id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
826
|
জসীম উদ্দীন
|
নকশী কাঁথার মাঠ – ১৩
|
কাহিনীকাব্য
|
তেরো
বিদ্যাশেতে রইলা মোর বন্ধুরে |
বিধি যদি দিত পাখা,
উইড়া যাইয়া দিতাম দেখা ;
আমি উইড়া পড়তাম সোনা বন্ধুর দেশেরে |
আমরা ত অবলা নারী,
তরুতলে বাসা বান্ধিরে ;
আমার বদন চুয়ায়া পড়ে ঘামরে |
বন্ধুর বাড়ী গঙ্গার পার
গেলে না আসিবা আর ;
আমার না জান বন্ধু, না জানে সাঁতাররে |
বন্ধু যদি আমার হও
উইড়া আইসা দেখা দাও
তুমি দাও দেখা জুড়াক পরাণরে |
. — রাখালী গান
একটি বছর হইয়াছে সেই রূপাই গিয়াছে চলি,
দিনে দিনে নব আশা লয়ে সাজুরে গিয়াছে ছলি |
কাইজায় যারা গিয়াছিল গাঁয়, তারা ফিরিয়াছে বাড়ী,
শহরের জজ, মামলা হইতে সবারে দিয়াছে ছাড়ি |
স্বামীর বাড়ীতে একা মেয়ে সাজু কি করে থাকিতে পারে,
তাহার মায়ের নিকটে সকলে আনিয়া রাখিল তারে |
একটি বছর কেটেছে সাজুর একটি যুগের মত,
প্রতিদিন আসি, বুকখানি তার করিয়াছে শুধু ক্ষত |
ও-গাঁয়ে রূপার ভাঙা ঘরখানি মেঘ ও বাতাসে হায়,
খুঁটি ভেঙে আজ হামাগুড়ি দিয়ে পড়েছে পথের গায় |
প্রতি পলে পলে খসিয়া পড়িছে তাহার চালের ছানি,
তারও চেয়ে আজি জীর্ণ শীর্ণ সাজুর হৃদয়খানি |
রাত দিন দুটি ভাই বোন যেন দুখেরই বাজায় বীণ |
কৃষাণীর মেয়ে, এতটুকু বুক, এতটুকু তার প্রাণ,
কি করিয়া সহে দুনিয়া জুড়িয়া অসহ দুখের দান!
কেন বিধি তারে এত দুখ দিল, কেন, কেন, হায় কেন,
মনের-মতন কাঁদায় তাহারে “পথের কাঙালী” হেন ?
সোঁতের শেহলা ভাসে সোঁতে সোঁতে, সোঁতে সোঁতে ভাসে পানা,
দুখের সাগরে ভাসিছে তেমনি সাজুর হৃদয়খানা |
কোন্ জালুয়ার মাছ সে খেয়েছে নাহি দিয়ে তায় কড়ি,
তারি অভিশাপ ফিরেছে কি তার সকল পরাণ ভরি !
কাহার গাছের জালি কুমড়া সে ছিঁড়েছিল নিজ হাতে,
তাহারি ছোঁয়া কি লাগিয়াছে আজ তার জীবনের পাতে !
তোর দেশে বুঝি দয়া মায়া নাই, হা-রে নিদারুণ বিধি
কোন্ প্রাণে তুই কেড়ে নিয়ে গেলি তার আঁচলের নিধি |
নয়ন হইতে উড়ে গেছে হায় তার নয়নের তোতা,
যে ব্যাথারে সাজু বহিতে পারে না, আজ তা রাখিবে কোথা ?
এমনি করিয়া কাঁদিয়া সাজুর সারাটি দিবস কাটে,
আমেনে কভু একা চেয়ে রয় দীঘল গাঁয়ের বাটে |
কাঁদিয়া কাঁদিয়া সকাল যে কাটে—দুপুর কাটিয়া যায়,
সন্ধ্যার কোলে দীপ নিবু-নিবু সোনালী মেঘের নায়ে |
তবু ত আসে না ! বুকখানি সাজু নখে নখে আজ ধরে,
পারে যদি তবে ছিঁড়িয়া ফেলায় সন্ধ্যার কাল গোরে |
মেয়ের এমন দশা দেখে মার সুখ নাই কোন মনে,
রূপারে তোমরা দেখেছ কি কেউ, শুধায় সে জনে জনে |
গাঁয়ের সবাই অন্ধ হয়েছে, এত লোক হাটে যায়,
কোন দিন কিগো রূপাই তাদের চক্ষে পড়ে নি হায় !
খুব ভাল করে খোঁজে যেন তারে, বুড়ী ভাবে মনে মনে,
রূপাই কোথাও পলাইয়া আছে হয়ত হাটের কোণে |
ভাদ্র মাসেতে পাটের বেপারে কেউ কেউ যায় গাঁরষ
নানা দেশে তারা নাও বেয়ে যায় পদ্মানদীর পার |
জনে জনে বুড়ী বলে দেয়, “দেখ, যখন যখানে যাও,
রূপার তোমরা তালাস লইও, খোদার কছম খাও |”
বর্ষার শেষে আনন্দে তারা ফিরে আসে নায়ে নায়ে,
বুড়ী ডেকে কয়, “রূপারে তোমরা দেখ নাই কোন গাঁয়ে !”
বুড়ীর কথার উত্তর দিতে তারা নাহি পায় ভাষা,
কি করিয়া কহে, আর আসিবে না যে পাখি ছেড়েছে বাসা |
চৈত্র মাসেতে পশ্চিম হতে জন খাটিবার তরে,
মাথাল মাথায় বিদেশী চাষীরা সারা গাঁও ফেলে ভরে |
সাজুর মায়ে যে ডাকিয়া তাদের বসায় বাড়ির কাছে,
তামাক খাইতে হুঁকো এনে দ্যায়, জিজ্ঞাসা করে পাছে ;
“তোমরা কি কেউ রূপাই বলিয়া দেখেছ কোথাও কারে,
নিটল তাহার গঠন গাঠন, কথা কয় ভারে ভারে |”
এমনি করিয়া বলে বুড়ী কথা, তাহারা চাহিয়া রয়,—
রুপারে যে তারা দেখে নাই কোথা, কেমন করিয়া কয় !
যে গাছ ভেঙেছে ঝড়িয়া বাতাসে কেমন করিয়া হায়,
তারি ডালগুলো ভেঙে যাবে তারা কঠোর কুঠার-ঘায় ?
কেউ কেউ বলে, “তাহারি মতন দেখেছিন একজনে,
আমাদের সেই ছোট গাঁয় পথে চলে যেতে আনমনে |”
“আচ্ছা তাহারে সুধাও নি কেহ, কখন আসিবে বাড়ী,
পরদেশে সে যে কোম্ প্রাণে রয় আমার সাজুরে ছাড়ি ?”
গাঙে-পড়া-লোক যেমন করে তৃণটি আঁকড়ি ধরে,
তেমনি করিয়া চেয়ে রয় বুড়ী তাদের মুখের পরে |
মিথ্যা করেই তারা বলে, “সে যে আসিবে ভাদ্র মাসে,
খবর দিয়েছে, বুড়ী যেন আর কাঁদে না তাহার আশে |”
এত যে বেদনা তবু তারি মাঝে একটু আশার কথা,
মুহুর্তে যেন মুছাইয়া দেয় কত বরষের ব্যথা |
মেয়েরে ডাকিয়া বার বার কহে, “ভাবিস না মাগো আর,
বিদেশী চাষীরা কয়ে গেল মোর—খবর পেয়েছে তার |”
মেয়ে শুধু দুটি ভাষা-ভরা আঁখি ফিরাল মায়ের পানে ;
কত ব্যথা তার কমিল ইহাতে সেই তাহা আজ জানে |
গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল, আসিল ভাদ্র মাস,
বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস |
আজকে আসিবে কালকে আসিবে, হায় নিদারুণ আশা,
ভোরের পাখির মতন শুধুই ভোরে ছেড়ে যায় বাসা |
আজকে কত না কথা লয়ে যেন বাজিছে বুকের বীনে,
সেই যে প্রথম দেখিল রূপারে বদনা-বিয়ের দিনে |
তারপর সেই হাট-ফেরা পথে তারে দেখিবার তরে,
ছল করে সাজু দাঁড়ায়ে থাকিত গাঁয়ের পথের পরে |
নানা ছুতো ধরি কত উপহার তারে যে দিত আনি,
সেই সব কথা আজ তার মনে করিতেছে কানাকানি |
সারা নদী ভরি জাল ফেলে জেলে যেমনি করিয়া টানে,
কখন উঠায়, কখন নামায়, যত লয় তার প্রাণে ;
তেমনি সে তার অতীতেরে আজি জালে জালে জড়াইয়া টানে,
যদি কোন কথা আজিকার দিনে কয়ে যায় নব-মানে |
আর যেন তার কোন কাজ নাই, অতীত আঁধার গাঙে,
ডুবারুর মত ডুবিয়া ডুবিয়া মানক মুকুতা মাঙে |
এতটুকু মান, এতটুকু স্নেহ, এতটুকু হাসি খেলা,
তারি সাথে সাজু ভাসাইতে চায় কত না সুখের ভেলা !
হায় অভাগিনী ! সে ত নাহি জানে আগে যারা ছিল ফুল,
তারাই আজিকে ভুজঙ্গ হয়ে দহিছে প্রাণের মূল |
যে বাঁশী শুনিয়া ঘুমাইত সাজু, আজি তার কথা স্মরি,
দহন নাগের গলা জড়াইয়া একা জাগে বিভাবরী |
মনে পড়ে আজ সেই শেষ দিনে রূপার বিদায় বাণী—
“মোর কথা যদি মনে পড়ে তবে পরিও সিঁদুরখানি |”
আরও মনে পড়ে, “দীন দুঃখীর যে ছাড়া ভরসা নাই,
সেই আল্লার চরণে আজিকে তোমারে সঁপিয়া যাই |”
হায় হায় পতি, তুমি ত জান না কি নিঠুর তার মন ;
সাজুর বেদনা সকলেই শোনে, শোনে না সে একজন |
গাছের পাতারা ঝড়ে পরে পথে, পশুপাখি কাঁদে বনে,
পাড়া প্রতিবেশী নিতি নিতি এসে কেঁদে যায় তারি সনে |
হায় রে বধির, তোর কানে আজ যায় না সাজুর কথা ;
কোথা গেলে সাজু জুড়াইবে এই বুক ভরা ব্যথা |
হায় হায় পতি, তুমি ত ছাড়িয়া রয়েছ দূরের দেশে,
আমার জীবন কি করে কাটিবে কয়ে যাও কাছে এসে !
দেখে যাও তুমি দেখে যাও পতি তোমার লাই-এর লতা,
পাতাগুলি তার উনিয়া পড়েছে লয়ে কি দারুণ ব্যথা |
হালের খেতেতে মন টিকিত না আধা কাজ ফেলি বাকি,
আমারে দেখিতে বাড়ি যে আসিতে করি কতরূপ ফাঁকি |
সেই মোরে ছেড়ে কি করে কাটাও দীর্ঘ বরষ মাস,
বলিতে বলিতে ব্যথার দহনে থেমে আসে যেন শ্বাস |
নক্সী-কাঁথাটি বিছাইয়া সাজু সারারাত আঁকে ছবি,
ও যেন তাহার গোপন ব্যথার বিরহিয়া এক কবি |
অনেক সুখের দুঃখের স্মৃতি ওরি বুকে আছে লেখা,
তার জীবনের ইতিহাসখানি কহিছে রেখায় রেখা |
এই কাঁথা যবে আরম্ভ করে তখন সে একদিন,
কৃষাণীর ঘরে আদরিনী মেয়ে সারা গায়ে সুখ-চিন |
স্বামী বসে তার বাঁশী বাজায়েছে, সিলাই করেছে সেজে ;
গুন গুন করে গান কভু রাঙা ঠোঁটেতে উঠেছে বেজে |
সেই কাঁথা আজো মেলিয়াছে সাজু যদিও সেদিন নাই,
সোনার স্বপন আজিকে তাহার পুড়িয়া হয়েছে ছাই |
খুব ধরে ধরে আঁকিল যে সাজু রূপার বিদায় ছবি,
খানিক যাইয়া ফিরে ফিরে আসা, আঁকিল সে তার সবি |
আঁকিল কাঁথায়—আলু থালু বেশে চাহিয়া কৃষাণ-নারী,
দেখিছে তাহার স্বামী তারে যায় জনমের মত ছাড়ি |
আঁকিতে আঁকিতে চোখে জল আসে, চাহনি যে যায় ধুয়ে,
বুকে কর হানি, কাঁথার উপরে পড়িল যে সাজু শুয়ে |
এমনি করিয়া বহুদিন যায়, মানুষে যত না সহে,
তার চেয়ে সাজু অসহ্য ব্যথা আপনার বুকে বহে |
তারপর শেষে এমনি হইল, বেদনার ঘায়ে ঘায়ে,
এমন সোনার তনুখানি তার ভাঙিল ঝরিয়া-বায়ে |
কি যে দারুণ রোগেতে ধরিল, উঠিতে পারে না আর ;
শিয়রে বসিয়া দুঃখিনী জননী মুছিল নয়ন-ধার |
হায় অভাগীর একটি মানিক ! খোদা তুমি ফিরে চাও,
এরে যদি নিবে তার আগে তুমি মায়েরে লইয়া যাও !
ফিরে চাও তুমি আল্লা রসুল ! রহমান তব নাম,
দুনিয়ায় আর কহিবে না কেহ তারে যদি হও বাম !
মেয়ে কয়, “মাগো ! তোমার বেদনা আমি সব জানি,
তার চেয়ে যেগো অসহ্য ব্যথা ভাঙে মোর বুকখানি !
সোনা মা আমার ! চক্ষু মুছিয়া কথা শোন, খাও মাথা,
ঘরের মেঝেয় মেলে ধর দেখি আমার নক্সী-কাঁথা !
একটু আমারে ধর দেখি মাগো, সূঁচ সুতা দাও হাতে,
শেষ ছবি খানা এঁকে দেখি যদি কোন সুখ হয় তাতে |”
পাণ্ডুর হাতে সূঁচ লয়ে সাজু আঁকে খুব ধীরে ধীরে,
আঁকিয়া আঁকিয়া আঁখিজল মুছে দেখে কত ফিরে ফিরে |
কাঁথার উপরে আঁকিল যে সাজু তাহার কবরখানি,
তারি কাছে এক গেঁয়ো রাখালের ছবিখানি দিল টানি ;
রাত আন্ধার কবরের পাশে বসি বিরহী বেশে,
অঝোরে বাজায় বাঁশের বাঁশীটি বুক যায় জলে ভেসে |
মনের মতন আঁকি এই ছবি দেখে বার বার করি,
দুটি পোড়া চোখ বারবার শুধু অশ্রুতে উঠে ভরি |
দেখিয়া দেখিয়া ক্লান্ত হইয়া কহিল মায়েরে ডাকি,
“সোনা মা আমার! সত্যিই যদি তোরে দিয়ে যাই ফাঁকি ;
এই কাঁথাখানি বিছাইয়া দিও আমার কবর পরে,
ভোরের শিশির কাঁদিয়া কাঁদিয়া এরি বুকে যাবে ঝরে !
সে যদি গো আর ফিরে আসে কভু, তার নয়নের জল,
জানি জানি মোর কবরের মাটি ভিজাইবে অবিরল |
হয়ত আমার কবরের ঘুম ভেঙে যাবে মাগো তাতে,
হয়ত তাহারে কাঁদাইতে আমি জাগিব অনেক রাতে |
এ ব্যথা সে মাগো কেমনে সহিবে, বোলো তারে ভালো করে,
তার আঁখি জল ফেলে যেন এই নক্সী-কাঁথার পরে |
মোর যত ব্যথা, মোর যত কাঁদা এরি বুকে লিখে যাই,
আমি গেলে মোর কবরের গায়ে এরে মেলে দিও তাই !
মোর ব্যথা সাথে তার ব্যথাখানি দেখে যেন মিল করে,
জনমের মত সব কাঁদা আমি লিখে গেনু কাঁথা ভরে |”
বলিতে বলিতে আর যে পারে না, জড়াইয়া আসে কথা,
অচেতন হয়ে পড়িল যে সাজু লয়ে কি দারুণ ব্যথা |
কানের কাছেতে মুখ লয়ে মাতা ডাক ছাড়ি কেঁদে কয়,
“সাজু সাজু ! তুই মোরে ছেড়ে যাবি এই তোর মনে লয় ?”
“আল্লা রসুল ! আল্লা রসুল !” বুড়ী বলে হাত তুলে,
“দীন দুঃখীর শেষ কান্না এ, আজিকে যেয়ো না ভুলে !”
দুই হাতে বুড়ী জড়াইতে চায় আঁধার রাতের কালি,
উতলা বাতাস ধীরে ধীরে বয়ে যায়, সব খালি ! সব খালি !!
“সোনা সাজুরে, মুখ তুলে চাও, বলে যাও আজ মোরে,
তোমারে ছাড়িয়া কি করে যে দিন কাটিবে একেলা ঘরে !”
দুখিনী মায়ের কান্নায় আজি খোদার আরশ কাঁপে,
রাতের আঁধার জড়াজড়ি করে উতল হাওয়ার দাপে |
******************
জালুয়া = জেলে
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/816
|
3268
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ধীরে সন্ধ্যা আসে
|
চিন্তামূলক
|
ধীরে সন্ধ্যা আসে, একে একে গ্রন্থি যত যায় স্খলি
প্রহরের কর্মজাল হতে। দিন দিল জলাঞ্জলি
খুলি পশ্চিমের সিংহদ্বার
সোনার ঐশ্বর্য তার
অন্ধকার আলোকের সাগরসংগমে।
দূর প্রভাতের পানে নত হয়ে নিঃশব্দে প্রণমে।
চক্ষু তার মুদে আসে,এসেছে সময়
গভীর ধানের তলে আপনার বাহ্য পরিচয়
করিতে মগন।
নক্ষত্রের শান্তিক্ষেত্র অসীম গগন
যেথা ঢেকে রেখে দেয় দিনশ্রীর অরূপ সত্তারে,
সেথায় করিতে লাভ সত্য আপনারে
খেয়া দেয় রাত্রি পারাবারে। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dhire-sondhya-ase/
|
3975
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সে যে পাশে এসে বসেছিল
|
প্রেমমূলক
|
সে যে পাশে এসে বসেছিল
তবু জাগি নি।
কী ঘুম তোরে পেয়েছিল
হতভাগিনী।
এসেছিল নীরব রাতে
বীণাখানি ছিল হাতে,
স্বপনমাঝে বাজিয়ে গেল
গভীর রাগিণী। জেগে দেখি দখিন-হাওয়া
পাগল করিয়া
গন্ধ তাহার ভেসে বেড়ায়
আঁধার ভরিয়া।
কেন আমার রজনী যায়–
কাছে পেয়ে কাছে না পায়
কেন গো তার মালার পরশ
বুকে লাগি নি।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/515.html
|
617
|
জয় গোস্বামী
|
আজ
|
রূপক
|
আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো : ‘এই জীবন নিয়ে
তুমি কি করেছো এতদিন ?’— তাহলে আমি বলবোএকদিন বমি করেছিলাম, একদিন ঢোঁক
গিলেছিলাম, একদিন আমি ছোঁয়া মাত্র জল
রুপান্তরিত হয়েছিল দুধে, একদিন আমাকে দেখেই
এক অপ্সরার মাথা ঘুরে গিয়েছিল একদিন
আমাকে না বলেই আমার দুটো হাত
কদিনের জন্য উড়ে গেছিল হাওয়ায়একদিন মদ হিসেবে ঢুকেছিলাম এক
জবরদস্ত মাতালের পেটে, একদিন সম্পূর্ণ
অন্যভাবে বেরিয়ে এসেছিলাম এক
রূপসীর শোকাশ্রুরুপে, আর তৎক্ষণাৎ
আহা উহু আহা উহু করতে করতে আমাকে
শুষে নিয়েছিল বহুমূল্য মসলিন
একদিন গায়ে হাত তুলেছিলাম
একদিন পা তুলেছিলাম
একদিন জিভ ভেঙিয়েছিলাম
একদিন সাবান মেখেছিলাম
একদিন সাবান মাখিয়েছিলাম যদি
বিশ্বাস না হয় তো জিগ্যেস করুন আমার মৃত্যুকেএকদিন কা কা করে ডেকে বেরিয়েছিলাম সারাবেলা
একদিন তাড়া করেছিলাম স্বয়ং কাকতাড়ুয়াকেই
একদিন শুয়োর পুষেছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ একদিন ছাগল
একদিন দোদোমা ফাটিয়েছিলাম, একদিন চকলেট
একদিন বাঁশি বাজিয়েছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ একদিন রাধাকেও
একদিন আমার মুখ আমি আচ্ছা ক’রে গুঁজে দিয়েছিলাম
একজনের কোলে আর আমার বাকি শরীরটা তখন
কিনে নিয়েছিল অন্য কেউ কে তা আমি এখনো জানি না যদি
বিশ্বাস না হয় তো জিগ্যেস করো গিয়ে তোমার…একদিন আমার শরীর ছিল তরুণ পাতায় ভরা
আর আমার আঙুল ছিল লম্বা সাদা বকফুল
আমার চুল ছিল একঝাঁক ধূসর রঙের মেঘ
হাওয়া এলেই যেখানে খুশি উড়ে যাবে, কেবল সেইজন্য—
একদিন মাঠের পর মাঠে আমি ছিলাম বিছিয়ে রাখা ঘাস
তুমি এসে শরীর ঢেলে দেবে, কেবল সেইজন্য—
আর সমস্ত নিষেধের বাইরে ছিল
আমার দুটো চোখ
এ নদী থেকে ও নদী থেকে সেই সে নদীতে
কেবলই ভেসে বেড়াতো তারাসেই রকমই কোনো নদীর উপর, রোগা একটা সাঁকোর মতো
একদিন আমি পেতে রেখেছিলাম আমার সাষ্টাঙ্গ শরীর
যাতে এপার থেকে ওপারে চলে যেতে পারে লোক
কোনো বাধা-নিষেধ ছাড়াই
যাতে ওপার থেকে এপারে চলে আসতে পারে লোক
কোনো বাধা-নিষেধ ছাড়াইসেই সাঁকোর উপর দিয়ে একদিন এপার থেকে
ওপারে চলে গিয়েছিল আসগর আলি মণ্ডলরা বাবুল ইসলামরা
সেই সাঁকোর উপর দিয়ে একদিন ওপার থেকে
এপারে চলে এসেছিল তোমার নতুন শাড়ি-পরা মা,
টেপ-জামা-পরা আমার সান্তুমাসীএকদিন সংবিধান লিখতে লিখতে একটু
তন্দ্রা এসে গিয়েছিল আমার দুপুরের ভাত-ঘুম মতো এসেছিল একটু
আর সেই ফাঁকে কারা সব এসে ইচ্ছে মতো
কাটাকুটি করে গিয়েছে দেহি পদপল্লব মুদারম্একদিন একদম ন্যাংটো হয়ে
ছুটতে ছুটতে চৌরাস্তার মোড়ে এসে আমি পেশ করেছিলাম
বাজেট
একদিন হাঁ করেছিলাম একদিন হাঁ বন্ধ করেছিলাম
কিন্তু আমার হা-এর মধ্যে কোনো খাবার ছিল না
কিন্তু আমার না-এর মধ্যে কোনো খাবার ছিল নাএকদিন দুই গাল বেয়ে ঝরঝর ক’রে রক্তগড়ানো অবস্থায়
জলে কাদায় ধানক্ষেত পাটক্ষেতের মধ্যে
হাতড়ে হাতড়ে আমি খুঁজে ফিরেছিলাম আমার উপড়ে নেওয়া চোখএকদিন পিঠে ছরা-গাঁথা অবস্থায়
রক্ত কাশতে কাশতে আমি আছড়ে এসে পরেছিলাম দাওয়ায়
আর দলবেঁধে, লণ্ঠন উঁচু করে, আমায় দেখতে এসেছিল গ্রামের লোকএকদিন দাউদাউ ক’রে জ্বলতে থাকা ঝোপঝাড় মধ্য থেকে
সারা গায়ে আগুন নিয়ে আমি ছুটে বেরিয়েছিলাম আর
লাফ দিয়েছিলাম পচা পুকুরে
পরদিন কাগজে সেই খবর দেখে আঁতকে উঠেছিলাম
উত্তেজিত হয়েছিলাম। অশ্রুপাত করেছিলাম, লোক জড়ো করেছিলাম,
মাথা ঘামিয়েছিলাম আর সমবেত সেই মাথার ঘাম
ধরে রেখেছিলাম দিস্তে দিস্তে দলিলে—যাতে
পরবর্তী কেউ এসে গবেষণা শুরু করতে পারে যে
এই দলিলগুলোয় আগুন দিলে ক’জনকে পুড়িয়ে মারা যায়মারো মারো মারো
স্ত্রীলোক ও পুরুষলোকের জন্যে আয়ত্ত করো দু ধরনের প্রযুক্তি
মারো মারো মারো
যতক্ষণ না মুখ দিয়ে বমি করে দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড
মারো মারো মারো
যতক্ষণ না পেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে পেটের বাচ্চা
মারো মারো মারো মারো মারো-ও-ও-ওএইখানে এমন এক আর্তনাদ ব্যবহার করা দরকার
যা কানে লাগলে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে মাথার খুলি
এইখানে এমন এক সঙ্গম ব্যাবহার করা দরকার
যার ফলে অর্ধেক শরীর চিরকালের মতো পুঁতে যাবে ভূগর্ভে আর
দ্রুত কয়লা হয়ে যাবে
এইখানে এমন এক থুতু নিক্ষেপ করা দরকার
যে-থুতু মুখ থেকে বেরোনো মাত্রই বিদীর্ণ হবে অতিকায় নক্ষত্ররুপে
এইখানে এমন এক গান ব্যাবহার করা দরকার যা গাইবার সময়
নায়ক-নায়িকা শূনে উঠে গিয়ে ভাসতে থাকবে আর তাদেরহাত পা মুণ্ডু ও জননেন্দিয়গুলি আলাদা আলাদা হয়ে আসবে
ও প্রতিটি প্রতিটির জন্যে কাঁদবে প্রতিটি প্রতিটিকে আদর করবে ও
একে অপরের নিয়ে কী করবে ভেবে পাবে না, শেষে
পূর্বের অখণ্ড চেহারায় ফিরে যাবে
এইখানে এমন এক চুম্বন-চেষ্টা প্রয়োগ করা দরকার, যার ফলে
‘মারো’ থেকে ‘ও’ অক্ষর
‘বাচাও’ থেকে ‘ও’ অক্ষর
তীব্র এক অভিকর্ষজ টানে ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে
পরস্পরের দিকে ছুটে যাবে এবং এক হয়ে যেতে চাইবে
আর আবহমানকালের জন্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুই প্রেমিক-প্রেমিকার মুখ
আকাশের দিকে উত্তোলিত তাদের গোল হয়ে থাকা হাঁ
একটি অনন্ত ‘ও’ ধ্বনিতে স্তব্ধ হয়ে থাকবেআজ যদি আমায় জিগ্যেস করো শত শত লাইন ধ’রে তুমি
মিথ্যে লিখে গিয়েছো কেন ?
যদি জিগ্যেস করো একজন কবির কাজ কী হওয়া উচিত
কেন তুমি এখনো শেখোনি ?—তাহলে
আমি শুধু বলবো একটি কণা,
বলবো, বালির একটি কণা থেকে আমি জন্মেছিলাম, জন্মেছিলাম
লবণের একটি দানা থেকে—আর অজানা অচেনা এক বৃষ্টিবিন্দু
কত উঁচু সেই গাছের পাতা থেকেও ঠিক দেখতে পেয়েছিল আমাকে
আর ঝরেও পড়েছিল আমার পাশে—এর বেশি আমি আর
কিচ্ছু জানি না……আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো কোন্ ব্যূহ কোন্ অন্ধকুপ
রাষ্টের কোন্ কোন্ গোপন প্রণালীর ভেতর তুমি ঘুরে
বেরিয়েছো তুমি বেড়াতে গিয়েছো কোন্ অস্ত্রাগারে তুমি চা খেয়েছো এক
কাপ
তুমি মাথা দিয়ে ঢুঁসিয়েছো কোন্ হোর্ডিং কোন্ বিজ্ঞাপন কোন্ ফ্লাইওভার
তোমার পায়ের কাছে এসে মুখ রেখেছে কোন্ হরিণ
তোমার কাছে গলা মুচড়ে দেওয়ার আবেদন এনেছে কোন্
মরালতাহলে আমি বলবো
মেঘের উপর দিয়ে মেঘের উপর দিয়ে মেঘের উপর
আমি কেবল উড়েই বেড়াইনি
হাজার হাজার বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় আমি
লাফিয়ে লাফিয়ে নেচে বেরিয়েছি মাঠে আর জনপদেআজ যদি আমায় জিগ্যেস করো :
তুমি একই বৃন্তে ক’টি কুসুম
তুমি শাণ্ডিল্য না ভরদ্বাজ
তুমি দুর্লভ না কৈবর্ত
তুমি ব্যাটারি না হাত-বাক্স
তুমি পেঁপে গাছ না আতা গাছ
তুমি চটি পায়ে না জুতো পায়ে
তুমি চণ্ডাল না মোছরমান
তুমি মরা শিলা না জ্যান্ত শিলাতা হলে আমি বলবো সেই রাত্রির কথা, যে-রাত্রে
শান্ত ঘাসের মাঠ ফুঁড়ে নিঃশব্দে নিঃশব্দে
চতুর্দিকে মাটি পাথর ছিটকোতে ছিটকোতে তীব্রগতিতে আমি উড়তে
দেখেছিলাম
এক কুতুন মিনার, ঘূর্ণ্যমান কুতুব মিনার
কয়েক পলকে শূনে মিলিয়ে যাবার আগে
আকাশের গায়ে তার ধাবমান আগুনের পুচ্ছ থেকে আমি সেদিন
দুদিকে দু’হাত ভাসিয়ে দিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিলাম ফেনায় তোলপাড়
এই
সময় গর্ভে……আজ আমি দূরত্বের শেষ সমুদ্রে আর জলের নিচে লোহার চাকা পাক খায়
আজ আমি সমুদ্রের সেই সূচনায় আর জলের নিচে লোহার চাকা পাক খায়
যা-কিছু শরীর অশরীর তা-ই আজ আমার মধ্যে জেগে উঠছে প্রবল প্রাণ
আজ আমি দুই পাখনায় কাটতে কাটতে চলেছি সময়
অতীত আর ভবিষ্যৎ দুই দিকে কাটতে কাটতে চলেছি সময় এক অতিকায়
মাছ
আমার ল্যাজের ঝাপটায় ঝাপটায় গড়ে উঠছে জলস্তম্ভ ভেঙে পরছে
জলস্তম্ভ
আমার নাক দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া ফোয়ারায় উচ্ছ্রিত হয়ে উঠছে জ্বলন্ত
মেঘপুঞ্জ
আমার নাসার উপরকার খড়্গে বাঁধা রয়েছে একটি রশি
যার অপরপ্রান্ত উঠে গেছে অনেক অনেক উপরে
এই পৃথিবী ও সৌরলোকের আকর্ষণসীমার বাইরে
যেখানে প্রতি মুহূর্তে ফুলে ফুলে উঠছে অন্ধকার ঈথার
সেইখানে, একটি সৌরদ্বীপ থেকে আরেক সৌরদ্বীপের মধ্যপথে
দুলতে দুলতে, ভাসতে ভাসতে চলেছে একটি আগ্নেয় নৌকা……এর বেশি আর কিছুই আমি বলতে পারবো নাকবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুনআজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো : ‘এই জীবন নিয়ে
তুমি কি করেছো এতদিন ?’— তাহলে আমি বলবোএকদিন বমি করেছিলাম, একদিন ঢোঁক
গিলেছিলাম, একদিন আমি ছোঁয়া মাত্র জল
রুপান্তরিত হয়েছিল দুধে, একদিন আমাকে দেখেই
এক অপ্সরার মাথা ঘুরে গিয়েছিল একদিন
আমাকে না বলেই আমার দুটো হাত
কদিনের জন্য উড়ে গেছিল হাওয়ায়একদিন মদ হিসেবে ঢুকেছিলাম এক
জবরদস্ত মাতালের পেটে, একদিন সম্পূর্ণ
অন্যভাবে বেরিয়ে এসেছিলাম এক
রূপসীর শোকাশ্রুরুপে, আর তৎক্ষণাৎ
আহা উহু আহা উহু করতে করতে আমাকে
শুষে নিয়েছিল বহুমূল্য মসলিন
একদিন গায়ে হাত তুলেছিলাম
একদিন পা তুলেছিলাম
একদিন জিভ ভেঙিয়েছিলাম
একদিন সাবান মেখেছিলাম
একদিন সাবান মাখিয়েছিলাম যদি
বিশ্বাস না হয় তো জিগ্যেস করুন আমার মৃত্যুকেএকদিন কা কা করে ডেকে বেরিয়েছিলাম সারাবেলা
একদিন তাড়া করেছিলাম স্বয়ং কাকতাড়ুয়াকেই
একদিন শুয়োর পুষেছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ একদিন ছাগল
একদিন দোদোমা ফাটিয়েছিলাম, একদিন চকলেট
একদিন বাঁশি বাজিয়েছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ একদিন রাধাকেও
একদিন আমার মুখ আমি আচ্ছা ক’রে গুঁজে দিয়েছিলাম
একজনের কোলে আর আমার বাকি শরীরটা তখন
কিনে নিয়েছিল অন্য কেউ কে তা আমি এখনো জানি না যদি
বিশ্বাস না হয় তো জিগ্যেস করো গিয়ে তোমার…একদিন আমার শরীর ছিল তরুণ পাতায় ভরা
আর আমার আঙুল ছিল লম্বা সাদা বকফুল
আমার চুল ছিল একঝাঁক ধূসর রঙের মেঘ
হাওয়া এলেই যেখানে খুশি উড়ে যাবে, কেবল সেইজন্য—
একদিন মাঠের পর মাঠে আমি ছিলাম বিছিয়ে রাখা ঘাস
তুমি এসে শরীর ঢেলে দেবে, কেবল সেইজন্য—
আর সমস্ত নিষেধের বাইরে ছিল
আমার দুটো চোখ
এ নদী থেকে ও নদী থেকে সেই সে নদীতে
কেবলই ভেসে বেড়াতো তারাসেই রকমই কোনো নদীর উপর, রোগা একটা সাঁকোর মতো
একদিন আমি পেতে রেখেছিলাম আমার সাষ্টাঙ্গ শরীর
যাতে এপার থেকে ওপারে চলে যেতে পারে লোক
কোনো বাধা-নিষেধ ছাড়াই
যাতে ওপার থেকে এপারে চলে আসতে পারে লোক
কোনো বাধা-নিষেধ ছাড়াইসেই সাঁকোর উপর দিয়ে একদিন এপার থেকে
ওপারে চলে গিয়েছিল আসগর আলি মণ্ডলরা বাবুল ইসলামরা
সেই সাঁকোর উপর দিয়ে একদিন ওপার থেকে
এপারে চলে এসেছিল তোমার নতুন শাড়ি-পরা মা,
টেপ-জামা-পরা আমার সান্তুমাসীএকদিন সংবিধান লিখতে লিখতে একটু
তন্দ্রা এসে গিয়েছিল আমার দুপুরের ভাত-ঘুম মতো এসেছিল একটু
আর সেই ফাঁকে কারা সব এসে ইচ্ছে মতো
কাটাকুটি করে গিয়েছে দেহি পদপল্লব মুদারম্একদিন একদম ন্যাংটো হয়ে
ছুটতে ছুটতে চৌরাস্তার মোড়ে এসে আমি পেশ করেছিলাম
বাজেট
একদিন হাঁ করেছিলাম একদিন হাঁ বন্ধ করেছিলাম
কিন্তু আমার হা-এর মধ্যে কোনো খাবার ছিল না
কিন্তু আমার না-এর মধ্যে কোনো খাবার ছিল নাএকদিন দুই গাল বেয়ে ঝরঝর ক’রে রক্তগড়ানো অবস্থায়
জলে কাদায় ধানক্ষেত পাটক্ষেতের মধ্যে
হাতড়ে হাতড়ে আমি খুঁজে ফিরেছিলাম আমার উপড়ে নেওয়া চোখএকদিন পিঠে ছরা-গাঁথা অবস্থায়
রক্ত কাশতে কাশতে আমি আছড়ে এসে পরেছিলাম দাওয়ায়
আর দলবেঁধে, লণ্ঠন উঁচু করে, আমায় দেখতে এসেছিল গ্রামের লোকএকদিন দাউদাউ ক’রে জ্বলতে থাকা ঝোপঝাড় মধ্য থেকে
সারা গায়ে আগুন নিয়ে আমি ছুটে বেরিয়েছিলাম আর
লাফ দিয়েছিলাম পচা পুকুরে
পরদিন কাগজে সেই খবর দেখে আঁতকে উঠেছিলাম
উত্তেজিত হয়েছিলাম। অশ্রুপাত করেছিলাম, লোক জড়ো করেছিলাম,
মাথা ঘামিয়েছিলাম আর সমবেত সেই মাথার ঘাম
ধরে রেখেছিলাম দিস্তে দিস্তে দলিলে—যাতে
পরবর্তী কেউ এসে গবেষণা শুরু করতে পারে যে
এই দলিলগুলোয় আগুন দিলে ক’জনকে পুড়িয়ে মারা যায়মারো মারো মারো
স্ত্রীলোক ও পুরুষলোকের জন্যে আয়ত্ত করো দু ধরনের প্রযুক্তি
মারো মারো মারো
যতক্ষণ না মুখ দিয়ে বমি করে দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড
মারো মারো মারো
যতক্ষণ না পেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে পেটের বাচ্চা
মারো মারো মারো মারো মারো-ও-ও-ওএইখানে এমন এক আর্তনাদ ব্যবহার করা দরকার
যা কানে লাগলে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে মাথার খুলি
এইখানে এমন এক সঙ্গম ব্যাবহার করা দরকার
যার ফলে অর্ধেক শরীর চিরকালের মতো পুঁতে যাবে ভূগর্ভে আর
দ্রুত কয়লা হয়ে যাবে
এইখানে এমন এক থুতু নিক্ষেপ করা দরকার
যে-থুতু মুখ থেকে বেরোনো মাত্রই বিদীর্ণ হবে অতিকায় নক্ষত্ররুপে
এইখানে এমন এক গান ব্যাবহার করা দরকার যা গাইবার সময়
নায়ক-নায়িকা শূনে উঠে গিয়ে ভাসতে থাকবে আর তাদেরহাত পা মুণ্ডু ও জননেন্দিয়গুলি আলাদা আলাদা হয়ে আসবে
ও প্রতিটি প্রতিটির জন্যে কাঁদবে প্রতিটি প্রতিটিকে আদর করবে ও
একে অপরের নিয়ে কী করবে ভেবে পাবে না, শেষে
পূর্বের অখণ্ড চেহারায় ফিরে যাবে
এইখানে এমন এক চুম্বন-চেষ্টা প্রয়োগ করা দরকার, যার ফলে
‘মারো’ থেকে ‘ও’ অক্ষর
‘বাচাও’ থেকে ‘ও’ অক্ষর
তীব্র এক অভিকর্ষজ টানে ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে
পরস্পরের দিকে ছুটে যাবে এবং এক হয়ে যেতে চাইবে
আর আবহমানকালের জন্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুই প্রেমিক-প্রেমিকার মুখ
আকাশের দিকে উত্তোলিত তাদের গোল হয়ে থাকা হাঁ
একটি অনন্ত ‘ও’ ধ্বনিতে স্তব্ধ হয়ে থাকবেআজ যদি আমায় জিগ্যেস করো শত শত লাইন ধ’রে তুমি
মিথ্যে লিখে গিয়েছো কেন ?
যদি জিগ্যেস করো একজন কবির কাজ কী হওয়া উচিত
কেন তুমি এখনো শেখোনি ?—তাহলে
আমি শুধু বলবো একটি কণা,
বলবো, বালির একটি কণা থেকে আমি জন্মেছিলাম, জন্মেছিলাম
লবণের একটি দানা থেকে—আর অজানা অচেনা এক বৃষ্টিবিন্দু
কত উঁচু সেই গাছের পাতা থেকেও ঠিক দেখতে পেয়েছিল আমাকে
আর ঝরেও পড়েছিল আমার পাশে—এর বেশি আমি আর
কিচ্ছু জানি না……আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো কোন্ ব্যূহ কোন্ অন্ধকুপ
রাষ্টের কোন্ কোন্ গোপন প্রণালীর ভেতর তুমি ঘুরে
বেরিয়েছো তুমি বেড়াতে গিয়েছো কোন্ অস্ত্রাগারে তুমি চা খেয়েছো এক
কাপ
তুমি মাথা দিয়ে ঢুঁসিয়েছো কোন্ হোর্ডিং কোন্ বিজ্ঞাপন কোন্ ফ্লাইওভার
তোমার পায়ের কাছে এসে মুখ রেখেছে কোন্ হরিণ
তোমার কাছে গলা মুচড়ে দেওয়ার আবেদন এনেছে কোন্
মরালতাহলে আমি বলবো
মেঘের উপর দিয়ে মেঘের উপর দিয়ে মেঘের উপর
আমি কেবল উড়েই বেড়াইনি
হাজার হাজার বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় আমি
লাফিয়ে লাফিয়ে নেচে বেরিয়েছি মাঠে আর জনপদেআজ যদি আমায় জিগ্যেস করো :
তুমি একই বৃন্তে ক’টি কুসুম
তুমি শাণ্ডিল্য না ভরদ্বাজ
তুমি দুর্লভ না কৈবর্ত
তুমি ব্যাটারি না হাত-বাক্স
তুমি পেঁপে গাছ না আতা গাছ
তুমি চটি পায়ে না জুতো পায়ে
তুমি চণ্ডাল না মোছরমান
তুমি মরা শিলা না জ্যান্ত শিলাতা হলে আমি বলবো সেই রাত্রির কথা, যে-রাত্রে
শান্ত ঘাসের মাঠ ফুঁড়ে নিঃশব্দে নিঃশব্দে
চতুর্দিকে মাটি পাথর ছিটকোতে ছিটকোতে তীব্রগতিতে আমি উড়তে
দেখেছিলাম
এক কুতুন মিনার, ঘূর্ণ্যমান কুতুব মিনার
কয়েক পলকে শূনে মিলিয়ে যাবার আগে
আকাশের গায়ে তার ধাবমান আগুনের পুচ্ছ থেকে আমি সেদিন
দুদিকে দু’হাত ভাসিয়ে দিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিলাম ফেনায় তোলপাড়
এই
সময় গর্ভে……আজ আমি দূরত্বের শেষ সমুদ্রে আর জলের নিচে লোহার চাকা পাক খায়
আজ আমি সমুদ্রের সেই সূচনায় আর জলের নিচে লোহার চাকা পাক খায়
যা-কিছু শরীর অশরীর তা-ই আজ আমার মধ্যে জেগে উঠছে প্রবল প্রাণ
আজ আমি দুই পাখনায় কাটতে কাটতে চলেছি সময়
অতীত আর ভবিষ্যৎ দুই দিকে কাটতে কাটতে চলেছি সময় এক অতিকায়
মাছ
আমার ল্যাজের ঝাপটায় ঝাপটায় গড়ে উঠছে জলস্তম্ভ ভেঙে পরছে
জলস্তম্ভ
আমার নাক দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া ফোয়ারায় উচ্ছ্রিত হয়ে উঠছে জ্বলন্ত
মেঘপুঞ্জ
আমার নাসার উপরকার খড়্গে বাঁধা রয়েছে একটি রশি
যার অপরপ্রান্ত উঠে গেছে অনেক অনেক উপরে
এই পৃথিবী ও সৌরলোকের আকর্ষণসীমার বাইরে
যেখানে প্রতি মুহূর্তে ফুলে ফুলে উঠছে অন্ধকার ঈথার
সেইখানে, একটি সৌরদ্বীপ থেকে আরেক সৌরদ্বীপের মধ্যপথে
দুলতে দুলতে, ভাসতে ভাসতে চলেছে একটি আগ্নেয় নৌকা……এর বেশি আর কিছুই আমি বলতে পারবো নাকবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%9c-%e0%a6%af%e0%a6%a6%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%b8-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8b-joy-goswami/#respond
|
115
|
আল মাহমুদ
|
আমি আর আসবো না বলে
|
চিন্তামূলক
|
আর আসবো না বলে দুধের ওপরে ভাসা সর
চামোচে নিংড়ে নিয়ে চেয়ে আছি। বাইরে বৃষ্টির ধোঁয়া
যেন সাদা স্বপ্নের চাদর
বিছিয়েছে পৃথিবীতে।
কেন এতো বুক দোলে? আমি আর আসবো না বলে?
যদিও কাঁপছে হাত তবু ঠিক অভ্যেসের বশে
লিখছি অসংখ্য নাম চেনাজানা
সমস্ত কিছুর।
প্রতিটি নামের শেষে, আসবো না।
পাখি, আমি আসবো না।
নদী আমি আসবো না।
নারী, আর আসবো না, বোন।
আর আসবো না বলে মিছিলের প্রথম পতাকা
তুলে নিই হাতে।
আর আসবো না বলে
সংগঠিত করে তুলি মানুষের ভিতরে মানুষ।
কথার ভেতরে কথা গেঁথে দেওয়া, কেন?
আসবো না বলেই।
বুকের মধ্যে বুক ধরে রাখা, কেন?
আর আসবো না বলেই।
আজ অতৃপ্তির পাশে বিদায়ের বিষণ্ণ রুমালে
কে তুলে অক্ষর কালো, ‘আসবো না’
সুখ, আমি আসবো না।
দুঃখ, আমি আসবো না।
প্রেম, হে কাম, হে কবিতা আমার
তোমরা কি মাইল পোস্ট না ফেরার পথের ওপর?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3715.html
|
418
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বাদল-রাতের পাখি
|
প্রেমমূলক
|
বাদল-রাতের পাখি!
কবে পোহায়েছে বাদলের রাতি, তবে কেন থাকি থাকি
কাঁদিছ আজিও ‘বউ কথা কও’শেফালির বনে একা,
শাওনে যাহারে পেলে না, তারে কি ভাদরে পাইবে দেখা?…
তুমি কাঁদিয়াছ ‘বউ কথা কও’সে-কাঁদনে তব সাথে
ভাঙিয়া পড়েছে আকাশের মেঘ গহিন শাওন-রাতে।
বন্ধু, বরষা-রাতি
কেঁদেছে যে সাথে সে ছিল কেবল বর্ষা-রাতেরই সাথে!
আকাশের জল-ভারাতুর আঁখি আজি হাসি-উজ্জ্বল ;
তেরছ-চাহনি জাদু হানে আজ, ভাবে তনু ঢল ঢল!
কমল-দিঘিতে কমল-মুখীরা অধরে হিঙ্গুল মাখে,
আলুথালু বেশ – ভ্রমরে সোহাগে পর্ণ-আঁচলে ঢাকে।
শিউলি-তলায় কুড়াইতে ফুল আজিকে কিশোরী মেয়ে
অকারণ লাজে চমকিয়া ওঠে আপনার পানে চেয়ে।
শালুকের কুঁড়ি গুঁজিছে খোঁপায় আবেশে বিধুরা বধূ,
মুকুলি পুষ্প কুমারীর ঠোঁটে ভরে পুষ্পল মধু।
আজি আনন্দ-দিনে
পাবে কি বন্ধু বধূরে তোমার, হাসি দেখে লবে চিনে?
সরসীর তীরে আম্রের বনে আজও যবে ওঠ ডাকি
বাতায়নে কেহ বলে কি, “কে তুমি বাদল-রাতের পাখি!
আজও বিনিদ্র জাগে কি সে রাতি তার বন্ধুর লাগি?
যদি সে ঘুমায় – তব গান শুনি চকিতে ওঠে কি জাগি?
ভিন-দেশি পাখি! আজিও স্বপন ভাঙিল না হায় তব,
তাহার আকাশে আজ মেঘ নাই – উঠিয়াছে চাঁদ নব!
ভরেছে শূন্য উপবন তার আজি নব নব ফুলে,
সে কি ফিরে চায় বাজিতেছে হায় বাঁশি যার নদীকূলে?
বাদলা-রাতের পাখি!
উড়ে চলো – যথা আজও ঝরে জল, নাহিকো ফুলের ফাঁকি! (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/badol-rater-pakhi/
|
3070
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জড়িয়ে গেছে সরু মোটা দুটো তারে
|
ভক্তিমূলক
|
জড়িয়ে গেছে সরু মোটা
দুটো তারে
জীবনবীণা ঠিক সুরে তাই
বাজে না রে।
এই বেসুরো জটিলতায়
পরান আমার মরে ব্যথায়,
হঠাৎ আমার গান থেমে যায়
বারে বারে।
জীবনবীণা ঠিক সুরে আর
বাজে না রে।এই বেদনা বইতে আমি
পারি না যে,
তোমার সভার পথে এসে
মরি লাজে।
তোমার যারা গুণী আছে
বসতে নারি তাদের কাছে,
দাঁড়িয়ে থাকি সবার পাছে
বাহির-দ্বারে।
জীবনবীণা ঠিক সুরে আর
বাজে না রে।বোলপুর, ৩ শ্রাবণ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/joriye-geche-soru-mota-duto-tare/
|
1626
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
নিদ্রিত, স্বদেশে
|
স্বদেশমূলক
|
পেটে-আসছে-মুখে-আসছে না, সেই কথাটা, সেই
হঠাৎ-শুনতে-পাওয়া কথাটা আমি
ভুলে গিয়েছি।
যে-কথা অস্ফুট স্বরে তুমি একদিন
যে-কথা অর্ধেক রাত্রে তুমি একদিন
সে-কথা স্বপ্নের মধ্যে তুমি একদিন বলেছিলে।
স্বপ্নের মধ্যে কেউ যখন কথা বলে,
তখন তাকে খুব অচেনা মানুষ বলে মনে হয়।
তখন তার নিদ্রিত মুখের দিকে তাকালে আমার মনে হয়,
অনেক বড়-বড় সমুদ্র পেরিয়ে, তারপর
অনেক উঁচু-উঁচু পাহাড় ডিঙিয়ে, তারপর
সুদীর্ঘ প্রবাস-জীবনের শেষে সে তার স্বদেশে ফিরেছে।
একমাথা রুক্ষ চুল, পায়ে ধুলো,
ঘুমের মধ্যে সে তার স্বদেশে ফিরেছে।
ঘুমের মধ্যে সে তার আপন ভাষায় কথা বলছে।
প্রিয় গাভীটির গলকম্বলে হাত বুলোতে-বুলোতে
খুব গভীর স্বরে সে তার বাড়ির লোকজনদের জিজ্ঞেস করছে,
সে যখন বিদেশে ছিল, তখন তার
আঙুল-বাগানোর পরিচর্যা ঠিকমতো হত কি না, তখন তার
খেতের আগাছা ঠিকমতো নিড়িয়ে দেওয়া হত কি না, তখন তার
গ্রামে কোনও বড়-রকমের উৎসব হয়েছিল কি না।
ঘুমের মধ্যে কি এসব প্রশ্ন করেছিলে তুমি?
আমার মনে নেই।
পেটে-আসছে-মুখে-আসছে না, সেই কথাটা, সেই
হঠাৎ-শুনতে পাওয়া কথাটা আমি
ভুলে গিয়েছি।
যে-কথা অস্ফুট স্বরে তুমি একদিন
যে-কথা অর্ধেক রাত্রে তুমি একদিন
যে-কথা স্বপ্নের মধ্যে তুমি একদিন বলেছিলে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1659
|
6010
|
হেলাল হাফিজ
|
অচল প্রেমের পদ্য - ১২
|
প্রেমমূলক
|
নখের নিচেরেখেছিলাম
তোমার জন্য প্রেম,
কাটতে কাটতেসব খোয়ালাম
বললে না তো, - ‘শ্যাম,
এই তো আমি তোমার ভূমি
ভালোবাসার খালা,
আঙুল ধরোলাঙ্গল চষো
পরাও প্রণয় মালা’।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/213
|
4186
|
লালন শাহ
|
মন তুই করলি একি ইতরপনা
|
চিন্তামূলক
|
মন তুই করলি একি ইতরপনা।
দুগ্ধেতে যেমন রে তোর মিশলো চোনা।।শুদ্ধ রাগে থাকতে যদি
হাতে পেতে অটলনিধি
বলি মন তাই নিরবধি
বাগ মানে না।।কী বৈদিকে ঘিরলো হৃদয়
হ’ল না সুরাগের উদয়
নয়ন থাকিতে সদাই
হ’লি কানা।।বাপের ধন তোর খেল সর্পে
জ্ঞানচক্ষু নাই দেখবি কবে
লালন বলে হিসাবকালে
যাবে জানা।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4407.html
|
2897
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কাব্য
|
সনেট
|
তবু কি ছিল না তব সুখদুঃখ যত,
আশা নৈরাশ্যের দ্বন্দ্ব আমাদেরি মতো,
হে অমর কবি! ছিল না কি অনুক্ষণ
রাজসভা-ষড়্চক্র, আঘাত গোপন?
কখনো কি সহ নাই অপমানভার,
অনাদর, অবিশ্বাস, অন্যায় বিচার,
অভাব কঠোর ক্রূর—নিদ্রাহীন রাতি
কখনো কি কাটে নাই বক্ষে শেল গাঁথি?
তবু সে সবার ঊর্ধ্বে নির্লিপ্ত নির্মল
ফুটিয়াছে কাব্য তব সৌন্দর্যকমল
আনন্দের সূর্য-পানে; তার কোনো ঠাঁই
দুঃখদৈন্যদুর্দিনের কোনো চিহ্ন নাই।
জীবনমন্থনবিষ নিজে করি পান
অমৃত যা উঠেছিল করে গেছ দান। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kabyo/
|
5665
|
সুকুমার রায়
|
বেজায় খুশি
|
ছড়া
|
বাহবা বাবুলাল ! গেলে যে হেসে !
বগলে কাতুকুতু কে দিল এসে ?
এদিকে মিটিমিটি দেখ কি চেয়ে ?
হাসি যে ফেটে পড়ে দু'গাল বেয়ে !
হাসে যে রাঙা ঠোঁট দন্ত মেলে
চোখের কোণে কোণে বিজলী খেলে ।
হাসির রসে গ'লে ঝরে যে লালা
কেন এ খি-খি-খি-খি হাসির পালা ?
যে দেখে সেই হাসে হাহাহা হাহা
বাহবা বাবুলাল বাহবা বাহা !
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/bejai-khushi/
|
2083
|
মহাদেব সাহা
|
ইচ্ছা
|
চিন্তামূলক
|
হয়তো এই পাহাড় সমান উঁচু হতে চায় কেউ
আমি মাটিতে মেশা ঘাস হতে ভালোবাসি,
যার মাড়িয়ে যাওয়ার সে মাড়িয়ে যাক ঘাস
তবু ঘাসের বুকেই জমে শিশিরবিন্দু ;হয়তো কেউ পার হতে চায় দীর্ঘ দূরের পথ
আমি বাড়ির উঠোনে লুটিয়ে থাকি,
উঠানের কোণে হয়ে থাকি চারাগাছ
সেইখানে ঐ দূর আকাশকে ডাকি ;হয়তো কেউ পাখিদের মতো চায় দুইখানি ডানা
আমি ভালোবাসি শিশুদের টলমলে হাঁটা, উড়তে চাইনা,
চাই এইখানে নিরিবিলি শুয়ে থাকি
যার হওয়ার সে হোক জোয়ার,
আমি হতে চাই ভাটা ;হয়তো কেউ হতে চায় ঐ পাহাড়ের মতো
আমি হাত-পা গুটিয়ে মাটিতেই শুয়ে থাকি,
লেগে থাক এই শরীরে শুধুও কাদামাটির ঘ্রাণ
যে কাছে আছে তাকেই আমি আরো কাছাকাছি ডাকি
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%87%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%be-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%ac-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be/
|
754
|
জয় গোস্বামী
|
স্বপ্নে মরা ময়ূর
|
রূপক
|
স্বপ্নে মরা ময়ূর, তার
গায়ে চাঁদের আলো
কার্নিশের ফণীমনসা
ছাদের কোণে ঘর
কাঁটায় বেঁধা কতকালের
শুকোনো সব পাখি
ওদের গলায় ফিসফিসোয়
বাতাস, ডাক, স্বর
মরা ময়ূর দাঁড়িয়ে–গায়ে
ফুটফুট জোনাকি
শিকল গেঁথে ঝোলানো চাঁদ,
পেণ্ডুলাম, কালো
হেলানো গাছ, গলতে থাকা
ইটকাঠের বাড়ি
স্বপ্নে মরা ময়ূর, তার
স্পষ্ট চোখ, খোলা
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1770
|
2547
|
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
|
প্রার্থনা সঙ্গীত
|
ভক্তিমূলক
|
ছোটো শিশু মোরা তোমার করুণা হৃদয়ে মাগিয়া লব
জগতের কাজে জগতের মাঝে আপনা ভুলিয়া রব।
ছোটো তারা হাসে আকাশের গায়ে ছোটো ফুল ফুটে গাছে;
ছোটো বটে তবু তোমার জগতে আমাদেরো কাজ আছে।
দাও তবে প্রভু হেন শুভমতি প্রাণে দাও নব আশা;
জগত মাঝারে যেন সবাকারে দিতে পারি ভালবাসা।
সুখে দুখে শোকে অপরের লাগি যেন এ জীবন ধরি;
অশ্রু মুছায়ে বেদনা ঘুচায়ে জীবন সফল করি।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/596
|
3970
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সুসময়
|
নীতিমূলক
|
শোকের বরষা দিন এসেছে আঁধারি—
ও ভাই গৃহস্থ চাষি, ছেড়ে আয় বাড়ি।
ভিজিয়া নরম হল শুষ্ক মরু মন,
এই বেলা শস্য তোর করে নে বপন। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/susomoy/
|
3374
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পসারিনী
|
চিন্তামূলক
|
পসারিনী, ওগো পসারিনী,
কেটেছে সকালবেলা হাটে হাটে লয়ে বিকিকিনি।
ঘরে ফিরিবার খনে
কী জানি কী হল মনে,
বসিলি গাছের ছায়াতলে--
লাভের জমানো কড়ি
ডালায় রহিল পড়ি,
ভাবনা কোথায় ধেয়ে চলে। এই মাঠ, এই রাঙা ধূলি,
অঘ্রানের-রৌদ্র-লাগা চিক্কণ কাঁঠালপাতাগুলি
শীতবাতাসের শ্বাসে
এই শিহরন ঘাসে--
কী কথা কহিল তোর কানে।
বহুদূর নদীজলে
আলোকের রেখা ঝলে,
ধ্যানে তোর কোন্ মন্ত্র আনে। সৃষ্টির প্রথম স্মৃতি হতে
সহসা আদিম স্পন্দ সঞ্চরিল তোর রক্তস্রোতে।
তাই এ তরুতে তৃণে
প্রাণ আপনারে চিনে
হেমন্তের মধ্যাহ্নের বেলা--
মৃত্তিকার খেলাঘরে
কত যুগযুগান্তরে
হিরণে হরিতে তোর খেলা। নিরালা মাঠের মাঝে বসি
সাম্প্রতের আবরণ মন হতে গেল দ্রুত খসি।
আলোকে আকাশে মিলে
যে-নটন এ নিখিলে
দেখ তাই আঁখির সম্মুখে,
বিরাট কালের মাঝে
যে ওঙ্কারধ্বনি বাজে
গুঞ্জরি উঠিল তোর বুকে। যত ছিল ত্বরিত আহ্বান
পরিচিত সংসারের দিগন্তে হয়েছে অবসান।
বেলা কত হল, তার
বার্তা নাহি চারিধার,
না কোথাও কর্মের আভাস।
শব্দহীনতার স্বরে
খররৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করে,
শূন্যতার উঠে দীর্ঘশ্বাস। পসারিনী, ওগো পসারিনী,
ক্ষণকাল-তরে আজি ভুলে গেলি যত বিকিকিনি।
কোথা হাট, কোথা ঘাট,
কোথা ঘর, কোথা বাট,
মুখর দিনের কলকথা--
অনন্তের বাণী আনে
সর্বাঙ্গে সকল প্রাণে
বৈরাগ্যের স্তব্ধ ব্যাকুলতা।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/psarune/
|
4108
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
ভালবাসার
|
প্রেমমূলক
|
ভালবাসার সময় তো নেই
ব্যস্ত ভীষন কাজে,
হাত রেখো না বুকের গাড় ভাজে।ঘামের জলে ভিজে সাবাড়
করাল রৌদ্দুরে,
কাছএ পাই না, হৃদয়- রোদ দূরে।কাজের মাঝে দিন কেটে যায়
কাজের কোলাহল
তৃষ্নাকে ছোয় ঘড়ায় তোলা জল।নদী আমার বয় না পাশে
স্রোতের দেখা নেই,
আটকে রাখে গেরস্থালির লেই।তোমার দিকে ফিরবো কখন
বন্দী আমার চোখ
পাহারা দেয় খল সামাজিক নখ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%9f-%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d/
|
2445
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
বেআইনি কাজ
|
ছড়া
|
গতরাতে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেছে মতিকে
ধরতে তো পারেই,খবর পেয়ে গেছো কোনো এক গতিকে।
একটা বেআইনি কাজ করেছে মতি,করেছে সে গোপনে
কেন যে করতে গেল!কে জানে কী ছিল তার মনে।
কাজটা যে বেআইনি সেটা তো গোপন কিছু নয়
মতি কেন করতে গেল,বুকে তার নাই এতোটুকু ভয়?
না জানি কার পাল্লায় পড়েছিল আমাদের বোকা সোকা মতি
এখন তাকে কে বাঁচাবে?কে বলবে,কী হবে তার গতি?
মতির এই সর্বনাশ খবর শুনে সবার মাথায় বাজ
জানত না সে,শূন্য দিয়ে ভাগ দেওয়া বেআইনি কাজ?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2050
|
4381
|
শামসুর রাহমান
|
আমার প্রতিদ্বন্দ্বী
|
চিন্তামূলক
|
একজন খর্বকায় মানুষ নিস্তব্ধ সন্ধ্যেবেলা
পড়ছে নামাজ কী তন্ময়। মনে হয়, সে এখন
অনেক অনেক দূরে শাল তাল অর্জুনের বন
পেরিয়ে সমুদ্রে এক ভাসিয়েছে নিরঞ্জন ভেলা।
এখন সত্তায় তার শান্ত উঠোনে শিশুর খেলা,
দিগন্তের বংশীধ্বনি, বিশাল তরঙ্গ, পাটাতন,
কিশোরীর পাখি পোষা, শিকারীর হরিণ হনন,
ভগ্নস্তুপময় জ্যোৎস্না একাকার, নিজে সে একেলা।যদিও জমিনে নতজানু তবু তার নক্ষত্রের
মতো মাথা পৌঁছে যায় পাঁচবার দূর নীলিমায়।
তার মতো আমিও একটি ধ্যানে সমর্পিত, তবু
আমার অভীষ্ট কেন ক্রমাগত অনেক দূরের
আবছা সরাই হয়ে থাকে? কেন আমি ব্যর্থতায়
কালো হই? কেন বিষ্করুণ বাক্ প্রতিমার প্রভু? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-protidondi/
|
1067
|
জীবনানন্দ দাশ
|
নদী
|
চিন্তামূলক
|
বঁইচির ঝোপ শুধু — শাঁইবাবলার ঝাড়–আর জাম হিজলের বন–
কোথাও অর্জুন গাছ–তাহার সমস্ত ছায়া এদের নিকটে টেনে নিয়ে
কোন কথা সারাদিন কহিতেছে অই নদী?–এ নদী কে?–ইহার জীবনহৃদয়ে চমক আনে;যেখানে মানুষ নাই–নদী শুধু–সেইখানে গিয়ে
শব্দ শুনি তাই আমি– আমি শুনি– দুপুরের জলপিপি শুনেছে এমন
এই শব্দ কতদিন;আমিও শুনেছি ঢের বটের পাতার পথ দিয়েহেঁটে যেতে–ব্যাথা পেয়ে;দুপুরে জলের গন্ধে একবার স্তব্ধ হয় মন;
মনে হয় কোন শিশু মরে গেছে, আমার হৃদয় যেন ছিল শিশু সেই;
আলো আর আকাশের থেকে নদী যতখানি আশা করে–আমিও তেমনএকদিন করি নি কি? শুধু একদিন তবু? কারা এসে বলে গেল, ‘ নেই–
গাছ নেই– রোদ নেই,মেঘ নেই– তারা নেই–আকাশ তোমার তরে নয়! ‘–
হাজার বছর ধরে নদী তবু পায় কেন এই সব? শিশুর প্রাণেই
নদী কেন বেঁচে থাকে?–একদিন এই নদী শব্দ ক’রে হদয়ে বিস্ময়
আনিতে পারে না আর; মানুষের মন থে নদী হারায়– শেষ হয় ।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/nodi/
|
3914
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সত্যের সংযম
|
নীতিমূলক
|
স্বপ্ন কহে, আমি মুক্ত, নিয়মের পিছে
নাহি চলি। সত্য কহে, তাই তুমি মিছে।
স্বপ্ন কয়, তুমি বদ্ধ অনন্ত শৃঙ্খলে।
সত্য কয়, তাই মোরে সত্য সবে বলে। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sottyer-songjom/
|
5288
|
শামসুর রাহমান
|
সে কবে আমার ঘরে
|
সনেট
|
সে কবে আমার ঘরে এসেছিলো তুমি হে প্রতিমা
শুন্যতায় তুলে ঢেউ? বসেছিলে মুখোমুখি; চোখে
বসন্ত-বিস্ময় ছিলো, শরীরে স্বপ্নের মধুরিমা।
টেবিলে তোমার হাত, যেন সে মাছ, রহস্যলোকে
সমর্পিত; দেখলাম নড়ে চড়ে বসলে আবার।
ইচ্ছে হলো তুলে নিই হাতে সেই মাছ অলৌকিক,
হয়নি সাহস; যেন আমি দীন কুষ্ঠরোগী, যার
সৌন্দর্যকে ছুতে ভয়। বলো, হবো কি করে অভীক?হে বন্ধু তাহলে আসি, বলে চলে গেলে কী সহজে
আমাকে একাকী ফেলে আর আমি যেন স্বপ্ন থেকে
চক্ষুদ্বয় কচলাতে কচলাতে জেগে উঠলাম
অকস্মাৎ; সত্যি তুমি এসেছিলে? নাকি এ মগজে
মায়াবী একাটি হাত আগোচরে দিয়েছিলো এঁকে
জীবন-স্পন্দিত চিত্র? জাগুক সে চিত্র অবিরাম। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/se-kobe-amar-ghore/
|
5537
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
লেনিন
|
মানবতাবাদী
|
লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।
আজকেও রুশিয়ার গ্রামে ও নগরে
হাজার লেনিন যুদ্ধ করে,
মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে।
বিদ্যুৎ-ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন
ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,
বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র, কণ্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ;
- আসে শত্রুজয়ের সংবাদ।
সযত্ন মুখোশধরী ধনিকেরও বন্ধ আস্ফালন,
কাঁপে হৃৎযন্ত্র তার, চোখে মুখে চিহ্নিত মরণ।
বিপ্লব হয়েছে শুরু, পদানত জনতার ব্যগ্র গাত্রোত্থানে,
দেশে দেশে বিস্ফোরণ অতর্কিতে অগ্ন্যুৎপাত হানে।
দিকে দিকে কোণে কোণে লেনিনের পদধ্বনি
আজো যায় শোনা,
দলিত হাজার কণ্ঠে বিপ্লবের আজো সম্বর্ধনা।
পৃথিবীর প্রতি ঘরে ঘরে,
লেনিন সমৃদ্ধ হয় সম্ভাবিত উর্বর জঠরে।
আশ্চর্য উদ্দাম বেগে বিপ্লবের প্রত্যেক আকাশে
লেনিনের সূর্যদীপ্তি রক্তের তরঙ্গে ভেসে আসে;
ইতালী, জার্মান, জাপান, ইংলন্ড, আমেরিকা, চীন,
যেখানে মুক্তির যুদ্ধ সেখানেই কমরেড লেনিন।
অন্ধকার ভারতবর্ষ: বুভুক্ষায় পথে মৃতদেহ
অনৈক্যের চোরাবালি; পরস্পর অযথা সন্দেহ;
দরজায় চিহ্নিত নিত্য শত্রুর উদ্ধত পদাঘাত,
অদৃষ্ট র্ভৎসনা-ক্লান্ত কাটে দিন, বিমর্ষ রাত
বিদেশী শৃঙ্খলে পিষ্ট, শ্বাস তার ক্রমাগত ক্ষীণ-
এখানেও আয়োজন পূর্ণ করে নিঃশব্দে লেনিন।
লেনিন ভেঙেছে বিশ্বে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন জানায় প্রতিবাদ।
মৃত্যুর সমুদ্র শেষ; পালে লাগে উদ্দাম বাতাস
মুক্তির শ্যামল তীর চোখে পড়ে, আন্দোলিত ঘাস।
লেনিন ভুমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/260
|
5388
|
শ্রীজাত
|
যে
|
প্রেমমূলক
|
রাক্ষসেরা বন্ধু সেজে আসে।
পাহাড়চুড়ােয় থমকে থাকে হাওয়া…
ঠোঁট খুলে যায়। বুকদুটো দু’পাশে
কামড়ে ধরে চুমু খাওয়ার আওয়াজ।চুল খােলাচুল দিগন্তে ডাক পাঠায়
মেঘের সেনা ঘােড়ার পিঠে সওয়ার
রক্ত গিয়ে ছিটকে লাগে ছাতায়
দরকার কী, এমন শ্রাবণ হওয়ারখিদের মুখে জিভ বাপের ব্যাটা।
সবাই তােমায় আদর করে দিত…
তখন আমার হাতের মুঠোয় ব্যথা,
সেসব আমি লিখতে পারিনি তাে!লিখতে গেলেই সর্বনাশ হাওয়া
ঝাপটা এসে উল্টে দেবে খাতা ।
মেঘ ডেকেছে। শরীরে তার আওয়াজ…
রক্ত এসে ছিটকে লাগে ছাতায়!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a7%81-%e0%a6%a8%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80/
|
3499
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বন-ফুল (চতুর্থ সর্গ)
|
কাহিনীকাব্য
|
নিভৃত যমুনাতীরে বসিয়া রয়েছে কি রে
কমলা নীরদ দুই জনে?
যেন দোঁহে জ্ঞানহত— নীরব চিত্রের মতো
দোঁহে দোঁহা হেরে একমনে।দেখিতে দেখিতে কেন অবশ পাষাণ হেন,
চখের পলক নাহি পড়ে।
শোণিত না চলে বুকে, কথাটি না ফুটে মুখে,
চুলটিও না নড়ে না চড়ে!মুখ ফিরাইল বালা, দেখিল জোছনামালা
খসিয়া পড়িছে নীল যমুনার নীরে—
অস্ফুট কল্লোলস্বর উঠিছে আকাশ-'পর
অর্পিয়া গভীর ভাব রজনী-গভীরে!দেখিছে লুটায় ঢেউ আবার লুটায়,
দিগন্তে খেলায়ে পুন দিগন্তে মিলায়!
দেখে শূন্য নেত্র তুলি— খণ্ড খণ্ড মেঘগুলি
জোছনা মাখিয়া গায়ে উড়ে উড়ে যায়। একখণ্ড উড়ে যায় আর খণ্ড আসে
ঢাকিয়া চাঁদের ভাতি মলিন করিয়া রাতি
মলিন করিয়া দিয়া সুনীল আকাশে। পাখী এক গেল উড়ে নীল নভোতলে,
ফেনখণ্ড গেল ভেসে নীল নদীজলে,
দিবা ভাবি অতিদূরে আকাশ সুধায় পূরে
ডাকিয়া উঠিল এক প্রমুগ্ধ পাপিয়া।
পিউ, পিউ, শূন্যে ছুটে উচ্চ হতে উচ্চে উঠে—
আকাশ সে সূক্ষ্ম স্বরে উঠিল কাঁপিয়া।বসিয়া গণিল বালা কত ঢেউ করে খেলা,
কত ঢেউ দিগন্তের আকাশে মিলায়,
কত ফেন করি খেলা লুটায়ে চুম্বিছে বেলা,
আবার তরঙ্গে চড়ি সুদূরে পলায়।দেখি দেখি থাকি থাকি আবার ফিরায়ে আঁখি
নীরদের মুখপানে চাহিল সহসা—
আধেক মুদিত নেত্র অবশ পলকপত্র—
অপূর্ব মধুর ভাবে বালিকা বিবশা!নীরদ ক্ষণেক পরে উঠে চমকিয়া,
অপূর্ব স্বপন হতে জাগিল যেন রে।
দূরেতে সরিয়া গিয়া থাকিয়া থাকিয়া
বালিকারে সম্বোধিয়া কহে মৃদুস্বরে—
‘সে কী কথা শুধাইছ বিপিনরমণী!
ভালবাসি কিনা আমি তোমারে কমলে?
পৃথিবী হাসিয়া যে লো উঠিবে এখনি!
কলঙ্ক রমণী নামে রটিবে তা হলে?ও কথা শুধাতে আছে? ও কথা ভাবিতে আছে!
ও-সব কি স্থান দিতে আছে মনে মনে?
বিজয় তোমার স্বামী বিজয়ের পত্মী তুমি
সরলে! ও কথা তবে শুধাও কেমনে? তবুও শুধাও যদি দিব না উত্তর!—
হৃদয়ে যা লিখা আছে দেখাবো না কারো কাছে,
হৃদয়ে লুকান রবে আমরণ কাল!
রুদ্ধ অগ্নিরাশিসম দহিবে হৃদয় মম
ছিঁড়িয়া খুঁড়িয়া যাবে হৃদিগ্রন্থিজাল।যদি ইচ্ছা হয় তবে লীলা সমাপিয়া ভবে
শোণিতধারায় তাহা করিব নির্বাণ।
নহে অগ্নিশৈলসম জ্বলিবে হৃদয় মম
যত দিন দেহমাঝে রহিবেক প্রাণ!যে তোমারে বন হতে এনেছে উদ্ধারি
যাহারে করেছ তুমি পাণি সমর্পণ
প্রণয় প্রার্থনা তুমি করিও তাহারি—
তারে দিয়ো যাহা তুমি বলিবে আপন!চাই না বাসিতে ভালো, ভালবাসিব না।
দেবতার কাছে এই করিব প্রার্থনা—
বিবাহ করেছ যারে সুখে থাক লয়ে তারে
বিধাতা মিটান তব সুখের কামনা!’‘বিবাহ কাহারে বলে জানি না তা আমি’
কহিল কমলা তবে বিপিনকামিনী,
“কারে বলে পত্মী আর কারে বলে স্বামী,
কারে বলে ভালবাসা আজিও শিখি নি।এইটুকু জানি শুধু এইটুকু জানি,
দেখিবারে আঁখি মোর ভালবাসে যারে
শুনিতে বাসি গো ভাল যার সুধাবাণী—
শুনিব তাহার কথা দেখিব তাহারে!ইহাতে পৃথিবী যদি কলঙ্ক রটায়
ইহাতে হাসিয়া যদি উঠে সব ধরা
বল গো নীরদ আমি কি করিব তার?
রটায়ে কলঙ্ক তবে হাসুক না তারা।বিবাহ কাহারে বলে জানিতে চাহি না—
তাহারে বাসিব ভাল, ভালবাসি যারে!
তাহারই ভালবাসা করিব কামনা
যে মোরে বাসে না ভাল, ভালবাসি যারে”।নীরদ অবাক রহি কিছুক্ষণ পরে
বালিকারে সম্বোধিয়া কহে মৃদুস্বরে,
“সে কী কথা বল বালা, যে জন তোমারে
বিজন কানন হতে করিয়া উদ্ধার
আনিল, রাখিল যত্নে সুখের আগারে—
সে কেন গো ভালবাসা পাবে না তোমার?হৃদয় সঁপেছে যে লো তোমারে নবীনা
সে কেন গো ভালবাসা পাবে না তোমার?”
কমলা কহিল ধীরে, “আমি তা জানি না”।
নীরদ সমুচ্চ স্বরে কহিল আবার—‘ তবে যা লো দুশ্চারিণী! যেথা ইচ্ছা তোর
কর্ তাই যাহা তোর কহিবে হৃদয়—
কিন্তু যত দিন দেহে প্রাণ রবে মোর—
তোর এ প্রণয়ে আমি দিব না প্রশ্রয়!আর তুই পাইবি না দেখিতে আমারে
জ্বলিব যদিন আমি জীবন-অনলে—
স্বরগে বাসিব ভাল যা খুসী যাহারে
প্রণয়ে সেথায় যদি পাপ নাহি বলে!কেন বল্ পাগলিনী! ভালবাসি মোরে
অনলে জ্বালিতে চাস্ এ জীবন ভোরে!
বিধাতা যে কি আমার লিখেছে কপালে!
যে গাছে রোপিতে যাই শুকায় সমূলে।'ভর্ৎসনা করিবে ছিল নীরদের মনে—
আদরেতে স্বর কিন্তু হয়ে এল নত!
কমলা নয়নজল ভরিয়া নয়নে
মুখপানে চাহি রয় পাগলের মতো!নীরদ উদ্গামী অশ্রু করি নিবারিত
সবেগে সেখান হতে করিল প্রয়াণ।
উচ্ছ্বাসে কমলা বালা উন্মত্ত চিত
অঞ্চল করিয়া সিক্ত মুছিল নয়ান। (বন-ফুল কাব্যোপন্যাস)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bon-ful-choturtho-sorgo/
|
2739
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে
|
চিন্তামূলক
|
আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে;
পাকে পাকে ফেরে ফেরে
আমার জীবন দিয়ে জড়ায়েছি এরে;
প্রভাত-সন্ধ্যার
আলো-অন্ধকার
মোর চেতনায় গেছে ভেসে;
অবশেষে
এক হয়ে গেছে আজ আমার জীবন
আর আমার ভুবন।
ভালোবাসিয়াছি এই জগতের আলো
জীবনেরে তাই বাসি ভালো।
তবুও মরিতে হবে এও সত্য জানি।
মোর বাণী
একদিন এ-বাতাসে ফুটিবে না,
মোর আঁখি এ-আলোকে লুটিবে না,
মোর হিয়া ছুটিবে না
অরুণের উদ্দীপ্ত আহ্বানে;
মোর কানে কানে
রজনী কবে না তার রহস্যবারতা,
শেষ করে যেতে হবে শেষ দৃষ্টি, মোর শেষ কথা।
এমন একান্ত করে চাওয়া
এও সত্য যত
এমন একান্ত ছেড়ে যাওয়া
সেও সেই মতো।
এ দুয়ের মাঝে তবু কোনোখানে আছে কোনো মিল;
নহিলে নিখিল
এতবড়ো নিদারুণ প্রবঞ্চনা
হাসিমুখে এতকাল কিছুতে বহিতে পারিত না।
সব তার আলো
কীটে-কাটা পুষ্পসম এতদিনে হয়ে যেত কালো।
সুরুল, ২৯ পৌষ, ১৩২১-প্রাতঃকাল
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1931
|
5053
|
শামসুর রাহমান
|
ব্যর্থ অভিশাপ
|
চিন্তামূলক
|
হে বান্ধব, এই যে এখানে তুমি এক কোণে ব’সে
প্রত্যহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা দেয়ালের
কিংবা বাইরের কোনও গাছ
অথবা প্রশান্ত আকাশের দিকে দৃষ্টি
মেলে দিয়ে কাটাও সময়
তাতে তোমার কী লাভ হয়, বলবে কি?প্রশ্ন করে করে ক্লান্ত হয়ে গেছি, তবু আজ অব্দি
পাইনি উত্তর, শুধু তুমি ঠোঁটে হাসি
খেলিয়ে তাকাও এই উৎসুক ব্যক্তির দিকে আর
এলেবেলে কী-যে বলো, শত চেষ্টাতেও
অর্থের সন্ধান মেলা ভার। ডুবন্ত সূর্যের দিকে
কিছুক্ষণ তাকালেই সম্ভবত মিলবে হদিস বক্তব্যের।হে বান্ধব, দেখছি তোমাকে ভ্রাম্যমাণ মেঘলোকে।
বুঝি না কী ক’রে ফের ফিরে আসবে এখানে
এই মৃত্তিকায় আর স্বাভাবিক ভাষা
উচ্চারণ করবে আবার সাধারণ মজলিশে।
এই তো জাগলো চাঁদ ঘুমের সাগর ভেদ ক’রে ;
হে বান্ধব, দেখছি তোমার হাতে অপরূপ চলিষ্ণু কলম।খাতার পাতার পর পাতা অক্ষরের চুমোয় লাল
হয়ে ওঠে পুনরায় কিছুদিন পর। জানি অনেকেই ভেবে
নেচে উঠেছিলো সুখে-এবার তোমার
কলমের গতি চিরতরে থেমে গেলো সুনিশ্চিত!
অথচ বেজায় একগুঁয়ে কলম তোমার বন্ধু,
কোনও অভিশাপ পুড়ে ছাই করতে পারে না কলমকে। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/byartho-ovishap/
|
4001
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্বপ্ন
|
চিন্তামূলক
|
কাল রাতে দেখিনু স্বপন —
দেবতা - আশিস - সম শিয়রে সে বসি মম
মুখে রাখি করুণনয়ন
কোমল অঙ্গুলি শিরে বুলাইছে ধীরে ধীরে
সুধামাখা প্রিয় - পরশন —
কাল রাতে হেরিনু স্বপন ।
হেরি সেই মুখপানে বেদনা ভরিল প্রাণে
দুই চক্ষু জলে ছলছলি —
বুকভরা অভিমান আলোড়িয়া মর্মস্থান
কণ্ঠে যেন উঠিল উছলি ।
সে শুধু আকুল চোখে নীরবে গভীর শোকে
শুধাইল , “ কী হয়েছে তোর ?”
কী বলিতে গিয়ে প্রাণ ফেটে হল শতখান ,
তখনি ভাঙিল ঘুমঘোর ।
অন্ধকার নিশীথিনী ঘুমাইছে একাকিনী ,
অরণ্যে উঠিছে ঝিল্লিস্বর ,
বাতায়নে ধ্রুবতারা চেয়ে আছে নিদ্রাহারা —
নতনেত্রে গণিছে প্রহর ।
দীপ - নির্বাপিত ঘরে শুয়ে শূন্য শয্যা - পরে
ভাবিতে লাগিনু কতক্ষণ —
শিথানে মাথাটি থুয়ে সেও একা শুয়ে শুয়ে
কী জানি কী হেরিছে স্বপন
দ্বিপ্রহরা যামিনী যখন । (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/swapno/
|
1569
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
কালো অ্যাম্বাসাডর
|
মানবতাবাদী
|
কালো অ্যাম্বাসাডরের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর কথা
অকস্মাৎ ঘুরে যায়
খুন, দাঙ্গা, রাহাজানি ইত্যাদির দিকে।
অতঃপর
কান টানলে যেমন মাথা আসে,
তেমনি করে এসে গেল
রাষ্ট্রনীতি, ইমার্জেন্সি, আইন-শৃঙ্ক্ষলা।
ভদ্রলোক অত্যন্ত আবেগ দিয়ে বলে যাচ্ছিলেন,
“অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, আশ্রয়, চিকিৎসা চাই, অবশ্যই চাই!
আরে বাবা,
এইসব উত্তম বস্তু কে না চায়? আমি কি চাই না?
চাই, চাই, একশো বার চাই।
কিন্তু তার আগে
ল অ্যাণ্ড অর্ডার চাই, সেইটেই এখন
সবচেয়ে জরুরি।”
কার জন্যে জরুরি, আমি প্রশ্ন করে উত্তর পাই না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1578
|
2428
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
কলা
|
রূপক
|
কলাটা কেমন করে খাই?
আমার মুখটা এতো ছোট
কলা ঢোকানোর জায়গাই তো নাই!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2030
|
3747
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে-গীতাঞ্জলি
|
প্রকৃতিমূলক
|
মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে,আঁধার করে আসে,আমায় কেন বসিয়ে রাখএকা দ্বারের পাশে।কাজের দিনে নানা কাজেথাকি নানা লোকের মাঝে,আজ আমি যে বসে আছিতোমারি আশ্বাসে।আমায় কেন বসিয়ে রাখএকা দ্বারের পাশে।তুমি যদি না দেখা দাও,কর আমায় হেলা,কেমন করে কাটে আমারএমন বাদল-বেলা।দূরের পানে মেলে আঁখিকেবল আমি চেয়ে থাকি,পরান আমার কেঁদে বেড়ায়দুরন্ত বাতাসে।আমায় কেন বসিয়ে রাখএকা দ্বারের পাশে।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/16-%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a6%bf/
|
5624
|
সুকুমার রায়
|
দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম্!
|
ছড়া
|
ছুটছে মটর ঘটর ঘটর ছুটছে গাড়ী জুড়ি,
ছুটছে লোকে নানান্ ঝোঁকে করছে হুড়োহুড়ি;
ছুটছে কত ক্ষ্যাপার মতো পড়ছে কত চাপা,
সাহেবমেমে থমকে থেমে বলছে 'মামা পাপা!'
আমরা তবু তবলা ঠুকে গাচ্ছি কেমন তেড়ে
'দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম্! দেড়ে দেড়ে দেড়ে!'
বর্ষাকালে বৃষ্টিবাদল রাস্তা জুড়ে কাদা,
ঠাণ্ডা রাতে সর্দিবাতে মরবি কেন দাদা?
হোক্ না সকাল হোক্ না বিকাল
হোক্ না দুপুর বেলা,
থাক্ না তোমার আপিস যাওয়া
থাক্ না কাজের ঠেলা—
এই দেখ না চাঁদনি রাতের গান এনেছি কেড়ে,
'দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম্! দেড়ে দেড়ে দেড়ে!'মুখ্যু যারা হচ্ছে সারা পড়ছে ব'সে একা,
কেউবা দেখ কাঁচুর মাচুর
কেউ বা ভ্যাবাচ্যাকা৷
কেউ বা ভেবে হদ্দ হল, মুখটি যেন কালি
কেউ বা ব'সে বোকার মতো মুণ্ডু নাড়ে খালি৷
তার চেয়ে ভাই, ভাবনা ভুলে গাওনা গলা ছেড়ে,
'দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম্! দেড়ে দেড়ে দেড়ে!'
বেজার হয়ে যে যার মতো করছ সময় নষ্ট,
হাঁটছ কত খাটছ কত পাচ্ছ কত কষ্ট!
আসল কথা বুঝছ না যে, করছ না যে চিন্তা,
শুনছ না যে গানের মাঝে তবলা বাজে ধিন্তা?
পাল্লা ধরে গায়ের জোরে গিটকিরি দাও ঝেড়ে,
'দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম্! দেড়ে দেড়ে দেড়ে!'
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/dare-dare-drum/
|
1688
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
শিল্পীর ভূমিকা
|
চিন্তামূলক
|
আপনি তো জানেন, শুধু আপনিই জানেন, কী আনন্দে
এখনও মূর্খের শূন্য অট্টহাসি, নিন্দুকের ক্ষিপ্র
জিহ্বাকে সে তুচ্ছ করে নিতান্তই অনায়াসে; তীব্র
দুঃখের মুহূর্তে আজও কী পরম প্রত্যয়ের শান্তি
শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখে; সন্ধ্যামালতীর মৃদু গন্ধে
কেন তার স্বপ্ন হয়ে সমুদ্রের মতো নীলকান্তি;
উপরে যন্ত্রণা যার, অন্তরালে সুধা অতলান্ত।
আপনি তো জানেন, শুধু আপনিই জানেন, মায়ামঞ্চে
কেউ বা সম্রাট হয়, কেউ মন্ত্রী, কেউ মহামাত্য;
শিল্পীর ভূমিকা তার, সাময়িক সমস্ত দৌরাত্ম্য
দেখার ভূমিকা। তাতে দুঃখ নেই। কেননা, অনন্ত
কালের মৃদঙ্গ ওই বাজে তার মনের মালঞ্চে।
ত্রিকালী আনন্দ তার; নেই তার আদি, নেই অন্ত।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1698
|
852
|
জসীম উদ্দীন
|
পল্লী-বর্ষা
|
প্রকৃতিমূলক
|
আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা
তারি স্রোতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া!
হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি,
নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন দিঠি!
চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন বাটে,
না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন ঘাটে!
কোন্ সে বিরল বুনো ঝাউ শাখে বুনিয়া গোলাপী শাড়ী, -
হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি!
দিকে দিগেনে- যতদূর চাহি, পাংশু মেঘের জাল
পায়ে জড়াইয়া পথে দাঁড়ায়েছে আজিকার মহাকাল।
গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়, -
গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!
কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি,
কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাঁকা বাঁধে কসি কসি।
কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল
কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।
মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে,
আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।
লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল,
কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভুল।
তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে- আমীর সাধুর নাও,
বহুদেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজ গাঁও।
ডাব্বা হুঁকাও চলিয়াছে ছুটি এর হতে ওর হাতে,
নানান রকম রসি বুনানও হইতেছে তার সাথে।
বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে,
এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপকথা আঁকে!
যেন ও বৃদ্ধ, গাঁয়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা।
বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রসি,
সমুদ্রকলি শিকা বুনাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি,
তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী নকসা টানি।
বৈদেশী কোন্ বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে,
মিঠে-সুরি-গান কাঁপিয়ে রঙিন ঠোঁটের বাঁধন ছেঁড়ে।
আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে,
বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/777
|
3547
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাণীর মুরতি গড়ি
|
চিন্তামূলক
|
বাণীর মুরতি গড়ি
একমনে
নির্জন প্রাঙ্গণে
পিণ্ড পিণ্ড মাটি তার
যায় ছড়াছড়ি,
অসমাপ্ত মূক
শূন্যে চেয়ে থাকে
নিরুৎসুক।
গর্বিত মূর্তির পদানত
মাথা করে থাকে নিচু,
কেন আছে উত্তর না দিতে পারে কিছু
বহুগুণে শোচনীয় হায় তার চেয়ে
এক কালে যাহা রূপ পেয়ে
কালে কালে অর্থহীনতায়
ক্রমশ মিলায়।
নিমন্ত্রণ ছিল কোথা শুধাইলে তারে
উত্তর কিছু না দিতে পারে—কোন্ স্বপ্ন বাঁধিবারে
বহিয়া ধূলির ঋণ
দেখা দিল
মানবের দ্বারে।
বিস্মৃত স্বর্গের কোন্
উর্বশীর ছবি
ধরণীর চিত্তপটে
বাঁধিতে চাহিয়াছিল
কবি,
তোমারে বাহনরূপে
ডেকেছিল,
চিত্রশালে যত্নে রেখেছিল,
কখন সে অন্যমনে গেছে ভুলি
আদিম আত্মীয় তব ধূলি,
অসীম বৈরাগ্যে তার দিক্বিহীন পথে
তুলি নিল বাণীহীন রথে।
এই ভালো,
বিশ্বব্যাপী ধূসর সম্মানে
আজ পঙ্গু আবর্জনা
নিয়ত গঞ্জনাকালের চরণক্ষেপে পদে পদে
বাধা দিতে জানে,
পদাঘাতে পদাঘাতে জীর্ণ অপমানে
শান্তি পায় শেষে
আবার ধূলিতে যবে মেশে। (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/banir-murti-gori/
|
896
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অঘ্রাণ
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি- বিকেলের এই রঙ- রঙের শূন্যতা
রোদের নরম রোম- ঢালু মাঠ- বিবর্ণ বাদামি পাখি- হলুদ বিচালি
পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে-ঘাসে- কুড়ুনির মুখে তাই নাই কোনো কথা,ধানের সোনার কাজ ফুরায়েছে- জীবনেরে জেনেছে সে- কুয়াশায় খালি
তাই তার ঘুম পায়- খেত ছেড়ে দিয়ে যাবে এখনি সে- খেতের ভিতর
এখনি সে নেই যেন- ঝ'রে পড়ে অঘ্রাণের এই শেষ বিষণ্ণ সোনালিতুলিটুকু;- মুছে যায়;- কেউ ছবি আঁকিবে না মাঠে-মাঠে যেন তারপর,
আঁকিতে চায় না কেউ,- এখন অঘ্রাণ এসে পৃথিবীর ধরেছে হৃদয়;
একদিন নীল ডিম দেখিনি কি?- দুটো পাখি তাদের নীড়ের মৃদু খড়সেইখানে চুপে চুপে বিছায়েছে;- তবু নীড়- তবু ডিম,- ভালোবাসা
সাধ শেষ হয়
তারপর কেউ তাহা চায় নাকো- জীবনের অনেক দেয়- তবুও জীবন
আমাদের ছুটি দেয় তারপর- একখানা আধখানা লুকানো বিস্ময়অথবা বিস্ময় নয়- শুধু শান্তি- শুধু হিম কোথায় যে রয়েছে গোপন
অঘ্রাণ খুলেছে তারে- আমার মনের থেকে কুড়ায়ে করেছে আহরণ।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/oghran/
|
4593
|
শামসুর রাহমান
|
কী করে করবো বসবাস
|
প্রেমমূলক
|
সকাল থেকেই আমার হৃদয় জুড়ে প্রখর তৃষ্ণা। বুক পুড়ে যাচ্ছে অনবরত।
ভাদ্রের জলধারা মুছতে ব্যর্থ হবে এই দাউ দাউ তেষ্টা জুড়োতে।
বনপোড়া শিঙঅলা হরিণের মতো অসহায় দৃষ্টিতে তাকাই এদিক
ওদিক। যেন চলেছি বেঢপ চালে এক মরু পথে। নেকড়ের
মতো খেঁকিয়ে ওঠা রোদ আমাকে ভাজছে কাবাব রূপে।
দু’চোখে ক্ষুধার্ত পশুর জঠরজ্বালা। পথে পড়ে থাকা ঘোড়ার
কংকাল, রুক্ষ গাছের ডালে ঝুলন্ত বিষধর সাপ, বালিতে
লুণ্ঠিত পুরানো রক্ত চিহ্নময় পোশাক, আর অতিকায় মরু কাঁকড়া
আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। হোঁচট খেয়ে বারবার বালিতে মুখ
থুবড়ে পড়ি। আমার চোখের তৃষ্ণা আর বুকের তেষ্টা এক যোগে
আর্তনাদ করে মরু নদীর মতো।আজ তোমাকে দেখার সঙ্গেই হৃদয়ের দু’কূল ছাপিয়ে
জেগে ওঠে তৃষ্ণানিবারণী জলময়তা। আমাদের
দুজনের দু’টি হাত পরস্পর চুম্বন ধারায় ভাসতে থাকে
কিছুক্ষণ। আমার মুখাবয়বে আন্দোচ্ছাসের ঝাপটা দেখে
তুমি মুগ্ধ হলে। কয়েক মিনিট পরেই আমার মুখের বিষণ্নতার
উকিঝুঁকি দেখে তোমাকে স্পর্শ করে মন খারাপের নীলাভ
আঙুল। তুমি আমার বিষণ্নতার উৎস জানতে চাইলে আমি
নিজের অসুস্থতার কপট উচ্চারণ করি। অথচ তোমাকে ক’দিন
এখানে দেখতে পাব না ভেবেই আমার হৃদয় ধুলোয়
লুটিয়ে পড়েছে আহত দোয়েলের মতো।তোমাকে আবার দেখার জন্যে নিরুপায় হয়ে আমাকে অপেক্ষা করতে হবে আরও
সাতদিন। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার নিষ্করুণ ঘরে কী করে করবো বসবাস? (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ki-kore-korbo-bosobas/
|
336
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
তরুণ প্রেমিক
|
চিন্তামূলক
|
তরুণ প্রেমিক, প্রণয় বেদন
জানাও জানাও বে-দিল প্রিয়ায়
ওগো বিজয়ী, নিখিল হূদয়
কর কর জয় মোহন মায়ায়।নহে ও এক হিয়ার সমান
হাজার কাবা হাজার মস্জিদ
কি হবে তোর কাবার খোঁজে
আশয় খোঁজ তোর হূদয় ছায়ায়।প্রেমের আলোয় যে দিল্ রোশন
যেথায় থাকুক সমান তাহার
খুদার মস্জিদ মুরত মন্দির
ইশাই দেউল ইহুদখানায়।অমর তার নাম প্রেমের খাতায়
জ্যোতির লেখায় রবে লেখা
দোজখের ভয় করে না সে
থাকে না সে বেহেস্তের আশায়।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/torun-premik/
|
2840
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ঐশ্বর্য
|
চিন্তামূলক
|
ক্ষুদ্র এই তৃণদল ব্রহ্মান্ডের মাঝে
সরল মাহাত্ম্য লয়ে সহজে বিরাজে।
পূরবের নবসূর্য, নিশীথের শশী,
তৃণটি তাদেরি সাথে একাসনে বসি।
আমার এ গান এও জগতের গানে
মিশে যায় নিখিলের মর্মমাঝখানে;
শ্রাবণের ধারাপাত, বনের মর্মর
সকলের মাঝে তার আপনার ঘর।
কিন্তু, হে বিলাসী, তব ঐশ্বর্যের ভার
ক্ষুদ্র রুদ্ধদ্বারে শুধু একাকী তোমার।
নাহি পড়ে সূর্যালোক, নাহি চাহে চাঁদ,
নাহি তাহে নিখিলের নিত্য আশীর্বাদ।
সম্মুখে দাঁড়ালে মৃত্যু মুহূর্তেই হায়
পাংশুপান্ডু শীর্ণম্লান মিথ্যা হয়ে যায়। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/oisshorjo/
|
3088
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জাগ্রত স্বপ্ন
|
প্রেমমূলক
|
আজ একেলা বসিয়া , আকাশে চাহিয়া ,
কী সাধ যেতেছে , মন!
বেলা চলে যায় — আছিস কোথায় ?
কোন্ স্বপনেতে নিমগন ?
বসন্তবাতাসে আঁখি মুদে আসে ,
মৃদু মৃদু বহে শ্বাস ,
গায়ে এসে যেন এলায়ে পড়িছে
কুসুমের মৃদু বাস ।
যেন সুদূর নন্দনকাননবাসিনী
সুখঘুমঘোরে মধুরহাসিনী ,
অজানা প্রিয়ার ললিত পরশ
ভেসে ভেসে বহে যায় ,
অতি মৃদু মৃদু লাগে গায় ।
বিস্মরণমোহে আঁধারে আলোকে
মনে পড়ে যেন তায় ,
স্মৃতি-আশা-মাখা মৃদু সুখে দুখে
পুলকিয়া উঠে কায় ।
ভ্রমি আমি যেন সুদূর কাননে ,
সুদূর আকাশতলে ,
আনমনে যেন গাহিয়া বেড়াই
সরযূর কলকলে ।
গহন বনের কোথা হতে শুনি
বাঁশির স্বর-আভাস ,
বনের হৃদয় বাজাইছে যেন
মরমের অভিলাষ ।
বিভোর হৃদয়ে বুঝিতে পারি নে
কে গায় কিসের গান ,
অজানা ফুলের সুরভি মাখানো
স্বরসুধা করি পান ।
যেন রে কোথায় তরুর ছায়ায়
বসিয়া রূপসী বালা ,
কুসুমশয়নে আধেক মগনা
বাকলবসনে আধেক নগনা,
সুখদুখগান গা ই ছে শুইয়া
গাঁথিতে গাঁথিতে মালা ।
ছায়ায় আলোকে , নিঝরের ধারে ,
কোথা কোন্ গুপ্ত গুহার মাঝারে ,
যেন হেথা হোথা কে কোথায় আছে
এখনি দেখিতে পাব —
যেন রে তাদের চরণের কাছে
বীণা লয়ে গান গাব ।
শুনে শুনে তারা আনত নয়নে
হাসিবে মুচুকি হাসি ,
শরমের আভা অধরে কপোলে
বেড়াইবে ভাসি ভাসি ।
মাথায় বাঁধিয়া ফুলের মালা
বেড়াইব বনে বনে ।
উড়িতেছে কেশ , উড়িতেছে বেশ ,
উদাস পরান কোথা নিরুদ্দেশ ,
হাতে লয়ে বাঁশি মুখে লয়ে হাসি ,
ভ্রমিতেছি আনমনে ।
চারি দিকে মোর বসন্ত হসিত ,
যৌবনকুসুম প্রাণে বিকশিত ,
কুসুমের'পরে ফেলিব চরণ
যৌবনমাধুরীভরে ।
চারি দিকে মোর মাধবী মালতী
সৌরভে আকুল করে ।
কেহ কি আমারে চাহিবে না ?
কাছে এসে গান গাহিবে না ?
পিপাসিত প্রাণে চাহি মুখপানে
কবে না প্রাণের আশা ?
চাঁদের আলোতে দখিন বাতাসে
কুসুমকাননে বাঁধি বাহুপাশে
শরমে সোহাগে মৃদুমধুহাসে
জানাবে না ভালোবাসা ?
আমার যৌবনকুসুমকাননে
ললিত চরণে বেড়াবে না ?
আমার প্রাণের লতিকা-বাঁধন
চরণে তাহার জড়াবে না ?
আমার প্রাণের কুসুম গাঁথিয়া
কেহ পরিবে না গলে ?
তাই ভাবিতেছি আপনার মনে
বসিয়া তরুর তলে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jagrota-sapno/
|
4612
|
শামসুর রাহমান
|
কে যেন তরঙ্গ তুলে কুয়াশায়
|
প্রকৃতিমূলক
|
এখন আমার যে বয়স সে বয়সে পৌষ, মাঘে
শীতের সুতীক্ষ দাঁত সহজেই ভেদ করে মাংসের দেয়াল
আর কেঁপে ওঠে খুব সত্তার চৌকাঠ। অন্ধকার
ঘরে একা বসে ভাবি, কী উদ্দাম ছিল
একদা আমার যৌবনের ফাল্গুনের পুষ্পময়
দিনগুলি, বৈশাখী ঝড়ের মতো আবেগের ঝাপ্টা
বয়ে শহরের অলিগলি চষে বেড়াবার দিনগুলি আর
কবিতায় মশগুল নিজের সঙ্গেই কথা-বলা রাতগুলি।সেকালের শীতের সুতীক্ষ্ণ দাঁতে হতো না তেমন
শীতল শরীর এই সাম্প্রতিক বুড়ো লোকটার
কিছুতেই; বসন্ত বাহার রাগে নিয়ত উঠত বেজে সবই
নিমেষে তখন। আজ জবুথবু
পড়ে থাকি এক কোণে হৈ-হুল্লা, মিছিল থেকে দূরে। কোনও দিন
নব্য কোনও কবির বইয়ের
পাতায় উৎসুক চোখ পাতি, স্বাদ নিই, কখনও বা দেখি
কাছের গাছের ডালে বসে-থাকা পাখিটিকে-ওর শীত নেই?সত্য, এখন তো এই শরীর শীতল অতিশয়
ঋতুর কামড়ে, কিন্তু হৃদয়ে আমার
ঝরে না তুষার আজও; কী আশ্চর্য, এখনও সেখান
প্রফুল্ল ধ্বনি হয় বসন্তের কোকিলের গান
প্রায় অবিরাম, সেই গানে প্রস্ফুটিত
হতে থাকে কারও কারও নাম। অকস্মাৎ চোখে পড়ে
কে যেন তরঙ্গ তুলে কুয়াশায় হেঁটে যায় একা
এবং পরনে তার অপরূপ মহীন লেবাস। সে রূপসী
তাকায় না পেছনে একটিবারও। তার হাত ধরে
নিবিড় যাচ্ছেন হেঁটে নিভৃত জীবনানন্দ প্রলম্বিত ছন্দে। (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ke-jeno-toronggo-tule-kuashay/
|
1349
|
তসলিমা নাসরিন
|
প্রিয় মুখ
|
প্রেমমূলক
|
আপনার মুখটি দেখলে আপনাকে কলকাতা বলে মনে হয়
আপনি কি জানেন যে মনে হয়?
আপনি কি জানেন যে আপনি খুব অসম্ভব রকম খুব আস্ত রকম কলকাতা?
জানেন না তো! জানলে মুখটি বারবার আপনি ফিরিয়ে নিতেন না।
একটা কথা শুনুন _
আপনার মুখে তাকালে আমি আপনাকে দেখি না, দেখি কলকাতাকে,
কপাল কুঁচকে আছে রোদে, চোখের কিনারে দুর্ভাবনার ভাঁজ,
গালে কালি,
ঠোঁটে বালি,
দৌড়োচ্ছেন আর বিশ্রি রকম ঘামছেন,
অনেকদিন ভালো কোনও খাবার নেই, অনেকদিন মেজে স্নান হয় না,
ঘুম হয় না!
আপনি কি ভেবে বসে আছেন আপনার প্রেমে পড়েছি আমি যেহেতু
আপনাকে আমি কাছে টেনে আনছি, সামনে বসাচ্ছি,
চিবুক ধরে মুখটি তুলছি, তন্ময় তাকিয়ে আছি,
আর আমার চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু স্বপ্ন জমা হচ্ছে!
আপনার ঠোঁটের দিকে যখন আমি আমার ভেজা ঠোঁটড়োড়া এগিয়ে নিচ্ছি,
আপনি কেঁপে উঠছেন সুখে!
আপনি তো জানেন না কেন আমার ঠোঁট বারবার যেতে চাইছে
আপনার ঠোঁটে
গালে
আপনার কপালে
চোখের কিনারে।
কেন আমার আঙুল আপনার মুখটি স্পর্শ করছে, ধীরে ধীরে চুলগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে,
কুঁচকে থাকাগুলোকে মিলিয়ে দিচ্ছে
ভাঁজগুলোকে নিভাঁজ করছে,
ঘাম মুছে দিচ্ছে, কালি বালি সব তুলে নিচ্ছে!
কেন চুমু খাচ্ছি এত মুখটিকে, জানেন না।
আপনি তো জানেন না যখন আপনাকে বলি যে আপনাকে ভালোবাসি
আসলে আমি কাকে বাসি ভালো,
জানেন না বলে এখনও আশায় আশায় আছেন।
আহ, তুমি আশায় থেকো না তো!
কাউকে এমন কাঙালের মত তাকিয়ে থাকতে দেখতে ভাল লাগে না,
এত বোকা কেন তুই! কেন দেখিস না যে আমার হাতটি নিয়ে যতবার
অন্য কোথাও রাখতে চাস, আমি রাখি না
এত যে দৃষ্টি আমার সরাতে চাস, আমি যে তবু স্থির থাকি মুখে, মুখেই।
আমি যে পুরো রাত্তির কেবল জেগে কাটিয়ে দিই
পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারি তোর মুখে চেয়েই, তোর মুখ চেয়েই!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1963
|
1016
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ঘাসের ভিতরে সেই চড়ায়ের শাদা ডিম
|
সনেট
|
ঘাসের ভিতরে সেই চড়ায়ের শাদা ডিম ভেঙে আছে — আমি ভালোবাসি
নিস্তব্ধ করুণ মুখ তার এই — কবে যেন ভেঙেছিল — ঢের ধুলো খড়
লেগে আছে বুকে তার — বহুক্ষণ চেয়ে থাকি; — তারপর ঘাসের ভিতর
শাদা শাদা ধুলোগুলো পড়ে আছে, দেখা যায় খইধান দেখি একরাশি
ছড়ায়ে রয়েছে চুপে; নরম বিষন্ন গন্ধ পুকুরের জল থেকে উঠিতেছে ভাসি;
কান পেতে থাকি যদি, শোনা যায়, সরপুটি চিতলের উদ্ভাসিত স্বর
মীনকন্যাদের মতো, সবুজ জলের ফাঁকে তাদের পাতালপুরী ঘর
দেখা যায় — রহস্যের কুয়াশায় অপরূপ — রূপালি মাছের দেহ গভীর উদাসীচলে যায় মন্ত্রিকুমারের মতো, কোটাল ছেলের মতো রাজার ছেলের মতো মিলে
কোন এক আকাঙ্খার উদঘাটনে কত দূরে; বহুক্ষণ চেয়ে থাকি একা
অপরাহ্ন এল বুঝি? — রাঙা রৌদ্রে মাছরাঙা উড়ে যায় — ডানা ঝিলমিলে;
এক্ষুনি আসিবে সন্ধ্যা, — পৃথিবীতে ম্রিয়মাণ গোধূলি নামিলে
নদীর নরম মুখ দেখা যাবে — মুখে তার দেহে তার কতো মৃদু রেখা
তোমারি মুখের মতো: তবুও তোমার সাথে কোনোদিন হবে নাকো দেখা।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ghasher-vetorey-shei-chorayer-shada-dim/
|
2817
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
একটা খোঁড়া ঘোড়ার ‘পরে
|
হাস্যরসাত্মক
|
একটা খোঁড়া ঘোড়ার ‘পরে
চড়েছিল চাটুর্জে,পড়ে গিয়ে কী দশা তার
হয়েছিল হাঁটুর যে!
বলে কেঁদে, “ব্রাহ্মণেরে
বইতে ঘোড়া পারল না যে
সইত তাও, মরি আমি
তার থেকে এই অধিক লাজে–
লোকের মুখের ঠাট্টা যত
বইতে হবে টাটুর যে!’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ekta-khora-ghorar-pore/
|
1632
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
পাতাগুলি
|
প্রকৃতিমূলক
|
পাতাগুলি উল্টেপাল্টে নিজেকে দেখায়
যখনই বাতাস এসে নাড়া দিয়ে যায়
বৃক্ষের বাড়িতে
অশ্বত্থের পাতা
এক্ষুনি সবুজ, কিন্তু পরক্ষণে সাদা।
হাক্লান্ত দৌড়চ্ছে গাড়ি, মস্ত একটা ফিতে
খুব দ্রুত গুটিয়ে তুলছে কেউ,
রোদ্দুরে ঝিমোচ্ছে শক্ত লালমাটির ঢেউ
দিগন্ত অবধি।
এইবারে কপালক্রমে রোগা ও তিরতিরে একটা নদী
পেয়ে গেলে ছবিটা সম্পূর্ণ হতে পারে।
বলতে-না-বলতেই গাড়ি পৌঁছে গেল নদীর কিনারে।
নদী তো ভাবনায় ছিল, সামনে এসে দাঁড়াল কখন!
পাথরে পা রেখে জলে তক্ষুনি দুইজন
নেমে গেল। রৌদ্র ঝরে, হাওয়া ঘুরে যায়।
দুটি পাতা উল্টেপাল্টে নিজেকে দেখায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1584
|
2490
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
দুঃসময়ে
|
সনেট
|
বহুদিন শুনিনাতো আত্মার নির্মোহ উচ্চারণ
কেবল ক্ষমতা লোভে ধাবমান বিবেক মগজ---
নগরীর ডাস্টবীনে জমে থাকা মাছিদের ভোজ
বয়ে যেন চলেছে মানুষ আজো --- মানুষের মন
হয়ে গেছে গাঢ় নীল মাছি --- যার পাখার গুঞ্জন
গানের মতই বাজে ক্ষমতাবানের চেতনায়
অথবা আরোগ্যহীন অচৈতন্য ব্যাধির লোনায়
সমাজের প্রতি রন্ধ্রে চলেছে ক্ষয়ের সংক্রমণ ক্ষমতার কীট জানে প্রভূ তার নরকের দূত
বিশ্বময় রক্তপাত --- লক্ষ-কোটি অযুত-নিযুত ----
নেতা-নেত্রী নতজানু --- পণ্ডিতেরা পরিনত দাসে
করুণার পলেস্তারা টেনে নেয় ভঙ্গুর আবাসে
কুঁজো হয়ে খোঁজে কার ব্যাঙ্ক হলো কতটা গরবী
তবু এর মধ্যে জাগে একাকী নির্ভীক এক কবি
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/duhshomoye/
|
3731
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মুক্তবাতায়নপ্রান্তে জনশূন্য ঘরে
|
চিন্তামূলক
|
মুক্তবাতায়নপ্রান্তে জনশূন্য ঘরে
বসে থাকি নিস্তব্ধ প্রহরে,
বাহিরে শ্যামল ছন্দে উঠে গান
ধরণীর প্রাণের আহ্বান;
অমৃতের উৎসস্রোতে
চিত্ত ভেসে চলে যায় দিগন্তের নীলিম আলোতে।
কার পানে পাঠাইবে স্তুতি
ব্যগ্র এই মনের আকূতি,
অমূল্যেরে মূল্য দিতে ফিরে সে খুঁজিয়া বাণীরূপ,
করে থাকে চুপ,
বলে,আমি আনন্দিত– ছন্দ যায় থামি–
বলে, ধন্য আমি। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/muktobatayonprante-jonoshunyo-ghore/
|
3252
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দেখলো সজনী চাঁদনি রজনী
|
ভক্তিমূলক
|
দেখলো সজনী চাঁদনি রজনী,
সমুজল যমুনা গাওত গান,
কানন কানন করত সমীরণ
কুসুমে কুসুমে চুম্বন দান।
কাহ লো যমুনা জোছন-ঢল ঢল
সুহাস সুনীল বারি?
আজু তোঁহারই উজল সলিল পর
নয়ন সলিল দিব ডারি।
কাহ সমীরণ লুটই কুসুম-বন
অলসি পড়সি যমুনায়?'
তোঁহার চম্পক-বাসিত লহরে
মিশাব নিশাস-বায়।জনম গোঁয়ায়নু রোয়ত রোয়ত
হম তর কোই ত কাঁদল না!
জনম গোঁয়ায়নু সাধত সাধত
হমকো কোইত সাধল না!
সকল তয়াগনু যো ধন আশে
সো বি তয়াগল মোয়
অপন ছোড়ি সব, অপন করনু যোয়
সো বি সজনি পর হোয়!
যমুনে হাস হাস লো হরখে
হম তর রোয়বে কে?
তোঁহারি সুহসিত নীল সলিল পরি
রাধা সঁপবে দে!
এক দিবস যব মাধ হমারা
আসবে কিনার তোর,—
যব সো পেখবে তোঁহার সলিলে
ভাসত তনুয়া মোর—তব্ কি শ্যাম সো মানস পাশে
তিল দুখ পাওবে না?
শ্যামক নয়নে বিন্দু নয়ন জল
তবহুঁ কি আওবে না?
রয়নে কুঞ্জে আসবে যব সখি
শ্যাম হমারই আশে,
ফুকারবে যব্ রাধা রাধা
মুরলি ঊরধ-শ্বাসে,
যব সব গোপিনী আসবে ছূটই
যব হম আসব না;
যব সব গোপিনী জাগবে চমকই
যব হম জগব না,
তব কি কুঞ্জপথ হমারি আশে
হেরবে আকুল শ্যাম?
বন বন ফেরই সো কি ফুকারবে
রাধা রাধা নাম?না যমুনা, সো এক শ্যাম মম
শ্যামক শত শত নারী;
হম যব যাওব শত শত রাধা
চরণে রহবে তারি!
তব সখি যমুনে, যাই নিকুঞ্জে,
কাহ তয়াগব দে?
অভাগীর তর বৃন্দাবনমে
কহ সখি, রোয়ব কে!
ভানু কহে চুপি ‘মান ভরে রহ
আও বনে ব্রজ-নারী,
মিলবে শ্যামক শত শত অাদর
শত শত লোচন বারি। (ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dekhlo-sojoni-chadni-rojoni/
|
5618
|
সুকুমার রায়
|
টুকরো ছড়া
|
ছড়া
|
তিন বুড়ো পন্ডিত টাকচুড়ো নগরে
চ’ড়ে এক গামলায় পাড়ি দেয় সাগরে।
গাম্লাতে ছেঁদা আগে কেউ দেখনি,
গানখানি তাই মোর থেমে গেল এখনি।।ম্যাও ম্যাও হুলোদাদা, তোমার যে দেখা নাই?
গেছিলাম রাজপুরী রানীমার সাথে ভাই!
“তাই নাকি? বেশ বেশ, কি দেখেছ সেখানে?”
দেখেছি ইদুর এক রানীমার উঠানে।।”গাধাটার বুদ্ধি দেখ!- চাঁট মেরে সে নিজের গালে,
কে মেরেছে দেখবে বলে চড়তে গেছে ঘরের চালে।ছোট ছোট ছেলেগুলো কিসে হয় তৈরি,
-কিসে হয় তৈরি,
কাদা আর কয়লা ধুলো মাটি ময়লা,
এই দিয়ে ছেলেগুলো তৈরি।
ছোট ছোট মেয়ে গুলি কিসে হয় তৈরি।
কিসে হয় তৈরি?
ক্ষীর ননী চিনি আর ভাল যাহা দুনিয়ার
মেয়েগুলি তাই দিয়ে তৈরি।।রং হল চিঁড়েতন সব গেল ঘুলিয়ে,
গাধা যায় মামাবাড়ি টাকে হাত বুলিয়ে।
বেড়াল মরে বিষম খেয়ে, চাঁদের ধরল মাথা
হঠাৎ দেখি ঘর বাড়ি সব ময়দা দিয়ে গাঁথা।। (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/tukro-chora/
|
2071
|
মহাদেব সাহা
|
আমি কেউ নই
|
চিন্তামূলক
|
আমি কেউ নই, আমি শরীরের
ভেতরে শরীর
গাছের ভেতরে গাছ,
এই অনন্ত দিনরাত্রির মধ্যে একটি বুদ্বুদ;
আমি মানুষের মতো কিন্তু মানুষ নই
শুধু মুখচ্ছবি
মানুষের একটি আদল
ছায়ার মানুষ;
আমি কেউ নই, কোনোকিছু নই
আমি মানুষের মতো
এক মুখোশ মানুষ
হয়তো জন্মেই মৃত আমি, হয়তো এখন
কেবল ছায়া,
মানুষের মতো
এই ছায়া-মানুষ;
আমি কেউ নই, আমি কোনোকিছু নই,
আমি ছায়ার ভেতরে শরীর
আমি কেউ নই, আমি মানুষের ভেতরে
মানুষ, ভেতর-মানুষ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1400
|
4453
|
শামসুর রাহমান
|
এই পরিণতি জেনেও এখনও
|
চিন্তামূলক
|
গভীর নিশীথে যখন বাড়ির সবাই ঘুমের
চুমোয় অচিন বাগানে মুগ্ধ, আমি জাগ্রত
একাকী লেখার টেবিলে কলম হাতে নিয়ে আর
দূরের আকাশে তারাগুলো হাসে কবির কাণ্ডে।
এই যে নিজেকে কবি বলে মেনে নিয়েছি কিছুটা-
ব্যাপারটি ঠিক হয়নি শোভন। মাঝে মাঝে ভাবি,
সত্যি কি আমি পেরেছি দাঁড়াতে এখনও প্রকৃত
সৃজন-মুখর কবির সারিতে? কে দেবে ভরসা?ভীষণ আঁধার আমাকে চকিতে মুছে ফেলে দিলে,
আমার সৃষ্টি শব্দমালা কি ঝুলবে তখনও
পাঠক-সমাজে? জানবো না, হায়, কিছুতেই আর।
তবুও সফেদ কাগজ সাজাই কালো অক্ষরে।হয়তো আড়ালে জাঁদরেল কোনও ক্রিটিক অধরে
বাঁকা হাসি টেনে আমার বেচারা কবিতার বই
ছুড়ে ফেলে দেন বাজে কাগজের ঘৃণ্য পাহাড়ে।
এই পরিণতি জেনেও এখনও বেহায়া মাথায়
এক রাশ শাদা কাশফুল নিয়ে কখনও সকালে
দুপুরে অথবা গভীর নিশীথে কলম চালাই। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ei-porinoti-jeneo-ekhon/
|
5928
|
সৈয়দ শামসুল হক
|
একুশের কবিতা
|
স্বদেশমূলক
|
সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়
বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল–তপ্তশ্বাস হাহুতাশ পাতাঝরা বিদীর্ণ বৈশাখীর জ্বালাকর দিগন্তে
আষাঢ়ের পুঞ্জীভূত কালো মেঘ আসবেই ঠিক।
সাগরের লোনাজলে স্নিগ্ধ মাটীর দ্বীপ
শ্যামলী স্বপ্নের গান বুকে পুষে
নবীন সূর্য্যেরে তার দৃঢ় অঙ্গীকার জানাবেই।
সংখ্যাহীন প্রতিবাদ ঢেউয়েরা আসুক, তুমি স্থির থেকো।
প্রাকৃতিক ঝঞ্ঝাবাত অবহেলা করি
সঞ্চয় করে যাও মুঠো মুঠো গৈরিক মাটী:
সবুজ গন্ধবাহী সোনালী সূর্য্যের দিশা
অকস্মাৎ উদ্ভাসিত কোরে দেবে তোমার চলার পথ।সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়
বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল–
পৃথিবীর জিজীবিষু আত্মার আছে। ঘনীভূত জনতার হৃদয়ে হৃদয়ে
উজ্জ্বল শিখা সেই অমর সংবাদে ঢেউ তুলে দিয়ে গেল।।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/ekusher-kobita/
|
5409
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
প্রথম গালি
|
ছড়া
|
বয়েস- আড়াই কি দুই
মনটি নির্মল জুই,
হালকা যেন হাওয়া
মেয়ে সে মুখ-চাওয়া
মায়ের কাছে কাছে
ছায়ার মত আছে
জানে না মা বিনা কিছুই৷
আর সে দিদি চেনে তার
দিদি সে সাথী খেলিবার,
দুটিতে পিঠোপিঠি
তবুও খিটিমিটি
হয় না বেশী বেশী
নাইক রেষারেষি
কলহ নাইক নিতুই৷
জগৎ মানে যেন,−তার−
মা, দিদি আপনি সে আর,
এ ছাড়া কিছুই নেই
চেনেনা কারুকেই,
অকথা কুকথার
ধারে না কোনো ধার
শেখেনি আজও ‘তুই’ ‘মুই’৷
একদা হ’ল দুটি বোনে
পুতুল নিয়ে কি কারণে
ঝগড়া কাড়াকাড়ি,
তখন দিয়ে আড়ি
হারিয়া কাদোঁ-কাদোঁ
হ’য়ে সে আধো আধো
কহিল ‘ডিডি!টুমি-টুই!’
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/prothom-gali/
|
1636
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রতীকী সংলাপ
|
রূপক
|
“দিনমান তো বৃথাই গেল, এখন আমার যুদ্ধ;
এখন আমার অস্ত্রসজ্জা সব কিছুর বিরুদ্ধে।”
বলেই তিনি হাত বাড়িয়ে নিলেন পদ্মফুল।
এটা কেমন যুদ্ধ? সাদা পদ্মফুলের কান্তি
যে-বস্তুটার প্রতীক, সেটা নিতান্তই যে শান্তি!”
দ্বিতীয় জন তন্মুহূর্তে ধরিয়ে দিলেন ভুল।
“তবে বৃথাই বর্ম আঁটো, সাজাও চতুরঙ্গ,
এখন আমি সন্ধি করব ঈশ্বরের সঙ্গে।”
বলেই তিনি পদ্ম ফেলে গোপাল তুলে নিলেন।
“এটা কেমন সন্ধি? জানে সবাই জগৎ সুদ্ধ
গোলাপ ঝরায় রক্তধারা, গোলাপ মানেই যুদ্ধ।”
দ্বিতীয় জন পুনশ্চ তাঁর ভুল ধরিয়ে দিলেন।
আমরা দেখছি খেলায় মত্ত প্রতীকী উদ্ভ্রান্তি।
রৌদ্রে ভাসে চবুতরা, ছায়ায় ভাসে খিলেন।
ভুল ঠিকানায় ঘুরে বেড়ায় যুদ্ধ এবং শান্তি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1643
|
4647
|
শামসুর রাহমান
|
খরার দুপুরে
|
সনেট
|
একটি দোতলা ফ্ল্যাটে লকলকে খরার দুপুরে
কিঞ্চিৎ ছায়ার লোভে দেয় হানা। পয়লা বৈশাখে।
ছিলাম আমরা বসে মুখোমুখি নতুনের ডাকে
অনেকেই বহির্মুখী। বৈশাখী মেলায় যে রোদ্দুর
ছিলো, তারই আভা বুকে নিয়ে, বলো কতদূর
শৈশবের টলটলে পুকুর আমার বলে কাকে
তোমার দু’চোখে পাই, কী খেয়ালে তুমি স্তব্ধতাকে
হঠাৎ দুলিয়ে ফ্ল্যাটে হও পুরোনো গানের সুর।যখন তোমার কণ্ঠে সাতটি সুরের উন্মীলন
চতুষ্পাশ্বে মায়া বোনে, আহত হরিণ শুশ্রূষায়
ক্রমান্বয়ে সুস্থ হয় অরণ্যের তন্দ্রালু ঊষায়,
ভবঘুরে পুনরায় ফিরে পায় গার্হস্থ্য জীবন,
আমার অসুস্থ মন অমৃতের খর পিপাসায়
আতর্স্বরে করে উচ্চারণ-চাই ভিন্ন জাগরণ। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khorar-dupure/
|
2480
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
চিৎকারের ভূগোলে কবিতা
|
চিন্তামূলক
|
আমি কাল সারারাত চিৎকারের ভূগোল খুঁজেছি
ব্যাকরণ থেকে আমি য্যফলাটা খুলে নিয়ে খোদনের কাজে
ব্যবহার করে শেষে উৎপত্তি ব্যুৎপত্তি খুঁজে খুঁজে
বাক্যগঠনের যত অনর্থ ঘটিয়ে - কবিতাকে
সারা রাত ধর্ষণ করেছি - অথচ সে মৃত ছিলো
চিৎকার করেনি একবার - আর তার চারপাশে
পড়েছিলো বিড়ালের পাঁজরের সাদা সাদা হাড়প্রকৃতি বিজ্ঞান মতে অনায়াসে সিদ্ধান্তে এলাম
প্রথম ধর্ষক আমি নই - প্রায় শতাব্দী কালের
নির্যাতনে ভূগোলের বিকৃতি ঘটেছে বারে বারে
কবিতাও সেই ভাবে ব্যবচ্ছেদ হয় নিত্য লাশকাটা ঘরে -
নাকি সেটা ইদানীং মাংসের দোকান হয়ে তাতে কবিতার
স্তন ঠোঁট চোখ উড়ু নিতম্ব যৌনাঙ্গ সব চিন্তার শলায়
গেঁথে গেঁথে সারি সারি সাজিয়ে ঝুলিয়ে রাখে অথর্ব চিৎকার
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/chitkarer-bhugole-kobita/
|
2266
|
মহাদেব সাহা
|
শুদ্ধ
|
প্রেমমূলক
|
তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি প্রতিটি ভোরের মতো
আবার নতুন হয়ে উঠি,
হই সূর্যোদয়
আমার জীবন তুমি পরিশুদ্ধ করো, আমি প্রস্ফুটিত হই
আমি বহুদিন ঝরা ব্যথিত বকুল অন্ধকারে, আমি বহুদিন
বিষন্ন বিধুর ;
একবার আমার মাথায় হাত রাখো, সুপ্রসন্ন হও
এই দগ্ধ বুকে করো শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ
আমি শ্যামল সবুজ বৃক্ষ হয়ে উঠি ।
তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি হই সূর্যোদয়,
আমি হই উদিত আকাশ
আমি হয়ে উঠি প্রতিটি শিশুর হাতে প্রথম বানান শেখা বই,
হয়ে উঠি ভোরবেলাকার পাখিদের গান ;
আমার জীবন তুমি শুদ্ধ করো, আমি হই নতুন সবুজ
কোনো দ্বীপ,
আমি হই বর্ষাকাল, আমি হই বরষার নব জলধারা
আমি বহুদিন ব্যথিত বিষাদ, আমি বহুদিন একা
ঝাউবন ।
তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি হয়ে উঠি সদ্যফোটা ফুল
আমি হয়ে উঠি সকালের ঘুমভাঙ্গা চোখ ।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-mahadeb-saha/
|
2960
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ক্ষুদ্রের দম্ভ
|
নীতিমূলক
|
শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির,
লিখে রেখো, এক ফোঁটা দিলেম শিশির। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khudrer-domvo/
|
5324
|
শামসুর রাহমান
|
স্বর্গের বর্ণিল স্মৃতি
|
রূপক
|
এই তো দাঁড়ানো তুমি সম্মুখে আবার একাকিনী
চোখে নিয়ে শতাব্দীর অস্তরাগ। মনে হয়, সাত
সুমুদ্দুর তের নদী পেরিয়ে এসেছো, রিনিঝিনি
রক্ত বাজে আমার শিরায়। জ্যোৎস্নাময় মধ্যরাত
তোমার শরীর, স্মিত ত্বকে বাংলাদেশের গ্রীষ্মের
মোহন দহন প্রাথমিক এবং তোমার ঠোঁটযেন তরমুজ-ফালি তৃষ্ণার্তের কাছে। এ দৃশ্যের
বর্ণনা কী করে দিই? পারতেন নক্ষত্রের কোট-
পরা কোনো চিত্রকর ভালোবেসে আঁকতে তোমাকে,
পারতেন সহজেই ফর্ম ভেঙে পিকাসো মার্তিস
নব্য কোনো ফর্মে অমরতা দিতে তোমার সত্তাকে।
গোপনে তোমাকে দেখে দেবতাও দেয় দীর্ঘ শিস।আমার স্বপ্নের অন্তরঙ্গ সবুজ উপত্যকায়
তোমার যৌবন শত নীলকণ্ঠী পাখি সৃষ্টি করে,
যে-যৌবন গুণীর তানের মতো ঢেউ দিয়ে যায়
নিসর্গের জায়মান আনাচে কানাচে। বায়ুস্তরে
বিদ্যুল্লতা, জ্বলজ্বলে নগ্নতাকে ঢাকবার ছলে
রাখো হাত যোনিতে এবং সামুদ্রিক উদ্ভিদেরঘ্রাণ জেগে থাকে বাহমূলে, দুটি শ্বেতপদ্ম জ্বলে
বুকে নির্নিমেষ, বুঝি তুমি হাতের মুঠোয় ফের
রহস্য রেখেছো পুরে, আমার গহন অন্তস্তলে
শামুক, পাথর, শঙ্খ এবং সোনালি মাছ মাতে
বন্দনায় তোমার নিদ্রিত নগ্নতার ছায়াবীথি
গড়ে ওঠে তোমার আমার মধ্যে ঢেউয়ের আঘাতে।এমন নীরব তুমি, যেন কোনো ভাষা জানা নেই
এখনো তোমার, শুধু এক সুর উভিন্ন সত্তার
বাঁকে বাঁকে বয়ে যায়। হে আমার নতুন অতিথি,
ফেনা থেকে উঠে-আসা, আমার হৃদয় তোমাতেই
নিজস্ব আশ্রয় খোঁজে। জলবিন্দুময় স্তনভার
আমার চৈতন্যে আনে হৃত স্বর্গের বর্ণিল স্মৃতি! (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/swarger-bornil-smriti/
|
5736
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
আরও নিচে
|
চিন্তামূলক
|
সিংহাসন থেকে একটু নিচে নেমে, পাথরের
সিঁড়ির উপর বসে থাকি
একা, চিবুক নির্ভরশীল
চোখ লোকচক্ষু থেকে দূরে।
‘সম্রাটের চেয়ে কিছু কম সম্রাটত্ব’ থেকে ছুটি নিয়ে আজ
হলুদ দিনাবসানে পরিকীর্ণ শব্দটির মোহে
মাটির মানুষ হতে সাধ হয়। এক-একদিন একরকম হয়।
আমার চোখের নীচে কালো দাগ
ব্যান্ডেজের মধ্যে একটা পোকা ঢুকলে যে-রকম জাদুদন্ডসম কোনো
মহিলার মতো
নিয়তি বদল করে, আলো-ছায়া-আলো ঘোরে নিভৃত সানুদেশে
দপ করে জ্বলে ওঠে হৃদয়ের পুরনো বারুদ
তেমনিই দিনাবসান
তেমনিই মোহের থেকে মুক্ত নিচু চাঁদ-
সিংহাসন থেকে নেমে, হাত ভরা পশমের মতো
রোমশ স্তব্ধতা।
পাথরের মতো মসৃণ বেদির নিচে রুক্ষ মাটি, একটু দূরে পায়ে চলা পথ।
সম্রাটের শেষ বৃত্য চিরতরে যেখানে শয়ান
তার চেয়ে দূরে, সীমার যেখানে শেষ
সেখানে উদ্ভিদ, জল মেতে আছে পাংশু ঈর্ষায়
যেখানে বিশীর্ণ হাত কাদার ভেতর খোঁজ বলির ফসল
তার চেয়ে দূরে
যেখানে শামুক তার খাদ্য পায়, নিজেও সে খাদ্য হয়
ভেসে যায় সাপের খোলস, সেখানেও
আমার অতৃপ্তি বড় দীর্ঘশ্বাস বিষদৃষ্টি নিয়ে জেগে রয়-
মুকুট খোলার পর আমি আরও বহুদূরে নেমে যেতে চাই।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1851
|
3060
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ছায়াসঙ্গিনী
|
প্রেমমূলক
|
কোন্ ছায়াখানি
সঙ্গে তব ফেরে লয়ে স্বপ্নরুদ্ধ বাণী
তুমি কি আপনি তাহা জানো।
চোখের দৃষ্টিতে তব রয়েছে বিছানো।
আপনাবিস্মৃত তারি।
স্তম্ভিত স্তিমিত অশ্রুবারি।একদিন জীবনের প্রথম ফাল্গুনী
এসেছিল, তুমি তারি পদধ্বনি শুনি
কম্পিত কৌতুকী
যেমনি খুলিয়া দ্বার দিলে উঁকি
আম্রমঞ্জরির গন্ধে মধুপগুঞ্জনে
হৃদয়স্পন্দনে
এক ছন্দে মিলে গেল বনের মর্মর।
অশোকের কিশলয়স্তর
উৎসুক যৌবনে তব বিস্তারিল নবীন রক্তিমা।
প্রাণোচ্ছ্বাস নাহি পায় সীমা
তোমার আপনা-মাঝে,
সে-প্রাণেরই ছন্দ বাজে
দূর নীল বনান্তের বিহঙ্গসংগীতে,
দিগন্তে নির্জনলীন রাখালের করুণ বংশীতে।
তব বনচ্ছায়ে
আসিল অতিথি পান্থ, তৃণস্তরে দিল সে বিছায়ে
উত্তরী-অংশুকে তার সুবর্ণ পূর্ণিমা
চম্পকবর্ণিমা।
তারি সঙ্গে মিশে
প্রভাতের মৃদু রৌদ্র দিশে দিশে
তোমার বিধুর হিয়া
দিল উচ্ছ্বাসিয়া।তার পর সসংকোচে বদ্ধ করি দিলে তব দ্বার,
উচ্ছৃঙ্খল সমীরণে উদ্দাম কুন্তলভার
লইলে সংযত করি--
অশান্ত তরুণ প্রেম বসন্তের পন্থ অনুসরি
স্খলিত কিংশুক-সাথে
জীর্ণ হল ধূসর ধুলাতে। তুমি ভাবো সেই রাত্রিদিন
চিহ্নহীন
মল্লিকাগন্ধের মতো
নির্বিশেষে গত।
জানো না কি যে-বসন্ত সম্বরিল কায়া
তারি মৃত্যুহীন ছায়া
অহর্নিশি আছে তব সাথে সাথে
তোমার অজ্ঞাতে।
অদৃশ্য মঞ্জরি তার আপনার রেণুর রেখায়
মেশে তব সীমন্তের সিন্দূরলেখায়।
সুদূর সে ফাল্গুনের স্তব্ধ সুর
তোমার কণ্ঠের স্বর করি দিল উদাত্ত মধুর।
যে চাঞ্চল্য হয়ে গেছে স্থির
তারি মন্ত্রে চিত্ত তব সকরুণ, শান্ত, সুগম্ভীর।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sahasagene/
|
5054
|
শামসুর রাহমান
|
ভয় হয়
|
প্রেমমূলক
|
মনে হয়, কতকাল প্রেরণার আলোড়ন নেই
মনের গহনে, স্থবিরতা বসে আছে
মুখোমুখি, শব্দেরা গুঞ্জন তুলে চকিতে উধাও। কবিতার
খাতার উম্মুখ পাতা বিধবার শাদা
থানের মতোই থাকে। হঠাৎ তোমার মুখ জেগে
ওঠে, যেন তুমি এলে হৃদয়ে তরঙ্গ তুলে অলৌকিক কোন
হেমবর্ণ দ্বার খুলে। কী আশ্চর্য আমার সম্মুখে
উম্মোচিত কবিতার স্তন, নাভিমূল। ভয় হয়,
যদি সে হারিয়ে যায় কুয়াশায় তবে
কাকে খুঁজে বেড়াবো সর্বদা? (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/voy-hoy/
|
2142
|
মহাদেব সাহা
|
চিঠি
|
প্রেমমূলক
|
করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙ্গুলের মিহিন সেলাইভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও …
বর্ণণা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও!আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি,
আসবেন অচেনা রাজার লোক
তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে ….
এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল! …করুণা করে হলেও চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি
দিও খামে
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস
একটি ফুলের ছোট নাম,টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু, হয়তো পাওনি খুঁজে
সেইসব চুপচাপ কোন দুপুরবেলার গল্প
খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড় একা লাগে, তাই লিখোকরুণা করে হলেও চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলেও বোলো, ভালবাসি !
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a0%e0%a6%bf-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%93-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%ac-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be/
|
5105
|
শামসুর রাহমান
|
মাতৃডাক
|
স্বদেশমূলক
|
ছিল না নদী, পাহাড় অথবা প্রান্তর; শস্যের ক্ষেতের
ঢেউ পড়েনি চোখে, বাউলের গান
যায়নি শোনা। এই শহরে শহীদ মিনারে
কতিপয় নারী, যেন শস্যক্ষেত, বিকেলের
নিস্তেজ আলোয়। শহীদ মানিকের মা, একাত্তরের
বীর প্রতীকের মা মাইক্রোফোনের
সামনে দাঁড়ানো এই প্রথমবারের মতো
বক্তার ভূমিকায়। বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা
তাঁর ওষ্ঠে শ্যামা পাখি,
বললেন তিনি মমতার শ্যামল স্বরে-
‘বিশ বছর মা ডাক শুনিনি আমি
তোমরা সবাই আমার সন্তান,
তোমাদের মুখে মা ডাক শুনতে সাধ হয়।নিমিষেই জনসমাবেশে মাতৃডাকে বাঙ্ময়,
গাছপালা, উদ্যান, পথরেখা, নদী-নালা, ব্রিজ দূরের
আকাশ
‘মা, মা’ বলে ডেকে ওঠে। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/matridak/
|
3119
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ঝাঁকড়াচুল
|
প্রেমমূলক
|
ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা কাউকে বলি নি,
কোন্ দেশে যে চলে গেছে সে-চঞ্চলিনী।
সঙ্গী ছিল কুকুর কালু,
বেশ ছিল তার আলুথালু,
আপনা-'পরে অনাদরে ধুলায় মলিনী।হুটোপাটি ঝগড়াঝাঁটি ছিল নিষ্কারণেই
দিঘির জলে গাছের ডালে গতি ক্ষণে-ক্ষণেই।
পাগলামি তার কানায় কানায়,
খেয়াল দিয়ে খেলা বানায়,
উচ্চহাসে কলভাষে কলকলিনী।দেখা হলে যখন-তখন বিনা অপরাধে
মুখভঙ্গী করত আমায় অপমানের ছাঁদে।
শাসন করতে যেমন ছুটি
হঠাৎ দেখি ধুলায় লুটি'
কাজল আঁখি চোখের জলে ছলছলিনী।আমার সঙ্গে পঞ্চাশবার জন্মশোধের আড়ি
কথায় কথায় নিত্যকালের মতন ছাড়াছাড়ি।
ডাকলে তারে "পুঁটলি' ব'লে
সাড়া দিত মর্জি হলে,
ঝগড়াদিনের নাম ছিল তার স্বর্ণনলিনী।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jakra-chelu/
|
5189
|
শামসুর রাহমান
|
রুস্তমের স্বগতোক্তি
|
মানবতাবাদী
|
কেমন সুর্যাস্ত এলো ছেয়ে চরাচরে, রক্তচ্ছটা
সর্বত্র ভীষণ জ্বলজ্বলে, ধরায় দারুণ জ্বালা
আমার দু’চোখে, আর যেদিকে তাকাই দেখি শুধু
একটি ফ্যাকাশে মুখ, নিষ্প্রভ তরুণ ফল যেন,
ভূলুণ্ঠিত গোধূলিতে। ঝকঝকে বল্লমের মতো,
মনে পড়ে, উঠেছিলো ঝল্সে সে ক্রুর রণক্ষেত্রে
সুকান্ত তেজস্বী যুবা। যদিও দূরন্ত যোদ্ধা, তবু
ছিলো না ঔদ্ধত্য কিংবা কর্কশতা কন্ঠস্বরে তার।
যেমন সে অশ্বারোহণে কি অস্ত্রশিক্ষায় নিপুণ
তেমনি পারদর্শী বাক্য উচ্চারণে, সৌজন্যে ভাস্বর।
শত্রুসংহারের নেশা। যে-বীরের শিরায় শিরায়
অত্যন্ত ফেনিল তার কন্ঠস্বরে রবাবের সুর
পাখির ওড়ার মতো, কখনো জানিনি আগে;হায়,
যে অন্ধ কৃষক তীক্ষ্ম কাস্তের আঘাতে স্বপ্নময়,
সাধের ফসল তার কেটে ফেলে অকালে, আমিও
তারই মতো বিভ্রমের মনহুশ ঊর্ণাজালে বন্দী
হয়ে নিজ হাতে ক্ষিপ্র করেছি বিরানা এই বুক,
আমার বয়সী বুক। যে মহল গড়েছি নিয়ত
স্বপ্নে, যখন তা কাছে এলো আসমানী ইশারায়
প্রকৃত নির্মাণ হ’য়ে, নিজেই করেছি তাকে ধু-ধু
ধ্বংসস্তুপ। কেন তাকে দেখামাত্র হৃদয় আমার
হয়নি উদ্বেল পিতৃস্নেহে? নিমেষেই কেন চোখ
হয়নি বিপুল বাষ্পাকুল? তবে কি রক্তের টান
দুর্মর সংস্কার কোনো? শুধু জনশ্রুতি, যুগ যুগ
ধ’রে যা’ লালিত আমাদের যৌথ সরল স্মৃতিতে?
কেন তাকে দেখামত্র বর্ম খুলে ফেলে, অস্ত্র রেখে
জড়িয়ে ধরিনি বুক, নিইনি মাথার ঘ্রাণ তার?
তাহ’লে পাঁজরে তার বর্শা-চালনার আগে কেন
কাঁপেনি আমার বুক একরত্তি? কেন এই হাত
মুহূর্তে হয়নি শিলীভূত? জয়মত্ত বীর আমি,
হইনি স্থবির কেন ক্ষণকাল? কেন অহমিকা
রৌদ্রঝলসিত শিরস্ত্রাণ হ’য়ে রইলো সর্বক্ষণ?
ধিক তোকে হে মূঢ় অহমিকা, ধিক।তাহমিনা,
মিথ্যার অক্ষরে কেন লিখেছিলে বিভ্রান্ত খেয়ালে
প্রতারক পত্র তুমি আঠারো বছর আগে? কেন
পুত্রের পিতাকে রেখেছিলে পুত্রহীন ক’রে, কেন?
তুমিতো জানো না এই হতভাগ্য পিতা পুত্রহীন
হয়েছে দ্বিতীয়বার। তুমিতো জানো না! তাহমিনা
তোমার দুলাল আজ এই বিয়াবানে কী নিষ্প্রাণ
কী নিঃস্পন্দ পড়ে আছে অশ্রুময় ঘাতক পিতার
ফজুল স্নেহের খিমাতলে!কেন আমি আজ তাকে
মিছেমিছি করি দায়ী? রাখ্শারোহী রুস্তম কি ছুটে
পারতো না যেতে ভুল আত্মজার জন্মের সংবাদ
পেয়ে? কেন সে যায় নি পাঁচ দশ মাস পরে কিংবা
দু’চার বছর পরে? কেন তার রক্তে জাগেনি কল্লোল
সন্তানের অকর্ষণে? কন্যা কি সন্তান নয় তবে?
কন্যার ওষ্ঠে কি হাসি ফোটেনা কখনো কিংবা তার
মাথায় থাকেনা ঘ্রাণ? কন্যা পিতাকে দুই হাতে
ধরে না জড়িয়ে? খেলনার জন্যে করে না আবদানে
কোনোদিন? থাকে না প্রবাসী জনকের প্রতীক্ষায়?
কন্যার শিরায় প্রবাহিত হয় না কি জনকের
সতেজ শোণিত ধারা? অনবোলা পরিন্দা সে-ও তো
যোজন যোজন দূর থেকে উড়ে আসে নীড়ে তার
শাবকের কাছে স্নেহবশে, সন্তান পুত্র কি কন্যা
করে না বিচার। হায়, কোন্ অভিশাপে হে রুস্তম
রণমত্ত অবিচল স্নেহহীন প্রবাদপ্রতিম বীর, তুমি
রেখেছো নিজেকে দূরে এতকাল দয়িতা এবং
সন্তানের কাছ থেকে? কী এমন ক্ষতি হতো কার
যদি এ যুদ্ধের ডঙ্গা স্তব্ধ হতো অনেক আগেই,
যদি দৈববলে আফ্রসিয়াবের রণমত্ততার
হতো অবসান এই সর্বনাশা দ্বৈরথের আগে,
যদি কায়কাউসের জলপাই পাতা উঠতো নেচে
আমার পুত্রের বুকে রুস্তমের মনহুশ বর্শা
উদ্যত হওয়ার আগে? কিন্তু, হায়, তা’ হওয়ার নয়।
আমরা ধনুক যাঁর হাতে তিনি নিজস্ব ইচ্ছায়
বাঁকান যতটা আমাদের, ততটাই বেঁকে যাই,
কেউ কেউ মচকাই, কেউবা ভীষণ খান খান।
লাশ নিয়ে বসে আছি,এখন ভীষণ ক্লান্ত আমি;
ওষ্ঠময় মরুবালি, সারামুখে খুনেলা রেখার
হিজিবিজি, মনে হয় হৃতজ্যোতি প্রবীণ ঈগল
সত্তায় নিয়েছে ঠাঁই। শুধু মাঝে-মাঝে পামীরের
উদাত্ত প্রান্তরেয়ার আলরুরুজের চূড়া থেকে
ভেসে-আসা সোহরার সোহরাব ধ্বনি, যা’ আমারই
শূন্য পাঁজরের আর্তনাদ, শুনে কেঁপে উঠি, যেন
মরুর শীতার্ত রাতে আহত নিঃসঙ্গ পুশুরাজ।এই আমি কতদিন ছাগলের চামড়ার মশক
থেকে ঢেলে আকন্ঠ করেছি পান ঝাঁঝালো শারাব
ইয়ারের মজলিশে রাত্রির তাঁবুতে। আকৈশোর
মৃগয়াবিলাসী আমি, ছুটেছি অরণ্যে, দীর্ঘশ্বাস-
ময় প্রান্তরের বুকে, কী এক নেশায় বুঁদ হ’য়ে
করেছি শিকার বাঘ, সংখ্যাহীন পাহাড়ি হরিণ।
মাজেন্দারানের পথে লড়েছি সিংহের সঙ্গে আর
হয়েছে নিমেষে দীর্ণ আমার নেজায় ভয়ানক
আতশবমনকারী অজগর; পাথুরে জমিনে,
রেগিস্তানে কত যে মড়ার খুলি প্রত্যহ উঠেছে
বেজে দ্রুত হাওয়া-চেরা রাখশ-এর প্রখর খুরাঘাতে,
সফেদ দৈত্যের প্রাণ করেছি সংহার, গুহাবন্দী
কায়কাউসের আয়ু-রাশ্মি দীপ্র দীর্ঘস্থায়ীকরার উদ্দেশ্যে শত শত খ্যাত গর্বিত বীরের
শিরশ্ছেদ করেছি হেলায় ধূলিগ্রস্ত রণক্ষেত্রে।
শুনিনি এমন যোদ্ধা আছে ত্রিভূবনে, রক্তে যার
জমে না তুষারকণা রুস্তমের রণহুংকারে হঠাৎ।
সোহবার তোর এই বালিমাখা রক্তাক্ত শরীর,
সেই পরাক্রান্ত চিরজয়ী রুস্তমকে আজ স্তব্ধ
ইরান-তুরাণ ব্যাপী অস্তরাগে করেছে ভীষণ
ক্লান্ত ওরে, পরাজিত। মিটেছে আগ্রাসী রণক্ষুধা,
আর নয় দুনিয়া কাঁপানো দামামার অট্রহাসি,
এইতো রেখেছি বর্ম খুলে, পড়ে থাকে তলোয়ার।
সোহরাব ফিরবে না আর;জানিনা মৃত্যুর পরে,
সে কেমন পটভূমি রয়েছে সাজানো, কোন্ মঞ্চ?
পুনরায় ভাঙবে কি ঘুম কোনো ভোরবেলা খুব
নিঝুম খিমায় স্নিগ্ধ হাওয়ার কম্পনে? শিরস্ত্রাণে
পরবে কি খসে দূরযাত্রী রাঙা পাখির পালক?
নতুন সামানগাঁয়ে যাবো কি আবার গোধূলিতে
কোনোদিন পথশ্রান্ত? প্রাক্তন প্রিয়ার হাত নেবো
তুলে হাতে, দেখবো মেহেদি-নক্শা তার করতলে
অথবা রহস্যময় কোনো সুর শুনে মরুদ্যান
ছেড়ে চলে যাবো দূর কুহকিনী নারীর গুহায়?
তুলে নেবো হাতে ফের ভল্ল, গদা, আত্মজ হননে
উঠবো কি মেতে পুনরায়? আঁজলায় নহরের
পানি নিয়ে হবো স্বপ্নাচ্ছন্ন? মৃত্যু শুধু নিরুত্তর
অন্ধকার নাকি আলো ভিন্নতর, জানিনা কিছুই।
তবে আজ জোনাকিরআসা-যাওয়া অন্য মানে প্রায়
আমার নিকট; শোনো রাখ্শ, নিত্যসঙ্গী কালশ্রান্ত
হে অশ্ব আমার, নেই অবসর, রাত্রি ছেয়ে আসে,
এখন প্রস্তুত হও, তোমার কেশরগুচ্ছ থেকে
ঝেড়ে ফেলো হাহাকার, আমাদের যেতে হবে দূর
আপন শস্তানে, বইতে হবে প্রিয় সওদা শোকের।
তোমার সওয়ার দুই-একজন মৃত, অন্যজন
জীবন্মৃত; ছোটো, ছোটো নিরন্তর, হে অশ্ব আমার।
আবার দাঁড়াবে এক দুঃখী পুত্রহীন পিতা
নিজের পিতার সামনে, হবে নতজানু তাঁর কাছে,
নাম যার বীর জাল এবং তুষারমৌলি তাঁর
শির; ফিরে যাবে নিজবাসভূমে সেই সওদাগরের
মতো, যে সর্বস্ব তার হারিয়ে ফেলেছে মরুপথে
প্রবল লুন্ঠনকারী তাতারস্যুর ক্রুর হাতে।
কখনো পাবো না দেখা তবুনিয়ত খুঁজবো তাকে,
বিদেহী যুবাকে, দিকে দিকে অন্তহীন বিরানায়,
মরীচিকাময় পথে, অন্তর্লোকে যে আমাকে খুঁজে
বেরিয়েছে এতকাল বালিয়াড়ি, দুর্গম প্রান্তর,
শত্রুর শিবির আর ভুবননন্দিত যোদ্ধাসংঘে।এখন নামুক শান্তি দিগন্তে দিগন্তে রেগিস্তানে,
এখন নামুক শান্তি আলরুরুজের জ্যোৎস্নাধোয়া
চূড়ায়, নামুক শান্তি ইতিহাস-তরঙ্গিত এই
আমূদরিয়ায় আর সামানগাঁয়ের গুলবাগে,
ফলের বাগানে রৌদ্রঝলসিত নহরে নহরে,
দিনান্তে উটের কাফেলায়, হরিণেয় পিপাসায়,
এখন নামুক শান্তি কায়কাউসের ব্যাঘ্রচর্ম
খিমায় এবং আফ্রাসিয়াবের সব অস্ত্রাগারে,
এখন নামুক শান্তি বেবাক তাতারী আস্তনায়,
এখন নামুক শান্তি রণলিপ্সু বিক্ষুব্ধ তুরাণে,
এখন নামুক শান্তি তিমিরান্ধ বিদীর্ণ ইরানে।
(ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/rustomer-swogotokti/
|
5880
|
সুফিয়া কামাল
|
জন্মেছি এই দেশে
|
স্বদেশমূলক
|
অনেক কথার গুঞ্জন শুনি
অনেক গানের সুর
সবচেয়ে ভাল লাগে যে আমার
‘মাগো’ ডাক সুমধুর।
আমার দেশের মাঠের মাটিতে
কৃষাণ দুপুরবেলা
ক্লান্তি নাশিতে কন্ঠে যে তার
সুর লয়ে করে খেলা।
মুক্ত আকাশে মুক্ত মনের
সেই গান চলে ভেসে
জন্মেছি মাগো তোমার কোলেতে
মরি যেন এই দেশে।
এই বাংলার আকাশ-বাতাস
এই বাংলার ভাসা
এই বাংলার নদী, গিরি-বনে
বাঁচিয়া মরিতে আশা।
শত সন্তান সাধ করে এর
ধূলি মাখি সারা গায়
বড় গৌরবে মাথা উচু করি
মানুষ হইতে চায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/295
|
4046
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হৃদয়ের গীতিধ্বনি
|
প্রেমমূলক
|
ও কী সুরে গান গাস, হৃদয় আমার?
শীত নাই গ্রীষ্ম নাই, বসন্ত শরৎ নাই,
দিন নাই রাত্রি নাই — অবিরাম অনিবার
ও কী সুরে গান গাস, হৃদয় আমার?
বিরলে বিজন বনে বসিয়া আপন মনে
ভূমি-পানে চেয়ে চেয়ে, একই গান গেয়ে গেয়ে–
দিন যায়, রাত যায়, শীত যায়, গ্রীষ্ম যায়,
তবু গান ফুরায় না আর?
মাথায় পড়িছে পাতা, পড়িছে শুকানো ফুল,
পড়িছে শিশিরকণা, পড়িছে রবির কর,
পড়িছে বরষা-জল ঝরঝর ঝরঝর,
কেবলি মাথার ‘পরে করিতেছে সমস্বরে
বাতাসে শুকানো পাতা মরমর মরমর–
বসিয়া বসিয়া সেথা, বিশীর্ণ মলিন প্রাণ
গাহিতেছে একই গান একই গান একই গান।
পারি নে শুনিতে আর একই গান একই গান।
কখন থামিবি তুই, বল্ মোরে বল্ প্রাণ!
একেলা ঘুমায়ে আছি–
সহসা স্বপন টুটি
সহসা জাগিয়া উঠি
সহসা শুনিতে পাই
হৃদয়ের এক ধারে
সেই স্বর ফুটিতেছে,
সেই গান উঠিতেছে–
কেহ শুনিছে না যবে
চারি দিকে স্তব্ধ সবে
সেই স্বর সেই গান অবিরাম অবিশ্রাম
অচেতন আঁধারের শিরে শিরে চেতনা সঞ্চারে।
দিবসে মগন কাজে, চারি দিকে দলবল,
চারি দিকে কোলাহল।
সহসা পাতিলে কান শুনিতে পাই সে গান,
নানাশব্দময় সেই জনকোলাহল।
তাহারি প্রাণের মাঝে একমাত্র শব্দ বাজে–
এক সুর, এক ধ্বনি, অবিরাম অবিরল–
যেন সে কোলাহলের হৃদয়ম্পন্দন-ধ্বনি–
সমস্ত ভুলিয়া যাই, বসে বসে তাই গনি।
ঘুমাই বা জেগে থাকি, মনের দ্বারের কাছে
কে যেন বিষণ্ণ প্রাণী দিনরাত বসে আছে–
চিরদিন করিতেছে বাস,
তারি শুনিতেছি যেন নিশ্বাস-প্রশ্বাস।
এ প্রাণের ভাঙা ভিতে স্তব্ধ দ্বিপ্রহরে
ঘুঘু এক বসে বসে গায় একস্বরে,
কে জানে কেন সে গান গায়।
বলি সে কাতর স্বরে স্তব্ধতা কাঁদিয়া মরে,
প্রতিধ্বনি করে হায়-হায়।
হৃদয় রে, আর কিছু শিখিলি নে তুই,
শুধু ওই গান!
প্রকৃতির শত শত রাগিণীর মাঝে
শুধু ওই তান!
তবে থাম্ থাম্ ওরে প্রাণ,
পারি নে শুনিতে আর একই গান, একই গান।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%b9%e0%a7%83%e0%a6%a6%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%bf/
|
3357
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পদ্মের পাতা পেতে অাছে অঞ্জলি
|
চিন্তামূলক
|
পদ্মের পাতা পেতে অাছে অঞ্জলি
রবির করের লিখন ধরিবে বলি।
সায়াহে রবি অস্তে নামিবে যবে
সে ক্ষণলিখন তখন কোথায় রবে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/podder-pata-pete-ache-onjoli/
|
2745
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আরবার ফিরে এল উৎসবের দিন
|
চিন্তামূলক
|
আরবার ফিরে এল উৎসবের দিন।
বসন্তের অজস্র সম্মান
ভরি দিল তরুশাখা কবির প্রাঙ্গণে
নব জন্মদিনের ডালিতে।
রুদ্ধ কক্ষে দূরে আছি আমি--
এ বৎসরে বৃথা হল পলাশবনের নিমন্ত্রণ।
মনে করি,গান গাই বসন্তবাহারে।
আসন্ন বিরহস্বপ্ন ঘনাইয়া নেমে আসে মনে।
জানি জন্মদিন
এক অবিচিত্র দিনে ঠেকিবে এখনি,
মিলে যাবে অচিহ্নিত কালের পর্যায়ে।
পুষ্পবীথিকার ছায়া এ বিষাদে করে না করুণ,
বাজে না স্মৃতির ব্যথা অরণ্যের মর্মরে গুঞ্জনে
নির্মম আনন্দ এই উৎসবের বাজাইবে বাঁশি
বিচ্ছেদের বেদনারে পথপার্শ্বে ঠেলিয়া ফেলিয়া।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/abarfera-alu-usabar-din/
|
5093
|
শামসুর রাহমান
|
মহুয়া আসছে
|
সনেট
|
মেঘের আড়ালে তুমি লুকাও হে চাঁদ, ঢাকো মুখ
তাড়াতাড়ি, মহুয়া আসছে তার অপরূপ রূপ
নিয়ে ধীর পদক্ষেপে কংসাই নদীর ধারে, ধূপ
জ্বলছে হৃদয়ে তার, নদীর ঢেউয়ের মতো বুক
ওঠা নামা করে আর বস্তুত নদেরচাঁদ নয়,
আমিই জলের ঘাটে একা বসে আছি প্রতীক্ষায়।
তার হাত ধরে নিয়ে যাবো বেদেদের পাহারায়
ধুলো দিয়ে নিজের ডেরায়, পাবে না সে আর ভয়।সৌন্দর্য ঐশ্বর্য তার, উপরন্তু মন ঝকঝকে
স্বচ্ছ সরোবর এক; গহন দু’চোখ। মাঝে মাঝে
কথায় কৌতুক খেলে, কিন্তু সৌন্দর্যই হলো কাল
শেষ অব্দি; বিষ-ছুরি, পুরুষের সিক্ত, লকলকে
লালসার জিভ থেকে পারিনি বাঁচাতে তাকে, বাজে
তার মৃত্যুধ্বনি, আমাকেও ঘিরে ধরে ক্রূর জাল। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/mohua-asche/
|
3507
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বনে ও রাজ্যে
|
সনেট
|
সারাদিন কাটাইয়া সিংহাসন পরে
সন্ধ্যায় পশিল রাম শয়নের ঘরে।
শয্যার আধেক অংশ শূন্য বহুকাল,
তারি পরে রাখিলেন পরিশ্রান্ত ভাল।
দেবশূন্য দেবালয়ে ভক্তের মতন
বসিলেন ভূমি-পরে সজলনয়ন,
কহিলেন নতজানু কাতর নিশ্বাসে—
“যতদিন দীনহীন ছিনু বনবাসে
নাহি ছিল স্বর্ণমণি মাণিক্যমুকতা,
তুমি সদা ছিলে লক্ষ্মী প্রত্যক্ষ দেবতা।
আজি আমি রাজ্যেশ্বর, তুমি নাই আর,
আছে স্বর্ণমাণিক্যের প্রতিমা তোমার।”
নিত্যসুখ দীনবেশে বনে গেল ফিরে,
স্বর্ণময়ী চিরব্যথা রাজার মন্দিরে। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bone-o-rajjye/
|
1680
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রক্তপাত, পড়ন্ত বেলায়
|
রূপক
|
আজকের মতো খেলা তো প্রায়
খতম হতে চলল।
আর মাত্র মিনিট পাঁচেক বাকি।
যাও বাছা, মাঠে গিয়ে
এই পাঁচটি মিনিট তুমি কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে থাকো।
চেয়ে দ্যাখো,
আলো পড়ে এসেছে।
চেয়ে দ্যাখো,
ওদের বোলারদের চোখ।
লোভে চকচক করছে।
মনে হচ্ছে, ওদের তেষ্টা এখনও মেটেনি।
মনে হচ্ছে,
এই শেষবেলায় ওরা অন্তত আর-একজনের
রক্ত না-দেখে ছাড়বে না।
বলো, আমার নামজাদা ব্যাটসম্যানদের
কাউকেই কি এখন আমি
মাঠে পাঠাতে পারি?
আজকের মতো তারা বেঁচেবর্তে থাক।
সকাল হোক
রোদ্দুর উঠুক,
তখন তারা খেলা দেখাবে।
তুমি যাও।
তুমি গিয়ে ওদের তেষ্টা মেটাও।
তুমি আমার এগারো-নম্বর খেলোয়াড়;
কিন্তু প্রমোশন দিয়ে তোমাকে আমি
তিন-নম্বরে তুলে আনলুম।
তোমার স্বার্থে নয়,
দলের স্বার্থে।
বাছা, তুমি ধরেই নাও যে, এই পড়ন্ত বেলায়
দলের স্বার্থে তোমাকে আমরা
খুন হতে পাঠাচ্ছি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1601
|
4250
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
সেই হাত
|
চিন্তামূলক
|
অভিনব দুটি হাতে দেয়াল দরোজা খুলে দাও।
ততক্ষণে রোদ্দুর পৌচেছে
গোটারাত ঘুরে ঘুরে রোদ্দুর পৌঁচেছে
ঘরে।
কিছুটা নড়বড়ে
ছিলো ঘর।
এককোণে পাথর
তেমন সন্তুষ্ট নয়, ‘দখল দখল শব্দ করে।
দাবি তার ঘরটি ভরাবে
মানুষের মাথায় চড়াবে
তার ভার।
আর
যদি পারে
গিলে খাবে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচা
অন্ধকারে!
তা কি হয়?
রোদ্দুরের ফুল ফোটে
ঘরে যে-হাতে দরোজা খোলো
সেই হাত শানাও পাথরে!
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/shei-haat/
|
3148
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তারা দিনের বেলা এসেছিল
|
ভক্তিমূলক
|
তারা দিনের বেলা এসেছিল
আমার ঘরে,
বলেছিল, একটি পাশে
রইব প’ড়ে।
বলেছিল, দেবতা সেবায়
আমরা হব তোমার সহায়–
যা কিছু পাই প্রসাদ লব
পূজার পরে।এমনি করে দরিদ্র ক্ষীণ
মলিন বেশে
সংকোচেতে একটি কোণে
রইল এসে।
রাতে দেখি প্রবল হয়ে
পশে আমার দেবালয়ে,
মলিন হাতে পূজার বলি হরণ করে।বোলপুর, ২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tara-diner-bela-esechilo/
|
2295
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
উদ্যানে পুষ্করিণী
|
সনেট
|
বড় রম্য স্থলে বাস তোর, লো সরসি!
দগধা বসুধা যবে চৌদিকে প্রখরে
তপনের, পত্রময়ী শাখা ছত্র ধরে
শীতলিতে দেহ তোর ; মৃদু শ্বাসে পশি,
সুগন্ধ পাখার রূপে, বায়ু বায়ু করে।
বাড়াতে বিরাম তোর আদরে, রূপসি,
শত শত পাতা মিলি মিষ্টে মরমরে;
স্বর্ণ-কান্তি ফুল ফুটি, তোর তটে বসি,
যোগায় সৌরভ-ভোগ, কিঙ্করী যেমতি
পাট-মহিষীর খাটে, শয়ন-সদনে।
নিশায় বাসর রঙ্গ তোর, রসবতি,
লয়ে চাঁদে,—কত হাসি প্রেম-আলিঙ্গনে!
বৈতালিক-পদে তোর পিক-কুল-পাত;
ভ্রমর গায়ক ; নাচে খঞ্জন, ললনে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/udyane-pushkorini/
|
581
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
আদর্শ ছেলে
|
মানবতাবাদী
|
আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
‘মানুষ হইতে হবে’- এই তার পণ।
বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান
নাই কি শরীরে তব রক্ত, মাংস, প্রাণ?
হাত পা সবারই আছে, মিছে কেন ভয়?
চেতনা রয়েছে যার, সে কি পড়ে রয়?
সে ছেলে কে চাই বল, কথায় কথায়
আসে যার চোখে জল, মাথা ঘুরে যায়?
মনে প্রাণে খাট সবে, শক্তি কর দান,
তোমরা ‘মানুষ’ হলে দেশের কল্যাণ।আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ?
মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন
“মানুষ হইতে হবে” — এই তার পণ,
বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান,
নাই কি শরীরে তব রক্ত মাংস প্রাণ ?
হাত, পা সবারই আছে মিছে কেন ভয়,
চেতনা রয়েছে যার সে কি পড়ে রয় ?
সে ছেলে কে চায় বল কথায়-কথায়,
আসে যার চোখে জল মাথা ঘুরে যায় |
সাদা প্রাণে হাসি মুখে কর এই পণ —
“মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন” |
কৃষকের শিশু কিংবা রাজার কুমার
সবারি রয়েছে কাজ এ বিশ্ব মাঝার,
হাতে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান
তোমরা মানুষ হলে দেশের কল্যাণ
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4304.html
|
1471
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
উপেক্ষা
|
প্রেমমূলক
|
অনন্ত বিরহ চাই, ভালোবেসে কার্পণ্য শিখিনি৷
তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে পারি
সমস্ত বোধের উত্স গ্রাস করা প্রেম; যদি চাও
ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা দেখাও৷
আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভিখারি বিরহে?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/192
|
4800
|
শামসুর রাহমান
|
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা[২]
|
স্বদেশমূলক
|
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
সকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে,
তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হল। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে বলে ছাই হল গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে বলে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করল একটা কুকুর।
তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের উপর।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুড়ো
উদাস দাওয়ায় বসে আছেন-তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্নের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধরে দগ্ধ ঘরের।স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহাবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী বলে যে নৌকো চালায় উদ্দাম ঝড়ে,
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিক্শাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে-
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্ধিদিক
এই বাংলায়
তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/independence-day/
|
4071
|
রামনিধি গুপ্ত
|
নানান দেশে নানান ভাষা
|
স্বদেশমূলক
|
নানান্ দেশে নানান্ ভাসা (ভাষা)
বিনে স্বদেশীয় ভাসে পূরে কি আশা ?
কত নদী সরোবর,
কি বা ফল চাতকীর |
ধরাজল বিনে কভু ঘুচে কি ত্রিষা (তৃষা) ?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3848.html
|
5309
|
শামসুর রাহমান
|
স্থগিত বাসনা
|
সনেট
|
সঙ্গমে কী সুখ পাবে তুমি? ওটা থাক, শারীরিক
ব্যাপার স্যাপার ভারি স্থুল মনে হয়, ঘেন্না লাগে।
বরং চুম্বনা নাও, আলিঙ্গনে বাঁধো অনুরাগে,
আমার আঙুল নিয়ে খেলা করো, আমি অনিমিখ
চেয়ে থাকি তোমার চোখের দিকে। শোনো, বাস্তবিক
এটুকুই চাই আমি, তার বেশি নয়। যদি জাগে
কোনোদিন কামনার বন্য ঢেউ শরীরী ভূভাগে
তাহলে আমার আত্মা বলবে আমাকে ধিক, ধিক।তোমার এ উচ্চারণ মেনে নিতে মনোকষ্ট হয়;
শরীর এবং আত্মা দুটি পাখি বসে একই ডালে
গান গায় প্রীতিবশে। নয়, ওরা তো পৃথক নয়
কেউ কারো থেকে; যত দূরে পারো ঠেলে দাও, তবু
তোমার ঘাটেই যাবো খেয়া বেয়ে লিবিডোর খালে,
মেটাবো অকুল তৃষ্ণা। এখনো তো নই জবুথবু। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sthogit-basna/
|
3344
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পক্ষীমানব
|
ভক্তিমূলক
|
যন্ত্রদানব, মানবে করিলে পাখি।
স্থল জল যত তার পদানত
আকাশ আছিল বাকি।
বিধাতার দান পাখিদের ডানাদুটি।
রঙের রেখায় চিত্রলেখায়
আনন্দ উঠে ফুটি;
তারা যে রঙিন পান্থ মেঘের সাথি।
নীল গগনের মহাপবনের
যেন তারা একজাতি।
তাহাদের লীলা বায়ুর ছন্দে বাঁধা;
তাহাদের প্রাণ, তাহাদের গান
আকাশের সুরে সাধা;
তাই প্রতিদিন ধরণীর বনে বনে
আলোক জাগিলে একতানে মিলে
তাহাদের জাগরণে।
মহাকাশতলে যে মহাশান্তি আছে
তাহাতে লহরী কাঁপে থরথরি
তাদের পাখার নাচে।
যুগে যুগে তারা গগনের পথে পথে
জীবনের বাণী দিয়েছিল আনি
অরণ্যে পর্বতে;
আজি একি হল, অর্থ কে তার জানে।
স্পর্ধা পতাকা মেলিয়াছে পাখা
শক্তির অভিমানে।
তারে প্রাণদেব করে নি আশীর্বাদ।
তাহারে আপন করে নি তপন,
মানে নি তাহারে চাঁদ।
আকাশের সাথে অমিল প্রচার করি
কর্কশস্বরে গর্জন করে
বাতাসেরে জর্জরি।
আজি মানুষের কলুষিত ইতিহাসে
উঠি মেঘলোকে স্বর্গ-আলোকে
হানিছে অট্টহাসে।
যুগান্ত এল বুঝিলাম অনুমানে--
অশান্তি আজ উদ্যত বাজ
কোথাও না বাধা মানে;
ঈর্ষা হিংসা জ্বালি মৃত্যুর শিখা
আকাশে আকাশে বিরাট বিনাশে
জাগাইল বিভীষিকা।
দেবতা যেথায় পাতিবে আসনখানি
যদি তার ঠাঁই কোনোখানে নাই
তবে, হে বজ্রপাণি,
এ ইতিহাসের শেষ অধ্যায়তলে
রুদ্রের বাণী দিক দাঁড়ি টানি
প্রলয়ের রোষানলে।
আর্ত ধরার এই প্রার্থনা শুন--
শ্যামবনবীথি পাখিদের গীতি
সার্থক হোক পুন।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pukhemanab/
|
4993
|
শামসুর রাহমান
|
বরাভয়
|
সনেট
|
গত কয়েকটি দিন আমাদের বড়ো এলোমেলো,
শরবিদ্ধ ছিল, চতুর্দিকে হৈ-হুল্লোড়, ধূলিঝড়
ছিল, ছিল তর্ক আর কর্কশ বচসা, বুনো জ্বর,
যা স্পর্শ করেছে আমাদেরও, কখন যে খুব খেলো
হয়েছি নিজেরই কাছে, বস্তুত পাইনি টের। ভুল
করেছি আমিও জেনেশুনে, কলহের সূত্রপাতে
পারিনি টানতে ছেদ, পড়েনি সে-তথ্য মনে, যাতে
ছিল সত্য, ফলে বিদ্ধ করেছে আমাকে শত হুল।তুমি কি আমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহের দোলা
কখনো পুষেছ মনে? আমাকে নির্দয় আর খল
ভেবেছ কি বিভ্রান্তির-ঝাপ্সা কোনো ক্ষণে? শোনো, ঘোলা
জলে মৎস্যশিকারি তো আমি নই উপরন্তু ছল
ধাতে নেই, পেয়েছি প্রেমের দেবতার বরাভয়-
প্রলয়েও আমাদের ভালোবাসা অম্লান, অক্ষয়। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/boravoy/
|
4584
|
শামসুর রাহমান
|
কালদীর্ণ কোকিলের মতো
|
মানবতাবাদী
|
অপার প্রসন্নতায় ছিলেন তিনি ঘর-দুয়ার
আগলে; নোংরা গলিতে,
রাস্তায় রাস্তায় বাজতো
তাঁর জুতোর আওয়াজ বাদ্যযন্ত্রের মতো। কখনো
দেখা যেত, হেঁটে চলেছেন
তিনি প্রান্তরের নীল প্রান্ত ঘেঁষে,পেরুচ্ছেন সাঁকো,
শস্যক্ষেতের ফসল ছাপিয়ে
জেগে উঠছে হরফ আলিফ-এর মতো তাঁর
ঋজু আর অনন্য শরীর। বনরাজিনীলার রহস্যময়তা
আর ডাগর নদীর ছলাৎছল শব্দ
কণ্ঠে ধারণ ক’রে তিনি সকলের জন্যে গাইতেন
ঘর ছাড়ার কীর্তন, ঘরে ফেরার গোধূলিপ্রতিম পদাবলীতাঁর সুরে বিষ-কাটালির ঝোপঝাড়
রূপান্তরিত হতো রজনীগন্ধাবনে, গুচ্ছ-গুচ্ছ পলাশে
চেয়ে যেত মেঘের পাড়,
নদী হতো অজস্র নারীর কলস্বর,
পাহাড় মস্তিতে ভরপুর দরবেশ। সে-গানে
আকাশ পরতো সূর্যের মুকুট।
সেই গীতধারায়
স্নাত গাছপালা পেতো স্বর্গীয় সৌন্দর্য।
অলংকারহীন সে-গান পান্থশালায়,
গেরস্তের কুটিরে, কারখানার চত্বরে চত্বরে,
খনির সুড়ঙ্গে, হাসপাতালের করিডোরে, ঝর্ণার ধারে
উড়ে-আসা পাতায়,
বেকারের বিবরে কী ব্যাপক
ছড়িয়ে পড়তো যেন স্মৃতিমুখর তেজালো জোয়ার।যত অন্তরারেই থাকুন তিনি, সে-গান
ঘোষণা করে তাঁর উপস্থিতি। ঘোর অমাবস্যায়
তাঁর হাতের মুঠোর থেকে ছল্কে পড়ে জ্যোৎস্না,
চোখ থেকে ঝরে ফুলের রেণু,
জামার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে
রঙ-বেরঙের পাখির ঝাঁক। তিনি যখানেই যান,
তাঁর সঙ্গে যায় লোক, রাস্তা-উপচে-পড়া লোক,
যেন তিনি এক মোহন ঐন্দ্রজালিক,
যার ইঙ্গিতে মাটিতে মুখ-থুবড়ে-পড়ে-থাকা শহর
নিমেষে তোলে মাথা,
মৌরসীপাট্রার ভুয়া দলিল দস্তাবেজ পুড়ে যায়
এবং বেজায় ছত্রভঙ্গ আততায়ীর দল।প্রহরে প্রহরে ওদের বেয়নেট শাসালো তাঁকে, ওর
ভেবেছিল এতেই নড়বে টনক,
কিন্তু যাঁর ভিতরে গুঞ্জরিত কবিতার ঝলক, তিনি কেন
মাতা নত করবেন পিস্তল আর বন্দুকের নলের অভিযোগের
সামনে? কেন তিনি নিজের স্বপ্নমালাকে
দলিত হতে দেবেন উন্মত্ত হাতির পারের পায়ের তলায়?আখেরে তাঁর, সেই কবির, ঠাঁই হলো আকাশ-ছোঁয়া
দেয়াল-ঘেরা কয়েদখানায়। দিনের পর দিন,
মাসের পর মাস যায়, অর্ধাহারে,
একাতিত্বের দংশনে গুকায় তাঁর শরীর, হাড়ে ধরে ঘুণ,
অথচ তাঁর আত্মায়
বিরতিহীন দেয়ালি, মৌন উৎসবের নহবৎ।ওরা ভেবেছিল, তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ
করলেই, তাঁর পিঠে চাবুকের চেঁচিয়ে-ওঠা ছোবলে
কালসিটে পড়লেই রুদ্ধ হবে
দূরন্ত এক কাহিনীর গতি, কিন্তু তাঁর কবিতাবলিকে
ওরা হাতকড়া পরাতে পারেনি কিংবা বেড়ি। পৃথিবীর
কোনো কয়েদখানারই সাধ্য নেই
তাঁর ঈগলের মতো কবিতাকে
আটকে রাখতে পারে, ডানা তার ঝলসায় আকাশে আকাশে।উত্যক্ত হয়ে ওরা একদিন কবিকণ্ঠে
পরালো মৃত্যুর ফাঁস; আর কী আশ্চর্য, ফাঁসির মঞ্চে
ঝুলন্ত কবির শরীরর প্রতিটি রোমকূপ থেকে বিচ্ছূরিত হলো
কবিতার পর কবিতা, যেন মেঘকৃষ্ণ গর্জনশীল আসমানে
বিদ্যুচ্চমক এবং সেই কবিতাবলি কালদীর্ণ কোকিলের মতো ডেকে
ডেকে
ভীষণ রক্তিম ক’রে তুললো নিজেদের চোখগুলো। (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kaldirno-kokiler-moto/
|
3673
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভেসে-যাওয়া ফুল
|
রূপক
|
ভেসে-যাওয়া ফুল
ধরিতে নারে,
ধরিবারই ঢেউ
ছুটায় তারে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/veshe-jawa-ful/
|
560
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক
|
মানবতাবাদী
|
হিন্দু-মুসলিম দুটি ভাই
ভারতের দুই আঁখি তারা
এক বাগানে দুটি তরু দেবদারু আর কদম চারা।।
যেন গঙ্গা সিন্ধু নদী
যায় গো বয়ে নিরবধি
এক হিমালয় হতে আসে, এক সাগরে হয় গো হারা।।
বুলবুল আর কোকিল পাখী
এক কাননে যায় গো ডাকি,
ভাগীরথী যমুনা বয় মায়ের চোখের যুগল ধারা।।
ঝগড়া করে ভায়ে ভায়ে
এক জননীর কোল লয়ে
মধুর যে এ কলহ ভাই পিঠোপিঠী ভায়ের পারা।।
পেটে ধরা ছেলের চেয়ে চোখে ধরারা মায়া বেশী,
অতিথী ছিল অতীতে, আজ সে সখা প্রতিবেশী।
ফুল পাতিয়ে গোলাপ বেলী
একই মায়ের বুকে খেলি,
পাগলা তা'রা আল্লা ভগবানে ভাবে ভিন্ন যারা।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/868
|
5238
|
শামসুর রাহমান
|
শেফার্স
|
রূপক
|
কত দীর্ঘকাল আমি শেফার্স করি না ব্যবহার।
ফলত হাতের লেখা, মনে হয়, ক্রমশ খারাপ
হয়ে যাচ্ছে। এমনকি আমার লেখার সুচিহ্নিত
চরিত্র বদলে গেছে, বলা যায়। এরকম ক্রীড়া-
পরায়ণ ধারণা আমার মনে সীলমোহরের
স্পষ্ট ছাপ কেবলি বসাতে চায়। হয়তো এর কোনো
মানে নেই; সংস্কার পাখির মতো ডেকে ওঠে লাল
রক্তের ভিতরে। বলপেনে ভাষাচর্চা কী রকম
ফুলচন্দনের ঘাণপায়ী হতে পারে, জেনে গেছি।
ধরেছি ঘরের ভাষা সুদূর প্রবাসে কাগজের
ব্যাপক শাদায়, পাই নিদ্রিত বনের বিষণ্নতা।
প্রকৃত রন্ধনশিল্পী যিনি তার কাছে কড়াইয়ের
আকার প্রকার স্রেফ অবান্তর। কোনো কোনোদিন
মনে হয়, একটি শেফার্স পেলে বড় ভালো হতো। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shefars/
|
5216
|
শামসুর রাহমান
|
শান্তি কি হরিণ
|
মানবতাবাদী
|
শান্তি কি হরিণ হয়ে ঘুমাচ্ছিল এখানে কোথাও? ‘স্বপ্ন দাও’
বলে সে কি ঘুমের ভেতর অন্তরীণ
উঠেছিল নড়ে? তার শরীরে আঁচড়
পড়ে এলোমেলো, জেগে বিখ্যাত দু’চোখ
মেলে খোঁজে ঝিলের ঝলক ত্রস্ত তাকায় অদূরে,
দেখে নিতে চায় সন্ত্রাসের নেশায় মাতাল কোনো
ব্যাধের নিশানা তীক্ষ্ণ হয়ে আছে কি না।
অথচ বাজায় বীণা গাছ, প্রজাপতিদের নাচ
পাতায় পাতায়; তবু ভয় জেগে রয়
স্পন্দিত হৃদয় জুড়ে। কত ভালো হয়, যদি গুপ্ত
নিষাদের পায়ের তলার মাটি দ্রুত সরে যায়,
দেবতার হাত নেমে আসে অকস্মাৎ মেঘ থেকে। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shanti-ki-horin/
|
2850
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ওরে চিরভিক্ষু, তোর আজন্মকালের ভিক্ষাঝুলি
|
ভক্তিমূলক
|
ওরে চিরভিক্ষু, তোর আজন্মকালের ভিক্ষাঝুলি
চরিতার্থ হোক আজি, মরণের প্রসাদবহ্নিতে
কামনার আবর্জনা যত, ক্ষুধিত অহমিকার
উঞ্ছবৃত্তি-সঞ্চিত জঞ্জালরাশি দগ্ধ হয়ে গিয়ে
ধন্য হোক আলোকের দানে, এ মর্ত্যের প্রান্ত-পথ
দীপ্ত ক’রে দিক, অবশেষে নিঃশেষে মিলিয়া যাক
পূর্ব সমুদ্রের পারে অপূর্ব উদয়াচল চূড়ে
অরুণ কিরণ তলে একদিন অমর্ত্য প্রভাতে। (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ore-chirovikkhu-tor-ajonmokaler-vikkhajhuli/
|
513
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সংকল্প
|
চিন্তামূলক
|
থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে,-
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে,
কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,
কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে।।
কেমন করে বীর ডুবুরী সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,
কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বরগ পানে।
জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি
যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি,
কেমন করে আঞ্ছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে,
কেমন জোরে টানলেসাগর উথলে ওঠে জোয়ার বানে।
কেমন করে মথলে পাথার লক্ষী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে,
কিসের অভিযানে মানুষ চলছে হিমালয় চুড়ে।
তুহিন মেরু পার হয়ে যায়
সন্ধানীরা কিসের আশায়;
হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরেঃ
শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন 'মঙ্গল' হতে আসছে উড়ে।।
কোন বেদনার টিকিট কেটে চন্ডু-খোর এ চীনের জাতি
এমন করে উদয়-বেলায় মরণ-খেলায় ওঠল মাতি।
আয়ার্ল্যান্ড আজ কেমন করে
স্বাধীন হতে চলছে ওরেঃ
তুরষ্ক ভাই কেমন করে কাঁটল শিকল রাতারাতি!
কেমন করে মাঝ গগনে নিবল গ্রীসের সূর্য-বাতি।।
রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে-
আকাশ বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুঁড়ে।
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটেঃ
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়েঃ
বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/867
|
4730
|
শামসুর রাহমান
|
জিন্দা লাশ
|
প্রেমমূলক
|
প্রস্থানের কালে তুমি বলেছিলে, ‘প্রিয়তম কবি,
খারাপ করো না মন, ক’টা দিন হাসিখুশি থেকো।
কী করে ফুটবে হাসি মনে, যখন তোমাকে আমি
দেখতে পাবো না আর শুনতে পাবো না কণ্ঠস্বর
তোমার? তা ছাড়া দেশ রাহুগ্রস্ত, মৃত্যুর খবর
পাই প্রতিদিন, নরহত্যা নেহাত মামুলি, দেখি
পুলিশের লাঠির আঘাতে মিছিলের ক্ষুব্ধ ছাত্রী
রাস্তায় রক্তাক্ত পড়ে থাকে হায়, যেন বাংলাদেশ।প্রিয়তমা আমার, তোমার কথা, প্রেমময়ী দৃষ্টি
মনে পড়ে প্রতিক্ষণ মনে হয়, রেখেছো আমার
হাতে এসে তোমার উৎসুক হাত পল, অনুপল
শতাব্দীর রূপ নেয় স্বপ্নঘোরে। সমূহ সঙ্কট,
স্বৈরাচারী দুঃশাসন এবং তোমার বিচ্ছেদের
ধারালো দাঁতের হিংস্রতায় জিন্দা লাশ হয়ে হাঁটি। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jinda-lash/
|
1082
|
জীবনানন্দ দাশ
|
পঁচিশ বছর পরে
|
প্রকৃতিমূলক
|
শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে-
বলিলামঃ ‘ একদিন এমন সময়
আবার আসিও তুমি- আসিবার ইচ্ছা যদি হয়;
পঁচিশ বছর পরে ।‘
এই ব’লে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে;
তারপর, কতবার চাঁদ আর তারা,
মাঠে- মাঠে মরে গেল, ইঁদুর – পেঁচারা
জ্যোৎস্নায় ধানক্ষেত খুঁজে
এল-গেল ! – চোখ বুজে
কতবার ডানে আর বাঁয়ে
পড়িল ঘুমায়ে
কত- কেউ !- রহিলাম জেগে
আমি একা- নক্ষত্র যে বেগে
ছুটিছে আকাশ,
তার চেয়ে আগে চ’লে আসে
যদিও সময়,-
পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয় !-তারপর- একদিন
আবার হলদে তৃণ
ভ’রে আছে মাঠে –
পাতায় , শুকনো ডাঁটে
ভাসিছে কুয়াশা
দিকে- দিকে, – চড়ুয়ের ভাঙা বাসা
শিশিরে গিয়েছে ভিজে, – পথের উপর
পাখির ডিমের খোলা , ঠাণ্ডা – কড়কড় !
শসাফুল , – দু-একটা নষ্ট শাদা শসা,-
মাকড়ের ছেঁড়া জাল, – শুকনো মাকড়সা
লতায়- পাতায়;-
ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে পথ চেনা যায়;
দেখা যায় কয়েকটা তারা
হিম আকাশের গায়,- ইঁদুর – পেঁচারা
ঘুরে যায় মাঠে – মাঠে , ক্ষুদ খেয়ে ওদের পিপাসা আজো মেটে,
পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে !
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1224.html
|
1665
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মাঠের সন্ধ্যা
|
প্রকৃতিমূলক
|
অন্যমনে যেতে যেতে হঠাৎ যদি
মাঠের মধ্যে দাঁড়াই,
হঠাৎ যদি তাকাই পিছন দিকে,
হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে বিকেলবেলার নদীটিকে।
ও নদী, ও রহস্যময় নদী,
অন্ধকারে হারিয়ে যাসনে, একটু দাঁড়া;
এই যে একটু-একটু আলো, এই যে ছায়া ফিকে-ফিকে,
এরই মধ্যে দেখে নেব সন্ধ্যাবেলার প্রথম তারাটিকে।
ও তারা, ও রহস্যময় তারা,
একটু আলো জ্বালিয়ে ধর, দেখে রাখি
আকাশী কোন্ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে যায় দিকে-দিকে,
দেখে রাখি অন্ধকারে উড়ন্ত ওই ক্লান্ত পাখিটিকে।
ও পাখি, ও রহস্যময় পাখি।
হারিয়ে গেল আকাশ-মাটি, কান্না পাওয়া
এ কী করুণ সন্ধ্যা! এ কোন্ হাওয়া লেগে
অন্ধকারে অদৃশ্য ওই নদীর দুঃখ হঠাৎ উঠল জেগে।
ও হাওয়া, ও রহস্যময় হাওয়া!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1694
|
1013
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ঘাটশিলা—ঘটশিলা—
|
প্রকৃতিমূলক
|
ঘাটশিলা—ঘটশিলা—
কলকাতা ছেড়ে বল ঘাটশিলা কে যায় মিছাই
চিরদিন কলতাকা থাকি আমি,
ঘাটশিলা ছাই।চিঠির উপরে তবু চিঠি
কয়েকটা দিন
এইখানে এসে তুমি থেকে যাও
চিঠিগুনো হয়ে গেল পুরোনো মলিনতবু আমি গেলাম না
যদিও দেখেছি আমি কলকাতা থেকে
কত দিন কত রাত
ঘাটশিলা গিয়েছে অনেকেএকদিন তারপর—বহুদিন পরে
অনেক অসাধ অনিচ্ছায়
ঘাটশিলা চলিলাম
ঘাটশিলা দেখিলাম হায়আবার এসেছি ফিরে—ধোঁয়ায় ধুলায় ভিড়ে
ফুটপাথে—ট্রামের জগতে
পথ থেকে পথে ফিরি
পথ থেকে ক্লান্ত পথে পথে।কী হল তোমার, আহা,
আমার হৃদয়
তোমারে যে গোধূলির তেপান্তরে
মায়াবীর মতো মনে হয়,যেই এই পৃথিবীর বেলা শেষ হয়ে গেছে
ম্না ঘোড়া নিয়ে একা তুমি
কড়ির পাহাড় খুঁজে ঘুরিতেছ
ঘুরিছ হাড়ের মরুভূমি।কাব্যগ্রন্থ - রুপসী বাংলা
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ghatshila-ghotshila/
|
1932
|
প্রেমেন্দ্র মিত্র
|
সাপ
|
রূপক
|
প্রথম সাপটা দেখবে নিথর পাথর সন্মোহিত,
কোন সে আদিম অন্ধ অঘোর অন্বেষণের দ্বিধা
আঁধার-ছোঁয়ানো ছায়া-বিদ্যুত হেনে খোলে কুণ্ডলী!তারপর সাপ অনেক দেখবে
কেঁপে-ওঠা শরবন।
কাঁটা-দেওয়া ঘাস সভয়ে শুনবে
গোপন সঞ্চারণ,
—শোনা না-শোনার সীমানার শুধু স্তব্ ধতা শিহরিত |সব শেষে এক সাহসী সকাল
গহন অতল থেকে,
হিমেল হিংসা ছেঁকে নিয়ে এসে
রোদ্দুরে মেলাবে কি?
ছন্দে মেলাবে ঘৃণা-পিচ্ছল বিবরের
সরীসৃপের বিষফণা আর পাখিদের নীল মুক্তি!
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4000.html
|
1151
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মরুতৃণোজ্জ্বলা
|
চিন্তামূলক
|
হেঁয়ালি রেখো না কিছু মনে;
হৃদয় রয়েছে ব’লে চাতকের মতন আবেগ
হৃদয়ের সত্য উজ্জ্বল কথা নয়,-
যদিও জেগেছে তাতে জলভারানত কোনো মেঘ;
হে প্রেমিক, আত্মরতিমদির কি তুমি?
মেঘ;মেঘ, হৃদয়ঃ হৃদয়, আর মরুভূমি শুধু মরুভূমিএই বিশ্বের এই শুধু আর্য সমাধান;
বাকি সব অনিয়ম, শূন্য, অন্ধকার;
নিখিলের পাশাপাশি দ্বিতীয় আধার
অন্য এক নিখিলের- অন্য এক নিখিলের তুমি;
মেঘঃ মেঘ,হৃদয়ঃ হৃদয়, আর মরুতৃণোজ্জ্বল মরুভূমি
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/morutrinojjola/
|
2839
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
এসো হে বৈশাখ এসো এসো
|
প্রকৃতিমূলক
|
এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4917.html
|
117
|
আল মাহমুদ
|
একুশের
|
স্বদেশমূলক
|
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6/
|
741
|
জয় গোস্বামী
|
শেষ
|
প্রেমমূলক
|
সেই শেষ চুম্বন আমারসেই শেষ
চুম্বন আমারতারপর অন্য কারও জন্য ওই ঠোঁটঅন্য কারও জন্য ওই স্রোত...
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/shesh/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.