id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
551
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
স্নেহ-পরশ
|
প্রেমমূলক
|
আমি এদেশ হতে বিদায় যেদিন নেব প্রিয়তম,
কাঁদবে এ বুক সঙ্গীহারা কপোতিনী সম –
তখন মুকুরপাশে একলা গেহে
আমারই এই সকল দেহে
চুমব আমি চুমব নিজেই অসীম স্নেহে গো!
আহা পরশ তোমার জাগছে যে গো এই সে দেহে মম,
কম সরস-হরষ সম।
তখন তুমি নাইবা – প্রিয় – নাইবা রলে কাছে,
জানব আমার এই সে দেহে এই সে দেহে গো
তোমার বাহুর বুকের শরম-ছোঁয়ার আকুল কাঁপন আছে –
মদির অধীর পুলক নাচে!
তখন নাইবা আমার রইল মনে
কোনখানে মোর দেহের বনে
জড়িয়েছিলে লতার মতন আলিঙ্গনে গো!
আমি চুমোয় চুমোয় ডুবাব এই সকল দেহ মম –
ওগো শ্রাবণ-প্লাবন সম। (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/sneho-purush/
|
460
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মিসেস এম রহমান
|
শোকমূলক
|
মোহররমের চাঁদ ওঠার তো আজিও অনেক দেরি,
কোন কারবালা-মাতম উঠিল এখনি আমায় ঘেরি'?
ফোরাতের মৌজ ফোঁপাইয়া ওঠে কেন গো আমার চোখে!
নিখিল-এতিম ভিড় ক'রে কাঁদে আমার মানিস-লোকে!
মর্সিয়া-খান! গা'সনে অকালে মর্সিয়া-শোকগীতি,
সর্বহারার অশ্রু-প্লাবনে সয়লাব হবে ক্ষিতি!......আজ যবে হায় আমি
কুফার পথে গো চলিতে চলিতে কারবালা মাঝে থামি,
হেরি চারিধারে ঘিরিয়াছে মোরে মৃত্যু-এজিদ-সেনা,
ভায়েরা আমার দুশমন-খুনে মাখিতেছে হাতে হেনা,
আমি শুধু হায় রোগ শয্যায় বাজু কামড়ায়ে মরি!
দানা-পানি নাই পাতার খিমায় নির্জীব আছি পড়ি'।
এমন সময় এল 'দুলদুল' পৃষ্ঠে শূন্য জিন,
শূন্যে কে যেন কাঁদিয়া উঠিল- 'জয়নাল আবেদিন'!
শীর্ণ-পাঞ্জা দীর্ণ-পাঁজর পর্ণকুটীর ছাড়ি'
উঠিতে পড়িতে ছুটিয়া আসিনু, রুধিল দুয়ার দ্বারী!
বন্দিনী মা'র ডাক শুনি শুধু জীবন-ফোরাত-পারে,
'এজিদের বেড়া পারায়ে এসেছি, যাদু তুই ফিরে যারে!'
কাফেলা যখন কাঁদিয়া উঠিল তখন দুপুর নিশা!-
এজিদে পাইব, কোথা পাই হায় আজরাইলের দিশা?
জীবন ঘিরিয়া ধূ-ধূ করে আজ শুধু সাহারার বালি,
অগ্নি-সিন্ধু করিতেছি পান দোজখ করিয়া খালি!
আমি পুড়ি, সাথে বেদনাও পুড়ে, নয়নে শুকায় পানি,
কলিজা চাপিড়া তড়পায় শুধু বুক-ভাঙা কাৎরানি!
মাতা ফাতেমার লাশের ওপর পড়িয়া কাতর স্বরে
হাসান হোসেন কেমন করিয়া কেঁদেছিল, মনে পড়ে!*******************************অশ্রু-প্লাবনে হাবুডুবু খাই বেদনার উপকূলে,
নিজের ক্ষতিই বড় করি আমি সকলের ক্ষতি ভুলে!
ভুলে যাই-কত বিহগ-শিশুরা এই স্নেহ-বট-ছায়ে
আমারই মতন আশ্রয় লভি' ভুলেছে আপন মায়ে।
কত সে ক্লান্ত বেদনা-দগ্ধ মুসাফির এরই মূলে
বসিয়া পেয়েছে মা'র তসল্লি, সব গ্লানি গেছে ভুলে!
আজ তারা সবে করিছে মাতম আমার বাণীর মাঝে,
একের বেদনা নিখিলের হ'য়ে বুকে এত ভারী বাজে!
আমাদের ঘিরিয়া জমিছে অথৈ শত নয়নের জল,
মধ্যে বেদনা-শতদল আমি করিতেছি টলমল!
নিখিল-দরদী ছিলেন আম্মা! নাহি মোর অধিকার
সকলের মাঝে সকলে ত্যাজিয়া শুধু একা কাঁদিবার!আসিয়াছি মাগো জিয়ারত লাগি' আজি অগ্রজ হ'য়ে
মা-হারা আমার ব্যথাতুর ছোট ভাইবোঙ্গুলি লয়ে।
অশ্রুতে মোর অন্ধ দু'চোখ, তবু ওরা ভাবিয়াছে
হয়ত তোমার পথের দিশা মা জানা আছে মোর কাছে!
জীবন-প্রভাতে দেউলিয়া হ'য়ে যারা ভাষাহীন গানে
ভর ক'রে মাগো চলেছিল গোরস্থানের পানে,
পক্ষ মেলিয়া আবরিলে তুমি সকলে আকুল স্নেহে,
যত ঘর-ছাড়া কোলাকুলি করে তব কোলে তব গেহে!'কত বড় তুমি' বলিলে, বলিতে, 'আকাশ শূনয় ব'লে
এত কোটি তারা চন্দ্র সূর্য গ্রহে ধরিয়াছে কোলে।
শূন্য সে বুক তবু ভরেনি রে, আজো সেথা আছে ঠাঁই,
শূন্য ভরিতে শূন্যতা ছাড়া দ্বিতীয় সে কিছু নাই।'গোর-পলাতক মোরা বুঝি নাই মাগো তুমি আগে থেকে
গোরস্থানে দেনা শুধিয়াচ আপনারে বাঁধা রেখে!
ভুলাইয়া রাখি গৃহ-হারাদের দিয়া স্ব-গৃহের চাবি
গোপনে মিটালে আমাদের ঋণ-মৃত্যুর মহা-দাবি!
সকলেরে তুমি সেবা ক'রে গেলে, নিলে না কারুর সেবা,
আলোক সবারে আলো দেয়, দেয় আলোকেরে আল কেবা?আমাদেরও চেয়ে গোপন গভীর কাঁদে বাণী ব্যথাতুর,
থেমে গেছে তার দুলালী মেয়ের জ্বালা-ক্রন্দন সুর।
কমল-কাননে থেমে গেছে ঝড়ে ঘূর্ণির দামাডোল,
কারার বক্ষে বাজে না ক' আর ডাঙন-ডঙ্কা-রোল!
বসিবে কবে জ্ঞানের তখতে, বাংলার মুসলিম!
বারে-বারে টুটে কলম তোমার না লিখিতে শুধু 'মিম'।*********************************সে ছিল আরব-বেদুঈনদের পথ-ভুলে-আসা মেয়ে,
কাঁদিয়া উঠিত হেরেমের উঁচা প্রাচীরের পানে চেয়ে!
সকলের সাথে সকলের মতো চাহিত সে আলো বায়ু,
বন্ধন-বাঁধ ডিঙাতে না পেরে ডিঙাইয়া গেল আয়ু!সে বলিত, "ঐ হেরেম-মহল নারীদের তরে নহে,
নারী নহে যারা ভুলে বাঁদী-খানা ঐ হেরেমের মোহে!
নারীদের ঐ বাঁদী ক'রে রাখা অবিশ্বাসের মাঝে
লোভী পুরুষের পশু-প্রবৃতী হীন অপমান রাজে!
আপন ভুলিয়া বিশ্বপালিকা নিত্য-কালের নারী
করিছে পুরুষ জেল-দারোগার কামনার তাঁবেদারি!
বলে না কোরান, বলে না হাদিস, ইসলামী ইতিহাস,
নারী নর-দাসী, বন্দিনী র'বে হেরেমেতে বারো মাস!
হাদিস কোরান ফেকাহ লয়ে যারা করিছে ব্যবসাদারি,
মানে না ক' তারা কোরানের বানী-সমান নর ও নারী!
শাস্ত্র ছাঁকিয়া নিজেদের যত সুবিধা বাছাই ক'রে
নারীদের বেলা গুম হ'য়ে রয় গুমরাহ যত চোরে!"
দিনের আলোকে ধরেছিল এই মুনাফেকদের চুরি,
মসজিদে বসে স্বার্থের তরে ইসলামে হানা ছুরি!
আমি জানি মাগো আলোকের লাগি' তব এই অভিযান
হেরেম-রক্ষী যত গোলামের কাঁপায়ে তুলিত প্রান!
গোলা-গুলি নাই, গালাগালি আছে, তাই দিয়ে তারা লড়ে,
বোঝে না ক' থুথু উপরে ছুঁড়িলে আপনারি মুখে পড়ে!
আমরা দেখেছি, যত গালি ওরা ছুঁড়িয়া মেরেছে গায়ে,
ফুল হয়ে সব ফুটিয়া উঠিয়া ঝরিয়াছে তব পায়ে।
**************************কাঁটার কিঞ্জে ছিলে নাগ্মাতা সদা উদ্যত-ফণা
আঘাত করিতে আসিয়া 'আঘাত' করিয়াছে বন্দনা!
তোমার বিষের নীহারিকা- লোকে নিতি নব নব গ্রহ
জন্ম লভিয়া নিষেধ- জগতে জাগায়েছে বিদ্রোহ!
জহরের তেজ পান ক'রে মাগো তব নাগ-শিশু যত
নিয়ন্ত্রিতের শিরে গড়িয়াছে ধ্বজা বিজয়োদ্ধত!
মানেনি ক' তারা শাসন- ত্রাসন বাধা-নিষেধের বেড়া,-
মানুষ থাকে না খোঁইয়াড়ে বন্ধ, থাকে বটে গরু-ভেড়া।এসম-আজম তাবিজের মত আজো তব রুহু পাক,
তাদের ঘেরিয়া আছে কি তেমনি বেদনায় নির্বাক?
অথবা 'খাতুনে-জান্নাত'মাতা ফাতিমার গুলবাগে
গোলাব-কাঁটায় রাঙা গুল হ'ইয়ে ফুটেছে রক্তরাগে?***************************তোমার বেদনা- সাগরে জোয়ার জাগিল যাদের টানে,
তারা কোথা আজ? সাগর শুকালে চাঁদ মরে কোনখানে?যাহাদের তরে অকালে, আম্মা, জান দিলে কোরবান,
তাদের জাগায় সার্থক হোক তোমার আত্নদান!
মধ্যপথে মা তোমার প্রানের নিভিল যে দীপ-শিখা,
জ্বলিক নিখিল-নারীও-সীমান্তে হ'য়ে তাই জয়টিকা!
বন্দিনীদের বেদনার মাঝে বাঁচিয়া আছ মা তুমি,
চিরজীবী মেয়ে, তবু যাই ওই কবরের ধূলি চুমি'!
মৃত্যুর পানে চলিতে আছিলে জীবনের পথ দিয়া,
জীবনের পানে চলিছ কি আজ মৃত্যুরে পারাইয়া?
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/mises-m-rahman/
|
2020
|
ভাস্কর চক্রবর্তী
|
দাশবাবুকে
|
মানবতাবাদী
|
আমরা বেঁচে থাকি কিংবা মরে যাই, দাশবাবু, এসে যায় না কিছু
যে যার ঘামাচি নিয়ে সবাই ব্যস্ত এখন।
যা কিছু দেখেছি তা কি বলতে পেরেছি ঠিকঠাক
যা লিখেছি, দশ বিশ বাইশ বছর, বোঝাতে পেরেছি কিছু?
শুধু বেঁচে থাকা নিয়ে বেঁচে থাকা শুনতে পাই শিল্পময় খুব
সেসব আমার জন্য নয়
কবিতার জন্য দাদা আমাদের রঘুনাথ রইল, আমি বেরিয়ে পড়লাম।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4237.html
|
949
|
জীবনানন্দ দাশ
|
উন্মেষ
|
চিন্তামূলক
|
কোথাও নদীর পারে সময়ের বুকে-
দাঁড়ায়ে রয়েছে আজো সাবেককালের এক স্তিমিত প্রাসাদ;
দেয়ালে একটি ছবিঃ বিচারসাপেক্ষ ভাবে নৃসিংহ উঠেছে;
কোথাও মঙ্গল সংঘটন হ’য়ে যাবে অচিরাৎ।নিবিড় রমণী তার জ্ঞানময় প্রেমিকের খোঁজে
অনেক মলিন যুগ- অনেক রক্তাক্ত যুগ সমুত্তীর্ণ ক’রে
আজ এই সময়ের পারে এসে পুনরায় দেখে
আবহ্মানের ভাঁড় এসেছে গাধার পিঠে চ’ড়ে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/unmesh/
|
3290
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
|
ভক্তিমূলক
|
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে ॥
বাসনার বশে মন অবিরত ধায় দশ দিশে পাগলের মতো,
স্থির-আঁখি তুমি মরমে সতত জাগিছ শয়নে স্বপনে ॥
সবাই ছেড়েছে, নাই যার কেহ, তুমি আছ তার আছে তব স্নেহ--
নিরাশ্রয় জন, পথ যার গেহ, সেও আছে তব ভবনে।
তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর,সমুখে অনন্ত জীবনবিস্তার--
কালপারাবার করিতেছ পার কেহ নাহি জানে কেমনে ॥
জানি শুধু তুমি আছ তাই আছি, তুমি প্রাণময় তাই আমি বাঁচি,
যত পাই তোমায় আরো তত যাচি, যত জানি তত জানি নে।
জানি আমি তোমায় পাব নিরন্তর লোকলোকান্তরে যুগযুগান্তর--
তুমি আর আমি মাঝে কেহ নাই, কোনো বাধা নাই ভুবনে ॥(রচনাকাল: 1887)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/noyon-tomare-pay-na-dekhite/
|
3190
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দয়া করে ইচ্ছা করে আপনি ছোটো হয়ে
|
ভক্তিমূলক
|
দয়া করে ইচ্ছা করে আপনি ছোটো হয়ে
এসো তুমি এ ক্ষুদ্র আলয়ে।
তাই তোমার মাধুর্যসুধা
ঘুচায় আমার আঁখির ক্ষুধা,
জলে স্থলে দাও যে ধরা
কত আকার লয়ে।বন্ধু হয়ে পিতা হয়ে জননী হয়ে
আপনি তুমি ছোটো হয়ে এসো হৃদয়ে।
আমিও কি আপন হাতে
করব ছোটো বিশ্বনাথে।
জানাব আর জানব তোমায়
ক্ষুদ্র পরিচয়ে?শিলাইদহ, ২৬ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/doya-kore-iccha-kore-apni-choto-hoye/
|
533
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সিন্ধুঃ প্রথম তরঙ্গ
|
স্তোত্রমূলক
|
হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর, হে চির-বিরহী,
হে অতৃপ্ত! রহি’ রহি’
কোন্ বেদনায়
উদ্বেলিয়া ওঠ তুমি কানায় কানায়?
কি কথা শুনাতে চাও, কারে কি কহিবে বন্ধু তুমি?
প্রতীক্ষায় চেয়ে আছে উর্ধ্বে নীলা নিম্নে বেলা-ভুমি!
কথা কও, হে দুরন্ত, বল,
তব বুকে কেন এত ঢেউ জাগে, এত কলকল?
কিসের এ অশান্ত গর্জন?
দিবা নাই রাত্রি নাই, অনন্ত ক্রন্দন
থামিল না, বন্ধু, তব!
কোথা তব ব্যথা বাজে! মোরে কও, কা’রে নাহি ক’ব!
কা’রে তুমি হারালে কখন্?
কোন্ মায়া-মণিকার হেরিছ স্বপন?
কে সে বালা? কোথা তার ঘর?
কবে দেখেছিলে তারে? কেন হ’ল পর
যারে এত বাসিয়াছ ভালো!
কেন সে আসিল, এসে কেন সে লুকালো?
অভিমান ক’রেছে সে?
মানিনী ঝেপেছে মুখ নিশীথিনী-কেশে?
ঘুমায়েছে একাকিনী জোছনা-বিছানে?
চাঁদের চাঁদিনী বুঝি তাই এত টানে
তোমার সাগর-প্রাণ, জাগায় জোয়ার?
কী রহস্য আছে চাঁদে লুকানো তোমার?
বল, বন্ধু বল,
ও কি গান? ওকি কাঁদা? ঐ মত্ত জল-ছলছল-
ও কি হুহুঙ্কার?
ঐ চাঁদ ঐ সে কি প্রেয়সী তোমার?
টানিয়া সে মেঘের আড়াল
সুদূরিকা সুদূরেই থাকে চিরকাল?
চাঁদের কলঙ্ক ঐ, ও কি তব ক্ষুধাতুর চুম্বনের দাগ?
দূরে থাকে কলঙ্কিনী, ও কি রাগ? ও কি অনুরাগ?
জান না কি, তাই
তরঙ্গে আছাড়ি’ মর আক্রোশে বৃথাই?….
মনে লাগে তুমি যেন অনন্ত পুরুষ
আপনার স্বপ্নে ছিলে আপনি বেহুঁশ!
অশান্ত! প্রশান্ত ছিলে
এ-নিখিলে
জানিতে না আপনারে ছাড়া।
তরঙ্গ ছিল না বুকে, তখনো দোলানী এসে দেয়নি ক’ নাড়া!
বিপুল আরশি-সম ছিলে স্বচ্ছ, ছিলে স্থির,
তব মুখে মুখ রেখে ঘুমাইত তীর।–
তপস্বী! ধেয়ানী!
তারপর চাঁদ এলো-কবে, নাহি জানি
তুমি যেন উঠিলে শিহরি’।
হে মৌনী, কহিলে কথা-“মরি মরি,
সুন্দর সুন্দর!”
“সুন্দর সুন্দর” গাহি’ জাগিয়া উঠিল চরাচর!
সেই সে আদিম শব্দ, সেই আদি কথা,
সেই বুঝি নির্জনের সৃজনের ব্যথা,
সেই বুঝি বুঝিলে রাজন্
একা সে সুন্দর হয় হইলে দু’জন!
কোথা সে উঠিল চাঁদ হৃদয়ে না নভে
সে-কথা জানে না কেউ, জানিবে না, চিরকাল নাহি-জানা র’বে।
এতদিনে ভার হ’ল আপনারে নিয়া একা থাকা,
কেন যেন মনে হয়-ফাঁকা, সব ফাঁকা
কে যেন চাহিছে মোরে, কে যেন কী নাই,
যারে পাই তারে যেন আরো পেতে চাই!
জাগিল আনন্দ-ব্যথা, জাগিল জোয়ার,
লাগিল তরঙ্গে দোলা, ভাঙিল দুয়ার,
মাতিয়া উঠিলে তুমি!
কাঁপিয়া উঠিল কেঁদে নিদ্রাতুরা ভূমি!
বাতাসে উঠিল ব্যেপে তব হতাশ্বাস,
জাগিল অন্তত শূন্যে নীলিমা-উছাস!
রোমাঞ্চিত হ’ল ধরা,
বুক চিরে এল তার তৃণ-ফুল-ফল।
এল আলো, এল বায়ু, এল তেজ প্রাণ,
জানা ও অজানা ব্যেপে ওঠে সে কি অভিনব গান!
এ কি মাতামাতি ওগো এ কি উতরোল!
এত বুক ছিল হেথা, ছিল এত কোন!
শাখা ও শাখীতে যেন কত জানাশোনা,
হাওয়া এসে দোলা দেয়, সেও যেন ছিল জানা
কত সে আপনা!
জলে জলে ছলাছলি চলমান বেগে,
ফুলে হুলে চুমোচুমি-চরাচরে বেলা ওঠে জেগে!
আনন্দ-বিহ্বল
সব আজ কথা কহে, গাহে গান, করে কোলাহল!
বন্ধু ওগো সিন্ধুরাজ! স্বপ্নে চাঁদ-মুখ
হেরিয়া উঠিলে জাগি’, ব্যথা ক’রে উঠিল ও-বুক।
কী যেন সে ক্ষুধা জাগে, কী যেন সে পীড়া,
গ’লে যায় সারা হিয়া, ছিঁড়ে যায় যত স্নায়ু শিরা!
নিয়া নেশা, নিয়া ব্যথা-সুখ
দুলিয়া উঠিলে সিন্ধু উৎসুক উন্মুখ!
কোন্ প্রিয়-বিরহের সুগভীর ছায়া
তোমাতে পড়িল যেন, নীল হ’ল তব স্বচ্ছ কায়া!
সিন্ধু, ওগো বন্ধু মোর!
গর্জিয়া উঠিল ঘোর
আর্ত হুহুঙ্কারে!
বারে বারে
বাসনা-তরঙ্গে তব পড়ে ছায়া তব প্রেয়সীর,
ছায়া সে তরঙ্গে ভাঙে, হানে মায়া, উর্ধ্ব প্রিয়া স্থির!
ঘুচিল না অনন্ত আড়াল,
তুমি কাঁদ, আমি কাঁদি, কাঁদি সাথে কাল!
কাঁদে গ্রীষ্ম, কাঁদে বর্ষা, বসন্ত ও শীত,
নিশিদিন শুনি বন্ধু ঐ এক ক্রন্দনের গীত,
নিখিল বিরহী কাঁদে সিন্ধু তব সাথে,
তুমি কাঁদ, আমি কাঁদি, কাঁদে প্রিয়া রাতে!
সেই অশ্রু-সেই লোনা জল
তব চক্ষে — হে বিরহী বন্ধু মোরা — করে টলমল!
এক জ্বালা এক ব্যথা নিয়া
তুমি কাঁদ, আমি কাঁদি, কাঁদে মোর প্রিয়া।
চট্টগ্রাম ২৯/০৭/১৯২৬
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/153
|
3927
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সময় আসন্ন হলে
|
চিন্তামূলক
|
সময় আসন্ন হলে
আমি যাব চলে,
হৃদয় রহিল এই শিশু চারাগাছে—
এর ফুলে, এর কচি পল্লবের নাচে
অনাগত বসন্তের
আনন্দের আশা রাখিলাম
আমি হেথা নাই থাকিলাম। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/somoy-asonno-hole/
|
1830
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
দিও
|
প্রেমমূলক
|
আজ সব খুলে দিও,
কোনো ফুল রেখোনা আড়ালে
ভূমধ্যসাগরও যদি চাই, দিও
দু'হাত বাড়ালে ।
দ্বিপ্রহরে যদি চাই
গোধূলি বেলার রাঙা ঠোঁট
গোধূলিতে জ্যোৎস্না যদি চাই
কাঠের চেয়ারে বসে
যদি বলি হতে চাই
কীর্তিনাশা নদী
সমস্ত কল্লোল দিও
কোনো ঢেউ রেখোনা আড়ালে ।
ভূমধ্যসাগরও যদি চাই, দিও
দু'হাত বাড়ালে ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1252
|
4154
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
ভালোবাসি তোমায়
|
প্রেমমূলক
|
ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমায়
জীবনের প্রতিটি পাতায় পাতায়
তোমার হাসি, তোমার কান্নায়
তোমার বেণীবাধা কেশের খোপায় খোপায়।কারণে অকারণে খুঁজি তোমায়
তোমার উলটো দিকে পড়ে থাকা ছায়ায় ছায়ায়
তোমাকে দেখবার , তোমাকে পাবার আশায়
দাঁড়িয়ে থাকি রৌদ্রে পুড়ে রাস্তায় রাস্তায়।মনের আবেগে হৃদয়ের টানে কাছে টানি তোমায়
শুধু দু’চোখ ভরে দেখার আশায়
তোমার টানা টানা চোখ, অপূর্ব চেয়ারায়
আলোকিত হয়েছে আমার পৃথিবীর প্রতিটি কানায় কানায়।তুমিহীনা জীবন, তুমিহীনা পৃথিবী কিভাবে মানায়
এই কথা মনে এলে দু’চোখ ভাসে অশ্রুর বন্যায়
তোমার হৃদয়ে কখনও কি মনে হয়?
তুমিহীনা আমি বেঁচে থাকবো এই দুনিয়ায়।ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমায়
জীবনের প্রতিটি পাতায় পাতায়
আমার চোখ আর হৃদয়ের ভাষায়
বুঝে নিও কতোটা ভালোবাসি আমি তোমায়।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2133.html
|
5351
|
শামসুর রাহমান
|
হে আমার বাল্যবন্ধুগণ
|
চিন্তামূলক
|
শোনো তোমরা হে আমার বাল্যবন্ধুগণ-
শোনো আফজাল, তাহের, ফরহাদ, সূর্যকিশোর।
আজ পঞ্চাশের ডান দিকে বসে
ভাবছি তোমাদের কথা।আফজাল, আমি জানতাম
সেলুলয়েডে একটা নির্মল কাহিনী রচনার সাধ ছিলো তোমার।
তাহের, তুমি একটা বিরাট সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে।
ফরহাদ, গ্রাম-থেকে-আনা তোমার গোলাপী রঙের টিনের
স্যুটকেস থেকে বেরিয়ে পড়েছিলো
যাবতীয় চিরকুট, সবুজ শাল আর একটা রাজহাঁস।
সূর্যকিশোর,
প্রতিদিন সূর্যাস্তের দিকে হেঁটে যাওয়াতেই ছিলো তোমার আনন্দ।আফজাল, তোমার সেই সেলুলয়েডী সাধ, যদ্দূর জানি,
পূর্ণ হয়নি। এইতো সেদিন আমরা কতিপয় শোকার্ত মানুষ
গোলাপজল আর লোবানের ঘ্রাণময় হাতে
তোমাকে শুইয়ে দিলাম মাটির নিচে, যেখানে
কাঁকড়াবিছে আর পোকামাকড়ের ঘনিষ্ঠ গেরস্থালি।
প্রতিবাদহীন তুমি ছিলে অসম্ভব নিশ্চুপ, অথবা শার্টের কলারে
কিং জ্যাকেটের আস্তিনে একটা পিঁপড়ে
অথবা, কাঁচপোকা আনাগোনা করলে তুমি
মাথাখারাপ-করা অস্বস্তিতে ভুগতে, টোকা মেরে উড়িয়ে দিতে
তৎক্ষণাৎ। মনে পড়ে, আফজাল তোমার সঙ্গে দেখেছিলাম
জীবনের প্রথম জোনাকি আর তোমার স্মৃতি এখন জোনাকি।তাহের তুমি সেতু তৈরির স্বপ্ন খারিজ করে
বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে একদিন পাড়ি জমালে সুদূর বিদেশে।
তুমি আজ ফেঁসে গিয়েছো ভিনদেশী এক শহরে, ডিপার্টমেন্টাল
স্টোরের ঝলমলে করিডোরে, ব্যাংক ত্র্যাকাউন্টের ঝকমকিতে,
চকচকে এস্কেলেটারে।ফরহাদ, তোমার সেই ‘এলাহি ভরসা’ খচিত
গোলাপী রঙের টিনের স্যুটকেস থেকে বেরিয়ে-পড়া রাজহাঁস
গ্রামীণ তেজারতির অন্ধকার গুদামে দম আটকে
মারা গ্যাছে। তুমি চটজলদি
তাকে দাফন করেছো জামতলায় হল্দে পাতার নিচে।সূর্যকিশোর; সেই যে তুমি হাঙ্গামায় বেচারামের
দেউড়ির বাসা থেকে বেরিয়ে হেঁটে গেলে
সূর্যাস্তের দিকে মুখ করে, তারপর তোমার কোনো খোঁজখবর
আমি পাইনি। তুমি কি পশ্চমবঙ্গের রাইটার্স বিল্ডিং এ
কলম পিষছো? নিত্যদিন মিশছো চৌরঙ্গীর ভিড়ে ? নাকি
ডেলি প্যাসেজ্ঞারি করছো মফস্বলী ট্রেনে?
সূর্যকিশোর, তুমি কি আজ খুচরো যন্ত্রাংশের কারবারি?
তুমি কি ধিকিয়ে-ধিকিয়ে-চলা খবর কাগজের
সংবাদ-শিকারি? তুমি কি ফাটকা বাজারে ঘোরো নিত্যদিন?
সূর্যকিশোর, হে বন্ধু আমার, তুমি এখনো
সূর্যাস্তের দিকে হেঁটে যেতে ভালোবাসো প্রত্যহ?
ইতিহাসের চেল্লাচিল্লি আর রাজনীতির হৈ-হল্লায়
তুমি বেঁচে আছো কিনা, আমি তা জানি না সূর্যকিশোর।শোনো তোমরা শোনো, হে আমার বাল্যবন্ধুগণ,
পঞ্চাশের ডান দিকে বসে
আমি ভাবছি তোমাদের
এবং ভাবছি আমার নিজের কথা।
একদা সুকান্তের মতো গালে হাত দিয়ে
পুরোদস্তুর কবির কায়দায়
একটা ফটো তুলেছিলাম,
উই-খাওয়া সেই ফটো আজ
কোথায় হারিয়ে গ্যাছে। তোমাদের অলক্ষ্যেকী রহস্যময় সখ্যে
অক্ষরের পরী ভর করেছিলো আমার ওপর। এখনো
গায়ে-কাটা-দেওয়া প্রহরে প্রহরে
আমার নিভৃত ঘরে, পথে-বিপথে তার
অনির্দিষ্ট আনাগোনা।
শোনো তোমরা শোনো, হে বাল্যবন্ধুরা আমার, শোনো
আমার ঘরে নিমেষে বস্তুময়তার উপরিতলে পিছলে
অনেক রঙিন মাছ এসে যায়, সাঁতার কাটে, এসে যায়
জলাভূমির ধারে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের
হাড়গোড়ের সারে মজ্ঞরিত লক্ষ লক্ষ টাটকা গোলাপ। (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/he-amar-balyobondhugon/
|
4825
|
শামসুর রাহমান
|
দণ্ড
|
রূপক
|
‘নত হও, নত হও’ ব’লে নির্বাপিত এজলাসে
পরচুলা-পরা বিজ্ঞ বিচারক খাগের কলমে
লিখলেন রায়, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লোকটার
ভাবলেশহীন মুখ। অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, ছন্নছাড়া,
তার বুক-চেরা পথে কুহকের অচিন সঙ্গীত
তোলে ঢেউ, কেউ ডেকে-ডেকে ঘুমিয়ে পড়েছে; সে-তো
বোবা-কালা নয়, তবু মৌনের নিঃস্পৃহ তাঁবেদার
সর্বক্ষণ, পোকা-খাওয়া ফলের মতোই স্তব্ধ মুখ।মনে-মনে বলে, ‘ছাগ দেবতার কাছে নত হওয়া
কী ক’রে সম্ভব?’ নইলে অনিবার্য বলি যূপকাঠে,
মন্ত্রপাঠে প্রস্তুত পুরুত, ঠেলাঠেলি অবান্তর
ঠেকে তার; কৌতূহলী জনতার কোলাহল ভেঁপু
বাজায় কিশোর, নারীদের কারো কারো কাঁখে শিশু;
অবশেষে বিচারক, অপরাধী দু’জনই দণ্ডিত। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dondo/
|
3451
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রশ্ন - শিশু কাব্যগ্রন্থ
|
ছড়া
|
মা গো, আমায় ছুটি দিতে বল্,
সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা।
এখন আমি তোমার ঘরে বসে
করব শুধু পড়া-পড়া খেলা।
তুমি বলছ দুপুর এখন সবে,
নাহয় যেন সত্যি হল তাই,
একদিনও কি দুপুরবেলা হলে
বিকেল হল মনে করতে নাই?
আমি তো বেশ ভাবতে পারি মনে
সুয্যি ডুবে গেছে মাঠের শেষে,
বাগ্দি-বুড়ি চুবড়ি ভরে নিয়ে
শাক তুলেছে পুকুর-ধারে এসে।
আঁধার হল মাদার-গাছের তলা,
কালি হয়ে এল দিঘির জল,
হাটের থেকে সবাই এল ফিরে,
মাঠের থেকে এল চাষির দল।
মনে কর্-না উঠল সাঁঝের তারা,
মনে কর্-না সন্ধে হল যেন।
রাতের বেলা দুপুর যদি হয়
দুপুর বেলা রাত হবে না কেন।(শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/proshno/
|
1603
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
তৈমুর
|
রূপক
|
রাজপথে ছিন্ন শব, ভগ্নদ্বার প্রাসাদে কুটিরে
নির্জন বীভৎস শান্তি, দলভ্রষ্ট আহত অশ্বের
চকিত খুরের শব্দ, মুমূর্ষুর আর্তকণ্ঠ, ফের
ভৌতিক স্তব্ধতা। শূন্য মসজিদের গম্বুজে খিলানে
রাত্রির নিঃসঙ্গ ছায়া নামে। প্রাণ-যমুনার তীরে
মৃত্যুর উৎসব সাঙ্গম বিহঙ্গ-হৃদয় ছিন্নপাখা।
নগরে গ্রামে ও গঞ্জে মসজিদে মন্দিরে সর্বখানে
দুরন্ত তাতার-দস্যু তৈমুরের পদচিহ্ন আঁকা।
তৈমুর এখানে আসে দস্যুর মতন, জীবনের
কামনাকে হত্যা করে, একটানা অদ্ভুত আহ্বানে
মৃত্যুকে সে ডাকে, তার লোভাতুর অতর্কিত টানে
ছিঁড়ে আসে প্রাণের মৃণাল, ত্রস্ত জীবনের সুর।
দুরন্ত আঘাতে থেমে যায়–ভয়বিহ্বব মনের
সমস্ত কপাট বন্ধ, এসে পড়ে কখন তৈমুর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1621
|
2239
|
মহাদেব সাহা
|
মানুষের সাথে থাকো
|
চিন্তামূলক
|
যতোই ব্যথিত হও মানুষের সান্নিধ্য ছেড়ো না
মানুষের সাথে থাকো সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে,
যতোই আঘাত পাও মানুষকে কিছুতে ছেড়ো না
যখন কিচুই নেই মনে রেখো,
তখনো সর্বশেষ আশা এই মানুষ;
সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও তোমার পাশে এসে মানুষই
দাঁড়াবে
ফুল যখন ফুটবে না, পাখি যখন গাইবে না
কেবল আকাশ-বাতাস মথিত করে আসবে ধ্বংস,
আসবে মৃত্যু
তখনো মানুষই তোমার একমাত্র সঙ্গী;
মানুষেল সব নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতার পরও
মানুষই মানুষের বন্ধু।
অরণ্য নয়, পাহাড় নয়, সমুদ্র বা তৃণভূমি নয়
মানুষের হৃদয়ই তোমার শ্রেষ্ঠ আশ্রয়
আর কোথাও নয় কেবল মানুষের হৃদয়েই মানুষ অমর।
মানুষকে এড়িয়ে কোনো সার্থকতা নেই
যতোই আঘাত পাও, যতোই ব্যথিত হও
মানুষের সঙ্গ ছেড়ো না,
মানুষের সাথে থাকো সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে
কেবল মানুষই এই মানুষের চিরদিন বাঁচার সাহস।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1446
|
640
|
জয় গোস্বামী
|
ওই যে বাড়ির তীরে কবর ওঠানো তার
|
চিন্তামূলক
|
ওই যে বাড়ির তীরে কবর ওঠানো তার
ছায়াচরে ঘুমে শুরু হই
আমার অতীতকাল জলে ডাক দিলো: ‘ওরে
লগ্নে লগ্নে ফেরী ছেড়ে যায়’
গৃহমুণ্ডে যে-বায়স নুড়িমুখে বসে তার
‘কা’ ধ্বনিতে সকাল অজ্ঞান
খেলনা দুর্গের সামনে যতবার হাবাখেলা
উত্থাপন করি, বাজে টাকা
যতই পালাতে যাই, ছাদ ভেঙে মাথায় পড়ে
ততবার হতভাগ্য যশ
সখার আঙুল শুষে পদ্মিনী খেলেন, ফলে
তুমিও ঝিনুকে ঢুকে খুন
মা বাবার সঙ্গে বসে বশবর্তী এ কবিতা
সকাতরে পড়া অসম্ভব
ওই যে উঠোন থেকে গৃহরক্ত বয়ে আসে
সবার দরজায় কাদা, পা পিছলে আসুন
রাস্তায় পলায়মান ভবিষ্যৎকাল, আর
হাত পায়ে বেড়ি আর পিছনে কুকুর
কালপুরুষের কাঁধে উড়ে বসে কাক, সেও
তারা ফেলে ফেলে ভরছে ব্রহ্মাণ্ড কলস
ওই যে ছায়ার তীরে শোয়ানো কবর, তার
বাড়ি-তীরে বালি ঝুরঝুর
পূর্বের আকাশ, মত্ত, পাশে এসে দাঁড়ালেন
ও আমার ভয় ভেঙে চুর
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1726
|
5860
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
সকল ছন্দের মধ্যে আমিই গায়ত্রী
|
রূপক
|
ছিলাম বাসনা-লঘু, ছন্দ এসে আমাকে সুসি’র হতে বলে
প্রিয় বয়স্যের মতো তার দন্তপঙ্ক্তি
আমি তাকে দূর হয়ে যেতে বলি নতুন বন্ধুর খোঁজে
আমি ছন্দহীন হতে হতে ক্রমশ ধর্মদ্রোহী আগোপন
পাষন্ড হয়ে যাই।
তবু সে দরজার কাছে মুখ চুন, আমি তাকে পালঙ্কের নিচ থেকে
জুতো মুখে করে আনতে হুকুম করেছি!
দ্বিধা নেই, সে এনেছে, সমালোচকের কানে মেরেছে চপ্পল।
সে আমার হাত ধরে স্ফটিকবর্ণের এক নারীর সান্নিধ্যে
টেনে আনে, মাত্রাহীন আঙুল তুলে নারীকে দেখিয়ে বলে,
সকল ছন্দের মধ্যে এই যে গায়ত্রী, তুমি নাও,
গায়ত্রীর মতো নারী শুয়ে আছে, বিশাল জঘন মেলে,
পর্ব ভেঙে ইশারায় আমাকে উপুড় হতে বলে
আমি তার শরীর বিস্তৃত করি, দুই বক্ষোদেশ ছিঁড়ে ক্রমশ পয়ারে
নিয়ে আসি, ঊরুদ্বয়ে কিছু কথ্য অশ্লীলতা মিশিয়ে চকিতে
খুলে ফেলি আরবের অলঙ্কার, যদিও নিশ্চিত
কাঙাল কুকুর হয়ে মাঝে মাঝে আমি বড় মিলন প্রত্যাশী।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1903
|
968
|
জীবনানন্দ দাশ
|
একদিন খুঁজেছিনু যারে
|
প্রেমমূলক
|
একদিন খুঁজেছিনু যারে
বকের পাখার ভিড়ে বাদলের গোধূলি-আঁধারে,
মালতীলতার বনে,- কদমের তলে,
নিঝুম ঘুমের ঘাটে,-কেয়াফুল,- শেফালীর দলে!
-যাহারে খুঁজিয়াছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে
হেমন্তের হিম ঘাসে যাহারে খুঁজিয়াছিনু ঝরোঝরো
কামিনীর ব্যথার শিয়রে
যার লাগি ছুটে গেছি নির্দয় মসুদ চীনা তাতারের দলে,
আর্ত কোলাহলে
তুলিয়াছি দিকে দিকে বাধা বিঘ্ন ভয়,-
আজ মনে হয়
পৃথিবীর সাঁজদীপে তার হাতে কোনোদিন জ্বলে নাই শিখা!
-শুধু শেষ-নিশীথের ছায়া-কুহেলিকা,
শুধু মেরু-আকাশের নীহারিকা, তারা
দিয়ে যায় যেন সেই পলাতকা চকিতার সাড়া!
মাঠে ঘাটে কিশোরীর কাঁকনের রাগিণীতে তার সুর
শোনে নাই কেউ,
গাগরীর কোলে তার উথলিয়া ওঠে নাই আমাদের
গাঙিনীর ঢেউ!
নামে নাই সাবধানী পাড়াগাঁর বাঁকাপথের চুপে চুপে
ঘোমটার ঘুমটুকু চুমি!
মনে হয় শুধু আমি,- আর শুধু তুমি
আর ঐ আকাশের পউষ-নীরবতা
রাত্রির নির্জনযাত্রী তারকার কানে- কানে কত কাল
কহিয়াছি আধো- আধো কথা!
-আজ বুঝি ভুলে গেছে প্রিয়া!
পাতাঝরা আঁধারের মুসাফের-হিয়া
একদিন ছিল তব গোধূলির সহচর,- ভুলে গেছ তুমি!
এ মাটির ছলনার সুরাপাত্র অনিবার চুমি
আজ মোর বুকে বাজে শুধু খেদ,- শুধু অবসাদ!
মহুয়ার,- ধুতুরার স্বাদ
জীবনের পেয়ালায় ফোঁটা ফোঁটা ধরি
দুরন্ত শোণিতে মোর বারবার নিয়েছি যে ভরি!
মসজেদ-সরাই-শরাব
ফুরায় না তৃষা মোর,- জুড়ায় না কলেজার তাপ!
দিকে দিকে ভাদরের ভিজা মাঠ,-আলেয়ার শিখা!
পদে পদে নাচে ফণা,-
পথে পথে কালো যবণিকা!
কাতর ক্রন্দন,-
কামনার কবর-বন্ধন!
কাফনের অভিযান,-অঙ্গার- সমাধি!
মৃত্যুর সুমেরু সিন্ধু অন্ধকারে বারবার উঠিতেছে কাঁদি!
মর্মর্ কেঁদে ওঠে ঝরাপাতা-ভরা ভোররাতের পবন,-
আধো আঁধারের দেশে
বারবার আসে ভেসে
কার সুর!-
কোন্ সুদুরের তরে হৃদয়ের প্রেতপুরে ডাকিনীর মতো মোর
কেঁদে মরে মন!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/900
|
5121
|
শামসুর রাহমান
|
মুছে যায় অপরূপ মেলা
|
চিন্তামূলক
|
আচানক মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়। মনে হ’ল,-
কিছু পদধ্বনি যে প্রবেশ করছে
খুব কাছে। চেয়ে দেখি চারটি রুপালি
কঠোর, নিষ্ঠুর পদযুগ। সেগুলোর অধিকারী
রয়েছে তাকিয়ে এই ভ্যাবাচ্যাকা-খাওয়া লোকটির
দিকে, যেন ওরা তাকে এক্ষুনি চিবোবে!বেশ কিছুক্ষণ ওরা ঘরের ভেতরে দাঁড়ানোর পর এই
সন্ত্রস্ত আমাকে বন্দি ক’রে
নিয়ে চলে ঘরের বাইরে বহুদূরে। হঠাৎ বিকট সেই
চারজন তাদের বন্দিকে গাছে বেঁধে মিশে গেল ধোঁয়াশায়।
আকাশে চাঁদের হাসি জেগে উঠতেই খ’সে যায়
বন্দিদশা আর নানা দিকে ফোটে পুষ্পরাজি।
অকস্মাৎ চোখে পড়ে কতিপয় বিদঘুটে জীব
ভয়নক নখ দিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে সকল ফুল আর
বমন ছড়িয়ে দিচ্ছে এদিকে-সেদিকে। কী করে যে
আমার ভেতর এক দূরন্ত বিদ্রোহ জেগে ওঠে
বিদঘুটে জীবদের তাড়াবার- নিজেই বুঝিনি।
চতুর্দিকে অপূর্ব পুষ্পিত ঘ্রাণ আর শোভা জন্ম নেয়।যাব আর কত দূর, কে আমাকে বলে দেবে
এই কণ্ঠকিত পথে? কোথায় পথের হবে শেষ?
এ-পথের শেষ নেই; যতদিন বেঁচে আছি, পথ
ডেকে যাবে আজ একদিকে, কাল অন্য দিকে আর
নিষ্ঠুর নানা দিক থেকে রংবেরঙের খেলা
দেখিয়ে চকিতে কেড়ে নেয় অপরূপ এক মেলা। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/muche-jai-oporup-mela/
|
3795
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যে-বসন্ত একদিন করেছিল কত কোলাহল
|
প্রকৃতিমূলক
|
যে-বসন্ত একদিন করেছিল কত কোলাহল
লয়ে দলবল
আমার প্রাঙ্গণতলে কলহাস্য তুলে
দাড়িম্বে পলাশগুচ্ছে কাঞ্চনে পারুলে;
নবীন পল্লবে বনে বনে
বিহ্বল করিয়াছিল নীলাম্বর রক্তিম চুম্বনে;
সে আজ নিঃশব্দে আসে আমার নির্জনে;
অনিমেষে
নিস্তব্ধ বসিয়া থাকে নিভৃত ঘরের প্রান্তদেশে
চাহি সেই দিগন্তের পানে
শ্যামশ্রী মূর্ছিত হয়ে নীলিমায় মরিছে যেখানে।
পদ্মা, ২০ মাঘ, ১৩২১
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1937
|
1684
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
শব্দ, শুধু শব্দ
|
প্রেমমূলক
|
হাজার শব্দ মাথায় ছিল,
হাজার শব্দ বুকে,
আর তা ছাড়া বাপ-পিতেমোর
জং-ধরা সিন্দুকে
শব্দ ছিল দু-তিন হাজার–
খরচা করে সবই
দেখছি তবু হয়নি আঁকা
তোমার মুখচ্ছবি।
দোষ ছিল না শব্দে, শুধু
দোষ ছিল জোড় বাঁধায়,
ভুল-বিবাহের বর-কনে তাই
গড়ায় ধুলো-কাদায়।
এখন ভূমিশয্যা থেকে
কুড়িয়ে তাদের তুলি;
নতুন করে জোড় মিলিয়ে
মেটাচ্ছি ভুলগুলি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1610
|
2249
|
মহাদেব সাহা
|
রবীন্দ্রোত্তর আমারা কজন যুবা
|
ভক্তিমূলক
|
শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে ভীষণ দায় বাঁচা, বড়ো অসহায়
আমারা কজন যাবা আপনার শান্তিনিকেতনে প্রত্যহ প্রার্থনা
করি হে ঈশ্বর, আমাদের
শান্তি দাও, প্রত্যহ প্রার্থনা করি মঠে ও গির্জায়
আমাদের শান্তি দাও, দাও মহান ঈশ্বর, তবু
সর্বত্র আজ অনাবৃষ্টি, রৌদ্রে
পোড়ে মাঠ, বোমায় শহর পোড়ে, লোকালয় উচ্ছন্নে যায়
মারী ও মড়কে কাঁপে দেশ, শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে আমরা বড়ো
অসহায় কজন যুবকও বিশেষত আমরা কজন যুবা
ব্যক্তিযত নিখোঁজ সংবাদ যারা ঢেকে রাখি সর্বক্ষণ আস্তিনের
পুরু ভাঁজে, বড়োই রুগ্ন আমরা
এ যুগে নিঃশ্বাস নেবো প্রকৃতিতে বৃষ্টিতে বা উদার অনণ্যে দাঁড়াবো
এমন জো নেই কোনো,
আমাদের সন্নিকটে বনভূমি নেই।
এখণ ভীষণ রুগ্ন আমরা, সারা গায়ে কালোশিরা, চোখ ভর্তি
নিঃশেব্দ আঁধার, যেখনে যাই আমরা কজন যুবা
যেন বড়ো বেশি ম্লাম ফ্যাকাশে বৃদ্ধ, চোখমুখে
স্পষ্ট হয়ে লেগে থাকে যাবতীয় অনাচার, নিজের কাছেও
আজ নিজেদের লুকাবার রাস্তা খোলা নেই, এ যুগে আমরা
কড়ো অসহায় কজন যুবক ; শুনান রবীন্দ্রনাথ তবু আমরা
কজন যুবা আজো ভালোবাসি গান, তবু
আমরা কজন যুবক
বড়ো ভালোবাসি মাধবীকে, ভালোবাসি মাধবীর বাংলাদেশ
তার নিজস্ব বর্ণমালা রবীন্দ্রসঙ্গীত।
শুনুন রবীন্দ্রনাথ আমরা কজন যুবা, বড়ো বেশি অসহায় কজন
যুবা, তখন তাকিয়ে দেখি সূর্যাস্ত অস্তিত্বে রৌদ্র
ওঠে, পাখি নাচে, আমরা কজন এই ভয়ানক রুগ্ন যুবা পুনরায়
মাঠে যাই আমরা নিঃশ্বাস নিই সঙ্গীতের উদার নিসর্গে, আমরা
যেন ধীরে ধীরে বেঁচে উঠি
তখন মনে হয় এমনি করেই বুঝি এদেশে
বিপ্লব আসে, একুশে ফেব্রুয়ারি আসে, নববর্ষ আসে;
আমরা কতিপয় যুবা
তাই আর সব পরিচয় যখন ভুলে যাই এমনকি ভুলে
যাই নিজেদের নাম, তখনো মনে রাখি
রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবহমান বাংলাদেশ
আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব,
রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1477
|
5138
|
শামসুর রাহমান
|
যখন ঘুমিয়ে ছিলাম
|
চিন্তামূলক
|
মিয়ে ছিলাম ঘরে একা; আচমকা ঘুম ছিঁড়ে
গেলে পর মনে হলো কে যেন ঝাঁকুনি
দিয়ে জোরে ভাঙালো আমার শান্ত, গাঢ়
নিদ্রা; বিচলিত হয়ে খুঁজি কাকে? কোন্ সে মানব
অথবা মানবী, যার মুখ দেখার আশায় দ্রুত
শয্যা ছেড়ে উঠে দোর খুলে দৃষ্টি বুলোই চৌদিকে।না, কোথাও নেই চিহ্ন কারও; বহুদূর থেকে কান্না
ভেসে আসে অথচ নিকটে ঘরবাড়ি
নেই কোনও। তা’হলে কি আকাশের মেঘমালা থেকে
মানবীর ক্রন্দনের মতো ধ্বনি ঝরছে আমার
শ্রুতিতে অথবা দূরে কোনও রুগ্ন, বিরহী যুবক
বাঁশিতে তুলছে কান্নারূপী সুর উন্মাতাল হয়ে।কিছুতে আসে না ঘুম। মনে হলো, যুগ যুগ ধরে
এভাবেই নিদ্রাহীন থাকবো এখানে
বিরানায়। ভুলেও এখানে কেউ আসবে না, কারও কোনও কথা
শোনার সুযোগ হয়তো-বা কোনওকালে
মিলবে না কিছুতেই। পশু, পাখি আর কীট, পতঙ্গ ব্যতীত
আর কারও মুখ দেখতে পাবো না কোনও কালে!কখনও রবিনসন ক্রুশোর ধরনে অবিকল
নিঃসঙ্গ জীবন কাটাবার মতো দশা হলে, তবে
জানি না কী ক’রে কাটাতাম একা দ্বীপবাসী হয়ে। তা’হলে কি
উন্মাদের পরিণতি হতো না আমার?
তখন হয়তো পাতাময় গাছের আগ্রহী ডালে
নিজেকে ঝুলিয়ে চিরতরে অসীমের ধোঁয়াশায় (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jokhon-ghumie-chilam/
|
5420
|
সিকান্দার আবু জাফর
|
মানা
|
নীতিমূলক
|
হাটে-মাঠে-গঞ্জে-ঘাটে সুদূর গাঁয়ের পথে
নদীর তীরে, বালুর চরে, সমুদ্র সৈকতে
ছড়িয়ে আছে জীবন যেন আনন্দে আটখানা
তুমিই যে তার ভাগ নেবে না তোমার শুধু মানা।
ও-জঙ্গলে দোয়েল নাচে, শালিক ডাকে গাছে
ঘুঘুর ছানা মিটমিটিয়ে হয়তো চেয়ে আছে
বুলবুলিটার লাল টুপিটা দেখার নেশায় মেতে,
টুনটুনি-বৌ আবাক হয়ে রাখে দু চোখ পেতে,
ও-জঙ্গলে বাতাস মিঠে, মিঠে ফুলের হাসি
তারও চেয়ে মধুর মিঠে বাঁশের পাতার বাঁশি
তবুও তোমার ও-দিকটাতে যেতে বিষম মানা,
ছাতিম গাছে লুকিয়ে আছে মুণ্ডু কাটা ডানা।
সাগর দিঘির তীরে তীরে ধান সবুজের মেলা
কচি ধানের হাজার শীষে সোনা রোদের খেলা।
ফড়িং-পায়ের নাচন কেড়ে নাচে মেঘের মায়া।
জল-পুকুরে আকাশ দেখে নিজের সুনীল কায়া।
মাছরাঙা তার রাঙা ঠোঁটের পরখ করে ধার
সাগর-দিঘির চতুর্দিকে খোলা খুশির দ্বার,
তবু তোমার ও-দিকটাতে যেতে বিষম মানা
জলের দানো হঠাৎ রেগে দিতেই পারে হানা।
দক্ষিণে যাও বারণ আছে, পশ্চিমে যাও মানা
উত্তরে যাও নিষেধ আছে, পুবে আগল টানা।
সবাই যখন হাসে-খেলে বন্ধ তোমার খেলা
একলা তোমার চতুর্দিকেই ভয়ের থাবা মেলা।
পালিয়ে যাবে কেবল তখন হার মেনে সব মানা
তুমি যখন সাহস করে হবে হার-না-মানা।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4211.html
|
5706
|
সুকুমার রায়
|
হিংসুটিদের গান
|
ছড়া
|
আমরা ভালো লক্ষী সবাই, তোমরা ভারি বিশ্রী,
তোমরা খাবে নিমের পাচন, আমরা খাব মিশ্রী।
আমরা পাব খেলনা পুতুল, আমরা পাব চম্চম্,
তোমরা ত তা পাচ্ছ না কেউ, পেলে ও পাবে কম কম
আমরা শোব খাট পালঙে মায়ের কাছে ঘেঁষ্টে,
তোমরা শোবে অন্ধকারে একলা ভয়ে ভেস্তে।
আমরা যাব জাম্তাড়াতে চড়ব কেমন ট্রেইনে,
চেঁচাও যদি "সঙ্গে নে যাও" বল্ব "কলা এইনে"!
আমরা ফিরি বুক ফুলিয়ে রঙিন্ জুতোয় মচ্মচ্,
তোমরা হাঁদা নোংরা ছিছি হ্যাংলা নাকে ফচ্ফচ্।
আমরা পরি রেশ্মি জরি, আমরা পরি গয়না,
তোমরা সেসব পাও না ব'লে তাও তোমাদের সয় না।
আমরা হব লাট মেজাজী, তোমরা হবে কিপ্টে,
চাইবে যদি কিচ্ছু তখন ধরব গলা চিপ্টে।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/hingshutider-gaan/
|
156
|
আহসান হাবীব
|
এই খানে নিরঞ্জনা
|
মানবতাবাদী
|
এইখানে নিরঞ্জনা নদী ছিলো
এই ঘাটে হাজার গৌতম
স্নান করে শুদ্ধ হয়েছেন।
নদী আছে ঘাট আছে
সেই শুদ্ধ জলের অভাব
অশুদ্ধ মানুষ খুব বেড়ে গেছে
সারিবদ্ধ স্নানার্থী মানুষ
মরানদী মরাস্রোত ছাড়িয়ে এখন _
বলে দাও
যেতে হবে অন্য কোনো নিরঞ্জনা নদীর সন্ধানে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3821.html
|
2296
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
উপক্রম
|
সনেট
|
যথাবিধি বন্দি কবি, আনন্দে আসরে,
কহে, জোড় করি কর, গৌড় সুভাজনে;—
সেই আমি, ডুবি পূর্বে ভারত‐সাগরে,
তুলিল যে তিলোত্তমা‐মুকুতা যৌবনে;—
কবি‐গুরু বাল্মীকির প্রসাদে তৎপরে,
গম্ভীরে বাজায়ে বীণা, গাইল, কেমনে,
নাশিলা সুমিত্রা‐পুত্র, লঙ্কার সমরে,
দেব‐দৈত্য‐নরাতঙ্ক— রক্ষেন্দ্র‐নন্দনে;
কল্পনা দূতীর সাথে ভ্রমি ব্রজ‐ধামে
শুনিল যে গোপিনীর হাহাকার ধ্বনি,
(বিরহে বিহ্বলা বালা হারা হয়ে শ্যামে;)—
বিরহ‐লেখন পরে লিখিল লেখনী
যার, বীর জায়া‐পক্ষে বীর পতি‐গ্রামে,
সেই আমি, শুন, যত গৌড়‐চূড়ামণি!—
ইতালি, বিখ্যাত দেশ, কাব্যের কানন,
বহুবিধ পিক যথা গায় মধুস্বরে,
সঙ্গীত-সুধার রস করি বরিষণ,
বাসন্ত আমোদে আমোদ মন পূরি নিরন্তরে;—
সে দেশে জনম পূর্বে করিলা গ্রহণ
ফ্রাঞ্চিস্কো পেতরাকা কবি; বাক্দেবীর বরে
বড়ই যশস্বী সাধু, কবি-কুল-ধন,
রসনা অমৃতে সিক্ত, স্বর্ণ বীণা করে।
কাব্যের খনিতে পেয়ে এই ক্ষুদ্র মণি,
স্বমন্দিরে প্রদানিলা বাণীর চরণে
কবীন্দ্র: প্রসন্নভাবে গ্রহিলা জননী
(মনোনীত বর দিয়া) এ উপকরণে।
ভারতে ভারতী-পদ উপযুক্ত গণি,
উপহাররূপে আজি অরপি রতনে॥
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/386
|
3602
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিরহবৎসর-পরে মিলনের বীণা
|
সনেট
|
বিরহবৎসর-পরে মিলনের বীণা
তেমন উন্মাদ-মন্দ্রে কেন বাজিলি না।
কেন তোর সপ্তস্বর সপ্তস্বর্গপানে
ছুটিয়া গেল না ঊর্ধ্বে উদ্দাম-পরানে
বসন্তে-মানস-যাত্রী বলাকার মতো।
কেন তোর সর্ব তন্ত্র সবলে প্রহত
মিলিত ঝংকার-ভরে কাঁপিয়া কাঁদিয়া
আনন্দের আর্তরবে চিত্ত উন্মাদিয়া
উঠিল না বাজি। হতাশ্বাস মৃদুস্বরে
গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া লাজে শঙ্কাভরে
কেন মৌন হল। তবে কি আমারি প্রিয়া
সে পরশ-নিপুণতা গিয়াছে ভুলিয়া।
তবে কি আমারি বীণা ধূলিচ্ছন্ন-তার
সেদিনের মতো ক’রে বাজে নাকো আর। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/birohbotsore-pore-miloner-bina/
|
4104
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
দুঃস্বপ্নের
|
প্রেমমূলক
|
আমার এখন সমস্তটাই স্মৃতিসৌধ,
হৃৎপিন্ডে পিন ফোটানো
কালো ব্যাজের মৌন বিষাদ,
একুশে ভোর, নগ্ন পায়ে শহীদ মিনার,
আমার এখন সমস্তটুক্ এক মিনিটের নীরবতা।দু’চোখ বেয়ে রাত্রি ঝরে, পাংশুটে রাত,
রক্তমাখা চাঁদের দেহে জোৎস্না উধাও,
উল্টে পড়ে রোদের বাটি,
আমার এখন আকাশ জুড়ে দুঃস্বপ্নের দালানকোঠা।উঠোনে সাপ
অবিশ্বাসের ভীষণ কালো রক্তজবা,
লকলকে জিভ,
এখন আমার সমস্তটাই লখিন্দরের লোহার বাসর।আঙুলগুলো ঝ’রে পড়ছে হাত থেকে ফুল,
ঘরের পাশে লক্ষèীপ্যাঁচার ধাতব গলা,
আমার এখন শঙ্খচিলের কান্নাভেজা দুপুরবেলা,
শূন্য খা-খা একাকী মাঠ,
ঘাসের ডগায় নীল ফড়িং-এর নিমগ্নতা।আমার এখন হৃদয় শুধু হৃদয় বোলে
দু’হাত মেলে চাতক পাখি…
আমার এখন বুকের ভেতর
কবর শুধু কবর খোঁড়ার ভারি শব্দ।
দু’চোখ বেয়ে সকাল ঝরে, উল্টে পড়ে স্বপ্নবাটি।
আমার এখন নিজের মধ্যে নিজের কফিন,
সমস্ত রাত করাতকলের কষ্টধ্বনি-
এখন আমার সমস্তটাই পিরামিডের মগ্ন মমি।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%83%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%8b%e0%a6%a0%e0%a6%be/
|
1090
|
জীবনানন্দ দাশ
|
পরস্পর
|
প্রেমমূলক
|
মনে প’ড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার ,
কহিলাম,- শোনো তবে ,-
শুনিতে লাগিল সবে,
শুনিল কুমার ;
কহিলাম ,- দেখেছি সে চোখ বুজে আছে,
ঘুমানো সে এক মেয়ে – নিঃসাড় পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে ;
সেইখানে আর নাই কেহ ,-
এক ঘরে পালঙ্কের’পরে শুধু এক খানা দেহ
প’ড়ে আছে ;- পৃথিবীর পথে- পথে রূপ খুঁজে খুঁজে
তারপর,- তারে আমি দেখেছি গো ,- সেও চোখ বুজে
প’ড়েছিল;- মসৃণ হাতের মতো শাদা হাত দুটি
বুকের উপরে তার রয়েছিল উঠি !
আসিবে না গতি যেন কোনদিন তাহার দু’পায়ে
পাথরের মতো শাদা গায়ে
এর যেন কোনোদিন ছিল না হৃদয় ,-
কিংবা ছিল – আমার জন্য তা নয় !
আমি গিয়ে তাই তারে পারিনি জাগাতে ,
পাষাণের মতো হাত পাষাণের হাতে
রয়েছে আড়ষ্ট হয়ে লেগে ;
তবুও,- হয়তো তবু উঠিবে সে জেগে
তুমি যদি হাত দুটি ধরো গিয়ে তার !-
ফুরালাম রূপকথা , শুনিল কুমার ।
তারপর, কহিল কুমার,
আমিও দেখেছি তারে,- বসন্তসেনার !
মতো সেইজন নয় ,- কিংবা হবে তাই ,-
ঘুমন্ত দেশের সে-ও বসন্তসেনাই !
মনে পড়ে ,- শোনো ,- মনে পড়ে
নবমী ঝরিয়া গেছে নদীর শিয়রে ,-
( পদ্মা – ভাগীরথী – মেঘ্না – কোন নদী যে সে –
সে সব জানি কি আমি !- হয়তো বা তোমাদের দেশে
সেই নদী আজ আর নাই ,-
আমি তবু তার পাড়ে আজো তো দাঁড়াই ! )
সেদিন তারার আলো – আর নিবু নিবু জ্যোৎস্নায়
পথ দেখে , যেইখানে নদী ভেসে যায়
কান দিয়ে তার শব্দ শুনে ,
দাঁড়ায়েছিলাম গিয়ে মাঘরাতে ,- কিংবা ফালগুনে ।
দেশ ছেড়ে শীত যায় চ’লে
সে সময় – প্রথম দখিনে এসে পড়িতেছে ব’লে
রাতারাতি ঘুম ফেঁসে যায়,
আমারো চোখের ঘুম খসেছিল হায়,-
বসন্তের দেশে
জীবনের – যৌবনের ;- আমি জেগে,- ঘুমন্ত শুয়ে সে !
জমানো ফেনার মতো দেখা গেল তারে
নদীর কিনারে !
হাতির দাঁতের গড়া মূর্তির মতন
শুয়ে আছে ,- শুয়ে আছে শাদা হাতে ধবধবে স্তন
রেখেছে সে ঢেকে !
বাকিটুকু ,-থাক – আহা , একজনের দেখে শুধু – দেখে না অনেকে
এই ছবি !
দিনের আলোয় তার মুছে যায় সবি ! –
আজো তবু খুঁজি
কোথায় ঘুমন্ত তুমি চোখ আছো বুজি !
কুমারের শেষ হলে পরে ,-
আর এক দেশের এক রূপকথা বলিল আর একজন ,
কহিল সে ,- উত্তর সাগরে
আর নাই কেউ !-
জ্যোৎস্না আর সাগরের ঢেউ
উঁচুনিচু পাথরের’পরে
হাতে হাত ধ’রে
সেইখানে ; কখন জেগেছে তারা – তারপর ঘুমাল কখন !
ফেনার মতন তারা ঠাণ্ডা – শাদা,-
আর তারা ঢেউয়ের মতন
জড়ায়ে জড়ায়ে যায় সাগরের জলে !
ঢেউয়ের মতন তারা ঢলে !
সেই জল মেয়েদের স্তন
ঠাণ্ডা, – শাদা, - বরফের কুঁচির মতন !
তাহাদের মুখ চোখ ভিজে ,-
ফেনার শেমিজে
তাহাদের শরীর পিছল !
কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল
চাঁদের বুকের থেকে ঝরে
উত্তর সাগরে !
পায়ে- চলা পথ ছেড়ে ভাসে তারা সাগরের গায়ে ,-
কাঁকরের রক্ত কই তাহাদের পায়ে !
রূপার মতন চুল তাহাদের ঝিকমিক করে
উত্তর সাগরে !
বরফের কুঁচির মতন
সেই জল- মেয়েদের স্তন !
মুখ বুক ভিজে,
ফেনার শেমিজে
শরীর পিছল !
কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল
চাঁদের বুকের থেকে ঝরে
উত্তর সাগরে !
উত্তর সাগরে !
সবাই থামিলে পরে মনে হল – একদিন আমি যাবো চ’লে
কল্পনার গল্প সব ব’লে
তারপর ,- শীত-হেমন্তের শেষে বসন্তের দিন
আবার তো এসে যাবে ;
এক কবি ,- তন্ময় , শৌখিন ,-
আবার তো জন্ম নেবে তোমাদের দেশে !
আমরা সাধিয়া গেছি যার কথা ,- পরীর মতন এক ঘুমোনো মেয়ে সে
হীরের ছুরির মতো গায়ে
আরো ধার লবে সে শানায়ে !
সেই দিনও তার কাছে হয়তো রবে না আর কেউ ,-
মেঘের মতন চুল ; তার সে চুলের ঢেউ
এমনি পড়িয়া রবে পালঙ্কের’পর ,-
ধূপের ধোঁয়ার মতো ধলা সেই পুরীর ভিতর !
চারপাশে তার
রাজ – যুবরাজ – জেতা – যোদ্ধাদের হাড়
গড়েছে পাহাড় !
এ রূপকথার এই রূপসীর ছবি
তুমিও দেখিবে এসে ,-
তুমিও দেখিবে এসে কবি !
পাথরের হাতে তার রাখিবে তো হাত ,-
শরীরে ননীর ছিরি ,- ছুঁয়ে দেখো – চোখা ছুরি ,- ধারালো হাতির দাঁত !
হাড়েরই কাঠামো শুধু ,- তার মাঝে কোনোদিন হৃদয় মমতা
ছিল কই ! – তবু , সে কি জেগে যাবে ? কবে সে কি কথা
তোমার রক্তের তাপ পেয়ে ?-
আমার কথার এই মেয়ে ,-এই মেয়ে !
কে যেন উঠিল ব’লে,- তোমরা তো বলো রূপকথা,-
তেপান্তরের গল্প সব ,- ওর কিছু আছে নিশ্চয়তা !
হয়তো অমনি হবে,- দেখিনিকো তাহা ;
কিন্তু , শোনো –স্বপ্ন নয় , আমাদেরি দেশে কবে আহা !-
যেখানে মায়াবী নাই ,- জাদু নাই কোনো ,-
এ দেশের- গাল নয়, গল্প নয় , দু’একটা শাদা কথা শোনো !
সে-ও এক রোদে লাল দিন ,
রোদে লাল -, সবজীর গানে গানে সবুজ স্বাধীন
একদিন,- সেই একদিন !
ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল চোখে ,
ছেঁড়া করবীর মত মেঘের আলোকে
চেয়ে দেখি রূপসী কে প’ড়ে আছে খাটের উপরে !
মায়াবীর ঘরে
ঘুমন্ত কন্যার কথা শুনেছি অনেক আমি , দেখিলাম তবু চেয়ে চেয়ে
এ ঘুমোনো মেয়ে
পৃথিবীর ,- মানুষের দেশের মতন;
রূপ ঝ’রে যায় ,- তবু করে যারা সৌন্দর্যের মিছা আয়োজন ,-
যে যৌবন ছিঁড়েফেরে যায়,
যারা ভয় পায়
আয়নায় তার ছবি দেখে !-
শরীরের ঘুণ রাখে ঢেকে ,
ব্যর্থতা লুকায়ে রাখে বুকে,
দিন যাহাদের অসাধে ,- অসুখে !-
দেখিতেছিলাম সেই সুন্দরীর মুখ ,
চোখে ঠোঁটে অসুবিধা ,- ভিতরে অসুখ !
কে যেন নিতেছে তারে খেয়ে !-
এ ঘুমোনো মেয়ে
পৃথিবীর ,- ফোঁপরার মতো ক’রে এরে লয় শুষে
দেবতা গন্ধর্ব নাগ পশু ও মানুষে !...
সবাই উঠিল ব’লে ,- ঠিক –ঠিক –ঠিক !
আবার বলিল সেই সৌন্দর্য- তান্ত্রিক,-
আমায় বলেছে সে কি শোনো ,-
আর এক জন এই ,-
পরী নয় ,- মানুষ ও সে হয়নি এখনো ,-
বলেছে সে – কাল সাঁঝরাতে
আবার তোমার সাথে
দেখা হবে ? – আসিবে তো ?- তুমি আসিবে তো !
দেখা যদি পেত !
নিকটে বসায়ে
কালো খোঁপা ফেলিত খসায়ে ,-
কি কথা বলিতে গিয়ে থেমে যেত শেষে
ফিক ক’রে হেসে !
তবু , আরো কথা
বলিতে আসিত ,- তবু, সব প্রগলভতা
থেমে যেত !
খোঁপা বেঁধে ,- ফের খোঁপা ফেলিত খসায়ে,-
স’রে যেত , দেয়ালের গায়ে
রহিত দাঁড়ায়ে !
রাত ঢের , - বাড়িবে আরো কি
এই রাত!- বেড়ে যায় , তবু চোখাচোখি
হয় নাই দেখা
আমাদের দুজনার !- দুইজন ,- একা !-
বার-বার চোখ তবু কেন ওর ভ’রে আসে জলে !
কেন বা এমন ক’রে বলে,
কাল সাঁঝরাতে
আবার তোমার সাথে
দেখা হবে !- আসিবে তো?- তুমি আসিবে তো !-
আমি না কাঁদিতে কাঁদে , দেখা যদি পেত !...
দেখা দিয়ে বলিলাম , ‘ কে গো তুমি ?’- বলিল সে , ‘ তোমার বকুল ,
মনে আছে ?’- ‘ এগুলি কি , বাসি চাঁপাফুল ?
হ্যাঁ , হ্যাঁ , মনে আছে ;’ – ‘ভালোবাসো ?’ –হাসি পেল, - হাসি !
‘ ফুলগুলো বাসি নয় ,- আমি শুধু বাসি !’
আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে ফেলে
নিবানো মাটির বাতি জ্বেলে
চ’লে এল কাছে ,-
জটার মতন খোঁপা অন্ধকারে খসিয়া গিয়াছে –
আজো এত চুল !
চেয়ে দেখি ,- দুটো হাত, ক’খানা আঙুল
একবার চুপে তুলে ধরি ;
চোখ দুটো চুন-চুন ,- মুখ খড়ি-খড়ি!
থুতনিতে হাত দিয়ে তবু চেয়ে দেখি ,-
সব বাসি ,সব বাসি , একেবারে মেকি !
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/877
|
3832
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
রূপ-বিরূপ
|
ভক্তিমূলক
|
এই মোর জীবনের মহাদেশে
কত প্রান্তরের শেষে,
কত প্লাবনের স্রোতে
এলেম ভ্রমণ করি শিশুকাল হতে--
কোথাও রহস্যঘন অরণ্যের ছায়াময় ভাষা,
কোথাও পাণ্ডুর শুষ্ক মরুর নৈরাশা,
কোথাও-বা যৌবনের কুসুমপ্রগল্ভ বনপথ,
কোথাও-বা ধ্যানমগ্ন প্রাচীন পর্বত
মেঘপুঞ্জে স্তব্ধ যার দুর্বোধ কী বাণী,
কাব্যের ভাণ্ডারে আনি
স্মৃতিলেখা ছন্দে রাখিয়াছি ঢাকি,
আজ দেখি, অনেক রয়েছে বাকি।
সুকুমারী লেখনীর লজ্জা ভয়
যা পুরুষ, যা নিষ্ঠুর, উৎকট যা, করে নি সঞ্চয়
আপনার চিত্রশালে;
তার সংগীতের তালে
ছন্দোভঙ্গ হল তাই,
সংকোচে সে কেন বোঝে নাই।
সৃষ্টিরঙ্গভূমিতলে
রূপ-বিরূপের নৃত্য একসঙ্গে নিত্যকাল চলে,
সে দ্বন্দ্বের করতালঘাতে
উদ্দাম চরণপাতে
সুন্দরের ভঙ্গী যত অকুণ্ঠিত শক্তিরূপ ধরে,
বাণীর সম্মোহবন্ধ ছিন্ন করে অবজ্ঞার ভরে।
তাই আজ বেদমন্ত্রে হে বজ্রী, তোমার করি স্তব--
তব মন্ত্ররব
করুক ঐশ্বর্যদান,
রৌদ্রী রাগিণীর দীক্ষা নিয়ে যাক মোর শেষগান,
আকাশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে
রূঢ় পৌরুষের ছন্দে
জাগুক হুংকার,
বাণীবিলাসীর কানে ব্যপ্ত হোক ভর্ৎসনা তোমার।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/rup-berup/
|
2320
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
গোগৃহ-রণে
|
সনেট
|
হুহুঙ্কারি টঙ্কারিলা ধনুঃ ধনুর্দ্ধারী
ধনঞ্জয়,মৃত্যুঞ্জয় প্রলয়ে যেমতি!
চৌদিকে ঘেরিল বীরে রথ সারি সারি,
স্থির বিজলীর তেজঃ,বিজলীর গতি!---
শর-জালে শূর-ব্রজে সহজে সংহারি
শূরেন্দ্র,শোভিলা পূনঃ যথা দিনপতি
প্রখর কিরণে মেঘে খ-মুখে নিবারি,
শোভেন অম্লানে নভে।উত্তরের প্রতি
কহিলা আনন্দে বলী;---''চালাও স্যন্দনে
বিরাট-নন্দন,দ্রুতে,যথা সৈন-দলে
লুকাইছে দুর্য্যোধন হেরি মোরে রণে,
তেজস্বী মৈনাক যথা সাগরের জলে
বজ্রাগ্নির কাল তেজে ভয় পেয়ে মনে।---
দণ্ডিব প্রচণ্ডে দুষ্টে গাণ্ডীবের বলে।''
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/gogriho-rone/
|
2941
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ
|
ভক্তিমূলক
|
কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ
জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।
সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো,
পাগল ওগো, ধরায় আস।
এই অকুল সংসারে
দুঃখ-আঘাত তোমার প্রাণে বীণা ঝংকারে।
ঘোরবিপদ-মাঝে
কোন্ জননীর মুখের হাসি দেখিয়া হাস।
তুমি কাহার সন্ধানে
সকল সুখে আগুন জ্বেলে বেড়াও কে জানে।
এমন ব্যাকুল করে
কে তোমারে কাঁদায় যারে ভালোবাস।
তোমার ভাবনা কিছু নাই--
কে যে তোমার সাথের সাথি ভাবি মনে তাই।
তুমি মরণ ভুলে
কোন্ অনন্ত প্রাণসাগরে আনন্দে ভাস।
১৭ পৌষ, ১৩১৬
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/633
|
5126
|
শামসুর রাহমান
|
মৃতের মুখের কাছে
|
চিন্তামূলক
|
মৃতের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলে ভাবনার
স্বরূপ বদলে যায়? চোখে সম্মুখে বনভূমি,
কাঁটাবন, শীর্ণ নদী, সন্তের ঔদাস্যময় ছিন্ন
আলখাল্লা, এক পাটি জীর্ণ জুতো, দূরবর্তী লাল
টিলা বেয়ে নেমে আসা কেউটে, গহ্বর ভয়ংকর,
অবেলায় ঘরে ফেরা জেগে ওঠে। চৌদিকে বিপুল
বৃষ্টিধারা, ভেসে যায় শিকড় নিরুদ্দেশে,
কে যেন একাকী দাঁড় টেনে চলে গহন নদীতে।মৃতের মুখের কাছে মুখ নিয়ে কিছু গূঢ় কথা
জিগ্যেস করতে সাধ হয়, কিন্তু ভুলে যাই সব।
কেমনে অমন পড়ে থাকে একা এমন অচিন,
শূন্য খাঁচা স্তব্ধতায় কম্পমান, হায়, গানহীন।
মৃতের মুখের কাছে মুখ নিয়ে দুঃখের ভিতরে
বসে থাকি কিছুক্ষণ খুব একা, মেঘ হয়ে যাই। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/mriter-mukher-kache/
|
289
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
খোশ আমদেদ
|
ভক্তিমূলক
|
আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালি।
ও চরণ ছুঁই কেমন হাতে মোর মাখা যে কালি॥
দখিনের হালকা হাওয়ায় আসলে ভেসে সুদূর বরাতি
শবে-রাত আজ উজালা গো আঙিনায় জ্বলল দীপালি॥
তালিবান ঝুমকি বাজায়, গায় মোবারক-বাদ৪ কোয়েলা।
উলসি উপচে পলো পলাশ অশোক ডালের ওই ডালি॥
প্রাচীন ওই বটের ঝুরির দোলনাতে হায় দুলিছে শিশু।
ভাঙা ওই দেউল-চূড়ে উঠল বুঝি নৌ-চাঁদের ফালি॥
এল কি অলখ-আকাশ বেয়ে তরুণ হারুণ-আল-রশীদ।
এল কি আল-বেরুনি হাফিজ খৈয়াম কায়েস গাজ্জালি৫॥
সানাইয়াঁ ভয়রোঁ বাজায়, নিদ-মহলায় জাগল শাহজাদি।
কারুণের রুপার পুরে নূপুর-পায়ে আসল রূপ-ওয়ালি।
খুশির এ বুলবুলিস্তানে মিলেছে ফরহাদ ও শিরীঁ।
লাল এ লায়লি লোকে মজনুঁ হরদম চালায় পেয়ালি॥
বাসি ফুল কুড়িয়ে মালা না-ই গাঁথিলি, রে ফুল-মালি!
নবীনের আসার পথে উজাড় করে দে ফুল ডালি॥পদ্মা
২৭.২.২৭
(জিঞ্জির কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/khosh-amded/
|
931
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আবার আসিব ফিরে
|
সনেট
|
আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে - এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় - হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়;
হয়তো বা হাঁস হবো - কিশোরীর - ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,
সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়;হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা বায়; - রাঙ্গা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে -
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/abar-ashibo-phire/
|
2910
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কীটের বিচার
|
নীতিমূলক
|
মহাভারতের মধ্যে ঢুকেছেন কীট,
কেটেকুটে ফুঁড়েছেন এপিঠ-ওপিঠ।
পণ্ডিত খুলিয়া দেখি হস্ত হানে শিরে;
বলে, ওরে কীট, তুই এ কী করিলি রে!
তোর দন্তে শান দেয়, তোর পেট ভরে,
হেন খাদ্য কত আছে ধূলির উপরে।
কীট বলে, হয়েছে কী, কেন এত রাগ,
ওর মধ্যে ছিল কী বা, শুধু কালো দাগ!
আমি যেটা নাহি বুঝি সেটা জানি ছার,
আগাগোড়া কেটেকুটে করি ছারখার। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kiter-bichar/
|
3665
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভিতরে ও বাহিরে
|
ছড়া
|
খোকা থাকে জগৎ-মায়ের
অন্তঃপুরে—
তাই সে শোনে কত যে গান
কতই সুরে।
নানান রঙে রাঙিয়ে দিয়ে
আকাশ পাতাল
মা রচেছেন খোকার খেলা-
ঘরের চাতাল।
তিনি হাসেন, যখন তরু-
লতার দলে
খোকার কাছে পাতা নেড়ে
প্রলাপ বলে।
সকল নিয়ম উড়িয়ে দিয়ে
সূর্য শশী
খোকার সাথে হাসে, যেন
এক-বয়সী।
সত্যবুড়ো নানা রঙের
মুখোশ পরে
শিশুর সনে শিশুর মতো
গল্প করে।
চরাচরের সকল কর্ম
করে হেলা
মা যে আসেন খোকার সঙ্গে
করতে খেলা।
খোকার জন্যে করেন সৃষ্টি
যা ইচ্ছে তাই—
কোনো নিয়ম কোনো বাধা-
বিপত্তি নাই।
বোবাদেরও কথা বলান
খোকার কানে,
অসাড়কেও জাগিয়ে তোলেন
চেতন প্রাণে।
খোকার তরে গল্প রচে
বর্ষা শরৎ,
খেলার গৃহ হয়ে ওঠে
বিশ্বজগৎ।
খোকা তারি মাঝখানেতে
বেড়ায় ঘুরে,
খোকা থাকে জগৎ-মায়ের
অন্তঃপুরে।
আমরা থাকি জগৎ-পিতার
বিদ্যালয়ে—
উঠেছে ঘর পাথর-গাঁথা
দেয়াল লয়ে।
জ্যোতিষশাস্ত্র-মতে চলে
সূর্য শশী,
নিয়ম থাকে বাগিয়ে ল'য়ে
রশারশি।
এম্নি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে
বৃক্ষ লতা,
যেন তারা বোঝেই নাকো
কোনোই কথা।
চাঁপার ডালে চাঁপা ফোটে
এম্নি ভানে
যেন তারা সাত ভায়েরে
কেউ না জানে।
মেঘেরা চায় এম্নিতরো
অবোধ ভাবে,
যেন তারা জানেই নাকো
কোথায় যাবে।
ভাঙা পুতুল গড়ায় ভুঁয়ে
সকল বেলা,
যেন তারা কেবল শুধু
মাটির ঢেলা।
দিঘি থাকে নীরব হয়ে
দিবারাত্র,
নাগকন্যের কথা যেন
গল্পমাত্র।
সুখদুঃখ এম্নি বুকে
চেপে রহে,
যেন তারা কিছুমাত্র
গল্প নহে।
যেমন আছে তেম্নি থাকে
যে যাহা তাই—
আর যে কিছু হবে এমন
ক্ষমতা নাই।
বিশ্বগুরু-মশায় থাকেন
কঠিন হয়ে,
আমরা থাকি জগৎ-পিতার
বিদ্যালয়ে। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vitore-o-bahire/
|
4705
|
শামসুর রাহমান
|
চারটি স্তবক
|
প্রেমমূলক
|
কুয়োর শীতল জল আঁজলায় নিয়ে সন্ধেবেলা
চেয়ে থাকি কিছুক্ষণ; জলে কার মুখ ভেসে ওঠে।
পাখির চিৎকার শুনি, ভাঙে শীতল জলের খেলা
অকস্মাৎ, অদূরে কোথাও শরমিলা ফুল ফোটে।২
তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কোনো কুয়োতলায়
কিংবা কোনো বাঁশের ঝাড়ে।
তোমাকে আমি দেখেছিলাম এই শহরে কিছু দূরে
স্বল্প ভিড়ে হ্রদের ধারে।
বসেছিলাম পাশাপাশি, হাওয়ায় ছিলো মাদকতা,
ছিলো কিছু জলজ ঘ্রাণ;
চোখের চাওয়ায়, কথা বলার ঈষৎ মায়ায়
দুলেছিলো দু’টি প্রাণ।৩
তোমার দাঁড়ানো বারান্দায়,
পশামি চপ্পল পায়ে হেঁটে বেড়ানো চাঁদের নিচে, একা
ব’সে থাকা ঘাসে,
অথবা তাকানো সন্ধেবেলা আকাশের
উড়ে-যাওয়া পাখিদের দিকে,
জঙ্গলে সফল পিকনিক, কানায় কানায় ভরা
অবকাশে খাটে শুয়ে নিভৃতে তোমার
নিমগ্ন কবিতা পাঠ, দূরন্ত হাওয়ায়
ফিরোজা শাড়ির আঁচলের নৌকার উদ্দাম পাল
হয়ে যাওয়া-এইসব দেখে যদি
কেটে যেত সারাটি জীবন।৪
কী ক’রে এখন শান্ত থাকবো বলো
যখন তোমার চোখ দু’টি ছলো ছলো?
আমার হৃদয় ঝড়ের রাতের পথ,
নিঃশ্বাস নেয় রুগ্ন পক্ষীবৎ।
বিষাদ তোমার রূপের পড়শি ব’লে
মনে হয় যেন পড়েছি অগাধ জলে। (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/charti-stobok/
|
2885
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কল্পনার সাথি
|
সনেট
|
যখন কুসুমবনে ফির একাকিনী ,
ধরায় লুটায়ে পড়ে পূর্ণিমাযামিনী ,
দক্ষিণবাতাসে আর তটিনীর গানে
শোন যবে আপনার প্রাণের কাহিনী —
যখন শিউলি ফুলে কোলখানি ভরি
দুটি পা ছড়ায়ে দিয়ে আনতবয়ানে
ফুলের মতন দুটি অঙ্গুলিতে ধরি
মালা গাঁথ ভোরবেলা গুন্ গুন্ তানে —
মধ্যাহ্নে একেলা যবে বাতয়নে ব ‘ সে
নয়নে মিলাতে চায় সুদূর আকাশ ,
কখন আঁচলখানি প ‘ ড়ে যায় খ ‘ সে ,
কখন হৃদয় হতে উঠে দীর্ঘশ্বাস ,
কখন অশ্রুটি কাঁপে নয়নের পাতে —
তখন আমি কি , সখী , থাকি তব সাথে ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kolponar-sathi/
|
5426
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
অবৈধ
|
চিন্তামূলক
|
আজ মনে হয় বসন্ত আমার জীবনে এসেছিল
উত্তর মহাসাগরের কূলে
আমার স্বপ্নের ফুলে
তারা কথা কয়েছিল
অস্পষ্ট পুরনো ভাষায়
অস্ফুট স্বপ্নের ফুল
অসহ্য সূর্যের তাপে
অনিবার্য ঝরেছিল
মরেছিল নিষ্ঠুর প্রগল্ভ হতাশায়।
হঠাৎ চমকে ওঠে হাওয়া
সেদিন আর নেই-
নেই আর সূর্য-বিকিরণ
আমার জীবনে তাই ব্যর্থ হল বাসন্তীমরণ!
শুনি নি স্বপ্নের ডাকঃ
থেকেছি আশ্চর্য নির্বাক
বিন্যস্ত করেছি প্রাণ বুভুক্ষার হাতে।
সহসা একদিন
আমার দরজায় নেমে এল
নিঃশব্দে উড়ন্ত গৃধিনীরা।
সেইদিন বসন্তের পাখি
উড়ে গেল
যেখানে দিগন্ত ঘনায়িত ।
আজ মনে হয়
হেমন্তের পড়ন্ত রোদ্দুরে,
কী ক'রে সম্ভব হল
আমার রক্তকে ভালবাসা!
সূর্যের কুয়াশা
এখনো কাটে নি
ঘোচে নি অকাল দুর্ভাবনা।
মুহূর্তের সোনা
এখনো সভয়ে ক্ষয় হয়,
এরই মদ্যে হেমন্তের পড়ন্ত রোদ্দুর
কঠিন কাস্তেতে দেয় সুর,
অন্যমনে এ কী দুর্ঘটনা-
হেমন্তেই বসন্তের প্রস্তাব রটনা।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1123
|
4086
|
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
|
অভিমানের
|
প্রেমমূলক
|
এতদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই,
পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত
পারিজাতহীন কঠিন পাথরে।প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে,
নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা-
এই খেলা আর কতোকাল আর কতটা জীবন!
কিছুটাতো চাই- হোক ভুল, হোক মিথ্যো ও প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক জোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই,
কিছুটাতো চাই, কিছুটাতো চাই।আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন- আর কতোদিন?
ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতটা বিলাবে?
কতো আর এই রক্ত তিলকে তপ্ত প্রণাম!
জীবনের কাছে জন্ম কি তবে প্রতারণাময়?এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে,
এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে কতোটা ক্ষরণ
কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়।
তুমি জানো নাই- আমি তো জানি,
কতটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে, এতো গান,
এতো হাসি নিয়ে বুকে নিশ্চুপ হয়ে থাকি।বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে বলি এইতো জীবন,
এইতো মাধুরী, এইতো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু সুনীল রাত।তুমি জানো নাই- আমি তো জানি।
মাটি খুঁড়ে কারা শস্য তুলেছে,
মাংসের ঘরে আগুন পুষেছে,
যারা কোনোদিন আকাশ চায়নি নীলিমা চেয়েছে শুধু,
করতলে তারা ধ’রে আছে আজ বিশ্বাসী হাতিয়ার।পরাজয় এসে কন্ঠ ছুঁয়েছে লেলিহান শিখা,
চিতার চাবুক মর্মে হেনেছো মোহন ঘাতক।
তবুতো পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মুখর হৃদয়,
পুষ্পের প্রতি প্রসারিত এই তীব্র শোভন বাহু।বৈশাখী মেঘ ঢেকেছে আকাশ,
পালকের পাখি নীড়ে ফিরে যায়-
ভাষাহীন এই নির্বাক চোখ আর কতোদিন?
নীল অভিমানে পুড়ে একা আর কতটা জীবন?
কতোটা জীবন!!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%85%e0%a6%ad%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b9%e0%a6%ae/
|
5506
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
বিবৃতি
|
মানবতাবাদী
|
আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,
জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে,
দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,
প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।
আহার্যের অন্বেষণে প্রতি মনে আদিম আগ্রহ
রাস্তায় রাস্তায় আনে প্রতিদিন নগ্ন সমারোহ;
বুভুক্ষা বেঁধেছে বাসা পথের দু'পাশে,
প্রত্যহ বিষাক্ত বায়ু ইতস্তত ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসে।
মধ্যবিত্ত ধূর্ত সুখ ক্রমে ক্রমে আবরণহীন
নিঃশব্দে ঘোষণা করে দারুণ দুর্দিন,
পথে পথে দলে দলে কঙ্কালের শোভাযাত্রা চলে,
দুর্ভিক্ষ গুঞ্জন তোলে আতঙ্কিত অন্দরমহলে!
দুয়ারে দুয়ারে ব্যগ্র উপবাসী প্রত্যাশীর দল,
নিষ্ফল প্রার্থনা-ক্লান্ত, তীব্র ক্ষুধা অন্তিম সম্বল;
রাজপথে মৃতদেহ উগ্র দিবালোকে,
বিস্ময় নিক্ষেপ করে অনভ্যস্ত চোখে।
পরন্তু এদেশে আজ হিংস্র শত্রু আক্রমণ করে,
বিপুল মৃত্যুর স্রোত টান দেয় প্রাণের শিকড়ে,
নিয়ত অন্যায় হানে জরাগ্রস্ত বিদেশী শাসন,
ক্ষীণায়ু কোষ্ঠীতে নেই ধ্বংস-গর্ভ সংকটনাশন।
সহসা অনেক রাত্রে দেশদ্রোহী ঘাতকের হাতে
দেশপ্রেমে দৃপ্তপ্রাণ রক্ত ঢালে সূর্যের সাক্ষাতে।
তবুও প্রতিজ্ঞা ফেরে বাতাসে নিভৃত,
এখানে চল্লিশ কোটি এখনো জীবিত,
ভারতবর্ষের 'পরে গলিত সূর্য ঝরে আজ-
দিগ্বিদিকে উঠেছে আওয়াজ,
রক্তে আনো লাল,
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।
উদ্ধত প্রাণের বেগে উন্মুখর আমার এ দেশ,
আমার বিধ্বস্ত প্রাণে দৃঢ়তার এসেছে নির্দেশ।
আজকে মজুর ভাই দেশময় তুচ্ছ করে প্রাণ,
কারখানায় কারখানায় তোলে ঐক্যতান।
অভুক্ত কৃষক আজ সূচীমুখ লাঙলের মুখে
নির্ভয়ে রচনা করে জঙ্গী কাব্য এ মাটির বুকে।
আজকে আসন্ন মুক্তি দূর থেকে দৃষ্টি দেয় শ্যেন,
এদেশে ভাণ্ডার ভ'রে দেবে জানি নতুন য়ূক্রেন।
নিরন্ন আমার দেশে আজ তাই উদ্ধত জেহাদ,
টলোমলো এ দুর্দিন, থরোথরো জীর্ণ বনিয়াদ।
তাইতো রক্তের স্রোতে শুনি পদধ্বনি
বিক্ষুব্ধ টাইফুন-মত্ত চঞ্চল ধমনী:
বিপন্ন পৃথ্বীর আজ শুনি শেষ মুহুর্মুহু ডাক
আমাদের দৃপ্ত মুঠি আজ তার উত্তর পাঠাক।
ফিরুক দুয়ার থেকে সন্ধানী মৃত্যুর পরোয়ানা,
ব্যর্থ হোক কুচক্রান্ত, অবিরাম বিপক্ষের হানা।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/265
|
3001
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গানের পারে
|
ভক্তিমূলক
|
দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ও পারে।
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে।
বাতাস বহে মরি মরি, আর বেঁধে রেখো না তরী,
এসো এসো পার হয়ে মোর হৃদয়-মাঝারে।।
তোমার সাথে গানের খেলা দূরের খেলা যে -
বেদনাতে বাঁশি বাজায় সকল বেলা যে।
কবে নিয়ে আমার বাঁশি বাজাবে গো আপনি আসি
আনন্দময় নীরব রাতের নিবিড় আঁধারে?।শান্তিনিকেতন
২৮ ফাল্গুন ১৩২০(কাব্যগ্রন্থঃ সঞ্চয়িতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gaaner-pare/
|
5754
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
কবির দুঃখ
|
চিন্তামূলক
|
শব্দ তার প্রতিবিম্ব আমাকে দেখাবে বলেছিল
শব্দ তার প্রতিবিম্ব আমাকে দেখাবে বলেছিল
গোপনে
শব্দ তার প্রতিবিম্ব আমাকে দেখাবে বলেছিল।
শব্দ ভেঙে গেল যেন শৃঙ্খলের মতো শব্দ হয়
পাহাড়ের চূড়া থেকে খসে পড়া রূপালি পাতার মতো
সন্ধ্যায় সূর্যকে দীপ্ত দেখে
লক্ষ বৎসরের পর এক মুহূর্তের জন্য দুর্লভ স্বরাজ
বুকের ভিতর যেন তোমার মুখের মতো প্রতিবিম্ব শিল্পে ঝলসে ওঠে
মনে হয়
সমস্ত শিল্পের সার তোমার ও মুখের বর্ণনা
সমস্ত শিল্পের সার তোমারও মুখের বর্ণনা
কালহীন, বর্ণহীন
প্রতিশব্দহীন
আমি সূর্যকরোজ্জল হ্রদের কিনার তবু ভালেরির মতো
পাইনি প্রার্থিত শব্দ, উদ্ভাসিত প্রতিবিম্ব, যদিও আমাকে
প্রেম তার প্রতিমূর্তি গোপনে দেখাবে বলেছিল।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1786
|
3426
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রতীক্ষা
|
প্রকৃতিমূলক
|
গানআজি বরষনমুখরিতশ্রাবণরাতি।
স্মৃতিবেদনার মালাএকেলা গাঁথি।
আজি কোন্ ভুলে ভুলি
আঁধার ঘরেতে রাখিদুয়ার খুলি–মনে হয়, বুঝি আসিবে যেমোর দুখরজনীরমরমসাথি।
আসিছে সে ধারাজলে সুর লাগায়েনীপবনে পুলক জাগায়ে।
যদিও বা নাহি আসেতবু বৃথা আশ্বাসেমিলন-আসনখানিরয়েছে পাতি।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be/
|
5984
|
হুমায়ুন আজাদ
|
তোমার ক্ষমতা
|
প্রেমমূলক
|
তুমি ভাঙতে পারো বুক শুষে নিতে পারো সব রক্ত ও লবণ
বিষাক্ত করতে পারো ঘুম স্বপ্নময় ঘুমের জগত
তছনছ ক’রে দিতে পারো তুমি বন উপবন
উল্টেপাল্টে দিতে পারো সব সিঁড়ি লিফট্ রাজপথ
মিশিয়ে দিতেও পারো সঙ্গীতের সুরেসুরে বিষ
আমাকে প্রগাঢ় কোনো আত্নহত্যায় উৎসাহিত ক’রে দিতে পারো
ম’রে যাবে ধানক্ষেত ঝ’রে যাবে পাখিদের শিস
তোমার ক্ষমতা আছে পারো তুমি আরো
আমাকে মাতাল ক’রে ছেড়ে দিতে পারো তুমি গলির ভেতরে
সমস্ত সড়কে তুমি জ্বালতে পারো লাল সিগনাল
বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ ক’রে দিতে পারো জীবনের সবগুলো ঘরে
এর বেশি আর তুমি কি পারো তমাল?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/502
|
943
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ইতিহাসযান
|
চিন্তামূলক
|
সেই শৈশবের থেকে এ-সব আকাশ মাঠ রৌদ্র দেখেছি;
এই সব নক্ষত্র দেখেছি।
বিস্ময়র চোখে চেয়ে কতবার দেখা গেছে মানুষের বাড়ি
রোদের ভিতরে যেন সমুদ্রের পারে পাখিদের
বিষণ্ণ শক্তির মতো আয়োজনে নির্মিত হতেছে;
কোলাহলে-কেমন নিশীথ উৎসবে গ’ড়ে ওঠে।
একদিন শূন্যতায় স্তব্ধতায় ফিরে দেখি তারা
কেউ আর নেই।
পিতৃপুরুষেরা সব নিজ স্বার্থ ছেড়ে দিয়ে অতীতের দিকে
স’রে যায়- পুরানো গাছের সাথে সহমর্মী জিনিসের মতো
হেমন্তের রৌদ্রে-দিনে-অন্ধকারে শেষবার দাঁড়ায়ে তবুও
কখনো শীতের রাতে যখন বেড়েছে খুব শীত
দেখেছি পিপুল গাছ
আর পিতাদের ঢেউ
আর সব জিনিষ : অতীত।তারপর ঢের দিন চ’লে গেলে আবার জীবনোৎসব
যৌনমত্তার চেয়ে ঢের মহীয়ান, অনেক করুণ।
তবুও আবার মৃত্যু।-তারপর একদিন মউমাছিদের
অনুরণনের বলে রৌদ্র বিচ্ছুরিত হ’ইয়ে গেলে নীল
আকাশ নিজের কন্ঠে কেমন নিঃসৃত হয়ে ওঠে;- হেমন্তের
অপরাহ্নে পৃথিবী মাঠের দিকে সহসা তাকালে
কোথাও শনের বনে- হলুদ রঙের খড়ে- চাষার আঙুলে
গালে-কেমন নিমীল সনা পশ্চিমের
অদৃশ্য সূর্যের থেকে চুপে নামে আসে;
প্রকৃতি ও পাখির শরীর ছুঁয়ে মৃতোপম মানুষের হাড়ে
কি যেন কিসের সৌরব্যবহারে এসে লেগে থাকে।
অথবা কখনো সূর্য- মনে পড়ে- অবহিত হয়ে
নীলিমার মাঝপথে এসে থেমে র’য়ে গেছে- বড়ো
গোল-রাহুর আভাস বেই-এমনই পবিত্র নিরুদ্বেল।
এই সব বিকেলের হেমন্তের সূর্যছবি- তবু
দেখাবার মতো আজ কোনো দিকে কেউ
নেই আর, অনেকেই মাটির শয়ানে ফুরাতেছে।
মানুষেরা এই সব পথে এসে চ’লে গেছে,- ফিরে
ফিরে আসে;- তাদের পায়ের রেখায় পথ
কাটে কারা, হাল ধরে, বীজ বোনে, ধান
সমুজ্বল কী অভিনিবেশে সোনা হয়ে ওঠে- দেখে;
সমস্ত দিনের আঁচ শেষ হলে সমস্ত রাতের
অগণন নক্ষত্রেও ঘুমাবার জুড়োবার মতো
কিছু নেই;- হাতুড়ি করাত দাঁত নেহাই তুর্পুন্
পিতাদের হাত থেকে ফিরেফির্তির মতো অন্তহীন
সন্ততির সন্ততির হাতে
কাজ ক’রে চ’লে গেছে কতো দিন।
অথবা এদের চেয়ে আরেক রকম ছিলো কেউ-কেউ;
ছোটা বা মাঝারি মধ্যবিত্তদের ভিড়;-
সেইখানে বই পড়া হত কিছু- লেখা হত;
ভয়াবহ অন্ধকারে সরুসলতের
রেড়ীর আলোয় মতো কী যেন কেমন এক আশাবাদ ছিল
তাহাদের চোখে মুখে মনের নিবেশে বিমনস্কতায়;
সাংসারে সমাজে দেশে প্রত্যন্তও পরাজিত হলে
ইহাদের মনে হত দীনতা জয়ের চেয়ে বড়;
অথবা বিজয় পরাজয় সব কোনো- এক পলিত চাঁদের
এ-পিঠ ও-পিঠ শুধু;- সাধনা মৃত্যুর পরে লোকসফলতা
দিয়ে দেবে; পৃথিবীতে হেরে গেলে কোনো ক্ষোভ নেই।* * *মাঝে-মাঝে প্রান্ত্রের জ্যোৎস্নায় তারা সব জড়ো হয়ে যেত-
কোথাও সুন্দর প্রেতসত্য আছে জেনে তবু পৃথিবীর মাটির কাঁকালে
কেমন নিবিড়ভাবে হয়ে ওঠে, আহা।
সেখানে স্থবির যুবা কোনো- এক তন্বী তরুণীর
নিজের জিনিস হতে স্বীকার পেয়েছে ভাঙ্গা চাঁদে
অর্ধ সত্যে অর্ধ নৃত্যে আধেক মৃত্যুর অন্ধকারেঃ
অনেক তরুণী যুবা- যৌবরাজ্যে যাহাদের শেষ
হয়ে গেছে- তারাও সেখানে অগণন
চৈত্রের কিরণে কিংবা হেমন্তের আরো।
অনবলুন্ঠিত ফিকে মৃগতৃষ্ণিকার
মতন জ্যোৎস্নায় এসে গোল হয়ে ঘুরে-ঘুরে প্রান্তরের পথে
চাঁদকে নিখিল ক’রে দিয়ে তবু পরিমেয় কলঙ্কে নিবিড়
ক’রে দিতে চেয়েছিল,- মনে মনে- মুখে নয়- দেহে
নয়; বাংলার মানসসাধনশীত শরীরের চেয়ে আরো বেশি
জয়ী হয়ে শুক্ল রাতে গ্রামীণ উৎসব
শেষ ক’রে দিতে গিয়ে শরীরের কবলে তো তবুও ডুবেছে বার-বার
অপরাধী ভীরুদের মতো প্রাণে।
তারা সব মৃত আজ।
তাহাদের সন্ততির সন্ততিরা অপরাধী ভীরুদের মতন জীবিত।
‘ঢের ছবি দেখা হল- ঢের দিন কেটে গেল- ঢের অভিজ্ঞতা
জীবনে জড়িত হয়ে গেল, তবু, হাতে খননের
অস্ত্র নেই- মনে হয়- চারিদিকে ঢিবি দেয়ালের
নিরেট নিঃসঙ্গ অন্ধকার’- ব’লে যেন কেউ যেন কথা বলে।
হয়তো সে বাংলার জাতীয় জীবন।
সত্যের নিজের রূপ তবুও সবের চেয়ে নিকট জিনিস
সকলের; অধিগত হলে প্রাণ জানালার ফাঁক দিয়ে চোখের মতন
অনিমেষ হয়ে থাকে নক্ষত্রের আকাশে তাকালে।
আমাদের প্রবীণেরা আমাদের আচ্ছন্নতা দিয়ে গেছে?
আমাদের মনীষীরা আমাদের অর্ধসত্য ব’লে গেছে
অর্ধমিথ্যার? জীবন তবুও অবিস্মরণীয় সততাকে
চায়; তবু ভয়- হয়তো বা চাওয়ার দীনতা ছাড়া আর কিছু নেই।
ঢের ছবি দেখা হল- ঢের দিনে কেটে গেল-ঢের অভিজ্ঞতা
জীবলে জড়িত হয়ে গেল, তবু, নক্ষত্রের রাতের মতন
সফলতা মানুষের দূরবীনে র’য়ে গেছে,- জ্যোতির্গ্রন্থে;
জীবনের জন্যে আজো নেই।
অনেক মানুষী খেলা দেখা হলো, বই পড়া সাঙ্গ হলো-ত বু
কে বা কাকে জ্ঞান দেবে- জ্ঞান বড় দূর- দূরতর আজ।
সময়ের ব্যাপ্তি যেই জ্ঞান আনে আমাদের প্রাণে
তা তো নেই; স্থবিরতা আছে- জরা আছে।
চারিদিক থেকে ঘিরে কেবলি বিচিত্র ভয় ক্লান্তি অবসাদ
র’য়ে গেছে। নিজেকে কেবলি আত্মকীড় করি; নীড়
গড়ি। নীড় ভেঙে অন্ধকারে এই যৌথ মন্ত্রণার
মাল্যিন এড়ায়ে উৎক্রান্ত হতে ভয়
পাই। সিন্ধুশব্দ বায়ুশব্দ রৌদ্রশব্দ রক্তশব্দ মৃত্যশব্দ এসে
ভয়াবহ ডাইনীর মতো নাচে- ভয় পাই- গুহার লুকাই;
লীন হতে চাই- লীন- ব্রহ্মশব্দে লীন হয়ে যেতে
চাই। আমাদের দু’হাজার বছরের জ্ঞান এ-রকম।
নচিকেতা ধর্মধনে উপবাসী হয়ে গেলে যম
প্রীত হয়। তবুও ব্রহ্মে লীন হওয়াও কঠিন।
আমারা এখনও লুপ্ত হই নি তো।
এখনও পৃথিবী সূর্যে হয়ে রৌদ্রে অন্ধকারে
ঘুরে যায়। থামালেই ভালো হত- হয়তো বা;
তবুও সকলই উৎস গতি যদি,- রৌদ্রশুভ্র সিন্ধুর উৎসবে
পাখির প্রমাথা দীপ্তি সাগরের সূর্যের স্পর্শে মানুষের
হৃদয়ে প্রতীক ব’লে ধরা দেয় জ্যাতির পথের থেকে যদি,
তাহলে যে আলো অর্ঘ্য ইতিহাসে আছে, তবু উৎসাহ নিবেশ
যেই জনমানসের অনির্বচনীয় নিঃসঙ্কোচ
এখনও আসে নি তাকে বর্তমান অতীতের দিকচক্রবালে বার-বার
নেভাতে জ্বালাতে গিয়ে মনে হয় আজকের চেয়ে আরো দূর
অনাগত উত্তরণলোক ছাড়া মানুষের তরে
সেই প্রীতি, স্বর্গ নেই, গতি আছে;- তবু
গতির ব্যসন থেকে প্রগতি অনেক স্থিরতর;
সে অনেক প্রতারণাপ্রতিভার সেতুলোক পার
হল ব’লে স্থির;-হতে হবে ব’লে দীন, প্রমাণ কঠিন;
তবুও প্রেমিক- তাকে হতে হবে; সময় কোথাও
পৃথিবীর মানুষের প্রয়োজন জেনে বিরচিত নয়; তবু
সে তার বহিমুর্খ চেতনার দান সব দিয়ে গেছে ব’লে
মনে হয়; এর পর আমাদের অন্তর্দীপ্ত হবার সময়।কাব্যগ্রন্থ - বেলা অবেলা কালবেলা
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/itihashjan/
|
2355
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
বসন্তে-২
|
ভক্তিমূলক
|
(১) সখি রে,—
বন অতি রমিত হইল ফুল ফুটনে!
পিককুল কলকল, চঞ্চল অলিদল,
উছলে সুরবে জল,
চল লো বনে!
চল লো, জুড়াব আঁখি দেখি ব্ৰজরমণে!(২) সখি রে,—
উদয় অচলে ঊষা, দেখ, আসি হাসিছে!
এ বিরহ বিভাবরী কাটানু ধৈরজ ধরি
এবে লো রব কি করি?
প্রাণ কাঁদিছে!
চল লো নিকুঞ্জে যথা কুঞ্জমণি নাচিছে!(৩) সখি রে,—
পূজে ঋতুরাজে আজি ফুলজালে ধরণী!
ধূপরূপে পরিমল, আমোদিছে বনস্থল,
বিহঙ্গমকুলকল,
মঙ্গল ধ্বনি!
চল লো, নিকুঞ্জ পূজি শ্যামরাজে, স্বজনি!(৪) সখি রে,—
পাদ্যরূপে অশ্রুধারা দিয়া ধোব চরণে!
দুই কর কোকনদে, পূজিব রাজীব পদে;
শ্বাসে ধূপ, লো প্রমদে,
ভাবিয়া মনে!
কঙ্কণ কিঙ্কিণী ধ্বনি বাজিবে লো সঘনে।(৫) সখি রে,—
এ যৌবন ধন, দিব উপহার রমণে!
ভালে যে সিন্দূরবিন্দু, হইবে চন্দনবিন্দু;---
দেখিব লো দশ ইন্দু
সুনখগণে!
চিরপ্রেম বর মাগি লব, ওলো ললনে!(৬) সখি রে,—
বন অতি রমিত হইল ফুল ফুটনে!
পিককুল কলকল, চঞ্চল অলিদল
উছলে সুরবে জল,
চল লো বনে!
চল লো, জুড়াব আঁখি দেখি—মধুসূদনে!
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/bosonte-2/
|
4815
|
শামসুর রাহমান
|
তোমার নিদ্রার দিকে
|
প্রেমমূলক
|
আমার ভেতর থেকে একজন একাকী মানুষ হেঁটে যায়
তোমার নিদ্রার দিকে, তুমি তার যাত্রা, ব্যাকুলতা,
কাতর দৃষ্টির প্রতি উদাসীন, ঘুমের ভেতরে
মজ্জমান, লতাপাতা জড়ায় তোমাকে,
খরগোশ বুকের নগ্ন মদির উষ্ণতা
শোঁকে কিছুক্ষণ। তার যাত্রায় রোদ্দুর নাচে, বৃষ্টি পড়ে,
কখনো জ্যোৎস্নাও ঝরে। কেমন অচেনা পাখি ডাকে
তার দু’চোখের নিরালায়।আমার ভেতর থেকে একজন একাকী মানুষ হেঁটে যায়
তোমার জাগরণের প্রতি, তার চুমু ঝরে অবিরল
যে পুষ্পিত জাগরণে। এখন সে তোমার নিদ্রার দিকে হাত
দিয়েছে বাড়িয়ে, নিশীথের ঘ্রাণময় বিছানায়
নিটোল ঘুমাও তুমি, তোমার নিদ্রার রাঙা জল
অত্যন্ত নিথর থেকে যাবে।
ভয় নেই, তোমাকে সে জাগাবে না; বুকে নিয়ে শীতরাত
তোমার রূপের হ্রদে ওজু করে চলে যাবে উড়িয়ে ফানুস
আকাঙ্ক্ষার। চিরকাল হৃদয়ের অভ্যন্তরে তার গভীর বনানী
আবৃত্তি করবে কিছু স্মৃতিময় বাণী।যখন সবুজ লনে শিশুর মতোন সুখে গড়াবে সকাল,
কার্ডিগান গায়ে তুমি বারান্দায় নিশ্চুপ দাঁড়াবে,
তখন তোমার মনে হতে পারে একজন একাকী মানুষ
শীতল সিঁড়ির ধাপে নত মুখে নিঃস্ব বসে আছে কতকাল। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-nidrar-dike/
|
5229
|
শামসুর রাহমান
|
শুদ্ধ হতে চাই
|
প্রেমমূলক
|
আহ্ কতকাল পর দেখা। এখন তোমার কোনো
খবর রাখি না বন্ধু, এ লজ্জা আমার। কী করে যে
তোমাকে ভুলেছিলাম এতদিন, অথচ দিন ছিল
আমরা দু’জন দিব্য একই বিছানায় ঘুমোতাম
গলাগলি, দাড়ি কামাতাম একই ব্লেডে। পরস্পর বলাবলি
করতাম নিজ নিজ স্বপ্ন কথা। আহ্ কী সুন্দর
স্বপ্নই না দেখতাম আমরা তখন।
সেসব স্মরণ করে বুকের ভেতর হু হু হাওয়া বয়ে যায়।কী-যে হলো, সঙ্গের সংঘর্ষে বাচালের হুমকিতে,
সঙ্গীতের ভ্রষ্টাচারে তুমি দূরে, খুব বেশি দূরে
সরে গেলে; আমাকে গিলতে হলো নোংরা।
বার বার বিসমিষা পাক খায়, ভেদবমি হ’য়েও নিস্তার
নেই, দ্যাখো আজ আমি গুলি-খাওয়া বাঘের মতোই
আপন গুহায় শুয়ে ক্ষত চেটে নিরাময়
চাই আগোচরে, ভুলে যেতে চাই সেই আত্মঘাতী
তমসার সরীসৃপ-স্মৃতি। হা করি, কী নিঃস্ব আমি।যাক গে, ভালোই হ’লো, হঠাৎ তোমার সঙ্গে দেখা
এই অবেলায়; হয়তো আমি
নিজেরই অজ্ঞাতসারে তোমাকে খুঁজেছি
অন্তরের বাহিরে সর্বক্ষণ। দ্রষ্টা তুমি, এ গরিব
ভিখিনীকে তোমার ভেতরে টেনে নাও,
হৃদয়ে রঙিন পাখি পোষার অবাধ অধিকার
দাও আর তোমার আশ্চর্য সব স্বপ্ন জাগাও আমার চোখে,
আমিও তোমারই মতো শুদ্ধ হতে চাই। (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shuddho-hote-chai/
|
5656
|
সুকুমার রায়
|
বিচার
|
হাস্যরসাত্মক
|
ইঁদুর দেখে মাম্দো কুকুর বল্লে তেড়ে হেঁকে-
'বলব কি আর, বড়ই খুশি হলেম তোরে দেখে।
আজকে আমার কাজ কিছু নেই, সময় আছে মেলা,
আয় না খেলি দুইজনাতে মোকদ্দমা খেলা ।
তুই হবি চোর তোর নামেতে করব নালিশ রুজু'-
'জজ্ কে হবে?' বল্লে ইঁদুর ,বিষম ভয়ে জুজু,
'কোথায় উকিল প্যায়দা পুলিশ , বিচার কিসে হবে?'
মাম্দো বলে 'তাও জানিসনে ? শোন বলে দেই তবে!
আমিই হব উকিল হাকিম , আমিই হব জুরি,
কান ধরে তোর বলব ব্যাটা, ফের করেছিস চুরি?
সটান দেব ফাসির হুকুম অমনি একেবারে-
বুঝবি তখন চোর বাছাধন বিচার বলে কারে।'
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/bichar/
|
1699
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
সান্ধ্য তামাশা
|
প্রকৃতিমূলক
|
হা-রে হা-রে হা-রে, দ্যাখো, হা-রে,
কী জমাট সান্ধ্য তামাশায়
আকাশের পশ্চিম দুয়ারে
সূর্য তার ডুগডুগি বাজায়।
টকটকে আগুনে জ্বেলে দিয়ে
আকাশের শান্ত রাজধানী
শূন্যে ও কে দিয়েছে উড়িয়ে
রক্তরং সতরঞ্জখানি।
দ্যাখো রে পুঞ্জিত মেঘে-মেঘে
চিত্রিত অলিন্দে ঝরোকায়
রঙের সংহত ছোঁয়া লেগে
সারি বেঁধে ও কারা দাঁড়ায়।
হা-রে হা-রে হা-রে, দ্যাখো, হা-রে,
কী জমাট সান্ধ্য তামাশায়…
ও কারা কৌতুকে ঠোঁট চেওএ
সায়াহ্নের সংবৃত আবাগে
দ্যাখে ভেল্কিবাজের চাতুরি;
কী করে সে শূন্যে জাল বেয়ে
নিখিল সন্ধ্যায় করে চুরি
নানাবর্ণ মাছের সম্ভার।
দর্শকেরা রয়েছে তাকিয়ে,
তবু কিছু লজ্জা নেই তার।
অন্তিম তামাশা ছিল বাকি।
অকস্মাৎ চক্ষের নিমেষে
নিঃসঙ্গ বিহ্বল এক পাখি
বিদ্যুত-গতিতে ছুটে এসে
যেন মায়ামন্ত্রবলে প্রায়
ডুবেছে অথই লাল জলে।
গেল, গেল!–মেঘেরা দৌড়ায়
নিঃশব্দ ভীষণ কোলাহলে।
হা-রে হা-রে হা-রে, দ্যাখো, হা-রে,
কী জমাট সান্ধ্য তামাশায়
আকাশের পশ্চিম দুয়ারে
সূর্য তার ডুগডুগি বাজায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1700
|
5710
|
সুকুমার রায়
|
‘ভাল ছেলের’ নালিশ
|
ছড়া
|
মাগো!
প্রসন্নটা দুষ্টু এমন! খাচ্ছিল সে পরোটা
গুড় মাখিয়ে আরাম ক’রে বসে -
আমায় দেখে একটা দিল ,নয়কো তাও বড়টা,
দুইখানা সেই আপনি খেল ক’ষে!
তাইতে আমি কান ধরে তার একটুখানি পেঁচিয়ে
কিল মেরেছি ‘হ্যাংলা ছেলে’ বলে-
অম্নি কিনা মিথ্যা করে ষাঁড়ের মত চেচিয়ে
গেল সে তার মায়ের কাছে চলে!
মাগো!
এম্নিধারা শয়তানি তার, খেলতে গেলাম দুপুরে,
বল্ল, ‘এখন খেলতে আমার মানা’-
ঘন্টাখানেক পরেই দেখি দিব্যি ছাতের উপরে
ওড়াচ্ছে তার সবুজ ঘুড়ি খানা।
তাইতে আমি দৌড়ে গিয়ে ঢিল মেরে আর খুঁচিয়ে
ঘুড়ির পেটে দিলাম করে ফুটো-
আবার দেখ বুক ফুলিয়ে সটান মাথা উঁচিয়ে
আনছে কিনে নতুন ঘুড়ি দুটো!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/336
|
4183
|
লালন শাহ
|
দেখ না মন,ঝকমারি এই দুনিয়াদারী
|
চিন্তামূলক
|
দেখ না মন, ঝকমারি এই দুনিয়াদারী।
আচ্ছা মজা কপনি-ধ্বজা উড়ালে ফকিরী।।
যা কর তা কর রে মন,
তোর পিছের কথা রেখে স্মরণ;
বরাবরই (ও তার) পিছে পিছে ঘুরছে শমন,
কখন হাতে দিবে দড়ি।।
(তখন) দরদের ভাই বন্ধুজনা,
সঙ্গে তোমার কেউ যাবে না;
মন তোমারি, তারা একা পথে খালি আতে
বিদায় দিবে তোমারি।।
বড় আশার বাসাখানি
কোথায় পড়ে রবে মন তোর ঠিক না জানি;
সিরাজ সাঁই কয়, লালন ভেরো
তুই করিস্ নে কার এন্তাজারি।।আরও পড়ুন… সময় গেলে সাধন হবে না – লালন শাহ
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4417.html
|
4324
|
শামসুর রাহমান
|
অশনি সঙ্কেত
|
মানবতাবাদী
|
চাঁদের আংশিক ক্ষয় আর নক্ষত্রের ত্রস্তরূপ
দেখে বুড়ো শিরিষের ডালে রাতজাগা প্যাঁচা বলে-
‘কবি আর বুদ্ধিজীবী হননের কাল ফের শুরু
হলো বুঝি! জেনেছি, সদর স্ট্রিটে ক’জন সন্ত্রাসী
ক্রোধে জ্বলে একজন দীপ্ত বুদ্ধিজীবীকে শাসায়
সতেজ জীবনকে প্রাণহীন ধূলায় লুটিয়ে দেবে
বলে ক্ষিপ্র বুলেটে, আরেকজন অপহৃত হতে
হতে কোনোমতে জীবনের কণ্ঠলগ্ন থেকে যান।কী কসুর তাঁদের? বস্তুত যারা অন্যের ভিটায়
প্রায়শ চড়ায় ঘুঘু, ছড়ায় আন্ধার চতুর্দিকে,
শহরকে জঙ্গল বানাতে চায় ক্রূরতায় মজে,
ওদের বিপক্ষে দৃঢ়চিত্ত কবি আর বুদ্ধিজীবী
আমজনতাকে বাগানের, অন্ধ কুয়ো নয়, নীল
সমুদ্রের স্বপ্ন আর ঠিক পথ দেখান সর্বদা। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/oshoni-songket/
|
4064
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হেথায় তিনি কোল পেতেছেন
|
ভক্তিমূলক
|
হেথায় তিনি কোল পেতেছেন
আমাদের এই ঘরে।
আসনটি তাঁর সাজিয়ে দে ভাই,
মনের মতো করে।
গান গেয়ে আনন্দমনে
ঝাঁটিয়ে দে সব ধুলা।
যত্ন করে দূর করে দে
আবর্জনাগুলা।
জল ছিটিয়ে ফুলগুলি রাখ
সাজিখানি ভরে--
আসনটি তাঁর সাজিয়ে দে ভাই,
মনের মতো করে। দিনরজনী আছেন তিনি
আমাদের এই ঘরে,
সকালবেলায় তাঁরি হাসি
আলোক ঢেলে পড়ে।
যেমনি ভোরে জেগে উঠে
নয়ন মেলে চাই,
খুশি হয়ে আছেন চেয়ে
দেখতে মোরা পাই।
তাঁরি মুখের প্রসন্নতায়
সমস্ত ঘর ভরে।
সকালবেলায় তাঁর হাসি
আলোক ঢেলে পড়ে।
একলা তিনি বসে থাকেন
আমাদের এই ঘরে
আমরা যখন অন্য কোথাও
চলি কাজের তরে,
দ্বারের কাছে তিনি মোদের
এগিয়ে দিয়ে যান--
মনের সুখে ধাই রে পথে,
আনন্দে গাই গান।
দিনের শেষে ফিরি যখন
নানা কাজের পরে,
দেখি তিনি একলা বসে
আমাদের এই ঘরে। তিনি জেগে বসে থাকেন
আমাদের এই ঘরে
আমরা যখন অচেতনে
ঘুমাই শয্যা-'পরে।
জগতে কেউ দেখতে না পায়
লুকানো তাঁর বাতি,
আঁচল দিয়ে আড়াল ক'রে
জ্বালান সারা রাতি।
ঘুমের মধ্যে স্বপন কতই
আনাগোনা করে,
অন্ধকারে হাসেন তিনি
আমাদের এই ঘরে। ( পৌষ, ১৩১৬)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hethay-tini-kol-petechen/
|
4272
|
শঙ্খ ঘোষ
|
যমুনাবতী
|
মানবতাবাদী
|
One more unfortunate
Weary of breath
Rashly importunate
Gone to her death. – Thomas Hoodনিভন্ত এই চুল্লীতে মা
একটু আগুন দে
আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে।
নোটন নোটন পায়রাগুলি
খাঁচাতে বন্দী
দু’এক মুঠো ভাত পেলে তা
ওড়াতে মন দি’।হায় তোকে ভাত দিই কী করে যে ভাত দিই হায়
হায় তোকে ভাত দেব কী দিয়ে যে ভাত দেব হায়নিভন্ত এই চুল্লী তবে
একটু আগুন দে –
হাড়ের শিরায় শিখার মাতন
মরার আনন্দে।
দু’পারে দুই রুই কাৎলার
মারণী ফন্দী
বাঁচার আশায় হাত-হাতিয়ার
মৃত্যুতে মন দি’।বর্গী না টর্গী না, যমকে কে সামলায়!
ধার-চকচকে থাবা দেখছ না হামলায়?
যাস্ নে ও-হামলায়, যাস্ নে।।কান্না কন্যার মায়ের ধমনীতে আকুল ঢেউ তোলে, জ্বলে না-
মায়ের কান্নায় মেয়ের রক্তের উষ্ণ হাহাকার মরে না-
চলল মেয়ে রণে চলল।
বাজে না ডম্বরু, অস্ত্র ঝন্ ঝন্ করে না, জানল না কেউ তা
চলল মেয়ে রণে চলল।
পেশীর দৃঢ় ব্যথা, মুঠোর দৃঢ় কথা, চোখের দৃঢ় জ্বালা সঙ্গে
চলল মেয়ে রণে চলল।নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এল
মৃত্যুরই গান গা-
মায়ের চোখে বাপের চোখে
দু-তিনটে গঙ্গা।
দূর্বাতে তার রক্ত লেগে
সহস্র সঙ্গী
জাগে ধক্ ধক্, যজ্ঞে ঢালে
সহস্র মণ ঘি।যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে
যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে
বিষের টোপর নিয়ে।
যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ পথ দিয়ে
দিয়েছে পথ, গিয়ে।নিভন্ত এই চুল্লীতে বোন আগুন ফলেছে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a4%e0%a7%80-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
|
986
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কার্তিক মাঠের চাঁদ
|
প্রেমমূলক
|
জেগে ওঠে হৃদয়ে আবেগ —
পাহাড়ের মতো অই মেঘ
সঙ্গে লয়ে আসে
মাঝরাতে কিংবা শেষরাতে আকাশে
যখন তোমারে! —
মৃত কে পৃথিবী এক আজ রাতে ছেড়ে দিল যারে!
ছেঁড়া ছেঁড়া শাদা মেঘ ভয় পেয়ে গেছে সব চলে
তরাসে ছেলের মতো– আকাশে নক্ষত্র গেছে জ্ব’লে
অনেক সময়–
তারপর তুমি এলে, মাঠের শিয়রে– চাঁদ–
পৃথিবীতে আজ আর যা হবার নয়,
একদিন হয়েছে যা– তারপর হাতছাড়া হয়ে
হারায়ে ফুরায়ে গেছে– আজও তুমি তার স্বাদ লয়ে
আর-একবার তবু দাঁড়ায়েছ এসে!
নিড়োনো হয়েছে মাঠ পৃথিবীর চার দিকে,
শস্যের ক্ষেত চেষে চেষে
গেছে চাষা চ’লে;
তাদের মাটির গল্প– তাদের মাঠের গল্প সব শেষ হলে
অনেক তবুও থাকে বাকি–
তুমি জানো– এ পৃথিবীর আজ জানে তা কি!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kartik-mather-chad/
|
4012
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্মৃতিকাপালিনী পূজারতা, একমনা
|
চিন্তামূলক
|
স্মৃতিকাপালিনী পূজারতা, একমনা,
বর্তমানেরে বলি দিয়া করে
অতীতের অর্চনা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/srmitikapalini-pujarota-ekmona/
|
4412
|
শামসুর রাহমান
|
আসাদের শার্ট
|
স্বদেশমূলক
|
গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায় ।
বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
হৃদয়ের সোনালী তন্তুর সূক্ষতায়
বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট
উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে ।
ডালীম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর- শেভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট
শহরের প্রধান সড়কে
কারখানার চিমনি-চূড়োয়
গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায় ।
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক ;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/426
|
4479
|
শামসুর রাহমান
|
একটি দুপুর
|
প্রেমমূলক
|
শহরে দুপুর ছিল, হৃদয়েও প্রখর দুপুর;
কে এক নবীন পাখি পাহাড়ের নিভৃতির ফুল,
সতেজ ঘাসের ঘ্রাণ, ঝর্ণার জলজ স্মৃতি নিয়ে
আমাদের দু’জনের ওপর ঝরালো বুনো সুর।তখন ছিল না মনে কী তোমার না, বিয়ে-টিয়ে
কখনো হয়েছে কি না, না কি তুমি সরল বিধবা!
আমাদের চতুর্দিকে বাংলা প্রজাপতি, দূর
আফ্রিকার ড্রামের সঙ্গীত; দেহমন রক্তজবা।সারা ঘরে তুমি রঙধনু, সমুদ্রের ঢেউ, দু’টি
মানুষের কী মধুর আলিঙ্গন অনন্তের পটে
আঁকা হয়ে যায় আর হৃৎপিণ্ডে গির্জার ঘন্টাধ্বনি;
আমরা দু’জন নীল স্বপ্ন হই, ফুল হ’য়ে ফুটে।যখন তোমাকে দেখি, মনে হয়, এই মাত্র তুমি
স্বপ্নের কোরক থেকে জন্ম নিয়ে দাঁড়িয়েছ পাশে
নবীনা, নতুন শিল্প সৃষ্টি হবে বলে। আমাদের
হৃদয়ের কান্না-ভেজা মাটি সে শিল্পের জন্মভূমি।তোমার কি মনে পড়ে সেই দুপুরের মাতলামি
কর্মময়তার কোনো ফাঁকে? যখন বারান্দা থেকে
বৃষ্টি দ্যাখো, তখন কি ভাবো বিগত-যৌবন এক
কবিকে নিঃসঙ্গতায় শরীর আহত স্বপ্নে ঢেকে? (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-dupur/
|
5791
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
দুপুর
|
চিন্তামূলক
|
রৌদ্রে এসে দাঁড়িয়েছে রৌদ্রের প্রতিমা
এ যেন আলোরই শস্য, দুপুরের অস্থির কুহক
অলিন্দে দাঁড়ানো মূর্তি ঢেকে দিল দু’চক্ষুর সীমা
পথ চলতে থম্কে গেলো অপ্রতিভ অসংখ্য যুবক।
ভিজে চুল খুলেছে সে সুকুমার, উদাস আঙুলে
স্তনের বৃন্তের কাছে উদ্বেলিত গ্রীষ্মের বাতাস
কি যেন দেখলো মিলে এক সঙ্গে নিল দীর্ঘশ্বাস।
একজন যুবক শুধু দূর থেকে হেঁটে এসে ক্লান্ত রুক্ষ দেহে
সিগারেট ঠোঁটে চেপে শব্দ করে বারুদ পোড়ালো
সম্বল সামান্য মুদ্রা করতলে গুণে গুণে দেখলো সস্নেহে
এ মাসেই চাকবি হবে, হেসে উঠলো, চোখে পড়লো
অলিন্দের আলো।
এর চেয়ে রাত্রি ভালো, নির্লিপ্তের মতো চেয়ে বললো মনে মনে
কিছুদূর হেঁটে গিয়ে শেষবার ফিরে দেখলো তাকে
রোদ্দুর লেগেছে তার ঢেকে রাখা যৌবনের প্রতি কোণে কোণে
এ যেন নদীর মতো, নতুন দৃশ্যের শোভা প্রতি বাঁকে বাঁকে।
এর চেয়ে রাত্রি ভালো, যুবকটি মনে মনে বললো বারবার
রোদ্দুর মহৎ করে মন, আমি চাই শুধু ক্লান্ত অন্ধকার।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/284
|
982
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কবিতা
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমাদের হাড়ে এক নির্ধূম আনন্দ আছে জেনে
পঙ্কিল সময়স্রোতে চলিতেছে ভেসে;
তা না হ'লে সকলি হারায়ে যেতো ক্ষমাহীন রক্তের- নিরুদ্দেশে।
হে আকাশ, একদিন ছিলে তুমি প্রভাতের তটিনীর;
তারপর হ'য়ে গেছ দূর মেরুনিশীথের স্তব্ধ সমুদ্রের।
ভোরবেলা পাখিদের গানে তাই ভ্রান্তি নেই,
নেই কোনো নিস্ফলতা আলোকের পতঙ্গের প্রাণে।
বানরী ছাগল নিয়ে যে- ভিক্ষুক প্রতারিত রাজপথে ফেরে-
আঁজলায় স্থির শান্ত সলিলের অন্ধকারে-
খুঁজে পায় জিজ্ঞাসার মানে।
চামচিকা যার হয় নিরালোকে ওপারের বায়ুসন্তরণে;
প্রান্তরের অমরতা জেগে ওঠে একরাশ প্রাদেশিক ঘাসের উন্মেষে;
জীর্ণতম সমাধির ভাঙ্গা ইঁট অসম্ভব পরগাছা ঘেঁষে
সবুজ সোনালিচোখ ঝিঁঝিঁ-দম্পতির ক্ষুধা করে আবিষ্কার
একটি বাদুড় দূর স্বোপার্জিত জ্যোৎস্নার মনীষায় ডেকে নিয়ে যায়
যাহাদের যতদূর চক্রবাল আছে লভিবার।
হে আকাশ, হে আকাশ,
একদিন ছিলে তুনি মেরুনিশীথের স্তব্ধ সমুদ্রের মতো;
তারপর হ'য়ে গেছ প্রভাতের নদীটির মতো প্রতিভার!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kobita/
|
3607
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিলয়
|
সনেট
|
যেন তার আঁখি দুটি নবনীল ভাসে
ফুটিয়া উঠিছে আজি অসীম আকাশে।
বৃষ্টিধৌত প্রভাতের আলোকহিল্লোলে
অশ্রুমাখা হাসি তার বিকাশিয়া তোলে।
তার সেই স্নেহলীলা সহস্র আকারে
সমস্ত জগৎ হতে ঘিরিছে আমারে।
বরষার নদী-’পরে ছলছল আলো,
দূরতীরে কাননের ছায়া কালো কালো,
দিগন্তের শ্যামপ্রান্তে শান্ত মেঘরাজি—
তারি মুখখানি যেন শতরূপ সাজি।
আঁখি তার কহে যেন মোর মুখে চাহি—
“আজ প্রাতে সব পাখি উঠিয়াছে গাহি,
শুধু মোর কণ্ঠস্বর এ প্রভাতবায়ে
অনন্ত জগৎমাঝে গিয়েছে হারায়ে।” (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/biloy/
|
3337
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নূতন সে পলে পলে
|
চিন্তামূলক
|
নূতন সে পলে পলে
অতীতে বিলীন,
যুগে যুগে বর্তমান
সেই তো নবীন।
তৃষ্ণা বাড়াইয়া তোলে
নূতনের সুরা,
নবীনের চিরসুধা
তৃপ্তি করে পুরা। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nuton-she-pole-pole/
|
5520
|
সুকান্ত ভট্টাচার্য
|
মধ্যবিত্ত -৪২
|
মানবতাবাদী
|
পৃথিবীময় যে সংক্রামক রোগে,
আজকে সকলে ভুগছে একযোগে,
এখানে খানিক তারই পূর্বাভাস
পাচ্ছি, এখন বইছে পুব-বাতাস।
উপায় নেই যে সামলে ধরব হাল,
হিংস্র বাতাসে ছিঁড়ল আজকে পাল,
গোপনে আগুন বাড়ছে ধানক্ষেতে,
বিদেশী খবরে রেখেছি কান পেতে।
সভয়ে এদেশে কাটছে রাত্রিদিন,
লুব্ধ বাজারে রুগ্ন স্বপ্নহীন।
সহসা নেতারা রুদ্ধ- দেশ জুড়ে
'দেশপ্রেমিক' উদিত ভুঁই ফুঁড়ে।
প্রথমে তাদের অন্ধ বীর মদে
মেতেছি এবং ঠকেছি প্রতিপদে;
দেখেছি সুবিধা নেই এ কাজ করায়
একক চেষ্টা কেবলই ভুল ধরায়।
এদিকে দেশের পূর্ব প্রান্তরে
আবার বোমারু রক্ত পান করে,
ক্ষুব্ধ জনতা আসামে, চাটগাঁয়ে,
শাণিত-দ্বৈত-নগ্ন অন্যায়ে;
তাদের স্বার্থ আমার স্বার্থকে,
দেখছে চেতনা আজকে এক চোখে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/post20160509035711/
|
3520
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বর্ষাযাপন
|
প্রকৃতিমূলক
|
রাজধানী কলিকাতা; তেতালার ছাতে
কাঠের কুঠরি এক ধারে;
আলো আসে পূর্ব দিকে প্রথম প্রভাতে,
বায়ু আসে দক্ষিণের দ্বারে।মেঝেতে বিছানা পাতা, দুয়ারে রাখিয়া মাথা
বাহিরে আঁখিরে দিই ছুটি,
সৌধ-ছাদ শত শত ঢাকিয়া রহস্য কত
আকাশেরে করিছে ভ্রূকুটি।
নিকটে জানালা-গায় এক কোণে আলিসায়
একটুকু সবুজের খেলা,
শিশু অশথের গাছ আপন ছায়ার নাচ
সারা দিন দেখিছে একেলা।
দিগন্তের চারি পাশে আষাঢ় নামিয়া আসে,
বর্ষা আসে হইয়া ঘোরালো,
সমস্ত আকাশজোড়া গরজে ইন্দ্রের ঘোড়া
চিকমিকে বিদ্যুতের আলো।
চারি দিকে অবিরল ঝরঝর বৃষ্টিজল
এই ছোটো প্রান্ত-ঘরটিরে
দেয় নির্বাসিত করি দশ দিক অপহরি
সমুদয় বিশ্বের বাহিরে।
বসে বসে সঙ্গীহীন ভালো লাগে কিছুদিন
পড়িবারে মেঘদূতকথা—
বাহিরে দিবস রাতি বায়ু করে মাতামাতি
বহিয়া বিফল ব্যাকুলতা;
বহুপূর্ব আষাঢ়ের মেঘাচ্ছন্ন ভারতের
নগ-নদী-নগরী বাহিয়া
কত শ্রুতিমধু নাম কত দেশ কত গ্রাম
দেখে যাই চাহিয়া চাহিয়া।
ভালো করে দোঁহে চিনি, বিরহী ও বিরহিণী
জগতের দু পারে দুজন—
প্রাণে প্রাণে পড়ে টান, মাঝে মহা ব্যবধান,
মনে মনে কল্পনা সৃজন।
যক্ষবধূ গৃহকোণে ফুল নিয়ে দিন গণে
দেখে শুনে ফিরে আসি চলি।
বর্ষা আসে ঘন রোলে, যত্নে টেনে লই কোলে
গোবিন্দদাসের পদাবলী।
সুর করে বার বার পড়ি বর্ষা-অভিসার—
অন্ধকার যমুনার তীর,
নিশীথে নবীনা রাধা নাহি মানে কোনো বাধা,
খুঁজিতেছে নিকুঞ্জ-কুটির।
অনুক্ষণ দর দর বারি ঝরে ঝর ঝর,
তাহে অতি দূরতর বন;
ঘরে ঘরে রুদ্ধ দ্বার, সঙ্গে কেহ নাহি আর
শুধু এক কিশোর মদন।আষাঢ় হতেছে শেষ, মিশায়ে মল্লার দেশ
রচি 'ভরা বাদরের' সুর।
খুলিয়া প্রথম পাতা, গীতগোবিন্দের গাথা
গাহি 'মেঘে অম্বর মেদুর'।
স্তব্ধ রাত্রি দ্বিপ্রহরে ঝুপ্ ঝুপ্ বৃষ্টি পড়ে—
শুয়ে শুয়ে সুখ-অনিদ্রায়
‘রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন’
সেই গান মনে পড়ে যায়।
‘পালঙ্কে শয়ান রঙ্গে বিগলিত চীর অঙ্গে’
মনসুখে নিদ্রায় মগন—
সেই ছবি জাগে মনে পুরাতন বৃন্দাবনে
রাধিকার নির্জন স্বপন।
মৃদু মৃদু বহে শ্বাস, অধরে লাগিছে হাস,
কেঁপে উঠে মুদিত পলক;
বাহুতে মাথাটি থুয়ে একাকিনী আছে শুয়ে,
গৃহকোণে ম্লান দীপালোক।
গিরিশিরে মেঘ ডাকে, বৃষ্টি ঝরে তরুশাখে
দাদুরী ডাকিছে সারারাতি—
হেনকালে কী না ঘটে, এ সময়ে আসে বটে
একা ঘরে স্বপনের সাথি।
মরি মরি স্বপ্নশেষে পুলকিত রসাবেশে
যখন সে জাগিল একাকী,
দেখিল বিজন ঘরে দীপ নিবু নিবু করে
প্রহরী প্রহর গেল হাঁকি।
বাড়িছে বৃষ্টির বেগ, থেকে থেকে ডাকে মেঘ,
ঝিল্লিরব পৃথিবী ব্যাপিয়া,
সেই ঘনঘোরা নিশি স্বপ্নে জাগরণে মিশি
না জানি কেমন করে হিয়া।লয়ে পুঁথি দু-চারিটি নেড়ে চেড়ে ইটি সিটি
এইমতো কাটে দিনরাত।
তার পরে টানি লই বিদেশী কাব্যের বই,
উলটি পালটি দেখি পাত—
কোথা রে বর্ষার ছায়া অন্ধকার মেঘমায়া
ঝরঝর ধ্বনি অহরহ,
কোথায় সে কর্মহীন একান্তে আপনে-লীন
জীবনের নিগূঢ় বিরহ!
বর্ষার সমান সুরে অন্তর বাহির পুরে
সংগীতের মুষলধারায়,
পরানের বহুদূর কূলে কূলে ভরপুর,
বিদেশী কাব্যে সে কোথা হায়!
তখন সে পুঁথি ফেলি, দুয়ারে আসন মেলি
বসি গিয়ে আপনার মনে,
কিছু করিবার নাই চেয়ে চেয়ে ভাবি তাই
দীর্ঘ দিন কাটিবে কেমনে।
মাথাটি করিয়া নিচু বসে বসে রচি কিছু
বহু যত্নে সারাদিন ধরে—
ইচ্ছা করে অবিরত আপনার মনোমত
গল্প লিখি একেকটি করে।
ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটো ছোটো দুঃখকথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি’ মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।
জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অজ্ঞাত জীবনগুলা, অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল—
সংসারের দশদিশি ঝরিতেছে অহর্নিশি
ঝরঝর বরষার মতো—
ক্ষণ-অশ্রু ক্ষণ-হাসি পড়িতেছে রাশি রাশি
শব্দ তার শুনি অবিরত।
সেই-সব হেলাফেলা, নিমেষের লীলাখেলা
চারি দিকে করি স্তূপাকার,
তাই দিয়ে করি সৃষ্টি একটি বিস্মৃতিবৃষ্টি
জীবনের শ্রাবণনিশার।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/barsayapon/
|
4341
|
শামসুর রাহমান
|
আজকাল খুব বেলা করে
|
চিন্তামূলক
|
আজকাল খুব বেলা করে ঘুম ভাঙে আমার
অথচ এমন একদিন ছিল
যখন আমি অন্ধকার থাকতেই জেগে উঠতাম
শুনতে পেতাম অনেক দূর থেকে কোনো পাখির গান
অনেকক্ষণ ধরে বালিশে মুখ গুঁজে
পাখির চাউনি স্বপ্নে দেখা ঘোড়ার চমকিলা পিঠ আর
একটি মেয়ের সোমত্থ বুকের কথা ভাবতাম
দমকা হাওয়ায় উলটে যাওয়া নীল পদার আড়ালে
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে একটি কি দুটি তারা চোখে পড়তআজকাল বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙে আমার
ঘুম ভাঙার পরও
বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না
দাড়ি কামাতে ভাল লাগে না
এক সময় খুব সিগারেট খেতাম প্যাকেটের পর প্যাকেট
এখন সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি
কিসসু আমার ভাল লাগে না
সকালবেলা মানে ন’টা-দশটার পর থেকেই
আমার মন খারাপ থাকে
আস্ত সকালবেলাটাকেই চুসকি মনে হয় বিছানার
চটকানো চাদরটার দিকে তাকাই
গিজগিজে দাড়িতে হাত বুলোই বাকরখানির ঘ্রাণ
ভেসে আসে কোত্থেকে রেডিওতে গান বাজে হাসন রাজার
একটা মেষপালক আর একটা গয়লানী জবর
জোড় খায় ঝোঁপেঝাড়ে কবে যেন কোন তৈলচিত্রে
দেখেছিলাম মনে পড়ে
চাটা বিস্বাদ লাগছে দাঁত দিয়ে রুটি ছিঁড়ি
খেতে হবে বলেই খাওয়া অনেক আগে
একজন বুড়োসুড়ো খুব ফর্সা মানুষ যার নাক ছিল
ঈগলের চঞ্চুর মতো
চায়ের বাটির দেয়ালে লেগে থাকা চায়ের
ভেজা পাতার দিকে চোখ রেখে আমাকে
বলেছিলেন তোমার জীবন যাবে বুঝেছ হে ছোকরা
কালি ছিটোতে ছিটোতে
তা কালি নেহাৎ কম ছিটোইনি রবীন্দ্রনাথের মুখ
কাজী নজরুল ইসলামের মুখ
জীবনানন্দের মুখ বুদ্ধদেব বসুর মুখ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ
কমলকুমার মজুমদারের মুখ একরাশ ফুল হয়ে ভাসে
আমার চেতনা প্রবাহেইদানীং সকালবেলা থেকেই মন খারাপ থাকে আমার
দাড়ি কামাতে ভাল লাগে না
মাথায় চিরুনি চালাতে ভাল লাগে না
সেলুনে যেতে ভাল লাগে না
অফিসে যেতে ভাল লাগে না
পরস্ত্রীর সঙ্গে দিল্লাগি ভাল লাগে না
টাইপরাইটারের আওয়াজ শুনতে ভাল লাগে না
পিকাসোর জীবনী পড়তে ভাল লাগে না
বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে ভাল লাগে না
স্ত্রীকে চুমু খেতে ভাল লাগে না
সাদা কাগজ দেখতে ভাল লাগে না
খবরের কাগজের হেডলাইনে
চোখ বুলোতে ভাল লাগে না
মায় কালি ছিটোতে ভাল লাগে না
এখন আমি সিগারেট খাই না
আবার ধরব কিনা ভাবছি
আমার রক্তের ভেতরে গোধূলি একটা স্তোত্র তৈরি করছে
আমার মগজের ভেতরে
এক ঝাঁক পাখি খড়কুটো জড়ো করছে দিনরাত
আমার বুকের ভেতরে ক্রমাগত
একটা রুপোলি গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ছে
এবং জীবন
কুষ্ঠরোগীর ফোলা ঠোঁট নিয়ে চুমো খাছে আমাকেমাঝে মাঝে মনে হয় নিজেকে
ফাঁসিতে লটকে দিই কিংবা নিজেই এই মাথাটা
পেতে দিই চলন্ত ট্রেনের চাকার নিচে
কিংবা সূর্যাস্তের রঙের মতো অনেকগুলো ট্যাচলেট খেয়ে
অসম্ভব লম্বা একটা ঘুম দিই
কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে যায় একজন বলেছিলেন
তোমার জীবন যাবে কালি ছিটোতে ছিটোতে
দেখি কালি আমাকে শেষ পর্যন্ত
কতটা ডোবাতে পারে কতটা। (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ajkal-khub-bela-kore/
|
3576
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিদায় (অনুবাদ কবিতা)
|
প্রেমমূলক
|
যাও তবে প্রিয়তম সুদূর প্রবাসে
নব বন্ধু নব হর্ষ নব সুখ আশে।
সুন্দরী রমণী কত, দেখিবে গো শত শত
ফেলে গেলে যারে তারে পড়িবে কি মনে?
তব প্রেম প্রিয়তম, অদৃষ্টে নাইকো মম
সে-সব দুরাশা সখা করি না স্বপনে
কাতর হৃদয় শুধু এই ভিক্ষা চায়
ভুলো না আমায় সখা ভুলো না আমায়।
স্মরিলে এ অভাগীর যাতনার কথা,
যদিও হৃদয়ে লাগে তিলমাত্র ব্যথা,
মরমের আশা এই, থাক্ রুদ্ধ মরমেই
কাজ নাই দুখিনীরে মনে করে আর।
কিন্তু দুঃখ যদি সখা, কখনো গো দেয় দেখা
মরমে জনমে যদি যাতনার ভার,
ও হৃদয় সান্ত্বনার বন্ধু যদি চায়
ভুলো না আমায় সখা ভুলো না আমায়।Mrs. Amelia Opie
(অনুবাদ কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/biday/
|
1474
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
এবারই প্রথম তুমি
|
চিন্তামূলক
|
ভুলে যাও তুমি পূর্বেও ছিলে
মনে করো এই বিশ্ব নিখিলে
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না
ছিলে না আকাশে, নদী জলে ঘাসে
ছিলে না পাথরে ঝর্ণার পাশে৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি কিছুতে ছিলে না৷
ফুলেও ছিলে না, ফলেও ছিলে না
নাকে মুখে চোখে চুলেও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি এখানে ছিলে না
এর আগে তুমি সেখানে ছিলে না
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
রাতের পুণ্য লগনে ছিলে না
নীল নবঘন গগনে ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি তুমিও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/188
|
5051
|
শামসুর রাহমান
|
ব্যক্তিগত হরতাল
|
মানবতাবাদী
|
আজ আমি কোনও কাজ করব না। আজ সকাল-সন্ধ্যা আমি
আমার ব্যক্তিগত হরতাল ঘোষণা করেছি। আমি নিঃসঙ্গ, সমিতিছুট;
পিকেটিং চালাবার মতো দলবল আমার নেই। যা কিছু করবার একা
আমাকেই করতে হবে। ভোরবেলার প্রথম আলো যখন গাছের
সবুজ ঠোঁটে চুমো খাবে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখব না।
অন্ধকার ঘরেই শুয়ে থাকব কিছুক্ষণ, জ্বালব না আলো শেষরাতের
স্পর্শলাগা জনহীন গলির সৌন্দর্য উপভোগ করতে জানালার কাছে গিয়ে
দাঁড়াব না। বেলা বাড়তেই কয়েকটি প্রজাপতি উড়ে আসবে আমার ঘরের
ভেতর। ওদের দেখে মুখ ফিরিয়ে নেব, আগেকার মতো জিগ্যেশ করব না
ওদের কুশল। খবরের কাগজ পড়ে থাকবে এক পাশে, চোখ পর্যন্ত বুলাব না
পাতায়। স্নানাহার থেকে বিরত থাকব আজ। দু’দিনের না-কামানো
দাড়িকে আরও একদিন বাড়তে দেব। বাংলা একাডেমীর সাহিত্য সভায় অথবা
আজিজ সুপার মার্কেটে আজ আমাকে দেখবে না কেউ। কোনও বই কিংবা লিটল
ম্যাগাজিন কেনার তাগিদ অনুভব করব না আমি। আজ কোনও কোনও আড্ডা হবে না
আমার ঘরে। না, ডাকঘরেও যাব না পোস্টকার্ড কিংবা এনভেলাপ কেনার জন্যে।
কোনও বই ছুঁয়ে দেখব না, বলে দিচ্ছি। আমার ব্যক্তিগত হরতাল পুরোদমে
সফল হবে। সে আজ থেকে ক’দিন আমার এই জন্মশহরে তার অনুপস্থিতির ঘোর
অমাবস্যা ছড়িয়ে রাখবে। এই অসহনীয় অমাবস্যার প্রতিবাদে সকল কাজে
তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি।হঠাৎ কবিতা সব কাঁটাতারের ব্যারিকেড ভেঙেচুরে আমার মগজের কোষে
কোষে গায় বীজবপনের সোনালি গান। কবিতা ধর্মঘটী কলমকে তুলে দিল
আমার হাতে। শুধু গৌরীর না-থাকার বেদনাকে আমার ভেতরে দ্বিগুণ করে
কবিতা ফুটতে থাকে নীলাক্ষরে শাদা পাতায়। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/byaktigoto-hortal/
|
4181
|
লালন শাহ
|
জাত গেলো জাত গেলো বলে
|
মানবতাবাদী
|
জাত গেলো জাত গেলো বলে
এ কি আজব কারখান !
জাত গেলো জাত গেলো বলে…
সত্য কাজে কেউ নাই রাজি
সবই দেখি তা না না না
জাত গেলো জাত গেলো বলে
আসবার কালে কি জাত ছিলে
এসে তুমি কি জাত নিলে
কি জাত হবা যাবার কালে
এ কথা ভেবে বল না
জাত গেলো জাত গেলো বলে
এ কি আজব কারখান !
ব্রাহ্মন চন্ডাল চামার মুচি
এক জলেতে সবাই শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যম তো কাকেও ছাড়বে না ।।
জাত গেলো জাত গেলো বলে
এ কি আজব কারখান !
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কি ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
আ ভ্রম তো গেলো না।।
জাত গেলো জাত গেলো বলে
এ কি আজব কারখান !আরও পড়ুন… খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় – লালন শাহ
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4399.html
|
5002
|
শামসুর রাহমান
|
বহুদিন আগে একজন বৃদ্ধ
|
চিন্তামূলক
|
বহুদিন আগে একজন বৃদ্ধ এক বিকেলের
নম্র অবসরে শোনালেন
আমাকে অজানা এক গল্প যা বানানো নয়
এক রত্তি। কোনওকালে না-শোনা কাহিনী শোনা গেল।
মনোযোগ সহকারে পাতাময় গাছের তলায় কিছুক্ষণ।
স্তব্ধতায় কথকের গাঢ় উচ্চারণ সৃষ্টি করে ভিন্ন প্রভা।বৃদ্ধ কথকের কথা শুনতে চেয়ে দেখি
আকাশে সূর্যের আলো ঝিমিয়ে এসেছে
আর কয়কটি পাখি গাছের শাখায়
এসে ব’সে নিয়েছে আশ্রয়। বৃদ্ধ তার
সফেদ দাড়িতে হাত বুলিয়ে গল্পের
সূচনা করেই থেমে আকাশের দিকে তাকালেন।ইতোমধ্যে পার্শ্বাবর্তী হ্রদে মৃদু ছলছল ক’রে ওঠে জল
আর বৃদ্ধ কথকের চোখে ভেসে ওঠে
তিনজন যুবতীর অপরূপ সাঁতার এবং কিছুক্ষণ
কেটে গেলে দেখা দেয় অন্য উপসর্গ হয়তো-বা
কেটে গেলে জ্যোৎস্না এই প্রিয় পৃথিবীতে-
মায়ামায় দুনিয়ার যেন আর কোনও জান্নাতের সৃষ্টি করে।একদিন বৃদ্ধ তার এই প্রিয় শহরের নানা পথ ঘুরে
কেমন বেদনা বোধ করে ধীরে ব’সে পড়লেন
আর চতুর্দিকে নানা মানুষজনের
কাণ্ডকারখানা দেখেটেখে আকাশের দিকে
চেয়ে খুব জোরে হেসে উঠলেন। এই আচরণে
পথচারীদের কেউ-কেউ থামলেন, অনেকেই বাঁকা হেসে দূরগামী। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bohudin-age-ekjon-briddho/
|
1458
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
আকাশ সিরিজ
|
প্রেমমূলক
|
শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
ঐ আনন্দে কেটে যাবে সহস্র জীবন।শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
অহংকারে মুছে যাবে সকল দীনতা।শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
স্পর্শসুখে লিখা হবে অজস্র কবিতা।শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
শুধু একবার পেতে চাই অমৃত আস্বাদ।শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
অমরত্ব বন্দী হবে হাতের মুঠোয়।শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
তারপর হব ইতিহাস।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/post20161117020723/
|
1396
|
তারাপদ রায়
|
ভুল
|
চিন্তামূলক
|
কোনটা যে চন্দ্রমল্লিকার ফুল
আর কোনতা যে সূর্যমুখী –
বারবার দেখেও
আমার ভুল হয়ে যায়,
আমি আলাদা করতে পারি না৷
ওলকপি এবং শালগম,
মৃগেলের বাচ্চা এবং বাটামাছ,
মানুষ এবং মানুষের মত মানুষ –
বারবার দেখেও
আমার ভুল হয়ে যায়,
আমি আলাদা করতে পারি না৷
বই এবং পড়ার মত বই,
স্বপ্ন এবং দেখার মত স্বপ্ন,
কবিতা এবং কবিতার মত কবিতা,
বারবার দেখেও
আমার ভুল হয়ে যায়,
আমি আলাদা করতে পারি না৷
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3888.html
|
265
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
কবি-রাণী
|
প্রেমমূলক
|
তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।
আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালোবাসার ছবি।।
আপন জেনে হাত বাড়ালো-
আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,
বিদায়-বেলার সন্ধ্যা-তারা
পুবের অরুণ রবি,-
তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাসে সবি?
আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,
তুমিই আমার মাঝে আসি’
অসিতে মোর বাজাও বাঁশি,
আমার পূজার যা আয়োজন
তোমার প্রাণের হবি।
আমার বাণী জয়মাল্য, রাণি! তোমার সবি।।
তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি।
আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।।
তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।
আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালোবাসার ছবি।।
আপন জেনে হাত বাড়ালো-
আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,
বিদায়-বেলার সন্ধ্যা-তারা
পুবের অরুণ রবি,-
তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাসে সবি?
আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,
তুমিই আমার মাঝে আসি’
অসিতে মোর বাজাও বাঁশি,
আমার পূজার যা আয়োজন
তোমার প্রাণের হবি।
আমার বাণী জয়মাল্য, রাণি! তোমার সবি।।
তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি।
আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/169
|
2749
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আরো একবার যদি পারি
|
প্রেমমূলক
|
আরো একবার যদি পারি
খুঁজে দেব সে আসনখানি
যার কোলে রয়েছে বিছানো
বিদেশের আদরের বাণী।অতীতের পালানো স্বপন
আবার করিবে সেথা ভিড়,
অস্ফুট গুঞ্জনস্বরে
আরবার রচি দিবে নীড়।সুখস্মৃতি ডেকে ডেকে এনে
জাগরণ করিবে মধুর,
যে বাঁশি নীরব হয়ে গেছে
ফিরায়ে আনিবে তার সুর।বাতায়নে রবে বাহু মেলি
বসন্তের সৌরভের পথে,
মহানিঃশব্দের পদধ্বনি
শোনা যাবে নিশীথজগতে।বিদেশের ভালোবাসা দিয়ে
যে প্রেয়সী পেতেছে আসন
চিরদিন রাখিবে বাঁধিয়া
কানে কানে তাহারি ভাষণ।ভাষা যার জানা ছিল নাকো,
আঁখি যার কয়েছিল কথা,
জাগায়ে রাখিবে চিরদিন
সকরুণ তাহারি বারতা। (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aro-ekbar-jodi-pari/
|
3470
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রেমের হাতে ধরা দেব
|
চিন্তামূলক
|
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে;
অনেক দেরি হয়ে গেল,
দোষী অনেক দোষে।
বিধিবিধান-বাঁধনডোরে
ধরতে আসে, যাই সে সরে,
তার লাগি যা শাস্তি নেবার
নেব মনের তোষে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে। লোকে আমায় নিন্দা করে,
নিন্দা সে নয় মিছে,
সকল নিন্দা মাথায় ধরে
রব সবার নীচে।
শেষ হয়ে যে গেল বেলা,
ভাঙল বেচা-কেনার মেলা,
ডাকতে যারা এসেছিল
ফিরল তারা রোষে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/461.html
|
2693
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আপিস থেকে ঘরে এসে
|
ছড়া
|
আপিস থেকে ঘরে এসে
মিলত গরম আহার্য,
আজকে থেকে রইবে না আর
তাহার জো।
বিধবা সেই পিসি ম’রে
গিয়েছে ঘর খালি করে,
বদ্দি স্বয়ং করেছে তার
সাহায্য। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/apas-theke-ghore-ese/
|
4940
|
শামসুর রাহমান
|
প্যারাবল
|
সনেট
|
নাড়েন সবল হাত ছুটে আসে নফরের দল
তড়িঘড়ি চতুঃসীমা থেকে। তাঁর প্রবল নির্দেশে
সমুদ্রে জাহাজ ভাসে, অবিরাম চাকা ঘোরে কল-
কারখানায়, তৈরি হয় সেতু দিকে দিকে; দেশে দেশে
নিমেষে জমান পাড়ি রাষ্ট্রদুতগণ, কারাগারে
জমে ভিড়, সৈন্য বাড়ে রাতারাতি, কানায় কানায়
ভ’রে ওঠে অস্ত্রাগার, এমন কি আগাড়ে ভাগাড়ে
শকুনের বসে ভোজ। কিন্তু ছোট কোমল ডানায়।ভর ক’রে পাখি আসে ডালে তাঁর নির্দেশ ছাড়াই-
বিখ্যাত কোকিল। ডাকে অন্তরালে, নির্ভীক স্বাধীন।
হঠাৎ বলেন তিনি, ‘পাখিটাকে কী ক’রে তাড়াই?
থামা তোর গান, নইলে দেবো শাস্তি ওরে অর্বাচীন।
তবু সুর আসে ভেসে। কোকিল নয়কো কারো দাস,
কখনো পারে না তাকে স্তব্ধ করতে কোনো সর্বনাশ। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/parabol/
|
930
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আবহমান
|
চিন্তামূলক
|
পৃথিবী এখন এখন ক্রমে হতেছে নিঝুম।
সকলেরই চোখ ক্রমে বিজড়িত হ’য়ে যেন আসে;
যদিও আকাশ সিন্ধু ভ’রে গেল অগ্নির উল্লাসে;
যেমন যখন বিকেলবেলা কাটা হয় ক্ষেতের গোধূম
চিলের কান্নার মতো শব্দ ক’রে মেঠো ইঁদুরের ভিড় ফসলের ঘুমগাঢ় করে দিয়ে যায়।-এইবার কুয়াশায় যাত্রা সকলের।
সমূদ্রের রোল থেকে একটি আবেগ নিয়ে কেউ
নদীর তরঙ্গে – ক্রমে তুষারের স্তুপে তার ঢেউ
একবার টের পাবে, দ্বিতীয়বারের
সময় আসার আগে নিজেকেই পাবে না সে ঢের।এইখানে সময়কে যতদুর দেখা যায় চোখে
নির্জন ক্ষেতের দিকে চেয়ে দেখি দাঁড়ায়েছে অভিভুত চাষা;
এখনো চালাতে আছে পৃথিবীর প্রথম তামাশা
সকল সময় পান ক’রে ফেলে জলের মতন এক ঢোঁকে;
অঘ্রানের বিকেলের কমলা আলোকে
নিড়োনো ক্ষেতের কাজ ক’রে যায় ধীরে;
একটি পাখির মতো ডিনামাইটের ’পরে ব’সে।
পৃথিবীর মহত্তর অভিজ্ঞতা নিজের মনের মুদ্রাদোষে
নষ্ট হয়ে খ’সে যায় চারিদিকে আমিষ তিমিরে;
সোনালি সূর্যের সাথে মিশে গিয়ে মানুষটা আছে পিছু ফিরে।ভোরের স্ফটিক রৌদ্রে নগরী মলিন হয়ে আসে।
মানুষের উৎসাহের কাছ থেকে শুরু হল মানুষের বৃত্তি আদায়।
যদি কেউ কানাকড়ি দিতে পারে বুকের উপরে হাত রেখে
তবে সে প্রেতের মতো ভেসে গিয়ে সিংহদরজায়
আঘাত হানিতে গিয়ে মিশে যায় অন্ধকার বিম্বের মতন।
অভিভূত হয়ে আছে — চেয়ে দ্যাখো — বেদনার নিজের নিয়ম।
নেউলধূসর নদী আপনার কাজ বুঝে প্রবাহিত হয়;
জলপাই অরণ্যের ওই পারে পাহাড়ের মেধাবী নীলিমা;
ওই দিকে সৃষ্টি যেন উষ্ণ স্থির প্রেমের বিষয়;
প্রিয়ের হাতের মতো লেগে আছে ঘড়ির সময় ভুলে গিয়ে
আকাশের প্রসারিত হাতের ভিতরে।সেই আদি অরণির যুগ থেকে শুরু ক’রে আজ
অনেক মনীষা, প্রেম, নিমীল ফসলরাশি ঘরে
এসে গেছে মানুষের বেদনা ও সংবেদনাময়।
পৃথিবীর রাজপথে-রক্তপথে-অন্ধকার অববাহিকায়
এখনো মানুষ তবু খোঁড়া ঠ্যাঙে তৈমুরের মতো বার হয়।
তাহার পায়ের নিচে তৃণের নিকটে তৃণ মুক অপেক্ষায়;
তাহার মাথার ‘পরে সূর্য, স্বাতী, সরমার ভিড়;
এদের নৃত্যের রোলে অবহিত হয়ে থেকে ক্রমে একদিন
কবে তার ক্ষুদ্র হেমন্তের বেলা হবে নিসর্গের চেয়েও প্রবীণ?চেয়েছে মাটির দিকে — ভুগর্ভে তেলের দিকে
সমস্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অবিরল যারা,
মাথার উপরে চেয়ে দেখেছে এবার;
দুরবীণে কিমাকার সিংহের সাড়া
পাওয়া যায় শরতের নির্মেঘ রাতে।
বুকের উপরে হাত রেখে দেয় তারা।
যদিও গিয়েছে ঢের ক্যারাভান ম’রে,
মশালের কেরোসিনে মানুষেরা অনেক পাহারা
দিয়ে গেছে তেল, সোনা, কয়লা ও রমণীকে চেয়ে;
চিরদিন এইসব হ্নদয় ও রুধিরের ধারা।
মাটিও আশ্চর্য সত্য। ডান হাত অন্ধকারে ফেলে
নক্ষত্রও প্রামাণিক; পরলোক রেখেছে সে জ্বেলে;
অনৃত সে আমাদের মৃত্যুকে ছাড়া।মোমের আলোয় আজ গ্রস্থের কাছে ব’সে – অথবা ভোরের বেলা নদীর ভিতরে
আমরা যতটা দূর চ’লে যাই -চেয়ে দেখি আরো কিছু আছে তারপরে।
অনির্দিষ্ট আকাশের পানে উড়ে হরিয়াল আমারো বিবরে
ছায়া ফ্যালে। ঘুরোনো সিঁড়ির পথ বেয়ে যারা উঠে যায় ধবল মিনারে,
কিংবা যারা ঘুমন্তের মতো জেগে পায়চারি করে সিংহদ্বারে,
অথবা যে সব থাম সমীচীন মিস্তিরির হাত থেকে উঠে গেছে বিদ্যুতের তারে,
তাহারা ছবির মতো পরিতৃপ্ত বিবেকের রেখায় রয়েছে অনিমেষ।
হয়তো অনেক এগিয়ে তারা দেখে গেছে মানুষের পরম আয়ুর পারে শেষ
জলের রঙের মতো স্বচ্ছ রোদে একটিও বোলতার নেই অবলেশ।তাই তারা লোষ্ট্রের মতন স্তব্ধ। আমাদেরও জীবনের লিপ্ত অভিধানে
বর্জাইস অক্ষরে লেখা আছে অন্ধকার দলিলের মানে।
সৃষ্টির ভিতরে তবু কিছুই সুদীর্ঘতম নয় — এই জ্ঞানে
লোকসানী বাজারের বাক্সের আতাফল মারীগুটিকার মতো পেকে
নিজের বীজের তরে জোর করে সূর্যকে নিয়ে আসে ডেকে।
অকৃত্রিম নীল আলো খেলা করে ঢের আগে মৃত প্রেমিকের শব থেকে।একটি আলোক নিয়ে বসে থাকা চিরদিন;
নদীর জলের মতো স্বচ্ছ এক প্রত্যাশাকে নিয়ে;
সে সবের দিন শেষ হয়ে গেছে
এখন সৃষ্টির মনে — অথবা মনীষীদের প্রাণের ভিতরে।
সৃষ্টি আমাদের শত শতাব্দীর সাথে ওঠে বেড়ে।
একদিন ছিলো যাহা অরণ্যের রোদে — বালুচরে,
সে আজ নিজেকে চেনে মানুষের হৃদয়ের প্রতিভাকে নেড়ে।
আমরা জটিল ঢের হয়ে গেছি — বহুদিন পুরাতন গ্রহে বেঁচে থেকে।
যদি কেউ বলে এসে : ‘এই সেই নারী,
একে তুমি চেয়েছিলে এই সেই বিশুদ্ধ সমাজ–
তবুও দর্পণে অগ্নি দেখে কব্ে ফুরায়ে গিয়েছে কার কাজ?আমাদের মৃত্যু নেই আজ আর,
যদিও অনেক মৃত্যুপরস্পরা ছিলো ইতিহাসে;
বিস্তৃত প্রাসাদে তারা দেয়ালের অবলঙ ছবি;
নানারুপ ক্ষতি ক্ষয় নানা দিকে মরে গেছি — মনে পড়ে বটে
এইসব ছবি দেখি; বন্দীর মতন তবু নিস্তব্ধ পটে
নেই কোনো দেবদত্ত, উদয়ন, চিত্রসেনী স্থাণু।
এক দরজায় ঢুকে বহিস্কৃত হয়ে গেছে অন্য এক দুয়ারের দিকে
অমেয় আলোয় হেঁটে তারা সব।
(আমাদের পূর্বপুরুষেরা কোন্ বাতাসের শব্দ শুনেছিল;
তারপর হয়েছিলো পাথরের মতন নীরব?)
আমাদের মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
কাচের গেলাসে জলে উজ্জুল শফরী;
সমুদ্রের দিবারৌদ্রে আরক্তিম হাঙরের মতো;
তারপর অন্য গ্রহ-নক্ষত্রেরা আমাদের ঘড়ির ভিতরে
যা হয়েছে, যা হতেছে, অথবা যা হবে সব এক সাথে প্রচারিত করে।
সৃষ্টির নাড়ীর ‘পরে হাত রেখে টের পাওয়া যায়
অসম্ভব বেদনার সাথে মিশে রয়ে গেছে অমোঘ আমোদ;
তবু তারা করে নাকো পরস্পরের ঋণশোধ।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/abohoman/
|
4265
|
শঙ্খ ঘোষ
|
বহিরাগত
|
মানবতাবাদী
|
আমার কথা কি বলতে চাও না? নিশ্চিত তুমি বহিরাগত |
উঁচু স্বর তুলে কথা বলে যারা জেনে নাও তারা বহিরাগত |
গাঁয়ে কোণে কোণে গাঁয়ের মানুষ খেতে বা খামারে বহিরাগত |
মরা মানুষের মুখাচ্ছাদন সরিয়ো না, ও তো বহিরাগত |
মাঠে মাঠে ধরে যেটুকু ফসল সেসবও এখন বহিরাগত |
চালার উপরে ঝুঁকে পড়ে চাঁদ বহুদূর থেকে বহিরাগত |
বর্ষাফলকে বিষ মেখে নিয়ে কালো মুখোশের আড়ালে যত
বহিরাগতরা এসে ঠিক ঠিকই বুঝে নেয় কারা বহিরাহত |
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1128
|
3307
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নারী
|
সনেট
|
তুমি এ মনের সৃষ্টি, তাই মনোমাঝে
এমন সহজে তব প্রতিমা বিরাজে।
যখন তোমারে হেরি জগতের তীরে
মনে হয় মন হতে এসেছ বাহিরে।
যখন তোমারে দেখি মনোমাঝখানে
মনে হয় জন্ম-জন্ম আছ এ পরানে।
মানসীরূপিণী তুমি, তাই দিশে দিশে
সকল সৌন্দর্যসাথে যাও মিলে মিশে।
চন্দ্রে তব মুখশোভা, মুখে চন্দ্রোদয়,
নিখিলের সাথে তব নিত্য বিনিময়।
মনের অনন্ত তৃষ্ণা মরে বিশ্ব ঘুরি,
মিশায় তোমার সাথে নিখিল মাধুরী।
তার পরে মনগড়া দেবতারে মন
ইহকাল পরকাল করে সমর্পণ। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nari/
|
2401
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সায়ংকাল
|
সনেট
|
চেয়ে দেখ, চলিছেন মৃদে অস্তাচলে
দিনেশ, ছড়ায়ে স্বর্ণ, রত্ন রাশি রাশি
আকাশে। কত বা যত্নে কাদম্বিনী আসি
ধরিতেছে তা সবারে সুনীল আঁচলে! –
কে না জানে অলঙ্কারে অঙ্গনা বিলাসী?
অতি-ত্বরা গড়ি ধনী দৈব-মায়া-বলে
বহুবিধ অলঙ্কার পরিবে লো হাসি,—
কনক-কঙ্কণ হাতে, স্বর্ণ-মালা গলে!
সাজাইবে গজ, বাজী; পৰ্ব্বতের শিরে
সুবর্ণ কিরীট দিবে; বহাবে অম্বরে
নদস্রোতঃ, উজ্জ্বলিত স্বর্ণবর্ণ নীরে!
সুবর্ণের গাছ রোপি, শাখার উপরে
হেমাঙ্গ বিহঙ্গ থোবে। –এ বাজী করি রে
শুভ ক্ষণে দিনকর কর-দান করে।
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/sayngkal/
|
2179
|
মহাদেব সাহা
|
তোমার বর্ণনা
|
প্রেমমূলক
|
তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি বর্ণনায়ই বুঝেছি অক্ষম
নাই সে কিঞ্চিৎ ভাষাজ্ঞান, মাত্রাবোধ এমনকি শব্দেরও
শৃঙ্খলা
সে-বিদ্যা আয়ত্তে নাই অনায়াসে পাঠ করি তোমার চিবুক
কিংবা ধরো প্রসিদ্ধ নগর দেখে দেয় কেউ যে-রকম গাঢ়
বিবরণ,
দর্শনীয় বস্তু আর সুপ্রাচীন স্থানের তালিকা, সে-রকম
তোমার বিশদ ব্যাখ্যা জানি আমি পারবো না কখনো।
তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি এখনো তো হয়নি অক্ষর-
জ্ঞানই কিছু
শব্দার্থ হয়নি জানা কি তোমার ঠোঁট কিংবা চোখের আভাস
এমন যোগ্যতা নাই তোমার সামান্য অংশ অনুবাদ করি
কিংবা একটি উদ্ধৃতি দিই যে-কোনো বিশেষ অংশ থেকে
এখনো হয়নি পড়া তোমার যুগল ভুরু, সূক্ষ্ম তিল
একগুচ্ছ চুলের বানান। হয়নি মুখস্ত জানি একটি আঙুল
তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি এখনো তো হয় নাই
বর্ণমালা চেনা,
কি তোমার অনুভূতি কি তোমার বিশুদ্ধ আবেগ, সেসবের
জানার তো প্রশ্নই ওঠে না, এখনো শিখিনি উচ্চারণ।
তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি এখনো তো খুলি নাই
পুঁথি
পাঠাভ্যাসই হয় নাই কীভা করবো বলো নিখুঁত তুলনা
কীভাবে দেখাবো মিল, অনুপ্রাস, শব্দের ব্যঞ্জনা
তোমার দেহের কাছে মূখ্য ছাড়া আর কিছু নই!
তেমন যোগ্যতা নাই তোমাকে সামান্যতম মর্মোদ্ধার করি
এখনো হয়নি পড়া কাদামাটি, পাঁচটি আঙুল
রহস্যের কথা থাক তোমার সরল অর্থ তাই খুঁজে পাইনি
কোথাও,
এখনো হয়নি শেখা বাস্তবিকই মূর্তি নয় পোড়ামাটি কিংবা অঙ্গার
তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি আদিঅন্ত নিয়ত আঁধার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1523
|
3890
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
শেষের মধ্যে অশেষ আছে
|
ভক্তিমূলক
|
শেষের মধ্যে অশেষ আছে
এই কথাটি মনে,
আজকে আমার গানের শেষে
জাগছে ক্ষণে ক্ষণে।
সুর গিয়েছে থেমে তবু
থামতে যেন চায় না কভু,
নীরবতায় বাজছে বীণা
বিনা প্রয়োজনে।তারে যখন আঘাত লাগে,
বাজে যখন সুরে--
সবার চেয়ে বড়ো যে গান
সে রয় বহুদূরে।
সকল আলাপ গেলে থেমে
শান্ত বীণায় আসে নেমে,
সন্ধ্যা যেমন দিনের শেষে
বাজে গভীর স্বনে। কলিকাতা, ২৬ শ্রাবণ, ১৩১৭
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shesher-modhye-ashesh-ache/
|
247
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ঈদ মোবারক
|
মানবতাবাদী
|
শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,
কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো,
বরষের পরে আসিলে ঈদ!
ভুখারীর দ্বারে সওগাত ব'ইয়ে রিজওয়ানের,
কন্টক-বনে আশ্বাস এনে গুল- বাগের,
সাকীরে "জা'মের দিলে তাগিদ!খুশীর পাপিয়া পিউ পিউ গাহে দিগ্বিদিক
বধূ জাগে আজ নিশীথ-বাসরে নির্নিমিখ!
কোথা ফুলদানী, কাঁদিছে ফুল,
সুদূর প্রবাসে ঘুম নাহি আসে কার সখার,
মনে পড়ে শুধু সোঁদা-সোঁদা বাস এলো খোঁপার,
আকুল কবরী উলঝলুল!ওগো কাল সাঁঝে দ্বিতীয়া চাঁদের ইশারা কোন
মুজদা এনেছে, সুখে ডগমগ মুকুলী মন!
আশাবরী- সুরে ঝুরে সানাই।
আতর-সুবাসে কাতর হ'ল গো পাথর-দিল,
দিলে দিলে আজ বন্ধকী দেনা-নাই দলিল,
কবুলিয়তের নাই বালাই।।আজিকে এজিদে হাসেনে হোসেনে গলাগলি,
দোযখে বেহেশতে সুল ও আগুনে ঢলাঢলি,
শিরী ফরহাদে জড়াহড়ি!
সাপিনীর মত বেঁধেছে লায়লী কায়েসে গো,
বাহুর বন্ধে চোখ বুঁজে বঁধু আয়েসে গো,
গালে গালে চুমু গরাগড়ি।।দাউ- দাউ জ্বলে আজি স্ফূর্তির জাহান্নাম,
শয়তান আজ বেহেশতে বিলায় শরাব-জাম,
দুশম্ন দস্ত এক-জামাত!
আজি আরফাত-ময়দান পাতা গাঁয়ে- গাঁয়ে,
কোলাকুলি করে বাদশা ফকীরে ভায়ে-ভায়ে,
কা'বা ধ'রে নাচে 'লাত-মানাত'।।আজি ইসলামী ডঙ্কা গরজে ভরি' জাহান,
নাই বড় ছোট-সকল মানুষ এক সমান,
রাজা প্রজা নয় কারো কেহ।
কে আমীর তুমি নওয়াব বাদশা বালাখানায়?
সকল কালের কলঙ্ক তুমি; জাগালে হায়
ইসলামে তুমি সন্দেহ।।ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,
সুখ-দুখ সম-ভাগ করে নেব সকলে ভাই,
নাই অধিকার সঞ্চয়ের!
কারো আঁখি-জলে কারো ঝাড়ে কি রে জ্বলিবে দীপ?
দু'জনার হবে বুলন্দ-নসীব, লাখে লাঝে হবে বদ-নসীব?
এ নহে বিধান ইসলামের।।ঈদ-অল-ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান,
ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান,
ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার!
ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,
তৃষ্ণাতুরের হিসসা আছে ও-পেয়ালাতে,
দিয়া ভোগ কর, বীর দেদার।।বুক খালি ক'রে আপনারে আজ দাও জাকাত,
করো না হিসাবী, আজি হিসাবের অঙ্কপাত!
একদিন করো ভুল হিসাব।
দিলে দিলে আজ খুন্সুড়ি করে দিললগী,
আজিকে ছায়েলা-লায়েলা-চুমায় লাল যোগী!
জামশেদ বেঁচে চায় শরাব।।পথে পথে আজ হাঁকিব, বন্ধু, ঈদ মোবারক! আসসালাম!
ঠোঁটে ঠোঁটে আজ বিলাব শিরনী ফুল-কালাম!
বিলিয়ে দেওয়ার আজিকে ঈদ!
আমার দানের অনুরাগে-রাঙা 'ঈদগা'রে!
সকলের হাতে দিয়ে দিয়ে আজ আপনারে-
দেহ নয়, দিল হবে শহীদ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/eid-mubarak/
|
1595
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
জোড়া খুন
|
চিন্তামূলক
|
লোভ আমাকে অরণ্যের দিকে টেনে আনে।
তারপর
অচেনা সেই অরণ্যের মধ্যে
ভয় আমাকে দিগ্বিদিকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়।
আমি ঠিক করেছিলুম,
আমার এই যুগল-শত্রুকে আমি শেষ না করে ছাড়ব না।
আগে আমি লোভের মরামুখ দেখব।
তারপর ভয়ের।
কিন্তু দ্যাখো, কী আশ্চর্য,
লোভের গলায়
আমার দীর্ঘ ও শাণিত ছুরিখানাকে আমূল বিঁধিয়ে দিয়ে
যেই আমি চেঁচিয়ে বলে উঠেছি,
“কিছুই আমি চাই না,”
ভয়ও অমনি, চুপসে-যাওয়া একটা বস্তার মতো, আমার পায়ের তলায়
লুটিয়ে পড়ল।
কখন আলো ফুটেছে, আমি জানি না।
আমি শুনতে পাচ্ছি,
দূর থেকে ভেসে আসছে সূর্যোদয়ের গান।
উদ্দীপক সুরার মতো
সেই গানের সুর ছড়িয়ে যাচ্ছে আমার রক্তে।
শরীরটা খুব হালকা লাগছে।
মনে হচ্ছে,
একটা মস্ত বড় ব্যাধির থেকে আমি মুক্ত হয়ে উঠলুম।
আমার সামনে ছিল লোভ।
আমার পিছনে ছিল ভয়।
আমি ভেবেছিলুম,
একে-একে আমি তাদের মোকাবিলা করব।
কিন্তু তার আর দরকার হল না,
একজনকে আক্রমণ করবার সঙ্গে-সঙ্গেই দেখতে পেলুম,
অন্যজনও ফতুর হয়ে গেছে।
আবিরের থালা হাতে নিয়ে আকাশ আমার মুখ দেখছে।
পাখিরা আমার বন্দনা গাইছে।
বৃক্ষ ও লতা বাতাসে নত হয়ে
নমস্কার করছে আমাকে।
জোড়া খুনের সমাধা করে, বাঁ পা এর লাথি মেরে
আমার দুই জন্মশত্রুর মৃতদেহকে একটা নালার মধ্যে ঠেলে দিয়ে
শিস দিতে দিতে
অরণ্য থেকে আমি বেরিয়ে এলুম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1599
|
1759
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
আত্মচরিত ০১
|
চিন্তামূলক
|
যখন ছ’সাত বছর বয়স
ঈশ্বর আকাশে কাঁপতেন কখন কী করে বসি
তাঁর নিপুণ সংসারে।
এক একটা আস্ত পুকুর এবং গগুুষে গিলে
আবার অন্য পুকুরে রুই কাতলার ভিতরে ডুবসাঁতার।
জল থেকে উপড়ে আনা শালুক ছিল
অবিকল রাজকন্যের মুখ।
এখন চল্লিশ।
এখন রক্তক্ষরণের শব্দে বুকের নিশ্বাস নিভে যায়।
যখন সাত-আট বছর বয়স
ঝকঝকে চোখ বলিদানের কাতান
বুকে ঢাক ঢোল কাঁসর ঘন্টা দিনরাতের পুজো পার্বণ
পা দুটো রাণা প্রতাপের চৈতক
চৈত-বোশেখের ঝড়ে কেবল ছুটছে ব্রক্ষান্ডের গায়ে লাথি মেরে।
ঈশ্বর সারাটা দুপুর আকাশে থাকতেন পাহারায়,
পাছে ঐ দুর্দান্ত বয়সটা আকাশের পথ চিনে ফেলে।
এখন চল্লিশ।
এখন নিশ্বাসের ভিতর কেবল স্বপ্নের দরজা ভাঙে।
যখন আঠারো বছর বয়স
দীর্ঘকার এক মন্দির তুলেচিলাম নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে
তার ভিতরে ধুপ, ধুপের ভিতরে পুস্পগন্ধ, পুস্পের ভিতরে নারী
নারীর ভিতরে আকাশময় ওষ্ঠ, ওষ্ঠের ভিতরে কেবল প্রবহমান চুম্বন।
এখন চল্লিশ।
এখন স্বপ্নের ভিতরে ঈশ্বরের তুমুল অট্রহাসি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1223
|
5905
|
সুব্রত পাল
|
তোমার দুর্গা আমার দুর্গা
|
মানবতাবাদী
|
তোমার দুর্গা মহালয়া ভোরে শরৎ মাখছে গায়
আমার দুর্গা এখনো দেখছি ফুটপাতে জন্মায়।তোমার দুর্গা অকালবোধন একশো আটটা ফুল
আমার দুর্গা দূর থেকে দ্যাখে খিচুড়ির ইস্কুল।তোমার দুর্গা আগমনী গান গিরিরাজ কন্যার
আমার দুর্গা ঘর দোর ভাসা বাঁধ ভাঙা বন্যার।তোমার দুর্গা প্রতিবার আসে বাবা মা’র বাড়িতেই
আমার দুর্গা মা’র কোলে পিঠে, বাবার খবর নেই।তোমার দুর্গা টেক্কা দিয়েছে এবার থিমের পুজো
আমার দুর্গা ইট বয়ে বয়ে এক্কেবারেই কুঁজো।তোমার দুর্গা হুল্লোড়ে মাতে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে
আমার দুর্গা বাঁচতে শিখছে অতীতকে ছুঁড়ে ফেলে।তোমার দুর্গা আলো ঝলমল চেনে না অন্ধকার
আমার দুর্গা রোজ সেজে গুজে খোঁজে তার সংসার।তোমার দুর্গা শপিং মলের কফির ধোঁয়ায় ওড়ে
আমার দুর্গা চা বানাচ্ছে, তিন রাস্তার মোড়ে।তোমার দুর্গা বহুজাতিকের বহুজনহিতায়চ
আমার দুর্গা কালকে যেমন, আজো তথৈবচ।তোমার দুর্গা ছবির ফ্রেমের শিউলি এবং কাশে
আমার দুর্গা এখনো আশায় কেউ যদি ভালোবাসে।তোমার দুর্গা ধুনুচি নাচের ঢ্যাম্ কুড় কুড় ঢাকে
আমার দুর্গা ঘুরেই মরছে দশচক্রের পাকে।তোমার দুর্গা অঢেল খাবার অঢেল নষ্ট হয়
আমার দুর্গা দিন আনাআনি কিছু নেই সঞ্চয়।তোমার দুর্গা কুলকুল নদী, স্নেহের প্রথম পাঠ
আমার দুর্গা নখের আঁচড়ে ভয়েই শুকিয়ে কাঠ।তোমার দুর্গা অস্ত্র শানায় সিংহবাহিনী রূপ
আমার দুর্গা কাঁদতে কাঁদতে নির্বাক, নিশ্চুপ।তোমার দুর্গা দশভুজা হয়ে অসুরের মাথা কাটে
আমার দুর্গা অপুষ্টি নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে হাঁটে।আমার দুর্গা কবে বলো আর তোমার দুর্গা হবে ?
আমার আকাশ ভরবে তোমার উৎসবে উৎসবে !!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be/
|
4740
|
শামসুর রাহমান
|
জ্যোৎস্নায় ভাসছে ঢাকা
|
রূপক
|
জ্যোৎস্নায় ভাসছে ঢাকা, অবসন্ন হাটুরের মতো বসে আছি
হাঁটু মুড়ে নগর ভেলায়।
এ এক প্রকৃত খেলা, এই ভেসে-যাওয়া তীরবর্তী শোভা দেখে,
জ্যোৎস্নার মাধ্যমে গড়ে তোলা মধুর সম্পর্ক কোনো
মহিলার সাথে।
বাতিল প্রেমিক যদি ফের খুঁজে পায় বেলাবেলি সম্প্রীতির ডেরা,
তাহ’লে সে নীলিমাকে জানিয়ে অভিবাদন, প্রায়
ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে উড়ে উড়ে অপরাহ্নে
ঘাসের অম্লান সবুজকে চুমু খেয়ে, হাত রেখে
খরগোশ অথবা কাঠবিড়ালীর পিঠে, হাত রেখে
খরগোশ অথবা কাঠবিড়ালীর পিঠে, দেয়ালের শ্যাওলায়
মগ্ন হবে গৃহপ্রবেশের সূরে এক লহমায়। কয়েক শতাব্দী তার
আঙুলে উঠবে নেচে, দেশলাই জ্বালালে আঁধারে
প্রাচীন দেয়ালচিত্র অকস্মাৎ হবে উন্মোচিত, বুঝিবা আহত হবে
কাতর হৃদয় তার অতীতের অসামাজিকতা হেতু আর
রাখবে সে চোখ টিকটিকি কিংবা বাতির ওপর।জ্যোৎস্নায় ভাসছে ঢাকা, ঢাকাও মরাল হতে জানে
পূর্ণিমায়, দেখে নিই। যেন দরদালান সমেত যাচ্ছে উড়ে
দুলিয়ে বিপুল ডানা মগজের জ্যোৎস্নায় আমার।
ওলোট-পালোট কত স্মৃতি গোলাপের মতো ঝরে
এখন আমাকে ঘিরে, ঘ্রাণে নেশাতুর হয়ে পড়ি।
শৈশব কাঠের ঘোড়া চেপে আসে, যৌবনের খর দিনগুলি,
রাত্রিগুলি খুব মেশামেশি করে রক্ত কণিকায়,চামর দোলায় কোন, অব্যক্ত তরুণী, তবু কিছু স্বেদচিহ্ন
থেকে যায় আমার এ শরীর-পেরুনো অন্য এক অবয়বে।
জ্যোৎস্নায় ভাসছে ঢাকা, আমিও ভাসছি ক্রমাগত।
জ্যোৎস্নায় ভাসছে, ঢাকা ওরা মৃত, ওরা পূর্বগামী পরিজন,
বুঝি ওরা বারংবার মরীচিকার চিৎকার শুনে
ছুটে গেছে, কোথায় যে মরুদ্যান প্রস্রবণ নিয়ে
আমন্ত্রণে উন্মুখর বেলা শেষে, করেনি খেয়াল। ওরা মৃত,
ভ্রান্তির গহ্বরে ওরা হারিয়ে ফেলেছে কণ্ঠস্বর।
দেখি প্লেগ-কবলিত শহরের মতো
ক্রুর অমাবস্যার এলাকা-
ছিন্নভিন্ন জামা, জীর্ণ জুতো পড়ে আছে ইতস্ততঃ
কাঁটাগুল্ম, পাথরের মধ্যে, ফুলের কেয়ারিগুলি ভরে ওঠে
পচা নাড়িভুড়ি আর হাড়গোড়ে। দেখি কতিপয়
ন্যাংটো লোক পথে
করছে বপন মৃত্যু,-আমি কি অসুস্থ হয়ে পড়ছি তাহ’লে?আমার অসুখ বলে ঢাকা মন খারাপ করেছে।
ওর চোখে-মুখে বিষণ্নতা জেগে থাকে সারাক্ষণ,
যত বলি ফুল্ল স্বরে, ভেবোনা লক্ষ্মীটি, আমি খুব
তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবো, দেখে নিও,
তত সে খারাপ করে মন, চোখে জমে অশ্রুকণা,
আমার শিয়রে বসে থাকে ঠিক নার্সের ধরনে।
জ্যোৎস্নায় ভাসছো তুমি ঢাকা বেসামাল পূর্ণিমায়।
যাবো না স্বাস্থ্যের লোভে কোনো শৈলাবাসে,
তুমি আছি থেকো তুমি আমার অসুখ সেরে যাবে।
জ্বরদগ্ধ চোখে দেখি জ্যোৎস্না-ধোয়া স্নেহজাত পথ্য
তার হাতে নাচ আর রোজ নিয়ে আসে কিছু ফুল
রোগীর টেবিলে সুখ ফোটানোর অমল উদ্দেশ্যে।
আমার অস্তিত্ব থেকে অসুখের ছায়া সরে যাচ্ছে, দেখে যাও। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jyotsnay-vasche-dhaka/
|
924
|
জীবনানন্দ দাশ
|
আজ
|
চিন্তামূলক
|
অন্ধ সাগরের বেগে উৎসারিত রাত্রির মতন
আলোড়ন মানুষের প্রিয়তর দিক নির্ণয়ের
পথ আজ প্রতিহত; তবুও কোথাও
নির্মল সন্ততি দেশ সময়ের নব নব তীর-
পেতে পায়ে হয়তো বা মানব হৃদয়;মহাপতনের দিনে আজ অবহিত হয়ে নিতে হয়।
যদিও অধীর লক্ষ্যে অন্ধকারে মানুষ চলেছে
ধ্বংস আশা বেদনায়বন্য মরালের মত চেতনায় নীল কুয়াশায়,-
কুহেলি সরিয়ে তবু মানুষের কাহিনীর পথে
ভাস্বরতা এসে পড়ে মাঝে মাঝে-
স্বচ্ছ ক্রান্তিবলয়ের মতন জগতে।মনে হয় মহানিশীথের স্তন্যপায়ী
মানুষ তবুও শিশুসূর্যের সন্তান,
স্থিরতর বিষয়ী সে,-
যদিও হৃদয়ে রক্তে আজো ভুল অকূলের গান।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/aaj/
|
5832
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
বাড়ি ফেরা
|
চিন্তামূলক
|
রাত্তির সাড়ে বারোটায় বৃষ্টি, দুপুরে অত্যন্ত শুক্নো এবং ঝক্্ঝকে
ছিল পথ, মেঘ থেকে কাদা ঝরেছে, খুবই দুঃখিত মূর্তি একা
হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে, কালো ভিজে চুপচাপ দ্বিধায়
ট্রাম বাস বন্ধ, রিক্সা ট্যাক্সি-পকেটে নেই, পৃথিবী তল্লাসী হয়ে গেছে পরশুদিন
পুলিশের হাতে শাস্তি এখন, অথবা নির্জনতাই প্রধান অস্ত্র এই বুধবার রাত্তিরে।
অনেক মোটরকারের শব্দ হয় না, ঘুমন্ত হেডলাইট, শুধু পাপপূণ্য
অত্যন্ত সশব্দে জেগে আছে, কতই তো প্রতিষ্ঠান উঠে যায়, ওরা শুধু
ঘাড়হীন অমর-গোঁয়ার।
মশারী ব্যবসায়ীদের মুন্ডুপাত হচ্ছে নর্দমায়, কলকন্ঠে, ঘুমহীন ঘুম
শিকে নিয়েছে ট্রাক ড্রাইভার। দু’পাশের আলো-জ্বলা অথবা
অন্ধকার ঘরগুলোয়
জন্মনিয়ন্ত্রণ জনপ্রিয় হয়নি। অসার্থক যৌন ত্রিয়ার পর
বারান্দায় বিড়ি খাচ্ছে বুড়ো লোটা, ঘন ঘন আগুনের চিহ্ন দেখে
বোঝা যায় কী তীব্র ওর দুঃখ! মৃত্যুর খুব কাছাকাছি-
হয়তো লোকটা
গত দশ বছর ধরে মরে গেছে, আমি বেঁচে আছি আঠাশ বছর।
সাত মাইল পদশব্দ শুনে কেউ পাগলামীর সীমা ছুঁয়ে যায় না
এ রাস্তা অনন্তে যায়নি, ডাদিকে বেঁকে কামিনী পুকুরে
দুই ব্রীজের নিচে জল, পাৎলুন গোটানো হলো, এই ঠান্ডা স্পর্শ
একাকী মানুষকে বড় অনুতাপ এনে দেয়-
লইট পোস্টে ওঠে বাল্ব চুরি করছে একজন, এই চোট্ট, তোর পকেটে
দেশলই আছে?
বহুক্ষণ সিগারেট খাইনি তাই একা লাগছে, দেশলাইটা নিয়ে নিলাম
ফেরত পাবি না
বল্ব চুরি করেই বাপু খুশি থাক না, দু’রকম আলো বা আগুন
এক জীবনে হয় না!….ভাগ শালা…..
ও-পাশে নীরেনবাবুর বাড়ি, থাক। এ-সময় যাওয়া চলে না- ডাকাতের
ছদ্মবেশ ছাড়া
চায়ের ফরমাস করলে নিশ্চয়ই চা খওয়াতেন, তিনদিন পরে
অন্য প্রসঙ্গে ভর্ৎসনা
একটু দূরে রিটায়ার্ড জজসাহেবের সুরম্য হর্ম্যের
দেয়াল চকচকে শাদা, কী আশ্চর্য, আজো শাদা! টুকরো কাটকয়লায়
লিখে যাবো নাকি, আমি এসেছিলাম, যমদূত, ঘমন্ত দেখে ফিরে গেলম
কাল ফের আসবো, ইতিমধ্যে মায়াপাশ ছিন্ন করে রাখবেন নিশ্চই!
কুত্তারা পথ ছাড়! আমি চোর বা জোচ্ছোর নই, অথবা ভূত প্রেত
সমান্য মানুষ একা ফিরে যাচ্ছি নিজের বড়িতে
পথ ভুল হয়নি, ঠান্ডা চাবিটা পকেটে, বন্ধ দরজার সামনে থেমে
তিনবার নিজের নাম ধরে হাকবো, এবং তৎক্ষাণাৎ সুইচ টিপে
এলোমেলো অন্ধকার সরিয়ে
আয়নায় নিজের মুখ চিনে নিয়ে বারান্দা পেরিয়ে ঢুকবো ঘরে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1873
|
269
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
কর্থ্যভাষা
|
ছড়া
|
কর্থ্যভাষা কইতে নারি শুর্দ্ধ কথা ভিন্ন।
নেড়ায় আমি নিম্ন বলি (কারণ) ছেঁড়ায় বলি ছিন্ন॥
গোঁসাইকে কই গোস্বামী, তাই মশাইকে মোর্স্বামী।
বানকে বলি বন্যা, আর কানকে কন্যা কই আমি॥
চাষায় আমি চশ্শ বলি, আশায় বলি অশ্ব।
কোটকে বলি কোষ্ঠ, আর নাসায় বলি নস্য॥
শশারে কই শিষ্য আমি, ভাষারে কই ভীষ্ম।
পিসিরে কই পিষ্টক আর মাসিরে মাহিষ্য॥
পুকুরকে কই প্রুষ্করিণী, কুকুরকে কই ক্রুক্কু।
বদনকে কই বদনা, আর গাড়ুকে গুড়ুক্কু॥
চাঁড়ালকে কই চণ্ডাল, তাই আড়ালকে অণ্ডাল।
শালারে কই শলাকা, আর কালায় বলি কঙ্কাল॥
শ্বশুরকে কই শ্মশ্রু, আর দাদাকে কই দদ্রু।
বামারে কই বম্বু, আর কাদারে কই কদ্রু॥
আরও অনেক বাত্রা জানি, বুঝলে ভায়া মিন্টু।
ভেবেছ সব শিখে নেবে, বলছিনে আর কিন্তু॥ (ঝড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/korthyovasha/
|
670
|
জয় গোস্বামী
|
ঝাউ
|
মানবতাবাদী
|
মিত্রা দিদি, তোমাকে নিয়ে কাব্য
লেখেনি কোন পুরুষ কোন দিন।
গলির মোড়ে বাজেনি সম্মিলিত
শীৎকার, বখাটে ছেলেদের।
তোমাকে দেখতে আসেনি পাত্রপক্ষ,
এসেছিল শুধু মেপে নিতে,
তোমার বুক, চুল, নিতম্ব
যাবতীয় সব শারিরিক।
কত বার গেছ তুমি কামরূপ-কামাক্ষা ?
কত বার ছুঁয়েছ তুমি কাম পীঠে সিঁদুর ?
কত বার পাল্টেছ জ্যোতিষি তুমি ?
কত বার করিয়েছ জাদুটোনা ?
কত যুগ উপবাসী তুমি ঢেলেছ দুগ্ধ,
সুগঠিত শিবলিঙ্গে ?
সে খবর জানে শুধু,
একলা রাতের পাশ বালিশ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রমিত্রা দিদি, তোমাকে নিয়ে কাব্য
লেখেনি কোন পুরুষ কোন দিন।
গলির মোড়ে বাজেনি সম্মিলিত
শীৎকার, বখাটে ছেলেদের।
তোমাকে দেখতে আসেনি পাত্রপক্ষ,
এসেছিল শুধু মেপে নিতে,
তোমার বুক, চুল, নিতম্ব
যাবতীয় সব শারিরিক।
কত বার গেছ তুমি কামরূপ-কামাক্ষা ?
কত বার ছুঁয়েছ তুমি কাম পীঠে সিঁদুর ?
কত বার পাল্টেছ জ্যোতিষি তুমি ?
কত বার করিয়েছ জাদুটোনা ?
কত যুগ উপবাসী তুমি ঢেলেছ দুগ্ধ,
সুগঠিত শিবলিঙ্গে ?
সে খবর জানে শুধু,
একলা রাতের পাশ বালিশ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রমিত্রা দিদি, তোমাকে নিয়ে কাব্য
লেখেনি কোন পুরুষ কোন দিন।
গলির মোড়ে বাজেনি সম্মিলিত
শীৎকার, বখাটে ছেলেদের।
তোমাকে দেখতে আসেনি পাত্রপক্ষ,
এসেছিল শুধু মেপে নিতে,
তোমার বুক, চুল, নিতম্ব
যাবতীয় সব শারিরিক।
কত বার গেছ তুমি কামরূপ-কামাক্ষা ?
কত বার ছুঁয়েছ তুমি কাম পীঠে সিঁদুর ?
কত বার পাল্টেছ জ্যোতিষি তুমি ?
কত বার করিয়েছ জাদুটোনা ?
কত যুগ উপবাসী তুমি ঢেলেছ দুগ্ধ,
সুগঠিত শিবলিঙ্গে ?
সে খবর জানে শুধু,
একলা রাতের পাশ বালিশ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রমিত্রা দিদি, তোমাকে নিয়ে কাব্য
লেখেনি কোন পুরুষ কোন দিন।
গলির মোড়ে বাজেনি সম্মিলিত
শীৎকার, বখাটে ছেলেদের।
তোমাকে দেখতে আসেনি পাত্রপক্ষ,
এসেছিল শুধু মেপে নিতে,
তোমার বুক, চুল, নিতম্ব
যাবতীয় সব শারিরিক।
কত বার গেছ তুমি কামরূপ-কামাক্ষা ?
কত বার ছুঁয়েছ তুমি কাম পীঠে সিঁদুর ?
কত বার পাল্টেছ জ্যোতিষি তুমি ?
কত বার করিয়েছ জাদুটোনা ?
কত যুগ উপবাসী তুমি ঢেলেছ দুগ্ধ,
সুগঠিত শিবলিঙ্গে ?
সে খবর জানে শুধু,
একলা রাতের পাশ বালিশ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9d%e0%a6%be%e0%a6%89-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be/
|
4699
|
শামসুর রাহমান
|
চতুর্দশপদী
|
সনেট
|
মনে পড়ে কোনোদিন আমাদের আবদ্ধ জলায়
চিলে তুমি রাজহংসী। শ্যাওয়ার পিছল সবুজে
কখনো হয়নি ম্লান শাদা পাখা, আলো খুঁজে খুঁজে
গ্নণ্ডি ছেড়ে চলে গেছো বহু দূরে। তোমার চলায়
এ-কাল মেলেছে দল। প্রতারণা কি ছলাকলায়
আনোনি বিভ্রম কোনো মগ্ধ চোখে; স্বপ্নের গম্বুজে
বাধোনি সুখের বাসা মসৃণ আরামে চোখ বুজে
এবং হওনি বিদ্ধ শিকারীর তীরের ফলায়।জলার কাদায় আজো আমাদের চঞ্চু, পাখা ডোবে,-
মজে থাকি অধঃপাতে। মধ্যে-মধ্যে হাই তুলি, ভাবি
এখন কোথায় তুমি? বুঝি না দারুণ সর্বনাশ
পেতেছে জটিল ফাঁদ আমাদের অস্তিত্বের লোভে।
উড়ো কথা কানে আসেঃ মেটাতে এ জীবনের দাবি
ইতিমধ্যে এমন কি তুমিও হয়েছো পাতিহাঁস। (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/choturdoshpodi/
|
1911
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
স্বপ্নের
|
চিন্তামূলক
|
রাত্রিবেলা বুকের মধ্যে একগোছা বৈদ্যুতিক তার
আর নীল রঙের একটা বালব টাঙিয়ে রাখা ভালো।
অন্ধকারে গায়ে নীল রঙের জামা পরিয়ে দিলে
স্বপ্ন দেখার দরজা খুলে দেয় সে।মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক খাটে
স্বপ্ন দেখার আলাদা কোনো বিছানা-বালিশ নেই।
অবিকল স্বপ্নের মতো নারীরও শুয়ে নেই কোনো খাটে।স্বপ্নের মধ্যে ছাড়া আর কোথায়
আকাশময় উলুউলু?
গায়ে-হলুদের গন্ধে আকাশ পাতাল জুড়ে ফুলশয্যা?
স্বপ্নের মধ্যেই বুক-পিঠের অসুখ-বিসুখে সরিয়ে
অবিরল জলপ্রপাতে অবিবেচকের মতো কেবল ঝরে যাওয়া
নানান নদীতে।স্বপ্নেই শুধু দ্বিতীয়বার ফিরে পাওয়া যায় শৈশব।
সব ধুলোবালি খোলামকুচি, সব উড়ে-যাওয়া আঁচল
রঙীন পরকলা জুড়ে জুড়ে আঁকা সব মুখচ্ছবি
বৃষ্টি বাদলের ভিজে গন্ধের ভিতরে লুকিয়ে কাঁদার সুখ।
স্বপ্নেই শুধু আরেকবার অগাধ জলের ভিতর থেকে
মুখ তুলে তাকায় ছেলেবেলার লাল শালুক।মোহিনী কলসগুলি যতদূর ভেসে যেতে চায়
ততদূর স্বপ্নের বিছানা।আরও দেখুনঃ পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%87%e0%a6%a8/
|
4212
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন
|
প্রেমমূলক
|
একটি জীবন পোড়ে, শুধুই পোড়ে
আকাশ মেঘ বৃষ্টি এবং ঝড়
ফুলছে নদী যেন তেপান্তর
চতুর্দিকে শীতল সর্বনাশে-
পেয়েছে, যাকে পায়নি কোনোদিনও
একটি জীবন পোড়ে, কেবল পোড়ে
আর যেন তার কাজ ছিল না কোনো
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/chinno-bichinno/
|
1153
|
জীবনানন্দ দাশ
|
মহাগোধূলি
|
প্রকৃতিমূলক
|
সোনালী খড়ের ভারে অলস গোরুর গাড়ি—বিকেলের রোদ প’ড়ে আসে
কালো নীল হলদে পাখিরা ডানা ঝাপটায় ক্ষেতের ভাঁড়ারে,
শাদা পথ ধুলো মাছি—ঘুম হয়ে মিশিছে আকাশে,
অস্ত-সূর্য গা এলিয়ে অড়র ক্ষেতের পারে-পারেশুয়ে থাকে; রক্তে তার এসেছে ঘুমের স্বাদ এখন নির্জনে;
আসন্ন এ-ক্ষেতটিকে ভালো লাগে—চোখে অগ্নি তার
নিভে-নিভে জেগে ওঠে;—স্নিগ্ধ কালো অঙ্গারের গন্ধ এসে মনে
একদিন আগুনকে দেবে নিস্তার।কোথায় চার্টার প্যাক্ট কমিশন প্ল্যান ক্ষয় হয়;
কেন হিংসা ঈর্ষা গ্লানি ক্লান্তি ভয় রক্ত কলরবঃ
বুদ্ধের মৃত্যুর পরে যেই তন্বী ভিক্ষুণীকে এই প্রশ্ন আমার হৃদয়
ক’রে চুপ হয়েছিল—আজও সময়ের কাছে তেমনই নীরব।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/mohagodhulii/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.