা, ওঠো, লহো গো সালাম, বেঁধে দাও হাতে রাখি,
ওই হেরো শিরে চক্কর মারে বিপ্লব-বাজপাখি!
অন্ধ হোয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহো –
ঘনায় আকাশে অসন্তোষের নিদারুণ বারিবাহ।
দোতালায় বসি উতাল হোয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী,
এ নহে কৌরব, এ কাঁদন উঠে নিখিল-মর্ম ছানি।
বিদ্রুপ করি উড়াইবে এই বিদ্রোহ-তেঁতো জ্বালা?
সুরের তোমরা কী করিবে তবু হবে কান ঝালাপালা
অসুরের ভীম অসি-ঝনঝনে, বড়ো অসোয়াস্তি-কর!
বন্ধু গো, এত ভয় কেন? আছে তোমার আকাশ-ঘর!
অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,
গোপীনাথ মলো? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি
বারীন* ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা,
লাল বাংলার হুমকানি,– ছি ছি, এত অসত্য ও মা,
কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!
সখী গো, আমায় ধরো ধরো! মাগো, কত জানে এরা ছল!
সই লো, আমার কাতুকুতু ভাব হয়েছে যে, ঢলে পড়ি
আঁচলে জড়ায়ে পা চলে না গো, হাত হতে পড়ে ছড়ি!
শ্রমিকের গাঁতি, বিপ্লব-বোমা, আ মলো তোমরা মরো!
যত সব বাজে বাজখাঁই সুর, মেছুনি-বৃত্তি ধরো!
যারা করে বাজে সুখভোগ ত্যাগ, আর রাজরোষে মরে,
ওই বোকাদের ইতর ভাষায় গালি দাও খুব করে।
এই ইতরামি, বাঁদরামি-আর্ট আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে
হন্যে কুকুর পেট পালো আর হাউ হাউ মরো কেঁদে?
এই নোংরামি করে দিনরাত বল আর্টের জয়!
আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ ভ্যাংচানো কয়!
আপনার নাক কেটে দাদা এই পরের যাত্রা ভাঙা
ইহাই হইল আদর্শ আর্ট, নাকি-সুর, কান রাঙা!
আর্ট ও প্রেমের এই সব মেড়ো মাড়োয়ারি দলই জানে,
কোনো বিদ্রোহ অসন্তোষের রেখা নাই কোনোখানে!
সব ভুয়ো দাদা, ও-সবে দেশের কিছুই হইবে নাকো,
এমনই করিয়া জুতো খাও আর মলমল-মল মাখো! –জ্ঞান-অঞ্জন-শলাকা তৈরি হতেছে এদের তরে,
দেখিবে এদের আর্টের আঁটুনি একদিনে গেছে ছড়ে!
বন্ধু গো! সখা! আঁখি খোলো, খোলো শ্রবণ হইতে তুলা,
ওই হেরো পথে গুর্খা-সেপাই উড়াইয়া যায় ধুলা!
ওই শোনো আজ ঘরে ঘরে কত উঠিতেছে হাহাকার,
ভূধর প্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার!
তোমার আর্টের বাঁশরির সুরে মুগ্ধ হবে না এরা,
প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আটশালা হবে ন্যাড়া!
প্রেমও আছে সখা, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনই ঠাঁই,
ভালো নাহি লাগে, ভালো ছেলে হয়ে ছেড়ে যাও, মানা নাই!
আমি বলি সখা, জেনে রেখো মনে কোনো বাতায়ন-ফাঁকে
সজিনার ঠ্যাঙা সজনিরই মতো হাতছানি দিয়ে ডাকে।
যত বিদ্রুপই করো সখা, তুমি জান এ সত্য-বাণী,
কারুর পা চেটে মরিব না; কোনো প্রভু পেটে লাথি হানি
ফাটাবে না পিলে, মরিব যেদিন মরিব বীরের মতো,
ধরা-মা-র বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত!
আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস!
ততদিন সখা সকলের সাথে করে নাও পরিহাস! (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sabdhani-ghonta/
|
4822
|
শামসুর রাহমান
|
তোমারই পদধ্বনি
|
স্বদেশমূলক
|
এই লেখা উঠে এসেছে তোমার স্বদেশের বুক থেকে,
এই খেলা উঠে এসেছে এ দেশের প্রতিটি নদী থেকে,
যে সব নদী তরঙ্গায়িত হতো তোমার শিরা উপশিরায়,
এই খেলা উঠে এসেছে সেসব ক্ষেত থেকে,
যাদের ফসলের ঢেউ ধারণ করতো তোমার হৃদয়।এই লেখা উঠে এসেছে তোমার প্রাণের স্বদেশের
গাছের শেকড়, পাখির বাসা, মাছের চোখ,
কৃষকের চঞ্চল লাঙল, শ্রমিকের শ্রমনিষ্ঠ হাত,
শত শত শহীদের জনক জননীর বিলাপ
বিচ্ছেদকাতর পক্ষিণীর মতো জীবন সঙ্গিনীর দীর্ঘশ্বাস,
আর
সন্তানের আর্তনাদ থেকে।এই লেখা উঠে এসেছে সেই সিঁড়ি থেকে,
যেখানে পড়েছিলো ঘাতকের গুলিবিদ্ধ তোমার লাশ,
এই লেখা উঠে এসেছে তোমার বুক জোড়া রক্তাক্ত
গোলাপ থেকে
বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া নব পরিণীতার
মেহদি-রাঙা হাত এবং
শিশুর নেকড়ে খোবলানো শরীর থেকে।তোমার দিকে ওরা ছুঁড়ে দিয়েছিলো মৃত্যু,
কিন্তু ওরা জানতো না,
কোনো কোনো মৃত্যু জীবনের চেয়েও সতেজ মহিমান্বিত,
তোমার মৃত্যুর কাছে কোটি কোটি জীবন আজো নতজানু,
তোমার গুলিবিদ্ধ শরীর এখনো
রাজপথ-উপচে-পড়া মিছিলের সামনে।
যেখানে সমাজ বদলে ফেলার প্রেরণাময় বাঙ্ময় হয়
কোনো তরুণ কণ্ঠ, সেখানে বেজে ওঠে তোমার কণ্ঠস্বর,
যেখানে বুলেটের আঘাতে ঢলে পড়ে কোনো সংগ্রামীর
শরীর,
যেখানে আবার লাফিয়ে পড়ে তোমার দীর্ঘ, ঋজু দেহ,
যেখানে প্রতিবাদে উত্তোলিত হয় বাহুর অরণ্য,
সেখানে সবচেয়ে উঁচু তোমার সূর্যঝলসিত হাত।
এমন কোনো হাই-রাইজ দালান নেই এই শহরে,
যা তোমার উচ্চতাকে খর্ব করতে পারে।
এইতো আমরা দেখছি রৌদ্রময় মাঠে মধ্যবয়সী
কৃষকের সঙ্গে তুমি লাঙল ঠেলছো কড়া-পড়া হাতে,
এইতো তুমি খালি পায়ে এবড়ো খেবড়ো জমিনে হেঁটে
হেঁটে
গুণ টানছো নদীতে, দাঁড় বাইছো মাঝির সঙ্গে,
কারখানার চাকা ঘোরাচ্ছো মজুরের সঙ্গে
কাদায় দেবে-যাওয়া চাকা ঠেলে তুলছো গাড়িয়াল
ভাইয়ের
হাতে হাত লাগিয়ে;
সুন্দর ও কল্যাণের স্বপ্ন দেখছো
ওডেসিউসের মতো বেরিয়ে পড়েছো নব অভিযানে।
আদর্শবাদী তরুণের স্বপ্নে মিশে গিয়ে। এইতো তুমি
কসাইখানাকে ফুলের বাগান বানানো যার সাধনা,
তুমি সেই সাধনার অকম্পিত শিখা।
তোমাকে ওরা অবজ্ঞায়, অপমানে, অবহেলায়
ঠেলে দিয়েছিলো এই বাংলার অজ পাড়াগাঁয়ে
এক কবরে, অথচ আজ চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে
তোমারই পদধ্বনি, আলো-জাগানো ভাস্বর পদধ্বনি। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomari-pododhoni/
|
56
|
আবদুল গাফফার চৌধুরী
|
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
|
স্বদেশমূলক
|
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু ঝরা এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2613.html
|
639
|
জয় গোস্বামী
|
ওই কালস্রোত
|
চিন্তামূলক
|
ওই কালস্রোত। আমি
সিমেন্ট বাঁধানো পাড় থেকে
হাত ডোবাই।
আমার আঙুল গলে যায়। কব্জি, বাহু
গলে যায়। ঘাড়ের উপরে মুণ্ডু নিয়ে
আমি হাত-পা-কাটে জগন্নাথ
নদী-নালা আঁকা এক ঘুরন্ত বলের পিঠে
বসে থাকি।
শূন্যে পাক খাই।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1725
|
303
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
চল্ চল্ চল্
|
মানবতাবাদী
|
চল্ চল্ চল্
ঊর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণী-তল
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল্ রে চল্ রে চল্
চল্ চল্ চল্।।
ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত
আমরা টুটিব তিমির রাত
বাঁধার বিন্ধ্যা চল।।
নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশশ্মান
আমরা দানিব নতুন প্রাণ
বাহুতে নবীন বল।।
চলরে নওজোয়ান
শোনরে পাতিয়া কান-
মৃত্যু-তোরণ-দুয়ারে-দুয়ারে
জীবনের আহ্বান
ভাঙ্গরে ভাঙ্গ আগল
চল্ রে চল্ রে চল্
চল্ চল্ চল্।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/cholcholchol/
|
2767
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আহ্বান
|
প্রকৃতিমূলক
|
জ্বেলে দিয়ে যাও সন্ধ্যাপ্রদীপ
বিজন ঘরের কোণে।
নামিল শ্রাবণ, কালো ছায়া তার
ঘনাইল বনে বনে।বিস্ময় আনো ব্যগ্র হিয়ার পরশ-প্রতীক্ষায়
সজল পবনে নীল বসনের চঞ্চল কিনারায়,
দুয়ার-বাহির হতে আজি ক্ষণে ক্ষণে
তব কবরীর কবরীমালার বারতা আসুক মনে।বাতায়ন হতে উৎসুক উই আঁখি
তব মঞ্জীর-ধ্বনি পথ বেয়ে
তোমারে কি যায় ডাকি।কম্পিত এই মোর বক্ষের ব্যথা
অলকে তোমার আনে কি চঞ্চলতা
বকুলবনের মুখরিত সমীরণে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ahuban/
|
1277
|
জীবনানন্দ দাশ
|
হিন্দু-মুসলমান
|
মানবতাবাদী
|
মহামৈত্রীর বরদ-তীর্থে-পুণ্য ভারতপুরে
পূজার ঘন্টা মিশিছে হরষে নমাজের সুরে সুরে!
আহ্নিক হেথা শুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে,
মুয়াজ্জেনের উদাস ধ্বনিটি গগনে গগনে বাজে,
জপে ঈদগাতে তসবি ফকির, পূজারী মন্ত্র পড়ে,
সন্ধ্যা-উষার বেদবাণী যায় মিশে কোরানের স্বরে;
সন্ন্যাসী আর পীর
মিলে গেছে হেথা,-মিশে গেছে হেথা মসজিদ , মন্দির!
কে বলে হিন্দু বসিয়া রয়েছে একাকী ভারত জাঁকি?
-মুসলমানের হস্তে হিন্দু বেঁধেছে মিলন-রাখী;
আরব মিশর তাতার তুর্কী ইরানের চেয়ে মোরা
ওগো ভারতের মোসলেমদল,- তোমাদের বুক-জোড়া!
ইন্দ্রপ্রস্থ ভেঙেছি আমরা,- আর্যাবর্ত ভাঙি
গড়েছি নিখিল নতুন ভারত নতুন স্বপনে রাঙি!
-নবীন প্রাণের সাড়া
আকাশে তুলিয়া ছুটিছে মুক্ত যুক্তবেণীর ধারা!
রুমের চেয়েও ভারত তোমার আপন,- তোমার প্রাণ!
-হেথায় তোমার ধর্ম অর্থ,- হেথায় তোমার ত্রাণ;
হেথায় তোমার আসান ভাই গো, হেথায় তোমার আশা;
যুগ যুগ ধরি এই ধূলিতলে বাঁধিয়াছ তুমি বাসা,
গড়িয়াছ ভাষা কল্পে কল্পে দরিয়ার তীরে বসি,
চক্ষে তোমার ভারতের আলো,-ভারতের রবি, শশী,
হে ভাই মুসলমান,
তোমাদের তরে কোল পেতে আছে ভারতের ভগবান!
এ ভারতভূমি নহেকো তোমার, নহকো আমার একা,
হেথায় পড়েছে হিন্দুর ছাপ,- মুসলমানের রেখা;
-হিন্দু মনীষা জেগেছে এখানে আদিম উষার ক্ষণে,
ইন্দ্রদ্যুম্নে উজ্জয়িনীতে মথুরা বৃন্দাবনে!
পাটলিপুত্র শ্রাবস্তী কাশী কোশল তক্ষশীলা।
অজন্তা আর নালন্দা তার রটিছে কীর্তিলীলা!
-ভারতী কমলাসীনা
কালের বুকেতে বাজায় তাহার নব প্রতিভার বীণা!
এই ভারতের তখতে চড়িয়া শাহানশাহার দল
স্বপ্নের মণি-প্রদীপে গিয়েছে উজলি আকাশতল!
-গিয়েছে তাহার কল্পলোকের মুক্তার মালা গাঁথি,
পরশে তাদের জেগেছে আরব- উপন্যাসের রাতি!
জেগেছে নবীন মোগল-দিল্লি,-লাহোর,-ফতেহপুর,
যমুনাজলের পুরানো বাঁশিতে বেজেছে নবীন সুর!
নতুন প্রেমের রাগে
তাজমহলের তরুণিমা আজো ঊষার আরুণে জাগে!
জেগেছে হেথায় আকবরী আইন,-কালের নিকষ কোলে
বারবার যার উজল সোনার পরশ উঠিল জ্বলে!
সেলিম,-শাজাহাঁ,- চোখের জলেতে এক্শা করিয়া তারা
গড়েছে মীনার মহলা স্তম্ভ কবর ও শাহদারা!
-ছড়ায়ে রয়েছে মোঘল ভারত,- কোটি সমাধির স্তূপ
তাকায়ে রয়েছে তন্দ্রাবিহীন,-অপলক অপরূপ!
-যেন মায়াবীর তুড়ি
স্বপনের ঘোরে ত্বব্ধ করিয়া রেখেছে কনকপুরী!
মোতিমহলের অযুত রাত্রি,- লক্ষ দীপের ভাতি
আজিও বুকের মেহেরাবে যেন জ্বালায়ে যেতেছে বাতি!
-আজিও অযুত বেগম-বাঁদীর শষ্পশয্যা ঘিরে
অতীত রাতের চঞ্চল চোখ চকিতে যেতেছে ফিরে!
দিকে দিকে আজো বেজে ওঠে কোন্ গজল-ইলাহী গান!
পথ-হারা কোন্ ফকিরের তানে কেঁদে ওঠে সারা প্রাণ!
-নিখিল ভারতময়
মুসলমানের স্বপন-প্রেমের গরিমা জাগিয়া রয়!
এসেছিল যারা ঊষর ধুসর মরুগিরিপথ বেয়ে,
একদা যাদের শিবিরে- সৈন্যে ভারত গেছিল ছেয়ে,
আজিকে তাহারা পড়শি মোদের,- মোদের বহিন-ভাই;
-আমাদের বুকে বক্ষে তাদের,-আমাদের কোলে ঠাঁই
‘কাফের’ ‘যবন’ টুটিয়া গিয়াছে,- ছুটিয়া গিয়াছে ঘৃণা,
মোস্লেম্ বিনা ভারত বিফল,- বিফল হিন্দু বিনা;
-মহামৈত্রীর গান
বাজিছে আকাশে নব ভারতের গরিমায় গরীয়ান!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/909
|
4721
|
শামসুর রাহমান
|
জনৈক সহিসের ছেলে বলছে
|
চিন্তামূলক
|
ঘোড়ার নালের মতো চাঁদ
ঝুলে আছে আকাশের বিশাল কপাটে, আমি একা
খড়ের গাদার শুয়ে ভাবি
মুমূর্ষু পিতার কথা, যার শুকনো প্রায়-শব প্রায় অবাস্তব
বুড়োটে শরীর
কিছুকাল ধরে যেন আঠা দিয়ে সাঁটা
বিছানায়। গতায়ু হবেন যিনি আজ কিংবা কাল,
অথবা বছর ঘরে, আপাতত ভাবছি তাঁকেই,
তাঁকেই ভাবছি যিনি ঘোড়াকে জরুর মতো ভালোবেসেছেন
আজীবন। মুমূর্ষু পিতার চোখে তরুণ ঘোড়ার
কেশরের মতো মেঘ জমে প্রতিক্ষণ। মাঝে-মাঝে
তাঁকে কেন যেন
দুর্বোধ্য গ্রন্থের মতো মনে হয়, ভাষা যার আকাশ-পাতাল
এক করলেও, মাথা খুঁড়ে মরলেও
এক বর্ণ বুঝি না কখনও।“জকির শার্টের মতো ছিল দিন একদা আমারও,
রেসের মাঠের সব কারচুপি নখের আয়নায়
সর্বদা বেড়াতো ভেসে। প্রতিদিন গলির দোকানে
ইয়ার বন্ধুর সাথে চায়ের অভ্যস্ত পেয়ালায়
দিয়েছি চুমুক সুখে। বিড়ির ধোঁয়ায় নানারঙ
পরীরা নেচেছে ঘুরে আর অবেলায়
কোথাও অশেষ স্বপ্ন ভাড়া পাওয়া যাবে ভেবে কতো
অলিগলি বেড়িয়েছি চষে আর রাতের বাতাসে
উড়িয়ে রুমাল হেসে শক্রতা, ব্যর্থতা ইত্যাদিকে
কাফন পরিয়ে
আপাদমস্তক
‘বলোতো তোমরা কেউ স্বপ্ন ভাড়া দেবে’-
বলে তীব্র কণ্ঠস্বরে মাথায় তুলেছি পাড়া, ভাগ্যদোষে পাইনি উত্তম।
“রাজা-রাজড়ার দিন নেই আর ছাপার হরফে
কত কিছু লেখা হয়, কানে আসে। ছোটো-বড়ো সব
এক হয়ে যাবে নাকি আগামীর সখের নাটকে!
বর্তমানে এ দেশের স্ত্রী-পুরুষ সাপের পাঁচ পা
হঠাৎ দেখেছে যেন। দিনগুলি হিস্টিরিয়া রোগী”-কখন ও মুমূর্ষু পিতা ঘোড়ার উজ্জ্বল পিঠ ভেবে
সস্নেহে বুলোন হাত অতীতের বিস্তৃত শরীরে।
মাঝে-মাঝে গভীর রাত্তিতে
দেখেন অদ্ভুত স্বপ্নঃ কে এক কৃষ্ণাঙ্গ ঘোড়া উড়িয়ে কেশর
পেরিয়ে সুদূর
আগুন রঙের মাঠ তাঁকে নিতে আসে।অথচ আমার স্বপ্নে রহস্যজনক ঘোড়া নয়,
কতিপয় চিম্নি, টালি, ছাদ, যন্ত্রপাতি, ফ্যাক্টরির
ধোঁয়ার আড়ালে ওড়া পায়রার ঝাঁক
এবং একটি মুখ ভেসে ওঠে, আলোময় মেঘের মতোই
একটি শরীর
আমার শরীর মেশে, আমি স্বপ্নে মিশি,
রুপালি স্রোতের মতো স্বপ্ন কতিপয়
আমার শরীরে মেশে, আমি মিশি, স্বপ্ন মেশে, আমাকে নিয়ত
একটু একটু করে স্বপ্ন গিলে ফেলে। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jonoik-sohiser-chele/
|
2056
|
মহাদেব সাহা
|
আমার কণ্ঠ কেউ থামাতে পারবে না
|
মানবতাবাদী
|
যতোই চাও না কেন আমার কন্ঠ তুমি থামাতে পারবে না,
যতোই করবে রুদ্ধ ততোই দেখবে আমি ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময়।
আমার কন্ঠকে কেউ কোনোদিন থামাতে পারেনি যেমন পারেনি
কেউ কোনো কালে ঠেকাতে অরুনোদয়,
চাও বা না চাও নৈঃশব্দ্যেও যদি কান পাতো
শুনবে আমারই কণ্ঠস্বর।
কীভাবে আমার কণ্ঠ সম্পূর্ণ রাখবে রুদ্ধ করে
আমি তো পাখির কলস্বরে হই উচ্চারিত,
কখনো নদীর শব্দে কখনোবা শস্যক্ষেতে বাতাসের ছন্দে
বেজে উঠি
আমার নিষিদ্ধ কণ্ঠ দেখবে তুমুল ওঠে বেজে,
আমার কণ্ঠকে কেউ থামাতে পারেনি, পারবে না।
আমাকে নিষিদ্ধ করে লাব নেই, আমি নিষেধ মানি না
সমস্ত নিষিদ্ধ পোস্টার আমি লাগিয়েছি বুকে, কেউ
সরাতে পারেনি
আমার কণ্ঠেই তবু অবিরাম স্বৈরাচারবিরোধী কবিতা;
তোমাদের সাধ্য নেই আমার কণ্ঠকে কেউ রুদ্ধ করে রাখো।
তোমাদের কোনো অস্ত্রে আমার কণ্ঠকে তুমি থামাতে পারবে না
যতোই আমাকে তুমি পরাবে মিকল, যতোই করবে রুদ্ধ
এই কণ্ঠস্বর,
দেখবে ততোই আমি শব্দহীন নীলিমার মতো ধ্বনি-
প্রতিধ্বনিময়, বিচ্ছুরিত
আমার কণ্ঠকে তাই ঠেকাতে পারবে না, কখনো পারবে না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1433
|
5146
|
শামসুর রাহমান
|
যখন শুধাও তুমি
|
সনেট
|
যখন শুধাও তুমি, ‘হে বন্ধু কেমন আছো’, আমি
কী দেবো উত্তর ভেবে পাই না কিছুই। প্রশ্ন খুব
শাদাসিধে, তবু থাকি নিরুত্তর; যিনি অত্নর্যামী
তিনিই জানেন শুধু কী রকম আছে এ বেকুর
দুঃখজাগানিয়া জনশূন্য ধুধু চরে। এ কেমন
দীর্ঘ স্থায়ী পরবাস নিজেরই ভেতর? দীর্ঘ বেলা
কাটে জন্মান্ধের মতো। সমাধি ফলক, ঝাউবন,
উন্মাদ আশ্রয়, শূন্য ঘর চেতনায় করে খেলাএসব কিছুই আমি বলি না তোমাকে। প্রায়শই
তোমার মুখের দিকে চেয়ে থাকি চুপচাপ, কথা
সামান্যই বলি, বলি, ‘ভালো আছি’। গূঢ় চঞ্চলতা
গোপন শিরায় জাগে, মনোকষ্ট ব্যাকুল লুকোই।
মৃতের রহস্যময় চোখ আমার নিকটে আসে
লাফাতে লাফাতে, অশ্রুকণা পড়ে থাকে বুনো ঘাসে। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jokhon-shudhao-tumi/
|
4433
|
শামসুর রাহমান
|
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ
|
রূপক
|
(আবদূর রাজ্জাক খান বন্ধু বরেষু)শেষ-হয়ে-আসা অক্টোবরে
শীতের দুপুরে নিউইয়র্কের অরচার্ড স্ট্রিটে ঘুরে ঘুরে
একটি দোকান দেখি মায়াপুরী, দোকানি ওয়াল্ট ডিজনির
আশ্চর্য ডবল, বলা যায়। দিলেন পরিয়ে গায়ে
স্মিত হেসে সহজ নৈপুণ্যে নীল একটি ব্লেজার। ব্লেজারের
বুকে জাগে অরণ্যের গহন শ্যামলপ্রসূ, সরোবর-উদ্ভুত অমর্ত্য
দূরায়নী তান।
সুনীল ব্লেজার ঝুলে আছে
আলনায়, কাঠের হ্যাংগারে একা আমার পুরানো ম্লান ঘরে
মালার্মের কবিতার স্তবকের মতো নিরিবিলি,
অথচ সংগীতময় সর্বক্ষণ অস্তিত্বের পরতে পরতে।
নানান সামগ্রী ঘরে থরে থরে, কিছু এলোমেলো; সামগ্রীর ভিড়ে
সুনীল ব্লেজার যেন বহু গদ্য-লেখকের মাঝে
বড় একা একজন কবি।
ব্লেজারের দিকে চোখ যায়
যখন তখন, দেখি সে আছে নিভৃত অহংকারে,
থাকার আনন্দে আছে, নিজের মতন
আছে; বলে সান্দ্র স্বরে, ‘এই যে এখানে আছি, এই
থাকা জানি নিজেই তাৎপর্যময় খুব’। এ মুহূর্তে
যদি ছুঁই তাকে, তবে মর্মরিত হবে সে এখন, উঠবে জেগে
স্বপ্ন-সুদূরতা থেকে।কখনো ব্লেজার কৌতূহলে
দ্রুত জেনে নিতে চায় তরুণ রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরী দেবীকে কখনো
তীব্র চুমো খেয়েছেন কিনা জোড়াসাঁকোর ডাগর অভিজাত
পূর্ণিমায়,
নব্য কবিসংঘ কী পুরাণ নিয়ত নির্মাণ করে মেধার কিরণে আর
শীতার্ত পোল্যান্ড আজ ধর্মঘটে রূদ্ধ কিনা কিংবা কোন
জলাভূমিতে গর্জায়
গেরিলার স্টেনগান, হৃদয়ের মগ্নশিলা, আর্ত চাঁদ
ইত্যাদিও জানা চাই তার।ভোরবেলা ঘন
কুয়াশার তাঁবুতে আচ্ছন্ন চোখ কিছুটা আটকে গেলে তার
মনে হয় যেন সে উঠেছে জেগে সুদূর বিদেশে
যেখানে এখন কেউ কারো চেনা নয়, কেউ কারো
ভাষা ব্যবহার আদৌ বোঝে না; দেখে সে
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।কোথায় পাগলাঘণ্টি বাজে
ক্রমাগত, এলোমেলো পদধ্বনি সবখানে। হামলাকারীরা
ট্রাম্পেট বাজিয়ে ঘোরে শহরে ও গ্রামে
এবং ক্রন্দনরত পুলিশের গলায় শুকায় বেল ফুল।
দশদিকে কত রকাডেমিতে নিশীথে
গোর-খোদকেরা গর্ত খোঁড়ে অবিরত, মানুষের মুখগুলি
অতি দ্রুত হয়ে যাচ্ছে শিম্পাঞ্জির মুখ।গালিবের জোব্বা,
দিল্লির সূর্যাস্ত যেন, রবীন্দ্রনাথের আলখাল্লা অনুপম,
মৌলানা রুমির খিরকা, বোদলেয়ারের মখমলি
কালো কোট দুলে ওঠে আমার সুনীল ব্লেজারের কাছাকাছি।
কিছু অসন্তোষ গাঁথা সুতোয়, বিশদ কারুকাজে;
ইতিহাসবিদ্বেষী ব্লেজার পুণ্য নীল পদ্ম অকস্মাৎ,
অবাধ স্বাতন্ত্র্য চায় ব্যাপক নির্মুখতায় আজ।নষ্ট হয়ে যাবে
ভেবে মাঝে মাঝে আঁৎকে ওঠে, টুপির মতন ফাঁকা
ভবিষ্যৎ কল্পনায় মূর্ত হয়ে কখনো কখনো,
কবরের অবরুদ্ধ গুহা তাকে চেটেপুটে খাবে
কোনো দিন, ভাবে সে এবং নীল পাখি হয়ে দূর
সিমেট্রির মিশকালো সাইপ্রেস ছেড়ে পলাশের রক্তাভায়
ব’সে গান গায়। (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/udvot-uter-pithe-choleche-swadesh/
|
3645
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভক্তি ও অতিভক্তি
|
নীতিমূলক
|
ভক্তি আসে রিক্তহস্ত প্রসন্নবদন—
অতিভক্তি বলে, দেখি কী পাইলে ধন।
ভক্তি কয়, মনে পাই, না পারি দেখাতে।—
অতিভক্তি কয়, আমি পাই হাতে হাতে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vokti-o-otivokti/
|
4144
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
ফিরে এসো
|
প্রেমমূলক
|
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশের রোদ্র হয়ে
চারিদিকে আলোকিত করে
এই হ্নদয়ের সকল ধোয়াশা দূর করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশে কুয়াশা হয়ে
নির্জন অন্ধকারে অতি গোপনে
আমায় ছুয়ে দিতে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশের বৃষ্টি হয়ে
চারিদিকে ভিজিয়ে দিয়ে
আমার হ্নদয় খানি সতেজ করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ অথৈই সাগরের জল হয়ে
চারিদিক প্লাবিত করে
আমার পুরো হ্নদয় ভরে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ রাত্রি বেলার অন্ধকার হয়ে
নির্জনে বলব কথা
অতি গোপনে গোপনে।
.
তুমি ফিরে এসো
দূর বিদেশের অতিথি পাখি
কত আপ্যায়ন করবো তোমায়
অনেক দিন পরে পেয়ে।
.
তুমি ফিরে এসো
বসন্তের কোকিলের গানের সূরে
শুনব তোমার মধুর সূর
হ্নদয় মন পুলকিত করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশে চাঁদ হয়ে
সারা রাত দেখব তোমায়
আকাশের দিকে তাকিয়ে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ জ্যোৎস্না রাতের জোনাকি হয়ে
দু’হাত দিয়ে ধরে রাখব তোমায়
জীবন জীবনের তরে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর বন-জঙ্গলের পাখি হয়ে
মনের খাঁচায় রাখব তোমায়
আজীবন বন্দি করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ ফুলের বাগানের গন্ধ হয়ে
সুভাষিত গন্ধে আমার
হ্নদয় খানি যাবে ভরে।
.
তুমি ফিরে এসো
চুর্ন বিচূর্ন এই হ্নদয়ে
ভাঙ্গা মনে লাগবে জোড়া
কোন দিনও যাবেনা ছিড়ে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2216.html
|
2879
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কর্ণ কুন্তি সংবাদ
|
গীতিনাটিকা
|
(কাব্যনাট্য)কর্ণ। পুণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যাসবিতার
বন্দনায় আছি রত। কর্ণ নাম যার
অধিরথসূতপুত্র, রাধাগর্ভজাত
সেই আমি-- কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ!কুন্তী। বৎস, তোর জীবনের প্রথম প্রভাতে
পরিচয় করায়েছি তোরে বিশ্ব-সাথে
সেই আমি, আসিয়াছি ছাড়ি সর্ব লাজ
তোরে দিতে আপনার পরিচয় আজ।কর্ণ। দেবী, তব নতনেত্রকিরণসম্পাতে
চিত্ত বিগলিত মোর, সূর্যকরঘাতে
শৈলতুষারের মতো। তব কণ্ঠস্বর
যেন পূর্বজন্ম হতে পশি কর্ণ-'পর
জাগাইছে অপূর্ব বেদনা। কহো মোরে
জন্ম মোর বাঁধা আছে কী রহস্য-ডোরে
তোমা সাথে হে অপরিচিতা!কুন্তী। ধৈর্য ধর্,
ওরে বৎস, ক্ষণকাল। দেব দিবাকর
আগে যাক অস্তাচলে। সন্ধ্যার তিমির
আসুক নিবিড় হয়ে।-- কহি তোরে বীর,
কুন্তি আমি।কর্ণ। তুমি কুন্তী! অর্জুনজননী!
কুন্তী। অর্জুনজননী বটে! তাই মনে গণি
দ্বেষ করিয়ো না বৎস। আজো মনে পড়ে
অস্ত্রপরীক্ষার দিন হস্তিনানগরে
তুমি ধীরে প্রবেশিলে তরুণকুমার
রঙ্গস্থলে, নক্ষত্রখচিত পূর্বাশার
প্রান্তদেশে নবোদিত অরুণের মতো।
যবনিকা-অন্তরালে নারী ছিল যত
তার মধ্যে বাক্যহীনা কে সে অভাগিনী
অতৃপ্ত স্নেহক্ষুধার সহস্র নাগিনী
জাগায়ে জর্জর বক্ষে-- কাহার নয়ন
তোমার সর্বাঙ্গে দিল আশিস্-চুম্বন।
অর্জুনজননী সে যে। যবে কৃপ আসি
তোমারে পিতার নাম শুধালেন হাসি,
কহিলেন "রাজকুলে জন্ম নহে যার
অর্জুনের সাথে যুদ্ধে নাহি অধিকার'--
আরক্ত আনত মুখে না রহিল বাণী,
দাঁড়ায়ে রহিলে, সেই লজ্জা-আভাখানি
দহিল যাহার বক্ষ অগ্নিসম তেজে
কে সে অভাগিনী। অর্জুনজননী সে যে।
পুত্র দুর্যোধন ধন্য, তখনি তোমারে
অঙ্গরাজ্যে কৈল অভিষেক। ধন্য তারে।
মোর দুই নেত্র হতে অশ্রুবারিরাশি
উদ্দেশে তোমারি শিরে উচ্ছ্বসিল আসি
অভিষেক-সাথে। হেনকালে করি পথ
রঙ্গমাঝে পশিলেন সূত অধিরথ
আনন্দবিহ্বল। তখনি সে রাজসাজে
চারি দিকে কুতূহলী জনতার মাঝে
অভিষেকসিক্ত শির লুটায়ে চরণে
সূতবৃদ্ধে প্রণমিলে পিতৃসম্ভাষণে।
ক্রূর হাস্যে পাণ্ডবের বন্ধুগণ সবে
ধিক্কারিল; সেইক্ষণে পরম গরবে
বীর বলি যে তোমারে ওগো বীরমণি
আশিসিল, আমি সেই অর্জুনজননী।কর্ণ। প্রণমি তোমারে আর্যে। রাজমাতা তুমি,
কেন হেথা একাকিনী। এ যে রণভূমি,
আমি কুরুসেনাপতি।কুন্তী। পুত্র, ভিক্ষা আছে--
বিফল না ফিরি যেন।কর্ণ। ভিক্ষা, মোর কাছে!
আপন পৌরুষ ছাড়া, ধর্ম ছাড়া আর
যাহা আজ্ঞা কর দিব চরণে তোমার।কুন্তী। এসেছি তোমারে নিতে।
কর্ণ। কোথা লবে মোরে!
কুন্তী। তৃষিত বক্ষের মাঝে-- লব মাতৃক্রোড়ে।
কর্ণ। পঞ্চপুত্রে ধন্য তুমি, তুমি ভাগ্যবতী,
আমি কুলশীলহীন ক্ষুদ্র নরপতি--
মোরে কোথা দিবে স্থান।
কুন্তী। সর্ব-উচ্চভাগে
তোমারে বসাব মোর সর্বপুত্র-আগে
জ্যেষ্ঠ পুত্র তুমি।
কর্ণ। কোন্ অধিকার-মদে
প্রবেশ করিব সেথা। সাম্রাজ্যসম্পদে
বঞ্চিত হয়েছে যারা মাতৃস্নেহধনে
তাহাদের পূর্ণ অংশ খণ্ডিব কেমনে
কহো মোরে। দ্যূতপণে না হয় বিক্রয়,
বাহুবলে নাহি হারে মাতার হৃদয়--
সে যে বিধাতার দান।
কুন্তী। পুত্র মোর, ওরে,
বিধাতার অধিকার লয়ে এই ক্রোড়ে
এসেছিলি একদিন-- সেই অধিকারে
আয় ফিরে সগৌরবে, আয় নির্বিচারে_
সকল ভ্রাতার মাঝে মাতৃ-অঙ্কে মম
লহো আপনার স্থান।কর্ণ। শুনি স্বপ্নসম,
হে দেবী, তোমার বাণী। হেরো, অন্ধকার
ব্যাপিয়াছে দিগ্বিদিকে, লুপ্ত চারি ধার--
শব্দহীনা ভাগীরথী। গেছ মোরে লয়ে
কোন্ মায়াচ্ছন্ন লোকে, বিস্মৃত আলয়ে,
চেতনাপ্রত্যুষে। পুরাতন সত্যসম
তব বাণী স্পর্শিতেছে মুগ্ধচিত্ত মম।
অস্ফুট শৈশবকাল যেন রে আমার,
যেন মোর জননীর গর্ভের আঁধার
আমারে ঘেরিছে আজি। রাজমাতঃ অয়ি,
সত্য হোক, স্বপ্ন হোক, এসো স্নেহময়ী
তোমার দক্ষিণ হস্ত ললাটে চিবুকে
রাখো ক্ষণকাল। শুনিয়াছি লোকমুখে
জননীর পরিত্যক্ত আমি। কতবার
হেরেছি নিশীথস্বপ্নে জননী আমার
এসেছেন ধীরে ধীরে দেখিতে আমায়,
কাঁদিয়া কহেছি তাঁরে কাতর ব্যথায়
"জননী, গুণ্ঠন খোলো, দেখি তব মুখ'--
অমনি মিলায় মূর্তি তৃষার্ত উৎসুক
স্বপনেরে ছিন্ন করি। সেই স্বপ্ন আজি
এসেছে কি পাণ্ডবজননীরূপে সাজি
সন্ধ্যাকালে, রণক্ষেত্রে, ভাগীরথীতীরে।
হেরো দেবী, পরপারে পাণ্ডবশিবিরে
জ্বলিয়াছে দীপালোক, এ পারে অদূরে
কৌরবের মন্দুরায় লক্ষ অশ্বখুরে
খর শব্দ উঠিছে বাজিয়া। কালি প্রাতে
আরম্ভ হইবে মহারণ। আজ রাতে
অর্জুনজননীকণ্ঠে কেন শুনিলাম
আমার মাতার স্নেহস্বর। মোর নাম
তাঁর মুখে কেন হেন মধুর সংগীতে
উঠিল বাজিয়া-- চিত্ত মোর আচম্বিতে
পঞ্চপাণ্ডবের পানে "ভাই' ব'লে ধায়।
কুন্তী। তবে চলে আয় বৎস, তবে চলে আয়।
কর্ণ। যাব মাতঃ, চলে যাব, কিছু শুধাব না--
না করি সংশয় কিছু না করি ভাবনা।
দেবী, তুমি মোর মাতা! তোমার আহ্বানে
অন্তরাত্মা জাগিয়াছে-- নাহি বাজে কানে
যুদ্ধভেরী, জয়শঙ্খ-- মিথ্যা মনে হয়
রণহিংসা, বীরখ্যাতি, জয়পরাজয়।
কোথা যাব, লয়ে চলো।
কুন্তী। ওই পরপারে
যেথা জ্বলিতেছে দীপ স্তব্ধ স্কন্ধাবারে
পাণ্ডুর বালুকাতটে।
কর্ণ। হোথা মাতৃহারা
মা পাইবে চিরদিন! হোথা ধ্রুবতারা
চিররাত্রি রবে জাগি সুন্দর উদার
তোমার নয়নে! দেবী, কহো আরবার
আমি পুত্র তব।কুন্তী। পুত্র মোর!
কর্ণ। কেন তবে
আমারে ফেলিয়া দিলে দূরে অগৌরবে
কুলশীলমানহীন মাতৃনেত্রহীন
অন্ধ এ অজ্ঞাত বিশ্বে। কেন চিরদিন
ভাসাইয়া দিলে মোরে অবজ্ঞার স্রোতে--
কেন দিলে নির্বাসন ভ্রাতৃকুল হতে।
রাখিলে বিচ্ছিন্ন করি অর্জুনে আমারে--
তাই শিশুকাল হতে টানিছে দোঁহারে
নিগূঢ় অদৃশ্য পাশ হিংসার আকারে
দুর্নিবার আকর্ষণে। মাতঃ, নিরুত্তর?
লজ্জা তব ভেদ করি অন্ধকার স্তর
পরশ করিছে মোরে সর্বাঙ্গে নীরবে--
মুদিয়া দিতেছে চক্ষু। থাক্, থাক্ তবে--
কহিয়ো না কেন তুমি ত্যজিলে আমারে।
বিধির প্রথম দান এ বিশ্বসংসারে
মাতৃস্নেহ, কেন সেই দেবতার ধন
আপন সন্তান হতে করিলে হরণ
সে কথার দিয়ো না উত্তর। কহো মোরে
আজি কেন ফিরাইতে আসিয়াছ ক্রোড়ে।
কুন্তী। হে বৎস, ভর্ৎসনা তোর শতবজ্রসম
বিদীর্ণ করিয়া দিক এ হৃদয় মম
শত খণ্ড করি। ত্যাগ করেছিনু তোরে
সেই অভিশাপে পঞ্চপুত্র বক্ষে ক'রে
তবু মোর চিত্ত পুত্রহীন--তবু হায়,
তোরি লাগি বিশ্বমাঝে বাহু মোর ধায়,
খুঁজিয়া বেড়ায় তোরে। বঞ্চিত যে ছেলে
তারি তরে চিত্ত মোর দীপ্ত দীপ জ্বেলে
আপনারে দগ্ধ করি করিছে আরতি
বিশ্বদেবতার। আমি আজি ভাগ্যবতী,
পেয়েছি তোমার দেখা। যবে মুখে তোর
একটি ফুটে নি বাণী তখন কঠোর
অপরাধ করিয়াছি-- বৎস, সেই মুখে
ক্ষমা কর্ কুমাতায়। সেই ক্ষমা বুকে
ভর্ৎসনার চেয়ে তেজে জ্বালুক অনল,
পাপ দগ্ধ ক'রে মোরে করুক নির্মল।
কর্ণ। মাতঃ, দেহো পদধূলি, দেহো পদধূলি--
লহো অশ্রু মোর।
কুন্তী। তোরে লব বক্ষে তুলি
সে সুখ-আশায় পুত্র আসি নাই দ্বারে।
ফিরাতে এসেছি তোরে নিজ অধিকারে।
সূতপুত্র নহ তুমি, রাজার সন্তান--
দূর করি দিয়া বৎস, সর্ব অপমান
এসো চলি যেথা আছে তব পঞ্চ ভ্রাতা।
কর্ণ। মাতঃ, সূতপুত্র আমি, রাধা মোর মাতা,
তার চেয়ে নাহি মোর অধিক গৌরব।
পাণ্ডব পাণ্ডব থাক্, কৌরব কৌরব--
ঈর্ষা নাহি করি কারে।
কুন্তী। রাজ্য আপনার
বাহুবলে করি লহো, হে বৎস, উদ্ধার।
দুলাবেন ধবল ব্যজন যুধিষ্ঠির,
ভীম ধরিবেন ছত্র, ধনঞ্জয় বীর
সারথি হবেন রথে, ধৌম্য পুরোহিত
গাহিবেন বেদমন্ত্র-- তুমি শত্রুজিৎ
অখণ্ড প্রতাপে রবে বান্ধবের সনে
নিঃসপত্ন রাজ্যমাঝে রত্নসিংহাসনে।
কর্ণ। সিংহাসন! যে ফিরালো মাতৃস্নেহ পাশ--
তাহারে দিতেছ, মাতঃ, রাজ্যের আশ্বাস।
একদিন যে সম্পদে করেছ বঞ্চিত
সে আর ফিরায়ে দেওয়া তব সাধ্যাতীত।
মাতা মোর, ভ্রাতা মোর, মোর রাজকুল
এক মুহূর্তেই মাতঃ,করেছ নির্মূল
মোর জন্মক্ষণে। সূতজননীরে ছলি
আজ যদি রাজজননীরে মাতা বলি,
কুরুপতি কাছে বদ্ধ আছি যে বন্ধনে
ছিন্ন ক'রে ধাই যদি রাজসিংহাসনে,
তবে ধিক্ মোরে।
কুন্তী। বীর তুমি, পুত্র মোর,
ধন্য তুমি। হায় ধর্ম, এ কী সুকঠোর
দণ্ড তব। সেইদিন কে জানিত হায়,
ত্যজিলাম যে শিশুরে ক্ষুদ্র অসহায়
সে কখন বলবীর্য লভি কোথা হতে
ফিরে আসে একদিন অন্ধকার পথে,
আপনার জননীর কোলের সন্তানে
আপন নির্মম হস্তে অস্ত্র আসি হানে।
এ কী অভিশাপ!
কর্ণ। মাতঃ, করিয়ো না ভয়।
কহিলাম, পাণ্ডবের হইবে বিজয়।
আজি এই রজনীর তিমিরফলকে
প্রত্যক্ষ করিনু পাঠ নক্ষত্র-আলোকে
ঘোর যুদ্ধ-ফল। এই শান্ত স্তব্ধ ক্ষণে
অনন্ত আকাশ হতে পশিতেছে মনে
জয়হীন চেষ্টার সংগীত, আশাহীন
কর্মের উদ্যম-- হেরিতেছি শান্তিময়
শূন্য পরিণাম। যে পক্ষের পরাজয়
সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না আহ্বান।
জয়ী হোক, রাজা হোক পাণ্ডবসন্তান--
আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে।
জন্মরাত্রে ফেলে গেছ মোরে ধরাতলে
নামহীন, গৃহহীন-- আজিও তেমনি
আমারে নির্মমচিত্তে তেয়াগো জননী
দীপ্তিহীন কীর্তিহীন পরাভব-'পরে।
শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে
জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,
বীরের সদ্গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/karna-kunti-sambad/
|
4203
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
একটি মানুষ
|
ভক্তিমূলক
|
একটি মানুষ দেখেছিলাম, দাঁড়িয়েছিলেন একা
হঠাৎ পথে দেখা আমার, হঠাৎ পথে দেখা
সবাই তাঁকে দেখতে পায় না
সবাই তাঁকে দেখতে পায় না
কিন্তু, তিনি দেখেন–
কোথায় তোমার দুঃখ কষ্ট, কোথায় তোমার জ্বালা
আমায় বলো, আমারই ডালপালা
তোমার এবং তোমার, তুমি যেমন ভাবেই কাটো
আমি একটু বৃহৎ, তুমি ছোট্ট করেই ছাঁটো
লাগবে না লাগবে না
আমি কি আর পাথর, আমায় লাগবে একটুতে?
মানুষ আমি, কী মনে হয়? মানুষ সহ্য করে।
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/ekti-manush/
|
5176
|
শামসুর রাহমান
|
রক্তগোলাপের মতো প্রস্ফুটিত
|
মানবতাবাদী
|
কী-যে হলো, কিছুদিন থেকে
আমার পড়ার ঘরে আজগুবি সব দৃশ্য জন্ম
নেয় চারদেয়ালে এবং
বইয়ের শেল্ফে, এলোমেলো, প্রিয় লেখার টেবিলে।কতবার গোছাই টেবিল
সযত্নে, অথচ ফের কেন যেন হিজিবিজি অক্ষরের মতো
কেমন বেঢপ রূপ হয়ে
আমাকে সোৎসাহে ভ্যাঙচায় লেখার সময়।ওরা কি আমার রচনার
পরিণাম বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে কলম থামাতে চায় এই
অধমের? লুকাবো না, আমি
ভীত চিত্তে কলম থামিয়ে দূরে দৃষ্টি মেলে দিই।আচমকা কতিপয় দীর্ঘদেহী প্রেত
লেখার টেবিল ঘিরে ধেই ধেই নেচে আমাকেই
বিদ্রূপের কাদায় সজোরে ঠেলে দিয়ে
দন্তহীন ভয়ঙ্কর মুখে ক্রূর হাসি হাসে!২
কোত্থেকে ঘরে ভুতুড়ে আঁধার ঢুকেছে হঠাৎ,
ভেবেই পাই না। আঁধার এমন দংশনপ্রিয়
হতে পারে, আগে জানতে পারিনি। নিজ হাতকেই
কেমন অচেনা বলে মনে হয়। ভয়ে কেঁপে উঠি।ভয় তাড়ানোর চেষ্টায় দ্রুত চড়িয়ে গলার
ধ্বনি এলোমেলো কীসব আউড়ে গেলাম কেবল।
আকাশে এখন চাঁদ আর তারা দেবে না কি উঁকি?
কেউ কি আমার গলা চেপে ধ’রে করবে হনন?কারা যেন ছুটে আসছে এদিকে। ওরা কি দস্যু?
নাকি আগামীর ঘটনাবলির বেঢপ আভাস?
হঠাৎ আমাকে ভগ্ন বাড়ির স্তূপের ভেতর
কাতরাতে দেখি। কিছু ধেড়ে পোকা চাটছে জখম।আমার দেশের চারদিক জুড়ে ক্রূদ্ধ পানির
দংশনে আজ পাড়া গাঁ এবং শহর কাতর।
ভয় হয় যদি হঠাৎ প্লাবন বাড়িঘর সব
মানুষ সমেত ঘোর বিরানায় মুছে ফেলে দেয়।৩
এখন কোথায় আমি? কে আমাকে এই
নিঝুম বেলায় বলে দেবে? এখানে তো ডানে-বামে
জনমানুষের চিহ্ন নেই। বড় বেশি শূন্যতার
হাহাকার অস্তিত্বকে নেউলের মতো
কামড়াচ্ছে সারাক্ষণ। ভাবছি, এখন যদি কোনও
কুশ্রী মানবেরও পদধ্বনি শুনি বড় ভালো হয়।কখনও হতাশা যেন সমাজকে, দেশকে বিপথে
টেনে নিয়ে অন্ধের আসরে
আরও বেশি অন্ধ, বোবা জমা ক’রে ঘন ঘন জোরে
করতালি দিয়ে আরও বেশি জম্পেশ আসর না বসায়।আজকের এই বোবা অন্ধকার লুটপাট আর
অস্ত্রবাজি, আমার বিশ্বাস, আগামীর
সকালে, দুপুরে, রাতে পারবে না মাথা তুলে দাঁড়াতে নিশ্চিত,
যখন স্বদেশ রক্তগোলাপের মতো প্রস্ফুটিত। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/roktogolaper-moto-prosfutito/
|
2287
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
আত্মবিলাপ
|
চিন্তামূলক
|
আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু, হায়,
তাই ভাবি মনে?
জীবন-প্রবাহ বহি কাল-সিন্ধু পানে যায়,
ফিরাবো কেমনে?
দিন-দিন আয়ুহীন হীনবল দিন-দিন ,--
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না ? এ কি দায়!রে প্রমত্ত মন মম! কবে পোহাইবে রাতি?
জাগিবি রে কবে?
জীবন-উদ্যানে তোর যৌবন-কুসুম-ভাতি
কত দিন র'বে?
নীরবিন্ধু, দূর্বাদলে, নিত্য কিরে ঝলঝলে?
কে না জানে অম্বুবিম্ব অম্বুমুখে সদ্যঃপাতি?নিশার স্বপন-সুখে সুখী যে কী সুখ তার?
জাগে সে কাঁদিতে!
ক্ষণপ্রভা প্রভা-দানে বাড়ায় মাত্র আঁধার
পথিকে ধাঁদিতে!
মরীচিকা মরুদেশে, নাশে প্রাণ তৃষাক্লেশে--
এ তিনের ছল সম ছল রে এ কু-আশার।প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণে সাধে
কী ফল লভিলি?
জ্বলন্ত-পাবক-শিখা-লোভে তুই কাল ফাঁদে
উড়িয়া পড়িলি
পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায়, ধাইলি, অবোধ, হায়
না দেখলি না শুনিলি, এবে রে পরাণ কাঁদেবাকি কি রাখিলি তুই বৃথা অর্থ-অন্বেষণে,
সে সাধ সাধিতে?
ক্ষত মাত্র হাত তোর মৃণাল-কণ্টকগণে
কমল তুলিতে
নারিলি হরিতে মণি, দংশিল কেবল ফণী
এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি, মন, কেমনে!যশোলাভ লোভে আয়ু কত যে ব্যয়িলি হায়,
কব তা কাহারে?
সুগন্ধ কুসুম-গন্ধে অন্ধ কীট যথা ধায়,
কাটিতে তাহারে?
মাৎসর্য-বিষদশন, কামড়ে রে অনুক্ষণ!
এই কি লভিলি লাভ, অনাহারে, অনিদ্রায়?মুকুতা-ফলের লোভে, ডুবে রে অতল জলে
যতনে ধীবর,
শতমুক্তাধিক আয়ু কালসিন্ধু জলতলে
ফেলিস, পামর!
ফিরি দিবি হারাধন, কে তোরে, অবোধ মন,
হায় রে, ভুলিবি কত আশার কুহক-ছলে!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/atmabilap/
|
2262
|
মহাদেব সাহা
|
শব্দ
|
চিন্তামূলক
|
শব্দ আমার ভালোবাসার পাত্র
মাত্র তাকে দিয়েছি এই শান্তি কোমল শান্তি
আরো অনেক দিনের দাহ, রাতের মেহকানি-
তবেই হবে শব্দ আমার গভীর প্রিয় পাত্রী!
শব্দ আমার ভালোবাসার বাগানবাড়ির বৃক্ষ
একখানি ডাল আকাশমুখী, একখানি তার পরম দুঃখী
আর একখানি ছুঁয়েছে কোনো গোপন দুর্নিরীক্ষ্য!
এতোদিন তো শব্দ কেবল শব্দ কেবল শব্দ
বুকের গভীর জলের ধারা তবেই তো সে স্বচ্ছ,
শব্দ তখন অধিক প্রিয় শস্য শালীন স্মরনীয়
শব্দ তোমায় শান্তি শান্তি! শব্দ তোমায় হৈমকানি-!
শব্দ তখন ভালোবাসার চিরকালীন পাত্রী!
এই শব্দে করেছি তোমায় শিল্প আমি শুদ্ধ
শব্দ তোমায় শান্তি শান্তি! শব্দ তোমায় হৈমকান্তি!
শব্দ তোমায় শব্দ!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1510
|
2297
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
উপসংহার
|
চিন্তামূলক
|
রাগিণী বসন্ত,তাল ধীমা তেতালা
শুন হে সভাজন!
আমি অভাজন,
দীন ক্ষীণ জ্ঞানগুণে,
ভয় হয় দেখে শুনে,
পাছে কপাল বিগুণে,
হারাই পূর্ব্ব মূলধন! যদি অনুরাগ পাই,
আনন্দের সীমা নাই,
এ কাষেতে একষাই,
দিব দরশন!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/uposnghar/
|
1754
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আগুনের খোলা ঝাঁপি
|
চিন্তামূলক
|
সময় প্রতিমা!
আগুনের ঝাঁপি খুলে দিলাম তোমাকে,
আত্মসমর্পণে আমি সম্মত হলাম।
ক্ষৌরকার ডেকে এনে কাল-পরশু মাথা ন্যড়া হবো
রাজার পোষাক ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবো গঙ্গাজলে।
গায়ে বড় আঁট হয়ে, বাঁশের গাঁটের মতো খোঁচা হয়ে আছে যে সকল
স্বর্ণ বর্ণ- অলঙ্কার, লকেট, মেডেল
সেই সব মণি-মুক্তো বেনাবনে শুকোবে এখন
দেবদারু গাছগুলি তদোর দুঃখের সব গোপনীয় কথা শুধু আমাকেই বলে
ক্ষুধিত বেড়ালে নখে চিরেছে যে সব ডালপালা
তার সব আর্তনাদ আমার ঘুমের মধ্যে হাতুড়ি পেটায় ঝন্ঝন্ ।
ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতে পাই
সমুদ্রের ঢেউগুলি দরজার কাছাকাছি এসেছে কখন,
তখন মেঘের পাখি ভোরবেলার আলতা রং মেখে
শিয়রের কাছে বসে কথা বলে আত্মীয়ের মতো।
নোংরা জল ঢুকে ঢুকে নিঃস্ব হয়ে যাচেছ সব পৃথিবীর খনিগর্ভগুলি
এই রকম অতর্কিত শিরোনাম ফুটে ওঠে জানালায় গায়ের আকাশে।
সময় প্রতিমা!
আকাঙ্খার ঝাঁপি খুলে দিলাম তোমাকে।
আত্মসমর্পনে আমি সম্মত হলাম।
তুমি যদি যুদ্ধে যাও, আমার সমস্ত সৈন্য পাবে।
রেলকলোনীর মাঠে তুমি যদি জনসভা ডাকো
হিম হাওয়া, অন্ধকার, কাঁটাতার, রক্ত-হাসি ঠেলে
প্রত্যেকটি ব্যথিত গাছে আলোর লন্ঠন আমি টাঙাবো একাই
তোমার তুনীর আমি ভরে দেবো, বিজয় উৎসবে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1203
|
5198
|
শামসুর রাহমান
|
লেখার কাগজ
|
চিন্তামূলক
|
লেখার কাগজ ক্রমে ক্রয় ক্ষমতার সীমা থেকে
খুব দূরে সরে যাচ্ছে; অথচ আমার রোজই চাই
কিছু শাদা কাগজ, কেননা আমি, বলা যায়, প্রায়
প্রত্যহ কিছু-না কিছু লিখি। উপরন্তু ভালো কাগজের
প্রতি, মানে সুশোভন কাগজের প্রতি বড় বেশি
আকর্ষণ বোধ করি। কাগজ কিনতে গিয়ে আমি
বেশ কিছু সময় কাটাই, উল্টে-পাল্টে বারবার
দেখি রাইটিং প্যাড, সযত্নে পরখ করে নিই।আমাকে ছিটেল বলে ব্যঙ্গ করা অত্যন্ত সহজ;
কিন্তু আমি যা বলি স্পষ্টই বলি; সত্যি, ঢাক-ঢাক
গুড়-গুড় আমার স্বভাবে নেই। যদি কোনোদিন
কাগজ বাজার থেকে কর্পূরের মতো উবে যায়,
নিরুপায় আমি অনন্তকে শ্লথগতি কচ্ছপের
ছায়া ভেবে লিখে যাবো ধূলো আর গাছের পাতায়। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/lekhar-kagoj/
|
1969
|
বিনয় মজুমদার
|
পাখি
|
রূপক
|
পাঠক মুখ দিয়ে উচ্চারণ করুন ‘নিড়িহা’ । দেখুন মাথার উপর দিয়ে একটি পাখি উড়ে যাচ্ছে । এই নিড়িহা পাখিটি আমি বানিয়েছি । বহুদিন আগে ছাপা হয়ে গেছে । কবি অজয় নাগ মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল ‘দাদা , এমন অদ্ভুত একটি শব্দ বানিয়েছেন? ‘ এতদিন পরে আমি অজয়ের প্রশ্নের জবাব লিখে জানালাম ।
এইবার পাঠক জোরে উচ্চারণ করুন ‘পিড়িহা’ । দেখুন মাথার উপর দিয়ে একটি পাখি উড়ে যাচ্ছে । পাখিটি পাঠক বানালেন ।
এইবার জোরে উচ্চারণ করুন ‘ফিড়িহা’ । পাঠক দেখুন মাথার উপর দিয়ে একটা ল্যাংটো বালক দেখা যাচ্ছে । পাঠক এই বালকটিকে বানালেন ।
এইবার পাঠক জোরে উচ্চারণ করুন ‘বিড়িহা’ । পাঠক দেখুন মাথার উপর দিয়ে শকুনের মতো বিরাট একটি পাখিউড়ে যাচ্ছে ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4064.html
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.