id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
2528
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
স্মৃতিময় শূন্যতার বাঁশি
চিন্তামূলক
স্মৃতির ভিতরে এক শূন্যতাও বসবাস করে যাকে আমি খুঁজে ফিরি মৃতদের কবরে কবরে শ্মশানের পরিত্যাক্ত করোটিতে বাতাসের বাঁশি কান পেতে শুনে হই সে ধ্বনির অর্থের প্রত্যাশীআজ কেউ এসেছিলো আজ কেউ চলে গেছে ফিরে বোধের ভিতরে বোধ আরো কোন বোধের গভীরে ঝিম ধরে থাকে এক মাতালের বুঁদ অনুভব বাহিরের কোলাহল শোনে না সে শূন্যতার শবসময়ের নষ্ট গন্ধ গায়ে মেখে ভিড় হেঁটে চলে --- সে নেশার কড়া মদ আমাকেও সাথী হতে বলে লুটে নিতে বলে যতো বিনষ্টির শরীরী বৈভব আজ কেউ এসেছিলো শূন্য করে দিয়ে গেছে সবভিড় আসে ভিড় যায় অবিরাম তার চলাচল পারিনা সেখানে যেতে শিখে নিতে চতুর কৌশল কেবল শূন্যতা খুঁজি শ্মশানে কি কবরে কবরে করোটির বাঁশি শুনি একা একা খিল দিয়ে ঘরে
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/sritimoy-shunyotar-bashi/
728
জয় গোস্বামী
মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়
প্রেমমূলক
বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো? বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলো বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে? সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে? আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো! স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক। রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই? কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1708
4771
শামসুর রাহমান
তাদের কথা
প্রকৃতিমূলক
বনেদি ঘরের কেউ নই, বলা যায় অত্যন্ত অগণ্য আমি। গোলাপ, রজনীগন্ধা অথবা চামেলি কারো সমতুল্য নই, থাকে না আমার প্রতীক্ষায় কখনো ড্রইংরুমে কোনো ফুলদানি পায়ের নিচেই থাকি সবার এবং পিঁপড়ে, পোকামাকড়েরা মাঝে মাঝে করে খুনসুটি। যখন যুবক যুবতীরা, যাদের সত্তায়, প্রেম রঙধনু হয়ে জ্বলে, যারা ঘাসের ওপর বসে, কথা ফুরুলে তাকায় এ আমার একরত্তি অস্তিত্বের দিকে; বুঝতেই পারো সামান্য ঘাসের ফুল ছাড়া অন্য কিছু নই। অথচ তোমরা আমাকেও নিশ্চিহ্ন করার প্রায় সব আয়োজন শেষ করে এনেছো বস্তুত। খুব হালকা উড়ে উড়ে রঙের বাহার আর খুশি ছড়িয়ে বেড়াই সবখানে। এ আমার খেলা; যদি বলো বাঁচার আনন্দ, মেনে নেবো তর্কহীন। আমাকে ধরার জন্যে খুকুমণিদের দল আর কখনো কখনো খেয়ালী বয়স্ক মজাদার কেউ কেউ নাওয়া খাওয়া ছেড়ে আমার পেছনে ছোটে। আমি যে রঙিন প্রজাপতি এ কথা নিশ্চয় না বললেও চলে; জানি, ঘর, বারান্দা, বাগান, ঝোপঝাড় আর মাঠ থেকে দ্রুত আমার সকল রঙ মুছে ফেলবার সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছো তোমার দেশ-দেশান্তরে ধীমান বন্ধুরা! আমি কারো সাতে পাঁচে নেই, তর তর গাছ বেয়ে উঠি, নেমে আসি ঘাসে বার বার, কখনো বা দালানের ছাদে যাই, রোদ শুকি, ছায়া পান করি আর এদিক ওদিক চোখ রেখে ছোটাছুটি করার খেলায় মেতে থাকি। যতদূর জানি, একবার এক দীর্ঘকায় গৌরবর্ণ কবি আমার মাথাটা চুলকিয়ে দেয়ার বাসনা প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ছোট অসামান্য কবিতায়। তোমরা আমাকে, এই কাঠবিড়ালিকে, পৃথিবীর ঘ্রাণময় গাছের কোটর, রৌদ্রছায়া থেকে মহরুম করবার বলিহারি নেশায় মেতেছো।এই যে আমাকে দ্যাখো, নদী নালায় সাঁতার কাটি, সর্বদা চাঞ্চল্যে ভরপুর, কখনো কখনো মাছরাঙা ছোঁ মেরে, ওপরে তুলে নিয়ে পরিপাটি ভোজ সেরে নিতে চায়। প্রায় প্রত্যহই জেলে জাল ফেলে জীবিকার টানে, তোলে যতক্ষণ পারা যায়, আমরাও বেঁচে থাকবার সাধ নিয়ে করি বসবাস জলজ পুরীতে। আমাদের সহজে সবংশে ধ্বংস করবার জন্যে লেগে গ্যাছো আদাজল খেয়ে; ভাবি, পাবে কি নিস্তার পদ্মা আর মেঘনার, তিস্তার, মিসিসিপি, গঙ্গা, হোয়াংহো ভলগার মৎস্যকুল?ভোরবেলা আমার গানের সুরে ঘুম ভাঙে তোমাদের, আমার রঙিন পাখা থেকে ঝরে কত স্বপ্নের মুকুল অবলীলাক্রমে, আমি এবং আমার ঝাঁক ঝাঁক সঙ্গী মধুর সঙ্গীতে ফাল্গুনকে ডেকে আনি, আশপাশ মুড়ে দিই, পুষ্পল সজ্জায়, অথচ তোমরা আমাদের লুপ্ত করে বিষাক্ত রাসায়নিক পদ্ধতির নিপুণ প্রয়োগে বসন্তকে নিস্তব্ধ করার নাছোড় চক্রান্তে নিয়োজিত।(সকলে মিলে) ঘাসফুল, প্রজাপতি, মাছ, পাখি কি কাঠবিড়ালি, যাকে ইচ্ছে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দাও; কোনো খেদ নেই। এ এক ভীষণ পরিহাস, স্বয়ং তোমরা নিজেরাই নিজেদের নির্মুল করার কী ব্যাপক খর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ইদানীং।   (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tader-kotha/
977
জীবনানন্দ দাশ
কত দিন ঘাসে আর মাঠে
প্রকৃতিমূলক
কত দিন ঘাসে আর মাঠে আমার উৎসাহে প্রাণ কাটে খড় খুঁটি—অশ্বথ্থের শুকনো পাতা চুপে উল্টাই দু’একটা পোকা যদি পাই আমারে চেনো না নাকি: আমি যে চড়াই। কতদিন তোমাদের ভোরের উঠানে দু’-একটা খই আর মুড়কির ঘ্রাণে উড়ে আসি চুপে দেখি কোনো রূপে চাল ডাল ছোলা ক্ষুদ খুঁজে পাই কিনা ঝুরঝুর ক’রে ফুল ফুরায় সজিনা থুপ্‌ থুপ্‌ থুপ্‌ থুপ্‌—একাকী লাফাই ঘুম নাই—চোখে ক্লান্তি নাই - থুপ্ থুপ্ থুপীর মতন দেখিনি কি করি আহরণ চিনি মিঠাইয়ের গুঁড়ি—মিশ্রির কণা ছাতু আটা…কলসীর পাশে বুঝি নাচিছে খঞ্জনা! আকাশে কতটা রোদ তোমাদের এত কি আমোদ। ছোট ছোট ছেলে আর মেয়েদের দল উঠানে কিসের এত ভিড় ছোট ছোট ছেলেমেয়ে—তোমাদের নরম শরীর হাতে তবু পাটকেল—ঢিল ? আমারে তাড়াও কেন? আমি বুঝি দাঁড়কাক চিল! চীনেবাদামের খোসা শূন্য ঠোঙা এই শুধু চাই আমি যে চড়াই। যাই উড়ে যাই জানালার পাশে বোলতার চাক খুব বড়ো হয়ে আসে হলদে বোলতা পাখি, ভাই এসেছি চড়াই এনেছি একটা কুটো আর এক খড় এই নিয়ে ঘরের ভিতর আমিও বানাবো এক ঘর কি বলো তোমরা ভাটের বনের থেকে এলে কি ভোমরা মধু পেলে খুঁজে সারাদিন একটুও ঘুমাইনি,—চোখ আসে বুজে মাকড়শা, অন্ধকারে আছো তুমি মিশে এখানে কার্ণিশে আমারে ঘুমাতে দেবে ভাই আমি যে চড়াই— থাক ঘুম—যাই উড়ে যাই আমি যে চড়াই। ঘুম নাই—চোখে ক্লান্তি নাই কাঠমল্লিকায় কাঁঠালী শাখায় করবীর বনে হিজলের সনে বেগুনের ভিড়ে ঘাসের শরীরে যাই—যাই—যাই চাই—চাই—চাই গাই—গাই—গাই ঘুম নাই—নাই আমি যে চড়াই। তবু একদিন যখন হলুদ তৃণ ভ’রে আছে মাঠে পাতায় শুকনো ডাঁটে ভাসিছে কুয়াশা দেখিলাম খানিকটা রোম মাঠের কিনারে ঘাসে—নির্জন নরম শিশিরে রয়েছে ডুবে—চোখ বুজে আছে কেমন সহিষ্ণু ছায়া মুখের উপরে পড়িয়াছে বহুক্ষণ আমারে থাকিতে বলে এইখানে এই স্থির নীরবতা, এই করুণতা মৃত্যুরে নিঃশেষ ক’রে দেয় নাকি: নক্ষত্রের সাথে কয় নাকি কথা ? এর চেয়ে বেশি রূপ, বেশি রেখা, বেশি করুণতা আর কে দেখাতে পারে আকাশের নীল বুকে—অথবা এ ধুলোর আঁধারে।।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/koto-din-ghash-ar-mathey/
4146
রেদোয়ান মাসুদ
বৃষ্টিতে হই একাকার
প্রেমমূলক
মেঘ জমেছে, আকাশ কাপছে, চারিদিকে অন্ধকার এমন দিনে প্রয়োজন আমার শুধু ভালোবাসার। আয় না তুই বাইরে আয়, বৃষ্টিতে হই একাকার ভিজে ভিজে হয়ে যাই আমরা, দুজন দুজনার। ভালোবাসা বাড়ুক না আজ হোক নিরাকার যেদিকে খুশি সেদিকে যাবো, না মানি কে কোথাকার। আয় না তুই বাইরে আয়, ভেঙ্গে সকল অহংকার দিনটি আজ হয়ে থাকুক না শুধুই ভালোবাসার। বৃষ্টির দিনে শীতল আবহে কেন থাকবে হৃদয়ে হাহাকার ভালোবাসার আবরণে জোড়া দেই সকল অধিকার। চল না আজ দুজন হৃদয়ের খেলায়, হই খেলোয়ার বৃষ্টির জলে পুলিকিত হৃদয়ে আসুক জোয়ার।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4913.html
4206
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ওদিকে যেও না তুমি আর
প্রেমমূলক
বেজে ওঠে দূর টেলিফোনে কাঁটাতার ওদিকে যেও না তুমি আর ওদিকে যেও না তুমি আর। আছো তুমি ভালো! দুইটি বিড়াল শাদা-কালো আছে দুই হাতে কথা হবে তোমাতে-আমাতে। সে-কথা কি আজো মনে পড়ে? বেজে ওঠে দূর টেলিফোনে কাঁটাতার ওদিকে যেও না তুমি আর ওদিকে যেও না তুমি আর।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/odike-jeyo-na-tumi-aar/
1929
প্রেমেন্দ্র মিত্র
জং
প্রেমমূলক
হাওয়া বয় সনসন তারারা কাঁপে । হৃদয়ে কি জং ধরে পুরনো খাপে !কার চুল এলোমেলো কিবা তাতে আসে গেল! কার চোখে কত জল কেবা তা মাপে?দিনগুলো কুড়াতে কত কি তো হারাল ব্যথা কই সেই ফলা-র বিধেঁছে যা ধারালো!হাওয়া বয় সনসন তারারা কাঁপে । জেনে কিবা প্রয়োজন অনেক দূরের বন । রাঙা হলো কুসুমে, না বহ্নিকাপে? হৃদয় মর্চে ধরা পুরনো খাপে!!
http://kobita.banglakosh.com/archives/3993.html
5364
শুভ দাশগুপ্ত
আমিই সেই মেয়ে
মানবতাবাদী
আমিই সেই মেয়ে। বাসে ট্রেনে রাস্তায় আপনি যাকে রোজ দেখেন যার শাড়ি, কপালের টিপ কানের দুল আর পায়ের গোড়ালি আপনি রোজ দেখেন। আর আরও অনেক কিছু দেখতে পাবার স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে যাকে ইচ্ছে মতন দেখেন। আমিই সেই মেয়ে।বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামে দিনের আলোয় যার ছায়া মাড়ানো আপনার ধর্মে নিষিদ্ধ, আর রাতের গভীরে যাকে বস্তি থেকে তুলে আনতে পাইক বরকন্দাজ পাঠান আপনি আর সুসজ্জিত বিছানায় যার জন্য অপেক্ষায় অধীন হয় আপনার রাজকীয় লাম্পট্য আমিই সেই মেয়ে।আমিই সেই মেয়ে- আসামের চাবাগানে ঝুপড়ি কামিন বস্তি থেকে যাকে আপনি নিয়ে যেতে চান সাহেবি বাংলোয় মধ্যরাতে ফায়ার প্লেসের ঝলসে ওঠা আলোয় মদির চোখে দেখতে চান যার অনাবৃত শরীর আমি সেই মেয়ে।রাজস্থানের শুকনো উঠোন থেকে পিপাসার জল আনতে যাকে আপনি পাঠিয়ে দেন দশ মাইল দূরে সরকারি ইঁদারায়- আর কুড়ি মাইল হেঁটে কান্ত বিধ্বস্ত যে রমণী ঘড়া কাঁখে ঘরে ফিরলেই যাকে বসিয়ে দেন চুলার আগুনের সামনে আপনার রুটি বানাতে আমিই সেই মেয়ে।আমিই সেই মেয়ে- যাকে নিয়ে আপনি মগ্ন হতে চান গঙ্গার ধারে কিংবা ভিক্টোরিয়ার সবুজে কিংবা সিনেমা হলের নীল অন্ধকারে, যার চোখে আপনি একে দিতে চান ঝুটা স্বপ্নের কাজল আর ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেটের প্যাকেটের মত যাকে পথের পাশে ছুঁড়ে ফেলে আপনার ফুল সাজানো গাড়ি শুভবিবাহ সুসম্পন্ন করতে ছুটে যায় শহরের পথে- কনে দেখা আলোর গোধুলিতে একা দাঁড়িয়ে থাকা আমিই সেই মেয়ে।আমিই সেই মেয়ে- এমন কি দেবতারাও যাকে ক্ষমা করেন না। অহংকার আর শক্তির দম্ভে যার গর্ভে রেখে যান কুমারীর অপমান আর চোখের জলে কুন্তী হয়ে নদীর জলে বিসর্জন দিতে হয় কর্ণকে। আত্মজকে। আমিই সেই মেয়ে।সংসারে অসময়ের আমিই ভরসা। আমার ছাত্র পড়ানো টাকায় মায়ের ওষুধ কেনা হয়। আমার বাড়তি রোজগারে ভাইয়ের বই কেনা হয়। আমার সমস্ত শরীর প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। কালো আকাশ মাথায় নিয়ে আমি ছাতা হয়ে থাকি। ছাতার নিচে সুখে বাঁচে সংসার।আপনি আপনারা আমার জন্য অনেক করেছেন। সাহিত্যে কাব্যে শাস্ত্রে লোকাচারে আমাকে মা বলে পুজো করেছেন। প্রকৃতি বলে আদিখ্যেতা করেছেন- আর শহর গঞ্জের কানাগলিতে ঠোঁটে রঙ মাখিয়ে কুপি হাতে দাঁড় করিয়েও দিয়েছেন। হ্যা, আমিই সেই মেয়ে। একদিন হয়ত হয়ত একদিন- হয়ত অন্য কোন এক দিন আমার সমস্ত মিথ্যে পোশাক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমিই হয়ে উঠবো সেই অসামান্যা ! খোলা চুল মেঘের মত ঢাকবে আমার খোলা পিঠ। দু চোখে জ্বলবে ভীষণ আগুন। কপাল-ঠিকরে বেরুবে ভয়ঙ্কর তেজরশ্মি। হাতে ঝলসে উঠবে সেই খড়গ। দুপায়ের নুপুরে বেজে উঠবে রণদুন্দভি। নৃশংস অট্টহাসিতে ভরে উঠবে আকাশ। দেবতারাও আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে বলতে থাকবেন মহামেঘপ্রভাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাং কালিকাং দক্ষিণাং মুণ্ডমালা বিভুষিতাং।বীভৎস দাবানলের মত আমি এগোতে থাকবো ! আর আমার এগিয়ে যাবার পথের দুপাশে মুণ্ডহীন অসংখ্য দেহ ছটফট করতে থাকবে- সভ্যতার দেহ প্রগতির দেহ- উন্নতির দেহ- সমাজের দেহহয়ত আমিই সেই মেয়ে ! হয়ত ! হয়ত বা।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4358.html
5826
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রার্থনা
প্রকৃতিমূলক
ঋজু শাল অশ্বত্থের শিকড়ে শিকড়ে যত ক্ষুধা সব তুমি সয়েছ, বসুধা। স্তব্ধ নীল আকাশের দৃশ্য অন্তহীন পটভূমি চক্ষুর সীমানা-প্রান্তে বেঁধে দিয়ে তুমি এঁকে দিলে মাঠ বন বৃষ্টি-মগ্ন নদী-তার দুরাভাস তীর আমাকে নিঃশেষে দিলে তোমার একান্ত মৃদু মাটির শরীর। আমার জন্মের ভোর সূযর্য-শরে আহত মাটিতে প্রত্যহকে ধরে থাকা অবাধ্য মুঠিতে। নিবির ঘুমের মৌন জীবনের অস্পষ্ট আভাসে নিস্পন্দ অন্ধকারে মিশে যায়,-বর্ণ ভেসে আসে, লাগে স্পর্শ-উষ্ণ হাওয়া, দেখি চক্ষু ভ’রে সূর্যমুখীর মতো মেলে আছো সেই এক অপরূপ ভোরে। আমারও আকাঙক্ষা ছিল সূর্যের দোসর হবো তিমির শিকারে সপ্তাশ্ব রথের রশি টেনে নিয়ে দীপ্ত অঙ্গীকারে। অথচ সময়াহত আপাত-বস’র দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত মনে বর্তমান ভীত-চক্ষু মাটিতে ঢেকেছি সঙ্গোপনে। দাঁড়াও ক্ষণিক তুমি স্তব্ধ করে কালচিহ্ন ভবিষ্যত অপার হৃৎস্পন্দে দাও আলো-উৎসের ঝংকার। নির্মম মুহূর্ত ছুঁয়ে বাঁচার বঞ্চনা স’য়ে স’য়ে আমাকে স্বাক্ষর দাও নবীন যৌবন, সমারোহে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/285
1300
তসলিমা নাসরিন
অভিশাপ
প্রেমমূলক
প্রেম আমাকে একেকবারে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে, আমি আর আমি নেই, আমাকে আমি আর চিনতে পারি না, আমার শরীরটাকে পারি না, মনটাকে পারি না। হাঁটাচলাগুলোকে পারি না, দৃষ্টিগুলোকে পারি না, কী রকম যেন অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছি, বন্ধুদের আড্ডায় যখন হাসা উচিত আমি হাসছি না, যখন দুঃখ করা উচিত, করছি না। মনকে কিছুতেই প্রেম থেকে তুলে এনে অন্য কোথাও মুহূর্তের জন্য স্থির করতে পারি না। পুরো জগতটিতে এখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, চাঁদ সুর্যের ঠিক নেই, রাত দিনের ঠিক নেই, আমার জীবন গেছে, জীবন-যাপন গেছে, নাশ হয়ে গেছে। এখন শত্রুর জন্য যদি অভিশাপ দিতে হয় কিছু, আমি আর বলি না যে তোর কুষ্ঠ হোক,তুই মরে যা, তুই মর। এখন বড় স্বচ্ছন্দে এই বলে অভিশাপ দিয়ে দিই —- তুই প্রেমে পড়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1978
4218
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
তোমার হাত
চিন্তামূলক
তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারিনি জানতে এই দেশে বসতি করে শান্তি শান্তি শান্তি তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারিনি জানতে সফলতার দীর্ঘ সিঁড়ি, তার নিচে ভুল-ভ্রান্তি কিছুই জানতে পারিনি আজ, কাল যা-কিছু আনতে তার মাঝে কি থাকতো মিশে সেই আমাদের ক্লান্তির দু-জন দু-হাত জড়িয়ে থাকা–সেই আমাদের শান্তি? তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারিনি জানতে।বেশ কিছুদিন সময় ছিলো–সুদুঃসময় ভাঙতে গড়তে কিছু, গড়নপেটন–তার নামই তো কান্তি? এ সেই নিশ্চেতনের দেশের শুরু না সংক্রান্তি– তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারি নি জানতে।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/tomar-haat/
5571
সুকুমার রায়
আবোল তাবোল
ছড়া
আয়রে ভোলা খেয়াল‐খোলা স্বপনদোলা নাচিয়ে আয়, আয়রে পাগল আবোল তাবোল মত্ত মাদল বাজিয়ে আয়। আয় যেখানে ক্ষ্যাপার গানে নাইকো মানে নাইকো সুর, আয়রে যেথায় উধাও হাওয়ায় মন ভেসে যায় কোন সুদূর।... আয় ক্ষ্যাপা‐মন ঘুচিয়ে বাঁধন জাগিয়ে নাচন তাধিন্ ধিন্, আয় বেয়াড়া সৃষ্টিছাড়া নিয়মহারা হিসাবহীন। আজগুবি চাল বেঠিক বেতাল মাতবি মাতাল রঙ্গেতে— আয়রে তবে ভুলের ভবে অসম্ভবের ছন্দেতে॥
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/abol-tabol/
661
জয় গোস্বামী
ছাদে জড়ভরত সন্তান
রূপক
ছাদে জড়ভরত সন্তান। তার গলা লম্বা হয়ে জল খেতে যায় দূরের পুকুরে রাস্তায়, বাদাড়ে নিশি থেকে থেকে ডাকে শেষরাত্রে, মেঘের আলপথে একটি কঙ্কাল ফেরিওয়ালা হেঁকে যায়: চাই, দই চাই… ছাদে জড়ভরত সন্তান, তার খটখটে তেষ্টায় সঙ্গ দিতে পুকুরে মুখ দিয়ে আমি খাই– জলের বদলে রক্ত–খাই…
https://banglarkobita.com/poem/famous/1735
1791
পূর্ণেন্দু পত্রী
কখন
প্রেমমূলক
সকল দুয়ার খোলা আছে নিমন্ত্রণ-লিপি গাছে গাছে গাঢ় চুম্বনের মত আকাশ নদীর খুব কাছে রোদে ঝলোমলো। কখন আসছ তুমি বলো? বেলা যায়, দেরী হয়ে যায় বাসি ফুল বাগানে শুকায় অন্যান্য সমস্ত লোক আড়ম্বরপূর্ণ হেঁটে যায় দূরের উৎসবে। তোমার কি আরো দেরী হবে? আজ ছিল বড় পুণ্যতিথি সব ঘরে আত্মীয় অতিথি পুরনো কাপড় ছেড়ে নতুন বসনে বনবীথি সেজেছে নবীনা জানি না তা তুমি জান কিনা। একা আছি, শূন্যতায় আছি বুকে ওড়ে বিতৃষ্ণার মাছি মনের সংলাপ থেকে যা কিছু বাসনায় বাছি জলে টলোমলো। কখন আসছ তুমি বলো?আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%96%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%9b-%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%aa%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81-%e0%a6%aa/
4293
শামসুর রাহমান
অত্যন্ত অস্পষ্ট থেকে যায়
চিন্তামূলক
অক্ষর সাজিয়ে আমি অক্ষরের রূপে মজে আছি সারা দিনমান আজো, কত নিদ্রাহীন রাত কাটে প্রতিমা বানিয়ে অক্ষরের। ক্যালেন্ডারময় শাদা দেয়ালের মুখোমুখি বসে থাকি প্রহরে প্রহরে। কখনো হঠাৎ, যেন বিদ্যুতের স্পর্শে বিচলিত, দাঁড়াই সটান ঘুরে। দেখেছি কি হরিণের লাফ, অথবা চিতার দৌড় নাকি বলেভিয়ার জঙ্গলে যে গুয়েভারার কাদামাখা হাত, অস্ত্রহীন, একা, চির অস্তাচলে! বুঝি তাই বহু দেশে এখনো তো হয়নি প্রকৃত সুর্যোদয়; স্বাধীনতা ফাঁসিকাঠে ঝোলে দিকে দিএক, পিঠে চাবুকের কালশিটে দাগ নিয়ে কুঁজো হয়ে পথ হাঁটে আহত বিবেক।অক্ষর সাজিয়ে আমি, মনে হয়, রৌদেজ্যোৎস্নাময় স্বাস্থ্যনিবাসের মতো কি একটা স্থাপন করেছি আমার নিজের বাম পাশে। যে যাই বলুক আজ এমন কন্টকময় পথে সোজা শিরদাঁড়া আর যিশুর চোখের মতো গৌরবের আভাই সম্বল আমার এবং দ্রুত শ্মশানের আগুন নেভাই।অনেক সুন্দর নৌকো গহীন নদীর চোরা টানে দূর নিরুদ্দেশে ভেসে যায়, দেখেছি কি দেয়ালের শূন্য বুকে? মাঝে-মধ্যে নাগলতা আমাকে জড়িয়ে ধরে আর অন্ধকারে স্বপ্নের মতই নিরিবিলি আলখাল্লা কম্পমান। ‘আয় তুই আমার হৃদয়ে’ ব’লে গাঢ় কণ্ঠস্বর আমাকে স্বপ্নের শুভ্রতায় ডাকেন মৌলানা রুমি নাকি হো চি মিন, বোঝা দায়; স্বপ্নে কিছু স্পষ্ট কিছু অত্যন্ত অস্পষ্ট থেকে যায়।   (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ottonto-osposto-theke-jai/
5897
সুবোধ সরকার
বড়লোক গরিবলোক
মানবতাবাদী
বড়লোক কখনও ভোরের আলো দেখতে পায় না গরিব তেমনি “সুপ্রভাত” বলে না কাউকে | বড়লোকের মেয়েরা গায়ে রোদ লাগাতে মরিশাস যায় গরিবের উঠোন রোদে পুড়ে নৌকো হয়ে থাকে | বড়লোকেরা রাত বারোটার আগে ঘুমোতে পারে না খালি পেটে ছোটলোকেরা ঘুমিয়ে পড়ে সন্ধে সাতটায় | ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে খালি পেটের ভেতর একটা বস্তি ভরা পেটের ভেতর একটা চোদ্দোতলা বাড়ি | বস্তি বলছে চোদ্দোতলাকে, তুই ভেঙে পড়, তোর দরজা খুলে বস্তিতে লাগাব চোদ্দোতলা বলছে, “তুই পুড়ে যা, তোর উপর চোদ্দোতলা তুলবো” |
http://kobita.banglakosh.com/archives/4187.html
494
কাজী নজরুল ইসলাম
রুবাইয়াত-ই- হাফিজ- ৮
ভক্তিমূলক
তোমার পথে মোর চেয়ে কেউ, সর্বহারা নাই কো, প্রিয়! আমার চেয়ে তোমার কাছে, নাই সখি, কেউ অনাত্নীয়! তোমার বেণীর শৃংখলে গো নিত্য আমি বন্দী কেন? মোর চেয়ে কেউ হয়নি পাগল, পিয়ে তোমার প্রেম- অমিয়!!
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rubaiyat-e-hafiz-8/
4103
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
তুমি বরং কুকুর পোষো
প্রেমমূলক
তুমি বরং কুকুর পোষো, প্রভুভক্ত খুনসুটিতে কাটবে তোমার নিবিড় সময়, তোর জন্য বিড়ালই ঠিক, বরং তুমি বিড়ালই পোষো খাঁটি জিনিস চিনতে তোমার ভুল হয়ে যায় খুঁজে এবার পেয়েছ ঠিক দিক ঠিকানা লক্ষী সোনা, এখন তুমি বিড়াল এবং কুকুর পোষো শুকরগুলো তোমার সাথে খাপ খেয়ে যায়, কাদা ঘাটায় দক্ষতা বেশ সমান সমান। ঘাটাঘাটির ঘনঘটায় তোমাকে খুব তৃপ্ত দেখি, তুমি বরং ওই পুকুরেই নাইতে নামো উংক পাবে, জলও পাবে। চুল ভেজারও তেমন কোন আশঙ্কা নেই, ইচ্ছেমত যেমন খুশি নাইতে পারো। ঘোলা পানির আড়াল পেলে কে আর পাবে তোমার দেখা। মাছ শিকারেও নামতে পারো তুমি বরং ঘোলা পানির মাছ শিকারে দেখাও তোমার গভীর মেধা। তুমি তোমার স্বভাব গাছে দাঁড়িয়ে পড়ো নিরিবিলির স্বপ্ন নিয়ে আর কতকাল? শুধু শুধুই মগজে এক মোহন ব্যধি তুমি বরং কুকুর পোষো, বিড়াল পোষো, কুকুর খুবই প্রভুভক্ত এবং বিড়াল আদরপ্রিয় তোমার জন্য এমন সামঞ্জস্য তুমি কোথায় পাবে ?
https://banglarkobita.com/poem/famous/316
4257
শঙ্খ ঘোষ
ছুটি
চিন্তামূলক
হয়তো এসেছিল | কিন্তু আমি দেখিনি | এখন কি সে অনেক দূরে চ’লে গেছে? যাব | যাব | যাব | সব তো ঠিক করাই আছে | এখন কেবল বিদায় নেওয়া, সবার দিকে চোখ, যাবার বেলায় প্রণাম, প্রণাম! কী নাম? আমার কোনো নাম তো নেই, নৌকো বাঁধা আছে দুটি, দুরে সবাই জাল ফেলেছে সমুদ্রে—
https://banglarkobita.com/poem/famous/1125
4983
শামসুর রাহমান
বন্দনীয়
প্রেমমূলক
আমার নিকটে এসে পুনরায় দূরে চলে গেলে। যাবার সময় তুমি আমার কথার প্রতি কান দাওনি, অথচ আমি আলো-আঁধারির কণ্ঠস্বরে হৃদয়ের কিছু কথা তোমাকেই বলতে চেয়েছি।আমার দু’হাতে কারা হাতকড়া দিয়েছে পরিয়ে, আমি হাঁটলেই ঝন্‌ঝনিয়ে ওঠে লোহার শেকল বার বার-এই অজুহাতে তুমি পরিহার করো আমাকে এখন, জানি কারাগারে জমে না প্রণয়। তবুও তোমাকে নিত্য গোলাপ পাঠাই, ভিলানেল লিখে যাই তোমার উদ্দেশ্যে তাজা হৃদরক্ত দিয়ে। প্রতিষ্ঠালোলুপ সব সমাজসেবক স্তব করে শাসকের; আমি আজও তোমাকেই বন্দনীয় মানি।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bondoniyo/
3911
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সত্য
সনেট
১ ভয়ে ভয়ে ভ্রমিতেছি মানবের মাঝে হৃদয়ের আলোটুকু নিবে গেছে ব’লে ! কে কী বলে তাই শুনে মরিতেছি লাজে , কী হয় কী হয় ভেবে ভয়ে প্রাণ দোলে ! ‘ আলো’ ‘আলো’ খুঁজে মরি পরের নয়নে , ‘ আলো’ ‘আলো’ খুঁজে খুঁজে কাঁদি পথে পথে , অবশেষে শুয়ে পড়ি ধূলির শয়নে — ভয় হয় এক পদ অগ্রসর হতে ! বজ্রের আলোক দিয়ে ভাঙো অন্ধকার , হৃদি যদি ভেঙে যায় সেও তবু ভালো । যে গৃহে জানালা নাই সে তো কারাগার — ভেঙে ফেলো , আসিবেক স্বরগের আলো । হায় হায় কোথা সেই অখিলের জ্যোতি ! চলিব সরল পথে অশঙ্কিতগতি !২ জ্বালায়ে আঁধার শূন্যে কোটি রবিশশী দাঁড়ায়ে রয়েছ একা অসীমসুন্দর । সুগভীর শান্ত নেত্র রয়েছে বিকশি , চিরস্থির শুভ্র হাসি , প্রসন্ন অধর । আনন্দে আঁধার মরে চরণ পরশি , লাজ ভয় লাজে ভয়ে মিলাইয়া যায় — আপন মহিমা হেরি আপনি হরষি চরাচর শির তুলি তোমাপানে চায় । আমার হৃদয়দীপ আঁধার হেথায় , ধূলি হতে তুলি এরে দাও জ্বালাইয়া — ওই ধ্রুবতারাখানি রেখেছ যেথায় সেই গগনের প্রান্তে রাখো ঝুলাইয়া । চিরদিন জেগে রবে নিবিবে না আর , চিরদিন দেখাইবে আঁধারের পার ।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sottyo/
5585
সুকুমার রায়
কাজের লোক
হাস্যরসাত্মক
প্রথম। বাঃ - আমার নাম 'বাঃ', বসে থাকি তোফা তুলে পায়ের উপর পা! লেখাপড়ার ধার ধারিনে , বছর ভরে ছুটি, হেসে খেলে আরাম ক'রে দুশো মজা লুটি। কারে কবে কেয়ার করি , কিসের করি ডর? কাজের নামে কম্প দিয়ে গায়ে আসে জ্বর। গাধার মতন খাটিস্ তোরা মুখটা করে চুন- আহাম্মুকি কান্ড দেখে হেসেই আমি খুন।                    সকলে। আস্ত একটি গাধা তুমি স্পষ্ট গেল দেখা, হাস্‌ছ যত, কান্না তত কপালেতে লেখা।                    দ্বিতীয়। 'যদি' বলে ডাকে আমায় নামটি আমার যদি - আশায় আশায় বসে থাকি হেলনা দিয়ে গদি। সব কাজেতে থাকতে যদি খেলার মত মজা, লেখাপড়া হত যদি জলের মত সোজা - স্যান্ডো সমান ষন্ডা হতাম যদি গায়ের জোরে, প্রশংসাতে আকাশ পাতাল যদি যেত ভরে - উঠে পড়ে গেলে যেতাম বাজে তর্ক ফেলে। করতে পারি সবি - যদি সহজ উপায় মেলে।                    সকলে। হাতের কাছে সুযোগ, তবু যদির আশায় বসে নিজের মাথা খাচ্ছ বাপু নিজের বুদ্ধি দোষে                    তৃতীয়। আমার নাম 'বটে' আমি সদাই আছি চটে- কট্‌মটিয়ে তাকাই যখন, সবাই পালায় ছুটে। চশমা পরে বিচার ক'রে চিরে দেখাই চুল- উঠ্‌তে বস্‌তে কচ্ছে সবাই হাজার গন্ডা ভুল। আমার চোখে ধুলো দেবে সাধ্যি আছে কার? ধমক শুনে ভূতের বাবা হচ্ছে পগার পার। হাসছ? বটে ভাবছ বুঝি মস্ত তুমি লোক, একটি আমার ভেংচি খেলে উল্টে যাবে চোখ।                    সকলে। দিচ্ছ গালি, লোকের তাতে কিবা এল গেল? আকাশেতে থুতু ছুঁড়ে - নিজেই গায়েই ফেল।                    চতুর্থ। আমার নাম 'কিন্তু' আমায় 'কিন্তু' বলে ডাকে, সকল কাজে একটা কিছু গলদ লেগে থাকে। দমটা কাজে লাগি কিন্তু আটটা করি মাটি, ষোল আনা কথায় কিন্তু সিকি মাত্র খাঁটি। লম্ফ ঝম্ফবহুৎ কিন্তু কাজের নাইকো ছিরি- ফোস করে যাই তেড়ে - আবার ল্যাজ গুটিয়ে ফিরি। পাঁচটা জিনিস গড়তে গেলে দশটা ভেঙে চুর - বল্ দেখি ভাই কেমন আমি সাবাস বাহাদুর!                    সকলে। উচিত তোমায় বেধে রাখা নাকে দিয়ে দড়ি, বেগারখাটা পশুকাজের মূল্য কানাকড়ি।                    পঞ্চম। আমার নাম 'তবু' তোমার কেউ কি আময়ি চেনো? দেখতে ছোট তবু আমার সাহস আছে জেনো। এতটুকু মানুষ তবু দ্বিধা নাইকো মনে, যে কাজেতেই লাগি আমি খাটি প্রাণপণে। এম্নি আমার জেদ, যখন অঙ্ক নিয়ে বসি, একুশ বারে না হয় যদি বাইশ বারে কষি। হাজার আসুক বাধা তবু উৎসাহ না কমে, হাজার লোকে চোখ রাঙালে তবু না যাই দ'মে।                    সকলে। নিস্কম্মারা গেল কোথা,পালাল কোন দেশে? কাজের মানুষ কারে বলে দেখুন এখন এসে। হেসে খেলে, শুয়ে বসে কত সময় যায়, সময়টা যে কাজে লাগায়,চালাক বলে তায়।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/kajer-lok/
5134
শামসুর রাহমান
ম্যাজিক লন্ঠন
প্রেমমূলক
কোথায় তোমার উৎস কবিতা হে কবিতা আমার? কোন্‌ নেই-দেশ থেকে অকস্মাৎ তুমি, পৃথিবীর কোন্‌ প্রান্ত থেকে আসো? স্যীন্‌ কিংবা রাইনের তীর অথবা টেমস্‌ ভল্গা, মিসিসিপি নীল নদ-কার তরঙ্গে নেচেছো তুমি? সত্য তুমি কেটেছো সাঁতার সেসব নদীতে আর নীল চঞ্চু রেখেছো নিবিড় ঢেউয়ে ঢেউয়ে, তবু মেঘনা নদীর তীরে নীড় তোমার সর্বদা নক্ষত্রের মতো জ্বলে দুর্নিবার।যখন তোমার উৎস খুঁজি, কোরবানীর ম্রিয়মাণ পশুর ভড়কে-যাওয়া চোখ, ডালিমের ফেটে-পড়া বুক, কবেকার শান্ত প্রান্তরের খোড়ো ঘর, ঝরা শৈশব, খঞ্জের যানে মেঘে মেঘে ভ্রমণ, নিঝুম বন মনে পড়ে বারংবার। নও তুমি দীপ্র বাতিঘর, এ বিরান উদাস আঁধারে তুমি কম্পমান ম্যাজিক লন্ঠন।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/majik-lomthon/
1086
জীবনানন্দ দাশ
পটভূমির
প্রেমমূলক
পটভূমির ভিতরে গিয়ে কবে তোমার দেখেছিলাম আমি দশ-পনেরো বছর আগে;—সময় তখন তোমার চুলে কালো মেঘের ভিতর লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালালো তোমার নিশিত নারীমুখের;—জানো তো অন্তর্যামী। তোমার মুখঃ চারিদিকে অন্ধকারে জলের কোলহল, কোথাও কোনো বেলাভূমির নিয়ন্তা নেই,—গভীর বাতাসে তবুও সব রণক্লান্ত অবসন্ন নাবিক ফিরে আসে;তারা যুবা, তারা মৃত; মৃত্যু অনেক পরিশ্রমের ফল। সময় কোথাও নিবারিত হয় না, তবু, তোমার মুখের পথে আজো তাকে থামিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছ, নারি,- হয়তো ভোরে আমরা সবাই মানুষ ছিলাম, তারি নিদর্শনের সূর্যবলয় আজকের এই অন্ধ জগতে। চারিদিকে অলীক সাগর—জ্যাসন ওডিসিয়ুস ফিনিশিয় সার্থবাহের অধীর আলো,—ধর্মাশোকের নিজের তো নয়, আপতিতকাল আমরা আজো বহন ক’রে, সকল কঠিন সমুদ্রে প্রবাল মুটে তোমার চোখের বিষাদ ভৎর্সনা…প্রেম নিভিয়ে দিলাম, প্রিয়।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/potovumiir/
5726
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আত্মা
চিন্তামূলক
প্রতিটি ট্রেনের সঙ্গে আমার চতুর্থভাগ আত্মা ছুটে যায় প্রতিটি আত্মার সঙ্গে আমার নিজেস্ব ট্রেন অসময় নিয়ে খেলা করে। আলোর দোকানে আমি হাজার হাজার বাতি সজিয়ে রেখেছি নষ্ট-আলো সঞ্জীবনী শিক্ষা করে আমার চঞ্চল অহমিকা। জাদুঘরে অসংখ্য ঘড়িতে আমি অসংখ্য সময় লিখে রাখি নারীর ঊরুর কাছে আমার পিঁপড়ে দূত ঘোরেফেরে আমারই ইঙ্গিতে তারা চুম্বনের আগে কেঁপে ওঠে। এইরূপ কর্মব্যস্ত জীবনের ভিতরে-বাইরেডুবে থেকে বিকেলের অমসৃণ বাতাসে হঠাৎ আমি দেখি আমার আত্মার একাটা কুচো টুকরো আজও কোনো কাজ পায়নি।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1849
695
জয় গোস্বামী
পাখিটি আমাকে ডেকে
প্রেমমূলক
পাখিটি আমাকে ডেকে বলল তার ডানার জখম বলল যে কীভাবে তার পালকে সংসার পোড়া ছ্যাঁকা কীভাবে পায়ের মধ্যে ফুটো করে ঢুকে এল চেন ঠোঁট দিয়ে খাঁচার শিক কাটতে গিয়ে ঠোঁটের জখম দ্যাখালো, বাইরে থেকে আমি নিজ ওষ্ঠ থেকে ওম দিলাম, খাঁচার দরজা খুলে তাকে “বাঁচবিযদি আয়’, বলে বার করে এনে রাখলাম আর একটা খাঁচায় সেখানে দুজনে বন্দি পরস্পর দোষারোপ করি, দোষারোপ করতে করতে বৃষ্টি আসে, সন্ধে হয়ে যায় …
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/pakhiti-amake-dake/
1279
জীবনানন্দ দাশ
হে হৃদয়
চিন্তামূলক
হে হৃদয় নিস্তব্ধতা? চারিদিকে মৃত সব অরণ্যেরা বুঝি? মাথার ওপরে চাঁদ চলছে কেবলি মেঘ কেটে পথ খুঁজে-পেঁচার পাখায় জোনাকির গায়ে ঘাসের ওপরে কী যে শিশিরের মতো ধূসরতা দীপ্ত হয় না কিছু? ধ্বনিও হয় না আর?হলুদ দু’-ঠ্যাং তুলে নেচে রোগা শালিখের মতো যেন কথা ব’লে চলে তবুও জীবনঃ বয়স তোমার কত? চল্লিশ বছর হল? প্রণয়ের পালা ঢের এল গেল- হল না মিলন?পর্বতের পথে-পথে রৌদ্রে রক্তে অক্লান্ত শফরে খচ্চরে পিঠে কারা চড়ে? পতঞ্জলি এসে ব’লে দেবে প্রভেদ কী যারা শুধু ব’সে থেকে ব্যথা পায় মৃত্যর গহ্বরে মুখে রক্ত তুলে যারা খচ্চরের পিঠ থেকে পড়ে যায়?মৃত সব অরণ্যেরা; আমার এ-জীবনের মৃত অরণ্যেরা বুঝি বলেঃ কেন যাও পৃথিবীর রৌদ্র কোলাহলে নিখিল বিষের ভোক্তা নীলকন্ঠ আকাশের নীচে কেন চ’লে যেতে চাও মিছে; কোথাও পাবে না কিছু; মৃত্যুই অনন্ত শান্তি হয়ে অন্তহীন অন্ধকারে আছে লীন সব অরণ্যের কাছে। আমি তবু বলিঃ এখনও যে-ক’টা দিন বেঁচে আছি সূর্যে-সূর্যে চলি, দেখা যাক পৃথিবীর ঘাস সৃষ্টির বিষের বিন্দু আর নিষ্পেষিত মনুষ্যতার আঁধারের থেকে আনে কী ক’রে যে মহা-নীলাকাশ, ভাবা যাক—ভাবা যাক- ইতিহাস খুঁড়লাই রাশি-রাশি দুঃখের খনি ভেদ ক’রে শোনা যায় শুশ্রুষার মতো শত-শত শত জলঝর্ণার ধ্বনি।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/hey-hridoy/
4274
শঙ্খ ঘোষ
শূন্যের ভিতরে ঢেঊ
চিন্তামূলক
বলিনি কখনো? আমি তো ভেবেছি বলা হয়ে গেছে কবে। এভাবে নিথর এসে দাঁড়ানো তোমার সামনে সেই এক বলা কেননা নীরব এই শরীরের চেয়ে আরো বড়ো কোনো ভাষা নেই কেননা শরীর তার দেহহীন উত্থানে জেগে যতদূর মুছে নিতে জানে দীর্ঘ চরাচর তার চেয়ে আর কোনো দীর্ঘতর যবনিকা নেই। কেননা পড়ন্ত ফুল, চিতার রুপালি ছাই, ধাবমান শেষ ট্রাম সকলেই চেয়েছে আশ্রয় সেকথা বলিনি? তবে কী ভাবে তাকাল এতদিন জলের কিনারে নিচু জবা? শুন্যতাই জানো শুধু? শুন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সেকথা জানো না?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1132
1622
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
নিজের কাছে প্রতিশ্রুতি
নীতিমূলক
বলেছিলে, দেবেই দেবে। আজ না হোক তো কাল, না হোক তো পরশু দেবে। আলোর পাখি এনে দেবে! তবে কেন এখন তোমার এই অবস্থা? কথা রাখো, উঠে দাঁড়াও, আবার দীর্ঘ বাহু বাড়াও আলোর দিকে। আকন্দ ফুল মুখে রেখে ধুলোর মধ্যে শুয়ে আছ, এই কি তোমার কথা রাখা? আমি তোমার দুই জানুতে নতুন শক্তি ঢেলে দিলাম, আবার তুমি উঠে দাঁড়াও। আমি তোমার ওষ্ঠ থেকে শুষে নিলাম সমস্ত বিষ, আবার তুমি বাহু বাড়াও আলোর দিকে। রাখো তোমার প্রতিশ্রুতি। যে-দিকে চাই, দৃশ্যগুলি এখন একটু ঝাপসা দেখায়; জানলা তবু খোলা রাখি। যে-দিকে যাই, নদীর রেখা একটু-একটু পিছিয়ে যায়। বুঝতে পারি, অন্তরিক্ষে জলে-স্থলে পাকিয়ে উঠছে একটা-কোনো ষড়যন্ত্র। বুঝতে পারি, কেউ উচাটন-মন্ত্র পড়ছে কোনোখানে। তাই আগুনের জিহ্বা এখন লাফ দিয়ে ছোঁয় আকাশটাকে। একটা-কিছু ব্যাপার চলছে তলে-তলে, তাই বাড়িঘর খাঁখাঁ শূন্য, শুকিয়ে যাচ্ছে তরুলতা। বুঝতে পারি ক্রমেই এখন পায়ের তলায় বসে যাচ্ছে আল্‌গা মাটি, ধসে যাচ্ছে রাস্তা-জমি শহরে আর মফস্বলে। তাই বলে কি ধুলোর মধ্যে শয্যা নেব? বন্ধ করব চক্ষু আমার? এখন আরও বেশিরকম টান্‌-বাঁধনে দাঁড়িয়ে থাকি। দৃষ্টি ঝাপসা, তবুও জানি, চোখের সামনে আজ না হোক তো কাল, না হোক তো পরশু আবার ফুটে উঠবে আলোর পাখি। বলেছিলে, দেবেই দেবে। যেমন করেই পারো, তুমি আলোর পাখি এনে দেবে। তবে কেন ধুলোর মধ্যে শুয়ে আছ? আবার তুমি উঠে দাঁড়াও। তবে কেন আনন্দ ফুল মুখে তোমার? আবার দীর্ঘ বাহু বাড়াও আলোর দিকে। আজ না হোক তো কাল, না হোক তো পরশু তুমি পাখিটাকে ধরে আনবে, কথা ছিল। এই কি তোমার কথা রাখা? উঠে দাঁড়াও, রাখো তোমার প্রতিশ্রুতি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1640
2562
রফিক আজাদ
ভাত দে হারামজাদা
মানবতাবাদী
ভীষণ ক্ষুধার্ত আছিঃ উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে অনুভূত হতে থাকে- প্রতিপলে- সর্বগ্রাসী ক্ষুধা অনাবৃষ্টি- যেমন চৈত্রের শষ্যক্ষেত্রে- জ্বেলে দ্যায় প্রভুত দাহন- তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোন দাবী অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়ঃ বাড়ি, গাড়ি, টাকা কড়ি- কারো বা খ্যাতির লোভ আছে আমার সামান্য দাবী পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর- ভাত চাই- এই চাওয়া সরাসরি- ঠান্ডা বা গরম সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চাল হ’লে কোনো ক্ষতি নেই- মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাইঃ দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য-সব দাবী; অযৌক্তিক লোভ নেই, এমনকি নেই যৌন ক্ষুধা চাইনিতোঃ নাভি নিম্নে পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক; যে চায় সে নিয়ে যাক- যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে দাও জেনে রাখোঃ আমার ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই। যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘ’টে যাবে ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন কানুন- সম্মুখে যা কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমেঃ থাকবে না কিছু বাকি- চলে যাবে হা ভাতের গ্রাসে। যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে ধরো পেয়ে যাই- রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে। সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে। দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছপালা, নদী-নালা গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব প্রধান নারী উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/356
5292
শামসুর রাহমান
সে লিখবে বলে
সনেট
সে লিখবে বলে বসে আছে নির্মল সুফীর মতো গভীর রাত্তিরে। চৌদিকের চেঁচামেচি গেছে থেমে অনেক আগেই, ক্রুশ হ’য়ে প্রকাশিত তার ব্রত অন্তরালে; সে লিখবে বলে আকাশ এসেছে নেমে ছিটিয়ে নক্ষত্র কিছু। গাছপালা জানায় কুর্নিশ, নিশীথের পক্ষীকুল ডানা থেকে ঘুম ঝেড়ে ঝুড়ে জুড়ে দেয় গান, সে লিখবে বলে অলীকে উষ্ণীষ মাথায় জ্বলছে তার, গূঢ় মন্ত্রধ্বনি জাগে মেধা জুড়ে। ধ্যান মানে এক ধরনের যাদুভাষ্য, জন্মান্তর বলা চলে, সে তার জানে বলেই প্রতীক্ষা করে খুব ধৈর্য ধরে বিভিন্ন প্রহরে; যদি কোনোদিন ভুল হয়ে যায় তার আরাধনায় বিভ্রমে সে প্রথম অনুতাপে আরো বেশি সত্তার গভীরে দেয় ডুব, অনন্তর ভেসে ওঠে হাতে নিয়ে অনন্তের ফুল।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/se-likhbe-bole/
4096
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
কথা ছিলো সুবিনয়
মানবতাবাদী
কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত, রাখালেরা পুনর্বার বাশিঁতে আঙুল রেখে রাখালিয়া বাজাবে বিশদ। কথা ছিলো বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বোসবে না, চিত্রর তরুন হরিনেরা সহসাই হয়ে উঠবে না রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট। কথা ছিলো , শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের নাম। নদীর চুলের রেখা ধ‌‌রে হেঁটে হেঁটে যাবে এক মগ্ন ভগীরথ, কথা ছিলো, কথা ছিলো আঙুর ছোঁবো না কোনোদিন। অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল, রাখালের হাত দুটি বড় বেশি শীর্ণ আর ক্ষীণ, বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে উঠে নাই- কথা ছিলো, চিল-ডাকা নদীর কিনারে একদিন ফিরে যাবো। একদিন বট বিরিক্ষির ছায়ার নিচে জড়ো হবে সহজিয়া বাউলেরা, তাদের মায়াবী আঙুরের টোকা ঢেউ তুলবে একতারায়- একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধরে বোলবেঃ উদ্ধার পেয়েছি। কথা ছিলো, ভাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরন্য, জমিন, আমাদের পাহাড় ও সমুদ্রের আদিগন্ত উপকূল- আজন্ম এ-জলাভূমি খঁজে পাবে প্রকৃত সীমানা তার। কথা ছিলো, আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে। অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের ধারাবাহিকতা কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ। মাতৃভূমি-খন্ডিত দেহের পরে তার থাবা বসিয়েছে আর্য বণিকের হাত। আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা, প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানারঙা পতাকা ওড়ায়। কথা ছিলো ‌’আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন’, আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ। অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে। জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি, আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন।
https://banglarkobita.com/poem/famous/323
68
আবিদ আনোয়ার
কোথায় বাপু যাই
ব্যঙ্গাত্মক
রুনুঝুনুর মেজোচাচা এবং তাদের চাচী আজকে যদি ঢাকায় তবে কালকে থাকেন রাচী, সিঙ্গাপুরে কাশেন তারা কাশ্মীরে দেন হাঁচি।বুক-পকেটে পাউন্ড-ডলার ব্যাক-পকেটে দিনার, মস্কো থেকে নাস্তা সেরে লন্ডনে খান ডিনার।জাপান ব’সে চা পান ক’রে বলেন তুলে হাই: এই পৃথিবী এত্তো ছোট, কোথায় বাপু যাই!
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/kothay-bapu-jai/
3735
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুরগি পাখির ‘পরে
ছড়া
মুরগি পাখির ‘পরে অন্তরে টান তার, জীবে তার দয়া আছে এই তো প্রমাণ তার। বিড়াল চাতুরী ক’রে পাছে পাখি নেয় ধরে এই ভয়ে সেই দিকে সদা আছে কান তার– শেয়ালের খলতায় ব্যথা পায় প্রাণ তার।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/murgi-pakhir-pore/
3078
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মদিন আসে বারে বারে
চিন্তামূলক
জন্মদিন আসে বারে বারে মনে করাবারে— এ জীবন নিত্যই নূতন প্রতি প্রাতে আলোকিত পুলকিত দিনের মতন।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jonmodin-ase-bare-bare/
2270
মহাদেব সাহা
সব তো আমারই স্বপ্ন
মানবতাবাদী
সব তো আমারই স্বপ্ন মাথার উপরে এই যে কখনো উঠে আসে মরমী আকাশ কিংবা স্মৃতি ভারাতুর চাঁদ মেলে ধরে রূপকাহিনীর গাঢ় পাতা। কোনো এক কিশোর রাখাল কী করে একদা দেখা পেয়ে গেলো সেই রাজকুমারীর আর পরস্পর ভাসালো গন্ডোলা। সেও তো আমারই স্বপ্ন রূপময় এই যে ভেনিস কী যে সিক্ত বাষ্পাকুল ছিলো একদিন রঙিন বর্ষণে শিল্পের গৌরবে তার মুখচ্ছবি উদ্ভাসিত আর থেকে থেকে জ্যোৎস্নখচিত সারা দেহে খেলে যেতো চিত্রের মহিমা! এসব তো আমার স্বপ্নের মৃত শিশু এই যে কখনো দেখি শৈশবের মতো এক স্মৃতির সূর্যাস্ত, অনুভূতিশীল মেঘ যেন রাত্রি নামে নক্ষত্রের নিবিড় কার্পেটে বুঝি যামিনী রায়ের কোনো সাতিশয় লোকজ মডেল। সব তো আমারই স্বপ্ন তবে, মাঝে মাঝে উদ্যান, এভেন্যু, লোকালয় মনে হয় অভ্রভেদী অব্যক্ত ব্যাকুল এই গাছগুলি কেমন মিষ্টিক আর প্রকৃতি পরেছে সেই বাউল বর্ণের উত্তরীয়! এও তো আমারই স্বপ্ন আঙিনায় একঝাঁক মনোহর মেঘ আর উন্মুক্ত কার্নিশে দোলে নীলিমা, নীলিমা! কিংবা টবে যে ব্যাপক চারাগুলি তাতে ফুটে ওঠে মানবিকতার রাঙা ফুল; এখনো যে কোনো কোনো অনুতপ্ত খুনী রক্তাক্ত নিজের হাত দেখে ভীষণ শিউরে ওঠে ভয়ে আর প্রবল ঘৃণায় নিজেই নিজের হাত ছিঁড়ে ফেলে সেখানে লাগাতে চায় স্নিগ্ধ গোলাপের ডালপালা। সেও তো আমারই স্বপ্ন এই যে চিঠিতে দেখি ভালোবাসারই তো মাত্র স্বচ্ছ অনুবাদ কিংবা একটি কিশোরী এখনো যে বকুলতলায় তার জমা রাখে মৃদু অভিমান; এখনো যে তার গণ্ডদেশ পেকে ওঠে পুঞ্জীভূত মাংসের আপেল। এসব তো আমার স্বপ্নের মৃত শিশু, বিকলাঙ্গ, মর্মে মর্মে খঞ্জ একেবারে! যেন আমি বহুকাল-পোষা একটি পাখির মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে আছি। আমি জানি সবই তো আমার স্বপ্ন নীলিমায় তারার বাসর আর এভেন্যুতে গূঢ় উদ্দীপনা- এইগুলি সব তো আমারই স্বপ্ন, সব তো আমারই স্বপ্ন।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1530
4263
শঙ্খ ঘোষ
পুনর্বাসন
চিন্তামূলক
যা কিছু আমার চার পাশে ছিল ঘাসপাথর সরীসৃপ ভাঙা মন্দির যা কিছু আমার চার পাশে ছিল নির্বাসন কথামালা একলা সূর্যাস্ত যা কিছু আমার চার পাশে ছিল ধ্বংস তীরবল্লম ভিটেমাটি সমস্ত একসঙ্গে কেঁপে ওঠে পশ্চিম মুখে স্মৃতি যেন দীর্ঘযাত্রী দলদঙ্গল ভাঙা বাক্স প’ড়ে থাকে আমগাছের ছায়ায় এক পা ছেড়ে অন্য পায়ে হঠাত সব বাস্তুহীন | যা কিছু আমার চার পাশে আছে— শেয়ালদা ভরদুপুর উলকি-দেয়াল যা কিছু আমার চার পাশে আছে— কানাগলি স্লোগান মনুমেন্ট যা কিছু আমার চার পাশে আছে— শরশয্যা ল্যাম্প পোস্ট লাল গঙ্গা সমস্ত এক সঙ্গে ঘিরে ধরে মজ্জার অন্ধকার তার মধ্যে দাঁড়িয়ে বাজে জলতরঙ্গ চূড়োয় শূণ্য তুলে ধরে হাওড়া ব্রিজ পায়ের নিচে গড়িয়ে যায় আবহমান | যা কিছু আমার চার পাশে ঝর্না উড়ন্ত চুল উদোম পথ ঝোড়ো মশাল যা কিছু আমার চার পাশে স্বচ্ছ ভোরের শব্ দ স্নাত শরীর শ্মশান শিব যা কিছু আমার চার পাশে মৃত্যু একেক দিন হাজার দিন জন্ম দিন সমস্ত একসঙ্গে ঘুরে আসে স্মৃতির হাতে অল্প আলোয় বসে থাকা পথ ভিখারি যা ছিল আর যা আছে দুই পাথর ঠুকে জ্বালিয়ে নেয় এতদিনের পুনর্বাসন |
https://banglarkobita.com/poem/famous/1126
4774
শামসুর রাহমান
তিন যুগ পর
চিন্তামূলক
অকস্মাৎ অন্ধকারে একটি পুরনো কোঠাবাড়ি তাকালো আমার প্রতি চোখ মেলে। বাড়িটার ঘ্রাণ বাড়ে ক্রমাগত, দেখি বর্ষিয়সী নারী, পরনে নিঝুম শাড়ি, অত্যন্ত সফেদ, যেন অই আসমান দিয়েছে মহিমা তার সমগ্র সত্তায়। তাকে চিনি মনে হয়, তিনি মাতামহী আমার এবং যাকে আপা বলে ডাকতাম শৈশবে, কৈশোরে। মনে হতো চিরদিনই থাকবেন তিনি তার কোঠাবাড়ি ভালোবেসে আর আমার ব্যাকুল ডাকে দেবেন সানন্দ সাড়া যখন তখন। অন্ধকারে এই তো দেখছি তিনি জ্বেলেছেন হ্যারিকেন ঘরে, আলো যার কল্যাণের প্রতিবাদ অশুভের বিরুদ্ধে সর্বদা। বারে বারে আমার মাতুল সেই কবে মদে চুর হয়ে ফিরে এলে হ্যারিকেন তাঁর নিশ্চুপ বেরিয়ে আসতো আঙিনায় সন্তানের হাত ধরে তিনি উঠোন পেরিয়ে ঘরে রাত্রিময় যেতেন ঔদাস্যে ভরপুর। দিতেন শুইয়ে তাকে, নিতেন জুতোর পাটি খুলে, আমি ঋণী চিরকাল এ দৃশ্যের কাছে। সুন্দরের স্পর্শে বাজে অস্তিত্বের সুর।রাত্রি বড় ভয়ংকর মনে হয় আজকাল, ভীষণ টলছে মাথা, সারা গায়ে ভুর ভুর করে গন্ধ প্রায় প্রতিরাত, মধ্যরাতে বুঝি মেঘে মেঘে হেঁটে যাই, খিস্তি করি নক্ষত্রের সাথে। দিশেহারা, বেজায় বিহ্বল আমি আর্ত অন্ধকারে। কী-যে খুঁজি এ বিজনে এলোমেলো ভীষণ একলা আর কেমন অচেনা লাগে প্রতিবেশ; আপা, তুমি হ্যারিকেন দোলাবে না?   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tin-jug-por/
821
জসীম উদ্‌দীন
নকশী কাঁথার মাঠ – ০৮
কাহিনীকাব্য
আট “কি কর দুল্যাপের মালো ; বিভাবনায় বসিয়া, আসত্যাছে বেটির দামান ফুল পাগড়ি উড়ায়া নারে |” “আসুক আসুক বেটির দামান কিছু চিন্তা নাইরে, আমার দরজায় বিছায়া থুইছি কামরাঙা পাটি মারে | সেই ঘরেতে নাগায়া খুইছি মোমের সস্র বাতি, বাইর বাড়ি বান্দিয়া থুইছি গজমতি হাতি নারে |” . — মুসলমান মেয়েদের বিবাহের গান বিয়ের কুটুম এসেছে আজ সাজুর মায়ের বাড়ি, কাছারী ঘর গুম্-গুমা-গুম্ , লোক হয়েছে ভারি | গোয়াল-ঘরে ঝেড়ে পুছে বিছান দিল পাতি ; বসল গাঁয়ের মোল্লা মোড়ল গল্প-গানে মাতি | কেতাব পড়ার উঠল তুফান ; —চম্পা কালু গাজী, মামুদ হানিফ সোনবান ও জয়গুন বিবি আজি ; সবাই মিলে ফিরছে যেন হাত ধরাধর করি | কেতাব পড়ার সুরে সুরে চরণ ধরি ধরি | পড়ে কেতাব গাঁয়ের মোড়ল নাচিয়ে ঘন দাড়ি, পড়ে কেতাব গাঁয়ের মোল্লা মাঠ-ফাটা ডাক ছাড়ি | কৌতুহলী গাঁয়ের লোকে শুনছে পেতে কান, জুমজুমেরি পানি যেন করছে তারা পান! দেখছে কখন মনের সুখে মামুদ হানিফ যায়, লাল ঘোড়া তার উড়ছে যেন লাল পাখিটির প্রায় | কাতার কাতার সৈন্য কাটে যেমন কলার বাগ, মেষের পালে পড়ছে যেন সুন্দর-বুনো বাঘ ! স্বপ্ন দেখে, জয়গুন বিবি পালঙ্কেতে শুয়ে ; মেঘের বরণ চুলগুলি তার পড়ছে এসে ভূঁয়ে ; আকাশেরি চাঁদ সূরুজে মুখ দেখে পায় লাজ, সেই কনেরে চোখের কাছে দেখছে চাষী আজ | দেখছে চোখে কারবালাতে ইমাম হোসেন মরে, রক্ত যাহার জমছে আজো সন্ধ্যা মেঘের গোরে ; কারবালারি ময়দানে সে ব্যথার উপাখ্যান ; সারা গাঁয়ের চোখের জলে করিয়া গেল সান | উঠান পরে হল্লা-করে পাড়ার ছেলে মেয়ে, রঙিন বসন উড়ছে তাদের নধর তনু ছেয়ে | কানা-ঘুষা করত যারা রূপার স্বভাব নিয়ে, ঘোর কলিকাল দেখে যাদের কানত সদা হিয়ে ; তারাই এখন বিয়ের কাজে ফিরছে সবার আগে, ভাভা গড়ার সকল কাজেই তাদের সমান লাগে | বউ-ঝিরা সব রান্না-বাড়ায় ব্যস্ত সকল ক্ষণ ; সারা বাড়ি আনন্দ আজ খুশী সবার মন | বাহিরে আজ এই যে আমোদ দেখছে জনে জনে ; ইহার চেয়ে দ্বিগুণ আমোদ উঠছে রূপার মনে | ফুল পাগড়ী মাথায় তাহার “জোড়া জামা” গায়, তেল-কুচ্-কাচ্ কালো রঙে ঝলক্ দিয়ে যায় | বউ-ঝিরা সব ঘরের বেড়ার খানিক করে ফাঁক, নতুন দুলার রূপ দেখি আজ চক্ষে মারে তাক | এমন সময় শোর উঠিল— “বিয়ের যোগাড় কর, জলদী করে দুলার মুখে পান শরবত ধর |” সাজুর মামা খটকা লাগায়, “বিয়ের কিছু গৌণ, সাদার পাতা আনেনি তাই বেজার সবার মন |” রূপার মামা লম্ফে দাঁড়ায় দম্ভে চলে বাড়ি ; সেরেক পাঁচেক সাদার পাতা আনল তাড়াতাড়ি | কনের খালু উঠিয়া বলে “সিঁদুর হল ঊনা!” রূপার খালু আনিয়া দিল যা লাগে তার দুনা! কনের চাচার মন উঠে না, “খাটো হয়েছে শাড়ী |” রূপার চাচা দিল তখন “ইংরাজী বোল ছাড়ি”| “কিরে বেটা বকিস নাকি?” কনের চাচা হাঁকে, জালির কলার পাতার মত গা কাঁপে তার রাগে | “কোথায় গেলি ছদন চাচা, ছমির শেখের নাতি, দেখিয়ে দেই দুলার চাচার কতই বুকের ছাতি! বেরো বেটা নওশা নিয়ে, দিব না আজ বিয়া ;” বলতে যেন আগুন ছোটে চোখ দুটি তার দিয়া | বরপক্ষের লোকগুলি সব আর যে বরের চাচা, পালিয়ে যেতে খুঁজছে যেন রশুই ঘরের মাচা | মোড়ল এসে কনের চাচায় অনেক করে বলে, থামিয়ে তারে বিয়ের কথা পাতেন কুতূহলে | কনের চাচা বসল বরের চাচার কাছে, কে বলে ঝড় এদের মাঝে হয়েছে যে পাছে! মোল্লা তখন কলমা পড়ায় সাক্ষী-উকিল ডাকি, বিয়ে রূপার হয়ে গেল, ক্ষীর-ভোজনী বাকি! তার মাঝেতে এমন তেমন হয়নি কিছু গোল, কেবল একটি বিষয় নিয়ে উঠল হাসির রোল | এয়োরা সব ক্ষীর ছোঁয়ায়ে কনের ঠোঁটের কাছে ; সে ক্ষীর আবার ধরল যখন রূপার ঠোঁটের পাছে ; রূপা তখন ফেলল খেয়ে ঠোঁট ছোঁয়া সেই ক্ষীর, হাসির তুফান উঠল নেড়ে মেয়ের দলের ভীড় | ভাবল রূপাই—অমন ঠোঁটে যে ক্ষীর গেছে ছুঁয়ে, দোজখ যাবে না খেয়ে তা ফেলবে যে জন ভূঁয়ে | ***** সস্র = সহস্র জুমজুম = আরবের একটি পবিত্র কূপ দুলা = বর পান শরবত ধর = বিবাহের আগে বরকে পান শরবত খাওয়ান হয় সাদার পাতা = তামাক পাতা খালু = মেশোমশায় নওশা = বর সাক্ষী উকিল = মুসলমানদের বিবাহের সময় বর-কন্যা একস্থানে থাকে না | কন্যাপক্ষের একজন উকিল এবং দুইজন সাক্ষী থাকেন | বাড়ির ভিকরে গিয়ে বিবাহে কন্যার মত আছে কিনা জেনে আসেন | উকিল জিজ্ঞাসা করেন, সাক্ষীরা তা শুনে এসে বাইরে বৈঠকখানায় বিবাহ সভার সকলকে বলেন |
https://banglarkobita.com/poem/famous/811
1227
জীবনানন্দ দাশ
সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়
প্রকৃতিমূলক
চোখ দুটো ঘুমে ভরে ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে! ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন,- স্বপন ক’দিন রয়! এসেছে গোধূলি গোলাপিবরণ,-এ তবু গোধূলি নয়! সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়, আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের’পরে! কেটেছে যে নিশি ঢের,- এতদিন তবু অন্ধকারের পাইনি তো কোনো টের! দিনের বেলায় যাদের দেখিনি-এসেছে তাহারা সাঁঝে; যাদের পাইনি পথের ধূলায়-ধোঁয়ায়-ভিড়ের মাঝে,- শুনেছি স্বপনে তাদের কলসী ছলকে,- কাঁকন বাজে! আকাশের নীচে- তারার আলোয় পেয়েছি যে তাহাদের! চোখ দুটো ছিল জেগে কত দিন যেন সন্ধ্যা-ভোরের নট্কান -রাঙা মেঘে! কত দিন আমি ফিরেছি একেলা মেঘলা গাঁয়ের ক্ষেতে! ছায়াধূপে চুপে ফিরিয়াছি প্রজাপতিটির মতো মেতে কত দিন হায়!- কবে অবেলায় এলোমেলো পথে যেতে ঘোর ভেঙে গেল,- খেয়ালের খেলাঘরটি গেল যে ভেঙে। দুটো চোখ ঘুম ভরে ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে! ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন,-স্বপন কদিন রয়! এসেছে গোধূলি গোলাপিবরণ,-এ তবু গোধুলি নয়! সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়,- আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের’ পরে !
https://banglarkobita.com/poem/famous/923
1678
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
যেখানেই যাই
চিন্তামূলক
যেখানেই যাই, যে-বাড়িতে কড়া নাড়ি, কেউই দেয় না সাড়া, সব রাস্তাই ফাঁকা, সাত-তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে পাড়া। সেখানেই যাই, ঘুমিয়ে রয়েছে আজ সবার কাছে ও দূরে, অথচ আমার কড়া নাড়বারই কাজ পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1136
5066
শামসুর রাহমান
ভালোবাসার অর্থ
প্রেমমূলক
সারা পথে ধুলো ছিল, কাঁটার শাসন ছিল, কাঁকরের বিরূপতা সইতে হয়েছে ঢের। জানতাম না পা দুটোকে রক্তাক্ত করে কায়ক্লেশে এখানে পৌঁছে দেখতে পাব সরোবরের উদ্ভাসন। এখানে আসার কথা ছিল না, তবুও এলাম।সরোবরের টলটলে জলে মুখ রেখে তৃষ্ণা মেটাই ব্যাধের বিপদে থেকে ছুটে-আসা বনের প্রাণীর মতো। দূরে তাকিয়ে দেখি, তুমি দিগন্তের মহিমা থেকে বেরিয়ে আসছো; তোমার শাড়ির রঙের বিচ্ছুরণ কলাপ মেলে আকাশে, আমার আকাঙ্ক্ষা সুদূরপ্রসারী।যখন নত আমি তোমার মুখের উপর, তুমি রহস্যের ভাস্কর্য। তোমার স্তনের নগ্নতাকে চুমো খাই যখন, তখন ধানের শীষ ফোটে গানের গানে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পাখি শিঁস দেয়, কৃষকের কুটির দুলে ওঠে বসন্ত বাহারের সুরে এবং ছিপছিপে নৌকো তীর ছেড়ে এগোতে তাকে জল চিরে।তোমার নাকে ক’ ফোঁটা ঘাম, যেন ভোরের পাতায় জমে থাকে শিশিরবিন্দু। তোমার নিঃশ্বাসের সুগন্ধ আমাকে বানায় মাতাল তরণী, অপ্রতিরোধ্য কামনার হাত চেপে ধরি। কী কথা বলতে গিয়ে বোবার অস্বস্তি রাখি ঢেকে; বিষণ্ন, রক্তচক্ষু কোকিল নীরবতা পোহায় নগ্ন পাতার আড়ালে।আমার হৃদয়ে প্রেম মজুরের কর্মচঞ্চল রগের মতো দপদপ করে। জীবনের সঙ্গে আমার গভীর দৃষ্টি বিনিময় হলো, যখন তোমার মধ্যে দেখলাম পবিত্র অগ্নিশিখা আর সেই মুহূর্তে তুমি আমাকে এনে দিলে একরাশ পতঙ্গের ভস্মরাশি, যাতে ভালোবাসার অর্থ বুঝতে ভুল না হয় আমার।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/valobashar-ortho/
2868
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কন্‌কনে শীত তাই
ছড়া
কন্‌কনে শীত তাই চাই তার দস্তানা; বাজার ঘুরিয়ে দেখে, জিনিসটা সস্তা না। কম দামে কিনে মোজা বাড়ি ফিরে গেল সোজা– কিছুতে ঢোকে না হাতে, তাই শেষে পস্তানা।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/konkone-shit-tai/
4421
শামসুর রাহমান
ইদানীং সন্ধ্যেবেলা
চিন্তামূলক
বকুলের ঘ্রাণময় পথে কিংবা শেফালির নিজস্ব ট্রাফিক আইল্যান্ডে কার সাথে রফা করে প্রেমের এগারো দফা কর্মসূচি আমি বাস্তবায়নের পন্থা বেছে নেবো? আমার এ প্রশ্নে সন্ধ্যেবেলা বকুল বিমর্ষ ঝরে যায়, শেফালির চোখেবাষ্প জমে। পথে পাতা, রাশি রাশি, ডালপালা, মৃত পাখি দেখে এখানে একটা কিছু ঘটে গেছে ভয়ংকর, যে কোনো পথিক বলে দিতে পারে সহজেই। একটি মানুষ তার একাকীত্ব নিজের ভেতরে রেখে হেঁটে গেছে কতবার এ রকম দৃশ্যের ভিতরে। তার হাতে ছিল স্মিত অমল পতাকা, চোখে দূরত্বের আভা, তার দীর্ঘ ভ্রমণের স্বীকৃতি রয়েছে কত নিরালা নিশ্বাসে, ভরপুর সারাবেলা, কেমন অচেনা গানে গুঞ্জরিত সরাইখানায়। ভ্রমণ ছাড়া কি পথিকের অন্য কাজ নেই? পথে কত গহন দুপুর কত অমানিশা তাকে ঢেকে দ্যায় কোমল আদরে? সবুজ রৌদ্রের কাছে বেগুনি জ্যোৎস্নার কাছে হাত পেতে সে কি চেয়ে নেয় কিছু ঝুলি ভরে তোলার আগ্রহে? এবার প্রশ্নের পর প্রশ্ন বারংবারচঞ্চু ঠোকে; যেতে যেতে দেখে যাই আমার নিজের আকাঙ্ক্ষাকে আমি গলা টিপে হত্যা করি; সন্ধ্যেবেলা গোলাপ-স্পন্দিত পথে নিঝুম গ্রহণ করে কত মৃতদেহ। হত্যাকারী বড় একা, পরিত্যক্ত; চরাচর আর্তনাদ করে। বহুদিন থেকে যোগফল নিয়ে ভাবছি, অথচ বারংবার বিয়োগ করতে হয়, বিয়োগান্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই। দেখেছি সতেজ সুখ কতদিন বাইসাইকেল চালাতে চালাতে গায়ে খড়কুটো, শুকনো পাতা ফুলের পরাগ, কখনো বা টুকরো টুকরো রঙিন কাগজ নিয়ে টগবগে গান গেয়ে হাসিমুখে গেছে দিগন্তের দিকে। হঠাৎ কোত্থেকে দুঃখ চায়ের দোকানে এসে বসে আমার টেবিলে হাত রেখে; মুখোমুখি বসে থাকে বহুক্ষণ, বলেনা কিছুই। কেবল চামচ নাড়ে, বিস্কুটের ভগ্নাংশ খিমচে তুলে নেয় নখ দিয়ে নিরিবিলি ভীষণ ঔদাস্যে, যেন কবি-মূর্তি, সামাজিক দাবি ভুলে, সর্বস্ব খুইয়ে স্বপ্ন পেতে চায়।সন্ধ্যেবেলা খুব শূন্য হয়ে গেছে ইদানীং। পাখি ডাকে পাতা ঝরে, একজন গৌণ ব্যক্তি বসে থাকে খুনীর মতোন একা, তার মুখ কবরের ঘাসে থুবড়ে পড়ে আছে কাদামাখা, পোকা মাকড়ের মধ্যে। সুন্দরের পায়ে চুমু খেয়ে ক্ষয়ে যায় ক্ষয়ে যায়, আপনার নিশ্বাসের প্রতি বিরূপ সে ইদানীং, দীর্ঘশ্বাস হয়ে তাকে। নিজেকে কর্কশ লাগে তার।ভালোবাসা যদি পুনরায় ফুল্ল মুখ তুলে চায় ভালোবেসে, তবে আমি বাইসাইকেল চালিয়ে দিগন্তে যাবো বকুল শেফালি আর জুঁই নীল দীর্ঘ পথে ছড়াতে ছড়াতে।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/idaning-sondhyebela/
2368
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মিত্রাক্ষর
সনেট
বড়ই নিষ্ঠুর আমি ভাবি তারে মনে, লো ভাষা, পীড়িতে তোমা গড়িল যে আগে মিত্রাক্ষররূপ বেড়ি ! কত ব্যথা লাগে পর' যবে এ নিগড় কোমল চরণে- স্মরিলে হৃদয় মোর জ্বলি উঠে রাগে ছিল না কি ভাবধন, কহ, লো ললনে, মনের ভাণ্ডারে তার, যে মিথ্যা সোহাগে ভুলাতে তোমারে দিল এ তুচ্ছ ভূষণে ? কি কাজ রঞ্জনে রাঙি কমলের দলে ? নিজরূপে শশিকলা উজ্জ্বল আকাশে ! কি কাজ পবিত্রি' মন্ত্রে জাহ্নবীর জলে ? কি কাজ সুগন্ধ ঢালি পারিজাত-বাসে ? প্রকৃত কবিতা রূপী কবিতার বলে,- চীন-নারী-সম পদ কেন লৌহ ফাঁসে ?
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/post20160702063534/
4511
শামসুর রাহমান
এবং প্রকৃত বিল্পবীর মতো
প্রেমমূলক
আমি তো একাই থাকি রাত্রিদিন, হৃদয়ের ক্ষত শুঁকি, চাটি বারংবার। বোমাধ্বস্ত শহরে যেমন নিঃসঙ্গ মানুষ ঘোরে, খোঁজে চেনা মুখ কিংবা স্বজনের মৃতদেহ, প্রত্যহ আমি তেমনি করি চলাফেরা একা একা। ধ্বংসস্তূপে চোখ পড়লেই আমার অস্তিত্ব করে আর্তনাদ। কবেকার গাঢ়বেহালার সুর বাজে পুনরায়, সভ্যতার পোকা-ছাওয়া মাংস স্পন্দিত সে সুরে। একটি ভালুক, লাল, বড় স্তব্ধ, বহুদিন থেকে নিরিবিলি ঘরে রয়েছে দাঁড়িয়ে ঠায়। যদি প্রাণ পায় চলে যাবে তাড়াতাড়ি মৌচাকের খোঁজে দূরে বাড়িটিকে ফেলে। বিটোফেনি সুর ঝরে তার গায়, চক্ষুদ্বয় অত্যন্ত সজীব হতে চায়। নিরুপায় অন্ধতায় তার বেলা যায়।একটি চিঠির খাম পড়ে আছে টেবিলের বুকে গোধূলিতে নিষ্প্রাণ পাখির মতো। পুরোনো চেয়ার অকস্মাৎ দূর শতাব্দীর সিংহাসন হ’য়ে মিশে যায় ফ্যাক্টরির কালো পেঁচানো ধোঁয়ায়। চতুষ্পার্শ্বে সভ্যতার মতো কিছু গড়ে ওঠে, ভেঙ্গে যায় ফের, কম্পমান অন্ধকারে একরাশ বেহালা চোখের মতো জ্বলে। কবির মেধার কাছে সভ্যতা কী চেয়ে বিমুখ হয়ে থাকে বারংবার? মরণের সঙ্গে দাবা খেলে অবসন্ন কবি, পাণ্ডুলিপি, ফুল মেঘে ছড়াতে ছড়াতে চলে যায় অবেলায়। আমিতো একাই থাকি রাত্রিদিন। কবি জনস্রোতে, মোটরের ভিড়ে বুনো ঘোড়ার মতোন থতমত; আর্তনাদ করে তার পেশী, চক্ষুঃশিরা যেন স্মৃতি ক্রন্দনের মতো আসে ব্যেপে অস্তিত্বের কন্টকিত তটে! চতুর্দিকে বাজে ট্রাফিকের কলরব, চোখ বেয়ে ঝরঝর মুহূর্ত ঝরে, জনতার পাশাপাশি মৃত্যু হাঁটে, কোথায় সে গোধূমের ক্ষেত পুড়ে যায়, শূন্য ঘরে টেলিফোন একটানা বেড়ে চলে, শুনেছো তো, হায়, রেডিয়োর সন্ধ্যার খবরে।এলভিস প্রেসলির মৃত্যু রটে গেছে চরাচরে। চারখানায় আড্ডা জমে, পপ সুরে মারফতী গান শুনে মাথা নাড়ে বিগত-যৌবন ফেরিঅলা। অন্ধকারে তরুণ কবির চোখে পড়ে অপ্সীরর স্তন, হিজড়ের সুবজাভ গাল, নর্দমায় ভাসমান সুন্দরীর মৃতদেহ। দ্যাখো দ্যাখো এ শহরে কী ঘর বানায় ওরা শূন্যের মাঝার।আমিতো একাই থাকি রাত্রিদিন। এখন কোথায় তুমি কোন সভ্যতার আলো চোখে নিয়ে আছো শূন্য বারান্দায়? সৌন্দর্য তোমার সাথে আছে, তোমাতেই মিশে আছে। পাথরের সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে হেঁটে বহুদূর চলে গেছে বুঝি? একজন কবি তার ব্যাকুলতা, শব্দপ্রেম রেখেছিলে। তোমার কোমল অঞ্জলিতে- মনে পড়ে নাকি? থেমে-যাওয়া ক্যাসেটের কথা মনে পড়ে? মনে পড়ে জানালার বাইরে কি যেন দেখানোর ছলে আমার আপন হৃদয়ের অন্তলীন গুহার আঁধার কত সজীব জাগ্রত দেখে নিতে চেয়েছিলে? অদৃশ্য হরিণ কাঁদে তোমার বাগানে গভীর রাত্তিরে ঘুরে ঘুরে।বারান্দায়, ছাদে আর সিঁড়িতে অস্পষ্ট পদধ্বনি, বাড়িটার দু’চোখে পা ঠোকে ঘোড়া, কার জেল্লাদার পোশাকের স্পর্শ লাগে তার গালে, বুকে বিদ্ধ কামার্ত নিশান। বিপ্লবের আগুনের মতো কিছু চক্রাকারে ঘোরে চতুর্দিকে, কেউ হাত সেঁকে, কেউ পুড়ে ছারখার হয়। হৃদয় কী ঘোরে সময় আবৃত্তি করে, প্রতীক্ষায় থাকে, জ্বলে আবেগকম্পিত, স্মৃতিভারাতুর কোনো গজলের মতো। আমি তো একাই থাকি রাত্রিদিন। কখনো সখনো লোকজন থাকে বটে আশেপাশে কিংবা চেনা মহলের চৌহদ্দিতে বসবাস করতেই হয়, কণ্ঠ মেলাতেই হয় সংসারের ঐকতানে, তবু আমি দৈনন্দিন কলরবে অকস্মাৎ কেমন রহস্যময় হয়ে উঠি নিজেরই অজ্ঞাতে, কেমন নিশ্চুপ এবং প্রকৃত বিপ্লবীর মতো জেগে থাকি নিজস্ব ভূগর্ভে উদাসীন, একা।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ebong-prokrito-biplobir-moto/
3969
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুশীলা আমার, জানালার ‘পরে
প্রেমমূলক
সুশীলা আমার, জানালার ‘পরে দাঁড়াও একটিবার! একবার আমি দেখিয়া লইব মধুর হাসি তোমার! কত দুখ-জ্বালা সহি অকাতরে ভ্রমি, গো, দূর প্রবাসে যদি লভি মোর হৃদয়-রতন– সুশীলারে মোর পাশে! কালিকে যখন নাচ গান কত হতেছিল সভা-‘পরে, কিছুই শুনি নি, আছিনু মগন তোমারি ভাবনা-ভরে আছিল কত-না বালিকা, রমণী, রূপসী প্রমোদ-হিয়া, বিষাদে কহিনু, “তোমরা তো নহ সুশীলা, আমার প্রিয়া!’ সুশীলে, কেমনে ভাঙ তার মন হরষে মরিতে পারে যেই জন তোমারি তোমারি তরে! সুশীলে, কেমনে ভাঙ হিয়া তার কিছু যে করি নি, এক দোষ যার ভালোবাসে শুধু তোরে! প্রণয়ে প্রণয় না যদি মিশাও দয়া কোরো মোর প্রতি, সুশীলার মন নহে তো কখনো নিরদয় এক রতি!Robert Burns (অনুবাদ কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sushila-amar-janalar-pore/
2513
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
বিষণ্ণতার কাছে
চিন্তামূলক
বিষণ্ণতা, তোর কাছে ক্ষমা চাই ছেড়ে দে আমাকে কাকের বিষ্ঠার থেকে জন্ম নেয়া বটের মতন শিকড়ের জটাজালে আষ্টেপৃষ্ঠে যদি বাঁধা থাকে মগজের প্রতি কোষ, তবে এই জরাজীর্ণ মন পুরানো দালান হয়ে টিকে থাকে কতো দিন আর পলেস্তারা খসে পড়ে ক্ষয়গ্রস্থ ইটের কাতার মৃত্যুর যন্ত্রণা হয়ে খিঁচিয়ে নিজের দাঁত মুখ প্রত্যহ জানান দেয় এ কেমন জটিল অসুখ
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/bishonnotar-kachhe/
2724
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে
ভক্তিমূলক
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে, তাই তো আমি এসেছি এই ভবে। এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার, ঘুচে যাবে সকল অহংকার, আনন্দময় তোমার এ সংসার আমার কিছু আর বাকি না রবে।মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে আমার মাঝে তোমার লীলা হবে। সব বাসনা যাবে আমার থেমে মিলে গিয়ে তোমারি এক প্রেমে, দুঃখসুখের বিচিত্র জীবনে তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-majhe-tomar-lila-hobe/
5404
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
ঝর্ণা
প্রকৃতিমূলক
ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা! তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা! অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে, গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে, তনু ভরি' যৌবন, তাপসী অপর্ণা! ঝর্ণা! পাষাণের স্নেহধারা! তুষারের বিন্দু! ডাকে তোরে চিত-লোল উতরোল সিন্ধু| মেঘ হানে জুঁইফুলী বৃষ্টি ও-অঙ্গে, চুমা-চুমকীর হারে চাঁদ ঘেরে রঙ্গে, ধূলা-ভরা দ্যায় ধরা তোর লাগি ধর্ণা! ঝর্ণা! এস তৃষার দেশে এস কলহাস্যে - গিরি-দরী-বিহীরিনী হরিনীর লাস্যে, ধূসরের ঊষরের কর তুমি অন্ত, শ্যামলিয়া ও পরশে কর গো শ্রীমন্ত; ভরা ঘট এস নিয়ে ভরসায় ভর্ণা; ঝর্ণা! শৈলের পৈঠৈয় এস তনুগত্রী! পাহাড়ে বুক-চেরা এস প্রেমদাত্রী! পান্নার অঞ্জলি দিতে দিতে আয় গো, হরিচরণ-চ্যুতা গঙ্গার প্রায় গো, স্বর্গের সুধা আনো মর্ত্যে সুপর্ণা! ঝর্ণা! মঞ্জুল ও-হাসির বেলোয়ারি আওয়াজে ওলো চঞ্চলা ! তোর পথ হল ছাওয়া যে! মোতিয়া মোতির কুঁড়ি মূরছে ও-অলকে; মেখলায়, মরি মরি, রামধনু ঝলকে তুমি স্বপ্নের সখী বিদ্যুত্পর্ণা ঝর্ণা!
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/jhorna/
5159
শামসুর রাহমান
যাচ্ছি প্রতিদিন
চিন্তামূলক
জানো কি কোথায় আছি? আমার নিবাস একটি ঠিকানা শুধু, বলা যায়, ফেলে-যাওয়া কোনো খামে লেখা, তোমার নিকট, তার বেশি নয়।এ-ঘরে আসোনি কোনোদিন, কী রকম ভাবে কাটে বেলা এখানে আমার, পায়চারি করি কতক্ষণ কিংবা চেয়ারে হেলান দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকাই কখন, কতটুকু দেখি প্রজাপতিদের ওড়াউড়ি, অথবা কখন কী মোহন ভূতগ্রস্ততায় লেখার টেবিলে ঝুঁকে গোলাপ এবং ফণিমনসার ঘ্রাণময় পর্ব ভাগ করি, তোমার অজানা।আজো আছি, অসুস্থ বৃদ্ধের ঈষৎ কাঁপুনি বাড়িটার সার গায়ে। মেশিনের ঝাঁকুনি সত্তায় গাঁথা, টলে মাথা, বুক কখনো মেঘলা হয়ে আসে। মাঝে-মাঝে বড় অবাস্তব মনে হয় এই ডেরা। তোমার নমিত পদচ্ছাপ এখানে পড়েনি বলে? চোখ ফটোগ্রাফে, অন্য ছবি, এলোমেলো, ছায়া ফেলে মনে হয়; কিছুই হবে না জানি, অথচ সর্বদা অপেক্ষার চোখ অনর্গল।শিরাপুঞ্জে মেশা আজো বটে অসংখ্য জোনাকি। বাসা-বদলের নেশা নেই, তবু যেতে চাই, দেখি ছায়াচ্ছন্ন চিত্রনাট্যে নানা দেশী উদ্বাস্তর ভিড়, গুপ্ত প্রেসে ছাপা পুস্তিকার মতো ভবিষ্যৎ জপায় নিষিদ্ধ মন্ত্র। যদি তুমি কোনোদিন আসো এখানে এ-ঘরে দেখবে তখনও আছি, নাকি পর্যটনে দৃশ্যান্তরে? হবে না তেমন প্রত্যহ কিশোর খোজে যেন কিছুই, হলেও নেই ক্ষতি। অলক্ষ্যে প্রকৃত আমার নিকট আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি প্রতিদিন।   (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jacchi-protidin/
4481
শামসুর রাহমান
একটি দৃশ্যের আড়ালে
চিন্তামূলক
এখনও আকাশ আছে, এই খোলা জানালার বাইরে রাস্তায় অটুট ট্রাফিকের ঐকতান। বাতাসের টোকায় খড়খড়ি জেগে ওঠে স্বপ্ন থেকে, বারান্দায় যুগল পায়রা প্রেমে নিমজ্জিত, গলির বুড়োটা তারাভরা আকাশের মতো শতচ্ছিন্ন তালিমারা কোট গায়ে বিড়ি টানে, বোষ্টমির গানে মাথা নাড়ে, দূরের শূন্যতা শব্দময় প্লেনের গুঞ্জনে।কিন্তু তার শোক নেই, পরিতাপ নেই, তৃষিত বাসনা নেই, নেই পৃথিবীর রৌদ্রছায়া স্থির চোখে। আমি শুধু লাশ নিয়ে বসে আছি পাশে হলুদ চাঁদের নিচে-আর যারা ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঘুমভরা ঢুলুঢুলু চোখে গেছে দোকানে চা খেতে।নিস্পন্দ শরীর এক পাশে আছে প’ড়ে, জমে-যাওয়া দশটি আঙুল প্রসারিত দেখছি আমার দিকে- যেন আঁকড়ে ধরবে তারা এখনি আমার স্তব্ধতাকে।নির্বাপিত সত্তার আড়ালে চকিতে উঠল জ্ব’লে গ্রীষ্মের সেঁকা দপদপে কোনো তরুণ ফলের মতো তোমার মুখের প্রখর যৌবন।   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-drissher-arale/
1144
জীবনানন্দ দাশ
মকরসংক্রান্তির রাতে
চিন্তামূলক
(আবহমান ইতিহাসচেতনা একটি পাখির মতো যেন)কে পাখি সূর্যের থেকে সূর্যের ভিতরে নক্ষত্রের থেকে আরো নক্ষত্রের রাতে আজকের পৃথিবীর আলোড়ন হৃদয়ে জাগিয়ে আরো বড়ো বিষয়ের হাতে সে সময় মুছে ফেলে দিয়ে কি এক গভীর সুসময়! মকরক্রান্তির রাত অন্তহীন তারায় নবীন: –তবুও তা পৃথিবীর নয়; এখন গভীর রাত, হে কালপুরুষ, তবু পৃথিবীর মনে হয়।শতাব্দীর যে-কোনো নটীর ঘরে নীলিমার থেকে কিছু নীচে বিশুদ্ধ মুহূর্ত তার মানুষীর ঘুমের মতন; ঘুম ভালো–মানুষ সে নিজে ঘুমাবার মতন হৃদয় হারিয়ে ফেলেছে তবু। অবরুদ্ধ নগরী কি? বিচূর্ণ কি? বিজয়ী কি? এখন সময় অনেক বিচিত্র রাত মানুষের ইতিহাস শেষ ক’রে তবু রাতের স্বাদের মতো সপ্রতিভ বলে মনে হয়। মানুষের মৃত্যু, ক্ষয়, প্রেম বিপ্লবের ঢের নদীর নগরে এই পাখি আর এই নক্ষত্রেরা ছিলো মনে পড়ে।মকরক্রান্তির রাতে গভীর বাতাস। আকাশের প্রতিটি নক্ষত্র নিজ মুখ চেনাবার মতন একান্ত ব্যাপ্ত আকাশকে পেয়ে গেছে আজ। তেমনি জীবনপথে চলে যেতে হ’লে তবে আর দ্বিধা নেই–পৃথিবী ভঙ্গুর হ’য়ে নিচে রক্তে নিভে যেতে চায়; পৃথিবী প্রতিভা হ’য়ে আকাশের মতো এক শুভ্রতায় নেমে নিজেকে মেলাতে গিয়ে বেবিলন লণ্ডন দিল্লি কলকাতার নক্টার্নে অভিভূত হয়ে গেলে মানুষের উত্তরণ মাঝপথে থেমে মহান তৃতীয় অঙ্কেঃ গর্ভাঙ্কে তবুও লপ্ত হ’য়ে যাবে না কি!– সূর্যে আরো নব সূর্যে দীপ্ত হ’য়ে প্রাণ দাও–প্রাণ দাও পাখি।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/mokorshongkrantir-ratey/
398
কাজী নজরুল ইসলাম
ফরিয়াদ
মানবতাবাদী
এই ধরণীর ধূলি-মাখা তব অসহায় সন্তান মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদি-পিতা ভগবান!- আমার আঁখির দুখ-দীপ নিয়া বেড়াই তোমার সৃষ্টি ব্যাপিয়া, যতটুকু হেরি বিস্ময়ে মরি, ভ’রে ওঠে সারা প্রাণ! এত ভালো তুমি? এত ভালোবাসা? এত তুমি মহীয়ান্‌? ভগবান! ভগবান! তোমার সৃষ্টি কত সুন্দর, কত সে মহৎ, পিতা! সৃষ্টি-শিয়রে ব’সে কাঁদ তবু জননীর মতো ভীতা! নাহি সোয়াসি-, নাহি যেন সুখ, ভেঙে গড়ো, গড়ে ভাঙো, উৎসুক! আকাশ মুড়েছ মরকতে-পাছে আঁখি হয় রোদে ম্লান। তোমার পবন করিছে বীজন জুড়াতে দগ্ধ প্রাণ! ভগবান! ভগবান! রবি শশী তারা প্রভাত-সন্ধ্যা তোমার আদেশ কহে- ‘এই দিবা রাতি আকাশ বাতাস নহে একা কারো নহে। এই ধরণীর যাহা সম্বল,- বাসে-ভরা ফুল, রসে-ভরা ফল, সু-স্নিগ্ধ মাটি, সুধাসম জল, পাখীর কন্ঠে গান,- সকলের এতে সম অধিকার, এই তাঁর ফরমান!’ ভগবান! ভগবান! শ্বেত পীত কালো করিয়া সৃজিলে মানবে, সে তব সাধ। আমরা যে কালো, তুমি ভালো জান, নহে তাহা অপরাধ! তুমি বল নাই, শুধু শ্বেতদ্বীপে জোগাইবে আলো রবি-শশী-দীপে, সাদা র’বে সবাকার টুঁটি টিপে, এ নহে তব বিধান। সন্তান তব করিতেছে আজ তোমার অসম্মান! ভগবান! ভগবান! তব কনিষ্ঠ মেয়ে ধরণীরে দিলে দান ধুলা-মাটি, তাই দিয়ে তার ছেলেদের মুখে ধরে সে দুধের বাটি! ময়ূরের মতো কলাপ মেলিয়া তার আনন্দ বেড়ায় খেলিয়া- সন্তান তার সুখী নয়, তারা লোভী, তারা শয়তান! ঈর্ষায় মাতি’ করে কাটাকাটি, রচে নিতি ব্যবধান! ভগবান! ভগবান! তোমারে ঠেলিয়া তোমার আসনে বসিয়াছে আজ লোভী, রসনা তাহার শ্যামল ধরায় করিছে সাহারা গোবী! মাটির ঢিবিতে দু’দিন বসিয়া রাজা সেজে করে পেষণ কষিয়া! সে পেষণে তারি আসন ধসিয়া রচিছে গোরস’ান! ভাই-এর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে বীরের আখ্যা পান! ভগবান! ভগবান! জনগণে যারা জোঁক সম শোষে তারে মহাজন কয়, সন্তান সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়। মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ, মাটির মালিক তাঁহারাই হন- যে যত ভন্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান। নিতি নব ছোরা গড়িয়া কসাই বলে জ্ঞান-বিজ্ঞান। ভগবান! ভগবান! অন্যায় রণে যারা যত দড় তারা তত বড় জাতি, সাত মহারথী শিশুরে বধিয়া ফুলায় বেহায়া ছাতি! তোমার চক্র রুধিয়াছে আজ বেনের রৌপ্য-চাকায়, কি লাজ! এত অনাচার স’য়ে যাও তুমি, তুমি মহা মহীয়ান্‌ । পীড়িত মানব পারে না ক’ আর, সবে না এ অপমান- ভগবান! ভগবান! ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডঙ্কা শঙ্কা নাহি ক’ আর! ‘ মরিয়া’র মুখে মারণের বাণী উঠিতেছে ‘মার মার!’ রক্ত যা ছিল ক’রেছে শোষণ, নীরক্ত দেহে হাড় দিয়ে রণ! শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড়, সেই হাড়ে ওঠে গান- ‘ জয় নিপীড়িত জনগণ জয়! জয় নব উত্থান! জয় জয় ভগবান!’ তোমার দেওয়া এ বিপুল পৃথ্বী সকলে কবির ভোগ, এই পৃথিবীর নাড়ী সাথে আছে সৃজন-দিনের যোগ। তাজা ফুল ফলে অঞ্চলি পুরে বেড়ায় ধরণী প্রতি ঘরে ঘুরে, কে আছে এমন ডাকু যে হরিবে আমার গোলার ধান? আমার ক্ষুধার অন্নে পেয়েছি আমার প্রাণের ঘ্রাণ- এতদিনে ভগবান! যে-আকাশে হ’তে ঝরে তব দান আলো ও বৃষ্টি-ধারা, সে-আকাশ হ’তে বেলুন উড়ায়ে গোলাগুলি হানে কা’রা? উদার আকাশ বাতাস কাহারা করিয়া তুলিছে ভীতির সাহারা? তোমার অসীম ঘিরিয়া পাহারা দিতেছে কা’র কামান? হবে না সত্য দৈত্য-মুক্ত? হবে না প্রতিবিধান? ভগবান! ভগবান! তোমার দত্ত হসে-রে বাঁধে কোন্‌ নিপীড়ন-চেড়ী? আমার স্বাধীন বিচরণ রোধে কার আইনের বেড়ী? ক্ষুধা তৃষা আছে, আছে মোর প্রাণ, আমিও মানুষ, আমিও মহান্‌ ! আমার অধীনে এ মোর রসনা, এই খাড়া গর্দান! মনের শিকল ছিঁড়েছি, পড়েছে হাতের শিকলে টান- এতদিনে ভগবান! চির-অবনত তুলিয়াছে আজ গগনে উ”চ শির। বান্দা আজিকে বন্ধন ছেদি’ ভেঙেছে কারা-প্রাচীর। এতদিনে তার লাগিয়াছে ভালো- আকাশ বাতাস বাহিরেতে আলো, এবার বন্দী বুঝেছে, মধুর প্রাণের চাইতে ত্রাণ। মুক্ত-কন্ঠে স্বাধীন বিশ্বে উঠিতেছে একতান- জয় নিপীড়িত প্রাণ! জয় নব অভিযান! জয় নব উত্থান!
https://banglarkobita.com/poem/famous/830
787
জসীম উদ্‌দীন
কবিতা
চিন্তামূলক
তাহারে কহিনু, সুন্দর মেয়ে! তোমারে কবিতা করি, যদি কিছু লিখি ভুরু বাঁকাইয়া রবে না ত দোষ ধরি।” সে কহিল মোরে, “কবিতা লিখিয়া তোমার হইবে নাম, দেশে দেশে তব হবে সুখ্যাতি, আমি কিবা পাইলাম ?” স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিনু কি দিব জবাব আর, সুখ্যাতি তরে যে লেখে কবিতা, কবিতা হয় না তার। হৃদয়ের ফুল আপনি যে ফোটে কথার কলিকা ভরি, ইচ্ছা করিলে পারিনে ফোটাতে অনেক চেষ্টা করি। অনেক ব্যথার অনেক সহার, অতল গভীর হতে, কবিতার ফুল ভাসিয়া যে ওঠে হৃদয় সাগর স্রোতে। তারে কহিলাম, তোমার মাঝারে এমন কিছু বা আছে, যাহার ঝলকে আমার হিয়ার অনাহত সুর বাজে। তুমিই হয়ত পশিয়া আমার গোপন গহন বনে, হৃদয়-বীণায় বাজাইয়া সুর কথার কুসুম সনে। আমি করি শুধু লেখকের কাজ, যে দেয় হৃদয়ে নাড়া, কবিতা ত তার ; আর যেবা শোনে-কারো নয় এরা ছাড়া। মানব জীবনে সবচেয়ে যত সুন্দরতম কথা, কবিকার তারই গড়ন গড়িয়া বিলাইছে যথাতথা। সেকথা শুনিয়া লাভ লোকসান কি জানি হয় না হয়, কেহ কেহ করে সমরকন্দ তারি তরে বিনিময়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/583
5194
শামসুর রাহমান
রৌদ্র করোটিতে
চিন্তামূলক
জীবনকে তুখোড় যদি সারাক্ষণ মাতলামো করি আর শরীর গাঁজার গন্ধে ভরে ছট করে চলে যাই সাঙাতের ফুর্তিবাজ রকে, পাপকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলি হ্রদের আলোর মতো যদি উৎপীড়িত অন্ধকারে, ঘেয়ো ভিখিরির ছেঁড়া ন্যাকড়ার ভাঁজে নক্ষত্রের ছায়া দেখি যদি অথবা স্বপ্নের ঠাণ্ডা হরিণকে কাঁধে নিয়ে, ওহে, কোথাও অলক্ষ্যে স’রে পড়ি, কনে-দেখা আলো সাক্ষী রেখে বড়বাবু পৃথিবীকে একটা সালাম ঠুকে হো-হো হেসে উঠি অতর্কিতে বদরাগী উর্দি দেখে,তবে কি বেল্লিক ভেবে সরাসরি দেবে নির্বাসন চিরতরে অথবা লেখাবে দাসখৎ শোকাবহ আত্মার সাক্ষাতে? যাই করো, চিরদিন আমি তবু থাকব অনড় সাক্ষী তোমাদের কাপুরুষতার।জানি যারা দেখতে চায় নিষ্কলুষ জ্যোৎস্নার সারস ঘুমেভরা ডানা দুটি গুটিয়ে রয়েছে ব’সে ভাঙা দেয়ালের মস্ত বড় হাঁয়ের ভেতর, দেখতে চায় বয়স্কের তোবড়ানো গালের মতন অতীতের ধসে কয়েকটি ক্লান্ত নর্তকী ঘুঙুর নিয়ে করে নাড়াচাড়া, যারা দেখতে চায় ঝাড়লণ্ঠনের নিচে মোহিনী সৌন্দর্য আবর্তিত কুৎসিতের আলিঙ্গনে রাত্রির স্খলিত গালিচায়, ফেলেনি নোঙর তারা কোনো দিন বণিকের জ্বলজ্বলে সম্পন্ন বন্দরে। নির্বাসন দাও যদি জনহীন অসহ্য সৈকতে, নিহত আত্মার শোকে করব না কখনো বিলাপ। বরং নির্মেষ মনে হাত-পা ছড়িয়ে অবিচল দুর্দশার প্রহার গ্রহণযোগ্য করে দেখব সে ডানপিটে সূর্যটাও সহসা উধাও অন্ধকার বনে; নিশাচর বেদে চাঁদের প্রসন্ন মুখে পাখা ঝাপটায় ঢাউস বাদুড়, ছিঁড়ে ফেলে শুভ্রতাকে।কখনো দেখব স্নপ্ন-কয়েকটি জলদস্যু যেন অবলীলাক্রমে কাটা মুণ্ডুর চামড়া নিচ্ছে তুলে অব্যর্থ ছোরার হিংস্রতায়, গড়ায় মদের পিপে রক্তিম বালিতে আর বর্বর উল্লাসে চতুর্দিকে কম্পিত পাতার মতো শব্দের ধমকে। কখনোবা হঠাৎ দেখব জেগে শুয়ে আছি হাত-পা ছড়ানো বিকেলের সাথে নামহীন কবরের হল্‌দে ঘাসে, দেখব অঢেল রৌদ্রে ঝল্‌সে উঠে ঝরায় চুম্বন ওষ্ঠহীন করোটিতে, জানব না সে করোটি কার, সম্রাট অথবা ভাঁড় যার হোক আমি শুধু একা দেখব রৌদ্রের খেলা একটি নির্মোহ করোটির তমসায় দেখব কে ছুঁয়ে যায় কালের বুড়িকে।   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/roudro-korotite/
4732
শামসুর রাহমান
জীবন তো প্রকৃত খেলার মাঠ
চিন্তামূলক
(বন্ধু তওফিক আজিজ খানের স্মরণে)জীবন তো প্রকৃত খেলারই মাঠ, আমরা সবাই খেলে যাই যে যার মতোই। যতদূর জানি তুমি শুরু থেকে শেষ অব্দি খেলেছ, বান্ধব, নিজের ধরনে ক্রিকেটের দক্ষ ব্যাটস্‌ম্যানের ভঙ্গিমায়। সাজিয়েছ আপন সংসার সুচারু অভিনিবেশে, যেমন ব্যাটস্‌ম্যান তার সফল ইনিংস। প্রতি পদক্ষেপে ছিল নিষ্ঠা আর ভঙ্গিতে সুষমা। বিপরীত দিক থেকে বল এলে কখনো ধৈর্যের সঙ্গে ঠেকিয়ে দিয়েছে, কখনো-বা ফুটিয়েছ চারের মারের ফুলঝুরি।ফুলবাণে বিদ্ধ হয়ে যখন উতলা ছিলে খুব, তখন সে কাঙ্ক্ষিতা তোমার প্রিয় জীবনসঙ্গিনী হয়ে বাঁধলো তোমাকে আলিঙ্গনে। তোমরা দুজন গড়েছিলে সুখের, শান্তির নীড়। প্রিয়ার চুম্বন আর সন্তানের খেলা তোমার ক্লান্তির ছায়াটিকে সহজে দিয়েছে মুছে। জীবনের মাঠে কখন যে কোন্‌ অঘটন ঘটে, কে তার হিশের রাখে? তোমার প্রতিটি শটে ছিল শিল্পের বিভাস, তবে কেন সেঞ্চুরী না হাঁকিয়ে হঠাৎ পরাজয় মেনে নিয়ে ব্যাট মাঠে ঠুকে ঠুকে বিশ্রামের কুয়াশায় নাকি ভবঘুরে মেঘদলে, পড়লে ঘুমিয়ে সেই শোকে, হে বন্ধু, যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না কস্মিনকালে। কেন চলে গেলে?ছিল না নাছোড় স্তব্ধ অভিমান কোনো? যতদূর চিনেছি তোমাকে, ছিলে তুমি দিব্যি হাসিখুশি, বাস্তবের খেলাঘরে সমর্পিত। কোন্‌ সে খেয়ালি আম্পায়ার আচমকা আঙুলের সংকেতে তোমাকে পিচ ছেড়ে যেতে বললেন আর সেই জ্বলজ্বলে ইনিংসটি পুরো না খেলেই তুমি হায়, মিশে গেলে অজানা কোথায়!  (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jibon-to-prokrito-khelar-math/
1399
তারাপদ রায়
সব কথা তোমাকে জানাবো ভেবেছিলাম
প্রেমমূলক
সব কথা তোমাকে জানাবো ভেবেছিলাম কিনে এনেছিলাম আকাশী রঙের বিলিতি হাওয়াই চিঠি সে চিঠির অক্ষরে অক্ষরে লেখা যেত কেন তোমাকে এখনো চিঠি লেখার কথা ভাবি লেখা যেত আমাদের উঠোনে কামিনী ফুলগাছে এবার বর্ষায় ফুলের ছড়াছড়ি তুমি আরেকটু কাছে থাকলেই বৃষ্টিভেজা বাতাসে সে সৌরভ তোমার কাছে পৌঁছতো আর তোমার উপহার দেওয়া সেই স্বচ্ছন্দ বেড়ালছানা এখন এক মাথামোটা অতিকায় হুলো সারা রাত তার হুঙ্কারে পাড়ার লোকেরা অস্থির। তোমাকে জানানো যেত, এবছর কলকাতায় গ্রীষ্ম বড় দীর্ঘ ছিল এখন পর্যন্ত বর্ষার হাবভাবও খুব সুবিধের নয়। এদিকে কয়েকমাস আগে নিউ মার্কেট আর্দ্ধেকের বেশী পুড়ে ছাই। আর দুনম্বর হাওড়া ব্রীজ শেষ হওয়ার আগেই যেকোনো দুনম্বরি জিনিসের মত ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে। এদিকে এর মধ্যে আবার নির্বাচন এসে গেল, অথচ কে যে কোন দলে, কার পক্ষে তা আজও জানা গেলনা। কিন্তু এসব তোমাকে কেন জানাবো? এসব খবরে তোমার এখন কোনো প্রয়োজননেই। অথচ এর থেকেও কি যেন তোমাকে জানানোর ছিল, কিছু একটা আছে, কিন্তু সেটা যে ঠিক কি পরিষ্কার করে আমি নিজেও বুঝতে পারছিনা। টেবিলের একপাশে কাঁচের কাগজচাপার নীচে ধুলোয়, বাতাসে বিবর্ণ হয়ে আসছে হাওয়াই চিঠি। তার গায়ে ডাকের ছাপের চেয়ে একটু বড়, অসতর্ক চায়ের পেয়ালার গোল ছাপ, পাখার হাওয়ায় সারাদিন, সারারাত ফড় ফড় করে ডানা ঝাপটায় সেই ঠিকানাবিহীন রঙিন ফাঁকা চিঠি। অথচ তোমার কাছে তার উড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3896.html
1660
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
মনে পড়ে
প্রেমমূলক
ভুলে গেলে ভাল হত, তবু ভোলা গেল না এখনও। পঁয়ত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে, তবু কোনো-কোনো মুহূর্তে তোমাকে মনে পড়ে। স্রোতের গোপন টানে ভেসে যায় পিতলের ঘড়া। অথচ বেদনা তার থেকে যায়। তাই বসুন্ধরা কেঁপে ওঠে ফাল্গুনের ঝড়ে। মনে পড়ে, মনে পড়ে, এখনও তোমাকে মনে পড়ে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1533
3407
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুষ্প
চিন্তামূলক
পুষ্প ছিল বৃক্ষশাখে, হে নারী, তোমার অপেক্ষায় পল্লবচ্ছায়ায়। তোমার নিশ্বাস তারে লেগে অন্তরে সে উঠিয়াছে জেগে, মুখে তব কী দেখিতে পায়।সে কহিছে-- "বহু পূর্বে তুমি আমি কবে একসাথে আদিম প্রভাতে প্রথম আলোকে জেগে উঠি এক ছন্দে বাঁধা রাখী দুটি দুজনে পরিনু হাতে হাতে।"আধো আলো-অন্ধকারে উড়ে এনু মোরা পাশে পাশে প্রাণের বাতাসে। একদিন কবে কোন্‌ মোহে দুই পথে চলে গেনু দোঁহে আমাদের মাটির আবাসে।"বারে বারে বনে বনে জন্ম লই নব নব বেশে নব নব দেশে। যুগে যুগে রূপে রূপান্তরে ফিরিনু সে কী সন্ধান-তরে সৃজনের নিগূঢ় উদ্দেশে।"অবশেষে দেখিলাম কত জন্ম-পরে নাহি জানি ওই মুখখানি। বুঝিলাম আমি আজও আছি প্রথমের সেই কাছাকাছি, তুমি পেলে চরমের বাণী।"তোমার আমার দেহে আদিছন্দ আছে অনাবিল আমাদের মিল। তোমার আমার মর্মতলে একটি সে মূল সুর চলে, প্রবাহ তাহার অন্তঃশীল।"কী যে বলে সেই সুর, কোন্‌ দিকে তাহার প্রত্যাশা, জানি নাই ভাষা। আজ, সখী, বুঝিলাম আমি সুন্দর আমাতে আছে থামি-- তোমাতে সে হল ভালোবাসা।'
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/puspo/
2221
মহাদেব সাহা
ভুলে-ভরা আমার জীবন
চিন্তামূলক
ভুলে-ভরা আমার জীবন, প্রতিটি পৃষ্ঠায় তার অসংখ্য বানান ভুল এলোমেলো যতিচিহ্ন; কোথাও পড়েনি ঠিক শুদ্ধ অনুচ্ছেদ আমার জীবন সেই ভুলে-ভরা বই, প্রুফ দেখ হয়নি কখনো। প্রতিটি পাতায় তাই রাশি রাশি ভুল, ভুল কাজ, ভুল পদক্ষেপ আমার জীবন এ আগাগোড়া ভুলের গণিত, এই ভুল অঙ্ক আমি সারাটি জীবন ধরে কষে কষে মেলাতে পারিনি ফল তার শুধু শূন্য, শুধু শূন্য, শুধু শূন্য। আমি সব মানুষেল মতো মুখস্ত করিনি এই জীবনের সংজ্ঞা, সূত্র আর ব্যাকরণ রচনা বইয়ে পড়া মহৎ জীবনী দেখে আমি কোনোদিন শুরু করিনি জীবন, দেখেছি প্রত্যহ আমি সকালের কাজ বিকেলে কীভাবে পুরোপুরি ভুল হয়ে যায় বিকেলের কাজ রাতের আগেই মনে হয় ভুলের ধুলোতে ছেয়ে গেছে। আমার জীবন এই ভুলে-ভরা দিনরাত্রির কবিতা অসংখ্যা ভুলের নুড়ি ও পাথর হয়েছে থলিতে তার জমা আমার জীবন একখানি স্বরচিত ভুলের আকাশ আমি তার কাছ থেকে কুড়াই দুহাত ভরে কেবল স্বপ্নের হাড়গোড়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1385
980
জীবনানন্দ দাশ
কতদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে
সনেট
কতদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়াছি আমরা দুজনে; আকাশ প্রদীপ জ্বেলে তখন কাহারা যেন কার্তিকের মাস সাজায়েছে, — মাঠ থেকে গাজন গানের স্নান ধোঁয়াটে উচ্ছ্বাস ভেসে আসে; ডানা তুলে সাপমাসী উড়ে যায় আপনার মনে আকন্দ বনের দিকে; একদল দাঁড়কাক ম্লান গুঞ্জরণে নাটার মতন রাঙা মেঘ নিঙড়ায়ে নিয়ে সন্ধ্যার আকাশ দু’মুহূর্ত ভরে রাখে — তারপর মৌরির গন্ধমাখা ঘাস পড়ে থাক: লক্ষ্মীপেঁচা ডাল থেকে ডালে শুধু উড়ে চলে বনেআধো ফোটা জ্যোৎস্নায়; তখন ঘাসের পাশে কতদিন তুমি হলুদ শাড়িটি বুকে অন্ধকারে ফিঙ্গার পাখনার মতো বসেছ আমার কাছে এইখানে — আসিয়াছে শটিবন চুমি গভীর আঁধার আরো — দেখিয়াছি বাদুড়ের মৃদু অবিরত আসা — যাওয়া আমরা দুজনে বসে বলিয়াছি ছেঁড়াফাঁড়া কত মাঠ ও চাঁদের কথা: ম্লান চোখে একদিন সব শুনেছ তো।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/koto-din-sondhyar-ondhokarey/
2332
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
নন্দন-কানন
সনেট
লও দাসে, হে ভারতি, নন্দন-কাননে, যথা ফোটে পারিজাত ; যথায় উৰ্ব্বশী,--- কামের আকাশে বামা চির-পূর্ণ-শশী,— নাচে করতালি দিয়া বীণার স্বননে ; যথা রম্ভা, তিলোত্তমা, অলকা রূপসী মোহে মনঃ সুমধুর স্বর বরিষণে ,— মন্দাকিনী বাহিনীর স্বর্ণ তীরে বসি, মিশায়ে সু-কণ্ঠ-রব বীচির বচনে ! যথায় শিশিরের বিন্দু ফুল্ল ফুল-দলে সদা সদ্যঃ ; যথা অলি সতত গুঞ্জরে ; বহে যথা সমীরণ বহি পরিমলে ; বসি যথা শাখা-মুখে কোকিল কুহরে ; লও দাসে ; আঁখি দিয়া দেখি তব বলে ভাব-পটে কল্পনা যা সদা চিত্র করে।
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/nandankanon/
1299
তসলিমা নাসরিন
অভিমান
প্রেমমূলক
কাছে যতটুকু পেরেছি আসতে, জেনো দূরে যেতে আমি তারো চেয়ে বেশী পারি। ভালোবাসা আমি যতটা নিয়েছি লুফে তারো চেয়ে পারি গোগ্রাসে নিতে ভালোবাসা হীনতাও। জন্মের দায়, প্রতিভার পাপ নিয়ে নিত্য নিয়ত পাথর সরিয়ে হাঁটি। অতল নিষেধে ডুবতে ডুবতে ভাসি, আমার কে আছে একা আমি ছাড়া আর ?
https://banglarkobita.com/poem/famous/414
4903
শামসুর রাহমান
নৈঃসঙ্গ্য-লালিত আমি
সনেট
নৈঃসঙ্গ্য লালিত আমি। শিরায় শিরায়, লোমকূপে কী শীতল স্রোত বয় সারাক্ষণ, অস্থিমজ্জা নিঝুম পল্লীর মতো। নিজে খাপছাড়া বলে লজ্জা পাই খুব একান্ত নিজেরই কাছে। নৈরাশের যূপে প্রায়শ আমাকে ঠেলে দ্যায়, দ্যায় বিরূপ দঙ্গলে ছুঁড়ে ক্ষিপ্র আমার ভেতরকার কোনো প্রতিপক্ষ এবং মনুষ্যরূপী মড়াখেকেদের সঙ্গে সখ্য জমে ওঠে নিত্য দিকচিহ্নহীন অসিত জঙ্গলে।আমি কি নৈঃসঙ্গপ্রিয় আজীবন? গাছপালা, পাখি পাখালির ভিড়ে, পশুদের কাছে, খরগোশের গায়ে মুখ ঢেকে, জনহীন ঝর্নাতলে আনন্দ আনন্দ ব’লে মেতে থাকতেই চাই জীবনের সব ফাঁকি, উন্মত্ত সংঘর্ষ রক্ত ফেনিলতা ভুলে বনচ্ছায়ে? মানুষের সঙ্গ অভিলাষী আমি, থাক শত দ্বন্দ্ব।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/noisongyo-lalito-ami/
4229
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
বাগানে তার ফুল ফুটেছে
প্রেমমূলক
ওইখানে ওই বাগানে তার ফুল ফুটেছে কতো জানতে পারি, ওর মধ্যে কি একটি দেবার মতো? একটি কিম্বা দুটির ইচ্ছে আসতে আমার কাছে তাহার পদলেহন করতে সমস্ত ফুল আছে। সব ফুলই কি গোষ্ঠীগত, সব ফুলই কি চাঁদের একটি দুটি আমায় চিনুক, বাদবাকি সব তাঁদের গাছ তো তাঁহার বাগানভর্তি, আমার রোপণ ছায়া– প্রবীণ তাঁদের ভালোবাসা, আমার বাসতে চাওয়াই।।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/bagane-taar-phul-futechhe/
83
আবিদ আনোয়ার
প্রত্নরমণী
প্রেমমূলক
তোমাকে দেখেনি মধ্যযুগের নিপুণ পটুয়া, অজন্তা কিবা ইলোরার ভাস্কর-- তাহলে দেখতে শত ক্যানভাসে, ব্রোঞ্জে-পিতলে কষ্টিপাথরে, টেরাকোটা-কাঠ-সোনার পুতুলে তুমি সাজিয়েছো পুরাকীর্তির সবগুলো যাদুঘর!কৃষ্ণের পাশে যে আছে দাঁড়িয়ে যৌবনবতী পাথুরে-স্তনের নারী লজ্জায় ভেঙে খান খান হবে তুমি যদি শুধু একটু সাহসে জোড়ামূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে খুলে ফেলো এই শাড়ি!তোমাকে মানাতো প্রত্নবেদীতে পঞ্চালিকায় গোপীচন্দনে তিলক পরালে বৈষ্ণব কবি, কোলাহলময় বিশ-শতকের শেষপাদে কেন এলে? নষ্ট কালের ভ্রষ্ট প্রেমিক কী দিয়ে তোমার বন্দনা করি? নারী-কীর্তনে ব্যবহৃত সব উপমা দিয়েছি ফেলে!তোমাকে দেখেনি চিতোরের রাজা, রূপের পূজারী রসিক রত্নসেন-- তাহলে দেখতে নিদারুণ ক্ষোভে মিথ্যুক সেই হীরামন পাখি, এমনকি প্রিয় পদ্মাবতীকে এক-শূলে চড়াতেন!নর্তকী নও, তোমার চলার পথ জুড়ে তবু প্রবাহিত তুমি নৃত্যের নানা মুদ্রায়: দ্যভিঞ্চি আর হেনরী’র নারী আমাদের প্রিয় রাজহংসীরা তোমাকে দেখেই গ্রীবাভঙ্গির অসঙ্গতিকে শোধরায়।তুমি চলে গেলে ঘর জুড়ে হাঁটে তোমার প্রতিমা, সারা বাড়ি হয় পরাবাস্তব কোনারক ও খাজুরাহো: সাজের টেবিলে-বিছানা-বালিশে, ফাঁকা করিডোরে-বিরান হেঁসেলে থেকে থেকে জলে ‘তুমি নেই’ এই সত্যের দাবদাহ।
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/an-archaic-woman/
3167
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি যে তুমিই, ওগো
প্রেমমূলক
তুমি যে তুমিই, ওগো সেই তব ঋণ আমি মোর প্রেম দিয়ে শুধি চিরদিন।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumi-je-tumii-ogo/
3560
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাসাবাড়ি
ছড়া
এই শহরে এই তো প্রথম আসা। আড়াইটা রাত, খুঁজে বেড়াই কোন্‌ ঠিকানায় বাসা। লণ্ঠনটা ঝুলিয়ে হাতে আন্দাজে যাই চলি, অজগরের ভূতের মতন গলির পরে গলি। ধাঁধাঁ ক্রমেই বেড়ে ওঠে, এক জায়গায় থেমে দেখি পথে বাঁদিক থেকে ঘাট গিয়েছে নেমে। আঁধার মুখোষ-পরা বাড়ি সামনে আছে খাড়া; হাঁ-করা-মুখ দুয়ারগুলো, নাইকো শব্দসাড়া। চৌতলাতে একটা ধারে জানলাখানার ফাঁকে প্রদীপশিখা ছুঁচের মতো বিঁধছে আঁধারটাকে। বাকি মহল যত কালো মোটা ঘোমটা-দেওয়া দৈত্যনারীর মতো। বিদেশীর এই বাসাবাড়ি কেউবা কয়েক মাস এইখানে সংসার পেতেছে, করছে বসবাস; কাজকর্ম সাঙ্গ করি কেউবা কয়েকদিনে চুকিয়ে ভাড়া কোন্‌খানে যায়, কেই বা তাদের চিনে। শুধাই আমি, "আছ কি কেউ, জায়গা কোথায় পাই।" মনে হল জবাব এল, "আমরা নাই নাই।" সকল দুয়োর জানলা হতে, যেন আকাশ জুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে রাতের পাখি শূন্যে চলল উড়ে। একসঙ্গে চলার বেগে হাজার পাখা তাই অন্ধকারে জাগায় ধ্বনি, "আমরা নাই নাই।" আমি সুধাই, "কিসের কাজে এসেছ এইখানে।" জবাব এল, "সেই কথাটা কেহই নাহি জানে। যুগে যুগে বাড়িয়ে চলি নেই-হওয়াদের দল, বিপুল হয়ে ওঠে যখন দিনের কোলাহল সকল কথার উপরেতে চাপা দিয়ে যাই-- নাই, নাই, নাই।" পরের দিনে সেই বাড়িতে গেলাম সকালবেলা-- ছেলেরা সব পথে করছে লড়াই-লড়াই খেলা, কাঠি হাতে দুই পক্ষের চলছে ঠকাঠকি। কোণের ঘরে দুই বুড়োতে বিষম বকাবকি-- বাজিখেলায় দিনে দিনে কেবল জেতা হারা, দেনা-পাওনা জমতে থাকে, হিসাব হয় না সারা। গন্ধ আসছে রান্নাঘরের, শব্দ বাসন-মাজার; শূন্য ঝুড়ি দুলিয়ে হাতে ঝি চলেছে বাজার। একে একে এদের সবার মুখের দিকে চাই, কানে আসে রাত্রিবেলার "আমরা নাই নাই"।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/basabare/
5813
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নীরার পাশে তিনটি ছায়া
প্রেমমূলক
নীরা এবং নীরার পাশে তিনটি ছায়া আমি ধনুকে তীর জুড়েছি, ছায়া তবুও এত বেহায়া পাশ ছাড়ে না এবার ছিলা সমুদ্যত, হানবো তীর ঝড়ের মতো– নীরা দু’হাত তুলে বললো, ‘মা নিষাদ! ওরা আমার বিষম চেনা!’ ঘূর্ণি ধুলোর সঙ্গে ওড়ে আমার বুক চাপা বিষাদ– লঘু প্রকোপে হাসলো নীরা, সঙ্গে ছায়া-অভিমানীরা ফেরানো তীর দৃষ্টি ছুঁয়ে মিলিয়ে গেল নীরা জানে না!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1870
5256
শামসুর রাহমান
সনেটের শতদল
সনেট
হে আমার সনেটের নিঃসীমা, তোমাকেই কী ব্যাকুল চায় খরাচিহ্নময় কবিতার খাতা তুচ্ছতা সরিয়ে পাশে। ‘সেজে ওঠো তুমি শূন্যে পাতা’ বলে প্রার্থনার স্বরে আর প্রায় প্রতিদিন এই রোগশয্যা খুব মেতে ওঠে সকলের আড়ালেই নক্ষত্রের কণাসমূহের নাচে, বসন্ত-উৎসবে; অষ্টক ঘটক আসে বারে বারে উল্লাসে গৌরবে। হে সনেটমালা তোমাদের বিনা আজ সুখ নেই।রোগশয্যা ক্রমশ উন্নীত হয়, যেন নীলিমায় নিশ্চিন্ত আশ্রয় নেবে। শয্যাগত আমি মেঘ ছুঁই, কে এক সুন্দরীতমা ছুঁয়ে যায় আমাকে আঁচল দিয়ে তার; অভ্রের গুঁড়োর মতো শব্দ ঝরে যায় চারপাশে; কোনো শব্দ কল্যাবতী, কোনো শব্দ জুঁই, কোনো শব্দ বেলী রূপে হয় সনেটের শতদল।  (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/soneter-shotodol/
4770
শামসুর রাহমান
তাচ্ছিল্য উজিয়ে
রূপক
‘এখানে এসে কি ভুল করলাম?’ এই প্রশ্ন তাকে চঞ্চুতে স্থাপন করে। উস্‌কো খুস্‌কো চুল, গালে দাড়ি কামানোর কাটা দাগ, শার্টের কলারে এক টুকরো ঘাস, যেন স্তম্ভিত টিকটিকির জিভ। এখানে আসার আগে ছিলেন নির্জন মাঠে শুয়ে। মেঠো ঘ্রাণ ঘিরে আছে তাকে, বুঝি উদ্ভিদের প্রাণ তার মাঝে সঞ্চারিত; কেউ তাকে আড় চোখে দ্যাখে, কেউ কেউ উপেক্ষার ডগায় নাচিয়ে কিছুক্ষণ ভিন্ন দিকে নজর ফেলায়, তিনি তাচ্ছিল্য উজিয়ে বললেন, ‘এসো কোণে, একা গুঞ্জনের অন্তরালে’।চোখে তার দূর দূরান্তের ছায়া। একে-একে ক’জন অতিথি কণ্ঠে ভাষণের মনোহর নক্‌শা ফুটিয়ে প্রচুর সুখ্যাতি পেলেন, সারা ঘর করতালিময়। এবার বলার পালা তার। অপ্রস্তুত,থতোমতো, গলায় কিসের দলা বাক্য-রোধক, হঠাৎ তার দু’ ভুরুর মাঝখানে রঙধনু জেগে ওঠে, ভোরের শেভের কাটা দাগে দোলে পুষ্পরেণু, কণ্ঠে ফোটে অচিন পাখির ধ্বনি। সারা ঘর নিস্তব্ধ প্রান্তর।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tacchillyo-ujie/
5356
শামসুর রাহমান
হেঁটে হেঁটে বেশ কিছুদূর এসে
সনেট
হেঁটে হেঁটে বেশ কিছুদূর এসে আজ মনে হয়- এই যে এতটা পথ পেরিয়ে এলাম কত আলো, কত অন্ধকার খেলা করেছে আমার সঙ্গে। ভালো, মন্দ এসে ঘিরেছে আমাকে আর ক্রুর দ্বন্দ্বময় অন্তরের ইতিহাস রয়ে যাবে অজানা নিশ্চয়। যদি নগ্নতায় উদ্ভসিত হতো অন্তর্লোক, তবে অনেকে আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতো নীরবে, কেউ কেউ দিতো টিটকিরি দিব্যি রাজপথময়।আমরা এমন যুগে বাস করছি, যখন কেউ পাশে এসে বসলে ভীষণ উসখুস বোধ করি। মনে হয়, পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির শার্টের খুব ফিকে আড়ালে রিভলবার কিংবা ছোরা ঘাপ্টিমারা ফেউ হয়ে আছে। এক্ষুণি লোকটা হাসিমুখে তড়িঘটি হিম লাশ করে দেবে জলজ্যান্ত ভদ্রলোকটিকে!   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/hete-hete-besh-kichudur-eshe/
2904
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালো ঘোড়া
চিন্তামূলক
কালো অশ্ব অন্তরে যে সারারাত্রি ফেলেছে নিশ্বাস সে আমার অন্ধ অভিলাষ। অসাধ্যের সাধনায় ছুটে যাবে ব'লে দুর্গমেরে দ্রুত পায়ে দ'লে খুরে খুরে খুঁড়েছে ধরণী, করেছে অধীর হ্রেষাধ্বনি।ও যেন রে যুগান্তের কালো অগ্নিশিখা, কালো কুজ্ঝটিকা। অকস্মাৎ নৈরাশ্য-আঘাতে দ্বার মুক্ত পেয়ে রাতে দুর্দাম এসেছে বাহিরিয়া। যারে নিয়ে এল সে-যে ব্যথায় মূর্তিত মোর প্রিয়া, বাহিরে না স্থান পেয়ে ধ্যানের আসন ছিল ছেয়ে।              এ-অমাবস্যায় বল্গাহারা কালো অশ্ব ঊর্ধ্বশ্বাসে ধায়। কালো চিন্তা মম আত্মঘাতী ঝঞ্ঝাসম বিস্মৃতির চিরবিলুপ্তিতে চলে ঝাঁপ দিতে নিরঙ্কিত পথ বেয়ে। যাক ধেয়ে। সৃষ্টিহীন দৃষ্টিহীন রাত্রিপারে ব্যর্থ দুরাশারে নিয়ে যাক্‌-- অন্তিম শূন্যের মাঝে নিশ্চল নির্বাক্‌। তার পরে বিরহের অগ্নিস্নানে শুভ্র মন রৌদ্রস্নাত আশ্বিনের বৃষ্টিশূন্য মেঘের মতন উন্মুক্ত আলোকে দীপ্তি পাক্‌ সুনির্মল শোকে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kalo-gura/
424
কাজী নজরুল ইসলাম
বিদায়-মাভৈঃ
মানবতাবাদী
বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়, বিশ্বাসী! বলো আসবে আবার প্রভাত-রবির জয়! খণ্ড করে দেখছে যারা অসীম জীবনটাই, দুঃখ তারাই করুক বসে, দুঃখ মোদের নাই। আমরা জানি, অস্ত-খেয়ায় আসছে রে উদয়। বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়।হারাই-হারাই ভয় করেই না হারিয়ে দিলি সব! মরার দলই আগলে মড়া করছে কলরব। ঘরবাড়িটাই সত্য শুধু নয় কিছুতেই নয়। বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়।দৃষ্টি-অচিন দেশের পরেও আছে চিনা দেশ, এক নিমেষের নিমেষ-শেষটা নয়কো অশেষ শেষ। ঘরের প্রদীপ নিবলে বিধির আলোক-প্রদীপ রয়। বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়।জয়ধ্বনি উঠবে প্রাচীন চিনের প্রাচীরে, অস্ত-ঘাটে বসে আমি তাই তো নাচি রে। বিদায়-পাতা আনবে ডেকে নবীন কিশলয়, বিশ্বাসী! বল আসবে আবার প্রভাত-রবির জয় ।  (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bidai-mavoi/
5246
শামসুর রাহমান
শ্রাবণের বিদ্যুতের মতো
সনেট
সযত্নে রাখবে পুষে তুমি সর্বদা আমার স্মৃতি, করি না এমন অসম্ভব দাবি, বিস্মৃতিপ্রবণ, কম বেশি, সকলেই। মাঝে-মধ্যে করলে স্মরণ উদাস প্রহরে কোনো, খুব ফিকে-হয়ে-আসা প্রীতি ধূলোর দবিজ পর্দা চকিতে সরিয়ে যথারীতি তুললে স্মিত মুখ, আমি তোমার নিকট আমরণ থাকবো কৃতজ্ঞ আর ঘটুক যতই অঘটন, স্মৃতিতে জ্বলবে তবু তোমার স্বপ্নের মতো সিঁথি।আমাকে রাখবে কিনা মনে, হে নবীনা, চিরদিন তা ভেবে উদ্বিগ্ন নই আদপেই আমি আপাতত, চাই না তোমার দীপ্র দরজায় অভ্যর্থনাহীন দাঁড়িয়ে থাকতে আর। এসো কাছে এসো বলে ডাকে তোমাকে আমার প্রতি অঙগ সময়ের প্রতি বাঁকে; এসো কাছে এসো তুমি শ্রাবণের বিদ্যুতের মতো।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shraboner-bidyuter-moto/
1905
পূর্ণেন্দু পত্রী
সেই সবও তুমি
প্রেমমূলক
তোমাকেই দৃশ্য মনে হয়। তোমার ভিতরে সব দৃশ্য ঢুকে গেছে। কাচের আলমারি যেন, থাকে থাকে, পরতে পরতে শরতের, হেমন্তের, বসন্তের শাড়ি গয়না দুল, নদীর নবীন বাঁকা, বৃষ্টির নুপুর, জল, জলদ উদ্ভিদ। সাঁচীস্তুপে, কোনারকে যায় যারা, গিয়ে ফিরে আসে দুধ জ্বাল দিয়ে দিয়ে ক্ষীর করা স্বাদ জিভে নিয়ে তোমার ভিতরে সেই ভাস্কর্যেরও লাবণ্য রয়েছে। কোন্‌খানে আছে? চুলে না গ্রীবায়, নাকি স্তনে? হাজারিবাগের গাঢ় জঙ্গলের গন্ধ পাই তোমার জঙ্ঘায়। ভয়াবহ খাদ থেকে নাচের মাদল, বাঁশী ডাকে। বহুদূর ভেসে যেতে যতখানি ঝর্নাজল লাগে তাও আছে, কোনখানে আছে? চোখে, না চিবুকে? দুমকায় তোমারই মতো একটি পাহাড়ী টিলা মেঘের আয়নায় মুখ রেখে খোঁপায় গুজছিল লাল গোধূলির ফুল। তুমি কালএমন তাকালে মনে হলো বীরভুমের দিগন্তের দাউ দাউ পলাশ। জয়পুরের জালি কাটা ঝুল-বারান্দার মতো সমৃদ্ধ খিলান, তাও আছে। কোন্‌খানে আছে? ভূরুতে, না ঠোঁটে? জলপাইগুড়ির কোনো ছাদ থেকে কাঞ্চনজঙঘার যতটুকু আলো, ওড়না, নীলরশ্মি সেই সবও তুমি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1316
5501
সুকান্ত ভট্টাচার্য
প্রার্থী
মানবতাবাদী
হে সূর্য! শীতের সূর্য! হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায় আমরা থাকি, যেমন প্রতীক্ষা ক'রে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ, ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে। হে সূর্য, তুমি তো জানো, আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব! সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে, এক-টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে, কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই! সকালের এক-টুকরো রোদ্দুর এক টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী। ঘর ছেড়ে আমরা এদিক ওদিকে যাই এক-টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায়। হে সুর্য! তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে উত্তাপ আর আলো দিও, আর উত্তাপ দিও, রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে। হে সূর্য তুমি আমাদের উত্তাপ দিও শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড, তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হব! তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা, তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে। আজ কিন্তু আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/254
1531
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
অন্ত্য রঙ্গ
প্রেমমূলক
হারে-রে রঙ্গিলা, তোর কথার টানে টানে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াই, সমস্ত রাতভোর কোন্‌ কামনার আগুন ছুঁয়ে স্বপ্ন দেখি তোর, কোন্‌ দুরাশার, রঙ্গিলা? তুই হঠাৎ কোনোখানে না ভাঙলে না-দেখার দেয়াল, মিথ্যে এ তোর খোঁজে দিন কাটানোল বাঁধন খোলার স্বপ্নে দিয়ে ছাই ঘর ছাড়িয়ে পরিয়ে দিলি পথের বাঁধন, তাই ব্যর্থ হল রঙ্গিলা তোর সমস্ত রঙ্গ যে। হারে-রে রঙ্গিলা, তোর গানের টানে টানে পার হয়েছি দুঃখ, তবু কেমন করে ভুলি আজও আমার জীর্ণ শাখায় সুখের কুঁড়িগুলি পাপড়ি মেলে দেয়নি, আমার শুকনো মরা গাঙে তরঙ্গ নেই, হৃদয়ধনুর দৃপ্ত কঠিন ছিলা দিনে দিনে শিথিল হল; রঙ্গিলা, এইবার অন্ধকারকে ছিন্ন করে ফুলের মন্ত্র আর ঢেউয়ের মন্ত্র শেখা আমায়, রঙ্গিলা রঙ্গিলা! হারে-রে রঙ্গিলা, তোর সময় নিরবধি রঙ্গও অনন্ত, আমার সময় নেই যে আর, কে আমাকে শিখিয়ে দেবে পথের হাহাকার কী করে হয় শান্ত, আমার প্রাণের শুকনো নদী উজান বইবে কেমন করে, অমর্ত্য কোন্‌ গানে ফুল ফুটিয়ে ব্যর্থ করি শীতের তাড়নায়,– তুই যদি না শেখাস তবে চলব না আর, না, রঙ্গিলা তোর কথার টানে, টানের টানে টানে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1614
4296
শামসুর রাহমান
অথচ দরজা থেকে
প্রেমমূলক
আমিতো যুবক নই, মধ্য বয়সের রুক্ষ পথে নিঃসঙ্গ চলেছি হেঁটে রৌদ্রদগ্ধ আর ঝঞ্ঝাহত অভিজ্ঞ শরীরে নিয়ে পথনিষ্ঠ শ্রমণের মতো। বিমুখ সকল দিক, তবু আছি টিকে কোনো মতে। কেটেছে আমার দিন পথের কিনারে বৃক্ষমূলে বসে গান শুনে গোত্রহীন কোনো একলা পাখির, আলোজ্বলা কুটিরের খোঁজে, ভুলি কামড় ক্লান্তির, যখন আমার দিকে তুমি তাকাও দু’চোখ তুলে।পিঙ্গল বয়স নিয়ে তোমার নিটোল যৌবনের নিকটে সর্বদা নতজানু আমি; প্রতিদ্বন্দ্বী যারা তাদের বৈভব আছে জ্বলজ্বলে, যদিও মনের ঐশ্বর্যে কাঙাল নই আমিও এখনো। তুমি ছাড়া কে জানে আমার হৃস্পন্দন কত তেজী, প্রেমময়? অথচ দরজা থেকে আমাকেই ফিরে যেতে হয়।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/othocho-dorja-theke/
1566
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
কাঁচ রোদ্দুর, ছায়া অরণ্য
চিন্তামূলক
কাঁচ-রোদ্দুর, ছায়া-অরণ্য, হ্রদয়ের স্বপ্ন। আকণ্ঠ নিস্তেজ তৃপ্তি, ডোরাকাটা ছায়া সরল’– বনে-বাদাড়ে শত্রু ঘোরে, তাজা রক্ত,–শয়তান অব্যর্থ। ঝানু আকাশ ঝুঁকে পড়ে অবাক। কাঁচা চামড়ার চাবুক হেনে ছিঁড়ে টেনে খেলা জমছে: এরা কারা, এ কী করছে? লোহা-গলানো আগুন জ্বলছে, সাঁড়াছি- যন্ত্রণার দুঃস্বপ্ন। আপ্রাণ চেষ্টায় জলের উপর রাখা জাগিয়ে আকাশ! আকাশ! বাতাস টেনে শ্বাসযন্ত্র আড়ষ্ট। এখন আবার মনে পড়ছে। প্রান্তরে জরায়ু-ভাঙা রক্তভ্রূণ, শকুন! শকুন! কয়েকবার পাখ্‌সাট মেরে ফেল আকাশে উঠল। করোটি, হাড়পোড়া, ধুলো– চাপ-চাপ জমাট রক্ত। ছায়ামূর্তি কে দাঁড়িয়ে? ধুলো, ধুলো। আমি ইয়াসিন, পুরব-চটির হাটে যাব; লাহেরিডাণ্ডা ছাড়িয়ে সে কত দূর, সেই এক ভাবনা ঘুরছে। জল! জল! মরচে-পড়া চুল উড়ছে। লোহামুঠিতে ট্রাক্‌টরের হাতল চেপে তবু কখন ঝিমিয়ে পড়ল মন; কে গো তুমি মধ্যাহ্নের স্বপ্ন কাড়ো? আগুন-বাতাসে সূর্য কাঁপে, সন্ধ্যা নামবে কখন। মস্তিষ্কের নিখুঁত ছাপ উঠল প্লাস্‌টারে। রাত করেছে, এলোমেলো চিন্তা নিস্পন্দ। পাহাড়ের শীত-হাওয়ায় চিন্তা নিস্পন্দ। তারা চলছে। ঘুমিয়ে পথ, যাত্রী। আকাশ ভিজিয়ে অন্ধকার জ্বলছে, আর মরা অরণ্যে হঠাৎ-আগুন-লাগা ফানুসের চাঁদ উঠল, রাত্রি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1619
4483
শামসুর রাহমান
একটি প্রাচীন সংলাপ
রূপক
বয়স কম তো নয়, উড়ছে মাথায় এখনও সফেদ চুল, কোনও কোনও দাঁত নড়বড়ে। তদুপরি কফের ধমকে হামেশাই বুক ফেটে যেতে চায়। তবুও কলম তার প্রায়শ চঞ্চল। আজকাল কখনও কখনও বটগাছ থেকে নেমে একজন অতিশয় বেঁকে-যাওয়া বুড়ো, অনন্ত কালের মতো বুড়ো, কবির বিনীত দোরে কড়া নেড়ে অপেক্ষা করেন।খানিক পরেই কবি দোর খুলে দাঁড়ান, তাকান অতিশয় নুয়ে-পড়া প্রবীণের দিকে। অনন্ত কালের মতো যিনি তাঁর কণ্ঠ ধীরে করে উচ্চারণ- ‘তোমার লেখার ধার অস্তগামী, অবিলম্বে থামাও লেখনী। নয়তো বুকের রক্ত ঝরিয়ে হলেও খাতার পাতায় ফের সাজাও সতেজ প্রাণ বেগ, সৃষ্টি করো পুষ্পদল। নয়তো কী লাভ বলো নিজেকেই নিজেরই ডোবায় নিত্য নাকানি চুবানি খেতে দেয়া?ক্ষণকাল পরে সেই অতিশয় প্রবীণ মানব হাওয়ায় মিলিয়ে গেলে বয়স্ক কবির মনে ভাবনার ঢেউ খেলে যায় বারবার; আখেরে চকিতে কবিতার খাতা খুলে তিনি রচনা করেন এক নতুন কবিতা, রূপ যার আকাশের তারার মতোই জ্বলজ্বলে,-হাসি ফোটে কবিতার খাতায়, এমন হাসি আর ঝরায়নি ঝর্নাধারা কোনও কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-prachin-songlap/
2750
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আরোগ্য--১০
মানবতাবাদী
অলস সময়-ধারা বেয়ে মন চলে শূন্য-পানে চেয়ে। সে মহাশূন্যের পথে ছায়া-আঁকা ছবি পড়ে চোখে। কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে সুদীর্ঘ অতীতে জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে। এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল, এসেছে মোগল; বিজয়রথের চাকা উড়ায়েছে ধূলিজাল,উড়িয়াছে বিজয়পতাকা। শূন্যপথে চাই, আজ তার কোনো চিহ্ন নাই। নির্মল সে নীলিমায় প্রভাতে ও সন্ধ্যায় রাঙালো যুগে যুগে সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আলো। আরবার সেই শূন্যতলে আসিয়াছে দলে দলে লৌহবাঁধা পথে অনলনিশ্বাসী রথে প্রবল ইংরেজ, বিকীর্ণ করেছে তার তেজ। জানি তারো পথ দিয়ে বয়ে যাবে কাল, কোথায় ভাসায়ে দেবে সাম্রাজ্যের দেশবেড়া জাল; জানি তার পণ্যবাহী সেনা জ্যোতিষ্কলোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না। মাটির পৃথিবী-পানে আঁখি মেলি যবে দেখি সেথা কলকলরবে বিপুল জনতা চলে নানা পথে নানা দলে দলে যুগ যুগান্তর হতে মানুষের নিত্য প্রয়োজনে জীবনে মরণে। ওরা চিরকাল টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল, ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে। ওরা কাজ করে নগরে প্রান্তরে। রাজছত্র ভেঙে পড়ে,রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে, জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে, রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি। ওরা কাজ করে দেশে দেশান্তরে, অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের সমুদ্র-নদীর ঘাটে ঘাটে, পঞ্জাবে বোম্বাই-গুজরাটে। গুরুগুরু গর্জন গুন্‌গুন্‌ স্বর দিনরাত্রে গাঁথা পড়ি দিনযাত্রা করিছে মুখর। দুঃখ সুখ দিবসরজনী মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি। শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-'পরে ওরা কাজ করে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/arogya-10/
840
জসীম উদ্‌দীন
নক্সী কাঁথার মাঠ - বার
কাহিনীকাব্য
(বার)রূপাই গিয়াছে ‘কাইজা’ করিতে সেই ত সকাল বেলা, বউ সারাদিন পথ পানে চেয়ে, দেখেছে লোকার মেলা | কত লোক আসে কত লোক যায়, সে কেন আসে না আজ, তবে কি তাহার নসিব মন্দ, মাথায় ভাঙিবে বাজ! বালাই, বালাই, ওই যে ওখানে কালো গাঁর পথ দিয়া, আসিছে লোকটি, ওই কি রূপাই ? নেচে ওঠে তার হিয়া | এলে পরে তারে খুব বকে দিবে, মাথায় ছোঁয়াবে হাত, কিরা করাইবে লড়ায়ের নামে হবে না সে আর মাৎ |আঁচলে চোখেরে বার বার মাজে, নারে না সে ত ও নয়, আজকে তাহার কপালে কি আছে, কে তাহা ভাঙিয়া কয় | লোহুর সাগরে সাতার কাটিয়া দিবস শেষের বেলা, রাত্র-রাণীর কালো আঁচলেতে মুছিল দিনের খেলা | পথে যে আঁধার পড়িল সাজুর মনে তার শত গুণ, রাত এসে তা ব্যথার ঘায়েতে ছিটাইল যেন নুন!ঘরের মেঝেতে সপটি ফেলায়ে বিছায়ে নক্সী-কাঁথা, সেলাই করিতে বসিল যে সাজু একটু নোয়ায়ে মাথা | পাতায় পাতায় খস্ খস্ খস্, শুনে কান খাড়া করে, যারে চায় সে ত আসেনাক শুধু ভুল করে করে মরে | তবু যদি পাতা খানিক না নড়ে, ভাল লাগেনাক তার ; আলো হাতে লয়ে দূর পানে চায়, বার বার খুলে দ্বার | কেন আসে নারে! সাজুর যদি গো পাখা আজ বিধি, উড়িয়া যাইয়া দেখিয়া আসিত তাহার সোনার নিধি | নক্সী-কাঁথায় আঁকিল যে সাজু অনেক নক্সী-ফুল, প্রথমে যেদিন রূপারে সে দেখে, সে খুশির সমতুল | আঁকিল তাদের বিয়ের বাসর, আঁকিল রূপার বাড়ি, এমন সময় বাহিরে কে দেখে আসিতেছে তাড়াতাড়ি |দুয়ার খুলিয়া দেখিল সে চেয়ে---রূপাই আসিছে বটে, ”এতক্ষণে এলে ? ভেবে ভেবে যেগো প্রাণ নাই মোর ঘটে | আর জাইও না কাইজা করিতে, তুমি যাহাদের মারো, তাদের ঘরে ত আছে কাঁচা বউ, ছেলেমেয়ে আছে কারো |” রূপাই কহিল কাঁদিয়া, “বউগো ফুরায়েছে মোর সব, রাতে ঘুম যেতে শুনিবে না আর রূপার বাঁশীর রব | লড়ায়ে আজিকে কত মাথা আমি ভাঙিয়াছি দুই হাতে, আগে বুঝি নাই তোমারো মাথার সিঁদুর ভেঙেছে তাতে | লোহু লয়ে আজ সিনান করেছি, রক্তে ভেসেছে নদী, বুকের মালা যে ভেসে যাবে তাতে আগে জানিতাম যদি! আঁচলের সোনা খসে যাবে পথে আগে যদি জানতাম, হায় হায় সখি, নারিনু বলিতে কি যে তবে করিতাম !”বউ কেঁদে কয়, “কি হয়েছে বল, লাগিয়াছে বুঝি কোথা, দেখি ! দেখি !! দেখি !!! কোথায় আঘাত, খুব বুঝু তার ব্যথা !” “লাগিয়াছে বউ, খুব লাগিয়াছে, নহে নহে মোর গায়, তোমার শাড়ীর আঁচল ছিঁড়েছে, কাঁকন ভেঙেছে হায়! তোমার পায়ের ভাঙিয়াছে খাড়ু ছিঁড়েছে গলার হার, তোমার আমার এই শেষ দেখা, বাঁশী বাজিবে না আর | আজ ‘কাইজায়’ অপর পক্ষে খুন হইয়াছে বহু | এই দেখ মোর কাপড়ে এখনো লাগিয়া রহিছে লহু | থানার পুলিশ আসিছে হাঁকিয়া পিছে পিছে মোর ছুটি, খোঁজ পেলে পরে এখনি আমার ধরে নিয়ে যাবে টুঁটি | সাথীরা সকলে যে যাহার মত পালায়েছে যথা-তথা, আমি আসিলাম তোমার সঙ্গে সেরে নিতে সব কথা | আমার জন্য ভাবিনাক আমি, কঠিন ঝড়িয়া-বায়, যে গাছ পড়িল, তাহার লতার কি হইবে আজি হায়! হায় বনফুল, যেই ডালে তুই দিয়েছিলি পাতি বুক, সে ডালেরি সাথে ভাঙিয়া পড়িল তোর সে সকল সুখ | ঘরে যদি মোর মা থাকিত আজ তোমারে সঙ্গে করি, বিনিদ্র রাত কাঁদিয়া কাটাত মোর কথা স্মরি স্মরি!ভাই থাকিলেও ভাইয়ের বউরে রাখিত যতন করি, তোমার ব্যথার আধেকটা তার আপনার বুকে ভরি | আমি যে যাইব ভাবিনাক, সাথে যাইবে কপাল-লেখা, এযে বড় ব্যথা! তোমারো কপালে এঁকে গেনু তারি রেখা!” সাজু কেঁদে কয়, “সোনার পতিরে তুমি যে যাইবে ছাড়ি, হয়ত তাহাতে মোর বুকখানা যাইতে চাহিবে ফাড়ি | সে দুখেরে আমি ঢাকিয়া রাখিব বুকের আঁচল দিয়া, এ পোড়া রূপেরে কি দিয়া ঢাকিব---ভেবে মরে মোর হিয়া | তুমি চলে গেলে পাড়ার লোকে যে চাহিবে ইহার পানে, তোমার গলার মালাখানি আমি লুকাইব কোন্ খানে!”রূপা কয়, “সখি দীন দুঃখীর যারে ছাড়া কেহ নাই, সেই আল্লার হাতে আজি আমি তোমারে সঁপিয়া যাই | মাকড়ের আঁশে হস্তী যে বাঁধে, পাথর ভাসায় জলে, তোমারে আজিকে সঁপিয়া গেলাম তাঁহার চরণ তলে |”এমন সময় ঘরের খোপেতে মোরগ উঠিল ডাকি, রূপা কয়, “সখি! যাই---যাই আমি---রাত বুঝি নাই বাকি!” পায়ে পায়ে পায়ে কতদূর যায় ; সাজু কয়, “ ওগো শোন, আর কি গো নাই মোর কাছে তব বলিবার কথা কোন ? দীঘল রজনী---দীঘল বরষ---দীঘল ব্যথার ভার, আজ শেষ দিনে আর কোন কথা নাই তব বলিবার ?” রূপা ফিরে কয়, “না কাঁদিয়া সখি, পারিলামনাক আর, ক্ষমা কর মোর চোখের জলের নিশাল দেয়ার ধার |”“এই শেষ কথা!” সাজু কহে কেঁদে, “বলিবে না আর কিছু ?” খানিক চলিয়া থামিল রূপাই, কহিল চাহিয়া পিছু, “মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যদি কোন ব্যথা লাগে, দুটি কালো চোখ সাজাইয়া নিও কাল কাজলের রাগে | সিন্দুরখানি পরিও ললাটে---মোরে যদি পড়ে মনে, রাঙা শাড়ীখানি পরিয়া সজনি চাহিও আরশী-কোণে | মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যতনে বাঁধিও চুল, আলসে হেলিয়া খোপায় বাঁধিও মাঠের কলমী ফুল | যদি একা রাতে ঘুম নাহি আসে---না শুনি আমার বাঁশী, বাহুখানি তুমি এলাইও সখি মুখে মেখে রাঙা হাসি | চেয়ো মাঠ পানে---গলায় গলায় দুলিবে নতুন ধান ; কান পেতে থেকো, যদি শোনো কভু সেখায় আমার গান | আর যদি সখি, মোরে ভালবাস মোর তরে লাগে মায়া, মোর তরে কেঁদে ক্ষয় করিও না অমন সোনার কায়া!”ঘরের খোপেতে মোরগ ডাকিল, কোকিল ডাকিল ডালে, দিনের তরণী পূর্ব-সাগরে দুলে উঠে রাঙা পালে | রূপা কহে, “তবে যাই যাই সখি, যেটুকু আধার বাকি, তারি মাঝে আমি গহন বনেতে নিজেরে ফেলিব ঢাকি |” পায়ে পায়ে পায়ে কতদূর যায়, তবু ফিরে ফিরে চায় ; সাজুর ঘরেতে দীপ নিবু নিবু ভোরের উতল বায় |
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-12/
501
কাজী নজরুল ইসলাম
শহীদী-ঈদ
প্রেমমূলক
১ শহীদের ঈদ এসেছে আজ শিরোপরি খুন-লোহিত তাজ, আল্লাহর রাহে চাহে সে ভিখ্: জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে আল্লার রাহে তাহারে দে, চাহি না ফাঁকির মণিমানিক। ২ চাহি না ক’ গাভী দুম্বা উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানী, চাই না দান। রাখিতে ইজ্জত্ ইসলামের শির চাই তোর, তোর ছেলের, দেবে কি? কে আছ মুসলমান? ৩ ওরে ফাঁকিবাজ, ফেরেব-বাজ, আপনারে আর দিস্নে লাজ,- গরু ঘুষ দিয়ে চাস্ সওয়াব? যদিই রে তুই গরুর সাথ পার হয়ে যাস পুল্সেরাত, কি দিবি মোহাম্মদে জওয়াব। ৪ শুধাবেন যবে-ওরে কাফের, কি করেছ তুমি ইসলামের? ইসলামে দিয়ে জাহান্নম আপনি এসেছ বেহেশ্ত্ ’পর- পুণ্য-পিশাচ! স্বার্থপর! দেখাস্নে মুখ, লাগে শরম! ৫ গরুরে করিলে সেরাত পার, সন্তানে দিলে নরক-নার! মায়া-দোষে ছেলে গেল দোজখ। কোরবানী দিলি গরু-ছাগল, তাদেরই জীবন হ’ল সফল পেয়েছে তাহারা বেহেশ্ত্-লোক! ৬ শুধু আপনারে বাঁচায় যে, মুসলিম নহে, ভন্ড সে! ইসলাম বলে-বাঁচ সবাই! দাও কোরবানী জান্ ও মাল, বেহেশ্ত্ তোমার কর হালাল। স্বার্থপরের বেহেশ্ত্ নাই। ৭ ইসলামে তুমি দিয়ে কবর মুসলিম ব’লে কর ফখর! মোনাফেক তুমি সেরা বে-দীন! ইসলামে যারা করে জবেহ্, তুমি তাহাদেরি হও তাবে। তুমি জুতো-বওয়া তারি অধীন। ৮ নামাজ-রোজার শুধু ভড়ং, ইয়া উয়া প’রে সেজেছ সং, ত্যাগ নাই তোর এক ছিদাম! কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কর জড়, ত্যাগের বেলাতে জড়সড়! তোর নামাজের কি আছে দাম? ৯ খেয়ে খেয়ে গোশ্ত্ রুটি তো খুব হয়েছ খোদার খাসী বেকুব, নিজেদের দাও কোরবানী। বেঁচে যাবে তুমি, বাঁচিবে দ্বীন, দাস ইসলাম হবে স্বাধীন, গাহিছে কামাল এই গানই! ১০ বাঁচায়ে আপনা ছেলে-মেয়ে জান্নাত্ পানে আছ্ চেয়ে ভাবিছ সেরাত হবেই পার। কেননা, দিয়েছ সাত জনের তরে এক গরু! আর কি, ঢের! সাতটি টাকায় গোনাহ্ কাবার! ১১ জান না কি তুমি, রে বেঈমান! আল্লা সর্বশক্তিমান দেখিছেন তোর সব কিছু? জাব্বা-জোব্বা দিয়ে ধোঁকা দিবি আল্লারে, ওরে বোকা! কেয়ামতে হবে মাথা নীচু! ১২ ডুবে ইসলাম, আসে আঁধার! ব্রাহিমের মত আবার কোরবানী দাও প্রেয় বিভব! “জবীহুল্লাহ্” ছেলেরা হোক, যাক সব কিছু-সত্য রোক! মা হাজেরা হোক মায়েরা সব। ১৩ খা’বে দেখেছিলেন ইব্রাহিম- “দাও কোরবানী মহামহিম!” তোরা যে দেখিস্ দিবালোকে কি যে দুর্গতি ইসলামের! পরীক্ষা নেন খোদা তোদের হাববের সাথে বাজি রেখে! ১৪ যত দিন তোরা নিজেরা মেষ, ভীরু দুর্বল, অধীন দেশ,- আল্লার রাহে ততটা দিন দিও না ক’ পশু কোরবানী, বিফল হবে রে সবখানী! (তুই) পশু চেয়ে যে রে অধম হীন! ১৫ মনের পশুরে কর জবাই, পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই। কশাই-এর আবার র্কোবানী!- আমাদের নয়, তাদের ঈদ, বীর-সুত যারা হ’ল শহীদ, অমর যাদের বীরবাণী। ১৬ পশু কোরবানী দিস্ তখন আজাদ-মুক্ত হবি যখন জুলম-মুক্ত হবে রে দীন।- কোরবানীর আজ এই যে খুন শিখা হয়ে যেন জালে আগুন, জালিমের যেন রাখে না চিন্!! আমিন্ রাব্বিল্ আলামিন! আমিন রাব্বিল্ আলামিন!!
https://banglarkobita.com/poem/famous/842
3348
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পত্র
রূপক
নৌকাযাত্রা হইতে ফিরিয়া আসিয়া লিখিতসুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ সেন স্থলচরবরেষুজলে বাসা বেঁধেছিলেম , ডাঙায় বড়ো কিচিমিচি । সবাই গলা জাহির করে , চেঁচায় কেবল মিছিমিছি । সস্তা লেখক কোকিয়ে মরে , ঢাক নিয়ে সে খালি পিটোয় , ভদ্রলোকের গায়ে পড়ে কলম নেড়ে কালি ছিটোয় । এখানে যে বাস করা দায় ভনভনানির বাজারে , প্রাণের মধ্যে গুলিয়ে উঠে হট্টগোলের মাঝারে । কানে যখন তালা ধরে , উঠি যখন হাঁপিয়ে কোথায় পালাই , কোথায় পালাই — জলে পড়ি ঝাঁপিয়ে গঙ্গাপ্রাপ্তির আশা করে গঙ্গাযাত্রা করেছিলেম । তোমাদের না বলে কয়ে আস্তে আস্তে সরেছিলেম ।দুনিয়ার এ মজলিসেতে এসেছিলেম গান শুনতে , আপন মনে গুনগুনিয়ে রাগ – রাগিণীর জাল বুনতে । গান শোনে সে কাহার সাধ্যি , ছোঁড়াগুলো বাজায় বাদ্যি , বিদ্যেখানা ফাটিয়ে ফেলে থাকে তারা তুলো ধুনতে । ডেকে বলে , হেঁকে বলে , ভঙ্গি করে বেঁকে বলে — ‘‘ আমার কথা শোনো সবাই , গান শোনো আর নাই শোনো। গান যে কাকে বলে সেইটে বুঝিয়ে দেব , তাই শোনে । ”টীকে করেন ব্যখ্যা করেন , জেঁকে ওঠে বক্তিমে — কে দেখে তার হাত – পা নাড়া , চক্ষু দুটোর রক্তিমে ! চন্দ্রসূর্য জ্বলছে মিছে আকাশখানার চালাতে — তিনি বলেন , ‘‘ আমিই আছি জ্বলতে এবং জ্বালাতে । ”’ কুঞ্জবনের তানপুরোতে সুর বেঁধেছে বসন্ত , সেটা শুনে নাড়েন কর্ণ , হয় নাকো তাঁর পছন্দ । তাঁরি সুরে গাক – না সবাই টপ্পা খেয়াল ধুরবোধ — গায় না যে কেউ , আসল কথা নাইকো কারো সুর – বোধ ! কাগজওয়ালা সারি সারি নাড়ছে কাগজ হাতে নিয়ে — বাঙলা থেকে শান্তি বিদায় তিনশো কুলোর বাতাস দিয়ে । কাগজ দিয়ে নৌকা বানায় বেকার যত ছেলেপিলে , কর্ণ ধরে পার করবেন দু – এক পয়সা খেয়া দিলে । সস্তা শুনে ছুটে আসে যত দীর্ঘকর্ণগুলো — বঙ্গদেশের চতুর্দিকে তাই উড়ছে এত ধুলো । খুদে খুদে ‘আর্য’ গুলো ঘাসের মতো গজিয়ে ওঠে , ছুঁচোলো সব জিবের ডগা কাঁটার মতো পায়ে ফোটে । তাঁরা বলেন , ‘‘ আমিই কল্কি” — গাঁজার কল্কি হবে বুঝি ! অবতারে ভরে গেল যত রাজ্যের গলিঘুঁজি ।পাড়ার এমন কত আছে কত কব তার ! বঙ্গদেশে মেলাই এল বরা ‘- অবতার । দাঁতের জোরে হিন্দুশাস্ত্র তুলবে তারা পাঁকের থেকে , দাঁতকপাটি লাগে তাদের দাঁত – খিঁচুনির ভঙ্গি দেখে । আগাগোড়াই মিথ্যে কথা , মিথ্যেবাদীর কোলাহল , জিব নাচিয়ে বেড়ায় যত জিহ্বাওয়ালা সঙের দল । বাক্যবন্যা ফেনিয়ে আসে , ভাসিয়ে নে যায় তোড়ে — কোনোক্রমে রক্ষে পেলাম মা – গঙ্গারই ক্রোড়ে ।হেথায় কিবা শান্তি – ঢালা কুলুকুলু তান ! সাগর – পানে বহন করে গিরিরাজের গান । ধীরি ধীরি বাতাসটি দেয় জলের গায়ে কাঁটা । আকাশেতে আলো – আঁধার খেলে জোয়ারভাঁটা । তীরে তীরে গাছের সারি পল্লবেরই ঢেউ । সারা দিবস হেলে দোলে , দেখে না তো কেউ । পূর্বতীরে তরুশিরে অরুণ হেসে চায় — পশ্চিমেতে কুঞ্জমাঝে সন্ধ্যা নেমে যায় । তীরে ওঠে শঙ্খধ্বনি , ধীরে আসে কানে , সন্ধ্যাতারা চেয়ে থাকে ধরণীর পানে । ঝাউবনের আড়ালেতে চাঁদ ওঠে ধীরে , ফোটে সন্ধ্যাদীপগুলি অন্ধকার তীরে । এই শান্তি – সলিলেতে দিয়েছিলেম ডুব , হট্টগোলটা ভুলেছিলেম , সুখে ছিলেম খুব ।জান তো ভাই আমি হচ্ছি জলচরের জাত , আপন মনে সাঁতরে বেড়াই — ভাসি যে দিনরাত । রোদ পোহাতে ডাঙায় উঠি , হাওয়াটি খাই চোখ বুজে , ভয়ে ভয়ে কাছে এগোই তেমন তেমন লোক বুঝে । গতিক মন্দ দেখলে আবার ডুবি অগাধ জলে , এমনি করেই দিনটা কাটাই লুকোচুরির ছলে । তুমি কেন ছিপ ফেলেছ শুকনো ডাঙায় বসে ? বুকের কাছে বিদ্ধ করে টান মেরেছ কষে । আমি তোমায় জলে টানি , তুমি ডাঙায় টানো — অটল হয়ে বসে আছ , হার তো নাহি মানো । আমারি নয় হার হয়েছে , তোমারি নয় জিত — খাবি খাচ্ছি ডাঙায় পড়ে হয়ে পড়ে চিত । আর কেন ভাই , ঘরে চলো ছিপ গুটিয়ে নাও , রবীন্দ্রনাথ পড়ল ধরা ঢাক পিটিয়ে দাও ।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/potro/
142
আল মাহমুদ
সোনালী
সনেট
১সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিনী যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি, আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি; ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন, ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি; দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি । বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না; তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিও সেই ফল জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয়না কবিরা; দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা ।১সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিনী যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি, আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি; ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন, ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি; দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি । বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না; তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিও সেই ফল জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয়না কবিরা; দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা ।১সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিনী যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি, আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি; ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন, ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি; দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি । বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না; তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিও সেই ফল জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয়না কবিরা; দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6/
5004
শামসুর রাহমান
বাঁচাবে
মানবতাবাদী
এ শহরে জীবিকা সর্বত্রগামী; ছোট বড় সব চাকুরে, টাউট, উচ্চাকাংক্ষী ধনবান, ভিখারীর ভিড়, শীতরাতে অতি ব্যবহারে জীর্ণ, শীর্ণকায় রঙিন গণিকা, গঞ্জনায় অভ্যস৫ত খঞ্জের জন্যে আয়ের নানান পথ খোলা। বেশ কিছু বেকার যুবক মাস্তানের দঙ্গলে সহজে ভিড়ে যায়। যত্রতত্র ধর্মের ব্যবসা জমে ওঠে; নীতিবিবর্জত ফাঁপা রাজনীতি, বাণিজ্যিক সভ্যতার মরু বেড়ে চলে।এ শহরে কোনোদিন কোকিলের ডাক শুনে অকস্মাৎ থমকে দাঁড়াই ফুটপাথে। শ্যামলীর এ মলিন গলিতেও গোলাপের চাষ হয়, কোথাও কোথাও প’ড়ে থাকে বুগেনভেলিয়া। সর্বোপরি আমাদের দু’জনের অপরূপ মানবিক ভালোবাসা ধু ধু শহরকে বাঁচাবে নিশ্চিত মরুভূর গ্রাস থেকে।   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bachabe/
2606
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপমানিত
মানবতাবাদী
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান! মানুষের অধিকারে   বঞ্চিত করেছ যারে, সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।।মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে । বিধাতার রুদ্ররোষে   দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান । অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।।তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে । চরণে দলিত হয়ে   ধুলায় সে যায় বয়ে সে নিম্নে নেমে এসো, নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ । অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান ।যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে, পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে । অজ্ঞানের অন্ধকারে   আড়ালে ঢাকিছ যারে তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান । অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।।শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার, মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার। তবু নত করি আঁখি   দেখিবারে পাও না কি নেমেছে ধুলার তলে হীন পতিতের ভগবান, অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান ।।দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে - অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে। সবারে না যদি ডাকো,   এখনো সরিয়া থাকো, আপনারে বেঁধে রাখো  চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান — মৃত্যু-মাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান ।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/insulted/
3584
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১২
প্রেমমূলক
দেখিনু যে এক আশার স্বপন শুধু তা স্বপন, স্বপনময়– স্বপন বই সে কিছুই নয়। অবশ হৃদয় অবসাদময় হারাইয়া সুখ শ্রান্ত অতিশয়– আজিকে উঠিনু জাগি কেবল একটি স্বপন লাগি! বীণাটি আমার নীরব হইয়া গেছে গীতগান ভুলি, ছিঁড়িয়া টুটিয়া ফেলেছি তাহার একে একে তারগুলি। নীরব হইয়া রয়েছে পড়িয়া সুদূর শ্মশান-‘পরে, কেবল একটি স্বপন-তরে! থাম্‌ থাম্‌ ওরে হৃদয় আমার, থাম্‌ থাম্‌ একেবারে, নিতান্তই যদি টুটিয়া পড়িবি একেবারে ভেঙে যা রে– এই তোর কাছে মাগি। আমার জগৎ, আমার হৃদয়– আগে যাহা ছিল এখন তা নয় কেবল একটি স্বপন লাগি।Christina Rossetti (অনূদিত কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-12/
1378
তারাপদ রায়
আণবিক সুড়সুড়ি
রূপক
বোলতা, ভিমরুল এবং মৌমাছিদের সঙ্গে কাঠপিঁপড়ে, ডেয়োপিঁপড়ে এবং লালপিঁপড়েদের সন্ধিচুক্তি যেদিন স্বাক্ষরিত হল, কেউ মাথা ঘামায় নি। শুধু কালোপিঁপড়েরা বলেছিল, “আমাদের কিছুই বলার নেই। আমরা কাউকে কামড়াই না শুধু সুড়সুড়ি দিই।’
http://kobita.banglakosh.com/archives/3882.html
4710
শামসুর রাহমান
চেয়ার অস্বস্তিকর
চিন্তামূলক
চেয়ার অস্বস্তিকর, উঠে দাঁড়ালেও স্নায়ুতন্ত্রী হয়না ঝংকৃত নিরাপদ মৃদু তালে, ফুলগুলি ব্যর্থ আজ। উদ্বেগের খচখচে কাঁটা ক্রমাগত বিঁধছে আমার মনে; ক্ষণে ক্ষণে হাওয়ায় হাওয়ায় কেমন পাশব গন্ধ ভাসে, আমার দু’কাঁধে কিছু বিসদৃশ ঘটে যাবে যেন! পাখনা গজাবে নাকিঅকস্মাৎ? আমি, শামসুর রাহমান, অবশেষে কাফকার গ্রেগর শামসা হয়ে যাবো? আমি বড়ো বেশি ছোটো হয়ে যাচ্ছি, মনে হয়; কীট পতঙ্গের মতোই আমি কি তবে দেয়ালে বসবো? মৃত্তিকায় খাবো লুটোপুটি কিংবা নোংরা শুঁড়ে নিয়ে নিরুদ্বেগ নর্দমার ধারে উড়ে যাবো আবর্জনা ভালোবেসে?ভাগ্যিস এসেছো তুমি এ মুহূর্তে, তোমার দৃষ্টির স্পর্শে আজ আমার মনুষ্যরূপ রয়ে গেলো শেষে।   (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/chair-oswostikor/
5952
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
অষ্টম
প্রেমমূলক
মাথার ওপর চাঁদ ভেঙেছে ওর জোৎস্না-গুঁড়ো ছড়িয়ে আছে ওই দল বেঁধে সব তোমার কাছে আসি আমরা যারা নবম শ্রেণী হইআমরা যারা আর আসে না ঘুম গন্ধ রাবার আর মানে না পোষ বুক পকেটে সব পেয়েছির পরে আমরা যারা লুকোনো আপশোষউল্টো জামায় দিন কেটে যায় বেশ একটা তারা আকাশ থেকে টুপ বাস স্টপেজে আর নামে না কেউ বিশাল বড় চাঁদের তলায় চুপএকটা শহর… একলা শহর আজ রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ট্রাম… কেউ ছিল না অন্ধ তোমার পাশে আমিই নাহয় সামান্য বসলামমাথার ওপর সেদিন থেকে তারা… বুকের ভেতর টলছে পাতাল রেল সামলে তবু লড়াইটুকু রাখি আমরা যারা নবম শ্রেণী ফেল
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%85%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%8e-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d/
2267
মহাদেব সাহা
শুধু এই কবিতার খাতা
প্রেমমূলক
এই কবিতার খাতা ছাড়া আর কার কাছে এমন অঝোরে অশ্রুপাত করা যায় কার কাছে প্রাণখুলে লেখা যায় চিঠি, বলা যায় সব দুঃখ, পাপ, অধঃপতনের কথা আর কার বুকে আঁকা যায় রবীন্দ্রনাথের মতো অসংলগ্ন, বিপর্যস্ত ছবি! একমাত্র কবিতার খাতা ছাড়া কোথায় লুকানো যায় মুখ আর কোন নীলিমায় এমন স্বচ্ছন্দ ওড়া যায় কোন স্বচ্ছতোয়া নদীজলে ধোয়া যায় সমস্ত কালিমা বুক ভরে আর কোন উদার প্রান্তরে নেয়া যায় বিশুদ্ধ বাতাস! শুধু এই কবিতার কাতা বিরহী যক্ষের মতো সযত্নে আগলে রাখে স্মৃতি বহু নিদ্রাহীন রাত্রির দুঃস্বপ্ন, অনন্ত দুঃখের দাহ আর কতো নীরব নিবিড় অশ্রু বর্ষার মেঘের মতো অবিরাম ঝরে একমাত্র এই কবিতার খাতা আপাদমস্তক ব্যর্থ মানুষের চাষযোগ্য একখণ্ড জমি। এ তার সবচে’ বিশ্বস্ত গৃহ, অন্তরঙ্গ নারী এই কবিতার খাতা তার একমাত্র নিজস্ব আকাশ, কেবল নিজের নদী, কেবল নিজের নারী, নিজের সংসার এই কবিতার খাতা রক্তমাংস স্বপ্নময় শুদ্ধ ভালোবাসা। এখানেই শুধু অশ্রু সোনালি ডানার চিল হয়ে যায় দুঃখ হয়ে যায় মেঘ, স্বপ্ন হয়ে যায় শেশবের ঘুড়ি, নিঃসঙ্গতা হয়ে ওঠে মনোরম হার্দ্য বেলাভূমি উপেক্ষার ধূলি হয়ে ওঠে মুহূর্তে রঙিন স্নিগ্ধ ফুল। এই কবিতার খাতা শুধু সহ্য করে অবৈধ মৈথুন সহ্য করে ব্রভিচার, পরকীয়া প্রেমের সান্নিধ্য, এই কবিতার খাতা নিমজ্জমানের একমাত্র ভেলা শুধু তার কাছে ফেলা যায় দুচোখের জল, বলা যায় হৃদয়ের কথা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1386
3102
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনবহনভাগ্য নিত্য আশীর্বাদে
ভক্তিমূলক
জীবনবহনভাগ্য নিত্য আশীর্বাদে ললাট করুক স্পর্শ অনাদি জ্যোতির দান-রূপে-- নব নব জাগরণে প্রভাতে প্রভাতে মর্ত এ আয়ুর সীমানায়। ম্লানিমার ঘন আবরণ দিনে দিনে পড়ুক খসিয়া অমর্তলোকের দ্বারে নিদ্রায় জড়িত রাত্রিসম। হে সবিতা,তোমার কল্যাণতম রূপ কারো অপাবৃত, সেই দিব্য আবির্ভাবে হেরি আমি আপন আত্মারে মৃত্যুর অতীত।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jebanbahanbaga-nitta-asebada/
1139
জীবনানন্দ দাশ
ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ দুপুর
সনেট
ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ-দুপুর — চিল একা নদীটির পাশে জারুল গাছের ডালে বসে বসে চেয়ে থাকে ওপারের দিকে; পায়রা গিয়েছে উড়ে তবু চরে, খোপে তার; — শসাতাটিকে, ছেড়ে গেছে মৌমাছি; — কালো মঘে জমিয়াছে মাঘের আকাশে, মরা প্রজাতিটির পাখার নরম রেণু ফেলে দিয়ে ঘাসে পিঁপড়েরা চলে যায়; — দুই দন্ড আম গাছে শালিখে — শালিখে ঝুটোপুটি, কোলাহল — বউকথাকও আর রাঙা বউটিকে ডাকে নাকো-হলুদ পাখনা তার কোন যেন কাঁঠালে পলাশেহারায়েছে; বউ উঠানে নাই — প’ড়ে আছে একখানা ঢেঁকি; ধান কে কুটবে বলো-কত দিন সে তো আর কোটে নাকো ধান, রোদেও শুকাতে সে যে আসে নাকো চুল তার — করে নাকে স্নান এ-পুকুরে — ভাঁড়ারে ধানের বীজ কলায়ে গিয়েছে তার দেখি, তবুও সে আসে নাকে; আজ এ দুপুরে এসে খই ভাজিবে কি? হে চিল, সোনালি চিল, রাঙা রাজকন্যা আর পাবে না কি প্রাণ?
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/vijey-hoye-ashe-meghe-e-dupur/
2258
মহাদেব সাহা
লিরিকগুচ্ছ - ২২
প্রেমমূলক
শরীর জুড়ে আমার শুধু ভালোবাসার গন্ধ কেউ বা তাকে ভালো বলে কেউ বা বলে মন্দ; আকাশে মেঘ হৃদয়ে ঝড় যতোই চলে দ্বন্দ্ব তুমি ঠিকই জানো আমি ভালোবাসায় অন্ধ!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1395
3683
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মথুরায়
প্রেমমূলক
বাঁশরি বাজাতে চাহি , বাঁশরি বাজিল কই ? বিহরিছে সমীরণ , কুহরিছে পিকগণ , মথুরায় উপবন কুসুমে সাজিল ওই । বাঁশরি বাজাতে চাহি , বাঁশরি বাজিল কই ?বিকচ বকুল ফুল দেখে যে হতেছে ভুল , কোথাকার অলিকুল গুঞ্জরে কোথায় ! এ নহে কি বৃন্দাবন ? কোথা সেই চন্দ্রানন ? ওই কি নূপুরধ্বনি বনপথে শুনা যায় ? একা আছি বনে বসি , পীত ধড়া পড়ে খসি , সোঙরি সে মুখশশী পরান মজিল সই । বাঁশরি বাজাতে চাহি , বাঁশরি বাজিল কই ?এক বার রাধে রাধে ডাক্ বাঁশি , মনোসাধে , আজি এ মধুর চাঁদে মধুর যামিনী ভায় । কোথা সে বিধুরা বালা , মলিন মালতীমালা , হৃদয়ে বিরহ – জ্বালা , এ নিশি পোহায় , হায় । কবি যে হল আকুল , এ কি রে বিধির ভুল , মথুরায় কেন ফুল ফুটেছে আজি লো সই ? বাঁশরি বাজাতে গিয়ে বাঁশরি বাজিল কই ?   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mothurai/
1788
পূর্ণেন্দু পত্রী
এখনো
প্রেমমূলক
কাগজ পেলেই আঁকচারা কাটা অভ্যেস। একবার আঁকছিলুম রাজবাড়ি। আঁকতে আঁকতে হয়ে উঠলো আলকাতরা মাখা দৈত্য, কাগজ থেকে লাফ দিয়ে উঠলো দশ আঙুলের থাবা খাঁবো, খাঁবো, খাঁবো। সেই থেকে আর রাজবাড়ি আঁকি না। আঁকি রাজহাঁস, ময়ুর, জলের ঘূর্নি, আর সেই সব শিকড় যা ডুবে আছে আকুলি-বিকুলি তৃষ্ণার ভিতরে। পদ্মপাতায় ডুমুরের গুছির মতো ফলে থাকে যে শিশির আঁকতে যাই, পারি না। অন্ধকারের খোঁপায় বাগান সাজিয়ে রাখে যেসব আলোর কুঁচি আঁকতে যাই, পারি না। প্রচণ্ড রাগে একদিন আকঁতে বসলুম ধ্বংসের ছবি আঁকতে আঁকতে ফুটে উঠল আশ্চর্য এক নারী। তখরও চোখ আঁকিনি, তবুও চন্দন গন্ধে হেসে। তখনও হাত আঁকিনি, তবুও কপালের জচুল সরিয়ে বললে শোনো বলেই হারিয়ে গেল ধ্বংসের আড়ালে। তাকে ধরবো, ছোঁবো, জড়াবো, নিংড়াবো বলে কলকাতার ট্রামলাইন, মেটেবুরুজের বসি- মুর্শিদাবাদের কবর, অন্ধ্রের ঝড়, রাজস্থানের বালি ডিঙিয়ে ছুটে চলেছি। ছুটে চলেছি। ছুটে চলেছি। এখনো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1298
4326
শামসুর রাহমান
অসিত উত্থানে
চিন্তামূলক
চতুষ্পার্শ্বে যাচ্ছে শোনা মুহুর্মুহু পিশাচের হল্লা, ওদের শরীরে পচা মাংসের উৎকট গন্ধ, বুনো অন্ধকারে পদশব্দ এলোমেলো, ক্ষুধার্ত শকুনও পালায় সে দৃশ্য দেখে; অতিশয় সন্ত্রস্ত মহল্লা। প্রতিটি মুহূর্ত কাটে, যেন কোনো ভীষণ দন্তুর নেকড়ে ছিঁড়ছে খরগোশ। সর্বব্যাপী ভয়ংকর অসিত উত্থানে বুঝি না কে শক্রু মিত্র কেবা। খর ছলনায় খল মাতে, হতবুদ্ধি বান্ধবও জন্তুরমতোই আমার দিকে আসে ধেয়ে। আজ ছদ্মবেশ করেছি ধারণ, নইলে আত্মরক্ষা দায়। প্রেমিকার সঙ্গেও ট্রাজিক চতুরালি চলে, বোঝে না সে কারা ক্রীড়নক বানিয়েছে ওকে, তার রুক্ষ এলোকেশ ভাসবে নদীর জলে, ভাঁড় হবে মূক, আমি পরিখার পাশে করোটির সঙ্গে জুড়বো আলাপ দিশেহারা।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/osit-utthane/