id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
405
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বকরীদ
|
মানবতাবাদী
|
‘শহিদান’দের ঈদ এল বকরীদ!
অন্তরে চির-নওজোয়ান যে তারই তরে এই ঈদ।
আল্লার রাহে দিতে পারে যারা আপনারে কোরবান,
নির্লোভ নিরহংকার যারা, যাহারা নিরভিমান,
দানব-দৈত্যে কতল করিতে আসে তলোয়ার লয়ে,
ফিরদৌস হতে এসেছে যাহারা ধরায় মানুষ হয়ে,
অসুন্দর ও অত্যাচারীরে বিনাশ করিতে যারা
জন্ম লয়েছে চিরনির্ভীক যৌবন-মাতোয়ারা, –
তাহাদেরই শুধু আছে অধিকার ঈদ্গাহে ময়দানে,
তাহারাই শুধু বকরীদ করে জান মাল কোরবানে।
বিভুতি, ‘মাজেজা’, যাহা পায় সব প্রভু আল্লার রাহে
কোরবানি দিয়ে নির্যাতিতেরে মুক্ত করিতে চাহে।
এরাই মানব-জাতির খাদেম, ইহারাই খাক্সার,
এরাই লোভীর সাম্রাজ্যেরে করে দেয় মিসমার!
ইহারাই ‘ফিরোদৌস-আল্লা’র প্রেম-ঘন অধিবাসী
তসবি ও তলোয়ার লয়ে আসি অসুরে যায় বিনাশি।
এরাই শহিদ, প্রাণ লয়ে এরা খেলে ছিনিমিনি খেলা,
ভীরুর বাজারে এরা আনে নিতি নব নওরোজ-মেলা!
প্রাণ-রঙ্গিলা করে ইহারাই ভীতি-ম্লান আত্মায়,
আপনার প্রাণ-প্রদীপ নিভায়ে সবার প্রাণ জাগায়।
কল্পবৃক্ষ পবিত্র ‘জৈতুন’ গাছ যথা থাকে,
এরা সেই আশমান থেকে এসে, সদা তারই ধ্যান রাখে!
এরা আল্লার সৈনিক, এরা ‘জবীহুল্লা’-র সাথি,
এদেরই আত্মত্যাগ যুগে যুগে জ্বালায় আশার বাতি।
ইহারা, সর্বত্যাগী বৈরাগী প্রভু আল্লার রাহে,
ভয় করে নাকো কোনো দুনিয়ার কোনো সে শাহানশাহে।
এরাই কাবার হজের যাত্রী, এদেরই দস্ত চুমি!
কওসর আনে নিঙাড়িয়া রণক্ষেত্রের মরুভূমি!
‘জবীহুল্লা’র দোস্ত ইহারা, এদেরই চরণাঘাতে,
‘আব-জমজম’ প্রবাহিত হয় হৃদয়ের মক্কাতে।
ইব্রাহিমের কাহিনি শুনেছ? ইসমাইলের ত্যাগ?
আল্লারে পাবে মনে কর কোরবানি দিয়ে গরু ছাগ?
আল্লার নামে, ধর্মের নামে, মানব জাতির লাগি
পুত্রেরে কোরবানি দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?
সেই মুসলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম করি তারে,
ঈদ্গাহে গিয়া তারই সার্থক হয় ডাকা আল্লারে।
অন্তরে ভোগী, বাইরে যে রোগী, মুসলমান সে নয়,
চোগা চাপকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য যে পরিচয়!
লাখো ‘বকরা’র বদলে সে পার হবে না পুলসেরাত
সোনার বলদ ধনসম্পদ দিতে পার খুলে হাত?
কোরান মজিদে আল্লার এই ফরমান দেখো পড়ে,
আল্লার রাহে কোরবানি দাও সোনার বলদ ধরে।
ইব্রাহিমের মতো পুত্রেরে আল্লার রাহে দাও,
নইলে কখনও মুসলিম নও, মিছে শাফায়ৎ চাও!
নির্যাতিতের লাগি পুত্রেরে দাও না শহিদ হতে,
চাকরিতে দিয়া মিছে কথা কও– ‘যাও আল্লার পথে’!
বকরীদি চাঁদ করে ফরয়্যাদ, দাও দাও কোরবানি,
আল্লারে পাওয়া যায় না করিয়া তাঁহার না-ফরমানি!
পিছন হইতে বুকে ছুরি মেরে, গলায় গলায় মেলো,
কোরো না আত্ম-প্রতারণা আর, খেলকা খুলিয়া ফেলো!
উমরে, খালেদে, মুসা ও তারেকে বকরীদে মনে কর,
শুধু সালওয়ার পরিয়ো না, ধরো হাতে তলোয়ার ধরো!
কোথায় আমার প্রিয় শহিদল মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ?
এসো ঈদের নামাজ পড়িব, আলাদা আমাদের ময়দান! (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bokriid/
|
385
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পুবের হাওয়া
|
মানবতাবাদী
|
আমি ঝড় পশ্চিমের প্রলয়-পথিক –
অসহ যৌবন-দাহে লেলিহান-শিখ
দারুণ দাবাগ্নি-সম নৃত্য-ছায়ানটে
মাতিয়া ছুটিতেছিনু, চলার দাপটে
ব্রহ্মাণ্ড ভণ্ডুল করি। অগ্রে সহচরী
ঘূর্ণা-হাতছানি দিয়া চলে ঘূর্ণি-পরি
গ্রীষ্মের গজল গেয়ে পিলু-বারোয়াঁয়
উশীরের তার-বাঁধা প্রান্তর-বীণায়।
করতালি-ঠেকা দেয় মত্ত তালিবন
কাহারবা-দ্রুততালে। – আমি উচাটন
মন্মথ-উম্মদ আঁখি রাগরক্ত ঘোর
ঘূর্ণিয়া পশ্চাতে ছুটি, প্রমত্ত চকোর
প্রথম-কামনা-ভিতু চকোরিণী পানে
ধায় যেন দুরন্ত বাসনা-বেগ-টানে।
সহসা শুনিনু কার বিদায়-মন্থর
শ্রান্ত শ্লথ গতি-ব্যথা, পাতা-থরথর
পথিক-পদাঙ্ক-আঁকা পুব-পথশেষে।
দিগন্তের পর্দা ঠেলি হিমমরুদেশে
মাগিছে বিদায় মোর প্রিয়া ঘূর্ণি-পরি,
দিগন্ত ঝাপসা তার অশ্রুহিমে ভরি।
গোলে-বকৌলির দেশে মেরু-পরিস্থানে
মিশে গেল হাওয়া-পরি।
অযথা সন্ধানে
দিকচক্ররেখা ধরি কেঁদে কেঁদে চলি
শ্রান্ত অশ্বশ্বসা-গতি। চম্পা-একাবলী
ছিন্ন ম্লান ছেয়ে আছে দিগন্ত ব্যাপিয়া, -
সেই চম্পা চোখে চাপি ডাকি, ‘পিয়া পিয়া’!
বিদায়-দিগন্ত ছানি নীল হলাহল
আকণ্ঠ লইনু পিয়া, তরল গরল –
সাগরে ডুবিল মোর আলোক-কমলা,
আঁখি মোর ঢুলে আসে – শেষ হল চলা!
জাগিলাম জন্মান্তর-জাগরণ-পারে
যেন কোন্ দাহ-অন্ত ছায়া-পারাবারে
বিচ্ছেদ-বিশীর্ণ তনু, শীতল-শিহর!
প্রতি রোমকূপে মোর কাঁপে থরথর।
কাজল-সুস্নিগ্ধ কার অঙ্গুলি-পরশ
বুলায় নয়ন মোর, দুলায়ে অবশ
ভার-শ্লথ তনু মোর ডাকে – ‘জাগো পিয়া।
জাগো রে সুন্দর মোরি রাজা শাঁবলিয়া।’জল-নীলা ইন্দ্রনীলকান্তমণি-শ্যামা
এ কোন মোহিনী তন্বী জাদুকরী বামা
জাগাল উদয়-দেশে নব মন্ত্র দিয়া
ভয়াল-আমারে ডাকি – ‘হে সুন্দর পিয়া!’
– আমি ঝড় বিশ্ব-ত্রাস মহামৃত্যুক্ষুধা,
ত্র্যম্বকের ছিন্নজটা – ওগো এত সুধা,
কোথা ছিল অগ্নিকুণ্ড মোর দাবদাহে?
এত প্রেমতৃষা সাধ গরল প্রবাহে? –
আবার ডাকিল শ্যামা, ‘জাগো মোরি পিয়া!’
এতক্ষণ আপনার পানে নিরখিয়া
হেরিলাম আমি ঝড় অনন্ত সুন্দর
পুরুষ-কেশরী বীর! প্রলয়কেশর
স্কন্ধে মোর পৌরুষের প্রকাশে মহিমা!
চোখে মোর ভাস্বরের দীপ্তি-অরুণিমা
ঠিকরে প্রদীপ্ত তেজে! মুক্ত ঝোড়ো কেশে
বিশ্বলক্ষ্মী মালা তার বেঁধে দেন হেসে!
এ কথা হয়নি মনে আগে, – আমি বীর
পরুষ পুরুষ-সিংহ, জয়লক্ষ্মী-শ্রীর
স্নেহের দুলাল আমি; আমারেও নারী
ভালোবাসে, ভালোবাসে রক্ত-তরবারি
ফুল-মালা চেয়ে! চাহে তারা নর
অটল-পৌরুষ বীর্যবন্ত শক্তিধর!
জানিনু যেদিন আমি এ সত্য মহান –
হাসিল সেদিন মোর মুখে ভগবান
মদনমোহন-রূপে! সেই সে প্রথম
হেরিনু, সুন্দর আমি সৃষ্টি-অনুপম!
যাহা কিছু ছিল মোর মাঝে অসুন্দর
অশিব ভয়াল মিথ্যা অকল্যাণকর
আত্ম-অভিমান হিংসা দ্বেষ-তিক্ত ক্ষোভ –
নিমেষে লুকাল কোথা, স্নিগ্ধশ্যাম ছোপ
সুন্দরের নয়নের মণি লাগি মোর প্রাণে!
পুবের পরিরে নিয়া অস্তদেশ পানে
এইবার দিনু পাড়ি। নটনটী-রূপে
গ্রীষ্মদগ্ধ তাপশুষ্ক মারী-ধ্বংস-স্তূপে
নেচে নেচে গাই নবমন্ত্র সামগান
শ্যামল জীবনগাথা জাগরণতান!
এইবার গাহি নেচে নেচে,
রে জীবন-হারা, ওঠ বেঁচে!
রুদ্র কালের বহ্নি-রোষ
নিদাঘের দাহ গ্রীষ্ম-শোষ
নিবাতে এনেছি শান্তি-সোম,
ওম্ শান্তি, শান্তি ওম!
জেগে ওঠ ওরে মূর্ছাতুর!
হোক অশিব মৃত্যু দূর!
গাহে উদ্গাতা সজল ব্যোম,
ওম্ শান্তি, শান্তি ওম!
ওম্ শান্তি, শান্তি ওম!
ওম্ শান্তি, শান্তি ওম॥এসো মোর শ্যাম-সরসা
ঘনিমার হিঙুল-শোষা
বরষা প্রেম-হরষা
প্রিয়া মোর নিকষ-নীলা
শ্রাবণের কাজল গুলি
ওলো আয় রাঙিয়ে তুলি
সবুজের জীবন-তুলি,
মৃতে কর প্রাণ-রঙিলা॥
আমি ভাই পুবের হাওয়া
বাঁচনের নাচন-পাওয়া,
কারফায় কাজরি গাওয়া,
নটিনীর পা-ঝিনঝিন!
নাচি আর নাচনা শেখাই
পুরবের বাইজিকে ভাই,
ঘুমুরের তাল দিয়ে যাই –
এক দুই এক দুই তিন॥
বিল ঝিল তড়াগ পুকুর
পিয়ে নীর নীল কম্বুর
থইথই টইটম্বুর!
ধরা আজ পুষ্পবতী!
শুশুনির নিদ্রা শুষি
রূপসি ঘুম-উপোসি!
কদমের উদমো খুশি
দেখায় আজ শ্যাম যুবতি॥
হুরিরা দূর আকাশে
বরুণের গোলাব-পাশে
ধারা-জল ছিটিয়ে হাসে
বিজুলির ঝিলিমিলিতে!
অরুণ আর বরুণ রণে
মাতিল ঘোর স্বননে
আলো-ছায় গগন-বনে
‘শার্দূল বিক্রীড়িতে।’(শার্দূল-বিক্রীড়িত ছন্দে)
উত্রাস ভীম
মেঘে কুচকাওয়াজ
চলিছে আজ,
সোন্মাদ সাগর
খায় রে দোল!
ইন্দ্রের রথ
বজ্রের কামান
টানে উজান
মেঘ-ঐরাবত
মদ-বিভোল।
যুদ্ধের রোল
বরুণের জাঁতায়
নিনাদে ঘোর,
বারীশ আর বাসব
বন্ধু আজ।
সূর্যের তেজ
দহে মেঘ-গরুড়
ধূম্র-চূড়,
রশ্মির ফলক
বিঁধিছে বাজ।
বিশ্রাম-হীন
যুঝে তেজ-তপন
দিক-বারণ
শির-মদ-ধারায়
ধরা মগন!
অম্বর-মাঝ
চলে আলো-ছায়ায়
নীরব রণ
শার্দূল শিকার
খেলে যেমন।
রৌদ্রের শর
খরতর প্রখর
ক্লান্ত শেষ,
দিবা দ্বিপ্রহর
নিশি-কাজল!
সোল্লাস ঘোর
ঘোষে বিজয়-বাজ
গরজি আজ
দোলে সিং-বি-
ক্রীড়ে দোল।(সিংহ-বিক্রীড় ছন্দে)
নাচায় প্রাণ রণোন্মাদ- বিজয়-গান, গগনময় মহোৎসব।
রবির পথ অরুণ-যান কিরণ-পথ ডুবায় মেঘ- মহার্ণব।
মেঘের ছায় শীতল কায় ঘুমায় থির দিঘির জল অথই থই।
তৃষায় ক্ষীণ ‘ফটিক জল’ ‘ফটিক জল’ কাঁদায় দিল চাতক ওই।
মাঠের পর সোহাগ-ঢল জলদ-দ্রব ছলাৎছল ছলাৎছল
পাহাড়-গায় ঘুমায় ঘোর অসিত মেঘ- শিশুর দল অচঞ্চল।
বিলোল-চোখ হরিণ চায় মেঘের গায়, চমক খায় গগন-কোল,
নদীর-পার চখির ডাক ‘কোয়াককো’ বনের বায় খাওয়ায় টোল।
স্বয়ম্ভূর সতীর শোক- ধ্যানোম্মাদ- নিদাঘ-দাব তপের কাল
নিশেষ আজ! মহেশ্বর উমার গাল চুমার ঘায় রাঙায় লাল।(অনঙ্গশেখর ছন্দে)
এবার আমার বিলাস শুরু অনঙ্গশেখরে।
পরশ-সুখে শ্যামার বুকে কদম্ব শিহরে।
কুসুমেষুর পরশ-কাতর নিতম্ব-মন্থরা
সিনান-শুচি স-যৌবনা রোমাঞ্চিত ধরা।
ঘন শ্রোণির, গুরু ঊরুর, দাড়িম-ফাটার ক্ষুধা
যাচে গো আজ পরুষ-পীড়ন পুরুষ-পরশ-সুধা।
শিথিল-নীবি বিধুর বালা শয়ন-ঘরে কাঁপে,
মদন-শেখর কুসুম-স্তবক উপাধানে চাপে।
আমার বুকের কামনা আজ কাঁদে নিখিল জুড়ি,
বনের হিয়ায় তিয়াস জিয়ায় প্রথম কদম-কুঁড়ি।
শাখীরা আজ শাখায় শাখা পাখায় পাখায় বাঁধা,
কুলায় রচে, মনে শোনে শাবক শিশুর কাঁদা।
তাপস-কঠিন উমার গালে চুমার পিয়াস জাগে,
বধূর বুকে মধুর আশা কোলে কুমার মাগে!
তরুণ চাহে করুণ চোখে উদাসী তার আঁখি,
শোনে, কোথায় কাঁদে ডাহুক ডাহুকের ডাকি!
এবার আমার পথের শুরু তেপান্তরের পথে,
দেখি হঠাৎ চরণ রাঙা মৃণাল-কাঁটার ক্ষতে।
ওগো আমার এখনও যে সকল পথই বাকি,
মৃণাল হেরি মনে পড়ে কাহার কমল-আঁখি! (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/puber-hawa/
|
5446
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
একুশে নভেম্বরঃ ১৯৪৬
|
স্বদেশমূলক
|
আবার এবার দুর্বার সেই একুশে নভেম্বর-
আকাশের কোণে বিদ্যুৎ হেনে তুলে দিয়ে গেল
মুত্যুকাঁপানো ঝড়।
আবার এদেশে মাঠে, ময়দানে
সুদূর গ্রামেও জনতার প্রাণে
হাসানাবাদের ইঙ্গিত হানে
প্রত্যাঘাতের স্বপ্ন ভয়ঙ্কর।
আবার এসেছে অবাধ্য এক একুশে নভেম্বর।।
পিছনে রয়েছে একটি বছর, একটি পুরনো সাল,
ধর্মঘট আর চরম আঘাতে উদ্দাম, উত্তাল;
বার বার জিতে, জানি অবশেষে একবার গেছি হেরে-
বিদেশী! তোদের যাদুদণ্ডকে এবার নেবই কেড়ে।
শোন্ রে বিদেশী, শোন্
আবার এসেছে লড়াই জেতার চরম শুভক্ষণ।
আমরা সবাই অসভ্য, বুনো-
বৃথা রক্তের শোধ নেব দুনো
একপা পিছিয়ে দু'পা এগোনোর
আমরা করেছি পণ,
ঠ'কে শিখলাম-
তাই তুলে ধরি দুর্জয় গর্জন।
আহ্বান আসে অনেক দূরের,
হায়দ্রাবাদ আর ত্রিবাঙ্কুরের,
আজ প্রয়োজন একটি সুরের
একটি কঠোর স্বরঃ
"দেশী কুকুর! আবার এসেছে একুশে নভেম্বর।"
ডাক ওঠে, ডাক ওঠে-
আবার কঠোর বহু হরতালে
আসে মিল্লাত, বিপ্লবী ডালে
এখানে সেখানে রক্তের ফুল ফোটে।
এ নভেম্বরে আবারো তো ডাক ওঠে।।
আমাদের নেই মৃত্যু এবং আমাদের নেই ক্ষয়,
অনেক রক্ত বৃথাই দিলুম
তবু বাঁচবার শপথ নিলুম
কেটে গেছে আজ রক্তদানের ভয়!
ল'ড়ে মরি তাই আমরা অমর, আমরাই অক্ষয়।।
আবার এসেছে তেরোই ফেব্রুয়ারী,
দাঁতে দাঁত চেপে
হাতে হাত চেপে
উদ্যত সারি সারি ,
কিছু না হলেও আবার আমরা
রক্ত দিতে তো পারি?
পতাকায় পতাকায় ফের মিল আনবে ফেব্রুয়ারি।
এ নভেম্বরে সংকেত পাই তারি।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1104
|
2153
|
মহাদেব সাহা
|
টুঙ্গিপাড়া
|
শোকমূলক
|
টুঙ্গিপাড়া একটি সবুজ গ্রাম, এই গ্রাম
গাভীর চোখের মতো সজল করুন
আজ সবকুছিতেই উদাসীন বিষন্ন বাউল;
এই গ্রামখানি বড়োই ব্যথিত
যদিও সে প্রকৃত কবির মতো ঢেকে রাখে
তার দুঃখ, শোক; কাউকে বলে না কিছু
তবু এই মধুমতী নদীটিকে দেখে মনে হয়
যেন অন্তহীন অশ্রুর সাগর;
এই সুনীল আকাশ যেন এক শোকের চাদর
এই নদীজলে, বৃক্ষের অন্তরে
অবিরাম শ্রাবণের বর্ষণের মতো বাজে শোকগাথা;
এখানে ঝিঁঝির ডাকে সন্ধ্যা নামে
মাঝে মাঝে দূর মাঠে রাখালের বাঁশি শোনা যায়,
কিন্তু জ্যোৎ্লারাতে শিশিরের স্পর্শে জেগে ওঠে
কার যেন অথই ক্রন্দন;
কাঁদে দেশ এইখানে নির্জন সমাধির পাশে।
এখানে এই সবুজ নিভৃত গ্রামে, মাটির হৃদয়ে
দোয়েল-শ্যামার শিসে,
নিরিবিলি গাছের ছায়ায়
ঘুমায় একটি দেশ, জ্যোতির্ময় একটি মানুষ;
টুঙ্গিপাড়া মাতৃস্নেহে তাকে বুকে রাখে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1320
|
1634
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
পূর্ব গোলার্ধের ট্রেন
|
চিন্তামূলক
|
মাঝ-রাত্রে ঘুম ভেঙে যায়।
হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসি।
মনে হয়,
ঘণ্টা পড়ে গেছে, ট্রেন আসতে আর দেরি নেই।
অথচ বিছানাপত্র, তোরঙ্গ, জলের কুঁজো–সব কিছু
ছত্রখান হয়ে আছে।
আমি দ্রুত হাতে ওয়েটিং রুমের সেই ছড়ানো সংসার
গুছিয়ে তুলতে থাকি।
বাইরে হুলুস্থুলু চলছে, ইনজিনের শানটিং, লোহার-
চাকাওয়ালা গাড়ি ছুটছে, হাজার পায়ের শব্দ,
আলো ছায়া আলো ছায়া
উন্মাদের মতন কে যেন
তারই মধ্যে
পরিত্রাহি ডেকে যাচ্ছে : কুলি, কুলি, এই দিকে, এ-দিকে।
মাঝ-রাত্রে ঘুম ভেঙে যায়।
হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসি, চারদিকে তাকিয়ে
কিচ্ছুই বুঝি না।
আমি কেন ওয়েটিং রুমের মধ্যে, প্রাচ্যের সুন্দরী ভীরু বালিকার মতো,
সংসার গুছিয়ে তুলছি মধ্য-রাতে?
আমি কেন ছিটকিয়ে-ছড়িয়ে-যাওয়া পুঁতিগুলি
খুঁটে তুলছি।
আমি কি কোথাও যাব? কোনোখানে যাব?
আমি কি ট্রেনের জন্য প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে
ঘুমিয়ে পড়েছি?
ইদানীং এই রকম ঘটছে। ইদানীং
শব্দে-শব্দে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাতে
টুপটাপ শিশির ঝরলে চমলে উঠি; মনে হয়,
দেড় কাঠা উঠোন, তার স্বত্ব নিয়ে
স্বর্গে-মর্তে ঘোরতর সংঘাত চলেছে।
অন্ধকারে
বৃষ্টির ঝর্ঝর শুনলে মনে হয়,
দুদিকে পাহাড়, তার হৃৎপ্রদেশে
আচম্বিতে ট্রেনের চাকার শব্দ বেজে উঠল।
অথচ কোথায় ট্রেন, উদ্ধারের-সম্ভাবনাহীন
যাত্রীদের বুকে নিয়ে কোনখানে চলেছে, আমি
কিচ্ছুই বুঝি না–
সূর্যকে পিছনে রেখে
পূর্ব গোলার্ধের থেকে পশ্চিম গোলার্ধে কোন্ নরকের দিকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1642
|
5557
|
সুকুমার বড়ুয়া
|
এমন যদি হতো
|
ছড়া
|
এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম
প্রজাপতির মতো
নানান রঙের ফুলের পরে
বসে যেতাম চুপটি করে
খেয়াল মতো নানান ফুলের
সুবাস নিতাম কতো ।
এমন হতো যদি
পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম
কত পাহাড় নদী
দেশ বিদেশের অবাক ছবি
এক পলকের দেখে সবই
সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম
উড়ে নিরবধি ।
এমন যদি হয়
আমায় দেখে এই পৃথিবীর
সবাই পেতো ভয়
মন্দটাকে ধ্বংস করে
ভালোয় দিতাম জগৎ ভরে
খুশির জোয়ার বইয়ে দিতাম
এই দুনিয়াময় ।
এমন হবে কি ?
একটি লাফে হঠাৎ আমি
চাঁদে পৌঁছেছি !
গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে
দেখে শুনে ভালো করে
লক্ষ যুগের অন্ত আদি
জানতে ছুটেছি ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5870.html
|
4785
|
শামসুর রাহমান
|
তুমি
|
প্রেমমূলক
|
কিয়দ্দূরে ইঁদারার কাছে দেখি একটি তরুণী
পেয়ারা গাছের পাতা ছোঁয় মমতায়,
তার শরীরের চমকিত
মুদ্রায় তোমার উপস্থিতি ভেবে কাছে যাই; ভুল ভেঙে যায়।একটি মেয়েকে দেখি রেস্তোরাঁয় বসে আছে একা;
কফির পেয়ালা শূন্য, দু’টি হাত টেবিলে স্থাপিত।
তাকে তুমি ভেবে প্রায় বলে ফেলি, ‘ভীষণ লজ্জিত, কতক্ষণ
বসে আছো?’ নিজের বিভ্রমে লজ্জা পাই।একদিন মফস্বলী ইস্টিশানে কুয়াশার রাতে
ওয়েটিং রুমে তুমি বসে আছো বিষণ্ন, সুন্দর।
কোথায় চলেছ, কত দূরে? কুয়াশা তোমাকে গিলে খেলো, দেখি
অপরিচিতার হাই; নিষ্প্রভ রাত্রির দিকে খানিক তাকাই।বেশ কিছুদিন পর সেদিন বিকেলবেলা তোমার নিবাসে
নিভৃত ড্রইংরুমে বসে আছি অস্থির, ব্যাকুল।
তুমি এলে, ট্রলিতে চায়ের সরঞ্জাম; কথা হলো
নিছক মামুলি কিছু। এ কাকে দেখছি? হায়, তুমি নও তুমি। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tumi/
|
3926
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সমব্যথী
|
ছড়া
|
যদি খোকা না হয়ে
আমি হতেম কুকুর-ছানা—
তবে পাছে তোমার পাতে
আমি মুখ দিতে যাই ভাতে
তুমি করতে আমায় মানা?
সত্যি করে বল্
আমায় করিস নে মা, ছল—
বলতে আমায় ‘দূর দূর দূর।
কোথা থেকে এল এই কুকুর'?
যা মা, তবে যা মা,
আমায় কোলের থেকে নামা।
আমি খাব না তোর হাতে,
আমি খাব না তোর পাতে।
যদি খোকা না হয়ে
আমি হতেম তোমার টিয়ে,
তবে পাছে যাই মা, উড়ে
আমায় রাখতে শিকল দিয়ে?
সত্যি করে বল্
আমায় করিস নে মা, ছল—
বলতে আমায় ‘হতভাগা পাখি
শিকল কেটে দিতে চায় রে ফাঁকি'?
তবে নামিয়ে দে মা,
আমায় ভালোবাসিস নে মা।
আমি রব না তোর কোলে,
আমি বনেই যাব চলে। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/somobyathi/
|
5337
|
শামসুর রাহমান
|
হরিনাথ সরকার বলছেন
|
মানবতাবাদী
|
আমার বসতবাড়ি, পুঁইমাচা, উঠোন, ইঁদারা
আমার দু’চোখ থেকে ওরা
মুছে দিতে চায়; ভরদুপুরে পুকুরে নিত্যদিন
জুড়িয়েছি শরীর, এ পথে হেঁটে গিয়েছি বিকেলে হাটে, প্রাণ
ভরে কথা বলে কাটিয়েছি কত বেলা
কাশেম মহিম আর মজিদের সঙ্গে। কোনোদিন
শুনেছি বাউল গান, ভেসে গেছি মুর্শিদি, কীর্তনে। ওরা আজ
আমার স্মৃতিকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে
হো হো হেসে ওঠে,
ওদের পায়ের নিজে আমার স্বপ্নেরা বড় আর্তনাদে করে।তুলসীতলায় সাঁঝে দীপহীন স্তব্ধতা শীতল
দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে, নাটমন্দিরের ছাই
হাওয়ার, হৃদয়ে ওড়ে! সন্ধ্যার আহ্নিকে
এখন বসে না মন। সাত পুরুষের ভিটে ছেড়ে
সোমত্ত মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াই সারাক্ষণ
আঁদাড়ে-পাঁদাড়ে একমুঠো চিড়েগুড় খেয়ে, অতি
সন্তর্পণে ছায়া হয়ে হেঁটে যাই, ভিখিরির মতো পুঁজিহীন
একটু আশ্রয় খুঁজে সদাশয় গেরস্তের কাছে।ও হরি, হে আল্লাহ, বলো প্রভু দয়াময়
আমার দেশের মাটি, ধুলিকণা আলো-হাওয়া, জল
কেন আজ এমন নিষিদ্ধ হবে আমারই সংসারে?
তোমার দুনিয়া, দীনবন্ধু, সমকালে
কেন এত ছোট মনে হয়?
তবে কি আমাকে শেষে, হায়,
নিজ চোখে দেখে যেতে হবে আত্মজার লুণ্ঠির সম্ভ্রম আর
নিঃশব্দে সাজাতে হবে আমার নিজেরই গুপ্ত চিতা? (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/horinath-sorkar-bolechen/
|
4159
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
যদি ফিরে আসতে
|
প্রেমমূলক
|
মন চায় তোমাকে দেখতে
না পারি তোমাকে ছাড়া থাকতে
ভুলতে চেয়ে পারি না ভুলতে।
না পারি চোখের জল রাখতে
পারি না কাদতে, না পারি হাসতে
বল কি করে পারি এ জগতে থাকতে?
তুমি নেই এক কথা না পারি মানতে
না পারি হৃদয়কে সান্ত্বনা দিতে
কি হয়েছে তোমার পারি না জানতে।
যদি সত্যি সত্যি আমায় ভালবাসতে
একবার না হয় কাছে আসতে,
চোখ খুলে পারতাম তোমাকে দেখতে
সুযোগ হতো তোমাকে নিয়ে আবার ভাবতে।
হঠাৎ মুখ খুলে পারতাম বলতে
পারি না তোমাকে ছাড়া থাকতে
না পারি হৃদয়ের জালা মিটাতে
কি করে তুমি পার আমাকে ছাড়া থাকতে?
হাত জোড় করে বলতাম তোমাকে
হৃদয় দিয়ে আবার আমাকে ভালবাসতে।
যদি তুমি আমার কাছে আসতে
আমার চোখের ভাষা দেখেই তুমি বুঝতে,
আমি কতটুকু পারি তোমাকে ভালবাসতে।
যদি তুমি আবার ফিরে আসতে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2236.html
|
4949
|
শামসুর রাহমান
|
প্রণয়ের সংজ্ঞা
|
প্রেমমূলক
|
বিশ্ববিদ্যালয়ে লগ্ন একজন মেদুর যুবক
ঝাঁ ঝাঁ এক দুপুরে আমার কাছে এসে সবিনয়ে
কিছুক্ষণ এটা সেটা বলে আমার নিকট থেকে
লাজনম্র স্বরে, যেন নিজের সঙ্গেই আলাপের
সূত্রপাত করে, জেনে নিতে চায় প্রণয়ের সংজ্ঞা
ঈষৎ গভীরভাবে। হরিচরণের অভিধান
বিশদ স্মরণ করি, গুণিজনদের তহবিল
উপুড় করেও শেষ অব্দি থেকে যাই নিরুত্তর।যখন তোমার চোখে চোখ রেখে তন্ময় ডুবুরি
হই, হাত ছুঁয়ে নিজে বীণা হয়ে বেজে উঠি আর
তোমার কথার ছায়া চামর দোলায় হৃদপুরে,
তখন আমার খুব ইচ্ছে হয় জ্ঞানপিপাসু ঐ
বিদ্যার্থীকে ডেকে বলি, ভালোবাসা কাকে বলে যদি
জানতো চাও, মানবীর চোখের তুমি গভীর তাকাও। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pronoyer-songga/
|
224
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
আমার
|
মানবতাবাদী
|
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’আনকোরা যত নন্ভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন্ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্-পেশী,
দু’কানে চশ্মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্ বেশী!কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!আমি বলি, ওরে কথা শোন্ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্ খোশ্-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্, এবার এ দাঁও ফস্কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ্ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্ চেয়ে!ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন
কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’আনকোরা যত নন্ভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন্ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্-পেশী,
দু’কানে চশ্মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্ বেশী!কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!আমি বলি, ওরে কথা শোন্ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্ খোশ্-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্, এবার এ দাঁও ফস্কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ্ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্ চেয়ে!ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন
কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’আনকোরা যত নন্ভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন্ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্-পেশী,
দু’কানে চশ্মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্ বেশী!কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!আমি বলি, ওরে কথা শোন্ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্ খোশ্-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্, এবার এ দাঁও ফস্কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ্ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্ চেয়ে!ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন
কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%88%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%8e-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%a8%e0%a6%9c%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%87/
|
2194
|
মহাদেব সাহা
|
নারীর মুখের যোগ্য শোভা নেই
|
প্রেমমূলক
|
কী করে বলো না করি অস্বীকার এখনো আমার কাছে
একটি নারীর মুখই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দর্শনীয়,
তার চেয়ে অধিক সুন্দর কিছু অদ্যাবধি দেখিনি কোথাও;
অন্তত আমার কাছে নারীর মুখের চেয়ে অনবদ্য শিল্প কিছু নেই
তাই নারীর মুখের দিকে নির্বোধের মতো চেয়ে রই,
মাঝে মাঝে বিসদৃশ লাগে তবু চোখ ফেরাতে পারি না
নিতান্ত হ্যাংলা ভেবে পাছে করে নীরব ভর্ৎসনা তাই এই পোড়া চোখে
অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেখি কোনো পার্শ্ববর্তী শোখা, লেক কিংবা জলাশয়
আসলে নারীর মুখই একমাত্র দর্শনীয় এখনো আমার!
এখনো নারীর মুখের দিকে চেয়ে হতে পারি প্রকৃত তন্ময়
সময়ের গতিবিধি, প্রয়োজন একমাত্র নারীর মুখের দিকে চেয়ে
ভুলে যেতে পারি;
তা সে যতোক্ষণই হোক নারীর মুখের দৃশ্য ছাড়া পৃথিবীতে
বাস্তবিকই অভিভূত হওয়ার যোগ্য শিল্প কি স্থাপত্য কিছু নেই।
মিথ্যা বলবো না এখনো আমার কাছে একটি নারীর মুখই
সর্বাপেক্ষা প্রিয়
তার দিক থেকে এখনো ফেরাতে চোখ সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়,
শহরের দর্শনীয় বস্তু ফেলে তাই আমি হাবাগোবা নির্বোধের মতো
নারীর মুখের দিকে অপলক শুধু চেয়ে রই
মনে হয় এই যেন পৃথিবীতে প্রথম দেখেছি আমি একটি নারীর মুখ;
নয়ন জুড়ানো এতো শোভা আর কোনো পত্রপুষ্পে নেই-
সেসব সুন্দর শুধু পৃথিবীতে নারী আছে বলে।
তাই নারীর মুখের দৃশ্য ছাড়া মনোরম বিপণিও কেমন
বেখাপ্পা লাগে যেন
অপেরা বা সিনেমা নিষপ্রাণ,
পার্কের সকল দৃশ্য অর্থহীন বিন্যাস কেবল
নারীর সান্নিধ্য ছাড়া দর্শনীয় স্থানের মহিমা কিছু নেই ;
তাই তো এখনো পথে দুপাশের দৃশ্য ফেলে নারীর মুখের
দিকে ব্যগ্র চেয়ে থাকি
লোকে আর কি দেখে জানি না
আমি শুধু দেখি এই সৌন্দর্যের শুদ্ধ শিল্পকলা, নারীর সুন্দর মুখ।
এর চেয়ে সম্পূর্ণ গোলাপ কিংবা অনবদ্য গাঢ় স্বর্ণচাঁপা
আমার মানুষ জন্মে আমি আর কোথাও দেখিনি,
এর চেয়ে শুদ্ধ শিল্প, সম্যক ভাস্কর্য কিংবা অটুট নির্মাণ
মিউজিয়াম, চিত্রশালা আর ইতিহাস-প্রসিদ্ধ কোথাও
আমি তো পাইনি খুঁজে ;
কী করে বলবো বলো নারীর মুখের চেয়ে দর্শনীয় ক্রিসানথিমান
কী করে বলবো আমি নারীর মুখের চেয়ে স্মরণীয়
অন্য কোনো নাম!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1360
|
3137
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তপোবন
|
সনেট
|
মনশ্চক্ষে হেরি যবে ভারত প্রাচীন
পুরব পশ্চিম হতে উত্তর দক্ষিণ
মহারণ্য দেখা দেয় মহাচ্ছায়া লয়ে।
রাজা রাজ্য-অভিমান রাখি লোকালয়ে
অশ্বরথ দূরে বাঁধি যায় নতশিরে
গুরুর মন্ত্রণা লাগি— স্রোতস্বিনীতীরে
মহর্ষি বসিয়া যোগাসনে, শিষ্যগণ
বিরলে তরুর তলে করে অধ্যয়ন
প্রশান্ত প্রভাতবায়ে, ঋষিকন্যাদলে
পেলব যৌবন বাঁধি পরুষ বল্কলে
আলবালে করিতেছে সলিল সেচন।
প্রবেশিছে বনদ্বারে ত্যজি সিংহাসন
মুকুটবিহীন রাজা পক্ককেশজালে
ত্যাগের মহিমাজ্যোতি লয়ে শান্ত ভালে। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/topobon/
|
4470
|
শামসুর রাহমান
|
একটি এলিজি
|
শোকমূলক
|
(খন্দকার মজহারুল করিম স্বরণে)কেন তুমি হুট করে এত প্রিয় এই আসরের
আকর্ষণ ছেড়ে চলে গেলে? কেন গেলে?
তোমার তো ছিলো না বিতৃষ্ণা,
যতদূর জানি, স্বদেশের নদী, মাঠ, গ্রামগঞ্জ,
শহরের ঘরবাড়ি, রাজপথ, অলিগলি আর
দীপ্ত জনসভা আর জনতা-শোভিত দীর্ঘ মিছিলের প্রতি।সংসার সুখেরই ছিলো; ছিলো না কি? জীবনসঙ্গিনী
আর প্রিয় দু’টি সন্তানের সঙ্গ তুমি উপভোগ
করেছো সর্বদা। বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে
মেতেছো আড্ডায়। দেশ, দেশবাসী, কখনও হতাশা,
কখনও-বা ভোরের সূর্যের মতো আশা
উঠেছে ঝলসে প্রাণে। দেশের দশের কল্যাণের,
প্রগতির পথ কী ক’রে যে প্রসারিত হবে, তার
ভাবনায় কেটেছে বিনিদ্র রাত বহুবার। স্বাস্থ্য গেছে ক্ষয়ে।প্রায়শই মধ্যরাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে, একা
কোনার টেবিলে ঝুঁকে প্রবন্ধ লিখেছো ঢের চাহিদা মেটাতে
পত্রিকার। তোমার জীবনে ছিলো নক্ষত্রের আলো
এবং সূর্যের হাসি; প্রগতির পথে
হেঁটেছো, তবুও কেন এই অবেলায়
চলে গেলে প্রিয় কাজ অসমাপ্ত রেখে? (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-eliji/
|
1825
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
তোমার জন্যে, ও আমার প্রিয়া
|
প্রেমমূলক
|
(জ্যাক প্রেভেরকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে)
আমি গেলাম পাখির বাজারে
তোমার জন্যে পাখি কিনতে
ও আমার প্রিয়া।
পাখির বাজারে পাখি নেই।
থিক খিক করছে লোহা-লক্কড়ের খাঁচা
আর সরু মোটা শিকলি
আর সেই সব দাঁড়িপাল্লা যাতে রক্ত ওজন হয়
সেরা জাতের পাখিদের সবুজ হৃৎপিণ্ড।
আমি গেলাম ফুলের বাজারে
তোমার জন্যে ফুল কিনতে
ও আমার প্রিয়া।
ফুলের বাজারে ফুল নেই।
থিক থিক করছে নীল মাছি হলুদ ডানা
আর চিমসে পোকামাকড়
আর বেশ্যার দালারদের সেই সব ফলন্ত মগজ
রাংতাকে সোনার দামে বেচতে বেচতে
যারা লাট-বেলাট।
আমি গেলাম গয়নার বাজারে
তোমার জন্যে গয়না কিনতে
ও আমার প্রিয়া।
গয়নার বাজারে গয়না নেই।
গিজ্ গিজ্ করছে লম্বা ঠ্যাঙের কাঁটা কম্পাস
আর খরখরে দাঁতের করাত
কুড়োল, কাটারি, কর্নিক।
আর পরোপকারী সেই সব তুখোড় কম্পিউটার
যারা এক নিশ্বাসে বলে দিতে পারে
পৃথিবীর যাবতীয় গুপ্তহত্যা অথবা ষড়যন্ত্রকে
কত দিয়ে ভাগ
অথবা কি কি দিয়ে গুণ করলে
ফলাফল হবে অমায়িক একটা মুখোশ।
আমি গেলাম বইয়ের বাজারে
তোমার জন্যে বই কিনতে
ও আমার পিয়া।
বইয়ের বাজারে বই নেই।
ঝলমল করছে শাড়ি শায়া ব্লাউজ সেন্ট সাবান
আর কত রকমের চিকন লেস
আর সেই সব অলৌকিক রুমাল
যাদের বশীকরণ মন্ত্রে
খুন-জখমের রক্ত-ছাপ অন্ধকারকেও মনে হয়
পরমাশ্চর্য ঘুম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1210
|
5572
|
সুকুমার রায়
|
আবোল তাবোল - ২
|
ছড়া
|
রামধনুকের আবছায়াতে,
তাল বেতালে খেয়াল সুরে,
তান ধরেছি কন্ঠ পুরে।
হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,
নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা।
হেথায় রঙিন্ আকাশতলে
স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,
সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,
আকাশ কুসুম আপনি ফোটে,
রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন
চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ।
আজকে দাদা যাবার আগে
বল্ব যা মোর চিত্তে লাগে-
নাই বা তাহার অর্থ হোক্না
ইবা বুঝুক বেবাক্ লোক।
আপনাকে আজ আপন হতে
ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে।
ছুটলে কথা থামায় কে?
আজকে ঠেকায় আমায় কে?
আজকে আমার মনের মাঝে
ধাঁই ধপাধপ তব্লা বাজে-
রাম-খটাখট ঘ্যাচাং ঘ্যাঁচ্
কথায় কাটে কথায় প্যাঁচ্ ।
আলোয় ঢাকা অন্ধকার,
ঘন্টা বাজে গন্ধে তার।
গোপন প্রাণে স্বপন দূত,
মঞ্চে নাচেন পঞ্চ ভুত!
হ্যাংলা হাতী চ্যাং দোলা,
শূন্যে তাদের ঠ্যাং তোলা!
মক্ষিরাণী পক্ষীরাজ-
দস্যি ছেলে লক্ষ্মী আজ!
আদিম কালের চাঁদিম হিম
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম।
ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর,
গানের পালা সাঙ্গ মোর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/350
|
5125
|
শামসুর রাহমান
|
মূল্যের উপমা
|
চিন্তামূলক
|
(তাকে, আমাকে যে কবি ব’লে উপহাস করত)লিখি না গোয়েন্দা গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী
কিংবা চিত্রতারকার বিচিত্র জীবনপঞ্জি লিখে
হয়নি প্রচুর অর্থাগম। অথচ যা-করি তা-ও
যায় না কখনো বলা অসংকোচে ভদ্রমণ্ডলীকে।
আমার উঠোনে সুখ নয় জানি মরালগামিনী
সকালের তাজা রোদে অপরাহ্নে অথবা উধাও
রাত্রির উপুড় করা অন্ধকারে। যখন প্রেমিক
প্রেমিকার উন্মোচিত স্তনে মুখ রেখে ভোলে শোক,
ঠোঁটের উত্তপ্ত তটে থরথর জীবনের দিক
ঝড়ে-পড়া সারেঙের মতো খোঁজে, গণিকার চোখ
যখন কাজলে দীপ্ত ক্লান্তির আড়ালে নগরের
অষ্টতম নাগরের আলিঙ্গনে, জেগে থেকে জ্বলিস্বর্গবাসী স্বপ্নের চিন্তায় দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ টেবিলের
নিষ্কম্প আলোর দিকে দৃষ্টি মেলে। নিজেকে কেবলি
ছেড়ে দিই শুভ্রতম জীবনের বিস্তীর্ণ অতলে।
নিখাদ বিশ্বাস নিয়ে নির্বীজ মাটির রুক্ষতাকে
সাজাই সরেস ফুলে, আমার ঝর্ণার স্নিগ্ধ জলে
মরুভূমি আর্দ্র হয়, শুকনো মৃত কাঠ হয় বীণা
এবং কর্দমে জেগে ওঠে এমন প্রতিমা যাকে
ত্রিলোকে দ্যাখেনি কেউ। প্রত্যহ নগদ মূল্য বিনাদেয়াল পাথর গাছ নদী বালি বাতাস আঁধার
বিড়ালের চোখ আর পাখির ডানার কাছে শুধু
কথা খুঁজি নিজেকে জীবনপণ যুদ্ধে করে ক্ষয়।
অথচ করে না কেউ ক্ষমা, তাই আমি জ্বলি ধু-ধু-
বিজ্ঞাপন, করতালি, বরমাল্য, জয়-পরাজয়
যা-ই হোক, জানি তবু একরত্তি মূল্য নেই তার। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/mulyer-upoma/
|
4973
|
শামসুর রাহমান
|
ফিরে যাও
|
চিন্তামূলক
|
ফিরে যাও আমার দুয়ার থেকে তোমরা এখন
ফিরে যাও; কিছুতেই তোমাদের দেবো না মাড়াতে
আমার চৌকাঠ! তোমরাতো রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে
নিরুদ্দেশ যাত্রায় দিয়েছো পাড়ি কতো না সমুদ্র
অথবা বীরভূমে ধু ধু হয়েছো তৃষ্ণার জল তাঁর
প্রহরে প্রহরে আর নজরুল জ্যৈষ্ঠের দুরন্ত
মেঘের মতন বাবরি দুলিয়ে মোহন বলাৎকার
করেছেন তোমাদের ওপর প্রত্যহ। কবেকার।জীবনানন্দের জন্যে চকিতে করেছো উন্মোচন
করুণ শঙ্খের মতো স্তন এবং সুধীন্দ্র দত্ত
নিখিল নাস্তির মৌনে ডুবে তোমাদের নাভিমূলে
যৌনাঙ্গের অগভীর কেশে রেখেছেন মুখ ভুলতে
মনস্তাপ। তোমরাতো সাজিয়েছো বিষ্ণুদে’র ঘর
রাত্রিদিন, দিয়েছো সন্ধ্যায় তুলে শ্বেত বাহু মুখ।
এখনো তো বুদ্ধদেব বসুর শয্যায় তোমাদের
ব্রার টুক্রো সিঁদুরের রঙ প’ড়ে থাকে ইতস্তত।ফিরে যাও, আমার দুয়ার থেকে ধিক্কার কুড়িয়ে
ফিরে যাও। তোমাদের চোখে তুলে রাখবার ইচ্ছে
মৃত টিকটিকি হ’য়ে আছে, বুকে নেবো না উৎফুল্ল।
বলে দিচ্ছি, ছলাকলা ব্যর্থ হবে; বিসমিল্লাহ খান
যতই বাজান তাঁর পুষ্পিত সানাই, তোমাদের
হাত ধ’রে আনবো না বাসরে কখনো। তোমরাতো
উচ্ছিষ্ট উর্বশী; ফিরে যাও, ফিরে যাও, যদি পারো
নতুন পাতার মতো সজীব শিহর নিয়ে এসো। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/fire-jao/
|
798
|
জসীম উদ্দীন
|
খুকির সম্পত্তি
|
ছড়া
|
শিউলি নামের খুকির সনে আলাপ আমার অনেকদিনের থেকে
হাসিখুশি মিষ্টমিশি অনেক কথা কই যে তারে ডেকে।
সেদিন তার কইনু ‘খুকি- কী কী জিনিস কওতো তোমার আছে?
সগৌরবে বলর, অনেক-অনেক কিছু আছে তাহারকাছে;
সাতটা ভাঙা পেন্সিল আর নীল বরণের ভাঙা দু-খান কাঁচ,
মারবেল আছে তিন-চারটে, কড়ি আছে গণ্ডা ছ কি পাঁচ।
ডলি পুতুল, মিনি পুতুল, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল আর-
পুঁতির মালা, রঙিন ঝিনুক, আরও অনেক খেলনা আছে তার।
আছে তাহার পাতার বাঁশি, টিনের উনুন, শোলার পাখির ছা,
সাতটা আছে ঝুমঝুমি তার আর আছে তার একটি খেলার মা।
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/post20160508090532/
|
2872
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কবি-কাহিনী (দ্বিতীয় সর্গ)
|
কাহিনীকাব্য
|
"এত কাল হে প্রকৃতি করিনু তোমার সেবা,
তবু কেন এ হৃদয় পূরিল না দেবি?
এখনো বুকের মাঝে রয়েছে দারুণ শূন্য,
সে শূন্য কি এ জনমে পূরিবে না আর?
মনের মন্দির মাঝে প্রতিমা নাহিক যেন,
শুধু এ আঁধার গৃহ রয়েছে পড়িয়া--
কত দিন বল দেবি রহিবে এমন শূন্য,
তা হোলে ভাঙিয়ে যাবে এ মনোমন্দির!
কিছু দিন পরে আর দেখিব সেখানে চেয়ে
পূর্ব্ব হৃদয়ের আছে ভগ্ন-অবশেষ,
সে ভগ্ন-অবশেষে-- সুখের সমাধি 'পরে
বসিয়া দারুণ দুখে কাঁদিতে কি হবে?
মনের অন্তর-তলে কি যে কি করিছে হুহু,
কি যেন আপন ধন নাইকো সেখানে,
সে শূন্য পূরাবে দেবি ঘুরিছে পৃথিবীময়
মরুভূমে তৃষাতুর মৃগের মতন।
কত মরীচিকা দেবী করেছে ছলনা মোরে,
কত ঘুরিয়াছি তার পশ্চাতে পশ্চাতে,
অবশেষে শ্রান্ত হয়ে তোমারে শুধাই দেবি
এ শূন্য পূরিবে না কি কিছুতে আমার?
উঠিছে তপন শশী, অস্ত যাইতেছে পুনঃ,
বসন্ত শরত শীত চক্রে ফিরিতেছে;
প্রতি পদক্ষেপে আমি বাল্যকাল হোতে দেবি
ক্রমে ক্রমে কত দূর যেতেছি চলিয়া--
বাল্যকাল গেছে চলে, এসেছে যৌবন এবে,
যৌবন যাইবে চলি আসিবে বার্দ্ধক্য--
তবু এ মনের শূন্য কিছুতে কি পূরিবে না?
মন কি করিবে হুহু চিরকাল তরে?
শুনিয়াছিলাম কোন্ উদাসী যোগীর কাছে--
"মানুষের মন চায় মানুষেরি মন;
গম্ভীর সে নিশীথিনী, সুন্দর সে উষাকাল,
বিষণ্ণ সে সায়াহ্নের ম্লান মুখচ্ছবি,
বিস্তৃত সে অম্বুনিধি, সমুচ্চ সে গিরিবর,
আঁধার সে পর্ব্বতের গহ্বর বিশাল,
তটিনীর কলধ্বনি, নির্ঝরের ঝর ঝর,
আরণ্য বিহঙ্গদের স্বাধীন সঙ্গীত,
পারে না পূরিতে তারা বিশাল মনুষ্য-হৃদি--
মানুষের মন চায় মানুষেরি মন।'
শুনিয়া, প্রকৃতিদেবি, ভ্রমিণু পৃথিবীময়;
কত লোক দিয়েছিল হৃদি-উপহার--
আমার মর্ম্মের গান যবে গাহিতাম দেবি
কত লোক কেঁদেছিল শুনিয়া সে গীত।
তেমন মনের মত মন পেলাম না দেবি,
আমার প্রাণের কথা বুঝিল না কেহ,
তাইতে নিরাশ হোয়ে আবার এসেছি ফিরে,
বুঝি গো এ শূন্য মন পূরিল না আর।"
এইরূপে কেঁদে কেঁদে কাননে কাননে কবি
একাকী আপন-মনে করিত ভ্রমণ।
সে শোক-সঙ্গীত শুনি কাঁদিত কাননবালা,
নিশীথিনী হাহা করি ফেলিত নিশ্বাস,
বনের হরিণগুলি আকুল নয়নে আহা
কবির মুখের পানে রহিত চাহিয়া।
"হাহা দেবি একি হোলো, কেন পূরিল না প্রাণ"
প্রতিধ্বনি হোতো তার কাননে কাননে।
শীর্ণ নির্ঝরিণী যেথা ঝরিতেছে মৃদু মৃদু,
উঠিতেছে কুলু কুলু জলের কল্লোল,
সেখানে গাছের তলে একাকী বিষণ্ণ কবি
নীরবে নয়ন মুদি থাকিত শুইয়া--
তৃষিত হরিণশিশু সলিল করিয়া পান
দেখি তার মুখপানে চলিয়া যাইত।
শীতরাত্রে পর্ব্বতের তুষারশয্যার 'পরে
বসিয়া রহিত স্তব্ধ প্রতিমার মত,
মাথার উপরে তার পড়িত তুষারকণা,
তীব্রতম শীতবায়ু যাইত বহিয়া।
দিনে দিনে ভাবনায় শীর্ণ হোয়ে গেল দেহ,
প্রফুল্ল হৃদয় হোলো বিষাদে মলিন,
রাক্ষসী স্বপ্নের তরে ঘুমালেও শান্তি নাই,
পৃথিবী দেখিত কবি শ্মশানের মত
এক দিন অপরাহ্নে বিজন পথের প্রান্তে
কবি বৃক্ষতলে এক রহিছে শুইয়া,
পথ-শ্রমে শ্রান্ত দেহ, চিন্তায় আকুল হৃদি,
বহিতেছে বিষাদের আকুল নিশ্বাস।
হেন কালে ধীরি ধীরি শিয়রের কাছে আসি
দাঁড়াইল এক জন বনের বালিকা,
চাহিয়া মুখের পানে কহিল করুণ স্বরে,
"কে তুমি গো পথশ্রান্ত বিষণ্ণ পথিক?
অধরে বিষাদ যেন পেতেছে আসন তার
নয়ন কহিছে যেন শোকের কাহিনী।
তরুণ হৃদয় কেন অমন বিষাদময়?
কি দুখে উদাস হোয়ে করিছ ভ্রমণ?"
গভীর নিশ্বাস ফেলি গম্ভীরে কহিল কবি,
"প্রাণের শূন্যতা কেন ঘুচিল না বালা?"
একে একে কত কথা কহিল বালিকা কাছে,
যত কথা রুদ্ধ ছিল হৃদয়ে কবির--
আগ্নেয় গিরির বুকে জ্বলন্ত অগ্নির মত
যত কথা ছিল কবি কহিলা গম্ভীরে।
"নদ নদী গিরি গুহা কত দেখিলাম, তবু
প্রাণের শূন্যতা কেন ঘুচিল না দেবি।"
বালার কপোল বাহি নীরবে অশ্রুর বিন্দু
স্বর্গের শিশির-সম পড়িল ঝরিয়া,
সেই এক অশ্রুবিন্দু অমৃতধারার মত
কবির হৃদয় গিয়া প্রবেশিল যেন;
দেখি সে করুণবারি নিরশ্রু কবির চোখে
কত দিন পরে হোল অশ্রুর উদয়।
শ্রান্ত হৃদয়ের তরে যে আশ্রয় খুঁজে খুঁজে
পাগল ভ্রমিতেছিল হেথায় হোথায়--
আজ যেন এইটুকু আশ্রয় পাইল হৃদি,
আজ যেন একটুকু জুড়ালো যন্ত্রণা।
যে হৃদয় নিরাশায় মরুভূমি হোয়েছিল
সেথা হোতে হল আজ অশ্রু উৎসারিত।
শ্রান্ত সে কবির মাথা রাখিয়া কোলের 'পরে,
সরলা মুছায়ে দিল অশ্রুবারিধারা।
কবি সে ভাবিল মনে, তুমি কোথাকার দেবী
কি অমৃত ঢালিলে গো প্রাণের ভিতর!
ললনা তখন ধীরে চাহিয়া কবির মুখে
কহিল মমতাময় করুণ কথায়,--
"হোথায় বিজন বনে দেখেছ কুটীর ওই,
চল পান্থ ওইখানে যাই দুজনায়।
বন হোতে ফল মূল আপনি তুলিয়া দিব,
নির্ঝর হইতে তুলি আনিব সলিল,
যতনে পর্ণের শয্যা দিব আমি বিছাইয়া,
সুখনিদ্রা-কোলে সেথা লভিবে বিরাম,
আমার বীণাটি লয়ে গান শুনাইব কত,
কত কি কথায় দিন যাইবে কাটিয়া।
হরিণশাবক এক আছে ও গাছের তলে,
সে যে আসি কত খেলা খেলিবে পথিক।
দূরে সরসীর ধারে আছে এক চারু কুঞ্জ,
তোমারে লইয়া পান্থ দেখাব সে বন।
কত পাখী ডালে ডালে সারাদিন গাইতেছে,
কত যে হরিণ সেথা করিতেছে খেলা।
আবার দেখাব সেই অরণ্যের নির্ঝরিণী,
আবার নদীর ধারে লয়ে যাব আমি,
পাখী এক আছে মোর সে যে কত গায় গান--
নাম ধোরে ডাকে মোরে "নলিনী' "নলিনী'।
যা আছে আমার কিছু সব আমি দেখাইব,
সব আমি শুনাইব যত জানি গান--
আসিবে কি পান্থ ওই বনের কুটীরমাঝে?"
এতেক শুনিয়া কবি চলিল কুটীরে।
কি সুখে থাকিত কবি, বিজন কুটীরে সেই
দিনগুলি কেটে যেত মুহূর্তের মত—কি শান্ত সে বনভূমি, নাই লোক নাই জন,
শুধু সে কুটীরখানি আছে এক ধারে।
আঁধার তরুর ছায়ে-- নীরব শান্তির কোলে
দিবস যেন রে সেথা রহিত ঘুমায়ে।
পাখীর অস্ফুট গান, নির্ঝরের ঝরঝর
স্তব্ধতারে আরো যেন দিত মিষ্ট করি।
আগে এক দিন কবি মুগ্ধ প্রকৃতির রূপে
অরণ্যে অরণ্যে একা করিত ভ্রমণ,
এখন দুজনে মিলি ভ্রমিয়া বেড়ায় সেথা,
দুই জন প্রকৃতির বালক বালিকা।
সুদূর কাননতলে কবিরে লইয়া যেত
নলিনী, সে যেন এক বনেরি দেবতা।
শ্রান্ত হোলে পথশ্রমে ঘুমাত কবির কোলে,
খেলিত বনের বায়ু কুন্তল লইয়া,
ঘুমন্ত মুখের পানে চাহিয়া রহিত কবি--
মুখে যেন লিখা আছে আরণ্য কবিতা।
"একি দেবি কলপনা, এত সুখ প্রণয়ে যে
আগে তাহা জানিতাম না ত!
কি এক অমৃতধারা ঢেলেছ প্রাণের 'পরে
হে প্রণয় কহিব কেমনে?
অন্য এক হৃদয়েরে হৃদয় করা গো দান,
সে কি এক স্বর্গীয় আমোদ।
এক গান গায় যদি দুইটি হৃদয়ে মিলি,
দেখে যদি একই স্বপন,
এক চিন্তা এক আশা এক ইচ্ছা দুজনার,
এক ভাবে দুজনে পাগল,
হৃদয়ে হৃদয়ে হয় সে কি গো সুখের মিল--
এ জনমে ভাঙ্গিবে না তাহা।
আমাদের দুজনের হৃদয়ে হৃদয়ে দেবি
তেমনি মিশিয়া যায় যদি--
এক সাথে এক স্বপ্ন দেখি যদি দুই জনে
তা হইলে কি হয় সুন্দর!
নরকে বা স্বর্গে থাকি, অরণ্যে বা কারাগারে
হৃদয়ে হৃদয়ে বাঁধা হোয়ে--
কিছু ভয় করি নাকো--বিহ্বল প্রণয়ঘোরে
থাকি সদা মরমে মজিয়া।
তাই হোক্--হোক্ দেবি আমাদের দুই জনে
সেই প্রেম এক কোরে দিক্।
মজি স্বপনের ঘোরে হৃদয়ের খেলা খেলি
যেন যায় জীবন কাটিয়া।"
নিশীথে একেলা হোলে এইরূপ কত গান
বিরলে গাইত কবি বসিয়া বসিয়া।
সুখ বা দুখের কথা বুকের ভিতরে যাহা
দিন রাত্রি করিতেছে আলোড়িত-প্রায়,
প্রকাশ না হোলে তাহা,মরমের গুরুভারে
জীবন হইয়া পড়ে দারুণ ব্যথিত।
কবি তার মরমের প্রণয় উচ্ছ্বাস-কথা
কি করি যে প্রকাশিবে পেত না ভাবিয়া।
পৃথিবীতে হেন ভাষা নাইক, মনের কথা
পারে যাহা পূর্ণভাবে করিতে প্রকাশ।
ভাব যত গাঢ় হয়, প্রকাশ করিতে গিয়া
কথা তত না পায় খুঁজিয়া খুঁজিয়া।
বিষাদ যতই হয় দারুণ অন্তরভেদী,
অশ্রুজল তত যায় শুকায়ে যেমন!
মরমের ভার-সম হৃদয়ের কথাগুলি
কত দিন পারে বল চাপিয়া রাখিতে?
একদিন ধীরে ধীরে বালিকার কাছে গিয়া
অশান্ত বালক-মত কহিল কত কি!
অসংলগ্ন কথাগুলি, মরমের ভাব আরো
গোলমাল করি দিল প্রকাশ না করি।
কেবল অশ্রুর জলে, কেবল মুখের ভাবে
পড়িল বালিকা তার মনের কি কথা!
এই কথাগুলি যেন পড়িল বালিকা ধীরে--
"কত ভাল বাসি বালা কহিব কেমনে!
তুমিও সদয় হোয়ে আমার সে প্রণয়ের
প্রতিদান দিও বালা এই ভিক্ষা চাই।"
গড়ায়ে পড়িল ধীরে বালিকার অশ্রুজল,
কবির অশ্রুর সাথে মিশিল কেমন—স্কন্ধে তার রাখি মাথা কহিল কম্পিত স্বরে,
"আমিও তোমারে কবি বাসি না কি ভাল?"
কথা না স্ফুরিল আর, শুধু অশ্রুজলরাশি
আরক্ত কপোল তার করিল প্লাবিত।
এইরূপ মাঝে মাঝে অশ্রুজলে অশ্রুজলে
নীরবে গাইত তারা প্রণয়ের গীত।
অরণ্যে দুজনে মিলি আছিল এমন সুখে
জগতে তারাই যেন আছিল দুজন—যেন তারা সুকোমল ফুলের সুরভি শুধু,
যেন তারা অপ্সরার সুখের সঙ্গীত।
আলুলিত চুলগুলি সাজাইয়া বনফুলে
ছুটিয়া আসিত বালা কবির কাছেতে,
একথা ওকথা লয়ে কি যে কি কহিত বালা
কবি ছাড়া আর কেহ বুঝিতে নারিত।
কভু বা মুখের পানে সে যে কি রহিত চেয়ে,
ঘুমায়ে পড়িত যেন হৃদয় কবির।
কভু বা কি কথা লয়ে সে যে কি হাসিত হাসি,
তেমন সরল হাসি দেখ নি কেহই।
আঁধার অমার রাত্রে একাকী পর্ব্বতশিরে
সেও গো কবির সাথে রহিত দাঁড়ায়ে,
উনমত্ত ঝড় বৃষ্টি বিদ্যুৎ আশনি আর
পর্ব্বতের বুকে যবে বেড়াত মাতিয়া,
তাহারো হৃদয় যেন নদীর তরঙ্গ-সাথ
করিত গো মাতামাতি হেরি সে বিপ্লব—করিত সে ছুটাছুটি, কিছুতে সে ডরিত না,
এমন দুরন্ত মেয়ে দেখি নি ত আর!
কবি যা কহিত কথা শুনিত কেমন ধীরে,
কেমন মুখের পানে রহিত চাহিয়া।
বনদেবতার মত এমন সে এলোথেলো,
কখনো দুরন্ত অতি ঝটিকা যেমন,
কখনো এমন শান্ত প্রভাতের বায়ু যথা
নীরবে শুনে গো যবে পাখীর সঙ্গীত।
কিন্তু, কলপনা, যদি কবির হৃদয় দেখ
দেখিবে এখনো তাহা পূর্ণ হয় নাই।
এখনো কহিছে কবি, "আরো দাও ভালবাসা,
আরো ঢালো' ভালবাসা হৃদয়ে আমার।"
প্রেমের অমৃতধারা এত যে করেছে পান,
তবু মিটিল না কেন প্রণয়পিপাসা?
প্রেমের জোছনাধারা যত ছিল ঢালি বালা
কবির সমুদ্র-হৃদি পারে নি পূরিতে।
স্বাধীন বিহঙ্গ-সম, কবিদের তরে দেবি
পৃথিবীর কারাগার যোগ্য নহে কভু।
অমন সমুদ্র-সম আছে যাহাদের মন
তাহাদের তরে দেবি নহে এ পৃথিবী।
তাদের উদার মন আকাশে উড়িতে যায়,
পিঞ্জরে ঠেকিয়া পক্ষ নিম্নে পড়ে পুনঃ,
নিরাশায় অবশেষে ভেঙ্গে চুরে যায় মন,
জগৎ পূরায় তার আকুল বিলাপে।
কবির সমুদ্র-বুক পূরাতে পারিবে কিসে
প্রেম দিয়া ক্ষুদ্র ওই বনের বালিকা।
কাতর ক্রন্দনে আহা আজিও কাঁদিল কবি,
"এখনও পূরিল না প্রাণের শূন্যতা।"
বালিকার কাছে গিয়া কাতরে কহিল কবি,
"আরো দাও ভালবাসা হৃদয়ে ঢালিয়া।
আমি যত ভালবাসি তত দাও ভালবাসা,
নহিলে গো পূরাবে না এ প্রাণের শূন্যতা।"
শুনিয়া কবির কথা কাতরে কহিল বালা,
"যা ছিল আমার কবি দিয়েছি সকলি--
এ হৃদয়, এ পরাণ, সকলি তোমার কবি,
সকলি তোমার প্রেমে দেছি বিসর্জ্জন।
তোমার ইচ্ছার সাথে ইচ্ছা মিশায়েছি মোর,
তোমার সুখের সাথে মিশায়েছি সুখ।"
সে কথা শুনিয়া কবি কহিল কাতর স্বরে,
"প্রাণের শূন্যতা তবু ঘুচিল না কেন?
ওই হৃদয়ের সাথে মিশাতে চাই এ হৃদি,
দেহের আড়াল তবে রহিল গো কেন?
সারাদিন সাধ যায় সুধাই মনের কথা,
এত কথা তব কেন পাই না খুঁজিয়া?
সারাদিন সাধ যায় দেখি ও মুখের পানে,
দেখেও মিটে না কেন আঁখির পিপাসা?
সাধ যায় এ জীবন প্রাণ ভোরে ভাল বাসি,
বেসেও প্রাণের শূন্য ঘুচিল না কেন?
আমি যত ভালবাসি তত দাও ভালবাসা,
নহিলে গো পূরিবে না প্রাণের শূন্যতা।
একি দেবি! একি তৃষ্ণা জ্বলিছে হৃদয়ে মোর,
ধরার অমৃত যত করিয়াছি পান,
প্রকৃতির কাছে যত তরল স্বর্গীয় গীতি,
সকলি হৃদয়ে মোর দিয়াছি ঢালিয়া--
শুধু দেবি পৃথিবীর হলাহল আছে যত
তাহাই করি নি পান মিটাতে পিপাসা!
শুধু দেবি ঐশ্বর্য্যের কনকশৃঙ্খল দিয়া
বাঁধি নাই আমার এ স্বাধীন হৃদয়!
শুধু দেবি মিটাইতে মনের বীরত্ব-গর্ব্ব
লক্ষ মানবের রক্তে ধুই নি চরণ!
শুধু দেবি এ জীবনে নিশাচর বিলাসেরে
সুখ-স্বাস্থ্য অর্ঘ্য দিয়া করি নাই সেবা!
তবু কেন হৃদয়ের তৃষা মিটিল না মোর,
তবু কেন ঘুচিল না প্রাণের শূন্যতা?
শুনেছি বিলাসসুরা বিহ্বল করিয়া হৃদি
ডুবাইয়া রাখে সদা বিস্মৃতির ঘুমে!
কিন্তু দেবি-- কিন্তু দেবি-- এত যে পেয়েছি কষ্ট,
বিস্মৃতি চাই নে তবু বিস্মৃতি চাই নে!--
সে কি ভয়ানক দশা, কল্পনাও শিহরে গো--
স্বর্গীয় এ হৃদয়ের জীবনে মরণ!
আমার এ মন দেবি হোক্ মরুভূমি-সম
তৃণলতা-জল-শূন্য জ্বলন্ত প্রান্তর,
তবুও তবুও আমি সহিব তা প্রাণপণে,
বহিব তা যত দিন রহিব বাঁচিয়া,
মিটাতে মনের তৃষা ত্রিভুবন পর্য্যটিব,
হত্যা করিব না তবু হৃদয় আমার।
প্রেম ভক্তি স্নেহ আদি মনের দেবতা যত
যতনে রেখেছি আমি মনের মন্দিরে,
তাঁদের করিতে পূজা ক্ষমতা নাইকো ব'লে
বিসর্জ্জন করিবারে পারিব না আমি।
কিন্তু ওগো কলপনা আমার মনের কথা
বুঝিতে কে পারিবেক বল দেখি দেবি?
আমার ব্যথার মর্ম্ম কারে বুঝাইবে বল—বুঝাইতে না পারিলে বুক যায় ফেটে।
যদি কেহ বলে দেবি "তোমার কিসে দুখ,
হৃদয়ের বিনিময়ে পেয়েছ হৃদয়,
তবে কাল্পনিক দুখে এত কেন ম্রিয়মাণ?'
তবে কি বলিয়া আমি দিব গো উত্তর?
উপায় থাকিতে তবু যে সহে বিষাদজ্বালা
পৃথিবী তাহারি কষ্টে হয় গো ব্যথিত--
আমার এ বিষাদের উপায় নাইক কিছু,
কারণ কি তাও দেবি পাই না খুঁজিয়া।
পৃথিবী আমার কষ্ট বুঝুক্ বা না বুঝুক্,
নলিনীরে কি বলিয়া বুঝাইব দেবি?
তাহারে সামান্য কথা গোপন করিলে পরে
হৃদয়ে কি কষ্ট হয় হৃদয় তা জানে।
এত তারে ভালবাসি, তবু কেন মনে হয়
ভালবাসা হইল না আশ মিটাইয়া!
আঁধার সমুদ্রতলে কি যেন বেড়াই খুঁজে,
কি যেন পাইতেছি না চাহিতেছি যাহা।
বুকের যেখানে তারে রাখিতে চাই গো আমি
সেখানে পাই নে যেন রাখিতে তাহারে--
তাইতে অন্তর বুক এখনো পূরিতেছে না,
তাইতে এখনো শূন্য রয়েছে হৃদয়।"
কবির প্রণয়সিন্ধু ক্ষুদ্র বালিকার মন
রেখেছিল মগ্ন করি অগাধ সলিলে--
উপরে যে ঝড় ঝঞ্ঝা কত কি বহিয়া যেত
নিম্নে তার কোলাহল পেত না শুনিতে,
প্রণয়ের অবিচিত্র নিয়তনূতন তবু
তরঙ্গের কলধ্বনি শুনিত কেবল,
সেই একতান ধ্বনি শুনিয়া শুনিয়া তার
হৃদয় পড়িয়াছিল ঘুমায়ে কেমন!
বনের বালিকা আহা সে ঘুমে বিহ্বল হোয়ে
কবির হৃদয়ে রাখি অবশ মস্তক
স্বর্গের স্বপন শুধু দেখিত দিবস রাত,
হৃদয়ের হৃদয়ের অনন্ত মিলন।
বালিকার সে হৃদয়ে সে প্রণয়মগ্ন হৃদে,
অবশিষ্ট আছিল না এক তিল স্থান--
আর কিছু জানিত না, আর কিছু ভাবিত না,
শুধু সে বালিকা ভাল বাসিত কবিরে।
শুধু সে কবির গান কত যে লাগিত ভাল,
শুনে শুনে শুনা তার ফুরাত না আর।
শুধু সে কবির নেত্র কি এক স্বর্গীয় জ্যোতি
বিকীরিত, তাই হেরি হইত বিহ্বল!
শুধু সে কবির কোলে ঘুমাতে বাসিত ভাল,
কবি তার চুল লয়ে করিত কি খেলা।
শুধু সে কবিরে বালা শুনতে বাসিত ভাল
কত কি--কত কি কথা অর্থ নাই যার,
কিন্তু সে কথায় কবি কত যে পাইত অর্থ
গভীর সে অর্থ নাই কত কবিতার--
সেই অর্থহীন কথা, হৃদয়ের ভাব যত
প্রকাশ করিতে পারে না এমন কিছু না।
একদিন বালিকারে কবি সে কহিল গিয়া--
"নলিনি! চলিনু আমি ভ্রমিতে পৃথিবী!
আর একবার বালা কাশ্মীরের বনে বনে
যাই গো শুনিতে আমি পাখীর কবিতা!
রুসিয়ার হিমক্ষেত্রে আফ্রিকার মরুভূমে
আর একবার আমি করি গে ভ্রমণ!
এইখানে থাক তুমি, ফিরিয়া আসিয়া পুনঃ
ওই মধুমুখখানি করিব চুম্বন।"
এতেক কহিয়া কবি নীরবে চলিয়া গেল
গোপনে মুছিয়া ফেলি নয়নের জল।
বালিকা নয়ন তুলি নীরবে রহিল চাহি,
কি দেখিছে সেই জানে অনিমিষ চখে।
সন্ধ্যা হোয়ে এল ক্রমে তবুও রহিল চাহি,
তবুও ত পড়িল না নয়নে নিমেষ।
অনিমিষ নেত্র ক্রমে করিয়া প্লাবিত
একবিন্দু দুইবিন্দু ঝরিল সলিল।
বাহুতে লুকায়ে মুখ কাতর বালিকা
মর্ম্মভেদী অশ্রুজলে করিল রোদন।
হা-হা কবি কি করিলে,ফিরে দেখ, ফিরে এস,
দিও না বালার হৃদে অমন আঘাত--
নীরবে বালার আহা কি বজ্র বেজেছে বুকে,
গিয়াছে কোমল মন ভাঙ্গিয়া চুরিয়া!
হা কবি অমন কোরে অনর্থক তার মনে
কি আঘাত করিলে যে বুঝিলে না তাহা?
এত কাল সুখস্বপ্ন ডুবায়ে রাখিয়া মন,
এত দিন পরে তাহা দিবে কি ভাঙ্গিয়া?
কবি ত চলিয়া যায়-- সন্ধ্যা হোয়ে এল ক্রমে,
আঁধারে কাননভূমি হইল গম্ভীর--
একটি নড়ে না পাতা, একটু বহে না বায়ু,
স্তব্ধ বন কি যেন কি ভাবিছে নীরবে!
তখন বনান্ত হোতে সুধীরে শুনিল কবি
উঠিছে নীরব শূন্যে বিষণ্ণ সঙ্গীত--
তাই শুনি বন যেন রয়েছে নীরবে অতি,
জোনাকি নয়ন শুধু মেলিছে মুদিছে।
একবার কবি শুধু চাহিল কুটীরপানে,
কাতরে বিদায় মাগি বনদেবী-কাছে
নয়নের জল মুছি-- যে দিকে নয়ন চলে
সে দিকে পথিক কবি যাইল চলিয়া।
সঙ্গীত
কেন ভালবাসিলে আমায়?
কিছুই নাইক গুণ, কিছুই জানি না আমি,
কি আছে? কি দিয়ে তব তুষিব হৃদয়!
যা আমার ছিল সাধ্য সকলি করেছি আমি
কিছুই করি নি দোষ চরণে তোমার,
শুধু ভাল বাসিয়াছি, শুধু এ পরান মন
উপহার সঁপিয়াছি তোমার চরণে।
তাতেও তোমার মন তুষিতে নারিনু যদি
তবে কি করিব বল, কি আছে আমার?
গেলে যদি, গেলে চলি, যাও যেথা ভাল লাগে--
একবার মনে কোরো দীন অধীনীরে।
ভ্রমিতে ধরার মাঝে যত ভালবাসা পাবে,
তাতে যদি ভাল থাক তাই হোক্ তবে--
তবু একবার যদি মনে কর নলিনীরে
যে দুখিনী, যে তোমারে এত ভালবাসে!
কি করিলে মন তব পারিতাম জুড়াইতে
যদি জানিতাম কবি করিতাম তাহা!
আমি অতি অভাগিনী জানি না বলিয়া যেন
বিরক্ত হোয়ো না কবি এই ভিক্ষা দাও!
না জানিয়া না শুনিয়া যদি দোষ করে থাকি,
ক্ষুদ্র আমি, ক্ষমা তবে করিয়ো আমারে--
তুমি ভাল থেকো কবি,ক্ষুদ্র এক কাঁটা যেন
ফুটে না তোমার পায়ে ভ্রমিতে পৃথিবী।
জননি, কোথায় তুমি রেখে গেলে দুহিতারে?
কত দিন একা একা কাটালাম হেথা,
একেলা তুলিয়া ফুল কত মালা গাঁথিতাম,
একেলা কাননময় করিতাম খেলা!
তোমার বীণাটি ল'য়ে, উঠিয়া পর্ব্বতশিরে
একেলা আপন মনে গাইতাম গান--
হরিণশিশুটি মোর বসিত পায়ের তলে,
পাখীটি কাঁধের 'পরে শুনিত নীরবে।
এইরূপ কত দিন কাটালেম বনে বনে,
কত দিন পরে তবে এলে তুমি কবি!
তখন তোমারে কবি কি যে ভালবাসিলাম
এত ভাল কাহারেও বাসি নাই কভু।
দূর স্বরগের এক জ্যোতির্ম্ময় দেব-সম
কত বার মনে মনে করেছি প্রণাম।
দূর থেকে আঁখি ভরি দেখিতাম মুখখানি,
দূর থেকে শুনিতাম মধুময় গান।
যে দিন আপনি আসি কহিলে আমার কাছে
ক্ষুদ্র এই বালিকারে ভালবাস তুমি,
সে দিন কি হর্ষে কবি কি আনন্দে কি উচ্ছ্বাসে
ক্ষুদ্র এ হৃদয় মোর ফেটে গেল যেন।
আমি কোথাকার কেবা! আমি ক্ষুদ্র হোতে ক্ষুদ্র,
স্বর্গের দেবতা তুমি ভালবাস মোরে?
এত সৌভাগ্য, কবি, কখনো করি নি আশা--
কখনো মুহূর্ত্ত-তরে জানি নি স্বপনে।
যেথায় যাও-না কবি, যেথায় থাক-না তুমি,
আমরণ তোমারেই করিব অর্চ্চনা।
মনে রাখ নাই রাখ, তুমি যেন সুখে থাক
দেবতা! এ দুখিনীর শুন গো প্রার্থনা। (কবি-কাহিনী কাব্যোপন্যাস)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kobi-kahini-ditio-sorgo/
|
10
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
আহা
|
মানবতাবাদী
|
কাঁড়া না আকাড়া?
এ-প্রশ্ন বিলাসিতা—
খরার উপোশে ভিক্ষার চাল তুমি।
ওই চাল থেকে ছুটেছে রমনী, ভিক্ষু ও ভিক্ষুক
খুনখারাবির মরীয়া লাল দু চোখে,
বাঁধের কোমরবন্ধ ফাটানো গতির তুমুল বন্যায়
আহা চাল,আহা একমুঠো শাদা চাল
কোথায় লুকোবে বলো,
অন্ধ কয়েদি
সে-ও তো তোমার জন্মের মাটি চেনে।সারারাত ধরে নিখাক শিশুকে ভুলিয়ে
যে-নারী হাড়িতে সেদ্ধ করেছে ভাতের বদলে নুড়ি,
সে তোমাকে চেনে নিজের তালুর মতন।
না খেতে পাওয়ার চিল-চিতকার সইতে না পেরে
যে মরদ কেটে ভাসিয়ে দিয়েছে দুধের বাচ্চা
সে তোমাকে চেনে তাঁর রক্তের মতন।আহা চাল,
তুমি কত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে শাপে,
এত তিতকুটে, কালো।
তোমাকে জ্বালিয়ে ভাত করে খাবে বলে
ভাঁটার মতন গনগনে রাগে
যেদিকে তাকাও ছুটেছে লুঠেরা করতল,
কোথায় লুকোবে তুমি?
অন্ধ কয়েদি – সে-ও যে তোমার জন্মের মাটি চেনে।কাঁড়া না আকাড়া?
এ-প্রশ্ন বিলাসিতা—
খরার উপোশে ভিক্ষার চাল তুমি।
ওই চাল থেকে ছুটেছে রমনী, ভিক্ষু ও ভিক্ষুক
খুনখারাবির মরীয়া লাল দু চোখে,
বাঁধের কোমরবন্ধ ফাটানো গতির তুমুল বন্যায়
আহা চাল,আহা একমুঠো শাদা চাল
কোথায় লুকোবে বলো,
অন্ধ কয়েদি
সে-ও তো তোমার জন্মের মাটি চেনে।সারারাত ধরে নিখাক শিশুকে ভুলিয়ে
যে-নারী হাড়িতে সেদ্ধ করেছে ভাতের বদলে নুড়ি,
সে তোমাকে চেনে নিজের তালুর মতন।
না খেতে পাওয়ার চিল-চিতকার সইতে না পেরে
যে মরদ কেটে ভাসিয়ে দিয়েছে দুধের বাচ্চা
সে তোমাকে চেনে তাঁর রক্তের মতন।আহা চাল,
তুমি কত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে শাপে,
এত তিতকুটে, কালো।
তোমাকে জ্বালিয়ে ভাত করে খাবে বলে
ভাঁটার মতন গনগনে রাগে
যেদিকে তাকাও ছুটেছে লুঠেরা করতল,
কোথায় লুকোবে তুমি?
অন্ধ কয়েদি – সে-ও যে তোমার জন্মের মাটি চেনে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%be-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%85%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ad-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
|
1945
|
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
|
দুর্গোৎসব
|
ভক্তিমূলক
|
দুর্গোৎসব 5
১
বর্ষে বর্ষে এসো যাও এ বাঙ্গালা ধামে
কে তুমি ষোড়শী কন্যা, মৃগেন্দ্রবাহিনি?
চিনিয়াছি তোরে দুর্গে, তুমি নাকি ভব দুর্গে,
দুর্গতির একমাত্র সংহারকারিণী ||
মাটি দিয়ে গড়িয়াছি, কত গেল খড় কাছি,
সৃজিবারে জগতের সৃজনকারিণী।
গড়ে পিটে হলো খাড়া, বাজা ভাই ঢোল কাড়া,
কুমারের হাতে গড়া ঐ দীনতারিণী।
বাজা-ঠমকি ঠমকি ঠিকি, খিনিকি
ঝিনিকি ঠিনি ||
২
কি সাজ সেজেছ মাতা রাঙ্গতার সাজে।
এ দেশে যে রাঙ্গই সাজ কে তোরে শিখালে?
সন্তানে রাঙ্গতা দিলে আপনি তাই পরিলে,
কেন মা রাঙ্গের সাজে এ বঙ্গ ভুলালে?
ভারত রতন খনি, রতন কাঞ্চন মণি,
সে কালে এদেশে মাতা, কত না ছড়ালে?
বীরভোগ্যা বসুন্ধরা, আজ তুমি রাঙ্গতা পরা,
ছিঁড়া ধুতি রিপু করা, ছেলের কপালে?
তবে-বাজা ঢোল কাঁশি মধুর
খেমটা তালে ||
৩
কারে মা এনেছ সঙ্গে, অনন্তরঙ্গিণি!
কি শোভা হয়েছে আজি, দেখ রে সবার!
আমি বেটা লক্ষ্মীছাড়া, আমার ঘরে লক্ষ্মী খাড়া,
ঘরে হতে খাই তাড়া, ঘরখরচ নাই ||
হয়েছিল হাতে খড়ি, ছাপার কাগজ পড়ি,
সরস্বতী তাড়াতাড়ি, এলে বুঝি তাই?
করো না মা বাড়াবাড়ি, তোমায় আমায়
ছাড়াছাড়ি,
চড়ে না ভাতের হাঁড়ি, বিদ্যায় কাজ নাই।
তাক্ তাক্ ধিনাক্ ধিনাক্ বাজনা
বাজা রে ভাই ||
৪
দশ ভুজে দশায়ুধ কেন মাতা ধর?
কেন মাতা চাপিয়াছ সিংহটার ঘাড়ে?
ছুরি দেখে ভয় পাই, ঢাল খাঁড়া কাজ নাই,
ও সব রাখুক গিয়ে রামদীন পাঁড়ে।
সিংহ চড়া ভাল নয়, দাঁত দেখে পাই ভয়,
প্রাণ যেন খাবি খায়, পাছে লাফ ছাড়ে,
আছে ঘরে বাঁধা গাই, চড়তে হয় চড় তাই,
তাও কিছু ভয় পাই পাছে সিঙ্গ নাড়ে।
সিংহপৃষ্ঠে মেয়ের পা! দেখে কাঁপি
হাড়ে হাড়ে ||
৫
তোমার বাপের কাঁধে-নগেন্দ্রের ঘাড়ে
তুঙ্গ শৃঙ্গোপরে সিংহ-দেখে গিরিবালে!
শিমলা পাহাড়ে ধ্বজা, উড়ায় করিয়া মজা,
পিতৃ সহ বন্দী আছ, হর্য্যক্ষের জালে।
তুমি যারে কৃপা কর সেই হয় ভাগ্যধর-
সিংহের চরণ দিয়ে কতই বাড়ালে!
জনমি ব্রাহ্মণ কুলে, শতদল পদ্ম তুলে
আমি পূজে পাদপদ্ম পড়িনু আড়ালে!
রুটি মাখন খাব মা গো! আলোচাল ছাড়ালে!
৬
এই শুন পুনঃ বাজে মজাইয়া মন,
সিংহের গভীর কণ্ঠ, ইংরেজ কামান!
দুড়ুম দুড়ুম দুম, প্রভাতে ভাঙ্গায় ঘুম,
দুপুরে প্রদোষে ডাকে, শিহরয় প্রাণ!
ছেড়ে ফেলে ছেঁড়া ধুতি, জলে ফেলে খুঙ্গী
পুঁথি,
সাহেব সাজিব আজ ব্রাহ্মণ সন্তান।
লুচি মণ্ডার মুখে ছাই, মেজে বস্যে মটন খাই,
দেখি মা পাই না পাই তোমার সন্ধান।
সোলা-টুপি মাথায় দিয়ে পাব জগতে সম্মান ||
৭
এনেছ মা বিঘ্ন-হরে কিসের কারণে?
বিঘ্নময় এ বাঙ্গালা, তা কি আছে মনে?
এনেছ মা শক্তিধরে, দেখি কত শক্তি ধরে?
মেরেছ মা বারে বারে দুষ্টাসুরগণে,
মেরেছ তারকাসুর, আজি বঙ্গ ক্ষুধাতুর,
মার দেখি ক্ষুধাসুর, সমাজের রণে?
অসুরে করিয়া ফের, মায়ে পোয়ে মারলে ঢের,
মার দেখি এ অসুরে, ধরি ও চরণে ||
তখন-“কত নাচ গো রণে!” বাজাব
প্রফুল্ল মনে।
৮
তোমার মহিমা মাতা বুঝিতে নারিনু,
কিসে লাগিয়া আন কাল বিষধরে?
ঘরে পরে বিষধর, বিষে রঙ্গ জ্বর জ্বর,
আবার এ অজগর দেখাও কিঙ্করে?
হই মা পরের দাস, বাঁধি আঁটি কেটে ঘাস,
নাহিক ছাড়ি নিশ্বাস কালসাপ ডরে।
নিতি নিতি অপমান, বিষে জ্বর জ্বর প্রাণ,
কত বিষ কণ্ঠ মাঝে, নীলকণ্ঠ ধরে;
বিষের জ্বালায় সদা প্রাণ ছটফট করে!
৯
দুর্গা দুর্গা বল ভাই দুর্গাপূজা এলো,
পুঁতিয়া কলার তেড় সাজাও তোরণ।
বেছে বেছে তোল ফুল সাজাব ও পদমূল,
এবার হৃদয় খুলে পূজিব চরণ ||
সাজা ভাই ঢাক ঢোল, কাড়া নাগড়া গণ্ডগোল,
দেব ভাই পাঁটার ঝোল, সোনার বরণ ||
ন্যায়রত্ন এসো সাজি, প্রতিপদ হল আজি,
জাগাও দেখি চণ্ডীরে বসায়ে বোধন?
১০
যা দেবী সর্ব্বভূতেষু-ছায়া রূপ ধরে!
কি পুঁথি পড়িলে বিপ্র! কাঁদিল হৃদয়!
সর্ব্বভূতে সেই ছায়া! হইল পবিত্র কায়া,
ঘুচিবে সংসারে মায়া, যদি তাই হয় ||
আবার কি শুনি কথা! শক্তি নাকি যথা তথা?
যা দেবী সর্ব্বভূতেষু, শক্তিরূপে রয়?
বাঙ্গালি ভূতের দেহ- শক্তি ত না দেখে কেহ;
ছিলে যদি শক্তিরূপে, কেন হলে লয়?
আদ্যাশক্তি শক্তি দেহ। জয় মা চণ্ডীর জয়।
১১
পরিল এ বঙ্গবাসী, নূতন বসন,
জীবন্ত কুসুমসজ্জা, যেন বা ধরায়।
কেহ বা আপনি পরে, কেহ বা পরায় পরে,
যে যাহারে ভালবাসে, সে তারে সাজায়।
বাজারেতে হুড়াহুড়ি, আপিসেতে তাড়াতাড়ি,
লুচি মণ্ডা ছড়াছড়ি ভাত কেবা খায়?
সুখের বড় বাড়াবাড়ি, টাকার বেলা ভাঁড়াভাঁড়ি,
এই দশা ত সকল বাড়ী, দোষিব বা কায়?
বর্ষে বর্ষে ভুগি মা গো, বড়ই টাকার দায়!
১২
হাহাকার বঙ্গদেশে, টাকার জ্বালায়।
তুমি এলে শুভঙ্করি! বাড়ে আরো দায়।
কে এসো কেন দাও, কেন চাল কলা খাও,
তোমার প্রসাদে যদি টাকা কুলায়।
তুমি ধর্ম্ম তুমি অর্থ, তার বুঝি এই অর্থ,
তুমি মা টাকারূপিণী ধরম টাকায়।
টাকা কাম, টাকা মোক্ষ, রক্ষ মাতঃ রক্ষ রক্ষ,
টাকা দাও লক্ষ লক্ষ, নৈলে প্রাণ যায়।
টাকা ভক্তি, টাকা মতি, টাকা মুক্তি, টাকা গতি,
না জানি ভকতিস্তুতি, নমামি টাকায়?
হা টাকা যো টাকা দেবি, মরি যেন টাকা সেবি,
অন্তিম কালে পাই মা যেন রূপার চাকায়?
১৩
তুমিই বিষ্ণুর হস্তে সুদর্শন চক্র,
হে টাকে! ইহ জগতে তুমি সুদর্শন।
শুন প্রভু রূপচাঁদ, তুমি ভানু তুমি চাঁদ,
ঘরে এসো সোনার চাঁদ, দাও দরশন ||
আমরি কি শোভা, ছেলে বুড়ার মনোলোভা,
হৃদে ধর বিবির মুণ্ড, লতায় বেষ্টন।
তব ঝন্ ঝন্ নাদে, হারিয়া বেহালা কাঁদে,
তম্বুরা মৃদঙ্গ বীণা কি ছার বাদন।
পশিয়া মরম-মাঝে, নারীকণ্ঠ মৃদু বাজে,
তাও ছার তুমি যদি কর ঝন্ ঝন্!
টাকা টাকা টাকা টাকা!
বাক্সতে এসো রে ধন।
১৪
তোর লাগি সর্ব্বত্যাগী, ওরে টাকা ধন!
জনমি বাঙ্গালী-কুলে, ভুলিনু ও রূপে!
তেয়াগিনু পিতা মাতা, শত্রু যে ভগিনী ভ্রাতা,
দেখি মারি জ্ঞাতি গোষ্ঠী, তোরে প্রাণ সপে!
বুঝিয়া টাকার মর্ম্ম, ত্যজেছি যে ধর্ম্ম কর্ম্ম,
করেছি নরকে ঠাঁই, ঘোর কৃমিকূপে ||
দুর্গে দুর্গে ডাকি আজ, এ লোভে পড়ুক বাজ,
অসুরনাশিনি চণ্ডি আয় চণ্ডিরূপে!
এ অসুরে নাশ মাত!
শুম্ভে নাশিলে যেরূপে!
১৫
এসো এসো জগন্মাতা, জগদ্ধাত্রী উমে
হিসাব নিকাশ আমি, করি তব সঙ্গে।
আজি পূর্ণ বার মাস, পূর্ণ হলো কোন আশ?
আবার পূজিব তোমা, কিসের প্রসঙ্গে?
সেই ত কঠিন মাটি, দিবা রাত্রি দুখে হাঁটি,
সেই রৌদ্র সেই বৃষ্টি, পীড়িতেছে অঙ্গে।
কি জন্য গেল বা বর্ষ? বাড়িয়াছে কোন হর্ষ?
মিছামিছি আয়ুঃক্ষয়, কালের ভ্রূভঙ্গে।
বর্ষ কেন গণি তবে, কেন তুমি এস ভবে,
পিঞ্জর যন্ত্রণা সবে বনের বিহঙ্গে?
ভাঙ্গ মা দেহ-পিঞ্জর! উড়িব মনের রঙ্গে।
১৬
ওই শুন বাজিতেছে গুম্ গাম্ গুম্
ঢাক ঢোল কাড়া কাঁশি, নৌবত নাগরা।
প্রভাত সপ্তমী নিশি, নেয়েছে শঙ্করী পিসী,
রাঁধিবে ভোগের রান্না, হাঁড়ি মাল্শা ভরা।
কাঁদি কাঁদি কেটে কলা, ভিজায়েছি ডাল ছোলা,
মোচা কুমড়া আলু বেগুন,
আছে কাঁড়ি করা ||
আর মা চাও বা কি? মট্কিভরা আছে ঘি,
মিহিদানা সীতাভোগ, লুচি মনোহরা!
আজ এ পাহাড়ে মেয়ের,
ভাল কর্যে পেট ভরা।
১৭
আর কি খাইবে মাতা? ছাগলের মুণ্ড?
রুধিরে প্রবৃত্তি কেন হে শান্তিরূপিণি।
তুমি গো মা জগন্মাতা, তুমি খাবে কার মাথা!?
তুমি দেহ তুমি আত্মা, সংসারব্যাপিনি!
তুমি কার কে তোমার, তোর কেন মাংসাহার?
ছাগলে এ তৃপ্তি কেন, সর্ব্বসংহারিণি?
করি তোমায় কৃতাঞ্জলি, তুমি যদি চাও বলি,
বলি দিব সুখ দুঃখ, চিত্তবৃত্তি জিনি ;
ছ্যাডাং ড্যাড্যাং ড্যাং ড্যাং!
নাচো গো রণরঙ্গিণি।
১৮
ছয় রিপু বলি দিব, শক্তির চরণে
ঐশিকী মানসী শক্তি! তীব্র জ্যোতির্ম্ময়ি!
বলি ত দিয়াছি সুখ, এখন বলি দিব দুখ,
শক্তিতে ইন্দ্রিয় জিনি হইব বিজয়ী।
এ শক্তি দিতে কি পার? ঠুসে তবে পাঁটা মার,
প্রণমামি মহামায়ে তুমি ব্রহ্মময়ী।
নৈলে তুমি মাটির ঢিপি, দশমীতে গলা টিপি,
তোমায় ভাসিয়ে গাঁজা টিপি, সিদ্ধিরস্তু কই।
ঐটুকু মা ভাল দেখি, পূজি তোমায় মৃণ্ময়ি!
——————
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/931
|
1839
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
না
|
প্রেমমূলক
|
তোমার কাছে চেয়েছিলাম অনির্বচনীয়তা
দাওনি।
আকাশ ভর্তি মেঘ করেছে, মেঘের হাতে তানপুরা
গাওনি।
পায়ের কাছে পৌঁছে দিলাম নৌকা বোঝাই বন্দনা
দাওনি।
গোপন কথা জানিয়েছিলাম, দুত ছিল রাজহংসেরা
পাওনি।
চাইবে বল রক্তকমল ভিজিয়ে দিলাম চন্দনে
চাওনি।
তোমার কাছে চেয়েছিলাম অনির্বচনীয়তা
দাওনি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1255
|
4805
|
শামসুর রাহমান
|
তোমার কি মনে পড়ে
|
সনেট
|
তোমার কি মনে পড়ে দিবপ্রহরে নিরিবিলি ঘরে
কতদিন কাটিয়েছি ভালোবেসে কিছুটা সময়
পরস্পর, কী আমরা বলেছি তখন, ঘরময়
কেমন সৌরভ ছিলো মৃদু তোমার কি মনে পড়ে?
তোমার দু’চোখে দৃষ্টি মেলে দিয়ে কী স্নিগ্ধ নির্ঝরে
মিটিয়ে প্রখর তৃষ্ণা পুনরায় পেয়েছি অভয়
দুঃসময়ে; ভুলে গেছি কে অর্জুজ কেই বা সঞ্জয়
সর্বগত্রাসী দাবানলে, দিকচিহ্নলোপকারী ঝড়ে।ঝড়ের পরেও দেখি আমরা দুজন মুখোমুখি
বসে আছি, জীবনের বন্দনায় স্পন্দিত এবং
নিজেরাই হয়ে গেছি গান, বিভ্রান্তির কালো রঙ
মুছে গেছে সত্তা থেকে, মনে হয়। এখন দাঁড়াবো
সুস্থির জমিনে তুমি আর আমি হবো দীপ্র সুখী।
ফের ভাবি-কেন বেঁচে আছি, কেনই বা মরে যাবো? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-ki-mone-pore/
|
256
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
এ মোর অহংকার
|
প্রেমমূলক
|
নাই বা পেলাম আমার গলায় তোমার গলার হার,
তোমায় আমি ক'রব সৃজন- এ মোর অহংকার!
এমনি চোখের দৃষ্টি দিয়া
তোমায় যারা দেখলো প্রিয়া,
তাদের কাছে তুমি তুমিই। আমার স্বপনে
তুমি নিখিল-রূপের রাণী- মানস-আসনে!সবাই যখন তোমায় ঘিরে ক'রবে কলরব,
আমি দূরে ধেয়ান-লোকে র'চব তোমার স্তব।
র'চব সুরধুনী-তীরে
আমার সুরের উর্বশীরে,
নিখিল কন্ঠে দুলবে তুমি গানের কন্ঠ-হার-
কবির প্রিয়া অশ্রুমতী গভীর বেদনার!যেদিন আমি থাকবনা ক' থাকবে আমার গান,
ব'লবে সবাই, 'কে সে কবির কাঁদিয়েছিল প্রাণ?'
আকাশ ভরা হাজার তারা
রইবে চেয়ে তন্দ্রাহারা,
সখার সাথে জাগবে রাতে, চাইবে আকাশে
আমার গানে প'ড়বে মনে আমায় আভাসে!বুকের তলা ক'রবে ব্যথা, ব'লবে কাঁদিয়া,
'বন্ধু! সে কে তোমার গানের মানসী প্রিয়া?'
হাসবে সবাই, গাইবে গীতি,
তুমি নয়ন-জলে তিতি'
নতুন ক'রে আমার গানে আমার কবিতায়
গহীন নিরালাতে ব'সে খুঁজবে আপনায়!
রাখতে যেদিন নারবে ধরা তোমায় ধরিয়া
ওরা সবাই ভুলবে তোমায় দু'দিন স্মরিয়া,
আমার গানের অশ্রুজলে,
আমার বাণীর পদ্মদলে
দুলবে তুমি চিরন্তনী চির-নবীনা!
রইবে শুধু বাণী, সে-দিন রইবে না বীণা!নাই বা পেলাম কন্ঠে আমার তোমার কন্ঠহার,
তোমায় আমি ক'রব সৃজন এ মোর অহংকার!
এইত আমার চোখের জলে,
আমার গানের সুরের ছলে,
কাব্যে আমার, আমার ভাষায়, আমার বেদনায়,
নিত্যকালের প্রিয় আমায় ডাকছ ইশারায়!চাই না তোমায় স্বর্গে নিতে, চাই এ ধুলাতে
তোমার পায়ে স্বর্গ এনে ভুবন ভুলাতে!
ঊর্ধ্বে তোমার- তুমি দেবী,
চাই না দেবীর দয়া, যাচি প্রিয়ার আঁখিজল,
একটু দুখে অভিমানে নয়ন টলমল!যেমন ক'রে খেলতে তুমি কিশোর বয়শে-
মাটির মেয়ের দিতে বিয়ে মনের হরষে।
বালু দিয়ে গড়তে গেহ
জাগত বুকে মাটির স্নেহ,
ছিল না তো স্বর্গ তখন সূর্য তারা চাঁদ,
তেমনি ক'রে খেলবে আবার পাতবে মায়া-ফাঁদ!মাটির প্রদীপ জ্বালবে তুমি মাটির কুটীরে,
খুশীর রঙে ক'রবে সোনা ধূলি-মুঠিরে।
আধখানে চাঁদ আকাশ 'পরে
উঠবে যবে গরব-ভরে
তুমি বাকী-আধখানা চাঁদ হাসবে ধরাতে,
তড়িৎ প'ড়বে তোমার খোঁপায় জড়াতে!তুমি আমার বকুল যূথী- মাটির তারা-ফুল,
ঈদের প্রথম চাঁদ গো তোমার কানের পার্সি-দুল।
কুসুমী রাঙা শাড়িখানি
চৈতী-সাঁঝে প'রবে রাণী,
আকাশ-গাঙে জাগবে জোয়ার রঙের রাঙা বান,
তোরণ-দ্বারে নাজবে করুণ বারোয়াঁ মূলতান।আমার রচা গানে তোমায় সেই বেলা-শেষে
এমনি সুরে চাইবে কেহ পরদেশী এসে!
রঙীন সাঁঝে ঐ আঙিনায়
চাইবে যারা, তাদের চাওয়ায়
আমার চাওয়া রইবে গোপন!- এ মোর অভিমান,
যাচবে যারা তোমায়-রচি তাদের তরে গান!নাই বা দিলে ধরা আমার ধরার আঙিনায়,
তোমায় জিনে গেলাম সুরের স্বয়ম্বর-সভায়!
তোমার রূপে আমার বুবন
আলোয় আলোয় হ'ল মগন!
কাজ কি জেনে-কাহার আশায় গাঁথছ ফুল-হার,
আমি তোমার গাঁথছি মালা এ মোর অহংকার!
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/e-mor-ohongkar/
|
4486
|
শামসুর রাহমান
|
একটি বাগান
|
সনেট
|
নিশ্চয় তোমার মনে আছে একটি বাগান তুমি
আর আমি খুব গোপনীয়তায় সাজিয়েছিলাম
রঙ বেরঙের ফুলে। ইচ্ছে করে বাগানের নাম
রাখিনি আমরা, শুধু গড়েছি সুন্দর পুষ্পভূমি
পানি ঢেলে চারার শিকড়ে তুলে ফেলে পরগাছা
অগণিত। সে বাগানে নানা পাখি দ্বিধাহীন এসে
শুনিয়েছে গান আমাদের, কী মধুর সুর ভেসে
গেছে দূরে কোথাও, শিখেছি কাকে বলে তীব্র বাঁচা।অথচ বসন্তদিনে চলে গেলে তুমি অকস্মাৎ
কাটিয়ে সকল মায়া বাগানের। ঝরে যাচ্ছে ফুল
যত্নের অভাবে, ক্রমাগত বেড়ে ওঠে বুনো ঘাস,
আমি আর কত পারি একা একা? দিন যায়, রাত
আসে, তুমি আসো না এখানে ছিঁড়ে যায় মর্মমূল
এবং বাগানময় বয় শুধু প্রেতের নিশ্বাস। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-bagan/
|
5463
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
চৈত্রদিনের গান
|
মানবতাবাদী
|
চৈতীরাতের হঠাৎ হাওয়া
আমায় ডেকে বলে,
“বনানী আজ সজীব হ’ল
নতুন ফুলে ফলে৷
এখনও কি ঘুম-বিভোর?
পাতায় পাতায় জানায় দোল
বসন্তেরই হাওয়া৷
তোমার নবীন প্রাণে প্রাণে,
কে সে আলোর জোয়ার আনে?
নিরুদ্দেশের পানে আজি তোমার তরী বাওয়া;
তোমার প্রাণে দোল দিয়েছে বসন্তেরই হাওয়া৷
ওঠ্ রে আজি জাগরে জাগ
সন্ধ্যাকাশে উড়ায় ফাগ
ঘুমের দেশের সুপ্তহীনা মেয়ে৷
তোমার সোনার রথে চ’ড়ে
মুক্তি-পথের লাগাম ধ’রে
ভবিষ্যতের পানে চল আলোর গান গেয়ে৷
রক্তস্রোতে তোমার দিন,
চলেছে ভেসে সীমানাহীন৷
তারে তুমি মহান্ ক’রে তোল,
তোমার পিছে মৃত্যুমাখা দিনগুলি ভোল॥”‘চৈত্রদিনের গান’ কবিতাটি বিজনকুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ছোটদের ‘শিখা’ পত্রিকার জন্য রচিত৷ রচনাকাল আনুমানিক ১৯৪০৷
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/choitrodiner-gan/
|
1582
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চতুর্থ সন্তান
|
মানবতাবাদী
|
দুটি কিংবা তিনটি বাচ্চা, ব্যস!
সভ্যতার সায়ংকালীন এই স্লোগানের অর্থ বুঝে নিয়ে,
চতুর্থ সন্তান, তুমি ঘরের ভিতরে
দেওয়ালের দিকে মুখ রেখে
গুম হয়ে বসে আছ।
ক্রোধে, নাকি দুঃখে, নাকি অবজ্ঞায়?
আয়ত চক্ষুর মধ্যে কখনও বিদ্যুত-জ্বালা খেলে যায়,
কখনও মেঘের ছায়া নেমে আসে।
তোমার বিরুদ্ধে আজ জোটবদ্ধ সমস্ত সংসার,
তবুও চেয়েছ তুমি তাকে,
যে তোমাকে চায়।
কে তোমাকে চায়?
পথে-পথে নিষেধাজ্ঞা, দিকে দিকে নিরুদ্ধ দুয়ার।
অবাঞ্ছিত ফল,
অসতর্ক মুহূর্তের ভ্রান্তির ফসল,
চতুর্থ সন্তান, তুমি কার?
দুটি কিংবা তিনটি বাচ্চা, ব্যস!
অপমানে বিকৃত মুখের রেখা, সভ্যতার চতুর্থ সন্তান,
হঠাৎ কখন তুমি ঘর থেকে উন্মাদের মতো
রাজপথে
বেরিয়ে এসেছ,
বন্দুক তুলেছ ওই বিদ্রুপের দিকে
জনতা ও যানবাহন থেমে যায়, প্রতিষ্ঠানগুলি
আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে।
হয়তো বুঝেছে তারা,
আসন্ন দিনের যুদ্ধে তুমিই তাদের
সব থেকে ক্ষমাহীন প্রতিদ্বন্দ্বী;
হয়তো জেনেছে,
যে-পৃথিবী তোমাকে চায়নি,
তুমিও অক্লেশে তাকে ঘাড়ে ধরে জাহান্নমে ঠেলে দিতে পারো।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1589
|
2957
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির
|
ছড়া
|
ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির
পাঁচ বোন থাকে কাল্নায়,
শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়,
হাঁড়িগুলো রাখে আল্নায়।
কোনো দোষ পাছে ধরে নিন্দুকে
নিজে থাকে তারা লোহাসিন্দুকে,
টাকাকড়িগুলো হাওয়া খাবে ব’লে
রেখে দেয় খোলা জাল্নায়–
নুন দিয়ে তারা ছাঁচিপান সাজে,
চুন দেয় তারা ডাল্নায়। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khantoburir-didishashurir/
|
925
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আজ তারা কই সব
|
সনেট
|
আজ তারা কই সব? ওখানে হিজল গাছ ছিল এক — পুকুরের জলে
বহুদিন মুখ দেখে গেছে তার; তারপর কি যে তার মনে হল কবে
কখন সে ঝরে গেল, কখন ফুরাল, আহা, — চলে গেল কবে যে নীরবে,
তাও আর জানি নাকো; ঠোট ভাঙা দাঁড়কাক ঐ বেলগাছটির তলে
রোজ ভোরে দেখা দিত — অন্য সব কাক আর শালিখের হৃষ্ট কোলাহলে
তারে আর দেখি নাকো — কতদিন দেখি নাই; সে আমার ছেলেবেলা হবে,
জানালার কাছে এক বোলতার চাক ছিল — হৃদয়ের গভীর উৎসবে
খেলা করে গেছে তারা কত দিন — ফড়িঙ কীটের দিন যত দিন চলেতাহারা নিকটে ছিলো — রোদের আনন্দে মেতে — অন্ধকারে শান্ত ঘুম খুঁজে
বহুদিন কাছে ছিলো; — অনেক কুকুর আজ পথে ঘাটে নড়াচড়া করে
তবুও আঁধারে ঢের মৃত কুকুরের মুখ — মৃত বিড়ালের ছায়া ভাসে;
কোথায় গিয়েছে তারা? ওই দূর আকাশেল নীল লাল তারার ভিতরে
অথবা মাটির বুকে মাটি হয়ে আছে শুধু — ঘাস হয়ে আছে শুধু ঘাসে?
শুধালাম — উত্তর দিল না কেউ উদাসীন অসীম আকাশে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/aaj-tara-koi-shob/
|
5368
|
শেখ ফজলুল করিম
|
এপিটাফ
|
চিন্তামূলক
|
আর্দ্র মহীতলে হেথা চির নিদ্রাগত
ব্যথাতুর দীন কবি, অফুরন্ত সাধ
ভুলে যাও একটি তার জনমের মতো
হয়তো সে করিয়াছে শত অপরাধ
পান্থপদ রেণুপুত এ শেষ ভবন
হতে পারে তার ভাগ্যে সুখের নন্দন।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4341.html
|
2509
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
বাংলা শায়েরী - ৪৪
|
প্রেমমূলক
|
জুলুম তোমার সয়েই গেছে তাইতো আজো যায়নি প্রাণ
বেশ তো আছি হয়ে তোমার জুলুমবাজীর গুলিস্তান ।
প্রতিবারের জুলুম থেকেই বুঝতে পারি যাওনি ছেড়ে
তাইতো হেসেই গ্রহণ করি বুকটা ভরে তোমার দান ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/bangla-shayeri-44/
|
5025
|
শামসুর রাহমান
|
বিচ্ছেদ বিষয়ক
|
সনেট
|
এক শহরেই থাকি আমরা দু’জন, গৌরী আর
আমি, কিন্তু কেউ কারো সঙ্গে দেখা করতে পারি না
আজকাল; এ কেমন কাল এলো? লুট, হত্যা বিনা
যায় না একটি দিনও। জালিমের কর্কশ হুঙ্কার
ত্রাস সৃষ্টি করে চতুর্দিকে, কোনোদিকে বেরুবার
তেমন সুবিধে নেই। সরকার শ্বাপদ হলে, কেউ
নিলে কিছু, সন্ত্রাসীর বাড়লে দাপট, তবে কেউ
নিরাপদ নয় প্রেমও হয় মুখোমুখি হায়নার।এখন গৌরীর মুখ দেখি কল্পনায়, বয়ে চলি
প্রতিদিন বিচ্ছেদের ভার; গৌরী আর রাজপথে
লেগে-থাকা রক্তচিহ্ন স্পষ্ট পাশাপাশি, অন্ধ গলি
মনে হয় এ জীবন। একা-একা মানস-সৈকতে
হাঁটি, শুই; ভাবি, এ বিচ্ছেদ এমন দুঃসহ এই
মুহূর্তে মৃত্যুতে চির বিচ্ছেদের যন্ত্রণাই নেই। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bicched-bishoyok/
|
5321
|
শামসুর রাহমান
|
স্বপ্নের ভিতরে বাল্যশিক্ষা ওড়ে
|
চিন্তামূলক
|
স্বপ্নের ভিতরে বাল্যশিক্ষা ওড়ে নিশ্চিত সহজে জ্যোৎস্নাধোয়া
পাখির মতোন, মাল্য বিভূষিত তোরণের কাছে উড়ে যায়।
বাল্যশিক্ষা, যতদূর জানি, কখনো বিলাসী নয়, পরে না সে
আংটি, মণিহার, সিল্কের দস্তানা কোনো, বটের পাতার মতো
রূপে থাকে এককোণে, মাঝে-মাঝে পাঠশালা পাঠশালা বলে
সুদূরের গান গেয়ে ওঠে ভোরে কিংবা মধ্যরাতে অকস্মাৎ।দেখেছি তদন্ত করে প্রতিদিন মনুমেন্টে মায়াবী অক্ষর ঝরে যায়,
ভিখিরীর পাত্রে, উদাসীন পথিকের চাদরের খুঁটে লেগে থাকে কিছু,
স্বপ্নস্মৃতি। ছেলেবেলা পেয়ারা গাছের পাতা, হলদে কোঠাবাড়ি
সমেত এখানে শীর্ণ নদীর এপারে এসে করে কানাকানি।নিঃশব্দ আড়ালে দ্যাখে বাল্যশিক্ষা তামাটে বিকেলে একজন
মুঠোয় নৈরাশ নিয়ে বসে আছে, কেউ মত্ততায় হেসে ওঠে
গভীর অরণ্যচারী কাপালি-প্রায়। শহরে হাতির পাল
ক্ষিপ্র ছোটে দিগ্ধিদিক, কেউবা কুড়ায় মুদ্রা কিছু
ডিগবাজী খেয়ে চোরাস্তায়। গ্রাম্যবধূ ফুটপাতে থতমত,
স্বপ্নের ভিতরে বাল্যশিক্ষা ওড়ে, মেঘে নীল সামিয়ানা। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/swapner-vitore-balyoshikkha-ore/
|
3776
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যা রাখি আমার তরে
|
চিন্তামূলক
|
যা রাখি আমার তরে
মিছে তারে রাখি,
আমিও রব না যবে
সেও হবে ফাঁকি।
যা রাখি সবার তরে
সেই শুধু রবে—
মোর সাথে ডোবে না সে,
রাখে তারে সবে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ja-rakhi-amar-tore/
|
4836
|
শামসুর রাহমান
|
দীর্ঘ আয়নায় নিজের ছায়া
|
চিন্তামূলক
|
দীর্ঘ আয়নায় নিজের ছায়া ঠোঁট নেড়ে স্তিমিত কণ্ঠস্বরে
প্রশ্ন করে, ‘বলতে কি পারো কে তুমি? ভড়কে গিয়ে ছায়াকে ছুঁই,
জানতে চাই কেন সে এমন সওয়াল করেছে ব্যাকুলতায় এই
গোধূলিবেলায়। ছায়া তাকায় আমার দিকে, কিছুক্ষণ থেমে
বলে, ‘আমি নিজেই জানি না কেন এই অবেলায় এমন প্রশ্ন ছুড়ে
দিয়েছি তোমার দিকে। তোমার মনের গভীরে কখনও কি
উঁকি দেয়নি এমন সওয়াল?’ মাথার সব কোণা হাতড়ে যাচাই
করি, কখনও ব্যাপারটি আমাকে প্রশ্নাতুর করেছে কি না। আবছা
কিছু মনে পড়ে, অথচ মুহূর্তেই গাঢ় কালো মেঘমালা দিয়েছে
ঢেকে অস্পষ্ট কথাকে। আয়নার ছায়া থেকে দূরে সরে গিয়ে
বসি পাশের ঘরে, যেখানে আমার তিনটি বুক-শেলফ্-ভরা নানা
বই রয়েছে হাতের স্পর্শের নীরব, ব্যাকুল প্রতীক্ষায়। আমার প্রিয় এই ঘরে
লেখার টেবিল, টেলিফোন সেট, কয়েকটি পুরোনো, নতুন
কলম, কছু সাদা কাগজের প্যাড, একটি টেবিলল্যাম্প, টেবিলের
শরীর-ঘেঁরা পুরোনো চেয়ার, অদূরে স্থিত খাট, মনে হয়,
অনুরক্ত, মায়াময় দ্যাখে।
কতকাল নিজের সঙ্গে বসবাস করছি, অথচ আজ অব্দি নিজের
প্রকৃত সত্তা অচেনা রয়ে গেল। বই পড়ি, টেবিলে ঝুঁকে লিখি, কখনও
দিনে, সর্বদা রাতে বিছানায় শুয়ে স্মৃতির জাল ফেলি, অচমকা
গুটিয়ে নিই, নিদ্রার কুয়াশায় হারাই। কখনও কখনও জেগে উঠে
অন্ধকারে চোখ মেলে তাকাই জীবনসঙ্গিনী, দেয়াল, দরজা জানালা,
বুক শেল্ফ-এর দিকে। ঘরের তিমির প্রশ্ন করে আমাকে, ‘কে তুমি?
বলতে পারো প্রকৃত কে তুমি? অস্থিরতায় বিছানায় এ-পাশ
ও-পাশ করি। দম বন্ধ হয়ে আসে যেন, হঠাৎ উঠে বসি, পাথুরে
অন্ধকার আমাকে গিলে খেতে চায়। বাতি জ্বেলে তাকাই চৌদিকে,
কিঞ্চিৎ স্বস্তি পাই, তবু প্রশ্ন জাগে, ‘কে আমি? আমার গন্তব্য
কোথায়? কে আমাকে বলে দেবে?’ ঘরের আলো নিভে গেছে যেন,
হাহাকারময় অন্ধকার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে করে উচ্চারণ,
‘কোথায় যেতে চাও? বস্তুত চির-তিমির ছাড়া কোথাও যাওয়ার নেই।‘ (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dirgho-ainai-nijer-chaya/
|
4137
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
দেয়াল
|
প্রেমমূলক
|
আমার শব্দ ঐখানে পৌছেনা
আমার ছায়া নদীতে পরেনা
ঐখানে বলতে কোথায় বুঝাচ্ছি
তা আমি নিজেও জানিনা !
আমি জানিনা তুমি
কোথায় থাক
আমি জানিনা তোমার ছায়া
কোন নদীতে পড়ে
আমি জানিনা কেন তুমি আজ স্তব্দ !
কেন তোমার কথা আমি শুনিনা
কেন তোমার ছায়া আমি দেখিনা
আমি বারবার কত চেষ্টা করি
শুধুমাত্র একটি বার কথা বলার জন্য
কিন্তু সবই নিয়তির খেলা
জানিনা জীবনে কোন দিন সে ভাগ্য
আমার হবে কিনা ।
আমার মুখের কোন শব্দই কি তোমার
কানে পৌছবে না
আমার হৃদয়ের যত দুঃখ গাথা
তোমার হৃদয়টাকে কি এতটুকু ও
নাড়াচাড়া দেয় না ?
এটাই কি মানবতা ?
এটাই কি ভালবাসা ?
আজ আমি ভালবাসার সংজ্ঞা ভুলে গেছি
আজ আমি সেই পরিচিত ডাকটাও ভুলে গেছি
কারন ভালবাসা কি জিনিস বা কাকে বলে
তা আর খুজে পাচ্ছিনা
হয়তবা কালের গর্ভে
ভালবাসার সঠিক সংজ্ঞাটি হারিয়ে গেছে।
যে ডাকে আমি তোমাকে ডাকতাম
যে নামে তুমি আমার ডাকে সাড়া দিতে
সে ডাক ও সাড়া দেওয়া ভাষাটি আজ
আমার হৃদয়টাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে
কারন যখন আমি মনে মনে ডাকি
আর উত্তরে সেই শব্দটি অনুভব করি।
তখন আমার হৃদয়টা ফেটে চুরমার হয়ে যায়
আমি ডাকতে চাই, কিন্তু কাকে ডাকব?
চোখের সামনে তো আর কাউকে দেখিনা
আর ডাকলেই বা কি হবে?
কে দিবে আমার সেই ডাকের উত্তর ?
কেউ নেই, আজ কেউ নেই
আমার মায়াভরা ডাকটি শুনার মত।
শুধু চারিদিকে অন্ধকার আর অন্ধকার
আর তার মাঝে একটি দেয়াল
যে দেয়ালটি আজ আমার থেকে তোমাকে
বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে ।
যার কারনেই আমার হৃদয়ের ডাক
তোমার হৃদয়ে পৌছানা
জানিনা এ দেয়াল কি ভাঙ্গা সম্ভব?
হ্যা সম্ভব তবে দেয়াল ভাঙ্গার জন্য
শুধু একটি জিনিস প্রয়োজন
সেটি কোন টাকা পয়সা বা হীরার টুকরো নয়।
যা ভাঙ্গতে তোমাকে কোন্য রাজ্য ও হারাতে হবে না।
দেশের সংবিধান ও পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই
শুধু একটি জিনিস দরকার
যা অনেক সহজ আবার অনেক কঠিন
আজ আমি সেই জিনিসটির নাম
না বলে পারছিনা
কারন যারা এখন আমার কবিতাটি পড়েছে
তারা সেই জিনিসটির নাম শুনতে
অধির আগ্রহে বসে আছে
তাই আমি বলে দিচ্ছি
দুনিয়াতে বিবেক বলে একটি কথা আছে
আর সেই বিবেক টির কারনেই
আজ আমি তোমার হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন
একটু ভেবে দেখ, নিজের কাছে প্রশ্ন করে দেখ
আসলে কি আমি ঠিক বলছি
না মিথ্যে বলছি
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তুমি উত্তর পেয়ে যাবে।
আর সেই সত্য মিথ্যা বের করার জন্যেও
প্রয়োজন একটি বিবেক।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত হল
মানুষের বিবেক
আর সেই আদালতে যদি তুমি নিজেই
নিজের বিচার কর তাহলেই ভেঙ্গে যেতে পারে
সেই দেয়ালটি
যে দেয়ালটি আজ দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে
আমি আর পারছিনা
প্রতিটি মুহুর্তই যে এক এক কোটি বছরের মত লাগে
কিভাবে আমি পাড় করব বাকিটা জীবন?
যে জীবন ভীষণ দুঃখময়
যে জীবন মরুভূমির মত
রোদ্রের তাপে আজ দাউ দাউ করে পুড়ছে
জানি আমার একথা গুলো তোমার কানে পৌছাচ্ছেনা
তারপরও যদি তুমি কখনও
সামান্য একটুকু সময় পাও
তোমার বিবেকের কাছে প্রশ্ন কর?
আমাকে এই আবদ্ধ পৃথিবী থেকে মুক্ত কর
আমি পাথরের ঘরে এখন আর
নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।
মৃত্যুই আমাকে বার বার তাড়া করে ফিরছে
হয়তোবা কোন দিন আমি মৃত্যুকে আপন করে নিব
তোমাকেই রেখে যাব এই স্বর্গ রাজ্যে
স্বাধীনভাবে চলার জন্য
চোখ খুলে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে
যেখানে তোমাকে সেই পরিচিত ডাকটি
আর শুনতে হবেনা
তোমার চারিদিক তোমাকে মুক্ত করে দিব
তোমাকে আর কেই বাধা দিবেনা
তুমি থাকবে আবার সেই স্বাধীনরাজ্যে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2208.html
|
4965
|
শামসুর রাহমান
|
প্রার্থনা
|
প্রেমমূলক
|
ফুলকে সুন্দর বলা হয়, পাখিকেও, নক্ষত্রের
নদীর রূপের খ্যাতি আছে যার পর্বতমালার
সৌন্দর্য কীর্তিত বিশ্বময়। তুমি বস্তুজগতের
অন্তর্গত, প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশিনী, কিন্তু
তোমার এবং তার সুষমায় পার্থক্য অনেক।
তোমাকে সুন্দরী বলা চলে, অন্তত আমি তো
তাই বলি; চোখ মুখ, চুল গ্রীবা অথবা চিবুক
-সবকিছু যেন সমন্বিত ইন্দ্রজাল বাস্তবিক।অথচ যখন তুমি বয়সের ভারে হবে নত,
পরিত্যক্ত ভাঙা হাটে, হবে লুপ্ত ইন্দ্রজাল, হায়,
মসৃণ পেলব ত্বকে অদৃশ্য লাঙল যাবে রেখে
শুকনো গাঢ় রেখাবলী। অতএব, হে নিরুপমা, আজ
জানাই প্রার্থনা, লোভাতুর কাফ্রি-মৃত্যু অন্ধকারে
এক্ষুণি তোমাকে নিয়ে যাক লুটে প্রেমিকের সাজে। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prarthona/
|
2780
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
উচ্চের প্রয়োজন
|
নীতিমূলক
|
কহিল মনের খেদে মাঠ সমতল,
হাট ভ’রে দিই আমি কত শস্য ফল।
পর্বত দাঁড়ায়ে রন কী জানি কী কাজ,
পাষাণের সিংহাসনে তিনি মহারাজ।
বিধাতার অবিচার, কেন উঁচুনিচু
সে কথা বুঝিতে আমি নাহি পারি কিছু।
গিরি কহে, সব হলে সমভূমি-পারা
নামিত কি ঝরনার সুমঙ্গলধারা? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/uccher-proyojon/
|
540
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সুরা কাওসার
|
ভক্তিমূলক
|
শুরু করিলাম পূত নামেতে খোদার
কৃপা করুণার যিনি অসীম পাথার।অনন্ত কল্যাণ তোমা' দিয়াছি নিশ্চয়,
অতএব তব প্রতিপালক যে হয়
নামায পড় ও দাও কোরবাণী তাঁরেই,
বিদ্বেষ তোমারে যে, অপুত্রক সে-ই।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sura-kawsar/
|
2746
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আরম্ভ ও শেষ
|
নীতিমূলক
|
শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে,
হে আরম্ভ, বৃথা তব অহংকার তবে।
আরম্ভ কহিল ভাই, যেথা শেষ হয়
সেইখানে পুনরায় আরম্ভ-উদয়। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aromvo-o-shesh/
|
5452
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
কাশ্মীর
|
মানবতাবাদী
|
সেই বিশ্রী দম-আটকানো কুয়াশা আর নেই
নেই সেই একটানা তুষার-বৃষ্টি,
হঠাৎ জেগে উঠেছে-
সূর্যের ছোঁয়ায় চমকে উঠেছে ভূস্বর্গ।
দুহাতে তুষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে
মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে,
ডেকেছে রৌদ্রকে,
ডেকেছে তুষার-উড়িয়ে-নেওয়া বৈশাখী ঝড়কে,
পৃথিবীর নন্দন-কানন কাশ্মীর।
কাশ্মীরের সুন্দর মুখ কঠোর হল
প্রচণ্ড সূর্যের উত্তাপে।
গলে গলে পড়ছে বরফ-
ঝরে ঝরে পড়ছে জীবনের স্পন্দনঃ
শ্যামল আর সমতল মাটির
স্পর্শ লেগেছে ওর মুখে,
দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছে ওর চুলঃ
আন্দোলিত শাল, পাইন আর দেবদারুর বনে
ঝড়ের পক্ষে আজ সুস্পষ্ট সম্মতি।
কাশ্মীর আজ আর জমাট-বাঁধা বরফ নয়ঃ
সূর্য-করোত্তাপে জাগা কঠোর গ্রীষ্মে
হাজার হাজার চঞ্চল স্রোত।
তাই আজ কাল-বৈশাখীর পতাকা উড়ছে
ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায়;
দুলে দুলে উঠছে
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুমন্ত, নিস্তব্ধ
বিরাট ব্যাপ্ত হিমালয়ের বুক।।
২
দম-আটকানো কুয়াশা তো আর নেই
নেই আর সেই বিশ্রী তুষার-বৃষ্টি,
সূর্য ছুঁয়েছে 'ভূস্বর্গ চঞ্চল'
সহসা জেগেই চমকে উঠেছে দৃষ্টি।
দুহাতে তুষার-পর্দা সরিয়ে ফেলে
হঠাৎ হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে
রোদকে ডেকেছে নন্দনবন পৃথিবীর
বৈশাখী ঝড় দিয়েছে বরফ গুঁড়িয়ে।
সুন্দর মুখ কঠোর করেছে কাশ্মীর
তীক্ষ্ণ চাহনি সূর্যের উত্তাপে,
গলিত বরফে জীবনের স্পন্দন
শ্যামল মাটির স্পর্শে ও আজ কাঁপে।
সাগর-বাতাসে উড়ছে আজ ওর চুল
শাল দেবদারু পাইনের বনে ক্ষোভ,
ঝড়ের পক্ষে চূড়ান্ত সম্মতি-
কাশ্মীর নয়, জমাট বাঁধা বরফ।
কঠোর গ্রীষ্মে সূর্যোত্তাপে জাগা-
কাশ্মীর আজ চঞ্চল-স্রোত লক্ষঃ
দিগ্দিগন্তে ছুটে ছুটে চলে দুর্বার
দুঃসহ ক্রোধে ফুলে ওঠে বক্ষ।
ক্ষুব্ধ হাওয়ায় উদ্দাম উঁচু কাশ্মীর
কালবোশেখীর পতাকা উড়ছে নভে,
দুলে দুলে ওঠে ঘুমন্ত হিমালয়
বহু যুগ পরে বুঝি জাগ্রত হবে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/262
|
5538
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
শত্রু এক
|
স্বদেশমূলক
|
এদেশ বিপন্ন আজ; জানি আজ নিরন্ন জীবন-
মৃত্যুরা প্রত্যহ সঙ্গী, নিয়ত শত্রুর আক্রমণ
রক্তের আল্পনা আঁকে, কানে বাজে আর্তনাদ সুর;
তবুও সুদৃঢ় আমি, আমি এক ক্ষুধিত মজুর
আমার সম্মুখে আজ এক শত্রুঃ এক লাল পথ,
শত্রুর আঘাত আর বুভুক্ষায় উদ্দীপ্ত শপথ।
কঠিন প্রতিজ্ঞা-স্তব্ধ আমাদের দৃপ্ত কারখানায়,
প্রত্যেক নির্বাক যন্ত্র প্রতিরোধ সংকল্প জানায়।
আমার হাতের স্পর্শে প্রতিদিন যন্ত্রের গর্জন
স্মরণ করায় পণ; অবসাদ দিই বিসর্জন।
বিক্ষুব্ধ যন্ত্রের বুকে প্রতিদিন যে যুদ্ধ ঘোষণা,
সে যুদ্ধ আমার যুদ্ধ, তারই পথে স্তব্ধ দিন গোনা।
অদূর দিগন্ত আসে ক্ষিপ্র দিন, জয়োন্মত্ত পাখা-
আমার দৃষ্টিতে লাল প্রতিবিম্ব মুক্তির পতাকা।
আমার বেগান্ধ হাত, অবিরাম যন্ত্রের প্রসব
প্রচুর প্রচুর সৃস্টি, শেষ বজ্র সৃষ্টির উৎসব।।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/post20160509035412/
|
1146
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মনে হয় একদিন
|
সনেট
|
মনে হয় একদিন আকাশে শুকতারা দেখিব না আর ;
দেখিব না হেলেঞ্চার ঝোপ থেকে একঝাড় জোনাকি কখন
নিভে যায় – দেখিব না আর আমি এই পরিচিত বাঁশবন ,
শুঁকনো বাঁশের পাতা -ছাওয়া মাটি হয়ে যাবে গভীর আঁধার
আমার চোখের কাছে – লক্ষ্মীপূর্ণিমার রাতে সে কবে আবার
পেঁচা ডাকে জোছনায় – হিজলের বাকা ডাল করে গুঞ্জরন ;
সারা রাত কিশোরীর লাল পাড় চাঁদে ভাসে – হাতের কাঁকন
বেজে ওঠে : বুঝিব না – গঙ্গাজল ,নারকোলনাড়ুগুলো তারজানি না সে কারে দেবে – জানি না সে চিনি আর সাদা তালশাঁস
হাতে লয়ে পলাশের দিকে চেয়ে দুয়ারে দাড়ায়ে রবে কি না …
আবার কাহার সাথে ভালবাসা হবে তার – আমি তা জানি না;
মৃত্যুরে কে মনে রাখে ?… কীর্তিনাশা খুঁড়ে খুঁড়ে চলে বারো মাস
নতুন ডাঙার দিকে – পিছনের অবিরল মৃত চর বিনা
দিন তার কেটে যায় – শুকতারা নিভে গেলে কাঁদে কি আকাশ ??
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/02/21/%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6-%e0%a6%a6/
|
5128
|
শামসুর রাহমান
|
মেঘ থেকে মেঘান্তরে
|
রূপক
|
প’ড়ে যাচ্ছি, প’ড়ে যাচ্ছি, দ্রুত
প’ড়ে যাচ্ছি। প’ড়ে যেতে-যেতে
ভাবছি কেন যে অকস্মাৎ এ-পতন
আমার? করেছি কোন গূঢ় অপরাধ?কিছুক্ষণ পর দেখি ঝুলছি গাছের
ডালে আর শরীর আমার বড় বেশি
কাঁটাবিদ্ধ। ঝুলতে ঝুলতে ডালে প্রায়
অজ্ঞান হওয়ার পথে কাতরাতে থাকি।বড় বেশি জনহীন অন্ধকার পথে
প’ড়ে গিয়ে চিৎকার করার চেষ্টায়, মনে নেই
কী হ’ল আমার। বেশ কিছুক্ষণ পর
দেখি এক জীব দ্রুত চাটছে আমার আর্ত্মুখ।কিছুক্ষণ পর বহু কষ্টে মুখ পশুর লোভের
গর্ত থেকে ফেরিয়ে সহজ,
বিশুদ্ধ পথের দিকে নিয়ে আসি। ফলে
দুর্গন্ধের জিহ্বার সান্নিধ্য থেকে মুক্তি পাওয়া গেল।একটি সফেদ ঢের রূপময় পাখি, ডানা যার
ঢেকে ফ্যালে উৎসুক যাত্রীকে, অকস্মাৎ
আমাকে আরোহীরূপে নিয়ে ওড়ে মেঘ থেকে
মেঘান্তরে, আমি তার প্রসাদের দান করি সানন্দে গ্রহণ। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/megh-theke-meghantore/
|
4469
|
শামসুর রাহমান
|
একটি আশ্চর্য মুখ
|
সনেট
|
একটি আশ্চর্য মুখ দেখি আমি স্বপ্নের প্রহরে
মাঝে-মাঝে; সেই একই মুখ নীল সমুদ্রের পানি
থেকে জেগে ওঠে, সিক্ত ওষ্ঠে তার গূঢ় ঝলকানি
হাসির, কখনো দেখি সে রয়েছে ঘুমের ভেতরে
পথপার্শ্বে একাকিনী কোনো এক প্রাচীন শহরে।
অজ্ঞাত শিল্পীর ক্ষিপ্র ছেনী তাকে রহস্যের রানী
রূপে কবে করেছে নির্মাণ; চোখে কী গভীর বাণী
নিয়ে চেয়ে থাকে শুধু নিষ্পলক নিস্পন্দ পাথরে!আশ্চর্য সে-মুখ বুঝি কেউ খৃষ্টপূর্ব জগতের।
ঘুম ভেঙে গেলে ভাবি তারই কথা, ছন্দিত পাথুরে
তার অবয়ব বারবার ভেসে ওঠে দৃষ্টিপথে।
পুনরায় নীল সমুদ্রের ঢেউ তাকে দেবে ছুঁড়ে
আমায় সত্তার তটে? মনে হয়, স্বপ্নের জগতে
দেখা সেই মুখ যেন প্রতিচ্ছায়া তোমারই মুখের। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-ashcorjo-mukh/
|
668
|
জয় গোস্বামী
|
জানি যে আমাকে তুমি
|
প্রেমমূলক
|
জানি যে আমাকে তুমি ঘৃণা করো, মেয়েদের ঘৃণা
যেখানে যেখানে পড়ে সে জায়গাটা কালো হয়ে যায়
নতুন অঙ্কুর উঠে দাঁড়াতে পারে না সোজা হয়ে
তোমার ঘেন্নার ভয়ে পালাতে পালাতে আমি এই
দিগন্তে শুয়েছি, সামনে সভ্যতা পর্যন্ত পড়ে থাকা
যতটা শরীর, তার কোথাও এক কণা শস্য নেই
শুধু কালো কালো দাগ পোড়া শক্ত ঝামা গুঁড়োমাটি
তাও তুমি আকাশপথে জলপথে বৃষ্টিপথে এসে
মুখে যে নিঃশ্বাস ফেলছ, না তাতে আবেশ, যৌনজ্বর
নেই, শান্ত ঘুম নেই—সে নিঃশ্বাসে কিছু নেই আর
তার শুধু ক্ষমতা আছে প্রেমিককে বন্ধ্যা করবার!
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/jani-ze-amake-tumi/
|
3020
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ঘাসি কামারের বাড়ি
|
হাস্যরসাত্মক
|
ঘাসি কামারের বাড়ি সাঁড়া,
গড়েছে মন্ত্রপড়া খাঁড়া।
খাপ থেকে বেরিয়ে সে
উঠেছে অট্টহেসে;
কামার পালায় যত
বলে, “দাঁড়া দাঁড়া।’
দিনরাত দেয় তার
নাড়ীটাতে নাড়া। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/fhasi-kamarer-bari/
|
358
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
নদীপারের মেয়ে
|
প্রেমমূলক
|
নদীপারের মেয়ে!
ভাসাই আমার গানের কমল তোমার পানে চেয়ে।
আলতা-রাঙা পা দুখানি ছুপিয়ে নদী-জলে
ঘাটে বসে চেয়ে আছ আঁধার অস্তাচলে।
নিরুদ্দেশে ভাসিয়ে-দেওয়া আমার কমলখানি
ছোঁয় কি গিয়ে নিত্য সাঁঝে তোমার চরণ, রানি?
নদীপারের মেয়ে!
গানের গাঙে খুঁজি তোমায় সুরের তরি বেয়ে।
খোঁপায় গুঁজে কনক-চাঁপা, গলায় টগর-মালা,
হেনার গুছি হাতে বেড়াও নদীকূলে বালা।
শুনতে কি পাও আমার তরির তোমায়-চাওয়া গীতি?
ম্লান হয়ে কি যায় ও-চোখে চতুর্দশীর তিথি?
নদীপারের মেয়ে!
আমার ব্যথার মালঞ্চে ফুল ফোটে তোমায়-চেয়ে।
শীতল নীরে নেয়ে ভোরে ফুলের সাজি হাতে,
রাঙা উষার রাঙা সতিন দাঁড়ায় আঙিনাতে।
তোমার মদির শ্বাসে কি মোর গুলের সুবাস মেশে?
আমার বনের কুসুম তুলি পর কি আর কেশে?
নদীপারের মেয়ে!
আমার কমল অভিমানের কাঁটায় আছে ছেয়ে!
তোমার সখায় পূজ কি মোর গানের কমল তুলি?
তুলতে সে-ফুল মৃণাল-কাঁটায় বেঁধে কি অঙ্গুলি?
ফুলের বুকে দোলে কাঁটার অভিমানের মালা,
আমার কাঁটার ঘায়ে বোঝ আমার বুকের জ্বালা? (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/nodiparer-meye/
|
5064
|
শামসুর রাহমান
|
ভালোবাসা
|
প্রেমমূলক
|
‘ভালোবাসি’, এই কথাটি বলতে গিয়ে
কণ্ঠে লাগে সংকোচের ফাঁসি?
এমনতো নয়, ভালোবাসা এবার প্রথম
হৃদয় জুড়ে হলো পুষ্পরাশি।
ইতোমধ্যে তোমার আগে বহুজনই
আমার কাছে শুনেছে এই বাঁশি।
একে আমার অপরাধের কালো ভেবে
করুক লোকে নিত্য হাসাহাসি,
তুমি ঘৃণায় ও-মুখ তোমার সরাও যদি,
বলবো তবু বলবো ‘ভালোবাসি। (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/valobasha/
|
2832
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
এবার নীরব করে দাও হে তোমার
|
ভক্তিমূলক
|
এবার নীরব করে দাও হে তোমার
মুখর কবিরে।
তার হৃদয়-বাঁশি আপনি কেড়ে
বাজাও গভীরে।
নিশীথরাতের নিবিড় সুরে
বাঁশিতে তান দাও হে পুরে
যে তান দিয়ে অবাক কর’
গ্রহশশীরে।যা-কিছু মোর ছড়িয়ে আছে
জীবন-মরণে,
গানের টানে মিলুক এসে
তোমার চরণে।
বহুদিনের বাক্যরাশি
এক নিমেষে যাবে ভাসি,
একলা বসে শুনব বাঁশি
অকূল তিমিরে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/517.html
|
2784
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
উদারচরিতানাম্
|
নীতিমূলক
|
প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন
ফুটিয়াছে ছোটো ফুল অতিশয় দীন।
ধিক্ ধিক্ করে তারে কাননে সবাই—
সূর্য উঠি বলে তারে, ভালো আছ ভাই? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/udarchoritnam/
|
1354
|
তসলিমা নাসরিন
|
ব্যক্তিগত ব্যাপার
|
প্রেমমূলক
|
ভুলে গেছো যাও,
এরকম ভুলে যে কেউ যেতে পারে,
এমন কোনও অসম্ভব কীর্তি তুমি করোনি,
ফিরে আর তাকিও না আমার দিকে, আমার শূন্যতার দিকে।
আমি যেভাবেই আছি, যেভাবেই থাকি এ আমার জীবন, তুমি এই
জীবনের দিকে আর করুণ করুণ চোখে তাকিয়ে না কোনওদিন।
ভুলে গেছো যাও,
বিনিময়ে আমি যদি ভুলে না যাই তোমাকে, যেতে না পারি
সে আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তুমি এই ব্যাপারটি নিয়ে ঘেঁটো না,
এ আমার জীবন, কার জন্য কাঁদি, কাকে গোপনে ভালোবাসি
জানতে চেও না।
ভুলে গেলে তো এই হয়, ছেড়ে চলে গেলে তো এই-ই হয় — যার যার জীবনের মতো
যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপারও যার যার হয়ে ওঠে।
তুমি তো জানোই সব, জেনেও কেন বলো যে মাঝে মাঝে যেন
খবর টবর দিই কেমন আছি!
আমার কেমন থাকায় তোমার কীই বা যায় আসে!
যদি খবর দিই যে ভালো নেই, যদি বলি তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে,
যদি বলি তোমার জন্য আমার মন কেমন করছে,
শরীর কেমন করছে!
তুমি তো আর ছুটে আসবে না আমাকে ভালোবাসতে!
তবে কী লাভ জানিয়ে, কী লাভ জানিয়ে যে আমি অবশেষে সন্ন্যাসী হলাম!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2002
|
5132
|
শামসুর রাহমান
|
মেষতন্ত্র
|
মানবতাবাদী
|
মেষরে মেষ তুই আছিস বেশ,
মনে চিন্তার নেইকো লেশ।ডানে বললে ঘুরিস ডানে,
বামে বললে বামে।
হাবে ভাবে পৌঁছে যাবি
সোজা মোক্ষধামে।
চলায় ঢিমে তালের রেশ,
মেষরে মেষ তুই আছিস বেশ।যাদের কথায় জগৎ আলো
বোবা আজকে তারা,
মুখে তুবড়ি ছোটে যাদের
আকাট মূর্খ যারা।দিনদুপুরে ডাকাত পড়ে
পাড়ায় রাহাজানি,
দশের দশায় ধেড়ে কুমির
ফেলছে চোখের পানি।
পৃথিবীটা ঘুরছে ঘুরুক
মানুষ উড়ুক চাঁদে,
ফাটায় বোমা সাগর তলায়
পড়ছে পড়ুক ফাঁদে।
তোর তাতে কি? খড়বিচুলি
পেলেই পোয়াবারো।
জাবর কেটে দিন চলে যায়,
পশম বাড়ুক আরও।জগৎ জোড়া দেখিস ঐ
সবুজ চিকন ঘাসের দেশ।
মেষরে মেষ তুই আছিস বেশ! (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/meshtontro/
|
471
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
যদি আর বাঁশী না বাজে
|
মানবতাবাদী
|
বন্ধুগণ, আপনারা যে সওগাত আজ হাতে তুলে দিলেন,
আমি তা মাথায় তুলে নিলুম। আমার সকল তনু-মন-প্রান আজ বীণার মত বেজে উঠেছে।
তাতে শুধু একটি মাত্র সুর ধ্বনিত হয়ে উঠছে- “আমি ধন্য হলুম”, “আমি ধন্য হলুম”।
আমায় অভিনন্দিত আপনারা সেই দিনই করেছেন, যেদিন আমার লেখা আপনাদের ভাল লেগেছে।
বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি। এরই অভিযান সেনাদলের তূর্য্যবাদকের একজন আমি- এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই, শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই; আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি।
কবি চায় প্রীতি। কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার ধর্ম।
তবু বলছি, আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তাঁর চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছি। শ্মশানের পথে,
গোরস্তানের পথে তাঁকে ক্ষুধাদীর্ণ মুর্তিতে ব্যাথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি। যুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি। কারাগারের অন্ধকূপে তাঁকে দেখেছি।
ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি।আমাকে বিদ্রোহী বলে খামখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ।
এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই।
আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে।
ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দু’টোর কোনটাই নয়।
আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।
সে হাতে হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না।
কেননা, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে চুরি । হিন্দু-মুসলমানে দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ ।
মানুষের জীবনে এক দিকে কঠোর দারিদ্র-ঋণ-অভাব; অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তুপের মত জমা হয়ে আছে।
এ অসাম্য ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে সংগীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম।
আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান- বেদনার গান গেয়ে যাব আমি।
দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থাকবো আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা।
রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন, “দ্যাখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত, কীটসের মত খুব বড় একটা ট্র্যাজেডী আছে, তুই প্রস্তুত হ’।“
জীবনে সেই ট্র্যাজেডী দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারনে অন্যের জীবনকে অশ্রুর বরষায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছি।
কিন্তু, আমারই জীবন রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত দগ্ধ। মেঘের উর্ধ্বে শূণ্যের মত কেবল হাসি, কেবল গান, কেবল বিদ্রোহ।
আমার বেশ মনে পড়ছে। একদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথা। আমার ছেলে মারা গেছে।
আমার মন তীব্র পুত্র শোকে যখন ভেঙে পড়ছে ঠিক সেই দিনই সেই সময় আমার বাড়িতে হাস্নাহেনা ফুটেছে।
আমি প্রানভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম। আমার কাব্য, আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছে।
যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূণ্য থাকে অসময়ে নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না, আমি সেই নজরুল।
সেই নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কী দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। মনে করবেন পুর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে যে একটি অশান্ত তরুণ
এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল।যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছি নে,
আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন। আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসি নি।
আমি নেতা হতে আসি নি। আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম। সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী হতে নিরব
অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে! দেশপ্রেমী,ত্যাগী,বীর,বিদ্রোহী-
বিশেষনের পর বিশেষন,টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে,বক্তার পর বক্তা! এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রার্থ্য দিনে বন্ধু, তুমি যেন যেও না। যদি পার চুপটি করে বসে
আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কোরো। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বোলো -
‘বন্ধু, আমি তোমায় পেয়েছি’।তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করে সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না।
নিশ্চল, নিশ্চুপ;
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/jodi-ar-banshee-na-baje/
|
2704
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমাদের ছোট নদী
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,
রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।আর-পারে আমবন তালবন চলে,
গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে।
তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাইবার কালে
গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।
বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,
বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে।আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর
মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।
মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে,
ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে।
দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া,
বরষার উৎসবে জেগে ওঠে পাড়া।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amader-choto-nodi/
|
3331
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নীহারিকা
|
প্রেমমূলক
|
বাদল-শেষের আবেশ আছে ছুঁয়ে
তমালছায়াতলে,
সজনে গাছের ডাল পড়েছে নুয়ে
দিঘির প্রান্তজলে।
অস্তরবির-পথ-তাকানো মেঘে
কালোর বুকে আলোর বেদন লেগে--
কেন এমন খনে
কে যেন সে উঠল হঠাৎ জেগে
আমার শূন্য মনে।"কে গো তুমি, ওগো ছায়ায় লীন"
প্রশ্ন পুছিলাম।
সে কহিল, "ছিল এমন দিন
জেনেছ মোর নাম।
নীরব রাতে নিসুত দ্বিপ্রহরে
প্রদীপ তোমার জ্বেলে দিলেম ঘরে,
চোখে দিলেম চুমো;
সেদিন আমায় দেখলে আলস-ভরে
আধ-জাগা আধ-ঘুমো।আমি তোমার খেয়ালস্রোতে তরী,
প্রথম-দেওয়া খেয়া--
মাতিয়েছিলেম শ্রাবণশর্বরী
লুকিয়ে-ফোটা কেয়া।
সেদিন তুমি নাও নি আমায় বুঝে,
জেগে উঠে পাও নি ভাষা খুঁজে,
দাও নি আসন পাতি--
সংশয়িত স্বপন-সাথে যুঝে
কাটল তোমার রাতি।তার পরে কোন্ সব-ভুলিবার দিনে
নাম হল মোর হারা!
আমি যেন অকালে আশ্বিনে
এক-পসলার ধারা।
তার পরে তো হল আমার জয়--
সেই প্রদোষের ঝাপসা পরিচয়
ভরল তোমার ভাষা,
তার পরে তো তোমার ছন্দোময়
বেঁধেছি মোর বাসা।চেনো কিম্বা নাই বা আমায় চেনো
তবু তোমার আমি।
সেই সেদিনের পায়ের ধ্বনি জেনো
আর যাবে না থামি।
যে-আমারে হারালে সেই কবে
তারই সাধন করে গানের রবে
তোমার বীণাখানি।
তোমার বনে প্রোল্লোল পল্লবে
তাহার কানাকানি।সেদিন আমি এসেছিলেম একা
তোমার আঙিনাতে।
দুয়ার ছিল পাথর দিয়ে ঠেকা
নিদ্রাঘেরা রাতে।
যাবার বেলা সে-দ্বার গেছি খুলে
গন্ধ-বিভোল পবন-বিলোল ফুলে,
রঙ-ছড়ানো বনে--
চঞ্চলিত কত শিথিল চুলে,
কত চোখের কোণে।রইল তোমার সকল গানের সাথে
ভোলা নামের ধুয়া।
রেখে গেলেম সকল প্রিয়হাতে
এক নিমেষের ছুঁয়া।
মোর বিরহ সব মিলনের তলে
রইল গোপন স্বপন-অশ্রুজলে--
মোর আঁচলের হাওয়া
আজ রাতে ওই কাহার নীলাঞ্চলে
উদাস হয়ে ধাওয়া।"
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nehereka/
|
3638
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বৈরাগ্য
|
সনেট
|
কহিল গভীর রাত্রে সংসারে বিরাগী—
“গৃহ তেয়াগিব আজি ইষ্টদেব লাগি।
কে আমারে ভুলাইয়া রেখেছে এখানে?”
দেবতা কহিলা, “আমি।”—শুনিল না কানে।
সুপ্তিমগ্ন শিশুটিরে আঁকড়িয়া বুকে
প্রেয়সী শয্যার প্রান্তে ঘুমাইছে সুখে।
কহিল, “কে তোরা ওরে মায়ার ছলনা?”
দেবতা কহিলা, “আমি।”—কেহ শুনিল না।
ডাকিল শয়ন ছাড়ি, “তুমি কোথা প্রভু?”
দেবতা কহিলা, “হেথা।”—শুনিল না তবু।
স্বপনে কাঁদিল শিশু জননীরে টানি—
দেবতা কহিলা, “ফির।”—শুনিল না বাণী।
দেবতা নিশ্বাস ছাড়ি কহিলেন, “হায়,
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়?” (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boiragyo/
|
1397
|
তারাপদ রায়
|
ভ্রমণ কাহিনী
|
চিন্তামূলক
|
শেষবার নামার আগে সমস্ত জিনিস পত্রগুলি
তালিকা মিলিয়ে নিতে হবে, এবার ভ্রমণকালে
প্রচুর সংগ্রহ হ’লো, মিনে-করা আগ্রার ফুলদানি।
জরির চপ্পল, দ্রুতগামী মেল ট্রেনে সচকিত
ভ্রূ-পল্লব, কী-কী ফেলে গেলে বাড়ি ফিরে দু:খ হবে?
যে আমগাছের ছায়া সঙ্গে নিয়ে আসা অসম্ভব
তা-ও বুঝি অজানিত হোল্ড-অলে বাঁধা হয়েছিলো,
আমগাছের ছায়ার ওজন জানা নেই, তাই করলে
বুকিং সম্ভব নয়, ভ্রূ-ভঙ্গির কুলি ভাড়া নেই।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3878.html
|
3585
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১৩
|
চিন্তামূলক
|
নহে নহে এ মনে মরণ।
সহসা এ প্রাণপূর্ণ নিশ্বাসবাতাস
নীরবে করে যে পলায়ন,
আলোতে ফুটায় আলো এই আঁখিতারা
নিবে যায় একদা নিশীথে,
বহে না রুধিরনদী, সুকোমল তনু
ধূলায় মিলায় ধরণীতে,
ভাবনা মিলায় শূন্যে, মৃত্তিকার তলে
রুদ্ধ হয় অময় হৃদয়–
এই মৃত্যু? এ তো মৃত্যু নয়।
কিন্তু রে পবিত্র শোক যায় না যে দিন
পিরিতির স্মিরিতিমন্দিরে,
উপেক্ষিত অতীতের সমাধির ‘পরে
তৃণরাজি দোলে ধীরে ধীরে,
মরণ-অতীত চির-নূতন পরান
স্মরণে করে না বিচরণ–
সেই বটে সেই তো মরণ!Hood (অনূদিত কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-13/
|
5440
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
ইউরোপের উদ্দেশে
|
মানবতাবাদী
|
ওখানে এখন মে-মাস তুষার-গলানো দিন,
এখানে অগ্নি-ঝরা বৈশাখ নিদ্রাহীন;
হয়তো ওখানে শুরু মন্থর দক্ষিণ হাওয়া;
এখানে বোশেখী ঝড়ের ঝাপ্টা পশ্চাৎ দাওয়া;
এখানে সেখানে ফুল ফোটে আজ তোমাদের দেশে
কত রঙ, কত বিচিত্র নিশি দেখা দেয় এসে।
ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়েছে কত ছেলেমেয়ে
এই বসন্তে কত উৎসব কত গান গেয়ে।
এখানে তো ফুল শুকনো, ধূসর রঙের ধুলোয়
খাঁ-খাঁ করে সারা দেশটা, শান্তি গিয়েছে চুলোয়।
কঠিন রোদের ভয়ে ছেলেমেয়ে বন্ধ ঘরে,
সব চুপচাপ; জাগবে হয়তো বোশেখী ঝড়ে।
অনেক খাটুনি, অনেক লড়াই করার শেষে
চারিদিকে ক্রমে ফুলের বাগান তোমাদের দেশে;
এদেশে যুদ্ধ মহামারী, ভুখা জ্বলে হাড়ে হাড়ে-
অগ্নিবর্ষী গ্রীষ্মের মাঠে তাই ঘুম কাড়ে
বেপরোয়া প্রাণ; জমে দিকে দিকে আজ লাখে লাখে-
তোমাদের দেশে মে-মাস; এখানে ঝোড়ো বৈশাখ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/europe-er-uddeshe/
|
5263
|
শামসুর রাহমান
|
সবাই সবার জন্য
|
মানবতাবাদী
|
নিঝুম রাতের ঘরের স্তব্ধ কড়া জেগে ওঠে
আচমকা কার জোরালো নাড়ায়। ছুটে গিয়ে খুলি
বন্ধ দুয়ার। দৃষ্টিতে শুধু শূন্যতা ঝুলে
থাকে আর এক টিকটিকি খোঁজে রাতের ডিনার।খানিক পরেই ধীরে ফিরে আসি ঘরের ভেতর;
টেবিলে-জিরানো বোতলের পানি শুষে নিয়ে ফের
বিছানায় যাই। ঘুমোতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ
হয়ে আকাশের রূপ দেখে নিই। গাছের পাতার
নাচ চোখে পড়ে। বাতাসের কাছে মনে-মনে ঢের
কৃতজ্ঞবোধ করি সুকোমল সেবার জন্য।নির্ঘুম রাতে বহুরূপী ধ্যান-ধারণা কেবল
উঁকি দেয় মনে। জানালার দিকে চোখ মেললেই
নানা সময়ের নানা মুখ আর অনেক কাহিনী
জ্বলজ্বল করে, কিছু শুধু প্রায় ধূসর, মলিন-
মিছিলের মতো আসা-যাওয়া করে। শুধু বালোবেসে
সেইসব ছবি কাছে টেনে আনি, উড়াই নিশান।যদি কোনও দিন কেউ ক্ষেপে গিয়ে লাঠিসোটা নিয়ে
তেড়ে আসে তাকে শান্তির বাণী শুনিয়ে, ভুলিয়ে
যাতনা আমার যত্নে সত্যি বুকে নেবো টেনে,-
বলবো আমরা নিয়ত সবাই সবার জন্য (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sobai-sobar-jonyo/
|
3377
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পাখি যবে গাহে গান
|
চিন্তামূলক
|
পাখি যবে গাহে গান,
জানে না, প্রভাতরবিরে সে তার
প্রাণের অর্ঘ্যদান।
ফুল ফুটে বন-মাঝে—
সেই তো তাহার পূজানিবেদন,
আপনি সে জানে না যে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pakhi-jobe-gahe-gan/
|
1257
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সোনার খাঁচার বুকে রহিব না আমি
|
সনেট
|
সোনার খাঁচার বুকে রহিব না আমি আর শুকের মতন;
কি গল্প শুনিতে চাও তোমরা আমার কাছে — কোন্ কোন্ গান, বলো,
তাহলে এ — দেউলের খিলানের গল্প ছেড়ে চলো, উড়ে চলো, —
যেখানে গভীর ভোরে নোনাফল পাকিয়াছে, — আছে আতাবন,
পউষের ভিজে ভোরে, আজ হায় মন যেন করিছে কেমন; —
চন্দ্রমালা, রাজকন্যা, মুখ তুলে চেয়ে দেখ — শুধাই , শুন লো,
কি গল্প শুনিতে চাও তোমরা আমার কাছে, — কোন্ গান বলো,
আমার সোনার খাঁচা খুলে দাও, আমি যে বনের হীরামন;রাজকন্যা শোনে নাকো — আজ ভোরে আরসীতে দেখে নাকো মুখ,
কোথায় পাহাড় দূরে শাদা হয়ে আছে যেন কড়ির মতন, —
সেই দিকে চেয়ে — চেয়ে দিনভোর ফেটে যায় রূপসীর বুক,
তবুও সে বোঝে না কি আমারো যে সাধ আছে — আছে আনমন
আমারো যে — চন্দ্রমালা, রাজকন্যা, শোনো — শোনো তোলো তো চিবুক।
হাড়পাহাড়ের দিকে চেয়ে চেয়ে হিম গেছে তার স্নান।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shonar-khachar-buke-rohibo-na-aami/
|
3513
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বরবধূ
|
রূপক
|
এ-পারে চলে বর, বধূ সে পরপারে,
সেতুটি বাঁধা তার মাঝে।
তাহারি 'পরে দান আসিছে ভারে ভারে,
তাহারি 'পরে বাঁশি বাজে।
যাত্রা দুজনার
লক্ষ্য একই তার,
তবুও যত কাছে আসে
সতত যেন থাকে
বিরহ ফাঁকে ফাঁকে
তৃপ্তিহারা অবকাশে।সে-ফাঁক গেলে ঘুচে থেমে যে যাবে গান,
দৃষ্টি হবে বাধাময়,
যেথায় দূর নাহি সেথায় যত দান
কাছেতে ছোটো হয়ে রয়।
বিরহনদীজলে
খেয়ার তরী চলে,
বায় সে মিলনেরই ঘাটে।
হৃদয় বারবার
করিবে পারাপার
মিলিতে উৎসবনাটে।বেলা যে পড়ে এল, সূর্য নামে ধীরে,
আলোক ম্লান হয়ে আসে।
ভাঙিয়া গেছে হাট, জনতাহীন তীরে
নৌকা বাঁধা পাশে পাশে।
এ-পারে বর চলে
পুরানো বটতলে,
নদীটি বহি চলে মাঝে,
বধূরে দেখা যায়
মাঠের কিনারায়,
সেতুর 'পরে বাঁশি বাজে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/barbudu/
|
1251
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সে
|
প্রেমমূলক
|
আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;
বলেছিলো: ‘এ নদীর জল
তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল:
সব ক্লান্তি রক্তের থেকে
স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;
এই নদী তুমি।’
‘এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?’
মাছরাঙাদের বললাম;
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।
আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।
সময়ের অবিরল শাদা আর কালো
বনানীর বুক থেকে এসে
মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে
ঢের আগে নারী এক – তবু চোখ ঝলসানো আলো
ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি
না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/444
|
5349
|
শামসুর রাহমান
|
হৃদয়ের চোখে জলধারা দেখে
|
প্রেমমূলক
|
আমি কি থাকবো পড়ে লোকালয় থেকে দূরে এমন একাকী?
বহুদিন তুমি চোখ তুলে দ্যাখোনি আমাকে, বহুদিন
আমার আকাঙ্ক্ষাগুলি আঙুলের ডগায় নাচিয়ে
দিয়েছো হেলায় ছুঁড়ে। আমি অভিমানে
নিশ্চুপ গিয়েছি চলে নিজের নৈঃসঙ্গ্যে পুনর্বার,
তোমার সান্নিধ্য থেকে দূরে যেতে শ্বাসকষ্ট হয়
জেনেও নিভিয়ে আলো হৃদয়ের অন্ধকার দীপের মতোই
ভেসে গেছি খরস্রোতে, ঝড়বাদলের প্রতি বড় উদাসীন।এখানে একাকী পড়ে আছি কতকাল
আমার শরীরের লতাগুল্ম
গজিয়েছে ক্রমান্বয়ে, পোকামাকড়ের আনাগোনা
চতুর্দিকে, মনে হয় উঠে আর দাঁড়াবো না পায়ের ওপরে
কোনোদিন, তুমি
এসে দেখে যাও একজন মানুষের
ভীষণ অনুপস্থিতি অন্যজন নিজের সত্তায় কী রকম
বোধ করে, কী রকম মনে হয় জীবনযাপন।একটি চুম্বন আমি তোমার নিকট বারংবার
প্রার্থনা করতে গিয়ে দেখেছি আমাকে দুঃখ তীব্র
চুমু খায় প্রতিবার আর
যখনই তোমাকে বুকে নিয়ে স্বর্গসুখ
নিরিবিলি পেতে চাই, তখনই শূন্যতা নরখাদকের মতো
আমাকে কেবলি গিলে খায় এবং আমাকে ঘেঁষেহাঁটে দূর শতাব্দীর কতিপয় বেনামি কংকাল প্রেমিকের।
তোমার চুম্বন জানি ঝরে যাবে ভিন্ন ওষ্ঠে সকল ঋতুতে;
হয়তো সে বীতপ্রেম চুম্বনকালীন দৃশ্যে একটি রঙিন
পায়ের আঙুলে
কিংবা উন্মোচিত স্তনে, তাকে তুমি দিওনা উড়িয়ে
কখনো বিরক্তি ভরে-সে আমার আরম্ভ বাসনা।
নিজের ভেতরে আমি বাজি, যেন করুণ বেহালা,
কী এক ক্ষুধায় নিজেকেই প্রতিদিন
করছি আহার
গাছের প্রতিটি পাতা ছিঁড়ে এনে পত্র লিখি, হটাৎ আবার
কুটি কুটি ছিঁড়ে ফেলি সব। মাঝ-মধ্যে মনে হয়
তুমিহীনতায় ভয়ানক সেলে আছি, যাচ্ছি ক্ষয়ে ক্রমাগত।
যদি তুমি দূর থেকে বলো,
‘এখনো লোকটা এত দুঃখে ডুবে আছে?’-
তাহলে আমার অহংকার
প্রবল জাগিয়ে
আমি নিরুত্তর সেলে মাথা রেখে
দুঃখের অধরে চুমু খেয়ে, হৃদয়ের চোখের জলধারা দেখে
খর বিবেকের শরশয্যায় থাকবো শুয়ে একা। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/hridoyer-chokhe-joldhara-dekhe/
|
5828
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
প্রেমিকা
|
রূপক
|
কবিতা আমার ওষ্ঠ কামড়ে আদর করে
ঘুম থেকে তুলে ডেকে নিয়ে যায়
ছাদের ঘরে
কবিতা আমার জামার বোতাম ছিঁড়েছে অনেক
হঠাৎ জুতোর পেরেক তোলে!
কবিতাকে আমি ভুলে থাকি যদি
অমনি সে রেগে হঠাৎ আমায়
ডবল ডেকার বাসের সামনে ঠেলে ফেলে দেয়
আমার অসুখে শিয়রের কাছে জেগে বসে থাকে
আমার অসুখ কেড়ে নেওয়া তার প্রিয় খুনসুটি
আমি তাকে যদি
আয়নার মতো
ভেঙ্গে দিতে যাই
সে দেখায় তার নগ্ন শরীর
সে শরীর ছুঁয়ে শান্তি হয় না, বুক জ্বলে যায়
বুক জ্বলে যায়, বুক জ্বলে যায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1801
|
4299
|
শামসুর রাহমান
|
অদৃশ্য ছোরা
|
চিন্তামূলক
|
পর্যটনে কেটেছে সময়; হেঁটে হেঁটে কায়ক্লেশে
নিঃসঙ্গ ধূসরপ্রান্তে এসে গেছি। বসে থাকি একা,
অতীতের হাত কাঁধে, আমার চোখের জ্যোতি নিভে
যেতে চায়। সম্প্রতি টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে নিশুত
রাতের গহন বাণী অক্ষরের আড়ম্বরহীন
আয়োজন ধরে রাখি। প্রাতঃকালে আকর্ষণ কমে
রচিত বাক্যের প্রতি। যেন আমি সম্পর্ক-রহিত
কবিতার সঙ্গে, ছন্নছাড়া আচরণে মেতে থাকিকিছুক্ষণ, স্বাভাবিক মানুষের মতো পুনরায়
সমাজে প্রবেশ করে সমাজের বাইরের কেউ
হয়ে যাই খোলা আকাশের নিচে কিংবা বন্ধ ঘরে।
ভয়ঙ্কর চাদর আমাকে ঢাকে, অদৃশ্য ছোরার
ফলা থেকে রক্ত ঝরে, লুট হয় আমার নিঃশ্বাস;
খাতার পাতার সব অক্ষরে শোণিত চিহ্ন ফোটে। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/odrishyo-chora/
|
3285
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নববর্ষ এল আজি
|
চিন্তামূলক
|
নববর্ষ এল আজি
দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে;
আনে নি আশার বাণী,
দেবে না সে করুণ প্রশ্রয়;
প্রতিকূল ভাগ্য আসে
হিংস্র বিভীষিকার আকারে—
তখনি সে অকল্যাণ
যখনি তাহারে করি ভয়।
যে জীবন বহিয়াছি
পূর্ণ মূল্যে আজ হোক কেনা;
দুর্দিনে নির্ভীক বীর্যে
শোধ করি তার শেষ দেনা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/noboborsho-elo-aji/
|
2934
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কেবল তব মুখের পানে চাহিয়া
|
প্রেমমূলক
|
কেবল তব মুখের পানে
চাহিয়া,
বাহির হনু তিমির-রাতে
তরণীখানি বাহিয়া।
অরুণ আজি উঠেছে–
আশোক আজি ফুটেছে–
না যদি উঠে,না যদি ফুটে,
তবুও আমি চলিব ছুটে
তোমার মুখে চাহিয়া।নয়নপাতে ডেকেছ মোরে
নীরবে।
হৃদয় মোর নিমেষ-মাঝে
উঠেছে ভরি গরবে।
শঙ্খ তব বাজিল–
সোনার তরী সাজিল–
না যদি বাজে, না যদি সাজে,
গরব যদি টুটে গো লাজে
চলিব তবু নীরবে।কথাটি আমি শুধাব নাকো
তোমারে।
দাঁড়াব নাকো ক্ষণেক-তরে
দ্বিধার ভরে দুয়ারে।
বাতাসে পাল ফুলিছে–
পতাকা আজি দুলিছে–
না যদি ফুলে, না যদি দুলে,
তরণী যদি না লাগে কূলে
শুধাব নাকো তোমারে। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kebol-tobo-mukher-pane-chahiya/
|
4176
|
লালন শাহ
|
আমি অপার হয়ে বসে আছি
|
ভক্তিমূলক
|
আমি অপার হয়ে বসে আছি
ও হে দয়াময়,
পারে লয়ে যাও আমায়।।
আমি একা রইলাম ঘাটে
ভানু সে বসিল পাটে-
(আমি) তোমা বিনে ঘোর সংকটে
না দেখি উপায়।।
নাই আমার ভজন-সাধন
চিরদিন কুপথে গমন-
নাম শুনেছি পতিত-পাবন
তাইতে দিই দোহাই।।
অগতির না দিলে গতি
ঐ নামে রবে অখ্যাতি-
লালন কয়, অকুলের পতি
কে বলবে তোমায়।।আরও পড়ুন… সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে – লালন শাহ
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4394.html
|
5269
|
শামসুর রাহমান
|
সম্পর্কে গ্রহণ দেখে
|
সনেট
|
কখনো আমার প্রতি এরকম তীক্ষ্ম বিরূপতা
দেখিনি তোমার ইতিপূর্বে। আমি সত্যি অপরাধ
করেছি, স্বীকার করি, নিজের অজ্ঞাতসারে, সাধ
করে নয়, তবু কেন আজো দিচ্ছ ছুঁড়ে বিষলতা
হে গৌরী আমার দিকে? রূঢ়ভাবে আমাকে বেজায়
একপেশে বলে খুব দিয়েছ ধিক্কার বারে বারে,
ফলে লুকিয়েছি মুখ স্বরচিত ভীরু অন্ধকারে
ভাসতে ভাসতে গ্লানি-সমুদ্দুরে ভঙ্গুর খেয়ায়।তোমাকে ফিরিয়ে আনবার কোনো পথ জানা নেই;
তেমন কুশলী নই বাক্যের তুবড়ি তাড়াতাড়ি
জ্বেলে টেলিফোনে কিংবা সাক্ষাতে ভেজাব মন এই
দীপ্ত অনুরাগের খরায়। মতান্তর মনান্তরে
রূপ নিলে শুরুতেই অপটু আনাড়ি আমি হারি,
সম্পর্কে গ্রহণ দেখে কেঁপে উঠি বাহিরে-অন্তরে। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/somporke-grohon-dekhe/
|
4911
|
শামসুর রাহমান
|
পরস্পর হাতে হাত রেখে
|
মানবতাবাদী
|
সূর্যোদয় এখনও অনেক দূরে, অন্ধকার বটতলে
বসে থাকি অর্থহীন। বেশ কিছু পথ
চলা বাকি আছে হে আমার ভাই-বোন। চোখ খোলা
রেখে এ মুহূর্তে যাত্রাপথে পা বাড়াও দ্বিধাহীন।রাহেলা, ফাতেমা, রাধা, অনিমা, নঈম, শাহরুখ,
অনিল গৌতম, শোনো, এখনই গা ঝাড়া দিয়ে পথে
নেমে পড়। মনে দ্বিধা, আতঙ্ক, নিরাশা
কিছুতেই কখনও দিও না ঠাঁই, পা চালাও দ্রুত।তোমাদের প্রাণ হরণের পালা ওত পেতে আছে
নানা দিকে, পথে কাঁটা বিছানো বিস্তর-
এই তথ্য জানা আছে, তবুও সব অশুভের হিংস্র
থাবা ছিঁড়ে খুঁড়ে যেতে হবে উদ্দিষ্ট চাতালে।মানবীকে দাসীরূপে দেখলে অপার উল্লাসিত যারা, তারা
যতই প্রবল হোক, হোক অমানুষ,
তোমরা রাশেদা, মরিয়ম, উর্মিলা, অঞ্জনা, বীথি,
বিমল, অতীশ, অবিনাশ, ফরহাদ, হালিম, রিয়াজ দ্রুত
পা চালাও পরস্পর হাতে হাত রেখে,
পৌঁছে যাও কাঙ্ক্ষিত মিলন-ক্ষেত্রে, যেখানে মানবী,
মানব সমান অধিকারে বসবাস করে আর
সাগ্রহে সানন্দে গড়ে নিরুপাম শান্তিনিকেতন। (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/porospor-hate-hat-rekhe/
|
1853
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
প্রশ্ন
|
চিন্তামূলক
|
ছটাক খানেক বুকে,
একটা গোটা আকাশ
এবং জলের স্থলের গা ভর্তি রং
সব পড়েছে ঝুঁকে।
কাকে কোথায় রাখি?
বুকের মধ্যে হেসে উঠল
শিকল-পরা পাখি।
কতটা গভীর হলে
নিরন্তর বেগবান নদী হওয়া যায়।
তুমি তার মাপ জানো নাকি?
মহান বৃক্ষের কাছে
একটি মানুষ এসে
একদিন প্রশ্ন করেছিল।
কতটা আগুন লাগে
নিখিলদহনে পুড়ে
পরিশুদ্ধ মানুষের অবয়ব পেতে
তুমি তার পরিমাণ জানো?
মানুষের কাছে এসে
এই প্রশ্ন করেছিল
কোনো এক ক্ষুধিত পাহাড়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1177
|
5675
|
সুকুমার রায়
|
মন্ডা ক্লাবের কয়েকটি আমন্ত্রণপত্র
|
হাস্যরসাত্মক
|
১
সম্পাদক বেয়াকুব
কোথা যে দিয়েছে ডুব-
এদিকেতে হায় হায়
ক্লাবটি তো যায় যায়।তাই বলি সোমবারে
মদগৃহে গড়পারে
দিলে সবে পদধূলি
ক্লাবটিরে ঠেলে তুলি।রকমারি পুঁথি কত
নিজ নিজ রুচিমত
আনিবেন সাথে সবে
কিছু কিছু পাঠ হবেকরযোড়ে বারবার
নিবেদিছে সুকুমার।২
কেউ বলেছে খাবো খাবো,
কেউ বলেছে খাই
সবাই মিলে গোল তুলেছে-
আমি তো আর নাই।ছোটকু বলে, রইনু চুপে
ক'মাস ধরে কহিল রূপে!
জংলি বলে "রামছাগলের
মাংস খেতে চাই।"যতই বলি "সবুর কর" -
কেউ শোনে না কালা,
জীবন বলে কোমর বেধে,
কোথায় লুচির থালা?খোদন বলে রেগেমেগে
ভীষণ রোষে বিষম লেগে-
বিষ্যুতে কাল গড়পারেতে
হাজির যেন পাই।৩
শনিবার ১৭ ই
সাড়ে পাঁচ বেলা,
গড়পারে হৈ হৈ
সরবতী মেলা।অতএব ঘড়ি ধরে
সাবকাশ হয়ে
আসিবেন দয়া করে
হাসিমুখে লয়ে।সরবৎ সদালাপ
সঙ্গীত - ভীতি
ফাঁকি দিলে নাহি মাপ,
জেনে রাখ-ইতি।৪
আমি,অর্থাৎ সেক্রেটারি,
মাসতিনেক কলকেতা ছাড়ি
যেই গিয়েছি অন্য দেশে
অমনি কি সব গেছে ফেঁসে।বদলে গেছে ক্লাবের হাওয়া,
কাজের মধ্যে কেবল খাওয়া!
চিন্তা নেইক গভীর বিষয়
আমার প্রাণে এসব কি সয়?এখন থেকে সমঝে রাখ
এ সমস্ত চলবে নাকো,
আমি আবার এইছি ঘুরে
তান ধরেছি সাবেক সুরে।শুনবে এস সুপ্রবন্ধ
গিরিজার বিবেকানন্দ,
মঙ্গলবার আমার বাসায়।
(আর থেক না ভোজের আশায়)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/monda-cluber-koyekti-amontronpotro/
|
5910
|
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
|
একটি সংলাপ
|
নীতিমূলক
|
মেয়ে: তুমি কি চাও আমার ভালবাসা ?
ছেলে: হ্যাঁ, চাই !
মেয়ে: গায়ে কিন্তু তার কাদা মাখা !
ছেলে: যেমন তেমনিভাবেই চাই ।
মেয়ে: আমার আখেরে কী হবে বলা হোক ।
ছেলে: বেশ!
মেয়ে: আর আমি জিগ্যেস করতে চাই ।
ছেলে: করো ।
মেয়ে: ধরো’ আমি কড়া নাড়লাম ।
ছেলে: আমি হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যাব !
মেয়ে: ধরো’ তোমাকে তলব করলাম ।
ছেলে: আমি হুজুরে হাজির হব ।
মেয়ে: তাতে যদি বিপদ ঘটে ?
ছেলে: আমি সে বিপদে ঝাঁপ দেব ।
মেয়ে: যদি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করি?
ছেলে: আমি ক্ষমা করে দেব ।
মেয়ে: তোমাকে তর্জনী তুলে বলব, গান গাও ।
ছেলে: আমি গাইব ।
মেয়ে: বলব,কোনো বন্ধু এলে তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দাও।
ছেলে: বন্ধ করে দেব ।
মেয়ে: তোমাকে বলব, প্রাণ নাও ।
ছেলে: আমি নেব ।
মেয়ে: বলব, প্রাণ দাও ।
ছেলে: দেব ।
মেয়ে: যদি তলিয়ে যাই ?
ছেলে: আমি টেনে তুলবো ।
মেয়ে: তাতে যদি ব্যথা লাগে ?
ছেলে: সহ্য করব ।
মেয়ে: আর যদি থাকে বাধার দেয়াল ?
ছেলে: ভেঙ্গে ফেলব ।
মেয়ে: যদি থাকে একশো গিঠঁ ?
ছেলে: তাহলেও ।
মেয়ে: তুমি চাও আমার ভালবাসা ?
ছেলে: হ্যাঁ, তোমার ভালবাসা ।
মেয়ে: তুমি কখনোই পাবে না ।
ছেলে: কিন্তু কেন ?
মেয়ে: কারণ, যারা ত্রীতদাস আমি তাদের কখনই ভালবাসি না ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4451.html
|
2106
|
মহাদেব সাহা
|
একা হয়ে যাও
|
চিন্তামূলক
|
একা হয়ে যাও, নিঃসঙ্গ বৃক্ষের মতো
ঠিক দুঃখমগ্ন অসহায় কয়েদীর মতো
নির্জন নদীর মতো,
তুমি আরো পৃথক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও
স্বাধীন স্বতন্ত্র হয়ে যাও
খণ্ড খণ্ড ইওরোপের মানচিত্রের মতো;
একা হয়ে যাও সব সঙ্গ থেকে, উন্মাদনা থেকে
আকাশের সর্বশেষ উদাস পাখির মতো,
নির্জন নিস্তব্ধ মৌন পাহাড়ের মতো
একা হয়ে যাও।
এতো দূরে যাও যাতে কারো ডাক
না পৌঁছে সেখানে
অথবা তোমার ডাক কেউ শুনতে না পায় কখনো,
সেই জনশূন্য নিঃশব্দ দ্বীপের মতো,
নিজের ছায়ার মতো, পদচিহ্নের মতো,
শূন্যতার মতো একা হয়ে যাও।
একা হয়ে যাও এই দীর্ঘশ্বাসের মতো
একা হয়ে যাও।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1329
|
134
|
আল মাহমুদ
|
বর্ষামঙ্গল নৃত্যমুখর বর্ষণ
|
প্রকৃতিমূলক
|
বৃষ্টির ছাঁটে শিহরিত হয় দেহ
কেউ বলে আমি কবি কি না সন্দেহ
তবু তো কবিতা আমাকে ঘিরেই নাচে
নাচুনে মেয়ের মতোই সেও কি বাঁচে?
বৃষ্টির কণা ফণা ধরে আছে পথে
পথ কই বলো রথ থেমে আছে ঘাটে
এ খেলার মাঠে সূর্য নেমেছে পাটে।
কেবল আমার মুখেই লালের তুলি
তুমিও দাঁড়ালে, নাচবে কি চুল খুলি
তবে শুরু করো নৃত্যের আয়োজন
নাচো দিল খুলে নাচো খুলে প্রাণ-মন।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3721.html
|
5237
|
শামসুর রাহমান
|
শুভেচ্ছান্তে
|
সনেট
|
তোমার বয়স কত হলো ঠিক? ঝড়ে-জলে আজ
তেষট্রি পেরুলে বুঝি। আমিও তোমাকে সুপ্রাচীন
ধুমল কাগুজে স্তূপে অতিশয় পরিণামহীন
বিবর্ণ দলিল ভেবে বস্তুত ছিলাম ভুলে। বাজ
পাখি বলে রটেনি তোমার নাম কিংবা অধিরাজ
ছিলে না কখনো কোনো কবিসংঘে। বড় বেশি ক্ষীণ
স্বাস্থ্য আজ; হাঁপানি এবং বাতে কাটে নিশিদিন।
ছিল না তোমার পদ্যে বিশ্ববীক্ষা, সূক্ষ্ম কারুকাজ।বেঠিক মাটিতে তুমি ছড়িয়েছো বীজ ক্রমাগত
বছর বছর? কিন্তু জানি, কখনো সখনো ভুল
মাটিতেও ফলে কত আশ্চর্য ফসল অবিরত!
যদিও তোমার গোলা শূন্য, তবু রক্তপায়ী মাঠে
স্বেদক্ষরণের কথা ভেবে যেন তোমারই চৌকাঠে
করুন প্রত্যহ পুষ্পবৃষ্টি দয়ালু ফেরেশতাকুল। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shuvecchante/
|
5030
|
শামসুর রাহমান
|
বিপর্যয় এবং একজন কোকিল
|
সনেট
|
আজ আমি, বলা যেতে পারে, পর্যুদস্ত ভয়ানক।
আমাকে ধরেছে ঘিরে ধূর্ত কাক, হাড়গিলা আর
কাদাখোঁচা, ক্রমাগত চঞ্চুর আঘাতে অন্ধকার
দেখছি, নিজের ক্ষত দেখে ভয় পাই। কাঁহাতক
সইব এমন নির্যাতন? হায়, আমার পালক
নেই যে ত্বরিৎ উড়ে যাবো বহুদূরে নীলিমার
নিভৃত অভয়াশ্রমে। সাধগুলো হচ্ছে ছারখার
কর্কশ চিৎকারে, আমি ভূলুণ্ঠিত, উদ্যত ঘাতক।একজন কোকিল শহরে আছে যার গানে গানে
আমার প্রহর খুব উদ্ভাসিত; আমি নিত্য কান
পেতে থাকি; হা কপাল, আজকাল সে-ও তো আহত
ভীষণ, হৃদয় তার জর্জরিত বিপক্ষের বাণে;
কণ্ঠ থেকে তার ঝরে ক্ষোভ আর বেদনার তান,
তবু সুপ্রভাত শুভরাত্রি জ্বলে নক্ষত্রের মতো। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/biporjoy-ebong-ekjon-kokil/
|
929
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আদিম দেবতারা
|
প্রেমমূলক
|
আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পরিহাসে
তোমাকে দিলো রূপ-
কী ভয়াবহ নির্জন রূপ তোমাকে দিলো তারা;
তোমার সংস্পর্শের মানুষদের রক্তে দিলো মাছির মতো কামনা৷আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসে
আমাকে দিলো লিপি রচনা করবার আবেগঃ
যেন আমিও আগুন বাতাস জল
যেন তোমাকেও সৃষ্টি করছি।তোমার মুখের রূপ যেন রক্ত নয়, মাংস নয়, কামনা নয়,
নিশীথ-দেবদারু-দ্বীপ;
কোনো দূর নির্জন নীলাভ দ্বীপস্থুল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে তবু
তুমি মাটির পৃথিবীতে হারিয়ে যাচ্ছো;
আমি হারিয়ে যাচ্ছি সুদূর দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়ার ভিতর।আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসে
রূপের বীজ ছড়িয়ে চলে পৃথিবীতে
ছড়িয়ে চলে স্বপ্নের বীজ।
অবাক হয়ে ভাবি
আজ রাতে কোথায় তুমি?
রূপ কেন নির্জন দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া চেনে না-
পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ?
স্থুল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে- ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –হয়ে
ব্যবহৃত –ব্যবহৃত –
আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা হো_ হো ক’রে হেসে উঠলোঃ
‘ব্যবহৃত – ব্যবহৃত হ’য়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যায়?’হো হো করে হেসে উঠলাম আমি!-
চারিদিককার অট্টহাসির ভিতর একটা বিরাট তিমির মৃতদেহ নিয়ে
অন্ধকার সমুদ্র স্ফীত হ’য়ে উঠলো যেন;
পৃথিবীর সমস্ত রূপ অমেয় তিমির মৃতহেদের দূর্গন্ধের মতো,
যেখানেই যাই আমি সেই সব সমুদ্রের উল্কায় – উল্কায়
কেমন স্বাভাবিক, কী স্বাভাবিক!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/adim-debotara/
|
824
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ১১
|
কাহিনীকাব্য
|
এগার
সাজ সাজ বলিয়ারে শহরে পৈল সাড়া,
সাত হাজার বাজে ঢোল চৌদ্দ হাজার কাড়া |
প্রথমে সাজিল মর্দ আহ্লাদি ডগরি,
পাঁচ কাঠে ভুঁই জুইড়া বসে মর্দ এয়সা ভারি |
তারপরে সাজিল মর্দ তুরক আমানি,
সমুদ্দুরে নামলে তার হৈল আঁটুপানি |
তারপরে সাজিল মর্দ নামে লোহাজুড়ী,
আছড়াইয়া মারত সে হাতীর শুঁড় ধরি |
তারপরে নামিল মর্দ নামে আইন্দ্যা ছাইন্দ্যা,
বাইশ মণ তামাক নেয় তার লেংটির মধ্যে বাইন্ধ্যা |
তারপরে সাজিল মর্দ নামে মদন ঢুলি,
বাইশ মণ পিতল তার ঢোলের চারটা খুলী |
আতালী পাতালী সাজে গগনেরি ঠাটা,
মেঘনাল সাজিয়া আইল তাম তুরুকের বেটা |
তুগুলি মুগুলি সাজে তারা দুই ভাই,
ঐরাবতে সাইজা আইল আজদাহা সেপাই |
বন্দুকি বন্দুকি চলে কামানে কামান,
ময়ূর ময়ুরী চলে ধরিয়া পয়গাম |
. — মহরমের জারী
“ও রূপা তুই করিস কিরে? এখনো তুই রইলি শুয়ে?
বন-গেঁয়োরা ধান কেটে নেয় গাজনা-চরের খামার ভূঁয়ে |”
“কি বলিলা বছির মামু ?” উঠল রূপাই হাঁক ছাড়িয়া,
আগুনভরা দুচোখ হতে গোল্লা-বারুদ যায় উড়িয়া |
পাটার মত বুকখানিতে থাপড় মারে শাবল হাতে,
বুকের হাড়ে লাগল বাড়ি, আগুন বুঝি জ্বলবে তাতে!
লম্ফে রূপা আনলো পেড়ে চাং হতে তার সড়কি খানা,
ঢাল ঝুলায়ে মাজার সাথে থালে থালে মারল হানা |
কোথায় রল রহম চাচা, কলম শেখ আর ছমির মিঞা,
সাউদ পাড়ার খাঁরা কোথায়? কাজীর পোরে আন ডাকিয়া!
বন-গেঁয়োরা ধান কেটে নেয় থাকতে মোরা গফর-গাঁয়ে,
এই কথা আজ শোনার আগে মরিনি ক্যান গোরের ছায়ে?
“আলী-আলী” হাঁকল রূপাই হুঙ্কারে তার গগন ফাটে,
হুঙ্কারে তার গর্জে বছির আগুন যেন ধরল কাঠে!
ঘুম হতে সব গাঁয়ের লোকে শুনল যেন রূপার বাড়ি ;
ডাক শুনে তার আসল ছুটে রহম চাচা, ছমির মিঞা,
আসল হেঁকে কাজেম খুনী নখে নখে আঁচড় দিয়া |
আসল হেঁকে গাঁয়ের মোড়ল মালকোছাতে কাপড় পড়ি,
এক নিমেষে গাঁয়ের লোকে রূপার বাড়ি ফেলল ভরি |
লম্ফে দাঁড়ায় ছমির লেঠেল, মমিনপুরের চর দখলে,
এক লাঠিতে একশ লোকেরমাথা যে জন আস্ ল দলে |
দাঁড়ায় গাঁয়ের ছমির বুড়ো, বয়স তাহার যদিও আশী,
গায়ে তাহার আজও আছে একশ লড়ার দাগের রাশি |
গর্জি উঠে গদাই ভূঁঞার ; মোহন ভূঁঞার ভাজন বেটা,
যার লাঠিতে মামুদপুরের নীল কুঠিতে লাগল লেঠা |
সব গাঁর লোক এক হল আজ রূপার ছোট উঠান পরে,
নাগ-নাগিনী আসল যেন সাপ-খেলানো বাঁশীর স্বরে!
রূপা তখন বেরিয়ে তাদের বলল, “শোন ভাই সকলে,
গাজনা চরের ধানের জমি আর আমাদের নাই দখলে |”
বছির মামু বলছে খবর—মোল্লারা সব কাসকে নাকি ;
আধেক জমির ধান কেটেছে, কালকে যারা কাঁচির খোঁচায় :
আজকে তাদের নাকের ডগা বাঁধতে হবে লাঠির আগায় |”
থামল রূপাই—ঠাটা যেমন মেঘের বুকে বাণ হানিয়া,
নাগ-নাগিনীর ফণায় যেমন তুবড়ী বাঁশীর সুর হাঁকিয়া |
গর্জে উঠে গাঁয়ের লোকে, লাটিম হেন ঘোড়ায় লাঠি,
রোহিত মাছের মতন চলে, লাফিয়ে ফাটায় পায়ের মাটি |
রূপাই তাদের বেড়িয়ে বলে, “থাল বাজারে থাল বাজারে,
থাল বাজায়ে সড়কি ঘুরা হানরে লাঠি এক হাজারে |
হানরে লাঠি—হানরে কুঠার, গাছের ছ্যন্ আর রামদা ঘুরা,
হাতের মাথায় যা পাস যেথায় তাই লয়ে আজ আয় রে তোরা |”
“আলী! আলী! আলী! আলী!!!” রূপার যেন কণ্ঠ ফাটি,
ইস্রাফিলের শিঙ্গা বাজে কাঁপছে আকাশ কাঁপছে মাটি |
তারি সুরে সব লেঠেল লাঠির, পরে হানল লাঠি,
“আলী-আলী” শব্দে তাদের আকাশ যেন ভাঙবে ফাটি |
আগে আগে ছুটল রূপা—বৌঁ বৌঁ বৌঁ সড়কি ঘোরে,
কাল সাপের ফণার মত বাবরী মাথায় চুল যে ওড়ে |
লল পাছে হাজার লেঠেল “আলী-আলী” শব্দ করি,
পায়ের ঘায়ে মাঠের ধূলো আকাশ বুঝি ফেলবে ভরি!
চলল তারা মাঠ পেরিয়ে, চলল তারা বিল ডেঙিয়ে,
কখন ছুটে কখন হেঁটে বুকে বুকে তাল ঠুকিয়ে |
চলল যেমন ঝড়ের দাপে ঘোলাট মেঘের দল ছুটে যায়,
বাও কুড়ানীর মতন তারা উড়িয়ে ধূল্ পথ ভরি হায়!
দুপুর বেলা এল রূপাই গাজনা চরের মাঠের পরে,
সঙ্গে এল হাজার লেঠেল সড়কি লাঠি হস্তে ধরে!
লম্ফে রূপা শূণ্যে উঠি পড়ল কুঁদে মাটির পরে,
থকল খানিক মাঠের মাটি দন্ত দিয়ে কামড়ে ধরে |
মাটির সাথে মুখ লাগায়ে, মাটির সাথে বুক লাগায়ে,
“আলী! আলী!” শব্দ করি মাটি বুঝি দ্যায় ফাটায়ে |
হাজার লেঠেল হুঙ্কারী কয় “আলী আলী হজরত আলী,”
সুর শুনে তার বন-গেঁয়োদের কর্ণে বুঝি লাগল তালি!
তারাও সবে আসল জুটে দলে দলে ভীম পালোয়ান,
“আলী আলী” শব্দে যেন পড়ল ভেঙে সকল গাঁখান!
সামনে চেয়ে দেখল রূপা সার বেঁধে সব আসছে তারা,
ওপার মাঠের কোল ঘেঁষে কে বাঁকা তীরে দিচ্ছে নাড়া |
রূপার দলে এগোয় যখন, তারা তখন পিছিয়ে চলে,
তারা আবার এগিয়ে এলে এরাও ইটে নানান কলে |
এমনি করে সাত আটবারে এগোন পিছন হল যখন
রূপা বলে, “এমন করে “কাইজা” করা হয় না কখন |”
তাল ঠুকিয়ে ছুটল রূপাই, ছুটল পাছে হাজার লাঠি,
“আলী-আলী — হজরত আলী” কণ্ঠ তাদের যয় যে ফাটি |
তাল ঠুকিয়া পড়ল তারা বন-গেঁয়োদের দলের মাঝে,
লাঠির আগায় লাগল লাঠি, লাঠির আগায় সড়কি বাজে |
“মার মার মার” হাঁকল রূপা, — “মার মার মার” ঘুরায় লাঠি,
ঘুরায় যেন তারি সাথে পায়ের তলে মাঠের মাটি |
আজ যেন সে মৃত্যু-জনম ইহার অনেক উপরে উঠে,
জীবনের এক সত্য মহান্ লাঠির আগায় নিচ্ছে লুটে!
মরণ যেন মুখোমুখি নাচছে তাহার নাচার তালে,
মহাকালের বাজছে বিষাণ আজকে ধরার প্রলয় কালে |
নাচে রূপা—নাচে রূপা— লোহুর গাঙে সিনান করি,
মরণরে সে ফেলছে ছুড়ে রক্তমাখা হস্তে ধরি |
নাচে রূপা—নাচে রুপা—মুখে তাহার অট্টহাসি,
বক্ষে তাহার রক্ত নাচে, চক্ষে নাচে অগ্নিরাশি |
—হাড়ে হাড়ে নাচন তাহার, রোমে রোমে লাগছে নাচন,
কি যেন সে দেখেছে আজ, রুধতে নারে তারি মাতন |
বন-গেঁয়োরা পালিয়ে গেল, রূপার লোকও ফিরল বহু,
রূপা তবু নাচছে, গায়ে তাজা-খুনের হাসছে লোহু |
. *****
পো = ছেলে
হজরত আলী = হজরত মুহাম্মদের (দঃ) জামাতা | তিনি মহাবীর ছিলেন |
এদেশে মারামারির সময় সকলে মিলে আলী, আলী, শব্দ
করে | কারও কারও মতে আলী, আল্লা শব্দের অপভ্রংশ |
ঠাটা = অশনি
ভাজন = ঔরসজাত
কাঁচির = কাস্তের
গাছের ছ্যান = খেজুর গাছের ডগা কাটার অস্ত্র
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/814
|
5508
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
বিয়ে বাড়ির মজা
|
হাস্যরসাত্মক
|
বিয়ে বাড়িঃ বাজছে সানাই, বাজছে নানান বাদ্য
একটি ধারে তৈরি হচ্ছে নানা রকম খাদ্য;
হৈ-চৈ আর চেঁচামেচি, আসছে লুচির গন্ধ,
আলোয় আলোয় খুশি সবাই, কান্নাকাটি বন্ধ,
বাসরঘরে সাজছে কনে, সকলে উৎফুল্ল,
লোকজনকে আসতে দেখে কর্তার মুখ খুললঃ
“আসুন, আসুন-বসুন সবাই, আজকে হলাম ধন্য,
যৎসামান্য এই আয়োজন আপনাদেরই জন্য;
মাংস, পোলাও, চপ-কাটলেট, লুচি এবং মিষ্টি।
খাবার সময় এদের প্রতি দেবেন একটু দৃষ্টি।”
বর আসে নি, তাই সকলে ব্যস্ত এবং উৎসুক,
আনন্দে আজ বুক সকলের নাচছে কেবল ধুক্-ধুক্,
‘হুলু’ দিতে তৈরী সবাই, শাঁক হাতে সব প্রস্তুত,
সময় চলে যাচ্ছে ব’লে মনটা করছে খুঁত-খুঁত।
ভাবছে সবাই কেমন ক’রে বরকে করবে জব্দ;
হঠাৎ পাওয়া গেল পথের মোড়ে গাড়ির শব্দঃ
হুলুধ্বনি উঠল মেতে, শাঁক বাজলো জোরে,
বরকে সবাই এগিয়ে নিতে গেল পথের মোড়ে।
কোথায় বরের সাজসজ্জা? কোথায় ফুলের মালা?
সবাই হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, পালা, পালা, পালা।
বর নয়কো, লাল-পাগড়ি পুলিশ আসছে নেমে।
বিয়েবাড়ির লোকগুলো সব হঠাৎ উঠল ঘেমে,
বললে পুলিশঃ এই কি কর্তা, ক্ষুদ্র আয়োজন?
পঞ্চাশ জন কোথায়? এ যে দেখছি হাজার জন!
এমনি ক’রে চাল নষ্ট দুর্ভিক্ষের কালে?
থানায় চলো, কাজ কি এখন এইখানে গোলমালে?
কর্তা হলেন কাঁদো-কাঁদো, চোখেতে জল আসে,
গেটের পাশে জড়ো-হওয়া কাঙালীরা হাসে।। (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/biye-barir-moja/
|
1532
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
অন্ধকারে, একলা মানুষ
|
চিন্তামূলক
|
ঠাট্টা, হাসি, গান, কলরব
যেই থেমেছে, দূরে কাছে
দেখছি পথের সঙ্গীরা সব
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্যাপার কী, আর গল্প কি নেই?
রাস্তাটা যে অনেক বাকি।
চোখ তুলে কালপুরুষ দেখেই
ফুরিয়ে গেল সব কথা কি?
সত্যি ছিল সঙ্গীরা? ধুস্।
মধ্যরাতে পথের ধারে
এই তো আমি একলা মানুষ
দাঁড়িয়ে আছি অন্ধকারে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1141
|
1215
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সবিতা
|
চিন্তামূলক
|
সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি
মনে হয় কোনো এক বসন্তের রাতে:
ভূমধ্যসাগর ঘিরে সেই সব জাতি,
তাহাদের সাথে
সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন;
মনে পড়ে নিবিড় মেরুন আলো, মুক্তার শিকারী,
রেশম, মদের সার্থবাহ,
দুধের মতন শাদা নারী।
অন্তত রৌদ্রের থেকে তারা
শাশ্বত রাত্রির দিকে তবে
সহসা বিকেলবেলা শেষ হয়ে গেলে
চলে যেত কেমন নীরবে।
চারি দিকে ছায়া ঘুম সপ্তর্ষি নক্ষত্র;
মধ্যযুগের অবসান
স্থির করে দিতে গিয়ে ইউরোপ গ্রীস
হতেছে উজ্জ্বল খৃষ্টান।
তবুও অতীত থেকে উঠে এসে তুমি আমি ওরা–
সিন্ধুর রাত্রির জল জানে–
আধেক যেতাম নব পৃথিবীর দিকে;
কেমন অনন্যোপায় হাওয়ার আহ্বানে
আমরা অকূল হয়ে উঠে
মানুষকে মানুষের প্রয়াসকে শ্রদ্ধা করা হবে
জেনে তবু পৃথিবীর মৃত সভ্যতায়
যেতাম তো সাগরের স্নিগ্ধ কলরবে।
এখন অপর আলো পৃথিবীতে জ্বলে;
কী এক অপব্যয়ী অক্লান্ত আগুন!
তোমার নিবিড় কালো চুলের ভিতরে
কবেকার সমুদ্রের নুন;
তোমার মুখের রেখা আজো
মৃত কত পৌত্তলিক খৃষ্টান সিন্ধুর
অন্ধকার থেকে এসে নব সূর্যে জাগার মতন;
কত আছে — তবু কত দূরে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/966
|
505
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
শায়ক-বেঁধা পাখী
|
রূপক
|
রে নীড়-হারা, কচি বুকে শায়ক-বেঁধা পাখী!
কেমন ক’রে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
কোথায় রে তোর কোথায় ব্যথা বাজে?
চোখের জলে অন্ধ আঁখি কিছুই দেখি না যে?
ওরে মাণিক! এ অভিমান আমায় নাহি সাজে-
তোর জুড়াই ব্যথা আমার ভাঙা বক্ষপুটে ঢাকি’।
ওরে আমার কোমল-বুকে-কাঁটা-বেঁধা পাখী,
কেমন ক’রে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
বক্ষে বিঁধে বিষ মাখানো শর,
পথ-ভোলা রে! লুটিয়ে প’লি এ কা’র বুকের’ পর!
কে চিনালে পথ তোরে হায় এই দুখিনীর ঘর?
তোর ব্যথার শানি- লুকিয়ে আছে আমার ঘরে নাকি?
ওরে আমার কোমল-বুকে-কাঁটা-বেঁধা পাখী!
কেমন ক’রে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
হায়, এ কোথায় শানি- খুঁজিস্ তোর?
ডাক্ছে দেয়া. হাঁকছে হাওয়া, কাঁপছে কুটীর মোর!
ঝঞ্ঝাবাতে নিবেছে দীপ, ভেঙেছে সব দোর,
দুলে দুঃখ রাতের অসীম রোদন বক্ষে থাকি’ থাকি’!
ওরে আমার কোমল-বুকে-কাঁটা-বেঁধা পাখী!
এমন দিনে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
মরণ যে বাপ বরণ করে তারে,
‘মা’ ‘মা’ ডেকে যে দাঁড়ায় এই শক্তিহীনার দ্বারে!
মাণিক আমি পেয়ে শুধু হারাই বারে বারে,
ওরে তাই তো ভয়ে বক্ষ কাঁপে কখন দিবি ফাঁকি!
ওরে আমার হারামণি! ওরে আমার পাখী!
কেমন ক’রে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
হারিয়ে পাওয়া ওরে আমার মাণিক!
দেখেই তোরে চিনেছি, আয়, বক্ষে ধরি খানিক!
বাণ-বেঁধা বুক দেখে তোরে কোলে কেহ না নিক,
ওরে হারার ভয়ে ফেলতে পারে চিরকালের মা কি?
ওরে আমার কোমল-বুকে-কাঁটা-বেঁধা পাখী!
কেমন ক’রে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি।
এ যে রে তোর চির-চেনা স্নেহ,
তুই তো আমার ন’সরে অতিথ্ অতীত কালের কেহ,
বারে বারে নাম হারায়ে এসেছিস এই গেহ,
এই মায়ের বুকে থাক যাদু তোর য’দিন আছে বাকী!
প্রাণের আড়াল ক’রতে পারে সৃজন দিনের মা কি?
হারিয়ে যাওয়া? ওরে পাগল, সে তো চোখের ফাঁকি!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/855
|
4286
|
শহীদ কাদরী
|
স্মৃতি _ কৈশোরিক
|
চিন্তামূলক
|
অদৃশ্য ফিতে থেকে ঝুলছে রঙিন বেলুন
রাত্রির নীলাভ আসঙ্গে আর স্বপ্নের ওপর
যেন তার নৌকা- দোলা; সোনার ঘণ্টার ধ্বনি
ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত শহরের! আমি ফিরলাম
ঝর্ণার মতো সেই গ্রীষ্ম দিনগুলোর ভেতর
যেখানে শীৎকার, মত্ততা আর বেলফুলে গাঁথা
জন্মরাত্রির উৎসবের আলো; দীর্ঘ দুপুর ভরে
অপেমান ঘোড়ার ভৌতিক পিঠের মতো রাস্তাগুলো,
গলা পিচে তরল বুদ্বুদে ছলছল নত্ররাজি,
তার ওপর কোমল পায়ের ছাপ, -চলে গেছি
শব্দহীন ঠাকুর মার ঝুলির ভেতর।
দেয়ালে ছায়ার নাচ
সোনালি মাছের। ফিরে দাঁড়ালাম সেই
গাঢ়, লাল মেঝেয়, ভয়-পাওয়া রাত্রিগুলোয়
যেখানে অসতর্ক স্পর্শে গড়িয়ে পড়লো কাঁচের
সচ্ছল আধার, আর সহোদরার কান্নাকে চিরে
শূন্যে, কয়েকটা বর্ণের ঝলক
নিঃশব্দে ফিকে হল; আমি ফিরে দাঁড়ালাম সেই
মুহূর্তটির ওপর, সেই ঠাণ্ডা করুণ মরা মেঝেয়
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4164.html
|
1997
|
বিষ্ণু বিশ্বাস
|
ঈশ্বরের জন্মজন্মান্তর
|
চিন্তামূলক
|
আমাকে পেরিয়ে গেলে তুমি পাবে এক ধূলিপথ
ডানে বাঁয়ে সবখানে শিলীভূত পাখিদের শব
মৃত্যু যেখানে অমর অমেয় জলের স্বপ্ন ধোয়া
বাঁশপাতা খড়খড়ি ঊষর দানোর লোহাগড়।
হয়ত থামতে হবে, বহুবার অনাত্মীয় শোকে
তোমার সোনালি জামা, হলুদ গন্ধের শাড়িখানা
উড়িয়ে নিয়েছে ঝড়। শুধু স্বপ্নের আঁধার-গান
তারাদের নীল জলে তোমাকে দিয়েছে কামরতি
তোমাকে বিয়োতে পারো আদি ঊষা, প্রথম বাগান?
দ্বিতীয় ঈশ্বর তবে তৃতীয় ঈশ্বর জন্মদানে
আবার মিলিত হবে সোনালি জামা হলুদ গন্ধে।
এই অনুবর্তনের গল্পে যে পথে গিয়েছে ধূলিপথ
ডানে বাঁয়ে সবখানে জাম আম সবুজ কথক
আমাকে পেরিয়ে গেলে নিশ্চিন্ত কল্পতরুর গাছ।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/01/%e0%a6%88%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf/
|
3073
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জন্ম ও মরণ
|
চিন্তামূলক
|
সে তো সেদিনের কথা বাক্যহীন যবে
এসেছিনু প্রবাসীর মতো এই ভবে
বিনা কোন পরিচয়, রিক্ত শূন্য হাতে,
একমাত্র ক্রন্দন সম্বল লয়ে সাথে।
আজ সেথা কী করিয়া মানুষের প্রীতি
কণ্ঠ হতে টানি লয় যত মোর গীতি।
এ ভুবনে মোর চিত্তে অতি অল্প স্থান
নিয়েছ ভুবননাথ! সমস্ত এ প্রাণ
সংসারে করেছ পূর্ণ। পাদপ্রান্তে তব
প্রত্যহ যে ছন্দে-বাঁধা গীত নব নব
দিতেছি অঞ্জলী তাও তব পূজাশেষে
লবে সবে তোমা-সাথে মোরে ভালোবেসে,
এই আশাখানি মনে আছে অবিচ্ছেদে।
যে প্রবাসে রাখো সেথা প্রেমে রাখো বেঁধে। নব নব প্রবাসেতে নব নব লোকে
বাধিবে এমনি প্রেমে। প্রেমের আলোকে
বিকিশিত হব আমি ভুবনে ভুবনে
নব নব পুস্পদলে। প্রেম-আকর্ষণে
যত গূঢ় মধু মোর অন্তরে বিলসে
উঠিবে অক্ষয় হয়ে নব নব রসে,
বাহিরে আসিবে ছুটি - অন্তহীন প্রাণে
নিখিল জগতে তব প্রেমের আহবানে
নব নব জীবনে গন্ধ যাব রেখে,
নব নব বিকাশের গন্ধ যাব এঁকে।
কে চাহে সংকীর্ণ অন্ধ অমরতাকূপে
এক ধরাতল-মাঝে শুধু এক রূপে
বাঁচিয়া থাকিতে! নব নব মৃত্যুপথে
তোমারে পূজিতে যাব জগতে জগতে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jonmo-o-moron/
|
1959
|
বিনয় মজুমদার
|
আর যদি নাই আসো
|
প্রেমমূলক
|
আর যদি নাই আসো,ফুটন্ত জলের নভোচারী
বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো না-ই মেশো,
সেও এক অভিজ্ঞতা ; অগণন কুসুমের দেশে
নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো
তোমার অভাব বুঝি ; কে জানে হয়তো অবশেষে
বিগলিত হতে পারো ; আশ্চর্য দর্শনবহু আছে
নিজের চুলের মৃদু ঘ্রাণের মতন তোমাকেও
হয়তো পাইনা আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি
অস্ফুট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,
গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4017.html
|
1385
|
তারাপদ রায়
|
এখন
|
প্রেমমূলক
|
মনে নেই,
আমি নিজে ফিরে গিয়েছিলাম, অথবা
তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম,
এখন
আর কিছু মনে নেই, তবু দুঃখ হয়
এখন, যখন একেকদিন খুব বৃষ্টি নেমে আসে
এখন, যখন একেকদিন খুব শীতের বাতাস
শুধু পাতা উড়িয়ে উড়িয়ে
আমার চারদিকে বৃষ্টি ও ঠান্ডা বাতাস ঘুরে ঘুরে;
এমন কি যখন সেই পুরনো কালের সাদা রোদ
হঠাত্ ভোরবেলা ঘর ভাসিয়ে ছাপিয়ে,
‘কি ব্যাপার এবার কোথাও যাবে না?’এখন আর কোনোখানে যাওয়া নেই,
এখন কেবল ঠান্ডা বাতাস, এখন বৃষ্টি, জল
আমার চারপাশ ঘিরে পাতা ওড়ে আর জল পড়ে ।
এখন তোমার জন্য দুঃখ হয়,
এখন আমার জন্য দুঃখ হয়,
আমি নিজে ফিরে গিয়েছিলাম অথবা
তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, এখন দুঃখ হয় ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
895
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অইখানে সারা দিন
|
চিন্তামূলক
|
ঐখানে সারা দিন উঁচু ঝাউবন খেলা করে
হলদে সবুজ নীল রঙ্গ তার বুকে;
পাখি মেঘ রৌদ্রের;
তবু আজও হদয়ের গভীর অসুখে
মানবেরা পড়ে আছে কেন।আজ অন্ধ শতাব্দীর শতচ্ছিদ্রতার
ভিতর আলোর খোঁজে যদি চলে যায়
তবুও শাশ্বত হয়ে থাকে অন্ধকার।নতুন যুগের জন্য তবুও প্রয়ান করা ভালো।
চিতল হরিণ ঐ শিঙ তুলে ফিকে জোছনায়
হরিণী কে খোঁজে তবু পাবে না কখনও;
ব্যাঘ্র যুগে শুধু মৃত হরিণীর মাংস পাওয়া যায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/oikhaney-shara-din/
|
4925
|
শামসুর রাহমান
|
পিতলের বক
|
সনেট
|
(আবুল হোসেনকে)
এতদিন আছি তার কাছাকাছি তাই দুটি চোখে
দেখেছি কৌতুক শ্লেষ, টকরো হাসি। স্তব্ধতায় ঠায়
টেবিলে দাঁড়িয়ে আছি আঠারো বছর এক পায়
ধ্যানী আলো-অন্ধকারে। প্রতিদিন তার প্রাণলোকে
কতো কী-যে ঘটে দেখি, ঘোরালো তর্কের তীক্ষ্ণ নখে
ছেঁড়ে ঢের জটিল তত্ত্বের সূত্র, কাটায় হেলায়
সময় শব্দের প্রেমে, বুদ্ধির দেউড়ি আগলায়
সারাক্ষণ। বাষ্পাকুল হয় না সে আনন্দ কি শোকে।কিছুতে পাই না ভেবে কৌচে বসে কী-যে বলে অত
বুদ্ধিজীবী বন্ধুদের সঙ্গে রোজ। না খাদ্য, না ঘুম
কিছুই পারে না তাকে বাধা দিতে; হয়তো নিছক
বাজে কথা, গা ভাসায় তবু সেই স্রোতে অবিরত।
যদিন মেয়েটা গেলো, কাঁদলো সে নিশ্চুপ নিঝুম (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pitoler-bok/
|
456
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মানিনী
|
প্রেমমূলক
|
মূক করে ওই মুখর মুখে লুকিয়ে রেখো না,
ওগো কুঁড়ি, ফোটার আগেই শুকিয়ে থেকো না!
নলিন নয়ান ফুলের বয়ান মলিন এদিনে
রাখতে পারে কোন সে কাফের আশেক বেদীনে?
রুচির চারু পারুল বনে কাঁদচ একা জুঁই,
বনের মনের এ বেদনা কোথায় বলো থুই?
হাসির রাশির একটি ফোঁটা অশ্রু অকরুণ,
হাজার তারা মাঝে যেন একটি কেঁদে খুন!
বেহেশতে কে আনলে এমন আবছা বেথার রেশ,
হিমের শিশির ছুঁয়ে গেছে হুরপরিদের দেশ!
বরষ পরের দরশনের কই সে হরষণ,
মিলবে না কি শিথিল তোমার বাহুর পরশন?
শরম টুটে ফুটুক কলি শিশির-পরশে
ঘোমটা ঠেলে কুণ্ঠা ফেলে সলাজ হরষে। (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/manini/
|
5621
|
সুকুমার রায়
|
ডানপিটে
|
ছড়া
|
বাপ্রে কি ডানপিটে ছেলে!-
কোন দিন ফাঁসি যাবে নয় যাবে জেলে।
একটা সে ভুত সেজে আঠা মেখে মুখে,
ঠাঁই ঠাই শিশি ভাঙে শ্লেট দিয়ে ঠুকে।
অন্যটা হামা দিয়ে আলমারি চড়ে,
খাট থেকে রাগ ক'রে দুম্দাম্ পড়ে।বাপরে কি ডানপিটে ছেলে!-
শিলনোড়া খেতে চায় দুধভাত ফেলে!
একটার দাঁত নেই, জিভ দিয়ে ঘষে,
একমনে মোমবাতি দেশলাই চোষে!
আরজন ঘরময় নীল কালি গুলে,
কপ্ কপ্ মাছি ধরে মুখে দেয় তুলে!বাপরে কি ডানপিটে ছেলে!-
খুন হ'ত টম্ চাচা ওই রুটি খেলে!
সন্দেহে শুঁকে বুড়ো মুখে নাহি তোলে,
রেগে তাই দুই ভাই ফোঁস্ ফোঁস্ ফোলে!
নেড়াচুল খাড়া হয়ে রাঙা হয় রাগে,
বাপ্ বাপ্ ব'লে চাচা লাফ দিয়ে ভাগে।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/danpite/
|
3710
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মাটিতে মিশিল মাটি
|
চিন্তামূলক
|
মাটিতে মিশিল মাটি,
যাহা চিরন্তন
রহিল প্রেমের স্বর্গে
অন্তরের ধন। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/matite-mishilo-mati/
|
5596
|
সুকুমার রায়
|
খিচুড়ি
|
হাস্যরসাত্মক
|
হাঁস ছিল, সজারুও, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল 'হাঁসজারু' কেমনে তা জানি না ৷
বক কহে কচ্ছপে—'বাহবা কি ফুর্তি !
অতি খাসা আমাদের 'বকচ্ছপ মূর্তি' ৷'
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে কাঁচা লঙ্কা ?
ছাগলের পেটে ছিল না জানি কি ফন্দি,
চাপিল বিছার ঘাড়ে, ধড়ে মুড়ো সন্ধি !
জিরাফের সাধ নাই মাঠে–ঘাটে ঘুরিতে,
ফড়িঙের ঢং ধরি সেও চায় উড়িতে ৷
গরু বলে, 'আমারেও ধরিল কি ও রোগে ?
মোর পিছে লাগে কেন হতভাগা মোরগে ?'
'হাতিমি'র দশা দেখ–তিমি ভাবে জলে যাই
হাতি বলে, 'এই বেলা জঙ্গলে চল ভাই ৷'
সিংহের শিং নাই এই বড় কষ্ট—
হরিণের সাথে মিলে শিং হল পষ্ট ৷
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/khichuri/
|
4850
|
শামসুর রাহমান
|
দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর
|
চিন্তামূলক
|
কী ক’রে যে এত দ্রুত কণ্টকিত আঁধারে
ঢুকে পড়েছি, টের পাইনি।
পথে ক’জন অন্ধ পথিক আমাকে
স্বেচ্ছায় দিব্যি কথা বলার ভঙ্গিতে
মুগ্ধ করে ফেললো, টের পাইনি। ওরা
কখন যে আমাকে ছেড়ে দিলো, বুঝিনি।আমার কাপড়ে অনেক কাঁটা জড়িয়ে গেলো
কখন, টেরই পাইনি। হঠাৎ এক
কর্কশ আওয়াজ আমাকে কামড়ে ধরছে
বারবার। এদিক-সেদিক তাকাতেই দূরের
এক গাছের ডালে অসামান্য এক পাখিকে
দেখি, যার কণ্ঠস্বর কখনও কর্কশ আর কখনও
মধুর সুর ছড়িয়ে দিচ্ছে অচেনা, নির্জন
বুনো জায়গায়। আমার যাত্রা থামে না।সূর্যের তেজ ম্লান হতেই প্রশান্ত অদূরে
গাছতলায় একজন বুজুর্গকে দেখতে পাই। কী যেন
আমাকে তার দিকে টেনে নিয়ে যায়। পক্ক কেশ আলেম
তাকান আমার দিকে অপরূপ
দৃষ্টি মেলে। হাতে তাঁর এক অজানা কেতাব।
ইচ্ছে হলো তাঁর পা ছুঁয়ে অবনত হই। পরক্ষণে
দৃশ্য মুছে যায়। আমি মেঘমালার দিকে তাকিয়ে
নতুন এক কবিতার প্রতিমা পেয়ে যাই। আড়াল ফোটে
আসমানে ভাসমান কার্পেট প্রবীণ যাত্রী
তাকান আমার দিকে হাসিস্নাত দৃষ্টিতে। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/drishyo-the-drishyantor/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.