id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
4749
|
শামসুর রাহমান
|
ডাকহরকরা বিলি করলেও
|
চিন্তামূলক
|
১
ডাক-হরকরা বিলি করলেও রাজা রামমোহন রায়ের পত্র ঘরে ঘরে
পৌঁছেনি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখে জবাব না পেয়ে আখেরে নিজেকে
আবৃত করেছিলেন নিঃসঙ্গতায়, অশ্রদ্ধা তাঁর মুখাবয়বে বসিয়ে দিয়েছিল
কাঠিন্যের রেখা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পত্রাবলী রচনায় অনলস, এমনকি শেষ
বয়সের গোধূলিতে কম্পিত হস্তে রচনা করেছেন বিস্তর চিঠি। টেলিগ্রাম
পাঠিয়েছেন বারবার। মনে হয় না, সেসব চিঠি কেউ পড়েছে। পড়লেও
মর্মোদ্ধারে ব্যর্থ অনেকে, কেউ কেউ বুঝলেও তেমন আমল দেয়নি, অনেকে
খাম পর্যন্ত খোলেনি। অবশ্যি অধিকাংশ লোকের কাছে ক-অক্ষর হারাম বলে
তারা শুধু ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রয়েছে। সেসব চিঠি মানবচিত্তে মনুষ্য ধর্মকে
পদ্মের মতো প্রস্ফূটিত করতে চেয়েছিল। এখন সেই প্রাতঃস্মরণীয় ত্রয়ীর
সুসমাচার ফাঁপা পথচারীদের কাছে ইলেকট্রিকের তারে আটকে থাকা কাটা
ঘুড়ির ছিন্নাংশ কিংবা নর্দমার পানিতে ভাসমান ছেঁড়াখোঁড়া কাগজের নৌকা,
যা বস্তির ছেলেমানুষদের তৈরি।২
যখন বয়স ছিল কম, তখন ক্ষীণায়ু কীটস্ এবং তরুণ রবীন্দ্রনাথের মতো
মৃত্যুবন্দনায় ছিলাম উচ্ছ্বসিত। ভাবতাম জ্যোৎস্নাপ্লাবিত কোনও চৈতীরাতে
আবেগাতুর কবিতা পাঠকালীন আমার ওপর মৃত্যু যদি নেমে আসত, সুশীল
পাখির মতো কি ভালোই না লাগত আমার। মৃত্যুকে দয়িতা ভেবে মরণের
প্রেমে পড়েছিলাম তারুণ্যে। অথচ আজ ষাটের ধূসরতায় বিবর্ণ হয়েও বেঁচে
থাকার সাধ তীব্র সুরার মতো উদ্দীপিত করে আমাকে। কেননা, এই তো
সেদিন দেখলাম তোমাকে-তন্বী এবং সুন্দর।৩
ভেবেছিলাম নাছোড় অভিমান এক আমাকে রাখবে লোকালয় থেকে
বহুদূরে নুড়িময় ঝর্ণাতলায় সুখে বুঁদ। বুনো ছাগ-যূথে, গাছগাছালির ভিড়ে,
পাখাপাখালির রাজ্যে জীবনযাপন মাধুর্যে মোড়া চিরদিন, ছিল আশা। পাথর
আর জলধারার ভাষা শেখা হবে। সুখের সংজ্ঞা কখনও কখনও ভাবায়।
গাছতলায় শুয়ে পাখির গান শোনা, বৃষ্টিধোয়া আকাশে রঙধনুর পেখম দেখা,
সূর্যের আলোয় নেয়ে ওঠা, চৈতালি জ্যোৎস্নায় হেঁটে বেড়ানো, সূর্যাস্তের দিকে
মুখ রেখে দাঁড়ানো-এসবই তো সুখকর; তবু কেন মানুষের মুখ দেখার
ব্যাকুলতা? লোকালয়ের উত্তাপ ফিরে না পেলে টইটম্বুর হবে না আমার সুখের
কলস।৪
কখনো সেজেগুজে, পরিপাটি দাড়ি কামিয়ে সুগন্ধি মেখে, কখনও বা
উশ্কো খুশ্কো ৩ দিনের না কামানো দাড়ি নিয়ে তার নিবাসে গিয়ে কড়া
নাড়ি। ব্যাকুলতা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় সর্বক্ষণ। যতক্ষণ না ওর ড্রইং
রুমের সোফায় বসি, কথা বলি এলোমেলো, তাকাই বারান্দায় লুটিয়ে পড়া
রৌদ্রের দিকে, ততক্ষণ আমার স্বস্তি নদারৎ। আলবৎ ওকে ভালোবাসি,
এরকম ভালোবাসিনি কোনও নারীকে। আমাকে সে ভালোবাসে কিনা, সঠিক
জানি না। যেমন জন্মান্ধের অজ্ঞাত চৈত্ররাত্রির জ্যোৎস্নার সৌন্দর্য। সন্দেহের
কাল বেড়াল ফিরোজা চোখ নিয়ে চেয়ে থাকে আমার দিকে, ভীত আমি
উদাসীনতায় ডুবে থাকার ভান করি। কোনও কোনওদিন আমার ঠোঁট থেকে
লতার মতো দুলতে থাকে একটা প্রশ্ন, ‘তুমি কি সত্যি ভালোবাস আমাকে?’
কখনও নিরুত্তর সে নোখ দিয়ে খুঁটতে থাকে সোফার হাতল কিংবা বলে,
‘চাই, চা করে আনি। কখন কি খেয়াল হয়, আমার দিকে না তাকিয়েই
ফ্লাওয়ার ভাস সাজাতে উচ্চারণ করে, ‘ভালোবাসি’। সেই মুহূর্তে
তার কণ্ঠস্বরে যেশাসের জন্মের আগেকার সুদূরতা। প্রাচীনতম লেখনের
পাঠোদ্ধারের চেষ্টায় ক্লান্ত আমি বর্তমানকে মুছে ফেলি নিজেরই অজান্তে। এর
পায়ের কাছে ছড়িয়ে থাকে আমার অনুভুতিগুলো, জড়ো করার উৎসাহ সবুজ
শিখার মতো জ্বলে ওঠে না। আমার ভেতরকার দুরন্ত যুবার অবয়বে বৃদ্ধের
মুখচ্ছন্দ দোদুল্যমান।৫
তার কাছে পৌঁছেই বলি, ‘বড় তৃষ্ণার্ত আমি। সে নিমেষে ফ্রিজের বোতল
থেকে এক গ্লাস পানি হাজির করে আমার সামনে। ঢক ঢক খেয়ে ফেলি
সবটুকু পানি। একটু পরে বলি, ‘বড় তৃষ্ণার্ত আজ। আবার এক গ্লাস পানি,
আর ধোঁয়াওঠা চায়ের পেয়ালা। পানির গ্লাস এবং চায়ের বাটি উজাড় করেও
আমার তৃষ্ণা মেটে না। উসখুস করি, যেন পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে। জালালউদ্দীন
রুমির মতো নিজের শরীরের উদ্দেশে বলি, ‘হে দেহ, এই তো তুমি বিটকেল
যুবরাজ। অধৈর্য আমি শেষটায় বলি, ‘তেষ্টায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।
ঘরের ভেতর তখন এক হাজার একরাত্রির রহস্যময়তা আর পারস্য গালিচার
সৌকর্য; অথচ সে দিনানু-দৈনিক কাজে মশগুল, হঠাৎ ব্যেপে আসা
অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের প্রতি উদাসীন। আখেরে আরও এক গ্লাস পানি গলায়
ঢেলে আমি পথচারী, একা, স্পর্শহারা, চুম্বনবিহীন। বুকজোড়া দাউ দাউ তৃষ্ণা
আর হাহাকার, যা আমার একাকিত্বকে আরও দুঃসহ করায় ব্রতী। কি করে
তৃষিত পায়রার ঘাড় মটাকে হয় বারবার, সে ভালো করেই জানে।৬
এখনও আছো, পরে থাকবে না। ভালোই, তখন আমি এই পৃথিবীর কেউ
নই। দর্পণে বিম্বিত নিজেকে উপভোগ করা চমৎকার খেলা তোমার। একদিন
ফুরাবে খেলা, তখনও দর্পণে ছায়া, আকাশে আদমসুরত। আবার বন্দনায় যে
সৌন্দর্য অক্ষরের পরতে পরতে ধৃত, সংরক্ষিত, তা হারানোর বুকজোড়া
হাহাকার কে আর শুনবে তুমি ছাড়া? কাকের ডাকে চমকে উঠে তুমি নিরর্থক
তরুণী পরিচারিকাকে করবে ভর্ৎসনা। হয়ত মনে পড়বে তাকে, যে তোমার
খুব কাছে আসতে চেয়ে ফিরে গেছে বারবার ব্যর্থ, অসহায়। কোনও কোনও
মধ্যরাতে দুঃস্বপ্নে কুরূপার বীভৎসতা, করোটিতে সাপের ফণা দেখে জেগে
উঠবে। তখনও দর্পণে ছায়া, আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল। ভূতুড়ে জ্যোৎস্নায় স্তব্ধতা
চিরে ডেকে উঠবে যুগপৎ কাক ও কোকিল।৭
বৃষ্টি নেই, রোদও নয় চড়চড়ে। তবু যাই না। আজকাল ইচ্ছে করেই
তোমার নিবাসে আমি অনুপস্থিত। তোমার কাছ থেকে দূরে থাকার সাধনায়
গলায় অন্যমনস্কতার রুদ্রাক্ষের মালা আর হাতে ঔদাস্যের তস্বি। তবুও
কোনও কোনওদিন তোমাকে দেখতে যাব বলে গলির মোড়ে উঠে পড়ি
রিক্শায়। রিক্শাচালক ঠিকানা জানতে চাইলে বলি, ‘নীলিমায় উড়ে যেতে
পার? আরোহীকে উন্মাদ ঠাউরে শীর্ণকায় লোকটা প্যাডেলে অসাবধানতা
ছড়ায় দুর্ঘটনা এড়ানোর উদ্দেশে বলি,
‘হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চলো।
কেন সেখানে যেতে হবে, নিজেই জানি না। শুনেছি তুমি বেশ ভালোই আছ,
তৃপ্তিতে টইটম্বর। আগের চেয়ে ফরসা, স্বাস্থ্যে স্বর্ণলতার সজীবতা। আর
যেখানেই হোক তুমি এ শহরের কোনও হাসপাতালে, ক্লিনিকে নেই। তোমার
কাছ থেকে বহুদূরে টেনে টুনে রেখেছি নিজেকে এবং তোমাকে তিল তিল করে
গড়ে তুলছি পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তিতে। সেই হরফের মূর্তি তোমার মতোই অথচ
তুমি নও। তোমার চেয়েও নমনীয়, দয়াময়ী। তার হাত দৈনন্দিনতায় নয়,
নক্ষত্রপুঞ্জে মিশেছে। কখনও সে আমাকে পাতালে টেনে নেয়, কখনও বা
তুমুল মন্দিরা বাজিয়ে নিয়ে যায় প্রাণবন্ত জীবজগতে।৮
নিস্তব্ধ বাড়ি ধ্যানী দরবেশের মতো জেগে আছেন, তার মাথা আকাশকে
স্পর্শ করার স্পর্ধা রাখে। বৃষ্টিভেজা মধ্যরাতে ঘুম ভাঙে, হাত লাগে দেয়ালে,
যেখানে রক্তের দাগ। বিছানায় বেনামী ভয় লেপ্টে থাকে, নিজেকে মনে হয়
ছন্নছাড়া আগন্তুক; আর ক’দিনই বা আছি এই ডেরায়? আজ আমি যে জায়গায়
খাট পেতেছি, সাজিয়েছি টেবিল, বুকশেলফ-এসব কি এরকমই থাকবে
অবিকল বহুবছর পর? এ জায়গায় ভিন্ন কোনও খাটে, কবোষ্ণ শয্যায় হয়ত
ঘুমোবে আমার কোনও ষাটপেরুনো বংশধর। তার নিদ্রিত হাত কি জেগে
উঠবে দেয়ালের স্পর্শে? তাকেও কি ডালকুত্তার মতো কামড়ে ধরবে এমনি
কোনও চিন্তা যা আমাকে এই মুহূর্তে গ্রাস করেছে? সে কি আমার মতোই
ভুগবে অর্থকষ্টে নাকি দু’হাতে ওড়াবে টাকা? সে কি কোনও অধ্যাপকের পদ
অলংকৃত করবে, অথবা হবে আমৃত্যু দুঃখের জোয়াল বয়ে বেড়ানো কোনও
কবি? (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dakhorkora-bili-korleo/
|
4269
|
শঙ্খ ঘোষ
|
ভবিতব্য
|
চিন্তামূলক
|
আগুন লেগেছে শূন্যে, আমোদে মেতেছে তটভূমি ।
হাড়পোড়া শব্দগন্ধ জড়িয়েছে গভীর আশ্লেষে
ঘুমন্ত মনেরও বোধ । মনে হয় একদিন তুমি
জলাধার হয়ে তবু দাঁড়াবে আমারই সামনে এসে ।
কতজনে জানতে চায় বেঁচে আছি আজও কি তেমনই —
অথবা কীভাবে আজও তোমাকেই ভেবেছি প্রবাহ !
তোমার সঞ্চয় তবে মিথ্যে থেকে মিথ্যে হয়ে এল ?
আমারও প্রতীক্ষা তবে শেষ থেকে হয়ে এল শেষ ?আগুন ছড়ায় আরও, কোথাও কিছুই নেই বাকি
পুড়ে যায় চক্ষুতারা, পুড়ে যায় দূরে বনস্থলী —
তবুও কীভাবে আজও তোমাকেই ভবিতব্য ভাবি !
যে-কথা কারোরই কাছে বলা যায় না — কীভাবে তা বলি !
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ad%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
|
3523
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বলের অপেক্ষা বলী
|
নীতিমূলক
|
ধাইল প্রচণ্ড ঝড়, বাধাইল রণ—
কে শেষে হইল জয়ী? মৃদু সমীরণ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boler-opekkha-boli/
|
4135
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
থাকবো তোমার আশায়
|
প্রেমমূলক
|
যে চোখ দেখেছে তোমায়
ভালবাসার নজরে,
সে চোখ কি করে তোমায়
ভুলতে পারে?
দু’চোখ ভাসবে শুধু বন্যায়
আকাশের দিকে চেয়ে,
ভুলবোনা কোনদিন তোমায়
যতক্ষণ এ দেহে প্রাণ থাকে।
কাঁদতে কাঁদতে যদি শুন্য হয়
চোখের জলাধারে,
তবুও ভুলবোনা তোমায়
বাঁধবো আশা বুকে।
অন্ধ চোখে খুঁজবো তোমায়
হৃদয়ের আয়না দিয়ে,
ভাসাবো তোমায় ভালবাসায়
বুক ভরা ভালবাসা দিয়ে।
বল তুমি যাবে কোথায়
আমাকে ছেড়ে,
থাকবো আমি তোমার আশায়
নদীর কুলে বসে।
যেদিন মৃত্যু হাতছানি দিবে আমায়
নিয়ে যাবে ওপারে,
সেখানেও থাকবো তোমার আশায়
অনন্ত কাল ধরে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2204.html
|
3603
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিরহীর পত্র
|
প্রেমমূলক
|
হয় কি না হয় দেখা , ফিরি কি না ফিরি ,
দূরে গেলে এই মনে হয় ;
দুজনার মাঝখানে অন্ধকারে ঘিরি
জেগে থাকে সতত সংশয় ।
এত লোক , এত জন , এত পথ গলি ,
এমন বিপুল এ সংসার —
ভয়ে ভয়ে হাতে হাতে বেঁধে বেঁধে চল , ি
ছাড়া পেলে কে আর কাহার ।
তারায় তারায় সদা থাকে চোখে চোখে
অন্ধকারে অসীম গগনে ।
ভয়ে ভয়ে অনিমেষে কম্পিত আলোকে
বাঁধা থাকে নয়নে নয়নে ।
চৌদিকে অটল স্তব্ধ সুগভীর রাত্রি ,
তরুহীন মরুময় ব্যোম —
মুখে মুখে চেয়ে তাই চলে যত যাত্রী
চলে গ্রহ রবি তারা সোম ।
নিমেষের অন্তরালে কী আছে কে জানে ,
নিমেষে অসীম পড়ে ঢাকা —
অন্ধ কালতুরঙ্গম রাশ নাহি মানে ,
বেগে ধায় অদৃষ্টের চাকা ।
কাছে কাছে পাছে পাছে চলিবারে চাই ,
জেগে জেগে দিতেছি পাহারা ,
একটু এসেছে ঘুম — চমকি তাকাই
গেছে চলে কোথায় কাহারা !
ছাড়িয়ে চলিয়া গেলে কাঁদি তাই একা
বিরহের সমুদ্রের তীরে ।
অনন্তের মাঝখানে দু - দন্ডের দেখা
তাও কেন রাহু এসে ঘিরে !
মৃত্যু যেন মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যায় ,
পাঠায় সে বিরহের চর ।
সকলেই চলে যাবে , পড়ে রবে হায়
ধরণীর শূন্য খেলাঘর ।
গ্রহ তারা ধূমকেতু কত রবি শশী
শূন্য ঘেরি জগতের ভিড় ,
তারি মাঝে যদি ভাঙে , যদি যায় খসি
আমাদের দু - দন্ডের নীড় —
কোথায় কে হারাইব! কোন্ রাত্রিবেলা
কে কোথায় হইব অতিথি !
তখন কি মনে রবে দু - দিনের খেলা ,
দরশের পরশের স্মৃতি !
তাই মনে করে কি রে চোখে জল আসে
একটুকু চোখের আড়ালে !
প্রাণ যারে প্রাণের অধিক ভালোবাসে
সেও কি রবে না এক কালে !
আশা নিয়ে এ কি শুধু খেলাই কেবল —
সুখ দুঃখ মনের বিকার !
ভালোবাসা কাঁদে , হাসে , মোছে অশ্রুজল ,
চায় , পায় , হারায় আবার । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/birohir-potro/
|
714
|
জয় গোস্বামী
|
বিবাহের
|
প্রেমমূলক
|
একসময় মনে হত কোনওদিন তোমাকে পাব না
একসময় মনে হত ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়
আজকে শেষবার আমি তোমাকে পেলাম
কালকের পর থেকে আমাকে নেবে না আর তুমি
দুপুর ফুরিয়ে এল।
এইবার ফিরে আসবে বাড়ির সবাই।
আর একবার, আর একবার, এসো__
প্রথম দিনের মতো আবার পুড়িয়ে করো ছাই !আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রএকসময় মনে হত কোনওদিন তোমাকে পাব না
একসময় মনে হত ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়
আজকে শেষবার আমি তোমাকে পেলাম
কালকের পর থেকে আমাকে নেবে না আর তুমি
দুপুর ফুরিয়ে এল।
এইবার ফিরে আসবে বাড়ির সবাই।
আর একবার, আর একবার, এসো__
প্রথম দিনের মতো আবার পুড়িয়ে করো ছাই !আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রএকসময় মনে হত কোনওদিন তোমাকে পাব না
একসময় মনে হত ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়
আজকে শেষবার আমি তোমাকে পেলাম
কালকের পর থেকে আমাকে নেবে না আর তুমি
দুপুর ফুরিয়ে এল।
এইবার ফিরে আসবে বাড়ির সবাই।
আর একবার, আর একবার, এসো__
প্রথম দিনের মতো আবার পুড়িয়ে করো ছাই !আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রএকসময় মনে হত কোনওদিন তোমাকে পাব না
একসময় মনে হত ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়
আজকে শেষবার আমি তোমাকে পেলাম
কালকের পর থেকে আমাকে নেবে না আর তুমি
দুপুর ফুরিয়ে এল।
এইবার ফিরে আসবে বাড়ির সবাই।
আর একবার, আর একবার, এসো__
প্রথম দিনের মতো আবার পুড়িয়ে করো ছাই !আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b/
|
4187
|
লালন শাহ
|
মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
|
মানবতাবাদী
|
(ভবে) মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার
নদী কিংবা বিল-বাঁওড়-খাল
সর্বস্থলে একই এক জল।।একা মেরে সাঁই হেরে সর্ব ঠাঁই ।।
মানুষে মিশিয়া হয় বিধান তার
মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার…নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে,
আকার সাকার হইল সে ।।
দিব্যজ্ঞানী হয় তবে জানতে পায় ।।
কলি যুগে হলেন মানুষ-অবতার
মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যারবহু তর্কে দিন বয়ে যায়
বিশ্বাসের ধন নিকটে পায় ।।
সিরাজ সাঁই ডেকে বলে লালনকে ।।
কুতর্কের দোকান সে করে না আর
মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
(ভবে) মানুষ গুরু নিষ্ঠা যারআরও পড়ুন… লালন ফকির এর সকল গান
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4435.html
|
2215
|
মহাদেব সাহা
|
বেশিদিন থাকবো না আর
|
চিন্তামূলক
|
বেশিদিন থাকবো না আর চলে যাবো গোলাপের
গাঢ় গিঁট খুলে
চলে যাবো পিঁড়ির গহন স্নেহ ভেঙে, চলে যাবে,
অনেক বসেছি
বেশি তো থাকবো না আর চলে যাবো মেঘ রেখে,
মমতাও রেখে
মন্ময় কাঁথাটি রেখে চলে যাবো বেশি দেরি নেই!
কুশন ও কার্পেটের নিবিড় গোধূলি ফেলে চলে যাবো
চাই কি ফুলের শুশ্রূষা আর ফুলদানিরও আদর,
চলে যাবো এখাবে বসার সুখ ফেলে, চলে যাবে
বেত, বাঁশ, বস্তুকে মাড়িয়ে,
বেশি দেরি নেই চলে যাবো জমাট মঞ্চেরও মোহ ভেঙে
মেধাকেও পরাবো বিরহ, আত্মাকেও অনন্ত বিচ্ছেদ।
বেশিদিন থাকবো না চলে যাবো এই তীব্র টান
ভেদ করে, ফেলে রেখে এই আন্তরিকতার জামা,
হাতের সেলাই
অধিক থাকবো না আর অনেক জড়িয়ে গেছি চলে যাবো
আসর ভাঙার আগে, আচ্ছন্নতা উন্মেষেরও আগে
চলে যাবো চোখের জলেরও আগে না হলে পারবো না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1524
|
5302
|
শামসুর রাহমান
|
সেই সুর
|
চিন্তামূলক
|
এখনো আমার মন আদিম ভোরের কুয়াশায়
প্রায়শ আচ্ছন্ন হয়। মনে হয় স্বচ্ছন্দ কৌশলে
অমার শহরটিকে প্রাচীন দেবতা করতলে
সর্বদা আছেন ধরে; পশু-পাখি কেমন ভাষায়
কথা বলে, খৃষ্টপূর্ব শতাব্দীর নারী কি আশায়
বসে থাকে নদীতীরে। ছিন্ন শির, বীণা খর জলেসে-সুরের ক্ষীণ ছায়া, মনে হয়, আজো মাঝে মাঝে
আমার নিমগ্ন অবচেতনের প্রচ্ছন্ন প্রদোষে
খেলা করে, নইলে কেন অস্তিত্বের তন্ত্রীতে আমার
জাগে সূক্ষ্ম কম্পন এমন? মর্মমূলে কেন বাজে
সাহসা অদৃশ্য বাণী? খর স্রোতে চোখ রেখে ব’সে
আছি একা ঔদাস্যের তটে, নেই লোভ অমরার। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sei-sur/
|
2924
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কৃষ্ণকলি
|
রূপক
|
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে
ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।পূবে বাতাস এল হঠাত্ ধেয়ে,
ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।এমনি করে কাজল কালো মেঘ
জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাত্ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/krishnokoli/
|
1811
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
গাছ অথবা সাপের গল্প
|
প্রেমমূলক
|
তোমাকে যেন কিসের গল্প বলবো বলেছিলাম?
গাছের, না মানুষের?
মানুষের, না সাপের?
ওঃ, হ্যাঁ মনে পড়েছে।
গাছের মতো একটা মানুষ।
আর সাপের মতো একটা নারী
কুয়াশা যেমন খামচা মেরে জড়িয়ে ধরে কখনো কখনো
দুধকুমারী আকাশকে
সাপটা তেমনি সাতপাকে জড়িয়ে ধরেছিল গাছটাকে।
আর গাছটাও বেহায়া।
লাজ-লজ্জা, লোক-লৌকিকতা ভুলে গিয়ে
নৌকা ডুবে যাচ্ছে, এখুনি ঝাঁপ দিতে হবে
নদীর নাইকুন্ডুতে,
এমনি ভাবেই সর্বস্ব ভাসিয়ে দিল সাপের হাতে।
আর তারপরেই ঘটল আজব কাণ্ডটা।
সাপের ছোবলে ছিল বিষ। নীল।
গাছের শিকড়ে ছিল তৃষ্ণা। লাল।
ছোবল খেতে খেতে ছোবল খেতে খেতে
নীলপদ্মে ভরে উঠল গাছ।
আর গাছের আলিঙ্গনে
গুড়ো হতে হতে গুড়ো হতে হতে
সেই শঙ্খচুড় সাপটা
আলতা-সিদুরে রাঙা বিয়ের কনে।
আর এই সব দৃশ্য দেখতে দেখতে
আকাশের আইবুড়ো নক্ষত্রগুলো
হেসে গলে গা ঢলাঢলি করে বলে উঠল
আজ সারা রাত জাগব ওদের বাসর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1303
|
3487
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বঙ্গবাসীর প্রতি
|
স্বদেশমূলক
|
আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না ।
এ কি শুধু হাসিখেলা , প্রমোদের মেলা
শুধু মিছে কথা ছলনা !
আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না ।
এ যে নয়নের জল , হতাশের শ্বাস ,
কলঙ্কের কথা দরিদ্রের আশ ,
এ যে বুক - ফাটা দুখে গুমরিছে বুকে
গভীর মরমবেদনা ।
এ কি শুধু হাসিখেলা , প্রমোদের মেলা ,
শুধু মিছে কথা ছলনা !
এসেছি কি হেথা যশের কাঙালি
কথা গেঁথে গেঁথে নিতে করতালি ,
মিছে কথা কয়ে মিছে যশ লয়ে
মিছে কাজে নিশিযাপনা !
কে জাগিবে আজ , কে করিবে কাজ ,
কে ঘুচাতে চাহে জননীর লাজ —
কাতরে কাঁদিবে , মা ' র পায়ে দিবে
সকল প্রাণের কামনা ।
এ কি শুধু হাসিখেলা , প্রমোদের মেলা ,
শুধু মিছে কথা ছলনা ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bonggobasir-proti/
|
3142
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তরঙ্গের বাণী সিন্ধু
|
রূপক
|
তরঙ্গের বাণী সিন্ধু
চাহে বুঝাবারে।
ফেনায়ে কেবলি লেখে,
মুছে বারে বারে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/torongger-bani-sindhu/
|
1828
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
তোমার মুখের দিকে
|
ভক্তিমূলক
|
প্রণাম করব। কিন্তু পা কই? আগুনে ও হিমজলে পা ডুবিয়ে
এখনো তো তাঁর অফুরাণ হাঁটা
বরণ করব। কিন্তু কই সে শব্দদল যা ছুঁতে পারে
তাঁর বোধের এলাকা?
তাহলে?
জ্বলন্ত সিড়ি ভেঙে ভেঙে শিখরের দিকে যাঁর এগিয়ে চলা,
অনুজের অভ্যর্থনা কীভাবে পৌঁছবে সে অগ্রজে?
তবে কি বিশেষণ-বিড়ম্বিত স্তব কোলাহলেই শেষ হবে সে আরতি?
না। ভীষণ নীরবে চাইব এই খবরটুকু পৌঁছে দিতে শুধু-
আরো দীর্ঘতর প্রতীক্ষায় আমরা প্রস্তুত।
আরো নতুনতর বিস্ফোরণের আলোয়
উত্তাপে আবীরে ঘোর লাল হয়ে উঠুক আমাদের আকাশ।
আমরা তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুমি মুখ ঘুরিও না।
যজ্ঞাগ্নির সামনে কী দিব্য তোমার দহন!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1192
|
1156
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মহিলা
|
প্রেমমূলক
|
এইখানে শূন্যে অনুধাবনীয় পাহাড় উঠেছে
ভোরের ভিতর থেকে অন্য এক পৃথিবীর মতো;
এইখানে এসে প’ড়ে- থেমে গেলে- একটি নারীকে
কোথাও দেখেছি ব’লে স্বভববশত
মনে হয়;- কেননা এমন স্থান পাথরের ভারে কেটে তবু
প্রতিভাত হয়ে থাকে নিজের মতন লঘুভারে;
এইখানে সে-দিন সে হেঁটেছিলো,- আজো ঘুরে যায়;
এর চেয়ে বেশি ব্যাখ্যা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন দিতে পারে,
অনিত্য নারীর রূপ বর্ণনায় যদিও সে কুটিল কলম
নিয়োজিত হয় নাই কোনোদিন- তবুও মহিলা
মা ম’রে অমর যারা তাহাদের স্বর্গীয় কাপড়
কোচকায়ে পৃথিবীর মসৃণ গিলা
অন্তরঙ্গ ক’রে নিয়ে বানায়েছে নিজের শরীর।
চুলের ভিতরে উঁচু পাহাড়ের কুসুম বাতাস।
দিনগত পাপক্ষয় ভুলে গিয়ে হৃদয়ের দিন
ধারণ করেছে তার শরীরের ফাঁস।
চিতাবাঘ জন্মাবার আগে এই পাহাড়ে সে ছিলো;
অজগর সাপিনীর মরণের পরে।
সহসা পাহাড় ব’লে মেঘ-খন্ডকে
শূন্যের ভিতরে
ভুল হলে- প্রকৃতিস্থ হয়ে যেতে হয়;
(চোখ চেয়ে ভালো ক’রে তাকালেই হতো;)
কেননা কেবলি যুক্তি ভালোবেসে আমি
প্রমাণের অভাববশত
তাহাকে দেখিনি তবু আজো;
এক আচ্ছান্নতা খুলে শতাব্দী নিজের মুখের নিস্ফলতা
দেখাবার আগে নেমে ডুবে যায় দ্বিতীয় ব্যথায়;
আদার ব্যাপারী হ’য়ে এই সব জাহাজের কথা
না ভেবে মানুষ কাজ ক’রে যায় শুধু
ভয়াবহভাবে অনায়াসে।
কখনো সম্রাট শনি শেয়াল অ ভাঁড়
সে-নারীর রাং দেখে হো হো ক’রে হাসে।
দুইমহিলা তবুও নেমে আসে মনে হয়ঃ
(বমারের কাজ সাঙ্গ হ’লে
নিজের এয়োরোড্রোমে-প্রশান্তির মতো?)
আছেও জেনেও জনতার কোলাহলেতাহার মনের ভাব ঠিক কী রকম-
আপনারা স্থির ক’রে নিন;
মনে পড়ে, সেন রায় নওয়াজ কাপূর
আয়াঙ্গার আপ্তে পেরিন-এমনই পদবী ছিলো মেয়েটির কোনো একদিন;
আজ তবু উশিন তো বিয়াল্লিশ সাল;
সম্বর মৃগের বেড় জড়ায়েছে যখন পাহাড়ে
কখনও বিকেলবেলা বিরাট ময়াল,অথবা যখন চিল শরতের ভোরে
নীলিমার আধপথে তুলে নিয়ে গেছে
রসুঁয়েকে ঠোনা দিয়ে অপরূপ চিতলের পেটি,-
সহসা তাকায়ে তারা ইউৎসারিত নারীকে দেখেছে;এক পৃথিবীর মৃত্যু প্রায় হ’য়ে গেলে
অন্য-এক পৃথিবীর নাম
অনুভব ক’রে নিতে গিয়ে মহিলার
ক্রমেই জাগছে মনস্কাম;ধূমাবতী মাতঙ্গী কমলা দশ-মহাবিদ্যা নিজেদের মুখ
দেখায়ে সমাপ্ত হ’লে সে তার নিজের ক্লান্ত পায়ের সঙ্কেতে
পৃথিবীকে জীবনের মতো পরিসর দিতে গিয়ে
যাদের প্রেমের তরে ছিলো আড়ি পেতেতাহারা বিশেষ কেউ কিছু নয়;-
এখনও প্রাণের হিতাহিত
না জেনে এগিয়ে যেতে তবু পিছু হটে গিয়ে
হেসে ওঠে গৌড়জনোচিতগরম জলের কাপে ভবেনের চায়ের দোকানে;
উত্তেজিত হ’য়ে মনে করেছিলো (কবিদের হাড়
যতদূর উদ্বোধিত হ’য়ে যেতে পারে-
যদিও অনেক কবি প্রেমিকের হাতে স্ফীত হ’য়ে গেছে রাঁঢ়):‘উনিশশো বেয়াল্লিশ সালে এসে উনিশশো পঁচিশের জীব-
সেই নারী আপনার হংসীশ্বেত রিরিংসার মতন কঠিন;
সে না হলে মহাকাল আমাদের রক্ত ছেঁকে নিয়ে
বা’র ক’রে নিতো না কি জনসাধারণ ভাবে স্যাকারিন।আমাদের প্রাণে যেই অসন্তোষ জেগে ওঠে সেই স্থির ক’রে;
পুনরায় বেদনার আমাদের সব মুখ স্থুল হয়ে গেলে
গাধার সুদীর্ঘ কান সন্দেহের চোখে দেখে তবু
শকুনের শেয়ালের চেকনাই কান কেটে ফেলে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/mohila/
|
1325
|
তসলিমা নাসরিন
|
চোখ
|
প্রেমমূলক
|
খালি চুমু চুমু চুমু
এত চুমু খেতে চাও কেন?
প্রেমে পড়লেই বুঝি চুমু খেতে হয়!
চুমু না খেয়ে প্রেম হয় না?
শরীর স্পর্শ না করে প্রেম হয় না?
মুখোমুখি বসো,
চুপচাপ বসে থাকি চলো,
কোনও কথা না বলে চলো,
কোনও শব্দ না করে চলো,
শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে চলো,
দেখ প্রেম হয় কি না!
চোখ যত কথা বলতে পারে, মুখ বুঝি তার সামান্যও পারে!
চোখ যত প্রেম জানে, তত বুঝি শরীরের অন্য কোনও অঙ্গ জানে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1979
|
4313
|
শামসুর রাহমান
|
অপ্রেমের কবিতা
|
প্রেমমূলক
|
এক্ষুণি বলে ফেলা দরকার, নইলে খুব বেশি
দেরি হয়ে যাবে। সত্যাসত্য নিয়ে ঝাক্কিঝামেলা,
তর্কাতর্কি মূলতুবি রেখে
বোধোদয়ের বাগান থেকে
পরগাছাগুলোকে একটু হাত লাগিয়ে
উপড়ে ফেলা যাক
সময় আমাকে তাড়া করে। গাছে লটকানো
হিস্পানি গিটার জপায়, স্বীকারোক্তি চাই।এতদিন যে তাসের ঘর তৈরি হয়েছিল
আমার মনের খেয়ালে, বৈরী হাওয়ার ফুৎকারে
তা লহমায় ভূমিসাৎ। অগ্নিবলয়ের এপার থেকে
দেখলাম, একটা জতুগৃহ গলে গলে
মাটির সঙ্গে মিশে গেল। সেই
অগ্নিকাণ্ডের তাণ্ডবমুক্ত একটি পাথরে
তোমার নাম উৎকীর্ণ করতে গিয়ে বানানের
বিসমিল্লায় গলদ, চৌদিকে হাহা হিহি।
করজোড়ে তোমার কাছে মাফ চাই। কবুল করি, এতদিন
তোমাকে নিয়ে যে ছাইভস্ম লিখেছি বার বার, তার
কোনো মাথামুণ্ডু নেই, কোনো বুনিয়াদই নেই।
মিথ্যার নকল নক্ষত্রখচিত কাঁচুলি নিয়ে খেলা করাই
আমার দ্বিতীয় স্বভাব, এতদিনে তোমার
অজানা থাকার কথা নয়,
তোমার যে হাত কখনো স্পর্শ করার
সুযোগ কিংবা সাহস আমার হয়নি,
তোমার যে ঠোঁট কখনো যুক্ত হয় নি আমার ওষ্ঠে,
তাদের কলুষিত করেছে আমার মিথ্যা বয়ান।আমার এমনই বসিব, কল্পনা আমাকে ফুসলিয়ে
তিলকে তাল বানিয়ে নিয়েছে। ভালোবাসার
কাঙাল আমি, তোমার মধুর সৌজন্যকে
তরজমা করে নিয়েছি প্রেমে এবং আমার বেহুদা
বেশরম কলম, অতিরঞ্জনে বেজায় দড়, তোমাকে
পর্বে পর্বে বিব্রত করেছে। এই মুহূর্তে ওর গালে চড়
কষাতে ইচ্ছে করেছে; কেননা সে ছন্নছাড়া,
অবাস্তব স্তবকের রচয়িতা।
আমার কলমের বেহায়াপনায়, রংবাজিতে
আমি নিজেই তাজ্জব।
তোমাকে প্রবাল সিঁড়ি থেকে নামিয়ে আমার
কল্পনাজীবী লেখনী আমার বাঁ পাশে
বসিয়ে দিয়েছে জ্যোৎস্নাধোয়া দোলনায়।
তুমি আমার আলিঙ্গনে
ছিপছিপে নৌকোর দোলা, এরকম একটা ছবি
ফোটে তার কয়েকটি আঁচড়ে।তুমি আমাকে কখনো এমন কিছুই বলোনি,
যাতে মনে হতে পারে তোমার হৃদয়ে
আমার উদ্দেশে ছিল ভালোবাসার বিচ্ছুরণ।
রৌদ্র-জ্যোৎস্না, পানিতে টইটুম্বুর দীঘি
আর হাওয়ায় স্পন্দিত গাছের পাতার ঝিলিমিলি
যা কিছু জপিয়েছে আমাকে
তাকেই তোমার উচ্চারণ ঠাউরে
আমি খুশিতে ডগমগ
যদি তুমি ভুলে যাও আমার বলপেনের
অপরিণামদর্শী উচ্ছলতা, তাহলে আমার
অপরাধের বিষবৃক্ষ উৎপাটিত শেকড়বাকড় সমেত।
যদি বলো, এই বেল্লিককে ছুঁড়ে ফেলে দিই
শ্মশানঘাটের দাউ দাউ চিতায়
অথবা মাছের মড়ক লাগা বুড়িগঙ্গায়।এতকাল আমার যে অক্ষরমালা
তোমার গলায় পরিয়েছি বলে ঢি ঢি
পড়ে গ্যাছে পাড়ায় পাড়ায়, আসলে তার
একটি মুক্তোও সাচ্চা নয়,
এটা কেউ একবারও ভেবে দেখলে না।
তুমি ছাড়া কে ওদের বলে দেবে যে, যদি কেউ
জলাশয় ভেবে মরীচিকার পেছনে ছুটে মরে দিশেহারা
তবে ভ্রষ্ট পথিকের আর্তনাদের জন্যে
মৃগতৃষ্ণিতাকে দায়ী করা অন্যায়।
কী আনন্দ পায় ওরা বেবুনিয়াদ ছায়ার মহল বানিয়ে?যারা আমাকে সাতবার
মাটিতে পুঁতে ফেটে পড়ে অট্রহাসিতে
আর গায়েব লাঠিসোটা নিয়ে
লড়াই করে আমার ছায়ার সঙ্গে দিনভর, রাতভর,
আমার হাতে স্বরচিত মিথ্যার কাঁচুলি দেখেই তারা ঠাউরে
নিয়েছে সত্যের নগ্নতার সঙ্গে আমার মাঝামাখি।আমার এই স্বীকারোক্তির পর
কেউ আর তোমাকে দেখে মুখ টিপে হাসবে না,
বিব্রত হবে না তুমি
আমার লজ্জা আর পাপ উন্মোচন করে
আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে
আমি তোমাদের সবাইকে মুক্তি দিলাম।
মনগড়া ভুল স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে থেকে
চড়ায় মুখ থুবড়ে রক্ত ভেজা বুকে
কীভাবে বেঁচে থাকা যায়
ভালোবাসার চৌচির খরায়, এখন থেকে
এটাই আমার অনুশীলন।হঠাৎ লেখার টেবিলে আমার কলম
স্যামসনের মতো পেশী ফুলিয়ে, ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে
গরগরে স্বরে করলো উচ্চারণ-
‘আমাকে মিথ্যেবাদী আখ্যা দিয়ে
কার কার মুখ বন্ধ করতে চাও, কবি?’ (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/opremer-kobita/
|
511
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
শেষের ডাক
|
চিন্তামূলক
|
মরণ-রথের চাকার ধ্বনি ওই রে আমার কানে আসে।
পুবের হাওয়া তাই নেমেছে পারুল বনে দীঘল শ্বাসে।
ব্যথার কুসুম গুলঞ্চ ফুল
মালঞ্চে আজ তাই শোকাকুল,
গোরস্থানের মাটির বাসে তাই আমার আজ প্রাণ উদাসে।
অঙ্গ আসে অবশ হয়ে নেতিয়ে-পড়া অলস ঘুমে
সাগর-পারের বিদেশিনীর হিম-ছোঁওয়া যার নয়ন চুমে।
হৃদয়-কাঁদা নিদয় কথা
আকাশ-ভেজা বিদায়-ব্যথা
লুটায় গো মোর ভুবন ভরি বাঁধন ছেঁড়ার কাঁদন ত্রাসে।
মোর কাফনের কর্পূর-বাস ভরপুর আজ দিগবলয়ে,
বনের শাখা লুটিয়ে কাঁদে হরিণটি তার হারার ভয়ে।
ফিরে-পাওয়া লক্ষ্মী বৃথাই
নয়ন-জলে বক্ষ তিতায়
ওগো এ কোন্ জাদুর মায়ায় আমার দু-চোখ শুধু জলে ভাসে।
আজ আকাশ-সীমায় শব্দ শুনি অচিন কাদের আসা যাওয়ার,
তাই মনে হয় এই যেন শেষ আমার সকল দাবি দাওয়ার।
আজ কেহ নাই পথের সাথি,
সামনে শুধু নিবিড় রাতি
আমায় দূরের মানুষ ডাক দিয়েছে রাখবে কে আর বাঁধন পাশে। (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/shesher-dak/
|
1681
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রাজপথে কিছুক্ষণ
|
মানবতাবাদী
|
দেখুন মশায়,
অনেকক্ষণ ধরে আপনি ঘুরঘুর করছেন,
কিন্তু আর নয়, এখন আপনার সরে পড়াই ভাল।
এই আমি থেকে হলফ করে বলছি,
কলকাতা থেকে কৈম্বাটুর অব্দি একটা
প্যাসেঞ্জার বাস-সারভিস খুলবার সত্যিই খুব দরকার আছে কি না,
তা আমি জানি না।
আপনার যদি মনে হয়, আছে,
তা হলে বেশ তো, যান,
যেখানে-যেখানে সিন্নি দেবার, দিয়ে,
জায়গামতন ইনফ্লুয়েনস খাটিয়ে
লাইসেন্স পারমিট ইত্যাদি সব জোগাড় করুন,
যাঁকে যাঁকে ধরতে হয়, ধরুন,
আমাকে আর জ্বালাবেন না। আমি
নেহাতই একজন ছাপোষা লোক,
টাইমের ভাত খেয়ে আপিস যাই,
অবসর-টবসর পেলে ছোট মেয়েটাকে নামতা শেখাই,
কৈম্বাটুর যে কোথায়,
মাদ্রাজে না পাঞ্জাবে, তা-ই আমি জানি না।
আপাতত তাড়াতাড়ি
শ্যামবাজারে যাওয়া দরকার, ভাগ্যবলে যদি একটা
শাট্ল-বাস পাই,
তা হলেই আমি আজকের মতন ধন্য হতে পারি।
দেখুন মহাশয়,
সেই থেকে আপনি আমার সঙ্গে সেঁটে আছেন।
কিন্তু আর নয়, এখন আপনার সরে পড়াই ভাল। আপনি
বিশ্বাস করুন চাই না-করুন,
দুই হাতের পাতা উল্টে দিয়ে এই আমি
শেষবারের মতো জানালুম, কেন
কৃষ্ণমাচারী গেলেন এবং
শচীন চৌধুরী এলেন,
তার বিন্দুবিসর্গও আমি জানি না।
আমি একজন ধিনিকেষ্ট,
কলম পিষতে বড়বাজারে যাই,
পিষি,
সাবান কিংবা তরল আলতার শিশি
কিনে বাড়ি ফিরি, গিন্নি
কলঘরে ঢুকলে বাচ্চা সামলাই।
আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করা না-করা সমান,
ভোটারদের আল্জিভ না-দেখিয়ে যাঁরা বক্তৃতা দিতে পারেন না
আপনি বরং তাঁদের কাছে যান।
আমার এখন তাড়াতাড়ি
শ্যামবাজারে যেতে হবে। সঙ্গে যদি আসতে চান, আসুন,
লজ্জা-টজ্জা না-করে একটু শব্দ করে কাসুন,
তা হলেই আপনার বাসভাড়াটা চুকিয়ে দিতে পারি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1646
|
500
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
শরাবন তহুরা
|
ভক্তিমূলক
|
নার্গিস-বাগমে বাহার কী আগমে ভরা দিল দাগমে –
কাঁহা মেরি পিয়ারা, আও আও পিয়ারা।
দুরু দুরু ছাতিয়া ক্যায়সে এ রাতিয়া কাটুঁ বিনু সাথিয়া
ঘাবরায়ে জিয়ারা, তড়পত জিয়ারা।
দরদে দিল জোর, রঙিলা কওসর
শরাবন তহুরা লাও সাকি লাও ভর,
পিয়ালা তু ধর দে, মস্তানা কর দে, সব দিল ভর দে
দরদ মে ইয়ারা – সঙ্গ দিল ইয়ারা।
জিগর কা খুন নেহি, ডরো মত সাকিয়া,
আঙ্গুরী-লোহুয়ো, - ক্যাঁও ভিঙ্গা আঁখিয়া?
গিয়া পিয়া আতা নেহি মত কহো সহেলি,
ছোড়ো হাত – পিয়ালা য়ো ভর দে তু পহেলি!
মত মাচা গওগা, বসন্তমে বাহবা ম্যায় সে ক্যা তৌবা?
আহা গোলনিয়ারা সখি গোলনিয়ারা –
শরাব কা নূর সে রৌশন কর দে দুনিয়া আঁধিয়ারা
দুনিয়া আঁধিয়ারা দুনিয়া আঁধিয়ারা।
(পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/shoraban-tohura/
|
5499
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
প্রথম বার্ষিকী
|
শোকমূলক
|
আবার ফিরে এল বাইশে শ্রাবণ।
আজ বর্ষশেষে হে অতীত,
কোন সম্ভাষণ
জানাব অলক্ষ্য পানে?
ব্যথাক্ষুব্ধ গানে
ঝরাব শ্রাবণ বরিষণ!দিনে দিনে, তিলে তিলে যে বেদনা
উদাস মধুর
হয়েছে নিঃশব্দ প্রাণে
ভরেছে বিপুল টানে,
তারে আজ দেব কোন সুর?তোমার ধূসর স্মৃতি, তোমার কাব্যের সুরভিতে
লেগেছে সন্ধ্যার ছোঁওয়া, প্রাণ ভরে দিতে
হেমন্তের শিশিরের কণা
আমি পারিব না।প্রশান্ত সূর্যাস্ত পরে দিগন্তের যে রাগ-রক্তিমা,
লেগেছে প্রাণের ‘পরে,
সহসা স্মৃতির ঝড়ে
মুছিয়া যাবে কী তার সীমা!
তোমার সন্ধ্যার ছায়াখানি
কোন পথ হতে মোরে
কোন পথে নিয়ে যাবে টানি’
অমর্ত্যরে আলোক সন্ধানী
আমি নাহি জানি।
একদা শ্রাবণ দিনে গভীর চরণে,
নীরবে নিষ্ঠুর সরণিতে
পাদস্পর্শ দিতে
ভিক্ষুক মরণে।
পেয়েছে পথের মধ্যে দিয়েছ অক্ষয়
তব দান,
হে বিরাট প্রাণ!
তোমার চরণ স্পর্শে রোমাঞ্চিত পৃথিবীর ধূলি
উঠিছে আকুলি’,
আজিও স্মৃতির গন্ধে ব্যথিত জনতা
কহিছে নিঃশব্দ স্বরে একমাত্র কথা,
‘তুমি হেথা নাই’।
বিস্ময়ের অন্ধকারে মুহ্যমান জলস্থল তাই
আদো তন্দ্রা, আধো জাগরণে
দক্ষিণ হাওয়ায় ক্ষণে ক্ষণে
ফেলিছে নিঃশ্বাস।
ক্লেদক্লিষ্ট পৃথিবীতে একী পরিহাস।
তুমি চলে গেছ তবু আজিও বহিছে বারোমাস
উদ্দাম বাতাস,
এখনো বসন্ত আসে
সকরুণ বিষণ্ণ নিঃশ্বাসে,
এখনো শ্রাবণ ঝরোঝর
অবিশ্রান্ত মাতায় অন্তর।
এখনো কদম্ব বনে বনে
লাগে দোলা মত্ত সমীরণে,
এখনো উদাসি’
শরতে কাশের ফোটে হাসি।
জীবনে উচ্ছ্বাস, হাসি গান
এখনো হয় নি অবসান।
এখনো ফুটিছে চাঁপা হেনা,
কিছুই তো তুমি দেখিলে না।
তোমার কবির দৃষ্টি দিয়ে
কোন কিছু দিলে না চিনিয়ে
এখন আতঙ্ক দেখি পৃথিবীর অস্থিতে মজ্জায়,
সভ্যতা কাঁপিছে লজ্জায়;
স্বার্থের প্রাচীরতলে মানুষের সমাধি রচনা,
অযথা বিভেদ সৃষ্টি, হীন প্ররোচনা
পরস্পর বিদ্বেষ সংঘাতে,
মিথ্যা ছলনাতে –
আজিকার মানুষের জয়;
প্রসন্ন জীবন মাঝে বিসর্পিল, বিভীষিকাময়।। (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/prothom-barshiki/
|
1857
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
বজ্র শব্দটাকে
|
মানবতাবাদী
|
বজ্র শব্দটাকে আমরা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে ভুলে গেছি
আর বৃক্ষ শব্দটাকেও।
টাকা-পয়সা শব্দটার ভিতরে লুকনো আছে একটা ঝুমঝুমি
এবং উচ্চারণ করা খুব সহজ।
ঘরবাড়ি শব্দটা সোফায় হেলান দেওয়ার মতো আরামদায়ক
এবং উচ্চারণ করা খুব সহজ।
গাড়িঘোড়া শব্দটা যেন সমুদ্রতীরের হৈ হৈ হাওয়া
এবং উচ্চারণ করা খুব সহজ।
সাহিত্য সংস্কৃতি এইসব শব্দ বুট জুতোর মতো ভারি ছিল বলে
আমরা বানিয়ে নিয়েছি হালকা চপ্পল।
মুক্তি শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে
একবার আমাদের হাড়েমাসে ঢুকে পড়েছিল কনকনে শীত।
তাই সংগ্রাম শব্দের মতো তাকেও আমরা যৎপরোনাসি- এড়িয়ে চলি।
নানাবিধ ছোটলাট বড়লাটের পায়ে
কচুটাতার মতো অনবরত আছড়াতে আছড়াতে
বৃক্ষ শব্দটাকে আমরা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে ভুলে গেছি
আর বজ্র শব্দটাকেও।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1217
|
1389
|
তারাপদ রায়
|
দারিদ্র্য
|
মানবতাবাদী
|
আমি নিতান্ত গরীব ছিলাম, খুবই গরীব।
আমার ক্ষুধার অন্ন ছিল না,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না,
আমার মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না।
অসীম দয়ার শরীর আপনার,
আপনি এসে আমাকে বললেন,
না, গরীব কথাটা খুব খারাপ,
ওতে মানুষের মর্যাদা হানি হয়,
তুমি আসলে দরিদ্র।
অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে আমারকষ্টের দিন,
আমার কষ্টের দিন, দিনের পর দিন আরশেষ হয় না,
আমি আরো জীর্ণ আরো ক্লিষ্ট হয়ে গেলাম।
হঠাৎ আপনি আবার এলেন, এসে বললেন,
দ্যাখো, বিবেচনা করে দেখলাম,
দরিদ্র শব্দটিও ভালো নয়, তুমি হলে নিঃস্ব।
দীর্ঘ নিঃস্বতায় আমার দিন রাত্রি,
গনগনে গরমে ধুঁকতে ধুঁকতে,
শীতের রাতের ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে,
বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে,
আমি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে গেলাম।
আপনার কিন্তু ক্লান্তি নেই,
আপনি আবার এলেন, আপনি বললেন,
তোমার নিঃস্বতার কোনো মানে হয় না,
তুমি নিঃস্ব হবে কেন,
তোমাকে চিরকাল শুধু বঞ্চনা করা হয়েছে,
তুমি বঞ্চিত, তুমি চিরবঞ্চিত।
আমার বঞ্চনার অবসান নেই,
বছরের পর বছর আধপেটা খেয়ে,
উদোম আকাশের নিচে রাস্তায় শুয়ে,
কঙ্কালসার আমার বেঁচে থাকা।
কিন্তু আপনি আমাকে ভোলেননি,
এবার আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আপনি এসে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিলেন,
জাগো, জাগো সর্বহারা।
তখন আর আমার জাগবার ক্ষমতা নেই,
ক্ষুধায় অনাহারে আমি শেষ হয়ে এসেছি,
আমার বুকের পাঁজর হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে,
আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে
আমি তাল মেলাতে পারছি না।
ইতিমধ্যে আরো বহুদিন গিয়েছে,
আপনি এখন আরো বুদ্ধিমান,
আরো চৌকস হয়েছেন।
এবার আপনি একটি ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে এসেছেন,
সেখানে চকখড়ি দিয়ে যত্ন করে
একটা ঝকঝকে লম্বা লাইন টেনে দিয়েছেন।
এবার বড় পরিশ্রম হয়েছে আপনার,
কপালের ঘাম মুছে আমাকে বলেছেন,
এই যে রেখা দেখছো, এর নিচে,
অনেক নিচে তুমি রয়েছো।
চমৎকার!
আপনাকে ধন্যবাদ, বহু ধন্যবাদ!
আমার গরীবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার দারিদ্র্যের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার নিঃস্বতার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার সর্বহারাত্বের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আর সবশেষে ওই ঝকঝকে লম্বা রেখাটি,
ওই উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
কিন্তু,
ক্রমশ,
আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে,
আমার মাথার ওপরের আচ্ছাদন আরো সরে গেছে।
কিন্তু ধন্যবাদ,
হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b0/
|
3720
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মায়াবাদ
|
সনেট
|
হা রে নিরানন্দ দেশ, পরি জীর্ণ জরা,
বহি বিজ্ঞতার বোঝা, ভাবিতেছ মনে
ঈশ্বরের প্রবঞ্চনা পড়িয়াছে ধরা
সুচতুর সূক্ষ্মদৃষ্টি তোমার নয়নে!
লয়ে কুশাঙ্কুর বুদ্ধি শাণিত প্রখরা
কর্মহীন রাত্রিদিন বসি গৃহকোণে
মিথ্যা ব'লে জানিয়াছ বিশ্ববসুন্ধরা
গ্রহতারাময় সৃষ্টি অনন্ত গগনে।
যুগযুগান্তর ধ'রে পশু পক্ষী প্রাণী
অচল নির্ভয়ে হেথা নিতেছে নিশ্বাস
বিধাতার জগতেরে মাতৃক্রোড় মানি;
তুমি বৃদ্ধ কিছুরেই কর না বিশ্বাস!
লক্ষ কোটি জীব লয়ে এ বিশ্বের মেলা
তুমি জানিতেছ মনে, সব ছেলেখেলা।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mayabad/
|
2387
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
শনি
|
সনেট
|
কেন মন্দ গ্রহ বলি নিন্দা তোমা করে
জ্যোতিষী ? গ্রহেন্দ্র তুমি,শনি মহামতি!
ছয় চন্দ্র রত্নরূপে সুবর্ণ টোপরে
তোমার ; সুকটিদেশে পর, গ্রহ-পতি
হৈম সারসন, যেন আলোক-সাগরে !
সুনীল গগন-পথে ধীরে তব গতি।
বাখানে নক্ষত্র-দল ও রাজ-মূরতি
সঙ্গীতে, হেমাঙ্গ বীণা বাজায়ে অম্বরে।
হে চল রশ্মির রাশি,সুধি কোন জনে,---
কোন জীব তব রাজ্যে আনন্দে নিবাসে?
জন-শূন্য নহ তুমি,জানি আমি মনে,
হেন রাজা প্রজা-শূন্য,---প্রত্যয়ে না আসে!---
পাপ,পাপ-জাত মৃত্যু,জীবন-কাননে,
তব দেশে,কীটরূপে কুসুম কি নাশে?
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/shoni/
|
3237
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুই বিঘা জমি-কাহিনী
|
মানবতাবাদী
|
শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে।বাবু বলিলেন, “বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।’কহিলাম আমি, “তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই।চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো-জোর মরিবার মতো ঠাঁই।’শুনি রাজা কহে, “বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানপেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা–ওটা দিতে হবে।’ কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণিসজল চক্ষে, “করুণ বক্ষে গরিবের ভিটেখানি।সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!’আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,কহিলেন শেষে ক্রূর হাসি হেসে, “আচ্ছা, সে দেখা যাবে।’ পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে–করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি–রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্যকত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য!ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমিতবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে বছর পনেরো-ষোলো–একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়ই বাসনা হল। নমোনমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি,ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ,স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল– নিশীথশীতল স্নেহ।বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে–মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে–কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি রথতলা করি বামে,রাখি হাটখোলা, নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছেতৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে। ধিক্ ধিক্ ওরে, শতধিক্ তোরে, নিলাজ কুলটা ভূমি!যখনি যাহার তখনি তাহার, এই কি জননী তুমি!সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতাআঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফল ফুল শাক পাতা!আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ–পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন–তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন!ধনীর আদরে গরব না ধরে ! এতই হয়েছ ভিন্নকোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন!কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহরা সুধারাশি!যত হাসো আজ যত করো সাজ ছিলে দেবী, হলে দাসী। বিদীর্ণ হিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি–প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে, সেই আমগাছ একি!বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক-কালের কথা।সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন–ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন!সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা,স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা। হেনকালে হায় যমদূত-প্রায় কোথা হতে এল মালী,ঝুঁটি-বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি।কহিলাম তবে, “আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব–দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব!’চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ–বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ।শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, “মারিয়া করিব খুন!’বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।আমি কহিলাম, “শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!’বাবু কহে হেসে, “বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়।’আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে–তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!
|
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%98%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80/
|
1541
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
আকাঙ্ক্ষা তাকে
|
প্রেমমূলক
|
আকাঙ্ক্ষা তাকে শান্তি দেয়নি,
শান্তির আশা দিয়ে বার বার
লুব্ধ করেছে। লোভ তাকে দূর
দুঃস্থ পাপের পথে টেনে নিয়ে
তবুও সুখের ক্ষুধা মেটায়নি
দিনে দিনে আরও নতুন ক্ষুধার
সৃষ্টি করেছে; সুখলোভাতুর
আশায় দিয়েছে আগুন জ্বালিয়ে।
এই যে আকাশ, আকাশের নীল,
এই যে সুস্থসবল হাওয়ার
আসা-যাওয়া, রূপরঙের মিছিল,
কোনোখানে নেই সান্ত্বনা তার।
বন্ধুরা তাকে যেটুকু দিয়েছে,
শত্রুরা তার সব কেড়ে নিয়ে
কোনো দূরদেশে ছেড়ে দিয়েছিল
কোনো দুর্গম পথে। তারপর
যখন সে প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছে,
শোকের আগুনে পুড়িয়ে পুড়িয়ে
প্রেম তাকে দিল সান্ত্বনা, দিল
স্বয়ংশান্তি তৃপ্তির ঘর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1616
|
1218
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সময়ের কাছে
|
মানবতাবাদী
|
সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চ'লে যেতে হয়
কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি।
সেই সব একদিন হয়তো বা কোনো এক সমুদ্রের পারে
আজকের পরিচিত কোনো নীল আভার পাহাড়ে
অন্ধকারে হাড়কঙ্করের মতো শুয়ে
নিজের আয়ুর দিন তবুও গণনা ক'রে যায় চিরদিন;
নীলিমার কাছ থেকে ঢের দূরে স'রে গিয়ে,
সূর্যের আলোর থেকে অন্তর্হিত হ'য়েঃ
পেপিরাসে- সেদিন প্রিন্টিং প্রেসে কিছু নেই আর;
প্রাচীন চীনের শেষে নবতম শতাব্দীর চীন
সেদিন হারিয়ে গেছে।আজকে মানুষ আমি তবুও তো- সৃষ্টির হৃদয়ে
হৈমন্তিক স্পন্দনের পথে ফসল;
আর এই মানবের আগামী কঙ্কাল;
আর নব-
নব-নব মানবের তরে
কেবলি অপেক্ষাতুর হ'য়ে পথ চিনে নেওয়া-
চিনে নিতে চাওয়া;
আর সে-চলার পথে বাধা দিয়ে অন্নের সমাপ্তিহীন ক্ষুধা;
(কেন এই ক্ষুধা-
কেনই বা সমাপ্তিহীন!)
যারা সব পেয়ে গেছে তাদের উচ্ছিষ্ট,
যারা কিছু পায় নাই তাদের জঞ্জাল;
আমি এই সব।
সময়ের সমুদ্রের পারে
কালকের ভোরে আর আজকের অন্ধকারে
সাগরের বড়ো শাদা পাখির মতন
দুইটি ছড়ানো ডানা বুকে নিয়ে কেউ
কোথাও উচ্ছল প্রাণশিখা
জ্বালায়ে সাহস সাধ স্বপ আছে- ভাবে।
ভেবে নিক- যৌবনের জোবন্ত প্রতীকঃ তার জয়!
প্রৌঢ়তার দিকে তবু পৃথিবীর জ্ঞানের বয়স
অগ্রসর হ'য়ে কোন্ আলোকের পাখিকে দেখেছে?
জয়, তার জয়, যুগে-যুগে তার জয়!
ডোডো পাখি নয়;মানুষেরা বার-বার পৃথিবীর আয়ুতে জন্মেছে;
নব নব ইতিহাস-সৈকতে ভিড়েছে;
তবুও কোথাও সেই অনির্বচনীয়
স্বপনের সফলতা- নবীনতা- শুভ্র মানবিকতার ভোর?
নচিকেতা জরাথ্রুস্ট্র লাওৎ-সে এঞ্জেলো রুশো লেনিনের মনের পৃথিবী
হানা দিয়ে আমাদের স্মরণীয় শতক এনেছে?
অন্ধকারে ইতিহাসপুরুষের সপ্রতিভ আঘাতের মতো মনে হয়
যতই শান্তিতে স্থির হ'য়ে যেতে চাই;
কোথাও আঘাত ছাড়া- তবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নেই।
হে কালপুরুষ তারা, অনন্ত দ্বন্দের কোলে উঠে যেতে হবে
কেবলি গতির গুণগান গেয়ে- সৈকত ছেড়েছি এই স্বচ্ছন্দ উৎসবে;
নতুন তরঙ্গে রৌদ্রে বিপ্লবে মিলনসূর্যে মানবিক রণ
ক্রমেই নিস্তেজ হয় ক্রমেই গভীর হয় মানবিক জাতীয় মিলন?
নব-নব মৃত্যুশব্দ রক্তশব্দ ভীতিশব্দ জয় ক'রে মানুষের চেতনার দিন
অমেয় চিন্তায় খ্যাত হ'য়ে তবু ইতিহাসভুবনে নবীন
হবে না কি মানবকে চিনে- তবু প্রতিটি ব্যক্তির ষাট বসন্তের তরে!
সেই সুনিবিড় উদ্বোধনে- 'আছে আছে আছে, এই বোধির ভিতরে
চলেছে নক্ষত্র, রাত্রি, সিন্ধু, রীতি, মানুষের বিষয় হৃদয়;
জয় অস্তসূর্য, জয়, অলখ অরুণোদয়, জয়।'
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shomoyer-kache/
|
2682
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আদর ক’রে মেয়ের নাম
|
ছড়া
|
আদর ক’রে মেয়ের নাম
রেখেছে ক্যালিফর্নিয়া,
গরম হল বিয়ের হাট
ঐ মেয়েরই দর নিয়া।
মহেশদাদা খুঁজিয়া গ্রামে গ্রামে
পেয়েছে ছেলে ম্যাসাচুসেট্স্ নামে,
শাশুড়ি বুড়ি ভীষণ খুশি
নামজাদা সে বর নিয়া–
ভাটের দল চেঁচিয়ে মরে
নামের গুণ বর্ণিয়া। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ador-kore-meyer-nam/
|
2994
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গান গাওয়ালে আমায় তুমি
|
ভক্তিমূলক
|
গান গাওয়ালে আমায় তুমি
কতই ছলে যে,
কত সুখের খেলায়, কত
নয়নজলে হে।
ধরা দিয়ে দাও না ধরা,
এস কাছে, পালাও ত্বরা,
পরান কর ব্যথায় ভরা
পলে পলে হে।
গান গাওয়ালে এমনি করে
কতই ছলে যে। কত তীব্র তারে, তোমার
বীণা সাজাও যে,
শত ছিদ্র করে জীবন
বাঁশি বাজাও হে।
তব সুরের লীলাতে মোর
জনম যদি হয়েছে ভোর,
চুপ করিয়ে রাখো এবার
চরণতলে হে,
গান গাওয়ালে চিরজীবন
কতই ছলে যে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/457.html
|
1192
|
জীবনানন্দ দাশ
|
লোকসামান্য
|
চিন্তামূলক
|
অন্ধভাবে আলোকিত হয়েছিলো তারা
জীবনের সাগরে-সাগরেঃ
বঙ্গোপসাগরে,
চীনের সমুদ্রে- দ্বীপপুঞ্জের সাগরে।
নিজের মৎসর নিয়ে নিশানের 'পরে সূর্য এঁকে
চোখ মেরেছিলো তারা নীলিমার সূর্যের দিকে।
তারা সব আজ রাতে বিলোড়িত জাহাজের খোল
সাগরকীটের মৃত শরীরের আলেয়ার মতো
সময়ের দোলা খেয়ে নড়ে;
'এশিয়া কি এশিয়াবাসীর
কোপ্রস্পেরেটির
সূর্যদেবীর নিজ প্রতীতির তরে?'
ব'লে সে পুরোনো যুগ শেষ হ'য়ে যায়।
কোথাও নতুন দিন আসে;
কে জানে সেখানে সৎ নবীনতা র'য়ে গেছে কিনা;
সূর্যের চেয়েও বেশি বালির উত্তাপে
বহুকাল কেটে গেছে বহুতর শ্লোগানের পাপে।
এ-রকম ইতিহাস উৎস রক্ত হ'য়ে
এই নব উত্তরাধিকারে
স্বর্গতি না হোক- তবু মানুষের চরিত্র সংহত হয় না কি?
ভাবনা ব্যাহত হ'য়ে বেড়ে যায়- স্থির হয় না কি?
হে সাগর সময়ের,
হে মানুষ,- সময়ের সাগরের নিরঞ্জন-ফাঁকি
চিনে নিয়ে বিমলিন নাবিকের মতন একাকী
হ'লেও সে হ'তো, তবু পৃথিবী বড়ো রৌদ্রে-
আরো প্রিয়তর জনতায়
'নেই' এই অনুভব জয় ক'রে আনন্দে ছড়ায়ে যেতে চায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/lokshamanno/
|
5294
|
শামসুর রাহমান
|
সে-রাতে নতুন ক’রে
|
প্রেমমূলক
|
অকস্মাৎ সে-রাতে নতুন ক’রে পেলাম তোমাকে
হৃদয়ের খুব কাছে। প্রত্যাশা ছিল না,
তবু আমার ঘাটে ভিড়ল আশ্চর্য তরী এক
অপরূপ সম্ভার সমেত। শুধু বিস্ময়ে তাকাই নিষ্পলক
সারাক্ষণ, ফেরাতে পারি না দৃষ্টি কিছুতেই। তুমি,
তরণীর পরম ঐশ্বর্য, নেমে এলে ধীর,
গৌর পদক্ষেপে।কখন যে আমার পায়ের কাছে এসে বসলে সবার
অগোচরে, স্বপ্নবিষ্ট আমি
খেয়ালই করিনি; দেখি আমার উরুতে
স্থাপিত তোমার মুখ। তোমার অতল চোখ দু’টি
কখনো আংশিক খোলা, কখনো নিবিড় নিমীলিত।
মাঝে মাঝে
চোখ মেলে দেখছ আমাকে, যেন খোদ ভালোবাসা
তাকাচ্ছে আমার দিকে সম্পূর্ণ নতুন ক’রে গাঢ়
অনুরাগে, আমার দু’ হাতে
তোমার অতুলনীয় মুখ, বুঝি কোনো শায়েরের
অঞ্জলিতে অনুপম প্রস্ফুটিত রূঁপসী গজল।আকাশে ছিল কি চাঁদ? সপ্তর্ষিমগুল?
বলতো কী ক’রে বলি? আমি তো তোমাকে ছাড়া আর
কিছুই দেখি নি স্পষ্ট ভেতরে বাহিরে।
সৌন্দর্যের কসম, তোমাকে
এর আগে এমন সুন্দর আমি কখনো দেখি নি,
যদিও সৌন্দর্যে লগ্ন আমার সমুখে দাঁড়িয়েছ,
বসেছ ঘনিষ্ট হয়ে বহুদিন, বহু
মুহূর্ত কেটেছে আমাদের আলিঙ্গনে, ওষ্ঠের নিলনে। (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/se-rate-notun-kore/
|
1543
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
আগুনের দিকে
|
প্রেমমূলক
|
রাস্তাগুলি ক্রমে আরও তপ্ত হয়।
স্বজন, সঙ্গীর সংখ্যা
ক্রমে আরও কমে আসে।
হাতের মুদ্রায় তবু জাইয়ে রেখেছ বরাভয়
হাওয়ার ভিতরে তবু ভাসে
তোমার সৌরভ।
আর তাই
চতুর্দিকে ছত্রাকার ধড়মুণ্ড-আলাদা-করা শব
দেখেও আমাকে
এগিয়ে যেতেই হয়, আগুনের দিকে
এগিয়ে যেতেই হয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1595
|
3302
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নাম তার ভেলুরাম ধুনিচাঁদ শিরত্থ
|
হাস্যরসাত্মক
|
নাম তার ভেলুরাম ধুনিচাঁদ শিরত্থ,
ফাটা এক তম্বুরা কিনেছে সে নিরর্থ।
সুরবোধ-সাধনায়
ধুরপদে বাধা নাই,
পাড়ার লোকেরা তাই হারিয়েছে ধীরত্ব–
অতি-ভালোমানুষেরও বুকে জাগে বীরত্ব॥ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nam-tar-veluram-dhunichad-shiroth/
|
3325
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নির্লিপ্ত
|
ছড়া
|
বাছা রে মোর বাছা,
ধূলির ‘পরে হরষভরে
লইয়া তৃণগাছা
আপন মনে খেলিছ কোণে,
কাটিছে সারা বেলা।
হাসি গো দেখে এ ধূলি মেখে
এ তৃণ লয়ে খেলা।
আমি যে কাজে রত,
লইয়া খাতা ঘুরাই মাথা
হিসাব কষি কত,
আঁকের সারি হতেছে ভারী
কাটিয়া যায় বেলা—
ভাবিছ দেখি মিথ্যা একি
সময় নিয়ে খেলা।
বাছা রে মোর বাছা,
খেলিতে ধূলি গিয়েছি ভুলি
লইয়ে তৃণগাছা।
কোথায় গেলে খেলেনা মেলে
ভাবিয়া কাটে বেলা,
বেড়াই খুঁজি করিতে পুঁজি
সোনারূপার ঢেলা।
যা পাও চারি দিকে
তাহাই ধরি তুলিছ গড়ি
মনের সুখটিকে।
না পাই যারে চাহিয়া তারে
আমার কাটে বেলা,
আশাতীতেরই আশায় ফিরি
ভাসাই মোর ভেলা। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nirlipto/
|
2540
|
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
|
ভালবাসার জয়
|
নীতিমূলক
|
ও ভাই, ভয়কে মোরা জয় করিব হেসে-
গোলাগুলির গোলাতে নয়, গভীর ভালবেসে।
খড়ুগ, সায়ক, শাণিত তরবার,
কতটুকুন সাধ্য তাহার, কি বা তাহার ধার?
শত্রুকে সে জিনতে পারে, কিনতে নারে যে সে-
ও তার স্বভাব সর্বনেশে।
ভালবাসায় ভুবন করে জয়,
সখ্যে তাহার অশ্রুজলে শত্রু মিত্র হয়-
সে যে সৃজন পরিচয়।
শত আঘাত-ব্যথা-অপমানে লয় সে কোলে এসে,
মৃত্যুরে সে বন্ধু বলে ধরে শেষে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/valbasar-jay/
|
954
|
জীবনানন্দ দাশ
|
এই ডাঙা ছেড়ে হায়
|
সনেট
|
এই ডাঙা ছেড়ে হায় রূপ কে খুঁজিতে যায় পৃথিবীর পথে।
বটের শুকনো পাতা যেন এক যুগান্তের গল্প ডেকে আনে:
ছড়ায়ে রয়েছে তারা প্রান্তরের পথে পথে নির্জন অঘ্রানে;-
তাদের উপেক্ষা ক’রে কে যাবে বিদেশে বলো- আমি কোনো-মতে
বাসমতী ধানক্ষেত ছেড়ে দিয়ে মালাবারে- উটির পর্বতে
যাব নাকো, দেখিব না পামগাছ মাথা নাড়ে সমুদ্রের গানে
কোন দেশে,- কোথায় এলাচিফুল দারুচিনি বারুণীর প্রাণে
বিনুনী খসায়ে ব’সে থাকিবার স্বপ্ন আনে;- পৃথিবীর পথেযাব নাকো : অশ্বত্থের ঝরাপাতা স্লান শাদা ধুলোর ভিতর,
যখন এ- দু’-পহরে কেউ নাই কোনো দিকে- পাখিটিও নাই,
অবিরল ঘাস শুধু ছড়ায়ে র’য়েছে মাটি কাঁকরের ’পর,
খড়কুটো উল্টায়ে ফিরিতেছে দু’একটা বিষণ্ণ চড়াই,
অশ্বত্থের পাতাগুলো প’ড়ে আছে স্লান শাদা ধুলোর ভিতর;
এই পথ ছেড়ে দিয়ে এ-জীবন কোনোখানে গেল নাকো তাই।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/eei-danga-chere-hai/
|
4847
|
শামসুর রাহমান
|
দুলবে তারার মালা, হবে জয়ধ্বনি
|
স্বদেশমূলক
|
বাগানের ফুলগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে জাঁহাবাজ
পশুপ্রায় লোকগুলো ডানে বামে নিষ্ঠুর বুলেট
ছুড়তে ছুড়তে ত্রাস সৃষ্টি শুধু-যেন ওরা
কর্কশ বুটের নিচে পিষে
নিরীহ বাঙালিদের মুছে
ফেলার প্রতিজ্ঞা নিয়ে যেন ফুঁসছে চৌদিকে শুধু।শহরে ও গ্রামে অস্ত্রধারী জল্লাদেরা
নিরস্ত্র বাঙালি নিধনের
ব্রত নিয়ে পাগলা কুকুর হয়ে রাজপথে আর
অলিতে গলিতে হানা দেয়। রক্ত ভাসে
সবখানে পশ্চিমের রক্তপায়ী পশুদের অস্ত্র
থেকে প্রায় যখন তখন। লুট হতে থাকে নারীর সম্ভ্রম।অচিরে বাংলায় নানা ঘরে মাথা তোলে
একে একে বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বদেশের
সম্ভ্রম রক্ষার জ্বলজ্বলে শপথের
পতাকা উড়িয়ে দিগ্ধিদিক। প্রাণ যায় যাক, ক্ষতি
নেই; দুর্বিনীত শক্রদের আমাদের
ধনধান্যে পুষ্পেভরা জন্মভূমি থেকে
ঝেঁটিয়ে বিদায় ক’রে নিজস্ব সত্তাকে সমুন্নত
রেখে ঢের ঝড় পাড়ি দিয়ে যেতে হবে সাফল্যের বাগিচায়।হায়, এখন তো নানা ঘাটে ছদ্মবেশী শক্রদল
কী চতুর প্রক্রিয়ায় দেশপ্রেমী বৃদ্ধিজীবী আর
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে ক্রূর ফাঁদ পেতে
আড়ালে মুচকি হাসে; আসমানে কেঁপে ওঠে চাঁদ!
তবু জানি, মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় আখেরে ঠিক
দুলবে তারার মালা, চতুর্দিকে হবে জয়ধ্বনি। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dulbe-tara-mala-hobe-joyoddhoni/
|
4331
|
শামসুর রাহমান
|
অ্যাকোরিয়াম, কয়েকটি মুখ
|
প্রেমমূলক
|
সকালটা ছিল যে-কোনও সকালেরই মতো। টাটকা মাখন রঙের রোদ,
ফুরফুরে হাওয়ায় গাছের গাঢ় সবুজ পাতার স্পন্দন, উঠোনে একটি কি দু’টি
ছোট পাখির ওড়াউড়ি, আমার ঘরকে চড়ুইয়ের নিজস্ব আকাশ বলে ঠাউরে
নেওয়া, দোতলার রেলিঙে শাড়ি, বাকরখানির ঘ্রাণ, রেডিওর গান, চা-খানার
গুঞ্জন, রিকশার টাং টাং শব্দ। আমার বেডসাইড টেবিলে ধূমায়িত চায়ের বাটি,
কাচের চুড়ির আনন্দ-ভৈরবী। কী যেন মনে পড়ছিল আমার, বহুদিন আগে যে
জায়গায় গিয়েছিলাম সেই জায়গার কিছু দৃশ্য, কোনও কোনও মুখ।
জায়গাটার নাম মনে পড়ছে না; কবে গিয়েছিলাম, তা-ও ঠিক মনে নেই।
বারবার মনে পড়ছে একটা বাগানের কথা, রঙ বেরঙের ফুলে সাজানো
মধ্যবিত্ত বাগান। বাগানে কি কেউ ছিল?ওরা চলেছে আল বেয়ে, ক্লান্তি পায়ে; ছায়ার মতো এগোচ্ছে ওরা শ্লথ গতিতে?
ওরা কারা? ওদের কি আমি চিনি? একজন বসে বসে ধুঁকছে, আঁকড়ে ধরেছে
আলের ভেজা মাটি। নোংরা নোখের ভেতর উঠে এসেছে কিছু মাটি, ওর চোখ
ঘোলাটে। সেই ঘোলাটে চোখে ভবিষ্যতের কোনও ছবি ছিল না, বাগানের
রঙিন স্তব্ধতা ছিল না, ছিল না ঝর্ণার পানির স্বচ্ছতা। সবার আগে যে হাঁটছিল,
সে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। ওর দৃষ্টি থেকে মুছে গেছে সকাল বেলার রোদ,
পাখির ডানায় ঝলসানি, ময়ূরের আনন্দিত পেখম। ওর ভবিষ্যতের ভাবনায়
রোদ ছিল না, মেঘের আনাগোনা ছিল। যে মেয়েটি ছেলে কাঁখে হাঁটছিল, ওর
একটা চুড়ি ভেঙে গেল হঠাৎ, টুকরোগুলো পড়ে রইল আলের এক পাশে।
মেয়েটির মনের ভেতর ওর ছেলের কান্নার দাগের মতো একটা দাগ খুব গাঢ়
হয়ে রয়েছে। ভাঙা বাবুই পাখির বাসার মতো তার সংসার অনেক দূরে
সমাহিত। উনুনের মুখ গহ্বর থেকে আর ধোঁয়া ওঠে না পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে,
‘গেরস্থের খোকা হোল’ বলে যে পাখি মাঝে-মধ্যে ডেকে যায়, সে হয়তো
বিধ্বস্ত ভিটের লাগোয়া গাছের ডালে এসে বসবে, কিন্তু দেখবে ত্রিসীমানায়
গেরস্থ নেই।সকালটা ছিল যে-কোনও সকালেরই মতো। টাটকা মাখন রঙের রোদ,
ফুরফুরে হাওয়ায় গাছের গাঢ় সবুজ পাতা স্পন্দন উঠোনে একটি কি দু’টি
পাখির ওড়াউড়ি। সকাল বেলা মধ্যরাতে রূপান্তরিত হয়ে এক লহমায়।
টেলিফোনে কার কণ্ঠস্বর? নিদ্রা-প্রভাবিত, স্বপ্ন-নির্ভর কণ্ঠস্বর। কিছুতেই
শনাক্ত করা যাচ্ছে না। আমি কি দরবারী কানাড়া শুনছি? সেই কণ্ঠস্বরে
নিঃসঙ্গতা, উদ্বেগ আর বিষণ্নতার অর্কেস্ট্রা। সেই কণ্ঠস্বর আমাকে পর্যটক
বানায়; আমি পাকদণ্ডী বেয়ে পাহাড়ে উঠি, জাহাজে চড়ে সাত সমুদ্র তের নদী
পাড়ি দিই, প্লেনে যাত্রা করি পূর্ব গোলার্ধ থেকে পশ্চিম গোলার্ধে, মরুভূমির
বালিয়াড়িতে সূর্যের চুম্বনে আমার ত্বক ঝলসে যায়, উত্তর মেরুর তুষার-
কামড়ে আমি জ্বরাক্রান্ত রোগীর মতো প্রলাপ বকি। সেই কণ্ঠস্বর বন্দি করে
আমাকে, আমার হাতে পরিয়ে দেয় ক্রীতদাসের কড়া। আমি কি প্রকৃত চিনি
তাকে?তাকে চিনি, একাল বেলার আকাশকে যেমন চিনি, কিংবা যেমন চিনি সন্ধ্যার
মেঘমালাকে-একথা বলার মতো সাহস সঞ্চয় করতে পারি না কিছুতেই। যদি
আমার ভুল হয়ে যায়! ভুল করবার অধিকার আমার আছে জেনেও আমি
নিজেকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখি। একটা পরাক্রান্ত হেঁয়ালিকে আমি
একনায়কত্ব ফলাতে দিই স্বেচ্ছায়। হেঁয়ালি মাকড়সার মতো জাল বুনতে
থাকে আমার চারপাশে, আমি জালবন্দি হই। মাঝে-মধ্যে চকচকে ছুরির মতো
ঝলসে ওঠে একটা ইচ্ছা-হেঁয়ালির অস্পষ্ট ঝালর সমাচ্ছন্ন টুঁটি আমি চেপে
ধরবে একদিন, যেমন ওথেলোর প্রবল কালো দু’টি হাত চেপে ধরেছিল
ডেসডেমোনার স্বপ্ন-শুভ্র গলা।আমি কি ভুল উপমার ফাঁদে পা দিলাম? আলোয় স্নান করতে গিয়ে কি অন্ধকার
মেখে নিলাম সমগ্র সত্তায়? আমার ভ্রূতে এখন স্বপ্নভুক, ক্রুদ্ধ একটা পাখি
ডানা ঝাপটাচ্ছে ক্রমাগত, আমার আঙুল থেকে উৎসারিত ফোয়ারা উদ্গীরণ
করছে আগুনের হলকা। আস্তে সুস্থে মৃতের বাগানে প্রবেশ করছি আমি; জানি
সেখানে কাউকে দেখতে পাব না, শুধু কারও কারও অনুপস্থিত উপস্থিতি নিস্তব্ধ
রাগিণীর মতো বেজে উঠবে হাওয়ায়, আমার শিরায়। পা ভারী হয়ে আসবে,
বিস্ফারিত হবে চোখ। কথা আমি কম বলি, যেটুকু বলি গলার পর্দা নিচু
রেখেই বলি। কিছু ছায়াকে দোসর ভেবে ওদের সঙ্গে কথা বললাম। মনে
হলো, অন্ধকার রাত্রির ফসফরাসময় তরঙ্গের মতো বয়ে গেল বহু যুগ।এইতো আমি এসে পড়েছি বিরাট এক অ্যাকোরিয়ামের কাছে। অনেক রঙিন
মাছ কেলিপরায়ণ সেখানে। কেউ সাঁতার কাটছে উদ্ভিদ ঘেঁষে, কেউবা ক্ষুধে
পিছল বল্লমের মতো ছুটে চলেছে নুড়ির দিকে। অ্যাকোরিয়ামের ভেতর মাছ
কি কুমারী থাকতে পারে কখনও? মাছগুলো আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে চায়
ওদের মৎস্যবৃত্তান্ত। ওদের অন্তর্জীবন পরতে পরতে যাতে যাতে মেলে ধরতে
পারি, সেজন্যে ওদের শরীর থেকে ওরা বিচ্ছুরিত হতে দিচ্ছে রহস্যময় সুর।
ওদের সন্ধ্যাভাষার দীক্ষিত করতে চাইছে আমাকে।
আমি লিখতে পারি, আমার কলমে অলৌকিকের ঈষৎ ঝলক আছে-একথা
ওদের বলে দিল কে? মাছগুলোর চোখ আমার দিকে? বিব্রত বোধ করলাম
আমি। আমি কি সেই কুহকিনীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে চলেছি, যার চোখ
ফসফরাসের মতো উজ্জ্বল আর চুল সামুদ্রিক শ্যাওলার মতো সবুজ? আমি কি
লিখতে পারব নতুন এক মৎস্য পুরাণ? ইতোমধ্যে একটি সোনালি মাছকে
আমি স্বৈরিতায় বলে শনাক্ত করেছি। না কি অ্যাকোরিয়ামের প্রতিটি স্ত্রী মাছই
স্বৈরিতায় নিপুণা আর প্রত্যেকটি পুরুষ মাছ অজাচারে পারঙ্গম? মাছগুলোর
জলকেলি দু’ চোখ ভরে দেখি, ওরা আমার ভেতর প্রবেশ করে সূর্যরশ্মির মতো,
আমি অ্যাকোরিয়ামের পাতালে চলে যাই, মাছ হই।এখানেই শেষ হতে পারত এই কথাগুচ্ছ, নামতে পারত এক বিবাগী নীরবতা।
অথচ বাবুই পাখির ভাঙা বাসার মতো একটি সংসার, ধুঁকতে-থাকা একজন
বৃদ্ধ, হারিয়ে যাওয়া সন্তানের খোঁজে প্রায়-উন্মাদিনী মা আমার ভাবনাকে
ভবঘুরে করে। একটা আচাভুয়া পাখি ডাকতে থাকে আমার বুকের সান্নাটায়।
সেই ডাক আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে কিছুক্ষণের জন্যে। আমার ঘুম আর
জাগরণের মধ্যে আছে যে বিরানা প্রান্তর, তার সুদূরতা আমাকে বলে ‘বাঁচো,
তুমি বাঁচো। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/akoriam-koyekti-mukh/
|
733
|
জয় গোস্বামী
|
যে-ছাত্রীটি নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে
|
মানবতাবাদী
|
কী বুঝেছে সে-মেয়েটি ?
সে বুঝেছে রাজুমামা মায়ের প্রেমিক।
কী শুনেছে সে-মেয়েটি ?
সে শুনেছে মায়ের শীৎকার।
কী পেয়েছে সে-মেয়েটি ?–সে পেয়েছে জন্মদিন ?
চুড়িদার, আলুকাবলি–কু-ইঙ্গিত মামাতো দাদার।
সে খুঁজেছে ক্লাসনোট, সাজেশন–
সে ঠেলেছে বইয়ের পাহাড়
পরীক্ষা, পরীক্ষা সামনে–দিনে পড়া, রাতে পড়া–
ও পাশের ঘর অন্ধকার
অন্ধকারে সে শুনেছে চাপা ঝগড়া, দাঁত নখ,
ছিন্ন ভিন্ন মা আর বাবার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1710
|
6062
|
হেলাল হাফিজ
|
রাখালের বাঁশি
|
মানবতাবাদী
|
কে আছেন ?
দয়া করে আকাশকে একটু বলেন -
সে সামান্য উপরে উঠুক,
আমি দাঁড়াতে পারছি না ।ময়মনসিংহ, ১৯৯০কাব্য গ্রন্থঃ- কবিতা একাত্তর
|
https://www.bangla-kobita.com/helalhafiz/post20161126081518/
|
1157
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মাঘসংক্রান্তির রাতে
|
প্রেমমূলক
|
হে পাবক, অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি, অন্ধকারে
তোমার পবিত্র অগ্নি জ্বলে।
অমাময়ী নিশি যদি সুজনের শেষ কথা হয়,
আর তার প্রতিবিম্ব হয় যদি মানব-হৃদয়,
তবুও আমার জ্যোতি সৃষ্টির নিবিড় মনোবলে
জ্ব’লে ওঠে সময়ের আকাশের পৃথিবীর মনে;
বুঝিছি ভোরের বেলা রোদে নীলিমায়,
আঁধার অরব রাতে অগণন জ্যোতিষ্ক শিখায়;
মহাবিশ্ব একদিন তমিস্রার মতো হ’য়ে গেলে,
মুখে যা বলোনি, নারি, মনে যা ভেবেছো তার প্রতি
লক্ষ্য রেখে অন্ধকার শক্তি অগ্নি সুবর্ণের মতো
দেহ হবে মন হবে-তুমি হবে সে-সবের জ্যোতি!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/maghsongkrantir-ratey/
|
5620
|
সুকুমার রায়
|
ঠিকানা
|
ছড়া
|
আরে আরে জগমোহন- এস, এস, এস-
বলতে পার কোথায় থাকে আদ্যনাথের মেশো?
আদ্যনাথের নাম শোননি? খগেনকে তো চেনো?
শ্যাম বাগচি খগেনেরই মামাশ্বশুর জেনো।
শ্যামের জামাই কেষ্টমোহন, তার যে বাড়ীওলা-
(কি যেন নাম ভুলে গেছি), তারই মামার শালা;
তারই পিশের খড়তুতো ভাই আদ্যনাথের মেশো-
লক্ষী দাদা, ঠিকানা তার একটু জেনে এসো।
ঠিকানা চাও? বলছি শোন; আমড়াতলার মোড়ে
তিন-মুখো তিন রাস্তা গেছে তারি একটা ধ'রে,
চলবে সিধে নাক বরাবর, ডান দিকে চোখ রেখে;
চলতে চলতে দেখবে শেষে রাস্তা গেছে বেঁকে।
দেখবে সেথায় ডাইনে বায়ে পথ গিয়াছে কত,
তারি ভিতর ঘুরবে খানিক গোলকধাঁধাঁর মত।
তারপরেতে হঠাৎ বেঁকে ডাইনে মোচর মেরে ,
ফিরবে আবার বাঁয়ের দিকে তিনটে গলি ছেড়ে।
তবেই আবার পড়বে এসে আমড়া তলার মোড়ে-
তারপরে যাও যেথায় খুশি- জ্বালিয়ো নাকো মোরে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/thikana/
|
3295
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নাগকুমারী
|
ছড়া
|
আমি যখন ছোটো ছিলুম, ছিলুম তখন ছোটো;
আমার ছুটির সঙ্গী ছিল ছবি আঁকার পোটো।
বাড়িটা তার ছিল বুঝি শঙ্খী নদীর মোড়ে,
নাগকন্যা আসত ঘাটে শাঁখের নৌকো চ'ড়ে।
চাঁপার মতো আঙুল দিয়ে বেণীর বাঁধন খুলে
ঘন কালো চুলের গুচ্ছে কী ঢেউ দিত তুলে।
রৌদ্র-আলোয় ঝলক দিয়ে বিন্দুবারির মতো
মাটির 'পরে পড়ত ঝরে মুক্তা মানিক কত।
নাককেশরের তলায় ব'সে পদ্মফুলের কুঁড়ি
দূরের থেকে কে দিত তার পায়ের তলায় ছুঁড়ি।
একদিন সেই নাগকুমারী ব'লে উঠল, কে ও।
জবাব পেলে, দয়া ক'রে আমার বাড়ি যেয়ো।
রাজপ্রাসাদের দেউড়ি সেথায় শ্বেত পাথরে গাঁথা,
মণ্ডপে তার মুক্তাঝালর দোলায় রাজার ছাতা।
ঘোড়সওয়ারি সৈন্য সেথায় চলে পথে পথে,
রক্তবরন ধ্বজা ওড়ে তিরিশঘোড়ার রথে।
আমি থাকি মালঞ্চেতে রাজবাগানের মালী,
সেইখানেতে যূথীর বনে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালি।
রাজকুমারীর তরে সাজাই কনকচাঁপার ডালা,
বেণীর বাঁধন-তরে গাঁথি শ্বেতকরবীর মালা।
মাধবীতে ধরল কুঁড়ি, আর হবে না দেরি--
তুমি যদি এস তবে ফুটবে তোমায় ঘেরি।
উঠবে জেগে রঙনগুচ্ছ পায়ের আসনটিতে,
সামনে তোমার করবে নৃত্য ময়ূর-ময়ূরীতে।
বনের পথে সারি সারি রজনীগন্ধায়
বাতাস দেবে আকুল ক'রে ফাগুনি সন্ধ্যায়।
বলতে বলতে মাথার উপর উড়ল হাঁসের দল,
নাগকুমারী মুখের 'পরে টানল নীলাঞ্চল।
ধীরে ধীরে নদীর 'পরে নামল নীরব পায়ে।
ছায়া হয়ে গেল কখন চাঁপাগাছের ছায়ে।
সন্ধ্যামেঘের সোনার আভা মিলিয়ে গেল জলে।
পাতল রাতি তারা-গাঁথা আসন শূন্যতলে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/post20160516064707/
|
2983
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে
|
ভক্তিমূলক
|
গহন কুসুমকুঞ্জমাঝে
মৃদুল মধুর বংশি বাজে ,
বিসরি ত্রাস - লোকলাজে
সজনি , আও আও লো ।
অঙ্গে চারু নীল বাস ,
হৃদয়ে প্রণয়কুসুমরাশ ,
হরিণনেত্রে বিমল হাস ,
কুঞ্জবনমে আও লো ।
ঢালে কুসুম সুরভভার ,
ঢালে বিহগ সুরবসার ,
ঢালে ইন্দু অমৃতধার
বিমল রজত ভাতি রে ।
মন্দ মন্দ ভৃঙ্গ গুঞ্জে ,
অযুত কুসুম কুঞ্জে কুঞ্জে ,
ফুটল সজনি , পুঞ্জে পুঞ্জে
বকুল যূথি জাতি রে ।
দেখ সজনি , শ্যামরায়
নয়নে প্রেম উথল যায় ,
মধুর বদন অমৃতসদন
চন্দ্রমায় নিন্দিছে ।
আও আও সজনিবৃন্দ ,
হেরব সখি শ্রীগোবিন্দ,
শ্যামকো পদারবিন্দ
ভানুসিংহ বন্দিছে । (ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gohon-kusumkunjo-majhe/
|
5306
|
শামসুর রাহমান
|
সৌন্দর্যের গহনে ডুবুরী
|
প্রেমমূলক
|
দিনভর রাতভর তোমার উদ্দেশেই আমার এই ডাক,
গলা-চেরা, বুক-ছেঁড়া। আসা না আসা
তোমার খেয়ালের বৃত্তে ঘূর্ণ্যমান, কোনো পাখি যদি
স্বপ্নঝিলিক, আশার খড়কুটো আমার ঘরে
না ঝরায়, তবু ডেকে যাবো,
যতদিন না তুমি আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়াও।সে কবে তোমাকে দেখলাম;
তুমি এসে বসলে আমার পাশে, সবুজ ঘাসে
লুটিয়ে পড়েছে তোমার ঘাসফুল-রঙ শাড়ির আঁচল,
তোমার হাসির ঢেউ,
আমার ভেতরে নৌকার দোলা, তোমার খোলা
চুল নিয়ে খেলছে হাওয়া, স্বপ্নছাওয়া চোখ তুলে
কী যেন বললে তুমি, কিছু শুনতে না পেয়ে
আমি তোমার সৌন্দর্যের গহনে ডুবুরী।
তোমার নরম হাত আমার মুঠোয়।
আমি কোনো গোলাপ
কিংবা স্বর্ণচাঁপাকে স্পর্শ করিনি। মনে হলো,
তোমার সকল কিছুই স্পর্শাতীত।মুখের ওপর রোদের ঝলক, বাসী
ধু ধু বিছানায় আমার ধড়ফড়িয়ে ওঠা, চোখ রগ্ড়ে
বারবার স্বপ্নের ছেঁড়া
মসলিন সেলাই করবার পরিণামহীন চেষ্টা।
ভীষণ তেষ্টায় আমার চোখ জুড়ে,
গলা জুড়ে, বুক জুড়ে বালি, কেবল বালি।চকিতে মনে পড়ে, তোমার হেকারতের হ্যাঁচকা টানে
টালমাটাল আমি
দেখেছি আমার স্বপ্নের সওদাকে গড়াতে
সদর রাস্তায়।
টুকরো টুকরো ছবি ভাসে, ডোবে। খণ্ডগুলোকে
জোড়া দিতে অপারণ আমি
অমিলের বেড়াজালে আটকা। যাকে দেখেছিলাম
শেষরাতের স্বপ্নের অভ্রের
আভাময় মাঠের মাঝখানে, সেকি তুমি? তার কালো
চুল কি নিতম্ব অব্দি নেমে-আসা
ঝর্ণা নাকি বিউটি পার্লারে রচিত খাটো স্তবক?আর তার আয়ত সুন্দর চোখ? ঈষৎ বাদামি নাকি
নীল ঢেউয়ের ঝলকানি-লাগা? অথবা
মৃত্যুর মতোই ঘন কালো? তোমাকে আর
তাকে মেলাবার আমার
সকল আয়োজন শুধু, পণ্ড হতে থাকে।
তোমাকে বাস্তবিকই কখনো দেখেছি কি দেখি নি,
এই ধন্দ আমাকে নিয়ে লোফালুফি করে লাগাতার।
বুকের ধুক ধুক আর হৃৎপিণ্ডের রক্তের দাপাদাপি
আর সীমাছাড়ানো অস্থিরতা নিয়ে
আমি কিছু শব্দকে ‘আয় আয়’ বলে ডেকে বেড়াই
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। অনন্তর
যে প্রতিমা গড়ে ওঠে আমার হাতে,
তাকে দেখে অনেকে বলে ওঠে সোল্লাসে, ‘সাবাস কবি,
কেমন করে, এই অসম্ভব সুন্দরকে
আনলে মর্ত্যলোকে?’ মাঝে-মধ্যে আমারও
অবাক হবার পালা। অথচ এই আমি
বহুদিনের নাছোড় অস্থিরতা
এবং অনেক নির্ঘুম রাত্রির বিনিময়েও তোমাকে
আমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে অক্ষম। এর ব্যর্থতার
ঝুলকালি মুখে নিয়ে চৌদিকে
মানুষের মেলায় হাঁটবো কী করে?মনকে প্রবোধ দিই, আমাকে না বলেই তুমি চলে যাবে,
বিশ্বাস করি না। তুমি সাড়া দাও
আর নাই দাও, আমি দিনরাত্তির ডেকেই যাবো
অকাল বসন্তের ব্যাকুল
কোকিলের মতো। গলায় রক্ত চল্কে দেয়া এই ডাক
তোমাকে কি কখনো নামিয়ে আনতে পারবে না
তোমার উদাসীনতার মিনার থেকে? তুমি কি
শীগগীরই একদিন এসে
আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলবে না, এই যে আমি?
আজ শুধু অন্ধকারে হারড়ে বেড়ানো, নিজের সঙ্গে কথা বলা।
শোনা যায়, কখনো কখনো মর্মর মূর্তিও
বেদীর স্থানুত্ব বিসর্জন দিয়ে
তার রূপের সাধককে বাঁধে নিবিড় আলিঙ্গনে।
কোন্ দিকে পড়বে তোমার পদচ্ছাপ,
তা দেখার জন্যে প্রতীক্ষায় কখনো আমি
পাথরের নুড়ি, কখনো প্রজাপতি, কখনো বা দোয়েল। (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/soundorjer-gohone-duburi/
|
5162
|
শামসুর রাহমান
|
যায়নি কোথাও
|
চিন্তামূলক
|
হঠাৎ গুলির বর্ষা, ধোঁয়াবিষ্ট বাড়ি, আর্তনাদ ছাদ বেয়ে
মেঘে ওঠে, এলোমেলো পদশব্দ, মূক রক্তধ্বানি,
মেঝেতে চামচ, ভাঙা চায়ের পেয়ালা,
চন্দ্রাকৃতি কমলালেবুর কোয়া দেয়ালে প্রবেশ করে ভীত।তবু কেউ অপরাহ্নে হাঁটুরে ঠেকিয়ে
চিবুক নীরব বসে আছে, তার হাতে প্রেমিকের
স্পর্শ খেলা করে, ভাবে মৃত্যুর মুহূর্তে ভালবাসা
বড় বেশি প্রয়োজন; তার কোলো মাথা
রেখে শোয় তৃষ্ণার্ত পুরুষ।
কবিতার পঙ্ক্তি খোঁজে আনত চোখের কামরূপে
স্মৃতি স্বপ্নাচ্ছন্ন পাখি, মাথার ভেতরে গান গায়,
সুরে কালাকাল বাজে। একটি ফড়িং
বইয়ের ওপর দেয় প্রাণের উত্তাপ, তারপর আলগোছে
তরুণীর স্তনের সুঘ্রাণ নিতে যায়।পুরুষ আবৃত্তি করে মনে-মনে যেখানে কোকিল
আর গাইবে না গান, ফুটবে না ফুল, বাগানে কি
পথপ্রান্তে, ফসলের সজীবতা মুছে যাবে, প্রেম
চরম নিষিদ্ধ হবে, সেখানে আমার
নিঃশ্বাস নিশ্চিত বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে লহমায়
মূঢ়দের খেলাচ্ছলে। পুরুষকে দলে পিষে একপাল
বাইসন ছুটে যেতে থাকে।স্বপ্নে তার ভ্রমরের ঝাঁক, সে পবিত্র বন্ধ দরজার
সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে, ভুল তীর্থযাত্রী, দ্বিধান্বিত,
কারা তাকে সরে যেতে বলে ক্রুদ্ধ স্বরে। প্রতিবাদহীন
একা
হেঁটে যায়, হেঁটে যায়; প্রকৃত সে যায়নি কোথাও। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jaini-kothao/
|
2157
|
মহাদেব সাহা
|
তার বুকে আছে
|
প্রেমমূলক
|
তার বুকে আছে স্বর্ণচাঁপার গাছ, আকাশের মতো বড়ো নীল
পোষ্টাপিস
সব যোগাযোগ, নিরুদ্দেশ মানুষের তারবার্তা, জরুরী খবর
বৃষ্টির কালো জামা পরে সেখানে লুকিয়ে থাকে তাড়িত ফেরারী
তার বুকে ট্যুরিষ্টের নিশ্চিত শেল্টার আছে, অসুখী লোকের
আছে সবুজ শুশ্রূষা
বনের চোখের নিচে যারা পাখির পারক খোঁজে, আসে
বনবিভাগের লোকজন জেনে নিতে গাছের বয়স, উদ্ভদ কীভাবে বাড়ে-
অথচ সবাই তারা ফির যায় প্রকৃতির জড় ব্যবহার দেখে
এইসব হন্যে মানুষ এসে তার বুকে খুঁজে পায় সমস্ত পাখির বাসা,
নিসর্গের নীল টেলিফোন শোনে
দেখে উদ্ভিদের নিজস্ব হস্তাক্ষরে লেখা চিঠি, পাখির পালক দিয়ে
নির্মিত গার্মেন্ট
তার বুকে আছে
অরণ্যের চিত্রকলা, গোপন স্টুডিও ;
তার বুকে আছে দেরি করে ঘরে ফিরে ডাক দিলে যে দেয়
দুয়ার খুলে
সেই ভালোবাসা,
যে এসে ভীষণ জ্বরে মাথায় কোমল হাত রাখে সেই দুঃখবোধ
তার বুকের মধ্যে বাস করে রাজদম্পতির সুখ, দুঃখী
বালকের কান্নার সঙ্গী
যখন শহরে বাধে গোলযোগ, ধর্মঘট হরতাল চলে
যানবাহন বন্ধ থাকে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়
ঝাঁপ-ফেলা দোকানপাট দেখে মনে হয় সমস্ত শহর যেন
মৃত রবিবার
তখনো দাঁড়িয়ে দেখি তার বুকে খোলা জুয়েলারী শপ,
ফুলের দোকান,
আকশের মতো সেই বড়ো নীল পোস্টাপিস,
তার বুকে আছে
গোপনীয় খাম হাতে সোনালি পিয়ন।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1468
|
1063
|
জীবনানন্দ দাশ
|
দেশ কাল সন্ততি
|
স্বদেশমূলক
|
কোথাও পাবে না শান্তি—যাবে তুমি এক দেশ থেকে দূরদেশে?
এ-মাঠ পুরানো লাগে—দেয়ালে নোনার গন্ধ—পায়রা শালিখ সব চেনা?
এক ছাঁদ ছেড়ে দিয়ে অন্য সূর্যে যায় তারা-লক্ষ্যের উদ্দেশে
তবুও অশোকস্তম্ভ কোনো দিকে সান্তনা দেবে না।কেন লোভে উদ্যাপনা? মুখ ম্লান—চোখে তবু উত্তেজনা সাধ?
জীবনের ধার্য বেদনার থেকে এ-নিয়মে নির্মুক্তি কোথায়।
ফড়িং অনেক দূরে উড়ে যায় রোদে ঘাসে—তবু তার কামনা অবাধ
অসীম ফড়িংটিকে খুঁজে পাবে প্রকৃতির গোলকধাঁধাঁয়ছেলেটির হাতে বন্দী প্রজাপতি শিশুসূর্যের মতো হাসে;
তবু তার দিন শেষ হয়ে গেল; একদিন হতই-তো, যেন এই সব
বিদ্যুতের মতো মৃদুক্ষুদ্র প্রাণ জানে তার; যতো বার হৃদয়ের গভীর প্রয়াসে
বাঁধা ছিঁড়ে যেতে চায়—পরিচিত নিরাশায় তত বার হয় সে নীরব।অলঙ্ঘ্য অন্তঃশীল অন্ধকার ঘিরে আছে সব;
জানে তাহা কীটেরাও পতঙ্গেরা শান্ত শিব পাখির ছানাও।
বনহংসীশিশু শূন্যে চোখ মেলে দিয়ে অবাস্তব
স্বস্তি চায়;—হে সৃষ্টির বনহংসী, কী অমৃত চাও?
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/desh-kaal-shontoti/
|
2617
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অবোধ হিয়া বুঝে না বোঝে
|
চিন্তামূলক
|
অবোধ হিয়া বুঝে না বোঝে,
করে সে একি ভুল—
তারার মাঝে কাঁদিয়া খোঁজে
ঝরিয়া-পড়া ফুল। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/obodh-hia-bujhe-na-bojhe/
|
1168
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মেঠো চাঁদ
|
প্রকৃতিমূলক
|
মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে
আমার মুখের দিকে, ডাইনে আর বাঁয়ে
পোড়ো জমি- খড়- নাড়া- মাঠের ফাটল,
শিশিরের জল।
মেঠো চাঁদ- কাস্তের মত বাঁকা, চোখা-
চেয়ে আছে; এমনি সে তাকায়েছে কতো রাত- নাই লেখা-জোখা।
মেঠো চাঁদ বলেঃ
‘আকাশের তলে
খেতে-খেতে লাঙ্গলের ধার
মুছে গেছে- ফসল- কাটার
সময় আসিয়া গেছে, চ’লে গেছে কবে!
শস্য ফলিয়া গেছে- তুমি কেন তবে
রয়েছো দাঁড়ায়ে
একা-একা! ডাইনে আর বাঁয়ে
নড়-নাড়া- পোড়া জমি- মাঠের ফাটল,
শিশিরের জল!’……
আমি তারে বলিঃ
‘ফসল গিয়াছে ঢের ফলি,
শস্য গিয়েছে ঝ’রে কতো-
বড়ো হ’য়ে গেছো তুমি এই বুড়ী পৃথিবীর মতো!
খেতে-খেতে লাঙ্গলের ধার
মুছে গেছে কতোবার- কতোবার ফসল-কাটার
সময় আসিয়া গেছে, চ’লে গেছে কবে!
শস্য ফলিয়া গেছে- তুমি কেন তবে
রয়েছো দাঁড়ায়ে
একা-একা! ডাইনে আর বাঁয়ে
পোড়ো জমি- খড়-নাড়া-মাঠের ফাটল,
শিশিরের জল!’
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/metho-chad/
|
3223
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুঃখ যেন জাল পেতেছে
|
চিন্তামূলক
|
দুঃখ যেন জাল পেতেছে চারদিকে;
চেয়ে দেখি যার দিকে
সবাই যেন দুর্গ্রহদের মন্ত্রণায়
গুমরে কাঁদে যন্ত্রণায়।
লাগছে মনে এই জীবনের মূল্য নেই,
আজকে দিনের চিত্তদাহের তুল্য নেই।
যেন এ দুখ অন্তহীন,
ঘরছাড়া মন ঘুরবে কেবল পন্থহীন।
এমন সময় অকস্মাৎ
মনের মধ্যে হানল চমক তড়িদ্ঘাত,
এক নিমেষেই ভাঙল আমার বন্ধ দ্বার,
ঘুচল হঠাৎ অন্ধকার।
সুদূর কালের দিগন্তলীন বাগবাদিনীর পেলেম সাড়া
শিরায় শিরায় লাগল নাড়া।
যুগান্তরের ভগ্নশেষে
ভিত্তিছায়ায় ছায়ামূর্তি মুক্তকেশে
বাজায় বীণা; পূর্বকালের কী আখ্যানে
উদার সুরের তানের তন্তু গাঁথছে গানে;
দুঃসহ কোন্ দারুণ দুখে স্মরণ-গাঁথা
করুণ গাথা;
দুর্দাম কোন্ সর্বনাশের ঝঞ্ঝাঘাতের
মৃত্যুমাতাল বজ্রপাতের
গর্জরবে
রক্তরঙিন যে-উৎসবে
রুদ্রদেবের ঘূর্ণিনৃত্যে উঠল মাতি
প্রলয়রাতি,
তাহারি ঘোর শঙ্কাকাঁপন বারে বারে
ঝংকারিয়া কাঁপছে বীণার তারে তারে।
জানিয়ে দিলে আমায়, অয়ি
অতীতকালের হৃদয়পদ্মে নিত্য-আসীন ছায়াময়ী,
আজকে দিনের সকল লজ্জা সকল গ্লানি
পাবে যখন তোমার বাণী,
বর্ষশতের ভাসান-খেলার নৌকা যবে
অদৃশ্যেতে মগ্ন হবে,
মর্মদহন দুঃখশিখা
হবে তখন জ্বলনবিহীন আখ্যায়িকা,
বাজবে তারা অসীম কালের নীরব গীতেশান্ত গভীর মাধুরীতে;
ব্যথার ক্ষত মিলিয়ে যাবে নবীন ঘাসে,
মিলিয়ে যাবে সুদূর যুগের শিশুর উচ্চহাসে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dukh-jano-jal-patase/
|
3637
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বৈতরণী
|
সনেট
|
অশ্রুস্রোতে স্ফীত হয়ে বহে বৈতরণী ,
চৌদিকে চাপিয়া আছে আঁধার রজনী ।
পূর্ব তীর হতে হু হু আসিছে নিশ্বাস ,
যাত্রী লয়ে পশ্চিমেতে চলেছে তরণী ।
মাঝে মাঝে দেখা দেয় বিদ্যুৎ – বিকাশ ,
কেহ কারে নাহি চেনে ব’সে নতশিরে ।
গলে ছিল বিদায়ের অশ্রুকণা – হার ,
ছিন্ন হয়ে একে একে ঝ’রে পড়ে নীরে ।
ওই বুঝি দেখা যায় ছায়া – পরপার ,
অন্ধকারে মিটিমিটি তারা – দীপ জ্বলে ।
হোথায় কি বিস্মরণ , নিঃস্বপ্ন নিদ্রার
শয়ন রচিয়া দিবে ঝরা ফুলদলে !
অথবা অকূলে শুধু অনন্ত রজনী
ভেসে চলে কর্ণধারবিহীন তরণী ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boitoroni/
|
2939
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো
|
ভক্তিমূলক
|
কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
রয়েছে দীপ না আছে শিখা,
এই কি ভালে ছিল রে লিখা–
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো।
বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো।বেদনাদূতী গাহিছে, “ওরে প্রাণ,
তোমার লাগি জাগেন ভগবান।
নিশীথে ঘন অন্ধকারে
ডাকেন তোরে প্রেমাভিসারে,
দুঃখ দিয়ে রাখেন তোর মান।
তোমার লাগি জাগেন ভগবান।’গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি,
বাদল-জল পড়িছে ঝরি ঝরি।
এ ঘোর রাতে কিসের লাগি
পরান মম সহসা জাগি
এমন কেন করিছে মরি মরি।
বাদল-জল পড়িছে ঝরি ঝরি।বিজুলি শুধু ক্ষণিক আভা হানে,
নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।
জানি না কোথা অনেক দূরে
বাজিল প্রাণ গভীর সুরে,
সকল গান টানিছে পথপানে।
নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
ডাকিছে মেঘ, হাঁকিছে হাওয়া,
সময় গেলে হবে না যাওয়া,
নিবিড় নিশা নিকষঘন কালো।
পরান দিয়ে প্রেমের দীপ জ্বালো।বোলপুর, আষাঢ়, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kothay-alo-kothay-ore-alo/
|
4492
|
শামসুর রাহমান
|
একটি মৃত্যুবার্ষিকী
|
শোকমূলক
|
হয়নি খুঁজতে বেশি, সেই অতদিনের অভ্যাস,
কী করে সহজে ভুলি? এখনও গলির মোড়ে একা
গাছ সাক্ষী অনেক দিনে লঘু-গুরু ঘটনার
আর এই কামারশালার আগুনের ফুলকি ওড়ে
রাত্রিদিন হাপরের টানে। কে জানত স্মৃতি এত
অন্তরঙ্গ চিরদিন? জানতাম তুমি নেই তবুআঠারো সাতে কড়া নেড়ে দাঁড়ালাম
দরজার পাশে। মনে হলো হয়তো আসবে তুমি,
মৃদু হেসে তাকাবে আমার চোখে, মসৃণ কপালে,
ছোঁয়াবে আলতো হাত, বলবে ‘কী ভাগ্যি আরে
আপনি? আসুন। কী আশ্চর্য। ভেতরে আসুন। দেখিঅন্ধকারে বন্ধ দরোজায় দুটি চোখ আজও দেখি
উঠল জ্ব’লে। কতদিনকার সেই চেনা মৃদু স্বর
আমার সত্তাকে ছুঁয়ে বাতাসে ছড়াল
স্মৃতির আতর।শূন্য ঘরে সোফাটার নিষ্প্রাণ হাতল
কী করে জাগল এইক্ষণে? একটি হাতের নড়া
দেখলাম যেন, চা খেলাম যথারীতি
পুরানো সোনালি কাপে, ধরালাম সিগারেট, তবু
সবটাই ঘটল যেন অলৌকিক
যুক্তি-অনুসারে।মেঝের কার্পেটে দেখি পশমের চটি
চুপচাপ, তোমার পায়ের ছাপ খুঁজি
সবখানে, কৌচে শুনি আলস্যের মধুর রাগিণী
নিঃশব্দ সুরের ধ্যানে শিল্পিত তন্দ্রায়।জানালায় সিল্ক নড়ে, ভাবি কত সহজেই তারা
তোমাকে কীটের উপজীব্য করেছিল,
সারাক্ষণ তোমার সান্নিধ্যে পেত যারা
অনন্তের স্বাদ।বারান্দায় এলাম কী ভেবে অন্যমনে, পারব না
বলতে আজ। জানতাম তুমি নেই, তবু (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-mrittubarshiki/
|
3141
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তম্বুরা কাঁধে নিয়ে
|
ছড়া
|
তম্বুরা কাঁধে নিয়ে
শর্মা বাণেশ্বর
ভেবেছিল, তীর্থেই
যাবে সে থানেশ্বর।
হঠাৎ খেয়াল চাপে গাইয়ের কাজ নিতে–
বরাবর গেল চলে একদম গাজনিতে,
পাঠানের ভাব দেখে
ভাঙিল গানের স্বর। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tombura-kadhe-niye/
|
4981
|
শামসুর রাহমান
|
বদলে ফেলি
|
প্রেমমূলক
|
আমি যে এই আমির খোলস ছেড়ে ছুঁড়ে যখন তখন
বেরিয়ে আসি,
রৌদ্রেপোড়া জ্যোৎস্না মোড়া এই সমাচার তোমার চেয়ে
ভালো ক’রে কেউ জানে না।
ফুটফুটে খুব সকালবেলা কিংবা ধরো পিতামাতার
বুক-কাঁপানো ঘুম-তাড়ানো ডাগর কোনো মেয়ের মতো
মধ্যরাতে
এই যে আমি ঘরে বাইরে কেমন যেন হ’য়ে উঠি,
তোমার চেয়ে বেশি বলো
কেই বা জানে?আমাকে এক ভীষণ দানো তাড়িয়ে বেড়ায় অষ্টপ্রহর,
তীব্র খাঁ খাঁ খিদের চোটে আমার মাংস
অস্থি মজ্জা চেটে চুটে হরহামেশা সাবাড় করে।
লকলকানো চুল্লিতে দেয় হেলায় ছুঁড়ে,
অথবা সে অগ্নিমান্দ্যে ভুগলে তখন খামখেয়ালি খেলায় মাতে।
তপস্বী এক বেড়াল সেজে ঘুরে বেড়ায় আশে পাশে
আমার ঘরে।রাত্রিবেলা অনেক দামী রত্ন স্বরূপ দু’চোখ জ্বেলে
আঁধার লেপা চুপ উঠোনে কিংবা কৃপণ বারান্দাটায়
আলস্যময় কোমল পশুর গন্ধ বিলায়
এবং আমি ইঁদুর যেন।
আবার কখন রুক্ষ মরু চতুর্ধারে জ্বলতে থাকে,
বুকের ভেতর শুশুনিয়া, হাতড়ে বেড়াই জলের ঝালর;
মুখের তটে ঝরে শুধুই তপ্ত বালি; কখনো-বা পায়ের নিচে
বেজে ওঠে বেগানা হাড়।
এই যে এমন দৃশ্যাবলি উদ্ভাসিত যখন তখন,
তুমি ছাড়া কেউ দেখে না।
হঠাৎ দেখি, মুখোশ-পরা আবছা মানুষ দু-রঙা ঐ
ঘুঁটিগুলো সামনে রেখে বললো এসে,
‘তোমার সঙ্গে খেলবো পাশা।
জনবিহীন জাহাজ-ডেকে দ্যুতক্রীড়ায় মত্ত দু’জন
ডাকিনীদের নিশাস হয়ে বাতাস ফোঁসে চতুর্দিকে,
মাঝে মধ্যে চোখে-মুখে ঝাপ্টা লাগে লোনা পানির।
প্রতিযোগীর শীর্ণ হাতের ছোঁয়ায় হঠাৎ চমকে উঠি,
যেন আমি ইলেকট্রিকের শক পেয়েছি অন্ধকারে।
প্রতিযোগী কিতাব নিসাড়, নীল-শলাকা আঙুলগুলো
দারুণ শীতে মৃত কোনো সাপের মতো ঠাণ্ড এতো-
শিউরে উঠি।
মুখোশধারীর চক্ষু তো নেই, শুধুই ধু ধু যুগ্ম কোটর।ভীষণ দানো দুরন্ত সেই পেলব বেড়াল এবং কালো
মুখোশ-পরা আবছা মানুষ আসলে সবতুমিই জানি।
ভূমন্ডলে তোমার চেয়ে চমকপ্রদ চতুর কোনো বহুরূপী
কে-ই বা আছে?আপন কিছু স্বপ্ন তোমায় বাট্রা দিয়ে খাট্রা মেজাজ
শরীফ করি।
তোমার জন্যে টুকরো টুকরো সত্তাটাকে নিংড়ে নিয়ে
রূপান্তরের গভীরে যাই কখনো বা কেবল চলি।
জানিনা হায়, সামনে কী-যে আছে পাতা-
ফুল্ল কোনো মোহন রাস্তা কিংবা বেজায় অন্ধ গলি।
তোমার জন্যে সকাল সন্ধ্যা নিজেকে খুব বদলে ফেলি,
অন্তরালে বদলে ফেলি।তোমার জন্যে চড়ুই হয়ে চঞ্চু ঘষি শ্বেত পাথরে,
কখনো ফের স্বর্ণচাঁপায় এক নিমিষে হই বিলীন।
কখনো বা পিঁপড়ে হ’য়ে দুর্গ বানাই ব্যস্তবাগীশ
ছুটে বেড়াই দেয়াল পাড়ায়।তোমার জন্যে হই শহুরে শীর্ণ কুকুর, দীর্ণ বুকে গাড্ডা থেকে
পান করি জল;তোমার জন্যে হই আসামী ফাঁসির এবং নোংরা সেলে
ব’সে ব’সে নিষিদ্ধ ঐ বহর্জীবন নিয়ে কেমন জ্বরের ঘোরে
উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখি, ক্বচিৎ কোনো শব্দ শুনি।
তোমার জন্যে যখন তখন নিজেকে খুব বদলে ফেলি, আমূল আমি
বদলে ফেলি। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bodle-feli/
|
144
|
আল মাহমুদ
|
হায়রে মানুষ
|
চিন্তামূলক
|
একটু ছিল বয়েস যখন ছোট্ট ছিলাম আমি
আমার কাছে খেলাই ছিল কাজের চেয়ে দামি।
উঠোন জুড়ে ফুল ফুটেছে আকাশ ভরা তারা
তারার দেশে উড়তো আমার পরাণ আত্মহারা।
জোছনা রাতে বুড়িগঙ্গা তুলতো যখন ঢেউ
আমার পিঠে পরীর ডানা পরিয়ে দিতো কেউ।
দেহ থাকতো এই শহরে উড়াল দিতো মন
মেঘের ছিটার ঝিলিক পেয়ে হাসতো দু’নয়ন।
তারায় তারায় হাঁটতো আমার ব্যাকুল দু’টি পা
নীল চাঁদোয়ার দেশে হঠাৎ রাত ফুরাতো না।
খেলার সাথী ছিল তখন প্রজাপতির ঝাঁক
বনভাদালির গন্ধে কত কুটকুটোতো নাক;
কেওড়া ফুলের ঝোল খেয়ে যে কোল ছেড়েছে মা’র
তার কি থাকে ঘরবাড়ি না তার থাকে সংসার?
তারপরে যে কী হলো, এক দৈত্য এসে কবে
পাখনা দুটো ভেঙে বলে মানুষ হতে হবে।
মানুষ হওয়ার জন্য কত পার হয়েছি সিঁড়ি
গাধার মত বই গিলেছি স্বাদ যে কি বিচ্ছিরি।
জ্ঞানের গেলাস পান করে আজ চুল হয়েছে শণ
কেশের বাহার বিরল হয়ে উজাড় হলো বন।
মানুষ মানুষ করে যারা মানুষ তারা কে ?
অফিস বাড়ির মধ্যে রোবোট কলম ধরেছে।
নরম গদি কোশন আসন চশমা পরা চোখ
লোক ঠকানো হিসেব লেখে, কম্প্যুটারে শ্লোক।
বাংলাদেশের কপাল পোড়ে ঘূর্ণিঝড়ে চর
মানুষ গড়ার শাসন দেখে বুক কাঁপে থরথর।
‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’- গান শোননি ভাই ?
মানুষ হবার ইচ্ছে আমার এক্কেবারে নাই।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3704.html
|
6013
|
হেলাল হাফিজ
|
অন্যরকম সংসার
|
প্রেমমূলক
|
এই তো আবার যুদ্ধে যাবার সময় এলো
আবার আমার যুদ্ধে খেলার সময় হলো
এবার রানা তোমায় নিয়ে আবার আমি যুদ্ধে যাবো
এবার যুদ্ধে জয়ী হলে গোলাপ বাগান তৈরী হবে।
হয় তো দু’জন হারিয়ে যাবো ফুরিয়ে যাবো
তবুও আমি যুদ্ধে যাবো তবু তোমায় যুদ্ধে নেবো
অন্যরকম সংসারেতে গোলাপ বাগান তৈরী করে
হারিয়ে যাবো আমরা দু’জন ফুরিয়ে যাবো।
স্বদেশ জুড়ে গোলাপ বাগান তৈরী করে
লাল গোলাপে রক্ত রেখে গোলাপ কাঁটায় আগুন রেখে
আমরা দু’জন হয় তো রানা মিশেই যাবো মাটির সাথে।
মাটির সথে মিশে গিয়ে জৈবসারে গাছ বাড়াবো
ফুল ফোটাবো, গোলাপ গোলাপ স্বদেশ হবে
তোমার আমার জৈবসারে। তুমি আমি থাকবো তখন
অনেক দূরে অন্ধকারে, অন্যরকম সংসারেতে।
২০.১২.৭৩
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/85
|
3578
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিদায় শেষের কবিতা থেকে
|
ভক্তিমূলক
|
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়--
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো--কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
সে আমার প্রেম।তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়। হে বন্ধু, বিদায়।
তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
হোক তব সন্ধ্যাবেলা,
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগ-বেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।আজো তুমি নিজে হয়তো-বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু, বিদায়। মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই--
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সেই ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/biday-shesr-kabita/
|
4947
|
শামসুর রাহমান
|
প্রচ্ছন্ন একজন
|
রূপক
|
ভরাট দুপুর আর নিশুতি রাত্তির নিয়ে বুকে
প্রত্যহ সে করে চলাফেরা
আশেপাশে, কথোপকথনে মাতে পথ ঘাটে যদি
ইচ্ছে হয় শুধায় কুশল পাত্রমিত্রদের। কখনো সখনো
তাকে যায় দেখা রেললাইনে, কখনো ডোবার ধারে
কাটায় ঘন্টার পর ঘন্টা, কী যেন অধীর দেখে নিস্তরঙ্গ
জরৎ সবুজ জলে, আঙুলে বসন্ত নিয়ে কখনো চালায়
ব’সে মাপে অন্ধকার, জ্যোৎস্না, কখনো-বা
ল্যাস্পপোস্টে ব’সে থাকে দু’হাত বাড়িয়ে
আকাশের দিকে, যেন নেবে করতলে
চমৎকার আসমানী পণ্য-
চাঁদের ভগ্নাংশ, নক্ষত্রের ফুলকি অথবা নীলিমা
যা’ পড়ে পড়ুক।ঘরে এসে ঢুকলেই দ্যাখে চার দেয়ালের একটাও
নেই কাছেধারে, ছাদ মেঘ হয়ে ভাসে, ‘ঘর তবুতো ঘর”
ব’লে সে গভীর নিদ্রা যায় নগ্ন উদার মেঝেতে।
স্বপ্নের চাতালে।লাল বল অতিশয় চপল এবং
সবুজ পুষ্পতি ট্রেন বাজায় বিদায়ী বাঁশি, ট্রাফিক পুলিশ
চিনির পুতুল হয়ে দিকদর্শী অত্যন্ত নিপুণ।সে ঘুমের ঘোরে হেসে ওঠে, যখন ভারিক্কী এক
কাকাতুয়া আপিসের বড় কর্মকর্তার ধরনে।কার্যকারণেরহদিশ খুঁজতে গিয়ে বেজায় গলদঘর্ম হন।
নিদ্রাল শিয়রে ব’সে পাখি বলে এ কেমন টেঁটিয়া মানুষ,
কেমন দুনিয়াছাড়া ঘুমোচ্ছে নিটোল কী-যে, যেন
চতুর্ধারে নেই কোনো বালা মুসিবৎ।
সে ঘুমের ঘোরে হেসে ওঠে, ভীষণ স্তম্ভিত পোকা ও মাকড়। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/procchonno-ekjon/
|
2783
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
উদবৃত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
তব দক্ষিণ হাতের পরশ
কর নি সমর্পন।
লেকে আর মেছে তব আলো ছায়া
ভাবনার প্রাঙ্গণে
খনে খনে আলিপন।বৈশাখে কৃশ নদী
পূর্ণ স্রোতের প্রসাদ না দিল যদি
শুধু কুণ্ঠিত বিশীর্ণ ধারা
তীরের প্রান্তে
জাগালো পিয়াসী মন।যতটুকু পাই ভীরু বাসনার
অঞ্জলিতে
নাই বা উচ্ছলিল,
সারা দিবসের দৈন্যের শেসে
সঞ্চয় সে যে
সারা জীবনের স্বপ্নের আয়োজন।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/utvetta/
|
718
|
জয় গোস্বামী
|
বোকা
|
প্রেমমূলক
|
তাকে ছেড়ে চলেছ সন্ধ্যায়
চাঁদ ওঠে।
চাঁদ উঠে যায়
গাছের মাথায়আর কোনও দায়
রইল না তোমারতোমার এই ছেড়ে যাওয়া
মহোল্লাসে উদযাপন কোরে
ঝোপঝাড়ে ঝিঁঝিপোকা ডাকে চমত্কারতোমার যাওয়ার পথে একদৃষ্টে তাকিয়ে
কেন যে বোকার মতো চোখ দিয়ে জল পড়ে এখনও
বৃদ্ধ লোকটার
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/boka/
|
1820
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
জ্বর
|
প্রেমমূলক
|
স্মৃতিতে সর্বাঙ্গ জ্বলে
একশ পাঁচ ডিগ্রী ঘোর জ্বর।
টালমাটাল ঝড়
ঘুষি মারে হাড়ে মাসে ব্রক্ষ্মতালু রক্তকণিকায়
যেন তাকে ছিড়েখুড়ে অন্য কিছু বানাবে এখুনি।
হঠাৎ হরিণ হয়ে হয়তো সে ছুটে যাবে বহুদূর বাঘ-ডোরা বনে
তুমুল আগুন জ্বেলে পলাশ যেখানে যজ্ঞ করে।
নিজের বিবিধ টুকরো জুড়ে জাড়ে হয়তো বা হলুদ শালিক
অর্জুন গাছের সাদা থামে
যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে সূর্যাস্ত যেখানে রোজ নামে
সেইখানে ঘরবাড়ি ভাড়া নিয়ে কিছুদিন থাকবে স্বাধীন
অথবা সে নিজেরই লালার
চমৎকার রাংতা দিয়ে গড়ে নেবে সাত-কুঠরি ঘর।
জ্বর
এইভাবে নখে চিরে করেছে উর্বর তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে।
কলসী কলসী জল ঢালি সান্ত্বনার, সুবিবেচনার
কপালের জলপটি শীতের ভোরের মতো সারাক্ষণ ভিজে হয়ে থাকে
তবু জ্বর ছাড়েনাকো তাকে।
এক অগ্নিকুন্ডে থেকে আরেক আগুনে ঝাঁপ দিয়ে
ছাই মাখে, ভস্ম মাখে, চোখে আঁকে না-ঘুম-কাজল।
জ্বরে সে পাগল।
শিশুরা পায়েস ঘেঁটে গোলগাল কিসমিস পেয়ে গেলে যে রকম হাসে
সেরকমই দিগ্বীজয়ী হাসি তার দুটি পাখি-ঠোঁটে।
সে নাকি মুঠোর মধ্যে পেয়ে গেছে বসন্তের সমস্ত কোকিল
গোপালপুরের সব রূপোলি ঝিনুক
পুরীর সমস্ত ঝাউবন।
সাঁওতাল পরগনা থেকে পেয়ে গেছে সব কটি নাচের মাদল।
আসলে এসব কিছু নয়
দুধের গাভীর মতো একটি নারীকে খুঁজে পেয়েছে সে কলকাতা থেকে
ছানা ওমাখন তাকে খেতে দেয় সেই রমনীটি
খেতে দেয় দু-বাটিকে ক্ষীর।
তারই গলকম্বলের স্বাদে গন্ধে এমন মাতাল
ভেবেছে পৃথিবী তার পকেটের তে-ভাঁজ রুমাল।
এই ভাবে জ্বর
নৌকো ভর্তি স্মৃতি সহ ভাসিয়ে দিয়েছে তাকে এই পৃথিবীর
ইট কাঠ বালি সুরকি পেরেকের ঢেউ-এর ওপর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1305
|
2503
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
বদলে যাওয়া ছড়া
|
মানবতাবাদী
|
ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি খালা ফুপুর দল
জেগে ওঠা বাচ্চাদেরে সঙ্গে নিয়ে চল
মানবি কেন ঘুমপাড়িয়ে শান্ত রাখার ছল
মা বাবারও ঘুম ভাঙিয়ে সঙ্গে যেতে বল
খোকা-খুকুর ভয় ভেঙেছে, তাদের কিসের ভয়
মা বাবারা সামনে গেলেই দেশের হবে জয়
যারা দেখায় ধান ভেনে তার কুড়ো পাবার লোভ
তাদের উপর খোকা-খুকুর আজকে বড় ক্ষোভ
চক্ষু পেতে আর বসা নয়, বোঝ না ওদের মন
বাঁচার মতো বাঁচতে সবার সাহস প্রয়োজন ।০৩/ ১২/ ২০১৮
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/bodle-jaowa-chhora/
|
4361
|
শামসুর রাহমান
|
আমার অজ্ঞতা নিয়ে
|
চিন্তামূলক
|
এখন মাঝরাস্তায় আমি; শ্বাসরোধকারী নিঃসঙ্গতা
একটা মাকড়সার মতো হাঁটছে
আমার চোখে, গালে, কণ্ঠনালীতে,
বুকে, ঊরুতে আর
অন্ধকারের জোয়ার খলখলিয়ে উঠছে আমার চারপাশে।অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। মনে হয়,
এখানে কোথাও তুমি আছো, ডাকলেই
সাড়া দেবে লহমায়। তলোয়ার মাছের মতো
তোমার কণ্ঠস্বর
ঝলসে উঠবে অন্ধকারে।
কণ্ঠে সমস্ত নির্ভরতা পুরে তোমাকে ডাকলাম,
শুধু ভেসে এলো আমার নিজের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি।অন্ধকারে পথ হাতড়ে চলেছি, যদি হঠাৎ
তোমার দেখা পেয়ে যাই।
ভেবেছি, আমার দিকে প্রসারিত হবে
অলৌকিক বৃক্ষশাখার মতো তোমার হাত।কতকাল প্রতীক্ষাকাতর আমি
তোমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্যে, কত পাথর আ কাঁটাময়
পথ পেরিয়েছি তোমাকে একটিবার
দেখবো বলে। অথচ আমার সকল প্রতীক্ষা আর
ব্যাকুলতাকে বারংবার উপহাস করেছে
তোমার নীরব অনুপস্থিতি।অন্ধকারে আমি দু’হাতে আঁকড়ে রেখেছি
একটি আয়না যাতে দেখতে পাই
তোমার মুখের ছায়া। কিন্তু আয়নায় পড়ে না
কোনো ছায়া, লাগে না নিঃশ্বাসের দাগ।এখানে কোথাও না কোথাও তুমি আছো,
এই বিশ্বাস কখনও-সখনও
আমাকে বাঁচায়
অক্টোপাশা-বিভ্রান্তি থেকে। কিন্তু সেই বিশ্বাস নিয়ে
আমি কী করবো যা সমর্থিত নয়
জ্ঞানের জ্যোতিশ্চক্রে?জ্ঞান আমার উদ্ধার, তারই অন্বেষণে
উজিয়ে চলি
স্বৈরিণীর মতো অন্ধকার। এজন্যে যদি তোমাকে খোঁজার সাধ
মুছে যায় কোনো রাগী পাখার ঝাপটে,
আমি প্রতিবাদহীন পা চালিয়ে যাবো
জ্ঞানের বলয়ে আমার অজ্ঞতা নিয়ে। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-oggota-nie/
|
4172
|
লালন শাহ
|
আপন ঘরের খবর লে না
|
চিন্তামূলক
|
অনায়াসে দেখতে পাবি
কোনখানে সাঁইর বারামখানা।
আপন ঘরের খবর লে না।
অনায়াসে দেখতে পাবি
কোনখানে সাঁইর বারামখানা।।আমি
কোমল ফোটা কারে বলি
কোন মোকাম তার কোথায় গলি ।।
সেইখানে পইড়ে ফুলি
মধু খায় সে অলি জনা।।সুখ্য জ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য
সাধক এর উপলক্ষ ।।
অপরূপ তার বৃক্ষ
দেখলে চক্ষের পাপ থাকে না।।শুষ্ক নদীর শুষ্ক সরোবর
তিলে তিলে হয় গো সাঁতার ।।
লালন কয়, কীর্তি-কর্মার
কি কারখানা।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4403.html
|
396
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
প্রার্থনা
|
ভক্তিমূলক
|
আমাদের ভালো করো হে ভগবান।
সকলের ভালো করো হে ভগবান।।আমাদের সব লোকে বাসিবে ভালো।
আমরাও সকলেরে বাসিব ভালো।
রবে না হিংসা দ্বেষ
দেহ ও মনে ক্লেশ,
মাটির পৃথিবী হবে স্বর্গ- সমান-
হে ভগবান।।জ্ঞানের আলোক দাও হে ভগবান।
বিপুল শক্তি দাও হে ভগবান।।তোমারই দেওয়া জ্ঞানে চিনিব তোমায়,
তোমারই শক্তি হবে কর্মে সহায়।
ধর্ম যদি সাথী হয়
রবে না ক দুঃখ ভয়,
বিপদে পড়িলে তুমি করো যেন ত্রান-
হে ভগবান।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/prarthona/
|
5894
|
সুবোধ সরকার
|
ছাত্রকে
|
মানবতাবাদী
|
তুমি যেদিন প্রথম এসেছিলে আমার কাছে
তোমার হাতে মায়াকভ্ স্কি
আর চোখে
সকালবেলার আলো |বিহার থেকে ফিরে এসে তুমি আবার এলে
গলা নামিয়ে, বাষ্প লুকিয়ে
তুমি বলেছিলে বিহারের কথা
খুন হয়ে যাওয়া বাবার কথা
আমি দেখতে পেলাম তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বিষণ্ণতা |আবার এলে একদিন, আবারও এলে, আবার, আবার
একদিন চিন নিয়ে কথা হল
একদিন ভিয়েৎনাম
একদিন কম্বোডিয়া
একদিন কিউবা
তোমার চোখে সকালবেলার আলো
তুমি চে-গুয়েভারার ডায়েরি মুখস্ত বলেছিলে |কিন্তু কী হল তোমার ?
আসা বন্ধ করে দিলে কেন ?
একদিন ফোন করেছিলাম, তোমার বাড়ি থেকে
আমায় বলল, তিনদিন বাড়ি ফেরনি তুমি
এরকম তো ছিলে না তুমি ? কী হয়েছে তোমার ?এইমাত্র জানতে পারলাম
তুমি আমূল বদলে গেছ
তুমি আর আমাকে সহ্য করতে পার না
মায়াকভ্ স্কি পুড়িয়ে ফেলেছ
ভারতের গো-বলয় থেকে গ্রাস করতে ছুটে আসা
একটা দলে তুমি নাম লিখিয়েছ |আমি কোন দোষ করিনি তো ?
লিখিয়েছ, লিখিয়েছ |
তুমি কেন আমার বাড়ি আসা বন্ধ করে দিলে ?
আমি কি তোমাকে জোড় করে
কার্ল মার্কস পড়াব ?
ঘোড়াটিকে পুকুর পর্যন্ত ধরে আনা যায়
তাকে কি জোড় করে জল খাওয়ানো যায় ?
ওগো সকালবেলার আলো, তুমি একদিন
আবার কাছে ফিরে আসবে, দরজা খোলা থাকবে আমার
ভালোবাসা নিয়ো |
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a0%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7/
|
4493
|
শামসুর রাহমান
|
একটি শিশুকে
|
প্রেমমূলক
|
যদি চাও, ভরে দিতে পারি এই ভোরের অঞ্জলি
গল্পের অজস্র ফুলে। শোনো বাঘ-ভাল্লুকের নয়,
অথবা পরীরও নয়, চেনা মানুষেই গল্প বলি।
করবো না নামোল্লেখ কিংবা করবো না নয় ছয়
ঘটনাবলিকে সত্যি। একরত্তি মেয়ে তুমি, তাই
বুঝরে না কাহিনীর সন্ধ্যাভাষা। একটি পুরুষজীয়ন কাঠির স্পর্শে চেয়েছিলো জাগাতে হৃদয়
মহিলার স্বপ্নাবেশে। বাস্তবের কর্কশ বুরুশ
খানিক রগড়ে দিলো তাকে, বাসনার ছিনতাই
দেখলো স্বচক্ষে, সে মহিলা, মানে, তোমার জননী
স্যুইচ টেপেনি তার ঘরে কিংবা খাবার টেবিল
সাজায়নি কোনোদিন। তার অস্তিত্বের রাঙা ধ্বনি
অন্যত্র পেলব বাজে, তুমি জানো। দিয়েছে সে খিল
একদা-র কপাটে নিপুণ; শোনো, তুমি প্রজাপতি
হ’য়ে ঘোরো, পুতুলের বিয়ে দাও, চালিয়ে কুরুশ
ইচ্ছেমতো তুলো ফুল যৌবনে রুমালে, নেই ক্ষতি
কারুর হৃদয়ে জ্বেলে তারাবাতি, সাজিয়ে নহবৎ
নাড়িও না ভুলে তুমি আরেক জনের ঘরে নথ। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-shishuke/
|
1366
|
তসলিমা নাসরিন
|
রাত
|
প্রেমমূলক
|
কত কত রাত কেটে যাচ্ছে একা বিছানায়,
রাতগুলো ঘুমিয়ে, না ঘুমিয়ে, একা
স্বপ্নে, না স্বপ্নে, একা
একাকীত্বে একা
পিপাসায় তৃষ্ণায়
বিছানার এক কিনারে আমি, বাকিটা ফাঁকা, অসভ্যের মত ফাঁকা।
তাকে পেতে ইচ্ছে করে আমার, আমার বাঁ পাশে, আমার ডানে,
আমার ওপরে, আমার নীচে।
একজনকে এনে মনে মনে আমি শুইয়ে দিই বিছানায়
সে আমাকে চুমু খায়, চুল থেকে পায়ের নখ অবদি ভিজিয়ে ফেলে
সে আমাকে নগ্ন করে, ভালোবাসে
সারারাত ভালোবাসে,
সারারাত সাত আকাশে উড়ে বেড়ায়, ঘুড়ি ওড়ায়,
সারারাত আমি শীর্ষসুখে মরি–
এরকম রাত কাটে আমার, মনে মনের রাত কাটে।
রাতগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছে দিন দিন, রাতগুলো নিভে যাচ্ছে
তাকে হয়ত পাবো একদিন, একদিন পাবো তাকে, শুধু রাতগুলোকেই পাবো না।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1996
|
5525
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
মুক্ত বীরদের প্রতি
|
মানবতাবাদী
|
তোমরা এসেছ, বিপ্লবী বীর! অবাক অভ্যুদয়।
যদিও রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে সারা কলকাতাময়।
তবু দেখ আজ রক্তে রক্তে সাড়া-
আমরা এসেছি উদ্দাম ভয়হারা।
আমরা এসেছি চারিদিক থেকে, ভুলতে কখনো পারি!
একসূত্রে যে বাঁধা হয়ে গেছে কবে কোন্ যুগে নাড়ী।
আমরা যে বারে বারে
তোমাদের কথা পৌঁছে দিয়েছি এদেশের দ্বারে দ্বারে,
মিছিলে মিছিলে সভায় সভায় উদাত্ত আহ্বানে,
তোমাদের স্মৃতি জাগিয়ে রেখেছি জনতার উত্থানে,
উদ্দাম ধ্বনি মুখরিত পথেঘাটে,
পার্কের মোড়ে, ঘরে, ময়দানে, মাঠে
মুক্তির দাবি করেছি তীব্রতর
সারা কলকাতা শ্লোগানেই থরোথরো।
এই সেই কলকাতা।
একদিন যার ভয়ে দুরু দুরু বৃটিশ নোয়াত মাথা।
মনে পড়ে চব্বিশে?
সেদিন দুপুরে সারা কলকাতা হারিয়ে ফেলেছে দিশে;
হাজার হাজার জনসাধারণ ধেয়ে চলে সম্মুখে
পরিষদ-গেটে হাজির সকলে, শেষ প্রতিজ্ঞা বুকে
গর্জে উঠল হাজার হাজার ভাইঃ
রক্তের বিনিময়ে হয় হোক, আমরা ওদের চাই।
সফল! সফল! সেদিনের কলকাতা-
হেঁট হয়েছিল অত্যাচারী ও দাম্ভিকদের মাথা।
জানি বিকৃত আজকের কলকাতা
বৃটিশ এখন এখানে জনত্রাতা!
গৃহযুদ্ধের ঝড় বয়ে গেছে-
ডেকেছে এখানে কালো রক্তের বান;
সেদিনের কলকাতা এ আঘাতে ভেঙে চুরে খান্খান্।
তোমারা এসেছ বীরের মতন, আমরা চোরের মতো।
তোমরা এসেছ, ভেঙেছ অন্ধকার-
তোমরা এসেছ, ভয় করি নাকো আর।
পায়ের স্পর্শে মেঘ কেটে যাবে, উজ্জ্বল রোদ্দুর
ছড়িয়ে পড়বে বহুদুর-বহুদূর
তোমরা এসেছ, জেনো এইবার নির্ভয় কলকাতা-
অত্যাচারের হাত থেকে জানি তোমরা মুক্তিদাতা।
তোমরা এসেছ, শিহরণ ঘাসে ঘাসেঃ
পাখির কাকলি উদ্দাম উচ্ছ্বাসে,
মর্মরধ্বনি তরুপল্লবে শাখায় শাখায় লাগেঃ
হঠাৎ মৌন মহাসমুদ্র জাগে
অস্থির হাওয়া অরণ্যপর্বতে,
গুঞ্জন ওঠে তোমরা যাও যে-পথে।
আজ তোমাদের মুক্তিসভায় তোমদের সম্মুখে,
শপথ নিলাম আমরা হাজার মুখেঃ
যতদিন আছে আমাদের প্রাণ, আমাদের সম্মান,
আমরা রুখব গৃহযুদ্ধের কালো রক্তের বান।
অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা, বুঝি আরো দিতে হবে
এগিয়ে চলার প্রত্যেক উৎসবে।
তবুও আজকে ভরসা, যেহেতু তোমরা রয়েছ পাশে,
তোমরা রয়েছ এদেশের নিঃশ্বাসে।
তোমাদের পথ যদিও কুয়াশাময়,
উদ্দাম জয়যাত্রার পথে জেনো ও কিছুই নয়।
তোমরা রয়েছ, আমরা রয়েছি, দুর্জয় দুর্বার,
পদাঘাতে পদাঘাতেই ভাঙব মুক্তির শেষ দ্বার।
আবার জ্বালাব বাতি,
হাজার সেলাম তাই নাও আজ, শেষযুদ্ধের সাথী।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1106
|
596
|
গোলাম কিবরিয়া পিনু
|
ইতিহাস হাসে -গোলাম কিবরিয়া পিনু
|
মানবতাবাদী
|
কোন অভীষ্টের জন্যে এ রকম ছায়া নিয়ে যুক্ত
শুদ্ধ হচ্ছে কার হাতে কার মুক্তিযুদ্ধ?তর্ক নামে শীতলতায় কিংবা উত্তাপে
সূক্ষ্মভাবে ফেলে দিচ্ছি কাউকে কাউকে খাপে!
রাজমুকুটের চাপে!দৃষ্টিগ্রাহ্য যা কিছু তা পিছু পিছু টেনে
বোধগম্য কারণে-বারণে
কীযে তোলা হচ্ছে ক্রেনে আর কীযে তোলা হচ্ছে ট্রেনে।
কোন দফতর থেকে দেওয়া হচ্ছে খেতাপ-সর্বস্ব নাম
আর রংমাখা মোমবাতি?
পর্বতমালায় কি হয়েছে তৈরী এ ইতিহাস?
নেই রক্ত, নেই কারো ঘাম!পোশাক পালটাতে পালটাতে
উচু-নিচু গিয়ারে ওঠা-নামা করতে করতে
কুচকাওয়াজকালেআটকে পড়ছি কোন জালে!
আজকাল রং পালটায় কি শুধুই গিরগিটি?
বাতিকগ্রস্ত চরিত্র রূপায়ণে যারা পারদর্শী
তাদেরই হাতে পালটে যাচ্ছে বিজয়মুকুট-
ইতিহাস হাসে মিটিমিটি ।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2016/03/29/%e0%a6%87%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%87-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a7%9f/
|
3953
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সারাবেলা
|
প্রেমমূলক
|
হেলাফেলা সারাবেলা
এ কী খেলা আপন - সনে !
এই বাতাসে ফুলের বাসে
মুখখানি কার পড়ে মনে !
আঁখির কাছে বেড়ায় ভাসি
কে জানে গো কাহার হাসি !
দুটি ফোঁটা নয়নসলিল
রেখে যায় এই নয়ন কোণে ।
কোন্ ছায়াতে কোন্ উদাসী
দূরে বাজায় অলস বাঁশি ,
মনে হয় কার মনের বেদন
কেঁদে বেড়ায় বাঁশির গানে ।
সারাদিন গাঁথি গান
কারে চাহে , গাহে প্রাণ ,
তরুতলের ছায়ার মতন
বসে আছি ফুলবনে । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sarabela/
|
5393
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
উত্তম ও অধম
|
নীতিমূলক
|
মূলঃ শেখ সাদী
কুকুর আসিয়া এমন কামড়
দিল পথিকের পায়
কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে
বিষ লেগে গেল তাই।
ঘরে ফিরে এসে রাত্রে বেচারা
বিষম ব্যথায় জাগে,
মেয়েটি তাহার তারি সাথে হায়
জাগে শিয়রের আগে।
বাপেরে সে বলে র্ভৎসনা ছলে
কপালে রাখিয়া হাত,
তুমি কেন বাবা, ছেড়ে দিলে তারে
তোমার কি নাই দাতঁ?
কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল
“তুই রে হাসালি মোরে,
দাঁত আছে বলে কুকুরের পায়ে
দংশি কেমন করে?”
কুকুরের কাজ কুকুর করেছে
কামড় দিয়েছে পায়,
তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে
মানুষের শোভা পায়?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/418
|
4969
|
শামসুর রাহমান
|
ফাঁসি
|
প্রেমমূলক
|
কাল তার ফাঁসি হবে। কেন হবে, তা সে জানে না এবং
জানে না বলেই অস্বস্তির পোকা তার
মগজের কোষে কোষে ঘোরে। পাঁজরে কী যেন পোড়ে,
ঘন ঘন বৃক্ক স্ফীত হয় আর
কখনো নিজেকে তার আনাজের বাকলার মতো মনে হয়
দেয়ালে ঠেকলে পিঠ।
এখন সে স্মৃতির ব্যাপক বেড়াজালে
আটকা পড়েছে। পেতলের বাসনের মতো ঝন্ ঝন্
বেজে ওঠে তৃতীয় এবং মনে পড়ে তার একদা দেয়ালে
লিখেছিল সে আবেগে কম্পমান; ‘ভুলব না কখনো তোমাকে’।
কাকে ভুলবে না?
অন্ধ সেলে দ্যাখে কবেকার বইয়ের পাতার
ফটোগ্রাফ থেকে
আসেন কী রাজসিক উঠে ক্ষুদিরাম; ফুচিকের
কাঁটাতারে বিদ্ধ টকটকে
গোলাপ-হৃদয় জ্বলে ওঠে অন্ধকারে। আর কিছু
পারস্পর্যহীন ছবি খেলা করে নির্ঘুম প্রহরে।মৃত্যু তার মাথার ওপর
অচিন পাখির মতো চক্রাকারে ওড়ে বারে বারে;
তুড়ি মেরে উড়িয়ে সে দিতে চায় ওকে,
অথচ নাছোড় পাখি নেয় না গুটিয়ে তার ছায়া
কিছুতেই সেল থেকে। হঠাৎ সে দ্যাখে
ধূসর পাজামা তার কখন যে ভিজে গেছে উদাস পেশাবে।
দেয়ালে ঠেকিয়ে মাথা বলে নিজেকেই,
তোমার অস্তিত্ব আজ, বুঝছ, হে, তুমুল নিঃশব্দ অট্রহাসি।আজ তার মনে হল-দরজায় মাধবীলতার
স্পন্দন, পাখির নাচ, পূর্ণিমার উচ্ছল চন্দন,
বিড়ালের চোখ, পাথরের মূর্তি,
রেকারি, কাচের গ্লাস, একটি মুখের রেখা, টুকরো
কথার এমন আকর্ষণ
কখনো জানেনি আগে। আজ অকারণ
বুকের ভেতরে তার যে কাঁদে একাকী
তার প্রতি এত ভালোবাসা এতকাল
কোথায় লুকিয়ে ছিল?কাল তার ফাঁসি হবে।
শেষ ইচ্ছা পূরণের ছলে কারুকে সে
দেখতে চায়নি, এমনকি
একটি অন্তিম সিগারেটও করেনি প্রার্থনা। শুধু
মনে-মনে চেয়েছিল দেখে নিতে পৃথিবীর রূপ
পুনর্বার। এখন সে কয়েদখানার
ঘুলঘুলি থেকে চুয়ে-পড়া
বখিল আলোয় রাখে ওষ্ঠ থরথর, যেন
চুমু খেল দয়িতার ঠোঁটে। (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/fanshi/
|
2915
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কুমার
|
ভক্তিমূলক
|
কুমার, তোমার প্রতীক্ষা করে নারী,
অভিষেক-তরে এনেছে তীর্থবারি।
সাজাবে অঙ্গ উজ্জ্বল বরবেশে,
জয়মাল্য-যে পরাবে তোমার কেশে,
বরণ করিবে তোমারে সে-উদ্দেশে
দাঁড়ায়েছে সারি সারি।দৈত্যের হাতে স্বর্গের পরাভবে
বারে বারে, বীর, জাগ ভয়ার্ত ভবে।
ভাই ব'লে তাই নারী করে আহ্বান,
তোমারে রমণী পেতে চাহে সন্তান,
প্রিয় ব'লে গলে করিবে মাল্য দান
আনন্দে গৌরবে।হেরো, জাগে সে যে রাতের প্রহর গণি,
তোমার বিজয়শঙ্খ উঠুক ধ্বনি।
গর্জিত তব তর্জনধিক্কারে
লজ্জিত করো কুৎসিত ভীরুতারে,
মন্দ্রিত হোক বন্দীশালার দ্বারে
মুক্তির জাগরণী।তুমি এসে যদি পাশে নাহি দাও স্থান,
হে কিশোর, তাহে নারীর অসম্মান।
তব কল্যাণে কুঙ্কুম তার ভালে,
তব প্রাঙ্গণে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালে,
তব বন্দনে সাজায় পূজার থালে
প্রাণের শ্রেষ্ঠ দান।তুমি নাই, মিছে বসন্ত আসে বনে
বিরহবিকল চঞ্চল সমীরণে।
দুর্বল মোহ কোন আয়োজন করে
যেথা অরাজক হিয়া লজ্জায় মরে--
ওই ডাকে, রাজা, এসো এ শূন্য ঘরে
হৃদয়সিংহাসনে।চেয়ে আছে নারী, প্রদীপ হয়েছে জ্বালা--
বিফল কোরো না বীরের বরণডালা।
মিলনলগ্ন বারে বারে ফিরে যায়
বরসজ্জার ব্যর্থতাবেদনায়,
মনে মনে সদা ব্যথিত কল্পনায়
তোমারে পরায় মালা।তব রথ তারা স্বপ্নে দেখিছে জেগে,
ছুটিছে অশ্ব বিদ্যুৎকশা লেগে।
ঘুরিছে চক্র বহ্নিবরন সে যে,
উঠিছে শূন্যে ঘর্ঘর তার বেজে,
প্রোজ্জ্বল চূড়া প্রভাতসূর্যতেজে,
ধ্বজা রঞ্জিত রাঙা সন্ধ্যার মেঘে।উদ্দেশহীন দুর্গম কোন্খানে
চল দুঃসহ দুঃসাহসের টানে।
দিল আহ্বান আলসনিদ্রা-নাশা
উদয়কূলের শৈলমূলের বাসা,
অমরালোকের নব আলোকের ভাষা
দীপ্ত হয়েছে দৃপ্ত তোমার প্রাণে।অদূরে সুনীল সাগরে ঊর্মিরাশি
উত্তালবেগে উঠিছে সমুচ্ছ্বাসি।
পথিক ঝটিকা রুদ্রের অভিসারে
উধাও ছুটিছে সীমাসমুদ্রপারে,
উল্লোল কলগর্জিত পারাবারে
ফেনগর্গরে ধ্বনিছে অট্টহাসি।আত্মলোপের নিত্যনিবিড় কারা,
তুমি উদ্দাম সেই বন্ধনহারা।
কোনো শঙ্কার কার্মূকটংকারে
পারে না তোমারে বিহ্বল করিবারে,
মৃত্যুর ছায়া ভেদিয়া তিমিরপারে
নির্ভয়ে ধাও যেথা জ্বলে ধ্রুবতারা।চাহে নারী তব রথসঙ্গিনী হবে,
তোমার ধনুর তূণ চিহ্নিয়া লবে।
অবারিত পথে আছে আগ্রহভরে
তব যাত্রায় আত্মদানের তরে,
গ্রহণ করিয়ো সম্মানে সমাদরে--
জাগ্রত করি রাখিয়ো শঙ্খরবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kumar/
|
2327
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
দুঃশাসন
|
সনেট
|
মেঘ-রূপ চাপ ছাড়ি, বজ্রাগ্নি যেমনে
পড়ে পাহাড়ের শৃঙ্গে ভীষণ নির্ঘোষে ;
হেরি ক্ষেত্রে ক্ষত্র-গ্লানি দুষ্ট দুঃশাসনে,
রৌদ্ররূপী ভীমসেন ধাইলা সরোষে ;
পদাঘাতে বসুমতী কাঁপিলা সঘনে ;
বাজিল ঊরুতে অসি গুরু অসি-কোষে
যথা সিংহ সিংহনাদে ধরি মৃগে বনে
কামড়ে প্রগাঢ়ে ঘাড় লহু-ধারা শোষে ;
বিদরি হৃদয় তার ভৈরব-আরবে,
পান করি রক্ত-স্রোতঃ গৰ্জ্জিলা পাবনি ।
“মানাগ্নি নিবানু আমি আজি এ আহবে
বর্ব্বর!–পাঞ্চালী সতী, পাণ্ডব-রমণী,
তার কেশপাশ পর্শি, আকর্ষিলি যবে,
কুরু-কুলে রাজলক্ষ্মী ত্যজিলা তখনি।"
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/duhshason/
|
3767
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যতকাল তুই শিশুর মতো
|
মানবতাবাদী
|
যতকাল তুই শিশুর মতো
রইবি বলহীন,
অন্তরেরি অন্তঃপুরে
থাক্ রে ততদিন।
অল্প ঘায়ে পড়বি ঘুরে,
অল্প দাহে মরবি পুড়ে,
অল্প গায়ে লাগলে ধুলা
করবে যে মলিন--
অন্তরেরি অন্তঃপুরে
থাক্ রে ততদিন। যখন তোমার শক্তি হবে
উঠবে ভরে প্রাণ
আগুন-ভরা সুধা তাঁহার
করবি যখন পান--
বাইরে তখন যাস রে ছুটে,
থাকবি শুচি ধুলায় লুটে,
সকল বাঁধন অঙ্গে নিয়ে
বেড়াবি স্বাধীন--
অন্তরেরি অন্তঃপুরে
থাক্ রে ততদিন।
১৪ শ্রাবণ, ১৩১৭
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/yotokal-tui-sisur-moto/
|
3441
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রভাত-উৎসব
|
প্রকৃতিমূলক
|
হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি!
জগত আসি সেথা করিছে কোলাকুলি!
ধরায় আছে যত মানুষ শত শত
আসিছে প্রাণে মোর,হাসিছে গলাগলি।
এসেছে সখা সখী বসিয়া চোখাচোখি,
দাঁড়ায়ে মুখোমুখি হাসিছে শিশুগুলি।
এসেছে ভাই বোন পুলকে ভরা মন,
ডাকিছে, ‘ভাই ভাই’ আঁখিতে আঁখি তুলি।
সখারা এল ছুটে, নয়নে তারা ফুটে,
পরানে কথা উঠে-- বচন গেল ভুলি।
সখীরা হাতে হাতে ভ্রমিছে সাথে সাথে,
দোলায় চড়ি তারা করিছে দোলাদুলি।
শিশুরে লয়ে কোলে জননী এল চলে,
বুকেতে চেপে ধরে বলিছে ‘ঘুমো ঘুমো’।
আনত দু’নয়ানে চাহিয়া মুখপানে
বাছার চাঁদমুখে খেতেছে শত চুমো।
পুলকে পুরে প্রাণ, শিহরে কলেবর,
প্রেমের ডাক শুনি এসেছে চরাচর--
এসেছে রবি শশী,এসেছে কোটি তারা,
ঘুমের শিয়রেতে জাগিয়া থাকে যারা।
পরান পুরে গেল হরষে হল ভোর
জগতে যারা আছে সবাই প্রাণে মোর।প্রভাত হল যেই কী জানি হল এ কী!
আকাশপানে চাই কী জানি কারে দেখি!
প্রভাতবায়ু বহে কী জানি কী যে কহে,
মরমমাঝে মোর কী জানি কী যে হয়!
এসো হে এসো কাছে সখা হে এসো কাছে--
এসো হে ভাই এসো,বোসো হে প্রাণময়।
পুরব-মেঘমুখে পড়েছে রবিরেখা,
অরুণরথচূড়া আধেক যায় দেখা।
তরুণ আলো দেখে পাখির কলরব--
মধুর আহা কিবা মধুর মধু সব!
মধুর মধু আলো, মধুর মধু বায়,
মধুর মধু গানে তটিনী বয়ে যায়!
যে দিকে আঁখি চায় সে দিকে চেয়ে থাকে,
যাহারি দেখা পায় তারেই কাছে ডাকে,
নয়ন ডুবে যায় শিশির-আঁখি-ধারে,
হৃদয় ডুবে যায় হরষ-পারাবারে।
আয় রে আয় বায়ু, যা রে যা প্রাণ নিয়ে,
জগত-মাঝারেতে দে রে তা প্রসারিয়ে।
ভ্রমিবি বনে বনে, যাইবি দিশে দিশে,
সাগরপারে গিয়ে পুরবে যাবি মিশে।
লইবি পথ হতে পাখির কলতান,
যূথীর মৃদুশ্বাস, মালতীমৃদুবাস--
অমনি তারি সাথে যা রে যা নিয়ে প্রাণ।
পাখির গীতধার ফুলের বাসভার
ছড়াবি পথে পথে হরষে হয়ে ভোর,
অমনি তারি সাথে ছড়াবি প্রাণ মোর।
ধরারে ঘিরি ঘিরি কেবলি যাবি বয়ে
ধরার চারি দিকে প্রাণেরে ছড়াইয়ে।পেয়েছি এত প্রাণ যতই করি দান
কিছুতে যেন আর ফুরাতে নারি তারে।
আয় রে মেঘ, আয় বারেক নেমে আয়,
কোমল কোলে তুলে আমারে নিয়ে যা রে!
কনক-পাল তুলে বাতাসে দুলে দুলে
ভাসিতে গেছে সাধ আকাশ-পারাবারে।আকাশ, এসো এসো, ডাকিছ বুঝি ভাই--
গেছি তো তোরি বুকে, আমি তো হেথা নাই।
প্রভাত-আলো-সাথে ছড়ায় প্রাণ মোর,
আমার প্রাণ দিয়ে ভরিব প্রাণ তোর।ওঠো হে ওঠো রবি,আমারে তুলে লও,
অরুণতরী তব পুরবে ছেড়ে দাও,
আকাশ-পারাবার বুঝি হে পার হবে--
আমারে লও তবে, আমারে লও তবে।জগৎ আসে প্রাণে, জগতে যায় প্রাণ
জগতে প্রাণে মিলি গাহিছে একি গান!
কে তুমি মহাজ্ঞানী, কে তুমি মহারাজ,
গরবে হেলা করি হেসো না তুমি আজ।
বারেক চেয়ে দেখো আমার মুখপানে--
উঠেছে মাথা মোর মেঘের মাঝখানে,
আপনি আসি উষা শিয়রে বসি ধীরে
অরুণকর দিয়ে মুকুট দেন শিরে,
নিজের গলা হতে কিরণমালা খুলি
দিতেছে রবি-দেব আমার গলে তুলি!
ধূলির ধূলি আমি রয়েছি ধূলি-’পরে,
জেনেছি ভাই বলে জগৎ চরাচরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/probhat-utshob/
|
3852
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শরতে শিশিরবাতাস লেগে
|
ভক্তিমূলক
|
শরতে শিশিরবাতাস লেগে
জল ভ'রে আসে উদাসি মেঘে।
বরষন তবু হয় না কেন,
ব্যথা নিয়ে চেয়ে রয়েছে যেন। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shorote-shishirbatas-lege/
|
4133
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
তুমি বুঝলেনা
|
প্রেমমূলক
|
তুমি বুঝলেনা আমার মনের কথা
বুঝলেনা আমারা হৃদয়ের কথা।
এই মন তোমার অপেক্ষায় ছিল
এই হৃদয় তোমারই আশায় ছিল
বুকভরা ভালবাসা নিয়ে বাসা বেধেছিল।
কিন্তু তুমি বুঝলে না
বুঝবে, বুঝবে কোন একদিন
যেদিন তোমার মনে অনুশোচনা জাগবে
নতুন রূপে আমাকে পেতে চাইবে
কিন্তু সে’দিন বয়সের ভারে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়বো
মাথার উপরে বাঁশ চাপা পড়বে।
কি হবে বুঝে সে’দিন?
শুধু নতুন করে হৃদয়ে দুঃখ জমাতে পারবে
আমি চাই না তোমার হৃদয় পুড়ে কয়লা হোক
দু’চোখে তোমার অশ্রু ঝড়ুক।
শুধু একটি কথাই বলবো তোমায়
তুমি সুখে থাক, ভাল থাক
তুমি সুখী হলেই আমি সুখী।
কারন আমি কখনও চাইনি
তোমার সেই হাসি মাখা মুখখানি মলিন হোক
চোখের জল গড়িয়ে তোমার বুক ভাসুক।
আমি শুধু আমার সুখের জন্যই তোমাকে চাইনি
চেয়েছি তোমাকে নিয়েই সুখের ঘর বাঁধতে।
আজ তুমি পাশে নেই বলে তোমার সুখের কথা বুঝবোনা?
জান আমি সুখেই আছি
আমার চোখে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি
হৃদয়ে মেঘনার তুমুল ঢেউ।
সেই ঢেউয়ে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি
আর তোমাকে নিয়ে ভাবছি।
তুমি ও হয়তোবা সুখেই আছ
মাঝরাত হলে স্বপ্নে দেখি
তুমি ডানা মেলে পরীর দেশে ঘুরছ
আর পরীদের সাথে কত মজা করছ।
জান আমার তখন কত ভাল লাগে?
তা আমি বলে তোমাকে বুঝাতে পারবোনা।
বল এ পৃথিবীতে কে না চায়?
তার প্রিয়তমার এত সুখ!
আমিও ঠিক সবার মতই
তোমার সুখই চাইবো।
আর এর মাঝেই একদিন হয়তো হারিয়ে যাবো
মেঘের সাথে, যে মেঘ কখনও বৃষ্টি হয় না
শুধু অন্ধকার দিয়ে পৃথিবীকে ঢেকে রাখে চিরদিন।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2196.html
|
5562
|
সুকুমার রায়
|
অবুঝ
|
হাস্যরসাত্মক
|
এক্কেবারেই হয় না ওতে বুদ্ধিশক্তির চালনা।
দেখ্ ত দেখি আজও আমার মনের তেজটি নেভেনি-
এইবার শোন বলছি এখন- কি বলছিলাম ভেবেনি!
বলছিলাম কি, আমি একটা বই লিখেছি কবিতার,
উচু রকম পদ্যে লেখা আগাগোড়াই সবি তার ।
তাইতে আছে “দশমুখে চায়,হ জম করে দশোদর,
শ্মশানঘাটে শষপানি খায় শশব্যস্ত শশধর।”
এই কথাটার অর্থ যে কি ,ভাবছে না কেউ মোটেও-
বুঝছে না কেউ লাভ হবে কি, অর্থ যদি জোটেও।
এরই মধ্যে হাই তুলিস যে? পুতে ফেলব এখনি,
ঘুঘু দেখেই নাচতে শুরু, ফাঁদ ত বাবা দেখনি!
কি বললি তুই? সাতান্নবার শুনেছিস্ ঐ কথাটা?
এমন মিথ্যা কইতে পারিস্ লক্ষ্মীছাড়া বখাটা!
আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধ্যি নেই কো পেরোবার
হিসেব দেব বলেছি এই চোদ্দবার কি তেরোবার।
সাতান্ন তুই গুনতে পারিস? মিথ্যেবাদী! গুনে যা-
ও শ্যামাদাস! পালাস্ কেন? রাগ করিনি, শুনে যা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/344
|
2144
|
মহাদেব সাহা
|
চিরকুট
|
প্রেমমূলক
|
হঠাৎ সেদিন হাতে পেয়ে চিরকুট
নিমিষে সময় হয়ে গেলো যেন লুট;
পার হয়ে বহু বছরের ব্যবধান
কানে ভেসে এলো হারানো দিনের গান।
মনে পড়ে গেলো তোমার প্রতম খাম
আদ্যক্ষরে লেখা ছিলো শুধু নাম,
একটি গোলাপ আঁকা ছিলো এককোণে
র-ফলাবিহীন প্রিয় লেখা পড়ে মনে;
খুব সাধারণ খাতার কাগজে লেখা
লুকিয়ে পড়েছি, হয়নি সেভাবে দেখা
তবু মনে আছে কোথায় কী ছিলো তাতে,
এতোদিন পর চিরকুট পেয়ে হাতে
আবার হঠাৎ কেঁপে ওঠে যেন বুক
নিজেই তখন লুকাই নিজের মুখ;
এই বয়সেও একখানি চিরকুট
তোলে শিহরন, কম্পিত করপুট।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/367
|
5776
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
জল বাড়ছে
|
প্রকৃতিমূলক
|
কেউ জানে না, গোপন- গোপনে জল উঠছে
জল বাড়ছে তিস্তায়, জল বাড়ছে তোর্সা
রাইডাক কালজানি নদীতে
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে, শুকনো নদীগুলো
এখন উন্মাদিনী
নেমে আসছে পাহাড়ী ঢল, ভেসে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত,
ভেঙে পড়ছে চা-বাগান
ডুবছে গ্রাম, চুয়াপাড়া, হাসিমারা, বাকসাদুয়ার
জল বাড়ছে মহানন্দায়, জল বাড়ছে পুনর্ববা
নাগর এবং কালিন্দীতে
ক্রুদ্ধ বিদ্রোহী জল ফুঁসে ফুঁসে উঠছে
ঝাপটা মারছে হাতে হাত মিলিয়ে
ভেঙে পড়ছে ভালুকা, রতুয়া, বলরামপুর, ইংলিশবাজার
ঘুমন্ত গ্রামগুলির ওপর দিয়ে হুড়হুড় করে
এগিয়ে আসছে জলস্রোত
জল বাড়ছে অজয়, মুন্ডেশ্বরী, কেলেঘাই নদীতে
জল বাড়ছে গঙ্গায়, পদ্মায়, যমুনায়, দামোদরে
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে
রোগা জল, কালো জল, দুঃখী জল, ভীতু জল
বুকের পাঁজরার মতো, তানপুরায় টঙ্কারের মতো
উড়ন্ত রুমালের মতো
জলের চঞ্চল খেলা
শত-শত ভ্রমরীর সহসা দিগন্তে উড়ে যাওয়া
অন্তরীক্ষ জুড়ে একটা ঘোর শব্দ- যা সংগীত নয়
ফারাক্কা ডি-ভি-সি’র বাঁধে প্রবল ধাক্কা দিচ্ছে জল
যেন লক্ষ-লক্ষ বাহু-
এবার সব ভেঙে পড়বে
জল উপচে এসে বর্ধমান, আসানসোল, দুর্গাপুরে
শোনা যাচ্ছে সমিমিলিত গর্জন
ওরা আর পিছিয়ে যাবে না
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে
সমস্ত ঘুম ভেঙে দেবে এবার
জল গড়িয়ে এসেছে কলকাতার ময়দানে
চতুর্দিকে থেকে শহরকে ঘিরে দৌড়ে আসছে ওরা
লাল, নীল, সবুজ বিভিন্ন রঙের
পতাকা ওড়ানো অফিসে দুমদাম করে
ধাক্কা দিচ্ছে জল
জল বাড়ছে, জল বাড়ছে
এইমাত্র তারা ঢুকে এলো অফিস পাড়ায়
বিনয় বাদল দীনেশের মতো দুর্দান্ত সাহসী জল
লাফিয়ে উঠে পড়লো রাইটার্স বিল্ডিংস এর বারান্দায়…..
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1834
|
5074
|
শামসুর রাহমান
|
ভোরবেলা চোখ মেলতেই
|
প্রেমমূলক
|
ভোরবেলা চোখ মেলতেই দেখি আকাশে কালো মেঘের
জটলা। মেঘ গলছে বৃষ্টি হয়ে, ঘুমের ঘ্রাণময় মন
ভিজতে থাকে। রাতে স্বপ্নে দেখেছিলাম তুমি এসেছ আমার কাছে
কদম কানন পেরিয়ে সেই নীল যমুনার তীর ঘেঁষে কত দূর থেকে।
জাগরণের এই মুহূর্তে হঠাৎ তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্যে আমার
হৃদয় হলো কদম ফুল। আকাশের ঘনকৃষ্ণ মেঘ আর রাধা-
বিদ্যুৎ দেখি। তারপর নেমে-আসা বৃষ্টিধারার দিকে তাকিয়ে থাকি
নিষ্পলক। কেমন ব্যাকুলতা ঠোঁট তোমার ঘুমের সরোবরে
কোনও ঢেউ জাগাতে পারবে না এখন। তুমি জানবেও না এই মুহূর্তে
তোমাকে দেখার জন্যে আমি কেমন তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠেছি আমার চতুর্দিকে
জেগে-ওঠা মরুভূমিতে। এই যে আমার হৃদয় হাত বাড়িয়ে দিয়েছে
তোমার নিদ্রিত শরীরকে একটু স্পর্শ করার জন্যে, এ-কথা তুমি বুঝবে
কী করে? আমার হৃদয়ের ওষ্ঠ তোমার ঠোঁটে মিলিত হওয়ার উদ্দেশে
পাখি হয়ে উঠতে চাইছে তুমি অনুভব করতে পারবে কি, যখন তোমার
শরীর থেকে ঝরে যাবে ঘুমের কুয়াশা? (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/vorbela-chokh-meltei/
|
1572
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
কেন যাওয়া, কেন আসা
|
প্রেমমূলক
|
অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে ভালবাসা,
পাখিটা সব বুঝতে পারে।
কেন যাওয়া, গিয়েও কেন ফিরে আসা,
নিষেধ কেন চার দুয়ারে।
এবং কেন ফোটাও আলোর পরিভাষা
খাঁচার মধ্যে, অন্ধকারে।
পাখি জানে, ঘরের বাইরে নদী পাহাড়
লুঠ করে নেয় সকল সোনা,
দূরের দর্জি মেঘে বসায় রূপালি পাড়;
দূরে তোমার সায় ছিল না।
কিন্তু এই যে চাবির গোছা, এও তো তোমার
মস্ত বড় বিড়ম্বনা।
পাখিটা সব বুঝতে পারে, চালাক পাখি
তাই আসে ফের খাঁচার ধারে।
আমিও তেমনি রঙ্গমঞ্চে ঘুরতে থাকি
স্বর্গেমর্তে বারে-বারে।
দূরে গিয়েও সেইমতো হাত বাড়িয়ে রাখি
বুকের মধ্যে, অন্ধকারে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1634
|
4080
|
রুদ্র গোস্বামী
|
প্রেমিক হতে গেলে
|
প্রেমমূলক
|
ওই যে ছেলেটাকে দেখছ, পছন্দ মতো ফুল ফুটল না বলে
মাটি থেকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো গাছটাকে?
ছেলেটার ভীষণ জেদ , ও কখনও প্রেমিক হতে পারবে না।এই তো সেদিন কাঁচের জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছিল বলে
কাঁচওয়ালার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে কী বকা!
কাঁচওয়ালাতো থ’!
সাদা কাঁচে রোদ ঢুকবে না এমন আবার হয়!ছেলেটার খুব জেদ, ও শুধু দেখে আর চেনে
বুঝতে জানে না।
প্রেমিক হতে গেলে ঋতু বুঝতে হয়
যেমন কোন ঋতুটার বুক ভরতি বিষ
কোন ঋতুটা ভীষণ একা একা, কোন ঋতুটা প্লাবন
কোন ঋতুতে খুব কৃষ্ণচূড়া ফোটে
ছেলেটা ঋতুই জানে না
ও শুধু দেখে আর চেনে, বুঝতে জানে না।ছেলেটা কখনো প্রেমিক হতে পারবে না
প্রেমিক হতে গেলে গাছ হতে হয়।
ছায়ার মতো শান্ত হতে হয়।
বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
জেদি মানুষেরা কখনও গাছ হতে পছন্দ করে না।
তারা শুধু আকাশ হতে চায়।আরও পড়ুন… রুদ্র গোস্বামীর সকল কবিতা
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4609.html
|
1123
|
জীবনানন্দ দাশ
|
বাংলার মুখ
|
সনেট
|
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতো ব্ড় পাতাটির নিচে বসে আছে
ভোরের দয়েলপাখি - চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশথের করে আছে চুপ;
ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;
মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে
এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপদেখেছিল; বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে -
কৃষ্ণা-দ্বাদশীর জোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায় -
সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,
শ্যামার নরম গান শুনেছিল - একদিন অমরায় গিয়ে
ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়
বাংলার নদ-নদী-ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/banglar-mukh/
|
2787
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
উপকথা
|
চিন্তামূলক
|
মেঘের আড়ালে বেলা কখন যে যায়।
বৃষ্টি পড়ে সারাদিন থামিতে না চায় ।
আর্দ্র - পাখা পাখিগুলি গীতগান গেছে ভুলি ,
নিস্তব্ধে ভিজিছে তরুলতা ।
বসিয়া আঁধার ঘরে বরষার ঝরঝরে
মনে পড়ে কত উপকথা ।
কভু মনে লয় হেন এ - সব কাহিনী যেন
সত্য ছিল নবীন জগতে ।
উড়ন্ত মেঘের মতো ঘটনা ঘটিত কত ,
সংসার উড়িত মনোরথে ।
রাজপুত্র অবহেলে কোন্ দেশে যেত চলে
কত নদী কত সিন্ধু - পার ।
সরোবর - ঘাট আলা, মণি হাতে নাগবালা
বসিয়া বাঁধিত কেশভার ।
সিন্ধুতীরে কত দূরে কোন্ রাক্ষসের পুরে
ঘুমাইত রাজার ঝিয়ারি ।
হাসি তার মণিকণা কেহ তাহা দেখিত না ,
মুকুতা ঢালিত অশ্রুবারি ।
সাত ভাই একত্তরে চাঁপা হয়ে ফুটিত রে ,
এক বোন ফুটিত পারুল ।
সম্ভব কি অসম্ভব একত্রে আছিল সব —
দুটি ভাই সত্য আর ভুল ।
বিশ্ব নাহি ছিল বাঁধা, না ছিল কঠিন বাধা ,
নাহি ছিল বিধির বিধান ,
হাসিকান্না লঘুকায়া শরতের আলোছায়া ,
কেবল সে ছুঁয়ে যেত প্রাণ !
আজি ফুরায়েছে বেলা , জগতের ছেলেখেলা
গেছে আলো - আঁধারের দিন ।
আর তো নাই রে ছুটি , মেঘরাজ্য গেছে টুটি ,
পদে পদে নিয়ম - অধীন ।
মধ্যাহ্নে রবির দাপে বাহিরে কে রবে তাপে,
আলয় গড়িতে সবে চায় ।
যবে হায় প্রাণপণ করে তাহা সমাপন
খেলারই মতন ভেঙে যায় । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/upokotha/
|
2968
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
খেলা (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
প্রকৃতিমূলক
|
পথের ধারে অশথতলে
মেয়েটি খেলা করে ;
আপন-মনে আপনি আছে
সারাটি দিন ধরে ।
উপর-পানে আকাশ শুধু ,
সমুখ-পানে মাঠ ,
শরৎকালে রোদ পড়েছে ,
মধুর পথঘাট ।
দুটি-একটি পথিক চলে ,
গল্প করে , হাসে ।
লজ্জাবতী বধূটি গেল
ছায়াটি নিয়ে পাশে ।
আকাশ-ঘেরা মাঠের ধারে
বিশাল খেলাঘরে
একটি মেয়ে আপন-মনে
কতই খেলা করে ।
মাথার'পরে ছায়া পড়েছে ,
রোদ পড়েছে কোলে ,
পায়ের কাছে একটি লতা
বাতাস পেয়ে দোলে ।
মাঠের থেকে বাছুর আসে ,
দেখে নূতন লোক ,
ঘাড় বেঁকিয়ে চেয়ে থাকে
ড্যাবা ড্যাবা চোখ ।
কাঠবিড়ালি উসুখুসু
আশেপাশে ছোটে ,
শব্দ পেলে লেজটি তুলে
চমক খেয়ে ওঠে ।
মেয়েটি তাই চেয়ে দেখে
কত যে সাধ যায় —
কোমল গায়ে হাত বুলায়ে
চুমো খেতে চায় !
সাধ যেতেছে কাঠবিড়ালি
তুলে নিয়ে বুকে ,
ভেঙে ভেঙে টুকুটুকু
খাবার দেবে মুখে ।
মিষ্টি নামে ডাকবে তারে
গালের কাছে রেখে ,
বুকের মধ্যে রেখে দেবে
আঁচল দিয়ে ঢেকে ।
‘‘ আয় আয়''' ডাকে সে তাই —
করুণ স্বরে কয় ,
‘‘ আমি কিছু বলব না তো
আমায় কেন ভয় ! ''
মাথা তুলে চেয়ে থাকে
উঁচু ডালের পানে —
কাঠবিড়ালি ছুটে পালায়
ব্যথা সে পায় প্রাণে ।
রাখাল ছেলের বাঁশি বাজে
সুদূর তরুছায় ,
খেলতে খেলতে মেয়েটি তাই
খেলা ভুলে যায় ।
তরুর মূলে মাথা রেখে
চেয়ে থাকে পথে ,
না জানি কোন্ পরীর দেশে
ধায় সে মনোরথে ।
একলা কোথায় ঘুরে বেড়ায়
মায়াদ্বীপে গিয়ে —
হেনকালে চাষী আসে
দুটি গোরু নিয়ে ।
শব্দ শুনে কেঁপে ওঠে ,
চমক ভেঙে চায় ।
আঁখি হতে মিলায় মায়া ,
স্বপন টুটে যায় । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khela-kori-o-komol/
|
2505
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
বাংলা শায়েরী - ১২২
|
প্রেমমূলক
|
ব্যর্থ হয়ে যাবে কেন তোমার অমন তীরন্দাজি
লক্ষ্য যখন হাতের মুঠোয়, কে পাল্টাবে তোমার বাজী?
দুঃখ শুধু একটুখানি, তৃষ্ণাময়ী
ভাবলে তুমি কী সহজেই হলে জয়ী
জানলে না-তো কী উৎসাহে মরতে আমি ছিলাম রাজী ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/bangla-shayeri-122/
|
3466
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে
|
ভক্তিমূলক
|
প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে
প্লাবিত করিয়া নিখিল দ্যুলোক-ভূলোকে
তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া ।
দিকে দিকে আজি টুটিয়া সকল বন্ধ
মুরতি ধরিয়া জাগিয়া উঠে আনন্দ ;
জীবন উঠিল নিবিড় সুধায় ভরিয়া ।চেতনা আমার কল্যাণ-রস-সরসে
শতদল-সম ফুটিল পরম হরষে
সব মধু তার চরণে তোমার ধরিয়া ।
নীরব আলোকে জাগিল হৃদয়প্রান্তে
উদার উষার উদয়-অরুণ কান্তি,
অলস আঁখির আবরণ গেল সরিয়া ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/552.html
|
676
|
জয় গোস্বামী
|
তাত লেগে চোখ খুলল
|
চিন্তামূলক
|
তাত লেগে চোখ খুলল। বালিস্তর ঠেলে
বেরিয়ে এলাম। পাহাড় তুষারহীন
গাছেরা দণ্ডায়মান কাঠ
জনপদ লোহা ইট কংক্রিটের কালো স্তূপ মাটি
ফ্যাকাসে হলদেটে সূর্য বিরাট চাকার মতো ছড়িয়ে রয়েছে
৭০০ কোটি বছরের পরের আকাশে
সমস্ত জ্বালানি পুড়ে শেষ।
বালির সমুদ্রখাতে আমি হাত জোড় করে দাঁড়াই
আমার কপালে এসো, ঝরে পড়ো,
রৌদ্র নয়--সূর্য-পোড়া ছাই!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1740
|
2809
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
এই মোর সাধ যেন এ জীবনমাঝে
|
ভক্তিমূলক
|
এই মোর সাধ যেন এ জীবনমাঝে
তব আনন্দ মহাসংগীতে বাজে।
তোমার আকাশ, উদার আলোকধারা,
দ্বার ছোটো দেখে ফেরে না যেন গো তারা,
ছয় ঋতু যেন সহজ নৃত্যে আসে
অন্তরে মোর নিত্য নূতন সাজে।তব আনন্দ আমার অঙ্গে মনে
বাধা যেন নাহি পায় কোনো আবরণে।
তব আনন্দ পরম দুঃখে মম
জ্বলে উঠে যেন পুণ্য আলোকসম,
তব আনন্দ দীনতা চূর্ণ করি’
ফুটে উঠে ফেটে আমার সকল কাজে।১৩ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ei-mor-sadh-jeno-e-jibonmajhe/
|
3349
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পত্র (সম্পাদক সমীপেষু)
|
লিপিমূলক
|
শ্রীমান্ দামু বসু এবং চামু বসু
সম্পাদক সমীপেষু । দামু বোস আর চামু বোসে
কাগজ বেনিয়েছে
বিদ্যেখানা বড্ড ফেনিয়েছে!
(আমার দামু আমার চামু!)
কোথায় গেল বাবা তোমার
মা জননী কই!
সাত-রাজার-ধন মানিক ছেলের
মুখে ফুটছে খই!
(আমার দামু আমার চামু!)
দামু ছিল একরত্তি
চামু তথৈবচ ,
কোথা থেকে এল শিখে
এতই খচমচ!
(আমার দামু আমার চামু!)
দামু বলেন ‘ দাদা আমার '
চামু বলেন ‘ ভাই ',
আমাদের দোঁহাকার মতো
ত্রিভুবনে নাই!
(আমার দামু আমার চামু!)
গায়ে পড়ে গাল পাড়ছে
বাজার সরগরম ,
মেছুনি-সংহিতায় ব্যাখ্যা
হিঁদুর ধরম!
(দামু আমার চামু!)
দামুচন্দ্র অতি হিঁদু
আরো হিঁদু চামু
সঙ্গে সঙ্গে গজায় হিঁদু
রামু বামু শামু
(দামু আমার চামু!)
রব উঠেছে ভারতভূমে
হিঁদু মেলা ভার ,
দামু চামু দেখা দিয়েছেন
ভয় নেইকো আর ।
(ওরে দামু , ওরে চামু!)
নাই বটে গোতম অত্রি
যে যার গেছে সরে ,
হিঁদু দামু চামু এলেন
কাগজ হাতে করে ।
(আহা দামু আহা চামু!)
লিখছে দোঁহে হিঁদুশাস্ত্র
এডিটোরিয়াল ,
দামু বলছে মিথ্যে কথা
চামু দিচ্ছে গাল ।
(হায় দামু হায় চামু!)
এমন হিঁদু মিলবে না রে
সকল হিঁদুর সেরা ,
বোস বংশ আর্যবংশ
সেই বংশের এঁরা!
(বোস দামু বোস চামু!)
কলির শেষে প্রজাপতি
তুলেছিলেন হাই ,
সুড়সুড়িয়ে বেড়িয়ে এলেন
আর্য দুটি ভাই ;
(আর্য দামু চামু!)
দন্ত দিয়ে খুঁড়ে তুলছে
হিঁদু শাস্ত্রের মূল ,
মেলাই কচুর আমদানিতে
বাজার হুলুস্থুল ।
(দামু চামু অবতার!)
মনু বলেন ‘ মনু আমি '
বেদের হল ভেদ ,
দামু চামু শাস্ত্র ছাড়ে ,
রইল মনে খেদ!
(ওরে দামু ওরে চামু!)
মেড়ার মত লড়াই করে
লেজের দিকটা মোটা ,
দাপে কাঁপে থরথর
হিঁদুয়ানির খোঁটা!
(আমার হিঁদু দামু চামু!)
দামু চামু কেঁদে আকুল
কোথায় হিঁদুয়ানি!
ট্যাকে আছে গোঁজ ' যেথায়
সিকি দুয়ানি ।
(থলের মধ্যে হিঁদুয়ানি!)
দামু চামু ফুলে উঠল
হিঁদুয়ানি বেচে ,
হামাগুড়ি ছেড়ে এখন
বেড়ায় নেচে নেচে!
(ষেটের বাছা দামু চামু!)
আদর পেয়ে নাদুস নুদুস
আহার করছে কসে ,
তরিবৎটা শিখলে নাকো
বাপের শিক্ষাদোষে!
(ওরে দামু চামু!)
এসো বাপু কানটি নিয়ে ,
শিখবে সদাচার ,
কানের যদি অভাব থাকে
তবেই নাচার!
(হায় দামু হায় চামু!)
পড়াশুনো করো , ছাড়ো
শাস্ত্র আষাঢ়ে ,
মেজে ঘষে তোল্ রে বাপু
স্বভাব চাষাড়ে ।
(ও দামু ও চামু!)
ভদ্রলোকের মান রেখে চল্
ভদ্র বলবে তোকে ,
মুখ ছুটোলে কুলশীলটা
জেনে ফেলবে লোকে!
(হায় দামু হায় চামু!)
পয়সা চাও তো পয়সা দেব
থাকো সাধুপথে ,
তাবচ্চ শোভতে কেউ কেউ
যাবৎ ন ভাষতে!
(হে দামু হে চামু!) (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/potro-sompadok-somipeshu/
|
729
|
জয় গোস্বামী
|
মেঘ
|
প্রেমমূলক
|
. মেঘ বলতে আপত্তি কি ?
. বেশ, বলতে পরি
. ছাদের ওপর মেঘ দাঁড়াতো
. ফুলপিসিমার বাড়ি
. গ্রীষ্ম ছুটি চলছে তখন
. তখন মানে ? কবে ?
আমার যদি চোদ্দো, মেঘের ষোলো-সতেরো হবে
. ছাদের থেকে হাতছানি দিতো
. ক্যারাম খেলবি ? … আয় …
. সারা দুপুর কাহাঁতক আর ক্যারম খেলা যায়
. সেই জন্যেই জোচ্চুরি হয়
. হ্যাঁ, জোচ্চুরি হতো
আমার যদি চোদ্দো, মেঘের পনেরো-ষোলো মত।. ঘুরিয়ে দিতে জানতো খেলা শক্ত ঘুঁটি পেলে
. জায়গা মত সরিয়ে নিতো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে
শুধু আঙ্গুল ? … বোর্ডের উপর লম্বা ফ্রকের ঝুল
. ঝপাং ফেলে ঘটিয়ে দিতো ঘুঁটির দিক ভুল
. এই এখানে … না ওখানে ..
. এই এইটা না ঐটা
. ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিনিয়ে নিলো ঘুঁটির বাক্সটা
. ঘুঁটির ও সেই প্রথম মরণ
. প্রথম মরা মানে ?
বুঝবে শুধু তারাই … যারা ক্যারাম খেলা জানে।চলেও গেলো কদিন পরে .. মেঘ যেমন যায়
কাঠফাটা রোদ দাঁড়িয়ে পড়ল মেঘের জায়গায়
খেলা শেখাও, খেলা শেখাও, হাপিত্যেস কাক
কলসিতে ঠোঁট ডুবিয়ে ছিলো, জল তো পুড়ে খাক
খাক হওয়া সেই কলসি আবার পরের বছর জলে …
. ভরল কেমন তোমায় ? …
. ধ্যাত্, সেসব কি কেউ বলে ? …. আত্মীয় হয় .. আত্মীয় হয় ? আত্মীয় না ছাই
. সত্যি করে বল এবার, সব জানতে চাই
দু এক ক্লাস এর বয়স বেশি, গ্রীষ্ম ছুটি হলে
ঘুরেও গেছে কয়েক বছর, এই জানে সক্কলে
আজকে দগ্ধ গ্রীষ্ম আমার তোমায় বলতে পারি
মেঘ দেখতাম, ছাদের ঘরে, ফুলপিসিমার বাড়ি।কবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুন. মেঘ বলতে আপত্তি কি ?
. বেশ, বলতে পরি
. ছাদের ওপর মেঘ দাঁড়াতো
. ফুলপিসিমার বাড়ি
. গ্রীষ্ম ছুটি চলছে তখন
. তখন মানে ? কবে ?
আমার যদি চোদ্দো, মেঘের ষোলো-সতেরো হবে
. ছাদের থেকে হাতছানি দিতো
. ক্যারাম খেলবি ? … আয় …
. সারা দুপুর কাহাঁতক আর ক্যারম খেলা যায়
. সেই জন্যেই জোচ্চুরি হয়
. হ্যাঁ, জোচ্চুরি হতো
আমার যদি চোদ্দো, মেঘের পনেরো-ষোলো মত।. ঘুরিয়ে দিতে জানতো খেলা শক্ত ঘুঁটি পেলে
. জায়গা মত সরিয়ে নিতো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে
শুধু আঙ্গুল ? … বোর্ডের উপর লম্বা ফ্রকের ঝুল
. ঝপাং ফেলে ঘটিয়ে দিতো ঘুঁটির দিক ভুল
. এই এখানে … না ওখানে ..
. এই এইটা না ঐটা
. ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিনিয়ে নিলো ঘুঁটির বাক্সটা
. ঘুঁটির ও সেই প্রথম মরণ
. প্রথম মরা মানে ?
বুঝবে শুধু তারাই … যারা ক্যারাম খেলা জানে।চলেও গেলো কদিন পরে .. মেঘ যেমন যায়
কাঠফাটা রোদ দাঁড়িয়ে পড়ল মেঘের জায়গায়
খেলা শেখাও, খেলা শেখাও, হাপিত্যেস কাক
কলসিতে ঠোঁট ডুবিয়ে ছিলো, জল তো পুড়ে খাক
খাক হওয়া সেই কলসি আবার পরের বছর জলে …
. ভরল কেমন তোমায় ? …
. ধ্যাত্, সেসব কি কেউ বলে ? …. আত্মীয় হয় .. আত্মীয় হয় ? আত্মীয় না ছাই
. সত্যি করে বল এবার, সব জানতে চাই
দু এক ক্লাস এর বয়স বেশি, গ্রীষ্ম ছুটি হলে
ঘুরেও গেছে কয়েক বছর, এই জানে সক্কলে
আজকে দগ্ধ গ্রীষ্ম আমার তোমায় বলতে পারি
মেঘ দেখতাম, ছাদের ঘরে, ফুলপিসিমার বাড়ি।কবি জয় গোস্বামীর কবিতার পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%98-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%aa%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a6%bf-joy-goswami/#respond
|
413
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
বাংলার মহাত্মা
|
স্বদেশমূলক
|
আজ না-চাওয়া পথ দিয়ে কে এলে
ওই কংস-কারার দ্বার ঠেলে।
আজ শব-শ্মশানে শিব নাচে ওই ফুল-ফুটানো পা ফেলে॥
আজ প্রেম-দ্বারকায় ডেকেছে বান
মরুভূমে জাগল তুফান,
দিগ্বিদিকে উপচে পড়ে প্রাণ রে!
তুমি জীবন-দুলাল সব লালে-লাল করলে প্রাণের রং ঢেলে॥
ওই শ্রাবস্তি-ঢল আসল নেমে
আজ ভারতের জেরুজালেমে
মুক্তি-পাগল এই প্রেমিকের প্রেমে রে!
ওরে আজ নদীয়ার শ্যাম নিকুঞ্জে রক্ষ-অরি রাম খেলে॥
ওই চরকা-চাকায় ঘর্ঘরঘর
শুনি কাহার আসার খবর,
ঢেউ-দোলাতে দোলে সপ্ত সাগর রে!
ওই পথের ধুলা ডেকেছে আজ সপ্ত কোটি প্রাণ মেলে।
আজ জাত-বিজাতের বিভেদ ঘুচি,
এক হল ভাই বামুন-মুচি,
প্রেম-গঙ্গায় সবাই হল শুচি রে!
আয় এই যমুনায় ঝাঁপ দিবি কে বন্দেমাতরম বলে–
ওরে সব মায়ায় আগুন জ্বেলে॥ (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/banglar-mohatma/
|
3147
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তারা তোমার নামে বাটের মাঝে
|
ভক্তিমূলক
|
তারা তোমার নামে বাটের মাঝে
মাসুল লয় যে ধরি।
দেখি শেষে ঘাটে এসে
নাইকো পারের কড়ি।
তারা তোমার কাজের তানে
নাশ করে গো ধনে প্রাণে,
সামান্য যা আছে আমার
লয় তা অপহরি।আজকে আমি চিনেছি সেই
ছদ্মবেশী-দলে।
তারাও আমায় চিনেছে হায়
শক্তিবিহীন ব’লে।
গোপন মূর্তি ছেড়েছে তাই,
লজ্জা শরম আর কিছু নাই,
দাঁড়িয়েছে আজ মাথা তুলে
পথ অবরোধ করি।বোলপুর, ২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tara-tomar-name-bater-majhe/
|
1517
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
শুধু তোমার জন্য
|
প্রেমমূলক
|
কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও
কতবার যে আমি সে কথা বলিনি
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে জেগে উঠবার জন্য
দরোজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম
আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবেঃ
‘এই ওঠো,
আমি, আ…মি…।‘
আর অমি এ-কী শুনলাম
এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য,
আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য,
আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/shodhu-tomar-jonn/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.