id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
5569
|
সুকুমার রায়
|
আদুরে পুতুল
|
ছড়া
|
ঝিকিমিকি চোখ মিটমিটি চায় ঠোঁট দুটি তায় টাট্কা লাল।
মোমের পুতুল ঘুমিয়ে থাকুক দাঁত মেলে আর চুল খুলে-
টিনের পুতুল চীনের পুতুল কেউ কি এমন তুলতুলে?
গোব্দা গড়ন এম্নি ধরন আব্দারে কেউ ঠোট ফুলোয়?
মখমলি রং মিষ্টি নরম – দেখছ কেমন হাত বুলোয়!
বলবি কি বল হাব্লা পাগল আবোল তাবোল কান ঘেঁষে,
ফোক্লা গদাই যা বল্বি তাই ছাপিয়ে পাঠাই “সন্দেশে”।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/348
|
5347
|
শামসুর রাহমান
|
হৃদয় তোমার অপরাধ
|
চিন্তামূলক
|
হৃদয় তোমার অপরাধ নিয়ে কানাঘুষো চলে
নানান পাড়ায়, কলোনির ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে, অপবাদ
দেয় অনেকেই, কারো কারো মনের জ্বলুনি বেড়ে
যায়, তেড়ে আসে মাস্তানেরা আর প্রকাশ্যে শাসায়
কেউ কেউ। কিছু তোমার বোধগম্য নয়, যদি
বলো, কারো হবে না বিশ্বাস, কেউ ছাড়বে না পিছু,
উপরন্তু চাঁই যারা, তারা তোমাকে সর্বদা মাথা
নিচু করে থাকবার দেবেন নির্দেশ। শেষমেশ
জলচল বন্ধ হবে; ক্রমে ‘ওর নির্বাসন চাই’
বলে স্লোগানের ধুম পড়বে রাস্তায় পুরো দমে।আকাশে ফুটলে তারা বাগানে রক্তজবা,
হে হৃদয়, তোমার দু’চোখ জ্বলে ওঠে; অকস্মাৎ
কোনো তরুণীর মুখ দেখে শিরায় শিরায় জাগে
ঢেউ, তীব্র অনুরাগে তুমি পুড়ে যেতে যেত গান
গাও দীপকের সুরে-এটাই তো কসুর তোমার,
যতদূর জানি; নাকি খুব একা-একা থাকে, তাই
বরাদ্দ তোমার জন্যে কাঠগড়া! যেন সমাজের
ভরাডুবি তোমার সকল কাজে ভর করে আছে!
নিজের ভেতর থেকে কস্মিনকালেও মুছে যেতে
পারো না বলেই ক্রুদ্ধ তর্জনীর হয়েছ শিকার। (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/hridoy-tomar-oporadh/
|
5838
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ভাই ও বন্ধু
|
চিন্তামূলক
|
আমার যমজ ভাই দুঃখ, আজ বহুদিন পলাতক
তার খোঁজে ইতিউতি যাবো- ইদানিং সময় পাই না
মাঝে-মাঝে কেউ বলে, তোমার ভাইকে কাল দেখলুম হে
চুপচাপ জারুল গাছে নিচে বৃষ্টিতে ভিজছিল
একটু আনমনা হই, উপন্যাস লেখা থেকে চোখ তুলে
শাদা দেয়ালের দিকে…..
গুপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে- নিজেকে ঠেকিয়ে বলি
সে অনেক বদলে গেছে,
সে আর আমার মতো নেই
আমার যমজ ভাই দুঃখ, আজ বহুদিন পলাতক!
আমার বন্ধুর নাম চিরঋতু, সে অনেক আগেকার কথা
তখন বাতাস ছিল হিরন্ময়
তখন আকাশ ছিল অতি ব্যক্তিগত
তখন মাংসের লোভে যাইনি আমরা কেউ উঁচু প্রতিষ্ঠানে
তরল আগুন খেয়ে মাঝরাতে দেখিয়েছি হাজার ম্যাজিক
তখন বাতাস ছিল…. তখন আকাশ ছিল….. সে অনেক
আগেকার কথা!
এখন অন্যের বাড়ি অকস্মাৎ ঢুকে পড়লে সব কথা
থেমে যায়
বিষয় বদলাতে গিয়ে গ্রীষ্মকালে কেউ শীতে কাঁপে
এমনকি নীরারাও……
আমার কঠিন মুখ, আচমকা কর্কশ বাক্য….. নিজেই চমকে উঠি
যেন এক রণেক্ষেত্র, পিঠ ফেরালেই আছে শত-শত তীর
আমার বন্ধুর নাম চিরঋতু….চিরঋতু? ঠিক নাম
মনে রেখেছি তো?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1842
|
4547
|
শামসুর রাহমান
|
কবিতাকে পূর্ণতা দেয়ার বাসনায়
|
রূপক
|
কখন যে আমাকে ভীষণ এক পশু এ পাড়ায়
তাড়িয়ে এনেছে, টের পাইনি। তা’হলে এতক্ষণ
দুঃস্বপ্ন দেখেছি ঘুমে? মনে
হলো সারা শরীরে রয়েছে
গাঁথা সারি সারি কাঁটা। কেন
এই শাস্তি ভোগ করে চলেছি, বুঝি না কিছুতেই।কখনও কখনও ক্ষণকাল অপরূপ গাছঘেরা
হ্রদের কিনারে দেখি নিজেকে শায়িত। কানে আসে
পাখিদের সুরেলা আওয়াজ। অপক্ষণে মনে হয়, কারা যেন
চুপিসারে চলে গেলো অজানায়। আমি ঘাসময়
মাটি থেকে উঠে আস্তে গা ঝেড়ে এগোই
অন্যদিকে ভিন্ন দৃশ্য দেখার আশায়। আসমানে জাগে চাঁদ।ঘুরতে ঘুরতে কোথায় যে চলে যাই, ঠিক বুঝে
ওঠা ঢের মুশকিল। কানামাছি খেলার ধরনে
প্রকৃত গন্তব্যে পৌঁছে স্বস্তি বোধ করা হয় না সহজ আর।
ঝরিয়ে প্রচুর ঘাম ডানে বামে শেষে
বস্তুত নিজের নির্বুদ্ধিতা ভীষণ অসহ্য লাগে। ঘরে ফিরে
ক্লান্তির অসহ্য চাপ দু’ চোখে ঘুমের ছায়া মাখে।সকালে যখন ঘুম ভাঙে সমস্ত শরীরে যেন কেউ শত
তীক্ষ্ণ সুচ বিঁধিয়েছে শাস্তিরূপে। আখেরে ক্লান্তির
কালিমা নিমেষে ঝেড়ে ফেলে
যেন জাদুবলে দিব্যি আলাদা মানুষ হয়ে ফের
কাছের টেবিলে ঝুঁকে অসমাপ্ত এক
কবিতাকে পূর্ণতা দেয়ার বাসনায় উদ্দীপিত হয়ে উঠি। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobitake-purnota-dear-basonay/
|
2697
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে
|
প্রকৃতিমূলক
|
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে–
আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।
এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি
পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি
নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের ‘পরে
নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে।
এসেছে এসেছে এই কথা বলে প্রাণ,
এসেছে এসেছে উঠিতেছে এই গান,
নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।
আবার আষাঢ় এসেছে আকাশ ছেয়ে।১০ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/abar-eseche-ashar-akash-cheye/
|
2592
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অনাবশ্যকের আবশ্যকতা
|
নীতিমূলক
|
কী জন্যে রয়েছ, সিন্ধু তৃণশস্যহীন—
অর্ধেক জগৎ জুড়ি নাচো নিশিদিন।
সিন্ধু কহে, অকর্মণ্য না রহিত যদি
ধরণীর স্তন হতে কে টানিত নদী? (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/onaboshyoker-aboshyokota/
|
5199
|
শামসুর রাহমান
|
লেনদেন
|
রূপক
|
হঠাৎ তিনি আমার স্মৃতির বনস্থলি রোমাঞ্চিত
করলে আমি প্রবেশ করি ছেলেবেলার শ্যামল মুঠোয়।
চোখের কোণে হারিয়ে-যাওয়া সুদূর চোখের, শীর্ণ হাতের,
তাঁর সে গায়ের হলদে কোটের ইতস্তত ঝলক লাগে।হলদে কোটে কেমন যেন চুরুট চুরুট গন্ধ ছিলো,
চোখের কোণে সে কোন্ ঝিলের ইস্পাতী এক ঝিলিক ছিলো।
টাঙ্গি হাতে ভালুক টালুক খুব মেরেছেন হেলায় ফেলায়-
তাঁর বিষয়ে আরো বহু এমনিতরো গল্প ছিলো।হলদে কোটের সিংহপুরুষ সুদূর আমার ছেলেবেলায়
দিয়েছিলেন হাতে তুলে একটি পুতুল, মনে পড়ে।
মনে পড়ে, পুতুলটাকে কোথায় যেন, কখন যেন
হারিয়ে ফেলে সেই ছেলেটা দুঃখ খুবই পেয়েছিলো।তেমন পুতুল আর দেখিনি ভূভারতে, দোকান-পাটে
তন্ন তন্ন করেও আমি পাইনি খুঁজে দেশ-বিদেশে।
তেমন পুতুল ঝরে শুধু অলৌকিকের মুঠো থেকে?
স্মৃতির সুতোয় লটকে থাকে নীল্চে নীল্চে দুর্বলতা।সেই যে তিনি পুতুল দিয়ে সাত সকালে নিলেন বিদায়
আর দেখিনি তাঁকে আমি এই শহরে, অন্য কোথাও।
তখন থেকে খুঁজছি তবু দেননি তিনি আমায় দেখা,
জ্বলছে মনে ভিন্ন কালের হলদে কোটের উদাস আভা।যদি তাঁকে একটা কিছু দিতে পারার একটুখানি
সুখের সময় পেতাম তবে ধন্য হতাম রুক্ষ বেলায়।
তাঁরই জন্যে দুঃখ-সুখের পদ্য বিছাই দোরে দোরে,
হঠাৎ যদি বিবাগী সিএ বর্ষীয়ানের চোখে পড়ে! (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/lenden/
|
1782
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
একটি দুটি তিনটি যুবক
|
চিন্তামূলক
|
কলকাতা শহরে মাত্র একটি দুটি তিনটি মানুষ
এখনো যুবক হয়ে আছে স্বেচ্ছাচারে।
ফুটবলের মতো তারা
কারো পায়ে থাকে না কখনো।
ক্রিকেট ব্যাটের মতো
ঘূর্ণি বলে যৌবনের জৌলুস হাঁকায়।
একেকটি শীত আসে
একেকটি যুবক খসে পড়ে।
উল্কাবৃন্তচ্যুত তারা আকাশের কিনারা হারিয়ে
সরপুটি, চাঁদা পুটি,
অল্প জলে অতিকায় খেলা।
হে গভীর! এখানে এসো না।
কলকাতার ক্ষণপ্রভ ভিড়ে এলে তুমিও হারাবে
আতরদানের শিশি, চশমা ও উষ্ণীষ।
তৃণীর মরচেয় গুড়ো হবে।
কিংবা এসো, এসে দেখে যাও
করাতকলের পাশে একটি দুটি তিনটি যুবকের
অগ্নিসাক্ষী রাখা অহঙ্কার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1186
|
2414
|
মাকিদ হায়দার
|
অদূরের
|
প্রেমমূলক
|
কেন যে সম্মতি দিলাম তার প্রস্তাবে
যেতে হবে সাথে নিয়ে তাকে
দেখবেন তিনি
চৈত্র সংক্রান্তির মেলা।গিয়ে দেখি শহরের সব লোকজন
উঠে বসে আছে
নাগরদোলায়।হঠাৎ আমায় সেই তিনি বললেন
চলো যাই দূরে যাই
যাওয়া যাক দূরে কোথাও।পুনরায় সম্মতি দিতে গিয়ে মনে হলো
হয়তোবা মেয়েটির প্রিয় হতে পারে
গুড়ের বাতাসা।
কিছু না বলে হঠাৎ
তাকালেম আকাশের দিকে
চেয়ে দেখি চৈত্রের শেষ মেঘ দ্রুত লয়ে
আসছে আমার দিকে।অদূরের নাগরদোলায়
কেউ নেই আর।
চৈত্র সংক্রান্তির মেলায়
শুধু ছিলেম দুজনে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%85%e0%a6%a6%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a6%b0%e0%a6%a6%e0%a7%8b%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%a6/
|
3014
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গোয়ালিনী
|
চিন্তামূলক
|
হাটেতে চল পথের বাঁকে বাঁকে,
হে গোয়ালিনী, শিশুরে নিয়ে কাঁখে।
হাটের সাথে ঘরের সাথে
বেঁধেছ ডোর আপন হাতে
পরুষ কলকোলাহলের ফাঁকে।হাটের পথে জানি না কোন্ ভুলে
কৃষ্ণকলি উঠিছে ভরি ফুলে।
কেনাবেচার বাহনগুলা
যতই কেন উড়াক ধুলা
তোমারি মিল সে ওই তরুমূলে।শালিখপাখি আহারকণা-আশে
মাঠের 'পরে চরিছে ঘাসে ঘাসে।
আকাশ হতে প্রভাতরবি
দেখিছে সেই প্রাণের ছবি,
তোমারে আর তাহারে দেখে হাসে।মায়েতে আর শিশুতে দোঁহে মিলে
ভিড়ের মাঝে চলেছ নিরিবিলে।
দুধের ভাঁড়ে মায়ের প্রাণ
মাধুরী তার করিল দান,
লোভের ভালে স্নেহের ছোঁওয়া দিলে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gualene/
|
5295
|
শামসুর রাহমান
|
সেই কখন থেকে খুঁজছি
|
মানবতাবাদী
|
সেই কখন থেকে খুঁজছি নিজের বাড়ি, দুপুর গড়িয়ে
বিকেল হল, গোধূলি ছুঁল সন্ধ্যাকে, তবু
খুঁজে পাচ্ছি না আপনকার বাড়ি। পাড়ায় পাড়ায়
প্রতিটি বাড়ির কলিংবেল টিপে, অথবা
দরজার কড়া নেড়ে ব্যাকুল জিগ্যেশ করি, বলতে পারেন
এই বাড়িটি কার? অমুক আমি, এটা কি আমার নিবাস?বাড়ির মালিক অথবা ভাড়াটে সবাই ভ্যাবাচ্যাকা
দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার দিকে চকিতে
দরজা বন্ধ করে দেয় মুখের উপর। নিরাশ
আমি এই পথ থেকে সেই পথে, এক গলি ছেড়ে আরেক
গলিতে রাম, রহিম, বড়ুয়া ডেভিডের
ঠিকানায় পৌঁছে নিজের বাড়ির হদিশ খুঁজি।ঘুরতে ঘুরতে, এ বাড়ি সে বাড়ি করতে করতে বড়ই
ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমার এই বেলা অবেলার অন্বেষণের জন্য
ঘুটঘুটে রাত্তিরে, এই ক্লান্তির জন্য ক্ষমা চাইব কার কাছে? হায়, অভাগা
আমার এমন কেউ কি আছেন
যার করুণাধারায় মুছে যাবে অবসাদ, সকল গ্লানি?
অভিভাবকহীন, অসহায় আমি ডুবে আছি অরণ্যরোদনে।গোধূলিবেলায় পুরনো একটি বাড়ির দরজা থেকে
ব্যর্থতার মুঠো মুঠো অন্ধকার নিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ
অমলকান্তি এক বালক এসে দাঁড়ায় সামনে এবং
কিছু না ব’লেই আমাকে পরিচালিত করে কোলাহল থেকে
দূরে আশ্চর্য নির্জনতায়, ঠেলে দেয় ঊর্ধ্বলোকে মেঘের
মহল্লায়, ডানাহীন আমি উড়তে থাকি নক্ষত্রের জলসায়। (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sei-kokhon-theke-khujchi/
|
2308
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
কাক ও শৃগালী
|
নীতিমূলক
|
একটি সন্দেশ চুরি করি,
উড়িয়া বসিলা বৃক্ষোপরি,
কাক, হৃষ্ট-মনে;
সুখাদ্যের বাস পেয়ে,
আইল শৃগালী ধেয়ে,
দেখি কাকে কহে দুষ্টা মধুর বচনে;—
“অপরূপ রূপ তব, মরি!
তুমি কি গো ব্রজের শ্রীহরি,—
গোপিনীর মনোবাঞ্ছা?—কহ গুণমণি! হে নব নীরদ-কান্তি,
ঘুচাও দাসীর ভ্রান্তি,
যুড়াও এ কান দুটি করি বেণু-ধ্বনি!
পুণ্যবতী গোপ-বধূ অতি।
তেঁই তারে দিলা বিধি,
তব সম রূপ-নিধি,—
মোহ হে মদনে তুমি; কি ছার যুবতী?
গাও গীত, গাও, সখে করি এ মিনতি!
কুড়াইয়া কুসুম-রতনে,
গাঁথি মালা সুচারু গাঁথনে,
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/kak-o-shrigali/
|
4397
|
শামসুর রাহমান
|
আমি কি পারবো_
|
চিন্তামূলক
|
নেমেছে অসিত নম্র ডানা মেলে নিশীথ নিঝুম
চৌদিকে এবং বাতিজ্বলা ছোট আমার এ ঘরে
স্তব্ধতা ঘুমন্ত বেড়ালের মতো গাঢ় আছে প’ড়ে,
রয়েছি চেয়ারে বসে বহুক্ষণ, চোখে নেই ঘুম,
হাতে প্রস্ফুটিত বোদলেয়ারের ক্লেদজ কুসুম।
মনে পড়ে, নিঃসংগ অসুস্থ কবি প্রহরে প্রহরে
হেঁটেছেন কৃষ্ণ বেশে। তাঁরই মতো আমিও শহরে
একা-একা ঘুরি নিয়ে অস্তিত্বে ব্যাধির গুপ্ত ধুম।যে-নারী দেয়নি শান্তি তাঁকে বরং কুটিল পাকে
করেছে অত্যন্ত ক্লান্ত তারই জন্যে কত দুঃখশোক
সয়েছেন, নিজেকে ক্ষইয়ে শুধু গড়েছেন তাকে।
আমি কি পারবো হতে দান্ত মহিমায় সমাসীন
তাঁর মতো? পারবো কি ক্ষিপ্র তুলে নিতে কোনোদিন
গরল আঁজলা ভরে অমৃতে ভাসিয়ে বিশ্বলোক? (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ami-ki-parbo/
|
688
|
জয় গোস্বামী
|
দোল
|
প্রেমমূলক
|
১বকুল শাখা পারুল শাখা
তাকাও কেন আমার দিকে?মিথ্যে জীবন কাটলো আমার
ছাই লিখে আর ভস্ম লিখে –কী ক’রে আজ আবীর দেবো
তোমাদের ওই বান্ধবীকে !২শান্ত ব’লে জানতে আমায় ?
কলঙ্কহীন, শুদ্ধ ব’লে ?
কিন্তু আমি নরক থেকে
সাঁতরে এলামতখন আমার শরীর থেকে
গরম কাদা গড়িয়ে পড়ছে
রক্ত-কাদাহঠাৎ তোমায় দেখতে পেলাম
বালিকাদের গানের দলেসত্যি কিছু লুকোচ্ছি না ।প্রাচীন তপোবনের ধারে
তোমার বাড়িকখন যাবো ? – ঘুম পাচ্ছে –
বলো কখন মুখ রাখবো
তোমার কোলে !
বারণ করবে ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র১বকুল শাখা পারুল শাখা
তাকাও কেন আমার দিকে?মিথ্যে জীবন কাটলো আমার
ছাই লিখে আর ভস্ম লিখে –কী ক’রে আজ আবীর দেবো
তোমাদের ওই বান্ধবীকে !২শান্ত ব’লে জানতে আমায় ?
কলঙ্কহীন, শুদ্ধ ব’লে ?
কিন্তু আমি নরক থেকে
সাঁতরে এলামতখন আমার শরীর থেকে
গরম কাদা গড়িয়ে পড়ছে
রক্ত-কাদাহঠাৎ তোমায় দেখতে পেলাম
বালিকাদের গানের দলেসত্যি কিছু লুকোচ্ছি না ।প্রাচীন তপোবনের ধারে
তোমার বাড়িকখন যাবো ? – ঘুম পাচ্ছে –
বলো কখন মুখ রাখবো
তোমার কোলে !
বারণ করবে ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র১বকুল শাখা পারুল শাখা
তাকাও কেন আমার দিকে?মিথ্যে জীবন কাটলো আমার
ছাই লিখে আর ভস্ম লিখে –কী ক’রে আজ আবীর দেবো
তোমাদের ওই বান্ধবীকে !২শান্ত ব’লে জানতে আমায় ?
কলঙ্কহীন, শুদ্ধ ব’লে ?
কিন্তু আমি নরক থেকে
সাঁতরে এলামতখন আমার শরীর থেকে
গরম কাদা গড়িয়ে পড়ছে
রক্ত-কাদাহঠাৎ তোমায় দেখতে পেলাম
বালিকাদের গানের দলেসত্যি কিছু লুকোচ্ছি না ।প্রাচীন তপোবনের ধারে
তোমার বাড়িকখন যাবো ? – ঘুম পাচ্ছে –
বলো কখন মুখ রাখবো
তোমার কোলে !
বারণ করবে ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র১বকুল শাখা পারুল শাখা
তাকাও কেন আমার দিকে?মিথ্যে জীবন কাটলো আমার
ছাই লিখে আর ভস্ম লিখে –কী ক’রে আজ আবীর দেবো
তোমাদের ওই বান্ধবীকে !২শান্ত ব’লে জানতে আমায় ?
কলঙ্কহীন, শুদ্ধ ব’লে ?
কিন্তু আমি নরক থেকে
সাঁতরে এলামতখন আমার শরীর থেকে
গরম কাদা গড়িয়ে পড়ছে
রক্ত-কাদাহঠাৎ তোমায় দেখতে পেলাম
বালিকাদের গানের দলেসত্যি কিছু লুকোচ্ছি না ।প্রাচীন তপোবনের ধারে
তোমার বাড়িকখন যাবো ? – ঘুম পাচ্ছে –
বলো কখন মুখ রাখবো
তোমার কোলে !
বারণ করবে ?আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a6%e0%a7%8b%e0%a6%b2-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d/
|
1916
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
স্রোতস্বিনী
|
প্রেমমূলক
|
তুমি বললে, রৌদ্র যাও, রৌদ্রে তো গেলাম
তুমি বললে, অগ্নিকুণ্ড জ্বালো, জ্বালালাম।
সমস্ত জমানো সুখ-তুমি বললে, বেচে দেওয়া ভালো
ডেকেছি নীলাম।
তবু আমি একা।
আমাকে করেছ তুমি একা।
একাকিত্বটুকুতেও ভেঙে চুরে শত টুকরো করে
বীজ বপনের মতো ছড়িয়ে দিয়েছ জলে-স্থলে।
তুমি বলেছিলে বলে সাজসজ্জা ছেড়েছি, ছুঁড়েছি।
যে অরণ্য দেখিয়েছ, তারই ডাল কেটেছি, খুঁড়েছি।
যখনই পেতেছ হাত দিয়েছি উপুড় করে প্রাণ
তবু আমি একা।
তবুও আমার কেউ নও তুমি
আমিও তোমার কেউ নই।
আমাদের অভ্যন্তরে স্রোতস্বিনী আছে, সেতু নেই।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%a4%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80-%e0%a6%86%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a7%81-%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%87/
|
5709
|
সুকুমার রায়
|
হুলোর গান
|
ছড়া
|
বিদ্ঘুটে রাত্তিরে ঘুট্ঘুটে ফাঁকা,
গাছপালা মিশ্মিশে মখ্মলে ঢাকা!
জট্বাঁধা ঝুল কালো বটগাছতলে,
ধক্ধক্ জোনাকির চক্মকি জ্বলে।
চুপচাপ চারিদিকে ঝোপ ঝাড়গুলো,
আয় ভাই গান গাই আয় ভাই হুলো।
গীত গাই কানে কানে চীৎকার ক'রে,
কোন্ গানে মন ভেজে শোন্ বলি তোরে।
পূবদিকে মাঝরাতে ছোপ্ দিয়ে রাঙা
রাতকানা চাঁদ ওঠে আধখানা ভাঙা।
চট্ ক'রে মনে পড়ে মট্কার কাছে
মালপোয়া আধখানা কাল থেকে আছে।
দুড়্ দুড়্ ছুটে যাই, দূর থেকে দেখি
প্রাণপণে ঠোঁট চাটে কানকাটা নেকী!
গালফোলা মুখে তার মালপোয়া ঠাসা,
ধুক ক'রে নিভে গেল বুকভরা আশা।
মন বলে আর কেন সংসারে থাকি,
বিল্কুল্ সব দেখি ভেল্কির ফাঁকি।
সব যেন বিচ্ছিরি সব যেন খালি,
গিন্নীর মুখ যেন চিম্নির কালি।
মন–ভাঙা দুখ্ মোর কন্ঠেতে পুরে
গান গাই আয় ভাই প্রাণফাটা সুরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/hulor-gaan/
|
613
|
জয় গোস্বামী
|
অপেক্ষা
|
প্রেমমূলক
|
যতবার বেল বাজে
ভাবি তুমি এলেদরজা খুলে দেখি,অন্য কেউমনে ঢেউ ওঠে, মনে
মরে যায় ঢেউ
|
https://www.bangla-kobita.com/joygoswami/opekkha/
|
3072
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জননী তোমার করুণ চরণখানি
|
ভক্তিমূলক
|
জননী, তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে।
জননী, তোমার মরণহরণ বাণী
নীরব গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে।
তোমারে নমি হে সকল ভুবন-মাঝে,
তোমারে নমি হে সকল জীবন-কাজে;
তনু মন ধন করি নিবেদন আজি
ভক্তিপাবন তোমার পূজার ধূপে।
জননী, তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে।১৩১৫
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jononi-tomar-korun-choronkhani/
|
3482
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ফুলের ইতিহাস
|
ছড়া
|
বসন্তপ্রভাতে এক মালতীর ফুল
প্রথম মেলিল আঁখি তার,
প্রথম হেরিল চারি ধার।
মধুকর গান গেয়ে বলে,
‘মধু কই, মধু দাও দাও। '
হরষে হৃদয় ফেটে গিয়ে
ফুল বলে, ‘এই লও লও। '
বায়ু আসি কহে কানে কানে,
‘ফুলবালা, পরিমল দাও। '
আনন্দে কাঁদিয়া কহে ফুল,
‘যাহা আছে সব লয়ে যাও। '
তরুতলে চ্যুতবৃন্ত মালতীর ফুল
মুদিয়া আসিছে আঁখি তার,
চাহিয়া দেখিল চারি ধার।
মধুকর কাছে এসে বলে,
‘মধু কই, মধু চাই চাই। '
ধীরে ধীরে নিশ্বাস ফেলিয়া
ফুল বলে, ‘কিছু নাই নাই। '
‘ফুলবালা, পরিমল দাও'
বায়ু আসি কহিতেছে কাছে।
মলিন বদন ফিরাইয়া
ফুল বলে, ‘আর কী বা আছে। '(শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/fuler-itihas/
|
2268
|
মহাদেব সাহা
|
শুভাশিস, তোমাকে খুঁজছি আমি
|
রূপক
|
শুভাশিস, তোমাকে খুঁজছি আমি
হরিচরনের যতার্থ বানানে লিখে নাম,
উচ্চারণ অভিধান ঘেঁটে সঠিক মাত্রায় ডেকে ডেকে
তোমাকে খুঁজছি আমি শুভাশিস, এই দুঃসময়ে
যখন সকল মানবিক স্রোতদারা মুস্ক হয়ে যায়,
নেমে আসে দিবসে-নিশীথে দীর্ঘ জিরাফের গ্রীবা।
তোমাকে খুঁজছি আমি যেন সেই শৈশবের নদী
আমার মায়ের দুটি স্নেহময় হাত,
যেন একটি প্রাচীন বৃক্ষ, তুলসীমঞ্চ, সন্ধ্যাদীপ
সুফী দরবেমের ধ্যানী দৃষ্টি;
তোমাকে খুঁজছি আমি শুখাশিস সমস্ত জীবন।
শুভাশিস, তোমাকে খুঁজছি আমি সকালের চোখে
নক্ষত্রের নিপুণ মুদ্রায়, মানুষের গাড় কণ্ঠস্বরে,
শ্রাবণের অঝোর বর্ষণে আর চৈত্রের উদাস জ্যোৎ্লায়
তোমাকে খুঁজছি আমি কতো লক্ষ সহস্র বছর।
তোমাকে খুঁজছি আমি শুভাশিস, সবখানে
লোকালয়ে, বৃক্ষপত্রে-
শহরের কংক্রিটের মাঠে
এই দুঃসময়ে কোথায় তোমার দেখা পাই;
শুভাশিস, তুমি নিরুদ্দেশ সেই কবে থেকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1344
|
5818
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
পাহাড়
|
ভক্তিমূলক
|
অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ।
কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না।
যদি তার দেখা পেতাম,
দামের জন্য আটকাতো না।
আমার নিজস্ব একটা নদী আছে,
সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে।
কে না জানে, পাহাড়ের চেয়ে নদীর দামই বেশী।
পাহাড় স্থানু, নদী বহমান।
তবু আমি নদীর বদলে পাহাড়টাই
কিনতাম।
কারণ, আমি ঠকতে চাই।নদীটাও অবশ্য কিনেছিলামি একটা দ্বীপের বদলে।
ছেলেবেলায় আমার বেশ ছোট্টোখাট্টো,
ছিমছাম একটা দ্বীপ ছিল।
সেখানে অসংখ্য প্রজাপতি।
শৈশবে দ্বীপটি ছিল আমার বড় প্রিয়।
আমার যৌবনে দ্বীপটি আমার
কাছে মাপে ছোট লাগলো। প্রবহমান ছিপছিপে তন্বী নদীটি বেশ পছন্দ হল আমার।
বন্ধুরা বললো, ঐটুকু
একটা দ্বীপের বিনিময়ে এতবড়
একটা নদী পেয়েছিস?
খুব জিতেছিস তো মাইরি!
তখন জয়ের আনন্দে আমি বিহ্বল হতাম।
তখন সত্যিই আমি ভালবাসতাম নদীটিকে।
নদী আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিত।
যেমন, বলো তো, আজ
সন্ধেবেলা বৃষ্টি হবে কিনা?
সে বলতো, আজ এখানে দক্ষিণ গরম হাওয়া।
শুধু একটি ছোট্ট দ্বীপে বৃষ্টি,
সে কী প্রবল বৃষ্টি, যেন একটা উৎসব!
আমি সেই দ্বীপে আর যেতে পারি না,
সে জানতো! সবাই জানে।
শৈশবে আর ফেরা যায় না।এখন আমি একটা পাহাড় কিনতে চাই।
সেই পাহাড়ের পায়ের
কাছে থাকবে গহন অরণ্য, আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাব, তারপর শুধু রুক্ষ
কঠিন পাহাড়।
একেবারে চূড়ায়, মাথার
খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী,
চরাচরে তীব্র নির্জনতা।
আমার কষ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবে না।
আমি ঈশ্বর মানি না, তিনি আমার মাথার কাছে ঝুঁকে দাঁড়াবেন না।
আমি শুধু দশ দিককে উদ্দেশ্য করে বলবো,
প্রত্যেক মানুষই অহঙ্কারী, এখানে আমি একা-
এখানে আমার কোন অহঙ্কার নেই।
এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে।
হে দশ দিক, আমি কোন দোষ করিনি।
আমাকে ক্ষমা করো।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a1%e0%a6%bc-%e0%a6%9a%e0%a7%82%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%99%e0%a7%8d/
|
2534
|
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
|
কলঙ্ক
|
চিন্তামূলক
|
কলঙ্ক
যতীন্দ্রমোহন বাগচীবাতাবিকুঞ্জে সন্ধ্যার বায় পুষ্পপরাগচোর------
কলঙ্কী মন, চেয়ে দেখ্ আজি সঙ্গী মিলেছে তোর।
দিবা অবসান, রবি হ’ল রাঙা,
পশ্চিমাকাশে নট্ কনা -ভাঙা;
সঙ্গহীনের যাহা কিছু কাজ সাঙ্গ করেছি মোর,
কুঞ্জদুয়ারে ব’সে আছি একা কুসুমগন্ধে ভোর!
আধফুটন্ত বাতাবিকুসুমে কানন ভরিয়া আছে,----
কি গোপন কথা গুঞ্জরি’ অলি ফিরিছে ফুলের কাছে!
ফুটনোন্মুখ ফুলদলগুলি
পুলক-পরশে উঠে দুলিদুলি
গন্ধভিখারী সন্ধ্যার বায় ফুলপরিমল যাচে-----
সঙ্কোচে নত পুষ্পবালিকা---অতিথি ফিরে বা পাছে!
বেলা বয়ে যায়, সন্ধ্যার বায় আসি’ কহে বার বার,
সন্ধ্যা হয় যে অন্ধ কুসুম-----খোলো অন্তর-দ্বার!
মুকুলগন্ধ অন্ধ ব্যথায়
কুঁড়ির বন্ধ টুটিবারে চায়,
লুটাইতে চায় সন্ধ্যার পায় রুদ্ধ আবেগভার,
বিকাইতে চায় চরণের পরে কৌমার সুকুমার।
মন্থরপদে সন্ধ্যা নামিছে কাজলতিমিরে আঁকা,
দুয়ারে অতিথি, অন্তরে ব্যথা--- সম্ভব সে কি থাকা?
গন্ধে পাগল অন্তর যার,
আবরণ মাঝে থাকে সে কি আর,
খুলি’ দিল দ্বার, পরান তাহার পরাগে-শিশিরে মাখা;
কুঞ্জ ঘিরিয়া আঁধারে ছাইল স্বপ্নপাখীর পাখা।
বাতাবিকুঞ্জে সন্ধ্যার বায় পুষ্পপরাগচোর----
হা রে কলঙ্কী হৃদয় আমার, সঙ্গী মিলেছে তোর।
দূরদিগন্তে দিবা হল সারা;
অন্তর ভরি ফুটে’ উঠে তারা,
নব-ফুটন্ত নেবুর গন্ধে আসিল তন্দ্রাঘোর-----
কলঙ্কী প্রেম, মুগ্ধ হৃদয়-----একই "পরিণাম তোর।
|
https://www.bangla-kobita.com/jatindramohan/kalanko/
|
40
|
অসীম সাহা
|
প্রতিবন্ধকতা
|
প্রেমমূলক
|
আষাঢ়ের প্রবল বর্ষণে ভেসে যাবে সমগ্র পৃথিবী-
এই ভেবে বিরহী যক্ষের মতো যখন আকাশের দিকে
আকুল নয়নে তাকিয়ে রয়েছি, তখন আমাকে বিস্মিত
করে সজল-সঘন কালো মেঘ কখন যে অসভ্য ছেলের
মতো চোখ ঠেরে মুহূর্তে উধাও হয়ে গেছে- আমি তা টেরও পাইনি।
তার মানে এখন আর মেঘলা-ধূসর আকাশের কোনো
অস্তিত্ব নেই- তার বদলে প্রকৃতিকে গৃহবন্দি করে
সে এখন খোশমেজাজে যত্রতত্র ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।অথচ কথা ছিলো, বাদল-বরিষনে তুমি এসে বসে থাকবে
কদমতলায়, আর আমি একটি হৃদয়ের ব্যাকুল বাঁশির সুর
শুনতে পাই বা না পাই, ঝড় ও বৃষ্টির জল উপেক্ষা করে
আমার পদ্ম-কোমল পা দুটো চেপে-চেপে নিজের রক্তের
ভেতর দিয়ে প্রবল প্রত্যাশা নিয়ে ছুটে আসবো তোমার কাছে।
কিন্তু আষাঢ়ের প্রকৃতি হঠাৎ এমন করে বেয়াড়া হয়ে উঠবে,
কে তা জানতো? বর্ষাও যে কখনো কখনো এমন বেরসিক আচরণ
করতে পারে, জীবনে এই প্রথম আমি তা প্রত্যক্ষ করলাম।
অতএব কী আর করা? আবার নতুন দিনের প্রতীক্ষা ছাড়া
তোমার কিংবা আমার আর তো কিছুই করার নেই।
তাই এসো, এই অলস ও উদাস অবসরে উভয়ে উভয়কে
বহফোনে এমন কিছু বার্তা পাঠাই, যাতে প্রবল বর্ষণের
মধ্যে যে ভয়ংকর বজ্রপাত হয়, আর তাতে কেঁপে ওঠে
সহজ হৃদয়, তেমনি করে শিহরনের ছোঁয়া লেগে
দু’জনেই কেঁপে উঠি, আর তুমি যেন আমাকে কিছুতেই
ভুল বুঝে বাঁশির সুর থামিয়ে দিতে না পারো- অন্তত
যেন বুঝতে পারো, সত্যিই আমি পায়ে কাঁটা বিঁধিয়ে,
আমার কোমল দুটি পা টিপে টিপে, দুর্গম পিচ্ছিল পথ
পেরিয়ে তোমার দিকেই ছুটে আসতে চেয়েছিলাম,
তা যেন সত্যিই আমি তোমার কাছে প্রমাণ করতে পারি।কিন্তু তুমিই বলো, প্রকৃতি যদি আমাদের সহায় না হয়, তা হলে
ইচ্ছে থাকলেও আয়ান-ঘরণী হয়ে আমি কেমন করে
প্রকাশ্য দিবালোকে তোমার দিকে আকুল হৃদয়ে ছুটে আসতে পারি?
তুমি যদি কৃষ্ণ না হয়ে আমার হাতে তুলে দিতে তোমার
মর্মহরণকারী বাঁশি, তা হলে তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারতে,
অবরুদ্ধ সংসারের প্রজাপতি-জাল ছিন্ন করে তোমার কাছে ছুটে
যেতে গিয়ে আমাকে কতোটা কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে !তাই বলছি, প্রয়োজনে তোমার চোখের জলে আমাকে ভাসিয়ে দাও,
তবু গোমড়া আকাশের মতো অমন মুখ ভার করে বসে থেকো না।
তুমি যদি আমার ওপর অমন অভিমান করে বসে থাকো,
তা হলে আমি বলবো, ‘এ জন্মেই কৃষ্ণ না হয়ে তুমি অন্তত একবার
আয়ান-ঘরণী হয়ে দেখো, কাজটা সত্যি সত্যিই অতটা সহজ নয়’ !
|
https://www.bangla-kobita.com/asimsaha/protibondhokota/
|
1899
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
সিঁড়ি
|
রূপক
|
কত রকম সিঁড়ি আছে ওঠার এবং নামার
চলতে চলতে থামার।
সরল সিঁড়ি শীতল সিঁড়ি
পদোন্নতির পিছল সিঁড়ি
অন্ধ এবং বন্ধ সিঁড়ি
কদম ফুলের গন্ধা-সিঁড়ি
ওঠার এবং নামার
চলতে চলতে থামার।
কত রকম সিঁড়ির ধাপে কত রকম জল
পা পিছলোলে অধঃপতন
ভাসতে পারো মাছের মতন
ডুব সাঁতারে মুঠোয় পেলে সঠিক ফলাফল।
কত রকম জলের ভিতর কত রকম মাছ।
চুনো পুঁটি রাঘব বোয়াল যার যে রকম নাচ।
পেট চিরলে আংটি কারো
কারো শুধুই আঁশ
দীর্ঘতর ফুসফুসে কার ভরাট দীর্ঘশ্বাস।
সিঁড়ির নীচ জল এবং সিঁড়ির উপর ছাদ
মেঘও পাবে মানিক পাবে
বজ্রধ্বনির খানিক পাবে
পুড়তে চাইলে রোদ
জ্যোৎস্না থেকে চাইতে পার সার্থকতাবোধ।
অনেকরকম সিঁড়ি আছে ওঠা নামা হাঁটার
ঊর্ধ্বে অভিষেকের তোরণ
নিচের ঝোপটি কাঁটার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1241
|
1650
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
বিরহ, এবং
|
প্রেমমূলক
|
।।১।।
জলের খানিক নীচে রয়েছে শৈবাল,
সামান্য ঝুঁকলেই দেখা যায়;
কিন্তু সে দেখে না, তার দৃষ্টিকে সে লাল
গোলাপের সন্ধানে পাঠায়।
আমি দেখি, উদয়াস্ত আমি দেখি তাকে,
বিরহ-ভাবনার মতো নিরন্তর দুলে যেতে থাকে
জলজ শৈবাল।
।।২।।
মর্মমূলে বিঁধে আছে পঞ্চমুখী তীর,
তার নাম ভালবাসা।
কেটেছে গোক্ষুরে যেন, নীল হয়ে গিয়েছে শরীর,
তার নাম ভালবাসা।
ঠাকুমা বলতেন, ওই সূর্যতাকে ছিঁড়ে
এনে যে লণ্ঠন জ্বালে দুঃখীর কুটিরে
তার নাম ভালবাসা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1559
|
4003
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্বপ্নরুদ্ধ
|
সনেট
|
নিষ্ফল হয়েছি আমি সংসারের কাজে,
লোকমাঝে আঁখি তুলে পারি না চাহিতে।
ভাসায়ে জীবনতরী সাগরের মাঝে
তরঙ্গ লঙ্ঘন করি পারি না বাহিতে।
পুরুষের মতো যত মানবের সাথে
যোগ দিতে পারি নাকো লয়ে নিজ বল,
সহস্র সংকল্প শুধু ভরা দুই হাতে
বিফলে শুকায় যেন লক্ষ্মণের ফল।
আমি গাঁথি আপনার চারি দিক ঘিরে
সূক্ষ্ম রেশমের জাল কীটের মতন।
মগ্ন থাকি আপনার মধুর তিমিরে,
দেখি না এ জগতের প্রকাণ্ড জীবন।
কেন আমি আপনার অন্তরালে থাকি!
মুদ্রিত পাতার মাঝে কাঁদে অন্ধ আঁখি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shopnoruddho/
|
259
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
এস হে সজল
|
প্রকৃতিমূলক
|
এস হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া
বেণুকুঞ্জ ছায়ায় এস
তাল তমাল বনে এস শ্যামল
ফুটাইয়া যূঁথী-কুন্দ-নীপ-কেয়া।বারিধারে এস চারিধার ভাসায়ে
বিদ্যুৎ-ইঙ্গিতে দশ দিক হাসায়ে
বিরহী মনে জ্বালায়ে আশা আলেয়া
ঘন দেয়া মোহনিয়া শ্যাম পিয়া।শ্রাবণ বরিষণ হরষণ ঘনায়ে
এস নব ঘনশ্যাম নূপুর শোনায়ে
হিজল তমাল ডালে ঝুলন ঝুলায়ে
তাপিতা ধরার চোখে অঞ্জন বুলায়ে
যমুনা স্রোতে ভাসায়ে প্রেমের খেয়া
ঘন দেয়া মোহনিয়া শ্যাম পিয়া।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/esho-he-shojol/
|
2925
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কে
|
প্রেমমূলক
|
আমার প্রাণের 'পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো !
সে যে ছুঁয়ে গেল নুয়ে গেল রে,
ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত । সে চলে গেল , বলে গেল না ,
সে কোথায় গেল ফিরে এল না ,
সে যেতে যেতে চেয়ে গেল ,
কী যেন গেয়ে গেল--
তাই আপন মনে বসে আছি
কুসুম-বনেতে ।
সে ঢেউয়ের মতো ভেসে গেছে ,
চঁদের আলোর দেশে গেছে ,
যেখান দিয়ে হেসে গেছে
হাসি তার রেখে গেছে রে ।
মনে হল আঁখির কোণে
আমায় যেন ডেকে গেছে সে ।
আমি কোথায় যাব কোথায় যাব ,
ভাবতেছি তাই একলা বসে ।
সে চাঁদের চোখে বুলিয়ে গেল
ঘুমের ঘোর ।
সে প্রাণের কোথা দুলিয়ে গেল
ফুলের ডোর ।
সে কুসুম-বনের উপর দিয়ে
কী কথা যে বলে গেল ,
ফুলের গন্ধ পাগল হয়ে
সঙ্গে তারি চলে গেল ।
হৃদয় আমার আকুল হল ,
নয়ন আমার মুদে এল ,
কোথা দিয়ে কোথায় গেল সে!
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ka/
|
2435
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
টাইগার মানে বাঘ
|
হাস্যরসাত্মক
|
Tiger মানে বাঘ Bug মানে পোকা
Flower মানে ফুল Fool মানে বোকা
Horn মানে শিং Sing মানে গাওয়া
Brick মানে ইট Eat মানে খাওয়া
Snake মানে সাপ Sharp মানে চোখা
Nail মানে নখ Knock মানে টোকা
ডান মানে Right Write মানে লেখা
People মানে লোক Look মানে দেখা
ময়দা মানে Flour Flower মানে ফুল
Color মানে রং Wrong মানে ভুল
নেতা মানে Leader Ladder মানে মই
Chest মানে বুক Book মানে বই
তোরণ মানে Gate Get মানে পাই
কিন্তু মানে But Butt মানে...
(থাক থাক, আর দরকার নাই!)
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2032
|
848
|
জসীম উদ্দীন
|
পলাতকা
|
শোকমূলক
|
হাসু বলে একটি খুকু আজ যে কোথা পালিয়ে গেছে-
না জানি কোন অজান দেশে কে তাহারে ভুলিয়ে নেছে।
বন হতে সে পলিয়ে গেছে, বনে কাঁদে বনের লতা,
ফুল ফুটে কয় সোনার খুকু! ছেড়ে গেলি মোদের কোথা?
বনের শাখা দুলিয়ে পাতা-করত বাতাস তাহার গায়ে।
তাহার শাড়ীর আঁচল লাগি ঝুমকো লতা দুলত বনে,
গাছে গাছে ফুল নাচিত তাহার পদধ্বনির সনে।
বনের পথে ডাকত পাখি, তাদের সুরের ভঙ্গী করে-
কচি মুখের মিষ্টি ডাকে সারাটি বন ফেলত ভরে।
প্রতিধ্বনি তাহার সনে করত খেলা পালিয়ে দূরে,
সুরে সুরে খুঁজত সে তার বনের পথে একলা ঘুরে।
সেই হাসু আজ পালিয়ে গেছে, পাখির ডাকের দোসর নাহি,
প্রতিধ্বনি আর ফেরে না তাহার সুরের নকল গাহি।
হাসু নামের একটি খুকু পালিয়ে গেছে অনেক দূরে,
কেউ জানে না কোথায় গেছে কোন্ বা দেশে কোন্ বা পুরে।
বাপ জানে না, মায় জানে না কোথায় সে যে পালিয়ে গেছে,
সেও জানে না, কোন সুদূরে কে তাহারে সঙ্গে নেছে।
কোনোখানে কেউ ভাবে না, কেউ কাঁদে না তাহার তরে,
কেউ চাহে না পথের পানে, কখন হাসু ফিরবে ঘরে।
মায় কাঁদে না, বাপ কাঁদে না, ভাই-বোনেরা কাঁদছে না তার,
খেলার সাথী কেউ জানে না, সে কখনও ফিরবে না আর।
ফিরবে না সে, ফিরবে নারে, খেলা ঘরের ছায়ার তলে,
মিলবে না সে আর আসিয়া তার বয়সের শিশুর দলে।
পেয়ারা-ডালে দোলনা খালি, ইঁদুরে তার কাটছে রশি,
চোড়ুই ভাতির হাঁড়ির পরে কাক দুটি আজ ডাকছে রশি,
খেলনাগুলি ধূলায় পড়ে, হাত-ভাঙা কার, পা ভাঙা কার,
ঝুমঝুমিটি বেহাত হয়ে বাজছে হাতে যাহার তাহার।
এসব খবর কেউ জানে না, সে জানে না, কেমন করে
কখন যে সে পালিয়ে গেলে তাহার চিরজনম তরে।
জানে তাহার পুতলগুলো অনাদরে ধুলায় লুটায়,
বুকে করে আর না চুমে, পুতুল-খেলার সেই ছোট মায়।
মাতৃ হারা মিনি-বিড়াল কেবা তাহার দুঃখ বুঝে,
কেঁদে কেঁদে বেড়ায় সে তার ছোট্ট মায়ের আঁচল খুঁজে।
খেলা ঘর আজ পড়ছে ভেঙে, শিশু কল-তানের সনে,
পুতুল বধূ আর সাজে না পুতুল-বরের বিয়ের কনে।
হাসু নামের সোনার খুকু আজ যে কোথা পালিয়ে গেছে,
সাত-সাগরের অপর পারে কে তাহারে ভুলিয়ে নেছে।
পালিয়ে গেছে সোনার হাসুঃ- খেলার সাথী আয়রে ভাই-
আজের মত শেষ খেলাটি এইখানেতে খেলে যাই।
সেখানটিতে খেলেছিলাম ভাঁড়-কাটি সঙ্গে নিয়ে,
সেইখানটি দে রুধে ভাই ময়না কাঁটা পুতে দিয়ে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/203
|
2823
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
একলা আমি বাহির হলেম
|
ভক্তিমূলক
|
একলা আমি বাহির হলেম
তোমার অভিসারে,
সাথে সাথে কে চলে মোর
নীরব অন্ধকারে।
ছাড়াতে চাই অনেক করে
ঘুরে চলি, যাই যে সরে,
মনে করি আপদ গেছে,
আবার দেখি তারে।ধরণী সে কাঁপিয়ে চলে–
বিষম চঞ্চলতা।
সকল কথার মধ্যে সে চায়
কইতে আপন কথা।
সে যে আমার আমি, প্রভু,
লজ্জা তাহার নাই যে কভু,
তারে নিয়ে কোন্ লাজে বা
যাব তোমার দ্বারে।১৪ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ekla-ami-bahir-holem/
|
4447
|
শামসুর রাহমান
|
এ রকমই হয়
|
মানবতাবাদী
|
এ রকমই হয়, দিব্যি হয়ে আসছে অনেককাল থেকে।
যুগে যুগে গ্রাম ও শহর
বাদুড়ের পাখার মতন অন্ধকারে যায় ঢেকে
অকস্মাৎ। জাহাজের সম্পন্ন বহর
সন্ত্রস্ত বন্দর ছেড়ে ছোটে আর্তরবে
মধ্য-সমুদ্রের গাঢ় নীলিমায়, পারে না এড়াতে
ভরাডুবি; এরকমই হয়, বারবার হবে।দ্বৈপায়ন বণিক বেড়াতে
এসে দূর দেশে মশলার ঘ্রাণে গড়ে রাজ্যপাট।
দ্বিগ্ধিজয়ী বীরের অশ্বের পদাঘাতে চতুর্ধারে
ঘন ঘন ওঠে হাহাকার, নিমেষে উজাড় ত্রস্ত পথঘাট-
মড়কে এমনই হয়, সবাই পালায় ঊর্ধ্বশ্বাসে বনবাদাড়ে।অনেক শহর পোড়ে, ভাঙে গ্রাম, গ্রন্থের পাতায়
প্রমত্ত অশ্বের বিষ্ঠা জমে, খোঁড়া তৈমুর অথবা হিটলার
সবাই সোৎসাহে ক্রূর জামার হাতায়
নাচায় কংকাল, নগরের আগুনে তুমুল সেঁকে হাত আর
দেয় ছুঁড়ে অন্ধকূপে কিংবা গ্যাস চেম্বারে তাদের,
যারা কাড়া নাকাড়ার তালে রাজ-রাজড়ার সুরে
ওঠেনা যান্ত্রিক নেচে, বোঝে যারা কুটিলতা নানান ফাঁদের।
চিরকাল খেলা একই, পাল্টায় খেলুড়ে। (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/e-rokomi-hoy/
|
5139
|
শামসুর রাহমান
|
যখন ছিলে না তুমি
|
সনেট
|
আখেরে অসিত বিচ্ছেদের দিন হলো অবসান
আজ এই প্রসন্ন বেলায়। আনন্দের অনাগত
মুহূর্তের তীব্র প্রতীক্ষায় হৃদয়ের অন্তর্গত
গানে-পাওয়া পাখি গেয়ে ওঠে পুনর্মিলনের গান।
একেকটি দিন ছিল বহুশত বর্ষের অবসান,
যখন ছিল না তুমি কাছে, প্রতিদিন অবিরত
দেখেছি তোমার মুখ মেঘে, স্বপ্ন-সরোবরে নত
পদ্মের আভায়, শুধু তোমাকেই করেছি সন্ধান।বিষাদের মুখে হাসি ফোটে, হাওয়া এসে দিলখোলা
কথা বলে, বুলায় রেশমি হাত চুলে, গৃহকোণ
বাসর শয্যার ঘ্রাণে পুলকিত; এ কিসের দোলা
আমার অস্তিত্বে? এই বুঝি বেজে ওঠে টেলিফোন,
যার অপেক্ষায় আছি স্বরচিত মনোজ নিবাসে
ঘাতক কালের মোড়ে, শাসকের ব্যাপক সন্ত্রাসে। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jokhon-chile-na-tumi/
|
4041
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হৃদয়
|
প্রকৃতিমূলক
|
হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে।
বেড়া-ভাঙার মাতন নামে উদ্দাম উল্লাসে॥
তোমার মোহন এল ভীষণ বেশে, আকাশ ঢাকা জটিল কেশে–
বুঝি এল তোমার সাধনধন চরম সর্বনাশে॥
বাতাসে তোর সুর ছিল না, ছিল তাপে ভরা।
পিপাসাতে বুক-ফাটা তোর শুষ্ক কঠিন ধরা।
এবার জাগ্রে হতাশ, আয় রে ছুটে অবসাদের বাঁধন টুটে–
বুঝি এল তোমার পথের সাথি বিপুল অট্টহাসে॥
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b9%e0%a7%83%e0%a6%a6%e0%a7%9f-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93%e0%a6%87-%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%9d%e0%a6%bf-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6/
|
3722
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মাস্টারবাবু
|
ছড়া
|
আমি আজ কানাই মাস্টার,
পোড়ো মোর বেড়ালছানাটি।
আমি ওকে মারি নে মা, বেত,
মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি।
রোজ রোজ দেরি করে আসে,
পড়াতে দেয় না ও তো মন,
ডান পা তুলিয়ে তোলে হাই
যত আমি বলি ‘শোন্ শোন্'।
দিনরাত খেলা খেলা খেলা,
লেখায় পড়ায় ভারি হেলা।
আমি বলি ‘চ ছ জ ঝ ঞ',
ও কেবল বলে ‘মিয়োঁ মিয়োঁ'।
প্রথম ভাগের পাতা খুলে
আমি ওরে বোঝাই মা, কত—
চুরি করে খাস নে কখনো,
ভালো হোস গোপালের মতো।
যত বলি সব হয় মিছে,
কথা যদি একটিও শোনে—
মাছ যদি দেখেছে কোথাও
কিছুই থাকে না আর মনে।
চড়াই পাখির দেখা পেলে
ছুটে যায় সব পড়া ফেলে।
যত বলি ‘চ ছ জ ঝ ঞ',
দুষ্টুমি করে বলে ‘মিয়োঁ'।
আমি ওরে বলি বার বার,
‘পড়ার সময় তুমি পোড়ো—
তার পরে ছুটি হয়ে গেলে
খেলার সময় খেলা কোরো। '
ভালোমানুষের মতো থাকে,
আড়ে আড়ে চায় মুখপানে,
এম্নি সে ভান করে যেন
যা বলি বুঝেছে তার মানে।
একটু সুযোগ বোঝে যেই
কোথা যায় আর দেখা নেই।
আমি বলি ‘চ ছ জ ঝ ঞ',
ও কেবল বলে ‘মিয়োঁ মিয়োঁ'। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/master-babu/
|
1234
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সুবিনয় মুস্তফী
|
রূপক
|
সুবিনয় মুস্তফীর কথা মনে পড়ে এই হেমন্তের রাতে।
একসাথে বিড়াল ও বিড়ালের-মুখে-ধরা-ইঁদুর হাসাতে
এমন আশ্চর্য শক্তি ছিল ভূয়োদর্শী যুবার।
ইঁদুরকে খেতে-খেতে শাদা বিড়ালের ব্যবহার,
অথবা টুকরো হ’তে-হ’তে সেই ভারিক্কে ইঁদুর,
বৈকুন্ঠ ও নরকের থেকে তা’রা দুই জনে কতোখানি দূর
ভুলে গিয়ে আধো আলো অন্ধকারে হেঁচকা মাটির পৃথিবীতে
আরো কিছুদিন বেঁচে কিছুটা আমেজ পেয়ে নিতে
কিছুটা সুবিধা ক’রে দিতে যেতো – মাটির দরের মতো রেটে;
তবুও বেদম হেসে খিল ধ’রে যেতো ব’লে বিড়ালের পেটে
ইঁদুর ‘হুর্রে’ ব’লে হেসে খুন হ’তো সেই খিল কেটে-কেটে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shubinoy-mustofi/
|
1128
|
জীবনানন্দ দাশ
|
বিড়াল
|
রূপক
|
সারাদিন একটি বিড়ালের সঙ্গে ঘুরে-ফিরে কেবলি আমার দ্যাখা হয়;
গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে
কোথায় কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর
তারপর শাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর
নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন হ'য়ে আছে দেখি;
কিন্তু তবুও তারপর কৃষ্ণচুড়ার গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছে,
সারাদিন সূর্যের পিছনে-পিছনে চলছে সে।
একবার তাকে দেখা যায়,
একবার হারিয়ে যায় কোথায়।
হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান-রঙের সূর্যের নরম শরীরে
শাদা থাবা বুলিয়ে বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তারে
তারপর অন্ধকারকে ছোটো-ছোটো বলের মতো লুফিয়ে আনলো সে,
সমস্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিল।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/bidal/
|
3568
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বিচার
|
ছড়া
|
আমার খোকার কত যে দোষ
সে-সব আমি জানি,
লোকের কাছে মানি বা নাই মানি।
দুষ্টামি তার পারি কিম্বা
নারি থামাতে,
ভালোমন্দ বোঝাপড়া
তাতে আমাতে।
বাহির হতে তুমি তারে
যেমনি কর দুষী
যত তোমার খুশি,
সে বিচারে আমার কী বা হয়।
খোকা বলেই ভালোবাসি,
ভালো বলেই নয়।
খোকা আমার কতখানি
সে কি তোমরা বোঝ।
তোমরা শুধু দোষ গুণ তার খোঁজ।
আমি তারে শাসন করি
বুকেতে বেঁধে ,
আমি তারে কাঁদাই যে গো
আপনি কেঁদে।
বিচার করি, শাসন করি,
করি তারে দুষী
আমার যাহা খুশি।
তোমার শাসন আমরা মানি নে গো।
শাসন করা তারেই সাজে
সোহাগ করে যে গো। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bichar/
|
1968
|
বিনয় মজুমদার
|
তুমি যেন ফিরে
|
প্রেমমূলক
|
তুমি যেন ফিরে এসে পুনরায় কুণ্ঠিত শিশুকে
করাঘাত ক’রে ক’রে ঘুম পাড়াবার সাধ ক’রে
আড়ালে যেও না ; আমি এত দিনে চিনেছি কেবল
অপার ক্ষমতাময়ী হাত দুটি, ক্ষিপ্র হাত দুটি—
ক্ষণিক নিস্তারলাভে একা একা ব্যর্থ বারিপাত ।
কবিতা সমাপ্ত হতে দেবে নাকি? সার্থক চক্রের
আশায় শেষের পঙক্তি ভেবে ভেবে নিদ্রা চ’লে গেছে ।
কেবলি কবোষ্ণ চিন্তা, রস এসে চাপ দিতে থাকে ।
তারা যেন কুসুমের অভ্যন্তরে মধুর ঈর্ষিত
স্থান চায়, মালিকায় গাঁথা হয়ে ঘ্রাণ দিতে চায় ।
কবিতা সমাপ্ত হতে দাও, নারী, ক্রমে—ক্রমাগত
ছন্দিত ঘর্ষণে, দ্যাখ, উত্তেজনা শির্ষ লাভ করে,
আমাদের চিন্তাপাত, কসপাত ঘটে, শান্তি নামে ।
আড়ালে যেও না যেন, ঘুম পাড়াবার সাধ ক’রে ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4038.html
|
559
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ
|
স্বদেশমূলক
|
মাভৈঃ! মাভৈঃ! এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ
সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্থান!
ছিল যারা চির-মরণ-আহত,
উঠিয়াছে জাগি’ ব্যথা-জাগ্রত,
‘খালেদ’ আবার ধরিয়াছে অসি, ‘অর্জুন’ ছোঁড়ে বাণ।
জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু-মুসলমান!
মরিছে হিন্দু, মরে মুসলিম এ উহার ঘায়ে আজ,
বেঁচে আছে যারা মরিতেছে তারা, এ-মরণে নাহি লাজ।
জেগেছে শক্তি তাই হানাহানি,
অস্ত্রে অস্ত্রে নব জানাজানি।
আজি পরীক্ষা-কাহার দস্ত হয়েছে কত দারাজ!
কে মরিবে কাল সম্মুখে-রণে, মরিতে কা’রা নারাজ।
মূর্চ্ছাতুরের কন্ঠে শুনে যা জীবনের কোলাহল,
উঠবে অমৃত, দেরি নাই আর, উঠিয়াছে হলাহল।
থামিসনে তোরা, চালা মন্থন!
উঠেছে কাফের, উঠেছে যবন;
উঠিবে এবার সত্য হিন্দু-মুসলিম মহাবল।
জেগেছিস তোরা, জেগেছে বিধাতা, ন’ড়েছে খোদার কল।
আজি ওস্তাদে-শাগরেদে যেন শক্তির পরিচয়।
মেরে মেরে কাল করিতেছে ভীরু ভারতের নির্ভয়।
হেরিতেছে কাল,-কবজি কি মুঠি
ঈষৎ আঘাতে পড়ে কি-না টুটি’,
মারিতে মারিতে কে হ’ল যোগ্য, কে করিবে রণ-জয়!
এ ‘মক্ ফাইটে’ কোন্ সেনানীর বুদ্ধি হয়নি লয়!
ক’ ফোঁটা রক্ত দেখিয়া কে বীর টানিতেছে লেপ-কাঁথা!
ফেলে রেখে অসি মাখিয়াছে মসি, বকিছে প্রলাপ যা-তা!
হায়, এই সব দুর্বল-চেতা
হবে অনাগত বিপ্লব-নেতা!
ঝড় সাইক্লোনে কি করিবে এরা! ঘূর্ণিতে ঘোরে মাখা?
রক্ত-সিন্ধু সাঁতরিবে কা’রা-করে পরীক্ষা ধাতা।
তোদেরি আঘাতে টুটেছে তোদের মন্দির মসজিদ,
পরাধীনদের কলুষিত ক’রে উঠেছিল যার ভিত!
খোদা খোদ যেন করিতেছে লয়
পরাধীনদের উপাসনালয়!
স্বাধীন হাতের পূত মাটি দিয়া রচিবে বেদী শহীদ।
টুটিয়াছে চূড়া? ওরে ঐ সাথে টুটিছে তোদের নিঁদ!
কে কাহারে মারে, ঘোচেনি ধন্দ, টুটেনি অন্ধকার,
জানে না আঁধারে শত্রু ভাবিয়া আত্মীয়ে হানে মার!
উদিবে অরুণ,ঘুচিবে ধন্দ,
ফুটিবে দৃষ্টি, টুটিবে বন্ধ,
হেরিবে মেরেছে আপনার ভায়ে বদ্ধ করিয়া দ্বার!
ভারত-ভাগ্য ক’রেছে আহত ত্রিশূল ও তরবার!
যে-লাঠিতে আজ টুটে গম্বুজ, পড়ে মন্দির-চূড়া,
সেই লাঠি কালি প্রভাতে করিবে শত্রু-দুর্গ গুঁড়া!
প্রভাতে হবে না ভায়ে-ভায়ে রণ,
চিনিবে শত্রু, চিনিবে স্বজন।
করুক কলহ-জেগেছে তো তবু-বিজয়-কেতন উড়া!
ল্যাজে তোর যদি লেগেছে আগুন, স্বর্ণলঙ্কা পুড়া!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/545
|
905
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অনেক আকাশ
|
ভক্তিমূলক
|
গানের সুরের মতো বিকেলের দিকের বাতাসে
পৃথিবীর পথ ছেড়ে – সন্ধ্যার মেঘের রঙ খুঁজে
হৃদয় ভাসিয়া যায়,- সেখানে সে কারে ভালোবাসে !-
পাখির মতন কেঁপে – ডানা মেলে- হিম- চোখ বুজে
অধীর পাতার মতো পৃথিবীর মাঠের সবুজে
উড়ে উড়ে ঘর ছেড়ে কত দিকে গিয়েছে সে ভেসে,-
নীড়ের মতন বুকে একবার তার মুখ গুঁজে
ঘুমাতে চেয়েছে,- তবু- ব্যথা পেয়ে গেছে ফেঁসে,-
তখন ভোরের রোদে আকাশে মেঘের ঠোঁট উঠেছিল হেসে!
আলোর চুমায় এই পৃথিবীর হৃদয়ের জ্বর
ক’মে যায়; -তাই নীল আকাশের স্বাদ- স্বচ্ছলতা-
পূর্ণ ক’রে দিয়ে যায় পৃথিবীর ক্ষুদির গহ্বর;
মানুষের অন্তরের অবসাদ – মৃত্যুর জড়তা
সমুদ্র ভাঙিয়া যায়; - নক্ষত্রের সাথে কয় কথা
যখন নক্ষত্র তবু আকাশের অন্ধকার রাতে-
তখন হৃদয়ে জাগে নতুন যে এক অধীরতা ,
তাই ল’য়ে সেই উষ্ণ –আকাশের চাই যে জড়াতে
গোধূলির মেঘে মেঘ, নক্ষত্রের মতো র’বো নক্ষত্রের সাথে!
আমারে দিয়েছ তুমি হৃদয়ের যে এক ক্ষমতা
ওগো শক্তি ,- তার বেগে পৃথিবীর পিপাসার ভার
বাধা পায়, জেনে লয় নক্ষত্রের মতো স্বচ্ছতা!
আমারে করেছ তুমি অসহিস্নু- ব্যর্থ-চমৎকার !
জীবনের পারে থেকে যে দেখেছে মৃত্যুর ওপার,
কবর খুলেছে মুখ বার-বার যার ইশারায়,
বীণার তারের মতো পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষার তার
তাহার আঘাত পেয়ে কেঁপে কেঁপে ছিঁড়ে শুধু যায়!
একাকী মেঘের মতো ভেসেছে সে- বৈকালের আলোয় – সন্ধ্যায় !
সে এসে পাখির মতো স্থির হয়ে বাধে নাই নীড়, -
তাহার পাখায় শুধু লেগে আছে তীর – অস্থিরতা !
অধীর অন্তর তারে করিয়াছে অস্থির অধীর !
তাহারি হৃদয় তারে দিয়েছে ব্যাধের মতো ব্যথা!
একবার তাই নীল আকাশের আলোর গাড়তা
তাহারে করেছে মুগ্ধ, - অন্ধকার নক্ষত্র আবার
তাহারে নিয়েছে ডেকে ,- জেনেছে সে এই চঞ্চলতা
জীবনের;- উড়ে উড়ে দেখেছে সে মরণের পার
এই উদ্বেলতা ল’য়ে নিশীথের সমুদ্রের মতো চমৎকার!
গোধূলির আলো ল’ য়ে দুপুরে সে করিয়াছে খেলা,
স্বপ্ন দিয়ে দুই চোখ একা একা রেখেছে সে ঢাকি ;
আকাশে আঁধার কেটে গিয়েছে যখন ভোরবেলা
সবাই এসেছে পথে,- আসে নাই তবু সেই পাখি!-
নদীর কিনারে দূরে ডানা মেলে উড়েছে একাকী,
ছায়ার উপরে তার নিজের পাখার ছায়া ফেলে
সাজায়েছে স্বপনের’ পরে তার হৃদয়ের ফাঁকি !
সূর্যের আলোর পরে নক্ষত্রের মতো আলো জ্বেলে
সন্ধ্যার আঁধার দিয়ে দিন তারে ফেলেছে সে মুছে অবহেলা !
কেউ তারে দেখে নাই ;- মানুষের পথ ছেড়ে দূরে
হাড়ের মতন শাখা ছায়ার মতন পাতা ল’য়ে
যেইখানে পৃথিবীর মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়ে
কথা কয়,- আকাঙ্ক্ষার আলোড়নে চলিতেছে বয়ে
হেমন্তের নদী,- ঢেউ ক্ষুধিতের মতো এক সুরে
হতাশ প্রাণের মতো অন্ধকারে ফেলিছে নিশ্বাস,-
তাহাদের মতো হয়ে তাহাদের সাথে গেছি রয়ে :
দূরে পড়ে পৃথিবীর ধূলা – মাটি – নদী- মাঠ – ঘাস,-
পৃথিবীর সিন্ধু দূরে ,- আরো দূরে পৃথিবীর মেঘের আকাশ !
এখানে দেখেছি আমি জাগিয়াছ হে তুমি ক্ষমতা,
সুন্দর মুখের চেয়ে তুমি আরো ভীষণ –সুন্দর !
ঝড়ের হাওয়ার চেয়ে আরো শক্তি – আরো ভীষণতা
আমারে দিয়েছে ভয়! এইখানে পাহাড়ের’ পর
তুমি এসে বসিয়াছ,- এইখানে অশান্ত সাগর
তোমারে এনেছে ডেকে ;- হে ক্ষমতা , তোমার বেদনা
পাহাড়ের বনে বনে তুলিতেছে উত্তরের ঝড়
আকাশের চোখে- মুখে তুলিতেছে বিদ্যুতের ফণা
তোমার স্ফুলিঙ্গ আমি, ওগো শক্তি,- উল্লাসের মতন যন্ত্রণা !
আমার সকল ইচ্ছা প্রার্থনার ভাষার মতন
প্রেমিকের হৃদয়ের গানের মতন কেঁপে উঠে
তোমারে প্রাণের কাছে একদিন পেয়েছে কখন !
সন্ধ্যার আলোর মতো পশ্চিম মেঘের বুকে ফুটে,
আঁধার রাতের মতো তারার আলোর দিকে ছুটে ,
সিন্ধুর ঢেউ এর মতো ঝড়ের হাওয়ার কোলে জেগে
সব আকাঙ্ক্ষার বাঁধ একবার গেছে তার টুটে !
বিদ্যুতের পিছে পিছে ছুটে গেছি বিদ্যুতের বেগে !
নক্ষত্রের মতো আমি আকাশের নক্ষত্রের বুকে গেছি লেগে !
যেই মুহূর্ত চ’লে গেছে ,- জীবনের যেই দিন গুলি
ফুরায়ে গিয়েছে সব,- একবার আসে তারা ফিরে;
তোমার পায়ের চাপে তাদের করেছো তুমি ধূলি !
তোমার আঘাত দিয়ে তাদের গিয়েছ তুমি ছিঁড়ে !
হে ক্ষমতা ,- মনের ব্যথার মতো তাদের শরীরে
নিমেষে নিমেষে তুমি কতবার উঠেছিলে জেগে !
তারা সব চ’লে গেছে;- ভূতুড়ে পাতার মতো ভিড়ে
উত্তর হাওয়ার মতো তুমি আজো রহিয়াছ লেগে!
যে সময় চ’লে গেছে তা- ও কাঁপে ক্ষমতার বিস্ময়ে – আবেগে !
তুমি কাজ ক’রে যাও, ওগো শক্তি , তোমার মতন !
আমারে তোমার হাতে একাকী দিয়েছি আমি ছেড়ে ;
বেদনা- উল্লাসে তাই সমুদ্রের মতো ভরে মন !-
তাই কৌতূহল – তাই ক্ষুধা এসে হৃদয়েরে ঘেরে ,-
জোনাকির পথ ধ’রে তাই আকাশের নক্ষত্রেরে
দেখিতে চেয়েছি আমি, - নিরাশার কোলে ব’সে একা
চেয়েছি আশারে আমি,- বাঁধনের হাতে হেরে, হেরে
চাহিয়াছি আকাশের মতো এক অগাধের দেখা ! –
ভোরের মেঘের ঢেউয়ে মুছে দিয়ে রাতের মেঘের কালো রেখা!
আমি প্রণয়িনী ,- তুম হে অধীর , আমার প্রণয়ী !
আমার সকল প্রেম উঠেছে চোখের জলে ভেসে !-
প্রতিধ্বনির মতো হে ধ্বনি, তোমার কথা কহি
কেঁপে উঠে – হৃদয়ের সে যে কত আবেগে আবেশে!
সব ছেড়ে দিয়ে আমি তোমারে একাকী ভালোবেসে
তোমার ছায়ার মতো ফিরিয়াছি তোমার পিছনে !
তবু ও হারায়ে গেছ ,- হঠাৎ কখন কাছে এসে
প্রেমিকের মতো তুমি মিশেছ আমার মনে মনে
বিদ্যুৎ জ্বালায়ে গেছ,-আগুন নিভায়ে গেছ হঠাৎ গোপনে !
কেন তুমি আস যাও ? – হে অস্থির , হবে নাকি ধীর !
কোনোদিন !- রৌদ্রের মতন তুমি সাগরের’ পরে
একবার-দুইবার জ্বলে উঠে হতেছ অস্থির ! –
তারপর, চ’লে যাও কোন দূরে পশ্চিমে- উত্তরে,-
সেখানে মেঘের মুখে চুমু খাও ঘুমের ভুতরে,
ইন্দ্রধনুকের মতো তুমি সেইখানে উঠিতেছ জ্ব’লে,
চাঁদের আলোর মতো একবার রাত্রির সাগরে
খেলা করো ;- জ্যোৎস্না চ’লে যায়,- তবু তুমি যাও চ’লে
তার আগে; - যা বলেছ একবার, যাবে নাকি আবার তা ব’লে !
যা পেয়েছি একবার পাব নাকি আবার তা খুঁজে !
যেই রাত্রি যেই দিন একবার কয়ে গেল কথা
আমি চোখ বুজিবার আগে তারা গেল চোখ বুজে,
ক্ষীণ হয়ে নিভে গেল সলিতার আলোর স্পষ্টতা !
ব্যথার বুকের ‘পরে আর এক ব্যথা বিহ্বলতা
নেমে এলো ;- উল্লাস ফুরায়ে গেল নতুন উৎসবে ;
আলো অন্ধকার দিয়ে বুনিতেছি শুধু এই ব্যথা, -
দুলিতেছি এই ব্যথা – উল্লাসের সিন্ধুর বিপ্লবে !
সব শেষ হবে , - তবু আলোড়ন ,- তা কি শেষ হবে !
সকল যেতেছে চ’লে ,- সব যায় নিভে – মুছে- ভেসে-
যে সুর থেমেছে তার স্মৃতি তবু বুকে জেগে রয় !
যে নদী হারায়ে যায় অন্ধকারে –রাতে – নিরুদ্দেশে,
তাহার চঞ্চল জল স্তব্ধ হয়ে কাঁপায় হৃদয় !
যে মুখ মিলায়ে যায় আবার ফিরিতে তারে হয়
গোপনে চোখের’পরে,- ব্যথিতের স্বপ্ন্বের মতন !
ঘুমন্তের এই অশ্রু –কোন পীড়া –সে কোন বিস্ময়
জানায়ে দিতেছে এসে !- রাত্রি-দিন আমাদের মন
বর্তমান অতীতের গুহা ধ’রে একা একা ফিরিছে এমন !
আমরা মেঘের মতো হঠাৎ চাঁদের বুকে এসে
অনেক গভীর রাতে- একবার পৃথিবীর পানে
চেয়ে দেখি, আবার মেঘের মতো চুপে চুপে ভেসে
চ’লে যাই এক ক্ষীণ বাতাসের দুর্বল আহ্বানে
কোন দিকে পথ বেয়ে! – আমাদের কেউ কি তা জানে ।
ফ্যাকাশে মেঘের মতো চাঁদের আকাশ পিছে রেখে
চ’লে যাই;- কোন এক রুগ্ন হাত আমাদের টানে ?
পাখির মায়ের মতো আমাদের নিতেছে সে ডেকে
আরো আকাশের দিকে,- অন্ধকারে,- অন্য কারো আকাশের থেকে !
একদিন বুজিবে কি চারিদিকে রাত্রির গহবর !-
নিবন্ত বাতির বুকে চুপে চুপে যেমন আঁধার
চ’লে আসে ,- ভালোবেসে – নুয়ে তার চোখের উপর
চুমু খায়,- তারপর তারে কোলে টেনে লয় তার;-
মাথার সকল স্বপ্ন – হৃদয়ের সকল সঞ্চার
একদিন সেই শূন্য সেই শীত নদীর উপরে
ফুরাবে কি? – দুলে দুলে অন্ধকারে তবুও আবার
আমার রক্তের ক্ষুধা নদীর ঢেউয়ের মতো স্বরে
গান গাবে,- আকাশ উঠিবে কেঁপে আবার সে সঙ্গীতের ঝড়ে !
পৃথিবীর – আকাশের পুরানো কে আত্মার মতন
জেগে আছি; - বাতাসের সাথে সাথে আমি চলি ভেসে,
পাহাড়ে হাওয়ার মতো ফিরিতেছে একা একা মন,
সিন্ধুর ঢেউয়ের মতো দুপুরের সমুদ্রের শেষে
চলিতেছে ; - কোন এক দূর দেশে – কোন নিরুদ্দেশে
জন্ম তার হয়েছিল ,- সেইখানে উঠেছে সে বেড়ে;
দেহের ছায়ার মতো আমার মনের সাথে মেশে
কোন স্বপ্ন !- এ আকাশ ছেড়ে দিয়ে কোন আকাশেরে
খুঁজে ফিরি !- গুহার হাওয়ার মতো বন্দী হয়ে মন তব ফেরে !
গাছের শাখার জালে এলোমেলো আঁধারের মতো
হৃদয় খুঁজিছে পথ, ভেসে ভেসে ,- সে যে কারে চায় ।
হিমের হওয়ার হাত তার হাড় করিছে আহত,-
সে- ও কি শাখার মতো – পাতার মতন ঝ’রে যায় !
বনের বুকের গান তার মতো শব্দ ক’রে গায় !
হৃদয়ের সুর তার সে যে কবে ফেলেছে হারায়ে !
অন্তরের আকাঙ্ক্ষারে – স্বপনেরে বিদায় জানায়
জীবন মৃত্যুর মাঝে চোখ বুজে একাকী দাঁড়ায়ে ;
ঢেউয়ের ফেনার মতো ক্লান্ত হয়ে মিশিবে কি সে – ঢেউয়ের গায়ে !
হয়তো সে মিশে গেছে- তারে খুঁজে পাবে নাকো কেউ!
কেন যে সে এসেছিল পৃথিবীর কেহ কি তা জানে !
শীতের নদীর বুকে অস্থির হয়েছে যেই ঢেউ
শুনেছে সে উষ্ণ গান সমুদ্রের জলের আহ্বানে !
বিদ্যুতের মতো অল্প আয়ু তবু ছিল তার প্রাণে ,
যে ঝড় ফুরায়ে যায় তাহার মতন বেগ লয়ে
যে প্রেম হয়েছে ক্ষুব্ধ সেই ব্যর্থ প্রেমিকের গানে
মিলায়েছে গান তার ,- তারপরে চ’লে গেছে বয়ে।
সন্ধ্যার মেঘের রঙ কখন গিয়েছে তার অন্ধকার হয়ে !
তবুও নক্ষত্র এক জেগে আছে,- সে যে তারে ডাকে!
পৃথিবী চায় নি যারে,- মানুষ করেছে যারে ভয়
অনেক গভীর রাতে তারায় তারায় মুখ ঢাকে
তবুও সে ! – কোন এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ চোখে ছবি দেখে একা জেগে রয় !
মানুষীর মতো ? কিংবা আকাশের তারাটির মতো ,-
সেই দূর- প্রণয়িনী আমাদের পৃথিবীর নয় !
তার দৃষ্টি তাড়নায় করেছে যে আমারে ব্যাহত ,-
ঘুমন্ত বাঘের বুকে বিষের বাণের মতো বিষম সে ক্ষত !
আলো আর অন্ধকারে তার ব্যথা- বিহবলতা লেগে,
তাহার রক্তে পৃথিবী হতেছে শুধু লাল !-
মেঘের চিলের মতো – দুরন্ত চিতার মতো বেগে
ছুটে যাই ;- পিছে ছুটে আসিতেছে বৈকাল-সকাল
পৃথিবীর ;- যেন কোন মায়াবীর নষ্ট ইন্দ্রজাল
কাঁদিতেছে ছিঁড়ে গিয়ে ! কেঁপে কেঁপে পড়িতেছে ঝ’রে!
আরো কাছে আসিয়াছি তবু আজ, - আরো কাছে কাল
আসিব তবুও আমি,- দিন রাত্রি রয় পিছে প’ড়ে ,-
তারপর একদিন কুয়াশার মতো সব বাধা যাবে স’রে !
সিন্ধুর ঢেউয়ের তলে অন্ধকার রাতের মতন
হৃদয় উঠিতে আছে কোলাহলে কেঁপে বার-বার!
কোথায় রয়েছে আলো জেনেছে তা – বুঝেছে তা মন
চারিদিকে ঘিরে তারে রহিয়াছে যদিও আঁধার !
একদিন এই গুহা ব্যথা পেয়ে আহত হিয়ার
বাঁধন খুলিয়া দেবে ! অধীর ঢেউয়ের মতো ছুটে
সেদিন সে খুঁজে লবে ওই দূর নক্ষত্রের পার !
সমুদ্রের অন্ধকারে গহ্বরের ঘুম থেকে উঠে
দেখিবে জীবন তার খুলে গেছে পাখির ডিমের মতো ফুটে !
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/876
|
2615
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
অবসান হল রাতি
|
চিন্তামূলক
|
অবসান হল রাতি।
নিবাইয়া ফেলো কালিমামলিন
ঘরের কোণের বাতি।
নিখিলের আলো পূর্ব আকাশে
জ্বলিল পুণ্যদিনে;
এক পথে যারা চলিবে তাহারা
সকলেরে নিক্ চিনে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/obosan-holo-rati/
|
3144
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তাই তোমার আনন্দ আমার পর
|
ভক্তিমূলক
|
তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর
তুমি তাই এসেছ নীচে।
আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর,
তোমার প্রেম হত যে মিছে।
আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা,
আমার হিয়ায় চলছে রসের খেলা,
মোর জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে
তোমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে।তাই তো তুমি রাজার রাজা হয়ে
তবু আমার হৃদয় লাগি
ফিরছ কত মনোহরণ-বেশে
প্রভু নিত্য আছ জাগি।
তাই তো, প্রভু, হেথায় এল নেমে,
তোমারি প্রেম ভক্ত প্রাণের প্রেমে,
মূর্তি তোমার যুগল-সম্মিলনে
সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে।জানিপুর। গোরাই, ২৮ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tai-tomar-anondo-amar-por/
|
485
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
রুবাইয়াত- ১১
|
ভক্তিমূলক
|
দুঃখে আমি মগ্ন প্রভু, দুয়ার খোলো করুণার!
আমায় করো তোমার জ্যোতি, অন্তর মোর অন্ধকার।
স্বর্গ যদি অর্জিতে হয় এতই পরিশ্রম করে-
সে ত আমার পারিশ্রমিক, নয় সে দয়ার দান তোমার।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rubaiyat-11/
|
2212
|
মহাদেব সাহা
|
বাঁচবে না কবির হৃদয়
|
প্রেমমূলক
|
তোমার দেখা না পেলে একটিও কবিতা হবে না
দুই চোখ কোথাও পাবে না খুঁজে একটি উপমা,
কবিতার পান্ডুলিপি হবে দগ্ধ রুক্ষ মরুময়
তোমার দেখা না পেলে কাটবে না এই দু:সময়।
তোমার দেখা না পেলে সবখানে গোলযোগ হবে
দুর্ঘটনা,যানজট,বিশৃঙ্খলা বাড়বে কেবল,
সর্বত্র বাড়বে রোগ,অনাবৃষ্টি আর দীর্ঘ খরা
প্রত্যহ বাধবে শুধু কলহ-কোন্দল আর যুদ্ধ-হানাহানি
তোমার দেখা না পেলে হবে শুষ্ক এই জলাশয়,
তোমার দেখা না পেলে বাঁচবে না কবির হৃদয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1430
|
1321
|
তসলিমা নাসরিন
|
কাঁপন ২১
|
প্রেমমূলক
|
এমন তোলপাড় করে, আমূল তছনছ করে শরীরের সব মধু নিলে তুমি মৌমাছি
অবশিষ্ট যেটুকু আছি সেটুক লেহন করে আমাকে নিঃশেষ করো, আমি বাঁচি।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1991
|
3408
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পুষ্পচয়িনী
|
প্রেমমূলক
|
হে পুষ্পচয়িনী,
ছেড়ে আসিয়াছ তুমি কবে উজ্জয়িনী
মালিনীছন্দের বন্ধ টুটে।
বকুল উৎফুল্ল হয়ে উঠে
আজো বুঝি তব মুখমদে।
নূপুররণিত পদে।
আজো বুঝি অশোকের ভাঙাইবে ঘুম।
কী সেই কুসুম
যা দিয়ে অতীত জন্মে গণেছিলে বিরহের দিন।
বুঝি সে-ফুলের নাম বিস্মৃতিবিলীন
ভর্তৃপ্রসাদন ব্রতে যা দিয়ে গাঁথিতে মালা
সাজাইতে বরণের ডালা।
মনে হয় যেন তুমি ভুলে-যাওয়া তুমি--
মর্ত্যভূমি
তোমারে যা ব'লে জানে সেই পরিচয়
সম্পূর্ণ তো নয়।
তুমি আজ
করেছ যে-অঙ্গসাজ
নহে সদ্য আজিকার।
কালোয় রাঙায় তার
যে ভঙ্গীটি পেয়েছে প্রকাশ
দেয় বহুদূরের আভাস।
মনে হয় যেন অজানিতে
রয়েছ অতীতে। মনে হয় যে-প্রিয়ের লাগি
অবন্তীনগরসৌধে ছিলে জাগি,
তাহারি উদ্দেশে
না জেনে সেজেছ বুঝি সে-যুগের বেশে।
মালতীশাখার 'পরে
এই-যে তুলেছ হাত ভঙ্গীভরে
নহে ফুল তুলিবার প্রয়োজনে,
বুঝি আছে মনে
যুগ-অন্তরাল হতে বিস্মৃত বল্লভ
লুকায়ে দেখিছে তব সুকোমল ও-করপল্লব।
অশরীরী মুগ্ধনেত্র যেন গগনে সে
হেরে অনিমেষে
দেহভঙ্গিমার মিল লতিকার সাথে
আজি মাঘীপূর্ণিমার রাতে।
বাতাসেতে অলক্ষিতে যেন কার ব্যাপ্ত ভালোবাসা
তোমার যৌবনে দিল নৃত্যময়ী ভাষা।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/puspupchane/
|
2556
|
রফিক আজাদ
|
জীবন একটি নদীর নাম
|
চিন্তামূলক
|
জীবন একটি নদীর নাম,
পিতামাতার ঐ উঁচু থেকে
নেমে-আসা এক পাগলা ঝোরা—
ক্রমশ নিম্নাভিমুখী;
পাথুরে শৈশব ভেঙে
কৈশোরের নুড়িগুলি বুকে নিয়ে
বয়ে চলা পরিণামহীন
এক জলধারা—
গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে বেলে-এঁটেল-দোআঁশ
মাটি ভেঙে-ভেঙে সামনে চলা
এক ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী;
এই বয়ে চলা পথে
বিভিন্ন বৃক্ষের সঙ্গে চলে
দ্বিরালাপ;
একবার এক বৃদ্ধ অশ্বথের সঙ্গে
হয় তার অল্পক্ষণ স্থায়ী
আদাব-সালাম বিনিময়,
তাকে বলেছিলো সেই বুড়ো:
“এ্যাতো তাড়াহুড়ো করো না হে,
ধীরে বয়ে যাও, তোমার চলার পথে
পড়বে অনেক বৃক্ষ— সবুজ, সতেজ—
তাদের শাখায় আছে পাখিদের প্রিয় ঘরবাড়ি,
পাখিদের শাবকেরা আছে— তাদের রয়েছে খুব
নরম পালক,
যেন ঐ বৃক্ষ আর তার আশ্রিতজনের
কোনো ক্ষতি না হয় তোমার দ্বারা;
যদি পারো ঊষর মাটির মধ্য দিয়ে
বয়ে যেয়ো, সর্বদা এড়িয়ে যেয়ো
পাখির নিবাস…
আমি তাকে কোনো কথাই পারিনি দিতে;
নদীর ধর্ম তো অবিরাম বয়ে চলা,
বহমান তার স্রোতধারা ভেঙে নিয়ে চলে
পাড়ের সমৃদ্ধ মাটি,
গৃহস্থের আটচালা, মাটির উনুন,
প্রবীণ লাঙল, ধানী মরিচের টাল,
তরমুজের ক্ষেত, পোষা বেড়ালের মিউ,
ফলবান বৃক্ষের বাগান, কাঁথা ও বালিশসহ সম্পন্ন সংসার।
তেমন আহ্লাদ নেই তার ভেঙে ফেলতে দু’পাড়ের
সোনার সংসার;
সে তো খুব মনস্তাপে পোড়ে,
নিরুপায় অশ্রুপূর্ণ চোখে
দীর্ঘশ্বাস চেপে সে-ও দু’পাড়ে তাকায়:
এক পাড়ে দাঁড়ানো নারীকে বাঁচাতে গিয়ে
অপর পাড়ের নিরুদ্বিগ্ন পাখিদের বাসা
তছনছ করে ছোটে,
তাকে তো ছুটতে হয়, সে যে নিরুপায়
তার কষ্ট থাকে তার বুকে;
তারও বুক ভেঙে যেতে পারে— বুকভাঙা অভিজ্ঞতা
তারও তো রয়েছে— থাকতে পারে, থাকে…
সে কথা ক’জন জানে।
নদীকে তোমরা জানো ভাঙচুরের সম্রাট!
দু’কূল-ছাপানো তার আবেগে উদ্বেল
পলি তোমাদের জীবনে কি এনে দ্যায়নি কখনো
শস্যের সম্ভার?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1603.html
|
8
|
অন্নদাশঙ্কর রায়
|
বঙ্গবন্ধু
|
ভক্তিমূলক
|
যতোকাল রবে পদ্মা-মেঘনা-
গৌরী-যমুনা-বহমান
ততোকাল র’বে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান,
চারিদিকে আজ রক্তগঙ্গা
অশ্রু গঙ্গা বহমান
নেই-নেই ভয় হবে-হবে জয়
জয় শেখ মুজিবুর রহমান।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/5835.html
|
2316
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
কৃষ্ণচূড়া
|
ভক্তিমূলক
|
(১) এই যে কুসুম শিরোপরে, পরেছি যতনে,
মম শ্যাম-চূড়া-রূপ ধরে এ ফুল রতনে!
বসুধা নিজ কুন্তলে পরেছিল কুতূহলে
এ উজ্জ্বল মণি,
রাগে তারে গালি দিয়া, লয়েছি আমি কাড়িয়া---
মোর কৃষ্ণ-চূড়া কেনে পরিবে ধরণী?(২) এই যে কম মুকুতাফল, এ ফুলের দলে,—
হে সখি, এ মোর আঁখিজল, শিশিরের ছলে!
লয়ে কৃষ্ণচূড়ামণি, কাঁদিনু আমি, স্বজনি,
বসি একাকিনী,
তিতিনু নয়ন-জলে; সেই জল এই দলে
গলে পড়ে শোভিতেছে, দেখ্ লো কামিনি!(৩) পাইয়া এ কুসুম রতন—শোন্ লো যুবতি,
প্রাণহরি করিনু স্মরণ —স্বপনে যেমতি!
দেখিনু রূপের রাশি মধুর অধরে বাঁশী,
কদমের তলে,
পীত ধড়া স্বর্ণরেখা, নিকষে যেন লো লেখা,
কুঞ্জশোভা বরগুঞ্জমালা দোলে গলে!(৪) মাধবের রূপের মাধুরী, অতুল ভুবনে—
কার মনঃ নাহি করে চুরি, কহ লো ললনে?
যে ধন রাধায় দিয়া, রাধার মনঃ কিনিয়া
লয়েছিলা হরি,
সে ধন কি শ্যামরায়, কেড়ে নিলা পুনরায়?
মধু কহে, তাও কভু হয় কি, সুন্দরি?(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/krisnochura/
|
5133
|
শামসুর রাহমান
|
ম্যাগাজিনে আমার স্ত্রীর সাক্ষাৎকার প’ড়ে
|
চিন্তামূলক
|
ভাবতেই পারিনি, এমন গুছিয়ে-গাছিয়ে
বলতে পারবেন তিনি
এত কথা, যেন হাতের চেটোয়
মেহেদীর নক্শা। আমার বিষয়ে যা-যা
বলেছেন তাতে মনে হ’তে পারে
আমি প্রায় ফেরেশ্তা আর
যে-সারল্য আরোপ করা হ’য়েছে এই
বান্দার ওপর তা-ও
ষোলআনা ঠিক নয়। যুগ-সংকটের
জটিলতা আমার দোসর।কোনো কিছু লেখার সময, গদ্য পদ্য যাই হোক,
আমি বার বার কাগজ দলামোচা ক’রে
ছুঁড়ে ফেলি বাজে কাগজের
ঝুড়িতে, তিনি বলেছেন। কী ক’রে অস্বীকার
করি, বলুন? কিন্তু এটাই
সব নয়, এ খবর যদি তিনি রাখতেন। তখন,
মানে, যখন টেবিলে ঝুঁকে
লিখি, আমার ভেতরে কত হাওয়াই সেতু
গুঁড়িয়ে যায়, টগবগানো লাভা
ক্রমাগত পোড়াতে থাকে আমাকে,
কেউ এই হতচ্ছাড়াকেই ব্যর্থ কাগজের মতো
দলামোচা করে প্রহরে প্রহরে।আমার গৃহিণীর কি কখনো মনে হয় যে,
রতিবিহারের কালে ওর মুখে
অন্য কারো মুখ স্থাপন ক’রে সুখের সরোবরে
ডুবে যাই? না, ফেরেশতা টেরেশতা
আমি নই, পাক্কা শয়তানের শিরোপাও
আমার লভ্যনয়।
আমি নিজের মধ্যে এক দাউ দাউ মশাল
ব’য়ে বেড়াচ্ছি দিনরাত্রি, এ-ও
তার অজানা। জায়নামাজে ব’সে তিনি আমার
মঙ্গল কামনা করেন প্রত্যহ দু’হাত তুলে,
তখন ওর কাপড়-ঢাকা মাথা
নীলিমাকে স্পর্শ করার স্পর্ধা রাখে। আমি কি
তার এই নিষ্কলুষ ভঙ্গির যোগ্য? তিনি
প্রকৃত আমাকে পুরোপুরি চেনেন না আজো।
আমাকে নিয়ে নানা মুনির নানা মত,
কত জল্পনা কল্পনা। ওদের
প্রত্যেকের বলাবলি উপেক্ষা ক’রে, ব্যাঙআচিদের
অগুণতি লাথি অগ্রাহ্য ক’রে
আমার অস্তিত্ব বিদ্যমান হাই-রাইজ
দালানের ধরনে। সবার আন্দাজের বাইরে আমি।এতকাল অন্তর্গত দ্রোহ, ক্ষোভ, বিষাদ,
আনন্দ আর ভালোবাসার
সান্নিধ্যে বেঁচে-বর্তে আছি গেরিলার মতো,
অথচ নিজেই সবচেয়ে কম জানি নিজেকে। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/magazine-amar-strir-sakkhatkar-pore/
|
4429
|
শামসুর রাহমান
|
উত্তর
|
প্রেমমূলক
|
তুমি হে সুন্দরীতমা নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলতেই পারো
‘এই আকাশ আমার’
কিন্তু নীল আকাশ কোনো উত্তর দেবেনা।
সন্ধ্যেবেলা ক্যামেলিয়া হাতে নিয়ে বলতেই পারো,
‘ফুল তুই আমার’
তবু ফুল থাকবে নীরব নিজের সৌরভে আচ্ছন্ন হয়ে।
জ্যোত্স্না লুটিয়ে পড়লে তোমার ঘরে,
তোমার বলার অধিকার আছে, ‘এ জ্যোত্স্না আমার’
কিন্তু চাঁদিনী থাকবে নিরুত্তর।
মানুষ আমি, আমার চোখে চোখ রেখে
যদি বলো, ‘তুমি একান্ত আমার’, কী করে থাকবো নির্বাক ?
তারায় তারায় রটিয়ে দেবো, ‘আমি তোমার, তুমি আমার’।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/429
|
4360
|
শামসুর রাহমান
|
আমাদের ভালোবাসায় সন্তান
|
প্রেমমূলক
|
ক’দিন একটানা আঁধিঝড়ের পর, পাখির নীড়-পোড়ানো
দহনে হৃদয় ঝলসে যাওয়ার পর আষাঢ়ের ঘন মেঘ নামে
আমার অন্তর ছেয়ে। তোমার হৃদয়-কূলের উদ্দেশে জোয়ারে
ভাসিয়েছিলাম যে-তরী তার চোখে কি তুমি আমার অথই
ব্যাকুলতা পাঠ করতে পেরেছিলে? সে-চোখের ভাষা
অস্পষ্ট দেখলে তুমি তোমার অন্তরের পুশিদা পাখিটিকে
জিগ্যেশ করে নিলেই পারতে। আমি তো রবীন্দ্রনাথের গান,
বিটোভেনের সিস্ফনি, স্বর্ণচূড়ার রঙ, ভ্যান-গগের ছবি,
সন্ধ্যার পাখির উড়ে-যাওয়া, মায় ঘাসের শিশিরে কী সহজে
তোমার বার্তা পেয়ে যাই। যা-কিছু সুন্দর তাতেই দেখতে
পাই তোমাকে। আহ্, কী চোখ-জুড়ানো রূপ।আষাঢ়ের প্রায় সন্ধ্যাপ্রতিম মন-কেমন-করা দুপুর।
বিছানায় শুয়ে পড়ছিলাম হাল আমলের কবিতার
বই; আমাকে খানিক চমকে দিয়ে টেলিফোনে বেজে
উঠল। ‘ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম নাকি’, তোমার কণ্ঠস্বর।
‘মোটেই না, আমি তো জেগেই আছি। ‘তবু অসময়ে
টেলিফোন করে ফেললাম বলে দুঃখিত। কেমন অস্থির
লাগছিল, তাই…,’ তুমি বললে কণ্ঠে ঝর্ণাধারা বইয়ে
দিয়ে। কী-যে বলছ তুমি, আমার সকল সময় তোমাকেই
অর্পণ করেছি। তোমার জন্যে আমার কোনও বেলাই
নয়, অবেলা, আমার স্মিত উত্তর। তুমি বললে, ‘তোমাকে
আমার মতো করে চাইছিলাম এই লগ্নে, তোমার কথা
আমাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিল নিমেষে। আমার অস্থিরতা
মিলিয়ে গেছে আষাঢ়ী মেঘে। এখন তুমি বিশ্রাম করো
কবি; ইচ্ছে হলে বই পড়ো কিংবা কবিতা লেখো; পরে
কথা হবে।
আমি চাই তুমি আমাকে জাগিয়ে তোলো সবসময়। পথ চলতে
যখন জড়িয়ে আসে আমার চোখের পাতা তখন তোমার কণ্ঠস্বর ক্লান্তিপ্রসৃত
জড়তা-কুয়াশা ছিঁড়ে ফেলুক। তোমার ডাক আমাকে ফিরিয়ে
আনুক ভুলভ্রান্তির চোরাটান থেকে, আমি চাই। চাই তোমার
কথার সেই মোহন স্পর্শ, যা গাইবে জাগরণী গান। একদিন তো
এমন আসবে, যখন আমার সত্তা জুড়ে নামবে রক্ত-জমানো
বরফের পানিভেজা হিমশীতল কালো চাদরের মতো এক দুর্ভেদ্য
নিদ্রা। হায়, সেই ঘুমপাথর তোমার অমন মধুর কণ্ঠস্বরের
আলোড়নেও নড়বে না কিছুতেই।আপাতত যাক সেদিনের কথা; এখন সে-কথার বিষপিঁপড়ে
তোমার অন্তরে ছড়িয়ে বিরূপতার কর্কশকাচে মুখ ঘষে রক্তাক্ত
হতে চাই না। আমাদের ভালোবাসার সন্তান এক ফুটফুটে স্বপ্ন, যে
কখনও রোদে, কখনও জ্যোৎস্নায় খেলছে, এখন এটাই হোক প্রিয় ভাবনা। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amader-valobasai-sontan/
|
5325
|
শামসুর রাহমান
|
স্বল্পভাষী
|
প্রেমমূলক
|
সেদিন দুপুরে বিদেশে যাবার আগে
প্রায় নিজে যেচে গেলাম তোমার বাড়ি।
বারান্দা থেকে আমাকে দেখেই তুমি
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলে তাড়াতাড়ি।‘কেমন আছেন? এখানে বসুন এই
সোফাটায়, কী-যে ভালো দুপুরটা আজ।
কী দেবো এখন? দেবো কি ঠাণ্ডা কিছু?
‘কিছুই খাবো না। বাড়বে তোমার কাজ।‘আমার তুচ্ছ কথায় কান দিয়ে
নিয়ে এলে কিছু খাদ্য এবং দামি
বীয়ারের ক্যান। জীবনের মতো ক্যান
নিমেষে ফুরোলো, ঈষৎ হেসেই থামি।‘কেন যে আপনি বলেন না কিছু?
কত লোক শুনি কথা বলে রাশি রাশি
অথচ আপনি নিজের মধ্যে ডুবে
থাকেন শুধুই, আপনি স্বল্পভাষী।‘আমিও নীরবে মেনে নিই অপবাদ।
‘অমন আপনি আপনি কর যে তুমি
তা হ’লে কী ক’রে ফুটবে কথার ফুল?
কীভাবে ভরবে সুরভিতে মনোভূমি?হাতে হাত রেখে বললে মধুর স্বরে,
‘সহজে আসে না ছোট্র এ তুমি, মাফ
ক’রে দাও, আর কখনো হবে না ভুল।
পেয়ে যাই তার হৃদয়ের উত্তাপ।বলি তার কানে ‘রোজ এই অভাজন
ব্যাকুল বাজায় তোমার নামের বাঁশি
মাটিতে আকাশে সকল সময়, তবু
আমাকেই তুমি বলবে স্বল্পভাষী?’ (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/solpovashi/
|
1451
|
নবারুণ ভট্টাচার্য
|
কিছু
|
স্বদেশমূলক
|
কিছু একটা পুড়ছে
আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে
কিছু একটা পুড়েছেই
আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি
বিড়ি ধরিয়েছে কেউ
কেউ উবু হয়ে ফুঁ দিচ্ছে উনুনে
কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে
আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু
ওলট পালট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি
কোথাও গ্যাসের সিলিণ্ডার ফেটেছে
কোথাও কয়লাখনিতে, বাজির কারখানায় আগুন
কিছু একটা পুড়ছে
চার কোনা ধরে গেছে
জ্বলন্ত মশারি নেমে আসছে ঘুমের মধ্যে
কিছু একটা পুড়ছে
ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা
ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক
পুড়ছে কামনার শরীর, তুষ, মবিলে ভেজানো তুলো
কিছু একটা পুড়ছেই
হল্কা এসে লাগছে আঁচের
ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি
প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, দুপ্তপ্রাপ্য বই
কিছু একটা পুড়ছে
আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখছি কী পুড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে
কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে
চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে
ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠবে
কিছু একটা পুড়ছে বলছি
দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য
কিছু একটা পুড়ছে
প্রকাশ্যে, চোখের ওপর
মানুষের মধ্যে
স্বদেশ!
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%9b%e0%a7%81-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3-%e0%a6%ad/
|
1202
|
জীবনানন্দ দাশ
|
শিকার
|
রূপক
|
ভোর;
আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল:
চারিদিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ।
একটি তারা এখনো আকাশে রয়েছে :
পাড়াগাঁর বাসরঘরে সবচেয়ে গোধূলি-মদির মেয়েটির মতো;
কিংবা মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে মুক্তা
আমার নীল মদের গেলাসে রেখেছিল
হাজার হাজার বছর আগে এক রাতে তেমনি-
তেমনি একটি তারা আকাশে জ্বলছে এখনো।
হিমের রাতে শরীর ‘উম্’ রাখবার জন্য দেশোয়ালিরা
সারারাত মাঠে আগুন জ্বেলেছে-
মোরগফুলের মতো লাল আগুন
শুকনো অশ্বত্থ পাতা দুমড়ে এখনো আগুন জ্বলছে তাদের;
সূর্যের আলোয় তার রঙ কুঙ্কুমের মতো নেই আর;
হয়ে গেছে রোগা শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো।
সকালের আলোয় টলমল শিশিরে চারিদিকের বন ও আকাশ
ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে।
ভোর;
সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে
নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে
অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে
সুন্দর বাদামি হরিণ এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিল।
এসেছে সে ভোরের আলোয় নেমে;
কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধী ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে;
নদীর তীক্ষ্ম শীতল ঢেউয়ে সে নামল-
ঘুমহীন ক্লান্ত বিহ্বল শরীরটাকে স্রোতের মতো একটা আবেগ দেওয়ার জন্য
অন্ধকারের হিম কুঞ্চিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রৌদ্রের মতো
একটা বিস্তীর্ণ উল্লাস পাবার জন্য,
এই নীল আকাশের নিচে সূর্যের সোনার বর্শার মতো জেগে উঠে
সাহসে সাথে সৌন্দর্যে হরিণীর পর হারিণীকে চমক লাগিয়ে দেবার জন্য।
একটা অদ্ভূত শব্দ।
নদীর জল মচকাফুলের মতো লাল।
আগুন জ্বলল আবার – উষ্ণ লাল হরিণের মাংস তৈরি হয়ে এল।
নক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় বসে অনেক পুরনো শিশিরভেজা গল্প;
সিগারেটের ধোঁয়া;
টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা;
এলোমেলো কয়েকটা বন্দুক – হিম – নিস্পন্দ নিরপরাধ ঘুম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/949
|
2427
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
ইমার্জেন্সি
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
প্রতিদিন দেখ কতদূর থেকে কতশত রোগী আসে
কারো জ্বর কারো মাথায় ব্যথা কেউ বসে শুধু কাশে।
কারো চুলকানি কারো এলার্জি কারো চোখ টকটকে লাল
কারো বদহজম কারো বুকে ব্যথা কারো পেট পুরো বেহাল।
এতো রোগী সব চুপ করে বসা কারো ব্যস্ততা নাই
আর তোমার একটু গলা ভেঙ্গেছে বলে ইমার্জেন্সি চাই?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2023
|
2649
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আকাশে ছড়ায়ে বাণী
|
ভক্তিমূলক
|
আকাশে ছড়ায়ে বাণী
অজানার বাঁশি বাজে বুঝি।
শুনিতে না পায় জন্তু,
মানুষ চলেছে সুর খুঁজি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akashe-choraye-banii/
|
1815
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
গোলাপসুন্দরী পড়ে
|
চিন্তামূলক
|
তোমাদের মনে হতে পারে ছেলেখেলা, ইয়ার্কি ফাজলেমির নশ্বরতাও হয়তো বা,
কিন্তু এই বুদবুদগুলো প্রকৃতপক্ষে আমার নিজস্ব অহঙ্কার!
হাওয়া, যে-কোনো ওড়াউড়িময় সৃষ্টির সম্পর্কে বিরুদ্ধতার জন্যে যে বিখ্যাত,
সরাসরি তার সঙ্গে এক গোপন পাঞ্জার লড়াইও বলতে পারো এটাকে।
সেই কারণেই আমার হাতের এনামেল বাটিতে সাবান জল
আর এখন আমি এই পাহাড়-সদৃশ হাসপাতালের খৃষ্টপূর্ব প্রাচীনতার সামনে
যার খোপে খোপে মৃত্যুর শৈশবের দিকে
শৈশবের মৃত্যুর দিকে যবনিকাহীন যাতায়াত।
এই বুদবুদগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌছবে আমার জানা নেই
কিন্তু এদের উদ্দেশ্য এবং উপকারিতা সম্বন্ধে আমি শতকরা নিরানব্বই ভাগ সজাগ।
এই রঙীন অহঙ্কারময় খেলাটি আমি আশ্চর্যভাবে শিখে যাই বাল্যকালে
বাল্যকালের পক্ষে যে-সব গল্প প্রবন্ধ কবিতা উপন্যাস ছবি এবং গান অপরাধমূলক
তার প্রত্যেকটির মধ্যেই আমি দেখতে পাই এই সাবান জল
আর সাবানা জলের উপরে ঝুকে পড়া সেই সব মানুষদের
যাদের ক্ষতবিক্ষত মুকের ভাস্কর্য-রেখার উপরে, সমকালীন নয়,
ভবিষ্যৎ শতাব্দীর সুর্যরশ্মি অভ্যর্থনার আয়োজনে ব্যতিব্যস্ত।
বস্তুত এই সাবান জল আমি পেয়ে গেছি একপ্রকার উত্তরাধিকারসূত্রেই
এখনকার এই বুদবুদগুলোই শুধু আমার।
ভ্রাম্যমান অক্ষর!
যাও, আকাশে একটা নতুন এলাচ-গন্ধের দ্বীপ গড়ে এসো।
ভ্রাম্যমান অক্ষর!
ঐ বিশ্বাসহীন যুবকটিকে বলে এসো আকাঙ্খারই অন্য নাম জীবন।
ভ্রাম্যমান অক্ষর!
অসহ্য রক্ত-প্রবাহের পিছনে যে বিশ্বাসঘাতক অস্ত্র
তাকে জানিয়ে দাও একদিনএর প্রতিশোধ নেবে যুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর সব গোলাপ ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1174
|
2727
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার শেষ বেলাকার ঘরখানি
|
স্বদেশমূলক
|
আমার শেষবেলাকার ঘরখানি
বানিয়ে রেখে যাব মাটিতে,
তার নাম দেব শ্যামলী।
ও যখন পড়বে ভেঙে
সে হবে ঘুমিয়ে পড়ার মতো,
মাটির কোলে মিশবে মাটি;
ভাঙা থামে নালিশ উঁচু করে
বিরোধ করবে না ধরণীর সঙ্গে;
ফাটা দেয়ালের পাঁজর বের ক'রে
তার মধ্যে বাঁধতে দেবে না
মৃতদিনের প্রেতের বাসা।
সেই মাটিতে গাঁথব
আমার শেষ বাড়ির ভিত
যার মধ্যে সব বেদনার বিস্মৃতি,
সব কলঙ্কের মার্জনা,
যাতে সব বিকার সব বিদ্রূপকে
ঢেকে দেয় দূর্বাদলের স্নিগ্ধ সৌজন্যে;
যার মধ্যে শত শত শতাব্দীর
রক্তলোলুপ হিংস্র নির্ঘোষ
গেছে নিঃশব্দ হয়ে।
সেই মাটির ছাদের নিচে বসব আমি
রোজ সকালে শৈশবে যা ভরেছিল
আমার গাঁটবাঁধা চাদরের কোনা
এক-একমুঠো চাঁপা আর বেল ফুলে।
মাঘের শেষে যার আমের বোল
দক্ষিণের হাওয়ায়
অলক্ষ্য দূরের দিকে ছড়িয়েছিল
ব্যথিত যৌবনের আমন্ত্রণ।
আমি ভালোবেসেছি
বাংলাদেশের মেয়েকে;
যে-দেখায় সে আমার চোখ ভুলিয়েছে
তাতে আছে যেন এই মাটির শ্যামল অঞ্জন,
ওর কচি ধানের চিকন আভা।
তাদের কালো চোখের করুণ মাধুরীর উপমা দেখেছি
ঐ মাটির দিগন্তে
নীল বনসীমায় গোধূলির শেষ আলোটির
নিমীলনে।
প্রতিদিন আমার ঘরের সুপ্ত মাটি
সহজে উঠবে জেগে
ভোরবেলাকার সোনার কাঠির
প্রথম ছোঁওয়ায়;
তার চোখ-জুড়ানো শ্যামলিমায়
স্মিত হাসি কোমল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে
চৈত্ররাতের চাঁদের
নিদ্রাহারা মিতালিতে।
চিরদিন মাটি আমাকে ডেকেছে
পদ্মার ভাঙনলাগা
খাড়া পাড়ির বনঝাউবনে,
গাঙশালিকের হাজার খোপের বাসায়;
সর্ষে-তিসির দুইরঙা খেতে
গ্রামের সরু বাঁকা পথের ধারে,
পুকুরের পাড়ির উপরে।
আমার দু-চোখ ভ'রে
মাটি আমায় ডাক পাঠিয়েছে
শীতের ঘুঘুডাকা দুপুরবেলায়,
রাঙা পথের ও পারে,
যেখানে শুকনো ঘাসের হলদে মাঠে
চরে বেড়ায় দুটি-চারটি গোরু
নিরুৎসুক আলস্যে,
লেজের ঘায়ে পিঠের মাছি তাড়িয়ে;
যেখানে সাথীবিহীন
তালগাছের মাথায়
সঙ্গ-উদাসীন নিভৃত চিলের বাসা।
আজ আমি তোমার ডাকে
ধরা দিয়েছি শেষবেলায়।
এসেছি তোমার ক্ষমাস্নিগ্ধ বুকের কাছে,
যেখানে একদিন রেখেছিলে অহল্যাকে,
নবদূর্বাশ্যামলের
করুণ পদস্পর্শে
চরম মুক্তি-জাগরণের প্রতীক্ষায়,
নবজীবনের বিস্মিত প্রভাতে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-shas-balar-garkhane/
|
774
|
জসীম উদ্দীন
|
আসমানী
|
মানবতাবাদী
|
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমন্দীর ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা-ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক’খান হাড়,
সাক্ষী দেছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাব আসি।
পরণে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালী তার গার বরণের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশীর মত সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয়নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল-বিল-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না খাওয়া আসমানীদের চলে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।
খোসমানী আর আসমানী যে রয় দুইটি দেশে,
কও তো যাদু, কারে নেবে অধিক ভালবেসে?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/575
|
2275
|
মহাদেব সাহা
|
সুন্দরের হাতে আজ হাতকড়া, গোলাপের বিরুদ্ধে হুলিয়া
|
মানবতাবাদী
|
সুন্দরের হাতে আজ হাতকড়া, গোলাপের বিরুদ্ধে
হুলিয়া,
হৃদয়ের তর্জমা নিষিদ্ধ আর মননের সম্মুখে প্রাচীর
বিবেক নিয়ত বন্দী, প্রেমের বিরুদ্ধে পরোয়ানা;
এখানে এখন পাখি আর প্রজাপতি ধরে ধরে
কারাগারে রাখে-
সবাই লাঞ্ছিত করে স্বর্ণচাঁপাকে;
সুপেয় নদীর জলে ঢেকে দেয় বিষ, আকাশকে
করে উপহাস।
আলোর বিরুদ্ধাচারী আঁধারের করে শুধু স্ততি,
বসন্তের বার্তা শুনে জারি করে পূর্বাহ্নে কারফিউ,
মানবিক উৎসমুখে ফেলে যতো শিলা ও পাথর-
কবিতাকে বন্দী করে, সৌন্দর্যকে পরায় শৃঙ্খল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1408
|
1012
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ঘরের ভিতরে দীপ জ্বলে ওঠে সন্ধ্যায়
|
প্রকৃতিমূলক
|
ঘরের ভিতরে দীপ জ্বলে ওঠে সন্ধ্যায়—ধীরে ধীরে বৃষ্টি ক্ষান্ত হয়
ভিজে চালে ডুমুরের পাতা ঝরে—শালিখ বসিয়া থাকে মুহূর্ত সময়
জানালার কাছে এসে, ভিজে জানালার কাছে
মৌমাছি বহুক্ষণ মৃদু গুমরায়
এইসব ভালো লাগে : এইসব ম্লান গন্ধ মৃদু স্বাদ চায়
পৃথিবীর পথে ঘুরে আমার হৃদয়
ডুমুরের পাতা ঝরে ভিজে চালে—ধীরে ধীরে বৃষ্টি ক্ষান্ত হয়
মলিন শাড়ির ঘ্রাণ ধূপ হাতে দুয়ারে দাঁড়ায়।এইসব ভালোবাসি—জীবনের পথে ঘুরে
এইসব ভালোবাসে আমার হৃদয়
ঘরে আলো, বৃষ্টি ক্ষান্ত হ’ল সন্ধ্যায়
ঘরের দীপ জ্বলে ওঠে, ধীরে ধীরে বৃষ্টি ক্ষান্ত হয়
ভিজে চালে কদমের পাতা ঝরে—শালিক বসিয়া থাকে মুহূর্ত সময়
মলিন শাড়ির ঘ্রাণ ধূপ হাতে দুয়ারে দাঁড়ায়
মৃদু আরো মৃদু হয়ে অবিরল বাতাসে হারায়।।কাব্যগ্রন্থ - রুপসী বাংলা
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ghorer-vitorey-dip-joley-othey-sondhyay/
|
4077
|
রুদ্র গোস্বামী
|
ঘর
|
প্রেমমূলক
|
মেয়েটা পাখি হতে চাইল
আমি বুকের বাঁদিকে আকাশ পেতে দিলাম।দু-চার দিন ইচ্ছে মতো ওড়াওড়ি করে বলল,
তার একটা গাছ চাই।
মাটিতে পা পুঁতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম।
এ ডাল সে ডাল ঘুরে ঘুরে ,
সে আমাকে শোনালো অরণ্য বিষাদ।তারপর টানতে টানতে
একটা পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে নিয়ে এসে বলল,
তারও এমন একটা পাহাড় ছিল।
সেও কখনো পাহারের জন্য নদী হোতো।আমি ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে মেয়েটিকে বললাম,
নদী আর নারীর বয়ে যাওয়ায় কোনও পাপ থাকে না।সে কিছু ফুটে থাকা ফুলের দিকে দেখিয়ে
জানতে চাইল,
কি নাম ?
বললাম গোলাপ।দুটি তরুণ তরুণীকে দেখিয়ে বলল,
কি নাম ?
বললাম প্রেম।তারপর একটা ছাউনির দিকে দেখিয়ে
জিজ্ঞেস করলো,
কি নাম ?
বললাম ঘর।এবার সে আমাকে বলল,
তুমি সকাল হতে জানো ?
আমি বুকের বাঁদিকে তাকে সূর্য দেখালাম ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4621.html
|
3169
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমাদের জানি তবু আমরা যে দূরের মানুষ
|
চিন্তামূলক
|
তোমাদের জানি, তবু তোমরা যে দূরের মানুষ।
তোমাদের আবেষ্টন, চলাফেরা, চারি দিকে ঢেউ ওঠা-পড়া,
সবই চেনা জগতের তবু তার আমন্ত্রণে দ্বিধা--
সবা হতে আমি দূরে, তোমাদের নাড়ীর যে ভাষা
সে আমার আপন প্রাণের, বিষণ্ন বিস্ময় লাগে
যবে দেখি স্পর্শ তার সসংকোচ পরিচয় নিয়ে
আনে যেন প্রবাসীর পাণ্ডুবর্ণ শীর্ণ আত্মীয়তা।
আমি কিছু দিতে চাই, তা না হলে জীবনে জীবনে
মিল হবে কী করিয়া-- আসি না নিশ্চিত পদক্ষেপে--
ভয় হয়, রিক্ত পাত্র বুঝি, বুঝি তার রসস্বাদ
হারায়েছে পূর্বপরিচয়, বুঝি আদানে-প্রদানে
রবে না সম্মান। তাই আশঙ্কার এ দূরত্ব হতে
এ নিষ্ঠুর নিঃসঙ্গতা-মাঝে তোমাদের ডেকে বলি,
যে জীবনলক্ষ্মী মোরে সাজায়েছে নব নব সাজে
তার সাথে বিচ্ছেদের দিনে নিভায়ে উৎসবদীপ
দারিদ্র৻ের লাঞ্ছনায় ঘটাবে না কভু অসম্মান,
অলংকার খুলে নেবে,একে একে বর্ণসজ্জাহীন উত্তরীয়ে
ঢেকে দিবে, ললাটে আঁকিবে শুভ্র তিলকের রেখা;
তোমরাও যোগ দিয়ো জীবেনের পূর্ণ ঘট নিয়ে
সে অন্তিম অনুষ্ঠানে, হয়তো শুনিবে দূর হতে
দিগন্তের পরপারে শুভশঙ্খধ্বনি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumadar-jane-tabu-amara-durar-manush/
|
3545
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বাক্যের যে ছন্দোজাল শিখেছি গাঁথিতে
|
চিন্তামূলক
|
বাক্যের যে ছন্দোজাল শিখেছি গাঁথিতে
সেই জালে ধরা পড়ে
অধরা যা চেতনার সতর্কতা ছিল এড়াইয়া
আগোচরে মনের গহনে।
নামে বাঁধিবারে চাই, না মানে নামের পরিচয়।
মূল্য তার থাকে যদি
দিনে দিনে হয় তাহা জানা
হাতে হাতে ফিরে।
অকস্মাৎ পরিচয়ে বিস্ময় তাহার
ভুলায় যদি বা,
লোকালয়ে নাহি পায় স্থান,
মনের সৈকততটে বিকীর্ণ সে রহে কিছুকাল,
লালিত যা গোপনের
প্রকাশ্যের অপমানে
দিনে দিনে মিশায় বালুতে।
পণ্যহাটে অচিহ্নিত পরিত্যক্ত রিক্ত এ জীর্ণতা
যুগে যুগে কিছু কিছু দিয়ে গেছে অখ্যাতের দান
সাহিত্যের ভাষা-মহাদ্বীপে
প্রাণহীন প্রবালের মতো। (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bakyer-je-chondojal-shikechi-gathite/
|
1992
|
বিষ্ণু দে
|
বাংলাই আমাদের
|
স্বদেশমূলক
|
আমরা বাংলার লোক,
বাংলাই আমাদের, এদের ওদের সবার জীবন |
আমাদের রক্তে ছন্দ এই নদি মাঠ ঘাট
এই আমজাম বন,
এই স্বচ্ছ রৌদ্রজলে অন্তরঙ্গ ঘরোয়া ভাষার
হাস্যস্নাত অশ্রুদীপ্ত পেশল বিস্তার|
চোখে কানে ঘ্রাণে প্রাণে দেহমনে কথায় স্নায়ুতে
গঙ্গার পদ্মার হাসি একাকার, সমগ্র সত্তার
অজেয় আয়ুতে নিত্য মৃত্যুত্তীর্ণ দুঃখে হর্ষে
ছন্দে বর্ণে বেঁধে দেবে কোমল কঠিন স্পর্শে |
যতই বর্বর হও শক্তিলোভে কূটবুদ্ধি
আজ শতাধিক রাবিন্দ্রিক পুণ্য বর্ষে
তুমি পাবে কোথায় নিস্তার ?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4107.html
|
1278
|
জীবনানন্দ দাশ
|
হৃদয়ে প্রেমের দিন
|
সনেট
|
হৃদয়ে প্রেমের দিন কখন যে শেষ হয় — চিতা শুধু পড়ে থাকে তার,
আমরা জানি না তাহা; — মনে হয় জীবনে যা আছে আজো তাই শালিধান
রূপশালি ধান তাহা… রূপ, প্রেম… এই ভাবি… খোসার মতন নষ্ট ম্লান
একদিন তাহাদের অসারতা ধরা পড়ে, — যখন সবুজ অন্ধকার,
নরম রাত্রির দেশ নদীর জলের গন্ধ কোন এক নবীনাগতার
মুখখানা নিয়ে আসে — মনে হয় কোনোদিন পৃথিবীতে প্রেমের আহ্বান
এমন গভীর করে পেয়েছি কি? প্রেম যে নক্ষত্র আর নক্ষত্রের গান,
প্রাণ যে ব্যাকুল রাত্রি প্রান্তরের গাঢ় নীল অমাবস্যায় –চলে যায় আকাশের সেই দূর নক্ষত্রের লাল নীল শিখার সন্ধানে,
প্রাণ যে আঁধার রাত্রি আমার এ, — আর তুমি স্বাতীর মতন
রূপের বিচিত্র বাতি নিয়ে এলে, — তাই প্রেম ধুলায় কাঁটায় যেইখানে
মৃত হয়ে পড়ে ছিল পৃথিবীর শূণ্য পথে সে গভীর শিহরণ,
তুমি সখী, ডুবে যাবে মুহূর্তেই রোমহর্ষে — অনিবার অরুণের ম্লানে
জানি আমি; প্রেম যে তবুও প্রেম; স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে রবে, বাঁচিতে সে জানে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/hridoye-premer-din/
|
1784
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
একমুঠো
|
রূপক
|
একমুঠো জোনাকীর আলো নিয়ে
ফাঁকা মাঠে ম্যাজিক দেখাচ্ছে অন্ধকার।
একমুঠো জোনাকীর আলো পেয়ে
এক একটা যুবক হয়ে যাচ্ছে জলটুঙি পাহাড়
যুবতীরা সুবর্ণরেখা।
সাপুড়ের ঝাঁপি খুলতেই বেরিয়ে পড়ল একমুঠো জোনাকী
পুজো সংখ্যা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল একমুঠো জোনাকী।
একমুঠো জোনাকীর আলো নিয়ে
ফাঁকা মাঠে ম্যাজিক দেখাচ্ছে অন্ধকার।
ময়দানের মঞ্চে একমুঠো জোনাকী উড়িয়ে
জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল যেন কারা।
রবীন্দ্রসদনে তিরিশজন কবি তিরিশদিন ধরে আউড়ে গেল
একমুঠো জোনাকীর সঙ্গে তাদের ভাব-ভালোবাসা।
ইউনেসকোর গোল টেবিল ঘিরে বসে গেছে মহামান্যদের সভা
একমুঠো জোনাকীর আলোয়
আফ্রিকা থেকে আসমুদ্র হিমাচল সমস্ত হোগলা বন আর ফাটা দেয়ালে
সাজিয়ে দেবে কোনারক কিংবা এথেন্সের ভাস্কর্য।
সাত শতাব্দীর অন্ধকার এইভাবে
ফাঁকা মাঠে ম্যাজি দেখিয়ে চলেছে একমুঠো জোনাকীর আলোয়।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a0%e0%a7%8b-%e0%a6%9c%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%80-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d/
|
5993
|
হুমায়ুন আজাদ
|
সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে
|
মানবতাবাদী
|
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ পবিত্র প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার চাঁদ
নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ
শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।
রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবিশংকরের
সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙুর
ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল
কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।
চলে যাবে সেই সব উপকথাঃ সৌন্দর্য-প্রতিভা-মেধা;
এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা
নির্বাধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে
অত্যন্ত উল্লাসভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে।
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
সবচে সুন্দর মেয়ে দুইহাতে টেনে সারারাত
চুষবে নষ্টের লিঙ্গ; লম্পটের অশ্লীল উরুতে
গাঁথা থাকবে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী। চ’লে যাবে,
কিশোরীরা চ’লে যাবে, আমাদের তীব্র প্রেমিকারা
ওষ্ঠ আর আলিঙ্গন ঘৃণা ক’রে চ’লে যাবে, নষ্টদের
উপপত্নী হবে। এই সব গ্রন্থ শ্লোক মুদ্রাযন্ত্র
শিশির বেহালা ধান রাজনীতি দোয়েলের স্বর
গদ্য পদ্য আমার সমস্ত ছাত্রী মার্ক্স-লেনিন,
আর বাঙলার বনের মত আমার শ্যামল কন্যা-
রাহুগ্রস্থ সভ্যতার অবশিষ্ট সামান্য আলোক
আমি জানি তারা সব নষ্টদের অধিকারে যাবে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/396
|
447
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মনের মানুষ
|
প্রেমমূলক
|
ফিরনু যেদিন দ্বারে দ্বারে কেউ কি এসেছিল?
মুখের পানে চেয়ে এমন কেউ কি হেসেছিল?
অনেক তো সে ছিল বাঁশি,
অনেক হাসি, অনেক ফাঁসি,
কই কেউ কি ডেকেছিল আমায়, কেউ কি যেচেছিল?
ওগো এমন করে নয়ন-জলে কেউ কি ভেসেছিল?
তোমরা যখন সবাই গেলে হেলায় ঠেলে পায়ে,
আমার সকল সুধাটুকুন পিয়ে,
সেই তো এসে বুকে করে তুলল আপন নায়ে
আচমকা কোন্ না-চাওয়া পথ দিয়ে।
আমার যত কলঙ্কে সে
হেসে বরণ করলে এসে
আহা বুক-জুড়ানো এমন ভালো কেউ কি বেসেছিল?
ওগো জানত কে যে মনের মানুষ সবার শেষে ছিল। (ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/moner-manush/
|
881
|
জসীম উদ্দীন
|
রাখাল ছেলে
|
প্রকৃতিমূলক
|
“রাখাল ছেলে ! রাখাল ছেলে ! বারেক ফিরে চাও,
বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?”
ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ,
কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা,
সেথায় আছে ছোট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,
সাঁঝ-আকাশের ছড়িয়ে-পড়া আবীর রঙে নাওয়া,
সেই ঘরেতে একলা বসে ডাকছে আমার মা-
সেথায় যাব, ও ভাই এবার আমায় ছাড় না।”
“রাখাল ছেলে ! রাখাল ছেলে ! আবার কোথা ধাও,
পুব আকাশে ছাড়ল সবে রঙিন মেঘের নাও।”
“ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির-ঝরা ঘাসে,
সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে।
আমার সাথে করতো খেলা প্রভাত হাওয়া, ভাই,
সরষে ফুলের পাঁপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই।
চলতে পথে মটরশুঁটি জড়িয়ে দুখান পা,
বলছে ডেকে, ‘গাঁয়ের রাখাল একটু খেলে যা।’
সারা মাঠের ডাক এসেছে, খেলতে হবে ভাই।
সাঁঝের বেলা কইব কথা এখন তবে যাই।’
“রাখাল ছেলে ! রাখাল ছেলে ! সারাটা দিন খেলা,
এ যে বড় বাড়াবাড়ি, কাজ আছে যে মেলা।”
কাজের কথা জানিনে ভাই, লাঙল দিয়ে খেলি
নিড়িয়ে দেই ধানের ক্ষেতের সবুজ রঙের চেলী।
রিষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হওয়ার সুখে।
টির বোনের ঘোমটা খুলে চুমু দিয়ে যায় মুখে।
ঝাউয়ের ঝাড়ে বাজায় বাঁশী পউষ-পাগল বুড়ী,
আমরা সেথা চষতে লাঙল মুশীদা-গান জুড়ি।
খেলা মোদের গান গাওয়া ভাই, খেলা-লাঙল-চষা,
সারাটা দিন খেলতে জানি, জানিই নেক বসা’।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/770
|
6045
|
হেলাল হাফিজ
|
পরানের পাখি
|
চিন্তামূলক
|
পরানের পাখি তুমি একবার সেই কথা কও,
আমার সূর্যের কথা, কাঙ্খিত দিনের কথা,
সুশোভন স্বপ্নের কথাটা বলো,–শুনুক মানুষ।
পরানের পাখি তুমি একবার সেই কথা কও,
অলক্ষ্যে কবে থেকে কোমল পাহাড়ে বসে
এতোদিন খুঁটে খুঁটে খেয়েছো আমাকে আর
কতো কোটি দিয়েছো ঠোকর,
বিষে বিষে নীল হয়ে গেছি, শুশ্রূষায়
এখনো কী ভাবে তবু শুভ্রতা পুষেছি তুমি দেখাও না
পাখি তুমি তোমাকে দেখাও,–দেখুক মানুষ।
পরানের পাখি তুমি একবার সেই কথা কও,
সময় পাবে না বেশি চতুর্দিক বড়ো টলোমলো
পরানের পাখি তুমি শেষবার শেষ কথা বলো,
আমার ভেতরে থেকে আমার জীবন খেয়ে কতোটুকু
যোগ্য হয়েছো, ভূ-ভাগ কাঁপিয়ে বেসামাল
কবে পাখি দেবেই উড়াল, দাও,–শিখুক মানুষ।
২১.৭.৮০
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/117
|
5407
|
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
|
পদ্মার প্রতি
|
স্তোত্রমূলক
|
হে পদ্মা! প্রলয়ংকরী! হে ভীষণা! ভৈরবী সুন্দরী!
হে প্রগলভা! হে প্রবলা! সমুদ্রের যোগ্য সহচরী
তুমি শুধু, নিবিড় আগ্রহ আর পার গো সহিতে
একা তুমি সাগরের প্রিয়তমা, অয়ি দুবিনীতে!দিগন্ত বিস্তৃত তোমার হাস্যের কল্লোল তারি মত
চলিয়াছে তরঙ্গিয়া, - চির দৃপ্ত, চির অব্যাহত|
দুর্নমিত, অসংযত, গূঢ়চারী, গহন গম্ভীর;
সীমাহীন অবজ্ঞায় ভাঙিয়া চলেছ উভতীর |রুদ্র সমুদ্রের মত, সমুদ্রেরি মত সমুদার
তোমার বদরহস্ত বিতরিছে ঐশ্বর্যসম্ভার|
উর্বর করিছ মহি, বহিতেছ বাণিজ্যের তরী
গ্রাসিয়া নগর গ্রাম হাসিতেছ দশদিক ভরি|অন্তহীন মূর্ছনায় আন্দোলিত আকাশ সংগীতে, -
ঝঙ্কারিয়া রুদ্রবীণা, মিলাইছ ভৈরবে ললিতে
প্রসন্ন কখনো তুমি, কভু তুমি একান্ত নিষ্ঠুর;
দুর্বোধ, দুর্গম হায়, চিরদিন দুর্জ্ঞেয় সুদূর!শিশুকাল হতে তুমি উচ্ছৃঙ্খল, দুরন্ত দুর্বার;
সগর রাজার ভস্ম করিয়ে স্পর্শ একবার!
স্বর্গ হতে অবতরি ধেয়ে চলে এলে এলোকেশে,
কিরাত-পুলিন্দ-পুণ্ড্র অনাচারী অন্ত্যজের দেশে!বিস্ময়ে বিহ্বল-চিত্ত ভগীরথ ভগ্ন মনোরথ
বৃথা বাজাইল শঙ্খ, নিলে বেছে তুমি নিজ পথ;
আর্যের নৈবেদ্য, বলি, তুচ্ছ করি হে বিদ্রোহী নদী!
অনাহুত-অনার্যের ঘরে গিয়ে আছ সে অবধি|সেই হকে আছ তুমি সমস্যার মত লোক-মাঝে,
ব্যাপৃত সহস্র ভুজ বিপর্যয় প্রলয়ের কাজে!
দম্ভ যবে মূর্তি ধরি স্তম্ভ ও গম্ বুজে দিনরাত
অভ্রভেদী হয়ে ওঠে, তুমি না দেখাও পক্ষপাত|তার প্রতি কোনদিন, সিন্ধুসঙ্গী, হে সাম্যবাদিনী!
মূর্খে বলে কীতিনাশা, হে কোপনা কল্লোলনাদিনী!
ধনী দীনে একাসনে বসায়ে রেখেছ তব তীরে,
সতত সতর্ক তারা অনিশ্চিত পাতার কুটিরে;না জানে সুপ্তির স্বাদ, জড়তার বারতা না জানে,
ভাঙ্গনের মুখে বসি গাহে গান প্লাবনের তানে,
নাহিক বস্তুর মায়া, মরিতে প্রস্তুত চির দিনই!
অয়ি স্বাতন্ত্রের ধারা! অয়ি পদ্মা! অয়ি বিপ্লাবনী!
|
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/podmar-proti/
|
2728
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমার সোনার বাংলা
|
স্বদেশমূলক
|
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি ॥
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে--
ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি ॥
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো--
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে--
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি ॥
তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিলে রে,
তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।
তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,
মরি হায়, হায় রে--
তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি ॥
ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,
সারা দিন পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,
তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,
মরি হায়, হায় রে--
ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি ॥
ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে--
দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।
ও মা, গরিবের ধন যা আছে তাই দিব চরণতলে,
মরি হায়, হায় রে--
আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ ব'লে গলার ফাঁসি ॥
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-sonar-bangala/
|
3049
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চিরায়মানা
|
প্রেমমূলক
|
যেমন আছ তেমনি এসো, আর কোরো না সাজ।
বেণী নাহয় এলিয়ে রবে, সিঁথি নাহয় বাঁকা হবে,
নাই-বা হল পত্রলেখায় সকল কারুকাজ।
কাঁচল যদি শিথিল থাকে নাইকো তাহে লাজ।
যেমন আছ তেমনি এসো, আর করো না সাজ।। এসো দ্রুত চরণদুটি তৃণের 'পরে ফেলে।
ভয় কোরো না - অলক্তরাগ মোছে যদি মুছিয়া যাক,
নূপুর যদি খুলে পড়ে নাহয় রেখে এলে।
খেদ কোরো না মালা হতে মুক্তা খসে গেলে।
এসো দ্রুত চরণদুটি তৃণের 'পরে ফেলে। হেরো গো ওই আঁধার হল, আকাশ ঢাকে মেঘে।
ও পার হতে দলে দলে বকের শ্রেণী উড়ে চলে,
থেকে থেকে শূন্য মাঠে বাতাস ওঠে জেগে।
ওই রে গ্রামের গোষ্ঠমুখে ধেনুরা ধায় বেগে।
হেরো গো ওই আঁধার হল, আকাশ ঢাকে মেঘে।। প্রদীপখানি নিবে যাবে, মিথ্যা কেন জ্বালো?
কে দেখতে পায় চোখের কাছে কাজল আছে কি না আছে,
তরল তব সজল দিঠি মেঘের চেয়ে কালো।
আঁখির পাতা যেমন আছে এমনি থাকা ভালো।
কাজল দিতে প্রদীপখানি মিথ্যা কেন জ্বালো?। এসো হেসে সহজ বেশে, আর কোরো না সাজ।
গাঁথা যদি না হয় মালা ক্ষতি তাহে নাই গো বালা,
ভূষণ যদি না হয় সারা ভূষণে নাই কাজ।
মেঘ মগন পূর্বগগন, বেলা নাই রে আজ।
এসো হেসে সহজ বেশে, নাই-বা হল সাজ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chiraymana/
|
782
|
জসীম উদ্দীন
|
ও তোর নাম শুনিয়ারে
|
প্রেমমূলক
|
ও তোর নাম শুনিয়ারে,
ও তোর রূপ দেখিয়ারে,
ও তোর ডাক শুনিয়ারে,
ও তোর ভাব জানিয়ারে,
সোনা, আমার মন ত
না রয় ঘরেরে।
সাগরে উঠিয়া ঢেউ কূলে আইসা পড়ে,
কূল নাই, কিনারা নাই কুল-কলঙ্কিনীর তরে;
কান্দিয়া কান্দাব বন্ধু! এমন দোসর নাই,
আমি সাজায়ে ব্যথার চিতা নিজ হাতে জ্বালাইরে।
তুমিত জানিতে বন্ধু প্রেমের কত জ্বালা,
তবে কেন পরিলে গলে আমার ফুলের মালা;
তবে কেন কদম্বতলে বাঁশরী বাজালে,
কিবা অপরাধে বন্ধু, অবলা বধিলে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/746
|
2652
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আকাশের আলো মাটির তলায়
|
প্রকৃতিমূলক
|
আকাশের আলো মাটির তলায়
লুকায় চুপে,
ফাগুনের ডাকে বাহিরিতে চায়
কুসুমরূপে।(স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/akasher-alo-matir-tolai/
|
5896
|
সুবোধ সরকার
|
বক
|
মানবতাবাদী
|
[যে লোক ঋণী ও প্রবাসী না হয়ে দিবসের অষ্টম ভাগে শাক রন্ধন করে সেই সুখী ]ইনি কে? হেলিকপ্টারের পাশে ওকে ঘিরে এত সংবাদিক?
ইনি অর্জুন থ্যাকারে, বম্বে চালান, ক্রিকেট বন্ধ করে দেন
বক বললেন, ইনিই তা হলে তোমার দ্বিতীয় ভাই?ইনি কে? কী লম্বা, কী পেশী! কালো কুচকুচে গা!
আমেরিকায় থাকেন, ব্ল্যাকদের সঙ্গে মারামারি করেন
ভারতীয় চামড়ার দোকান আছে, এন আর আই
পুজো দেখে, আশ্বিন দেখে, আশ্বিনেই ফিরে যান
বক বললেন ইনি তোমার প্রবাসী ভাই, কুন্তিপুত্র ভীম?কুল আর দেব রবীন্দ্রভারতী থেকে এম.এ. কোরে
বরিশাল থেকে লেবার নিয়ে গিয়ে
কুয়ালালামপুরে বিক্রি করেন—ওরা এখন আদমব্যাপারী |তোমার স্ত্রী কোথায়?দিনে আটবার এই প্রশ্ন আমাকে শুনতে হয়
কি জানতে চান আপনি?আমার স্ত্রী যেদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যান
সেদিন আমি কারখানার গেটে
পরের দিন থেকে লক আউট
তিনদিন বাদে পুলিশে যাই |
থানা কখনও স্ত্রী ফেরত দেয় না, দেয় একটা নম্বর
এই সেই নম্বর, দেখবেন?আমি বক আমি ধর্ম, আমি নম্বর বুঝি না
বলো সে কোথায়?পুলিশ বলল, লিলুয়া ঘুরে আসুন
লিলুয়ার মেয়েদের দিকে তাকিয়ে চোখে জল আসছিল
সেদিনই বুঝেছিলাম ওদের জন্য কোন হোম নেইলোকাল কমিটি বলল, খেতে না পেলেও
তোর বউ চালাক ছিল, ডাঁসা ছিল
সে কাজ পেয়ে গেছে, তুই একটা বিয়ে করে নে |হে ধর্ম, হে বক, হে অনিল বিশ্বাস
আমি শাকান্ন রান্না করে খাই, টিনের চাল উড়ে যাওয়া
নিজের ঘরে থাকি, মুদির কাছেও ধার নেই
আমাকে কেউ ভিসা কার্ড দেখিয়ে বলে নি, গো গেট ইটএবার আপনি বলুন আমি না আমার ভায়েরা ভাল আছে?
সিঙ্গাপুর, আমেরিকা ভালো
না সারা ভারতবর্ষব্যাপী আমি, চালের কলে আমি
কয়লার খনিতে আমি, বস্তিতে বস্তিতে আমি
কে বেশি ভালো আছে, বলুন ধর্ম
কে তাহলে সুখী হয়েছে বলুন?
|
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/04/%e0%a6%ac%e0%a6%95-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7-%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0/
|
1750
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
অষ্টাদশ শতকের মতো ঘুম
|
প্রকৃতিমূলক
|
কার ডাকে জেগে উঠে
মেঘের গলায় গাঢ় মালকোষ শুনে
আবার ঘুমিয়ে গেছে এই নদীজল।
অথচ নদীর পাড়ে অবিরল চড়-ইভাতির
পেয়ালার পিরীচের ফ্রাই-প্যান কাঁটা-চামচের
মাছের মাংসের স্যালাডের
মাছ ও মাংসের মতো উত্তেজক জানালের ভিডিও টেপের
জিনস মিডি হাইহল মাসকারার গ্লো-গ্লীটারের
হাই-ফাই জমাট সিম্ফনী।
দেশে দেশে দিকপাল ক্ষমতালোভীর মতো প্রতিযোগিতায়
দাঁতালো কামড় ছুঁড়ে সারা বেলা পরস্পর যুদ্ধে নাজেহাল
হাড়গিলে কুকুরের ঝাঁক।
খাক বা না খাক
চিকেনের মিহি হাড়ে পেয়ে গেছে অবিকল পাটলিপুত্রের
সোনার যুগের স্বাদু ঘ্রাণ।
তাজা বিরিয়ানী থেকে যেন কিছু জাফরান খুঁটে নেবে বলে
গাছের নরম ডালে নেমে আসে কাঙাল দুপুর।
আহ্নিক গতিতে সূর্য বাঁকে।
সূর্য যত বাঁকে তত মানুষের ছায়া দীর্ঘ হয়
কোনো কোনো মানুষের ছায়া ফুলে-ফেঁপে ক্রমে পাহাড়-পর্বত
কোনো কোনো মানুষের ছায়া বহু গোল চৌকো নক্শার উল্লাসে
বাগদাদের উড়ন্ত কার্পেট।
কার ডাকে জেগে উঠে
মেঘের গলায় গাঢ় মালকোষ শুনে
অষ্টাদশ শতকের মতো ঘুমে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ছে
এই নদীজল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1166
|
2127
|
মহাদেব সাহা
|
কে চায় তোমাকে পেলে
|
চিন্তামূলক
|
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়
বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন
জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান,
কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?
তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা
কে চায় তাহলে আর মানপত্র তোমার হাতের চিঠি পেলে,
তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া
তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো,
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ
কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন,
তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা
বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়,
কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1426
|
5015
|
শামসুর রাহমান
|
বাতাসে ভাসবে ঠিক
|
রূপক
|
আমাকে যেতেই হবে দূরে, বহু দূরে।
যদি পা আমার
এখন প্রবল হয়ে যায়, তা হ’লে নিশ্চিত আমার এই
সংসারে বেকার হয়ে থাকব এক কোণে
থাকব সবার কণ্ঠলগ্নপাত্র হয়ে, যা আমার
কস্মিনকালেও নয় বিন্দুমাত্র কাঙ্ঘনীয়,
তখন কি বলতেই হবে আমরাই সব
স্বেচ্ছায় নিয়েছি গ’ড়ে আমাদের বাসনার প্রবল ইচ্ছায়।বলতে কি হবে কোনও-একটি ঘটনা আমাদের
প্রবল ইচ্ছায় ঘ’টে গেলে
আমাদের প্রতিটি ইচ্ছাই
ঘ’টে যায় সুষ্ঠুভাবে। এমনও তো হয়
পরপর কতিপয় অতিশয় জরুরি কাজের
ছেঁড়াখোঁড়া অবসান ঘটে।কে তুমি ডাকছ এই ঘোর অন্ধকারে
কামেলা নামের এক রমণীকে? কে সে?
কোথায় নিবাস তার? কী সম্পর্ক সেই
রমণীর সঙ্গে যার নাম ধরে এই অন্ধকারে
বারবার ডাকছ ব্যাকুল সুরে? তাকে
দেখতে না পেলে, বলি আমিও ব্যাকুল হব খুব।এসো ভাই আমরা দু’জন কণ্ঠ মিলিয়ে ডাকি
পরস্পর, আমরা বাংলার আসমান,
বাতাস ভাসিয়ে দিই। আমাদের দেখা
হোক না-ই হোক, দু’জনের কণ্ঠস্বর বাতাসে ভাসব ঠিক। (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/batashe-vasbe-thik/
|
2792
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
উৎসর্গ (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
প্রেমমূলক
|
আজি মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে
গুচ্ছ গুচ্ছ ধরিয়াছে ফল।
পরিপূর্ণ বেদনার ভরে
মুহূর্তেই বুঝি ফেটে পড়ে,
বসন্তের দুরন্ত বাতাসে
নুয়ে বুঝি নমিবে ভূতল—
রসভরে অসহ উচ্ছ্বাসে
থরে থরে ফলিয়াছে ফল।
তুমি এসো নিকুঞ্জনিবাসে,
এসো মোর সার্থকসাধন।
লুটে লও ভরিয়া অঞ্চল
জীবনের সকল সম্বল,
নীরবে নিতান্ত অবনত
বসন্তের সর্ব-সমর্পণ—
হাসি মুখে নিয়ে যাও যত
বনের বেদননিবেদন।
শুক্তিরক্ত নখরে বিক্ষত
ছিন্ন করি ফেলো বৃন্তগুলি।
সুখাবেশে বসি লতামূলে
সারাবেলা অলস অঙ্গুলে
বৃথা কাজে যেন অন্যমনে
খেলাচ্ছলে লহো তুলি তুলি—
তব ওষ্ঠে দশনদংশনে
টুটে যাক পূর্ণ ফলগুলি।
আজি মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে
গুঞ্জরিছে ভ্রমর চঞ্চল।
সারাদিন অশান্ত বাতাস
ফেলিতেছে মর্মরনিশ্বাস,
বনের বুকের আন্দোলনে
কাঁপিতেছে পল্লব-অঞ্চল—
আজি মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে
পুঞ্জ পুঞ্জ ধরিয়াছে ফল। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/utsorgo-choitali/
|
2424
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
অভাগা
|
প্রকৃতিমূলক
|
“অভাগা যেদিকে চায়
সাগর শুকায়ে যায়।”
সত্যি?
তোমরা কই জান
পৃথিবীটা ডুবে যাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতায়?
অভাগারা,তোমরা কোথায়?
কোন জায়গায়?
তাড়াতাড়ি চলে আস সমুদ্রের পাড়
তোমাদের দেশে এখন খুব দরকার।
অপূর্ব এই সুযোগ পানি কমাবার
চলে আস কুয়াকাটা কক্সবাজার।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2035
|
5927
|
সৈয়দ শামসুল হক
|
আমি একটুখানি দাঁড়াব
|
স্বদেশমূলক
|
আমি একটুখানি দাঁড়াব এবং দাঁড়িয়ে চলে যাব;
শুধু একটু থেমেই আমি আবার এগিয়ে যাব;
না, আমি থেকে যেতে আসিনি;
এ আমার গন্তব্য নয়;
আমি এই একটুখানি দাঁড়িয়েই
এখান থেকে
চলে যাব।
আমি চলে যাব
তোমাদের এই শহরের ভেতর দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি
এর মার্চপাস্টের যে সমীকরণ
এবং এর হেলিকপ্টারের যে চংক্রমণ,
তার তল দিয়ে তড়িঘড়ি;
আমি চলে যাব
তোমাদের কমার্সিয়াল ব্লকগুলোর জানালা থেকে
অনবরত যে বমন
সেই টিকার-টেপের নিচ দিয়ে
এক্ষুনি;
আমি চলে যাব
তোমাদের কম্পিউটারগুলোর ভেতরে যে
বায়ো-ডাটার সংরক্ষণ
তার পলকহীন চোখ এড়িয়ে
অবিলম্বে;
আমি চলে যাব
যেমন আমি যাচ্ছিলাম আমার গন্তব্যের দিকে
ধীরে ধীরে
বহুকাল ধরে
আমি একটি
দু’টি
তিনটি
প্রজন্ম ধরে।
আমি কথা দিচ্ছি
তোমাদের কোনো রমণীকে আমি চুম্বন করব না;
আমি কথা দিচ্ছি
তোমাদের কোনো সন্তানকে আমি কোলে করব না;
এবং কথা দিচ্ছি
তোমাদের এপার্টমেন্টের জন্যে আমি দরখাস্ত করব না,
তোমাদের ব্যাংক থেকে আমি ঋণ গ্রহণ করব না,
তোমাদের শাসন-পরিষদে আমি সদস্য হতে চাইব না,
তোমাদের নির্বাচনে আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না;
এবং আমি আরো কথা দিচ্ছি
তোমাদের বেতারে কোন ভাষণ দেব না,
তোমাদের কম্পিউটারে কোন তথ্য ফিড করব না,
তোমাদের হেলিকপ্টারে আমি উড্ডীন হতে চাইব না,
তোমাদের মার্চপাস্টে আমি ড্রামবাদক হব না।
তোমাদের এপার্টমেন্ট আমার কষ্ট,
তোমাদের উনোন আমার কষ্ট,
তোমাদের ব্যাংক আমার কষ্ট,
তোমাদের পরিষদ আমার কষ্ট,
তোমাদের আয়না আমার কষ্ট,
তোমাদের গেলাশ আমার কষ্ট,
তোমাদের রমণী আমার কষ্ট,
তোমাদের সন্তান আমার কষ্ট।
আমি শুধু একটু সময় দাঁড়িয়ে দেখে যাব-
এ সবের ভেতর দিয়েই তো আমার বাড়ি যাবার পথ,
আমি বাড়ি যাব,
পৃথিবীতে সমস্ত বাড়ি যাবার পথেই আছে
এরকম একেকটি শহর;
আমি এক্ষুনি এগিয়ে যাব।
তোমাদের যে এপার্টমেন্ট, আমি জানি, তার ছাদ নেই;
তোমাদের যে উনোন, আমি জানি, তার আগুন নেই;
তোমাদের যে ব্যাংক, আমি জানি, তার স্বচ্ছলতা নেই;
তোমাদের যে পরিষদ – কারো সম্মতি নেই;
তোমাদের যে আয়না – কোনো প্রতিফলন নেই;
তোমাদের যে গেলাশ – কোনো পানীয় নেই;
আমি জানি
তোমাদের রমণীদের গর্ভধারণ করবার ক্ষমতা নেই;
আমার জানা আছে
তোমাদের সন্তানদের হাতে শস্যের একটিও বীজ নেই।
একটি দু’টি তিনটি প্রজন্ম ধরে আমি
একাধিক যুদ্ধ – একটি শান্তিকে,
একাধিক মন্বন্তর – একটি ফসলকে,
একাধিক স্তব্ধতা – একটি উচ্চারণকে,
একাধিক গণহত্যা – একটি নৌকোকে,
একাধিক পতাকা – একটি স্বাধীনতাকে
শরীরে আমার বীভৎস ক্ষতের মধ্যে লাল স্পন্দনের মতো
অনুভব করতে করতে
এই যে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছি-
সে একটি বাড়ির দিকে যে কখনো ভেঙে পড়ে না,
সে একটি উনোনের দিকে যে কখনো নিভে যায় না,
সে একটি ব্যাংকের দিকে যে কখনো দেউলে হয় না,
সে একটি পরিষদের দিকে যে কখনো যুদ্ধ ঘোষণা করে না,
এমন একটি আয়নার দিকে যেখানে প্রতিফলন,
এমন একটি গেলাশের দিকে যেখানে পরিস্রুত পানীয়,
এমন একটি রমণীর দিকে যে এইমাত্র চুল খুলেছে,
এমন এক সন্তানের দিকে যে এইমাত্র বর্ষায় ভিজেছে।
আমার এই অগ্রসর
সে তোমাদের ভেতর দিয়েই অগ্রসর।
রাতের পর রাত ভেঙে উৎকর্ণ জন্তুর মতো চলেছি
চাঁদের নিচে পানির সন্ধানে,
সমস্ত স্তব্ধতাকে মাকড়শার জালের মতো ছিঁড়ে ছিঁড়ে
গুহাবন্দী মানুষের মতো আমি চলেছি
পানির শব্দ নির্ণয় করে।
আমি এখনো জানি না তার শেষে অপেক্ষা করছে কিনা
একটি রমণী অথবা তার হাঁসুলী ছেঁড়া পুঁতি;
আমি এখনো জানি না তার শেষে দেখতে পাব কিনা
সরোবরের ভেতরে চাঁদ অথবা কাদার ভেতরে করোটি।
তবু আমাকে যেতে হবে
এবং তবু আমাকে যেতেই হবে, সহস্র ক্ষত শরীরে।
তোমাদের এই শহরের ভেতর দিয়ে যেতে
যদিবা আমার চোখে পড়ল কচিৎ একটি যুগল
যাদের গান এখনো বহন করতে বাতাস বড় ইচ্ছুক,
আমি জানি আমিও তো একটি যুগল হতে চেয়েছি-
তাই আমার একটুখানি থামা।
যদিবা আমার চোখে পড়ল ছেঁড়া কিছু কাগজ
যার ভেতরে বন্দী কোনো কবির লেখা ছিন্ন ক’টি অক্ষর,
আমি জানি আমিও তো একটি কবিতার জন্যে কলম ধরেছি-
তাই আমার একটু এই দাঁড়ানো।
যদিবা আমার চোখে পড়ল শাদা একটি ফুল
যা রাতের অন্ধকারে ছোট্ট কিন্তু তীব্র সুগন্ধ নিয়ে ফুটেছিল,
আমি জানি আমিও তো একটি উদ্যানই আমার স্বপ্নে দেখেছি-
তাই আমার একটু শুধু বিরতি।
আমাকে এক রমণী তার রাতের প্রস্তুতি নিয়ে ডাকছে,
আমাকে যেতেই হবে;
আমাকে একটি কাগজ তার কবিতার সম্ভাবনা নিয়ে ডাকছে,
আমাকে যেতেই হবে;
আমাকে একটি উদ্যান তার চারাগাছগুলো নিয়ে ডাকছে,
আমাকে যেতেই হচ্ছে
আমাকে ডাকছে একটি শিশু,
আমাকে ডাকছে একটি রাষ্ট্র,
আমাকে ডাকছে একটি আয়না তার সমুখে স্থাপিত হবার জন্যে।
তাই একটুখানি দাঁড়িয়েই আমি এগিয়ে যাব আবার
যেমন যাচ্ছিলাম
ধীরে ধীরে
বহুকাল ধরে
আমি একটি
দু’টি
তিনটি
প্রজন্ম ধরে।
তোমাদের ভেতর দিয়েই তো সর্বকাল চলে গেছে আমার পথ
এবং সর্বকাল আমি দাঁড়িয়েছি আমি আবার নিয়েছি পথ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1164
|
5224
|
শামসুর রাহমান
|
শিরোনামহীন
|
মানবতাবাদী
|
কিছুই পারো না ধরে রাখতে কখনো, ঝরে যায়-
হাত থেকে গোলাপ টগর, চিঠি, ঝুঁটি কাকাতুয়া,
কবিতা লেখার নীল পোয়াতী প্রহর
নিরিবিলি ঝরে যায় শুধু।
এক ডিসেম্বরে পাওয়া নামঙ্কিত আলৌকিক একটি রুমাল
হারিয়ে ফেলেছো তুমি অন্য ডিসেম্বরে।
এমন শিথিল মুঠি যদি, তবে ঘোর অবেলায়
কী করে ধরবে বলো সারবন্দি ঝড়ক্ষুব্ধ খুঁটি?প্রতিবাদ করবো কি? স্বীকার করাই ভালো, আমি
ব্যর্থতার আতিথ্য গ্রহণ করে অম্ল
ঢেকুর তুলছি ক্রমাগত,
তবু কলমের নিবটিকে সোনারুর মতো খুব ঘঁষে ঘঁষে
একটি নিজস্ব অলংকার বানিয়েছি চমৎকার। বারংবার
হৃদয় কুপিয়ে তুলে আনি গোপন উদ্ভিদ কিছু,
অথচ খরখরে কাগজের কাছে কতবার পরাস্ত এ হাত।কী এক সময় এল বিশ্বাময়, নির্ভরযোগ্যতা নেই কোথাও কিছুর।
ব্যানারে ফেস্টুনে মিথ্যা চেঁচাচ্ছে মাতাল
আদিবাসীদের মতো। মুদ্রাক্ষর, নাম ধাম লোকালয়, কবির হৃদয়
সবকিছু মিথ্যা, ভয়ানক মিথ্যা মনে হয় আর
অতিশয় ঘৃণ্য ঠেকে বসবাস পৃথিবীতে আজ।
অন্যদের কাছ থেকে, এমনকি নিজের নিকট
থেকেও পালাতে চায় দিগ্ধিদিক দেশে দেশে বিপন্ন মানুষ।
বসে থাকি অস্তরাগে ভীষণ একাকী, চক্ষুদ্বয় নিবু নিবু,
কেমন নিঃস্পন্দ শিরোপুঞ্জ মাঝে-সাঝে অলৌকিক গুঞ্জরণে
নড়ে চড়ে উঠি আর ক্ষণিকের জন্যে তড়াক লাফিয়ে ওঠে
হরিণ শিশুর মতো খুশি।
কখনো আবার বড় লোনা,
খর ঢেউ ভেঙে পড়ে আমার শরীরে
এবং পায়ের নিচে পড়ে থাকে অনেক গাংচিল, ভেজা, মৃত;
ভারি জব্দ করে ক্রুর হিসহিস জলে চাবুক।
ভালোমন্দ কিছু অভিজ্ঞতা আছে আমারও অকূল সমুদ্রের,
আমিও দুলেছি ঢেউশীর্ষে বহুকাল,
দেখেছি দু’চোখ ভরে উথাল পাথাল কত মাছ,
এবং ডাগর চন্দ্রোদয়।
আহারের মতো ছুটে চলেছি সফেদ
প্রাণীটির প্রতি আজো বিরতিহীন।
পরে কোনোদিন তীরে পৌঁছে সঙ্গীহীন ইশমায়েল বলবে
অবসন্ন, সিক্ত স্বরে ট্র্যাজিক কাহিনী আমাদের। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shironamhin/
|
884
|
জসীম উদ্দীন
|
রাতের পরী
|
প্রকৃতিমূলক
|
রাতের বেলায় আসে যে রাতের পরী,
রজনীগন্ধা ফুলের গন্ধে সকল বাতাস ভরি।
চরণের ঘায়ে রাতের প্রদীপ নিভিয়া নিভিয়া যায়,
হাসপাতালের ঘর ভরিয়াছে চাঁদিমার জোছনায়।
মানস সরের তীর হতে যেন ধবল বলাকা আসে,
ধবল পাখায় ঘুম ভরে আনে ধবল ফুলের বাসে।
নয়ন ভরিয়া আনে সে মদিরা, সুদূর সাগর পারে,
ধবল দ্বীপের বালু-বেলাতটে শঙ্খ ছড়ায় ভারে।
তাহাদেরি সাথে লক্ষ বছর ঘুমাইয়া নিরালায়,
ধবল বালুর স্বপন আনিয়া মাখিয়াছে সারা গায়।
আজ ঘুম ভেঙে আসিয়াছে হেথা, দেহ লাবনীর পরে,
কত না কামনা ডুবিছে ভাসিছে আপন খুশীর ভরে।
বসনে তাহার একে একে আসি আকাশের তারাগুলি,
জ্বলিছে নিবিছে আপনার মনে রাতের বাতাসে দুলি।
রাতের বেলায় আসে যে রাতের পরী
চরণে বাজিছে ঝিঁঝির নূপুর দোলে ধরা মরি মরি!
তাহারি দোলায় বনপথে পথে ফুটিছে জোনাকী ফুল,
রাত-জাগা পাখি রহিয়া রহিয়া ছড়ায় গানের ভুল!
তারি তালে তালে স্বপনের পরী ঘুমের দুয়ার খুলে,
রামধনু রাঙা সোনা দেশেতে ডেকে যায় হাত তুলে।
হলুদ মেঘের দোলায় দুলিয়া হলদে রাজার মেয়ে,
তার পাছে পাছে হলুদ ছড়ায়ে চলে যায় গান গেয়ে।
রাতের বেলায় ঝুমিছে রাতের পরী,
মোহ মদিরার জড়াইছে ঘুম সোনার অঙ্গ ভরি।
চেয়ারের গায়ে এলাইল দেহ খানিক শ্রানি-ভরে,
কেশের ছায়ায় মায়া ঘনায়েছে অধর লাবনী পরে।
যেন লুবানের ধূঁয়ার আড়ালে মোমের বাতির রেখা,
কবরের পামে জ্বালাইয়া কেবা রচিতেছে কোন লেখা।
পাশে মুমূর্ষু রোগীর প্রদীপ নিবু নিবু হয়ে আসে,
উতল বাতাস ঘুরিয়া ফিরিয়া কাঁদিছে দ্বারের পাশে।
মরণের দূত আসিতে আসিতে থমকিয়া থেমে যায়,
শিথিল হস্ত হতে তরবারি লুটায় পথের গায়।
যুক্ত করেতে রচি অঞ্জলি বার বার ক্ষমা মাগে,
রাত্রের পরী মেলি দেহভার ঝিমায় ঘুমের রাগে।
ভোরের শিশির পদ্ম পাতায় রচিয়া শীতল চুম,
তাহার দুইটি নয়ন হইতে মুছাইয়া দিবে ঘুম।
রক্তোৎপল হইতে সিদুর মানাইতে তার ঠোঁটে,
শুক-তারকার সোনার তরনী দীঘির জলে যে লোটে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/792
|
4285
|
শহীদ কাদরী
|
সঙ্গতি
|
চিন্তামূলক
|
বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা
মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ,
কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা
ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…
একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে
শূন্য হাঁড়ির গহ্বরে অবিরত
শাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো,
পুরোনো গানের বিস্মৃত-কথা ফিরবে তোমার স্বরে
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…
ব্যারাকে-ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ
ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীলগাই,
গ্রামান্তরের বাতাস আনবে স্বাদু আওয়াজ
মেয়েলি গানের- তোমরা দু’জন একঘরে পাবে ঠাঁই
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4160.html
|
1092
|
জীবনানন্দ দাশ
|
পলাতকা
|
প্রেমমূলক
|
পাড়ার মাঝারে সব চেয়ে সেই কুদুঁলি মেয়েটি কই!
কতদিন পরে পল্লীর পথে ফিরিয়া এসেছি ফের
সারাদিনমান মুখখানি জুড়ে ফুটিত যাহার খই
কই কই বালা আজিকে তোমার পাই না কেন গো টের!তোমার নখের আঁচড় আজিও লুকায়ে যায় নি বুকে,
কাঁকন-কাঁদানো কণ্ঠ তোমার আজিও বাজিছে কানে!
যেই গান তুমি শিখায়ে দিছিলে মনের সারিকা শুকে
তাহারই ললিত লহরী আজিও বহিয়া যেতেছে প্রাণে!কই বালা কই!-প্রণাম দিলে না!- মাথায় নিলে না ধূলি
-বহুদিন পরে এসেছি আবার বনতুলসীর দেশে!
কুটিরের পথে ফুটিয়া রয়েছে রাঙ্গা রাঙ্গা জবাগুলি-
উজান নদীতে কোথায় আমার জবাটি গিয়েছে ভেসে!
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/polatoka/
|
4386
|
শামসুর রাহমান
|
আমার মৃত্যুর পরেও যদি
|
চিন্তামূলক
|
একটি পাখী রোজ আমার জানালায়
আস্তে এসে বসে, তাকায় আশেপাশে।
কখনো দেয় শিস, বাড়ায় গলা তার;
আবার কখনোবা পাখাটা ঝাপটায়।
পালকে তার আঁকা কিসের ছবি যেন,
দু’চোখে আছে জমা মেঘের স্মৃতি কিছু;
নদীর স্বপ্নের জলজ কণাগুলি
এখনো তাঁর ঠোটে হয়তো গচ্ছিত।
কাউকে নীড়ে তার এসেছে ফেলে বুঝি?
হয়তো সেই নীড়, আকাশই আস্তানা।
তাই তো চোখ তার এমন গাঢ় নীল,
মেললে পাখা জাগে নীলের উৎসব।
যখন লিখি আমি টেবিলে ঝুঁকে আর
পড়তে বসি বই, তখন সেই পাখি
চকিতে দোল খায় আমার জানালায়-
খাতার পাতা জুড়ে ছড়িয়ে দেয় খুশি।
আমার মৃত্যুর পরেও যদি সেই
সুনীল পাখি আসে আমার জানালায়,
আবার শিস দেয়, আমার বইখাতা
যদি সে ঠোকরায়, দিও না বাধা তাকে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/593
|
4169
|
রোকনুজ্জামান খান
|
বাক বাক্ কুম পায়রা
|
ছড়া
|
বাক বাক্ কুম পায়রা
মাথায় দিয়ে টায়রা
বউ সাজবে কাল কি
চড়বে সোনার পালকি।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/34.html
|
532
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
সিন্ধুঃ দ্বিতীয় তরঙ্গ
|
স্তোত্রমূলক
|
হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর
হে মোর বিদ্রোহী!
রহি’ রহি’
কোন্ বেদনায়
তরঙ্গ-বিভঙ্গে মাতো উদ্দাম লীলায়!
হে উন্মত্ত, কেন এ নর্তন?
নিষ্ফল আক্রোশে কেন কর আস্ফালন
বেলাভূমে পড়ো আছাড়িয়া!
সর্বগ্রাসী! গ্রাসিতেছ মৃত্যু-ক্ষুধা নিয়া
ধরণীরে তিলে-তিলে!
হে অস্থির! স্থির নাহি হ’তে দিলে
পৃথিবীরে! ওগো নৃত্য-ভোলা,
ধরারে দোলায় শূন্যে তোমার হিন্দোলা!
হে চঞ্চল,
বারে বারে টানিতেছ দিগন্তিকা-বন্ধুর অঞ্চল!
কৌতুকী গো! তোমার এ-কৌতুকের অন্ত যেন নাই।-
কী যেন বৃথাই
খুঁজিতেছ কূলে কূলে
কার যেন পদরেখা!-কে নিশীথে এসেছিল ভুলে
তব তীরে, গর্বিতা সে নারী,
যত বারি আছে চোখে তব
সব দিলে পদে তার ঢালি’,
সে শুধু হাসিল উপক্ষায়!
তুমি গেলে করিতে চুম্বন, সে ফিরালো কঙ্কণের ঘায়!
–গেল চ’লে নারী!
সন্ধান করিয়া ফের, হে সন্ধানী, তারি
দিকে দিকে তরণীর দুরাশা লইয়া,
গর্জনে গর্জনে কাঁদ–“পিয়া, মোর পিয়া!’’
বলো বন্ধু, বুকে তব কেন এত বেগ, এত জ্বালা?
কে দিল না প্রতিদিন? কে ছিঁড়িল মালা?
কে সে গরবিনী বালা? কার এত রূপ এত প্রাণ,
হে সাগর, করিল তোমার অপমান!
হে মজনু, কোন্ সে লায়লীর
প্রণয়ে উন্মাদ তুমি?-বিরহ-অথির
করিয়াছে বিদ্রোহ ঘোষণা, সিন্ধুরাজ,
কোন্ রাজকুমারীর লাগি’? কারে আজ
পরাজিত করি’ রণে, তব প্রিয়া রাজ-দুহিতারে
আনিবে হরণ করি?-সারে সারে
দলে দলে চলে তব তরঙ্গের সেনা,
উষ্ণীষ তাদের শিরে শোভে শুভ্র ফেনা!
ঝটিকা তোমার সেনাপতি
আদেশ হানিয়া চলে উর্ধ্বে অগ্রগতি।
উড়ে চলে মেঘের বেলুন,
‘মাইন্’ তোমার চোরা পর্বত নিপুণ!
হাঙ্গর কুম্ভীর তিমি চলে ‘সাবমেরিন’,
নৌ-সেনা চলিছে নীচে মীন!
সিন্ধু-ঘোটকেতে চড়ি’ চলিয়াছ বীর
উদ্দাম অস্থির!
কখন আনিবে জয় করি’-কবে সে আসিবে তব প্রিয়া,
সেই আশা নিয়া
মুক্তা-বুকে মালা রচি’ নীচে!
তোমার হেরেম্-বাঁদী শত শুক্তি-বধূ অপেক্ষিছে।
প্রবাল গাঁথিছে রক্ত-হার-
হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর-তোমার প্রিয়ার!
বধূ তব দীপাম্বীতা আসিবে কখন?
রচিতেছে নব নব দ্বীপ তারি প্রমোদ-কানন।
বক্ষে তব চলে সিন্ধু-পোত
ওরা তব যেন পোষা কপোতী-কপোত।
নাচায়ে আদর করে পাখীরে তোমার
ঢেউ-এর দোলায়, ওগো কোমল দুর্বার!
উচ্ছ্বাসে তোমার জল উলসিয়া উঠে,
ও বুঝি চুম্বর তব তা’র চঞ্চুপুটে?
আশা তব ওড়ে লুব্ধ সাগর-শকুন,
তটভূমি টেনে চলে তব আশা-তারকার গুণ!
উড়ে যায় নাম-নাহি-জানা কত পাখী,
ও যেন স্বপন তব!-কী তুমি একাকী
ভাব কভু আনমনে যেন,
সহসা লুকাতে চাও আপনারে কেন!
ফিরে চলো ভাঁটি-টানে কোন্ অন্তরালে,
যেন তুমি বেঁচে যাও নিজেরে লুকালে!-
শ্রান্ত মাঝি গাহে গান ভাটিয়ালী সুরে,
ভেসে যেতে চায় প্রাণ দূরে-আরো দূরে।
সীমাহীন নিরুদ্দেশ পথে,
মাঝি ভাসে, তুমি ভাস, আমি ভাসি স্রোতে।
নিরুদ্দেশ! শুনে কোন্ আড়ালীর ডাক
ভাটিয়ালী পথে চলো একাকী নির্বাক?
অন্তরের তলা হ’তে শোন কি আহবান?
কোন্ অন্তরিকা কাঁদে অন্তরালে থাকি’ যেন,
চাহে তব প্রাণ!
বাহিরে না পেয়ে তারে ফের তুমি অন্তরের পানে
লজ্জায়-ব্যথায়-অপমানে!
তারপর, বিরাট পুরুষ! বোঝা নিজ ভুল
জোয়ারে উচ্ছ্বসি’ ওঠো, ভেঙে চল কূল
দিকে দিকে প্লাবনের বাজায়ে বিষাণ
বলো, ‘ প্রেম করে না দুর্বল ওরে করে মহীয়ান্!’
বারণী সাকীরে কহ, ‘ আনো সখি সুরার পেয়ালা!’
আনন্দে নাচিয়া ওঠো দুখের নেশায় বীর, ভোল সব জ্বালা!
অন্তরের নিষ্পেষিত ব্যথার ক্রন্দন
ফেনা হ’য়ে ওঠে মুখে বিষর মতন।
হে শিব, পাগল!
তব কন্ঠে ধরি’ রাখো সেই জ্বালা-সেই হলাহল!
হে বন্ধু, হে সখা,
এতদিনে দেখা হ’ল, মোরা দুই বন্ধু পলাতকা।
কত কথা আছে-কত গান আছে শোনাবার,
কত ব্যথা জানাবার আছে-সিন্ধু, বন্ধু গো আমার!
এসো বন্ধু, মুখোমুখি বসি,
অথবা টানিয়া লহ তরঙ্গের আলিঙ্গন দিয়া, দুঁহু পশি
ঢেউ নাই যেথা-শুধু নিতল সুনীল!-
তিমির কহিয়া দাও-সে যেন খোলে না খিল
থাকে দ্বারে বসি’,
সেইখানে ক’ব কথা। যেন রবি-শশী
নাহি পশে সেথা।
তুমি র’বে-আমি র’ব-আর র’বে ব্যথা!
সেথা শুধু ডুবে র’বে কথা নাহি কহি’,-
যদি কই,-
নাই সেথা দু’টি কথা বই,
আমিও বিরহী, বন্ধু, তুমিও বিরহী!’
চট্টগ্রাম ৩১/০৭/১৯২৬
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/154
|
3670
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভূমিকা
|
চিন্তামূলক
|
স্মৃতিরে আকার দিয়ে আঁকা ,
বোধে যার চিহ্ন পড়ে ভাষায় কুড়ায়ে তারে রাখা ,
কী অর্থ ইহার মনে ভাবি ।
এই দাবি
জীবনের এ ছেলেমানুষি ,
মরণেরে বঞ্চিবার ভান ক ' রে খুশি ,
বাঁচা-মরা খেলাটাতে জিতিবার শখ ,
তাই মন্ত্র প ' ড়ে আনে কল্পনার বিচিত্র কুহক ।
কালস্রোতে বস্তুমূর্তি ভেঙে ভেঙে পড়ে ,
আপন দ্বিতীয় রূপ প্রাণ তাই ছায়া দিয়ে গড়ে ।
“ রহিল ” বলিয়া যায় অদৃশ্যের পানে ;
মৃত্যু যদি করে তার প্রতিবাদ , নাহি আসে কানে ।
আমি বদ্ধ ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের জালে ,
আমার আপন-রচা কল্পরূপ ব্যাপ্ত দেশে কালে ,
এ কথা বিলয়দিনে নিজে নাই জানি
আর কেহ যদি জানে তাহারেই বাঁচা ব'লে মানি ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bumeka/
|
2439
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
ডিটেকটিভ
|
ছড়া
|
ডিটেকটিভের চাকরি আমার মানুষকে ফলো করা কাজ
পায়ের চিহ্ন ধরে হেঁটে হেঁটে এখানে পৌঁছেছি আজ।
(চাকরিটা মনে হয় ছেড়েই দেব!)
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2044
|
4916
|
শামসুর রাহমান
|
পাখির ভূমিকা
|
প্রেমমূলক
|
এখন ডাকার কথা নয় তার এই মধ্যরাতে অকস্মাৎ,
তবুও এমন আর্ত কণ্ঠস্বরে উঠলো ডেকে, যেন
দিয়েছে বসিয়ে দাঁত কেউ তার বুকে হিংস্রতায়।
যেমন নিপুণ দর্জি কাঁচি দিয়ে কাটে মখমল,
তেম্নি তার ডাক নিশীথকে চিরে ঝরে ফুটপাতে,
কলোনীর ফ্ল্যাটে আর বস্তির বিনীত দোচালায়।
প্রহর প্রগাঢ় হয়, মধ্যরাতে পাখির ভূমিকা
মেনে নিয়ে বালিশের গালে খুব জোরে, গাল চেপে
চুপচাপ শূন্য এক কুটিরের কথা, দূর কোনো
বনানীর কথা ভাবি; খড়কুটো উড়ে আসে ঘরে।এবং পাখির ডাকে ঝিল, কারো স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখ,
পদচ্ছাপময় দীর্ঘ পথ, প্রাচীন যে ধাতুশিল্পী
বানায় সোনার পাখি কী তন্ময় অন্ধকার ঘরে,
তাকে, আপনার আবডালে নিজেকেই পেয়ে যাই।
মধ্যরাতে পাখি ডেকে যায়, ডেকে যায় কী একাকী,
এই ডাক শুনে শুনে এ জীবন কেটে যাবে বুঝি! (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pakhir-vumika/
|
4772
|
শামসুর রাহমান
|
তার উদ্দেশেই ন্যস্ত
|
সনেট
|
এখনো আমার কবিতার যারা আগ্রহী পাঠক
আর যারা কখনো ছুঁয়েও দ্যাখেন না এইসব
পঙ্ক্তিমালা, তাদের জরুরি মূল্যবান কলরব
স্তব্ধতায় ঝিমোলে খানিক, মুছে ফেলে কিছু ছক
আমার কবিতা এই ক্রান্তিকালে গূঢ় পর্যটক
নান্দনিক ভূমণ্ডলে। জীবনের শিঙ ধরে যুঝি
সাধ্যমতো; নানা স্তরে রূপের আড়ালে রূপ খুঁজি,
যতই ধরুন খুঁত বিজ্ঞ, সন্ধানী সমালোচক।এই শহরেই আছে একজন যার ধ্যানে কাটে
সারাবেলা, যার নাম উচ্চারণে ক্লান্তি নেই আর
যার কথাশিল্প থেকে পাই কত কবিতার শাঁস,
যার পদধ্বনি বাজে আমার সনেটে বারবার,
যাকে খুঁজে পেতে চায় কৌতূহলী জন এই বাটে,
তার উদ্দেশেই ন্যস্ত আমার এ নিঃশ্বাস, বিশ্বাস। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tar-uddeshei-naysto/
|
4042
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হৃদয়-আকাশ
|
সনেট
|
আমি ধরা দিয়েছি গো আকাশের পাখি,
নয়নে দেখেছি তব নূতন আকাশ ।
দুখানি আঁখির পাতে কী রেখেছ ঢাকি,
হাসিলে ফুটিয়া পড়ে উষার আভাস ।
হৃদয় উড়িতে চায় হোথায় একাকী
আঁখিতারকার দেশে করিবারে বাস ।
ওই গগনেতে চেয়ে উঠিয়াছে ডাকি,
হোথায় হারাতে চায় এ গীত-উচ্ছ্বাস ।
তোমার হৃদয়াকাশ অসীম বিজন,
বিমল নীলিমা তার শান্ত সুকুমার,
যদি নিয়ে যাই ওই শূন্য হয়ে পার
আমার দুখানি পাখা কনকবরন --
হৃদয় চাতক হয়ে চাবে অশ্রুধার,
হৃদয়চকোর চাবে হাসির কিরণ ।।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hridoy-akash/
|
5367
|
শুভ দাশগুপ্ত
|
প্রেম
|
প্রেমমূলক
|
৪ঠা অক্টোবর তাদের দুজনের প্রথম দেখা হল।
তখন বিকেল ঘনিয়ে আসছে। বাতাসে শীতের আমেজ।১০ই অক্টোবর তাদের দীর্ঘক্ষণ কথা হল টেলিফোনে।
সেদিন ছেলেটি নতুন কেনা টব’এ গোলাপের চারা লাগাল।৩০শে অক্টোবর রেস্টুরেন্টের নিরালা কেবিনে
ছেলেটি বলল—
তোমাকে আমি ভালবাসি।
মেয়েটি লজ্জায় মাথা নিচু করে টেবিলে আঁকিবুকি কাটল।১২ই ডিসেম্বর গোলাপগাছে কুঁড়ি ধরল।
মেয়েটি রেস্টুরেন্টে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল—
—কেন ভালবাস আমায়? আমি সুন্দরী, তাই?
—তোমার চেয়েও সুন্দরী আছে কত…
—আমার বাবার প্রচুর অর্থ—তাই?
—তোমার বাবার চেয়ে বড়োলোক এখানে কম আছে?
—তাহলে?
—ভালবাসি ভালবাসি। তার আবার কারণ হয় নাকি?
মেয়েটি বাড়ি ফিরে বন্ধুদের টেলিফোনে অনেক আলোচনা
করল। সবাই একবাক্যে বুঝিয়ে দিল—- ভালো যখন বাসে—তখন
একটা কিছু কারণ তো আছে বটেই। সেটা না বুঝে বেশি এগোস না।৩রা জানুয়ারি মেয়েটি বললো :
—আমার কাছে কী চাও?
—কই, চাইনি তো কিছু।
—ভালোবাস অথচ চাওনা—তাহলে?
—না চাহিলে যারে পাওয়া যায়
তেওয়াগিলে আসে হাতে…
—এতো গান।
—শুধুই গান?
—তা ছাড়া কী?… কিছুই যদি না চাও, তবে ভালোবাস কেন?
—ভালোবাসি, তাই ভালোবাসা দিতে চাই। চাইব কেন?
—তুমি সত্যিই অদ্ভূত!১০ই ফেব্রুয়ারি দুজনের দেখা হল মেট্রো স্টেশনের পাতালে।
ছেলেটি বললো :
—আমি কাল সারারাত বাঁশি বাজিয়েছি। সারারাত সেই সুরের
মায়াবী আলোয় তুমি নাচছিলে। অসামান্য অনন্য সে নাচ।
—ধ্যাৎ। কাল সারারাত আমি ঘুমিয়েছি।
—আমি কিন্তু তোমার নাচই দেখে গেছি সারারাত।
—তোমার বাঁশি একদিন শুনতে হবে১২ই মার্চ ছেলেটি বাঁশি বাজালো। মেয়েটি শুনলো। সময় থমকে রইল অনেকক্ষণ।
বাঁশি যখন থামল, মেয়েটির দুচোখ ভরা
জলে। বললো—
—বাঁশি শুনতে শুনতে আমার ঘুম এল আবেশে। আমি দেখলাম
আমি নাচছি। মেঘের মাঝখানে, তারাদের পাশে আমি নাচছি। আকাশে ফুলের
গন্ধ।
—ডাক্তার আমায় বাঁশি বাজাতে নিষেধ করেছেন।
—সেকি? কেন?
—বাঁশি আমায় টেনে নিয়ে যায় স্বপ্নের মধ্যে। ডাক্তার বলেছে
স্বপ্ন দেখে আমার মস্তিষ্কের শিরা উপশিরায় জট
পাকিয়ে যাচ্ছে।
—তাহলে?
—ভাবছি।১৬ই এপ্রিল মেয়েটি বললো :
— আমার বন্ধুরা বলেছে— তুমি খুউব ভালো। অসাধারণ, কিন্তু তুমি
সৃষ্টি ছাড়া। তোমার স্বপ্ন সব অর্থহীন।
—আমি জানি।
স্বপ্ন-টপ্ন ছেড়ে দিতে পারো না তুমি?
—-না।
—তাহলে… তুমি তো আমাকে হারাবে।
—তোমায় পাইনি তো কখনও!৫ই মে ছেলেটির মস্তিষ্কে অপারেশন হল। একটু সুস্থ হতে মেয়েটি
এসে বললো :
—ভাল আছ তো? এখন আর স্বপ্ন দেখছ না তো?
—দেখছি। আরও সুন্দর সব স্বপ্ন।
—তাহলে তো দেখছি operationটা আদৌ সফল হয়নি!
বাড়ি ফিরে বন্ধুদের ফোন করল মেয়েটি।
বন্ধুরা একবাক্যে বলল : বাঁশি বাজানো, স্বপ্ন দেখা, সবই backdated
সৃষ্টিছাড়া। তুই আর লোক পেলি না? তুই এত রূপসী।
তোর এত উজ্জ্বল prosppect। ভালো যদি চাস তাহলো শিগগির
বিয়ে করে ফেল তোর দাদার সেই বন্ধুকে—। উনিতো শুনলাম
কানাডাতেই settle করবেন।৭ই জুলাই মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করলো : —
—তুমি সত্যিই কী চাও বলতো?
—তুমি আরও সার্থক, আরও সুন্দর হয়ে ওঠো।
—ব্যাস! আর কিছু না
—আর! চাই স্বপ্ন দেখতে।
—ও : স্বপ্ন তাহলে তুমি ছাড়তে পারবে না?
—না।
—তাহলে থাকো তুমি স্বপ্ন নিয়ে।১২ই আগস্ট গোলাপ গাছে ফুল ফুটলো অনেক। সেদিন দুপুরে
ছেলেটির মস্তিষ্কে আবার অপারেশন হল।১৩ই সেপ্টেম্বর ছেলেটি মারা গেল।১৪ই সেপ্টেম্বর মেয়েটির শুভবিবাহ সুসম্পন্ন হল কানাডাগামী
সেই পাত্রের সঙ্গে।২০শে সেপ্টেম্বর গোলাপ গাছটি হঠাৎ ঝড়ে উপড়ে গেল।
সেদিন সন্ধ্যার বিমানে মেয়েটি হানিমুনে গেল—।
যাবার আগে বন্ধুদের বলে গেল। স্বপ্নের চেয়ে বাস্তব অনেক ভাল।
অনেক মধুর। স্বপ্ন দেখে কেবল বোকারা।৪ঠা অক্টোবর ছেলেটির মা ঝরে পড়া গোলাপ গাছটিকে
সযত্নে তুলে ফেলে দিলেন।শূন্য টবে তখন কয়েকটা পোকা, কয়েকটা মাছি।
আমরা কেউ জানিনা
ওগুলো পোকা-মাছি-না কি
ছেলেটির স্বপ্ন।
আমরা ঠিক জানিনা।
আমরা কেউই জানিনা।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae-%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%ad-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
|
2291
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ইতালি
|
সনেট
|
ইতালি, বিখ্যাত দেশ, কাব্যের কানন,
বহুবিধ পিক যথা গায় মধুস্বরে,
সঙ্গীত‐সুধার রস করি বরিষণ,
বাসন্ত আমোদে আমোদ মন পূরি নিরন্তরে;—
সে দেশে জনম পূর্বে করিলা গ্রহণ
ফ্রাঞ্চিস্কো পেতরাকা কবি; বাক্দেবীর বরে
বড়ই যশস্বী সাধু, কবি‐কুল‐ধন,
রসনা অমৃতে সিক্ত, স্বর্ণ বীণা করে।
কাব্যের খনিতে পেয়ে এই ক্ষুদ্র মণি,
স্বমন্দিরে প্রদানিলা বাণীর চরণে
কবীন্দ্র: প্রসন্নভাবে গ্রহিলা জননী
(মনোনীত বর দিয়া) এ উপকরণে।
ভারতে ভারতী‐পদ উপযুক্ত গণি,
উপহাররূপে আজি অরপি রতনে॥
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/523
|
1728
|
পাবলো নেরুদা
|
পিঙ্গলবর্ণের উচ্ছ্বল শিশু
|
চিন্তামূলক
|
অনুবাদ: ইমন জুবায়েরপিঙ্গলবর্ণের উচ্ছ্বল শিশু, সূর্য -যা সৃজন করে ফল
আর শষ্যকে করে পরিপক্ক, সমুদ্রশ্যাওলাকে করে আন্দোলিত
তোমার সুখি শরীর আর তোমার উজ্জ্বল চোখ করেছে নির্মান
আর তোমার মুখে দিয়েছে জলের হাসি।
কৃষ্ণকায় এক যন্ত্রণাকাতর সূর্যকচি পাতায় জড়ানো
তোমার কালো কেশরে যখন তুমি বাড়িয়ে দাও হাত
তুমি সূর্যালোকে খেলে বেড়াও যেনবা জোয়ারের নদী
আর তা তোমার চোখে কালো দুটি জলাশয় রেখে যায়।
পিঙ্গলবর্ণের উচ্ছ্বল শিশু, তোমার দিকে আমাকে নেয় না কিছুই
এই অপরাহ্নে সবই আমাকে টেনে সরিয়ে দিচ্ছে।
তুমি মৌমাছির উদ্দাম যৌবন,
ঢেউয়ের মাতলামি, তাপের শক্তি।
আমার ঘোর লাগা হৃদয় সবর্দা তোমায় খোঁজে
আমি তোমার সুখি শরীর ভালোবাসি, তোমার ঐশ্বর্যময় নম্র কন্ঠস্বর।
গোধূলির প্রজাপতি, মিষ্টি ও নিশ্চিত
গমক্ষেতের মতো, সূর্য, পপিফুল,আর তোমার জল।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3959.html
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.